হজম করতেই হবে

সুপ্রিম কোর্ট আবারও জানিয়ে দিয়েছে যে, যদি কোনও দম্পতির সন্তান থাকে, তাহলে বিবাহ বিচ্ছেদ না হওয়া পর্যন্ত, ওই সন্তানের পিতা হিসাবে বিবেচিত হবেন ওই মহিলার স্বামী। এক্ষেত্রে ওই সন্তান যদি অন্য কোনও পুরুষের প্রমাণিতও হয়, তাহলেও তা আইন মাফিক গ্রাহ্য হবে না বিবাহ বিচ্ছেদ না হওয়া পর্যন্ত। আইনি বিষয়টি এমনই যে, আইনি পিতা-মাতার বিবাহ বিচ্ছেদ না হওয়া পর্যন্ত, সন্তানকে ‘অবৈধ’ করে তোলা যাবে না। এক্ষেত্রে ওই সন্তান যদি অন্য কোনও পুরুষের হয়, তাহলেও সে তার বৈধ পিতার সমস্ত সম্পত্তির অধিকারী হবে।

এই আইনি ব্যবস্থা বেঠিক নয় এবং নিষ্পাপ সন্তানকে অস্বীকার করা কিংবা তাকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করাও ঠিক নয়। এখন ডিএনএ পরীক্ষা এতটাই সঠিক যে, সন্তানের আসল পিতা কে, তা যাচাই করে নেওয়া খুব কঠিন নয়। আসলে, অনেক পুরুষ নিছক সন্দেহের বসে স্ত্রী-কে দোষারোপ করেন এবং সন্তান অন্য পুরুষের বলে ঝামেলা করে বিবাহ বিচ্ছেদ চান। তাই, কেউ যাতে আইনের অপপ্রয়োগ না করতে পারে, সেই উদ্দেশ্যেই সত্য-মিথ্যে যাচাইয়ের বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং বিচারের জন্য এটাই উপযুক্ত মাধ্যম।

আদালতে এমন ভুরিভুরি মামলা চলে, যে সমস্ত মামলায় দেখা যায় যে, স্ত্রী-র সঙ্গে অন্য কোনও পুরুষের সম্পর্ক আছে— এমন অভিযোগ করে মামলা করেছেন স্বামী। এই ধরনের মামলা আসলে খুবই দুঃখজনক। কারণ, এক্ষেত্রে সত্যিটা যাইহোক না কেন, নিষ্পাপ সন্তানকেও এর মাশুল দিতে হয়। তারও ডিএনএ টেস্ট হয় এবং সেই সন্তানের যদি তাকে নিয়ে চলতে থাকা বিবাদের বিষয়টি বোঝার মতো বয়স হয়, তাহলে তার মনে যে চাপ পড়ে কিংবা দুঃখ হয়, তা খুবই মর্মান্তিক।

হিন্দু বিবাহ আইনে সংশোধনের আগে, ‘স্ত্রী-র সঙ্গে অন্য পুরুষের সম্পর্ক আছে এবং সন্তান তার নয়’ —এমন অভিযোগ এনে, সন্তানের দায়দায়িত্ব থেকেও নিজেকে মুক্ত করে নিতেন অনেকে। এর ফলে, ‘অবৈধ’ ঘোষিত হওয়া ওই সন্তানকে অনাথ আশ্রমে অসহায় ভাবে জীবনযাপন করতে হতো। কিন্তু বর্তমান আইনে কেউ কারওর বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে, তা বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে বিচার করে সিদ্ধান্তে আসার সুযোগ রয়েছে। তাই, এখন স্ত্রী-র বিরুদ্ধে ‘বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক আছে’ —এই অভিযোগ এনে সন্তানকে অস্বীকার করা অসম্ভব। অতএব, স্ত্রী-র বিরুদ্ধে স্বামী সত্যি-মিথ্যে যে অভিযোগ এনে মামলা করুন না কেন, আইনি সিদ্ধান্ত তাকে হজম করতেই হবে।

পরিধানে পরিপূর্ণতা

বাংলা তথা সারা ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে, হ্যান্ডলুম পোশাকের চাহিদা বাড়ছে। আসলে, হাতে তৈরি পোশাকের সৌন্দর্য এবং মর্যাদা-ই আলাদা। তাই, এমন পোশাক নির্বাচন করুন, যা হাতে তৈরি এবং আধুনিক। শুধু চাই সঠিক ড্রেসিং সেন্স, যা আপনার পরিধানে আনবে পরিপূর্ণতা।

মনে রাখবেন, তরুণী থেকে পূর্ণবয়স্কা— সকলেই চান যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের ফ্যাশনেবল রাখতে। কিন্তু, ঐতিহ্য এবং আধুনিকতার মিশেলে কীভাবে হট লুক বজায় রাখবেন, সেই বিষয়ে জ্ঞান থাকা জরুরি।

জানেন তো, ভারতে হ্যান্ডলুম শিল্প একটি বড়ো কুটির শিল্প এবং এই শিল্প দেশের অর্থনীতি ও সংস্কৃতির অন্যতম অংশ। তাই, তাঁত কিংবা যে-কোনওরকম হাতে তৈরি পোশাকে নিজেকে ফ্যাশনেবল করে তুলতে পারলে, ভারতের এই হ্যান্ডলুম শিল্পও বেঁচে থাকবে এবং আপনিও রুচিশীল মানুষ হিসাবে বিশেষ মর্যাদা পাবেন।

যারা শাড়ি পরতে ভালোবাসেন, তাদের জানিয়ে রাখি, বিখ্যাত কিছু হ্যান্ডলুম শাড়ির মধ্যে রয়েছে- – বেনারসি শাড়ি, টাঙ্গাইল শাড়ি, বালুচরি শাড়ি, ধনেখালি শাড়ি, চিকনকারি শাড়ি, জামদানি শাড়ি প্রভৃতি। আর এইসব শাড়ি পরে স্টাইল-এ আনুন পরিবর্তন এবং গ্রহণযোগ্যতা। তবে, প্রত্যেক ঋতুর সঙ্গে মানানসই পোশাক চয়ন করা আবশ্যক।

তরুণ প্রজন্ম ইচ্ছেমতো যেমনটা পছন্দ পোশাক পরে এবং বয়স অল্প হওয়ায় মানিয়েও যায়। কখনও আবার তাদের ব্যবহার করা পোশাক-ই ফ্যাশন স্টেটমেন্ট হয়ে ওঠে। কিন্তু বয়স বাড়লেও, ‘নিজেকে আর ফ্যাশনেবল রাখা সম্ভব নয়’— এমনটা ভাববেন না। পছন্দের পোশাক পরে যে কোনও বয়সে আপনিও হয়ে উঠতে পারেন ফ্যাশন ডিভা।

ফ্যাশনের বহতা স্রোতে আপনিও যদি গা ভাসান — তাহলে আপনাকেও মাঝেমধ্যে ওয়ার্ডরোব-টিতে বদল আনতে হবে। তাহলেই ফিরে আসবে ফ্যাশনের জোয়ার।

হ্যান্ডলুম শাড়ির পাশাপাশি, একটু লম্বা ঝুলের হ্যান্ডমেড কুর্তি এখন ফ্যাশনে ইন। কিনে ফেলুন রাউন্ড শেপড কুর্তি। ওই পোশাকের সঙ্গে পরুন লেগিংস বা সিগারেট প্যান্ট। পরতে পারেন পালাজোও। কানে থাকুক একটু বেশি ঝুলের কানের দুল। কে বলতে পারে এই লুকেই হয়তো কতজনের মন চুরি করে ফেলবেন আপনি।

আবার স্লিভলেস ব্লাউজের সঙ্গে শাড়ি পরে আয়নার সামনে দাঁড়ালে নিজেকে চিনতে পারবেন না আপনি। শাড়ি পরার সময়ে বিশেষ কয়েকটি টিপস মাথায় রাখা প্রয়োজন, নয়তো সাজটাই মাটি হবে। পেটিকোটের রং এবং ফিটিংস-এ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। ব্লাউজের ফিটিংসের দিকে অবশ্যই লক্ষ্য রাখুন। শাড়িতে মাত্রাতিরিক্ত সেফটিপিন লাগাবেন না। এতে সাজটাই নষ্ট হয়। এসব টিপস সঙ্গে রাখুন, আপনাকে শাড়িতে এতটাই সুন্দর দেখাবে যে, কেউ আপনার থেকে চোখে ফেরাতে পারবে না।

অনেকেই পশ্চিমি পোশাক পরতে পছন্দ করেন। আপনারও কি সেরকমই প্ল্যান রয়েছে? সেক্ষেত্রে কয়েকটি দিকে খেয়াল রাখুন। পোশাকের সঙ্গে মানানসই অন্তর্বাস পরুন। সেইসঙ্গে সঠিক অ্যাকসেসরিজ দিয়ে লুককে পারফেক্ট করে তুলতে হবে।

প্রয়োজনে নিজের ডিজাইন সেন্স থেকেই অদলবদল করে নিতে হবে পুরোনো হয়ে যাওয়া পোশাকগুলির মলিন চেহারা। এক কথায় ‘শ্রী’ ফিরিয়ে আনতে হবে ওয়ার্ডরোব এবং নিজের।

পুরোনো শাড়ি দিয়েও করতে পারেন ফ্যাশন মেকওভার। পুরোনো শাড়ি যা বহুবার পরেছেন অথচ সেটি খুব প্রিয় বলে বাতিল করতেও পারছেন না— তা দিয়ে কিন্তু নতুন স্টাইলের ড্রেস বানিয়ে নিতে পারেন। তাহলে বাজেটের মধ্যেই ফ্যাশন মেকওভার করতে পারেন।

ওয়ান-পিস গাউন সবাই পরতে ভালোবাসেন আর এখন এটা ফ্যাশন ট্রেন্ডেও ইন। একরঙা গাউন হোক কিংবা হ্যান্ডপেইন্টেড অথবা প্যাচওয়ার্ক করা, যেরকমই হোক না কেন, আপনি কিন্তু আপনার পুরোনো শাড়ি দিয়ে দিব্যি একটা ওয়ান-পিস গাউন তৈরি করে নিতে পারেন এবং সেটাও কম খরচে।

ফিউশন স্কার্ট খুব ভালো লাগে দেখতে। আপনার পছন্দ মতো যে-কোনও টপের সঙ্গে আপনার এই স্কার্ট কিন্তু দারুণ লাগবে দেখতে। আর এতে বেশি খরচও নেই।

এক রঙের কোনও শাড়ি আর তাতে পাড় বসানো থাকলে, তা থেকে আনারকলি বানিয়ে নিন। আনারকলি বানানোর অনেক কাপড় লাগে, যেহেতু আনারকলিতে অনেক কুঁচি হয়। আর সেই কাপড়টা আপনি আপনার পুরোনো শাড়ি থেকে খুব সহজেই পেয়ে পেয়ে যাবেন।

একচ্ছত্র সাহিত্য আকাদেমি (পর্ব-০৩)

বিল্টুর দিকে তাকাতেই, ও অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে। যত্তসব অকম্মার কলাগাছ কোথাকার! অগত্যা নিধিরাম নিজের হাতেই কাগজ কলম তুলে নিয়েছে। দু’চার মিনিট বিশাল ভাবনাচিন্তা করে খসখস কিংবা খচখচ করে কিছু একটা লিখে— ‘এই নে ধর দেখি”, বলে মনোজের হাতে গুঁজে দিল।

মনোজ যথাস্থানে রেখে দিয়ে বলল, ‘জানোই তো দাদা আমি কিন্তু যাকে বলে এক্কেবারে ক-অক্ষর গোমাংস, মানে যদ দেখিতং তদ লিখিতং। যশ খ্যাতি সব তোমার। এবার এসো তোমরা। আমার এখন অনেক কাজ। শনিবার সকালে ‘ফেলো কড়ি মাখো তেল’ করে নিয়ে চলে যেও দয়া করে তা হলেই হবে।’ আর কথা না বাড়িয়ে ওরা দু’জনে বেরিয়ে পড়ল।

—বিল্টু তুই আর আমার সঙ্গে গিয়ে কী করবি বল। বাড়ি ফিরে যা। আমাকে আজ অনেকের কাছে যেতে হবে বুঝলি। অন্তত সেদিন মিটিংয়ে যারা এসেছিল। মনে হয় সারাদিনটাই লেগে যাবে। আর হ্যাঁ শোন, আগামীকাল বিকেল চারটে নাগাদ আমার বাড়ি চলে আসিস কেমন।

বিল্টু মাথামুণ্ডু তেমন বুঝতে না পেরে, মুখে একরাশ বিরক্তি নিয়ে বলল, “ঠিক আছে যাও।”

তারপর যে যার পথে পা বাড়াল।

বিল্টু পরেরদিন চারটের অনেক আগেই নিদুদার বাড়িতে হাজির। বাড়িতে অনেকগুলো ঘর। তার মধ্যে দু’তিনটে তালা বন্ধই পড়ে থাকে সারা বছর। তারই একটাতে নিদুদাকে হাঁকডাক করে পাওয়া গেল। দেখে বোঝাই যাচ্ছে ঝাড়পোছটা আজই করা হয়েছে। একটা কাঠের পুরোনো শোকেস দু’তিনটে টেবিল আর খানকয়েক চেয়ার পাতা আছে। শোকেস টেবিলে বেশ কিছু উত্তরীয় আর স্মারক সাজানো।

বিল্টুকে দেখেই বলল, ‘আর বলিস না, কাল থেকে যা চলছে! ওদের সবাইকে জনে জনে খবর দিয়ে ফিরতে ফিরতেই সন্ধে সাতটা।’

—বুঝলাম না দাদা।

—আরে বাবা, এখানে মানে আমার বাড়ির পাশে আমাদের বারোয়ারি দুর্গা মণ্ডপের গ্রিল দিয়ে ঘেরা হলঘরের মতোন বিশাল শেডটা দেখলি না, পঞ্চাশ-ষাটটার মতোন চেয়ার পাতা আছে। আজ ওখানেই একটা মিটিং কল করেছি, সেদিন যারা এসেছিল তাদের সবাইকে নিয়ে। তারা প্রত্যেকেই তাদের পাওয়া কিছু না কিছু স্মারক ও উত্তরীয় নিয়ে আসবে। সেগুলো সব তাদের নামে নামে আমার এই ঘরে আলাদা আলাদা ভাবে রাখা থাকবে।

—কেন গো? তারা এখানে রাখতে আসবে কেন?

—আসবে আসবে। একটু সবুর কর। ঠিক সময় মতোন জানতে পারবি। চল দেখি বাকিরা আসার আগে তুই আর আমি একটু চা পান করে আসি।

—আচ্ছা নিদুদা সেদিন কী যেন বললে চালতা বাগানের কোথায় কী একটা ঘাপটি মেরে বসে রয়েছে, ঠিক বুঝলাম না। —ওটা না বোঝার আছেটা কী শুনি? মাথা মোটা কোথাকার! কিছুই বুঝতে পারে না, সব বলে দিতে হবে। যত্তসব গাড়ল এসে জুটেছে আমার কাছেই একসে এক।

—বেশ বেশ… এবার বলো তো কেসটা কী?

—আরে, শ্রাদ্ধশান্তির অনুষ্ঠানে একই খাট-বিছানা, উপচার, ব্যবস্থাপনা, পুরোহিত, লোকজন কোনও কিছুই পালটায় না। আজ একজনের আত্মার শান্তি হল তো ওই একই জায়গায় একই উপচারাদি দিয়ে কাল আর একজনের শ্রাদ্ধশান্তি হচ্ছে। এবার বুঝলি?

চায়ের দোকানের অনুপকে নিধিরাম বলল, “এই অনু, একটাকে দু’টো।’

অনুপ দু’জনকে হাফ কাপ করে চা ধরিয়ে দিল। জিজ্ঞাসা করল, “বিস্কুট?’

—না দরকার নেই। কীরে বিল্টু?

—লাগবে না।

চা খেয়ে ফেরার সময় বিল্টুকে শেডটা ভালো করে দেখাল। নিধি শুধু দু’টো পুরোনো টেবিল চেয়ারগুলোর সামনে রেখে তার উপর সাদা কাপড় বিছিয়ে দিয়েছে।

—বুঝলি বিল্টু, এবার থেকে এই অঞ্চলের সমস্ত সাহিত্যসভা, আলোচনা, সংবর্ধনা— যা কিছু সব এখানেই হবে বুঝলি। পুরো হল ভাড়াটা বেঁচে যাবে। আর চেয়ার তো এই মণ্ডপেই থাকে, টেবিল আমার বাড়ির। শুধু ইলেকট্রিক আর মাইক ভাড়াটা দিলেই হবে।

এখন যাদের আসার কথা তারা একে একে জমতে শুরু করেছে। তাদের থেকে স্মারক উত্তরীয় নিয়ে নাম লিখে নিধিরাম ঘরে রেখে দিচ্ছে তাদেরকে দেখিয়ে। তারপর মণ্ডপে চেয়ার গ্রহণ। মোটামুটি সবাই হাজির যখন সাড়ে চারটে নাগাদ সাহিত্যসভা, আলোচনা পদ্ধতি, নিয়ম-রীতি, সংবর্ধনা কীভাবে কী হবে না হবে ঠিক হল। মানে প্রতি মাসে এক একটা লিটল ম্যাাগের নামে একটা করে সাহিত্যসভা, আলোচনা, কবিতা পাঠ হবে। সঙ্গে থাকবে গুণীজন সংবর্ধনা।

প্রয়োজন হলে বিশেষ আলোচনাসভা করার অবকাশও থাকছে। সবাই খুব খুশি এমন একটা প্রায় চিরস্থায়ী ব্যবস্থায়। খরচ প্রায় নেই বললেই চলে। আর প্রত্যেক সভায় নতুন নতুন লেখক কবিদেরকে সংবর্ধনা দেওয়া আবশ্যিক থাকছে। সঙ্গে পুরোনো কবি, লেখক, সম্পাদকও দু’তিনজন থাকলেও থাকতে পারেন।

অনুপ, কেটলি ভরতি চা নিয়ে এসে কাপে সার্ভ করে গেল। সাড়ে পাঁচটা নাগাদ সভা শেষ। সবাই চলে গেলে নিধিরাম বিল্টুকে নিয়ে টেবিল দু’টো আর সাদা কাপড়টাকে বাড়ি নিয়ে গেল। দুর্গামণ্ডপ শুনশান আবার যে কে সেই!

—বুঝলি বিল্টু, আপাতত আমার কাজ শেষ আজকের মতোন। এবার একটু গড়িয়ে নিতে হবে। আজ তাড়াতাড়ি রাতের খাবার খেয়ে একটা সলিড ঘুম দিতে হবে। তুই পরশু মানে রোববার দশটা নাগাদ চলে আয়। অ্যাডভেঞ্চারে বেরোব। এখন বাড়ি যা।

পরের দিন মানে শনিবার সকাল সকাল রেডি হয়ে নিধিরাম দশটা নাগাদ মনোজের দোকানে হাজির। মনোজ নিধিরামের হাতে লেখা ম্যাটারের কাগজ আর একটা ফ্লেক্স খুলে দেখিয়ে বলল, “ভালো করে দেখেশুনে নাও সব ঠিকঠাক আছে কিনা। নইলে পরে আবার খুঁত বের করবে।’

নিধিরাম দেখে নিল মন দিয়ে। বলল, “ঠিকই তো লাগছে এখন। তবে তোর কাজ তো। এখানে দেখলাম ঠিকঠাক, আবার বাড়ি গিয়ে হয়তো দেখব ভুলভাল।’ বলে নিজেই হাঃ হাঃ হোঃ হোঃ করে হেসে উঠল। যাইহোক, বিল মিটিয়ে বারোটা ফ্লেক্স হাতে নিয়ে “আসি রে বলে’, দোকান থেকে বেরিয়ে পড়ল নিধিরাম।

একে একে অন্য জনাসাতেক সম্পাদকের বাড়ি গিয়ে এক একটা করে ফ্লেক্স দিয়ে বলেছে, এটাকে পাড়ার কোনও একটা স্ট্র্যাটেজিক পয়েন্টে ডিসপ্লে করে দেবেন। এটা আমাদের বিজ্ঞাপনের কাজ করবে, বুঝলেন কিনা। সব শেষে দালাল মিত্তিরের বাড়ি। সেখানে দুপুরের খাওয়াদাওয়া সেরে ভালোমতো একটা ভাতঘুম দিয়ে সন্ধে হব হব সময়ে ‘মন চল নিজ নিকেতনে”।

রোববার সকালে নিধিরাম তার রাস্তামুখী বাড়ির বারান্দা থেকে একটা ফ্লেক্স টাঙিয়ে দিল। বেলা ন’টা নাগাদ পাড়ার ছেলে কবচ এল তার অটো নিয়ে। ‘নিদুদা ও নিদুদা কই গো কোথায় গেলে? আমি এসে গেছি।’ নিধিরাম অলক্ষ্যে থেকে আওয়াজ ছাড়ল— ‘একটু দাঁড়া, আসছি এখন।”

মিনিট পাঁচেক পর একটা ফ্লেক্স কবচের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, ‘এটা অটোর পিছনে ভালো করে জড়িয়ে বেঁধেছেদে দে দেখি। দেখিস হাওয়ায় না আবার উড়িয়ে নিয়ে যায়। আর মাইকটা টেস্ট করে এনেছিস তো?’

—হ্যাঁ দাদা, কোনও চিন্তা কোরো না। আমার কাজে কোনও গাফিলতি পেয়েছ কখনও। এতদিন তো তোমার কাজ করছি। আমার এককথা— যেমন কথা তেমন কাজ। কোনওরকম খেলাপ পাবে না কখনও। আমি গ্যারান্টি দিয়ে কাজ করি। আর দেব নাই বা কেন, তোমরা যখন যথাযোগ্য মূল্য দাও!

—ঠিক আছে বাবা, তোকে জিজ্ঞাসা করাটাই আমার ঘাট হয়েছে।

ততক্ষণে বিল্টু এসে হাজির। নিধিরাম বলল— এই বিল্টু ফ্লেক্সের লেখাটা ভালো করে পড়ে মুখস্থ করে নে। একটু পরে বেরোব আমরা এই অটোটায়। মাইকিংটা কিন্তু তুই করবি। কারণ ওটা তুই ভালো পারিস। বিল্ট মক টেস্টিং করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। একটু শব্দ করেই পড়ে নিচ্ছে, “শিল্পাঞ্চলের সমস্ত লিটল ম্যাগের একটি সম্মিলিত প্রয়াশ (পড়ুন প্রয়াস) একচ্ছত্র সাহিত্য আকাদেমির উদ্যোগে এখন থেকে প্রতি মাশের (পড়ুন মাসের) শেষ রবিবারে মালপাড়ার দুর্গামণ্ডপে সাহিত্যসভা, কবিতা পাঠ, আলোচনা এবং পত্রিকা ও গ্রন্থ প্রকাশসহ নামমাত্র সহযোগিতায় গুণীজনদের সুলভ সংস্করণের সংবর্ধনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আপনাদের সহৃদয় উপস্থিতি ও সক্রিয় সহযোগিতা একান্ত কাম্য। সহযোগিতায় ইচ্ছুকেরা সত্বর যোগাযোগ করুন। যোগাযোগ, দালাল মিত্তির, মুঠোফোন- ৯৮৭৬…. ১০ শুনুন শুনুন শুনুন…।’

এটা মুখস্থ করতে করতেই বিল্টু বেশ চার্জড হয়ে গেল। আর যেন তর সয় না। দশটা বাজতেই বিল্টু নিধিরামকে পাশে বসিয়ে মাইক ফুঁকতে শুরু করল। আপাতত প্রথম বলে এই মাসটা পর পর দিন চারেক। পরবর্তীতে মাসে একদিন। তারপর প্রচারটা একবার পেয়ে গেলে, তখন আর মাইকিং করার দরকার হবে বলে মনে হয় না। আজ একবেলা মাইকিং করে বেলা দু’টো নাগাদ বিল্টুকে তার বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে নিধিরাম বলল, “বিল্টু কাল দু’টোর সময় রেডি থাকিস, তোকে তুলে নেব!” তারপর নিজের বাড়ি ফিরেছে। কবচকে বলল, “তাহলে আগামীকাল দেড়টার সময় চলে আসিস।”

—ঠিক আছে দাদা।

কবচ হাত পাততেই নিধি একটা পাঁচশো টাকার নোট দিয়ে বলল, কাজ চুকেবুকে গেলে ফাইনাল হিসাবটা একদিন করে নেওয়া যাবে বুঝলি।

—নিশ্চয়। তা আর বলতে।

পরপর দিন কয়েক শিল্পাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে প্রচার চলল। কিন্তু দালাল মিত্তিরের কাছে থেকে এখনও কারও যোগাযোগের খবর আসছে না। নিধিরাম ভেবে ভেবে একটু বিমর্ষ হয়ে পড়ল। দিন দশেক পর প্রথম একজনের খবর এল— তরুণ কবি শুক্রাচার্য ভট্টোপাধ্যায়, যে তার নাম নথিভুক্ত করিয়েছে।

সঠিক তদন্তের প্রয়োজন

সাংসারিক অশান্তি কিংবা ঝগড়া-ঝামেলার কারণে স্ত্রী যদি আত্মহত্যা করে নেন, তাহলে স্বামীর জেলজীবন প্রায় নিশ্চিত। সাধারণ ভাবে আইনের এই রীতিনীতিই প্রচলিত আছে। মৃত স্ত্রী-র মা-বাবা সাধারণত এই অভিযোগ করেন যে, তাদের মেয়ের শ্বশুরবাড়ির লোকেদের অত্যাচারে এবং প্ররোচনাতেই বাধ্য হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হয়েছে মেয়েকে। ভারতীয় দণ্ডবিধি অনুসারে, যদি কেউ কাউকে আত্মহত্যায় মদত দেয়, সাহায্য করে কিংবা বাধ্য করে, তাহলে সেই ব্যক্তি অপরাধী হিসাবে গণ্য হবে।

স্ত্রী-র আত্মহত্যার কারণে অনেক স্বামী আজ জেলবন্দি। শুধু তাই নয়, জেলবন্দি ব্যক্তির পরিবারের লোকেদেরও হয়তো কাটাতে হচ্ছে বন্দিজীবন। সুইসাইড নোট যদি না-ও পাওয়া যায়, তাহলেও শুধু মৃত মহিলার মা-বাবার অভিযোগের ভিত্তিতেই গ্রেফতার করা হয় মেয়েটির শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে এবং বিচারে নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করার কোনও সুযোগ না পেয়ে, কারাদণ্ড ভোগ করতে হয় অভিযুক্তদের।

স্বামী-স্ত্রীর বিবাদে সাধারণত দেখা যায়, দুর্বল মনের মহিলারা আত্মহত্যা করে স্বামীকে বিপদে ফেলে দেন। আর মেয়ে আত্মহত্যা করলে, মেয়ের বাবা-মা সঠিক তথ্য অনুসন্ধান না করেই সাধারণত অভিযোগ দায়ের করেন মৃত মেয়ের স্বামী এবং শ্বশুরবাড়ির লোকেদের বিরুদ্ধে। আর স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া-ঝামেলা হলে স্ত্রী যদি আত্মহত্যা না-ও করেন, তাহলে ‘বিষ খেয়ে নেব’, ‘জলে ঝাঁপ দিয়ে দেব’, ‘গায়ে আগুন দিয়ে দেব’ কিংবা ‘রেল লাইনে ঝাঁপ দেব’ বলে প্রতি মুহূর্তে ভয় দেখিয়ে মানসিক চাপে রাখেন স্বামীকে। এক্ষেত্রে সরলীকরণ করা উচিত নয়, তবে কিছুসংখ্যক মহিলা ভয় দেখানো কিংবা সত্যিই আত্মহত্যার পথ বেছে নেন এবং অবশেষে ফেঁসে যান স্বামী বেচারা।

আসলে শুধু সাংসারিক ক্ষেত্রেই নয়, এই ভয় দেখানো কিংবা কাউকে ফাঁসিয়ে দেওয়ার রীতি-রেওয়াজ চলছে সব ক্ষেত্রে। স্কুল, কলেজ, চিকিৎসাক্ষেত্র, রাজনৈতিক ক্ষেত্র, বিনোদনের জগৎ সর্বত্র চলছে দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচার।

সত্যিই যদি স্বামী কিংবা শ্বশুর বাড়ির লোকেরা অত্যাচার করেন কোনও কারণে, তাহলে সেই সম্পর্ক ভেঙে বেরিয়ে এসে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা তো নেওয়াই যায়। অবশ্য শুধু দুর্বল ব্যক্তিরাই নয়, হিটলারের মতো নিষ্ঠুর ব্যক্তিও গ্রেফতারী এড়াতে বেছে নিয়েছিলেন আত্মহত্যার পথ। তাহলে হিটলারের আত্মহত্যার জন্য এক্ষেত্রে কি তার দেশের প্রসাশনকে দায়ী করা হবে নাকি দায়ী করা হবে হিটলারের দ্বারা অত্যাচারিত নাগরিকদের? অতএব, কাউকে দোষী সাব্যস্ত করার আগে, সঠিক তদন্ত এবং বিচার-বিশ্লেষণ জরুরি।

যেতেই পারি… দারিংবাড়ি (শেষ পর্ব)

বেলা বেড়েছে। আবাসে ফিরে দ্বিপ্রাহরিক আহারের পর চলেছি ‘হিল ভিউ পার্ক ’-এর পথে। এটা দারিংবাড়ির একটি সুসজ্জিত উদ্যান। ছোটোদের মনোরঞ্জনের আয়োজন প্রধান হলেও, বড়োদের প্রবেশে বাধা নেই। পার্কে প্রবেশমূল্য আছে। সাজানো উদ্যানের মাঝে মাঝেই আছে শাবক সহ বাঘ, জিরাফ, জেব্রার সিমেন্ট নির্মিত অবয়ব। আছে দোলনা, ফোয়ারা, টয়ট্রেন, নানান প্রজাতির রঙিন ফুল গাছ। তবে, সবথেকে আকর্ষণীয় হচ্ছে সুন্দর ভিউপয়েন্ট করিডোর। এই লম্বা করিডোর-এ উঠে দেখে নেওয়া যায়। দারিংবাড়ির অসাধারণ ৩৬০ ডিগ্রি প্যানোরামিক ভিউ। বহু দূর বিস্তৃত নীল-সবুজ পাহাড়শ্রেণির দৃশ্য দেখে মন ভরে যাবে। কাশ্মীর না হলেও, ‘ওড়িশার কাশ্মীর’ দারিংবাড়ি-র সৌন্দর্য পর্যটকদের মন মোহিত করবে। প্রকৃতি এখানে তার রূপের ডালি উজাড় করে দিয়েছে।

নেচার পার্কে শুশ্রুত

হিল ভিউ পার্কের অদূরেই ‘নেচার পার্ক’। এখানেও প্রবেশমূল্য লাগে। এই প্রাকৃতিক উদ্যানটি দেখতে হাতে সময় নিয়ে আসতে হবে। পার্কে জানা অজানা প্রচুর ফুল, ফলের গাছ। পরিচিতি সহ মূল্যবান আয়ুর্বেদিক গাছ-গাছড়ার সমাবেশ। এইসব গাছের ঔষধি গুণ সম্পর্কে আমাদের ধারণা সীমিত। উদ্যানের এদিক ওদিক ঘুরলেই চোখে পড়বে — ওড়িশার আদিবাসীদের বাসস্থান সহ তাঁদের পূর্ণাবয়ব রেপ্লিকা। এক জায়গায় হস্তিশাবক সহ হাতিদের রেপ্লিকা দেখে মনে হয় জীবন্ত! গাছ-গাছালির সবুজ রঙের এত বৈচিত্র্য, তা এই উদ্যানে না এলে বোঝাই যাবে না। পার্কের মধ্যমণি আয়ুর্বেদাচার্য শুশ্রুত মুনির মূর্তি। ফোয়ারার জলের অসংখ্য সূক্ষ্ম বিন্দু পশ্চিমের আকাশে ছড়িয়ে পড়ে সৃষ্ট রামধনুর সাত রঙের ওপারে সূর্যদেব কখন যেন টুপ করে ডুব দিলেন তা বুঝতে বুঝতেই সন্ধ্যার আঁধারে দারিংবাড়ি-র দৃশ্যপট অন্য মাত্রা পেল।

আশ্চর্য চৌম্বক-ক্ষেত্র!

আজকের দিনটা হাতে রয়েছে। কোথায় যাওয়া যেতে পারে তা জানার জন্য শরণাপন্ন হলাম আমাদের আবাসস্থলের ম্যানেজারের কাছে। তাঁর পরামর্শে প্রাতরাশের পর্ব সেরে চলেছি “ইকো ট্যুরিজম সেন্টার’— মাগুাসুরু।

অনেক অনেক বছর আগে, কত বছর তা অবশ্য কেউ সঠিক ভাবে বলতে পারেন না। তবে স্থানীয় আদিবাসী বয়স্ক মানুষদের কথা অনুযায়ী, ভয়ংকর ভূমিকম্পে মাণ্ডাসুর অঞ্চলের এক সু-উচ্চ পাহাড়-শিখর ফাটল ধরে দু-ভাগ হয়ে যায়। ওই দুটি পাহাড়চূড়ার খুব কাছাকাছি যদি কোনও বিমান ভুলেও এসে যায়, তা হলে বিমানের ইঞ্জিন নাকি বিকল হয়ে দুর্ঘটনার শিকার হতে পারে। ওই পাহাড়চূড়ার অঞ্চলে এক অদৃশ্য চৌম্বক-ক্ষেত্র, যা তৎকালীন ভূমিকম্পের ফলে সৃষ্ট, তাই ওই পাহাড়চূড়ার নাম— – ম্যাগনেটিক পয়েন্ট। কেউ কেউ স্থানটিকে ‘সাইলেন্ট ভ্যালি’ও বলেন।

প্রবেশমূল্য দিয়ে ‘ইকো ট্যুরিজম সেন্টার’ মাণ্ডাসুরু-তে প্রবেশ করলাম। বাঁদিকে সুসজ্জিত উদ্যান আর ডানদিকে ঝাঁ-চকচকে লগ-হাট, ভ্রমণ-পিয়াসীদের প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্য উপভোগের জন্য রয়েছে সমস্ত আধুনিক ব্যবস্থা। অপূর্ব নৈসর্গিক নিঝুম নিস্তব্ধ পরিবেশে এক-দুদিন কাটানোর আদর্শ স্থান। প্রকৃতি তার অপার সৌন্দর্যের ডালি উজাড় করে দিয়েছে এই মাণ্ডাসুরুতে। রয়েছে ভিউপয়েন্ট। ওয়াচ-টাওয়ার। ছোট্ট ক্যান্টিনে চা, স্ন্যাকস, কফি…। আর, সেই চা, কফি পান করতে করতেই নয়ন মেলে দেখে নেওয়া যায় দূরের দুই লালচে-বাদামি ম্যাগনেটিক পাহাড়চূড়ার সম্মোহক দৃশ্য। চারদিকের হরেক শেড-এর সবুজ

গাছ-গাছালির কনট্রাস্ট-এ অপরূপ মোহিনী হাতছানি দেখে মনে হতেই পারে— আহা! ইচ্ছেডানায় ভর করে যদি একবার ওই পাহাড়চূড়া প্রদক্ষিণ করে আসা যেত, তা হলে… তা হলে…..

বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে ফেরার পথে সুসজ্জিত উদ্যানে একটু বিশ্রাম। গাছ-গাছালির মাঝে দোলনা প্রভৃতির একধারে মাতা মেরী-র করুণাঘন মূর্তি। অপূর্ব স্বর্গীয় শান্তির পরিবেশ। পার্কের উলটোদিকের ছোট্ট দোকানে ঝালমুড়ির স্বাদ নিতে নিতে জানা গেল, কাছেই আছে এক সুন্দর ঝরনা। তবে, পাহাড়ি জঙ্গল-পথ ভেঙে অনেকটা পেরিয়ে তার দর্শন মিলবে। কিন্তু পথ ঝুঁকিপূর্ণ। তাই বিরত থাকলাম।

এমু পাখি!

ওড়িশায় এসে এমু পাখিদের দেখা মিলবে, তা ভাবিনি। মাগুাসুরুর চৌম্বক পাহাড় দেখে এবার যাওয়া যাক এমু পাখিদের আস্তানায়। উন্মুক্ত প্রকৃতির মাঝে কিছুটা অঞ্চল ঘিরে এমু পাখির ফার্ম। জাল ঘেরা জায়গায় এমু পাখিরা বিচরণ করছে। কোনও কারণে আজ পরিচর্যাকারীরা নেই। স্থানীয় একটি ছোটো ছেলে জানাল, এখানে এমুর মাংস বিক্রি হয়। আজ অবশ্য পাওয়া যাবে না। হেসে বললাম, আমরা মাংস কিনতে আসিনি। এমু পাখি দেখতে এসেছি।

লাভার্স পয়েন্ট

পাকা সড়ক ধরে কিছুটা এগিয়ে গাড়ি লাল মাটির পথ ধরে এসে পৌঁছাল ‘লাভার্স পয়েন্ট’ ডাডুবাড়ায়। ফুলবনি এখান থেকে প্রায় আশি কিলোমিটার। উঁচু-নিচু পাহাড়ের খাত বেয়ে বয়ে চলেছে ছোট্ট এক খরস্রোতা নদী।

ছোটো-বড়ো পাথরের বাধা এড়িয়ে উচ্ছল গতিতে সে এগিয়ে আসছে আপন খেয়ালে। তারপর লাভার্স পয়েন্ট ছুঁয়ে বয়ে যাচ্ছে অবিরাম।

এখন জানুয়ারির প্রথমার্ধ। বর্ষায় এই নদীর রূপ নিশ্চয়ই আরও দামাল হয়। পাথরের চাতালে পিকনিক পার্টিদের হুল্লোড়। সাউন্ড সিস্টেমের শব্দ এখানকার নিস্তব্ধ পরিবেশ খান খান করে দিচ্ছে। নদীজলের কলধ্বনি ম্লান। চলছে রান্নার আয়োজন। অতি উৎসাহী কয়েকটি যুবক নদীর জলে গা ডুবিয়ে বসে আছে। সতর্ক ভাবে স্রোতস্বিনীতে পা বাড়িয়ে পরখ করলাম, পাথরের উপর শ্যাওলার আস্তরণ বেশ পিচ্ছিল। অতএব, নো রিস্ক। সৌন্দর্য দর্শন করেই শাস্তি।

শীত নেমে এল

বেলা পড়তির দিকে। আবাসে ফিরে দ্বিপ্রাহরিক আহার। বিকেলে ছাদের উপর চেয়ারে বসে আড্ডা দিতে দিতে সূর্যাস্তের রঙিন আকাশ দেখা, সেইসঙ্গে সন্ধ্যার আঁচল বিছানো শুরু। রাতের অন্ধকার জমাট হতেই অজস্র নক্ষত্ররাজির উজ্জ্বল সমাবেশ দেখতে দেখতেই জমিয়ে শীত নেমে এল ‘ওড়িশার কাশ্মীর’ দারিংবাড়ির উপত্যকায়। আমরাও আর বেশি রাত না করে ডিনার সেরে শুয়ে পড়লাম।

আক্ষেপ

খুব সকালে ঘুম ভাঙল। দারিংবাড়ির মেয়াদ শেষ। আজ আমাদের বাড়ি ফেরার দিন। ঘর থেকে বেরিয়ে ছাদে এলাম। পুবের আকাশ লাল। এখনই সূর্যোদয় হবে। উৎসুক দৃষ্টি মেলে চারিদিক পর্যবেক্ষণ করেও বরফের লেশমাত্র দেখা গেল না! থেকে গেল আক্ষেপ৷

প্রয়োজনীয় তথ্য: দারিংবাড়ি ভ্রমণের উপযুক্ত সময় ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি।

কীভাবে যাবেন: হাওড়া স্টেশন থেকে ১২৮৩৯ চেন্নাই মেল ছাড়ে এবং পরদিন সকালবেলা ব্রহ্মপুর (বেরহামপুর) পৌঁছায়। বেরহামপুর থেকে আগাম বুকিং-এ গাড়ি পাবেন দারিংবাড়ি যাওয়া এবং ফেরার চুক্তিতে।

কোথায় থাকবেন: থাকার জন্য রয়েছে রিসর্ট, রিট্রিট, হোমস্টে, জঙ্গল ক্যাম্প, ইকো হোম প্রভৃতি।

কীভাবে ফিরবেন: হাওড়া ফেরার ট্রেন হিসেবেও ১২৮৪০ চেন্নাই মেল সুবিধাজনক। বেরহামপুর পৌঁছে হাতে সময় থাকলে গোপালপুর সমুদ্রসৈকত উপভোগ করতে পারবেন।

পুনশ্চ: শীতের উপযুক্ত শীতপোশাক এবং সঙ্গে অবশ্যই রাখবেন বৈধ পরিচয়পত্র (আধার কার্ড, ভোটার কার্ড), প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র, পানীয় জল এবং শুকনো খাবার।

এক নতুন উপায়ে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ সম্ভব বলে জানালেন বিশেষজ্ঞরা

ভারতে ডায়াবেটিস এবং প্রি-ডায়াবেটিস রোগীর ক্রমবর্ধমান হার মোকাবিলায় এখন প্রয়োজন ওষুধনির্ভর প্রতিক্রিয়াশীল চিকিৎসা থেকে বেরিয়ে এসে, প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপে জোর দেওয়া। চিকিৎসকের পরামর্শ, সচেতন জীবনধারা এবং খাদ্যাভ্যাস—এই তিনের সমন্বয়েই মানুষ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করতে পারে বলে জানালেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস উপলক্ষ্যে সম্প্রতি কলকাতা-র এক অভিজাত হোটেলে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে এন্ডোক্রিনোলজিস্ট এবং পুষ্টিবিদরা অংশ নিয়েছিলেন। আলোচনার বিষয় ছিল—পুষ্টির মাধ্যমে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ সম্ভব কিনা। এই প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ভারতে বর্তমানে ১০ কোটি ১০ লক্ষেরও বেশি মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। তাই, চিকিৎসার পাশাপাশি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে পুষ্টি ও জীবনধারার পরিবর্তনের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে।

লীলাবতী হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের এন্ডোক্রিনোলজিস্ট ও ডায়াবেটোলজিস্ট এবং ইন্ডিয়ান আকাদেমি অব ডায়াবেটিস-এর সভাপতি এবং অধ্যাপক ডা. শশাঙ্ক জোশি জানিয়েছেন, ‘ডায়াবেটিস চিকিৎসা তখনই সবচেয়ে সফল হয়, যখন আমরা ব্যক্তিকেন্দ্রিক পুষ্টি পরিকল্পনা করি। আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত, স্বাস্থ্যকর খাদ্য ও জীবনধারার মাধ্যমে রক্তে শর্করা স্থিতিশীল রাখা। রোগীরা যখন এগুলো বুঝতে পারেন, ডায়াবেটিস তখন রোগ নয়—বরং নিয়ন্ত্রণ-যোগ্য হয়ে ওঠে।’

Experts say that diabetes can be controlled through special methods
Dr. Jeffrey Mechanick, Nutritionist Agnes Siew Ling Tey & Dr. Prof. Shashank Joshi

মাউন্ট সিনাই হাসপাতালের এন্ডোক্রিনোলজিস্ট ও মেডিসিন অধ্যাপক ডা. জেফরি মেকানিক জানিয়েছেন, ‘যেসব ডায়াবেটিস রোগী গ্লাইসেমিক নিয়ন্ত্রণে সমস্যায় ভোগেন, তাদের জন্য মায়ো-ইনোসিটল খাদ্যের সঙ্গে যুক্ত করা সুষম খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্যকর জীবনধারার সঙ্গে মিলিয়ে—উপকারী হতে পারে। তবে এটি প্রচলিত ডায়াবেটিস চিকিৎসার বিকল্প নয়, বরং চিকিৎসকের পরামর্শে ব্যবহারযোগ্য একটি সহায়ক উপাদান।’

এদিকে, ডায়াবেটিস-নির্দিষ্ট পুষ্টিকর ফর্মুলা (DSFs) এখন ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে পরিচিত হচ্ছে। গবেষণায় দেখা যায়, DSF পদ্ধতিতে গ্লাইসেমিক নিয়ন্ত্রণ, হৃদ্‌রোগজনিত ঝুঁকি এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়। বিশেষকরে অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা থাকা টাইপ–২ ডায়াবেটিস রোগীদের পক্ষে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ সহজ হয় এই পদ্ধতিতে। অ্যাবট-এর এশিয়া-প্যাসিফিক নিউট্রিশন R&D সেন্টারের সিনিয়র লিড, ক্লিনিক্যাল সায়েন্স অ্যান্ড নিউট্রিশন, ড. অ্যাগনেস সিউ লিং টে জানিয়েছেন, ‘সঠিক পুষ্টি পরিকল্পনা খুব সহজ বিষয় নয়।  কিন্তু DSFs একটি বিজ্ঞাননির্ভর, ব্যবহারবান্ধব সমাধান, যা জীবনধারাগত পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত হলে দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের উন্নতিতে শক্তিশালী ভূমিকা রাখে।’

গবেষণা জানা গেছে, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত প্রতি চারজনের মধ্যে তিনজনই গ্লাইসেমিক নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যর্থ হন। এর কারণ হিসাবে পাওয়া গেছে, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, জিনগত কারণ এবং অলস জীবনযাপন। স্থূলতাও এই চ্যালেঞ্জ আরও বাড়িয়ে দেয়, ফলে রক্তে শর্করার ওঠানামা এবং হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের প্রতি চারজন ডায়াবেটিস রোগীর মধ্যে তিনজনই রক্তে শর্করার মাত্রা বজায় রাখতে সমস্যায় পড়েন। এর প্রধান কারণ হল, অতিরিক্ত পরিমাণে পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট গ্রহণ এবং খাদ্যে প্রোটিন এবং ফাইবারের ঘাটতি। কিন্তু, সঠিক ভাবে পরিকল্পিত পুষ্টি এবং মায়ো-ইনোসিটল-এর মতো নির্দিষ্ট পুষ্টিগুণ রক্তে শর্করা ও মেটাবলিক স্বাস্থ্যের উন্নতিতে সহায়ক হতে পারে, যা উপবাসকালীন রক্তে শর্করা এবং এইচবিএ১সি স্তর কমাতে সাহায্য করে।

নতুন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, নির্দিষ্ট পুষ্টি উপাদান ও সঠিক খাদ্যাভ্যাস ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ফল, শস্য, বাদাম ও ডালজাত খাদ্যে প্রাকৃতিক ভাবে উপস্থিত মায়ো-ইনোসিটল ইনসুলিনের মতো কাজ করার ক্ষমতা রাখে এবং গবেষণায় এটি রক্তে শর্করা এবং HbA1c কমাতে সহায়ক হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।

বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত যে, আমরা কী খাই এবং কীভাবে খাই, এটাই আমাদের দেহের গ্লুকোজের মাত্রার মূল বিষয়। পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট সমৃদ্ধ এবং কম প্রোটিন ও ফাইবার-যুক্ত খাদ্য শুধু রক্তে শর্করার মাত্রা নয়, সামগ্রিক মেটাবলিক ও হজমস্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। জটিল কার্বোহাইড্রেট, উন্নত প্রোটিন এবং স্বাস্থ্যকর ফ্যাটসমৃদ্ধ খাদ্য গ্লাইসেমিক স্থিতিশীলতা ও সার্বিক সুস্থতায় সহায়তা করে।

যেতেই পারি… দারিংবাড়ি (পর্ব-০২)

প্রাতরাশের পর্ব সেরে বেরোতে একটু দেরিই হয়ে গেল। রোদের তাপ বাড়ছে। উচিত ছিল আরও সকাল সকাল বেরোনো। এখানকার মজা এটাই— রোদ বাড়লেই শীত উধাও।

আদিবাসী এবং স্থানীয় মানুষজনের দেখা মিলছে পথে। কেউ কেউ ছাগল, ভেড়ার পাল নিয়ে চলেছে। কেউবা মাথায় ধানগাছ কিংবা ঘাসের বোঝা নিয়ে হাঁটছে। কলসি নিয়ে মহিলাদের জল আনার দৃশ্যও চোখে পড়ছে। বাড়ির দাওয়ায় উঠোনে মুরগি চরে বেড়াচ্ছে। এখানকার প্রায় প্রতি বাড়িতেই আছে একটা মুরগির ঘর, যা এখানে ‘কুকুড়া-ঘর’ নামে পরিচিত। পোষ্য হিসেবে গরু, কুকুরও আছে। লোকজনের মুখে প্রশান্তির ছাপ। নগর-সভ্যতার নানান সুখ-অসুখ যেন এরা দূরে সরিয়ে রেখেছেন। যদিও এখানকার বেশ প্রত্যন্ত অঞ্চলে মোটরযান, ডিশ টিভি, মোবাইল ফোন প্রবেশ করেছে। তবুও, এখনও প্রকৃতির রূপ, রস, বর্ণ এবং গন্ধের সঙ্গে মিলেমিশে এরা বসবাস করছেন এবং জীবনযাপন করছেন।

টেকাবাড়ি পেরিয়ে বালিগুদা ফরেস্ট রেঞ্জে প্রবেশ করলাম। জঙ্গলের নীরবতা ভাঙছে শুকনো পাতা হাওয়ায় ওড়ার শব্দ এবং নাম না-জানা নানান পাখির ডাকে। উঁচু উঁচু শাল, সেগুন, পাইন সবুজ গাছ-গাছালির মধ্যে দিয়ে রোদ্দুর নকশা আঁকছে লাল মাটি আর কালো পিচ পথের উপর। মাঝেমধ্যেই আছে গ্রাম পঞ্চায়েত ভবন। দেখে মনে হচ্ছে পঞ্চায়েতের কাজকর্ম বেশ সন্তোষজনক।

সামনেই নজরে পড়ল ফ্লেক্স-বোর্ড— মিডুবাণ্ডা ওয়াটারফল। গাড়ি থামল। চালক বলল এটা হচ্ছে দাসিংবাড়ি ওয়াটারফল। নেমে পড়লাম। সামান্য হাঁটতেই গাছপালার ভিতর থেকে জলের শব্দ। একটু এগোতেই সিঁড়িধাপ। নামতে নামতে বেশ কয়েকটি পিকনিক পার্টির সাউন্ড সিস্টেমের আওয়াজ শান্ত পরিবেশ ভেঙে খান খান করে দিচ্ছে। আরও কিছুটা নামতেই সাউন্ড সিস্টেমের শব্দ কমছে, জলপ্রপাতের শব্দ বাড়ছে।

ডানদিকের এক শুঁড়ি-পথে জলপ্রপাতের উপরের অংশে পৌঁছানো যায়। আমরা সেই পথে না গিয়ে প্রপাতের পাদদেশে গিয়ে দাঁড়ালাম। এটাকে ঠিক জলপ্রপাত না বলে ঝরনাধারা বলাই শ্রেয়। তবে জলধারার ছান্দসিক অবতরণ উপভোগ্য। অসম, প্রায় ফুট খানেক উচ্চতার সিঁড়িধাপ ভেঙে ফিরতি পথ অতিক্রম করার পর বেশ ক্লান্ত লাগছে। বেলা বেড়েছে। গরম অনুভূত হচ্ছে।

রূপসি শোনপুরা

গাড়ি কিছুটা এগিয়ে বাঁ-হাতি রাস্তায় ঘুরল। চালক বলল, আমরা এখন চলেছি শোনপুরা গ্রামের উপত্যকার দিকে। এখানে আলাদা ভাবে কোনও স্পট নেই। দুচোখ ভরে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করুন। মনটা খুশিতে নেচে উঠল। এমনটাই তো চেয়েছিলাম। প্রকৃতির কোলে কিছুটা সময়। পথের প্রতিটা বাঁকে নির্বাক সুন্দর প্রকৃতির অসামান্য রূপের ডালি সবুজ-নীল পাহাড়শ্রেণির অকল্পনীয় বৈচিত্র্যে মনে পড়ে যায় আরব সাগরের তীরবর্তী পশ্চিমঘাট সহ্যাদ্রি পর্বতমালার কথা।

শোনপুরা উপত্যকার ছবির মতো গ্রামের অবস্থান সত্যিই মনোমুগ্ধকর। মন চাইছিল ওই গ্রামের আঙিনায় চলে যেতে, কিন্তু আমাদের আজ আরও কিছু দর্শনীয়স্থল দেখতে হবে। তাই প্রকৃতির সেই অমলিন সৌন্দর্য, উপত্যকার সবুজের বৈচিত্র্যে রৌদ্রছায়ার খেলা ক্যামেরাবন্দি করে অ্যাবাউট টার্ন।

ছায়াময় কফি বাগান

সামনে নেচার পার্ক। কফি আর গোলমরিচ বাগান। সেই সঙ্গেই রয়েছে আরও নানান ধরনের গাছ। মূলত এটি কফি গার্ডেন। বাইরের পাঁচিলে ছবি। প্রবেশমূল্য আছে। বাগানে উঁচু উঁচু গাছের ঘনত্বে রোদ্দুরের প্রবেশ সীমিত। তাই বেশ শীতল শিরশিরানি আমেজ। ঝিরিঝিরি বাতাস বইছে।

ডলুরির সঙ্গে দেখা

রাস্তার ধার ঘেঁষে সুনীল আকাশের দিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ঘন পাইন গাছের সমাবেশে জায়গাটার সঙ্গে কাশ্মীর না হলেও, হিমাচলের পাইন জঙ্গলের সাদৃশ্য মেলে। এখানেও পিকনিক পার্টিদের হুল্লোড়। পাইন গাছের পাশ কাটিয়ে লাল মাটির উপর রোদ্দুর এবং ছায়ার নকশা দেখতে দেখতে মিনিট দশেক হাঁটলেই দেখা হবে নদীর সাথে। ডলুরি নদী। দু-পাশে সোনালি বালিতটের মাঝে ক্ষীণ ধারায় নিজের পথ তৈরি করে আপন খেয়ালে সে বয়ে চলেছে। বর্ষায় তার রূপ অন্য। দামাল। তবে স্থানীয় মানুষজনের কথায়, ঘুরতে আসা মানুষেরা যেন ডলুরিতে স্নান করা থেকে বিরত থাকেন। আপাত শান্ত ডলুরির হিমশীতল জল আঁজলা ভরে চোখে মুখে ছিটোতেই শরীরে এক অপরূপ প্রশান্তির অনুভব!

যেতেই পারি… দারিংবাড়ি (পর্ব-০১)

কলকাতায় তখন জমিয়ে শীত। জানুয়ারির প্রথমার্ধ। রাত পৌনে বারোটায় চেন্নাই মেল ছাড়ল। দারিংবাড়িতে না জানি কত শীত! নেট-ঘাঁটা তথ্যে তাপমান চার থেকে পাঁচ! উরিব্বাপ। সাধে বলে — ওড়িশার কাশ্মীর! অতীতে নাকি এখানে বরফপাতের দৃশ্য দেখার সৌভাগ্য অনেকেরই হয়েছে। সেই রোমাঞ্চকর দৃশ্য দেখার বাসনায় যথেষ্ট শীতপোশাক ব্যাগবন্দি করে কলকাতা থেকে সফর শুরু করি।

লম্বা দৌড়

ভোরের সূর্যালোকে চিলিকার সোনালি জলরাশি দেখতে দেখতেই সকাল দশটা নাগাদ ব্রহ্মপুর (চলতি কথায় বেরহামপুর) প্লাটফর্মে নেমে, শীত পোশাক খুলে আবার ব্যাগে ভরে রাখি। কোথায় শীত! মনে পড়ল, কাছেই তো গোপালপুর সমুদ্রসৈকত।

কুকুরাখাণ্ডি বাজার

গাড়ি রেডি। এন এইচ ৫৯ ধরে বড়োবাজার পুলিশ স্টেশনের কাছেই পথ নির্দেশ— বাঁয়ে রায়গাড়া, ডাইনে ফুলবনি, সোজা আশিকা। হ্যাঁ, জায়গার নাম আশিকা। অবাক লাগলেও সত্যি।

বেরহামপুর শহরাঞ্চল ছাড়িয়ে প্রায় এগারোটা নাগাদ কুকুরাখাণ্ডি বাজার। একটা বড়োসড়ো মিষ্টির দোকানের সামনে গাড়ি দাঁড়াল প্রাতরাশের জন্য। এমন একটা জায়গায় সাইনবোর্ডহীন দোকানের ভিতর দু’পাশে সারিবদ্ধ চেয়ারগুলো খানেওয়ালাদের দখলে। ভোজ-বাড়ির ফর্মুলায় চেয়ার দখল করে মশলা ধোসা, রাবড়ি এবং মিষ্টি সহযোগে কোনওরকমে উদরপূর্তি সেরে বাইরে চায়ের দোকানে চা পান করে ফের ছুট!

সমলতল থেকে পাহাড়

সারদা মোড় থেকে গাড়ি বাঁদিকের পথ ধরল। পথ নির্দেশ বোর্ডে লেখা— ধারাকোট, বালিগুদা, ভবানীপাটনা, রায়পুর। ধারাকোটের ডানদিকে ঋষিকুল্য নদী এবং জলাধার। বেলা প্রায় একটা। কিছুটা এগিয়ে শুরু হল জঙ্গল, পাহাড়ি পথ৷ এতক্ষণ সমতল পথ দেখে মনে হচ্ছিল, কোথায় দারিংবাড়ি? কোথায় সেই জঙ্গল, পাহাড়? অপ্রত্যাশিত গরম। গায়ের শার্টটাও খুলে শুধুমাত্র স্যান্ডো গেঞ্জি পরে চলেছি ‘ওড়িশার কাশ্মীর’। এমন কথা ছিল কি!

হঠাৎই দৃশ্য পরিবর্তন। শুরু হল জঙ্গল-পথ। গাছ-গাছালির ঘনত্ব বাড়ছে। পথের চেহারা পালটে যাচ্ছে। অজস্র চড়াই আর অসংখ্য ধারালো পাকদণ্ডী। গাড়ির গতির সঙ্গে দৃশ্যপট চোখ-সওয়া হওয়ার আগেই, বাঁকের মোচড়ে শরীরে অস্বস্তি। এমনটা হতো না যদি ঠান্ডার আমেজটা থাকত। রোদ্দুরে গরম, কিন্তু ছায়াতে ঠান্ডার সামান্য আমেজ— এই কি পাঁচ-ছয় ডিগ্রির নমুনা!

এরই মধ্যে কোথা থেকে হনুমান বাবাজিদের হুটোপুটিতে গাড়ির গতি মন্থর। থেমেও গেল। বেশ কয়েকটা হনুমান গাড়ির বনেটে, ছাদের উপর লাফালাফি শুরু করে দিল। গাড়ির চালক তার পাশে রাখা ছোটো ছোটো বিস্কুটের প্যাকেট খুলে হাত বাড়িয়ে দিতেই তা নেওয়ার জন্য প্রতিযোগিতার ধুম। এমনকী বন্ধ কাচের জানলায় উঁকিঝুকি, চোখে প্রশ্ন খাবার আছে তো?

রোমাঞ্চকর পথযাত্রা

দারিংবাড়ি পৌঁছানোর শেষ তিরিশ কিলোমিটার পথে প্রায় তিন হাজার ফুটের বেশি উচ্চতায় আরোহণ পর্ব সত্যিই রোমাঞ্চকর। প্রায় নির্জন জঙ্গল-পাহাড়ি অসংখ্য পাকদণ্ডী পথ পেরিয়ে বেলা প্রায় দুটো নাগাদ দেখা মিলল দারিংবাড়ির ছোট্ট জনপদ। দেখা গেল, বাজার কিংবা হাট শেষবেলার বিকিকিনিতে ব্যস্ত। স্থানীয় বা আশপাশের গ্রাম থেকে আসা মানুষজন, মাথার উপর নীল আকাশ, দু’ধারে লাল মাটির মাঝে কালো পিচ রাস্তা আর সবুজের সমারোহ উপভোগ করতে করতে, পৌঁছে গেলাম ইকো হোমের গেটে।

গাড়ি থেকে নেমে চারদিকে চোখ বুলিয়ে মনে হল, দারিংবাড়ির এটাই সবথেকে মনোরম পকেট-ফ্রেন্ডলি আবাসস্থল। চমৎকার মরশুমি রংবাহারি ফুল এবং নানা ধরনের গাছেরা সেজেগুজে আমাদের অভ্যর্থনা জানাল ‘ওড়িশা-র কাশ্মীর’ দারিংবাড়ি-তে। পাহাড়ের উপর আমাদের জন্য নির্ধারিত তিনটি ঘর অবস্থানের দিক দিয়ে সেরা। দ্বিপ্রাহরিক আহারের ব্যবস্থা তৈরি। ব্যাগপত্তর ঘরে রেখে, মুখ হাত ধুয়ে হালকা স্নান সেরে সোজা ডাইনিং হল।

ঘরে ফিরে ছোট্ট একটা ঘুম। সেই ঘুম ভাঙল পড়ন্ত বিকেলের আলোয়। আকাশের রং পালটাচ্ছে। সামনে প্রশস্ত ছাদে চেয়ার, টেবিল, গার্ডেন আম্ব্রেলা৷ আলস্য কাটিয়ে চেয়ারে গিয়ে বসলাম। সূর্য ক্রমশ পশ্চিমের পাহাড়শ্রেণির চূড়া ছুঁতে চলেছে। চেয়ারে বসে সূর্যাস্তের যে অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করলাম, তা পরের দিন দারিংবাড়ির সানসেট পয়েন্টে গিয়েও পাইনি।

তারাদের বৈঠকে

চোখের সামনেই কখন যেন সূর্যটা সন্ধ্যার আঁধারের মধ্যে মিলিয়ে গেল। এবার শীত লাগছে। শীতপোশাক চড়িয়ে এসে সকলে মিলে জমিয়ে আড্ডা। আড্ডার মূল বিষয় যেমন শীতের কথা শুনেছিলাম, তেমনটা কই?

দারিংবাড়ির আকাশে আঁধার নামছে। দূর পাহাড়ের নীলচে-সবুজ রঙের উপর নিউট্রাল কালারের পৌঁচ— গাঢ় থেকে গাঢ়তর হচ্ছে। দু-একটা পাখির ডাক ছাড়া চারদিক নিস্তব্ধ। ধোঁয়াটে। এও এক অন্ধকারের রূপ! তবে তা কিছুটা ব্যাহত উপত্যকার বসবাসের এলাকায় জ্বলে ওঠা বিজলিবাতির উদ্ভাসে। সান্ধ্যকালীন নৈঃশব্দের দারিংবাড়ির আকাশ ভরে উঠছে অসংখ্য নক্ষত্ররাজির সমাবেশে। তারাদের সেই সমাবেশ দেখতে দেখতে, তাদের কথা শুনতে শুনতে মনে হল— এমন গহন অন্ধকারে রাতের আকাশে তারাদের ঔজ্জ্বল্য কেন কলকাতার আকাশে দেখতে পাই না!

ভোরের সূর্য

খুব ভোরে ঘুম ভাঙল। তৈরি হতে হবে। আঁধার কাটছে। দূর পাহাড়ের নীলচে সবুজ স্তরে স্তরে মেঘের হালকা তুলির টান। কুয়াশার পর্দাও হতে পারে। চাদর জড়িয়ে বাইরে বেরোলাম। কৌতূহলী দৃষ্টি বরফ খুঁজছে। বরফদানা কোথায়! শীতটাও অদ্ভুত। আবহাওয়া দফতরের ভাষ্য অনুযায়ী— তাপমান চার থেকে ছয় ডিগ্রির মধ্যে অথচ শীতের কামড়ানি নেই। এক আশ্চর্য স্নিগ্ধ শীত। যতদূর মনে হয়, শীতের রাতে যে শিশিরপাত হয়, তা ভোরবেলার ঘাসের উপর পাতলা দানার আকার সৃষ্টি হয়, ওটাই বরফের ভ্রম। তবে, আমরা তার দেখাও পাইনি।

প্রশস্ত ছাদে বসে শীত উপভোগ করতে করতে সূর্যোদয়ের অপেক্ষা। আকাশ লাল হচ্ছে। সেই লালিমার নানান পরতের খেলা দেখিয়ে অবশেষে সূর্যদেব উঁকি দিলেন। আহা! কী তার রূপ! অবাক বিস্ময়ে বরফপাত না দেখার মনখারাপ মুছে দিল সূর্যোদয়ের সোনালি আলোর প্রলেপ।

প্রস্টেট ক্যানসার-এর চিকিৎসা এবং সচেতনতা

বিশ্বব্যাপী এবং ভারতে পুরুষদের সবচেয়ে সাধারণ ক্যানসারগুলির মধ্যে একটি হল প্রস্টেট ক্যানসার। সাম্প্রতিক ভারতীয় ক্যানসার রেজিস্ট্রি অনুসারে, পুরুষদের মধ্যে প্রস্টেট ক্যান্সার শীর্ষ দশটি ক্যানসারের মধ্যে রয়েছে এবং এর প্রকোপ ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে, বিশেষকরে শহরাঞ্চলে।

প্রস্টেট হল মূত্রাশয়ের নীচে অবস্থিত একটি ছোট গ্রন্থি, যা পুরুষ প্রজননে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কলকাতা-র মেডেলা কার্কিনোস অনকোলজি ইনস্টিটিউট-এর কনসালটেন্ট রেডিয়েশন এবং ক্লিনিক্যাল অনকোলজিস্ট ডা. শৌভিক ঘোষ এই বিষয়ে কী জানিয়েছেন, সেই তথ্য-ই পরিবেশন করা  হচ্ছে বিস্তারিত ভাবে।

লক্ষণ 

প্রাথমিক পর্যায়ে প্রস্টেট ক্যানসারের তেমন কোনও লক্ষণ থাকে না। তবে, এটি বৃদ্ধি ঘটলেই পুরুষদের কিছু সমস্যা হতে পারে। যেমন–ঘন ঘন প্রস্রাব, বিশেষকরে রাতে। প্রস্রাব শুরু করতে কিংবা বন্ধ করতে অসুবিধা, প্রস্রাবের গতি কম থাকা কিংবা ফোঁটা ফোঁটা প্রস্রাব হওয়া, প্রস্রাব করার সময় ব্যথা কিংবা জ্বালা, প্রস্রাব কিংবা বীর্যের সঙ্গে রক্তক্ষরণ এবং পিঠের নীচের অংশ, নিতম্ব কিংবা উরুতে ব্যথা (যদি রোগটি ছড়িয়ে গিয়ে থাকে) ইত্যাদি।

এটা মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে, এই লক্ষণগুলি প্রস্টেট বৃদ্ধির কারণেও দেখা দিতে পারে, যা বয়স বাড়লে খুবই সাধারণ সমস্যায় পরিণত হতে পারে। অতএব, সঠিক রোগ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসা মূল্যায়ন অপরিহার্য।

Photograph of Dr Souvik Ghosh
Dr. Souvik Ghosh

প্রস্টেট-এ সমস্যার কারণ 

প্রস্টেট ক্যানসারের সঠিক কারণ এখনও পুরোপুরি বোঝা যায়নি, তবে কিছু কারণ ঝুঁকি বাড়ায়।  যেমন—বয়স। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ৫০ বছর বয়সের পরে সাধারণত প্রস্টেট-এর সমস্যা হয়। বাবা কিংবা ঠাকুরদা প্রস্টেট ক্যানসার-এ আক্রান্ত হওয়ার পারিবারিক ইতিহাস ঝুঁকি দ্বিগুণ করে। উচ্চ চর্বিযুক্ত খাবার, স্থূলতা এবং বসে থাকার অভ্যাস এই সমস্যার মুখ্য ভূমিকা পালন করতে পারে।

এরজন্য নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং সচেতনতা, ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের প্রাথমিক ভাবে প্রস্টেট ক্যানসার সনাক্ত করতে সাহায্য করতে পারে।

চিকিৎসা

চিকিৎসায় সাফল্যের হার রোগের পর্যায়, বয়স এবং রোগীর সাধারণ স্বাস্থ্যের উপর নির্ভর করে।

  • প্রাথমিক পর্যায়: বিকল্পগুলির মধ্যে রয়েছে অস্ত্রোপচার, রেডিয়েশন থেরাপি অথবা সক্রিয় নজরদারি (সতর্ক পর্যবেক্ষণ)
  • উচ্চ পর্যায়: হরমোন থেরাপির সঙ্গে মিলিত রেডিয়েশন থেরাপি অত্যন্ত কার্যকর
  • মেটাস্ট্যাটিক পর্যায়: হরমোন থেরাপি, কেমোথেরাপি এবং নতুন লক্ষ্যযুক্ত কিংবা ইমিউনো থেরাপির বিকল্পগুলি রোগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং জীবনের মান উন্নত করতে পারে।

আধুনিক রেডিয়েশন থেরাপি কৌশল, যেমন–আইএমআরটি, আইজিআরটি এবং স্টেরিও ট্যাক্টিক রেডিও থেরাপি ন্যূনতম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সহ অত্যন্ত নির্ভুল এবং নিরাপদ চিকিৎসা প্রদান করে।

সতর্কতা

  • ৫০ বছরের বেশি বয়সি পুরুষদের (অথবা পারিবারিক ইতিহাস থাকলে ৪৫ বছর বয়সি) তাদের উচিত চিকিৎসকের পরামর্শ মতো প্রস্টেট স্ক্রিনিং করিয়ে নেওয়া
  • পিএসএ রক্ত পরীক্ষা এবং ডিজিটাল রেকটাল পরীক্ষা হল সহজ পরীক্ষা, যা প্রাথমিক রোগ নির্ণয়ে সহায়তা করে
  • একটি স্বাস্থ্যকর জীবনধারা বজায় রাখুন। যেমন–সুষম খাদ্য গ্রহণ, নিয়মিত ব্যায়াম এবং ধূমপান এড়িয়ে চলুন
  • মূত্রনালীর যে-কোনও সমস্যা হলে, বিলম্ব না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন

সেইসঙ্গে মনে রাখবেন, প্রস্টেট ক্যানসার যখন প্রাথমিক ভাবে সনাক্ত করা হয়, তখন এটি চিকিৎসার সাফল্য বাড়িয়ে দেয়। আসলে, সচেতনতা এবং নিয়মিত স্ক্রিনিং জীবন বাঁচাতে পারে। প্রাথমিক ভাবে রোগ শনাক্ত করাই সর্বোত্তম সুরক্ষার উপায়। ছোটো ছোটো লক্ষণগুলিকে উপেক্ষা করবেন না। কারণ, এগুলো আপনার জীবন বাঁচানোর চাবিকাঠি হতে পারে।

একচ্ছত্র সাহিত্য আকাদেমি (পর্ব-০২)

নিধি হকচকিয়ে পিছন ফিরে বিল্টুকে দেখে বলে, “কী রে আবার কী হল? এদিকে আমার পিছনে কেন? তোর তো মনোজের দোকানে যাওয়ার কথা এখন৷ বিল্টু হাঁপাতে হাঁপাতে বলে— আরে বাবা ফ্লেক্স তো বানাতে বলব, কিন্তু ম্যাটারটা বলবে না?”

—ও, আচ্ছা। এই একটা সামান্য ব্যাপার সেটাও আমাকেই বলে দিতে হবে? কী মুশকিল। তোরা কি কিছুই পারিস না। যতসব অপোগণ্ডের দল কোথাকার। এক কাজ কর, ওটা তুই ফোন করে ওই যে রে ‘চালচিত্তির’ ম্যাগের সম্পাদক দালাল মিত্তিরের কাছে জেনে নে৷ যা যা, যা তো দেখি এখন। আমাকে যেতে দে ঘ্যানঘ্যান না করে।

বিল্টু ব্যোমকে দাঁড়িয়ে উলটো দিকে পা বাড়াল, ‘যাঃ শালা’ বলে!

অগত্যা বিল্টু প্রথমে রিকশ তারপর মিনিট দশেক পায়ে হেঁটে গলির গলি তস্য গলি পেরিয়ে, কেন্দুবাজারের মনোজের দোকানে। মনোজ চেনে বিল্টুকে আগে নিধিরামের সঙ্গে বারকয়েক যাওয়ার সূত্রে।

—আরে কী খবর বিল্টুভায়া।

—নিধিদার জন্য একটা ফ্লেক্স বানিয়ে দিতে হবে। আজ সোমবার তো। তা সামনের শনিবার সকালের মধ্যে পেলেই হবে।

—চিন্তা কোরো না, হয়ে যাবে। শনিবার সকালে নিয়ে যেও।

—ঠিক আছে।

বিল্টু উঠে দাঁড়াতেই মনোজ বলল, “আরে যাও কোথায়? ম্যাটারটা দাও।’

—ও হ্যাঁ, নিদুদা বলেছে তুমি ওটা দালাল মিত্তিরের থেকে নিয়ে নিও। বলেই চম্পট।

মনোজ ওর চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে অস্ফুটে বলল, ‘যাচ্চলে! কে দালাল মিত্তির তার ঠিক নেই। আমি জানব কী করে? যত্তসব…’

দিন দুয়েক পর সাতসকালে চটি ফটফটিয়ে নিধিরাম বিল্টুর বাড়ি হাজির। বিল্টু তখনও বিছানা ছাড়েনি। বিল্টুর মা বসার ঘরে বসতে বলে ভিতরে চলে গেলেন। বিল্টু মিনিট কয়েকের মধ্যেই চোখ কচলাতে কচলাতে নিধির সামনে হাজির।

—কী ব্যাপার নিদুদা এই সাতসকালে?

—কেন রে আসতে মানা আছে নাকি?

—না, তা না, তবে ভয়ানক কিছু নয় তো…..

—আরে, না না। ভিতরে গিয়ে দ্যাখ তো টিফিনটা এখনও আসছে না কেন? খুব খিদে পেয়েছে বুঝলি কিনা। এতটা পথ ঠেঙিয়ে আসা তো!

এর মধ্যেই বিল্টুর মা থালাভরতি লুচি, মিষ্টি, আলুভাজা নিয়ে হাজির। বাঁ-হাতে জলের গেলাস। নিধিরামকে খেতে বলে চলে গেলেন।

—তুমি খাও, আমি ব্রাশ করে আসি।

বিল্টু ভিতরে ঢুকে গেল। যখন ফিরে এল ততক্ষণে প্লেট সাফ। জল খেয়ে নিধিরাম তৃপ্তির ঢেকুর উগরে দিল। মায়ের ডাক শুনে বিল্টু চা নিয়ে এল। নিধি চায়ে চুমুক দিল। মুখের সিগারেট আগুনের অপেক্ষায়।

—হ্যাঁ রে বিল্টু, ফ্লেক্সটার কী খবর?

—চিন্তা কোরো না, শনিবার সকালে দেবে বলেছে মনোজদা। তুমি শুধু একবার গিয়ে ম্যাটারটা দিয়ে এসো।

—সে কী রে, দালাল মিত্তির দেয়নি?

—তা তো জানি না। আমি মনোজদাকে বলেছিলাম দালালবাবুর থেকে ম্যাটারটা নিয়ে নিতে। তবে নিয়েছে কিনা জানি না। -গেল গেল রে সব গেল। এই আমি এখন কী যে করি!

—একটু বোসো। আমি রেডি হয়ে নিই। তারপর বেরোব দু’জনে মিলে।

—আচ্ছা, বলছিস যখন… কিন্তু আমার আর এক কাপ চা লাগবে তাহলে।

—ঠিক আছে।

বিল্টু মিনিট দশেক পরে ওর নিজের জন্য বরাদ্দ ঠান্ডা মেরে যাওয়া চা-টা তার নিদুদাকে ধরিয়ে দিল। তাতেই খুশি নিধিরাম। বিল্টু সকালের টিফিন খেয়ে তারপর নিধিরামের সঙ্গে জয় মা বলে বেরিয়ে পড়ল কেন্দুবাজারের মনোজের দোকানের উদ্দেশ্যে। যেতে যেতে মেইন রাস্তায় উঠেই দেখল একটা মৃতদেহ নিয়ে— বলো হরি, হরিবোল করতে করতে যাচ্ছে। দু’জনেই অভ্যাসবশত মাথা নুইয়ে কপালে হাত ঠেকাল।

—আচ্ছা, নিদুদা তুমি সেদিন চালতা বাগান, মঠ, শ্রাদ্ধ— এসব নিয়ে কিছু একটা বলছিলে। কিন্তু শুরু হতে না হতেই থেমে গেলে। এখন ব্যাপারখানা একটু বিশদে খুলে বলো তো দেখি দাদা।

—ও হ্যাঁ, ঠিক মনে করিয়েছিস তো। সে বেশ গোছানো চমৎকার ব্যবস্থাপনা রে। আমাদের এখানে নেই। একদম নেই অথচ থাকা উচিত ছিল।

অধৈর্য বিল্টু বলে ওঠে, “আরে বাবা অত ধানাই-পানাই না করে মোদ্দা কথাটা বলো দেখি। সেদিন থেকে আমার মাথা গরম করছ।’

—আহা, বলছি তো। দেখছিস না আমি কি না বলে চুপ করে আছি? তুই তো কথার মাঝে কথা কেটে দিয়ে খামোকা রাগারাগি করছিস। তা জানিস উপর নীচের দু’টো হলঘরে একসাথে দু’দুটো শ্রাদ্ধের কাজ একসঙ্গে করার ব্যাবস্থা রয়েছে রে। এক্কেবারে ‘টার্ন কি’ প্রোজেক্টের মতোন। শুধু টাকা ফেলে দাও। খাটবিছানাসহ সমস্ত উপচারাদি, পুরুত বাহ্মণ, রান্নাবান্না, লোক খাওয়ানো সব সেই সংস্থার। যাকে বলে পার্মানেন্ট এস্টাব্লিশমেন্ট। ঝামেলাহীন। বসার খাওয়ার টেবিল, চেয়ার, পায়খানা, বাথরুম… কী নেই!

—তাহলে তো প্রচুর টাকার ব্যাপার নিশ্চয়।

—আরে না না। ওইখানেই তো আসল ব্যাপারখানা ঘাপটি মেরে বসে রয়েছে। বেশ ভালো লাগল বুঝলি। পারলৌকিক কাজকম্মো চুকেবুকে গেলে এবার খাবার টেবিলে। বেশি না, আমি ক্ষমাঘেন্না করে এই নামমাত্তর গোটা পঞ্চাশেক লুচি আলুর দমসহ বোঁদে, রসগোল্লা আর ক্ষীরকদম্ব সাঁটালাম। বলতে বলতে ততক্ষণে ওরা মনোজের দোকানে।

মনোজ নমস্কার করে বলল, ‘আরে দাদা এসো এসো। কী সৌভাগ্য আমার সাতসকালে তোমার চরণধুলোয় আজ আমার দিনটা ভালো যাবে আশা করি।’

নিধিরামও অমায়িক বলল, ‘তা আর বলতে। একটা সিগারেট দে আর চা বল, দুধ চিনি বেশি করে।

—তা হ্যাঁ রে, শনিবার সকালে ফ্লেক্সগুলো ঠিক পেয়ে যাব তো? তোর যা কথার দাম! বিল্টু বলছিল বটে, তবে নিশ্চিত হতে আমি নিজেই এলাম এই সাত সকালে।

–আচ্ছা বলেছ দাদা। ম্যাটারটা দেবে তবে তো কাজ শুরু করব নাকি?

—সে কী রে, দাদাল মিত্তির তোকে দেয়নি এখনও? আর না দিলে তুই চেয়ে নিবি না, কী যে বলি। তোরা না সব… আজকালকার ছেলেপিলেদের সব এই এক দোষ!

—আরে সেদিন থেকে তোমরা দু’জন দালাল দালাল করছ, তা এই মালটা কে? আর মোদ্দা কথা আমি কি ছাই ওকে চিনি, না জানি? দ্যাখো, এখনও ম্যাটারটা দিলে সময়মতো পেয়ে যাবে, না হলে ঘুড়ি ওড়াবে। ক্ষমা করো দাদা আর চেটো না।

—আচ্ছা আচ্ছা, বোসো। সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। এই মনোজ একটা কাগজ কলম নিয়ে বোস তো দেখি তাড়াতাড়ি।

মনোজ রেগেমেগে বলল, ‘কাগজ কলম দিচ্ছি, ইচ্ছে হয় নিজে বোসো। আমি পারব না। ব্যস, এটাই আমার শেষ কথা।”

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব