ছবির প্রচারে অভিনব উদ্যোগ নিলেন অভিনেত্রী সঙ্গীতা সিনহা

সুন্দরী হিসাবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আছে তাঁর। মিস ইন্ডিয়া ইউনিভার্স আর্থ ২০১৮, মিসেস এশিয়া গ্র্যান্ড ইউনিভার্স ২০১৯, মিসেস ইন্ডিয়া এশিয়া স্টাইল আইকন ২০১৯, এশিয়া গ্র্যান্ড ইউনিভার্স ইন্টারন্যাশনাল ফিলিপাইন্স প্রভৃতি শিরোপা রয়েছে তাঁর মুকুটে। তবে এবার, বিউটি কুইন থেকে অভিনয়ে অভিষেক ঘটেছে সঙ্গীতা সিনহা-র। রামকমল মুখোপাধ্যায় পরিচালিত ‘রিকশাওয়ালা’য় অন্যতম মুখ্য ভুমিকায় রূপদান করেছেন তিনি।

actress sangeeta sinha
Photo of actress and beauty queen Sangeeta Sinha

মেলবোর্ন এবং মাদ্রিদ ছাড়াও, আরও অনেক চলচ্চিত্র উৎসবে নির্বাচিত হয়েছে ‘রিকশাওয়ালা’। কয়েকটি উৎসবে প্রদর্শিত এবং প্রশংসিতও হয়েছে ছবিটি। অভিনয়ের প্রশংসাও পেয়েছেন সঙ্গীতা। আর ছবিটি যাতে আরও অনেক মানুষের কাছে পৌঁছোয়, সেই উদ্দেশ্যে প্রচারের এক অভিনব উদ্যোগ নিলেন সঙ্গীতা স্বয়ং। কলকাতার মল্লিকবাজার অঞ্চলে গিয়ে রিকশা-চালকদের হাতে কম্বল, স্যানিটাইজার এবং মাস্ক তুলে দিলেন তিনি। আর প্রসঙ্গত তিনি জানালেন, শুধু ছবির প্রচারের জন্যই নয়, মাঝেমধ্যে তিনি ‘অ্যাঞ্জেল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি’-র মাধ্যমে অভাবী,অসহায় কিংবা গর্ভবতী এবং বৃদ্ধদের হাতে দিনযাপনের নানারকম সামগ্রী দিয়ে সাহায্য করেন। আর তাঁর প্রথম অভিনীত ছবিটি যেহেতু রিকশা-চালকদের মতো কিছু অচিরাচরিত নায়কদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের বিষয় সমৃদ্ধ, তাই তিনি রিকশা-চালকদের হাতেই তাঁর দান-সামগ্রী তুলে দিলেন সম্প্রতি।

film rikshawala
actress sangeeta sinha

——

সুগন্ধী গৃহকোণ

আপনার বাসস্থানটি কি যথেষ্ট স্ট্রেসমুক্ত করছে আপনাকে? যেখানে থাকেন সেই জায়গাটির পরিচ্ছন্নতাই কিন্তু শেষ কথা নয়। ঘরের পরিবেশ সুন্দর করতে সুগন্ধীরও কিন্তু একটি বিশেষ ভূমিকা আছে। নিমেষে আপনাকে রিফ্রেশ করতে সাহায্য করে সুগন্ধী পরিবেশ। তাই বর্ষায় ক্ষতি হয়ে যাওয়া ইন্টিরিয়র-এ আনুন কিছু নতুনত্বের ছোঁয়া। পুরোনো কার্পেট, ফাংগাস লাগা দেয়াল, পেট্‌স-এর পরিচ্ছন্নতা, ডাস্টবিন সাফাই– সবই প্রয়োজন হয় এই সময়টায়, যখন একঘেয়ে বর্ষার ময়েশ্চার আপনার ঘরের অভ্যন্তরকেও স্যাঁতসেতে করে তুলেছে।

অনেকেই বাড়ির পরিচ্ছন্নতায় মন দেন কিন্তু ঘরের ভিতরের ভ্যাপসা গন্ধটা থেকেই যায়। এই সমস্যা কাটাতে অ্যারোমা ক্যান্ডেল্স, ধূপ, রুম ফ্রেশনার ব্যবহার করতে হবে। এর ফলে অভ্যন্তরে এক ধরনের ফ্রেশনেস আসবে, যা আপনার মনকে প্রসন্নতা দেবে।

কাঠের ফার্নিচারে স্যাঁতসেতে ভাব থেকে যায় বর্ষা বিদায় নেওয়ার পরও। আজকাল অনেকেই ল্যামিনেটেড ফার্নিচার ব্যবহার করছেন, যাতে এই সমস্যা থাকে না। ফলে ঘুন ধরা বা সময়ে সময়ে ফার্নিচার পলিশ করার সমস্যাও পোহাতে হয় না।

ঘর ফ্রেশ রাখার টিপস

  • ঘরের ভেন্টিলেশন যেন সঠিক থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখুন– এর ফলে ঘরের ভ্যাপসা গন্ধ অনেকটাই কেটে যাবে। দিনের বেশ কিছুটা সময় ঘরের দরজা জানলা খোলা রাখুন, ঘরে যেন পর্যাপ্ত আলো-বাতাস খেলে
  •  সুগন্ধী রুম ফ্রেশনার, ধূপ, পটপৗরি প্রভৃতি বেডরুম বা লিভিংরুম-এ রাখুন, কিচেনে নয়
  •  কার্পেট ফ্রেশ করার জন্য এর উপর ট্যালকম পাউডার ছড়িয়ে, কিছুক্ষণ রাখার পর ভ্যাকুম ক্লিনার দিয়ে পরিষ্কার করুন
  •  কাপড়জামা থেকে বর্ষাকালে দুর্গন্ধ বেরোয়। তাই ধোয়ার পর এগুলিকে ফ্যাব্রিক রিফ্রেশার দিয়ে সুগন্ধী করে তুলুন। এর ফলে কাপড়জামা মোলায়েম তো থাকবেই, সেই সঙ্গে ফ্রেশও থাকবে
  •  বাড়ির আসবাব কলিন বা অন্য কোনও ক্লিনার দিয়ে পরিষ্কার করুন। পুরোনো কাঠের ফার্নিচার থাকলে একবার পলিশ করিয়ে নিন, না হলে স্যাঁতসেতে ফার্নিচারে ঘুণ ধরবে
  • বিছানার চাদর বালিশ রোদে দিন, বাথরুমে ফিনাইল ও ন্যাপথালিন বল্স দিন
  • রুম-স্প্রে হিসাবে ল্যাভেন্ডার, লেমন, ক্লোভ প্রভৃতি ফ্র্যাগরেন্স বাছুন। এই ধরনের গন্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয় ও ঘর সুগন্ধিত রাখে

ঘরোয়া উপায়ে ফ্রেশনেস

ঘরের ভ্যাপসা গন্ধ থেকে মুক্তি পেতে, আপনি কয়েকটি ঘরোয়া পদ্ধতিও অবলম্বন করতে পারেন।

  • আলমারিতে নিমপাতা রাখুন। এর ফলে কাপড়-জামায় ভ্যাপসা গন্ধ হবে না
  • লেবু আধাআধি কেটে একটি বাটিতে করে ঘরের কোণে রেখে দিন
  • কর্পূরদানিতে কর্পূর জ্বেলে দিন। এই সময় দরজা-জানলা বন্ধ রাখুন যাতে কর্পূরের গন্ধ ঘরে ছড়িয়ে পড়ে
  • বাড়িতে পটপৗরি বানানোর জন্য কোনও সুগন্ধী ফুলের পাপড়ি অল্প জলে ফুটিয়ে নিন। ফুলের গন্ধ ঘরে নিমেষে ছড়িয়ে পড়বে। ফুলের বদলে একই ভাবে লেবুর খোসা, লবঙ্গ বা দারুচিনি ব্যবহার করতে পারেন ঘরে ফ্রেশনেস আনার জন্য

আসলে ফোটোগ্রাফি এক ধরনের মেডিটেশনের মতো

১৯৮৪ সালের এই ডিসেম্বর মাসের গোড়ার দিকেই ঘটেছিল ভয়াবহ সেই ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনা৷ কীটনাশক কারখানায় বিস্ফোরণের জেরে কয়েক সেকেন্ড –এ প্রায় ১৪০০ জন মানুষ প্রাণ হারিয়ে ছিলেন৷ ক্রমশ মৃতের তালিকা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৩৫০০–এ৷আরও কয়েক বছরে সেটা হয় ১৬০০০৷ এই ঘটনার করাল গ্রাস থেকে আজও সম্পূর্ণ মুক্ত নয়, কারখানার নিকটবর্তী গ্রামগুলির মানুষ৷ বিকলাঙ্গ শিশু আজও জন্মায় সেখানে বিষাক্ত গ্যাসের পার্শ্বপ্রতিক্রয়া হিসাবে৷ সেদিনের দুর্ঘটনার ভয়াবহতার ছবি, বিশ্বের মানুষের কাছে তুলে ধরেছিলেন বহু সমাদৃত আলোকচিত্রী রঘু রাই৷ আজ তাঁর ৭৮ তম জম্মদিনে গৃহশোভার আর্কাইভ থেকে প্রকাশ করা হল একটি সাক্ষাৎকার

প্রায় ছ’ফুট লম্বা, এখনও এতটুকু ঝুঁকে পড়েন না কথা বলার সময়ে, কথা বলেন সোজা চোখের দিকে তাকিয়ে। বেশি প্রশ্ন করা চলবে না, এই শর্তে রাজি হলেন দু-এক কথা বলতে। কলকাতায় এসেছিলেন ইন্টারন্যাশনাল ফোটোগ্রাফি ফেস্টিভ্যালের উদ্বোধন করতে। ভারতীয় জাদুঘরের একটি গ্যালারিতে ভিড়ে ঠাসা গুণমুগ্ধদের সামনে যখন ফোটোগ্রাফি নিয়ে কথা বলছিলেন, মনে হচ্ছিল তাঁর কথা শোনা যায় আরও অনন্ত সময়। ইনিই সেই মানুষ যিনি একদা দেখতে শিখিয়েছিলেন এক অন্য ভারতবর্ষকে। ছিন্নমূল মানুষের মিছিলের সেই কষ্টক্লিন্ন চেহারা থেকে ভোপাল গ্যাস ট্র্যাজেডির সেই মৃতশিশুর মুখ– চূড়ান্ত বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল আপামর পৃথিবীকে।

খালি চোখে দেখা আর ক্যামেরার চোখ দিয়ে দেখার মধ্যে কী তফাত অনুভব করেন?

খালি চোখে দেখা মানে ইউ সি দ্য ফিজিক্যাল সিচুয়েশন। আর আমি যখন ক্যামেরার চোখ দিয়ে দেখি আমি আমার ভেতরের ইমোশন, এনার্জি নিয়ে দেখি। সেটাকে বলা যায় আ ভিশন ইন টোট্যালিটি। এটা একটা ইন্টার্যাকশন, যেটা অনুভব করি ভেতর থেকে।

আসলে ফোটোগ্রাফি এক ধরনের মেডিটেশনের মতো। ইউ কানেক্ট উইথ থিংস অ্যারাউন্ড টেকিং পিকচারস, অ্যান্ড দেন দ্য মেডিটেটিভ মোমেন্ট হ্যাপেন্স। খুব সহজে একটা ছবি হয় না। তার জন্য নিজেকে মেন্টালি, ফিজিকালি, স্পিরিচুয়ালি প্রিপেয়ার করতে হয়।

ফোটো জার্নালিজমের সঙ্গে ক্রিয়েটিভিটির যোগ কতখানি?

আমি যখন স্টেটস্ম্যানে সবে কাজ শুরু করেছি, তখন আমার মনে হতো, এত নাটকীয়তা, এমন চূড়ান্ত ড্রামাটিক অ্যাম্বিয়েন্স মানুয়ের দৈনন্দিনে ছড়িয়ে আছে, এটাই ফ্রেমে ধরা দরকার। সত্যজিৎ রায়ের সিনেমার মতো। এই ছোটো ছোটো বাস্তব দৃশ্য একের পর এক সাজিয়ে তৈরি হয়েছিল তাঁর ছবি। সেগুলো সত্যের থেকে আলাদা নয়। বাস্তবধর্মী। সেন্সিটিভ। সেন্সিটিভিটি থাকলে, ক্রিয়েটিভিটির ছায়া পড়ে ফোটো জার্নালিজম-এর ক্ষেত্রেও।

এই যে এখন ডিজিটাল ক্যামেরা হাতে হাতে ঘুরছে, এতে কি সত্যি ফোটোগ্রাফির ক্ষেত্রটা ঋদ্ধ হচ্ছে?

এটাই খুব দুঃখজনক মনে হয় যে, ক্যামেরা যতটা সুলভ হয়েছে, সেই মানের ছবি কিন্তু আমরা পাচ্ছি না। সবই যেন ওপর ওপর দেখা। ইন ডেপথ্ ভিশনটা মিসিং।

কনসেপ্ট ফোটোগ্রাফির ব্যাপারে কী বলবেন?

জানি না, আমরা তো ঘন্টার পর ঘন্টা ক্যামেরা তাক করে বসে থাকতাম, ফর দ্যাট ডিভাইন মোমেন্ট টু হ্যাপেন। দেখুন প্রকৃতিতে যা আছে তা এমনিতেই সুন্দর। তাতে আপনার কন্ট্রিবিউশন কী? কনসেপ্ট ভেবে আপনি হয়তো ছবিতে একটা ড্রামা তৈরি করতে পারেন, কিন্তু এতে স্পনটেনিটি কোথায়!

নতুন প্রজন্মের উদ্দেশ্যে কী বলবেন?

এই প্রজন্ম এখন ইন্টারনেটের সুবাদে প্রচুর ছবি দেখতে পায়। দেশবিদেশের নানা ফোটোগ্রাফারের তোলা ছবি। সে সব ছবি দেখার সুফল যেমন আছে, কুফলও আছে। আর কুফল হল সেগুলো মাথার হার্ড ডিস্ক-এ থেকে যায়। ফলে ছবি তোলার সময় তারা কনশিয়াসলি বা আনকনশিয়াসলি সেগুলো রিপিট করতে থাকে। তাদের উদ্দেশ্যে একটাই কথা বলব, যে আপনার মাথার মধ্যে জায়গা এইটুকু, কিন্তু প্রকৃতি অনন্ত। সীমাহীন। তাই নিজেকে শুধু ওইটুকুতে সীমাবদ্ধ রাখবেন না যা আপনার ব্রেন-এ স্টোরড হয়ে আছে। চারিয়ে দিন। দৃষ্টি প্রসারিত করুন। ছবি আপনিই হবে।

বাচ্চাদের মুখরোচক খাবারের বায়না সামলান

করোনার কারণে স্কুল বন্ধ। বাড়িতে বসে মনখারাপ স্কুল-পড়ুযাদের। মায়ের কাছে তাই সারাক্ষণই কিছু না কিছু আবদার করছে তারা। কখনও ইন্ডোর গেমস নিয়ে বায়না, তো কখনও মুখরোচক খাবারদাবারের বায়না। এই পরিস্থিতিতে মায়েরও হিমশিম। তাই এমন খাবার দিন ছোটোদের, যেটা পুষ্টিকরও হবে আবার সুস্বাদুও।

আটার মোমো : ময়দা শরীরের জন্য তেমন ভালো নয়। তাই ময়দার পরিবর্তে আটার মোমো তৈরি করতে পারেন। পুরের জন্য চিকেন কিমা, নিউট্রিলা ডাস্ট, পনির বা সবজির পুর যে-কোনওটাই দিতে পারেন। বেসিক স্টাফিং যেটা দিয়েই করুন, এতে পুষ্টি বাড়াতে গ্রেট করা গাজর, কড়াইশুঁটি, পেঁযাজকুচি, রসুনকুচি মেশান। এবার আটার লেচির মধ্যে পুর ভরে স্ট্রিমড মোমো তৈরি করুন।

ম্যাকারনি উইথ রেড সস : সুজির তৈরি ম্যাকারনি বা পাস্তা দুটোই বাচ্চাদের ভীষণ প্রিয়। টম্যাটো সেদ্ধ করে মিক্সিতে রসুনের সঙ্গে বেটে পিউরি তৈরি করে নিন। তারপর এই পিউরি কড়ায় দিয়ে গ্রেভি তৈরি করুন। ম্যাকারনি সেদ্ধ করে এই গ্রেভির সঙ্গে মিশিয়ে মাখন আর অরিগ্যানো ছড়িয়ে পরিবেশন করুন।

ভেজ প্যান কেক : রাতে সমপরিমাণ চাল আর ছোলার ডাল, জলে ভিজিয়ে রাখুন। সকালে, একসঙ্গে মিক্সিতে পিষে নিন। প্রয়োজনে অল্প জল মিশিয়ে একটু পাতলা করুন। এবার পেঁযাজ, টম্যাটো, কাঁচালংকা, ক্যাপসিকাম কড়ায় নেড়েচেড়ে একটা পুর তৈরি করুন। ধোসার মতো করে এই প্যান কেক তৈরি করুন চাল-ডালের মিশ্রণ থেকে। ভিতরে সবজির পুর দিয়ে খেতে দিন।

মাল্টিগ্রেন ব্রেড কাটলেট : মাল্টিগ্রেন ব্রেড অত্যন্ত পুষ্টিকর। এর ধারগুলো কেটে বাদ দিয়ে ব্রেডগুলো মিক্সিতে গুঁড়ো করে নিন। এবার এর সঙ্গে পেঁযাজ, আলুসেদ্ধ, কারিপাতা, কাঁচালংকা, আমচুরগুঁড়ো, আদাকুচি, নুন একসঙ্গে চটকে মেখে নিন। কাটলেটের মতো গড়ে, অল্প তেলে এপিঠ-ওপিঠ ভেজে নিন। প্রযোজনে একটু বেসন মেশাতে পারেন।

টেস্টি পনির কিউবস : কিউব আকারে পনির কেটে নিন। এবার আদা, কাঁচালংকা, কারিপাতা, ধনেপাতা একসঙ্গে মিক্সিতে পেস্ট করে নিন। একটি বোল-এ দই, চালের গুঁড়ো, নুন, লংকাগুঁড়ো লেবুর রস আর মিক্সিতে পিষে রাখা মিশ্রণ ভালো করে মেশান। একটা ননস্টিক তাওযায় অল্প তেল গরম করুন। পনিরের গায়ে ভালো ভাবে এই মিশ্রণ মাখিয়ে তাওযার তেলের উপর সেঁকে নিন। এটা খেতেও যেমন টেস্টি, তেমন পুষ্টিতেও ঠাসা।

পাহাড় সুন্দরী ডেলো আর কালিম্পং

কালিম্পং জায়গাটা একদিকে সিকিমের , অন্যদিকে দার্জিলিং ও শিলিগুড়ি যাওয়ার ত্রিবিধ পথের সন্ধি। এর ফলে ব্রিটিশ আমলের আগে থেকেই ব্যাবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এর ভৌগোলিক গুরুত্ব ছিল যথেষ্ট। দার্জিলিং থেকে ৫৩ কিলোমিটার দূরের শহরটা এখন জেলায় উত্তীর্ণ। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে অন্তর্ভুক্তির আগে কালিম্পং,ভুটান রাজ্যের অধীনে ছিল। বেশ কিছু পুরোনো বৌদ্ধ মনেস্ট্রি রয়েছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। নাথুলা ও জিলেপ-লা পাস থেকে দূরত্ব বেশি নয়। জুলুক থেকে চার ঘণ্টা। সিল্ক রুট ঘুরতে চাইলে কালিম্পং থেকেই শুরু করা যায়।

একসময় ভারত ও তিব্বতের মধ্যে রেশম ছাড়াও অন্যান্য পণ্যেরও বাণিজ্যিক আদান-প্রদান হতো।এখন পর্যটকের কাছে অন্যতম ব্যস্ত শৈলশহর। তবে গাড়ি স্ট্যান্ড এলাকাটা যেমন নোংরা তেমন ঘিঞ্জি। মূল শহর থেকে একটু বাইরে না এলে পাহাড়ের সৗন্দর্যের কণামাত্র ধরা পড়ে না। দার্জিলিং যাওয়ার প্ল্যান থাকলেও, দুটো দিন কালিম্পং-এ কাটাতে মন্দ লাগে না। একটা গাড়ি ভাড়া করে দিনে দিনে দেখে ফেলা যায় কালিম্পং-এর দ্রষ্টব্য।

হনুমান টক

কলিম্পং-এর হনুমান টক, বস্তুত রামধুরা অঞ্চলেই। ঠিক মন্দির নয়, একটা টিলার মাথায় হনুমানের বিশাল কমলা রঙের মূর্তি। সিঁড়ি দিয়ে বা ঢাল বেয়ে ওঠা যায়। পুজো দেওয়ার ঝক্বি নেই। কেউ চাইলে দক্ষিণা দিতে পারে। আসলে এই হনুমান টকও একটা ভিউ পয়েন্ট। এখান থেকেও নীচের দিকে তিস্তা আর উত্তর-পূর্বে কাঞ্চনজঙ্ঘা চোখে পড়ে।

দেওরালি আর্মি ক্যাম্প

আদৌ কোনও দ্রষ্টব্য হিসাবে কোথাও উল্লিখিত নয়। কিন্তু বার্মিক এলাকায় সাইট সিইং করতে গিয়ে যা দেখলাম, তার তুলনায় এই সেনা ছাউনিকে বেশি মনে ধরল। গাছের গুঁড়িগুলোর গায়ে সাদা চুনকাম যেন তাদের গায়ে ইউনিফর্মের মতো শোভিত। সেনা সর্বত্র সেরা জায়গাটা বেছে নেয় আর সেটা তদারকি করে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে। তাই অবিন্যস্ত, নোংরা অঞ্চলেও স্থায়ী ক্যান্টনমেন্ট হোক বা অস্থায়ী শিবির, মিলিটারি অধিকৃত জায়গাগুলো মনোরম লাগে। এই অভিজ্ঞতা ভুটান, সিকিম, শিলিগুড়ি এমনকী আমাদের ব্যারাকপুর, কাশীপুরেও। গাড়ি অবশ্য দেওরালি থামল না। এগিয়ে চললাম ডেলোর দিকে।

ডেলো

কালিম্পং জেলার সবচেয়ে সুন্দর জায়গা নিঃসন্দেহে ডেলো পাহাড়ের মাথায় রিসর্ট ও তার ৮ একর জোড়া বাগান। রাজ্য সরকারের পর্যটন দফতরের এই আবাসনে বুকিং পাওয়া সহজ নয়। উচ্চতা ৫৬০০ ফুট। ডেলোতে ওঠার মুখে সায়েন্স সেন্টার যা সোমবার বন্ধ থাকে বলে দেখা গেল না। ২০ টাকার টিকিট কেটে প্রবেশ করলাম। বাগানে দাঁড়িয়ে পাইন বনও দেখতে দারুণ লাগে। প্যারাগ্লাইডিং-এর ব্যবস্থা আছে। কিন্তু মূল্য অস্বাভাবিক লাগাতে রোদ ঝলমলে অনুকূল পরিবেশেও ইচ্ছা সংবরণ করতে হল। ১০-২০ মিনিটের উড়ানের জন্য ৩০০ টাকা যা কিনা সেদিন ছাড় দিয়ে ২৫০০ টাকায় দেওয়া হচ্ছিল। টিকিট কাউন্টারে কম্পিউটারে ছবি দেখিয়ে বুঝিয়ে দিল কী ভাবে পাইলটকে পেছনে নিয়ে উঠতে হবে। আর হাওয়ার মর্জিমাফিক অবতরণ ডেলোতেও হতে পারে অথবা কিছু দূরে একটা স্কুলের মাঠেও হতে পারে যেখান থেকে গাড়ি করে নিয়ে আসা হবে।

Delo park

আমরা বরং দু চোখ ভরে আবার কাঞ্চনজঙঘাই দেখলাম। শুধু তাকেই নয়, চোখে পড়ল নাথুলার তুষার চূড়াগুলোও। ঠিক কতটা কাঞ্চনজঙঘা, আর কোনটা অন্য পাহাড় খালি চোখে দেখে ঠাওর করা যাচ্ছিল না। একমাত্র ইয়ুমথাং ও জিরো ছাড়া দার্জিলিং, গ্যাংটক বা পেলিং থেকে এতটা লম্বা তুষারশৃঙ্গের সারি আগে দেখিনি। খানিকক্ষণ ঘুরেফিরে বসে যখন ফিরছি, তখন পর্যটকদের সমাগম বাড়তে শুরু করেছে।

রক গার্ডেন ও বুদ্ধ মূর্তি

ডেলোর কাছেই ছোটো পাথুরে বাগানের মাঝখানে বুদ্ধমূর্তি। ভেতরে ঢুকিনি, বাইরে থেকে ছবি তুলে আবার গাড়িতে উঠে পড়লাম।

শেরপা ভিউ পয়েন্ট

এখান থেকে উত্তর ও দক্ষিণে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। কাঞ্চনজঙ্ঘা ছাড়াও রেলি নদী ও উপত্যকা এবং লোলেগাঁও অঞ্চল চোখে পড়ে। জায়গাটা ভালো ভাবে রক্ষণাবেক্ষণ হয় না, তবে সম্ভব হলে দেখে নিন। আমরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়ি দেখতে চাই শুনে সেদিকেই ছুটল গাড়ি। রাস্তায় পড়ল পাইন ভিউ নার্সারি।

টেগোর হাউস

ঠাকুর বললে অবাঙালিরা উত্তর ও মধ্য ভারতের ঠাকুর সম্প্রদায়কে বোঝে। ইংরেজদের বিকৃত উচ্চারণের ‘টেগোর’ দিয়েই সবাই রবি ঠাকুরকে চেনে। কী আর করা যাবে?  রবীন্দ্রনাথের বাড়ি বলে একটা ভূতুড়ে জায়গায় গাড়ি এসে দাঁড়াল। রাস্তা থেকে অনেকটা নীচে কর্দমাক্ত পথ বেয়ে নেমে গিয়ে যার সামনে হাজির হলাম সেটাকে হানাবাড়ি বলাই যেত, যদি না দু-একজন মানুষকে ভেতরে ঢুকতে বেরোতে দেখতাম। ওদের কাউকেই তো ঠাকুরবাড়ির বংশধর বলে মনে হল না। নেটে পড়ে ফেসবুকে বন্ধুদের পোস্ট দেখে রবি ঠাকুরের ব্যবহৃত আসবাব, পড়ার টেবিল, বইপত্রের যে ছবিটা মনে নিয়ে এসেছিলাম, তার সঙ্গে মেলাতেই পারলাম না। ড্রাইভার ভুল করেছে ভেবে উঠে আসছিলাম। দেখা হল এক অবাঙালি মহিলার সঙ্গে। আমাদের উদ্দেশ্য জেনে নিজেকে কেয়ারটেকার পরিচয় দিয়ে ফের পাকড়াও করে নিয়ে এলেন বাড়িটার কাছে।

যে-দিকটা পেছন দিক ভাবছিলাম, সে দিকেই আসলে বাড়ির সদর দরজা, যার পাশে শ্বেত পাথরের ফলকে লেখা, এই বাড়িতে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন যিনি আকাশবাণীতে কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন। ভেতরে ধূলিধূসরিত ঘরে দরজার ওপর রঙিন কাচ দেখে খুব কষ্ট করে বাকি ছবিটা কল্পনা করতে হল। বড়ো দুটো ঘরে ফায়ার প্লেস রয়েছে। মহিলা খুব উৎসাহ নিয়ে বাংলা হিন্দি মিশিয়ে তার ও ওই বাড়িটার সমস্যা বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন। ভাঙাচোরা বাড়িটির পাশে একটা পলিটেকনিক কলেজ নির্মাণের কাজ চলেছে।

পরে শিলিগুড়িতে এই ভ্রমণকাহিনি লিখতে বসে দেখলাম পথে ফেলে আসা পাইন ভিউ নার্সারির পাশেই আছে ১৯৪৩ সালে তৈরি রবীন্দ্রনাথের পুত্রবধূ প্রতিমাদেবীর সুরম্য বাড়ি। আর সেটিতেই রবি ঠাকুরের বেশ কিছু স্মৃতিচিহ্ন সযত্নে রক্ষিত আছে। আমাদের সারথি কেন সেখানে না থেমে সোজা এই পরিত্যক্ত বাড়িটার সামনে হাজির করেছিল কে জানে?

View of Kalimpong

ডার্পিন মনেস্ট্রি

ডার্পিন পাহাড়ের ওপর এই বিহার তৈরি হয় ১৯৭২ সালে। আসল নাম ‘জাং দোগ পালরি মনেস্ট্রি’ । তিব্বত থেকে দালাই লামার আনা বেশ কিছু দুষ্প্রাপ্য পুঁথিপত্র সংরক্ষিত আছে এখানে। এখান থেকেও কাঞ্চনজঙঘার পটভূমিতে কালিম্পং-এর দৃশ্য চোখে পড়ে। নীচের দিকে তিস্তা ছাড়াও রিয়াং নদী, আর এক পাশে পেশোক চা বাগান। স্বীকার না করে উপায় নেই, সিঙ্কোনা রোপনের চেয়ে চা বাগান অনেক সুন্দর যা বহুবার দেখেও পুরোনো হয় না।

তবে কালিম্পং-এর সবচেয়ে পুরোনো বিহার ১৬৯২ সালে নির্মিত থোংসা গোম্পা ড্রাইভারকে বলে রাখিনি বলে দেখা হয়নি। এর কাছাকাছি ‘মঙ্গলধাম’ নামে কৃষ্ণমন্দিরেও ভক্ত ও পর্যটক সমাগম হয়ে থাকে। এছাড়াও দর্শনীয় জিলেপ-লা ভিউ পয়েন্ট, আর্মি গল্ফ কোর্স, মরগান হাউস, নেচার ইন্টারপ্রিটেশন সেন্টার, পাইনভিউ নার্সারি ইত্যাদি যেগুলো সময় ও পরিকল্পনার অভাবে আমাদের দেখা হয়নি। যারা বার্মিক অঞ্চল বেড়াতে চান, তাদের উদ্দেশ্যে বলি, একটা গোটা দিন কালিম্পং-এর জন্য বরাদ্দ রাখলে ও গাড়ির সঙ্গে সেই মতো কথা বলে রাখলে ঠকবেন না।

গাড়ি যখন আমাদের বাস বা গাড়ি স্ট্যান্ডে ছেড়ে দিল, তখন দুপুর ১টায়। কিছু শুকনো খাবার কিনে সোজা শিলিগুড়ি রওনা হওয়াই স্থির করলাম।

প্রয়োজনীয় তথ্য

শিয়ালদা, হাওড়া ও কলকাতা স্টেশন থেকে পছন্দসই ট্রেন ধরে নিউ জলপাইগুড়ি চলে আসুন। স্টেশন চত্ত্বর থেকেই কালিম্পং যাওয়ার গাড়ি ভাড়া পেয়ে যাবেন। শিলিগুড়ি থেকে যাত্রা করলে পানি টাঙ্কির মোড়ে এসে গাড়ি ধরতে পারেন। হোমস্টেগুলোর নিজস্ব গাড়ি পরিষেবা আছে। তবে কালিম্পং পৗঁছোনোর পর গাড়ি নিলে সাশ্রয় হয়। সিলেরি গাঁও যেতে হলে বড়ো চাকার মহিন্দ্রা জিপ, ল্যান্ডরোভার, টাটা সুমো বা বোলেরো – যেটা পাওয়া যাবে ভাড়া নিতে হবে। ছোটো চাকার গাড়ি যেতে চাইবে না।

মন চাইলে ও সময় থাকলে একাধিক জায়গায় ভাগাভাগি করে থাকতে পারেন। লাভা-লোলেগাঁও-রিশপ, নেওরা ভ্যালি ও সিল্করুট ভ্রমণের জন্য ইন্টারনেট থেকেও সাহায্য পেতে পারেন। একাধিক টুর অপারেটরের হদিশ ইন্টারনেট থেকে পেয়ে যাবেন।

সঙ্গে রাখুন রোজকার ওষুধ ছাড়াও জ্বর, পেটের অসুখ, হজম, অ্যালার্জি বা ঠান্ডা লাগার ওষুধ-পত্র সঙ্গে রাখুন। বার্মিকের মানুষ জ্বর-জ্বালায় সিংকোনা গাছের ছাল জলে ফুটিয়ে সেই জল পান করে। কোনও ওষুধের দোকান দেখিনি। বর্ষাকাল না হলেও ছাতা সঙ্গে রাখা ভালো।

ভিলেন নয়, পজিটিভ ভূমিকা খুঁজছেন সোনু সুদ 

লকডাউনের সময় অসহায় মানুষের কাছে ‘‌রবিন হুড’‌ হয়ে উঠেছিলেন অভিনেতা সোনু সুদ। যাঁর যেখানে যখন অর্থ বা সাহায্যের দরকার পড়েছে, সোনু সুদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেই মিলেছে সহায়তা৷ অসহায়দের পাশে থেকে কখনও তিনি  ১০ কোটি টাকা ঋণের কারণে  তাঁর জুহুর আটটি সম্পত্তি বন্ধক রেখেছেন। কখনও আবার টুইটারে খবর পাওয়া মাত্র, সারিয়ে দিয়েছেন জলপাইগুড়ি জেলার লুকসান চা বাগান এলাকার ভুট্টাবাড়ির হতদরিদ্র পবনের ভাঙা বাড়ি।

গত কয়েক মাসে মহামারির সময়ে কৃষকদের সাহায্য করা, ছোটো ব্যবসায়ীদের আর্থিক অনুদান দেওয়া, বেকার যুবক-যুবতিদের কাজের খোঁজ দেওয়া, পরিযায়ী শ্রমিকদের বাড়ি ফেরানোর ব্যবস্থা করা– এমন নানা সেবামূলক কাজ করে রাতারাতি খবরের শিরোনামে চলে এসেছেন সোনু। অথচ মজার বিষয়টি হল, সিনেমায় তাঁকে দেওয়া হয় নেগেটিভ রোল,যার সঙ্গে বাস্তবের সোনুর কোনওই মিল নেই৷ তাই আর ভিলেন নয়, পর্দায়  এবার থেকে পজিটিভ, অথার ব্যাকড রোল করতে চান সোনু৷

এর আগে বড়ো পর্দায়, সোনুকে পেশিবহুল চেহারা আর মুখের ধারালো চোয়ালে কেবল আক্রোশ ফুটিয়ে তুলতেই দেখা গিয়েছিল৷ সোনু পরিচিতি পেয়েছিলেন দাবাং-সহ নানা হিন্দি ছবির প্রসিদ্ধ খলনায়ক আর ভিলেনের রোল-এ৷এখন আর এই ধরনের চরিত্র করতে চান না সোনু৷ তাই একদিকে তিনি যেমন পজিটিভ রোল করতে চাইছেন, তেমনই পরিচালক ও প্রযোজকরাও তাঁকে অন্য রকম রোল দেওয়া নিয়ে অন্য রকম ভাবে চিন্তাভাবনা করা শুরু করে দিয়েছেন।

বর্তমানে ফ্লোরে রয়েছে সোনু সুদের নতুন তেলগু ছবি আল্লু আধুরস। সন্তোষ শ্রীনিবাস পরিচালিত এই ছবিতে স্বল্প দৈর্ঘের একটি চরিত্র করার কথা ছিল সোনুর৷কিন্তু শোনা যাচ্ছে সোনুর ইচ্ছেকে আমল দিয়ে অভিনেতার চরিত্রটিতে  অনেক পরিবর্তন ঘটিয়েছেন নির্দেশক।

ছবির অফিসিয়াল লিড সাঁই শ্রীনিবাস বাল্লাকোন্ডা। কিন্তু তা সত্বেও  সোনুর রোলটিকে গুরুত্বপূর্ণ করে অনেকখানি জায়গা বাড়িয়ে দিতে চাইছেন নির্মাতারা। সোনুর রোলটায় প্রচুর পজিটিভ দিক জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এই ছবিটির প্রেক্ষিতেই পজিটিভ রোলে কাজের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন সোনু।  পরিবর্তিত অংশে শুধু ডায়ালগই বাড়েনি, সোনুর উপর দু-দুটি গান পিকচারাইজ  করার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। চিত্রনাট্যে পরিবর্তন করা হচ্ছে, কাহিনিতে নতুন টান টান উত্তেজনার মুহূর্ত নিয়ে আসা হচ্ছে, অ্যাকশন সিকোয়েন্স বাড়ানো হচ্ছে এবং এই সবই করা হচ্ছে সোনুকে মাথায় রেখে৷

অসলে সোনু নিজেও স্বীকার করেছেন যে, গত এক বছরে তাঁর জীবনে অনেক পরিবর্তন এসেছে এবং পুরো পরিবর্তনটাই পজিটিভ চেঞ্জ।ফলে তাঁর আগামী দিনের কেরিয়ার পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও আর সেই আগের মতো নেগেটিভ রোল করে যাবেন না। পজিটিভ এবং অথার ব্যাকড রোল পেলেই অভিনয় করবেন বলে জানিয়েছেন অভিনেতা৷তাঁর ভাবমূর্তিতে  নতুন বছরে একটা বড়োসড়ো পরিবর্তন আনতে  চান সোনু সুদ৷

আশার কথা হল, তাঁর এই অনুরোধকে মাথায় রেখে, ইতিমধ্যেই অনেক প্রযোজকই তাঁকে ভালো ভালো চরিত্র অফার করছেন৷ সময় নিয়ে বসে সেগুলো বিবেচনা করবেন বলে সিদ্ধান্তও নিয়েছেন সোনু৷। প্রতি বছর কয়েকটা করে ভালো ছবি– একজন অভিনেতার আর কী-ই বা চাওয়ার থাকতে পারে !

বাচ্চা অন্তর্মুখী নাকি লাজুক

সন্তান গর্ভাবস্থায় থাকাকালীনই মা-বাবা তার ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তা-ভাবনা শুরু করে দেন। তার পড়াশোনা, স্বাস্থ্য, ব্যক্তিত্ব কীভাবে গড়ে তোলা যায় তার প্ল্যানিং শুরু করে তাকে ভবিষ্যতের জন্য তৈরি করার একটা ছক কষে ফেলেন তারা। সুতরাং শিশুর জন্মের সঙ্গে সঙ্গে তার পালন-পোষণ এবং তাকে সু-অভ্যাস ও ব্যবহারের সঙ্গে পরিচিত করাবার জন্য অভিভাবকেরা উঠেপড়ে লেগে যান।

বাচ্চার গ্রোয়িং এজ-টাতে যদি দেখা যায়, মা-বাবা বা খুব নিকট আত্মীয়-স্বজন অতিরিক্ত অন্য বাইরের লোকের উপস্থিতিতে বাচ্চা ঠিক সহজ হতে পারছে না অথবা ভয় পাচ্ছে তাহলে অনেক সময় ভবিষ্যতে গিয়ে দেখা যায় যে, বাচ্চাটি প্রয়োজনের তুলনায় একটু বেশিই লাজুক অথবা তার অন্তর্মুখী পার্সোনালিটি রয়েছে। এই দুটোই বাচ্চার সম্পূর্ণ বিকাশের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

ইন্ট্রোভার্ট সমস্যা-টা কিন্তু দুর্লভ নয়। দেখা যায় প্রায় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ মানুষই অন্তর্মুখী। অনেক সময় বংশানুক্রমিক এই সমস্যাটা চলতে থাকে। ভবিষ্যতে গিয়ে বাচ্চা ইন্ট্রোভার্ট হবে কীনা এটার সংকেত পাওয়া যায় তার বেড়ে ওঠার সময় থেকেই।

পারিপার্শ্বিক পরিবেশের প্রতি অত্যধিক সংবেদনশীলতা এবং সহজ হতে না পারা : খুব বেশি আলোতে, খুব চ্যাঁচামেচিতে অথবা অপরিচিত ব্যক্তির সান্নিধ্যে বাচ্চা যদি কাঁদতে থাকে, হাত-পা ছুড়ে জেদ দেখাতে থাকে তাহলে বুঝতে হবে বড়ো হয়ে সে লাজুক প্রকৃতির হতে পারে বা সবসময় ভয়ে ভয়ে থাকার একটা প্রবণতা জন্মাতে পারে আর নয়তো অন্তর্মুখীও হয়ে উঠতে পারে। শিশুর মধ্যে এই প্রতিক্রিয়া নজরে এলে প্রথম প্রথম আলো কম করে, চ্যাঁচামেচি থেকে শিশুকে দূরে রেখে তাকে সুরক্ষিত পরিবেশ দেওয়ার চেষ্টা করুন। তারপর ধীরে ধীরে সুরক্ষিত পরিবেশ থেকে তাকে সরিয়ে এনে, স্বাভাবিক জীবনশৈলীর স্রোতে মিশতে অনুপ্রেরিত করুন

জিজ্ঞাসা, আশঙ্কা ও ভয় : আশেপাশে নতুন জিনিস দেখে সব বাচ্চার মনেই সেটা নিয়ে প্রশ্ন উদয় হয়। এই বাচ্চাদের প্রতিক্রিয়া অন্যদের থেকে একটু আলাদা হয়। তারাও প্রশ্ন করে ঠিকই কিন্তু কোনও অনাবশ্যক কারণবশত ভীত এবং আশঙ্কিত হয়ে পড়ে। দূর থেকে দেখেই মনের মধ্যে সেটা নিয়ে একটা চিন্তার জগত্ তৈরি করার চেষ্টা করে। কিন্তু সেটা কাছে গিয়ে দেখা অথবা সেই পরিবেশে, নিজে উপস্থিত থাকতে অস্বীকার করে। ইন্ট্রোভার্ট হওয়ার এটা একটা লক্ষণ।

অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া : কোনও কোনও বাচ্চা খুব স্বাভাবিক অপ্রত্যাশিত কোনও শব্দ, চ্যাঁচানোর শব্দ বা অনেকের একসঙ্গে চ্যাঁচামেচির শব্দে চমকে ওঠে, অসহজ বোধ করে। নতুন বাচ্চাদের সঙ্গে মিশতে বা নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে না পারা বা বিলম্ব হওয়ার লক্ষণও বাচ্চার মধ্যে দেখা যেতে পারে। এই ধরনের পরিবেশে বাচ্চা যদি ছটপট করতে থাকে, ঘাবড়ে যায়, কিছুতেই অ্যাডজাস্ট করতে না-চায় বা খুশি হওয়ার বদলে উদাসীনতায় ঘিরে থাকে তাহলে বাচ্চাটির ইন্ট্রোভার্ট হয়ে বড়ো হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে

সময়ের আগে বাচ্চার জন্ম হলে : সময়ের আগেই যদি বাচ্চা মায়ের গর্ভ থেকে বাইরে আসে তাহলে দেখা গেছে বাচ্চার অন্তর্মুখী হওয়ার বেশি সম্ভাবনা থাকে। সুতরাং অভিভাবকদের প্রথম থেকে সতর্ক হওয়া জরুরি এবং বাচ্চাকে সামাজিক হওয়ার জন্য(সোশ্যালাইজ) উৎসাহ এবং প্রেরণা দেওয়া বাঞ্ছনীয়

একটা জিনিস বা খেলনা নিয়ে ব্যস্ত থাকা : কোনও বাচ্চা যদি একটা কোনও জিনিস বা খেলনা নিয়ে সারাক্ষণ নিজেকে ব্যস্ত রাখে তাহলে তার অন্তর্মুখী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এরা ওই বিশেষ জিনিস বা খেলনা নিয়ে মনের মধ্যে একটা কল্পনার জগত্ তৈরি করে নেয় সেটাই তাদের মনোরঞ্জন করে। এই ক্ষেত্রে অভিভাবক এবং শিক্ষকদের বাচ্চাটির বেশি করে খেয়াল রাখা দরকার। বাচ্চাটির নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা তাদের সঙ্গে শেয়ার করার জন্য, তাকে উৎসাহিত করা উচিত। অন্যথায় বাচ্চাটির ইন্ট্রোভার্ট হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।

 

আরও পড়ুন

 

ইন্ট্রোভার্ট এবং লাজুকের মধ্যে পার্থক্য

অন্তর্মুখী ব্যক্তি একাকী থাকতে ভালোবাসে, অপরে তার সম্পর্কে কী ভাবল সেটা নিয়ে চিন্তা করে না। লাজুক বাচ্চা বা ব্যক্তি একাকিত্ব পছন্দ করে না কিন্তু চট করে কারও সঙ্গে মিশতেও ভয় পায় বা এড়িয়ে চলে। উদাহরণ হিসেবে মাইক্রোসফট-এর ফাউন্ডার বিল গেটস-এর নাম বলতে হয়, যিনি ইন্ট্রোভার্ট হিসেবে পরিচিত কিন্তু লাজুক নন।

লাজুক স্বভাব রোধ করা সম্ভব : অন্যের সাহায্য নিয়ে বা থেরাপির সাহায্যে লাজুক স্বভাব থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব। কিন্তু অন্তর্মুখী ব্যক্তিকে বহির্মুখী করে তোলার প্রচেষ্টায় অনেক সময় ব্যক্তিটি অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং তার আত্মসম্মানে লাগে। এরা অনেক সময় যে-কোনও সামাজিক পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে কিন্তু কিছুতেই নিজেকে বহির্মুখী করে তুলতে পারে না

মানসিক দুর্বলতা : ইন্ট্রোভার্ট ব্যক্তি মানসিক ভাবে দুর্বল হয়। নিজেদের সম্মান হানি হয়েছে বুঝতে পারলে সেটা থেকে বেরিয়ে আসা তাদের জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়

 

জরুরি টিপস

বাচ্চা যদি অন্তর্মুখী হয় এবং তার মধ্যে আত্মবিশ্বাসের অভাব থাকে তাহলে এই টিপস আপনার কাজে আসবে।

  • যারা ইন্ট্রোভার্ট তারা কী করবে বা কী করবে না সেটা ঠিক করতে পারে না। তাই অভিভাবকদের উচিত নানা রকম পরিস্থিতির মধ্যে কী পার্থক্য বাচ্চাকে শেখানো। ধীরে ধীরে বাচ্চা সঠিক দিশা খুঁজে পাবে
  • বাচ্চা যদি কোনও পরিবেশে বা কোনও ব্যক্তির সঙ্গে মেলামেশা করতে অসুবিধা বোধ করে তাহলে তাকে কাছে বসিয়ে আদর করে, কারণ জানার চেষ্টা করুন। নিজেকে এই বলে সান্ত্বনা দেবেন না যে, বাচ্চা অন্তর্মুখী তাই ওরকম ব্যবহার করছে। আপনার এই চিন্তাধারা বাচ্চার সামগ্রিক বিকাশে বাধা হয়ে উঠতে পারে
  • অন্যান্য বাচ্চাদের মতোই অন্তর্মুখী বাচ্চারা তাদের নিজস্ব প্রতিভা নিয়ে জন্মায়। অভিভাবকদের কাজ হচ্ছে সেই প্রতিভার সঙ্গে বাচ্চাকে পরিচিত করানো
  • অন্তর্মুখী বাচ্চা অন্য বাচ্চাদের মতো বাড়ির বাইরে গিয়ে খেলাধুলো করতে পছন্দ নাও করতে পারে। এর মানে ও খেলতে ভালোবাসে না, এমন নয় বরং বলা যেতে পারে অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে মিশতে ওর মধ্যে দ্বিধা রয়েছে। দ্বিধা কাটাবার জন্যে বাড়িতেই বাচ্চার সঙ্গে আউটডোর গেমস খেলুন। ধীরে ধীরে বাচ্চাকে বোঝান আউটডোর গেম খেলতে তখনই ভালো লাগবে যখন সে বাইরে গিয়ে অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে টিম বানিয়ে খেলবে
  • এই ধরনের বাচ্চাদের কিছুটা স্বাধীনতা দিতে হবে। সব সময় ওদের প্রোটেক্টর হয়ে থাকলে চলবে না। ওরা যে-কাজটা করতে পারছে না আগ বাড়িয়ে নিজে করে দেওয়ার চেষ্টা করবেন না। এর ফলে ওদের মনে হতে পারে, কোনও কাজ করতে ওরা অক্ষম।

খেয়াল রাখতে হবে প্রতিটি বাচ্চা স্বভাবে এবং শারীরিক ক্ষমতায় একে অপরের থেকে আলাদা। সুতরাং বাচ্চার ব্যক্তিত্বের সঠিক মূল্যায়ন করেই আপনি আপনার বাচ্চার ভবিষ্যতের ভিত মজবুত করতে পারবেন।

ফিরে এসো পিউ

‘তোর একটা কবিতায় দেখলাম লিখেছিস, ‘সাদা তালের মতো তুলতুলে। তুই দেখেছিস কোনও সাদা তাল?’

‘না, মানে…’ তো তো করতে থাকে পথিক।

‘তোকে বলেছি না, যা দেখিসনি তা নিয়ে লিখবি না, ভুল লিখবি…’

একমুখ ধোঁয়া হতভম্ব পথিকের মুখের উপর দিয়ে আকাশে ছুড়ে দেয় লেনাদি। বয় কাট চুল, টিকালো নাক, ধারালো মুখ, সাদা শার্ট আর নীল ফেডেড জিন্স পরা লেনাদি, কলেজের মারকাটারি সুন্দরীদের মধ্যে একজন।

‘দেখিসনি তো…?’ গলার স্বর খাদে নামিয়ে লেনাদি বলল, ‘আমি দেখাব তোকে…।’ বলেই স্কুটিতে চড়ে সাঁ করে বেরিয়ে গেল কলেজ থেকে।

হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল পথিক!

একদিন এতটা লাজুক ছিল সে, মুখে ভালোবাসার কথাও কাউকে বলতে পারেনি। তখন ইলেভেন চলছে। সে এক নভেম্বরের সকালবেলা। পিউ টিউশানি যাচ্ছে। পথিক পিছু পিছু হাঁটছে। আর তার বুকের মধ্যে ধুকপুকুনি। হাতে রাখা চিরকুট ঘামে ভিজছে। নির্জন জায়গার অপেক্ষায়।

ফলো করে কিছুটা যাবার পর পিউ বুঝতে পারে পথিক ওকে অনুসরণ করছে। ও ঘুরে দাঁড়ায়।

‘কী রে পথিক, তুই এই রাস্তায়…কোথায় যাবি?’

‘তোর সাথে একটা কথা ছিল…’

‘ওহ, হ্যাঁ, বল…’

চিঠিটা হাত বাড়িয়ে এগিয়ে দেয় পথিক। ‘এটা একটু পড়ে দ্যাখ।’

পথিক মাথা নীচু করে দাঁড়িয়েছিল দুরুদুরু বুকে। এভাবে আগে কেউ কাউকে প্রোপোজ করেছে কি না তার জানা নেই। চিঠিতে লেখা ছিল ‘আই লভ ইউ, পিউ’ ব্যস, এতটুকুই।

‘তুই এই কথাটা তো আমাকে মুখেও বলতে পারতিস…’

প্রায় তিরিশ সেকেন্ড পর স্তব্ধতা ভেঙে বলেছিল পিউ।

ওদিকে তখন পথিকের বুকে অবিরাম হাতুড়ি পেটা চলেছে। তার পরের শব্দগুলো শোনার জন্য।

‘দ্যাখ, আমি তোকে বন্ধুর মতো দেখি। তোর সাথে আমার সম্পর্কটা বন্ধুর মতো থাকলেই ভালো!’

হিমালয়ের চূড়া থেকে কোন অতল খাদের গভীরে যেন তলিয়ে যেতে লাগল পথিক। শরীর যেন ভারশূন্য পালকের মতো ভাসছে। যে-কোনও দিকেই উড়ে চলে যেতে পারে। শহরের সব শব্দ, সব কোলাহল যেন তার কানের তিন ফুট দূরে এসে থমকে গেছে। আর কিছুই শুনতে পাচ্ছে না পথিক। কতক্ষণ এভাবে দাঁড়িয়ে ছিল সে, জানে না। আবার সম্বিত ফেরে পিউ-এর কথায়। ‘সরি, কিছু মনে করিস না। টিউশনির দেরি হচ্ছে, চলি…’

চলে গেছিল পিউ। আর তখনই মুখ তুলে তাকিয়ে ছিল পথিক। নাহ, পিউ আর পিছন ফিরে তাকায়নি। মেয়েরা সত্যিই কখনও পিছন ফিরে তাকায় না…

‘কী রে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অত কী ভাবছিস?’ দূর থেকে হাঁক দেয় সঞ্জয়দা ‘ইউনিয়ন রুমে আয়, কথা আছে।’

লেনাদির আহ্বানে মশগুল থাকা পথিক চমকে ওঠে। লেনাদির সাথে পথিকের পরিচয়ও ইউনিয়ন রুমেই। তখন ওরা সদ্য ঢুকেছে। ফ্রেশারস ওয়েলকাম হয়নি তখনও।

দুই

কলেজ শুরুর প্রথম দিনই পিউকে দেখেছিল পথিক। ও উইমেন্স এ ভর্তি না হয়ে বিবেকানন্দে ভর্তি হয়েছে, জেনে ভিতরে ভিতরে খুশিই হয়েছিল। তবে পিউ কে সিগারেট খেতে দেখে খুব অবাক হয়েছিল।

 

কলেজে গিয়ে তার মনে হয়েছিল পুকুর থেকে যেন সমুদ্রে এসে পৗঁছেছে। গার্জেনদের চোখ রাঙানি নেই, মাস্টারমশাইদের শাসন নেই। হঠাৎ এতটা স্বাধীনতা পেয়ে গিয়ে বেশ মজাই লাগছিল পথিকের।

 

পথিক ভেবেছিল পড়াশোনার সাথে হালকা করে থাকবে ছাত্র রাজনীতিতে। আর সবাই যেমন থাকে। কিন্তু ইউনিয়ন রুমের মোহ ক্রমশ বাড়তে থাকে তার কাছেও। কারণ পিউও সেখানে যাতায়াত শুরু করেছে ততদিনে। স্কুলের রাজনীতি-নির্বোধ ছেলেগুলো এখানে এসে কীভাবে তুখোড় নেতা হয়ে ওঠে, সে দেখতে থাকে চোখের সামনে।

 

সঞ্জয়দা তখন নতুন ব্যাচকে সমাজতন্ত্রে দীক্ষিত করতে উন্মুখ। কলেজ শুরুর দু’একদিনের মধ্যেই ফাঁকা ক্লাসগুলোয় গিয়ে শুরু করল রুম মিটিং। তারপর ইউনিয়ন রুমে নিরন্তর দীক্ষাদান তো আছেই।

 

‘শোন, সেকেন্ড ইয়ার, থার্ড ইয়ারে অলরেডি আমাদের তৈরি ছেলেরা আছে। সে নিয়ে চিন্তা নেই। এই যে ফ্রেশ মাইন্ডগুলো স্কুল পেরিয়ে কলেজে এল, এদের মাথায় কোনও পলিটিক্যাল থট নেই। অন্য কেউ চষে দেবার আগে রাজনীতির বীজটা আমাদের পুঁতে দিতে হবে। দেখতে হবে আমাদের ছেড়ে কেউ অন্যদিকে চলে না যায়…’

 

সিগারেট ধরিয়ে নিজের মার্ক করা চেয়ারে বসে ধোঁয়া ছাড়ল সঞ্জয়দা। বাকিরা উলটো দিকের সারি সারি চেয়ারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসা। কয়েকজন নীচে পাতা ম্যাট্রেসের উপর গোল হয়ে বসে ওয়াল ম্যাগাজিনের ছবি অাঁকছে।

 

‘আয় লেনা…আয়…এই এদের একটু ক্লাস নিচ্ছিলাম।’

 

লেনা নাম্নি ফরসা, লম্বা, সুন্দরী, জিন্স পরিহিত সঞ্জয়দার সহপাঠিনী কমরেড ইউনিয়ন রুমে ঢুকল। তার সাথে পাঁচটা মেয়ে। সব ফাস্ট ইয়ারের। যাদের মধ্যে পিউ একজন।

 

তাদের দেখিয়ে বলল, ‘এই যে আমার লেডি ব্রিগেড… কী বলছিলি বল, এরাও শুনুক…’

 

‘তোমাদের ক’জনের উপরেই আমরা ভরসা করছি। তোমাদের যে যার নিজের নিজের ক্লাসকে নেতৃত্ব দিতে হবে। তাছাড়াও সার্বিক ভাবে কলেজে পার্টির স্বার্থটা দেখতে হবে।’ সিগারেটে টান দেওয়ার ফাঁকে ফাঁকে যথেষ্ট পজ দিয়ে কথাগুলো আমাদের সবার দিকে ছুড়ে দিল সঞ্জয়দা।

 

ম্যাগাজিনের কাজ করতে থাকা সেকেন্ড ইয়ারের একজন পকেট থেকে বের করে একটা সিগারেট ধরাল। দু’টান দিয়েই পাশের জনকে ধরিয়ে দিল। তারপর এল ফার্স্ট ইয়ারের হাতে। দু’একজন টান দিয়েই কেশে ফেলল। বাকিরা তাই দেখে হাসতে লাগল।

 

দীপাঞ্জন তার কানে কানে বলল, ওটা সিগারেট নয় শালা, ব্যাগড়া ভরা আছে। তাই দু’টান করে দিচ্ছে…’

 

পথিক তখনও ‘ব্যাগড়া’ মানে শোনেনি। পরে জানল গাঁজা ভরা আছে। কলেজের গেটেই ছাত্রদের জন্য নাকি গাঁজা ভরা সিগারেট বিক্রি করা হয়। ছাত্ররা তো আর ক্যাম্পাসে কলকে মুখে দিয়ে গাঁজা টানতে পারে না!

 

কথা শেষ করে সঞ্জয়দা আর লেনাদি ভিতরের কেবিনে গিয়ে বসল। বাইরের ঘরে নতুন পুরোনো ইউনিয়নপন্থী ছাত্র ছাত্রীরা গল্প, গান, কবিতায় মশগুল হয়ে গেল।

 

পথিক যেন সেদিন নতুন করে মানুষ চিনল। মানুষ যে এত ক্যালকুলেশন করে অন্য মানুষের সঙ্গে মেশে, তা ওর অজানা ছিল। কমরেডদের কথা বলা, গল্প করার পিছনেও যে পার্টি তথা সমাজতন্ত্রকে এগিয়ে নিয়ে যাবার তাগিদ থাকে, সে তখনই জানতে পারল।

 

পথিক বারবার পিউয়ের দিকে তাকাচ্ছিল। পিউয়ের কোনও হেলদোল নেই। ও কী অনায়াসে তার এতদিনের সহপাঠী, তার প্রেমে প্রত্যাখ্যাত ছেলেটাকে অগ্রাহ্য করছে! মেয়েরা পারেও বটে!

 

তিন

 

পথিকের কাছে কলেজ আর ইউনিয়ন রুমের আকর্ষণটাই ছিল পিউয়ের জন্য। সারাক্ষণ ক্লাসে মন বসত না। শুধু বসে বসে ওর কথা ভাবত। আর ক্যান্টিন, ইউনিয়ন রুম, লাইব্রেরি, কলেজের মাঠ, শালজঙ্গল যেখানেই ওর দেখা পেত পথিকের শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে যেত।

 

দু’এক বার সামান্য দলবদ্ধ হাই হ্যালো ছাড়া অন্য কথাই বলেনি আজ পর্যন্ত। বর্ধমান শহরের অন্য আর পাঁচটা অচেনা মেয়ের মতোই শীতল সম্পর্কটা। কিন্তু কেন হবে? নিজেকে প্রশ্ন করে পথিক, কিন্তু উত্তর খুঁজে পায় না। ওর সাথে ছ’টা বছর একসাথে পড়ার কোনও রেখাপাতই নেই! পথিকও নাছোড়…। সে নিজেকে বলে এর শেষ দেখবই…কী এমন রহস্য আছে, যে বন্ধু বন্ধুই রয়ে যাবে? প্রেমিক হতে পারবে না!

 

সেদিন ওদের কবিতা পত্রিকার নতুন সংখ্যাটা ইউনিয়ন রুমে কয়েকজন বন্ধুকে দিচ্ছিল পথিক। লেনাদি বলল, ‘পথিক তুই নাকি ‘ভূমি’তে, লিখিস!’

 

‘ওই আর কি…’ মৃদু হেসে জবাব দেয় পথিক।

 

পত্রিকার পাতা ওলটাতে ওলটাতে তার প্রেমের কবিতাটা দেখে বলল, ‘ও! এটা তোর লেখা…?’

 

পথিক ঘাড় নাড়ে।

 

পড়া শেষ করে তার দিকে চেয়ে হাসে লেনাদি। সিগারেটে টান মেরে বলে, ‘উমম্….কী লিখেছিস যেন… ‘তারপর লঘু অথচ গম্ভীর পদক্ষেপে হেঁটে চলে গেলে তুমিয একবারও পিছন ফিরে তাকালে নায সত্যি, মেয়েরা কখনও পিছন ফিরে তাকায় না…!’

 

‘তুই মেয়েদের কী জানিস? অ্যাঁ? এর আগে কটা প্রেম করেছিস? আর এখন তোর কটা গার্লফ্রেন্ড আছে, বল শুনি….’ তর্জনি আর মধ্যমার মাঝে চেপে ধরা সিগারেট নাচিয়ে জিজ্ঞেস করে লেনাদি।

 

‘এর আগে একটাও প্রেম করেনি’, বলল দীপাঞ্জন।

 

‘আর একটাও গার্লফ্রেন্ড নেই বেচারির’, যোগ করেছিল গণেশ।

 

‘একটাই সরু লাইন করতে গেছিল, মেয়েটি প্রথম দিনই ভাই না বন্ধু কী একটা বলে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছিল।’ হি হি করে হাসে আলতাফ।

 

‘হুম… তোর ক্লাস নিতে হবে রোজ। না হলে মেয়েদেরকে না জেনেই প্রেমের কবিতা লিখতে যাবি, দিয়ে হোঁচট খাবি। আই মিন, ভুলভাল লিখবি। কাল থেকে অফ পিরিয়ডে আমার কাছে আসবি, রোজ আধঘন্টা করে মেয়েরা কী করে, কী চায় তোকে শেখাব…’

 

‘হা হা হি হি…।’ লেনাদির সাথে সবাই যোগ দেয় হাসিতে।

 

ইউনিয়ন রুমে সেদিন অনেকক্ষণ ধরে গান, কবিতা, গল্প হল। পিউ কী রকম একটা গম্ভীর হয়ে বসে রইল। সঞ্জয়দা তার সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন আমাদের চোখে একটু পর পর মাখিয়ে দিতে থাকল।

 

‘শোন, শোন… হো চি মিন বলেছিলেন, ‘পোয়েট্রি মাস্ট বি ক্ল্যাড ইন স্টিল। আ পোয়েট শুড নো হাউ টু ফাইট।’ তোদের ওই শান্তনু রায় এর ছেলে ভোলানো কবিতায় শুধু ‘আমি-তুমি’… এই তো…? এর বাইরে খেটে খাওয়া মানুষের কথা কোথায়! যত বোগাস কবিতা সব!’

 

‘আরে কী বলছ? জানো তুমি লোকটার কী বিশাল ফ্যান

 

ফলোয়িং?’

 

‘রাখ তোর ফ্যান। আগে ভাতের কথা ভাব, তারপর ফ্যান নিয়ে ভাববি। আমার সব ভালো করে পড়া আছে। মানুষে মানুষে সম্পর্ক বলতে উনি বোঝেন প্রেম, অবৈধ প্রেম, ভাই বোনে প্রেম…তোরাও তাই গিলছিস, আর নিজেরাও তেমন লিখছিস…’

 

সেদিন ইউনিয়ন রুম থেকে বেরিয়ে একা একা হাঁটছে পথিক। দ্রুত পা চালিয়ে পাশাপাশি এল পিউ। ‘তুই খবরদার লেনাদির কাছে যাবি না। ফরসা কচি ছেলেদের খুব পছন্দ করে ডাইনিটা। আর ব্যাগে সবসময় কন্ডোম নিয়ে ঘোরে…’ দাঁড়ায় না পিউ, পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে কথাগুলো ছুড়ে দিয়ে হনহনিয়ে হেঁটে চলে যায়।

 

চার

 

‘কী, আমার কাছে ক্লাস করতে এলি না তো?’ সিগারেটে টান দিতে দিতে বলল লেনাদি।

 

দিন পনেরো পর বাইক শেডের সামনে মুখোমুখি দেখা। ইউনিয়ন রুমে এর মধ্যে বারকতক দেখা হলেও কিছু বলেনি লেনাদি। পথিক সেদিনের কথাটাকে ঠাট্টাই ভেবেছিল।

 

তাই কী উত্তর দেবে পখিক ভাবছিল।

 

‘না, মানে…’ তো তো করতে থাকে ঊনিশ বছরের পথিক।

 

‘তোকে বলেছি না, যা দেখিসনি তা নিয়ে লিখবি না, ভুল লিখবি…। আমার কাছে আসিস, দেখাব…’ বলে স্কুটিতে চড়ে সাঁ করে চলে যায় লেনাদি।

 

সাতপাঁচ ভাবছিল পথিক। সত্যি-মিথ্যা, রোমাঞ্চ, পিউয়ে-র সাবধানবাণী…। তার মাঝে হাঁক দিয়ে গেল সঞ্জয়দা। তবু ইউনিয়ন রুমে গেল না পথিক।

 

পাঁচ মিনিট পর তার মোবাইলে একটা মেসেজ ঢুকল। ন্তুপ্প ২ প্পম্ভ ব্জপ্প ্ত্রব্ধ ন্সন্ধ্রুন্ন্স্ত্র, ্ত্রন্দ্রব্ধব্জ ন্ধ্রচ্ঞন্দ্র ু ন্ধ্রব্জ, ঢঅচ্ঞচ্ঞ ব্দন্ধ্রভ্র ব্ভ ভ্রন্ধ্রব্ধ হ্মব্জপ্সপ্পব্দস্তু.

 

বুক ধড়ফড় করতে থাকে পথিকের। ও মাঠের ঘাসে বসে পড়ে। পা কাঁপছে, দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। ভাগ্যিস আশেপাশে কেউ নেই এখন। ঘাসের উপর পিঠ এলিয়ে দিয়ে আকাশের দিকে তাকায়। উত্তেজনায় তার নিঃশ্বাস ক্রমশ গরম হয়ে উঠছে, বুঝতে পারে পথিক। সে কলেজের আনাড়ি ছোকরা। সদ্যাগত, তাকে ‘সাদা তাল’ দেখতে আমন্ত্রণ করছে কলেজের হার্টথ্রব ইউনিয়ন নেত্রী থার্ড ইয়ারের লেনাদি! নিষিদ্ধ ফলের আকর্যণ পথিককে চুম্বকের মতো টানতে থাকে।

 

আবার মনে পড়ে পিউয়ে-র কথা। ভীষণ রাগ হয় পিউয়ে-র উপর। মনে হয় কেন শুনবে সে ওর কথা? সবাই কত হাসি গল্প করে তাদের বান্ধবীদের সাথে। ফোন করে, মেসেজ করে। ঘুরতে যায়… আরও কত কী… সে কেন বঞ্চিত থাকবে এই সুখ থেকে…

 

এক অপ্রতিরোধ্য রোমাঞ্চ তাড়িয়ে নিয়ে যায় পথিককে। কলেজের খেলার মাঠ, শাল জঙ্গল ছাড়িয়ে, বাজারের শেষে ছাতার দিঘির পাড়ে ছোট্ট অতিথিনিবাস, ক্ষণিকা। হাফ প্যান্ট আর ফিনফিনে গেঞ্জিতে অপেক্ষা করছিল লেনাদি…

 

সেদিন লেনাদি আরও অনেক কিছু দেখিয়েছিল। এক প্রকার হাতে ধরে শিখিয়েছিল শরীরের কোন ভাঁজে লুকিয়ে আছে কতটা সুখ, দুগ্ধফেননিভ ফর্সা নরম তাল তাল মাংসের মধ্যে হারিয়ে যেতে যেতে পথিকের প্রথমবারের জন্য মনে হয়েছিল জীবনটা সত্যিই সুন্দর…।

 

লেনাদি আলস্য জড়ানো চোখে বিড়বিড় করছিল, ‘হোয়াই ইউ পিপল ডোন্ট ডু ইট ফর আওয়ারস!

 

পাঁচ

 

সেদিন মাথায় একটা কবিতা ঘুর ঘুর করছিল পথিকের। একটা অফ পিরিয়ড পেতেই ও ভাবল কবিতাটা নামিয়ে ফেলতে হবে। সাদা কাগজ আর পেন তার পকেটেই থাকে। বই খাতা ক্লাস রুমে রেখে ও হাঁটতে লাগল। খেলার মাঠ, শাল জঙ্গল পেরোলে কলেজের পাঁচিল। পাঁচিলের ওপারেই ছোট্ট ক্যানেল। কুলকুল জলের শব্দ। দূরে তাকালে দেখা যায় ছাতার দিঘির বিস্তৃত জলরাশি। ভিতরের দিকের প্রাচীরের গায়ে একজায়গায় পুরানো ইট ঢিবি হয়ে আছে। তাতে পা দিয়ে অনায়াসে সীমানা প্রাচীরের উপর বসে সৗন্দর্যে বিভোর হয়ে কবিতার কথা ভাবা যায়। জায়গাটা খুব পছন্দ পথিকের। সেদিকেই হাঁটছিল ও। হঠাৎ জঙ্গলের ভিতর খুক খুক কাশির শব্দে থমকে দাঁড়াল সে। পিউ আর কেমিস্ট্রির রুষা। রুষার হাতে একটা কল্কে, যা থেকে দু’জনেই একবার করে টান মারছে। পথিককে দেখে পিউ ডাকে, ‘এই গুড বয়, শোন শোন, এদিকে আয়, একা একা কোথায় যাচ্ছিস? তোর সখীরা কই?’

 

পথিক বুঝতে পারে পিউয়ে-র নেশা হয়ে গেছে। এই কারণে ও সব ক্লাস করে না আজকাল।

 

‘তোরা কল্কে নিয়ে…’

 

‘সিগারেটে পুরে হয় না রে মাইরি। গাঁজা খেলে কল্কেতে ফেলেই খাওয়া উচিত…উঁহ…কী স্বাদ । মাইরি! দু’টান মেরে দ্যাখ…’

 

‘আমি গাঁজা খাই না, নট ইভন বিড়ি, সিগারেট, চা…’

 

‘চা খাস না… হি হি… চা খায় না…দুধ তো খাস…’

 

‘না, তাও খাই না।’ নাকের পাটা ফুলিয়ে জবাব দেয় পথিক।

 

‘অলে বাবা… কচি ছেলে দুদুও খায় না…।’ হঠাৎ তড়াক করে রুষার গায়ের হেলান ছেড়ে উঠে বসে পিউ। ‘সেদিন তাহলে লেনাদির ঘরে গিয়ে কী খেয়ে এলি?’

 

পিউ আর রুষা দুজনেই হাসতে থাকে হো হো করে।

 

চমকে ওঠে পথিক। তার লেনাদির ঘরে গোপন অভিসারের কথা এরা জানল কী করে!

 

‘শালা ভাবছিস চুপি চুপি করে গেলাম, এরা জানল কী করে?

 

হা-হা-হা… এমন অভিসারের কথা এই মফস্সলে চাপা থাকে না সোনা…। গেছিলি তো একা একা…পায়ে হেঁটে। আসার সময় যে স্কুটিতে চড়ে একেবারে কলেজের গেট পর্যন্ত চলে এলি…হি হি… কচি ছেলেটার খিদে পেয়েছে রে রুষা, একটু দুদু খাওয়া…’

 

মাথা ঘুরতে থাকে পথিকের। সময়টা বড়ো দ্রুত বদলে যাচ্ছে। তার সাথে তাল রেখে হাঁটতে পারে না সে… ছোট্ট থেকেই দেখেছে তার শিক্ষক বাবা সমাজতন্ত্রের আদর্শে বিশ্বাসী। তাদের ঘরে রুশ দেশের বাংলা পত্র-পত্রিকা, বই-সাহিত্য ছিল ঠাসা। সেগুলো ছোটো থেকে গোগ্রাসে গিলেছে সে। তাদের মতাদর্শের অনুসারী এই অঙ্গরাজ্যের হাত ধরে সারা দেশে একদিন সমাজতন্ত্র আসবে এমন স্বপ্ন ছিল বাবার, যা ক্রমশ ফিকে হয়ে যাচ্ছে। এখন ভোটে জিতে ক্ষমতায় টিকে থাকাই আসল। কলেজগুলোতেও ভোটে জেতার জন্য কী সুবিশাল আয়োজন! বাবা যে কমিউন গড়ার গল্প শোনাতেন তা আজ প্রলাপ বা বিলাপের মতন শোনায়…

 

‘উরুর তিলটা দেখেছিস… লেনাদির উরুর সেই বিখ্যাত তিল…’

 

‘বিদ্যুতের শক খাওয়ার মতো চমকে ওঠে পথিক। লেনাদির ডান দিকের ফরসা উরুর মাঝ বরাবর কপালের বড়ো টিপের সাইজের একটা ঘোর কালো তিল…সেদিন হাত বুলিয়ে দেখেছিল সে…’

 

তার কান গরম হতে থাকে…কী করে সম্ভব…

 

‘তুইও যেমন… শালা একটা প্রসের সাথে শুতে গেছিস…গোটা কলেজ জানে ওর সারা শরীরের কোথায় ক’টা তিল আছে…’ ভক ভক করে গাঁজার ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলে রুষা।

 

মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকা কবিতাটা কোথায় চলে যায়… শাল জঙ্গলের মধ্যে ধপ করে বসে পড়ে পথিক।

 

ছয়

 

পরদিন তার কবিতা আশ্রমে যাবার পথে পিউকে একা বসে থাকত দেখল পথিক। খেলার মাঠের শেষে। শাল জঙ্গলের শুরুতেই। টান মারার জন্য জাস্ট আড়াল নেওয়া আর কি!

 

‘আসতে পারিস। কোনও পরিশ্রম করাব না… নেশালু কণ্ঠে বলে পিউ।’

 

বিনা বাক্যব্যয়ে পাশে গিয়ে বসে পথিক। বুঝতে পারে আগে থেকেই টান দিচ্ছে পিউ। তাই ক্লাসে যায়নি।

 

‘তোদের তো ভালোই হল…’ জড়ানো গলায় বলে পিউ।

 

‘কেন?’

 

‘শুনিসনি?

 

‘না তো, কী?’

 

‘তোদের কিছু ক্যান্ডিডেট পারচেজ করতে চাইছে বিপ্লব বাবুদের দল। দু’হাতের উপর পিঠ হেলিয়ে বিড়বিড় করে পিউ।

 

এরকম কথা আগে একবার শুনেছিল পথিক।।

 

‘সেজন্য নমিনেশন জমা দেবার পরই তোদের গাড়ি করে নিয়ে চলে যাওয়া হবে মাইথনের একটা হোটেলে। চারবেলা খাওয়া,

 

মউজ-মস্তি। তোদের পাহারায় থাকবে সঞ্জয়দা, লেনাদি। কটা দিন লেনাদির কাছাকাছি থাকবি…’

 

‘বেশ করব থাকব।’ রাগ দেখিয়ে বলে পথিক। ‘আমারও একটা গার্ল ফ্রেন্ড-এর দরকার আছে…’

 

‘মাই গড, লেনাদি তোর গার্ল ফ্রেন্ড! থার্ড ইয়ারে তিনবছর ড্রপ… পার্টির নির্দেশে ও আর সঞ্জয়দা কলেজ দেখছে। ছাত্র না থাকলে ‘বহিরাগত’ হয়ে যাবে, তাই…’

 

‘হোক ছ’বছরের বড়ো, তবু তাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে পারব আমি।’

 

রাগ দেখিয়ে বলে পথিক। পিউ-র প্রত্যাখানের জ্বালা মেটাতে। কিন্তু সে জানে আর তার লেনাদিকে চুমু খাওয়া হবে না। চারদিন আগেই সে দেখেছে সেকেন্ড ইয়ারের লম্বা বীরুকে। স্কুটি চড়ে লেনাদির সাথে ক্ষণিকায় যেতে। তখনই সে বুঝতে পারে, কেন ক’দিন ধরে কাছাকাছি ঘুর ঘুর করলেও তাকে আর ডাকছে না লেনাদি, তার সফেন সমুদ্রের জোয়ারের জলে নামতে। এদিকে জীবনের প্রথম নারী সঙ্গমের পর পথিকের তখন পাগলের মতো অবস্থা। চোখ বুজলেই সফেন সমুদ্র… কালো টিপের মতো তিল। তাল তাল নরম মাংসের মধ্যে স্বর্গের সমস্ত সুখ। অথচ লেনাদি কী নিস্পাপ ভাবে কবিতার কথা, ইউনিয়ন ভোটের কথা, সমাজবাদের কথা আওড়ে যায়! যেন তাদের মধ্যে কিছুই হয়নি কোনওদিন! লেনাকে জানার ইচ্ছা তাকে পাগল করে দিয়েছিল। সেই ইচ্ছাই তাকে জানিয়েছে কলেজের লেকচারার জাহিরবাবুর ভাড়া বাড়িতে প্রায়ই রাত কাটায় সে। আর কলেজের লালটুস দেখতে জুনিয়র, সিনিয়র অনেকেই চেনে তার শরীরের ঘাত প্রতিঘাত, চড়াই উতরাই। সেদিনের জড়নো গলায় বলা কথাটার মানে এদ্দিনে বুঝতে পারে পথিক, ‘হোয়াই ইউ পিপল ডোন্ট ডু ইট ফর আওয়ারস!’

 

লেনাদি এক পুরুষে তৃ৫ হবার মতো মেয়েই নয়। তবে তার এই আবিষ্কার সে পিউ-র কাছে চেপে যায়।

 

‘খা শালা, কত চুমু খাবি পিসিমাকে, ফ্রি তে খেয়ে নে…হা-হা-হা-হা, হাসির দমকে কাশতে থাকে পিউ।

 

‘হাসির কী হল?’ জিজ্ঞেস করে পথিক।

 

‘আমার সেই দিনটার কথা মনে পড়ছে। মুখে ‘আই লাভ ইউ’ বলতে না পারা সেই ছেলেটার কথা…. একটা চিরকুট কাগজ নিয়ে আমার পিছু পিছু ঘুরে বেড়াচ্ছিল…’

 

হঠাৎ ধবক করে জ্বলে ওঠে যেন পিউর চোখ। কিড়মিড় করে দাঁত। পথিকের বুকের কাছের জামা খামচে ধরে বলে ওঠে, ‘ক্যান ইউ ব্রিং দ্যাট গাই ব্যাক টু মি…?’

 

‘ছাড়…বোতাম ছিঁড়ে যাবে…’

 

‘পারবি না বল? জানতাম…’ শিথিল হয়ে যায় পিউ এর হাত।

 

একটা সিগারেট বের করে লাইটার জ্বালায় পিউ। টান দিতে দিতে বলে, ‘ডু ইউ নো, হু ইজ মাই ফার্স্ট ক্রাশ?’

 

পথিক কিছু না বলে চুপ করে থাকে।

 

‘ইউ… ব্লাডি শিলি ইউ… পথিক রায়… মাই ক্লোজ কম্পিটিটর ইন দ্য ক্লাস। বাট দেয়ার ইন দ্য ভিলেজ ইজ নো অ্যাটমোস্ফিয়ার ফর আওয়ার লাভ। নাইদার ইউ কুড টেল মি এনিথিং, নর আই…’

 

শূন্যে ক’বার ধোঁয়া ছাড়ে পিউ।

 

‘তখন রাতদিন পড়ছি জয়েন্টের জন্য। স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হব।

 

যে-স্যারের কাছে টিউশন নিতাম… বায়োলজির সুনীল স্যার…তাঁর ছেলে উদ্দী৫ তখন ডাক্তারির সেকেন্ড ইয়ারের স্টুডেন্ট। মাঝে মাঝে ছুটিতে বাড়ি আসত… জয়েন্ট অ্যাস্পিরান্ট আমাদের কাছেও তখন হিরো। ওই শালা আমাকে বলেছিল রাতে ঘুম পেলে সিগারেট খাবে…। সেই থেকে…’

 

পথিক অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে পিউয়ে-র দিকে।

 

‘আর কী বোকা ছিলাম আমি! ওর বাবা মা দু’জনেই টিচার। ফাঁকা বাড়িতে একদিন ডাকল। আমিও গেলাম গাইডেন্স-এর লোভে। বাঁধভাঙা ভালোবাসার কথা শুনতে শুনতে নিজেকে হারিয়ে ফেলল একটা সতেরো বছরের মেয়ে। টোটালি আন প্রিপেয়ার্ড অবস্থায় একটা আন প্রোটেক্টেড সেক্স। সব মিটে গেলে নিজের ভুল বুঝতে পারলাম। ও তখন ডেট-ফেট কী সব হিসেব করে বলল আমার সেফ পিরিয়ড চলছে… ওরিড হবার কিছু নেই। তারপরও ওর ডাকে সাড়া দিয়ে পাঁচবার মিলিত হয়েছি। তবে প্রত্যেকবার উইথ প্রোটেকশন। কিন্তু দেড়মাসের মাথায় আমি বুঝতে পারলাম আই ওজ মিসিং মাই পিরিয়ড…’

 

‘ওই টার্মিনেশনের জন্য অ্যারেঞ্জ করেছিল একটা নার্সিংহোমে। তারপর কুড়ি দিন বাড়ি থেকে বেরোতে পারিনি। মা-কে ঝুড়ি ঝুড়ি মিথ্যা বলেছি। আর তারপর থেকেই ওর সুইচ অফ। সারাদিন শুধু অঝোরে কেঁদেছি। এমন সময় একটা মেয়ের মনের অবস্থা কী হয়… সেসময় কাকে পাশে দরকার হয়…। তোর ওই ‘মেয়েরা যেমন হয়’ কবিতা পড়ে বোঝা যাবে না কোনওদিনও, রাস্কেল…’

 

হঠাৎ কেঁদে ফেলে পিউ। আই ওয়াজ টোটালি ডিভাস্টেটেড। অ্যাট দ্যাট টাইম ইউ কেম টু টেল মি ‘আই লাভ ইউ’। ইট ওয়াজ আ লেট কল, পথিক…’

 

‘স্যারের কাছে একদিন সব বলে কান্নায় ভেঙে পড়ি। স্ত্বান্নার জন্য তাঁর হাতের স্পর্শ মাথা থেকে নেমে ক্রমশ আমার সারা শরীর ঘুরতে শুরু করে… ছেলের সাথে শুয়েছি শুনেই ওঁর চাউনি কেমন যেন বদলে গেল। ভাবছিলাম… সেদিন ওই বাস্টার্ডের মুখে থুতু ছিটিয়ে বেরিয়ে আসি। জয়েন্টের স্বপ্ন ফিনিশড…’

 

‘যে-ছেলেটা মুখে বলতে পারে না ‘আই লভ ইউ’, তার হাতে একটা অ্যাবরশন হওয়া মেয়েকে তুলে দিতে মন চায়নি সেদিন। তাই ফিরিয়ে দিয়েছিলাম।’

 

‘কিন্তু সে যদি আজও চায়?’ পিউয়ে-র একটা হাত খপ করে নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে প্রশ্ন করে পথিক। ‘সেও তো একটা ভুল তোরই মতো করে বসেছে? তোকে একজন পুরুষ ব্যবহার করেছিল, আমাকে একজন নারী। যে-দুটোর কোনওটার মধ্যে ভালোবাসা ছিল না…’

 

‘তোকে ফিরিয়ে দিয়ে কতরাত কেঁদেছি জানিস, রাস্কেল…।’ তারপর ডিপ্রেশন শুরু হয়। বন্ধুদের কাছ থেকে মদ গাঁজা সব খাওয়া আস্তে আস্তে শিখে যাই।’

 

‘এখনও কি ফিরে আসা যায় না?’

 

‘কে ফেরাবে তারে… সব স্বপ্ন লুঠিত হয়ে গেছে যার, সবার অগোচেরে…’

 

‘আছে একজন।’

 

‘সে ইউনিয়নের পঙ্কিলতায় নিমজ্জিত।’

 

‘ছেড়ে দেবে সে ইউনিয়ন।’

 

‘বেট?’

 

‘বেট।’

 

ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে পিউ।

 

পিউয়ে-র হাতে ধরা রুমাল নিয়ে চোখের জল মুছিয়ে দেয় পথিক। নির্জন চরাচরে দু’জন মানব মানবী দু’জনকে নতুন করে দেখতে থাকে। চার চোখের মুগ্ধতায় তখন ভর করে হাঁটতে থাকে ভাষাহীন শব্দেরা। অনেক না বলা কথা যেন বলা হয়ে যায় মুহর্তে। একে অপরকে পরম আশ্লেষে বুকে জড়িয়ে ধরে ওরা। পিউ-র কাঁধে পথিক-এর মাথা। তার হাতে ধরা রুমালে একটা মৗমাছি এসে বসে। পথিক ফিসফিস করে বলে, ‘পিউ তোর রুমালে মৗমাছি…’

 

পিউ নেশা ধরানো গলায় প্রশ্নের স্বরে আওয়াজ দেয়, ‘উমমম…’

 

পথিক পিউ এর কানের কাছে মাথা রেখে অস্ফুটে বলতে থাকে,

 

‘দুহাতে কোনও কাজ ছিল না, দুটোই মারকুটে

 

দুহাত ভরে সেলাই এলো নাইন-টেনে উঠে

 

এহাতে এল রান্নাঘর, ওটায় তানপুরা

 

হাতের কথা জেনেও গেল দাদার বন্ধুরা

 

দুহাতে আজ ভরা সেলাই, আঙুলে সুতো কাঁচি

 

টেবিল ক্লথে ভ্রমর এলো, রুমালে মৗমাছি…’

 

আরও গভীর ভাবে পথিককে চোখ বুজে জড়িয়ে ধরল পিউ। শালের পাতায় পাতায় তখন লুটোপুটি খাচ্ছে শীতের রোদ। দূরে কোথাও একটা সুখপাখি ডেকে উঠল। তিনবার।

(কবিতার ঋণছ ‘সেলাই খাতার নকশা’ –শিবাশিস মুখোপাধ্যায়)

ব্রণর মোকাবিলা করতে

ব্রণর সমস্যা হয় তখনই, যখন জমা তেল ও মৃত কোশ অয়েল গ্ল্যান্ডের মুখ আটকে দেয়। বযঃসন্ধিতে এই সমস্যায় পড়েননি, এমন মানুষ নেই। পিরিয়ড যে- বয়সটাতে সবে শুরু হয়, হরমোনের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ব্রণর সমস্যা  দেখা দেয়৷ অবশ্য যে-কোনও বয়সেই অতিরিক্ত অয়েলি স্কিনে এই সমস্যা বাড়তে থাকে। পরিত্রাণে সহায়ক ভূমিকা রয়েছে ক্লিনজিং-এর। তবে সমস্যা বাড়লে, ত্বকের পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি অবশ্যই ডার্মাটোলজিস্ট-এর সাহায্য নিতে হবে। সাবান, সাধারণ ক্লেনজার-এর বদলে, স্যালিসাইলিক অ্যাসিড-যুক্ত ক্লেনজার ব্যবহার করতে হবে। আর কী কী করবেন, রইল তারই পরামর্শ।

  • স্যালিসাইলিক ক্লিনজার ত্বকের মৃত কোশ ভেদ করে ত্বকের বুজে যাওয়া ছিদ্রগুলিকে খুলতে সাহায্য করে। এর এক্সফলিয়েটিং ক্রিয়া, ত্বকের ছিদ্র বুজে যাওয়ার সমস্যা কমায়
  • যাদের ত্বক স্বাভাবিক ভাবে তৈলাক্ত ও ব্রণপ্রবণ, তারা অয়েল ফ্রি ফেসিয়াল লোশন ব্যবহার করুন
  • ব্যাক্টেরিয়া-বিরোধী উপাদান আছে, এমন বিশেষ লোশন ব্যবহার করলে উপকার পাবেন। এই লোশন ত্বককে শুদ্ধ করে, মেক-আপ তুলতে সাহায্য করে ফলে ব্যাক্টেরিয়ার প্রকোপ বাড়ে না
  • ক্লিনজার ব্যবহার করার পর টোনার লাগানো জরুরি। এতে ত্বকের ছিদ্রগুলি অঁটোসাটো হয় ও ব্রণ রোধ করে
  • বাড়িতে নিম-হলুদের টোটকা ব্যবহার করলে উপকার পাবেন, কারণ নিম ব্যাক্টেরিয়া রোধ করে
  • গরম জল ব্রণর উপর ব্যবহার করবেন না। এতে ব্রণ সারানোর কোনও গুণ নেই, বরং তা জ্বলুনির সৃষ্টি করবে
  • টুথপেস্ট দাঁতের জন্যই ভালো, ব্রণর জন্য নয়।

ব্রণ পরিচর্যায় প্রাকৃতিক উপায়

 শসা – কেবল খাদ্যগুণই নয়, শসার নানা গুণ রয়েছে। তার মধ্যে একটা অবশ্যই ত্বকচর্চায় কাজে লাগা৷ এতে রয়েছে ভিটামিন এ, ডি এবং ই। এর প্রতিটিই ত্বকের জন্য মারাত্মক ভালো। শসা থেঁতো করে মুখে লাগিয়ে রাখতে পারেন। ২০ মিনিট লাগিয়ে রাখার পর ঠান্ডা জলে ধুয়ে নিন মুখ। এছাড়াও শসাকে অন্যভাবে ব্যবহার করতে পারেন। শসা গোল গোল করে কেটে অন্তত একঘণ্টা জলে ভিজিয়ে রাখুন। তারপর সেই জল খেয়েও নিতে পারেন, অথবা ওই জল দিয়ে মুখও ধুয়ে নিতে পারেন।

গ্রিন টি-গ্রিন টি ব্রণর বিরুদ্ধে খুবই কার্যকরী। গরম জলে গ্রিন টি বানান। তারপর সেই গ্রিন টি একদম ঠান্ডা করে ব্রণর জায়গায় ব্যবহার করুন। তুলোয় ভিজিয়ে ব্যবহার করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে ভালো করে ত্বকের ওপর মিশতে পারবে চায়ের মিশ্রণটি। যদি টি ব্যাগ থেকে গ্রিন টি বানান, তাহলে ঠান্ডা গ্রিন টি ব্যাগটিও রাখতে পারেন ত্বকের ওপর। মিনিট ২০ রাখার পর ধুয়ে নিন।

বন পলাশের বড়ন্তি

স্নিগ্ধ কোমল ভোরের আলোয় হোটেলের পিছনের ফাঁকা জায়গাটায় গিয়ে উপস্থিত হলাম। ধীরে ধীরে আর একটা নতুন দিন শুরু হচ্ছে। পাখির ডাকে মুখরিত চারপাশ। বিদায়ি শীতের রেশ ছেড়ে প্রকৃতি এখন ঋতুরাজের আবাহনে মত্ত। বসন্ত প্রেমের ঋতু, কারও কারও কাছে বিরহের ঋতু, আবির রং-এ রঙিন হওয়া দোল উৎসবের ঋতু। শহরে বসন্তের আগমন প্রত্যাগমন বড়োই ম্রিয়মান। কিন্তু শহর থেকে বহু দূরে এহেন গ্রাম্য পরিবেশে প্রকৃতির রূপ-রস-গন্ধ-বর্ণের নির্যাস রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনুভব করা যায়।

ফাঁকা জায়গাটির তিন দিকে শাল, শিশু, বাবলা প্রভৃতি গাছের সমাহার আর তার মাঝে মাঝে রামধনু থেকে চুরি করা গাঢ় কমলা রঙের ফুলে মোড়া পলাশ গাছ। এর আগে বসন্তের এই কিংশুকের আবেশে মুগ্ধ হওয়ার সৗভাগ্য আমার হয়নি। গাছগুলি প্রায় পাতা বিহীন, ফুলের ভারে যেন নুইয়ে পড়ছে। হাতের নাগাল থেকে উঁচু ডাল পর্যন্ত গাছগুলি ফুলের আতিশয্যে দিশাহারা। মনে হল পুব আকাশের রক্তিম আভা মর্তে নেমে এসেছে। শিশির ভেজা ঘাসের ওপর পলাশের সেজ বিছানো। গাঢ় সবুজ রঙের মাঝে যেন আগুনের ফুলকারি নকশা। অঞ্জলি ভরে তুলে নিলাম পলাশ ফুল।

কোনও একটা ম্যাগাজিনের পাতা ওলটাতে ওলটাতে হঠাৎ চোখে পড়েছিল নামটা। পুরুলিয়া জেলার আসানসোলের কাছে, প্রায় ৩২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত একটি ছোট্ট আদিবাসী গ্রাম বড়ন্তি। কলকাতা থেকে বড়ন্তির দূরত্ব ২৩৬ কিলোমিটার। পাঞ্চেত পাহাড় এবং বিহারীনাথ পাহাড়ের মাঝে অবস্থিত সাঁতুড়ি ব্লক। ছোটো ছোটো পাহাড়, টিলা, নদী, জঙ্গল এবং তার সাথে আদিম গ্রাম্য পরিবেশ মন ছুঁয়ে যায়।

বড়ন্তি পাহাড়ের কোল ঘেঁসে বড়ন্তি গ্রাম। সামনে মুরাডি পাহাড়ের পাশ দিয়ে বয়ে চলা বড়ন্তি নদীর ওপর বাঁধ দিয়ে তৈরি রামচন্দ্রপুর জলধারা প্রকল্প। লেকটির পোশাকি নাম রামচন্দ্রপুর জলধারা। গ্রামে ঢোকার মাটির রাস্তাটি লেকের পাশ দিয়ে এঁকেবেঁকে পাহাড়ে গিয়ে মিশেছে। গ্রামে ঢোকার পথে চোখে পড়ে শাল, সেগুন, শিশু, বাবলা, নিম, শ্যাওড়া, আকাশমণি এবং অবশ্যই পলাশ গাছ।

প্রথমবার যখন বড়ন্তি আসি সেটা জুন মাস। গ্রাম্য পথের দুপাশ তখন গাঢ় সবুজ গাছগাছালিতে ছেয়ে আছে। এক যুবকের কাছে জেনেছিলাম, বড়ন্তির আসল সৗন্দর্য বসন্তের আগমনের সঙ্গে বিকশিত হয়। চারদিক ভরে থাকে আগুন রঙা পলাশে। তাই বহু ব্যস্ততাকে পেছনে রেখে দু-তিন দিনের ছুটি নিয়ে রঙ্গিনী পলাশের রঙে রঙিন হতে চলে এলাম বড়ন্তি।

আমাদের হোটেল থেকে দু-পা এগিয়েই গ্রামের বসতি শুরু। এই সকালে দলে দলে গ্রাম্য যুবা, পুরুষ, মহিলারা গরু, ছাগলের পাল চরাতে বেরিয়েছে। মাঠের সামনের দিকটায় পাকা রাস্তা। দূর থেকে চোখে পড়ল আদিবাসী বালিকারা রাস্তার ওপর প্রায় উপুড় হয়ে কি যেন খেলা করছে। কাছে গিয়ে দেখি, ওরা পলাশ ফুল দিয়ে রাস্তার ওপর নিজেদের নাম লেখার খেলায় ব্যস্ত।

‘এত ফুল কোথা থেকে পেলি?’

একজন বলল, ‘গাছ থিক্যা পাড়লাম গো।’

‘কোথায় থাকিস তোরা?’

‘ইতো সামনের গেরামটায়।’

দু’জনের বয়স ছয়-সাত বছর হবে। অন্য দু’জন একেবারেই ছোটো। দলের মধ্যে সবচেয়ে বড়ো মেয়েটি অনর্গল বলে চলে নাম, ঠিকানা, কোন স্কুলে পড়ে, বাড়িতে কে কে আছে ইত্যাদি। তার মাঝেই কৌতূহলী হয়ে জেনে নেয়, আমরা কোন হোটেলে উঠেছি। গ্রাম্য সরলতায় আবদার করে বসে– দিদি তোমার সঙ্গে ছবি তুলব। ছবি পর্ব শেষ করে সামনের দিকে এগোতে লাগলাম।

পেছন থেকে ছোটো মেয়েটি বলে উঠল– ‘তুমি পলাশ ফুল নিবে?’ উত্তরের অপেক্ষা না করেই দেখি বড়ো মেয়ে দুটির মধ্যে একজন তরতরিয়ে রাস্তার পাশে একটি গাছে উঠে পড়েছে। দাঁড়িয়ে পড়লাম। মেয়েটি একগুচ্ছ পলাশের ডাল নিয়ে এল। গ্রাম্য আদিবাসী বালিকাদের সারল্য ও ভালোবাসায় ভরা এই উপহার যেন– সারা জীবনের প্রাপ্ত উপহারগুলির মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ।

গ্রামটিতে বেশ কয়েকটি ঘরের বাস। মাটির রাস্তার দুপাশে সযত্নে তৈরি আড়ম্বরহীন দৈন্য মাটির বসতি। চোখে পড়ল একটি বড়ো পাতকুয়ো। মেয়েরা জল তোলায় ব্যস্ত। আরও কিছুটা হাঁটার পর নজরে এল প্রাথমিক বিদ্যালয়। জিজ্ঞেস করে জানলাম, এরপর পড়াশোনা করতে হলে যেতে হয় মুরাডিতে। বড়ন্তি থেকে মুরাডির দূরত্ব ৬ কিলোমিটার। বাঁদিকের ঘরগুলির পেছন থেকেই বড়ন্তি পাহাড় শুরু।

পাহাড়ে ওঠার রাস্তা খুঁজছি! গ্রামের এক যুবতি বধূ বলল, ‘আমরা রোজ সকালে কাঠ আনতে পাহাড়ে উঠি। কাল সকালে আমাদের সাথে যেও। না হলে পথ হারিয়ে যাবে। তাছাড়া জঙ্গলে অনেক জন্তু-জানোয়ার আছে। এখন বেলা হয়ে গেছে, পাহাড়ে চড়তে কষ্ট হবে।’বাহ্ এ তো মেঘ না চাইতেই জল। খুব ভালো, তবে কালই হবে পাহাড় অভিযান।

হোটেলে ফিরে স্নান খাওয়া সেরে নিলাম। বেলা একটু পড়লে লেকের ধারে যাব ঠিক হল। দিঘির টলটলে কালো জলে সূর্যাস্তের দৃশ্য বড়োই মনোরম। আগের বার অবশ্য জমির ওপর আল বরাবর হেঁটেই লেকে পৌঁছেছিলাম। হোটেলের দুটি পোষ্য সারমেয় রাস্তা চিনিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। সেই অদ্ভুত আনুগত্য এখনও ভুলতে পারিনি। গ্রীষ্মে লেকের জল কম থাকে। সামনে বেশ অনেকটা ডাঙা এবং জলজ আগাছা ভেসে ওঠে। রাস্তার ঢাল বেয়ে নেমে পড়েছিলাম স্নানের আনন্দ নিতে।

বিকেলে বসন্তের সৗন্দর্য উপভোগ করতে, রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে লেকের সামনে পৌঁছোলাম। এখন অবশ্য লেকে জল বেশি, থইথই জল কয়েক ফুট উঁচু রাস্তার ঢালের নীচ পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে। বাঁদিকের গাছগুলির ডালের ফাঁকফোকরে সূর্য লুকোচুরি খেলছে। এইসময় বড়ন্তিতে পর্যটক বেশি থাকেন। প্রায় প্রত্যেকেই সূর্যাস্তের দৃশ্য উপভোগের উদ্দেশ্যে লেকের পাশের রাস্তা বরাবর মৃদুমন্দ গতিতে হেঁটে বেড়াচ্ছেন।

একজন বয়স্ক ভদ্রমহিলা হাঁটতে হাঁটতে উচ্চস্বরে রবীন্দ্রসংগীত গাইছেন। সূর্য দিন আহ্নিক শেষ করে দিঘির ওপাশের পাহাড়ে বিশ্রাম নিচ্ছে। পশ্চিম আকাশের রং ধীরে ধীরে পালটে গেল। মনে হল আগুনের একটা গোল বল যেন পাহাড় থেকে গড়িয়ে দিঘির জলে টুপ করে ডুবে গেল।

পরদিন সকালে তাড়াতাড়ি ঘুম ভাঙল। ট্রেকিং করে পাহাড়ে উঠব, একি কম রোমাঞ্চের! তৈরি হয়ে নিলাম। সেই ছোট্ট মেয়েটি ডাকতে এল। কতটা ওপরে উঠতে পারব জানি না। পাহাড়টা বেশ খাড়াই। একজনের বাড়ির উঠান পেরিয়ে জঙ্গলে ঢুকলাম। সঙ্গী যুবতি বধূটি বলল, পুরো শীতকাল ধরে ওরা কাঠ সংগ্রহ করে। সারা বছরের জন্য মজুত করে, বিশেষ করে বর্ষাকালের জন্য।

পায়ের নীচে শুকনো পাতার পুরু স্তর। পাতার মর্মর শব্দ কানে বাজছে। ধারে কাছে কোনও প্রাণী থাকলে এই শব্দে নিশ্চিত পালাবে বা সতর্ক হয়ে যাবে। ধীরে পা ফেলার চেষ্টা করলাম যাতে শব্দ না হয়। না, বৃথাই চেষ্টা। জঙ্গলটি বেশ ঘন। তবে বেশিরভাগ গাছেই সব পুরোনো পাতা ঝরে গিয়ে নতুন কচি পাতা এসেছে। একটা লম্বা ঢ্যাঙা গাছে বড়ো বড়ো হলুদ ফুল ফুটে আছে। বেশ সুন্দর দেখতে।

একটানা অনেকটা উঠে হাঁফ ধরে গেল। দাঁড়িয়ে বিশ্রাম নিচ্ছি, হঠাৎ যুবতিটি বলে উঠল, ওপরে ডান দিকে হরিণের দল। আমাদের চোখ ওই পর্যন্ত পৌঁছোল না। ঝোপ-ঝাড়, গাছের ডালে আটকে গেল। তাছাড়া ওই দিকটা বেশ ঘন জঙ্গল, আলো কম। কই, কোথায়…? প্রশ্ন করলাম। ওই যে ওই দিকে, আমাদের উপস্থিতি টের পেয়ে, এক জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়েছে, মেয়েটি বলল। অনেক কষ্টে নজরে এল স্বাস্থ্যবান হরিণগুলি। অনেকগুলি একসাথে রয়েছে। ওরা খাবারের সন্ধানে নীচে নামছিল। আর একটু ওপরে উঠতে গেলাম, হরিণগুলি ঝোপের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল।

এই অরণ্যে বুনো খরগোশ, বুনো শূকরও আছে। মাঝে মাঝে দেখা মেলে নেকড়ে বা হায়নারও। সামনে আর একেবারেই রাস্তা নেই। ডাল, পাতা, ঝোপ সরিয়ে রাস্তা তৈরি করে ওপরে উঠতে হচ্ছে। এখান থেকে পাহাড় আরও খাড়া হয়ে গেছে। আর ওপরে উঠলে নামতে বড়োই কষ্ট হবে। আর এগোনো ঠিক হবে না। একটা পাথরের ওপর বসলাম। এই জায়গাটা কিছুটা ফাঁকা, দূরে দেখা যাচ্ছে মুরাডি পাহাড়, বড়ন্তি নদী এবং বিশাল লেক। আরও দূরে দিগন্তরেখা, এত ওপর থেকে গ্রাম, পাহাড়, দিঘি, নদী, জঙ্গল এবং অবশ্যই পলাশ বন অপূর্ব, অনবদ্য, অবর্ণনীয়, নয়নাভিরাম দৃষ্টিসুখ দিচ্ছে। বেশ খানিকক্ষণ এই প্রাকৃতিক শোভার পরশ নিয়ে ধীরে ধীরে নীচে নেমে এলাম।

হোটেলে ফিরে এলাম। আশপাশের গ্রাম এবং এই শান্ত-নির্জন পরিবেশের স্বাদ নেওয়ার উদ্দেশ্যে একটি গাড়ি ঠিক করে ফেললাম। ধুলো উড়িয়ে গ্রামের মধ্যে দিয়ে গাড়ি এগিয়ে চলল। শালের জঙ্গলের ভিতর দিয়ে গাড়ি এসে থামল একটি গ্রামের মুখে। গ্রামটির নাম রামজীবনপুর। এখানে সব ঘরই সাঁওতালদের। সম্ভবত রামচন্দ্র মহাশয় এখনও বনবাস থেকে ফেরেননি। তাই রাম বাদে জীবনপুর নামটি প্রচলিত।

ধুলোভরা পথে হাঁটতে লাগলাম। ছোটো বাচ্চাগুলো রাস্তার ওপর খেলা করছে। পরিষ্কার ঝকঝকে মাটির বাড়ি দুপাশে। দেয়ালে রঙিন কারুকার্য করা একটি বাড়িতে ঢুকলাম। নিত্য প্রয়োজনীয় সামান্য কয়েকটা জিনিস, কিন্তু কি গোছানো সংসার। পঁচিশ-তিরিশ বছরের এক সাঁওতাল বধূ। আমাদের হঠাৎ আগমনে একটু আড়ষ্ট বোধ করছে মনে হল।

‘তোমার কয়টি সন্তান?’ একজন প্রশ্ন করল।

‘একটা বটে।’

‘কত বড়ো?’

‘ছয় ক্লাসে পড়ে’ – মেয়েটি উত্তর দিল।

‘একটি কেন? আর নেওনি?’ – আবারও প্রশ্ন ধেয়ে আসে।

মেয়েটি উত্তর দেয়– ‘না একটাই ভালো।’একটু থেমে বলল, ‘অ্যাত্তা পয়সা কুথায় পাবো, একটাকে তবু মানুষ করা সহজ বটে।’

অখ্যাত অজ পাড়াগাঁয়ের এক সাঁওতাল রমণী, হয়তো সারা জীবনে স্কুলের চৌকাঠ মাড়ানোর সুযোগ পায়নি, সভ্যজগৎ ও উন্নত সংস্কৃতি থেকে মাইলের পর মাইল দূরে, শহর বলতে যার ধারণা মুরাডি পর্যন্ত সীমিত, এরকম একজন পেছনের সারির মহিলার কাছে এমন বুদ্ধিদীপ্ত উত্তর শুনে আমি থমকে গেলাম। আমি নিশ্চিত নই আমার পাড়ার সবকটা বাড়ি ঘুরলেও এমন ভাবনার প্রকাশ বা সমর্থন পাব কিনা!

কেউ উঠানে বসে বড়ো কড়াইতে ধান সেদ্ধ করছে, কেউবা দাওয়ায় বসে হুঁকো টানছে, কেউ গেরস্থলির নিত্য কর্মে ব্যস্ত। পুরুষ ও মহিলাদের বিভিন্ন দৈনিক কাজ দেখতে দেখতে এগিয়ে চললাম। কিন্তু এই ব্যস্ততার মাঝেও আথিতেয়তার বিন্দুমাত্র অভাব নজরে পড়ল না। কখনও চা, জল খাওয়ার অনুরোধ, আবার কখনও তাড়াহুড়োয় গাছ থেকে পাড়া কুল হাতে গুঁজে দেওয়া, সবকিছুই মনে গেঁথে রইল।

আমাদের দেরি দেখে ড্রাইভার গ্রামের ভেতরে গাড়ি নিয়ে চলে এলেন। বললেন ‘চলুন, এরপর অন্ধকার নেমে এলে আর কিছুই দেখা হবে না।’জীবনপুর গ্রাম ছেড়ে এগিয়ে গেলাম ছোট্ট বড়ন্তি ড্যামটির দিকে। হাঁ করে রাস্তার দুপাশে তাকিয়ে আছি। মুগ্ধ হয়ে দেখছি, চারিদিকে শুধু লাল আর লাল পলাশ। ড্রাইভার দাদা বললেন, ‘আপনাদের এবার পলাশের বনে নিয়ে যাব। আহা!

‘পিন্দারে পলাশের বন

পালাবো পালাবো মন।’

সূর্য দিগন্তের কাছাকাছি চলে এসেছে। যেখানে নামলাম সেখানে অন্য গাছ বিশেষ একটা নেই। কেবলই কিংশুকের মাহাত্ম্য দিকে দিকে। গাছগুলি ফুলে ঠাসা। প্রকৃতি যেন গেরুয়া আবিরে আমাদের স্বাগত জানাচ্ছে। পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণ, ওপর-নীচ যেদিকেই তাকাই শুধুই পলাশ আর পলাশ। গাছগুলি একটু নাড়া দিলেই ঝুপঝুপ করে ফুলের বৃষ্টি হচ্ছে। মনে হল স্বর্গের অমরাবতী-বাটিকা। দেবতারা বুঝি পুষ্প বৃষ্টি করছেন। সূর্যদেব বন পলাশে গা ঢাকা দিলেন। এই গোধূলি বেলায় এক আশ্চর্য অনুভবে প্রাণ মন ভরে গেল। ফিরে চললাম বড়ন্তি লেকের দিকে।

মেঠো পথ ধরে অন্ধকার নেমে এল। হোটেলে ফিরে দেখলাম সামনের গ্রামের বাচ্চা মেয়েগুলো আমাদের জন্য পলাশ ফুলের মালা গেঁথে রেখে গেছে। এই হোটেলের ভিতরটা বেশ সাজানো-গোছানো। পুরো ক্যাম্পাস জুড়ে বিভিন্ন বৈদ্যুতিক আলো লাগানো আছে। গ্রামেও বিদ্যুৎ আছে। কিন্তু বাকি পুরো অঞ্চলটি ঘুটঘুটে অন্ধকার।

ঘড়ি দেখলাম– প্রায় আটটা বাজে। হঠাৎ মাদলের শব্দ কানে এল। খুব কাছেই কোথাও বাজাচ্ছে। খানিক বেজে থামল… আবার বেজে উঠল। দোতলার বারান্দায় এসে দেখার চেষ্টা করলাম, কিন্তু মিশমিশে অন্ধকারে কিছুই দেখা গেল না। এক নাগাড়ে বেজে চলেছে। এবার থাকতে না পেরে প্রায় দৗড়ে গেটের বাইরে বেরোলাম। কিছুই বুঝতে পারছি না। আমাদের পাশের ঘরের দুজনও বেরিয়ে এসেছেন। প্রত্যেকেই কৗতুহলী।

গ্রামের সামনের রাস্তায় ঝাপসা আলো। ঠাহর করলাম কয়েকজন সাঁওতাল মেয়ে নাচের সাজে বেশ পরিপাটি করে সেজেছে। এবং আমরা কিছু জিজ্ঞাসা করবার আগেই অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে গেল। মাদলের শব্দও ধীরে ধীরে মৃদু হচ্ছে।

বাইরে হালকা ঠান্ডা, হিম পড়ছে, কিন্তু রুম থেকে সোয়েটার আনতে গেলে দেরি হয়ে যাবে। মোবাইলটাও আনতে ভুলে গেছি। মাদলের শব্দ লক্ষ্য করে আমরা কজন অন্ধকারেই হাঁটতে লাগলাম। নিজের গা পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছি না। মনে হল কে যেন দৗড়ে এসে হাতটা ধরল। নরম ছোটো দুটি হাত!

‘কে রে– কেয়েল?’

‘হ্যাঁ দিদি। সেই ছোট্ট মেয়েটি।

অন্ধকারে দেখতে পাওয়াটা একটা অভ্যাসের ব্যাপার। ওর কাছেই জানলাম পলাশবাড়িতে আজ সাঁওতাল নাচের আয়োজন হয়েছে। ওরা ওখানেই যাচ্ছে। ‘চলো তোমাদের নিয়ে যাচ্ছি – বাচ্চা মেয়েটি বলল।

সাঁওতাল গান এবং মাদলের তালে তালে নাচের অদ্ভূত ছন্দ এসবই উপরি পাওনা। একটু আগে পর্যন্ত জানতাম না যে এমন সাঁওতালি নাচ চাক্ষুষ করব। এ যেন ষোলোকলা পূর্ণ হল। মন ও শরীর নেচে উঠল তালে তালে। কোয়েলের কাছে নাচের কয়েকটা স্টেপও শিখে নিলাম। নিকষ কালো আকাশে অসংখ্য তারার সাথে আমরাও সাক্ষী হয়ে রইলাম এই অপূর্ব সুন্দর মুহূর্তের।

ফাগুনের আগুনে, বসন্তের শিহরণে, পাহাড়ের নির্জনতায়, নিস্তরঙ্গ দিঘির পড়ন্ত সৗন্দর্যে, গ্রাম্য আথিতেয়তায়, সাঁওতাল বালিকাদের সারল্যে আর ভালোবাসায় দুটো দিন সত্যিই উৎসবের মতো কেটে গেল। এই নির্মল আনন্দ নিয়ে কাল কোলাহলময় রুটিন জীবনে ফিরে যাওয়ার পালা।

বড়ন্তি থেকে বেশ কয়েকটি জায়গা ঘুরে দেখা যায়। গাড়ি ভাড়া করে যাওয়া যায় প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত গড়পঞ্চকোটে। নির্জন, গাঢ় সবুজের মাঝে পঞ্চকোট পাহাড়ে কাটানো যায় কিছুক্ষণ। বর্গীদের আক্রমণে ধবংস হয়ে যাওয়া কাশীপুর রাজার তৈরি দুর্গের ধবংসাবশেষ এবং মন্দির দর্শন করে চলে যাওয়া যায় পাঞ্চেৎ ড্যাম দেখতে। যাওয়া যায় প্রায় ২১ কিলোমিটার দূরের জয়চণ্ডী পাহাড়ে। এখানেই সত্যজিৎ রায়ের বিখ্যাত ছবি হীরক রাজার দেশের কয়েকটি দৃশ্য চিত্রায়িত হয়েছিল। এছাড়া যাওয়া যায় মাইথন জলাধার এবং কল্যাণেশ্বরী মন্দিরে (দূরত্ব প্রায় ৩৮ কিলোমিটার)। বড়ন্তি থেকে বিহারিনাথ পাহাড়ের দূরত্ব প্রায় ২৫ কিলোমিটার এবং শুশুনিয়া পাহাড় ৪০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

তবে আর দেরি কেন? এই বসন্তেই পাড়ি দেওয়া যাক লাল মাটি আর পলাশের দেশে।

কীভাবে যাবেন – হাওড়া থেকে ট্রেনে আসানসোল। আসানসোল থেকে আদ্রা লাইন ধরে ট্রেনে বার্নপুর, দামোদর, মধুকুণ্ডা হয়ে পরবর্তী স্টেশন মুরাডি। মুরাডিতে নেমে গাড়ি করে বড়ন্তি (দূরত্ব ৬ কিমি)। আসানসোল থেকে সরাসরি গাড়ি করেও মুরাডি যাওয়া যায়। দূরত্ব প্রায় ৪৫ কিলোমিটার, কম বেশি এক ঘন্টায় পৌঁছে যাওয়া সম্ভব। তবে মুরাডিতে গাড়ির ব্যবস্থা সুবিধাজনক নয়। তাই হোটেলে আগে থেকে বললে ওনারাই গাড়ি পাঠিয়ে দেন।

কোথায় থাকবেন – বড়ন্তিতে থাকার অনেক হোটেল আছে।

কখন যাবেন – বছরের যে কোনও সময় বড়ন্তি যাওয়া যেতে পারে। তবে বসন্তে বড়ন্তির রূপ ও সৗন্দর্য আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব