হাম্পি- এক আশ্চর্য স্থাপত্য নগরী (পর্ব-০২)

বিতালা মন্দির চত্বরের বাইরে পূর্বদিকে ৯৭৫ মিটার লম্বা ও ৩৯৬ মিটার চওড়া বাজার ছিল। এখন যার কাঠামোটুকুই অবশিষ্ট আছে, কোথাও শুধু কয়েকটা পিলার। মন্দিরে যাওয়ার পথের দু-পাশে এরকম প্রাচীন ধ্বংসপ্রাপ্ত মণ্ডপ ও বাজার চোখে পড়ল। মন্দিরের উত্তর-পূর্বে আছে বিষ্ণু বা ব্রহ্ম বিতালা মন্দির ও তৎসংলগ্ন মণ্ডপ, বাজার। মূল মণ্ডপে কৃষ্ণের বিভিন্ন লীলা ও রামায়ণের ঘটনাবলি খোদিত আছে। প্রত্যক্ষ করলাম দেয়ালে মাওয়ালি আর্ট। পিলারে বিভিন্ন চরিত্র ও স্বরলিপিগুলিও এককথায় অপূর্ব। উৎসব মণ্ডপের মুক্ত মঞ্চটা ষোড়শ শতকে তৈরি হয়েছিল।

বিতালা মন্দির যাওয়ার পথে আছে আয়তাকার তল বিশিষ্ট দোতলা প্রবেশ পথ— তলাভারাঘাটা। প্রায় ভগ্নদশা নিয়ে এখনও দাঁড়িয়ে আছে এই অংশটি। বিতালা মন্দিরের কাছেই আছে কুডুরে গোম্বে মণ্ডপ, যেখানে উৎসবের সময় দর্শনার্থীরা একত্রিত হতো। পিলারে ঘোড়সওয়ার খোদাই করা আছে।

 

১৫১৩ খ্রিস্টাব্দে কৃষ্ণ দেবরায় দ্বারা নির্মিত কৃষ্ণ মন্দির, বালকৃষ্ণকে ওড়িশার উদয়গিড়ি থেকে আনা হয়েছিল। এখানে গর্ভগৃহ, অন্তরাল, অর্দ্ধমণ্ডপ ও মহামণ্ডপ আছে। এছাড়াও এখানে অনেক ছোটো ছোটো মন্দির আছে। সবচেয়ে বড়ো গোপুরাতে কলিঙ্গ যুদ্ধের স্টুকো আকৃতির কারুকাজের দেখা মিলল। এই অঞ্চলে এই বিস্তৃত ঐতিহাসিক স্থাপত্য দেখতে হলে ইচ্ছের সঙ্গে সঙ্গে দু’পায়ের বলভরসা প্রবল ভাবে প্রয়োজন। বিতালা মন্দিরের উত্তর প্রবেশদ্বারের থেকে খানিকটা এগোলে পাওয়া যায় কিংস ব্যালেন্স। বিভিন্ন উৎসব উপলক্ষ্যে রাজার দামি পাথর ও ধাতু মাপার জন্য এই তুলাযন্ত্র ব্যবহৃৎ হতো। মন্দির ও জনসাধারণকে দান দেওয়ার সময় এটা কাজে আসত। দুটো গ্রানাইটের স্তম্ভের মাঝে রয়েছে একটা কারুকার্য করা বিম। স্তম্ভে রাজা কৃষ্ণ দেবরায় ও রানিদের জীবন বর্ণিত আছে।

এখানের সব দর্শনীয় স্থানই সন্ধে ছ’টায় বন্ধ হয়ে যায়। তাই বেলা থাকতেই আসার পথে ফেলে আসা কুইনস বাথ দেখার জন্য ফিরে এলাম। এখানে এসে বালি, সুগ্রীবদের বর্তমান বংশধরদের সঙ্গে দেখা হল। যদিও তারা কারও বিরক্তির কারণ না হয়ে নিজেদের মধ্যে খেলায় মত্ত ছিল। ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্যের অন্যতম নমুনা এই কুইনস বাথ। ১৫ বর্গমিটার ক্ষেত্রফলের ও ১.৮ মিটার গভীরতার এই বর্গাকার স্নানাগারের তিনদিকের খোলা আর্চ আলো প্রবেশের উপযোগী। চারপাশের করিডরের মাঝে মাঝে ঝুলবারান্দা আছে। দক্ষিণের একমাত্র সিঁড়ি স্নানাগারে নেমে গেছে। এখানেও সিলিংয়ের কাজগুলো অনেকাংশেই নষ্ট হয়ে গেছে।

স্নানের পরে পোশাক পরিবর্তনের জন্য সারি সারি ঘর ছিল। বর্তমানে তা কালের গর্ভে লীন হয়েছে। শুধুমাত্র উপরে ওঠার সিঁড়িটা অবশিষ্ট আছে। একজন মহিলা সিকিউরিটি খুব আন্তরিকতার সঙ্গে আমাদের ছবি তুলে দেওয়ার পর আমরা বেরিয়ে পড়লাম। এখানে বিনামূল্যে প্রবেশ করা যায়, গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য কোনও অর্থমূল্য নেই। প্রাচীন এই নগরীর বুকে ততক্ষণে সন্ধে নেমে এসেছে। গেস্টহাউসে ফিরে, ঘরে দেওয়া ইলেকট্রিক কেটলিতে চা বানিয়ে তা পান করে চায়ের তৃষ্ণা নিবারণ হল। সাড়ে আটটায় এল রুটি, ডাল, সবজি, আচার, স্যালাড ও দইয়ের দেড়শো টাকা মূল্যের থালি।

পরদিন নতুন কিছু দেখার স্বপ্ন নিয়ে ঘুমোতে গেলাম। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্তই হাম্পি ভ্রমণের সঠিক সময়। খোলা আকাশের নীচে এই পাথুরে স্থাপত্য প্রত্যক্ষ করতে হয় বলে পরদিন সকাল সকাল ধোসা ও চা সহযোগে ব্রেকফাস্ট সেরে বেরিয়ে পড়লাম বিরূপাক্ষ মন্দিরের উদ্দেশ্যে। এটা সপ্তম শতকে নির্মিত শিবমন্দির। এখনও বিগ্রহ আছে ও প্রতিদিন পুজো হয়। মন্দিরে ঢোকার জন্য জুতো জমা দেওয়ার আগে পাশ দিয়ে প্রবাহিত তুঙ্গভদ্রা নদী দেখে নিলাম। যদিও এই অংশে নদী বেশ মজে গেছে। এখানেও ভগ্ন বাজার, অতীতের পুষ্করিনি নজরে পড়ল। প্রত্যেকে ২ টাকার বিনিময়ে জুতো জমা রেখে মন্দিরে প্রবেশ করলাম।

১৪০০ শতকে রাজা কৃষ্ণ দেবরায়ের অভিষেক উপলক্ষ্যে পুনরায় নির্মিত এই মন্দিরটিকে প্রসন্ন বিরূপাক্ষও বলা হয়। দক্ষিণ ভারতের সমস্ত মন্দিরের বৃহদাকার পিরামিডের মতো প্রবেশদ্বারকে গোপুরা বলে। এই মন্দিরেও এরকম স্বর্ণসদৃশ গোপুরা আছে। কয়েকটা কৌণিক মণ্ডপ ও মাঝের মহামণ্ডপে দীপস্তম্ভ আছে। এছাড়াও দক্ষিণে ক্ষয়ে যাওয়া বারান্দা ও স্তম্ভ আছে। পূর্বমুখী এই মন্দিরটা ভূমির থেকে অনেক নীচে অবস্থিত হওয়ায় একে ভূনিম্নস্থ শিবমন্দিরও বলে। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ছিল মিউজিয়াম ও জু। তাই, আমরা পাথুরে স্থাপত্যকে ডাইনে, বাঁয়ে রেখে এগিয়ে চললাম।

(ক্রমশ…)

হাম্পি—এক আশ্চর্য স্থাপত্য নগরী (পর্ব-০১)

পাথুরে স্থাপত্যের বিস্তৃত অঞ্চল দেখার জন্য আদর্শ সময় শীতকাল। যে সময়ে রোদের তীব্রতা মানুষকে কাবু করতে পারে না। আমরা বেঙ্গালুরু থেকে গাড়ি ভাড়া করে দু-দিন তিনরাত্রি সময় নিয়ে এসেছিলাম। চুক্তিমতো আমাদের ৭৫০ কিমি ১০,৮০০ টাকা, টোল, পার্কিংয়ের খরচ ও অতিরিক্ত দূরত্বের জন্য ১১ টাকা প্রতি কিলোমিটার দরে এসেছিলাম। এছাড়া রেল ও সড়কপথে বাসে হসপেট হয়ে এখানে আসা যায়। গাড়ির সুবিধে ভ্রমণপথে নিজের ইচ্ছেমতো ঘোরা যায়। স্থানীয় ভাবে ঘোরার জন্য অবশ্যা অটো ভাড়া পাওয়া যায়। আগে থেকে পরিকল্পনা করে আমরা প্রথমদিনের জন্য রেখেছিলাম বিতালা মন্দির ও তুলাভারা। যদিও সময় থাকায় আমরা লোটাস মহল ও জেনানা এনক্লোজার ওইদিনেই দেখে নিয়েছিলাম।

পৌরাণিক ব্যাখ্যায় রামায়ণের কিস্কিন্দা এই অঞ্চলকে বলা হয়। অর্থাৎ সুগ্রীব, বালির রাজ্য ছিল এখানেই। একে শিবভূমি তথা পম্পাক্ষেত্রও বলা হয়। এই নগরী মৌর্য, চালুক্য, রাষ্ট্রকূট ও যাদব বংশ দ্বারা শাসিত হয়েছে। ১৩৩৬-১৩৪২ খ্রিস্টাব্দে হরিহর ও বুকা নামের দুই রাজা বিজয়নগর পত্তন করেন, যার রাজধানী হয় হাম্পি। এর পরেও ১৫৬৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত হিন্দু রাজাদের আধিপত্য ছিল। তালিকোটা যুদ্ধের পর এই নগরের ধ্বংস আসন্ন হয়। পরবর্তীতে দ্বিতীয় হরিহর, প্রযুদ্ধ দেবরায়, কৃষ্ণ দেবরায় ও অচ্যুত আর্য দেবরায় নামক উল্লেখযোগ্য রাজাদের দ্বারা শাসিত হলেও, পূর্বের গৌরবোজ্জ্বল দিন আর ফিরে আসেনি। ফিরিস্থা, আব্দুল রাজ্জাক, ডমিঙ্গোস পিস, ফারনাও নুনিস, ইবন বতুতা, ডুয়ার্তি বারবোসা, নিকোলো দি কন্টি প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য পর্যটক এই অংশে পরিভ্রমণ করে তাঁদের অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করে গেছেন।

একটা সম্পূর্ণ নগর তার অপূর্ব স্থাপত্য নিয়ে অপেক্ষা করে আছে আজকের পর্যটকদের জন্য। এখানে লজ, গেস্টহাউস হোটেল সবই আছে। এছাড়া শহরের স্থায়ী বাসিন্দাদের ঘরবাড়িও আছে। যেহেতু আমরা বেলা দেড়টাতে পৌঁছেছিলাম, তাই দুপুরের খাবার স্থানীয় রেস্তোরাঁ থেকে আনাতে হয়েছিল। স্নান, খাওয়া সেরে বেলা তিনটেতে আমরা আমাদের গাড়িতেই রওনা হলাম কমলাপুর অঞ্চলের বিতালা মন্দিরে।

প্রায় এক কিলোমিটার যাওয়ার পর রাস্তার ডান পাশে দেখলাম তৎকালীন টাকার ছাপাখানা। পাঁচিল সহ এলাকাটার ভগ্ন দশা। ওই চত্বরেই দেখলাম পাথুরে ইটে তৈরি ভগ্নপ্রায় মসজিদ ও তার থেকে ১০০ মিটার দূরত্বে একটা ভেঙে পড়া ওয়াচ টাওয়ার। লোটাস মহলের বাইরে টিকিট ঘর থেকে জনপ্রতি ৪০ টাকা দিয়ে টিকিট কাটার পর, ওই চত্বরটা ঘুরে দেখার সিদ্ধান্ত নিলাম। এখানে দেখলাম লোটাস মহল, জেনানা এনক্লোজার, রানিদের স্নানাগার, কোষাগার ও হাতিদের থাকার জায়গা।

ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্যে তৈরি লোটাস মহলকে চিতরঙ্গি মহলও বলা হয়। এটা পাথুরে ইটের উপর প্লাস্টার করা একটা দ্বিতল ভবন। ঠিক মাঝখানে ছাদের অংশে গোপুরার মতো দেখতে ন’টা ছোটো ছোটো অংশ আছে। গোপুরার সামনের প্রান্তভাগ ক্রমশ বড়ো থেকে ছোটো হয়েছে। সবার উপরে আছে একটা পিরামিডাকৃতির গম্বুজ। প্রবেশদ্বারে স্টুকো আর্ট দেখা গেল। উপরে ওঠার সিঁড়ি এখনও অবশিষ্ট আছে। কাছাকাছিই তৎকালীন নারীদের বাসস্থান, জলমহল ও কোষাগার নিয়ে ৩০,০০০ বর্গমিটার ক্ষেত্রের জেনানা এনক্লোজার। একটা ধাপসহ প্লাটফর্ম দেখলাম, যেটা রানিদের প্রাসাদের ভিত্তি। মূল প্রাসাদটা আর অবশিষ্ট নেই।

জেনানা এনক্লোজারের পুবদিকের দেয়ালের সঙ্গে পর পর একইরকম দেখতে এগারোটা কক্ষ নিয়ে ছিল হাতিশালা। কক্ষগুলো উত্তর থেকে দক্ষিণে ৮৫০ বর্গমিটার ক্ষেত্র নিয়ে বিস্তৃত। কক্ষগুলোর মাথায় গম্বুজাকৃতির, গোল ও অষ্টভূজাকার চূড়া আছে। কেন্দ্ৰীয় কক্ষের মাথায় বর্গাকার পথযুক্ত ছাদ আছে। হাতিশালার কাছেই পেলাম আয়তাকার গঠনের রক্ষীদের ভবন। এগুলো ঠিক কক্ষ নয়, একটা টানা বারান্দা, যার সামনে পর পর আর্চ। মাঝখানে বারান্দায় ওঠার জন্য সিঁড়ি আছে। এখান থেকে বেরিয়ে আরও আট কিলোমিটার যাওয়ার পর পেলাম বিতালা মন্দির।

লোটাস মহলে জনপ্রতি চল্লিশ টাকায় যে-টিকিট সংগ্রহ করেছিলাম, তাতেই বিতালা মন্দিরে ঢোকা গেল। মূল মন্দিরে যেতে প্রায় এক কিলোমিটার পথ যেতে হয়। তাই আসা যাওয়া নিয়ে জনপ্রতি কুড়ি টাকায় লম্বা লাইন দিয়ে ট্রেকারে উঠলাম। দ্বিতীয় দেবরায় এই বিষ্ণু মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বলে এমনটা জানা গেছে। পরে কৃষ্ণ দেবরায় এর পরিবর্ধন করেন। ১৫০০ ও ১৬০০ শতক জুড়ে মূলত রাজ পরিবারের ব্যবহারের জন্য এই মন্দিরটা তৈরি হয়েছিল।

ঢুকেই একটা পাথরের রথ চোখে পড়ল। যেটা আগে চালানো হতো। ক্ষয় রোধের জন্য বর্তমানে ভূমিতে আটকে দেওয়া হয়েছে। এটা বিষ্ণুর বাহন গারুডার পবিত্র স্থান। রথের উপরের ইট-নির্মিত অংশ বর্তমানে ভেঙে পড়েছে। পূর্বমুখী এই মন্দিরের বিস্তৃত মণ্ডপ অতিক্রম করলে বিষ্ণুর গর্ভগৃহ নজরে পড়ে। বর্তমানে বিগ্রহ না থাকলেও, ওই অন্ধকার গর্ভগৃহ প্রদক্ষিণ করার রীতি আছে। মহামণ্ডপ ছাড়াও আছে কল্যাণ মণ্ডপ ও উৎসব মণ্ডপ। এই অঞ্চলের প্রায় প্রত্যেকটি মন্দিরের সঙ্গে ছিল ধর্মশালা ও বাজার।

(ক্রমশ…)

অবাক পৃথিবী (শেষ পর্ব)

যখন-তখন অনলাইনে জিনিস কেনা। কুঁড়ের বাদশা কোথাকার! ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই। এরা কী ধরনের উটকো জীব!

—কথায় আছে নিজের ভালো তো পাগলেও বোঝে। এরা কি তবে পাগলের চেয়েও অধম? এমনকী, সামান্য পিঁপড়েটাও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে পূর্ণ সচেতন।

গৌরাঙ্গবাবু স্বীকার করেন যে, পরস্পর দুই প্রজন্মের মানুষের মধ্যে ব্যবধান থাকাটা অতি স্বাভাবিক এবং এটা সর্বকালের স্বীকৃত ঘটনা। তাই বলে এতটা?

—বাবুর জিরো ব্যালেন্স অ্যাকাউন্ট। সেই কারণে ন্যূনতম পুঁজিটুকুও রাখার প্রয়োজন মনে করে না। অর্থাৎ খাও-দাও আর বুঁদ হয়ে যাও। কোথাও কাঁচা টাকার লেনদেন নেই। সবই প্রিপেইড। প্লাসটিক কার্ড জিন্দাবাদ! বাবুগিরির চূড়ান্ত। সহ্য করা যায় না, পরাণ যায় জ্বলিয়া। অথচ মুখ ফুটে তাকে কোনও ভালো-মন্দ পরামর্শ দেওয়া যাবে না। ওটা তার নিজের উপার্জিত ধনলক্ষ্মী। বয়স হয়ে গেল চতুর্বিংশতি বৎসর, কিন্তু জীবন সম্পর্কে এখনও অচৈতন্য। অথচ এই বয়সে আমরা কত ম্যাচিওরড ছিলাম! ব্যাংক-এর পাশবুক-টা যে সময় করে কখনও কখনও আপ-টু-ডেট করানো উচিত, সেই ব্যাপারেও কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই।

–বাবু লাইনে দাঁড়াতে চান না। ঘোর অনীহা। তাঁর নাকি সময়ের অপচয় হয়। বাবু মুকুটহীন সম্রাট, তিনি যে কোন রাজ্য পরিচালনায় ব্যস্ত থাকেন কে জানে? ঢাল নেই, তলোয়ার নেই, আমি নিধিরাম সর্দার! পাশবইটা হারিয়ে যাওয়ার ফলে যার সাহায্যে আবার নতুন করে তৈরি করে আনা হয়েছিল, ব্যাংক-এর নিয়ম অনুযায়ী অতিরিক্ত দেড়শো টাকার বিনিময়ে তিনি যে অ্যাকাউন্ট থেকে ডেবিট করবেন সেই টাকাটা, তারও কোনও উপায় ছিল না। কারণ ভাঁড়ারঘর শূন্য।

ভদ্রলোকের মুখে কথাটা শোনার পরে সেদিন পকেট থেকে টাকাটা হাত বাড়িয়ে দিতে চাইলে ভদ্রলোক তা নিতে অস্বীকার করেছিলেন। ছিঃ কী লজ্জার কথা !

—মেয়ে হয়ে জন্মালে বিষয়টা বোধহয় এতটা দৃষ্টিকটূ লাগত না। কিন্তু ছেলেদের যে প্রসাধনের প্রতি কোনওরূপ দুর্বলতা থাকতে পারে, কথাটা ওকে কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ না করলে কেউ বিশ্বাসই করবে না। নামী ব্র্যান্ডেড কোম্পানির পাউডার, ক্রিম, শ্যাম্পু, বডিলোশন আর সাবান ছাড়া তিনি ব্যবহার করতে পারেন না! এ এক অবিশ্বাস্য ঘটনা!

অথচ গৌরাঙ্গবাবুর স্পষ্ট মনে আছে, চাকরি জীবনে প্রথম ট্যুরে যাওয়ার সময় মাত্র দশ টাকার দশটি শ্যাম্পু পাউচ সঙ্গে নিয়ে তিনি ট্রেনে উঠেছিলেন। তাতে দাড়ি কাটা, গায়ে মাখা, মাথায় দেওয়া থেকে শুরু করে কখনও কখনও বিশেষ প্রাকৃতিক ক্রিয়া শেষে বাঁ-হাতটাও ধৌত করতে হতো। হায়, একাল আর সেকালের মধ্যে জমিন আসমান ফারাক !

—দেড় লাখের উপর টাকা খরচ করে বাবু বুলেট গাড়ি কিনেছে অথচ একবারও ভেবে দেখল না যে, তাতে এক কিলো আলুও বহন করা যায় না। বেআক্কেল কোথাকার! একেবারেই আহাম্মক, মোটা মাথা যাকে বলে!

একদিন শরৎচন্দ্র পণ্ডিতের উদাহরণ পেশ করতেই পুত্র জবাবদিহি করেছিল এই বলে— ‘সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম’। ওনার খালি পায়ে চলতে ভালো লাগত তাই চলতেন। ভালো লাগার বিষয়গুলো সবার ক্ষেত্রে আলাদা আলাদা। উনি যা করতে ভালোবাসতেন সেটা যে আমাকেও নকল করতে হবে, সেকথা কোথাও লেখা আছে নাকি? তাতে ফলটা কী হল? ইদানীংকালের লোকেরা কেউ তাঁকে চেনে? না কোনও ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে তাঁর নাম খোদাই করা আছে?

ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে কত শত বাঙালি ফাঁসির মঞ্চে প্রাণ হারিয়েছেন। স্বাধীন ভারতের ক’টা লোক হাতে গুনে তাঁদের নাম বলতে পারবেন? ক’জন স্বাধীনতা সংগ্রামীর স্মৃতির উদ্দেশ্যে স্মারক তৈরি হয়েছে বলতে পারো? তাই ‘আমাকে আমার মতো থাকতে দাও’। আমি ‘নতুন ছন্দে লিখব জীবন’।

—ওকে কতবার বলা হয়েছে, বালিশের তলায় মোবাইল ফোন রেখে যেন না ঘুমোয়। এখনও পর্যন্ত অনেক মানুষের মৃত্যু হয়েছে মোবাইল ফোন ফেটে গিয়ে। কিন্তু কে কার কথা শোনে? এরকম দুর্ঘটনা যে কারওর জীবনে আর কখনও ঘটবে না, তা কি কেউ বলতে পারে? যে-কোনও মুহূর্তে ঘটে যেতে পারে এমন দুর্ঘটনা। এরা আবার নিজেদের শিক্ষিত বলে! যাদের চোখে আঙুল দিয়ে বোঝানো সত্ত্বেও বোঝার চেষ্টা করে না, তারা এক কথায় নিরেট নির্বোধ।

—বছরে কতবার যে চাকরি ছাড়ে আর ধরে, তার কোনও হিসেব নেই। এরা নাকি কর্পোরেট সেক্টরের উৎসর্গীত কর্মচারী! মিথ্যে ঠাঁট-বাট আর কথায় ফুলঝুরি, এই হল তাদের একমাত্র যোগ্যতা। এরা নিজেদের মধ্যে ইংরেজিতে বার্তালাপ করে। এরা নাকি আমেরিকান ইংলিশ ফলোয়ার। অনেকটা হাঁটু ভাঙা দ’য়ের মতো অবস্থা। যার মধ্যে ভার্ব নেই, টেন্স নেই, মুড নেই— তবু ইংরেজি বলা চাই। অবশ্য কোনও বিষয়ে চিঠি লিখতে গেলে শেষ পর্যন্ত ইন্ডিয়ান ইংরেজি জানা বাপের কাছেই আবার ফিরে আসতে হয়। ইংরেজিতে শেক্সপিয়র বানানের শেষে আর (R) থাকে, নাকি ই (E) থাকে, তাও হলপ করে বলতে পারে না।

—আমার পুত্র কিনা আবার ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক! হাসি পায় কথা শুনলে! তিন বছরের মধ্যে সাহিত্যের একটি বইয়ের পাতাও খুলতে দেখিনি। বই পড়ার কথা বললে গায়ে জ্বর আসে অথচ সারাদিন মোবাইল নিয়ে নাড়াচাড়া করতে কোনও আলসেমি নেই। আমার বাবার সংগৃহীত বই থেকে মিখাইল শ্লোকোভ (Mikhail Sholokhov) রচিত চার খণ্ডে সমাপ্ত ‘অ্যান্ড কুইট ফ্লোজ দি ডন’ (And Quiet Flows The Don) বইটা ওকে অন্ততপক্ষে চারবার অনুরোধ করেছিলাম পড়ে দেখার জন্যে। প্রত্যেকবার একই উত্তর— রেখে দাও, পরে পড়ব। সেই থেকে বাবু এখনও পর্যন্ত পড়ে উঠতে পারলেন না বইখানা। অথচ ফুটপাত থেকে কিনে আনা চেতন ভগত রচিত ‘হাফ গার্ল ফ্রেন্ড’ বইটা দেখে আমি হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম।

—বইটা পড়তে বলে আমি যে সেদিন কতটা ভুল করেছিলাম তা বুঝতে এখন একটুও অসুবিধে হয় না। আমি নিজে পড়ে যতটা তৃপ্ত হয়েছিলাম, আমি ওকেও সেই রস আস্বাদন করাতে চেষ্টা করেছিলাম। অর্থাৎ ‘আপনি আচরি ধর্ম” আমি অপরকে শেখাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পারিনি। আমি হেরে গিয়েছিলাম নিজের কাছে। সেইদিনই প্রথম উপলব্ধি করেছিলাম, পাত্র বিশেষে জ্ঞানদান করা বিধেয়, অন্যথায় অপমানিত হতে হয়। এখন ইংরেজি স্কুলে পড়াবার ফল পাচ্ছি হাড়ে হাড়ে। না শিখেছে বাংলা, না শিখল ইংরেজি! একেক সময় গৌরাঙ্গবাবু নিজের অজান্তে ভাবেন— কী দুর্ধর্ষ ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ। পরের ছেলে নরেনকে নিজগুণে তিনি স্বামী বিবেকানন্দরূপে তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ভাবা যায় সেই কথা! অথচ কী আশ্চর্য! আমি নিজের ঔরসজাত পুত্রকে যেমনটি করতে চেয়েছিলাম, তেমন করে তৈরি করতে পারিনি। সবই কপাল! কথায় আছে— ম্যান প্রোপোজ গড ডিসপোজেস।

ঘণ্টাখানেক বাদে বাড়িতে ফিরে এসে দেখেন, বিশাল বিপুল আকারের একটি পিসবোর্ডের তৈরি বাক্স পড়ে আছে মেঝেতে আর ইতস্তত ছড়ানো ছিটানো নানান প্রয়োজনীয় সামগ্রী। বিশেষ উৎকণ্ঠিত হয়ে ওঠে তাঁর মন। মনে মনে ছেলের উপর একটু অসন্তুষ্ট হন।

—কী দরকার ছিল একসঙ্গে এতগুলো অর্থের অপচয় করার?

ভাগ্নি অতসী মামার মনের ভাবখানা বুঝতে পেরে তাকে আশ্বস্ত করতে গিয়ে বলে, ‘মামা, এগুলো ভাইয়ের গিফ্ট এসেছে আমেরিকা থেকে। ভাই কোনও এক কোম্পানির প্রোডাক্টের উপর নিজের লেখা একটি ক্যাপশন পাঠিয়েছিল। ভাইয়ের লেখাটাকে তারা প্রথম স্থান দিয়েছে। তাই খুশি হয়ে এই উপহারগুলো ভাইকে পাঠিয়েছে। এতে আঠারোটি আইটেম আছে আর দু’হাজার ডলারের একটি অ্যাকাউন্ট চেক পাঠিয়েছে। ওটা ভাইয়ের ব্যাংক-এ জমা পড়বে। ভাবা যায় একথা!

গৌরাঙ্গবাবু সেই মুহূর্তে শিশুর অপার বিস্ময়ভরা দৃষ্টি মেলে বিষয়টা অনুধাবন করার চেষ্টা করছিলেন। কেবলই মনে পড়ছিল সেই আপ্ত বাক্যটি— ‘স্বপ্ন শুধু সত্য আর সত্য কিছু নয়’। তিনি কি সেই মুহূর্তে চোখ খুলে দিবাস্বপ্ন দেখছেন? সেই মুহূর্তে তার ইন্দ্রিয়গুলো অসাড় হয়ে পড়েছিল বলে বোধ হচ্ছিল। এও কি সম্ভব? তিনি ভুল কিছু শুনছেন না তো? ভুল কিছু দেখছেন না তো? সব সত্যি তো!

কেবলই মনে হচ্ছিল, ছেলের কাছে তিনি হেরে গিয়েছেন। তবুও বারে বারে ঘুরে ফিরে একটা কথাই মনে পড়ছিল। তাই নিজেকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন এই বলে— পুত্রের কাছে পিতার পরাজয় সে তো পরাজয় নয়, গর্বের বিষয়। পুত্র সিদ্ধার্থের সিদ্ধিলাভের পরে পিতা শুদ্ধোদন পুত্রের চরণ স্পর্শ করে তাঁকে প্রণাম করেছিলেন। একথা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ করা আছে।

সেই মুহূর্তে গৌরাঙ্গবাবুর নিজেকে ভীষণ অপরাধী এবং ছোটো বলে মনে হচ্ছিল। পুন্নাম নামক নরক থেকে উদ্ধারকারী পুত্রের বিষয়ে তিনি কত কী আবোল-তাবোল ধারণা পোষণ করে বেড়াতেন। কিন্তু আজ এই অপ্রত্যাশিত ঘটনার মাধ্যমে তাঁর সেই ভুলটা ভেঙে গেল৷

Sweet & Cool রেসিপিজ

ধীরে-ধীরে বদলাতে শুরু করেছে আবহ। কমছে ঠান্ডা ভাব, পরিবর্তে হালকা গরম অনুভূত হতে শুরু করেছে। কিছুদিন বাদে হয়তো এই গরম আরও বাড়বে। আর সেই গরমের আবহে শরীর, মন চাইবে শীতলতার পরশ। এই রেসিপিগুলি আপনাকে দেবে সেই অনুভূতি।

আমের পুডিং

উপকরণ:  ১৫০ মিলিমিটার ক্রিমযুক্ত দুধ, ২ ছোটো চামচ চিনি, ২ টেবিল চামচ ম্যাংগো-জ্যাম, ২ টেবিল চামচ কর্নফ্লাওয়ার, ২ টেবিল চামচ হোয়াইট ক্রিম, ১/২ কাপ ম্যাংগো পিউরি, ১ প্যাকেট ম্যাংগো-জেলি, খোসা ছাড়ানো আম কাটা ১ কাপ।

প্রণালী: দুধ ফুটিয়ে তাতে চিনি ও ম্যাংগো-জ্যাম যোগ করুন। অল্প পরিমাণ জলে কর্নফ্লাওয়ার গুলে দুধে মিশিয়ে ঘন না হওয়া পর্যন্ত জ্বাল দিয়ে রাখুন। আঁচ থেকে নামিয়ে ক্রিম যোগ করুন এবং ভালো করে ফেটিয়ে নিন। প্রস্তুত আমের ক্রিমটি একটি কাচের পাত্রে ঢেলে, ফ্রিজে রেখে দিন যাতে এটি হালকা জমে যায়। এরপর ওই ঠান্ডা ম্যাংগো পুডিং ফ্রিজ থেকে বের করে, তার উপর ম্যাংগো-জেলি এবং কুচানো আম উপরে ছড়িয়ে দিয়ে, ১৫ মিনিট ফ্রিজে রেখে ঠান্ডা করে পরিবেশন করুন।

জ্যাম এবং স্ট্রবেরির এই মিশ্রণটির টেস্ট অসাধারণ! আপনিও ট্রাই করতে পারেন যে-কোনও দিন।

স্ট্রবেরি-জ্যাম

উপকরণ: ১/২ কাপ মিক্সড ফ্রুট জ্যাম, ২ বড়ো চামচ হোয়াইট ক্রিম, ১/২ কাপ জল, ১/২ কাপ স্ট্রবেরি আইসক্রিম, সাজানোর জন্য স্ট্রবেরি কুচি।

প্রণালী: ফ্রুট জ্যাম, জল এবং ক্রিম একসঙ্গে মিশিয়ে, হালকা ফুটিয়ে নরম করে ঠান্ডা হতে দিন। এবার কাচের পাত্রে হোয়াইট ক্রিম-এর সঙ্গে স্ট্রবেরি আইসক্রিম মিশিয়ে নিন। আবার হোয়াইট ক্রিম-এর লেয়ার তৈরি করুন। সবশেষে, স্ট্রবেরি-র টুকরো ছড়িয়ে ঠান্ডা ঠান্ডা পরিবেশন করুন।

কলা আর কাস্টার্ডের স্বাদ সুমধুর। খেয়ে খাইয়ে পাওয়া যাবে মনের আরাম।

কলা-কাস্টার্ড

উপকরণ: ২টো কলা গোলগোল করে কাটা, ১ কাপ ভেনিলা কাস্টার্ড, ১৫০ মিলিলিটার ফেটানো ক্রিম, ১ বড়ো চামচ চকোলেট ক্রিম, সাজানোর জন্য কলা কুচি করে কাটা, চকোলেট দানা, দু’টুকরো আম, কাজুবাদামের কুচি এবং গোলমরিচের গুঁড়ো।

প্রণালী: কলার টুকরোগুলো একটি চিনামাটির পাত্রে রাখুন এবং উপরে ভ্যানিলা কাস্টার্ড ঢেলে দিন। এরপর ফেটানো ক্রিমের একটি লেয়ার তৈরি করুন। এবার কলার টুকরো যোগ করুন এবং তারপর ফেটানো ক্রিম ও চকোলেট ক্রিমের একটি লেয়ার তৈরি করুন। এবার, কুচানো কলা, চকোলেট দানা, কাজুবাদামের কুচি এবং আমের টুকরো দিয়ে সাজিয়ে ফ্রিজে রাখুন। পাঁচ মিনিট পর ঠান্ডা হয়ে হালকা জমে গেলে, গোলমরিচের গুঁড়ো ছড়িয়ে পরিবেশন করুন হাসিমুখে।

অবাক পৃথিবী (পর্ব-০১)

সকালবেলায় বাজার সেরে একটু জিরিয়ে নিয়ে গৌরাঙ্গবাবু পাড়ার মুদিখানার দোকানের উদ্দেশে ঘরের বাইরে পা বাড়াতেই বিশাল এক ভ্যান গাড়িতে বসা চব্বিশ-পঁচিশ বছরের একটি তরতাজা যুবক হঠাৎ কৌতূহল ভরা স্বরে জিজ্ঞাসা করে, ‘কাকু, অভিরূপ মুখার্জ্জী নামে এখানে কেউ থাকেন?”

অজানা অচেনা ছেলেটির মুখে সকালবেলায় নিজ পুত্রের নাম উচ্চারিত হতেই গৌরাঙ্গবাবু যারপরনাই একটু যেন অবাক হন এবং বলতে দ্বিধা নেই, একটু রাগতঃস্বরে জবাবদিহি করেন, ‘হ্যাঁ, আমারই নবাব পুত্তুর সে।’ বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করেন, “আবার কোনও জিনিসপত্র অর্ডার করেছে নাকি?”

অতঃপর ছেলেটির কাছ থেকে কোনওরকম উত্তরের আশা না করেই মনে মনে তিনি বলতে থাকেন— এ এক জ্বালা হয়েছে! কোভিডের কারণে বিশ্বজুড়ে সবাই দিশেহারা, অথচ আমার ‘সুপুত্র’-র এখনও ষোলআনা বাবুগিরি বজায় আছে। প্রতিদিন কিছু না কিছু আসছেই। ঠাঁট-বাট দেখে আর বাঁচি না! তিনি মনে মনে সেকাল আর একাল নিয়ে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করতে শুরু করেন। বলি এককালে আমরাও ইয়াং ছিলাম, মনের নিভৃত কোণে আমাদেরও অনেক আশা-আকাঙ্ক্ষা জমে ছিল। কিন্তু আমাদের কালে এখনকার মতো বাবুগিরির প্রতি এতটা প্রবণতা ছিল না।

ছেলের উপর অসন্তুষ্ট হওয়ার কারণে সেখানে দাঁড়িয়েই তিনি হাঁক দিলেন, ‘অ্যাই কে আছো? একবার বাইরে এসো, নবাব পুত্তুরের নামে কী সব জিনিসপত্তর এসেছে। ছাড়িয়ে নিয়ে যাও।’ কথাটুকু শেষ করেই তিনি দ্রুতপায়ে এগিয়ে গেলেন নিজের কাজে। আর মনে মনে কেবলই সেকাল-একাল নিয়ে আলোচনা করতে লাগলেন।

স্পষ্ট মনে আছে স্কুলের সাদা কাপড়ের জুতোর তলাটা ঘষে ফুটো হয়ে যাওয়ার পরেও সেখানে অতি যত্ন সহকারে তাপ্পি লাগিয়ে পায়ের শোভা বর্ধন করতে হতো। ছেঁড়া জুতোর পরিচর্যার বেলাতেও কোনওপ্রকার অবহেলা ছিল না। ক্লাসের পরিত্যক্ত অবশিষ্ট টুকরো চকগুলি লোকচক্ষুর আড়ালে আগাম সংগ্রহ করে রাখতে হতো ছেঁড়া জুতো পালিশ করার জন্য। কী সুন্দর ছিল ফেলে আসা সেই বিগত দিনগুলি! অভাব ছিল, কিন্তু স্বভাবটা কখনও বদলায়নি। এখনও রাস্তায় একটা বোতাম পড়ে থাকলে তিনি সেটা নির্দ্বিধায় হাতে তুলে নেন, ভবিষ্যতে যদি কখনও প্রয়োজন পড়ে এই ভেবে।

—সেকালে গরিব হওয়ার কারণে মানুষের মনে বিন্দুমাত্রও ক্ষোভ ছিল না। অভাব ছিল অলংকারতুল্য অহংকার। মানুষের চরিত্র গঠনে অভাবের অবদান অনস্বীকার্য! এর প্রভাব যেমন দীর্ঘস্থায়ী, তেমনই অতুলনীয়। মানুষকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে শেখায়। তাঁর মতে অভাব এক মহান সম্পদ। সেই সম্পদে সমৃদ্ধ হয়ে মনের আঙিনা জুড়ে বিরাজ করে অপার শান্তি। অথচ এখনকার মানুষের ধারণায় অভাব, নাকি এক অমোঘ অভিশাপ! তারা বুঝতেই চায় না কথাটা যে, অভাব অভিশাপ নয়, বরং আশীর্বাদ। কারণ ইতিহাস প্রসিদ্ধ অধিকাংশ মহাপুরুষ-ই ছিলেন অভাবগ্রস্ত। অভাবের কারণেই তাঁরা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন এবং জীবনে সুপ্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন।

—এখন ব্র্যান্ড-এর যুগ। অথচ সেকালের মানুষের ব্র্যান্ডেড মেজাজটা কিন্তু ইদানীংকালে বিরল। এমনকী আত্মসম্মান বোধটাও ইদানীংকালে অতীব নিম্নগামী! তখনকার দিনের আত্মসম্মান বোধ এখনকার মতো এতটা ঠুনকো ছিল না। অনেকটা ক্রাস্ট আয়রন নির্মিত টিপু সুলতানের তরবারি তুল্য, যেমন ধারালো, তেমনই ছিল শক্ত।

হঠাৎ নিজের অজান্তে বহুদিন পূর্বে কোনও এক পত্রিকার পাতায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের কথা তাঁর অতর্কিতে মনে পড়ে যায়— একবার প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর তাঁর বাড়িতে অনুষ্ঠিত দুর্গাপুজো উপলক্ষ্যে স্বয়ং না গিয়ে পরিবর্তে পুত্র দেবেন্দ্রনাথের সঙ্গে পেয়াদা পাঠিয়েছিলেন রাজা রামমোহন রায়কে সেই পুজোয় অংশগ্রহণ করার জন্য নিমন্ত্রণ করতে। কিন্তু আত্মসম্মানপ্রিয় রাজা রামমোহন রায় বন্ধুবর প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের নিমন্ত্রণ রক্ষা করেননি সেইবার এই কারণে যে, প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর সশরীরে নিজে না এসে, পেয়াদা পাঠিয়েছিলেন বলে।

কিন্তু এখনকার দিনে মুঠো ফোনের সাহায্যে কাউকে নিজের পোষ্য কুকুরের জন্মদিনে নিমন্ত্রণ করলেও, নিমন্ত্রিত ব্যক্তিটির তন- মন-প্রাণ অপার কৃতজ্ঞতায় আপ্লুত হয়ে ওঠে। নিমন্ত্রণ রক্ষা বা সেই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে না পারাটা তার বিচারে অধর্ম বা মনুষ্যত্বের অবমাননা বলে বিবেচিত হয়। ভাবতে অবাক লাগে যে, সময়ের বিবর্তনে মানুষের আত্মসম্মান বোধটাও আজ অধোগামী!

—মোজা পরে লোকে হাঁটু পর্যন্ত। আজীবন তাই দেখে অভ্যস্ত। অথচ এখনকার আধুনিক যুগের ছেলে-মেয়েদের ফ্যাশনের ধরনটাই আলাদা। তারা মোজা পরে গোড়ালি পর্যন্ত, জুতোর বাইরে যেন দেখা না যায়! জুতোর ভিতরে অদৃশ্য হয়ে থাকে সেই মোজা। কী যে বাহারের স্টাইল তা ভগবানেরও অজানা! ওই ভাবে মোজা গলানোর যে কী প্রয়োজন সেটা তাঁর বোধে কুলোয় না? তারচেয়ে বরং মোজা ছাড়া জুতো পরলেই হয়। ধুতির সঙ্গে বিহারিরা যেমন মোজা ছাড়া জুতো পরেন। ওদের বিচারে এটাই নাকি আধুনিক স্টাইল! বলিহারি স্টাইল!

—নিজের রুচিবোধ অপরের মধ্যে সংক্রমিত করতে পারাটাই প্রকৃত স্টাইল। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, এদের বিচারে কোনটা আসল, কোনটা নকল, এই বিষয়ে কোনও ধারণাই নেই। এদের কোট-জামা-জ্যাকেট সব অ্যাবডোমিন পর্যন্ত। মেয়েদের ব্লাউজ সদৃশ্য সব পোশাক। এরা জামা পরে অথচ বোতাম লাগায় না। দূর থেকে অনেকটা যেন কাকতাড়ুয়াদের মতো দেখতে লাগে, যখন জামার দু’দিকটা পতাকার মতো আন্দোলিত হতে থাকে বাতাসের দাপটে।

—প্যান্টের ভিতরে জামা গোঁজার দিন শেষ। কোমর নেই অথচ পরনে জিন্‌স। কী যে বিকট লাগে দেখতে একেকজনকে! কথায় বলে না— মাথায় নাই চুল, বগলে শ্যাম্পু। অনেকটা সেইরকম। আজকাল কোর্টেরও হাত গোটানো থাকে কবজি পর্যন্ত, ভাবা যায়? এরা প্রকৃত স্টাইল কাকে বলে তা জানেই না। এর চেয়ে আমাদের সময়ে ধুতির প্রচলন ছিল ঢের ভালো।

স্বনামধন্য কণ্ঠশিল্পী, বাঙালির গর্ব শ্রদ্ধেয় হেমন্ত মুখোপাধ্যায় তাঁর সারাটা জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন হাফ হাতা বুশ সার্ট আর ধুতি পরে। স্টাইল কাকে বলে তিনি সেটা চোখে আঙুল দিয়ে আমাদের দেখিয়ে গিয়েছেন।

—বিদ্যাসাগর মহাশয়কে তাঁর স্কুল কর্তৃপক্ষ সাহেবি পোশাক পরে স্কুলে আসতে বলায় সেদিন তিনি নিঃসঙ্কোচে এবং সগর্বে চাকরি থেকে ইস্তফা দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। আসল কথা, সর্বসম্মতিক্রমে সুরুচিসম্পন্ন স্টাইলই একমাত্র গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়।

কতবার ছেলেকে তিনি নিষেধ করেছেন খোলামকুচির মতো যেন টাকা নষ্ট না করে। বেসরকারি চাকরির কোনও স্থিরতা নেই, ভবিষ্যৎ নেই। যে-কোনও দিন ‘চাকরি নট’ হয়ে যাওয়ার নোটিস আসতে পারে। এই পরিস্থিতিতে টাকার মূল্য বোঝাটা যে একান্তই আবশ্যক। কিন্তু কাকে বোঝাবেন তিনি?

—“টাকা মাটি, মাটি টাকা’ যে যাই বলুক, সংসারি লোকের কাছে টাকার মূল্য কিন্তু অসীম। অর্থ বিনে সুস্থ জীবনযাপন করা যে বড়োই দুরূহ। বিপদকালে কারও কাছে হাত পাতলেও এই বস্তু সহজে কেউ হাতছাড়া করতে চান না। এই কথাটুকু অন্তত এই বয়সে বোধগম্য হওয়া উচিত। অবশ্য অন্য কেউ দেবেনই বা কেন? যে-মানুষ সময় থাকতে নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে উদাসীন থাকে, তাকে তো উপযুক্ত কর্মফল ভোগ করতেই হবে।

—প্রকৃতি থেকে যথাযথ জীবনের শিক্ষা নেওয়া উচিত। সঞ্চয়ের পাঠ সামান্য পিঁপড়ের কাছ থেকেও নেওয়া যায়! কিন্তু চোখ থাকলে তবে তো? রাজর্ষি অত্রির পুত্র দত্তাত্রেয়ও প্রকৃতি থেকে পাঠ গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু তাঁর মানুষরূপী কোনও গুরু ছিল না। বনের চব্বিশটি প্রাণীর আচরণ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি তাদের গুরু হিসাবে বরণ করেছিলেন। অথচ আমার সুপুত্র চটিও পরেন এগারোশো টাকা দামের আর জুতো পরেন দু’হাজার টাকা দামের। কোনও মানে আছে এই বাবুগিরির? খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি। বলি অত দামি চটি-জুতো পায়ে গলাবার জন্য, নাকি মাথায় রাখার উপকরণ? সস্তা দামের চটি-জুতোতেও তো সেই একই কাজ হতে পারে। এ কেবল যুক্তিহীন বিলাসিতা ছাড়া আর কিছু নয়।

—মানুষের ইয়ং বয়সটা হল পরিশ্রম করার জন্য, ঝুঁকি নেওয়ার জন্য। এই সময়টা হারিয়ে গেলে আর কি ফিরে পাওয়া যাবে? কখনওই না। এই সময়টাতেই পরিশ্রম করে রোজগার করতে হয় অনাগত ভবিষ্যৎ জীবনটাকে সুরক্ষিত করার জন্য। বোঝা উচিত, “দেহপট সনে নট সকলি হারায়। তা না করে— ‘উঠল বাই তো কটক যাই’।

হয়তো গভীর ষড়যন্ত্র চলছে

আত্মহত্যার আগে অতুল সুভাষের ভিডিও এবং দীর্ঘ সুইসাইড নোট নিয়ে হইচই হয়েছে। আবার মিরাটে এক প্রেমিকের সহযোগিতায় মুসকান নাকি তার স্বামীকে হত্যা করে সিমেন্ট মাখিয়ে ড্রামে রেখে দিয়েছিল! অন্যদিকে, এও জানা গেছে, পার্টনায় ৪ জন সহকর্মীর সহযোগিতায় স্ত্রীকে গুলি করে হত্যা করেছেন এক ব্যক্তি। এখন বিষয়টি হচ্ছে, কেন এই অপ্রীতিকর ঘটনার সংখ্যা বাড়ছে? এক্ষেত্রে আরও একটি প্রশ্ন উঠে আসছে যে, অপরাধী নারী-পুরুষ যে-ই হোক না কেন, পৃথক বিচার হয় না। কিন্তু কোনও স্বামী খুন হলে সমাজে যতটা আলোড়ন পড়ে যায়, স্ত্রী খুন হলে অনেক ক্ষেত্রে তা নিয়ে চর্চা অনেকটা কম থাকে। কিন্তু কেন এমনটা হয়?

কয়েক দশক আগেও মহিলাদের মরতে হতো নানারকম কারণে। যেমন— বিয়েতে দাবি মতো পণের টাকা দিতে না পারার জন্য কিংবা বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কের কারণে ইত্যাদি। শুধু তাই নয়, অনেক পরিবারে তো কন্যা সন্তানকে পৃথিবীর আলোই দেখতে দেওয়া হতো না। হয়তো সেই অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে কড়া আইন বলবত করে, অর্থাৎ এখন কন্যাভ্রূণ হত্যা কমেছে। কিন্তু মহিলাদের প্রতি অন্যায়-অত্যাচারের ঘটনা কমলেও, তা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, হয়তো অত্যাচারের ধরন কিছুটা বদলেছে। তাহলে কি ধরে নিতে হবে যে, নারীদের প্রতি অত্যাচারের পরম্পরা বজায় থাকবে? আইন কিংবা মানবিকতা কি নারী-সম্মান কিংবা নারী-সুরক্ষা নিশ্চিত করবে না?

বিষয়টি হল— না চাইলেও এখন মহিলাদের ধর্ম এবং রীতিনীতির বেড়াজালে আটকে রাখা হচ্ছে, ডানা কেটে ফেলা হচ্ছে, স্বামীর অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খুললে তাকে মেরেও ফেলা হচ্ছে। অপরাধী পুরুষটি যদি রাজনৈতিক ভাবে ক্ষমতাধারী হন, তাহলে তো তার অপরাধ ঢেকে দেওয়ার জন্য কিছু ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃত ভাবে বিশৃঙ্খলা তৈরি করা হয়। দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ এবং আদালত যাতে অপরাধের তদন্ত সঠিক ভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে না পারে, তার জন্য নানারকম কৌশল অবলম্বন করা হয়ে থাকে। সবচেয়ে মজার বিষয় হল, আজও মহিলাদের বোঝানো হয়, বিয়ে হল ধৈর্য সংস্কৃতির পরিচয় এবং স্বামী হলেন পরমেশ্বর! অতএব, স্বামীর উপপত্নীকে সহ্য করার, তার মারধর সহ্য করার, শ্বশুরবাড়ির লোকদের কটূক্তি সহ্য করার ক্ষমতা রাখতেই হবে মহিলাদের।

একথা বললে হয়তো ভুল হবে না যে, নারীরা যেটুকু সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন, তাতে শাসকদের পক্ষ থেকে সমর্থন কম এবং উদাসীনতা বেশি দেখা গেছে। তাহলে কি মহিলারা আবারও ধর্মোপদেশ, প্রার্থনা এবং তাদের স্বামী ও দেবতাদের সেবায় আত্মনিয়োগের সিদ্ধান্তে প্লাবিত হবেন? আবার তো তাহলে গভীর ষড়যন্ত্রের শিকার হতে হবে মহিলাদের!

ওদের প্রকৃত বন্ধু হয়ে উঠুন

মনে রাখবেন, বাবা-মায়ের মতো প্রকৃত বন্ধু আর কেউ হতে পারে না। তাই, প্রত্যেকটি সন্তান চায় তার মা-বাবার সঙ্গে হেসেখেলে কিছুটা সময় কাটাতে এবং এটাই কাম্য। তাই সারাদিনের কর্মব্যস্ততার মধ্যে যতটা সম্ভব বন্ধুর মতো যেমন মেলামেশা করা উচিত সন্তানের সঙ্গে, ঠিক তেমনই সময় সুযোগ বুঝে সুশিক্ষা দেওয়া উচিত সন্তানকে। কারণ, তারা সবচেয়ে বেশি কমফর্টেবল থাকে মা-বাবার সঙ্গে থাকার সময়টাতে। তাই বন্ডিং টাইম-টাকে কাজে লাগিয়ে, সন্তানের মানসিক নির্ভরতার মাধ্যম হয়ে উঠুন। আপনি সমস্ত অ্যাটেনশন দিয়ে সন্তানকে আগলে রাখলে, সেও ইমোশনালি এবং ফিজিক্যালি অনেক নিশ্চিন্তবোধ করবে। এটাই তাকে মানসিক ভাবে ভালো থাকার রসদ জোগাবে এবং সন্তান প্রকৃত শিক্ষা পাবে।

যা যা করণীয়

  • সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কীভাবে সময় কাটাবেন সন্তানের সঙ্গে, সেই বিষয়ে সন্তানের সঙ্গে আলোচনা করে নিন। বেশিরভাগ বাচ্চারা বেশ বুদ্ধিমান। তাদের সম্পূর্ণ পরিস্থিতি বুঝিয়ে বললে তারা ঠিকই বুঝতে পারবে
  • প্রত্যেকদিন একটা নির্দিষ্ট সময় বের করে নিন, যখন সন্তানের সঙ্গে সময় কাটাবেন। এই সময়টায় দু’জনে একসঙ্গে গান শুনুন কিংবা দাবা খেলুন। কোনও গল্প পড়েও শোনাতে পারেন বাচ্চাকে
  • সদ্য কথা বলতে শেখা খুদে সদস্যটির সব বিষয়ে অসীম কৌতূহল থাকে। তাই, তার কৌতূহল নিরসন করে ভালো বন্ধু হয়ে উঠুন। এর জন্য আপনিও কিছুটা বাচ্চাদের মতো হয়ে উঠুন এবং তাকে গাছগাছালি, ফুল, ফল, পশু, পাখি আর রং চেনাবার দায়িত্ব নিন
  • এখনকার বাচ্চাদের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস খুব কমে গিয়েছে। আপনার ছুটির দিনে ওদের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার চেষ্টা করুন। বই পড়ার অভ্যাস না থাকলে কোনও ভালো গল্প পড়ে শোনান, কিন্তু সম্পূর্ণ করার আগেই থেমে যান। সন্তানকে বলুন বাকি অংশ ও যেন আপনাদের পড়ে শোনায়। শিশু-সাহিত্যিকদের লেখা একটা করে গল্প পড়ে শোনানোর ফলে মাতৃভাষার প্রতি ধীরে ধীরে আগ্রহও বাড়বে
  • আপনার ল্যাপটপ বা ডেস্কটপ-এ সন্তানের সঙ্গে সেরা মুহূর্তগুলির ছবি অ্যালবাম-এ সেভ করে রাখুন। খুব মন খারাপের দিনগুলোয় যাতে সে ওগুলো দেখে আনন্দ পায়
  • সন্তান মা-বাবার কেয়ার করে, এই ভাবনাটুকুই সন্তানকে বাইরের নানা অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সঙ্গে মোকাবিলা করতে সাহায্য করে। তাই ওর মনের ইনসিকিয়োরিটি দূর করতে, খারাপ-ভালো পরিস্থিতিতে ওর পাশে থাকুন
  • সন্তানের ছোটো ছোটো সাফল্য সেলিব্রেট করুন
  • ডিনার করুন একসঙ্গে। এর ফলে সারাদিন সে কী করল, তা শেয়ার করার সুযোগ পাবে
  • অতিরিক্ত শাসন না করে, বরং সন্তানের সমস্যাগুলো বোঝার চেষ্টা করুন। এতে সমাধানের পথ খুঁজে পাবেন

• সন্তানের কোনও কৃতিত্বের বিষয়ে দু-চার লাইন লিখে একটা ছোট্ট ডায়ারি তুলে দিন ওর হাতে। যদি জীবনের কোনও পর্যায়ে সন্তান ডিমোটিভেটেড হয়ে পড়ে, এই ডায়ারি-টি তাকে মানসিক শক্তি জোগাবে।

না বললেই নয় (শেষ পর্ব)

রাকা থরথর করে কেঁপে উঠল। কমল কোমর দিয়ে দেয়ালে চেপে ধরল। কোমরে কোমর মিশে গেল। ওর পৌরুষ স্ফীত হচ্ছে। রাকা টের পেল। ওর স্ত্রী অঙ্গের মুখে চাপ বাড়ছে। মাঝে শুধু একটা নাইটির ব্যবধান। কমল হঠাৎ ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে বুকে হাত রাখল। চাপ দিল। ক্রমশ চাপ বাড়ল। এক ফাঁকে কমল দেখল রাকাকে। চোখ বুজে আদর উপভোগ করছে। আরও কিছুক্ষণ আদর করে ওকে খাটের কিনারে এনে সরে এল। খাটে বসল। রাকা ফুঁসে উঠল। ঝাঁপিয়ে পড়ল কমলের উপর।

—মামদোবাজি পেয়েছেন? বলতে বলতে কমলকে চিৎ করে ফেলে চড়ে বসল। কমল নিশ্চুপ হয়ে পড়ে রইল। রাকা শরীর দোলাতে দোলাতে বলল, আরেকটু অপেক্ষা করলে হতো না?

—তুমি তো শুরু করলে।

—শুরু করেছেন আপনি। রাকা হিস হিসিয়ে বলল, আমার শরীর জাগিয়ে ধ্যাষ্টামো করা হচ্ছিল।

—আস্তে বলো। সুমন শুনতে পাবে।

—শুনুক। আমি কাউকে পরোয়া করি না। বলেই রাকা কমলের বুকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে কাঁদতে লাগল।

কমল পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে বলল, ‘কেঁদো না। কেঁদে কী হবে? যতটুকু যন্ত্রণা পাওয়ার তা পেতেই হবে।”

রাকা কাঁদতে কাঁদতে কমলের বুক ভিজিয়ে দিল।

—আমার কিছু ভালো লাগে না।

—সব ঠিক হয়ে যাবে।

—সুমন মারা যাবে।

—মরার সময় পর্যন্ত তোমার জীবনে ওর ভূমিকা লেখা আছে। তুমি কী করবে বলো? বিধির বিধান কে খণ্ডাবে? দ্যাখো বিধাতা তোমাকে-আমাকে নিয়ে আবার কী লিখে রেখে গেছে?

—বৃদ্ধস্য তরুণী ভার্জা।

—বেশ বলেছ। তবে আমি বুড়ো নই। পাক্কা এক ঘণ্টা বিছানায় ঝড় তুলতে পারি।

অনলের কথা মনে পড়ল। কমলের ধারে কাছে আসতে পারবে না। তারা সমবয়সি। বেচারা বউ ছাড়া থাকে। তারও প্রয়োজন বলে এগিয়ে গেল। প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা মোটেই ভালো না। দাঁড়াতেই পারল না। মাথা নিচু করে রইল। দ্বিতীয়বার একটু হল। এখন মোটামুটি পারে। আর প্রয়োজন হবে না। ওর কাছে যায় বলে ফিসফাস শুরু হয়েছে। শুরু হতেই সে কলকাতায় ট্রান্সফারের আবেদন করেছে। মঞ্জুর হয়েছে। আগামী সপ্তাহে জয়েন করবে।

রাকা বলল, “আগামী সপ্তাহে আমি কলকাতায় জয়েন করব।”

—এ তো ভালো খবর।

যাতায়াতে অনেকটা সময় চলে যাচ্ছিল। ফুলির উপর সুমনের দায়িত্ব দিয়ে যেতাম। এবার থেকে অনেকটা সময় ওকে দিতে পারব।

—তুমি সুমনকে খুব ভালোবাসো তাই না?

—বেশি ভালোবাসি বলেই ভগবান ওকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিচ্ছে।

—চিন্তা কোরো না। দুনিয়ার কিছুই কারও জন্য থেমে থাকে না। চলার নামই জীবন।

—ওটাই মানুষের কাছে শেষ সান্ত্বনা।

—এই দ্যাখো না। আমার সব থেকেও কেউ নেই। তাই বলে কি আমি ভেঙে পড়েছি? আমিও ঝরনা-কে খুব ভালোবাসতাম। আমাদের লাভ ম্যারেজ ছিল। আমাদের মধ্যে কখনও ঝগড়া মারামারি হয়নি।

—শূন্যতায় ভালোবাসা ঠাঁই পায় না।

—ঠিক বলেছ। শরীর। এই শরীর ভুলিয়ে দেয়। এই শরীর অনেক ব্যথার উপশম। বলেই কমল রাকাকে বুকে টানল। এতে তুমি এনার্জি পাবে!

—বেশি এনার্জি দেবেন না। দিলে ফুলতে শুরু করব!

—বেশ বলেছ।

রাকা কখনও এভাবে কমলের সঙ্গে কথা বলেনি। সে সুযোগ হয়নি। ওরা স্বামী-স্ত্রী ওদের দু’জনকে যথেষ্ট ভালোবাসত। সে কয়েক মাস আগে এই ফ্লাটে এসেছে। সুমন আছে পাঁচ বছর ধরে। ঝরনা বউদির সঙ্গে ওর ভালো সম্পর্ক ছিল। সম্পর্ক কতটা গভীর ছিল তা সে তলিয়ে ভাবেনি। ভাবার সময় হয়নি। সে সাতটায় বেরিয়ে যেত। অনেকটা সময় ওরা পাশাপাশি ফ্ল্যাটে থাকত। সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার সুযোগ ছিল। আসলে, সময় সুযোগ দুটো মানুষকে এক বিন্দুতে মিলিয়ে দেয়। আজ যেমন কমলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হল। হয়তো সুমনের ইন্ধন না থাকলে সম্পর্ক হতো না। তার জন্য মনে কোনও গ্লানি নেই। বড্ড নির্ভার লাগল নিজেকে। ধীরে ধীরে বলল, “নিজেকে খুব হালকা লাগছে।

—এবার দেখবে কাজে মন বসবে।

—ছাড়ুন। সুমনকে দেখে আসি।

—আরেকটু থাকো না।

—অনেকক্ষণ হল এখানে এসেছি। আমি যাব আর আসব।

—আসবে তো? বলেই কমল উঠে বসল।

রাকা খাট থেকে নেমে পড়ে সাবধানে দরজার খিল খুলে বাইরে এল। করিডোর অন্ধকার। লাইট জ্বেলে দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকল।

—জেগে আছো?

সুমনের সাড়া পেল না। তবে শ্বাস ছাড়ছে, শুনে রাকা জিরো পাওয়ারের লাইটটা জ্বেলে কিচেনে ঢুকল। দু-কাপ চা করে বেডরুমে এল। সুমনের কপালে হাত দিল। অমনি সুমন চোখ মেলল, ‘চায়ের গন্ধ পাচ্ছি।’

রাকা কোনও কথা না বলে সুমনের পিঠের নীচে দুটো বালিশ দিয়ে বসিয়ে দিল। চায়ের কাপ হাতে দিতে সুমন বলল, “অনলবাবু ফোন করেছিলেন।’

রাকা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে মোবাইল হাতে নিল। অন করে দেখল সাতটা মিসড কল।

—আমি ধরিনি। তোমাকেও ডাকিনি।

—বেশ করেছ।

সুমন মৃদু হাসল।

—আমি কৃষ্ণনগর থেকে চলে আসছি শুনে ছেলেটা আপসেট হয়ে পড়েছে।

—তোমাকে খুব মিস করবে। বেচারাকে একবার ফোন করো।

—পরে করব। রাতে কী খাবে?

—এক গেলাস দুধ দিও।

—ক’টা বাজে?

—ন’টা। আমি এবার নিশ্চিন্তে মরতে পারব।

—হঠাৎ এ কথা কেন?

ঝরনা বউদি খুব ভালো ছিলেন। কমলদাও খুব ভালো লোক। তোমাকে লক্ষ্য রাখবেন। সুমন বলতে বলতে রাকার হাত দুটো জড়িয়ে ধরল, “আমি তোমার গর্ভে ছেলে হয়ে ফিরে আসব। তোমার ইচ্ছে ছিল মা হওয়ার।”

—চুপ করো, বলেই সুমনের মুখ চেপে ধরল রাকা। জিভে লাগাম দাও।

মুখ থেকে হাত সরিয়ে সুমন বলল, ‘রাকা, আমাকে বলতে দাও। কমলদার ছেলে আর ফিরে আসবে না।’

—তাতে আমার কী?

—কমলদা যাতে মরার সময় জল পায় তার ব্যবস্থা করো।

—কমলদার জন্য তোমার এত দরদ উথলে উঠছে কেন?

—কারণ ঝরনা বউদি মরার সময় ছেলেকে খুব খুঁজছিল। ওর সেই চাউনি আজও আমি ভুলতে পারিনি। বেচারা ছেলের হাতে জল না খেয়ে মরে গেল।

—কমলদা আমার চেয়ে কুড়ি বছরের বড়ো।

—কমলদা এখনও শক্ত-সমর্থ্য আছেন। কমলদাকে দুঃখ দিও না।

—মানে!

—কিছু মনে কোরো না। আমি অনধিকার চর্চা করে ফেলছি। সুমন বলল, হোয়াটসঅ্যাপে তোমাদের চ্যাটগুলো পড়ে ফেলেছি। ডিলিট করোনি কেন?

রাকার মুখটা কালো হয়ে গেল। খুব সাবধানে মেলামেশা করেও ধরা পড়ে গেল। ভেবেছিল কেউ জানতে পারবে না। সুমনও জানতে পারবে না। সব সময় মোবাইল নিজের হাতের কাছে রাখত। আজই ভুল হল। ভুল সময়ে অনল ফোন করল। সুমন জেনে গেল। তাই নিজেকে খুব খেলো মনে হল। তাতেই ডুকরে কেঁদে উঠল, ‘ভুল করে ওর ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছি। আর হবে না। ওর জন্যই আমি কৃষ্ণনগর থেকে ট্রান্সফার নিয়ে চলে আসছি। বিশ্বাস করো।’

—বিশ্বাস করলাম। সুমন রাকার হাতে চাপ দিল। তুমি আমাকে বিশ্বাস করো। যা বলছি মন থেকে বলছি। আমি তোমাকে সুখী দেখে মরতে চাই। বলেই রাকাকে বুকে চেপে ধরল। ওর গায়ে কমলদার গায়ের গন্ধ পেয়ে স্বস্তির শ্বাস ছাড়ল। এই গন্ধটা তার ভীষণ চেনা। ঝরনা বউদির গায়ে পেত। পাঁচ-পাঁচটা বছর এই গন্ধটা পেয়েছে। কমলদাকে তার প্রতিদান দেওয়া দরকার। সত্যটা প্রকাশ করা দরকার। তাই সুমন ধীরে ধীরে বলল, ‘যে কথা না বললেই নয়, সে কথা আজ তোমাকে বলব।’

—আমি শুনব না। তুমি আজ বেশি কথা বলে ফেলছ।

—আমাকে বলতে দাও। আর হয়তো সুযোগ পাব না। আজ আমাকে কথায় পেয়েছে।

—বলো।

—ঝরনা বউদি আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল।

ঘরে যেন বোমা ফাটল। তাতেই ছিন্নভিন্ন হল রাকা। ওর চোখমুখের চেহারা বদলে গেল। তা দেখতে দেখতে সুমন আবার বলল, ‘আমি পাপ করেছি। আমি প্রায়শ্চিত্ত করতে চাই।’

রাকা থরথর করে কেঁপে উঠল। কাঁপতে কাঁপতে বলল, ‘এ কথা না বললেই চলছিল না।’

—না বলতে পেরে আমি গুমরে গুমরে মরছিলাম। আমি ছলাকলায় ভুলিয়ে ঝরনা বউদিকে এই বিছানায় টেনে এনেছিলাম। তুমি কমলদাকে গায়ে মেখেছ। শোধবোধ হয়ে গেছে। এবার আমি মরে শান্তি পাব।

রাকা ডুকরে কেঁদে উঠল। কাঁদতে কাঁদতে দরজার সামনে অস্থির পায়ের শব্দ শুনতে পেল। শুনতে শুনতে সুমনের বুক ভেজাল চোখের জলে। সুমন ওর মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলল, “এবার ও ঘরে যাও।”

(সমাপ্ত)

কেনাকাটার অদ্ভুত আসক্তি

কোটিপতি কোম্পানিগুলির কুইক হোম ডেলিভারি-র রমরমা বাজার দেখে পাড়ার মুদি দোকানগুলির মালিকরা এখন বেশ চিন্তিত। জেপ্টো, ব্লিঙ্কিট, সুইগি, বিগ বাস্কেটের মতো কোম্পানিগুলি কেবল দ্রুত পণ্য সরবরাহ করছে না, তারা পণ্যের উপর ভালো ছাড়ও দিচ্ছে। এর ফলে অবস্থা যেখানে গিয়ে দাঁড়িয়েছে, একক মালিকদের দ্বারা পরিচালিত ১০০-২০০ ফুটের দোকানগুলির ভবিষ্যৎ বড়ো বেদনাময় হতে চলেছে। আজকের জেনারেশন জেড, যারা সবকিছুর জন্য মোবাইলের উপর নির্ভরশীল, তারা এই ‘ক্লিক ই-কমার্স’ কোম্পানিগুলির ফাঁদে পা দিচ্ছে। এই জেনারেশন-জেড, পরিচিত দোকানদারের কাছ থেকে জিনিসপত্র কেনার মূল্য উপলব্ধি করতে পারে না।

কুইক ই-কমার্সে আপনি বাড়ি বসে দ্রুত জিনিসপত্র পেয়ে যাবেন ঠিকই কিন্তু এর জন্য গ্রাহক হিসাবে ভবিষ্যতে জিতবেন নাকি ঠকবেন, সেই বিষয়ে বিচক্ষণতার সঙ্গে বিবেচনা করেছেন কি? মনে রাখবেন, কুইক হোম ডেলিভারির বিষয়টি অত্যন্ত ব্যয়বহুল সফ্টওয়্যারের উপর নির্ভরশীল এবং শত শত লোক এর ব্যাকএন্ড পরিচালনায় নিযুক্ত, যার খরচ গ্রাহকদের আজ হোক কিংবা কাল হোক, পরিশোধ করতেই হবে।

অনেকে এখন ফল এবং সবজিও কিনছেন কুইক হোম ডেলিভারি-কে মাধ্যম করে। কিন্তু ভেবে দেখুন, বাজারে গিয়ে দামাদামি করে যে গুণমানের ফল কিংবা সবজি আপনি কিনতে পারতেন, তা কি হোম ডেলিভারি- -কে মাধ্যম করে পাচ্ছেন? এক্ষেত্রে মনে রাখবেন, শুরুতে সবকিছুই ভালো পাওয়া যায় কিন্তু আপনি একবার বাড়ি বসে ফল-সবজি কেনার অভ্যাস তৈরি করে ফেললে, তা আর ছাড়তে পারবেন না সহজে। আসলে, ই-কমার্স কোম্পানিগুলো জানে যে, ক্রেতারা একবার আরামের কেনাকাটায় আসক্ত হয়ে পড়লে, তারা আর দোকানে গিয়ে কেনাকাটা করতে চাইবে না। এক্ষেত্রে হয়তো এক কোম্পানিকে পছন্দ না হলে, ক্রেতারা অন্য কোনও ই-কমার্স কোম্পানি সার্চ করবে।

এক্ষেত্রে আরও একটি বড়ো সমস্যা আসতে পারে। আর তা হল— চার-পাঁচটি বাণিজ্যিক কোম্পানি একসঙ্গে মিলে ক্রেতাদের একটি ফাইল তৈরি করতে পারে এবং এমনকী গ্রাহকদের ‘কালো তালিকাভুক্ত’ও করতে পারে। বিমান সংস্থাগুলি ‘নো ফ্লাই’ তালিকার মাধ্যমে এটি করছে এবং ব্যাংকগুলি সিভিল স্কোরের মাধ্যমে এটি করছে।

এক সময় হয়তো এমন হয়ে উঠবে যে, এই দ্রুত বাণিজ্য কোম্পানিগুলি সরকারি রেশন দোকানের মতো একচেটিয়া ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করবে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭ শতকে বন্দুক ও কামানের শক্তি ব্যবহার করে ব্যবসা করে শাসন করেছিল, কারণ তারা কৃষকদের সরাসরি পণ্য বিক্রির অধিকার কেড়ে নিয়েছিল। তাই বলা যায়, জেনারেশন জেড আসলে জেনারেশন ব্লাইন্ডে পরিণত হতে চলেছে।

না বললেই নয় (পর্ব-০১)

সুমনকে জবাব দিয়ে দিয়েছেন ডক্টর। আর বড়োজোর একমাস বেঁচে থাকবে। তারপর কী হবে জানে না রাকা। বিয়ের তিন মাসের মধ্যে এমন ছন্দপতন ঘটবে, তা দু’জনের কেউ ভাবতে পারেনি। সুমন তাই বলল, “আমি তোমার জীবনটা নষ্ট করে দিলাম।”

রাকা ঝাঁজিয়ে উঠল, “চুপ করবে? তোমার ভিতরে ক্যান্সার বাসা বেঁধেছে, তুমি কি আগে জানতে?”

—জানতাম না। জানলে বিয়ে করতাম নাকি? রাকা চুপ করে রইল।

—শোনো, আমার মরার পর তুমি আবার বিয়ে করবে।

রাকা চমকে উঠল, ‘কী বলছ?’

—একা থাকতে পারবে না। তুমি তাড়াতাড়ি বিয়ে করে নেবে।

সুমনের ডান হাতটা হাতের মুঠোয় নিয়ে রাকা গালে ছোঁয়াল, ‘ওগো তুমি চুপ করো। আমার কপালে যা লেখা আছে তাই হবে।”

—শোনো। আমি স্বার্থপর নই। তোমার শারীরিক চাহিদা মেটাতে পারছি না। তুমি শুকিয়ে মরছ। আমার খুব কষ্ট হয়। তুমি কাউকে ডাকতে পারো।

—ছিঃ

—ছিঃ ছিঃ কোরো না।

—তোমার সামনে ওসব করলে তোমার ভালো লাগবে? চুপ করে ঘুমাও তো।

—ঘুম আসে না। তোমার চিন্তায় মাঝেমধ্যে ভাবি, বিয়ে না করলে ভালো হতো। মরে যেতাম। কাঁদার কেউ থাকত না।

—যতসব বাজে কথা! বলেই রাকা ব্যালকনিতে এল।

ব্যালকনি থেকে সুমনের গলা শুনতে পেল, “আমার কথাটা ভেবে দেখো।’

—কী বলছে?

রাকা চমকে উঠে তাকাল পাশের ব্যালকনিতে। আগে ছিল, না পরে এল— বুঝতে পারল না। এক পলক দেখে বলল, “শুনে কী করবেন?”

সদ্য বিপত্নীক কমল সামন্ত। আইটি সেক্টরে কর্মরত। বয়স পঞ্চাশ-এর কাছাকাছি। একমাত্র ছেলে আমেরিকায় থাকে। কাজের মাসি দু’বেলা রান্না করে দিয়ে যায়। বেশ মিশুকে লোক। তবে সে ওকে এড়িয়ে চলে। আজ মনটা কেমন যেন হয়ে গেল সুমনের জন্য। তাই তাকাল।

কমল বলল, “সুমন কেমন আছে?’

—ওই যেমন থাকে।

—তোমার উপর দিয়ে খুব ঝড়-ঝাপটা যাচ্ছে।

—কী আর করা যাবে।

আজ রবিবার। তাই কাজের মেয়ে ফুলিকে ছুটি দিয়েছে। সে-ই সুমনের দেখাশোনা করে। সোমবার থেকে শনিবার ফুলি থাকে। শনিবার কোনও ক্লাস থাকে না। তবু কলেজের নাম করে বেরিয়ে পড়ে। সুমনকে বিরক্ত না করে দু-মাস ধরে অনলের ফ্ল্যাটে যাচ্ছে রাকা। গতকালও গিয়েছিল। দু’বার আগে নিজের গরজে ফ্ল্যাটে গেল। অনল ওর ডিপার্টমেন্টের জুনিয়র। বয়স সাতাশ, বিবাহিত। বউ অধ্যাপনা করে উত্তরবঙ্গের একটি কলেজে।

ফাঁকা ফ্ল্যাটে প্রথম দিনেই শরীরে শরীর মিলে গেল। তারপর থেকে চলছে। সুমনকে সে কথা বলা যায় না। যতই উদারতার কথা বলুক না কেন, পুরুষ তার ইগো কখনও ভুলতে পারে না। ভাবতে ভাবতে ফোঁস করে একটা শ্বাস ছাড়ল। তা দেখে কমল বলল, “তোমার জন্য দুঃখ হয়।’

রাকা ম্লান হাসল।

—এসো চা করি।

—যাচ্ছি।

রাকা ঘরে ঢুকতে সুমন চোখ মেলল। ওর কপালে হাত রেখে রাকা বলল, “পাশের ঘরে যাচ্ছি।’

সুমন হাতের উপর চাপ দিয়ে রাকাকে বলল, ‘বেস্ট অফ লাক।’

রাকা দরজা টেনে পাশের ফ্ল্যাটে এল। কমল চা এগিয়ে দিল— কেমন হয়েছে জানি না।

চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে রাকা বলল, ‘ভালো হয়েছে।”

—চা-পাতি আর একটু ফোটাতে হতো।

—তা ফোটালেন না কেন? এত তাড়াহুড়ো করার কী দরকার ছিল?

—সেটাই কথা। আমরা অনেক সময় অযথা তাড়াহুড়ো করে ফেলি। অনেক কাজ ভেবে-চিন্তে করি না। তার জন্য ভুগি।

—আমার বাবা-মা তাড়াহুড়ো করে বিয়ে দিল। ডাক্তার ছেলে হাতছাড়া করতে চাইল না। খোঁজ নিল না, বিয়ে দিয়ে দিল।

রাকার বাবার এক কলিগ সুমনের সন্ধান নিয়ে এল। পাত্র ডাক্তার। বারাসাতে পোস্টিং। বন্ধুদের নিয়ে রাকাকে দেখতে এল। পছন্দ হয়ে গেল। রাকারও পছন্দ হল। সুমন পাঁচ ফুট নয় ইঞ্চি লম্বা। মাথাভর্তি কালো চুল। বিশেষকরে ওর মায়াবী চোখ দুটো ভীষণ ভাবে ওকে টানল। বিয়ে না করার কোনও কারণ ছিল না। বিয়ে হয়ে গেল। কলকাতা থেকে সে কৃষ্ণনগর যাতায়াত শুরু করল। তিন মাস পর সুমনের মাথার যন্ত্রণা শুরু হল। সিটি স্ক্যান করে টিউমার ধরা পড়ল। লাস্ট স্টেজ। অপারেশন করতে গেলে বিপদ হতে পারে। তাই যতদিন বাঁচবে বেড রেস্টেই থাকতে হবে। আর এক মাস, তারপর সে একা হয়ে যাবে… একা। ভাবতে ভাবতে চা শেষ করে কাপ রাখল টেবিলের উপর।

কমল চা শেষ করে সিগারেট ধরাল। টানতে টানতে বলল— ঝরনার ব্রেস্ট ক্যান্সার বছরখানেক আগে ধরা পড়ল। অনেক চেষ্টা করেও বাঁচাতে পারলাম না। তুমি তো সবই জানো। ছেলে তো এল না। ওই ছেলের জন্য ঝরনা কী না করেছে। ছোটোবেলায় অমল খুব ভুগত। দু’জনে রাত জেগেছি। সেই ছেলে মায়ের মৃত্যুসংবাদ পেয়েও এল না।

রাকা চুপ করে শুনল।

—আমি মরলেও আসবে না। কোনওদিন মরে পড়ে থাকব, গন্ধ ছড়ালে মানুষ টের পাবে।

—চুপ করুন।

—এটা ঘটবে।

—বিয়ে করুন।

—এই বয়সে বিয়ে!

—কী এমন বয়স হয়েছে আপনার ?

—তুমি আমাকে বিয়ে করবে?

—যা !

—বলো করবে। কমল হঠাৎ রাকার

দু-কাঁধে হাত রাখল। আমি এখনও সক্ষম আছি। পরীক্ষা দিতে পারি।

রাকা কেঁপে উঠল। কমল ওকে ঠেলতে ঠেলতে দরজার কাছে নিয়ে এল। দরজায় খিল তুলে দিল। রাকা ফিসফিস করে বলল, ‘দরজায় খিল দিলেন কেন?”

—আমি সব শুনেছি।

—কী শুনেছেন? সুমনের সব কথা।

রাকা চুপ করে রইল।

কমল থুতনি তুলে ধরল, ‘তুমি অভুক্ত আছো। অভুক্ত শরীর নিয়ে কতদিন সুমনকে বয়ে বেড়াবে?”

(ক্রমশ…)

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব