অনুসন্ধান এবং…

কালো রংয়ের পালিশ দরজায় সোনালি নেমপ্লেট। বিজয় পাণিগ্রাহী। তার নীচে সবিতা পাণিগ্রাহী। আর একবার নিজের মনের প্রস্তুতিটা সেরে নিল নীলমণি পরিদা। কলিংবেলে তর্জনী রাখতেই পাখি ডাকার শব্দ ভেসে এল বাইরে।

—আপনাকে ঠিক চিনলাম না। যদি নামটা বলেন…

—আমি নীলমণি পরিদা। আগন্তুক বটে, কিন্তু আততায়ী কিংবা প্রতারক নই।

—আরে না না, আপনি ওসব কেন হতে যাবেন। তাছাড়া বেলা এগারোটার সময় আবাসনের সিকিউরিটি চেক টপকে ওসব লোকেদের আসার কোনও প্রশ্নই নেই। আসুন ভিতরে আসুন। সবিতা পাণিগ্রাহী নীলমণি পরিদাকে আহ্বান জানালেন। থ্যাঙ্ক ইউ। আসলে আমি এসেছি আমার নিজের একটা প্রয়োজনে।

—আশ্চর্য, আমার কাছে আবার কীসের প্রয়োজন? আপনি জল খাবেন?

—হ্যাঁ, তা একটু খেতে পারি। ভদ্রমহিলা ঘরে যেতেই নীলুর চোখ চলে গেল দেয়ালে অয়েল পেইন্টিং-এর দিকে। ঠিক এইরকম একটা পেইন্টিং মাস চারেক আগে অলকানন্দা এনেছে।

—এই নিন জল।

আধ গেলাস জল খাওয়ার পর রুমাল দিয়ে মুখটা মুছে নিল নীলু পরিদা।

—পেইন্টিংটা খুব সুন্দর।

—হ্যাঁ, ওটা আমার স্বামী প্রায় মাসচারেক আগে দিল্লির একটা এক্সিবিশন থেকে কিনে এনেছেন। ঘর সাজানোর জিনিস সাধারণত আমিই কিনে থাকি। জীবনে এই প্রথম তিনি এই শৌখিন কাজটা করলেন। ভালোই লেগেছে তাঁর পছন্দটা। আপনি কী একটা বলছিলেন নিজের প্রয়োজনের কথা ।

—আসলে আমার স্ত্রী অলকানন্দা আর আপনার স্বামী একই কোম্পানিতে কাজ করেন। তাই কিছু কথা বলতে এসেছি। বিজয়বাবু নিশ্চয়ই অফিসে গেছেন?

—না, কোম্পানির কাজে বাইরে মানে কানপুরে গেছেন তিনদিন আগে। পরশু ফিরবেন।

—জানেন অলকানন্দাকেও ঠিক তিনদিন আগেই কোম্পানি তার কাজে ট্যুরে পাঠিয়েছে। আর ওরও পরশু ফেরার কথা। কি আশ্চর্য তাই না?

—এতে আশ্চর্যের কী আছে? দু’জনেই হয়তো একই প্রোজেক্টে আছে। তাই…

—সে হতে পারে। আমি কিন্তু সিওর নই যে প্রোজেক্টটা পাঁচদিনেরই।

—আপনি কী বলতে চাইছেন?

—আমি শুধু অনুমান করছি। নাও হতে পারে। আজকাল আমার স্ত্রী সব কথা সঠিক বলে না। এমনকী জায়গার নামও ভুল বলে। এই তো মাসছয়েক আগে ভুবনেশ্বর যাওয়ার নাম করে বেরিয়েছিল। কিন্তু সে ভুবনেশ্বর যায়নি।

—আপনি তো আপনার স্ত্রীর বিরুদ্ধে গোয়েন্দাগিরি করছেন। কী করে বুঝলেন যে, উনি ভুবনেশ্বর না গিয়ে অন্য কোথাও গিয়েছিলেন?

—তাহলে শুনুন, ও ভুবনেশ্বর থেকে একটা শাড়ি কিনে এনেছিল। ভুল করে শাড়িটা আমার জামাকাপড়ের তাকে রেখেছিল। অবশ্য প্যাকেট ছাড়াই। শান্তিপুরের তাঁতের শাড়ি। আচ্ছা বলুন তো, ভুবনেশ্বরে তাঁতের শাড়ি কেউ কেনে?

—এখানে আমার স্বামীর ভূমিকা কোথায়?

—আপনার স্বামী হয়তো তাঁতের কিংবা গরদের শাড়ি ভালোবাসেন। কিন্তু আপনার হয়তো সিল্ক, জর্জেট শাড়ি ভালো লাগে। তাছাড়া আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে,আপনি শাড়ির পরিবর্তে সালোয়ার কামিজ কিংবা জিন্স টপেই অনেক বেশি স্বচ্ছন্দ।

—কোনও কিছুর বিনিময়েই আমি আমার স্বাধীনতা ছাড়তে রাজি নই। আমি আমার পছন্দ নিয়ে থাকতেই ভালোবাসি। কারও পছন্দ মতো চলব কেন?

—জানেন, আমার স্ত্রী-কে আমি ‘অলকা’ নামেই ডাকি, কিন্তু ও কখনও আমার পছন্দের মূল্য দেয়নি। একসময় স্মিতা পাতিল ছিলেন আমার প্রিয় নায়িকাদের মধ্যে অন্যতম। তাঁর মার্জিত পোশাক আর বাইরের একটা পেলব আবরণ আমাকে ভীষণ আকৃষ্ট করত। একবার আমি আমার পছন্দের হালকা নীল রঙের সম্বলপুরী তাঁতের শাড়ি এনেছিলাম। সেই শাড়ি একদিনও ওকে পরতে দেখিনি। কিন্তু হঠাৎ করেই আটমাস যাবৎ ও তাঁত কিংবা সুতির শাড়ি পরা ধরেছে। এখন আর চলাফেরা করতে কোনও অসুবিধা হয় না।

—তাহলে তো বলতে হয়, উনি দেরিতে হলেও আপনার পছন্দের সম্মান আর মর্যাদা দিচ্ছেন। কী বলেন?

—না, আমার মনে হয় ওর এই পরিবর্তনের পিছনে অন্য কারও উৎসাহ কিংবা পছন্দ আছে।

—আচ্ছা, এখন আপনার স্বামী নিশ্চয়ই খুব কম কথা বলেন, তাই না? আগের মতো ছোটো ছোটো বিষয় নিয়ে কথায় কথায় ঝগড়াও করেন না।

হয়তো কাজের চাপ আছে তাই। দেখি তো, রাতে খাওয়াদাওয়ার পর এক কাপ কোল্ড কফি নিয়ে ল্যাপটপে কাজ সারেন অনেক রাত পর্যন্ত।

—এই অভ্যাসটা কি ওনার বরাবরের?

—না, এই অভ্যাসের বয়স ছয় থেকে আট মাস হবে। কেন বলুন তো? আপনি তো দেখছি, সিআইডি সিরিয়ালের এসিপি প্রদ্যুম্ন স্যারের মতো জেরা করছেন।

—আসলে আমি আমার স্ত্রীর বিরুদ্ধে যাবতীয় প্রমাণ জোগাড় করতে চাইছি। অলকানন্দা বরাবর রাতে শোওয়ার আগে কোল্ড কফি খায়। এই নিয়ে আমার সঙ্গে প্রথমদিকে অনেক কথা কাটাকাটি হতো।

—এখনও হয়?

একদম না। আপনার স্বামীর কোম্পানিতে যোগ দেওয়ার আগে পর্যন্ত অলকা আমাকেও মেনে নিয়েছিল। আমি সুগার মিলের একজন সাধারণ কর্মী। মাস গেলে স্যালারি আর বছরে একটা করে ইনক্রিমেন্ট— এই হল আমার স্ট্যাটাস। আপনার স্বামীর সঙ্গে পরিচয়ের পর ও যেন খাঁচা ভেঙে উড়তে চাইল। এখন আর এসব নিয়ে ভাবি না। না, আর আপনাকে বিরক্ত করব না। আপনি স্বীকার করুন আর নাই করুন, আমার যেটুকু জানার ছিল জেনে নিয়েছি। এখন আমি উঠব।

—যাওয়ার আগে আমি একটা কথা জানতে চাইছি, আপনি কি এই সম্পর্ক ভেঙে দিতে চান?

—গায়ের জোরে কোনও সম্পর্ক বিশেষ করে বিবাহিত জীবনের, ধরে রাখা সম্পূর্ণ অর্থহীন।

—আর একবার ভেবে দেখলে হয় না?

—প্রশ্নই ওঠে না।

—যাওয়ার আগে আমার কিছু কথা শুনবেন না?

—আপনার কাছ থেকে কিছু শোনার জন্যই তো এতগুলো কথা বললাম।

—আপনি এতক্ষণ ধরে আমার স্বামী আর আপনার স্ত্রীকে জড়িয়ে যে কথাগুলো বললেন, তার সবটাই সত্যি। বছরখানেক আগেই আমি বুঝেছি, বিজয় আর আমার কাছে নেই। অনেক দূরে সরে গেছে। আপনি পুরুষ মানুষ, আপনার পক্ষে যে-কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছোনো যতটা সহজ, আমাদের মেয়েদের একটু ভাবতে হয়। তাছাড়া আমাদের ছেলেটা বড্ড ছোটো। ও বাবাকে খুব ভালোবাসে। এখন যদি আমি সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে যাই, তাহলে ওর মনের উপর ভীষণ চাপ পড়বে। এতদিন আমি মেয়েটার নামধাম, পরিচয় এসব কিছুই জানতাম না। অফিসে গিয়ে অনুসন্ধান করতে নিজের আত্মসম্মানবোধে লেগেছিল। বাইরের কারও কাছে হেয় হতে কার ভালো লাগে? কী আশ্চর্য, আজ আপনি যেচে তার সন্ধান আনলেন। মিস্টার পরিদা, আজ আপনি আমার বড়ো উপকার করলেন। এতক্ষণ পর সবিতা পাণিগ্রাহীর ঝলমলে মুখের উপর ঘন কুয়াশা ছড়িয়ে পড়ল। বুকের ভিতর এতদিনের জমে থাকা মেঘগুলো এইবার বুঝি ঝরে পড়বে তার অস্তিত্বের উঠোনে, কার্নিশে আর ব্যালকনিতে।

ইচ্ছাপূরণ (শেষ পর্ব)

মিনু আপন মনে কাজ করে। গল্প করে পাড়ার। ওর বিধবা জীবনের। কিন্তু সুরাহা পেল না দিয়া। আজ অবধি এরকম হয়নি। তবে কি মস্তিষ্কের বিকৃতি সত্যিই! মিনু ঘুমায় রাতে। শীত করে, আবার দিয়ার দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে মেয়েটা… কাঁদে। চিৎকার করে। কান চেপে থাকে দিয়া। কেউ বিশ্বাস করছে না। ও বিশ্বাস করাতেও পারছে না। দাঁতে দাঁত চেপে সইতে থাকে মানসিক ভ্রম থেকে নির্গত এই অশরীরীর যন্ত্রণা। কখনও সখনও থাকতে না পেরে দিয়া নিজেই চিৎকার করে। মানব ডাক্তার দেখিয়েছে। ডাক্তার একপাতা ওষুধ প্রেসক্রাইব করেছে। সাফ জানিয়েছে, এগুলো ভৌতিক ব্যাপার নয়। নার্ভ ফাংশন ডিসটার্ব করছে। এখন যেন একটু কাছে কাছে থাকে মানব।

মিনুর পাল্লায় পড়ে তিনটে গোল্ড মেডেলিস্ট তান্ত্রিকও ঘোরা হয়ে গেছে। ঘরে ধুনো ঝাঁটা লেবু লংকা, যাগযজ্ঞ সব করিয়েছে মানব। হাতে হরেকরকম আকারের তাবিজও পরেছে। এই জল, সেই জল, কত জল খেয়েছে! নিয়ম মেনে পুজো জপ সব করেছে। তারপরও শীত করছে দিয়ার। এখনও কাঁদছে মেয়েটা। কাঁদতে কাঁদতে ক্রমশ এগিয়ে আসে। মাছিগুলো সারাক্ষণ ভনভন করছে! গায়ে এসে বসছে দিয়ার। দিয়া চোয়াল শক্ত করে জিজ্ঞেস করল, “কী চাই তোমার? আমার সঙ্গে তোমার কী শত্রুতা?”

—সংসাআআআআর! হাড় হিম করা দুর্গন্ধযুক্ত বাতাস বেরিয়ে আসে মেয়েটার পচনযুক্ত মুখ থেকে।

—আমার সংসার কেন চাও? মাছি তাড়াতে তাড়াতে প্রশ্ন করে দিয়া।

মানবের কাছে সরে সরে যায় মেয়েটা। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে কাঁদে। সেই বিশ্রী কান্না। তারপর বলে, ‘সানন্দা!”

চোয়াল শক্ত করে বসে থাকে দিয়া। ভোর অবধি। মানব ঘুম থেকে উঠে হাই তোলে। কৃত্রিম ভাবে জিজ্ঞেস করে, “কী হল? সারারাত তোমার ঘুম হয়নি নাকি?”

—সানন্দাকে চেনো?

কথা আটকায় মানবের।

—কে সানন্দা? আমি চিনি না।

সারারাত তোমার পাশে বসে চিৎকার করে কেঁদেছে।

—আবার শুরু করেছ? এত কিছু করেও শান্তি পাওনি?

—হয় জানাও সানন্দা কে, না হয় আমি সুইসাইড করব। আমি আর পারছি না মানব। আমার জীবনটা শেষ হয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন। কিচ্ছু হবে না এই হাজাররকম পুজো তন্ত্রমন্ত্র দিয়ে।

ঢোক গেলে মানব। বুঝতে পারে না কীভাবে কী বলবে। কীভাবে শুরু করবে! সানন্দার সঙ্গে পরিচয় গড়িয়াহাট বাজারে। ভিড়ে সঙ্গীরা হারিয়ে গিয়েছিল। সানন্দার কাছে ফোন ছিল না। মানবের কাছে ফোন চেয়ে ফোন করেছিল বন্ধুদের। তারপর একদিন ফেসবুকে যোগাযোগ। ভালোলাগা। ভালোবাসা। তারপর উলের কাঁটায় বুনতে শুরু করা একে অপরের সঙ্গে ঘর করার স্বপ্ন। বেকার মানবের সঙ্গে বিয়েতে নারাজ ছিল সানন্দার পরিবার। খুব কষ্টে, অনেক অত্যাচার সহ্য করে মুখ বুজে ছিল সানন্দা। শুধু অপেক্ষা একটা চাকরির। ঘর থেকে হাত খরচটুকুও বন্ধ করে দিয়েছিল সানন্দার। অত্যাচার বাড়ছিল দিনকে দিন। ঠিকমতো খেতে দিত না। আটকে রাখত সারাদিন চার দেয়াল মোড়া ঘরে। প্রতিষ্ঠিত ঘরের ছেলের সঙ্গে বিয়েতে নারাজ ছিল তবু সানন্দা।

একসঙ্গে রাস্তার বামপাশে সানন্দাকে রেখে হাঁটার সময়, অনেকটা বিশ্বাস নিয়ে মানব জানতে চাইত, কতদিন এভাবে চলবে? একগাল হেসে সানন্দা বলত, তোমার একটা কাজের অপেক্ষা। কাজ পেলেই ছুটে আগে আমার কাছে আসবে। আমি তোমার সঙ্গে বেরিয়ে যাব সেদিনই। তারপর তো আর কষ্ট নেই! সম্ভব হয়নি আর। মাত্রা পেরিয়ে গেল অবশেষে। তর্ক করলে বেধড়ক মারত পরিবারের সম্মান রক্ষণীয় ব্যক্তিরা। যোগাযোগটাও বন্ধ করে দেওয়া হয় পরিবার থেকে। তিনমাস পর চাকরিটা পেয়েই ছুটে এসেছিল জ্ঞানশূন্য হয়ে মানব। কিন্তু এসে খবর পেয়েছিল, সুইসাইড করেছে দু-সপ্তাহ আগে।

সুইসাইড নোটে লিখে গিয়েছিল, ওর সাধের বাড়ি কোথায় হবে? কেমন হবে… তাতে সদর দরজা কোনমুখী হবে… ঘরে কেমন পর্দা বসবে… সোফা সেট আসবে! বেডরুমে কী রং হবে ইত্যাদি সব। এক কথায় জলজ্যান্ত স্বপ্ন বুনেছিল ওর সাধের বাড়ির। বাড়ির লোকেরা বেশি কথা বলেনি। অচিরেই বিদায় করেছে মানবকে, অজ্ঞাত ব্যক্তির মতো।

মানব সেইভাবেই বাড়ি বানিয়েছে। দিনযাপনের মধ্যে দিয়েই, জীবন কাটছিল মানবের। দীর্ঘ চারটে বছরে নিঃসঙ্গতার চরম শিকার হয়ে গিয়েছিল মানব। তারপরই দিয়ার সঙ্গে পরিচয় ডাক্তারের চেম্বারে। প্রায় যেতে হতো, মনোরোগ বিশেষজ্ঞর কাছে। সেখানেই ওদের মধ্যে আলাপ পরিচয়, ঘনিষ্ঠতা। মানুষের জীবন একাকীত্বকে সবচেয়ে বেশি চায়। অথচ সবচেয়ে বেশি ভয়ও পায়। কেউ একজন বিশ্বাস দেখিয়ে হাত বাড়ালে, এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব।

কথাগুলো নিজের মতো কীভাবে বলে দিল মানব দিয়াকে, জ্ঞানই ছিল না। যেন, যত বেশি বলছিল, তত বেশি বুকের ভিতরটা হালকা হচ্ছিল।

দিয়া ঢোক গেলে। সানন্দা জোঁকের মতো আঁকড়ে ধরেছে ওর প্রিয় ঘর, প্রেম, আর সংসারকে। এর থেকে নিস্তার নেই! কান্নাটা গলার কাছে দলা পাকিয়ে আসছিল।

—দিয়া? যাবে একবার সেই তান্ত্রিকটার কাছে? যদি সত্যি ও অশরীরী হয়, সেটা আমাদের এখুনি কোনও ব্যবস্থা নিতে হবে। চুপচাপ বেরিয়ে চলে যায় দিয়া। গা ছমছম করে ওর। এই হয়তো পর্দার ফাঁকে মাছি উড়বে। মেয়েটা দাঁড়িয়ে থাকবে। রান্না ঘরে ঢুকে মুখে চোখে জল দেয়। আবার মাছির ভনভন শব্দ কানের কাছে। মানে সানন্দা পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। চোখে চোখ পড়লেই চিৎকার করে কাঁদবে।

—চা করবে না?

একি! এ তো মানব। তাহলে মাছির শব্দটা এল কেন?

—করছি।

মানব বেরিয়ে গেল নিস্তব্ধ ভাবে।

—মানব? কোথায় যাচ্ছ? ওদিকে কোথায় যাচ্ছ?

মানব ছাদে ওঠে। বহুবছরের ভাঙা টবগুলোর দিকে ইশারা করে বলে, ‘ফুল লাগাও না কেন দিয়া ?” দিয়া কী উত্তর দেবে ভেবে পায় না। ফুল বিশেষ দিয়া পছন্দ করে না। তাই লাগায়নি কোনওদিন। এসবে ন্যাক নেই মানবেরও।

দিয়াকে নীচ থেকে ডাকে মানব। এতক্ষণে দিয়া বোঝে, ছাদে যে-মানব সে আসলে অশরীরী নয়, সশরীরী সানন্দা। সূর্যের আলোতে আর দেখতে পাওয়া যায়নি তারপর থেকে সানন্দাকে।

ওর মনের মতো ছাদ সাজায়নি মানব। দিয়া নিজের হাতে বাজার থেকে চারা এনে নানা রং-এর ফুলগাছ লাগিয়েছে। নিজের হাতে সার দিয়েছে। জল দিয়েছে। প্রতি সকালে এসে ছাদের দরজা খুলে দাঁড়ায় দিয়া। ফুলগাছগুলোতে ছড়িয়ে থাকে অজস্র মাছি। প্রজাপতি আসে না, আসে না মৌমাছিও। এতটুকু স্বপ্ন তো একটা অশরীরীর পূরণ করা যেতেই পারে। প্রত্যেকটা শরীরেই বিরাজ করছে একটা অশরীরী। দেহ ছাড়তে বাধ্য হলেও, মায়া ছাড়তে পারে না সবাই। এখন প্রশ্ন একটা জায়গাতেই এসে নাড়া দেয় দিয়াকে…

সানন্দার কথা বহুদিন আগে শুনেছিল একবার মানবের এক বন্ধুর মুখ থেকে। তাহলে কি অবচেতন মনের জিজ্ঞাসা থেকেই একটা ভ্রম সৃষ্টি হয়েছিল সানন্দা নামক অস্পষ্টতা নিয়ে? ডাক্তার তো তাই বলেছিল! মানসিক ভ্রম। নাকি সত্যি সানন্দা চেয়েছিল ওর শেষ ইচ্ছেটুকু দিয়ার হাতেই পূর্ণ হোক।

ভাবতে ভাবতেই একটা মাছি উড়ে এসে হাতে বসল দিয়ার! কোনও দুর্গন্ধ নেই, আর ভন ভনও করে না। শুধু নিঃশব্দে উড়ে আসে, আবার একই ভাবে উড়ে যায়…।

(সমাপ্ত)

বদলে গেছে আবহ

মেয়েরা এখন একাই পথ চলে, একাই সিদ্ধান্ত নেয়। পেশাগত কারণে ঘুরে বেড়ায় দেশে-বিদেশে। কাজ করে নাইট শিফটেও। আর্থিক ভাবেও স্বনির্ভর। একশো ভাগ না হলেও, সিংহভাগ মেয়েরাই এখন স্বনির্ভর, স্বাধীনচেতা এবং সচেতন। ‘জলে নামব অথচ গা ভেজাব না’ —এমন সনাতন মানসিকতাকেও তাই ঝেড়ে ফেলেছে আজকের মেয়েরা। সেক্স সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণাও এখন মেয়েদের রয়েছে। পুরুষের কাছে কীভাবে নিজেকে আকর্ষণীয় রূপে তুলে ধরতে হয়, তাও জানে মেয়েরা। সঠিক গর্ভনিরোধক কৌশলও রপ্ত করেছে তারা। তাই, অনেক মেয়ের হ্যান্ডব্যাগে এখন সাজগোজের উপকরণ ছাড়াও থাকে গর্ভনিরোধক সামগ্রী। অতএব, বিয়ের আগে প্রেমকে চরম উপভোগ্য করে তুলতে, মেয়েরা এখন অনেক সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

আসলে, সমীক্ষা করলে হয়তো দেখা যাবে, আজকের যুগের প্রায় সিংহভাগ মেয়েদেরই বিয়ের আগে আচমকা এই সম্ভোগের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তবে দু’দশক আগেও হয়তো ‘অগ্নিপরীক্ষা’ দিতে হতো ভারতীয় মেয়েদের। অর্থাৎ ফুলশয্যার রাতে নারীকে দিতে হতো সতীত্বের প্রমাণ। বিয়ের আগে যৌন স্বাধীনতা ভোগ করার অধিকারী ছিল একমাত্র পুরুষরাই। নারী শুধু তার শরীর ও মনকে সযত্নে তুলে রাখত স্বামীর জন্য।

বিয়ের আগে মেয়েদের অন্য কারওর সঙ্গে শারীরিক মিলনকে ‘পাপ কাজ’ বলে মনে করা হতো। আসলে এমনই সামাজিক অনুশাসনকে মেনে নিতে বাধ্য করা হতো মেয়েদের। কিন্তু সত্যিই কি সব মেয়েরাই ওই সামাজিক অনুশাসন মানত? নাকি বিয়ের আগেই লুকিয়ে চুরিয়ে অন্য প্রেমিকের সঙ্গে এক- আধবার শরীরী মিলন ঘটিয়ে ফেলত কেউ কেউ? হয়তো অনেক কিছুই ঘটত কিন্তু সামাজিক চাপের কথা ভেবে কেউ স্বীকার করত না কিংবা ওই ঘটনার কথা প্রকাশ্যে আসত না। তবে সময় বদলেছে।

এখন মোবাইল, ইন্টারনেট-এর যুগ। মেয়েরা এখন সামাজিক অনুশাসনের চোখ রাঙানি-কে ভয় না করে, ইচ্ছে মতো ইচ্ছেপূরণ করে। বিবাহ-পূর্ব সম্পর্কে শারীরিক ঘনিষ্ঠতার সাহস দেখাতে পারে এবং তা স্বামীর কাছে নির্দ্বিধায় বলতেও পারে। ছেলেরাও এখন এ ব্যাপারে অনেকটাই উদার। আসলে এই মানসিকতার বদল ঘটেছে খুবই সংগত কারণে।

বয়ঃসন্ধিকালে যুবক-যুবতির শরীরে যে প্রবল যৌন ইচ্ছে তৈরি হয়, তা পূরণের জন্য পরস্পর উন্মুখ হয়ে থাকে। ফলে, যুবক-যুবতিরা পরস্পরের কাছাকাছি এলে, কোনও এক ইমোশনাল মুহূর্তে শরীরী মিলন ঘটে যেতেই পারে।

দু’দশক আগেও হয়তো এই সাহস দেখাতে পারত না অনেক মেয়ে, কিন্তু এখন পারে। তাই বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে বিবাহ-পূর্ব শারীরিক মিলনের ঘটনা খুব অস্বাভাবিক কিছু নয় বলেই মনে করে তরুণ প্রজন্ম।

ফিলমি রিফ্লেকশন

কেউ বাড়িতে নেই। পরিবারের সবাই আত্মীয়ের বাড়ি বেড়াতে গেছেন। তাই অসীমা বাড়িতে একা রয়েছে। এমন সময় বাড়িতে এল অসীমার প্রেমিক ভিকি। স্মার্ট ছেলে। দেখা হওয়া মাত্রই ভিকি তার বলিষ্ঠ বাহুযুগল দিয়ে কাছে টেনে নিল অসীমা-কে। শুধু তাই নয়, ভিকি যখন অসীমার কাছ থেকে জানল বাড়িতে কেউ নেই, তখন তার সে কী আনন্দ! ‘ঘরমে কোই নেহি হ্যায়! থোড়াই না লুডো খেলেঙ্গে, চোলে…’ বলেই অসীমাকে নিয়ে সোজা বিছানায়। অসীমাও ভিকিকে বাধা দেয়নি কিংবা মনে মনে হয়তো এমনটাই চাইছিল। কারণ অসীমা তখন ভিকির প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিল। সুজিত সরকার পরিচালিত ‘ভিকি ডোনার’ ছবির এমন ঘটনা হয়তো অনেকের জীবনেই ঘটেছে কিংবা ঘটতেও পারে।

নারীর স্বাধীনতা, প্রি-ম্যারিটাল যৌন ইচ্ছে পূরণ প্রভৃতি বিষয় নিয়ে আজকাল প্রচুর ছবি তৈরি হচ্ছে। এইসব ছবি দেখে উদ্বুদ্ধও হচ্ছে আজকের মেয়েরা। তাছাড়া, মেয়েরা এখন মুঠোফোনে, ল্যাপটপ-এ কিংবা কম্পিউটার-এর মাধ্যমেও সহজেই ‘নীল ছবি’ দেখছে। আর এরই প্রতিফলন ঘটছে বাস্তব জীবনে। ফলে মনের মধ্যে যে প্রবল যৌন ইচ্ছে তৈরি হচ্ছে, তা মিটিয়ে নিচ্ছে প্রেমপর্বেই, অর্থাৎ বিয়ের আগেই।

চাহিদা পূরণ

পুরুষের মতো নারী শরীরেও যৌন চাহিদা তৈরি হয় খুব স্বাভাবিক ভাবে। আর খুব সহজ ভাবেই এই যৌন চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে আজকের মেয়েরা। তাই কোনও ইমোশনাল মুহূর্তে যদি শারীরিক মিলন ঘটেও থাকে, তাহলে ‘ভুল করেছি ” বলে আক্ষেপ করে না আজকের মেয়েরা। আর যার সঙ্গে সেই শারীরিক মিলন ঘটেছিল, অনিবার্য কারণে যদি তার সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙেও যায়, তাহলেও এখন আর মেয়েদের জীবন ‘বৃথা’ হয়ে যায় না।

সময় বয়ে চলে, পুরোনো সম্পর্কের সুখস্মৃতি সঙ্গে রেখে আজকের মেয়েরা গড়ে তোলে নতুন সম্পর্ক। বিয়ের আগেই হোক কিংবা পরে, প্রেমিকই হোক কিংবা হবু স্বামী, শরীর চাইলে যৌন সম্পর্ক যখন খুশি, যার সঙ্গে খুশি স্থাপন করতে এই প্রজন্মের মেয়েরা বেশ দ্বিধাহীন।

সতীচ্ছদ প্রসঙ্গে

সনাতন রীতি অনুযায়ী, একমাত্র স্বামীরাই পারে মেয়েদের কুমারীত্ব হরণ করতে। অর্থাৎ নববধূ স্বামীর সঙ্গেই প্রথমবার সেক্স করছে কিনা, তা প্রমাণিত হতো ফুলশয্যার রাতেই। আর এই কুমারীত্ব প্রমাণ করত ‘সতীচ্ছদ’ (স্ত্রী যোনিতে পাতলা পর্দাবিশেষ)। অর্থাৎ সতীচ্ছদ অক্ষত রাখা বাধ্যতামূলক ছিল সনাতন রীতি অনুযায়ী। অবশ্য যৌনসম্পর্ক ছাড়াও যে সতীচ্ছদ ছিঁড়ে (সাইক্লিং কিংবা আঘাতজনিত কারণে) যেতে পারে, এই জ্ঞানটুকু সবার নেই। তাই কিছু না করেও, ‘ইউড্’ শব্দটি অজ্ঞ স্বামীর মুখ থেকে শুনতে হয় অনেক মেয়েকেই।

তবে আজকের মেয়েরা বিয়ের আগে সেক্স-এর অভিজ্ঞতা নেওয়ার পরও, বিবাহিত জীবনে ‘ইউজ্‌ড্’ বলে গিলটি ফিল করে না। তাছাড়া, একটা ছোট্ট সার্জারির মাধ্যমে (হাইমেনোপ্লাস্টি), যৌনাঙ্গে কৃত্রিম সতীচ্ছদ তৈরি করে ‘অজ্ঞ’ স্বামীকে যে খুশি করা যায়, এই বিষয়টিও এখন অনেক মেয়েই জানে। অতএব, শরীর, মন চাইলে বিবাহ-পূর্ব সেক্স-এ সমস্যা নেই, অন্তত এমনটাই মনে করে তরুণ প্রজন্ম।

ফিল গুড ফ্যাক্টর

একটা সময় ছিল যখন মেয়েরা নিজের ইচ্ছের কথা মুখ ফুটে বলতে পারত না পুরুষ বন্ধুটিকে। কিন্তু এখন বেশিরভাগ মেয়েই মনের ইচ্ছে প্রকাশ করতে পারে। শুধু তাই নয়, নিজের ইচ্ছেকে প্রাধান্য দিয়ে সম্ভোগের সময় অ্যাক্টিভ রোল-ও প্লে করতে পারে আজকের মেয়েরা। অর্থাৎ শুধু পুরুষরাই নয়, মেয়েরাও এখন চরম তৃপ্তিলাভের ব্যবস্থা করে নিতে পারে নিজেরাই।

সতর্কতা

সম্পর্ক তৈরি করার ক্ষেত্রে মেয়েরা এখন অনেক বেশি সচেতন। কার সঙ্গে সম্পর্ক করবে, কতটা এগোবে, মানসিক সম্পর্ক থেকে শারীরিক সম্পর্কে যাবে কিনা এসব নিয়ে মেয়েরা এখন উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখে। সেইসঙ্গে নিজের ইচ্ছেমতো সুরক্ষিত যৌনতার জন্য মেডিকেল প্রিকশনস সর্বদা সঙ্গে রাখে। তবে শুধু আগাম প্রিকশনস-ই নয়, ইমোশনালি হঠাৎ যদি প্রিকশনস ছাড়াও কারও সঙ্গে দৈহিক ঘনিষ্ঠতা হয়েও যায়, তাহলেও ইমারজেন্সি কন্ট্রাসেপটিভ পিল ব্যবহার করে চাপমুক্ত হতে পারার সহজ ফর্মুলা এখন তাদের হাতের মুঠোয়।

Drug Allergy-র সমস্যা এবং সতর্কতা

মনে রাখবেন, ড্রাগ অ্যালার্জি সাধারণ বিষয় নয়। যদিও সবার ড্রাগ অ্যালার্জির সমস্যা থাকে না, কিন্তু যাদের এই সমস্যা থাকে, তাদের চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা উচিত সর্বদা। আপনার ড্রাগ অ্যালার্জি আছে কিনা এবং কোন কোন ওষুধে অ্যালার্জি-র সমস্যা হতে পারে, তা নির্ণয় করা আবশ্যক।

আপনার ইমিউন সিস্টেম, যা সংক্রমণ এবং রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করে, সেই লড়াই করার ক্ষমতা হারাতে পারেন ড্রাগ অ্যালার্জি-র শিকার হলে। এই ধরনের প্রতিক্রিয়ায় দেখা যায়— শরীরের বিভিন্ন জায়গায় কালো বা লালচে দাগ এবং ফুসকুড়ি হতে পারে। এছাড়া জ্বর এবং শ্বাসকষ্টের সমস্যাও হয় অনেক সময়। শুধু তাই নয়, যাদের ড্রাগ অ্যালার্জি-র সমস্যা আছে, তারা যদি অ্যালার্জি টেস্ট করিয়ে সতর্কতা অবলম্বন না করেন, তাহলে বড়ো ধরনের শারীরিক সমস্যা হতে পারে, এমনকী জীবনহানিও ঘটতে পারে। তাই, আগাম সতর্কতা জরুরি। এই বিষয়ে, টেকনো ইন্ডিয়া ডামা হাসপাতাল-এর সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. দীপংকর পাল-এর বক্তব্য এবং পরামর্শ তুলে ধরা হচ্ছে বিস্তারিত ভাবে।

ড্রাগ অ্যালার্জি কী?

কোনও কোনও মেডিসিন অর্থাৎ ওষুধ সেবন করলে কিংবা ইনজেক্ট করলে, শরীরে কিছু পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হতে পারে। আর এই এফেক্ট-কেই বলা হয় ড্রাগ অ্যালার্জি। অর্থাৎ, নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ বা ওষুধের একটি গ্রুপের অ্যালার্জি-র প্রতিক্রিয়াকে ড্রাগ অ্যালার্জি বলা হয়। এটি ওষুধ খাওয়ার পরপরই ঘটতে পারে কিংবা কিছুদিন পরেও হতে পারে। কিছু ওষুধ ইনজেক্ট করা হয় শরীরে, আবার কিছু ওষুধ সেবন করা হয় এবং এর ঠিক পরেই অনেকের অ্যালার্জি-র সমস্যা হতে পারে।

ড্রাগ অ্যালার্জি কখনও সামান্য প্রভাব ফেলে শরীরে, আবার কখনও গুরুতর ক্ষতি করে দিতে পারে। কার শরীরে কতটা কী প্রভাব ফেলবে, তা আগে থেকে নির্দিষ্ট করে বলা যায় না। অনেক সময় এমনও দেখা গেছে যে, ড্রাগ অ্যালার্জি এতটাই প্রভাব ফেলেছে যে, রোগীকে হাসপাতালের আইসিইউ-তে ভর্তি করতে হয়েছে। এমন পরিস্থিতি হলে রোগীকে দীর্ঘ সময়ের জন্য অ্যান্টি-অ্যালার্জিক ওষুধ এবং অক্সিজেন প্রয়োগ করতে হতে পারে।

ড্রাগ অ্যালার্জি কারণ

এখন নানারকম কারণে অনেকেই ড্রাগ অ্যালার্জির শিকার হচ্ছেন। সত্যি বলতে কী, অনেক ওষুধই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকে মুক্ত নয় বর্তমানে। এই পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া সঙ্গে সঙ্গে হতে পারে, আবার অনেক সময় বিলম্বিত হতে পারে। আসলে, অ্যালার্জি হল পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াগুলির মধ্যে একটি, যা আমরা সাধারণত কোনও ওষুধ ব্যবহার করার পরে দেখতে পাই কিংবা অনুভব করতে পারি। যে-সমস্ত ওষুধে সাধারণত অ্যালার্জির সমস্যা হতে পারে, ওষুধের সেই গ্রুপগুলি হল—

O মৃগীরোগের ওষুধ

O সালফার অ্যান্টিবায়োটিক রেয়ার অ্যান্টিবায়োটিক

O ভ্যানকোমাইসিন

O মিনোসাইক্লিন

O যক্ষ্মা রোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার ওষুধ

O এইচআইভি-র ওষুধ

O কিছু ব্যথানাশক ওষুধ

O ইউরিক অ্যাসিড-এর সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার ওষুধ ইত্যাদি।

উপসর্গ

ড্রাগ অ্যালার্জি বিভিন্ন ভাবে দেখা দিতে পারে। কখনও এটি শুধুমাত্র ত্বকের উপর প্রভাব ফেলে, কখনও ফুসফুসের উপর প্রভাব ফেলে। অর্থাৎ শ্বাসকষ্ট এবং শ্বাসকষ্টের সমস্যা হয়। আবার কখনও রোগীর জ্বর, অস্বস্তি, মাথাব্যথা, খিদে না পাওয়া এবং কখনও আবার বমিও হতে পারে।

আবার কখনও ত্বকের উপর কালো স্পট দেখা দেয় কিংবা ফুসকুড়ি হতে পারে। আর এই ফুসকুড়ি বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। শুধু তাই নয়, ত্বকের উপর লালচে দাগ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। হতে পারে চুলকানিযুক্ত লাল প্যাপিউলস এবং আঁশযুক্ত ক্ষত। এই সমস্যা কখনও গুরুতর রূপ নিতে পারে, যদি ওই অ্যালার্জিযুক্ত ওষুধ খাওয়া বন্ধ না করেন রোগী। আর একবার ড্রাগ অ্যালার্জি-র সমস্যা হলে, তার কুপ্রভাব দীর্ঘ সময় পর্যন্ত থাকতে পারে।

ড্রাগ অ্যালার্জি-র সমস্যা আছে অথচ তা যদি তিনি বুঝতে না পেরে বারবার অ্যালার্জিযুক্ত ওষুধ খেয়ে যান, তাহলে যৌনাঙ্গের ত্বকে বারবার ফুসকুড়ি-র সমস্যা হতে পারে এবং যৌনাঙ্গের ত্বক ফেটে গিয়ে জ্বালা করতে পারে। অবশ্য ত্বকের ফুসকুড়ি ছাড়াও, মুখ-গহ্বরে ঘা হতে পারে, মিউকোসাল ডিসক্যামেশন এবং আলসার হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। গলায় ছড়িয়ে থাকা অ্যালার্জি কিংবা আলসারের ফলে খাবার খেতে কিংবা জলপান করতে গিয়েও কষ্ট হতে পারে। মুখ-গহ্বরে ফুসকুড়ি, আলসার এমনকী রক্তপাতও ঘটতে পারে অনেক সময়। নাক দিয়ে শ্বাস নিতে গিয়েও অসুবিধা হতে পারে।

ড্রাগ অ্যালার্জি-র সমস্যা থাকলে চোখ লাল হয়ে যেতে পারে, চোখ চুলকাতে পারে এবং চোখ থেকে জল পড়তে পারে অনবরত। সেইসঙ্গে, শ্বাসযন্ত্রের সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে হাঁচি হতে পারে এবং রাইনোরিয়ার সমস্যা হতে পারে। কাশি, শ্বাস-প্রশ্বাসে কষ্ট, বুকে চাপ অনুভব করা, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া প্রভৃতি সমস্যা হয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। এছাড়া, যারা হাঁপানি রোগী, তাদের হাঁপানির সমস্যা আরও গুরুতর রূপ নিতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে আবার রোগীকে অক্সিজেন দিতে হতে পারে।

ওষুধের অ্যালার্জি গুরুতর হলে রক্তচাপ বাড়তে বা কমতে পারে। রক্তচাপ কমে যাওয়াকে সাধারণত অ্যানাফিল্যাকটিক শক বলা হয়। এর জন্য অবিলম্বে হাসপাতালে ভর্তি, শিরায় স্যালাইন, স্টেরয়েড, অ্যাড্রেনালিন, অক্সিজেন প্রভৃতি প্রয়োগ করতে হতে পারে।

চিকিৎসা

রোগীকে নতুন কোনও ওষুধ দেওয়ার আগে, সঠিক অ্যালার্জি রিপোর্ট নেওয়া আবশ্যক। আর ড্রাগ অ্যালার্জির উপসর্গ দেখা দিলে, অবিলম্বে চিকিৎসককে তা জানানো উচিত এবং সঠিক চিকিৎসাকে মাধ্যম করা উচিত। যদি ড্রাগ অ্যালার্জির সমস্যা থাকে, তাহলে নতুন ওষুধ গ্রহণ করার আগে সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। বিশেষকরে হাঁপানি কিংবা চর্মরোগের সমস্যা থাকলে আরও বেশি সতর্ক থেকে ওষুধ দেওয়া উচিত। যেমন— সালফার জাতীয় ওষুধগুলি অ্যালার্জির সমস্যা বাড়াতে পারে। তাই, অ্যান্টিবায়োটিক ছাড়াও চিকিৎসকদের মাথায় রাখতে হবে, আর কোন ওষুধে সালফারের অণু থাকে।

চুলকানি, ত্বকে জ্বালাপোড়া, ত্বকের উপরি আস্তরণ খসে পড়া, মুখের বা ত্বকের আলসার, ত্বক বা যৌনাঙ্গে ফোসকা, জ্বর, ক্লান্তি এমনকী জন্ডিসও হতে পারে ড্রাগ অ্যালার্জি-র এফেক্টে। তাই, এই ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে, তখনই আপনাকে সমস্ত ওষুধ গ্রহণ বন্ধ করতে হবে এবং ওই পরিস্থিতিতে কী করা উচিত, তা তখনই চিকিৎসকের থেকে জেনে নিতে হবে। চিকিৎসক আপনাকে অ্যান্টি-অ্যালার্জিক ওষুধ দিতে পারেন। গুরুতর ক্ষেত্রে ব্যথা-যন্ত্রণা কমানোর ওষুধও দেওয়া হতে পারে। তবে ড্রাগ অ্যালার্জি-র কুপ্রভাব যদি ত্বকে কিংবা মুখ-গহ্বরে পড়ে, তাহলে সেক্ষেত্রে চিকিৎসক আপনাকে লোশন, ইমোলিয়েন্ট প্রভৃতি দিতে পারেন।

আর যদি গায়ে জ্বর থাকে, তাহলে প্যারাসিটামল দিতে পারেন আপনার চিকিৎসক। কিন্তু ড্রাগ অ্যালার্জি-র এফেক্ট যদি গুরুতর হয়, তাহলে তখনই রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করানো উচিত। কারণ, হাসপাতালে ভর্তি করলে চিকিৎসক রোগীর অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নিতে পারেন। যেমন— – রোগীকে আইসিইউ-তে নিয়ে অক্সিজেন, ইনহেলার, স্যালাইন এবং অন্যান্য জীবনরক্ষাকারী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতে পারে।

পরিশেষে যে বিষয়টি জেনে রাখা উচিত, তা হল— ড্রাগ অ্যালার্জি-র উপসর্গ দেখা দিলেই, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অ্যালার্জি টেস্ট করিয়ে নিন এবং যে-সমস্ত ওষুধে আপনার অ্যালার্জি আছে, সেই সমস্ত ওষুধ খাওয়া বন্ধ করতে হবে ভবিষ্যতে। শুধু তাই নয়, অ্যালার্জিযুক্ত ওষুধের লিস্ট সর্বদা সঙ্গে রাখা উচিত এবং অসুস্থ হলে ওই অ্যালার্জিযুক্ত ওষুধের তালিকা চিকিৎসককে দেখিয়ে নেওয়া আবশ্যক।

দেশ-দুনিয়ার জন্য স্বস্তিদায়ক

বিশ্বের দ্বিতীয় জনবহুল দেশ চীন থেকে আসছে সুখবর। এর ফলে চীনের শাসকদের কপালে অবশ্য ঘাম ফুটে উঠতে পারে। চীনের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২, ৭৪, ৪০০টি কিন্ডারগার্টেন স্কুলের মধ্যে ১৪,০০০টি ২০২৩ সালে বন্ধ করতে হয়েছে, কারণ স্কুলগুলিতে কোনও স্টুডেন্ট ছিল না। আসলে, চীনের জনসংখ্যা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। সেখানকার যুবক-যুবতিরা এখন কেরিয়ার সচেতন এবং বুঝতে শিখেছে, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।

একদিকে হয়তো এটা প্রকৃতির পরিপন্থী কিন্তু বিশ্বের জন্য ভালো। প্রায় প্রতিটি দেশের শাসকদের ভয় আছে যে, জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকলে খাদ্য জোগান দেওয়া, চাকরি দেওয়া, বাসস্থানের ব্যবস্থা করা মুশকিল হবে। অবশ্য শাসকের ভয় এখন কমেছে। কারণ তরুণ জনগোষ্ঠী এখন নিজেদের স্বার্থে চায় ছোটো পরিবার। তারা নিজেরা ভালো ভাবে বাঁচতে চায়। ভবিষ্যতে বংশ রক্ষা হবে কী করে এবং মৃত্যুর পর কে শ্রাদ্ধকর্ম করবে— এইরকম হাস্যকর বিষয়গুলি নিয়ে ভাবতে নারাজ আজকের প্রজন্ম।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে, ধর্মের দোকানদাররা এবং রাজারা নারীদের সন্তান জন্মদানের যন্ত্রে পরিণত করেছিল, যাতে তাদের ছেলেদের যুদ্ধে পাঠানো যায় এবং মেয়েদের যৌন আনন্দের জন্য রাখা যায়। প্রতিটি সমাজ ও প্রতিটি ধর্মেই এই সূত্র ছিল। মেয়েরা শুধু পুরুষদের শারীরিক সুখদানের জন্য, সন্তান ধারণের জন্য, বাড়িঘর দেখাশোনা করার জন্য এবং তাদের খাবার রান্না করার জন্য গুরুত্ব পেত। বলা যায়, তারা ছিল একপ্রকার গৃহপালিত দাসী।

কিন্তু আজ নারীরা ক্ষমতাশালী। যে-কোনও মেয়ে আজ গর্ব অনুভব করতে পারে যে, সে সব কাজ করতে পারে। রণক্ষেত্রের পাশাপাশি রাজনীতিতেও পিছিয়ে নেই মেয়েরা। কিন্তু তাদের মূল্যায়ণ তখনই সম্ভব, যখন শুধু শহরে নয়, গ্রামের মেয়েরাও কেবল সন্তান উৎপাদনের কাজে নিয়োজিত না হয়ে, তাদের অধিকার বুঝে নেবে।

তবে, আশার কথা এই যে, এখন ধীরে ধীরে মানুষ বুঝতে শিখেছে, তাই জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে। তাই এখন মেয়েদের মূল্য বিচার হবে, মর্যাদা পাবে এবং নারীশক্তির কল্যাণে দেশের কল্যাণ হবে, পৃথিবীর কল্যাণ হবে। আর নারী-পুরুষের এই স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগীতা কিছু পুরুষের আলস্য দূর করবে।

জনসংখ্যা বৃদ্ধি বিষয়ক উদ্বেগ এখন কমছে। আজ আমরা অনুভব করছি যে, জনসংখ্যা বৃদ্ধি আসলে ক্ষতিকারক। ছোটো পরিবার-ই আসলে সুখী পরিবার। আর পৃথিবীর জনসংখ্যা যদি নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, খাদ্যের জোগান প্রভৃতি নিয়ে সমস্যা কমবে, মানুষ খুশি থাকবে। আর খুশি থাকলেই শান্তি বজায় থাকবে, অপরাধ কমবে। রান্নাঘরের কাজও কমে যাবে। আর জনসংখ্যা আয়ত্তের মধ্যে থাকলে, সমাজের প্রত্যেকে প্রত্যেককে সম্মান করবে, মর্যাদা দেবে।

বর্ষায় কার ড্রাইভিং-এর ট্রিকস

বর্ষার বারিধারা গ্রীষ্মের তপ্ত ধরনির বুকে শীতলতার প্রলেপ লাগায় ঠিকই, সেইসঙ্গে সবুজ গাছগাছালি, প্রাণীজগৎ, এমনকী মানুষও শীতল প্রলেপে নতুন করে সজীবতা লাভ করে। কিন্তু এত সুবিধা সত্ত্বেও, এই মরশুমে রাস্তায় জলকাদা ভরে যাওয়া থেকে জায়গায় জায়গায় গর্ত হয়ে সেগুলো জলে ভরে যায়। এই সমস্যাগুলোর কারণে গাড়িও অনেকসময় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই বর্ষার সময় গাড়ি নিয়ে রাস্তায় বেরোলে কিছু সাবধানতা অবলম্বন করা একান্ত দরকার। এই সাবধানতাগুলো মেনে চললে গাড়ির সেলফ লাইফ যেমন বাড়বে, তেমনই রাস্তার মাঝে গাড়ি নিয়ে আপনাকে অসুবিধায় পড়তে হবে না।

O বর্ষার আগে গাড়ির সার্ভিসিং করান। ইঞ্জিন অয়েল, এয়ার ও ফুয়েল ফিলটার বদলাবার সঙ্গে সঙ্গে সাসপেনশন জয়েন্ট, সাইলেন্সার পাইপও অবশ্যই চেক করিয়ে নিন। কারণ বর্ষায় এই পার্টস বিশেষ ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়

O বর্ষায় রাস্তায় জায়গায় জায়গায় কাদামাটি জমা হয়ে থাকে। ফলে টায়ার স্কিড (পিছলে যাওয়া) করার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। এই সমস্যা রোধ করতে ৪-৫ বছরের পুরোনো ঘষে যাওয়া টায়ার বদলে নেওয়া বাঞ্ছনীয়। স্টেপনিও ভালো আছে কিনা দেখে সবসময় সঙ্গে রাখুন, যাতে দরকার পড়লে তৎক্ষণাৎ ব্যবহার করতে পারেন

O গাড়ির সমস্ত লাইট চেক করিয়ে নিন। লাইট-এর কাচে ক্র্যাক থাকলে বদলে নিন। নয়তো জল ঢুকে বাল্ব শর্ট হয়ে যেতে পারে

O বর্ষার মধ্যে নতুন রাস্তা বেছে না নিয়ে, পুরোনো চেনা রাস্তাই ব্যবহার করা ভালো। কারণ চেনা রাস্তায় গাড়ি চালালে কোথায় জলকাদা জমে আছে তা জানা থাকে, ফলে অ্যাক্সিডেন্টের চান্স কমানো যায়

O বৃষ্টির মধ্যে গাড়ি চালাবার সময় ডিপার অন করে চলুন, যাতে সামনের গাড়ির ড্রাইভার আপনার স্থিতি বুঝতে পারে

O গাড়ির ভিতর পরিষ্কার করে ফুট কভার-এ কাগজ বিছিয়ে নিন, যাতে কাগজ নোংরা হয়ে গেলে দু-তিন দিনে বদলে দিতে পারেন। এর ফলে গাড়ির ভিতর এবং ফুট কভার কোনওটাই নোংরা হবে না

O বৃষ্টিতে গাড়ি ভিজে গেলে সেটা কভার দিয়ে ঢেকে না রেখে, খুলে রাখাই ভালো। ভেজা অবস্থায় ঢেকে রাখলে গাড়িতে মরচে ধরতে পারে

O গাড়ি চালাবার সময় সঙ্গে বাচ্চা থাকলে, নিজের সঙ্গে খাওয়ার জল, বিস্কুট, চিপস ইত্যাদি রাখুন যাতে রাস্তার মধ্যে নামতে না হয় গাড়ি থেকে

O বর্ষার মরশুমে গাড়ি চালাবার সময় একটা ছাতা এবং একটা ছোটো তোয়ালে সবসময় সঙ্গে রাখুন

O আপনার অফিস এবং কার পার্কিং করার জায়গার মধ্যে যদি দূরত্ব বেশি থাকে, তাহলে সঙ্গে রেনকোট রাখুন যাতে আপনাকে একটুও না বৃষ্টিতে ভিজতে হয়

O যদি আপনাকে বৃষ্টির মধ্যে দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে হয় এবং পৌঁছোতে রাত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে সঙ্গে টর্চ অবশ্যই রাখবেন, কারণ যে-কোনও মুহূর্তে টর্চের প্রয়োজন হতে পারে

O বৃষ্টির বেগ যদি খুব বেশি থাকে তাহলে সুবিধামতো জায়গায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখুন। কারণ প্রচণ্ড বৃষ্টিতে সামনে পিছনে কিছু দেখা না গেলে, অন্য গাড়ির স্থিতি বুঝতে পারা বা আন্দাজ করা মুশকিল হতে পারে।

গাড়ি জলে আটকে পড়লে

বৃষ্টিতে রাস্তায় জল জমে থাকলে অনেক সময় গাড়িতে জল ঢুকে গাড়ি আটকে যেতে পারে। এই অবস্থায় জোর করে গাড়ি বার করার চেষ্টা না করে, ব্রেকডাউন সার্ভিস কোম্পানিকে ফোন করুন। তারাই গাড়ি ওখান থেকে বার করে দেবে। যদি কোনও অজানা রাস্তা দিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন হয়, জিপিএস-এর সাহায্যে নিরাপদে পৌঁছোতে পারবেন।

‘বেঙ্গল প্রো টি-টোয়েন্টি লিগ’-এর সূচনা পর্বে গান গেয়ে ইডেন মাতালেন সুনিধি

এবার মহা ধূমধামে শুরু হয়েছে বেঙ্গল প্রো টি-টোয়েন্টি লিগের দ্বিতীয় সিজন। ১১ জুন বুধবারের গোধূলি লগ্নে ইডেন গার্ডেন্স-এ এই লিগের সূচনা হয় আনুষ্ঠানিক ভাবে। শুরুটা ছিল বেশ জমকালো এবং সুরেলা। বলিউড গায়িকা সুনিধি চৌহান দর্শকদের মাতিয়ে দিয়েছেন গান শুনিয়ে।

এই ক্রিকেট টুর্নামেন্ট-এর শুরুর দিনটিতে সকাল থেকে ছিল বৃষ্টির আবহ। আর তাই বিক্ষিপ্ত বৃষ্টির কারণে ম্যাচ শুরু হওয়ার আগে পর্যন্ত ঢেকে রাখা হয়েছিল মাঠের পিচ। তবে বিকেলের দিকে আবহাওয়া স্বাভাবিক হওয়ার ফলে স্বস্তি ফিরে আসে সবার এবং জমকালো অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে শুরু হয় বেঙ্গল প্রো টি-টোয়েন্টি লিগের দ্বিতীয় সিজন।

বিকেল ঠিক ৫টা ৩৭ মিনিটে ইডেন গার্ডেন্স-এর মঞ্চে এসে সুনিধি শুনিয়েছেন একের পর এক গান। ‘ধুম মচালে’ থেকে শুরু করে ‘বে-ইন্তেহান’ প্রভৃতি হিট গানে, সুনিধি চিত্ত জয় করে নিয়েছেন মাঠে উপস্থিত ক্রিকেট-প্রেমীদের। গানের সঙ্গে নাচের ছন্দ আর রঙিন আলোয় ধামাকাদার ছিল সূচনা-পর্ব।

টানা এক ঘন্টা দশ মিনিট সুনিধি-র গানে মেতে থাকার পর, দর্শকরা পেয়েছেন আরও অনেক চমক। মাঠের উদবোধনী অনুষ্ঠানে ভারতীয় ক্রিকেটের প্রাক্তন অধিনায়ক সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় ছাড়াও, ক্রীড়া তারকা ঝুলন গোস্বামী এবং ঋদ্ধিমান সাহা-র উপস্থিতি, ক্রীড়াপ্রেমীর আনন্দে ভরিয়ে দিয়েছে। এরই পাশাপাশি, সুজিত বোস, অরূপ বিশ্বাস, দেবাশীষ কুমার এবং সিএবি-র সভাপতি স্নেহাশীষ গঙ্গোপাধ্যায়-এর উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। এঁদের সবার উপস্থিতিতে প্রদর্শিত হয় ‘বেঙ্গল প্রো টি-টোয়েন্টি লিগ’-এর ট্রফি।

প্রথম ম্যাচের প্রতিযোগী ছিল ‘সোবিস্কো স্ম্যাশার্স মালদা’ (এসএসএমকে) বনাম ‘মুর্শিদাবাদ কিংস’ (এমকে)। এমকে টস-এ জিতে এসএসএমকে ব্যাট করতে পাঠায়। এসএসএম ১৯.৩ ওভারে ১১৩ রানে অলআউট হয়। সৈয়দ ইরফান আফতাব ৪ উইকেট নেন। অধিনায়ক ঋত্বিক চ্যাটার্জি ৩০ রান করেন। অর্থাৎ, এমকে ২২ বল বাকি থাকতেই ৭ উইকেটে ম্যাচটি জিতে নেয়। উল্লেখ্য, এমকে ১৬.২ ওভারে ৩ উইকেটে ১১৯ রান করেন। ঋষভ চৌধুরী ৫৯ রান করেন(অপরাজিত) এবং ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন।

‘বেঙ্গল প্রো টি-টোয়েন্টি লিগ’-এর ছিল দুটি পার্ট। একটা পার্ট-এর প্রতিযোগী পুরুষদের দল এবং অন্য পার্ট-এ প্রতিযোগিতায় লড়ছেন মহিলাদের দলগুলি। খেলা শুরু হয়েছে ১১ জুন ২০২৫ এবং খেলা চলবে ২৮ জুন ২০২৫ তারিখ পর্যন্ত। পুরুষদের ফাইনাল এবং মহিলাদের ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে ২৮ জুন ২০২৫-এ।  মাঠে ধীরে-ধীরে দর্শক-সংখ্যা বাড়ছে। সবাই বেশ উপভোগ করছেন ‘বেঙ্গল প্রো টি-টোয়েন্টি লিগ’-এর সিজন-টু। কলকাতা, মুর্শিদাবাদ, ডায়মন্ড হারবার, মেদিনীপুর, শিলিগুড়ি, হাওড়া, মালদা প্রভৃতি জেলার ক্রিকেট দলগুলির খেলা উপভোগ করতে পারবেন দর্শকরা।

বিকল্প বিনিয়োগ লাভজনক

আর্থিক লাভ পেতে, কমার্শিয়াল এবং রেসিডেনশিয়াল দুই ধরনের প্রপার্টিতেই টাকা ইনভেস্ট করা যেতে পারে। রেসিডেনশিয়াল প্রপার্টিতে সব শ্রেণির অর্থাৎ উচ্চবিত্ত থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত সকলেই বিনিয়োগে আগ্রহী হন কিন্তু কমার্শিয়াল প্রপার্টির ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের থেকে উচ্চবিত্ত শ্রেণিই বেশি আগ্রহ দেখিয়ে থাকেন। কিন্তু এখন ট্রেন্ড বদলাচ্ছে। সাধারণ মধ্যবিত্তরাও দ্রুত লাভের আশায় কর্মাশিয়াল প্রপার্টিতে বিনিয়োগ করছেন।

রিয়েল এস্টেট বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন কমার্শিয়াল প্রপার্টির বাজার একটু খারাপের মুখে। যদি কোনও বিনিয়োগকারী প্রাইম লোকেশনে লাভজনক প্রপার্টি কিনতে সফল হন, তবে দীর্ঘ মেয়াদ শেষে বেশ মোটা অঙ্কের একটা লাভ তিনি অবশ্যই তুলতে পারবেন। এর মধ্যে প্রপার্টির দাম যদি অল্পবিস্তর কমেও যায়, তাহলেও বিনিয়োগের উপর তার কোনও প্রভাব পড়বে না। কিন্তু বিনিয়োগের জন্য যখন প্রাইম লোকেশনে প্রপার্টি কিনতে মনস্থির করবেন, তখন সেখানে প্রপার্টির চাহিদা কীরকম, কত ইনভেস্ট করতে গ্রাহকরা আগ্রহী ইত্যাদি বিষয়ে একটা রিসার্চ করে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

বিনিয়োগের কৌশল

কমার্শিয়াল প্রপার্টিতে বিনিয়োগ তিন ভাবে করা যায়। প্রথমত, কমার্শিয়াল বিল্ডিংটি যে ডেভেলপার, তার কাছ থেকে সরাসরি অফিস স্পেস ক্রয় করা যেতে পারে। এছাড়াও ডেভেলপার কোম্পানির শেয়ারও কেনা যায় অথবা এমন রিয়েল এস্টেট ফান্ড-এ বিনিয়োগ করা যেতে পারে, যেখানে থাকবে শুধু কমার্শিয়াল বিল্ডিং তৈরির উপরেই সম্পূর্ণ ফোকাস্ড। এই ধরনের বিনিয়োগে যেহেতু একটা মোটা অঙ্কের টাকার প্রয়োজন হয়, তাই অনেক ভেবেচিন্তে, খবর সংগ্রহ করে তবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

প্রাইম লোকেশনে ছোটো জায়গা হলেও সেটা লাভজনক হতে পারে। ভালো লোকেশনে গ্রাহক পাওয়ার কোনও অসুবিধা হয় না। নিজের ব্যাবসা থাকলে এই স্পেস নিজের প্রয়োজনেও ব্যবহার করা যেতে পারে। কমার্শিয়াল প্রপার্টিতে বিনিয়োগ করার সবথেকে বড়ো সুবিধা হল, মুদ্রাস্ফীতি এবং শেয়ার মার্কেটে ক্ষতির সম্ভাবনার হাত থেকে সুরক্ষিত রাখে। কমার্শিয়াল প্রপার্টি কেনার জন্য ব্যাংক, প্রপার্টির ট্রু ভ্যালুর ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ঋণ দেয় এবং রেসিডেনশিয়াল প্রপার্টির ক্ষেত্রে ট্রু ভ্যালুর ৭০ থেকে ৮৫ শতাংশ ঋণ মঞ্জুর করে ব্যাংক। যে ঋণ নিচ্ছে তার শোধ করার ক্ষমতা কতটা, সেটা নির্ধারণ করেও ঋণ কতটা দেওয়া হবে, সেটা ঠিক করে ব্যাংক।

তবে, রেসিডেনশিয়াল প্রপার্টি কেনার পর ফেলে না রেখে, ভাড়া দিয়ে ঋণের টাকা শোধ করতে পারেন। দেখবেন, কয়েক বছর ভাড়া দিতে পারলেই লোনের টাকা শোধ হয়ে গিয়ে একসময় ওই প্রপার্টি ফ্রি-তে পাওয়া মনে হবে। কিন্তু এই ক্ষেত্রে একটা বিষয় মনে রাখতে হবে যে, আইনমাফিক মাত্র এগারো মাসের চুক্তিতে ভাড়াটে বসাতে হবে। সেইসঙ্গে, ভাড়া দেওয়ার আগে ভাড়াটের ব্যাকগ্রাউন্ড ভালো কিনা যাচাই করে নেবেন যতটা সম্ভব। সবচেয়ে ভালো হয় যদি কলেজ স্টুডেন্টদের কিংবা সরকারি চাকরিজীবীদের ভাড়া দিতে পারেন। তবে যাকেই ভাড়া দেবেন, তার থেকে রেসিডেনশিয়াল প্রুফ নেবেন এবং রেফারেন্স পার্সন-কে উইটনেস হিসাবে রাখতে ভুলবেন না।

বাজার বুঝে নেওয়া জরুরি

প্রপার্টিতে বিনিয়োগ কিন্তু কোনও সহজ কাজ নয়। টাকা ইনভেস্ট করার জন্য যে প্রপার্টি বেছে নিচ্ছেন, সেটা আদৌ কোনও লাভের মুখ দেখাবে কিনা তা মার্কেট রিসার্চ করে তবেই বিনিয়োগ করা উচিত। প্রপার্টি-টি কীরকম জায়গায় অবস্থিত, তার চাহিদা কীরকম, সেখানে কী কী অসুবিধা রয়েছে, সবকিছুই ভালো ভাবে খোঁজখবর নেওয়া প্রয়োজন। ভালো করে খোঁজ না নিয়ে প্রপার্টির ডিল করলে এমনও হতে পারে যে, সেই প্রপার্টির চাহিদা বাড়তে প্রচুর সময় পার হয়ে যাবে অথবা ওই প্রপার্টি থেকে লাভ ওঠাতে গেলে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে। প্রত্যেক এরিয়ার কমার্শিয়াল প্রপার্টির দাম সবসময় আলাদা আলাদা হয়। আর একটা বিষয়— বিনিয়োগকারীকে মাথায় রাখতে হবে যে, অর্থব্যবস্থা, জব মার্কেট এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির স্থিতি, সবকিছু প্রপার্টি বাজারের অনুকূলে রয়েছে কিনা।

আইনি বিষয়

তাড়াহুড়ো করে প্রপার্টিতে বিনিয়োগ করা কখনও-ই উচিত নয়। বিনিয়োগের আগে প্রপার্টির বিল্ডার সম্পর্কে পুরো খোঁজখবর নিয়ে নেওয়া উচিত। তার পুরোনো রেকর্ড ঘাঁটা উচিত। প্রপার্টিটা নিয়ে কোনওরকম বিবাদ রয়েছে কিনা সেটাও ভিতরে ভিতরে জানার চেষ্টা করতে হবে। এর জন্য প্রপার্টির সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেকটি কাগজপত্র আইনগত ভাবে সঠিক আছে কিনা, সেটা নিজেকে দেখে নিতে হবে।

এছাড়াও, প্রপার্টি-র কন্ডিশন, প্রপার্টি ট্যাক্স, বিল্ডিং ইনশিয়োরেন্স ইত্যাদি পরীক্ষা করে নেওয়া দরকার। অফিস স্পেস- এর ক্ষেত্রে আর্থিক লাভের সম্ভাবনা কতটা রয়েছে, তাও ভালো করে খতিয়ে দেখা দরকার। এইসব তথ্য পরিষ্কার করে জেনে নেওয়ার জন্য পরামর্শ নিতে পারেন কোনও ভালো উকিল এবং রিয়েল এস্টেট কনসালট্যান্ট-এর সঙ্গে।

ত্রিপুরা-সফর (শেষ পর্ব)

যদিও একদিনেই সব মন্দির দেখা হয়নি, তবু অন্যদিনে দেখা ‘চতুর্দশ দেবতা মন্দির’-এর কথা এখানেই বলে নিচ্ছি। জনশ্রুতি— মহাভারতের যুগেও চতুর্দশ দেবতার পুজোর প্রচলন ছিল। পুজো করতেন ত্রিপুরার রাজা ত্রিলোচন। পরবর্তীকালেও ত্রিপুরার রাজপরিবারের দ্বারা পূজিত হয়ে আসছেন চতুর্দশ দেবতাগণ।

১৭৭০ খ্রিস্টাব্দের আগে এই চতুর্দশ দেবতার অবস্থান ছিল পুরাতন রাজধানী উদয়পুরে। সামশের গাজীর কাছে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে মহারাজ কৃষ্ণকিশোর মাণিক্য উদয়পুর থেকে পুরাতন আগরতলার খয়েরপুরে রাজধানী স্থানান্তরিত করার সময় চতুর্দশ দেবতার বিগ্রহ সঙ্গে নিয়ে আসেন এবং মন্দির স্থাপন করেন। পুনরায় ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দে রাজধানী বর্তমান আগরতলায় স্থানান্তরিত হলেও চতুর্দশ দেবতার মন্দির খয়েরপুরেই রয়ে যায়।

মন্দিরের আকার স্বতন্ত্র। বৃত্তাকার চালার মন্দিরটি দূর থেকে দেখে মনে হয় যেন চাষিদের মাথায় পরার যে টোকা, অনেকটা সেইরকম। বৌদ্ধস্তূপের সাদৃশ্যও আছে। মন্দির সংলগ্ন এক বিশাল পুষ্করিণীও আছে। মন্দির দর্শন হলেও বিগ্রহ দর্শন হল না। পুজো- সামগ্রীর দোকান থেকে কেনা ছবি অনুযায়ী দেবতাগণ হলেন— শংকর, শংকরী, বিষ্ণু, লক্ষ্মী, বাগদেবী, কার্তিক, গণপতি, ব্রহ্মা, পৃথিবী, সমুদ্র ভাগীরথী, অগ্নি, প্রদ্যুন্ম এবং হিমালয় পর্বত।

জুলাই মাসের শুক্লা সপ্তমী তিথিতে এই মন্দিরে ত্রিপুরার জাতীয় উৎসব ‘খটি পুজো’ জাঁকজমক সহকারে অনুষ্ঠিত হয়। কবিগুরুর ‘রাজর্ষি’ উপন্যাসে উল্লেখ আছে এই চতুর্দশ দেবতাগণের কথা।

পার্ক উদ্যান লেক

ত্রিপুরা ভ্রমণে বেশ কিছু পার্ক, উদ্যান, ইকো-পার্ক, ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারি ঘুরেছি। পার্কগুলি আঞ্চলিক প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য— বড়োমুড়া ইকো-পার্ক, থুমলওণ্ড পার্ক, তৃষ্ণা ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারির বাইসন পার্ক, বাটারফ্লাই পার্ক, তেপানিয়া ইকো-পার্ক এবং অবশ্যই দর্শনীয়- ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী উদ্যান।

এই পার্কগুলিতে দেখা যাবে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নানান প্রজাতির বাঁশ গাছ, গাছপালা, অর্কিড, ফুল। কোথাও বা লেকের জলে নৌকাবিহারের আয়োজন। লগ-হাট…। ফুল পাখিদের সমাগমে সুসজ্জিত পার্কগুলি রঙিন সজীব। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের ডালি নিয়ে প্রকৃতিপ্রেমীদের সামনে হাজির এইসব পার্ক উদ্যান।

আগরতলা থেকে প্রায় একশো পনেরো কিলোমিটার দূরে রাইমা এবং সাইমা নদীর বহতা জলধারায় সমৃদ্ধ ‘ডম্বুর লেক’। লেকটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অপরূপ ! জলবিহারের ব্যবস্থা আছে। বিশাল লেকের মাঝে বেশ কিছু দ্বীপ আছে। তার মধ্যে সুসজ্জিত ‘নারকেল কুঞ্জ’ দ্বীপটি পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় করে তোলা হয়েছে। কাছেই গোমতীর উৎসস্থল। পৌষ সংক্রান্তির দিন এখানে ‘তীর্থমুখ’ উৎসব পালিত হয়। শীতকালে প্রচুর পরিযায়ী পাখিদের সমাগম হয়।

ফ্যাশন শোয়ের ফটোশুট!

আগরতলায় এলে ‘সিপাহীজলা ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারি’ অবশ্য দর্শনীয়। প্রবেশমূল্য কুড়ি টাকা। সমগ্র এলাকা ঘুরে দেখতে হলে সাইকেল ভাড়া নেওয়ার ব্যবস্থা আছে। এটি ‘ক্লাউডেড লেপার্ড ন্যাশনাল পার্ক” নামেও পরিচিত। নানান ধরনের জীবজন্তু, বন্যপ্রাণীর দেখা তো মিলবেই, সেই সঙ্গে দেখা মিলবে ক্লাউডেড লেপার্ড এবং চশমা বাঁদর। এই প্রাণী দুটি ভারতের খুব কম চিড়িয়াখানাতে দেখতে পাবেন। এক কথায় বিরলদর্শন।

ক্লাউডেড লেপার্ডদের হাবভাব বেশ গম্ভীর, রাশভারি। আর চশমা বাঁদররা ঠিক তার উলটো ছটফটে, রসিক। ক্যামেরা তাক করলেই যা সব ভঙ্গিমা দেয়, তা যেন ফ্যাশন শোয়ের ফটোশুট! কৃত্রিম লেকে জলবিহারের ব্যবস্থা আছে। এটা অনেকটা বোটানিক্যাল গার্ডেনও বটে। নানান প্রজাতির গাছ-গাছালি, অর্কিড আর প্রজাপতিদের ওড়াউড়িতে জমজমাট।

আগরতলা থেকে প্রায় ২২০ কিলোমিটার দূরে, তিন হাজার ফুট উচ্চতায় অপূর্ব নৈসর্গিক শোভাসমৃদ্ধ চিরবসন্তের দেশ জম্পুই পাহাড় ত্রিপুরা সফরে অবশ্য দর্শনীয়স্থল। নিজেদের কিছু অসুবিধার কারণে এবং বৃষ্টিতে রাস্তা খারাপ থাকার খবর পেয়ে জম্পুই যাওয়ার পরিকল্পনা বাতিল। বেড়াতে গিয়ে অনেক সময়ই পরিস্থিতির কারণে দু-একটা জায়গা অদেখা থেকে যায় এবং তা মেনেও নিতে হয়।

জম্পুই পাহাড়ের প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলি অপরূপ। সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত দৃশ্য অসাধারণ। তাছাড়া, মেঘের স্তর পরিবেষ্টিত পাহাড়শ্রেণির শোভা অপূর্ব। উৎকৃষ্টমানের কমলালেবু উৎপাদনে বিখ্যাত জম্পুই পাহাড়। আগরতলায় বসে জম্পুইয়ের কমলালেবুর স্বাদ নিতে অবশ্য ভুলিনি।

পুরাতত্ত্বের আঙিনায়

ত্রিপুরার পুরাতত্ত্বের নিদর্শন রয়েছে যে দুটি জায়গাতে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য দর্শনীয়স্থল ‘পিলাক’ এবং ‘বক্সানগর’। খ্রিস্টিয় অষ্টম থেকে দশম শতকের মধ্যে নির্মিত হিন্দু ধর্মের শৈব, সৌর, বৈষ্ণব পন্থা এবং বৌদ্ধ ধর্মের হীনযান, মহাযান, বজ্রযান পন্থার নানান প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনসমৃদ্ধ পিলাক দেখে মনে হল এগুলির সংরক্ষণ জরুরি।

পিলাক-এ আছে বেশ কিছু মূর্তি-ভাস্কর্যর নিদর্শন, যার অধিকাংশই ক্ষয়প্রাপ্ত। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য— সূর্য, বিষ্ণু, নৃসিংহ, গণপতি, লক্ষ্মী, মহিষাসুরমর্দিনী, শিবলিঙ্গ, অবলোকিতেশ্বর প্রভৃতি। শোনা গেল, ভারতের সর্ববৃহৎ সুর্যমূর্তিটি এখানেই রয়েছে। দেখলাম, তবে খুবই ক্ষয়প্রাপ্ত। এখানে আছে একটি ছোটো সংগ্রহশালা। সেখানে প্রদর্শিত নানান প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন।

আগরতলা থেকে বক্সানগরের দূরত্ব ৩৮ কিলোমিটার। বিশালগড় সাব-ডিভিশনের জঙ্গলাকীর্ণ অঞ্চল পরিষ্কার করতে গিয়ে অতি সম্প্রতি বেশ কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন মিলেছে। খননকার্যে একটি বুদ্ধমূর্তি পাওয়া গেছে। ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ সংরক্ষিত অঞ্চলটির পথের দু’পাশে রেলিংঘেরা সবুজ লনের মধ্যে ইটের গাঁথুনি-ভিত্তি দেখে মনে হল, বৌদ্ধ স্তূপের কিংবা বিহারের অবশিষ্টাংশ। এই স্থলের প্রাচীনত্ব সম্বন্ধে এখনও বিশেষ কিছু জানা যায়নি।

রোমাঞ্চকর জলযাত্রা

সকাল সকাল চলেছি উদয়পুর। সেখান থেকে আঁকাবাঁকা জঙ্গলপথ, হাতিদের চলপথ এড়িয়ে পৌঁছালাম অমরপুর। ট্যুরিস্ট লজ- এ রিফ্রেশ হয়ে চলেছি গোমতীর তীরে ছবিমুড়া। ত্রিপুরার অধিকাংশ জায়গাতেই পথের ধারে, গাছের নীচে পুজো হয়ে যাওয়া মাটির মূর্তি রেখে যাওয়ার নিদর্শন মেলে। সম্ভবত এখানে দেব মূর্তির জলে বিসর্জনের প্রথা নেই। অথচ, পুষ্করিণীর অভাব নেই।

আজ আমাদের ছবিমুড়া অভিযানের পথপ্রদর্শক সাগরিকার তরুণ ম্যানেজার মহাশয়। তৎসহ বোট চালক ও তাঁর সহকারী। এঁদের দক্ষতা এবং সহায়তা ব্যতীত এমন রোমাঞ্চকর ‘ছবিমুড়া-দেবতামুড়া’ অভিযান সম্ভবপর হত না।

বোটের ইঞ্জিনের শব্দের সঙ্গে গোমতীর জলে ঢেউ তুলে যতই এগোচ্ছি, দু-পাশে সুউচ্চ পাহাড়শ্রেণির শরীর জুড়ে সবুজ গাছ-গাছালিরা জলের আলিঙ্গনে একাকার! কিছু অংশের উন্মুক্ত পাথরের গায়ে ‘বা-রিলিধর্মী” অপূর্ব দেবদেবীর ভাস্কর্যের নিদর্শন অবাক করছে। এর মধ্যে দেখা যাচ্ছে দেবাদিদেব মহাদেব, ভগবান বিষ্ণু, কার্তিকেয়, নরসিংহ, বুদ্ধদেব সহ নানান মূর্তি, অধিকাংশই জলবায়ুর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত। ক্ষয়প্রাপ্ত।

আরও কিছুটা এগোতেই অবাক করা এক মহিষাসুরমর্দিনীর মূর্তির ভাস্কর্য! স্থানীয় অধিবাসীদের কাছে ইনি ‘চকরক-মা’ নামে পরিচিত। দেবীর শিরোভূষণ, কর্ণালঙ্কার এবং সর্পাকৃতি কেশবিন্যাস অভিনব! ভাস্কর্যের সহজ সরল ফর্মে আদিম কলা-শৈলীর অনন্য প্রকাশ!

একটু পথ এগিয়ে বোটের মুখ ঘুরল। সামনেই গিরিখাত। ঘন গাছপালা, পাথরের খণ্ড, পড়ে থাকা ভাঙা গাছের ডালপালা, গুড়ি, লতাগুল্ম ছাওয়া গিরিখাতে রোদের দেখা সামান্য। এসবের মধ্যে দিয়েই তিরতির বয়ে আসছে জলের ধারা। সেই জলধারার হালকা শব্দের সঙ্গে সঙ্গত করছে অনবরত ঝিঁঝিঁপোকাদের ঐকতান। অনেকের মতে ছবিমুড়া নাকি ‘ভারতের অ্যামাজন’!

চিচিংফা-র ধনসম্পদ!

জলধারার পাশ কাটিয়ে, মাটি পাথরের উপর সতর্ক পা ফেলে চলেছি। দু-পাশে পাথরের দেয়াল থেকে টুপ টাপ জল ঝরছে। দ্বিধা এবং ভয়মিশ্রিত মনে এগোচ্ছি। বিপদসঙ্কুল অথচ অপার্থিব সৌন্দর্য-পথ! পাথরের খাঁজে পা রেখে এগোনো অসম্ভব। জুতো খুলে প্যান্ট গুটিয়ে হাঁটুজলে নামতে হল। জলে মৌরলা মাছদের খেলা, ডাঙায় নিরাপদ দূরত্বে ছোটো ছোটো সাপ, বিছে! বুঝলাম, এই পথে একা আসার চেষ্টা নৈব নৈব চ। পথপ্রদর্শক চাই-ই। মাঝে মাঝেই পড়ে আছে খণ্ডপাথরে হালকা খোদিত রেখাচিত্র। তার উপর শ্যাওলা ফার্ণের জড়াজড়ি। অনেক উঁচু থেকে ঝুলছে পাহাড়ি বৃক্ষলতা। মনে পড়ছে টারজান চলচ্চিত্রের কথা!

সামনেই গুহামুখ, ডানদিকের দেয়ালে। টর্চের আলোয় যতটুকু দেখা গেল তাতে ভিতরে প্রবেশের সাহস হল না। বেরিয়ে এলাম। কথিত— এই গুহার মধ্যে কোথাও গচ্ছিত রয়েছে রাজা চিচিংফা-র ধনসম্পদ! সেসবের রক্ষক এক প্রাচীন সর্পদেবতা! থাক বাবা! আমরা গুপ্তধনের সন্ধানে আসিনি।

বিস্ময়কর দৃশ্য

বেশ খানিক কসরত করে সংকীর্ণ গিরিপথে আরও কিছু পথ এগোতেই দেখি গাছের ডাল, গুঁড়ি, লতা দিয়ে তৈরি একটা মই। তার পিছনে পাথরের খাঁজ বেয়ে ঝর ঝর শব্দে নেমে আসছে জলাধারা। অতি কষ্টে, সন্তর্পণে সেই মই বেয়ে উপরের সমতলে পৌঁছে বিস্ময়ে হতবাক! সুন্দরী ঝরনা। স্বল্প-পরিসর স্লেট-রঙা স্তরীভূত পাথরের খাঁজ বেয়ে আপন ছন্দে নেমে আসছে। চলেছে যে-পথে আমরা তার কাছে পৌঁছেছি, সেই গোমতীর উদ্দেশে…

জেনে নিন:

ত্রিপুরা ভ্রমণের সেরা সময়: সেপ্টেম্বর থেকে মার্চ। পোশাক: গ্রীষ্মে- হালকা, শীতে- ভারী উলেন। সঙ্গে রাখবেন: বৈধ পরিচয়পত্র, প্রয়োজনীয় ওষুধ, ড্রাই ফুড এবং জল।

কলকাতায় যোগাযোগ: ট্যুরিস্ট ইনফরমেশন সেন্টার, ত্রিপুরা ভবন, ১ প্রিটোরিয়া স্ট্রিট, কলকাতা ৭০০০৭১। ফোন: 033- 2282 5730/0624। এ ছাড়াও বেশ কিছু বেসরকারি হোটেল ও গাড়ির ব্যবস্থাপনা রয়েছে। অবশ্যই তা অনুসন্ধানসাপেক্ষ।

(সমাপ্ত)

আর্থিক সুরক্ষার ৫ উপায়

কথায় বলে, বিচক্ষণ-বিবেচক লোকের সমস্যা কম। অর্থাৎ, যে-ব্যক্তি ভবিষ্যতের কথা ভেবে পরিকল্পনামাফিক আর্থিক সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করে রাখেন, তিনি এবং তার পরিবারের সদস্যরা অনেকটাই আর্থিক ভাবে সুরক্ষিত এবং সমস্যামুক্ত থাকেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল এই যে, সুবিবেচক মানুষের সংখ্যা খুব বেশি নয়। অথচ, সবারই স্বপ্ন অনেক। নিজের একটা ভালো বাড়ি থাকবে, একটা গাড়ি থাকবে, ভবিষ্যৎ সুরক্ষার জন্য ব্যাংক-এ মোটা টাকা জমা থাকবে, ছেলেমেয়েদের ভালো স্কুল-এ পড়ানো যাবে— এমন স্বপ্ন বা ইচ্ছে থাকে প্রায় প্রতিটি মানুষেরই। কিন্তু, এই স্বপ্ন পূরণ হয় না সকলের। কারণ, টাকার মূল্য যে-ভাবে কমছে, তাতে সংসারের ব্যয়ভার বহন করার পর, খুব বেশি টাকা সঞ্চয় করা সকলের পক্ষে সম্ভব হয় না। অতএব আর্থিক সুরক্ষা পেতে হলে, বিচক্ষণতা জরুরি।

প্রস্তুতি নিন এখনই

প্রথম থেকেই বুঝে নিতে হবে, টাকা-পয়সার জোগান বন্ধ হয়ে গেলে বাস্তবে কী কী বিপদের সম্মুখীন হতে হবে। উপার্জন এবং খরচের একটা হিসেব রেখে তার থেকেই অর্থ জমাবার একটা উপায় করতে হবে। পেশা এবং জীবনশৈলীতে ছেদ টানতে পারে, এমন অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি থেকে নিজেকে এবং প্রিয়জনদের (বয়স্ক মা-বাবাও শামিল এর মধ্যে) সুরক্ষা দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত জীবনবিমা এবং স্বাস্থ্যবিমা করানো উচিত। পরিবারের জন্য সবথেকে ভালো এবং বিপন্মুক্ত ইনভেস্টমেন্ট হল জীবনবিমা এবং স্বাস্থ্যবিমা।

একক মহিলাদের নিজের উপর ভরসা রেখে ভবিষ্যতের বোঝা থেকে বাঁচার একটা উপায় খোঁজা উচিত। হঠাৎই কোনও খরচার সম্মুখীন হওয়া, যেমন— বাড়ি বা ফ্ল্যাটের মেরামতি, কোথাও বেড়াতে যাওয়া অথবা কিছুদিনের জন্য ঋণ নিয়ে সেটা শোধ করার প্রয়োজনীয়তা বা গাড়ি কেনা, ভবিষ্যতের জন্য আর্থিক ভাবে সাবলম্বী হওয়া অর্থাৎ রিটায়ারমেন্ট-এর পরের অবস্থা, ঋণ থাকলে সেটা শোধের ব্যবস্থা— এই সবকিছুর জন্যই ইনভেস্টমেন্ট করা অত্যন্ত জরুরি। যে- যোজনাগুলিতে বিনিয়োগ করলে রিটার্ন-এর সুবিধা পাওয়া যায়, সেগুলির মধ্যে রয়েছে লিকুইড ফান্ড, মানিব্যাক বিমা পলিসি, রিটায়ারমেন্ট প্ল্যান ইত্যাদি।

পুরুষদের মতো মহিলাদেরও বড়ো বড়ো স্বপ্ন দেখা উচিত। যেমন নিজের নামে জমি, বাড়ি কেনা, নিজের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করা। এর জন্য বর্তমানের প্রয়োজন কী এবং রিটায়ারমেন্ট প্ল্যান কী কী আছে, সেগুলিও মহিলাদের মনোযোগ সহকারে দেখা কর্তব্য।

যদি আর্থিক ভাবে আপনি নিজেকে স্বনির্ভর মনে করেন এবং আপনার বয়স ৪০-এর কোটা পার হয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে জেনে রাখুন— আগামী ৪০ বছরকে সুরক্ষিত করতে আপনার হাতে ১৫ থেকে ২০ বছর সময় আছে। এই পরিস্থিতিতে সবদিক ভেবে নিয়ে নিজেকে আর্থিক ভাবে সুরক্ষিত করুন।

রোজগার এবং খরচ

দৈনন্দিন সবকিছুর হিসেব রাখা শুরু করুন। হয়তো দেখবেন প্রতি মাসে এমন কিছু ব্র্যান্ডেড জিনিসের পিছনে ছুটেছেন, যেটা অর্থহীন অথচ আপনার পকেটের জন্য একটা বড়ো ভারও বটে। তাই, আয় বুঝে ব্যয় করুন। সঞ্চয় এবং বিনিয়োগ

দুটো কিন্তু আলাদা আলাদা বিষয়। খরচ না করাটাই কিন্তু ‘সঞ্চয় করা। আপনার অর্থ ব্যাংকে সেভিংস অ্যাকাউন্ট-এ পড়ে রয়েছে, যার উপর মাত্র ৪ শতাংশ সুদ পাচ্ছেন আপনি। অথচ এর উপর সরকার ‘ট্যাক্স’-ও কাটছে আপনার থেকে। যেখানে মূল্যবৃদ্ধির হার শতকরা ৬ শতাংশ, সেখানে ব্যাংকে রাখা টাকার মূল্য দিনে দিনে কমছে সেটা বলাই বাহুল্য। তাছাড়া ওই টাকাটা ভবিষ্যতের কতটা বোঝা হালকা করতে পারবে? অতএব এফডি (ফিক্সড ডিপোজিট) করে বেশি সুদ পাওয়া নিশ্চিত করুন।

প্রায়োরিটি

২০ থেকে ২৫ বছর পর কীসের প্রয়োজনীয়তা বেশি, অর্থাৎ গুরুত্ব অনুসারে কোন কাজটা আগে বাছা উচিত এবং নিজের জীবন কীভাবে কাটাব, সেই কল্পনাও আমরা বেশিরভাগই করে উঠতে পারি না। সুতরাং, ৪০ বছর বয়স পেরিয়ে যাওয়ার পরও আমরা সাপোর্ট সিস্টেম হিসেবে বিনিয়োগের প্রয়োজন উপলব্ধি করতে পারি না। বিশেষকরে মেয়েরা সামাজিক সম্পর্ক এবং পরনির্ভরতার বশবর্তী হয়ে জীবন কাটিয়ে দেন, অর্থের প্রয়োজনীয়তা বোঝার চেষ্টা খুব একটা করেন না। কিন্তু আপনি যদি একক জীবনযাপন করেন, তাহলে আপনাকে আরও বেশি সতর্ক থাকতে হবে আর্থিক সুরক্ষার বিষয়ে। সুতরাং, সময় থাকতেই রিটায়ারমেন্ট প্ল্যানগুলো নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করা খুব দরকার।

সঠিক সিদ্ধান্ত

মহিলাদের উচিত বিনিয়োগ যোজনাগুলি নিয়ে সচেতন এবং সুচিন্তিত পদক্ষেপ নেওয়া। নিজের জীবনবিমা থেকে শুরু করে, মা-বাবার স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সবরকম প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকাটা খুব দরকার। বর্তমানের কথা খেয়াল রাখার সঙ্গে সঙ্গে একক মহিলাদের, রিটায়ারমেন্টের জন্য সুরক্ষিত পেনশন যোজনায় ইনভেস্ট করা উচিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে। আসল কথা হল— এখন সময় এসেছে আর্থিক ভাবে স্বাবলম্বী মহিলাদের নিজের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার।

তাছাড়া, কোনওরকমে মোটা টাকা জমিয়ে কিংবা জমানো টাকা নিঃশেষ করে বড়ো বাড়ি কিংবা দামি গাড়ি কিনলেই তো আর সমস্যা মিটল না, বরং ঝামেলা বাড়ল। কারণ, বড়ো বাড়ি মানেই জমা দিতে হবে বেশি টাকা সম্পত্তি কর। দামি গাড়ি মানেই মেন্টেন্যান্স খরচও বেশি পড়বে। আর এই বিলাসবহুল জীবনযাপনের বিপুল খরচ মেটাতে গিয়ে অনেকসময় আর্থিক সমস্যায় পড়েন অনেকে এবং ঠিক তখনই সম্পত্তি বন্ধক কিংবা বিক্রির বিষয়টি সামনে এসে দাঁড়ায় দুর্ভাগ্যক্রমে।

এই প্রসঙ্গে প্রথমেই জানিয়ে রাখি, কোনও বিপদ কিংবা প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হলেও, চট করে জমি-বাড়ি বিক্রি না করে, বন্ধক রাখার সিদ্ধান্ত নেবেন। কারণ, আপনি যে দামে জমি-বাড়ি বিক্রি করবেন, সেই দামে আর জমি-বাড়ি কিনতে পারবেন না। তাছাড়া, জমি কিংবা বাড়ি বিক্রির পর আপনার আর্থিক সমস্যা মিটতে নিশ্চয়ই অনেকদিন গড়িয়ে যাবে এবং ওই সময়ের ব্যবধানে জমি-বাড়ির দাম আরও বেড়ে যাবে। অবশ্য যদি একাধিক জমি-বাড়ি থাকে, সেক্ষেত্রে বিক্রির সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কিন্তু যদি তা না থাকে, তাহলে বাড়ি বিক্রির পর পুনরায় বাড়ি কেনা পর্যন্ত ভাড়াবাড়িতে আশ্রয় নিতে হবে এবং বাড়ি ভাড়া বাবদ যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হবে, তা বাড়ি বন্ধক রেখে টাকা নিয়ে সুদ মেটানোর থেকে অনেক বেশি।

কিন্তু মুশকিল হল এই যে, বেশিরভাগ মানুষ দেনার দায়ে জমি-বাড়ি হারানোর ভয়ে বন্ধক রাখতে চান না। আসলে এই ভয়ের কারণ হল অজ্ঞতা। সঠিক নিয়মকানুন জেনে বুঝে, সঠিক ভাবে চুক্তিপত্রকে মাধ্যম করে জমি-বাড়ি বন্ধর রেখে ঋণ নেন না অনেকে। অতএব, জমি-বাড়ি বিক্রি না করে, বন্ধক রেখে ঋণ নিতে হলে কী কী বিষয় গুরুত্ব সহকারে দেখে নিতে হবে, তা জেনে নিন বিশদে।

আপনার সম্পত্তির ভ্যালু অনুযায়ী আপনি তা বন্ধক রেখে কত টাকা ঋণ হিসাবে পেতে পারেন, সেই বিষয়টি জেনে নিন ঋণদাতা অর্থাৎ ব্যাংক কর্তৃপক্ষের থেকে। এবার আপনি ঠিক করুন আপনার প্রয়োজনমতো কত টাকা ঋণ নেবেন। ঋণের পরিমাণ নির্ধারণ করার পর জেনে নিন সুদের পরিমাণ কত। কতদিনে আপনি ঋণ শোধ করবেন (অর্থাৎ পাঁচ, দশ কিংবা কুড়ি বছর) তার উপর সুদের হার নির্ভর করবে। শুধু তাই নয়, ফ্লোটিং এবং ফিক্সড এই দু’ভাবে ঋণ নেওয়া যায়। ফ্লোটিং অর্থাৎ যখন যেমন সুদের হার হবে, তখন তেমন ভাবেই সুদ মেটাতে হবে।

এক্ষেত্রে ইএমআই (ইক্যুয়েটেড মান্থলি ইনস্টলমেন্ট) একই থাকবে। কিন্তু সুদ বাড়লে ঋণের মেয়াদ বাড়বে এবং কমলে ঋণের মেয়াদ কমবে। আর যদি ফিক্সড রেট-এ ঋণ নেন, তাহলে সুদের পরিমাণ অপরিবর্তিত থাকবে। তবে ফিক্সড রেট অন্তত ৪ থেকে ৫ শতাংশ বেশি থাকে ফ্লোটিং রেট-এর থেকে। অতএব, বুঝে-শুনে বন্ধকি ঋণ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিন এবং শর্তাবলি ভালো ভাবে পড়ে নিয়ে ঋণের চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করুন।

তবে মনে রাখবেন, গৃহঋণ, ব্যক্তিগত ঋণ এবং বন্ধকি ঋণ— প্রতিটি ক্ষেত্রেই কিছু নিয়মকানুন একই থাকে। যেমন, যেরকম ঋণই নিন না কেন, ঋণগ্রহীতার মাসিক আয় পনেরো হাজার টাকার বেশি হতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে, ইএমআই-এর (মাসিক প্রদেয় অর্থ) থেকে ঋণগ্রহীতার মাসিক আয় যেন দু’গুনের বেশি হয়। আর বাড়ি কিংবা জমি যাই বন্ধক রাখুন না কেন, সম্পত্তির আসল দলিল (ওরিজিনাল ডিড) ঋণদাতা-র কাছে অর্থাৎ ব্যাংক-এ জমা (বন্ধক) রাখতে হবে এবং লোন শোধ করার পর ওই দলিল ফেরত নিতে হবে।

অনেক সময় দেখা যায় যে, লোন নিয়ে জমি-কিংবা বাড়ি কিনেছেন এবং লোন শোধ করার আগেই হয়তো দুর্ভাগ্যবশত টাকার প্রয়োজন হল। এমন পরিস্থিতিতেও দ্বিতীয়বার ঋণ নেওয়া যায়। তবে এক্ষেত্রে যে-ব্যাংক আগে ঋণ দিয়েছে, তাদের থেকে লিখিত অনুমতি নিতে হবে। যদি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ দেখেন যে, দীর্ঘদিন আপনি ঋণের টাকা ঠিকঠাক শোধ করে চলেছেন, তাহলে আপনাকে ভালো গ্রাহক ধরে নিয়ে পুনরায় বন্ধকি ঋণ নেওয়ার অনুমতি দিতে পারে।

বন্ধকি ঋণ শোধ করার ক্ষেত্রে কিছু সুবিধা নিতে পারেন আর্থিক ক্ষমতা থাকলে। যেমন, যে-পরিমাণ ইএমআই আপনি দেবেন, তা বাদ দিয়ে পাঁচ হাজার, দশ হাজার যখন যেমন সুযোগ পাবেন সেই পরিমাণ টাকা জমা দিয়ে প্রিন্সিপাল অ্যামাউন্ট (সুদ ছাড়া লোনের আসল টাকা) কমিয়ে দিতে পারেন। এতে আপনার ঋণের মেয়াদ কমে যাবে এবং কম সুদ দিতে হবে। আর যদি কোনও কারণে ঋণ শোধ না করতে পারেন, তাহলে বন্ধকি জমি কিংবা বাড়ি নিজে বিক্রি করাই লাভদায়ক।

কারণ ঋণদাতা-ব্যাংক যদি ঋণের টাকা না পেয়ে বন্ধকি জমি কিংবা বাড়ি বিক্রি করতে বাধ্য হয়, তাহলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাদের প্রাপ্য বকেয়া টাকা পেয়ে যাওয়ার পর আর বেশি মাথা ঘামায় না। এতে ঋণগ্রহীতার ক্ষতি হতে পারে। তাই ঋণগ্রহীতার উচিত, ঋণের টাকা শোধ করতে না পারলে, বন্ধকি সম্পত্তি বিক্রির বন্দোবস্ত করে, ক্রেতার কাছ থেকে অগ্রিম (অ্যাডভান্স) বাবদ কিছু টাকা নিয়ে ঋণ শোধ করে কিংবা ক্রেতার নামে লোন ট্রান্সফার করে সমস্যার সমাধান করতে পারেন।

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব