ছোট্ট ফ্ল্যাট, দেখতে বড়ো

আকারে বড়োসড়ো ফ্ল্যাটে থাকতে সকলেই চান, কিন্তু রিয়্যাল এস্টেটের দরদস্তুর আকাশচুম্বি হওয়ায়, অনেকেরই সেই স্বপ্ন অধরা থেকে যাচ্ছে। বড়োজোর সাড়ে সাতশো স্কোয়ার ফিট-এই কোনওরকমে পরিবার সমেত নিজেকে কুলিয়ে-আঁটিয়ে নিতে হচ্ছে।

তাই অন্দরসাজে বদল এনে অনেকেই বড়ো ফ্ল্যাটে থাকার সাধপূরণ করতে চান। সাজসরঞ্জামে সামান্য অদলবদল এনে, কীভাবে Two roomed Flat বড়ো দেখানো যায়– জেনে নিন তারই কিছু টিপস।

অপ্রয়োজনীয় জিনিস বর্জন করুন

2BHK flat হলে প্রথমেই, অপ্রয়োজনীয় জিনিস আঁকড়ে রাখার মায়া ছাড়তে হবে। নিজেই বসে অদরকারি জিনিসের একটা লিস্ট করুন। যেগুলি এক্সচেঞ্জ করে দরকারি কিছু কেনা যায়, তার ব্যবস্থা করুন। এরপর পুরোনো ফার্নিচার কেটে-ছেঁটে রিমডেলিং করুন। ধরা যাক আপনার কাছে কাঠের কাজ করা তিন পাল্লার ড্রেসিং টেবিল রয়েছে। অনায়াসে তার দুটি পাল্লা কেটে নতুন করে স্মার্ট লুক দিতে পারেন। পুরোনো চেয়ার-এর হাতল কেটে স্মার্ট আধুনিক চেয়ারের শেপ দিতে পারেন, আপনার পরিচিত কাঠের মিস্ত্রির সাহায্যে।

রং-এর নির্বাচনে বুদ্ধিমত্তা

কিছু রং থাকে যার ব্যবহারে ঘর উজ্জ্বল এবং বড়ো দেখায়। হালকা রং-ই ঘরের তিনদিকের দেয়ালের জন্য আদর্শ। বাকি থাকা একটি দেয়ালে গাঢ় রং করে, দৃষ্টিবিভ্রমের সুযোগে ঘরটিকে বৃহৎ দেখানো যায়। সাদা, ক্রিম বা আইস ব্লু রঙে ঘর স্বাভাবিক মাপের চেয়ে বড়ো দেখায়।

Innovative Space Saving

স্পেস সেভ করার জন্য একটু বুদ্ধির প্রয়োগ করুন, তাহলেই আপনি ঘরের ফাঁকা জায়গার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে পারবেন। আধুনিক কোম্পানির বহু ফার্নিচার এখন পাওয়া যায় যা মাল্টি ইউজ-এর জন্য আদর্শ অথচ জায়গাও বেশি দখল করে না। ক্যাবিনেট বা স্টোরওয়েল ধরনের আসবাব দেয়ালে ফিট করুন, খাটের সঙ্গে বক্স করে নিন, এতে ঘরের জিনিসপত্র অযথা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকবে না। ঘর পরিষ্কার থাকলে আকারে বড়ো দেখাবে। আজকাল কিছু নামি ফার্নিচার ব্র্যান্ড এমন স্মার্ট ইউটিলিটি প্রোডাক্ট বাজারে এনেছে, যার ফলে ওয়াশিং মেশিন রাখার পর ওপরের জায়গাটাকেও কাজে লাগানো সম্ভব। পাওয়া যাচ্ছে ফোল্ডিং ওয়ার্ডরোব, যা অল্প পরিসরেও দিব্যি মানানসই।

Space Illusion -এর জন্য আয়না

ঘরের দেয়ালে বড়ো আয়না লাগিয়েও ঘরকে বড়ো দেখানো সম্ভব। এই স্পেস ইল্যুশন করতে হলে ঘরের সবচেয়ে বড়ো দুটি দেয়াল ব্যবহার করতে পারেন। এরফলে আলো প্রতিসারিত হয়ে ঘরটিকে বড়ো দেখতে লাগবে। ফুলের টব বারান্দায় হ্যাঙ্গিং অবস্থায় রাখুন। অ্যাকোয়ারিয়াম ও টিভি দেয়ালের গাঁ ঘেঁষে সেট করুন।

 

গেরস্থালির সমস্যার সমাধান

সংসার মানেই সাতরকম ঝামেলা। বাড়িঘরের সারাই মেরামত তো লেগেই আছে, সেইসঙ্গে আছে টুকিটাকি সমস্যা। এখানে আলোচনা করা হল তেমনই কিছু সমস্যার বিষয়ে। সঙ্গে রইল তার সমাধানসূত্র।

রান্নাঘরের সিংক, বেসিন কিংবা বাথটাব বন্ধ হয়ে গেলে কী করবেন – বেসিন অথবা টাব, যাই আটকে যাক প্রথমে জল দিয়ে বেসিনটি ভরুন (যার জন্য বেসিনের ছিদ্র আটকাচ্ছে সেটিকে ঠেলে পরিষ্কার করার জন্য জলের প্রয়োজন রয়েছে।) বেসিনের উপরে যে বাতাস এবং জল যাওয়ার জায়গাটি রয়েছে সেটাকে স্পঞ্জ অথবা কাপড়ের টুকরো দিয়ে ভালো করে আটকান যাতে ওটা খুললেই জল তোড়ে ওখান দিয়ে ঢুকতে পারে। দোকানে প্লাঞ্জার অথবা পাম্প কিনতে পাওয়া যায়। সেটার সাহায্যে জোরে পাম্প করলেই, যার জন্য বেসিন আটকেছে সেটা খুলে যাবে।

প্রত্যেকবার যখন পাম্প করবেন তখন কিছুটা করে জল অবশ্যই ড্রেনের ভিতর বেশ তোড়ে ঢোকা উচিত। প্রত্যেকবারই পাম্প করার সময় এই নিয়ম মানা উচিত। এরকম নিয়মে কয়েকবার পাম্পিং এবং ফ্লাশিং করার পর বেসিনের ড্রেনের মুখ খুলে দিন।

বাথরুমে দুর্গন্ধ দূর করতে – একটি প্লেটে বেকিং সোডা রেখে টয়লেটের পিছনে রেখে দিলে দুর্গন্ধ চলে যাবে।

মাছ অথবা পচে যাওয়া খাবারের দুর্গন্ধ দূর করতে – যেখান থেকে গন্ধ আসছে সেখানে একটা বোলে সাদা ভিনিগার রেখে দিন কিছু ঘণ্টার জন্যে। গন্ধ নিজে নিজেই গায়েব হয়ে যাবে।

স্টিকার, মরচে, আঠার দাগ দূর করতে – আসবাবপত্র, কাচ, প্লাস্টিক থেকে দাগ ওঠাবার জন্য ভেজিটেবল অয়েল দিয়ে জায়গাটা ভিজিয়ে রাখুন কিছুক্ষণ। তারপর একটু রগড়ালেই দাগ উঠে আসবে।

মেটাল জিপার যদি বার বার আটকে যায় – কোনও পেনসিলের শিষ হালকা করে জিপারের গায়ে বুলিয়ে দিন। পেনসিলের গ্রাফাইট, জিপারকে লুব্রিকেট করে এবং এটিকে মসৃণভাবে কাজ করতে সাহায্য করে। এটি শুধুমাত্র মেটাল জিপারের ক্ষেত্রেই কাজ করে।

জামাকপড়, জিনস-এ চিউয়িংগাম আটকে গেলে – চিউয়িং গাম শুদ্ধু কাপড় খানিক্ষণের জন্য ফ্রিজারে রেখে দিন। চিউয়িংগাম ঠান্ডায় জমে ফাটা ফাটা হয়ে যাবে। তারপর কপড় ধুয়ে নিলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে।

নেল ভার্নিশ, বেয়াড়়া আঠা তুলতে সাহায্য করে। শার্ট অথবা ব্লাউজের কলারে লেগে থাকা নোংরা তুলতে শ্যাম্পু ব্যাবহার করুন। যেভাবে মাথায় শ্যাম্পু করা হয় সেই একই পদ্ধতিতে কলারে শ্যাম্পু লাগাতে হবে। বডি অয়েল তোলার জন্য বিশেষভাবে শ্যাম্পু প্রস্তুত করা হয়। ওয়াশিং মেশিনের পাশে সবসময় একটা কমদামি শ্যম্পুর বোতল রাখুন যাতে কাপড়ের দাগে ওটা ব্যবহার করতে পারেন।

কালির দাগ – সবথেকে ভালো হল, কালির দাগ জামাকাপড়ে লাগলে, দাগের উপর অ্যালকোহল ঘষে দেওয়া। তাহলেই দেখবেন দাগ উধাও। কাপড় ধুতে দেবার আগেই এই প্রক্রিয়া করা দরকার।

বলপয়েন্ট পেনের দাগ সহজে উঠে যাবে যদি তার উপর হেয়ার স্প্রে করা হয়। হেয়ার স্প্রে শুকিয়ে গেলে কাপড় ধুয়ে ফেলুন। দাগ পরিষ্কার হয়ে যাবে।

ভিনাইলের উপর ক্রেয়ন-এর দাগ – সিলভার পলিশ দিয়ে এই দাগ তোলা যায়। ওয়ালপেপারের উপর বাচ্চারা ক্রেয়ন দিয়ে দাগ করলে, বেকিং সোডা ছড়িয়ে ভিজে কাপড় দিয়ে আস্তে করে মুছে দিন।

শক্ত যে-কোনও সারফেস-এ দাগ লাগলে, স্টিল উল সাবানে ডুবিয়ে হালকা করে দাগের জায়গাটা মুছে নিন। জায়গাটা ভেজাবেন না।

পেইন্ট করা দেয়ালে ওয়্যাক্স ক্রেয়ন দিয়ে দাগ করা হলে, ডব্লুডিফরটি (এক ধরনের স্প্রে লুব্রিকেন্ট) দাগের উপর স্প্রে করুন। কাপড় দিয়ে হালকা করে মুছে ফেলুন। লিকুইড সাবান যে-কোনও ধরনের লুব্রিকেন্ট-এর দাগ দেয়াল থেকে মুছে ফেলতে সাহায্য করে। গাঢ় রঙের জায়গা হলে, দাগ ওঠাবার জন্যে হয়তো বেশিবার স্প্রে করার দরকার হতে পারে এবং স্প্রে লাগিয়ে খানিকক্ষণ রেখে দেওয়ারও প্রয়োজন পড়তে পারে।

মাখনের দাগ – দাগের মধ্যে মাখনের দাগ তোলা খুব শক্ত। মাখনের দাগ তোলার জন্য দরকার নরম স্পঞ্জ, হলকা গরমজল, শ্যাম্পু এবং অল্প পরিমাণে গ্রিজ সলভেন্ট। দাগের উপর সামান্য গ্রিজ সলভেন্ট লাগিয়ে শুকোতে দিন। স্পঞ্জে অল্প শ্যাম্পু ঢেলে গরমজলে ভিজিয়ে হালকা করে দাগটা মুছে নিন।

কেচ-আপের দাগ – দাগ তোলার জন্য গ্লিসারিন, সাবান ও জল দরকার। দাগ লাগলেই সঙ্গে সঙ্গে মুছে ফেলুন নয়তো দাগ থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।

রক্তের দাগ – যত তাড়াতাড়ি ধুয়ে ফেলা যায় ততই ভালো। সব থেকে ভালো উপায় শ্যাম্পু ব্যবহার করা।

অন্যান্য উপায় – ভুট্টার মাড় রক্তের দাগ ওঠাতে সাহায্য করে। কাপড়ে রক্তের দাগ লাগলে ঠান্ডা জল দিয়ে ধুয়ে নিন। তারপর ভুট্টার মাড় ভিজিয়ে জায়গাটাতে লাগিয়ে দিন। রোদ্দুরে রেখে শুকোতে দিন।

পেশাদারি প্রক্রিয়া – ঠান্ডা জলে প্রথমে দাগটা ধুয়ে ফেলুন। গরমজলে ধুলেই দাগ বসে যাবে। তখন দাগ ওঠানো খুব মুশকিল। রক্তের দাগ তুলতে হাইড্রোজেন পারক্সাইড ব্যবহার করা সবথেকে ভালো উপায়। দাগ লাগার সঙ্গে সঙ্গে করতে পারলে ভালো কিন্তু শুকনো রক্তের দাগও চেষ্টা করলে উঠে যাবে। হাইড্রোজেন পারক্সাইড জামাকাপড়ের কোনও ক্ষতি করে না।

ঘষটানি দাগ – এক বালতি জলে ৩ চা চামচ টিএসপি (ট্রিসোডিয়াম ফসফেট) মিশিয়ে নিন। এই মিশ্রণ ঘষটানির দাগ এবং দেয়ালে ক্রেয়নের দাগ ওঠাতে সাহায্য করে। যে-কোনও পেন্টের দোকানে অথবা হার্ডওয়্যার স্টোরে টিএসপি কিনতে পাওয়া যায়। এটি ব্যবহারের সময় অবশ্যই দস্তানা পরা উচিত। গ্লস, সেমি গ্লস অথবা কাঠের সারফেসের উপর টিএসপি ব্যবহার করবেন না।

ম্যাজিক মার্কার-এর দাগ – হেয়ার স্প্রে দিলেই মার্কার কালির দাগ উঠে যায়।

মরচে অথবা জলে আয়রন বেশি থাকলে যদি দাগ হয় – ভিনিগার অথবা পাতিলেবুর রসে উপকার পাওয়া যাবে।

তামার পাত্র – পাতিলেবু কেটে নুনে ভিজিয়ে তামার গায়ে বোলালে পাত্র পরিষ্কার হবে (অথবা ভিনিগার দিয়েও পরিষ্কার হবে)।

কফি ও চায়ের কাপ – বেকিং সোডা দিয়ে পরিষ্কার করা যায়।

সাবধান থাকবেন – কোনও জিনিস ব্যবহারের আগে, সেই জিনিসটি পোশাকের দাগ ওঠানোর জন্য জামাকাপড়ের সেই অংশে লাগিয়ে একবার পরীক্ষা করে নিন, যে অংশটির কোনও রকম ক্ষয়ক্ষতি হলে তা দৃষ্টিগোচর হবে না। সিল্ক এবং উলের কাপড়ে অ্যামোনিয়া ব্যবহার করবেন না। রেয়ন, ভেলভেট, সিল্ক এবং লেস কোনও ভালো দোকান থেকেই (কাচার দোকান) কাচিয়ে নিয়ে আসা ভালো।

বাচ্চাদের খুব পছন্দের খেলা হল, টয়লেটের মধ্যে খেলনা এবং জিনিসপত্র ফেলে দেওয়া। ছুতোর মিস্ত্রি ডাকার আগে, নিজেই চেষ্টা করুন টয়লেট থেকে জিনিসটা তুলে ফেলতে। বালতি ভরে জল নিয়ে টয়লেটের মধ্যে তোড়ে ঢালুন। অন্য কোনওভাবে হঠাৎ টয়লেট আটকে গেলে জলের তোড়ে অনেকসময়ে খুলে যায়। তাও যদি সমস্য থেকে যায়, টয়লেটে জল ঢেলে পাম্প অথবা আবার প্লাঞ্জারের সাহায্যে জোরে জলটা পাম্প করলেও অনেকসময় টয়লেট খুলে যায়। এছাড়াও হার্ডওয়্যার-এর দোকানে সরু তার কিনতে পাওয়া যায় যেটা সহজেই ইচ্ছামতো বাঁকানো যায়। এটাও টয়লেট আটকালে ব্যবহার করা যেতে পারে।

 

গ্যাজেটে আধুনিকতা

বাড়ি-গাড়ির চিন্তা এখন অনেকটাই ব্যাকডেটেড। আগে হলে চোখে পড়ত দৈনিক খবরের কাগজে চোখ রেখে নতুন নতুন জমি, বাড়ির সন্ধানে অথবা গাড়ির বাজারে নতুন কী এল তার খবর রাখতেই মানুষ বেশি ব্যস্ত।

এখন ধারণাটা ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। বাজার ক্যাপচার করছে হালকা ওজনের ছেটোখাটো ইলেকট্রনিকস গুড্-স এর পপুলারিটি এবং চাহিদা। মানুষের পছন্দ বদলাচ্ছে, লাইফস্টাইলেরও আমূল পরিবর্তন ঘটছে। আগে এত কিছুর প্রয়োজন ছিল না। বাড়ি ভর্তি লোকজনের আনাগোনা, বড়ো পরিবার কোনও মানুষকে একাকিত্ববোধের আঁচটুকুও গায়ে লাগতে দিত না। আর এখন সবই প্রায় নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি। সকলেই লাইফটাকে নিজের মতো করে এনজয় করতে চায়। বাড়ির বড়োরা নিজেদের কাজে ব্যস্ত। যে-কাজ আগে বাড়িতে বসেই করে নেওয়া যেত, আজকের যুগে সময়ের অভাবে গাড়িতে, বাসে বসেই অনেক দায়িত্বপূর্ণ কাজ করে ফেলতে হয়। সুতরাং ছোটোদের কোয়ালিটি সময় দেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। তাদের সময় কাটাবার জন্য তাই হাতে তুলে দেওয়া হয় নতুন নতুন গ্যাজেট, যেগুলি ব্যাটারি অথবা ইলেকট্রিকে অপারেট করা যায় এবং এগুলি ব্যবহার করতে গেলে অপরের সাহায্যেরও কোনও প্রয়োজন পড়ে না। বাচ্চা থেকে বুড়ো, সকলেই অনায়াসে এগুলির ব্যবহার করতে পারেন।

গ্যাজেটে বাচ্চাদের হাতেখড়ি বলা যায় প্রথম ভিডিও গেমস্ দিয়ে। টিভি অথবা কম্পিউটার মনিটরের পর্দায় চোখ রেখে সারাদিন ধরে ভিডিও গেমস্ খেলতে বাচ্চাদের কখনওই ক্লান্ত হতে দেখা যায় না। বড়োদের লাইফস্টাইলেও এখন হালকা ওজনের গ্যাজেট ভীষণভাবে ইন কারণ তা ক্যারি করার সুবিধা রয়েছে।

বাজারে কাস্টমার নিড-এর উপর বেস করে পৃথিবীর বড়ো বড়ো কোম্পানিগুলো ঝাঁপিয়ে পড়ছে চাহিদার জোগান দিতে। কোম্পানিগুলির মধ্যে অ্যাপল, স্যামসাং, সোনি, মাইক্রো ম্যাক্স, এইচপি, লেনোভো, ডেল ইত্যাদি অবশ্যই উল্লেখযোগ্য।

মোবাইল এবং ল্যাপটপ, ট্যাব এখন সকলের হাতে হাতে।এগুলি ছাড়া আধুনিকতার দরজায় পৌঁছোনো যেন একপ্রকার অসম্ভব। কানে হয় গান বাজছে নয়তো সময়ে অসময়ে দরকারি কাজ টুক করে সেরে ফেলতে মোবাইল-ই এখন মাধ্যম। তাই এই সব গ্যাজেটস্-এ যত নতুন নতুন ফিচার দেওয়া হচ্ছে, ততই তার চাহিদা এবং দাম বাড়ছে।  এদেশের মধ্যবিত্তদের কথা মাথায় রেখেই বহু ফিচার দেওয়া সত্ত্বেও পকেট ফ্রেন্ডলি দাম রাখার চেষ্টা করে কোম্পানিগুলি বাজারে মোবাইলের রকমফের নিয়ে আসছে।

অ্যাপেল-এর আইপ্যাড মিনি, আইফোন, আইপড ন্যানো ইত্যাদি গ্যাজেটগুলি শুধু দোকানের শেল্ফ-এ শোভা পাচ্ছে না, মানুষের হাতে হাতেও ঘুরছে। এগুলির অত্যাধুনিক ফিচার দৈনন্দিন চাহিদাগুলি পূরণ করছে।

যে- কাজগুলি আগে ছিল সময় সাপেক্ষ, আজ বাটন-এর একটি ছোঁয়ায় তা মুহূর্তে সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে। টাচ্সি্্ক্রন, এলসিডি ডিসপ্লে, একসঙ্গে দু-দুটি ক্যামেরার সুবিধালাভ, ফুল এইচডি ভিডিও রেকর্ডিং, ইন্টারনাল হাই-স্টোরেজ ফেসিলিটি, গান শোনার সুবিধা এবং কম্পিউটারের সবরকম সুযোগ-সুবিধাও এগুলির মধ্যে রয়েছে। আইফোন থ্রিজি, ফাইভএস, আইফোন সিক্স ফোনগুলি ব্যাবসায়িক কাজের সুবিধার জন্যেও ব্যবহার করা হয়। এগুলিতে পার্সোনাল ইনফরমেশন ম্যানেজার উইথ ক্যালেন্ডার, অ্যাড্রেস বুক, স্টক ট্র্যাকিং ইত্যাদি সুবিধাও দেওয়া থাকে। ওয়েদার আপডেট-ও আপনি সহজে পেতে পারেন এই ছোট্ট যন্ত্রটির সাহায্যে।

আইপড ন্যানো, ১৬ এবং ৩২ জিবি বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। এতে অসংখ্য ছবি,ভিডিয়ো এবং গান স্টোর করা যায়। এগুলিতে গান, এমপিথ্রি প্লেয়ার, অডিয়োবুক, পডকাস্ট, ছবি এবং এফএম রেডিও-র সুবিধা রয়েছে।

অ্যাপেল-এর স্মার্টফোনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাজারে ব্ল্যাকবেরি, স্যামসাং, সোনির মতো কোম্পানি নিজেদের প্রোডাক্টগুলিকে আরও আধুনিক করে তুলছে।

ব্ল্যাকবেরি-র স্মার্টফোন রেঞ্জে রয়েছে জেডটেন– যা বিশেষভাবে কাজের সুবিধার জন্যে অনেকেই বেছে নিচ্ছেন। এটিতে মাইক্রো সিম, ইন্টারনাল রছ জিবি স্টোরেজ, মাইক্রো এসডি কার্ড এট, ওয়াইফাই, ব্লুটুথ, জিপিএস সিসটেম, রিয়ার ও ফ্রন্ট ফেসিং ক্যামেরার সুবিধাও রয়েছে।

স্মার্টফোনের বাজার জুড়ে সবচেয়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে স্যামসাং স্মার্টফোনের রেঞ্জগুলি। স্যামসাং গ্যালাক্সি এসথ্রি এবং এসফোর ক্রেতামহলে চূড়ান্ত জনপ্রিয়তা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। ক্যামেরা-সহ সবরকম আধুনিক সুবিধাই ক্রেতাদের দিতে চেষ্টা করা হয়েছে এই গ্যাজেটে।

‘ট্যাবলেট’গুলিও এখন ফ্যাশনে ইন। প্রচুর সুবিধাও এতে দেওয়া আছে। স্যামসাং গ্যালাক্সি নোট টু, মাইক্রোম্যাক্স-এর ট্যাবলেট প্রভৃতি ক্রেতাদের পছন্দের তালিকায় উপরের সারিতে স্থান পাচ্ছে। স্মার্টফোন, ট্যাব, সবেতেই ক্রেতারা অ্যানড্রয়েড, টাচস্ক্রিন, ক্যামেরা, এক্সপ্যানডেবল স্টোরেজ ফেসিলিটি, এফএম রেডিও ও ওয়াইফাই (নেট) এর সুবিধা পাচ্ছেন।

সোনি এক্সপিরিয়া তাদের স্মার্টফোনের রেঞ্জে একটু রকমফের এনেছে। এদের জেড আর ব্ল্যাক স্মার্টফোনটিতে জলের তলায় সম্পূর্ণ হাই ডেফিনেশন ফিল্মিং করার সুবিধা পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া গ্যাজেট-এর পরিবারে ল্যাপটপ, আল্ট্রাবুক, নোটবুক, ই-বুক ইত্যাদিরও একটা বড়ো বাজার রয়েছে। স্যামসাং, সোনি, ডেল, লেনোভো, এইচপি, এসার ইত্যাদি বড়ো বড়ো কোম্পানিগুলি– বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্নরকম প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখেই এর প্রচুর ভ্যারাইটি বাজারে ছেড়েছে। স্টুডেন্ট, ডোমেস্টিক ইউজ, শেয়ার বাজার, ব্যাবসা, আইটি সেক্টর, গেমিং ইত্যাদি আলাদা আলাদা প্রয়োজনেই এগুলিতে বিভিন্ন রকমের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এগুলির মধ্যে সেকেন্ড, থার্ড, ফিফ্থ জেনারেশন এর ক্যাটাগরি রয়েছে, ইনটেল (আর) কোর ফেসিলিটি, হাই স্পিড প্রসেসর, উইনডোজ এইট, লেড ব্যাকলিট ডিসপ্লে উইথ এইচভি রিসোলিউশন, র্যাম (বহু ভেরিয়েশনেই পাওয়া যায়) এইচডি গ্রাফিক্স এবং হার্ড ডিস্ক-এর ক্যাপাসিটির বিভিন্ন রেঞ্জও  বাজারে খুঁজে পাবেন আপনার চাহিদা অনুসারে।

ইলেকট্রনিক্স-এর জগতের উপর আমাদের লাইফস্টাইল এতটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে যে, এটা আর এখন শুধুমাত্র বিলাসিতার সামগ্রী নয়, বরং নিত্য প্রয়োজনীয় বস্তুর মতো করে ঢুকে পড়েছে গৃহস্থের অন্দরে।

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় অভ্যস্থ করুন সন্তানকে

উমার একটা বড়ো সমস্যা হল, তার ৭ বছরের ছেলে কনিষ্ক তার কথা শোনে না। অন্যান্য বাচ্চাদের মতো কনিষ্কও খেলাধুলা করতে ভালোবাসে। ঘরে একেবারেই তার মন বসে না, যার কারণে দিনের বেশিরভাগ সময়েই তাকে পাড়ার পার্ক-এ লাফালাফি-ছোটাছুটি করতে দেখা যায়। ঘরে ফিরে হাত না ধুয়ে, সেই নোংরা হাতেই বিস্কুট নয়তো অন্য কিছু খেতে থাকে সে। মায়ের বারবার মানা করা সত্ত্বেও সে শোনে না।

এই সমস্যা শুধুমাত্র উমার নয়, আমাদের আশেপাশে থাকা বেশিরভাগ বাচ্চাই কনিষ্কর মতো। তাদের মায়ের অথবা বাড়ির অন্যদের ‘হাইজিন’ সংক্রান্ত কথা না শুনে, বাড়ির সকলকে চিন্তায় ফেলে দেয়। খেলনা, ভিডিয়ো গেমস থেকে শুরু করে জুতোয় পর্যন্ত জীবাণু থাকে। বাড়িতে হাইজিনিক পরিবেশ তৈরি করার জন্য স্প্রে, অ্যান্টি-ব্যাকটিরিয়াল সাবান, ফিনাইল ইত্যাদি ব্যবহার করুন, যাতে পোকামাকড় মুক্ত হয়। এটাই সঠিক উপায় কিন্তু আপনাদের কি মনে হয় না যে, বাচ্চাকে সুস্থ এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য হাইজিন সম্পর্কিত সঠিক পথগুলি বাতলে দেওয়া উচিত তাদের।

শিক্ষা জরুরি

যখন আপনার আদরের সোনা ছোটো ছিল, তখন তার ঘামের গন্ধও নাকে বড়ো মিষ্টি লাগত। সে যখন হাতে রুটির টুকরো নিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ত, তখন তার এই হেন আচরণও খুব ভালোলাগত। গোটা গালে যখন জ্যাম মেখে আপনার সামনে হাজির হতো, তখন আপনি সেটিকে ক্যামেরাবন্দি করে রাখতেন। কিন্তু এখন আপনার আদরের সেই শিশুটি আগের তুলনায় বড়ো হয়েছে, বেড়েছে দুরন্তপনাও। এই রকম দুরন্ত বাচ্চাকে পরিষ্কার করানো ও স্নান করানো মায়েদের কাছে প্রায় যুদ্ধের-ই সমান।

‘হাইজিন’-এর মানে, আপনার বাচ্চাকে পরিষ্কার কাপড়জামায় সুন্দর আর ভালো দেখানোই নয়, রোগ থেকেও দূরে রাখা। স্কুল-এর বাচ্চাদের সঠিক হাইজিন হ্যাবিট তৈরি করা ভীষণ প্রয়োজন কারণ স্কুল যাওয়ার পর ওদের নাক, মুখ এবং হাত থেকে ছড়ায় জীবাণু। যদি শুরুতেই বাচ্চাদের হাইজিন সম্বন্ধে ধারণা দেওয়া যায় তাহলে বাচ্চারা সুস্থ, সবল থাকার চেষ্টাটা অন্তত করতে পারবে।

যখন আপনার বাচ্চা কৈশোরে পা রাখে তখন হরমোনাল কারণে ঘামের গন্ধ তীব্র হয় এবং ত্বক তৈলাক্ত হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় হাইজিন মেনটেইন করাটা খুব জরুরি।

সুন্দর হাসি

প্রত্যেকদিন বাচ্চাদের ব্রাশ করার অভ্যাস করান। যদি বাচ্চা ছোটো হয়, সেক্ষেত্রে আপনি নিজে দিনে একবার টুথব্রাশ দিয়ে বাচ্চার দাঁত পরিষ্কার করে দিন। ভালো কোম্পানির, মাথা ছোটো এবং নরম ব্রাশ দিয়েই দাঁত পরিষ্কার করা উচিত। তবেই সেটি দাঁতের কোনায় কোনায় পৌঁছে, ক্যাভিটিজ দূর করবে। বাচ্চা যখন আর একটু বড়ো হয়ে যাবে তখন তাকে দাঁতের পাশাপাশি জিভও পরিষ্কার করতে শেখাতে ভুলবেন না। ওদের বলুন, জিভ পরিষ্কার না করলে মুখে গন্ধ হবে, বন্ধুরা কেউ তোমার সঙ্গে মিশবে না। মুখের দুর্গন্ধ তাড়ানোর জন্য বাচ্চাদের কখনও মাউথওয়াশ কিনে দেবেন না। মাউথওয়াশ ব্যবহার করার জন্য নির্দিষ্ট বয়স থাকে, যেটা একজন দন্তচিকিৎসকই সঠিকভাবে বলতে পারেন।

হাত পরিষ্কার রাখা

জীবাণু সবথেকে বেশি ছড়ায় হাত থেকে। এইজন্য ঘরের প্রত্যেক সদস্যের হাত ধোয়ার গুরুত্ব জানা উচিত। কাশি হলে বাচ্চারা মুখে হাত দিয়েই কাশি আটকাবার চেষ্টা করে এবং সেই হাতই বিস্কুটের কৌটোয় ঢোকায়। খাওয়ার আগে এবং পরে, বাইরে থেকে এসে, বাথরুমের কাজ সেরে, পোষ্যদের সঙ্গে খেলার পর এবং নাক পরিষ্কার করার পর হাত ধোয়া বাধ্যতামূলক।

এর মানে এই নয় যে, আপনি আপনার বাচ্চাকে হ্যান্ড স্যানিটাইজার কিনে দেবেন অথবা সবসময় অ্যান্টি-ব্যাকটিরিয়াল সাবান দিয়ে হাত ধুতে বলবেন। সাধারণ সাবান আর গরম জল হলেই হবে। হাত ধোয়ার সময় এইটুকু খেয়াল রাখতে হবে যেন হাতে সাবান না লেগে থাকে। এরপরেই বাচ্চাকে পরিষ্কার ও শুকনো তোয়ালেতে হাত মুছে নিতে শেখান। বাথরুমে টিশু পেপারও লাগিয়ে রাখতে পারেন। মুখ ও নাকে হাত দিতে মানা করুন। নখ খাওয়া এবং নাকে আঙুল দেওয়া দৃষ্টিকটু তো বটেই, এটি হাইজিন-এরও সমস্যা ঘটায়।

অন্তর্বাস

গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহে বাচ্চারা যখন বাইরে খেলতে যায়, তখন তার অন্তর্বাস থেকেও দুর্গন্ধ বের হয়। কিছু মায়েরা বাচ্চাদের উপরের জামা বদলে দেন। কিন্তু অন্তর্বাসের দিকে নজর দেন না। বাচ্চাদের ভিতরের পোশাকও বদলানোর অভ্যাস করান।

চুলের পরিচর্যা

চার বছরের অহনা চুল আঁচরাতে একদম পছন্দ করে না। সেই জন্য তার চুল সবসময় জটে ভর্তি থাকে। একদিন অহনার মা অহনাকে শ্যাম্পু করানোর সময় দেখলেন তার ত্বকের উপর সাদা রঙের একটি আস্তরণ জমেছে। ডাক্তার দেখানোর পরে অহনার মা জানতে পারেন, চুল না আঁচড়ানোর ফলে তার মাথার ত্বকে সংক্রমণ হয়েছে।

অহনার মতো অবস্থা যাতে আপনার বাচ্চার না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখুন। রোজ চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়ে দিন আপনার বাচ্চার। রোজ চুল আঁচড়ালে বাচ্চার ত্বকে কোনও মৃত কোশ জমবে না, সঙ্গে  চুলও জটমুক্ত ও সুন্দর দেখাবে।

যদি আপনি, আপনার বাচ্চাকে এটা রপ্ত করাতে পারেন তাহলে সপ্তাহে একদিন ভালো করে চুল ধুলেই হবে। বাচ্চাদের মাথায় মাইল্ড শ্যাম্পু-ই ব্যবহার করুন, যেটা স্পেশালি বাচ্চাদের জন্যই তৈরি। যেসব বাচ্চার কোঁকড়ানো চুল তাদের ক্ষেত্রে বাচ্চাদের কন্ডিশনারও ব্যবহার করতে পারেন। এছাড়াও সপ্তাহে ১-২ দিন নারকেল তেল অথবা বাদাম তেলও ব্যবহার করতে পারেন। নিয়মিত চুল কাটাও জরুরি। এই প্রক্রিয়াটি ৫-৬ সপ্তাহ অন্তর চলতে পারে। মেয়েদের লম্বা চুলের ক্ষেত্রে মাসে একবার ট্রিমিং করানো উচিত। নিজের চিরুনি অন্যদের সঙ্গে শেয়ার না করারও পরামর্শ দিন। অন্যথায় মাথায় উকুন চলে আসার ভয় থাকে। মাসে একবার চিরুনি পরিষ্কার করাটাও বাঞ্ছনীয়।

স্নান একান্ত প্রয়োজন

বেশ কিছু বাচ্চা রোজ স্নান করা পছন্দ করে না। স্নান না করার সবথেকে বড়ো কারণ হল, খেলায় বিঘ্ন ঘটা অর্থাৎ চান করতে গেলে সেই সময়টায় খেলতে পারবে না। সেইসব বাচ্চার মায়েদের জন্যও আছে কিছু উপায় যার দ্বারা আপনার বাচ্চার কাছে স্নান করাটাও একটা আনন্দের বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।

যেমন, বাচ্চাদের স্নান সংক্রান্ত সুন্দর অ্যাক্সেসরিজ বা খেলনা বাথরুমে রাখতে পারেন। এছাড়া বাচ্চাদের জন্য তৈরি বিভিন্ন আকারের সাবান রাখতে পারেন, যেটা দেখে বাচ্চার খেলনাই মনে হবে। স্নানের সময় বাচ্চাদের বিভিন্ন ধরনের গল্পে ব্যস্ত রাখুন, যাতে সে একদম ভয় না পায়।

এছাড়াও প্রত্যেকদিন ভালো করে পা ধুয়ে, মুছে পরিষ্কার করে দিন। গরমের সময় ট্যালকম পাউডার খুব গুরুত্বপূর্ণ। স্নানের পর গায়ে পাউডার মাখলে বেশ ঠান্ডা অনুভূতিও হবে আর দুর্গন্ধের হাত থেকে বাঁচবে আপনার বাচ্চা। তবে, এইসব জিনিস ব্যবহার করার আগে জেনে নিন বাচ্চার কোনও কিছুতে অ্যালার্জি আছে কিনা।

খেলনা পরিষ্কারও জরুরি

কোন বাচ্চা না খেলনা পছন্দ করে? কিন্তু এটা কি জানেন, যে– খেলনাটি নিয়ে আপনার বাচ্চা খেলাধুলা করছে তার মধ্যে জীবাণু আছে কিনা? যদি আপনি এখনও এটা নিয়ে ভেবে না থাকেন, তাহলে এখন ভাবুন। বেশিরভাগ জীবাণু সবথেকে আগে জিনিসপত্র এবং হাত থেকেই আসে। এগুলি থেকে বাচ্চাদের ফ্লু, হাঁপানি এবং বিভন্ন ধরনের অ্যালর্জি হওয়ার ভয় থাকে। এই রকম যাতে না হয়, তার জন্য কয়েকটি বিষয়ের উপর লক্ষ্য রাখুন।

ক) এমন খেলনা কিনুন, যেটা ধুতে পারবেন। যেসব খেলনা ধোয়া সম্ভব নয় সেগুলি ফেলে দিন। খেলনা মাঝে-মাঝে পরিষ্কার করুন, নয়তো আপনার বাচ্চার সর্দিকাশি ও জ্বর হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যাবে।

খ) যদি আপনার বাচ্চা খেলনা নিয়ে, কোনও অসুস্থ বাচ্চার আশেপাশেও যায়, সেক্ষেত্রে তাড়াতাড়ি খেলনাটি ধুয়ে ফেলুন। জলের মধ্যে ডেটল-এর মতো কিছু অ্যান্টিসেপটিক মিশিয়ে নিন ধোয়ার আগে।

গ) স্টাফড খেলনাগুলিকে কখনও কখনও প্লাস্টিক জড়িয়ে ৪-৫ ঘণ্টা ডিপ ফ্রিজ-এ রেখে দিন। তাতে খেলনায় বাহিত জীবাণু মরে যাবে।

 

সুরক্ষার নাম টার্ম প্ল্যান

বর্তমানে মানুষের আস্থা বাড়ছে টার্ম প্ল্যান পলিসির উপর। এর অন্যতম কারণ হল, যে-কোনও ইনসিওরেন্স পলিসির তুলনায় টার্ম প্ল্যান-এ প্রিমিয়ামের অঙ্ক যথেষ্ট কম। তবে টার্ম প্ল্যান করার আগে কয়েকটি জরুরি বিষয় জেনে নিন।

আপনার কতটা কভার প্রয়োজন

টার্ম প্ল্যানের মূল উদ্দেশ্য হল, পরিবারের উপার্জনশীল ব্যক্তির মৃত্যুতে তার উপর নির্ভরশীল সদস্যরা যাতে আর্থিক সহায়তা লাভ করতে পারেন, তারই অগ্রিম পরিকল্পনা। তাই প্ল্যান গ্রহণের আগে যে-বিষয়গুলিতে গুরুত্ব দেওয়া উচিত তা হল, আপনার পরিবারের আনুমানিক খরচ কত, আপনার কোনও লোন রয়েছে কিনা এবং আপনার পরিবারের কোনও সদস্যের বিবাহ দেওয়ার প্রয়োজন হবে কিনা। ধরা যাক বিশ্বজিৎ মিত্রের কথা। ইনি ১২.৫ লক্ষ টাকার ইনসিওরেন্স কভার প্ল্যানটি গ্রহণ করেছেন, কারণ তাঁর ৩ লক্ষ টাকা ঋণ রয়েছে, উপরন্তু রয়েছে পরিবারের ৩ জন নির্ভরশীল সদস্য। একটি থাম্ব-রুল অনুযায়ী আপনার বার্ষিক আয়ের ১০ থেকে ২০ শতাংশের মধ্যে ইনসিওরেন্স কভার প্ল্যান নেওয়াই যুক্তিযুক্ত।

কভারের মেয়াদকাল কতটা

বিশেষজ্ঞদের মতে অন্ততপক্ষে ৬৫ বছরের সময়সীমা পর্যন্ত কভার-এর প্রয়োজন রয়েছে। অর্থাৎ আপনার বয়স ২০-৩০ বছরের মধ্যে হলে ১৫ থেকে ২০ বছরের শর্ট টার্ম কভার না নেওয়াই ভালো, কারণ তা সেই সময়সীমার মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে যখন আপনার জীবন সংশয় প্রায় নেই বললেই চলে। অথচ ৫০ বছর বয়সের পর টার্ম প্ল্যান করাতে হলে প্রিমিয়ামের অঙ্ক বেশি হবে কারণ স্বভাবতই আপনারও লাইফ রিস্ক ফ্যাক্টরও বেশি। তাই অগ্রপশ্চাৎ ভেবে প্রথম থেকেই লং টার্ম প্ল্যান নেওয়া ভালো। কিছু অনলাইন টার্ম প্ল্যান রয়েছে যা ১৫, ২০, ২৫ ও ৩০ বছরের সময়সীমা পর্যন্ত কভার দেয়। অন্যান্যগুলি ৬০ বছরের বেশি বয়স কভার করে না। অর্থাৎ আপনার বয়স যদি ৩২ হয়, আপনি ৩০ বছরের টার্ম প্ল্যান-এর সুবিধা পাবেন না। সুতরাং আপনার বয়স অনুযায়ী টার্ম প্ল্যান নির্বাচন করুন।

মূল্যবৃদ্ধিকেও গুরুত্ব দিন

আপনি যদি ৫০ লক্ষ টাকার পলিসি করিয়ে সেটি পর্যাপ্ত বলে সন্তুষ্ট থাকেন, তাহলেও তা আপনার সঠিক সিদ্ধান্ত বলে বিবেচিত হবে না। এর কারণ আগামী দশ বছরে যদি ৬ শতাংশ হারে মুদ্রাস্ফীতি হয়, তাহলে ৫০ লক্ষের মূল্য আজকের হিসেবে ২৮ লক্ষে এসে ঠেকবে মেয়াদকাল ফুরোলে। কিছু কিছু কোম্পানি তাই এমন টার্ম প্ল্যান বাজারে এনেছে যা মুদ্রাস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে প্রতি বছর ৫ থেকে ১০ শতাংশ কভার বৃদ্ধি করে। যদিও এই ধরনের প্ল্যানে প্রিমিয়ামের অঙ্ক বেশি, তবু ভবিষ্যতের কথা ভেবে এই প্ল্যান গ্রহণ করাই যুক্তিযুক্ত।

কিছু প্ল্যান আবার বড়ো অঙ্কের ঋণের সুদ কমানোর কাজে সহায়তা দেয়। যেমন কিছু প্ল্যান হোম লোনের ইন্টারেস্ট কমানোর ক্ষেত্রে কার্যকর।

টার্ম প্ল্যান কিনুন অনলাইন-এ

এজেন্ট-এর মাধ্যমে টার্ম প্ল্যান কিনতে হলে আপনাকে ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি ব্যয় করতে হবে। সুতরাং অনলাইন-এ নিজেই টার্ম প্ল্যান ক্রয় করুন। এর ফলে আপনি বেশ কয়েকটি ট্যাক্স দেওয়া থেকে অব্যাহতি পাবেন। তবে কেনার আগে প্রত্যেকটি টার্ম ভালো ভাবে বুঝুন ও বিবেচনা করুন।

 

মায়েদের জন্য ইউজার-ফ্রেন্ডলি উপহার

জীবনে সবথেকে প্রিয় মানুষটির কথা জানতে চাওয়া হলে একটা শব্দই হৃদয় ছুঁয়ে প্রতিধ্বনিত হয়, মা। সন্তানের জীবনে মায়ের ভূমিকা অপরিসীম। মায়ের স্নেহ, ভালোবাসা, শাসন, স্বার্থত্যাগ এসব কিছুই সন্তানকে মাথা উঁচু করে নিজস্ব পরিচয় গড়ে তুলতে নানা ভাবে সাহায্য করে।

এই দীর্ঘ সময়টা পেরিয়ে আসতে গিয়ে অনেক মা-ই সমাজ এবং সময়ে অগ্রগতির সঙ্গে নিজেদের ঠিক করে খাপ খাইয়ে নেওয়া থেকে পিছিয়ে পড়েন। সন্তানই তাদের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে ওঠে তখন। অথচ এই সন্তান যখন জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভ করে তখন মায়ের জন্য সময় থমকে দাঁড়িয়ে যায়। আধুনিকতার আঁচ থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখার ফলে, নতুন নতুন আবিষ্কারের কথা একপ্রকার অজানাই থেকে যায় মায়ের জীবনে।

বাচ্চাকে সামলাতে গিয়ে প্রচুর পরিশ্রম বেড়ে যায় মায়েদের। এই পরিস্থিতিতে তাঁর কাজের সুবিধে হয় এমন কিছু উপহার দিন তাঁকে। এর ফলে সন্তানকে বড়ো করা এবং নতুন মাতৃত্বের দিনগুলোতে তাঁর জীবনযাত্রা সহজ হয়ে যাবে।

সকলেই বাড়িতে কমবেশি মা-কে আধুনিক টেকনোলজির সঙ্গে যুদ্ধ করতে দেখেন। সে মোবাইলের ফ্রন্ট ক্যামেরায় সেলফি তুলতে না পারা থেকে ফোন চার্জ করতে ভুলে যাওয়া, ফোন কোথায় রেখেছে মনে না থাকা, শরীর-স্বাস্থ্যের ঠিকমতো খেয়াল না রাখা এসব কিছুই মায়েদের সাধারণ সমস্যা। সুতরাং মাদার্রস ডে অথবা বুড়ি মায়ের জন্মদিন উপলক্ষে তাঁকে এমন কিছু উপহার দিন যাতে তাঁর দৈনন্দিন কাজকর্ম সহজ হয়ে ওঠে।

নতুন মা হয়েছে যাঁরা তাঁদের ঘড়ি নিয়ন্ত্রিত হয় বাচ্চার দেখাশোনায় সময়ে নিরিখে। ফলে মায়েদের সকাল সকাল উঠে পড়তে হয় দৈনন্দিন কাজ সামাল দিতে। দেরি হয়ে গেলেই সমস্যা। তাই ভালো অ্যালার্ম ক্লক কিনে দিন তাঁকে যাতে সময় দেখার সঙ্গে সঙ্গে সাউন্ডও কাস্টমাইজড করতে পারবেন। সকালে উঠেই যাতে দুধ গরম করার জন্য দৌড়োতে না হয় তাই ইলেক্ট্রিক কেটল-এর ব্যবস্থা করে দিতে পারেন।

ভারতবর্ষে মায়েরা বেশিরভাগ সময় কাটান রান্নাঘরে। বদ্ধ রান্নাঘরের ধোঁয়ায় অনেকটা সময় কাটাবার ফলে মায়ের স্বাস্থ্যের উপর তার প্রভাব পড়ে এবং গরমেও প্রচণ্ড কষ্টের সম্মুখীন হতে হয় তাদের। রান্নাঘরের পরিবেশ গরম এবং ধোঁয়া ধুলোময়লা থেকে বাঁচাতে একটা মিনি ইনডোর ফ্যান-এর ব্যবস্থা করে দিতে পারেন। রান্নাঘরে পছন্দমতো চিমনি লাগিয়ে দিন যাতে তেল, ধোঁয়া ইত্যাদি কম হয়। এতে পরিষ্কারের ঝামেলা যেমন কমবে, তেমনি নিজেকে দেওয়ার জন্য মায়ের কাছে সময় বাঁচবে।

বাচ্চার জন্য প্রেশার কুকার, ফ্লাস্ক সব মায়েদেরই লাগে। এখন বাচ্চার ভাত ও সবজির একসঙ্গে সেদ্ধ হয়ে যায় এমন হ্যান্ডি গ্যাজেটসও বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। উপহার হিসেবে এটা দারুণ কার্যকরী। এছাড়া হেলদি এবং স্মার্ট কুকিং-এর জন্য মাইক্রো আভেন এবং এয়ার ফ্রায়ার প্রতিটা রান্নাঘরে থাকাটা এখন মাস্ট হয়ে উঠেছে। এতে রান্নায় তেলের ব্যবহার অনেক কম হয়ে যাবে।

আপনার স্ত্রী যদি সদ্য মা হয়ে থাকেন, সময়ে সঙ্গে আপ-টু-ডেট করতে পুরোনো মোবাইলটার বদলে একটা নতুন স্মার্ট অ্যানড্রয়েড ফোন কিনে দিন। সেটাতে ফোন করা ছাড়াও আর কী কী সুবিধা মা পেতে পারেন, যত্ন নিয়ে শিখিয়ে দিন। দেখবেন কিছুদিনের মধ্যেই নতুন ফোনটি-ই তাঁর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ এখন ফোনেই তিনি পেতে পারেন এক্সারসাইজিং অ্যাপ থেকে বাচ্চার ডায়েট চার্ট পর্যন্ত। এমনকী প্রয়োজনে বাচ্চাকে যোগাযোগ করার সুবিধাও।

সময়ে দাম সকলের কাছে। ঘড়ির শখ যদি থাকে তাহলে নতুন মা-কে স্মার্টওয়াচ কিনে উপহার দিতে পারেন। এতে শরীর ফিট রাখার অনেক ব্যবস্থা দেওয়া থাকে যেমন রানিং হেল্থ অ্যাপ্লিকেশন, ট্র‌্যাকিং স্টেপস, ট্র‌্যাকিং হার্ট রেট, স্লিপ মনিটরিং এবং আরও নানা ধরনের সেনসর রিলেটেড ফিচারস। কিছু কিছুতে আবার মোবাইলেরও অনেক সুবিধা ওই একটা ঘড়ির মধ্যেই দেওয়া থাকে। নানা অ্যাপ পেয়ে যাবেন, মেসেজ পাঠানো যাবে এবং কল রিসিভ-ও করা যাবে। ফোন নিয়ে বাড়ির বাইরে যাওয়ার অসুবিধা থাকলে একটা ঘড়িতেই অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

যারা বই পড়তে ভালোবাসেন সেই মায়েদের জন্য কিনডেল, হতে পারে একটি ভালো উপহার। কিন্তু বই কিনে রাখার জায়গার অভাব অথচ দেশ-বিদেশের লেখকদের বই তাঁর অত্যন্ত প্রিয়। এক্ষেত্রে এই উপহারটি খুব কার্যকরী। ভারী বই বেশিক্ষণ ধরে থাকতে অসুবিধা হতে পারে আবার অত্যধিক ট্র‌্যাভেল করতে হওয়ার কারণে বই ক্যারি করা সবসময় সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। উপহার দিতে পারেন ই-বুক রিডার। হাজারেরও বেশি ই-বুক পড়ার সুযোগ পাওয়া যাবে এই একটি গ্যাজেট-এর মাধ্যমেই।

বাড়ি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখাটা সব মায়েদেরই পছন্দ তাই ভ্যাকিউম ক্লিনার, মায়ের পরিশ্রম অনেকটাই কমাতে সাহায্য করবে।

সবশেষে মায়েদের স্বাস্থ্য এবং আরাম এই দুটোর প্রয়োজন অন্য আর সব প্রয়োজনকে ছাপিয়ে ওঠে। সারাদিনের সংসারের কাজ মিটিয়ে বাইরে গিয়ে শরীর ফিট রাখতে ওয়াক করাটা হয়তো ইচ্ছের মধ্যে নাও পড়তে পারে অথবা বাইরে বেরোনো যে-কোনও কারণেই সম্ভবপর নাও হতে পারে। তাই বাড়িতে ট্রেডমিল কিনে দিতে পারেন। এতে সকাল সন্ধে মা ছাড়াও বাড়ির বাকি সদস্যরাও শরীর ফিট রাখতে কিছুটা কসরত করে নিতে পারেন।

এছাড়াও মায়েদের সারাটা দিন পায়ের উপর দাঁড়িয়ে থেকে পরিবারের সকলের খেয়াল রাখতে হয়। সুতরাং পা-টাকে একটু আরাম দেওয়া যায় না কি? রাত্রে শোয়ার আগে যাতে আরামে ঘুমোতে যেতে পারেন তার জন্য উপহার হিসেবে কিনে দিন ফুট অ্যান্ড লেগ মাসাজার।

মায়েরা যদি আনন্দে থাকেন একটা পরিবারে খুশিও দ্বিগুন হয়ে ওঠে। তাহলে অপেক্ষা কীসের! যে-কোনও উপলক্ষ্যেই উপহারগুলির মধ্যে একটি অনায়াসেই বেছে নিতে পারেন।

 

জেদ নয় সংকল্প করুন

বিজ্ঞানভিত্তিক যত নতুন নতুন আবিষ্কার হয়েছে এবং আজ যে আমরা প্রগতির পথে অনেকখানি এগোতে পেরেছি, সেটা সম্ভব হয়েছে কিছু মানুষের দৃঢ় সংকল্প করার মানসিকতার জন্য। কোনও জিনিসকে পাওয়ার তীব্র ইচ্ছা থেকে অথবা কোনও প্রচেষ্টাকে সফল করে তোলার মানসিক দৃঢ়তা, ব্যক্তিবিশেষের মনে আন্তরিক প্রেরণা যুগিয়ে তাকে লক্ষ্যের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করে।

লক্ষ্যে পৌঁছোতে হলে দৃঢ় সংকল্প দরকার ঠিকই কিন্তু দেখতে হবে এর ফলে অপরের অথবা নিজের কোনওরকম ক্ষতি যেন না হয়। দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যেতে পারে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ প্রখ্যাত ডা. নলিনী পটেলের কথা। দৃঢ় সংকল্প নিয়েই তিনি ভারত এবং বিদেশ থেকে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং দেশের মাটিতে মহিলাদের শরীর-স্বাস্থ্যের উন্নতির লক্ষ্যে কাজ করে চলেছেন।

অস্বচ্ছল কৃষক পরিবারে তাঁর জন্ম। মাত্র ৪ বছর বয়সে তাঁর পিতার মৃত্যু হয়। অন্যান্য আত্মীয়স্বজনেরা নলিনীর মায়ের স্বল্প শিক্ষার সুযোগ নিয়ে তাঁকে দিয়ে সই করিয়ে জমিজায়গা সমস্ত হস্তগত করে। একমাত্র সন্তান নলিনী এবং নিজের পেট চালাবার জন্যে লোকের বাড়িতে বাসন মাজা, কাপড় কাচার মতো কাজও তাঁকে করতে হয়। নলিনী সরকারি স্কুলে পড়াশোনা করতেন। মেধার কারণে পড়াশোনায় জলপানি পেতেন। ছোটো থেকে মনস্থির করেছিলেন বড়ো হয়ে ডাক্তার হবেন এবং অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা করবেন। মা-কেও সমস্ত অসম্মান থেকে মুক্তি দিয়ে সুখের মুখ দেখাবার সংকল্পও তিনি মনে মনে গ্রহণ করেছিলেন।

উদ্দেশ্য এবং সংকল্প অনুযায়ী নলিনী কঠোর পরিশ্রম করে নিজের লক্ষ্যে পৌঁছোতে সক্ষম হন এবং আজ তিনি এক জনপ্রিয় চিকিৎসক হিসাবে যথেষ্ট প্রতিষ্ঠিত।

মানুষ সামাজিক প্রাণী। সমাজে থেকে নিজেদের গৃহস্থ জীবনকে সুখশান্তিতে ভরিয়ে তোলার ইচ্ছা সব স্ত্রী-পুরুষের মধ্যেই থাকে। এই ইচ্ছেকে পূরণ করতে সকলে নিজের মতো করে চেষ্টা করে। তাছাড়াও আত্মীয়স্বজন, বন্ধুর সাহায্য, পর্যাপ্ত অর্থ এবং মানসিক ধৈর্যেরও প্রয়োজন রয়েছে। কঠোর পরিশ্রমও করতে হয়।

লক্ষ্যে পৌঁছোবার তীব্র ইচ্ছা মনের মধ্যে পোষণ করে, মনকে শান্ত এবং মজবুত করে গড়ে তোলাকেই দৃঢ় সংকল্পের আক্ষরিক ব্যাখ্যা বলা যেতে পারে।

জেদকেই অনেকে দৃঢ় সংকল্প বলে ভুল করেন

দৃঢ় সংকল্প অনেকের ক্ষেত্রেই জেদের আকার ধারণ করে। জেদের ক্ষেত্রেও তীব্র ইচ্ছাশক্তিই কাজ করে। কোনও জিনিস পেতে হলে অথবা নিজের পছন্দ অনুযায়ী পরিবেশ তৈরি করতে গিয়ে অন্যের উপর চাপ সৃষ্টি করে ফেলাকেই ‘জেদ’ বলা যেতে পারে। জেদ দেখাতে হলে বেশিরভাগই অন্যের উপর নির্ভর করতে হয়। কোনও বাচ্চা পছন্দের খেলনা কিনতে চাইলে বড়োদের উপর (মা-বাবা) নির্ভর করে। মা-বাবা স্বইচ্ছায় খেলনা কিনে দিতে না চাইলে, অনেক সময় রাগ দেখিয়ে, কান্নাকাটি করে অথবা অন্য কোনও উপায় অবলম্বন করে মা-বাবার উপর খেলনাটি কিনে দেওয়ার চাপ সৃষ্টি করে।

এক সন্তানের অভিভাবকেরা কিছুটা পর্যায় পর্যন্ত সন্তানের জেদ মেনে নেন, কারণ এর জন্যে বাবা-মা অথবা বাচ্চা, কারোরই খুব একটা ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে না। অনেক সময় রাস্তায় বেরিয়ে এমন খাবার কিনে দেবার জন্যে বাচ্চারা বায়না ধরে, যেটা খেলে তাদের স্বাস্থ্যের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। রাস্তার ফুটপাথের আঢাকা খাবার, তেলেভাজা, ফুচকা, দইচাট্ ইত্যাদি খাবার কিনে দেবার জেদ করলে, বড়োদের উচিত তাদের বুঝিয়ে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খাওয়ানো। যদি বাচ্চা একেবারেই বড়োদের কথা না শুনে নিজের জেদ বজায় রাখে, তাহলে অভিভাবকেরা কম পরিমাণে খাবারটা কিনে বাচ্চাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু বড়োদের উপর জেদ ফলাবার পরিণামস্বরূপ, বেশিরভাগই জেদি বাচ্চারা নানারকম অসুখে ভোগে। ফলত বাচ্চা এবং বড়ো, দুজনকেই বিপদের মুখে পড়তে হয়।

ভাঙনের হাত থেকে সংসারকে বাঁচান

সংসারে থাকতে গেলে, একে অপরের সঙ্গে বাদ-বিবাদ লেগেই থাকে। তাই বলে জেদের বশবর্তী হয়ে সংসার ভেঙে ফেলে বেরিয়ে আসাটা সমস্যার সমাধান নয়। বরং দৃঢ় সংকল্প মনের মধ্যে রেখে সঠিক রাস্তায় নিজের প্রিয়জনদের নিয়ে সংসারে থাকার চেষ্টা করা উচিত।

শ্রীপর্ণা আজ নিজের জেদের মাশুল গুনছে। ছয় বছর আগে প্রবালের সঙ্গে ওর বিয়ে হয়েছিল। বাড়িতে শ্বশুর-শাশুড়ি। দুই ননদের বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। শ্বশুরের ব্যাবসায় স্বামী যুক্ত ছিল। অর্থ, প্রতিপত্তি কিছুরই অভাব ছিল না। একটাই সমস্যা ছিল, শাশুড়ির সঙ্গে শ্রীপর্ণার একেবারেই বনিবনা হতো না।

এক বছর পরে ওদের একটি মেয়ে জন্মায় কিন্তু বাড়ির অশান্তির কারণে, শ্রীপর্ণা মেয়েকে নিয়ে বাপের বাড়ি গিয়ে ওঠে। প্রবাল ওকে অবহেলা করে এই অজুহাত দেখিয়ে, শ্রীপর্ণা কোর্টে বিবাহবিচ্ছেদের জন্যে আবেদন করে। পরে অবশ্য আত্মীয়দের এবং উকিলের বোঝানোতে সেই মামলা তুলে নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে ফিরে আসতে মনস্থির করে শ্রীপর্ণা।

কিন্তু শাশুড়ি জেদ ধরে, বউমা ফিরে এলেও ওই বাড়িতে সে উঠতে পারবে না। বরং প্রবালকে সঙ্গে নিয়ে অন্য বাড়িতে চলে গেলে শ্বাশুড়ি খুশি হবেন, সেটা স্পষ্টই জানিয়ে দেন। শ্রীপর্ণাও জেদ ধরে বলে, ফিরলে শ্বশুরবাড়িতেই ফিরবে নয়তো না।

মা আর স্ত্রীয়ের জেদের মধ্যে পড়ে, প্রবালের জীবনটা দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে মদ আর ড্রাগের নেশায় প্রবাল ব্যাবসার কাজকর্ম এড়িয়ে যেতে শুরু করে। শেষপর্যন্ত প্রবালকে নেশা ছাড়াবার জন্যে চিকিৎসাকেন্দ্রে ভর্তি করতে হয়। শ্বশুরমশাই ব্যাবসা গুটিয়ে ফেলেন। শাশুড়ি অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। জেদের যে এরকম পরিণাম ঘটতে পারে সেটা শ্রীপর্ণা আদৌ কি কল্পনা করতে পেরেছিল? সেদিন যদি ও জেদ না করত তাহলে হয়তো প্রবালের সঙ্গে সুখে শান্তিতে এতদিন সংসার করতে পারত।

মিতা-ও শ্বশুরশাশুড়ির সঙ্গে বিবাদ লেগে থাকায় দুই ছেলেকে নিয়ে বাপের বাড়ি চলে গিয়েছিল। ওর জেদ ছিল স্বামীকে আলাদা বাড়ি নিতে হবে ওর সঙ্গে থাকতে হলে। কিন্তু স্বামীর এতে মত ছিল না।

এদিকে বাপের বাড়িতেও মিতা, ভাই-ভাইয়ের বউয়ের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারছিল না। অশান্তি লেগে থাকত। বাচ্চারাও সুস্থ পরিবেশে মানুষ হতে পারছিল না। মিতার মা-বাবাও ছেলে, ছেলের বউকেই সাপোর্ট করতেন। ছয়, সাত মাস এভাবে কাটার পর মিতার মনে হতে থাকে ভুলটা সে নিজেই করেছে। এত সামান্য কারণে স্বামীর বাড়ি ছেড়ে এসে ও একেবারেই ভালো কাজ করেনি। আর একটু সহনশীলতা এবং ধৈর্য তার ধরা উচিত ছিল, তাহলে সংসার এভাবে ছেড়ে আসতে হতো না। মিতার এই আত্মউপলব্ধির খুবই প্রয়োজন ছিল। নিজের জেদ ত্যাগ করে মিতা দুই ছেলেকে নিয়ে আবার শ্বশুরবাড়িতে ফিরে এসেছিল, সংসারটাকে ভেঙে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়েছিল। এটা সম্ভব হয়েছিল একমাত্র জেদ ত্যাগ করার জন্যই। সুতরাং কিছু পাওয়ার জন্য দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগ করুন কিন্তু তাকে জেদে পরিবর্তিত হতে দেবেন না।

 

আজকের বিনিয়োগ ভবিষ্যতের সুরক্ষা

প্রসিদ্ধ ফিলম অভিনেতা জ্যাকি শ্রফ এব্যাপারে পাবলিক প্রভিডেন্ট ফান্ড (পিপিএফ) তথা বন্ড-এ বিনিয়োগেই বিশ্বাসী। যদিও ওনার কথায়, তিনি তাঁর আয়ের বেশিরভাগ টাকাই নিজের কোম্পানির কাজে লাগান। যেটা মূলত টিভি কার্যক্রমের জন্য সফট্ওয়্যার বানিয়ে থাকে। গীতিকার জাভেদ আখতারের মতে, রিয়াল এস্টেট-এ ইনভেস্ট করাই সবথেকে ভালো উপায়। জাভেদ আখতারের মতো ঐশ্বর্য রাইও প্রপার্টি-তে বিনিয়োগই শ্রেষ্ঠ মাধ্যম বলে মনে করেন।

প্রয়াত দেব আনন্দ মুম্বই তথা ব্যাঙ্গালুরুতে অবস্থিত তাঁর বাড়ি এবং স্টুডিয়োকেই নিজের বিনিয়োগ বলে মনে করতেন। আবার ফিলম অভিনেতা অনুপম খের উদ্বৃত্ত অর্থ শেয়ারে খাটাতেই বেশি পছন্দ করেন।

অন্যদিকে ওম পুরি মনে করতেন, সমস্ত টাকা ব্যাংকে রাখাটাই শ্রেয়। বিশ্বখ্যাত দাবাড়ু বিশ্বনাথন আনন্দ বিনিয়োগ হিসাবে জমিবাড়িকেই বেছে নিয়েছেন। হিন্দি ছবি ‘মোহরা’ খ্যাত অভিনেত্রী রবিনা ট্যান্ডন তার উপার্জিত অর্থ, শেয়ার এবং বন্ড-এ খাটানোকেই সঠিক রাস্তা বলে মনে করেন। বিখ্যাত চিত্রকর পরিতোষ সেন কখনওই টাকাপয়সা জমানোর পক্ষপাতী ছিলেন না। টাকাপয়সা কোনও কোম্পানি অথবা অন্য কোথাও বিনিয়োগ করার কথা ভাবনার মধ্যেই আনেননি কখনও। অতিরিক্ত অর্থ মাঝেমধ্যে কেবলমাত্র ব্যাংকের খাতায় জমা করতেন। কিন্তু নিজের এক বন্ধুকে টাকার অভাবে বিনা চিকিৎসায় মারা যেতে দেখার পর, নিজেও জমানোর কথা ভাবেন এবং অন্যদেরও টাকা জমানোর পরামর্শ দেন।

সংগীতজ্ঞ ভীমসেন যোশির অর্থ থেকে শুরু করে সমস্ত প্রপার্টির হিসাব দেখাশোনা করতেন ওনার সিএ। অপরদিকে আবার প্রসিদ্ধ নর্তক রাজা রেড্ডি তার সঞ্চিত অর্থের বিষয়ে একেবারেই অজ্ঞ। কারণ তার দুই স্ত্রী রাধা আর কৌশল্যাই সে সমস্ত দেখাশোনা করে থাকেন।

কোথায় বিনিয়োগ করবেন

এই সমস্ত তাবড় তাবড় প্রসিদ্ধ ব্যক্তিদের বিনিয়োগের কথা তো জানলেন। এবার আপনি নিজের কথা ভাবুন। আপনার টাকা আপনি কোথায় বিনিয়োগ করবেন? আপনার টাকা কি শেয়ারে লাগিয়ে বিপদের ঝুঁকি সামলাবেন, নাকি এমন কোনও উপায় অবলম্বন করবেন, যেখানে কোনও রিস্ক নেই বললেই চলে?

আমাদের পরামর্শ, আপনার বয়স যদি ২০ থেকে ৩০-এর মধ্যে হয় এবং মাসিক আমদানি আপনার মাসিক খরচের তুলনায় ১০০ শতাংশ বেশি হয়, তাহলে মোট জমা অর্থের ৭৫ শতাংশ শেয়ারে লাগাতে পারেন।

যদি আপনার বয়স ৩০ থেকে ৪০-এর মধ্যে হয় এবং আপনার একটি বছর দুয়েকের সন্তানও থাকে তথা আপনার বার্ষিক আয়ের তুলনায় বার্ষিক খরচ অনেক কম হয়– সেক্ষেত্রে আপনার মোট জমারাশির ২৫ শতাংশ শেয়ারে, ২৫ শতাংশ ওপেন এন্ড গ্রোথ মিউচুয়াল ফান্ডে, ১৫ শতাংশ ব্যাংকে, ১৫ শতাংশ রাষ্ট্রীয় জমা যোজনায় তথা জীবনবিমায় বিনিয়োগ করা উচিত।

আপনার বয়স ৪০-এর বেশি এবং ৫০-এর কম হলে, ৭৫ শতাংশ সুরক্ষিত রাস্তায় বিনিয়োগ করাই উচিত। যেমন – পাবলিক প্রভিডেন্ট ফান্ড, রাষ্ট্রীয় জমা পত্র তথা মিউচুয়াল ফান্ডে জমানোই সঠিক পথ। এছাড়া অতিরিক্ত অর্থ ব্যাংকেই রাখা উচিত।

 

 

কতটা শাসন কতটা আদর

শাসনের দণ্ড Administration থেকে আপনার সন্তানকে সরিয়ে রাখলে স্বাভাবিকভাবেই সন্তানের চরিত্র খারাপ হবার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু এই বক্তব্য সবসময় সঠিক হয় না। অর্থাৎ যুক্তি ও কারণ দিয়ে মেনে নেওয়া যায় না।

বাড়িতে এবং বাড়ির বাইরে হিংসার অঙ্গ হল বিশৃঙ্খলা এবং গোলযোগ। এসবই হল অনিয়মের বা নিয়মভঙ্গের ফল। মানুষই নিয়ম ভাঙে। নিয়মানুবর্তিতা কতগুলি বিধিনিষেধ স্থির করে যা আমাদের আচরণবিধির মধ্যে কোনগুলি সভ্য এবং হিংসাত্মক এবং কোনগুলি নয়, তা ঠিক করে। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে যে, বড়ো ভাই বা বোন যখন অগ্রজ হওয়ার সুবাদে বা গায়ের জোরের দরুণ ছোটোভাই-বোনেদের মারে বা শাসন করে, তা কখনওই মেনে নেওয়া যায় না কারণ তা অনিয়মানুবর্তিতার সামিল। সময়মতো এইসব নিয়মভঙ্গকারী সন্তানকে শুধরানো প্রয়োজন। এদের শাস্তি দেওয়া প্রয়োজন নইলে আগামীদিনে এরা শুধরাবে না।

একটি শিশুর মনস্তত্ত্ব বুঝতে হলে তার সঙ্গে সবসময় যোগাযোগ রাখতে হয় এবং শিশু-শিক্ষার মধ্য দিয়েই শিশুকে বদলানো যায়। মূল কথা হল ‘সংযোগ’ ও ‘শিক্ষা’। কখনও কখনও দেখা যায়, যে শিশুকে মারা হয় সে প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ওঠার পরিবর্তে, সে তার ওই ভাই-বোন বা যে তাকে শাস্তি দেয় তার সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন করে। অর্থাৎ বুঝতে হবে এক্ষেত্রে শিশুটির গায়ে হাত তোলার একটি বিরূপ ফল হয়েছে।

শিশুকে মারবেন না

প্রাজ্ঞ ব্যক্তিরা বলেন, না মেরে শান্তভাবেও একটি শিশুর ব্যবহার শুধরানো যায়। এব্যাপারে জনৈকা দিদিমার মত, ‘আমি আমার ছেলেমেয়েদের কখনও মারিনি এবং তারা অনেক নম্র, ভদ্র ও বড়োমাপের মানুষ হয়েছে। যে শিশুর মধ্যে মানসিক সুরক্ষাবোধের অভাব রয়েছে, তাদের কোনও সময়ই মারাটা সমীচীন নয়। শিশুদের পেলব মন অত্যন্ত মূল্যবান, তাদের আঘাত করা উচিত নয়।

শারীরিক বা দৈহিক শাস্তি অনেক সময়ে শিশুর মধ্যে নিয়ে আসে ভয়, সুরক্ষাহীনতা। এক শ্রেণির মানুষজন, বিশেষত পশ্চিমি দেশের মানুষজন দৃঢ়ভাবে সমর্থন করেন যে, শিশুদের মারা বা দৈহিক শাস্তি দিলে তারা আর কিছুই নয়, মানসিক অবসাদের শিকার হয়।

শাসনের ক্ষতিকারক দিক

এর থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে, শাস্তি পেলে শিশুটি নড়বড়ে হয় এবং আত্মবিশ্বাসের অভাব নিয়ে বেড়ে ওঠে। উপরন্তু নিরাপত্তার অভাব থেকেই ভীতিচক্রের সূচনা হয়। শিশুটির মনে ভয় জাগে, মানুষকে অবিশ্বাস করতে শেখে এবং সঙ্গীসাথি ত্যাগ করে। এই একই শিশুকে যখন তীব্র প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হতে হয়, বড়ো হয়ে যখন উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা চাকরিতে প্রবেশাধিকারের প্রশ্ন ওঠে, তখন সে পিছিয়ে পড়ে। যদি দৈহিক শাস্তি একটি নির্দিষ্ট ‘না’ হয়, তাহলে কীভাবে পড়াশুনোয় অবাধ্য শিশুকে অভিভাবক-শিক্ষকের ‘স্বীকৃত আচরণের’ পথে আনা যায়? শুধুমাত্র যদি, শিশুটি এসবকিছু মেনে না নেয়, তাহলেই তার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।

বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে আমরা এটাই বলতে পারি তিরস্কার ও পুরস্কারের মধ্য দিয়ে শিশুকে বড়ো করে তোলা, Administration হল সর্বোত্তম প্রয়াস।

শিশুর সঙ্গে কেমন ব্যবহার করবেন

১)   বারো বছরের পর কোনও শিশুকে মারবেন না।

২)   শিশুকে যুক্তি দিয়ে শেখান।

৩)   ইতিহাস বা লোককথা থেকে ভালো ব্যবহারের দৃষ্টান্ত তুলে ধরুন।

৪)   শিশুর বন্ধুদের দৃষ্টান্ত দেবেন না।

৫)   আপাত বিপথগামী শিশুদের সামনে শিশুর বন্ধুর বেশি প্রশংসা করবেন না।

৬)   রুটিন অভ্যাসে শিশুকে মারবেন না। খুব অল্প মারবেন।

৭)   অবশ্যই শিশুকে তার ভালো কাজের জন্য প্রশংসা করবেন।

৮)   প্রশংসা থেকেই শিশু সবার সঙ্গে মিলেমিশে চলতে শিখবে।

 

ডিপ্রেশনের কবলে কৈশোর

শৈশব থেকে কৈশোরে পদার্পণ করার রাস্তাটা সবসময় যে খুব সহজ হয় না, সেটা সন্তানের মা-বাবারা সন্তানকে বড়ো করে তুলতে গিয়েই বুঝতে পারেন। কৈশোরে পা দিতেই ছেলেমেয়েদের মানসিক এবং শারীরিক অনেক পরিবর্তন ঘটে, বিশেষত হরমোনাল। সুতরাং কৈশোরের রাস্তা কিন্তু কঠিন কিন্তু বেশিরভাগ কিশোর-কিশোরীরা জীবনের ও শরীরের সংঘাতপূর্ণ পরিবর্তনের চাপ সহজ করতে ভালো বন্ধু খুঁজে নেয় স্কুল-কলেজে অথবা বাইরের অ্যাকটিভিটিতে, অ্যাকাডেমিক্স-এ নিজেকে বেশি করে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করে। নিজের মধ্যে একটা মজবুত স্বাধীন সত্ত্বা গড়ে তোলার প্রচেষ্টা করে।

কখনও-সখনও মন খারাপ অথবা রাগের প্রকাশ কৈশোরে স্বাভাবিক। কিন্তু অবসাদ, কৈশোরের সদ্য বিকশিত ব্যক্তিত্বকে তছনছ করে দেয়। যাকে গ্রাস করে তাকে হতাশাগ্রস্ত, বিষণ্ণ এবং রাগি করে তোলে। Teenage Depression-এর সঙ্গে কীভাবে মোকাবিলা করবেন আসুন জেনে নিই।

Teenage Depression বা কৈশোরে অবসাদে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা দিন দিন বাড়ছে নাকি এই ব্যাপারটা নিয়ে মানুষ এখন অনেক বেশি সচেতন? যেটাই হোক না কেন অবসাদগ্রস্ত টিনএজারদের সংখ্যা আজ এতটাই বেড়ে চলেছে যে, সেটা কল্পনার বাইরে। তবে চিকিৎসায় এই সমস্যা সম্পূর্ণ সারিয়ে তোলা সম্ভব। এই ব্যস্ততার দিনকালে, পাঁচজন অবসাদগ্রস্ত শিশুর মধ্যে, হয়তো একজনের অভিভাবকই এই রোগের লক্ষণ চিনে নিতে পারেন। বাকিদের চোখ এড়িয়ে যায় কিশোরটির এই মানসিক সমস্যা। অথচ অবসাদগ্রস্ত কৈশোরকে সুন্দর জীবনে ফিরিয়ে আনতে দরকার অভিভাবক, শিক্ষক এবং বন্ধুদের সচেতনতা এবং সহমর্মিতা।

অবসাদের লক্ষণ

 অভিভাবকদের পক্ষে সন্তানের অবসাদের লক্ষণগুলি সবসময় নির্ণয় করা সম্ভব হয় না। বেশিরভাগ সময়েই টিনএজারদের স্বাভাবিক সাময়িক মানসিক অবস্থার সঙ্গে অবসাদের লক্ষণগুলি অভিভাবকেরা আলাদা করতে পারেন না। এই সমস্যা আরও বেড়ে যায় যখন অবসাদে আক্রান্ত টিনএজারদের ক্ষেত্রে দেখা যায় তাদের মধ্যে বিষণ্ণতার অথবা অন্যদের থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখার (উইথড্র) কোনও লক্ষণ প্রকাশিত হয় না। কিছু কিছু ডিপ্রেসড টিনএজারদের ক্ষেত্রে উত্তেজনা, খিটখিটে মানসিকতা, ঝগড়া করার প্রবণতা এবং অমানবিক রাগের লক্ষণ খুব প্রমিনেন্ট হয়। অভিভাবকদের পরিষ্কার করে বুঝতে হবে সত্যিই তাদের সন্তান অবসাদগ্রস্ত কিনা। তার জন্যে অবসাদের কয়েকটি লক্ষণ তাদের জেনে রাখা দরকার।

১)   বিষণ্ণতা অথবা নিজের উপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলা

২)   রাগ, খিটখিটে স্বভাব, সহযোগিতার অভাব

৩)   ন্যাগিং করা স্বভাব এবং বিনা কারণে কেঁদে ফেলা

৪)   পরিবার এবং বন্ধুদের থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখা

৫)   যে-কোনও কাজেই আগ্রহ, কৌতূহল হারিয়ে ফেলা

৬)   খাওয়াদাওয়া এবং ঘুমের অভ্যাসের পরিবর্তন

৭)   অস্থির এবং বিক্ষোভপূর্ণ মনোভাব

৮)   নিজেকে অকর্মণ্য এবং দোষী ভাবা

৯)   উৎসাহ এবং প্রেরণার অভাব

১০) অবসাদ এবং স্ফূর্তির অভাব

১১) মনোযোগ দিতে অসুবিধা বোধ করা

১২) মৃত্যু এবং আত্মহননের চিন্তা করা

টিন এজারদের উপর অবসাদের প্রভাব

১)   অবসাদ, এনার্জি লেভেল কমিয়ে দেয় ফলে মনোযোগ দিতে অসুবিধা হতে থাকে। এর ফলে স্কুল-কলেজে উপস্থিতির হার কমতে থাকে, পড়াশোনার মান খারাপ হয় অথবা হোমওয়ার্ক নিয়ে নৈরাশ্য বাড়তেই থাকে একজন ভালো ছাত্রেরও।

২)   অবসাদে আক্রান্ত হয়ে অনেকে বাড়ি থেকে পালাবার চেষ্টা করে অথবা পালাবার কথা ভাবে। এগুলি আসলে সাহায্য চাওয়ারই আর্তিতে।

৩)   অনেকে ড্রাগ এবং অন্যান্য ধরনের নেশায় আসক্ত হয় অবসাদ কাটাবার জন্যে। অবশ্য পুরো ইচ্ছেটাই রোগীর সম্পূর্ণ কল্পনাপ্রসূত।

৪)   মনের মধ্যে খারাপ চিন্তা আসা, নিজের উপর বিশ্বাস একেবারে হারিয়ে ফেলা।

৫)   অবসাদ কাটাতে অনেকেই কম্পিউটার ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে যেটা আরও তাদের একাকিত্বের দিকে ঠেলে দেয়।

৬)   অবসাদগ্রস্ত টিনএজার-রা হাই রিস্ক বিহেভিয়ার-এ নিজেদের নিয়োগ করে ফেলে অনেক সময়। যেমন রেকলেস ড্রাইভিং, অতিরিক্ত মদ্যপান এবং আনসেফ সেক্স।

৭)   কিছু কিছু কিশোর যারা প্রথম থেকেই দুর্বলদের উপর অত্যাচার করতে ভালোবাসে, এই বয়সে অবসাদে আক্রান্ত হলে তারা বেশি করে ভায়োলেন্ট হয়ে পড়ে। অপরের মারাত্মক ক্ষতি করতেও (প্রাণে মেরে ফেলা) তারা দ্বিধা করে না।

এছাড়াও অবসাদগ্রস্ত কিশোর-কিশোরীদের অন্যান্য মানসিক সমস্যার সঙ্গে খাওয়া-দাওয়ার সমস্যা এবং নিজেরও ক্ষতি করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।

এই লক্ষণগুলি যদি অভিভাবকেরা নিজের সন্তানের মধ্যে লক্ষ্য করেন, তাহলে দেখতে হবে কতদিন ধরে লক্ষণগুলি তার মধ্যে মাথাচাড়া দিয়েছে এবং তা কতটা সাংঘাতিক।

সুতরাং মা-বাবার মনে যদি এতটুকুও সন্দেহ দানা বাঁধে যে তার সন্তান অবসাদের শিকার, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে তার সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনা করতে হবে যাতে সে মন খুলে তার সমস্যা শেয়ার করতে পারে। প্রথমে হয়তো মনের কথা শেয়ার করতে লজ্জা পাবে, তাকে সবাই ভুল বুঝবে এই ভয়টাও তার মনের মধ্যে বারবার হবে। আবার অনেক সময় অবসাদে আক্রান্ত হলে বহু টিনএজার তাদের মনের মধ্যে চলা কথাগুলো ঠিকমতো বলে উঠতে পারে না। এর একমাত্র উপায় বন্ধুর মতো তার দিকে হাত বাড়ানো। যতটা সে নিজের কমফর্ট লেভেল বজায় রেখে শেয়ার করতে পারবে, ততটাই আগ্রহ নিয়ে বড়োদের শোনা উচিত। আরও না-বলা কথা জানার জন্যে পীড়াপীড়ি করা কখনওই বাঞ্ছনীয় নয়। নিজে বক্তৃতা না দিয়ে পীড়িত যে তার কথা শোনা উচিত। তার অবসাদের কারণগুলো সুস্থ মানুষের কাছে অর্থহীন হতে পারে কিন্তু তা-সত্ত্বেও তার বলা সমস্যাগুলোকে মেনে নিতে হবে, রোগীর সামনে নঞর্থক ভাবনা প্রকাশ করা চলবে না।

চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা

 অবসাদের সঠিক চিকিৎসা করানো না হলে এটি প্রচন্ড ক্ষতিকারক হয়ে উঠতে পারে। তাই যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি পোশাগত সাহায্য নেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ।

পরিবারের ডাক্তারের কাছে সন্তানের অবসাদের লক্ষণগুলি খুলে বলতে হবে এবং সেই সঙ্গে পরিবারে আর কারও ওই সমস্যা হয়েছিল কিনা সেটাও পরিষ্কার ভাবে জানাতে হবে। অবসাদের কারণ নির্ণয় করতে ডাক্তার কমপ্লিট ফিজিক্যাল পরীক্ষা এবং রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পাঠাবার নির্দেশ দিতে পারেন অবসাদের ডাক্তারি কারণ খুঁজে বার করার জন্যে।

শারীরিক কোনও কারণ যদি অবসাদের জন্যে পাওয়া না যায় তাহলে ডাক্তার সাইকোলজিস্ট অথবা সাইকায়াট্রিস্ট-এর কাছে রোগীকে পাঠিয়ে থাকেন এবং রোগের কারণ নির্ণয় করে ডাক্তার ওষুধ দিয়ে থাকেন। তবে এই ধরনের সাইকায়াট্রিক ড্রাগের অনেক ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকে থাকে।

চিকিৎসা চলাকালীন অভিভাবকদের সাপোর্ট

 অবসাদের চিকিৎসা চলাকালীন অভিভাবকদের উচিত অবসাদগ্রস্ত সন্তানকে এই বিশ্বাস দেওয়ানো যে তারা সন্তানের পাশে সবসময় আছেন। যে-ছেলে অথবা মেয়েটি অবসাদগ্রস্ত, তার যেন সবসময় মনে হয় তাকে সকলে ভালোবাসে।

মা-বাবার অথবা বাড়ির অনেকেরই অনেক সময় বহুদিন ধরে রোগীর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াটা অসহ্য হয়ে উঠতে পারে তবে মনে রাখতে হবে রোগীর অসুখটি ইচ্ছাকৃত নয়। সুতরাং ধৈর্য এবং সন্তানকে বোঝার মানসিকতা বজায় রাখতে হবে। তাকে সর্বক্ষণ কাজের মধ্যে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে যাতে একাকিত্ববোধ তার মধ্যে স্থান করতে না পারে। খেয়াল রাখা উচিত যেন সে বন্ধুবান্ধবহীন না হয়ে পড়ে। সোশ্যালাইজ করতে তাকে সাহায্য করা প্রয়োজন। সন্তানের ট্রিটমেন্টের প্রতি নজরদারি নিতান্তই জরুরি। সে ঠিকমতো ডাক্তারের কথা শুনছে কিনা, ওষুধ ঠিক মতো খাচ্ছে কিনা ইত্যাদি ইত্যাদি। সবথেকে শেষ কথা হচ্ছে, যে-অসুখে সন্তান ভুগছে, সেই অসুখটা নিয়ে নিজে কিছুটা পড়াশোনা করা যাতে বিষয়টি সম্পর্কে অভিভাবকেরা অজ্ঞ থেকে না যান। অবসাদ জিনিসটা কী, এটা নিজে বুঝতে পারলে সন্তানের সমস্যায় আপনিও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে পারবেন।

অবসাদে আক্রান্ত সন্তানকে সুস্থ করে তোলার রাস্তাটা হয়তো খুব সহজ নয় কিন্তু ধৈর্য ধরতেই হবে। ভালোবাসার জোরে অসুখটাকে হারাবার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। জয়-পরাজয় থাকবেই, তাই বলে নিজেকে এবং পরিবারের সকলকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করা উচিত হবে না। যতক্ষণ অবসাদে আক্রান্ত সন্তানকে সারিয়ে তুলতে মা-বাবা যথাসম্ভব প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, ততক্ষণ তাঁরা তাদের নিজেদের কর্তব্য অক্ষরে অক্ষরে পালন করছেন।

 

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব