মেনুসংবাদ (শেষ পর্ব)

কাবেরী জানে, জামাইয়ের ব্যাপারে নিজের মায়ের একটা অদ্ভুত আদিখ্যেতা আছে। কিছু কিছু ব্যাপারে তো ওকেই রীতিমতো ধমকে চুপ করিয়ে অমলেন্দুর পক্ষ নেয়। বাবা বরং বেশ নিরপেক্ষ। কথা ঘুরিয়ে কায়দা করে অন্য বিষয়ে চলে গেল।

অন্যদিন এ সময় মা ফোন করলে তাড়াহুড়ো করে। আজ ধীরেসুস্থে কথা বলতে বলতে যে অনেকটা সময় চলে গেছে খেয়াল ছিল না। খেয়াল হল যখন উঁকি মেরে অমলেন্দু ইশারায় খেতে ডাকল। ফোন রেখে ডাইনিং টেবিলে এসে বসল। শুকনো মুখে টেবিলে খাবারের বোলগুলো রাখল অমলেন্দু।

বোলের ঢাকনা খুলে চক্ষু চড়কগাছ কাবেরীর। ভেটকির ফিলে ভেঙে লটে মাছের ঘ্যাঁটে পরিণত হয়েছে। ফ্রায়েড রাইস হয়ে গেছে ফ্যানে ভাত।

—এটা কী হয়েছে, গলা আপনা থেকেই চড়ে গেল কাবেরীর।

গণ্ডগোলটা কোথায়, নিজেও জানে অমলেন্দু। ড্যামেজ কনট্রোল করার ভঙ্গিমায় বলল, ‘আসলে ভেটকিগুলো একটু শক্ত ছিল তো। একটু বেশিক্ষণ ধরে কষতেই বলা ছিল প্রিপারেশন গাইডলাইনে, তারপর এক সেকেন্ড থেমে বলল, তারপর ওই অফিসের তরফদারদা ফোন করল…।’

তিন্নি ইতিমধ্যেই নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে ডিশের ছবিগুলো তোলার জন্য মোবাইল ফোকাস করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ক্যামেরা গুটিয়ে হো হো করে হেসে উঠল।

কোনওক্রমে খাবার গলা দিয়ে নামাল কাবেরী। মাথা নীচু করে এক মনে খেয়ে যাচ্ছে তিন্নি। খেয়ে একটা বড়ো ঢেঁকুর তুলল অমলেন্দু, “রাতের প্রিপারেশনের সময় তিন্নি ইউটিউবের চ্যানেলটা সামনে একটু খুলে ধরে থাকিস তো।”

কাবেরী একটা হেঁচকি তুলে কাতর মিনতি করল, “আর না। দোহাই আর না। আমার বিশ্রামের আর দরকার নেই। ও বেলারটা আমিই করে নেব। তুমি আর রান্নাঘরে এসে আমার উপকার কোরো না।”

চোখে কাতর অনুরোধ ফুটিয়ে অমলেন্দু বলল, “প্লিজ। ওয়ান লাস্ট চান্স। কথা দিচ্ছি, আর কোনও গণ্ডগোল হবে না। তিন্নি তুই এবার আমার সঙ্গে থাকবি।”

কাবেরী চেয়ার পিছনে ঠেলে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘বাপ-মেয়ে মিলে যা খুশি করো। কমিউনিটির পুজো মিটিং আছে আজ মহিলাদের। আমি চললাম।”

কোভিড পরিস্থিতিতে কমিউনিটি হলে মেম্বাররা দূরত্ব রেখে বসেছে। মুখে মাস্ক। প্রফেসর অর্ণব সান্যালের বউ শকুন্তলা সান্যাল হলের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সবাইকে স্প্রে করে হ্যান্ড স্যানিটাইজ করাচ্ছেন। কাবেরীদের ফ্ল্যাটের উপর তলাতেই থাকেন।

কাবেরী ঢুকে বুঝতে পারল, সব মেম্বার বা বেশি বয়স্কদের ডাকা হয়নি। প্রত্যেক বছরেই এই মিটিংটা হয়। মূলত আলোচনার বিষয় থাকে, পুজোর চারদিন জোগাড় আর ভোগরান্না কোনবেলায় কারা করবে। সব বছর এক থাকে না লিস্টটা। কারণ কিছু ফ্যামিলি এক আধ বছর বেড়াতে যায়। ফলে প্রত্যেক বছরই মিটিং-এ আলোচনা করে ঠিক করা হয়, দায়িত্বে ঠিক কারা থাকতে পারে। ঘুরতে যাবার প্ল্যানিং এখন সবাই পুজোর অনেক আগে থেকে করে। তাই আলোচনাটা সহজ হয়ে যায় অনেক। এ বছর অবশ্য একটা গোলমেলে পরিস্থিতি। পুজো হবে, সিদ্ধান্ত নেবার পরে এই মিটিং-এর আয়োজন।

মিটিং শেষ করে, ইচ্ছে করে একটু দেরি করে ফিরল কাবেরী। ঘড়িতে তখন সাড়ে আটটা।

ফ্ল্যাট জুড়ে সুন্দর কষা মাংসের গন্ধ ভাসছে। খাবার টেবিল খুব সুন্দর করে সাজিয়েছে বাবা-মেয়ে। খিদে পাচ্ছিল।

মুখ-হাত ধুয়ে ন’টা নাগাদ খেতে বসল ওরা তিনজন। অমলেন্দুর মুখে একটা লাজুক হাসি। রান্নাঘর দর্শন করে এসেছে। ঝকঝক তকতক করছে। রুটি আর মাংস প্লেটে সাজিয়ে দিয়ে অমলেন্দু ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। ভাবটা, কী, কেমন দিলাম!

রুটি-মাংস মুখে দিয়ে কাবেরীর মন ভালো হয়ে গেল। কথা রেখেছে অমলেন্দু। সত্যিই লা-জবাব স্বাদ হয়েছে। গলা দিয়ে নামাতে নামাতে কাবেরী শুধু বলল, ‘এ তো স্বর্গীয় বানিয়েছ গো।’

লজ্জায় মাথা নামিয়ে অমলেন্দু কমপ্লিমেন্টটা নিল। তিন্নি কাবেরীর মুখ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে বাবার দিকে ফেরাল। বাবা-মেয়ের মুখে বিজয়ীর হাসি। ওর নিজেরও মনে হচ্ছিল, সব ভালো যার শেষ ভালো। শেষ পর্যন্ত কথা রেখেছে অমলেন্দু। সত্যিই করে দেখাল। সকাল থেকে বিপর্যয় ঘটলেও এক মুহূর্তের জন্যও হাল ছাড়েনি।

তিন্নি ঘরে চলে গেছে নিজের। শুতেই যাচ্ছিল কাবেরী। উপরের তলার মিসেস সান্যাল ফোন করলেন, ‘কী কাবেরী, আজ মিটিং-এ বললে তোমার হাজব্যান্ড রান্না করছে, এ দিকে মিটিং থেকে তাড়াতাড়ি চলে আসার সময় দেখলাম, তোমার ফ্ল্যাটে অনলাইন অ্যাপ থেকে খাবার ডেলিভারি হচ্ছে?’

কাবেরী তাকাল অমলেন্দু’র দিকে। সারাদিনের কাণ্ডকীর্তির পর ইতিমধ্যেই অঘোরে ঘুম শুরু করে দিয়েছে। মিসেস সান্যালকে বলল, ‘হ্যাঁ, ওর শরীরটা একটু খারাপ লাগছিল। তাই আর পারেনি করতে।’

ফোন নামিয়ে বিছানায় উঠে এল কাবেরী। আর ঠিক তখনই ওদের ফ্ল্যাটবাড়ির বাইরের আঁস্তাকুঁড়টায় কয়েকটা কুকুরের তর্জন-গর্জন আর লড়াই শুরু হল। মনে হল, যেন ফেলে দেওয়া খাবারের জন্যই সে লড়াই।

সমাপ্ত

মেনুসংবাদ (পর্ব-০৩)

বাথরুম থেকে বেরিয়ে চিনি মেশানো পেঁয়াজের মিষ্টি গন্ধ পেয়েছিল। বুঝতে পারছিল, ঠিকঠাক পথেই রান্না এগিয়ে চলেছে। মেয়ে উঠে ব্রাশ মুখে নিজের মোবাইল ঘাঁটতে ঘাঁটতে বাবার সঙ্গে হাসাহাসি করছিল।

বেডরুমের দেয়ালেও একটা ছোটো ‘এলইডি’ টিভি ঝোলানো আছে। বিছানায় আধশোয়া হয়ে সেটা অন করল কাবেরী। দু’টো সিরিয়ালের এপিসোড সকালে আবার টেলিকাস্ট হয়। আজকে একটু আরাম করে দেখা যাবে। ‘অমর-সিঁথি’ সিরিয়ালটার শ্রমণার তিন নম্বর স্বামীর সঙ্গে এক নম্বর স্বামীর দেখা হওয়ার এপিসোডটা বেশ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করল কাবেরী।

বেশ কয়েকটা বিজ্ঞাপনের পর শুরু হয়ে গেল, ‘আমিও দুর্গা’। রত্না বলে চরিত্রটার অভিনয় মনে ধরলেও, কাবেরী বোঝে স্ক্রিপ্টের চাপে মেয়েটা হাঁসফাস করে। রত্নাকে গুলিবিদ্ধ স্বামীর সাঁড়াশি দিয়ে গুলি বের করতে দেখার দৃশ্যটা স্লো মোশনে দশ মিনিট দেখতে দেখতে চোখে চুল এসে গিয়েছিল, হঠাৎ একটা প্রচণ্ড জোরে আওয়াজ শুনে ধড়মড় করে উঠে বসল কবেরী। তাড়াতাড়ি টিভি অফ করে রান্নাঘরে ছুটে গিয়ে দৃশ্য দেখে কিছু বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলল।

মিক্সিতে পেঁয়াজ বাটছিল অমলেন্দু। মিক্সির বাটির মুখ পর্যন্ত পেঁয়াজ দিয়ে ওভারলোড করে মিক্সি ঘোরাতেই দু’টো কাণ্ড ঘটেছে। বাটা পেঁয়াজ পুরো রান্নাঘরের বাসন আর দেয়ালে মকবুল ফিদা হুসেনের ক্যানভাসে রং ছিটোনোর মতো ছড়িয়েছে। অমলেন্দুর চশমায় আর বুকের লোমেও অসহায় পেঁয়াজবাটা ঝুলতে ঝুলতে যেন ভাবছে, কড়া আর গরম তেলের বদলে এ কোথায় এসে পড়লাম! অন্যদিকে মিক্সি বসে গিয়েছে শব্দ করে।

কাবেরীকে দেখে চশমাটা চোখ থেকে খুলে ক্যাবলার মতো হেসে অমলেন্দু বলল, “আসলে ইউটিউবে না বেশ বড়ো মিক্সিতে পেঁয়াজটা বাটছিল…’

পুরো কিচেনের অবস্থা দেখে মাথা ঘুরছিল কাবেরীর। রাগটা কনট্রোল করে মৃদুস্বরে বলল, ‘রাখো তো ইউটিউব। রাতদিন তোমার আর তোমার মেয়ের ওই ডিজিটাল কচকচানি।”

একটু দমে গেছে অমলেন্দু। আঙুল দিয়ে চশমার উপর থেকে পেঁয়াজবাটা সরিয়ে মিনমিন করে শুধু বলল, ‘আবার এর মধ্যে মেয়েকে টানা কেন…।”

তিন্নিও শব্দ পেয়ে কিচেনের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রাণপণে হাসি চাপার চেষ্টা করছে, বোঝা যাচ্ছে। সেই অবস্থাতে শুধু বলল, ‘শেফ হবার মিশন মনে হচ্ছে, আজ ফেল করল বাবা।’ আরও কিছু বলত হয়তো তিন্নি। মা কটমট করে তাকাতে ফোনে মাথা গুঁজে হাওয়া হয়ে গেল নিজের ঘরের দিকে।

অমলেন্দুকে কাবেরী এবার ধমকে উঠল, ‘গ্যাস অফ করে বেরিয়ে এসো। পরিষ্কার করতে দাও। তারপর পিণ্ডি পাকিও।”

—তোমার সিরিয়ালের নায়িকারা তাদের হাজব্যান্ডের যে-কোনও কাজ কী সুন্দর মেনে নেয়। আর তুমি…

—ও সব টিভিতেই থাক। তুমি বেরোও এবার। আর খবরদার, সিরিয়াল ফিরিয়াল টেনে আনবে না রান্নাঘরে, বলে দিলাম। সুড়সুড় করে বেরিয়ে যায় অমলেন্দু।

সমস্ত পরিস্কার করে আবার যখন গা হাত পা ধুতে গেল কাবেরী, বারোটা বেজে গেছে। আজকের খাওয়ারও যে বারোটা বাজবে, বুঝতে পারছিল। ইতিমধ্যেই আবার দ্বিগুন উৎসাহ নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকেছে অমলেন্দু।

গা-হাত-পা ধুয়ে বেডরুমে ফ্রেশ হবার সময় রান্নাঘর থেকে বেশ সুগন্ধ ভেসে আসছিল। একটু হলেও এবার নিশ্চিন্ত হল কাবেরী।

ডাইনিংয়ে অফিসের কোনও কলিগের সঙ্গে হেসে কথা বলছে অমলেন্দু।

নিজের ফোন বেজে উঠতে কাবেরী দেখল, মা। অন করে কানে দিতে মা বলল, ‘সত্যিই আজ অমলেন্দু রান্না করছে?”

অবাক হয়ে পালটা প্রশ্ন করল কাবেরী, ‘তুমি কী করে জানলে?”

—কী করে আবার, তিন্নি ফোন করেছিল।

—ও, হ্যাঁ, করছে বটে। তবে আমার ভরসা নেই। ওর এসব আসে না। জীবনে কোনওদিন করতে দেখেছ!

—সেটাই। আমি তো শুনেই অবাক। যতবার তোর ওখানেই গেছি, ওর শুধু এ রেস্টুরেন্ট আর ও রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার অর্ডার। ছেলেটা খেটে করছে, বড়ো দেখতে ইচ্ছে করছে রে।

ক্রমশ…

মেনুসংবাদ (পর্ব-০২)

বছর দুয়েক আগে পেট খারাপ হয়ে মেয়ে তিন্নি বেশ অসুস্থ। কাবেরী অমলেন্দুকে ডাব এনে কেটে জল আনতে বলেছিল। ফ্ল্যাটের সিকিউরিটির কাছ থেকে হাতুড়ি আর বাটালি যোগাড় করে ডাব ফুঁড়ে জল বের করার অপারেশন শুরু করেছিল। হাতুড়ি সপাটে মারতেই বাটালি ডাবের পেছন ফুটো হয়ে বেরিয়ে এসেছিল। তারপর সে বাটালি বের করার জন্য সিকিউরিটির ঘরে করাত চাইতে যায় অমলেন্দু। সিকিউরিটি দেখে শুনে হাওয়া।

এ ছাড়া ইস্ত্রি করতে গিয়ে বার দুয়েক জামাকাপড়ের বারোটা বাজানো, নেল পলিশ শুকিয়ে যাওয়ার পর গাড়ির পেট্রোল ঢেলে তরল করার চেষ্টা— শেষ কয়েক বছরে কাবেরী ভয়ের চোটে অমলেন্দুকে ঘর সংসারের কোনও কাজ করতে বলে না। নিজেও জানে, ওকে কিছু এ ধরনের কাজ করতে বলা মানে পরে নিজের খাটনি কয়েক গুন বেড়ে যাবে। তো এই অমলেন্দু যখন রান্নাঘর সামলানোর কথা নিজে থেকে বলল, কাবেরীর লো ব্লাড প্রেশার হাই হয়ে গিয়েছিল। তিন্নি অবশ্য বাঁ-হাতের বুড়ো আঙুল তুলে বাবাকে বলেছিল, ‘আমি আছি।’

কাবেরী ভালোমতোই জানে, ক্লাস ইলেভেনে পড়া মেয়ে বাবাকে কত হেল্প করবে! পড়াশোনার সময়টুকু বাদ দিয়ে মোবাইল সার্ফিং-এ যে-স্পিডে হাত চলে, তার সিকিভাগও ঘরের কাজে চলে না। এ ব্যাপারে মেয়ে একেবারে বাবার কনফার্মড জিন পেয়েছে। ‘থামস আপ’ করা মানে তিন্নি আসলে যে কাঁচকলা দেখিয়েছিল, অফিসের জটিল ম্যানেজমেন্ট সামলেও অমলেন্দুর মাথায় ঢোকেনি।

ফলে আজ সকালে এই চা যখন বাবা সার্ভ করছে, মেয়ে নিজের বিছানায় পা বালিশের সঙ্গে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কবাডি খেলছে।

মুখটা বিচ্ছিরি লাগছে কাবেরীর। তাও স্বাভাবিক মুখ করে অমলেন্দুর মুখের দিকে তাকাল, ‘তা আজ দুপুরে আর রাতে কী রান্না হবে? কাল তো বলেছিলে, সারপ্রাইজ দেবে।’

মুখ আর টাকের ছাঁটা বাগানে যেন একটা উজ্জ্বল আলো খেলা করল অমলেন্দু’র। অতি উৎসাহে আছে বোঝাই যাচ্ছে। সকালে উঠে চান করে স্যান্ডোগেঞ্জি আর বারমুডা পরে যেভাবে ময়দানে নেমেছে, একটা কিছু যেন করে দেখাবে আজ। একটা রহস্যময় হাসি দিয়ে বলল, ‘দুপুরে ফ্রায়েড রাইস আর চিলি ফিস। রাতে তন্দুরি, রুটি, সঙ্গে চিকেন কষা।’

হাঁ করে অমলেন্দু’র মুখের দিকে তাকিয়ে রইল কাবেরী। বলে কী লোকটা! ওকে চুপ করে থাকতে দেখে অমলেন্দু আবার বলল, “তুমি বরং ড্রয়িংরুমে বসে আরাম করে টিভি সিরিয়াল দ্যাখো। কাটাকুটিও আমি নিজের হাতেই করে নেব। আজকে রান্নার ব্যাপারে এক পার্সেন্ট ক্রেডিট কাউকে আমি দিতে রাজি নই।

সত্যি কথা বলতে এসব কথা যখন কোনও স্বামী বিয়ের এতগুলো বছর পর বউকে বলে, তার খুশি হওয়ার কথা। কাবেরীর মনে হচ্ছে, আজ অমলেন্দু আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে আছে। শরীরে আপনা থেকেই একটা যেন আলিস্যিভাব চলে আসছে। গলায় অবিশ্বাস ফুটিয়ে বলল, “ঠিক তুমি ম্যানেজ করে নিতে পারবে?”

—শুধু দেখতে থাকো।

অমলেন্দু চায়ের খালি কাপ ডিশ, ট্রে-তে নিয়ে শোবার ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। কাবেরী বাথরুমে ঢোকে।

ম্যাক্সি পরে, অল্প ভেজা চুল পিঠে ছড়িয়ে বেডরুমে চলে এল কাবেরী। এ রকম বেলার দিকে গা এলিয়ে অনেকদিন বিছানায় শুয়ে থাকা হয়নি। অমলেন্দু সাড়ে ন’টার মধ্যেই বেরিয়ে যায় অফিস থাকলে। বেরনোর আগে পর্যন্ত কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের একেকদিন একেকটা এপিসোড করে লোকটা। কোনওদিন রুমালের বদলে পকেটে এক পার্টি মোজা ঢুকিয়ে খুঁজতে থাকে, কোনওদিন মোবাইল রেখে আসে কমোডের ফ্ল্যাশ বক্সের উপর। মাঝেমধ্যে অবাক হয়ে কাবেরী ভেবেছে, এই মানুষটাই কোন জাদু বলে নিজের অফিসে এত ভালো পারফরম্যান্স লেভেল বজায় রেখেছে। লকডাউন হয়ে অন্তত কিছুদিনের জন্য এখন সেসব দক্ষযজ্ঞের হাত থেকে মুক্তি।

ক্রমশ…

মেনুসংবাদ (পর্ব-০১)

যেমন সময়ে রোজ ঘুম ভাঙে, আজও ভাঙল কাবেরীর। পাশে অমলেন্দু নেই। তার মানে আরও সকালে উঠে কথামতো শুরু করে দিয়েছে নিজের কাজ। ব্রাশ করে রান্নাঘরে যাবার আগেই দেখল, ট্রে-তে চায়ের কাপ ডিশ, বিস্কুট সাজিয়ে শোবার ঘরে অমলেন্দু হাজির।

চায়ের কাপে চুমুক দিয়েই কাবেরীর চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। জিভটায় যেন কেউ কারেন্ট মারল। লিকার অত্যধিক কড়া। তার উপরে গুড় গোলার মতো মিষ্টি। এক কথায় বিচিত্র স্বাদ। গোটা সকালটাই একেবারে তেতো হয়ে গেল। হাসি হাসি মুখ করে অমলেন্দু ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। ছোটোবেলায় বাবা শিখিয়েছিল, “মর্নিং শোজ দ্য ডে!’

সকাল যখন এইভাবে শুরু হল, গোটা দিন কীভাবে যাবে, ভাবতে গিয়ে ভেতরে কেঁপে উঠল কাবেরী। অথচ কাল রাতে খাবার টেবিলে বসে চোখ বুজে কাবেরীর হাতে তৈরি তরকা-রুটি চিবোতে চিবোতে অমলেন্দু যখন বলেছিল, ‘সারা সপ্তাহে তো একদিনও বিরাম পাও না। ভাবছি, কাল গোটা দিনটা কিচেন সামলাব আমি।’

রুটির গ্রাস মুখে তুলতে গিয়েও নামিয়ে নিয়েছিল কাবেরী। আঠারো বছরের বিবাহিত জীবনে যাকে কোনওদিন রান্নাঘরের চৌকাঠ পেরোতে দেখেনি, সে সারাদিনের হেঁসেল সামলাবে! অমলেন্দু’র প্রায় টাক মাথায় কয়েকগাছি চুল সুন্দরবনের বিরল হয়ে আসা সুন্দরী গাছের মতোই জেগে আছে। সে দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে ব্যাঁকা হাসি হেসে কাবেরী বলেছিল, ‘যদ্দুর জানি তোমার তো ডিগ্রি বিজনেস ম্যানেজমেন্টে ছিল, হোটেল ম্যানেজমেন্টে তো নয়।’ বড়ো জালার মতো ভুঁড়িটা কাঁপিয়ে হেসে উঠেছিল অমলেন্দু,

—আরে, না না গিন্নি। এই লকডাউনে আমাদের তো তাও ওয়ার্ক ফ্রম হোমে কিছুটা বাঁচোয়া। যেমন, ট্রেন, বাসে জার্নির ঝক্কিটা এখন নেই। কিন্তু তোমাদের? তোমাদের তো লকডাউনে খাটা-খাটনি কিছু কম হয়ে যায়নি। আমি হাজব্যান্ড হিসাবে একটু ব্যতিক্রমী হতে চাই।

সোহাগ করে ‘গিন্নি” কথাটা অমলেন্দু’র মুখে শুনলেই কাবেরীর মনে ‘কু’ গায়। নিশ্চিত ভাবে কিছু ধান্দাবাজির গন্ধ পায়। লকডাউন, ভাইরাসের অ্যাটাক তো এ বছর বা এই কয়েক মাসে হয়েছে। বছরের পর বছর ঘুরে গেল। কাবেরীর রান্নাঘরের ঝক্কি সামলানোর কথা কোনওদিন ভাবেনি অমলেন্দু। খেতে ভালোবাসে। ছুটির দিনে বাজার থেকে ফিরে বরং একস্ট্রা কোনও মাছের পদ রাঁধার কাতর অনুরোধ জানিয়ে, হয় টিভির খবরের চ্যানেলের সামনে বসত, আর না হলে সোশ্যাল নেট ওয়ার্ক সাইটে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা। তার হঠাৎ এই ভক্তিভাব জেগে উঠল কেন বুঝতে না পেরে কাবেরী প্রশ্ন করেছিল,

—বটে! তা তুমি তো হাতা-খুন্তিই কোন দিকে ধরতে হয় জানো না। করবেটা কী করে?

বউয়ের এই মনোভাবের কথাটা বিস্তর বোঝে অমলেন্দু। রীতিমতো হাঁ হাঁ করে উঠেছিল, ‘ধুস! তুমি জানোই না। আমি তো লকডাউনের মধ্যেই একটা কুকিং কোর্স করে নিয়েছি।”

—কুকিং কোর্স! কোথা থেকে? অবাক ভাবটা যাচ্ছিল না কাবেরীর।

—কোথা থেকে আবার! ইউটিউব থেকে। কোর্সটার দর্শনই ছিল, “বিরতি দিন বউকে’।

কাবেরী হাঁ করে ফেলেছিল মুখটা — আবার দর্শন !

গলার স্বর ভাসিয়ে বলে উঠেছিল অমলেন্দু, ‘অফকোর্স। লকডাউন তো শুধু ভাইরাস তাড়াতে বন্দিদশা নয়। কোর্সে বলা হয়েছে, নিজের জীবনকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবতে শেখাও।”

এ বার ভয় পেয়েছিল কাবেরী। টাকা রোজগার করতে শিখলেও অমলেন্দুর সংসার সামলানোর নমুনার সঙ্গে বেশ ভালো ভাবেই পরিচিতি ঘটেছে এতগুলো বছরে। বিয়ের দু’মাসের মাথায় ব্লাউজের হাতা ফিটিং করাতে দর্জির কাছে নিয়ে গিয়েছিল। পরতে গিয়ে দেখেছিল হাতা জুড়িয়ে দু’টো আঙুল ঢোকানোর মতো মেরে কেটে জায়গা রেখেছিল।

ক্রমশ…

সমাজ কতটা উদার কর্মরত মহিলাদের প্রতি

সব ধর্মই চায় নারীরা দুর্বল হোক এবং এই কারণেই ধর্মের প্রতারকরা বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করে। তারা বলে যে, ধর্মের উপাসনা বাড়িতে আশীর্বাদ বয়ে নিয়ে আসে, বাচ্চারা সুস্থ থাকে, মেয়েরা ভালো বর পায়, অসুস্থদের নিরাময় করে।  যে কোনও কাজ করতে নাকি পুরুষরা কম সময় ব্যয় করে, নারীরা বেশি সময় ব্যয় করে। এটা কি কর্মরত নারীদের বিরুদ্ধে সমাজের পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র নয়? অথচ যাদের বিরুদ্ধে এই ষড়যন্ত্র তারা কি আদৌ বুঝতে পারেন এটা একটা বৈষম্য তৈরির বিশেষ পন্থা। ধর্মের পাষণ্ডরা মনে করেন নারীদের জন্য বাইরের জগত নয়, তাদের উচিত সংসারধর্ম পালন করে  পুজোপাঠ, ধর্মে সময় ব্যয় করা উচিত।

এদিকে আজকের যুগের নারীরা অনেক বেশি আধুনিক চিন্তাধারার, মহিলারা সংসার সামলিয়ে বাইরে চাকরি করাই পছন্দ করেন বেশি। সন্তান ছোট থাকতে তারা শিশুর জন্য বেবি সিটার বা বেবি কেয়ার নিয়োগ করেন এবং এর পরে মহিলারা অনায়াসেই তাদের কাজ চালিয়ে যেতে পারেন।

মহিলাদের এই সত্যকে স্বীকার করে নেওয়া উচিত যে তাদের প্রাপ্ত বেতন শিশুর যত্ন এবং গৃহপরিচারিকাদের জন্য ব্যয় হবে। সেই সময়ে তাদের যা করতে হবে তা হল,   তাদের কাজ চালিয়ে যাওয়া কারণ এটিই একমাত্র উপায় যা তাদের বাইরের বিশ্বের সাথে এবং সংযুক্ত রাখবে এবং পুরুষদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলার প্রেরণা জোগাবে, একসাথে চলার সুযোগ করে দেবে।

সময় পরিবর্তিত হয়েছে

দিল্লির প্যাটেল নগরের বাসিন্দা নীতি জানান, তিনি একটি নিউজ চ্যানেলে কাজ করছেন। নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে তিনি বলেন, তিনি সবসময় ভয় পেতেন যে সন্তান হওয়ার পরে  তিনি কি তার কাজ চালিয়ে যেতে সক্ষম হবেন? কিন্তু গৃহপরিচারিকা এবং বেবি সিটারদের সহায়তায়, তিনি বাড়ি এবং বাইরের কাজ উভয়ই ভালোভাবে পরিচালনা করেন। তিনি বলেন,   নারীদের সবসময় নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করা উচিত। এজন্য বিয়ের পরও তাদের চাকরি করা জরুরি।

নারীদের জন্য চাকরি পাওয়া এবং একসাথে বাড়ি ও সন্তানের যত্ন নেওয়া সহজ কাজ নয়, তবে নতুন যুগের মহিলারা এটি  ভালোভাবেই করে দেখিয়েছেন। মহিলাদের উচিত তাদের সঙ্গীকে বলা যে সন্তান উভয়েরই, তাই দায়িত্বও উভয়ের, মহিলার একার নয়। সুগার কসমেটিকসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা বিনীতা আগরওয়াল এবং মামা আর্থের মালিক কাজল আলঘের নাম ভুলে যাওয়া উচিত নয়। অন্যদিকে মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রির কথা যদি বলি, তাহলে অঞ্জনা ওম কাশ্যপের মতো উচ্চপদে কর্মরত মহিলারাও বিবাহিত, তবুও তাঁরা সকলেই বাড়ি এবং চাকরি উভয় ক্ষেত্রেই সমান দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছেন।

ভারতের অনেক রাজ্য ও শহরে এমন অনেক মহিলা রয়েছেন যারা খাবারের স্টল স্থাপন করে নিজেকে স্বাবলম্বী করেছেন। তারা কেবল তাদের নিজের ব্যয় বহন করেন না বরং তাদের পরিবারের প্রয়োজনের পুরো যত্ন নেন।

দিল্লির লাজপত নগরে  এমনই একটি স্টল চালান এক মহিলা, যিনি মোমোর জন্য বিখ্যাত।  তিনি ‘দোলমা আন্টি’ নামে পরিচিত। আমরা আমাদের চারপাশে অনেক মহিলাকেই দেখি যারা  লেবুরজল, জুস, লসসি এবং চা ইত্যাদির স্টল  চালাচ্ছেন। এই নারীরাই আমাদের অনুপ্রাণিত করে। এই মহিলারা সেই সমস্ত মহিলাদের জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন যারা বিয়ের পরে চাকরি ছেড়ে ঘরে নিজেকে নিযুক্ত রেখেছেন এবং তাদের কেরিয়ারও আজ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

বিবাহিত মহিলারা পার্ট-টাইম হিসাবে অনেক কিছু করতে পারেন। এই কাজগুলি বাড়িতে বসেও  করা যেতে পারে। সাধারণত এই কাজগুলো কয়েক ঘণ্টার হয় যেমন লেখালেখি, প্রুফ রিডিং, এডিটিং, টাইপিং ইত্যাদি। পার্ট-টাইম কাজ করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ যে, আপনার কাছে সেই কাজগুলি সম্পর্কিত সবরকম সামগ্রী রয়েছে যেমন প্রুফ রিডিং এবং লেখার জন্য টেবিল এবং চেয়ার প্রয়োজন।

কর্মরতা নারীদের সুবিধা

কর্মরত নারীরা যেমন আর্থিকভাবে সক্ষম, তেমনি চাকুরিজীবী  হওয়ার অনেক উপকারিতা রয়েছে। এর ফলে মেয়েরা আরও অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে কারণ তারা সমাজের অন্ধবিশ্বাস থেকে নিজেদের দূরে রাখে,  তাই তাদের একটি ব্যক্তিত্ব রয়েছে। কর্মরত মহিলারা আনন্দে থাকেন  এবং একই সাথে জীবনকে নতুন ভাবে দেখতে বিশ্বাস করেন। এ ছাড়া আরও অনেক উপকারিতা রয়েছে

অর্থনৈতিকভাবে  সক্ষম:  অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম কর্মজীবী নারীদের সমাজে আলাদা মর্যাদা রয়েছে। আর্থিকভাবে সক্ষম হওয়ার কারণে, তারা তাদের নিজস্ব আর্থিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তারা যা খুশি তাই কিনতে পারে। এজন্য তাদের স্বামীর ওপর নির্ভর করতে হয় না। বিয়ের  পর নারীরা চাকরি না করলে ছোটখাটো প্রয়োজনে স্বামীর দিকে তাকাতে হয়, তার কাছে হাত পাততে হয়। মহিলাদের এটা অস্বস্তির কারণ হতে পারে।

এই অস্বস্তি থেকে নিজেকে বের করে আনতে বিয়ের পরও তাদের কাজ করা উচিত।  আর্থিকভাবে সক্ষম হওয়ার কারণে, তারা তাদের সন্তানদের ভালোভাবে লালন-পালন করতে পারে। এছাড়া আয়ের উৎস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সংসারে সঞ্চয় হতে শুরু করে, যা তাদের ভবিষ্যতের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

 

 

বিয়ের পর কখনওই চাকরি ছাড়বেন না

বিয়ের পর মেয়েদের কাছে চাকরি ছেড়ে  দেওয়ার আশা করা হয়, কারণ বাড়িতে বিয়ে হয়ে আসা নারীকে, আমাদের সমাজ সংস্কৃতিবান নারী হিসেবে তার উপর মোহর লাগাতে চায় যা একেবারেই মেনে নেওয়া যায় না। প্রকৃতপক্ষে, এই সমাজ নারীদের সীমানা শ্বশুরবাড়ির চার দেয়ালের মধ্যে বন্দি করে রাখতে চায়।  এমন পরিস্থিতিতে, বিশেষ করে বর্তমান সময়ে নারীদের উচিত বিয়ের পরেও তাদের কাজ চালিয়ে যাওয়া, এতে হয়তো বাড়িতে বসবাসরত সংস্কৃতিবান নারীর ভাবমূর্তি নষ্ট হতে পারে কিন্তু তার স্বাধীনতা নয়।

এই সমাজ নারীদের বিয়ের পর গৃহস্থালী সামলাবার জন্য চাপ দেয় কারণ তারা চায় নারীরা ঘরে বন্দি থাকুক। সমাজ মনে করে যে, মহিলারা তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হবে যখনই  তারা বাড়ির বাইরে পা  রাখবে এবং বছরের পর বছর ধরে চলে আসা রক্ষণশীল ঐতিহ্যগুলি অনুসরণ করতে তারা অস্বীকার করবে।  সমাজের এই অন্ধকারাচ্ছন্ন মনোভাব ভেঙে বাড়ির বাইরে পুরুষের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে চলাটা বিবাহিত নারীদের জন্য একান্ত দরকার। এতে যেমন বিবাহিতার আত্মবিশ্বাস বাড়বে তেমনি সমাজের ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে এক ধরনের বিদ্রোহ ঘোষণা করাও হবে যারা বহু শতাব্দী ধরে কোনও না কোনও ভাবে মহিলাদের শোষণ করে আসছে। নারীদের উচিত এ ধরনের  শোষকদের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করা। এই ক্ষেত্রে প্রথম ধাপ হল, বিয়ের পরেও মহিলাদের চাকরি করা।  বিবাহিত নারীদের নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হবে। চাকরি কি তাদের জন্য? তাদের জানা  উচিত যে এই কাজ করার মানসিকতা থাকাটা আজ তাদের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ! এটি কেবল তাদের বাড়ির চার দেয়াল থেকে বের হওয়ার একটি উপায় নয়, এটি তাদের স্বাবলম্বী করে তোলার একটি ধাপ। তাদের   সামর্থ্যকে কাজে লাগাতে হবে।  তাদের চিন্তা করা উচিত যে তারা যদি এটি প্রয়োগ করতে না পারে তবে তাদের শিক্ষার কী লাভ।

আসল কারণ কী

এই সমাজ সবসময় চায় নারীরা ঘরে বন্দি  থাকুক। এজন্য বাড়িতে রান্নাঘরও এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে একবারে মাত্র একজন ব্যক্তি এতে কাজ করতে পারেন। রান্নাঘর শুধু নারীদের জন্যই  প্রচলিত সমাজের এই ধারণা  ভেঙে দিতে হবে। এজন্য প্রথমেই ওপেন কিচেন তৈরি করতে হবে অথবা কিচেন সেটিংস এমনভাবে করতে হবে যাতে সেখানে কমপক্ষে ২ জন একসঙ্গে কাজ করতে পারে।

মেয়েরা যখন তার বাবার বাড়িতে থাকে, তখন সে সহজেই ইচ্ছা মতন নিজেকে চালিত করে। ইচ্ছে মতন চাকরি করে কিন্তু বিয়ের পর মেয়েরা চাকরি করতে চান না কেন? এর অন্যতম কারণ হল তাদের স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির লোকেরা এটি করতে দেন না। বিয়ের পর মেয়েদের চাকরি করতে না যাওয়ার আরেকটি কারণ হল অল্প বয়সে সন্তান হওয়া। এ অবস্থায় শিশুর জন্ম হতে ৯ মাস সময় অতিবাহিত হয় এবং  এরপর পরবর্তী ৩ বছর তার যত্ন নিতে কেটে যায়।

এমন পরিস্থিতিতে সব নারীকেই পড়তে হয়। তাই বিয়ের আগে মেয়েদের পরিবার পরিকল্পনা নিয়ে হবু স্বামীর সঙ্গে কথা বলা জরুরি। বিয়ের আগে আপনার ভবিষ্যৎ জীবনসঙ্গীর সাথে কথা বলুন। তাকে বলুন যে  বিয়ের পরেও আপনি চাকরি করতে চান।

পরিবারের সদস্যদের সাথে খোলাখুলি কথা বলুন

অনেক মেয়েরাই বিয়ের পর নিজেদের ইচ্ছেকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। তারা তাদের ভালো কেরিয়ার ছেড়ে দেয়। তাহলে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা ভাবলে আগেই উচিত এমন একজন জীবনসঙ্গী চয়ন করা যে কিনা আপনাকে কেরিয়ারে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করবে।

যেসব মেয়েরা কেরিয়ার নিয়ে অত্যন্ত সচেতন এবং বিয়ের পর চাকরি ছাড়তে চান না, তাদের  উচিত এ বিষয়ে তাদের জীবনসঙ্গী ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে  খোলামেলা কথা বলা। এর ফলে মেয়েদের পক্ষে  সেই সব মানুষের উত্তর জেনে নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে।

মহিলারা তাদের সম্ভাব্য স্বামীদের জিজ্ঞাসা করতে পারেন যে, বিয়ের পরে কেরিয়ার এগিয়ে নিয়ে যেতে তারা কীভাবে স্ত্রীদের সাহায্য করতে পারেন?  তারা কি আপনাকে গৃহস্থালির দায়িত্ব পালনে আপনার পাশে দাঁড়াবে নাকি পরিবার বড় হওয়ার পরেও তারা তাদের স্ত্রীকে কেরিয়ার এগিয়ে নিয়ে যেতে সহযোগিতা করবে?  যদি পরিবারের সদস্যরা বাড়ির বউকে চাকরি ছেড়ে দিতে বলে, তবে এটি কি তার স্বামী বিনা বিরোধিতায় পরিবারের কথা মেনে নেবে? জীবনসঙ্গী কতটা চেষ্টা করবেন স্ত্রীকে নিজের কেরিয়ার গরতে? এমনই কিছু প্রশ্ন  করে মেয়েরা নিজের জন্য সঠিক জীবনসঙ্গী  বেছে নিতে পারেন।

 

বিবাহিত মহিলাদের সময়ের যত্ন নেওয়া উচিত

বিবাহিত মহিলাদের নিজেদের সময়ের বিশেষ যত্ন নেওয়া উচিত। যারা চাকরি করেন তাদের  উচিত পরের দিনের খাওয়াদাওয়ার জন্য রাতেই প্রস্তুতি নেওয়া, যেমন শাকসবজি কেটে ফ্রিজে রাখা, পরের দিন অফিস কী পরে যাবেন রাতেই সেটা গুছিয়ে রাখা, ব্যাগে কী কী রাখবেন সেটা প্রস্তুত রাখা ইত্যাদি। এইভাবে   মহিলারা তাদের কাজের সময় কিছুটা হলেও বাঁচাতে পারেন।

দিল্লির বাসিন্দা ২৮ বছর বয়সি আনু জানান, তিনি দুই বছর ধরে বিবাহিত। প্রথমদিকে বিয়ের পর  চাকরি করতে গিয়ে অনেক অসুবিধা হয়েছে তাঁর, তারপর নিজের বেতনের একটা অংশ দিয়ে গৃহপরিচারিকা রাখার ব্যবস্থা করেন। এখন বাড়ি আর অফিসের কাজ একসাথে সামলানো অনেক সহজ হয়ে গেছে। বেতনের বেশ কিছুটা অংশ চলে যাওয়াতে তাঁর কোনও আফসোস নেই কারণ তিনি অনেক ভালোভাবে এখন সংসার সামলাতে পারছেন। সব মহিলাদেরই  কাজ করা উচিত এবং বিয়ের পরেও কাজ চালিয়ে যাওয়া  উচিত।

কর্মরতা নারীদের ঘর ও অফিসের কাজ দুটোই করতে হয়। এই পরিস্থিতিতে, তাদের কাজকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করা উচিত। পরিবারের প্রতিটি সদস্যকে নিজের নিজের প্রয়োজনের যত্ন নিতে দিন, পকেট চেক  করার পরে, খাওয়া শেষ করে তাদের ঝুড়িতে নোংরা কাপড় ছেড়ে রাখতে বলুন। তাদের এঁটো প্লেট নিজেদের তুলতে বলুন, নিজেদের বিছানা নিজেদের ঝাড়তে বলুন, নিজেদের ঘরের জলের জাগ নিজেরাই ভর্তি করার মতো ছোট ছোট কাজ সকলের মধ্যে ভাগ করে দিন।

পুরুষদেরও কী  করা কর্তব্য? বাড়ি সামলানো কেবল মহিলাদের কাজ নয় কারণ একজন কর্মরত মহিলা হিসাবে অফিস এবং বাড়ি উভয়ই ভালোভাবে পরিচালনা সে তো করছেই, পুরুষের সমান কাজ সে করছে। আপনার সঙ্গী যদি রান্না করতে জানেন, তাহলে তাকেও রান্না করতে বলুন। যদি পরিবারে আরও অন্য সদস্যরা থাকে  তাদের সবার কাছে নম্রভাবে পরিষ্কার করে বলুন যে, আপনি একজন কর্মরত নারী, আপনি  চাকরি করেন, তাই বাড়িতে সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে।

নারীকেন্দ্রিক প্লট মাথায় আছে মেঘনা গুলজারের

আরুষি তলোয়ার হত্যাকাণ্ডের সুনানি হয় এলাহাবাদ হাইকোর্ট-এ। এই মামলার রায়ে আরুষির মা-বাবাকে সম্মানের সঙ্গে মুক্তি দেওয়ার পাশাপাশি, সিবিআই এবং সিবিআই আদালতের সিদ্ধান্তকে কটাক্ষ করা হয়েছে। আর এই ঘটনার উপর আধারিত তলোয়ার নামের ছবি তৈরি করে জনপ্রিয়তা পান মেঘনা গুলজার। সাফল্যের কারণে ছবিটির সঙ্গে যুক্ত শিল্পীরা প্রত্যেকেই খুশি হয়েছেন। ছবিটির মাধ্যমে তদন্তের পদ্ধতি নিয়ে কিছু জোরালো প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন মেঘনা। ‘রাজি’ বা ‘তলোয়ার’ প্রসঙ্গ ছাড়াও, তাঁর পরিচালক হয়ে ওঠার কাহিনি শোনালেন মেঘনা গুলজার।

তলোয়ারছবিটি পরিচালনা করে যথেষ্ট জনপ্রিয়তা পেয়েছেন আপনি। যাদের নিয়ে এই ছবি, সেই তলোয়ার পরিবারের দুই অভিযুক্তকে (আরুষির মাবাবা) মুক্তি দিয়েছে এলাহাবাদ হাইকোর্ট। প্রসঙ্গে আপনার কী বক্তব্য?

আদালতের রায় নিয়ে আমার কোনও বক্তব্য নেই, থাকতে পারেও না। কারণ, আদালত তথ্য-প্রমাণ নির্ভর রায় দেয়। তবে সঠিক ভাবে তদন্ত হয়েছে কিনা, তা নিয়ে কিছু প্রশ্ন রেখেছি ছবিটির মাধ্যমে। অবশ্য সেই প্রশ্নের উত্তর হয়তো আর পাওয়া যাবে না। কিন্তু এ ব্যাপারে আমাদের তো কিছু করার নেই, আমরা শুধু সমস্যাকে তুলে ধরতে পারি, দর্শকদের ভাবাতে পারি। যাইহোক, ছবিটি যে দর্শকদের ভালো লেগেছে, এতেই আমি খুশি।

কী ভেবে এই রকম একটি ঘটনাকে ছবির বিষয় করেছিলেন?

ঘটনাটা আমাকে ভাবিয়েছিল, মনে রেখাপাত করেছিল। ছবিটি তৈরি করার আগে অনেক রিসার্চ করতে হয়েছে আমাকে। বিশাল ভরদ্বাজ এবং আমি, এরজন্য খুব পরিশ্রম করেছি। খুঁটিনাটি সমস্ত বিষয়ে আমরা চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছি। ঘটনা এবং তদন্ত প্রক্রিয়া নিখুঁত ভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। আমরা পুরো কাজটা করেছি নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ নিয়ে। এরজন্য প্রতি মুহূর্তে তদন্তের উপর কড়া নজর রাখতে হয়েছে আমাদের। কাজটা খুবই কঠিন ছিল কিন্তু ছবিটিকে নিখুঁত করার জন্য খুব খেটেছি আমরা।

ছবিটিতে আপনার নিজস্ব চিন্তাধারার কোনও প্রতিফলন ঘটিয়েছেন কী?

আমার ব্যক্তিগত কোনও সিদ্ধান্তকে আমি ছবিতে তুলে ধরি না। ছবিটি তৈরি করার আগে রাজেশ তলোয়ার কিংবা নুপূর তলোয়ারের সঙ্গে আমি দেখাও করিনি। অবশ্য ছবিটি তৈরি করার পর তলোয়ার পরিবারের লোকজনকে দেখিয়েছি।

আপনি নিজে একজন মা কিন্তু ছবিতে মায়ের কোনও দৃষ্টিকোণ রাখেননি কেন?

যে-ভাবে ঘটনার তদন্ত এগিয়েছে, সেভাবেই তুলে ধরেছি। কারও পক্ষ নিয়ে কিংবা কারও দৃষ্টিকোণ থেকে ছবিটি তৈরি করিনি। আরুষি হত্যাকাণ্ডের পর প্রকাশিত হওয়া প্রায় চারহাজার খবর পড়ে, চ্যানেলের ফুটেজ দেখে এবং অনেক লোকের সঙ্গে কথা বলে তবেই ছবির চিত্রনাট্য লেখা হয়েছে।

বাস্তব ঘটনাবলী নিয়ে ছবি তৈরি করতে বেশি আগ্রহী দেখা যাচ্ছে আপনাকে। এর কোনও বিশেষ কারণ আছে কি ?

আমার প্রথম ছবি ‘ফিলহাল’ ছিল সারোগেট মাদার-এর উপর। তখন আমি বিয়েও করিনি। এরপর আমি ‘জাস্ট ম্যারেড’ তৈরি করি। অ্যারেড ম্যারেজ ছিল ছবিটির বিষয়। আসলে, ছবির জন্য আমি এমন বিষয় বেছে নিই, যা নিয়ে দর্শকরা ভাবতে বাধ্য হবেন। তবে শুধু বিষয়ের গভীরতা নয়, আমার ছবিতে ভালোলাগার কিংবা বলা যায়, মনোরঞ্জনের বিষয়ও থাকে।

আপনার সাম্প্রতিক ছবিরাজি‘- সাফল্যে কতটা খুশি আপনি?

ছবিটি দেখে সবার ভালো লেগেছে, এতে আমি অত্যন্ত খুশি ৷ তবে শুধু আমি নই, প্রযোজক বিনীত, করণ, ছবির নায়িকা আলিয়া, মুখ্য অভিনেতা ভিকি কুশল, রঞ্জিৎ কপূর, মিউজিক ডিরেক্টর শংকর-এহসান-লয় প্রত্যেকেই আমাকে ফোন করে আনন্দ-উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন। ছবিটি বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবেও প্রদর্শিত হতে পারে।

গুপ্তচর বৃত্তির বিষয় নিয়ে ছবি করার ইচ্ছে হল কেন?

হরিন্দর সিক্কা-র উপন্যাস ‘কলিং সেহমত’ পড়ার পরে আমার মনে হয়েছিল, এই উপন্যাসে গুপ্তচর বৃত্তির মতো সিরিয়াস বিষয় যেমন আছে, তেমনই সাধারণ মানুষের ভালোলাগার বিষয়ও আছে। বাবার শেষ ইচ্ছে পূরণ করতে তাঁর কথা মতো এক পাকিস্তানি আর্মি অফিসার-কে বিয়ে করেও সেহমত কীভাবে তার কর্মজীবনকে সফল করবে, তা দারুণ ভাবে তুলে ধরা হয়েছে এই কাহিনিতে। তাই উপন্যাসটি পড়ার পর ঝটপট ছবিটা বানিয়ে ফেললাম।

বাবা স্বনামধন্য গীতিকার, পরিচালক (গুলজার) আর মা জনপ্রিয় অভিনেত্রী (রাখী) কতটা প্রেরণা পেয়েছেন এঁদের থেকে?

মা-বাবার থেকে শুধু প্রেরণা পাওয়াই নয়, বাবার কাজের ধরন রপ্ত করব বলে, তাঁর সহকারি হিসাবে কাজ করেছি ‘ম্যাচিস’ এবং ‘হুতু তু’ ছবিতে।

পরিচালক হওয়ার আগে তো আপনি কবিতা, প্রবন্ধ লিখতেন। এখনও ওসব লেখালেখি চালু আছে কি ?

লেখালেখি আমার প্যাশন। এনএফডিসি-র “সিনেমা ইন ইন্ডিয়া’ বই-তেও লিখেছি। ‘পোয়েটি সোসাইটি অফ ইন্ডিয়া’-য় আমার কবিতাও ছাপা হয়েছে। নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির আন্ডার-এ ‘টিস্ক স্কুল অফ আর্ট’ থেকে যখন আমি ফিল্‌ম মেকিং-এর উপর শর্ট কোর্স করতাম, তখনও লেখালেখি জারি ছিল কিন্তু এখন সময়ের অভাবে কবিতা, প্রবন্ধ এসব কমে গেছে।

শর্ট ফিল্ পরিচালনার মাধ্যমে তো ফিলমি কেরিয়ার শুরু করেছিলেন। এখন ওয়েব সিরিজএর বাজার রমরমা। আপনি ওয়েব সিরিজ নিয়ে কিছু ভাবছেন?

‘দশ কাহানিয়া’-তে ‘পূরণমাসী’ করে প্রশংসা পেয়েছিলাম। এমন আরও কিছু ভালো প্লট মাথায় আছে, সুযোগ পেলে ওয়েব সিরিজ-কেই মাধ্যম করব।

ফিল্ মেকিংএর ক্ষেত্রে যে পরিবর্তন এসেছে, সেই বিষয়ে আপনার কী বক্তব্য?

ফিল্‌ম ইন্ডাস্ট্রি এখন টেকনিক্যালি অনেক অ্যাডভান্সড । এখন ভিন্ন ভিন্ন বিষয় নিয়ে বিভিন্ন বাজেটের ছবি তৈরি হচ্ছে। নতুন প্রতিভাবান ছেলে-মেয়েরা ফিল্ম করছেন। স্টার ছাড়া ছবি চলবে না এমন যুগ আর নেই এখন। দর্শকদের রুচি, স্বাদ এসব বদলেছে। সব মিলে ফিল্মি দুনিয়ার এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানাতেই হচ্ছে।

আপনার সাম্প্রতিক ছবি ‘সাম বাহাদুর’-এর সাফল্যের বিষয়ে কতটা আশাবাদী?

এক ফিল্ড মার্শাল অফিসারের কর্মজীবন নিয়ে এই ছবি। মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন ভিকি কৌশল। খুব ভালো কাজ হয়েছে। তাই, ছবিটির সাফল্যের বিষয়ে আমি ভীষণ আশাবাদী।

নতুন আর কী কী বিষয় নিয়ে ছবি করার ইচ্ছে আছে?

মেয়েদের বিষয় নিয়ে নতুন কিছু প্লট মাথায় আছে। সময়-সুযোগ মতো করব।

চায়ের সঙ্গে চটকদার নিমকি

পড়ন্ত বিকাল মানেই তো দিনের শেষ, সেই গোধুলি লগ্ন! যারা শহরের বাইরে একটু ফাঁকা জায়গায় বসবাস করেন, তাদের এই সময় তো সত্যিই বারান্দায় বসে প্রকৃতি দেখে সময় কেটে যায়৷ পাখিদের নীড়ে ফেরার দৃশ্য উপভোগ করতে করতে চায়ের কাপে চুমুক দেওয়ার মজা-ই আলাদা। আর চায়ের সাথে যদি হয় মুখরোচক নিমকি, তাহলে তো কথাই নেই! আমরা আজ এনেছি ভিনপ্রদেশের দু’ধরনের নিমকির রেসিপি৷ এগুলি বাড়িতে তৈরি করাও যাবে সহজেই৷

জোয়ারের নিমকি

উপকরণ: ৩/৪ কাপ জোয়ারের আটা, ১/৪ কাপ সুজি, ১/৪ কাপ দই, ২ ছোটো চামচ আদা-কাঁচালংকা পেস্ট, ২ ছোটো চামচ ধনেপাতাকুচি, ২ ছোটো চামচ গুঁড়োচিনি, ১ ছোটো চামচ হলুদগুঁড়ো, ১/২ কাপ বাঁধাকপি মিহি করে কাটা, ২ ছোটো চামচ রিফাইন্ড অয়েল, ১/২ ছোটো চামচ ইনো পাউডার, নুন স্বাদমতো।

প্রণালী: জোয়ারের আটা ও সুজির সঙ্গে দই এবং বাকি সব উপকরণ মিশিয়ে নিন। মিশ্রণ যেন বেশি শক্ত বা অতিরিক্ত নরম না হয়, এমন ভাবে মাখুন। এবার ৪-টে লম্বা রোল তৈরি করুন। স্টিমারে ঢুকিয়ে রোলগুলো ১৫ মিনিট স্টিম করুন। ঠান্ডা হলে রোল শক্ত হয়ে যাবে। তখন টুকরো করুন।

ননস্টিক কড়ায় তেল দিয়ে ফোড়নের সামগ্রী দিন। এর মধ্যে টুকরোগুলো দিয়ে নাড়াচাড়া করুন, যাতে এর গায়ে মশলা ভালো ভাবে মাখানো যায়। ৩-৪ মিনিট সঁতে করে চাটনির সঙ্গে পরিবেশন করুন।

 

গুজরাতি নিমকি

Gujrati Nimki recipe

উপকরণ: ১ কাপ বেসন, ১ কাপ বিউলির ডালের গুঁড়ো, ১ ছোটো চামচ বেকিং সোডা, ১ ছোটো চামচ রিফাইন্ড তেল, ১/২ কাপ গরম জল, অল্প রিফাইন্ড তেল ভাজার জন্য, অল্প চাটমশলা ছড়ানোর জন্য, অল্প কাশ্মীরি লংকার গুঁড়ো এবং স্বাদমতো নুন।

প্রণালী: : বেসন, ডালের গুঁড়ো এবং বেকিং সোডা ছেঁকে নিয়ে একসঙ্গে মিশিয়ে নিন। রিফাইন্ড তেল, নুন আর প্রয়োজনমতো জল মিশিয়ে, ভালো ভাবে মেখে নিন। ১/২ ঘন্টা ঢেকে রেখে দিন।

এবার ভালো ভাবে চটকে লেচি কেটে নিন। বেলে নিয়ে নিমকির আকারে কেটে নিন। কড়ায় তেল গরম করে, ঢিমে আঁচে নিমকি ভালো ভাবে ফ্রাই করুন। গুজরাতিরা এই নিমকিকে চেরাফলি বলে। নিমকি প্লেটে তুলে এর উপর কাশ্মীরি লংকার গুঁড়ো ছড়ান। চাটমশলাও ছড়িয়ে দিন। এয়ারটাইট কন্টেনারে ভরে রাখলে ১৫ দিন ভালো থাকবে। চায়ের সঙ্গে পরিবেশন করুন।

ডাঙার নৌকা (শেষ পর্ব)

—হ্যাঁ। তোর লজ্জা লাগে না দাদা। মা অসুস্থ, তা সত্ত্বেও তুই…

—বেশি বাহাদুরি তোর! এবার কোথায় যাবি? মেরে আজ হাড়গোড় ভেঙে দেব।

—আমি আবার থানায় যাব।

—কথাগুলো শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই অর্পিতার ডান গালে একটা থাপ্পড় এসে পড়ল। মাথাটা ঝনঝনিয়ে উঠল। কিছু বোঝার আগেই আরেকটা থাপ্পড়। পাশের ঘর থেকে মেজদি বেরিয়ে এসে বারান্দায় দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “দাদা!”

অর্পিতাও আচমকা দাদাকে লক্ষ্য করে সটান হাত চালিয়ে দিল। হাত পড়ল দাদার গালে। চমকে উঠল দাদা। ‘তবে রে’ বলেই অর্পিতাকে আবার মারতে গেল। অর্পিতা সরে গেলেও টাল সামলাতে না পেরে উলটে পড়ল রান্নাঘরের মেঝেতে। দাদাও নিজেকে সামলাতে না পেরে সটান গিয়ে পড়ল ছোটবোনের ওপর। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জামাইবাবুও এলোপাথাড়ি লাথি মারতে আরম্ভ করল। বড়দি আর বউদি চেপে ধরে রইল মেজদির মুখ, হাত।

ঘুমের ওষুধ খেয়ে বিছানাতে পড়ে থাকা মা টলমল পায়ে বাইরে বেরিয়ে এসে প্রথমেই পাথরের মতো দাঁড়িয়ে পড়ল। বুঝতে পারল না ঠিক কী করা যেতে পারে? রান্নাঘরের মেঝেতে তখন অর্পিতার শরীরের ওপর শুয়ে নিজের শক্তি প্রয়োগ করছে দাদা, দুটো পা ধরে আছে জামাইবাবু। অন্ধকার শুষে নিচ্ছিল সম্পর্ক, নিস্তব্ধতা শুষছিল গোঙানি।

মা জোরে বলে উঠল, ‘বাবু! একি করছিস তুই, ও যে তোর ছোটো বোন!”

ততক্ষণে দাদার ঘামের সঙ্গে মিশে গেছে ছোটবোনের চোখের জল। মায়ের গলা শুনেই দাদা হাঁপাতে হাঁপাতে উঠে দাঁড়িয়ে আস্তে আস্তে বাগানে নামল, পিছনে একে একে নেমে গেল জামাইবাবু, বউদি, বড়দি। কারওর মুখে কোনও কথা নেই। কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার গাড়ির আওয়াজটা শোনা গেল৷

মেজদি, বউদিদের হাত থেকে ছাড়া পেয়েই অর্পিতার কাছে গিয়ে জলের ঝাপটা দিল। তার জামাকাপড় অবিন্যস্ত। কিছুটা ঠিক করে, দরজার কপাট ধরে অসহায় ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা মাকে ধরে ধরে বিছানাতে বসিয়ে বাগানে বেরিয়ে জোরে জোরে চেল্লাতে আরম্ভ করল, ‘বাঁচাও… বাঁচাও!’

আরও অন্ধকার নেমে এলেও বাগানে লোকজনের ভিড় বাড়তে লাগল। কেউ কেউ বলল, ‘আমরা ভাবছিলাম এমনি ঝামেলা হচ্ছে। ছেলেটা তো এর আগেও কয়েকবার এসেছিল। কিন্তু শেষকালে যে নিজের বোনকে এমন করবে! ছিঃ ভাবতে পারা যাচ্ছে না।’

খোঁড়াদাও ভিড়ের মধ্যে এসে সোজা ঘরের ভিতর চলে এল। অর্পিতা তখনও রান্নাঘরের মেঝেতেই অর্ধ অচৈতন্য হয়ে শুয়েছিল। পাড়ার কয়েকজন বউদি কাকিমা ধরাধরি করে অর্পিতাকে ভিতরের ঘরে শুইয়ে দিয়ে এল। মেজবোনেরও ঠোঁট, গাল কেটে গেছে। একজন মহিলা ওষুধ লাগিয়ে দিল। পাড়ার একজন নেতা গোছের লোক অর্পিতার মায়ের কাছে এসে বলে, ‘কাকিমা মানে পুলিশে কি খবর দেব, নাকি মিটিয়ে…’

ওনাকে মাঝখানেই থামিয়ে অর্পিতার মা কাঁপা গলায় বলে ওঠে, ‘না, পুলিশ ডাকো। আমার নিজের ছেলে এই বাড়ি হাতানোর জন্যে আমার ছোটো মেয়ের সর্বনাশ করছিল। আমি চুপ থাকলে সবার ক্ষতি হয়ে যাবে।’

কথাগুলো শেষ করেই শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ দুটো মুছে নিল। বাকি চোখগুলো আর কেউ দেখতে পায়নি, পাবেও না।

সমাপ্ত

বিয়ের আগে হেয়ার রিমুভাল (শেষ পর্ব)

পরিষ্কার, কোমল ও মোলায়েম ত্বক পাওয়ার ইচ্ছে সব মেয়েরই থাকে। ত্বকের সৌন্দর্য ধরে রাখতে নানা প্রচেষ্টা তারা করতে ছাড়েন না। মুখের সৌন্দর্য নিয়ে প্রায় সব মেয়েরাই বেশি ভাবনা চিন্তা করেন।

ফেস রেজার

ফেসিয়াল Hair Removal-এর জন্য বিশেষ করে ফেস রেজার ব্যবহার করা হয়। এই এক্সফলিয়েটর মুখের রোম তুলতে কার্যকরী। মুখ, চিন, আপার লিপ্‌স, আইব্রোজ, ফোরহেড— সর্বত্র এটি হেয়ার রিমুভ করতে সক্ষম।

এটি ত্বকের মৃত কোশ এবং অতিরিক্ত অয়েল রিমুভ করে ক্লিন স্কিন টেক্সচার নিয়ে আসতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে পকেট ফ্রেন্ডলি হওয়ার কারণে সকলেই এটি অ্যাফোর্ড করতে পারে।

যা করণীয়

  • ব্যবহারের আগে অবশ্যই ফেস হাইড্রেট করুন
  • হেয়ারের গ্রোথ যে-দিকে সেই দিশায় রেজার চালান
  • প্রসেস সম্পূর্ণ হলে পরিষ্কার কাপড় দিয়ে মুখ ক্লিন করুন।

এড়িয়ে চলুন

  • একে অপরের রেজার ব্যবহার করবেন না।
  • ভালো রেজাল্ট পেতে হার্শ ভাবে এটি ব্যবহার করবেন না
  • গ্রোথ দেখে রেজার ব্যহার করুন
  • ত্বক সংবেদনশীল হলে মুখে রেজার ব্যবহার করবেন না।

লেজার Hair Removal

রোজ রোজ ওয়্যাক্সিং, শেভিং-এর ঝঞ্ছাট থেকে যারা রেহাই পেতে চান তাদের জন্য Hair Removal-এর সবথেকে ভালো বিকল্প হল লেজার হেয়ার রিমুভাল ট্রিটমেন্ট। অবাঞ্ছিত রোম-এর হাত থেকে নিষ্কৃতি পাবার এটি একটি কসমেটিক পদ্ধতি। এই প্রক্রিয়ায় লেজার লাইট ব্যবহার করে হেয়ার ফলিকলস নষ্ট করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

ট্রিটমেন্ট সামান্য দীর্ঘ হলেও এর এন্ড রেজাল্ট খুব ভালো। কয়েকটি সিটিং দেওয়ার পর অবাঞ্ছিত রোম থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যায়। সিটিং এবং লেজার ট্রিটমেন্ট নির্ভর করে আপনার রোম কতটা মোটা এবং শরীরের কতটা অংশের রোম আপনি তুলে ফেলতে চান।

উচিত কাজ

  • লেজার ট্রিটমেন্ট করাবার ২-৩ সপ্তাহ আগে থেকে ওয়্যাক্সিং, ব্লিচ এবং হেয়ার প্লাক করা আপনাকে সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিতে হবে
  • ক্ষতিকারক আল্ট্রা ভায়োলেট রশ্মি থেকে ত্বক বাঁচিয়ে চলতে হবে এবং বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন হলে সানস্ক্রিন লাগিয়ে যেতে হবে
  • ব্লিচ করা পুরোপুরি অ্যাভয়েড করতে হবে
  • ট্রিটমেন্ট নেওয়ার আগে মেক-আপ এবং ক্রিম পুরোপুরি ত্বক থেকে মুছে ফেলুন।

অনুচিত কাজ

  • ট্রিটমেন্টের পর ২-৩ দিন পর্যন্ত হার্শ সোপ এবং ক্রিম ব্যবহার করবেন না
  • অন্তত ১-২ দিন, বেশি গরমজলে স্নান করবেন না
  • ট্রিটমেন্ট হয়ে যাওয়ার ২-৩ সপ্তাহ পর্যন্ত ব্লিচ-এর ব্যবহার একেবারেই করবেন না।
  • সুগন্ধীযুক্ত কসমেটিকস এড়িয়ে চলুন কারণ এতে ত্বকে অ্যালার্জি হওয়ার সমস্যা বেশি থাকে
  • অ্যাফেক্টেড অংশে বরফ ঘষে ত্বক ঠান্ডা রাখুন
  • সিটিং যেন মিস না হয় ।

অ্যাডভান্সড শেভিং মেশিন

শরীরের অবাঞ্ছিত রোম রিমুভ করা খুব সংবেদনশীল একটি কাজ। কারণ সঠিক টেকনিক ফলো না করলে, দায়সারা ভাবে কাজ সারতে চাইলে, ত্বকের নানাভাবে ক্ষতি হতে পারে। যেমন কেটে বা জ্বলে পর্যন্ত যেতে পারে।

মহিলাদের এই ধরনের সমস্যামুক্ত করতে অ্যাডভ্যান্সড শেভিং মেশিন ফর উইমেন মার্কেটে লঞ্চ করা হয়েছে। এটি ইলেকট্রিক মেশিন যার সফ্ট ব্লেডস খুব সহজে রোমকে ট্র্যাপ করে ত্বক পরিষ্কার করে। সাধারণত এটি বিকিনি এরিয়া, আন্ডারআর্ম এবং আপার লিপস-এর জন্য ব্যবহার করা হয়।

মেশিন ব্যবহারের নিয়ম

  • যখনই শেভিং মেশিন কিনবেন, সবসময় অ্যাডভান্সড মেশিন বাছবেন রিসার্চ করে তবেই মেশিন কিনবেন
  • হাইজিন-এর কথা মাথায় রেখে ভালো করে মেশিন পরিষ্কার করবেন
  • মাঝে মাঝেই ব্লেড বদলাতে ভুলবেন না। ঠিকমতো চার্জ করবেন।

মাথায় রাখুন

  • প্রয়োজনের বেশি মেশিন ব্যবহার করবেন না
  • একই জায়গায় বারবার মেশিন চালাবেন না
  • আন্ডার রুট হেয়ার, মেশিন দিয়ে রিমুভ করবেন না, এতে রেজাল্ট মনের মতো হবে না।
পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব