টিং টং (শেষ পর্ব)

দেখতে দেখতে রাত বারোটা বেজে গেল। তাপস ও সজল খাওয়া শেষ করে চুপ করে পাশে এসে বসেছে। আমাদের খাওয়া বাকি। খিদেতে শরীর আনচান করছে, ফলস্বরুপ আমাদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটতে শুরু করেছে। ঘড়িতে সাড়ে বারোটা বাজতে বাজতে সবার এনার্জি শেষ। সুধীর বলল, ‘অনেক হয়েছে ভূত দেখা, এবার ক্ষান্ত দেওয়া যাক।’ আশিসকে বললাম, “খাবারটা একটু বেড়ে দিবি?’ আশিস উঠে গেল। আমরাও আড়মোড়া ভেঙে উঠে পড়লাম। সজল জল খাবে বলে আমাদের আগে ঘরে ঢুকল। ওর পিছনে আমি, আমার পিছনে তাপস, শেষে সবার পিছনে সুধীর।

সুধীর ঘরের ভিতর পা দিতে যাবে, এমন সময় “টং” আওয়াজ কড়া ফেলার। সুধীর এক ধাক্কায় তাপসকে সরিয়ে দিয়ে হুমড়ি খেয়ে ঘরে ঢুকে পড়ল। ততক্ষণে আমাদের মধ্যেও হুড়োহুড়ি লেগে গেছে। সজল বলল, ‘দরজা বন্ধ কর, আরে আগে দরজটা বন্ধ কর।’ কে দরজা বন্ধ করবে? ভয়ে সবাই আধমরা। এতদিন শুনেছিলাম লোকে বলত, কী রে ভূত দেখেছিস নাকি! সত্যি সত্যি ভূত দেখলে মুখের অবস্থা কী হয় আজ তা দেখলাম। কোনও মতে বারান্দার দরজা ও মেন দরজা বন্ধ করা হল। খাওয়া সবার মাথায় উঠেছে। সবাই গেলাস গেলাস জল খাচ্ছে। ইতিমধ্যে ভয় কাটানোর জন্য তিনজন সিগারেট ধরিয়ে ফেলেছে। সিগারেটের পর সিগারেট খেয়ে পেটে কিছু খাবার ফেলে রাত দেড়টার সময় সবাই শুতে গেল। পরেরদিন সারাদিন আগের দিনের ঘটনার ও ভূত নিয়ে চর্চা চলল।

এরপরে বেশ কিছু দিন কেটে গেল। গেটের ঘন্টার আওয়াজ প্রাত্যহিক হয়ে গেছে। ব্যাপারটা গা সওয়ার পর্যায়ে চলে গেছিল।

বাড়িওয়ালি মাসিমার অ্যাপেন্ডিসাইটিস ধরা পড়েছে। আমরাই ডাক্তার ঠিক করে দিলাম। ডাক্তার ইমিডিয়েট অপারেশন করতে বলেছেন। ডেটও দিয়ে দিয়েছেন। মাসিমার অপারেশনে ভীষণ ভীতি, যদি জ্ঞান না ফিরে আসে! আমরা বোঝালাম এটা একটা সামান্য অপারেশন, আকছার হচ্ছে, সবাই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে আসে। মাসিমা নাছোড়বান্দা, বললেন, “তোমরা আমার অপারেশনের সময় নার্সিংহোমে থেকো। তোমাদের মোসোমশাই ভরসা পাবেন।”

মেসোমশাই ও ওনাদের মেয়ে সকাল সকাল বেরিয়ে গেছেন। আমরা জানতাম ৯টার আগে অপারেশন শুরু হয় না। হঠাৎ করে সোয়া ৮টার সময় পাশের বাড়িতে ফোন এল। মাসিমার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে, আমরা যেন তাড়াতাড়ি নার্সিং হোমে পৌঁছে যাই। নার্সিং হোমে পৌঁছে দেখি মাসিমা পরম শান্তিতে শুয়ে আছেন। অপারেশন করার আর সুযোগ দেননি। মাসিমা অমৃতলোকে গমন করেছেন। ওনার মেয়ে মাকে ধরে বসে আছে মাথা নীচু করে। আমরা পৌঁছোতেই মেয়েটি হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল। ওকে শান্ত করে মেসোমশাইয়ের খোঁজে বেরোলাম। বাইরের টেলিফোন বুথে পেয়ে গেলাম মেসোমশাইকে। ওনাকে বললাম, ‘আপনার নম্বরগুলো দিন। আপনি গিয়ে আপনার মেয়ের কাছে বসুন।’

মাত্র ৬০ বছর বয়সে চলে গেল একটি সুন্দর প্রাণ। নিজের একমাত্র ছেলের অল্প বয়সে চলে যাওয়া ভুলতে পারেননি মাসিমা। তাই পুত্রসম ছেলেদের মাতৃস্নেহে যত্ন করতেন। কলকাতার বাড়ি বা অন্য কোথাও থেকে ফিরলে সেইবেলাটা ওনার ওখানেই নিমন্ত্রণ থাকত। বৃষ্টি পড়লে ভাজা সমেত খিচুড়ি পাঠিয়ে দিতেন। অপূর্ব তার স্বাদ। আজও খিচুড়ি খেতে গেলে ওনার কথা মনে পড়ে।

স্ত্রী এখন যখন জিজ্ঞেস করে, ‘মাসিমার মতো হয়েছে?’ আমি মাথা নাড়ি। উনি চলে গিয়ে বাড়িটার জৌলুসই চলে গেল।

মাঝে ক’দিনের ধাক্কায় ভুলে গেছি সমীরদার সেই গ্রিলের গেট খোলার আওয়াজ। হঠাৎ একদিন আশিস বলল আমাকে, “হ্যাঁ রে গেট খোলার আওয়াজ তো আর কানে আসে না।’ মাথা নেড়ে বললাম, ‘ঠিক বলেছিস, আচ্ছা এবার থেকে খেয়াল রাখব।’

দিন পনেরো কান পেতেও সেই আওয়াজ আর শোনা গেল না। বুঝলাম, ‘মাইমা’ বিহীন বাড়িতে ঢুকতে সমীরদার আর মন চায় না। কিছুদিন পরে বাবা ও মেয়ে বাড়ি বিক্রি করে কলকাতায় চলে গেলেন। মামাবাড়ির কাছেই ফ্ল্যাট কিনেছেন। আমরাও অন্য বাড়ি ভাড়া নিলাম। মাসিমার মৃত্যুর সাথে বিলীন হয়ে গেল সেই ভৌতিক আওয়াজ, আর ভৌতিক অনুভূতি। সাথে থেকে গেল এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। আমার সাথে যারা দেখেছেন, অনুভব করেছেন, তারা ছাড়া অন্যদের কাছে এটা শুধুই এক গল্প।

(সমাপ্ত)

টিং টং (পর্ব-০২)

আশিসকে জিজ্ঞেস করাতে বলল, গেট খোলার আওয়াজ ও পরিষ্কার শুনেছে। ও আরও বলল, ‘আমি একদিন ঝুল বারান্দাতেই বসেছিলাম, আওয়াজ হতেই তাকিয়ে দেখি গেট কিন্তু বন্ধ। চার ব্যাটারির টর্চ এনে গেটের সামনে আলো ফেলে দেখি কেউ নেই।’

কিছুদিন পর খেয়েদেয়ে কিছু পেপার ওয়ার্কস নিয়ে বসেছি। আশিস শুয়ে গল্পের বই পড়ছিল, দশটা বেজেছে, যথারীতি গেট খোলার আওয়াজ এল। আশিস জিজ্ঞেস করল, ‘গেটের কড়া লাগানোর আওয়াজ পেলি কি?’ বললাম, ‘কানে এল।’ মজা করে আশিস আমাকে বলল, “গুরু এ বাড়িতে রোজ রাতে ভূত আসে। চল অন্য বাড়িতে যাই। সমীরদা মাঝে মাঝেই রাত্রিবেলায় এখানে এসে ফিল্টার উইলস খেতেন। কোনওদিন সেটা মনে পড়ে আমাকে দর্শন দিলে আমি হার্টফেল করব। চলো গুরু এখান থেকে পালাই।’ বললাম, ‘এখন এই বাড়ি আর ছাড়া নেই। আজকাল ছিঁচকে চোরের উৎপাত বেড়েছে। সমীরদা মামাবাড়ি পাহারা দিতে রোজ রাতে চলে আসেন। আমাদের আর কিছু চিন্তা করার দরকার নেই। সমীরদাই দেবেন চোরের ঘাড় মটকে।

রাত দশটার গেটের আওয়াজের চর্চা এখন বাড়ির সব ভাড়াটেদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। সেই সাথে কম বেশি ভূত দর্শনের ভীতিও সংক্রমিত হয়েছে। ভূত দর্শনের ভয়ে, আমি ও আশিস নিতান্ত নিরুপায়। নাহলে রাত্রিবেলায় ন’টার মধ্যে বাড়িতে ঢুকে পড়ি! অবাক লাগত বাড়িওয়ালাদের কেউই কিন্তু কখনওই এই ব্যাপারে কথা তুলতেন না। ওনাদের সবাইকে আলাদা করে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করেছি। সবার সপার্ট উত্তর, সেরকম কোনও আওয়াজ শোনেনি। ওনাদের কোনও কারণে শুতে দেরি হলে আওয়াজটাও দেরিতেই হতো। আরেকটা কথা বলি ঘন্টি বাজানো, দরজার কড়া বাজানো আলাদা আলাদা মানুষের আলাদা রকমের হয়। তার রকমফের থেকে বোঝা যায়, দরজার ওদিকে কে দাঁড়িয়ে আছে। যেমন কেউ কড়া ফেলে জোরের সাথে, কেউ-বা খুব আস্তে করে। কড়া ফেলার স্পিডের সাথে তার আওয়াজও বদলে যায়, বলা বাহুল্য। সেই আওয়াজ আর জীবিত থাকতে সমীরদার গেট খুলে ঢোকার সময়ের গেটের কড়া ফেলার আওয়াজ ছিল এক-ই-রকম। আর প্রতিদিনই আমরা সেই একই রকমের আওয়াজ শুনতাম।

দেশের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধি নিজের দেহরক্ষীর গুলিতে নিহত হলেন। সারাদেশে অরাজকতা ছড়িয়ে পড়ল। পাটনাতেও তার ব্যতিক্রম ছিল না। এই অজুহাতে লোভী মানুষের দল শিখদের দোকান লুটপাট শুরু করে দিল। চোখের সামনে বিহারি মালিকের দোকান লুধিয়ানা এম্পোরিয়ামও লুট হয়ে গেল। শহরে কার্ফু ঘোষণা হয়েছে। খাবারের দোকান সব বন্ধ, কাজকর্ম বন্ধ। বাড়িতে বসে টিভির দিকে চোখ খুলে বসে থাকা ছাড়া আর কোনও কাজ নেই। কার্টুর প্রকোপে পড়ে আমার যেসব বন্ধুরা একা একা থাকত, তাদের বেশ কয়েকজন আমাদের বাড়িতে জায়গা নিল। কারণ আমাদের বাড়িটা বড়ো আর রুমমেট আশিস দারুণ রান্না করে।

কাজকর্ম নেই বাড়িতে ২৪ ঘন্টা ডু ফুর্তি পরিবেশ। রাত্রিবেলায় সবাই একসাথে হাতে থালা নিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে খেতে বসেছি, এমন সময় গ্রিলের গেট খোলার আওয়াজ এল। আশিস বলল, “শুনতে পেলি?” আমি বলি, ‘হুঁ, শালা ভূত কার্ফুতেও বেরিয়ে পড়েছে।’ গরম তেলে জল পড়ার অবস্থা। সবাই চেপে ধরল, ‘কী ব্যাপার? কী ব্যাপার?’ খাওয়া শেষ হলে, বলতে বসি ঘটনার আদ্যোপান্ত। সুধীর, আমাদের বন্ধু বলল, “গুরু! রসদ পেয়ে গেছি, এই রহস্য ভেদ না করে এখান থেকে যাওয়া নেই।”

ঠিক হল পরের দিন রাত্রি ন’টার পর থেকে আমরা ঝুলবারান্দায় বসব, ওখান থেকে গেটটা স্পষ্ট দেখা যায়। গল্প করব, হল্লা নয়, শুধু নজর থাকবে গেটের দিকে। জোগাড় হল আরেকটা বড়ো টর্চ। সেই অনুযায়ী রান্না সকাল সকাল সেরে এক ফ্লাস্ক চা ভরে আমরা পাঁচজন ন’টা বাজতেই বসলাম গিয়ে ঝুলবারান্দায়। সুধীরের কথামতো আমাদের ঘরের মেন দরজা খোলা রাখা হল। নীচু আওয়াজে আমাদের মধ্যে গল্প চলছে। কারওর আওয়াজ বেড়ে গেলেই তাকে থামিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি গলার আওয়াজ আমারই। তাই দু-তিন বার বকা খেয়ে ঘাপটি মেরে চুপ করে বসে গেছি। এদিকে ঘড়ির কাঁটা দেখতে দেখতে ১০টা ছাড়িয়েছে। বাড়িওয়ালার বাড়ির লাইট অনেক আগেই নিভে গেছে।

তাপস বলল সুধীরকে, ‘যা একবার দেখে আয়, বাড়িওয়ালার মেন দরজা বন্ধ হয়েছে কিনা! আর কেউ সাথে যাবে না। তুই একাই যাবি। মেলা কপচেছিস, দেখি তোর সাহস।’ ইজ্জতের সওয়াল, সুধীর উঠল, তবে বীর পুঙ্গবের মতো নয়, কিছুটা অনিচ্ছুক ভঙ্গিতে। পরিবেশ ও পরিস্থিতির ছোঁয়া ওর মধ্যেও পৌঁছে গেছে। বললাম, “সিঁড়ির লাইট জ্বালাস না, টর্চ জ্বালিয়ে যা।”

কিছুটা গিয়েও সুধীর ফিরে এল। বলল, ‘গা ছমছম করছে মাইরি, কেউ একজন সাথে চল।’ সজল আর ও একই কোম্পানিতে চাকরি করে। সজল ওর সাথে গেল। কিছুক্ষণ পরে দু’জনে বীরদর্পে ফিরে এল। সজল বলল, ‘দরজা বন্ধ। হালকা ঠেলে দেখেছি, ঠেলা দিলে খুলছে না।”

রাত সাড়ে দশটা বেজেছে ঘড়িতে। আশেপাশের বাড়িগুলোর লাইটও নিভতে শুরু করেছে। পরিবেশ ধীরে ধীরে কিছুটা ভৌতিক হয়ে গেছে। সবাই খুব আগ্রহ নিয়ে বসে আছে জীবনে প্রথম ভূত দেখার আগ্রহে। ১১টা বেজে গেছে, এবার তাপস ও সজলের ধৈর্য কমে এল। তাপস বলল, ‘সমীরদা আমাদের দেখে চলে গেছে। আজ কোনও তেঁতুল গাছে বসে রাত কাটিয়ে দেবে।’ আশিসের দিকে তাকিয়ে তাপস বলল, “আশিস আমি আর পারছি না, খাবারটা দিয়ে দে।’ সজল বলল, “তাহলে আমাকেও দিয়ে দে।’ ওরা দুজন খাবার নিয়ে ঘরের কেন্দ্রস্থলে রাখা টেবিলে বসে গেল। ওটা আমাদের ডাইনিং কাম ওয়ার্কিং টেবিল।

(ক্রমশ…)

টিং টং (পর্ব-০১)

তখন আমি ব্যাচেলর, পাটনাতে এক বাঙালি ভদ্রলোকের বাড়িতে ভাড়া থাকি। বাড়িওয়ালা ও বাড়িওয়ালি অতি সজ্জন ও ভালোমানুষ। মাসিমা অর্থাৎ বাড়িওয়ালি ছিলেন প্রকৃত মাতৃসুলভ মহিলা। ওনাদের সন্তান বলতে ছিল একটিমাত্র মেয়ে। ননদের বড়ো ছেলে ওনাদের কাছেই থাকত। পুত্রস্নেহে মামিমা ভাগ্নের খুব যত্ন করতেন। ভাগ্নেও মাইমা বলতে অজ্ঞান ছিল। পৃথিবীতে কিছু সুন্দরদর্শন মানুষ থাকেন যাদের সুন্দর ব্যবহার তাদের রূপকেও ছাপিয়ে যায়। সাধারণ মানুষ ওনাদের গুণে মোহিত হয়ে যায়, শ্রদ্ধা করে, ভালোবাসে, মান্য করে এবং প্রায় ভগবানের জায়গায় বসায়। মাসিমা ছিলেন সেই রকমই এক অতি সমাদৃতা মহিলা।

মাসিমার ভাগ্নে আমার থেকে বয়সে অনেকটা বড়ো ছিলেন। সমীরদা বলে ডাকতাম। সমীরদা মানুষটা একটু মুডিয়াল ছিলেন। কখনও হেসে কথা বলতে আসতেন, আবার কখনও গাম্ভীর্য দেখিয়ে এড়িয়ে যেতেন। বাড়িওয়ালির আদরের ভাগ্নে, আমিও তাই ওনার মন বুঝে চলতাম। রাস্তা চলতেন একটু টালমাটাল ভঙ্গিতে। এক সরকারি কলেজে ক্লার্কের চাকরি করতেন। চাকরিতে হাজিরা, মাইমার একটু-আধটু ফরমায়েস তামিল করা, আর এদিকে-ওদিকে ফাঁকা সময়ে আড্ডা দেওয়া— এটাই ছিল সারাদিনের রুটিন।

জীবনের রাস্তাও চলতেন টালমাটাল ভঙ্গিতে। সেরকম কোনও মোহ নেই, নেই কোনও তাড়াহুড়ো, বিয়ে করা অথবা সংসার করার ব্যাপারে কোনও মাথাব্যথা ছিল না। সমীরদার আচরণে সমীরদার বাবা-মা এবং মামা-মামি ভুল করেও এই ধরনের কোনও কথা মুখেও আনত না। গয়ং গচ্ছ ভাবে চলতে চলতে একদিন সবাই লক্ষ্য করল সমীরদার থেকে স্বাভাবিকত্ব হারিয়ে গেছে। উন্মাদনা না থাকলেও মানসিক সুস্থতা নেই। ডাক্তার-বদ্যি করেও হাল ফেরানো গেল না। একটা ভয় ও অনিশ্চয়তা ওনাকে তাড়া করে বেড়াত।

কলেজ যাওয়া বন্ধ হল। সারাদিন বাড়িতে পায়চারি করতেন। সন্ধে হলে বেরিয়ে যেতেন, বাড়ি ফিরতেন রাত দশটা নাগাদ। গেট খোলার সময় বাইরের গ্রিলের গেটে ছোট্ট লোহার কড়া ওঠানোর আওয়াজ এবং গেট বন্ধ করার সময় কড়া ফেলার আওয়াজ শোনা যেত। আমি ও আমার রুমমেট আশিস বলতাম, “ওই যে সমীরদা বাড়িতে ঢুকল।’

সমীরদার পাগলামো বেড়ে যাওয়াতে মাসিমা তার ননদ ও নন্দাইকে ডেকে পাঠিয়ে, ওনাদের বাড়িতে সমীরদাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে বললেন। সমীরদা ‘মাইমাকে’ ছেড়ে যেতে নারাজ। অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে ওর মা-বাবা বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে গেলেন। কিছুদিন পরেই খবর এল সমীরদা আত্মহত্যা করেছেন। সাঁতার জানতেন না, গঙ্গায় ঝাঁপ দেন। দু-দিন পরে গঙ্গায় এক কিনারে দেহ ভেসে ওঠে।

এর কিছুদিন পর থেকেই বাড়িতে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে লাগল। বাড়িতে ঢোকার ছোট্ট গ্রিলের গেটে কখনও তালা লাগানো হতো না কারণ অনেক ভাড়াটে থাকত, কে কখন ঢুকবে বা বেরোবে তার ঠিক নেই। এমনিতে তালা দিয়েও লাভ নেই কারণ নীচু পাঁচিল, ইচ্ছা করলে যে-কেউ পাঁচিল টপকে ঢুকতে পারে। সমীরদার মৃত্যুর পর মাসিমারা তাড়াতাড়ি খেয়েদেয়ে ন’টা থেকে সাড়ে ন’টার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়তেন। আর তারপরই….

তারপরই, রাত দশটা বাজলে যে-কোনও সময়, বাড়িতে ঢোকার ছোট্ট গ্রিলের গেট খোলার আওয়াজ আসত। সাধারণ ভাবে গেটের আওয়াজ নিয়ে মাথাব্যথা হওয়ার যুক্তি নেই, অবকাশও ছিল না কারওর। সময়টা ছিল জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহ। হাড় কাঁপানো ঠান্ডায় পাটনাতে সবাই তখন সন্ধ্যা আটটার মধ্যেই ঘরে ঢুকে পড়ত। শীত বাড়লে আওয়াজের তীব্রতা বাড়ে। পাশের বাড়িতে কাচ ভাঙলে, মনে হয় নিজের বাড়িতে অঘটন ঘটল। নিঝুম রাতের নির্জনতা ভেঙে কড়ার আওয়াজ সবার কানে বাজতে লাগল। একদিনের ব্যতিক্রম নয়, রোজদিনের এই অস্বাভাবিক আচরণ সবার মনে প্রশ্ন জাগাত।

নতুন করে এত রাতে রোজ কে আসছে? ঔৎসুক্যবশত একদিন রাতে গেট খোলার ও বন্ধ করার আওয়াজ হতেই ঝুল বারান্দা দিয়ে গেটের দিকে নজর দিলাম। কাউকে দেখতে পেলাম না। ব্যাপারটা যেহেতু বাড়ির সুরক্ষার সাথে জড়িত, তাই বাড়িওয়ালাকে রিপোর্ট করলাম। সব শুনে বাড়িওয়ালা বললেন, ‘এরকম কোনও আওয়াজ তো শুনতে পাই না আমরা।’ রীতিমতো আশ্চর্য হয়ে বললাম, ‘রাত দশটা নাগাদ গ্রিলের গেট খোলার আওয়াজ শুনতে পান না আপনারা?” একদম নির্লিপ্ত অথচ নিশ্চিত ভঙ্গিতে বললেন, ‘না তো!”

বাড়ির অন্য ভাড়াটেরা অবশ্য আমার কথা মানল। আওয়াজ ওদের কানেও পৌঁছোয়। ওদের ধারণা ছিল কাণ্ডটা আমরাই করি। যেহেতু আমরা ব্যাচেলর, সুতরাং এরকম ঘটনা ঘটানো আমাদের দ্বারা স্বাভাবিক ভাবে অসম্ভব নয়। বাড়িওয়ালার সাথে এই ব্যাপারে আর কথা না বাড়ালেও, কেউ যে দশটার সময় গেট খুলে এই বাড়িতে ঢোকে, সেটা মনের থেকে ঝেড়ে ফেলা গেল না। মনে মনে ভাবলাম — হয়তো ঘটনা যখন ঘটে তখন ওনারা গভীর ভাবে নিদ্রামগ্ন থাকেন। ওনাদের কথায় নিজের মনকে শান্ত করার জন্য যুক্তিবাদী ভাবনার আশ্রয় নিলাম। ভাবলাম ওই সময় বাইরে থেকে এই বাড়িতে বিড়ালের আগমন ঘটে।

গ্রিলের ফাঁক গলে যখন তিনি ঢোকেন তখন দুদিকের পাল্লা দুটো একটু নড়ে যায় আর তার ফলে লোহার কড়া একটু উঠে আবার যথাস্থানে পড়ে যায়। আর তখনই ঘটে এই ভুতুড়ে আওয়াজ। আর এই ভাবনাকে বাস্তব প্রমাণ করতে একদিন আওয়াজ হতেই বাইরে ঝুলবারান্দা থেকে গেটের দিকে তাকাই। টর্চের আলো গেট ও তার আশেপাশে ফেলে দেখি গেটের কাছে না কোনও বিড়াল না কোনও কুকুর দেখা যাচ্ছে। আর গেটটাও ঠিকঠাক বন্ধ করা আছে।

(ক্রমশ…)

কর্মরত মায়েদের জন্য উপযুক্ত টিফিন

অফিসে যাওয়ার আগে প্রচণ্ড ব্যস্ততা থাকে। কিন্তু চটজলদি টেস্টি খাবার রেডি হওয়াও প্রয়োজন। রইল উপযুক্ত রেসিপিজ।

রাইস সেমাই

উপকরণ: ২ কাপ রাইস সেমাই, ১টা পেঁয়াজ লম্বা করে কাটা, ১/৪ কাপ লাল, সবুজ ও হলুদ ক্যাপসিকাম, ১টা টম্যাটো কুচি করা, ১ ছোটো চামচ আদা (কাটা), ১/২ চামচ কাঁচালংকা কুচি করা, ১ বড়ো চামচ ধনেপাতাকুচি, ১ বড়ো চামচ সাদা তেল, ১/২ ছোটো চামচ সরষে ফোড়ন দেওয়ার জন্য, ১/২ ছোটো চামচ জিরে, ৭-৮টা কারিপাতা, নুন স্বাদমতো।

প্রণালী: একটা পাত্রে ৬ কাপ জল ফুটতে দিন। এতে সেমাই দিয়ে ঢেকে রাখুন এবং আঁচ বন্ধ করে দিন। ১০ মিনিট পর দেখবেন সেমাই নরম হয়ে গেছে। ছাঁকনি দিয়ে জল ঝরিয়ে সেমাইগুলো একটা প্লেটে চারিয়ে দিন। এর আগে এক বোতল ঠান্ডা জলে সেমাইগুলো ধুয়ে নিলে ভালো হয়।

এবার কড়ায় তেল গরম করে, সরষে, কারিপাতা আর কাঁচালংকা ফোড়ন দিন। পেঁয়াজ বাদামি করে ভাজুন। এবার ক্যাপসিকাম, টম্যাটো, আদাকুচি, দিয়ে ঢিমে আঁচে ৫ মিনিট নাড়চাড়া করুন। সেমাইগুলো দিয়ে আবার ভালো ভাবে নাড়ুন। নুন দিয়ে আরও ২ মিনিট কড়ায় নাড়াচাড়া করে, নামিয়ে দিন। আপনার লাঞ্চ প্যাক তৈরি।

স্প্রাউট ডাল মুগলেট

উপকরণ: ১ কাপ স্প্রাউট বিনস, ২ ছোটো চামচ আদা-কাঁচালংকা পেস্ট, ১/৪ ছোটো চামচ বেকিং পাউডার, ২ বড়ো চামচ কুচোনো পেঁয়াজ, ২ ছোটো চামচ লাল-হলুদ-সবুজ ক্যাপসিকামকুচি, ১ বড়ো চামচ চালগুঁড়ো, ১ ছোটো চামচ রিফাইন্ড তেল, নুন স্বাদমতো।

প্রণালী: অঙ্কুরিত মুগ মিক্সিতে দিয়ে ১-২ বড়ো চামচ জল দিয়ে ভালো ভাবে পেস্ট করে নিন। এতে মেশান চালগুঁড়ো, আদা-কাঁচালংকার পেস্ট, নুন, লংকাগুঁড়ো, আর ধনেপাতা। ৫ মিনিট ঢেকে রেখে দিন। এবার বেকিং পাউডার দিয়ে ভালো ভাবে ফেটিয়ে নিন।

একটা ননস্টিক প্যানে তেল বুলিয়ে, মিশ্রণটা প্যানে ঢেলে দিন। মোটা করে চারিয়ে, উপর থেকে সবজিগুলো ছড়িয়ে দিন। এবার প্যানটা ঢেকে ঢিমে আঁচে রান্না হতে দিন। নীচের অংশটা সেঁকা হয়ে গেলে, খুব সাবধানে উলটে দিন। আরও মিনিট দুয়েক সেঁকে নামিয়ে নিন। সস-এর সঙ্গে খেতে ভালোই লাগবে।

ভেজ অন টোস্ট

উপকরণ: ৬টা স্লাইস ব্রেড, ২ বড়ো চামচ পিৎজা সস, ২ ছোটো চামচ মাখন, ৩ বড়ো চামচ লাল-সবুজ-হলুদ ক্যাপসিকাম কুচি, ২ বড়ো চামচ লম্বা করে কাটা পেঁয়াজ, ১ বড়ো চামচ মাখন, নুন-মরিচ স্বাদমতো।

প্রণালী: প্যানে মাখন গলিয়ে নিন। এতে সবজি দিয়ে ২ মিনিট সঁতে করুন। নুন-মরিচ দিন। এবার ব্রেড স্লাইস হালকা সেঁকে এর উপর পিৎজা সস বুলিয়ে নিন। উপরে সবজি চারিয়ে দিন। টম্যাটো সসের সঙ্গে খান।

কর্নফ্লেক্স পোলাও

উপকরণ: ২ কাপ কর্নফ্লেকস, ১/৪ কাপ আলু সেদ্ধ করে টুকরো করা, ২ বড়ো চামচ কড়াইশুঁটি সেদ্ধ, ১/৪ কাপ লাল-সবুজ-হলুদ ক্যাপসিকামকুচি, ২ বড়ো চামচ পেঁয়াজকুচি, ২ ছোটো চামচ আদা-কাঁচালংকাকুচি, ১/৪ কাপ গাজর গ্রেট করা, ১/৪ কাপ টম্যাটোকুচি, ১/২ ছোটো চামচ সরষেদানা, ১/২ ছোটো চামচ জিরে, এক চিমটে হিং, ১/২ ছোটো চামচ লেবুর রস, ১ বড়ো চামচ রিফাইন্ড তেল, নুন স্বাদমতো।

প্রণালী: একটা ননস্টিক প্যানে তেল গরম করে হিং আর সরষে ফোড়ন দিন। এবার সবজি, টম্যাটো, আদা- কাঁচালংকা, নুন ছড়িয়ে ভালো ভাবে সঁতে করুন। টম্যাটো নরম হয়ে গেলে কর্নফ্লেকস দিয়ে নাড়াচাড়া করুন। তৈরি কর্নফ্লেকস-এর পোলাও।

 

তালিত গড়ের ঢিবি (শেষ পর্ব)

আচমকা নূপুরের শব্দে সম্বিৎ ফেরে রেহানের। এই নির্জন ঢিবিতে নূপুরের আওয়াজে হকচকিয়ে যায়। চারিদিকে তাকিয়ে কাউকে দেখতে না পেয়ে সোজা উঠে যায় ঢিবির উপরে। ঠিক তখনই ও দেখতে পায় একটি মেয়ে ধীরে ধীরে ঢিবির গা’বেয়ে উপরে উঠে আসছে। গায়ে হলুদ রঙের সালোয়ার। পায়ের তোড়ায় লাগানো নূপুরগুলো থেকে শব্দটা ভেসে আসছে বাতাসে ভর করে। রেহানের সাথে চোখাচোখি হতেই মেয়েটি থমকে দাঁড়ায়। তারপর মাথা নীচু করে উঠে আসে ঢিবির উপরে।

দোহারা লম্বা, শ্যমলা মেয়েটির চোখ দুটো আকাশজোড়া। একমাথা ঘন কালো কোঁকড়া চুল কোমর পর্যন্ত নেমে গেছে। রেহান মেয়েটির দিকে তাকিয়ে হাসে। গালের পাশ থেকে চুল সরিয়ে সামান্য মাথা তুলে হাসল মেয়েটি। নদীর ঘূর্ণির মতো দুটো টোল পড়ল গালে। মেয়েটির হাসিটা খুব ভালো লাগল রেহানের।

—তোমার এখানেই বাড়ি? জিজ্ঞেস করল রেহান।

—হ্যাঁ, বলে ঢিবির উপর থেকে হাত দিয়ে ইশারায় ওদের গ্রামটার দিকে নির্দেশ করল মেয়েটি। রেহান তাকিয়ে দেখল দূরে গাছপালার আড়ালে একটি গ্রাম। কয়েকটি খড়ের ছাউনি দেওয়া ঘর দেখা যাচ্ছে।

রেহান জানতে পারল মেয়েটির নাম প্রমা। এ বছর উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে কলেজে ভর্তি হয়েছে। ইতিহাসে অনার্স। রেহান খুব খুশি হয়ে প্রমাকে জিজ্ঞেস করল তালিত গড়ের ঢিবি সম্বন্ধে।

প্রমা বলল, “তালিত গড়ের ঢিবি আসলে একটা নিরাপত্তা বেষ্টনী। এখানে যে মোট ১৬টা ঢিবি আছে তার প্রত্যেকটিতে ছিল একটি করে কামান। কামানগুলিতে ফারসি ভাষায় খোদিত ছিল বর্ধমানের মহারাজা চিত্রসেনের নাম। বর্গিনেতা ভাস্কর পণ্ডিতের নেতৃত্বে ১৭৪২ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে ২০ হাজার মারাঠা সৈন্য নাগপুর থেকে অগ্রসর হয়ে বর্ধমানে প্রবেশ করে। মহারাজা চিত্রসেন আগেই বর্গিদের আগমনের বার্তা পেয়েছিলেন, তাই তিনি রাজধানীর নিকট তালিতে এই গড় কেটে রেখেছিলেন। মারাঠা সৈন্যদের আটকানোর জন্য।’

এই প্রথম ক্ষেত্রসমীক্ষা করতে গিয়ে কারও কাছ থেকে সঠিক তথ্য পেল রেহান। বই পড়ে যেটুকু জেনেছিল সেটা প্রায় সবটাই মিলে গেল প্রমার কথার সঙ্গে। এরপর কখনও ওই ঢিবিতে গেলে প্রমার সঙ্গে দেখা করত রেহান। ধীরে ধীরে মিশে গেছিল ওদের পরিবারের সঙ্গে। এই ভাবে অজান্তেই কখন প্রমার প্রেমে পড়ে গেল। দুটি পরিবারের মধ্যে বিশাল সামাজিক ব্যবধান আছে জেনেও প্রমাকে ভালোবেসেছিল রেহান।

বর্ধমান শহরের বিখ্যাত ব্যবসায়ী মনোরঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের ছেলে রেহান। মফস্সলে ভালোই প্রতিপত্তি ছিল মুখোপাধ্যায় পরিবারের। ওদের সম্পর্কটা যে অত্যন্ত রক্ষণশীল মনোভাবাপন্ন ওদের পরিবার মেনে নেবে না, তা ভালোই জানত রেহান। প্রমার মা মারা যাবার পর যখন প্রমার বাবা রেহানকে বিয়ের কথা বলে, তখন বাবার দিকে মুখ তুলে কখনও কথা না বলা রেহান আচমকা সাহসী হয়ে বাবাকে সবটা জানায়। রেহানের অনুমানমতো একজন অন্ত্যজ পরিবারের মেয়ের সাথে ওর বিয়েটা মেনে নিতে অস্বীকার করে পরিবারের সবাই। ভালোবাসার মানুষটিকে নিয়ে সংসার করতে বদ্ধপরিকর রেহান একটি বেসরকারি সংস্থায় চাকরি নিয়ে, প্রমাকে বিয়ে করে মফস্সল ছেড়ে চলে যায়।

মাস ছয়েক পরে আচমকা একদিন রেহানের বাবা ওদের বাড়িতে এসে উপস্থিত হয়। ওদের বিয়েটা মেনে নিয়ে বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন ওদের। রেহান চাকরি ছেড়ে দিয়ে বাবার ব্যাবসায় মন দেয়। সপ্তাহ খানেক পরে একদিন অফিস থেকে ফিরে রেহান জানতে পারে প্রমা চলে গেছে। রেহানের বাবা ওর হাতে একটা চিঠি দেয়। যেখানে প্রমা নিজের হাতে লিখেছে— ‘ও রেহানকে কোনওদিন ভালোবাসেনি। একটা বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়েও রেহানের সঙ্গে মেলামেশা করেছিল সেটা পূর্ণ হওয়ায়, সে আর রেহানের সঙ্গে থাকতে চায় না। ও যেন আর কোনও দিন ওর খোঁজ না করে। ‘

ওর কাকা আরও বলেন যে, তিনি নাকি দেখেছেন বাইরে একটা ছেলে গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়েছিল, সেই গাড়িতে চেপে প্রমা চলে গেছে। মনোরঞ্জনবাবু একটা চেকবুক বার করে দেখায় রেহানকে যেখানে দু’লক্ষ টাকার একটা অ্যাকাউন্ট পেয়ি চেক কাটা হয়েছে প্রমার নামে। মাথায় যেন বজ্রাঘাত হল রেহানের। প্রমার বিশ্বাসঘাতকতায় মানসিক ভাবে ভেঙে পড়ে সে। প্রমার স্মৃতি মনের মধ্যে ভিড় করে আসত এই শহরে। কিছুদিন পর একটু স্বাভাবিক হয়ে সাংবাদিকতার চাকরি নিয়ে দিল্লি চলে যায় রেহান।

স্মৃতির জাল কাটিয়ে, ঢিবি থেকে নেমে গ্রামের রাস্তা ধরে এগিয়ে যায় রেহান। কাদামাটির রাস্তাটা ঢালাই হয়েছে। অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে গ্রামটার। উন্নয়নের জাঁতাকলে কাটা পড়েছে গ্রামের ঢোকার রাস্তার পাশের সেই মেহগনি গাছটা। একটা বড়ো স্টেশনারি দোকান হয়েছে সেখানে। একটু এগিয়ে দোকানের সামনেটায় গিয়ে দাঁড়াল রেহান। আচমকা একটি মেয়েকে বেরিয়ে আসতে দেখে চমকে যায়! এ কাকে দেখছে ও! যেন কুড়ি বছর আগেকার প্রমা। কিন্তু গায়ের রং শ্যামলা নয়। নিজের দিকে তাকাল রেহান। মেয়েটার গায়ের রং অনেকটা ওরই মতো। পায়ে পায়ে ওকে অনুসরণ করে গিয়ে ওদের বাড়ির দরজার সামনে দাঁড়ায় রেহান। বাড়িটা ওর চেনা। শুধু আগের তালপাতার ছাউনি দেওয়া ঘরটা এখন পাকা হয়েছে। দরজাটা খোলাই ছিল। ভেতরে ঢুকে পড়ল রেহান। মাথা নীচু করে একজন মেশিনে সেলাই করে চলেছে। পায়ের শব্দে মহিলাটি মুখ তুলতেই রেহান মুখোমুখি হল প্রমার। কয়েক মুহূর্ত নিষ্পলক দুজনেই।

প্রমার আকাশজোড়া চোখ দুটোয় আজও নিজের ছবি দেখতে পাচ্ছে রেহান। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘামের আড়ালে হালকা বলিরেখা। কালো কোঁকড়া চুলগুলো গাল দুটো ঢেকে রেখেছে। নিজেকে সামলে নিয়ে অস্ফুট গলায় রেহান বলে ওঠে, ‘প্রমা!”

প্রমা কোনও উত্তর দেয় না। শুধুই তাকিয়ে থাকে। অনেকদিনের জমা অভিমান চোখের জল হয়ে গড়িয়ে নেমে আসছে দু’গাল বেয়ে। ভিতরের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে প্রমার পাশে দাঁড়াল মেয়েটি। সেই মুখ, সেই চেহারা অবাক হয়ে দেখতে থাকে রেহান।

অপেক্ষার বাঁধ ভাঙে। প্রমা বলে উঠল, “তুমি এসেছ রেহান’! রেহান তখন সম্মোহিতের মতো তাকিয়ে আছে মেয়েটির দিকে। প্রমা বুঝতে পারে। মেয়ের কাঁধে হাত রেখে বলে, ‘অবাক হচ্ছ ওকে দেখে! ও রেশমি। আমাদের মেয়ে। মাস ছয়েক তো সংসার করেছিলাম!’

—কেন চলে এসেছিলে প্রমা?

—আমি বাধ্য হয়েছিলাম। তোমার বাবা আমাকে দিয়ে জোর করে লিখিয়ে নিয়েছিলেন আর বলেছিলেন, না লিখলে আমার বাবাকে…। তোমার বিধায়ক কাকা আর অর্থবান বাবার কাছে আমরা…!

বইয়ের ফাঁক থেকে একটা কাগজ বের করে রেহানের হাতে দিল প্রমা। বাবার সই করা সেই চেকটা দেখে কেঁদে ফেলল রেহান। প্রমার হাতের উপর হাত রেখে বলল, ‘ক্ষমা করে দিও।’

(সমাপ্ত)

বর্ষাকালের উপযোগী স্বাস্থ্যকর শাকসবজি এবং ফলমূল

সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার জন্য স্বাস্থ্যকর খাদ্য অপরিহার্য, বিশেষ করে বর্ষাকালে, যখন মানুষ বিভিন্ন ব্যাক্টেরিয়া সংক্রমণে অসুস্থ হয়ে পড়ে। অতএব, সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে বর্ষাকালে বিভিন্ন ধরনের ফল ও সবজি খাওয়া জরুরি। বাজারে বিভিন্ন ধরনের তাজা এবং মরশুমি ফল ও সবজি পাওয়া যায়, যা সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। ওজন কমানো থেকে শুরু করে রোগ প্রতিরোধ পর্যন্ত অনেক স্বাস্থ্য-উপকারিতা রয়েছে এইসব তাজা পণ্যের, তাই সেগুলি মিস করা উচিত নয়।

এখানে কিছু সবজি এবং ফলমূলের বিবরণ দেওয়া হচ্ছে, যার গুণাগুণ আপনাকে সুস্থ থাকতে এবং এই বর্ষায় আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।

করলা

বাজারে অবশ্য আপনি সারা বছর করলা পাবেন, কিন্তু এটি সাধারণত জুলাই মাসে হয়। করলা রক্তে শর্করা বজায় রাখতে সাহায্য করে, এটি ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য আদর্শ। এগুলিতে ক্যালশিয়ামও বেশি, এমনকী পালং শাকের চেয়েও বেশি। এটি ভিটামিন সি, অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট এবং খনিজ সমৃদ্ধ এবং টক্সিনগুলিকে দূরে রাখতে সাহায্য করে। এটির স্বাদ খুব ভালো নয় বটে, তবে আধা কাপ করলার জুস বর্ষাকালে অপরিহার্য।

শিম

শিম ভারতীয় পরিবারে খুব জনপ্রিয়। এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ, বি এবং কে প্লাস পটাশিয়াম, আয়রন, ফোলেট ও ক্যালসিয়ামের মতো খনিজ রয়েছে। এটি গর্ভবতী মহিলাদের জন্য ভালো।

ঢ্যাঁড়শ

ট্যাড়শ ফলনের জন্য উষ্ণ আবহাওয়ার প্রয়োজন হয় এবং বাড়তে সময় লাগে। এটি সাধারণত বর্ষাকালে সংগ্রহ করা হয় যখন এটি সবচেয়ে সতেজ থাকে। এতে প্রচুর পরিমাণে ডায়েটারি ফাইবার, ভিটামিন সি এবং এ, ম্যাগনেশিয়াম, ক্যালশিয়াম এবং আয়রন রয়েছে। এছাড়াও, ভাজা হলে এটি মুখরোচক!

বিটরুট

আমরা সবাই মাঝেমধ্যে কম হিমোগ্লোবিনের মাত্রা অনুভব করি। সমস্ত বর্ষাকালীন সবজির মধ্যে বিটরুটই একমাত্র সবজি যা হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বাড়াতে সাহায্য করে। ম্যাঙ্গানিজ, ফাইবার, ভিটামিন সি, পটাশিয়াম এবং আয়রনের মতো খনিজগুলি থাকা ছাড়াও, যাদের উচ্চ স্তরের পুষ্টির প্রয়োজন, তাদের জন্য বিটরুট একটি আদর্শ খাদ্য উৎস। রক্ত সঞ্চালন এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে এটি নিয়মিত ভাবে রস, স্যুপ বা স্যালাড হিসাবে খান। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি থাকার কারণে বিটরুট বর্ষাকালে খাওয়ার জন্য আদর্শ।

লাউ

বর্ষাকালে লাউ সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর সবজি হিসাবে বিবেচিত হয়। লাউ পরিপাকতন্ত্রকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। এতে প্রচুর পরিমাণে আয়রন রয়েছে, সেইসঙ্গে আছে ভিটামিন বি এবং সি, যা শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট হিসাবে পরিচিত। অধিকন্তু এটি একটি কম ক্যালোরি যুক্ত সবজি, যা ওজন ঠিক রাখতে সাহায্য করে।

সবুজ শাক

যে-কোনও রকম সবুজ সতেজ শাক স্বাস্থ্যরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। বর্ষাকালে পাওয়া যায় লাল শাক, সাদা শাক, পুঁই শাক, লেটুস শাক, মেথি শাক, কলমি শাক, শুশুনি শাক প্রভৃতি। আর এগুলি যেহেতু ফাইবার সমৃদ্ধ, তাই পেটের স্বাস্থ্যরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। অতএব, বর্ষাকালে অবশ্যই সবুজ-সতেজ শাকসবজি খাবেন। ব্রকোলি, মাশরুম, ক্যাপসিকাম এবং লেটুসের মতো সবজিও খাওয়া উচিত বর্ষাকালে।

আদা

আদায় রয়েছে অ্যান্টিব্যাক্টেরিয়াল, অ্যান্টিসেপটিক এবং অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি বৈশিষ্ট্য। এটি অ্যান্টিঅক্সিড্যান্টে সমৃদ্ধ এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। সর্দি-কাশি, গলাব্যথা এবং শরীরের ব্যথা উপশম করতে সাহায্য করে। চা ছাড়াও, আপনি স্যুপ এবং তরকারিতে আদা যোগ করতে পারেন।

বর্ষার ফলের গুণাগুণ

বর্ষা ভাইরাল সংক্রমণ, অ্যালার্জি এবং ম্যালেরিয়ার মতো অন্যান্য রোগ নিয়ে আসে। বাতাসের আর্দ্রতাও হজম প্রক্রিয়া ধীর করে, হজমের সমস্যা সৃষ্টি করে। তাই, বর্ষায় ফল খেলে হজমের উন্নতি করতে এবং আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করবে। তবে, বর্ষাকালে ফলগুলিকে সঠিকভাবে ধুয়ে খাওয়া উচিত। কোন কোন ফল খাবেন, রইল তার বিবরণ—

কালোজাম

কালোজামে রয়েছে ক্যালশিয়াম, যা রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে উপকারী। এছাড়াও, এই ফলটি পেটের সমস্যার সমাধানে সাহায্য করতে পারে। উপরন্তু, এই ফল রক্ত সঞ্চালন, লিভার ফাংশন এবং কিডনির কার্যকারিতা বাড়ায়। প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি এবং ফাইবার থাকার পাশাপাশি, কালোজামে রয়েছে আয়রন, যা ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করে।

লিচু

ভারত লিচু চাষের জন্য আদর্শ। কারণ, এতে জলের পরিমাণ বেশি থাকে। এই ফলের রস সর্দি, অ্যাসিড রিফ্লাক্স এবং হজমের সমস্যাগুলির মতো অসুস্থতার প্রতিকার করতে পারে। লিচু হাঁপানির রোগীদেরও সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। তাছাড়া লিচু শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিকারী হিসেবে সুপরিচিত। লিচুতে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার রয়েছে, যা অ্যাসিডিটি এবং বদহজমের বিরুদ্ধে লড়তে সহায়ক। লিচুতে থাকা ভিটামিন সি সাধারণ সর্দি-কাশি প্রতিরোধ করে। এই ফলটি বর্ষার ত্বকের সমস্যা যেমন ব্রণ এবং র‍্যাশের বিরুদ্ধেও সক্রিয়।

শসা

সারা বছর ধরে শসা চাষ করা গেলেও, বর্ষাকাল হল শসা চাষের আদর্শ সময়। শীতল জলবায়ু এবং প্রচুর বৃষ্টির জল শসা গাছের দ্রুত বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। বর্ষা ঋতুতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখতে, শসা শরীরকে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হাইড্রেশন প্রদান করে। শসা পটাশিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, কপার এবং ভিটামিন এ, বি, সি এবং কে সমৃদ্ধ।

খেজুর, বাদাম, আখরোট এবং কাজু

খেজুর, বাদাম, আখরোট এবং কাজু খাওয়ার জন্য যে-কোনও ঋতুই উপযুক্ত সময়। বাদামে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ও খনিজ রয়েছে এবং রিবোফ্লাভিন এবং নিয়াসিন উভয়ই সমৃদ্ধ। এগুলির অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট বৈশিষ্ট্য আপনার কোশ সুস্থ রাখে।

ডালিম

ডালিম পুষ্টি এবং অ্যান্টিঅক্সিড্যান্টে সমৃদ্ধ যা অসুস্থতা প্রতিরোধ করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা উন্নত করে। ডালিম ফলের ভিটামিন বি লোহিত রক্ত কণিকার উৎপাদন বাড়ায় এবং রক্ত সঞ্চালন সহজ করে।

নাশপাতি

নাশপাতি ভিটামিন সি সমৃদ্ধ, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। এটি বর্ষায় বিশেষ ভাবে সহায়ক কারণ, ১টি নাশপাতিতে আপনার দৈনিক ভিটামিন সি পুষ্টির চাহিদার প্রায় ১২ শতাংশ থাকে।

আপেল

আপেল ভিটামিন এ, বি, বি-টু, সি এবং ফসফরাস, আয়োডিন, ক্যালশিয়াম এবং আয়রনের মতো খনিজগুলির একটি সমৃদ্ধ উৎস। এই ফলটি সারা বছর আপনার শরীরের প্রায় প্রতিটি অঙ্গের জন্য সহায়ক।

চেরি

চেরি হল মরশুমি ফল যা অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট সমৃদ্ধ। এটি শরীরকে সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে এবং প্রদাহ কমাতে সহায়ক করে তোলে। বর্ষাকালের ফলগুলি কাঁচা খেতে পারেন, জুস হিসাবেও খেতে পারেন কিংবা আপনি কোনও ডেজার্টে যোগ করতে পারেন।

আম

হিমসাগর, দশেরি, তোতাপুরি, কেশর, চৌসা এবং ল্যাংড়া — সব আম-ই পাওয়া যায় জুন থেকে জুলাই মাসে। ১ কাপ আমের রস আপনার দৈনিক ভিটামিন সি এর ১০০ শতাংশ সমান এবং এতে কোনও সোডিয়াম, কোলেস্টেরল বা চর্বি নেই। আমরা জানি ভিটামিন সি রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা বাড়ায়।

তবে, ফুটপাথে বিক্রি হওয়া কাটা ফল এবং ফলের রস খাওয়া উচিত নয়, কারণ সেগুলি জীবাণুমুক্ত না-ও হতে পারে। এমনকী বাড়িতেও ফল কাটার পর খুব বেশি দেরি করে খাওয়া উচিত নয়।

দেশব্যাপী নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা আবশ্যক

নারী এখন আর অবহেলার সামগ্রী নয় কিংবা মুখ বুজে হিংসার বলি হওয়ার নয়। নারী এখন শারীরিক কিংবা মানসিক সবদিক থেকে শক্তিধারী। কারণ, আজ তারা শিক্ষিতা, আর্থিক ভাবে সাবলম্বী এবং লড়াই করে বাঁচতে জানে। অনেক ক্ষেত্রে তো ছেলেদের পিছনের সারিতে রেখে দিয়েছে মেয়েরা।

শিল্প-সংস্কৃতি এবং সভ্যতার অনন্য বৈশিষ্ট্যের জন্য ভারত বিশেষ ভাবে পরিচিত সারা বিশ্বে। প্রত্যেক ভারতবাসী এরজন্য গর্ব অনুভব করেন। আর এই অনন্য বৈশিষ্ট্যের জন্য বেশিরভাগ কৃতিত্বের দাবীদার ভারতীয় নারীরা। কারণ, ‘ভারতীয় নারী’ এই শব্দ দুটি শুনলেই প্রেম, করুণা, দয়া, ত্যাগ, সেবা প্রভৃতি ভাবমূর্তি ফুটে ওঠে চোখের সামনে। আসলে, ভারতীয় নারী মানেই সৌন্দর্য এবং কোমলতা-র মিশ্রণ। এইসব গুণ নারীরা পেয়েছেন প্রকৃতিগত ভাবেই।

বেশিরভাগ পরিবারে দেখা যায়, নারী তার সমস্ত গুণ এবং শক্তি দিয়ে পরিবারকে সুখময় করতে চায়। প্রাকৃতিক নিয়মেই নারীরা সংসারের হাল ধরেন শক্ত হাতে। এরজন্য তারা অনেক সময় আত্মসুখও বিসর্জন দিয়ে থাকেন। তাই, নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে, মনিপালসিগনা হেলথ ইন্স্যুরেন্স ভারতে ১০,০০০ মহিলা উপদেষ্টা নিয়োগের জন্য মহিলা উপদেষ্টা প্রোগ্রাম চালু করেছে। ভারতে স্বাস্থ্য বীমা উপদেষ্টা হিসাবে মহিলাদের নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এই সংস্থা। আসলে এর উদ্দেশ্য, দেশব্যাপী নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা। কোম্পানি বিভিন্ন রাজ্যে আর্থিক এবং স্বাস্থ্য বীমা প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নিয়ে ভারত জুড়ে ১০,০০০ মহিলা উপদেষ্টাদের অন-বোর্ড করার পরিকল্পনা করেছে।

মনিপালসিগনা বীমা সংস্থার চিফ মার্কেটিং অফিসার স্বপ্না দেশাই প্রসঙ্গত জানিয়েছেন, ‘দেশব্যাপী নারী উপদেষ্টা প্রোগ্রামেরে লক্ষ্য ১০,০০০ নারীদের স্বাস্থ্য বীমা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ করা। এই উদ্যোগটি বীমা ইন্ডাস্ট্রিতে নারীদের অনন্য শক্তি এবং প্রতিভাকে কাজে লাগানোর জন্য একটি বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গির অংশ। মহিলারা তাদের পরিবারের স্বাস্থ্য রক্ষাকারী এবং তাদের পরিবারের সুস্থতা নিশ্চিত করেন। এই উদ্যোগের উপর মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করে, আমরা শুধুমাত্র বৈচিত্র্য এবং অন্তর্ভুক্তির প্রচারই করছি না বরং সেই সব নারীদের জন্য সুযোগও তৈরি করছি, যারা সবেমাত্র তাদের কর্মজীবন শুরু করছেন বা যারা আবার শুরু করতে চাইছেন। আমরা নারীদের ক্ষমতায়নের জন্য নিবেদিত রয়েছি এবং তাদের ভূমিকা পালনের জন্য প্রয়োজনীয় সাহায্য করার প্রস্তুতি নিয়েছি। আমাদের লক্ষ্য হল, তাদের বীমা ইন্ডাস্ট্রিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে সাহায্য করা।’

উদ্যোগটি শুরু করতে মনিপালসিগনা হেলথ ইন্স্যুরেন্স সম্প্রতি কলকাতায় একটি মহিলা উপদেষ্টা প্রোগ্রাম ‘নয়ি শুরুয়াত, এক্সপার্ট কে সাথ’ আয়োজন করেছিল এবং এর অংশ হিসাবে প্রায় ১,৫০০+ মহিলা উপদেষ্টা নিয়োগ করার পরিকল্পনা করছে।

এই মহিলা উপদেষ্টা উদ্যোগের লক্ষ্য হল–স্বাস্থ্য বীমা উপদেষ্টা হওয়ার জন্য মহিলাদের শিক্ষিত, প্রশিক্ষণ এবং ক্ষমতায়নের জন্য পরিকল্পিত একটি এন্ড-টু-এন্ড প্রশিক্ষণ, সহায়তা এবং সার্টিফিকেশন প্রোগ্রাম অফার করা। এই ইভেন্টে ইন্ডাস্ট্রি এক্সপার্টসরা উপস্থিত ছিলেন, যার মধ্যে মনিপালসিগনা হেলথ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির চিফ মার্কেটিং অফিসার স্বপ্না দেশাই এবং ইস্ট জোনাল হেড রোহিত মিত্তল ছিলেন। ইভেন্টটিতে ‘উইমেন অফ ওয়ান্ডার’ সেগমেন্টের মাধ্যমে নারী উপদেষ্টাদের ব্যতিক্রমী অবদান এবং সফল কর্মসফর উদযাপন করা হয়েছে।

এই উদ্যোগটি প্রোডাক্টের জ্ঞান, সেলস টেকনিক্স  এবং কাস্টমার সার্ভিস স্কিলস সহ স্বাস্থ্য বীমার বিভিন্ন দিক কভার করবে। লক্ষ্য হল, এই নারীদের প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাসের সাথে ক্ষমতায়ন করা, যাতে তারা তাদের নতুন ভূমিকায় এগিয়ে যেতে পারে এবং সফল ও পরিপূর্ণ কেরিয়ার গড়ে তুলতে পারে। উপরন্তু, প্রশিক্ষণ এবং সার্টিফিকেশন প্রোগ্রাম গ্রাহকের চাহিদা সনাক্তকরণ, নেটওয়ার্কিং, গ্রাহক-কেন্দ্রিক পদ্ধতি এবং অভিজ্ঞতা সহ কার্যকর সেলস স্ট্রাটেজিগুলিকে কভার করবে। পলিসি হোল্ডারদের সঙ্গে কার্যকর ভাবে যোগাযোগ করার জন্য, অংশগ্রহণকারীদের ব্যতিক্রমী গ্রাহক অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করতে যোগাযোগ, সহানুভূতি এবং সমস্যা সমাধান সহ প্রয়োজনীয় দক্ষতার উপর শিক্ষিত করা হবে বলে জানানো হয়েছে।

মহিলা উপদেষ্টা প্রোগ্রাম স্বাস্থ্য বীমা সেক্টরে সাফল্য এবং ক্ষমতায়নের দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ চিহ্নিত করে৷ ১০,০০০ মহিলা নিয়োগের দেশব্যাপী লক্ষ্য নিয়ে, সারা ভারত জুড়ে শিল্প এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে স্থায়ী প্রভাব ফেলতে চলেছে৷

চমকপ্রদ বিষয় নিয়ে মুক্তি পেতে চলেছে ‘নীরব মৃত্যুদণ্ড’ ছবিটি

সন্তানের মৃত্যু, তার তদন্ত এবং আদালতে বিচারপর্ব—এই বিষয় নিয়েই তৈরি হয়েছে ‘নীরব মৃত্যুদণ্ড’ শীর্ষক একটি ছবি। ‘Cine Verite Studios’ নিবেদিত, এই ছবিটি প্রযোজনা করেছেন বাণী চৌধুরি এবং ছবিটি পরিচালনা করেছেন সৌমিক চৌধুরি।

‘নীরব মৃত্যুদণ্ড’ ছবিটি প্রসঙ্গে পরিচালক এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছেন, ‘এ এক অদ্ভুত সময়ে দাঁড়িয়ে আছি আমরা। অতিমারি-র কারণে সারা বিশ্ব তোলপাড়। জীবন যেখানে অনিশ্চিত, জীবিকা সেখানে শুধুমাত্র টিকে থাকার অবলম্বন মাত্র। অরিত্র তিয়াসা আর তাদের একরত্তি পাভেলের ছোট্ট নৌকাটাও এই ঝড়ে বেসামাল। অস্থির জীবন আরও অস্থিরতর করে দেয়, দুর্বল হয়ে পড়ে সম্পর্কের বুনিয়াদ।’

ছবির কাহিনি সম্পর্কে পরিচালক আরও জানিয়েছেন, ‘তিয়াসার জীবনে ঝড়ো হাওয়ার মতো আসে এক তরতাজা যুবক জায়েদ। দৈনন্দিন  দম বন্ধ জীবনে সেই এক ঝলক মুক্তির উদ্দাম আবেগ ভাসিয়ে দেয় তিয়াসাকে নিষিদ্ধ পরকীয়ার নেশায়। হঠাৎ নেমে আসে চরম বিপর্যয়। এরই মধ্যে ছোট্ট পাভেলের আকস্মিক মৃত্যু, তাও আবার বিষক্রিয়ায়। চিকিৎসক রাইয়ান রায়ের রিপোর্টের ভিত্তিতে সন্তানের হত্যার অভিযোগে মা ওঠেন কাঠগড়ায়। ইথিলিন গ্লাইকল পয়জনিং। সরকারি উকিলের ক্ষুরধার যুক্তি আর রায়ান রায়ের ফরেনসিক রিপোর্ট যখন তিয়াসার মৃত্যুদন্ড নিশ্চিত করে তুলেছে, তখন তার পক্ষে শহরের অন্যতম গ্ল্যামারাস আধুনিক ও দক্ষ ডিফেন্স আইনজীবি অদিতি বোস হাজির করেন জেনেটিক বিশেষজ্ঞ ডক্টর অনলাভ রায় চৌধুরীকে।’

কিন্তু কী ঘটবে এরপর? হ্যাঁ, এরপর যা ঘটবে, তা আরও চমকপ্রদ। ইথিলিন গ্লাইকল পয়জনিং-এর সঙ্গে হুবহু মিলে যায় জন্মগত একটি অসুখ মিথাইল মেলোনিক এসিডিমিয়া। সুতরাং পাভেলের মৃত্যুর কারণ বিষক্রিয়া নাও হতে পারে। বেনিফিট অফ ডাউট-এ জামিন পায় তিয়াসা।

কিন্তু এ কোন পৃথিবী ? মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে তার খুব কাছের পরিচিত দুনিয়াই এখন তার দিকে তাকিয়ে আছে চরম অবিশ্বাস আর সন্দেহের দৃষ্টিতে। ব্যতিক্রম শুধু তার স্বামী অরিত্র। নিজেদের সন্তানের সম্ভাব্য হত্যাকারিনীর স্ত্রী-র পাশে তার অনড় অবস্থান বিস্মিত করে সকলকে।

ইতিমধ্যে ঘটনা মোড় নয় অন্যদিকে। জেলে থাকতে তিয়াসা জানতে পারে যে, সে দ্বিতীয়বারের জন্য অন্তঃসত্ত্বা। যথাসময়ে দ্বিতীয় সন্তান জন্মগ্রহণ করে এবং আবার সেই শিশুর অসুস্থতার ঘটনার পুনরাবৃত্তি। এবার সতর্ক পরিবার অনতিবিলম্বে হাসপাতালে ভর্তি করায় ও শিশুটি প্রাণ রক্ষা পায়। অমোঘ নিয়তির মতো পরীক্ষার রিপোর্ট আসে, অসুস্থতার কারণ ইথিলিন গ্লাইকল পয়জনিং। আবার সন্তান হত্যা, আবার প্রয়োজন হয় অকাট্য প্রমাণের। লায়ন রায়ের পয়জনিং তথ্য-প্রমাণে সমাজ শিউরে ওঠে মাতৃত্বের এই নৃশংস রূপ দেখে।

 

তিয়াসার জামিন নাকচ হয় এবং পাভেলের হত্যার কারণে তার মৃত্যুদণ্ডের সাজা হয়। সবকিছু শেষ হয়েও কিছু যেন বাকি থাকে। একটা ইমেইল আসে রায়ান রায়ের কাছে। সেই মেইল-এ জানা যায়, এক ভয়াবহ ষড়যন্ত্রের কথা। কীভাবে সুপরিকল্পিতভাবে প্লট করে এই মৃত্যু ঘটানো। কে দায়ী এই ছোট্ট শিশুটির মৃত্যুর জন্য? উত্তর পাওয়ার জন্য ‘নীরব মৃত্যুদণ্ড’ ছবিটি দেখার অনুরোধ করেছেন পরিচালক সৌমিক।

‘নীরব মৃত্যুদণ্ড’ ছবির বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন সৌম্যদেব ভট্টাচার্য, মহুয়া দাশগুপ্ত, সংগীতা মুখোপাধ্যায়, রাজর্ষি মুখোপাধ্যায়, ঐশি রায়, সুকান্ত চক্রবর্তী প্রমুখ।

পরিচালক নিজেই লিখেছেন এই ছবির কাহিনি এবং চিত্রনাট্য। সিনেম্যাটোগ্রাফার আফ্রিদি এবং অভিরাজ। সম্পাদনা করেছেন সুদীপ ম্রিধা। ছবিতে ব্যবহার করা হয়েছে কয়েকটি রবীন্দ্রসংগীত। গানগুলি গেয়েছেন উৎসব দাস এবং বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। সংগীত আয়োজনে ছিলেন পরাগ বরণ। পরিচালকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগামী মাসের মধ্যে বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাবে ছবিটি।

‘হেমন্তের অপরাহ্ন’ ছবির ট্রেলার লঞ্চ করা হল সম্প্রতি

গভীর, মনস্তাত্ত্বিক এবং বলা যায় কিছুটা জটিল বিষয় নিয়েই সিনেমা তৈরি করেন অশোক বিশ্বনাথন। এবারও হয়তো এমনই একটি মর্মস্পর্শী বিষয়ের সিনেমা দেখবেন দর্শকরা। কারণ, অশোক বিশ্বনাথনের পরিচালনায় তৈরি হওয়া ‘হেমন্তের অপরাহ্ন’ ছবির বিষয়ও তেমনই সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলেছে। এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে স্বয়ং অশোক জানিয়েছেন, ‘এই চলচ্চিত্রে এমন একটি বিষয়কে তুলে ধরেছি, যা আপনাদের অবসরের পরের জীবন, মৃত্যুর পরের জীবন নিয়ে যেমন ভাবাবে, ঠিক তেমনই, আকাঙ্ক্ষা, হতাশা, ভার্চুয়াল বাস্তবতা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে পরিপূর্ণ সমাজের পরিবর্তনের মধ্যেও কীভাবে বেঁচে আছেন, সে সম্পর্কিত প্রশ্ন জাগাবে মনে। ছবির পটভূমিতে লকডাউন এবং ইউক্রেন তথা গাজায়  যুদ্ধের ভয়ঙ্কর ফলাফল দেখতে পাবেন।’

যাইহোক, কলকাতা-র মিন্টো পার্ক অঞ্চলের একটি অভিজাত ক্লাব রেস্তোরাঁয়, ‘হেমন্তের অপরাহ্ন’ ছবির ট্রেলার লঞ্চ করা হল সম্প্রতি। পরিচালক অশোক বিশ্বনাথন ছাড়াও, এই ট্রেলার লঞ্চ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এই ছবির প্রযোজক অমিত আগরওয়াল এবং অভিনেতা-অভিনেত্রীরা।

‘হেমন্তের অপরাহ্ন’ ছবির প্রযোজক অমিত আগরওয়াল প্রসঙ্গত জানিয়েছেন, ‘এই ছবিটি প্রযোজনা করতে পেরে আমি ভীষণই খুশি। ছবিটির গল্প, সামাজিক এবং মানসিক বার্তা, সর্বোপরি অশোক’দা যেভাবে ছবিটি পরিচালনা করেছেন, তা আমার খুব পছন্দ হয়েছে। তাঁর আগের গুরুত্বপূর্ণ  কাজগুলির মতো এই ছবিটিও একই স্বাদ দেবে বলে আমার মনে হয়। যুবসমাজ এবং প্রবীণ সমাজের কাছে এক নতুন বার্তা দিতে চলেছে এই ছবি। এটি একটি পারিবারিক চলচ্চিত্র, এতে প্রত্যেককে অনুপ্রাণিত ও প্রভাবিত করার মতো গল্প এবং বার্তা রয়েছে। অনেকদিন পর ছবির ট্রেলার-এডিটর হিসেবে আমার কাজ করাটাও ছিল অসাধারণ অভিজ্ঞতা। আমি আশা করি দর্শকরা ট্রেলারটি পছন্দ করবেন এবং প্রেক্ষাগৃহে ছবিটি দেখতে আগ্রহী হবেন।’

এই উপলক্ষে, ‘হেমন্তের অপরাহ্ন’ ছবির অন্যতম মুখ্য অভিনেতা ঋতব্রত মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ‘এই ছবির অংশ হতে পেরে আমি সত্যিই রোমাঞ্চিত। এমন একটি চলচ্চিত্র যা জীবনের জটিলতাকে সুন্দরভাবে ধারণ করে এবং দর্শকদের সঙ্গে গভীরভাবে অনুরণিত হওয়ার সুযোগ দেবে।’

ছবির মুখ্য অভিনেত্রী অনুশা বিশ্বনাথন জানিয়েছেন, ‘হেমন্তের অপরাহ্ন’ মানুষের আবেগ এবং সম্পর্কের হৃদয়গ্রাহী অন্বেষণ এবং আমি এই অসাধারন ছবিতে আমার চরিত্রটিকে প্রাণবন্ত করতে পেরে সম্মানিত বোধ করছি।’

অমিত এর আগে ‘এম. এস ধোনি- দ্য আনটোল্ড স্টোরি’ এবং কঙ্গনা রানওয়াত অভিনীত ‘সিমরান’-এর মতো চলচ্চিত্রের আংশিক প্রযোজক ছিলেন। তিনি  প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা গৌতম ঘোষ পরিচালিত ‘রাহগির’ নামে একটি ছবিও প্রযোজনা করেছেন, যা এখনও মুক্তি পায়নি।

অনুশা বিশ্বনাথন এবং ঋতব্রত মুখোপাধ্যায় ছাড়াও, এই ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন সত্যপ্রিয় মুখোপাধ্যায়। অন্য একটি বলিষ্ঠ পার্শ্ব  চরিত্রে রয়েছেন বিদীপ্তা চক্রবর্তী। ছবিতে লৌকিক গানের সুর করেছেন গৌরব চট্টোপাধ্যায়। সিনেমাটোগ্রাফি-তে ছিলেন জয়দীপ ভৌমিক এবং সম্পাদনা করেছেন জাতীয় পুরস্কার বিজয়ী অর্ঘ্যকমল মিত্র। ‘আদর্শ টেলিমিডিয়া এবং এভি প্রোডাকশন’-এর পক্ষে অমিত আগরওয়াল এবং অশোক বিশ্বনাথন প্রযোজনা করেছেন এই ছবিটি। প্রযোজকরা জানিয়েছেন, ১২ জুলাই, ২০২৪-এ বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাবে ‘হেমন্তের অপরাহ্ন’।

তালিত গড়ের ঢিবি (পর্ব-০১)

মফস্সলের বাইরে এই জায়গাটা এখনও আদিম রয়ে গেছে। আদিগন্ত বিস্তৃত গাছের সারির নীচে মখমলের মতো পুরু ঘাসে ভর্তি শান্ত নিরিবিলি নির্জন এক স্থান। অনেকগুলি ছোটো ছোটো ঢিবি অর্ধচন্দ্রের মতো বিস্তৃত সমস্ত এলাকা জুড়ে। ঢিবির পশ্চিমদিকে খনন করা পরিখার মাঝে বাঁধ দিয়ে পুকুর তৈরি করে নেওয়া হয়েছে। উপর থেকে দেখলে অনেকটা ঘোড়ার নালের মতো দেখায়। অপূর্ব তার সৌন্দর্য। একটু গভীর ভাবে নিরীক্ষণ করলে বোঝা যায় শত্রু বাহিনীর আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যেই এমন নিরাপত্তা বেষ্টনীর নির্মাণ করা হয়েছিল।

সবুজ ধানে ভরা জমির আল পেরিয়ে ঢিবিতে উঠতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠল রেহান। একটা বড়ো গাছের নীচে গিয়ে বসে পড়ল। এত হাঁপিয়ে গেল কেন ও! বয়স কি তাহলে ওর ক্ষমতার উপর থাবা ফেলছে? ভাবছিল রেহান। এদিকে সন্ধে নেমে এসেছে। আকাশে গোলাকার রুপোর থালার মতো চাঁদ উঁকি দিচ্ছে গাছের ফাঁক দিয়ে। এলোমেলো ভাবে বয়ে চলা বাতাস গাছের পাতায় ধাক্কা খেয়ে শনশন্ শব্দে ঝরে পড়ছে নীচের দিকে।

শরতের মৃদু হাওয়ায় মৃত হলুদ পাতাগুলো উড়ে এসে পড়ছিল রেহানের মাথার উপরে। চোখ বন্ধ বেশ কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিয়ে উঠে পড়ল সে। আস্তে আস্তে হাঁটতে শুরু করল ঢিবিটার উপরে যাওয়ার জন্য। অন্ধকার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চাঁদের আলো আরও স্পষ্ট হচ্ছিল। মাথার উপরে ঘন গাছের ডালপালার আস্তরণ ভেদ করে চুঁইয়ে চুইয়ে তিরের ফলার মতন পড়ছিল চাঁদের আলোর শিখা। সেই আলোয় নীচের ঘন সবুজ ঘাসের ডগাগুলো ঝিকিয়ে উঠছিল ছুরির ফলার মতন। চাঁদের আলো আর গাছপালা নিয়ে ঢিবিটায় সুন্দর মায়াবী পরিবেশ। বুনো গাছের গন্ধ আর নির্জনতায় ভরা এই ঢিবিটা যেন পৃথিবীর আদিমতা এখনও শেষ হয়ে যেতে দেয়নি।

ঢিবিটার উপরে গিয়ে খানিকটা আকাশের দেখা পেল রেহান। এখানে বেশ খানিকটা ফাঁকা জায়গা। ঢিবির আশে পাশের ঢালু জায়গায় বড়ো বড়ো গাছপালা দিয়ে ঢাকা থাকলেও এখানে গাছ নেই। আকাশের দিকে তাকিয়ে মোহিত হয়ে গেল রেহান। অপরূপ জ্যোৎস্নার রূপ। মেঘমুক্ত আকাশ থেকে যেন জ্যোৎস্নার ফুল ঝরে পড়ছে। রূপকথার পরিবেশ তৈরি হয়েছে সমস্ত চরাচর জুড়ে। চাঁদের আলোর শুভ্রতায় মনে হচ্ছে যেন এক্ষুনি আকাশ থেকে রূপকথার পরিরা ডানা মেলে নেমে আসবে। সমস্ত আকাশজুড়ে খণ্ড খণ্ড রূপোলি মেঘের দলের আনাগোনা। বহুদিন আকাশের দিকে তাকায়নি রেহান। আজকের রাতের আকাশের দৃশ্য দেখে মন ভালো হয়ে গেল ওর। মনের মধ্যে জমে থাকা কষ্টটা আচমকা গলে জল হয়ে গেল। মনটা বেশ ফুরফুরে লাগছিল।

ঢিবির উপর থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সামনের পরিখাটা। স্থির জলে ভাসছে পূর্ণিমার চাঁদ। ঢিবির চুড়ো থেকে ধীরে ধীরে নীচের দিকে নামছিল রেহান। পরিখার কাছাকাছি পৌঁছোতেই চোখ চলে গেল একটু দূরে ঢিবি লাগোয়া গ্রামটির দিকে। গাছপালায় ঘেরা সবুজ গ্রামটায় আধুনিকতার ছাপ। চাঁদের আলোয় গাছপালার ফাঁক ফোঁকর দিয়ে দেখা যাচ্ছে বেশ কয়েকটি পাকা বাড়ি।

এই গ্রামটা একসময় খুব প্রিয় ছিল রেহানের। অনুন্নত এই গ্রামের মানুষগুলো ছিল খুব সহজ সরল প্রকৃতির। বেশির ভাগ মানুষই ছিল জেলে সম্প্রদায়ের। ঢিবি লাগোয়া পুকুরে মাছ চাষ করত ওরা। এছাড়া অন্যের পুকুরে ভাগে মাছ চাষ আর বর্ষার সময় কাছাকাছি বাঁকা আর দামোদর নদে গিয়ে মাছ ধরেই জীবিকা অর্জন করত। গাছ দিয়ে ঘেরা ছোটো ছোটো তালপাতা আর খড়ের ছাউনি দেওয়া ঘরগুলো খুব ভালো লাগত রেহানের। আর ভালো লাগত প্রমাকে।

প্রমার সাথে প্রথম পরিচয় এই তালিত গড়ের ঢিবিতেই। রেহান তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস কমিউনিকেশনের ছাত্র। শহর জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রাচীন মন্দির, জনপদ, ঢিবিগুলোর অতীত কথকতা নিয়ে প্রচণ্ড আগ্রহ। সময় পেলেই বেরিয়ে পড়ত ক্ষেত্র সমীক্ষায়। এই বিষয়ে ওর বেশ কিছু গবেষণামূলক লেখা প্রকাশিত হয়েছিল বহুল প্রচারিত সংবাদপত্রে।

মফস্সলের এত কাছে যে একটা ঐতিহাসিক ঢিবি আছে জানা ছিল না রেহানের। বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট্রাল লাইব্রেরির রেফারেন্স সেকশনের রিডিং রুমে কথা প্রসঙ্গে বাংলা বিভাগের ইন্দ্রর কাছ থেকে ও তালিত গড়ের ঢিবিটার সন্ধান পায়। সময় করে একদিন রওনা দেয় তালিত গড়ের ঢিবির উদ্দেশ্যে। বাইকে করে নবাবহাট মোড় পেরিয়ে ডানদিক ন্যাশনাল হাইওয়ে দিয়ে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে বাঁদিকের রাস্তা ধরে পৌঁছে যায় তালিত গড়ের ঢিবিতে।

শীতকাল, মাঠের ধান কাটা হয়ে গেছে। একটু দূরে উঁচু উঁচু গোলাকার ঢিবিগুলো দেখা যাচ্ছে। সরু আল পথ ধরে তবেই পৌঁছানো যাবে ঢিবিতে। বাইক নিয়ে যাওয়া ঝুঁকির হয়ে যাবে। অগত্যা আলপথ ধরে হাঁটতে শুরু করল রেহান। কিছুটা হেঁটে পৌঁছে যায় ঢিবিতে। শীতের দুপুরের কমলা রঙের সূর্যের আলো তখন ছড়িয়ে পড়েছে সমস্ত ঢিবিজুড়ে। রেহান ঘুরে ঘুরে দেখছিল পুরো ঢিবিটা। এখানে আসার আগে বইপত্র ঘেঁটে ঢিবিটার সম্বন্ধে কিছুটা ধারণা হয়েছিল রেহানের। এছাড়া ইন্দ্রর কাছ থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও পেয়েছিল। রেহান যেখানেই ক্ষেত্রসমীক্ষায় যায় তার আগে সেই জায়গাটার সম্বন্ধে বেশ পড়াশোনা করেই যায়। এলাকার লোকেদের সাথেও কথা বলে। বিশেষ করে বয়োঃজ্যেষ্ঠদের সাথে। এতে অনেক নতুন তথ্য ওর হাতে আসে যা পরবর্তী কালে ওর লেখার রসদ জোগায়।

এখানে এই ঢিবিতে এখনও পর্যন্ত একজন মানুষের সাথেও ওর দেখা হয়নি। চারিদিক শুনসান। সবুজ পাতার আড়াল থেকে পাখিদের কিচির মিচির শব্দে প্লাবিত সমস্ত ঢিবি। সেই সুরের অনুরণন রেহানের কানের মধ্যে দিয়ে মনের গভীরে প্রবেশ করছে। অদ্ভুত এক ভালোলাগায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল সে। ঢিবির পরিবেশটা আচমকাই সম্মোহিত করে ফেলল ওকে। যেন কয়েকশো বছরের আগের এক আদিম পৃথিবী। যেখানে গাছপালা আর পশুপাখির রাজত্ব।

(ক্রমশ… )

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব