রিজপুরের সিংহাসন কার দখলে যাবে, সেই কৌতূহল মেটাবে ‘আবার রাজনীতি’

লোকসভা নির্বাচন এখন শেষ পর্যায়ে। তাই সবচেয়ে চর্চিত বিষয় এখন রাজনীতি। আর এই রাজনৈতিক নির্বাচনী আবহে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম হইচই-তে হাওয়া আরও গরম করতে চলেছে ‘আবার রাজনীতি’। ২৪-মে মুক্তি পেতে চলা ‘আবার রাজনীতি’ দর্শকদের মন জয় করে নেবে, এমনই আশা প্রকাশ করেছেন পরিচালক সৌরভ চক্রবর্তী।

ওয়েব প্ল্যাটফর্ম হইচই-তে স্ট্রিমিং শুরুর দিনকয়েক আগে, ‘আবার রাজনীতি’-র ট্রেলার লঞ্চ করা হয়েছে আনুষ্ঠানিক ভাবে। পরিচালক  সৌরভ চক্রবর্তী প্রসঙ্গত জানিয়েছেন, ‘রাজনীতি নিয়ে একটা খুব প্রচলিত প্রবাদ  আছে — রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয় আর উলুখাগড়ার প্রাণ যায়। কিন্তু অনেক সময় রাজায় রাজায় যুদ্ধে রাজারও প্রাণ যায়। রাজাকে রাজা করার পিছনের যে রাজনীতি, যে ষড়যন্ত্র, তার ইতিহাসও কম রক্তাক্ত নয়। আসলে রাজা হওয়ার দাবিদার অনেক হলেও, রাজ-সিংহাসন তো সেই একটাই। তাই ভারতবর্ষের চেনা রাজনৈতিক চিত্রের মতো ‘আবার রাজনীতি’-র কাহিনিতেও প্রতি মুহূর্তে পাল্টে যায় রাজনৈতিক আর ব্যক্তিগত সম্পর্কের সমীকরণ।  কে বন্ধু, কে শত্রু  আর কার হাতেই-বা থাকবে রিজপুরের সিংহাসন-এর দখল, সেই কৌতূহল মেটাবে ‘আবার রাজনীতি’।’

পরিচালক আরও জানিয়েছেন, ‘আগের সিজনে দর্শকরা দেখেছেন, রাশি কীভাবে গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টের পর কোমা থেকে ফিরে এসে নতুন করে আবিষ্কার করতে শুরু করে তার পিছনে ঘটে যাওয়া যাবতীয় চক্রান্তগুলো। ঘটনাক্রমে অনেক নতুন তথ্যও আবিষ্কার করে সে। কিন্তু ওই যে– রাজনীতিতে তো ধ্রুব সত্যি  বলে কিছু নেই। আজ যা সত্যি, কাল তা মিথ্যে হয়ে যেতে পারে। তাই, যে ঘটনাগুলোকে রাশি এতদিন  নিয়তি বলে মেনে নিয়েছিল, সেই নিয়তিই এবার লুকিয়ে থাকা বাস্তব হিসেবে দাঁড়ায় রাশির সামনে। আগের সিজন-এ রথীন ব্যানার্জি মারা গেলেও, ‘আবার রাজনীতি’-তে কৌশিক গাঙ্গুলীকে আবার দেখা যাবে রিজপুরের মাটিতে। উপনির্বাচনের ঠিক আগের মুহূর্তে তার ফিরে আসা কতটা অস্বস্তিতে ফেলবে ক্ষমতার  কেদ্রবিন্দুতে থাকা মাল্লিকা ব্যানার্জি-কে? কী হবে মল্লিকা ও রিজপুরের ভবিষ্যৎ? কে এই মানুষটি? ব্যানার্জি বাড়ির সঙ্গে তার কী সম্পর্ক? এই সব কিছুর উত্তর দেবে ‘আবার রাজনীতি’।’

‘আবার রাজনীতি’-র বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন  কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়,  দিতিপ্রিয়া রায়,  কনীনিকা বন্দ্যোপাধ্যায়,  অর্জুন চক্রবর্তী,  শ্যামল চক্রবর্তী,  অনিরুদ্ধ গুপ্ত,  দেবজ্যোতি রায়চৌধুরি,  মধুরিমা বসাক  প্রমুখ। চিত্রগহণে শুভদীপ দে। সম্পাদনায় অমিতাভ দাশগুপ্ত। সংগীত পরিচালক অমিত বোস এবং যশ গুপ্তা। কালারিস্ট দেবজ্যোতি ঘোষ এবং তথাগত ঘোষ। ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর ঈশিতা সরকার।

আইভিএফ পদ্ধতির চাহিদা হয়তো বাড়বে

১৯৭৮ সালের আগে যত বাচ্চার জন্ম হয়েছে, তারা সবাই মাতৃগর্ভে শুক্রাণু এবং ডিম্বাণুর স্বাভাবিক মিলনেই জন্ম নিয়েছেন। কিন্তু তারপর থেকে আইভিএফ পদ্ধতি চলে আসার ফলে পুরো ছবিটা বদলে গেছে। আর এখন প্রতি মিনিটে অন্তত একজন বাচ্চার ভ্রূণ তৈরি হচ্ছে টেস্টটিউব-এ পুরুষের স্পার্ম এবং নারীর এগ ফার্টিলাইজ করে। তাই বলা যায়, সারা পৃথিবীতে অসংখ্য ভ্রূণ মাতৃগর্ভে তৈরি না হয়ে, আইভিএফ অর্থাৎ ইনভিট্রো ফার্টিলাইজ পদ্ধতিতে হচ্ছে।

এখন মেয়েরা যেহেতু ঘরে-বাইরে নানা কাজে ব্যস্ত থাকেন বেশিরভাগ সময়, তাই তাদের কাছে বাচ্চার জন্ম দেওয়ার বিষয়টি এক বিড়ম্বনায় পরিণত হয়েছে। কীভাবে সবকিছু সামলে উঠে বাচ্চা নেবেন একজন কর্মরতা নারী, এটা ভাবতে ভাবতেই বয়স ৪০ বছর পার হয়ে যায়। আর বাচ্চা নেওয়ার সঠিক বয়স পার হয়ে যাওয়ার পর যদি স্বামীর স্পার্ম কাউন্ট কিংবা স্ত্রী-র এগ্ প্রোডাকশন কমে যায় কিংবা ইউটেরাস-এ কোনও সমস্যা দেখা দেয়— তাহলে তখন তারা নিরুপায় হয়ে আইভিএফ সেন্টারগুলির দ্বারস্থ হন।

আসলে কেরিয়ার গড়ার জন্য অতি ব্যস্ততা এবং প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড়ে শামিল হতে গিয়ে পারিবারিক জীবন এবং স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক চাহিদা পূরণের বিষয়টি ভাবতে ভুলে যাচ্ছে মানুষ। আর যখন ভাবার অবসর পান কিংবা ভাবতে বাধ্য হন, তখন সময় অনেকটা পার হয়ে যায়— স্বপ্ন আর পূরণ হয় না স্বাভাবিক পন্থায়। কারণ যাই হোক না কেন, স্বাভাবিক ভাবে বাচ্চার জন্ম দিতে অক্ষম হচ্ছেন এখন অসংখ্য নারী। আর তাই ইনভিট্রো ফার্টিলাইজেশন বা আইভিএফ-এর চাহিদা বাড়ছে সারা পৃথিবীতে। সমীক্ষা অনুযায়ী, এখন ১২৫জন বাচ্চার মধ্যে ১জন বাচ্চা হয় আইভিএফ পদ্ধতিতে। তবে আশা করা হচ্ছে, আগামী দিনে আইভিএফ-এর সংখ্যা হয়তো আরও বাড়বে।

এখন সবকিছুই হয় প্ল্যান মাফিক। বাচ্চার জন্ম থেকে শুরু করে স্কুলে ভর্তি, এমনকী ডক্টর, ইঞ্জিনিয়ার ইত্যাদি কী হবে ভবিষ্যতে, তার সবটাই যেন পূর্ব নির্ধারিত! অতএব বাচ্চা জন্মানোর বিষয়টিও যে স্বাভাবিক ভাবে না হয়ে আইভিএফ পদ্ধতিতে হবে, এ আর আশ্চর্যের কী? আর এই আইভিএফ-এর বিষয়টি যত বাড়বে, বিবাহিত দম্পতির কাছে তা খরচাসাপেক্ষ কিংবা বিপর্যয়ের হলেও, আইভিএফ সেন্টারগুলির রমরমা ব্যাবসা চলতে থাকবে।

অলীক পাহাড়িয়া (শেষ পর্ব)

মালবাজার পশ্চিম ডুয়ার্সের একটি জমজমাট উল্লেখযোগ্য জনপদ। এখানকার বাস টার্মিনাস থেকে নানান রুটের বাস ছাড়ে। মাল নদী পেরিয়ে বাঁয়ে সুনগাচি টি-এস্টেট। যাত্রাপথে একটি বড়ো সেতুর নীচে এলিয়ে নেওড়া নদী। সেই চওড়া নদীবক্ষে কয়েকটি মাত্র শীর্ণ জলধারা বয়ে চলেছে অজস্র নুড়ি ভিজিয়ে। বর্ষা মরশুমে উত্তরবঙ্গের এইসব নদীগুলিই বন্যার জলে ফুঁসে ভাসিয়ে দিয়ে যায় দুই পাড়ের যাপিত জীবনকে। প্রকৃতির উগ্র রোষের কাছে তখন অসহায় ও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন উত্তরবঙ্গের মানুষ ও প্রশাসন।

পথের ভাঁজে ভাঁজে ছায়া কখনও একফালি রোদের আরাম। পেরোতে থাকি অজস্র ছোটো নদী। সবুজের বর্ণমালায় ভেসে ছিল চালসা। স্থানীয়দের কাছে পরিচিত ‘চালসা মহাবারি’ নামে। চালসার পরিচিতি ‘কুইন অফ ডোর্স’ (Queen of Doors) নামেও। গরুমারা ও চাপড়ামারি অরণ্যের সীমান্ত-ঠিকানা। উত্তর-পূর্ব ডুয়ার্স ভ্রমণের প্রবেশতোরণ বলা যায় চালসাকে। এখান থেকে ডুয়ার্সের অন্যান্য বিভিন্ন গন্তব্যের যানবাহন ছাড়ছে। ট্রেকার, বেসরকারি বাস, জিপ, সওয়ারি গাড়িগুলির বিস্তর হাঁকাহাঁকি। কাছেপিঠে বেশ কিছু অফবিট ভ্রমণ ঠিকানা, লালিগুরাস, লালঝামেলা, সামসিং, সুনতালেখোলা, মণ্ডল গাঁও, রকি আইল্যান্ড, সাকামবস্তি, ঝান্ডি, টামটা ভ্যালি, বিন্দু, প্যারেন, ঝালং ইত্যাদি স্থানগুলি নিসর্গমোহে আধভেজা করবেই।

আবার ওদিকে রয়েছে গরুমারা জাতীয় উদ্যান অন্যদিকে চাপড়ামারি অভয়ারণ্য। ‘মারি’ অর্থ হল ‘প্রাচুর্য। চালসার সাপ্তাহিক ‘মঙ্গলবারি হাট’-টি খুব জনপ্রিয়। মালবাজার ডিভিশনে, মেটেলি সিডি ব্লকের অধীনে চালসা। চালসা মোড় থেকে কিছুটা এসেই চালসা থেকে মেটেলি, পাহাড়ের মৃদু ঢাল বেয়ে রেললাইন। আগের মিটারগেজ সরিয়ে এখন ব্রডগেজ হয়ে গেছে। তার ঠিক পরেই দু’তিনটে চূড়ান্ত সর্পিল বাঁক ঘুরে পাহাড়িপথের শুরু। এক লাফেই অনেকটা উঁচুতে চলে এলাম। নীচে একান্তে পড়ে রইল ডুয়ার্সের সমতল আর চালসা শহরতলি।

আঁকাবাঁকা পাহাড়িপথ বেয়ে কস্মিন লাবণ্য চিরে দু’পাশে আদিগন্ত চা-বাগানের মসৃণ সামগান। বাঁদিকে চড়াইয়ের কিনারা ঘেঁষে সিনক্লিয়ার্স রিট্রিট। অবকাশযাপনের এক নিপাট আবাস। আমরা এখানেই ঘাঁটি গেড়ে পূর্ব ডুয়ার্সের কয়েকটি ভ্রমণস্থল গাড়ি নিয়ে টো- টো করে ঘুরে ফিরে দেখে নেব, এমনই মনস্থ করেছি। অনন্ত শ্যামলিমা চিরে চিকণ পথ। প্রায় বুক সমান উঁচু চা-বাগিচার মাঝেমাঝে শিরিষ গাছের শেড-ট্রির ফাঁক গলে দিনের নরম রোদ্দুর বিছিয়ে রয়েছে অকাতর সবুজ জলসাঘরে। বাঁয়ে-ডাইনে কিলকট, আইভিল, ইনডং, থাবো, চুলসা, জুরান্তি, নাগাইসুরি, চালাউনি, সামসিং, মেটিয়ালি, সাতখোয়া, নেওড়া মাঝিয়ালি, সালবারি, উত্তর ধুপঝোরা, বরাদিঘি, বাতাবাড়ি এমনই রকমারি চা-বাগিচা নিয়েই মাটিয়ালি বা মেটেলি ব্যাস্ত জনপদ।

চালসা থেকে মেটেলি ১২.১ কিলোমিটার মাত্র। মাটিয়ালি গ্রামপঞ্চায়েতটি চা-বাগান ঘেরা এক জনপদ। এখানে সাদরি, গোর্খালি, কুরুক, ওঁরাও, রাজবংশী, বোরো ইত্যাদি জনজাতির বাস। স্থানীয় মানুষজন, যানবাহন, ব্যাস্ততা ঘিরে মেটেলি, সামসিং পাহাড়তলির এক ভালোলাগা স্থান। এখানকার বেশিরভাগ বাসিন্দার জীবিকা মূলত চা-বাগিচাকেন্দ্রিক। মাটিয়ালি কালিবাড়ি স্থানীয়দের কাছে খুব জাগ্রত। ঠিক উলটো দিকে মাটিয়ালি থানা। মেটেলিতে রবিবার বেশ জমজমাট হাট বসে। ওপরে ফারি বস্তি, সামসিং, মৌটুসি বিট থেকে স্থানীয় মানুষজন নীচে নেমে এসে এই হাটেই প্রয়োজনীয় রসদ কেনাবেচা করেন।

ভ্রমণের সবটুকু ধরা থাকে কুয়াশার আস্তরণ চিরে চা-বাগান, দূরের আকাশ, পাখির ডাক আর নিরিবিলির কাছে। নেওড়া নদীর কোল ঘেঁষে জুরন্তি চা-বাগিচার কাছে রয়েছে চমৎকার এক পিকনিক স্পট। অনাবিল স্নিগ্ধতা ছেয়ে আছে। নুড়িপাথর মাড়িয়ে ডিঙিয়ে নেওড়া নদীর এক্কেবারে কাছ বরাবর চলে এসেছি। নেওড়া নদীর অগভীর স্বচ্ছ জলে নামলাম, পা ভিজোলাম। আজীবন ঋণী থাকা যায়, পরমা প্রকৃতির কাছে। মূর্তি নদীর কোলে রকি আইল্যান্ড ও সুন্তালেখোলার কাছেই লালিগুরাসেও ঢুঁ মারি।

কখনও চলে যাই, ডায়না নদীর তীরে ভুটান সীমানা লাগোয়া এক রত্তি গাঁ, লালঝামেলা বস্তি। আদপে এটি হল দুটো পৃথক বস্তি, লাল বস্তি ও ঝামেলা বস্তির মিলিত রূপ। ভারত-ভুটানের সংযোগকারী সেতুটিতে ঠেস দিয়ে, অদ্ভুত অচেনা আনন্দ। সামসিং ছাড়িয়ে সুনতালে ঢোকার আগেই ওপরের বিজনপথ চলে গেছে মণ্ডলগাঁও, সেখানে দু’ধারে স্ট্রবেরি চাষের জমি, তার মধ্যে দিয়েই এক পা এক পা করে সেঁধিয়ে যাই।

দূরে টেম্পলা পাহাড়ের ফিকে রেখা। না-ফুরোনো অলীক ডিঙিয়ে চালসা-মাটিয়ালির অরক্ষিত গোপন আনকোরা ঠিকানা, অচেনা সবই আমার কাছে। নতুন গল্প নেই কোনও। পর্যাপ্ত ভ্রমণপথ সাঁতরে, হারাতে চেয়েছি পথ ডুয়ার্সের কুঠুরিতে।

পেট ভালো রাখার উপায়

একটু ভালো ভাবে নজর রাখলে প্রমাণ পাবেন, মাথার চুল পড়ে যাওয়া এবং ত্বকের জৌলুস হারিয়ে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হল পেটের অসুখ। তবে শুধু চুল পড়া কিংবা ত্বকের সমস্যাই নয়, পেপটিক আলসার কিংবা লিভার ক্যানসারের মতো বড়ো অসুখগুলির সূত্রপাতও কিন্তু নিয়মিত হজমের গোলমাল কিংবা অ্যাসিডিটি থেকে হয়। অতএব পেটের সুস্থতা জরুরি। কিন্তু কীভাবে পেট ভালো রাখবেন, সেই বিষয়ে একগুচ্ছ গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিলেন কলকাতার এএমআরআই হাসপাতালের কনসালট্যান্ট গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সার্জন (অ্যাডভান্সড ল্যাপারোস্কোপি এবং জিআই অংকোসার্জারিতে বিশেষজ্ঞ) ডা. সঞ্জয় মণ্ডল।

এখন ফ্রিজে রাখা খাবার খাওয়ার অভ্যেস হয়ে গেছে সবার। এর ফলে পেটের সমস্যা বাড়ছে। মনে রাখতে হবে, যে- কোনও বয়স এবং লিঙ্গের জনসংখ্যার একটি বড়ো শতাংশকে প্রভাবিত করে পেটের সমস্যা। কোনও কারণে যদি শারীরিক মুভমেন্ট কমে যায়, তাহলে ভারী খাবার হজম হয় না ঠিক ভাবে। আর যারা মাংস বেশি খান, তাদের কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা বেশি হয়। এর ফলে পাইলস এবং ফিসারও হতে পারে। তৈলাক্ত এবং চর্বিযুক্ত খাবারও নানারকম সমস্যায় ফেলতে পারে।

অপর একটি গুরুতর সমস্যা যা খাদ্য গ্রহণের ফলে ঘটতে পারে, তা হল— অস্বাস্থ্যকর উপায়ে তৈরি করা খাবার অর্থাৎ যা সঠিক ভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি। এর ফলে টাইফয়েড এবং ভাইরাল হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হতে পারেন। যে- পরিমাণ ক্যালোরি আমরা শরীরকে দিচ্ছি, তা যদি সঠিক পরিমাণে ক্ষয় না হয় পরিশ্রমের অভাবে, তাহলে ওজন বেড়ে যেতে পারে এবং অতিরিক্ত ওজন শরীরের পক্ষে মোটেই যে ভালো নয়, তা আমরা প্রায় প্রত্যেকেই জানি।

আরেকটি পানীয় যা কিছু লোক ঠান্ডা আবহাওয়ায় বেশি পান করার প্রবণতা রাখেন, তা হল অ্যালকোহল। এটি অতিরিক্ত গ্রহণ করলে শুধুমাত্র স্বল্পমেয়াদে নয়, দীর্ঘমেয়াদেও ক্ষতিকারক। অতিরিক্ত অ্যালকোহল স্বল্পমেয়াদে রিফ্লাক্স এসোফ্যাগাইটিস এবং গ্যাস্ট্রাইটিস এবং দীর্ঘমেয়াদে লিভারের সিরোসিস, হৃদরোগ, প্যানক্রিয়াটাইটিস এবং স্থূলতার দিকে নিয়ে যায়। শীতের ঋতুতে আমাদের তরল বিশেষত জল কম পান করার প্রবণতা থাকে এবং এর ফলে ডিহাইড্রেশন হতে পারে, যা কিডনির সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে যাদের কিডনিতে পাথর রয়েছে, তাদের আরও বেশি সাবধান হওয়া উচিত। মনে রাখবেন, ডিহাইড্রেশনের ফলে কোষ্ঠকাঠিন্যের প্রবণতা এবং পাইলস ও ফিসারের সমস্যাও বেড়ে যায়। তাছাড়া, শীতকালও এমন একটি সময় যখন শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণের সম্ভাবনা বেশি থাকে। তাই, আমাদের সঠিক যত্ন এবং সুষম খাদ্য গ্রহণ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

এ প্রসঙ্গে মনে রাখতে হবে যে, লিভার আমাদের শরীরের একটি প্রধান অঙ্গ। আমাদের সুস্থ রাখার জন্য সবসময় কাজ করে চলেছে লিভার। তাই লিভারের যত্ন নেওয়া আমাদের দায়িত্ব। আসলে, আমরা যে ধরনেরই খাবার খাই না কেন, তা মেটাবোলিজম-এ সাহায্য করে লিভার। তাই লিভার সংক্রান্ত কোনও সমস্যা হলে, খাবার ঠিক করে হজম হয় না। অ্যাসিডিটি, গ্যাস্ট্রাইটিস, কোষ্ঠকাঠিন্য ও হজম সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়।

আমরা যে-খাবার খাই, তার থেকে পাওয়া পুষ্টি শরীরে সঠিক ভাবে শোষণ ও জমা হতে সাহায্য করে লিভার। তাই লিভারের সমস্যা হলে এই ধরনের খাদ্য উপাদান যেমন বিভিন্ন ভিটামিন, মিনারেলস-এর ঘাটতিজনিত সমস্যা দেখা দেয়। বিশেষত আয়রন, ফেরাটিন, ভিটামিন এ, ডি, ই প্রভৃতির ঘাটতি দেখা যায় শরীরে। তাই লিভার ঠিক না থাকলে, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। এছাড়া লিভার শরীরের অতিরিক্ত টক্সিন বের করে ডি-টক্সিফিকেশন-এ সাহায্য করে। তাই লিভার ঠিক কাজ না করলে, এই টক্সিন শরীর থেকে ঠিক ভাবে বেরোতে পারবে না এবং বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেবে।

লিভার-এর যে-সমস্যায় এখন ভীষণ ভাবে ভুগছেন অসংখ্য মানুষ, তা হল-ফ্যাটি লিভার। ফ্যাটি লিভার-এর সমস্যা আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি আমাদের খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার অভ্যাস নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে। কিন্তু যদি আমরা ফ্যাটি লিভার- কে প্রাথমিক স্টেজ-এ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারি, তাহলে লিভার-এর বিভিন্ন সমস্যা দেখা যায়। যেমন—’ – লিভার ফাইব্রোসিস, লিভার সিরোসিস, এমনকী ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে।

ফ্যাটি লিভার-এর প্রাথমিক স্টেজ সাধারণ ভাবে উপসর্গহীন। তাই আমাদের সচেতন থাকতে হবে। ফ্যাটি লিভার-এর দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় স্টেজ থেকে যে-উপসর্গগুলি বোঝা যায়, তা হল— পেট বেশি বেড়ে যায় শরীরের অন্যান্য অংশ থেকে, অতিরিক্ত ওজন বেড়ে যাওয়া, হাঁপিয়ে যাওয়া, পেটে ব্যথা, বমি, হালকা জন্ডিস, ঘনঘন সর্দি কাশি। দ্বিতীয় স্টেজ থেকে ওষুধের প্রয়োজন হয়। সেইসঙ্গে, নিয়ন্ত্রণ করতে হয় খাওয়া-দাওয়া এবং নিয়মিত হাঁটাচলা ও ব্যায়ামের মাধ্যমে ফ্যাটি লিভারকে সুস্থ রাখতে হয়।

চিকিৎসা ও সতর্কতা

  • বিনা প্রয়োজনে ওষুধ খাওয়া উচিত নয়। এই বিষয়টি অ্যান্টাসিড গ্রহণের ক্ষেত্রেও সমান ভাবে প্রযোজ্য। নিয়মিত কখনওই অ্যান্টাসিড খাওয়া উচিত নয়।
  • একজন ডায়াবেটিক রোগীকে প্রথমেই চিনি ও কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাদ্য বর্জন করতে হবে। খাদ্য তালিকায় রাখতে হবে প্রোটিন জাতীয় খাবার। অন্যান্য সাধারণ মানুষের মতোই অত্যধিক তেল ও মশলা জাতীয় খাবারকে তাদের খাদ্য তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে। খাদ্য তালিকা হতে হবে সুষম এবং খাদ্য গ্রহণ করতে হবে পর্যাপ্ত সময়ের ব্যবধানে। খাবারের মধ্যে ক্যালোরি’র মাত্রাকে সঠিক ভাবে বিচার করে খাবার খেতে হবে।
  • ব্রেকফাস্ট করতে হবে ভারী। লাঞ্চ হবে হালকা এবং ডিনারটিও করতে হবে হালকা। এটাই হচ্ছে প্রাত্যহিক জীবনের ভালো খাদ্যাভ্যাস। তাছাড়া তেল-মশলা জাতীয় খাবারকে বর্জন করতে হবে। অ্যালকোহল ও ধূমপান বর্জন করতে হবে। ভালো ভাবে তৈরি টাটকা খাবার খেতে হবে এবং রেস্তোরাঁর খাবার এড়িয়ে চলতে হবে।
  • বাড়িতে তৈরি খাবার দিতে হবে ছেলেমেয়েদের। খাবারকে হতে হবে সুষম ও পুষ্টিকর। বাইরের রেস্তোরাঁর খাবার থেকে তাদের দূরে রাখতে হবে। ছেলেমেয়েদের টাটকা ফল ও তরিতরকারি খেতে উৎসাহিত করতে হবে। ঠান্ডা ও নরম পানীয় এবং বাইরের খাবার এড়িয়ে চলতে হবে।
  • নিয়মিত ভাবে ব্যায়াম করতে হবে। সময়মতো খাবার খেতে হবে এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে ও সঠিকমাত্রার ক্যালোরি-যুক্ত খাবার খেতে হবে। অস্বাস্থ্যকর খাবার বর্জন করতে হবে।
  • খাবার এড়িয়ে গিয়ে কখনওই ডায়েটিং হতে পারে না। সঠিক সময় উপযুক্ত ও পর্যাপ্ত মাত্রায় খাবার গ্রহণ করেই সঠিক ডায়েটিং করা সম্ভব। সবসময় অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার, চিনি ও তেল-মশলা জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলতে হবে।
  • অ্যাসিডিটি হল কোনও মানুষের দেহের পাকস্থলি থেকে অতিরিক্ত মাত্রায় অ্যাসিড ক্ষরণের ঘটনা। এর কারণে পেটের উপরের দিকে ব্যথা হয় এবং বমি বমি ভাব তৈরি হয়। এর মাত্রা বেড়ে গেলে পাকস্থলিতে ক্ষতের সৃষ্টি হয়। সেখান থেকে রক্ত বের হয় এমনকী অন্ত্রে ছিদ্রও হয়ে যেতে পারে। এর চিকিৎসায় অ্যান্টাসিড খেতে হয়। কোনও কোনও ক্ষেত্রে চিকিৎসা হয় প্রোটন পাম্প ইনহিবিটার-এর সাহায্যে, যাকে পিপিআই বলা হয়ে থাকে।
  • সুস্থ পাকযন্ত্র তৈরির ক্ষেত্রে কোনও সুনির্দিষ্ট ব্যায়াম নেই। তবে সার্বিক ভাবে নিয়মিত ব্যায়াম করলে সেটা শরীর এবং পরিপাক প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে ভালো হয়।
  • তেল ও মশলা জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলতে হবে এবং সেইসঙ্গে বর্জন করতে হবে ধূমপান এবং মদ্যপান।
  • নিয়ম করে আহার গ্রহণ করতে হবে। মানসিক চাপমুক্ত হয়ে থাকতে হবে। পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমোতে হবে। অতিরিক্ত মাত্রায় চা, কফি ও এনার্জি ড্রিংকস বর্জন করতে হবে। জল পান করতে হবে সঠিক পরিমাণে। দিনে অন্তত চার লিটার।
  • স্বাস্থ্যকর অভ্যাস বজায় রাখতে হবে। অর্থাৎ খাওয়ার আগে ভালো ভাবে হাত ধুয়ে নিতে হবে। খাবার তৈরি ও সংরক্ষণ করতে হবে সঠিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে। টাটকা ও সঠিক পদ্ধতিতে তৈরি খাবার খেতে হবে। ফল ও তরিতরকারি খাওয়ার আগে সেগুলিকে ভালো ভাবে ধুয়ে পরিষ্কার করে নিতে হবে। যদি কারওর গ্যাস্ট্রোএন্টারাইটিস দেখা দেয় তাহলে প্রচুর পরিমাণে জল পান করতে হবে এবং ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন নিতে হবে। প্রয়োজনে একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সেইমতো চলতে হবে এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ গ্রহণ করতে হবে। অধিকাংশ সময়ই গ্যাস্ট্রোএন্টারাইটিস ভাইরাল অসুখ হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকের তেমন একটা প্রয়োজন হয় না।
  • নানান কারণে ক্ষুধামান্দ দেখা দিতে পারে। অধিকাংশ সময়ই এটা দেখা দেয় সীমিত সময়ের জন্য। তখন এর জন্য কোনও চিকিৎসারও প্রয়োজন হয় না। তবে যদি এই ঘটনা বেশিদিন ধরে চলতে থাকে এবং দিন দিন দেহের ওজন কমে যেতে থাকে, তখন অবশ্যই এই বিষয় নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

অলীক পাহাড়িয়া (পর্ব-০১)

কত সফর যে জেগে থাকে ভ্রামণিক জীবন অভিজ্ঞতায়। কখনও কখনও ঘরের বাঁধনকেও বুঝি তখন নিতান্ত তুচ্ছ মনে হয়। বাউন্ডুলে মনটা শীতঘুম কাটিয়ে আবার চঞ্চল হয়ে ওঠে আর তখনই শুরু হয়ে যায় অচিন পথে বেরিয়ে পড়ার নানান অন্ধিসন্ধি। পৌঁছে যাই পাহাড়ের কাছে, নদীর কাছে। মন উজানের টানে কোথায় পাড়ি জমানো যায়— ভাবনাটা গাঢ় হতে না হতেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিই ‘ডুয়ার্স’। কাছে, তবু দূরের সেই ‘দুয়ার’, অভিসারী পদক্ষেপে পৌঁছে যাওয়া, নতুন গন্তব্যে। হাতের কাছে যে কত স্বপ্নের মতো জায়গা আছে ডুয়ার্সের ত্রিসীমানা জুড়ে।

সবুজ সোহাগের প্রীত সম্ভাষণে জানি না কতদূর ভেসে গেছে ডুয়ার্সের হৃদিকথা। এই সফরে ঘনঘটা নেই তেমন। শুধুই পাহাড় ও চায়ের আবাদভূমির ভূমিকা। গন্তব্য চালসা-মাটিয়ালি হয়ে আরও ওদিকের কিছু ভ্রমণ ঠিকানা। শালুগোড়া পেরিয়ে ডানপাশে অনেকখানি জুড়ে সেনাছাউনি। তারপর উত্তর-পূর্বে মহানন্দা অভয়ারণ্যের বুক চিরে ৩১ নম্বর জাতীয় সড়ক বা সেবক রোড ধরে এগিয়ে চলা।

শিলিগুড়ি ছাড়িয়ে ১২৭.২২ বর্গকিলোমিটার জুড়ে মহানন্দা অভয়ারণ্য। মাঝখান দিয়ে তিরতির করে বয়ে চলেছে পঞ্চনই নদী। দু’পাশে গহিন জঙ্গলের মিশ্র বনজঘ্রাণ বাতাসে। উন্মাদনায় দিশেহারা করে পথশোভা। নন্দীখোলা নদীর পাশে, মহানন্দার জঙ্গল ক্রমশ ফিকে হয়। পারিজাত নগরে নন্দীখোলা তিস্তার অপার সান্নিধ্যে মেশে। তিস্তার ওপর করোনেশন ব্রিজ বা বাঘপুল সেতু। ১৯৩৭ সালে রাজা ষষ্ঠ জর্জ ও রানি এলিজাবেথের রাজ্যাভিষেক স্মরণে এই ব্রিজের নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ১৯৪১ সালে সম্পন্ন হয়।

তিস্তা নদীর গভীরতা ও স্রোতের কারণে এই ব্রিজ পিলার ছাড়াই ‘ফিক্সড আর্চ” বা খিলান ব্যবহারে নির্মিত হয়। জায়গাটার নাম স্বস্তিক সেক্টর। বাঁদিকে সেবকেশ্বরী কালিমন্দির। ‘সেবক’ কথার অন্য অর্থ ‘হাওয়ার দরজা’। কিছু ঘরবাড়ি, ধাবা, দোকানপাট-সহ ছোট্ট জনপদ। নুড়িপাথরের গা ঘেঁষে বহতা তিস্তাকে পাশে নিয়ে চলতে চলতেই খাড়াই পথ শুরু। তিস্তা পার হওয়া মানেই তরাই ছেড়ে ডুয়ার্সের শুরু। এই পাহাড়িপথের দুপাশে বাঁদরদের বাঁদরামি গাড়ির জানলা দিয়ে উপভোগ করছিলাম।

দিগন্ত জুড়ে ছায়া-রোদের প্রস্তাবে নিয়মমাফিক অনিবার্য শরণার্থী সবুজ। পশ্চিম ডুয়ার্সের প্রথম চা-বাগান ওয়াশাবাড়ি টি এস্টেট। সবুজ কিন্তু ফুরল না সহজে। নুড়ি-পাথর ছাওয়া শুষ্ক লিস নদী পেরিয়ে সোনালি টি এস্টেট, বাগরাকোট টি গার্ডেন। বিখ্যাত ডানকান চা, এই বাগরাকোট চা-বাগিচার সবুজতরঙ্গ।

গণেশ নদী পেরিয়ে নেশা জাগানো সবুজে চোখ রেখেই এসে যায় ওদলাবাড়ি। দোকানপাট, বাজার নিয়ে ওদলাবাড়ি বেশ জনবহুল এলাকা। ওদলাবাড়ি হাট ডুয়ার্সের প্রাচীনতম। তার দু’ধারে অঢেল বেড়ানোর জায়গা, ক্ষয়ে যাওয়া জঙ্গল, পাহাড়তলি। এইভাবে কখনও সবজে নিবিড়তা, কখনও ঝিমঝিম স্তব্ধতায় এক একটি মায়াময় চা-বাগিচা, যত্রতত্র নিঝুম বয়ে চলা অজস্র পাহাড়ি নদী, খোলা, ঝোরা, চড়াই-উতরাই পাহাড়িপথ, দু-একটা শহর, অগণিত গ্রাম-জনপদ, শাল-সেগুনের জঙ্গল। একটু তফাত রেখে সমান্তরালে পাহাড়শ্রেণি। সে এক অনন্য ডুয়ার্স।

১৮৭৪ সালে এখানে চা-বাগিচার পত্তন করেন মিস্টার ব্রুহাম নামক এক ব্রিটিশ আধিকারিক। যদিও তার অনেক আগেই আসামের চা-বাগানগুলিতে উল্লেখযোগ্য ভাবে প্রচুর চা চাষ হতো। তবে জলপাইগুড়ি সংলগ্ন অসংখ্য নদী ও জঙ্গলঘেরা ডুয়ার্স অঞ্চলে চা চাষের দেরি হওয়ার কারণ, এটি তখন ভুটান সাম্রাজ্যের অধীন ছিল। পরে ভুটানরাজকে পরাস্ত করে ব্রিটিশরা এই সমগ্র অঞ্চলের মালিকানা হস্তগত করে এবং পরে ডুয়ার্স অঞ্চলটির পত্তন হয়। নাম না জানা, অথবা সদ্য চেনা, অজানা অচেনা নদী ঝোরা পার হয়ে চলেছি। চেল নদী পেরিয়ে রানিচেরা চা-বাগিচা।

চেল নদীর অপরূপ শোভা এখানে। চেল নদীকুলে পাপরখেতি নামের এক সুন্দর স্থান আছে। বাঁ-হাতি গরুবাথান পেরিয়ে আরও একটা ছোট্ট জনপদ ডামডিম। কাছেই টি ট্যুরিজমের নতুন ঠিকানা ফাগু ও সামবিয়ং। শঙ্খিঝোরা, সুখাঝোরা ইত্যাদি বিবিধ ঝোরা পেরিয়ে রাজা টি-এস্টেট। মাঝেমাঝেই চোখে পড়ছে চা-বাগানে মহিলা শ্রমিকদের পিঠে লাগানো বেতের ঝুড়িতে নিপুণ হাতে, ‘দুটি পাতা একটি কুঁড়ি’ তোলার ব্যস্ততা।

(ক্রমশ…)

অভিনব শাস্ত্রীয় সংগীতের আসর ‘উড়ান’-এ মঞ্চ মাতাবেন একঝাঁক তরুণ প্রতিভা

এখন শাস্ত্রীয় সংগীতে দেশের তরুণ তুর্কিরা কেমন তৈরি হচ্ছে, তা জানার খুব একটা সুযোগ তৈরি হয় না সর্বদা। অথচ এই তরুণ প্রতিভারাই দেশের ভবিষ্যৎ। এবার কলকাতা-য় এই সুযোগ করে দিতে চলেছে ভারতীয় বিদ্যাভবন এবং সংস্কৃতি সাগর। ওদের যৌথ উদ্যোগে একঝাঁক তরুণ প্রতিভাদের নিয়ে জি ডি বিড়লা সভাঘরে ২৫ মে বসতে চলেছে অভিনব শাস্ত্রীয় সংগীতের আসর ‘উড়ান’। নিঃসন্দেহে কলকাতার জন্য এটা একটা বড়ো সুখবর। তরুণ প্রতিভাদের কাছেও খুব বড়ো একটা সুযোগ। কলকাতার মতো সমঝদারি শ্রোতাদের শহরে নিজেদের মেলে ধরার সুবর্ণ সুযোগ।

‘উড়ান’-এ অংশগ্রহণ করবেন দেশের অন্যতম বাছাইকরা কয়েকজন তরুণ প্রতিভা। এঁরা ইতিমধ্যেই দেশে-বিদেশে সাড়া ফেলতে শুরু করেছেন। এই আসরে থাকছেন উদীয়মান প্রতিভা সেতারবাদক মেহতাব আলি নিয়াজি এবং জনপ্রিয় তবলাবাদক দেবজিৎ পতিতুন্ডির যুগলবন্দি। দুজনেই ছাইচাপা আগুন। দুজনেই শাস্ত্রীয় সংগীত পরিবারের উত্তরসূরি। মেহতাব মোরাদাবাদ ঘরানার সেতারবাদক।  বাবা বিখ্যাত সেতারবাদক মহসিন আলি খানের কাছেই অনেক ছোটবেলা থেকেই মেহতাব তালিম নিয়েছেন। স্বয়ং বিরজু মহারাজ, জাকির হুসেনের মতো দিকপালরা ওঁর বাজনার তারিফ করেছেন একাধিকবার। দেবজিতের হাতেখড়ি ওঁর বাবা তবলাবাদক অমল পতিতুন্ডির কাছে। পরে বাবার গুরু শঙ্খ চট্টোপাধ্যায়ের কাছে নাড়া বেঁধেছিলেন। এখন ওঁরা দুজনেই দেশে-বিদেশে অনুষ্ঠান করে ক্রমশই নিজেদের জায়গা শক্ত করে নিচ্ছেন।

থাকছে এই সময়ের অন্যতম প্রতিভাময় তরুণ তবলাবাদক যশবন্ত বৈষ্ণবের একক তবলা বাদন। মাত্র তিন বছর বয়স থেকেই নিজের বাবা-র ( বিখ্যাত তবলাবাদক রাজেন্দ্র বৈষ্ণব) কাছে তালিম নিতে শুরু করেন। আজ নিঃসন্দেহে যশবন্ত তবলা দুনিয়ায় একটা উজ্জ্বল নাম। দিকপাল তবলাবাদকদের যোগ্য উত্তরসূরী। যশবন্তকে সঙ্গত করবেন দুই প্রতিভাধর তরুণ তুর্কি আকাশ জালমি (হারমোনিয়াম) এবং আমন হুসেন (সারেঙ্গি)।

অনুষ্ঠান শেষ হবে নবীন প্রজন্মের অন্যতম একজোড়া  বিস্ময়কর প্রতিভাধরদের যুগল ঝংকারে। এঁরা হলেন সরোদবাদক ইন্দ্রায়ুধ মজুমদার এবং তবলাবাদক ইশান ঘোষ। দুজনেই শাস্ত্রীয় সংগীত জগতে আজ পরিচিত নাম। দেশে-বিদেশে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে ছড়িয়ে দেবার কাজে উজ্জ্বলতম কান্ডারি দুজনেই। ইন্দ্রায়ুধ বিখ্যাত সরোদবাদক পন্ডিত তেজেন্দ্রনারায়নের সুযোগ্য পুত্র এবং ঈশান বিখ্যাত সেতার এবং তবলাবাদক নয়ন ঘোষের যোগ্য উত্তরসূরি। কয়েকমাস আগেই এঁদের যুগলবন্দি কলকাতায় সাড়া ফেলেছিল। আবার  কলকাতাকে মাতাতে দুজনকেই একসঙ্গে মঞ্চে দেখা যাবে।

তরুণদের নিয়ে এমন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আসর খুব একটা হয় না। তাই বলা যায়, তরুণদের মেলে ধরার জন্য ভারতীয় বিদ্যাভবন এবং সংষ্কৃতি সাগর মহৎ উদ্দোগ নিয়েছে। গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় এক নতুন যৌবনের ডাকে শামিল  হবে গোটা কলকাতা।

শিশুদের অন্তর্মুখী স্বভাবে কীভাবে পরিবর্তন আনবেন?

শহুরে সভ্যতায় ক্রমশ একটা নতুন ট্রেন্ড মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে দেখা যাচ্ছে যে, কে নিজের বাচ্চাকে সবথেকে বেশি ফেসিলিটি দিতে পারে তাই নিয়ে প্রতিযোগিতার মানসিকতা। বাস্তবে এই ফেসিলিটির অর্থ, বাচ্চাকে কতটা ব্যস্ত রাখা যায়। যার বাচ্চা যতটা ব্যস্ত, ভবিষ্যতে সে ততটাই উপযুক্ত— এমনটাই এ যুগের ধারণা। এই মানসিকতারই প্রতিফলন হল হোম টিউশন, অনলাইন টিউশন, এক্সট্রা ক্লাসেস ইত্যাদি।

বাচ্চারা কেন একাকিত্বে ভুগছে

শৈশবে অন্তর্মুখী হওয়ার কারণে যৌবনে এসে সমস্যায় পড়লে সর্বপ্রথম চেষ্টা করতে হবে যত বেশি বন্ধু বানানো যায়। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে গল্পগুজব করা, পার্টি, যে-কোনও ইভেন্ট অ্যাটেন্ড করা, ট্রেনে-বাসে সকলের সঙ্গে কথা বলা ইত্যাদিতে ধীরে ধীরে জড়তা কাটবে। ছাত্রাবস্থায় স্কুল-কলেজের অনুষ্ঠানে অবশ্যই যোগদান করা বাঞ্ছনীয়। আশেপাশের সবকিছু জানার চেষ্ট করতে হবে। প্রথমে দ্বিধাবোধ হলেও ধীরে ধীরে যখনই নিজেকে প্রকাশ করতে শিখে যাবেন, দেখবেন অন্তর্মুখী হওয়ার অভ্যাসে পরিবর্তন এসেছে।

হোম টিউশন

একটা সময় ছিল যখন মা-বাবার হাত ধরে বাচ্চার অক্ষরজ্ঞান হতো। এখন শৈশবেই একটি বাচ্চাকে হোম টিউশন এবং অনলাইন টিউশনে জোর করে ভর্তি করে দেওয়া হয়।

৭-৮ ঘন্টা স্কুলে কাটিয়ে বাড়িতে এসেই আবার ১-২ ঘন্টা টিউশনে পড়ার বোঝা বাচ্চাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। এর উপর স্কুলের হোমওয়ার্ক, টিউশনের হোমওয়ার্ক তো আছেই। মা-বাবা আসলে চান বাচ্চাকে মেশিন করে তুলতে, যার অভিধানে ‘হাসিমুখে থাকা’ শব্দটাই নেই।

স্কুলের ৭টি ক্লাস বা পিরিয়ডস

সাধারণত স্কুলে ৬ থেকে ৭টি পিরিয়ডস হয়। একটা ক্লাস শেষ হলে বেল বাজে। নতুন ক্লাস শুরু হয়, নতুন টিচার আসেন। ক্রিকেটের ময়দানও এই একটাই ব্যপার! টিমের হার-জিত নির্ভর করে নতুন প্লেয়ারের টলারেন্স-এর উপর যে, সে কতটা চাপ নিতে সক্ষম।

ইকোনমিক টাইমস-এর একটি সমীক্ষা অনুসারে ভারতের ৯০ মিলিয়ন বাচ্চা প্রাইভেট স্কুলে পড়াশোনা করে। প্রাইভেট স্কুলগুলিতে পড়াশোনা ছাড়াও এক্সট্রা অ্যাক্টিভিটিজ-এর নামে বাচ্চাদের কখনও প্রোজেক্ট, কখনও প্র্যাক্টিকাল, কখনও অ্যাসাইনমেন্ট অথবা ইভেন্টস করানোর অছিলায় ব্যস্ত রাখা হয়। স্কুলের লক্ষ্য একটাই থাকে, ছাত্র-ছাত্রীদের অভিভাবকদের বিশ্বাস করানো যে, স্কুল বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ তৈরির প্রচেষ্টায় আধুনিকতম পথ অবলম্বন করছে।

বাচ্চাদের জীবনে নির্ভরতার অভাব

শহরে আজ এমনই পরিস্থিতি যে বাচ্চাদের কাছে নির্ভর করার মতো মানুষের অভাব দিনে দিনে বাড়ছে। এমন কেউ নেই যার সঙ্গে বাচ্চা কিছুটা সময় কাটাতে পারে। স্কুলে পিরিয়ড শেষ হতেই শিক্ষক বদলাচ্ছে। টানা ক্লাস চলার ফলে ক্লাসে বন্ধুদের সঙ্গেও ঠিকমতো কথা বলতে পারে না। স্কুল শেষ হতেই অভিভাবকেরা উপস্থিত হয়ে যান বাচ্চাকে স্কুল থেকে নিয়ে যেতে অথবা বাস, কারপুল বাচ্চাদের নিয়ে রওনা দেয়।

বাস কিংবা কারপুলেও বাচ্চারা মন খুলে কথা বলতে পারে না কারণ বিভিন্ন ক্লাসের অন্য বাচ্চা সেখানে উপস্থিত থাকে। বাড়ি আসতেই টিউশন, হোমওয়ার্কের চাপ। এত ব্যস্ত জীবনশৈলীর কারণে বন্ধু বানানো যেমন সম্ভব হয় না তেমনই প্রতিবেশী বাচ্চার সঙ্গেও মেলামেশা করা সম্ভব হয় না। এই পরিস্থিতিতে বাচ্চার মানসিক বিকাশ যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয় ঠিক তেমনই বাচ্চা খোলামেলা স্বভাবের কিংবা সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারে না।

সমাজের বাস্তবতা থেকে দূর

এনসিইআরটি-র রিপোর্ট অনুযায়ী এখানে বাচ্চারা প্রায় ৬ থেকে ৮ ঘন্টা স্কুলে সময় কাটায়। ওখানে ৩০ থেকে ৪০ মিনিটের একটা ব্রেক দেওয়া হয়। টানা ক্লাস চলার মধ্যে এই ৩০-৪০ মিনিটের ব্রেক বাচ্চাদের কাছে ফ্রেশ হাওয়ার মতন। কিছুক্ষণের জন্য হলেও তারা বন্ধুদের সঙ্গে বসে গল্প করতে পারে নয়তো ওদের জীবনটা অনেকটা ফাঁকা প্ল্যাটফর্ম-এর মতো যেখানে একটা ট্রেন ছেড়ে গেলেই অন্য ট্রেন এসে ঢুকে পড়ে।

শৈশব থেকেই দৌড় ঝাঁপ, পড়াশোনার চাপ, সময়ের অভাব অন্তঃসারশূন্য ব্যস্ততা, নতুন করে কারও সঙ্গে পরিচিতি না বাড়ার কারণে বাচ্চা বড়ো হয়ে সমাজের বাস্তবতা থেকে দূরে সরে যায়। নিজের ভিতরেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রেখে শৈশবের সারল্য হারিয়ে ফেলে তারা অন্তর্মুখী হয়ে ওঠে।

অন্তর্মুখী হওয়ার প্রভাব যৌবনে

শৈশবে মা-বাবা বন্ধুবান্ধব, খেলাধুলা, উৎসব, পার্টি, খেলনা— -বাচ্চাদের জীবনে ব্যবহাহিক পরিবর্তন এনে খুশির সঞ্চার করে। কিন্তু নিজের কথা শেয়ার করতে না পারা, বন্ধু না থাকা, মা-বাবার সঙ্গে দূরত্ব, খেলাধুলার অভাব ইত্যাদি যৌবনে পৌঁছে বাচ্চার ব্যবহারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। স্বভাবগত ভাবে সে খিটখিটে হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে অবসাদ গ্রাস করার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়।

সহজে প্রলোভনের শিকার

সামাজিক পরিস্থিতির কারণে টিনএজাররা সহজেই সোশাল মিডিয়া এবং সুযোগসন্ধানী ব্যক্তিদের প্রলোভনের শিকার হয়ে পড়ে। কারণ সে সমাজের লেনদেনের সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত-ই হয় না শৈশব থেকে। বহু মানুষ অনলাইনে কন্টেন্ট দেখেই আকর্ষিত হয়। সেটা ভালো হোক কি খারাপ কারণ তার কাছে পৃথিবীকে দেখার একটাই জানলা হল সোশাল মিডিয়া।

২০১৮-তে দেরাদুনের সহসপুর অঞ্চলে ৫জন নাবালক ছেলে একটি ৪ বছরের মেয়েকে গণধর্ষণ করে। তারা পরে স্বীকার করে, ওই জঘন্য অপরাধ করেছিল মোবাইলে পর্ণোগ্রাফি দেখেই।

সম্প্রতি উত্তর প্রদেশের বদায়ু জেলার একটি ১১ বছরের ছেলের ৬ বছরের বাচ্চা মেয়েকে ধর্ষণের মামলা বেশ সাড়া ফেলে। অত ছোটো বাচ্চার মধ্যে এ ধরনের মানসিকতা এল কোথা থেকে? এটাও কি সোশাল মিডিয়ার প্রভাব বলেই মনে হয় না?

এই ধরনের মানসিকতায় মানুষ একবার অভ্যস্ত হয়ে উঠলে সেটা ছাড়ানো মুশকিল হয়ে ওঠে। সাধারণত দেখা যায় অন্তর্মুখী বাচ্চা অপরের করা সাহায্যকে একটা কাজ বলেই মনে করে। সে ওই ব্যক্তি বা সাহায্যের জন্য বাধিত বোধ করেই না বরং প্র্যাক্টিকাল দিকটাই দেখে। এর ফলে বড়ো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আবেগ এবং আদর্শ থেকে বাচ্চা ক্রমশ দূরে সরে যেতে থাকে।

আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে

যৌবনে পৌঁছে বন্ধু বানাবার দ্বিধা, প্রাণ খুলে কথা বলার ভয়, নিজেকে অন্যের কাছে মেলে ধরার দ্বন্দ্ব ইত্যাদি আরও অনেক ক্ষতির বোঝা যৌবনে সহন করতে হয়। যদি বাচ্চা শৈশবেই অন্তর্মুখী হয়ে ওঠে, বুঝতে হবে সেটা ব্যস্ত জীবনশৈলী এবং একাকিত্বেরই ফল। এর জন্য প্রাপ্ত বয়সে বহু ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। সামাজিক পরিস্থিতি সম্পর্কে অনভিজ্ঞ বাচ্চা বড়ো হয়ে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজেকে অযোগ্য বিবেচনা করতে থাকে।

ঝগড়া-বিবাদে জীবনের অমূল্য সময় নষ্ট হয়

জাতপাত ভেদাভেদ করতে করতে জীবনের অমূল্য সময় নষ্ট করেন অনেকে। ঠিক তেমনই বিষয়সম্পত্তি নিয়ে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ করতে করতে বাঁচার সঠিক আনন্দ থেকেই বঞ্চিত হচ্ছেন কিছু মানুষ।

কোনও স্ত্রী যেমন স্বামীর ভাইবোনদের বঞ্চিত করে সব সম্পত্তি ভোগ করতে চান, ঠিক তেমনই ওই মহিলার মায়ের বাড়িতেও তাকে বঞ্চিত করার মতলব আঁটছেন তার ভাইয়ের বউ। এতে আশ্চর্যের তেমন কিছুই নেই। কারণ আপনি যেমন ভাবনা পোষণ করবেন মনে, আপনার সঙ্গেও ঠিক তেমনটাই ঘটবে এটাই স্বাভাবিক।

আজ ভারতবর্ষের যেসব বিবাহিত মেয়েরা তার পিতার সম্পত্তি পাওয়ার জন্য আইনি লড়াই করছেন, উলটো দিকে তার শ্বশুরবাড়িতে তারই ননদও ঠিক একই ভাবে তার পিতার সম্পত্তিতে ভাগ বসাতে চাইছেন। আর এই চাওয়া-পাওয়ার লড়াইটা যখন চরম মাত্রা নিচ্ছে, তখনই ঘটছে অপরাধমূলক ঘটনা। অথচ চরমপন্থার পথ ছেড়ে সুষ্ঠু আলোচনার মাধ্যমেও ন্যায্য অধিকার আদায় করা যায় ভাইবোনেদের মধ্যে সুসম্পর্ক রেখে।

ভেবে দেখুন তো, আবার যদি সেই আদিম সমাজ ফিরে আসে তাহলে কী হবে! এও ভেবে দেখুন, আপনি এগোতে চান নাকি পিছিয়ে যেতে চান?

মনে রাখতে হবে, মন্দিরের নামে যারা মিথ্যের আশ্রয় নিচ্ছেন, তাদের পাতা ফাঁদে পা দিলে চলবে না। কারণ, শুধু মন্দিরে গেলেই আপনার পরিবার, সমাজ কিংবা দেশের সমস্যা মিটবে না। কিংবা শুধু জাতপাত ভেদাভেদ করলে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

ভারত-কানাডার মধ্যে যদি সম্পর্ক খারাপ হয়ে থাকে, তাহলে সমস্যার শিকড় খুঁজে বের করে সমাধান করতে হবে, চেঁচিয়ে লাভ হবে না। কারণ ঠান্ডা মাথায় সবকিছুর সমাধান করার চেষ্টা না করলে শত্রুপক্ষ সুবিধে নিয়ে নেবে।

এখন এমন একটা সময় এসেছে, যখন নিজেদের ভালোমন্দ নিজেদেরই বুঝে নিতে হবে। সবক্ষেত্রেই এখন সতর্কতা আবশ্যক। নয়তো ধান্দাবাজরা দীপাবলির বাজি দিয়ে কখন আপনার ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেবে তা বুঝতেও পারবেন না।

আড়াল (শেষ পর্ব)

এ বার একটু থতমত খেয়ে গেল তিন্নি। বলল, ‘না মানে… শুনলাম ছেলেকে নিয়ে তোমার দাদা ডাক্তার দেখাতে গেছে।’

কথাটা শুনেই হো হো করে হেসে উঠল ঝিনুক। ও, তুমি দাদার ছেলেকে চেনো না? বলেই হাসতে হাসতে কোলের খরগোশটাকে দেখিয়ে বলল, ‘এই তো দাদার ছেলে!”

—এটা !

—হ্যাঁ, এই খরগোশটাকে ও এত ভালোবাসে যে আমাদের বাড়ির লোকেরাই শুধু না, গোটা পাড়ার সবাই বলে, এটা ওর ছেলে।

—আর মেয়ে?

মেয়ে তো উপরে। ইয়া বড়ো। একেবারে বাঘের মতো। দেখলে কেউ বলবে না, ও কুকুর। ভীষণ বুঝদার। আমাদের প্রত্যেকের পায়ের শব্দ চেনে। আমাদের কলিংবেল টেপার শব্দ শুনেই বুঝতে পারে, কে এসেছে। টিভি চালিয়ে দিলে নীচে আর নামতেই চায় না। বসে বসে টিভি দেখে!

ঝিনুক বলেই যাচ্ছিল। আর সেটা হাঁ করে গিলছিল তিন্নি। সে কত কী না ভেবেছিল! আর যাকে নিয়ে তার এত সন্দেহ, সে কিনা একটা কুকুর! মুখ দিয়ে অস্ফুটে বেরিয়েও এল শেষ শব্দটা— কুকুর!

—হ্যাঁ। কেন, তুমি কী ভেবেছিলে? বলেই, তিয়াসের দিকে তাকিয়ে ঝিনুক বলল, ‘কী রে দাদা, তুই ওকে তোর ছেলেমেয়ের কথা বলিসনি?”

ঢোঁক গিলে তিয়াস বলল, ‘আসলে আলাপের প্রথম দিনই আমি যখন জানতে পারলাম ও কুকুরকে ভীষণ ভয় পায়, কুকুর থেকে একশো হাত দূরে থাকে— তখন আমার মনে হয়েছিল আমাদের বাড়িতে কুকুর আছে শুনলে ও হয়তো এই কুকুরের ভয়েই আমার সঙ্গে আর মিশবে না। তাই…’

—তাই বলিসনি? তুই কী রে?

রঞ্জনা বলল, “সে নয় বলেননি ঠিক আছে। কিন্তু বাড়ি ঢুকলেই মোবাইলটা অফ করে দেন কেন?”

তিয়াস মাথা নত করে বলল, ‘না মানে আসলে অবলা জীব তো, ও তো অতশত বোঝে না। যদি হঠাৎ কখনও ডেকে ওঠে আর সেই ডাক শুনে যদি তিন্নি জেনে যায় আমাদের বাড়িতে কুকুর আছে তাই….

—সে জন্য মোবাইল অফ করে দিতে? সে জন্যই ল্যান্ড নম্বর দাওনি? অবাক হয়ে প্রশ্ন করল তিন্নি।

—না মানে আসলে…

রঞ্জনা বলল, ‘ও যখন ফোন করত, আপনি রাস্তায় থাকলে, আপনার সঙ্গে তখন কে থাকত?”

—আমার সঙ্গে? কে ?

—কেউ না থাকলে কথা বলতে বলতে তুমি অন্যমনস্ক হয়ে যাও কেন?

তিন্নি জানতে চাইতেই তিয়াস বলল, ‘আসলে তুমি ফোন করলেই আমি তটস্থ হয়ে যেতাম। দেখতাম, আশপাশে কোনও কুকুর আছে কি না। ভয়ে ভয়ে থাকতাম, হঠাৎ কোনও কুকুর ডেকে উঠবে না তো!”

—তা হলে তমন্না ওই কথা বলল কেন? ফের প্রশ্ন করল তিন্নি।

—কোন কথা?

—তুমি খুব একটা সুবিধের না।

-আমি সুবিধের না? এটা তোমার মনে হল?

—এটা আমি বলছি না।

—তাহলে?

—তমন্না বলেছিল।

—সে তো বলবেই।

—কেন?

—কারণ, বাচ্চা।

—কার?

—আমার মেয়ের।

—তোমার মেয়ের? আঁতকে উঠল তিন্নি।

সেটা দেখেই তিয়াস তড়িঘড়ি বলে উঠল, ‘না না আমার মেয়ের না। আমার ডগির বাচ্চা। ওর বাচ্চা হবে শুনে তমন্না আমাকে আগেই বলেছিল, ওর বাচ্চা হলে আমাকে একটা দিস। আমিও বলেছিলাম, দেব। কিন্তু বেচারি তিনটে বাচ্চা দিলেও সব ক’টারই ইনফেকশন হয়ে গিয়েছিল। আমি অনেক চেষ্টা করেও কাউকে বাঁচাতে পারিনি। তমন্না সে কথা বিশ্বাস করেনি। ও ভেবেছিল, আমি বুঝি কারও কাছে তিনটে বাচ্চাই বিক্রি করে দিয়েছি। তাই বলেছিল, তুই আমাকে বললে কি আমি টাকা দিতাম না?”

শুনে, আমার মাথায় রক্ত চড়ে গিয়েছিল। আমি ওকে যা-তা বলেছিলাম। সেই থেকেই ওর সঙ্গে আমার মুখ দেখাদেখি বন্ধ। মাঝে মাঝে এর তার মুখে খবর পাই, বিভিন্ন লোকের কাছে আমার নামে ও যা তা বলে। বলে, আমি নাকি মিথ্যাবাদী। লোককে কথা দিয়েও কথা রাখি না। আমি নাকি মোটেও সুবিধের না। তা হলে আমার নামে তোমাকেও বলেছিল?

—হ্যাঁ, বলেছিল তো। কিন্তু তুমি আমাকে এসব আগে বলোনি কেন?

এ প্রশ্নের কী উত্তর দেবে সে! কিছু একটা বলতে গিয়ে আমতা আমতা করতে লাগল। দাদাকে বিব্রত হতে দেখে তিন্নির দিকে তাকিয়ে ঝিনুক বলল, ‘তুমিও পারো বাবা! কবে কোন কুকুর তোমাকে একবার কামড়েছে, সেই জন্য তুমি পৃথিবীর সব কুকুরকেই ভয় করতে শুরু করে দিয়েছ? তুমি জানো, শুধু কুকুর নয়, তুমি যদি বিষাক্ত সাপকেও ভালোবাসো— সে ভুল করেও তোমাকে কখনও ছোবল মারবে না। কারণ পশুপাখিরাও ঠিক বুঝতে পারে, কে তাকে ভালোবাসে। বুঝেছ?”

মাথা কাত করতে করতে তিন্নি যখন দেখল, সন্দেশ শেষ করে রঞ্জনা চায়ের কাপ হাতে তুলে নিয়েছে, তখন সে-ও প্লেট থেকে একটা সন্দেশ তুলে অর্ধেকটায় কামড় বসিয়ে দিল। আর সেটা দেখেই ফিক করে হেসে ফেলল রঞ্জনা। বলল, ‘কী রে, গলা দিয়ে এ বার নামবে তো?’

সন্দেশ খেতে খেতেই মাথা কাত করল তিন্নি। বোঝাতে চাইল, নামবে। খুব নামবে।

(সমাপ্ত)

শৈশব কি হারিয়ে যাচ্ছে?

ঝরনার বয়স ১১। ওকে অনেকদিন পর বারান্দায় আসতে দেখে উলটো দিকের ফ্ল্যাটের চৌধুরিদের বড়ো মেয়ে দৃষ্টি জিজ্ঞেস করল, ‘ঝরনা অনেক দিন পর তোমাকে দেখছি, এখানে ছিলে না?’

ঝরনা উত্তর দিল, ‘এখানেই ছিলাম, কোথাও যাইনি। সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত স্কুল, টিউশন, স্কুল আর টিউশনের হোমওয়ার্ক, বন্ধুদের ফোন ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ততার কারণে বাইরে বেরোবার সময় পাই না।’

ঝরনার উত্তর শুনে দৃষ্টির সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠল নতুন এই সমাজ ব্যবস্থায় পুষ্ট হয়ে ওঠা হিউমান রোবটের দৈনন্দিন জীবনের নতুন একটা রূপ।

এই ঘটনা দক্ষিণ কলকতার হলেও আজ সমস্যা প্রতিটি শহরের টিনএজারদের জন্য প্রায় একইরকম। ব্যস্ত জীবনশৈলীর কারণে আজকের ছেলেমেয়েরা একটা স্পেসিফিক জীবনচর্যায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। শৈশবেই বাড়ি, পরিবার, মা-বাবা, ভাই-বোনের থেকে দূরত্ব বাড়তে বাড়তে তারা নিজের মধ্যেই গড়ে তুলছে বিচ্ছিন্ন এবং একক জীবন।

২০১৬-তে দিল্লির একটা স্কুলের ঘটনা আজও বাকরুদ্ধ করে দেওয়ার মতো। এগারো ক্লাসের এক ছাত্র ৭ বছরের প্রদ্যুমন-কে হত্যা করে শুধুমাত্র পরীক্ষা এবং পিটিএম মিটিং থেকে বাঁচার জন্য। পড়াশোনার চাপ, পরীক্ষার ভয়, পিটিএম-এ শিক্ষক এবং অভিভাবকদের থেকে ভর্ৎসনার আশঙ্কা ওই ছাত্রকে মানসিক ভাবে এতটাই বিপর্যস্ত করেছিল যে, সে হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে।

২০১৯-এ সারা বিশ্বে কোভিড অতিমারি ছড়িয়ে পড়লে চারদিকে হাহাকার পড়ে যায়। ইউনিসেফ-এর একটি সমীক্ষা অনুসারে ভারতে প্রায় ৩৩০ মিলিয়ন শিশু মানসিক ভাবে কোভিড দ্বারা প্রভাবিত হয়। টোটাল লকডাউন এবং কোভিডের বাড়বাড়ন্ত মানুষের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে। স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হয়, পাবলিক প্লেসে যাওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। বাচ্চাদের পড়াশোনাও অনলাইন নির্ভর হয়ে ওঠে।

সব ক্ষেত্রেই মানুষের রিয়েল ওয়ার্ল্ড-এর সঙ্গে সম্পর্ক ধীরে ধীরে কমে আসতে থাকে। বাড়ির ভিতরের অন্দরমহল-ই বাস্তব হয়ে ওঠে সকলের জন্য। খেলনার জায়গা অধিকার করে মোবাইল এবং মানুষের উপর সোশ্যাল মিডিয়ার থাবা ক্রমশ গভীরতর হয়ে ওঠে।

একটি সমীক্ষা অনুসারে ভারতে ইন্টারনেট ইউজারের সংখ্যা প্রায় ৭০ কোটি যার মধ্যে ৫ থেকে ১৫ বছরের বাচ্চাও রয়েছে। এখানে জনসাধারণ প্রায় পাঁচ ঘন্টা ফোন এবং ইন্টারনেট ব্যবহার করে। ব্যস্ত জীবনশৈলীর কারণে মানুষ সামাজিক স্তরে একাকিত্ব ভোগ করছে এবং মানসিক যাতনাও ভোগ করছে। একাকিত্বের প্রভাব এতটাই যে কৈশোরেই ক্রিমানাল অ্যাক্টিভিটি-তেও অনেকেই জড়িয়ে পড়ছে। কোভিড ও লকডাউনের পরিস্থিতি চলাকালীন বাচ্চারাও ইন্ট্রোভার্ট হয়ে পড়তে বাধ্য হয়েছে।

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব