কাশ্মীরে কয়েকদিন (শেষ পর্ব)

এবার যাত্রা আমাদের আগামী চারদিনের বাসস্থান শ্রীনগর-মুখো। যাত্রার প্রাক্কালে রাস্তা-ধারের স্টল থেকে এখানকার বিখ্যাত পানীয় ‘কাওয়া’ পান করে নিলাম। কাওয়া হল সবুজ চা পাতা, এলাচ, জাফরান আর বিভিন্ন বাদামের গুঁড়োর মিশ্রণকে জলে ফুটিয়ে চায়ের মতো পান করা। শীতের দেশে এই পানীয় শরীরে উত্তাপ দেয় বলে স্থানীয়দের বিশ্বাস।

 

শ্রীনগর

পহেল গাঁও থেকে শ্রীনগর মাত্র ৫৮ কিলোমিটার। পাহাড়ি পথ হওয়ায় মাঝে মাঝেই থামতে হয় চা-জলখাবার বা বাথরুম ইত্যাদির জন্য। তাই বেশ সময় লেগে গেল। পথে পড়ল ৭১৯৮ ফুট উঁচু ২.৮৫ কিলোমিটার লম্বা জওহর টানেল। এই টানেলটি বানিহাল গিরিপথের নীচ দিয়ে তৈরি হয়েছিল ১৯৫৫ সালে। পরের বছর ১৯৫৬ সালের ২২ ডিসেম্বর থেকে এই টানেল-পথে বছরের সব সময় মোটরগাড়ি যাতায়াত শুরু হল। রাস্তায় পাহাড়ের গায়ে সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে সন্ধ্যার ঠিক আগে শ্রীনগরের উপকণ্ঠে পৌঁছে গেলাম। রাস্তার দুধারে বিশালকায় চিনার গাছগুলো দেখে রতন চেঁচিয়ে উঠল, “এ যে ক্যালিফোর্নিয়ার রেড-উড গাছের মতো মোটা দাদা।’

আমি হেসে বলি, ‘প্রায়! তবে ওখানের গাছগুলো আরও বেশি মোটা আর উঁচু। এক একটা বড়ো চিনার গাছের গোড়ার ব্যাস চার-পাঁচ ফুটের মতো আর লম্বায় ৭০-৮০ ফুট উঁচু। এদের স্থানীয় ভাষায় ‘বুয়েন’ বলে। কাশ্মীরিরা চিনার বা ‘বুয়েন’কে গর্বের সঙ্গে ওদের সংস্কৃতির অংশ মনে করে। গাছগুলো বাঁচেও অনেক দিন। শালিমার বাগে একটি মোটা চিনার গাছ দেখলাম, বয়স নাকি ৩০০ বছরের উপর।

শ্রীনগর শহর জম্মু-কাশ্মীরের বৃহত্তম আর জনবহুল শহর। শঙ্করাচার্য পর্বত আর হরি পর্বতের মাঝখানে ডাল, উলর, আনছর, নিগেন, গঙ্গা-বাল ইত্যাদি হ্রদ বেষ্টিত ছবির মতো সুন্দর এই শ্রীনগর শহর সমুদ্রতল থেকে প্রায় দু’হাজার ফুট উপরে অবস্থিত। এই শহরের যেখানেই যাওয়া যাক সেখানেই ঝিলম নদী, ডাল বা অন্য কোনও লেকের দর্শন পাওয়া যায়। পুরাকালে ঝিলম নদীর একটি সুন্দর নাম ছিল বিতস্তা, স্থানীয় ভাষায় এর নাম ভ্যায়ে-ত। পশ্চিম হিমালয়ের ‘ভেরি-নাগ” নামক হিমবাহ থেকে এর জন্ম আর পথে অসংখ্য ছোটো নদী-নালা মিলে একে পুষ্ট করেছে। শ্রীনগর ঘনবসতিপূর্ণ জনপদ। মাত্র ২৯৪ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এই শহরের বর্তমান লোকসংখ্যা প্রায় ১৭ লক্ষ।

গুলমার্গ

পরের দিন ভোরবেলা চা-জলখাবার খেয়ে বাসে করে বেরিয়ে পড়লাম গুলমার্গের পথে। গুলমার্গ শ্রীনগর থেকে ৪৯ কিলোমিটার রাস্তা। সমুদ্রতল থেকে ৮৬৯৪ ফুট উঁচু পাহাড়ি শহর গুলমার্গ। পৌঁছে মনে হল পুরো গুলমার্গ যেন বরফের চাদরে ঢেকে ঘুমিয়ে আছে। বরফের উপর স্কিয়িং আর ‘গণ্ডোলা’ নামের কেবল কার চড়ে এক বরফের চূড়া থেকে আর এক বরফ ঢাকা পাহাড়ের চূড়ায় যাওয়া। দুই স্টেজে এই গন্ডোলা চড়তে হয়। প্রথম স্টেজে গুলমার্গ থেকে কুংডোর পর্যন্ত কেবেল কার ১০ মিনিটে পৌঁছে যায়। তারপর দ্বিতীয় স্টেজে কুংডোর থেকে আফারোয়াত চূড়া পর্যন্ত পৌঁছে যায় ১৪-১৫ মিনিটে। তৃতীয় স্টেজে, অবশ্য যারা বিশেষ ভাবে স্কিয়িং করতে যাবেন তাদের জন্য ‘চেয়ার-লিফট’-এর ব্যবস্থা আছে।

এক এক স্টেজে দাঁড়িয়ে স্বর্গীয় নৈসর্গিক শোভা উপভোগ করতে করতে ধূমায়িত চা-কফির আনন্দও নেওয়া যায়। গণ্ডোলা রাইডের জন্য আগে থেকে ‘অনলাইন’ বুকিং করাই ভালো। যদিও গুলমার্গ-এও টিকিট করা যায়। গুলমার্গের পুরো আনন্দ উপভোগ করে সন্ধ্যার আগে হোটেলে ফিরে এলাম। পরের দিন আমাদের ট্যুর অপারেটরের ব্যবস্থা অনুসারে শুধু ডাল লেক ভ্রমণ আর শহরে ঘোরা আর বাজার করা।

ডাল লেক ও আশপাশ

শ্রীনগর শহরের বৃহত্তম আকর্ষণ হল ডাল লেক আর তার উপরের ‘হাউস-বোট’ আর শিকারা বা ছোটো ছোটো সুসজ্জিত নৌকা। হাউস-বোটগুলি একেকটি ভাসমান হোটেল বিশেষ। শুনলাম ৫০০-র বেশি হাউস বোট আর কয়েক হাজার শিকারা আছে ডাল লেকে। হাউস বোটে বৈদ্যুতিক সুযোগ-সুবিধা, এমনকী এয়ারকন্ডিশন এবং ওয়াই-ফাই ও আছে। কোনও কোনও হাউস- বোটের পাশে নিজের শিকারা ‘পার্কিং’-এর বন্দোবস্তও আছে। আর এক আকর্ষণ হল শিকারায় চড়ে ডাল লেক ভ্রমণ আর শিকারাতে বসেই ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ আর বাজার করা। আবার কিছু হাউস-বোটে আছে শহরের ‘মল’-এর মতো ‘শপিং’-এর সুবিধা। এক কথায় লেকের উপরেই কিছুদিনের জন্য জীবনযাপনের সবকিছু প্রয়োজনীয় জিনিস পাওয়া যায়।

শ্রীনগরের আর এক বিশেষ আকর্ষণ হল শঙ্করাচার্য মন্দির। ডাল লেকের পাড়ে শঙ্করাচার্য পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত এই মন্দির পাহাড়ের ১০০০ ফুট উপরে আর ২৪০টি সিঁড়ি চড়ে পৌঁছোতে হয় মন্দির চত্বরে। ডাল লেকের পশ্চিম পাড়ে আছে হজরত-বাল মসজিদ বা দরগা শরীফ। ডাল লেক থেকে ফেরার পথে ‘লাল-চৌক’-এ কিছুক্ষণ কাটিয়ে সন্ধ্যায় হোটেলে ফিরলাম।

মোঘল-টিউলিপ গার্ডেন

পরের দিন আমাদের প্রোগ্রাম ছিল শ্রীনগরের বিখ্যাত মোঘল গার্ডেনগুলি ঘুরে দেখা। কী অপূর্ব সব রং-বেরং-এর ফুলে সুসজ্জিত টিউলিপ গার্ডেন, শালিমার উদ্যান, নিশাত বাগ, আরও কত ছোটো বড়ো উদ্যানে সুশোভিত এই শ্রীনগর। এত বিভিন্ন রঙের বিশাল টিউলিপের সমারোহ আমি টিউলিপের স্বর্গভূমি হল্যান্ডেও দেখিনি।

সোনমার্গ

পরের দিন সোনমার্গ যাওয়ার জন্য মানসিক ভাবে তৈরি হতে লাগলাম। সোনমার্গ শ্রীনগর থেকে ৮১ কিলোমিটার দূরে আর গুলমার্গ থেকে প্রায় ২৬০ ফুট বেশি উঁচুতে। গুলমার্গের মতো স্কিয়িং অথবা গণ্ডোলা-রাইড এখানে নেই কিন্তু কাছেই বিখ্যাত ‘জোজিলা-গিরিপথ’ দর্শন, ঘোড়ায় চড়ে ঘুরে বেড়ানো, থাজিওয়াস হিমবাহ দেখা— এইসব করতে করতেই দিন শেষ হয়ে যায়। সোনমার্গে খুব পরিষ্কার আবহাওয়া পেয়েছিলাম।

জম্মু

পরের দিন সকালে আবার আমাদের বাস ছাড়ল জম্মুর পথে। মোট ১৫২ কিলোমিটার রাস্তা বাসে ১০-১১ ঘণ্টা লাগবে। পথে কয়েক বার চা পান বিরতি এবং লাঞ্চ সারা হল। মাঝে ২.৮৫ কিলোমিটার লম্বা ‘জহর টানেল’ হয়ে ঠিক সন্ধ্যার মুখে পৌঁছে গেলাম জম্মু শহরে। অনেকেই বৈষ্ণোদেবী দর্শনের জন্য বেরিয়ে পড়ল মন্দিরের নীচে লাইন দিতে। যাদের অগ্রিম বুকিং ছিল না তারা টিকিট না পেয়ে ফিরে এল।

পরের দিন আমরা জম্মুর বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ঘুরে সন্ধ্যায় জম্মু রেলওয়ে স্টেশনে দিল্লিগামী ট্রেন ধরলাম। জম্মুর রাস্তায় দেখেছিলাম প্রায় গরুর আকারের বিশাল বিশাল ছাগল। এদের সারা শরীরে লম্বা লম্বা রোমশ চুল দেখার মতো। শুনলাম, এদের চুলগুলিও ভেড়ার লোমের মতো মূল্যবান। ভোরবেলায় দিল্লি পৌঁছে গেলাম।

(সমাপ্ত)

একটা নিরীহ ভূমিকম্প (পর্ব-০২)

কাকলি অফিসে বেরিয়ে যাওয়ার পরেও ভাবনাটা মগজে ক্রমাগত নাড়া দিতে থাকে। সে ভাবে, বাবা আজ দশ বছর হল নেই। বাবার চাকরিটাই মা পেয়েছে। মায়ের এখন বিয়াল্লিশ। আর্লি ম্যারেজ। মায়ের কুড়ি বছর বয়সে শ্রেয়া এসেছে মায়ের কোলে। তার মানে মায়ের বত্রিশ বছর বয়সেই যৌনজীবন স্তব্ধ হয়ে গেছে। রজো নিবৃত্তির দিল্লি তো এখনও অনেক দূর। কী আশ্চর্য! কী সাংঘাতিক অবিচার সংসারের! শ্রেয়া কোনওদিন মনের ভুলেও এসব ভাবেনি। অথচ ভাবা উচিত ছিল তার। তার জন্যই তো। সে-ই তো মায়ের পথের কাঁটা হয়ে আছে। সে না এলে তো মা অনায়াসেই ফের বিয়ে করতে পারত।

এর মধ্যে বার দুই শ্রেয়ার স্মার্ট ফোনের কালার স্ক্রিন কাঁপিয়ে সম্রাট ভেসে উঠেছে। অমনি ধকধক করে কেঁপেছে শ্রেয়ার বুকও। শ্রেয়া কাঁপা কাঁপা হাতে কানে ফোন তুলেছে। ওপার থেকে সেই আশ্চর্য রোমান্টিক কণ্ঠস্বর, ‘তোমার ব্যোমকেশ সমগ্র এনে রেখেছি।’

শ্রেয়া অনেক কষ্টে বলে, ‘আমি আসছি!’

শ্রেয়া এবার তড়িঘড়ি সব গুছিয়ে নিতে থাকে৷ কিন্তু তার মাঝখানেই আবার শ্রেয়ার মগজে খোঁচা দিতে থাকে মায়ের কথা। তার মায়ের প্রতি সংসারের অবিচারের কথা। মায়ের প্রতি তার অবিচারের কথা। শ্রেয়া শুনেছে, কুড়ি বছরের চৌকাঠ পেরোনোর আগেই ওর মায়ের বিয়ে হয়ে গেছে।

ওর দাদু নাকি বলত, ‘মেয়েদের এত রূপ ভালো নয়।’ তাই বিএ পাশ করার আগেই বিয়ে হয়ে গেছে। বছর না ঘুরতেই কনসিভ করেছে। শ্রেয়া এসে গেছে পেটে। বাবা চলে যাওয়ার পরেও একযুগ কেটে গেছে। সে ভাবে, তার মায়ের কোনও তুলনা হয় না। তার মায়ের ত্যাগের কোনও তুলনা হয় না।

শ্রেয়া ভাবে, তার মাকে হয়তো কেউ প্রোপোজ করেছে। মা বলেছে, না না অসম্ভব। আমার মেয়ে বড়ো হয়েছে। আমার পক্ষে এগোনো অসম্ভব। মায়ের হয়তো ইচ্ছে ছিল। কিন্তু তার জন্য স্রেফ তার জন্য, মা ইচ্ছের চুঁটি টিপে ধরেছেন। ছিঃ ছিঃ! এসব কথা তো তার কখনও মনে আসেনি। তখন ঠাট্টার ছলে বলা কথাটাকেই সত্যি করে তুলতে হবে তাকে।

আজ মা অফিস থেকে ফিরলে সে মায়ের গলা ধরে ঝুলে পড়বে। নিজের কথাও বলবে মাকে। মাকে বলতেই হবে। মাকে না বলে সে এই কঠিন ভাবনার বোঝা বয়ে বেড়াতে পারবে না। শ্রেয়া চিবুক শক্ত করে সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়, সে আজ তার মাকে সব খুলে বলবে। বলবে, ‘আমাদের কলেজে সেমিনারে এসেছিলেন ভদ্রলোক। নাম সম্রাট মিটার। আই মিন মিত্র। তোমাকে কী বলব মা, লোকটা অসম্ভব রোমান্টিক আর কী অ্যাফেকশনেট লুক, যে কী বলব তোমাকে। যতবারই আমার সঙ্গে চোখাচোখি হয়েছে, ততবারই বুক ধক ধক করে কেঁপে উঠেছে।’

বাকিটা মাকে সে বলতে পারবে না। সে বড়ো লজ্জার নেহাতই মেয়েলি ব্যাপার। তার দেহনদীর চঞ্চল স্রোতধারা ফল্গুধারার মতো বয়ে গেছে। সেমিনারে ঝাড়া চল্লিশ মিনিট বললেন। আমার মনে হল, মাত্র চার মিনিট। উফ কী দুর্দান্ত ভয়েস মা। শুনলে তুমিও ফিদা হয়ে যেতে। আমি ফার্স্ট লুকেই ফিদা, হয়তো বুঝতে পেরেছেন। টি-ব্রেকের সময় আমাকে হাতের ইশারায় ডাকলেন। আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়েই ছিলাম। অনুরাধা, পূজা ওরা আওয়াজ দিল। আমি তো ডোন্ট কেয়ার। লিস্ট বদারড। গেলাম ওঁর কাছে। আমাকে পাশে বসতে বললেন। আমি তখন আর আমার মধ্যে নেই। সারা শরীর আমার অবশ হয়ে গেছে। বললেন, ‘তোমার নম্বরটা দাও।’ আমি তক্ষুনি দিলাম। উনি বললেন, ‘মিসড কল দিলাম, সেভ করে নাও।’ না বললেও সেভ করতাম!

হ্যাংলার মতো তো বলেই বসলাম, ‘ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে আপনার সঙ্গে দেখা করতে পারি?’

উনি বললেন, “নিশ্চয়ই। মোস্ট ওয়েলকাম। ফোন করে চলে এসো। সাহিত্য টাহিত্য পড়ো?’

—হ্যাঁ পড়ি।’

—ফেভারিট কে? শীর্ষেন্দু?

আমি বললাম, “আপনি ঠিক গেস করেছেন। তবে আমি একটু ব্যোমকেশ পড়তে চাই।

উনি বললেন, “ঠিক আছে তুমি যেদিন আসবে, ফোনে জানিও। আমি আনিয়ে রাখব। তোমায় প্রেজেন্ট করব কেমন?’

আমি বললাম, “ঠিক আছে।”

পরের দিনই আকাশ থেকে পড়ল শ্রেয়া। ফোনে সম্রাট মিত্র। ফোন কানে তুলে নেয় শ্রেয়া। সম্রাট বলেন, ‘তুমি আমার অফিসে আসছ তো?’

—হ্যাঁ যাচ্ছি তো।

কিন্তু শেষইস্তক আর যায়নি শ্রেয়া।

পরদিন আবার সম্রাটের ফোন পেল শ্রেয়া। বললেন, ‘এলে না কেন? ঠিক আছে তুমি একদিন আমার বাড়িতে চলে এসো।’ শ্রেয়া দমে যায়। তার মনে হয় ওনার বাড়িতে গেলে ব্যাপারটা একেবারেই জমবে না। শ্রেয়া ভাবে, প্রথম আলাপেই হুট করে বাড়ি চলে যাওয়াটা খুবই হ্যাংলামি হবে। তাছাড়া ওনার স্ত্রী থাকবেন। সে বড়ো অস্বস্তির ব্যাপার হবে। তাছাড়া নিজের সম্ভ্রমেও বাধছে। তার মনে হয়, সে যা ভেবেছিল, তা একেবারেই নয়। ওর প্রেমটা তাহলে একতরফা। নইলে উনি বাড়িতে চলে এসো বলবেন কেন?

সম্রাট শুনে বললেন, ‘আরে ধুর আমি বাড়িতে একাই থাকি। আমার স্ত্রী তিন বছর হল চলে গেছেন।’ শুনে শ্রেয়ার ভেতরটা ফের দুলে ওঠে। যেন খুবই দুঃখের ব্যাপার, কণ্ঠস্বরে তেমনই আপশোশ জাগিয়ে শ্রেয়া বলল, “ওহো! ইস, খুবই দুঃখিত আপনাকে দুঃখ দেওয়ার জন্য। কী হয়েছিল ওনার?’

—লাং ক্যানসার। একবছর ট্রিটমেন্টে চলল। তারপর আর ধরে রাখতে পারলাম না। আর আমাদের কোনও ইস্যুও হয়নি। শুনে শ্রেয়ার বুকের ভেতরটা আনন্দে তা তা থই থই করে দুলে উঠল। তার মানে উনি একা। ওদের মাঝখানে কোনও বাধার পাঁচিল নেই।

সম্রাট বলেন, “আমার লোনলিনেস আর হেল্পলেসনেসই এখন আমার জীবনের নিত্যসঙ্গী।’

(ক্রমশ…)

কাশ্মীরে কয়েকদিন (পর্ব-০১)

ঘুম থেকে উঠে সবেমাত্র দিনের প্রথম চায়ের কাপটি হাতে নিয়েছি কী, মোবাইল বেজে উঠল। এত সকালে কে ফোন করতে পারে?

—হ্যালো, কে বলছেন?

—দাদা, ঢাকা থেইক্যা রতন সরকার কইতাছি।

—হ্যাঁ, বলো রতন কী সংবাদ? সব কুশল মঙ্গল তো? —হ, সব ঠিক আছে দাদা। বাড়ির কাছের নৈসর্গ ছেড়ে ইয়োরোপ-আমেরিকা দৌড়াই ক্যান?

—কোন জায়গার কথা বলছ রতন? কাশ্মীরের কথা?

—হ, দাদা, খুব ইচ্ছে হইতাছে জম্মু-কাশ্মীর দেখার।

আমিও অনেক দিন ধরেই ভাবছিলাম একই কথা। সঙ্গী হিসাবে রতন সরকার খুবই ভালো। রাজি হয়ে গেলাম।

রতন ঢাকা থেকে কলকাতায় আসবে, সেখান থেকে দিল্লি এয়ারপোর্টে ওর সঙ্গে দেখা হবে, তারপর দিল্লি থেকে একই প্লেনে জম্মু যাব। এরপর জম্মু থেকে ভ্রমণ শুরু। দু’ঘণ্টার কিছু কম সময়ে আমাদের প্লেন জম্মু এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করল। হালকা বৃষ্টি হচ্ছিল। এপ্রিলের প্রথম দিক, আশাতীত ভাবে ঠান্ডাটাও বেশ রয়েছে।

এয়ারপোর্টের বাইরে ট্যাক্সি স্ট্যান্ড থেকে একটা ট্যাক্সি নিয়ে হোটেলে পৌঁছোতে আধঘণ্টার বেশি সময় লেগে গেল। হোটেলের ঘরে ঢুকে শীত বেশি করতে লাগল, বুঝিয়ে দিল কাশ্মীরে এসে গেছি। হোটেল মালিক বললেন— এখানে কিন্তু ‘প্রি-পেইড’ সিমের মোবাইল চলবে না, পোস্ট-পেইড সিম অথবা লোকাল সিম নিতে হবে। সে ব্যবস্থা অবশ্য ওরাই করে দেবেন। কয়েক মিনিটের মধ্যেই নতুন সিম লাগিয়ে আমাদের ফোন ‘চালু’ হয়ে গেল।

চা-বিস্কুট খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম। হোটেল থেকে বেরিয়েই শেয়ার ‘টোটো’তে চড়ে বসলাম, রঘুনাথ মন্দিরের উদ্দেশ্যে। টোটো পাহাড়ি রাস্তা ঘুরে ঘুরে উঠে এল রঘুনাথ মন্দিরের সামনে। বেশ বড়ো মন্দির, সুরক্ষারও কড়া বন্দোবস্ত। বড়ো এলাকাজুড়ে বিভিন্ন দেব-দেবীর মন্দির। অবশ্য রঘুনাথ অর্থাৎ রামের মন্দিরই প্রধান। এখানে রাম, সীতা, লক্ষ্মণের বিরাট সুদৃশ্য মূর্তি রয়েছে। দেখলাম রামের মূর্তি কালো পাথরের। একের পর এক মন্দির পেরিয়ে শেষে এলাম একটি ছোটো মন্দিরে। এটি মা বৈষ্ণোদেবীর মন্দির। সুসজ্জিত আর নির্মল পরিবেশ।

সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল। চারদিকে বাজারের ভিড় আর রকমারি দোকানের সাজসজ্জা, কাশ্মীরি ফল আর শীতের পোশাকের সমারোহ। রতন এখান থেকে শীতের কিছু গরম কাপড় কিনল।

পরের দিন সকালবেলায় আমাদের গন্তব্য সোজা পহেল গাঁও। শুনলাম রাস্তা ভালো থাকলে বাসে আট ঘণ্টার মতো লাগবে। প্রথম দিকে বেশ ভালোই চলছিল বাস, সবাই খুব খুশি, বিকেল বিকেল পৌঁছে যাব। নয় কিলোমিটারের উপর লম্বা ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী টানেলও পেরিয়ে এলাম নির্বিঘ্নে। কিন্তু তার একটু পরেই শুরু হল বাসের থামা আর ধিকি ধিকি চলা। তারপর একেবারেই থেমে গেল।

শোনা গেল সামনে কোথায়ও ধস নেমে রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে। ধস পরিষ্কার করা শুরু হয়েছে কিন্তু কতক্ষণ লাগবে কেউ জানে না। সবাই নেমে কাছের ধাবা, রেস্টুরেন্টে জলযোগ, চা খাবার কাজে লেগে গেল। প্রায় দু’ঘণ্টা পরে গাড়ি, বাস, লরি ধিকি ধিকি করে চলতে শুরু করল। বাস থেকেই দেখা গেল বরফ ঢাকা পাহাড়ের গায়ে সূর্যাস্ত।

রাস্তা একটাই তাই সব গাড়ি এক লাইনে চলতে চলতে শেষ পর্যন্ত রাত ন’টায় পৌঁছোলাম পহেল গাঁওতে। আগে থেকেই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হয়েছিল, এবার বেশ জোরেই বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। ভিজতে ভিজতেই হোটেলে পৌঁছোলাম।

হিমালয়ের প্রাচীরে ঘেরা উত্তর ভারতভূমির সমতলের এই প্রথম গ্রাম তাই বুঝি এই জনপদের নাম পহেলগাঁও। রাতেই মেঘ কেটে গিয়ে আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেল। শীত অবশ্য আরও বেড়ে গেল। হোটেলে ইলেকট্রিক হিটের কম্বলের ব্যবস্থা ছিল তাই বিশেষ অসুবিধা হল না।

পহেল গাঁও

ভোরবেলা ঘুম ভেঙে শরীর বেশ ভালো লাগল। রতনও উঠে বসে সারাদিনের রুটিন ঠিক করতে লেগে গেল। টিফিন খেয়ে ছোটো ট্যাক্সি নিয়ে স্থানীয় দ্রষ্টব্য স্থান যেমন— আরু ভ্যালি, বেতাব ভ্যালি আর চন্দনবাড়ি দেখতে হবে। তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিলাম। নীচের রেস্টুরেন্টে কিছু জলযোগ সেরে জামা-কাপড়ে আপাদমস্তক মুড়ে রাস্তায় নেমে এলাম। সারে সারে ট্যাক্সি দাঁড়িয়েই ছিল, সকলেরই একই রেট। তিনটি ভ্যালি ঘুরিয়ে দেখিয়ে নিয়ে আসবে লাঞ্চের আগে। লাঞ্চের পরেই আমাদের বাস ৮ ঘণ্টার রাস্তা শ্রীনগরের পথে যাত্রা শুরু করবে।

আরু ভ্যালি

প্রথমেই এলাম ‘আরু’ভ্যালি বা উপত্যকায়। অপূর্ব নৈসর্গিক দৃশ্যে ভরা বরফঢাকা পাহাড় আর নীচে সবুজ ঘাসে ভরা স্বর্গীয় উদ্যান। নীচে প্রবাহিত ‘লিডার’ বা ‘লাইডার’ নদী। চারিদিকে এমন নিস্তব্ধ যে, আমরা শহুরে মানুষেরা কিছুদিন এখানে থেকে নৈঃশব্দ্য উপভোগ করার শিক্ষা নেওয়া ভালো। পাহাড়ে চড়া আর ‘ট্রেকার’দেরও এটি একটি ‘বেস-ক্যাম্প’। আরু ভ্যালিতে প্রায় ৪০ মিনিট কাটিয়ে আমাদের গাড়ি চলল বেতাব ভ্যালির দিকে। আসলে এটি একটি অতি সুন্দর পাহাড়ি গ্রাম। গরু, ছাগল, ভেড়া আর মুরগি পালনই স্থানীয়দের জীবিকা। মনে হল বেশ আধুনিক গ্রাম। সব রকমের দোকানপাট, ডিসপেনসারি, হাসপাতাল সবই দেখা গেল। গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে সরু আর শান্ত লাইডার বা লিডার নদী। এই নদীই আবার বয়ে গেছে বেতাব ভ্যালিতেও।

পনেরো মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম আর এক স্বর্গীয় উপত্যকায়। এখন একে ‘বেতাব’ উপত্যকা বলে। কিন্তু এর আসল নাম ছিল ‘হাজন’ বা ‘হাগন’ উপত্যকা। এখানে বিখ্যাত হিন্দি চলচ্চিত্র, বেতাব-এর শুটিং হয়েছিল; তারপর থেকেই এর নাম হয়ে গেছে বেতাব উপত্যকা। যে কুটিরগুলিতে চলচ্চিত্রের নায়ক নায়িকারা থাকতেন সেইসব ‘কুটির’গুলি এখনও আছে। পরে অবশ্য, আরও অনেক চলচ্চিত্রর এখানে শুটিং হয়েছে। উপরের রাস্তা থেকে নীচের উপত্যকার রাস্তা, মাঠ, ঘরবাড়ি, লিডার নদী ছবির মতো লাগছিল। সিনেমার ছবি তোলার উপযুক্ত স্থানই বটে! আমাদের গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ল প্রায় আধ ঘণ্টার জন্য, শুনলাম কোনও সরকারি তথ্যচিত্রের শুটিং চলছে। আধঘণ্টা পরে রাস্তা খুলে গেল।

চন্দনবাড়ি

বেতাব উপত্যকা থেকে চড়াই রাস্তা পার করে চল্লিশ মিনিট পরে এসে পৌঁছোলাম আর এক স্বর্গরাজ্যে। চারদিকে শুধু সাদা সাদা বরফ, কোথায়ও কোনও মাটির চিহ্ন নেই। বড়ো বড়ো পাইন গাছ বরফের উপর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এ স্থানের নাম আমরা সবাই শুনেছি, অমরনাথ তীর্থের পথে— চন্দনবাড়ি। এখান থেকেই শুরু হয় ৩২ কিলোমিটারব্যাপী পায়েচলা রাস্তা অমরনাথ গুহা পর্যন্ত। কী অপরূপ নৈসর্গিক সৌন্দর্যে ভরা এই চন্দনবাড়ি উপত্যকা। প্রায় একঘণ্টা কাটালাম চন্দনবাড়িতে। ফিরতে ইচ্ছে না থাকলেও সময়ের কারণে ফিরতেই হয়।

দুপুরের খাওয়া শেষ করে আবার বাসে উঠে পড়লাম। চারদিকে আমাদের ঘিরে ধরল শুকনো ফল আর বিভিন্ন বাদাম বিক্রেতার দল। এখানকার আমন্ড, এলাচ, আখরোট ইত্যাদি ভারত বিখ্যাত এবং অপেক্ষাকৃত সস্তা। রতন অনেক বাদাম, আখরোট, এলাচ কিনল। আমিও সামান্য কিনলাম। ডাল লেকের শিকারার বাজার থেকে কিনব বলে আপাতত বেশি কিছু কিনলাম না।

(ক্রমশ……)

একটা নিরীহ ভূমিকম্প (পর্ব-০১)

শ্রেয়া বলল, ‘কেন মা, সব মা তো মেয়ের বিয়ে দেয়, আমি যদি মেয়ে হয়ে ঘটা করে মায়ের বিয়ে দিই, তাতে দোষেরই বা কী? কোন মহাভারত অশুদ্ধ হবে তাতে?’

কাকলি ও-পাশ ফিরে শুয়েছিলেন। মেয়ের কথা শুনে এ-পাশ ফিরলেন। মজা পেলেন। তবু কপট রাগ দেখালেন। বললেন, ‘বড্ড বাচাল হয়েছিস আজকাল। এসব আবার কী কথা?”

শ্রেয়া বিছানায় উঠে বসে। বালিশটাকে টেনে কোলে নিয়ে তাতে একটা চাপড় কষিয়ে বলে, ‘এইটাই তো কথা। এখন যুগ পালটেছে মা। এখন আর এটা করতে নেই, ওটা মানায় না, ওটা শোভা পায় না— এসব নিয়ে মানুষের মাথা ঘামানোর সময় নেই। এই ডিজিটাল ইন্ডিয়াতে এসেও যদি শরৎচন্দ্রের নারী চরিত্রের পরাকাষ্ঠা হয়ে থাকো, তাহলে তুমি স্রেফ বাতিলের দলে। বুঝলে? আমি যদি দাঁড়িয়ে থেকে তোমার বিয়ে দিই, মানুষ আমাকে রিওয়ার্ড দেবে। মিডিয়া ঝাঁপিয়ে পড়বে।’

—মুখরোচক খবর হবে। তাই তো? ভুলে যাস না আমাদের সমাজ বলে একটা কথা আছে।

—কীসের সমাজ মা? তুমি উইডো, সিঙ্গল মাদার জেনেও তোমার অফিসে, রাস্তায়, পাড়ায় কেউ তোমাকে রেয়াত করে? কুদৃষ্টি, কুপ্রস্তাব দেয় না? কেন দেয়? দেয় কারণ তোমার সিঁথি সাদা। কাল ওই সিঁথিতে চওড়া সিঁদুর চড়লেই দেখবে মানুষের দৃষ্টি পালটে গেছে।

—অনেক হয়েছে। নে এবার ঘুমো। রাত অনেক হল। কাল অফিস আছে। তোর ক’টায় ক্লাস?

—আমার অত চাপ নেই।

শ্রেয়া আজ বালিশ বগলদাবা করে মায়ের ঘরে চলে এসেছে। বলেছে, ‘মা আমি আজ তোমার কাছে শোব।”

কাকলি বললেন, “কেন রে ঘুম আসছে না বুঝি?

শ্রেয়া ছোট্টবেলার মতো আদুরে গলায় বলে, ‘না ঠিক তা না। এমনি তোমাকে জড়িয়ে ধরে শোব আজ।”

—বুড়ো মেয়ের এ আবার কী বায়না? এত বছর পরে মাকে মনে পড়ল বুঝি? আজ কী হল তোর?

—কী হল, বা কী হতে চলেছে, তা সে কাউকেই বুঝিয়ে বলতে পারবে না। মাকেও না। আজ যা ঘটে গেছে, তাতে রাতের একাকিত্ব তার সহ্য হবে না। লোকটার অনেক বয়স। হিসেব মতো বাপেরই বয়সি ভদ্রলোক। তা হোক গে। শ্রেয়া জাস্ট লোকটার প্রেমে পড়ে গেছে। সারা শরীরের রোমে রোমে এক আশ্চর্য শিহরণ শ্রেয়াকে কাঁপিয়ে বলে দিচ্ছে, ‘ইয়েস ইউ আর ইন লভ৷’ কিন্তু মাকে কথাটা বলা অ্যাবসার্ড। জাস্ট ইম্পসিবল। অথচ এই মুহূর্তে তার মা ছাড়া আর কী অবলম্বন আছে, যে তার ওপর মনের সব ভার ছেড়ে দিয়ে শান্ত হতে পারে সে? অতএব মাকে জড়িয়ে ধরে মুখ গুঁজে দাও মায়ের বুকে। শ্রেয়া তা-ই করল।

কাকলি বললেন, “দ্যাখো, বুড়ো মেয়ের কাণ্ড দ্যাখো।’

মাকে জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ উশখুশ করার পরে ঘুমিয়ে পড়েছে শ্রেয়া। ভোরে কাকলি যখন বিছানা ছেড়েছেন, শ্রেয়া তখন ঘুমিয়ে কাদা। লেট রাইজার শ্রেয়ার শোয়ার ধরন হল, পাশ ফিরে পা তুলে দেবে পাশ বালিশে। সব জানলা ভারী পর্দায় ঢাকা। রোদের চিকনরেখারও সাধ্যি কী যে শ্রেয়ার ঘুমন্ত চোখে চুমু দেবে! পাশ ফিরে শোয়া শ্রেয়ার মাথার নীচে বালিশ, মাথার ওপরেও বালিশ চাপানো থাকে। হলে হবে কী? ঠাঁইনাড়া হয়েছে গতরাতে। মায়ের বিছানায় তার ঘুমটা তাই ভাজা চিনেবাদামের আলগা খোসার মতো খসে পড়েছে চোখ থেকে। বালিশে ঢাকা বলতে গেলে খনিগর্ভের মতো অন্ধকারে যে, মেয়ের চোখ দুটো জ্বলছে, কল্পনাই করেননি কাকলি। কারণ, বেলা ন’টার আগে চোখ খোলার পাত্রী নয় শ্রেয়া। আর তাছাড়া কাকলি হয়তো ভেবেছেন, মেয়ের সামনেই বা কীসের লজ্জা? তাই বেডরুম লাগোয়া বাথরুম থেকে স্নান সেরে বেরিয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে রোজকার মতো বেদিংস্যুটটা অবলীলায় খসিয়ে দিলেন কাকলি।

বালিশের গর্ভ থেকে মায়ের গড়ন-সৌষ্ঠবের শরীর দেখে চমকে যায় শ্রেয়া। তার বুক কেঁপে ওঠে। কী অপরূপ মেদহীন চকচকে তকতকে ত্বক! কাকলি একটা একটা করে অন্তর্বাসে ঢেকে ফেলেন শরীর। সেই ইস্তক বালিশের নীচে শ্রেয়া পাথর হয়েছিল। তবু মেয়ের নিঃশ্বাসের শব্দ কি পেলেন কাকলি? মুহূর্তের তৎপরতায় সালোয়ার স্যুটে পা গলিয়ে নিতে নিতে বললেন, ‘কী রে ঘুম ভাঙল? শ্রেয়া সটান উঠে বসে বিছানায়। কাকলি তখনও কামিজ পরার ফুরসত পাননি।

শ্রেয়া ওর কোলের ওপর পাশ বালিশে দু’হাতের কনুই ডুবিয়ে হাতের চেটোয় গ্রীবার ভর দিয়ে বসে। মায়ের অর্ধ অনাবৃত শরীরের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। চোখ পাকিয়ে কপট শাসনের ভঙ্গি করেন কাকলি। বলেন, ‘মার খাবি! কী দেখছিস অমন করে?’

মায়ের ধমকে মৃদু নাড়া খায় শ্রেয়া। বলে, “ওয়াও মা, তুমি এখনও কত সুন্দর আছো।’ কাকলি আবার মেয়েকে কপট ধমক লাগান৷

মেয়েকে ভেঙচে বলেন, ‘হুম সুন্দর আছ। অসভ্য মেয়ে কোথাকার। তোর বড়ো মুখ বেড়েছে আজকাল। কী বলিস তার ঠিক ঠিকানা আছে?’

—মা, বাবা তো দশ বছর হল চলে গেছে। আমিও তো বড়ো হয়ে গেছি। তুমি এখন অনায়াসেই বিয়ে করতে পারো। –তুই থামবি?

—কেন? কীসের ভয় তোমার? সোসাইটি? ড্যাম ইওর সোসাইটি।

—তা বললে হয়? সমাজে থাকতে গেলে…

—মা, আমার বিয়ের কথা তুমি ভাবো না? কেন ভাবো? আমার ভবিষ্যৎ ভেবে তো? তেমনি তোমার ভবিষ্যৎ ভাবাটাও আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। আমার বিয়ের পর কে দেখবে তোমাকে? আমি কি পারব ছুটে ছুটে আসতে তোমার কাছে? অনেকের ইচ্ছে থাকলেও ছেলেমেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বা লজ্জায় মরে যায়। কিন্তু আমি তো নিজে তোমাকে বলছি।

শ্রেয়ার গাল টিপে দিয়ে আদুরে গলায় কাকলি বলেন, ‘আমার মেয়েটা কবে যে আমার মা হয়ে গেছে, বুঝতে পারিনি তো!

সুস্থতার জন্য চাই লোয়ার কোলেস্টেরল সমৃদ্ধ খাদ্য-উপকরণ

শত-শত বছর ধরে প্রতিটি পরিবারের রান্নাঘরে ঘি রাখা থাকে রান্নার উপকরণ হিসাবে। কারণ, ঘি দিয়ে রান্না করলে খাবারের স্বাদ ভালো হয়। তাই, স্বাদ বাড়ানোর প্রধান উপকরণ হিসাবে রান্না ঘরে বরাদ্দ থাকে ঘি। আসলে, স্বাদে-গন্ধে ঘি এক অনন্য উপকরণ এবং অল্প পরিমাণে ঘি খেলে পুষ্টিগত উপকারিতাও পাওয়া যায়। ডাল-রুটি-সবজি হোক কিংবা উৎসবে-অনুষ্ঠানে লাড্ডু ও হালুয়ার মতন মিষ্টিই হোক, সব কিছুতেই অবশ্য প্রয়োজনীয় উপকরণ হল ঘি। যা রোজকার খাবারদাবারকে তো বটেই, সেই সঙ্গে উৎসব-অনুষ্ঠানের জন্য তৈরি খাবারের স্বাদে-গন্ধে আলাদা একটা মাত্রা এনে দেয় ঘি।

ভারতে ঘি ব্যবহারের দীর্ঘ এক ইতিহাস আছে এবং এর সাংস্কৃতিক গুরুত্বও আছে। তবু, কিছু স্বাস্থ্য সচেতন মানুষ ঘি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। কারণ ঘি-তে আছে উচ্চ মাত্রার স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও কোলেস্টেরল। তবে বলা হয়, ঘি-তে কিছু আবশ্যিক পুষ্টিও আছে, যেগুলি স্বাস্থ্যের পক্ষে উপকারী।  তাই, সুস্থতার জন্য চাই লোয়ার কোলেস্টেরল ঘি। আর এই সাধারণ ঘি এবং লোয়ার কোলেস্টেরল ঘি-এর বিষয়ে তুলে ধরা হচ্ছে আইটিসি লিমিটেড-এর পুষ্টি বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ড. ভাবনা শর্মা-র বক্তব্য এবং পরামর্শ।

  • ঘি-তে আছে প্রচুর আবশ্যিক ফ্যাটি অ্যাসিড, ওমেগা-থ্রি ও ওমেগা-সিক্স ফ্যাটি অ্যাসিড। এগুলি সেল মেমব্রেনকে সুসংহত রাখে আর বোধশক্তিকে উন্নত করে। এই ফ্যাটগুলি ইনফ্লেমেশন কম করে সামগ্রিক ভাবে স্বাস্থ্যকে উন্নত করে।
  • ঘি-তে যে বিউটিরিক অ্যাসিডের মতন উপাদান আছে, তা অন্ত্রের নালীতে রোগ প্রতিরোধক কোষ তৈরি করে, যেগুলি রোগ প্রতিরোধের কাজকে শক্তিশালী করতে পারে।
  • ঘি-তে আরও এক উপাদান আছে। যাকে বলে লিনোলেনিক ফ্যাটি অ্যাসিড (ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড)। এটি ইনফ্লেমেশন মোকাবিলায় সহায়ক বলে পরিচিত। সে জন্যও ঘি সুস্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে।
 Low-cholesterol-rich ingredients are essential for good health
Dr. Bhavna Sharma, Head of the Nutrition Science Department at ITC Limited

ঘি-কে আয়ুর্বেদে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান দেওয়া হয়েছে। এই শাস্ত্রে ঘিকে বলা হয়েছে সাত্ত্বিক আহার। যা সেবন করলে শরীরমন শুদ্ধ হয়ে ওঠে। আয়ুর্বেদের মতে, ঘি সেবন করলে পাচক রস বা এনজাইম বেশি করে নিঃসৃত হয় বলে খাবার হজমেও সহায়ক হয়ে ওঠে। ভেষজ ওষুধ তৈরিতে ঘি-কে একটি মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ঘি শরীরের প্রাণশক্তির নির্যাস, যা শরীরকে মজবুত রাখে এবং রোগ ইত্যাদি থেকেও সুরক্ষিত রাখে। ঘি-তে কিছু আবশ্যিক ভিটামিনও আছে। যেমন, , ডি, , কে ভিটামিন। সেই সঙ্গে মিনারেল  যেমন ক্যালসিয়াম ফসফরাস। অবশ্য, ঘি স্বাস্থ্যের পক্ষে উপকারী হলেও এটি হল স্যাচুরেটেড ফ্যাট কোলেস্টেরলের উৎস। তাই ব্যাপক মাত্রায় রোজ ঘি সেবন করলে তা চিন্তার বিষয় হয়ে উঠতে পারে

ঘি ভারতীয় পরিবারগুলির একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। তাই, একে পুরোপুরি বাদ দেওয়া কঠিন। অতএব, ঘি সেবনের দৈনিক মাত্রাকে নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। এমন বিকল্প ঘি গ্রহণ করতে পারেন, যাআপনার জন্য ভালো’ যেমন, লোয়ার কোলেস্টেরল ঘি সেবন করলে আপনি ঘি উপভোগ করার অন্য একটি উপায় পেয়ে যাবেন। ফুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্রসেসের সময়কম কোলেস্টেরল শোষণ‘-এর মতন উন্নত খাদ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। এই ভাবে এমন ঘি তৈরি করা হচ্ছে যে, গ্রাহকরা চিরাচরিত ঘিয়ের একটি বিকল্প খুঁজে পাচ্ছেন। আর এর জন্য তাদের স্বাদ উপকারিতার ব্যাপারে কোনও আপসও করতে হচ্ছে না। খাদ্য প্রযুক্তি এত উন্নত হয়ে গেছে যে, প্রস্তুতকারকরা এখন ঘি-এর দুর্দান্ত স্বাদগন্ধকে অবিকৃত রেখেই তার কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে ফেলতে পারছেন।   

 আজকের গ্রাহকরা সহজ কিছু উপায়ে অল্প মাত্রায় লোয়ার কোলেস্টেরল ঘি সেবন করে ঘিয়ের দুর্দান্ত স্বাদগন্ধ এবং পুষ্টিগত উপকারিতাও লাভ করতে পারবেন। এই উপায়গুলি হলঃ–

 –     রুটি, ডাল, সবজির মতন বিভিন্ন খাবারে এই ঘি ব্যবহার করা

–     উৎসবঅনুষ্ঠানের জন্য তৈরি মিষ্টি যেমন লাড্ডু, হালুয়া, জিলিপির স্বাদগন্ধকে আরও বাড়ানোর জন্য এই ঘি ব্যবহার করা

–     মাখন দিয়ে যেসব পদ রান্না করা হয়, সেগুলিকে এই ঘি দিয়ে রান্না করা

–     শরীরমন চাঙ্গা করার জন্য সকালের চায়ে বা কফিতে এক চাচামচ এই ঘি মিশিয়ে নেওয়া

 এই ঘি সেবন করলে চিরাচরিত ঘিয়ের মতনই উন্নত মানের স্বাদ, গন্ধ, পুষ্টিগত উপকারিতা পাওয়া যাবে। সেই সঙ্গে, কোলেস্টেরলের মাত্রাও বেশ উল্লেখযোগ্য ভাবে কম করা যাবে। এই ভাবে সবাই ঘি-কে তাদের বৈচিত্রময় সুষম আহারের অঙ্গ করে তুলতে পারবেন

প্রতিটি বিচ্ছেদ কষ্ট দেয়

দেশে আমরা যৌথ পরিবারের জয়গান গাই। বেশিরভাগ টিভি ধারাবাহিকে তাই তুলে ধরা হয় যৌথ পরিবারের কাহিনি। যেখানে দেখা যায় শাশুড়ি, ননদ, কাকিমা, পিসিমা, জা, ঠাকুরপো, শ্বশুর, কাকা-শ্বশুর প্রভৃতি চরিত্রদের নিয়ে সমৃদ্ধ ধারাবাহিকগুলো। অবশ্য শুধু টিভি ধারাবাহিকেই নয়, বাস্তবেও আমরা যৌথ পরিবারের ভালোমন্দ দিক নিয়ে চর্চা করি প্রায় সময়। প্রবীণরা অনেকেই যৌথ পরিবারের কনসেপ্টকে ‘ভালো’ বলে থাকেন। কিন্তু বাড়ির ছেলে বিয়ে করে যখন বউ নিয়ে আসে এবং তারপর যদি যৌথ পরিবার ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়, তখন বাড়ির বউয়ের দিকে আঙুল তুলে দোষারোপ করে সবাই। অনন্দরমহল থেকে পাড়ার চায়ের দোকান, সর্বত্রই শুরু হয়ে যায় বউমার সমালোচনা। যৌথ পরিবার ভালো নাকি ছোটো পরিবার-ই সুখী পরিবার— এই নিয়ে চলে জোর চর্চা।

সবাই জানেন, যৌথ পরিবারের এই কাহিনি কোনও অঞ্চলে কিংবা সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এই কাহিনির ব্যপ্তি সারা দেশ জুড়ে। পৌরাণিক কাহিনি কিংবা ইতিহাসের বেশিরভাগ কাহিনিতেও প্রাধান্য পেয়েছে এই যৌথ পরিবার ভাঙার বিষয়টি। ইংরেজরা ভারত ছাড়ার পর এই সমস্যা আরও তীব্র হয়েছে বলা যায়।

আসলে বিচ্ছেদের এই বিষয়টি আজকের নয়, অনেক প্রাচীন। মানুষের মধ্যে বিচ্ছিন্নতার এই মানসিকতা প্রায় জন্মগত। অথচ দেখুন, একটা গাছ ভেঙে যাওয়ার আগে আরও কিছু গাছের জন্ম দিয়ে যায়। কিন্তু মানুষের মধ্যে বিচ্ছেদ মানে সমাপ্তির বার্তা দেয়। অবশ্য মানুষের মধ্যে এই বিচ্ছেদের শিক্ষা সেই পৌরাণিক কিংবা ঐতিহাসিক কাহিনি থেকে। রামায়ণেও যৌথ পরিবার থেকে বেরিয়ে জঙ্গলে বাস করতে হয়েছে রাম, লক্ষ্মণ এবং সীতাকে। ঠিক তেমনই মহাভারতেও দেখা যায়, যুদ্ধ এবং বিচ্ছিন্নতার ঘটনা। আর ঐতিহাসিক কাহিনিতে তো বিচ্ছেদ কোনও নতুন বিষয় নয়।

পরাধীন ভারতে ব্রিটিশরা যখন আমাদের অনেক অত্যাচার করেছিল তখন তাদের অত্যাচার থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ভারতবাসী এক হয়ে লড়ার পথ বেছে নিয়েছিল। কিন্তু ১৯৪৭ সালে ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীন হওয়ার পর থেকে আর সেই একতা নেই। হয়তো রাস্তাঘাট উন্নত হয়েছে, যোগাযোগ ব্যবস্থা আধুনিক হয়েছে, বিজ্ঞান উন্নত হয়েছে, কলকাতা থেকে দিল্লি করা হয়েছে ভারতের রাজধানী কিন্তু বিচ্ছেদের সমস্যা বেড়েছে বৈ কমেনি।

আমরা এখন ধর্ম, জাতি, সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভাজনকে প্রাধান্য দিয়ে চলেছি। নানা অজুহাত দেখিয়ে চলছে এই বিভাজনের রাজনীতি। কোথাও ঘরবাড়ি ভেঙে দিয়ে বলা হচ্ছে, এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে। আর এই বিভাজনে লাভবান হচ্ছেন ধনী ব্যক্তিরা। আর গরীব যে তিমিরে ছিল, সেখানেই আছে। প্রশ্ন জাগে মনে, শুধু ৮৫ হাজার লোককে বিনামূল্যে খাবার খাওয়ালে কি জোটবদ্ধ করা যায়?

আমাদের দেশে বিভাজনের এই রাজনীতি সর্বত্র। সংসার থেকে রাজনৈতিক ক্ষেত্র সর্বত্র বাড়ছে বিচ্ছেদ। সবচেয়ে মজার বিষয় হল, সবকিছুর শুরুটা হয় অনেক লোকজনকে নিয়ে কিন্তু কিছুদিন পর ধীরে ধীরে শুরু হয় মতানৈক্য এবং অবশেষে বিভাজন।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তো বিভাজনের পর উৎসবও করা হয় মিষ্টান্ন বিতরণ করে। কিন্তু মনে রাখা দরকার, প্রত্যেক বিচ্ছেদ-ই কষ্ট দেয়। ভারত-পাকিস্তান কিংবা ভারত-বাংলাদেশের বিভাজনও ওই একই বিষয়।

প্রেম এবং ম্যাচমেকিং-এর বিষয় নিয়ে জি বাংলা-য় শুরু হল ‘মালাবদল’

ঋতু পাইন এবং বিশ্বজিৎ ঘোষ-কে প্রধান ভূমিকায় রেখে, এন্টারটেইনমেন্ট চ্যানেল জি বাংলা-য় শুরু হল ‘মালাবদল’ ধারাবাহিকটির সম্প্রচার। আর সম্প্রচার শুরুর আগে, ধারাবাহিকটির বিষয়ে বিশদ তথ্য দেওয়া হল আনুষ্ঠানিক ভাবে।

‘ক্রেজি আইডিয়াজ’ প্রযোজিত এই ধারাবাহিকটির সম্প্রচার শুরু হয়েছে গত ৮ জুলাই থেকে। প্রতি সোমবার থেকে শুক্রবার জি বাংলা চ্যানেল-এ রাত ১০টা ১৫ মিনিটে ‘মালাবদল’ দেখতে পারবেন দর্শকরা। প্রযোজনা সংস্থা ‘ক্রেজি আইডিয়াজ’-এর পক্ষ থেকে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, প্রেম এবং ম্যাচমেকিং বিষয়-নির্ভর এই ধারাবাহিকটি উপভোগ্য হয়ে উঠবে দর্শকদের কাছে।

এই ধারাবাহিকে দিতিপ্রিয়া ওরফে ‘ঘটক দিদি’ দিতি-র ভূমিকায়  অভিনয় করছেন ঋতু পাইন। এখানে দেখা যাবে, দিতি একজন প্রাণবন্ত এবং আবেগপ্রবণ ম্যাচমেকার। যে মনে করে,  ম্যাচমেকিং খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। তাই সে ম্যাচমেকিংয়ের সার্ভিস দিয়ে থাকে ব্যক্তিগত আবেগ এবং সততা সহকারে।  তার বিখ্যাত ম্যাচমেকার বাবার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে এই পেশা বেছে নিয়েছে দিতি। তাই, ‘ঘটক দিদি’-র ভূমিকা নিয়ে সে ভীষণ খুশি।  এই পেশায় যোগ দেওয়ার পর  দিতি-র  জীবনও নাটকীয় মোড় নেয়। হঠাৎই দেখা যায়, বিবাহবিচ্ছেদ স্পেশালিস্ট আইনজীবী কাব্য মল্লিককে বিয়ে করছে দিতি। তবে তাদের বিবাহিত সম্পর্কের প্রতি  দিতি-র স্বামী কাব্যের সংশয় থাকলেও, প্রেমে  দিতি-র অটল বিশ্বাস কিছু অপ্রত্যাশিত ঘটনার মুখোমুখি করবে দর্শকদের। এই ভাবেই মজাদার কিছু ঘটনার সমন্বয়ে গল্প এগিয়ে চলবে পরিণতি-র দিকে। ধারাবাহিকটিতে কাব্য মল্লিকের চরিত্রে রূপদান করছেন বিশ্বজিৎ ঘোষ।

জি এন্টারটেইনমেন্ট এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড-এর চিফ ক্লাস্টার অফিসার (ইস্ট, নর্থ, এবং প্রিমিয়াম ক্লাস্টার) সম্রাট ঘোষ প্রসঙ্গত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানিয়েছেন, ‘আমরা ‘মালাবদল’ সম্প্রচার করতে পেরে রোমাঞ্চিত। এটি এমন একটি শো, যা আমাদের দর্শকদের কাছে আকর্ষক মুহূর্তগুলি তুলে ধরবে। এই সিরিজটি বর্তমান বাংলা সাধারণ বিনোদন চ্যানেলগুলির শো-এর থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার এবং  এটি  প্রেম এবং ম্যাচমেকিংয়ের বিষয়ে অন্যরকম বার্তা দেবে দর্শকদের। আমরা আত্মবিশ্বাসী যে, দর্শকরা প্রাণবন্ত চরিত্র এবং ঘটনাগুলি দেখে মুগ্ধ হবেনই। কারণ, সেই ভাবেই সিরিজ-টির গুণমান বজায় রাখার চেষ্টা করেছি আমরা।’

জি বাংলা-র বিজনেস হেড নবনীতা চক্রবর্তী জানিয়েছেন, ‘মালাবদল’–এর কাহিনি মজা, রোমান্স এবং নাটকের একটি মনোরম সংমিশ্রণের তৈরি। পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে উপভোগ করতে পারবেন এই সিরিজটি।’

‘মালাবদল’ ধারাবাহিকটি পরিচালনা করছেন স্বর্ণেন্দু সমাদ্দার। চ্যানেল কর্তৃপক্ষ ছাড়াও, ধারাবাহিকটি-র পরিচালক এবং অভিনেতা-অভিনেত্রীরা সকলেই সাফল্যের বিষয়ে আশাবাদী।

অঘটন আজও ঘটে (শেষ পর্ব)

অতীনদা সব কথা মনযোগ দিয়ে শুনলেন। তারপর বললেন, “আমার বাবা মারা যান বেশ কিছু বছর আগে। আর আমি তো এখানে ছিলাম না, যদি আপনার বাবার সেই চিঠি আমাদের বাড়িতে এসে থাকে তাহলে নিশ্চয়ই জবাব দেব। বাবার হয়ে আমি আপনাদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।’

মেয়েটিকে দেখে অতীনদার খুব ভালো লেগে গিয়েছিল। মনে হয় তখনই একটা সিদ্ধান্ত স্থির করে ফেলেছিলেন। সব শোনার পর মেয়েটি আর অপেক্ষা না করে হন হন করে চলে গেল।

মেয়েটি চলে যেতেই অতীনদা বাবার ঘরে গিয়ে একটা চেন টানা স্যুটকেসে যত পুরোনো চিঠিপত্র ছিল, সব খুলে দেখতে লাগলেন। তার মধ্যে সত্যি একটা খামের ভেতর মেয়েটির বাবার চিঠির সাথে মেয়েটির একটা ফটোও ছিল। অতীনদা ঠিক করলেন সোজা মেয়েটির বাড়িতে গিয়ে ক্ষমা চাইবেন এবং বিয়ের প্রস্তাব দেবেন।

একটা ছুটির দিন দেখে অতীনদা নকুলদাকে নিয়ে মেয়েটির বাড়ি ফার্ন রোডে গিয়ে হাজির হলেন।

একদম না জানিয়ে যাওয়াতে যদিও মনে একটা সংকোচ হচ্ছিল, তাও আর দেরি করেননি চিঠি চালাচালিতে। ডোরবেল বাজাতেই একজন মধ্যবয়স্ক লোক এসে দরজা খুলে জিজ্ঞেস করল, “কাকে চাই?”

অতীনদা বললেন, এই বাড়ির মালিকের সাথে দেখা করতে এসেছেন। অতীনদাদের ভেতরে নিয়ে এল সেই লোকটি। লোকটিকে দেখে মনে হয়েছিল, বাড়ির কেয়ার টেকার।

তারপরেই ভেতর থেকে বেশ ভরাট গলায় প্রশ্ন, ‘সম্পদ, কারা এসেছেন?’

—দু’জন বাবু এয়েচেন সাহেব। নকুলদাকে দেখে তো কেয়ার টেকার লাগত না মোটেই। বাবা নিজের বড়ো ছেলের মতোই ব্যবহার করতেন নকুলদার সাথে।

উনি ভারী পর্দা ঠেলে ঘরে ঢুকলেন। তখন ঘরের চারিদিকে নজর পড়তেই অতীনদা দেখতে পেলেন, একটা বেশ প্রমাণ সাইজের ছবি তাতে টাটকা মোটা বেলি ফুলের মালা দেওয়া। অতীনদা ভাবলেন, হয়তো মেয়েটির মা-এর অল্প বয়সের ছবি। অতীনদাকে ওই ভাবে দেখতে দেখে ভদ্রলোক বললেন, ‘আরে দাঁড়িয়ে কেন? বসুন বসুন। কী উদ্দেশ্যে হঠাৎ আপনাদের আগমন, জানতে পারলে নিশ্চিন্ত হতাম। আগে বসুন।”

—এই সম্পদ যা যা! সামনের দোকান থেকে একটু মিষ্টি আর সিঙ্গাড়া নিয়ে আয়। অনেকদিন পর বাড়িতে অতিথি হয়ে এলেন আপনারা।

অতীনদা ফটোর দিকে আঙুল উচিয়ে জিজ্ঞেস করেই ফেললেন, ‘যদি কিছু মনে না করেন, ইনি আপনার কে হন?”

—না না! মনে কেন করতে যাব। ও আমার একমাত্র মেয়ে অলকানন্দা।

কথাটা শোনার পর অতীনদা একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেছিলেন। নকুলদা এক ঠেলা মারতেই অতীনদার ঘোর কেটে গিয়েছিল।

—জানেন, খুব ভালো মেয়ে ছিল আমার আলো। আমি ওকে আলো বলেই ডাকতাম। কোনওদিন ওকে অবাধ্য হতে দেখিনি। হাইয়ার সেকেন্ডারিতে প্রথম হয়েছিল তাই আমি এই ছবিটা বাঁধিয়ে ওকে উপহার দিয়েছিলাম। ফটোটা জড়িয়ে আমার বুকে মাথা রেখে বলেছিল, ও বাবি! এটা তোমার আলোমা? ছোটোবেলায় মাকে হারায় বলে আমি ওকে চোখের আড়াল করতে চাইতাম না। আড়াই বছর আগে বন্ধুদের সাথে আমার মেয়ে কলেজ টুরে নৈনিতাল বেড়াতে গিয়েছিল। আমার একদম ওকে ছাড়তে ইচ্ছে ছিল না। তখনই এক বিপর্যয় ঘটে। গাড়ি খাদে পড়ে যাওয়াতে গাড়ির ভিতর যারাই ছিল তারা সবাই মারা গিয়েছিল। বলেই কিছুক্ষণ অবাক হয়ে অতীনদার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

—কিন্তু উনি তো আমাদের বাড়ি এসেছিলেন গতকাল সন্ধেবেলা। আমার বাবাকে আপনার লেখা চিঠি ও ওনার ফটোর কথা বলছিলেন। আমার বাবা তো মারা গেছেন কিছু বছর আগে, তাই সব চিঠির উত্তর দিতে পারেননি। বিশ্বাস করুন, আমার খুব অবাক লাগছে। আমি সেইজন্য আর চিঠি চালাচালির মধ্যে না গিয়ে সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছিলাম এখানে।

—কিন্তু আপনি কী বলছেন কিছুই বুঝতে পারছি না। একটু খুলে যদি বলেন। আপনাদের নামটাই তো জিজ্ঞেস করা হয়নি।

অতীনদা নিজের আর নকুলদার নাম বললেন। অতীনদা সব গল্প করলেন যা যা ঘটেছে এতদিন। আরও বললেন, “যখন অতীনদার বাড়িতে এসেছিল অলকানন্দা তখনকার এই ছবির সাথে একটু পার্থক্য দেখলাম। এত স্পষ্ট কিন্তু দেখা যাচ্ছিল না তাকে। আমি কিছুই বুঝতে পারিনি তখন।’

মেয়েটির বাড়ি থেকে আসার পর আর কোনও দিন অতীনদা তাকে দেখতে পাননি। অতীনদা এতটাই ভেঙে পড়েছিলেন যে, নিজেই মনকে শান্ত করার জন্য কাগজে বিজ্ঞাপন দেখে টুলটুলদির সঙ্গে বিবাহে যুক্ত হন। বিয়ের পরে ওনাদের দুই যমজ মেয়ে হয়। দিদি বড়ো মেয়ের নাম রেখেছেন ‘অলকা’, আর ছোটোটির নাম ‘নন্দা’।

আজ আমরাও বড়ো হয়ে গেছি, তবে ছুটিছাটাতে এখনও ফুলিয়ার বাড়িতে যাই সদলবলে। অঘটন কিন্তু আজও ঘটে!

(সমাপ্ত)

অঘটন আজও ঘটে (পর্ব-০১)

আমাদের আদি বাড়ি ছিল নবদ্বীপের ফুলিয়া গ্রামে। আমরা ছুটিছাটাতে ফুলিয়ার সেই বিশাল বাড়িতে সবাই যেতাম। কী ছিল না সেই বাড়িতে? সুপুরি গাছ আর নারকেল গাছ দিয়ে ঘেরা পুকুর। সেই পুকুরে ভর্তি চিংড়ি, পুঁটি, কাতলা মাছ। পেছনের বাগানে আম, কাঁঠাল, কামরাঙা, আতা গাছ ছিল।

আমরা জ্যাঠাইমা-জ্যাঠামশাই না বলে বলতাম বড়োমা আর বড়োবাবি। আমাদের একটিমাত্র জ্যেঠতুতো দিদি টুলটুলদি। সবার বড়ো ছিল সে। দিদি খুব সুন্দর দেখতে ছিল। সবারই খুব প্রিয় ছিল দিদি। খুব ভালো গল্প বলতে পারত। সন্ধে হলেই আমরা শুরু করতাম, “ও টুলটুলদি এসো না, গল্প বলবে।”

সূর্যদেব পাটে গেলেই আমরা দোতলা বাড়ির ঘেরাটানা বারান্দায় মাদুর পেতে বসে দেশ-বিদেশের কত গল্প শুনতাম। সন্ধ্যাবেলা টুলটুলদি যখন গল্প বলত, তখন বাড়ির হ্যাজাকের আলো দোতলার ঝুল বারান্দার দেয়ালে অদ্ভুত সব ছায়া তৈরি করত। সেই ছায়াগুলো হাওয়ায় এমন ভাবে নড়ত, মনে হতো যেন জীবন্ত মানুষ!

বড়োমার যমজ দাদারা আমাদের ফেলুমামা আর জিতুমামা। তাঁদের কাছেও ছোটোবেলায় অনেক মজার গল্প শুনেছি। ওনারা বিয়ে করেননি। শুনেছি ফেলুমামা ফেল করেননি জীবনে কিন্তু সবাই মজা করে ফেলুমামাকে ওই নামেই ডাকত। জিতুমামাও কোনও খেলায় জিততে পারতেন না। অদ্ভুত লাগে!

খুব মজার মানুষ ছিলেন ফেলুমামা আর জিতুমামা। অদ্ভুত সব হাসির ভূতের গল্প বলতেন।

অন্য কেউ হলে রাগ করতেন অথবা মনে দুঃখ পেতেন। কিন্তু ফেলুমামা আর জিতুমামার স্বভাবই ছিল একেবারে অন্য ধাঁচের। আমার নিজের কোনও মামা না থাকাতে ফেলুমামা আর জিতুমামাই আমাদের খুব প্রিয় মামা ছিলেন। ছুটিছাটাতে গেলেই ওনারাও চলে আসতেন তাই খুব জমজমাট আড্ডা আর হইচই হতো সারা বাড়িজুড়ে।

টুলটুলদির বিয়ের পর, দিদি ও অতীনদা বড়োমার কাছেই থাকত। কারণ বড়োবাবি মারা যাওয়ার পর ওই বিশাল বাড়িতে বড়োমার একা থাকা ভালো না ভেবেই টুলটুলদিরা থাকত। অতীনদারও কেউ কোথাও ছিল না, কাজেই কোনও সমস্যা হয়নি। তাতে বাড়ির সবাই খুব খুশি আর নিশ্চিন্তে থাকতে পারত।

গরমের ছুটিতে আমরা ফুলিয়াতে ছুটি কাটাতে যেতাম। খুব আম খেতাম, পুকুরে সাঁতার কাটতাম আর মাছ ধরতাম। আর টুলটুলদির কোল ঘেঁষে বসে নানান গল্প শুনতাম। তার মাথার জবাকুসুম তেল আর শরীরের তুহিনার সুবাসে এমন সুন্দর একটা পরিবেশ তৈরি হতো যে, আমরা কেউ দিদিকে ছেড়ে উঠতে চাইতাম না। একবার গরমের ছুটিতে গিয়ে দিদির কাছে এমন গল্প শুনেছিলাম, যা চিরদিনের মতো মনে থেকে গেছে। যার কোনও ব্যাখ্যা আজও ভেবে পাই না।

আমরা একটু বড়ো হওয়াতে টুলটুলদির সঙ্গে অতীনদার বিয়ের কয়েকবছর আগেকার সত্যি ঘটনা, টুলটুলদি গল্প আকারে আমাদের বলেছিল। আর বলেছিল এখনও স্পষ্ট মনে আছে, “শূন্য আকাশ থেকে কেউ খুঁজে দেখেনি কত সংঘাত থেকে ‘সাংঘাতিক’ হয় কিছু কিছু নাটকের দৃশ্য।”

অতীনদার মায়ের ইচ্ছে ছিল, একমাত্র ছেলে বিদেশে পড়তে যাবার আগেই তার বিয়ে দিয়ে দেবেন। ফলে কাগজে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল। অনেক সম্বন্ধ আসা শুরু হয়েছিল। সেই সম্বন্ধ দেখে চারিদিকে মেয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ অতীনদার মা পড়ে গিয়ে কোমরে সাঙ্ঘাতিক আঘাত পান এবং কিছুদিন ভুগে শেষ পর্যন্ত তিনি মারা যান। ফলে মেয়ে দেখার ব্যাপারটা ওখানেই থেমে গেছিল এবং অতীনদাও লন্ডনে পড়তে চলে গিয়েছিলেন।

কিন্তু অতীনদা না থাকলে কী হবে, পাত্রীপক্ষরা সমান আগ্রহে চিঠি দিতে লাগলেন। স্ত্রীর মৃত্যুতে অতীনদার বাবা একেবারে একা হয়ে যাওয়াতে খুবই ভেঙে পড়েছিলেন। তাই পাত্রীদের অভিভাবকদের লেখা সেই সব চিঠির মধ্যে ইচ্ছে হলে কোনওটা তিনি খুলতেন আবার কোনওটা খুলতেন না। না খুলেই সেই অবস্থায় রেখে দিতেন।

এমনি করে প্রায় এক বছরের মাথায় অতীনদার বাবা হঠাৎ সেরিব্র্যাল অ্যাটাক হয়ে মারা গেলেন। তখন বাড়ির দায়িত্ব নিয়ে নকুলদা একা। অতীনদার ছোটোবেলা থেকেই নকুলদা ওই বাড়িতে আছে। সে-ই সংসার দেখতে লাগল।

কয়েক বছর পরের কথা। লন্ডন থেকে ব্যারেস্টারি পাশ করে দেশে ফিরে অতীনদা চাকরি করছেন তাও প্রায় দু’বছর হয়ে গেছে। হঠাৎ অতীনদা কয়েকদিন ধরেই লক্ষ্য করছেন যে, কোর্ট থেকে বাড়ি ফেরার পথে একটি মেয়ে তাঁকে অনুসরণ করছে। কখনও কোর্টের সামনে আবার কখনও বাড়ির সামনের গলিতে। এই ভাবে মেয়েটিকে রোজই প্রায় দেখা যেতে লাগল। একদিন মেয়েটি অতীনদার কাছে এগিয়ে এসে বলল, “আমি কি আপনার সঙ্গে আপনার বাড়ির বৈঠকখানায় একটু যেতে পারি?”

অতীনদা ভাবলেন, মেয়েটির নিশ্চয়ই আইন সংক্রান্ত কোনও কিছু গুপ্ত পরামর্শ নেবার প্রয়োজন হয়েছে। তাই অতীনদা একটা নির্দিষ্ট দিন-সময় ঠিক করে তাকে আসতে বললেন। ঠিক সেই দিনে মেয়েটি এল। ঘরে ঢুকেই বিনা ভূমিকায় মেয়েটি অতীনদাকে একটা অদ্ভুত প্রশ্ন করে বসল, ‘আপনি বিয়ে করছেন না কেন? জানেন আপনার সঙ্গে আমার বিয়ে দেবার আগ্রহ নিয়ে আমার বাবা আপনার বাবাকে আমার একটা ফটোসমেত চিঠি দিয়েছিলেন? আমার বাবা যা-ই করতেন, আমার মতামত ছাড়া কিন্তু তা কোনওদিন করেননি। সেই বিষয়ে আমি খুব ভাগ্যবর্তী বলতে পারেন। কিন্তু আপনার বাবা আমার বাবার চিঠিরও জবাব দেননি আর আমার ফটোটা ফেরত দেননি।’

(ক্রমশ…)

লেজার ক্যাটারাক্ট সার্জারি

আমাদের চোখ একটি অত্যন্ত উন্নত মানের ক্যামেরার মতো। চোখের ভিতরে প্রোটিন দিয়ে তৈরি অত্যন্ত ট্রান্সপারেন্ট একটা ন্যাচারাল লেন্স থাকে। এই লেন্স ঘোলাটে বা অস্বচ্ছ হয়ে গেলে, তাকে ক্যাটারাক্ট বা ছানি বলে। এখন এই ছানি সার্জারি করা হচ্ছে ফেমটো লেজার-এর সাহায্য নিয়ে। কারণ ফেমটো লেজার অ্যাসিস্টেড ক্যাটারাক্ট সার্জারি বেশি নিঁখুত এবং নিরাপদ প্রমাণিত হয়েছে ইতিমধ্যেই। এই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এবং পরামর্শ দিয়েছেন দিশা আই হসপিটাল-এর ক্যাটারাক্ট অ্যান্ড রিফ্রাক্টিভ সার্ভিসেস-এর সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. সঞ্জীব বন্দ্যোপাধ্যায়।

ক্যাটারাক্টের লক্ষণ কী কী?

রামধনু রঙা বর্ণমালা দেখা, ঝাপসা দেখা, রঙের মাত্রা বা উজ্জ্বলতা কমে যাওয়া, রোদে বা সামনে থেকে আসা আলোতে অসুবিধা হওয়া, চোখে ক্লান্তি— এমনকী চোখ বা মাথা ব্যথাও হতে পারে।

এছাড়াও আরেকটা বিভ্রান্তিকর লক্ষণ আছে। চশমা ছাড়াই কাছের জিনিস ভালো দেখা। এতদিন বই বা নিউজ পেপার পড়তে যে চশমা ছাড়া চলত না, সেটার আর ব্যবহার করার দরকার-ই হচ্ছে না। ভ্রম হয় চোখ ভালো হয়ে গেছে মনে করে। পরিভাষায় একে বলা হয় সেকেন্ড সাইট, এটাও ক্যাটারাক্টের লক্ষণ।

কোন বয়সে ক্যাটারাক্ট হয়?

ক্যাটারাক্টের কোনও বয়স হয় না, যে-কোনও বয়সেই ছানি পড়তে পারে। এমনকী শিশুরাও ক্যাটারাক্ট নিয়ে জন্মাতে পারে। সাধারণত ৪০ বছর বয়সের পর আমাদের চোখের লেন্সের প্রোটিনগুলি ভাঙতে শুরু করে। ৫০-৬০ বছর বয়সে বেশিরভাগ লোকই একটু ঝাপসা দৃষ্টি অনুভব করেন। তবে লক্ষণগুলি প্রথমে তেমন বোঝা নাও যেতে পারে।

কী কারণে ক্যাটারাক্ট হয়?

ক্যাটারাক্ট হওয়ার নির্দিষ্ট কোনও কারণ হয় না। যদিও এটা একটা এজ রিলেটেড অর্থাৎ বয়সজনিত অসুখ। শরীরে ডায়াবেটিস জাতীয় কোনও মেটাবলিক ডিজিজ থাকলে কম বয়সেই ক্যাটারাক্ট হতে পারে। এছাড়া স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধের ব্যবহারে কিংবা চোখে আঘাত লেগে থাকলে অনেক আগেই ক্যাটারাক্ট আসতে পারে।

কীভাবে ক্যাটারাক্ট হওয়া আটকানো যায়? প্রতিকার কী?

কোনও পরিচিত ওষুধ, চোখের ড্রপ, ব্যায়াম বা চশমা ব্যবহার করে ক্যাটারাক্ট নিরাময় বা প্রতিরোধ করা যায় না। অপারেশনই একমাত্র চিকিৎসা।

কখন অপারেশন করা দরকার?

যখন ক্যাটারাক্ট ক্রমশ ঘন হয়ে একজন ব্যক্তির দৈনন্দিন কার্যকলাপে অসুবিধার সৃষ্টি করে, তখনই ক্যাটারাক্ট অপারেশন করে নিতে হয়। আজকাল ফেমটোসেকেন্ড লেজারের মাধ্যমে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে সহজেই ক্যাটারাক্ট অপারেশন করা হয়ে থাকে।

হাসপাতালে কত দিন ভর্তি থাকতে হয়?

ডে কেয়ার প্রসিডিয়োর ক্যাটারাক্ট সার্জারি হয়ে থাকে, তাই অপারেশনের দিন-ই রোগীকে ডিসচার্জ করা হয়।

ফেকো সার্জারি কী? কীভাবে করা হয়?

খুব ধারালো একটা ইনস্ট্রুমেন্ট দিয়ে চোখে ছিদ্র করে চোখের ভিতরে পথ তৈরি করা হয়। অস্বচ্ছ লেন্সের আবরণীকে গোলাকার চাকতি (capsulotomy) আকৃতিতে কেটে নেওয়া হয়। এরপর ছানি অর্থাৎ অস্বচ্ছ লেন্স ইমালসিফাই করে বের করে, একটি কৃত্রিম ইন্ট্রা ওকুলার লেন্স ক্যাপসুলার ব্যাগ (Capsular bag)-এ প্রতিস্থাপন করা হয়।

ফেমটো লেজার অ্যাসিস্টেড ক্যাটারাক্ট সার্জারি বা এফএলএসিএস কী?

এখন অত্যন্ত আধুনিক প্রযুক্তিতে ফেমটো-লেজারের সাহায্যে ক্যাটারাক্ট সার্জারি করা যায়। ফেমটো লেজার অ্যাসিস্টেড ক্যাটারাক্ট সার্জারি, সংক্ষেপে এফএলএসিএস। চোখের সামনে থাকা একটি ক্যামেরা বা ওসিটি ডিভাইস প্রথমে চোখের সারফেস ম্যাপিং এবং চোখের ভিতরের বিভিন্ন টিস্যুর স্ক্যানিং করে। সেখান থেকে একটি কম্পিউটারের মাধ্যমে চোখের নির্দিষ্ট স্থানে, সঠিক আকার, সুনির্দিষ্ট মাপ এবং গভীরতায় লেজার কাটিংয়ের প্রোগ্রামিং করে। এরপর অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত ও সুনির্দিষ্ট ভাবে লেজার রশ্মির মাধ্যমে লেন্সের ক্যাপসুলোটমি (আবরণী কাটা) এবং ক্যাটারাক্টস লেন্সকে টুকরো টুকরো করা হয়। কোনও ধারালো ইন্সট্রুমেন্ট ছাড়াই অর্থাৎ সম্পূর্ণ ব্লেডলেস পদ্ধতিতে পুরো ব্যাপারটা করা হয় ফেমটো লেজার ফটো- আয়োনাইজেশনের মাধ্যমে। লেজার কাট প্রক্রিয়াটি মাত্র ৩০ সেকেন্ডের মধ্যেই সম্পন্ন হয়ে যায়।

ফেমটোসেকেন্ড লেজার কী?

ফেমটোসেকেন্ড লেজার একটি ইনফ্রারেড লেজার। এটি খুব দ্রুত গতিতে এবং ফেমটোসেকেন্ড পরিসরে লেজার শক্তি নির্গত করে। যদিও এটি মূলত লাসিক (lasik) সার্জারিতে ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয়েছিল, যেহেতু খুবই নিরাপদ তাই এই লেজারগুলি এখন চোখের বিভিন্ন সার্জারিতে ব্যাপক ভাবে ব্যবহৃত হয়।

এফএলএসিএস (FLACS)-এর বিশেষত্ব কী?

লেজার ক্যাটারাক্ট সার্জারি অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিত ও নিখুঁত আর তাই কম ঝক্কিপূর্ণ। ধরুন যদি কাউকে একটা কাগজে তিনটে একই আকারের বৃত্ত আঁকতে বলা হয় তবে দেখা যাবে তিনটে একই সাইজ এবং শেপ-এর নাও হতে পারে, যা কিনা লেজার দিয়ে অসংখ্যবার করা সম্ভব। তাই লেজার দিয়ে নির্দিষ্ট ৫ মিলিমিটার সাইজের ক্যাপসুলোটমি নিখুঁত ভাবে করা যায়। প্রিমিয়াম আইওএল (IOL) ইমপ্ল্যান্ট করার ক্ষেত্রে যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

এফএলএসিএস কতটা নিরাপদ?

লেজার এমন ছেদ তৈরি করে, যা প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ হওয়ার পরে চোখের ছেদটি সেল্ফ সিলিং হয়ে সহজেই জুড়ে যায়। এই সেলফ সিলিং ছেদ প্রচলিত পদ্ধতিতে ক্যাটারাক্ট সার্জারিতে কাটা ফ্লাপের থেকে অনেক বেশি নিরাপদ। এফএলএসিএস- -এর সুবিধা কী কী?

১) অনেক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, প্রচলিত পদ্ধতিতে একটি ধারালো ইন্সট্রুমেন্ট দিয়ে অপারেশন করার তুলনায় ফেমটো লেজার দিয়ে আরও সুনির্দিষ্ট এবং নিখুঁত ভাবে কাটা যায় এবং আশেপাশের টিস্যুর তেমন ক্ষতি হয় না। ২) লেজার দিয়ে লেন্সকে টুকরো টুকরো করার ফলে ইমালসিফাই করার জন্য অনেক কম আল্ট্রাসাউন্ড শক্তির প্রয়োজন হয়।

৩) নিখুঁত এবং নির্দিষ্ট সাইজের ক্যাপসুলোটমি (আবরণী চাকতি) হওয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট স্থানে আইওএল বা কৃত্রিম লেন্সকে সুপ্রতিষ্ঠিত করা যায়।

৪) কর্নিয়ায় লেজার ইনসিশনের মাধ্যমে সিলিন্ডার পাওয়ার অনেক ক্ষেত্রে কমিয়ে দেওয়া যেতে পারে।

৫) গবেষণায় দেখা গেছে যে, এই লেজারগুলি কম জটিলতা সৃষ্টি করে এবং রোগীরা অস্ত্রোপচারের পরে তাই দ্রুত নিরাময় লাভ করেন।

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব