সমাজ আজও বিভক্ত

হিন্দুত্বের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে এক রাজনীতিবিদ বলেছেন যে, আমরা বিভক্ত হয়েছি, সে কারণেই আমরা বারবার পরাজিত হয়েছি এবং বিদেশীরা বারবার আমাদের শাসন করেছে। হিন্দু ধর্মে সবকিছু ঠিক আছে কিন্তু যেহেতু অনুগামীরা বিভক্ত, তাই হয়তো রাম জন্মভূমি ৫০০ বছর ধরে বিধর্মীদের হাতে ছিল।

এই ভাগাভাগি সমাজের দ্বারা, রাজার দ্বারা, প্রজাদের দ্বারা বা ধর্মের দ্বারা করা হয়। আমরা যদি রামায়ণ ও মহাভারতের স্মৃতি এবং পৌরাণিক কাহিনি পড়ি, তাহলে ভাগাভাগির বিষয়টিকে যেভাবে মহিমান্বিত করা হয়েছে, তার জন্য প্রজা বা রাজা কেউই দায়ী নয়, ধর্মগ্রন্থের লেখকরাই দায়ী।

তাহলে কে সমাজকে সুর-অসুরে বিভক্ত করেছে? প্রত্যেক দেব-দেবীর হাতে অসুর নিধনের জন্য অস্ত্র থাকলেও, ধনুর্ধারী মানুষের তীর তার নিজের লোকদের হত্যা করেছে যুগ যুগ ধরে। শাস্ত্রে এই শত্রুতা কিংবা লড়াইয়ের বিষয়গুলি গর্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। আজও এসব গ্রন্থ শ্রবণ ও পাঠ করাকে ধর্মের কাজ বলে মনে করা হয়। তাহলে ভাগাভাগি নিয়ে চোখের জল কেন?

রামায়ণ ও মহাভারত, যার উপর ভিত্তি করে আমাদের বর্তমান রাজনীতি গড়ে উঠেছে, তা ঘর-বাড়ি ভাগেরই তো গল্প বলে। উভয় গল্পেই ক্ষমতা লাভের জন্য একজন অন্যজনকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করেছে কিংবা তৃতীয়জন উচ্ছেদে মদত জুগিয়েছে।

আমাদের যৌথ পারিবারিক ঐতিহ্য সুফল দেয়নি। যৌথ পরিবারে সবাই অংশীদার এবং যে বাড়িতে একসঙ্গে রান্নাঘর থাকে, সেখানে অর্ধেক সময় ঝগড়া হয়। আর এরপর যা ঘটে তা হল— বিভাজনের বিষয়টি ঘরের বাইরে দলাদলিতে পরিণত হয় এবং সম্পর্কগুলো নষ্ট হতে শুরু করে।

সমাজকে বিভক্ত করে পুনর্জন্মের ধারণা। এক জন্মের পাপের কারণে অন্য জীবনে নাকি নিম্নবর্ণে জন্ম নিতে হবে— এমন ভাবনা গ্রামের মানুষকে আরও কুসংস্কারের দিকে ঠেলে দেয়। জাত-পাতের বিভাজন অস্পৃশ্যতাকেও ছড়িয়ে দিয়েছে। জাত-পাতের বিষয়টি তাই শুধু ঈশ্বরের মধ্যেই আটকে নেই, খাদ্যাভ্যাসের মধ্যেও ঢুকে পড়েছে।

প্রত্যেক জাতি আলাদা, তার আলাদা দেবতা আছে, সাধারণ মানুষ উচ্চবিত্তদের থেকে আলাদা— ধর্ম তো তাই শিক্ষা দেয়। আর তাই হিন্দু সমাজ হিন্দু ধর্মের দেখানো পথে চলতে বাধ্য। অতএব, হয় বিশ্বাস করুন ধর্ম অকেজো, সমাজে এর কোনও প্রভাব নেই। ধর্ম আসলে পাণ্ডাদের উপার্জনের মাধ্যম, আসলে নারীদের দাসী বানিয়ে রাখার ষড়যন্ত্র মাত্র।

প্রত্যেক ধর্মই সমাজকে কমবেশি বিভক্ত করেছে তার পরিধির মধ্যে। কিন্তু বিজ্ঞান বিশ্বকে একত্রিত করছে, যা ইন্টারনেটের মাধ্যমে এবং আগে বই, রেডিও তরঙ্গ, টেলিভিশন, ট্রেন, জাহাজের মাধ্যমে বিশ্বকে সংযুক্ত করেছে। তাই যদি পুজো করতে চান, তাহলে বিজ্ঞানের পুজো করুন।

সুন্দরবনে সাসপেন্স (শেষ পর্ব)

সরকারি ক্ষতিপূরণের জন্য মেয়েটির নামধাম, বয়স ইত্যাদি তথ্যগুলো নোট করতে করতে শিশুগুলোর দিকে বার বার চোখ চলে যাচ্ছিল ডরোথির। ঘরে ওরও ছোটো দুটো ছেলেমেয়ে আছে। তারা এদেরই বয়সি হবে। কথায় কথায় বৃদ্ধের কাছ থেকে ডরোথি জানতে পারল, কয়েক মাস আগে জঙ্গলে কাঁকড়া ধরতে গিয়ে এই বৃদ্ধের ছেলেও বাঘের পেটে গেছে। হাতের খাতাটা বন্ধ করে চোয়াল শক্ত করে ডরোথি। জঙ্গলের ভিতর কিছুটা গেলে যদি বডিটা পাওয়া যায়, যদি বাঘটাকে ট্রেস করা যায়— অন্তত এই বর্ষার ভিজে মাটিতে পাগমার্ক থাকবেই।

বাঘটাকে ট্রাঙ্কুলাইজ করে ফরেস্ট গার্ডদের অন্য টিমটাকে খবর দিতে হবে। বাঘটাকে ঘুম পাড়ানো গেলে, গলায় রেডিও কলার পরিয়ে, খাঁচায় ভরে বড়ো নদীর উলটো পাড়ের রিজার্ভ ফরেস্টে ছেড়ে দেওয়া যাবে। এই কাজটা ছাড়া প্যাডিং ও অন্যান্য কাজের জন্য অবশ্য আলাদা টিম আছে। তবু ডরোথির মতো ফরেস্ট রেঞ্জার আর তাঁর বাহিনীই এই জঙ্গলের অভিভাবক। বন্যপ্রাণের অবস্থান সুরক্ষিত করা আর স্থানীয় জীবনকে জঙ্গলের বিপদের হাত থেকে দূরে রাখার জন্যই এই অঞ্চলের অধিবাসীদের সহযোগিতায় তৈরি হয়েছে, ‘জয়েন্ট ফরেস্ট ম্যানেজমেন্ট কমিটি’ বা জেএফএমসি।

বাঘটাকে খুঁজে বার করার একটা অবিরাম জেদ যেন পেয়ে বসল ডরোথিকে। বৃদ্ধের কথা ঠিক হলে জঙ্গলের পথ ধরে মাতলা নদীর দিকে এগিয়েছে বাঘটা। পথে নরম মাটিতে বাঘের পায়ের ছাপ পাওয়া গেলে অবশ্য আরও নিশ্চিত হওয়া যায়। রাইফেলম্যান অখিল পান-কে ডেকে ডরোথি বলল, ‘অখিলবাবু আপনে রাইফেল নিয়া চলেন আমার পিছন পিছন। ওই দিকটায় পোচারের ঝামেলা আসে। কিন্তু বাঘ দেখলি আমার অর্ডার না মেলা অবধি কেউ মুভমেন্ট কইরবেন না। বুঝতি পারতিসেন?’

অখিল নিজে আগে পোচার ছিল। মাতলা নদীর চরে চিতল হরিণের ঝাঁক পাওয়া যায়। ওরাই সুন্দরবনের বাঘের প্রধান খাদ্য। পোচাররা গাছে চড়ে তক্কে তক্কে থাকে। বাঘ চড়ার দিকে এলেই গুলি চালায়। তাছাড়া খাড়ি, জোলার জলে বিষ দিয়ে মাছ শিকার তো আছেই। মাটির বাড়িটার পিছন দিকে বর্ষার জলে গজিয়ে ওঠা ঝোপঝাড়গুলো হাতের কুঠার দিয়ে সাফা করতে করতে, পথ বানিয়ে এগিয়ে চলেছে অরূপ মণ্ডল। বাঁ-হাতে বেঁকিয়ে ট্রাঙ্কুইলাইজারটা ধরেছে। অখিল অবশ্য জঙ্গলে ঢুকতে বারণ করেছিল। ঠিক বারোটা বাজে এখন। দুপুর বারোটায় নাকি জঙ্গলে ঢুকতে নেই, এসময় জঙ্গলে বনবিবি নামাজ পড়েন। সবই জঙ্গলের লোকশ্রুতি হয়তো। কিন্তু ধর্ম-আচার-সম্প্রদায় এগুলো সবই উলটে-পালটে মিশে আছে কথাগুলোয়।

জঙ্গলের পথটাকে প্রায় ঢেকে রেখেছে চিতে, বকরা ঝাঁপি, কাঠগড়ানের ঘন ত্রিযামা চাদর। জোয়ারের জল এলে গাছগুলোর গায়ে এসে জমা হয় নোনা কাঁকড়া বা নোনা ঝিনুক। ভীষণ ধারালো। অসাবধান হলেই গায়ের চামড়া চিরে রক্ত বেরিয়ে আসবে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও হাতে থ্রি-নট-থ্রি রাইফেলটাকে নিয়ে পিছু পিছু আসছে অখিল পান। সে ততক্ষণে হেতাল পাতার খেজুরের একটা গোছা ছিঁড়ে হাতে নিয়েছে। বিচিগুলো টিপে ফেলে দিয়ে ফলগুলো খেতে শুরু করেছে। সামনেই একটা খোলসে গাছে ছোটো ছোটো মৌমাছি ভোঁ ভোঁ করছে। এই ফুলের মধু খুব মিষ্টি হয়, তাই ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট থেকে এই গাছগুলোতে এই আকারের ছোটো মৌমাছিগুলো দিয়ে মধুর চাষ করানো হয়।

বর্ষার এই সময়টায় জঙ্গল থেকে বেরিয়ে জংলি শুয়োর হানা দেয় লোকালয়ে। তাদের পিছন পিছন বাঘও এসে হাজির হয়। আরও কিছুটা এগোতে একটা ছোটো পুকুর মতো পড়ল। একটা খাঁড়ি অর্ধেক বুজে গিয়ে এই ব্যবচ্ছেদের রূপ নিয়েছে। এইখানে প্রচুর মাছ, কাঁকড়া পাওয়া যায়। প্রকৃতির অকৃত্রিম নৈসর্গিক রূপান্তরে জঙ্গলটা এখানে যেন মৃত্যুকালীন খিদে আর অমার্জিত দর্শনশৈলীর এক সন্ধিহীন যাপনচিত্রের উদ্যাপনে রত।

পুকুরটার পাড় বরাবর উত্তরদিকে এগোতে প্রথম বাঘের পাগমার্ক চোখে পড়ল অরূপের। ভিজে কাদায় একজোড়া ছাপ। পাগমার্ক অনেকটাই আয়তাকার এবং পিএমএল (পাগমার্ক length) এবং পিএমবি (পাগমার্ক width) এর তফাৎ প্রায় ২.৫ সেন্টিমিটার। তার মানে এটি বাঘ নয়, পূর্ণবয়স্ক বাঘিনী। একটু দূরে পর পর আরও দু-জোড়া বাঘের পায়ের ছাপ, আকারে একটু ছোটো। এরা ব্যাঘ্র শাবক। তার মানে মা শিকার করে এনে বাচ্চাদের খাইয়েছে। তারপর সবাই মিলে এই পথ ধরেই নদীর দিকে গেছে। পাগমার্ক বলছে শাবকেরা খুব ছোটো নয়, এদের বয়স আন্দাজ দেড় বছরের কাছাকাছি। সতর্ক হয়ে ওঠে ওরা তিনজনে। আশপাশেই বাঘ থাকতে পারে।

ডরোথি মোবাইল ক্যামেরায় বাঘের পায়ের ছবি তুলে রাখে। পাশের একটা মরা কাঠগরানের ডালে বসে একটা মদন টাক সমানে মাথা নাড়ছে আর মুখ দিয়ে অদ্ভুত আওয়াজ করছে। লেপটপটিলস জাভানিকাস (Leptoptilos Javanicus), হাড় গিলগিলে চেহারা। মাথাটা অবিকল টেকো বুড়োদের মতো। বিশালাকার চঞ্চু দিয়ে এরা মূলত মাছ শিকার করে। দূরের আকাশটার ভেজা গায়ে পরিপাটি কনে বউয়ের লজ্জারাঙা লালের টুকরো ছুঁড়ে দিয়ে, কমলা রঙের রোদটাকে এঁটো করে উড়ে গেল একটা সিঁদুরে মৌটুসি। জলাটায় চরে বেড়াচ্ছে বেশ কিছু সুন্দরী হাঁস। এরা মানুষের সাহচর্য একদম পছন্দ করে না।

এই ধরনের গভীর জঙ্গলেই মৌচাকের লোভে ঘুরে বেড়ায় নিরন্ন, দারিদ্রের যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাওয়া কিছু মানুষ। একবার জঙ্গলে গেলে হয়তো হপ্তা দুয়েকের অন্ন সংস্থান হয় ওদের। কোটালের জল নামতে শুরু করেছে। জায়গাটা জুড়ে এখন ফুটে উঠছে সার দেওয়া কাঁকড়া গাছের শ্বাসমূল। এগুলোর উপর দিয়েই মুখে করে শিকার নিয়ে দৌড় দেয় বাঘ, ঘাড়টা মুখে নিয়ে পাছাড় দেয়। এ যেন এক অশ্রাব্য বধ্যভূমি। যেন এক বিশ্রী অভিশাপ। একটা স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ মাখানো জায়গাটায় মানুষের গোঙানি, বাঘের খুনে প্রবৃত্তি, আর চরম যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু, সবে মিলে চারপাশ কালো করা একটা বিবর্ণ মনস্তাপ এসে ভিড় করে ডরোথির মাথার পেরিটাল লোবে। হঠাৎই হাত পাঁচেক দূরত্বে পড়ে থাকা কিছু একটা ঘিরে মাছির ভ্যানভ্যানানি শুনতে পায় ওরা। যেন বুভুক্ষুর এই রাজ্যে মাছিদের পিকনিক চলছে। হাতে সুন্দরী গাছের একটা মরা ডাল নিয়ে এগিয়ে এসে অরূপ মণ্ডল আবিষ্কার করে ওটা একজন মেয়েমানুষের ডান হাতের কাটা কব্জির কিছুটা অংশ। তার মানে বডিটা ছেঁচড়াতে ছেঁচড়াতে এতদূর নিয়ে এসেছে বাঘটা। আশপাশের জমি জুড়ে বেশ কিছু বাঘের পায়ের ছাপ আর বাসি রক্তের দাগ। আজ যার সন্ধানে এই গভীর অরণ্যে ওদের আসা, এই ছাপগুলো সেই বাঘিনী আর তার শাবকদেরই।

হঠাৎই আশপাশের মাটি কাঁপিয়ে একটা বিকট আওয়াজ হল— ওয়াউউউম, পরপর বেশ কয়েকবার। আর কিছুদূর এগোলেই মাতলা নদীর চর। ওইখানের হেতালের বন থেকে আসছে আওয়াজটা। গাছের ডাল জুড়ে বাঁদরের লাফালাফি, পাখিদের চিল চিৎকার বুঝিয়ে দেয় খুব কাছাকাছির মধ্যেই ‘তাঁরা’ আছেন।

অরূপ তার প্রায় অকেজো হয়ে যাওয়া বাঁ-হাত থেকে ট্রাঙ্কুইলাইজারটা ডানহাতে নিয়ে শক্ত করে ধরল এবার। খুব সাবধানে প্রায় নিঃশব্দে ওরা নদীর দিকে এগোয়। জঙ্গলের ভিতর ঘুরতে ঘুরতে কখন ঘণ্টা চারেক পেরিয়ে গেছে, খেয়ালই নেই কারও। ঘন সবুজের আড়ালে দিনের আলোটা প্রায় পড়ে এসেছে। হুটপাট করে সন্ধে নেমে যাবে হয়তো। ডরোথি সার্চ লাইটটা বের করে জ্বালাল। পাশেই চিলমারী খাল, বনবিবি খাল। স্থানীয় মানুষের কাছে এসব জায়গা সাক্ষাৎ নরক।

হঠাৎই সামনের ঝোপে সার্চলাইটের তীব্র আলোয় এক জোড়া জ্বলন্ত চোখ দেখতে পেল ডরোথি। হাতের ট্রাঙ্কুইলাইজারটায় বিরামহীন ক্ষীপ্রতায় ঘুমের ইনজেকশন লোড করল অরূপ। হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে ছায়াসদৃশ সাড়ে ছ’ফুটের দেহটাকে আন্দাজ করে নিয়ে নিশানা সাধল বাঘিনীর ঘাড়ের দিকে। আরও দু-জোড়া জ্বলজ্বলে চোখ দশহাতের ভিতর ঘোরাফেরা করছে তখন। অরূপের বন্দুক থেকে জাইলাজাইন (Xylazine) আর কেটামাইন (Ketamine) মেশানো ইনজেকশন ফায়ার হল। জন্তুগুলো বিশাল লাফ দিয়ে উলটোদিকে হেতালপাতার আড়ালে মিলিয়ে গেল। ডরোথি ওয়াকিটকিতে মেসেজ পাঠাল, ‘টাইগার দেখা গেছে মাতলা নদীর উত্তরদিকের খালে। ব্যাকআপ ফোর্স পাঠান। ওভার।’

হঠাৎই গুলির বিকট আওয়াজে চারপাশ কেঁপে উঠল। বুকফাটা বিকট আওয়াজ, পরপর দু-বার। আবার পাখিদের কিচিমিচি, নদীর চরে হরিণের পালে উৎকণ্ঠা, চঞ্চলতা। ওরা তিনজন দৌড়াল চড়ার দিকে। পোচার! এবার অখিল আর ডরোথি হেতাল ঝোপের আড়ালে বসে চোখ রাখে বাইনোকুলারে। চরের বাঁ-দিকের সুন্দরী গাছের ডালে দু’জন পোচার, মুখ-চোখ গামছায় ঢাকা। ডরোথি সেইদিকে তাক করে সার্ভিস রিভলভার বার করল। অখিলও ওর থ্রি-নট-থ্রি-তে নিশানা করেছে গাছের ডালে।

ডরোথি চাপা গলায় বলে ওঠে, ‘আমি ইশারা করলে ফায়ার কইরবেন।’ ডরোথি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে, মা আর ওর বছর দেড়েকের ছানাগুলো তখনও পোচারদের নিশানার ভিতর। বাঘিনী চরের ডানদিকে একটা খাদের ভিতর থেকে উঁকি দিচ্ছে, বাচ্চাগুলোকে আড়াল করে। ডরোথির রিভলভার গর্জে উঠল।

আজ সকালে বাঘিনী নিজের সন্তানদের ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য আরেক ‘মা’-কে তুলে নিয়ে এসেছে। নিজের শাবকদের মুখে তুলে দিয়েছে নরমাংস। দুটি অসহায় মানবশিশু হয়তো আরও বেশ কিছুদিন তাদের মায়ের পথ চেয়ে থাকবে। তারপর একদিন ঠিকই ওরা সত্যিটা বুঝবে। বুঝতে শিখবে জঙ্গলের ক্ষুধার খাদ্যশৃঙ্খল বিঘ্নিত হলে, নিরীহ মানুষের প্রাণ যায়। এর জন্য দায়ী হয়তো মানুষেরই চাহিদা, লোভ। ডরোথি ওদের মানুষ মা-কে হয়তো আর ঘরে ফেরাতে পারবে না। কিন্তু বাঘিনী আর তার শাবকদের জঙ্গলে যদি ফেরাতে পারে, তবে ঝাঁসি মণ্ডলের মতো আরও অনেকগুলো জীবনের অকালে খরচ হয়ে যাওয়াটা আটকাতে পারবে।

এই যে বিপুল মৃত্যুযজ্ঞের আয়োজন, যার সঙ্গে মিশে আছে অপরিমিত আতঙ্ক, প্রতিদিনের জনজীবনে যা চিরবিচ্ছেদের অশনি হয়ে বাজে। এর পরিসমাপ্তি ঘটাতে পারলেই হয়তো এই সুন্দরবন, যা ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ-এর তকমা পেয়েছিল একসময়, ম্যানগ্রোভ কাঁটার রক্তাল্পতা নিয়ে যা আজও আয়লা, রেমাল-এর মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে সভ্যতাকে আগলায় বুকে করে, তার জীবন আরও কিছুটা দীর্ঘায়িত হবে। এই সুন্দরবনকে প্রতিনিয়ত সমানুপাতী ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে এই বাঘেরাই। যত্নশীল দীক্ষায় ডরোথি আর তার ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট, বিনিদ্র প্রহর জাগে প্রায় নিভে আসা বাস্তুতন্ত্রের মূর্তিমান প্রহরী হয়ে।

শীতকালে স্বাদবদল

শীতকাল মানেই মনটা খাইখাই করে ওঠে। তাই মাঝেমধ্যে একটু নতুন কিছু খেতে ইচ্ছে করে অনেকের। আর তাই আমরা পরিবেশন করছি মুখরোচক কয়েকটি খাবার তৈরির পদ্ধতি।

ভেজিটেবল স্প্রিং রোল 

উপকরণ: এক টেবিল চামচ তেল, এক টেবিল চামচ আদা রসুনের কুচি, কাঁচালংকার কুচি এক চামচ, আধা কাপ গাজর কুচি, আধা কাপ বাঁধাকপির কুচি, ক্যাপসিকাম কুচি আধা কাপ, বিনস কুচি আধা কাপ, ১ টেবিল চামচ চিনি, আধা টেবিল চামচ গোলমরিচের গুঁড়ো, সামান্য সয়া সস, লাল লংকার গুঁড়ো আধা টেবিল চামচ, কয়েকটা টিস্যু পেপার এবং স্বাদ অনুযায়ী লবণ।

বাঁধাই উপাদান: দুই টেবিল চামচ ময়দা এবং পরিমাণ মতো জল।

প্রণালী: প্রথমে জল দিয়ে ময়দা মেখে লেচি তৈরি করে রাখুন পাঁচ মিনিট। এরপর ছোটো ছোটো রুটির মতো বেলে রাখুন স্প্রিং রোল তৈরি করার জন্য। মাঝারি আঁচে একটি ভারী প্যানে তেল গরম করুন এবং আদা ও রসুন ভালো করে ভেজে নিন। এরপর সামান্য বাঁধাকপির কুচি এবং ক্যাপসিকাম কুচির সঙ্গে লবণ, চিনি এবং গোলমরিচের গুঁড়ো মিশিয়ে ভাজুন। লাললংকার গুঁড়ো এবং সয়া সস মিশিয়ে ভালো করে নাড়ুন। ওই ভাজা পুর বেলে রাখা ময়দার রুটিতে ভরে, ভেজা কাপড়ে মুড়ে নিয়ে কিছুক্ষণ রাখুন ফ্রিজে। পাঁচ মিনিট পর ফ্রিজ থেকে বের করে নিয়ে ফ্রাইং প্যানে তেল দিয়ে মাঝারি আঁচে সোনালি না হওয়া পর্যন্ত ভাজুন। মুচমুচে হয়ে এলে নামিয়ে রাখুন টিস্যু পেপারের উপর। এবার টম্যাটো সস এবং চাটনি সহ গরম- গরম পরিবেশন করুন।

স্বাস্থ্যকর বারকেক 

উপকরণ: এক কাপ খেজুর, এক চা-চামচ গোলমরিচের গুঁড়ো, তেঁতুলের দানার গুঁড়ো এক টেবিল চামচ, দুই টেবিল-চামচ গোলাপের পাপড়ি, এক টেবিল-চামচ নারকেলের দুধ, দুই টেবিল-চামচ তুলসীর বীজ এবং চিনি স্বাদমতো।

প্রণালী: মিক্সিতে খেজুর ব্লেন্ড করুন মিহি করে। এরপর ওই খেজুরের পেস্ট রাখুন একটি বাটিতে। এবার অন্যান্য সমস্ত উপাদান ভালো ভাবে খেজুরের সঙ্গে মিশিয়ে নিয়ে ময়দা মাখার মতো করে রাখুন একটি কাচের ট্রে বা বেকিং ট্রে-তে। পাঁচ মিনিট পর এর সঙ্গে বাটার পেপার লাগিয়ে ফ্রিজে রাখুন পাঁচ মিনিট। পাঁচ মিনিট পর ফ্রিজ থেকে বের করে নিয়ে সমান ভাবে গোলাপের পাপড়ি লাগিয়ে ছোটো ছোটো করে কেটে রাখুন একটা কাচের পাত্রে। তৈরি হয়ে যাওয়া স্বাস্থ্যকর বারকেক ফ্রিজে স্টোর করুন এবং যখন মন চাইবে তখন ফ্রিজ থেকে বের করে খান ঠান্ডা-ঠান্ডা।

স্পেশাল সরভাজা

উপকরণ: ২০০ গ্রাম দুধের সর, ১ টেবিল চামচ কাঁচালংকার কুচি, আধা চা চামচ আদা রসুন বাটা, সামান্য ‘সুমন’ ব্র্যান্ড-এর হলুদগুঁড়ো, দুই টেবিল চামচ ভেজানো মুগডাল পেষ্ট, গাঢ় দই, দুই টেবিল চামচ ধনেপাতা কুচি, এক চা চামচ বেকিং সোডা, পরিমাণমতো তেল এবং স্বাদমতো লবণ।

প্রণালী: প্রথমে দুধের সরের সঙ্গে কাঁচালংকার কুচি, আদা-রসুন বাটা, হলুদগুঁড়ো, ভেজানো মুগডাল পেস্ট, গাঢ় দই, ধনেপাতা কুচি, বেকিং সোডা এবং স্বাদমতো লবণ মিশিয়ে নিন। ওই মিশ্রণ ফ্রিজে দশ মিনিট রাখুন একটি কাচের বাটিতে। দশ মিনিট পর ফ্রিজ থেকে বের করে নিয়ে ছোটো ছোটো পিস করে কেটে নিন। এবার একটি ফ্লাইং প্যানে তেল গরম করে তাতে ওই ছোটো ছোটো আয়তক্ষেত্রাকার পিসগুলো ভাজুন। সোনালি রং এসে গেলে নামিয়ে নিয়ে পরিবেশন করুন গরম-গরম।

সুন্দরবনে সাসপেন্স (পর্ব-০২)

ঠিক এরকম একটা ঘটনা ডরোথি শুনেছিল জঙ্গলে মধু শিকারে যাওয়া এক মউলি ছেলের মুখে। তার চোখের সামনে দিয়ে বাঘ তার বাবাকে নিয়ে গিয়েছিল নৌকা থেকে। ঘটনাটা বলতে বলতে তখনও কেঁপে কেঁপে উঠছিল সে, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরি জঙ্গলি যেতাম। বাবা তো পেরায় পনেরো ষোলো বছর বয়স থেকি জঙ্গলি যায়। আমার যখন আঠারো বছর বয়স, তখন থেকি আমুও জঙ্গল শুরু কইরলাম। বাবার সঙ্গে জঙ্গলে যায়া কাঁকড়া ধরতাম, মধু কাইটতাম। মরিচঝাঁপির জঙ্গলি যায়া মাছ কাঁকড়া ধইরতাম, বাইরের জঙ্গলিও যেতাম।”

‘একদিন মরিচঝাঁপির জঙ্গলে তখন দুপুর হয়ই গ্যাসে। আমাদের বাড়ির ওপারে সোজা খালটা। খালের ভিতর যায়া দুটো ডাল দু- দিকে গ্যাসে। দক্ষিণের ডালে ঢুকি গেলাম আমরা। যে খালটায় ঢুকিসি পুব্বো দিকে আগা,

পশ্চিমে গোড়া। আমাদের নৌকাটা মোটামুটি চোদ্দ-পনেরো হাত লম্বা হবে। খাল থিক্যা একখান সরু খাল বেরোই চিলমারী কুমিরমারী জঙ্গুলে যায়া জয়েন্ট হইসে। খালের একদম আগায় খুব সরু জায়গায় নৌকা রাখি দিসি। তক্ষনি বর্ষা আসল, ভালো জোরে বর্ষা আসল, দশ পনেরো মিনিট বর্ষা হবার পর আস্তে আস্তে বর্ষা একটু কমে আসল। কমে আসার পর ওরা দু’জন নেমে গেলো, বাবা আর পতিবেশী কাকা।’

‘দক্ষিণ পারে নেমে ওরা শ’দুই ফুট ভেতরে গ্যাসে। আমি নৌকায় বসি রইলাম। এইবার নৌকায় যখন একা বসে আছি, তখন চিন্তা করসি কী করি! জঙ্গলের তো পরিস্থিতি ভালো না! বাঘের চাপ খুব! আমি তাড়াতাড়ি করি নৌকা বেঁধে, ওদের পেসন পেসন গেলাম, জোরে গেলাম। যাওয়ায় ওরা বলল, কেন তুই নৌকা ছেড়ে আসিছিস? আমি বুললাম, জঙ্গলের পরিস্থিতি খারাপ, আমি থাকি তোমাদের সঙ্গে। ‘

‘এবার কাছাকাছি চারখানা কাঠগড়ান গাছে চাক দেখিসি। চাকে মধুও হইসে খুব। এক একটা চাকে পেরায় তিরিশ কিলো মধু হবি। বাবা বুইল্লো চাক কাটা হবে ধুয়ো করা দরকার। হেতাল পাতার বোলেন হবে, চলো কুমিরমারির দিকে যাই। বর্ষায় হেতাল পাতা সব ভিজি গ্যাসে, শুকনা পাতা চাই। কাকা বলতিসে কুমিরমারী যাব না, যে খাল দিয়ে ঢুকিসি চলো ওখানে যাই। ওখানে হেতাল পাতা আসে। হেতালি গাছের গোড়া খাল থিকে প্রায় ৩০০ ফুট, যেখানে আমরা নৌকা রাখিসি সেখান থেকে। ওই মন্তব্য কইরে নৌকায় আসলাম। দুইজন দুই মাথায় বসি আসে, আমি মাঝায়। নৌকা খালে এমনি ভাসতেছে। খালের মুখ সমান জোয়ার উঠিসে তখন।’

‘আমরা গেছিলাম দক্ষিণপাড়ে, বাঘটা ছিল উত্তরপাড়ে। উত্তরপাড়ের জঙ্গলটা ঘন, ছাড়া ছাড়া, উঁচু। ছোটো ইতোলি গাছের পিছনে একটা গাড্ডায় বাঘটা ছিল। জোয়ারের টানে ভাসতি ভাসতি নৌকার পাসাটা বাঘের মুখের কাছে। বাবা দু-বার দাঁড় টেনে নৌকাটা স্টেইট করিসে, দ্বিতীয়বার বোটে তুলে মারতি যাবে অমনি জঙ্গলের ভিতর দিয়ে ঝ্যাঁট ঝ্যাঁট করি একটা বিশাল আওয়াজ হল। আওয়াজ শুনে সঙ্গে সঙ্গে আমরা তিনজন ওইদিকে ফলো কইরে ঘাড় ঘুরিয়ে হাঙ মারিসি। হাঙ বেরোচ্ছে মুখের দিয়ে। বাঘটাও স্পিডে বেরিয়ে আসতেসে, বাবার লেবেলে। ওই অবস্থায় বাবার উপর পরি দুই হাতো বাবার দুই সাইড দিয়ে ঢুকায়ে দিসে। বাবারে বাঁধি নিয়ে নৌকার অপোজিট ছাইডে জলের তলায় ঢুকি গেল।’ – আসা যাওয়ার সাঁকো ধরে ঝুলতে থাকা মানুষের মতো বিপন্নতা নিয়ে ওর দেখা দক্ষিণরায়ের চণ্ডাল মূর্তি বোঝাতে ছেলেটাও বাঘের মতো দু-হাত সামনে প্রশস্ত করে দেখিয়েছিল। সে হাত তখন কাঁপছে।

‘বাবারে কোনও এধার ওধার হবার টাইমই দেয়নি যে, উঠে দাঁড়াবে বা শুইয়া পরবে বা সাইড করবে। মানে এত স্পিডে বাঘ বেরোইসে, তড়িঘড়ির মধ্যি যে, কোনও টাইম দেয়নি। বাবারে নিয়ে ওই ভাবে জলের তলায় ঢুকি গেল। জলের তলায় যখন ঢুকি গ্যাসে আমি তখন নৌকার মাঝায়। আমার হাতে ফুট তিনেক বেশ একটা মোটা লাঠি ছ্যাল। খালের রুইতে তখন জল আসে, এই আমার বুক সমান জল আসে। হাতে লাঠিটা নিয়ে আমি নৌকার সোজা আসি, তইয়ার হয়ে আসি, যদি বাঘ বাবারে লইয়া ভাসি ওঠে। আমি বাঘের মাথায় বাড়ি দিব। বেশ কিছুক্ষণ পর বাঘটা জলে ভীষণ পাক তুলিসে। কিন্তু বাবাও উঠতন না, বাঘও উঠতন না। কিছুক্ষণ পর বাঘ পিঠ ভাসি দেল। আমি মুখে ভীষণ আওয়াজ করি বাঘের পিঠে বাড়ি দিসি। বাবার মুণ্ডটা গিলে নিসিল, বাঘ ছারিকে পলাইল।”

ডরোথিদের বোটটা খাল বরাবর ভেসে এসে একটা ছোট্ট ঘাটে ভিড়ল। সামনে মাছের ভেড়ি, তার গা দিয়ে বাঁধটা। বাঁধটার গা ঘেঁষে ঘন জঙ্গল। প্রায়ই মাতলা নদীর ওপারের রিজার্ভ ফরেস্ট থেকে বাঘ সাঁতরে নদী পেরিয়ে এসে এই জঙ্গলটায় গা ঢাকা দেয়। সন্ধে হলে এখানে বিদ্যুৎ সংযোগ ছিন্ন করে দেওয়া হলে, বাঘ বেরিয়ে আসে লোকালয়ে। এর ওর গোয়াল থেকে গরু ছাগল তুলে নিয়ে যায়। সুযোগ পেলে মানুষও শিকার করে।

এদিককার বাঘেরা প্রায় প্রত্যেকে ম্যান ইটার। বাঁধের গা বরাবর কিছুদূর এগিয়ে গেলে বনবিবির মন্দির। কোস্টাল মুইপীঠ থানার অন্তর্গত এই গ্রাম এখন প্রায় জনমানবশূন্য। মন্দিরেও পুজো হয় না। জনবসতি থাকলে অবশ্য বৈশাখ মাসের শেষ মঙ্গলবার পুজো হওয়ার কথা। এই পুজোতে জঙ্গলের বিভিন্ন উপকরণ লাগে, যেমন হেতাল গাছের পাতা, কাঁকড়া গাছের পাতা। পাশেই একটা বাণী গাছ। গায়ে শুকনো মালা, মানতের লাল সুতো জড়ানো। জোয়ারের সময় বাঁধের ওপাশের জঙ্গলটার গাছগুলোর গা বেয়ে প্রায় ১০- ১২ ফুট অবধি জল উঠে যায়। জল নামলে বোঝা যায় বাঁধের ওপাশটা কতটা গভীর।

বোটটা ছেড়ে দিয়ে ডরোথি বলল, সামনের খাঁড়ি বেয়ে মাতলা নদীতে ওদের জন্য অপেক্ষা করতে। ছোটো ছোটো ঝোপের জঙ্গল পায়ে মাড়িয়ে কিছুদূর ইটের রাস্তা বরাবর এগোতেই সামনে একটা কুঁড়েঘর দেখল ডরোথি। গায়ে বাঁশের খাঁচা, মাথায় হোগলা পাতার ছাউনি। সম্ভবত ভেড়ি থেকে তুলে মাছ কাঁকড়াগুলো শুকনো হতো এখানটায়। বাঘের উপদ্রব বাড়তে এই ঘরটাকেও খালি করে চলে গেছে মানুষজন। মৃত্যুর বিষাদ এতটাই অনিশ্চিত করে তুলেছে এখানকার জীবনযাত্রাকে।

কুঁড়ে ঘরটাকে ফেলে রেখে কয়েক হাত এগোতেই রাস্তার উপরেই পড়ল বাড়িটা। উঠোনের সামনেই একজন কোলকুঁজো বৃদ্ধ৷ দাওয়ায় দুটি ছোটো ছেলেমেয়ে বসে মুড়ি চিবোচ্ছে তখনও। নিতান্ত অবোধ শিশু। আজ ওদের মা-কেই বাঘে তুলে নিয়ে গেছে। কথা বলে যা বোঝা গেল— বাড়ির পিছনে কয়েক হাত দূরে বাথরুম। পথটা ছোটো ছোটো গেওয়া গরান আর অগোছালো ঝোপে ঢেকে গেছে। ভোররাতের দিকে বাথরুম যাওয়ার প্রয়োজন হয়েছিল স্ত্রীলোকটির। বাঘ আগে থেকেই পাশের ঝোপ ঝাড়ে ঘাপটি মেরে ছিল। এই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় শিকারের ঘাড়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। শিশুগুলি তখন নিশ্চিন্ত ঘুমের দেশে। এই বৃদ্ধ ধস্তাধস্তির আওয়াজ পেয়ে অন্ধকারে কিছুদূর এগিয়েও কিছু ভালো করে ঠাহর করতে পারেননি। শুধু তার ছেলের বউয়ের প্রাণফাটা আর্তনাদ আর বাঘের হাড় হিম করা গর্জন কানে এসেছে তাঁর।

সুন্দরবনে সাসপেন্স (পর্ব-০১)

‘সুন্দরবন ইজ দ্য মোস্ট বিউটিফুল প্লেস ইন দ্য বেঙ্গল বাট সুন্দরবন ইজ দ্য মোস্ট ডেঞ্জারাস প্লেস ইন বেঙ্গল টু’- এই লাইনটা কোনও এক বইতে পড়েছিল ডরোথি, কলেজে পড়ার সময়। ডরোথি বিশ্বাস, পাথরপ্রতিমার মেয়ে। সেই ছোটো থেকে জল, জঙ্গল, জীব-জন্তু জগতের সঙ্গে মনুষ্যসমাজের ঘোলাটে ক্ষীণ সহাবস্থান দেখে বড়ো হয়েছে সে। ২০১৬ সালে ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল ফরেস্ট সার্ভিস’-এ যোগ দেওয়া। এখন চিকুরি ফরেস্ট অফিসে পোস্টিং, ফরেস্ট রেঞ্জার হিসেবে।

ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের ভুটভুটি বোটটা খুব নিচু হয়ে, দু-পাশে মাতলা নদীর কালচে জলে অলৌকিক সৌন্দর্যের মাদুর বুনছে। ডরোথি চোখের উপর লং রেঞ্জ বাইনোকুলারটা চাপিয়ে দেখে নেয় চারিপাশ। দুদিকের উঁচু জায়গাগুলোতে কাঁকড়া, গরান, গেওয়া, হেতাল গাছের জঙ্গল। সেখান থেকে জমি ঢালু হয়ে নেমে এসেছে নদীর পাড় অবধি। এখন অমাবস্যার মরা কোটাল চলছে। তাই দু- পাশের চর নোনা জলে ডুবে গেছে। না হলে অন্যসময় জায়গাগুলো থকথকে পা ডোবানো কাদায় ভরে যায়। জোয়ারের জল সরে গেলে কাঁকড়া গাছের শ্বাসমূলগুলো তীক্ষ্ণ হয়ে জেগে ওঠে শক্ত ভোঁতা ছুরির আগার মতো।

অ্যালট নম্বর ১২০, ১২১, গৌরচক গ্রাম৷ এখানেই আজ ভোররাতে ঘটনাটা ঘটেছে। ঝাঁসি মণ্ডল নামের এক গ্রাম্য গৃহবধূকে বাঘে তুলে নিয়ে গেছে আজমলমারীর জঙ্গলে। সেই কেসেই স্পট ভিজিটে যাচ্ছে ডরোথি, সঙ্গে দু’জন ফরেস্ট গার্ড। এদের মধ্যে একজন অরূপ মণ্ডল, খুবই অভিজ্ঞ। বহুবছর হয়ে গেল এই জঙ্গলে। এদিককার জঙ্গলে গাছের পাতা, খাল-জলার গতিপ্রকৃতি, বাঘের মুভমেন্ট খুব ভালো ভাবে চেনে সে।

মাস চারেক আগে গত ফেব্রুয়ারিতে শ’দুয়েক চিতল হরিণ ছাড়া হয়েছিল এদিককার জঙ্গলে, বাঘের খাবারের অভাব মেটাতে। কিন্তু এদিকটায় এখন পোচিং-এর খবর খুব পাওয়া যায়। বোটে করে এসে পোচাররা জঙ্গলে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থেকে গুলি চালিয়ে হরিণ মারে। সেইজন্যই লোকালয়ে বাঘ হানা দিচ্ছে খুব। হঠাৎ বর্ষা এসে যাওয়ায় বাঁধের গায়ের নাইলন ফেন্সিংয়ের কাজ পুরোটা শেষ করা যায়নি। সেইখান থেকেই বনমামাদের আবির্ভাব হচ্ছে।

পশ্চিমদিক থেকে জলীয় বাষ্পের একটা ঘূর্ণি এসে সজোরে ধাক্কা দিল বোটটার গায়ে। ভুরভুর করে ভেসে আসা জোলো বাতাস সামনের ডেকে দাঁড়িয়ে থাকা ডরোথির সারা গায়ে সোঁদা গন্ধের আলেখ্য এঁকে দিল যেন। ডেকের অন্য পাশটাতে ডান হাতে ট্রাংকুইলাইজারটাকে ধরে বিশেষ কায়দায় বাঁ-হাতে বিড়ি ধরিয়েছে অরূপ। বিশেষ কায়দায় কারণ মুখটা তাঁর বাঁ-দিকে বেঁকে গেছে। একবার জঙ্গলে প্যাডিংয়ের কাজ করতে গিয়ে ওর উপর টাইগার অ্যাটাক হয়েছিল। বাঘের থাবায় মুখ আর মাথা চুরমার হয়ে যায় অরূপের। প্রায় মাসখানেকের যমে মানুষে টানাটানির পর, বনবিবির দয়ায় ঘরে ফেরে অরূপ।

এখনও সেই গল্প শুনলে গায়ে কাঁটা দেয় ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের নতুনদের। তবু অরূপ হার মানেনি। চাকরি ছেড়ে বাড়িতে বসে সরকারি পেনশনে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেবার বদলে, জঙ্গলে ফিরে এসেছে। আসলে এই বিবস্ত্র জঙ্গল আর তার মধ্যবর্তী বিচিত্র জীবজগৎই এখনও ওর জীবন-আসক্তির মূল কারণ। এই সুন্দরবন আসলে কাদের? দক্ষিণরায়, হিংস্র শ্বাপদ, শঙ্খচূড়, কালাচ, রাজগোখরার মতো বিষধর সরীসৃপ, সদা ক্ষুধার্ত কুম্ভীরকুল, চিতল হরিণ, রং-বেরঙের পাখি যেমন মৌটুসি, পাপিয়া কিংবা মদন টাক, বক, লাজুক সুন্দরী হাঁস এদের? নাকি জঙ্গলের একদম গা ঘেঁষে মূর্তিমান মরীচিকার মতো বসবাস করা নিঃসঙ্গ, নিশ্চুপ, নির্ভার, ছায়াচ্ছন্ন জনপদগুলোর? এ প্রশ্ন চিরন্তন স্বাভাবিক।

দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার “ডিস্ট্রিক্ট হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন’-এর সমীক্ষা অনুযায়ী সুন্দরবনের মোট ১০২টি বদ্বীপের মধ্যে ৫৪টিতে জনবসতি আছে বাকি ৪৮টিতে আছে সংরক্ষিত অরণ্য। তবু অরণ্যের প্রাচীন প্রবাদ, এ জঙ্গল মা বনবিবি আর দক্ষিণরায়ের। দক্ষিণরায় এ জঙ্গলের অঘোষিত নরখাদক রাজা। তার সঙ্গে তুমুল যুদ্ধ-বিবাদ বনবিবির। বনবিবির উপাখ্যানে পাওয়া যায়—

‘আঠারো ভাটির মাঝে আমি সবার মা

মা বলি ডাকিলে কারও বিপদ থাকে না।

বিপদে পড়ি যেবা মা বলি ডাকিবে

কভু তারে হিংসা না করিবে।’

আসলে জঙ্গলের রাজার সঙ্গে জলের শাসক কুমিরের বিবাদী আখ্যান, লোকশ্রুতি হয়ে ভেসে বেড়ায় লোকসাহিত্যের শর্বরী অন্তঃসলিলায়। আজও জঙ্গলে মাছ, কাঁকড়া শিকারে যাওয়া কিংবা মধু সংগ্রহে যাওয়া প্রতিটি জেলে কিংবা মউলিরা বিশ্বাস করে, বনে যাওয়ার আগে মা বনবিবির পুজো দিলে বিপন্ন সময়ে মা তাদের নিজের সন্তানের মতো আগলান।

বর্ষার মেঘের সঙ্গে ফন্দি করে অস্বাভাবিক রকমের একটা আলো-আঁধারির মায়াজাল, বিকট ফ্যাটফ্যাটে ফণা তুলে আকাশটাকে প্রায় পুরোটা ঢেকে ফেলেছে। মাকি নদীর মুখটায় এসে ফরেস্ট বোটটা ডানদিকে বাঁক নিল। আর কিছুদূর এগোলেই খালটা সরু হয়ে ‘পান্তামারি খাল’ শুরু। এই ধরনের খাল বা জলাগুলোতে মাছ, কাঁকড়ার পরিমাণ থাকে অনেক বেশি। খয়রা মাছের টোপ দিয়ে এখানে জেলেরা বড়শিতে কানমাগুর, সোনাবোগো কিংবা কাঁকড়া শিকার করে। অথবা ভাটার জলে হাতজালে শিকার করে ঢাকা চিংড়ির ঝাঁক।

দু-ধারে নিদ্রিত ঘন হেতাল পাতার জঙ্গল। হেতাল পাতার হলুদ সবুজ রঙের অস্পষ্ট আবছায়ায় গা মিশিয়ে, অশরীরী ধূমকেতুর মতো ওত পেতে বসে থাকে বাঘ। জঙ্গল ভিতর দিকে খুব ঘন, সূর্যের আলো মাটি ছোঁয় না। শিকার করার সময় বাঘ বিড়ালের মতো দু-পায়ের মাঝে শরীরটা ভাঁজ করে ছোটো হয়ে যায়। তারপর হাড় হিম করা একটা ক্ষমাহীন হুংকার ছুঁড়ে, চারপায়ে প্রচণ্ড লাফ দেয়। মানুষের টুটি কামড়ে ধরে, তীক্ষ্ণ দুটো শ্বদন্ত দিয়ে গলার নলি ফুটো করে দেয়। সঙ্গে বাঘের দুই পার্টির carnassial teeth কাজ করে কাঁচির মতো।

‘ইন্টারন্যাশনাল মাউন্টেন ডে’ উপলক্ষ্যে রাঘবের অভিনব উপহার…

শীত পড়েছে, পর্যটকেরা পাহাড়ে ঘুরতেও বেরিয়ে পড়ছেন। আর ঠিক এমন সময়ে, অর্থাৎ ১১ ডিসেম্বর-এর ইন্টারন্যাশনাল মাউন্টেন ডে বা আন্তর্জাতিক পর্বত দিবস উপলক্ষ্যে সুদীপ্ত চন্দ এবং রাঘব চট্টোপাধ্যায় দিতে চলেছেন অভিনব উপহার। কিন্তু কী সেই উপহার?

আসলে, পর্বত সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে এবং আরও বেশি সংখ্যক মানুষকে পাহাড়ের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে ১১ ডিসেম্বর-কে আন্তর্জাতিক পর্বত দিবস হিসাবে পালন করা হয়। অনেক সময় দেখা যায় যে, পর্যটকেরা যত্রতত্র নোংরা ফেলে প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করেন। তাই, পাহাড়কে দূষণমুক্ত রাখার জন্য আমাদের আরও বেশি সচেতন থাকতে হবে।  আর গানের মাধ্যমে সেই সচেতনতার উদ্যোগ নিলেন রাঘব চট্টোপাধ্যায় এবং সুদীপ্ত চন্দ। তাঁরা উপহার দিতে চলেছেন ‘স্বপ্ন ডানা’ শীর্ষক একটি বাংলা ট্রাভেল-সং।

Screenshot

‘স্বপ্ন-ডানা’ শীর্ষক গানটি এমন একজন গেয়েছেন, যিনি প্রকৃতিকে ভালোবাসেন এবং মানুষের নানা সমস্যায় পাশে দাঁড়ান। সবসময় পরোপকারী , ইতিবাচক মনের এই গায়ক পাহাড়ের আনাচে- কানাচে ঘুরে বেড়ান ,কখনও গান গেয়ে কচিকাঁচাদের মুখে হাসি ফোটান, কখনও আবার গরীবদের সাহায্য করেন।

‘স্বপ্ন-ডানা’ গানটা গেয়েছেন বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী রাঘব চট্টোপাধ্যায়। গানটি রচনা করেছেন এবং সুরারোপ করেছেন সুদীপ্ত চন্দ। গানটির ভিডিওতে দেখা যাবে নীলাঞ্জন সাহা-কে, যিনি একজন স্ট্রিট মিউজিশিয়ান। পাশাপাশি, তাঁর বিভিন্ন উদ্যোগ ‘মিউজিক্যাল স্যান্ডউইচ’-এর জন্যেও পরিচিত। গানের ভিডিও জুড়ে আছে ডিসেম্বর মাসের দার্জিলিং-এর নজর কাড়া ঝলমলে দৃশ্যাবলী। ক্রিস্টমাস ট্রি, রঙিন আলো, নানা রঙের শীতের পোশাক, দার্জিলিং ম্যালে পর্যটকদের ঢল, পাহাড়ি ঘোড়ার দল আর তার সঙ্গে একটা মিষ্টি শান্ত গান। গানের সংগীতায়োজন করেছেন শুভংকর চট্টোপাধ্যায়। ভিডিওগ্রাফিতে ছিলেন শুভদীপ দাস।

এই গান নিয়ে রাঘব চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ‘আমার গান বললে শ্রোতারা যে ধরনের গান বোঝেন, এই গান তার থেকে একদম স্বতন্ত্র। খুব সফ্ট গান, একটা শান্তি আছে, খুব মিনিমাম যন্ত্রের ব্যবহার গানটাকে রেগুলার গানের থেকে আলাদা করেছে। সঙ্গে উপরি পাওনা দার্জিলিং-এর ক্রিস্টমাসের সময়ের সুন্দর দৃশ্যাবলী।‘

গানটির রচয়িতা এবং সুরকার সুদীপ্ত চন্দ জানিয়েছেন, ‘রাঘব-দা’র সঙ্গে এটা আমাদের প্রথম কাজ। সাধারণত রাগাশ্রয়ী গানে রাঘব চট্টোপাধ্যায়ের অবাধ বিচরণ। যদিও এই গান পাশ্চাত্য সংগীতের প্রভাবে প্রভাবিত। গানের শেষে খুব সুন্দর শিস-সংগীতের ব্যবহার আছে, যা রাঘব দার সংযোজন।’

সুদীপ্ত চন্দ-র ইচ্ছে, বাংলায় ট্র্যাভেল-সং তৈরি করে যাওয়ার। এর আগেও সুদীপ্ত-র উদ্যোগে রূপংকর বাগচী, অন্তরা চৌধুরী সহ অনেক শিল্পী বাংলা ট্র্যাভেল-সং পরিবেশন করেছেন। সুদীপ্ত চন্দ-র উদ্যোগগুলোর মধ্যে মাউন্টেন মিউজিক ফেস্টিভ্যাল উল্লেখযোগ্য।

সুদীপ্ত চন্দ আরও জানিয়েছেন, ‘ভবিষ্যতে আরও ট্র্যাভেল-সং বানাব। ইচ্ছে আছে মনোময় ভট্টাচার্য, লোপামুদ্রা মিত্র ও অমিত কুমার-এর সঙ্গেও কাজ করার।’

১৫টি সেরা উপহার

প্রিয়জনকে উপহার দেওয়ার মধ্যে আন্তরিকতা থাকাই স্বাভাবিক। কিন্তু মানুষটি কী পছন্দ করেন, কোন উপহার পেলে সবচেয়ে খুশি হবেন— এগুলোও মাথায় রাখা দরকার। সেই সঙ্গে যোগ করুন আপনার নান্দনিক ভাবনার পরশ। তবেই সুন্দর হয়ে উঠবে আপনার সম্পর্ক।

একসময় উপহার মানেই ছিল মিষ্টি এবং জামাকাপড়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উপহারেও এসেছে নানা বৈচিত্র্য। সকলেই চান এমন কোনও উপহার দিতে যা দীর্ঘমেয়াদি হবে। অর্থাৎ দীর্ঘদিন ধরে তা নিজের কাছে রেখে দিতে পারবেন প্রাপক। এখন অনলাইন শপিংয়ের রীতি শুরু হয়েছে। ফলে ঘরে বসেই আপনি বহু ধরনের জিনিস বাছাই করতে পারেন। আমাদের কিছু পরামর্শ রইল উপহার চয়ন করার বিষয়ে।

১) কস্টিউম জুয়েলারি খুব ভালো উপহার হতে পারে। বিস, পার্লস বা সেমিপ্রেশাস স্টোন বসানো এই সব হাতের, কানের বা গলায় পরার গয়না আপনার প্রিয়জনের জন্য কিনতে পারেন।

২) হার্বাল প্রসাধনীর উপর এখন অনেকেই নির্ভর করা শুরু করেছেন। রাসায়নিক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে ত্বকের ক্ষতি করে। তাই হার্বাল প্রোডাক্ট দিন প্রিয়জনকে। সেটা চুলের শ্যাম্পু সেট বা স্কিন কেয়ার সেট— যে-কোনও কিছুই হতে পারে।

৩) মেডিসিনাল প্লান্টস এবং অর্গ্যানিক ফুড উপহার হিসাবে বেশ ভালো। এতে আপনার প্রিয় মানুষটির স্বাস্থ্যের খেয়াল রাখাও হবে আবার উৎসবে তাকে সঠিক উপহারও দেওয়া হবে। চাইলে তার রোগ অসুখ অনুযায়ী যা স্বাস্থ্যকর হবে, সেভাবে কাস্টমাইজ করে দিতে পারেনস খাবারের উপকরণগুলি।

৪) পেন্ডেন্ট খুব স্পেশাল গিফট, সরু চেনের সঙ্গে প্রিয় মানুষটির নামাঙ্কিত পেন্ডেন্ট পেলে সে অবশ্যই খুশি হবে। ক্রিস্টালে গাঁথা হার সঙ্গে হার্ট শেপড় পেন্ডেন্টও দিতে পারেন।

৫) আপনাদের একসঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলোর ছবির কোলাজ তৈরি করে উপহার দিতে পারেন। এটি সারাজীবনের সম্বল হয়ে থাকবে। কিংবা প্রিয় মানুষটির কিছু পোর্ট্রেট ছবি তুলে বাঁধিয়ে উপহার দিতে পারেন।

6) ঘর সাজানোর উপহারও কিনতে পারেন তার জন্য। সেন্টেড ক্যান্ডেলস, লাইট স্ট্যান্ড, ডেকোরেটিভ লাইট, ওয়াল হ্যাঙ্গিং প্রভৃতি ভালো উপহার দীপাবলির জন্য।

7) কোনও বিশেষ ভ্রমণের জায়গা যদি আপনার প্রিয়জনের পছন্দের হয়, তাহলে সেখানে বেড়ানোর ডেস্টিনেশন প্যাকেজ উপহার দিতে পারেন।

৮) কুকিজ বক্স বা ড্রাইফ্রুটস বক্স-ও ভালো উপহার হতে পারে। খাবার জিনিসের পরিবর্তে দু-তিন রকম সুগন্ধী দিয়ে একটা গিফট প্যাক উপহার দিতে পারেন।

৯) আপনার প্রিয়জন যদি ফিটনেস ফ্রিক হয়, তাহলে তাকে ব্যায়ামের উপকরণ দিতে পারেন। যোগা ম্যাট এবং সঙ্গে ব্যায়ামের কটি উপকরণ পেলে সে খুশিই হবে।

১০) গিফট কার্ড উপহার দেওয়া এখন খুব ট্রেন্ডিং, সেটা হতে পারে কোনও জুয়েলারি শপ-এর বা কোনও জামাকাপড়ের স্টোরের গিফট কার্ড। এটা উপহার হিসেবে দিন, যাতে প্রিয়জন তার পছন্দের জিনিস নিজেই কিনে নিতে পারে।

১১) স্যালন বা বিউটি পার্লারের প্যাকেজ-ও উপহার দিতে পারেন। এই গিফট কুপন সে তার সৌন্দর্যচর্চায় ব্যয় করতে পারে।

১২) ইলেক্ট্রনিক গ্যাজেটস উপহার দিতে চাইলে অনেকগুলি অপশনই মাথায় রাখতে পারেন। পোর্টেবল ব্যাটারি চার্জার, ইয়ার ফোন, কর্ডলেস ইয়ারফোন প্রভৃতি।

১৩) ভালো একটি মোবাইল ফোন কিনে দিতে পারেন প্রিয় মানুষটিকে, উৎসবে নতুন ফোন পেলে তিনি খুশিই হবেন।

১৪) কিছু রেস্তোরাঁ উৎসবের সময় ডিসকাউন্ট কুপন বা গিফট ভাউচার দেয়। এরকম কিছু ভাউচার প্রিয় মানুষটিকে দিতে পারেন, যাতে সে তার পছন্দের রেস্তোরাঁয় গিয়ে খেতে পারে।

১৫) সাস্টেনেবল গিফট হিসাবে ফুলের গাছ বা বাহারি গাছ উপহার দিতে পারেন আপনার পছন্দের মানুষকে। এতে আপনার রুচি আর তার প্রতি ভাবনাটাও প্রতিফলিত হবে।

আসল কথা হল উপহার দেওয়ার সময় যাকে সেটি দিচ্ছেন, তার বয়স, রুচি ও ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দগুলিকে গুরুত্ব দিন। ছোটোদের খেলনা, ভিডিয়ো গেমস প্রভৃতি যেমন খুব পছন্দ হবে। বড়োদের আবার প্রয়োজনের জিনিসটি পেলে ভালো লাগে। অ্যালার্ম ক্লক, ইলেকট্রিক কেটলি বা কফিমেকারও কিন্তু ভালো উপহার হতে পারে।

কাজের সময় বাড়াতে হবে

সমস্ত সুযোগ-সুবিধে পেয়েও অনেকে জীবনযাপন করতে চান রাজা-মহারাজাদের মতো। ইউরোপে চারদিনের সপ্তাহ অর্থাৎ, সপ্তাহে চারদিনের কাজ এবং বাকি দিনগুলো ছুটিতে থাকতে চাওয়া হচ্ছে বারবার। শুধু তাই নয়, ওই চারদিনও বাড়ি থেকে কাজ করার দাবি তোলা হচ্ছে।

সপ্তাহে ৯০ ঘণ্টা কাজের বিষয়টি হয়তো অযৌক্তিক হতে পারে কিন্তু যারা কর্মক্ষেত্রে আরও সুযোগ- সুবিধে চাইছেন— তা কি আদৌ যুক্তিযুক্ত? এক্ষেত্রে বিভিন্ন কর্মসংস্থার কর্ণধাররা জানিয়েছেন, যারা সপ্তাহে মাত্র চারদিন কাজ করতে চান, তাদের প্রতিদিনের কাজের সময় আরও বাড়িয়ে দেওয়া উচিত।

কর্মক্ষেত্রে সংস্থার মালিক এবং কর্মীদের মধ্যে পরস্পর সহযোগিতার পরিবেশ কাম্য। এই বোঝাপড়াই আসলে ভারসাম্য বজায় রাখে এবং এই ভারসাম্য-ই কর্মক্ষেত্রে ভালো আবহ তৈরি করে।

চিনে বিগত ৪০ বছরে অর্থনৈতিক সাফল্য এসেছে শুধু কর্মীদের নিরলস পরিশ্রমের কারণে। আসলে, চিনে কাজের সময় হিসেব না করেই শ্রম দেন কর্মীরা। কর্মক্ষেত্রে সুযোগ-সুবিধা নিয়েও খুব বেশি মাথা ঘামান না। আবার ইউকে-তে চিনের ঠিক বিপরীত পরিস্থিতি। কর্মীরা সেখানে কাজের থেকে বেশি সুযোগ- সুবিধে চাইছেন।

আমেরিকায় কিন্তু সপ্তাহে ৯০ ঘণ্টা কাজ করিয়ে নেওয়া হয়। এভাবেই অর্থনৈতিক সাফল্য পেয়ে আসছে আমেরিকা। বাস্তবে দেখা গেছে, কর্মীরা যে দেশে ফাঁকিবাজির রাস্তা ধরেন, সেই দেশের অর্থনীতিতেও ধস নেমেছে। এর ফলে মালিক এবং কর্মী উভয়পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

ভারতীয় কর্মক্ষেত্র এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আবার কিছুটা আলাদা। যারা ধর্ম এবং ঈশ্বর নিয়ে বেশি সময় ব্যয় করেন, তপস্যা করেন, তাদেরই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। যেমন, পৌরাণিক যুগে মুনিঋষিরা কোনও কাজ না করেও, মহান হয়ে আছেন। রাজা-মহারাজারাও হয় যুদ্ধ করতেন, নয়তো বিলাসিতার জীবনযাপন করতেন। কোনও-কোনও রাজা আবার ব্যস্ত থাকতেন পূজাপাঠ নিয়ে।

আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা- র (এআই) যুগেও, কিছু রাজাদের মতো জনগণকে ধর্মকর্মে ব্যস্ত রাখার প্রয়াস চালানো হচ্ছে এখন আমাদের দেশে। জলে একটা ডুব দিয়ে পূণ্যার্জন করার আশায়, কষ্ট করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নষ্ট করছেন কোটি কোটি মানুষ! কিন্তু এই এরাই আবার কর্মক্ষেত্রে একটু বেশি সময় কাজ করতে নারাজ।

ভারতবর্ষের মহিলারা আবার কর্মক্ষেত্রে এবং সংসারে সপ্তাহে ৯০ ঘণ্টার বেশি কাজ করার ধৈর্য রাখলেও, পুরুষরা কিন্তু কর্মক্ষেত্রে এবং সংসারে এতটা উদার মানসিকতা দেখাতে পারেন না। অথচ, মুখ বুজে অত্যাচারও সহ্য করেন অনেক মহিলা। আর পুরুষরা কর্মক্ষেত্রেও সংসারের মতো অনৈতিক ভাবে দাবি করে চলেছেন সমস্ত সুযোগ-সুবিধা। তাই, এই মনোভাবের পরিবর্তন চাই। নিজের স্বার্থে, সংস্থার মালিকের স্বার্থে এবং এমনকী দেশের স্বার্থে আরও বেশি সময় দিতে হবে কর্মক্ষেত্রে। এটাই সামগ্রিক সাফল্যের একমাত্র পথ৷

নবজন্ম

আজ অনেকদিন পর আবার এক নতুন সাজে সেজেছে ইমন-কল্যাণ। আজ এই অনুষ্ঠান শুধুমাত্র এই বাড়ির মালিক ও মালকিনের পঞ্চম পুণ্যতিথি বলে যে তা কখনওই নয়, কারণ সেই ভয়ঙ্কর দিন কখনওই তিথি ভুলতে পারে না। আজকের দিনে সে তার একান্ত নিজের বলেই যাদের জানত, তার মা ও বাবাকে হারিয়েছে। আর তাদেরকে হারাতেই এই সমাজের কদর্য, স্বার্থপর রূপ ওর সামনে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়েছে। আজ সেই সকল স্মৃতি ওর মনের আনাচে কানাচে উঁকি মারছে। কিন্তু কিছু বিশেষ কারণে আজ তার মন কিছুটা তৃপ্ত আবার শান্ত।

আজ বহুদিন ধরে চলে আসা নানান পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হতে চলেছে। তার মায়ের মনের ইচ্ছে সে আজ পূরণ করতে চলেছে। আর তারই সঙ্গে অনেক মানুষের অনেক প্রশ্নের জবাব আজ বিনা বাক্যব্যয়ে করেই দিতে পারবে, এটা ভেবেই সে আজ অনেক তৃপ্ত। আজ সকল অপেক্ষার অবসান হবে কিছু সময় পর। আজ দীনু কাকা, মঙ্গলা পিসি আর যারা বাইরের কাজ করেন, প্রত্যেকে নতুন উদ্যমে কাজ করছেন।

আবার বহুদিন পর এই বাড়ি অনেক মানুষের কথায় ভরে উঠবে। সত্যিই তিথি দিদির হাত ধরেই এইসব মানুষগুলো যেন আরও কয়েক বছর বাঁচার রসদ পেল। কিন্তু তিথি সে এরপর কী করবে, তার তো পথচলা এই পর্যন্তই ছিল। তাকে তো এবার তার নতুন ঠিকানা খুঁজতে হবে। কখনও কখনও গভীর চিন্তায় আমরা আমাদের বাহ্যিক পরিবেশ থেকে এতটাই সরে যাই যে, আমাদের আশেপাশে কোনও মানুষের উপস্থিতিও আমরা টের পাই না।

তিথি নিজের ভাবনার মধ্যে এমন ভাবে ডুবেছিল যে, বাবা ও মায়ের ছবির ভিতর যে কারোর প্রতিচ্ছবি এসে পড়েছে সে সেটা এতক্ষণ খেয়ালই করেনি। এবার সে পিছন ফিরতেই বাগানের মালি দামু দাদাকে দেখে জিজ্ঞেস করল, “কিছু বলবে?” তার প্রশ্নে দামু কিছু একটা ভেবে বলল, ‘এজ্ঞে ওই ভালোমানুষ দাদা, দিদিরা এয়েছেন গো দিদিমণি, তোমার খোঁজ করতাছেন। আমি উনাদের বৈঠকখানাতে বসায়ে এলুম।’

তিথি সব শুনে বুঝতে পারল, কাদের কথা দামু বলছে। দামুকে বিদায় করে নিজের মনে হাসল, আহা এই সহজ সরল মানুষগুলো কত সুন্দর ভাবে মানুষের কাজের উপর বিশ্বাস রেখে তাদের পরিচয়ের সামনে একটা বিশেষণ ব্যবহার করে তাদের উপস্থিতি বুঝিয়ে দেয়। সত্যিই তো মেঘা, রুমেলা, কৌশিক, নীল— এরা সততার সঙ্গে সমাজের উদ্ধারে নিজেদের ব্রতী করেছে। আর তাদের সাহায্যেই আজ তিথিও এত বড়ো কাজটা করতে পারবে।

নীচে নামার সঙ্গে সঙ্গেই ওর নজর চলে গেল সোজা লনের দিকে, যেখানে তার কিছু পরিচিত প্রতিবেশী, সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত কিছু অতিথি আর এই বাড়ির মালিকের কিছু আত্মীয় নিজেদের আসনে বিরাজ করছেন। এত জনসমাবেশের কারণ বুঝতে না পারায় কিছু কৌতূহলী চোখ তিথিকে খুঁজছে, আর কেউ কেউ নিজেদের মধ্যেই সম্ভাব্য কী ঘটতে পারে তা নিয়ে নিজেদের মত পোষণ করছেন, ফলে একটা মৃদু গুঞ্জনের আভাস পাওয়া যাচ্ছিল।

যথাসময়ে তিথি তার ভালোমানুষ বন্ধুদের (দামু দাদার মতে) নিয়ে সকলের সামনে উপস্থিত হল। সকলের সামনে দুই হাত তুলে নমস্কার জানিয়ে আজকের এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার জন্য সকলকে ধন্যবাদ জানাল। এরপর সে আজকের এই অনুষ্ঠানের মূল কারণে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে জানাল— সে আগে সকলকে কিছু পুরোনো কথা জানাতে চায়, যা এই বাড়ির সঙ্গে যুক্ত, তার জীবনের সঙ্গে জড়িত। এই বলে সে সকলকে আজ থেকে পাঁচশ বছর পিছনে নিয়ে গেল।

ইমন-কল্যাণ-এর প্রধান আকর্ষণ ছিল তার মালিক কল্যাণ রায় আর মালকিন ইমন রায়। দুইজন ছিলেন যেমন প্রাণবন্ত, তেমনই তাদের ছিল পরোপকারী মন। সকলের খুব প্রিয়, কোনও শত্রু তাদের ছিল না। পৈতৃক ব্যাবসা সামলানোর পরও সকলের বিপদ-আপদে ঠিক পৌঁছে গেছেন ওনারা। শুধুমাত্র একটি কষ্ট ভগবান তাদেরকে দিয়েছেন, সেটা হল সন্তান-সুখ থেকে বঞ্চিত থাকার দুঃখ। এই দুঃখের একদিন অবসান হল এই ছোট্ট তিথিকে দত্তক নিয়ে।

কিন্তু এই মেয়ে যত বড়ো হতে লাগল ততই ইমনের মনে নানান ধরনের দ্বন্দ্ব শুরু হল। কারণ সে বেশ বুঝতে পারছিল তাদের অবর্তমানে আশেপাশের লোকজন তাকে নানাভাবে বিরক্ত করবে। যে সত্য ওনারা তিথিকে কোনওদিন জানতে দিতে চাননি, সকলে মিলে সেটাই আগে তার সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করবে। এইসব ভেবেই ইমন ঠিক করলেন যে, তিনি তিথিকে এমন ভাবেই মানুষ করবেন যেন সকল পরিস্থিতির জন্য সে নিজেকে প্রস্তুত রাখে।

যখন তিথির ষোলো বছর পূর্ণ হল, তখন থেকেই তিনি তার সকল প্রয়োজন মেটানোর সঙ্গে সঙ্গে এটাও বলতেন, ‘সব বাবা-মা সন্তানকে সেরা জিনিসটা তুলে দেন, আমরাও তাই করবার চেষ্টা করি। কিন্তু সন্তান যদি এটাতে অভ্যস্ত হয়ে যায় তবেই হবে মুশকিল। কারণ সকলের সবদিন এক নাও যেতে পারে। তাই এই উপযুক্ত সময় নিজেকে তৈরি করার, একে কাজে লাগাও। নিজেকে সকল পরিস্থিতির জন্য তৈরি করো। আমরা তোমার এই নিজেকে গড়ার কাজে সাহায্যের জন্য আছি, কিন্তু তারপর তোমাকে নিজেকে সফল ভাবে সমাজের একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। তোমার সেই উন্নতি, প্রতিষ্ঠা শুধুমাত্র তোমার— যা কেউ কখনও কেড়ে নিতে পারবে না।’

এতসব কথা ঠিক মতোন করে সবটা তিথির বোধগম্য হতো না। কিন্তু যখন মা এইসব কথা বলতেন তখন মাকে যেন ভীষণ অচেনা মনে হতো। এই ভাবেই বেশ ক’টা বছর আনন্দের সঙ্গে কাটছিল। তিথির স্কুল-জীবন শেষ হতেই কল্যাণবাবু তার উচ্চশিক্ষার জন্য তাকে বিদেশে পাঠিয়ে দিলেন। কিন্তু সময় সব সময় একরকম যায় না। হঠাৎই একটা দুর্ঘটনার ফলে এই রায় দম্পতির জীবনের প্রদীপ নিভে গেল। তিথি খবর পেয়ে এসে দেখল সব শেষ।

এই ভাবে তার জীবনে যে এরকম বিপর্যয় নেমে আসবে তা তার কল্পনার অতীত। যখন সে সকল ক্রিয়াকর্ম মিটিয়ে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে তখন অতিপরিচিত মানুষদের ব্যবহার তার কাছে খুব অদ্ভূত লাগতে লাগল। যারা এতদিন তাকে খুব ভালোবাসত এখন কেমন ঈর্ষার চোখে দেখছে, বলছেও যে তার নাকি কপাল খুলে গেল। সে ভাবত, তার যা হারিয়ে গেল তাতে কীভাবে সে লাভবান হয়। নিজের মা-বাবাকে হারিয়ে কেউ কি খুশি হয়।

এইসব ভাবনা নিয়ে সে বিদেশ ফেরার প্রস্তুতি নিতে শুরু করল। কারণ তার পড়া শেষ হতে এখনও কয়েক বছর বাকি। সেইসময় জিনিসপত্র গোছানোর সময় তার হাতে আসে মায়ের ডায়েরি। যার প্রথম পাতার উপর তিথির উদ্দেশ্যে লেখা, তিথির জন্য মায়ের আশীষ। সেই ডায়েরি পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সে নিজেকে নতুন করে জানতে শুরু করল। সে এইদিন প্রথম জানল যে, সে দত্তক কন্যা। তাই আশপাশের লোকজনের থেকে তার মা তাকে কীভাবে আগলে রেখেছেন। তার মা ও বাবা তাকে তাদের যথা সর্বস্ব দিয়ে মানুষ করতে চেয়েছেন। এইসবের বদলে তার মা তার কাছে একটাই দাবি রেখেছেন, ‘জীবনে তুই অনেক বড়ো মাপের মানুষ হয়ে আশপাশের সকলকে দেখিয়ে দে যে, তুই শুধুমাত্র মা ও বাবার আশীর্বাদ নিয়ে, নিজের যোগ্যতায় নিজের একটা আলাদা জগৎ ও পরিচয় তৈরি করেছিস। তোর বাবার সমস্ত কিছুই তোর হওয়া সত্ত্বেও তুই সকল বৈভব দূরে রেখে নিজের কর্মের দ্বারা এইসব কিছু অর্জন করে দেখা। তখন আমরা যেখানেই থাকি আমাদের তোকে নিজের সন্তান বলে ভাবতে গর্ববোধ হবে। মনে হবে কাউকে আমরা আমাদের সত্যিকারের উত্তরাধিকারী হিসেবে এই পৃথিবীতে রেখে যেতে পারলাম। আর আমাদের অবর্তমানে তুই এই বাড়ি কোনও এক সংস্থাকে দিয়ে দিবি, যারা এখানে অনাথ শিশুদেরকে যথার্থ শিক্ষা দিয়ে বড়ো করতে পারে। এটা আমার একটা স্বপ্ন।’

এইসব কথা বলতে গিয়ে কখন যে তার দুই গাল বেয়ে অশ্রুধারা নেমে এসেছিল, তা তিথি খেয়াল করেনি। চোখ মুছে সে সকলকে জানাল যে, আজ সে তার মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে চলেছে। এই বাড়ি সে ‘নবজন্ম’ নামে এক সংস্থার হাতে তুলে দিচ্ছে। এই বলে সে রুমেলা, নীল, কৌশিক আর মেঘার হাতে বাড়ির কাগজ আর কিছু চেক তুলে দেয়। আর সকলকে বলে সে আজ থেকে এইসব কিছু থেকে মুক্ত। তার নতুন ঠিকানায় সে কেবল তার মা ও বাবার স্মৃতি হিসেবে তাদের ফোটোটাই নিয়ে যাবে। কিন্তু এখানকার পুরোনো কাজের লোক আগের মতোই এখানে থাকবে।

তার এই মহৎ উদ্দেশ্য জানার পর ওখানে উপস্থিত সকলে এতটাই অবাক হলেন যে, বলার মতো কিছু ভাষা খুঁজে পেলেন না তাঁরা। শুধু এই মেয়েটিকে আজ মন থেকে আশীর্বাদ জানালেন। কারণ সে আজ প্রতিষ্ঠিত শুধুমাত্র কারওর দয়ার জন্য নয়। তার মধ্যে যে মেধা ছিল, সহনশীলতা আর শালীনতাবোধ ছিল, তার জন্যই আজ সে সকলের থেকে আলাদা। আজ সকলের সামনে তার ‘নবজন্ম’ হল।

একচ্ছত্র সাহিত্য আকাদেমি (শেষ পর্ব)

নিধিরাম তো আনন্দে ডগমগ। এরপর একে একে নবীন প্রবীণ মিলে আরও জনা সাতেক কবি সাহিত্যিক সুলভ সংস্করণের সংবর্ধনা নেওয়ার জন্য নাম নথিভুক্ত করিয়েছেন। তাহলে মোটমাট আটটা ‘মুরগি’ হল! নিধিরামকে আর পায় কে, মার দিয়া কেল্লা। বর্তমান বাজারদর চলছে চার থেকে পাঁচ হাজার মতোন। ওরা সেখানে মাত্র আড়াই হাজার। আট আড়াই… উঃ তার মানে কড়কড়ে যাকে বলে হাতে গরম কুড়ি হাজার। ফার্স্ট চান্সেই বাজিমাৎ। এক্কেবারে কল্পনার বাইরে, ভাবা যায়! মাসের শেষ রবিবার মানে হাতে আর দিনদশেক।

আটজনের বেশি একদিনে সংবর্ধনা দেওয়া সম্ভব না। পরের দিন সকাল সকাল দালাল মিত্তিরকে বলে এল, আর নাম এনরোল না করতে। আর করলে যেন বলে দেয় সেগুলো নেক্সট মাসের জন্য। এরপর তাহলে… একবার প্রেসে গিয়ে ‘একচ্ছত্র সাহিত্য আকাদেমি’-র নামে ছাপানো মানপত্রগুলো নিয়ে আসতে হবে। সে কাল পরশু করে একবার গিয়ে নিয়ে এলেই চলবে।

সন্ধেবেলা নিধিরাম তার হিসেব লেখা ডায়ারি খুলে বসল। এক একটা ফাঁকা পাতায় পত্রিকা ও তার সম্পাদকের নামগুলো একে একে লিখে ফেলল হিসেবের সুবিধার জন্যে পর পর এইভাবে— নামাবলি – নিধিরাম বাড়ুজ্যে, চালচিত্তির- দালাল মিত্তির, দুলি- অযোধ্যা হেমব্রম, ভূতের ছানা- যীশুকৃষ্ণ কবিরাজ, তাজমহল – অদিতি ইসলাম, শ্যামলা মেয়ের- কাজল কৈবর্ত, কলিকাল- বাক্য বাগীশ বাগচি, প্রলাপ- পয়োধি পরামাণিক।

প্রেস থেকে মানপত্র নিয়ে ফেরার পথে নিধিরাম বিল্টদের বাড়িতে ঢুঁ মারল একবার। তখন সান্ধ্য চায়ের সময়। কাজেই নিধি তৎক্ষণাৎ প্লেটে সাজানো জিভে গরম এককাপ চা, চানাচুর ও বিস্কুট পেয়ে গেল। লোকে বলে নিধিরামের নক্ষত্রযোগ নাকি অসাধারণ। খাবার ওর পিছু ছাড়ে না। খাবার যেন ওর জন্য অপেক্ষা করে থাকে সব সময়। নিজেই বলল, ‘মানপত্রগুলো নিয়ে এলাম বুঝলি বুল্টি! স্যরি স্যরি বিন্টু।”

বিল্টু হাসতে হাসতে বলল, ‘ঠিক আছে৷ ঠিক আছে।’

—এই শোন, এর মধ্যে অনুষ্ঠানের আগের দিন মানে শনিবার বিকেলবেলা আমার বাড়ি আসিস একবার।

কথামতো বিল্টু হাজির। নিধিরাম ব্ল্যাংক মানপত্র আর আটজনের নামের একটা লিস্ট এবং একটা কলম দিয়ে বিল্টুকে বলল— প্রাপকদের নাম লিখে মানপত্রগুলো সব রেডি কর। হয়ে গেলে বলিস। দুর্গা মণ্ডপটায় টেবিল দু’টো নিয়ে যাব। চেয়ারগুলো একটু সাজিয়ে নিতে হবে। আর চারটে ফ্লাওয়ার ভাস চাই। কবচকে বলে রেখেছি ফুলশুদ্ধ কাল দুপুরে দিয়ে যাবে। মাইক সকালে সেট করে দেবে বলেছে। পাশের ইলেকট্রিক দোকানি কয়েকটা এলইডি বাল্ব লাগিয়ে দেবে। আর… অনুপকে চা বিস্কুট তো বলেই দিয়েছি। ব্যস ফিনিশ। সন্ধের আগেই দুর্গামণ্ডপ চেয়ার টেবিলে সাজিয়ে ফেলে অনুপের দোকানে চা বিস্কুট খেয়ে একটা তৃপ্তির ঢেকুর তুলল। বিল্টু বলল, “দাদা, এবার আমি আসি।

—আচ্ছা। আর হ্যাঁ, কাল তুই চারটের মধ্যে আয়। ডট পাঁচটায় অনুষ্ঠান শুরু হবে কিন্তু।

—ঠিক আছে।

পরদিন সব্বাই পৌনে পাঁচটায় হাজির। দুর্গা মণ্ডপ গমগম করে উঠল ঠিক পাঁচটায়। আটজন সম্পাদক মঞ্চের চেয়ারে। আটজন যারা সংবর্ধিত হবেন তারা দর্শকাসনের একদম সামনের সারিতে। মণ্ডপ কানায় কানায় পূর্ণ কবি সাহিত্যিকদের উপস্থিতির সমারোহে।

নিধিরামের স্নেহধন্য বিল্টই সভা শুরুর সূচনা করল একটা উদ্বোধনী সংগীত দিয়ে। তারপর দালাল মিত্তির ‘একচ্ছত্র সাহিত্য আকাদেমি’র উদ্দেশ্য ও সাহিত্য সংস্কৃতির প্রচার প্রসার সম্পর্কিত ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ড বিস্তারিত তুলে ধরলেন। হল ফেটে হাততালি উঠল। ধন্য ধন্য করল উপস্থিত সকলেই। এটা একটা অনন্য প্রয়াস বলেও অনেকে স্বীকার করে নিলেন।

এরপর নিধিরাম মাইক হাতে ‘কলিকাল’ পত্রিকার সম্পাদক বাক্যবাগীশ বাগচি মহাশয়কে কবিতা বিষয়ক কিছু বক্তব্য রাখতে অনুরোধ করলেন, যাতে এই প্রজন্মের নতুন কবিরা সমৃদ্ধ হতে পারে।

বাক্যবাগীশ বাগচি ‘আধুনিক কবিতার রূপকল্পের ফোর্থ ডাইমেনশন’ নিয়ে এক অত্যাশ্চর্য বক্তব্য রাখলেন আধঘণ্টা যাবৎ। এক্কেবারে পিনড্রপ সাইলেন্স যাকে বলে। হাততালির বালাই নেই। যে কারণে বাক্যবাগীশমশায়কে খানিকটা বিমর্ষ দেখাল। পরবর্তীতে কবিতা পাঠ। এরপর সংবর্ধনা। একে একে এক একজন সম্পাদক এক এক করে সাতজনকে গলায় উত্তরীয়, হাতে স্মারক ও নীলবর্ণের মানপত্র দিয়ে সংবর্ধনা দিলেন।

সবশেষে অষ্টমজনকে মানে ইসিএলের ম্যানেজার মাননীয় শুক্রাচার্য ভট্টোপাধ্যায়কে অবশ্য নিধিরাম বাঁড়ুজ্যে খুব যত্ন সহকারে গদগদ ভাব এনে নিজহাতে গলায় উত্তরীয় পরালেন। হাতে দিলেন কিং-সাইজের একটা স্মারক ও গোলাপি রঙের মানপত্র এবং ঘোষণা করলেন, ‘মাননীয় ভট্টোপাধ্যায় মহাশয়কে ওনার সম্মতিক্রমে আমরা ওনাকে বার্ষিক মাত্র তিন হাজার দু’শো টাকার বিনিময়ে আজীবন সদস্য করে নিলাম।’ আবার জোর হাততালি উঠল। ‘অন্য যে-কেউ আগ্রহ থাকলে এই সুবিধাটা নিতে পারেন। এতে আপনারা একচ্ছত্র সাহিত্য আকাদেমি গোষ্ঠীর সমস্ত পত্রপত্রিকা সারা বছর বিনা পয়সায় পেয়ে যাবেন বিশেষ সংখ্যাসহ।’

তাজমহল পত্রিকার অদিতি ইসলাম সকলকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে সভা সমাপ্তির কথা ঘোষণা করলেন এবং সেই সঙ্গে একটু চা- পান করারও বার্তা রাখলেন। অনুপের চা-বিস্কুট হাতে হাতে পৌঁছে যেতে থাকল মণ্ডপময়।

চা-পর্বের শেষে যে যার মতোন চলে গেলে সভাস্থল যখন প্রায় শূন্য নিধিরামসহ সাতজন সম্পাদক সংবর্ধিত সকলকে বিশেষত শুক্রাচার্যকে সসম্মানে বিদায় জানানোর প্রাক্কালে এটা জানাতে ভুল করল না যে, পরের মাসের অনুষ্ঠানে আপনারা অবশ্যই আসবেন যেন। আগে থেকেই আমন্ত্রণ জানিয়ে রাখলাম। আর হ্যাঁ, সহযোগিতা পেলে কয়েক মাস পরে আপনাদের প্রত্যেকের একটা করে এক ফর্মার কবিতার বই বের করব। তাছাড়া সকলের লেখা নিয়ে একটা কাব্য-সংকলন করার কথাও ভাবছি। হ্যাঁ, এবার আসুন আপনারা, নমস্কার ।

নিধিরাম এবার অপর সাতজন সম্পাদককে নিয়ে একটা মিটিংয়ে বসল পরবর্তী কর্মপ্রবাহের রূপরেখা নিয়ে একটু আলোচনার নাম করে মূলত আজকের অনুষ্ঠানের হিসেব-নিকেশটা বুঝে নিতে।

নিধিরাম তার ডায়ারির পাতা খুলল। দালাল মিত্তির কালেকশনের দায়িত্বে ছিল। সে মোট পঁচিশ হাজার সাতশো টাকা নিধিরামের হাতে তুলে দিল। সাতজনের সুলভ সংবর্ধনা খাতে আড়াই হাজার করে সাড়ে সতেরো হাজার, শুক্রাচার্যের স্পেশাল পাঁচ হাজার আর বার্ষিক সদস্য ফি বাবদ আরও তিনহাজার দুশো টাকা।

নিধিরাম জানাল, আজকের অনুষ্ঠানের সব খরচখরচা বাবদ চার হাজার টাকা গেছে। এবার স্মারক উত্তরীয়-র সংখ্যার হিসাবে সবার থেকে একটা করে বাদ গেল। বার্ষিক সদস্য ফি বাবদ কালকশনের তিনহাজার দুশো টাকা আটভাগে ভাগ করলে এক একজনের ভাগে পড়ছে চারশো টাকা। নিন চারশো করে ধরুন সবাই।

আড়াই হাজার টাকা ফান্ডে থাক পরের মাসের অনুষ্ঠানের কাজ শুরু করার জন্য। এ মাসে তো আমার পকেট থেকে দিয়েই শুরু করেছিলাম। আর বাকি রইল ষোল হাজার টাকা। অর্থাৎ তাদের প্রত্যেকের ভাগে পড়ল আরও দু’হাজার। নিধিরাম জেনে নিল আর কারও জিজ্ঞাস্য কিছু আছে কি না। সকলেই ঘাড় নেড়ে ‘না” বলেছে।

নিধিরাম তার ডায়ারিতে সকলের দস্তখত নিয়ে নিল। যাতে পরবর্তীতে কোনওরকম বিভ্রান্তি না আসে কারও মনে।

নিধিরাম বাদে বাকি সাত সম্পাদক পকেট গরম করা কড়কড়ে দু’হাজার চারশো করে পেয়ে খুশি মনে চলে গেল শুভরাত্রি জানিয়ে।

বিল্টু কী একটা জিজ্ঞেস করবে বলে উশখুশ করছিল।

নিধিরাম বলল, ‘বল কী বলছিস?

—কিছু না, মানে বলছিলাম কী চালতা বাগানের সঙ্গে ঠিক যেন মিলছে না।

—কেন কোথায় আবার অমিল দেখলি?

—ওই যে চালতা বাগান থেকে তো কেউ কিছু নিয়ে যায় না। এখানে যে ওরা সব স্মারক উত্তরীয় নিয়ে চলে গেল!

—আরে নাদান, তুই এটা বুঝলি না বাড়িতে পড়ে থাকা বেকার স্মারক উত্তরীয়গুলো চড়াদামে বিক্রি করে দিলাম এই সংবর্ধনার মোড়কে৷ এটাকে একটা মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজিও বলতে পারিস তুই।

আপাত সহজ সরল দেখতে নিধিরামের দুর্বুদ্ধি দেখে তো বিল্টুর ভিরমি খাওয়ার জোগাড়। যাইহোক, নিদুদা আমাকে আর বোধহয় তোমার কবি সাহিত্যিক বানানো হল না।

—কেন রে?

—কারণ সামনের এক তারিখ থেকে আমি আর বেকার থাকছি না।

—তার মানে?

—বলতে পারো তোমার দুর্ভাগ্য আর আমার কপাল…

—সে আবার কী? বুঝলাম না।

—আমি একটা চাকরি পেয়েছি। এক তারিখে জয়েনিং।

নির্বাক নিধিরাম হাঁ করে বিন্টুর চলে যাওয়া পথের পানে চেয়ে রইল— কতক্ষণ কে জানে!

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব