ঘুমের মান উন্নত করার বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ

ঘুম মানুষের স্বাস্থ্য এবং সুস্থতা বজায় রাখার জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় জৈবিক প্রক্রিয়াগুলির মধ্যে একটি। এর গুরুত্ব সত্ত্বেও, আধুনিক জীবনে, বিশেষকরে কিশোর এবং তরুণদের মধ্যে পর্যাপ্ত ঘুম ক্রমশ বিরল হয়ে উঠছে। গত প্রায় এক দশক ধরে গড় ঘুমের সময়কাল উদ্বেগজনক ভাবে হ্রাস পেয়েছে। এই বিষয়ে কলকাতা-র আনন্দপুর অঞ্চলে অবস্থিত ফর্টিস হাসপাতাল-এর ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের কনসালটেন্ট ডা. জয়দীপ ঘোষ জানিয়েছেন, অনেক কিশোর-কিশোরী এখন নির্দিষ্ট সময়ের চেয়ে দুই থেকে তিন ঘন্টা কম ঘুমোচ্ছে। এই ক্রমবর্ধমান ঘুমের ঘাটতি মানসিক এবং শারীরিক উভয় স্বাস্থ্যের জন্যই গুরুতর প্রভাব ফেলছে, যা ঘুমের স্বাস্থ্যবিধিকে একটি প্রধান জনস্বাস্থ্য উদ্বেগের বিষয় করে তুলেছে।

কিশোর-কিশোরীদের মস্তিষ্কের বিকাশ এবং মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য প্রতি রাতে আট থেকে দশ ঘন্টা ঘুমানোর পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা। দুর্ভাগ্যবশত, জীবনযাত্রার পরিবর্তন, শিক্ষাগত চাপ এবং ডিজিটাল ডিভাইসের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে স্বাভাবিক ঘুমের চক্র উল্লেখযোগ্য ভাবে ব্যাহত হয়েছে। অনেক তরুণ-তরুণী এখন দেরিতে ঘুমোতে যায় এবং তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে ওঠে, যা দীর্ঘস্থায়ী ঘুমের অভাব তৈরি করে।

অপর্যাপ্ত ঘুমের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক পরিণতিগুলির মধ্যে একটি হল মানসিক স্থিতিশীলতার উপর এর প্রভাব। ঘুম-বঞ্চিত কিশোর-কিশোরীদের অতিরিক্ত বিরক্তি, মেজাজের পরিবর্তন এবং বর্ধিত মানসিক সংবেদনশীলতা দেখা গেছে ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায়। আসলে, ঘুমের অভাব মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতাকে ব্যাহত করে, যা উদ্বেগ, রাগ এবং হতাশাজনক প্রবণতার জন্য আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। যখন মস্তিষ্ক পর্যাপ্ত বিশ্রাম পায় না, তখন দৈনন্দিন চ্যালেঞ্জগুলি মোকাবেলা করতে অসুবিধা হতে পারে।

Doctor's advice on improving sleep quality
Dr. Joydeep Ghosh

এই মানসিক ব্যাঘাতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ভাবে সম্পর্কিত হল ঘুম-বঞ্চিত কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে আবেগপ্রবণ কিংবা আক্রমণাত্মক আচরণের বৃদ্ধি। অপর্যাপ্ত ঘুম মস্তিষ্কের সেই অঞ্চলগুলিকে প্রভাবিত করে, যা আবেগ নিয়ন্ত্রণ, বিচার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য দায়ী। ফলস্বরূপ, যেসব কিশোর-কিশোরী নিয়মিত ভাবে নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম ঘুমোয়, তারা অতিরিক্ত বিরক্তি প্রকাশ করে, বন্ধুদের সঙ্গে ঝামেলা করে কিংবা তাদের ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পেতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী ঘুমের অভাব আচরণগত সমস্যাগুলির দিকে ঠেলে দিতে পারে, যা সামাজিক সম্পর্ক এবং শিক্ষাজীবনকে প্রভাবিত করে।

সুস্থ মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য ঘুমও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত ঘুমের মাধ্যমে মস্তিষ্ক স্মৃতিশক্তি বাড়ায় এবং স্নায়ু মেরামত সহ বেশ কয়েকটি পুনরুদ্ধারমূলক প্রক্রিয়া সম্পাদন করে। এটি বিশেষকরে বয়ঃসন্ধিকালে গুরুত্বপূর্ণ, যখন মস্তিষ্ক দ্রুত কাঠামোগত এবং কার্যকরী বিকাশের মধ্য দিয়ে যায়। পর্যাপ্ত ঘুম মস্তিষ্ককে নতুন অর্জিত তথ্য সংগঠিত করতে, স্নায়ু সংযোগগুলিকে শক্তিশালী করতে এবং জেগে থাকার সময় জমা হওয়া বিপাকীয় বর্জ্য পদার্থ পরিষ্কার করতে সহায়তা করে। যখন ঘুমের সময়কাল অপর্যাপ্ত হয়, তখন এই গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়াগুলি ব্যাহত হয়, শেখার ক্ষমতা এবং সামগ্রিক জ্ঞানীয় কর্মক্ষমতাকে কমিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।

শিক্ষাক্ষেত্রে কম ঘুমের প্রভাব স্পষ্ট ভাবে দৃশ্যমান। দীর্ঘস্থায়ী ঘুমের অভাব ভোগকারী কিশোর-কিশোরীদের প্রায়ই ক্লাসে মনোযোগ দিতে অসুবিধা, স্মৃতিশক্তি হ্রাস এবং পড়াশোনার দক্ষতা হ্রাস পায়। বিপরীতে, যারা নিয়মিত ঘুমের রুটিন বজায় রাখেন, তারা পড়াশোনায় আরও ভালো পারফর্ম করেন, তাদের মনোযোগ বৃদ্ধি পায় এবং মানসিক সুস্থতাও বজায় থাকে।

মস্তিষ্কের উপর এর প্রভাবের পাশাপাশি, শারীরিক স্বাস্থ্য বজায় রাখার জন্য ঘুম সমান ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অপর্যাপ্ত ঘুম রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে, সংক্রমণ এবং অসুস্থতার জন্য আরও সংবেদনশীল করে তোলে। এটি ক্রমাগত ক্লান্তি, মাথাব্যথা এবং শারীরিক শক্তি হ্রাসেও অবদান রাখে। দীর্ঘস্থায়ী ঘুমের অভাব বিপাকীয় নিয়ন্ত্রণকে ব্যাহত করতে পারে, স্থূলতা, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য জটিলতার ঝুঁকি বাড়ায়।

আধুনিক জীবনযাত্রার কু-অভ্যাস এই ক্রমবর্ধমান ঘুমের ঘাটতির জন্য দায়ী। ডিজিটাল স্ক্রিনের অতিরিক্ত সংস্পর্শ এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ। স্মার্টফোন, ট্যাবলেট এবং কম্পিউটার নীল আলো নির্গত করে, যা শরীরের স্বাভাবিক ঘুম চক্র নিয়ন্ত্রণের জন্য দায়ী হরমোন মেলাটোনিনের উৎপাদনে প্রভাব ফেলে। কিশোর-কিশোরীরা যখন দীর্ঘ সময় ডিজিটাল ডিভাইসে সময় কাটায়, বিশেষ করে রাত্রে, তখন মস্তিষ্ক উদ্দীপিত থাকে, যার ফলে ঘুম শুরু হতে বিলম্ব হয় এবং মোট ঘুমের সময়কাল হ্রাস পায়।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল— তরুণদের মধ্যে শারীরিক কার্যকলাপ হ্রাস। বসে থাকা এবং দীর্ঘ সময় ধরে স্ক্রিন টাইম শরীরের বিশ্রামের জন্য স্বাভাবিক ড্রাইভকে হ্রাস করে। অন্যদিকে, নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম সার্কাডিয়ান ছন্দ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে এবং ঘুমের মান উন্নত করে।

এই বাস্তবতাগুলি বিবেচনা করে, স্বাস্থ্যকর ঘুমের অভ্যাস স্বাস্থ্যসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠেছে। পিতামাতার উচিত, ঘুমের আগে সন্তানের স্ক্রিন এক্সপোজার সীমিত করা এবং কিশোর-কিশোরীরা যাতে দিনের বেলা নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপে নিযুক্ত থাকে, তা নিশ্চিত করা। সেইসঙ্গে চাই, শান্ত, আরামদায়ক ঘুমের পরিবেশ।

ছোটোদের দীর্ঘস্থায়ী ঘুমের অভাবের লক্ষণগুলি শনাক্ত করাও গুরুত্বপূর্ণ। ক্রমাগত ক্লান্তি, বিরক্তি, মনোযোগে অসুবিধা এবং ঘন ঘন মেজাজের পরিবর্তন—এই সবই অপর্যাপ্ত ঘুমের ইঙ্গিত দিতে পারে। যখন এই ধরনের লক্ষণগুলি অব্যাহত থাকে, তখন অন্তর্নিহিত ঘুমের ব্যাধি বা আচরণগত ধরণগুলি শনাক্ত করার জন্য একজন চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করা প্রয়োজন হতে পারে। অর্থাৎ, ঘুমকে বিলাসিতা কিংবা দৈনন্দিন জীবনের একটি ঐচ্ছিক দিক হিসাবে দেখা উচিত নয়। এটি একটি মৌলিক জৈবিক প্রয়োজনীয়তা, যা মানসিক ভারসাম্য, জ্ঞানীয় বিকাশ এবং শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখে।

উপবাসের পর হজমজনিত সমস্যা এড়ানোর বিশেষ উপায়

ধর্মীয় কারণে অনেক মানুষ সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত উপবাস করেন। এই ক্ষেত্রে, ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম (IBS), অ্যাসিডিটি কিংবা গ্যাস্ট্রাইটিসের মতো হজমজনিত ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল স্বাস্থ্য বজায় রাখার জন্য বিশেষ যত্ন নেওয়া উচিত। এই বিষয়ে বিস্তারিত পরামর্শ দিয়েছেন কলকাতা-র মুকুন্দুপুরে অবস্থিত মণিপাল হাসপাতাল-এর গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের পরিচালক ডা. প্রদীপ্ত কুমার শেঠি।

সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত অভুক্ত থাকলে খাদ্যাভ্যাস এবং হজমের ছন্দ পরিবর্তন করে শরীর।  দীর্ঘ সময় ধরে খাবার না খাওয়ার পর হঠাৎ ভারী খাবার খাওয়ার ফলে কখনও কখনও হজমে সমস্যা দেখা দিতে পারে। ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম-এ আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে, অনিয়মিত খাওয়ার ধরণ পেটে ব্যথা, পেট ফাঁপা, কোষ্ঠকাঠিন্য কিংবা ডায়রিয়ার মতো লক্ষণগুলিকে আরও খারাপ করতে পারে। একই ভাবে, অ্যাসিডিটি কিংবা গ্যাস্ট্রাইটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা খাবার খাওয়ার বিষয়টি যদি সঠিক ভাবে পরিকল্পনা না করেন, তাহলে তাদের বুক জ্বালা, পেটে জ্বালা কিংবা অ্যাসিড রিফ্লাক্স বৃদ্ধি পেতে পারে।

Ways to avoid digestive problems after fasting
Dr. Pradeepta Kumar Sethy

মনে রাখবেন, সবচেয়ে সাধারণ ভুলগুলির মধ্যে একটি হল উপবাসের পর অতিরিক্ত খাওয়া। প্রচুর পরিমাণে তৈলাক্ত খাবার এবং মশলাদার খাবার খাওয়া পেটের আস্তরণে জ্বালাপোড়া করে এবং অতিরিক্ত অ্যাসিড উৎপাদনকে উদ্দীপিত করে। গ্যাস্ট্রাইটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে, এটি পেটের আস্তরণের প্রদাহকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে এবং জ্বালাপোড়া, বমি বমি ভাব কিংবা পেটের উপরের অংশে অস্বস্তির মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।

এই ধরনের সমস্যা প্রতিরোধ করার জন্য, উপবাস ভাঙার পর অল্প অল্প খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। খেজুর, ফল কিংবা স্যুপের মতো হালকা খাবার দিয়ে শুরু করুন। এটি পাচনতন্ত্রকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক করতে সহায়তা করে। ভারী খাবার কিংবা ভাজা খাবার খাওয়া এক্ষেত্রে এড়িয়ে চলুন, যা অ্যাসিডিটি এবং বদহজমের কারণ হতে পারে।

ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম-এ আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য সুষম এবং সহজে হজমযোগ্য খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। যেসব খাবার ট্রিগার হিসেবে পরিচিত, যেমন খুব মশলাদার খাবার, ক্যাফেইন, কার্বনেটেড পানীয় এবং অত্যন্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার সীমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত। পরিবর্তে, ভাত, শাকসবজি, চর্বিহীন প্রোটিন এবং দইয়ের মতো ঘরে রান্না করা সাধারণ খাবার অন্তর্ভুক্ত করা উচিত, যা সাধারণত হজম করা সহজ।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল— হাইড্রেশন। উপবাসের সময় ডিহাইড্রেশন ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম-এ আক্রান্ত রোগীদের কোষ্ঠকাঠিন্যকে আরও খারাপ করতে পারে এবং হজমের অস্বস্তিকে বাড়িয়ে তুলতে পারে। অতএব, নিয়মিত জল পান করে এবং চিনিযুক্ত পানীয় সীমিত করে উপবাস ভাঙা উচিত।

যারা নিয়মিত অ্যাসিডিটি কিংবা গ্যাস্ট্রাইটিসের জন্য ওষুধ গ্রহণ করেন, তাদের দীর্ঘদিন উপবাস করার আগে, চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। চিকিৎসকরা এ ক্ষেত্রে অ্যাসিড-দমনকারী ওষুধ দিয়ে সমস্যামুক্ত করতে পারেন।

ধর্মীয় কারণে মৃত্যু খুব মর্মান্তিক

পহেলগামে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা যেমন মর্মান্তিক, ঠিক তেমনই মহাকুম্ভে পদদলিত হয়ে মারা যাওয়া কিংবা গোয়ার সিরগাঁওয়ের লাইরাই দেবী মন্দিরে পদদলিত হয়ে মারা যাওয়াও সমান ভাবে মর্মান্তিক। আসলে কোনও মৃত্যুই কাম্য নয় এবং সব মৃত্যুই মর্মান্তিক। তবে ধর্মের জন্য মৃত্যুবরণ করার মতো মর্মান্তিক আর কী হতে পারে!

মানুষের ধারণা যেখানে ধর্ম করলে রক্ষা পাওয়া যায়, বিপদ থেকে উদ্ধার হওয়া যায়, সুখ-সম্পদে ভরে ওঠে, পরবর্তী জীবনে কিংবা মৃত্যুর পরে সুখী থাকা যায়, সেই ধর্ম কীভাবে পরিবারের উপর মৃত্যুর বোঝা চাপিয়ে দেয়, মহিলাদের বিধবা করে অকালে, শিশুদের অনাথ করে, শ্রমজীবী মানুষের জীবন কেড়ে নেয়! ধর্মের এ কেমন পরিহাস! মৃত্যুর জন্য কেবল মন্দিরে আসা হাজার হাজার ধর্মান্ধরাই দায়ী নয়। প্রত্যেক ব্যক্তিই দায়ী, যারা বিশ্বাস করে যে, মন্দিরে গেলেই জীবন সুখ-সম্পদে ভরে ওঠে। আসলে ধর্ম করতে গিয়ে আমরা সব ধরণের শৃঙ্খলা ভঙ্গ করি।

কিন্তু এটা কেমন ধর্ম যে, তার ভক্তদের সঠিক পথে চলতে শেখাতে পারে না! আপনাকে কখন আসতে হবে, কোন সময়ে পূজা করতে হবে, কোন পূজার কী কী উপকরণ আনতে হবে, কত দান করতে হবে, কী পরতে হবে, কী খুলতে হবে, তা বলে দেয় ধর্মের দোকানদাররা কিন্তু তারা বলতে পারে না কীভাবে ধীরেসুস্থে আসতে হবে, কীভাবে দাঁড়াতে হবে, কীভাবে মন্দিরে পৌঁছানোর জন্য ধৈর্য নিয়ে যেতে হবে। যদি ধর্মই সব সমস্যার সমাধান করতে পারে, তাহলে প্রশাসন কেন সমস্যা মেটাবে? পুলিশ কেন পরিশ্রম করবে? এ তো সর্বশক্তিমান সেই দেবতাদের করা উচিত।

এক্ষেত্রে নারীদের দুর্দশা সবচেয়ে বেশি। কারণ, ধর্মস্থানে পৌঁছানোর জন্য তাদের কেবল মাইলের পর মাইল হাঁটতে হয় না, পুজোর উপকরণও বহন করতে হয়, বাচ্চারা যদি ছোটো থাকে তাহলে তাদেরও বহন করতে হয়। আসলে, তাদের মগজ ধোলাই করা হয়েছে যে, স্বামীর উদাসীনতা, শাশুড়ির নিষ্ঠুরতা, অর্থের অভাব, মেয়ের বিয়ে এবং পরিবারের সদস্যদের স্বাস্থ্য সমস্যা মেটানোর জন্য তাকে পূজার্চনা করতেই হবে। ধর্ম-ই যেন বিপদ থেকে মুক্তিলাভের একমাত্র পথ। কিন্তু মনে রাখবেন, যত বেশি ধর্ম নিয়ে মেতে থাকবেন, বাস্তবের বাইরে থাকবেন, মস্তিষ্কে ততই মরচে পড়ে বুদ্ধিনাশ হবে, ফলে লাভবান হবে ধান্দাবাজরা। আর ধর্ম করে কী পাবেন? অকাল মৃত্যু, কখনও কোনও কারণ ছাড়াই বিধবা হবেন এবং কখনও আবার হারাতে হবে সন্তানকে।

নাগার্জুনকোন্ডা থেকে ইথিপোথালা (শেষ পর্ব)

প্রায় দেড় হাজার বছর পর নাগার্জুনকোন্ডা উপত্যকা প্রচারের আলোয় আসে। ১৯৬২ সালে এআর সরস্বতীর উদ্যোগে ভারতীয় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ব্যাপক খননকার্য চালিয়ে, প্রস্তর যুগ থেকে মধ্যযুগের মাঝামাঝি পর্যন্ত বহু নিদর্শন খুঁজে পান। বৌদ্ধস্তুপ, বিহার, চৈত্য ও মণ্ডপের ধ্বংসাবশেষ ছাড়াও পাওয়া যায় বহু হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি, মুদ্রা, নব্যপ্রস্তর যুগের নরকঙ্কাল, প্রস্তর যুগ ও পরবর্তীকালে ব্যবহৃত অস্ত্রশস্ত্র এবং হাতিয়ার। এই সমস্ত প্রত্নসম্ভার সংরক্ষণ করা হয়, প্রত্নস্থলের কাছেই এক মিউজিয়ামে। এর কিছুদিন পরই দেখা দেয় এই সঙ্কট। এই বিপদের মোকাবিলায় ভারতের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এক অভূতপূর্ব পরিকল্পনা করে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় তা বাস্তবে রূপায়িত করে।

পুরো মিউজিয়ামটি তারা নাগার্জুনকোন্ডা পাহাড়ের টেবিল টপে উঠিয়ে নিয়ে যান। আর গঠন, আকৃতি, আয়তন সমস্ত কিছু অপরিবর্তিত রেখে সতেরোটি নির্মাণের অনুকৃতি নির্মিত হয় এই পাহাড়ের সমতল ভূমিতে। আরও চোদ্দটি এই ধরনের অনুকৃতি নির্মিত হয় বিজয়পুরী থেকে আট কিমি দূরে অনুপু নামক এক গ্রামে।

৪৫ মিনিট লঞ্চযাত্রা শেষে পৌঁছালাম দ্বীপ জেটিতে। জেটি থেকে পাহাড়ি সিঁড়িপথ ধরে উপরে উঠতেই, পাকা সড়ক। সামান্য হাঁটাপথেই মিউজিয়াম। সুন্দর কেয়ারি করা ফুলবাগিচা ঘেরা পরিবেশ। বিজয়পুরী জেটিঘাট থেকেই মিউজিয়ামের টিকিট কাটা ছিল। ভিতরে ঢুকে দেখি, থরে থরে সাজানো প্রস্তর থেকে মধ্যযুগীয় আমলের বিপুল প্রত্নসম্ভার। এর মধ্যে রয়েছে প্রাচীনমুদ্রা, অলংকার, মাটির ভস্মাধার, অগুনতি মূর্তি, ভাস্কর্য, শিলালিপি ইত্যাদি। এছাড়া চতুর্দশ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যে বেশ কিছু হিন্দু মূর্তি। এর মধ্যে রয়েছে যোগনৃসিংহ, মহিষমর্দিনী, গণেশ, শিবশক্তি ইত্যাদি। নজর কাড়ে বুদ্ধের বিশাল স্টোন ইমেজ, বুদ্ধিস্ট অ্যান্টিকস ও সেই সময়কার পটারির বেশ কিছু কালেকশন। রয়েছে নাগার্জুনকোন্ডার বিখ্যাত স্তুপের অনন্য সাধারণ শিল্পকর্মের খণ্ড খণ্ড অংশ বিশেষ। পাশের ঘরে রয়েছে প্রাচীনকালে নাগার্জুনকোন্ডার বৌদ্ধ জনপদটি কেমন ছিল, তার একটি সুন্দর মডেল। অনবদ্য স্তুপটিরও একটি মডেল চোখে পড়ল। আছে প্রস্তরযুগের ব্যবহৃত বিভিন্ন হাতিয়ার।

মিউজিয়ামের পিছনে আছে ক্যাফেটেরিয়া। এই পথটাও ফুলে ফুলে সাজানো। এবার ঝোপ জঙ্গলের মাঝে গ্রাম্য পাকা সড়ক ধরে চললাম সাইট দেখতে। হাঁটতে হাঁটতে হাজির হলাম, এক পুনঃস্থাপিত প্রত্নস্থলে। যেখানে ভাঙাচোরা ইঁট সারির মাঝে দণ্ডায়মান এক বুদ্ধের দর্শন মিলল। এখানে পুনঃনির্মাণ এতটাই সুন্দর যে, মনে হয় যেন দেড় দু-হাজার বছর আগের কোনও বৌদ্ধ সংস্কৃতি কেন্দ্রের ধ্বংসাবশেষের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি। মনশ্চক্ষে দেখতে পাচ্ছি কষায় পরিহিত মুণ্ডিত মস্তক বৌদ্ধ ভিক্ষুদের। প্রার্থনালগ্নে সমবেত হয়েছেন এখানে। স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি সমবেত কণ্ঠে তাদের প্রার্থনা— বুদ্ধং স্মরণং গচ্ছামি, ধম্মং স্মরণং গচ্ছামি, সংঘং স্মরণং গচ্ছামি।

পায়ে পায়ে আরও কয়েকটি পুনঃস্থাপিত প্রত্নস্থল দেখে শেষে লঞ্চঘাটে এলাম। ফেরার পথে ডেকে বসে জলদর্পণেও ইতিহাসকে খুঁজছিলাম। নাগার্জুনকোন্ডার অতীত মনের কোণে অনুরণন তুলছিল। ভাবনায় ভর করছিল বৌদ্ধধর্ম কথা। বিজয়পুরী লঞ্চঘাটে ফিরে পড়ন্ত দুপুরে লাঞ্চ সারা হল। সময়াভাবে ৮ কিমি দূরে অনুপুতে অন্যান্য বৌদ্ধ নিদর্শনগুলি দেখতে যাওয়া হল না৷

ফেরার পথে ১১ কিমি দূরে ইথিপোথালা জলপ্রপাত দেখতে গেলাম। পড়ন্ত বিকালে টিকিট কেটে প্রপাত পরিমণ্ডলে প্রবেশ করলাম। নির্জন শান্ত গাছগাছালি ঘেরা জায়গাটা খুবই মনোরম। চারদিকে পাহাড়ি পরিমণ্ডলের মধ্যে চন্দ্রভাঙ্কা নদীর জলধারা দেখে মুগ্ধ হলাম। অফ সিজন বলে ক্ষীণ জলধারা। প্রপাতের উচ্চতা ৭০ ফুট। উঁচু পাহাড় থেকে নীচে পড়ে, জলধারাটি একটি মাঝারি লেগুনের সৃষ্টি করেছে। গিরিখাত দিয়ে বয়ে চলা স্রোতধারা ৩ কিমি দূরে কৃষ্ণায় পতিত হয়েছে।

তেলুগু ভাষায় ইথিপোথালা কথার অর্থ তোলা আর ফেলা। এখানে বাঁদরদের উৎপাত মাত্রাতিরিক্ত। ফুরিয়ে আসা বিকেলে, রেলিং দেওয়া নেটের ওপারে ঝরে পড়া স্রোতধারার ছবি তুললাম। কাছেই রয়েছে একটি ক্রোকোডাইল বিড্রিং সেন্টার। শুনলাম প্রতি সন্ধ্যায় এই প্রপাত কৃত্রিম রঙিন আলোয় উদ্ভাসিত হয়। প্রপাত সন্নিকটে গাছগাছালির মাঝে সুন্দর সুন্দর কটেজ দেখে, থাকার ইচ্ছা হল। কিন্তু এই যাত্রায় তার আর উপায় নেই। অতএব অন্ধকারকে অনুষঙ্গ করেই ফেরার পথ ধরি।

কীভাবে যাবেন: হাওড়া থেকে ফলকনামা কিংবা ইস্টকোস্ট এক্সপ্রেসে হায়দরাবাদ পৌঁছে, সড়কপথে নাগার্জুন সাগর আসতে হবে। এই রুটে নিয়মিত বাস চলাচল করলেও, গাড়িভাড়া করে আসাই বুদ্ধিমানের কাজ। হায়দরাবাদ থেকে ১৬৮ কিমি দূরে নাগার্জুন সাগর পৌঁছাতে ঘণ্টা তিনেক মতো সময় লাগবে। আবার বিজয়ওয়াড়া থেকেও এই ট্যুরটা অনায়াসেই করতে পারেন। বিজয়ওয়াড়া থেকে এই পথের দূরত্ব ১৭৫ কিমি।

কোথায় থাকবেন: হায়দরাবাদ বা বিজয়ওয়াড়া থেকে গাড়িতে এসে দিনে দিনেই এই ট্যুরটা করা যায়। তাই সাধারণ ভাবে এখানে থাকার প্রয়োজন পড়ে না। তবে রাস্তার ধকলের কথা ভেবে এবং ভালো ভাবে দেখার জন্য নাগার্জুন সাগর অথবা ইথিপোথালাতে এক বা দুটো দিন থাকলেই ভালো হয়। অনেক প্রাইভেট হোটেল রয়েছে, চাইলে সেখানে থাকতে পারেন।

মনে রাখবেন: নাগার্জুনকোন্ডা মিউজিয়াম শুক্রবার বন্ধ থাকে। দিনে দিনে ট্যুরটা করলে, সমস্ত কিছু দেখে হায়দরাবাদ শহরে ফিরতে রাত ১০টা-১১টা বেজে যাবে। এটা মাথায় রাখতে হবে।

ছবি সৌজন্য: লেখক

(সমাপ্ত)

তবু দেখা হল শেষবেলায় (পর্ব-০২)

ভয় করছিল মঞ্জুর। স্যারের দিকে তাকাতেও লজ্জা করছে। মাথা নামিয়ে চুপ করে বসে অপেক্ষা করছে এরপর কী বলবেন অমৃতদা।

—তোমার কি ভয় করছে? তাহলে চলো ড্রয়িং রুমে বসবে।

ভাবছিল কথাটা কীভাবে শুরু করা যায়। এদিকে সন্ধের পর একটা মেয়েকে ঘরে আটকে রাখলে বদনাম হবে সে খেয়াল নেই৷ একটু বাদে চা খাবে কিনা জানতে চাইলেন।

সত্যি ওর ভীষণ ভয় করছে। স্যারের এমন অদ্ভুত আচরণ বিশ্বাস করতে পারছে না। কোনওদিন এরকম অস্বস্তি হয়নি। কী বলবে তাকে, আটকে রেখেছেন কেন? মঞ্জিমা কিছুতেই বুঝতে পারছে না। ভালো-মন্দ সবরকম ভাবনা এসে ওকে পাগল করে দিচ্ছে। ভয়-মিশ্রিত ভালোলাগায় বুক ধড়ফড় করছে। হয়তো তেমন কিছু বলবেন না, শুধু শুধু ভয় পাচ্ছে। তাহলে কি নতুন কিছু নোট’স দেবেন? তবু কেমন যেন একটা অস্বস্তি লাগছে ওর। বন্ধুদের সঙ্গে চলে গেলে ভালো হতো। অথচ কী এক অমোঘ আকর্ষণে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেও পারছে না।

সংকোচের সঙ্গে বলল, ‘না চা খাই না।’

সেই সমাজ একটি মেয়েকে অন্য পুরুষের সঙ্গে এক ঘরে থাকাটা ভালো চোখে দেখে না। কেউ জানলে নিশ্চিত ভাবে সারা পাড়ায় দুর্নাম রটিয়ে দেবে। শিক্ষক বলে ছাড় পাবেন না অমৃত। কিছুক্ষণ পেরিয়ে যেতে হঠাৎ অমৃতর কী খেয়াল হল, ‘বললেন ছাদে চলো। আমাদের ছাদটা আজ তোমাকে দেখাব।’

ইতস্তত করছে মঞ্জু।

—চলোই না।

ধীর পায়ে মঞ্জুর কোমল হাতটা ধরে আস্তে আস্তে ছাদে উঠলেন। দরজাটা আস্তে করে টেনে চিলেকোঠার ঘরে নিয়ে গেলেন মঞ্জুকে। ছাদের সামনের অংশটা খোলা। এই সময় ছাদে জমাট অন্ধকার থাকার কথা। কোনও আলো জ্বালানো হয়নি, তবু সারা ছাদে সাদা আলোর বন্যা। অপার্থিব সেই আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে। এত আলো ওই ঘরে এসে ঢুকছে যে, আলাদা করে লাইট জ্বালানোর প্রয়োজন নেই। আঁধার রাতে মাথার উপরে চাঁদকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

কোনও ভণিতা না করে অমৃত সরাসরি বলল, “শোনো মঞ্জু আমি কখনও প্রেম করিনি। প্রেমে পড়েছি অস্বীকার করব না।

একজনকে ভালো লাগত, এখনও ভালো লাগে। তুমি কি জানো কে সে?’

মঞ্জু মাথা দু-দিকে নাড়ল। সে জানে না! স্যারের কাকে ভালো লাগে, তার জানার কথা নয়।

—জানো না?

—তোমাকে ভালোবেসেছি।

শোনার পর অজানা শিরশির অনুভূতিতে মঞ্জু আবার চমকে উঠল।

—কোনওদিন কি টের পাওনি? মেয়েরা তো সহজেই বুঝতে পারে জানতাম। ভালো লাগাটা এতটাই তীব্র যে, আর কাউকে মনে মনে ভাবতেই পারি না। অবশ্য তুমি তখন খুব ছোটো ছিলে। তবে একটা কথা বলে রাখি, তোমাকে বিয়ে করে সংসার করব আমি এমন স্বপ্ন দেখি না। ভালোবাসলে বিয়ে করতে হবে এর কোনও মানে নেই।

মঞ্জু চুপচাপ শুনছে। স্যার তাকে এসব জটিল কথা বলছেন কেন। কবে ভালো লেগেছিল সেটা মনেও রেখেছেন, অথচ সে ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি।

এসব শুনে আর থাকা যায় না। এরপরে কী হবে কে জানে। পাড়া-প্রতিবেশী বাড়ির বাইরে এসে হাজির হলে আত্মহত্যা করতে হবে মঞ্জুকে! বাবা-মায়ের মুখ মনে পড়াতে অস্থির লাগছে। অন্ধকার সিঁড়ি দিয়ে একদৌড়ে নেমে যাবে, সেটাও পারল না! এবার অমৃত ওর কাছে এগিয়ে এসে ওর কাঁধে দু’হাত রাখলেন।

—ভালোবাসি কিন্তু কখনও বিয়ে করার কথা ভাবতেই পারি না। আমি আর এখানে থাকব না ঠিক করেছি। তোমার ভালোর জন্য থাকতে চাই না। তাছাড়া আমি ক্রমশ আধ্যাত্মিক মনস্ক হয়ে যাচ্ছি। একটা কথা জেনে রাখো, তোমাকে বড়ো হতে হবে। সমাজের জন্য ভাবতে হবে। স্বনির্ভর হতে হবে। বিয়ে করা হল প্রেমের সমাধি। তোমাকে মাথা উঁচু করে বাঁচতে হবে। নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে, তারপর যত ইচ্ছে দেশ-বিদেশ ঘুরবে। শুধু বারাণসী কেন, অনেক জায়গায় ভ্রমণ করার সুযোগ পাবে। আমাদের মা-মাসিরা কীভাবে বেঁচে আছেন ভাবলেই শিউরে উঠতে হয়। তবে, এটাও ঠিক— সব পুরুষ তাদের নারীকে পরাধীন করে রেখে সরাসরি অপমান করে না। অসুবিধে হলে বুঝতে দেয় না বলে অনেক সম্পর্ক টিকে গেছে।

অমৃত নাকি তার মা-কে দেখেই ঠিক করেছেন, আর যাইহোক, কোনও মেয়েকে সংস্কারের ঘেরাটোপে আবদ্ধ করবে না।

—তুমি চাইলে কাউকে বিয়ে করে সংসারী হতেই পারো। তবে তার আগে তোমাকে নিজের পায়ের তলার মাটি শক্ত করতে হবে।

এসব শুনে মঞ্জুর গা-হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। কী বলবে স্যারকে। ওঁর কথাগুলো বোঝার মতো বুদ্ধি ততখানি হয়নি। একটু একটু বুঝতে পেরেছে এই মানুষটা সবার থেকে আলাদা। অমৃত এও বললেন— একদিন বাড়ি ছেড়ে চলে যাব। তোমার কথা মনে পড়বে কিন্তু মেনে নেব।

—এই সিদ্ধান্তের কথা আপনার বাড়িতে জানিয়েছেন? মঞ্জু এটুকুই জিজ্ঞেস করেছে।

—বাড়িতে বললে কেউ যেতে দেবে নাকি। শুধু তোমাকে বলে রাখলাম। হয়তো বারাণসীতে যেতে পারি। কখনও গেলে আমার গোঁজ কোরো।

—এসব কেন বলছেন। সাধু হয়ে যাবেন? বলতে গিয়েও চুপ করে যায়। এসব কেন বলছেন, ভেবে পেল না। তবে বুঝেছে স্যার ওকে খুব বিশ্বাস করেন, না হলে গোপন কথাটা একমাত্র তাকেই আলাদা করে জানিয়ে রাখতেন না।

শেষ অনুরোধ রাখতে পারেনি। যখন বললেন, তুমি শুধু একবার আমাকে ছুঁয়ে বলো— আমাকে ভালোবাসো। চমকে উঠেছিল মঞ্জিমা!

অমৃত ওকে ভালোবাসেন বলছেন, এদিকে বাড়ি ছেড়ে চলেও যাবেন— এসব শুনে সব তালগোল পাকিয়ে গেছিল। ভালোমন্দ কিছু না বলে তক্ষুনি সিঁড়ি ধরে নীচে নেমে আসে। অমৃত পৌঁছে দেবেন সে তোয়াক্কা না করে সেদিন একটু রাতে বাড়িতে ফিরেছিল। সারা সপ্তাহ জুড়ে কেমন একটা মন খারাপের পরশ, উদাসীন অপরাহ্নের মতো নির্জনতা বুক জুড়ে। কী ঘটেছে ভুলেও কাউকে জানাল না। আজীবন গোপন রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, জানাতে পারবে না কিছুতেই।

ঠিক তার পরের সপ্তাহে এক ভোরে অমৃত বসু নিখোঁজ হলেন। কোথায় চলে গেছেন কেউ জানে না। মঞ্জুও চুপ করে থেকেছে। এতগুলো বছর পেরিয়ে গেছে আজও কেউ জানে না। এরপর কালের নিয়মে মঞ্জুর বিবাহ হয় কলকাতায়। পাত্র ভালো, কিন্তু স্বভাবে অমৃতর বিপরীত। দাম্পত্য জীবন মোটামুটি সুখেই কেটেছে।

এরপরে অমৃতর সব কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। আজ পর্যন্ত সমাজের ভালোর জন্য তেমন কিছু করতে পারেননি ঠিকই, তবে সেদিনের ভিতু কিশোরী মঞ্জু পরে স্বাবলম্বী নারী হয়েছেন। তাই এখনও কয়েকটি অনাথ বাচ্চার লেখাপড়ার খরচ বহন করছেন। আজকে অমৃত জানতে পারলে হয়তো খুশি হতেন, কিন্তু সে উপায় নেই। কোথায় তিনি। এখন কি বারাণসীতেই থাকেন? আদৌ জীবিত আছেন কিনা কে বলতে পারবে।

(ক্রমশ…)

তবু দেখা হল শেষবেলায় (পর্ব-০১)

নৌকা চলতে শুরু করেছে। মঞ্জিমাদেবীকে গ্রুপের কেউ একজন বলল, ‘মাসিমা ভয় পাবেন না। একটু পরে সব আত্মস্থ হয়ে যাবে। বলছিলেন, আপনার অনেক দিনের শখ গঙ্গা আরতি দেখবেন। একটু পরেই আরতি শুরু হবে। আমরা এখনই তীরে পৌঁছে যাব।’ সবাই দেখছে সব ঘাটগুলো আলোয় মোড়ানো আর গঙ্গার জলটা ভীষণ কুচকুচে কালো দেখাচ্ছে। স্বর্গীয় পরিবেশ দেখে খুব ভালো লাগছিল সকলের।

অদ্ভুত মায়ার শহর বারাণসী। অহল্যা ভূমিতে এলে পুণ্যার্থীদের ভক্তি বেড়ে যায়। এখন নৌকার উপর দাঁড়িয়ে মাঝে মাঝে করজোড়ে প্রণাম সেরে নিচ্ছেন সকলে। প্রত্যেকটা ঘাট পেরোনোর সময় প্রণাম সেরে নিচ্ছেন মঞ্জিমাদেবী আর যেসব মহিলা পুরুষ একসঙ্গে কাশীধামে ঘুরতে এসেছেন। পর পর সরে সরে যাচ্ছে ঘাটগুলো। সব ঘাটের নাম একের পর এক বলে যাচ্ছেন দক্ষ মাঝি।

মোটর বোটের আওয়াজে কিছু শোনা যাচ্ছে না। ঠিক সেই সময় কে যেন বেশ জোরে জোরে তীর্থযাত্রীদের উদ্দেশ্যে বলল, ‘ওই তো দশাশ্বমেধ ঘাট। ওই তো সামনে। আমরা এসে গেছি। সেই কবে থেকে একেকটা ঘাটের আড়ালে একেকরকম ঐতিহাসিক কাহিনি শুনে শুনে মুখস্থ হয়ে গেছে।’

—না না, ওটা দূরে। মাঝি নৌকা ঘুরিয়ে ঘাটের কাছে এনে জানালেন, ‘কয়েকটা ঘাট পেরোলে দশাশ্বমেধ ঘাট আসবে।’ ওদের নৌকা বিশেষ একটা ঘাটের কাছে এসে পড়তেই সব যাত্রীরা আবার উঠে দাঁড়ালেন।

—এই ঘাটের নাম কী? কে হঠাৎ জানতে চাইলেন।

—এটা হরিশচন্দ্র ঘাট।

একজন বললেন প্রতিদিন অগুনতি চিতা সাজানো হয় এখানে। আগুন নেভেই না। একের পর এক দাহকর্ম সারা দিনরাত চলতে থাকে। সবাই দেখে নিন।

শুনে গা ছমছম করে উঠল মঞ্জিমাদেবীর। হঠাৎ মনে পড়ে গেল অমৃত-র কথা। একবার শুনেছিলেন তিনি নাকি এখন এখানেই থাকেন। এখন মঞ্জিমাদেবীর বয়স যদি পয়ষট্টি হয়, তাহলে অমৃত এখন সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধ হয়ে গেছেন। এদিকে থাকেন, কিন্তু কোথায় থাকেন কেউ জানে না। ঠিকানা জানা থাকলে একবার ওঁর সঙ্গে দেখা করে নিলে ভালো হতো। হয়তো আগেই এটা করা উচিত ছিল। এতগুলো বছর কেন একবারও যোগাযোগ করেননি। মাঝে মাঝে খুব আপশোশ হয়, তিনি একমাত্র তাকে বলে গেছিলেন। একবার সাহস করে এদিকে বেড়াতে এসে খোঁজ করা কি যেত না? এরপর কত বছর পেরিয়েছে। জীবনের বেশির ভাগ সময়টাই পার করে এসে খুব আপশোশ হচ্ছে। বয়স হলে মনে হয় কে কখন চলে যাবে, পুরোনো রাগ অভিমান মুছে আর একটিবার যদি পাশাপাশি বসে কথা বলা যেত।

যদিও রাগ অভিমানের তেমন কোনও কারণ নেই। সেদিন তেমন কিছু ঘটেনি, যা হয়েছিল সবটা হঠকারিতায়। সেই হঠকারী তরুণ অমৃত বসু তেমন হালকা স্বভাবের ছিলেন না। ওর ভিতর একটা সত্যিকারের মানুষ বেঁচে ছিল। তিনি যে সবার থেকে আলাদা, অনেক পরে বুঝেছেন। পরে বুঝে কোনও লাভ হয় না, আগে থাকতে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সাধারণ মানুষ আশ্চর্য ভাবে সব অতীত বেমালুম ভুলে গিয়ে দিব্যি বেঁচে থাকে।

মনে পড়ে গেল আজ থেকে চল্লিশ বছর আগের সেই দিনটার কথা। অমৃত ছিলেন ইতিহাসের শিক্ষক। তখন মঞ্জিমা ক্লাস ইলেভেনের ছাত্রী। পরীক্ষার আগে কয়েকটা মাস অমৃতর কাছে টিউশন পড়তে যেতে হয়েছিল। পড়ানোর ফাঁকে অমৃত আর ছাত্রীদের মধ্যে নানান বিষয় নিয়ে গল্পগুজব চলত। অমৃত ছিলেন একেবারে বন্ধুর মতো।

একদিন পড়ানোর ফাঁকে ছাত্রীদের জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমরা কে কে বারাণসী গেছো?”

একমাত্র মঞ্জু ছাড়া সবাই বলল— তারা বারাণসী বেড়িয়ে এসেছে।

মঞ্জু কখনও যায়নি শুনে অমৃত বললেন, এ মা, যাওনি বলে লজ্জার কী আছে! মাথা নামিয়ে থাকার দরকার নেই। আমিও তোমার দলে। একবারও যাইনি। আসলে সুযোগ হয়নি।

কেউ যেন বিশ্বাস করতে পারছে না স্যারের কথা।

—স্যার আপনি যাননি?

—না গো যাইনি।

ওদের মধ্যে কেউ একজন বলল— কিন্তু আপনি ওই জায়গা সম্পর্কে এতকিছু জানেন, তাই মনে হয় যে, একবার না, বহুবার ঘুরে এসেছেন। অতটা আমরাও জানি না।

—আরে চাক্ষুষ করিনি, কিন্তু সব পড়ে পড়ে জেনেছি।

সেদিন মঞ্জু ওদের কথা চুপ করে শুনেছে। ভ্রমণ জিনিসটা কী সেটাই মঞ্জু জানত না। স্বাবলম্বী হলে একা একা অনেক ঘুরবে মনস্থির করে তখনই।

প্রত্যেকেই স্যারকে ভালোবাসে। ছাত্রীদের নিজের বোনের চোখে দেখেন অমৃত। সেকালে সারা পাড়ার লোক তাদের মেয়েদের কোথাও প্রাইভেট টিউশন নিতে পাঠাতেন না। কিন্তু অমৃতর কাছে মেয়েদের রেখে এসে নিশ্চিন্ত হয়ে বসে থাকতেন। সবাই বলতেন ছেলেটি এত কম বয়েসে শিক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আর চরিত্রবান। এতটুকু অহংকার নেই। এরকম শিক্ষকের উপর ভরসা করা যায়।

সেদিন পড়া শেষে সবাই যে যার বাড়ি চলে গেল। মঞ্জুকে আলাদা করে ডেকে অমৃত বললেন, দাঁড়াও, তুমি একটু পরে যেও। আমার একটু দরকার আছে। সবাই চলে গেলে অমৃত বাইরের দরজা বন্ধ করে দিয়ে মঞ্জুর কাছে এসে দাঁড়ালেন।

এরকম পরিস্থিতিতে গলা শুকিয়ে কাঠ, কথা বেরোচ্ছে না। স্যার তাকে আলাদা করে কী বলবে বুঝতে পারছে না। মনে হাজার প্রশ্ন এসে ভিড় করছে।

—আজকে বাড়িতে কেউ নেই, দাদা এসে বাবা-মাকে ওর কাছে ক’দিনের জন্য নিয়ে গেছে। সম্ভবত তাঁরা সাতদিন পরে ফিরবেন। এত বড়ো বাড়িতে আমি একা। ভয় কোরো না। একটু পরে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসব।

নাগার্জুনকোন্ডা থেকে ইথিপোথালা (পর্ব-০১)

হায়দরাবাদ থেকে সাত সকালে বেরিয়েছি। লং ড্রাইভে চলেছি নাগার্জুন সাগর। শহরের সীমানা ছাড়তেই গাড়ি গতি পায়। তবে পথপার্শ্বস্থ সবুজের ছোঁয়া সেভাবে মন ছোঁয় না। হায়দরাবাদ থেকে ১৬৮ কিমি দক্ষিণ পূর্বে কৃষ্ণানদীর দক্ষিণ তীরে অবস্থিত নাগার্জুন সাগর। এই তল্লাটে রাস্তা সারাইয়ের কাজ চলছে বলে, বাতাসে প্রচুর ধুলিকণা। ঘণ্টাখানেক চলার পর পথ-পার্শ্বস্থ এক ধাবায় দক্ষিণী পদে ব্রেকফাস্ট সারলাম। আবার গাড়ির চাকা গড়ায়। এবার ভাঙাচোরা রাস্তা থেকে মসৃণ সড়কে। দ্রুত ছুটতে থাকে গাড়ি।

দূরে দৃশ্যমান হয় নাল্লামালাই পাহাড়শ্রেণির ল্যান্ডস্কেপ। দু’পাশে অনুর্বর বন্ধুর পাথুরে জমি। কোথাও চোখে পড়ে তুলো ও তুয়ার নিবিড় চাষ। ঘণ্টা তিনেক পর নাগার্জুন সাগরের নাগাল পেলাম। অবশ্য সংরক্ষিত এলাকা বলে সরাসরি লঞ্চঘাটে উপস্থিত হতে পারলাম না। শুনলাম, বাঁধপাড়ের পুরাতন পথ সাধারণের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়ছে। অতএব আরও কিছুটা এগিয়ে ঘুরপথে বিজয়পুরীর লঞ্চঘাটে পৌঁছালাম।

কয়েকটা ছোটোখাটো হাতে গোনা দোকান, লজ, হোটেল, আর এপিটিডিসি-র রিসর্ট নিয়ে বিজয়পুরীর (দক্ষিণ) ছোট জনপদ। একটু এগিয়েই বাসস্ট্যান্ড। কয়েকটা অটো, টেম্পো, আর ছোটো বড়ো গাড়ির জটলা। গাড়ি থেকে নেমে ফেরি লঞ্চের টিকিট কাটতে পড়িমরি করে ছুটলাম। ছুটির দিন বলে তালিকার বাইরেও লঞ্চ দেওয়া হবে বলে কাউন্টার থেকে জানানো হল। টিকিট কেটেই সোজা লঞ্চঘাটের লাইনে। লঞ্চে ওঠার বাঁধানো জেটিঘাট ছবির মতো।

যাত্রী বোঝাই হতেই লঞ্চ ছেড়ে দিল। চলেছি নাগার্জুনকোন্ডা দ্বীপে। কৃষ্ণার জল কেটে এগিয়ে চলেছি। চারিদিকে শুধু ঘন নীল জল। দিগন্ত ছোঁয়া সেই ঘন জলরাশি রোদে চিকচিক করছে। আর কাছে দূরে জল ফুঁড়ে দাঁড়িয়ে আছে নাল্লামালাই পর্বতশ্রেণি। শিরশিরে হাওয়ার মধ্যে আদিগন্ত এই জলরাশির দিকে অপলক ভাবে তাকিয়ে থাকি। এককথায় এই জলযাত্রা অসাধারণ।

তেলেঙ্গানা রাজ্যের নালগোন্ডা জেলায় অবস্থিত নাগার্জুন সাগর। এর বিশালত্ব দেখে বিস্মিত হতে হয়। এটি বিশ্বের উচ্চতম বাঁধ। আবার বাঁধ সৃষ্ট নাগার্জুন সাগর হল বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম লেক। স্বাধীনতা পরবর্তী ষাটের দশকে বিদ্যুৎ ও সেচের প্রয়োজন মেটাতে কৃষ্ণা নদীর উপর বাঁধের পরিকল্পনা করা হয়। ১ কিমি দীর্ঘ ১২৪ মিটার উঁচু ছাব্বিশটি সুইস গেটের এই বাঁধ থেকে উৎপন্ন হয় চারশো মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ। অন্যদিকে জওহর ও লালবাহাদুর নামের দুটি খাল দিয়ে প্রায় ৩৫ লক্ষ একর জমিতে সেচের জল সরবরাহ করা হয়। এর ফলে মাইলের পর মাইল অনুর্বর কৃষি জমি আজ ভরে গেছে আদিগন্ত সবুজে। অন্ধ্র হয়ে উঠেছে ভারতের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অন্নভাণ্ডার।

নীলনদের উপর নির্মিত আসওয়ান বাঁধের আদলে তৈরি এই বাঁধের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু। অবশ্য খাতায়-কলমে এই কাজ শুরু হয় পরের বছর ১৯৫৫ সাল নাগাদ। দশ বছরের মাথায় ১৯৬৬ সালে কাজ শেষ হলে, ইন্দিরা গান্ধী বাঁধটির উদ্বোধন করেন। কিন্তু এই কৃত্রিম বাঁধের বাস্তবায়ন ঘটলে, এর জলে তলিয়ে যায় অতীতের ধান্যকটক, বিজয়পুরী, শ্রীপর্বতের একটা বড়ো অংশ। সলিলসমাধি ঘটে দু’হাজার বছরের বেশি প্রাচীন দাক্ষিণাত্যের মহান বৌদ্ধ ও হিন্দু সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রত্নসম্ভার-এর। তবে ডুবে যাওয়ার আগে ওই অঞ্চলের অধিকাংশ প্রত্ন নিদর্শনই পুনঃস্থাপিত হয় নাগার্জুনকোন্ডা দ্বীপে। সেই দ্বীপেই এখন আমরা চলেছি।

তিনদিকে নাল্লামালাইয়ের জঙ্গলে ভরা পাহাড় আর অন্যদিকে বহমান কৃষ্ণানদীর মাঝে এক বিস্তীর্ণ উপত্যকা, এই ছিল অতীতের নাগার্জুনকোন্ডা। তেলুগু ভাষায় ‘কোন্ডা’ অর্থ পাহাড় আর বৌদ্ধ আচার্য নাগার্জুনের নাম থেকে নাম হয় নাগার্জুনকোন্ডা। এরও পূর্বে নাম ছিল বিজয়পুরী। খুবই সমৃদ্ধশালী ছিল এই জনপদ। এই অঞ্চলে রাজত্ব করেছে সাতবাহন, ইক্ষ্বাকু বংশের বহু রাজা। যারা সনাতন হিন্দুধর্মের পাশাপাশি বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকে বৌদ্ধ শ্রমণ নাগার্জুন সিংহল থেকে অমরাবতী হয়ে বৌদ্ধধর্ম প্রচারে এখানে হাজির হন। তারই হাত ধরে গড়ে উঠে বৌদ্ধ সংস্কৃতির এক বিশাল কর্মকাণ্ড। ক্রমে রাজপৃষ্ঠপোষকতায় তিনি গড়ে তোলেন স্তুপ, চৈত্য, বিহার, মণ্ডপ, বিশ্ববিদ্যালয়, ছাত্রাবাস ইত্যাদি। শুধু স্বদেশ নয়, বিদেশ থেকেও বহু শিক্ষার্থী এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসত।

ইতিহাস বলছে, নাগার্জুনকোণ্ডা বিখ্যাত হয়, খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতাব্দীর মাঝামাঝি ইক্ষ্বাকু রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা বশিষ্ঠপুত্র চামতমুলার আমলে। কিন্তু পরবর্তী পহ্লব, কদম্ব বিষ্ণু-কুন্তী ও সালোঙ্করণ বংশের রাজারা বৌদ্ধধর্মের প্রতি অনুরাগী ছিলেন না। তাঁরা কেবলমাত্র ব্রাহ্মণ ধর্ম ও পৌরাণিক দেবতাদের প্রতিই ভক্তিশ্রদ্ধা দেখাতেন। ফলে পঞ্চম শতাব্দী থেকে রাজানুগ্রহের অভাবে ও শৈবধর্মের পুনরুদ্ভবের ফলে নাগার্জুন-কোন্ডার ও সেই সঙ্গে দক্ষিণ ভারতের বৌদ্ধধর্ম ক্রমশ বিলুপ্ত হয়ে পড়ে। ক্রমেই এই উপত্যকা হারিয়ে যায় বিস্মৃতির অন্তরালে।

রাজার চোখে জল (শেষ পর্ব)

মঙ্গল: আজ্ঞে না মশাই। অতটা গুড় আধসের না। এটি হচ্ছে না। রাজা চোখের জলে নাকের জলে ভাসছে। তবু তার মধ্যেই খাজনা আদায় নিয়ে হিসেব নিকেশ খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে দেখছেন। নতুনপল্লির তিন প্রজার শাস্তির বিধান দিয়েছেন।

রবি: তাহলে দেখা যাচ্ছে কথাটা সত্যি। আদতে ভোলানাথ পাগল না।

মঙ্গল: তারই মধ্যে কান্নার বিরাম নেই। রাজা কেঁদে ভাসাচ্ছে। বড়োরানি রাজার মন ভালো করার অনেক চেষ্টাচরিত্র করলেন। অনেক বুদ্ধি খাটালেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। শেষমেশ বড়োরানি একদিন ছোটোরানিকে ডেকে বললেন…..

দৃশ্যান্তর
(রাজপ্রাসাদের অন্দরমহল)

বড়োরানি: হ্যাঁরে, পূর্ণশশী, রাজা তো তোর গান শুনে তোকে পছন্দ করে এনেছে। তুই একবার রাজার কাছে যা না। গিয়ে কাছে বোস। একটু পিরিতের কথা বল টল। ছলাকলা কর। একটা গান শোনা। দ্যাখ যদি তাতে কাজ হয়।

পূর্ণশশী: না বাবা না। রাজার মুখটা ভাবলেই আমার প্যালপিটিশন শুরু হয়ে যায়। ও আমি পারব না।

বড়োরানি: পারবি না মানে! গান জানিস। ন্যাকামো করিস না লো। এই বেপদের সময়…

(পূর্ণশশীকে ঠেলে রাজার ঘরে ঢুকিয়ে দেয় বড়োরানি।

রাজা: তুমি আবার কী মনে করে?

পূর্ণশশী: ভাবছিলাম ক’দিন ধরে।

রাজা: কী ভাবছিলে পূর্ণশশী?

পূর্ণশশী: এই তোমার কাছে এসে একটু বসি। তুমি তো আমার গান খুব ভালোবাসো। গাইব? শুনবে একটা গান?

রাজা: গাইতে চাও গাও। কিন্তু, কিছুই ভালো লাগে না আমার। আজকাল তোমাদের দেখলেও কোনও এন্থ পাইনা। গাও, গাইতে চাও গাও।

পূর্ণশশী: গান শোনো, দেখো ঠিক মন ভালো হয়ে যাবে। (গান ধরে) তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়, সেকি মোর অপরাধ? (গান শুনে রাজা ভেউ ভেউ করে কেঁদে ওঠে। পূর্ণশশী ঘাবড়ে যায়।)

রাজা: (কান্নার স্বরে) আমি সুন্দর? তাই চেয়ে থাকো? ওসব বিদ্রুপ রাখো। এটা কি আমার চেয়ে থাকার মতো সুন্দর মুখ? উলুকনগরের রাজা আমার টাক নিয়ে ঠাট্টা করেছে। সে আমার ঘোরশত্রু। আর তুমি আমার ঘরশত্রু। যাও ভাগো এখান থেকে। (পূর্ণশশী হাতে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যায়)। ওরে কে আছিস রাজবদ্যিকে ডাক। এখনই আসতে বল।

(রাজা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে চলেছে। রাজবদ্যির প্রবেশ)

রাজা: এই যে রাজবদ্যি, আমার চুল গজানোর ফর্মুলা কিছু হল? সারাজীবন কি আমি এই টাকের বোঝা বয়ে বেড়াব?

রাজবদ্যি: মহারাজ, বোঝা হলে তো বয়ে বেড়ানোর প্রশ্ন আসে। সেদিক দিয়ে আপনার বোঝা তো একেবারে হালকা হয়ে গেছে। রাজা: কী বাজে বকছ?

রাজবদ্যি: বলছিলাম মহারাজ, চুলে সুগন্ধি তেল মাখো, নিত্য নিত্য শ্যাম্পু করো, ভেজা চুলে তোয়ালে ঘসো, চুল শুকোও। পরিপাটি করে চুল আঁচড়ানো। হ্যাপা কি কম? এখন এসব ঝামেলা থেকে আপনি কত মুক্ত ভাবুন তো? মাথায় একটা জুতসই মুকুট পরে নিন। টাক হাওয়া হয়ে যাবে।

রাজা: এসব বলে তুমি আমার কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দিচ্ছ? ফর্মুলার কথা কিছুই ভাবছ না?

রাজবদ্যি: না মহারাজ না। আমি ভাবছি। মাইরি, মা কালীর দিব্যি, স্বয়ং বিসমিল্লাহর দিব্যি আমি ভাবছি। বলছিলাম মহারাজ, আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে। মহামন্ত্রীকে বলে গোটা রাজ্যে ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে দিন। যে বিজ্ঞানী টাকে ফর্মুলা বের করে দিতে পারবে, তাঁকে অনেক টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে।

রাজা: যা খুশি করো, ঢ্যাঁড়া পেটাও, গলা ফাটাও। মোট কথা আমার টাক হটাও।

রাজবদ্যি: হটে যাবে। টাক হটে যাবে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস উপায় একটা হবেই হবে। আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন। মহামন্ত্রীকে বলুন, পাইক পেয়াদাকে ফিল্ডে নামিয়ে দিতে।

(ঢ্যাঁড়া পেটানো হয়।)

পেয়াদা: শোনো শোনো সর্বজন শোনো। যে বিজ্ঞানী রাজার টাকে চুল গজানোর ফর্মুলা দিতে পারবেন, তাঁকে দশহাজার টাকা ও জমি পুরস্কার দেওয়া হবে।

দৃশ্যান্তর
(শম্ভু ও মালতীর সংসার)

মালতী: বলি এত বেলা পর্যন্ত শুয়ে আছো যে। রুজিরোজগারে বেরোও। কুঁড়ের বাদশা। শুয়ে শুয়েই কাল কাটালে আর বুদ্ধি বুদ্ধি করে গলা ফাটালে। বলি অতই যদি বুদ্ধি, তাহলে খাওয়া জোটে না কেন? ঘরে যে জল পড়ে। ওনার কথা হল, খিদে পেলে পেটে কিল মারো। জল পড়লে পাশ ফিরে শোও। হ্যা, ছ্যা, ঘেন্না ধরে গেল জীবনে।

শম্ভু: (শুয়ে শুয়ে গান করে) ভালো কইরা ঘর বানাইয়া কয়দিন থাকব আর… লোকে বলে, ও বলে রে ঘরবাড়ি ভালো নাই আমার।

মালতী: (মুখ ঝামটা দেয়) থামো। ন্যাকামো কোরোনা। একে তাকে বেশ বুদ্ধি দাও। তা সেই বুদ্ধিটা কেন নিজের বেলায় খাটাচ্ছ না?

শম্ভু: খাটিয়েছি। বুদ্ধি খাটিয়েছি গিন্নি। এমন বুদ্ধি খাটিয়েছি যে, এবার রাজার হালে থাকব। তুমি রাজরানি হবে।

মালতী: তোমার ওই স্বপ্ন দেখেই জীবন কেটে গেল।

শম্ভু: শোনো না। স্বপ্ন না। রাজার লোক ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে গেল, রাজার টাকে চুল গজানোর ফর্মুলা চাই। আমার মাথায় একটা ফর্মুলা এসেছে।

মালতী: তুমি কি বিজ্ঞানী?

শম্ভু: বিজ্ঞানী সেজে যাব রাজপ্রাসাদে।

মালতী: তুমি কি পাগল হলে? ধরা পড়লে গর্দান যাবে।

শম্ভুঃ না না। ধরা পড়ব না। মোক্ষম ফর্মুলা। পুরস্কার নিয়েই ফিরব।

দৃশ্যান্তর
রাজপ্রাসাদ

রাজা: তুমি বলছ, তোমার ফর্মুলায় কাজ হবে?

শম্ভু: হবে মহারাজ, নিশ্চয়ই হবে। তবে মহারাজ, আপনার সঙ্গে আমার রুদ্ধদ্বার বৈঠক হবে। ওই বৈঠকে আমি আপনাকে ফর্মুলা বলব। আমি আমার ফর্মুলা আপনার শরীরে প্রয়োগ করব না। প্রয়োগ করব আপনার মগজে। মগজ থেকে যাবে ঘিলুতে। ঘিলু থেকে যাবে তালুতে। তারপরেই দেখবেন মহারাজ মাথার তালুতে গোছা গোছা চুল ঠেলে উঠবে।

রাজা: তাই নাকি? এ তো বিজ্ঞানী দেখছি ম্যাজিকের কথা কচ্ছে। ভেবে আমার ভারি আহ্লাদ হচ্ছে। বিজ্ঞানী: চলুন, কোন ঘরে বসবেন চলুন।

রাজা: আপনি আসুন আমার সঙ্গে। (দু’জনে রুদ্ধদ্বার ঘরে ঢুকে পড়ে)।

রবি, সোম ও মঙ্গল নেচে নেচে গায়।

গান—

আহা বাহা কী মজারে রাজার মাথায় চুল গজাবে

সমস্যা থাকবে না আর

মুখে হাসি ফুটবে রাজার

ঝরবে না রাজার আর চোখের জল

ফর্মুলা এসে গেছে ফলবেই ফল

ধানের চারার মতো রাজার মাথায় চুল গজাবে হাজার হাজার

(আচমকা রাজার অট্টহাসি শোনা যায়)

হাসতে হাসতে রাজা মঞ্চে প্রবেশ করে। হাসি শুনে রানিরা ছুটে আসে। তারা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। রাজা কাঁদছে না। উলটে অট্টহাসি হাসছে!

রাজা: ওরে কে আছিস, বিজ্ঞানীকে যথাযথ পুরস্কার দিয়ে রাজপ্রাসাদ থেকে সসম্মানে বিদেয় কর।

(তিনরানি এককোণে দাঁড়িয়ে রাজার কাছে আসতে ভয় পাচ্ছে)

বড়োরানি: হ্যাঁরে, বিজ্ঞানী আবার রাজাকে কিছু খাইয়ে পাগল টাগল করে দিল না তো?

রাজা: কী গুজগুজ ফুসফুস করছ তোমরা রানি? আরে না না। পাগল হইনি আমি। বরং বলতে পারো পাগল হয়ে গেছিলাম। এখন পাগলামি ছুটে গেছে। আমি ভালো হয়ে গেছি। হা হা হা হা…..

বড়োরানি: তোমাকে তো আবার কিছু বলতে ভয় করে। কখন কী মুডে থাকো। অনেকদিন পরে তোমাকে হাসতে দেখে ভালো লাগছে।

রাজা: আমারও ভালো লাগছে।

বড়োরানি: কিন্তু অবাক লাগছে, বিজ্ঞানী কী এমন ফর্মুলা দিল। ওকে যে আগেই পুরস্কার দিয়ে দিলে, চুল গজাতে কি খুব দেরি হবে?

রাজা: আরে ধুর, ওই বুড়ো বজ্জাত বিজ্ঞানীর ফর্মুলা আমি নিয়েছি নাকি অ্যাঁ? বলি ওই বজ্জাত বিজ্ঞানী যে ফর্মুলা দিয়েছে, সেই ফর্মুলা নিলে তোমাদের তিনরানিকে নিয়ে আমায় গাছতলায় গিয়ে দাঁড়াতে হবে। বুড়ো বিজ্ঞানী শয়তান বলে কিনা, গলায় গলায় ভাব টাক আর টাকাতে, টাকাকে ছাড়তে হবে টাকটাকে ঠেকাতে। বোঝো কথা বোঝো। সারাজীবন ধরে তিলতিল করে আমি যে টাকার পাহাড় তৈরি করেছি, তাকে কিনা ছাড়তে হবে। টাকার জন্যই যদি আমার এই টাক, তবে তো সেই টাক লক্ষ্মী। সেই লক্ষ্মী যুগযুগান্ত আমার মাথায় থাক। হারামজাদা বিজ্ঞানী বলে কিনা বিলি করে দিন টাকা, থাকবে না টাক। রাতারাতি রাজকোষ করে দিন ফাঁক।

বড়োরানি: তুমি কী বললে?

রাজা: আমি বলি, মরে যাব, থাক তবে থাক। আমি রাজা বলেই তো রাজকীয় টাক।

বড়োরানি: তাহলে ওকে যে তুমি পুরস্কার দিলে!

রাজা: পুরস্কার দিয়েছি কি ফর্মুলার জন্য নাকি? ওর সঙ্গে আমার একটা চুক্তি হয়েছে। ও আমাকে যে অস্বস্তিকর ফর্মুলাটা বাতলেছে, তা যেন ও পাঁচকান না করে। টাকা দিয়েছি সে জন্য। শুনলে প্রজারা কী বলবে? অ্যাঁ কী বলবে? বলবে, টাকার শোক সামলাতে গিয়ে রাজা চুলের শোক ভুলে গেল। আমি কি অত বোকা? হা হা হা হা… (রাজার অট্টহাসিতে রাজপ্রাসাদ কেঁপে উঠল।

(রবি, সোম ও মঙ্গল তিনজন ফের নাচের তালে তালে ঢুকে গাইতে লাগল)

গান—

রাজার চোখে জল, কে দেখেছে বল?

এই তো দেখ দিব্যি রাজা হাসতেছে কলকল….

(ধীরে ধীরে যবনিকা নেমে আসে)

মস্তিষ্ক এবং মেরুদণ্ডের প্রাথমিক রোগ নির্ণয় এবং নিরাপদ চিকিৎসা

নানারকম কারণে মস্তিষ্ক এবং মেরুদণ্ডের ব্যাধি ক্রমশ বাড়ছে। তাই, এই বিষয়ে কলকাতা-র এক অভিজাত হোটেলে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এবং পরামর্শ দিলেন বিশিষ্ট নিউরোসার্জন এবং স্পাইন বিশেষজ্ঞ ডা. অনিন্দ্য বসু এবং ডা. মিলিন্দ দেওগাঁওকর। আধুনিক উপায়ে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে কীভাবে দ্রুত রোগীদের সুস্থতায় অগ্রগতি ও ফলাফলে আমূল পরিবর্তন আনে, সেই বিষয়ে জানালেন এই দুই চিকিৎসক।

এই আলোচনাটি মূলত প্রাথমিক উপসর্গ শনাক্তকরণ, চিকিৎসার বিকল্প এবং প্রচলিত ওপেন সার্জারি থেকে মিনিমালি ইনভেসিভ সার্জারি এবং প্রযুক্তি-চালিত পদ্ধতির পরিবর্তনের গুরুত্বের ওপর আলোকপাত করে।

মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ডের অবস্থার প্রাথমিক সতর্কতামূলক লক্ষণ যেমন টানা পিঠের ব্যথা, দুর্বলতা, অসাড়তা, ভারসাম্যের অভাব, দীর্ঘস্থায়ী মাথাব্যথা এবং কথা বলা বা দৃষ্টিশক্তিতে পরিবর্তনের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পরিবেশন করেন ডা. অনিন্দ্য বসু এবং ডা. মিলিন্দ দেওগাঁওকর। তাঁদের মতে, সময়মতো রোগ নির্ণয় এবং সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে জীবনের মান উল্লেখযোগ্য ভাবে উন্নত করতে পারে।

Early diagnosis and safe treatment of brain and spinal cord diseases
Neurosurgeon and Spine specialist Dr. Anindya Basu & Dr. Milind Deogaonkar

ডা. অনিন্দ্য বসু এবং ডা. মিলিন্দ দেওগাঁওকরের বক্তব্য থেকে জানা যায়, বর্তমানে মেরুদণ্ডের মিনিমালি ইনভেসিভ সার্জারি এবং মস্তিষ্কের অস্ত্রোপচারের কৌশল উন্নত হয়েছে। যদিও বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন যে, চিকিৎসার সিদ্ধান্তগুলি অত্যন্ত ব্যক্তিনির্ভর এবং তা রোগীর অবস্থা, সামগ্রিক স্বাস্থ্য এবং রোগের তীব্রতার ওপর নির্ভর করে।

মেরুদণ্ডের অস্ত্রোপচারের বিবর্তন সম্পর্কে বলতে গিয়ে বিশেষজ্ঞরা প্রচলিত ওপেন সার্জারি থেকে মিনিমালি ইনভেসিভ সার্জারি-র দিকে একটি স্পষ্ট পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করেছেন, যা টিস্যুর ক্ষতি, রক্তক্ষরণ, হাসপাতালে থাকার সময়কাল এবং সুস্থ হয়ে ওঠার সময় কমিয়ে দেয়। উন্নত ইমেজিং এবং নেভিগেশন প্রযুক্তির সংযোজন অস্ত্রোপচারের নির্ভুলতা এবং নিরাপত্তাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

মস্তিষ্কের অস্ত্রোপচারের অগ্রগতির বিষয়ে বক্তারা তুলে ধরেন যে, নেভিগেশন প্রযুক্তির সংযোজন অস্ত্রোপচারের নির্ভুলতা এবং নিরাপত্তাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে এবং ঝুঁকি কমিয়ে আরও নির্ভুল ভাবে অস্ত্রোপচার করতে সাহায্য করে। এই উদ্ভাবনগুলি উন্নত ফলাফল, দ্রুত স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার এবং সামগ্রিক ভাবে রোগীদের আরও ভালো অভিজ্ঞতা দিতে অবদান রাখে। তবে তাঁরা এও জানিয়েছেন যে, মেরুদণ্ড এবং মস্তিষ্কের সমস্যার ক্ষেত্রে, প্রতিটি রোগীর  অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয় না কিন্তু এরজন্য বিশেষজ্ঞের মূল্যায়ন অপরিহার্য। তাই, মস্তিষ্ক এবং মেরুদণ্ডের স্বাস্থ্য সম্পর্কে আরও জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

ক্যালেন্ডার-এ প্রকাশ পেল ‘শোলে’ ছবির কিছু স্মরণীয় মুহূর্ত

১৯৭৫ সালের কালজয়ী ছবি রমেশ সিপ্পির ‘শোলে’, সেলিম-জাভেদ জুটির অনবদ্য চিত্রনাট্য, ভারতীয় চলচ্চিত্রের এক মাইলফলক সৃষ্টি করেছে। সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল এই ছবি।

‘দ্য ড্রিমার্স মিউজিক পিআর এজেন্সি’-র উদ্যোগে, ‘সেরাম গ্রুপ’-এর নিবেদনে প্রকাশ পেল “শোলে পঞ্চাশ” শিরোনামের বিশেষ ক্যালেন্ডার। চমক ছিল এই ক্যালেন্ডার প্রকাশ অনুষ্ঠানে। ‘শোলে’-র দুই মুখ্য চরিত্র জয় এবং বীরু রূপে উপস্থিত ছিলেন বাংলা রক ব্যান্ড ‘ক্যাকটাস’-এর সিধু এবং পটা।

বাংলা রক ব্যান্ড ‘ক্যাকটাস’-এর পথ চলাও তিরিশ অতিক্রম করেছে। এদিন মোটরবাইকে চেপে সিধু-পটা গাইলেন সেই আইকনিক গান ‘ইয়ে দোস্তি’। পরে এক ঘরোয়া আলোচনায় সিধু এবং পটা দুজনেই ‘শোলে’ ছবির বিষয় নিয়ে তাঁদের ভালোলাগার কথা জানান।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ‘সেরাম গ্রুপ’-এর চেয়ারম্যান সঞ্জীব আচার্য্য জানিয়েছেন, “শোলে নিয়ে আজও আমাদের সকলের মধ্যেই একটা ভালোলাগা কাজ করে। সেরাম গ্রুপ সবসময় সুস্থ রুচি এবং সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক।”

সিধু এবং পটা জানিয়েছেন, “আমাদের এইরকম ভাবে জয় এবং বীরু-র ভূমিকায় এই বিশেষ অনুষ্ঠানে যে ভাবা হয়েছে, এটাই খুব আনন্দের, ভালো লাগার।”

‘দ্য ড্রিমার্স মিউজিক পিআর এজেন্সি’-র কর্ণধার সুদীপ্ত চন্দ এই ক্যালেন্ডারের মূল ভাবনা প্রসঙ্গে জানিয়েছেন, “প্রতিবছর নতুন কিছু থিম নিয়ে ‘দ্য ড্রিমার্স’ ক্যালেন্ডার প্রকাশ করে। এবছরের ক্যালেন্ডারের  প্রতি পাতায় আছে ‘শোলে’ ছবির আকর্ষণীয় নানা মুহূর্ত। সেই সময়ের পত্রিকায় প্রকাশিত ‘শোলে’ ছবির বিজ্ঞাপন, টিকিট, রেকর্ড কভার এবং মেকিং-এর নানা মুহূর্ত। ছবি প্রেক্ষাগৃহে চলার সময়ের লোকারণ্য হলের সামনের নানা দৃশ্য, পাউডার কেস, দেশলাই বাক্স, ছবির পোস্টার, বুকলেট, লবি কার্ড আরও অনেক কিছুও রয়েছে এই ক্যালেন্ডার-এ। সব মিলিয়ে সংগ্রহে রাখার মতো এই ক্যালেন্ডার।”

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব