তমসারেখা (শেষ পর্ব)

পরদিন আমরা হালকা ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়ে পড়লাম। অভিদা আফটারনুন সেশনে অফিস থেকে সরাসরি এসে জয়েন করবে। বেনাচিতি মার্কেটে দু’বার ফুচকা খেয়ে ফুটপাত ধরে হাঁটছি আর হা হা করে হাসছি। হঠাৎ অভিদার গাড়ি ঘ্যাঁচ করে ব্লেক মেরে দাঁড়িয়ে গেল। ড্রাইভার নেমে আমাদের হাত থেকে প্যাকেটগুলো নিয়ে ডিকিতে রাখল। আমরা হুড়মুড় করে পিছনের সিটে বসে গেলাম। গাড়ি বেশ কিছুটা গিয়ে একটা সুন্দর পার্কের সামনে থামল। নেমে দেখি একটা নামি রেস্তোরাঁ। সবাই হই হই করে ভিতরে ঢুকলাম। ওরা দুই বোন ওয়াশরুমে গেলে, অভিদা আমায় দেখাল, একটা রাস্তা সোজা বিশাল শপিং মলে মিট করেছে। সেখানে সব চোখধাঁধানো শোরুম। অভিদা ফিসফিস করে আমার কানের কাছে মুখ এনে বলল, ‘সারপ্রাইজ আছে।”

জমিয়ে মোগলাই লাঞ্চ সেরে আমরা শপিং মলে ঢুকলাম। এবার অভিদা হাটে হাঁড়ি ভেঙে বলল, ‘আমি আমার সুন্দরী স্ত্রী-কে একটি হিরের সেট প্রজেন্ট করব। তোমরা সেটা পছন্দ করে দেবে।’ টাপুর আর আমি লাফিয়ে উঠলাম। টুপুর কিন্তু একদম উলটো সুর গাইল। বলল, ‘কী দরকার অভি, এত খরচ করে দামি গিফট দেবার; সত্যিই চাই না।’

টাপুর বলল, ‘দেখলি বস; বর দিতে চাইছে বউ নিচ্ছে না। ওহ, পুরো কেস জন্ডিস!”

দোকানে ঢোকামাত্র কোক-এর গেলাস এগিয়ে ধরল নীল বসনা এক সুন্দরী। ম্যানেজার সায়ন্তিকা এগিয়ে এসে হ্যান্ডশেক করল অভিদার সঙ্গে। ওরা সবাই পূর্ব পরিচিত। কারণ অভিদা বিয়ের সব গয়না এখান থেকেই কিনেছিল, তাই খুব খাতির। আমার আবার গয়না-গাটিতে বিশেষ আকর্ষণ নেই। কিছুক্ষণ দেখে আমি সোফায় বসে কোকে সিপ দিয়ে ম্যাগাজিনের পাতা ওলটাতে লাগলাম।

আমি জরিপ করছি ম্যানেজার মেয়েটি ভাবছে তার টার্গেট রিচ করতে হলে এই ‘মেড ফর ইচ আদার’ কাপলকে বধ করতেই হবে। নামতার মতোন বিভিন্ন ডিসকাউন্টের টোপ এগিয়ে দিচ্ছে। মাঝে মাঝে টাপুর আমার দিকে কটমট করে তাকাচ্ছে। অবশেষে মিয়া-বিবির পছন্দ হল একটা সেট। অপূর্ব সুন্দর পেন্ডেন্ট আর ম্যাচিং কানের দুল। পেন্ডেন্টের মাঝখানে একটা মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো ছোট্ট নীলা, যার চারপাশ হীরককুচি শোভিত। পুরো সেটটা পরে টুপুর-কে ঠিক পরীর মতো লাগছিল। আমি আবার যথাস্থানে গা হেলিয়ে দিলাম। মনে মনে ওই ম্যানেজারের তারিফ না করে পারলাম না। অভিদা ক্লিন বোল্ড। টাপুর টুপুর দু’জনেই ফিল্ডিং করে অভিদা কে বাঁচাতে চেষ্টা করেছিল। কিন্তু যে হারবে ঠিক করে আছে, তাকে কে বাঁচায় !

ঘড়ির কাঁটা সাতটা ছুঁতে চলল, আমি গার্জেনের মতো তাড়া লাগিয়ে ওয়াশরুম ঘুরে এসে কাউন্টারে ওদের কাউকে দেখতে পেলাম না। একটু পরে টাপুর ছুটে এসে বলল, “টুষ্কা তোর কাছে ক্যাশ হবে? প্রচুর টাকার বিল হয়েছে। এই মুহূর্তে এত ফান্ড নেই অভিদার৷’ বললাম, “আইটেম কমিয়ে দে, বিল হুহু করে নেমে যাবে।” তাকিয়ে দেখি টাপুরের চোখভর্তি জল।

টাপুর নিচু স্বরে বলল, “ওরা বলছে টুপুর ওই সেটটা ছাড়া আরও একটা ব্রেসলেট নিয়েছে।’ শুনে আমার মাথাটা চোঁ করে একটা চক্কর দিয়ে উঠল। কোনও মতে সামলে ফ্লোর ম্যানেজারের ঘরে ছুটলাম। গিয়ে দেখি টুপুর সিদ্ধের শাড়ির আঁচলের কোনা কামড়ে প্রায় ছিঁড়ে ফেলেছে। অভিদা প্রাণপণে বোঝাচ্ছে, “বিশ্বাস করুন ম্যাম, আমার মিসেস এমন কাজ করতেই পারে না, নেভার। নিশ্চিত ভুল হচ্ছে।’’

অভিদার কাছে গিয়ে বললাম, “তুমি আমার কার্ডটা ইউজ করো।’ তখনই সেই টার্গেট ফিক্স করা ম্যানেজার প্যাঁচার মতো মুখ করে বলল, ‘উইথ অল রেসপেক্ট স্যার, এতক্ষণ কনসিডার করেছি। প্লিজ লুক থ্রু দ্য ভিডিও ফুটেজ অ্যান্ড সি ইট থরোলি।”

ফুটেজে দেখা যাচ্ছে, টাপুর আমার কাছে এসেছে, আমরা কথা বলছি। অভিদা ফোনে ক্যালকুলেট করছে আর টুপুর কোনওদিকে না তাকিয়ে ব্রেসলেটটা ওর হ্যান্ড ব্যাগে ভরে ফেলল। সেই দৃশ্য দেখে অবাক বিস্ময়ে অভিদা থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে ধপাস করে চেয়ারে বসে পড়ল। ততক্ষণে দু’জন লেডি সিকিউরিটি চলে এসেছে। তাই দেখে ঘাবড়ে গিয়ে টাপুর ম্যানেজার-সহ সবাইকে বোঝাতে চেষ্টা করল, “প্লিজ পার্ডেন অ্যাজ মাই সিস্টার ইজ আ ক্লেপ্টোম্যানিয়াক পেশেন্ট। শি ইজ আন্ডার ট্রিটমেন্ট।’’

এটা শুনে অভিদা চিৎকার করে বলল, ‘হোয়াট?’

টুপুরের কেমন একটা হিস্টিরিয়া অ্যাটাক হল যেন। ও ছুটে গিয়ে অভিদার পা জড়িয়ে ধরল। অভিদা ‘না না’ বলে টুপুরকে তুলে দাঁড় করিয়ে গালে হাত বুলিয়ে চুল সরিয়ে দিয়ে বলল, ‘এদের তিনজনকে এখানে রেখে দিন আর আমার সঙ্গে একজন চলুন। আমি আমার অন্য কার্ড নিয়ে এসে পেমেন্ট ক্লিয়ার করে, ওদের নিয়ে যাব।” বলে আর দাঁড়াল না, গটগট করে বেরিয়ে গেল। আমি ছুটে গেলাম। “প্লিজ অভিদা ইউ ক্যান ইউজ মাই কার্ড প্লিজ।’ অভিদা আমার হাত ধরে ফিসফিস করে বলল, “সারপ্রাইজ টুঙ্কা, রিয়েলি সারপ্রাইজ ফর মি!’

প্রায় দু-ঘণ্টা হতে চলল অভিদা আসছে না, কত রাত হয়ে গেল। ফোন নটরিচেবল শুনতে শুনতে হয়রান। টুপুর-কে আর আটকে রাখা যাচ্ছে না, পাগলের মতো করছে। লেডি সিকিউরিটিকে অনুরোধ করায় তারা তৎপর হয়ে, যিনি সঙ্গে গেছেন তাকে ফোন করলেন। আরও মিনিট চল্লিশেক পর একটা পুলিশের জিপ এল। ওসি আমাদের কাছে এসে অভিদার নাম বলায় আমরা ঘাড় নাড়তেই বললেন, ‘জিপে উঠুন।’ বললাম, ‘হোয়াই? হোয়াট হ্যাপেন্ড অফিসার?’

উনি তাচ্ছিল্য ভরে তাকিয়ে বললেন, “গিয়েই দেখতে পাবেন। কাম অন লেডিস, হ্যারিয়াপ।’ আমি বললাম, ‘ওয়েট আ মিনিট অফিসার।’ ম্যানেজার সায়ন্তিকা-কে চিবিয়ে বললাম, “আই ওয়ান্ট টু পে দ্য ডিউ অ্যামাউন্ট ইমিডিয়েটলি, প্লিজ প্রসিড।”

আমি কোথাও গেলে এখনও বাবা টুক করে নিজের এটিএম কার্ডটা আমায় দিয়ে দেয়। সেই বাবার কার্ডটা দিয়ে আমি ডিউ পেমেন্ট অল ক্লিয়ার করে গাড়িতে উঠে বসলাম। সারাটা রাস্তা অভিদার ‘সারপ্রাইজ’ কথাটা কানে বাজতে লাগল। কে কাকে সারপ্রইজ দিল!

বাংলোয় পৌঁছে দেখি, সবদিকে লাইট জ্বালানো। অনেক লোকজন জমা হয়েছে। মিত্র দম্পতি আরও অনেকে। টুপুর নেমেই ছুটতে শুরু করেছে। আমরাও পিছন পিছন দৌড়ে ড্রইংরুম পার করে ওদের বেডরুমে ঢুকে দেখি, ফ্যানের সঙ্গে টুপুরের দোপাট্টা দিয়ে অভিদার ঝুলন্ত দেহ হালকা দুলছে। বিছানার উপর সাইড টেবিল ব্যবহার করে ঝুলছে, তাই কোনও শব্দ হয়নি। আমি আর টাপুর আর্তনাদ করে উঠলাম— ‘অভিদা’। টুপুর একদম পাথর হয়ে গেল।

বাবা, মা, সেন কাকু-কাকি প্রায় ভোরের দিকে এসে পৌঁছোল। টুপুর শুধু একটা কথা বলছে, ‘কেন? কেন? কেন বলতে দিলে না মা ওকে? ও যে আমায় ভীষণ ভালোবাসত! খুব ভালোবাসত মা…! অ-ভি-গো অভি, ক্ষমা করো।

রং-এর উৎসবে স্পেশাল মেনু

শুধু রং খেললেই তো আর রং-এর উৎসব সম্পূর্ণ হয় না, সঙ্গে চাই ভালো কিছু খাবার। তেমনই কিছু রেসিপি রইল রং-এর উৎসব উপলক্ষ্যে।

রাইস স্পেশাল সুইট ডিশ

গুড়ের সিরাপ তৈরির উপকরণ: ২ থেকে আড়াই কাপ জল, ৪৫০ গ্রাম গুড়, ২ চামচ মৌরি এবং নুন স্বাদমতো। অন্যান্য উপকরণ: ১ বড়ো চামচ ঘি, ১৫-২০টি কিশমিশ, এলাচের দানা, নারকেলের কিছু টুকরো, ৩ কাপ বাসমতি চাল জলে ভিজিয়ে রাখুন এবং আলাদা ভাবে ৪ কাপ জল নিয়ে রাখুন।

গার্নিশিং-এর উপকরণ: অল্প পেস্তার টুকরো, সামান্য পুদিনাপাতা, রুপোলি তবক, গোলাপ ফুলের পাপড়ি এবং সামান্য কেশর। গুড়ের সিরাপ তৈরির পদ্ধতি: গভীরতা যুক্ত পাত্রে গুড়, মৌরি,এলাচের দানা-র সঙ্গে জল দিয়ে মাঝারি আঁচে ফোটান। সামান্য নুন দিন। এরপর অপেক্ষা করুন গুড়ের সিরাপ তৈরি হওয়া পর্যন্ত এবং সিরাপ তৈরি হয়ে গেলে নামিয়ে রাখুন আঁচ থেকে।

রাইস স্পেশাল সুইট ডিশ তৈরির পদ্ধতি: একটি বড়ো এবং গভীরতা যুক্ত পাত্র আঁচে বসান। পাত্র গরম হলে ঘি ঢালুন এবং কিশমিশ ও নারকেলের টুকরো দিয়ে হালকা আঁচে সামান্য ভেজে নিন। এরপর ধুয়ে রাখা বাসমতি চাল ঢেলে ভালো ভাবে মেশান। ৪ কাপ জল ঢালুন। পাত্র ঢাকা দিয়ে মাঝারি আঁচে বসিয়ে রাখুন কিছুক্ষণ। জল যখন শুকিয়ে আসবে, তখন তৈরি করে রাখা গুড়ের সিরাপ মিশিয়ে দিন। ঢাকা দিয়ে কিছুক্ষণ হালকা আঁচে বসিয়ে রাখুন। চালের মধ্যে গুড় ভালোভাবে মাখামাখি হয়ে গেলে আঁচ বন্ধ করে দিন। ২-৩ মিনিট পর এর উপর ছড়িয়ে দিন পেস্তার টুকরো, পুদিনাপাতা, গোলাপ ফুলের পাপড়ি, কেশর এবং রুপোলি তবক। গরম থাকতে থাকতে পরিবেশন করুন।

স্পেশাল ভেজ বিরিয়ানি

স্পেশাল উপকরণ: ৫টি মাঝারি মাপের পেঁয়াজ এবং পেঁয়াজ ভাজা-র জন্য উপযুক্ত পরিমাণ তেল।

বিরিয়ানি মেরিনেশন-এর উপকরণ: মাঝারি মাপের দুটো গাজর, ১০-১২টা বিন্‌স, একটা ফুলকপি, ২০০ গ্রাম পনিরের টুকরো, আধা কাপ পেঁয়াজ পাতা, আধা কাপ দই, সামান্য পুদিনাপাতা, আধা কাপ ছাড়ানো কড়াইশুঁটি, ২-৩ টে কাঁচালংকা, সামান্য লাল লংকার গুঁড়ো, আধা চামচ হলুদগুঁড়ো, আধা চামচ ধনেগুঁড়ো, সামান্য ধনেপাতা, এক চামচ আদা-রসুনের পেস্ট এবং নুন স্বাদমতো।

অন্যান্য উপকরণ: ২ বড়ো চামচ ঘি, ২টি তেজপাতা, কয়েকটা দারচিনির টুকরো, দুটো বড়ো এলাচ, ২ কাপ পছন্দের সবজির টুকরো, ৩ কাপ চাল জলে ভেজানো, ৫ কাপ গরম জল, সামান্য গরম মশলা, ১ চামচ কেওড়া জল, সামান্য কেশর এবং ২ চামচ ঘি।

রায়তা-র উপকরণ: ২টো মাঝারি মাপের আলু সেদ্ধ করা, ২টো কাঁচালংকা, ১ কাপ দই, সামান্য ধনেপাতা, সামান্য পুদিনাপাতা, আধা চামচ চিনি, আধা চামচ জিরেগুঁড়ো, লাল লংকা-র গুঁড়ো আধা চামচ এবং নুন স্বাদমতো।

গার্নিশিং-এর উপকরণ: পেঁয়াজ পাতার টুকরো এবং ধনেপাতা কুচি।

স্পেশাল ফ্রাই-এর উপকরণ: পেঁয়াজ পাতলা করে কাটুন। এরপর কড়াইতে তেল গরম করে পেঁয়াজ ভাজুন লাল রং না হওয়া পর্যন্ত। পেঁয়াজ লাল লাল করে ভাজা হয়ে গেলে নামিয়ে টিসু পেপারের উপর রাখুন যাতে তেল শুষে নেয়। ভাজা পেঁয়াজ ঠান্ডা হয়ে গেলে ঢেকে রাখুন।

মেরিনেশন-এর পদ্ধতি: একটা বড়ো পাত্রে গাজরের টুকরো, কেটে রাখা বিস, ফুলকপি-র টুকরো এবং পনিরের টুকরো ফ্রাই করুন তেল দিয়ে। একটু ভাজা হয়ে গেলে কড়াইশুঁটি, দই এবং পুদিনাপাতা মেশান। কাঁচালংকার টুকরো, লাল লংকার গুঁড়ো, হলুদগুঁড়ো, ধনেগুঁড়ো এবং স্বাদমতো নুন দিয়ে নেড়ে নিন সবজিগুলো। এরপর আদা-রসুনের পেস্ট দিয়ে ভাজুন এবং সবশেষে ধনেপাতা-র কুচি মিশিয়ে নামিয়ে রাখুন।

ভেজ বিরিয়ানি তৈরির পদ্ধতি: প্রেসার কুকার আঁচে বসিয়ে ঘি ঢালুন। দারচিনি, লবঙ্গ, এলাচ এবং তেজপাতা ঘি-তে দিয়ে ভাজুন। এরপর ভেজে রাখা সবজিগুলো মিশিয়ে আবার ভালো ভাবে ভাজতে থাকুন। কুকারের ঢাকনা ব্যবহার করে ৪-৫ মিনিট রান্না করুন মাঝারি আঁচে। এরপর পুদিনাপাতা, কাঁচালংকার টুকরো দিয়ে ভিজিয়ে রাখা চাল ঢেলে গরম জল মিশিয়ে নিন। এর উপর গরমমশলা, স্বাদমতো নুন, কেওড়ার জল এবং কেশর ছড়িয়ে দিয়ে কুকারের ঢাকনা ব্যবহার করে একটা সিটি দেওয়া পর্যন্ত রান্না করুন হালকা আঁচে। চাল থেকে জল শুকিয়ে গেলে আঁচ নিভিয়ে দিন এবং রায়তা তৈরি করে গরম গরম বিরিয়ানি পরিবেশন করুন।

রায়তা তৈরির পদ্ধতি: সেদ্ধ করে রাখা আলু, পেঁয়াজ, টম্যাটো, কাঁচালংকার টুকরো এবং দই ভালোভাবে মিশিয়ে নিন। এরমধ্যে ধনেপাতা, পুদিনাপাতা, স্বাদমতো নুন, জিরেগুঁড়ো এবং সামান্য চিনি মিশিয়ে নিন ভালোভাবে, রায়তা তৈরি।

তমসারেখা (পর্ব-০২)

আমার শূন্যে ছোড়া তির কাজে লেগে গেল। টাপুর অজান্তেই সত্যি বলে দিল। আমি বললাম চিন্তা করিস না, টুপুর ভালো হয়ে যাবে। শুধু দেখিস মেডিসিন যেন দুম করে বন্ধ করে না দেয় আর মরাল সাপোর্ট দিস।

বছর ঘুরল। রেজাল্ট ভালো হওয়ায় আমি এমএসসি-তে অ্যাপ্লায়েড সাইকোলজি নিলাম। ডিপার্টমেন্টের হেড কলকাতার নাম করা মনোবিজ্ঞানী ডা. বৌধায়ন মুখার্জির সুনজরে পড়লাম। ওঁনাকে আমি একদিন টুপুরের ছবি দেখিয়ে কেস হিস্ট্রিটা বললাম। স্যার মন দিয়ে শুনে বললেন, “এই পেশেন্টরা ফেজে ফেজে চলে। রেগুলার কাউন্সেলিং, নিয়মিত মেডিকেশন আর ফ্যামিলি সাপোর্ট পেলে কনফিডেন্স ফিরে আসে, ভালো হয়ে যায়।’ খুশি হয়ে বললাম, ‘দরকার হলে আপনার সাহায্য নেব স্যার। প্লিজ সেভ মাই চাইল্ডহুড ফ্রেন্ড।’ উনি বললেন, ‘সিওর ইয়াং লেডি।’

টাপুর তো বরাবরই ভালো। ও যাদবপুর থেকে খড়গপুর আইআইটি-তে চলে গেল। এর মধ্যে মায়ের মুখে শুনলাম টুপুরের জন্য বিয়ের সম্বন্ধ এসেছে। মা বলল, ‘ডাক্তার বলেছেন টুপুর একদম ভালো হয়ে গেছে। গ্র্যাজুয়েশনও শেষ, তাই ওকে বিয়ে দিতেই পারেন।’ একটা বিয়েবাড়িতে টুপুর-কে দেখে পাত্র নিজেই পছন্দ করেছে। ছেলের আগ্রহ বেশি, তাই অগ্রহায়ণেই বিয়ে ফিক্স হতে পারে। টুপুরের সেই সাইকিয়াট্রিস্ট ডাক্তার গ্রিন সিগন্যাল দেওয়ায় সেন বাড়ি এগোচ্ছে।’

আমি ভবিষ্যতের সাইকিয়াট্রিস্ট। এখন স্যারের সঙ্গে নিয়মিত কেস হ্যান্ডেল করি। বন্ধু হিসেবে আমারও কিছু দায়িত্ব থেকে যায়। বিয়েটা ম্যাচিওর করছে জেনে, না জানিয়ে ঝটিকা সফরে আমি বাড়ি এলাম। মা তো হতভম্ব। কফির কাপে সিপ দিতে দিতে মায়ের সামনেই সেন কাকিকে টুকুস করে ফোন করে, যেচে বিকেলের চায়ের নেমতন্ন নিলাম।

মা তো আমার কাণ্ড দেখে চোখ কপালে তুলে বলল, ‘সর্বনাশ।”

—সর্বনাশ যাতে না হয়, সেই জন্যই এই ব্যস্ত শেডিউল ছেড়ে ছুটে এসেছি মা। নিশ্চিন্তে থাকো।

বিকেলে গেলাম। বেশ লম্বা গ্যাপের পর ওদের সঙ্গে দেখা। সেন কাকু কাকি অনেকটা বয়স বাড়িয়ে ফেলেছেন। দীর্ঘদিন পর তিনজনের সঙ্গে চুটিয়ে গল্প করে খেয়ে বাড়ি ফিরলাম। মনে হল, কোনওদিন টুপুরের কিচ্ছু হয়নি, এক্কেবারে স্বাভাবিক। আমার সাইকোলজির পাণ্ডিত্য দিয়ে কিছু নজর করতে পারলাম না। আমি যে টুপুরের বিষয় জানি, তা প্রকাশও করলাম না।

টুপুরের হবু জামাইয়ের বর্ণনায় মা উচ্ছ্বসিত। অভিনন্দন দত্তগুপ্ত। পান্টিম্বর। দুর্গাপুরে স্টিল প্ল্যান্টে চাকরি করে বিশাল পোস্টে। আমি শুধু বললাম, ‘এত পালটি-টালটি বুঝি না মা; সব ঠিক আছে। কিন্তু টুপুরের যে-অসুখটা করেছিল, সেন কাকিরা কি সেটা ছেলেকে জানিয়েছে?’ মা সদুত্তর দিতে পারল না। শুধু বলল, ‘টুপুর যখন ভালো হয়ে গেছে, তখন আগ বাড়িয়ে বলে কী লাভ? আসলে কী হয়েছিল বল তো? ডিপ্রেশন?

সবটা চেপে গিয়ে বলি, ‘ওই ধরনেরই কিছু হবে; তবে মা, এই মানসিকতা থেকে বের হয়ে এসো। এখন অ্যারেঞ্জন্ড ম্যারেজে ছেলে-মেয়ে দু’জনের ব্লাড গ্রুপ-সহ যাবতীয় তথ্য বায়োডাটায় দিতে হয়। এটা নেহাত বর একতরফা পছন্দ করেছে তাই। টুপুর এখন একদম সুস্থ, তাই তো বলা আরও উচিত ছিল। সজ্জন মানুষ হলে ঠিক বুঝবে, পাশে থাকবে৷’

আমরা টুপুরের বিয়েতে দারুণ মজা করে আইবুড়ো ভাত থেকে নিমন্ত্রণ খেলাম। ক্যাম্পাসের মাঠে বিশাল প্যান্ডেল বেঁধে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের লোক দিয়ে সাজিয়ে, টুপুরের বিয়ে হয়ে গেল। স্বপ্নের মতো চারটে দিন যেন বাষ্প হয়ে মিলিয়ে গেল। টুপুর সারা পাড়াকে কাঁদিয়ে বরের সঙ্গে দুর্গাপুরে চলে গেল।

পরের বছর দীপাবলিতে কিছু আন-এক্সপেক্টেড ছুটি জুটে যেতে বাড়ি এসে দেখি, টাপুর এসেছে। শুনলাম, টুপুররা পুজোয় এসেছিল। অভিদা আর টুপুর-কে দারুণ মানিয়েছে। অভিদাকে চমৎকার সেন্সেবল ছেলে বলেই মনে হয়েছে আলাপ করে। টুপুরের বিয়ের পরে এই দেখা হল টাপুরের সঙ্গে। বলল, “চল, তিনদিনের জন্য দুর্গাপুর থেকে ঘুরে আসি দু’জনে। টুপুর আর অভি’দা দারুণ খুশি হবে। সামনেই ওদের প্রথম ম্যারেজ অ্যানিভার্সারি।’

টাপুরের পাল্লায় পড়ে রাজি হয়ে গেলাম।

অনেকদিন পর এসি চেয়ারকারে দূরপাল্লার জার্নি করছি। ভীষণ ভালো লাগছে, যেন উড়ন্ত শঙ্খচিল ! নির্ধারিত সময়ে দুর্গাপুর ঢুকছে ট্রেন। আমরা লাগেজ নিয়ে ওভারব্রিজের দিকে পা চালিয়ে সিঁড়িতে পা রাখতে যাব, হঠাৎ মাথায় একটা চাঁটি। তাকিয়ে দেখে বলি, ‘ও,ও মা অভিদা তুমি!’

ড্রাইভার ততক্ষণে আমাদের লাগেজ নিয়ে নিয়েছে। অভিদা আমাদের দু’জনকে দুই পাশে নিয়ে গল্প করতে করতে এক্সিটের দিকে হাঁটতে লাগল। আমি এক সন্তান। নিজের ভাই, বোন, দাদা কেউ নেই। আমার ভীষণ ভালো লাগছিল অভিদা’র দাদা-সুলভ এই ব্যবহারের জন্য।

গাড়ি সরাসরি গুলমোহর গাছের ক্যানপির মধ্য দিয়ে গিয়ে হর্ন বাজিয়ে দাঁড়াল বাংলোর সামনে। টুপুর ভিতর থেকে ছুটে বেরিয়ে এসে আমাদের দু’জন-কে জড়িয়ে ধরল। আদর জড়াজড়ির শেষে নজর পড়ল বাগানের ঝুলন্ত দোলনায়। আমরা বুড়ো ধাড়ি হয়ে, লাগেজ টাগেজ ভুলে ঝপাৎ করে দোলনায় উঠে পড়লাম।

ছোটোবেলায় পার্কে আমি আর টাপুর জোড়া শালিকের মতো থাকতাম সব সময়। আর সব থেকে উঁচুতে উঠে যেতাম দুলতে দুলতে। অভিদা ওদের ড্রাইভার সব দাঁড়িয়ে দেখছে আমাদের কাণ্ড। আমরাও স্মৃতি থেকে চোরকাঁটা তোলার মতো দুলে দুলে স্মৃতিচারণ করে ক্ষান্ত হলাম।

বাংলোটা কী সুন্দর করে নিপুণ হাতে সাজিয়েছে টুপুর। ঘরের প্রতিটি কোনায় টুপুরের শিল্পীসত্তার প্রতিফলন। ড্রয়িংরুম ট্রাইবল আর্ট আর মডার্ন আর্টের কম্বিনেশনে সাজানো। ঝাড়লণ্ঠনটা রঙিন নক্সাদার দড়ির বুনটে বাঁধা। ড্রইং থেকে ডাইনিং-এর লম্বা প্যাসেজের দেয়ালে ঝিনুকের বিশাল চামচ আর ফর্ক ঝোলানো। আমি বলেই ফেললাম, ‘টুপুর কী করেছিস রে, এ তো পুরো হোটেল। আমার তো বসতেই ভয় করছে।

টুপুর বরাবরই চুপচাপ। কিন্তু একটা প্রচ্ছন্ন গরিমা খেলে গেল প্রশংসা শুনে। অভিদা তো এমন ভাব করল যেন টুপুর-কে ওই আবিষ্কার করছে, এতটাই বুকের ছাতি ফুলিয়ে বলল, ‘আমার সিলেকশন একেবারে পারফেক্ট।’

স্নান সেরে ফ্রেশ হয়ে লাঞ্চে বসে গেলাম সবাই। আমাদের মুখ আর আড্ডা একযোগে চলতে থাকল। দুপুরে একটা জব্বর ঘুম দিলাম। ঘুমের শেষের দিকে ঝাপসা কেমন একটা স্বপ্ন দেখে ধড়মড় করে উঠে বসে কিছুক্ষণ গুম হয়ে থাকলাম স্বপ্নের অভিঘাত সামলাতে।

টাপুর-কে ধাক্কা দিতে যাব, তখনই দরজা নক করে টুপুর একটা বাসন্তী কালারের সিল্কের শাড়ি পরে এসে ঢুকল। বলল, “কী রে কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমোলে হবে?’

আমি হাঁ করে দেখছি, কী অপূর্ব লাগছে টুপুরকে। ঠিক যেন বুদ্ধদেব গুহ-র ‘কুচি”!

—চা রেডি। চল চল, ওঠ।

বাংলোর পিছনের দিকে ডেক ব্যালকনিতে সুন্দর ক্রকারিজে চা, কুকিজ, সাজানো টিকোজি দিয়ে ঢাকা টি-পট। সামনে রয়েছে সবুজ গাছ-গাছালিতে ভরা চোখ জুড়ানো বাগান।

আমরা তিনজনে বের হলাম হাঁটতে। টুপুর পরিচয় করাল মিত্র বউদি, সোনম গুলজার, ওর সব নতুন ফ্রেন্ডস সার্কেলের সঙ্গে। মনে হল টুপুরকে সবাই খুব পছন্দ করেন। রাত আটটায় অভিদা নামী রেস্তোরাঁর স্ন্যাক্স আর রেড ওয়াইন নিয়ে হাজির। আমি তো বেমালুম ভুলেই মেরে দিয়েছি গিফটের কথা। ফোনে মায়ের ম্যাসেজ দেখে দৌড়ে ঘরে গিয়ে গিফট প্যাক দুটো নিয়ে এসে অভিদা আর টুপুর-কে দিলাম। অভিদা পুরো ছেলে মানুষের মতো নতুন টাইটা পরে নিল। কাফলিংস হাতে নিয়ে বলল, ‘ভীষণ পছন্দ হয়েছে টুঙ্কা।’ আর টুপুর তো জড়িয়ে ধরে প্রায় কেঁদে ফেলে আর কী! এরপর রেড ওয়াইন দিয়ে সেলিব্রেশন। অভিদা বলল, ‘সুন্দরী শালিদের উপস্থিতি মানেই সেলিব্রেশন, চিয়ার্স।’

( ক্রমশ…)

এক চরম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করাবে ‘ছেলেধরা’

চলতি বছরের মার্চ মাসের প্রথম দিন থেকে শুরু হতে চলেছে শিলাদিত্য মৌলিক পরিচালিত নতুন বাংলা ছবি ‘ছেলেধরা’-র শুটিং। ছবির মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করবেন স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়। ইন্দো-আমেরিকান যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত এই ছবির শুটিং হবে অরুণাচল প্রদেশের মনোরম ও তুলনামূলক ভাবে অনাবিষ্কৃত লোকেশন— ইটানগর এবং জিরো ভ্যালিতে।

উল্লেখ্য, পরিচালক শিলাদিত্য মৌলিকের আগের ছবি ‘সূর্য’ ১১ সপ্তাহ প্রেক্ষাগৃহে দর্শকদের ভালোবাসা জিতে নিয়েছিল। সেই সাফল্যের সুবাদে এবারও ভিন্নধর্মী বিষয়কে কেন্দ্রে রেখে তৈরি করতে চলেছেন ‘ছেলেধরা’ ছবিটি।

ছেলেধরা একটি ফ্যামিলি থ্রিলার, যেখানে পারিবারিক আবেগ, দায়িত্ববোধ এবং নৈতিক দ্বন্দ্ব থ্রিলারের কাঠামোর মধ্যেই তুলে ধরা হবে। ছবিটির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জটিল এক নারী চরিত্র—যা বাংলা ছবিতে সচরাচর কম দেখা যায়।

ছবির গল্প আবর্তিত হয়েছে এক বিবাহবিচ্ছিন্না মাকে ঘিরে। যিনি আবেগের বশে মেয়ের জন্মদিন উপলক্ষ্যে বেরিয়ে পড়েন ঘুরতে। কিন্তু হঠাৎই ঘটনা অন্যদিকে মোড় নেয়। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, যখন মেয়েটি সত্যিই অপহৃত হয়। এই টানটান পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই কাহিনি এগোয় পরিণতির দিকে। হঠাৎ ঘটে যাওয়া এক অপ্রত্যাশিত ঘটনার মোড়ে, বৃষ্টি এমন এক সত্যের মুখোমুখি হয়, যা সে কল্পনাও করেনি। এভাবেই জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এক সফরে শামিল হয় বৃষ্টি।

পরিচালক শিলাদিত্য মৌলিক ছবিটি সম্পর্কে জানিয়েছেন, “এই ছবিটি মূলত সেই মানুষদের গল্প, যাঁরা নিখুঁত নন, কিন্তু ভালোবাসতে পারেন। ছেলেধরা এক ধরনের রোড জার্নির মতো, তবে তার কেন্দ্রে রয়েছে অভিভাবকত্ব, দায়িত্ববোধ এবং নিজেদের ভুলের মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহস।”

অভিনেত্রী স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়-এর মতে, “বৃষ্টি এমন চরিত্র নয়, যাকে সহজে ভালো লাগবে। সে আবেগপ্রবণ, মর্মাহত এবং ত্রুটিপূর্ণ। কিন্তু একজন মা হিসেবে তার ভালোবাসা খুবই প্রকট। এই চরিত্রটি আমাকে নিজের মনের ভেতরে অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।”

নিজস্ব সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়েও ছবিটি অভিভাবকত্ব, অপরাধবোধ এবং মানসিক অবহেলার মতো বিষয়কে সামনে আনবে, যা সমাজের সব স্তরের দর্শকের সঙ্গেই সম্পর্ক তৈরি করতে পারবে বলেও জানানো হয়েছে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে। সেই কারণেই ছবিটি সাধারণ দর্শকের পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবগুলির কথা মাথায় রেখেও নির্মিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন নির্মাতারা।

ছবিটি প্রযোজনা করছেন প্রতীক মজুমদার ও অনিন্দিতা (Ann) মুখোপাধ্যায়। প্রযোজনা সংস্থা হিসেবে যুক্ত রয়েছে ‘হ্যান্ডিম্যান এবং সীতা২২ ফিল্মস’। ছবির চিত্রগ্রহণের দায়িত্বে থাকবেন ইতালির সিনেম্যাটোগ্রাফার ভিনসেনজো কনডোরেলি। সৃজনশীল প্রযোজক হিসেবে কাজ করবেন জিতিন হিঙ্গোরানি, লাইন প্রডিউসার হিসেবে যুক্ত রয়েছেন শুভেন কুমার দাস। ছবির প্রোডাকশন ডিজাইনের দায়িত্বে রয়েছেন সোমান্বিতা ভট্টাচার্য এবং কস্টিউম ডিজাইন করছেন অজোপা মুখোপাধ্যায়। মার্চ মাসের শেষ পর্যন্ত একটানা শুটিং চলবে বলে জানা গেছে। শীঘ্রই ছবির অন্যান্য অভিনেতা ও কলাকুশলীদের নাম ঘোষণা করা হবে বলেও জানানো হয়েছে সম্প্রতি।

‘ক্লাবফুট’ সমস্যা এবং চিকিৎসার সঠিক উপায়

‘ক্লাবফুট’ শৈশবের এমন একটি বিকৃতি, যা নিয়ে এই রোগে আক্রান্ত শিশুর মা-বাবা দুশ্চিন্তায় থাকেন। কিন্তু ‘ক্লাবফুট’ নিরাময়যোগ্য। এই সমস্যার সমাধানের বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন পেডিয়াট্রিক অর্থোপেডিক সার্জন ডা. সৌম্য পাইক।

প্রতি বছর, হাজার হাজার শিশু ‘কনজেনিটাল ট্যালিপস ইকুইনোভারাস’ (Congenital Talipes Equinovarus or CTEV) নিয়ে জন্মগ্রহণ করে, যা সাধারণত ‘ক্লাবফুট’ নামে পরিচিত। এই অবস্থার ফলে এক বা উভয় পা ভিতরের দিকে এবং নীচের দিকে বেঁকে যেতে পারে। বিশ্বব্যাপী প্রতি ১,০০০ নবজাতকের মধ্যে প্রায় ১ জন প্রভাবিত হয় জন্মগত ট্যালিপস ইকুইনোভারাস বা ক্লাবফুট-এ। কিন্তু সন্তানের এই বিকৃতি বাবা-মায়ের কাছে উদ্বেগজনক হতে পারে। তাই, ডা. সৌম্য পাইক জানিয়েছেন যে, সময়মত চিকিৎসার মাধ্যমে শিশুরা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং সক্রিয় জীবনযাপন করতে পারে।

সমস্যা

ক্লাবফুট কেবল একটি সাধারণ স্বাস্থ্য-সমস্যা নয় , এটি হাড়, পেশী, পা এবং গোড়ালির টেন্ডনগুলির সঙ্গে জড়িত একটি কাঠামোগত বিকৃতি। প্রায় ৫০% ক্ষেত্রে উভয় পা বিকৃত হয়। মেয়েদের তুলনায় ছেলেরা দ্বিগুন আক্রান্ত হয় এই অসুখে।

কারণ

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই সমস্যা ইডিওপ্যাথিক (কোন স্পষ্ট কারণ ছাড়াই)। যদিও, জেনেটিক্স এবং পরিবেশগত কারণগুলি ভূমিকা পালন করতে পারে।

রোগ নির্ণয়

ডা. সৌম্য পাইক-এর মতে, প্রাথমিক রোগ নির্ণয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে, প্রসবপূর্ব আল্ট্রাসাউন্ড জন্মের আগেই বিকৃতি সনাক্ত করতে পারে, যা পরিবারগুলিকে চিকিৎসার জন্য প্রস্তুত করার সুযোগ করে দেয়।

Pediatric Orthopedic Surgeon Dr. Soumya Paik
Dr. Soumya Paik

 

চিকিৎসা

ডা. ইগনাসিও পোনসেটির প্রবর্তিত ‘পোনসেটি’ পদ্ধতি বিশ্বব্যাপী ক্লাবফুট চিকিৎসায় বিপ্লব এনেছে। কাস্টিং, অর্থাৎ প্লাস্টার কাস্টের মাধ্যমে পায়ের সমস্যা দূর করা যায়। টেনোটমি পদ্ধতিও খুব-ই কার্যকরী। টাইট টেন্ডন মুক্ত করার জন্য একটি ছোটো বহির্বিভাগীয় পদ্ধতি, যা সম্পূর্ণ সংশোধনের জন্য প্রয়োজন হয়। ব্রেসিং পদ্ধতিও দ্রুত সমস্যামুক্ত করে। পুনরাবৃত্ত হওয়া রোধ করার জন্য ব্রেসের দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহার করা হয়, বিশেষকরে জীবনের প্রথম ৪-৫ বছরে।

সঠিক আনুগত্যের সঙ্গে যত্ন নিলে, সাফল্যের হার ৯০% ছাড়িয়ে যায়, যা শিশুদের সীমাবদ্ধতা ছাড়াই হাঁটা, দৌড়ানো এবং খেলার ক্ষমতা দেয়।

সচেতনতা

যদিও চিকিৎসা অত্যন্ত সহজলভ্য কিন্তু চিকিৎসা না করা হলে আজীবন অক্ষমতা, ব্যথা এবং স্বাভাবিকতা নষ্ট হতে পারে ‘ক্লাবফুট’। অনেক গ্রামীণ এলাকায় সচেতনতার অভাব এবং চিকিৎসার সুযোগের অভাব এখনও প্রধান বাধা। অতএব মনে রাখবেন, ক্লাবফুট সাধারণ কিন্তু নিরাময়যোগ্য। প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিত করে যে, শিশুরা স্বাভাবিক, সক্রিয় জীবনযাপন করবে। কোনও শিশু যাতে পিছিয়ে না পড়ে, তা নিশ্চিত করার জন্য পরিবারের সদস্যদের সহায়তা এবং সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে, সিটিইভির মতো রোগগুলি চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠতে পারে।

স্পেশাল ভেজ ও নন-ভেজ টিক্কা

আনপজনের সঙ্গে জমিয়ে খান ভেজ ও নন-ভেজ টিক্কা। প্রত্যেকটি পদ-ই মুখরোচক। রইল রেসিপিজ।

মাশরুম টিক্কা

উপকরণ : ২৫০ গ্রাম মাশরুম, ৪০ গ্রাম জল ঝরানো দই, ১/২ বড়ো চামচ খোলায় নাড়াচাড়া করা বেসন, ৫ গ্রাম সরষের তেল, ১/২ ছোটো চামচ রসুনবাটা, ১/২ ছোটো চামচ আদাবাটা, ৫ মিলিগ্রাম লেবুর রস, ১/২ ছোটো চামচ দেখি মির্চ, ১/২ ছোটো চামচ গরমমশলাগুঁড়ো, ১/২ ছোটো চামচ ‘সুমন’ ব্র্যান্ড-এর জিরেগুঁড়ো, ১/২ ছোটো চামচ জোয়ান, ১/২ ছোটো চামচ গোলমরিচগুঁড়ো, ১/২ ছোটো চামচ কসৌরি মেথি, নুন স্বাদমতো।

প্রণালী : একটা পাত্রে মাশরুম ছাড়া অন্য সব উপকরণ একসঙ্গে মিশিয়ে নিন। মাশরুম পরিষ্কার করে কেটে এই মিশ্রণ ভালো ভাবে মাখিয়ে ৪৫ মিনিট ম্যারিনেট করুন। এরপর প্রত্যেকটি মাশরুম শিকে গেঁথে ১০ মিনিট আভেনে গ্রিল করুন। ধনেপাতা ছড়িয়ে সার্ভ করুন।

পনির টিক্কা

উপকরণ : ২৫০ গ্রাম পনির ছোটো টুকরোয় কাটা, ৪০ গ্রাম জল ঝরানো দই, ১/২ বড়ো চামচ খোলায় নাড়াচাড়া করা বেসন, ৫ গ্রাম সরষের তেল, ১/২ ছোটো চামচ রসুনবাটা, ১/২ ছোটো চামচ আদাবাদা, ৫ মিলিগ্রাম লেবুর রস, ১/২ ছোটো চামচ দেগি মির্চ, ১/২ ছোটো চামচ জোয়ান, ১/২ ছোটো চামচ জিরেগুঁড়ো, ১/২ ছোটো চামচ গোলমরিচের গুঁড়ো, ১/২ চামচ কসৌরি মেথি, নুন স্বাদমতো।

প্রণালী : একটা পাত্রে পনির বাদ দিয়ে, আর সব সামগ্রী ভালো ভাবে মিশিয়ে নিন। পনিরের টুকরোয় মিশ্রণ মাখিয়ে ৪৫ মিনিট ম্যারিনেট করুন। এবার শিকে গেঁথে ৭-১০ মিনিট গ্রিল করুন। ধনেপাতা ছড়িয়ে প্লেটে সাজান।

চিকেন টিক্কা

উপকরণ : ২৫০ গ্রাম হাড়ছাড়া মুরগির মাংস ছোটো টুকরোয় কাটা, ৮০ গ্রাম জল ঝরানো দই, ১/২ বড়ো চামচ বেসন শুকনো খোলায় নাড়াচাড়া করা, ৫ গ্রাম সরষের তেল, ১/২ ছোটো চামচ রসুনবাটা, ১/২ ছোটো চামচ আদাবাটা, ৫ মিলিগ্রাম লেবুর রস, ১/২ ছোটো চামচ দেগি মির্চ, ১/২ ছোটো চামচ গরমমশলাগুঁড়ো, ১/২ ছোটো চামচ জিরেগুঁড়ো, ১/২ ছোটো চামচ গোলমরিচগুঁড়ো, ১/২ ছোটো চামচ কসৌরি মেথি, নুন স্বাদমতো।

প্রণালী : একটা পাত্রে, চিকেন বাদ দিয়ে, অন্য সমস্ত উপকরণ ভালো ভাবে মেশান। এবার এই মিশ্রণ চিকেনের গায়ে ভালো ভাবে মাখিয়ে, অন্তত ৪৫ মিনিট ম্যারিনেট করুন। এরপর চিকেনের টুকরোগুলো শিকে গেঁথে ৭-৮ মিনিট আভেন-এ গ্রিল করুন। ধনেপাতা-পুদিনাপাতার চাটনি সহযোগে সার্ভ করুন।

মুর্গ ইলাইচি টিক্কা

উপকরণ : ২৫০ গ্রাম হাড়ছাড়া চিকেন (ছোটো টুকরো করা), ৫ বড়ো চামচ কাজুপেস্ট, ২৫ গ্রাম চিজ, ৩০ গ্রাম জল ঝরানো দই, ১টা ডিম, ৫০ গ্রাম ক্রিম, ১ বড়ো চামচ শাহমরিচ, ১ বড়ো চামচ এলাচগুঁড়ো, ১/২ বড়ো চামচ কুচোনো পুদিনাপাতা, নুন স্বাদমতো।

প্রণালী : একটা বোল-এ চিকেনের টুকরোগুলো ধুয়ে রাখুন। এবার অন্য পাত্রে সমস্ত সামগ্রী একসঙ্গে মেখে নিন। চিকেনের গায়ে ভালো ভাবে এই মিশ্রণ মাখিয়ে ৪৫ মিনিট ম্যারিনেট হতে দিন। শিকে গেঁথে ১০ মিনিট গ্রিল করুন। ধনেপাতার চাটনির সঙ্গে পরিবেশন করুন।

তমসারেখা (পর্ব-০১)

অলকানন্দা রান্নাঘর থেকে চিৎকার করে বলল, ‘টুঙ্কা, আজ খেলতে যাবে না। প্রচুর রিভিশন আছে, সামনেই টেস্ট।’ টুঙ্কা বলল, ‘অনেকটা রিভিশন হয়ে গেছে মা, বাকিটা রাতে করব। রবীন্দ্রজয়ন্তীর রিহার্সাল আছে তো, তাই টাপুর লুকিয়ে এসে পর্দার তলা দিয়ে বলে গেছে।’ এটুকু বলেই টুঙ্কা বাবার ইশারায় নাচতে নাচতে বেরিয়ে গেল। অলকানন্দা রান্নাঘর থেকে উঁকি দিয়ে সৌমেন-কে দেখে বলল, ‘আশকারা দিয়ে মেয়ের বারোটা বাজাও, তারপর দেখব সামলাও কী করে?’

টাপুর আর টুপুর, সেনগুপ্ত বাড়ির যমজ দুই মেয়ে। টাপুর চার মিনিটের ছোটো টুপুরের থেকে। দুই বোনের চরিত্রের গঠনগত দিক সম্পূর্ণ ভিন্ন। যেমন, টাপুর খুবই ছটফটে, দুরন্ত। এত দুষ্টুমি করেও টাপুর অঙ্কে প্রচণ্ড ভালো। আমার আবার সব সমস্যা অঙ্ক নিয়ে। তাইতো টাপুরের সঙ্গে গলায় গলায় ভাব।

টুপুর তুলনায় বাধ্য। সব সময় বই মুখে করে থাকা শান্ত, চাপা, ঠোঁট টিপে থাকা মেয়ে। টুপুর দুর্দান্ত ছবি আঁকে, ফ্রেম ডিজাইনের কনসেপ্ট একদম অন্যরকম। ছোটো থেকেই সবাই জানি টুপুর ইন্টিরিয়র ডিজাইনার হবে। এরা দু’জনেই প্রিয়, কিন্তু টাপুর হল গিয়ে আমার ক্রাইম পার্টনার, একটু বেশি কাছের। প্রায় একইরকম দেখতে যমজ দুই বোনেকে যাতে কেউ গুলিয়ে না ফেলে, তাই সেন- কাকি সব সময় টাপুরের চুলটা বয়েজ কাট করে রাখে।

আমার জন্মদিনে পাড়ার বন্ধুদের নেমন্তন্ন করা হয়েছে। কলকাতা থেকে জেঠু পিসিরা বিশাল কেক আর বেশ কয়েকটা গল্পের বই নিয়ে হাজির। সকাল থেকে মা রান্নার মাসি-কে নিয়ে খুব ব্যস্ত, আর বাবা ঘনঘন বাজার যাচ্ছে। টাপুর-টুপুরের আজ সারাদিনের নেমন্তন্ন আমাদের বাড়িতে। কেক কাটা, বেলুন ফাটানো, বন্ধুদের সঙ্গে মজা, হুল্লোড় করে আনন্দে জন্মদিন কেটে গেল। দশটা গল্পের বই পেয়েছি, তার মধ্যে আছে খুব পছন্দের লীলা মজুমদারের ‘দিন দুপুরে’ বইটা। আমি গুছিয়ে রেখেছি আমার বইয়ের তাকে। পরদিন একটু বেলার দিকে গল্পের বইগুলো নিয়ে বসলাম, ওমা দেখি একটা বই কম। পছন্দের ‘দিন দুপুরে’-টাই নেই।

আমি কান্নাকাটি জুড়ে দিতে বাবা এসে শান্ত করতে বসল। মা রান্নাঘর থেকে খুন্তি হাতে ছুটে এসে বলল ‘আরও ধিঙ্গিপনা করো, আনন্দের চোটে নিজেই কোথায় ফেলেছ দ্যাখো।’

আমি আরও জোরে কেঁদে জানালাম, ‘ওটা টাপুর দিয়েছে, কী হবে? আমার খুব লজ্জা করবে বইটা হারিয়ে গেছে বলতে।’ বাবা বলল, ‘দরকার হলে আমি কিনে দেব। কিন্তু তুমি ভালো করে খুঁজে দ্যাখো।’

পরীক্ষার পর এক রবিবারে আমি টাপুরদের বাড়ি খেলতে যাচ্ছি। মা তখন বলে দিল, ‘বইয়ের ব্যাপারে কাউকে কিচ্ছু বলবে না কিন্তু।’

টাপুরদের ছাদে দারুণ খেলার আসর বসেছে। পিয়া, ডেম্পো, রানাদা সবাই এসেছে। ক্যারামের এক্সট্রা স্ট্রাইকার আনতে আমি নীচে ওদের ঘরে ঢুকে খাটের নীচ থেকে ক্যারামের গুটি রাখার টাবটা বার করতে গিয়ে দেখলাম, বুকশেলফ থেকে একটা বই মাটিতে উপুড় হয়ে পড়ে আছে। তুলে রাখতে গিয়ে দেখি ‘দিন দুপুরে’ বইটা। প্রথম পাতার নীচের দিকে হাতে লেখাটা কালো কালিতে কে দাগিয়ে রেখেছে। আমি তো ভয়ে কাঁপতে লাগলাম! এটা তো আমার সেই বইটা, এখানে কী করে এল!

কোনওরকমে টাবটা টেনে স্ট্রাইকার খুঁজতে গিয়ে দেখি, টাবের মধ্যে আমার সেই বিনাকাগুলো। বিনাকা পেস্টের সঙ্গে প্রতিবার একটা করে জীব-জন্তু, পাখি থাকত। আমি আর মা অনেক বিনাকা জমিয়েছিলাম। ভালো করে নজর করে দেখলাম, এখানে সেই ক’টা বিনাকাই আছে, যেগুলো আমাদের শোকেসে আর নেই। সারা বাড়ি, বাইরের বাগানে তন্নতন্ন করে খুঁজেও পাওয়া যায়নি। খুব বকেছিল মা-বাবা। ভেবেছিল, আমি মা-কে না বলে বন্ধুদের দিয়ে দিয়েছি। এখন দেখছি বিনাকাগুলো ওদের টাবে পড়ে আছে। আমি প্রচণ্ড ভয় পেলেও, একটা বিনাকা জামার পকেটে করে লুকিয়ে বাড়ি চলে এলাম।

মা-কে চুপিচুপি বললাম, ‘দিনে দুপুরে’ বইটা তো টাপুরদের বাড়িতে রয়েছে। পকেটে লুকিয়ে নিয়ে আসা জিরাফ বিনাকাটা দেখিয়ে বললাম, দ্যাখো। তখন কত বকেছিলে আমায়! বাকি সব বিনাকাগুলো ওই টাবে কী অযত্নে পড়ে আছে। মা বলল, টুঙ্কা একদম বারণ করে দিচ্ছি, ঘুণাক্ষরেও কোনও বন্ধু বা অন্য কাউকে কিচ্ছু বলবে না প্রমিস করো। বাবা আর একটা নতুন ‘দিনে দুপুরে’ গল্পের বই কিনে দিয়ে লিখে দিল— আদরের টুঙ্কা-কে বাবা।

অসংখ্য আনন্দ, মজা, ধাপ্পা, আব্বুলিশের স্মৃতি সঞ্চয় করে উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি টপকে আমি কলকাতার রাজাবাজার সায়েন্স কলেজে ভর্তি হলাম সাইকোলজি নিয়ে। ছোটোবেলার বন্ধুরা ছড়িয়ে ছিটিযে দূরে চলে গেলেও আমার আর টাপুরের যোগাযোগটা রয়ে গেল। টাপুর যাদবপুরে ম্যাথেমেটিক্স অনার্স নিয়ে ভর্তি হল। ওর বিদেশে গিয়ে রিসার্চ করার ইচ্ছে। টুপুর কলকাতা আসেনি। ও ফ্যাশন ডিজাইনিং পড়বে, তাই এন্ট্রান্স পরীক্ষার প্রিপারেশন নিচ্ছে। সেকেন্ড ইয়ারে বাড়ি গিয়ে শুনলাম, টুপুরকে নিয়ে বাড়িতে সমস্যা হচ্ছে। পাড়ায় হাওয়াতে কিছু কথা ভাসছে। কিন্তু সত্যিটা কেউ জানে না। সেন কাকু আর কাকি টুপুর-কে নিয়ে বারবার ডাক্তারের কাছে ভিজিট করছে।

মনটা খারাপ! আমার মাথায় তখন সেমেস্টারের গন্ধমাদন, টাপুরেরও তাই। সেমেস্টারের শেষে টাপুরকে ফোনে পাকড়াও করে বললাম, “চল একদিন দু’জনে ডে-আউট করি।’ প্রথমে টাপুর এড়াতে চাইলেও কী ভেবে শেষে রাজি হল। আমরা একটা সিনেমা দেখে রেস্তোরাঁয় বসলাম। টাপুর যেন ঠিক সহজ হতে পারছে না। বললাম, ‘টাপুর, আমার সাবজেক্ট সাইকোলজি। তাই তুই যাই লুকোস না কেন, আমার চোখকে ফাঁকি দিতে পারবি না। আমি তোর ছোট্টবেলার বন্ধু, তোদের খারাপ হোক চাইব না। টুপুরের কী হয়েছে? আমি তোর থেকে সত্যিটা শুনতে চাইছি।’

টাপুর কান্নায় ভেঙে পড়ে বলল, “টুপুর একটা বিশেষ রোগের স্বীকার। ছোটোবেলায় বোঝা যায়নি, কিন্তু মাঝে এমন অবস্থা হয়েছিল যে, ওকে নিয়ে কোথাও যাওয়া যেত না। গেলেই গণ্ডগোল হতো। তারপর থেকে টুপুর নিজেই কেমন গুটিয়ে গেছে। কোথাও যেতে চায় না, দিন দিন কেমন হয়ে যাচ্ছে।”

—এটা আমার সাবজেক্ট টাপুর। সাধারণের কাছে এর গুরুত্ব যত কম, আমার কাছে তত বেশি। প্রতিপদে মানুষ ভারসাম্য হারাচ্ছে। মেন্টাল ডিজঅর্ডার? ম্যাসিভ ডিপ্রেশন? এর মধ্যে কোনটা ?

টাপুর হাঁ করে তাকিয়ে বলে, ‘স্ট্রেঞ্জ, ভেরি স্ট্রেঞ্জ। তুই জানলি কেমন করে টুঙ্কা? এটা আমরা বাড়ির চারজন ছাড়া কোনও আত্মীয়স্বজন পর্যন্ত জানে না। অন্য রোগ জানে। জানিস তো শিক্ষিত লোকেরাও ডিপ্রেশনকে পাগল ছাড়া আর কিছু ভাবে না?’

—তোর মনে আছে টাপুর, একবার আমার জন্মদিনে তুই লীলা মজুমদারের লেখা ‘দিন দুপুরে’ বইটা গিফট করেছিলি। সেই রাতেই বইটা হারিয়ে যায়। আমি খুব কেঁদেছিলাম তোর দেওয়া বলে! যদিও বাবা আমায় কিনে দিয়েছিল। তাও দুঃখ যায়নি। একদিন তোদের বাড়ি গিয়ে তোদের বুক শেলফে বইটা পাই। এছাড়াও আমাদের অনেকগুলো জমানো বিনাকা কী করে বাড়ি থেকে হারিয়ে গেছিল কেউ জানি না৷ ওগুলোও আমি তোদের খাটের তলার টাবে পেয়েছিলাম। বাড়িতে এসে বলায়, মা আমায় দিয়ে প্রমিস করিয়ে নিয়েছিল; তাই তোকে বলতে গিয়েও বলতে পারিনি।’

টাপুর বলল, “টুপুর পেন্টালুন্সের স্টোরে গিয়ে ধরা পড়েছে। ভাগ্যিস বাবা ছিল, তাই পুলিশ কেস হয়নি। ও যা যা শপ লিফটিং করেছিল, সব পে করে বাবা বাড়ি নিয়ে আসে। তার পরেই সাইকিয়াট্রিস্ট ডা. মিত্রের সঙ্গে কনসাল্ট করে ওর ট্রিটমেন্ট শুরু হয়। এখন অনেক বেটার আছে। জাস্ট নাও টুপুর কলেজেও যাচ্ছে।’

(ক্রমশ…)

ত্বকের ঘরোয়া যত্ন

আমাদের শরীরের বাহ্যিক সৌন্দর্য প্রতিফলিত হয় আমাদের ত্বকে। আর এই ত্বক খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ত্বক-ই দেহের সমস্ত অঙ্গ- প্রত্যঙ্গগুলিকে সুরক্ষিত রাখে। অথচ এই ত্বকেরই আমরা ঠিকমতো যত্ন নিই না অনেকসময়। এখন সূর্যের তাপ হালকা হলেও, ত্বকের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলে এবং ত্বককে ঝলসে দেয়। এই সময় ত্বকে নানান সমস্যা দেখা দেয়, যেমন— ট্যানিং, অ্যালার্জি, ব্রণ, ফুসকুড়ি, কালো ছোপ ইত্যাদি। এই সমস্যাগুলি থেকে রেহাই পেতে, দিনে ঘাম ঝরানো শরীরচর্চা করা দরকার। কারণ, ঘামের মাধ্যমে শরীরের মধ্যেকার দূষিত পদার্থ বেরিয়ে আসে। ঘামের মূল উপাদান জল, যার সঙ্গে মিশে থাকে বিভিন্ন লবণজাতীয় পদার্থ। তাই, যখনই রোদ থেকে ফিরবেন, তখন কিছুক্ষণ ঠান্ডায় থাকার পর ভালো কোনও মাইল্ড ক্লিনজার দিয়ে ঠান্ডা জলে মুখ ধুয়ে ফেলুন।

সান প্রোটেকশন

রোদে বেরোনোর অন্তত ১৫ মিনিট আগে সানস্ক্রিন লাগান। সান প্রোটেকশন লোশনের মধ্যে ক্যালামাইন, টাইটেনিয়াম ডাই- অক্সাইড বা জিংক অক্সাইড ব্যবহার করতে পারেন। শীতের শুরুতে ত্বকের সমস্যাগুলির মধ্যে যেগুলি সবচেয়ে বেশি হয়, সেগুলি হল—

ডার্ক সার্কেল

রোদে বেরোনোর ফলে চোখের চারপাশে কালো ছোপ পড়ে। তবে এই ছোপ স্থায়ী কোনও সমস্যা নয়। শশা ও আলুর রস সমপরিমাণ নিয়ে ফ্রিজে ঠান্ডা করে, চোখের চারপাশে লাগাতে পারেন। ঠান্ডা টি-ব্যাগও ব্যবহার করতে পারেন।

ব্রণ ও অ্যাকনে

শীতের শুরুতে যাদের ত্বক শুষ্ক হয়ে ওঠে, তারাও ব্রণ ও অ্যাকনে সমস্যার সম্মুখীন হয়ে পড়েন। এতে শুধু বিশ্রী দেখতেই লাগে না, ত্বকে স্থায়ী দাগ বা গর্ত হয়ে যেতে পারে। তাই খুব ভালো ভাবে যত্ন নিয়ে এই সমস্যার সমাধান করতে হবে। পুদিনাপাতার রস অ্যাকনে ও ব্রণতে খুব ভালো কাজ করে। এই রস লাগিয়ে ১০ মিনিট রেখে ঠান্ডা জলে ধুয়ে ফেলুন। ব্রণ শুকিয়ে গিয়ে কালো দাগ হয়ে গেলে, ওই জায়গায় রসুনবাটা লাগিয়ে আঙুলের ডগায় একটু চাপ দিয়ে ঘষে ধুয়ে ফেলুন, উপকার পাবেন। রসুন এবং পুদিনাপাতা দুটিই ত্বকের যে-কোনও ইনফেকশন সারাতে সাহায্য করে। পাকা পেঁপে চটকে মুখে ও হাত-পায়ের যে সমস্ত জায়গা রোদে পুড়ে কালো দাগ হয়েছে, সেখানে লাগাতে পারেন।

ত্বকের রিংকল

বয়স বাড়লে খুব স্বাভাবিক ভাবেই ত্বকে বলিরেখা দেখা যায়। এছাড়া হালকা রোদে দীর্ঘক্ষণ থাকার ফলেও ত্বকে বলিরেখা পড়ে যায়। এই অকাল বলিরেখা রোধ করার জন্য ত্বকের বিশেষ যত্ন নিন। সপ্তাহে অন্তত একদিন সরষেবাটার সঙ্গে কাঁচা দুধ মিশিয়ে মাস্ক তৈরি করে সারা গায়ে মেখে ত্বককে ময়েশ্চারাইজড করে নিন। কারণ শুষ্ক ত্বকে বলিরেখা পড়ে তাড়াতাড়ি। আর শীতের শুরুতে ত্বককে সার্বিক ভাবে সুস্থ রাখতে রোদ কম লাগান। সেইসঙ্গে, রাসায়নিক পদার্থ এড়িয়ে, ঘরোয়া পদ্ধতিতে ত্বকের যত্ন নিন।

স্পেশাল কেয়ার

ত্বকের যত্ন নেওয়ার আগে আপনাকে জানতে হবে আপনার ত্বকের প্রকৃতি। এটি জানার পর খুব সহজেই আপনার কিচেন গার্ডেন থেকেই ত্বকচর্চার উপকরণ জোগাড় করে, হয়ে উঠতে পারেন সুন্দর ত্বকের অধিকারিণী। হাতের কাছেই রাখুন শসার রস, অ্যালোভেরা, পাতিলেবু, মিল্ক পাউডার, দই, কাঁচা হলুদ, চন্দন, ওটমিল, গাজর, মধু, পুদিনা, তুলসীপাতা ইত্যাদি। এগুলির সঠিক প্রয়োগ আপনার ত্বককে কোমল, উজ্জ্বল ও নমনীয় করে তুলবে।

ব্লিচ করুন

কাঁচাদুধ, মধু সমপরিমাণ ও তার সঙ্গে কয়েক ফোঁটা পাতিলেবুর রস মিশিয়ে মুখে, হাতে, পায়ে মেখে ১৫ মিনিট পর ঠান্ডা জলে ধুয়ে ফেলুন। এটি প্রাকৃতিক ব্লিচ। যাদের তৈলাক্ত ত্বক, তারা এই ব্লিচ ব্যবহার করে উপকার পাবেন।

স্কিন স্ক্রাব

ডেড সেল কিংবা তৈলাক্ত পদার্থ, ধুলোবালি প্রভৃতি ত্বকের উপরের রোমছিদ্রগুলি বন্ধ করে দেয়। ফলে ত্বকের ভিতরের দূষিত পদার্থ ঘামের আকারে বেরোতে পারে না। আর পারে না বলেই, ত্বকের নানা সমস্যা দেখা দেয়। সামান্য ওটমিল পাউডার, কয়েকটা পুদিনাপাতা, কয়েক ফোঁটা পাতিলেবুর রস, সামান্য টক দই ও কোরানো গাজর একসঙ্গে মিশিয়ে সামার স্কিন স্ক্রাব হিসাবে ব্যবহার করতে পারেন।

স্পেশাল প্যাক

কাঁচা হলুদবাটা কিছুটা নিয়ে এতে চন্দনের গুঁড়ো, শশার রস ও কয়েকফোঁটা পাতিলেবুর রস মিশিয়ে প্যাক তৈরি করুন। এই প্যাক মুখে লাগিয়ে ১৫ মিনিট রাখুন। শুকিয়ে গেলে ঠান্ডা জলে ভালো করে ধুয়ে ফেলুন। এটি ব্রণ সারাতে ভালো কাজ দেয়। এই প্যাকের মধ্যে তুলসী অথবা সামান্য পুদিনাপাতা বাটা মিশিয়ে নিলে ঠান্ডাবোধ হবে ও ত্বকের ডেড সেল বা মরা কোশ উঠে গিয়ে ত্বক হয়ে উঠবে আরও মসৃণ ও উজ্জ্বল।

টোনিং

বাজারে বহু কোম্পানির রেডিমেড টোনার পাওয়া যায়। কিন্তু এগুলিতে বেশিরভাগই অ্যালকোহল মিশ্রিত অ্যাস্ট্রিনজেন্ট থাকে। তাই ঘরোয়া টোনার তৈরি করতে, অ্যালোভেরা রসের সঙ্গে সামান্য গোলাপ জল মিশিয়ে নিন। এই মিশ্রণটি শুধু টোনিং-এর কাজই করবে না, অ্যালার্জি এবং র‍্যাশও সারাবে।

স্পেশাল Tips

ত্বকের পরিপূর্ণ যত্নের জন্য ঘরোয়া টোটকার পাশাপাশি, সঠিক এবং স্বাস্থ্যকর খাবারও খেতে হবে। এই বিষয়ে রইল কিছু স্পেশাল টিপস।

  • সকাল ৬টায় পান করুন এক গেলাস লেবুর জল (উষ্ণ) এবং সঙ্গে খান ভেজানো ছোলা-বাদাম সামান্য পরিমাণে
  • সকাল ৮টা থেকে সাড়ে ৮টার মধ্যে খান মাল্টি গ্রেইন ফ্লেক্স এবং গরম দুধ অথবা উপমা বা চিড়ের পোলাও এবং একটা ডিম
  • সকাল ১১টা থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যে আঙুর, কমলালেবু, বেদানা অথবা মুসম্বি লেবুর এক কাপ জুস অথবা গ্রিন টি পান করুন এবং মাল্টিগ্রেইন বিস্কুট খান
  • দুপুর ১টার মধ্যে খান ২টো মাল্টিগ্রেইন রুটি অথবা ভাত, ডাল এবং সবজি। সঙ্গে যেন থাকে স্যালাড এবং দই। ৩০ মিনিট বাদে পান করুন এক গেলাস জল
  • বিকেল ৫টার সময় খান বাড়িতে বানানো ভেজ স্যান্ডুইচ এবং স্যুপ অথবা গ্রিন টি পান করুন
  • রাত ৯টার সময় খান ২টো মাল্টিগ্রেইন রুটি অথবা ভাত, ডাল এবং সবজি। সঙ্গে যেন থাকে স্যালাড এবং দই। ৩০ মিনিট বাদে পান করুন এক গেলাস জল
  • সম্ভব হলে বিছানায় যাওয়ার আগে কিছুক্ষণ হাঁটাচলা করুন এবং পাঁচ মিনিট বিশ্রাম নিয়ে এক কাপ উষ্ণ দুধ পান করুন।

হাম্পি- এক আশ্চর্য স্থাপত্য নগরী (শেষ পর্ব)

মিউজিয়ামের প্রবেশ মূল্য জনপ্রতি ৪০ টাকা। এখানে নিওলিথিক যুগের মৃৎপাত্র, অস্ত্রশস্ত্র থেকে শুরু করে কৃষ্ণ দেবরায়ের সময়কালের ব্যবহৃত বাসনপত্র, অস্ত্র সংরক্ষিত আছে। এছাড়া, হাম্পির একটা থ্রিডি ম্যাপ, প্রত্যেকটা স্থাপত্য এলাকার বৈশিষ্ট্য। সবচেয়ে অবাক করেছে শরীরচর্চার জন্য ব্যবহার হওয়া বড়ো আকারের পাথরের ডাম্বেল। কতখানি শারীরিক সক্ষমতা থাকলে ওই ডাম্বেল ব্যবহার করা যায়, তা ভেবে অবাক হয়েছিলাম৷ প্রত্যেকটা নতুন গন্তব্যে থাকা চিড়িয়াখানা অবশ্যই দেখি। চিড়িয়াখানার প্রবেশমূল্য জনপ্রতি ৭৫ টাকা, পার্কিংয়ের চার্জ ৫০ টাকা। তবে কলকাতার আলিপুর চিড়িয়াখানায় যেমন ঢুকেই আমরা প্রাণীদের দেখতে পাই, এখানে সেরকম নয়। একটা বড়ো জঙ্গলকে চিড়িয়াখানায় রূপান্তরিত করা হয়েছে।

আসা যাওয়াতে দুই দুই চার কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে বেশ খারাপ অবস্থা হয়েছিল। জনপ্রতি ১৫০০ টাকায় সাফারির আলাদা ব্যবস্থা আছে। আমরা ওই হাঁটাপথেই চিড়িয়াখানায় ঘুরলাম। ভারতীয় নেকড়ে, নীল নেকড়ে, কাকাতুয়া, ময়ূর, জলহস্তী, জিরাফ, কচ্ছপ, কুমির, বাঘ ছাড়াও যাদের দেখে আনন্দ পেয়েছি, তারা হল কালো রাজহাঁস। কুচকুচে কালো শরীরে টকটকে লাল ঠোঁট ওদের দারুণ আকর্ষণীয় করেছিল। রোদের তাপ থেকে বাঁচতে প্রায় সব পশুপাখিই ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছিল। ফেরার পথটা যখন মনে হচ্ছিল শেষ হওয়ার নয়, তখন চিড়িয়াখানার এক কর্মী তার জিপে উঠিয়ে গেট পর্যন্ত ছেড়ে দিয়ে অশেষ উপকার করলেন। সময় যেহেতু বাঁধা, তাই হাম্পি বাজারের উদিপি হোটেলে দক্ষিণ ভারতীয় থালি খেয়ে আবার আমাদের গাড়ি ছুটল রাজা ও রানিদের রেখে যাওয়া ভগ্ন স্থাপত্যের দিকে। আনজান্যা পর্বতের শীর্ষে অবস্থিত হনুমানমন্দির হিন্দুদের একটা বিখ্যাত মন্দির। পাঁচশো সিঁড়ি চড়ে এই যাত্রায় ওই মন্দিরটাতে পৌঁছাতে পারিনি।

আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে ১৯৭৬ থেকে জাতীয় সম্পদ হিসেবে হাম্পির বিভিন্ন স্থানে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করে। এরমধ্যে ছিল রয়াল এনক্লোজার, বিতালা বাজার, জৈন মন্দির, পান সুপারি বাজার, রক কাট মন্দির, অষ্টভূজাকার স্নানাগার। এই খননে উঠে আসে পাথরের স্থাপত্য, টেরাকোটার কাজ, স্টুকো মূর্তি, মুদ্রা, মাটির বাসন, লোহার অস্ত্র, পুঁতি, গয়না, সিরামিক, চিনের পোর্সেলিন পাত্র এবং দ্বিতীয় শতক থেকে পাওয়া বিভিন্ন শিলালিপি। এই সমস্ত খনন হাম্পির ইতিহাস বুঝতে সহায়ক হয়েছে।

এবারে জানাব রয়াল এনক্লোজারের বিষয়ে। রাজা দ্বিতীয় হরিহর ১৩৭৭ থেকে ১৪০৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এখানে রাজত্ব করেছেন। এখানে রাজসভা, রাজার বাসস্থান, সুদৃশ্য বাগান, জলাধার ও নিকাশি ব্যবস্থা ও পুরো ঘেরা এলাকার একটা বিশেষ মহাদ্বারের ধ্বংসাবশেষ সংরক্ষিত আছে। এখানে প্রাসাদের দেয়ালে টেরাকোটার কাজ দেখলাম। এই চত্বরে সবাই সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে একটা প্ল্যাটফর্মে উঠে যাচ্ছে দেখে আগ্রহী হয়ে আমরাও পৌঁছালাম দেখতে। চারদিক দিয়ে সিঁড়ি চড়ে একটা বাঁধানো জায়গায় উঠলাম। এর নাম হল মহানবমী দিব্যা। নীচে দাঁড়িয়ে দেখলে সিঁড়িসহ পিরামিডের মতো দেখতে। এই সমতলে বসে রাজা ও পারিষদেরা নীচে ঘটে চলা উৎসব অনুষ্ঠান প্রত্যক্ষ করতেন।

দশদিনের দশেরা উৎসব এখানে হতো, তাই একে মহানবমী উৎসব বলা হয়ে থাকে। একটা বিশাল উঁচু বিস্তৃত অংশ থেকে বিভিন্ন উৎসবের শোভাযাত্রা দেখা হতো। সমতলের উপর একটা কাঠের কাঠামো ছিল, যা আজ আর নেই। শুধু ক্ষয়ে যাওয়া ও ভেঙে পড়া স্তম্ভগুলো টিকে আছে। পশ্চিমদিক ছাড়া বাকি অংশ খোলা, সম্ভবত ওইদিকটা রাজার প্রবেশের জন্য সংরক্ষিত ছিল। গ্রানাইট ও মার্বেল পাথর নির্মিত দেয়ালে বিজয়নগরের তৎকালীন দৈনন্দিন ক্রিয়াকর্ম খচিত আছে। যেমন রাজাদের জীবনযাপন, শিকার, পর্যটক ও বন্যপ্রাণীদের চিত্র। এই চত্বরেই আছে ১৩৭৭ থেকে ১৪০৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করা রাজা বীর হরিহরের রাজত্বের ধ্বংসাবশেষ। রাজসভা, বাসভবন, বাগান ও জল সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে তৈরি একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ অঞ্চল।

রাজকীয় স্নানাগারটি কালো পাথরে বিশেষ ভাবে নির্মিত ধাপ। সেখানে জলের প্রবেশ ও নির্গমনের কৌশল আমাকে অবাক করল। এছাড়া জনগণের ব্যবহারের জন্যও আয়তাকার পাথর দিয়ে সাজানো বৃহৎ জলাধার দেখলাম। কৃষ্ণ দেবরায় আর দুই রানির বাসস্থানও এখানে নির্মিত হয়েছিল। বাসস্থান ও বিভিন্ন মণ্ডপ, প্রাচীরের খসে পড়া পাথর অতীতের সমস্ত নির্যাস নিয়ে ধ্বংসাবশেষ হয়ে রয়ে গেছে। অতীত থেকে মন যখন বর্তমানে ফিরব ফিরব করছে, তখন তুঙ্গভদ্রা ড্যাম দেখার প্রস্তাব দিল আমাদের ড্রাইভার ওয়াসিম। যেহেতু আমরা পরেরদিন যে পথে ফিরব সেই পথে ১৫ কিলোমিটার গিয়ে আরও ১০ কিলোমিটারের বাঁক নিতে হবে, তাই ভাবলাম ব্যাপারটা পরেরদিন দেখাই ভালো। ড্যামের সান্ধ্যকালীন আলোকসজ্জা আকর্ষণীয়। এই কারণে ভ্রমণপিপাসুরা সন্ধেতেই এখানে যায়।

দু-কিলোমিটার পথ হয় হেঁটে বা বাসে যেতে হয়। যেহেতু সন্ধেবেলায় লোক থাকে, তাই তখন বাস ঘন ঘন ছাড়ে। আমরা পরদিন সকালে অতটা পথ গিয়েও, শারীরিক ক্লান্তি ও বেঙ্গুলুরু ফেরার তাড়া থাকায়, ড্যামের গেট থেকেই ফিরে আসতে হল।

সকালে গেস্টহাউসে ধোসা দিয়ে জলযোগ করলেও, বেলা বাড়তেই, রাস্তার ধারে একটা দক্ষিণ ভারতীয় দোকানে খেলাম কলাইয়ের ডাল দিয়ে তৈরি করা স্থানীয় খাবার পাড্ডু। এই ভ্রমণের অভিজ্ঞতা দীর্ঘদিন মনের মণিকোঠায় ঠাঁই পাবে। কারণ কত পরিশ্রম, নিষ্ঠা ও নান্দনিক অনুভূতি নিয়ে স্থপতিশিল্পীরা ওই অপূর্ব নগরী গড়ে তুলেছিল, তা ভাবলেও বিস্ময়বোধ হয়। যাইহোক, স্মৃতির ঝাঁপি ভরে ফিরে এলাম নিজের শহরে।

সমৰ্পণ (শেষ পর্ব)

আসলে আমার মা তার বোনকে এতটাই ভালোবাসতেন যে, মাসির বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ শুনতে চাইতেন না। তাই আমার ভাই যখন বাড়ি এসে রাগের মাথায় মাসিকে ‘বৃন্দাবনের বেশ্যা” বলে গালি দিয়েছিল, মা তখন ভাইয়ের গালে সপাটে একটা চড় বসিয়ে বলেছিলেন, ‘গুরুজনদের সম্মান করতে শেখো।’ কিন্তু আমার ভাই তাতে এতটুকুও বিচলিত না হয়ে বলেছিল, ‘আমি যা দেখে-শুনে এলাম তা কি সব মিথ্যে?’ তবে আমার মা-ও ছিলেন বক্তব্যে অবিচল। তিনি ভাইকে বলেছিলেন, “তুই যা জেনেছিস, সব ভুল, মিথ্যে। আর কোনওদিন যদি আমার বোনের সম্পর্কে অপমানজনক কথা বলিস তো আমার অন্য রূপ দেখবি।”

সেদিন মা এবং ভাইয়ের অমন ঝগড়া দেখে আমিও ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। ঠিক এমন সময় মাসির ফোন এল। মা তখন রাগের মাথায় মাসিকে জিজ্ঞেস করে বসলেন, ‘যা শুনছি তা কি সত্যি? তুমি কি সম্মান হারিয়েছ?’

মায়ের কথা শুনে মাসি বলেছিলেন, ‘এখন এসব কথার উত্তর খুঁজতে গিয়ে লাভ কী? পরিবারের লোকজন, সমাজ— সবাই মিলে যখন গুরুজির আশ্রমে এই সুদূর বৃন্দাবনে আমাকে জোর করে পাঠিয়ে দিয়েছিল, তখন কি কেউ আমার ভালোমন্দের কথা চিন্তা করেছিল? আমার যে সম্মানহানি হতে পারে, তা কি তখন কেউ ভেবেছিল? সবই কি আমার দোষ? আমার ইচ্ছেতে কি সবকিছু চলেছে? যা ঘটেছে কিংবা ঘটে চলেছে, তার জন্য কি আমি-ই দায়ী?’ মাসির থেকে অমন কথা শুনে মা তো রেগে আগুন। বলেছিলেন, ‘এমন জীবনের কী দাম! এর থেকে তো মরা ভালো।’

মায়ের কথার উত্তরে মাসি বলেছিলেন, ‘মরে যাওয়া কি অতই সোজা! সবার কি অত মনের জোর আছে?’ এভাবেই আরও কিছু কথা কাটাকাটির পর চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে গিয়েছিল মায়ের সঙ্গে মাসির যোগাযোগ।

এরপর সময়ের স্রোতে বয়ে গেছে সবার জীবনের অনেক ক’টা বছর। আমার মায়ের সঙ্গে মাসির যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নই ছিল। হঠাৎ দিল্লির এক হাসপাতাল থেকে একটা ফোন এল। জানা গেল, মাসি ক্যান্সারে আক্রান্ত। লাস্ট স্টেজ। চিকিৎসা চলছে। শেষবেলায় মাসি মায়ের সঙ্গে দেখা করার কাতর অনুরোধ জানিয়েছিলেন। সবকিছু জানার পর আমার মা পুরোনো মান-অভিমান ভুলে দিল্লি যাওয়ার প্রস্তুতি নিলেন। ভাইও কী ভেবে যেন সমস্ত রাগ-অভিমান ভুলে মাকে নিয়ে দিল্লি পাড়ি দিল।

মায়ের কাছ থেকে শুনেছিলাম, দিল্লি গিয়ে মা দেখে যে, মাসির সেই সুঠাম চেহারা ভেঙে জীর্ণকায় রূপ নিয়েছে। মুখোমুখি হওয়ার পর দু’জনে গলা জড়িয়ে অনেকক্ষণ কান্নাকাটি করেছিলেন। দুই বোনের অমন ভাব-ভালোবাসা দেখে আমার ভাইও কেমন অবাক হয়ে গিয়েছিল বলে শুনেছিলাম।

কিন্তু কান্নাকাটির পর মাসি হঠাৎ মাকে বলেছিলেন, ‘আর তো ক’টা দিন আছি এই পৃথিবীতে। তাই কোনও কথা আর গোপন রেখে মরতে চাই না। কী জানার আছে বল। আমি সব বলতে চাই আজ।’

এমন অবস্থায় মাসিকে শান্ত হতে বলেছিলেন আমার মা। কিন্তু মাসি থামেননি। প্রশ্ন করার আগেই অতীত তুলে ধরেছিলেন তিনি।

মাসি সেদিন মায়ের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, “শোন মিনতি, একা একটা মেয়ের বেঁচে থাকা বড়ো কঠিন রে। এটা আমি হাড়ে হাড়ে টের পাওয়ার আগেই নিজেকে বদলে নিয়েছিলাম। যখন দেখেছিলাম, বাপেরবাড়ির কিংবা শ্বশুরবাড়ির লোকেরা কেউ-ই আমার দায়িত্ব না নিয়ে বৃন্দাবন পাঠিয়ে দিল, তখন আমি মনকে শক্ত করে নিয়েছিলাম। ঠিক করেছিলাম, ঝড়- ঝাপটা যাই আসুক না কেন, সব সামলাব শক্ত হাতে।

অবশ্য এই লড়াই শুরু হয়ে গিয়েছিল আরও আগে থেকেই। স্বামীকে বাঁচানোর জন্য কতগুলি অন্ধ-কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষ যখন ভণ্ড গুরুজির সেবা করতে বাধ্য করেছিল, সেই তখন থেকেই আমার কপাল পুড়তে শুরু করেছিল। আমার সতীত্ব হরণ হয়েছিল তখনই। তাই বৃন্দাবনে গিয়ে নতুন করে আর খারাপ হতে হয়নি।

অতএব বেঁচে থাকার জন্য গুরুজির দয়া ছাড়া আর দ্বিতীয় কোনও পথ খোলা ছিল না আমার কাছে। আর আমি জানি যে, বিধবা এক মহিলা বাড়ি ছেড়ে বৃন্দাবনের আশ্রমে থাকলে, তাকে সমাজ বেশ্যা-ই তো বলবে। অথচ সেই সমাজই রক্তচক্ষু দেখিয়ে এই বিধবাকে গুরুজির পায়ে সমর্পণ করেছিল। শালীনতা রক্ষা করা কি শুধু নারীর দায়িত্ব, কর্তব্য?” এক নিশ্বাসে জীবনের গোপন ঝাঁপি খুলে দিয়ে মাসি তার বোনের কোলে এলিয়ে দিলেন শরীরটাকে।

একটু দূরে দাঁড়িয়ে আমার ভাই সব শুনছিল। সব শুনে মাসির প্রতি সমস্ত ঘৃণা যেন মুহূর্তের মধ্যে দূর হয়ে গিয়েছিল তার। কিন্তু সে যখন মাসির পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে গেল, তখন মাসি ইহজগৎ ত্যাগ করেছিলেন।

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব