ত্রিপুরা-সফর (পর্ব-০২)

সফর শুরু হল দুর্গাবাড়ি চা-বাগানের মধ্যে দিয়ে। তারপর স্মার্ট সিটি আগরতলার জগন্নাথ মন্দির, উমামাহেশ্বরী, লক্ষ্মীনারায়ণ মন্দির, বেণুবন বিহার, এমবিবি কলেজ, ‘পূর্বাশা’ বিপণি দেখে দুপুরের ভোজন-বিরতি। এর পর ‘হেরিটেজ পার্ক”। ভ্রমণের প্রথম দিন এই পার্কটি দেখলেই গোটা ত্রিপুরা রাজ্যের উল্লেখযোগ্য দর্শনীয়স্থল, রেলপথ, রেলস্টেশন, টানেল, নদী-ব্রিজ, মন্দির, মসজিদ, বুদ্ধ মন্দির প্রভৃতির অসামান্য রেপ্লিকা-দর্শন হয়ে যাবে। হ্যাঁ, এই পার্কেই দেখা গেল আগরতলা নামকরণ সম্পর্কিত ‘আগর’ বৃক্ষ। সুসজ্জিত পার্কটি যেন সমগ্র ত্রিপুরা রাজ্যের ঐতিহ্য বহন করছে।

উজ্জয়ন্ত প্যালেস

পড়ন্ত বিকেলে মায়াময় আলোয় উদ্ভাসিত ‘উজ্জয়ন্ত প্যালেস’-এর প্রবেশতোরণ দিয়ে প্রবেশ করতেই সুসজ্জিত বাগিচা সরণি মনে পড়িয়ে দেয় তাজমহলের বাগিচা সরণির কথা। সরণির শেষে স্বমহিমায় অবস্থান করছে ১৮৯৯ থেকে ১৯০১ খ্রিস্টাব্দ সময়কালে নির্মিত অভিনব স্থাপত্যশৈলীর রাজপ্রাসাদ। দু-পাশে রাধাসাগর এবং কৃষ্ণসাগর জলাশয় প্রাসাদের সৌন্দর্যবর্ধন করছে। মহারাজ রাধাকিশোর মাণিক্য এই প্রাসাদ নির্মাণ করান বিখ্যাত ‘মার্টিন অ্যান্ড বার্ন’ কোম্পানিকে দিয়ে। তৎকালীন নির্মাণব্যয় দশ লক্ষ টাকা৷

এই প্রাসাদের আগে ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দে রাজা ঈশানচন্দ্র মাণিক্য-র আমলে পুরাতন আগরতলায় নির্মিত রাজপ্রাসাদ, সেটি ১২ জুন ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দে ভয়াবহ ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তার পর এই উজ্জয়ন্ত প্রাসাদের নির্মাণ।

বর্তমানে এখানে হয়েছে রাজ্য সংগ্রহশালা। ত্রিপুরা রাজ্য এবং তার আশপাশের জনজীবনের শিল্প-সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, মাণিক্য রাজবংশের ইতিহাস, ত্রিপুরাবাসীদের পোশাক-আশাক, জীবনযাপন, হস্তশিল্প, মুদ্রা প্রভৃতির সংগ্রহ, চিত্রাঙ্কন, ভাস্কর্য, দেবদেবী মূর্তি— এইসব দেখতে লেগে গেল অনেকটা সময়। সন্ধ্যার পর আলোক- শোভিত রাজপ্রাসাদ, বাগিচা স্বপ্নময় হয়ে ওঠে।

সকাল পৌনে দশটায় বিমানবন্দরে নামার পর থেকে এতসব দেখতে ধকল কম হয়নি। রাজ্য পর্যটনের গীতাঞ্জলি অতিথিনিবাসে ফিরে নৈশাহার সেরে ঝিঁঝিঁপোকাদের ঐকতান শুনতে শুনতে ঘুমের দেশে।

ত্রিপুরাসুন্দরী এবং…

সকাল সকাল চলেছি উদয়পুর। একান্ন পীঠের অন্যতম সতীপীঠ ত্রিপুরাসুন্দরী মন্দিরে। স্থানীয় অধিবাসীদের কাছে এই মন্দির মাতাবাড়ি নামেও পরিচিত। অনেকের মতে দেবী ত্রিপুরাসুন্দরী বা ত্রিপুরেশ্বরী থেকেই নাকি ত্রিপুরা। এই মন্দির ‘কূর্ম পীঠ’ নামেও পরিচিত। মন্দিরের ছাদটি চারচালা, কচ্ছপের পৃষ্ঠদেশের আকৃতি। শিখর বৌদ্ধস্তূপাকৃতি। তার উপর শীর্ষ-কলস। সমস্ত মন্দিরগাত্রের রং উজ্জ্বল টেরাকোটা-বর্ণ। ১৫০১ খ্রিস্টাব্দে মহারাজ ধন্যমাণিক্য বর্তমান মন্দিরটি নির্মাণ করেন। প্রতি বছর দেওয়ালির সময় এখানে খুব বড়ো মেলা হয়।

মন্দির চত্বরে ভিড় কম। গর্ভগৃহে দেবী মূর্তি দুটি। একটি পাঁচ ফুট উচ্চতার কষ্টিপাথরের কালী মূর্তি ‘ত্রিপুরেশ্বরী”। অপরটি দু-ফুট উচ্চতার ‘ছোটো-মা’, চণ্ডী মূর্তি। লাল ওড়না ঢাকা ত্রিপুরেশ্বরীর কেবলমাত্র মুখমণ্ডল দৃশ্যমান। ভগবান বিষ্ণুর সুদর্শনচক্রে কর্তিত সতীর ডান পায়ের অংশ এখানে পড়েছিল।

মন্দির পরিক্রমা সেরে, সিঁড়ি ভেঙে নেমে সামনেই বিশাল পুষ্করিণী ‘কল্যাণসাগর’। স্বচ্ছ জলে খেলা করছে প্রচুর মাছ। কচ্ছপের দেখাও মেলে। অনেকে মাছদের খাবার দিচ্ছেন।

সতীপীঠ থাকলে ভৈরব থাকবেন। কাছেই বিজয়সাগরের তীরে ত্রিপুরেশ্বরীর ভৈরব তথা শিব মন্দির। জগন্নাথ দিঘির পাড়ে জগন্নাথ মন্দির। তার পর গুণাবতী মন্দিরগুচ্ছ, রেলিং ঘেরা, তাই বাইরে থেকেই দেখে চলে এলাম গোমতী নদীর তীরে এক সময়ের ত্রিপুরার রাজধানী এবং রাজপ্রাসাদের ধ্বংসস্তূপে। সেখান থেকে সামান্য এগিয়ে দেখা গেল মহারাজ গোবিন্দ মাণিক্যর প্রতিষ্ঠিত ভুবনেশ্বরী মন্দির। বর্তমানে এএসআই সংরক্ষিত বেলেপাথরের ছিমছাম মন্দির এবং চত্বর। উঁচু ভিত্তি-চত্বরের উপর চতুষ্কোণাকৃতি (প্রথম অংশ ছোটো, দ্বিতীয় অর্থাৎ গর্ভগৃহ অংশটি বড়ো) কূর্মাকৃতি চালার উপর বৌদ্ধস্তূপাকৃতি শীর্ষদেশ।

এই সেই মন্দির, যার কথা পড়েছি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘রাজর্ষি’ উপন্যাসে এবং নাটক ‘বিসর্জন’-এ। মন্দির বিগ্রহহীন। রাজর্ষি-র কাহিনি অনুযায়ী পুরোহিত রঘুপতি কর্তৃক গোমতীর জলে বিগ্রহ বিসর্জিত!

কাছেই এক রেলিংঘেরা চত্বরে রবীন্দ্রনাথের মূর্তি। ফেরার পথে চোখে পড়ল নড়বড়ে এক ওয়াচ টাওয়ার, সংস্কারের অভাবে সেটায় ওঠা ঝুঁকিপূর্ণ। আর একটু এগোতেই খোলা জায়গাতে সংস্কারের অভাবে জাঁকিয়ে বসা গাছ-গাছালির আড়ালে ভগবান বিষ্ণুর ভগ্নমন্দির।

নীরমহল-এ চল্লিশ মিনিট

দৃশ্যপট বদলে গেল। জমজমাট মেলাঘর বাজার। চলছে বিকিকিনির ব্যস্ততা। তার মধ্যে দিয়ে ডানহাতি পথ ধরে আমাদের ইনোভা পৌঁছাল রুদ্রসাগরের তীরে। বিস্তীর্ণ জলাশয়ের দিগন্তে শ্বেতশুভ্র প্রাসাদ দৃশ্যমান। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একমাত্র জলমধ্যে প্রাসাদটি ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে মহারাজ বীরবিক্রম কিশোর মাণিক্য মার্টিন অ্যান্ড বার্ন কোম্পানিকে দিয়ে নির্মাণ করান। নীরমহল নির্মাণে সময় লেগেছিল প্রায় ন’বছর। দূর থেকে দেখলে মনে হয় প্রাসাদটি যেন জলে ভাসমান। প্রসঙ্গত ভারতে আর একটি জলমধ্যে প্রাসাদ আছে রাজস্থানের উদয়পুরে। জলমহল তথা লেক প্যালেস, (জগনিবাস প্রাসাদ)। বর্তমানে সেটি বিলাসবহুল হোটেলে পরিণত।

রুদ্রসাগরের জলে মোটরচালিত নৌকা দুপুরের শান্ত পরিবেশ ব্যাহত করে ভট ভট আওয়াজ তুলে এগোচ্ছে। জলাশয় ছেয়ে আছে শ্যাওলা এবং প্রচুর কোঁকড়ানো পদ্মপাতায়। ফুল নেই। এখন ফুলের সময়ও নয়। আকাশে পাখিদের ওড়াউড়ি, জলে হাঁসেদের দলবদ্ধ বিচরণ— এসব দেখতে দেখতেই নীরমহল স্পষ্ট হচ্ছে। এখন বোঝা যাচ্ছে, প্রাসাদের ভিত্তি অংশ টেরাকোটা-বর্ণরঞ্জিত, বিভাজন-রেখায় আলাদা। উপরিভাগ শ্বেতশুভ্র। প্রাসাদের কাছে পৌঁছাতেই নৌকাচালকদের বার্তা— ‘সময়সীমা চল্লিশ মিনিট’।

তিরিশ টাকা প্রবেশমূল্য দিয়ে প্রবেশ করলাম মাণিক্য রাজবংশের রাজকীয় বিলাস-ভাবনায় নির্মিত গ্রীষ্মকালীন আবাস নীরমহল-এর অন্দরে। চব্বিশটি কক্ষসম্বলিত প্রাসাদটি দু’টি অংশে বিভক্ত— অন্দরমহল এবং নাচ-গান-নাটক, সাংস্কৃতিক রাজকীয় অনুষ্ঠানের জন্য কক্ষ, মুক্তমঞ্চ, বাগিচার অপরূপ সমন্বয়। স্থাপত্যশৈলীর অভিনবত্বে নীরমহল সত্যিই অনন্য। তবে সমগ্র প্রাসাদ পায়ে হেঁটে দেখতে চল্লিশ মিনিট সময়সীমা যথেষ্ট নয়। কোথাও কোথাও প্রাক-বিবাহ ফটোশুট চলছে।

পা বাড়ালেই…

দুপুরের আহারপর্ব সেরে পৌঁছালাম বিশালগড় সাব-ডিভিশনের অন্তর্গত কসবায়, কসবেশ্বরী মাতার মন্দিরে। অনেকে কমলাসাগর কালী মন্দিরও বলেন। কালী মন্দির হলেও কসবেশ্বরী আসলে দুর্গা মূর্তি। বিশেষত্ব হল, দেবীর আসন- -ভূমিতলে দেবাদিদেব মহাদেবের অধিষ্ঠান। মন্দিরের নির্মাণ নক্সা কূর্মাকৃতি চালাঘরের আদলের উপর বৌদ্ধ স্তূপের মতো শিখরদেশ। মন্দিরগাত্রের বহির্ভাগ টেরাকোটা-বর্ণরঞ্জিত, অন্তর্ভাগ দুধ-সাদা। মহারাজা কল্যাণমাণিক্য এই মন্দির স্থাপনার কাজ শুরু করেন এবং পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষে মহারাজ ধন্যমাণিক্য সেই নির্মাণকার্য সমাপন করেন। ভক্তবৃন্দের কাছে দেবী কসবেশ্বরী অত্যন্ত জাগ্রত। মন্দিরের সামনের পথ ধরে কিছুটা এগোতেই বিশাল দিঘি— কমলাসাগর।

বিকেলের চা-পর্ব সারলাম রাজ্য পর্যটনের ‘কুমিল্লা ভিউ ট্যুরিস্ট লজ’-এ। চমৎকার ঘোরানো সিঁড়ি বেয়ে লজের ছাদে উঠে দেখি চারদিকে সবুজে সবুজ গাছ-গাছালি, ধানক্ষেত, নীল আকাশের পটভূমিতে লাল পলাশের রংবাহার, অদূরে দেখা যাচ্ছে কাঁটাতারে ঘেরা সীমান্তের ও-পাশে বাংলাদেশ! পা বাড়ালেই… এমন নিকট অথচ দূর!

(ক্রমশ…)

ত্রিপুরা-সফর (পর্ব-০১)

‘কোটি থেকে এক কম !

হ্যাঁ, তাই ঊনকোটি।’

সামনের পাকদণ্ডীটা সতর্কতার সঙ্গে সামলে আমাদের ত্রিপুরা ভ্রমণের সারথি বললেন, ‘স্থানীয় ভাস্কর কালু কামার স্বপ্ন দেখেছিলেন এক রাতের মধ্যে রঘুনন্দন পাহাড়ে কাশীধাম গড়বেন। কালু সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে রাতারাতি এক কোটি দেবদেবীর মূর্তি খোদাই শুরু করেন। কাজ সেরে তিনি গুনে দেখলেন, কোটি থেকে একটি মূর্তি কম! ওদিকে, শর্তানুযায়ী ভোরের সূর্যালোক তাঁর শিল্পকর্মের উপরে এসে পড়ায় আর মূর্তি গড়া যাবে না। একটি মূর্তি কম হওয়ার কারণে পার্বতী তাঁর স্বামী মহাদেব সহ রঘুনন্দন পাহাড় পরিত্যাগ করেন…। এমনটাই ত্রিপুরা রাজপরিবারের ইতিহাস ‘রাজমালা’য় লেখা আছে।

আগরতলা থেকে ঊনকোটি যাচ্ছি। আঁকাবাঁকা উঁচু নিচু পথে পাকদণ্ডী পড়ে অনেক। পথে প্রচুর মুকুলিত লিচু বাগান, বাঁশ ঝাড়, রবার চাষ, চা বাগান, রৌদ্রোজ্জ্বল নীল আকাশ, পাখিদের ওড়াউড়ি, হাল্কা ঘন জঙ্গলপথে অনর্গল ঝিঁঝিঁপোকাদের ডাক, ছোটো ছোটো নদী-ব্রিজ— এইসব দেখা-শোনার মধ্যে দিয়ে চলেছি। পথের দূরত্ব কমাতে পূর্ত দফতরের বিশাল কর্মকাণ্ড চলছে, তাই আমাদের ইনোভা-র গতি কমছে মাঝে মধ্যেই।

সারথি ফের শুরু করলেন— আর এক কিংবদন্তি কৈলাসধাম থেকে কাশীধামের পথে কোটিসংখ্যক দেব-দেবীদের নিয়ে চলেছেন ভোলামহেশ্বর। পথশ্রমে ক্লান্ত দেব-দেবীরা রাতের বিশ্রাম নিতে চাইলেন এই রঘুনন্দন পাহাড়ে। দেবাদিদেব সম্মত হলেন এই শর্তে যে, ব্রাহ্মমুহূর্তে, সূর্যোদয়ের আগেই যাত্রা শুরু হবে। দুর্ভাগ্যক্রমে ব্রাহ্মমুহূর্তে দেব-দেবীদের ঘুম ভাঙল না। দেবাদিদেব একাই কাশীধামের পথে রওনা দিলেন। ওদিকে রঘুনন্দন পাহাড়ে ভোরের সূর্যালোক এসে পড়তেই শর্তভঙ্গের কারণে বাকি দেব- দেবীরা পাথরে রূপান্তরিত হলেন। এই ভাবেই এক কোটির এক কম, ঊনকোটি হয়ে এখানেই রয়ে গেলেন তাঁরা।

সারথির কথা শুনতে শুনতে গাড়ি থামল ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ কর্তৃক সংরক্ষিত ঊনকোটির প্রবেশ পথে। রেজিস্টারে নাম, ঠিকানা, পরিচিতি, মোবাইল নম্বর লিখে প্রবেশ করলাম। না, কোনও প্রবেশমূল্য নেই।

রেলিং ঘেরা বাঁধানো পথে এগোতেই সিঁড়ি। নামতে নামতেই সামনের পাহাড়ের গায়ে বিস্তৃত জটাজুটধারী দেবাদিদেবের প্রস্তরমূর্তি। বিশালাকার মূর্তিটির জটা-সমাবেশ, কর্ণকুণ্ডল, কণ্ঠহার, মস্তকের শিরোভূষণে জ্যামিতিক নক্সার সারল্য এবং পাহাড়ের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে নতোন্নত ভাস্কর্যশিল্প অবাক হয়ে দেখতে হয়। এ ছাড়াও পুরো পাহাড়ের গায়ে শিবের মূর্তি ছাড়াও ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে নানান দেব-দেবী মূর্তির আশ্চর্য সব ভাস্কর্যশিল্প।

দেখতে দেখতে মনে পড়ছে দক্ষিণ ভারতে মহাবলীপুরমের রক-কাট ভাস্কর্যশিল্পের কথা। যদিও শৈলীর দিক থেকে তা ভিন্ন ধারার, তবুও কোথাও যেন একটা সাদৃশ্য! বেশ কিছু ভগ্ন-ভাস্কর্যও এদিক ওদিক ছড়িয়ে রয়েছে। অনেক মূর্তিতে ফাটল-রেখা, সম্ভবত প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা ভূমিকম্পের ফলে সৃষ্ট। অসামান্য এই শিল্পকর্মগুলির সংরক্ষণে ভারপ্রাপ্ত দফতরের আরও যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন। তা না হলে, কালের গতিতে হয়তো হারিয়ে যাবে কোনও দিন৷

প্রচুর সিঁড়ি ভেঙে, ওঠা-নামা করে এসব দেখতে সময় লাগল বেশ কয়েক ঘণ্টা। জটাজুটধারী শিবের মূর্তিভাস্কর্যটি কালভৈরব বলে খ্যাত। পাশেই পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসছে জলধারা, সৃষ্টি হয়েছে স্বল্প-পরিসর কুণ্ড। সেই কুণ্ডের জল ফের পাথরের খাঁজ বেয়ে নীচে, আরও নীচে সবুজ গাছ-গাছালির ভিতরে হারিয়ে যাচ্ছে। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য যেন এই জায়গাতেই তার প্রকাশ উন্মুক্ত করে দিয়েছে। সেই সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য সমগ্র পাহাড়ের গায়ে তৈরি হয়েছে প্রচুর সিঁড়ি ধাপ। কর্তব্যরত প্রহরীরা পাহাড়জুড়ে নজরদারির কাজে ব্যস্ত।

গাছে গাছে ফুল, প্রজাপতিদের ওড়াউড়ি, পাখিদের কলতানে সবুজে ছাওয়া ঊনকোটির মনোরম পরিবেশ সিঁড়ি ভাঙার ক্লান্তি ভুলিয়ে দিচ্ছে। এমন অপূর্ব দর্শনীয় স্থলের আকর্ষণে দেশ-বিদেশের মানুষ এখানে ছুটে আসেন বছরের নানা সময়ে। এবার ফিরতে হবে। কাছেই কৈলাস শহরে রাজ্য পর্যটনের ঊনকোটি গেস্ট হাউসে দুপুরের আহারপর্ব সেরে আগরতলা ফিরতে রাত হয়ে গেল।

একটু ইতিহাস

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ ত্রিপুরা রাজ্যের আয়তন ছোটো হলেও পর্যটকদের কাছে কিছুটা কম আকর্ষণীয়। তার কারণ, যোগাযোগ ব্যবস্থার খামতি। রেলপথে আগরতলা যেতে সময় এবং শারীরিক ধকল কম নয়। একমাত্র উপায়— আকাশপথ। মূলত ত্রিপুরী, রিয়াং, জামাতি, চাকমা, লুসাই, মগ প্রভৃতি নানান উপজাতিদের বসবাস দীর্ঘকাল ধরে। বাঙালিদের বসবাসও উল্লেখযোগ্য। সকলের মেলবন্ধনে ত্রিপুরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেও যথেষ্ট সমৃদ্ধ।

মহাভারতেও ত্রিপুরার উল্লেখ মেলে— চন্দ্রবংশীয় রাজা যযাতির পুত্র দ্রুহ্য কিরাত দেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে ত্রিপুরায় এসে রাজ্যপাট শুরু করেন। সেই বংশের চল্লিশতম বংশধর ত্রিপুর-এর নাম থেকেই ত্রিপুরা রাজ্যের নামকরণ।

‘রাজমালা’ গ্রন্থের বিবরণ অনুযায়ী জানা যায়, ত্রিপুরায় প্রায় তেরোশো বছর ধরে রাজত্ব করেন গৌড়ের সুলতান শামসুদ্দিন কর্তৃক উপাধিপ্রাপ্ত ‘মাণিক্য’ রাজবংশ। আধুনিক ত্রিপুরার গোড়াপত্তনের সময়কাল ধরা হয় মহারাজ বীরচন্দ্র মাণিক্য বাহাদুরের আমল থেকে। তাঁর রাজত্বকাল ত্রিপুরার ইতিহাসে উজ্জ্বলতম সময়। ইতিহাসের নানান উত্থান-পতন এবং ঘটনাবলির মধ্য দিয়ে ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের ২১ জানুয়ারি রাজতন্ত্রের অবসান হয় এবং পূর্ণরাজ্যের মর্যাদা লাভ করে ত্রিপুরা।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজপরিবারের যোগসূত্রের কথা আমরা প্রায় সকলেই অবগত। তাঁর লেখা ‘রাজর্ষি’ উপন্যাস এবং ‘বিসর্জন’ নাটকে ত্রিপুরা রাজপরিবারের কাহিনির প্রতিফলন দেখতে পাই।

রানওয়ে ছুঁয়েছে

আকাশপথে কলকাতা থেকে আগরতলা মহারাজ বীর বিক্রম বিমানবন্দর পৌঁছাতে সময় লাগল মাত্র পঁয়তাল্লিশ মিনিট। এর থেকে ঢের বেশি সময় লাগে বিমানবন্দরে প্রবেশ করার পর থেকে বিমানে ওঠা পর্যন্ত আবশ্যিক প্রক্রিয়া এবং নিয়মকানুন পর্ব সমাধা হতে।

বিমান-যাত্রায় জানলার পাশের আসনটি মিললে উড়ান-কালে অনেক উঁচু থেকে দেখা যায় শহর গ্রাম, বাড়ি ঘর, নদী নালা, চাষজমি…. কিংবা হঠাৎ করে মেঘের রাজ্যে প্রবেশ-দৃশ্য। এসব দেখতে দেখতেই সামান্য ঝাঁকুনি! বিমান আগরতলার রানওয়ে ছুঁয়েছে।

(ক্রমশ…)

বলিউড অভিনেতা সঞ্জয় মিশ্র-র অভিনয়ে সমৃদ্ধ হতে চলেছে বাংলা ছবি ‘ফেরা’

সব সম্পর্কের ভাষা উচ্চারণে প্রকাশ পায় না। কিছু অনুভব শুধু নীরবতার ভিতরেই বাঁচে। পান্নালাল, এককালের ফুটবল খেলোয়াড়, এখন তিনি অবসরপ্রাপ্ত। একা থাকেন মফস্বলের পুরনো বাড়িতে। তার ছেলে পলাশ, শহরের এক কর্পোরেট কোম্পানিতে সেলস ম্যানেজার, রোজ লড়ছে চাকরি বাঁচিয়ে রাখার জন্য। জীবনের দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এই দুই পুরুষ, আকস্মিক এক ঘটনার কারণে এসে পড়েন এক ছাদের তলায়। কিন্তু কী ঘটবে এরপর? – এমনই এক কৌতূহল জাগিয়ে রেখে ‘নন্দী মুভিজ’-এর ব্যানারে তৈরি হতে চলেছে ‘ফেরা’ শিরোনামের একটি ছবি।

এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হয়েছে, ‘ফেরা’ কোনও দ্বন্দ্বের গল্প নয়। এ এক নীরব সহাবস্থানের ছবি—যেখানে কথা কম, অস্বস্তি বেশি কিন্তু তবুও একটা বোঝাপড়া ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। তবে সবকিছুর পরেও কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি করে—সফলতা মানে ঠিক কী? আমরা কতটা রেখে যেতে চাই আর তার কতটা আসলে জরুরি?  ফিরে আসা মানে কি পুরনো জীবনে ফেরা, নাকি নতুন করে উপলব্ধি করা যে, মাঝারি হওয়া, সাধারণ হওয়া, নিজেকে মেনে নেওয়াও একধরনের সফলতা? আসলে সব ফেরার  ঠিকানা হয় না— আবার নিঃশব্দ পাশে বসে থাকাও অনেক সময় সুখে ভরিয়ে দেয় অন্তরমহল।

প্রদীপ কুমার নন্দী প্রযোজিত, ‘ফেরা’ ছবিটি পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছেন পৃথা চক্রবর্তী। এই ছবির মাধ্যমে প্রথমবার বাংলায় অভিনয় করতে চলেছেন বর্ষীয়ান অভিনেতা সঞ্জয় মিশ্র, যিনি ভারতীয় সিনেমায় তাঁর অনবদ্য অভিনয়ের জন্য সমাদৃত। তাঁর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অভিনয় করবেন টলিউডের ঋত্বিক চক্রবর্তী ও সোহিনী সরকার।

প্রযোজক প্রদীপ কুমার নন্দী-র মতে, ‘‘দক্ষ অভিনেতা এবং হৃদয়স্পর্শী  কাহিনির মেলবন্ধনে, ‘ফেরা’ হতে চলেছে এক গভীর আবেগপূর্ণ ও মননশীল সিনেমা। আসলে, ‘ফেরা’ আমাদের একটি বিশেষ প্রচেষ্টা । প্রথিতযশা অভিনেতা সঞ্জয় মিশ্র তাঁর প্রথম বাংলা ফিচার ফিল্মের সফর শুরু করছেন আমাদের ব্যানারে, এটা আমাদের জন্য গর্বের বিষয়। তাই, আমার বিশ্বাস, এই ছবি দর্শকদের হৃদয়ে গভীর ভাবে প্রভাব ফেলবে এবং দীর্ঘদিন মনে থেকে যাবে।’’

‘‘ফেরা’-র পরিচালক পৃথা জানিয়েছেন, ‘এ এমন এক গল্প, যেটা বড়ো করে কিছু বলে না—বরং যেটা বলা হয় না, তাকেই জায়গা দেয়। এই ছবি আমার কাছে অনেকটা নিজের ভিতরে ফিরে তাকানোর চেষ্টা। আমার নিজের বড়ো হয়ে ওঠা  যেহেতু মফস্বলের ছোট্ট শহরে, তাই এই ছবির প্রতিটা চরিত্রকেই আমি খুব কাছে থেকে দেখেছি এবং খানিকটা বেঁচেছি। মফস্বল ছেড়ে বড়ো শহরের রোজনামচাতে বহুবার মনে হয়েছে, আমরা কতটা ছুটছি, কেন ছুটছি আর সেই দৌড়ের শেষে আদৌ কিছু বদলায় কি না—এই সব প্রশ্ন। এই ছবি মধ্যবিত্তের এবং সম্পর্কের সেই দিকগুলো তুলে ধরবে, যেগুলো খুব সাধারণ এবং সত্যি। তাই, ‘ফেরা’ কোনও চূড়ান্ত উত্তরে উত্তীর্ণ করবে না। কিন্তু কিছুটা থেমে, কিছুটা উপলব্ধির সুযোগ তৈরি করবে।’’

ঋত্বিক চক্রবর্তী জানিয়েছেন, ‘‘আমি ভীষণ উৎসাহিত ‘ফেরা’ ছবির অংশ হতে পেরে । পরিচালক পৃথা যেভাবে ভাবেন এবং তাঁর গল্পগুলোকে পর্দায় তুলে ধরেন — সেই সংবেদনশীলতা আর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিভঙ্গির আমি সবসময়ই প্রশংসা করেছি। কিংবদন্তি অভিনেতা সঞ্জয় মিশ্রর সঙ্গে স্ক্রিন শেয়ার করা আমার কাছে এক বিরাট সম্মানের বিষয় হতে চলেছে, তাই আমি ভীষণভাবে মুখিয়ে আছি।’’

সোহিনী সরকার-এর বক্তব্য, ‘‘আমার চরিত্রটি যদিও সংক্ষিপ্ত, তবু, ‘ফেরা’-র গল্পের প্রেক্ষিতে এর গভীর প্রভাব রয়েছে। অনেক সময় চরিত্রের দৈর্ঘ্যের চেয়ে প্রভাবটাই বড়ো হয়ে ওঠে। এই সিনেমাটির অংশ হতে পেরে আমিই খুবই খুশি।’’

প্রযোজক প্রদীপ কুমার নন্দী প্রসঙ্গত আরও জানিয়েছেন, খুব শিগগির শুরু হবে ‘ফেরা’ ছবির শুটিং। ছবিটির সংগীত পরিচালনার দায়িত্বে থাকবেন অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়।

অর্থ এবং সম্পত্তির সঠিক হস্তান্তর

পৃথিবী বিখ্যাত এক অভিনেতার প্রতিটি ছবি বাবদ উপার্জন ছিল প্রায় ৭৩ মিলিয়ন ডলার। কিন্তু তিনি এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, তাঁর স্থাবর, অস্থাবর সমস্ত সম্পত্তি, তাঁর মৃত্যুর পর সন্তানদের হাতে তিনি পুরোপুরি সঁপে দিতে চান না। সাক্ষাৎকারে বলা কথার স্বপক্ষে তিনি জানিয়েছিলেন, এই বিপুল অর্থরাশি উপার্জনের কষ্ট সন্তানরা বুঝবে না, যদি তা উত্তরাধিকার সূত্রে অনায়াসে তাদের হস্তগত হয়। তাই তিনি তাঁর আংশিক সম্পত্তি দান করে যেতে চান কোনও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে। কয়েক দশক আগে আরও এক বিখ্যাত ব্যক্তিও তাঁর যাবতীয় সম্পত্তি এক ফাউন্ডেশন-এর তহবিলে দান করে দেন।

আসলে ব্যক্তি বিশেষে চিন্তা-ভাবনা এবং সিদ্ধান্ত বদলে যায়। তাই, পিতা-মাতার সম্পত্তি সবসময় যে সন্তানেরই প্রাপ্য হবে, এমনটা না-ও ঘটতে পারে। সমাজ-সংসারের যদিও সেটাই প্রত্যাশা থাকে। অনেক মা-বাবা মনে করেন, সন্তান জন্মানোর পর কায়-ক্লেশহীন জীবন অতিবাহিত করে অভিভাবকদের কঠোর পরিশ্রম এবং সচ্ছলতার কারণে। এই জেনারেশনের অধিকাংশ তরুণ-তরুণী তাই ভোগবিলাসে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে বলে মনে করেন অনেক অভিভাবক। তাদের যুক্তি, সন্তানের হাতে অঢেল অর্থ তুলে দিলে তারা বিলাসিতার জীবনযাপন করবে। তাই, সন্তানের হাতে অর্থ-সম্পত্তি তুলে না দিয়ে, বদলে তাকে বুদ্ধি, বিচক্ষণতা এবং পরিশ্রমের পাঠ দিতে চান অনেকে। এর ফলে সন্তান নাকি যোগ্য হবে এবং মা-বাবার উপার্জিত অর্থের মূল্য বুঝবে।

আর এই ধ্যান-ধারণার ফলে, আজকাল অনেকে তাদের সম্পত্তি দান করে যাচ্ছেন কোনও প্রতিষ্ঠানে। কিন্তু ভেবে দেখেছেন কি, সেই প্রতিষ্ঠানও কি মূল্য দিচ্ছে আপনার পরিশ্রম করে উপার্জন করা অর্থের? তারা আদপে এই বিত্তের কতটা অধিকারী?

সামাজিক কাজের জন্য সচ্ছল কোনও ব্যক্তি হয়তো তার অর্থ দান করলেন কোনও ধর্মীয় বা সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠানে। আখেরে দেখা যায় সেই অর্থের প্রতি কোনও মমত্ববোধ থাকে না প্রতিষ্ঠানগুলির এবং আর্তের সেবায় না লেগে সে টাকা নয়ছয় হয়। কিছুদিন আগেই এক বিখ্যাত কোম্পানির মালিক তার প্রতিষ্ঠান বিক্রি করে দিলেন, কারণ তাঁর একমাত্র কন্যার এই ব্যাবসার প্রতি কোনও টান নেই। সে শিল্পকলায় আগ্রহী। প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার তাঁর বৃদ্ধাবস্থায় প্রতিষ্ঠান চালাতে অপারগ। ফলত, এই কোম্পানি এখন ক্রয় করেছেন তাঁরই চাটার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট।

এইরকমই ঘটনা ঘটে নানা যৌথ পরিবারের ব্যাবসার ক্ষেত্রেও। পরিবারের মধ্যে বিবাদের জেরে ব্যাবসা ভাগ বাটোয়ারা হয়ে যায় বা বছরের পর বছর বাদানুবাদের মামলা চলে। আবার কেউ যদি মনে করেন তাঁর সারাজীবনের অর্থ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চার্চ, মন্দির বা মাদ্রাসায় দিয়ে যাবেন, তাহলেও কিন্তু নিশ্চিত হওয়া যায় না যে, এই অর্থ সৎ-কাজে সদ্ব্যবহার হবে।

তাই সন্তানদের কাছে পারস্পরিক ভাবে বিত্ত হস্তান্তরিত হওয়া ছাড়া বিকল্প প্রায় নেই বললেই চলে। তাই, আপনার কষ্টার্জিত অর্থ কোনও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দেওয়া অর্থহীন। মাঝে সরকার এই দাতব্য বিত্তের উপর এস্টেট ডিউটি লাগু করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু এই ব্যবস্থা পৃথিবীর কোনও দেশেই কার্যকর হয়নি। ফলে এখন আইনি জটিলতায় না গিয়ে, সন্তানরাই উত্তরাধিকার সূত্রে বাবা-মার বিত্তের অধিকারী হবে, ভারতীয় আইনে এই ব্যবস্থাই কায়েম রয়েছে।

উত্তরাধিকারীদের জন্য গৃহকর্তা কিংবা গৃহকর্ত্রী যদি তাঁর জীবিতাবস্থায় অর্থ, সম্পত্তির প্রয়োজনীয় আইনি কাগজপত্র তৈরি না করে রাখেন, তাহলে সমস্যা জট পাকাবেই। আর যদি সম্পত্তি এবং অর্থের একাধিক দাবিদার থাকে, তাহলে সমস্যা ঝগড়া-মারামারি থেকে খুনোখুনি পর্যন্ত যে গড়াতে পারে, এমন উদাহরণ পাওয়া যাবে অসংখ্য। প্রায় প্রতিদিনই এরকম ঘটনার খবর আমরা পাই টেলিভিশনের নিউজ চ্যানেল কিংবা খবরের কাগজের মাধ্যমে। আর যদি সমস্যা মারামারি কিংবা খুনোখুনি পর্যন্ত না-ও গড়ায়, তাহলেও আর্থিক এবং মানসিক ক্ষতির শিকার হতে পারেন উত্তরাধিকারীরা।

এ প্রসঙ্গে দুটো ঘটনার উল্লেখ করা যেতে পারে। জীবিতাবস্থায় কাউকে কানাকড়িও দেবেন না, এমনই জেদ ধরেছিলেন এক ব্যক্তি। তাই তাঁর উত্তরাধিকারীরাও ওই বৃদ্ধের দেখাশোনার দায়িত্ব নিতে চাননি। একসময় ওই বৃদ্ধ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়া সত্ত্বেও, আত্মীয়স্বজনরা কেউ তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাননি। শেষ পর্যন্ত পাড়ার ছেলেরা নিয়ে গিয়ে ওই বৃদ্ধের ইচ্ছেমতো বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করে। কিন্তু বৃদ্ধ আর বেঁচে ফেরেননি এবং চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে অনেক টাকার বিল করে মারা যান। এরপর আত্মীয়স্বজনরা কেউই প্রথমে হাসপাতালের বিল মিটিয়ে মৃতদেহ সৎকারের ব্যবস্থা করেননি। পরে ওই মৃত বৃদ্ধের স্ত্রী আশ্বাস দেন যে, উত্তরাধিকীরা যাতে বিষয়সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত না হন, তার জন্য তিনি সবরকম আইনি সহায়তা করবেন। এরপরই বৃদ্ধের মৃতদেহ হাসপাতাল থেকে শ্মশানে নিয়ে যান উত্তরাধিকারীরা।

দ্বিতীয় ঘটনাটি আরও ভয়াবহ। এক ব্যক্তির ব্যাংক-এ অনেক টাকা ছিল। কিন্তু কোনও নমিনি কিংবা জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট না করেই হঠাৎ একদিন নিখোঁজ হয়ে যান তিনি। আত্মীয়স্বজনরা প্রশাসনিক সাহায্য নিয়ে ওই ব্যক্তির কোনও খোঁজ পাননি। সময় এগিয়ে চলে। কেটে যায় পাঁচটা বছর। এখনও অসহায় উত্তরাধিকারীরা। এখন প্রশ্ন, যদি এরকম ঘটনা ঘটে, তাহলে কি চুপ করে বসে থাকতে হবে, নাকি সমস্যার সমাধান করা সম্ভব? কী করতে হবে এর জন্য?

এর উত্তরে জানাই, সমস্যার সমাধানের পথ নিশ্চয়ই আছে। কারণ, ওই যে কথায় বলে– যে সমস্যার সমাধান নেই, সেটা কোনও সমস্যাই নয়। অতএব, সমস্যার সমাধানের জন্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ এবং সাহায্য নিতে হবে। আর এই বিশেষজ্ঞ হলেন আইনজীবী। সমস্যা যতই গভীর হোক না কেন, আইনের পথ খোলা আছেই। তবে সতর্ক থাকলে সহজে সমস্যার সমাধান করা যাবে। এই সতর্কতার মধ্যে রয়েছে, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গুছিয়ে রাখা। এছাড়া গৃহকর্তা কিংবা গৃহকর্ত্রী, অর্থাৎ যার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে আপনি বিষয়সম্পত্তির অধিকারী হবেন, তাঁর সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রেখে চলা, নমিনি হিসাবে নিজের নাম নথিভুক্তিকরণের অনুরোধ, প্রত্যেকটি আইনি কাগজপত্র কোথায় তিনি রাখছেন তা জেনে রাখা ইত্যাদি।

আসলে এসব সতর্কতা সমস্যা কমানোর অন্যতম পথ। এছাড়া আর যা করা প্রয়োজন তা হল, গৃহকর্তা কিংবা গৃহকর্ত্রী যদি পেনশনার হন, তাহলে তাঁর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা ফেলে রাখবেন না। প্রতি মাসের পেনশনের পুরো টাকাটাই তুলে রাখবেন। নয়তো, পেনশনারের মৃত্যুর পর তাঁর অ্যাকাউন্টে জমানো টাকা তুলতে সমস্যা হবে। আর এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার অন্য একটি পথও খোলা আছে। পেনশনারের সঙ্গে যদি জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট করে রাখেন তাঁর স্ত্রী, তাহলে পেনশনারের মৃত্যুর পর নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা খুব সহজেই জমা পড়ে যাবে ওই জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট-এ। এর জন্য অবশ্য স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁর ডেথ সার্টিফিকেটের ফোটোকপি এবং নাম পরিবর্তনের জন্য একটি আবেদনপত্র জমা দিতে হবে নির্দিষ্ট ব্যাংকে।

যিনি সম্পত্তি এবং টাকাপয়সার মালিক, তাঁর যদি কোথাও ধার-বাকি থাকে কিংবা আয়কর জমা না দেওয়া থাকে, তাহলে ওই ব্যক্তির মৃত্যুর পর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ডেথ সার্টিফিকেটের ফোটোকপি জমা দিন নির্দিষ্ট দফতরে। এতে মৃত্যুর দিন পর্যন্ত বকেয়া আয়কর এবং ঋণের সুদ বহন করতে হবে, এর বেশি নয়। তবে শুধু আয়কর এবং ঋণ মকুবের ক্ষেত্রেই নয়, উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তির মালিকানা পাওয়ার জন্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মৃত ব্যক্তির ডেথ সার্টিফিকেট কর্পোরেশনে জমা দিয়ে সম্পত্তির মালিকানা পরিবর্তনের জন্য (নাম পরিবর্তন) আবেদন করুন। তবে এক্ষেত্রে উত্তরাধিকারীর প্রমাণপত্রও জমা দিতে হবে।

টেস্টি স্ন্যাকস in the Evening

সন্ধে নামলেই মনটা কেমন যেন খাই-খাই করে। এই সময় মুখরোচক কিছু হলে মনের সাধ মেটে। আর তাই আপনার মনের সাধ মেটানোর জন্য আমরা দিচ্ছি সুস্বাদু কিছু রেসিপি। বানিয়ে খান নিজের হাতে।

আলুর সালসা

উপকরণ: ৪টি মাঝারি আকারের আলু, ৩ টেবিল চামচ ‘সুমন’ ব্র্যান্ড-এর সরষের তেল, আধা চা চামচ গোলমরিচের গুঁড়ো, আধা চা চামচ অরিগানো, আধা চা চামচ কসৌরি মেথি, আধা চা চামচ তিল, সামান্য মেয়োনিজ, স্বাদ অনুযায়ী লবণ।

প্রণালী: আলুর খোসা ছাড়িয়ে নিন। আর যদি খোসা ছাড়াই আলুর সালসা বানাতে চান, তাহলে প্রথমে আলুগুলোকে ভালো ভাবে ধুয়ে লম্বালম্বি করে কেটে টুকরো টুকরো করে নিন। এরপর টুকরো করা আলুগুলিকে আবার ভালো ভাবে ধুয়ে নিয়ে জল ঝরিয়ে রাখুন।

একটি বড়ো পাত্রে সমস্ত মশলা এবং তিল দিয়ে আলুর টুকরোগুলির সঙ্গে ভালো করে মেশান। লবণ যোগ করুন। গ্যাস আভেনে কড়াই বসিয়ে ১৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে প্রিহিট করুন। এরপর কড়াইতে সরষের তেল গরম করে, মশলাযুক্ত আলুর টুকরোগুলি ভাজুন ভালো ভাবে। সবশেষে, ভাজা আলুগুলি তেল ঝরিয়ে নিয়ে নামিয়ে রাখুন একটি ট্রে-তে এবং মেয়োনিজ দিয়ে পরিবেশন করুন গরম গরম।

গ্রিল্ড মাশরুম

উপকরণ: ২৫০ গ্রাম মাশরুম, ১ বড়ো চামচ আদা-রসুনের পেস্ট, সামান্য কেসর, ১ বড়ো চামচ বেসন, ১ ছোটো চামচ গরমমশলা, প্রয়োজন মতো তেল, ১ বড়ো চামচ দই, ১ বড়ো চামচ চাট মশলা এবং স্বাদ অনুসারে লবণ।

প্রণালী: চাট মশলা বাদ দিয়ে বাকি সমস্ত উপকরণ একটা পাত্রে ভালো ভাবে মিশিয়ে নিয়ে ৪০ মিনিট পর্যন্ত রেখে দিন লবণ সহযোগে। ৪০ মিনিট পর সমস্ত উপকরণের মিশ্রণ হালকা ভাবে ভেজে নিন। সামান্য তেল গরম করে মাশরুমগুলো ভাজুন বাদামি রং আসা পর্যন্ত। সবশেষে ভাজা মাশরুম-এ অন্যান্য উপকরণ মিশিয়ে নিয়ে চাট মশলা ছড়িয়ে দিয়ে গরম গরম পরিবেশন করুন।

মাশরুম কুড়কুড়ে

উপকরণ: ১৫-টি মাশরুম, ৫০ গ্রাম লাল এবং সবুজ ক্যাপসিকাম, ২০ গ্রাম চিজ, হাফ চামচ গোলমরিচের গুঁড়ো, ৩ চা চামচ অ্যারারুট, ৩ চা চামচ ময়দা, প্রয়োজন মতো সরষের তেল এবং স্বাদ অনুসারে লবণ।

প্রণালী: প্রথমে ৩ চামচ অ্যারারুট এবং দেড় চামচ ময়দা জল দিয়ে ফেটিয়ে রাখুন। ওই মিশ্রণে স্বাদ অনুসারে লবণ এবং গোলমরিচের গুঁড়ো যোগ করুন। এরপর সামান্য তেল দিয়ে মাশরুমগুলো ভেজে নিন। ভাজা মাশরুমগুলোর মাঝখানে ফুটো করে চিজ ভরে দিন। লাল এবং সবুজ ক্যাপসিকামগুলো কেটে, ধুয়ে জল ঝরিয়ে নিন।

প্রতিটা টুথপিকে ২-৩টে করে মাশরুম গেঁথে নিন লাল-সবুজ ক্যাপসিকাম সহযোগে। সবশেষে মাশরুম এবং ক্যাপসিকাম গাঁথা টুথপিক, ময়দা এবং অ্যারারুট-এর মিশ্রণে চুবিয়ে ভালো ভাবে ফ্রাই করে নিন। গরম গরম মাশরুম কুড়কুড়ে পরিবেশন করুন টম্যাটো সস এবং স্যালাড-এর সঙ্গে।

ইচ্ছাপূরণ (পর্ব-০১)

দিয়া সকালে উঠেই মানবের জন্য আগে গ্রিন-টি বানিয়ে রাখে। ঘুম থেকে উঠে মেয়ে শ্রেয়াকে কোলে বসিয়ে গ্রিন-টির স্বাদ নেয় মানব। বাবা-মেয়ের সারাদিনের নিবিড় মুহূর্ত বলতে সকালটুকুই। তারপর বস্তাবন্দী কাজ আর কাগজ নিয়ে, কোনওমতে ব্রেকফাস্ট করে, দু-চাকায় শরীর চাপিয়ে দৌড়োয় অফিস। দিয়া তারপর শ্রেয়াকে খাইয়ে পরিয়ে স্কুলবাসে তুলে দেয়। সারাদিনের জন্য এবার ঘর ফাঁকা হয়ে যায়। এই অবসরের শূন্যতা মেটাতে দিয়া একটা সেলাইয়ের ক্লাস খুলেছে।

গরিব অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে পড়া মেয়েদের স্বনির্ভর হওয়ার জন্য শিক্ষা দেয় এখানে। বেতন বলতে সামান্যটুকু। কেউ কাজ শিখে গেলে, নিজেদের মতো অর্ডার নিয়ে এসে দিয়ার ঘরেই তৈরি করে। তার জন্য অবশ্য দিয়া ওদের কাছে থেকে কিছুই নেয় না। বিকেলের পর একটু জিরিয়ে নেয় সে। তারপরই তো শ্রেয়া চলে আসে। হাতমুখ ধুয়ে, হেল্থ ড্রিংক খেয়ে বেরিয়ে পড়ে খেলতে। সন্ধে নামতেই ওর দিদিমণি পড়াতে আসে। তারপরই ঢোকে মানব। সোফায় খানিক আরাম করে বেরিয়ে যায় বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে। ফেরে রাত করে। খাওয়ার টেবিলে দিয়ার সঙ্গে কয়েকটা কেজো কথা বলে শুয়ে পড়ে। দিয়াও অভ্যস্ত হয়ে গেছে গত দশ বছরের এই সাংসারিক অভিজ্ঞতায়।

বেশ কদিন যাবৎ দিয়া রাতের দিকে বিছানায় শুতে এলে ওর কেমন শীত শীত করে। ফ্যানটা কমাতে বললে শ্রেয়া ঘেমে ওঠে, বিরক্ত হয় মানবও। বলে, “তুমি কী যে বলো দিয়া! এত গরমে তোমার শীত করে? রক্ত কমেছে নাকি?” ডাক্তার দেখিয়েছে মানব। সেরম কিছু ধরা পড়েনি। শীতে কুঁকড়ে যায় দিয়া। কম্বলও নিয়েছিল। তাও সুরাহা হয়নি।

নিত্য রাতের মতো আজও শীত করছে ওর। জানলা দিয়ে বরফের মতো ঠান্ডা হাওয়া ঢুকছে মনে হচ্ছে দিয়ার। অথচ বাবা আর মেয়ে দিব্যি শুয়ে হাত পা ছড়িয়ে! ঘড়ির কাঁটা টিক টিক শব্দে এগিয়ে যাচ্ছে। শীতে কাঁপতে কাঁপতে উঠে বসে দিয়া। হাতের তালু ঘষে গরম করে। নিঝুম রাত! চারদিক অন্ধকার। অমাবস্যার রাত বলে কথা। রাস্তার কয়েকটা কুকুর চিৎকার করছে। আর কোনও শব্দ নেই সমস্ত পাড়াজুড়ে।

দিয়া কম্বলটা কাঁধ অবধি তুলে নিতে গেল৷ সেইসময়ই সদর দরজা থেকে কড়া নাড়ার শব্দ এল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকাল দিয়া। রাত আড়াইটে! এত রাতে কে? ধাক্কা দিয়ে মানবকে ডাকল দিয়া, ‘অ্যাই শুনছ? দেখো না কে এল এত রাতে? ওঠো না! আমার ভয় করে।’ মানব ঘুমের ঘোর ভেঙে বলল, ‘কেউ আসেনি। ঘুমাও তো। জ্বালিও না।”

দিয়া আর ডাকেনি। মানব অল্পতেই বিরক্ত হয় ও জানে। কিছুক্ষণ বসে রইল… আবার কড়া কেউ নাড়ে কিনা শোনার জন্য। ঠিক তাই! আবার কেউ কড়া নাড়ছে। উঠে গেল এবার দিয়া। প্রচণ্ড শীত করছে ওর। কাঁপতে কাঁপতে গিয়েই দরজার ভিতর থেকে হাঁক দিল, কে? কড়া নাড়ার আর কোনও শব্দ নেই। তার কিছুক্ষণ পরই রান্নাঘরের জানলাতে আওয়াজ পেল দিয়া। মনে মনে ভাবল, বিড়াল বোধ হয়। আপন মনে, নিজের ঘরে চলে গেল দিয়া। বিছানার কাছে মেয়েটাকে বসে থাকতে দেখে আঁতকে উঠল ও। গলা একপ্রকার শুকিয়ে গেল। খ্যাসখ্যাসে গলায় বলে উঠল দিয়া, ‘কে তুমি? কীভাবে ঢুকলে ঘরে?”

মেয়েটার মুখের দিকে তাকানো যায় না। মাছি উড়ছে ভনভন করে… পচে গেছে মুখের অর্ধেকটা! গায়ে পোকা ধরেছে! চোখগুলো নেই কেবল কোটর দুটো পড়ে আছে। একটা দুটো মাছি ঘরময় উড়ছে। আতঙ্কে জ্ঞান হারাল মুহূর্তেই দিয়া। জ্ঞান আসার পর, মানবকে দেখে ভয়ে কেঁদে ফেলল।

—তোমার কী হয়েছে বলো তো? রাতে বিছানায় না শুয়ে ঘরের দুয়ারে কেন?

—মেয়েটা কীভাবে ঢুকল আমাদের ঘরে?

—মানে? কোন মেয়ে?

—মাছি উড়ছিল, সারা শরীরে পোকা…।

—হ্যাট…ট! যত রকমের ফালতু কথা। শরীর কেমন বলো।

—ভালো। কথা এগোয় না আর দিয়া। মানব কোনওদিন ভালোবেসে বুঝতেই চায়নি ওকে। বিয়ের পর একটু একটু করে বুঝেছে দিয়া। কোনও কমতি সে দেয়নি। খাওয়া পরা আর্থিক স্বাধীনতা সব দিয়েছে। দেয়নি শুধু সময়, ভালোবাসা আর সান্নিধ্য।

মানব ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বলল, ‘শ্রেয়াকে ওর ঠাকুমা ক’দিনের জন্য নিয়ে যেতে বলছে, যাবে? ওর স্কুলে তো পরীক্ষা নেই এই মাসে।’

দিয়া বলল, “ঠিক আছে যাক। তুমি তাহলে আজ আসবে না তো?”

মানব বলল, “আজ না এলেও, কাল অফিস করে একবারে চলে আসব। আজকে না হয়, মিনুকে বোলো তোমার সঙ্গে থাকতে! টাকা চাইলে বোলো, দাদা এসে দেবে।’ ঘাড় নাড়ায় দিয়া।

বেরোবার আগে মানব বলে, ‘এরকম কোরো না। সুস্থ রাখো নিজেকে। আমি সকালের ব্রেকফাস্ট বানিয়ে দিয়েছি। দু’জনে খেয়েও নিয়েছি। তুমি খেয়ে নিও। শ্রেয়াকে স্কুলের বাসে তুলে দিয়েছি। তুমি রেস্ট নিতে পারো আজ।”

হাসে দিয়া। ভালো লাগে মানবের এই মানবিকতা বোধটাকে। এই কারণেই হয়তো ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবেনি দিয়া। মানব চলে যাওয়ার পর দরজা দিয়ে এসে আবার একই জায়গায় দাঁড়ায় সে। কালকেরটা এতটা ভুল হবে? নিছক ভ্রম? অস্থির মানসিকতা দায়ী এর জন্য? নিজের মনে প্রশ্নের ভিড় জমিয়েই বাথরুম ঢোকে দিয়া। দাঁত মাজে। মুখ ধোয়। বেরিয়ে এসে ডিমটোস্ট খায়। খেতে খেতে ঘরের চারদিকে চোখ বোলায়। পর্দা, টিভি, শোকেশ, সোফা— সব কী শৌখিন! কী ম্যাচিং করা সবকিছু। চাকরি পাওয়ার পর একটা ছেলে একা এতকিছু এত নিখুঁত ভাবে গুছিয়েছে যেন সংসারী! এগুলোই ধুয়ে মুছে সাফ করে চলেছে দিয়া। পালটাতে বলেনি কিছুই।

চোখ নামাতেই দেখে পাশের চেয়ারে মেয়েটা বসে আছে। আঁতকে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় দিয়া। আবারও গলা খ্যাসখ্যাসে হয়ে আসে!

—কে তুমি? কী করছ এই ঘরে? কী চাইছ?

মেয়েটা কাঁদে। খুব কাঁদে। প্রচণ্ড আওয়াজ করে চিৎকার করে। কী বিশ্রী সে চিৎকার। কান চেপে ধরে দিয়া। ছুটে বেরিয়ে যেতে চায় ঘর ছেড়ে! কিন্তু দরজা কই? চারদিক তো দেয়াল… শুধুই দেয়াল ! মুখ গুঁজে বসে পড়ে দিয়া। চিৎকার ওর বেরোয় না। মেয়েটাও ওর সামনে বসে কাঁদে। এত বিশ্রী আওয়াজ কান্নার রোল যে কানে তালা ধরে যাওয়ার উপক্রম।

—দিদি? ও দিদি? কী হল গো? কথা বলো। মিনুর আওয়াজ পেয়ে স্বস্তি পায় দিয়া।

—মেয়েটা এই ঘরেই আছে রে মিনু। তোর দাদা বিশ্বাস করেনি। আমি মিথ্যে বলিনি। আমি ওকে দেখেছি। সত্যি রে মিনু।

—কোন মেয়ে দিদি? কেউ নেই দ্যাখো তুমি। এই নাও, জল খাও তো দেখি৷

(ক্রমশ…)

বর্ষায় ফার্নিচারের যত্ন

প্রাকৃতিক নিয়মেই বর্ষাকালে কাঠের আসবাবপত্র ময়েশ্চার অ্যাবজর্ব করতে শুরু করে। ফলে দরজা জানলা থেকে শুরু করে কাঠের আসবাবপত্রের স্ট্রাকচারে খানিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় অর্থাৎ এই সময় কাঠ বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। শুধু তাই নয়, ফাংগাসের সমস্যাও পিছু ছাড়ে না। তাই বর্ষায় ফার্নিচার সুরক্ষিত রাখতে হলে দরকার অতিরিক্ত যত্নের।

বিশেষজ্ঞরা সর্বদাই বলে থাকেন, যে-কোনও আসবাব বানানোর আগে কাঠকে সিজন করে নেওয়া জরুরি। ওয়াটারপ্রুফ প্লাইউড দিয়েও ফার্নিচার বানাতে পারেন, তবে ফার্নিচার জোড়ার আঠাও হতে হবে যথোপযুক্ত, যাতে বর্ষাকালে কোনওরকম ভাবে প্রভাব না পড়ে আসবাবপত্রে।

বর্ষার আবহে আসবাবপত্রের সুরক্ষার জন্য কিছু সহজ উপায়

o কোনও অবস্থাতেই কাঠের ফার্নিচার জানলার পাশে রাখবেন না

o অবিরাম বৃষ্টির ফলে ফার্নিচারের জোড়া অংশ খুলে যেতে পারে। সেই কারণেই সংযুক্ত জায়গাটিতে সর্বদা ওয়াটারপ্রুফ অ্যাডহেসিভ-ই ব্যবহার করুন

o সোফা বা চেয়ার পরিষ্কার করতে হলে ভিজে কাপড়ের প্রয়োগ করবেন না। বরং নরম আর শুকনো কাপড় কাজে লাগান

o ওয়ার্ডরোব বা আলমারি যাই হোক না কেন, দেওয়াল থেকে এক ইঞ্চি হলেও দূরে রাখুন। এই সময় আলমারির ভিতরে ন্যাপথলিন রাখতে ভুলবেন না। প্রয়োজনে নিমপাতাও রাখতে পারেন। এতে পোকামাকড়ের উপদ্রব কমবে

o বর্ষায় কাঠের দরজা জ্যাম হয়ে যায়। সহজে দরজা খোলা বন্ধ করতে হলে দরজায় পিতলের হাতল লাগানোটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে

o যদি উডেন ফ্লোর হয়, সেক্ষেত্রে এই সময় ভালো করে পালিশ করিয়ে নেওয়া উচিত

o বৃষ্টি থামলেই দরজা জানলা খুলে রাখবেন

o আপনার বাড়ির গ্যাজেটের মধ্যে সিলিকনের প্যাকেট রাখুন। সিলিকন আর্দ্রতা টেনে নেয়

o বর্ষায় কলিন ব্যবহার করবেন না

o ফার্নিচার-এ ফাংগাসের কারণে অ্যালার্জিক রি-অ্যাকশন হওয়ার সম্ভাবনা অতিমাত্রায় থাকে, যার মধ্যে রয়েছে অ্যাজমা, কাশি এবং শ্বাস সম্পর্কিত বিভিন্ন রোগ অন্যতম। শুকনো কাপড় দিয়ে অবিলম্বে কালো ফাংগাস রগড়ে তুলে ফেলুন

o আর্দ্রতার কারণে এই সময়ে ফার্নিচারে উইপোকা হওয়ার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়। এই কারণেই অ্যান্টি টার্মাইট সলিউশন প্রয়োগ করুন বা পেস্ট কন্ট্রোলের বিশেষজ্ঞকে খবর দিন।

পরিচর্যা: ফ্লোরের ধুলোমাটি, পরিষ্কার শুকনো কাপড় দিয়ে নিয়মিত পরিষ্কার করুন। কাঠের মেঝে হলে বর্ষার আগে অন্তত একবার মেঝে পালিশ করানো বাঞ্ছনীয়। মেঝের উপর যদি কোথাও কোনও দরজা জানলা দিয়ে জল ঢোকে, তাহলে জল আটকাবার ব্যবস্থা করুন। কারণ বৃষ্টির জলে ফ্লোরের রং হালকা হয়ে যেতে পারে এবং ফ্লোরে ব্যবহৃত কাঠ ফুলে গিয়ে কিংবা পচে গিয়ে নষ্ট হতে পারে।

যা যা করণীয়:

o যে-ঘরে কাঠের ফ্লোর থাকবে সেখানকার আসবাবপত্রের নীচে তুলোর প্যাড অথবা ফার্নিচার প্যাড লাগাবেন, যাতে ফ্লোরে স্ক্র্যাচ না পড়ে

o দরজার বাইরে পাপোশ রাখবেন এবং তা যেন নিয়মিত রোদে দেওয়া হয়

o ভ্যাকুম ক্লিনার সফট ব্রাশের সঙ্গে ব্যবহার করুন

o বাড়িতে যদি কোনও গৃহপালিত পশু থাকে তাহলে খেয়াল রাখবেন, তারা যদি বৃষ্টিতে ভিজে ঘরে ঢোকে তাহলে তাদের গায়ের জল যেন ফার্নিচার-এ না লাগে

o ভালো কোম্পানির ফ্লোর ক্লিনার ব্যবহার করবেন

o ফ্লোর পরিষ্কার করার জন্য ভালো মপ ব্যবহার করা উচিত

o অ্যামোনিয়া বা অন্য কোনওরকম অ্যাসিড ব্যবহার করবেন না

o কাঠের ফ্লোর পরিষ্কার করতে জলের ব্যবহার করবেন না।

অনেকেই শখ করে পারস্পরিক কিংবা হাল ফ্যাশনের আসবাবে ঘর সাজান। কিন্তু শুধু আসবাব দিয়ে ঘর ভরিয়ে ফেললে হবে না। আসবাবেরও চাই নিয়মিত যত্ন ও রক্ষণাবেক্ষণ, বিশেষকরে বর্ষাকালে। দীর্ঘদিন সাফসুতরো না করার ফলে ফার্নিচারে ধুলো জমে, দাগ পড়ে, এমনকী এতে পোকামাকড়ও জন্মায়। তাই সময় থাকতে সজাগ হোন। বর্ষার আবহে আসবাব ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আগেই মেনে চলুন কয়েকটি সাধারণ রক্ষণাবেক্ষণের নিয়ম।

(১) পরিষ্কার করার জন্য সপ্তাহে একদিন ভ্যাকুম ক্লিনার ব্যবহার করুন, বাকি দিনগুলিতে কাপড়ের সাহায্যে ডাস্টিং করুন।

(২) সোফায় বা অন্য কোনও ফার্নিচারে দাগ-ছোপ লাগলে, তা পরিষ্কার এবং শুকনো কাপড় দিয়ে মুছে দিন।

(৩) চামড়ার ফার্নিচার পরিষ্কার করার জন্য নির্দিষ্ট লেদার ফার্নিচার কেয়ার লিকুইড-ই ব্যবহার করুন।

(৪) কাঠের ফার্নিচারে ওয়াটার রেজিস্ট্যান্ট মেলামাইন পালিশ করানো ভালো। এর ফলে বর্ষাকালের স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়াতেও আসবাবগুলি ভালো থাকবে।

(৫) কাঠ ও চামড়ার তৈরি আসবাবের উপরেই পোকামাকড়ের উপদ্রব সবচেয়ে বেশি দেখা দেয় বর্ষাকালে। তাই এই ধরনের আসবাবের বিশেষ রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন।

(৬) স্টেনলেস স্টিলের দেখভালের জন্য চিন্তা না করলেও চলবে। কারণ এই ধরনের আসবাবে বর্ষাকালেও তেমন মেন্টেনেন্সের প্রয়োজন হয় না। শুধু কেনার সময় খেয়াল রাখবেন, স্টিলের গুণগত মান যেন ভালো হয়।

(৭) ফার্নিচারগুলিকে সবসময় শুকনো কাপড়ের সাহায্যেই পরিষ্কার করুন। ভেজা কাপড় একেবারেই ব্যবহার করবেন না। এর ফলে ফার্নিচারের পালিশ নষ্ট হয়ে যায়। সেইসঙ্গে কাঠও কমজোরি হয়ে যায়।

(৮) যদি কাঠের আসবাবই আপনার বেশি পছন্দের হয়ে থাকে, তাহলে বর্ষাকালের কথা ভেবে অবশ্যই ভালো কাঠের, সলিড উড ফার্নিচারই ব্যবহার করুন।

(৯) রট আয়রনের তৈরি ফার্নিচার বা পিতলের ফার্নিচার, বর্ষাকালে সরংক্ষণ করতে রেড অক্সাইড ব্যবহার করুন।

(১০) আসবাবের জয়েন্টের জায়গাগুলি যাতে মরচে পড়ে নষ্ট না হয়ে যায় বর্ষাকালে, তাই এর উপর রেড অক্সাইড লেপে দিন।

(১১) বর্ষার মরশুম শুরু হওয়ার আগেই আসবাবে পেইন্ট বা ভার্নিশ ব্যবহার করুন। এর ফলে আসবাবে ঘুণ ধরবে না।

(১২) লিভিং-রুম বা বাগানে ব্যবহৃৎ বেতের আসবাবগুলি যাতে বৃষ্টির জলে না ভেজে, সেদিকে নজর দিন। কারণ এই ধরনের আসবাব ভিজে গেলেই এতে কালচে ছোপ ধরে ও ফাংগাস পড়ে যায়।

(১৩) দীর্ঘদিন যদি ঘর বন্ধ করে কোথাও যাওয়ার পরিকল্পনা থাকে বর্ষাকালে, তাহলে অতি অবশ্যই আসবাবগুলি কাপড় দিয়ে ঢেকে রেখে যাবেন। এর ফলে আসবাব ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।

(১৪) যদি আসবাবে ফ্রেঞ্চ পালিশ থাকে, তাহলে এই ফার্নিচারের এক্সট্রা কেয়ার প্রয়োজন বর্ষাকালে। খেয়াল রাখবেন এগুলি যেন কোনও ভাবেই জলের সংস্পর্শে না আসে।

মহানুভবতা (শেষ পর্ব)

মণিমালা এখনও মা হয়নি। তাই ভাই অনুরোধ করতেই চলে এল মা-বাবাকে খুশিতে রাখার জন্য।

দিদি আসার পর বাবা-মাকে অনেকটা চিন্তামুক্ত দেখে, মনোজও বেশ ফুরফুরে মেজাজেই ছিল। কিন্তু এক সন্ধ্যায় সূচনা হল এক রহস্যজনক অধ্যায়ের।

দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। মণিমালা তখন বাড়িতে থাকলেও, মনোজ ছিল না। ছেলেমেয়ের সামনে দিনেরবেলা মা- বাবাকে কখনও দরজা বন্ধ করে থাকতে দেখেনি মণিমালা। তার কাছে বিষয়টি আরও বিস্ময়ের এবং ভয়ের মনে হল, যখন সে ডাকাডাকি করেও দরজা খোলাতে পারল না। অগত্যা মণিমালা ভাই মনোজকে ফোন করে তাড়াতাড়ি আসতে বলল সব জানিয়ে।

অফিস ছুটি থাকার কারণে পাড়ার মোড়ে বসেই আড্ডা দিচ্ছিল মনোজ। দিদির ফোন পেয়ে সে দ্রুত ফিরে আসে বাড়িতে।

ছেলে এসে দরজায় জোরে জোরে কড়া নাড়তেই দরজা খুলে গেল। মা খুললেন দরজা। তাঁকে বেশ গম্ভীর দেখতে লাগছিল।

—কী হয়েছে তোমাদের? শরীর খারাপ? প্রায় চেঁচিয়ে উঠল মনোজ।

—না, তেমন কিছু হয়নি। একটা বিষয় নিয়ে আমরা একান্তে কিছু আলোচনা করছিলাম। ভিতরে আয়। উনি তোদের ভাইবোন-কে কিছু বলতে চান আজ।

ভয় এবং বিস্ময়ের প্রাথমিক ধাক্কা কাটানোর পর ভাইবোন দু’জনে ঘরে ঢুকল মায়ের সঙ্গে।

—কী হয়েছে বাবা? প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল মনোজ।

ওদের ভাইবোনকে ইশারায় বসতে বললেন সরোজ। তারপর কয়েক সেকেন্ড বাদে ঘরের নিস্তব্ধতা কাটিয়ে মুখ খুললেন তিনি। প্রশ্নের সুরে বললেন, “আচ্ছা, তোরা বল তো, বিয়ের মতো শুভ কাজে বাইরের একটা উটকো লোকের রীতিনীতি পালনের অধিকার আছে? মানে, যে-কেউ কি বাবার ভূমিকা নিতে পারে?”

এমন হেঁয়ালিপূর্ণ কথা শুনে ভাইবোন প্রায় সমস্বরে বলে ওঠে— মানে!

—হ্যাঁ, মনের সঙ্গে যুদ্ধ করে জিতে গেছি, তাই আজ বলতে দ্বিধা নেই। আমি আসলে তোদের বাবা নই, সম্পর্কে মামা! তাও আবার নিজের রক্তের সম্পর্কের মামা নই, প্রতিবেশী পাতানো মামা।

এই পর্যন্ত বলে সরোজ থামলেন এবং মনোজ ও মণিমালার প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন। গীতা তখন মাথা নিচু করে খাটের উপর বসে রয়েছেন।

কিছুটা থমকে থাকার পর, মায়ের দিকে তাকিয়ে মনোজ জিজ্ঞেস করল, ‘মা, বাবা ভুল বকছে কেন? শরীর ঠিক আছে তো?’

মনোজের প্রশ্নের উত্তরে সরোজ আবারও শান্ত গলায় জানালেন, ‘আমি সম্পূর্ণ সুস্থ আছি মনোজ। আজ তোমাদের কঠিন সত্যের মুখোমুখি হতেই হবে। নয়তো আমি হয়তো সত্যিই মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলব।’

অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর মণিমালার মুখ থেকে অস্ফুটে বেরিয়ে গেল— ‘কী সত্যি…!’

একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন সরোজ। তারপর ডুব দিলেন স্মৃতির গভীরে। বলতে শুরু করলেন, ‘তোদের মা এবং আমি হিমাচলের একটি গ্রামে পাশাপাশি বাড়িতে থাকতাম। বলতে গেলে একই পরিবারের মতো। ছোটোবেলা থেকেই আমরা ভাইবোনের মতো ছিলাম। তোদের মা আমাকে ফোঁটা দিত, রাখি পরাত। আমরা একই স্কুলে, একই ক্লাস-এ পড়তাম। বড়ো হয়ে দু’জনে হায়ার এডুকেশনের জন্য আহমেদাবাদ, মানে এখানে এলাম। আমি যে মেসবাড়িতে থাকতাম, তার থেকে খানিক দূরে লেডিজ হস্টেল-এ থাকত তোদের মা। দেখা হতো নিয়মিত। ভাইবোনের বেশ আড্ডাও হতো।’

‘একদিন আমাদের সঙ্গে আড্ডায় যোগ দিল সুনির্মল। আমি আর সুনির্মল একই মেস-এ থাকতাম। কিন্তু সুনির্মল চাকরি করত একটি প্রাইভেট সংস্থায়। আমিই সুনির্মলের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছিলাম তোদের মা-কে। ব্যস, ওই পর্যন্তই। তারপর কবে, কীভাবে ওরা দু’জন দু’জনকে ভালোবাসতে শুরু করেছিল, সম্পর্ক গভীর হয়েছিল, তা আমি জানতাম না। ‘হঠাৎ একদিন তোদের মা কাঁদতে কাঁদতে এসে দেখা করল আমার সঙ্গে। এত হাসিখুশি বোনটাকে ওভাবে কাঁদতে দেখে আমি অবাক হয়েছিলাম। কিছুতেই ও বলতে পারছিল না ওর দুঃখ-কষ্ট কিংবা সমস্যার কথাটা। তারপর সব জানলাম অনেক অনুরোধের পর। কিন্তু সুনির্মল যে মেস ছাড়ার আগে গীতার সর্বনাশ করে গেছে, তা জেনে মর্মাহত হলাম। কারণ, সুনির্মলের ব্যবহারে কোনও দিন অবিশ্বাসের চিহ্নও খুঁজে পাইনি। চাকরিসূত্রে অন্যত্র বদলি হয়ে যাচ্ছে বলে মেস ছেড়েছিল। সে। তখন কে জানত যে, আসলে ও পালিয়েছে!’

‘অনেক খোঁজাখুঁজির পরও পাওয়া গেল না সুনির্মলকে। উলটে পুলিশের মাধ্যমে অন্য এক মর্মান্তিক ঘটনার খবর পেয়েছিলাম। সুনির্মলের ওই অপকর্ম করে পালিয়ে বেড়ানোর খবর পেয়ে, বালিগঞ্জে বাপের বাড়িতে এসে আত্মহত্যা করেছিল তার বিবাহিত স্ত্রী। আর তার বৃদ্ধা অসহায় মায়ের কাছে রেখে গিয়েছিল একরত্তি মেয়েকে। মণি তুই তখন কথা বলতেও শিখিসনি।’

‘সব জেনে গীতা চমকে দেওয়ার মতো একটা পদক্ষেপ নিয়েছিল। পুলিশের সাহায্য আর আইনি অনুমতি নিয়ে, কলকাতা থেকে মণিকে নিয়ে এসে নিজের মেয়ের পরিচয় দিয়েছিল। অথচ নিজেই তখন অসহায়। পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। গীতা-র ওই অদ্ভুত মানসিক শক্তি, মহানুভবতা আর সাহস দেখে আমি হতবাক হয়েছিলাম। কিন্তু ঘোর কাটতেই আমার মনে হয়েছিল, একা একটা মেয়ের পক্ষে এত বড়ো লড়াই চালিয়ে যাওয়া অত্যন্ত কঠিন। তাই হাত বাড়িয়ে দিলাম সাহায্যের।’

‘আর হিমাচলে নিজেদের বাড়িতে ফেরা হল না আমাদের। সমাজের রক্তচক্ষু এড়াতে গিয়ে আমরা একসঙ্গে থাকতে শুরু করলাম ‘স্বামী-স্ত্রী’র পরিচয়ে। কিন্তু সে তো শুধু সমাজের চোখে, আসলে তো আমরা দুটি ভাই-বোন। পবিত্র সে সম্পর্ক। আজও সে পবিত্রতা বজায় রেখে চলেছি দু’জনে এবং দায়িত্ব পালনেও সাফল্য বজায় রেখে চলেছি। তোরা দু’জনেই সুনির্মলের সন্তান হলেও, তোদের মা আলাদা। কিন্তু গীতা তোদের দু’জনকেই সমান স্নেহে মানুষ করেছে। আর আমি শুধু পাশে থেকে সাহস জুগিয়ে গেছি মাত্র। কিন্তু এতদিন এই ‘স্বামী-স্ত্রীর’ অভিনয় করতে করতে হাঁপিয়ে উঠেছি। আর লুকিয়ে তোদের মায়ের হাত থেকে রাখি পরতে পারব না। এবার তোদের সামনেই গীতার হাত থেকে ফোঁটা নিতে চাই, রাখি পরতে চাই। তোরা সে অনুমতি দিবি তো?’

এতক্ষণ সরোজের কণ্ঠস্বর ছাড়া আর কোনও শব্দ ছিল না ঘরে। কিন্তু সরোজের কথা শেষ হতেই কান্নার বাঁধ ভাঙল মণিমালার। গীতাকে আঁকড়ে ধরে শিশুর মতো কাঁদছে সে। গীতার চোখ বেয়েও জল গড়িয়ে পড়ছে। অন্যদিকে, সরোজের পা ধরে বসে পড়েছে মনোজ। সরোজের স্বার্থত্যাগের মহানুভবতার কাহিনি শুনে মনোজের তখন বাকরুদ্ধ অবস্থা।

একসময় ঘরে দেখা গেল এক স্বর্গীয় সুখময় দৃশ্য। সরোজ, গীতা, মণিমালা, মনোজ সবাই একে অন্যকে জাপটে ধরে রয়েছে। সবার চোখেই জল। দুঃখ, যন্ত্রণা আর গর্বভরা সেই অনুভূতি যে কেমন ছিল, তা ওরা চারজন ছাড়া অনুভব করা অন্যদের কাছে দুরূহ বিষয়।

যাইহোক, মনোজের মর্মান্তিক অতীত এবং গীতা ও সরোজের অকল্পনীয় মহানুভবতার কাহিনি শুনে পৃথা, ওর মা- বাবা, এমনকী দিদিমাও বিস্ময় প্রকাশ করেন ও মুগ্ধ হন। তারপর, মনোজের অনুরোধ মতো রীতিনীতি ছাড়াই বিয়ের অনুমতি দেন পৃথার দিদিমা। আর এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি খুশি হন মনোজের ‘বাবা’ ওরফে পাতানো মামা। কারণ, তাঁকে আর অসহায় ভাবে ‘বাবা’ সাজতে হবে না।

দুই নারীর কর্মময় জীবনকথায় সমৃদ্ধ হয়ে আসছে বাংলা ছবি ‘আপিস’

ভিন্ন সামাজিক অবস্থানের দুই নারীর জীবন-কাহিনিকে কেন্দ্রে রেখে, তৈরি হয়েছে বাংলা ছবি ‘আপিস’ (The Office)। এই দুই নারীর মধ্যে একজন কর্পোরেট জগতে কর্মরতা এবং অন্যজন প্রান্তিক পটভূমির, যিনি প্রথমজনের সন্তানের আয়া হিসেবে নিয়োজিত। আর এই দুই বিপরীত সামাজিক অবস্থান সত্ত্বেও, দুই নারী একই রকম সংগ্রামের মুখোমুখি হন। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর দৈনন্দিন লড়াই এবং সমাজের চোখে তাদের অবস্থানও এই ছবির মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে উঠবে বলে জানানো হয়েছে এই ছবির ট্রেলার ও মিউজিক লঞ্চ উপলক্ষ্যে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে।

পরিচালক অভিজিৎ গুহ এবং সুদেষ্ণা রায় প্রসঙ্গত জানিয়েছেন, ‘বাণী বসুর লেখা গল্প অবলম্বণে তৈরি করা হয়েছে এই ছবিটি। আধুনিক জীবনে আমাদের সমাজে নারীর যে অবস্থান, তাদের যে চোখে দেখা হয়, আর্থিক কিংবা সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে বিচার করা হয়, সেই সবকিছু গুরুত্ব পেয়েছে এই ছবির চিত্রনাট্যে। শুধু তাই নয়, এই ছবিটি আত্মসমীক্ষার মাধ্যমও হয়ে উঠবে এবং আশা করা যায়, মানবিক মূল্যবোধকেও জাগ্রত করবে।’

২০২৪ সালের কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলা প্যানোরামা বিভাগে প্রদর্শিত হয়েছে ‘আপিস’। থার্ড-আই মুম্বই ফিলম ফেস্টিভ্যাল-এও স্থান পেয়েছিল ছবিটি। আরও কিছু ফিলম ফেস্টিভ্যালে পাঠানোর ইচ্ছের কথাও জানালেন এই ছবির অন্যতম পরিচালক অভিজিৎ গুহ।  সেইসঙ্গে আনুষ্ঠানিক ভাবে জানানো হয়েছে, ১৩ জুন (২০২৫) ‘আপিস’ (The Office) বাণিজ্যিক ভাবে মুক্তি পাবে বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে।

‘ম্যাকনেল ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড’-এর ব্যানারে তৈরি হয়েছে এই ছবিটি এবং এই ছবিটির নিবেদক প্রদীপ চুড়িয়াল। ‘আপিস’ ছবিতে মুখ্য দুই চরিত্রে রূপদান করেছেন সুদীপ্তা চক্রবর্তী এবং সন্দীপ্তা সেন। অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন তথাগত চৌধুরি, কিঞ্জল নন্দ, সৌম্যদীপ উরাং, মৃণাল হালদার, রঞ্জিৎ চক্রবর্তী, দেবাঞ্জন মিত্র, প্রিয়ংকা ভট্টাচার্য, বিদিশা চক্রবর্তী, অর্পিতা বোস এবং তৃষাণ পাল।

‘আপিস’-এর চিত্রনাট্য লিখেছেন পদ্মনাভ দাশগুপ্ত। চিত্রগ্রহণের দায়িত্বে ছিলেন কৌস্তভ মুখোপাধ্যায় এবং সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন সুজয় দত্ত রায়। ছবিতে ব্যবহৃত গানগুলি লিখেছেন দুর্বা সেন বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সুরারোপ করেছেন রণজয় ভট্টাচার্য। গান গেয়েছেন ঐন্দ্রিলা মুখোপাধ্যায়। ছবিটির আবহ-সংগীত পরিচালনা করেছেন শুভদীপ গুহ। শিল্প নির্দেশনায় ছিলেন সুভাষ সাহা। ‘আপিস’ ছবির শিল্পীদের মেক-আপ করেছেন তন্ময় রায়, কস্টিউম-এ পল্লবী চৌধুরি এবং হেয়ার ড্রেসিং-এ ছিলেন হেমা মুন্সি।

অভিজিৎ গুহ এবং সুদেষ্ণা রায়-এর এটি ২২তম ছবি। নতুন আরও একটি ছবি তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিলেন কিন্তু কিছু সমস্যা হওয়ার কারণে আপাতত সেই ছবির মেকিং শুরু করা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন পরিচালক অভিজিৎ গুহ।

মহানুভবতা (পর্ব-০১)

রাখিবন্ধনের ঠিক একদিন আগে মনোজের হাতে কিছু টাকা এল। তাই, কিছুটা আবেগবশতই সে তার মা-বাবার জন্য কিনল কিছু আকর্ষণীয় উপহার। বাদ গেল না তার মণিদিদিও। ওর জন্য কিনল একটি সুন্দর হাতঘড়ি। মণিদিদি শ্বশুরবাড়ি থেকে এসেছে রাখি পরাতে।

‘সব টাকা আমার ঘড়ির জন্য খরচ করে দিয়েছিস নাকি মা-বাবার জন্য কিছু কিনেছিস?’—ভাইকে প্রশ্ন মণিমালার। মুখ টিপে হাসল মনোজ। আর বলল, ‘আজকের দিনটা অপেক্ষা কর দিদি, কাল জেনে যাবি মা-বাবাকে কী উপহার দেব’, বলেই নিজের ঘরে ঢুকে গেল মনোজ।

আসলে মনোজ তার অনেক দিনের ইচ্ছেপূরণ করতে চলেছে। সে এখন সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়র। মোটা মাইনের চাকরি। প্রথম মাসের বেতন হাতে আসতেই সে তার দীর্ঘদিনের লালিত শখ-আহ্লাদ পূরণ করতে চায়। মা, বাবা, দিদি, সবাইকে খুশি করতে চায়। আধুনিক সাজে সাজাতে চায় নিজের বাড়িটাকে। বন্ধুদের সঙ্গে ফার্নিচার-এর শোরুম-এ গিয়ে সে কিছু জিনিসও পছন্দ করে এসেছে।

রাখিবন্ধনের দিন খুব সকালে উঠে স্নান সেরে নিয়েছে মনোজ। তার দেওয়া হাতঘড়িটা পরে মণিদিদি খুব খুশি। আদর করে রাখিও বাঁধল ভাইয়ের হাতে। এবার মা-বাবাকে উপহার দিয়ে চমকে দেওয়ার পালা। কিন্তু বাবা কোথায়?

মনোজের প্রশ্ন শুনে মা হাসলেন। মনোজ অবাক হল। তা দেখে মণিদিদি বলল, “বাবা তো রাখি পরতে চলে গেছেন।’

—কিন্তু কোথায়?

মনোজের কৌতূহল মেটার আগেই মনোজের বাবা অর্থাৎ সরোজ এসে হাজির। তাঁর হাতে রাখি বাঁধা রয়েছে দেখে দ্বিগুন কৌতূহলে মনোজের প্রশ্ন— “বাবা, কে রাখি পরাল তোমায়?”

সরোজ জানালেন, ‘দিদির সঙ্গে তো আর যোগাযোগ নেই, তাই কৃষ্ণ মন্দিরের সেবাকর্মী এক দিদির হাতে রাখি পরে এলাম। গরিব মানুষ, এই ছুতোয় কিছু টাকাও সাহায্য করে এলাম।”

নিজে একটা সাধারণ চাকরি করলেও, সরোজ চিরকালই পরোপকারী। শুধু তাই নয়, কিছুটা আবেগপ্রবণও। বাবাকে এমনটাই এতদিন দেখে এসেছে মনোজ এবং মণিমালা। কিন্তু বাবার হাতে দুটো রাখি কেন, সে প্রশ্নের উত্তর পায়নি ভাইবোন।

যাইহোক, বাবার পরোপকারের বিষয়টি সামনে আসতেই আবার কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ল মনোজ। সে নিজের ঘর থেকে মা-বাবার জন্য রাখা উপহারটা এনে তুলে দিল বাবার হাতে।

উপহারটা হাতে নিয়ে সরোজ খুলে দেখলেন একটা দামি স্মার্ট ফোন।

–তোর তো স্মার্ট ফোন আছে, আবার কিনে টাকা নষ্ট করলি কেন?

—না বাবা, এটা আমার জন্য নয়। এটা মা এবং তোমার জন্য। যাদের সঙ্গে যোগাযোগ কমে গেছে, তাদের সঙ্গে আবার ভিডিয়ো কল করে কথা বলবে। ফেসবুকও করতে পারবে। অবসর সময়টা ভালো ভাবেই কেটে যাবে তোমাদের।

মনোজের কথা শুনে সরোজ আপত্তি তুলতে গিয়েও পারলেন না, কারণ মনোজের মা গীতা বললেন, “খোকা যখন শখ করে কিনে এনেছে, তখন আর আপত্তি তুলো না।’

মণিমালা বলল, ‘বাবা তুমি চিন্তা কোরো না, আমি সব শিখিয়ে দেব।’

“দিদি, মোবাইলটা নিয়ে চার্জ-এ বসিয়ে দে এবার।’ —মনোজের অনুরোধ মণিদিদিকে।

বিকেলবেলা মুখরোচক কিছু স্ন্যাক্স তৈরি করে গরম গরম পরিবেশন করল মণিমালা। সবাই একসঙ্গে বসে খাবারের স্বাদ নিল। এক ফাঁকে কথায় কথায় মনোজ জানাল, পুরোনো ফার্নিচার বদলে নতুন ফার্নিচার আনার ইচ্ছের কথা। কিন্তু এবার ওর মা আপত্তি তুললেন— পুরোনো হলেও এত বড়ো খাট রয়েছে তো ঘরে, আবার কিনবি কেন? এটাতে কী সুন্দর আমরা সবাই একসঙ্গে শুতে পারি ইচ্ছে হলে। নতুন খাট তো আর এত বড়ো হবে না!

মনোজ বুঝল মায়ের আবেগ-অনুভূতির বিষয়টা। কিন্তু সে তার গার্ল-ফ্রেন্ড পৃথা-কে কথা দিয়েছে যে, বিয়ের আগে ঘরগুলিকে গুছিয়ে, কিছু জিনিসপত্র চেঞ্জ করে একেবারে আধুনিক রূপ দেবে। এরপর দিদি মণিমালা-ই অবশ্য মাকে মনোজের ইচ্ছের কথা বুঝিয়ে রাজি করাল।

আসলে, মনোজ এবং পৃথা-র সম্পর্কের বিষয়ে অনেকটাই জানত দিদি মণিমালা। ওদের ভাইবোনের মধ্যে খুব ভালো সম্পর্ক, একেবারে বন্ধুর মতো। তাই, চাকরি পাওয়ার পর মনোজ যে পৃথাকে বিয়ে করে ঘরে আনতে চায়, এ কথা জানত ওর মণিদিদি। সে তাই মায়ের কানে কানে মনোজের ইচ্ছের কথা জানিয়ে দেওয়ার পর, মা মুচকি হেসে মনোজকে নতুন ফার্নিচার ঘরে আনার অনুমতি দেন।

ভাই মনোজের কাছ থেকে ওর হবু শ্বশুরের মোবাইল ফোনের নাম্বারটা নিয়ে মায়ের হাতে তুলে দিয়েছিল মণিমালা। মেয়ে মণি, শ্বশুরবাড়ি চলে যাওয়ার পর কেটে গেছে আরও এক মাস। এর মধ্যে সরোজ এবং গীতা মনে মনে ছেলের বিয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছেন।

সরোজ একদিন ফোন করে আলাপ-পরিচয় সারলেন ছেলের হবু শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে। মনোজের সঙ্গে পৃথার বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। পৃথার বাবা-মা অবিনাশ এবং সুনীতা তাদের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানালেন সরোজ এবং গীতাকে।

মনোজের মতো পৃথাও চাকরি করে। তবে সে মনোজের মতো ইঞ্জিনিয়র নয়, একটি বহুজাতিক সংস্থার অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ হেড। শিক্ষিত এবং আধুনিক মনস্ক। তাই মনোজ এবং পৃথা চেয়েছিল, ওরা রেজিস্ট্রি ম্যারেজ-এর পর একটা রিসেপশন পার্টি দেবে। কিন্তু পৃথার দিদিমা চান বিয়েটা সামাজিক মতে হইহুল্লোড় করেই হোক। পৃথা যেহেতু তার দিদিমাকে ভীষণ ভালোবাসে, তাই তাঁর আদেশ অমান্য করতে পারল না। অগত্যা মনোজও সামাজিক বিয়েতেই মত দিতে বাধ্য হল।

দুই বাড়ির মধ্যে মনোজ এবং পৃথা-র বিয়ের কথা এগোতে থাকল। প্রস্তুতিও শুরু হল জোর কদমে। নির্দিষ্ট দিনে আংটি বদলও করে নিল মনোজ এবং পৃথা। অবশ্য ওইদিন শুধু দুই বাড়ির লোকেরাই একটা ছোটো মতো অনুষ্ঠান করে একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করে।

এরপর বিয়ের দিন এগিয়ে আসতে লাগল। মনোজ সমস্ত দায়-দায়িত্ব ভাগ করে দিতে শুরু করল আগাম। দিদি- জামাইবাবুকে জানিয়ে দিল তাদের অতিথি আপ্যায়নের দায়িত্ব নেওয়ার কথা। আর মা-বাবাকে জানাল, ওরা যেন পৃথা র দিদিমার কথামতো সমস্ত সামাজিক রীতিনীতি মেনে চলেন।

কিন্তু বিয়ের দিন যত এগিয়ে আসতে লাগল, সরোজ এবং গীতাকে খুব চিন্তান্বিত মনে হল। বিশেষ করে সরোজকে খুব মনমরা হয়ে বসে থাকতে দেখা গেল। এই দৃশ্য মনোজের চোখ এড়াল না।

—বাবা, তোমাদের কী হয়েছে? খুব দুশ্চিন্তায় রয়েছ মনে হচ্ছে! এনি প্রবলেম ?

কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর সরোজ ছেলেকে বললেন, ‘না তেমন কিছু নয়, আসলে বয়স হয়েছে তো, তাই ভাবছি যদি পৃথা-র দিদিমার ইচ্ছেমতো সমস্ত রীতিনীতি ঠিক মতো মেনে চলতে না পারি! না, মানে তিনি খুশি না হলে তো বউমাও দুঃখ পাবে, তাই ভাবছি…’

—তোমরা এত ভেবো না তো। বাবা-মা হিসাবে যা রীতিনীতি মানার তাই মানবে, বাড়াবাড়ির তো কোনও প্রয়োজন নেই।

—না, মানে পৃথার দিদিমা একটু প্রাচীন ধ্যান ধারণার মানুষ তো, যদি তাঁর মন ভরাতে না পারি।

এবার মনোজ ওর মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘মা, বাবাকে তো এমন করে সাধরণ একটা বিষয় নিয়ে ভাবতে দেখিনি। বাবা তো এত সংস্কার মানে না। এখন কী যে হল! যাকগে, তুমি বাবাকে একটু খুশিতে থাকার ব্যবস্থা করো তো। আচ্ছা, ঠিক আছে, আমি কালই দিদিকে চলে আসতে বলছি। জামাইবাবু না হয় ব্যস্ত মানুষ, পরে আসবে। দিদি এলে তোমাদের মাতিয়ে রাখবে।”

(ক্রমশ……)

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব