অনুপ্রেরণার অন্য নাম মালবিকা আইয়ার

করোনার এই মনখারাপ করা সময়ে যখন শুধুই হতাশা গ্রাস করছে আমাদের, মৃত আত্মীয় পরিজনের কথা ভেবে কিংবা অর্থনৈতিক বিপর্যয় সামলাতে নাজেহাল আমরা, তখন আসুন একটা মন ভালো করা গল্প বলা যাক।কিছু নারী আছেন আমাদের সমাজে, যারা আচিরেই হয়ে ওঠেন অন্য বহু নারীর অনুপ্রেরণা— মালবিকা আইয়ার তেমনই একটি নাম। তিনি এক কথায় অপ্রতিরোধ্য। বোম ব্লাস্ট সার্ভাইভার, অন্তর্জাতিক স্তরের মোটিভেশনাল স্পিকার, মডেল ও একাধারে আরও এনেক কিছু৷

মালবিকার  গল্প জানতে হলে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে ২০০২ সালে। সেই অপয়া দুপুরে যা কিনা চিরতরে বদলে দিয়েছিল মালবিকার জীবন।

তেরো বছরের মেয়েটি তখন থেকেই ছিল স্টাইল ডিভা। তাদের বিকানেরের বাড়িতে  সেদিন চলছিল পার্টি। মা-বাবা ব্যস্ত ছিলেন অতিথি অভ্যর্থনায়, আর মালবিকা নানা রকম পোশাক ট্রাই করে দেখছিলেন  তাঁর নিজের বেডরুমে।  তাঁর জিন্স মেরামত করছিলেন গ্লু দিয়ে। একটা ভারী কিছুর প্রয়োজন হয়েছিল গ্লু লাগানো জায়গাটা চাপা দিতে। গ্যারাজ থেকে তুলেও এনেছিলেন একটা বড়োসড়ো পাথরের খণ্ড। ডিম্বাকৃতি ওই খণ্ডটি হাতে করে চাপ দেওয়া মাত্র বিস্ফোরণ ঘটে। বস্তুত ওটা ছিল একটা গ্রেনেড। মালবিকার বাড়ির কাছেই ছিল একটা আ্যমিউনিশন ডিপো, যেখানে বেশ কিছু মাস আগে এক ভয়াবহ বিস্ফোরণের পর, এরকম বহু গ্রেনেডের খণ্ড ছড়িয়ে পড়েছিল এলাকায়। এই দুর্ঘটনায় মালবিকা তাঁর দুটি হাত হারান, সেই সঙ্গে সারা শরীরে অজস্র ফ্র্যাকচার, নার্ভ প্যারালিসিস, হাইপোএসথেসিয়া ।

জীবন তাই বলে থেমে যায়নি মালবিকার। বরং অক্ষমতা কাটিয়ে তিনি আত্মবিশ্বাসে ভর করে আরও অনেকগুলো সাফল্যের দরজা খুলে ফেলেছেন। জীবনের বাকি ১৭টা বছর শুধুই সাফল্যের উড়ান। পরীক্ষায় স্টেট লেভেল-এ উচ্চ স্থানাধিকারী থেকে ওয়ার্ল্ড ফোরাম-এ গ্লোবাল শেপার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়া! বিষয়টি খুব সহজ ছিল না।

এখন তিনি বহু নারীর অনুপ্রেরণার উৎস। একাধারে পিএইচডি স্কলার, ফ্যাশন ডিভা, মোটিভেশনাল স্পিকার— মালবিকার আজকের পরিচয় এমন নানা ক্ষেত্রে ব্যাপ্ত।

অথচ একটা সময় এমনও পেরিয়েছেন  তিনি, যখন জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ছিল আবার নতুন করে হাঁটতে পারা। শুধু আর-পাঁচটা মেয়ের মতো সুস্থ স্বাভাবিক একটা জীবন চেয়েছিলেন সেদিন। একটাই প্লাস পয়েন্ট ছিল তাঁর, তিনি একবারের জন্যও মনের জোর হারিয়ে ফেলেননি। তাঁর মতে এটাই তাঁর জেতার সূচনা করেছিল।

ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরের ৬টা মাস হাসপাতালে খুবই যণ্ত্রণাদায়ক এবং কষ্টকর এক অধ্যায় কেটেছিল মালবিকার। বুঝেই উঠতে পারছিলেন না, সব কী করে আবার আগের মতো স্বাভাবিক হবে। সাময়িক ভাবে ডিপ্রেশন-এরও শিকার হয়েছিলেন তিনি। পরিবারের সাপোর্ট তাঁর ক্ষেত্রে একটা বিরাট ভূমিকা নিয়েছিল ওই পর্যায়ে। বেশ খানিকটা সময় লেগেছে, প্রাথমিক হীনন্মন্যতা কাটিয়ে উঠতে। তারপর তিনি আগের মতোই চালিয়ে গেছেন এক্সট্রা ক্যারিকুলার অ্যাক্টিভিটি, ফ্যাশন শো-এ অংশগ্রহণ, নাচ। জীবনকে একইরকম সুন্দর করে দেখা, একই ভাবে উপভোগ করা এবং নিজেকে বারবার বোঝানো যে, এমন একটা ঘটনা ঘটে গেছে বলেই সব শেষ হয়ে যায়নি। এটাই তাঁকে বাঁচতে সাহায্য করেছিল।

ধীরে কিন্তু আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে তিনি শিক্ষাক্ষেত্রে এগিয়েছেন। যা যা করতে চেয়েছেন  জীবনে, সেই ইচ্ছেপূ্রণের  দিকে অগ্রসর হয়েছেন। স্কুল মিস হয়েছিল অনেকগুলো মাস। তাই দ্বিগুন খেটে ঘাটতি পূরণ করে, স্টেট লেভেল-এ স্থানাধিকারী হওয়ার মতো রেজাল্ট করলেন। স্কুলে নোটস নেওয়ার সময় প্রয়োজন হয়েছে রাইটারের কিন্তু সেই প্রতিবন্ধকতা তাঁকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। ডিফারেন্টলি এবলড হওয়া সত্বেও তিনি সাফল্যের সঙ্গে অর্থনীতিতে স্নাতক হন। ক্রমে পিএইচডি।

তাঁর জীবনের আরও একটি লাইফ চে়ঞ্জিং ঘটনা হল TEDx  TALK-এ তাঁর দেওয়া মোটিভেশনাল স্পিচ। বহু মানুষ তাঁর কথায় খুঁজে পান নতুন করে বাঁচার অনুপ্রেরণা। এই সূত্রেই তাঁকে ট্রাভেল করতে হয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকা, ইন্দোনোশিয়া, নরওয়ে প্রভৃতি জায়গায়। ইউনাইটেড নেশনস –এর হেডকোয়ার্টারে দাঁড়িয়ে মোটিভেশনাল স্পিচ দেওয়ার গৌরবও অর্জন করেছিলেন তিনি।

তাঁর কথা জানতে পেরে একসময় স্বয়ং রাষ্ট্রপতি এপিজে আবদুল কালাম, মালবিকার সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। মালবিকা সত্যি সত্যিই  পৌঁছে গিয়েছিলেন কালাম সন্দর্শনে। তাঁর প্রস্থেটিক হাত সম্পর্কে, তাঁর পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নানা কথা জানতে চান কালাম। একটি প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে তাঁর লেখা কবিতা সই করে উপহার দেন মেয়েটিকে। সেই স্মৃতি সারা জীবনেও ভুলতে পারেননি মালবিকা।

যারা এই দুর্দিনে মনোবল হারিয়ে ফেলছেন, তাদের কাছে মালবিকা হোক এক দৃষ্টান্ত। নিজের উপর বিশাস আর লড়াকু মানসিকতার উপর ভর করে অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখিয়েছেন এই কন্যা। গৃহশোভা এই সাহসী নারীকে জানায় কুর্নিশ।

দেহমুক্তি

সকালে খবর শোনার ইচ্ছে হল বিদিতার। টিভি অন করে খবরের চ্যানেল-এ যেতেই শুনতে পেল, আশ্রমের যে-ঘটনা এখন তুলে ধরব আপনাদের সামনে, তা দেখে আপনারা বুঝতে পারবেন, মহিলারা অত্যাচারিত হয় অনেক সময় নিজের কারণেই।

সাত-সকালে এমন খবর শুনেই মাথা গরম হয়ে গেল বিদিতার। সবসময় মহিলাদেরই কাঠগড়ায় তুলে কেন যে দোষী সাব্যস্ত করা হয়, এটা দেখেই রাগ দ্বিগুন হল তার। তার মাথার মধ্যে ঘুরতে লাগল, আশ্রমের সাধুরা যা ঘটাচ্ছে, তা কি কোনও নতুন ঘটনা? রাতারাতি তো আর আশ্রমও গড়ে ওঠেনি এবং সেখানে সাধুদের দৌরাত্ম্যও নতুন কোনও ঘটনা নয়। যাইহোক এ-সব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই মাথা যখন আরও গরম হয়ে উঠল, তখন টিভির সুইচ অফ করে দিল সে। তারপর মনকে শান্ত করার জন্য রান্না ঘরে গেল চা বানাতে। কিন্তু চা বানাতে গিয়ে মনকে শান্ত করার চেষ্টা করলেও, মন ডুব দিল স্মৃতির গভীরে। শতকোটি চেষ্টা করেও মন খারাপের সেই স্মৃতিকে তাড়াতে পারল না বিদিতা।

অবশ্য মনকে আয়ত্তে আনতে না পারার ঘটনা নতুন নয়। আগেও বিদিতা বহুবারই পুরোনো দিনের কথা ভেবে মন খারাপের শিকার হয়েছে, কষ্ট পেয়েছে। আজও সেই অবস্থার পুনরাবৃত্তি ঘটল।

আজ আবার মাসির কথা মনে পড়ে গেল। মা আর মাসি যখন কথা বলত, তখন আমাকে সেখান থেকে চলে যেতে হতো। মাসি বলত, বড়োদের কথা শুনতে নেই বাচ্চাদের। বাধ্য হয়ে আমি তখন চলে যেতাম অন্যত্র। কিন্তু তারই মধ্যে যতটুকু যা কথা কানে আসত, তাতে মনে হয়েছিল, মাসি ছিলেন বাল্যবিধবা। তবে তখন বিধবা শব্দটা শুনলেও, সঠিক মানে বুঝতাম না। তাই, মা-কে জিজ্ঞেস করে জেনেছিলাম যে, মাসি যখন ছোটো ছিল, তখন মেসো মারা গিয়েছিলেন। অবশ্য পুরো বিষয়টা বুঝেছিলাম আরও বড়ো হয়ে।

অনেক বড়ো ঘরে বিয়ে হয়েছিল মাসির। বিষয়-সম্পত্তিও ছিল অনেক। কিন্তু মেসোর স্বাস্থ্য ভালো ছিল না। মা-বাবার একমাত্র সন্তান ছিলেন মেসো। খুব আদরে মানুষ হয়েছিলেন। মাসির থেকে মেসো বয়সে অনেকটাই বড়ো ছিলেন। মেসোকে সুস্থ করে তোলার জন্য তাদের বাড়িতে পুজোপাঠ চলত। বৃন্দাবন থেকে এক গুরুজি আসতেন বাড়িতে। তাঁর আদেশ মানতে হতো পরিবারের সব সদস্যকে। গুরুজিকে ভগবান-এর মতো মনে করা হতো।

মাসি সব রকম নিয়মনিষ্ঠা পালন করতেন মেসোকে সুস্থ করে তোলার জন্য। শুনেছি একবার এক শীতের রাতেও নাকি স্নান করে রাতভর কীসব নির্দেশ পালন করেছিলেন মাসি। সব তিনি মুখ বুজে করতেন। কিন্তু কোনও সেবাযত্ন, নিয়মনিষ্ঠা, পূজাপাঠ করেও মেসোর প্রাণরক্ষা হয়নি।

মাসির বৈধব্যের পর অনেকেই অনেক জ্ঞান, উপদেশ প্রভতি দিতে শুরু করেছিলেন। কেউ বলেছিলেন, বাকি জীবন নিষ্ঠার সঙ্গে বৈধব্য পালন করে পুণ্য অর্জন করো। কেউ আবার সহানুভতি দেখিয়েছিল এই বলে যে, এত কচি বয়ে, আবার বিয়ে করে আনন্দ করো। কিন্তু গুরুজি বলেছিলেন, একে ভগবানের সেবায় নিযোজিত করো, ভালো থাকবে এবং তাঁর নির্দেশই পালন করতে শুরু করেছিলেন মাসি।

বেশি দিন অপেক্ষা করতে হয়নি, বৃন্দাবন থেকে গুরুজি ডেকে পাঠালেন মাসিকে। তখন পরিবারের লোকজন আর প্রতিবেশীরা অনেকেই গুরুজির ডাকে সাড়া দেওয়ার পরামর্শ দিল মাসিকে এবং মাসিও সেই আজ্ঞা পালন করলেন মাথা নত করে।

এরপর শুরু হয়েছিল মাসির বৃন্দাবন-কাহিনি। শ্বশুর বাড়িতে তো টাকার অভাব ছিল না, তাই বৃন্দাবনে ভগবান সেবা করতে গিয়ে অন্য বিধবাদের মতো ভিক্ষেবৃত্তি করতে হয়নি। বরং মাসির দেওয়া টাকায় গুরুজি বৃন্দাবনের আশ্রমকে সাজিয়েগুছিয়ে নিয়েছিলেন। তাই, থাকার জন্য ভালো জায়গাও পেয়েছিলেন মাসি। প্রথম দিকে দু-একবার শ্বশুর বাড়িতে এলেও পরের দিকে আর বৃন্দাবন ছাড়েননি মাসি। তবে আমার মায়েরর সঙ্গে মাসির কথা হতো মাঝেমধ্যে ফোনে। কিন্তু, দুএকবার দেখেছি, মাসির সঙ্গে কথা বলার পর মা কেমন যেন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়তেন। একবার তো এমনই হল যে, মা বৃন্দাবন যাওয়ার প্রস্তুতি নিলেন। কিন্তু আমার ভাই ছাড়ল না মা-কে একা। মায়ের সঙ্গে ভাইও বৃন্দাবন গেল মাসির আশ্রমে।

মা আর ভাইকে দেখে মাসি খুশি হলেও, সবকিছু দেখে-শুনে আমার ভাই গেল বিগড়ে। মাসিকে সম্মান প্রদর্শন তো দূরের কথা, ঘৃণা করতে শুরু করল। মা যখন ভাইকে বলেছিলেন মাসিকে প্রণাম করতে, ভাই তখন রেগে আশ্রমের বাইরে চলে গিয়েছিল। শুধু তাই নয়, সেই ঘটনার রেশ গড়িয়েছিল বাড়ি পর্যন্ত।

আসলে আমার মা তার বোনকে এতটাই ভালোবাসতেন যে, মাসির বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ শুনতে চাইতেন না। তাই আমার ভাই যখন বাড়ি এসে রাগের মাথায় মাসিকে বৃন্দাবনের বেশ্যা বলে গালি দিয়েছিল, মা তখন ভাইয়ে গালে সপাটে একটা চড় বসিয়ে বলেছিলেন, গুরুজনদের সম্মান করতে শেখো। কিন্তু আমার ভাই তাতে এতটুকুও বিচলিত না হয়ে বলেছিল, আমি যা দেখে-শুনে এলাম তা কি সব মিথ্যে? তবে আমার মা-ও ছিলেন বক্তব্যে অবিচল। তিনি ভাইকে বলেছিলেন, তুই যা জেনেছিস, সব ভুল, মিথ্যে। আর কোনও দিন যদি আমার বোনের সম্পর্কে অপমানজনক কথা বলিস তো আমার অন্য রূপ দেখবি। সেদিন মা এবং ভাইয়ে অমন ঝগড়া দেখে আমিও ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। ঠিক এমন সময় মাসির ফোন এল। মা তখন রাগের মাথায় মাসিকে জিজ্ঞেস করে বসলেন, যা শুনছি তা কি সত্যি? তুমি কি সম্মান হারিয়ে রয়েছিস ওখানে?

মায়ের কথা শুনে মাসি বলেছিলেন, এখন এসব কথার উত্তর খুঁজতে গিয়ে লাভ কী? পরিবারের লোকজন, সমাজ সবাই মিলে যখন গুরুজির আশ্রমে এই সুদূর বৃন্দাবনে আমাকে জোর করে পাঠিয়ে দিয়েছিল, তখন কি কেউ আমার ভালোমন্দের কথা চিন্তা করেছিল? আমার যে সম্মানহানি হতে পারে, তা কি তখন কেউ ভেবেছিল? সবই কি আমার দোষ? আমার ইচ্ছেতে কি সবকিছু চলেছে? যা ঘটেছে কিংবা ঘটে চলেছে, তার জন্য কি আমি-ই দাযী? মাসির থেকে অমন কথা শুনে মা তো রেগে ফায়ার। বলেছিলেন, এমন জীবনের কী দাম! এর থেকে তো মরা ভালো।

মায়ের কথার উত্তরে মাসি বলেছিলেন, মরে যাওয়া কি অতই সোজা! সবার কি অতো মনের জোর আছে? এভাবেই আরও কিছু কথা কাটাকাটির পর চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে গিয়েছিল মায়ের সঙ্গে মাসির যোগাযোগ।

এরপর সময়ে স্রোতে বয়ে গেছে সবার জীবনের অনেক কটা বছর। আমার মায়ের সঙ্গে মাসির যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নই ছিল। হঠাৎ, দিল্লির এক হাসপাতাল থেকে একটা ফোন এল। জানা গেল, মাসি ক্যান্সারে আক্রান্ত। লাস্ট স্টেজ। চিকিৎসা চলছে। শেষবেলায় মাসি মায়ের সঙ্গে দেখা করার কাতর অনুরোধ জানিয়েছিলেন। সবকিছু জানার পর আমার মা পুরোনো মান-অভিমান ভুলে দিল্লি যাওয়ার প্রস্তুতি নিলেন। ভাইও কী ভেবে যেন সমস্ত রাগ-অভিমান ভুলে মাকে নিয়ে দিল্লি পাড়ি দিল।

মায়ের কাছ থেকে শুনেছিলাম, দিল্লি গিয়ে মা দেখে যে, মাসির সেই সুঠাম চেহারা ভেঙে জীর্ণকায় রূপ নিয়েছে। মুখোমুখি হওয়ার পর দুজনে গলা জড়িয়ে অনেকক্ষণ কান্নাকাটি করেছিলেন। দুই বোনের অমন ভাব-ভালোবাসা দেখে আমার ভাইও কেমন অবাক হয়ে গিয়েছিল বলে শুনেছিলাম। কিন্তু কান্নাকাটির পর মাসি হঠাৎ মাকে বলেছিলেন, আর তো কটা দিন আছি এই পৃথিবীতে। তাই কোনও কথা আর গোপন রেখে মরতে চাই না। কী জানার আছে বল। আমি সব বলতে চাই আজ। এমন অবস্থায় মাসিকে শান্ত হতে বলেছিলেন আমার মা। কিন্তু মাসি থামেননি। প্রশ্ন করার আগেই অতীত তুলে ধরেছিলেন তিনি।

মাসি সেদিন মায়ের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, শোন মিনতি, একা একটা মেয়ে বেঁচে থাকা বড়ো কঠিন রে। এটা আমি হাড়ে হাড়ে টের পাওয়ার আগেই নিজেকে বদলে নিয়েছিলাম। যখন দেখেছিলাম, বাপের বাড়ির কিংবা শ্বশুর বাড়ির লোকেরা কেউ-ই আমার দাযিত্ব না নিয়ে বৃন্দাবন পাঠিয়ে দিল, তখন আমি মনকে শক্ত করে নিয়েছিলাম। ঠিক করেছিলাম, ঝড়-ঝাপটা যাই আসুক না কেন, সব সামলাব শক্ত হাতে। অবশ্য এই লড়াই শুরু হয়ে গিয়েছিল আরও আগে থেকেই। স্বামীকে বাঁচানোর জন্য কতগুলি অন্ধ-কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষ যখন ভণ্ড গুরুজির সেবা করতে বাধ্য করেছিল, সেই তখন থেকেই আমার কপাল পুড়তে শুরু করেছিল। আমার সতীত্ব হরণ হয়েছিল তখনই। তাই, বৃন্দাবনে গিয়ে নতুন করে আর খারাপ হতে হয়নি। অতএব বেঁচে থাকার জন্য গুরুজির দয়া ছাড়া আর দ্বিতীয় কোনও পথ খোলা ছিল না আমার কাছে। আর আমি জানি যে, বিধবা এক মহিলা বাড়ি ছেড়ে বৃন্দাবনের আশ্রমে থাকলে, তাকে সমাজ বেশ্যা-ই তো বলবে। অথচ সেই সমাজই রক্তচক্ষু দেখিয়ে এই বিধবাকে গুরুজির পায়ে সমর্পণ করেছিল। শালীনতা রক্ষা করা কি শুধু নারীর দাযিত্ব, কর্তব্য?

এক নিশ্বাসে জীবনের গোপন ঝাঁপি খুলে দিয়ে মাসি তার বোনের কোলে এলিয়ে দিলেন শরীরটাকে। একটু দূরে দাঁড়িয়ে আমার ভাই সব শুনছিল। সব শুনে মাসির প্রতি সমস্ত ঘৃণা যেন মুহূর্তের মধ্যে দূর হয়ে গিয়েছিল তার। কিন্তু সে যখন মাসির পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে গেল, তখন মাসি ইহজগৎ ত্যাগ করেছেন।

শ্রীপ্রীতমের সুরে গান গাইলেন টলিউড তারকারা

সুরকার হিসাবে ইতিমধ্যেই সুনাম অর্জন করেছেন শ্রীপ্রীতম। ২০১২ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বাংলা গানের জগতে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি। গুটি গুটি পায়ে,তোকে হেব্বি লাগছে,সলিড কেস খেয়েছি,পাগলি প্রভৃতি বাংলা গানে জনপ্রিয়তার পাশাপাশি,সজনা পাস আ, বিন তেরে তেরে বিন প্রভৃতি হিন্দি গানেও নজর কেড়েছেন শ্রীপ্রীতম। তবে শুধু বলিউড কিংবা টলিউডে-ই নয়, বাংলাদেশেও তিনি সমান জনপ্রিয়। আর এই জনপ্রিয়তায় আবার যোগ হল ‘বাংলা হাসবে বিশ্ব হাসবে’-র মিউজিক ভিডিয়োটি। এই মিউজিক ভিডিয়োয় অংশ নিয়েছেন বিশিষ্ট সুরকার বাপ্পি লাহিড়ি, সংগীতশিল্পী অভিজিৎ, কুমার শানু, আসিফ আকবর, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, শ্রাবন্তী, সোহম, অঙ্কুশ , ওম প্রমুখ।

music launch

প্রসঙ্গত শ্রীপ্রীতম জানিয়েছেন, অভিনেতা-অভিনেত্রীদের কন্ঠে সচরাচর গান শোনা যায় না।তাই তাঁরা গান গাইলে একটা বাড়তি চমক তৈরি হয়। এবারও তাই হল। এই মিউজিক ভিডিয়োটি ইউটিউবে মুক্তির পর দারুণ সাফল্য পেয়েছে।

কথা প্রসঙ্গে শ্রীপ্রীতম আরও জানিয়েছেন, সম্প্রতি তাঁর সুরে অমিত মিশ্র গেয়েছেন ‘খুশনুমা’ এবং রাজ বর্মন গেয়েছেন ‘হে ইয়ারা তুঝসে’ গানটি। পরিচালক সুজিত সরকারও তাঁর আগামী ছবির জন্য শ্রীপ্রীতমের সঙ্গে কথা বলেছেন।

——-

দৈনন্দিন জীবনে রাফেজ-এর ভূমিকা

বর্তমানে  খাদ্যতন্তু বা রাফেজ কোনো নতুন শব্দ নয়।খাদ্যের উপাদানগুলি যেমন কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাটের সাথে খাদ্যতন্তু বা রাফেজ সমান পংক্তিতে জায়গা করে নিয়েছে। আমাদের খাদ্যতালিকায় যেমন প্রোটিন, ভিটামিন, খনিজ পদার্থের যেমন গুরুত্ব রয়েছে , তেমনই প্রয়োজন আছে রাফেজ- এরও। তাই রোজকার ডায়েট-এ রাখুন পরিমানমতো আঁশয়ুক্ত খাদ্যবস্তু।

শস্যদানা,  ফল ও সবজির কিছু অংশ যা হজম বা পরিপাক হয় না এমন তন্তুময় বা আঁশযুক্ত অংশ রাফেজ নামে পরিচিত। তন্তু দু ধরনের– দ্রবণীয় তন্তু  এবং অদ্রবণীয় তন্তু।

দ্রবণীয় তন্তু – এগুলি আমাদের রক্তের কোলেস্টেরল ও গ্লুকোজের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। জলে দ্রবণীয়  তন্তুগুলি হল ওটস, বিনস, আপেল, লেবুজাতীয় ফল, বার্লি ইত্যাদি।

অদ্রবণীয় তন্তু– এগুলি আমাদের পরিপাকতন্ত্রে পরিপাক হওয়া খাদ্যের বিচলনে বা  পেরিস্টালসিসে সাহায্য করে এবং মলের মধ্যে জলের পরিমাণ বাড়ায়, মলকে নরম করে ও মল নির্গমনে সাহায্য করে। যারা কোষ্ঠকাঠিন্য রোগে ভুগছেন তাদের জন্য এই তন্তু খুবই উপকারি। গমের ভূষিসমেত আটা ,গমের ভূষি,বাদাম,বিনস,

সবুজ শাকপাতা,শাকসবজি যেমন ফুলকপি,আলু প্রভৃতি অদ্রবণীয় তন্তুর উদাহরণ।

রাফেজ-এর উপকারিতা

  • রক্তস্রোতে গ্লুকোজের পরিমাণ কমায়
  • ডায়াবেটিক রোগীদের পক্ষে উপকারি
  • রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়
  • কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে।মল নির্গমন সহজ করে।

সবুজ শাকপাতা,খোসাসুদ্ধ ফল, ভুষি, বিনস, গমের রুটিতে তন্তুর পরিমাণ বেশি থাকে।খাবারে তন্তুর পরিমাণ কম থাকলে ইস্কেমিক হার্ট ডিজিজ (হৃৎপিণ্ডে রক্তপ্রবাহের স্বল্পতা), ডায়াবেটিস বা মধুমেহ, ডাইভার্টিকুলার ডিজিজ ( কোলনের মধ্যে ছোটো থলির মত গঠন যা একটি অস্বাভাবিক অবস্থা ) ও কোলন ক্যান্সারের প্রবণতা দেখা যায়।

খাবারে বেশি পরিমাণ তন্তু কিন্তু প্রোটিন পরিপাকে বিঘ্ন ঘটায়।প্রাপ্তবয়স্কদের খাদ্যে প্রতিদিন ৩০-৪০গ্রাম তন্তু থাকা প্রয়োজন। অতএব প্রাত্যাহিক জীবনে মাছের কালিয়া, মাংসের ঝোল,  চপ কাটলেট , ভাজাভূজি এসবের সাথে পেঁপে সিদ্ধ, কুমড়ো সিদ্ধ, শাকচচ্চরি, ডাঁটাচচ্চরি–এসব রাখা খুবই দরকার।

মাল্টিভিটামিন খাওয়া কি ভালো?

মাল্টিভিটামিন ট্যাবলেট যে-কোনও সময়ে খাওয়া যায়, এমন ধারণার বশবর্তী হয়ে এখন সবাই ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়াই এইসব ট্যাবলেট খেয়ে থাকেন। অনেকের ধারণা সবগুলো ভিটামিনের সংমিশ্রণে তৈরি মাল্টিভিটামিন ট্যাবলেট খেলেই বুঝি অসুস্থতা দূর হয়ে যাবে। কিন্তু সম্প্রতি বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বিভিন্ন বিজ্ঞাপন দেখে বা বাজারে সুলভে পাওয়া যায় এমন ভিটামিন ট্যাবলেট কিনে খেলেও, বেশিরভাগই কোনও কাজে লাগে না। শুধু তা-ই নয়, অনেক ভিটামিন ট্যাবলেট শরীরের জন্য ক্ষতিকর বলেও জানা গেছে।

লন্ডনের কয়েকজন বিশিষ্ট চিকিৎসক টানা ছয় বছর প্রায় আট হাজার লোকের ওপর গবেষণা চালানোর পর দেখতে পান, এ ধরনের ভিটামিন অনেকদিন ধরে খাওয়ার কারণে তাদের শারীরিক কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে। গবেষকরা বলেন, মানুষ দ্রুত আরোগ্য লাভের বা স্বাস্থ্যোন্নতির জন্য এভাবে বাজে খরচ করেন। তবে সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হল, হৃদরোগ, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা আলঝাইমারের মতো মারাত্মক রোগের জন্যও অনেকে ভিটামিন ট্যাবলেট খান।

মাল্টিভিটামিন ট্যাবলেটে বড়োজোর দু-ডজন উপাদান থাকতে পারে। কিন্তু টাটকা শাক-সবজি আর ফলের বিকল্প তা হতে পারে না। ফল-সবজিতে রয়েছে অন্য আরও শতাধিক উপকারী যৌগ। তার মানে একখানা মাল্টিভিটামিন ট্যাবলেট খেলে বহু উপকারি যৌগ থেকে বঞ্চিত হবে শরীর।

সাধারণত বয়স্কদের মধ্যে ঠান্ডা লাগার প্রবণতা থাকে। প্রতিদিন ভিটামিন সি ট্যাবলেট খেলে বড়োজোর তা সামযিক ভাবে ঠেকানো সম্ভব। কিন্তু রাতারাতি কারও ধাত বদলানো যায় না। বাচ্চাদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

তাই গবেষকদের মতে ঠান্ডা লাগা হ্রাসের পরিমাণ যেহেতু নগণ্য, সেহেতু সারা বছর ধরে ট্যাবলেট খেয়ে যাওয়ার কোনও যুক্তি নেই। তাছাড়া সর্দি-কাশির লক্ষণগুলো দেখা দেওয়ার পর ভিটামিন সি ট্যাবলেট খেলে তাতে কোনো কাজই হবে না । মাল্টিভিটামিন ট্যাবলেটেই অনেক রকমের ভিটামিন উপাদান থাকে।

বিক্রেতারা ভিটামিন সি, ভিটামিন ডি, ভিটামিন ই, মাল্টিভিটামিন প্রেস্ক্রিপশন ছাড়াই বিক্রি করেন। ভিটামিন শরীরের জন্য অপরিহার্য হলেও তার নিজস্ব বা নিজের শক্তি উৎপাদনের ক্ষমতা নেই। কারও শরীরে যদি ভিটামিনের অভাব থাকে, সে ক্ষেত্রে সুষম ও পরিমিত খাবারের সঙ্গে ভিটামিন বা মাল্টিভিটামিন ট্যাবলেট খেলে শক্তি উত্পন্ন বা বৃদ্ধি হয়। তবে সেটা অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ অনুযাযী খেতে হবে।

ভিটামিন ট্যাবলেট খেলেই স্বাস্থ্যের সামগ্রিক উন্নতি হবে, এই মিথটা থেকে যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব বেরিয়ে আসুন।

ভরতপুর ন্যাশনাল পার্ক

পাখপাখালির স্বর্গ ভরতপুরঃ দিল্লি থেকে খুব দূরে নয়। সেইমতো পথনির্দেশ মেনে গাড়িতে ফরিদাবাদের জনবসতি ছাড়িয়ে মথুরা-ভরতপুরগামী পথ ধরেছি। সঙ্গে রয়েছে জোরালো বাইনোকুলার, ক্যামেরা, চার্জার, টর্চ প্রভৃতি জরুরি অ্যাক্সেসরি।

ভরতপুর স্যাংচুয়ারির গেটে পেৌঁছোতেই মনটা চনমনে হয়ে উঠল। এন্ট্রি টিকিট সংগ্রহ করে সোজা আমাদের আস্তানা, হোটেল ভরতপুর অশোক-এর দিকে এগোলাম।

ভরতপুর ন্যাশনাল পার্ক-এর ডাক নাম কেওলাদেও ন্যাশনাল পার্ক। উদ্যানের ভিতরে প্যাডেল রিকশায় চড়ে জঙ্গলের নির্জনতা উপভোগ করা ও বার্ড ওয়াচিং দুই-ই সারতে পারেন। সামান্য বিশ্রামের পর আমরা এই জঙ্গুলে সফর শুরু করলাম। বনজ গন্ধ নাকে এসে ঝাপটা মারছে ঠান্ডা হাওয়ার সঙ্গে। নানা অচেনা গাছ গুল্মে ভরা জঙ্গলে, এখানে ওখানে স্যাঁতসেঁতে জলাভূমি।

মার্শি ল্যান্ড বলতে যা বোঝায় পাতায় ছাওয়া সেই বনভূমির পথ চিরে চলেছে রিকশা প্রজাতির পাখির বাস এই ভরতপুর। জলের মধ্যে ইতস্তত পড়ে থাকা শুকনো গাছের গুঁড়ির কোথাও মাছরাঙা, কোথাও সারসের ঝাঁক। শুকনো পাতায় সরসর আওয়াজ তুলে একেবেঁকে চলে যায় সরীসৃপ। গাছে গাছে অজস্র গিরগিটি, বাঁদর এমনকী বনবিড়ালেরও দেখা মেলে কদাচিৎ। তপস্বীর মতো বসে থাকতে দেখলাম একটি প্যাঁচাকে। কে বলবে এই প্রাণীটিই রাতে কী ভয়ানক হয়ে ওঠে!

অনর্গল ঝিঁঝিঁর ডাকে কেমন যেন ঝিম ধরে যায়। সেই সঙ্গে চেনা-অচেনা পাখির কলকাকলী। কথা না বলে সেই বন্য সৌন্দর্যের সবটুকু রূপসুধা পান করে চলেছি আমরা। কখনও ক্যামেরায়, কখনও বাইনোকুলারে ধরা দিচ্ছে কপারস্মিথ বারবেট, গ্রিন বি ইটার, ইউরেনিয়ান কুট বা লাফিং ডাভ।

চলতে চলতে এসে পড়লাম এক প্রশস্ত ঝিলের ধারে। একটি মরা গাছকে আঁকড়ে সেখানে বাসা বেঁধেছে অজস্র পরিযায়ী পাখির ঝাঁক। ঝিলের ধার ঘেঁষে পেন্টেড স্টর্ক-এর দল সংসার পেতেছে। চোখে পড়ল কিছু হুইসলিং ডাক-ও। চোখ ভরে দেখছি পাখির স্বর্গভূমি।

গায়ের খুব কাছ দিয়ে সামনের ডালে উড়ে গিয়ে বসল একটি অতিকায় ময়ূর। তার কেকা রবে জঙ্গল চনমনে হয়ে উঠল। অজস্র রঙের পালক। অদ্ভূত কম্বিনেশনে সেজে ওঠা পাখির দল ধরা দিতে লাগল ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারে।

স্যাংচুয়ারির শেষ মাথায় একটি শিব মন্দির। এই কেওলাদেও শিবের নামেই জঙ্গলের নামকরণ। এখানেই রয়েছে একটি ওয়াচ টাওয়ার। উপরে উঠে পাখির চোখে ধরা দিল গোটা বনস্থলি। একটি নীলকণ্ঠ উড়ে গেল হঠাৎ চমকে দিয়ে। সূর্য ডোবার মুখে যেন কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে উঠল গোটা জঙ্গল। রাতের আস্তানায় ফিরল পাখির দল। আমরাও ফিরলাম হোটেলে।

ভোরবেলায় আরও একবার জঙ্গল ভ্রমণের লোভ সামলাতে পারলাম না। নানা রঙের প্রজাপতি এবং কয়েকটি সরীসৃপ চোখে পড়ল। একটি ফেউ ত্রস্ত পায়ে ঢুকে গেল ঝোপের আড়ালে, কয়েকটি সাইবেরিয়ান ক্রেন দাঁড়িয়েছিল আমাদের অভ্যর্থনার জন্য। এই জঙ্গলমহলে আমাদের নীরব উপস্থিতিতে যেন খুশি হল তারাও।

অকল্পনীয়

রাখিবন্ধনের ঠিক একদিন আগে মনোজের হাতে কিছু টাকা এল। তাই, কিছুটা আবেগবশতই সে তার মা-বাবার জন্য কিনল কিছু আকর্ষণীয় উপহার। বাদ গেল না তার মণিদিদিও। ওর জন্য কিনল একটি সুন্দর হাতঘড়ি। মণিদিদি শ্বশুরবাড়ি থেকে এসেছে রাখি পরাতে।

সব টাকা আমার ঘড়ির জন্য খরচ করে দিয়েছিস নাকি মা-বাবার জন্য কিছু কিনেছিস? ভাইকে প্রশ্ন মণিমালার।

মুখ টিপে হাসল মনোজ। আর বলল, আজকের দিনটা অপেক্ষা কর দিদি, কাল জেনে যাবি মা-বাবাকে কী উপহার দেব, বলেই নিজের ঘরে ঢুকে গেল মনোজ।

আসলে মনোজ তার অনেক দিনের ইচ্ছেপূরণ করতে চলেছে। সে এখন সফটওয্যার ইঞ্জিনিয়র। মোটা মাইনের চাকরি। প্রথম মাসের বেতন হাতে আসতেই সে তার দীর্ঘদিনের লালিত শখ-আহ্লাদ পূরণ করতে চায়। মা, বাবা, দিদি, সবাইকে খুশি করতে চায়। আধুনিক সাজে সাজাতে চায় নিজের বাড়িটাকে। বন্ধুদের সঙ্গে ফার্নিচার-এর শোরুম-এ গিয়ে সে কিছু জিনিসও পছন্দ করে এসেছে।

রাখিবন্ধনের দিন খুব সকালে উঠে স্নান সেরে নিয়েছে মনোজ। তার দেওয়া হাতঘড়িটা পরে মণিদিদি খুব খুশী। আদর করে রাখিও বাঁধল ভাইয়ের হাতে। এবার মা-বাবাকে উপহার দিয়ে চমকে দেওয়ার পালা। কিন্তু বাবা কোথায়?

মনোজের প্রশ্ন শুনে মা হাসলেন। মনোজ অবাক হল। তা দেখে মণিদিদি বলল, বাবা তো রাখি পরতে চলে গেছেন।

কিন্তু কোথায়?

মনোজের কৌতহল মেটার আগেই মনোজের বাবা অর্থাৎ সরোজবাবু এসে হাজির। তাঁর হাতে রাখি বাঁধা রয়েছে দেখে দ্বিগুন কৌতহলে মনোজের প্রশ্ন, বাবা, কে রাখি পরাল তোমায়?

সরোজবাবু জানালেন, দিদির সঙ্গে তো আর যোগাযোগ নেই, তাই, কৃষ্ণ মন্দিরের সেবাকর্মী এক দিদির হাতে রাখি পরে এলাম। গরিব মানুষ, এই ছুতোয় কিছু টাকাও সাহায্য করে এলাম।

নিজে একটা সাধারণ চাকরি করলেও, সরোজবাবু চিরকালই পরোপকারী। শুধু তাই নয়, কিছুটা আবেগপ্রবণও। বাবাকে এমনটাই এতদিন দেখে এসেছে মনোজ এবং মণিমালা। কিন্তু বাবার হাতে দুটো রাখি কেন, সে প্রশ্নের উত্তর পায়নি ভাইবোন।

যাইহোক, বাবার পরোপকারের বিষয়টি সামনে আসতেই আবার কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ল মনোজ। সে নিজের ঘর থেকে মা-বাবার জন্য রাখা উপহারটা এনে তুলে দিল বাবার হাতে।

উপহারটা হাতে নিয়ে সরোজবাবু প্যাকেট খুলে দেখলেন একটা দামি স্মার্ট ফোন।

তোর তো স্মার্ট ফোন আছে, আবার কিনে টাকা নষ্ট করলি কেন?

না বাবা, এটা আমার জন্য নয়। এটা মা এবং তোমার জন্য। যাদের সঙ্গে যোগাযোগ কমে গেছে, তাদের সঙ্গে আবার ভিডিযো কল করে কথা বলবে। ফেসবুকও করতে পারবে। অবসর সময়টা ভালো ভাবেই কেটে যাবে তোমাদের।

মনোজের কথা শুনে সরোজবাবু আপত্তি তুলতে গিয়ে পারলেন না, কারণ মনোজের মা গীতা বললেন, খোকা যখন শখ করে কিনে এনেছে, তখন আর আপত্তি কোরো না।

মণিমালা বলল, বাবা তুমি চিন্তা কোরো না, আমি সব শিখিয়ে দেব।

দিদি, মোবাইলটা নিয়ে চার্জ-এ বসিয়ে দে এবার। মনোজের অনুরোধ মণিদিদিকে।

বিকেলবেলা মুখরোচক কিছু স্ন্যাক্স তৈরি করে গরম গরম পরিবেশন করল মণিমালা। সবাই একসঙ্গে বসে খাবারের স্বাদ নিল। এক ফাঁকে কথায় কথায় মনোজ জানাল, পুরোনো ফার্নিচার বদলে নতুন ফার্নিচার আনার ইচ্ছের কথা। কিন্তু এবার ওর মা আপত্তি তুললেন, পুরোনো হলেও এত বড়ো খাট রয়েছে তো ঘরে, আবার কিনবি কেন? এটাতে কী সুন্দর আমরা সবাই একসঙ্গে শুতে পারি ইচ্ছে হলে। নতুন খাট তো আর এত বড়ো হবে না!

মনোজ বুঝল মায়ের আবেগ-অনুভতির বিষয়টা। কিন্তু সে তার গার্ল-ফ্রেন্ড পৃথা-কে কথা দিয়েছে যে, বিয়ের আগে ঘরগুলিকে গুছিয়ে কিছু জিনিসপত্র চেঞ্জ করে একেবারে আধুনিক রূপ দেবে। এরপর দিদি মণিমালা-ই অবশ্য মাকে মনোজের ইচ্ছের কথা বুঝিয়ে রাজি করাল।

আসলে, মনোজ এবং পৃথা-র সম্পর্কের বিষয়ে অনেকটাই জানত দিদি মণিমালা। ওদের ভাইবোনের মধ্যে খুব ভালো সম্পর্ক, একেবারে বন্ধুর মতো। তাই, চাকরি পাওয়ার পর মনোজ যে পৃথাকে বিয়ে করে ঘরে আনতে চায়, এ কথা জানত ওর মণিদিদি। সে তাই মায়ের কানে কানে মনোজের ইচ্ছের কথা জানিয়ে দেওয়ার পর, মা মুচকি হেসে মনোজকে নতুন ফার্নিচার ঘরে আনার অনুমতি দেন। ভাই মনোজের কাছ থেকে ওর হবু শ্বশুরের মোবাইল ফোনের নাম্বারটা নিয়ে মায়ের হাতে তুলে দিয়েছিল মণিমালা।

মেয়ে মণি, শ্বশুরবাড়ি চলে যাওয়ার পর কেটে গেছে আরও এক মাস। এর মধ্যে সরোজবাবু এবং গীতা মনে মনে ছেলের বিয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছেন। সরোজবাবু একদিন ফোন করে আলাপ-পরিচয় সারলেন ছেলের হবু শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে। মনোজের সঙ্গে পৃথার বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। পৃথার বাবা-মা অবিনাশ এবং সুনীতা তাদের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানালেন সরোজবাবু এবং গীতাকে।

মনোজের মতো পৃথাও চাকরি করে। তবে সে মনোজের মতো ইঞ্জিনিয়র নয়, একটি বহুজাতিক সংস্থার অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ হেড। শিক্ষিত এবং আধুনিক মনস্ক। তাই মনোজ এবং পৃথা চেয়েছিল, ওরা রেজিস্ট্রি ম্যারেজ-এর পর একটা রিসেপশন পার্টি দেবে। কিন্তু পৃথার দিদিমা চান বিয়ে  সামাজিক মতে হইহুল্লোড় করেই হোক। পৃথা যেহেতু তার দিদিমাকে ভীষণ ভালোবাসে, তাই তাঁর আদেশ অমান্য করতে পারল না। অগত্যা মনোজও সামাজিক বিয়েতেই মত দিতে বাধ্য হল।

দুই বাড়ির মধ্যে মনোজ এবং পৃথা-র বিয়ের কথা এগোতে থাকল। প্রস্তুতিও শুরু হল জোর কদমে। নির্দিষ্ট দিনে আংটি বদলও করে নিল মনোজ এবং পৃথা। অবশ্য ওইদিন শুধু দুই বাড়ির লোকেরাই একটা ছোটো মতো অনুষ্ঠান করে একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া সারল। এরপর বিয়ের দিন এগিয়ে আসতে লাগল। মনোজ সমস্ত দায়-দাযিত্ব ভাগ করে দিতে শুরু করল আগাম। দিদি-জামাইবাবুকে জানিয়ে দিল তাদের অতিথি আপ্যায়নের দাযিত্ব নেওয়ার কথা। আর মা-বাবাকে জানাল, ওরা যেন পৃথা-র দিদিমার কথামতো সমস্ত সামাজিক রীতিনীতি মেনে চলেন।

কিন্তু বিয়ের দিন যত এগিয়ে আসতে লাগল, সরোজবাবু এবং গীতাকে খুব চিন্তান্বিত মনে হল। বিশেষ করে সরোজবাবুকে খুব মনমরা হয়ে বসে থাকতে দেখা গেল। এই দৃশ্য মনোজের চোখ এড়াল না।

বাবা, তোমাদের কী হয়েছে? খুব দুশ্চিন্তায় রয়েছে মনে হচ্ছে! এনি প্রবলেম?

কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর সরোজবাবু ছেলেকে বললেন, না তেমন কিছু নয়, আসলে বয়স হয়েছে তো, তাই ভাবছি যদি পৃথা-র দিদিমার ইচ্ছেমতো সমস্ত রীতিনীতি ঠিক মতো মেনে চলতে না পারি! না, মানে তিনি খুশি না হলে তো বউমাও দুঃখ পাবে, তাই ভাবছি…

তোমরা এত ভেবো না তো। বাবা-মা হিসাবে যা রীতিনীতি মানার তাই মানবে, বাড়াবাড়ির তো কোনও প্রযোজন নেই।

না, মানে পৃথার দিদিমা একটু প্রাচীন ধ্যান ধারণার মানুষ তো, যদি তাঁর মন ভরাতে না পারি।

এবার মনোজ ওর মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, মা, বাবাকে তো এমন করে সাধরণ একটা বিষয় নিয়ে ভাবতে দেখিনি। বাবা তো এত সংস্কার মানে না। এখন কী যে হল! যাকগে, তুমি বাবাকে একটু খুশিতে থাকার ব্যবস্থা করো তো। আচ্ছা, ঠিক আছে, আমি কালই দিদিকে চলে আসতে বলছি। জামাইবাবু না হয় ব্যস্ত মানুষ, পরে আসবে। দিদি এলে তোমাদের মাতিয়ে রাখবে।

মণিমালা এখনও মা হয়নি। তাই ভাই অনুরোধ করতেই চলে এল মা-বাবাকে খুশিতে রাখার জন্য। দিদি আসার পর বাবা-মাকে অনেকটা চিন্তামুক্ত দেখে, মনোজও বেশ ফুরফুরে মেজাজেই ছিল। কিন্তু এক সন্ধ্যায় সূচনা হল এক রহস্যজনক অধ্যায়ের।

দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। মণিমালা তখন বাড়িতে থাকলেও, মনোজ ছিল না। ছেলেমেয়ের সামনে দিনেরবেলা মা-বাবাকে কখনও দরজা বন্ধ করে থাকতে দেখেনি মণিমালা। তার কাছে বিষয়টি আরও বিস্ময়ের এবং ভয়ের মনে হল, যখন সে ডাকাডাকি করেও দরজা খোলাতে পারল না। অগত্যা মণিমালা ভাই মনোজকে ফোন করে তাড়াতাড়ি আসতে বলল সব জানিয়ে।

অফিস ছুটি থাকার কারণে পাড়ার মোড়ে বসেই আড্ডা দিচ্ছিল মনোজ। দিদির ফোন পেয়ে সে দ্রুত ফিরে আসে বাড়িতে।

ছেলে এসে দরজায় জোরে জোরে কড়া নাড়তেই দরজা খুলে গেল। মা খুললেন দরজা। তাঁকে বেশ গম্ভীর দেখতে লাগছিল।

কী হয়েছে তোমাদের? শরীর খারাপ? প্রায় চেঁচিয়ে উঠল মনোজ।

না, তেমন কিছু হয়নি। একটা বিষয় নিয়ে আমরা একান্তে কিছু আলোচনা করছিলাম। ভেতরে আয়। উনি তোদের ভাইবোন-কে কিছু বলতে চান আজ।

ভয় এবং বিস্ময়ের প্রাথমিক ধাক্কা কাটানোর পর ভাইবোন দুজনে ঘরে ঢুকল মায়ের সঙ্গে।

কী হয়েছে বাবা? প্রশ্ন ছুড়ে দিল মনোজ।

ওদের ভাইবোনকে ইশারায় বসতে বললেন সরোজবাবু। তারপর কয়েক সেকেন্ড বাদে ঘরের নিস্তব্ধতা কাটিয়ে মুখ খুললেন তিনি। প্রশ্নের সুরে বললেন, আচ্ছা, তোরা বলতো, বিয়ের মতো শুভ কাজে বাইরের একটা উটকো লোকের রীতিনীতি পালনের অধিকার আছে? মানে, যে-কেউ কি বাবার ভমিকা নিতে পারে?

এমন হেঁয়ালিপূর্ণ কথা শুনে ভাইবোন প্রায় সমস্বরে বলে ওঠে, মানে!

হ্যাঁ, মনের সঙ্গে যুদ্ধ করে জিতে গেছি, তাই আজ বলতে দ্বিধা নেই। আমি আসলে তোদের বাবা নই, সম্পর্কে মামা! তাও আবার নিজের রক্তের সম্পর্কের মামা নই, প্রতিবেশী পাতানো মামা। এই পর্যন্ত বলে সরোজবাবু থামলেন এবং মনোজ ও মণিমালার প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করতে লাগলেন। গীতা তখন মাথা নীচু করে খাটের উপর বসে রয়েছেন।

কিছুটা থমকে থাকার পর, মায়ের দিকে তাকিয়ে মনোজ জিজ্ঞেস করল, মা, বাবা ভুল বকছে কেন? শরীর ঠিক আছে তো?

মনোজের প্রশ্নের উত্তরে সরোজবাবু আবারও শান্ত গলায় জানালেন, আমি সম্পূর্ণ সুস্থ আছি মনোজ। আজ তোদের কঠিন সত্যের মুখোমুখি হতেই হবে। নয়তো আমি হয়তো সত্যিই মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলব।

অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর মণিমালার মুখ থেকে অস্ফুটে বেরিয়ে গেল, কী সত্যি…!

একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন সরোজবাবু। তারপর ডুব দিলেন স্মৃতির গভীরে। বলতে শুরু করলেন, তোদের মা এবং আমি জলপাইগুড়ির একটি গ্রামে পাশাপাশি বাড়িতে থাকতাম। বলতে গেলে একই পরিবারের মতো। ছোটোবেলা থেকেই আমরা ভাইবোনের মতো ছিলাম। তোদের মা আমাকে ফোঁটা দিত, রাখি পরাত। আমরা একই স্কুলে, একই ক্লাস-এ পড়তাম। বড়ো হয়ে দুজনে হায়ার এডুকেশনের জন্য কলকাতায়, মানে এখানে এলাম। আমি যে মেসবাড়িতে থাকতাম, তার থেকে খানিক দূরে লেডিজ হস্টেল-এ থাকত তোদের মা। দেখা হতো নিয়মিত। ভাইবোনের বেশ আড্ডাও হতো।

একদিন আমাদের সঙ্গে আড্ডায় যোগ দিল জামশেদপুরের ছেলে সুনির্মল। আমি আর সুনির্মল একই মেস-এ থাকতাম। কিন্তু সুনির্মল চাকরি করত একটি প্রাইভেট সংস্থায়। আমিই সুনির্মলের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছিলাম তোদের মায়ের। ব্যস, ওই পর্যন্তই। তারপর কবে, কীভাবে ওরা দুজন দুজনকে ভালোবাসতে শুরু করেছিল, সম্পর্ক গভীর হয়েছিল, তা আমি জানতাম না।

হঠাৎ একদিন তোদের মা কাঁদতে কাঁদতে এসে দেখা করল আমার সঙ্গে। এত হাসিখুশি বোনটাকে ওভাবে কাঁদতে দেখে আমি অবাক হযেছিলাম। কিছুতেই ও বলতে পারছিল না ওর দুঃখ-কষ্ট কিংবা সমস্যার কথাটা। তারপর সব জানলাম অনেক অনুরোধের পর। কিন্তু সুনির্মল যে-মেস ছাড়ার আগে গীতার সর্বনাশ করে গেছে, তা জেনে মর্মাহত হলাম। কারণ, সুনির্মলের ব্যবহারে কোনও দিন অবিশ্বাসের চিহ্নও খুঁজে পাইনি। চাকরিসূত্রে অন্যত্র বদলি হয়ে যাচ্ছে বলে মেস ছেড়েছিল সে। তখন কে জানত যে, আসলে ও পালিয়েছে!

অনেক খোঁজাখুঁজির পরও পাওয়া গেল না সুনির্মলকে। উলটে, পুলিশের মাধ্যমে অন্য এক মর্মান্তিক ঘটনার খবর পেয়েছিলাম। সুনির্মলের ওই অপকর্ম করে পালিয়ে বেড়ানোর খবর পেয়ে বালিগঞ্জে বাপের বাড়িতে এসে আত্মহত্যা করেছিল তার বিবাহিত স্ত্রী। আর তার বৃদ্ধা অসহায় মায়ের কাছে রেখে গিয়েছিল একরত্তি মেয়েকে। মণি তুই তখন কথা বলতেও শিখিসনি।

সব জেনে গীতা চমকে দেওয়ার মতো একটা পদক্ষেপ নিয়েছিল। পুলিশের সাহায্য আর আইনি অনুমতি নিয়ে বালিগঞ্জের বাড়িতে গিয়ে মণিকে নিয়ে এসে নিজের মেয়ে পরিচয় দিয়েছিল। অথচ নিজেই তখন অসহায়। পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। গীতা-র ওই অদ্ভুত মানসিক শক্তি, মহানুভবতা আর সাহস দেখে আমি হতবাক হয়েছিলাম। কিন্তু ঘোর কাটতেই আমার মনে হযেছিল, একা একটা মেয়ের পক্ষে এত বড়ো লড়াই চালিয়ে যাওয়া অত্যন্ত কঠিন। তাই হাত বাড়িয়ে দিলাম সাহায্যের।

আর জলপাইগুড়িতে নিজেদের বাড়িতে ফেরা হল না আমাদের। সমাজের রক্তচক্ষু এড়াতে গিয়ে আমরা একসঙ্গে থাকতে শুরু করলাম স্বামী-স্ত্রীর পরিচয়ে কিন্তু সে তো শুধু সমাজের চোখে, আসলে তো আমরা দুটি ভাই-বোন। পবিত্র সে সম্পর্ক। আজও সে পবিত্রতা বজায় রেখে চলেছি দুজনে এবং দাযিত্ব পালনেও কোনও ত্রুটি রাখিনি। তোরা দুজনেই সুনির্মলের সন্তান হলেও, তোদের মা আলাদা। কিন্তু গীতা তোদের দুজনকেই সমান স্নেহে মানুষ করেছে। আর আমি শুধু পাশে থেকে সাহস জুগিয়ে গেছি মাত্র। কিন্তু এতদিন এই স্বামী-স্ত্রীর অভিনয় করতে করতে হাঁপিয়ে উঠেছি। আর লুকিয়ে তোদের মায়ের হাত থেকে রাখি পরতে পারব না। এবার তোদের সামনেই গীতার হাত থেকে ফোঁটা নিতে চাই, রাখি পরতে চাই। তোরা সে অনুমতি দিবি তো?

এতক্ষণ সরোজবাবুর কণ্ঠস্বর ছাড়া আর কোনও শব্দ ছিল না ঘরে। কিন্তু তার কথা শেষ হতেই কান্নার বাঁধ ভাঙল মণিমালার। গীতাকে আঁকড়ে ধরে শিশুর মতো কাঁদছে সে। গীতার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। অন্যদিকে, সরোজবাবুর পা ধরে মাটিতে বসে পড়েছে মনোজ। সরোজবাবুর স্বার্থত্যাগ ও মহানুভবতার কাহিনি শুনে মনোজের তখন বাকরুদ্ধ অবস্থা।

একসময় ঘরে দেখা গেল এক স্বর্গীয় সুখময় দৃশ্য। সরোজবাবু, গীতা, মণিমালা, মনোজ সবাই একে অন্যকে জাপটে ধরে রয়েছে। সবার চোখেই জল। দুঃখ, যন্ত্রণা আর পারস্পরিক শ্রদ্ধার সেই অনুভতি যে কেমন ছিল, তা ওরা চারজন ছাড়া অনুভব করা অন্যদের কাছে দূরূহ বিষয়।

যাইহোক, মনোজের মর্মান্তিক অতীত এবং গীতা ও সরোজবাবুর এই সংবেদনশীল কাহিনি শুনে পৃথা, ওর মা-বাবা, এমনকী দিদিমাও বিস্ময় প্রকাশ করেন ও মুগ্ধ হন। তারপর, মনোজের অনুরোধ মতো রীতিনীতি ছাড়াই বিয়ের অনুমতি দেন পৃথার দিদিমা। আর এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি খুশি হন সরোজবাবু। কারণ, তাঁকে আর অসহায় ভাবে বাবা সাজতে হবে না।

 

বাড়িতে থেকেই ওজন কমান

ওজন কমানোর জন্য খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ‘ডায়েট’ শব্দটা শুনলেই অনেকে ভাবেন অল্প খাওয়াদাওয়া করা। কিন্তু আসলে ব্যাপারটা একেবারেই সেরকম নয়।দিনের পর দিন প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত কম খেলে সেক্ষেত্রে আপনার মেটাবলিজম কমে যেতে পারে। অর্থাত্ আপনি যতই কম খান না কেন, সেটা ধীরে ধীরে হজম হবে। ফলে কোনওদিন একটু বেশি খেলেই তা ফ্যাট হিসেবে শরীরে স্টোর হওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পাবে।

দেহের ওজন আয়ত্বে রাখতে হলে, খেতে হবে কম ক্যালোরিযুক্ত খাবার। এমন হবে সেই খাবার, যা শরীরকে হাইড্রেট রেখে, ওজন কমাতে সাহায্য করবে।

বাজারে সহজলভ্য কিছু উপকরণকে আমরা ওজন কমানোর জন্য বেছে নিতে পারি। এর মধ্যে আছে করোলা, কাঁচা আম এবং তরমুজ। এই তিনটি উপকরণ দেহের চর্বি কমিয়ে ওজনের সমস্যা দূর করতে সাহায্য করে। বর্তমান পরিস্থিতিতে কমেছে হাঁটাচলা, পরিশ্রম। তাই, গৃহবন্দি থেকেও কীভাবে ওজন কমাবেন, বিশদে জেনে নিন।

  • করোলা : তেতো স্বাদের এই সবজিটি রান্না করে খেলে, রক্তে শর্করার মাত্রা কমবে এবং শরীরের ক্যালোরি কমাতে সাহায্য করবে। আর ক্যালোরি গ্রহণ কমলে, দেহের ওজনও কমবে।
  • কাঁচা আম : কেটে, নুন মাখিয়ে কিংবা চাটনি বানিয়ে খেতে পারেন কাঁচা আম। আর এই আম ফাইবার, ম্যাগনেসিযাম, অ্যান্টি অক্সিড্যান্টস এবং আয়রন সমৃদ্ধ। এটি তাই খিদে নিয়ন্ত্রণ করে। আর খিদে নিয়ন্ত্রণ করার কারণেই, দেহের ওজনও আয়ত্তে থাকে।
  • তরমুজ : তরমুজ খেলে যেমন শরীরে জলের ঘাটতি হবে না, ঠিক তেমনই এতে অ্যান্টি অক্সিড্যান্ট লাইকোপেন থাকার কারণে, দেহের ফ্যাট পোড়াতে সাহায্য করবে। আর চর্বি না জমলে, দেহের ওজন বেড়ে যাওযারও সম্ভাবনা থাকবে না।

এগুলি খাওয়ার পাশাপাশি, সম্ভব হলে ওজন নিয়ে ব্যায়াম করুন। বডিওয়েট এক্সারসাইজ, যেমন পুল আপ, পুশ আপ, স্কোয়াটস্ ইত্যাদি করুন। এতে শরীরে পেশি বৃদ্ধি পাবে। পেশি যত বাড়বে, ততই আপনার মেটাবলিজম বৃদ্ধি পাবে। তখন বেশি খেলেও সেই ক্যালোরি দ্রুত খরচ হয়ে যাবে।

বেলা শেষের গান

চিড়চিড়ে গরম। কোনওরকমে বাজারের থলে সামলে হাঁটছেন মধুশ্রী। সঙ্গে ছাতা নেই, ভুলে গেছেন আনতে। হাত দিয়ে ঘাম মুছতে হচ্ছে বারবার। বাজারের থলেটা খুব ভারী ছিল না কিন্তু জুন মাসের অসহ্য গরমে রোদের মধ্যে ছাতা ছাড়া হাঁটতে খুব কষ্ট হচ্ছিল মধুশ্রীর। অটোরিক্সা স্ট্যান্ড খুব দূরে ছিল না, তাই অটো ধরার আশায় কিছুটা হেঁটে এগিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু হঠাৎই মাথা ঘুরতে শুরু করল। নিজেকে সামলে নেওয়ার আগেই ধাক্কা খেলেন বিদ্যুতের স্তম্ভে। আচমকা ধাক্কার জেরে রাস্তায় পড়ে গেলেন মধুশ্রী। তাঁর হাতের বাজারের থলি ছিটকে গিয়ে পড়ল অন্যদিকে।

ভিড় জমে গেল মুহূর্তেই।

বুঝলাম না কীভাবে পড়ে গেল! হয়তো মাথা ঘুরে গেছে।

চল, হাসপাতালে নিয়ে যাই। মনে হচ্ছে সেন্সলেস।

ভিড়ের ভেতর থেকে এমনই কিছু কথা ভেসে এল। কিন্তু কেউ দাযিত্ব নিয়ে মধুশ্রীকে তার বাড়ি কিংবা হাসপাতালে নিয়ে গেল না।

ভিড় দেখে সাদা রঙের চলমান এক গাড়ি রাস্তার ধারে দাঁড় করালেন গাড়ির যাত্রী। গাড়ি থেকে নেমে এলেন লম্বা চওড়া এক ব্যক্তি। ভিড় ঠেলে এগিয়ে দেখলেন মধুশ্রীর সংজ্ঞাহীন অসহায় অবস্থা। কী হয়েছে জেনে নিলেন ভিড়ের জনতার থেকে এবং আর দেরি না করে, তাঁর গাড়ির চালকের সাহয্যে গাড়িতে তুললেন মধুশ্রীকে।

এখানে কাছাকাছি কোনও হাসপাতাল আছে ভাই? একজনকে জিজ্ঞেস করলেন সেই ব্যক্তি।

হ্যাঁ স্যার, সামনের মোড় থেকে ডানদিকে একটু এগোলেই একটা নার্সিংহোম আছে।

গাড়ি দ্রুত এগিয়ে গেল নার্সিংহোম-এর উদ্দেশে।

হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছেন মধুশ্রী। স্যালাইন চলছে। কিছুক্ষণ পর হুঁশ ফিরল তাঁর। নার্স তাঁকে জানাল সবকিছু। শরীর কিছুটা কমজোর মনে হলেও মধুশ্রীর ইচ্ছে হল উঠে গিয়ে সেই মহানুভবকে ধন্যবাদ জানাতে, যিনি তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন। কিন্তু মধুশ্রীকে যেতে না দিয়ে নার্স নিজেই ডেকে আনলেন ওই ব্যক্তিকে।

কেমন আছেন এখন? ডক্টর জানিয়েছেন, ভয়ের কিছু নেই। একটু পরেই ডিসচার্জ করা হবে আপনাকে। ঘরে ঢুকে মধুশ্রীকে আশ্বস্ত করলেন ওই ব্যক্তি।

উপকারী মানুষটির জন্য  বিনয়ে মন ভরে গেল মধুশ্রীর।

আপনি আমার জন্য অনেক কিছুই করলেন। আপনাকে কীভাবে যে ধন্যবাদ জানাব, ভেবে পাচ্ছি না!

এসব ভেবে বিচলিত হবেন না। মানবিকতাই সবচেয়ে বড়ো ধর্ম। আমি শুধু ধর্ম পালন করেছি মাত্র। যাইহোক, আপনাকে একটা কথা বলতে চাই। ডক্টর জানিয়েছেন, আপনার ব্লাড সুগার-এর সমস্যা আছে। ঠিকমতো চিকিৎসা করে আয়ত্তে রাখবেন, নয়তো বিপদ হতে পারে।

সম্মতিসূচক মাথা নাড়ালেন মধুশ্রী। তিনি জানতেন, ভুল করেছেন। সকালে সুগারের ওষুধ খেতে ভুলে গেছেন। তার উপর আবার রোদে হেঁটেছেন। ফলে সুগার লেভেল কমে গিয়ে মাথা ঘুরে পড়ে যান। এই ঘটনায় বেশ অস্বস্তিতে পড়েন মধুশ্রী। ভাবতে থাকেন, তাঁরই ভুলের জন্য একজন অচেনা লোক সব কাজ ফেলে কষ্ট করলেন। কিন্তু যার প্রতি মধুশ্রী এত কৃতজ্ঞ, সেই মানুষটি তাঁর মহানুভবতার তালিকা আরও দীর্ঘ করলেন। নিজের গাড়ি করে মধুশ্রীকে তাঁর বাড়ি পেঁছে দিলেন। কিন্তু মধুশ্রী তাঁকে এক কাপ চা-ও খাওয়াতে পারলেন না। এমনকী তাঁর নাম কিংবা মোবাইল নম্বরটাও নিতে ভুলে গেলেন।

কিছুক্ষণ বাদে মেয়েকে ফোন করতে গিয়ে মধুশ্রী দেখলেন, অনেক মিসড কল। মোবাইলটা পার্স-এর মধ্যেই ছিল।

মধুশ্রী ফোন তোলেননি বলে সোমা খুব চিন্তায় ছিল। হঠাৎ ফোন-এ পেয়ে প্রশ্নের ঝড়। কথা বলতে বলতে সোমা জানাল, মধুশ্রীকে আর কিছুক্ষণ ফোনে না পেলে সে বিকাশকে ফোন করত।

ভাগ্যিস তুই বিকাশকে ফোন করিসনি, এতদূরে থাকে বিকাশ, বেচারা দুশ্চিন্তায় থাকত।

মা, তুমি কী ভাবো, আমরা তোমাকে ফোন-এ না পেলে ঠিক থাকতে পারি? আমি একটু পরেই সুমিতকে বলে গাড়ি নিয়ে তোমার খোঁজে যেতাম।

একজন অচেনা লোক কীভাবে মধুশ্রীকে বিপদের থেকে বাঁচিয়েছেন, পুরো ঘটনার বিবরণ সোমাকে জানালেন মধুশ্রী।

মা-কে সোমা জানাল, থ্যাংক গড, ভদ্রলোক এতবড়ো উপকার করলেন তাই, নয়তো যে কী হতো! মুম্বই থেকে কলকাতা তো খুব কাছে নয়, তোমার কাছে পেঁছোতে আমার বেশ সময়-ই লাগত। মা, তুমি সুস্থ আছো এটাই বড়ো খুশির খবর। কিন্তু এবার থেকে আর ভুল করবে না, ঠিক সময়ে ওষুধ খাবে। নয়তো আমি দাদাকে বলে দেব যে, তুমি নিজের খেয়াল রাখছ না।

মধুশ্রীর ছেলে বিকাশ, বউ-বাচ্চা নিয়ে বিদেশে থাকে। আগে প্রায় প্রতিদিন-ই ফোন করে মায়ের খবরাখবর নিত। কিন্তু এখন হয়তো মাসে একবার ফোন করে। মধুশ্রী নিজেকে সান্ত্বনা দেন যে, সাত সমুদ্র তেরো নদী পার করে থাকে ওরা, কাজের চাপে হয়তো সময় পায় না ফোন করতে, কী আর করা যাবে!

হার্টের অসুখে অকালে স্বামী মারা যাওয়ার পর কলেজে লাইব্রেরিয়ান-এর চাকরি পেয়েছেন মধুশ্রী। ওটাই এখন তাঁর আর্থিক এবং মানসিক অবলম্বন। কিন্তু তবুও মাঝেমধ্যে বেশ অসহায় এবং একাকিত্ব বোধ গ্রাস করে মধুশ্রীকে। স্বামী-সন্তান নিয়ে সুখে-শান্তিতে সংসার করার সেই দিনগুলি স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে প্রায়শই। অ্যালবাম খুলে পুরোনো ছবিগুলি দেখতে দেখতে দু-চোখ ভারাক্রান্ত হয়, জলে টইটুম্বুর হয়ে ওঠে।

ছেলে বিকাশ আর বউমা মৌমিতা কানাডায় সংসার পেতেছে। ওদের দুই মেয়ে বড়ো হচ্ছে বিদেশি আবহে। মধুশ্রী অবশ্য দুবার গিয়ে ওদের সঙ্গে থেকে এসেছেন। ছেলে এবং বউমা দুজনে চাকরি করে। ওদের জীবনযাত্রা, পোশাক, চালচলনে এখন বিদেশি ছাপ। এসব মধুশ্রীকে খুব ভাবিয়েছে। তিনি চেয়েছিলেন তাঁর ছেলে-বউ আর নাতনিরা ভারতীয় সংস্কৃতিকে আপন করে নিক কিন্তু তা হল না। অনেক চেষ্টা করেও বিফল হয়েছেন। শুধু তাই নয়, তিনি প্রাচীন পন্থী, ব্যাক ডেটেড ইত্যাদি আখ্যাও দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, এটা ভারত নয়, কানাডা। এখানে যা চলে তা-ই আপন করে নিতে হবে। মধুশ্রী চুপ করে যান। ভালো-খারাপের তফাত বুঝিয়ে আর উপহাস-এর শিকার হতে চাননি।

উইক এন্ড-এ বন্ধুদের নিয়ে ক্লাব-এ পার্টি করতে চলে যায় ছেলে-বউমা। মধুশ্রীর সঙ্গে দুদণ্ড বসে কথা বলার সময় কোথায়! ঠান্ডার দেশের লোক হয়তো এমনই ঠান্ডা থাকে। দরজার বাইরে জমে থাকা বরফ দেখে মধুশ্রী আরও উদাস হয়ে পড়তেন। বাড়ির বাইরে গিয়ে প্রতিবেশীদের সঙ্গে বসে দুচারটে কথা বলারও উপায় নেই ওখানে। সবাই এক ছাদের তলায় থেকেও যেন পরস্পরের মধ্যে যোজন দূরত্ব। সবকিছু যেন যন্ত্রের মতো চলছে ওখানে। এসব দেখে ভিনদেশে আর মন টেকেনি মধুশ্রীর। নিজের দেশ হাতছানি দিতে থাকে তাঁকে। ফিরে আসেন আপন দেশে।

ছেলে বিকাশ অবশ্য অনেকবার-ই মা-কে আবার নিজেদের কাছে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে কিন্তু মধুশ্রীর মন ওঠেনি।

না না, তোমাদের ব্যস্ত জীবন, কাজকর্ম নিয়ে থাকো, আমি তোমাদের সঙ্গে থাকলে অসুবিধা হবে। তাছাড়া, সারাদিন বাড়িতে একা একা সময় কাটানো বিরক্তিকর মনে হবে আমার কাছে। এর থেকে আমার চাকরি নিয়ে ব্যস্ত থাকা ভালো।

এভাবেই সেদিনের কথাগুলি মনে পড়ে যায় মধুশ্রীর। আর মনে পড়ে বন্ধু পামেলার কথাগুলো। পামেলা বলত, দূর থেকেই সবকিছু ভালো লাগে। কিন্তু বিদেশে গিয়ে থাকতে পারলে কি সব সুখ পাওয়া যাবে?

পামেলার একথা শুনে মধুশ্রী বলেছিলেন, ছেলে-বউমারা সেখানে থাকে, ওদের জন্য ঠিক আছে। আমাদের মতো বুড়িদের কানাডায় থাকা মানায় না।

মধুশ্রীর বুড়ি হয়ে যাওয়ার কথা শুনেই পামেলা সঙ্গে সঙ্গে জোরালো প্রতিবাদ করে। তুই নিজেকে বুড়ি ভাবতে পারিস, কিন্তু আমি নিজেকে বুড়ি ভাবি না। বলেই দুজনে হো হো করে হেসেছিল সেদিন। এভাবেই চলতে থাকে ওদের কথোপকথন। দৈনন্দিন ঝামেলা থেকে শুরু করে কলেজে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে ঘুরে বেড়ানোর কথা উঠে আসে আলোচনায়।

পুরোনো কথা ভাবতে ভাবতে আনমনা হয়ে পড়েন মধুশ্রী। সম্বিত ফিরে পেয়ে আবার চোখ রাখেন বইয়ের পাতায়। স্বামীকে হারানোর পর এই বই-ই তাঁর অবসর যাপনের সম্বল। তেমন কোথাও যাওয়ার নেই। তাই লাইব্রেরি থেকে বই তুলে এনে পড়ার অভ্যাস তৈরি করেছেন মধুশ্রী। বলতে গেলে, তাঁর বেঁচে থাকার দুনিয়াটা অনেক ছোটো হয়ে গেছে। সন্তানদের যোগ্য করে তুলতে গিয়ে কখন বার্ধক্য নেমেছে শরীরে, টের পাননি, বেলা শেষের দিনগুলিতে সেই সন্তানরাই পাশে নেই। তাই ধীরে ধীরে গ্রাস করছে একাকিত্ব। অবশ্য এই একাকিত্ব মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনও  উপায়ও নেই। কারণ, এর জন্য তো ছেলেকে দোষারোপ করা যায় না, এ তো যুগের হাওয়া।

বিদেশে গিয়ে চাকরির বাসনা শুধু বিকাশের ছিল এমন নয়, মা মধুশ্রীও মনে মনে তাই চাইতেন। কারণ, ছেলের সাফল্যে তিনি গর্বিত ছিলেন। দুই সন্তানের ভবিষ্যত্ গড়ার জন্য অনেক ত্যাগ শিকারও করেছেন তিনি। বাবার অবর্তমানেও সন্তানরা কোনও রকম চাহিদা পূরণের অভাব অনুভব করেনি। ছেলে বিকাশ আর মেয়ে সোমা যখন কলেজে পড়ত, তখন তো মধুশ্রী নিজের জন্য আলাদা কোনও সময় বের করতে পারতেন না। সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকতেন ছেলেমেয়েকে নিয়ে। তখন মনে হতো, যেন ওদের সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের বাইরে আর কোনও নারীসত্তা নেই তাঁর। কিন্তু আজ মাতৃত্বের জন্য সবকিছু মেনে নিলেও, একজন ব্যক্তিমানুষ হিসাবে মধুশ্রীর মনের কোণে হয়তো দুঃখকষ্টের মেঘ জমে আছে।

ফোনটা হঠাৎ বেজে উঠল। রিসিভ করতেই পামেলার গলা শোনা গেল ও-প্রান্ত থেকে। তাদের বিবাহবার্ষিকীর পার্টিতে মধুশ্রীকে আসার কথা আবারও মনে করিয়ে দিল পামেলা। চিন্তায় পড়লেন মধুশ্রী। আজকাল কোনও হইহুল্লোড়ই যেন ভালো লাগে না তাঁর। কিন্তু প্রিয় বন্ধু বলে কথা, ইচ্ছে না থাকলেও, না গিয়ে উপায় নেই। কারণ, পামেলার মনে কষ্ট দিতে চান না তিনি।

আলমারিতে শাড়ি খুঁজতে খুঁজতে হালকা পলাশরঙা একটা শাড়ি চোখে পড়ল মধুশ্রীর। সধবাদিনের অনেক কথা-ই মনে পড়ে গেল তাঁর। শাড়িটা বের করে পরে ফেললেন। দাঁড়ালেন আয়নার সামনে। হঠাৎ যেন জোয়ার এল শরীর-মনে। বিদ্যুৎ খেলে গেল আপাদমস্তক। মুক্তোর হার-টা পরে নিলেন গলায়। কপালে একটা টিপও পরলেন। হঠাৎ চোখ পড়ল মাথার কালো চুলের ফাঁকফোকরে উঁকি মারতে থাকা সাদা চুলগুলোর দিকে। রঙিন হয়ে ওঠা মনটা হঠাৎই যেন মুষড়ে পড়ল। কিন্তু ওভাবেই তিনি বেরিয়ে পড়লেন পামেলা আর তার বর কর্নেল সাহেবের বিবাহবার্ষিকীর পার্টিতে।

ফুলের তোড়া হাতে নিয়ে ট্যাক্সি থেকে নামলেন মধুশ্রী। পা বাড়ালেন আলো দিয়ে সাজানো অর্কিড বাংলোর দিকে। গেট দিয়ে ঢোকার পর মধুশ্রীর চোখ আটকাল হলুদ অর্কিড ফুলগুলির দিকে। থরে থরে ফুটে থাকা ফুলগুলি সত্যিই এক মোহময়ী আবহ তৈরি করেছে। মধুশ্রীর মনটা বেশ ভালোলাগার আবেশে ভরে গেল।

কর্নেলসাহেব বন্ধুদের সঙ্গে হইহুল্লোড়ে ব্যস্ত ছিলেন। অতিথিদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিলেন দম্পতি। তাদের নিয়ে কর্নেলসাহেব আসর বেশ জমিয়ে তুলেছিলেন। এমন সময় সেখানে গিয়ে উপস্থিত হলেন মধুশ্রী। যাদের বিবাহবার্ষিকী, সেই পামেলা আর কর্নেলসাহেব মধুশ্রীকে স্বাগত জানানোর আগেই, অন্য একজন এগিয়ে এসে বলে উঠলেন, হ্যালো, কেমন আছেন আপনি? আবার দেখা হয়ে ভালো লাগছে।

প্রথমটা চিনতে না পারলেও, পরমুহূর্তেই বক্তাকে ঠিক চিনতে পারলেন মধুশ্রী। এ তো সেই মানুষটি, যিনি তাঁকে অসুস্থ অবস্থায় রাস্তা থেকে গাড়িতে তুলে নিয়ে গিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিলেন।

আরে আপনি? আবার এভাবে হঠাৎ দেখা হয়ে যাবে, ভাবতেও পারিনি!

আমি সুরজিৎ। কর্নেল আমার বন্ধু।

আমি মধুশ্রী। পামেলার বন্ধু।

আসুন, কোথাও বসি। বলেই একটু এগিয়ে গিয়ে দুটো চেয়ার টেনে মধুশ্রীর দিকে একটা চেয়ার এগিয়ে দিয়ে নিজে অন্যটাতে বসলেন সুরজিৎ।

বসার পর প্রথমে মুখ খুললেন মধুশ্রী। বিনয়ভরা কণ্ঠে বললেন, ওই দিন আপনি এত বড়ো উপকার করলেন, আর আমি আপনাকে এককাপ চা-ও খাওয়াতে পারিনি। আমার খুব আপশোশ হয়েছে পরে।

আপশোশের কথা ছাড়ুন। যখন দেখা হয়ে গেল, চা-পানের সুযোগ তো হবেই আবার। বলেই হাসতে লাগলেন সুরজিৎ।

আবহাওয়া হঠাৎই বদলে গেছে। হালকা হাওয়ায় বেশ একটা আরামের আমেজ অনুভত হচ্ছিল। পাশের মঞ্চে সুমধুর গজল পরিবেশন করে খুশির আমেজকে আরও খানিকটা বাড়িয়ে তুলেছিলেন জনৈক শিল্পী। মধুশ্রী এবং সুরজিতের আড্ডাও চলেছিল অনেকক্ষণ। এরই মধ্যে কখন যে দুজনে বন্ধুর মতো হয়ে উঠেছিলেন, তা তাঁরা নিজেরা বুঝে না উঠলেও সাক্ষী ছিল ওই রাতের আবহ।

এরপর অনেকবারই রেস্তোরাঁয় মুখোমুখি বসে খাবার খেয়েছেন মধুশ্রী এবং সুরজিৎ। সুখ-দুঃখের কথাও বলেছেন অনেক।

সুরজিতের সুন্দর একটি বাগান এবং নার্সারি আছে। অবিবাহিত সুরজিৎ বাগান নিয়ে ব্যস্ত থাকেন সারাক্ষণ। আর ওখানে গিয়ে অনেকবারই আতিথ্য নিয়েছেন মধুশ্রী। সুরজিৎ তাঁকে অনেক ফুলের গাছ উপহার হিসাবেও দিয়েছেন। উপহার পাওয়া সেইসব গাছ এখন ফুলে ভরিয়ে রেখেছে মধুশ্রীর বাড়ির ঘর-বারান্দা।

মধুশ্রী এবং সুরজিৎ দুজনেই প্রায় একা। সুরজিৎ বিয়ে না করে একা আর মধুশ্রী সংসারজীবনে থেকেও একা। আর এই একাকিত্ব দূর করার জন্য দুজনে কখনও রেস্তোরাঁয়, কখনও বাগানে, কখনও আবার লং ড্রাইভ-এ গিয়ে এক অন্য জীবনের সাধ পেয়েছেন।

এভাবেই একদিন মুখোমুখি বসে কথা হতে হতে মধুশ্রী সুরজিত্কে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি বিয়ে করেননি কেন?

ব্যক্তিত্ববান সুপুরুষ সুরজিতের প্রেমে পড়েনি কোনও মেয়ে এমনটা ভাবতেও অবাক লাগে মধুশ্রীর। তাই তিনি কৌতূহল মেটাতে চাইলেন। উত্তরে সুরজিৎ জানালেন, কিছু দাযিত্ব এমন ছিল যা পালন করতে গিয়ে নিজের কথা আর ভাবতে পারিনি। অকালে বাবাকে হারাবার পর সংসারের সব দাযিত্ব এসে পড়ে আমার উপর। আমিই বাড়ির বড়ো ছেলে, তাই ভাইবোনের লেখাপড়া, ভরণপোষণ, বিয়ে দেওয়া ইত্যাদি সবই সামলাতে হয়েছে আমাকে। কিন্তু ভাইবোনেরা যখন নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল, তখন তারা মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসতে চাইল। আমি পারলাম না। আমি চাকরি থেকে স্বেচ্ছাবসর নিয়ে বৃদ্ধা মায়ের সেবাযত্ন শুরু করলাম। একসময় আমার বিয়ের খুব স্বাভাবিক ভাবে কিছু সম্বন্ধ এসেছিল। কিন্তু নানা কারণে বিয়ে অবধি গড়ায়নি। তবে আনন্দে থাকার চেষ্টা করি। ব্যস, একজন ভালো বন্ধুর ঘাটতি ছিল, সেও তো পেয়ে গেলাম। এখন আর আমার চিন্তা কীসের? বলেই হো হো করে হাসতে শুরু করলেন সুরজিৎ।

মুগ্ধ হয়ে সবকিছু শুনছিলেন মধুশ্রী। সুরজিতের কথা শেষ হওয়ার পর মধুশ্রীর মুখ দেখে মনে হল, সুরজিতের প্রতি তাঁর সম্মান যেন আরও বেড়ে গেল।

শুনলাম সুরজিতের সঙ্গে আজকাল নাকি খুব ঘুরছিস বলেই মধুশ্রীর দিকে আড় চোখে তাকালেন পামেলা।

একথা শুনে মধুশ্রীর গাল লাল হয়ে উঠল। পামেলা আবার বলতে শুরু করলেন, আমার খুব ভালো লাগল অন্তত নিজের কথা একটু ভাবতে শুরু করেছিস তুই।

চিলেকোঠার একপাশে দুজনে বসে বিকেলের চা-পানে ব্যস্ত ছিলেন। পামেলাকে বেশ খোশমেজাজে থাকতে দেখা গেল। কারণ, তিনি মধুশ্রীর এই অন্য জীবনের জন্য সত্যিই খুশি।

সত্যি বলছি, কাউকে মনের কথা খুলে বলে যে এত আনন্দ পাওয়া যায়, তা নতুন করে উপলব্ধি করলাম। একমাত্র তোকে মনের কথা বলতাম এতদিন, এবার আরও একজনকে পেলাম। জানালেন মধুশ্রী।

পামেলা আর মধুশ্রীর আড্ডার মধ্যেই মধুশ্রীর ছেলে বিকাশের ফোন এল। বিকাশ জানাল, কিছুদিনের জন্য সপরিবারে সে ভারতে এসে থাকবে। গত তিন বছর অনেক চেষ্টা করেও অফিসের কাজের চাপে আসতে পারেনি, এবার সুযোগ পেয়েছে আসার। সঙ্গে বউ এবং বাচ্চাদেরও নিয়ে আসবে।

অনেকদিন বাদে ছেলে, বউ আর নাতনিদের দেখতে পাবেন জেনে মনটা আনন্দে ভরে গেল মধুশ্রীর। তখন থেকেই তিনি ওদের আসার দিন গুনতে শুরু করলেন।

ছেলে এবং তার পরিবার বিদেশ থেকে নিজের বাড়িতে ছুটি কাটাতে আসার ঠিক দুদিন আগে মধুশ্রীর জন্মদিন। এর আগে নিজের জন্মদিন কখনও পালন করেননি মধুশ্রী। কিন্তু এবার সুরজিৎ নাছোড়া। রেস্তোরাঁয় টেবিল বুকিং হয়ে গেছে।

সন্ধেবেলা মধুশ্রীকে দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলেন সুরজিৎ। নীলরঙা শাড়ি আর হালকা মেক-আপ-এ মধুশ্রী যেন মোহমযী নারী রূপে আবির্ভূতা। সুরজিৎ তাঁর দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে আছেন দেখে লজ্জায় আরও লাল হয়ে উঠেছিল মধুশ্রীর ফর্সা গাল।

মধুশ্রীর পছন্দের হলুদরঙা অর্কিড ফুল কিনে এনেছিলেন সুরজিৎ। টাটকা, সুন্দর সেই একগোছা ফুল হাতে পেয়ে মধুশ্রী যেন নববধূর মতো লজ্জা পেয়ে হাসতে লাগলেন।

খুব সুন্দর ফুল, হেসে ধন্যবাদের ভাব প্রকাশ করলেন মধুশ্রী।

একদম আপনার মতো বলেই অর্থবহ হাসলেন সুরজিৎ।

আজ যেন পাশাপাশি বসে দুটি শিশুহৃদয় একে অপরকে দেখছে। অন্তরে কি পরস্পরের প্রতি প্রেম জাগরিত, নাকি ওরা নিষ্পাপ সম্পর্কের দুটি মানুষ, দুই বন্ধু?

বাড়ির সামনে মধুশ্রীকে নামিয়ে দেওয়ার আগে, তাঁর হাতে সুন্দর একটি উপহার তুলে দিলেন সুরজিৎ। বাড়িতে ঢুকে উপহারের মোড়ক খুললেন মধুশ্রী। দেখলেন সুন্দর একটি মুক্তোর আংটি। আর, সঙ্গে একটি চিঠি। মধুশ্রী ঝটিতি পড়ে ফেললেন সুরজিতের চিঠি। পড়ার পর আনমনা হয়ে পড়তে দেখা গেল তাঁকে।

অনেক কম বয়সে বিধবা হয়েছেন মধুশ্রী। কিন্তু এর আগে কখনও কোনও পুরুষ মানুষের সঙ্গে তাঁর সখ্যতা তৈরি হয়নি। চিঠিতে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন সুরজিৎ। মধুশ্রী নিশ্চুপ! সুরজিত্কে তিনি পছন্দ করেন, কিন্তু বিয়ে সে তো অনেক বড়ো বিষয়। মধুশ্রী এভাবে বিষয়টি নিয়ে ভাবেননি কখনও কিন্তু আজ ভাবতে হচ্ছে। কারণ, দাম্পত্য সম্পর্কে সূক্ষ্ম স্বার্থ থাকে, নিখাদ বন্ধুত্বে থাকে না।

সে যাই হোক, এভাবে একা একা দিন কাটানোও তো শরীর আর মনের জন্য ভালো নয়। তাহলে কী করা উচিত? বিয়ের প্রস্তাব কি মেনে নেওয়া উচিত? পরিবারের লোকজন কী বলবে? সমাজ কী ভাবে নেবে বিষয়টিকে? এসব প্রশ্ন নিজেই নিজেকে করেন মধুশ্রী। এভাবেই কেটে যায় অনেকটা সময়। নিজের প্রশ্নের উত্তর নিজেই খুঁজে পান না। আলমারি-তে চিঠি তুলে রাখেন সযত্নে। সিদ্ধান্তে পেঁছোতে না পারার জন্য ফোনও করে উঠতে পারেননি সুরজিত্কে।

বিকাশ তার বউ-বাচ্চাদের নিয়ে এসে গিয়েছে। মেয়ে সোমাও তার ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে হাজির। বাড়ি এখন ভরাভরতি রূপ নিয়েছে। স্কুল থেকে ছুটি নিয়ে নাতি-নাতনিদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন মধুশ্রী। প্রতিদিন কিছুটা বিনোদনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এসবের মধ্যে সিনেমা দেখা, রেস্তোরাঁয় খাওয়া ইত্যাদি রয়েছে।

একদিন সুরজিতের ফোন এল। এতদিন মধুশ্রীর উত্তর না পেয়ে সুরজিৎ ভেবেছিলেন, বোধ হয় রাগ করেছে মধুশ্রী।

সুরজিতের ফোন পেয়ে খুব লজ্জায় পড়ে যান মধুশ্রী। ছেলেমেয়ে বউমা আর নাতি-নাতনিদের পেয়ে সুরজিত্কে ফোন না করতে পেরে নিজেকে খুব স্বার্থপর মনে হল মধুশ্রীর।

পরের দিন মধুশ্রী তাঁর বাড়িতে আমন্ত্রণ জানালেন সুরজিত্কে। সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার ইচ্ছেপ্রকাশও করলেন মধুশ্রী। তিনি ভাবলেন, এখন ছেলে-মেয়েরাই তাঁর অভিভাবক। তাই তাদের মতামত নেওয়াটাও জরুরি। যতই হোক, এই বয়সে বিয়ে বলে কথা!

ডিনার-এ কাকে নিমন্ত্রণ করেছ মা? কৌতূহল মেটাতে চায় মেয়ে সোমা।

কেউ একজন হবে। আমার কোনও বিশেষ বন্ধু-ই ভেবে নে। সন্ধেবেলা নিজেই আলাপ করে নিবি। মেয়েকে হাসিমুখে জানালেন মধুশ্রী।

আলাপ, পরিচয় এবং কথাবার্তার পর সুরজিত্কে সবার খুব পছন্দ হয়ে গেল। মধুশ্রীর ছেলেমেয়ে মন জয় করে নিয়েছিলেন সুরজিৎ। তাই সবাই একসঙ্গে খুব হইহই করে ডিনার সারলেন।

সুরজিৎ চলে যাওয়ার পর, ছেলেমেয়েকে তাঁর ইচ্ছের কথা জানাবার উপযুক্ত সময় মনে করলেন মধুশ্রী। কিন্তু সবকিছু শোনার পর ছেলে বিকাশ আর মেয়ে সোমার কপালে ভাঁজ দেখা গেল।

দাদাকে চুপচাপ থাকতে দেখে নীরবতা ভাঙল সোমা, এই বয়সে কেউ বিয়ে করে মা! আমরা তো ভাবলাম তোমরা খুব ভালো বন্ধু। তাই বলে বিয়ে?

আমরা তো বন্ধু-ই আছি। বন্ধুর মতোই এতদিন সময় কাটিয়েছি। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে দুজনের দুজনকে প্রতিটা মুহূর্তে প্রযোজন। তাই, বন্ধুত্ব থেকে আরও অনেকটা এগিয়ে সম্পর্ককে বৈধতার মোড়ক দিতে চাই। জানালেন মধুশ্রী কোনওরকম জড়তা না রেখে।

মায়ের কথা শুনে এরপর মুখ খুলল বিকাশ, কিন্তু মা তুমি শুধু তোমার কথাটাই ভাবছ, আমাদের কথা ভাবছ না। লোকে কী বলবে ভেবে দেখেছ?

সুযোগ পেয়ে বউমাও দু-চার কথা শুনিয়ে দিল মধুশ্রীকে। ছেলে, বউমা, মেয়ে যেন এক সুরে কথা বলছে তখন।

অবাক হলেন মধুশ্রী। ছেলেমেয়ে দুজনেই শিক্ষিত। ছেলে-বউমা বিদেশে থাকে, তারা তো মায়ের থেকেও আধুনিক মনষ্ক হবে এটাই প্রত্যাশিত ছিল। তা নয়, লোকলজ্জার কথা তারা ভাবছে! খানিকটা ব্যথিত হয়ে সভা ভঙ্গ করে ঘরে ঢুকলেন মধুশ্রী।

একমাস থাকার কথা ছিল ছেলেমেয়েদের। কিন্তু তারা থাকল না। মনোমালিন্য এতটাই চরমে উঠল যে, ফ্লাইটের টিকিট পাওয়া মাত্রই রওনা দিল তারা।

আবার একাকিত্ব গ্রাস করল মধুশ্রীকে। অবশ্য এবারের একাকিত্ব আরও তীব্র রূপ নিল, মানসিক অবসাদের কারণে। এক সময় মনকে শক্ত করে মধুশ্রী সবকিছু জানালেন সুরজিত্কে। সব শুনে সুরজিৎ নিজেকে প্রথমে লজ্জিত এবং অসহায় মনে করলেও, পরক্ষণেই আবার স্বভাববশত ইতিবাচক কথা শোনালেন মধুশ্রীকে।

সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে, ধৈর্য ধরো। আমিও সুসময়ের অপেক্ষায় থাকব।

 

ছেলেমেযেরা যাওয়ার পর এক সপ্তাহ কেটে গেছে, কোনও ফোন নেই। মধুশ্রীর ফোনও রিসিভ করেনি কেউ। মায়ের মন তো, তাই দুশ্চিন্তায় বিনিদ্র রাত কাটাচ্ছেন মধুশ্রী।

হঠাৎ ফোন বেজে উঠল। ছুটে গিয়ে ফোনটা তুললেন মধুশ্রী।

ফোনের ও-প্রান্তে মেয়ে সোমার কণ্ঠস্বর, হ্যালো মা, সরি, তোমাকে ফোন করা হয়নি। দাদাও ফোন করতে পারেনি। বউদি জানিয়েছে আমাকে, দাদা খুব অসুস্থ। হাসপাতালে ভর্তি আছে। লিভারের কোনও বড়ো সমস্যা হয়েছে। তুমি পারলে আমার এখানে মুম্বই চলে এসো। আমি তোমাকে নিয়ে কানাডা রওনা দেব।

কথাগুলো শুনতে শুনতে ভয়ে মধুশ্রী হতবাক হয়ে যান। কী হয়েছে? কত বড়ো অসুখ? এসব নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে করতে বসে পড়েন মধুশ্রী।

মা নীরব কেন বুঝতে না পেরে সোমা ও-প্রান্ত থেকে হ্যালো, হ্যালো করতে থাকে। সম্বিত ফিরে পেয়ে উদ্গ্রীব হয়ে জানান মধুশ্রী, আমি শুনছি। তুই চিন্তা করিস না, আমি আজই পৌঁছে যাচ্ছি তোর ওখানে। তুই কালকেই কানাডা যাওয়ার ব্যবস্থা কর।

মেয়ের ফোনটা রাখার পর কিছুক্ষণ ভাবলেন মধুশ্রী। তারপর ফোন করে সবকিছু জানালেন সুরজিত্কে।

সবকিছু শুনে সুরজিৎ বললেন, আমি এক্ষুণি ফ্লাইটের দুটো টিকিট কেটে নিচ্ছি। রাতেই রওনা দেব। তুমি চিন্তা কোরো না। বন্ধুত্বটা তো রাখতে দাও। ছেলেমেযেরাও জানুক, আমরা বন্ধু ছিলাম, বন্ধু-ই আছি।

শত কষ্টের মধ্যেও যেন সব অসহায়ত্ব কেটে গেল মধুশ্রীর। চোখের কোণ তখন জলে টইটুম্বুর।

দাগ

যখন বাড়ি ঢুকল বেশ রাত হয়ে গেছে। মনটা আজকে খুশিতে ভরে রয়েছে। পুরোনো স্মৃতিগুলো এমন ভাবে ঘিরে ধরেছে রুমনাকে যে, রুমনা বিছানায় শুয়ে কিছুতেই ঘুম আসতে চাইছে না। খালি সমীরের মুখটা মনের পর্দায় বারবার ভেসে উঠছে। প্রথম যেদিন আলাপ হয় সমীরের সঙ্গে ওকে দেখা মাত্রই, বিদ্যুৎ বয়ে গিয়েছিল সারা শরীরে।

সমীর ইউনির্ভাসিটি-তে এমটেক-এর ফাইনাল ইযারের ছাত্র আর রুমনা ফাইন আর্টস-এর। প্রথম দেখাতেই প্রেম। একে অপরকে ছাড়া জীবন, নিরর্থক মনে হতো। রোজ কিছুটা সময় একসঙ্গে কাটানো চাই-ই। অদ্ভুত এক আকর্ষণ কাজ করত ওদের মধ্যে। রুমনার সৌন্দর্য‌্য আর মধুর স্বভাব সমীরকে আচ্ছন্ন করে রাখত। প্রেমের বহমান স্রোতে দুজনেই গা ভাসিয়ে দিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি। এভাবেই বেশ কেটে যাচ্ছিল দিনগুলো। খোলা আকাশে মুক্ত বিহঙ্গের মতোই স্বাধীন ছিল ওরা। কিন্তু হঠাৎই মেঘমুক্ত আকাশে কালো মেঘের আভাস রুমনাকে আশঙ্কিত করে তুলল।

একদিন স্নান করার সময় আয়নায় নজরে এল পিঠে একটা সাদা দাগ। আগে এই দাগটা কখনও দেখেনি। মুহূর্তে বিচলিত হয়ে উঠল রুমনা। এটা যদি তার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে সে অসুন্দর হয়ে যাবে। তখন বেঁচে থাকার কোনও অর্থই থাকবে না। সঙ্গে সঙ্গে সমীরের মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠল। তার স্বপ্নের জগৎ মুহূর্তে কাচের মতো ভেঙে পড়ল। বাথরুম থেকে বেরিয়ে সোজা মায়ের সামনে এসে দাঁড়াল সে, চোখে আতঙ্ক স্পষ্ট! মা, আমার পিঠে দ্যাখোতো, এটা কীসের সাদা দাগ? শম্পা মেয়ের পিঠে সাদা দাগ দেখে নিজেও ঘাবড়ে গেলেন।

কথায় কথায় শম্পা এক বান্ধবীর কাছ থেকে একজন সাধুর ঠিকানা জোগাড় করে সেখানেই মেয়েকে নিয়ে যাওযা মনস্থ করলেন। সেই সাধু নাকি এরকম হাজারো রোগ মন্ত্র বলে সারিয়ে দিতে পারেন। রুমানাকেও জানালেন সাধুর কথা, আমি তোকে ওই সাধুর কাছে নিয়ে যাব ঠিক করেছি। আমার বান্ধবীর ভাইয়ের মেয়েরও এই রকম দাগ হয়েছিল শরীরে। তিন-চারবার বাবার কাছে, নিয়ে যাওয়ার পর দাগ সম্পূর্ণ মিলিয়ে গেছে।

মায়ের কথা রুমনা বিশ্বাস করতে পারল না।তন্ত্র-মন্ত্র-তে কোনওদিনই তার বিশ্বাস নেই। তাই মায়ের মুখে এই কথা শুনে একটু আশ্চর্য হল। জিজ্ঞেস করল, মা, তুমি পড়াশোনা জানা একজন মহিলা হয়ে এরকম কথা কী করে বলছ? এই সব সাধু-রা ধর্ম এবং বিশ্বাসের দোহাই দিয়ে মানুষকে ঠকায়।

শম্পা মেয়ের কথায় বিন্দুমাত্র বিচলিত হলেন না বরং উলটে একটু রাগ দেখিয়ে উত্তর দিলেন, নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের নিয়ে এটাই সমস্যা। তোরা নিজেদের ছাড়া অন্য কিছু আর ভাবিস-ই না। রুমি এই যে মন্ত্র-তন্ত্র, এরও শক্তি কিন্তু বিশাল, একে অবহেলা করিস না। আমার সঙ্গে তোকে যেতেই হবে, তুই বিশ্বাস করিস আর না-ই করিস।

অগত্যা রুমনা মায়ের সঙ্গে ওই সাধুবাবার কাছে যাওয়ার জন্য রাজি হয়ে গেল। মা-মেয়ে যখন পৌঁছল তখন বেশ ভিড় জমা হয়েছে ওখানে। সকলেই কোনও না কোনও সমস্যা নিয়ে এসেছে। খানিকক্ষণ পরেই কালো বস্ত্রে সর্বাঙ্গ ঢেকে জটাধারী এক বাবা প্রবেশ করলেন। কপালে জ্বলজ্বল করছে লাল টিকা। পিছনে সাত-আটজন শিষ্য। আসন গ্রহণ করতেই এক একজন করে যারা সমস্যা নিয়ে এসেছেন, তারা সামনে গিয়ে বসে সমস্যা খুলে বলা শুরু করলেন। অদ্ভুত ভঙ্গিমায়ে বাবা তাদের চিকিৎসা শুরু করলেন।

একজন মহিলা পেটে পাথরের সমস্যা নিয়ে বাবার সামনে বসে ছিলেন। রুমনার চোখের সামনে বাবা কিছু মন্ত্র পড়ে মহিলার পেটে তাঁর মুখ স্পর্শ করলেন। খনিকক্ষণ ওভাবে থাকার পর একটা পাথর সত্যি সত্যি মুখ দিয়ে বার করে আনলেন বাবা। রুমনার এবার ভয় করতে শুরু হল। ওর যখন বাবার সামনে যাওয়ার সুযোগ হল রুমনা ভেতরে ভেতরে ভয় পেয়ে গেল। বাবা রুমনার শরীরের এই দাগের উপর একটা মযূরের পালক বোলাতে আরম্ভ করলেন। মুখেও মন্ত্র উচ্চারণ করতে লাগলেন। এভাবে কিছুক্ষণ চলার পর বাবা মৌনতা ভেঙে বলে উঠলেন, এই দাগ সহজে যাবার নয়। কোনও অজানা শক্তির প্রকোপ এটা। এর জন্য অন্য কোনও বড়ো ব্যবস্থা করতে হবে।

বলুন বাবা কী করলে এই দাগ সারবে? আমরা সবকিছু করতে রাজি আছি, শ্রদ্ধার সঙ্গে উত্তর দিলেন শম্পা।

সাধুবাবা রুমনার হাতে একটা লাল কাপড়ের পুঁটুলি দিয়ে বললেন, শোন, এই কাপড়ের পুঁটুলিটা রোজ নিজের বালিশের তলায় রেখে শুবি। আর প্রতি শনিবার একটা যে-কোনও কালো কুকুরকে একটি করে অমৃত্তি খাওযাবি।

শম্পা মাথা নেড়ে মেনে নিল এই আদেশ। একটি পাত্রে রাখা পানীয় বাবা রুমনার হাতে দিয়ে বললেন, নে, এটা অমৃত, খেয়ে নে। এবার পিছন দিকে যে-কুঁড়েঘরটা রয়েছে সেখানে গিয়ে আমার জন্য অপেক্ষা কর।

রুমনার সঙ্গে সঙ্গে শম্পাও কুটিরে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়াতেই বাবা বললেন, উঁহু, তুই না… তুই, এখানেই থাক। তোর মেয়েকে একলাই ওখানে যেতে হবে।

এই বদ্ধ পরিবেশে রুমনা হাঁপিয়ে উঠছিল, তার উপর সাধুর কারসাজি যতই দেখছিল ভয়টা চেপে বসছিল বুকের ভিতর। ওকে ওই কুটিরে যেতে হবে শুনেই একটা চোরা টেনশন তাকে উদ্বেল করল। সে নিজেকে আর সামলাতে পারল না। শক্ত করে মায়ের হাতটা চেপে ধরে সে সোজা ওই ঘর থেকে রাস্তায় নেমে এল।

মুহূর্তের আকস্মিকতায় শম্পাও কিছুটা হকচকিয়ে গিয়েছিলেন। সম্বিত ফিরতেই শুনলেন বাবার সাগরেদরা চিৎকার করে বলছেন, আরে দাঁড়া, তোরা দাঁড়া, কোথায় যাচ্ছিস?

হাঁটার গতি অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছিল তারা। হাঁপাতে হাঁপাতে রুমনা বলল, আমার কাউকে দেখাবার কোনও দরকার নেই। ভণ্ড সাধু-সন্ন্যাসীতে আমার কোনও দিনই বিশ্বাস ছিল না, তোমার জন্য এখানে আসতে হল। শিগগিরি বাড়ি চলো মা।

রুমনার বাবা যখন পুরো ঘটনাটা শুনলেন, স্ত্রীয়ের উপর প্রচণ্ড রেগে গেলেন, শম্পা, তুমি কোন যুগে বাস করছ? এইসব বাবাজী, ওঝা আসলে বুজরুকের দল। ব্যাবসা ফেঁদে বসেছে। তুমি জানো না, দৈবশক্তির প্রভাব বলে এরা মানুষকে বোকা বানায়। রুমিকে একা পেয়ে বদমায়েসটা কী করত কোনও ধারণা আছে তোমার? খুব অন্যায় করেছ রুমিকে ওখানে নিয়ে গিয়ে, কাল আমি রুমিকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব।

পরের দিন রুমনার বাবা ওকে স্কিন স্পেশালিস্টের কাছে নিয়ে গেলেন। ডাক্তার রুমনাকে পরীক্ষা করে জানালেন, লিউকোডার্মার জাস্ট প্রথম স্টেজ। ঘাবড়াবার কিছু নেই। এখনই চিকিৎসা শুরু করে দিলে ঠিক হয়ে যাবে। রোগীকে যদি আনতে দেরি করে ফেলতেন তাহলে হয়তো পরিণাম খারাপ হতে পারত।

ডাক্তারের কথামতো রুমনা চিকিৎসা করানো শুরু করে দিল। কিন্তু মাথার মধ্যে একটা চিন্তা সবসময় ঘুরপাক খেতে আরম্ভ করল। সমীর এখনও ওর এই অসুখটার কথা কিছুই জানে না। কিছুতেই বলে উঠতে পারেনি রুমনা। সমীর হয়তো জানতে পারলে ওকে ছেড়ে চলে যাবে। কিন্তু না বলে বিয়ে করলেও পরে তো ও ঠিকই জানতে পারবে। তখন? কল্পনা করেই শিউরে ওঠে রুমনা। শত চেষ্টা করেও মন থেকে সমীরের চিন্তাটা কিছুতেই সরাতে পারে না সে। মন এক কথা বলে, মস্তিষ্ক সেটা কিছুতেই মানতে চায় না। দুটোই যেন রুমনার নিয়ন্ত্রণে নেই। সমীরকে হারাবার ভয়ে সত্যিটা চেপে রাখার চেষ্টা যেন রুমনার মধ্যে দিন দিন আরও জোরালো হয়ে উঠতে লাগল।এরকম চিন্তা করার জন্য রুমনার মন ওকে ধিক্কার দিত। কিন্তু তাতেও রুমনা সত্যিটা বলার জন্য কিছুতেই নিজেকে তৈরি করতে পারত না। ও খুব ভালো করেই বুঝত সমীরকে সাদা দাগের ব্যাপারটা না জানানো মানে ওকে ঠকানো। বিয়ের মতো পবিত্র এবং মধুর একটা সম্পর্কের ভিতটাই হল বিশ্বাস আর ভালোবাসা। সেটাই যদি না থাকে তাহলে ওদের বিয়ে কীসের ভিত্তিতে টিকে থাকবে? এই একই চিন্তায় ভিতরে ভিতরে গুমরে ক্ষয়ে যেতে লাগল রুমনা। হঠাৎই একদিন নিজের মন শক্ত করল, ঠিক করল সমীর যাই বলুক না কেন, সত্যিটা ওকে জানাতেই হবে।

সেদিন ইউনিভার্সিটি বন্ধ। দুপুর নাগাদ সমীরের ফোন এল, রুমনা, বিকেলে কী করছ? একটা নতুন রেস্তোরাঁর সন্ধান পেয়েছি, যাবে নাকি আজ?

সমীরের গলার আগ্রহ উপলব্ধি করে রুমনা তত্ক্ষণাৎ রাজি হয়ে গেল, ঠিক আছে, যেখানে অপেক্ষা করো সেখানেই থেকো। আমি পৌঁছে যাব।

ওরা দুজনে রেস্তোরাঁর একটা কোনা বেছে নিয়ে চেযার টেনে বসল। রঙিন আলোর মাযাবী খেলায় স্বপ্নাচ্ছন্ন পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে রেস্তোরাঁর ভিতরে।

আজ সমীর, রুমনা-কে বিয়ের প্রস্তাব দেবে ঠিক করেই এসেছিল। ক্যাম্পাসের সুবাদে ভালো একটা চাকরি পেয়েছে সে। ছমাস বাদে জয়েনিং। মনে মনে আউড়ে নিচ্ছিল কী ভাবে শুরু করবে, তার আগেই রুমনা হঠাৎ বলল, সমীর, আমার তোমাকে কিছু কথা বলার আছে।

রুমনার মনে হল হৃৎপিণ্ডের আওযাজটা সে নিজেই যেন শুনতে পাচ্ছে। সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দেওযার জন্য রুমনা আজ তৈরি হয়ে এসেছে। সমীরের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে রুমনা জানাল তার শরীরের সাদা দাগটার কথা।

সমীরের চোখের গভীরে চোখ রাখল রুমনা। সেখানে ভালোবাসা ছাড়া আর কিছুই নেই। কোনও ঘেন্না, বিতষ্ণা, কিছু ফুটে উঠল না সমীরের চোখে। বরং রুমনার হাতটা নিজের হাতে টেনে নিল সমীর, রুমনা তোমার যাই হয়ে থাকুক না কেন, আমি সবসময় তোমার সঙ্গে আছি। তুমি আমার বাঁচার প্রেরণা। আমাকে বিয়ে করবে রুমনা?

অশ্রু গড়িয়ে পড়ল রুমনার গাল বেয়ে প্রচণ্ড ঝড়ের পরে প্রকৃতি যেমন শান্ত হয়ে ওঠে, রুমনার মনটাও তেমনি প্রশান্তিতে ছেয়ে গেল। মনের সমস্ত শঙ্কা মুহূর্তে দূর করে দিয়েছিল সমীর।

 

রাত গভীর হয়েছে, তবুও অতীতের স্মৃতিগুলো রুমনার মনে এসে ভিড় জমাচ্ছে। নিজের অজান্তেই কখন ঘুমিয়ে পড়েছে রুমনা।

রুমি, এই রুমি ওঠ। অনেক বেলা হয়ে গেছে। ইউনিভার্সিটি যাবি না। মায়ের ডাকে ধড়মড় করে উঠে বসে রুমনা। মুহূর্তে গত সন্ধের সব ঘটনা মনে পড়ে যায় তার। একটা অদ্ভুত শান্তির পরিবেশ যেন ওকে ঘিরে রেখেছে। সে মায়ের হাতটা ধরে বলল, মা, প্লিজ আমার কাছে বসো না একটু।

রুমনা শম্পার কোলে মাথা রেখে বিছানায় এলিয়ে দিল শরীরটা। খানিকক্ষণ দুজনেই চুপ। নিরবতা ভেঙে রুমনাই বলল, মা, তোমাকে আমি কিছু বলতে চাই।

শম্পা রুমনার চুলে সস্নেহে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, কী বলবি বল না।

মা, তোমার সঙ্গে তো সমীরের আলাপ আছে। আমরা একে অপরকে ভালোবাসি। আমরা বিয়ে করতে চাই।

রুমি এটা তো খুবই ভালো খবর। সমীরকে আমারও খুব পছন্দ। কিন্তু ও কি তোর অসুখটা সম্পর্কে জানে? শম্পার গলায় অনিশ্চয়তা ফুটে উঠে!

হ্যাঁ মা, আমি ওকে সব বলেছি।

রুমনার মা-বাবা সম্বন্ধ পাকাপাকি করার জন্য সমীরের মা-বাবার সঙ্গে দেখা করলেন। সকলের সম্মতিতে ওদের বিয়ে দিনও স্থির হয়ে গেল। ওদের ভালোবাসা পরিণতি পেল বিয়ের পবিত্র বন্ধনে।

ফুলশয্যার রাতে রুমনা নববধূর সাজে সমীরের জন্য অপেক্ষা করছিল। চারিপাশে আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব, হইচই। এত ভিড়ের মধ্যেও রুমনার চোখ খুঁজে বেড়াচ্ছিল শুধু একটি মানুষকেই। সব কাজ সেরে সমীর যখন ঘরে এল তখন বেশ রাত হয়েছে।

সমীর দরজা বন্ধ করে রুমনার সামনে এসে বসল। মুহূর্তে রুমনা নিজেকে সঁপে দিল সমীরের আলিঙ্গনে। এভাবেই কাটে কিছুটা সময়। রুমনাই প্রথম কথা বলল, সমীর আমি সত্যিই ভাবিনি, ওই সাদা দাগটা হওযা সত্ত্বেও তুমি আমাকে বিয়ে করতে চাইবে।

সমীর রুমনার ঠোঁটে আঙুল রাখল ওকে চুপ করাবার জন্য। মৃদু হেসে বলল, একটা সম্পর্কে বিশ্বাসটাই সব নয়। পারস্পরিক বোঝাপড়াটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। একটা সামান্য দাগ কি সত্যিই তোমার আমার মধ্যে দূরত্ব তৈরি করতে পারে? রুমনা মনে রেখো তুমিই আমার জীবন। তোমাকে ছাড়া আমি কিছুই নই।

 

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব