মধু যামিনী রে… (শেষ পর্ব)

অবনী খেতে খুব ভালোবাসে। বাঁচার জন্য খায় না, খাওয়ার জন্য বাঁচে। নানারকম বাজার করা, রান্নাবান্না, পূজা-পার্বণ আর নানা ছুতোয় হই হই করে তিন-চার বছর আরও কেটে গেল। রসিক মানুষ অবনী। সারাক্ষণ হাসিখুশি। রসবোধ থাকলেও, নারীমনের সম্পূর্ণতা যে মাতৃত্বে সেই বোধটা নেই। অনেক ডাক্তার দেখানো হল, সমস্যাটা অবনীর। আজকে হলে, হয়তো সেটা সমাধান হতো। কিন্তু নব্বইয়ের দশকে সেটা অকল্পনীয়। ছন্দহীন জীবনে গতানুগতিক দিন কাটতে লাগল।

সুখের দিনগুলো সেকেন্ডের কাঁটার মতো ছোটে। ভালো না লাগা দিনগুলো কাটতে চায় না। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে যেন ঘন্টার কাঁটা। তা-ও ধীরে ধীরে বিয়ে ফটোটা পুরোনো যুগের মানুষের মতো লাগে। সাজগোজ, জামা-কাপড়, ফটোর ভঙ্গি কেমন যেন সেকেলে হয়ে যায়, সবারই হয়। এটাই নিয়ম। তা-ও ভালো লাগে, যদি বর্তমানটা সুন্দর হয়। কোনওমতেই অবন্তীর গর্ভে কোনও সন্তান এল না। নিজের ফাঁকা পৃথিবীতে উলটে একে একে বাবা, তারপর মাকে হারাল।

অতনুর এখন ভরা সংসার। এক ছেলে, এক মেয়ে বউদি ভালো। তবুও বাপের বাড়ির শিকড়ের টান অনেক ক্ষীণ হয়ে গেছে অবন্তীর। দেখতে দেখতে দ্বিতীয় পদবির বয়সও কুড়ি বছর হয়ে গেল। এদিকে অবনীর একবার স্ট্রোক হয়ে গেছে। হাই সুগার। কিন্তু খাওয়া-দাওয়ার কোনও বাঁধন নেই। অনিয়ম চলতেই লাগল। ওষুধপত্র ঠিকঠাক খায় না। একদিন ভোররাতে সেরিব্রাল অ্যাটাক হল অবনীর। তিনদিন পর সব শেষ। স্বামী কেমন, সেটার থেকেও বড়ো হল স্বামী থাকা আর না থাকা। এই দুটোর তফাত বুঝল অবন্তী। বৈধব্য মানে শুধু সিঁদুর মোছা নয়। ভেতরের মনটাও সাদা হয়ে যায়। একাকিত্ব গ্রাস করতে লাগল অবন্তীকে। আবার মানসিক রোগগ্রস্ত হয়ে পড়ল। তখনই স্কুলের এক কলিগের হাত ধরে এই সংস্থায় আসা।

॥ ৬ ॥

আজ আকাশটা ভিজেভিজে। কিন্তু বৃষ্টি নেই। গঙ্গা গর্ভবতী, তবু শান্ত, তবে গম্ভীর। সূর্য‌ আজকের মতো বিদায় নিচ্ছে। শেষ দাহর সিঁদুর ছড়িয়ে দিচ্ছে পশ্চিম আকাশে, গোধূলির আলো ছড়িয়ে পড়ছে অবন্তীর ফরসা হলদেটে নিরামিষ গালে, কাঁচাপাকা আলগা খোঁপার বাঁধনটা সোনালি লাগছে। একগাছি সোনার চুড়ি চিকচিক করছে বিকেলের নরম আলোয়। হাতের ওপর চিবুক রাখা।

মাঝগঙ্গা দিয়ে একটা নৌকা যাচ্ছে, কোন পাড়ে লাগবে বোঝা যাচ্ছে না। অবন্তী একবার ভাবছে এই মঠে সবকিছু ছেড়ে যোগদান করবে। সন্ন্যাসিনী হয়ে যাবে। পারবে কি সে এপথে চলতে? সে পথ বড়ো বন্ধুর। আবার পরক্ষণেই মনে পড়ছে, বাবার দেওয়া সেগুন কাঠের খাট, নকশাকাটা আলমারি, এক বাক্স বাসন, কত ভরি গয়না এসব ছেড়ে চলে আসবে?

কত কঠিন, যারা পারে তারা কি অতিমানব? কিন্তু এগুলো আঁকড়ে রেখেই বা কী লাভ? সন্ধ্যা নামার মতো খাদের গাম্ভীর্য নিয়ে একটা গলা আস্তে কিন্তু গভীর সেই স্বর, অন্তর‌্যামীর মতো হঠাৎ বলে উঠল, অবন্তী…।

এই মঠে এতদিন আসছে অবন্তী। এই প্রথম সরাসরি কথা বলল ফাল্গুনী। অবন্তীর গলা দিয়ে কোনও শব্দ বেরল না। অস্ফুট স্বরে বেরিয়ে এল, কী…? বালিকার মতো সেই প্রশ্ন।

—তুমি এখানে আসবে অবন্তী? এ সংসারে সুখ আছে কিনা জানি না, তবে শান্তি অপার। এটা জগৎ সংসার। এর সেবায় শুধুই আনন্দ। জীবাত্মার সাথে পরমাত্মার মিলনের আনন্দ। তোমার ভালো লাগবে।

—আমি পারব?

—কেন পারবে না? আমি তো আছি।

টুপ করে চাঁদটা কোত্থেকে যেন বেরিয়ে এল। সারা আকাশ, বাতাস, নদীর জলে জ্যোত্স্না গড়িয়ে পড়ল। অবন্তী সারা শরীরে যেন মুহূর্তের মধ্যে ভরা কোটাল। মনের মধ্যে বেঁচে থাকার জোয়ার। আস্তে করে উঠে দাঁড়িয়ে চন্দন রঙের শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখটা মুছে বলল, আমি আসছি।

ফাল্গনী দেখল, একটা অশ্রুকণা গালের উপর চাঁদের রুপোলি আলোয় চিকচিক করছে, পঁচিশ বছর আগে যেটা নার্সিংহোমে দেখেছিল। ওই জলবিন্দুটার ভেতরে মনে হচ্ছে গঙ্গার থেকেও বেশি জল ধরা আছে। পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের সেই বিন্দুতে অর্চনা আর প্রেম মিলিয়ে যাচ্ছে। গঙ্গার ওপারে কোন ২২শে শ্রাবণের মঞ্চ থেকে ভেসে আসছে, দুজনে দেখা হল, মধুযামিনী রে…।

সমাপ্ত

মধু যামিনী রে… (পর্ব-০৫)

এর মধ্যে চার-চারটে বসন্ত পার হয়ে গেল। কত পুরোনো পল্লব ঝরে গেল, আবার সেই জায়গায় কত কচি পাতা এসে ভরে দিল। এটাই নিয়ম। এটাই স্বাভাবিক। এখনও মাঝেমধ্যে ছাদে গিয়ে দাঁড়ায় অবন্তী। শরীর, মন, বয়স অনেক পরিণত। বিকেলের সূর্য‌্য ঢলে পড়েছে। ঠিক ডুবে যাবার আগে একটা আবির ছড়িয়ে দিচ্ছে, ওই হলুদ বাড়িটার চিলেকোঠায়। ওই বাড়িটায় ফাল্গুনীরা থাকত। বহুদিন চলে গেছে। তবু তাকিয়ে থাকে ওই ছাদে টাঙানো তারের দিকে।

হ্যাঁ ঠিক, ওখানেই ফাল্গুনীর পানাফুল রঙের শার্ট টানটান করে দেওয়া থাকত। কাক বসলে রাগ হতো। আজও ঝুলছে একটা সাদা শার্ট, কার জানা নেই। কিন্তু গোধূলির আলোয় মনে হচ্ছে পানাফুল। আলো কমে আসছে। একটা ছায়া-শরীর পায়চারি করছে। হয়তো ওই বাড়ির কেউ। ঠিক ফাল্গুনীর মতো হাঁটার ভঙ্গিটা। না, ডাক্তারবাবু এসব ভাবতে বারণ করেছে, মনে মনে ভাবল অবন্তী। মাথার ওপর একটা কাক কর্কশ স্বরে ডেকে ঘরে ফিরছে।

বাস্তবের মাটিতে মনকে নামিয়ে আনল অবন্তী। নীচে নেমে এল। সামনে বিএ ফাইনাল। মন দিয়ে পড়তে বসল। নিজের পায়ে ওকে দাঁড়াতে হবেই।

॥ ৫ ॥

আরও বছর চারেক লাগল অবন্তীর চাকরি পেতে। অনেক দূরে, মথুরাপুরের কাছে অবন্তীর স্কুল। অবন্তীর মামা থাকে বাগবাজারে। মাহিমা একদিন একটা পাত্তরের খবর নিয়ে এল। পাল্টি ঘর, ব্যাংকে কাজ করে ছেলেটি। যৌথ পরিবার। শরিকি বাড়ি বাগবাজারে। তবে হাঁড়ি আলাদা। অবন্তীর বাবা-মার বেশ পছন্দ। অবন্তীর কোনও মত নেই। তার মন মতামতের উর্ধ্বে

ছেলে মানে, লোক বলাই ভালো, দেখতে এল অবন্তীকে। অবন্তীকে দেখার কিছু নেই। ঈশ্বর তাঁর রূপের ডালি ঢেলে দিয়েছেন ওর শরীরে। অবন্তীর রক্তের ব্যাপারটা জানানো হল। এতে ছেলের কোনও আপত্তি নেই। অবাক হল অবন্তী। যাইহোক দু-বাড়িই রাজি হয়ে গেল। অবন্তীর সিঁথিতে ফাল্গুনীর দেওয়া আবিরের দাগটা যেটা শুধু অবন্তীই দেখতে পায়, সেটা এক কলকাকলি ভরা সন্ধ্যায় ঢেকে গেল অবনীর সিঁদুরে।

কপালে সিঁদুর পরলে, মেয়ে থেকে নারী হওয়ার যে-অনুভতি শরীরে খেলে যায়, সেটা অনুভব করতে পারল না অবন্তী। তবে বেশ বনেদি পরিবার অবনীরা। বউভাতে অবন্তীর গা-ভরা গয়না, লাল বেনারসি, বিরাট কাঁসারের বগি থালায় ভাত, সারি সারি কাঁসারের বাটি। সব-ই ঠিক আছে। সবকিছুই মেঘলা আকাশের মতো সূর্য‌্যকে ঢেকে দিতে চাইছে। কিন্তু কোথা দিয়ে যে মেঘ ছিঁড়ে একটু রোদ এসে মনটা উদাস করে দিচ্ছে অবন্তী বুঝতে পারছে না।

চোখ ভিজে যাচ্ছে। সবাই ভাবছে বাপের বাড়ির শোকে। সবাই সান্ত্বনা দিচ্ছে, মেযো হল টবের গাছ, যখন যেখানে তখন সেখানের মতো। কিন্ত গাছটাই যে ভেতরে ভেতরে শুকিয়ে যাচ্ছে, তার খবর কেউ রাখল না।

ফুলশয্যার রাত। অবনী দরজা দিল। নারীর নতুন জীবন। কোনও পুরুষের সাথে একা একটা ঘরে। এই দুদিনে অবন্তী একটা জিনিস বুঝেছে, মানুষটা খারাপ না। জটিল নয়।

হাউ-হাউ করে কথা বলে, নিজেও হাসে, হাসাতেও ভালোবাসে। অবনী ঘরে ঢুকে বলল, এই এ বাড়িতে কোনও অসুবিধা হচ্ছে না তো? অবন্তী মাথা নাড়ে।

অবনী আবার শুরু করে, এই জানো আমার বন্ধু পল্টু এত বদমাইশ, বলে কিনা, নানারকম ফল দিয়ে খাট সাজাবে, বলে ফুল তো বিয়ে আগে ফোটে, বিয়ে পরে তো ফল। সাজালে কী সাংঘাতিক কাণ্ড হতো বলো? এবার অবন্তী হেসে ফেলল। বুঝল মানুষটা একেবারেই সরল। না হলে, নতুন বউয়ে কাছে কেউ এ গল্প করে।

তারপর অনেক রাত অবধি নানা মজার গল্প করল অবনী। আস্তে আস্তে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে অবনী। অবন্তী এবার একটু জড়োসড়ো হয়ে যাচ্ছে, আবার স্বাভাবিক থাকারও চেষ্টা করছে। মন আর শরীর এক বিন্দুতে মিলছে না। সেই বিন্দুতে অন্য ছবি আঁকা রয়েছে, ঝাপসা কিন্তু গভীর। অস্পষ্ট তবুও অনস্বীকার্য। তারপর যেটা হল, সেটাকে শারীরিক সম্পর্ক না বলে একতরফা কর্ম সমাপন বলাই ভালো। মোটামুটি এই ভাবেই চলতে লাগল পরের দিনগুলো।

ক্রমশ…

মধু যামিনী রে… (পর্ব-০৪)

মাথা নীচু করে বসে রইল ফাল্গুনী। পরেরদিন অতনুদের বাড়ি গেল ফাল্গুনী। এত বেপরোয়া আগে কোনওদিন মনে হয়নি। বাড়িতে ঢুকে অতনুকে বলল, অবন্তীর সাথে আমার কিছু ব্যক্তিগত কথা আছে। অতনু বলল, যা ওপরে আছে।

দরজাটা বন্ধ রয়েছে। দুবার আলতো টোকা দিল ফাল্গুনী, অবন্তী… অবন্তী।

আস্তে করে দরজা খুলল, বয়স বেড়ে গেছে অবন্তীর, চুল খোলা, চোখের পাতা কিছু ঝরে গেছে, গভীর নয়, ফাঁক ফাঁক, বাকিগুলো নুইয়ে আছে। গাল দুটো বাসি বিয়ে মালার মতো, ঠোঁট দুটো ঈষৎ কাঁপছে। ঘরে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে জড়িয়ে ধরল ফাল্গুনী। বহুদিন পরে কেঁদে ফেলল। অবন্তী মুহূর্তের জন্য অবশ হয়ে গেল। তারপরই নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। ফাল্গুনী ভেজা গলায় বলল, আমি কিছু বুঝি না, আমি তোমাকে চাই।

—না, ফাল্গুনীদা তা হয় না। আমি গান ভালোবাসি। এই লাইনের লোকের সাথেই আমার মানানসই। আমি মৈনাককে ভালোবাসি। তুমি আমাকে ভুলে যাও।

—আমি পারব না অবন্তী।

—সেটা আমার কিছু করার নেই। পাগলামো করে লাভ নেই। অনেক ভালো মেয়ে আছে। তুমি সুখী হবে।

ভালো মানুষ আর মনের মানুষের তফাত অবন্তী বুঝতে পারছে না, বা পারছে, বুঝতে চাইছে না। মাথা নীচু করে ফাল্গুনী বেরিয়ে এল। শরীরে মন কোথায় থাকে বুঝতে পারছে ফাল্গুনী, কারণ বুকে একটা মোচড় দিচ্ছে। জীবন, এক পথ ছেড়ে অন্য পথের দিকে বেঁকে যাচ্ছে। নিজের ভেতর অনেক গুটিয়ে গেল ফাল্গুনী।

এদিকে অবন্তী দিল তার নারীত্বের পরিচয়। নারীমন দেবা ন জনন্তি।

কদিন আগের যন্ত্রণার থেকেও মারাত্মক কষ্ট হচ্ছে অবন্তীর। কোথায় হচ্ছে, বুঝতে পারছে না। কিন্তু শরীর মন এই ঝড়ে কিছুতেই দাঁড়াতে পারছে না। মনের সব প্রদীপগুলো নিভে যাচ্ছে একে একে। শরীর ভারী হয়ে আসছে। কান্না আসছে না। অশ্রুনদী বইতে গেলে মনের কোণে যে-হিমবাহটা লাগে সেটাই শুকিয়ে গেছে। মনের হিমাঙ্ক অনেক নীচে নেমে গেছে। যার তল খুঁজে পাচ্ছে না অবন্তী। শুধু দিশেহারার মতো শান্তি খুঁজছে।

॥ ৪ ॥

এদিকে মৈনাক রক্তের স্বাদ পেয়ে গেছে। সে অবন্তীর শরীর চায়। অবন্তীর ভাঙা মন শরীর দিতে চায় না। ফাল্গুনীর মনে ঘৃণা জন্মানোর জন্য যেটুকু দরকার ছিল অবন্তীর তা মিটে গেছে।

এবার ও নিজেকে দূরে সরিয়ে নিতে চাইছে। কিন্তু মৈনাক ছাড়বার পাত্র নয়। একদিন বাবা-মা দাদা গেছে বিযোড়ি। অবন্তীর এখন বাইরে খাওয়া বারণ। ও যায়নি। বাড়িতে একা। মৈনাক এসে হাজির। অবন্তী প্রথমে ভেবেছিল ঢুকতে দেবে না। তারপর শালীনতায় আটকাল। জড়তা নিয়ে দরজা খুলল। হারমোনিয়াম পেতে বসল। গানে মন নেই আজ। হঠাৎ তবলা ছেড়ে উঠে এল মৈনাক। জড়িয়ে ধরল অবন্তীকে, ঘাড়ের কাছে ঠোঁট ঘষতে লাগল, অস্ফুট স্বরে ফিসফিস করে বলল, আমি তোমাকে অনেকদিন ধরে ভালোবাসি।

বয়সের ধর্মে দূর্বল হয়ে পড়ছে অবন্তী। মৈনাকের দুটো হাত অবন্তীর শরীরের অলিতে গলিতে বযঃসন্ধির স্পর্শ খুঁজছে। অবন্তী নিজেকে ছাড়াতে চাইছে, কিন্তু দূর্বল হয়ে পড়ছে। হঠাৎ কপালে একটা চুম্বন করল মৈনাক। অবন্তীর সারা শরীরে একটা তরঙ্গ খেলে গেল। ফাল্গুনীর মুখটা ভেসে উঠল। হাঁউমাউ করে কেঁদে উঠল অবন্তী। ঘাবড়ে গেল মৈনাক। ছিটকে সরে গেল। ভয় মেশানো গলায় বলে উঠল, কী হল?

অবন্তী হাত জোড় করে বলল, আমাকে ছেড়ে দাও।

মৈনাকের চরিত্র দৃঢ় নয়, ফলে মন দূর্বল। ভয় পেল। চোরের মতো চলে গেল। মৈনাকের এ-বাড়িতে আসা বন্ধ করে দিল অবন্তী। তাতে শরীর বাঁচল। কিন্তু মন ধীরে ধীরে খুশির রসদ না পেতে পেতে ক্রমশ মুষড়ে যেতে লাগল। একটা উচ্ছল অষ্টাদশীর পালকের মতো মন বুকের মাঝে, খুলতে ভুলে যাওয়া মৃত্যুদিনের পরানো মালার মতো ঝুলতে থাকল। মনোবিদ দেখাতে হল অবন্তীকে। অনেক সময় লাগল সুস্থ হতে।

ক্রমশ…

 

মধু যামিনী রে… (পর্ব-০৩)

প্রায় ঘন্টাদুয়েক পরে জ্ঞান এল অবন্তীর। সবাই ঘুরে আসার পর শেষে গেল ফাল্গুনী। ওদের বাড়ির সবাই সবই বোঝে, কিন্তু না বোঝার ভান করে। ঘরে ঢোকার পর ফাল্গুনী দেখল, তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে শুয়ে আছে অবন্তী। আলতো করে মাথায় হাত দিয়ে জিজ্ঞেস করল, অবন্তী…কষ্ট হচ্ছে?

বোজা চোখটা অর্ধেক খুলল, দ্রুত একটা মোটা জলের ধারা দুচোখ থেকে বেরিয়ে এল। মনে হল অনেক কিছু ধুয়ে নিয়ে গেল। তারপর ধীর গতিতে মাথা নেড়ে না বলল, কিন্তু কোনও শব্দ হল না। এবার ফাল্গুনী হাতটা ধরে বলল, একটা দিন একটু কষ্ট করো, কাল ঠিক হয়ে যাবে।

অবন্তী আবার ঘাড় নেড়ে না বুঝিয়ে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু পারল না, ঘুমিয়ে পড়ল।

বাইরে বেরিয়ে বহুদিন পর সিগারেট ধরাল ফাল্গনী। অতনু জিগ্যেস করল, কী হল?

—না… কিছু না, তবে ভালো লাগছে না।

—আরে দূর, অ্যানেস্থিশিয়া করেছে না, কালকে ঠিক হয়ে যাবে।

—তুই বুঝবি না, ওর কষ্ট হচ্ছে।

—বাবাকে বলব? তুই কি রাত্তিরে ওর কেবিনে থাকবি?

—না ইয়ার্কি নয়, বিশ্বাস কর আমি বলছি ও কষ্টে আছে।

পরদিন সকাল এগারোটায় ভিজিটিং আওয়ার। অনেকেই এসেছে। এক এক করে দেখা করে আসছে। সবাই এসে বলছে, ভালো আছে। ভালো লাগছে ফাল্গুনীর। আজও সবার শেষে গেল ফাল্গুনী। খাটে উঠে বসেছে অবন্তী। গঙ্গাজল রঙের একটা সামনে চেরা নাইটি। জানলার একটা কাচ দিয়ে একফালি রোদ এসে পড়েছে একদিকের গালে। মনে হচ্ছে এদিকটা দিন, অন্য গোলার্ধ। আর একদিকটা গম্ভীর, অন্ধকার।

—কেমন আছো, অবন্তী?

—তোমার কলেজ নেই?

এবার হাত ধরে ফাল্গুনী বলে উঠল, কী হল আবার?

—আমার বাবা আছে, দাদা আছে, তুমি সারাদিন এখানে পড়ে আছ কেন? তোমার পড়াশোনা নেই। এরপর রেজাল্ট খারাপ হবে। দোষটা তো আমার হবে। তুমি এখন যাও। বলে হাতটা ছাড়িয়ে নিল অবন্তী।

নতুন এক অবন্তীকে দেখল ফাল্গুনী। সম্পূর্ণ অচেনা। প্রেমের সুতো দিয়ে

যে-নকশাটা আঁকা হচ্ছিল হঠাৎ যেন হাত লেগে রঙের দোয়াতটাই উলটে গেল। তাও মনকে বোঝাল শরীর ঠিক না থাকলে কি মেজাজ ঠিক থাকে? আস্তে করে বেরিয়ে কলেজের পথে হাঁটা দিল ফাল্গুনী।

দুদিন পর ছুটি হল অবন্তীর। বাড়ি এল। ফাল্গুনী দেখা করতে গেল। অবন্তী একটা বই নিয়ে মুখ গুঁজে বসে আছে। চোখের নীচে কালি। মিষ্টিমুখটায় চন্দ্রগ্রহণ। ঠোঁটদুটো শুকনো। দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করছে। ফাল্গুনী জোর করেই বলল, কিছু হয়েছে অবন্তী?

—হলেই বা কী করবে? আমি তোমার কে?

—আমি তোমার কথার এক বর্ণও বুঝতে পারছি না।

—বোঝার তো দরকার নেই, নিজের চরকায় তেল দাও।

কথা বাড়াল না ফাল্গুনী। এরপর সম্মানহানি হবে। আস্তে করে বেরিয়ে এল। প্রায় দিন পনেরো গেল না ওই বাড়িতে। একদিন স্কুলফেরত দেখা হল অবন্তীর সাথে। মিষ্টি হেসে বলল, মঙ্গলবার একটু আসবে, সন্ধেবেলা, একটা নতুন গান তুলেছি, শোনাব।

মেঘ ভেঙে রোদ উঠল ফাল্গুনীর মনে। চিত্কার করে গান গাইতে ইচ্ছে করছে। সবকিছুই সুন্দর লাগছে। সবার সঙ্গে হেসে কথা বলতে ইচ্ছে করছে। চারিদিকেই যেন খুশি আর আনন্দ।

তারপরই সেই মঙ্গলবার, রাখিপূর্ণিমার দিন। তবে সেদিন যেটা ঘটল, তাতে নির্বোধরা আত্মহত্যা করত, বেসামালরা নেশা, আর যাদের নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ আছে যেমন ফাল্গুনী ডুবে গেল নিজের পড়াশোনায়, সঙ্গে দর্শন আর আধ্যাত্মবাদ। এইভাবেই দিন কাটতে লাগল। অতনুর সাথেও অনেকদিন দেখা হয় না।

অতনু একদিন ফাল্গুনীর বাড়িতে উপস্থিত। এসে বলল, তোর কী খবর রে? কোনও যোগাযোগ নেই।

—না এমনিই। কী আবার হবে?

—তুই ভুল বুঝছিস। আমাদের বাড়ির সবার মন খারাপ। বুনির (অবন্তী) রক্ত পরীক্ষার রিপোর্টটা ভালো নয়। ও হিমোফিলিয়া-র বাহক। ডাক্তারবাবু বলেছেন বিয়ে পর ছেলেমেয়ে হলে সমস্যা হতে পারে।

ফাল্গুনীর মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠল। কিছুক্ষণ সময় নিল, তারপর বলল, আমাকে এতদিন পরে বললি!

—না, কী ভাবে বলব ভাবছিলাম।

ক্রমশ…

 

মধু যামিনী রে… (পর্ব-০২)

॥ ২ ॥

তখন ক্লাস নাইনে পড়ে অবন্তী। শরীর বাড়ছে চন্দ্রকলার মতো। আর তত সুন্দর হচ্ছে প্রতিদিন। শ্রাবণের পুকুর টইটুম্বুর হয়ে উঠছে। সন্ধেবেলা স্কুল থেকে এসে স্নান সেরে গান নিয়ে বসলে জ্যোত্স্না গড়িয়ে পড়ে গা বেয়ে।  ফাল্গুনী ছোটোবেলা থেকেই ওদের বাড়ি যায়। অতনুর বন্ধু হিসেবে। মাঝেমধ্যে টুকটাক কথা হয় অবন্তীর সাথে। কোনওদিন বসে গানও শোনে। তবে আগের মতো আর পিছনে লাগে না। যেমন লাগত ছোটোবেলায় ক্যারাম খেলার সময়।

ইদানীং ফাল্গুনীর, অবন্তীর সামনে এলে একটা জড়তা আসে। সব কাজ, কথা, অস্বাভাবিক হয়ে যায়। সব কিছুই ভেবেচিন্তে সুন্দর করে বলতে চায় বা করতে চায়। যাতে অবন্তীর ভালো লাগে। ফাল্গুনী বোঝে না এটা কী প্রেম না পূর্বরাগ?

এর মধ্যেই উচ্চ মাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরোল। প্রথম একশো জনের মধ্যে জায়গা হল ফাল্গুনীর। চোখধাঁধানো রেজাল্ট। অতনু ফার্স্ট ডিভিশন পেয়েছে। ফাল্গুনী পরেরদিন অতনুদের বাড়ি গেল। অতনুর বাবা-মা তো ভীষণ খুশি। জিজ্ঞেস করল, এবার কী নিয়ে পড়বে?

—যাদবপুরে ইঞ্জিনিয়রিং-এ চান্স পেয়েছি, তবে আমি প্রেসিডেন্সি কলেজে ফিজিক্স নিয়ে পড়ব।

অতনুর ঘরে ঢোকার মুখে সিঁড়ি আর বারান্দার মাঝামাঝি অবন্তী হঠাৎ হাতটা চেপে ধরল। শাসনের সুরে বলে উঠল অনেকটা মায়েদের মতো, চান্স পেয়ে ইঞ্জিনিয়রিং পড়বে না কেন?

—অপদার্থরা পদার্থ নিয়ে পড়ে।

—সবসময় ফাজলামি। আড়ি যাও, কথা বলব না।

ওরা দুজনেই বুঝল না, সেইদিন ওদের ভাব হওয়া শুরু হল। ধীরে ধীরে দুটো পবিত্র মন কাছাকাছি আসতে লাগল। দিনটা ছিল দোলের দিন। অতনুর কেমিস্ট্রি অনার্স। বিদ্যাসাগর কলেজ। ওরা একসাথে অঙ্ক করছে অতনুর দোতালার ঘরে। ফাল্গুনীর খুব ইচ্ছে করছে একবার অবন্তীকে দেখতে। অনুকে জিজ্ঞেসও করতে পারছে না। অবন্তী ইচ্ছে করেই এ ঘরে আসছে না। হঠাৎ অতনু বলল, যাই নীচে থেকে কিছু খাবার নিয়ে আসি। বলে বেরিয়ে গেল।

সুযোগের অপেক্ষায় ছিল অবন্তী। হাতে আবিরের থালা নিয়ে ঢুকল। ফাল্গুনীর দুগালে আবির মাখিয়ে দিল। তারপর চোখের এত ছোটো মৃদুকম্পনে বোঝাল আবির মাখানোর আবদার, সেটা বিশেষ সম্পর্ক না থাকলে বোঝার উপায় নেই। ফাল্গুনী আবির নিয়ে ওর মাথায় মাখিয়ে দিল। অবন্তী দৌড়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। একদৌড়ে আয়নার সামনে। এই প্রথম অবন্তীর নিজেকেই আয়নার ভেতর থেকে বার করে খুব আদর করতে ইচ্ছে করল। প্রেমের দেবতা বোধহয় জীবনের কোর্টে খেলা শুরু দিলেন। মনে মনে বললেন লভ অল। আসলে তা শূন্য-শূন্য। বছর দুই গুছিয়ে প্রেম করল ওরা।

॥ ৩ ॥

অবন্তীর এখন ক্লাস ইলেভেন। গরমের ছুটি। হঠাৎ একদিন পেটের নীচের দিকে অসহ্য ব্যথা। কিন্তু পিরিয়ডের ডেট তো এখনও হয়নি। ভাবল গ্যাস অম্বল। সবাই যা ভাবে, কিন্তু ব্যথাটা বাড়ছে।

সন্ধেবেলা ডাক্তার দেখাতে গেল। ফাল্গুনীর আজ পড়ায় মন বসছে না। রাতে একটা অঙ্কের ছুতো নিয়ে গেল অনুদের বাড়ি। গিয়ে শুনল, একটা ইউএসজি করতে দিয়েছে। আর ব্যথা কমার ওষুধ দিয়ে দিয়েছে। একটা ওষুধ খাবার পর ব্যথা অনেক কম। নিশ্চিন্ত হল ফাল্গুনী। দুদিন পর ধরা পড়ল অ্যাপেন্ডিসাইটিস। এই বয়সি মেয়েদের সাধারণ রোগ। আজকাল ফাল্গুনীরর অবন্তীকে তুই বলতে মুখে বাধে। আবার সবার সামনে তুমি বলতেও লজ্জা লাগে। কারণ সেটা আশির দশক। আজ ওসব সমস্যা নেই।

নার্সিংহোমে ভর্তি হল অবন্তী। সবরকম পরীক্ষা হবে, তারপর অপারেশন। জানে ছোটো অপারেশন, তাও ওইদিন টেনশন হচ্ছিল ফাল্গুনীর। অপারেশনের পর বেডে দিল অবন্তীকে। প্রসাধনহীন গোলাপি ওষ্ঠ, ঈষৎ পীতাভ ফরসা চিবুকে চোখের কোণ থেকে বেয়ে আসা শুকনো একটা জলের রেখা। অজ্ঞান হবার আগের মুহূর্তে কষ্টের প্রকাশ। ফাল্গুনীর বুকে একটা মোচড় দিল। সবাই রয়েছে, তাও হাতটা নিশপিশ করে উঠল, একটু মাথায় হাত বুলিয়ে দেবার জন্য। নার্স এসে সবাইকে বার করে দিল। ভিজিটিং আওয়ারে একজন করে আসতে বলল।

ক্রমশ…

বাঁকুড়ার মণিমাণিক্য ( পর্ব ২ )

কুমারী নদী থেকে ‘মিস্টেরিয়াস আইল্যান্ড’-দের আরও একটু কাছে থেকে দেখা গেল, উঁচু চ্যাটানো পাথুরে জমি জল থেকে মাথা তুলে রয়েছে। কিছু গাছপালাও রয়েছে ওই দ্বীপগুলিতে। মাঝি দুই নদীর সঙ্গমস্থল দেখিয়ে আমাদের জানাল, গ্রীষ্মে জল কমলে সঙ্গমটা পরিষ্কার দেখা যায়। নৌকা এবার ড্যামের দিকে এগোতে লাগল। আমরা যাব অন্য পাড়ে পরেশনাথ শিবমন্দির ও কালী মন্দির দর্শন করতে।

মিনিট ১৫ নৌকাবিহারের পর আমরা জলাধারের অন্য পাড়ে এসে পৌঁছোলাম। তীর থেকে উঠে এলাম পাকা রাস্তায়। গরমে সকলেরই বেশ তেষ্টা পেয়েছিল। প্রথমেই রাস্তার ধারের দোকান থেকে ঠান্ডা জলের বোতল কিনলাম। একটু বিশ্রাম করে আমরা কেউ নিলাম চা, আবার কেউ ঠান্ডা পানীয়।

দোকানের পাশেই সিঁড়ি শিবমন্দিরে যাবার জন্য। আমরা গন্তব্যে পৌঁছে দেখি, মহাদেবের এক উন্মুক্ত মন্দির, স্থানীয় অধিবাসীদের কাছে যা পরম পবিত্র স্থান। ড্যাম তৈরির সময় মাটি খনন করা হলে, ওই লিঙ্গাকৃতি অবয়ব খুঁজে পাওয়া যায়। শিবলিঙ্গের চারিধারে দেখতে পেলাম আরও বেশ কয়েকটা প্রস্তরমূর্তি। অনেকেই বিশ্বাস করেন, কিছু মূর্তি জৈন প্রবর্তকদের। বহু মানুষ এখানে আসেন মহা শিবরাত্রি উদযাপন করতে। এবার আমরা এগোলাম কালীমন্দিরের পথে। ড্যামের উপরের রাস্তা দিয়ে মিনিট পাঁচেক হেঁটে অন্য পাড়ে গিয়ে পৌঁছোলাম। ডানপাশে ছোট্ট একটি মন্দিরে সুন্দর কালীমূর্তি।

বিকেল ৫টা বেজেছে। সূর্যের রং ও অবস্থান দেখে বুঝলাম, সূর্যাস্ত হতে আর বেশি দেরি নেই। আমরা রাস্তা থেকে নদীতীরে নেমে এলাম। ধীর গতিতে আমাদের নৌকা চলেছে। সূর্য হেলে পড়েছে পশ্চিমে। সূর্যের কমলা রং লুটিয়ে পড়েছে কংসাবতীর বুকে। নৌকা এগোচ্ছে পূর্ব দিকে, আর আমাদের দৃষ্টি পশ্চিম দিগন্তে। রক্তিম সূর্যের অর্ধেকটা জলের মাঝে, মেঘের গায়েও কমলা আভা। হঠাৎই সূর্যদেব পাহাড়ের পিছনে অস্তমিত হলেন, চারিদিকে তখনও তার স্তিমিত আলো। এক ঝাঁক টিয়াপাখি ডাকতে ডাকতে ফিরে চলল তাদের বাসায়। আমাদের নৌকার গতিও বেড়ে গেল। তীরে এসে নৌকা থেকে নেমে চলে এলাম আমাদের জন্য অপেক্ষারত গাড়িতে।

রাত পৌনে ৮টা নাগাদ গাড়ি নিয়ে আবার গেলাম ড্যামের কাছে। গাড়ি নির্দিষ্ট জায়গায় রেখে হেঁটে বেড়ালাম আলোকোজ্জ্বল ড্যামের রাস্তায়। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই ড্যামের দৈর্ঘ্য ১১.২৭ কিমি এবং নদীবুক থেকে উচ্চতা ৪১.১৫ মিটার। নদীর অববাহিকার আয়তন ৩৬২৫ বর্গকিলোমিটার। হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম ছোট্ট বাজার এলাকায়। দোকানপাট ধীরে ধীরে বন্ধ হচ্ছে একে একে। আমরাও ফিরে এলাম। রাত সাড়ে ৯টায় ডিনারের ডাক পড়ল। দুপুরের রান্নার মতো রাতের পদগুলিও ছিল বেশ সুস্বাদু।

Weekend Bankura

ভোর সাড়ে ৫টায় উঠে মুখ ধুয়ে রেলিং ঘেরা বারান্দায় এসে বসলাম। সকাল ৬টাতেই পেয়ে গেলাম কম-চিনির লিকার চা। একে একে স্নান সেরে যে যার পছন্দের মেনুতে প্রাতরাশ সেরে নিলাম। হোটেলের বিল মিটিয়ে ঠিক সকাল ১০টায় চেক-আউট করলাম। শুরু থেকেই মসৃণ রাস্তা। গাড়ি তেঁতুলচিটা, বেকিয়া হয়ে চলে এল ছেঁদুড়ি মোড়। এবার ডান দিকে বাঁক নিয়ে গাড়ি এগোল রানিবাঁধ-এর দিকে। রাস্তার দুই পাশে শুধুই সবুজ গাছের সমারোহ। মাঝেমাঝে কাশফুলের মেলা। আধ ঘন্টার মধ্যেই রানিবাঁধ পৌঁছে গেলাম। এবার পথের দু’পাশে হালকা জঙ্গল। রানিবাঁধ বাজার এলাকা বেশ ব্যস্ত মনে হ’ল। পরবর্তী মোড় থেকে আবার ডানদিকে বাঁক নিলাম ঝিলিমিলির পথে। ঝিলিমিলির দূরত্ব এখান থেকে আরও ২১ কিমি।

অপূর্ব সুন্দর রাস্তা। দু’পাশে শাল, পলাশ, শিমূল, পিয়াল ও মহুয়ার জঙ্গল। যা এখানে পরিচিত ‘১২ মাইলের জঙ্গল’ নামে। জঙ্গল এবার আরও ঘন, অন্তহীন। রাস্তার ডান পাশে জঙ্গলের সীমায় ওয়াচ টাওয়ার। কিছুদূর পরেই হাতি পারাপারের ‘সেফ জোন’। দলমা পাহাড় থেকে মাঝে মাঝে হাতি চলে আসে সুতানে বা ১২ মাইলের জঙ্গলে। কয়েক কিমি এগোনোর পর বাঁ দিকে পথ এগিয়েছে সুতানের জঙ্গলের দিকে। কিছুটা এগোলেই ডানদিকে অম্বিকানগর যাবার পথ।

মধু যামিনী রে… ( পর্ব-০১)

আজ শনিবার। অবন্তীর সেবালয়-মঠে যাওয়ার দিন। মেডিটেশনের ক্লাস আছে। মাঝেমধ্যে আধ্যাত্মিক পদার্থবিদ্যা নিয়ে কিছু লেকচারও শোনে। অনেক কঠিন বক্তব্য সহজ করে বুঝিয়ে দেওয়া হয় সেখানে। যেমন একদিন শুনছিল, পৃথিবীর সব কিছু যেমন সোনা, লোহা, গাছপালা সব প্রাণী এমনকী মানুষ-ও প্রটোন, নিউট্রন, ইলেকট্রন দিয়ে তৈরি। তা-ও কত হানাহানি, মারামারি, কত লড়াই, ছলচাতুরী। কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত সেই কণাতেই সব কিছুর চির সমাপ্তি। সময় বলে কিছু নেই। মহাকাশে তা সব অসীম, অনন্ত। বেশ লাগে অবন্তীর।

ফাল্গুনী বরাবরই ভালো বক্তা। আবৃত্তিও ভালো করত। পড়াশোনায় বেশ ভালো। পদার্থবিদ্যা ওর বিষয় ছিল। তবে মঠে আসার পর যেটা হয়েছে, সেটা হল শরীরের জৌলুস। একটা আলাদা দীপ্তি। গোধূলির আকাশে যে আভাটা দেখা যায়। গেরুয়া বস্ত্রে গাল দুটো মনে হয় আবির মাখা দুধে-আলতা। সত্যিই যেন ভগবানবুদ্ধ।

আজ একটু গঙ্গার ধারে বসতে ইচ্ছে করছে অবন্তীর। কারণ আজ রাখিপূর্ণিমা। ওইদিন প্রথম, জীবনে প্রথম ফাল্গুনীকে অপমান করেছিল অবন্তী। তখন ওর গানের সাথে বিকেলে তবলা বাজাতে আসত মৈনাক। চালাক ধূর্ত মেয়েপটানোর মাস্টার। দেখতে সুন্দর না হলেও একটা চটক ছিল। আর ছিল জামা-কাপড়, সাজের বাহার।

ফাল্গুনী মাঝেমধ্যে আসত অবন্তীর কাছে কিছু বাংলা লেখা নিয়ে সেটা মুখ্য উদ্দেশ্য নয়, মূল লক্ষ্য ছিল দেখা করা। বাড়িতে ঢোকার ছাড়পত্র হল অবন্তীর দাদা অতনুর বন্ধু ছিল ফাল্গুনী। সেদিন গানের রেওয়াজ করার সময়ে ফাল্গুনী উপস্থিত। অবন্তী ইচ্ছে করেই হারমোনিয়াম নিয়ে মৈনাকের পাশে বসল। ফাল্গুনীর দিকে মিষ্টি হেসে ওকে আটকে রাখল।

ফাল্গুনীর মনে তখন সমগ্র পৃথিবী আর অবন্তীর মধ্যে বাছতে বললে ও অবন্তীকেই বেছে নেবে। ভরা শ্রাবণে গান শুরু হল শাওন গগনে ঘোর ঘনঘটা নিশীথ যামিনীরে…। রাগ পিলু-মল্লার। তখন অবন্তী একাদশে পড়ে। বয়স সতেরো হবে। গানটির তাল ত্রিতাল। ষোলো মাত্রার তাল। বেশ কঠিন। তালের ঠেকা, ধা ধিন ধা। ধা ধিন ধিন ধা। না তিন তিন না। তেটে ধিন ধিন ধা।

অবন্তী সেদিন পরেছে লাল টুকটুকে টপের নীচে জাম রঙের গাঢ় স্কার্ট। একটু উঠে আছে জঙ্ঘার ওপর। ফাল্গুনী আড়চোখে দেখল মুলতানি মাটির মতো কোমল উন্মুক্ত সেই ত্বকের ওপর তবলা থামিয়ে মৈনাক হাত দিয়ে তালটা বুঝিয়ে দিচ্ছে। মৈনাকের হাতটা ঊর্ণনাভর মতো অবন্তীর জানুর বেশ খানিকটা ওপরে খেলা করছে। আর ফাল্গুনীর মনে হল অবন্তীর ধানের তুষের মতো অদৃশ্য সোনালি রোমগুলো শিহরিত হচ্ছে।

হিসাব মিলছে না ফাল্গুনীর। ফাল্গুনী বুঝল অবন্তীর প্রশ্রয় আছে। মনের কোণে যে-কষ্টের ধূমযোনি জমল, তা থেকে রক্তক্ষরণ শুরু হতে লাগল। অঙ্ক বিজ্ঞান সব গুলিয়ে যাচ্ছে। ও আর থাকতে পারল না। বাধ্য হয়ে বলে ফেলল, এবার উঠি।

অবন্তী মুচকি হেসে বলল, দাঁড়াও রাখিটা পরে যাও।

ফাল্গুনীর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। তা-ও মৈনাকের সামনে নিজেকে সামলে নিয়ে হাতটা বাড়িয়ে দিল। দুবছর ধরে চুটিয়ে প্রেম করছে অবন্তী আর ফাল্গুনী। এই দুবছরে, গত বছর বিজয়া দশমীর দিন ছাদের ঘরে অবন্তী প্রণাম করার পর, ফাল্গুনী শুধু কপালে একটা চুমু খেয়েছিল। উত্তরে অবন্তী ঠোঁটে একটা চুমু খেয়ে বলেছিল, যাবে না কিন্তু, মিষ্টি খেয়ে যাবে।

ফাল্গুনী হেসে উত্তর দিল, এরপরে আবার মিষ্টি! মুখ নষ্ট হয়ে যাবে তো।

—ধ্যাৎ, অসভ্য!

সেদিন বোধহয় একটু অসভ্য হতে বলেছিল ফাল্গুনীকে। আসলে অবন্তী ভীষণ ভালো মেয়ে সুন্দরী সরল এক সাদাসিধে মেয়ে কোনও জটিলতা ওর চোখে নেই। ফাল্গুনী চায় ওকে রাজার মতো আদর করতে। গোপনে লুকিয়ে নয়। তাই সবকিছু হৃদয়ে গোপন প্রকোষ্ঠে তুলে রাখতে চায়। সেটা অবন্তী বোঝে। প্রেমের সততা মেযো বুঝতে পারে। তাই ফাল্গুনী তার প্রাণের থেকেও প্রিয়। কষ্টিপাথরে ফেললে দুজনেই খাঁটি সোনা। তবুও সেদিন অবন্তী ওইরকম করল কেন? সেই গল্পই আজকে বলব।

বাঁকুড়ার মণিমাণিক্য ( পর্ব ১ )

৬টা ৪৫-এ ভদ্রকালী থেকে আমাদের যাত্রা শুরু হল। হিন্দমোটর ফ্যাক্টরির শর্টকাট রাস্তা দিয়ে গাড়ি রঘুনাথপুরে চলে এল ৭টা নাগাদ। কিছুক্ষণের মধ্যেই ইন্ডিগো ডানকুনি পেরিয়ে এনএইচ-২ ধরে নিল। জাতীয় সড়কের দু’পাশেই সবুজের মেলা— আম, কলা, নারকেল আর কৃষ্ণচূড়া চোখে পড়ছে বেশি। মুকুটমণিপুরের দূরত্ব কম নয়, এনএইচ-২ ধরে প্রায় ২০০ কিমি, আর এনএইচ-১৬ দিয়ে প্রায় ২৩০ কিমি। সময় লাগবে কম করেও সাড়ে ৫ ঘণ্টা।

ড্রাইভার বুম্বা-র বিশ্বস্ত হাতে গাড়ি ছুটছে দুরন্ত গতিতে। রাস্তার বাঁ পাশে অনেকটা জায়গা জুড়ে কাশফুলের রাজত্ব। ডান পাশে কলকাতা ফেরার রাস্তায় বেশ লম্বা জ্যাম। মশাগ্রাম পার করতেই চলে এল দ্বিতীয় টোলগেট। এরপর শক্তিগড় পেরোলাম। গলসি পেরোলাম, বাঁয়ে মিনিট ২০ পরে “পানাগড় মিলিটারি ক্যাম্প’-এর বিশাল এলাকা শুরু হ’ল। চলে এলাম কোটগ্রামে। ডান দিকে ‘পানাগড় ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক”-এর এলাকা।

গাড়ি মুচিপাড়া-র রাস্তা ধরল। এখান থেকে বাঁকুড়া আরও ৫৫ কিমি দূরে। বাঁকুড়া রোডের ওভারব্রিজে লম্বা জ্যাম। সাড়ে ১০টা নাগাদ দুর্গাপুর ব্যারেজ— নীচে দামোদর। এখন চলেছি বড়জোড়া রোড ধরে। মিনিট ১০ যাবার পরেই রাস্তার দু’পাশে ঘন জঙ্গল শুরু হ’ল৷ প্রধানত শাল-পলাশের এই বন এখানে পরিচিত ‘তিন মাইলের জঙ্গল’ নামে। ফুলবেড়িয়া পার করে বিনকা, চলেছি এসএইচ-৯ ধরে। আমরা সোজা এগোলাম, আর ডান দিকের রাস্তায় ৩ কিমি এগোলেই বাঁকুড়া টাউন।

কয়েক কিমি এগোতেই আবার জঙ্গল। ধরমপুর পেরিয়ে গেলাম দুপুর সাড়ে ১২টায়। এখন পথের দু’পাশে সবুজ ধানখেত। হাতিরামপুর পেরোতেই আবার দু’পাশে জঙ্গল। বাঁকুড়ায় এত গাছপালা আর জঙ্গল, ভাবলেই মনে আনন্দ জাগে! এবার ডান দিকে বাঁক নিয়ে মুকুটমণিপুরের পথে চলে এলাম। কিছুটা এগিয়েই ‘আরণ্যক রিসর্ট”-এর গেট পেরিয়ে গাড়ি এসে থামল রিসর্টের সবুজ পরিবেশে। গাড়ি থেকে লাগেজ নামিয়ে আমাদের জন্য নির্দিষ্ট চার-শয্যার ঘরে ঢুকে পড়লাম।

দ্রুত স্নান সেরে চলে এলাম ডাইনিং রুমে। লাঞ্চ শেষ করে ঘর বন্ধ করে গাড়িতে করে চলে এলাম মুকুটমণিপুরের বিশাল জলাধারের কাছে নৌকা বিহারের জন্য। গোড়াবাড়ি অঞ্চলের মুকুটমণিপুর উন্নয়ন পর্ষদ নৌকা বিহার পরিষেবা সমবায় সমিতি লিমিটেড দ্বারা পরিচালিত জেটির কাছে এসে পৌঁছোলাম। নির্দিষ্ট জায়গায় গাড়ি পার্ক করে, ১২০০ টাকায় একটি নৌকা বুক করলাম ৩ ঘণ্টার জন্য।

কংসাবতী ড্যামের অথৈ জলরাশির মাঝ দিয়ে এগিয়ে চলল যন্ত্রচালিত নৌকা। ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম, মাটির তৈরি এই ড্যাম দৈর্ঘ্যে ১১ কিলোমিটার, যা নির্মিত হয়েছিল পশ্চিম বাংলার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী ডা বিধান চন্দ্র রায়ের তত্ত্বাবধানে। জলের মাঝে মিষ্টি হাওয়ায় মন-প্রাণ জুড়িয়ে যাচ্ছিল। আমাদের প্রথম গন্তব্য ডিয়ার পার্ক। ক্যামেরায় চোখ রাখলে তীরের হদিশ পাওয়া যায় না। দূরে জলরাশির বুকে দেখা যাচ্ছে ৩-৪টি রহস্যময় দ্বীপ। প্রায় ৪০ মিনিট পরে নৌকা এসে ভিড়ল নদীতীরে। আমরা ধীরে ধীরে নেমে এলাম ডাঙায়।

কয়েক মিনিট হেঁটে উঠে এলাম রাস্তায়। বনপুকুরিয়ায় অবস্থিত ডিয়ার পার্ক-এ পৌঁছোতে হবে ভ্যান-রিক্সায় চেপে। অদূরেই টিকিট ঘর, আমরা যাতায়াতের ৪টে টিকিট কেটে চড়ে বসলাম ভ্যানে। নদীতীর থেকে বনপুকুরিয়া গ্রামের দূরত্ব ৩ কিমি। পিচ উঠে যাওয়া রাস্তার অবস্থা ভালো নয়, তবে দু’পাশের সবুজ গাছপালা মনে এনে দেয় এক দারুণ ভালোলাগা। ১০-১২ মিনিটেই পৌঁছে গেলাম ডিয়ার পার্কে। উঁচু জাল দিয়ে ঘেরা পার্ক আর তার মাঝে বেশ কয়েকটি ছোটো-বড়ো, চিতল হরিণ ঘুরে বেড়াচ্ছে।

Bonpukuria Deer park

গ্রামের কয়েকটি ছোটো ছেলেমেয়ে পার্কের বাইরে ৫-১০ টাকায় বিক্রি করছে কয়েক রকম পাতার গোছা, হরিণগুলোকে খাওয়ানোর জন্য। বিক্রেতাদের কাছ থেকে আমরা কয়েক গোছা পাতা কিনে নিরীহ হরিণদের খাওয়ালাম। মিনিট ১০ সেখানে কাটিয়ে আমরা আবার ভ্যানে চেপে ফিরে চললাম নদীর তীরে। নৌকায় উঠে বসতেই মাঝি ইঞ্জিন স্টার্ট করল। এবার চলেছি কংসাবতী ও কুমারী নদীর মোহনায়।

বরফ-ঠান্ডা দাম্পত্যে উষ্ণতার ছোঁয়া

কথায় বলে, শিলনোড়া একসঙ্গে থাকলে ঠোকাঠুকি লাগবেই। অর্থাৎ, বৈবাহিক জীবনে ঝগড়া, মনোমালিন্য এসব চলতেই থাকে। এতে সম্পর্ক ভেঙে যায় না। কিন্তু ঝগড়া-অশান্তি মাত্রাছাড়া হলেই বিপত্তি। একই ছাদের তলায়, একই বিছানায় রাত কাটালেও শারীরিক কিংবা মানসিক ভাবে স্বামী-স্ত্রী দুই মেরুতে অবস্থান করেন। এই পরিস্থিতিকে বলা হয় বরফ-শীতল সম্পর্ক।

এই প্রসঙ্গে একটি ঘটনার উল্লেখ করছি। দুই বন্ধুর মধ্যে এক বন্ধুকে বলতে শোনা গেল, ‘রেস্তোরাঁয় ফিরে চল, বাড়ি যেতে ভালো লাগছে না।’

– ‘কেন?’

‘বিকজ, নোবডি ইজ ওয়েটিং ফর মি দেয়ার।’

অর্থাৎ, কোনও দাম্পত্য সমস্যা থেকেই জনৈক বন্ধুর ওই আক্ষেপ-পূর্ণ সংলাপ। অবশ্য শুধু ওই ব্যক্তি একা নন, খোঁজখবর নিলে এমন আরও অনেকের কাছ থেকেই দাম্পত্য-অসুখের কথা শোনা যাবে। হয়তো এই অসুখী দম্পতির সংখ্যাটা পঞ্চাশ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। তবে, অসুখী দাম্পত্যের পরিণতি যে সবার ক্ষেত্রে বিবাহবিচ্ছেদ পর্যন্ত গড়ায়, এমন নয়। কিন্তু অশান্তি চরম পর্যায়ে যাওয়া মানেই স্বামী-স্ত্রী উভয়ের ক্ষতি।

আসলে, পরিপূর্ণ সুখ না পেলেও, প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে শান্তিতে বেঁচে থাকাটাই কাম্য। কারণ, জীবন বহমান। মানসিক চাপ নিতে- নিতে কখন যে যৌবন উবে গিয়ে বার্ধক্য স্বাগত জানাবে, তা টেরও পাওয়া যাবে না। অথচ, জন্ম থেকে স্বাভাবিক মৃত্যু পর্যন্ত সময়ের মধ্যে, বিবাহিত জীবনের মেয়াদ-ই বেশি। তাই এই বিবাহিত জীবনে অসুখী হওয়া মানে, জীবনটাই বৃথা হয়ে যায়। অতএব, দাম্পত্য জীবনে সমস্যামুক্ত থাকতে হবে।

দাম্পত্যে অসুখী থাকার পিছনে নানারকম সমস্যা থাকে। কারও আর্থিক, কারও মানসিক, কারও শারীরিক, কারও-বা আবার থাকে সাংসারিক ঝামেলা। অনেকের দাম্পত্যে আবার সমস্যা তৈরি হয় নিজেদের ভুলের জন্য। কীভাবে দাম্পত্য-জীবনকে সুখী করতে হয়, সেই আদবকৌশল জানেন না অনেকে কিংবা অনেকে বেশি আত্মকেন্দ্রিক কিংবা কেরিয়ারিস্ট হওয়ার কারণে, জীবনসঙ্গীকে অবহেলা করেন এবং এর মাশুল গোনেন, বঞ্চিত হন সঠিক দাম্পত্যসুখ থেকে।

উষ্ণতা ফেরানোর পরামর্শ

  • শুধু সোশ্যাল স্টেটাস বজায় রাখার জন্য বিয়ে করবেন না। সঙ্গীকে আন্তরিক ভাবে ভালোবাসতে না পারলে কিংবা পছন্দ না করলে বিয়ে করা উচিত নয়। আর যদি তাই ঘটে থাকে, তাহলে সঙ্গীর ভালো গুণগুলির কথা ভেবে নতুন ভাবে ভালোবাসতে শুরু করুন এবং দাম্পত্যে উষ্ণতা উদ্ধার করুন।
  • সম্পর্কের অবনতি ঘটলে, এর কারণ অনুসন্ধান করুন। কারণ খুঁজে পেলে, হয় নিজে সমস্যার সমাধান করুন অথবা মনস্তাত্ত্বিকের পরামর্শ নিন।
  • আর্থিক কারণে যদি দাম্পত্য সম্পর্কের অবনতি ঘটে, তাহলে হয় দুজনে আলোচনার মাধ্যমে আয় এবং খরচের মধ্যে ভারসাম্য রেখে সমস্যা দূর করুন, নয়তো আয় বাড়ানোর উপায় খুঁজুন।
  • শ্বশুর, শাশুড়ি, ননদ কিংবা পরিবারের অন্য কারওর সঙ্গে যদি মানিয়ে না নিতে পারার কারণে মানসিক সমস্যা হয়, তাহলে জীবনসঙ্গীর উপর অভিমানে মুখ ভার না করে, বরং আলোচনার মাধ্যমে সমস্যামুক্ত হোন।
  • একে-অপরকে স্পেস দিন, সম্মান দিন এবং দোষ-ত্রুটি শুধরে নিয়ে ভালোবাসার চেষ্টা করুন।
  • রাগ, জেদ কমান। ধৈর্য রেখে সমস্যার সমাধান করুন। সমস্যা যতই গভীর হোক, ভেঙে না পড়ে ঠান্ডা মাথায় সমস্যা কাটাবার চেষ্টা করুন।
  • অহেতুক সন্দেহ করবেন না, পরস্পরের উপর বিশ্বাস রাখুন।
  • কোনও অনুষ্ঠান-উপলক্ষ্য ছাড়াই সঙ্গীকে উপহার দিন তার পছন্দের সামগ্রী।
  • দৈনন্দিন একঘেয়েমি কাটানোর জন্য মাঝেমধ্যে দুজনে রেস্তোরাঁয় খান এবং দূরে কোথাও বেড়াতে যান।
  • সম্পর্কের উষ্ণতা ধরে রাখার জন্য সেক্স খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই, শারীরিক তৃপ্তিলাভের চেষ্টা করুন। এরজন্য শারীরিক-মানসিক সুস্থতা জরুরি। যদি দুজনের কারও স্বাস্থ্যগত সমস্যা থাকে, তাহলে সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে রোগমুক্ত হোন। আর যৌনসঙ্গমের আগে সঠিক তৃপ্তিলাভের জন্য ফোরপ্লে জরুরি। তবে সঙ্গীর পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপারে জেনে-বুঝে নিয়ে তারপর শারীরিক মিলনে লিপ্ত হওয়া উচিত। মনে রাখবেন, কোনওরকম হঠকারী পদক্ষেপ শারীরিক মিলনের ক্ষেত্রে কাম্য নয়। সঙ্গীর অপছন্দের কোনও কিছু থাকলে, সেই বিষয়ে জোর খাটাবেন না। এতে, সঙ্গী মানসিক আঘাত পেতে পারেন এবং সম্পর্কের অবনতি ঘটতে পারে।

সম্পর্কে উষ্ণতা বজায় রাখার জন্য সবদিক বিচার-বিবেচনা করে চলা উচিত। বিশেষ করে, দৈনন্দিন একঘেয়েমি কাটানোর জন্য বয়সের কথা ভুলে শরীরে-মনে তারুণ্য বজায় রাখতে হবে। ইমেজ চেঞ্জ করতে হবে এবং প্রতিদিনই পরস্পরকে নতুন ভাবে আবিষ্কার করতে হবে। মনে রাখতে হবে, বিয়ে এবং সম্পর্ক টিকিয়ে রাখাটাও একটা শিল্প (আর্ট)। কারণ, বিয়ের প্রথম দিকে ভালোবাসা যতই নিবিড় থাকুক না কেন, সম্পর্কের বাঁধন একটি সরু সুতোর উপর দাঁড়িয়ে থাকে। অতএব, বোধ-বুদ্ধিকে পুঁজি করে, আর্থিক, মানসিক এবং শারীরিক ভাবে সচল থেকে উষ্ণতা ফিরিয়ে আনতে হবে কিংবা উষ্ণতা ধরে রাখতে হবে দাম্পত্য সম্পর্কে।

দিনে গৃহবধূ রাতে চর, রাধিকার নতুন চ্যালেঞ্জ

বাঙালি পরিবারের বউ হয়ে উঠেছেন সফল আন্ডারকভার এজেন্ট! এটা শুনে যারা বিস্ময় প্রকাশ করছেন, তাদের সব প্রশ্নের উত্তর দিতে Zee 5 –এ শিগ্গিরি হাজির হচ্ছেন রাধিকা আপ্টে৷ছবির নাম ‘মিসেস আন্ডারকভার’। দিনে বউ-রাতে স্পাই এমনই এক তাক লাগানো চরিত্রে এবার অভিনয় করছেন Radhika Apte৷ বঙ্গনারীর জয়জয়কার হবে এমনই এক চরিত্রের মধ্যে দিয়ে।এই নিয়ে বেশ উত্তজনার পারদ চড়ছে OTT Platform –এর দর্শকের মধ্যে।

অত্যন্ত পরিশ্রমী রাধিকার লক্ষ্য কিন্তু বরাবরই উঁচু তারে বাঁধা ছিল। আর তাই থিয়েটারের পাশাপাশি ফিল্মে কাজের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ২০০৯ সালে প্রথম ‘ঘো মালা আসলা হাভা’ নামে একটি মরাঠি কমেডি ফিল্মে সুযোগ পান। তারপর ‘শোর ইন দ্য সিটি’, ‘রক্তচরিত্র’, ‘আই অ্যাম’-এ অভিনয় করেন তিনি।অন্তহীন, মাঝি ছাড়াও সুজয় ঘোষের একটি শর্ট ফিল্ম, অহল্যা-তে অভিনয় করেন। রাজস্থানের পটভূমিকায় পার্চড ছবিতে কাজ করেছেন সম্পূর্ন ভিন্ন এক চরিত্রে৷

চ্যালেঞ্জিং চরিত্রে অভিনয় এর আগে অনেক করেছেন রাধিকা। সেক্রেড গেমস-এর তদন্তকারী Raw agent অঞ্জলি মাথুরের চরিত্রে চঞ্চল্য ফেলেছিলেন এই অভিনেত্রী৷ এবারের বাঙালি গৃহবধূ এবং একই সঙ্গে চর, দুটি ভিন্ন শেডের চরিত্রের চ্যালেঞ্জ নিতে এগিয়ে এসেছেন তিনি৷

এপ্রিলেই ওটিটি-তে রিলিজ হতে চলেছে Mrs Undercover ছবিটি।নতুন এই ছবিতে রাধিকার সঙ্গে স্ক্রিন শেয়ার করেছেন টলিউড অভিনেতা সাহেব চট্টোপাধ্যায়। রাধিকার চরিত্র দুর্গার স্বামীর ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে তাঁকে। রাধিকার শ্বশুরের ভুমিকায় দেখা যাবে বিশ্বজিৎ চক্রবর্তীকে। এছাড়াও, রাজেশ শর্মা, সুমিত ভিয়াসকে দেখা যাবে এই ছবিতে। সিরিজ পরিচালনা করেছেন আবির সেনগুপ্ত।

সম্প্রতি টিজার রিলিজ হয়েছে এই ছবির৷ সেই টিজারে অভিনেত্রীকে এই চরিত্রে দেখার পর থেকেই উত্তেজনা তুঙ্গে অনুরাগীদের।টিজারে রাধিকাকে বেশ অপটুভাবে ঘরকন্না সামলাতে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এই দুর্গাই আবার রাতের অন্ধকারে হয়ে উঠছে অপ্রতিরোধ্য সিক্রেট এজেন্ট।

টিজারে বোঝাই যাচ্ছে রাধিকাকে এবার বেশ কিছু অ্যাকশন দৃশ্যে দেখা যাবে। কিন্তু ছবিতে কমেডির উপাদান বেশি থাকবে বলেই মনে করা হচ্ছে । রোশনি ভট্টাচার্য, অমৃতা চট্টোপাধ্যায়ও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন বলেই খবর। ছবিতে অভিনয় করবেন একাধিক বাংলা সিনেমা-সিরিয়ালের অভিনেতা ও অভিনেত্রীরা৷ এছাড়া থাকছেন সুমিত ব্যাস।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে এই ছবির ফার্স্ট লুক প্রকাশ্যে এনেছিলেন রাধিকা। এখন মুক্তি আসন্ন– তাই প্রচারের কাজে গোটা টিমের ব্যস্ততা বেড়েছে৷ অনুশ্রী মেহতা পরিচালিত ‘মিসেস আন্ডারকভার’ কতটা দর্শকদের মনোগ্রাহী হয়ে উঠতে পারে সেটাই এখন দেখার।

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব