উদয়ের অস্তাচল (পর্ব ২)

এবার হারান মণ্ডল প্রায় মেঝেতে শুয়ে প্রণাম জানাল অমিয়বাবুকে। বৈদ্যনাথবাবুও সসম্ভ্রমে আরও একবার হাতজোড় করে নমস্কার জানাল। অমিয় আর একটা সিগারেট জ্বালিয়ে ধোঁয়া ছাড়লেন।

—বাবা চেয়েছিলেন আমিও বাবা-ঠাকুরদার মতো প্রজাপালন আর তথাকথিত জমিদারির কাজকর্ম দেখে জীবনটা কাটিয়ে দিই। কিন্তু আমার লক্ষ্য ছিল অন্য। আমি চেয়েছিলাম বলরামপুরের গণ্ডি পেরিয়ে অনেক অনেক দূরের পৃথিবী দেখতে! নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে। সেই কুড়ি বছর বয়সে আমাকে পেয়ে বসেছিল বিশ্বজয়ের নেশা। এই নেশা আমাকে টেনে নিয়ে গেল অনেক অনেক দূরে। একটা স্কলারশিপ পেয়েছিলাম। এক লাফে আরব সাগর পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম ইংল্যান্ড! সেই সময় আমাদের যুগের যুবকদের স্বপ্ন ছিল শিক্ষা-দীক্ষা আর উন্নতির শেষ সীমানা— ইংল্যান্ড-লন্ডন।

অমিয় থামলেন। অদ্ভুত একটা হাসিতে মুখ ছেয়ে গেল! বৈদ্যনাথবাবুর মনে হল— অমিয়বাবু বুঝি নিজেকেই ব্যঙ্গ করছেন। কিন্তু মুখ তুলে অমিয়বাবুর গল্প শোনার জন্য চেয়ে রইল। হারানও গাঙ্গুলিবাড়ির বড়ো কর্তার গল্প শুনছিল অবাক হয়ে। একবার শুধু রান্নাঘরে গিয়ে মাছের ঝোলটা নামিয়ে ভাত বসিয়ে এল।

রাতের হাওয়ার স্বরে আবার শুরু করলেন অমিয়নাথ — কুড়ি বছরের বিশ্বজয়ের নেশা আফিমের নেশার চেয়েও জোরালো। ওদেশে পৌঁছে মনে হয়েছিল আমার যোগ্য স্থানে পৌঁছে গেছি। ওই যে ইংরাজিতে বলে না ‘আই হ্যাভ অ্যারাইভড’, অনেকটা সেই রকম। আবার একবার সেই অদ্ভুত হাসিতে অনিন্দ্যসুন্দর মুখখানি ছেয়ে গেল।

অমিয়নাথ চেয়ার ছেড়ে জানলার দিকে এগিয়ে গেলেন। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি হয়ে চলেছিল তখনও। মাঝে মাঝে দূরে নিঃশব্দ বিদ্যুৎ চমকের আলোয় ওর মুখটা কেমন যেন রহস্যময় দেখাচ্ছিল। মনে হল স্টেশনের কোয়ার্টারের জানালায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টিভেজা আকাশ পানে চেয়ে যেন নিজের পুরোনো দিনের স্মৃতির গবাক্ষ উন্মুক্ত করে নিজেকেই দেখছেন অমিয়।

ফিরে এল হারানের ডাকে— ‘মাস্টারবাবু, ভাত হয়ে গেছে, আসুন।’ খাবার ডাকে সম্বিত ফিরে পেলেন বৈদ্যনাথবাবুও অনুভব করলেন চিনচিনে খিদে। ‘আসুন, গরম গরম ভাত আর তাজা রুই মাছের ঝোল’, বলে উঠে পড়লেন।

খেতে বসে বিশেষ কথা হল না। ঠাট্টার ছলেই বৈদ্যনাথবাবু বললেন, ‘আসলে আজ খিচুড়ি আর ইলিশ মাছ ভাজার রাত।”

—ইলিশ মাছ পাওয়া যায় এখন? খেতে খেতে প্রশ্ন করলেন আমিয়।

—পাওয়া যায়, তবে আগের মতো স্বাদ আর নেই। উত্তর দিলেন বৈদ্যনাথবাবু।

খাবার থালা থেকে মুখ তুলে অমিয় বললেন, “ওদেশে, মানে ইংল্যান্ড-এ কিন্তু আসল পদ্মার ইলিশ পাওয়া যায়। সে জিনিস বোধহয় আপনারাও এখানে পান না।’

বৈদ্যনাথবাবু মাথা নাড়লেন, ‘না অত দামি জিনিস খাবার সামর্থ্য কোথায় এখানের লোকের? তাই আসেও না, এখানে পাওয়া যায় কোলাঘাটের ইলিশ। আজকাল তো শুনি পুকুরেও ইলিশের চাষ হচ্ছে।’

—পুকুরে! অবাক হয়ে হাসলেন অমিয়।

ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন বৈদ্যনাথবাবু।

খাবার পরে দু’জনেই তক্তাপোষের উপর পা’তুলে আরাম করে বসলেন। অমিয় পা ছড়িয়ে দেয়ালে হেলান দিয়ে জানলার ধারে বসে একটা সিগারেট ধরালেন। হারান একটা ছোটো বাটি এগিয়ে দিল ছাইদানি হিসাবে।

বাইরে বৃষ্টিঝরা অন্ধকার রাত্রির স্তব্ধতা ভেঙে ভরাট গলায় বলে উঠলেন অমিয়, ‘বৈদ্যনাথবাবু, বলুন তো মানুষের অ্যাচিভমেন্ট কী?’

কী উত্তর দেবেন বৈদ্যনাথবাবু?

উত্তরের অপেক্ষা না করে অমিয়-ই বলে চলল, ‘মানুষের উচ্চাশা মানুষকে কোথা থেকে কোথায় নিয়ে যায়। মানুষকে চাঁদে নামিয়েও তো ফেরত এনেছে। তবুও তার উচ্চাশা থেমে আছে?”

বৈদ্যনাথবাবু সম্মতিসূচক ভাবে ঘাড় নাড়লেন না। উচ্চাশা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এবার বলছে মঙ্গলে যাবে।

সম্মতিসূচক ঘাড় নেড়ে অমিয় বলল— এ এক অদ্ভুত মরীচিকা। আমি এর পিছনে ঘুরে বেড়িয়েছি ঘণ্টা, দিন, মাস, বছর। ডাক্তার হয়েছিলাম লন্ডনে গিয়ে। বিরাট সার্জেন-মানুষের অসুস্থ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ছুরি দিয়ে কেটে নতুন প্রত্যঙ্গ জুড়ে দিয়েছি। মৃত্যুপথযাত্রীকে মৃত্যু দেবতার হাত থেকে ছিনিয়ে এনে যমকে কাঁচকলা দেখিয়েছি। ইউরোপ, আমেরিকার বড়ো বড়ো হাসপাতালে কাজ করে প্রচুর

নাম-যশ আর অর্থ উপার্জন করেছি। একজন মানুষ পার্থিব সম্পদ বা সুনাম যা কিছু কামনা করতে পারে তার সবকিছু পেয়েছিলাম। এমনকী আমাদের দুনিয়ার সেরা পুরস্কারের জন্যও ‘নমিনেশন’ গেছে শুনে এসেছি।

বৈদ্যনাথবাবু সপ্রশংস দৃষ্টিতে আর একবার অমিয়নাথকে পা-থেকে মাথা পর্যন্ত জরিপ করে নিলেন।

—কিন্তু, এসবের কিছুই থাকে না বৈদ্যনাথবাবু! এমনকী, মনে হয়, কোনও দরকারও ছিল না। এ সত্যটা বুঝলাম অনেক দেরিতে! অমিয়র কণ্ঠে আন্তরিক আক্ষেপ প্রকাশ পেল। আমাদের একমাত্র মেয়ে ফুটফুটে ছোট্ট পরির মতো, পলিন। আমি তাই ওকে এঞ্জেল বলে ডাকতাম। মাত্র তিন দিনের জ্বরে সে আমাদের ছেড়ে চলে গেল!

উদয়ের অস্তাচল (পর্ব ১)

দিন-রাতের শেষ ট্রেনটা যখন চন্দনপুর স্টেশন ছেড়ে চলে গেল তখন একটা হাঁফ ছেড়ে বৈদ্যনাথবাবু দেয়াল ঘড়িটার দিকে তাকালেন— রাত ন’টা বেজে পাঁচ মিনিট। বহুদিন পরে ট্রেনটা প্রায় ঠিক সময়ে স্টেশন ছেড়ে গেল। বৃষ্টিটা কমেছে এখন। সারাদিন ধরে আজ ঝম ঝম করে বৃষ্টি হচ্ছিল।

পয়েন্টস ম্যান হারান মণ্ডল কেরোসিনের সিগনাল ল্যাম্প-টা হাতে নিয়ে ঢুকল। ‘বৃষ্টিটা একটু ধরেছে মাস্টারবাবু; চলুন এবার বন্ধ করুন দোকানপাট।’

—হ্যাঁ, চল, বলে খাতাপত্র বন্ধ করলেন বৈদ্যনাথবাবু। ম্লান হেসে চশমার কাচ পরিষ্কার করলেন শার্টের আস্তিনে। আজ মেল- টা লেট করেনি অনেকদিন পরে।

ঘাড় নেড়ে সামান্য হেসে হারান মণ্ডল বলল, ‘হ্যাঁ আজ ঠিক সময়ে চাট্টি গরম ভাত ভাগ্যে জুটবে।’

হারান ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করল। পিছনের দরজা দিয়ে কোয়ার্টারে চলে যাবে। মাস্টারবাবুর কোয়ার্টারেরই একটা ঘরে থাকে হারান। বৈদ্যনাথবাবু লণ্ঠনটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন, ‘বাইরের লাইটটা জ্বলছে তো?”

ঘাড় নাড়ল হারান মণ্ডল৷

—চল, বলে এগিয়ে গেলেন বৈদ্যনাথবাবু। এমন সময় প্ল্যাটফর্মের দিকের দরজায় মৃদু টোকা পড়ল।

বিরক্ত হল হারান। এই অসময়ে আবার কে এল? অবাক হয়ে বাইরের দিকে তাকালেন বৈদ্যনাথবাবু।

হারান মণ্ডল দরজার দিকে এগিয়ে যেতেই বাইরে থেকে ভরাট গলায় আওয়াজ এল, ‘দয়া করে দরজাটা খুলুন।’ বৈদ্যনাথবাবু ইশারা করলেন।

দরজা খুলতেই দেখা গেল আগম্ভক মাঝবয়সি, প্রায় ছ’ফুট লম্বা সম্ভ্রান্ত সুপুরুষ। হালকা ফ্রেমের অন্তরালে উজ্জ্বল একজোড়া চোখে সাগরের গভীরতা।

—ভিতরে আসতে পারি? দরজায় ভারী গলার আওয়াজ।

বৈদ্যনাথবাবু দু’পা এগিয়ে এসে আমন্ত্রণ জানালেন, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ আসুন।’

আগন্তুক কোনও ভণিতা না করে ভিতরে ঢুকে বললেন, ‘আপনাদের অসুবিধায় ফেলার জন্য ভীষণ দুঃখিত! ঠিক জানা ছিল না, গাড়িতে এক ভদ্রলোক বললেন এখানে নামলে বলরামপুর কাছে পড়বে আর বাস বা অন্য গাড়ি পেয়ে যাব। কিন্তু এখন দেখছি এখানে কোনও গাড়ি-ঘোড়া পাওয়া যাবে না।’ বৈদ্যনাথবাবু আগন্তুককে বসতে ইঙ্গিত করলেন।

—এখান থেকে বলরামপুর কাছে বটে কিন্তু আগের জংশন স্টেশনে নামলে ওখান থেকে রাতের বাসটা বা হয়তো শেয়ারের ট্যাক্সিও পেয়ে যেতেন।

পকেট থেকে বিদেশি সিগারেটের প্যাকেট বের করে একটি সিগারেট নিজের ঠোঁটে লাগিয়ে, প্যাকেটটা বৈদ্যনাথবাবুর সামনে এগিয়ে ধরলেন। বৈদ্যনাথবাবু হাতজোড় করে স্মিত হেসে মাথা নাড়লেন, ‘আমার চলে না।’

আগন্তুক সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করে একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে হাত জোড় করলেন, ‘আমি অমিয়নাথ গাঙ্গুলি, যাব বলরামপুর। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে, তা নাহলে রাতটা প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চিতেই কাটিয়ে দেওয়া যেত।’

বৈদ্যনাথবাবু লজ্জা পেয়ে জিভ বের করে বলে উঠলেন, “আরে না না, তাতে কী হয়েছে, পেছনেই আমার ডেরা। চলুন ওখানেই কষ্ট করে রাতটা না হয়…!’

—খুব খারাপ লাগছে। আপনাদের অযথা কষ্ট দিলাম। আন্তরিক বিনয়ের সঙ্গে বলে অমিয়নাথ কাঁধের ছোটো ব্যাগটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন।

—ছি ছি এমন করে বললে সত্যি সত্যিই নিজেকে অপরাধী বলে মনে হবে! বৈদ্যনাথবাবু জিভ কাটলেন।

গুঁড়ি গুড়ি বৃষ্টির মধ্যে কয়েক পা হেঁটেই স্টেশন মাস্টারের কোয়ার্টারে চলে এলেন, ‘আসুন স্যার’ বলে একটা নড়বড়ে হাতভাঙা চেয়ার এগিয়ে দিলেন বৈদ্যনাথবাবু। পরিচয় দিয়ে বললেন, ‘আমি বৈদ্যনাথ দে৷ এই পাণ্ডববর্জিত স্টেশনের চাকুরে, পরিবারের অন্যান্যরা কলকাতায় থাকে, তাই ওই হারান মণ্ডলই আমার সেবক, পাচক, মালি আবার স্টেশনের পয়েন্টসম্যান। তাই ও যেমন ‘অল ইন ওয়ান’ আমিও তেমনি ‘ওয়ান ইন অল।” নিজের রসিকতায় নিজেই হাসলেন বৈদ্যনাথ দে।

ছোটো কোয়ার্টারের ততোধিক ছোটো রান্নাঘর থেকে কেরোসিন স্টোভের সোঁ সোঁ আওয়াজ আসছিল। হারান রান্না চাপিয়েছে।

—পঁচিশ বছরে বিশেষ পরিবর্তন দেখছি না এখানের। জানালার বাইরে তাকিয়ে মন্তব্য করল অমিয়।

বৃষ্টিটা ততক্ষণে বেশ জোরে পড়তে আরম্ভ করেছিল, জ্বলন্ত সিগারেটের টুকরোটা বাইরে ছুড়তেই ছ্যাঁত করে আওয়াজ তুলল।

জানলা থেকে মুখ ফিরিয়ে খুব আলতো করে বলল অমিয়, ‘বলরামপুরের গাঙ্গুলিদের নাম শুনেছেন?

—না, মানে আমার তো এখানে বেশিদিন হয়নি। আমতা আমতা করতে লাগলেন বৈদ্যনাথবাবু।

হঠাৎ হারান রান্নাঘর থেকে প্রায় দৌড়ে এসে হাতজোড় করে প্রণাম জানিয়ে বলে উঠল, ‘অপরাধ মাফ করবেন! কত্তা কি জমিদার বাড়ির বড়ো ছেলে? যিনি …’ ইতস্তত করতে লাগল হারান।

ধীরে ধীরে ঘাড় নেড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে অমিয়নাথ বলে উঠল, ‘হ্যাঁ, আমিই জমিদার শঙ্করনাথ গাঙ্গুলির বড়ো ছেলে অমিয়নাথ। বাবার সঙ্গে মতের অমিল হওয়াতে বাড়ি আর দেশ দুটোই ছেড়েছিলাম।’

এমএনসি-র প্রেম (শেষ পর্ব)

একটু বাদেই রঘু এসে ঢোকে অবনীবাবুর কেবিনে। স্যার, আপনি আমাকে ডেকেছেন? হ্যাঁ, আচ্ছা তুমি শুনলাম এখানে একাই থাকো। তা খাওয়াদাওয়া কোথায় করো? কোনওদিন অফিসের ক্যান্টিনে, কোনওদিন বাইরের হোটেলে। এভাবেই চলে যাচ্ছে।

–তা, বিয়ের কথা ভাবছ না কেন? বিয়ে করবে না বলে ঠিক করেছ নাকি?

—না স্যার, ঠিক তা নয়। এখনও তেমন ভাবে ভাবিনি।

—আমি আমাদের অফিসের একটি মেয়েকে জানি। তুমি যদি রাজি থাকো তবে আমি তাকে বলে দেখতে পারি। তোমাদের জন্য না হয় ঘটকালির অভিজ্ঞতাও হয়ে যাবে। বলা তো যায় না রিটায়ারমেন্টের পর কাজে লাগতে পারে, কী বলো? বলেই হা হা করে হাসতে লাগলেন।

বললেন— এক কাজ করো আজ ছুটির পর তৈরি থেকো। বাড়ি ফেরার পথে আজ শিপ্রা হোটেলে আমরা তিন কাপ কফি খেয়ে বাড়ি যাব।

—স্যার, দু’কাপ কফি তো বুঝলাম। কিন্তু তিনকাপের রহস্যটা ঠিক বুঝলাম না।

—ওটাই তো সাসপেন্স। সময় হলেই বুঝতে পারবে। সন্ধে সাড়ে ছ’টায় অফিস থেকে বেরিয়ে যেও। শিপ্রা হোটেলের কফিশপেই বাকি কথাটা হবে।

রঘু কেবিন থেকে বেরিয়ে যেতেই, অবনীবাবু স্নেহাকে ইন্টারকমে ফোন করে বললেন— স্নেহা, তোমার সঙ্গে কিছু প্রয়োজনীয় কথা আছে। সন্ধে সাড়ে ছ’টায় আমার কেবিনে চলে এসো। আমরা একসঙ্গে বেরিয়ে যাব। পথে একটু কফি খেয়ে যাওয়া যাবে।

বলে ফোনটা রেখেই বাড়িতে ফোন করে স্ত্রীকে বললেন— আজ আমার ফিরতে একটু দেরি হবে। একটু বিশেষ কাজে আটকে গেছি। অন্যপ্রান্ত থেকে আওয়াজ ভেসে এল — বাড়ি না এলেই তো পারো। বাড়ি তো শুধু খাওয়া আর শোয়ার জন্য মনে হয়। মাল্টিন্যাশানাল আর কর্পোরেট এই কথাগুলো শুনে শুনে একেবারে ঘেন্না ধরে গেছে, বলেই ফোনটা সজোরে রেখে দিল ও প্রান্ত।

সন্ধে হতেই অবনীবাবু স্নেহাকে নিয়ে অফিস থেকে বেরিয়ে হাজির হলেন শিপ্রা হোটেলে। বললেন— চলো, ক্যাফেতে বসা যাক। ইতিমধ্যেই রঘুর ফোন এল, ‘স্যার, আমি রিসেপশন-এ পৌঁছে গেছি। আপনি কোথায়?”

অবনীবাবু বললেন— আমি ক্যাফেতে আছি। চলে এসো এখানে।

রঘু এসে হাজির হলে, স্নেহা ও রঘু একে অন্যের দিকে তাকিয়ে মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল। অবনীবাবু ব্যাপারটা সামাল দেবার জন্য ওয়েটারকে ডেকে তিন কাপ কফির অর্ডার দিলেন।

অবনীবাবু— স্নেহা ও রঘু, আমি তোমাদের সম্পর্কে খোঁজ খবর নিয়ে যা জেনেছি তাতে মনে হল, তোমরা একে অন্যকে ভালোবাসো কিন্তু তোমাদের ব্যাপারটা আর এগোয়নি। তাই আমাকেই সে কাজটা করতে হল। আমার মনে হয় তোমাদের মধ্যে সম্পর্কটা গড়ে উঠলে তোমরা দু’জনেই সুখী হবে। আজ সকাল থেকে বহু সমস্যা মেটাতে মেটাতে খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। এই কফিটা খেয়েই আমাকে একটু তাড়াতাড়ি যেতে হবে, আগামীকাল অফিসে দেখা হবে। অফিসিয়াল রিপোর্ট চাই কিন্তু, বলেই হাসতে হাসতে কফির দাম মিটিয়ে বেরিয়ে গেলেন হোটেল থেকে।

বাড়ি ফিরে দেখলেন সেখানকার পরিবেশটা বেশ থমথমে। তাই কথা না বাড়িয়ে জামা-কাপড় ছেড়ে ইজি চেয়ারে বসে স্নেহা আর রঘুর কথা ভাবছিলেন।

এমন সময় তাঁর স্ত্রী এসে বললেন— আমি আর তোমার সঙ্গে ঘর করতে পারছি না জানো। আজকাল তুমি আমার কোনও খোঁজ খবরই রাখো না। আজ আমার জন্মদিন সেটাও তুমি ভুলে গেছ। আমি ড্রাইভার গোপালকে ফোন করে যখন জানলাম যে তুমি একটি মেয়েকে নিয়ে হোটেলে গেছ, তখনই ঠিক করে ফেললাম। তোমার সঙ্গে আর থাকা যাবে না। এনাফ ইজ এনাফ। আমি ডিভোর্স চাই। কালই চলো উকিলের কাছে যাব।

অবনীবাবু কী করবেন ভেবে উঠতে পারছিলেন না। অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে মনে মনে ভাবলেন, আজ অন্যের ঘর বাঁধার তোড়জোর করে এলাম, আর আমার নিজের ঘরই টালমাটাল হয়ে গেল বলে মনে হচ্ছে।

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে অবনীবাবু মুখ খুললেন। বললেন— উমা, আমি কাল অফিস যাব না। তোমার সঙ্গে সারাদিন কাটাব। ডিভোর্সের কথাটা না হয় কালই ভাবা যাবে!

এমএনসি-র প্রেম (তৃতীয় পর্ব)

এর পরে বহু চেষ্টা করেও যখন রোহনকে রাজি করাতে পারলাম না, তখন ফিরে গেলাম আবার ওই আগের প্রেমিকের কাছে অর্থাৎ অভিজিৎ-এর কাছে। অভিজিৎ সব কথা শুনে বলল, তুমি কি ভেবেছ যে আমি তোমাকে বিয়ে করব? রোহন তোমাকে প্রত্যাখ্যান করাতে তুমি আমার কাছে এসেছ। তাই তোমার জন্য আমার রাস্তাও এখন বন্ধ। বুঝলাম আমি আমার নিজের পায়েই কুড়ুল মেরেছি।

আপনিই বলুন স্যার, এ ভুলের কি প্রায়শ্চিত্ত হয়? এখন আমার জীবনটা মনে হয় রুক্ষ আর শুষ্ক। তাই মাথা উঁচু করে বাঁচার রাস্তাগুলোও আর খুঁজে পাচ্ছি না। কার জন্য, কীসের জন্য বাঁচব বলুন তো? আমার বাবা, মা, ভাই, বোনেরা ঝাঁসিতে থাকে। ওদের কাছেও আজ আমি বড়ো ছোটো হয়ে গেছি জানেন। ওরাও হয়তো আর আমাকে বিশ্বাস করে না।

—আমি তোমার সব ঘটনাটাই শুনলাম। কিন্তু এতে ভেঙে পড়লে তো চলবে না। যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। তুমি যদি আমাকে সাহায্য করো তাহলে আমি তোমাকে আবার পথের সন্ধান দিতে পারি। নিজের কাকার মতো ভেবে যদি আমার কথা শোনো, আমাকে সাহায্য করো, তাহলে হয়তো আমি তোমাকে আবার মূলস্রোতে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারব। তবে তোমার সহযোগিতা ছাড়া সেটা সম্ভব নয়। আমার মনে পড়ে ছাত্র জীবনে আমরা বন্ধুরা মিলে কিছু ওয়াগন ব্রেকার-কে জীবনের মূলস্রোতে ফিরিয়ে এনেছিলাম। সে কথা অন্যদিন তোমাকে শোনাব। আচ্ছা, তুমি বলো তো, এই অফিসে এমন কোনও ছেলে আছে যে-তোমার প্রতি দুর্বলতা দেখিয়েছে কোনওদিন?

—আছে, কিন্তু আমি তাকে কখনও পাত্তা দিইনি।

—ছেলেটি কি সবদিক থেকে ভালো নয়?

—না, ঠিক তা নয়। আসলে আমি তখন অন্যের সঙ্গে এনগেইজড তাই।

—কী নাম বল তো? এত কষ্টের মধ্যেও স্নেহার মুখে যেন একটু মুচকি হাসির ঝলক দেখা গেল।

স্নেহা উত্তর দিল— রঘু।

—ও, তোমাদের ডিপার্টমেন্টের রঘু! ও তো খুব ভালো ছেলে শুনেছি। পড়াশোনায় যেমন ভালো, ব্যবহারের দিকেও তেমন ভালো। ও আবার কখনও প্রপোজ করতে পারে এমনটা কেউ দেখে বলতে পারবে না। আচ্ছা স্নেহা, সত্যি কথা বলো তো— রঘুকে তোমার অপছন্দ নয় তো? যদি রঘু তোমায় বিয়ে করতে চায়, তবে তুমি রাজি কিনা শুধু এটুকু বললেই চলবে।

স্নেহা কোনও উত্তর দিল না। অবনীবাবু বুঝলেন স্নেহার মত আছে। নীরবতাই সম্মতির লক্ষণ। স্নেহাকে উদ্দেশ্য করে বললেন— তুমি আজ যাও। খুব শীঘ্রই হয়তো আমাদের আবার দেখা হবে। আর ভেঙে পোড়ো না বুঝলে! অবনী কখনও হারতে শেখেনি জানো। তোমার সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে আমি নিশ্চিত।

স্নেহা বেরিয়ে গেলে অবনীবাবু হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলেন রাত হয়ে গেছে। তাই অফিসে থেকে বেরিয়ে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হলেন। পরের দিন অফিসে পৌঁছেই মি. তেওয়ারির কাছে গিয়ে তেওয়ারির লুকোনো ক্যামেরায় তোলা মি. সন্দীপ চাড্ডার আপত্তিজনক ছবিগুলো দেখে ফিরে এলেন নিজের কেবিনে। ডেকে পাঠালেন বিনয় রাজদান-কে। তাঁকে বললেন— মি. চাড্ডাকে টারমিনেট করার চিঠিটা বানিয়ে চেয়ারম্যানের থেকে সই করিয়ে ওকে আজই হিসেবপত্র দিয়ে বের করে দিন।

চেয়ারম্যান-কে বলা হয়ে গেছে। সিকিউরিটিকে বলবেন যেন ওকে চিঠি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মেন গেটের বাইরে ছেড়ে আসে আর ভেতরে যেন ঢুকতে না দেয়।

রাজদান— স্যার, মনে হয় টারমিনেটের দরকার হবে না। ব্যপারটা জেনে গেলে ও নিজেই সম্ভবত ‘রেজিগনেশন’ দিয়ে চলে যাবে।

অবনীবাবু— আপনি যাবার পথে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়র রঘুকে একটু পাঠিয়ে দেবেন তো?

‘ওকে স্যার’ বলেই মি. রাজদান বেরিয়ে যান কেবিন থেকে।

সমাজে পুরুষদের সুশিক্ষা জরুরি

‘বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও’ আসলে এখন ‘মেয়েদের সহানুভূতি দেখাও’-এ পরিণত হয়ে গেছে। এমনিতে তো মেয়েদের উপর অত্যাচার আর ধর্ষণের ঘটনা বাড়ছে। আর এক্ষেত্রে যুগযুগ ধরে রাজা-মহারাজারা এটাই প্রমাণ করেছেন যে, অন্য দেশে আক্রমণ করলে যেমন আর্থিক লাভ হয়, ঠিক তেমন-ই নারীদেরও অধিকার করা যায় সহজে। অর্থাৎ, যুদ্ধ মানেই মেয়েদের ধর্ষণ করার যেন রাষ্ট্রীয় অনুমতিপত্র সৈনিকদের হাতের মুঠোয়। এ বড়ো বেদনাদায়ক অধ্যায়।

গত কয়েকদিন যাবৎ কলকাতা সরগরম হয়ে আছে তিলজলায় সাত বছরের একটি নাবালিকার উপর যৌন নির্যাতন ও খুনের ঘটনায়৷ উত্তরপ্রদেশের আম্বেদকর জেলায় গত বছর অক্টোবর মাসে একটি ১৫ বছর বয়সের মেয়ে আত্মহত্যা করে। কারণ, টানা দু’দিন তাকে ধর্ষণ করা হয়েছিল এবং পুলিসে অভিযোগ জানানোর পর শুধু মেডিকেল টেস্ট ছাড়া আর কিছুই হয়নি। এই ঘটনা থেকে এটাই মনে হয়— মেয়েদের বাঁচানোর পরিবর্তে, এ যেন মেয়েদের মরতে দাও অবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ধর্ষণের পর মেয়েদের কী পরিস্থিতি হয়, সুপ্রিম কোর্ট-এর সাম্প্রতিক এক রায়ে বিষয়টি সামনে এসেছে। এক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্ট সংসদীয় আইন সংশোধনের কথা উল্লেখ করে জানিয়েছে, ধর্ষণের শিকার হওয়া মেয়েরা এবার থেকে ২৪ সপ্তাহ পর্যন্ত গর্ভপাত করার অনুমতি পাবেন এবং বিবাহিত ধর্ষিতারাও এই অধিকার পাবেন।

দুঃখের বিষয় এই যে, আজও ধর্ষণ হয়, আজও উচ্চ আদালত পর্যন্ত ধর্ষণের মামলা গড়ায়, আজও মেয়েদের আগলে রাখতে হয়, আজও এই ভয় কাজ করে যে, অসাবধান হলে মেয়েরা, তা সে সাবালিকা বা নাবালিকা, যে বয়সেরই হোক– এই পাশবিকতার শিকার হবে।

আসলে ধর্ষণের খুব কম মামলা প্রকাশ্যে আসে। কারণ, বেশিরভাগ রেপ ভিক্টিম চুপচাপ যন্ত্রণা সহ্য করেন। ধর্ষিতার মনে এই ভয় কাজ করে যে, সমাজ, পরিবারের লোকজন সবার কাছে সে তখন শুধুই ‘ধর্ষিতা’, শুধুই সহানুভূতির পাত্র । ‘তুমি বাইরে একা বেরিয়েছিলে কেন?’, ‘এমন ছোটোখাটো পোশাক পরেছিলে কেন?’, ‘এত রাত পর্যন্ত রাস্তায় ছিলে কেন?’ ইত্যাদি হরেক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় ধর্ষিতাকে।

রেপ কেস-এর ক্ষেত্রে পুলিশও তেমন গুরুত্ব সহকারে কাজ করে না সবসময়। আসলে তারাও জানে, দীর্ঘদিন মামলা আদালতে চলতে থাকলে, রেপ ভিক্টিম বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পিছু হটে, মামলা তুলে নিতে চায় এবং অনেকে তুলে নেয়ও। তাছাড়া রেপ ভিক্টিম-এর থেকে নয়, পুলিশের পকেট ভরে রেপিস্ট-এর থেকে৷ তাই সত্য ঢাকা পড়ে মেঘের আড়ালে।

যে-পুরুষটি ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ করল, তার দিকে সে ভাবে কেউ আঙুল তোলে না কিংবা ঘৃণার চোখে দেখে না। তাই আজ সময় এসেছে ছোটো থেকেই ছেলেদের সুশিক্ষা দেওয়ার। পুরুষদের শেখাতে হবে মেয়েদের সম্মান করতে।আর এই শিক্ষা একেবারে শৈশব থেকেই দেওয়া দরকার৷

ধর্ষিতা যখন আত্মহত্যা করে, তখন তা আরও বেদনাদায়ক হয়ে ওঠে পরিবারের লোকজনের কাছে। কারণ, তারা যেমন সন্তানকে হারান, পাশাপাশি সারা জীবন তাদের সামাজিক গ্লানিরও শিকার হতে হয়। কিন্তু ধর্ষিতার মাথায় তখন এসব কথা আসে না, সে শুধু তখন অপমানের কথা ভেবে ভেবে আত্মহননের পথ বেছে নেয়।

এমএনসি-র প্রেম (দ্বিতীয় পর্ব)

জন ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে, অবনীবাবু এইচআর হেড, মিস্টার বিনয় রাজদান-কে ডেকে পাঠান। মিস্টার রাজদান অবনীবাবুর কেবিনে এসে প্রবেশ করলে, অবনীবাবু বলা শুরু করেন— আচ্ছা, মিস্টার রাজদান, যদি কোনও কর্মচারীকে অফিস থেকে বের করে দেওয়া হয়, তবে কত তাড়াতাড়ি আপনি তাঁকে বের করতে পারবেন আমাকে বলতে পারেন?

রাজদান— স্যার, দু’-তিন ঘণ্টা লাগবে সব ফর্মালিটি পুরো করতে। তবে তেমন আপৎকালীন অবস্থায় পাঁচ মিনিটেও বের করা যেতে পারে।

অবনীবাবু— আগামীকাল প্রয়োজন হতে পারে। তবে এ খবরটা যেন কেউ জানতে না পারে আগে থেকে।

রাজদান— ওকে, তাই হবে স্যার।

অবনীবাবু— আচ্ছা, স্নেহা গুপ্তা-কে আপনি চেনেন? মেয়েটি কাজেকর্মে কেমন?

রাজদান— স্যার, ভালোই কাজ করছিল, তবে কিছুদিন ধরে ওর প্রোজেক্ট ম্যানেজার বলছে যে, মেয়েটা যেন কেমন উদাস হয়ে গেছে।

অবনীবাবু— কোনও প্রেমে-ট্রেমে পড়েনি তো? ওর কোনও প্রেমিক থাকলে তার থেকেই জেনে নিন না ব্যাপারটা কী? কারণ মেয়েটা আগে কাজের জন্য অনেক পুরস্কারও পেয়েছে। এমন একজন কর্মচারীর কাউন্সেলিং তো খুবই প্রয়োজন, তাই না? আপনি গিয়ে ওকে একবার আমার কাছে পাঠিয়ে দিন দেখি, আমাকে কিছু বলে কিনা। চেষ্টা করেই দেখি।

রাজদান বেরিয়ে গেলে অবনীবাবু ভাবতে থাকেন, কীভাবে কথা শুরু করবেন স্নেহার সঙ্গে। কারণ ওর মেজাজ ও হাবভাব দেখে খুবই হতাশ লাগছে আজকাল। নিশ্চয়ই এমন কিছু হয়েছে যা ও আমাদের সঙ্গে শেয়ার করতে পারছে না। দেখা যাক কী করা যায়।

স্নেহা গুপ্তা এসে অবনীবাবুর কেবিনে ঢোকে। অবনীবাবু স্নেহাকে বসতে বলে, ফোনে দু’টো চায়ের অর্ডার দেন। অবনীবাবুই প্রথম শুরু করেন—

—আচ্ছা, স্নেহা কেমন আছো বলো?

—ঠিক আছি স্যার।

—না, মোটেই তুমি ঠিক নেই। কয়েকদিন ধরেই দেখছি তুমি কেমন অন্যমনস্ক হয়ে থাকো। কোনও সমস্যা হলে আমাকে অনায়াসেই বলতে পারো। এর আগেও তুমি দেখেছ অনেকের ক্ষেত্রেই আমি সমস্যার সমাধানে সাহায্য করেছি।

–না স্যার, এটা নিতান্তই ব্যক্তিগত। এ ব্যাপারে আপনি কিছুই করতে পারবেন না।

—বলেই দ্যাখো না, পারি কিনা? আরে বাবা, আমার চুলগুলো তো এমনি পাকেনি? তুমি আমাকে বলতে পারো। সমস্যার সমাধান আমার কাছে না থাকলে আমি তোমাকে সোজাসুজি বলে দেব।

—স্যার, এটা আমার একান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার। এতে আপনি কিছুই করতে পারবেন না। তবুও আপনি যখন জানতে চাইছেন বলছি, যেহেতু আমি আপনাকে অন্য চোখে দেখি। তবে কারও সঙ্গে এই কথাগুলো শেয়ার করবেন না প্লিজ।

—ঠিক আছে, বলো।

—স্যার, আমি সংক্ষেপে আপনাকে বলছি। আমি একটি ছেলেকে ভালোবাসতাম কলেজ জীবনে। ওর সঙ্গে ঘর বাঁধব বলে ঠিকও করে ফেলেছিলাম। কিন্তু আমি এই শহরে চলে আসার পর ওর সঙ্গে যোগাযোগ ক্রমশ কমতে থাকে। এর পর ও আমেরিকাতে অন সাইটে চলে যায়। সেখান থেকে মাঝে মাঝে কথাবার্তা হতো কিন্তু ধীরে ধীরে তা কমে আসতে থাকে। যাকে ‘আউট অফ সাইট, আউট অফ মাইন্ড’ বলে আর কী। এই কোম্পানিতে এসে রোহন বলে একটি ছেলের সঙ্গে আমার অন্তরঙ্গতা ও বন্ধুত্ব বেড়ে যায়। একদিন সেই বন্ধুত্ব ভালোবাসায় পরিণত হয়। ধীরে ধীরে আমরা একে অপরের কাছাকাছি আসতে থাকি। দু’জনে বিয়ে করব বলে ঠিক করি। কিন্তু আমাদের ভাগ্য মনে হয় সেটা মেনে নিল না। রোহনের বদলি হয়ে গেল বেঙ্গালুরু। এই ক্ষেত্রেও প্রায় তাই হচ্ছিল, দেখা শোনা কম হওয়ায় দূরত্বটা একটু বাড়ছিল। কিন্তু আমরা নিজেরাই ঠিক করলাম আর দেরি নয়। বিয়েটা তাড়াতাড়ি সেরে ফেলব। আমাদের দু’বাড়ির মধ্যে কথাও প্রায় পাকাপাকি হয়ে গিয়েছিল। পাকাদেখার কয়েকদিন আগে আমি ভেবে দেখলাম আমার আগের প্রেমিকের সম্পর্কে রোহনকে সব খুলে বলা উচিত এবং সব কথা ওকে বললাম। কিন্তু কী আশ্চর্য, ও সে সব কথা শুনে পিছিয়ে গেল! বলল – তোমার মনে হয় আগের জনকেই বিয়ে করা ঠিক হবে। আমি আকাশ থেকে পড়লাম! এটাকে আমার সরলতা বলব না বোকামি বুঝতে পারলাম না। এর পরে বহু চেষ্টা করেও যখন রোহনকে রাজি করাতে পারলাম না, তখন ফিরে গেলাম আবার ওই আগের প্রেমিকের কাছে অর্থাৎ অভিজিৎ-এর কাছে।

বাঁকুড়ার মণিমাণিক্য (শেষ পর্ব)

খেজুরিয়া মোড় পেরিয়ে আমরা এগিয়ে চললাম সোজা পথে। ঝিলিমিলি আরও ৮ কিমি দূরে। মুকুটমণিপুর থেকে এই পথ কখনও চড়াই, কখনও বা উৎরাই। সোয়া ১১টা নাগাদ এসে পৌঁছোলাম ঝিলিমিলিতে। চারপাশে হালকা জঙ্গলের মাঝে নিরিবিলিতে এখানে থাকার জন্য রয়েছে “রিমিল রিসর্ট”। আমরা ঝিলিমিলিতে না দাঁড়িয়ে গাড়ি ঘুরিয়ে নিলাম তালবেড়িয়া লেকে পৌঁছনোর জন্য।

ফিরতি পথে ২-৩ কিমি এসে কোরাপাড়া মোড়। এখান থেকে ডান দিকের রাস্তায় আরও ৩ কিমি দূরে জঙ্গলের মাঝে লুকিয়ে আছে সুন্দরী তালবেড়িয়া লেক। রাস্তা ততটা ভালো নয়, গাড়ি এগোচ্ছে ধীরে ধীরে। জঙ্গলের গায়েই ছোটো এক গ্রাম। এক গ্রামবাসীকে জিজ্ঞেস করে, দুই পাশে জঙ্গলকে সঙ্গে নিয়ে তালবেড়িয়া ড্যাম পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম সুন্দর এক লেকের কাছে। প্রথম দর্শনেই মুগ্ধ হয়ে গেলাম লেকের রূপে! চারিদিকে শাল, পলাশ, শিমূল আর মহুয়ায় ঘেরা লেকটির নির্জনতাই মুখ্য আকর্ষণ প্রকৃতিপ্রেমীর কাছে।

গত কয়েক দিনের বর্ষায় লেক জলে পরিপূর্ণ। তীর থেকে সিমেন্টের (দু’পাশে রেলিং-সহ) যে সিঁড়ি লেক পর্যন্ত পৌঁছেছে, সেটারও তিনচার ধাপ জলের নীচে। সিঁড়ির শেষে সিমেন্টের ছাউনি— লেকের রূপ দর্শন ও ছবি তোলার জন্য। নীল আকাশের রঙে লেকের পরিষ্কার জলও হালকা নীল। হাতে সময় কম, তাই ইচ্ছা থাকলেও বেশি সময় থাকতে পারলাম না রূপসী ওই লেকের কাছে। ফিরে এলাম রাস্তার মোড়ে।

একজন স্থানীয় অধিবাসীর দেখিয়ে দেওয়া বাঁ দিকের রাস্তা ধরে এগোলাম সুতানের পথে। উঁচু-নীচু পথ, দু’পাশেই জঙ্গল। প্রথমেই এল চুরকু গ্রাম। সবুজের সাম্রাজ্যে তেমন গরম অনুভূত হচ্ছে না। চলে এলাম সুতান গ্রামে। মোটামুটি বড়ো লোকালয়। গ্রাম পেরোতেই আবার গভীর জঙ্গল সুতানের। কিছুদূর এগোতেই ‘এলিফ্যান্ট করিডর’। আরও গভীর জঙ্গলের মাঝ দিয়ে কাঁচা রাস্তা এগিয়ে মিশেছে বড়ো পাকা রাস্তায়। সেই পথে বাঁ দিকে এগোলেই ঝিলিমিলি-মুকুটমণিপুরের রাস্তায় পৌঁছনো যায়।

সুতানের গভীর জঙ্গল মনে আনন্দ জাগায়। জঙ্গলের মাঝে অনেকটা ফাঁকা জায়গায় তৈরি হয়েছে নতুন এক ওয়াচ টাওয়ার এবং রাজ্য সরকার বনবিভাগের সুন্দর এক ‘অতিথি নিবাস’। বড়ো ওয়াচ টাওয়ারটি সত্যিই সুন্দর। অদুরেই দেখা যাচ্ছে কয়েক বছর আগে রাজনৈতিক হামলার দুই নিদর্শন— পুড়ে-যাওয়া সিআরপিএফ-এর ছাউনি ও পুরোনো ওয়াচ টাওয়ার। নতুন ওয়াচ টাওয়ার দিয়ে উপরে উঠলে অবাক হয়ে যেতে হয়। যেদিকে তাকানো যায় সেদিকেই গভীর জঙ্গল। অনতিদূরেই চোখ পড়বে সুতান লেক। শীতকালে বহু টুরিস্টের আগমনে লেকের জলে নৌকাবিহারের ব্যবস্থা থাকে৷ হাতে সময় নেই, আজই কলকাতা ফিরতে হবে। সুতানের অরণ্য নিবাসে একটা পুরো দিন কাটাতে পারলে ভালো হতো!

দুপুর ১২টা, ফিরে চলেছি মকুটমণিপুরের পথে। বার বার উঁচু-নীচু রাস্তায় চলার পর গাড়ি এবার বিদ্রোহ করতে শুরু করেছে। কিছুদূর যেতেই গাড়ির ইঞ্জিন গরম হয়ে উঠেছে। ১২ মাইল জঙ্গলের মাঝামাঝি এলে রাস্তার পাশে গাড়ি থামানো হল। গাড়ির বনেট খুলে রেডিয়েটরের চেম্বারে ঠান্ডা জল ঢালা হল। মিনিট ১৫ পরে গাড়ি আবার চলতে শুরু করল। রানিবাঁধ পৌঁছোলাম, কিছুক্ষণ পরেই মুটমণিপুর পেরিয়ে খাতরার পথে এগোলাম। খাতরায় পৌঁছোতে দুপুর ২টো বেজে গেল। রাস্তার পাশে এক হোটেলের কাছে গাড়ি পার্ক করলাম। হাত-মুখ ধুয়ে হোটেলে ঢুকলাম লাঞ্চ সারতে।

বাঁকুড়ায় ঢুকলাম সোয়া ৪টে নাগাদ। বাড়ি কখন পৌঁছোব কে জানে! বরজোড়া আরও ৩৪ কিমি দূরে। বেলিয়াতোড় পৌঁছোতেই দিনের আলো কমে এল। ‘তিন মাইল জঙ্গল’-এর মাঝামাঝি এসে বুম্বা গাড়ি থামাল। দেখি, আরও কয়েকটি গাড়ি এসে থেমেছে সেখানে। সকলেই ফিসফিস করছে ‘হাতি, হাতি’ বলে৷ আমিও চট করে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়িয়েছি অকুস্থলে। একেবারে আশ্চর্য হয়ে দেখি, মাত্র ২৫-৩০ মিটার দূরে জঙ্গলের মাঝে একটু ফাঁকা জায়গায় তিনটে হাতি দাঁড়িয়ে। চোখদুটি সার্থক হতেই গাড়িতে এসে বসলাম। গাড়ি এসে থামল দুর্গাপুর ব্যারেজের কাছে এক ধাবায়।

এনএইচ-২ তে এসে পৌঁছোলাম প্রায় সন্ধে ৬টায়। পূর্ব বর্ধমানে এসে গাড়ি আবার বেঁকে বসল। ঘড়িতে সাড়ে ৭টা বাজে, আমাদের উৎকণ্ঠা বাড়তে লাগল। প্রায় ২০ মিনিট পরে আবার গাড়ির ইঞ্জিন স্টার্ট করা হল। ধীরে ধীরে গাড়ি চালিয়ে আমরা ডানকুনি এসে পৌঁছোলাম।

কিছু প্রয়াজেনীয় তথ্য

কীভাবে যাবেন: কলকাতা থেকে ট্রেনে বাঁকুড়া স্টেশনে এসে বাস বা গাড়িতে মুকুটমণিপুর। নয়তো করুণাময়ী (সল্টলেক) থেকে সরকারি বাসে বাঁকুড়া এসে, গাড়িতে মুকুটমণিপুর। সবচেয়ে সুবিধেজনক, নিজের বা ভাড়া গাড়িতে চলে আসা মুকুটমণিপুরে। দূরত্ব প্রায় ২৩০ কিমি। সময় লাগবে মোটামুটি সাড়ে ৫ ঘণ্টা।

কোথায় থাকবেন: মুকুটমণিপুরে থাকার জন্য আছে আরণ্যক রিসর্ট, ডবলুবিএফডিসি নেচার ক্যাম্প এবং পিয়ারলেস রিসর্ট। ঝিলিমিলিতে থাকার জন্য রয়েছে “রিমিল ইকো টুরিজম রিসর্ট”। সুতানের জঙ্গলে থাকার জন্য আছে রাজ্য সরকারের ‘অতিথি নিবাস’ (বন বাংলো)।

কখন যাবেন: বছরের যে কোনও সময়ে আসা যায় মুকুটমণিপুর, ঝিলিমিলি ও তালবেড়িয়া লেক দর্শনে। সুতানের জঙ্গলে বর্ষাকাল ছাড়া যে-কোনও সময়ে আসা যাবে। পুরো অঞ্চলেই গ্রীষ্মে খুব গরম। সেরা সময় অক্টোবর থেকে মার্চ মাস।

এমএনসি-র প্রেম (প্রথম পর্ব)

অবনীবাবু অফিস থেকে ফিরে ইজি চেয়ারে হেলান দিয়ে চায়ের কাপটা মুখে তুলতে তুলতে অফিসের বিভিন্ন সমস্যার কথা ভাবছিলেন। তিনি যেহেতু কোম্পানির উচ্চপদে আছেন তাই সকলের সুবিধে অসুবিধের কথা তাঁকেই ভাবতে হয়। তাঁর কাজটাই এরকম। তাঁর ওপর কর্পোরেট অফিস বলে কথা।

মনে মনে ভাবেন এই কর্পোরেট গাল ভরা কথাটা শুনতে যেমন ভালো লাগে, আসলে তেমন নয়। আজকাল মাল্টিন্যাশানাল, কর্পোরেট এসব কথাগুলো শুনতে মন্দ লাগে না। এমনকী খবরের কাগজে ‘পাত্র-পাত্রী’ কলমেও এর ব্যবহার করে বিজ্ঞাপনদাতারা নিজের কুলীন গোত্রের নিদর্শন তুলে ধরতে চান।

অবনীবাবু বহুদিন ধরেই একটি মাল্টিন্যাশানাল কোম্পানিতে চাকরি করছেন। নানান সমস্যার সমাধান করতে করতে এখন আর সমস্যাগুলোকে সমস্যা বলেই মনে হয় না। তবে দু’-একটি সমস্যা যে তাঁকে ভাবিয়ে তোলে না এমন নয়! গতকাল স্নেহা গুপ্তা-কে কাউন্সেলিং করতে গিয়েই বেশ মুশকিলে পড়েছিলেন। কীভাবে সমস্যাটার সমাধান করবেন ভেবে কুল পাচ্ছিলেন না, কারণ এই সমস্যার সমাধান তাঁর হাতে নেই। আর সে বয়সও তাঁর নেই।

স্নেহা-কে ক’দিন খুব ম্রিয়মাণ দেখে তাঁর প্রজেক্ট ম্যানেজার, মনদীপ জ্বলি, অবনীবাবুকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন— স্নেহার কাউন্সেলিং-এর প্রয়োজন আছে। যে-মেয়েটা ক’দিন আগেও হাসি-খুশিতে সবাইকে মাতিয়ে রাখত, হঠাৎই কী এমন হল যে, সে কেমন যেন নিশ্চুপ হয়ে গেছে।

অবনীবাবু এর আগেও বহু কর্মচারীরই কাউন্সেলিং করেছেন কিন্তু স্নেহা-র কথা শুনে উনিও আজকাল বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। চিন্তা শুধু এজন্য— এর সমাধান তাঁর হাতে নেই। কারণ এই সমস্যাটি একান্তই প্রেমঘটিত এবং ব্যক্তিগত। যদিও এর আগে এই কর্পোরেট সেক্টরে উনি বহু প্রেমেরই সাক্ষী হয়ে আছেন।

একবার মনে আছে গভীর রাতে অফিসে শিফট চলাকালীন ইলেকট্রিকের ফোরম্যান পরেশবাবু এসে বললেন— স্যার চলুন, আপনাকে একটা জিনিস দেখাই। বেশ কিছুদিন ধরে আমি এটা লক্ষ্য করছি। কোনওদিন কোনও বিপদ হয়ে গেলে আপনি আমাকেই চাকরি থেকে বের করে দেবেন।

অবনীবাবু— কী এমন হল যে আমাকে ডেকে দেখাতে হবে?

পরেশ বাবু— চলুনই না স্যার। দেখলেই বুঝতে পারবেন।

এর পরের ঘটনা অবনীবাবুকে সত্যিই খুব অবাক করেছিল। তখন তিনি নতুন ছিলেন এই ইন্ডাস্ট্রিতে তাই অদ্ভুত লেগেছিল। আজকাল অবশ্য অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। সেদিন ইলেকট্রিক সুইচরুমের ভেতর থেকে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়র একটি ছেলে ও একটি মেয়েকে আপত্তিজনক অবস্থায় উদ্ধার করেছিলেন।

অন্য এক ঘটনা— অবনীবাবু খবর পেয়েছিলেন যে এক ম্যানেজার নাকি তাঁর অধস্তন মহিলা কর্মচারীদের সঙ্গে খুব খারাপ ব্যবহার করছেন। কিন্তু এর কারণ তিনি কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছিলেন না। পরে এক মহিলা-র সঙ্গে কথা বলে বুঝেছিলেন, সেই ম্যানেজার প্রথমে কাজের চাপ ও ভয় দেখিয়ে তাঁকে বশবর্তী করেন এবং পরে তাঁর সঙ্গে অশ্লীলতা করেন।

অবনীবাবুর আর বুঝতে বাকি রইল না, কীভাবে এর অনুসন্ধান শুরু করতে হবে। অবনীবাবু প্রথমেই ডেকে পাঠালেন সিকিউরিটি সুপারভাইজার মিস্টার তিওয়ারি-কে। বললেন— মি. তিওয়ারি, আমি মি. সন্দীপ চাড্ডার সম্পর্কে বিস্তারিত সব খবর জানতে চাই। কখন সকালে আসেন, কখন কোথায় যান এবং ক’টা অবধি রাতে থাকেন?

মি. তিওয়ারি— স্যার, উনি তো বড়ো পোস্টে আছেন তাই ওনার সব খবরাখবরই আমরা লিখে রাখি। আপনি কী জানতে চান বলুন, আমি জানিয়ে দিচ্ছি।

—উনি রাত ক’টা অবধি অফিসে থাকেন?

—স্যার, কোনও ঠিক নেই। মাঝে মাঝে রাতে থেকেও যান কাজের জন্য, আবার কখনও কখনও রাত বারোটায় বেরিয়ে যান।

-ওঁর সঙ্গে কি অন্য কেউ থাকে?

–হ্যাঁ স্যার, থাকেন। মিস ডলি থাকেন।

—আপনি কি ওদের দু’জনের পরিবারের সম্পর্কে কিছু জানেন?

—স্যার, মি. চাড্ডার স্ত্রী একটি নামি কাগজের রিপোর্টার এবং তাঁর ডিউটি রাতেই থাকে, সেই কারণেই হয়তো মি. চাড্ডা রাতে অনেকদিনই বাড়ি যান না। মিস ডলি এই শহরে একাই থাকেন কারণ তাঁর মা-বাবা অন্য শহরে থাকেন।

—এদের সম্পর্কে কি আপনার কোনও কিছু বলার আছে?

—স্যার, আমাদের সিকিউরিটি গার্ডরা এদের নিয়ে নানারকম অশ্লীল কথাবার্তা বলে থাকে। রাতে নাকি এরা একই বন্ধ কেবিনে বসে কাজ করেন। আমাদের অফিসের একজন নাকি একদিন দু’জনকে রাতে পাশের শিপ্রা হোটেলে একসঙ্গে বসে বিয়ার খেতেও দেখেছেন।

—ঠিক আছে আপনি যান। ইলেক্ট্রিশিয়ান জন-কে একটু পাঠিয়ে দিন তো।

একটু পরেই জন এসে কেবিনের দরজায় টোকা দিয়ে প্রবেশ করে।

জন— স্যার আপনি আমাকে ডেকেছেন?

অবনীবাবু— হ্যাঁ। আচ্ছা আমাদের ক্লোজসার্কিট ক্যামেরাগুলো সব ঠিকমতো চলছে তো? আগামীকাল আমি কিন্তু সবগুলো চেক করতে চাই। শোনো, মি. চাড্ডা-র কেবিনে আমার ঘরের সামনের ক্যামেরাটা খুলে নিয়ে গিয়ে লাগাবে, তবে এখন নয়। সকলে অফিস থেকে চলে যাবার পর। আর এটা তুমি আর আমি ছাড়া কিন্তু কেউ জানবে না। জানলে তোমার চাকরি যাবে। ওটা লাগানো হয়ে গেলে তুমি রাতে আমাকে ফোনে কনফার্ম করবে।

জন— ঠিক আছে স্যার।

 

মধু যামিনী রে… (শেষ পর্ব)

অবনী খেতে খুব ভালোবাসে। বাঁচার জন্য খায় না, খাওয়ার জন্য বাঁচে। নানারকম বাজার করা, রান্নাবান্না, পূজা-পার্বণ আর নানা ছুতোয় হই হই করে তিন-চার বছর আরও কেটে গেল। রসিক মানুষ অবনী। সারাক্ষণ হাসিখুশি। রসবোধ থাকলেও, নারীমনের সম্পূর্ণতা যে মাতৃত্বে সেই বোধটা নেই। অনেক ডাক্তার দেখানো হল, সমস্যাটা অবনীর। আজকে হলে, হয়তো সেটা সমাধান হতো। কিন্তু নব্বইয়ের দশকে সেটা অকল্পনীয়। ছন্দহীন জীবনে গতানুগতিক দিন কাটতে লাগল।

সুখের দিনগুলো সেকেন্ডের কাঁটার মতো ছোটে। ভালো না লাগা দিনগুলো কাটতে চায় না। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে যেন ঘন্টার কাঁটা। তা-ও ধীরে ধীরে বিয়ে ফটোটা পুরোনো যুগের মানুষের মতো লাগে। সাজগোজ, জামা-কাপড়, ফটোর ভঙ্গি কেমন যেন সেকেলে হয়ে যায়, সবারই হয়। এটাই নিয়ম। তা-ও ভালো লাগে, যদি বর্তমানটা সুন্দর হয়। কোনওমতেই অবন্তীর গর্ভে কোনও সন্তান এল না। নিজের ফাঁকা পৃথিবীতে উলটে একে একে বাবা, তারপর মাকে হারাল।

অতনুর এখন ভরা সংসার। এক ছেলে, এক মেয়ে বউদি ভালো। তবুও বাপের বাড়ির শিকড়ের টান অনেক ক্ষীণ হয়ে গেছে অবন্তীর। দেখতে দেখতে দ্বিতীয় পদবির বয়সও কুড়ি বছর হয়ে গেল। এদিকে অবনীর একবার স্ট্রোক হয়ে গেছে। হাই সুগার। কিন্তু খাওয়া-দাওয়ার কোনও বাঁধন নেই। অনিয়ম চলতেই লাগল। ওষুধপত্র ঠিকঠাক খায় না। একদিন ভোররাতে সেরিব্রাল অ্যাটাক হল অবনীর। তিনদিন পর সব শেষ। স্বামী কেমন, সেটার থেকেও বড়ো হল স্বামী থাকা আর না থাকা। এই দুটোর তফাত বুঝল অবন্তী। বৈধব্য মানে শুধু সিঁদুর মোছা নয়। ভেতরের মনটাও সাদা হয়ে যায়। একাকিত্ব গ্রাস করতে লাগল অবন্তীকে। আবার মানসিক রোগগ্রস্ত হয়ে পড়ল। তখনই স্কুলের এক কলিগের হাত ধরে এই সংস্থায় আসা।

॥ ৬ ॥

আজ আকাশটা ভিজেভিজে। কিন্তু বৃষ্টি নেই। গঙ্গা গর্ভবতী, তবু শান্ত, তবে গম্ভীর। সূর্য‌ আজকের মতো বিদায় নিচ্ছে। শেষ দাহর সিঁদুর ছড়িয়ে দিচ্ছে পশ্চিম আকাশে, গোধূলির আলো ছড়িয়ে পড়ছে অবন্তীর ফরসা হলদেটে নিরামিষ গালে, কাঁচাপাকা আলগা খোঁপার বাঁধনটা সোনালি লাগছে। একগাছি সোনার চুড়ি চিকচিক করছে বিকেলের নরম আলোয়। হাতের ওপর চিবুক রাখা।

মাঝগঙ্গা দিয়ে একটা নৌকা যাচ্ছে, কোন পাড়ে লাগবে বোঝা যাচ্ছে না। অবন্তী একবার ভাবছে এই মঠে সবকিছু ছেড়ে যোগদান করবে। সন্ন্যাসিনী হয়ে যাবে। পারবে কি সে এপথে চলতে? সে পথ বড়ো বন্ধুর। আবার পরক্ষণেই মনে পড়ছে, বাবার দেওয়া সেগুন কাঠের খাট, নকশাকাটা আলমারি, এক বাক্স বাসন, কত ভরি গয়না এসব ছেড়ে চলে আসবে?

কত কঠিন, যারা পারে তারা কি অতিমানব? কিন্তু এগুলো আঁকড়ে রেখেই বা কী লাভ? সন্ধ্যা নামার মতো খাদের গাম্ভীর্য নিয়ে একটা গলা আস্তে কিন্তু গভীর সেই স্বর, অন্তর‌্যামীর মতো হঠাৎ বলে উঠল, অবন্তী…।

এই মঠে এতদিন আসছে অবন্তী। এই প্রথম সরাসরি কথা বলল ফাল্গুনী। অবন্তীর গলা দিয়ে কোনও শব্দ বেরল না। অস্ফুট স্বরে বেরিয়ে এল, কী…? বালিকার মতো সেই প্রশ্ন।

—তুমি এখানে আসবে অবন্তী? এ সংসারে সুখ আছে কিনা জানি না, তবে শান্তি অপার। এটা জগৎ সংসার। এর সেবায় শুধুই আনন্দ। জীবাত্মার সাথে পরমাত্মার মিলনের আনন্দ। তোমার ভালো লাগবে।

—আমি পারব?

—কেন পারবে না? আমি তো আছি।

টুপ করে চাঁদটা কোত্থেকে যেন বেরিয়ে এল। সারা আকাশ, বাতাস, নদীর জলে জ্যোত্স্না গড়িয়ে পড়ল। অবন্তী সারা শরীরে যেন মুহূর্তের মধ্যে ভরা কোটাল। মনের মধ্যে বেঁচে থাকার জোয়ার। আস্তে করে উঠে দাঁড়িয়ে চন্দন রঙের শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখটা মুছে বলল, আমি আসছি।

ফাল্গনী দেখল, একটা অশ্রুকণা গালের উপর চাঁদের রুপোলি আলোয় চিকচিক করছে, পঁচিশ বছর আগে যেটা নার্সিংহোমে দেখেছিল। ওই জলবিন্দুটার ভেতরে মনে হচ্ছে গঙ্গার থেকেও বেশি জল ধরা আছে। পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের সেই বিন্দুতে অর্চনা আর প্রেম মিলিয়ে যাচ্ছে। গঙ্গার ওপারে কোন ২২শে শ্রাবণের মঞ্চ থেকে ভেসে আসছে, দুজনে দেখা হল, মধুযামিনী রে…।

সমাপ্ত

মধু যামিনী রে… (পর্ব-০৫)

এর মধ্যে চার-চারটে বসন্ত পার হয়ে গেল। কত পুরোনো পল্লব ঝরে গেল, আবার সেই জায়গায় কত কচি পাতা এসে ভরে দিল। এটাই নিয়ম। এটাই স্বাভাবিক। এখনও মাঝেমধ্যে ছাদে গিয়ে দাঁড়ায় অবন্তী। শরীর, মন, বয়স অনেক পরিণত। বিকেলের সূর্য‌্য ঢলে পড়েছে। ঠিক ডুবে যাবার আগে একটা আবির ছড়িয়ে দিচ্ছে, ওই হলুদ বাড়িটার চিলেকোঠায়। ওই বাড়িটায় ফাল্গুনীরা থাকত। বহুদিন চলে গেছে। তবু তাকিয়ে থাকে ওই ছাদে টাঙানো তারের দিকে।

হ্যাঁ ঠিক, ওখানেই ফাল্গুনীর পানাফুল রঙের শার্ট টানটান করে দেওয়া থাকত। কাক বসলে রাগ হতো। আজও ঝুলছে একটা সাদা শার্ট, কার জানা নেই। কিন্তু গোধূলির আলোয় মনে হচ্ছে পানাফুল। আলো কমে আসছে। একটা ছায়া-শরীর পায়চারি করছে। হয়তো ওই বাড়ির কেউ। ঠিক ফাল্গুনীর মতো হাঁটার ভঙ্গিটা। না, ডাক্তারবাবু এসব ভাবতে বারণ করেছে, মনে মনে ভাবল অবন্তী। মাথার ওপর একটা কাক কর্কশ স্বরে ডেকে ঘরে ফিরছে।

বাস্তবের মাটিতে মনকে নামিয়ে আনল অবন্তী। নীচে নেমে এল। সামনে বিএ ফাইনাল। মন দিয়ে পড়তে বসল। নিজের পায়ে ওকে দাঁড়াতে হবেই।

॥ ৫ ॥

আরও বছর চারেক লাগল অবন্তীর চাকরি পেতে। অনেক দূরে, মথুরাপুরের কাছে অবন্তীর স্কুল। অবন্তীর মামা থাকে বাগবাজারে। মাহিমা একদিন একটা পাত্তরের খবর নিয়ে এল। পাল্টি ঘর, ব্যাংকে কাজ করে ছেলেটি। যৌথ পরিবার। শরিকি বাড়ি বাগবাজারে। তবে হাঁড়ি আলাদা। অবন্তীর বাবা-মার বেশ পছন্দ। অবন্তীর কোনও মত নেই। তার মন মতামতের উর্ধ্বে

ছেলে মানে, লোক বলাই ভালো, দেখতে এল অবন্তীকে। অবন্তীকে দেখার কিছু নেই। ঈশ্বর তাঁর রূপের ডালি ঢেলে দিয়েছেন ওর শরীরে। অবন্তীর রক্তের ব্যাপারটা জানানো হল। এতে ছেলের কোনও আপত্তি নেই। অবাক হল অবন্তী। যাইহোক দু-বাড়িই রাজি হয়ে গেল। অবন্তীর সিঁথিতে ফাল্গুনীর দেওয়া আবিরের দাগটা যেটা শুধু অবন্তীই দেখতে পায়, সেটা এক কলকাকলি ভরা সন্ধ্যায় ঢেকে গেল অবনীর সিঁদুরে।

কপালে সিঁদুর পরলে, মেয়ে থেকে নারী হওয়ার যে-অনুভতি শরীরে খেলে যায়, সেটা অনুভব করতে পারল না অবন্তী। তবে বেশ বনেদি পরিবার অবনীরা। বউভাতে অবন্তীর গা-ভরা গয়না, লাল বেনারসি, বিরাট কাঁসারের বগি থালায় ভাত, সারি সারি কাঁসারের বাটি। সব-ই ঠিক আছে। সবকিছুই মেঘলা আকাশের মতো সূর্য‌্যকে ঢেকে দিতে চাইছে। কিন্তু কোথা দিয়ে যে মেঘ ছিঁড়ে একটু রোদ এসে মনটা উদাস করে দিচ্ছে অবন্তী বুঝতে পারছে না।

চোখ ভিজে যাচ্ছে। সবাই ভাবছে বাপের বাড়ির শোকে। সবাই সান্ত্বনা দিচ্ছে, মেযো হল টবের গাছ, যখন যেখানে তখন সেখানের মতো। কিন্ত গাছটাই যে ভেতরে ভেতরে শুকিয়ে যাচ্ছে, তার খবর কেউ রাখল না।

ফুলশয্যার রাত। অবনী দরজা দিল। নারীর নতুন জীবন। কোনও পুরুষের সাথে একা একটা ঘরে। এই দুদিনে অবন্তী একটা জিনিস বুঝেছে, মানুষটা খারাপ না। জটিল নয়।

হাউ-হাউ করে কথা বলে, নিজেও হাসে, হাসাতেও ভালোবাসে। অবনী ঘরে ঢুকে বলল, এই এ বাড়িতে কোনও অসুবিধা হচ্ছে না তো? অবন্তী মাথা নাড়ে।

অবনী আবার শুরু করে, এই জানো আমার বন্ধু পল্টু এত বদমাইশ, বলে কিনা, নানারকম ফল দিয়ে খাট সাজাবে, বলে ফুল তো বিয়ে আগে ফোটে, বিয়ে পরে তো ফল। সাজালে কী সাংঘাতিক কাণ্ড হতো বলো? এবার অবন্তী হেসে ফেলল। বুঝল মানুষটা একেবারেই সরল। না হলে, নতুন বউয়ে কাছে কেউ এ গল্প করে।

তারপর অনেক রাত অবধি নানা মজার গল্প করল অবনী। আস্তে আস্তে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে অবনী। অবন্তী এবার একটু জড়োসড়ো হয়ে যাচ্ছে, আবার স্বাভাবিক থাকারও চেষ্টা করছে। মন আর শরীর এক বিন্দুতে মিলছে না। সেই বিন্দুতে অন্য ছবি আঁকা রয়েছে, ঝাপসা কিন্তু গভীর। অস্পষ্ট তবুও অনস্বীকার্য। তারপর যেটা হল, সেটাকে শারীরিক সম্পর্ক না বলে একতরফা কর্ম সমাপন বলাই ভালো। মোটামুটি এই ভাবেই চলতে লাগল পরের দিনগুলো।

ক্রমশ…

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব