সেতার ও চিত্রকলার যুগলবন্দীতে কলকাতা-য় বর্ণময় হয়ে উঠতে চলেছে ‘শ্রাবণ’ সন্ধ্যা

চলছে বর্ষাকাল। বর্ষার বারিধারা  গ্রীষ্মের তপ্ত ধরনির বুকে শীতলতার যেমন  প্রলেপ লাগায়, ঠিক তেমনই সবুজ গাছগাছালি,  প্রাণীজগত, এমনকী মানুষও শীতল প্রলেপে নতুন করে সজীবতা লাভ করে। তবে মেঘমেদুর বর্ষাদিনে অনেক সময়  মন  খানিকটা মেঘলা  হয়ে থাকে।  আর এই মনের মেঘ কাটাতে মুখ্য ভূমিকা নেয়  সংগীত তথা শিল্পের সমস্ত মাধ্যম। কারণ, বর্ষার সঙ্গে সংগীত এবং শিল্পের রয়েছে নিবিড় যোগ। আর এই বর্ষা-সুন্দরীর জন্যই এবার অভিনব মেলবন্ধন ঘটবে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারার দুই শিল্পমাধ্যমের। উপলক্ষ্য শুধু অঝোর বৃষ্টিধারা!

আগামী ১৪ আগস্ট বিড়লা আকাদেমিতে সন্ধ্যায় ঘটবে এই অভূতপূর্ব মিলন-পর্বটি। সেতার এবং চিত্রকলার যুগলবন্দিতে বর্ণময় হয়ে উঠবে ‘শ্রাবণ’। বর্ষামুখর সন্ধ্যায় এইভাবে দুই ভিন্ন শিল্পের মিলে যাওয়া নিঃসন্দেহে এক অভিনব প্রয়াস। কলকাতা সাক্ষী থাকবে এমন এক অনন্য সান্ধ্য মিলন উৎসবে!  শহরের দুই উজ্জ্বল সৃজনশীল শিল্পীর হাত ধরেই ঘটবে এই মহামিলন। সেতারে থাকবেন বিশিষ্ট সেতারবাদক দীপাঞ্জন গুহ এবং চিত্রকলায় (পেন্টিং) থাকবেন শহরের অন্যতম গুণী চিত্রকর শুভাশিস সাহা।

সেতারবাদক দীপাঞ্জন গুহ পণ্ডিত কুশল দাসের সুযোগ্য শিষ্য। ইউরোপ আমেরিকা-সহ দেশ-বিদেশের বহু অনুষ্ঠানে দীপাঞ্জনের সেতারবাদন শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছে। ভারত সরকারের আমন্ত্রণে একাধিকবার বাজিয়েছেন দেশের বিভিন্ন মঞ্চে। আমেরিকায় তাঁকে ‘দি মাস্টার অফ ক্রিয়েটিং মুডস থ্রু মেলোডিজ’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। সেতারবাদন ছাড়াও দীপাঞ্জন লেখক ও পর্বতারোহী। কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতক দীপাঞ্জন তাঁর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পেয়েছেন ‘বেস্ট অল-রাউন্ড গ্রাজুয়েট’-এর সম্মান। অন্যদিকে,  শুভাশিস সাহা এই সময়ের অন্যতম প্রতিভাবান একজন চিত্রশিল্পী। কলকাতার গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজ এবং শান্তিনিকেতনের কলাভবন থেকে তিনি শিক্ষাপ্রাপ্ত। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে তাঁর আঁকা ছবি প্রদর্শিত হয়েছে।

দীপাঞ্জন গুহ-র সেতারের ঝংকারকে সঙ্গী করে ক্যানভাসে তুলির আঁচড়ে শুভাশিস সাহা জন্ম দেবেন এক নতুন ‘শ্রাবণ’। এমন শ্রাবণ সত্যিই বিরল। দীপাঞ্জন গুহ-র কথায়, “আমাদের এই যুগলবন্দী ‘শ্রাবণ’ একটি অন্য রকমের প্রচেষ্টা। সংগীত ও চিত্রকলা, মানুষের ইতিহাসের এই প্রাচীন এবং অন্যতম শ্রেষ্ঠ দুই শিল্পমাধ্যমের মেলবন্ধনে, বর্ষার আবহে, একটি যৌথ ভাষ্য গড়ে তোলা – এটিই আমাদের এই যুগলবন্দীর উদ্দেশ্য। শ্রাবণসন্ধ্যায়, সংগীতের সঙ্গে যুগ্ম ভাবে মঞ্চের উপর একটি বড়ো ক্যানভাস ধীরে ধীরে পূর্ণ হয়ে উঠছে, এই অভিজ্ঞতা আমাদের বেশি হয় না। এর আগেও আমরা বসন্তের আবহে একটি যুগলবন্দী করেছিলাম।”

এমনই এক ‘শ্রাবণ’ সন্ধ্যায় ভেজার অপেক্ষায় থাকুক গোটা কলকাতা।

ই’বেবি (পর্ব-০২)

সুমনা কথাগুলো শুনে কোনও উত্তর না দিয়ে কিছু সময় চুপ করে বসে থাকে। এই সময় অলোকা সুমনার ফ্ল্যাটের চারদিকটা চোখ ঘুরিয়ে দেখে নেন। টু’বিএইচকে, তবে বসবার জায়গাটা এক্কেবারেই ছোটো নয়, একটা সোফা আর টি’টেবিলের পর আরও কিছুটা জায়গা থাকছে। একদিকের দেয়ালে একটা বাচ্চার ছবি টাঙানো আছে।

কফি করি? এই প্রথম আমার ফ্ল্যাটে এলে। আমার বিয়েতেও তুমি আসতে পারোনি।

—না, কার একটা বিয়ে ছিল। তুমি বরং একটু বোসো, আমাকে দেখিয়ে দাও, আমি করে নিচ্ছি। আবার হেসে উঠল সুমনা। —আজ এখন করবে, তারপর কাল, পরশু? ছাড়ো এই সব টুকটাক কাজ আমি করে নিতে পারব। সব কিছু ঠিক থাকলে ডাক্তারবাবুর সাথে কথা বলে সামনের সপ্তাহ থেকেই অফিস জয়েন করব।

—অফিস! তোমাকে দেখেই তো সবাই অবাক হয়ে যাবে।

—হতো। কিন্তু টিভিতে দেখানোর পর সবাই জেনে গেছে। কয়েকটা ম্যাগাজিনেও ফিচার বেরোবে। অফিসের অনেকেই ফোন করে জিজ্ঞেস করল। তমালবাবুকে চেনো? অ্যাকাউন্টসে বসেন, উনি নিজে ফোন করেছিলেন, পরে বউদিও ফোন করেছিলেন। ওনাদেরও মনে হয় কোন ইস্যু নেই না?

—না। অনেক টাকা খরচ করেছেন। কিছু টাকা লোনও হয়েছে।

—আমিও তো ওই জন্যেই এসেছি।

—তোমার তো মেয়ে আছে।

—মেয়ের তো কেউ নেই।

শেষের এই কথাগুলোর পরে ফ্ল্যাটের ভেতরটা একটা চাপা শূন্যতা গ্রাস করে নিল। কিছু সময় দুটো মানুষ শুধু দু’জনের শ্বাসের শব্দ শুনেই কাটিয়ে দিল।

—তুমি নিজে তো আবার বিয়ে করতে পারতে। কিছু সময় চুপ থেকে অলোকাদি জিজ্ঞেস করলেন।

—আর সম্ভব নয় দিদি। একটা মানুষকে ভালোবেসে বিয়ে করলাম। প্রথমে তো আমার বাড়ি থেকে মেনে নেয়নি, আমি কিন্তু বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে। মানুষটা তো কোনও কষ্ট দেয়নি। আমার ভাগ্যে সুখ নেই, কী আর করা যাবে! এখন বিয়ে করলে শরীর আর মন মেশাতে পারব না। তাতে একজনের সাথে বেইমানি করা হবে। এটা অবশ্য আমার নিজের বিশ্বাস। অনেকেই এখন এই সব ছেঁদো সেন্টিমেন্ট-কে বিশেষ পাত্তা দেয় না।

—তুমি হাসপাতালে ভর্তি হয়ে সব কিছু করলে না কেন?

—গেছিলাম দিদি। এই শহরের সব বড়ো বড়ো সেন্টারে কথা বলেছি। যে-টাকাটা ট্যারিফ বলল সেটা এই মুহূর্তে বিয়ার করতে পারব না। তুমি মনে হয় জানো না, অ্যাক্সিডেন্টের পরে ও পনেরো দিন কোমাতে ছিল। সেই সময় অনেক টাকা খরচা হয়ে গেছে। ব্যাংকে প্রায় কিছুই নেই, তার উপর এই ফ্ল্যাটের ইএমআই— সব কিছুর মধ্যে খুব চাপে আছি।

কথাগুলো বলবার সময়েই সুমনা কফি তৈরি করছিল। তারপর একটা ছোটো প্লেটে কফি আর কয়েকটা বিস্কুট নিয়ে ড্রয়িংরুমের টি-টেবিলের উপর রাখল।

কফিতে একটা চুমুক দিয়ে সুমনা একটা শান্তির শ্বাস ছাড়ল। ভেবেছিলাম বাকি জীবন একাই কাটিয়ে দেব। একটা অনাথ আশ্রমে যাতায়াত আরম্ভ করেছি, সেই মতোই মানসিক প্রস্তুতিও নিচ্ছিলাম। হঠাৎ ফেসবুকের একটা লিঙ্কে খবরটা পাই। যদিও ব্যাপারটা বিদেশের, এবং সেই ভদ্রমহিলার হ্যাজব্যান্ড বেঁচে ছিল, তাও এই কিট কিনে ডোনার নিয়ে আবার প্রেগন্যান্ট হয়েছিলেন। আমিও চেষ্টা আরম্ভ করলাম।

—ওই সব এখানে পাওয়া যায়?

—এ হল ইনসেমিনেশন কিটস! হ্যাঁ হ্যাঁ। এখন সব অনলাইনে পাওয়া যায়। এটাকে মোসি কিটও বলে। বাইরে ওষুধের দোকানে পাওয়া যায় কিনা বলতে পারব না। আমি তো অনলাইনে অর্ডার দিয়ে ছিলাম। অলোকা ম্যাডাম কিছু সময় আবার চুপ করে গেলেন। এমনকী হাতে থাকা কফির কাপটাও স্থির হয়ে গেছিল।

—আমার মেয়েটার হবে? এবার সুমনা বেশ চমকে উঠল।

—না হবার তো কোনও কারণ নেই।

একটা লম্বা শ্বাস ছাড়লেন অলোকা ম্যাডাম, ‘তুমি ভুলে গেছ, আমার মেয়েটার কিন্তু দুটো পা নেই। হুইল চেয়ারে চেপেই ঘুরে বেড়ায়। এখনও কিছু ব্যবস্থা করতে পারিনি। সব সময় ভয়ে ভয়ে থাকি, এই বুঝি কিছু করে দেয়। এর মধ্যে বেশ কয়েকবার সুইসাইড করবার চেষ্টা করেছে। এখন দিনেরবেলায় একজনকে আয়া হিসাবে রাখতে হয়েছে। কাউসেলিং করালাম, কুকুর পাখি পোষার কথাও বললেন, তবে বাচ্চা হলে আরেকটু ভালো হয়। ওই আয়া ভদ্রমহিলারও কেউ নেই, সেই রকম চার্জ নেয় না, তবে দুবেলার খাবারটা দিতে হয়।

—ও, হ্যাঁ হ্যাঁ। আমি ভুলে গেছিলাম। সত্যি এই রকম দেখা যায় না। ওর শ্বশুরবাড়ি থেকে কিছু বলেনি তো…

—কেন বলবে? হনিমুন করতে গিয়ে ওদের ছেলে মারা গেল, আমার মেয়ের দুটো পা কেটে গেলেও প্রাণে তো বেঁচে আছে। অতো উঁচু পাহাড় থেকে পড়ল, একই গাড়িতে পাশাপাশি দু’জন ছিল, একজন মারা গেল আরেক জন…। আবার কিছু সময় চুপ করে “মাঝে মাঝে মনে হয় দু’জন মারা গেলেই ভালো হতো।”

—এই রকম কেন বলছ? তোমার মেয়ে তো বেশ ড্যাশিপুশি। আমার মনে আছে, অফিসের সেই পিকনিকটার কথা। সেই কী একটা বাগানে হয়েছিল। তোমার মেয়ে তখন বেশ বড়ো, হায়ারসেকেন্ডারি দেবে। অশোক তখন বেঁচে ছিল। সেই অরূপবাবুর ছেলের সাথে কী একটা হয়েছিল। ডিসটার্ব করেছিল, তোমার মেয়ে সবার মাঝে ছেলেটাকে চড় মেরে দিয়েছিল। তুমি কত বকলে। অরূপবাবু লাঞ্চ না করেই বেরিয়ে গেছিলেন। ওর ডাকনাম মনে হয় ঘুড়ি।

(ক্রমশ…)

বর্ষাকালেও থাকুন স্টাইলিশ

ফ্যাশনের জন্য সময়-কাল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলায় ঋতু পরিবর্তন হয় বছরে ছ’বার। আর এই ছয় ঋতুতে আলাদা ধরনের পোশাক বাজারে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। দেখে শেখা কিংবা ফ্যাশনে নিজেই সচেতন হওয়া— যে-কারণই হোক না কেন, বৈচিত্র্যময় ঋতুতে বৈচিত্র্যের ছোঁয়া পোশাকেও যে শুরু হয়েছে, তা আজ অস্বীকার করার উপায় নেই। বর্ষাকালে আরামদায়ক অনুভূতি-র সঙ্গে অফিসেও প্রফেশনাল দেখানোটা একটু কঠিন হয়ে পড়ে। তবে বিশেষজ্ঞদের এই পরামর্শ মেনে চললে, বর্ষাতেও স্টাইলিশ দেখাতে পারবেন। বর্ষার কথা মাথায় রেখে এমনই কিছু প্রয়োজনীয় টিপ্‌স এখানে রইল–

উজ্জ্বল রং ব্যবহার করুন

বর্ষাকালে নীল, লাল ও কমলা রঙের পোশাক পরলে বর্ষার আবহাওয়াতেও অপরের দৃষ্টি সহজেই আকর্ষণ করতে পারবেন এবং মন থেকেও বিরক্তি চলে গিয়ে সুখানুভূতি হবে। বর্ষা ঋতুতে সাদা পোশাক পরবেন না। বৃষ্টিতে ভিজে গেলে, সাদা পোশাক ট্রান্সপারেন্ট হয়ে পড়ে এবং সঙ্গে সহজে তাদের উপর জল, নোংরার দাগও পড়ে যায়।

প্যান্ট এবং স্কার্ট

লম্বা প্যান্ট পরবেন না, কারণ লম্বা প্যান্ট দ্রুত নোংরা হয়ে যায়। আপনি চাইলে লম্বা প্যান্ট-কে আপনার সুবিধা ও পরিবেশ অনুযায়ী নীচ থেকে গুটিয়ে নিতে পারেন। স্মার্ট ফর্মাল স্কার্ট এই মরশুমের জন্য দুর্দান্ত।

কোট এবং জ্যাকেট: বৃষ্টির কোর্ট (Rain Coat) বা জ্যাকেটের সঙ্গে আপনি ওয়েস্টার্ন পোশাক পরতে পারেন।

ভারতীয় পোশাক

আপনি যদি বর্ষাকালে ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় পোশাক পছন্দ করেন, তবে সালোয়ার এবং পাতিয়ালার পরিবর্তে ছোটো কুর্তি-সহ লেগিংস বা চুড়িদার ব্যবহার করে দেখুন। এই মরশুমে, বড়ো দোপাট্টাগুলি স্কার্ফ বা স্টোল দিয়ে রিপ্লেস করুন। বৃষ্টিতে এমন প্রিন্ট ও রঙের পোশাক পরবেন না, যা ভিজে গেলে রং ছেড়ে দেয়।

জুতো স্লিপার

এই ঋতুতে চামড়ার জুতো বা স্যান্ডেল পরবেন না, কারণ এগুলি দ্রুত ভিজে যায় এবং শুকোতে অনেক সময় নেয়। জেলি জুতো, হিলবিহীন স্লিপার এবং স্যানডাক, রাবারের জুতো পরুন। বর্ষায় একের বেশি জুতো অবশ্যই সঙ্গে রাখুন। রাস্তায় আপনার জুতো ভিজে গিয়ে ছিঁড়ে যেতেই পারে যে-কোনও সময়। বর্ষায় প্লাস্টিক বা নন লেদার মেটিরিয়ালের জুতো পরুন। বর্ষা স্পেশাল বিভিন্ন স্টাইলের প্লাস্টিকের জুতো পেয়ে যাবেন ফুট-এ কিংবা ব্র্যান্ডেড শু-স্টোরে।

মেকআপ: ওয়াটার প্রুফ মাস্কারা এবং আই-লাইনার প্রয়োগ করুন। বর্ষাকালে ফাউন্ডেশন ব্যবহার করবেন না এবং যদি এটি প্রয়োগ করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়, তাহলে এটি হালকা ভাবে প্রয়োগ করুন।

চুল: বর্ষাকালে বায়ুমণ্ডলে উপস্থিত আর্দ্রতা আপনার চুলের জন্য ক্ষতিকারক হতে পারে। তাই, বাইরে বেরোবার সময় চুলে খোঁপা বা বিনুনি করতে পারলে চুল ভালো থাকবে।

জিন্স: বর্ষায় জিন্স ব্যবহার একেবারেই করবেন না। এগুলি শুকোতে অনেক সময় লাগে।

ছাতা: পোশাকের সঙ্গে ম্যাচিং করে ছাতা চয়ন করুন।

ই’বেবি (পর্ব-০১)

টেবিলে ব্যাগটা রাখবার কিছু সময় পরেই নিজের বোতলটা বের করে আধ বোতল জল শেষ করে দিলেন অলোকা ম্যাডাম। এমনটা যে রোজ করেন তা নয়, তবে আজকে লিফটের কী একটা অসুবিধা হয়েছে, দু’তলা থেকে এই চারতলা পর্যন্ত সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসতে হল। বয়স হচ্ছে, এবার একটু বেশিই হাঁপ লাগছে। কয়েকদিনের মধ্যে একবার ডাক্তার বোসের কাছে যেতে হবে। মেয়ের কথা ভেবে সব কেমন যেন গোলমাল হয়ে যাচ্ছে।

এর মধ্যেই অলোকা ম্যাডাম নিজের চেয়ারে বসে চারদিকটা একবার দেখে নিলেন। অনেক টেবিলই এখন ফাঁকা। চেয়ার থেকে উঠে গোবিন্দ এসেছে কিনা খোঁজ করলেন। না, ওই মহাশয়েরও পাত্তা নেই, অন্য কোথাও ফাইফরমাশ খাটতেও যেতে পারে। ম্যাডাম আস্তে আস্তে নিজেই বোতলে জল ভরতে গেলেন। চেয়ারের কাছে আসতে যাবেন, এমন সময় অন্য প্রান্ত থেকে কাবেরি হাত নাড়ার সাথে বেশ জোরেই চিৎকার করে উঠল— ‘অলোকাদি, আসছি, দারুণ খবর আছে।’

মেয়েটা কয়েক বছর হল এখানে জয়েন করেছে, আগে অন্য কোনও এক ডিপার্টমেন্টে ছিল। বেশ চনমনে, এর মধ্যে দুটো ডাইভোর্স হয়ে গেছে, এখন একটা ব্যাংকের ম্যানেজারের সাথে তৃতীয় বিয়ের জন্যে তৈরি হচ্ছে। কারওর খাতির করে না, এক্কেবারে মুখের সামনে বলে দেয়। এই জন্যেই অফিসের আর কেউ তাকে ঘাঁটায় না। তবে অলোকা ম্যাডামের সাথে বেশ ভালোই সম্পর্ক, কয়েকবার তার বাড়িতেও গেছে। ঘটনাটার পরে…।

—তোমার পাশে বসে বলতে হবে, দারুণ খবর।

কথাগুলো শেষ করবার আগেই অলোকাদির টেবিলের পাশ থেকে একটা চেয়ার টেনে বসে যায় সে। তারপর চারদিকটা দেখে। বলে, “কিছু কি শুনেছো?”

—কী ব্যাপারে বলতো?

—এই সুমনার ব্যাপারে?

অলোকা ম্যাডাম বেশ অবাক হন, ‘সুমনা মানে নীচের তলায় ডেসপ্যাচে বসে, গড়িয়ার দিক থেকে আসে!”

—হ্যাঁ গো।

—ওরও তো স্বামীর চাকরি, বেচারি, খুব অল্পদিনই বিয়ে হয়েছিল।

—হ্যাঁ। এখন একেবারে ফেমাস হয়ে গেছে, কাল একটা টিভিতে ওর ইন্টারভিউ দেখিয়েছে।

—ইন্টারভিউ! কেন?

—আরে সেটাই তো বলছি।

মানুষ ভাবে এক আর হয় আরেক। বাবা মা আর তাদের একমাত্র মেয়ে শর্মিষ্ঠা, আদরের ঘুড়ি, এই তিনজনের সুখের সংসার ছিল। বাবা সরকারি চাকরি করতেন, টাকার প্রাচুর্য না থাকলেও বেশ ভালো ভাবেই চলে যাচ্ছিল। মেয়ে ইংরাজি মিডিয়ামে না পড়লেও শহরের নামি সরকারি স্কুলেই পড়ত। একদিন রাতে খেয়ে উঠে বাবার বুকে ব্যথা, হাসপাতালে নিয়ে যাবার রাস্তাতেই শেষ। তারপরেই মায়ের আরম্ভ হল আরেক যুদ্ধ, সেটা এখনও চলছে। মাঝখানে এখন আরেকটা লড়াইও এসে জুটেছে।

বাস থেকে নেমে টোটোতে সুমনার বাড়ি আসার রাস্তায় এই সব কথাগুলো অলোকা ম্যাডামের মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে আরম্ভ করেছিল। ‘মেয়েদের ভেতর একটা আলাদা শক্তি থাকে, যে-কোনও স্থানে ঠিক মানিয়ে নিতে পারে। যারা পারে না তাদের কপালে চরম দুঃখ নেমে আসে।’ কথাগুলো বারান্দায় বসে বসে ঠাকুমা প্রায়ই বলত। এখন এই সব কথা কাউকে বললে উলটোপালটা কথা শোনাবে। ঘুড়ির এই রকম অবস্থা ছিল, এই সব কথা বললে রেগে উঠত।

টোটোতেই ফোনটা রিং হয়। অলোকা ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করতেই দ্যাখেন ‘সুমনা কলিং’। ফোনটা রিসিভ করতেই লোকেশন বলে দেয়।

ফ্ল্যাটে ঢুকেই অলোকা খুব অবাক হয়ে যান। দরজাটা সুমনাই খুলেছে। ভেতরে ঢুকেই জিজ্ঞেস করে, “তোমার সাথে আর কেউ থাকে না?’

—আর কে থাকবে? অশোক মারা যাবার পরে মা কয়েক মাস ছিল, তারপর থেকে আমি একা। শোকটা নিতে পারল না, প্রথমে বাবা তারপর মা— ওই ছয় মাসের গ্যাপ।

—কিছু অসুবিধা হলে?

এই কমপ্লেক্সে একটা প্রাইমারি হেল্থ সার্ভিস আছে, যে ডাক্তারবাবুর আন্ডারে আছি, তার ফোন নম্বরও নিয়ে রেখেছি। –কিন্তু আর কয়েকদিন পরে তো…

—তখন একটা আয়াকে রেখে দেব। কথাবার্তা বলা আছে।

—তোমার তো এখন বেড রেস্ট দরকার?

—ওভুল্যেশনের পরে পজিটিভ হল, দু’সপ্তাহ একটু সাবধানে থাকতে বলেছিল। আমি তিন সপ্তাহ বেডরেস্ট নিয়েছি। আমার আবার একটা প্রোজেস্টেরণ হরমোন ট্রিটমেন্ট হল, অশোক বেঁচে থাকতে একটা মিসক্যারেজ হয়েছিল। তাই ডাক্তারবাবু আর রিস্ক নেননি। এখন তো মাঝেমাঝেই ডাক্তার দেখাতে যেতে হবে। সিক্স উইকে একটা ইউএসব্জি আছে, এইট উইকে একটা ইউএসজি আছে। তারপর আস্তে আস্তে এনটি স্ক্যান, ডবল মার্কার — এই সব চলতেই থাকবে।

—বাবা, এত কিছু! আমাদের সময় এত সব ছিল না।

—এখন ডাক্তাররা যেভাবে ভাবছেন।

—আমি কাবেরির কাছে তোমার কথা পরশুই জানতে পারি। এই রকম একটা ঘটনা যে এই দেশে হতে পারে এটাই তো ভাবতে পারছি না। অলোকা ম্যাডামের কথাগুলো শুনে সুমনা একটু হেসে ওঠে।

—কাবেরিদি-ও জানতে পারত না, নেহাত সে দিন টিভিতে আমার সাক্ষাৎকারটা দেখতে পেয়ে গেছিল, তারপরেই ফোন করে। নাহলে আমি অফিসেও কিছু বলিনি। সবাই জানে শরীর খারাপ।

—তোমার সাহস আছে, আগে তোমার সাথে সেরকম কথা হয়নি। কাবেরি তোমার কথা বলতেই প্রথমে খুব অবাক লাগছিল। আমার পাশের বাড়ির এক ভদ্রমহিলা আইভিএফ ট্রাই করলেন। কিন্তু সাকসেস হল না।

—সাকসেস রেট তো খুব কম, সারা দেশে তিরিশ থেকে পঁয়ত্রিশ। বয়স কম হলে মেরে কেটে চল্লিশ। তাও তো এখন অনেকটা বেড়েছে। প্রসেসটাও তো খুব জটিল, সম্ভবত চারটে স্টেপ আছে। কিছু সময় থেমে অলোকা বললেন, ‘আচ্ছা তুমি তো আবার বিয়ে করলেই পারতে।’

(ক্রমশ…)

সম্পর্ক (শেষ পর্ব)

হ্যাঁ, ভেবে তো দেখেনি ঋষভ! এক একটা দুর্গা ঠাকুর দেখতে কত কত লোক আসে। কিছু একটা জাদু তো আছেই, নাহলে অত মানুষ কীসের টানে ঘর ছেড়ে পথে নামে!

—কত্তা, আমার মনে হয় এ একটা সম্পর্ক। এ যে কতকাল ধরি বুকির মদ্যি বসি থাকে বলা যায় না। কিন্তুক যেমনি পালমশাই মূর্তি বানাতি যায়, অমনি সে আপনা আপনি উঠি আসে। সেই সম্পর্ক ধরা দেয়। না দিলি পারবে কেন! সে তো আর ফটোক দেকি দেকি ঠাকুর বানাতিছে না। সেই কবে থেকি, শিশুবেলা থেকি বাপ-দাদাদের দেখাদেখি পালেরা ঠাকুর বানাতি যায়। তাদের কোনও দিকি তাকাতি হয় না। চক্ষুদানের পর পালমশাই যখন দুগ্‌গোর দিকি তাকায় তখন সে নিজিই দেকতি দেকতি মাতাল হইয়ে যায়। এই দেবী কী তার নিজির বানানো! তাহলি সে তো এক ম্যাজিকশিয়ান!

লোকটা কী বলে রে বাবা! ঋষভ চমকায়! এত কথা লোকটা জানল কী করে! ওই সাধারণ মানুষ, ওই প্রায় না-খেতে পাওয়া মানুষটার ভেতর ঘর এত ঝলমল করে কীভাবে!

শিলকাটাইওয়ালা বলে, ‘এই যে রাম-সীতার মূর্তি এখানে ফুটি উঠতিছে, তাকি আমি কোনও ফটোক দেখে করতিছি কত্তা! আমার বুকির ভেতর কবেই যেন বাপ-পিতেমোরা তা পেতে দেছে। আমি তো শুধু ছেনি আর হাতুড়ির ঠুকঠুক করা সাধারণ মানুষ। আমি তাদের উজোনে ভাইসছি গো কত্তা।

তিন

মেঘের ভেতর চাঁদ ভেসে বেড়াচ্ছে না চাঁদের ভেতর মেঘ। রবিবারের ছুটির দিন। বিকেলে আজ আর কোথাও বেরনোই হল না। শিল কাটার কাজ শেষ হতে সন্ধ্যা গড়িয়ে গেছে। অন্যদিন সন্ধ্যাবেলায় দু-তিন জন বন্ধু মিলে কাশী মিত্র ঘাটে বসে গল্প গুজব করে। আজ যায়নি। আজ আর ভালো লাগছিল না। একটু নিজের কাছে নিজেকে একা করে রাখতে ইচ্ছে করছিল। আজ ঋষভ বাড়ির তিন তলার ছাদে উঠে এসেছে। গঙ্গার জল পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। জেলে ডিঙি দেখা যাচ্ছে। রাতে বুঝি মাছ ধরবে। হারিকেন জ্বালিয়েছে। হারিকেনের মিটমিট আলো গঙ্গার বুকে প্রদীপের মতো লাগছে।

আজ কী মনে হয়েছে, দেয়ালে ঝোলানো ব্যাগ থেকে বাঁশি-টা বের করে নিয়ে এসেছে ছাদে। ফুঁ দিতে ইচ্ছে করছে না। হাওয়া হচ্ছে খুব। এলোমেলো হাওয়া। ধুতি আলুথালু হয়ে যাচ্ছে। আজ ঠিক পূর্ণিমা নয়। আগে-পরে হবে। চাঁদের গোলপানা রকম চোখে পড়ছে। অনেকদিন পর ছাদে এসেছে। ছাদে আসায় খারাপ যে লাগছে তা নয়। গঙ্গার দিক থেকে হু হু করে হাওয়া আসছে। উড়িয়ে নিয়ে যাবে নাকি!

অন্যমনা হয়ে আছে মন। নাড়াচাড়া খেয়েছে। শিলকাটাইওয়ালা ঋষভের মনটাকে নরম করেছে ঢের। বারবার মা-র কথা মনে পড়ছে। পশ্চিম দিকের কোণে গেল৷ নতুন বানানো ব্রিজটা চোখে পড়ে ওখান থেকে। মানুষের হাতে বানানো, মহাভারতের ময়দানবের হাতের নয়। নিম গাছটা বড়ো হতে হতে এত উঁচুতেও তার হাত ছড়িয়ে দিয়েছে। তার পাতাগুলি ঋষভের গায়ে লাগতেই মনে হল, কেউ যেন গায়ে নরম হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। ঋষভ ভাবল গাছও যে ঘুরে বেড়াতে চায়, তা যেন এই মাটি তাকে ছাড়তে চায় না বলে সে ক্রমাগত উঁচুর দিকে নিজেকে নিয়ে যায়। ঋষভের মনের ভিতর থেকে অস্থিরতা উধাও। আর কখন যেন আনমনে বাঁশি তুলে নিয়েছে ঠোঁটে।

হ্যাঁ হ্যাঁ হচ্ছে তো! কিচ্ছুটি ভোলেনি। রাখালিয়া সুর দিব্যি খেলছে! কত যুগ পরে বাঁশি মুখে তুলল ঋষভ। সে ঠোঁট থেকে নামিয়ে বাঁশির সারা গায়ে আদর করে দিল। আজ মনে হল, অভিমান এসে তাদের কত কত দিন কেড়ে নিয়ে গেছে।

একটা সুর ভুল বাজিয়েছিল বলে ঋষভের বাবা তার হাত থেকে বাঁশি কেড়ে নিয়ে সেই বাঁশি দিয়েই দুই ঘা বসিয়েছিলেন ঋষভের পিঠে। তারপর বাবাও বাজাননি, ঋষভও না। তখন ক্লাস টেন। ঋষভের মনে পড়ছে কতবার ইচ্ছে করেছে, কিন্তু বাঁশি ঠোঁটে তুলতে পারেনি। সে শুধু ভেবেছে, বাবাও তো নিজেকে শাস্তি দিয়েছে, তারপর থেকে বাবা বাঁশি বাজানোর সুখ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করেছেন। তাহলে কোন স্বার্থপরতায় সে আবার বাঁশি বাজাবে!

এ সময় ঋষভ অবাক হয়ে দেখল চাঁদের উপর থেকে সমস্ত দাগ যেন সরে গেছে। কালো কালো দাগের চাঁদের মা বুড়ি উধাও। ঝকমক করছে চাঁদ মাথার উপরে। মেঘেরা নেই। তার নিজের মনের ভেতর থেকে সব কালো উধাও। কী এক নতুন আলোয় সে স্নান করছে।

এই ঠিকঠাক সুর তুলতে পারাটা ঋষভের সামনে পথ মেলে ধরল। শিলকাটাইওয়ালার কথা মনে এল। সে শুধুমাত্র তার শিল্পীসত্তা বজায় রাখার জন্য একটা গোটা জীবন বাজি রেখে বসে আছে। অন্য কোনও কাজ করলে সে তার পরিবার পরিজন নিয়ে আরও একটু ভালো ভাবে কাটাতে পারত। কিন্তু বুকের ভেতরে থাকা পুর্ব-পুরুষের শিল্পবোধ তাকে বারণ করেছে।

ঋষভ চাঁদের দিকে হাত মুঠো করে বলল, ‘পেয়েছি। আমি পেয়েছি। এই বাঁশির সারা গায়ে আমার বাবার গায়ের গন্ধ। এই বাঁশিতে বাবার ঠোঁটের স্বাদ লেগে আছে। বাঁশির মনের সাথে বাবার মন জুড়েছিল একদিন।’

ঋষভ বাঁশিকে বুকে চেপে ধরে বলল, ‘না না, আমি বাজাব, আর ছাড়ব না একে। ও শিলকাটাইওয়ালা, শোনো শোনো আমিও সম্পর্ক পেয়ে গেছি গো।’

(সমাপ্ত)

চলতি মাসেই ZEE5-এ মুক্তি পাবে রহস্যে মোড়া সিরিজ ‘কাঁটায় কাঁটায়’

ZEE5 অরিজিনাল-এ মুক্তি পেতে চলেছে বাংলা থ্রিলার ‘কাঁটায় কাঁটায়’। নারায়ণ সান্যালের লেখা ‘সোনার কাঁটা’ অবলম্বণে তৈরি হওয়া এই থ্রিলার ‘কাঁটায় কাঁটায়’ সমৃদ্ধ হয়েছে শাশ্বত চট্টোপাধায়, অনন্যা চট্টোপাধ্যায় এবং সোহম চক্রবর্তী-র অভিনয়ে। শ্যাম সুন্দর প্রযোজিত এবং জয়দীপ মুখোপাধ্যায় পরিচালিত এই সিরিজটি মুক্তি পাবে ১৫ আগষ্ট।

দার্জিলিংয়ের ঝড়-ঝঞ্ঝার পটভূমিতে নির্মিত ধোঁয়াশায় মোড়া ‘কাঁটায় কাঁটায়’। এই সিরিজটি দর্শকদের এমন একটি বিশ্বে নিয়ে যাবে, যেখানে ঘটতে থাকবে চমকপ্রদ সব ঘটনা। মেয়ে হারানোর দুর্ভাগ্য তাড়িয়ে বেড়ায় পিকে বসু-কে। এরপর পিকে বসু তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও অসাধারণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ব্যবহার করে হত্যাকারীকে খুঁজে বের করবেন। অবশ্য তার আগে দর্শকদের মনে জাগবে নানারকম প্রশ্ন। হত্যাকারী কি হোটেলের অতিথিদের মধ্যেই  কেউ নাকি অন্য কেউ? তবে এটা কোনও সাধারণ হত্যা রহস্য নয় বলে মনে করেন পরিচালক।

ZEE5-এর চিফ বিজনেস অফিসার মণীশ কালরা প্রসঙ্গত জানিয়েছেন, ‘আমরা অত্যন্ত আনন্দিত যে, ‘কাঁটায় কাঁটায়’ তৈরি হয়েছে বাংলার বর্তমান প্রতিভাধর অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নিয়ে। ZEE5 গত এক বছরে একাধিক অরিজিনাল লঞ্চ করেছে। আমরা দেখেছি যে, হত্যা রহস্য এবং গোয়েন্দা থ্রিলারগুলি বিশেষ করে বাংলা-র দর্শকদের কাছে অসাধারণ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। তাই, হত্যা রহস্য ‘কাঁটায় কাঁটায়’-এর সাফল্যের বিষয়েও আমরা ভীষণ আশাবাদী।’

পরিচালক জয়দীপ মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ‘কাঁটায় কাঁটায়’-এর সাফল্যের জন্য আমি এবং আমার টিম-এর সকলেই নিষ্ঠা সহকারে কাজ করেছেন। সেইসঙ্গে,  নারায়ণ সান্যালের প্রিয় ‘সোনার কাঁটা’-কে আধুনিক দর্শকদের জন্য পুনর্গঠন করেছি এবং একটি থ্রিলার তৈরি করেছি, যা যেমন আবেগপূর্ণ,  তেমনই রোমাঞ্চকর।’

এই সিরিজ-এ শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় পিকে বসুর চরিত্রে অভিনয় করেছেন। এছাড়া, সোহম চক্রবর্তী-র এটি ওটিটি ডেবিউ। অনন্যা চট্টোপাধ্যায় রাণী বসুর চরিত্রে অভিনয় করেছেন।

প্রসঙ্গত শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন,‘পিকে বসুকে জীবন্ত করে তোলার চেষ্টা করেছি আমি। তবে এই উদ্যোগে কতটা ফল হয়েছি, তা বলবেন প্রিয় দর্শকরা। একদিকে নিজের মেয়ে-কে হারানোর যন্ত্রণা, অন্যদিকে আইনজীবি পিকে বসু হিসাবে অপরাধীকে খুঁজে বের করে শাস্তির ব্যবস্থা করা—অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং একটি চরিত্র বলে আমার মনে হয়েছে। এই চরিত্রটি বুদ্ধিমত্তা এবং আবেগের মিশ্রণে তৈরি। আশাকরি দর্শকদের খুশি করতে পারব।’

অন্যদিকে, রানি একজন মা এবং স্ত্রী। যার বিশ্ব ছিল মেয়ে মিঠু, যা মিঠুর মৃত্যুর পর ধ্বংস হয়ে যায়। রানি  তার মৃত সন্তানের ছবি এমন ভাবে দেখেন, যা তার চরিত্রকে একটি অশরীরি উপাদান যোগ করেছে মনে হবে। এর মধ্যেও রানি কীভাবে তার স্বামীকে মামলা লড়তে সাহায্য করবে, তা সত্যিই দর্শকদের ভাবাবে বলে মনে করেন রানি চরিত্রে রূপদানকারী অনন্যা চট্টোপাধ্যায়।

সোহম চক্রবর্তী তাঁর প্রতিক্রিয়া-য় জানিয়েছেন, ‘ওটিটিতে ডেবিউ করা অত্যন্ত রোমাঞ্চকর মনে হয়েছে।কারণ সাবির রায়-এর মতো একটা চ্যালেঞ্জিং চরিত্রে অভিনয় করেছি ‘কাঁটায় কাঁটায়’ সিরিজে।’

আকাশ আট-এ আজ থেকে দেখা যাবে দুটি নতুন ধারাবাহিক

বিনোদনের চ্যানেল ‘আকাশ আট’ তাদের দর্শকদের জন্য আজ থেকে উপহার দেবে দুটি নতুন বাংলা ধারাবাহিক। ‘মধুর হাওয়া’ এবং ‘বউ চুরি’– এই দুটি ধারাবাহিক দেখা যাবে সাহিত্যের সেরা সময় সিরিজ-এ।

উত্তর কলকাতার সান্যাল বাড়ির চার প্রজন্মের নীতি এবং আদর্শ নিয়ে গড়ে উঠেছে ‘মধুর হাওয়া’ ধারাবাহিকের কাহিনি। আর এই সান্যাল বাড়ির কর্তা-র নাম– নীহাররঞ্জন সান্যাল।

আশি বছর বয়সি নীহাররঞ্জনবাবু প্রাচীনপন্থী। কানন দেবীর অভিনয়ের ভক্ত ছিলেন তিনি। এখনও ঘরে কাননবালার পুরনো গানের রেকর্ড, ছবি সবকিছুই রাখা আছে যত্নে। নীহারঞ্জনবাবুর স্ত্রী কিরণময়ী। অল্প বয়সে কিরনময়ীর কণ্ঠে কাননবালার গান শুনেই মুগ্ধ হয়েছিলেন নীহারঞ্জন। ফুলশয্যার রাতে স্ত্রীর নাম বদলে ‘কানন’ রাখতে চেয়েছিলেন। কিরণময়ী বেঁকে বসেন। নীহারঞ্জন তখন নিজের বাড়ির নাম রাখেন ‘কিরণ  কানন’।

কিশোরী কিরণ দুষ্টমি করে পাথর খোদাইয়ের সেই নাম ইট দিয়ে ঘষে ঘষে ‘কানন’ কথাটি মুছে দিয়েছিলেন। এত বছরের বিবাহিত জীবনে নীহাররঞ্জন ও কিরণময়ীর সম্পর্কে আজও সতীন কাঁটা হয়ে রয়েছেন কাননদেবী। নীহাররঞ্জন ও কিরণময়ীর এই ঝগড়ার মধ্যেও লুকিয়ে রয়েছে এক মিষ্টি মধুর সম্পর্ক।

নীহাররঞ্জন এবং কিরণের দুই সন্তান নিরঞ্জন ও নীহারিকা। নিরঞ্জন বাংলার শিক্ষক। নিরঞ্জনের স্ত্রী কল্যানী। ওদের চার সন্তান।বড়ো ছেলে কুনাল, মেজ ছেলে মনোজ, ছোটো ছেলে বিজয় আর একমাত্র মেয়ে বনলতা । নীহাররঞ্জনের নয়নের মণি নাতনি বনলতা। আর আছে এই বাড়িতে কুনাল ও মনোজের স্ত্রী সুজাতা,পাপিয়া ও দুই খুদে সদস্য সুজাতা কুনালের মেয়ে ও ছেলে পায়েস আর সন্দেশ। চার প্রজন্ম একই বাড়িতে একসঙ্গে আলাদা আলাদা আদর্শে বিশ্বাসী। কিন্তু এরপর কী ঘটবে, তা দেখা যাবে আজ থেকে ‘আকাশ আট’ চ্যানেলে।

‘মধুর হাওয়া’-র কাহিনিকার প্রচেত গুপ্ত। কাহিনী বিন্যাস করেছেন রাকেশ ঘোষ এবং সংলাপ লিখেছেন অভিনন্দন দত্ত। ধারাবাহিকটির পরিচালক অনিন্দ্য সরকার। বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করছেন অরিজিৎ গুহ, গোপা নন্দী, শুভাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়, মৌসুমী চক্রবর্তী, শুভজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, শতাব্দী নাগ, স্বরূপ দে, শ্রেয়সী বিশ্বাস, প্রীতম দাস, অর্না ধর, সবুজ বর্ধন, জায়িত্রী বন্দ্যোপাধ্যায়, শেখর পাল, সৈকত দাস, রিয়া দাস, আয়শ্রী মুখোপাধ্যায়, ডেভিড মিত্র এবং মন্টু দাস।

দ্বিতীয় ধারাবাহিক ‘বউ চুরি’-র কাহিনি-র কেন্দ্রে রয়েছে জমিদার বাড়ির ঘটনা। জমিদার বিধূভূষণের বাড়িতে খবর এসেছে তাঁর ছোটো ছেলে অনাথ, কলকাতায় পড়তে গিয়ে ব্রাহ্মদের খপ্পড়ে পড়েছে। বুনো ছেলেকে বশ করতে বাড়ির লোক তাকে মিথ্যে অছিলায় ডেকে এনে বিয়ে দেয় পিতৃবন্ধুর ভাইজি মন্দাকিনীর সঙ্গে।

এদিকে অনাথের বিশ্বাস, সে ভালোবাসে ব্রাহ্ম ঘরের মেয়ে ইন্দুবালাকে। মন্দাকিনীর সঙ্গে বিয়ে হলেও, ইন্দুবালার দাদা হেমন্তের প্ররোচনায় তরুণ অনাথ বিশ্বাস করে নেয় ভালোবাসাহীন এই বিবাহের একটাই অর্থ, মন্দাকিনী তার বোন। আর এই ‘বিশেষ বোনটিকে’ একবার কলকাতায় নিয়ে গিয়ে ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত করে অন্য পাত্রস্থ করতে পারলেই, তার জীবন ইন্দুময়।

বাড়ির লোককে রাজি করতে না পেরে, শেষে অনাথ নিজের ঘরেই চুরি করে। বউ চুরি। কিন্তু চোরাই বউ নিয়ে শহরে গিয়ে পড়ার পরে এই দুটি তরুণ জীবন কী আর একই খাতে বইবে! অনাথের ভালোবাসার মোহ, নাকি বিবাহ প্রতিষ্ঠানের উপরে মন্দার সরল বিশ্বাস, শেষ পর্যন্ত জিতবে কে? আজ থেকে ধীরে-ধীরে এই প্রশ্নের উত্তর পাবেন দর্শকরা। কারণ, আজ থেকেই ‘বউচুরি’-র সম্প্রচার শুরু হবে ‘আকাশ আট’ চ্যানেলে।

‘বউচুরি’-র কাহিনিকার প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়। ধারাবাহিকটির পরিচালনায় আছেন বিজয় জানা। চিত্রনাট্য লিখেছেন মৌমিতা করগুপ্ত এবং সংলাপ লিখেছেন শাঁওলি। বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করছেন রাজর্ষি মুখোপাধ্যায়, বহ্নি চক্রবর্তী, অয়ন্যা চট্টোপাধ্যায়, রিয়াজ লস্কর, তানিশকা তিওয়ারি,  দীপঞ্জালি মুখোপাধ্যায়, কেশব ভট্টাচার্য, সংগীতা  ঘোষ, আয়ুষ মজুমদার এবং পার্বনি বর্মন।

‘আকাশ আট’ চ্যানেলের পক্ষ থেকে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হয়েছে, ‘মধুর হাওয়া’ এবং ‘বউ চুরি’-র সম্প্রচার শুরু হবে আজ ৫ আগস্ট থেকে। প্রথম ধারাবাহিকটি সন্ধে ৭টা এবং দ্বিতীয় ধারাবাহিকটি সন্ধে ৭টা ৩০ মিনিটে দেখা যাবে প্রতি সোমবার থেকে শনিবার পর্যন্ত।

সম্পর্ক (পর্ব-০৪)

ঋষভ কথার মাঝখানে ঢুকে পড়ে। এটা ওর স্বভাব। মনে হয় যদি ভুলে যায়। তাই তো তক্ষুনি তক্ষুনি বলা চাই। এতে যে অশান্তি হয় তা সে জানে। কিন্তু নিজেকে সামলাতে পারে না। ঋষভ শিলকাটাইওয়ালার কথার মাঝে ঢুকে পড়ে জিজ্ঞাসা করে, “তা আপনার চলে এ কাজে? বাড়িতে ক’জন খোরাকি? কেমন আয় হয়?’

একগাদা প্রশ্ন করে নিজে নিজে খানিকটা অপ্রস্তুত হয়। এখন যদি লোকটা কাঁদুনি গাইতে শুরু করে। আর শিলকাটার মজুরি দ্বিগুন চায়! তার কেবলি মনে হয় লোকজন তাকে ঠকাতে কোমর বেঁধে নেমে পড়ে। যে যেখান থেকে পারে, তাকে ঠকায়।

শিলকাটাইওয়ালা অবাক চোখে চায়। তারপর মাথা নীচু করে। তার কাঁধ ঝুলে পড়ে। ‘সত্যি কথা বলি কত্তা, চলতি চায় না। মা আর বউ দুজনেই বিড়ি বাঁধে। কখনও ধানের জমিতে কামিন খাটে। কখনও মাছ ধরতি যায়, কাঁকড়া ধরতি যায়, হোগলার চাটাই বুনে বেচে।’

—এই কাজ থেকে কেমন আয় হয়?

—তা কী আর আয় হবে কত্তা! একবার শিল কাটালি তো কয়েক বচ্ছর নিশ্চিন্তি। তা ছাড়া এখন অনেকে প্যাকেটের মশলা খেতি লেগেছে। বাটনা বুটনির তালে থাকতি চায়নে।

–দিন দিন তো আরও খারাপ হবে। তখন আপনি কী করবেন? অন্য কাজ দেখে নিন এই বেলা। বলার পর পরই ঋষভের মনে হল,লোকটা যদি অন্য কাজে যেত, তাহলে সে শিলকাটাইওয়ালা কোথায় পেত! তখন তো তার নিজেরই বিপদ হতো।

—কী কব কত্তা, আমারই গোয়ার্তুমি! আমাগে ওখানে কত লোকে কত কী করে! নদীতে ফেরি নৌকো চালায়। মউলি-র কাম করে। সেদিন তো দেহি কালু বাগদি কলকাতার পথে রিকশা টানতিছে।

সে কথা থামায় না। শিলের উপর ঠুকুর ঠুকুর করতে করতে ছবি ফোটায় আর বলে চলে, “ওরা কত কতি থাকে, শহরে আর এ কাজ পাবিনে রে দীনু, চলি আয় আমাগে সাথে। কিন্তু কত্তা, আমার ওই এক জেদ, বিশ্বকর্মার ইচ্ছেয় আমার বাপ-পিতেমোর শেখা শিল্প আমি নষ্ট করি ফ্যালবো! আমার বাপ আমারে হাতে ধরি শিল কাটা শেখায় ছেল। তার খুব নাম। লোকে কতো আমার বাপ তো শিল কাটে না, পাথরের বুকি আলপনা দেয়। তার ছেলে হয়ে কেমনে আমি ছাড়ি ছুড়ি দিই কন! প্যাডের খিদের জন্যি মনের খিদেরে মারি ফেলব!’ শিলকাটাইওয়ালার গলার স্বর ভেঙে আসে। তার অসহায়তা নজরে পড়ে ঋষভের।

এই অসহায়তাই তো তাকে গিলে খাচ্ছে। জুটমিলের চাকরিটা চলে যাবার পর ঋষভ কেবলই ভাবে, মরে গেলে ভালো হতো। সে তো হোমেও লাগছে না, যজ্ঞেও না। বাড়ির কোনও কাজই সে গুছিয়ে করতে পারে না। আবার মাকে নিজের কাছে এনেও রাখতে পারে না বউ-এর ভয়ে। মার কাছেও তার কোনও মূল্য নেই। আর এ বাড়িতে নিজের মূল্যহীনতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে হয় না। এমনি করে বাঁচায় কী লাভ!

শিলকাটাইওয়ালা তার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ঋশভ চেয়ারে বসে কিছুই দেখছে না ওই পাথর ও বাটালির সংগ্রাম। সে আছে নিজের ঘোরের মধ্যে। মাঝেমধ্যে অবশ্য শিলকাটাইওয়ালার কথা কানে বাজছে।

—জানেন কত্তা, এক সালে আমার ভায়রা আমারে জোর করি নে গেল মাঠের কাজে। সেখানে ধানের চারা রুইতে হতো। পায়ের নীচি জল, আর মাথার পরে রোদ্দুর। দুদিক থে কামড়। শ্যাষ করতি পারলাম নি। উদোম জ্বর। সেই ভায়রাই ট্যাকের কড়ি খরচ করি ওষুধ-পথ্যি কইরল। কিন্তু কিছুতেই সে শালোর জ্বর নামে না। শ্যাষে বিরক্ত হইয়ে আমারে বাড়িতে ফিরায়ে দেলি জ্বর বাপ বাপ করি পগার পার।

শিলকাটাইওয়ালার চার চারটে বাটালি কাজে নেমে পড়েছে। ভারী মোটা বাটালি রেখে সে এবার নরুণের মতো একটা নিয়ে লেগেছে। ছোটো ছোটো রেখার কাজ। নাক, মুখ হাতের গড়ন পুরুষ ও মেয়ের আলাদা আলাদা হবে। সেই সূক্ষ্ম কাজে ধৈর্য আর বাটালির উপরে হাতুড়ির ঘা মাপ মতো হতে হবে। কোথাও পাথরের বুক থেকে বেশি করে চলটা উঠিয়ে ফেলা যাবে না।

শিলকাটাইওয়ালার হাত চলছে বলে মুখ থেমে থাকেনি। সে বলে চলেছে, ‘কত্তা, আজ যা প্রাণে আনন্দ পাতিছি তা মেলাদিন পাইনি। কলকেতায় রাস্তায় রাস্তায় সারাদিন ঘুরি। সাধারণ শিল সব। তাতে তো রূপ ফোটাতে লাগে না। এক বাটালিতেই চলি যায়। তাতে যা হয়, চাল কিনি, সবজি কিনি — বাঁচি। কিন্তুক বাঁচার মতো বাঁচি নে।”

এই ‘বাঁচার মতো বাঁচি নে’ শব্দ ক’টি ঋষভের কানে ধাক্কা মারে। সে নিজের মনেই, হয়তো একটু জোরেই স্বর ফেলে, “বাঁচার মতো বাঁচাটা আবার কী!”

শিলকাটাইওয়ালা তার কাজ না থামিয়েই বকে, ‘কত্তা, ওই যে কতিছিলাম না, ধান রুইতে গে জ্বর এল। তা অন্য কামিনদের তো আসে নাই। যে-ঘরামি দিনভর রোদে পুড়ে ঘরের চাল ছায়, আবার বৃষ্টি আলি জলে ভেজে, কই তার তো জ্বর আসে নে। তয় আমার হল ক্যান!”

পাথরের বুকে মৃদু ঠুন ঠুন ধ্বনি উঠতে থাকে। সে শিল একটু একটু নাড়ায়, নিজের কোলের দিকে টানে। কিন্তু ঋষভ এই দেখাটা দেখছে না। সে দেখছে, মানে দেখতে চাইছে, জ্বর আসছে কীভাবে! ভেতরে ভেতরে সে বলছে, বল বল জ্বর এল কেন!

—কত্তা, আমাগে পালপাড়ায় দেবী দুগ্‌গোর পুজোর আগে আমি দেখতি যাই, কেমন করি পালেরা ঠাকুর বানায়। এই পেল্লায় পেল্লায় মায়ের মূর্তি। কত মূর্তি সারি দেয়া। একখানা গড়তেই মানুষের একজীবন কাটি যাবার কতা। তো সে কোতা থেকি এত খ্যামতা পায়! এক একখান দেবীর দিকি চালি আর নজর ফেরাতি পারি না। কী মায়া, কী আলো, কী অবাক পারা ভালোলাগা সব মুখে মুখে! কত্তা, কন তো সে ওই দেবতার দেবতা হতি পারল তো!

(ক্রমশ…)

গর্ভাবস্থায় গ্যাস্ট্রিক সমস্যা এবং নিরাময়ের উপায়

গর্ভাবস্থা এমন একটি পরিস্থিতি, যা প্রায় প্রত্যেক মহিলাকেই অনুভব করতে হয় কিংবা বলা যায় এই পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। এটি মূলত একটি শারীরবৃত্তীয় অবস্থা, যেখানে শরীর ধীরে ধীরে ক্রমবর্ধমান ভ্রূণের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়। আর এই গর্ভাবস্থায় মহিলাদের শরীরের সমস্ত ক্রিয়াকলাপে সুক্ষ্ম পরিবর্তন ঘটতে পারে। তাই, এই সময় সতর্ক থাকা অত্যন্ত জরুরি। এক্ষেত্রে মনে রাখবেন, গর্ভাবস্থায় মা যদি সাবধানে এবং সতর্ক থাকেন, তাহলে তিনি এবং তার আসন্ন সন্তান সুস্থ-স্বাভাবিক থাকতে পারবেন। এই বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন কনসালট্যান্ট জিআই সার্জন ডা. সঞ্জয় মণ্ডল।

শিশুর আকার বৃদ্ধির সময় বর্ধিত জরায়ু ধীরে ধীরে পেটের গহ্বরের আরও বেশি জায়গা দখল করে এবং এর ফলে পরিপাকতন্ত্রের উপর চাপ পড়ে। এছাড়াও গর্ভাবস্থায় হরমোনের পরিবর্তনের ফলে গ্যাস্ট্রোসোফেজিয়াল জংশনের স্ফিঙ্কটার প্রায়শই শিথিল হতে থাকে। এর ফলে রিফ্লাক্স এবং বুকজ্বালার প্রকোপ বৃদ্ধি পায়, যা ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ গর্ভবতী মহিলা অনুভব করেন৷ এই সমস্যাটি প্রাথমিক ভাবে লাইফস্টাইল পরিবর্তনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। যেমন, বিছানার মাথার দিক উঁচু করে শোওয়া, খুব তৈলাক্ত এবং মশলাদার খাবার এড়িয়ে চলা এবং কিছু সময়ের ব্যবধানে খাবার গ্রহণ করা ইত্যাদি।

বাড়িতে রান্না করা খাবার খাওয়া সবচেয়ে নিরাপদ এই সময়। যেহেতু মায়ের নিজের এবং তার শিশুর জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করা প্রয়োজন, তাই এই সময় চর্বিযুক্ত খাবার কম খাওয়া একটি ভালো বিকল্প। বিকাশমান ভ্রূণ ওষুধ দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে, তাই গর্ভাবস্থায় সমস্ত ওষুধ নিরাপদ বিবেচিত হয় না। অতএব গর্ভাবস্থায় চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনও ওষুধ খাওয়া উচিত নয়।

বিশেষকরে গর্ভাবস্থার প্রথম ত্রৈমাসিকে কোন ওষুধগুলি গ্রহণ করবেন, সেই বিষয়ে খুব সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। কারণ এটি এমন সময়, যখন বিকাশমান ভ্রূণ ক্ষতিকারক ওষুধের জন্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। তবে সুসংবাদটি হল যে, বেশিরভাগ ওষুধ যা আমরা সাধারণ অসুখে ব্যবহার করি, সেগুলি সাধারণত নিরাপদ বলে বিবেচিত হয়। তবে সর্বোত্তম উপায় এটাই যে, প্রতিটি হুবু-মায়ের সতর্ক থাকা উচিত এবং তিনি যে ওষুধগুলি গ্রহণ করতে চান, সে সম্পর্কে প্রসূতি বিশেষজ্ঞকে জানিয়ে ব্যবহার করা উচিত।

রেনিটিডিনের মতো ওষুধগুলিকে গর্ভাবস্থায় নিরাপদ বলে মনে করা হয়। তবে বেশিরভাগ পিপিআই, যা আজকাল ব্যবহার করা হয়, সেগুলি সাধারণত নিরাপদ। পিপিআই-এর মধ্যে ল্যাঞ্জোপ্রাজল সবচেয়ে নিরাপদ বলে মনে করা হয়। তবে সবচেয়ে ভালো উপায় হল, আপনার যদি কোনও সমস্যা না হয়, তাহলে অপ্রয়োজনীয় ওষুধ খাবেন না।

কোষ্ঠকাঠিন্য হল আরেকটি সমস্যা, যা গর্ভাবস্থায় সাধারণত ১১ থেকে ৩৮ শতাংশ হবু মায়েরা এই সমস্যায় পড়েন। এটি মূলত গ্র্যাভিড জরায়ু গর্ভাবস্থায় হরমোনের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বড়ো অস্ত্রের উপর চাপ দেয়।

এটি উপশম করার সর্বোত্তম উপায় হল প্রচুর পরিমাণে তরলযুক্ত খাবার, শাকসবজি, স্যালাড, ফল এবং অন্যান্য উচ্চ ফাইবারযুক্ত খাবার খাওয়া উচিত। তবে মনে রাখবে, তরল পানীয় মানে সফট-ডিংক্স নয় কিংবা কোনও সিন্থেটিক জুস নয়। তরল খাদ্য বলতে এখানে বুঝতে হবে ফলের রস। এই সময় শারীরিক কার্যকলাপ স্বাভাবিক রাখুন, তবে সাবধানতা অবলম্বন করুন। চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে হালকা কিছু ব্যায়াম করতে পারেন এই সময়।

পেট ফাঁপা বা গ্যাস-এ পেট ফুলে যাওয়া গর্ভাবস্থায় খুব খারাপ হতে পারে এবং এটি মূলত হরমোনের পরিবর্তনের কারণে হয়। এই সময় গ্যাসের সমস্যা সমাধানের সর্বোত্তম উপায় হল হালকা কিছু ব্যায়াম, তবে তা চিকিৎসকের থেকে জেনে নিয়ে অভ্যাস করুন। এই সময় খাবার খেতে হবে ধীরে ধীরে অর্থাৎ সময় নিয়ে। সেইসঙ্গে, সঠিক পরিমাণে জল পানও করতে হবে। তবে এই সময় কার্বোহাইড্রেটযুক্ত পানীয় এড়াতে হবে এবং তৈলাক্ত ও চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়া বন্ধ করতে হবে। আর যদি এই উপায়গুলি কার্যকরী না হয়, তাহলে অবশ্যই যত দ্রুত সম্ভব আপনার চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করুন।

গর্ভাবস্থায় আইবিডি বা Irritable bowel disease হল আরও একটি সমস্যা, যা হবু-মাকে এবং তার গর্ভের সন্তানকে বিপদে ফেলতে পারে। এই পরিস্থিতির থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য প্রয়োজনে আপনার চিকিৎসক উপযুক্ত ওষুধ দিতে পারেন, যা নিয়ম মেনে খেতে হবে।

হরমোনের পরিবর্তনের ফলে গর্ভাবস্থায় পিত্তথলিতে পাথর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে, যা পিত্তের লিখোজেনিসিটি বাড়ায়। পিত্তথলির স্লাইডের ঝুঁকি ৩১ শতাংশ এবং নতুন পাথর হওয়ার ঝুঁকি আরও ২ শতাংশ। গর্ভাবস্থায় ব্যথা, ডিসপেসিস এবং অন্যান্য জটিলতা হতে পারে হবু-মায়ের। এই ধরনের পরিস্থিতিতে আপনার একজন জিআই সার্জনের সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত। বারবার একই উপসর্গ দেখা দিলে রোগীর কোলেসিস্টেক্টমি করা উচিত, যা দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকের সময় সবচেয়ে নিরাপদ।

অ্যাপেনডিসাইটিস হল আরও একটি খুব সাধারণ রোগ যা গর্ভাবস্থায় বৃদ্ধি পায় না, তবে যদি এটি ঘটে তাহলে জটিলতা তৈরি হতে পারে। সেক্ষেত্রে পরিস্থিতি বুঝে সমস্যার সমাধান করবেন চিকিৎসক।

প্রথম ও দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে কোনও সার্জারির প্রয়োজন হলে ল্যাপারোস্কোপিক পদ্ধতিতে করা যেতে পারে। দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকের সময় অস্ত্রোপচার সবচেয়ে নিরাপদ কিন্তু এর পরবর্তী সময়ে মা এবং সন্তান উভয়ের ক্ষেত্রেই ঝুঁকি হতে পারে। অবশ্য পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, একজন প্রসূতি বিশেষজ্ঞ এবং জিআই বিশেষজ্ঞের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চললে সবরকম সমস্যা কাটিয়ে ওঠা অনেকটাই সম্ভব হবে।

সম্পর্ক (পর্ব-০৩)

ঋষভ ঘর-জামাই হয়ে বাগবাজারে আছে। আর এখানে, বারাসাতে স্বামীর হাতে তৈরি নিজের বাড়িতে জীবনের শেষটুকু কাটাচ্ছেন মমতাদেবী। বিরাট বাড়ি। গাছ-পালা বেশি হওয়ায় অন্ধকার দিনেরবেলাতেও তাড়া করে বেড়ায় মমতাদেবীকে। নিঃসঙ্গতায় মন খারাপ হলে পাশের বাড়িতে যান, গল্প করেন। এখনও গ্রামে পাড়া-পড়শি বলে শব্দ চালু আছে। আর আছে কাজের মেয়ে লক্ষ্মী। সে-ই মেয়ের মতো হয়ে ঘর ভরিয়ে রাখে।

মমতাদেবী আজ লক্ষ্মীকে বলেছেন, বাজারে যাবেন। ছেলে-বউ-নাতনি-র জন্য পয়লা বৈশাখের জামা-কাপড় কিনবেন। তাড়াতাড়ি রান্না-বান্না সেরে নিতে হবে। তো সে মেয়ে বেশ মুখরা। রান্নাঘর থেকেই চ্যাচায়, “যে ছেলে-বউ-নাতনিরা খোঁজ-খবর রাখে না, তাদের জন্য আবার জামা-কাপড়! তোমার আদিখ্যেতা দেখলে আর বাঁচি নে।’

কী করবেন মমতাদেবী! ছোটো-বড়ো কথা তাকে সইতে হয়। এই কাজের মেয়ের উপরে তার ছিয়াত্তর বছর বয়সের জীবন অনেকটা নির্ভরশীল। আবার নিজের ছেলে-বউ-কে নিয়ে কেউ কটু কথা শোনালে মন থেকে মানতে পারেন না। অদৃষ্টকে দোষেন। আঁচলে চোখ মোছেন। লক্ষ্মী একটু বাদেই ডাকবে, ‘মা ভাত বেড়েছি, খাবে এসো।’

ছেলে, ছেলে-বউয়ের কাছ থেকে মা-ডাক শুনতে না পাওয়াটা পুষিয়ে দেয় লক্ষ্মী। মমতাদেবী জানেন লক্ষ্মী এক্ষুনি ডাকবে খেতে। আজ কেন যেন রান্না হতে বেশ দেরি হয়েছে। তিনি উঠোনের আমগাছের তলা ছেড়ে ঘরমুখো হলেন। এসময়ই ফোন বেজে উঠল। ছেলের ফোন। অনেকদিন বাদে ফোন করেছে। এখন কানে কম শোনেন।

ফলে ফোনের কালো রিসিভারটা কানের সাথে চেপে ধরলেন।

—কুন শিলের কথা কস? অয় অয়, ওই শিল আমার মায়ের, তাইন দিছলেন। মা-য় বিয়ের তত্ত্বের সাথে জোর করি পাঠায় ছেলেন। রাম-সীতার ছবি আঁকা ছেল। ওটা হবিগঞ্জের শিল।

ফোন রেখে মমতাদেবী একেবারে গোড়ায় ডুব দিলেন। মঙ্গলাচারণ হচ্ছে। শ্বশুড়বাড়ি থেকে সব লোকজন এসে পড়েছে। তিনি তখন কতটুকুই বা। খুব কৌতূহল। নিজেকে নিয়ে নয়, তাদের গাঁয়ের নতুন নতুন লোকজন, পোশাক-আশাক — সব ভালো লাগছে। খুব ইচ্ছে করছিল, চার-পাঁচ খানা ধামায় করে কী এনেছে ওরা, দেখে আসতে। কিন্তু তাকে সেসব করতে দিচ্ছে কোথায় ! মা এক বুক ঘোমটা টেনে দিয়েছে তার চোখের উপরে। সব আবছা আবছা। বাইরে উঠোনে কুঞ্জ সাজানো হয়েছে। সেখানে পঞ্চঘট। তার জল আমের পল্লব দিয়ে কন্যার গায়ে ছিটিয়ে তাকে বিশুদ্ধ করে তবেই পাত্রপক্ষের লোকেরা মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান শুরু করবে।

মমতাদেবীর মা ছটফট করছিলেন। কতদিন আগেকার কথা। ঠিক মনে আছে। মা তো তাকে বুকের ভেতর চেপে ধরে রাখছিলেন, অন্য ব্যথায়। তার প্রাণের পুত্তলিকে মায়ার বাঁধন ছিন্ন করে পরদেশে পাঠাতে হবে, তার আয়োজনে তিনি ছিন্নতা টের পাচ্ছেন। আর সে নিজে ছটফট করছিল কতক্ষণে বন্ধুদের নিয়ে পা-ছড়িয়ে বসে উপহার সামগ্রী দেখবে। ডালমুট খেতে খেতে গল্প করবে।

কুঞ্জে নিয়ে এসে তাকে একটা পিঁড়িতে বসানো হয়েছে। বিয়ের আগে শ্রীহট্টে এটাই প্রধান মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানেই কন্যার হাতে শাঁখা, কপালে ও সিঁথিতে সিঁদুর পরানো নিয়ম। ঠিক মনে আছে, তাকে পিঁড়িতে বসিয়ে দিতেই গোল হয়ে ঘিরে থাকা মেয়েরা গেয়ে উঠেছিল—

আসিল জনক রাজ করিতে মঙ্গল কাজ

স্বর্ণদান করিলেন যতেক ব্রাহ্মণে।

ওই যে পাকা কথা হয়ে গেল, তারপর তো আচার-অনুষ্ঠান লেগেই থাকে। রূপসিপুজোর কথা মনে আছে তার।

বারান্দায় কাঠের চেয়ারে পা তুলে বসে স্মৃতির ভেতর সেঁধিয়ে যেতে চাইছিলেন মমতাদেবী। ছেলে ফোন রেখেছে অনেকক্ষণ, কিন্তু স্মৃতি তাঁকে ছাড়ছে না। রূপসি পুজোয় শেওড়াগাছের তলা ঝকঝকে তকতকে করে লেপে রাখা হয়েছে। নিজের বিয়ের অনুষ্ঠান। সেখানে যেতে নেই। জানলার লম্বা গরাদে মুখ ঠেসে ধরে যতটা সম্ভব দেখার চেষ্টা।

কলাপাতায় পাঁচ রকমের ফল রাখা আছে। আর একটা রেকাবিতে আছে ধান-দুর্বা, তেল- ল-সিঁদুর, কাঁচাদুধ, খই, আর দুটো পানের খিলি। চোখে পড়েছে তার মা প্রথমে সেই শেওড়াগাছকে ধান-দুর্বা, তেল-সিঁদুর আর পানের খিলি দিলেন। গাছের গুঁড়িতে তেল-সিঁদুর মাখালেন। তার পর অন্য এয়োতিরা। এরপর সাতপাঁকে রঙিন সুতোয় গাছ বাঁধা পড়ল।

দুই

—কত্তা, কামডা যখন দেলেন, একখান বিড়ি খাতি দেন। মনডা ফুরফুরে লাগতে আছে। কদিন পর পেরাণ লাচায়ে কাম করবানে। বাপ-পিতেমোরা আমার হাতের ভিতরি দে ফের ধরা দেবেনে। জানেন তো কত্তা, এই আমি কিচ্ছুডি না। তেনারাই আমার চাদ্দিকে ঘুরি বেড়ায়, আমারে দে আমার জীবনডারে বয়ায়ে নেয়। হাসায়, কাঁদায়। আমি খুব টের পাই।

ঋষভ মাথা নাড়ে। মনটা নরম হয়ে আছে তার। অনেকদিন পর মা-র সাথে কথা হল। মা-র গলায় কি কোনও কষ্ট ছিল! কষ্ট তো থাকবেই। একা একা থাকে বনের ভেতরে। কখনও মুখ ফুটে তো কিচ্ছুটি বলে না। কিন্তু মনের যন্ত্রণা কোথায় উবে যাবে! কুলাঙ্গার কুলাঙ্গার! মনে মনে নিজেকে গাল পাড়ে। যারে তুমি মর্তভূমি দিয়েছ, সে তোমারে তিলে তিলে মৃত্যুযন্ত্রণা দেয়। জন্মের পর মেরে ফেলতে পারোনি! ঋষভ নিজের চুলের ভেতর আঙুল ঢুকিয়ে হ্যাঁচকা টান দিল। ব্যথা চাই তার। ঢের ব্যথা চাই।

ছোটো টিনের নস্যির কৌটো থেকে বিড়ি বের করে ধরানোর আয়োজন করল শিলকাটাইওয়ালা। সব কাজ তার গোছানো। সে বলল, ‘কত্তা, সাতমুখো আমার ঘর।’ গল্পের ঝাঁপি সে খুলে বসতে চাইল। বাইরে ঠা ঠা রোদ্দুর। এরকম নিরিবিলি ঠান্ডা জায়গা আজ আর হয়তো পাবে না।

—ক্যানো, ক্যানিং-এর নদীগুলো সব কোথায় গেল! ঋষভের অল্প অল্প ধারণা আছে। ওখানে মাতলা আছে, বাসন্তী আছে। সুন্দরবনের কাছাকাছি জায়গা।

শিলকাটাইওয়ালা দাঁতে বিড়ি চেপে কৌটো আর দেশলাই নিজের ঝোলার ভেতর ঢুকিয়ে রেখে বলল, ‘সে আছে কত্তা অনেক। মাতলা, বাসন্তী, বিদ্যেধরী, পিয়ালি, কুলতলি, ডুলিভাসানি গাঙ, রায়মঙ্গল, পাঠানখালি, কালিন্দি, হরিণভাঙা।’

বিড়িতে ঘন করে একটা টান দিয়ে চোখ বুজে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে সে আবার বলল, ‘ছোডোমোডো আরও কত যে ভারানি, দইনে নদী আছে!’

—এত নদী, তবুও বলছেন রুখাসুখা?

—বলতিছি কি সাধে! আমাগে বাড়ি ঠিক উলটো পানে। ওহানে নদী ক্যানো কোনও পুকুরও নাই। আশ্চর্যি বিধান বিধির। কিন্তু মাতলা নদীতে যদি বর্ষাকালে বান আসে, দেখপানে আমাগেও ভাসায় দেবেনে।

মা-র সাথে কথা বলার পর থেকে ঋষভের মন ভেসে আছে। মা-র মায়ের শিল এটা। মা তার মায়ের কথা বলার সময় উচ্ছ্বাস দেখাচ্ছিল, আবার নিজের কথা বলার সময় গলা মিইয়ে গেছে। সবটা মিলিয়ে ঋষভ এখন নিজত্বে নেই। সে কেবল কথা চালানোর জন্য শুধোয়, ‘তা ওখানকার গাঁয়ের লোকজনদের চলে কী করে? সবাই শিলকাটার কাজে ঢুকেছে?’

—কী যে কন কত্তা! এই কামে অহন আর প্যাড ভরে! লোকে নানান কাম করে। ক্যানিং থে মাছ নে শহর পানে বেচতে আসে। ধানের জমিতে মজুরি দেয়, কাড়াল দেয়, মানে মাঝিগিরি করে।

(ক্রমশ…)

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব