তমসা পেরিয়ে (পর্ব-০২)

ইন্টারভিউয়ের পরে কোথায় যাবে? বাড়িতে?’ ইন্টারভিউয়ের বাইরে বেরিয়ে এই সমস্ত ব্যক্তিগত প্রশ্ন! মনে মনে তল খুঁজে পাচ্ছিল না ঋতম! আশ্চর্যের বিষয় চাকরি দিতে বসে মহিলা একের পর এক ব্যক্তিগত প্রশ্ন করে যাচ্ছেন অথচ বাকিরা কেউ কোনও কথা বলছেন না। ঋতম ধরেই নিয়েছিল ওনার হাতেই সবকিছু। তাই বাকিরা নিশ্চুপ। যাই হোক চাকরিটাও তো তার দরকার। কাজেই উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।

‘না টিউশন পড়িয়ে তবে বাড়ি ফিরব।’

‘কোথায় থাকো?’

“এখান থেকে ঠিক আধ কিলোমিটার দূরে গুরুজির আশ্রমে থাকি।’

“ওহ্ আচ্ছা সদানন্দ গুরুজির আশ্রমে? বহুবার গিয়েছি। আর তোমার মা?’

“মা অসুস্থ। মাসখানেক হল আশ্রমেরই হাসপাতালে ভর্তি।’

“ঠিক আছে, এবার তুমি যেতে পারো।’

কথাটা শোনামাত্রই শরীর রিরি করে ওঠে ঋতমের। ভাবে দু-এক কথা শুনিয়ে তারপর যাবে। কিন্তু বড়োদের অনাদর করতে তো সে শেখেনি তাই কোনওমতে সামলে নেয় নিজেকে।

ফাইল হাতে নিয়ে বেরোতে বেরোতে ভাবতে থাকে ‘সে তো চাকরিটা পাবে না ভেবে উঠেই পড়েছিল, তাহলে আবার আদিখ্যেতা দেখিয়ে বসানো কেন? যত্ত সব। একটাও তো কাজ সংক্রান্ত কিছু প্রশ্ন করল না। আর তার কী যে হল, গড়গড় করে সেও সব পেটের কথা বলে বসল। মনে মনে নিজেকেই দোষারোপ করতে থাকে সে। এ-পৃথিবীতে বরাবরই দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচার হয়ে এসেছে। ভাবতে ভাবতে ইন্টারভিউ রুম থেকে বেরিয়ে বাইরের দিকে পা বাড়াতেই পিয়োন বলে গেল, ‘কোথায় যাচ্ছেন। একটু পরেই ইন্টারভিউ-এর ফল জানানো হবে। শুনে যাবেন।’

কী এক অজানা প্রত্যাশায় বসে পড়ে বেঞ্চের এক কোণায়। কিছুতেই ওই মহিলাকে মাথা থেকে বের করতে পারছে না সে। হঠাৎই মনে পড়ে যায় তাকে প্রথম একঝলক দেখেই মহিলা কেমন যেন চমকে উঠেছিল। তারপর থেকেই তো… মাথা গুলিয়ে যাচ্ছিল ঋতমের।

অন্যসময় ইন্টারভিউয়ের ফলাফল নিজেই জানিয়ে দেন কাকলি। সেদিন যে কী হল ডিসিশন নেওয়ার পর ভারপ্রাপ্ত ম্যানেজারের উপর সমস্ত দায়িত্ব দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। ড্রাইভারের আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন না। এর আগেও বেশ কয়েকবার আশ্রমে এসেছেন। বাচ্চাদের জন্য প্রতিবার হাজারো গিট সঙ্গে করে এনেছেন। তবে এইবারের উদ্দেশ্যটা বোধহয় একটু আলাদা।

আশ্রমের গেটের ভিতর গাড়ি থামিয়ে সোজা ম্যানেজমেন্টের ঘরে। এই আশ্রমে মোটা টাকা ডোনেশন দেওয়ার কারণেই ওনার বেশ দহরম-মহরম। কাকলি-র খোঁজখবর নেওয়ার পর একজন তাকে ছেড়ে গেল কাকলির ঘরের কাছে। ঘরে ঢোকার আগে একটু ইতস্তত করলেন বটে, কী বলবেন? কেন তিনি এখানে এসেছেন? উত্তর পাওয়ার আগেই চোখে পড়ল শীর্ণকায় এক মহিলা বেড-এ শুয়ে আছেন। ওটাই ঋতমের মা কাকলি। দেখে মনে হল তার সম্পর্কে একদিন তিনি যা শুনে এসেছেন তার থেকে এক বর্ণও কম নয়। রোগের কারণে গায়ের রং খানিক চেপে গেলেও দীপ্তির ছটা আজও অব্যাহত। চুলে খানিক পাকও ধরেছে তবু টানাটানা চোখ আর টিকোলো নাকের কাছে সে-সব সামান্য খুঁত চোখে পড়ার মতো নয়। খানিক তাকিয়ে থাকার পর ধীর পায়ে তার সামনে গিয়ে হাসলেন কাকলি। একজন অচেনা অপরিচিত মহিলাকে হাসতে দেখে উঠে বসলেন তিনি। “আমি তো ঠিক….!’

“আমি কাকলি ইন্ডাস্ট্রিজ-এর মালিক কাকলি।’

নামটা শুনে ঋতমের মা কাকলিও মৃদু হেসে বললেন, ‘আমার নামও তো কাকলি। কিন্তু আপনি আমাকে কীভাবে…?’

“আপনার ছেলে আমার অফিসে ইন্টারভিউ দিতে এসেছিল।’

“ঠিক বুঝলাম না। চাকরির জন্য গেল আর আপনি…

(ক্রমশ…)

আম আদমির পায়ের নীচের জমিই টলমল

আমেরিকার হিন্ডেনবার্গ রিপোর্টে দাবি করা হয়েছিল, আদানি গ্রুপ শেয়ার দরের ক্ষেত্রে কারচুপি করেছে। শেয়ারবাজারে আদানির থাকা ৭টি লিস্টেড কোম্পানিরই ৮৫ শতাংশ নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। আদানি গ্রুপ নাকি বহু বছর ধরেই স্টক ম্যানিপুলেশন এবং অ্যাকাউন্টিং জালিয়াতিতে জড়িত। ফলে গৌতম আদানি যতই কোর্ট কেসের হুমকি দেন, হু হু করে নেমেছে তাঁর শেয়ার দর। বাজারে যখন শেয়ারের দাম ২৭৬২ টাকা তখন সেই শেয়ার আদানি বিক্রি করেছেন ৩১১৭-৩২৭৬ টাকায়।

সাধারণত একটি ব্যক্তিগত মালিকানাধীন কোম্পানির ওঠা-পড়ায় দেশের উপর তার প্রভাব থাকার কথা নয়। কিন্তু এক্ষেত্রে ঘটেছে উলটো। কারণ এই আদানি গ্রুপেই সাধারণ মানুষের টাকা থেকে শুরু করে, লাইফ ইনশিয়োরেন্স কর্পোরেশন, স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া প্রভৃতির টাকাও লগ্নি করা রয়েছে। ঋণ দেওয়ার সময় ব্যাংকগুলি সাধারণত শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেই এই টাকা দেন। আর এক্ষেত্রে সবমিলিয়ে দেশের প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়ে আছে আদানির শেয়ারে।

সাধারণ মানুষ তার কষ্টার্জিত আয়ের বড়ো অংশ হয় ২৬টি ব্যাংকের কোনওটায় কিংবা মিউচুয়াল ফান্ড-এ বিনিয়োগ করেছেন। এই ভরসাতেই তাদের বার্ধক্য, মেয়ের বিয়ে কিংবা ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খরচ সামলানোর কথা ভেবেছিলেন। সেই সঙ্গে রয়েছে অচেনা কোনও অসুখে সংক্রমিত হওয়ার ভয়। যে-সময় আদানির শেয়ারের দাম হু হু করে বাড়ছিল, বুদ্ধিমান মানুষরা চড়া দামে শেয়ার বিক্রি করে, বাড়ি, গাড়ি, অলংকার বানিয়ে নিয়েছেন।

ধনীরা কোনওদিনই এসবে প্রভাবিত হন না। প্রভাব পড়ে সাধারণ ঘরগৃহস্থ মানুষের উপর, যাদের মাসিক আয়ের থেকে ১০-২০ হাজার বা ২ থেকে ৪ লক্ষ টাকা এইসব কোম্পানি শেয়ারে বিনিয়োগ হয়ে গিয়েছে।

এছাড়া সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে সেইসব প্রোজেক্টগুলির, যেগুলি খোদ নরেন্দ্র মোদি আদানির হাতে ন্যস্ত করেছিলেন ২০১৪ সালে। কত এয়ারপোর্ট, বন্দর, রেলস্টেশন তৈরির কাজ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। হিল্ডনবার্গ রিপোর্ট তো হিমশৈলের চূড়ামাত্র। এবার বিশ্বের অজস্র খবরের কাগজ, ও বিজনেস এক্সারপার্টরা এই অনুসন্ধানে লেগে পড়েছেন, যে গোটা বিশ্বের কতগুলি দেশের আদানিরা নিজেদের ব্যাবসা প্রসারিত করে রেখেছেন। এই বিপুল অর্থসমূহ ইডির চোখ পড়বে না এই ভরসাতেই তাদের এই বাণিজ্যের জাল ছড়িয়েছিল।

আদানির টোটাল গ্যাস লিমিটেডকে ক্লিনচিট দেওয়া হয়েছে, যে-কোম্পানির মার্কেট ভ্যালু ৪২,৭৫,৫৬,৭০,০০,০০০ টাকা। এর অর্থ এই বিপুল পরিমাণ টাকা এখন বিপদসংকুল অবস্থায় রয়েছে। এর আরও একটি অর্থ হল সাধারণ মানুষের টাকা নিশ্চয়ই বিনিয়োগ হয়েছে যার সূত্র এই বিপুল অর্থরাশি।

এই বাণিজ্যের ঘোলাটে চিত্র যাতে সাধারণ মানুষের বোধগম্যের বাইরে থাকে, তাই তাদের ভোলানোর জন্য এত মন্দির, ধর্মস্থান তৈরি হচ্ছে। সেসবেই তারা নিমজ্জিত থাকলে আর টেরও পাবে না কখন পায়ের নীচ থেকে জমিটা সরে গেল।

তমসা পেরিয়ে (পর্ব-০১)

ইন্টারভিউ দিতে এসে কেমন যেন গা-টা পাক দিচ্ছে ঋতমের। একটু বাড়তি-ই টেনশন হচ্ছে আজ তার। এর আগেও তো বারকয়েক ইন্টারভিউ সে দিয়েছে। কোনওরকম ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। তবু আজ যে কী হল ওর! হয়তো মার কথা ভেবে স্নায়ুর চাপ খানিক বেড়ে গেছে। হাসপাতালে ভর্তি। ঠিক করে যে চিকিৎসা চালাবে সে ক্ষমতাও নেই তার। আশ্রমের গুরুজির দয়ায় চিকিৎসা চলছে। সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই ডাক পড়ল, নেক্সট… ঋতম রায়। নামটা শুনেই উঠে দাঁড়ায় সে। খানিক মনোবল সঞ্চয় করে। আস্তে আস্তে ইন্টারভিউ রুমে ঢুকে পড়ে।

‘মে আই কাম-ইন স্যার?’

‘ওহ্, ইয়া ইয়া।’

‘প্লিজ সিট।’

বসে ঋতম। অ্যাকাডেমিক ফাইলটা বাড়িয়ে দিতে যাবে এমন সময় ইন্টারভিউয়ার-দের মধ্যে থেকে এক মহিলা প্রশ্ন করে ওঠেন,

‘তোমার নাম?’

‘ঋতম রায়।’

‘বাবার নাম?’

‘নীহারেন্দু রায়।

ঋতম মনে মনে অবাক হয়ে যায়। এর আগেও তো সে বারকয়েক ইন্টারভিউ দিয়েছে, কোথাও তো তার নিজের নাম ছাড়া… আরও অবাক হয়ে যায় পরের প্রশ্নটা শুনে, মা-র নাম?’

“কাকলি’ নামটা বলে বোকার মতো তাকিয়ে থাকে সেই মহিলার দিকে। মহিলার চোখেমুখে এক অদ্ভুত দীপ্তি লক্ষ্য করে ঋতম। কী যেন উৎসাহ ওনার। যেন আরও কিছু জানতে চান। ভাবে ইন্টারভিউ রুমের ভিতর তো আরও জনাপাঁচেক ম্যানেজমেন্টের লোক রয়েছে— তারা তো কেউ…! অবশ্য এর মাঝে এক দাড়িওয়ালা ভদ্রলোক কিছু বলার চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু উনি থামিয়ে দেন। মহিলা তার মায়েরই বয়সি হবে। এখনও বেশ সুন্দরী। চেহারায় রয়েছে আভিজাত্যের ছোঁয়া।

‘তোমার বাবা কী করেন?’ সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে হঠাৎই এই অপ্রত্যাশিত প্রশ্নে চমকে ওঠে সে। কোনওমতে একটা বেপরোয়া জবাব দেয়, ‘আমার জন্মের আগেই বাবা, মা-কে ছেড়ে চলে গেছেন। তার পর আর ফেরেননি। মা বলেন বাবার সঙ্গে নাকি ওনার বিয়ের দিনও ঠিক হয়ে গিয়েছিল। বাবা-মা একে-অপরকে অনেকদিন ধরে ভালোবাসতেন। কিন্তু বিয়ের দিনকয়েক আগে থেকেই ওনার আর কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি।’ মুখস্তের মতো কথাগুলো বলে থেমে যায় ঋতম। বেশ আরাম লাগছে। অযথা এই সম্পর্কের চাপ বয়ে বেড়াতে আর ভালো লাগে না। কিন্তু সে নিরুপায়।

‘এই যে কথাগুলো বললে, এতে তোমার মনে হয় না কী, এর কারণে তুমি চাকরিটা না-ও পেতে পারো? নাকি সিমপ্যাথি ড্র করতে চাইছ?’

মহিলার প্রশ্ন শুনে বেশ রুক্ষভাবেই জবাব দেয় ঋতম, “চাইলে আপনারা চাকরিটা না-ই দিতে পারেন, সেটা আপনাদের অভিরুচি। তবে এটা আমার নেগেটিভিটি বলে আমি মনে করি না। এর জন্য তো সত্যিটা বদলে যাবে না। আর সিমপ্যাথি ড্র করার কথা বলছেন, ছোটো থেকে যেভাবে ঠোক্কর খেয়ে মানুষ হয়েছি তাতে এই সমস্ত ইমোশন-টিমোশন আর আমার আসে না। ধন্যবাদ,’ বলে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে ঋতম।

“উঠে দাঁড়ালে যে বড়ো? তোমাকে তো চলে যেতে বলা হয়নি।’

‘না, আপনি যেভাবে…’ কথা শেষ না করেই থেমে যায় সে।

‘আরে বোসো বোসো। এই বয়সে এত অ্যারোগ্যান্ট হওয়া ভালো নয়। তোমার চিন্তাভাবনা তো বেশ ভালো। এর আগে চাকরি করেছ কোথাও?’

“না। এই বছরেই বিকম পাশ করেছি। এখন কয়েকটা টিউশন করি।’

(ক্রমশ…)

উইকএন্ডস মস্তি উইথ Grilled Snacks

আমাদের ব্যস্ত জীবনে চটজলদি রান্নার প্রাসঙ্গিকতা অনেক বেশি। বাতাসে এখন পুজোর গন্ধ। কাজের মাঝেই মন চলে যায় শপিং, আড্ডা আর খাওয়াদাওয়ায়। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা মশলা পিষে রান্না করতেও ইচ্ছে করে না কারও কিন্তু পেট পুজো ছাড়া আড্ডা জমবেই বা কী করে? তাই এমন রান্না করতে হবে যা বিনা ঝামেলায় ঝটপট হয়ে যাবে, খেতেও হবে আঙুল চেটে খাওয়ার মতো। আজ আমরা বানাবো হার্ব চিকেন এবং জুসি মাশরুম যা খেতেও হবে সুস্বাদু এবং অল্প সময়ের মধ্যেই রান্না সেরে ফেলা যাবে।

হার্ব চিকেন

উপকরণ : ৫০০ গ্রাম বোনলেস চিকেন টুকরো করা, ১০০ গ্রাম ক্রিম, ১ ছোটো চামচ রসুনবাটা, ১-১ ছোটো চামচ পার্সলে (শুকনো), অরিগ্যানো, রোজমেরি, নুন ও গোলমরিচ।

প্রণালী : ক্রিমের সঙ্গে সমস্ত উপকরণ মেশান ও চিকেনের টুকরোয় মাখিয়ে নিন। হালকা হাতে  উলটেপালটে রাতভর ম্যারিনেট হতে দিন। গ্রিলার গরম করে চিকেনের টুকরো গ্রিল করে নিন। দু’পিঠ ভালোভাবে সেঁকে, স্যলাড, ফ্রুট স্যালাড, ডিপ বা চাটনি, যে-কোনও কিছুর সঙ্গেই পরিবেশন করতে পারেন।

জুসি মাশরুম

উপকরণ : ২৫০ গ্রাম মাশরুম, ৩/৪ কাপ দই, ১/২-১/২ ছোটো চামচ নুন ও গোলমরিচ, ১/২-১/২ ছোটো চামচ অরিগ্যানো ও চিলি ফ্লেক্স, ২ ছোটো চামচ পুদিনাবাটা, ১ ছোটো চামচ অলিভ অয়েল।

প্রণালী : মাশরুমগুলি ময়দা মাখিয়ে রগড়ে ধুয়ে নিন। এবার মাঝখান বরাবর চিরে নিন। দইয়ের সঙ্গে মশলা, তেল ও পুদিনা মিশিয়ে নিন। মাশরুমের উপর ছড়িয়ে হালকা হাতে মেখে নিন। ৩-৪ ঘণ্টা ঢেকে রাখুন। গ্রিলার গরম করে, শিকে গেঁথে গ্রিল হতে দিন। চাটনি, সস, গরম আলু ও মটরশুঁটি সেদ্ধ বা ফল— যে-কোনও কিছুর সঙ্গেই এটা পরিবেশন করা যায় ।

নারীদের কতটা স্বাধীনতা, কতটা বশ্যতা ?

পরিবারে মেয়েদের কতটা স্বাধীনতা থাকা উচিত, আর কতটা বশ্যতা স্বীকার করা উচিত— তা রীতিমতো আলোচনার বিষয় হতে পারে।মেয়েদের জীবন জন্মকাল অবধি নানা অনুশাসনের শৃঙ্খলে বাঁধা থাকে৷  ছোটো থেকেই একটি পরিবারে মেয়েদের নিয়ন্ত্ৰণমূলক ও ভয়ের একটা পরিবেশে আবদ্ধ রাখা হয়। বাইরের পৃথিবীটা কেমন বা কতটা উপদ্রুত তার কোনও সঠিক আন্দাজ মেয়েদের দেওয়া হয় না। এর ফলে বৃহত্তর সমাজে যখন মেয়েদের ঘোরাফেরা করতে হয়, তখন তারা মানসিক ভাবে প্রস্তুত থাকে না। ফ্রয়েড বলেন, আমরা স্বাধীনতা আসলে পছন্দ করি না। কারণ স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে কিছু দায়িত্বশীলতাও বহন করতে হয়, যা আমরা সামলাতে পারি না।

এই প্রজন্ম দায়িত্বভার নিতে অস্বীকার করে। এর কারণ তাদের রেসপনসিবিলিটি সেন্সটাই গড়ে ওঠে না। অধিকাংশ ভারতীয় পরিবারে মেয়েটি কী খাবে, কী পরবে, কতদূর পঠনপাঠন করবে, সবই ঠিক করে রাখে তার পরিবার। ছোটো থেকেই তাকে কোনও দায়িত্ব নিতে শেখানো হয় না। বয়স হলে তাকে বিয়ে দিয়ে আরেকটি পরিবারের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়। এই পর্যায়গুলি পেরোতে গিয়ে সে আর স্বাধীন ভাবে বাঁচার স্বাদটাই পায় না।

ভারতে ধর্মীয় স্থানগুলিতে মহিলাদের ভিড় বেশি। এর কারণ মহিলারা নিজেরা যে-দায়িত্বভার নিতে অক্ষম, তা প্রশ্নাতীত ভাবে ঈশ্বরের কাঁধে তুলে দিতে চায়। তারা এই নাগপাশেই আবদ্ধ থাকতে চায়। মুক্তির কথা কেউ ভাবেও না।

অর্থ উপার্জনকারী মহিলারাও অধিকাংশ ক্ষেত্রে অর্জিত অর্থ স্বামীর হাতে তুলে দেন। এদিকে সংসারের সমস্ত কাজ, গেরস্থালি থেকে বাচ্চা সামালানোর দায়িত্বও মহিলাদের উপরেই বর্তায়। কেউ ভাবে না বধূটি সেই কাজ কতটা নিজের ইচ্ছেয় করে আর কতটা তার বশ্যতা। অর্থাৎ এক্ষেত্রেও নিজের ইচ্ছে কায়েম করার কোনও স্বাধীনতা তার নেই। এই স্বাধীনতার অভাবেই মেয়েরা ক্রিয়েটিভ কাজে বাধাপ্রাপ্ত, কোনও রিস্ক নিতে তারা দ্বিধান্বিত, বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়তে অক্ষম।

বশ্যতার এই মানসিকতা মেয়েদের সৃষ্টিশীল হওয়ার পথে প্রধান অন্তরায়। কিন্তু সমাজ তো তৈরি করে মানুষই। সেই সমাজে পুরুষদের তৈরি করা অনুশাসনও যেমন আছে, তেমনি মহিলারাও নিজেদের শৃঙ্খলা ভেঙে বেরোতে চান না। একসময় এই নতিস্বীকারের মানসিকতাই তাকে আরও বেশি বেড়ি পরিয়ে দেয়। আইন, আদালত, সমাজ সর্বক্ষেত্রেই তাদের পরাধীনতায় আটকা পড়ে যেতে হয়।

চটপটা ভেজি বারবিকিউ

বাটার জ্যাকেট পট্যাটোজ

উপকরণ : ৮-১০টা মাঝারি আকারের আলু, ১/২ বড়ো চামচ তেল, ১/২ কাপ মাখন, নুন, চাটমশলা প্রয়োজনমতো, ১টা লেবুর রস।

প্রণালী : আলু ধুয়ে একটি কাঁটার সাহায্যে আলুর গায়ে বেশ কিছু ছিদ্র করে নিন। হাতে ঘি বা মাখন লাগিয়ে আলুর গায়ে হাতটা ভালো ভাবে মাখিয়ে নিন। এবার আলুগুলো গ্রিলারে রাখুন বা শিকে গেঁথে নিন। উপর থেকে গলানো মাখন আর লেবুর রস ও নুন ছড়িয়ে গ্রিল করুন। সেদ্ধ হয়েছে বুঝলে গ্রিলার থেকে বের করে পুনরায় মাখন মাখিয়ে আরও একবার গ্রিল হতে দিন। গরম গরম জ্যাকেট পট্যাটোজগুলি ডিপ চাটনি, সস ও স্যালাডের সঙ্গে পরিবেশন করুন। প্লেটে সার্ভ করার আগে অবশ্যই আলুর উপর চাটমশলা ছড়িয়ে দিন।

স্পাইসি টম্যাটো

উপকরণ : ৪-৫টা মাঝারি আকারের টম্যাটো, ১-২ ছোটো চামচ অলিভ অয়েল, অরিগ্যানো, নুন ও চাটমশলা, গোলমরিচ স্বাদমতো।

প্রণালী : টম্যাটোগুলি ধুয়ে অল্প মাখন হাতে নিয়ে মাখিয়ে নিন। একটু নুন-ও বুলিয়ে নেবেন একই সঙ্গে। এরপর শিকে গেঁথে গ্রিল করুন। টম্যাটো সেদ্ধ হয়ে খোসাটা ফাটাফাটা হয়ে এলে বের করে নিন। ২ ভাগে কেটে চাটমশলা, গোলমরিচ ছড়িয়ে পরিবেশন করুন।

টেস্টি পনির

উপকরণ : ৫০০ গ্রাম পনির, ১/৪ কাপ দই, ১/২ কাপ টম্যাটো পিউরি, ৩/৪ ছোটো চামচ নুন, ১/৪ ছোটো চামচ লংকাগুঁড়ো, ১/৪ ছোটো চামচ রসুনবাটা, ১/২ ছোটো চামচ অলিভ অয়েল।

প্রণালী : দই, টম্যাটো পিউরি, নুন, লংকাগুঁড়ো, রসুন আর তেল একসঙ্গে মেশান। পনিরগুলি চৌকো টুকরোয় কেটে নিন। টুকরোগুলির উপর দই ছড়িয়ে হালকা হাতে মাখিয়ে নিন। ৩-৪ ঘণ্টা ঢেকে রাখুন। গ্রিল গরম করে নিন। জালের র‍্যাকটায় মাখন মাখান। পনিরের টুকরোগুলো এর উপর রেখে অল্প অলিভ অয়েল ছড়িয়ে দিন। সস, চাটনি ডিপ, স্যালাড সহযোগে পরিবেশন করুন।

ম্যারিনেটেড কপি

উপকরণ : ১টা ফুলকপি, ১/২ কাপ দই, ২ বড়ো চামচ কাচালংকা বাটা, পুদিনা আর ধনেপাতা চাটনি, চাটমশলা, গোলমরিচ প্রয়োজনমতো, ১ ছোটো চামচ অলিভ অয়েল, ১টা লেবুর রস।

প্রণালী : দইয়ের সঙ্গে অলিভ অয়েল, চাটনি, নুন ও মশলা মিশিয়ে নিন। লেবুর রস ছড়িয়ে ফুলকপির টুকরো দইয়ে ম্যারিনেট করুন। ৫-৬ ঘণ্টা পরে শিকে গেঁথে গ্রিল করুন। ডিপ, স্যালাড, ধনেপাতার চাটনির সঙ্গে পরিবশেন করুন।

 

ওড়িশা সফর-কথা (শেষ পর্ব)

আজও খুব ভোরে বিছানা ছেড়েছি । চা-প্রাতরাশ সেরে সকাল ৮টায় জিপে চড়ে বসেছি। গন্তব্য গন্ধমাদনের বিপরীত ঢালে ৮০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হরিশংকর মন্দির। পান্থশালার ম্যানেজারকে বলে গেলাম, আমরা ফিরে এসে লাঞ্চ করব, যদি একটু দেরিও হয়। ড্রাইভার সন্তোষ তার নামের প্রতি সুবিচার করে সদাপ্রসন্ন। কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়ি চলে এল নুয়াপাড়া রোড-এ। প্রায় ঘণ্টাখানেক চলার পর গাড়ি ডান দিকে বাঁক নিল এবং আধ ঘণ্টা পরেই পৌঁছোলাম হরিশংকর মন্দিরের কাছে। এই মন্দির ভগবান বিষ্ণু (হরি) এবং মহাদেব শিব (শংকর)-এর নামে পরিচিত। মতান্তরে, বিষ্ণুভক্ত হরি শবর-এর নামেই মন্দিরের পরিচিতি। গাড়ি থেকে নেমেই দেখি, পাহাড় থেকে এক ঝরনা নেমে এসেছে মন্দিরের কাছে। হরিশংকর-এর এই মূর্তি আবিষ্কৃত হয় চৌহান বংশীয় এক রাজার দ্বারা, সেই চতুর্দশ শতাব্দীতে। নৃসিংহনাথ ও হরিশংকর মন্দির দুটির মাঝের উপত্যকা থেকে পাওয়া যায় বৌদ্ধ যুগের বহু ধ্বংসাবশেষ। মনে করা হয়, সেগুলি প্রাচীন বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয় পরিমলগিরির ধ্বংসস্তূপ। আরও আবিষ্কৃত হয়, দ্বাদশ শতাব্দীতে তৈরি পর্বতগাত্রে খোদিত নৃত্যরত গণেশের চিত্র। এই মন্দির তৈরি করান মহারাজ বৈজলদেব-এর মহারানি দুর্লভা দেবী। মন্দিরে মহাদেব, রাম-সীতা প্রভৃতি বিগ্রহ দর্শন করে জিপে চড়ে বসলাম।

হরিশংকর থেকে যাওয়া যায় ১১০ কিমি দূরে অবস্থিত পাটোরা ড্যাম এবং যোগেশ্বর মহাদেব মন্দির। আমরা সেদিকে না গিয়ে ফিরে চললাম নৃসিংনাথ-এর পথে। গন্ধমাদনের গহনে পৌঁছে দেখতে হবে আরও কয়েকটি সুন্দর স্থান। বেলা ১টার মধ্যেই ফিরে এলাম পান্থশালায়। দ্রুত স্নান সেরে নিয়ে সবাই লাঞ্চ করতে বসলাম। ভাত-ডাল-তরকারির সঙ্গে সুস্বাদু মাছ পেয়ে আমরা সবাই খুশি। গতকাল থেকেই পান্থশালার ম্যানেজার-এর আতিথ্যে বার বার মুগ্ধ হয়েছি আমরা।

আজই শেষ দিন নৃসিংহ নাথ-এ। লাঞ্চ-এর পর তাই আর বিশ্রাম নিয়ে আবার জিপের সওয়ারি হলাম। চলেছি গহন জঙ্গলপথে কপিলধারা ও সুপ্তধারা দর্শন করতে। প্রায় ৪০ মিনিট পরে এসে পৌঁছোলাম বড়ো বড়ো পাথরে ভরা এক জায়গায়। জিপ থেকে নেমে একটু এগিয়ে অবাক বিস্ময়ে দেখি, প্রায় ১০০ ফুট উপর থেকে এক শুভ্র জলধারা পাথরে ধাকা খেতে খেতে প্রবল বেগে নেমে আসছে। সূর্যের আলো সেই ধাবমান জলধারায় প্রতিফলিত হচ্ছে। মিনিট ১৫ সেখানে কাটিয়ে আবার চড়ে বসলাম জিপে । গাড়ি চলল সুপ্তধারা-র পথে। জঙ্গল পথে প্রায় মিনিট ২০ জিপযাত্রার পর এসে পৌঁছোলাম গন্তব্যে। সে এক ভারি সুন্দর এবং ততটাই নির্জন স্থান। সমগ্র অঞ্চলে আমরা ছাড়া আর কোনও টুরিস্ট নেই। প্রাচীন, অখণ্ড নীরবতাকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করলাম আমি।

প্রসঙ্গত জানাই, সমগ্র গন্ধমাদন-এ চোখে পড়েনি একটিও কাক। কারণ অনুসন্ধান করে জানলাম, পাহাড়ের বক্সাইট জলে মিশে তা অপেয় হয়ে পড়ে কাকেদের জন্য। তাছাড়া, জঙ্গলের ভেষজ গাছপালার তীব্র গন্ধও কাকেদের অনুপস্থিতির অন্যতম কারণ। অন্য পাখীদেরও বিশেষ দেখিনি এই অঞ্চলে।

পরদিন সকাল। ঘুম থেকে উঠেছি একটু দেরিতে। সকালের মিষ্টি রোদে বারান্দায় বসে চা খেলাম। নির্মল প্রকৃতির প্রেক্ষাপটে আমার মনে এক অব্যাখ্যাত আনন্দ ৷ গন্ধমাদনে নৃসিংহনাথ ও হরিশংকর স্থান দুটি ভারি সুন্দর। স্নান সেরে সকাল ৯টায় প্রাতরাশ করতে বসলাম। গরম ইলি-বড়া-সাম্বার-এ আড়ম্বরহীন খাওয়া। সন্তোষ এসে বলল, বেলা ১০টার মধ্যেই বার হতে হবে। লাগেজ বাঁধা হল বোলেরোর ছাদে। ম্যানেজারের সঙ্গে করমর্দন সেরে বিদায় জানালাম নৃসিংহনাথকে । গাড়ি ধীরে ধীরে গন্ধমাদনের পাহাড়ি পথ দিয়ে নেমে এসে পৌঁছোল সমতল রাস্তায়। পিছন ফিরে তাকালাম না। আর, পাছে আরও মন খারাপ হয়।

কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য:

কীভাবে যাবেন: এই লেখায় বেড়ানোর যে জায়গাগুলোর উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো রাউরকেলা অথবা সম্বলপুরকে কেন্দ্র করে দেখা যেতে পারে। মুম্বাই বা আমেদাবাদগামী যে- কোনও ট্রেনে চেপে রাউরকেলা স্টেশনে চলে আসুন। স্টেশন থেকে ২ কিলোমিটারের মধ্যে বিভিন্ন বাজেটের কম করেও ৩০টি হোটেল পাবেন। সেখানে থেকে এক এক করে দেখে নিন জায়গাগুলো। রাউরকেলায় থাকলে আরও দেখে নিন হনুমান মন্দির, ইন্দিরা পার্ক, নেহরু পার্ক এবং ডিয়ার পার্ক।

সম্বলপুরকে কেন্দ্র করে ঘুরতে চাইলে ১২৮৭১ হাওড়া- তিতলাগড় ইস্পাত এক্সপ্রেস, ১৮০০৫ হাওড়া-জগদলপুর সম্বলেশ্বরী এক্সপ্রেস ধরে চলে আসুন সম্বলপুর স্টেশনে। সেখান থেকে প্রথমে সম্বলপুরের আশেপাশে দর্শনীয় জায়গাগুলো দেখে চলে আসুন গন্ধমাদনের নৃসিংহনাথ ও হরিশংকর-এ। তারপর ফেরার পথে রাউরকেলা স্টেশনে নেমে দু’দিনে দেখে নিন বাকি জায়গাগুলো।

কোথায় থাকবেন: রাউরকেলা বা সম্বলপুরে থাকার জন্য হোটেলের অভাব নেই। বড়গড়-এও ৩-৪টি মাঝারি মানের হোটেল আছে।

কখন যাবেন: এই জায়গাগুলো দেখার জন্য সেরা সময় অক্টোবর থেকে মার্চ মাস।

ওড়িশা সফর-কথা (পর্ব ৪)

ভোর হচ্ছে৷ সূর্যের নরম আলো ক্রমশ প্রকাশিত হচ্ছে। সাড়ে ৮টার মধ্যেই সবার স্নান-প্রাতরাশ সারা। জিপে চেপে প্রথমে চলেছি ৬ নং জাতীয় সড়ক ধরে ১৫ কিমি দূরে মহানদীর বুকে হীরাকুদ বাঁধ দেখতে। এই বাঁধ স্বাধীন ভারতের প্রথম ও প্রধান ‘রিভারভ্যালি প্রোজেক্ট’গুলির অন্যতম। ১৯৫৩ সালে ড্যাম তৈরি সম্পূর্ণ হয় এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত নেহরু এর উদবোধন করেন ১৯৫৭ সালে। গাড়ি পৌঁছোল ড্যাম-এর কাছে। জওহর মিনারে উঠে দেখলাম পিছনে সুবিশাল হীরাকুদ জলাধার, যার দৈর্ঘ্য ৫৫ কিমি। প্রধান ড্যামের দৈর্ঘ্য ৪৮ কিমি যা বাঁয়ে লামডুংরি থেকে ডাইনে চান্ডিলিডুংরি পাহাড় পর্যন্ত বিস্তৃত। সে এক চোখ ধাঁধানো দৃশ্য। ড্যাম থেকে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন এবং জলসেচ শুরু হয় ১৯৫৬ সালে। এশিয়ার দীর্ঘতম মাটির তৈরি বাঁধ হীরাকুদ সমগ্র ভারতের গর্ব।

দীর্ঘ যাত্রায় এবার আমরা চলেছি গন্ধমাদন পর্বতে অবস্থিত নৃসিংহনাথ মন্দির দেখতে। এই গন্ধমাদন পর্বতের বিস্তৃতি ওড়িশার বড়গড় ও বোলাঙ্গির জেলাদুটির মাঝে। বক্সাইট-এর বিপুল ভাণ্ডার এই পর্বতে। রামায়ণখ্যাত গন্ধমাদন পর্বত ভেষজ উদ্ভিদের আকর। বোটানিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া-র রিপোর্টে ২২০টি ভেষজ উদ্ভিদ প্রজাতির উল্লেখ আছে, যদিও স্থানীয় অধিবাসীরা মনে করেন কম করেও ৫০০ প্রজাতির উদ্ভিদ পাওয়া যায় এই পর্বতে। সেই কারণে ১০০ জনেরও বেশি ঐতিহ্যবাহী আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকের বাস গন্ধমাদন ঘিরে, যাঁরা প্রায় ৫০,০০০ আদিবাসীর চিকিৎসা করে থাকেন। এই পর্বতের দুই প্রান্তে, বড়গড় ও বোলাঙ্গির জেলায় দুটি আয়ুর্বেদিক কলেজ ও চিকিৎসালয় অবস্থিত। স্থানীয় আদিবাসীদের অনেকেরই প্রধান জীবিকা ভেষজ উদ্ভিদ সংগ্রহ করা এবং সেগুলি নামমাত্র মূল্যে বিখ্যাত কিছু ওষুধ কোম্পানিকে যোগান দেওয়া। স্থানীয় অধিবাসীদের সক্রিয় আন্দোলন গন্ধমাদনের জৈব বিবিধতাকে বাঁচিয়ে রেখেছে আজও।

সম্বলপুর থেকে নৃসিংহনাথ মন্দির প্রায় ১৭০ কিলোমিটার দূরে। নিকটতম স্টেশন বড়গড় রোড থেকে মন্দিরের দূরত্ব প্রায় ১১০ কিমি। বেলা ১১টা নাগাদ বড়গড়-এ পৌঁছে ১০ মিনিটের চা-বিরতি পেলাম। এবার ৬ নং জাতীয় সড়ক ধরে সোহেলা পৌঁছোলাম, তারপর বাঁদিকে বেঁকে রায়পুরগামী নুয়াপাড়া রোড ধরে পৌঁছে গেলাম পাইকমল। বেলা সাড়ে ১২টা বাজে। এবার আবার বাদিকে বেঁকে ৪-৫ কিমি পথ পার হয়ে পৌঁছোলাম বহু আকাঙ্খিত নৃসিংহনাথ-এ। গন্ধমাদনের উত্তর ঢালে অবস্থিত এই মন্দির বড়গড় জেলায় অবস্থিত। মন্দিরের অনেকটা আগে থেকেই গন্ধমাদনের বহু-বিচিত্র, ছোটোবড়ো ভেষজ গাছপালার নিমন্ত্রণ মনকে ভরিয়ে দিল এক অনাবিল আনন্দে। কলকাতার উৎকল ভবন থেকে পান্থশালায় দুটি ঘর বুক করে রাখা ছিল। পান্থশালার অবস্থান মন্দিরের কিছু আগে গাছপালায় ঘেরা এক মনোরম পরিবেশে। শাল, পিয়াশাল, মেহগনি, জারুল-সহ আরও নানা প্রকার বৃক্ষরাজির সমাবেশ সেখানে। আমাদের ঠাই হল দোতলায়। ঘরের পিছনে বারান্দা, আর তার পিছনেই জঙ্গল। প্রথম দর্শনেই আমাদের চোখ ও মন কেড়ে নিল সেই পরিবেশ।

গন্ধমাদন পর্বতের উল্লেখ আছে রামায়ণে, মহাভারতে, ভোগরাজের স্মৃতিকথায়, নাগার্জুন-এর পুস্তকে এবং সন্ত কবীরের লেখায়। রামায়ণে বর্ণিত আছে, রাবণপুত্র ইন্দ্রজিতের শক্তিশেলে আহত, মৃতপ্রায় লক্ষণ-এর প্রাণরক্ষার জন্য পবনপুত্র হনুমান যখন বিশল্যকরণী সমেত হিমালয়ের এক বিশাল পর্বতখণ্ড কাঁধে চাপিয়ে আকাশপথে আসছিলেন, তখন সেই পর্বতখণ্ডের কিছুটা অংশ এই অঞ্চলে পতিত হয়। সেই অংশই পরে গন্ধমাদন (গন্ধমর্দন) পর্বত নামে পরিচিতি লাভ করে। বিখ্যাত চিনা পর্যটক হিউয়েন সাং এই পর্বতের এক বিশেষ স্থানকে ‘পো-লো-মো-লো-কি-লি’ (পরিমলগিরি) নামে উল্লেখ করেন। তাঁর ভ্রমণকালে এইস্থানে একটি বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয় ছিল। ইতিহাস থেকে জানা যায়, পাটনাগড়ের রাজা বৈজল সিংদেব নৃসিংহনাথ মন্দিরের ভিত্তিস্থাপন করেন ১৩১৩ সালের ১৭ মার্চ। ৪৫ ফুট উঁচু মন্দিরের দুটি অংশ– প্রথম অংশে নৃসিংহনাথ-এর আসন, দ্বিতীয় অংশ জগমোহন-এর জন্য নির্দিষ্ট। মন্দিরে তিনটি দরজা, প্রতিটাই চারটি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে। মন্দিরের পাথরে তৈরি দরজা এবং কষ্ঠিপাথরে নির্মিত বিগ্রহ, মার্জার কেশরী বিষ্ণু বা বিড়াল নৃসিংহ মূর্তি অত্যন্ত আকর্ষণীয়।

মন্দিরের পাশ দিয়ে সিঁড়ি উঠে গেছে পাপহরণ নালা পার গন্ধমাদনের জঙ্গলে। মন্দির থেকে চালধারা, ভীমধারা এবং সীতাকুণ্ডের দূরত্ব যথাক্রমে ৪০০, ৪২৫ এবং ৫০০ মিটার। জঙ্গলের ভিতরে ৪ কিমি ও ৭ কিমি দূরত্বে কপিলধারা ও সুপ্তধারা। এইসমস্ত ঝরনা ধারা মিলিত হয়ে মন্দিরের কাছে সৃষ্টি করেছে পাপহরণ নালা । ভক্তজনের বিশ্বাস, এই পাপহরণ নালায় স্নান করে পাপমুক্ত হওয়া যায়। জনমানসে বিশ্বাস, পঞ্চপাণ্ডব বনবাসকালে এই স্থানে কিছু সময় কাটিয়ে যান।

জঙ্গল ও পাহাড়ের প্রেক্ষাপটে বিকেল সাড়ে ৪টেয় চা পান করলাম সকলে মিলে। সন্ধে নেমেছে গন্ধমাদনে। সকলে চললাম মন্দির অভিমুখে সন্ধ্যারতি দর্শনে। সন্ধে ৬টায় শুরু হ’ল আরতি। নিস্তব্ধ, পাহাড়ি জঙ্গলময় পরিবেশে দেবারতির স্নিগ্ধ আলোর ছটা এবং কাঁসর-ঘণ্টা-ঢাকের শব্দ তৈরি করল এক অচেনা মায়াময় পরিবেশ। সন্ধ্যারতি শেষ হলে কেউ কেউ পুজো দিল। পান্থশালায় ফিরলাম সন্ধে সাড়ে ৭টায়। চা-পকোড়া সহ গল্প চলল বেশ কিছুক্ষণ। রাত ৯টায় সেরে নিলাম পরিচ্ছন্ন, তৃপ্তিকর নিরামিষ ডিনার।

(চলবে)

ওড়িশা সফর-কথা (পর্ব ৩)

এবার গাড়ি চলেছে সম্বলপুরগামী জাতীয় সড়ক ধরে। রাউরকেলা থেকে প্রায় ১৮০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে বেলা ১টা নাগাদ আমরা এসে পৌঁছোলাম সম্বলপুর-এ। মহানদীর তীরে অবস্থিত এই জেলাশহর দোকান-বাজার-হোটেল, স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটি, কোর্ট- পোস্ট অফিস-ব্যাংক নিয়ে বেশ ব্যস্ত ও জমজমাট। আমাদের গাড়ি এসে থামল একেবারে সমলেশ্বরী মন্দিরের কাছে।

মন্দিরে পূজিতা মা সমলেশ্বরী (সামালাই মা) পশ্চিম ওড়িশা এবং প্রতিবেশী রাজ্য ছত্তিশগড়-এ এক প্রভাবশালী ধর্মীয় শক্তি। প্রাচীনকাল থেকেই মা সমলেশ্বরী পূজিতা জগৎজননী, আদিশক্তি, মহালক্ষ্মী এবং মহাসরস্বতী রূপে। গ্রানাইটের মতো শক্ত পাথরে তৈরি মন্দিরের দুটি অংশ। ১২টি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে ১০ ফুট চওড়া আচ্ছাদিত প্রদক্ষিণস্থল এবং বর্গাকৃতি গর্ভগৃহ চার-সিঁড়ি নীচে। গর্ভগৃহের বাহির দেয়ালে ১১ জন পার্শ্বদেবীর মূর্তি খোদিত। মা সামালাই দেবীর মূর্তি গঠিত এক প্রানাইট প্রস্তরখণ্ডে যা থেকে বেরিয়ে এসেছে শুঁড়ের মতো অংশ। বরাহরূপী মা সমলেশ্বরী স্থানীয় ভক্তজনের কাছে পরম আরাধ্যা।

গাড়ি ঘুরিয়ে সোজা পৌঁছোলাম পান্থনিবাসে। দুটি ঘর বুক করা ছিল আমাদের নামে। দুপুর দেড়টা বাজে। হাত-মুখ ধুয়ে সবাই ছুটলাম ডাইনিং রুমে। খিদের মুখে ভাত-ডাল-তরকারি এবং মাছের ঝালকে অমৃত সমান মনে হল। ড্রাইভার সন্তোষও লাঞ্চ সারল আমাদের সঙ্গেই। যাত্রার পরিশ্রম ছিল না তেমন। তাই দুপুর আড়াইটে বাজতেই আবার আমরা জিপের সওয়ারি হলাম। উদ্দেশ্য, ২৮ কিমি দূরে হুমা গ্রামে মহানদীর তীরে অবস্থিত বিমলেশ্বর মহাদেব মন্দির দর্শন। গাড়ি শহর ছাড়াতেই রাস্তার দু’পাশে ধূসর সবুজের আহ্বান। ৬ নং জাতীয় সড়ক ধরে প্রায় ৫ কিমি যাবার পর ডানদিকে বেঁকে রাজ্য সড়ক ধরে আরও প্রায় ২০ কিমি এগোলাম। গাড়ি আবার ডানদিকে বাঁক নিয়ে গ্রাম্যপথে ৩-৪ কিমি এগোতেই পৌঁছে গেলাম হুমা-য়।

হুমার বিমলেশ্বর মহাদেব মন্দির অতি প্রাচীন। এই মন্দিরের নির্মাণ নিয়ে রয়েছে অনেক গল্প, উপকথা এবং অস্পষ্টতা। তবে অলিপিবদ্ধ ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, মন্দির প্রথমে নির্মিত হয় চৌহান বংশীয় প্রথম রাজা বলরাম দেব দ্বারা এবং সবশেষে ১৬১৭-১৬৫৭ খ্রীস্টাব্দের মধ্যে, সম্বলপুরের রাজা বীর বালিয়ার সিং দ্বারা মন্দির নির্মাণ সম্পূর্ণ হয়। মহাদেবের দৈনন্দিন পুজো ও ভোগ-এর ব্যয় নির্বাহের জন্য রাজা নিকটস্থ কয়েকটি গ্রাম (হুমা, পুলপুতঙ্গা, মাহেল, ধাতুকাপালি, গঙ্গাধরপালি, ভৈরোপালি)-এর স্বত্ব দান করেন গ্রামের হোতা ব্রাহ্মণ পরিবারকে। বিশেষজ্ঞদের মতে হুমার বিমলেশ্বর মন্দির উত্তর-পূর্ব দিকে ৫ থেকে ৬ ডিগ্রি হেলে দাঁড়িয়ে আছে। ২৫ ফুট উঁচু মন্দিরের চারিপাশে তৈরি করা হয়েছে ভারবহনকারী দালান তার আরও হেলে যাওয়া আটকাতে।

মন্দিরের হেলানো-গঠনের সঠিক কারণ আজও অজ্ঞাত প্রকৃত গবেষণার অভাবে। তাই এ ব্যাপারে বহুমত। কেউ কেউ বলেন, মন্দির তৈরির পরেই নাকি বজ্রপাতের শব্দ শোনা যায় এবং তারপর থেকেই মন্দির হেলে যায়। অন্যেরা বলেন, মহানদীর তীব্র জলস্রোতের কারণে মন্দির উত্তর-পূর্ব দিকে হেলে যায়। মাটির গঠনকেও মন্দির হেলে থাকার কারণ বলে মনে করেন অনেকে। মন্দিরের বিমলেশ্বর মূর্তিটির বিশিষ্টতা লক্ষ্যণীয়। মন্দিরের পিছন থেকে এক বাঁধানো সিঁড়ি নেমে গেছে মহানদীর কাছে— তার নাম মাচিন্দ্রা ঘাট। বড়ো বড়ো পাথরে পূর্ণ নদীখাত, অন্যপাড়ে সবুজ বনানী — সব মিলিয়ে এক মনোরম দৃশ্য। হুমার হেলানো মন্দির মনে করিয়ে দেয় ইতালির বিখ্যাত হেলানো মিনার ‘পিসা’-র কথা।

সন্তোষ ততক্ষণে গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়েছে। এবার আমরা চলেছি চিপলিমায় ‘মা ঘণ্টেশ্বরী মন্দির দেখতে। সম্বলপুর থেকে চিপলিমার দূরত্ব প্রায় ৩৩ কিলোমিটার। মহানদীর তীরে অবস্থিত এই মন্দিরে দূর দূর থেকে পূণ্যার্থীরা আসেন। মানত (ইচ্ছা) পূর্ণ হলে তাঁরা ঘণ্টা বেঁধে দিয়ে যান। অসংখ্য ছোটো বড়ো ঘণ্টার সমাবেশ মন্দির চত্বরে। বহুপূর্বে নাবিকদের তৈরি এই মন্দিরকে বলা হতো ‘আলোকহীন লাইটহাউস’। কারণ অসংখ্য ঘণ্টাধ্বনি নাবিকদের জানিয়ে দিত আসন্ন ঝড়ের সংকেত। চিপলিমা হাইড্রো পাওয়ার প্ল্যান্ট মন্দিরের কাছেই নদীতীরে। নদীবুকে লম্বা, সরু সেতু পেরিয়ে পৌঁছোতে হয় মন্দিরে, বেশ অন্যরকম পরিবেশ মা ঘণ্টেশ্বরী মন্দির চত্বরে।

সন্ধে ঘনিয়ে আসছে। আমরা দ্রুত ফিরে আসছি রাত্রিবাসের আস্তানা, সম্বলপুর-এর পান্থনিবাস-এ। সন্ধে সাড়ে ছ’টার পর আমরা ডেরায় ফিরলাম৷ সারাদিনের যাত্রাজনিত ক্লান্তির অনেকটাই দূর হল গরম চা-এ। রাতে গরম রুটি ও পনির-মশালায় ডিনার সেরে সবাই সটান বিছানায়।

(চলবে)

বন্ধ্যাত্বের সমস্যা এবং সঠিক পদক্ষেপ

গর্ভ-নিরোধক ছাড়া নিয়মিত যৌন মিলনের ১২ মাস পরেও যদি গর্ভধারণ না হয়, তাহলে সেই অবস্থাকে চিকিৎসকরা বন্ধ্যাত্ব সন্দেহ করেন। সম্ভাব্য কারণগুলির মধ্যে রয়েছে পুরুষদের মধ্যে শুক্রাণুর স্বল্পতা এবং মহিলাদের ডিম্বস্ফোটনের সমস্যা। এই বিষয়ে বিশদে জানিয়েছেন কলকাতার টেকনো ইন্ডিয়া ডামা হাসপাতাল-এর কনসালট্যান্ট অবস্টেট্রিসিয়ান অ্যান্ড গাইনিকোলজিস্ট ডা. সুনীপা চট্টোপাধ্যায়।

বন্ধ্যাত্ব কী?

বন্ধ্যাত্ব হল যখন একজন পুরুষ বা মহিলা উভয় সঙ্গীর প্রজনন সিস্টেমের সমস্যা হয়, তখন গর্ভধারণ করতে পারে না। পুরুষ বা মহিলা প্রজনন সিস্টেমে বন্ধ্যাত্ব বিভিন্ন কারণে হতে পারে। তবে অনেক সময় বন্ধ্যাত্বের কারণ ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয় না।

বন্ধ্যাত্বের রকমফের

সাধারণত দু’রকম বন্ধ্যাত্ব হতে পারে। এক হচ্ছে পুরোপুরি বন্ধ্যাত্ব। এক্ষেত্রে গর্ভধারণ করতে সক্ষম হয় না নারী। সেকেন্ডারি বন্ধ্যাত্ব হল, যখন কেউ আগে গর্ভধারণ করেছে কিন্তু আর করতে পারছে না।

বন্ধ্যাত্বের কারণ

  • হরমোনজনিত ব্যাধি, শুক্রাণু চলাচলে বাধা প্রভৃতি— পুরুষের ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ।
  • PCOS এন্ডোমেট্রিওসিস, ব্লকড ফ্যালোপিয়ান টিউব ইত্যাদি— মহিলাদের মধ্যে ৩০ শতাংশ।
  • সম্মিলিত কারণ ১০ শতাংশ।
  • অপ্রত্যাশিত কারণ ২৫ শতাংশ।
  • অন্যান্য কারণ ৫ শতাংশ।

এছাড়া, পিটুইটারির টিউমার প্রভৃতির ফলে শুক্রাণু উৎপাদন কম হতে পারে। শুধু তাই নয়, রক্তে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে গেলেও বন্ধ্যাত্বের সমস্যা হতে পারে।

পুরুষদের মধ্যে বন্ধ্যাত্বের সাধারণ কারণগুলি

বীর্য ও শুক্রাণুর সমস্যা: ডিম্বাণুকে নিষিক্ত করা শুক্রাণুর সংখ্যা ১৫ মিলিয়নের নীচে থাকা, শুক্রাণুর গতিশীলতা কম, বা শুক্রাণু যার অস্বাভাবিক আকার রয়েছে এবং ডিম্বাণুকে নিষিক্ত করতে অক্ষম এমন শুক্রাণু।

অতিরিক্ত উত্তপ্ত অণ্ডকোশ: কারণগুলির মধ্যে রয়েছে অণ্ডকোশ গরম হয়ে থাকা। অণ্ডকোশে ভেরিকোজ শিরা যদি অতিরিক্ত গরম হয়ে থাকে তাহলে সেই শুক্রাণু অকেজো হয়ে যায়। বেশি টাইট পোশাক পরা এবং অতিরিক্ত গরম পরিবেশে কাজ করার বিষয়টিও এর প্রধান কারণ হতে পারে।

বীর্যস্খলনজনিত ব্যাধি: সঠিক ভাবে বীর্যস্খলন না হওয়া।

হরমোনের ভারসাম্যহীনতা: হাইপোগোনাডিজম, টেস্টোস্টেরনের ঘাটতি প্রভৃতি।

জেনেটিক কারণ: একজন পুরুষের একটি X এবং Y ক্রোমোজোম থাকা উচিত। যদি একজন ব্যক্তির দুটি X ক্রোমোজোম এবং একটি Y ক্রোমোজোম থাকে, যেমন ক্লাইনফেল্টার সিন্ড্রোমের মতো, অণ্ডকোশগুলি অস্বাভাবিক ভাবে বিকশিত হবে এবং কম টেস্টোস্টেরন এবং কম শুক্রাণুর সংখ্যা হবে তখন, এমনকী শুক্রাণু না-ও থাকতে পারে।

মাম্পস: বয়ঃসন্ধির পরে যদি এটি ঘটে তবে অণ্ডকোশের প্রদাহ শুক্রাণু উৎপাদনকে প্রভাবিত করতে পারে।

হাইপোস্প্যাডিয়াস: এই জন্মগত অসংগতির সঙ্গে মূত্রনালীর দ্বার বা ছিদ্র লিঙ্গের অগ্রভাগের পরিবর্তে যদি নীচে থাকে। ছোটোবেলায় যদি অস্ত্রোপচার করে এই অবস্থার সংশোধন করা না হয়, তাহলে বীর্যপাতে সমস্যা হবে এবং শুক্রাণু সঠিক জায়গায় পৌঁছোবে না। হাইপোস্প্যাডিয়াস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ২০০ নবজাতকের মধ্যে ১ জনের থাকে।

সিস্টিক ফাইব্রোসিস: এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী রোগ, যার ফলে আঠালো শ্লেষ্মা তৈরি হয়। এই শ্লেষ্মা প্রধানত ফুসফুসকে প্রভাবিত করে। তবে পুরুষদেরও অনুপস্থিত ভ্যাস ডিফারেন্স থাকতে পারে। ভ্যাস ডিফারেন্স এপিডিডাইমিস থেকে বীর্যবাহী নালী এবং মূত্রনালীতে বহন করে।

রেডিয়েশন থেরাপি বা কেমোথেরাপি: এই চিকিৎসা উভয়ই শুক্রাণু উৎপাদনকে ব্যাহত করতে পারে। রেডিয়েশন থেরাপির ক্ষেত্রে, তীব্রতা সাধারণত অণ্ডকোশের কত কাছাকাছি বিকিরণ ঘটেছে তার উপর নির্ভর করে।

অন্যান্য রোগ: রক্তাল্পতা, কুশিং সিন্ড্রোম, ডায়াবেটিস এবং থাইরয়েড রোগ।

ওষুধ: কিছু ওষুধ পুরুষদের উর্বরতা সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়। এর মধ্যে রয়েছে সালফাসালাজিন (আজুলফিডাইন) এবং অ্যানাবলিক স্টেরয়েড।

ডিম্বস্ফোটনের সমস্যা

ডিম্বস্ফোটন ব্যাধিগুলি মহিলাদের মধ্যে বন্ধ্যাত্বের ক্ষেত্রে প্রায় ২৫ শতাংশ প্রভাব ফেলে। ডিম্বস্ফোটন হল একটি ডিমের মাসিক মুক্তি। যা সঠিক ভাবে না হলেই সমস্যা।

ডিম্বস্ফোটন ব্যাধি এই কারণে ঘটতে পারে :

হাইপারপ্রোল্যাক্টিনেমিয়া: যদি প্রোল্যাক্টিনের মাত্রা বেশি হয় তাহলে এটি ডিম্বস্ফোটন এবং উর্বরতাকে প্রভাবিত করতে পারে।

থাইরয়েড সমস্যা: অতিরিক্ত সক্রিয় বা কম সক্রিয় থাইরয়েড গ্রন্থি একটি হরমোনের ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি করতে পারে যা ডিম্বস্ফোটনে বাধা তৈরি করতে পারে।

পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোম (PCOS): এটি একটি হরমোনজনিত অবস্থা যা ঘন ঘন বা দীর্ঘায়িত মাসিক হতে পারে এবং ডিম্বস্ফোটনে সমস্যা তৈরি করতে পারে।

জরায়ু বা ফ্যালোপিয়ান টিউবের সমস্যা: ডিম্বাশয় থেকে জরায়ু বা গর্ভাশয়ে যেতে ডিম্বাণুকে বাধা দিতে পারে। যদি ডিম এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় না যায়, তাহলে গর্ভধারণ কঠিন হতে পারে।

ডিম্বাশয়ের ব্যাধি: যেমন পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম এবং অন্যান্য ফলিকুলার ডিসঅর্ডার, এন্ডোক্রাইন সিস্টেমের ব্যাধি যা প্রজনন হরমোনের ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি করে। এন্ডোক্রাইন সিস্টেমের মধ্যে রয়েছে হাইপোথ্যালামাস এবং পিটুইটারি গ্রন্থি। এই সিস্টেমকে প্রভাবিত করে এমন সাধারণ ব্যাধিগুলির মধ্যে রয়েছে পিটুইটারি ক্যান্সার এবং হাইপোপিটুইটারিজম।

বিকৃত পেলভিক অ্যানাটমি, এন্ডোক্রাইন এবং ডিম্বস্রাবজনিত অস্বাভাবিকতা, পরিবর্তিত পেরিটোনিয়াল ফাংশন এবং পরিবর্তিত হরমোন ফাংশন এন্ডোমেট্রিয়ামে বন্ধ্যাত্বের কারণ হতে পারে।

বন্ধ্যাত্বের কারণ হতে পারে এমন বিভিন্ন ঝুঁকি

বয়স- নারী ও পুরুষ উভয়ের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিম এবং শুক্রাণুর সংখ্যা এবং গুণমান হ্রাস পায়।

ধূমপান- যে-সব মহিলারা ধূমপান করেন, তাদের জরায়ু এবং ফ্যালোপিয়ান টিউব ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যার ফলে গর্ভধারণে সমস্যা তৈরি হয়।

ওজন- অতিরিক্ত ওজন হরমোনের ভারসাম্যকে ব্যাহত করতে পারে এবং উর্বরতার সম্ভাবনা হ্রাস করতে পারে। অ্যালকোহল সেবন- অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন শুক্রাণুর সংখ্যা, আকার এবং আকৃতির বিকৃতি ঘটায় এবং উর্বরতা কমিয়ে দেয়।

প্রদাহজনিত রোগ

মহিলাদের প্রজনন অঙ্গের সংক্রমণ। এটি ফ্যালোপিয়ান টিউবগুলিকে ব্লক করতে পারে এবং ডিম্বাণু-কে নিষিক্ত হতে বাধা দিতে পারে এবং এটি নিষিক্ত ডিম্বাণুকে জরায়ুতে যেতে বাধা দিতে পারে।

বন্ধ্যাত্বের বিভিন্ন লক্ষণ ও উপসর্গগুলো

মহিলাদের ক্ষেত্রে

  • অস্বাভাবিক বা অনিয়মিত মাসিক
  • পিরিয়ড চক্র ২১ দিনের কম
  • কোনও পিরিয়ড না হওয়া

পুরষদের ক্ষেত্রে

  • একজন পুরুষের সমস্যা আছে কিনা তা জানার জন্য সাধারণত তা নানারকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানতে হয়।
  • বয়ঃসন্ধিকালে মাম্পস (ভাইরাল ইনফেকশন) হয়েছে এমন পুরুষ, তাদের শুক্রাণু তৈরিতে সমস্যা হতে পারে।

উভয়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষা

নারী-পুরুষ উভয়কেই বন্ধ্যাত্বের কারণের মূল্যায়নের জন্য পরীক্ষা করা দরকার। যদি অন্তত এক বছর ধরে সন্তান নেওয়ার চেষ্টা করে সফল না হয়ে থাকেন।

বন্ধ্যাত্ব প্রতিরোধের কিছু সতর্কতা

  • ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখুন
  • সুষম খাদ্য গ্রহণ করুন • নিয়মিত ব্যায়াম করুন • স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখুন • নিষিদ্ধ ওষুধ সেবন এড়িয়ে চলুন • অ্যালকোহল এবং ধূমপান বন্ধ করুন। • মানসিক চাপের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করুন
  • নিরাপদ যৌন অভ্যাস করুন
  • অতিরিক্ত কফি (ক্যাফেইন) সেবন বন্ধ করুন।
পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব