কোভিডে মারা গিয়েছেন ৭০০, আক্রান্ত ৩০ হাজার রেলকর্মী

লকডাউনের শুরুতে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকলেও, মে মাসেই পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য বিশেষ ট্রেন চালানো শুরু হয়। দেশজুড়ে এই বিশেষ ট্রেন চলতে শুরু করার পর বহু রেলকর্মীকেই জনসাধারণের সরাসরি সংস্পর্শে আসতে হয়। আর তার ফলেই এই বিপুল সংখ্যক মানুষ সংক্রমিত হন বলে মনে করা হচ্ছে। মৃত্যু বরণ করতে হয়েছে কয়েকশো রেলকর্মীকে।গত নয় মাস  ধরে দেশে কোভিড-১৯ মহামারি ছড়িয়ে গিয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় কোটি। বিপুল মানুষ সুস্থও হয়েছেন। কিন্তু মৃত্যুর হয়েছে বহু মানুষের।তাঁদের বেশির ভাগই হলেন ফ্রন্টলাইনারস৷অর্থাত্ যে সব কর্মক্ষেত্রে, সরাসরি মানুষের সঙ্গে সংস্পর্শে আসতে হয়েছে কর্মীদের ৷

জানা গেছে এই মারণ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ৩০ হাজার রেলকর্মী। এর মধ্যে মৃত ৭০০ কর্মী। মারা যাওয়া মানুষদের মধ্যে সিংহভাগই ছিলেন ফ্রন্টলাইন কর্মী। তাঁরা সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি সংস্পর্শে এসেছিলেন ট্রেন চলাচলের সময় ।  মহামারির সময় রেল পরিষেবা দিতে গিয়ে এই বিপুল সংখ্যক কর্মীকে হারিয়েছে দেশ।

রেলের তরফে জানানো হয়েছে, প্রত্যেক কর্মীর বিষয়ে সচেতন থেকেছে কর্তৃপক্ষ এবং সেজন্য প্রতিটি অঞ্চলে কোভিড সেন্টার খোলা হয়েছে। তবুও সকলকে বাঁচাতে পারা যায়িনি। খুবই দুর্ভাগ্যজনক ! প্রথমে কোভিড চিকিৎসার জন্য ৫০টি হাসপাতালের ব্যবস্থা করা হয়েছিল৷। পরে তা বাড়িয়ে ৭৪ করা হয়েছে।

গত সেপ্টেম্বরে রেল মন্ত্রক জানিয়েছিল, করোনা আক্রান্ত রেলকর্মীদের সংখ্যা ১৪ হাজারের বেশি। মৃত ৩৩৬ জন। সেই সঙ্গে এও পরিষ্কার করে দেওয়া হয়, কোনও অসুখে ভুগে মারা গেলে সেই রেলকর্মীর পরিবারকে আলাদা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয় না। ফলে করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত রেলকর্মীদের পরিবারও আলাদা করে কোনও ক্ষতিপূরণ পাবে না। এ সত্যিই বড়ো দুর্ভাগ্যজনক ৷আইনের ফাঁসে হাঁসফাঁস করে, শেষে আত্মবলিদান দিতে হয় সেই সাধারণ মানুষদেরই৷এই রেলকর্মীরাও ‘অন্তরালের নায়ক’ হিসেবেই থেকে যাবেন৷ অথচ ভেবে দেখেছেন কি, এই কর্মীরা না থাকলে দেশের বহু মানুষেরই বাড়ি ফেরা হতো না ? করোনা মহামারির এই ভয়াবহ সময়ে, পরিবারের মানুষের পাশে থাকাই হতো না !

অবলম্বন

অন্ধ্রপ্রদেশ তখন অবিভাজিত ছিল। হায়দরাবাদের এক প্রাইভেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে, একসঙ্গে পড়ত আকাশ এবং সুমনা। আকাশ ছিল স্থানীয় যুবক। আর সুমনার বাড়ি ছিল কলকাতায়। ওদের দুজনের মধ্যে গড়ে উঠেছিল বন্ধুত্বের সম্পর্ক। ফাইনাল ইয়ার-এর পরীক্ষা হয়ে ক্যাম্পাসিং-এ জব-অফারও ছিল দুজনের। কিন্তু দুজনেরই শখ ছিল এমবিএ করার। তাই ওরা টেস্ট দিয়ে ভর্তি হয় হায়দরাবাদের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ বিজনেস-এ।

আকাশ ধনী পরিবারের ছেলে। তার বাবা পুলিশ, উচ্চ পদে কর্মরত। আকাশ তার মা-বাবার একমাত্র সন্তান। দামি গাড়ি আছে তাদের। গাড়ি ড্রাইভ করতে ভালোবাসে আকাশ।

সুমনা কিন্তু মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে তবে তার বাবা ভালো চাকরি করেন। আকাশের মতো সুমনাও মা-বাবার একমাত্র সন্তান।

আকাশ এবং সুমনার সম্পর্কের বিষয়টি জানতেন দুই বাড়ির লোকেরা। সুমনার মা-বাবা বিষয়টিকে খুব স্বাভাবিক ভাবে নিয়েছিলেন কিন্তু বিয়ের কথা উঠতেই আপত্তি তুলেছিলেন আকাশের মা-বাবা। কারণ, তারা তাদের ছেলের সঙ্গে একই ভাষাভাষির স্থানীয় কোনও মেয়ের বিয়ে দেবার ইচ্ছে পোষণ করেন। কিন্তু আকাশের অনিচ্ছার জন্য তার মা-বাবা পিছু হঠতে বাধ্য হন। তাই, আকাশ ও সুমনার সম্পর্ক আরও গাঢ় হতে থাকে।

তারা মাঝেমধ্যে লং ড্রইভ-এ যেত। কারণ, আকাশ গাড়ি চালিয়ে দূরে যেতে ভালোবাসত এবং গাড়িও চালাত ভালো। শুধু তাই নয়, ধীরে ধীরে সুমনাকেও গাড়ি চালানো শিখিয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার ব্যবস্থাও করে দিয়েছিল আকাশ। আসলে, তারা তখন নিজেদের শখ-আহ্লাদ পূরণে ব্যস্ত ছিল। এতটাই ব্যস্ত ছিল যে, একটি সংস্থার কিছু ইউনিক কাজ করে সাফল্য পেলেও কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখেনি সুমনা। অথচ, ওই সংস্থা সুমনার কাজে এতটাই খুশি ছিল যে, তাকে অ্যাওয়ার্ড দেয় এবং স্থাযী চাকরি অফার করে।

সময় এগিয়ে চলে তার নিজের গতিতে। কলেজের ফাইনাল ইয়ার-এ পৌঁছে পরীক্ষায় ভালো ফল করে আকাশ এবং সুমনা। সেই সঙ্গে, একাধিক সংস্থায় চাকরির অফারও পায় তারা। কলেজের অন্যান্য স্টুডেন্টরাও একই ভাবে ভালো রেজাল্ট এবং কর্মজীবনে প্রবেশ করার অফার পেয়ে খুশি ছিল। তাই, সবাই চাইল এক বিদায়ী জমায়েত। হলও তাই। তারা সবাই একটি গেস্ট হাউস ভাড়া নিল। সেখানে সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত চলল খানাপিনা, হইহুল্লোড়।

এই অবসরে নাচ, গান, অভিনয়, আবৃত্তি যার যা প্রতিভা আছে, সে তা প্রদর্শন করল। গান গেয়ে সবচেয়ে বেশি করতালি কুড়িয়েছিল শুভম নামের কলকাতার-ই এক বাঙালি ছেলে। গান গেয়ে প্রশংসা পেয়েছিল সুমনাও। তাই, সবার অনুরোধে ডুয়েট গাইতে হল সুমনা এবং শুভমকে। এই সুবাদে কলেজের বাইরে এই প্রথম একটু বেশি কথা এবং ফোন নাম্বার আদানপ্রদান করল শুভম এবং সুমনা। সবটাই খুব স্বাভাবিক ভাবে সহপাঠি হিসাবে হল এবং আকাশের সামনেই। তবে সবচেয়ে মজার বিষয় হল, শুভমও প্রথমে সুমনা ও আকাশের মতো ইঞ্জিনিয়ারিং কমপ্লিট করার পর ম্যানেজমেন্ট করল।

স্টুডেন্টদের ওই বিদায়ী সমাবেশ-এর পর কেটে গেছে এক সপ্তাহ। আকাশ এবং সুমনার ইচ্ছেমতো হায়দরাবাদের এক রেস্তোরাঁয় আযোজন করা হয়েছিল রিং-সেরিমনির। কলকাতা থেকে সুমনার মা-বাবাও উপস্থিত ছিলেন সেই অনুষ্ঠানে। মূল অনুষ্ঠান পর্বের পর, সুমনা এবং আকাশের বাড়ির সবাই যোগ দিয়েছিলেন খাওয়াদাওয়া এবং আড্ডায়। আকাশ এবং সুমনাও খুব খুশি ছিল। তারা দুজনে হঠাৎই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, রামোজি ফিলম সিটি গিয়ে দুদিন কাটাবে আর দুই বাড়ির বড়োরা ওই দুদিন একসঙ্গে হই-হুল্লোড় করবেন আকাশের বাড়িতে।

সিদ্ধান্তমতো আকাশ গাড়ি বের করল। তারা দুজনে ঠিক করল, প্রথমে আকাশ গাড়ি চালাবে, তারপর সুমনা। আকাশের বাড়ি থেকে রামোজি ফিলম সিটির দূরত্ব প্রায় ২৫ কিলোমিটার। স্টিয়ারিং আকাশের হাতে। পাশে সিট বেল্ট পরে বসল সুমনা। কিছুটা দূরে গিয়ে একটি পেট্রোল পাম্প থেকে তেল ভরল গাড়িতে। তারপর ওদের গাড়ি আবার চলতে শুরু করল। একবার গাড়ি থেকে নেমে একটা ধাবাতে ঢুকে দুজনে স্পেশাল লস্যি খেল। আর ওই ধাবাতে বসেই আকাশ সুমনাকে বলল, কথামতো আর পাঁচ কিলোমিটার আমি গাড়ি চালাব। তারপর আরও ভালো রাস্তাও পেয়ে যাবে এবং তখন তুমি গাড়ি চালাবে।

আকাশের কথার পর সুমনা থামস আপ শো করল আর বলল, কিন্তু, তোমার মতো এত স্পিড-এ চালাব না। আমি স্পিড লিমিট রাখব ৫০ কিলোমিটার প্রতি ঘন্টায়। রাজি তো?

আকাশ ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল। এরপর আকাশের হাতে স্টিয়ারিং থাকল আরও কিছুক্ষণ। তারপর একটা ফাঁকা জায়গায় এসে গাড়ি থামাল আকাশ। গাড়ি থেকে নেমে কথামতো স্টিয়ারিং ধরাল সুমনাকে আর সুমনার জায়গায় নিজে গিয়ে বসল আকাশ।

ওদের গাড়ি গন্তব্যে পেঁছোতে আর বেশি সময় লাগবে না, তাই মাঝারি গতিতে গাড়ি চালাচ্ছিল সুমনা। পাশে বসে সুমনার গাড়ি চালানোর তারিফ করছিল আকাশ। এরই মধ্যে বৃষ্টি নামল। মুহূর্তের মধ্যে চারদিক ঝাপসা হয়ে এলে সঙ্গে-সঙ্গে গাড়ির ওয়াইপার চালু করে সামনের কাচ পরিষ্কার করার ব্যবস্থা করল সুমনা। বৃষ্টির আবহে কার ড্রাইভ করতে বেশ ভালোই লাগছিল সুমনার এবং আকাশও বেশ খুশি ছিল।

হঠাৎ সুমনা দেখতে পেল, সামনের দিক থেকে তীব্র গতিতে ছুটে আসছে একটা বাস এবং বাসটি কোনও একটা সাইড না ধরে প্রায় রাস্তার মাঝখান দিয়ে চলছিল। সুমনা নিজের গাড়িকে যতটা সম্ভব বাম দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেও শেষ রক্ষা হল না। সুমনাদের ইনোভা গাড়িটাকে সজোরে ধাক্কা মেরে চলে গেল বাসটি। একটা বিকট আওয়াজের পর ওদের গাড়িটি ছিটকে গিয়ে ওলটপালট খেতে খেতে পড়ল একটা বড়ো গর্তে থাকা পাথরের উপর। কাছাকাছি কিছু দোকান ছিল, তাই, তীব্র আওয়াজ শুনে অনেকে সঙ্গে সঙ্গে ছুটে আসে দুর্ঘনাগ্রস্ত জায়গাটিতে।

চালক এবং অন্য আরোহীকে গাড়ির ভেতর থেকে দ্রুত উদ্ধার করার চেষ্টা করে সবাই মিলে। কিন্তু, আরোহীকে গাড়ির ভেতর থেকে বাইরে আনা সম্ভব হলেও, চালকের দিকটা এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল যে, পুলিশ আসার পর গ্যাস কাটার দিয়ে কেটে তবে গাড়ি থেকে চালককে বের করা সম্ভব হয়েছিল।

সুমনা তখন বেহুঁস। শরীরের নানা জায়গা থেকে রক্ত ঝরছিল তার। তুলনায় আকাশের চোট কম। কারণ, উলটো দিক থেকে আসা বাসটি চালকের দিকেই ধাক্কা মেরে পালিয়ে গিয়েছিল। তাই তার আঘাত ছিল গুরুতর। তবে পুলিশ এবং স্থানীয় মানুষের সহায়তায়, সুমনা এবং আকাশ দুজনকেই নিকটবর্তী একটি বড়ো প্রাইভেট হাসপাতালে অ্যাম্বুল্যান্স-এ করে দ্রুত নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা শুরু করা হয়েছিল।

আকাশের হুঁস ছিল, তাই সে দুজনের বাড়ির লোকের মোবাইল নাম্বার দিতে পেরেছিল। খবর পেয়ে কিছুক্ষণের মধ্যে থানা থেকে গাড়ি নিয়ে অন ডিউটিতেই হাসপাতালে পেঁছে গিয়েছিলেন আকাশের বাবা। অন্যদিকে আকাশের মা এবং সুমনার মা-বাবা সবাই অন্য একটি গাড়ি করে পৌঁছেছিলেন হাসপাতালে। ভয়ে তখন সবার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল। তবে আকাশের চোট কম ছিল, তাই প্রাথমিক চিকিৎসার পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল তাকে।

ছাড়া পেয়ে আকাশ পৌঁছল সুমনার কেবিনের দিকে। কেবিনের সামনে সবাই বসে অপেক্ষা করছিলেন চিকিৎসকের জন্য।

চিকিৎসক বেরিয়ে জানালেন, আগামী ৪৮ ঘন্টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ পেশেন্ট-এর জন্য। মাল্টিপল ফ্র‌্যাকচার আছে। পেইন রিলিফের ইঞ্জেকশন দেওয়া হয়েছে। কিছু টেস্ট চলছে, কিছুক্ষণ পরেই সবটা পরিষ্কার হয়ে যাবে। আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করব ওকে দ্রুত সুস্থ করার। কিন্তু আপনাদের ধৈর্য ধরতে হবে।

সুমনার আঘাত কতটা গুরুতর তা জানার জন্য আরও কয়ে ঘন্টা অপেক্ষা করতে হল সবাইকে। সন্ধে নাগাদ চিকিত্সক আবার এসে জানালেন, পেশেন্ট-এর সিরিয়াস ইনজুরি আছে। হিপ-জযে্ট এবং কলার-বোন্স ছাড়াও ফ্র‌্যাকচার আছে রিব্স-এ। তাই, লাং-এ প্রেশার পড়ছে। রিব্স-এ কোনও সার্জারি হয় না, তাই সেন্স ফিরলে অন্য ভাবে ট্রিটমেন্ট করতে হবে। আর হ্যাঁ, পেশেন্ট-এর লোয়ার লেভেল-এও চোট আছে। হুঁশ ফিরলে আবার টেস্ট করলে জানা যাবে। তবে লাক ভালো যে, ওর ব্রেন-এ কোনও ইনজুরি নেই।

চিকিৎসকের কথা শোনার পর উদ্বেগ জড়ানো গলায় সুমনার বাবা জিজ্ঞেস করলেন, আমার মেয়ে সুস্থ-স্বাভাবিক হয়ে উঠবে তো ডক্টর?

লাইফ-রিস্ক হয়তো নেই, তবে সময় লাগবে সবকিছু ঠিক হতে। আমরা ট্রাই করছি যতটা সম্ভব। তবে হিপ-জযে্ট এবং আরও কয়েটা বিষয় নিয়ে দুশ্চিন্তা আছে। ধৈর্য রাখুন।

পরের দিন হুঁশ ফিরল সুমনার। বাবা, মা, হবু শ্বশুর-শাশুড়ি ছাড়াও আকাশকে সামনে বসে থাকতে দেখল সুমনা। চোখ ফেরাতেই দেখল শুভমও বসে আছে একটু দূরে। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে বন্ধু হিসাবে শুভমও দেখতে এসেছে সুমনাকে।

পা নাড়ানোর চেষ্টা করতেই নার্স মানা করল ইশারায়। আকাশ, সুমনার মাথায় হাত রাখতেই তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। সে আকাশের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, তোমার কোনও ক্ষতি হয়নি দেখে ভালো লাগছে। কত স্বপ্ন দেখেছিলাম আমরা! নিজেদের কোম্পানি খোলার কত ইচ্ছে ছিল। সব মাটি হয়ে গেল! আমি তো কখনও কারও ক্ষতি চাইনি, তাহলে এমন শাস্তি পেলাম কেন?

আশা রাখো, মনের জোর বাড়াও, বলেই আবার সুমনার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল আকাশ।

হাসপাতালের বিছানায় সুমনার কেটে গেছে কয়েক সপ্তাহ। তার বাবা-মা আর কলকাতায় ফিরতে পারেননি। আকাশের বাড়ি ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন হায়দরাবাদের একটি হোটেলে।

সুমনার বুকের ভাঙা পাঁজর আবার জুড়ে গিয়ে অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল। সার্জারির পর কলার বোন্স নিয়ে আর কোনও সমস্যা ছিল না। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয়েছিল হিপ-জযে্ট এবং ইউটেরাস-এ। দুর্ঘটনার আঘাত এতটাই জোরালো ছিল যে, পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে চিকিৎসক পরে জানতে পেরেছিলেন সুমনার করুণ পরিণতির কথা। তাকে যে সারাজীবন হুইল চেয়ারেই জীবন কাটাতে হবে, একথা চিকিৎসকের থেকে জেনে নিয়েছিল সুমনা। কিন্তু সে যে আর কোনওদিন মা হতে পারবে না, এ কথা চিকিৎসক সুমনাকে জানাতে পারেননি জানিয়েছিলেন সুমনার বাবাকে। আসলে, দুর্ঘটনার সময় গাড়িতে থাকা এমন কিছুর মাধ্যমে তার ভ্যাজাইনাল ট্র‌্যাক-এ আঘাত লেগেছিল যে, যার প্রভাব পড়েছিল ইউটেরাস পর্যন্ত।

এক সময় সুমনা মনস্থির করল যে, এভাবে হাসপাতালের বেড-এ শুয়ে না থেকে কিছু কাজ করবে। তাই সে বাবা-কে দিয়ে ল্যাপটপ আনাল হস্টেল থেকে। কী করবে ভাবতে ভাবতে মাথায় এল একটা বুদ্ধি।

বিজনেস ম্যানেজমেন্ট-এর আগে, ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ডিগ্রি নিয়ে সে যে-সংস্থার কাজ করে প্রশংসা পেয়েছিল, ই-মেইল-এর মাধ্যমে আবার যোগাযোগ করল তাদের সঙ্গে। সংস্থার টেকনিক্যাল হেড সব জেনে সুমনাকে কিছু মেশিনারি গুডস ডিজাইন-এর কাজ দিলেন। সুমনা তা দক্ষতার সঙ্গে করে পাঠাবার পরই, ওই সংস্থা স্থাযী ভাবে তাকে নিযোগ করল এবং জানাল, ওয়ার্ক ফ্রম হোম করার কথা।

চিকিৎসকের অনুমতি নিয়ে কাজ করে সুমনা বেশ খুশি-ই ছিল। কিন্তু মন খারাপ হয়ে গেল আকাশের দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণে।

আসলে, সুমনা হাসপাতালেই আছে প্রায় দুমাস। প্রথম দিকে প্রায়ই দেখা করতে আসত আকাশ। কিন্তু ধীরে ধীরে আসা কমতে থাকে। আর গত প্রায় এক মাস আর আকাশের দেখা পাওয়া যায়নি। নার্স-এর অনুমতি নিয়ে দুতিনবার আকাশকে ফোনও করেছিল সুমনা কিন্তু ফোন বেজে গেছে, ধরেনি আকাশ।

এরপর কেটে গেছে আরও এক সপ্তাহ। হাসপাতাল থেকে সুমনার ছাড়া পাওয়ার দিন তার মা-বাবা ছাড়াও আকাশ এবং আকাশের বাবা উপস্থিত। সুমনার জন্য কেনা হুইলচেয়ারে বসে আছে সুমনা। হঠাৎ আকাশের বাবা সুমনার উদ্দেশ্যে বললেন, তোমার প্রতি পূর্ণ সহানুভতি আছে আমাদের কিন্তু ডক্টর জানিয়ে দিয়েছেন, সারাজীবন হুইল চেয়ার অবলম্বন করতে হবে তোমাকে। একটু থেমে আবারও আকাশের বাবা বললেন, আর ডক্টর এও জানিয়েছেন, তুমি আর মা হতে পারবে না কোনও দিন।

সুমনাকে ডক্টর নিজে না বললেও, তার বাবা তাকে সবটাই জানিয়ে দিয়েছিলেন। অতএব, সুমনা নিজের মনকে আগেই শক্ত করে নিয়েছিল। তাই আকাশের বাবা-র বলা কথার উদ্দেশ্য বুঝতে অসুবিধা হয়নি, সুমনা এবং তার মা-বাবার। এবার মুখ খুললেন সুমনার বাবা। জানালেন, আমরা জানি সবকিছু কিন্তু ও তো আমার মেয়ে তাই, যাই ঘটুক, ভবিষ্যৎ যেমনই হোক না কেন, মা-বাবার থেকে ও আগের মতোই ভালোবাসা পাবে। তাই কোনও কথাতেই এখন আর আমরা দুঃখ পাব না। আরও কিছু বলার থাকলে বলতে পারেন নির্দ্বিধায়।

আকাশের বাবা এবার বললেন, আই অ্যাম সরি! বলতে কষ্ট হচ্ছে কিন্তু আকাশ আমার একমাত্র সন্তান। তাই, সুমনার সঙ্গে তার বিয়ের প্রতিশ্রুতি আর রক্ষা করতে পারব না। উই আর এক্সট্রিমলি সরি!

এবার আকাশের বাবার কথা কেড়ে নিয়ে সুমনা জানাল, আঙ্কল, প্লিজ নো এক্সকিউজ। আপনি আমার মনের কথাটাই বলে দিয়েছেন। আমিও চাই, আকাশ অন্য কারওর সঙ্গে জীবন গড়ুক। বেস্ট অফ লাক আকাশ।

আকাশ চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল তার বাবার ঠিক পিছনেই। এমন সময় আকাশের বাবা, সুমনা এবং তার মা-বাবাকে থ্যাংকস জানিয়ে আাকশের দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, চলো আকাশ।

ওরা চলে যাওয়ার পর সুমনা তার মা-বাবার চোখে জল দেখে বলল, বাবা, তোমরা সবসময় আমাকে সাহস জুগিয়ে। আজ আর চোখের জল ফেলে আমাকে দুর্বল করে দিও না।

সুমনার বাবা সুমনার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, তুই আমার সাহসী মেয়ে দুঃখ জয় করতে শিখে গেছিস। গড ইজ গুড! সম্পর্কটা ভেঙে গিয়ে হয়তো ভালোই হল।

মা-বাবার সঙ্গে সুমনা এখন কলকাতায় থাকে। বাড়িতে থেকেই অফিস করছে স্থাযী ভাবে। তার কাজে অফিসও এখন ভীষণ খুশি। প্রোমোশনও হয়েছে। মোটা টাকা বেতন পায় সুমনা। তাই, হুইল চেয়ারের বিষয়টা ছাড়া, মা-বাবার সঙ্গে বেশ আনন্দে থাকারই চেষ্টা করে চলেছে সে।

একদিন হঠাৎ শুভমের ফোন এল। সুমনা, তুমি এখন কোথায়? কেমন আছো? জানতে চাইল শুভম। সুমনা জানাল যে, সে এখন কলকাতায় আছে এবং হুইল চেয়ার-ই এখন তার অবলম্বন। তবে সে বাড়ি থেকেই যে চাকরি করছে, এটা জানাল শুভমকে। তারপর শুভমের কী খবর, কেমন আছে জানতে চাইল সুমনা। উত্তরে শুভম জানাল, প্রথমেই সরি বলে নিচ্ছি, দীর্ঘদিন খোঁজখবর নিতে পারিনি বলে। আসলে, হায়দরাবাদে একটি সংস্থার ডিজাইন ইউনিটে মেশিন ট্রায়াল রান-এর সময় চেক করতে গিয়ে আমি দুর্ঘটনার শিকার হই। ডান হাতটা হারিয়েছি কবজি থেকে। টানা দুমাস বেড রেস্ট-এ খুব মানসিক অবসাদের মধ্যে কাটিয়েছি। তারপর হঠাৎ তোমার কথা মনে পড়তেই মনে জোর পেলাম। ভাবলাম, সুমনার তুলনায় আমার দুর্ঘটনা নগণ্য। তাই, সে যদি মনের জোর রাখতে পারে, তাহলে আমিই বা পারব না কেন?

শুভমের দুর্ঘটনা এবং হাত কাটা যাওয়ার বিষয়টা শুনে খুব দুঃখ পেয়ে সুমনা বলল, খুবই দুঃখজনক ঘটনা। আমার কাছে এ বিষয়ে কোনও খবরই ছিল না। তা, তুমি এখন কোথায় আছো?

আমি কলকাতায় ফিরে এসেছি। আমার কোম্পানি আমার অসহায় অবস্থা দেখে আমাকে কাজের সুবিধে করে দিয়েছে। মাসের কুড়ি দিন আমি কলকাতায় থেকে টেলি কনফারেন্স এবং ভিডিযো কনফারেন্স-এর মাধ্যমে জুনিয়র স্টাফদের গাইড করি আর ওখানে থেকে সপ্তাহখানেক ফিজিক্যালি গাইড করি।

এরপর আরও কয়েবার দূরভাষ কথোপকথনের পর, সুমনাদের বাড়িতে আসে শুভম। সুমনা ছাড়াও, শুভম আড্ডা দেয় সুমনার মা-বাবার সঙ্গে। এভাবেই আরও কয়েবার সুমনাদের বাড়ি এসে আড্ডা জমিয়েছে শুভম। সুমনা এবং শুভমের বন্ধুত্ব আরও গাঢ় হয়েছে। তাদের বন্ধুত্বে সুমনার মা-বাবাও ভীষণ খুশি হন। একদিন আড্ডার মধ্যেই সুমনার মা শুভমকে হাতে ধরে বলেই বসেন, বাবা, তোমরা দুজনে তো ভালো বন্ধু, পারবে না একসঙ্গে বুড়ো হতে?

মায়ের কথা শুনে সুমনা একটু কপট রাগ দেখিয়ে বলল, মা, তুমি যে কী বলো না, শুভমের জন্য একটা উজ্জ্বল, সুখের ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে। ও কেন আমার জন্য স্যাক্রিফাইস করবে? এটা তোমার অন্যায় আবদার মা। তুমি চিন্তা কোরো না, বাকি জীবনটা আমি একাই কাটিয়ে দিতে পারব।

সুমনার কথা শেষ হতেই শুভম মুখ খুলল। সুমনার দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে ওর মায়ের দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল, কাকিমা, আমার মনের কথাটা আপনি বলে দিয়েছেন। সুমনা চাইলে আমি তাকে বিয়ে করতে পারি।

শুভমের কথা শুনে কয়ে সেকেন্ড চুপ করে থাকার পর সুমনা ধরা গলায় বলল, কিন্তু…

কোনও কিন্তু নয়। তুমি তো আমাকে তোমার সমস্ত প্রতিবন্ধকতার কথা শেয়ার করেছ বন্ধু হিসাবে, জানাল শুভম।

উত্তরে সুমনা জানাল, ভুল করবে, আমরা বন্ধু হিসাবেই তো ভালো ছিলাম! তুমি অন্য কাউকে বিয়ে করলে সুখী হতে। আমি তো তোমার সন্তানের মা হতে পারব না কোনও দিন।

সুমনাকে থামিয়ে দিয়ে শুভম বলল, অসহায় কোনও বাচ্চাকে আমরা দত্তক নিলে, সে নতুন জীবন পাবে। প্লিজ সুমনা, তোমার মতো লড়াকু মনের মেয়েকে আমি জীবনসঙ্গী হিসাবে পেলে খুশি থাকব।

এরপর আর বেশি কথা বাড়ায়নি সুমনা। তার মনের কোণেও হয়তো কোথাও একটা গভীর ভালোবাসার জায়গা তৈরি হয়েছিল শুভমের জন্য। তাই, মাসখানেকের মধ্যেই তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হল। আর ফুলশয্যার রাতে দুজনেরই মনে পড়ে গেল ম্যানেজমেন্ট-এর পর বিদায়ী সমাবেশে একসঙ্গে গান গাওয়ার স্মৃতি। হয়তো মনের কোণে সেদিনই সূচনা হয়েছিল ভালোবাসার।

 

রুদ্রনাথ দর্শন

এই যাত্রাতেও কুম্ভ এক্সপ্রেস সময় মেনে দুপুর ঠিক ১টায় স্টেশন ছাড়ল। মানকড় স্টেশনে ট্রেন এসে পৌঁছোল ২টো ৩৫ মিনিটে। মনে পড়ল, কয়েক বছর আগে এখান থেকেই গিয়েছিলাম যমুনাদিঘি ও ভালকি মাচান বেড়াতে। জানলার বাইরে শরতের আবহাওয়া! হাওয়ায় দুলছে কাশফুল। উজ্জ্বল সূর্যলোকে ঝলমল করছে সবুজ মাঠ। ট্রেনের কামরায় বাংলা গান পুজোর গন্ধকে ছড়িয়ে দিয়েছে সবার মাঝে। বেশ ভালো লাগছে কাচের জানলায় চোখ রাখতে –পুকুরে ফুটে রয়েছে অজস্র পদ্মফুল, আর বকগুলো সাদা পাখা মেলে উড়ে চলেছে আকাশের দিকে। গাড়ি আসানসোল, যোশিডি হয়ে পৌঁছোল ঝাঝা স্টেশনে। স্লখান থেকেই আমাদের ৩ এসি কামরা আপামর জনসাধারণের এক্তিয়ারে চলে এসেছে। আমরাই এখন সংখ্যালঘু! রাত সাড়ে ৯টায় বাড়ি থেকে আনা খাবারে ডিনার সেরে শুয়ে পড়লাম।

সকাল ৭টায় উঠে চায়ে চুমুক দিতেই ট্রেন এসে পৌঁছোল লখনউ স্টেশনে। বেরিলি আসতে পৗনে ১টা। হরিদ্বারে গাড়ি পৌঁছোল ঠিক সময়েই। লাগেজ পিঠে নিয়ে প্লাটফর্মের বাইরে আসতেই দেখি ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে। এসবিআই এটিএম-এ কাজ সেরেই চলে এলাম এক চা-দোকানে। হরিদ্বারে মামুলি কিছু কাজ ছিল। কিন্তু বিরামহীন বৃষ্টিতে পরিকল্পনা পালটে নিয়ে সোজা বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছোলাম এবং ঋষিকেশগামী বাসে চড়ে বসলাম। বাস ছাড়ল সাড়ে ৫টায়, গন্তব্যে পৌঁছোলাম সন্ধে ৭টায়। মদমহেশ্বর যাত্রার সময় যে প্ল্যান করেছিলাম, এবারেও তাই। বাসস্ট্যান্ডের কাছেই স্লক গেস্ট হাউস-এর দোতলায় একটি ঘরে এসে উঠলাম লাগেজ সহ। সেবার অবশ্য ছিলাম বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন অন্য স্লক লজ-এ। এবারের ব্যবস্থাটা কৌলীন্যে একটু উঁচুতে। উদ্দেশ্য একটাই, ভোরে গোপেশ্বরগামী প্রথম বাসটা ধরা। ডিনার সেরে শুয়ে পড়লাম রাত ১টায়।

গোপেশ্বর যাবার প্রথম বাস ভোর ৪টেয়। লাগেজ বাসের ডিকিতে ঢুকিয়ে অপেক্ষা করতে থাকি। ইতিমধ্যে, প্রাতঃকালীন চা-বিস্কুট খাওয়া হয়ে গেছে। আধঘণ্টা পরে বাসের কনডাক্টর জানায়, যাত্রী সংখ্যা কম বলে এই বাস ছাড়বে না। পরবর্তী বাস ভোর সাড়ে ৫টায়। রুদ্রপ্রয়াগগামী বাসটাই যাবে গোপেশ্বর পর্যন্ত। বড়ো ব্যাগ ডিকিতে রেখে ছোটো ব্যাগ সঙ্গে নিয়ে বসেছি। পতিতপাবনী গঙ্গাকে পিছনে ফেলে, সূর্যের নরম আলো গায়ে মেখে বাস চলতে লাগল পাহাড়ি পথে। ঘণ্টা দুই পরে আমরা দেবপ্রয়াগ এসে পৌঁছোলাম। এখানে যাত্রা বিরতি ২০ মিনিটের। বাস থেকে নেমে এক দোকানে বসে গরম গরম আলুপরোটা ও চায়ে প্রাতরাশ সারলাম। সকাল সাড়ে ৮টা নাগাদ ভাগিরথী-অলকনন্দার সঙ্গমস্থল ছেড়ে বাস আবার চলতে শুরু করল। বেলা ১টায় বাস এসে পৌঁছোল রুদ্রপ্রয়াগ। দুই বছর আগের যাত্রার স্মৃতি ভেসে আসে মনে– সেবারে এখান থেকেই বাস পরিবর্তন করতে হয়েছিল। এখানেও যাত্রাবিরতি, তাই বাস থেকে নেমে কিছুদূর এগিয়ে মন্দাকিনী ও অলকনন্দার সঙ্গমের ছবি নিলাম। গোচর ছাড়িয়ে বাস কর্ণপ্রয়াগ-এ পৌঁছোল দুপুর সোয়া ১টায়। রুদ্রপ্রয়াগ-এর মতো কর্ণপ্রয়াগও আজ চামোলী জেলার এক ব্যস্ত, বড়ো শহর। এখানে অলকনন্দার মিলন ঘটেছে পিণ্ডারী নদীর সঙ্গে। এই জায়গা মহাভারতের মহাবীর কর্ণের তপস্যাস্থল। আমার সবচেয়ে প্রিয় এই প্রয়াগে অনেকটা সময় কাটিয়েছিলাম।

নন্দপ্রয়াগ এসে পৌঁছোলাম দুপুর দেড়টা নাগাদ– এই স্থানে মন্দাকিনী মিলিত হয়েছে অলকনন্দার সঙ্গে। পরিচিত পথে চামোলী শহর পেরিয়ে গোপেশ্বর এসে পৌঁছোলাম দুপুর ৩টেয়। লাগেজ নামাতেই নজরে এল অপেক্ষারত এক জিপের। মাথা পিছু ২০ টাকা ভাড়া দিয়ে পৌঁছোলাম ৫ কিলোমিটার দূরে সাগর গ্রামে, আমাদের প্রথম গন্তব্যস্থল। গাড়ি থেকে মালপত্র নামিয়ে চেক-ইন করলাম হোটেলে। ঘড়িতে তখন বিকেল ৩টে বেজে ৫মিনিট।

অ্যাটাচ্ড বাথরুম সহ ঘর বেশ পরিষ্কার।নিজেদের মোবাইল ও পাওয়ার ব্যাংক চার্জ করতে দিয়ে সামনের ডাইনিং হলে এসে বসলাম। এরপর চায়ের গেলাস হাতে নিয়ে বাইরে এলাম। কিছু দূরেই সগরেশ্বর মহাদেব মন্দির দেখা যাচ্ছে। একটু পরে হোটেল থেকে কিছুটা এগিয়ে পথের ধারে এক জায়গায় এলাম। সেখান থেকে সিঁড়ি নেমে গেছে নীচে ঘুরে ঘুরে। দেখছি, ধাপে ধাপে ফসলের চাষ– ধান, গম, মনুয়া, কলাই ও তিল। মন্দিরের পিছনে পাহাড়, সামনে ও দুই পাশে চাষজমি। উপরের পাহাড় থেকে আগত কয়েকটি ঝরনাধারা প্রতিটি ধাপের চাষজমিকে ভিজিয়ে দিয়ে নীচে নেমে আসছে  এবং সেই জমা জলকে পুনরায় চাষের কাজে লাগানো হচ্ছে। এক অনুপম প্রাকৃতিক জলসেচ ব্যবস্থা! ধীরে ধীরে পৌঁছোলাম প্রাচীন সকলেশ্বর (সগরেশ্বর) মন্দিরে। কয়েক বছর আগেই সংস্কার করা হয়েছে সকলেশ্বর মহাদেব মন্দির এবং পাশেই অবস্থিত মা চণ্ডিকা দেবী ও লক্ষ্মীনারায়ণ মন্দিরে। জানলাম, সূর্যবংশীয় রাজা বাহু-র পুত্র মহারাজ সগর-এর জন্মভূমি, ক্রীড়াভূমি, শিক্ষাস্থল ও উপাসনাস্থল এই সাগর গ্রাম। সগর রাজা শিব ও শক্তি (মা চণ্ডিকা)-র উপাসনা করে পুনরায় অযোধ্যা রাজ্য জয় করেন। তাঁর উপাসনাস্থলেই রয়েছে ওই প্রাচীন তিন মন্দির। মন্দিরের শান্ত পরিবেশ সহজেই মন কেড়ে নেয়। মন্দির থেকে ফেরার পথে আমরা আলাপ করলাম চাষের কাজে ব্যস্ত রমণীদের সঙ্গে। তারাই দেখাল, কোন জমিতে কোন ফসলের চাষ হচ্ছে।

হোটেলে ফিরে আর এক দফা চা খেয়ে লাগেজ গুছোতে শুরু করলাম। ঠিক হল, একটা রুকস্যাকে আমাদের দুজনের প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে গাইড রুদ্রনাথের পথে এগোবে। বাকি জিনিস সমেত অন্য রুকস্যাকটা থাকবে এই হোটেলেই। ট্রেকিং শেষে আমাদের ফোন পেলেই স্লই হোটেল থেকে লাগেজ পাঠিয়ে দেওয়া হবে মণ্ডলে ঠিক করা হোটেল-স্ল। রাতে গরম রুটি, ডাল ও সবজিতে ডিনার সেরে নিয়ে শুয়ে পড়লাম। কাল ভোর সাড়ে ৪টেয় উঠতে হবে।

আমাদের গাইড প্রদীপ সিং রানা ভোর হতেই চলে এসেছে হোটেলে। আমরাও গরম জলে স্নান সেরে, চা-বিস্কুট খেয়ে তৈরি হয়ে নিয়েছি ৬টার মধ্যে। হোটেল মালিক-এর সামনেই ঠিক হল, গাইডকে  পারিশ্রমিক এবং থাকা-খাওয়ার খরচ দেওয়া হবে। প্রদীপ স্থানীয় গাড়োয়ালি যুবক। সে রুকস্যাক পিঠে তুলে নিল,  আমাদের পিঠে ন্যাপস্যাক ও হাতে লাঠি। ঠিক সকাল সোয়া ৬টায় হোটেল ছেড়ে বের হলাম। একটু এগিয়েই এক দোকান থেকে

২ প্যাকেট ধূপ কিনে নিলাম, কারণ মন্দির চত্বরে কিছুই পাওয়া যাবে না। সাড়ে ৬টায় রুদ্রনাথ যাত্রার প্রবেশদ্বারে পৌঁছোলাম এবং চতুর্থ কেদারের উদ্দেশ্যে প্রণাম জানিয়ে যাত্রা শুরু করলাম।

গ্রাম পেরিয়ে, ঘাস জমিকে নীচে রেখে, পাহাড়ি পথে উপরে উঠতে লাগলাম। সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে, পৌঁছোলাম চন্দ্রকোঠি। সেখানে গজেন্দ্র সিং-এর ধাবায় বসে চা খাওয়ার সময় জানলাম, দোকানে প্রায় ৩ঙ্মজন যাত্রীর রাত কাটানোর ব্যবস্থা রয়েছে। ১৫ মিনিটের বিরতি নিয়ে আবার চলা শুরু করলাম। এবার পাথুরে পথ এগিয়েছে হালকা জঙ্গলের মধ্য দিয়ে। গাছের পাতা চুঁইয়ে সূর্যের নরম আলো শরীর ছুঁয়ে যাচ্ছে। নিস্তব্ধ বনপথ, চড়াই ক্রমশ বেড়ে চলেছে।

গত রাতে বৃষ্টি না হলেও আগের ২-৩ দিন প্রচুর বৃষ্টি হয়েছিল। ফলে পথ বেশ পিছল। দু’পাশেই ফার্ন-এর জঙ্গল, ভিজে পাথরের ওপর মসের আস্তরণ। ক্বচিৎ কখনও পাখির ডাক। বাঁ-দিকে সবুজ পাহাড় রোদে উজ্জ্বল। বনে বিশাল সব ওক, মাঝারি সাইজের ব্রাস এবং নাম না জানা অজস্র বুনো গাছ। শুনে চলেছি ঝিঁঝি পোকার একটানা কলতান।

পুঙ বুগিয়ালে এসে পৌঁছোলাম ৯টা নাগাদ। প্রায় ৩প্তঙ্ম০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত ছোট্ট বুগিয়ালটি ভারি সুন্দর, তিন দিকে পাহাড় দিয়ে ঘেরা। সাগর থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে এই বুগিয়ালে এক রঙিন ছাতার নীচে বসার ব্যবস্থা। তাঁবু খাটানো ধাবার মালিক দেবেন্দ্র সিং এগিয়ে এসে আমাদের আমন্ত্রণ জানালেন। শিশিরভেজা ঘাসের ওপর বড়ো পলিথিনের চাদর পেতে দিলেন। আমরা সেখানে লাগেজ রেখে হাত-পা ছড়িয়ে বসলাম। সঙ্গে আনা কিছু শুকনো খাবার খেয়ে আরাম করে চা পান করলাম। ছবি নিলাম বুগিয়ালের, দেবেন্দ্র সিংকে সঙ্গে নিয়ে। উল্লেখ্য, পুঙ বুগিয়ালে বন বিভাগের তৈরি একটি শৗচালয়ও আছে।

এবার চড়াই আরও কঠিন। ধীরে ধীরে হাঁটছি। প্রথম বার দেখলাম গাছের ডালে হনুমানের সতর্ক উপস্থিতি। খরস্রোতা ঝরনার ওপর নির্মিত পুল পার হ’লাম। অসাধারণ সুন্দর জায়গা। বেলা বেড়েছে, গাছের ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো এসে চলার পথকে আলোকিত করেছে। পথের ধারে সাদা বুনো ফুল, মাথার ওপরে গাছে হলুদ ফুল। স্যাঁতসেঁতে গাছের গায়েও মসের আস্তরণ। দ্স্তুর চড়াই অতিক্রম করে বেলা ১রটা ১প্তমিনিটে চক্রগনি-তে এসে পৌঁছোলাম। এখানে ১৫ মিনিটের চা-বিরতি।

আবার হাঁটা শুরু করলাম ধীর লয়ে। পরবর্তী গন্তব্য মৗলি খড়ক, প্রায় ২ কিলোমিটার দূরে। জঙ্গলে উড়ে বেড়াচ্ছে নানা রং-এর প্রজাপতি। পাহাড়ের চূড়ায় নেমে এসেছে সাদা মেঘ। চারিদিক একেবারে নিশ্চুপ। শুধু দূর থেকে ভেসে আসছে ঝরনার জলের একটানা শব্দ। পথের দু’পাশেই বহু রডোডেনড্রন, যদিও ফুল আসেনি গাছে। ভয়ংকর চড়াই ভেঙে দুপুরে পৌঁছোলাম মৗলি খড়ক-এ। এখানে থাকার কোনও জায়গা নেই। তাই একটু থেমেই আবার হাঁটতে শুরু করলাম। চড়াই ক্রমশই বাড়ছে। তাই আমাদের হাঁটার গতি আরও মন্থর হয়েছে। জঙ্গলের ঘনত্ব কমেনি একটুও। আকাশে হঠাৎই মেঘের উপস্থিতি। বহু কষ্টের পর লিউটি বুগিয়াল-এ এসে পৌঁছোলাম।

কিষাণ সিং বিস্ত-এর ধাবায় লাগেজ নামিয়ে রাখতেই বৃষ্টি শুরু হল। পুঙ বুগিয়াল থেকে কম করেও ৫ কিলোমিটার হেঁটে এসেছি এখানে। শরীর আর চলছিল না। তাই জুতো খুলে বসে পড়লাম কম্বলের ওপরে। গরম চায়ের সঙ্গে মশলা-মুড়ি খেতে খেতে অপেক্ষা করছি যদি বৃষ্টি থেমে যায় তাড়াতাড়ি। ইতিমধ্যে কয়েকটি মিশমিশে কালো কাক চলে এসেছে ধাবার উঠোনে। আবহাওয়া আরও খারাপ হল, সঙ্গে আরও বৃষ্টি। আমাদের লক্ষ্য ছিল, সন্ধের আগে পানার বুগিয়ালে পৗঁছোনো। বিকেল সাড়ে ৪টে বেজে গেল, কিন্তু বৃষ্টি থামল না। দিনের আলোয় পানার-এ পৗঁছোনোর সময় হাতে আর রইল না। গাইড প্রদীপও চাইছিল না আর এগোতে। মনকে শান্ত করলাম, লিউটি বুগিয়ালেই রাত কাটাব।

বিকেল ৫টা নাগাদ বৃষ্টি থেমে গেল। বাইরে এসে দাঁড়ালাম। পাহাড়ের ঠিক নীচেই এই ছোট্ট বুগিয়াল। দেখছি আকাশে মেঘের খেলা। সন্ধে ঘনিয়ে আসছে। কিষাণ সিং-এর বউ তাদের গরুগুলোকে সামনের গোশালায় ঢুকিয়ে দিয়ে এল। ঠিক তখনই বিশাল, পোষা পাহাড়ি কুকুরটা চলে এল ধাবার উঠোনে, রাতে পাহারা দেবার জন্য। সন্ধেবেলায় পুজো সেরে রান্নার কাজে বসলেন কিষাণ সিং। তিনি কাজের ফাঁকে গল্প করতে লাগলেন আমাদের সঙ্গে। জানালেন, সকাল ৬টায় আলো ফোটার আগে আমাদের বুগিয়াল ছেড়ে যাওয়া ঠিক হবে না। তাছাড়া লিউটি থেকে পানার বুগিয়ালের দূরত্ব প্রায় ৪ কিলোমিটার, দুই ঘণ্টার বেশি সময় লাগবে না। রাত ৮টায় সয়াবিন-এর বড়ি সহযোগে মিক্সড ভেজিটেবল্স ও রুটি দিয়ে ডিনার সেরে নিলাম। ক্লান্ত আমরা, ৯ টার আগেই শুয়ে পড়লাম।

ভোর সাড়ে ৫টায় বিছানা ছেড়ে উঠে পড়েছি। হাত-মুখ ধুয়ে, পরিষ্কার হয়ে, ব্যাগ গুছিয়ে নিলাম। গরম চা পান করে সকাল সাড়ে ৬টার মধ্যে লিউটি বুগিয়াল ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম। আমাদের গন্তব্য পানার বুগিয়াল। এই পথের সবচেয়ে বড়ো ও সুন্দর বুগিয়াল। গত রাতের বিশ্রাম আমাদের হাঁটার গতিকে বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রথম সকালে হিমালয়ের স্নিগ্ধ রূপ দেখব না দ্রুত হেঁটে লক্ষ্যে পৌঁছোব, ঠিক করতে পারছি না। প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে চড়াই ভাঙার পর জঙ্গল হালকা হল। আমরা দ্রুত এগিয়ে চললাম। আরও আধ ঘণ্টা হাঁটার পর কিছু দূরে দেখা পাওয়া গেল এক সবুজ বুগিয়ালের। বুঝলাম, গন্তব্য আর বেশি দূরে নয়। আরও কিছুদূর হেঁটে ঠিক পৗনে ৮টায় পৌঁছে গেলাম এক বিশাল বুগিয়ালে। চোখের সামনে পানার বুগিয়াল। গিরিরাজ হিমালয়ের কোলে এ যেন এক স্বর্গরাজ্য! বহুদিন মনে পোষণ করার পর আজ সে ধরা দিয়েছে তার অনিন্দ্য সুন্দর রূপকে সম্পূর্ণ উন্মোচন করে। সুবিস্তৃত, ঢালু, সবুজ প্রান্তরের পিছনে বিভিন্ন উচ্চতায় বিশাল সব প্রস্তরখণ্ড মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে পড়েছে। তারও পিছনে তুষার শুভ্র হিমালয়ের বিখ্যাত সব শৃঙ্গরাজি। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে কিছুক্ষণ বুগিয়ালের রূপ উপভোগ করে এগিয়ে গেলাম দিলওয়ার সিং-এর ধাবায়। এখানে ট্রেকারদের থাকা-খাওয়ার জন্য ভালো ব্যবস্থা আছে। ধাবার পিছনে বনবিভাগের তৈরি একটি শৌচালয়ও আছে। অর্জুন সিং জানাল, ধাবায় থাকা-খাওয়া-শোওয়া-র ভালো ব্যবস্থা আছে। বেশ খিদে পেয়েছিল। চেয়ারে বসে আরাম করে খেলাম গরম ম্যাগি ও চা।এরপর পানার বুগিয়ালের ছবি নিলাম বিভিন্ন স্থান থেকে।

আধ ঘণ্টা বিশ্রামের পর আবার হাঁটা শুরু করলাম। এবার গন্তব্য ৩ কিলোমিটার দূরে পিত্রাধর টপ্। অনেকটা পথ হাঁটলাম হালকা চড়াইয়ে। সামনে তাকালে দেখা যাচ্ছে সুউচ্চ শৃঙ্গগুলি– ত্রিশূল, দ্রোণাগিরি, হাতি, ঘোড়ি, নন্দাদেবী ও নন্দাঘুণ্টি। যত এগোচ্ছি, যত চড়াই ভাঙছি, হিমালয়ের শৃঙ্গগুলি ততই যেন বিভিন্ন আঙ্গিকে ধরা দিচ্ছে চোখের সামনে! ওপর থেকে দেখছি, সবুজ পাহাড়ি ঢাল ক্রমশ মিশে গিয়েছে বুগিয়ালে।

এইবার খাড়া চড়াই শুরু হল। সে চড়াই-এর যেন শেষ নেই। ঘণ্টা দেড়েক পরে, অনেকটা উঁচুতে দেখতে পেলাম পিত্রাধর-এর

লাল-হলুদ পতাকা। আবার উজ্জীবিত হয়ে হাঁটতে লাগলাম। ভয়ংকর চড়াই শেষে সকাল স্লগারোটা নাগাদ পৌঁছে গেলাম পিত্রাধর টপ্-এ। কয়েক মিনিট সেখানে দাঁড়িয়ে আবার হাঁটা শুরু করলাম। হঠাৎই কোথা থেকে একখণ্ড মেঘ এসে আমাদের ছুঁয়ে গেল। পঞ্চগঙ্গার পথে চড়াই কম, বেশিটাই উতরাই। মোটামুটি দ্রুত হাঁটছি আমরা। এখান থেকে পথের দু’পাশেই রডোডেনড্রনের জঙ্গল। ঘড়িতে ১টা ৪৫ মিনিট। আমরা এসে পড়েছি ২ কিলোমিটার দূরে পরের গন্তব্যে। দেখছি পথের ধারে ছোটো-বড়ো পাথরে বাঁধানো এক জায়গা থেকে নলের মাধ্যমে জল পড়ছে, সেখানে লেখা ‘পঞ্চ গঙ্গা’। সামনে এগোলেই একটি ধাবা। তার উলটো দিকে পাথরে তৈরি সুন্দর এক বসার জায়গা। আমরা সেখানেই লাগেজ নামিয়ে বসলাম।

চা-বিরতি প্রায় ২০ মিনিটের। ফটো তোলার সুযোগও পাওয়া গেল।

পঞ্চগঙ্গা থেকে রুদ্রনাথ-এর দূরত্ব প্রায় ৩ কিলোমিটার। এবার অনেকটা পথ উতরাইয়ে। দু’পাশে শুধু রডোডেনড্রনের বন। মাসখানেক পরে ফুলে ফুলে ভরে যাবে এই জায়গা। বাঁদিকে পাহাড়ের গায়ে ঘাস বন– সেখানে বেগুনি, হলুদ ও সাদা ফুলের ছড়াছড়ি। রুদ্রনাথ মন্দিরের আধ কিলোমিটার আগেই থাকা-খাওয়ার জায়গা ‘যাত্রী নিবাস’। সেখানে পৌঁছোলাম দুপুর ২টো নাগাদ। লাগেজ নামিয়েই মন্দির দর্শন করলাম।

মন্দিরের দরজা তখন বন্ধ, খুলবে বিকেল সাড়ে ৪টেয়। মন্দিরের কাছাকাছি কয়েকটি  পবিত্র কুণ্ডের অবস্থান– সূর্য কুণ্ড, চন্দ্র কুণ্ড, তারা কুণ্ড, মানা কুণ্ড, যোধা কুণ্ড ইত্যাদি। মন্দিরের কিছুটা নীচে বয়ে চলেছে বৈতরণী নদী যাকে রুদ্রগঙ্গাও বলা হয়। আকাশ পরিষ্কার। দেখতে পাচ্ছি ত্রিশূল, নন্দাদেবী, দেবস্থান, হাতি পর্বত, নন্দাঘুণ্টি এবং আরও কয়েকটি অজানা শৃঙ্গ।

রুদ্রনাথে প্রচণ্ড ঠান্ডা এই সময়ে। সাড়ে ৩টে নাগাদ গরম ম্যাগি ও চায়ে খিদে ও তৃপ্তি মেটালাম। তখনই আলাপ হ’ল মালয়েশিয়া থেকে আগত দু’জন তামিল যুবকের সঙ্গে। তারা দুজনেই ধর্মপ্রাণ এবং একই সঙ্গে পঞ্চকেদার পরিক্রমা করছে। আরও আলাপ হ’ল দিল্লিবাসী রাজেন্দ্র সিং রাওয়াত ও তাঁর পত্নীর সঙ্গে। পরে জেনেছিলাম, রাজেন্দ্রজি দেশের প্রায় সব শিবতীর্থই দর্শন করে ফেলেছেন। সকলেই সন্ধে সাড়ে ৬টার মধ্যে পৌঁছে গেলাম রুদ্রনাথের গুহামন্দিরে আরতি দর্শনের জন্য।

অসাধারণ পরিবেশ মন্দিরে। ভক্তগণ সমবেত হয়েছেন নীরবে। ঠিক সন্ধে ৬টা ৪৫ মিনিটে আরতি শুরু হ’ল। গুহামন্দিরের সঙ্গে যুক্ত ঘরের ছাদ থেকে ঝুলছে বিভিন্ন আকারের ১ঙ্ম-রচ্টি ঘণ্টা। আরতি শুরু হতেই ভক্তজনেরা ঘণ্টা বাজিয়ে যোগদান করলেন। বর্তমান পূজারি সৗম্যদর্শন হরিশ ভাট, গাড়োয়ালেরই বাসিন্দা। প্রথমে তিনি ধুনুচি নিয়ে এবং তারপর পঞ্চপ্রদীপ-এ আরতি করতে লাগলেন। এবার চামর দুলিয়ে এবং শেষে ডুগডুগি বাজিয়ে আরতি সম্পন্ন করলেন শুদ্ধ মন্ত্রোচ্চারণের সঙ্গে। মহাদেবের বাঁ পাশে পিতলের সাপ, ডান পাশে পিতলের কমণ্ডলু ও ত্রিশূল। আরতি শেষে আমরা সকলেই দীপশিখার ওম্ স্পর্শ করলাম।

আরতির পরে এবার মন্ত্রোচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে পূজারিজি মুখরূপী, স্বয়ম্ভূ শিবলিঙ্গ থেকে ধীরে ধীরে, এক এক করে খুলে নিলেন মালা ও রাজ (রুদ্র) বেশ। আমার অনন্ত প্রতীক্ষার অবসান ঘটল। চোখের সামনে উন্মোচিত হলেন চতুর্থ কেদার, তাঁর শান্ত ক্ষমাশীল, সমাহিত রূপে। আমি অপলক দৃষ্টিতে সেই অনুপম রূপ অবলোকন করে ধন্য হলাম। ধীরে ধীরে মন্দিরের বাইরে এলাম এবং ফিরে চললাম পুষ্পিন্দর সিং-এর ধাবায়। রাতে আমাদের ইচ্ছে অনুযায়ী গরম খিচুড়ি পরিবেশন করা হল আলুভাজা ও পাঁপড় ভাজা সহ। আজ রাতে যাত্রীনিবাস বিভিন্ন বয়সের তীর্থযাত্রীতে ভর্তি। দুই পোর্টার-এর সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করে শুয়ে পড়লাম।

সকাল ৬টায় উঠে পড়লাম। মুখ ধুয়ে প্রথমে গরম চা খেয়ে নিলাম। এবার পোশাক পরিবর্তন করে ৭টার মধ্যেই মন্দিরে পৗঁছে গেলাম। রুদ্রনাথের অভিষেক ক্রিয়া শুরু হল সকাল সাড়ে ৭টায়। পূজারিজি শিবলিঙ্গ শোধন করে পরম যত্নে এক এক করে সমস্ত অলংকার পরাতে লাগলেন– পিছন থেকে তাঁর সহকারীর মন্ত্রোচ্চারণ চলতে লাগল। মহাদেব ধারণ করলেন রুদ্ররূপ। অভিষেক ক্রিয়া সম্পূর্ণ হল দুই ঘণ্টা পরে। বেলা ১ঙ্মটায় আমরা পুজো দিলাম। আমাদের সঙ্গে আনা রুপোর বিল্বপত্র শোভিত হল মহাদেবের মস্তকে। এরপর হোম চলল প্রায় এক ঘণ্টা ধরে। ফুল ও প্রসাদ নিয়ে আমরা যখন ধাবায় ফিরলাম, তখন ঘড়িতে বেলা সোয়া ১টা। বুঝলাম, অনেক দেরি হয়ে গেছে। আজ আর কোনওভাবেই মণ্ডল পৌঁছোনো যাবে না। লাগেজ গুছিয়ে নিয়ে দ্রুত রুটি-সবজি ও চা খেয়ে নিলাম। ধাবার বিল মিটিয়ে পিঠে স্যাক ও হাতে লাঠি নিয়ে আমরা ফিরতি যাত্রা শুরু করলাম ঠিক দুপুর ১টায়।

শীতকালে মহাদেবের প্রতীকী অবয়ব গোপেশ্বরে নিয়ে এসে পূজা করা হয়। ডোলিযাত্রা গোপেশ্বর থেকে শুরু হয়ে সাগর, লিউটি, পানার পেরিয়ে পিত্রাধর এসে পৌঁছোয়। সেখানে পূর্বপুরুষদের পুজো করা হয়। ধালাবনি ময়দান পেরিয়ে ডোলি রুদ্রনাথ এসে পৗঁছোয়। সেখানে প্রথমে বনদেবী-র পুজো করা হয়, যাঁকে অঞ্চলের রক্ষাকর্ত্রী বলে মানা হয়। শ্রাবণ মাসে রাখী পূর্ণিমার দিন বার্ষিক মেলা উদ্যাপিত হয় রুদ্রনাথ মন্দিরে।

যাত্রীনিবাস থেকে পঞ্চগঙ্গা পর্যন্ত প্রায় পুরোটাই চড়াই পথ। দু’পাশে রডোডেনড্রনের বন ও ঘাস জমি। আমরা এগোচ্ছি ধীর পায়ে। পঞ্চগঙ্গা পৌঁছোতে দুপুর সোয়া ১টা বেজে গেল। সেখানে ১০ মিনিট বিশ্রাম করে, একেবারে খাড়া চড়াই ভেঙে পাহাড়ের শীর্ষদেশে পৌঁছোলাম আধ ঘণ্টায়। হঠাৎই আবহাওয়া খারাপ হয়ে গেল। আকাশ জুড়ে শুধু মেঘ আর মেঘ। গাইড প্রদীপের পিছু পিছু বিপজ্জনক শৈলশিরা ধরে বাঁদিকে এগিয়ে গেলাম, কোনও ভাবে ঘাসের গোছা আঁকড়ে ধরে। হঠাৎ গাইডের খেয়াল হয়, সে ভুল পথে চলে এসেছে। বহু কষ্টে সেই শৈলশিরা ধরে ফিরে আসি পূর্বস্থানে। বৃষ্টিতে দেখা যাচ্ছে না পথ। ভাগ্যক্রমে, নীচে এক জায়গা থেকে স্থানীয় এক ব্যক্তি আমাদের গাইডকে সঠিক রাস্তা দেখিয়ে দিল। ভুলের জন্য আধ ঘণ্টা অমূল্য সময় নষ্ট হল। এবার ডান দিক ধরে চলতে শুরু করলাম অনসূয়ার উদ্দেশ্যে। মিনিট দশেক হাঁটার পরেই শিলাবৃষ্টি শুরু হল। ছোটো বড়ো শিলা পড়তে শুরু করল মাথায়। তাড়াতাড়ি মাথা ও লাগেজ ঢেকে নিলাম পলিথিনের চাদরে। কখনও জঙ্গল পথে, কখনও ঘাসবনের মধ্য দিয়ে ভয়ানক বিপজ্জনক পথে নামতে লাগলাম আমরা। নীচে তাকালে রক্ত হিম হয়ে যায়! অন্তত তিন-চার হাজার ফুটের ভয়ংকর উতরাই। অবিরাম শিলাবৃষ্টি হয়ে চলেছে। গত কয়েকদিনের বৃষ্টিতে ঘাসঝোপের অস্বাভাবিক বাড়-বাড়ন্ত! পথ খুঁজে পাওয়াই মুশকিল হয়ে পড়ছে। প্রত্যেকেরই গলা শুকিয়ে কাঠ, নিজেদের দুর্বল মনে হচ্ছে। এবার একটু সুরক্ষিত স্থানে এসে পাহাড়ের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়ালাম। প্রত্যেকেই কিছুটা করে শুকনো ফল খেয়ে জলে গলা ভেজালাম।

এবার আবার শুরু হল জঙ্গল পথ। পিছল পথে ক্রমশ নীচে নেমে চলেছি। প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে নীচে নেমে আসার পর আরও কিছুটা নীচে নজরে এল ছোট্ট এক বুগিয়াল। আমরা অনেকটা নীচে নেমে এসেছি। মনে আশা, কোনওরকমে ওই বুগিয়ালে পৌঁছোতে হবে যেখানে দেখা যাচ্ছে দুটি পাতা ছাওয়া ঘর। হয়তো কোনও একটাতে মিলে যাবে রাতে থাকার আশ্রয়। গাইড দ্রুত নেমে গেল খোঁজ নিতে। আমরা টলতে টলতে বুগিয়ালের কাছে এসে পৌঁছোলে গাইড জানায়, ঘর দুটি মেষপালকদের, যেখানে ট্রেকারদের জন্য থাকা-খাওয়ার কোনও ব্যবস্থা নেই। আশাহত হ’লাম ভীষণ ভাবে। আমরা সেখানে গিয়ে বসলে একজন মেষপালক পাঁচ মিনিটের মধ্যে গরম চা নিয়ে চলে এল। বেশি মিষ্টি চা আমাদের শরীরে জোগাল প্রয়োজনীয় শর্করা। আমরা জোর করে তাকে কিছু টাকা দিয়ে আবার হাঁটা শুরু করলাম। বুগিয়ালের লোকেরা জানাল, নিকটবর্তী কাণ্ডাই বুগিয়াল আরও ৩ কিলোমিটার দূরে। আরও জানাল, পিত্রাধর থেকে নাওলা পাস হয়ে এলে আমরা পৌঁছোতাম হানসা বুগিয়ালে।

ঘড়িতে সন্ধে পৗনে ৬টা। তাই, আরও ঘণ্টাখানেক আলো থাকবে পথে। কিন্তু মেঘলা আবহাওয়ায় আধ ঘণ্টার মধ্যেই অন্ধকার ঘনিয়ে এল। জঙ্গলপথে আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। বৃষ্টিতে আলগা, পিছল মাটি। এর মাঝে আমরা প্রত্যেকেই এক-দুই বার করে পিছলে পড়েছি মাটিতে। যেখানে সেখানে বড়ো গাছ উলটে পড়ে হাঁটা পথ আটকে দিয়েছে। টর্চ-এর আলোই একমাত্র ভরসা। কখনও হামাগুড়ি দিয়ে, কখনও বুকে হেঁটে, কখনও বা উলটে পড়া গাছের ওপর চড়ে আমরা এগোচ্ছি। পথ যেন আর শেষ হয় না। এখনও পর্যন্ত আনুমানিক ৯০ কিলোমিটার হেঁটেছি চরম প্রতিকূল অবস্থায়। গাইড যদিও বলে চলেছে, আমরা ঠিক পথেই চলেছি, তবু আমাদের মনে বেশ

সংশয়। বহু চেষ্টার পরে গাইড মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করতে সমর্থ হয় কাণ্ডাই বুগিয়ালে ধাবার মালিকের সঙ্গে। তার কথা মতো আমাদের অবস্থান বোঝাতে বার বার গাছের মাথায় টর্চের আলো ফেলতে লাগলাম। প্রায় আধ ঘণ্টা পর কাণ্ডাই ধাবা থেকে ছুটে এল নন্দন সিং বিস্ত। এবার তাকে অনুসরণ করে আরও প্রায় ৪৫ মিনিট পরে রাত ৮টা নাগাদ আমরা এসে পৌঁছোলাম কাণ্ডাই বুগিয়ালে, পঞ্চগঙ্গা থেকে যার দূরত্ব ১১ কিলোমিটার। মনে হল, আমরা যেন নতুন জীবন ফিরে পেলাম!

ছোট্ট ধাবায় আমাদের স্বাগত জানালেন রাওয়াতজি। আমরা খুশি হ’লাম পরিচিত ব্যক্তিকে দেখে। হাত-পা ধুয়ে প্রথমেই গরম চায়ে একটু চাঙ্গা হবার চেষ্টা করলাম। আধভেজা পোশাক পরিবর্তন করে ডিনারে বসলাম। তার পরেই ক্লান্ত শরীরকে বিছানায় এলিয়ে দিলাম।

সকালে উঠে ধাবা থেকে বাইরে এলাম। মন ভরে গেল প্রকৃতির অপার সৗন্দর্যে। ধ্যান মগ্ন হিমালয়ের মাঝে নিজেকে ধন্য মনে করলাম। দূরে, অনেকটা নীচে দেখতে পাচ্ছি অনসূয়া মন্দির ও সংলগ্ন ঘরবাড়ি। ঠিক সকাল সাড়ে ৭টায় দুই গাইডের সঙ্গে আমরা ৭জন যাত্রা শুরু করলাম গহন জঙ্গলের মাঝ দিয়ে।

রাতের বিশ্রাম চলার শক্তি দিয়েছে আবার। আজ ভারি ভালো লাগছে জঙ্গলের শান্ত রূপ! ক্বচিৎ শুনছি পাখির ডাক, নয়তো দূরে বয়ে চলা ঝরনার কলতান। সামনে চলেছে দুই গাইড, পেছনে আমরা চারজন। এবার পার হ’লাম খরস্রোতা এক ঝরনার ওপরে বানানো একটি সেতু। আরও ১৫ মিনিট হাঁটার পর পৌঁছোলাম অত্রিমুনির আশ্রমে যাওয়ার পথে। প্রদীপ সকলের লাগেজ নিয়ে উপরে থেকে গেল। আমরা অন্য গাইডকে অনুসরণ করে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে চলে এলাম অত্রিগঙ্গার কাছে। কাছেই একটি গুহায় বিশালদেহী এক মৗনীবাবার বাস। নদীতে প্রচণ্ড স্রোত। গাইডের সাহায্যে বিশাল পাথরগুলোর ওপর সতর্ক পা ফেলে একে একে নদী পার হ’লাম। ঘড়িতে তখন বেলা ১রটা। ধীরে ধীরে আশ্রমের ঠিক নীচে গিয়ে পৌঁছোলাম। উপরে তাকিয়ে দেখি, অত্রিগঙ্গা বিপুল জলধারায় পাহাড় থেকে নীচে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। উপরে গুহা আশ্রমে পৌঁছোনোর পথ এই বর্ষায় অত্যন্ত বিপজ্জনক। তাই, নীচে দাঁড়িয়েই মহর্ষির উদ্দেশ্যে প্রণাম জানালাম এবং একই পথে সাবধানে ফিরে গেলাম নদীর অপর পাড়ে।

আবার হাঁটা লাগালাম বনপথে। প্রায় ঘণ্টাখানেক হেঁটে দুপুর সোয়া ১টায়। পৌঁছোলাম ছবির মতো সুন্দর গ্রাম অনসূয়াতে। প্রথমেই চলে এলাম হোটেলে। গত দিনের বর্ষাতে ভিজে যাওয়া পোশাক ও জুতো রোদে শুকোতে দিলাম। তারপর সবাই মিলে গল্প করতে করতে চা খেলাম। লাঞ্চের অর্ডার দিয়ে চললাম অনসূয়া দেবী মন্দিরে। সেখানেও থাকা-খাওয়ার জন্য মন্দির কমিটির ধর্মশালা রয়েছে। আমাদের দেখে পুরোহিত মশাই এসে মন্দিরের দরজা খুলে দিলেন। দর্শন করলাম অনসূয়া দেবীর অপূর্ব সুন্দর মূর্তি।

এরপর গেলাম দত্তাত্রেয় মন্দিরে। ঋষি দত্তাত্রেয়-র মূর্তিটিও অতি সুন্দর। ছোট্ট গ্রামটিতে যেন এক অপার শান্তি! ফিরে এলাম লজে। পিছনে স্নানের জায়গায় গিয়ে সাবান দিয়ে হাত-পা-মুখ ধুয়ে পরিষ্কার হ’লাম। সকলে মিলে লাঞ্চ সারলাম ভাত, কারি ও শাকভাজায়।

৬ কিলোমিটার দূরে মণ্ডলের পথে যাত্রা শুরু করলাম আড়াইটে নাগাদ।

শুরুতে অনেকটা পথ পাথরে বাঁধানো, হাঁটলে পায়ে লাগে। এরপর আবার শুরু হল জঙ্গল, সঙ্গে বৃষ্টি। প্রায় ২ কিলোমিটার হাঁটার পর এএসআই দ্বারা রক্ষিত এক প্রাচীন শিলালিপি দেখতে  পেলাম পথের পাশেই। অনুমান করা হয়, এই শিলালিপি ষষ্ঠ শতকের, যখন সেখানে (সির্কা) রাজত্ব করতেন মৌখান রাজ সরবর্মন । শিলালিপির ছবি তুলে আবার এগিয়ে চললাম।

কিছুক্ষণ হাঁটার পর এক চা-দোকান দেখে সকলে বসে পড়লাম সেখানে। চা খাওয়ার সময় লক্ষ্য করলাম, পাহাড়ের গায়ে অনেক উঁচুতে দাঁড়িয়ে আছে হরিণ প্রজাতির দুই প্রতিভু। বিকেল সাড়ে ৪টের সময় পৌঁছোলাম বর্ধিষ্ণু গ্রাম মণ্ডল-এ এবং আরও ১৫ মিনিট পরে বাস রাস্তার পাশে আমাদের রাতের আশ্রয় ভগৎ সিং বিস্ত-এর হোটেলে। দোতলায় একটি ঘরে আমাদের থাকার ব্যবস্থা। ঘরটা ভালোই, সবরকম সুবিধে যুক্ত। ব্যালকনিতে দাঁড়ালে রাস্তা সহ মণ্ডল গ্রামের অনেকটা দেখা যায়। হালকা গরম জলে স্নান করে নীচে চলে এলাম এবং গরম চায়ে ক্লান্তি দূর করলাম। একটু আগেই জেনেছি, প্রায় সমগ্র গাড়োয়াল অঞ্চলে ছোটো গাড়ি (জিপ, ট্যাক্সি)-র ধর্মঘট চলছে গত তিন দিন ধরে। বুঝলাম, পরদিন সকালে আমাদের জন্যও দুর্ভোগ থাকতে পারে। ইতিমধ্যে, সন্ধেবেলার লোকাল বাসে আমাদের

‘লেফ্ট-লাগেজ’ চলে এল হোটেলে।

ঘরে ফিরে আমরা নিজের নিজের রুকস্যাক গুছিয়ে নিলাম। মোবাইল ও পাওয়ার ব্যাংক-এও যতটা সম্ভব চার্জ দিয়ে নিলাম। রাত সাড়ে ৮টায় ডিনার করতে নীচে নামলাম। মেনুতে ছিল মনুয়া ও গমের রুটি, ভাত, ডাল, আলু, কপির তরকারি। অন্যান্য তীর্থযাত্রীদের সঙ্গে গল্প করতে করতে ডিনার সারলাম। এখনও আমার মন জুড়ে শুধুই রুদ্রনাথ! সত্যিই তো, চতুর্থ কেদার একমাত্র স্বয়ম্ভু লিঙ্গ যার মাধ্যমে দেবাদিদেব-এর অনুপম, ক্ষমাশীল মুখমণ্ডলের প্রকাশ। আমি প্রকৃতই ভাগ্যবান সেই রূপ দর্শন করে। পরদিন মণ্ডল থেকেই যাত্রা শুরু করব কেদারনাথ অভিমুখে।

কীভাবে যাবেন ছ হরিদ্বার বা ঋষিকেশ থেকে গোপেশ্বর আসুন। সেখান থেকে আরও ৫ কিলোমিটার দূরে সাগর গ্রামে অথবা

১৩ কিলোমিটার দূরে মণ্ডল গ্রামে চলে আসুন। সাগর অথবা মণ্ডল থেকে ট্রেকিং শুরু করুন। সাগর থেকে যাত্রা শুরু করে একই পথে নির্বিঘ্নে ফিরে আসুন ২০ কিলোমিটার দূরত্ব। মণ্ডল থেকে ট্রেক করলে চড়াই অতি ভয়ানক, উতরাই আরও বিপজ্জনক, প্রায় ২৪ কিলোমিটারের পথ।

কোথায় থাকবেনঃ সাগর থেকে ট্রেক শুরু করলে থাকুন ‘হোটেল রুদ্র’-তে। পাশেই ‘হোটেল হরি ওম’।

মণ্ডল থেকে ট্রেক শুরু করলে থাকুন ‘হোটেল অনুসূয়া’তে।

কখন যাবেনঃ মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত। বর্ষায় যাত্রা কিছুটা বিপজ্জনক।

চিকেনের দুটি অসাধারণ রেসিপি

আজ লাঞ্চ-এ কী মেনু? চিকেন? তাহলে জেনে নিন দুটি নতুন পদ্ধতিতে চিকেন রান্নার প্রসেস৷ স্বাদে ভিন্নতাও আসবে আবার নতুন এক্সপেরিমেন্ট-এর মজাও পাবেন৷ রইল রেসিপি৷

সাউথ ইন্ডিয়ান চিকেন

উপকরণ – ১ কেজি চিকেন চৗকো টুকরো করা, ৬টা লাল কাশ্মীরি লংকা (১/২ কাপ ভিনিগারে ২ ঘন্টা ভিজিয়ে রাখা), ২ বড়ো চামচ আদাবাটা, ২ বড়ো চামচ রসুনবাটা, ২ বড়োচামচ জিরেবাটা, ৩ বড়ো চামচ সরষের তেল, ২৫০ গ্রাম বাটন অনিয়ন কুচি, ২ বড়ো চামচ গুড়, নুন স্বাদমতো।

প্রণালী – নুন, লংকা, আদা, রসুন ও জিরে পেস্ট মিশিয়ে নিন। এই মশলা মাখিয়ে চিকেনটা ম্যারিনেট করুন। প্যানে তেল গরম করে চিকেনের মিশ্রণটা দিয়ে রান্না করুন। এতে পেঁয়াজবাটা দিয়ে কষতে থাকুন। একটু নরম হলে, গুড় দিন। গরম গরম পরিবেশন করুন।

Murgh makhani recipe

মুর্গ মাখানি

উপকরণ (ম্যারিনেশনের জন্য) – ৫০০ গ্রাম বোনলেস চিকেনের টুকরো, ২ ছোটো চামচ আদাবাটা, ২ ছোটো চামচ রসুনবাটা, ৩ ছোটো চামচ টক দই, ১ বড়ো চামচ লেবুর রস, ২ ছোটো চামচ ভিনিগার, ১ ছোটো চামচ ধনেগুঁড়ো, ১ ছোটো চামচ জিরেগুঁড়ো, ১-২টো পেঁয়াজ কুচি করা, ২ ছোটো চামচ লংকাগুঁড়ো, নুন স্বাদমতো।

গ্রেভির জন্য – ৬টা টম্যাটো, ১/২ বড়ো চামচ মাখন, ১ ছোটো চামচ লংকাগুঁড়ো, ১ ছোটো চামচ আদাবাটা, ১টা কাঁচালংকা কুচোনো, ১/৪ ছোটো চামচ অরেঞ্জ কালার, ৩ বড়ো চামচ ফ্রেশ ক্রিম, ১ ছোটো চামচ ধনেগুঁড়ো, ১ ছোটো চামচ জিরেগুঁড়ো, ১ ছোটো চামচ চিনি, নুন স্বাদমতো।

সাজানোর জন্য – ২টো মিহি করে কাটা কাঁচালংকা, ১ চামচ মাখানি (ঘি দিয়ে খোলায় ভেজে নেওয়া), ১ বড়ো চামচ মাখন, ২ বড়ো চামচ ফ্রেশ ক্রিম, ধনেপাতাকুচি।

প্রণালী – টম্যাটো পিউরি বানিয়ে রাখুন। এবার ম্যারিনেশনের সব উপকরণ একসঙ্গে মেখে পেস্ট তৈরি করুন। এতে ভালো ভাবে চিকেনটা মাখিয়ে, ২ ঘন্টা রেখে দিন। এবার একটা গভীর কড়াইতে মাখন গরম করুন। এতে ম্যারিনেটেড চিকেনটা দিয়ে কষতে থাকুন। চিকেন রান্না হয়েছে বুঝলে, অন্য একটি সসপ্যানে মাখন গরম করুন। এতে লংকাগুঁড়ো, ধনেগুঁড়ো, জিরেগুঁড়ো, আদাবাটা, নুন ও কাঁচালংকা দিয়ে কষতে থাকুন। এতে চিকেন দিন। কষতে থাকুন। কালার, চিনি ও ক্রিম দিন। মাংস ভালো ভাবে সেদ্ধ হলে মাখানি দিয়ে একটু নাড়াচাড়া করে নামিয়ে নিন। উপর থেকে ফ্রেশ ক্রিম, কাঁচালংকাকুচি ও ধনেপাতা ছড়িয়ে পরিবেশন করুন।

বায়োপিক-এ দাবাড়ু আনন্দ-এর সাফল্যের কাহিনি

ইলো রেটিং-এর নিরিখে ২৮০০ পয়েন্টের বেশি পাওয়া মাত্র চার জন দাবাড়ুর মধ্যে আনন্দ একজন। বিশ্বনাথন আনন্দ ১৯৯৪ সাল থেকে আজ পর্যন্ত বিশ্বের সেরা তিন ধ্রুপদী দাবাড়ুর একজন৷ বিশ্বের সেরা দ্রুতগতির দাবাড়ু হিসেবে সর্বজনবিদিত তাঁর নাম৷আর তাঁর জীবনই এবার চিত্রায়িত হতে চলেছে রুপোলি পর্দায়৷পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন আনন্দ এল রাই, যিনি ইতিমধ্যেই ‘রাঞ্ঝনা’, ‘তনু ওয়েডস মনু’-এর মতো জনপ্রিয় ছবি বানিয়েছেন। এবার তিনি দক্ষিণ ভারতীয় এই দাবা কিংবদন্তীর জীবন নিয়ে ছবি তৈরি করতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন৷

বায়োপিক–এর এই ট্রেন্ডে এর আগে শামিল হয়েছে বহু খেলোয়াড়ের জীবন৷  এবার বলিউড প্রস্তুত হচ্ছে গ্র্যান্ডমাস্টার বিশ্বনাথন আনন্দের বায়োপিকের জন্য।খেলাধুলো ভারতীয়দের অন্যতম প্রিয় একটি বিষয়৷ এর আগে যতজন খেলোয়াড়ের জীবনকে কেন্দ্রে রেখে ছবি তৈরি হয়েছে, মানুষ তা সাদরে গ্রহণ করেছে৷এবার দাবা নিয়ে মানুষের মনে কতটা উত্তেজনা রয়েছে সেটাই প্রমাণ করবে এই ছবি৷ দীর্ঘ তিন দশক ধরে দাবার ক্ষেত্রটিতে রয়েছেন আনন্দ। এখনও প্রথম ১৫ জনের মধ্যে রয়েছেন তিনি। আনন্দের মতো তারকার জীবনযুদ্ধ দেখতে দারুণ আগ্রহী ও উন্মুখ হবেন দর্শক, এমনটাই আশা রাখছেন ছবি নির্মাতারা।

প্রসঙ্গত, নিজস্ব আক্রমণাত্মক খেলার ধরন দিয়ে নয়ের দশকে দাবায় সোভিয়েত ইউনিয়নের একচেটিয়া দাপটের জবাব দেন বিশ্বনাথন আনন্দ। ভারতের প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়া থেকে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সেই দীর্ঘ অভিযানই তুলে ধরা হবে সেলুলয়েডে। ছবিটিতে যেমন আনন্দের বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপের দুর্দান্ত কিছু ম্যাচের ঝলক দেখানো হবে, তেমনি তুলে ধরা হবে তাঁর জীবনের নানা দিক।

বলিউডের চলচ্চিত্র নির্মাণ সংস্থা সানডায়াল এন্টারটেনমেন্ট-এর সঙ্গে আনন্দের ইতিমধ্যেই চুক্তি সই হয়েছে। সম্প্রতি বেশ কয়েকটি প্রযোজনা সংস্থা থেকে প্রস্তাব পেয়েছিলেন আনন্দ। শেষ পর্যন্ত সানডায়ালকেই বায়োপিকের জন্য বেছে নেন গ্র্যান্ডমাস্টার। তবে সিনেমাটিতে আনন্দের ভূমিকায় কে অভিনয় করবেন বা আর কারা কারা থাকবেন, সেই বিষয়ে কোনও কিছুই জানাননি পরিচালক।

মিলখা সিংহ, মহেন্দ্র সিংহ ধোনি, আজহারউদ্দিন, শচীন তেণ্ডুলকর, মেরি কম- এঁদের জীবন নিয়ে ছবি হয়েছে বলিউডে। সাম্প্রতিক অতীতে হকি তারকা সন্দীপ সিংহকে নিয়েও ছবি হয়েছে। শুটিং শুরু হয়েছে ভারতীয় তারকা শাটলার সাইনা নেহওয়ালের বায়োপিকেরও।আর এবার বিশ্বনাথন আনন্দ।

নির্দেশক আনন্দ এল রাই বর্তমানে অক্ষয় কুমার, ধনুশ ও সারা আলি খান-কে নিয়ে ‘আটরঙ্গি রে’ সিনেমার শুটিং করছেন । আর এরই মধ্যেই নিজের পরবর্তী ছবির কথা ঘোষণা করে ফেললেন তিনি। দাবা খেলায় তুমুল আগ্রহ দেখেছেন তিনি ছোটোদের মধ্যে, তাই এ ছবি শুধু বড়োদেরই নয়, ভালো লাগবে ছোটোদেরও, এমনটাই মনে করছেন নির্দেশক৷২০২১ সালে ছবিটি মুক্তি পাবে। তাই শুরু হয়েছে জোর প্রস্তুতি৷

শাড়ির সঙ্গে ব্লাউজ-এ আনুন বৈচিত্র্য

বাঙালিয়ানার সেরা সাজ নিঃসন্দেহে শাড়ি। অনুষ্ঠানে পরার পোশাক হিসেবে, শাড়িই অনেকের প্রথম পছন্দ। অনুষ্ঠানের জন্য চাই  ট্র্যাডিশনাল ভারী জরির পাড় বসানো কোনও দক্ষিণী শাড়ি। আর রোজকার ব্যবহারে বা অফিস যাওয়ার সময়ে, হালকা শাড়ি পরতেই বেশি ভালোবাসেন আজকের তন্বীরা। তাঁদের পছন্দের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তাই  আনুষ্ঠানিক ভারী শাড়ির পাশাপাশি,  এখন দারুণ ভাবে ট্রেন্ডিং খাদির শাড়ি। নরম, তুলতুলে এই শাড়ি পরাও যেমন সোজা তেমনই আবার দীর্ঘক্ষণ ধরে পরে থাকার ফলে ভাঁজ নষ্ট হয়ে গেলেও খারাপ দেখতে লাগে না। আর দামও মধ্যবিত্তের হাতের নাগালে। এছাড়া খাদির শাড়ি পরে বেরোলে সকলেই বুঝতে পারবেন যে আপনি ট্রেন্ডিং ফ্যাশন সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন। আপনার পছন্দেরও তারিফ করবেন সকলেই।

কিন্তু খাদির শাড়ি কিনে যেমন তেমন করে পরে নিলেই তো চলবে না। তার সঙ্গে অবশ্যই চাই মানানসই ব্লাউজ। বোট নেক ব্লাউজ এখন ফ্যাশনে ইন। চাইলে সুতির বোট নেক ব্লাউজ পরতে পারেন। আপনার কোনও সমস্যা না থাকলে স্লিভলেস ব্লাউজও পরতে পারেন। ব্যাকলেস ব্লাউজও খাদি শাড়ির সঙ্গে বেমানান লাগে না। তবে শাড়ির সঙ্গে রং মিলিয়ে ব্লাউজ না পরাটাই এখন ফ্যাশন। তার চেয়ে বরং শাড়ির রঙের সঙ্গে কিছুটা অফবিট ব্লাউজই আপনাকে করে তুলতে পারে অনেক বেশি আকর্ষণীয়।

ট্র্যাডিশনাল সাজ যাঁরা পছন্দ করেন, তাঁদের কাছে কনট্রাস্ট করে পোশাক পরার কোনও বিকল্প নেই। তা দেখতেও নিশ্চিতভাবেই খুব ভালো লাগে।ব্লাউজ-এ ব্যবহার করুন এই কনট্রাস্ট কালার। কিন্তু কনট্রাস্ট করারও একটা ব্যাকরণ আছে, সেটা না মেনে চললে কিন্তু দেখতে ভালো লাগবে না। তাই যে ধরনের শাড়িই পরুন না কেন, ব্লাউজ বাছার সময়, হয় সেটির কাট-এ থাকবে বৈচিত্র্য আর নয় রং হবে কনট্রাস্ট।

প্রথম নিয়ম হচ্ছে, হালকা আর গাঢ় রঙে ভালো কনট্রাস্ট হয়। যেমন ধরুন সাদা আর কালো হচ্ছে খুব ভালো কনট্রাস্ট। সেই নিয়ম মেনেই সাদা আর লালও দারুণ। তবে একটি শেডের লাইট আর ডার্ক টোন দিয়েও খুব ভালো বৈপরীত্য তৈরি করা সম্ভব – গাঢ় নীল আর হালকা নীল পাশাপাশি রেখে দেখতেই বুঝতে পারবেন!

শাড়ি ও ব্লাউজের ফ্যাব্রিক বাছার সময় দু রকম প্রিন্ট-এর মধ্যেও কনট্রাস্ট করা যায়। আবার একাধিক শেডের মধ্যেও কনট্রাস্ট করানো সম্ভব। যেমন ধরুন, হলুদ আর কমলার বৈপরীত্য সুন্দর দেখতে লাগে। আবার কালার হুইলের একেবারে বিপরীত দিকে থাকা রং, যেমন সবুজ আর বেগুনি বা নীল আর গোলাপির কনট্রাস্টও ভালো।

বিভিন্ন ধরনের জ্যামিতিক নকশা দিয়েও কনট্রাস্ট করা যায়, আবার ছোটো এবং বড়ো আকারের প্রিন্ট দিয়েও তা করা সম্ভব। যাঁরা প্রথমবার কনট্রাস্ট করে পোশাক পরছেন, তাঁরা রং দিয়েই এক্সপেরিমেন্ট শুরু করুন। তার পর না হয় অন্যগুলো ট্রাই করে দেখতে হবে।

এথনিক জুয়েলারি, অক্সিডাইজড গয়না, হাল্কা লিপস্টিক আর টিপের সঙ্গে শাড়ি পরলে দেখতে অসম্ভব সুন্দর লাগবে। শুধু নিজের বুদ্ধিমত্তা আর কালার সেন্সকে কাজে লাগান।

অসুস্থতা নিয়েই শট দিলেন মিঠুন, কাশ্মীর ফাইলস-এ

শরীর ভালো না থাকা সত্ত্বেও তিনি প্রথমে বেশ কয়েকটি দৃশ্যের শট দিয়েছিলেন। তারপর শুটিং চলাকালীন হঠাৎই খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তী ৷বিবেক অগ্নিহোত্রী পরিচালিত ছবি ‘দ্য কাশ্মীর ফাইলস’ ছবির শ্যুটিং করছিলেন তিনি মুসৌরিতে।পেটের সংক্রমণের কারণে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। আর তাই থেকেই ঘটে বিপত্তি৷

মিঠুন চক্রবর্তীকে কেন্দ্র করেই সব শট ছিল নির্দিষ্ট দিনটিতে। আউটডোর শুটিং চলছিল দ্য কাশ্মীর ফাইলস টিমের ৷ সেখানেই মিঠুন শট দেওয়ার সময় তাঁর শরীর খারাপ লাগতে শুরু করে৷ উপায় না দেখে শুটিং থামিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন পরিচালক৷ কিন্তু মিঠন তা কিছুতেই থামাতে দেননি৷ তিনি নিজের অংশটি অভিনয় করেন তুমুল অসুস্থতার মধ্যেও৷

এই ঘটনার পরে. মিঠুন চক্রবর্তীর মতো বর্ষীয়ান এক অভিনেতার ডেডিকেশন প্রায় অভিভূত করেছে ছবির নির্দেশক বিবেক অগ্নিহোত্রীকে৷ তিনি বলেন, “কোনও সাধারণ মানুষ এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না৷  কিন্তু অসুস্থতা থাকা সত্বেও তিনি কিছুক্ষণের জন্য বাইরে থেকে ঘুরে এসে, সম্পূর্ণ শুটটি শেষ করেছেন। তাঁর শরীর এতটাই খারাপ ছিল যে, আমি ভাবতেও পারিনি কেউ কীভাবে এই অবস্থায় শুটিংয়ের কথা  ভাবতে পারে। এজন্যেই তিনি সুপারস্টার। তিনি আমাকে বলেছিলেন বিগত কয়েক মাসে তিনি  এরকম ভাবে অসুস্থ হননি। তিনি আমাকে ক্রমাগত বলেছিলেন, ‘আপনার শুটিংয়ে অসুবিধা হচ্ছে না তো?’ আমি সত্যিই অবাক হয়েছি, কারণ আমি নতুন প্রজন্মের কোনও অভিনেতাকে, এতটা সিনসিয়ারিটি দিয়ে কাজ করতে দেখিনি”।

বেশ কিছুকাল যাবত নানা অসুস্থতায় জর্জরিত ছিলেন এই অভিনেতা ৷ ২০০৯ সালে ‘লাক’ ছবির শুটিং করতে গিয়ে পিঠে আঘাত পান মিঠুন। তারপর থেকে সেই ব্যথা তাঁকে ভোগাচ্ছিল। প্রায়ই পিঠে ব্যথা হতো তাঁর। ২০১৬-য় সেই ব্যথা নিয়েই তিনি হাসপাতালে ভর্তিও হন। পুরোদমে চলছিল তাঁর চিকিৎসা। কিন্তু দু’বছর কেটে গেলেও পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেননি। ২০১৯ সালের মে মাসেও পিঠে ব্যথা নিয়ে ফের হাসপাতালে ভর্তি হন মিঠুন। এরপর অবশ্য অনেকটাই সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন তিনি। চিকিৎসা করতে লস অ্যাঞ্জেলস নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে। সেখানকারই একটি হাসপাতালে চিকিৎসা হয় তাঁর।

সাম্প্রতিক সময়ে বড়োসড়ো কোনও শারীরিক কষ্ট না থাকায় , কাশ্মীর ফাইলস –এ কাজ শুরু করেন মিঠুন৷ এই প্রসঙ্গে নির্দেশক বিবেক আরও বলেন, “মিঠুনদা খুবই পরিশ্রমী এবং পেশাদার একজন অভিনেতা। শুধু তাই নয়, সকালে যখন আমরা শুটিংয়ের পরে ফিরেছি, তিনি সকলকে উৎসাহ দিয়েছেন যাতে প্রত্যেকে দ্রুত গতিতে কাজ করে। যে কারণে, আমাদের কাজের যেটুকু বিলম্ব হয়েছিল,সেটা দ্রুত মেকআপ হয়ে গেছে। মিঠুন চক্রবর্তীর মতো অভিনেতা যে কোনও ইউনিট, কলা কুশলী এবং যে কোনও চলচ্চিত্রের জন্য একটা সম্পদ।”

২০১২ সালের এপ্রিলে ‘তাশকন্দ ফাইলস’-এর সাফল্যের পরে, বিবেক সিদ্ধান্ত নেন যে, কাশ্মীরি হিন্দুদের দুর্দশার বিষয়টি পৃথিবীর সামনে তুলে ধরবেন। সেই জন্যই ‘দ্য কাশ্মীর ফাইলস’-এর বিষয় নির্বাচন৷। এই ছবিতে মিঠুন ছাড়াও মূল চরিত্রে রয়েছেন অনুপম খের। সব ঠিক থাকলে ২০২১ সালে মুক্তি পাবে ছবিটি।

বর্তমানে মিঠুন চক্রবর্তী ব্যস্ত আছেন আরও একটি প্রোজেক্ট –এ৷ সেটি হল নাচের রিয়্যালিটি শো ‘ডান্স ডান্স জুনিয়র সিজন ২’ । কিছুদিন আগেই মুক্তি পেয়েছে শোয়ের প্রোমো। স্টার জলসার নতুন রিয়্যালিটি শো-তে একেবারে নতুন লুক-এ দেখা যাবে মিঠুনকে। এই শো-এ কালো জ্যাকেটে, কালো চশমায় সেজে উঠেছেন সুপার স্টার।

বেকিং সোডা-র বহুবিধ ব্যবহার

বেকিং সোডা যে কতরকম কাজে লাগতে পারে, তা অনেকেরই অজানা। মনে রাখবেন, কিছু খাবারকে খাস্তা, মুচমুচে কিংবা স্পঞ্জি করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বেকিং সোডা-র কার্যকারিতা। এসব ছাড়াও, আর কী কী প্রয়োজনীয় সুবিধে নেওয়া যায় বেকিং সোডা ব্যবহার করে, সেই বিষয়ে জেনে নিন বিস্তারিত ভাবে।

বেকিং সোডা আসলে সোডিয়াম হাইড্রোজেন কার্বোনেট বা সোডিয়াম বাইকার্বোনেট। এক কার্বোনিক যৌগিক। NaHCO3 হল এর কেমিক্যাল ফর্মূলা। চলতি ভাষায় একে আমরা বলি ‘খাওয়া সোডা’।

ব্যবহার সমূহ

¤ ফল এবং সবজি জীবাণুমুক্ত করাঃ বাজার থেকে কাঁচা সবজি এবং ফলমূল আনার পরে বেকিং সোডা জলে মিশিয়ে ধুয়ে নিন।

¤ কার্পেট ক্লিনিংঃ কার্পেট পরিষ্কার এবং জীবাণুমুক্ত করার জন্য ব্যবহার করুন বেকিং সোডা। কিছুটা বেকিং সোডা কার্পেটের উপর ছড়িয়ে, দশ মিনিট পরে ভ্যাকুয়াম ক্লিনার দিয়ে ক্লিন করে নিন।

¤ মাউথওয়াশঃ মুখের দুর্গন্ধ দূর করার জন্য এক গেলাস জলে হাফ চা-চামচ বেকিং সোডা মিশিয়ে গারগল করুন।

¤ ডিওডরেন্টঃ ঘামের দুর্গন্ধ দূর করার জন্য ট্যালকম পাউডারের সঙ্গে সামান্য বেকিং সোডা মিশিয়ে ব্যবহার করুন।

¤ এয়ার ফ্রেশনারঃ ঘরের অস্বস্তিকর গন্ধ কাটানোর জন্য একটা কৌটোতে বেকিং সোডা রেখে, কিছুক্ষণ কৌটোর ঢাকনা খুলে রাখুন।

¤ জামাকাপড়ের কড়া দাগ দূর করার জন্যঃ ওয়াশিং মেশিনে জামাকাপড় কাচার সময় লিকুইড সোপ-এর সঙ্গে সামান্য বেকিং সোডা মিশিয়ে নিন।

¤ বাসনপত্রের কড়া দাগ দূর করার জন্যঃ স্টিল কিংবা সিলভার-এর তৈরি বাসনপত্রের পোড়া কিংবা তৈলাক্ত দাগ দূর করার জন্য সাবানের সঙ্গে বেকিং সোডা মিশিয়ে ব্যবহার করুন।

¤ বাথরুম ক্লিনিংঃ বাথরুমের মেঝের দাগছোপ কিংবা পিচ্ছিল ভাব কাটানোর জন্য বেকিং সোডা ঘষে দিন। ড্রেন ক্লিনার হিসাবেও ব্যবহার করতে পারেন বেকিং সোডা।

¤ ব্রাশ ক্লিনিংঃ টুথ-ব্রাশ এবং হেয়ার-ব্রাশ পরিষ্কার এবং জীবাণুমুক্ত রাখার জন্য বেকিং সোডা ব্যবহার করুন।

¤ শু ক্লিনিংঃ জুতোর মধ্যে জমে থাকা ঘাম এবং ধুলোময়লা দূর করার জন্য, জলে বেকিং সোডা মিশিয়ে ধুয়ে নিন।

¤ দাঁত পরিষ্কার করার জন্যঃ যাদের দাঁত হলুদ কিংবা ছোপছোপ, তারা বেকিং সোডা দাঁতে ঘষে মুখ ধুয়ে নিন।

¤ আন্ডারআর্ম কালো দাগ দূর করার জন্যঃ স্নানের এক ঘন্টা আগে সামান্য পরিমাণ বেকিং সোডা বগলে লাগিয়ে রাখুন।

¤ ফ্রিজ এবং মাইক্রোআভেন ক্লিনিংঃ সামান্য বেকিং সোডা দিয়ে ফ্রিজ এবং মাইক্রোআভেন পরিষ্কার করলে দাগমুক্ত এবং জীবাণুমুক্ত রাখা যাবে।

¤ মাথার খুসকি দূর করার জন্যঃ শ্যাম্পু করার পনেরো মিনিট আগে মাথায় বেকিং সোডা মেখে নিন।

¤ নখ পরিষ্কারঃ যাদের হাত এবং পায়ের নখ হলুদ কিংবা বিবর্ণ হয়ে গেছে, তারা বেকিং সোডা ঘষে উপকার পাবেন।

মনের ঠিকানা

সোম দেয়াল ঘড়িটার দিকে তাকাল। দশটা বেজে গেছে। তার দশতলার ফ্ল্যাট-টা থেকে নীচের গাড়ি-ঘোড়ার আওয়াজ প্রায় কিছুই শুনতে পাওয়া যায় না। তাই দশটাতেই মনে হচ্ছে রাত নিঝুম হয়ে পড়েছে। স্বাতী রোজই ডিনার করে নীচে একটু হাঁটতে যায়। আজ সোমের মনে হল স্বাতী একটু বেশি দেরি করছে উপরে আসতে।

আট বছরের ধ্রুব বসবার ঘরে টিভিতে কার্টুন দেখছে মন দিয়ে, সোম ভাবল পড়াশোনার সময় এতটা মন দিয়ে ধ্রুবকে কোনওদিন পড়তে দেখে না। সে নিজেও ল্যাপটপে সার্ফিং করতে করতে বোর হয়ে উঠেছিল। ল্যাপটপ বন্ধ করে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। উপর থেকে স্বাতীকে খোঁজার চেষ্টা করল কিন্তু কিছুই নজরে এল না। দরজার একটা চাবি নিয়ে ড্রযিংরুমের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে দরজা টেনে দিল। সোজা পা বাড়াল লিফট-এর দিকে।

তাদের হাউজিং কমপ্লেক্সের চারপাশে এখনও সব আলোগুলো জ্বলছে দেখল সোম। নীচে আবাসনের অনেকেই হাঁটতে বেরিয়েছে কিন্তু স্বাতী কোথাও নেই। ঘুরতে ঘুরতে সোম আবাসনের শপিং কমপ্লেক্সের ভিতরও একবার ঢুঁ মারল। সেখানেও স্বাতী নজরে পড়ল না। এত রাতে গেল কোথায়? চিন্তার ভাঁজ পড়ল কপালে।

হঠাৎই যেদিকটায় আলো একটু কম সেদিকে চোখ পড়তেই, সোম দেখল স্বাতী কথা বলতে বলতে হাঁটছে, সঙ্গে একজন পুরুষমানুষ। দেখেই সোমের বেশ রাগ হল। ইচ্ছে হল স্বাতীর সামনে গিয়ে কষে গালে একটা থাপ্পড় মারে। কিন্তু আশেপাশে এত মানুষজন দেখে নিজেকে সংযত করল সোম। সে নিজেও একটু দূরত্ব রেখে ওদেরকে অনুসরণ করল। তারপর একটু খালি জায়গা দেখে হাঁক দিল, স্বাতী!

চমকে পিছনে তাকাল স্বাতী। মুখে নানা ভাবের আনাগোনা লক্ষ্য করল সোম। স্বাতীর সঙ্গের পুরুষটিকে বহু আগে থেকেই চেনে সে। সুতরাং মুখে হাসি টেনে সোম জিজ্ঞেস করল, আরে প্রশান্ত কেমন আছো?

প্রশান্তর সঙ্গে করমর্দন করা শেষ হলে, হাসি মুখেই প্রশান্ত জবাব দিল, আমি ভালোই আছি। তোমার কী খবর বলো?

সোম নিজেকে পুরোপুরি কন্ট্রোল করে নিয়েছিল। নানা একথা সেকথা বলতে বলতে তিনজনে একসঙ্গে হাঁটতে শুরু করল। স্বাতী পুরোপুরি চুপ করে গিয়েছিল। সোম আর প্রশান্ত আবাসনের নানা সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে আলোচনা করতে করতে হাঁটছিল। হঠাৎ প্রশান্ত বাড়ির সবাই হয়তো চিন্তা করছে বলে, পা চালিয়ে নিজের বিল্ডিং-এর দিকে চলে গেল।

প্রশান্ত চলে যেতেই সোম, স্বাতীর দিকে ফিরে তিক্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল, এসব কী চলছে স্বাতী?

তুমি যা ভাবার ভেবে নাও। আমার কিছু যায় আসে না, সোমের মুখের উপরে একটু জোরেই কথাগুলো বলে স্বাতী পা চালিয়ে নিজের বিল্ডিং-এ ঢুকে গেল। সোম বিস্ফারিত চোখে কিছুক্ষণ স্বাতীর চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে একই দিশায় পা বাড়াল।

(২)

ফ্ল্যাটে ঢুকে, স্বাতী আগে টিভি বন্ধ করে ধ্রুবকে ওর শোবার ঘরে শুইয়ে দিয়ে এল। পরের দিন ধ্রুব-র স্কুল আছে। ধীরে ঘরের আলো সব নিভিয়ে স্বাতী নিজের বেডরুমে এসে ঢুকল। সে জানত, এখনই তাকে সোমের প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে।

স্বাতীকে দেখেই দাবানলের মতো জ্বলে উঠল সোম। কী হল স্বাতী, তুমি তো আমার প্রশ্নের উত্তর দিলে না? এত রাতে প্রশান্তর সঙ্গে ঘুরে বেড়াবার অর্থ কী?

এমনিই। একই আবাসনেতে থাকি, নীচে দেখা হয়ে গেল তাই একসঙ্গে হাঁটছিলাম।

এটা ভাবলে না যে, কেউ যদি তোমাদের দেখে তারা কী ভাববে? বলল সোম।

না ভাবিনি। একসঙ্গে হাঁটলে কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হবে?

সকালে সোমের অফিস ছিল। নিজের ব্যাবসা ভালো চলছিল না। ধারদেনা বাড়ছিল। তার উপর স্বাতীর এই ব্যবহার। রাগে সোমের মাথা ঝিমঝিম করছিল, কিছুতেই ঘুম আসছিল না। এপাশ ওপাশ ছটফট করতে করতে কখন ঘুম এসেছে সোম মনে করতে পারল না।

রোজের মতো স্বাতী বাইরের জামাকাপড় ছেড়ে ফ্রেশ হল। তারপর আয়নার সামনে বসে নাইট ক্রিম লাগাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। প্রশান্তর কথা মনে হতেই ঠোঁটের কোণায় হাসি ফুটে উঠল স্বাতীর। বিছানায় এসে শুয়ে পড়ল। পাশে শুয়ে থাকা সোমের দিকে চোখ পড়তেই চোখ ফিরিয়ে অন্য পাশ ফিরে শুল স্বাতী। রাগের মাথায় বলা সোমের কথাগুলো স্বাতীর মনে আদৌ কোনও প্রভাব ফেলেছে বলেই মনে হল না। সোমকে একেবারেই পাত্তা না দিয়ে স্বাতী প্রশান্তর কথা ভাবতে ভাবতেই আয়েশে চোখ বুঁজল। মুহূর্তে ঘুম এসে গেল।

প্রশান্ত এবং স্বাতী দুজনেই এই আবাসনে এসেছে বছর দুয়েক হল। জিমে আসতে যেতে দুজনের বন্ধুত্ব হয়, যা আজ অনেক বেশি গভীর। প্রশান্তর বউ নূপুর আর তার দুই ছেলে-মেয়ে অয়ন ও নিকিতার সঙ্গেও স্বাতীর যথেষ্টই ভালো সম্পর্ক। বাড়িতে আসা-যাওয়াও হয়েছে বহুবার। কিন্তু কী ভাবে যেন ওদের দুজনের সম্পর্কটা সকলের দৃষ্টি বাঁচিয়ে সম্পূর্ণতা পাওয়ার দিকে এগোচ্ছিল। সমস্ত সামাজিক বিধিনিষেধের ঊর্ধ্বে তারা এই সম্পর্কের আবদ্ধ হয়ে পড়ছিল। একে অপরকে দেখা, কথা বলা, একসঙ্গে কোনও কিছু নিয়ে হাসিতে গড়িয়ে পড়া, কিছুটা সময় একসঙ্গে কাটানো এই অল্পতেই দুজনে খুশি হয়ে উঠত। কাউকে তোয়াক্কা করা ছেড়ে দিয়েছিল দুজনেই।

(৩)

ধ্রুব তখন খুব ছোটো। ধ্রুব-র সব দাযিত্ব স্বাতী একাই সামলাত। সোম প্রথম থেকেই বেপরোয়া ধরনের মানুষ। সোম প্রচুর অর্থ উপার্জন করে দেখেই স্বাতীর মা-বাবা, সোমের সঙ্গে তার বিয়ে দেন। কিন্তু বিয়ের পর সোমের স্বাতীর ব্যাপারে উদাসীনতা তাকে বেশ পীড়া দিত। স্বাতী সুন্দরী, স্মার্ট, ফিটনেস ফ্রিক এবং প্রাণবন্ত। আর সেখানে সোম ছিল ঢিলেঢালা প্রকৃতির। ব্যাবসা ভালো করলেও টাকা ওড়ানো একটা নেশা ছিল সোমের। প্রতি রাতে বন্ধুবান্ধব নিয়ে নেশা না করে বাড়ি ঢুকত না সে। তার উপর ছিল দাযিত্বহীন, মুডি আর রাগি একটা মানুষ।

সোমের মা-বাবাও ওই আবাসনেই অন্য একটা বিল্ডিং-এ থাকতেন। তাদের দাযিত্বও স্বাতী একাই বহন করত। শ্বশুর-শাশুড়ির কোনও দরকার পড়লেই বউমা-কে ফোন করে দিতেন। স্বাতী তত্ক্ষণাৎ হাজির হয়ে যেত। সোমও বউয়ের উপর সব দাযিত্ব চাপিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ব্যস্ত থাকত।

স্বামী-র সঙ্গে অন্তরঙ্গতা কোনওদিন স্বাতীকে সুখ দিতে পারেনি। কারণ সেখানে ভালোবাসা বা রোম্যান্সের বড়ো অভাব অনুভব করত স্বাতী। শুধু খিদে মেটাবার একটা ইচ্ছা যেন তাড়িয়ে বেড়াত সোমকে, আর ইচ্ছেপূরণ করতে হতো স্বাতীকে। অথচ দাম্পত্য জীবনের মধুর স্বপ্ন চোখে নিয়ে স্বাতী, সোমের সঙ্গে সুখে সংসার করতে চেয়েছিল। সেই স্বপ্নপূরণ হয়নি ঠিকই কিন্তু একটি সন্তান এসেছে তার জীবনে।

প্রশান্তর সঙ্গে আলাপের পরেই জীবনটাকে অন্য চোখে দেখতে আরম্ভ করে স্বাতী। কী করে জানি স্বাতীর সব প্রযোজন নিমেষে বুঝে যেত প্রশান্ত। সাহায্য করতে ঝাঁপিয়ে পড়ত কোনওরকম প্রত্যাশা না করেই। সোমকে প্রায়শই কলকাতার বাইরে যেতে হতো। তখন কত সময় প্রশান্ত অফিস ছুটি করেও স্বাতীকে সঙ্গ দিয়েছে, যতক্ষণ না ধ্রুব স্কুল থেকে ফিরেছে। দুজন একে অপরের মনের কথা মুখে না বলেও ঠিক বুঝে যেত। কোনও নিয়মে আবদ্ধ না হয়ে দুটো মন সমস্ত সীমা লঙ্ঘন করে অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিল।

স্বাতীর দাম্পত্য জীবনে যে-সুখটুকুর অভাব ছিল, প্রশান্তর সঙ্গে আলাপের পর স্বাতীর আর কোনও অপূর্ণতা ছিল না। যন্ত্রের মতো শরীরী মিলনের সুখ ছাড়াও জীবনে আরও অনেক কিছু আছে। সমর্পণ মানে শুধু শরীরের প্রযোজনে কাছে আসা নয়, দেহে-মনে এক হয়ে যাওয়া।

স্বাতীর মনে কোনও অপরাধবোধ নেই। জীবনের আসল সুখ প্রশান্তই তাকে দিয়েছে। সোমকে কতবার দেখেছে স্বাতী একাধিক জনের সঙ্গে ফ্লার্ট করতে। স্বাতী যখনই বাধা দিতে চেয়েছে, তখনই সোম স্বাতীকে চুপ করিয়ে দিয়েছে, মানসিক সমস্যা বলে। দুবার তো সোমকে তার দূর সম্পর্কের এক বোনের সঙ্গে অশালীন অবস্থায় স্বাতী দেখেও ফেলেছিল কিন্তু সোম নিজেকে শুধরোবার কোনওরকম চেষ্টাই করেনি। মেয়েদের সঙ্গে এই ধরনের অশালীন ব্যবহারই নাকি সোমের মতে পুরুষত্বের প্রমাণ। এটাতেই সোম আনন্দ পায়। আজ প্রশান্তর সঙ্গে স্বাতীকে দেখেও হয়তো এই জন্যই বেশি কিছু বলার সাহস অর্জন করতে পারেনি সোম।

প্রশান্ত নিজের বাড়ি ঢুকে দেখল, নূপুর আর তার দুই ছেলে-মেয়ে সকলেই শুয়ে পড়েছে। অয়ন আর নিকিতার সকালে কলেজ আছে। ছেলে-মেয়ের জন্য নূপুরকেও ঠিক সময় শুয়ে পড়তে হয়।

প্রশান্ত চেঞ্জ করে বেডরুমে ঢুকতেই নূপুর জিজ্ঞেস করল, এত লেট?

হ্যাঁ, হাঁটতে বেশ ভালো লাগছিল।

কার সঙ্গে হাঁটছিলে? নূপুর জিজ্ঞেস করে।

স্বাতীর সঙ্গে দেখা হয়ে গিয়েছিল। তারপর সোমও আমাদের জয়েন করল।

নূপুর আর কিছু বলল না। স্বাতীর সঙ্গে প্রশান্তর মেলামেশার সব খবরই সে রাখে। কী করবে সে? কী করে এই কথা প্রশান্তকে জিজ্ঞেস করবে? বাড়িতে বাচ্চারা বড়ো হয়ে গেছে, খুব ভেবেচিন্তে কথা বলতে হয় এখন। রেগে গেলে প্রশান্ত চ্যাঁচামেচি শুরু করে। নূপুর ভালোই বুঝতে পারে স্বাতী কতটুকুই বা জানে প্রশান্তর সম্পর্কে। ও বাইরে একরকম আর বাড়িতে আর এক রকম, যেমন সব পুরুষমানুষ হয়। কুড়ি বছরের বিবাহিত জীবনে নূপুর প্রশান্তকে হাড়ে মজ্জায় চেনে। অন্য মহিলাদের প্রভাবিত করার ক্ষমতা তার মতো কারও আছে বলে, নূপুর বিশ্বাস করে না।

নূপুরের নিজের ছোটো বোনের সঙ্গেও প্রশান্তর অন্তরঙ্গতা গড়ে উঠেছিল একটা সময়। কিছুই করতে পারেনি নূপুর। বোনের অন্যত্র বিয়ে হওয়ার পর নূপুর কিছুটা স্বস্তি পেয়েছিল। কত মেয়ে যে প্রশান্তর জীবনে এসেছে, তার কোনও গুনতি নেই। নূপুর গরিব ঘরের মেয়ে, সন্তানদের সুরক্ষিত ভবিষ্যৎ দেওয়ার জন্য কোনওদিন স্বামীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রশ্ন তুলতে সাহস করেনি।

কিন্তু স্বাতীর সঙ্গে সম্পর্কটা একটু বেশিই খোলামেলা হয়ে দাঁড়াচ্ছে ধীরে ধীরে। নূপুর জানত আবাসনের সকলেই এই অ্যাফেয়ারের বিষয়ে জানে এবং আলোচনা করে। এটাই ক্রমশ চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছিল নূপুরের কাছে। মোড়ের দোকানে দেখা করা, একসঙ্গে সিনেমা যাওয়া, বাইরে বেড়াতে যাওয়া সব খবরই তার কানে আসত।

প্রশান্ত শুয়ে নাক ডাকতে শুরু করে দিল। কিন্তু নূপুরের চোখে ঘুম এল না। শরীরে অস্বস্তি অনুভব করে বিছানায় উঠে বসল নূপুর। কী করে বন্ধ করবে প্রশান্তর এই অভ্যাস? কবে শুধরোবে প্রশান্ত? নূপুর আন্দাজ করে ছেলে-মেযোও নিশ্চয়ই এই সম্পর্কের কথা জেনে গেছে। বাবার সঙ্গে ওরা কেউই তেমন কথা বলতে চায় না। নূপুরের কিছু ভালো লাগে না। এরকম দীর্ঘসময় ধরে প্রশান্তর কোনও অ্যাফেয়ারই টেঁকেনি।

(৪)

সারা রাত নূপুরের চোখে ঘুম এল না। সে ঠিক করল ছেলেমেযেরা কলেজে বেরিয়ে গেলে প্রশান্তর সঙ্গে কথা বলবে। প্রশান্ত একটু দেরি করেই বেরোয়। অফিস কাছেই। ছেলেমেযেরা বেরনোর পর নূপুর প্রস্তাবনা না করেই বলল, প্রশান্ত তোমার আর স্বাতীর সম্পর্কের কথা ছেলেমেযোও জেনে গেছে। ওরা কিছুতেই তোমার সঙ্গে কথা বলতে চায় না। আমাদের আবাসনেও সকলেই তোমাদের অ্যাফেয়ারের ব্যাপারটা নিয়ে ঠাট্টা করে। লজ্জা করে আমার প্রশান্ত, বয়স হয়েছে। এসব এখন আর মানায় না তোমায়। আগেও আমি তোমার এই ধরনের ব্যবহার অনেক বরদাস্ত করেছি, আর সহ্য হচ্ছে না এখন। এছাড়া টাকাও প্রচুর ওড়াচ্ছ, এগুলো ঠিক নয়।

রাগে মুখ লাল হয়ে ওঠে প্রশান্তর। উত্তরে সে বলে, টাকা আমার, আমি যেখানে খুশি খরচ করব। আর বয়স? আমার মনে হয় তোমারই বয়স হয়ে গেছে। আমি তো স্বাতীর সঙ্গ পুরো মাত্রায় এনজয় করছি। আসলে ওর সঙ্গে থাকলে আমার নিজেকে যুবক মনে হয়। বাড়িতে তোমার আর ছেলেমেয়েদের সঙ্গে অশান্তি, এসবের মধ্যেই বেশি ডিপ্রেসড লাগে আর বাকি রইল আবাসন। জেনে নাও আমি এসবের তোয়াক্কা করি না। ঠিক আছে? না আরও কিছু বলবে?

কিন্তু প্রশান্ত আমি এসব আর বরদাস্ত করব না, কড়া ভাবে জানিয়ে দেয় নূপুর।

প্রশান্তর মুখ কুটিল হাসিতে ভরে যায়। কী করবে তুমি? বাপের বাড়ি চলে যাবে? ডিভোর্স দেবে? জানি তোমার দৌড় কত? বলে তোয়ালে কাঁধে ফেলে চান করতে চলে যায় প্রশান্ত।

নূপুরের চোখের জল গড়িয়ে পড়ে। সত্যিই তো বলেছে প্রশান্ত। নূপুর কী করবে? কিছুই না। বাপের বাড়ি নেই। কাঁদতে কাঁদতে রান্নাঘরের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে সে। মনে হয় একবার সোমের সঙ্গে কথা বলা দরকার কিন্তু সোমের নম্বর ওর কাছে নেই। স্বাতীর সঙ্গে কথা বলা ছেড়ে দিয়েছে নূপুর। আজকাল সামনাসামনি দেখা হয়ে গেলেও, না চেনার ভান করে ওকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাওয়া আরম্ভ করেছিল সে। এতে স্বাতী বেশ মজা পেত। এটা একপ্রকার চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল স্বাতীর কাছে। সেও বিদ্রুপ ভরা চোখে নূপুরের দিকে তাকিয়ে থাকত।

একদিন আবাসনের এক বান্ধবীর কাছ থেকে নূপুর জানতে পারল, স্বাতী বাপের বাড়ি গেছে দুতিন দিনের জন্য। সুযোগ বুঝে সোমের সঙ্গে কথা বলতে ওদের ফ্ল্যাটে চলে এল নূপুর। সোম নূপুরকে দেখে একটু অবাক হলেও, তাকে ভিতরে আসার জন্য অভ্যর্থনা জানাল।

নূপুর ভিতরে এসেই সোমের মুখোমুখি হল। ভূমিকা না করেই বলল, আপনি নিশ্চয়ই জানেন প্রশান্ত আর স্বাতীর অ্যাফেয়ার-এর কথা। আপনি ওদের আটকাচ্ছেন না কেন?

হ্যাঁ আমি সবই জানি। কিন্তু আপনিও তো প্রশান্তকে আটকাতে পারেন।

চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু কোনও লাভ হয়নি। কাতর শোনায় নূপুরের কণ্ঠ।

আমিও চেষ্টা করেছিলাম, বলে সোম কাঁধ ঝাঁকাল।

সোমকে নিরুদ্বেগ দেখে নূপুরের রাগ আরও বাড়তে লাগল। তার মনে হল এ কীরকম পুরুষমানুষ! কী নিশ্চিন্তে কথাগুলো বলছে। চেষ্টা করেছিল কিন্তু হেরে গেছে।

তাহলে নিজের স্ত্রী-কে ছেড়ে দেবেন?

হ্যাঁ, আর কী বা করতে পারি?

মানে?

মানে এই যে, আমার গলা উঁচু করার উপায় নেই। কারণ অতীতে আমিও এমন কিছু কাজ করেছি, যার সুযোগ স্বাতী নিচ্ছে এখন। আমার ব্যাবসাও এখন খারাপ যাচ্ছে। স্বাতীকে আটকাতে পারছি না ঠিকই কিন্তু সারাদিন বসে ওকে পাহারা দেওয়া কি আমার পক্ষে সম্ভব? এছাড়াও বাড়ি, ধ্রুব এমনকী আমার মা-বাবার দেখাশোনাও সব স্বাতীই করে। পুরো দাযিত্ব ও পালন করে। কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলে থামে সোম। তারপর একটু সময় নিয়ে বলে, ঠিক আছে, কিছু তো একটা করতে হবেই! ও ফিরে আসুক, চেষ্টা করে দেখি।

আশার আলো দেখতে না পেয়ে নুপূর নিজের ফ্ল্যাটে ফিরে এল। মনটা ভারী হয়ে ছিল। সোমও বসে বসে ভাবতে লাগল স্বাতী কী করে প্রশান্তর সঙ্গে এরকম খোলাখুলি প্রেমের সম্পর্ক বজায় রাখতে পারছে? অনেকে হয়েছে, লাজলজ্জা বলে কি কিছুই নেই স্বাতীর? একবার বাড়ি ফিরুক। আমিও দেখব কী করে ওকে সোজা রাস্তায় আনা যায়।

(৫)

সেদিন রাত্রে স্বাতীকে ফোন করল সোম। কড়া ভাষায় অনেককিছুই বলল কিন্তু স্বাতীকে কোনও ভাবেই ফেরাতে পারবে বলে বলে মনে হল না তার। সোমের কথায় এখন কিছুই আর যায় আসে না স্বাতীর। মন যা চায় সেটাই করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল স্বাতী। ধ্রুবর স্কুল খুলতে স্বাতী ফিরে এল সোমের কাছে। ধ্রুব স্কুল চলে গেলে বাড়ির কাজকর্ম সেরে একটু বসতেই, সোম এসে সামনে বসল। সোমকে মনে হল অন্যদিনের তুলনায় একটু বেশীই গম্ভীর।

স্বাতী, তোমার আর প্রশান্তর মধ্যে যা চলছে সেটা বন্ধ করো নয়তো…, সোমের কথার মাঝখানে তাকে থামিয়ে দিয়ে স্বাতী বলল, নয়তো কী?

খুব খারাপ হবে।

কী খারাপ হবে?

তুমি যা করে বেড়াচ্ছ সেটা কিছুতেই বরদাস্ত করব না।

কেন? আমার থেকে তোমার সহ্যশক্তি কম? আমি যদি তোমার সবরকমের আচরণ বরদাস্ত করে থাকতে পারি, তুমি পারবে না কেন?

স্বাতী… হিসহিসিয়ে ওঠে সোমের স্বর। ভুলে যেও না তুমি আমার বিবাহিতা স্ত্রী।

তাতে কী হয়েছে? স্বাতী ভয় না পেয়ে জিজ্ঞেস করল।

আমি যা করব, তুমিও তাই করবে? এ হতে পারে না, সোমের গলায় একটা মরিয়া সুর।

আমার যেটা ভালো লাগে আমি সেটাই করছি। নিজের জন্য বাঁচছি, এটাতে অন্যায়টা কী? যে-খুশি আমি তোমার কাছে চেয়েছিলাম, তুমি সেটা দাওনি। এখন আমি সেটা খুঁজে পেয়েছি অন্যখানে। আমি এখন আনন্দে আছি, এটা অন্যায়? এসব তো তুমি অনেক বছর ধরে করে এসেছ।

স্বাতী এখনও সময় আছে শুধরে যাও। আমার যদি রাগ হয়ে যায়, তাহলে আমি কোর্ট পর্যন্তয়ও যেতে পারি। তোমার আর প্রশান্তের বিরুদ্ধে কড়া ব্যাবস্থা নেব।

ঠিক আছে চলো কোর্টে। সারাজীবন আধমরা হয়ে বেঁচে থাকার থেকে তো অনেক ভালো।

স্বাতী, অনেক হয়েছে। প্রশান্তের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করো, নয়তো আদালতের দরজায় যাওয়ার জন্য তৈরি থেকো। আমি প্রশান্তকেও ছাড়ব না।

কিন্তু কোর্ট তো পরকীয়া সম্পর্কের উপর থেকে সমস্ত বিধিনিষেধ তুলে নিয়েছে। এটাই নতুন আইন।

তাই বলে তুমি এই অবৈধ সম্পর্ক বজায় রাখবে, ক্লান্ত শোনায় সোমের গলা।

তুমি আমার মালিক নও আর আমিও তোমার গোলাম নই। আমাকে আইনের ভয় দেখিও না। বসে চিন্তা করো তোমার ভুলটা কোথায়? আমি কত কিছু সহ্য করেছি। আমার প্রশান্তের সঙ্গে সময় কাটাতে ভালো লাগে এটুকুই আমি জানি। তোমার মতো আমারও সুখে থাকার অধিকার আছে। আর আমি তো কোনও দাযিত্ব নিতে অস্বীকার করিনি।

ঘড়ির দিকে তাকাল স্বাতী, বলল, ধ্রুবর স্কুল থেকে ফেরার আগে আমাকে বাড়ির সব কাজ সেরে রাখতে হবে। এছাড়া ওর প্রোজেক্টের জন্য কিছু জিনিসপত্র আমাকেই এখন বেরিয়ে কিনে আনতে হবে, বলে স্বাতী উঠে বাথরুমে চলে গেল।

বাথরুম থেকে স্বাতীর গুনগুন করে গাওয়া গানের কলি ভেসে আসতে লাগল। মাথায় হাত দিয়ে স্তব্ধ হয়ে বসে রইল সোম। এরপর কী করবে, কিছুই ভেবে পেল না সে। দেয়াল ঘড়িটা টিকটিক আওয়াজ করে শুধু সময়ে এগিয়ে চলার কথা জানান দিল।

 

রিমোট মনিটরিং সিস্টেম

এখনও আমরা রয়েছি করোনার আবহে। তাই, জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হয়নি। এই পরিস্থিতিতে যে-কোনও সময় চাইলেই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে চিকিৎসকের মুখোমুখি হয়ে চিকিৎসা পরিষেবা নেওয়া কষ্টকর। অতএব, জরুরি পরিষেবা নেওয়ার প্রযোজন ছাড়া, চিকিৎসা কেন্দ্রে যাওয়ার বিষয়টি এড়িয়ে চলা উচিত। এক্ষেত্রে, রিমোট মনিটরিং সিস্টেম একটি অত্যন্ত সহায়ক চিকিৎসা পরিষেবা। সম্প্রতি এই বিষয়ে যাবতীয় কৌতূহল মেটালেন ডা. আফতাব খান।

রিমোট মনিটরিং সিস্টেম কী?

এটি চিকিৎসক এবং রোগীর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষাকারী একটি মাধ্যম। অ্যাপ-নির্ভর এই মাধ্যমটির জন্য চাই একটি স্মার্ট ফোন। রোগী এবং তার দ্বারা নিযুক্ত চিকিৎসকের স্মার্ট ফোন-এ নির্দিষ্ট একটি অ্যাপ ডাউনলোড করে, চিকিৎসার সুযোগ নিতে হবে। এটি একটি অত্যন্ত আধুনিক চিকিৎসা পরিষেবার মাধ্যম।

সব রোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রে কি রিমোট মনিটরিং সিস্টেমএর সাহায্য নেওয়া যেতে পারে?

না, এটি সব রোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রে কার‌্যকরী নয়। তবে, কয়ে সেকেন্ড যার স্পন্দন বন্ধ হয়ে গেলে দেহে আর প্রাণ থাকবে না, সেই গুরুত্বপূর্ণ অর্গ্যান অর্থাৎ হৃদয়ন্ত্রের সুরক্ষার জন্য ব্যবহার করা হয় এই রিমোট মনিটরিং সিস্টেম। যাদের হার্ট-এ ডিভাইস ইমপ্ল্যান্ট করা আছে অর্থাৎ পেসমেকার বসানো আছে, তাদের সবসময় পর‌্যবেক্ষণে রাখা জরুরি। কারণ, মুহূর্তের অসতর্কতা কিংবা সমস্যা, বড়ো বিপদে ফেলতে পারে রোগীকে। তাই, জীবনের সুরক্ষার জন্য রিমোট মনিটরিং সিস্টেম একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

কীভাবে কাজ করে এই রিমোট মনিটরিং সিস্টেম?

এটি আসলে একটি ট্রান্সমিটার সিস্টেম। পেসমেকার-এর সঙ্গে রিমোট মনিটরিং অ্যাপ-এর সুন্দর ভাবে যোগাযোগ স্থাপিত হয়ে ওঠার কারণে, হৃদয়ন্ত্রের ভালোমন্দ অবস্থার সম্পূর্ণ তথ্য সর্বদা পাওয়া যায় স্মার্ট ফোনে।

রিমোর্ট মনিটরিং সিস্টেমএর সুবিধাগুলি কী কী?

এটি একটি স্বযংক্রিয় পদ্ধতি। রক্তচাপ, রক্ত সঞ্চালন এবং হৃদস্পন্দনের মাত্রার তথ্য স্বযংক্রিয় ভাবে পরিবেশিত হয় স্মার্ট ফোন-এর নির্দিষ্ট অ্যাপ-এ। এমনকী, রোগী যখন ঘুমিয়ে থাকবেন, তখনও হার্ট-এর ভালোমন্দ পরিস্থিতির সমস্ত তথ্য পাওয়ার সুবিধা রয়েছে। হার্ট-এর সামান্য অস্বাভাবিকতা দেখা দিলেই তৎক্ষণাৎ সতর্ক করবে এই সিস্টেম। রোগী নিজেই বুঝতে পারবেন হার্ট-এর অস্বাভাবিকতা। অর্থাৎ, কোনও সমস্যা হলেই অ্যাপ-এর মাধ্যমে মোবাইল ফোন-এ রেড-অ্যালার্ট পাবেন রোগী কিংবা তার বাড়ির লোকেরা। এরপর, চিকিৎসক যদি ব্যস্তও থাকেন তখন রোগীর রিমোট মনিটরিং সিস্টেম-এর তথ্য না দেখে থাকলেও, বিপদের বার্তা পাওয়া মাত্র রোগী কিংবা তার বাড়ির লোকেরা বিষয়টিকে চিকিৎসকের নজরে আনতে পারবেন দূরভাষের মাধ্যমে। চিকিতসক তখন তাঁর মোবাইল-এ থাকা সংযোগকারী অ্যাপ-এর মাধ্যমে রোগীর হার্ট-এর সমস্যা বুঝতে পারবেন এবং প্রযোজনীয় নির্দেশ দিতে পারবেন। যদি কোনও ওষুধের মাধ্যমে বিপদ এড়ানোর সম্ভাবনা থাকে, তাহলে চিকিত্সক সেই পরামর্শ দেবেন। আর যদি গুরুতর কোনও সমস্যা দেখা দিয়ে থাকে, তাহলে রোগীকে তখনই হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেবেন। অর্থাৎ অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে এক্ষেত্রে। তাই, অহেতুক মানসিক চাপ নিতে হয় না এবং প্রযোজন না থাকলে হাসপাতালে যাওয়ার কিংবা ভর্তি হওয়ার ঝামেলা থাকে না। শুধু তাই নয়, পেসমেকার বসানো রোগী যদি তাঁর হোম টাউন-এ না থাকেন, তিনি যদি ট্রাভেল করেন কিংবা বহু দূরে থাকা অবস্থায় হার্ট-এর কোনও সমস্যা দেখা দিলে, বিশেষ অসুবিধায় পড়তে হবে না রোগীকে। কারণ, তিনি তাঁর শারীরিক অসুস্থতার বার্তা রিমোট মনিটরিং সিস্টেম-এর মাধ্যমে যেমন নিজে জানতে পারবেন সঠিক সময়ে ঠিক তেমনই তিনি তার বর্তমান পরিস্থিতি চিকিৎসকের  নজরে এনে, উপযুক্ত চিকিৎসা পরিষেবা নিতে পারবেন। এক্ষেত্রে দ্রুত চিকিত্সা পরিষেবা নেওয়ার সুযোগ আছে বলে, রোগীর জীবনরক্ষার সুযোগও অনেক বেশি। কারণ, রোগীর স্মার্ট ফোন ছাড়াও চিকিৎসকের ফোন সেট-এ এসএমএস, ই-মেইল এবং অ্যাপ-এর নোটিফিকেশন-এও রোগীর শারীরিক সমস্যার বার্তা পেঁছে যাবে।

এই রিমোট মনিটরিং সিস্টেম কতটা নির্ভরযোগ্য?

এটি বিজ্ঞানের একটি ফলপ্রসু আবিষ্কার। বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর, সাফল্যের সঙ্গে ব্যবহার করা হচ্ছে এই রিমোট মনিটরিং সিস্টেম। ক্লিনিক-এ গিয়ে চিকিৎসকের মুখোমুখি হয়ে যে-পরিষেবা পান রোগীরা সেই সমতুল্য বা তার থেকেও ভালো পরিষেবা নেওয়ার সুযোগ পাওয়া যাবে এই রিমোট মনিটরিং সিস্টেমকে মাধ্যম করলে। কারণ, এই সিস্টেম হার্ট-এর ভালোমন্দ খবর দিতে থাকে প্রতি মুহূর্তে। আর এটি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য বলেই আমরা কার্ডিওলজিস্টরা এর ব্যবহার বাড়িয়েি। তাছাড়া, রিমোট মনিটরিং সিস্টেম ব্যবহার করলে রোগীরাও অতিরিক্ত মানসিক জোর পান। কারণ, তারা নিশ্চিন্ত থাকেন যে, হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক হওয়ার প্রাথমিক পর‌্যায়ে সতর্ক করবে এই রিমোট মনিটরিং সিস্টেম। তাই সঠিক সময়ে সতর্ক হয়ে ভালো ভাবে চিকিৎসা পরিষেবাও নেওয়ার সুযোগ থাকে এক্ষেত্রে।

রিমোট মনিটরিং সিস্টেম কি খুব ব্যয়বহুল?

খুব ব্যয়বহুল নয়। পেসমেকার-এর খরচের সঙ্গে সামান্য টাকা খরচ করলেই রিমোট মনিটরিং

সিস্টেম-এর সুবিধা নেওয়া যায়। তাছাড়া, এককালীন কিছু টাকা খরচ করলেই বারবার ক্লিনিক-এ যাওয়ার খরচ এবং ঝামেলা এড়ানো যায়। প্রসঙ্গত আরও জানিয়ে রাখি, আগের থেকে এর খরচ এখন অনেকটাই কমেছে।

টেলিহেল্থ ফেসিলিটি এবং রিমোট মনিটরিং সিস্টেমএর মধ্যে কতটা পার্থক্য ?

টেলিহেল্থ ফেসিলিটি হল একটি চুক্তিভিত্তিক চিকিৎসা পদ্ধতি। প্রিপেড-এর মাধ্যমে কোনও স্বাস্থ্যকেন্দ্র এক্ষেত্রে ভয়ে কলিং কিংবা ভিডিযো কলিং-এর মাধ্যমে রোগীর সঙ্গে চিকিত্সকের যোগাযোগ স্থাপন করিয়ে দেয় এবং জরুরি চিকিত্সার ব্যবস্থা করায়। কিন্তু যাদের হার্ট-এর সমস্যা রয়েছে এবং পেসমেকার বসানো আছে, তাদের ক্ষেত্রে রিমোট মনিটরিং সিস্টেম উপযুক্ত জরুরি চিকিৎসা মাধ্যম। কারণ, এটি অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর, প্রতি মুহূর্তে স্বযংক্রিয় পদ্ধতি সতর্ক করে এবং সঠিক সময়ে চিকিত্সা পরিষেবা নেওয়ার সুযোগ করে দিয়ে জীবনরক্ষা করে।

রিমোট মনিটরিং সিস্টেমএর সুবিধে নিলেও, পেসমেকার বসানো রোগীদের কী কী সতর্কতা নেওয়া উচিত?

ধূমপান কিংবা মদ্যপানের কু-অভ্যাস থাকলে তা একেবারে বন্ধ করতে হবে। ঘুমের ঘাটতি চলবে না। অর্থাৎ, রাতে নির্দিষ্ট সময়ে (১১টার মধ্যে) ঘুমোতে হবে এবং অন্তত আটঘন্টা ঘুম হওয়া চাই। সেইসঙ্গে, কতটা ভারী কাজ করতে পারবেন কিংবা বেশি উঁচু পাহাড়ি অঞ্চলে বেড়াতে যেতে পারবেন কিনা প্রভতি বিষয়ে আপনার চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলতে হবে।

ডা. আফতাব খান

সিনিয়র কনসালট্যান্ট অ্যান্ড ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট,

অ্যাপোলো গ্লেনেগল্স হাসপাতাল, কলকাতা।

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব