অমানবিক চাপের মুখে কর্মরতা নারীরা (শেষ পর্ব)

কর্মরতা মহিলারা সারাদিন অমানবিক পরিশ্রম করার পর কিছু মুহূর্তের জন্য আরামের আকাঙ্ক্ষা রাখতেই পারেন। কিন্তু দায়বদ্ধতা তাদের শান্তিপূর্ণভাবে দিনযাপন করতে দেয় না। যদিও সংবিধান নারীদের পুরুষের সমান অধিকার দিয়েছে।

স্ত্রীর টাকায় আয়েশ

চঞ্চল, মধ্যপ্রদেশের একটি ছোট্ট গ্রামের স্কুল শিক্ষক। স্বামী কোনও রকম কাজ করতে পছন্দ করেন না। বিয়ের আগে তিনি পরিবারের থেকে টাকা নিয়ে খরচ করতেন। মাঝেমধ্যে ডাক্তার ভাইয়ের ক্লিনিকে ভাইকে সাহায্য করতেন। পড়াশোনা বিশেষ কিছু করেননি। এখন তিনি পরিবার থেকে আলাদা হয়ে স্ত্রীর উপার্জিত অর্থে আয়েশ করেন। সারাদিন ঘুরে বেড়ানো ছাড়া তার আর কোনও কাজ নেই। পাড়াপড়শি যদি তাকে বোঝাবার চেষ্টা করে যে, সে তার উপার্জনকারী স্ত্রীকে সাহায্য করার চেষ্টা করে না কেন, তৎক্ষণাৎ উত্তর আসে যে, ‘আমি কোনও কাজ করতে পারব না। বিয়ে কীসের জন্য করেছি?

চঞ্চল, স্বামীর পরিবারের দেখাশোনা করেন, সন্তানদের বিয়ে দিয়েছেন, একাই আর্থিক দায়িত্ব নিজের ঘাড়ে নিয়েছেন, কিন্তু স্বামীর কাছ থেকে কোনও সহযোগিতা কোনওদিন পাননি। এমনকী বাড়ির কাজেও স্বামীর সাহায্য পাননি তিনি। চঞ্চলকে কেউ যদি জিজ্ঞেস করে, আপনি কেন আপনার স্বামীকে বাড়ির কাজে সাহায্য করতে বলেন না? তার উত্তর একটাই, ‘আমার স্বামী কিছু করতে পারেন না। কোনও কাজ যদি তিনি করেনও সবকিছু আরও গণ্ডগোল পাকিয়ে রেখে দেন তাতে আমার পরিশ্রম বাড়ে বৈ কমে না’, এর থেকে নিজে দ্রুত সব কিছু করে নেওয়া আমার পক্ষে অনেক সোজা।’

নারীরা সব ক্ষেত্রে এগিয়ে

আজ সব দেশেই Working Women-রা পুরুষদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে উপার্জন করছেন। কিন্তু যখন বাড়ির কাজের দায়িত্ব আসে, তখন নারীর প্রতি মানুষের প্রত্যাশাও প্রচণ্ড রূপ নেয়। সর্বোপরি, এই কাজগুলির বিভাজন রেখা কীভাবে সমাজের গভীরে গিয়ে শিকড় ছড়িয়েছে? এই সমস্যার মূল কতটা যে সমাজের গভীরে থাবা বসিয়েছে তা পরিষ্কার হয় যখন সময়ের সাথে সাথে সেই সমস্যা উপড়ে ফেলার চেষ্টা করেও নারীরা আজও হার স্বীকার করছে।

নিধি এবং মায়াঙ্ক দুজনেই কর্পোরেট জগতে একসাথে কাজ করেন। একসাথে অফিসে যান। দুজনের দাম্পত্যে নিধিই সবসময় মায়াঙ্ককে আনন্দে রাখার চেষ্টা করে স্বামীর চাহিদামতো হাতের কাছে সব কিছু এগিয়ে দিয়ে। অফিস থেকে বাড়ি আসার পর রোজই মায়াঙ্ক ব্যাগটা একপাশে ফেলে টিভি চালিয়ে সোফায় শুয়ে পড়ে, ‘স্ত্রীকে বলে, আমি খুব ক্লান্ত, একটু চা আর জলখাবারের ব্যবস্থা করো প্লিজ।’ নিধিও আনন্দের সঙ্গে গরম চা আর জলখাবারের জোগাড় করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ভালোবাসায় মানুষ কী না করে? কিন্তু কেউ কি কখনও ভেবে দেখেছে যে নিধিও অফিসে গিয়ে স্বামীর মতোই উপার্জন করেন? কিন্তু যখন বাড়ির কাজের কথা ওঠে, তখন বেশিরভাগ স্বামীই বলে থাকেন যে, তার স্ত্রী নিজের ইচ্ছেতেই চাকরি করছে। তিনি স্ত্রীকে চাকরি করতে পাঠাননি। চাকরি ছেড়ে দিয়ে শুধু বাড়ির দেখাশোনা করার স্বাধীনতা তাদের স্বামীরা নাকি সব সময়েই তাদের দিয়ে রেখেছেন। স্বামীদের এই ব্রহ্মাস্ত্র কমবেশি প্রতিটি মহিলার প্রতি নিক্ষেপ করা হয়। স্বপ্নকে যাতে বিসর্জন না দিতে হয় তাই কর্মরতারা স্বইচ্ছায় পিঠের ওপর বাড়ির কাজের দায়িত্ব বহন করেন, এবং এই বোঝা হালকা করার মতো পাশে কাউকে পান না।

ভারসাম্যহীনতা এবং মানসিক চাপ

নারীরা দায়িত্ব পালনে এতটাই অভিভূত হয়ে পড়েন যে তারা তাদের নিজের স্বাস্থ্য এবং খাওয়াদাওয়া সম্পর্কে অমনোযোগী হয়ে পড়েন। এর ফলে বিবাহিত জীবনের মাধুর্যও হারিয়ে যায়। সেক্সের প্রতি উদাসীন হয়ে পড়েন এবং নিজের শরীরচর্চা করতেও আলস্য অনুভব করেন। নারী যতই উদ্যোক্তা হোন না কেন, একজন পুরুষ ঠিক কিছু না কিছু তার দুর্বলতা খুঁজে বের করেন, গালি গালাজ করেন, কারণ এটা তিনি নিজের জন্মগত অধিকার বলে মনে করেন। Working Women-এর অবস্থা দুটি নৌকায় একসাথে পা রেখে চলার মতো, কারণ একদিকে অফিসে একজন নারী হওয়ার কারণে কর্মকর্তারা তাকে দমন করার চেষ্টা করেন আবার অন্যদিকে, পরিবার ও স্বামীর দ্বারা বাড়িতে শোষিত হন।

ভারসাম্যহীনতার ফলে বেশিরভাগ নারী মানসিক চাপে ভোগেন, যার কারণে তাকে ক্লান্তি, ঘুমের অভাব, বিরক্তি, অনিদ্রা, রক্তচাপ, সুগারের মতো রোগে ভুগতে হয়। সঙ্গে আরও নানা রোগকেও আমন্ত্রণ জানায় মেয়েদের অত্যধিক মানসিক স্ট্রেস। দিনের পর দিন এই দিনচর্যায় নিজেকে অ্যাডজাস্ট করতে করতে অবশেষে ক্লান্ত হয়ে পড়ে তারা, তখন তার মন এবং শরীর দুটোই জবাব দিয়ে দেয়।

সর্বোপরি আর কতদিন নারী লিঙ্গ, স্ত্রী এবং ধর্মের নামে প্রতারিত হবে? যখন সব কাজ নারীদেরই করতে হয়, তখন তারা সম্পূর্ণ পুণ্য লাভের অধিকারী নয় কেন?

আজ আমাদের চিন্তায়, সমাজ ব্যবস্থায় বিপ্লব আনা দরকার। শুধু মোবাইল বা সোশ্যাল মিডিয়ায় বড়ো বড়ো কথা বলে কিছু হবে না। এটিকে কাজে লাগানোর খুবই প্রয়োজন আছে। এই পরিবর্তনই আগামী দিনে একটি সুখী ভবিষ্যৎ তৈরি করবে বলে আশা করা যায়।

জীবনসঙ্গীর উচিত একে অপরের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা। পুরুষদের উচিত তাদের স্ত্রীকে গৃহকর্মে সহযোগিতা করা। সাহায্য করলে কেউ ছোটো হয়ে যায় না। পরিবারে নারীবান্ধব পরিবেশ থাকতে হবে। সহযোগিতা এবং ভালোবাসা মনের মধ্যে নিরাপত্তার অনুভূতি প্রদান করে। ছুটির দিনে পরিবারের সঙ্গে ভালো সময় কাটান। লিঙ্গ বৈষম্যের বাইরে চিন্তা করুন। Working Woman-দের উচিত নিজের সমস্যাগুলো পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে খোলাখুলিভাবে শেয়ার করা। চিন্তাভাবনার পরিবর্তন হলে সমাজের পাশাপাশি নারীর অবস্থারও পরিবর্তন হবে।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

‘রক্তবীজ’-এর আগমন শারোদোৎসবে

প্রথমবার শারোদোৎসবে মুক্তি পেতে চলেছে শিবপ্রসাদ-নন্দিতার ছবি— তবে শুধু বাংলা নয় ওড়িয়া, অহমীয়া এবং হিন্দি ভাষাতেও৷ বাঙালির সেরা উৎসবে নতুন ছবি দেখা আকর্ষণ একটা থাকেই৷  প্রত্যেক বছরই একগুচ্ছ ছবি রিলিজ হয় এই সময়ে৷ এবার জনপ্রিয় জুটি এই জনপ্রিয় জুটিশিবপ্রসাদ-নন্দিতার  ছবি বাজার গরম করবে, এমনই প্রত্যাশা সকলের।

উইন্ডোজ প্রোডাকশন হাউজ প্রযোজিত ‘রক্তবীজ’ নামের এই ছবিটির অফিসিয়াল পোস্টার প্রকাশ্যে এসেছে সম্প্রতি৷পোস্টারের উপরের অংশে   দেখা যাচ্ছে তিরঙ্গার সামনে একদিকে বন্দুক হাতে দাঁড়িয়ে আবির, অন্যদিকে মিমি। আর মাঝে রয়েছেন ভিক্টর। ছবির নিচের দিকে মুখোশ পরা মানুষের ভিড় এবং  দুর্গার একটি মূর্তি। মাঝে লেখা ছবির নাম রক্তবীজ।

খাগড়াগড় কাণ্ডের উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে এই ছবি। ২০১৪ সালে ২ অক্টোবর, দুর্গাপুজোর সময় বর্ধমানের খাগড়াগড়ে একটি বাড়িতে ভয়াবহ বিস্ফোরণের জেরে কেঁপে উঠেছে এলাকা। তৈরি হয়েছিল ভয়ের পরিবেশ। সরগরম হয়ে ওঠে রাজ্য রাজনীতি। সেই ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণের ইতিবৃত্ত নিয়েই তৈরি হচ্ছে এই ছবি।

সংবাদ মাধ্যমকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে, পরিচালক শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বলেন, “সেই সময় এই ঘটনা নিয়ে চারিদিকে অনেক রকম থিওরি বা ন্যারেটিভ তৈরি হয়েছিল। এখানে কারা বোমা বানাত, কেনই বা বানাত, এদের লক্ষ্যটা ঠিক কী ছিল– এটাই দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে ছবিতে৷ আমি আর নন্দিতাদি প্রথম থেকেই এই নিয়ে খবরের কাগজে বের হওয়া নানা তথ্য নজরে রাখছিলাম। সেটাই আমাদের দুজনকে ভাবিয়েছিল। তখন থেকে মনে হয়েছিল এটা নিয়ে ছবি তৈরি করা যেতে পারে।”

দুর্গাপুজোর প্রেক্ষাপটে প্রসঙ্গিকতা বজায় রাখতে ‘রক্তবীজ’ পুজোর সময়েই মুক্তি পাচ্ছে।বাস্তব  ঘটনার এক জীবন্ত দলিল হয়ে উঠবে ছবিটি, এমনই মনে করছে প্রযোজনা সংস্থা। এই ছবির মাধ্যমেই প্রথমবার নায়ক-নায়িকা হিসেবে আবীর-মিমিকে দেখা যাবে পর্দায়। এছাড়াও , দেখা যাবে অনসূয়া  মজুমদার, কাঞ্চন মল্লিক, অম্বরীশ ভট্টাচার্য, গুলশানারা খাতুন এবং দেবাশিস মণ্ডলের মতো একঝাঁক তারকাকে।এর আগে, ছবির কাজ শুরু হওয়ার পর,  আবীর মিমি নিজেরাই প্রথম তাঁদের সোশাল মিডিয়ায় শেয়ার করেছিলেন শুটিংয়ের ছবি। বলেছিলেন, “সারা বছরই ভালো ভালো ছবি উপহার দিয়ে থাকেন  শিবপ্রসাদ ও নন্দিতা৷ তাই বাঙালির জন্য পুজোয় এই উপহার। আমরা নতুন ছবি নিয়ে আসছি।”

বোলপুর থেকে ধূলাগড়, পশ্চিমবঙ্গের নানা প্রান্তে হবে ছবির শুটিং হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। থ্রিলার ঘরানার এই ছবি যে দর্শকের ভালোলাগবে, এ বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী গোটা টিম।  এমন চমকের অপেক্ষায় দর্শকও।এর আগে কখনও থ্রিলার ঘরানার ছবি তেমনভাবে দেখা যায়নি শিবপ্রসাদ-নন্দিতার পরিচালনায়। তাই এ ধরনের ছবি যে নতুনত্বের স্বাদ আনতে পারে সে ব্যাপারেও আশাবাদী দর্শক।

অমানবিক চাপের মুখে কর্মরতা নারীরা (১-পর্ব)

বর্তমানে নারীশক্তির চারিদিকে জয়জয়কার তুঙ্গে। সময়ের সাথে সাথে নারীদের ভূমিকাও অনেক পরিবর্তিত হয়েছে। মহিলারা ঘরের বাইরে পা রেখেছেন এবং নিজেদের জন্য একটি বড়ো পরিচয় তৈরি করেছেন। তাদের একটি বিশেষত্ব হ’ল বেশিরভাগ মহিলারাই মাল্টিটাস্কিং করতে অভ্যস্ত, যারা নিজেদের পরিচালনার মাধ্যমে নিজের কাজগুলি খুব ভালো ভাবে সম্পাদন করছেন। আজ, প্রতিটি ক্ষেত্রে মহিলারা তাদের কাজে দক্ষতার সাথে কাজ করছেন। কিন্তু লিঙ্গবৈষম্যের শিকড় আজও আমাদের সমাজের মানসিকতার মধ্যে থেকে গেছে।

আজ আমরা আলোচনা করছি Working Woman-দের নিয়ে, যাদের ওপর দায়িত্বের বোঝা আজ দ্বিগুন নয় বরং আর এক গুন বৃদ্ধি পেয়েছে। অফিস থেকে উপার্জন করুন, বাড়ি চালান, স্ত্রীয়ের কর্তব্য ও সন্তানধর্ম পালন করুন সঙ্গে বাচ্চাদের মধ্যে মূল্যবোধও গড়ে তুলুন। শুধু তাই নয়, সমান উদ্যমে এর উপর নিষ্ঠাভরে পূজাপাঠ ও আচার-অনুষ্ঠানও সম্পন্ন করুন। এটা কি সত্যি ন্যায়সঙ্গত বলে মনে হয়?

মহিলারা সারাদিন অমানবিক পরিশ্রম করার পর কিছু মুহূর্তের জন্য আরামের আকাঙ্ক্ষা রাখতেই পারেন। কিন্তু দায়বদ্ধতা তাদের শান্তিপূর্ণভাবে দিনযাপন করতে দেয় না। যদিও সংবিধান নারীদের পুরুষের সমান অধিকার দিয়েছ। অথচ আমাদের সমাজে কুসংস্কার এবং লিঙ্গবৈষম্যের শিকড় এতটাই গভীর যে, নারীরা চেষ্টা করেও তা থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না। পরিবর্তনই সমাজের নিয়ম, কিন্তু এই নিয়ম কি শুধু নারীদের জন্যই প্রযোজ্য হবে? এই সমাজ কি পুরুষদের নিয়েও গঠিত নয? শুধুই কি নারীদের নিয়ে গঠিত?

নিম্ন মানসিকতার শিকার

বর্তমানে ৫৮ শতাংশ নারী Working Women। নারীরা তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী পরিবারকে আর্থিক অনুদান দিচ্ছে, কিন্তু তাদের জীবন সংগ্রামে পরিপূর্ণ এবং তাদের দৈনন্দিন চ্যালেঞ্জ শেষ হওয়ার নামই নেয় না। পরিবারের দেখাশোনা, রান্নাবান্না, বাচ্চাদের স্কুলের জন্য প্রস্তুত করা, স্বামীর জন্য টিফিন তৈরি করা এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ইত্যাদি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য খুব ভোরে ঘুম থেকে তাদের উঠতে হয়। এসব কাজ শেষ করে তারা অফিসে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়। তারা যদি কাজের জন্য একজন সহায়ক নিয়োগ করে তবে তাদের নিজেদেরই তার সমস্ত দায়িত্বভার বহন করতে হয় যেমন সে ঠিকমতো বাড়ির কাজ করছে কিনা খেয়াল রাখা, ঠিক সময়ে আসছে কিনা, এমনকি তার মাসমাইনের দায়িত্বও বহন করতে হয়। সময় এবং অর্থ সাশ্রয়ের জন্য, কর্মরত মহিলারা চেষ্টা করে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে বাড়ির কাজের সঙ্গে জুড়ে রাখতে। পরিবারের পাশাপাশি কর্মরতাদের তাদের অফিসেও, সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির দ্বৈত মানসিকতার মুখোমুখি হতে হয়।

ডিম্পল একজন Working Woman। তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার ডিম্পল নিজের বাড়ি থেকেই তাঁর কাজ সম্পাদন করেন। তিনি একটি ওষুধের দোকান চালান, পরিবার এবং কাজের ভারসাম্য বজায় রাখতে তিনি সফল। কিন্তু সমাজের নীচ মানসিকতা ডিম্পলকেও নিজের শিকার বানাতে জল্পনা চালায়। পরিবারের সদস্য থেকে শুরু করে প্রতিবেশীরা তাঁর এই সাফল্য সহ্য করতে পারে না। তাঁর প্রতি মন্তব্য করা হয় যে, ডিম্পল-এর পূজাপাঠ করা উচিত, নির্জলা উপবাস রাখা উচিত এবং বাড়ির সদস্যদের জন্য সুস্বাদু খাবারও তৈরি করা উচিত। এটাই নারীর একমাত্র ধর্ম। সব ধর্মই কি তাহলে নারীর ধর্ম?

জরিপ যা বলছে

একটি জরিপে, পুরুষ কর্মচারীরা মতামত দিয়েছিল যে, ‘মহিলারা মহিলা হওয়ার সুবিধা নেয় যেমন – আমাদের তাড়াতাড়ি বাড়ি যেতে হবে। সরকারি চাকরিতে নারীদের ছাড় দিয়েছে সরকার। এখানে সবাই চাকরি করতে এসেছে তাহলে মহিলারা বিশেষ সুবিধা কেন পাবে? আমরা যখন ছোটো ছোটো গ্রামগুলিতে স্থানান্তরিত হই, তখন কেন তাদের জন্য একই নিয়ম লাগু নয়?’

তারপর তাদের জিজ্ঞেস করা হয় যে তারা কি বাড়িতে গিয়ে তাদের স্ত্রীদের সাহায্য করে, কারণ তাদের স্ত্রীরাও Working Women? উত্তর ছিল যে, ‘আমরা স্ত্রীকে বলিনি যে বাইরে গিয়ে চাকরি করতে, তারা নিজেদের ইচ্ছে বা পছন্দে চাকরি করছে বলতে পারেন। আমরা বাড়ির জন্য উপার্জন করি, সংসারের খরচ চালাই, বাড়ির কাজের জন্য একজন গৃহপরিচারিকা রেখে দিয়েছি। আমরা কেন বাড়ির কাজ করব?

অধিকারের বিভাজন রেখা

অধিকারের বিভাজন রেখাকে কে বা কারা সমাজের বুকে আরও গভীরতর করেছে? কেন কোনও পুরুষ গৃহস্থালির কাজে সাহায্য করতে লজ্জা পায়? যদিও সমাজে ১০শতাংশ মানুষ রয়েছে যারা প্রকাশ্যে তাদের স্ত্রীদের গৃহকর্মে সাহায্য করে, কিন্তু এই সংখ্যা নগণ্য। এ ধরনের লোকদের সমাজ ‘বউয়ের কথায় ওঠে বসে’ বলে চিহ্নিত করে।

অঙ্কিতা নিজে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে একটি উঁচু পদে কাজ করেন এবং তাঁর স্বামীও একটি বেসরকারি সংস্থায় কাজ করেন। অঙ্কিতা খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠেন। সকালের জলখাবার থেকে শুরু করে বাবা-মায়ের ওষুধ, বাচ্চাদের টিফিন তৈরি করে ১০টায় অফিসে যান। এমনকী বাড়িতে যে-কোনও পূজা-অনুষ্ঠানে তিনি একাই বাজার করা থেকে পূজার সব আয়োজন একাই সামলান। সন্তানদের জন্মদিনে পুরোহিত ডেকে বাড়িতেই বিশেষ পূজার আয়োজন করেন। পরিবারের প্রতিটি দায়িত্বের পাশাপাশি সন্তানদের লেখাপড়ার দায়িত্বও তিনিই বহন করেন। রাতে ক্লান্ত হয়ে বিছানায় ঘুমিয়ে পড়েন, কিন্তু পরের দিনের দুশ্চিন্তা অঙ্কিতার ঘুমে ব্যঘাত ঘটায়। কিন্তু সকালে উঠে প্রতিদিনই এই রুটিনের হেরফের হতে দেন না। অঙ্কিতার মতো এই পরিস্থিতি বর্তমানে শুধু শহরেই নয়, গ্রামেও জায়গা করে নিয়েছে।

একা কীভাবে সব সামলান অঙ্কিতাকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘এগুলো আমাদের সংস্কার এবং মূল্যবোধ। আমরা যদি আমাদের সন্তান এবং প্রিয়জনদের জন্য এটুকু না করি তবে কে করবে? পরিবারের প্রতি এটা আমার সত্যিকারের ভক্তি ও ভালোবাসা, যা পুরো পরিবারকে খুশিতে রেখেছে।’

 

 

কর্মমুখী শিক্ষার চাহিদা বাড়ছে

এখন অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে চান। তাই তারা কোনওরকম ঝুঁকি নিতে চান না। সন্তান যাতে নিশ্চিত ভাবে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে পারে এবং আর্থিক নিরাপত্তা থাকে, সেই বিষয়ে এখন বিশেষ ভাবে গুরুত্ব দিচ্ছেন অভিভাবকরা। এরজন্য তারা মোটা টাকা খরচ করে সন্তানকে কর্মমুখী শিক্ষার ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন। শুধু তাই নয়, শিক্ষাক্রমের শুরুতেই নিশ্চিত হয়ে নিচ্ছেন প্লেসমেন্ট-এর বিষয়ে। চাকরির ১০০ শতাংশ  নিশ্চয়তার পর-ই কর্মমুখী শিক্ষাক্ষেত্রে কোর্স শুরু করছে ছাত্রছাত্রীরা।আর তাই শিক্ষাক্ষেত্রের ছবিটা ক্রমশ বদলে যাচ্ছে। প্রচলিত শিক্ষাক্রম থেকে অনেকে এখন বিমুখ হয়ে কর্মমুখী শিক্ষার দিকে ঝুঁকছেন। ঠিক সেই কারণে সাধারণ পাঠক্রমে ছাত্রছাত্রীদের সংখ্যা কমছে।

এখন যেহেতু টেকনোলজি-র যুগ, তাই এই ক্ষেত্রে ছাত্রছাত্রীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকছেন। আর ঠিক এই কারণে প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিও টেকনোলজিক্যাল এবং টেকনিক্যাল শিক্ষার পাঠক্রমে বেশি গুরুত্ব আরোপ করে চলেছে। নানারকম বিষয় নিয়ে চলছে পঠনপাঠন। ব্যবসায়িক শিক্ষা ছাড়াও, সৃজনশীল শিক্ষা নিচ্ছেন ছাত্রছাত্রীরা।

দেশের প্রতিটি বড়ো শহরে এখন প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি এডুকেশন সেন্টার চালু করছে এবং সেইসব সেন্টারের চাহিদাও এখন তুঙ্গে। বিভিন্ন ডিগ্রি কোর্স ছাড়াও, ৩ডি অ্যানিমেশন, ২ডি অ্যানিমেশন, ভিএফএক্স, গ্রাফিক্স, মোশন গ্রাফিক্স এবং ওয়েব ডিজাইনিং-এ বিস্তৃত চাকরিমুখি সার্টিফিকেট কোর্স অফার করছে ওইসব প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি। ফিজ-এর জন্য সহজ ইএমআই অপশনও রেখেছে প্রায় সমস্ত প্রাইভেট এডুকেশন সেন্টার। শিক্ষার্থীরা যাতে সহজেই তাদের আগ্রহকে চরিতার্থ করতে পারে এবং কর্মসংস্থানের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে পারে, সেই কারণে এই ধরনের ইএমআই-এর ব্যবস্থা রেখেছে। এই যেমন পূর্ব ভারতের বৃহত্তম অ্যানিমেশন প্রোডাকশন হাউস, হাইটেক অ্যানিমেশন স্টুডিও, যেটি ভারতীয় টেলিভিশন এবং ওটিটি শিল্পের জন্য বেশিরভাগ অ্যানিমেশন কনটেন্ট তৈরি করে, তাদের শিক্ষা শাখা, মুপল ইনস্টিটিউট অফ অ্যানিমেশন অ্যান্ড ডিজাইন-এর অধীনে কলকাতার চৌরঙ্গীতেও তাদের ফ্ল্যাগশিপ সেন্টার চালু করেছে।

মুপল তার সমস্ত ছাত্রদের ১০০% প্লেসমেন্ট-এর সহায়তা প্রদান করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বর্তমানে, তাদের স্টুডেন্টরা অ্যামাজন, টেকনিকলার, রেড চিলিস, পিডব্লিউসি, জি বাংলা, এসভিএফ, সুরিন্দর ফিল্মসের মতো কোম্পানিতে কাজ করছে। কোর্সটি সফলভাবে সমাপ্তির পরে ফ্রেশারদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ প্রারম্ভিক বেতন দেওয়া হয় ৪১,০০০ টাকা।দিল্লি ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ কলকাতা, উত্তর কলকাতা, হাওড়া, হুগলি, বর্ধমান, দুর্গাপুর প্রভৃতি জায়গায় মোট ১৬টি শাখা খুলেছে। মুপল আকাদেমি-র ডিরেক্টর সুব্রত রায় প্রসঙ্গত জানিয়েছেন, ‘প্লেসমেন্টের ক্ষেত্রে ক্যাম্পাস কিংবা সেন্টার পরিদর্শন করার জন্য ভারতীয় এবং গ্লোবাল কোম্পানিগুলির আগ্রহ ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ছাত্ররা ভারতের সেরা বেশ কিছু সংস্থায় কাজের সুযোগ পেয়ে চলেছে। এটি একটি অত্যন্ত ইতিবাচক লক্ষণ যে, ওই কোম্পানিগুলি পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এভিজিসিএক্সআর পেশাদারদের গুরুত্ব বুঝতে শুরু করেছে (ওটিটি প্ল্যাটফর্মের আবির্ভাবের সঙ্গে)। প্লেসমেন্ট টিম এই বিষয়ে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে এবং ভারত থেকে আরও বেশি সংখ্যক কোম্পানির অংশগ্রহণের মাধ্যমে পরবর্তী মরসুমে প্লেসমেন্টের সংখ্যা আরও হয়তো বাড়বে।’  মুপল আকাদেমি-র আরও এক ডিরেক্টর পায়েল চোপড়া প্রসঙ্গত জানিয়েছেন, ‘প্রতিনিয়ত সর্বাধুনিক টেকনিক অন্তর্ভুক্ত করার জন্য নিয়মিত পাঠ্যক্রম আপডেট করে, শিক্ষার মানকে উন্নত করতে কাজ করছি। শুধু তাই নয়, শিক্ষার্থীদের সর্বোত্তম শিক্ষার অভিজ্ঞতা প্রদানের জন্য সর্বাধুনিক পরিকাঠামো প্রদানেরও চেষ্টা রয়েছে।’

মিষ্টির পসরা সাজান অতিথিদের জন্য

উৎসবের মরশুম শুরু হয়েছে এবং উৎসব মানেই মিষ্টি কারণ ভারতীয় সংস্কৃতিতে উৎসবের অর্থ নানা ধরনের সুস্বাদু মিষ্টি। অতিথিদের আগমনের কারণে বাড়িতে প্রচুর কাজ থাকে। এমন পরিস্থিতিতে এমন কিছু তৈরি করা যেতে পারে যা সহজেই বাড়িতে থাকা সামগ্রী থেকেই সহজে তৈরি করা যায়। আজ এমনই কিছু Sweets-এর রেসিপি দেওয়া হল যা খুব সহজেই বাড়িতে তৈরি করতে পারেন অতিথিদের আসার আগেই। চলুন দেখে নেওয়া যাক কীভাবে তৈরি করা হয় –

১)  ক্যারট রাইস

কত জনের জন্য – ৬ জনের মতো। প্রস্তুত হতে সময় লাগবে ২০ মিনিট।

উপকরণ

১ কাপ চাল, দেড় কাপ জল, ২টি তেজপাতা, ২টি বড়ো এলাচ, ১/২ ইঞ্চি দারুচিনি, ১ টেবিল চামচ ঘি, ২৫০ গ্রাম গাজর, ১০০ গ্রাম চিনি, ৮-১০টি কাজুবাদাম, ৮টি কাঠবাদাম, ৮টি পেস্তা, ১/৪ চা চামচ এলাচগুঁড়ো, ১ টেবিল চামচ নারকেল বাটা।

প্রণালী

চাল ভালো করে ধুয়ে দেড় কাপ জলে ৩০ মিনিট ভিজিয়ে রাখুন। এবার চালের সঙ্গে তেজপাতা, এলাচ, দারুচিনি ও ১/২ চা চামচ ঘি মিশিয়ে প্রেসারে ভাত তৈরি করে রাখুন। গাজর ধুয়ে কড়াইতে সামান্য ঘি দিয়ে ভালো করে কষে নিন যাতে গাজরের কাঁচা গন্ধ চলে যায়। এবার একটি প্যানে অবশিষ্ট ঘি দিয়ে অল্প আঁচে সব বাদাম ভাজুন এবং একটি প্লেটে বের করে নিন। বাদাম ঠান্ডা হয়ে গেলে ছুরি দিয়ে মোটা মোটা করে কেটে নিন। এবার এই প্যানে কষে রাখা গাজর আর এলাচ গুঁড়ো মিশিয়ে প্যানের মুখ ঢেকে দিন। গাজর সেদ্ধ হলে চিনি যোগ করুন। চিনি পুরো মিশে গেলে, রান্না করা চাল ওতে দিয়ে দিন এবং ভালো ভাবে নাড়ুন। ঢেকে ৩-৪ মিনিটের জন্য রান্না হতে দিন এবং উপরে বাদাম সাজিয়ে পরিবেশন করুন।

২)  চকোলেট পনির বরফি

কত জনের জন্য – ৬ জনের মতো। প্রস্তুত হতে সময় লাগবে ২০ মিনিট।

উপকরণ

১ কাপ তাজা পনির, ১ কাপ মাওয়া, ১ চা চামচ গুঁড়ো দুধ, ১ কাপ গুঁড়ো চিনি, ১/৪ কাপ চকোলেট পাউডার, ১ টেবিল চামচ চকোলেট চিপস, ঘি ১ চা চামচ।

প্রণালী

পনির ও মাওয়া ভালো করে হাত দিয়ে মিশিয়ে একটি প্যানে দিন। এবার তাতে গুঁড়ো দুধ, গ্রাউন্ড করা চিনি যোগ করুন। কম আঁচে ক্রমাগত নাড়তে থাকুন চিনি গলে না যাওয়া পর্যন্ত। মিশ্রণটি ঘন হতে শুরু করলে চকোলেট পাউডার যোগ করুন। ঘি যোগ করুন এবং আঁচ জোরে করে ২ মিনিটের জন্য ভাজুন। মিশ্রণটি প্যানের গা থেকে ছেড়ে যেতে শুরু করলে এটি একটি ঘি মাখানো ট্রে-তে ভালো করে চারিয়ে দিন। উপরে চাকো চিপগুলি ছড়িয়ে দিন ও একটু প্রেসার দিন যাতে মিশ্রণটির গায়ে লেগে যায়। ঠাণ্ডা হয়ে গেলে বরফি আকারে কেটে পরিবেশন করুন।

৩)  পান নারকেল লাড্ডু

কত জনের জন্য ৬ জনের মতো। প্রস্তুত হতে সময় লাগবে – 20 মিনিট।

উপকরণ

২ কাপ নারকেল গুঁড়ো, ১ কাপ ফুল ক্রিম মিল্ক, ১/২ কাপ মিল্ক পাউডার, ৮টি পানের পাতা, ১/৪ চা চামচ এলাচ গুঁড়ো, ২ টেবিল চামচ গুঁড়ো চিনি, ১ টেবিল চামচ গুলকন্দ, ১ চা চামচ ঘি, ১ চা চামচ পেস্তা কুচি।

প্রণালী

একটি প্যানে নারকেল গুঁড়ো এবং দুধ দিন এবং আঁচে বসান। দুধ ফুটে উঠলে, দুধের গুঁড়ো যোগ করুন। ক্রমাগত নাড়তে থাকুন এবং নাড়তে নাড়তেই ওতে চিনি এবং ঘি যোগ করুন এবং মিশ্রণটি ঘন না হওয়া পর্যন্ত রান্না করুন। মিশ্রণটি প্যানের গা থেকে ছেড়ে যেতে শুরু করলে, আঁচ বন্ধ করুন এবং এটি ঠাণ্ডা হতে দিন। পান পাতাগুলো খুব সূক্ষ্ম করে কেটে নিন। এবার নারকেলের মিশ্রণে কাটা পান, গুলকন্দ ও এলাচ গুঁড়ো মিশিয়ে ঘি মাখানো হাতে ছোটো ছোটো লাড্ডু তৈরি করুন। পেস্তার টুকরো দিয়ে সাজিয়ে পরিবেশন করুন।

ওড়িশা সফর-কথা (পর্ব ২)

প্রায় ২ কিমি অতিক্রম করে এসে পৌঁছোলাম মন্দিরা ড্যাম-এর কাছে। রাউরকেলা থেকে দূরত্ব ২৮ কিমি। শঙ্খনদীর ওপর বাঁধ দিয়ে মন্দিরায় তৈরি হয়েছে সুবিশাল জলাধার। রাউরকেলা স্টিল প্ল্যান্ট ও তার টাউনশিপে জল সরবরাহ করা হয় এই জলাধার থেকেই। ১৯৫৭ সালে মন্দিরা ড্যাম তৈরি শুরু হয়। ড্যাম প্রায় ২৪০০ পরিবারকে ভিটেছাড়া করলেও পরে ৮৫০ পরিবারকে পুনর্বাসন দেওয়া হয়।

প্রতি রবিবার বিকেল ৪টে থেকে মন্দিরার হেলথ্ সেন্টারে ইস্পাত জেনারেল হসপিটাল-এর ওপিডি ক্লিনিকস চলে ২ ঘন্টা ধরে, নিকটস্থ গ্রামবাসীদের চিকিৎসার জন্য। পর্যটকদের সাধারণত ড্যাম-এর কোর এরিয়া পর্যন্ত যেতে দেওয়া হয় না। সিআইএসএফ-এর সদা সতর্ক পাহারা রয়েছে। পরিচিতি থাকায় আমি অবশ্য সিআইএসএফ-এর চেকপোস্ট-এ জিপের নম্বর অফিসিয়ালি পাঠিয়ে দিয়েছিলাম আগেই, অনুমতি সংগ্রহের জন্য। গাড়ি নিয়ে তাই অনেকটা উপরে কোর এরিয়াতে চলে এলাম সোজা। আমাদের জিপ এসে থামল সেল-এর গেস্টহাউস সংলগ্ন সুপরিচর্যিত বাগানের কাছে। ঘড়িতে দেখি বেলা ৩টে। তিনদিন আগে এই অসাধারণ গেস্টহাউসের একটা ঘর বুক করে রেখেছিলাম। তাই প্রথমে সেখানে গিয়ে সকলেই মুখ-হাত ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। তারপর গেস্ট হাউসের ছাদ থেকে ড্যাম ও জলাধারের ছবি তুললাম অনেকগুলো। দূর থেকে বয়ে আসা শঙ্খ নদীকেও ক্যামেরাবন্দি করলাম।

নীচ থেকে ডাক এল। বাগানে চেয়ার-টেবিল পেতে দেওয়া হয়েছে। গেস্টহাউস-এর ক্যানটিন-ইন-চার্জ বেহেরাবাবুর তত্ত্বাবধানে চা-পকোড়ার আসর বসল বিকেলে। চা-পর্ব শেষ করে ড্যাম -এর বিভিন্ন অংশ ঘুরে ঘুরে দেখলাম। ঘড়িতে দেখি, প্রায় সাড়ে ৫টা বাজে। বিকেল গড়িয়ে সঙ্গে হয়ে গেছে। আমরা সবাই গাড়িতে এসে বসলাম। গন্তব্য সোজা রাউরকেলা। আগামীকাল সম্বলপুর যাবার পথে দেখে নেওয়ার ইচ্ছে আরও দুটি সুন্দর জায়গা। ভোরে উঠেই যাত্রার প্রস্তুতি নিতে হবে, তাই ডিনার সারব তাড়াতাড়ি।

রোদ-ঝলমলে সকাল। স্নান সেরে, চা-বিস্কুট পেয়ে সবাই যখন বোলেরোতে চড়ে বসলাম, ঘড়িতে সকাল ৯টা। গাড়ি আধঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছোল বেদব্যাস চক। রাজ্য সড়ক ১০ ধরে এগিয়ে চলেছি। বাঁপাশে চলে এল লারসেন-টুবরোর কংসবাহন টাউনশিপ, রাউরকেলা থেকে ২৫ কিমি দূরত্বে। সুসজ্জিত, আধুনিক, ছোটো টাউনশিপের মাঝে রকমারি ফুলে ভরা দৃষ্টিনন্দন এক বাগান। বাগানের পাশ দিয়ে হেঁটে বেড়ালাম কিছুক্ষণ। কংসবাহন টাউনশিপ রাউরকেলা মিউনিসিপ্যালিটির অধীনেই। গাড়ি আবার রাজ্য সড়ক ধরে কিছুদূর এগোতেই দেখি রাস্তার বাঁপাশ থেকে পথ চলে গেছে পীতামহল ড্যাম পর্যন্ত। সুন্দরগড় জেলায়, কুয়ারমুণ্ডা তহশিলের বালান্ডা গ্রামের কাছে শঙ্খ-এর শাখানদী পীতামহল-এ তৈরি এই ড্যাম সম্পূর্ণ হয় ১৯৭৮ সালে। ড্যামের দৈর্ঘ্য ৬৬০.২ মিটার এবং উচ্চতা ২৫.০৬ মিটার। জঙ্গল-পাহাড়ে ঘেরা এক অতি সুন্দর জায়গায় অবস্থিত এই ড্যাম তাই জনপ্রিয় পিকনিক স্পটও। মন্দিরা ড্যামের মতো এখানেও আগে এসেছি কয়েকবার। আমার বড়ো প্রিয় এই জায়গা। পীতামহল ড্যাম সংলগ্ন এই জায়গাটি যেন প্রকৃতির ফ্রেমে বাঁধানো এক নৈসর্গিক ছবি।

সামনে লম্বা পথ, কিন্তু হাতে সময় কম। তাই অনিচ্ছে সত্ত্বেও উঠে বসলাম জিপে। রাজ্য সড়কে পৌঁছেই গাড়ি ছুটল দুরন্ত গতিতে। কিছুক্ষণের মধ্যেই পেরিয়ে গেলাম কলুঙ্গা। আরও কয়েক কিলোমিটার এগোতেই ডাইনে মন্দিরা ড্যাম যাবার রাস্তা। গতকাল এসেছিলাম এই পর্যন্ত। আজ চলেছি লারসেন-টুবরোর তৈরি মসৃণ পিচরাস্তা ধরে সম্বলপুর অভিমুখে। পৌঁছে গেলাম রাজগাংপুরে, রাউরকেলা থেকে ৪০ কিমি দূরে। এখানে আছে ওসিএল-এর সিমেন্ট তৈরির বিশাল কারখানা। কুঢরা ছাড়িয়ে ৬০ কিমি দূরের বড়গাঁওতে আমাদের জিপ থামল। এখানে চা-পানের বিরতি ১০ মিনিটের।

পথের ধারে একটি দোকান থেকে খেলাম গরম বড়া ও এলাচ চা। আবার বসলাম গাড়িতে এবং ৯০ কিমি দূরের সুন্দরগড়ে পৌঁছোলাম বেলা সাড়ে ১১টায়। গাড়ি না থেমে এগিয়ে চলল গন্তব্যের দিকে। রাস্তার পাশে মাঝে মাঝে পাহাড়ি এলাকা। বেশ কয়েকবার পার হলাম নদীর ওপর তৈরি সেতু। মসৃণ রাস্তায় ১২৫ কিমি দূরে অবস্থিত ঝাড়সুগুদায় পৌঁছোলাম বেলা সোয়া ১২টা নাগাদ। এখানে রয়েছে ভূষণ স্টিল প্ল্যান্ট— ওড়িশার শিল্পোন্নতির আরও এক পরিচয়। ঝাড়সুগুদা আজ এক ব্যস্ত, আধুনিক শহর।

(চলবে)

আই-ফ্লু বা কনজাংক্টিভাইটিস—সতর্কতা এবং সঠিক চিকিৎসা

আই-ফ্লু বা আরও সঠিকভাবে বলা যায় কনজাংক্টিভাইটিস। এটি একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ। এই রোগটির বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন এবং পরামর্শ দিয়েছেন কলকাতা-র এএমআরআই হাসপাতালের অ্যাডভান্সড ল্যাপারোস্কোপি এবং জিআই অনকোসার্জারি বিশেষজ্ঞ ডা. সঞ্জয় মণ্ডল।

মনে রাখতে হবে, সবচেয়ে সাধারণ ভাইরাস সংক্রমণের কারণে হয় আই-ফ্লু বা কনজাংক্টিভাইটিস। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অ্যাডেনো ভাইরাস দ্বারা সৃষ্টি হয়, তবে অন্যান্য কারণ যেমন হারপিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস এবং ভেরিসেলা-জোস্টার ভাইরাস দ্বারাও আক্রান্ত হতে পারে । এগুলিও পরিচিত গলা ব্যথা এবং উপরের শ্বাস নালীর সংক্রমণের কারণ হিসেবে।

এটি সাধারণত স্পর্শের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তবে সমস্ত ভাইরাল রোগের মতো এটি একটি স্ব-সীমাবদ্ধ রোগ।কনজাংক্টিভাইটিস-এর কারণে চোখে ব্যথা, জ্বালা এবং চোখ লাল হয়ে গিয়ে জল বেরোতে থাকে। এর কারণে স্রাব বা হতে পারে চোখের চারপাশে ক্রাস্টিং। সম্পূর্ণ ভাবে সেরে উঠতে কমপক্ষে ৫ থেকে ৭ দিন সময় লাগতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এমনকি আরও সময় অর্থাৎ ২-৩ সপ্তাহ পর্যন্ত লেগে যেতে পারে সেরে উঠতে।

Dr. Sanjoy Mandal

আর কনজাংক্টিভাইটিস যদি শিশুদের হয়, তাহলে তা খুবই সমস্যার বিষয়। কারণ কনজাংক্টিভাইটিস যেহেতু ছোঁয়াচে একটি রোগ, তাই শিশুরা স্কুলে গেলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে বাকি বাচ্চাদের মধ্যেও। এখন তাই শিশুদের কনজাংক্টিভাইটিস হলে অভিভাবকদের পরামর্শ দেওয়া হয় ওদের স্কুলে না পাঠাতে। অতএব, শিশুদের স্কুলে উপস্থিতি হ্রাসের জন্য কনজাংক্টিভাইটিস-কেই দায়ী করা হয়। তাই বলা যায়, এই কনজাংক্টিভাইটিস শিশুদের শিক্ষার উপর পরোক্ষ ভাবে প্রভাব ফেলে। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেও এটি কর্মদিবসের ক্ষতি করে এবং সামগ্রিক ব্যাঘাত ঘটায়। কারণ, কনজাংক্টিভাইটিস হলে কর্মক্ষেত্রে যেতে বারণ করা হয় রুগিকে।

কনজাংক্টিভাইটিস আক্রান্ত হওয়ার সময় কন্টাক্ট লেন্স পরা বন্ধ করা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এই সময় কন্টাক্ট লেন্স পরলে কনজাংক্টিভাইটিস-এর চিকিৎসায় ব্যাঘাত ঘটতে পারে। অ্যালার্জিক কনজাংক্টিভাইটিস-এর চিকিৎসা করা যেতে পারে অ্যান্টিহিস্টামাইনস অর্থাৎ কৃত্রিম অশ্রু নামক চোখের ড্রপ দিয়ে। আইড্রপগুলিতে অ্যান্টিহিস্টামাইন বা অন্যান্য ওষুধ রয়েছে যা অ্যালার্জিযুক্ত সমস্যার জন্য সহায়ক হতে পারে। ব্যাকটেরিয়াল কনজাংক্টিভাইটিস অ্যান্টিবায়োটিক যুক্ত চোখের ড্রপ দিয়ে চিকিৎসা করা যেতে পারে।

শিশুদের কনজাংক্টিভাইটিস হলে শিশু বিশেষজ্ঞ বা চক্ষু বিশেষজ্ঞ-র সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত। কিছু ক্ষেত্রে কনজাংক্টিভাইটিস দীর্ঘমেয়াদে গুরুতর ক্ষতি এবং কর্নিয়াল আঘাত এবং দাগ হতে পারে অথবা এমনকি দৃষ্টিতে স্থায়ী ব্যাঘাত ঘটতে পারে। এটি একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ এবং এটি স্পর্শ করার মাধ্যমে, ত্বকের সঙ্গে যোগাযোগ (হ্যান্ডশেক বা আলিঙ্গন) ইত্যাদির ফলে হতে পারে।

তাই, কনজাংক্টিভাইটিস-এ আক্রান্ত হলে ঘনঘন হাত স্যানিটাইজ করতে হবে। এছাড়াও এই সময় চোখ স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শুধু তাই নয়, ব্যক্তিগত ব্যবহার্য জিনিসপত্রও স্যানিটাইজ করতে হবে এই সময়। পরিশেষে একটা কথা জানিয়ে রাখা প্রয়োজন,কনজাংক্টিভাইটিস প্রতিরোধ করা যায় সাবধান থাকলে। তাই কনজাংক্টিভাইটিস-এ আক্রান্ত হলে দেরি না করে চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যান এবং উপযুক্ত চিকিৎসার মাধ্যমে তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠুন।

চান (শেষ পর্ব)

শেষ পর্ব

পুরোহিতের নির্দেশের অপেক্ষায় আছে আদিবাসী ভক্তরা। তাদের ধামসা, রামসিঙা বেজে উঠবে। দুই থানের মাঝখানে দুটো মোষ বাঁধা আছে। পুরোহিত মঞ্চ থেকে তাদের গায়ে ফুল ছুড়লেই চারদিক থেকে টাঙি, বর্শা ছুঁড়ে মারতে থাকবে ভক্তরা। যতক্ষণ না ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে না পড়ে। তারপর বিশাল খাঁড়া দিয়ে তাদের মাথা কেটে দেবীর পায়ে দেয়া হবে। কুড়ানি সেই সময়ের প্রতীক্ষায় আছে। মোষের রক্ত কপালে ছুঁয়ে প্রার্থনা জানাবে, হে মা, একটা সন্তান দাও। অথচ ঝমঝম পা ফেলে সে নেমে আসে এসময়। রাগে চৌচির হতে থাকে। এই প্রতিক্ষিত সময়ে ডাকাডাকি! সন্ধ্যাদি কানে কানে বলল, দু’পা পেরোলেই শিলদারদের আটচালা শিবমন্দির, পাশে সামন্তদের বাড়িতেই মজুমদার মশায়ের ডাক। দ্রুত পা কুড়ানির। উৎকর্ণ কান ধামসা, সিঙার শব্দের দিকে। পাছে সে বাদ পড়ে যায়। মজুমদার মশাইকে কখনও দেখেনি কুড়ানি, তাঁর নামডাক শুনেছে শুধু। এই হতদরিদ্র অঞ্চলে যে সামান্য শ্রী এসেছে তাঁর নেপথ্যে তিনি। স্থানীয় রাজনীতিতেও তাঁর প্রবল প্রতাপ। ফলে তাঁকে কেউ অমান্য করে না। কিন্তু এই সময়ে ডাক! অবোধ মেয়ে মানুষ। পাঁচিলের পাশে বুড়ো শিরীষ গাছে একটা পেঁচা উড়ে এসে বসে। কুড়ানির চোখ যায়। ‘আর ভাল্লাগেনি মোর। বলতো কোন পানে আছেন উনি?’

বাগাল ছেলেটা গোয়ালে গরু তুলতে তুলতে মুখ না ফিরিয়েই আঙুল দেখিয়ে দেয়। সূর্য নেমে গেছে কিছুক্ষণ হল। কুয়াশার মতো একপোঁচ অন্ধকার নেমে এসেছে। কুড়ানির উৎকণ্ঠা আর ক্লান্তি তাতে রহস্য ছড়িয়েছে ঢের। একটা অস্থিরতা নিয়ে হুড়মুড় করে বনটগর গাছটার পাশে সামন্তদের বৈঠকখানা ঘরে ঢুকে পড়ে কুড়ানি।

সামনে জমাট অন্ধকার দেয়ালে বাধা পেয়ে ফিরে আসছে। কুড়ানির শরীরেও তা পিছলে যেতে থাকে। খোলা দরজা দিয়ে কিছু দূরের ভৈরব থানের অস্পষ্ট আলো দেখা যায়। কিন্তু ভিতরে গুমোট অন্ধকার। কোথাও কাউকে দেখা যাচ্ছে না। আর দেখা যাবে বা কাকে! আজ এ তল্লাটের সমস্ত মানুষের বউ-বাচ্চার ঝক্কি সামলাবে ওই রঙ্কিণী থান। চোখের নজর বাড়িয়েও কোথাও কাউকে দেখে না কুড়ানি ।

‘তবে মোর ভুল হইছে। কী শুনতি কী শুনছি!’

পিছনে ফেরে কুড়ানি, দরজার দিকে পা বাড়ায়। ‘ফিরতিছ ক্যান?’ একটা গলা ফ্যাসফ্যাস করে ওঠে আচমকা। কুড়ানি চমকায়। আবার চিঁচিঁ করে কথা বাজে, ‘তুমি আইছ, বসো, দুফরে খাওয়া হয় নাই?’

কুড়ানির মাথা ফাঁকা হয়ে যায়। কার কথা! নন্দীদের জোয়ান ছেলেটা শিরীষ গাছের ডালে ঝোলার পর অনেকবার ওইপথে সাঁঝবেলায় এরকম রক্তহীন আমন্ত্রণ শুনেছে। পড়িমরি দৌড়ে দাওয়ায় এসে উঠেছে অনেকদিন। ঘরে বসেও সেই বুক ধরফরানি থামেনি।

‘মায়ের ফুল আনছ, ধকল গিছে। এটটু বসো, জিরায় লও।’

“আলো নাই ক্যানে?’

শশব্যস্ত একটা ক্ষীণ আলো তক্ষুনি জ্বলে ওঠে। ঘরের কোণে একটা বসার জায়গা পরিপাটি দেখা যায়। অন্য প্রান্ত থেকে ডাক আসে, ‘আসো, বসো!’

কুড়ানির পায়ে জড়তা। মাথার ভিতর কাঁসাইয়ের ভটভটি। জোয়ারের টানে ভটভটি এগিয়ে যায় একপার থেকে অন্যপার। তক্তপোশে বসতেই কুড়ানির নাকে একটা বোটকা গন্ধ ধাক্কা মারে। এরকম গন্ধ তার চেনা। মাঝে মাঝে অনেক রাতে দিবা যখন বাড়ি ফেরে, এই গন্ধে সে ভীষণ রেগে যায়, চ্যাঁচামেচি করে। ততক্ষণে অন্য গন্ধ সমস্ত ঘরজুড়ে কুণ্ডলী পাকাতে থাকে। একটা অমঙ্গলের ঘূর্ণি ঘুরপাক খায়। কুড়ানির বুক ঢিপঢিপ করে ওঠে। অন্ধকার সয়ে এসেছে কুড়ানির, দূরে অস্পষ্ট আলোয় দেখে আরাম চেয়ারে শুয়ে এক বিশাল পুরুষ। এই আলোতে মুখ দেখা না গেলেও বোঝে সেইটা মজুমদারমশাই। ভয় ছেনে কুড়ানি কিছু সাহস সঞ্চয় করে। কথা বাড়ায়।

‘তা কি কইতেছেন? মোর একন কি করার আছে বলো দিকিন?’

‘করার তো আছেই। তুমি বুঝনি?’

শরীর রক্তহীন লাগে। কেমন ধোঁয়াটে বাতাস ঘরময় ঘোরাফেরা করে। এই রহস্যের খোলসের ভেতর থেকে একসময় সেই আধশোয়া পুরুষ উঠে আসে, কপাট লাগায়। ধোঁয়াশার চাদর সরে যায়। কুড়ানির সারাদিনের উপোসি শরীর এই আতঙ্ক সহ্য করতে পারে না। তার প্রায় বুজে আসা চোখের সামনে দেখে ভয়ংকর করাল মূর্তি। রক্তলোভী, লোলুপ তার জিভ, লকলক করছে। বহুদিনের পিপাসা তৃষ্ণা মেটাতে চায়। ভৈরব থান থেকে মাইকে মন্ত্র ভেসে আসে

মুণ্ডমালা গলে রক্তাংগীং শববাহনাম
সদাপূজম ধ্যায়েৎ সদা রঙ্কিণীম

সঙ্গে সঙ্গে ধামসা মাদল রামসিঙা ঢোল উৎকট শব্দে বেজে ওঠে। এই উচ্চকিত শব্দে তার সংজ্ঞা ফিরে আসতে দেখে, সেই বিশালাকায় মূর্তি তাকে গ্রাস করছে। মনে হচ্ছে যেন শত শত আদিবাসীদের টাঙি, বর্শা তার গায়ে এসে পড়ছে। ভীষণদর্শন পুরোহিত খাঁড়া নিয়ে এগিয়ে আসছে তার মুন্ডু কেটে নিতে। জ্ঞান হারায় কুড়ানি।

চেতন অচেতনে এই জল-জঙ্গল ধান-পানের দেশে এক ভটভটি জলের শান্ত শরীর দুমড়ে দিতে দিতে অন্য পারে চলে যায়। আর এক গাড্ডার ভিতর থেকে, হুজুগের ভিতর থেকে, পাগলামির ভিতর থেকে উঠে আসে কুড়ানি। বড়ো রাস্তায় উঠে চোখ যায় রঙ্কিণী থানের দিকে। মানতের কথা মনে হতেই পেটের ভিতর থেকে, বুকের ভেতর থেকে, গলার ভেতর থেকে ঘেন্নার থুতু তুলে আনে। থুক করে। থুথু হাওয়ায় ভেসে ছড়িয়ে পড়ে রঙ্কিণী থানে, দূরের বর্গভীমার মন্দিরে, বাবা পঞ্চানন্দের চোখে মুখে। তারপর আত্মবিশ্বাসে লৌকিক পায়ে হেঁটে যায় উলটো পথে, নেমে পড়ে পালদের পুকুরে। জমানো গ্লানি ধুয়ে ফেলে ঘরে ফিরতে হবে।

 

 

ওড়িশা সফর-কথা (পর্ব ১)

ঘড়িতে সবে সাড়ে ৯টা। আমাদের বোলেরো জিপ রাউরকেলা টাউনশিপ থেকে স্টার্ট করে ৮ কিমি দুরে মিউনিসিপাল পৌঁছোল মাত্র ১৫ মিনিটে। জিপ এবার বাদিকে ঘুরে কয়েক কিলোমিটার এগিয়েই ঢুকে পড়ল রাউরকেলা স্টিল প্ল্যানটের ফার্টিলাইজার টাউনশিপ-এ। গাড়ির গতি মধ্যম, আধঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে গেলাম লাঠিকাটা। হালকা জঙ্গলের শুরু এখান থেকে৷  ছোট্ট ছুটিতে অনেকেই প্ল্যান করেন পাশের রাজ্য ওড়িশার কিছু স্বল্পখ্যাত টুরিস্ট স্পট দেখে নেওয়ার। এমনই উদ্দেশ্য নিয়ে। আমরাও চলেছি ব্রাহ্মণী নদীর তীরে অবস্থিত দার্জিং-এর দিকে।তবে এ সফর শীতে আরও মনোরম হতো৷

জাতীয় সড়ক ২৩-এর দুই পাশে জঙ্গল ক্রমশ ঘন হচ্ছে। রাস্তার স্থানে স্থানে পিচ ওঠা, অবস্থা খারাপ। এপথে জিপ ছাড়া অন্য গাড়ি বিশেষ চোখে পড়ে না। মাঝে মাঝে দেখা যায় ডাম্পার চলেছে পথের লাল ধুলো উড়িয়ে। জঙ্গলঘেরা পাহাড়ি পথে মাঝে মাঝে লোকালয়, আদিবাসী অধ্যুষিত। পেরিয়ে এসেছি চাদিপোশি, বাস্তি নামের ছোটো ছোটো গ্রাম। পার হলাম ব্রাহ্মণী নদীর ওপর একটি ছোটো সেতু। ভারি সুন্দর, নির্জন বন্য পরিবেশ। গাড়ি রাস্তার ধারে দাঁড় করিয়ে নেমে এলাম।

সামনে পাহাড়ঘেরা জঙ্গলময় উপত্যকা। পাশে বয়ে চলেছে নদী। পথের দু’পাশে শাল-পলাশের জঙ্গলে লাল ধুলোর আস্তরণ। আরও কিছুটা এগিয়ে ড্রাইভার সন্তোষ জিপ দাঁড় করাল ছবির মতো সুন্দর এক জায়গায়। পাহাড় নদী ও জঙ্গল নিয়ে জায়গাটির নাম দার্জিং, রাউরকেলা থেকে মাত্র ৪৫ কিলোমিটার দূরে। আমরা এসেছি জাতীয় সড়ক ২৩ ধরে। এই পথ দার্জিং পেরিয়ে রাজামুন্ডা গ্রাম হয়ে পৌঁছোবে ৬০ কিমি দূরের লাহুনিপাড়া তহশিলে। সেখান থেকে দুটি ভিন্ন পথ গেছে কাল্টা ও টেনসায়।

শীতে দার্জিং-এ পিকনিক পার্টিদের ভিড় থাকে। এখন ফাঁকা৷ আমরা ছাড়া এসেছে ৩-৪ জন স্থানীয় আদিবাসী যুবক, দুটি মোটর সাইকেলে। চাদর বিছিয়ে আমরা যে-জায়গায় বসলাম তার পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে ব্রাহ্মণী নদী। শীতে সে শীর্ণকায় হয়ে যায়। তার বিস্তৃত বালুকাময় চড়ার মাঝ দিয়ে তিরতির করে বয়ে চলে কয়েকটি ছোটো জলধারা। কী অপূর্ব সুন্দর পরিবেশ। অদূরেই অনুচ্চ পাহাড়, জঙ্গল। সেখানে বিরাজমান অপার নীরবতা।

 Odisha Darjing travel

দার্জিং-এ বেড়াতে এসে পিকনিকটাও সেরে নিচ্ছি হটকেস-এ আনা চিলি চিকেন-ফ্রায়েড রাইস-এ। এখান থেকে আরও ২ কিলোমিটার এগোলেই দেওধর গর্জ। দুই পাহাড়ের মাঝে বহমান নদীতে যথেষ্ট জল এই শীতেও। পরিবেশের অখণ্ড নীরবতাকে নষ্ট না করে আমরা প্রায় নিঃশব্দেই লাঞ্চ সারলাম দুপুর সাড়ে ১২টা নাগাদ। পায়ে পায়ে পৌঁছে গেলাম পিডব্লুডি-র ইন্সপেকশন বাংলোর কাছে। আরও কিছুটা অমূল্য সময় কাটিয়ে উঠে বসলাম জিপ-এ। একই পথে লাঠিকাটা পার হয়ে ফিরে এলাম রাউরকেলায়।

পানপোশ চক পেরিয়ে গাড়ি চলে এল ব্রাহ্মণী নদীর ওপর তৈরি ব্যস্ত সেতুতে। বেদব্যাস চক-এ পৌঁছে গাড়ি ডানদিকে মোড় নিয়ে মাত্র আধ কিলোমিটার এগোতেই আবার ব্রাহ্মণী নদীর তীরে বেদব্যাস মন্দিরে। এই মন্দির রাউরকেলা থেকে মাত্র ১২ কিলোমিটার দূরে। মন্দির থেকে সিঁড়ি নেমে গেছে নদী পর্যন্ত। বায়ে তাকালে চোখে পড়ে শঙ্খ ও কোয়েল নদীর সঙ্গম। ঝাড়খণ্ড থেকে বয়ে আসা নদী দুটি বেদব্যাসে মিলিত হয়ে জন্ম দিয়েছে ওড়িশার অন্যতম প্রধান নদী ব্রাহ্মণীর।

নদী বেশ চওড়া এখানে। কিংবদন্তী অনুযায়ী, ব্যাসদেবের জন্ম এইস্থানে এবং তাঁর নামে মন্দিরও। কাছেই নদীতীরে এই অঞ্চলের একমাত্র মহাশ্মশান। শিবরাত্রিতে মন্দিরের পাশে রাতভর মেলা বসে। বেদব্যাস চকে ফিরে এলাম দুপুর আড়াইটে নাগাদ। এবার সম্বলপুরগামী রাজ্য সড়ক ১০ ধরে এগিয়ে চললাম। গাড়ির গতি বেড়েছে। পার হলাম কংসবহুল টাউনশিপ, তারপরই কলুঙ্গা, আরও কিছুদুর এগিয়ে গাড়ি রাজ্য সড়ক ছেড়ে ডান দিকে মোড় নিল।

(চলবে)

বর্ষাকালের অসুখ, সতর্কতা এবং পরামর্শ

আমাদের মনে রাখতে হবে যে, বর্ষাকালে হজমের সমস্যা এবং কিছু সংক্রামক রোগ-সহ নানারকম শারীরিক সমস্যা দেখা দেয় অনেকের। এই সময় মশার প্রজনন বৃদ্ধি পায় এবং ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু প্রভৃতি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। কিন্তু এত সমস্যা কাটিয়ে কীভাবে সুস্থ থাকবেন বর্ষাকালে, সেই পরামর্শ দিচ্ছেন কলকাতার এএমআরআই হাসপাতালের অ্যাডভান্সড ল্যাপারোস্কোপি এবং কনসালট্যান্ট গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সার্জন ডা. সঞ্জয় মণ্ডল।

আর্দ্রতা এবং গরম আবহাওয়ার কারণে বর্ষাকালে খাবার সহজেই নষ্ট হয়ে যায় এবং খাদ্যে বিষক্রিয়া হতে পারে এবং তীব্র গ্যাস্ট্রো-এন্টেরাইটিসের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। তাই এটা সবসময় সুপারিশ করা হয়— যাতে টাটকা রান্না করা গরম খাবার খেতে পারেন। খাবার বাইরে বেশিক্ষন অঢাকা অবস্থায় ফেলে রাখা উচিত নয়। কারণ, এটি ব্যাকটেরিয়া এবং প্যাথোজেনের সংস্পর্শে আসতে পারে। হাতের স্বাস্থ্যবিধি এবং বিশেষ করে খাদ্য হ্যান্ডলারদের পরিচ্ছন্নতা এবং স্বাস্থ্যবিধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধি না মানলে খাদ্যে বিষক্রিয়ার ঝুঁকি বাড়াবে এবং গ্যাস্ট্রো-এন্টেরাইটিস এবং অন্যান্য হজমের সমস্যা যেমন পেট ফোলা, ফুসকুড়ি, বমি বমি ভাব, বমি, কোষ্ঠকাঠিন্য, পেটে ব্যথা এবং জ্বালাপোড়ার সমস্যা হতে পারে।

Dr. Sanjoy Mandal

অ্যাসিডিটির ফলে পিত্তথলিতে পাথর এবং এর জটিলতার একটি উপসর্গও হতে পারে। যারা প্রচুর মাংস কিংবা তেলমশলা যুক্ত খাবার খান, তারা কোষ্ঠকাঠিন্যর সমস্যায় ভুগতে পারেন। আর বেশিদিন কোষ্টকাঠিন্যর সমস্যা থাকলে শক্ত মলের সঙ্গে রক্তপাত, পাইলস এবং ফিসার হতে পারে। বেশি অ্যালকোহল গ্রহণ করলেও অগ্ন্যাশয়ে প্রদাহ হতে পারে, লিভারের চরম ক্ষতি করতে পারে।  বর্ষাকালে টাইফয়েড এবং ভাইরাল হেপাটাইটিস প্রভৃতি সমস্যাও দেখা দিতে পারে। টাইফয়েড সালমোনেলা সংক্রমণের কারণে হয় এবং এর সঙ্গে যুক্ত জ্বর এবং হজমের  সমস্যাও হয় অনেক সময়। অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে টাইফয়েডের চিকিৎসা করা হয়।

ভাইরাল হেপাটাইটিস প্রায়শই হেপাটাইটিস ‘এ’ ও ‘ই’ সংক্রমণ এবং জন্ডিস, বমি বমি ভাব, বমি, জ্বর ইত্যাদিও হয় বর্ষাকালে। বর্ষাকালে কাঁচা ফল এবং সবজি খাওয়ার আগে সঠিকভাবে ধুয়ে এবং পরিষ্কার করে নিতে হবে। যতটা সম্ভব বাইরের খাবার এড়িয়ে চলার চেষ্টা করুন বর্ষাকালে। যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে তাজা প্রস্তুত এবং স্বাস্থ্যকর ভাবে সংরক্ষিত খাবার খান। এই সময় বিশুদ্ধ জল পান করুন। কারণ, বর্ষাকালে জলবাহিত অনেক অসুখ হয়।  বর্ষাকালে যেমন অ্যাসিডিটির সমস্যা দেখা দেয়, ঠিক তেমনই এই সময় ডায়ারিয়া-র সমস্যাও দেখা যায়। ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু এবং অন্যান্য রোগ যেমন চিকুনগুনিয়া, কলেরা, হেপাটাইটিস  এবং লেপ্টোস্পাইরোসিস অস্বাভাবিক নয়। স্বাস্থ্য সম্পর্কিত যে কোনও সমস্যা বদহজমের জন্যও হতে পারে, তাই সঠিক সময়ে সঠিক খাবার খান, প্রতিদিন ৩-৪ লিটার জলপান করুন এবং রাতে অন্তত ৭-৮ ঘন্টা ঘুমিয়ে সঠিক বিশ্রাম নিন।

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব