সম্পর্কের বন্ধনে আপনি ও আপনার পোষ্যটি

কখনও খেয়াল করে দেখেছেন কি, আপনার পোষা বন্ধুটি কিন্তু কোনওরকম স্বার্থের তোয়াক্কা না করেই আপনাকে ভালোবাসে! এই স্বার্থপর পৃথিবীতে মানুষের থেকে আঘাত পেতে পেতে, অনেকেই আজকাল একা থাকেন শুধু তার পোষ্যটিকে নিয়ে৷ বিশেষজ্ঞরা বলছেন পোষ্যেরা তাদের মালিক বা পালক তথা তাদের হিউম্যান পেরেন্টসকে নিঃস্বার্থ ভাবেই ভালোবাসে।

আপনি বাড়িতে পেটস রাখলে দেখবেন, ঘুম থেকে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই আপনার পোষ্যের সঙ্গে আপনার রসায়ন শুরু হয়ে যায়। পোষ্যরা ধীরে ধীরে সন্তানের মতোই হয়ে ওঠে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পোষ্য তার মালিকের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটাতে পারে, তাদের বিভিন্ন আচার-আচরণ মালিকের সামগ্রিক শরীর-স্বাস্থ্যেরও উন্নতি ঘটায়।

আমাদের মধ্যে অনেকেই বাড়িতে কুকুর বিড়ালের মতো পোষ্য রাখতে ভালোবাসি। ছোটো থেকে মানুষের সাহচর্যে থাকার জন্য তারাও পরিবারের একজন সদস্য হয়ে ওঠে। বাড়ির লোকেরা তাকে আদর আহ্লাদে ভরিয়ে রাখে। পোষ্যরাও পরিবারের লোকেদের সঙ্গে সময় কাটাতে এবং তাদের দ্বারা প্যাম্পারড হতে ভালোবাসে।

পোষ্যর সঙ্গে কীভাবে নিবিড় হবে সম্পর্ক?

প্রতিদিন আপনার পোষ্যকে বাইরে কোথাও বেড়াতে নিয়ে যান৷ একটা নির্দিষ্ট সময়ে রোজ পার্কে ঘোরান কিংবা দৌড়াতে নিয়ে যান। এতে তাদের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক গভীর হবে। ইচ্ছে করলে বাইরে বেরোনোর সময় সঙ্গে কিছু খেলনা রাখতে পারেন। এতে তারা সেই সমস্ত খেলাতে নিজেদের ব্যস্ত রাখতে পারবে।ফিটনেস বাড়বে৷ প্রাণীটি চনমনে থাকবে৷

খেলনা তাদের নাগালের কাছেই রাখুন। এগুলো বিভিন্ন ধরনের হতে পারে যেমন ডিস্পেন্স ট্রিট ,চিউ টয় কিংবা কোন বল জাতীয় খেলনা। এছাড়াও বিড়ালদের জন্য অভিভাবকরা কার্ডবোর্ডের বাক্স বা কাগজের ব্যাগ রেখে যেতে পারেন। এগুলি ওদের কাছে খুবই প্রিয়। এর মধ্যে রাখা ফ্লাফি বল কিংবা নকল ইঁদুর তাদের খেলার আগ্রহ বাড়িয়ে তোলে।

বাড়িতে পোষ্যদের একটা ডিসিপ্লিনের অভ্যাস করান৷ একটা নির্দিষ্ট ঘর বা স্পেস রাখুন ওর জন্য, যেখানে সে স্বাধীনভাবে খেলাধুলা করতে পারে। অনেকেই কুকুর কিংবা বিড়ালের থাকার বা ঘুমানোর জন্য ছোটো ডেন বা শোয়ার জায়গা রাখেন। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় তারা এগুলোকে ভেঙে দেয় কিংবা নোংরা করে রাখে। সেটা পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব কিন্তু আপনাকেই নিতে হবে৷। তাই বাড়িতে যে-কোনও একটি ঘরে তাদের অ্যাক্সেস সীমাবদ্ধ করতে হবে যাতে আপনার ঘরদোর পরিচ্ছন্ন থাকে।

তাদের জন্য একটি পাত্রে জল এবং খাবার রেখে দিন যাতে তেষ্টা বা খিদে পেলে তারা সেগুলো হাতের নাগালে পায়।খেয়াল করে দেখুন আপনি নিজে হাতে না খাওয়ালে তারা প্রকৃতিগত তাগিদে খাবার খাচ্ছে কিনা৷ এইটুকু স্বাবলম্বী হওয়া কিন্তু আপনার পোষ্যটির প্রয়োজন৷

প্রশিক্ষণ জরুরি

ছোটো বয়স থেকেই আপনার পোষ্যদের সঠিক প্রশিক্ষণ দিয়ে বড়ো করে তুলুন। তাদের জন্য একটা রুটিন নির্দিষ্ট করে রাখুন যেটা তাদের সময় মেনে চলতে শেখাবে। তবে অবশ্যই তাদের জন্য কিছু সময় রাখবেন যেটা আপনাদের সম্পর্ককে আরও উন্নত এবং মজবুত বানাবে।

অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে বিশেষ কোনও কারণে পোষ্যদের বাড়িতে ছেড়ে যেতে হয়। এইরকম পরিস্থিতি সামনে এলে মালিক এবং কুকুর উভয়ের ক্ষেত্রেই তা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কেউই একে অপরকে একা ছেড়ে থাকতে পারে না। আপনার পোষ্যকে বাড়িতে একা থাকার প্রশিক্ষন দেওয়াও কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ।

এমন তীর্থযাত্রায় লাভ কার?

এক সাম্প্রতিক দুর্ঘটনায় কেদারনাথ দর্শন করতে যাওয়া সাত পূণ্যার্থীর মৃত্যু হয়েছে। হেলিকপ্টারে বসা ওই তীর্থযাত্রীরা আন্দাজও করতে পারেননি কুয়াশায় ঢেকে থাকা পাহাড়ে, তাদের কপ্টারটি ধাক্কা খাবে এবং আগুনে ভস্মীভূত হবেন তারা। যবে থেকে চারধাম যাত্রায় এই হেলিকপ্টার ভ্রমণের ব্যবস্থার সূত্রপাত হয়েছে, তবে থেকে প্রায় অটোর মতো সংখ্যাবৃদ্ধি হয়েছে এই কপ্টারগুলির। এগুলি প্রলুব্ধ করেছে সেইসব পূণ্যলোভী মানুষদের, যারা পূণ্যের জন্য ওই দুর্গম পথ পাড়ি দিতে রাজি কিন্তু পায়ে হেঁটে নয়।

হিমালয়ের এইসব দুর্গম স্থানে ধর্মস্থলগুলির প্রতিষ্ঠা হয়েছে এবং যুগ যুগ ধরে সেখানে পৌঁছোনোর জন্য কোনও যানবাহনের ব্যবস্থা ছিল না। পুরাণ কাহিনিতে বর্ণিত সেইসব পুণ্যস্থানের মাহাত্ম্যের বিবরণ পড়ে, সাধারণ মানুষ বিপদ অগ্রাহ্য করেও বছর বছর তীর্থযাত্রায় বেরিয়ে পড়েন। এইসব জায়গায় পৌঁছোনোর রাস্তা অতি কঠিন কিন্তু সেখানেই ব্যাবসা ফেঁদে বসেছেন পুরোহিত-পাণ্ডারা এবং সাধারণ মানুষের ধর্মীয় আবেগই তাদের রোজগারের পথ প্রশস্ত করেছে।

বর্তমানে সব সরকারই এই পুণ্যলোভীদের তাদের ভোট ব্যাংকে ঢোকানোর স্বার্থে ওই দুর্গম গিরিপথেও থাকার ব্যবস্থা, রুমহিটার থেকে আধুনিক সুযোগ সুবিধা যুক্ত নানা পরিষেবা দিতে শুরু করেছে। ফলে পুরোহিত-পাণ্ডারা এখন ওখানেই গুছিয়ে বসেছেন ও তাদের ব্যাবসাও ফুলেফেঁপে উঠছে। অল্প কিছুদিনের মধ্যে বৈষ্ঞদেবী দর্শনের জন্য সহজ মাধ্যম রোপওয়ে (গন্ডোলা) চালু হতে যাচ্ছে৷ হেলিকপ্টার এর মতোই এই যন্ত্রযানেও পিলপিল করে চড়বেন পূণ্যার্থীরা এটাই প্রত্যাশিত৷

কেদারে তীর্থযাত্রার শেষ অংশের পথ, যেখানে পাহাড় সবচেয়ে বেশি খাড়া, সেই জায়গায় যাতে মানুষের পৌঁছোতে অসুবিধা না হয় তাই হেলিকপ্টারের পরিষেবা। দামি টিকিট। এসব সত্ত্বেও বিপর্যয়ে প্রাণ গেল সাত যুবক ও প্রৌঢ়ের। কেন হেলিকপ্টার নিতে হল? অন্ধবিশ্বাস কি তবে এতটাই চেপে বসেছে যে, যে-কোনও প্রকারে তীর্থযাত্রা সম্পূর্ণ করতেই হবে? আর অর্থ থাকলেই পথকে সুগম করবে আধুনিক ব্যবস্থা৷

রাহুল গাঁধি তাঁর ভারতযাত্রায় প্রমাণ করেছেন, পায়ে হেঁটে নিজের লক্ষ্যে পৌঁছোনো সবচেয়ে ভালো উপায়। বহু যুবক আজ ট্রেকিংকে তাদের প্যাশন করেছেন। তাহলে হেলিকপ্টার কেন? অর্থনৈতিক ভাবে স্বচ্ছল বলেই কি মানুষ বেশি সুবিধা ভোগ করতে চান? ভাবার সময় এসেছে। অ্যাডভেঞ্চার নাকি এক্সাইটমেন্ট? পুণ্যার্জনের জন্য কষ্ট করবেন নাকি টাকা দিয়ে হাসিল করবেন? অর্থের জোর থাকলেই সেটা কখন কোথায় ব্যবহার করবেন, ভেবে দেখুন।

বিয়ের আগে হেয়ার রিমুভাল (পর্ব – ১)

পরিষ্কার, কোমল ও মোলায়েম ত্বক পাওয়ার ইচ্ছে সব মেয়েরই থাকে। ত্বকের সৌন্দর্য ধরে রাখতে নানা প্রচেষ্টা তারা করতে ছাড়েন না। বিয়ের আগে তনিমাও এটাই চেয়েছিল। কিন্তু এই সম্পর্কে বিস্তারিত না জেনেই ও ফেসিয়াল হেয়ার রিমুভ করার জন্য, বিকল্প হিসেবে হেয়ার রিমুভাল ক্রিম বেছে নিয়েছিল। কিন্তু যেহেতু এই সম্পর্কে ওর কোনও জ্ঞান ছিল না, তাই তনিমা হেয়ার রিমুভালের জন্য সঠিক টেকনিক এবং উপায় কোনওটাই বাছতে পারেনি। এর ফলে, ওর ত্বকের সৌন্দর্য বাড়ার বদলে ত্বক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে।

শুধু তনিমাই কেন, বহু মেয়েই এই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হন। সুতরাং আজ কিছু টেকনিক এবং সেই বিষয়ে অবগত করানোর প্রচেষ্টা করব যাতে সেই টেকনিকটির সম্পূর্ণ সুবিধা আপনি গ্রহণ করতে পারেন। বিয়ের আগে আপনার ত্বকও যাতে সুন্দর হয়ে ওঠে।

Hair Removal ক্রিম

হাত-পায়ের অবাঞ্ছিত রোম রিমুভ করতে হেয়ার রিমুভাল ক্রিম ব্যবহারের অপশন আপনি বেছে নিতে পারেন। এটি ব্যবহারের সুবিধা হল ব্যথাহীন এই টেকনিকটি আপনি বাড়ি বসেই করতে পারবেন। তাছাড়া গোড়া থেকে রোম তুলে ফেলতে পারবেন এবং কোমল, মোলায়েম এবং পরিষ্কার ত্বক পাবেন খুব অল্প সময়ের মধ্যে।

কিন্তু এর জন্য সঠিক ক্রিম বেছে নেওয়া খুব দরকার। ত্বকের ধরন বুঝে তবেই ক্রিম বাছা উচিত। প্রোডাক্ট-টিতে কী কী উপাদন ব্যবহার করা হয়েছে, প্রোডাক্টটি সম্পর্কে ক্রেতাদের কী রিভিউ ইত্যাদিও খেয়াল করা অত্যন্ত জরুরি। যা করা উচিত –

  • ত্বক এবং রোম-এর ধরন পরখ করুন
  • ক্রিম ব্যবহারের আগে অবশ্যই প্যাচ টেস্ট করুন
  • ক্রিমের প্যাকের উপর দেওয়া শর্তাবলি মন দিয়ে পড়ুন
  • এক্সপায়ারি ডেট চেক করুন
  • সবসময় ভালো দোকান বা অনলাইন স্টোর থেকে নামি কোম্পানির প্রোডাক্ট কিনুন
  • ব্যবহারের আগে ত্বক অবশ্যই পরিষ্কার করুন।

যা করবেন না।

  • খুব হালকা ভাবে ত্বকে ক্রিম অ্যাপ্লাই করুন। খুব জোরে জোরে রগড়াবেন না
  • প্রয়োজনের বেশি সময় ধরে ত্বকে ক্রিম লাগিয়ে রাখবেন না।
  • Hair Removal ক্রিম লাগাবার সঙ্গে সঙ্গে ত্বকে জ্বালাভাব অনুভূত হলে বা লালচে ভাব দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে ত্বক ধুয়ে ফেলুন
  • এক্সপায়ারি হয়ে যাওয়া ক্রিম কখনওই ব্যবহার করবেন না।
  • বারবার একই জায়গায় ক্রিম অ্যাপ্লাই করবেন না।
  • অল্প সময়ের ব্যবধানে ক্রিম ব্যবহার করবেন না। অন্তত ২০-২৫ দিন ছেড়ে তবেই ব্যবহার করুন।

ওয়্যাক্সিং

হেয়ার রিমুভালের ক্ষেত্রে ওয়্যাক্সিং খুব ভালো এবং এফেক্টিভ বিকল্প। এটি ত্বকের গোড়া থেকে যেমন রোম তুলতে সাহায্য করে, তেমনি ত্বককে এক্সফলিয়েট করতেও সাহায্য করে। এই পদ্ধতিতে শুধু হাত-পায়ের রোমই নয়, চিন, ফোরহেড, আপার লিপ্স, বিকিনি এরিয়া এবং শরীরের অন্যান্য অংশের অবাঞ্ছিত রোমও রিমুভ করা সম্ভব। তবে বেছে নেওয়া প্রয়োজন সঠিক ওয়্যাক্স।

সফ্ট ওয়্যাক্স: হাতে পায়ের রোম রিমুভ করতে সাধারণত সফট ওয়্যাক্স ব্যবহার করা হয়। ত্বকের উপর ওয়্যাক্স-এর পাতলা পরত চারিয়ে দিয়ে হেয়ার রিমুভ করা হয়। আন্ডার আর্ম এর জন্যও এই ওয়্যাক্স ব্যবহার হয়।

হার্ড ওয়্যাক্স: সংবেদনশীল ত্বকের জন্য এই ওয়্যাক্স ব্যবহার হয়। চিন, আপার লিপ্‌স, বিকিনি এরিয়া, ফেসিয়াল Hair Remove করতে এই ওয়্যাক্স ব্যবহার হয়। এই ওয়্যাক্স ত্বকের পোরস এর মুখ প্রশস্ত করে। সুতরাং এটি অ্যাপ্লাই করার সঙ্গে সঙ্গে গোড়া থেকে রোম উঠে আসে। এতে ব্যথাও অনেক কম অনুভূত হয়।

ফ্রুট ওয়্যাক্স: এটাতে আছে ফলের গুণাগুণ। এটি ভিটামিন এবং অ্যান্টি অক্সিড্যান্টস রিচ, ফলত ত্বককে নারিশ করার সঙ্গে সঙ্গে ত্বকের বিশেষ যত্ন নিতেও সক্ষম।

চকোলেট ওয়্যাক্স: এই ওয়্যাক্সের চাহিদা সবথেকে বেশি। গ্লিসারিন এবং অয়েল ও নিউট্রিয়েন্ট ই-যুক্ত এই ওয়্যাক্সে রয়েছে অ্যান্টি ইনফ্লেমেটারি প্রপার্টিজ। সংবেদনশীল ত্বকে ব্যবহারের জন্য এই ওয়্যাক্স বিশেষ ভাবে তৈরি করা হয়েছে।

জরুরি পরামর্শ

  • ওয়্যাক্সিং করার আগে ত্বকের উপর জমে থাকা নোংরা স্ক্রাব দিয়ে এক্সফলিয়েট করুন
  • ওয়্যাক্সিং-এর আগে ত্বকে হালকা করে পাউডার লাগিয়ে নিন। এতে ত্বকে থাকা এক্সট্রা অয়েল অ্যাবজর্ব হয়ে যাবে, যার ফলে রোম রিমুভ করা সহজ হবে
  • খুব টাইট করে ত্বক ধরে থাকতে হবে। এতে ত্বকে কেটে যাওয়ার ভয় থাকবে না
  • সবসময় ওয়্যাক্স করার সময় রোম-এর গ্রোথ-এর ঠিক উলটো ডিরেকশনে রোম টানা বাঞ্ছনীয়
  • ত্বকের ধরন বুঝে ওয়্যাক্স বাছুন
  • ওয়্যাক্সিং হয়ে গেলে ওয়াইপস-এর সাহায্যে ত্বক পরিষ্কার করে জল দিয়ে ভালো করে ধুয়ে অবশ্যই ময়েশ্চারাইজার লাগান
  • মুখে ওয়্যাক্স করতে হলে অল্প অল্প অংশ নিয়ে ওয়্যাক্স করুন
  • প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে তৈরি এবং ত্বকে কুলিং এফেক্ট দেবে— এরকমই ওয়্যাক্স-ই ব্যবহার করুন।

অবশ্যই খেয়াল রাখুন

  • ত্বকে কোনওরকম আঘাত বা আঁচড় লেগে থাকলে ভুলেও ওয়াক্সিং করবেন না
  • একই জায়গায় বারবার ওয়্যাক্সিং করবেন না
  • ওয়্যাক্সিং করার পরেই সূর্যের ক্ষতিকারক ইউভি রশ্মির সংস্পর্শে ত্বক যেন না আসে
  • ওয়্যাক্সিং-এর ৬-৭ ঘন্টার মধ্যে ত্বকে সাবান ব্যবহার করবেন না
  • ওয়্যাক্স স্ট্রিপ খুব জোর দিয়ে টানবেন না

 

 

ডাঙার নৌকা (পর্ব-০৪)

প্রথম দিকে মা ‘ঠিক আছে, ভাবছি।’ এইসব বলে কাটালেও শেষদিকে একদিন দাদার মুখের ওপর বলে দিল, ‘এটা তো আমার শ্বশুরের ভিটে, শ্বশুর একবার নিজের ঘরবাড়ি ছেড়ে এখানে বাড়ি বানিয়েছিলেন, আমি তো এই বাড়িতেই প্রথম এসে উঠেছি। আমি যতদিন বেঁচে আছি ততদিন এই জায়গা থেকে আর কোথাও যাব না, এই বাড়িও বিক্রি করব না।

দাদা, বড়দি, বউদি— সবাই মিলে বুঝিয়ে যখন কাজ হল না তখনই জোর করতে আরম্ভ করল। ভয়ও দেখাল। ‘মেরে দেবে, জোর করে তুলে দেবে।” তারপরেই এই। ঘর তছনছ, সব কিছু উলটপালট। সব কিছু দেখে অর্পিতা মেজদির ওপর খুব রেগে উঠল, “কিছু বলতে পারলি না। এসে এমন করে চলে গেল আর তোরা!”

মেজদি ফুঁপিয়ে কেঁদে উত্তর দিল, ‘কী বলব? মাকে পর্যন্ত ধরে শুইয়ে দিল।’

—চেল্লাতে পারলি না?

—জামাইবাবু মুখ চেপে ধরে রেখেছিল। আমার ঘাড়ে লেগেছে।

পিঠ ঘুরিয়ে অর্পিতাকে ঘাড়ের নীচে কালো দাগটা দেখাল। কাছে গিয়ে অর্পিতা হাত বুলিয়ে দাগটাকে দেখল। হাত দিতেই মেজদি, ‘লাগছে” বলে চিল্লিয়ে উঠল। দরজার কাছে এসে অর্পিতা কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল, তারপর বলে উঠল, ‘মা শুয়ে থাক, তুই আমার সঙ্গে চল।’

—কোথায়?

—প্রথমে পার্টি অফিস যাব, তারপরে একবার থানায় গিয়েও সব বলে আসি। এবার ব্যাপারটা অন্যদিকে চলে যাচ্ছে।

বলবার পরেও অবশ্য মেজদির কোনওরকম গা না করে একই ভাবে বসে থাকা দেখে অর্পিতা একটু জোরেই বলে উঠল, “কিরে, কী হল, চল আমার সঙ্গে।’ মা বিছানার ওপরেই বসে আস্তে আস্তে বলল, ‘আর এইরকম করিস না, আমায় একটু বাঁচতে দে। ভালো লাগছে না আমার, শরীরও খারাপ লাগছে।’

—যেতে হবে না তোমাদের কাউকে। আমি দাদা, জামাইবাবু, দুজনকেই ফোন করছি। তারপরে দেখছি, আজ ওদের একদিন কি আমার একদিন।

কথাগুলো শেষ করেই বড়দি, জামাইবাবু, দাদা, বউদি— সবাইকে ফোনে খুব অপমান করে শেষে থানা, পার্টি অফিস যাওয়ার কথাও বলে দিল। ফোনটা রেখে একাই প্রথমে পার্টি অফিসে গিয়ে সবকিছু জানিয়ে থানাতে গেল। বাড়ি ফেরবার সময় খোঁড়াদার দোকান থেকে আরেকটা ডিম কিনে কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে দাদা জামাইবাবুর সবকথা বলে শেষে বলল, ‘কখনও আমাদের বাড়িতে চ্যাঁচামেচির আওয়াজ পেলে পাড়ার কয়েকজনকে নিয়ে আমাদের বাড়িতে একটু যেও। না হলে দাদা আর জামাইবাবু আমাদের তিনজনকেই মেরে দিয়ে চলে যাবে।”

অন্ধকার দমকা হাওয়ার মতো চারদিকটা কেমন যেন লন্ডভন্ড করে দিয়েছে। সবাই এই অন্ধকারকেই ভয় পায়, অসহায় বোধ করে। অন্ধকারও তার শরীরের ভেতর চেপে বসে গিলে খেতে চায় সব সুখ, ভালোবাসা, মমতা, স্নেহ। রাতের খাবার বাড়তে বসে মাথার ভেতর এসব কথাগুলোই নড়াচড়া করছিল।

মা বিছানাতে, না খেয়ে শুয়ে পড়েছে। মেজদিও ‘খাব না, খাব না করলেও অর্পিতার ধমকানিতে খেতে রাজি হয়েছে। রান্না অর্পিতাই করেছে, তবে আজ রুটি করেনি। দু’জনের জন্যেই ভাত করে নিয়েছে, সঙ্গে সেদ্ধ ডিম, গোটা গোটা। শরীরটা ভালো লাগছে না। অন্যদিন সবাই শুয়ে পড়লে নিজে একটু বইপত্র নিয়ে নাড়াচাড়া করে। সরকারি চাকরি পাবার পরীক্ষা দেবার ইচ্ছে রয়েছে।

দু’জনের ভাত বেড়ে সিদ্ধ ডিমের খোসা ছাড়াচ্ছিল, এমন সময় বাইরে একটা গাড়ি দাঁড়ানোর আওয়াজ হল। এত রাতে এ গলিতে গাড়ি ! কারওর শরীর খারাপ হল নাকি? মাথা তুলে রান্নাঘরের জানলা দিয়ে চোখ তুলতেই দেখল গাড়িটা বাইরের গেটের কাছেই দাঁড়িয়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাগানের কাঠের দরজাটা খোলার আওয়াজ এল। কয়েকটা ছায়ামূর্তি বাগানে ঢুকল। রান্নাঘর থেকে বারান্দার আলো জ্বালতে জ্বালতেই দাদার গলার আওয়াজ কানে ঢুকল, “কিরে তুই নাকি আমাদের নামে থানাতে কমপ্লেন করেছিস? পার্টি অফিস গেছিলিস?’

ক্রমশ…

কাজের ফাঁকে এনার্জি বাইটস

দুঃসহ গরমে সকলেরই প্রাণ আইঢাই৷ এনার্জি প্রায় তলানিতে এসে ঠেকেছে৷ কিন্তু তাতেই কি নিস্তার আছে! অফিস, দফতর থেকে রান্নাঘর– গৃহিণীদের এরই মধ্যে সবই সামলাতে হচ্ছে৷এই পরিস্থিতিতে হারানো এনার্জি ফিরে পেতে হলে বা নিজেকে পুনরায় রিচার্জ করতে হলে, গৃহিণীরা এই দুটি জিনিস কৌটো করে রেখে দিতে পারেন৷ কাজের ফাঁকে খেলে এনার্জি ফিরে পাবেন৷তৈরি করাও খুব সহজ৷ আর উপকরণগুলি সকলের বাড়িতেই মজুদ থাকে৷

ড্রাইফ্রুট চিক্কি

উপকরণ : ১০০ গ্রাম কাজু, বাদাম, পেস্তা একসঙ্গে করে বড়ো বড়ো টুকরোয় কেটে নেওয়া, ৫০ গ্রাম গুড়, ২ ছোটো চামচ দেশি ঘি।

প্রণালী: সমস্ত বাদামজাতীয় উপকরণ ঘিয়ে ভেজে নিন। এবার একটা প্যানে গুড়টা গলতে দিন। প্যান নামিয়ে এই গুড়ের মধ্যে বাদামের মিশ্রণ পাক দিন। ঠান্ডা হলে মনের মতো আকারে কেটে, পরিবেশন করুন। এটা খুবই হেলদি খাবার এবং যে-কোনও সময় মুখ চালানোর জন্য উপাদেয়।

খেজুর এনার্জি বার

Khejur Energy Bar recipe

উপকরণ: ৫০ গ্রাম কাজু, ৫০ গ্রাম বাদাম, ২৫ গ্রাম পেস্তা, ৫০ গ্রাম আখরোট, ২৫ গ্রাম নারকেল পাউডার, ২৫ গ্রাম তরমুজের বীজ, ২৫ গ্রাম কুমড়োর বীজ, ১/২ ছোটো চামচ এলাচগুঁড়ো, ২৫০ গ্রাম বীজ ছাড়ানো খেজুর, ২ ছোটো চামচ দেশি ঘি।

প্রণালী: কাজু, বাদাম, আখরোট ও পেস্তা ছোটো করে কেটে নিন। তরমুজ ও কুমড়োর বীজ শুকনো খোলায় ভেজে নিন। ১ চামচ দেশি ঘি দিয়ে অন্য বাদামগুলোর সঙ্গে সঁতে করে নিন। খেজুরগুলো ১ কাপ জলের মধ্যে ফুটিয়ে, নরম করে নিন। ঠান্ডা করে মিক্সিতে পিষে নিন। একটা ননস্টিক প্যানে, বাকি ঘি গরম করে এতে খেজুরের পেস্ট দিয়ে ভালো ভাবে নাড়াচাড়া করুন। সমস্ত বাদাম ও বীজ এতে দিয়ে দিন ও শুকনো হতে দিন। এবার নারকেল পাউডার দিয়ে আরও কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করুন।

একটা প্লেটে ঘি বুলিয়ে এর উপর ওই মিশ্রণটা চারিয়ে দিন। ঘন্টা চারেক পর মনের মতো আকারে কেটে পরিবেশন করুন।

‘রিভলভার রহস্য’-র হাত ধরে বড়ো পর্দায় নতুন গোয়েন্দা

বাংলার ছবিতে যখন গোয়েন্দার অভাব নেই, ঠিক সেই সময় একজন নতুন গোয়েন্দাকে বড়োপর্দায় হাজির করলেন অঞ্জন দত্ত। প্রায় তিন বছর পর প্রেক্ষাগৃহে এল তাঁর নতুন সিনেমা ‘রিভলভার রহস্য’ । গল্পের সূত্র তাঁর নিজের লেখা বই, যা কিনা এবারের বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে৷ নতুন এই গোয়েন্দা ফ্র‌্যাঞ্চাইজি পরিচালক অঞ্জন দত্তের কাছে এক বড়ো চ‌্যালেঞ্জ। এর আগে ওয়েব সিরিজ়ে পা রেখেছে সুব্রত। এই প্রথম অঞ্জন তাকে নিয়ে এলেন বড়ো পর্দায়। তাই ‘রিভলভার রহস্য’ নিয়ে কৌতূহলীদের আগ্রহ থাকটা স্বাভাবিক।

বৃষ্টিভেজা দার্জিলিং শহর বারবার জায়গা করে নিয়েছে অঞ্জনর ছবিতে।এবারো তার ব্যতিক্রম হবে না৷ গল্পের ষুরুতেই জানা যায়, এক নিখোঁজ মহিলাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে সুব্রত। একের পর পর এক রহস্যের জাল সরতে থাকে। গোয়েন্দা সুব্রত শর্মা। কাকে বিশ্বাস করবে সে?

শুরুতে একটা চমৎকার চেজ সিকোয়েন্স রয়েছে। দার্জিলিংয়ের খাড়াই গলিঘুঁজি, সর্পিল পথ পেরিয়ে অপরাধীকে ধাওয়া করছে সে। মার খাচ্ছে, পালটা দিচ্ছে, আবার হারছে। দুরন্ত সম্পাদনার গুণে দৃশ‌্যটা আবার ফিরে আসছে ছবিতে। তখন বোঝা যায় দার্জিলিং কেন পরিচালকের অনিবার্য অন্বেষণ।

ভূত আর রক্তমানুষের সত‌্যসন্ধানীর যুগলবন্দি খুবই ইন্টারেস্টিং! সুব্রত এক সময় ছিল ক্রাইম রিপোর্টার, চাকরি হারিয়ে হয়েছে টিকটিকি। ‘ড‌্যানি ডিটেকটিভ আইএনসি’ চালাত সে-ই। ওয়েব সিরিজ় ‘ড্যানি ডিটেকটিভ আইএনসি’ যাঁরা দেখেছেন, তাঁরা ড্যানি বা সুব্রত সম্পর্কে অল্প বিস্তর জানেন। যাঁরা দেখেননি, তাঁদেরকে সূত্রটা একটু ধরিয়ে দেওয়া উচিত। ‘বস’ অর্থাৎ ড্যানির গোয়েন্দা সংস্থাতেই সুব্রত চাকরি করে। কিন্তু তদন্ত করতে গিয়ে ড্যানি খুন হয়েছে। ফলে এক দিকে রুগ্ন এজেন্সি। অন্য দিকে, ড্যানির স্ত্রীর অফিস বিক্রির শাসানি, সবটাই সুব্রতকে একা হাতে সামলাতে হয়। রয়েছে তার বোন রত্না (তানিকা) আর মৃত বসের স্ত্রী মালা (সুদীপা)। এমন সময় তার কাছে একটা কেস আসে, ব‌্যবসায়ী রাজা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (সুজন নীল) নিখোঁজ স্ত্রী তমালিকে (তনুশ্রী) খুঁজে বের করার জন‌্য।

‘ড‌্যানি ডিটেকটিভ আইএনসি’-র গোয়েন্দা সুব্রত শর্মাকে নিয়ে তিনি এর আগে সিরিজ করেছিলেন তবে এবারে সম্পূর্ণ নতুন গল্প নিয়ে তাঁর সিনেমা। লেখার ধরন ‘পাল্প ফিকশন থ্রিলার’ গোছের। এই গোয়েন্দা সর্বার্থেই ছকভাঙা। ডিটেকটিভ বলতে আমরা যেমন বুঝি প্রখর ধীশক্তি সম্পন্ন। প্রবল তার পর্যবেক্ষণ শক্তি, মাছিও গলতে পারবে না তার নজর এড়িয়ে। তার এক সহকারী থাকবে, যে বুদ্ধিতে খাটো হবে এবং প্রধান গোয়েন্দা তাকে দাবড়ে রাখবে।

না, অঞ্জনের সুব্রত (সুপ্রভাত দাস) তেমন নয়। ছ’ফুট লম্বা নয়, সে কোনওদিন ডিটেকটিভ হতেও চায়নি। উত্তর কলকাতার রকে বসা, পাড়ায় চায়ের দোকানে ম‌্যাজিক দেখানো, গলি ক্রিকেটে হাত পাকানো, অল্প-স্বল্প ঢপ মারা সাধারণ মানুষের মতোই সে। আর সুব্রত তার সহকারীকে দাবড়ে রাখবে কী, উল্টে তার সহযোগী ড‌্যানি ব‌্যানার্জি-ই (অঞ্জন) ধমকায় তাকে। যদিও সেই ড‌্যানি মারা গিয়েছে একটা কেস সলভ করতে গিয়ে। কিন্তু ছেড়ে যেতে পারেনি সুব্রতকে। এখনও তাকে গাইড করে বস ড‌্যানি। সর্বক্ষণ তার ঘাড়ে চেপে থাকে! শুধু ঘাড়টা মটকায় না! সে নির্দেশ দেয় নেপথ্যে থেকে আর ‌বিপদের ঝুঁকি নেয় সুব্রত।

আনাড়ি হলেও তার অল্টার ইগোর মতো ড‌্যানিকে সঙ্গে নিয়ে সুব্রত নেমে পড়ে রহস‌্য সমাধানে। রহস‌্য ঘনায় দার্জিলিংয়ের স্যাঁতসেঁতে কুয়াশায়।রাজা ব্যানার্জি (সুজন নীল মুখোপাধ্যায়) নামক কলকাতার এক ব্যবসায়ীর স্ত্রী মালতী নিখোঁজ। পরকীয়া সম্পর্কের জেরে স্বামীকে ছেড়ে চলে গিয়েছে স্ত্রী। পুলিসে খবর দিলে লোকলজ্জার আশঙ্কা। তাই ডিটেকটিভ এজেন্সির শরণাপন্ন হয় রাজা। কিন্তু, ড্যানি তো নেই। অগত্যা, কিছুটা মিথ্যের আশ্রয়েই কেসটা হাতে পায় সুব্রত।

এ ছবির দার্জিলিং অঞ্জনের আগের ছবিগুলোর থেকে একদম আলাদা। ক‌্যামেরার দায়িত্ব সুন্দরভাবে সামলেছেন প্রভাতেন্দু মণ্ডল। নীল দত্তর সুরে অঞ্জনের কণ্ঠে ‘পুরনো চাঁদ আমার এখনও আকাশে’ ছবির শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি৷  অ‌্যাকশন, মজা, বুদ্ধিদীপ্ত সংলাপ সব মিলিয়ে ছবি জমে যায়। রিভলভার আর বুলেট গল্পের মজ্জায় মিশে। । ক্লাইম‌্যাক্সে টুইস্ট আছে, চক্রান্ত আছে। তবে ছবির শেষটা অবিশ্বাস‌্য লাগে। কিন্তু সিনেমায় তো এমন হয়ই!

ব্যবসায়ীর চরিত্রে সুজন নীল মুখোপাধ্যায়ের পরিণত অভিনয় ভালো লাগে। তনুশ্রী চক্রবর্তী এবং শোয়েব কবীরও মন্দ নন। অভিজিৎ গুহ, কাঞ্চন মল্লিক, সুদীপা বসু এবং তনিকা বসুর চরিত্রগুলোক ক্যামিয়ো বলা চলে। থ্রিলারকে মাথায় রেখে প্রভাতেন্দু মণ্ডলের ক্যামেরা বেশ কিছু ভালো দৃশ্য উপহার দিয়েছে। অর্ঘ্যকমল মিত্রর সম্পাদনা যথাযথ।

এই ছবিকে ঠিক ‘হু ডান ইট’ ছকে বাঁধতে চাননি পরিচালক। ফলে ছবি জুড়ে কৌতূহল যে একমাত্রায় রয়েছে, তা নয়। তবে প্রচুর চমক রয়েছে। আবার সেই চমক যে সব ক্ষেত্রে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছে তা নয়।

সুব্রত যে ফেলুদা বা সোনাদার মতো শুধুমাত্র ছোটোদের জন্য তৈরি নয়, সে কথা অঞ্জন আগেভাগেই জানিয়েছিলেন। বাঙালি গোয়েন্দাদের ভিড়ে নতুন সংযোজন। ফলে আগামী দিনে সুব্রত আলাদা করে তার নিজের দর্শকবৃত্ত তৈরি করে নেবে, আশা করাই যায়।

মোহময়ী দিল্লি (শেষ পর্ব)

দিল্লিতেও বারো মাসে তেরো পার্বণ দেখা যায়। এখানে বিভিন্ন রাজ্যের অধিবাসী থাকাতে এখানে বিভিন্ন ধরনের পুজোপার্বণ অনুষ্ঠিত হয় এবং সেখানে বিভিন্ন জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে যোগদান সত্যিই উল্লেখযোগ্য। ‘বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান’— এই বাক্যটির যথার্থরূপ আপনি এখানে সবর্ত্র দেখতে পাবেন।

Delhi বিভিন্ন কারণেই অন্যান্য প্রদেশের থেকে একটু পৃথক। এখানে দেখবেন অত্যাধুনিক শিল্পকলার যত্রতত্র ব্যবহার। পাবেন লাল রঙের এয়ার কন্ডিশন বাসে ভ্রমণের আনন্দ। দিল্লির বাজারদরও অন্যান্য শহরের তুলনায় অনেক বেশি। অন্যান্য রাজধানী শহরের চেয়ে দিল্লিতে গাছপালার আধিক্য উল্লেখনীয়। মানসিকতার দিক দিয়ে বলা চলে, সকলেই যেন সমাজে প্রতিপত্তি স্থাপন করতে বা বর্হিআবরণ দেখাতে ব্যস্ত।

Delhi-র পুরাতন স্মৃতি সৌধগুলোর কাছে গেলেই যেন চোখের সামনে সেই পুরোনো দিনের ইতিহাস ভেসে ওঠে। মনে হয় লালকেল্লায় যেন শোনা যায় নতর্কীদের ঘুঙুরের আওয়াজ। শোনা যায় স্রোতস্বীনী যমুনার জলের কলকলধ্বনি। সে এক অবর্ণনীয় অভিজ্ঞতা। যা শুধু অনুভব করা যায় কিন্তু প্রকাশ করা যায় না। পুরাতন সেসব দিনের স্মৃতিতে ফিরে যেতে গেলে আপনাকে লালকেল্লা বা পাণ্ডব কেল্লার (পাণ্ডব কেল্লাকে অনেকে পুরোনো কেল্লা বলেও অভিহিত করেন) ‘লাইট অ্যান্ড সাউন্ড’ শো অবশ্যই দেখতে হবে।

আজকাল ‘অক্ষরধাম’ মন্দির এবং ‘লোটাস টেম্পল’ও ভ্রমণার্থীদের খুব আকর্ষণ করে। দিল্লিতে কনউটপ্লেসের কাছে হনুমান মন্দিরও খুব পরিচিত একটি নাম। দিল্লির বহু জায়গাতেই দেখতে পাবেন আগেকার দিনের রাজ-রাজাদের কবরস্থান বা প্রাচীরের ধ্বংসাবশেষ ও ছোটো ছোটো পাহাড়ের অংশবিশেষ। বর্তমানে পাহাড় কেটে সমতল করে গড়ে উঠেছে মনুষ্যবসতি। এখন আর দিল্লি আগেকার মতো খোলামেলা নেই। সর্বত্রই মানুষের ভিড়।

ইন্দ্রপ্রস্থের পাণ্ডবদের কেল্লার প্রাচীর ও ধ্বংসাবশেষ আজও ভ্রমণার্থীদের আকর্ষিত করে। পুরাণের ইন্দ্রপ্রস্থের পর পাঠানরা দিল্লি তৈরি করে। শহরের কেন্দ্র ছিল পুরোনো কেল্লা ও মেহেরলীর কুতবমিনার অঞ্চল। কিন্তু দিল্লির বিকাশ হয় সম্রাট শাহাজাহানের সৌন্দর্য প্রকাশের কল্পনাশক্তি ও মহৎ প্রচেষ্টায়। তাজমহল ও শাহাজাহানাবাদ তাঁর অপূর্ব সৃষ্টি। এখানকার পুরোনো দিল্লি শাহাজাহানাবাদের অবশিষ্ট আকার। সম্রাট শাহাজাহান ১৬৩৯ খ্রিস্টাব্দে স্থির করলেন যে, যমুনার পাশে এই নতুন শহরটি তৈরি হবে। তাঁর পরিকল্পনা, এই নতুন শহরের প্রধান আকর্ষণ হবে লালকেল্লা ও চাঁদনি চক।

লালকেল্লার সামনে থাকবে জুম্বা মসজিদ। দশ বছর ধরে এই শহর নির্মাণের কাজ চলেছিল। হাজার হাজার রাজমিস্ত্রি ও শ্রমিক দিবারাত্র অক্লান্ত পরিশ্রম করে এই শহর নির্মাণ করেন। লাল পাথর আনা হয়েছিল একশো পঞ্চাশ মাইল দূরে আগ্রার কাছে লাল পাথরের পাহাড় থেকে। লালকেল্লার দেয়াল, দেওয়ানি-খাস, দেওয়ানি-আম, মতিমহল, শিশমহল ও অন্দরমহল তৈরি করতে খরচ হয়েছিল ষাট লক্ষ টাকা। ময়ূর সিংহাসন ‘তৎ-ই-তাউস্’ তৈরি হল আগ্রায় সাত বছরের কঠোর পরিশ্রমে।

দেওয়ানি-খাসের দেয়ালে সোনার জলে লেখা হল ‘হামিনাস্ত……’, মানে পৃথিবীতে যদি কোথাও ভূস্বর্গ থাকে তো তা এইখানে। দেওয়ানি-খাসের শ্বেত পাথরের বেদিতে স্থাপন করা হল ময়ূর সিংহাসন। যমুনার জল খাল কেটে এনে ঝরনার ধারায় পড়তে লাগল নাহের-ই বিহিস্তে (স্বর্গের জলস্রোত)। বিশ্রাম করার জন্য দুটি বাগান তৈরি হল— শাবন ও ভাদো। বর্ষার দু’মাসের নাম অনুকরণে। লালকেল্লার সামনের রাস্তার নাম হল চাঁদনি চক – পূর্ণিমা আলোকিত পথ। আবার অনেকের মতে রুপো মোড়া পথ। সাতটি দরজা দেওয়া খুব বড়ো শহর তৈরি হল, নাম শাহাজাহানাবাদ। সাতটি দরজা সাতটি শহরের দিকে মুখ করা, আজমীরের দিকের দরজার নাম হল আজমিরি দরজা, কাশ্মীরের দিকের দরজার নাম কাশ্মীরি দরজা, লাহোরের দিকের দরজার নাম লাহোরি দরজা। আজও লালকেল্লায় গেলে যেন অনুভব করা যায় সে সব স্মৃতি। ইতিহাস জানা মানুষের মন অজান্তেই ভাবুক ও উদাস হয়ে ওঠে আজও। সেই স্মৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে তাই লালকেল্লায় সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হয় ‘লাইট অ্যান্ড সাউন্ড’ শো। যারা দেখেছেন তারা জানেন সে এক অদ্ভূত অনুভূতি।

দিল্লিতে সারারাত ধরেই কিছু খাবারের দোকান খোলা পাওয়া যায়। জায়গাগুলো জানা থাকলে এবং দিল্লি সম্পর্কে সুপরিচিত থাকলে আপনি অনায়াসেই বেশি রাতেও খাবার কিনে খেতে পারেন। যেমন সফদরজঙ্গ এনক্লেভের রাজেন্দ্রর ধাবা এবং পত্রিকা অফিসগুলোর সামনের দোকানগুলো উল্লেখযোগ্য। রাজেন্দ্র-র ধাবা কষা মাংস এবং রুমালি রুটির জন্য খুব বিখ্যাত। দিল্লিতে আরও একটি সুবিধা হল চব্বিশ ঘন্টা আপনি ট্যাক্সি সেবা পাবেন। প্রায় প্রতি পাড়াতেই ট্যাক্সি স্ট্যান্ড পাবেন, যারা সারারাত খোলা রাখে।

তবে সর্বজনীন দুর্গাপুজোর প্রথম সূত্রপাত করে তিমারপুর এবং পরে দিল্লি দুর্গাপুজো সমিতি, কাশ্মীরি গেট ১৯১০ সালে। এটিই দিল্লির প্রাচীনতম, ঐতিহ্যময় সর্বজনীন দুর্গাপুজো৷ ১৯১১ সালে এই কাশ্মীরি গেট দুর্গাপুজো সমিতি-ই প্রথম বেনারস থেকে ঠাকুর বানিয়ে নিয়ে এসে মূর্তি পুজো শুরু করে। চিত্তরঞ্জন পার্কে প্রথম দুর্গাপুজো শুরু হয় ১৯৭০ সালে এক নম্বর বাজারের উলটোদিকের জে-ব্লকের মাঠে। ১৯১৬ সালের আগে অবধি দিল্লিতে প্রতিমা আসত বাইরে থেকে। ১৯১৬ সাল থেকে দিল্লিতেই প্রতিমা গড়ার ব্যবস্থা হয়। মৃৎশিল্পীরা কৃষ্ণনগর/কুমারটুলি থেকে আসতেন। এদের মধ্যে গৌর পাল ও বঙ্কিম পাল বহু বছর প্রতিমা গড়েছিলেন।

Delhi আজও থেমে নেই, প্রতিদিন এগিয়ে চলেছে তার তীব্র গতিতে। ভিড় ক্রমশ‍ই বেড়ে চলেছে। কয়েক বছর আগের একটি পরিসংখ্যান, দিল্লিতে প্রতিদিন ৫০০ নতুন মোটর গাড়ি রাস্তায় চলাচল শুরু করে। এখন সংখ্যাটা নিশ্চয়ই আরও বেড়েছে। আজকাল বহু অঘটনের কথাও পত্রিকায় ছাপা হচ্ছে। কিন্তু কোথাও কোনও বিরাম চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না। সবাই দৌড়ে চলেছে যেন দম দেওয়া কলের পুতুলের মতো!

দিল্লিতে যারা আসেন তারাই দিল্লির প্রেমে পড়ে যান। তাই হয়তো আর ফিরে যেতে চান না। আমার মনে হয়েছে দিল্লির সবথেকে বড়ো আকর্ষণ হল কর্মসংস্থানের সুযোগ, পড়াশোনার সুযোগ সুবিধা ও পরিবেশ এবং কাজ করার সংস্কৃতি (ওয়ার্ক কালচার) ইত্যাদি। সবশেষে বলা যেতে পারে, কারণ যাই হোক না কেন, দিল্লি সকলের মন জয় করতে সমর্থ হয়েছে। যে একবার দিল্লিতে এসে বসবাস করতে শুরু করে সে আর ফিরে যেতে চায় না।

 

ডাঙার নৌকা (পর্ব-০৩)

—চুপ কর। আমি দেখছি, একটা চাকরির ব্যবস্থা করতে হবে।

–কোথায় পাবি বুনু, রাস্তায় পড়ে আছে?

অর্পিতা মেজদির কথার কোনও উত্তর দেয় না। সত্যিই তো চাকরি মাটিতে পড়ে নেই। তাও চেষ্টা করে সামনের বাজারে একটা উইমেন গারমেন্টসের দোকানে সেল্স গার্লের চাকরি জোটায়। মাস দুই কাজ করে। কিন্তু খাটনি আর স্যালারির সহাবস্থানে এক্কেবারেই মানানসই না হওয়ায় ছাড়তে হয়। তারপর কয়েক সপ্তাহ বাড়িতে বসে একে ওকে বলে টিউশন জোগাড় করে, খুব বেশি নয়। বাড়ি বাড়ি গিয়ে মাত্র তিন বাড়ি। জুনিয়র ক্লাস হলেও পয়সা আছে।

মায়ের অর্ধেক পেনসনের টাকা আর টিউশন মিলিয়ে ভাঙা গাড়িতে গতি আসে। এমনিতে অর্পিতা কাজ ছাড়া আর বাইরে যায় না। যাবেই বা কী করে, মেজদির শরীরের অবস্থা ভালো নয়, রান্না করতে করতে হাঁপিয়ে যায়। অর্পিতাকেই সব কিছু করতে হয়। দাদা-বউদি, বড়দি-জামাইবাবু — ইচ্ছে হলে আসে। মাঝে মাঝে ফোন করে। মা ওদের কথা আলোচনা করে, কাঁদে, বলে, ‘হ্যাঁ রে আমি মারা গেলে তোরা দু’বোন থাকবি কী করে বলত?”

এ প্রশ্নের উত্তর অর্পিতার কাছে না থাকলেও, অর্পিতা মায়ের ওপরেই কৃত্রিম রাগ দেখায়। এক রাতে খেতে বসে মা বলে, ‘আজ জামাই ফোন করে বাড়িটা বিক্রি করে দেবার কথা বলছিল।’ অর্পিতা খাওয়া থামিয়ে জিজ্ঞেস করে, “কখন ?’

—সন্ধেবেলা, তুই যখন পড়াতে গেছিলিস। আমি ফোনটা রিসিভ করলে মাকে দিতে বলে।

—আচমকা বিক্রি করে দিতে বলে কেন?

—বলছিল, ‘মা ওই অঞ্চলে বড়ো বড়ো প্রোমোটার থাবা বসিয়েছে। ফ্ল্যাট উঠছে। কোনও দিন জোর করে দখল করে নেবে তখন কাঁচকলা পাবেন।’ ওর নাকি চেনাজানা কে সব আছে, ভালো দাম দেবে।

অর্পিতা সেদিন মাঝ পথে খাওয়া শেষ করে অন্ধকারেই বাগানে এসে দাঁড়ায়। ছয় কাঠার ওপরে জায়গা আছে। বাবার মুখে শুনেছে ওপার বাংলা থেকে দাদু এসে এই জায়গাটাতেই প্রথম তাঁবু খাটিয়েছিল। ঠাকুমা চারদিকে লাউ কুমড়োর গাছ পুঁতে অনেকটা জায়গা দখল করেছিল। পরে সরকার থেকে দিয়ে দেয়। অনেক গাছ আছে। সব দাদু ঠাকুমার হাতে লাগানো। বাতাবি লেবু, আম, জাম, পেয়ারা। বাড়ির পিছনদিকে একটা বেলগাছও রয়েছে। সন্ধের পর মা ওদিকে কাউকে যেতে দিত না। তবে ভাইবোনরা মিলে উঠোনটাতে খুব মজা করে খেলত।

বৃষ্টি পড়লে উঠোনে জল জমলে বাবা বাগানের দরজা থেকে বারান্দা পর্যন্ত ইঁট পেতে দিত। অর্পিতারা সবাই মিলে তখন বেশি করে বাইরে বেরোত, উঠোনের জমা জলে কাগজের নৌকা ভাসিয়ে প্রতিযোগিতা করত। দিদির নৌকাটা সব থেকে বড়ো হলেও, দাদা ঢেউ উঠিয়ে সব নৌকাকে ডুবিয়ে দিত। অন্ধকারে বাগানে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে সেদিন অর্পিতার নাকে সোঁদা মাটির গন্ধ লাগল।

এ পাড়াতে সবাই অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থাকে, অর্পিতার চোখের সামনে সেদিন অন্ধকারেই অতীত জেগে ওঠে। দাদা, বড়দি সব খেলতে আরম্ভ করে, ‘কুমির তোর জলকে নেমেছি।’ তারপরেই চোখ ভিজে যায়। ঘরের ভিতর এসেই বলে, “মা, ওদের কারওর ফোন ধরবে না। মেজদি তুইও ধরিস না।’

ফোন অবশ্য আর ধরতে হল না। তারপর থেকে দাদা, আর জামাইবাবুর বাড়ি আসা বাড়তে লাগল, বাদ গেল না বড়দি বা বউদিরও আসা। এক রবিবার আবার সবাই মিলে হাজিরও হয়ে গেল। একথা সেকথার মাঝে সেই এক কথা, ‘ভালো দাম উঠেছে, বাড়িশুদ্ধ জায়গাটা বিক্রি করে দাও।’

—থাকব কোথায়?

—আরে ওরা তো ফ্ল্যাট দেবে, টাকা দেবে।

—ততদিন?

—কেন ভাড়া বাড়িতে।

মোহময়ী দিল্লি (৩য় পর্ব)

দিল্লির সুস্বাদু কিছু খাবার

দিল্লিতে বাঙালি পাড়াগুলোতে অর্থাৎ চিত্তরঞ্জন পার্ক, নিবেদিতা এনক্লেভ, মহাবীর এনক্লেভ ইত্যাদি জায়গায় বাঙালিদের মোটামুটি প্রায় সব জিনিসই পাওয়া যায়। শুক্তো থেকে চাটনি, মাছ, মাংস, হাঁসের ডিম সবই পেয়ে যাবেন এই বাজারগুলোতে। এমনকী মোয়া, নাড়ু থেকে মোগলাই পরোটা, বিভিন্ন ধরনের চপ থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি- এসব বাজারে কিনতে পাওয়া যায়। তাই দিল্লির বাঙালিরা বাংলার খাওয়ার স্বাদ থেকে বঞ্চিত হন না। এখানে মোচা, মুড়ি, ঝালমুড়ির সাথে সাথে কলকাতার ফুচকাও পাবেন। তবে দিল্লিতে প্রধানত পাঞ্জাবিদের বা উত্তর ভারতের খাবারের প্রাধান্য বেশি, যা একবার খেলে আপনাকে তারিফ করতেই হবে।

প্রথমেই আসি ‘পরোটা’-র কথায়। এখানকার স্থানীয় লোকেরা যখন উচ্চারণ করেন তখন ‘পরোঠা’-র মতো শোনায়। এই পরোটা দিল্লিতে খুবই প্রচলিত একটি খাবার। অনেক লোকই এই পরোটা দিয়ে তাদের সকালের জলখাবার সারেন। এখানে বিভিন্ন ধরনের পরোটা পাওয়া যায়। প্লেন পরোটা থেকে শুরু করে আলুর, ফুলকপির, মুলোর, ডিমের, ডালের ইত্যাদির হয়। সে পরোটা একবার খেলে আপনার মুখে স্বাদ লেগে থাকবে। পুরাতন দিল্লিতে ‘পরোঠাওয়ালি গলি’ খুবই বিখ্যাত ছিল এক সময়ে। পাশাপাশি বেশ কয়েকটি দোকান সেই গলিতে। পরোটার বিশেষত্ব দেশি ঘি-এর পরোটা বানানো হয় এবং সাথে ছোটো ছোটো বাটিতে দশ-বারো রকমের তরকারি পরিবেশন করা হয়, চাটনি, আচার ইত্যাদির সাথে। মাটির পাত্রে পরোটা ভাজা হয়। আজও সেখানে দেশি ঘিয়ের সাথে বহু ব্যাঞ্জন সহযোগে পরোটা পাওয়া যায়। দিল্লিতে এলে লাচ্ছা পরোটা অবশ্যই একবার চেখে দেখবেন। ভাঁজে ভাঁজে বা পরতে পরতে দেশি ঘি দিয়ে বানানো এই পরোটার স্বাদ আপনার বহুদিন মনে থাকবে।

দিল্লির আরেকটি সুস্বাদু খাবার হল, চাট। এই চাট-ওয়ালাদের কাছে পাবেন, আলুরটিক্কি, দহিভাল্লা, পাপড়ি চাট, গোলগাপ্পা। দিল্লিতে স্ট্রিট ফুডের মধ্যে চাট হল একটি জনপ্রিয় খাবার। এই প্রসঙ্গে জানিয়ে রাখি চাঁদনি চকের স্ট্রিট ফুড খুব বিখ্যাত। যারা দিল্লির চাট খেয়েছেন তারা জানেন, দিল্লির চাটের স্বাদ অতুলনীয়। এ স্বাদ দিল্লির বাইরে আপনি কোথাও পাবেন না। সুস্বাদু আলুটিক্কি সব জায়গায় পাওয়া গেলেও চাঁদনি চকের নটরাজ কাফে এর জন্য খুবই বিখ্যাত।

দিল্লির কয়েকটি জায়গা চাটের জন্য বিখ্যাত, যেমন ইউপিএসসি-র কাছে অর্থাৎ শাহজাহান রোডে, বিটুটিক্কিওয়ালা করোল বাগে, দৌলত কি চাট চাঁদনি চকে এবং নটরাজ দহিভাল্লেওয়ালা চাঁদনি চকে।

আপনি যদি আমিষাশী হয়ে থাকেন তবে দিল্লির ‘বাটার চিকেন’- এর স্বাদ নিতে ভুলবেন না। আজকাল দিল্লির প্রায় সব জায়গাতেই রাস্তার ধারে বা বাজারগুলোতে এ ধরনের খাবারগুলো পেয়ে যাবেন। সাধারণত ভাত বা নান দিয়েই পরিবেশন করা হয়।

দিল্লিতে যেহেতু মোঘলরা রাজত্ব করেছে একসময় তাই তাদের কিছু কিছু খাবার আজও এখানে পাওয়া যায়। তার মধ্যে সুস্বাদু একটি খাবার হল ‘কাবাব’। পাঁঠার মাংস বা মুরগির মাংস বা মাছ দিয়ে বিভিন্ন সুগন্ধিজাত মশলা দিয়ে ম্যারিনেট করে গ্রিলড করে বানানো হয় এই কাবাব। অপূর্ব এর স্বাদ। বহু জায়গায় পনীরের কাবাবও পাওয়া যায়। এই খাবারগুলোও আজকাল প্রায় সর্বত্রই পাওয়া যায়।

দিল্লির আর একটি নামকরা খাবার হল ছোলে বটুরে (ভটুরে)। এটি খুবই মুখরোচক, মশলাযুক্ত এবং তৈলাক্ত খাবার। দিল্লির মতো ছোলে বটুরে আপনি এই রাজ্যের বাইরে কোথাও পাবেন না, তাই দিল্লিতে এলে প্রাতরাশের তালিকায় এটিকে রাখতে ভুলবেন না। সাধারণত এর সাথে লস্যি পরিবেশন করা হয়। তবে আপনি যদি সস্তায় টিফিন সারতে চান তাহলে আছে কুলচে-ছোলে। এটিও উত্তর ভারতে একটি জনপ্রিয় খাবার।

মোঘলরা আরও একটি খাবার ছেড়ে গেছে, সেটি হল বিরিয়ানি। তবে দিল্লিতে বিভিন্ন জায়গায় বিরিয়ানির স্বাদ আলাদা আলাদা। ধাবার বিরিয়ানির স্বাদ, বড়ো দোকানের বিরিয়ানির স্বাদ এবং পাঁচতারা হোটেলের বিরিয়ানির স্বাদ স্বাভাবিক ভাবেই আলাদা আলাদা হতে বাধ্য। এখানকার বিরিয়ানির বিশেষত্ব হল, এখানে অনেক জায়গাতেই মাটির হাঁড়িতে মুখবন্ধ অবস্থায় বিরিয়ানি পরিবেশন করা হয় যাতে মশলার স্বাদ ও গন্ধ অটুট থাকে। এখানকার বিরিয়ানিতে কিন্তু কলকাতার বিরিয়ানির মতো আলু খুঁজলেও পাবেন না।

দিল্লির রাস্তায় রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে অনেক জায়গায় হয়তো মাংস এবং মশলার ঘ্রাণ আপনার নাকে ভেসে আসবে। এই মাংসের ঝোলকে স্থানীয় ভাষায় নিহারি-ও বলে থাকেন অনেকে। নিহারি নামে এই মাংসের ঝোল নাকি অনেকক্ষণ ধরে জাল দেওয়া হয়। সাধারণত তন্দুরি রুটি সহযোগে পরিবেশন করা হয়। পুরাতন দিল্লিতে সকাল সকাল রাস্তার ধারে রিকশাওয়ালা, শ্রমিক ইত্যাদিদের ভিড় দেখা যায় এইসব দোকানগুলোর সামনে। যদিও কলকাতা রোলের জন্য বিখ্যাত, তবে দিল্লিতেও বেশকিছু হোটেল এবং রেস্টুরেন্টেও এই কাঠিরোল বিক্রি হয়। এখানে রাস্তার আশেপাশে লেবানিজ মিট ডিস শশুরমা (Shawarma) প্রায় সব জায়গাতেই পাওয়া যায়।

মোমোর সম্পর্কে তো আর বলতে হবে না। মনে হয় সারা ভারতবর্ষে আজকাল মোমো ছেয়ে গেছে। অফিসপাড়ায়, জন্মদিনের পার্টিতে এবং ককটেল পার্টিতেও মোমোর উপস্থিতি দেখা যায়। এখানে ভেজ এবং নন-ভেজ ষ্টিম মোমো ছাড়াও ফ্রাইড মোমো, তন্দুরি মোমো, কুড়কুড়ে মোমো ইত্যাদি আরও অনেক ভ্যারাইটি পাওয়া যায়।

দিল্লির মানুষদেরও বাঙালিদের মতো খাওয়ার শেষে মিষ্টি খাওয়ার একটি অভ্যেস আছে। তাই তাদের বলতে শোনা যায়— খানে কা বাদ কুছ মিঠা হো যায়ে। এখানে ভালো ছানার মিষ্টি হয়তো সব জায়গায় পাবেন না, তবে দেশি ঘিয়ে ভাজা জিলিপি, বিভিন্ন ধরনের আইসক্রিম, রাবড়ি ফালুদা, কাস্টার্ড, আম পাঁপড় (আমসত্ত্ব), দেশি ঘি-এর তৈরি মতিচুরের লাড্ডু, বেসনের তৈরি লাড্ডু, গুলাবজামুন ইত্যাদি খেতেও কিন্তু অত্যন্ত সুস্বাদু।

দিল্লিতে আলুর তরকারির সাথে কচুরিও বেশ সুস্বাদু। তবে এগুলো সব খাস্তা হিং-এর কচুরির মতো। বিশেষ বিশেষ কিছু জায়গা আছে দিল্লিতে যেখানকার কচুরি খেতে বহু দূর থেকেও লোকেদের আসতে দেখেছি। যেমন শেখ সরাই, ফেস-২। দিল্লিতে এসে যদি আপনি কর্ণাটকের বিসি বেলে ভাত খেতে চান তাহলে আপনাকে যেতে হবে রাও তুলা রাম মার্গে, কর্ণাটক সংঘ- র কর্ণাটক ফুড সেন্টার-এ। অন্ধ্র-র ভালো খাবার খেতে হলে চলে যাবেন অন্ধ্র ভবন-এ। সেখানে কম মূল্যে ভালো অন্ধ্রের খাবার পাওয়া যায়। তবে ইডলি, দোসা আপনি দিল্লির সর্বত্রই পাবেন, কারণ দিল্লিতে দক্ষিণ ভারতের লোকও আছে প্রচুর।

দিল্লির কয়েকটি মিষ্টির মধ্যে শোন হালুয়া খুব প্রসিদ্ধ। দেশি ঘি, কর্নফ্লাওয়ার, দুধ এবং স্যাফ্রন ইত্যাদি দিয়ে বানানো হয় এই মিষ্টি। এই মিষ্টিটি বেশ সুস্বাদু এবং দামও অন্যান্য মিষ্টির চেয়ে একটু বেশি।

 

ডাঙার নৌকা (পর্ব-০২)

—তা কী করে হয়, বাবার অবর্তমানে মা, আর মায়ের অবতর্মানে আমরা তো বাবার পেনসনের কণামাত্র পাব না।

— না এমনি পাবে না, তবে পেনসনটা তো বিক্রি করা যায়। অর্পিতা সেদিন কোনও উত্তর দেয়নি। বাবার নিয়মভঙ্গের কাজ। কয়েকঘর আত্মিয় কুটুমের পাশে পাড়ার কয়েকঘরও নিমন্ত্রিত ছিল। তাদের সবার কাছে আর কথা বাড়াতে ভালো লাগেনি। এমনিতেই বাবা বেঁচে থাকাকালীন দিদির বিয়ে হয়। অর্পিতা তখন টুয়েলভে পড়ে। যথেষ্ট দিয়ে দিদির বিয়ে হলেও দিদি এ বাড়িতে এলেই বলে, “আমি তো সেরকম কিছু নিইনি।” বা “বাবা তো আর আমাকে কিছু দেয়নি।’ মেজদি সামনেই বলে দেয়, “আর কত নিবি, মায়ের সব সোনা নিলি, বাবার পুরো পিএফের টাকা নিলি, তাতেও এই কথা!”

মেজদির শরীর ভালো নয়। অল্প বয়সেই থাইরয়েড, হাইসুগার। বাবা বেঁচে থাকাকালীন বিয়ের দেখাশোনা শুরু হলেও রোগের কথা শুনেই সবাই পা ফেলবার আগেই পা গুটিয়ে নিত। তবে কথাবার্তা হচ্ছে শুনেই মেজদির চোখ মুখটা চকচক করে উঠত। তারপরেই সব শেষ। মেজদিকে দেখেই অর্পিতার সব থেকে খারাপ লাগে। দিদি জামাইবাবু মেজদির সামনেই বলে, ‘তোর আর বিয়ে হবে না, বুঝলি। কে আর রোগধরাকে বিয়ে করে বল তো?”

এসময় মেজদি কোনও উত্তর দেয় না। আড়ালে শুধু কাঁদে। দাদাকে কথাগুলো জানালে দাদা, বড়দি আর জামাইবাবুর হয়েই কথা বলে। বাবার মারা যাওয়ার এক বছরের মধ্যেই দাদা নিজে বিয়ে করে নেয়। বউ নিয়ে ঘরে মাস দুই থাকবার পরেই মাকে বলে, “আমার এখান থেকে অফিসে যেতে অসুবিধা হচ্ছে। অফিসের কাছে একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিচ্ছি।”

—অফিসের কাছে, না শ্বশুরবাড়ির কাছে?

মেজদির কথাগুলো শুনেই দাদা খেঁকিয়ে উত্তর দেয়, ‘শ্বশুরবাড়িটা যদি আমার অফিসের কাছে হয়, সেখানে তো আমার কিছু করবার নেই। আমি তো তোমাদের সুবিধার জন্যেই যাচ্ছি।’

—আমাদের সুবিধা! সেকি রে! আমাদের আবার কী সুবিধা হবে?

—সুবিধা মানে দুটো ঘর, থাকব কোথায় ?

—ও।

অর্পিতা বা মেজদি দাদার সঙ্গে কথা বললেও মা কিন্তু এক্কেবারে চুপ। না ভালো, না খারাপ। শুধু দাদা বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবার পর বলে, ‘পিন্টু ভয় পেয়ে গেছে। দুটো বোন, মা, যদি এদের সবার দায়িত্ব নিতে হয়। বউমাও আমাদের এখানে থাকতে চায় না।”

অর্পিতার বউদি কারওর সঙ্গে সরাসরি ঝগড়া ঝামেলা না করলেও কথায় কথায় দাদার চাকরির তুলনা দিত। অথচ বাবা, দাদার পড়াশোনার কোনও ত্রুটি রাখেনি। কলেজ শেষ করে কম্পিউটার ট্রেনিং কোনও কিছুতেই পিছিয়ে আসেনি। দাদা সরকারি চাকরি না পেলেও বেশ ভালোই একটা চাকরি পায়। ভালো স্যালারি, অন্যান্য সুবিধা। বাড়ি ছেড়ে যাবার সময় দাদা বলে যায়, “তোরা কোনও চিন্তা করবি না, আমি ঠিক সময় করে এসে দেখে যাব।’

প্রথম কয়েকমাস দাদা বউদি প্রতি সপ্তাহে এসে মায়ের হাতে টাকা দেওয়া ছাড়াও, ফল মিষ্টি কিনেও এনেছিল। তারপর দিন গড়াতে গড়াতে এক্কেবারে বন্ধ। দাদাকে ফোন করা হলে প্রথম দিকে নানারকম কথা বলে এড়িয়ে যেত, বাহানা করত। আস্তে আস্তে রাগতে আরম্ভ করল। বাড়ি আসার কথা বললেই রেগে যেত, “আমার কি আর কোনও কাজ নেই? যখন সময় হবে গিয়ে দেখে আসব। ফোন করে এমনি ভাবে বিরক্ত করবি না।’

মায়ের পেনসনের টাকায় সব খরচ সামলানো যায় না। মাসের নিত্য খরচের পাশে ডাক্তার, ওষুধের খরচও কম নয়। মেজদি একদিন অর্পিতাকে বলে, ‘বোনরে আমার আর ওষুধ আনতে হবে না। আমি তো আর ঠিক হব না, আমার বিয়ে থাও হবে না!”

ক্রমশ……

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব