শিশুদের ত্বকের যত্নের কয়েকটি টিপস

রিমঝিম সেদিন স্কুল থেকে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরেছিল। স্বভাবতই বাড়ির সকলেই ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। ছোট্ট মেয়েটির গায়ে হাত ভুলিয়ে মা কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলেন। আট বছরের রিমঝিম কেঁদে বলল, “মা, আমি কি ভাল্লুকের মেয়ে? তুমি কি আমাকে চিড়িয়াখানা থেকে নিয়ে এসেছ?”

রিমঝিমের মা মেয়ের চোখের জল মুছে দিতে দিতে বললেন, ‘না সোনামণি, তুমি আমারই মেয়ে। কে বলেছে তুমি ভাল্লুকের মেয়ে?’

‘সবাই তাই বলে। আজকে তো হিন্দি শিক্ষিকাও বললেন, আমাকে ভাল্লুলুকের মতো দেখতে।’ ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে ছোট্ট মেয়েটি বলল।

স্পষ্টতই মেয়ের মুখে এরকম কথাবার্তা শুনে মা ভীষণই চিন্তিত হলেন। তিনি মেয়েকে আবার জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ওনারা তোমাকে কেন এমন বলেন তুমি কি কিছু জানো ?

জবাবে রিমঝিম বলল, ‘মা, এই দ্যাখো, আমার হাতে ও পায়ে কত লোম রয়েছে। এজন্যই আমাকে ভাল্লুকের মতো দেখতে লাগে।’ এই বলে রিমঝিম মায়ের সামনে দু’হাত প্রসারিত করল।

এদিকে মেয়ের কথা শুনে আঁতকে উঠলেন মা। আসলে, রিমঝিমের মুখ সহ সারা শরীরে বেশ ঘন লোম রয়েছে। এ কারণে তার গায়ের রং-ও খানিকটা কালো লাগে। এদিকে এত অল্প বয়সে ওকে পার্লারে নিয়ে গিয়ে ওয়াক্স করানোও সম্ভব নয়।

ছোট্ট রিমঝিম পড়াশোনায় খুব মেধাবী। নাচ এবং অভিনয়ও ভালো করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ভাবে স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সে সুযোগ পায় না। শিক্ষিকারা যদিওবা রিমঝিমকে নাচের ক্লাসে নিয়ে যান, কিন্তু ভালো নাচের পরও তাকে পিছনের সারিতে রেখে দেন। কারণ, তার মুখমণ্ডল এবং হাত-পা এমন লোম দ্বারা আবৃত যা মেক-আপ করেও লুকানো যায় না।

জন্মের পর মালিশের প্রয়োজনীয়তা

আসলে রিমঝিমের জন্মের পরে তার শরীরে যে মালিশ করার প্রয়োজন ছিল তা কখনও করা হয়নি। আমরা জানি, নবজাতকদের জন্মের পর শরীরে কিছু লোম থাকে, যা ছয় মাস বা এক বছর টানা মালিশ করলে পরিষ্কার হয়ে যায়। আপনারা প্রায়শই দেখেছেন যে, গ্রামের মহিলারা তাদের নবজাতককে তাদের দু’পায়ে শুইয়ে সরষের তেল, হলুদ ও বেসনের পেস্ট তৈরি করে তা দিয়ে মালিশ করেন।

শহুরে মায়েরা তাদের বাচ্চাদের বিভিন্ন ধরনের বেবি অয়েল দিয়ে মালিশ করেন— যা তাদের বাচ্চাদের শরীর শক্ত ও পরিষ্কার করে। মালিশের ফলে বাচ্চাদের শরীরের রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়া উন্নত হয় এবং ওরা আরও শক্তপোক্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু রিমঝিমের জন্মের পর দুর্ভাগ্যজনক ভাবে ওর মা পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হন এবং প্রায় দু’বছর শয্যাশায়ী ছিলেন। তার শরীরের অর্ধেক অংশ অবশ হয়ে যায়। দীর্ঘ চিকিৎসা ও ফিজিওথেরাপির পর তিনি বর্তমানে হাঁটাচলা করতে সক্ষম হয়েছেন।

ঘটনাচক্রে জন্মের পর থেকে প্রায় চার বছর রিমঝিমকে তার দিদিমার কাছে থাকতে হয়েছিল। ওদিকে দিদিমার বয়সও হয়েছিল অনেক। তাই, নবজাতকদের সাধারণত যে ধরনের যত্ন নেওয়ার প্রয়োজন হয়, দিদিমার পক্ষে রিমঝিমের সেরকম ভালো যত্ন নেওয়া সম্ভব হয়নি। এমনকী ওর শরীরে ঠিকমতো মালিশও করা হয়নি। এই কারণেই জন্মের সময় তার শরীরে লোম ছিল, যেগুলি বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও ঘন এবং শক্ত হয়ে উঠেছে। আর এজন্যই ওকে কুৎসিত দেখাচ্ছে।

শিশুদের সঠিক বিকাশ

নানা কারণে শিশুদের শরীরে মালিশ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মনে রাখতে হবে, মালিশ শুধুমাত্র শরীরকে অবাঞ্ছিত লোম থেকে মুক্ত করে না, এটি শরীরের হাড়কেও যথেষ্ট মজবুত করে। এছাড়া মালিশের ফলে যেহেতু সারা শরীরে ভালো রক্ত সঞ্চালন হয়, তাই শিশুর বিকাশও সঠিক মাত্রায় ঘটে।

মনে রাখবেন, শিশুদের ত্বক ফুলের মতো নরম হয় এবং তাই ওদের ত্বকের বিশেষ যত্ন প্রয়োজন। এরই সঙ্গে এটাও বুঝতে হবে যে, শিশুদের ত্বকের যত্ন নেওয়া মানে শুধুমাত্র তাদের মুখমণ্ডলের ত্বকের যত্ন নিলেই হবে না। মুখমণ্ডলের সঙ্গে সঙ্গে সমগ্র শরীরের ত্বকের যত্ন নেওয়াও অতীব গুরুত্বপূর্ণ।

শিশুদের মালিশের প্রয়োজনীয়তার কথা মাথায় রেখে বাজারে বিভিন্ন ধরনের বেবি স্কিন কেয়ার প্রোডাক্ট পাওয়া যায়। আজ শুধু শহুরে মায়েরাই নন, গ্রামাঞ্চলের মায়েরাও তাঁদের সন্তানের মালিশের জন্য এই পণ্যগুলি অধিক মাত্রায় ব্যবহার করছেন।

পণ্য কেনার আগে মনে রাখবেন

আপনার শিশুর সূক্ষ্ম ও নরম ত্বকের জন্য কোনও পণ্য কেনার আগে বিশেষ ভাবে সচেতন ও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। মনে রাখবেন, এই পণ্যগুলিতে অনেক ধরনের রাসায়নিক, সুগন্ধি, কাপড় রঙ করার জন্য ব্যবহৃত পদার্থ, ডিটারজেন্ট প্রভৃতি মেশানো থাকে— যা নবজাতকের ত্বকে দাগ, ফুসকুড়ি, রুক্ষতা, জ্বালাভাব এবং শুষ্কতার কারণ হতে পারে। তাই, শিশুর ত্বকের উপযোগী পণ্যগুলি বেছে নেওয়ার সময় কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখা উচিত—

সাধারণত, শিশুদের শরীরের সঠিক যত্নের জন্য যে জিনিসগুলি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তা হল— বেবি ক্রিম, শ্যাম্পু, বেবি সোপ, হেয়ার অয়েল, ম্যাসাজ অয়েল, পাউডার এবং শিশুর পোশাক।

শিশুদের ত্বক খুবই সংবেদনশীল। যদি তাদের ত্বকের যত্নে সামান্যও গাফিলতি হয়, তবে ত্বকে ফুসকুড়ি-জাতীয় সমস্যা দেখা দেয়। এর ফলে ত্বকে জ্বালাভাব সৃষ্টি হয় এবং শিশুটি অস্বস্তি বোধ করে। পরিণতিতে দিনরাত কাঁদে। এমন পরিস্থিতিতে আপনি যদি প্রথমবার বাবা-মা হয়ে থাকেন, তাহলে আপনার সন্তানের ত্বকের বিশেষ যত্ন নিতে শেখা আপনার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মায়ের জন্য জানা জরুরি

জন্মের পর প্রথম দিকে শিশুর ত্বক ও চুলে ক্রমাগত পরিবর্তন হতে থাকে। নবজাতকের শরীর থেকে বেশ কিছুদিন পর্যন্ত সাদা রঙের আস্তরণ বেরিয়ে আসে। এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। একে বলে ভারনিক্স। তেল দিয়ে আলতো করে শরীরে মালিশ করলে এই আস্তরণটি সম্পূর্ণ দূর হয়। এরই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় লোমও দূর হয়।

কিন্তু তা দ্রুত দূর করার জন্য কেউ কেউ শিশুকে অতিরিক্ত রগড়ে স্নান করান, যা সঠিক নয়। শিশুর ত্বকের যত্নের জন্য আমাদের কী করা উচিত এবং কী করা উচিত নয় তা জানা একজন নতুন মায়ের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

ত্বককে পুষ্ট করা

শিশুর ত্বকের পুষ্টির প্রয়োজন হয়। এজন্য দিনে দু’বার ওকে মালিশ করুন। নারকেল তেল, বাদাম তেল, অলিভ অয়েল ইত্যাদি মালিশের জন্য বেছে নিতে পারেন। উল্লেখ্য, বাজরে বিক্রি হওয়া সেইসব বেবি-প্রোডাক্ট থেকে দূরে থাকুন যে সব পণ্যে তীব্র গন্ধ, রং এবং রাসায়নিক পদার্থ থাকে।

হালকা ধরনের সাবান ও শ্যাম্পু ব্যবহার করুন

শিশুর ত্বকে কোনও রাসায়নিক-মিশ্রিত পণ্য ব্যবহার করলে ত্বক শুষ্ক হতে পারে। এমনকী ফুসকুড়িও বেরোতে পারে। তাই শিশুর চুল এবং ত্বকের জন্য হালকা ধরনের সাবান ও শ্যাম্পু ব্যবহার করুন।

খুব বেশি পাউডার লাগাবেন না

শিশুর ত্বকে খুব বেশি পাউডার লাগানো ঠিক নয়। স্নানের পর একটি নরম সুতির কাপড় দিয়ে ওর ত্বক ভালো ভাবে মুছুন। এরপর পাউডার লাগান। মনে রাখবেন, পাউডারটিতে যেন খুব বেশি গন্ধ না থাকে, আর তা যেন ভালো কোম্পানির হয়।

পরিষ্কার পোশাক পরান

সবসময় আপনার শিশুকে পরিষ্কার পোশাক পরাবেন। মনে রাখবেন, নোংরা পোশাক থেকে ত্বকে ফুসকুড়ি, চুলকানি প্রভৃতি সমস্যা হতে পারে।

নখ পরিষ্কার রাখুন

শিশুদের নখ খুব দ্রুত বৃদ্ধি পায়। নখ নিয়মিত ভাবে কাটবেন। নয়তো নখের আঁচড় লেগে শিশুর মুখে বা শরীরের যে কোনও জায়গায় কেটে যেতে পারে।

সুতির ডায়পার ব্যবহার করুন

আজকাল মায়েরা শিশুদের নিয়মিত ডায়পার পরিয়ে থাকেন। মনে রাখবেন, ডায়পার ব্যবহারের কারণে বাচ্চার ত্বকে ফুসকুড়ি-জাতীয় সমস্যা দেখা দিতে পারে। ভিজে থাকার কারণে বাচ্চার ত্বকে ফুসকুড়ির পাশাপাশি চুলকানিও হতে পারে। এমনকী ত্বকে লাল-ভাবও দেখা দিতে পারে। এই সমস্যা এড়াতে চেষ্টা করবেন বাচ্চাকে যতটা সম্ভব কম ডায়পার পরাতে। আর পরাতেই হলে সুতির ডায়পার ব্যবহার করাই ভালো ।

কুসংস্কার ত্যাগ করুন

শিশুদের ত্বক খুবই নরম প্রকৃতির হয়। তাই সংস্কারবশতঃ ওদের ত্বকে কাজল, সিঁদুর, হলুদ, চন্দন প্রভৃতি লাগাবেন না। মনে রাখবেন এসব পণ্যে রাসায়নিক পদার্থ থাকতে পারে।

সান বার্ন থেকে দূরে রাখুন

কখনওই আপনার সন্তানকে সরাসরি প্রখর সূর্যের তাপে রাখবেন না। ওদের জন্য সকালের সূর্যের তাপই সবথেকে ভালো। যদি এরপরও শিশুর ত্বকে ফুসকুড়ি কিংবা লাল-ভাব দেখা যায়, তাহলে তৎক্ষণাৎ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। হতে পারে এটা অ্যালার্জির সমস্যা।

মায়েরাও বদল আনুন ব্যক্তিত্বে

বাচ্চাকে সামলাতে গিয়ে পরিশ্রম বেড়ে যায় মায়েদের। সন্তান লালন-পালনের জন্য দীর্ঘ সময় পেরিয়ে আসতে গিয়ে অনেক মা-ই সমাজ এবং সময়ের অগ্রগতির সঙ্গে নিজেদের ঠিক করে খাপ খাইয়ে নেওয়া থেকে পিছিয়ে পড়েন। সন্তানই তাদের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে ওঠে তখন। অথচ এই সন্তান যখন জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভ করে, তখন মায়ের জন্য সময় থমকে দাঁড়িয়ে যায়। আধুনিকতার আঁচ থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখার ফলে, নতুন নতুন আবিষ্কারের কথা একপ্রকার অজানাই থেকে যায় মায়ের জীবনে। তাই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে বদলানো উচিত। এর জন্য ব্যক্তিত্বেও বদল আনতে হবে। কারণ ব্যক্তিত্ব সামগ্রিক ভাবে এমনই একটি বিষয়, যা সবার নজর কাড়বে এবং আপনাকেও খুশি রাখবে।

মায়ের দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করার পাশাপাশি, মানুষ হিসেবেও আপনাকে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে হবে। আপনার চারপাশের মানুষজন যত বেশি করে আপনার প্রতি আকৃষ্ট হবে, তত সহজে আপনি জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারবেন এবং সফল মা হয়ে উঠতে পারবেন। কর্মক্ষেত্রেই হোক কিংবা সংসারে, নিজেকে সবার কাছে প্রেজেন্টেবল করে তুলতে হবে। তাই নিজেকে প্রফেশনালি দক্ষ করে তোলাও যেমন জরুরি, ঠিক ততটাই জরুরি নিজের পার্সোনালিটি ডেভেলপমেন্ট। ভিতর এবং বাইরে উভয় ক্ষেত্রেই নিজেকে সমৃদ্ধ করে তুলতে হবে।

আপনার শিক্ষা, রুচি, আচার-ব্যবহার, কথা বলার স্টাইল, শব্দচয়ন—— সব মিলিয়েই কিন্তু আপনি এবং আপনার থেকেই সবকিছু শিখবে আপনার সন্তান। তাই প্রথমে খুঁজে বের করুন, কোন কোন বিষয়ে আপনার ত্রুটি রয়েছে। একবার এটা চিহ্নিত করতে পারলেই, ব্যক্তিত্ব বদলে ফেলে সবার নজর কাড়তে সুবিধে হবে।

লুক-এর প্রতি নজর

মডার্ন ড্রেস ও হেয়ারস্টাইল নিয়ে অনেক মায়ের মধ্যে একটা দ্বিধা কাজ করে। কে কী বলবে, কী ভাববে? সবার আগে এই ভাবনারই বদল দরকার। প্রয়োজন আত্মবিশ্বাস। দ্বিধা, হীনমন্যতা দূর করে নতুন লুকে নিজেকে আপ টু ডেট করে নিন। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির মনোবিদ এলেন ল্যাঙ্গারের রিসার্চ এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। তিনি ২৭ থেকে ৮৩ বছর বয়সি ৪৭ জন মায়ের উপর রিসার্চ চালিয়েছিলেন। মুখের গঠন অনুযায়ী প্রত্যেককে হেয়ার কাট ও কালার টাচ দেন। সঙ্গে মানানসই মডার্ন পোশাক। দেখা যায়, যেসব মায়েরা নিজেদের ইয়ং লুক-এর ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন, তাদের অনেক বেশি উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। বয়সটাও একধাপে অনেকটা কমে গেছে।

ঠিক উলটো পরিস্থিতি অন্যদের ক্ষেত্রে। অর্থাৎ অন্তর আর বাহ্যিক তারুণ্য— দুইয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকাটা জরুরি। সেক্ষেত্রে মনকে তাজা রাখার পাশাপাশি দরকার হেয়ারস্টাইল এবং পোশাকের পরিবর্তনও। সঙ্গে স্টাইলিশ অ্যাক্সেসরিজ। তাহলেই নিজেকে অনেক বেশি আকর্ষণীয় ও সতেজ লাগবে৷ লো কনফিডেন্স-কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে জীবনটা উপভোগ করুন। অনেকের হালকা রঙের পোশাক পছন্দ। তাদের বলব, মাঝেমধ্যে নিজেকে নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করুন। জিন্স-এর সঙ্গে রংবাহারি জ্যাকেট, কখনও বা ফ্যাশনেবল গাউন ট্রাই করুন। অন্যের সমালোচনার ভয় ঝেড়ে ফেলে, নিজেকে স্মার্ট করে তুলুন।

কাজের মধ্যে নিজেকে ব্যস্ত রাখুন, যাতে সদর্থক ভাবনা আপনাকে ঘিরে রাখে। ডিপ্রেশন নয়। জীবন একটাই। তাই মায়ের দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি, বেঁচে থাকার মানে খুঁজে নিতে হবে আপনাকেই। জীবনটাকে কীভাবে আপনি চালিত করবেন তা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এর জন্য বিরাট শিক্ষিত বা অভিজাত পারিবারের ব্যাকগ্রাউন্ড থাকার প্রয়োজন নেই। বরং অনেক বেশি জরুরি হল অন্তরের তাগিদেই কিছু কাজ করা।

এক নজরে

o অন্যদের খুশির খবর আনন্দের সঙ্গে শুনুন। মন খুলে হাসুন পছন্দের গান শুনুন। গুনগুন করুন। পারলে একটু নেচেও নিন

o খুশির মুহূর্তগুলি স্মৃতিপটে সাজিয়ে রাখুন। দুঃখকে বিদায় জানান

O মাথা ঠান্ডা রেখে সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করুন

O সদর্থক ভাবনাচিন্তার মানুষের সঙ্গে বেশি করে সময় কাটান

O মনের মধ্যে দুঃখ-কষ্ট চেপে না রেখে বন্ধু, স্বামী কিংবা সন্তানের সঙ্গে শেয়ার করুন

O অন্যের পাশে দাঁড়ান

O সবরকম নেশা থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকুন

O ওজন বাড়তে দেবেন না। শরীর ফিট রাখুন

O মায়ের দায়িত্ব পালন এবং কেরিয়ারের পাশাপাশি, বিবাহিত জীবন ও সেক্সলাইফ এনজয় করুন

O কাজ, এন্টারটেইনমেন্ট এবং বিশ্রামের মধ্যে ভারসাম্য রাখুন

O সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং-এর সাহায্য নিয়ে নতুন নতুন বন্ধু বানান।

সম্পর্ক (পর্ব-০২)

কপালে বাটালি ছুঁইয়ে একটা ভারী হাতুড়ি দিয়ে বাটালির উপর আঘাত করতেই ঠন করে উঠল পাথর। লোকটা তার ঝোলা থেকে এবার একটা ছোটোমতো বাটি আর শান দেবার পাথর বের করে। তারপর ঘটির তলায় পড়ে থাকা শেষ জলটুকু বাটির মধ্যে ঢেলে নেয়। একটু ঢালে শিলের উপরে। মুখে বলে, ‘কত্তা, শিলডা এট্টুস নরম কত্তি হবেনে। ম্যালা দিন ব্যাভার নেই দেখতিছি।”

সে শিল ভেজাতে দিয়ে তার বাটালি নিয়ে পড়ে। বাটালির মাথায় অল্প করে জল নিয়ে শান দেবার পাথরের উপর ফেলে ঘসতে থাকে। বাটালির মাথা চকচক করে ওঠে। ঋষভের চোখও চকচক করে। আজ তাহলে একটা কাজের কাজ করে ফেলতে পারছে। বউ দুপুরের ভাতঘুম থেকে উঠে যখন দেখবে, নিশ্চই তার মরদগিরিতে নম্বর যোগ হবে। মানে, সে যে করিতকর্মা লোক, সামান্য হলেও তার একটা নমুনা পেশ করা যাবে।

শিলকাটাইওয়ালা টাইম নেয়। সে যে শুধু শিল খোদাইতে দক্ষ তা তো নয়। সে মানুষের মন খোদাই করতেও পারে। সে জানে নিজের কর্মপদ্ধতি যথা সম্ভব বিস্তৃত করে বুঝিয়ে দিতে হবে। তা না হলে এই কাজের পারিপাট্য ও মূল্য জানবে কী করে!

—কইসি কি, সে যা দিতি হবেনে দেবেন ক্ষণ৷ বেগোনে যাবোনানে। আর আকশ্রুতি হবে এমন কর্মও করবোনানে।

মুখে দাম বললে যদি কম বেশি কিছু একটাতে খদ্দের হাতছাড়া হয়ে যায়! ভাবে শিলকাটাইওয়ালা। সে নিজের মনে কাজ করতে থাকে। ব্যাগের ভেতর থেকে নরম গামছার কাপড় বের করে ভেজা শিল ভালো করে মুছে নেয়। তারপর আবার একটা বেঁটে ও মোটা হাতুড়ি দিয়ে বাটালির উপর আঘাত করতে থাকে। শিলটার গোটা শরীরের চারপাশ ছোটো ছোটো খোদাই দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়।

ঋষভের কৌতূহলী একজোড়া চোখের উপর দৃষ্টি বুলিয়ে সে শুধোল, ‘তা কত্তা, ডিজাইনখানা, হ্যাঁ, এইবারে কন।”

ঋষভ ঘাড় চুলকোতে চুলকোতে বলে, ‘ডিজাইন মানে?’

—কত্তা, এই শিলডায় রাম-সীতার বিয়ের ডিজাইন ছেল। তার মানে এই শিলের সাথে আপনার মা-বাবা-রা জড়ায়ে আচেন।

—অ্যাঁ, আপনি কী করে জানলেন? ঋষভের মনে হচ্ছে লোকটা গায়ে পড়া

শিলকাটাইওয়ালা শিলের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে বিড়বিড় করে, ‘আপনে যদি হুকুম দেন কত্তা, আমি একেনে রাম- সীতেরে ফেরাই দিতি পারি। মানে রাম-সীতের বিয়ের ছবি তুলে দিতি পারি। আর যদি অতখানি না লাগে, পদ্ম আর কলকা আঁকে দেবানে পাথরের খোলে।”

সে একটু থেমে আবার বলে, ‘শিলির বুকি মৎস অবতার আনতি পারি। এক্কেবারে সাদামাটা চালি, আপনেরে কুলো আঁকি দেবানে।’

ঋষভ ভয় পায়, কত না চার্জ করে দেবে একটা শিল খোদাই করে দিতে! সে তাড়াতাড়ি বলে, ‘না, তেমন কি আর দরকার আছে! এই সাদা-মাটা কেটে দিলেই হল, যাতে কাজে লাগে। মানে, একটু জিরে-হলুদ বাটা যায়, এই আর কি!”

—কত্তা, সব জিনিসেই কটুকু কাজের, ভাবলি চলে না।

কথাটা বলে ফেলার পর হয়তো তার মনে হয়েছে বলাটা ঠিক হয়নি, তাই একটুকু থেমে থাকে। তারপর স্বীকারোক্তির ঢঙে আবারও সে বলে, “কিছু মনে নেবেন না, আপনেরা আমাদের ভগমান, আমাদের ভাত দেন। ভচ্ছনা করলি করবেন আনে। কিন্তু ছোটো মুকি এটুকুন বলি…।’

লোকটা হাতুড়ির ঠুকঠুক থামিয়ে চোখ তুলে চায়। চোখে কী যেন আকুল নদী কুলকুল করছে! চোখের ভেতর কী যেন করুণতা ঝরছে! মুখের উপর মুখ চালানোয় যে স্বাভাবিক রাগ হবার কথা, তা ঋষভের মন থেকে উধাও। কী যে মায়া ওই চোখে ছড়ানো! ঋষভ তো তো করে। ‘মানে কত খরচ পড়বে… কিছুই তো জানি না।’

একগাল হেসে শিলকাটাইওয়ালা বলে, ‘বিশ্বেস করেন, আপনের থে অল্যায্য কিচ্ছুটি নেবো নানে। আপনের যা মনে লয়, তা-ই দেবেন আনে। কিন্তু আমার ইচ্ছেড়া শোনাই কত্তা। এহানে আপনের পুরাণ কথা যদি ফেরায় আনা যায়! এই শিলডার বুকি যতখানি মায়া ধরা ছেল, যতখানি ভালোবাসা আঁকা ছেল, তা যদি ফেরান যায়…।’

গলা কাঁপছিল শিলকাটাইওয়ালার। একটু কি কান্না জড়ানো ছিল! ঋষভের বুকের ভেতর কেমন যেন ফাঁকা হয়ে গেল। এই শিল যার তাকে তো প্রায় বনের ভেতর একা থাকতে বাধ্য হতে হচ্ছে। তার গলার ভেতর থেকে একটা গোঙানি বেরিয়ে এল, ‘মা মা৷’ ঋষভ শিলকাটাইওয়ালাকে থামায় হাত উঁচিয়ে। তার হাত ও মুখ একই সাথে থেমে যায়। ঋষভ বলে, “আচ্ছা আমি মায়ের কাছ থেকে শুনে নিই, এটা তাঁরই তো শিল। জেনে নিই এর বুকে কী ছবি আঁকা ছিল।”

তড়িঘড়ি সিঁড়ি বেয়ে দোতলার লম্বা বারান্দায় উঠে যায়। সেখানেই রয়েছে শ্বশুরমশাই প্রাণনাথ চক্রবর্তীর খুব শখের টেলেফোনটি। ঋষভ ফোন করে, ‘মা, আচ্ছা শোনো, ঋষভ বলছি। কেমন আছো মা?’

ঠোক্কর খেতে খেতে, মানে একমাত্র ছেলের বউ-এর কাছে ঠান্ডা ব্যবহার পেতে পেতে নিজের ভেতরে কান্না সামলে মমতাদেবী অনেকগুলো বছর আগেই স্থির করে নিয়েছিলেন, একাই থাকবেন এই ভিটেয়। যাক। ছেলে, ছেলে-বউ, নাতনি কলকাতায় চলে যাক।

(ক্রমশ……)

কলকাতা-য় এসে করতালি কুড়োলেন বলিউড অভিনেতা সুনীল শেট্টি

এক সময় তিনি ছিলেন শুধু অভিনেতা। তারপর তাঁর নামের আগে অভিনেতা ছাড়াও যুক্ত হয়েছে প্রযোজক এবং শিল্পোদ্যোগী শব্দগুলো। প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি সফল। তাই ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতে  তিনি যেমন বিশেষ মর্যাদা পেয়ে চলেছেন, ঠিক তেমন-ই শিল্প-বাণিজ্য মহলেও নজর কেড়ে চলেছেন এই মানুষটি। শুধু তাঁর ভক্তরাই নন, অনেক মানুষ এখন তাঁর সাফল্যের কাহিনি, বক্তব্য কিংবা পরামর্শ শোনেন মনযোগ দিয়ে। সম্প্রতি কলকাতা-র এক অভিজাত হোটেলে আয়োজিত বাণিজ্য-সম্মান প্রদান অনুষ্ঠানে নজর কাড়লেন বলিউড অভিনেতা, প্রযোজক এবং শিল্পদ্যোগী সুনীল শেট্টি।

Bollywood actor Sunil Shetty received applause in Kolkata

আসলে, কলকাতার জেডব্লিউ ম্যারিয়ট হোটেলে সদ্য অনুষ্ঠিত হল এক জমকালো বিজনেস অ্যাওয়ার্ড প্রদান অনুষ্ঠান। আর সেই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন সুনীল শেট্টি। সান্ধ্যকালীন বর্ণময় ওই অনুষ্ঠানে সুনীল-কে দেখা যায় একেবারে কর্পোরেট পোশাকে। শুধু তাই নয়, তাঁর বক্তব্যেও প্রাধান্য পায় বাণিজ্যিক বিষয়। কীভাবে ধৈর্য, নিষ্ঠা, সততা এবং পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা যায়, সেই কথা-ই তিনি তুলে ধরেন মঞ্চে দাঁড়িয়ে। আর তাঁর কথাগুলো মনযোগ দিয়ে শোনেন কলকাতা-র বিভিন্ন ক্ষেত্রের শিল্পদ্যোগীরা এবং সেইসব শিল্পদ্যোগীরা খুশি হয়ে আনন্দপ্রকাশ করেন করতালির মাধ্যমে।

প্রসঙ্গত সুনীল জানিয়েছেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের শিল্প-বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেককে আমি আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই এবং আমি তাঁদের আরও সাফল্য কামনা করি। নতুন প্রজন্মের যাঁরা বাণিজ্যে ইচ্ছুক, তাদেরও আমি স্বাগত জানাই। আর আমি মনে করি, যাঁরা সমস্ত প্রতিকুলতা কাটিয়ে আজ সফল ব্যবসায়ী, তাঁরা সত্যিই কৃতিত্বের দাবীদার এবং সম্মান-প্রাপক। আজ তাই, সেইসব বাণিজ্য-সফল মানুষদের হাতে টাইমস গ্রুপ-এর পক্ষ থেকে পুরস্কার হাতে তুলে দিতে পেরে আমি গর্বিত এবং আনন্দিত।’

উদ্ভাবন এবং উৎকর্ষের নিরলস চেতনা উদযাপন করার অসাধারণ এই সেভেন্থ এডিশন-এর সম্মান-জ্ঞাপন অনুষ্ঠানের অংশ হতে পেরে উদ্যোক্তাদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন সুনীল শেট্টি। শুধু তাই নয়, এই মহৎ উদ্যোগকে জারি রাখার জন্যও অনুরোধ করেছেন আয়োজকদের।  সুনীল শেট্টি-র সঙ্গে একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে বাণিজ্য-সফল ব্যক্তিদের হাতে পুরস্কার তুলে দিতে পেরে প্রবল আনন্দ প্রকাশ করেছেন টলিউড অভিনেত্রী সৌরসেনী মৈত্র।

ক্ষুদ্র, মাঝারি, মাইক্রো এন্টারপ্রাইজ (এসএমএসই), স্টার্ট-আপ এবং উদীয়মান ব্র্যান্ডগুলিকে তাদের শ্রেষ্ঠত্ব এবং কৃতিত্বের জন্য সম্মানিত করা হয়েছে এই অনুষ্ঠানে। কর্পোরেট, ই-কমার্স, শিক্ষা, রিয়েল এস্টেট, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, শিল্প ও সংস্কৃতি, মিডিয়া এবং বিনোদন সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের বাণিজ্য-সফল ব্যক্তিদের হাতে আয়োজকদের পক্ষ থেকে পুরস্কার তুলে দেন সুনীল শেট্টি। সব শেষে মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি ধন্যবাদ জানিয়ে গেছেন সিনেমাপ্রেমী দর্শকদের।

সম্পর্ক (পর্ব-০১)

শি-ই-ই-ই-ই-ল কাটা-ই-ই। শি-ই-ই-ই-ই-ল কাটা-ই-ই। শি-ই-ই-ই-ই-ল কাটা-ই-ই। আওয়াজটা কানে যায়। প্রতীক্ষিত সে আওয়াজ। কতদিন ধরে খুঁজছে। ঝটাপট দেয়ালের হুকে ঝুলতে থাকা শার্ট খুলে নিয়ে গায়ে চাপাতে চাপাতে সিঁড়ি বেয়ে দুদ্দাড় নেমে আসে নীচে।

দুপুরবেলায় হরেক ফেরিওয়ালা চ্যাঁচাতে চ্যাঁচাতে গৃহস্থের দিবানিদ্রার দফারফা করে দেয়। এই “মিশি লেবে গো’ বলে হাঁক পাড়ছে তো পরে পরেই ‘শিশি বোতল বিক্রি’ হেঁকে চলে যাচ্ছে। ধামা বাঁধাইওয়ালাও ডেকে ডেকে চলে গেছে, অবাক জলপানওয়ালা গেছে। একটু আগেই হেঁকে গেছে, ‘গামছা চা-ই-ই, বাঁদিপোতার গামছা চাই গো-ও-ও’। কিন্তু কতদিন থেকে শিল কাটাইওয়ালার খোঁজ নেই।

দুপুর ঝাঁ ঝাঁ করছে। রবিবার। ঋষভ নীচে নেমে দেখল কেউ কোথাও নেই। এ বছর ফেব্রুয়ারি থেকেই গরম পড়েছে। এটা মে মাস। রাস্তা-ঘাট শুনশান। কোনদিক থেকে ডাকটা এসেছে! বাড়ির ডানদিকের রাস্তা বোসপাড়া লেন গিয়ে পেছনে পড়েছে বাগবাজার স্ট্রিটে। বাঁ দিকের শচীন মিত্র লেনও গিয়ে মিশেছে বাগবাজার স্ট্রিটে। বিভ্রান্ত লাগে ঋষভের। ঠিকই তো বলে গিন্নি, অকর্মণ্য, অপদার্থ লোক৷ শ্বশুরের দেওয়া জুটমিলের চাকরিটাও কয়েক মাস হল হারিয়েছে। কারখানায় যায়, ইউনিয়নের লোকদের সাথে ঘোরে কিন্তু জোর দিয়ে বলতে পারে না যে তোমাদের জন্য আমার চাকরি গেছে, তোমরা আমার চাকরি ফিরিয়ে দাও।

ঋষভ ফাঁকা রাস্তায় সোজা তাকাল, একটা রিক্সাওয়ালা এই রামকান্ত বোস স্ট্রিট যেখানে ভূপেন বোস অ্যাভিনিউতে গিয়ে পড়েছে, সেইখানে দাঁড়িয়ে ঠুন ঠুন শব্দ তুলছে। যদি কোনও সওয়ারি পাওয়া যায়। কিন্তু এই তীব্র গরমে মাঝদুপুরে কে বেরোবে! ডান দিকেও রাস্তার শেষ প্রান্ত পর্যন্ত চোখ ফেলল ঋষভ। কিন্তু কোথায়! শুনশান রাস্তা।

কাউকে তো দেখতে পাচ্ছে না। মনে একটা খটকা লাগল তার। সত্যি কি ডাকটা শুনেছে সে! না কি হ্যালুসিনেশন! মানে তার প্রয়োজনের তাগিদ থেকে মনের ভেতর ওই ডাকটার জন্ম হয়েছে। আবার দু’পাশে তাকাল ঋষভ। রাস্তার পিচের উপর হা হা করছে গ্রীষ্ম। মরীচিকা তৈরি হয়েছে। মনে হচ্ছে দূরের রাস্তায় পিচের একটা অংশ ভিজে আছে। ডান দিকেও যতদূরে চোখ যায় তেমনই শুনশান। আরে তাহলে ওই ডাকটা তার মালিককে নিয়ে কি উবে গেল! পেছন ফিরে গেট বন্ধ করে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে যাবে, ঠিক তখনই উলটো দিকের কানাগলির ভেতর থেকে বেরিয়ে এল সেই প্রাণসঞ্চারী আওয়াজ, শি-ই-ই-ই-ই-ল কাটা-ই-ই। শি-ই- ই-ই-ই-ল কাটা-ই-ই। শিল-চাকতি-জাঁতা কাটাই।

—এই শিল কাটাই, এদিকে আসুন তো।

ঋষভ বাড়ির ভেতর ডেকে নিয়ে গেল লুঙ্গিপরা, চেকজামা গায়ে মাঝবয়সি একজনকে। এই আগুন ঝরানো মাঝ দুপুর, ভাগ্যিস লোকটা বুদ্ধি করে একটা লম্বা কাঠের ডান্ডাওয়ালা কালো ছাতা সঙ্গে এনেছিল! নাহলে এই ভর দুপুরে কী যে গতি হতো তার! লোকটা হয়তো রাস্তায় বের হতেই পারত না। কোনও গাছের তলায় বসে থাকত, আর ঋষভও খুঁজে পেত না তাকে। মুহূর্তে কত কী ভেবে ফেলেছে ঋষভ।

—আসুন, আসুন এখানটায় বসুন। আচ্ছা কত নেবেন? পুরোনো শিল, পারবেন তো কাটতে? মানে ভেঙে-চুরে যাবে না তো! অনেকদিন ব্যবহার নেই তো, তাই বলছি। বেলে পাথরের শিল।

লোকটা যেন বর্তে গেছে। ছায়ায়, বাড়ির বারান্দায় বসতে পেরে বর্তে গেছে। সে ঋষভের মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে খানিক তাকিয়ে থেকে বলে, ‘বাবু, একটুকুন জল খাতি দিবা? পেরাণডা ইদিক ওদিক করতি আচে।”

—হ্যাঁ হ্যাঁ তাই তো তাই তো, এই ঝাঁ ঝাঁ রোদের ভেতর থেকে এসেছে লোকটা, বসতে না বসতেই কাজের কথা বলতে লেগেছে সে। কাণ্ডজ্ঞান লুপ্ত হয়ে গেল নাকি তার! ঋষভ চট করে দোতলায় উঠে যায়। কলাই করা থালার উপরে চারটে বাতাসা আর এক ঘটি জল নিয়ে আসে। বাতাসা-সহ জল লোকটা মুহূর্তে লোপাট করে দেয়।

লোকটা জল খাচ্ছে আর ঋষভ উশখুশ করছে কতক্ষণে কথা পাড়বে। তার হাতে চাঁদ ধরা দিয়েছে। অনেকদিন ধরে খোঁজ করছে একটা শিলকাটাইওয়ালা। পাচ্ছে না। বউ বলেছে কিছুতেই প্যাকেটের মশলা সে খাবে না। কিন্তু সমস্যা হয়েছে শিলের বুক থেকে সব পিছলে পিছলে যাচ্ছে। কিছুতেই বাটা ভালো হচ্ছে না। শিল একেবারে প্লেন হয়ে গেছে। ঋষভ ভেবেছে মিস্ত্রিকে যখন পাওয়াই গেছে, বড়ো শিলটাকে কাটাবে। ছোটো শিলের জন্য আর পয়সা ব্যয় করে লাভ নেই। রান্না ঘরের কোণে বহুদিন থেকে পড়ে থাকতে দেখেছে বড়ো শিলটিকে। সেটাকেই সারিয়ে নেবে।

আগেকার দিনে বাড়িতে বাড়িতে শিল-নোড়ার সঙ্গে গম ও ডাল ভাঙার জাঁতা থাকত। এখন ইলেক্ট্রিক গম ভাঙার কল হয়ে অনেক গৃহস্থবাড়ি থেকে সে পাট উঠে গেছে। কিন্তু গুঁড়োমশলার ব্যবহার অনেক হেঁসেলে ঢুকে পড়লেও, . শিলনোড়া এক্কেবারে বিদেয় নেয়নি। বাড়ির পুরোনো লোকেরা বলে শিল ধোওয়া জল না দিলে তরকারির স্বাদ নাকি ফিরতেই চায় না।

—তা কত নেবেন?

ঋষভকে থামিয়ে শিলকাটাইওয়ালা বলতে শুরু করল, “শিল দেখতি হবে তো কত্তা! তার শিরেল, তার মাথালি, ভুটুকো পানা কিনা, সব দেখতি হবেনে। তবে তো দাম কতি পারব।’

তার গলার স্বরে হিসেব চনমন করছে। আজ সারাদিন একটাও কাজ হয়নি। আজ আর কোনও খদ্দের না জুটতেও পারে। কাল হবে কিনা বলা যায় না। কাজে কাজেই একটা খদ্দের থেকে যতটা পারা যায় জুটিয়ে নিতে হবে। এদিকে আবার খন্দের হারাবার ভয়ও আছে। যদি বেশি দাম শুনে গৃহস্থ শিল না কাটায়! ফলে মেপে কথা ফেলে শিলকাটাইওয়ালা।

—আমি কি শিলটা নিয়ে আসব? বেশ ভারী কিন্তু! ঋষভ বরাবরই বেশি কথা বলে। দরকারের বেশি সেসব কথা। গিন্নি কাছে থাকলে মুখ করত। ভাগ্য ভালো সে এখন ঘুমোচ্ছে। রবিবারের দুপুর।

(ক্রমশ……)

সারভাইভ্যাল গিল্ট (শেষ পর্ব)

বছর দু’য়েক আগে কাশ্মীরে ছিল রঞ্জনের বাবার পোস্টিং। কোনও বারে থাকতে পায় না। তাই সেবারে ছেলের জন্মদিনে ঘরে থাকবে বলে ছুটি নিয়ে বাড়ি আসছিল। পথে হঠাৎ আর্মি কনভয়ে গ্রেনেড বিস্ফোরণে ওদের গাড়ি চুরমার হয়ে গেল। জন্মদিনে বাবার বদলে এল তার কফিন। দেখে রঞ্জন নির্বাক হয়ে গেল। কারও সঙ্গে কথা বলত না, বাইরে যেত না, সারাদিন ঘরে একলা গুম মেরে বসে থাকত। আপন মনে বিড়বিড় করে বলত — আমার জন্যে বাবা চলে গেল। আমি আমার জন্মদিনে ছুটি নিয়ে বাড়ি আসার জন্যে জেদ না করলে বাবার এই দুর্ঘটনা হতো না। কলেজ যাওয়া বন্ধ করল, বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গেও মেলামেশা বন্ধ, খালি ঝিম মেরে ঘরে বসে থাকে। সবাই অনেক বোঝাল, আমিও বোঝালাম কিন্তু কিছু পরিবর্তন হল না। আত্মীয়স্বজন দেখে বলল— বাবাকে খুব ভালোবাসত তো, তাই এই অবস্থা। ধৈর্য ধরুন, ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু মাসের পর মাস কাটল, কিছুই হল না। একজন সাইকায়াট্রিস্টকে দেখালাম। কিন্তু সে কী যে ওষুধ দিল খালি গোটাদিন ঝিম মেরে পড়ে থাকে। অবস্থা ভালো হবে কী, শরীর আরও দুর্বল হয়ে যেতে লাগল। মাস ছয়েক ওষুধ খাইয়ে বন্ধ করে দিলাম। শেষে অনেকে বলল— ওকে নিয়ে একটু বাইরে ঘুরে আসুন, মন ভালো হবে, উন্নতি হবে। তখন শুরু করলাম এদিক ওদিক বেড়াতে যাওয়া। তাই ক’দিন আগে গিয়েছিলাম বারাণসীতে বাবার দর্শন করতে। বাইরে গেলে একটু ভালো থাকে কিন্তু ঘরে এলে আবার একই অবস্থা।

শেষে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘স্বামী তো গেলই। এখন ছেলেটারও যদি এই অবস্থা হয় তো আমি কী নিয়ে বাঁচি বল তো?’ মহিলার দু’চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

পূজারও চোখ জলে ভরে গিয়েছিল। এবার বুঝতে পারল এতদিন রঞ্জনের এই বিসদৃশ আচরণের কারণ। অথচ সে কী উলটোপালটাই না ভেবেছে তার সম্বন্ধে। বলল, “আমি একটু ওর কাছে যাব কাকিমা?”

পূজার মধুর সম্বোধনে মহিলা মোহিত হয়ে উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, যাও না।’

পাশের ঘরে গিয়ে পূজা দেখল রঞ্জন উপরের দিকে তাকিয়ে চুপ করে শুয়ে আছে। তার ডাকে একবার তাকাল। তারপর উঠে বসে বলল, ‘তুমি এখানে কেন এসেছ? আমার কাছে এসো না, তুমিও মরবে।’

মনটা তার ডুকরে কেঁদে উঠল। হাতটা ধরে বলল, “কে বলেছে মরব? আপনজনের থেকে দূরে গিয়েই বরং মানুষ বেশি কষ্ট পায়।’

—না না, আমি অপয়া ! আমার ছায়ায় বিষ আছে। তুমি চলে যাও, যাও। বলে হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে উঠে বেরিয়ে গেল। খানিকক্ষণ গালে হাত দিয়ে বসে রইল পূজা। তারপর রঞ্জনের মাকে ঢুকতে দেখে উঠে দাঁড়াল। ‘দেখলে তো? এইরকমই। দু’দণ্ড ভালো করে কথা বলতে চায় না। ওকে একলা ছেড়ে বাইরে যেতেও ভয় হয়। কখন কী করে বসে।’

হঠাৎ পূজার একটা কথা মনে এল। বলল, ‘আচ্ছা কাকিমা, ওকে একবার কোনও সাইকোলজিস্টের কাছে নিয়ে গেলে হয় না? আমার মায়ের বন্ধু একজন ভালো মনোবিদ আছে। আমি তার সঙ্গে কথা বলে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে ফেলি?”

—কিন্তু তাতে কি কিছু লাভ হবে?

—তার সঙ্গে একবার কথা বলেই দেখা যাক না। তবে আমার মন বলছে কাজ হবে।

—ঠিক আছে, তাই করো।

দিন দুই পরে তিনজনে হাজির হল বাইপাসের ধারে সাইকোলজিস্ট ম্যাডামের চেম্বারে। পূজা তাঁকে আগেই কিছুটা বলে রেখেছিল। তিনি প্রথমে রঞ্জনের মায়ের কাছে সমস্যাটা শুনলেন। তারপর তার কাছে আগেকার সমস্ত ঘটনা, ছেলেবেলা থেকে রঞ্জনের জীবনের কথা, তার এখনকার দিনচর্যা ইত্যাদি খোঁজখবর করলেন। রঞ্জনের সঙ্গেও একান্তে অনেকক্ষণ কথা বললেন। সব শুনে একটু উষ্মা প্রকাশ করলেন আরও আগে তার কাছে আনা হয়নি বলে। অবশেষে বললেন—এটা হল সারভাইভ্যাল গিল্ট ডিসঅর্ডার বা পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার। এতে কোনও দুর্ঘটনায় আপনজনের মৃত্যুর জন্যে মানুষ নিজেকেই দোষী ভাবে। বেশির ভাগ লোকই এই স্ট্রেস কিছুদিনের মধ্যে কাটিয়ে ওঠে। কিন্তু কেউ কেউ সেটা পারে না। ধীরে ধীরে প্রচণ্ড মানসিক চাপ, বিষাদ আর হতাশার গহ্বরে তলিয়ে যেতে থাকে। মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। কোনও কাজে মন বসাতে পারে না। এমনকী আত্মহত্যার প্রবণতাও দেখা দিতে পারে।

তিনি রঞ্জনের মাকে কিছু টিপ্‌স দিলেন ঘরে মেনে চলতে— ওকে একলা না ছেড়ে প্রিয়জনদের পাশে পাশে রাখতে, ওর পছন্দের খাবার, কাজকর্ম বেশি করতে ইত্যাদি। রঞ্জনকেও শিখিয়ে দিলেন কিছু ব্যায়াম প্রাণায়াম, আর কয়েকটা বই দিলেন পড়তে। বলে দিলেন পরের বারে তার কাছে শুনবেন বইগুলো কেমন লাগল। শেষে রঞ্জনের মাকে বুঝিয়ে বললেন চিন্তা না করতে। ওষুধপত্র লাগবে না, আশা করা যায় কিছুদিনের মধ্যেই অবস্থার উন্নতি হবে। দিন পনেরো বাদে আবার ছেলেকে নিয়ে আসতে বলে দিলেন।

শুরু হল রঞ্জনের নিয়মিত কাউন্সেলিং আর নতুন জীবনচর্যা। পূজা প্রায় প্রতিদিনই মা-বাবাকে লুকিয়ে বিকেলের দিকে রঞ্জনের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটিয়ে যায়। প্রথম প্রথম মুখ ফিরিয়ে থাকলেও পরে পূজার আসতে একটু দেরি হলে বা একদিন না এলে রঞ্জন অস্থির হয়ে ওঠে, গাল ফুলিয়ে বসে থাকে। অনেক সাধ্যসাধনা করে তখন পূজাকে তার অভিমান ভাঙাতে হয়। আর ম্যাডামের কাছেও যাওয়ার জন্যে রঞ্জন উন্মুখ হয়ে থাকে, মা-ছেলের সঙ্গে পূজাকেও যেতে হয়।

এইভাবে মাস দুই কাটিয়ে পূজা বারাণসী ফিরে গেল। কিন্তু তার মন পড়ে রইল কলকাতায়। প্রত্যেক দিন ইউনিভার্সিটি থেকে ফিরে চলত তাদের ভিডিও বার্তালাপ। একদিন কল করতে একটু দেরি হলে বাবুর অভিযোগের অন্ত থাকত না।

বছর পাঁচেক পরের কথা। ইতিমধ্যে রঞ্জন সুস্থ হয়ে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে ডব্লুবিসিএস পরীক্ষা দিয়ে কলকাতায় উইমেন অ্যান্ড চাইল্ড ওয়েলফেয়ার ডিপার্টমেন্টে আন্ডার সেক্রেটারি হিসেবে জয়েন করেছে। তৈরি হচ্ছে অল ইন্ডিয়া সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার জন্যে। ওদিকে পূজা আইআইটির পড়া শেষ করে চাকরি পেয়েছিল পুনেতে, মাস ছয়েক হল বদলি নিয়ে চলে এসেছে কলকাতায়। বাবা-মা এবার মেয়েকে আল্টিমেটাম দিলেন— আর অপেক্ষা নয়। হয় নিজের পছন্দের কাউকে হাজির কর, নয়তো তারা নিজেরাই দেখাশোনা শুরু করবেন।

পূজা মাকে বলল— সে একজনকে ভালোবাসে, রাজ্য সরকারি অফিসার। মা-ছেলের সংসার, কলকাতাতেই থাকে। হুকুম হল একদিন তাকে বাড়িতে চায়ের নিমন্ত্রণ করার।

নির্দিষ্ট সময়ে রঞ্জন মায়ের সঙ্গে এল পূজাদের বাড়িতে। কথায় কথায় তার নাম আর পূজার সঙ্গে বঙ্গবাসীতে পড়ত শুনে পূজার মায়ের কেমন যেন সন্দেহ হল। মেয়ের কানে কানে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এ সেই ছেলেটা না যে তোকে ধোঁকা দিয়েছিল? আবার তুই তার খপ্পরে পড়লি? কীরকম মেয়ে রে তুই?’

রঞ্জনের মায়ের কানে বোধহয় কথাটা গিয়েছিল। পূজার মায়ের হাত দু’টো ধরে বলে উঠলেন, ‘ভগবান যে ওদের জুড়ি ঠিক করে পাঠিয়েছেন দিদি। আজ ও না থাকলে আমি আমার রঞ্জনকে ফিরে পেতাম না। ও আমার ছেলের নতুন জীবন দিয়েছে। আপনি না করবেন না দিদি, আপনার পূজাকে আমাকে দিন।”

পূজার মা কথাগুলো ঠিক বুঝতে পারলেন না। ফ্যালফ্যাল করে রঞ্জনের মায়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

রঞ্জন-পূজার চোখে চোখে তখন দুষ্টুমির খেলা শুরু হয়েছে।

(সমাপ্ত)

প্রকাশিত হল ‘শেষ জীবন’ ছবির ট্রেলার

প্রেমের গল্পে আধারিত ছবি ‘শেষ জীবন’-এর ট্রেলার প্রকাশিত হল সম্প্রতি। ‘আইলিড’-এর ব্যানারে এই ছবিটি প্রযোজনা করেছেন প্রদীপ চোপড়া।

ছবিটির পরিচালক শুভেন্দু রাজ ঘোষ এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছেন, ‘শেষ জীবন’ পরিচালনা করা একটা অসাধারণ ফিলমি-সফর বলে আমার মনে হয়েছে। এই ছবির কাহিনিতে প্রেম এবং জীবনের চ্যালেঞ্জগুলিকে ওভারকাম করতে দেখবেন দর্শকরা। আবেগে ভরপুর এই ছবির কাহিনি দর্শকচিত্ত জয় করে নেবে এবং দর্শকদের গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করবে বলেও আমার মনে হয়। কলকাতা ছাড়াও, দার্জিলিং এবং কালিম্পং-এর মনোরম পটভূমিতে ক্যামেরাবন্দি করা হয়েছে এই ছবিটি। একজন দাদু এবং তার নাতনির সম্পর্কের নিবিড় বন্ধন প্রাধান্য পেয়েছে এই ছবির কাহিনিতে।’

Zee Music-এর সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলিতে প্রকাশিত হয়েছে এই ছবির ট্রেলার। গভীর আবেগ এবং সুন্দর দৃশ্যে ভরপুর এই ছবির ট্রেলারটি ইতিমধ্যেই দর্শকদের নজর কেড়েছে বলেও জানিয়েছেন পরিচালক। ছবিটির কেন্দ্রীয় চরিত্রে (বিক্রম রাঠোর)অভিনয় করেছেন এই ছবির প্রযোজক প্রদীপ চোপড়া। এছাড়া,  মুকেশ ঋষি, জারিনা ওয়াহাব, মুশতাক খান, পুনিত রাজ শর্মা  এবং কাব্য কাশ্যপ অভিনয় করেছেন এই ছবির অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে।

এই ছবিটি সম্পর্কে প্রযোজক প্রদীপ চোপড়া জানিয়েছেন, ‘শেষ জীবন’ একটি হৃদয়গ্রাহী গল্প নিয়ে তৈরি হয়েছে, যা আপনারা প্রিয়জনদের সঙ্গে প্রেক্ষাগৃহে একসঙ্গে বসে উপভোগ করতে পারবেন। আমি বিশ্বাস করি, ছবিটি চূড়ান্ত সাফল্য পাবে, কারণ এই ছবিটিতে সবাই আন্তরিক ভাবে কাজ করেছেন এবং ছবির কাহিনিতে ভালোলাগার রসদ আছে। তাছাড়া, পরিচালক শুভেন্দু প্রচুর পরিশ্রম করেছেন এই ছবিটির জন্য।’

প্রেস বিজ্ঞপ্তি-র মাধ্যমে আরও জানানো হয়েছে, ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র বিক্রম সিং রাঠোরের নাতনী কাব্য দ্বারা অনুপ্রাণিত একটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচনের মাধ্যমে শুরু হয়েছে এই ছবির কাহিনি। এরপর ফ্ল্যাশব্যাক-এ উঠে আসবে বিক্রম এবং কাব্যের হৃদয়গ্রাহী এক জার্নি। আর এই জার্নি-তে দেখা যাবে, জীবনের চ্যালেঞ্জগুলিকে কীভাবে ওভারকাম করে চলেছে বিক্রম এবং কাব্য।

‘জি মিউজিক’ প্রকাশ করেছে ‘শেষ জীবন’ ছবির মিউজিক। বব এসএন-এর কম্পোজিশন এবং শোভন গঙ্গোপাধ্যায়, ত্রিশা চট্টোপাধ্যায় এবং প্রদীপ চোপড়ার গাওয়া গানে সমৃদ্ধ হয়েছে এই ছবিটি।

ছবিটির কাহিনি লিখেছেন প্রদীপ চোপড়া। চিত্রনাট্য এবং সংলাপ লিখেছেন প্রদীপ চোপড়া এবং সঞ্জীব তিওয়ারি। ডিওপি অরবিন্দ নারায়ণ দোলাই। সিনেমাটি প্রেম এবং জীবনের চ্যালেঞ্জগুলিকে ছন্দময় করে তুলেছে বলে প্রসঙ্গত জানিয়েছেন দুই চিত্রনাট্যকার। শুভেন্দু রাজ ঘোষ পরিচালিত এই  ছবিটি, আগামী ৯ আগস্ট বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাবে বলে জানানো হয়েছে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে।

একটা নিরীহ ভূমিকম্প (শেষ পর্ব)

শ্রেয়া তার কণ্ঠস্বরে যারপরনাই সহানুভূতি মিশিয়ে বলল, ‘নিজেকে অত অসহায় ভাববেন না।’ ‘আমি তো আছি৷’ না। কথাটা বলতে গিয়েও বলে ফেলেনি শ্রেয়া।

শ্রেয়া সেদিন হ্যাংলার মতোই বলেছিল, ‘যদি কালই যাই?’ উনি খানিক ভেবে বললেন, “ঠিক আছে সেকেন্ড হাফে এসো। হাতে একটু সময় নিয়ে আসবে। ফিরতে সন্ধে হলে আমি ড্রপ করে দেব। ওকে?’

এসব ভাবতে ভাবতেই শ্রেয়া কখন মন্ত্রচালিতের মতো ইউনিভার্সিটিতে সম্রাট মিত্রর চেম্বারের সামনে এসে দাঁড়াল। সে ভাবে, প্রেমে পড়লেই বা, একটু বেশি তাড়াহুড়ো হয়ে যাচ্ছে নাকি? ওদের ক্লাসের অয়ন খুব মজার কথা বলে। ও প্রায়ই বলে, ‘প্রেমকে একটু পাকতে দিতে হয়। বুঝলি কাঁচা আম পেড়ে এনে যেমন কার্বাইডে জাঁক দিয়ে পাকিয়ে নেয়, প্রেমকেও তেমনই পাকিয়ে নিতে হয়।’

শ্রেয়া ভাবল, কালই আলাপ, আজই ছুটে আসাটা হ্যাংলামিই হবে। অয়নের কথাটা মনে ধরেছে। শ্রেয়া মনে মনে বলে, ঠিক হ্যায় বাচ্চু প্রেমটা একটু পাকুক। দেখাই যাক না ব্যাপারটা রেসিপ্রোকাল কিনা। তাই সে গন্তব্যে পৌঁছেও অ্যাবাউট টার্ন করে ফিরে এসেছে।

সম্রাট ফোনে বলেছেন, ‘কী হল এলে না কেন?’ শ্রেয়া বুঝল ব্যাপারটা তাহলে পাকছে। বলল, ‘কাল একটা এক্সট্রা ক্লাস ছিল। তাই যেতে পারিনি।’ তখনই সম্রাট বলেছেন, ‘তুমি বরং আমার বাড়িতে এসো।”

আজ সেই সম্রাটের বাড়িতে এসে পৌঁছোল। ঠিকানা ছবির মতো বুঝিয়ে দিয়েছিলেন সম্রাট। একটুও বেগ পেতে হয়নি শ্রেয়াকে। ডোরবেলে আঙুল ছোঁয়ানোর আগে খানিক থমকে যায় শ্রেয়া। সে ভাবে, মানুষটা বাড়িতে একা থাকেন। অফিস কামাই করে শ্রেয়াকে আসতে বলেছেন। ওঁর সম্পর্কে শ্রেয়ার সব ধারণা পালটে যাবে না তো? ওই ভালোমানুষি চেহারার আড়ালে কোনও শ্বাপদ লুকিয়ে নেই তো? যে-শ্বাপদের শুধুই মাংসের লোভ? শ্রেয়া আবার ভাবে, সে না এসেও তো থাকতে পারেনি। ওনার সম্পর্কে অসীম কৌতূহল আর দুর্বার আকর্ষণ তাকে সেই কুদঘাট থেকে সল্টলেক পর্যন্ত তো ছুটিয়ে এনেছে। সে আজ ফিরেও যাবে না। ভদ্রলোকের পিওরিটি তো যাচাই করা যাবে। ভাবতে ভাবতে শ্রেয়ার আঙুল চলে যায় ডোরবেলের ওপর। চেপেও দেয়৷

খানিকবাদে খুলে যায় দরজা। এই বাড়ির খোলা দরজার একক অধীশ্বরী কি শ্রেয়া? নাকি এই দরজা টপকে আজ তাকে নিজের সম্মান, সম্ভ্রম বাঁচিয়ে ছিটকে বেরিয়ে আসতে হবে?

একজন মাঝবয়সি মহিলা দরজা খুলে দিয়ে বলেন, ‘আপনি কি শ্রেয়া দিদিমণি।’

শ্রেয়া বলল, “হুঁ, স্যার আছেন তো?’ শ্রেয়া জানত, উনি থাকবেনই। তবু এটুকু নেহাতই সৌজন্য।

ওই মহিলা বললেন, ‘আসুন, ভেতরে আসুন।’

শ্রেয়া ভাবল, যাক তাহলে খতরা নেই। মানে বিপদ অনেকটাই নেই। এত বড়ো বাড়িতে উনি একা থাকলে ঝুঁকি তো ছিলই।

শ্রেয়া ওর সৌন্দর্য সম্পর্কে পুরোমাত্রায় সচেতন। তার ফিগার যে খুবই অ্যাপিলিং, সেই টনটনে জ্ঞান নিয়েই চলে শ্রেয়া। সেই শরীরী আগুনে কি পতঙ্গের মতো ঝাঁপ দিতে চায় লোকটা? দেখাই যাক না, ওঁর ওই শান্ত সৌম্যকান্তি মুখ না মুখোশ!

শ্রেয়া পায়ে পায়ে এগোচ্ছিল। তখনই শ্রেয়ার বুক কেঁপে ওঠে। সম্রাট খানিক গলা চড়িয়েই বলেন, ‘মোস্ট ওয়েলকাম শ্রেয়া। এসো সোজা ভেতরে চলে এসো।’

একটা দামি সোফায় শ্রেয়ার প্রায় কোমর পর্যন্ত ডুবে গেল। এত নরম ও আরামদায়ক সোফা। নিশ্চয়ই খুব দামি হবে। সম্রাট একটা বই এগিয়ে দেন শ্রেয়ার দিকে। বলেন, ‘এই নাও তোমার ব্যোমকেশ সমগ্র।’

শ্রেয়া হাত বাড়িয়ে নেয় বইটা। কোনও গিফট প্যাক নয়। বইটা হাতে নিয়ে প্রথম পাতাটা উলটেই বোবা হয়ে যায় শ্রেয়া। সল্টলেকে এই মুহূর্তে একটা ভূমিকম্প হল। নেহাতই একটা নিরীহ ভূমিকম্প। শ্রেয়া ছাড়া সেই কম্পন কেউ অনুভব করতে পারে না।

বইটার পুস্তানিতে লেখা, ‘আমাদের আদরের শ্রেয়াকে মা ও বাবা।’ ঠিক তখনই শরবতের ট্রে নিয়ে ঘরে ঢোকেন কাকলি। শ্রেয়া চমকে ওঠে মাকে দেখে

কাকলি বলেন, “কীরে? খুব তো আমার বিয়ে দিবি বলছিলি। এখন এই বাবাকে পছন্দ হয়েছে তো?’ শ্রেয়া মায়ের বুকে ঝাঁপিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে।

কাকলির বুক থেকে শ্রেয়াকে ছিনিয়ে নেন সম্রাট। সম্রাটের দামি গাউনের বুক খামচে ধরে কাঁদতে থাকে শ্রেয়া। কাঁদতে কাঁদতেই শ্রেয়া একসময় উপলব্ধি করে প্রেমিক নয়, এতদিন এমনই একটা বড়োমাপের নির্ভরতার বুক আর আস্তানারই কাঙাল ছিল সে।

(সমাপ্ত)

হাঁটু প্রতিস্থাপনে রোবোটিক সার্জারি

হাঁটু প্রতিস্থাপনে রোবোটিক-অ্যাসিস্টেড সলিউশন-এর বিষয়ে সম্প্রতি আলোকপাত করলেন অর্থোপেডিক সার্জন ডা. সৌম্য চক্রবর্তী। কলকাতা প্রেস ক্লাব-এ আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি জানিয়েছেন, কলকাতা-র আনন্দপুরে অবস্থিত ফর্টিস হাসপাতালে তাঁরা হাঁটু প্রতিস্থাপনের জন্য চালু করেছেন রোবোটিক-অ্যাসিস্টেড (VELYS) সার্জারি।

যে-সমস্ত রোগীদের সম্পূর্ণ কিংবা আংশিক হাঁটু প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হয়, তাদের জন্য রোবোটিক সার্জারি অত্যন্ত সুফলদায়ক বলে জানিয়েছেন ডা. চক্রবর্তী। তিনি প্রসঙ্গত আরও জানিয়েছেন, এক্ষেত্রে রোগীরা হাঁটাচলার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য গতি অনুভব করবেন, সার্জারি পরবর্তী সময়ে অস্বস্তি এবং ফ্যাট এমবোলিজমের মতো জটিলতার ঝুঁকিও অনেকটাই কমে যাবে। প্রযুক্তিটি ইমপ্লান্টকে দীর্ঘ দিন কাজ করার জন্য সক্রিয় রাখবে, নিরাময় প্রক্রিয়া গতি পাবে এবং হাসপাতালে থাকার সময়সীমা কমবে। উপরন্তু, অস্ত্রোপচার পদ্ধতি আরও সহজ হবে।

আসলে, চিকিৎসা-ক্ষেত্রে রোবোট-এর ব্যবহার শুরু হওয়ার পর থেকে আমূল পরিবর্তন ঘটেছে বিশ্বব্যাপী। কারণ, চিকিৎসা, বিশেষকরে সার্জারি-তে অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা নিয়ে চলেছে রোবোট। রোবোট-এর ব্যবহারের পর থেকে, বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সুবিধে হয়েছে। যেমন–রোবোট সময় বাঁচায় এবং প্রি-সার্জিক্যাল সিটি স্ক্যানের প্রয়োজনীয়তা দূর করে, চিকিৎসার খরচ কমায়।

ডা. সৌম্য চক্রবর্তী প্রসঙ্গত আরও জানিয়েছেন, ‘একটি ইনফ্রারেড ক্যামেরা এবং অপটিক্যাল ট্র্যাকারের মতো উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে, রোগীদের অ্যানাটমি সম্পর্কিত সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রদান করে এবং নিঁখুত চিকিৎসা সহায়ক হয়ে ওঠে রোবোট। এর অ্যাডাপটিভ ট্র্যাকিং প্রযুক্তি একটি উচ্চ-গতির ক্যামেরা, ট্রিপল-ড্রাইভ মোশন প্রযুক্তি এবং অস্ত্রোপচার পরিকল্পনাকে সঠিক এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে সাহায্য করে।’

‘পিউরসাইট অপটিক্যাল রিফ্লেক্টর সহ, অনেক কম সময়ে রোগী সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন রোবোটিক সার্জারি-র সাহায্য নিলে। অ্যাক্যুব্যালান্স গ্রাফ স্থিতিশীলতার পূর্বাভাস দেয়। ভারসাম্যপূর্ণ প্রাক-রিসেকশন ভিজ্যুয়ালাইজেশন-এর সুবিধে দেয়। এছাড়া, প্রো-অ্যাডজাস্ট প্ল্যানিং সহজেই প্যারামিটারগুলিতে সামঞ্জস্য রাখে, রোগীর শরীরের নরম টিস্যুগুলি চিনিয়ে দিতে সাহায্য করে চিকিৎসকদের। সেইসঙ্গে, রোবোটিক সিস্টেম পরিচালনা করা সহজ এবং অস্ত্রোপচারের সময় কমিয়ে দেয়।’

ডা. সৌম্য চক্রবর্তী-র মতে, রোবোটিক সার্জারি চালু হওয়ার পর থেকে, সবচেয়ে বেশি সুবিধে পাচ্ছেন রোগীরা। কারণ, সার্জারির পর তাদের হাসপাতালে থাকতে হচ্ছে কম সময় এবং দ্রুত তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারছেন। এছাড়া, রোগীদের সর্বাধিক সুবিধা প্রদানের জন্য সর্বোত্তম উপায়ে প্রযুক্তির সঙ্গে দক্ষতার সমন্বয় করে, আর্থ্রোপ্লাস্টি পরবর্তী স্তরে উন্নীত করার সুবিধে পাওয়া যাচ্ছে।

ডা. সৌম্য চক্রবর্তী এই  বিষয়ে উৎসাহ প্রকাশ করে আরও জানিয়েছেন, ‘আমরা রোবোটিক সার্জারি চালু করতে পেরে অত্যন্ত আনন্দিত। এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তি হাঁটু প্রতিস্থাপন সার্জারিতে বিপ্লব ঘটিয়েছে। সেইসঙ্গে, কম সময়ে নিখুঁত সার্জারির সুবিধা এবং রোগীকে দ্রুত স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।  তাই বলা যায়, রোবোটিক সার্জারি-র সামগ্রিক ফলাফল অত্যন্ত ভালো। আমাদের দক্ষতার সঙ্গে সর্বোত্তম  প্রযুক্তি ব্যবহারের মিলিত সুফল যেমন পাচ্ছি আমরা, ঠিক তেমনই সুবিধা পাচ্ছেন রোগীরা। শুধু তাই নয়, রোগীর পরিবারের লোকেরাও সার্জারি-র আগে-পরে অনেক বেশি নিশ্চিন্ত থাকছেন। এক্ষেত্রে আরও একটি বিষয় জানিয়ে রাখি যে, রোবোটিক আর্থ্রোপ্লাস্টিতে যেমন উল্লেখযোগ্য সুবিধে পাওয়া যায়, ঠিক তেমনই রোগীদের জীবনে এটি যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে, তা নিশ্চিত ভাবে বলা যায়।’

সারভাইভ্যাল গিল্ট (পর্ব-০১)

দশাশ্বমেধ ঘাটে সন্ধ্যারতির থিকথিকে ভিড়ের মধ্যে দূর থেকে হঠাৎ একটা চেনা মুখ দেখে পূজা চমকে উঠল। পরক্ষণেই ভাবল- ধুর, এখানে এত দূরে সে আসবে কী করে? তাও আবার এই সন্ধেবেলা? সব তার মনের ভ্রম। চোখ কচলে ভালো করে আবার দেখার চেষ্টা করল।

হ্যাঁ, সেই তো মনে হচ্ছে। পাশে একজন মহিলা, তাকে কিছু যেন বলছে। সে মাঝে মাঝে ঘাড় নাড়ছে আর একদৃষ্টে আরতি দেখছে। ইচ্ছে হল দৌড়ে কাছে যায়, পরক্ষণেই অভিমানে বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। যে তাকে অবহেলা করে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, একটা খোঁজখবরও নেয় না, কেন সে যাবে তার কাছে হ্যাংলার মতো? তার সঙ্গে আবার কীসের কথা?

কিন্তু পারল না। বন্ধুদের একটু দাঁড়াতে বলে ভিড় ঠেলে কাছে গিয়ে দাঁড়াল। দেখল হ্যাঁ রঞ্জনই। সন্ধ্যারতির মৃদু আলোতেও মনে হল চেহারাটা কেমন যেন শুকনো, দুর্বল। এই দু’বছরে বয়সটা যেন বেশ বেড়ে গেছে। অজান্তেই ঠোঁট দু’টো নড়ে উঠল, ‘কেমন আছো রঞ্জনদা?”

ছেলেটি তার দিকে একবার তাকিয়ে ঠান্ডা গলায়, ভালো বলে মুখ ঘুরিয়ে নিল। তার নিস্পৃহ ভাব দেখে পূজা অবাক হয়ে গেল, কী বলবে ভেবে পেল না। পাশের মহিলাটি জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কে? রঞ্জনকে চেন নাকি?’

পূজা মৃদুস্বরে বলল, “আমার নাম পূজা। আমরা কলকাতায় বঙ্গবাসী কলেজে একসঙ্গে পড়তাম।’

—আচ্ছা। এখানে বেড়াতে এসেছ বুঝি?

—না, আমি এখানেই থাকি, আইআইটিতে পড়ি। মাঝে মাঝে গঙ্গারতি দেখতে আসি।

—তাই নাকি? খুব ভালো।

—আপনারা এখানে ?

—একে নিয়ে এসেছি কয়েকদিন হল। কালই চলে যাব।

পূজার কেমন যেন খটকা লাগল। ‘নিয়ে এসেছি’ মানে? মুখ ঘুরিয়ে দেখে রঞ্জন উলটো দিকে তাকিয়ে আছে, তার উপস্থিতি যেন জানেই না। আর মহিলার বিধবার বেশ কেন? সে তো জানত ওর বাবা আছে। জিজ্ঞেস করল, , “আপনি…?’

—রঞ্জন আমার ছেলে।

—কিন্তু আপনার এই বেশ, আমি ঠিক…।

মহিলা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভারী গলায় বললেন, ‘সে অনেক কথা।”

হঠাৎ রঞ্জন বলে উঠল, ‘মা, আশ্রমে চলো, আর ভালো লাগছে না।”

—হ্যাঁ বাবা চল। বলে মহিলা ছেলের হাত ধরে বেরোবার উপক্রম করলেন। পূজাকে বললেন, ‘আমরা এবার যাই।’

পূজার সবকিছু যেন রহস্যময় লাগল, এদের ব্যাপার-স্যাপার ঠিক মাথায় ঢুকল না। হঠাৎ কী মনে হল কে জানে। দৌড়ে সামনে গিয়ে বলে উঠল, “আমি পরের সপ্তায় বাড়ি যাচ্ছি। যদি আপত্তি না থাকে, আপনাদের বাড়ির ঠিকানাটা পেলে ভালো হতো, একটু যেতাম।’

মহিলা পূজার মুখের দিকে তাকাল একঝলক। তারপর ঠিকানাটা বলে দিয়ে ছেলের সাথে আস্তে আস্তে বেরিয়ে গেলেন। পূজা তাদের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। আর ভালো লাগল না, বন্ধুদের নিয়ে দশাশ্বমেধ ঘাট থেকে বেরিয়ে এল।

হোস্টেলে ফিরে গিয়ে রাতে ঘুম এল না, বিছানায় শুয়ে ছটফট করতে লাগল। আবার দগদগিয়ে উঠল পুরোনো ক্ষতটা। মনের মধ্যে ভেসে উঠতে লাগল ফেলে আসা দিনগুলোর কথা।

বঙ্গবাসী কলেজে ভর্তি হওয়ার দিন থেকেই রঞ্জনের সারল্য, বুদ্ধিদীপ্ত কথাবার্তা আর প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস পূজাকে আকর্ষণ করেছিল। দু’জনের মধ্যে ক্রমশ গড়ে উঠল ঘনিষ্ঠতা, স্বপ্ন দেখতে লাগল সারাটা জীবন একসঙ্গে কাটানোর। পড়তে পড়তে পূজা পরীক্ষা দিচ্ছিল আইআইটির, ইচ্ছে ছিল সুযোগ পেলে ইঞ্জিনিয়রিং পড়বে। অন্যদিকে রঞ্জনের ইচ্ছে ছিল বাবার মতো আর্মি অফিসার হবে, এনডিএ পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

বছর খানেক পরে কলেজে একদিন হঠাৎ রঞ্জনের ব্যবহার দেখে পূজা অবাক হয়ে গেল। এমনিতেই ও কথা কম বলে কিন্তু সেদিন সারাটা সময় গোমড়া মুখে ক্লাসে বসে রইল। তার সঙ্গে ভালো করে কথাই বলল না। সে দু’একবার কাছে গিয়ে কথা বলার চেষ্টা করতে তার উপর চেঁচিয়ে উঠল। পূজা বুঝতে পারল না হঠাৎ তার হলটা কী ?

তারপর বেশ কয়েকদিন রঞ্জনকে কলেজে না আসতে দেখে পূজা তাকে ফোন করল। কিন্তু দু’একটা ‘হুঁ’ ‘হ্যাঁ’ বলেই রঞ্জন ফোন রেখে দিল, ভালো করে কথাই বলল না। মনে বড়ো আঘাত লাগল পূজার। নানারকম ভাবনা মাথায় আসতে লাগল। তবে কি ও এনডিএতে চান্স পেয়ে চলে যাচ্ছে? নাকি অন্য কোনও ঘাটে তরি ভিড়িয়েছে ? যাই হোক, সেটা তো মুখ ফুটে বললেই পারত, এরকম ব্যবহার করার মানে কী? খুব অভিমান হল, ভাবল বয়ে গেছে আমার ওর পিছনে হ্যাংলার মতো পড়ে থাকতে!

তারপর বেশ কিছুদিন পূজার প্রাণোচ্ছলতা হারিয়ে গিয়েছিল, সবসময় মনমরা হয়ে থাকত। মা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করে সব কথা জানতে পেরে মেয়েকে খুব বকেছিল। বারণ করেছিল — ওইরকম বাজে ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ না রাখতে।

হঠাৎ এল তার জয়েন্টের পাশের খবর, সে চান্স পেয়েছে বেনারস আইআইটিতে, শিগগির যেতে হবে কাউন্সেলিং-এ। যাওয়ার আগে একবার ফোন করল রঞ্জনকে খবরটা দিতে। কিন্তু পূজা আশ্চর্য হয়ে গেল তার কথা শুনে। নিস্পৃহ ভাবে উত্তর দিল, ‘ভালোই তো, চলে যাও’ বলে ফোন রেখে দিল। চোখে জল এসে গিয়েছিল পূজার। পরে ফোন করার আর প্রবৃত্তি হয়নি। বারাণসী গিয়ে বারবার ভাবত, মানুষ এত তাড়াতাড়ি বদলে যায় কী করে? যাক যা হয়েছে ভালোই হয়েছে, ভগবান বাঁচিয়ে দিয়েছেন।

কিন্তু আজ ওর মায়ের কথাগুলো পূজার কাছে কেমন যেন রহস্যময় মনে হল। রঞ্জনকে নিয়ে হঠাৎ বারাণসী এসেছে কেন? ওর বাবা কী করে এত তাড়াতাড়ি মারা গেল? কী এমন ‘অনেক কথা’ আছে যা রঞ্জন ওর মাকে বলার সুযোগ দিল না?

পূজা স্থির করল পরের সপ্তাহে সামার ভ্যাকেশানে কলকাতা গিয়েই একবার রঞ্জনের মায়ের কাছে যাবে।

দিন দশেক পরে পূজা একদিন বিকেলে গিয়ে হাজির হল রঞ্জনদের বাড়ি। ওর মা তাকে দেখে বেশ খুশি হল, আপ্যায়ন করে বসাল। রঞ্জনকে দেখতে না পেয়ে জিজ্ঞেস করল, “রঞ্জন কোথায়? দেখছি না তো?”

—ও ঘরে শুয়ে আছে।

—ও এখন কী করে? পড়ছে না চাকরি করে?

রঞ্জনের মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “আর চাকরি, তাহলে তো আমার কপালই খুলে যেত!”

কথাটা পূজার ঠিক বোধগম্য হল না। তারপর মহিলার কাছে সমস্ত বাপারটা শুনে পূজা স্তম্ভিত হয়ে গেল।

(ক্রমশ…)

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব