আমার কোমরের নীচের অংশে এবং হিপস-এ খুব যন্ত্রণা হচ্ছে, এখন কী করা উচিত?

আমি ৪৫ বছর বয়সি মহিলা ব্যাংক কর্মী। কয়েক মাস ধরে আমার কোমরের নীচের অংশে এবং হিপ খুব যন্ত্রণা হচ্ছে। পরীক্ষা করিয়ে জেনেছি আমার সিয়াটিকা রয়েছে। এটা সারাবার উপায় কিছু আছে কি?

সিয়াটিকার ব্যথা কোমরের নীচ থেকে শুরু করে হিপ, এমনকী পা অবধিও পৌঁছে যায়। সিয়াটিকা নার্ভ-এর উপর প্রেসার পড়লে বা কোথাও খারাপ হলে এই সমস্যা তৈরি হয়। ডিস্ক-এ কোনও প্রবলেম বা মেরুদণ্ডের সংক্রমণ ঘটলে সিয়াটিকা নার্ভে সমস্যা দেখা দিতে পারে। সিয়াটিকার যন্ত্রণা সহ্য করা সম্ভব হয় না। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অপারেশন ছাড়াই কয়েক সপ্তাহে এটা ঠিক হয়ে যায়। হট এবং কোল্ড প্যাকস, স্ট্রেচিং ইত্যাদিতেও অনেকে আরাম অনুভব করেন। কিন্তু সিয়াটিকার জন্য যাদের পা খুব দুর্বল হয়ে পড়ে অথবা ব্লাডার ও বাওয়েল সিস্টেমে পরিবর্তন হয় তাদের অপারেশন করিয়ে নেওয়াই বাঞ্ছনীয়।

আমি ৪২ বছর বয়সি মহিলা। কোভিড ১৯এর ফলে ওয়ার্ক ফ্রম হোম চলাকালীন আমার কোমরের নীচের অংশে ব্যথা শুরু হয়েছে। মাঝে মাঝে ব্যথা অসহ্য হয়ে ওঠে। কী করব?

কোভিড ১৯ চলাকালীন গ্যাজেট্স-এর অত্যধিক ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় শিরদাঁড়ার সমস্যা নিয়ে অনেকেই ভুগছেন। আপনি যদি সমাধানের চেষ্টা এখনই না করেন তাহলে সমস্যা গুরুতর আকার নিতে পারে। এখনই ডাক্তার দেখান। ফিজিওথেরাপি এবং ওষুধের সাহায্য নিয়ে ৮০ শতাংশ রোগী এই সমস্যা কাটিয়ে ওঠেন। সমস্যা বেড়ে গেলে এমআরআই, এক্সরে এবং অন্যান্য পরীক্ষা করানোর দরকার হতে পারে।

আমি কলেজ স্টুডেন্ট। একটা অ্যাক্সিডেন্টের ফলে আমার স্লিপ ডিস্কএর সমস্যা শুরু হয়েছে। এখন কী করা উচিত?

আপনার বয়স কম সুতরাং ভালো কোনও নিউরোসার্জেন দেখিয়ে তাঁর পরামর্শ নিন। সমস্যা কতটা গুরুতর তার উপর নির্ভর করবে চিকিৎসা। আপনার ডিস্ক কতটা খারাপ অবস্থায় রয়েছে ডাক্তার পরীক্ষা করেই বলতে পারবেন। ওষুধ এবং ফিজিওথেরাপির সাহায্যে প্রথমে ঠিক করার চেষ্টা করা যেতে পারে। স্লিপ ডিস্ক-এর ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে অপারেশনের প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু বাকি ১০ শতাংশ কেসে সার্জারি করানোর প্রয়োজন হয়।

ডা. মনীষ বৈশ্য ডিরেক্টর, নিউরো বিভাগ ম্যাক্স সুপার স্পেশালিটি হসপিটাল, গাজিয়াবাদ

স্পাইনাল স্ট্রোকের জন্য কী কী চিকিৎসা করানো যায়?

আমার বয়স ৫৮ বছর কিছুদিন আগে আমার স্পাইনাল স্ট্রোক হয়েছিল ডাক্তার সার্জারি করাবার পরামর্শ দিয়েছিলেন আমি জানতে চাই স্পাইনাল স্ট্রোকের জন্য কী কী চিকিৎসা করানো যায়?

স্পাইনাল কর্ড-এ ঠিকমতো রক্ত পৌঁছোতে বাধাপ্রাপ্ত হওয়াকে স্পাইনাল স্ট্রোক বলা হয়। এর ফলে নার্ভ ইমপাল্স পাঠাতে অসুবিধা হয়। এটি একটি গুরুতর সমস্যা এবং এর তাৎক্ষণিক চিকিৎসার প্রয়োজন। ওষুধ ফোলা ভাব দূর করে। রক্ত পাতলা করতে, রক্তচাপ কম করতে এবং কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করতে ওষুধ দেওয়া হয়। কিন্তু সমস্যা যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় তাহলে সার্জারি করিয়ে নেওয়া জরুরি। মিনিমালি ইনভেসিভ সার্জারির টেকনিক এই সার্জারি পদ্ধতিকে খুব সহজ করে দিয়েছে। নর্মাল সার্জারির থেকে এই সার্জারিতে ঝামেলাও অনেক কম। হাসপাতালেও বেশিদিন থাকার দরকার পড়ে না।

আমার বয়স ৩৪ বছর।  বেশ কিছুদিন ধরে স্পন্ডিলাইটিসএর সমস্যায় খুব ভুগছি। সার্জারি ছাড়া আর কোনও চিকিৎসা করাবার উপায় আছে কি?

আপনার সমস্যা কতটা গুরুতর তার উপরই কী চিকিৎসা করাবেন সেটা নির্ভর করে। হট অ্যান্ড কোল্ড থেরাপি এই ক্ষেত্রে খুবই কার্যকরী। জয়েন্ট পেন, মাসল পেন-এ এতে অনেক আরাম পাওয়া যায়। যেখানে ব্যথা হচ্ছে সেখানে হিটিং প্যাড্স লাগান। হট শাওয়ারও নিতে পারেন। ফোলা ভাব কমাতে, ফুলে ওঠা জায়গায় বরফ ঘষুন। এতে ফোলা এবং ব্যথা দুটোই কমবে। এটা ছাড়াও ব্যথা, ফোলা, স্টিফনেস কম করতে ননস্টেরয়েড অ্যান্টিইনফ্লেমেটারি ড্রাগসও প্রেসক্রাইব করা হয়। ফিজিওথেরাপি এই চিকিৎসার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বেশিরভাগ স্পন্ডিলাইটিসের রোগীর সার্জারি করাবার দরকার পড়ে না। কিন্তু ব্যথা যদি অসহনীয় অথবা জয়েন্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গিয়ে থাকে তাহলে সার্জারি করাবার পরামর্শ দিয়ে থাকেন ডাক্তাররা।

ঘাড়ে, কাঁধে প্রায় সবসময়েই ব্যথা করে। আমার এই সমস্যা কেন হচ্ছে? কোন চিকিৎসায় পদ্ধতিতে আমি সুস্থ হতে পারব?

ঘাড়ে, কাঁধে ব্যথা হওয়াকে ডাক্তারি পরিভাষায় সার্ভাইকাল পেন বলা হয়। ঘাড়, কাঁধের সঙ্গে যুক্ত সার্ভাইকাল স্পাইনের জয়েন্ট বা ডিস্ক-এ সমস্যা হলে সার্ভাইকাল পেন হয়। সমস্যা যদি কম হয় তাহলে জীবনশৈলীতে পরিবর্তন এনে সেটা সারিয়ে তোলা যায়। সমস্যা গুরুতর হলে চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। যদি ফিজিওথেরাপি এবং ওষুধে সার্ভাইকাল পেন ঠিক না হলে, সার্জারি করাতে হতে পারে। সার্ভাইকাল পেন-এর সমস্যা এড়াতে চাইলে ওঠাবসা, হাঁটা এবং কম্পিউটারে কাজ করার সময় পশ্চার সঠিক রাখা একান্ত দরকার। নিয়মিত এক্সারসাইজ করুন। কান এবং কাঁধের মাঝখানে মোবাইল ফোন রেখে কথা বলবেন না।

ডা. মণিষ বৈশ্য ডিরেক্টর, নিউরো বিভাগ ম্যাক্স সুপার স্পেশালিটি হসপিটাল, গাজিয়াবাদ

সবজিতে স্বাদবদল করুন অনায়াসে

আমিষ খাবার রোজ না খেয়ে, মাঝেমধ্যে স্বাদবদল করুন সবজিতে। সোয়াবিন-মটর কিমা, ওলকপির ভর্তা এবং মুলো ড্রাই-ফ্লাই ট্রাই করে দেখুন, জমে যাবে। রইল রেসিপি।

সোয়াবিন-মটর কিমা

উপকরণ: ১/২ কাপ সোয়া গ্র্যানিউলস্, ২ বড়ো চামচ টম্যাটো পিউরি, ২ বড়ো চামচ পেঁয়াজবাটা, ২ ছোটো চামচ আদা-রসুন পেস্ট, ১ ছোটো চামচ লেবুর রস, ১/২ ছোটো চামচ হলুদগুঁড়ো, ১ ছোটো চামচ ধনেগুঁড়ো, ১২ ছোটো চামচ দেগি মির্চ পাউডার, ১ প্যাকেট ম্যাগি মশলার গুঁড়ো, ১ বড়ো চামচ ধনেপাতাকুচি, ১ বড়ো চামচ তেল, নুন স্বাদমতো।

প্রণালী: ৩ কাপ জলে লেবুর রস দিয়ে ১/২ চামচ নুন মিশিয়ে সোয়াবিনের গ্র্যানিউল ১/২ ঘন্টা ভিজিয়ে রাখুন। এবার তুলে ভালো ভাবে চেপে জল ফেলে দিন। একটা ননস্টিক কড়ায় তেল গরম করে, পেঁয়াজ, আদা-রসুনপেস্ট দিয়ে কষতে থাকুন। টম্যাটো পিউরি ও শুকনো মশলা দিয়ে ভালো ভাবে নাড়াচাড়া করুন। সোয়াবিন গ্র্যানিউলস দিয়ে কষতে থাকুন। তারপর ১ বড়ো চামচ জল দিয়ে ২-৩ মিনিট রান্না হতে দিন। এবার ম্যাগি মশলা ছড়িয়ে ঢিমে আঁচে আরও ২-৩ মিনিট রেখে দিন। তারপর আরও একবার নাড়াচাড়া করে ধনেপাতা ছড়িয়ে নামিয়ে নিন।

ওলকপির ভর্তা

উপকরণ: ৫০০ গ্রাম ওলকপি, ১/২ কাপ টম্যাটো বীজ বের করে নেওয়া এবং ছোটো টুকরোয় কাটা, ১/৪ কাপ পেঁয়াজ লম্বা করে কাটা, ১ ছোটো চামচ আদা-কাঁচালংকা কুচি করা, ১/২ ছোটো চামচ লংকাগুঁড়ো, ১/২ ছোটো চামচ কালোজিরে, ১/২ কাপ কড়াইশুঁটি, ১ বড়ো চামচ সরষের তেল, অল্প ধনেপাতাকুচি, নুন স্বাদমতো।

প্রণালী: ওলকপির ছোটো টুকরো করে নিন। কড়ায় তেল গরম করে কালোজিরে ফোড়ন দিন। এবার পেঁয়াজ, আদা-লংকাকুচি দিয়ে নাড়াচাড়া করুন। ওলকপির টুকরোগুলি দিয়ে দিন। নুন ছড়িয়ে দিন। ঢেকে দিয়ে ঢিমে আঁচে সেদ্ধ হতে দিন। ওলকপি সেদ্ধ হয়ে ঘাঁটা ঘাঁটা হয়ে গেলে, টম্যাটোকুচি ও লংকা দিন। ভালো করে নাড়াচাড়া করে নামিয়ে, সার্ভিং প্লেটে পরিবেশন করুন।

মুলো ড্রাই-ফ্লাই

উপকরণ: ৫০০ গ্রাম মুলো পাতা সমেত, ১ ছোটো চামচ জোয়ান, ১/২ ছোটো চামচ লংকাগুঁড়ো, ১/২ ছোটো চামচ হলুদগুঁড়ো, ২ বড়ো চামচ সরষের তেল, নুন স্বাদমতো।

প্রণালী: মুলো এবং শাক খুব ভালো ভাবে ধুয়ে রাখুন। এবার শাকটা মিহি করে কুচিয়ে নিন। মুলোর খোসা চেঁছে নিয়ে ছোটো ছোটো টুকরো করুন। কড়ায় সরষের তেল গরম করে জোয়ান ফোড়ন দিন। আদা, কাঁচালংকা ও রসুনও দিন। একটু ভাজা হলে মুলো এবং শাকটা দিয়ে দিন।

লেডিস কম্পার্টমেন্ট (শেষ পর্ব)

প্রায় ভেজা সালোয়ার কামিজে নন্দিতা যখন শিয়ালদা স্টেশনে এসে পৌঁছোল তখন ঘড়িতে সাড়ে আটটা বাজব বাজব করছে। সাউথ সেকশনের দিকে ছুটতে ছুটতে কানে এল ট্রেন লাইনে জল জমায় আর তার ছিঁড়ে যাওয়ায় অনেক ট্রেন বাতিল হয়েছে আজ। ডিজিটাল বোর্ডটায় দেখল আর একটি মাত্র ট্রেন ছাড়তে মাত্র তিন মিনিট মতো বাকি। দুই নম্বর প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনটার কামরাগুলোর বেশিরভাগ কুপের জানলা এখনও ঝরতে থাকা বর্ষার জলের জন্য ভেতর থেকে বন্ধ। কোনও কোনওটার তো দরজাও অর্ধেক আটকানো। এমনই অবস্থা যে, কোনটা লেডিস, কোনটা গুডসের কামরা আর কোনটা জেনারেল — সেটাও ঠিকমতো বোঝা যাচ্ছে না! ভাগ্যিস আজ চুড়িদার পরেছিল তাই রক্ষে, নাহলে শাড়ি পরে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে ভিড় ঠেলে দৌড়ে ট্রেনটা ধরা সম্ভব হতো না নন্দিতার পক্ষে। মাত্রাতিরিক্ত ভিড় দেখেও এই দুর্যোগে ট্রেনটা যাতে মিস না হয় তাই তাড়াহুড়োয় একটা জেনারেল বগিতেই উঠে পড়ল নন্দিতা।

লোকাল ট্রেনে যাতায়াতের অলিখিত নিয়মই হল যে যার গন্তব্য স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম কামরার দুটো দিকের গেটের মধ্যে যেদিকে পড়বে সে সেই দিকের গেটের কাছে গিয়ে দাঁড়ায় ট্রেন থেকে নামার সুবিধের জন্য। ফেরার সময় যাদবপুর স্টেশন পড়ে বাম দিকে কিন্তু ভিড়ের ঠেলায় নন্দিতা গিয়ে পৌঁছল কামরার দুই গেটের মাঝখান থেকে প্রায় ডান দিকের গেটের কাছাকাছি জায়গায়। বাম কাঁধে নেওয়া সাইড ব্যাগটা সামলে ডান হাত দিয়ে কোনও মতে ধরল ট্রেনের দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীদের জন্য টাঙানো হাতলগুলো।

আওয়াজ করে ছাড়ল ট্রেন। পার্ক সার্কাস ঢুকতেই যেন এতক্ষণের অপেক্ষায় থাকা যাত্রীরা ট্রেনে উঠে ট্রেনের কামরাগুলোকে জনসমুদ্রে পরিণত করল। এমনই অবস্থা যে নন্দিতা যদি ধরার ঝোলা হাতলগুলো ছেড়েও দেয় তবুও শুধু ভিড়ের চাপে এমনিই দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে। লোকে যে দুই কামরার মাঝে আর মাথায় চেপে বসেনি এই অনেক!

পার্ক সার্কাস থেকে ট্রেনটা ছাড়তেই হঠাৎ শরীরে এক অজানা অস্বস্তি টের পেতে শুরু করল নন্দিতা। পেছন থেকে একটা অচেনা হাত প্রথমে ঠেকল ওর দেহে তারপর ক্রমশ সেটা নন্দিতার বুকের কাছ থেকে শুরু করে উরুর উপর পর্যন্ত অশ্লীল ভাবে ছোঁয়ার চেষ্টা করে চলল ওর শারীরিক গোপনীয়তাকে! এর আগে কোনওদিন এইরকম অবস্থার কথা দুঃস্বপ্নেও ভাবতে না পারা কিংকর্তব্যবিমূঢ় নন্দিতা, আগুপিছু কোনও দিকে ঘুরে তাকাতে এবং নড়াচড়া করতে না পেরেও খপ করে ডান হাত দিয়ে চেপে ধরল মানুষরূপী পশুটার হাতটা। উদ্দেশ্য, এই যে ভিড়টা একটু কমলেই জঘন্য কীটটার হাতটা টেনে সামনে এনে ঠাটিয়ে একটা থাপ্পড় কষানোর। ওর একবার মনে হল আশেপাশের কেউ কি কিছু দেখতে পাচ্ছে না এই সাংঘাতিক ভিড়ে নাকি ও চেঁচিয়ে কারও থেকে কোনও সাহায্য চাইছে না বলেই কেউ আগ বাড়িয়ে অন্যের ব্যাপারে নাক গলাতে চাইছে না! কোনও মহিলা যাত্রীও তো চোখে পড়ছে না এই মানুষের মাথার ভিড়ে! এখন যদি পরের স্টেশন আসার আগেই লাইন ক্লিয়ার বা সিগন্যাল না পেয়ে ট্রেনটা হঠাৎ থেমে যায় তবে ঠিক কী করা উচিত হবে তার? স্থির করতে না করতেই ট্রেনটা ঢুকেছে বালিগঞ্জ স্টেশনে। আরেকপ্রস্থ জনজোয়ারের সুযোগে নোংরা লোকটা নন্দিতার হাত ছাড়িয়ে কেটে পড়েছে, সম্ভবত ট্রেন থেকে নেমে গেছে স্টেশনে। চেহারা না দেখতে পাওয়ায় যাকে চেনা আর সম্ভব নয় নন্দিতার পক্ষে, শাস্তি দেওয়া তো অনেক দূরের কথা! শরীর আর মস্তিষ্কের ঘেন্না আর রাগটাকে বাধ্য হয়ে মনেই চেপেই রাখতে হল তাই!

আর এক স্টেশন পরেই যাদবপুর। ভিড় অনেকটা কমে কামরায় চলাফেরা করার মতো স্বাভাবিক অবস্থাতে এলেও যেন হঠাৎই জড়বস্থানু হয়ে গেছে নন্দিতা। এতটাই যে বাম দিকের গেটের কাছে যেতেও যেন পা সরছে না ওর! আরেকটু অল্প বয়স হলে হয়তো চোখে জল বাঁধ মানত না কিন্তু মাঝ-বয়সের অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়েছে বাড়ির বাইরে রাস্তাঘাটে নিজের আবেগকে সংযত ভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে, নাহলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হিতে বিপরীত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবুও অপমানে লাল হয়ে থাকা নাকের পাটা আর অসম্মানে গরম হয়ে ওঠা কান নিয়ে নন্দিতার ইচ্ছে করছে কোনও অন্ধকার ঘরে লুকিয়ে হাপুস নয়নে কাঁদতে অথবা গলা ফাটিয়ে খুব খুব জোরে চিৎকার করতে— যেটার কোনওটাই করা সম্ভব নয় তার পক্ষে, অন্তত এই মুহূর্তে!

নন্দিতার মুখ-চোখের অবস্থা লক্ষ্য করেই বোধহয় ট্রেনের গেটের কাছেই দাঁড়িয়ে থাকা পিতৃস্থানীয় এক বয়স্ক ভদ্রলোক হয়তো বা কিছু একটা আঁচ করেই বলে উঠলেন— ‘ট্রেনে ভিড় থাকলে জেনারেলে না উঠে লেডিসে উঠবেন, মা… ‘

যাদবপুরে নেমে স্টেশনের ওভারব্রিজের সিঁড়িটার গোড়ায় দাঁড়িয়ে ওড়নাটা ঠিক করতে করতে সবে একটু ধাতস্থ হয়েছে নন্দিতা; চোখের সামনে দিয়ে আস্তে আস্তে বেরিয়ে যাচ্ছে লোকাল ট্রেনটা একটু আগেই যেটার যাত্রী ছিল সে। হঠাৎ খুব স্বাভাবিক ভাবেই চলন্ত ট্রেনটার একটা বগির গায়ে ‘মহিলা কামরা’/ ‘মহিলাও কে লিয়ে আরক্ষিত’/ ‘লেডিস ওনলি’— লেখাগুলো চোখে পড়ল নন্দিতার আর জীবনে এই প্রথমবার ‘লেডিস কম্পার্টমেন্ট’ বাক্যাংশটাকে একটা নীরব সুরক্ষাবলয়ের মতো মনে হল তার।

(সমাপ্ত)

‘হাঙ্গার-ফ্রি ওয়ার্ল্ড’ কর্মসূচিকে স্বাগত জানানো উচিত সকলের

কত মানুষ আছেন যারা ঠিকমতো খাবার পান না। আবার এমন কিছু অর্থবান অবিবেচক লোক আছেন, যারা অনেক সময় খাবার নষ্ট করেন। যাইহোক, দীর্ঘদিন অর্ধাহারে কিংবা অনাহারে থাকা মানুষগুলো অপুষ্টিতে ভোগেন। আর পুষ্টির অভাবে, তাদের শরীরে বাসা বাঁধে নানারকম রোগ। তাই অসহায়, অন্নকষ্টে ভোগা মানুষগুলোর মুখে যারা অন্ন তুলে দেন, তাদেরকে স্বাগত জানানো উচিত। পাশাপাশি, ‘হাঙ্গার-ফ্রি ওয়ার্ল্ড’ কর্মসূচিকে সফল করতে যাতে আরও বেশি মানুষ আগ্রহ দেখিয়ে এগিয়ে আসেন, সেই চেষ্টা করা উচিত সকলের।

ওয়ার্ল্ড হাঙ্গার ডে উপলক্ষ্যে, মালাবার গ্রুপ-এর সিএসআর প্রোগ্রামের অধীনে সারা দেশে অভাবীদের জন্য পুষ্টিকর দৈনিক খাবার সরবরাহ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।  ‘হাঙ্গার-ফ্রি  ওয়ার্ল্ড’ প্রকল্পের অধীনে, ইতিমধ্যেই কলকাতা-র বিভিন্ন অংশে খাবারের প্যাকেট বিতরণ করে চলেছে এই গ্রুপ।

‘হাঙ্গার-ফ্রি ওয়ার্ল্ড’ প্রকল্প, জাতিসংঘের একটি অনন্য স্বীকৃত উদ্যোগ। এই প্রকল্প কিংবা কর্মসূচিটি  স্বীকৃত সমাজকল্যাণ এনজিও ‘থানাল-দয়া রিহ্যাবিলিটেশন ট্রাস্ট’-এর সহায়তায় করা হয়। দক্ষ শেফদের দ্বারা স্বাস্থ্যকর পরিবেশে পুষ্টিকর খাবার তৈরির জন্য বিভিন্ন জায়গায় আধুনিক রান্নাঘর তৈরি করা হয়েছে। স্বেচ্ছা-সেবকরা রাস্তায় এবং শহরতলির অভাবী মানুষদের  বেছে নিয়ে, তাদের হাতে খাবারের প্যাকেটগুলি পৌঁছে দিচ্ছেন প্রতিদিন।

মালাবার গ্রুপের চেয়ারম্যান, এমপি আহমেদ এই প্রসঙ্গে জানিয়েছেন, ‘বর্তমানে উপসাগরীয় দেশগুলির কয়েকটি কেন্দ্র ছাড়াও, কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল সহ ১৬টি রাজ্য জুড়ে, কলকাতা সহ ৩৭টি শহরে প্রোগ্রামটি বাস্তবায়িত হয়েছে৷  সম্প্রসারণের অংশ হিসাবে, প্রোগ্রামটি এখন ১৬ টি রাজ্যের ৭০টি শহরকে কভার করবে।  এছাড়াও, গ্রুপটি আফ্রিকান দেশ জাম্বিয়াতে স্কুল শিশুদের জন্য একই প্রোগ্রাম চালু করার পরিকল্পনা করেছে।  বর্তমানে, উচ্চাভিলাষী কর্মসূচির অধীনে ৩১,০০০ টির মতো খাবারের প্যাকেট বিতরণ করা হয়েছে।  স্কেল আপ করার অংশ হিসাবে, ৫১,০০০ টি  পুষ্টিকর খাবারের প্যাকেট এখন বিতরণ করা হবে।’

‘হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ড’  কর্মসূচিকে প্রসারিত করার জন্য, সারা দেশে ২০২৪-২৫  অর্থবর্ষে প্রতিদিন পুষ্টিকর খাবারের ৫১,০০০ প্যাকেট সরবরাহ করার উদ্যোগ সফল করতে চায় মালাবার গ্রুপ। সম্প্রতি এই উদ্যোগের কথা আনুষ্ঠানিক ভাবে ঘোষণা করা হল ক্যামাক স্ট্রিট অঞ্চলে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে। মালাবার গোল্ড অ্যান্ড ডায়মন্ডস স্টোর-এর ক্যামাক স্ট্রিট এবং কাঁকুড়গাছি শাখার ব্যবস্থাপনায়, ইতিমধ্যেই কলকাতা-র বিভিন্ন অঞ্চলের অভাবী মানুষদের হাতে প্রতিদিন তুলে দিচ্ছে খাবারের প্যাকেট। গ্রুপটি কলকাতার বিভিন্ন অংশে প্রায় ৩,৫০০টি খাবারের প্যাকেট বাড়ানো এবং বিতরণ করার পরিকল্পনা করেছে। পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা এবং ঝাড়খণ্ড সহ পূর্বাঞ্চলে আরও ৫,৭০০ টি খাবারের প্যাকেট সরবরাহ করতে চায়।

ফুলকপির কোফতা কারি আর ড্রাই ভেজিটেবল-এ বাজিমাত

বৃষ্টিভেজা দিনে জমিয়ে খান ফুলকপির কোফতা কারি আর ড্রাই ভেজিটেবল। রইল রেসিপিজ।

ফুলকপির কোফতা কারি

উপকরণ: ৩ কাপ ফুলকপি, ৩/৪ কাপ কড়াইশুঁটি, ২ ছোটো চামচ আদা-কাঁচালংকাকুচি, ১/২ ছোটো চামচ হলুদগুঁড়ো, ১/২ ছোটো চামচ গরমমশলাগুঁড়ো, ১ ছোটো চামচ জিরে ও ধনেগুঁড়ো, ১ বড়ো চামচ ধনেপাতাকুচি, ৩/৪ কাপ খোলায় ভাজা বেসন, কোফতা ভাজার জন্য সাদা তেল, নুন স্বাদমতো।

গ্রেভির জন্য: ১/২ কাপ পেঁয়াজবাটা, ১/৪ কাপ পেঁয়াজ লম্বা করে কাটা, ১ বড়ো চামচ আদা-রসুন পেস্ট, ১/২ ছোটো চামচ লংকাগুঁড়ো, ১/২ ছোটো চামচ হলুদগুঁড়ো, ১ বড়ো চামচ সরষের তেল, ২ বড়ো চামচ ধনেপাতাকুচি সাজানোর জন্য, নুন স্বাদমতো। প্রণালী: একটা ননস্টিক কড়াইতে তেল গরম করে আদা ও কাঁচালংকা দিন।

এবার হলুদ ও ছোটো টুকরোয় গ্রেট করা কপি এবং কড়াইশুঁটি দিয়ে দিন। নুন দিয়ে ৫ মিনিট মিডিয়াম আঁচে রেখে, ঢাকা দিয়ে রান্না হতে দিন। জল শুকিয়ে গেলে নামিয়ে ঠান্ডা করুন। এবার কোফতা গড়ার জন্য বাকি মশলা মিশিয়ে হাত দিয়ে চেপে নির্দিষ্ট আকার দিন। তেল গরম করে কোফতা ভেজে আলাদা রাখুন।

কড়ায় তেল গরম করে পেঁয়াজ ভাজতে দিন। এবার এই তেলেই বাটা পেঁয়াজ ও আদা-রসুন পেস্ট দিয়ে নাড়াচাড়া করুন। শুকনো মশলা দিয়ে কষতে থাকুন। তেল ছেড়ে এলে, অল্প জল দিয়ে গ্রেভিটা রান্না হতে দিন। ৫ মিনিট পর, এতে কোফতা ছেড়ে দিন। প্রয়োজনমতো জল দিন গ্রেভির জন্য। কোফতা এপিঠ ওপিঠ ঝোলে ডুবে রান্না হলে নামিয়ে নিন। ধনেপাতা ছড়িয়ে পরোটার সঙ্গে পরিবেশন করুন।

ড্রাই ভেজিটেবল

উপকরণ: ৫০০ গ্রাম বাধাকপিকুচি, ৩/৪ কাপ গাজর ১/২ ইঞ্চি টুকরোয় কাটা, ১/৪ কাপ কড়াইশুঁটির দানা, ১/২ ছোটো চামচ চিনি, ১০টা গোটা গোলমরিচ, ২টো শুকনো লংকা, ১/২ ছোটো চামচ হলুদগুঁড়ো, ১/২ ছোটো চামচ মেথিদানা, ১/৪ কাপ পেঁয়াজকুচি, ২ বড়ো চামচ ধনেপাতাকুচি, ২ ছোটো চামচ আদা-কাঁচালংকাকুচি, ২ বড়ো চামচ তেল, নুন স্বাদমতো।

প্রণালী: গোলমরিচ গুঁড়ো করে নিন। এবার কড়ায় তেল গরম করে মেথিদানা ফোড়ন দিন। এর সঙ্গে দিন আদা, কাঁচালংকা এবং শুকনো লংকা। পেঁয়াজ ভাজতে দিন। তারপর একে একে অন্য সবজিগুলো দিয়ে নাড়ুন৷ নুন ও চিনি দিন। এবার ঢেকে দিন যাতে সবজি সেদ্ধ হয়ে যায়। সবজি থেকে বেরোনো জল শুকনো হয়ে এলে, একটা সার্ভিং প্লেটে ঢেলে, ধনেপাতা ছড়িয়ে সার্ভ করুন।

লেডিস কম্পার্টমেন্ট (পর্ব-০২)

ক’দিন আগে, সেদিন একটু তাড়াতাড়িই এই সন্ধে সাতটা নাগাদ বাড়ি ফিরছিল নন্দিতা। সোনারপুর লোকালের লেডিসেই ফেরবার সময় দেখে যে, এক কলেজপড়ুয়া তরুণী এক পুরুষ হকারের উদ্দেশ্যে হঠাৎ ধমকে উঠল— “এই যে দাদা, নিজের হাতটা ঠিকমতো নিজের কাছেই রাখুন।’

হকারটিও হকচকিয়ে জবাব দেয়— “ইয়ে, না মানে আমি তো কিছু করিনি।’ সাথে সাথেই তরুণীর বাউন্সার ছোটে— ‘না, না, আপনারা তো কিছুই করেন না। আমরা মেয়েরা এমনি এমনিই বানিয়ে বানিয়েই এসব বলি!’ এরপর এই হকারকে সমর্থন করতে এগিয়ে এল এক নিম্নবিত্ত দেহাতি মহিলা আর তার পালটা দিতে মেয়েটির সমর্থনে তার সাথের বান্ধবী ও এক যুবতি অফিসযাত্রী।

—তোমার তো তাও এই অল্প বয়সেই সাহস রয়েছে প্রতিবাদ করার। অনেকে তো প্রথমে বুঝেই উঠতে পারে না যে আসলে কী ঘটল বা ঘটছে আর বুঝে উঠলেও লজ্জার খাতিরে কিছু বলে উঠতে পারে না এই ভয়ে, পাছে তাকেই উলটে কেউ কিছু বলে, দোষারোপ করে! বলে ওঠে বছর ছাব্বিশ-সাতাশের চাকুরিজীবী মেয়েটি।

দেহাতি মহিলাটির যুক্তি আবার আলাদা। তার মতে ভিড়ের মধ্যে হয়তো ভুলবশত ‘ছোঁয়াছুঁয়ি’ হয়ে গেছে কোনও ভাবে, তাতে এতো চ্যাঁচামেচির কী আছে? নন্দিতার মতো বাকিরা বেশিরভাগই কিছু নিজের চোখে না দেখে থাকায় চুপচাপ থেকে নিজেদের নিরপেক্ষতা বজায় রাখে। তবে প্রায়শই এই ট্রেনযাত্রার সুবাদে ওই হকারটির সাথে দেহাতি মহিলাটির রঙ্গরসিকতার ঢলাঢলি নন্দিতার চোখে লাগলেও, এক্ষেত্রে নন্দিতার ওই মহিলাটির কথাই ঠিকঠাক যুক্তিসঙ্গত মনে হল।

ক’দিন আগেই নন্দিতা ইউটিউবে দেখল, একটা মিউজিক ভিডিওতে গানের সাথে অভিনয় করে দেখাচ্ছে— বাসে আচমকা ব্রেক কষায় ছেলেটা অনিচ্ছাকৃত ভাবে একটা মেয়ের গায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ায় থাপ্পড় হজম করতে হল ছেলেটিকে। অথচ এর উলটো ঘটনাটা ঘটলে কী ঘটত সেই প্রশ্নোত্তরে তোলপাড় ভাইরাল ভিডিওটার কমেন্ট সেকশন!

আজ সকাল থেকে বোঝাই যায়নি যে এত বৃষ্টি হতে পারে নাহলে তানিয়ার হাফ-ডে’র ছুটিটা কিছুতেই মঞ্জুর করত না অ্যাসিস্টান্ট ম্যানেজার নন্দিতা। আবহাওয়ার খবর না রাখার ফলাফল! সদ্য পিও পোস্টে জয়েন করেছে তানিয়া। বয়স বছর ত্রিশ-বত্রিশ। আজ বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ এসে আবদার জুড়ল— আগামীকাল থেকে ওর যে-দিন তিনেকের ছুটি নেওয়া আছে তার সাথে আজকের অর্ধেক দিনের ছুটিও চায়!

—বুঝতেই তো পারছেন ম্যাম, মাসতুতো দিদির বিয়ে। এখান থেকেই ডিরেক্ট চলে যেতাম তবে…..

—হ্যাঁ, তো ব্যাংক বন্ধের পরই যেও। অসুবিধে কী?

—আরে ওই অফিস ছুটির সময়ে বাসে এত ভিড় থাকে যে পা রাখার জায়গা তো দূর, ওই লাইনের বাসে ওঠা পর্যন্ত যায় না। ওই রুটের বাস তো আবার কলেজ স্ট্রিটের ওখানে ছাড়া পাওয়াও যাবে না। মাসিদের বাড়িটা এমন জায়গায় যে অতটা ভেতরে ক্যাব যেতেও চায় না, তাই আরকী। আপনি যদি ম্যানেজার স্যারকে একবার প্লিজ বলে দেন আর্লি লিভের ব্যাপারে….

শোনো তানিয়া, আমহার্স্ট স্ট্রিট থেকে একটা রানিং অটোয় কলেজ স্ট্রিট দু মিনিটও লাগবে না। ছুটিটা না নিয়ে বরং একটু তাড়াতাড়িই বেরিয়ো না হয়।

—ওরে বাবা, ওই চলতি অটোয় সামনে নয়তো পিছনের সিটের মাঝে বা শেষ কোণায় বসতে আমি এক মিনিটের জন্যও চাই না। কেমন যেন সাফোকেটিং, ইনসিকিয়োরড লাগে। আর তাছাড়া…

—এই আমাদের মেয়েদের এক দোষ জানো তো। এটা চাই না, ওটা পারব না ইত্যাদি ইত্যাদি! এই তো ক’দিন আগেই আমাদের গাড়িটা সার্ভিসিং-এ গেছে বলে হাজব্যান্ড আর ছেলের সাথে বাসে একসাথে অফিস আসার সময় দেখলাম, একটা মেয়ে তার ছেলে বন্ধুটির সাথে গল্প করতে করতে যাবে বলে বাসের জেনারেল সিটে বসেছে অথচ আমার পনেরো বছরের ছেলেটা জায়গা না পেয়ে লেডিস সিটে বসেছিল বলে এক ভদ্রমহিলা ওই সিটে বসবে বলে ওকে তুলে দিল! বলো কী বলবে?

—সে তো একদিনের একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ম্যাডাম। কিন্তু হামেশাই যে-সব হ্যারাসমেন্টগুলো যাওয়া-আসার পথে ফেস করতে হয় সেসবের জাস্টিফিকেশন কী? আর এক-আধটা এই ধরনের ঘটনা দিয়ে কী প্রমাণ হয়? ভিড় বাসে দাঁড়িয়ে থাকার কথা তো ছেড়েই দিন, অনেক সময় বাসের সিটে ধারের দিকে বসলেও… এই সময় কেবিনে ঢোকেন গোল্ড-লোন সেকশনের সিনিয়র-মোস্ট ক্লার্ক, টালিগঞ্জ থেকে সেন্ট্রাল মেট্রোর নিত্যদিনের যাত্রী, অবিবাহিত, মাঝবয়সি মীনাক্ষীদি। তানিয়ার কথাগুলো ওনার কানেও গেছে আর তার প্রতিক্রিয়াস্বরূপ প্রচ্ছন্ন সমর্থন যেন খেলা করছে তাঁর দৈহিক অভিব্যক্তিতে। তাই আর এই নিয়ে বেশি দূর কথা না। এগিয়ে চুপ করে যাওয়াই শ্রেয় মনে হল নন্দিতার।

কিন্তু তানিয়ার ছুটির জন্য অতিরিক্ত কাজ সারতে গিয়ে এমনিতেই দেরি হয়ে গিয়েছিল। তার মধ্যে এরকম প্রবল বৃষ্টিতে কলকাতা শহরের যানজট যে কী ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করে— তা এই প্রথম বুঝল নন্দিতা যখন বাড়ি ফেরার জন্য চেষ্টা করেও কোনও অ্যাপ-ক্যাব বুক করতে পারল না সে। এদিকে গাড়ি সারাই করতে দেওয়ায় স্বামী তপন আজ বাসে অনেক আগেই বাড়ি ঢুকে গেছে। বৃষ্টিতে শিয়ালদা অবধি না গিয়ে ব্যাংকের নীচেই অপেক্ষা করল বাসের জন্য কিন্তু বিধি বাম, এতে সময় নষ্ট হলেও বাড়ি ফেরার মতো একটা বাস বা হলুদ ট্যাক্সিও কপালে জুটল না নন্দিতার।

(ক্রমশ……)

লেডিস কম্পার্টমেন্ট (পর্ব-০১)

নতুন অর্থ-বর্ষের শুরুতেই বদলিটা হয়ে গেল নন্দিতার। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের স্থায়ী সরকারি চাকরিতে তিন থেকে পাঁচ বছর অন্তর বদলি হওয়া নিতান্তই স্বাভাবিক ঘটনা; কিন্তু এরকম পছন্দসই জায়গায় একদম উপযুক্ত সময়ে ট্রান্সফার পাওয়াটা সত্যিই সৌভাগ্যের ব্যাপার! তবে সাধারণ মানুষের জীবনেও কখনও-সখনও ম্যাজিক ঘটে বই-কি— এই যেমন নন্দিতার জীবনেই ঘটল!

প্রায় বিশ বছরের চাকরি-জীবনে এই প্রথমবার ট্রান্সফার অর্ডারটা হাতে পেয়ে এত খুশি হল বছর পঁয়তাল্লিশের নন্দিতা। সঙ্গে সঙ্গেই স্বামী তপনকে ফোনে খবরটা জানাল সে। পেশায় ইঞ্জিনিয়র বছর পঞ্চাশের তপনবাবু চাকরি করেন রাজ্যের সেচ দফতরে, সল্টলেকে অফিস ওনার। আর নন্দিতার ট্রান্সফার হয়েছে আমহার্স্ট স্ট্রিট ব্রাঞ্চে। নন্দিতার মুখে খবরটা শুনে তপনবাবুও আনন্দিত নন্দিতার মতো একই কারণে।

নাহ্, আঠেরো বছরের বিবাহিত জীবনের পর একই শহরে এক ছাদের তলায় থেকে কাজ করতে পারার আনন্দ এটা নয়; ওদের একমাত্র সন্তান কলকাতার নামি স্কুলের ক্লাস টেনের ছাত্র। বছর পনেরোর তমালের সামনের বছরই মাধ্যমিক, তাই মা-বাবা দুজনের সাহচর্যই যে তাকে জীবনের প্রথম বড়ো পরীক্ষার ক্ষেত্রে মানসিক ভাবে সাহায্য করবে— এ’কথা ভেবেই আনন্দিত নন্দিতা, তপন দুজনেই।

নন্দিতাদের গ্যারেজ-সহ তিন কামরার নিজস্ব ফ্ল্যাটটা যাদবপুরে। নন্দিতা বা তপন কারওরই বাড়ি কলকাতায় নয়। কিন্তু চাকরির প্রায় কয়েক বছর পর থেকেই তপনবাবুর পোস্টিং কলকাতায় হয়ে যাওয়ায় এবং পরবর্তী বদলির সম্ভাবনা ক্ষীণ বুঝে আর একমাত্র ছেলের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে, অনেক বিচার-বিবেচনা করেই এই বাসস্থানটি কিনেছেন এবং নন্দিতার অবসর গ্রহণের পর এই মহানগরীরই পাকাপাকি বাসিন্দা হয়ে যাবেন বলে ঠিক করেছেন। দক্ষিণবঙ্গে নিজেদের পুরোনো মফস্সল শহরে আর ফেরার ইচ্ছে নেই তাদের।

অদ্ভুত ভাবে নন্দিতা এযাবৎ চাকরিসূত্রে কেবলমাত্র থেকেছে জেলা-শহরে, আবার কখনওবা গ্রামেও। কিন্তু ছুটিছাটায় কলকাতায় পরিবারের সাথে কিংবা অন্য শহরে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে সময় কাটালেও কখনও কোনও বড়ো শহরে কয়েক মাসের জন্যও থাকার দরকার পড়েনি তার।

এই প্রথমবার কল্লোলিনী তিলোত্তমায় কয়েক বছরের জন্য আসার পর ঠিক হল যে, নিজেদের চারচাকা ড্রাইভ করে অফিস যাওয়ার সময় তপনবাবু ছেলেকে স্কুলে ছেড়ে দিয়ে আর তারপর নন্দিতাকে ব্যাংকে নামিয়ে সল্টলেকের পথে বেরিয়ে যাবেন। তমালের স্কুল, বাড়ি থেকে হাঁটা দূরত্বে তাই ফিরতে ওর কোনও সমস্যা কোনও দিনই ছিল না। শিয়ালদার কাছাকাছি নন্দিতার ব্রাঞ্চও তপনের অফিস যাওয়ার রাস্তাতেই পড়ে। তাই তাতেও কোনও ঝামেলা নেই। শুধু সমস্যা হবে নন্দিতার বাড়ি ফেরার সময়। ব্যাংকের কাজের বরাবরই বিশাল চাপ। কর্মীদের ছুটিও হয় দেরিতেই, তাই দুজনের বাড়ি ফেরার সময় না মেলায় নন্দিতাকে ফিরতে হবে সেই বাস অথবা লোকাল ট্রেনে। ওদের ফ্ল্যাটটা যাদবপুর স্টেশনের একদম গায়ে লাগা। ট্রেনে সময় তুলনামূলক কম লাগায় বা জ্যামে আটকে দেরি হওয়ার ঝক্কি না থাকায় রেলের পথটিই বেশি সুবিধাজনক ঠেকল নন্দিতার কাছে।

নন্দিতার রোজ লোকাল ট্রেনে বাড়ি ফেরা তাও আজ নেই নেই করে মাস তিনেক হয়েই গেল। আর-পাঁচটা নিত্যযাত্রীর মতোই “মান্থলি’ করা আছে তার। এতে শিয়ালদার কাউন্টারের ভিড়ে দাঁড়িয়ে রোজ টিকিট কাটার পরিশ্রম আর সময় দুই’ই বাঁচে। নন্দিতা যে-সব সময় ট্রেনের লেডিস কামরাতেই চড়ে তা নয়। অনেক সময় সেখানে সুবিধে না হলে জেনারেল কম্পার্টমেন্টেও উঠে পড়ে কোনও কোনও দিন। এভাবে অনেক পুরুষ ও মহিলা ডেইলি প্যাসেঞ্জারের সাথেই আলাপ জমে গেছে মাত্র এই ক’দিনেই।

নন্দিতার কলকাতার বাসে, ট্রেনে বা মেট্রোয়— মহিলাদের জন্য সিট-সংরক্ষণ ব্যাপারটা খুব আশ্চর্য ঠেকে মাঝেমধ্যে! সে বড়ো শহরে আগে নিজেদের গাড়ি ছাড়া কোথাও আসা-যাওয়া করেনি ঠিকই কিন্তু জেলার ছোটোখাটো শহর, মফস্সল, শহরতলি বা গ্রামেগঞ্জে তো ট্রেনে বাসেই ডেইলি প্যাসেঞ্জারি করেছে কাজের সূত্রে বিভিন্ন সময়ে। কই, সেসব জায়গায় তো এমন পাবলিক যানবাহনের সিটের ক্ষেত্রে মহিলাদের জন্য আলাদা কোনও রিজার্ভেশন নেই। আর সত্যি বলতে কী, তাতে কোনও সমস্যাও হচ্ছে না কারওর। দিব্যি পুরুষ, নারী পাশাপাশি সিট শেয়ার করে বা ভিড়ে একসাথে দাঁড়িয়ে স্কুল-কলেজ-অফিস করছে। সেসব জায়গায় ছেলেদের জন্য যে এক্ষেত্রে অন্তত মেয়েদের সত্যিই কোনও অসুবিধা হয় না, তার প্রকৃষ্ট সাক্ষী সে নিজে। আর এই মহানগরে দ্যাখো… ‘ইকুয়্যালিটি’র দাবি তুলেও মেয়েরা নিজেরাই আবার ‘মহিলাদের বিভিন্ন অসুবিধা’র ধুয়ো তুলে এই ‘গাছেরও খাব আবার তলারও কুড়াব’ গোছের সুবিধাগুলো নিয়েই চলেছে! সাধে কি আর লোকে এখন ‘নারীবাদ’কে গালিগালাজ করে!

এই তো নন্দিতাদের কলকাতার ফ্ল্যাটের রান্নার লোক শ্যামলী— ওকে যদি একদিন একটা বেশি কাজের কথা বলা হয় তো সঙ্গে সঙ্গে ফোঁস করে উঠবে— ‘এই বেরোবার মুখে এক্সট্রা কিছু বোলোনি গো বউদি। এখান থেকে বেরোতে দেরি হয় বলে একেই তো লেডিস-স্পেশালটা পাই না আজকাল। তার মধ্যে বারো বগির ক্যানিং লোকালটা না পেলে সেই তার পরের দশ বগির নামখানায় লেডিসে ভিড়ে ওঠা যায় না আর।’

এ কথা শুনে নন্দিতা যদি বলে ফেলে— “কেন? লেডিসে না উঠতে পারলে জেনারেলে গেলেই তো পারো।” তার প্রত্যুত্তরে শ্যামলী মুখের ভাবখানা এমন করবে যেন নন্দিতা কি একটা ভয়ংকর ধরনের অসম্ভব কাজ করতে বলেছে ওকে! অথচ, ওই লেডিসেই বসার জায়গা নিয়ে ঝগড়ায় এই শ্যামলীদের খিস্তি-খেউড় থেকে শুরু করে চুলোচুলি অবধি কিছুই প্রায় বাদ যায় না!

(ক্রমশ……)

নিয়ন্ত্রণে রাখুন হাইপার টেনশন

দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ রক্তচাপ শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গকে প্রভাবিত করে যা হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক এবং কিডনির নানারকম রোগের সবচেয়ে সাধারণ কারণ। এমনকী আকস্মিক মৃত্যু পর্যন্ত হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধ এবং নিয়ন্ত্রণে রাখার মূল পদক্ষেপ হল— স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করা। জীবনধারা পরিবর্তনের মাধ্যমে কীভাবে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখবেন, এই বিষয়ে রইল গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ।

  • অতিরিক্ত ওজন কমানো। ওজন বেশি থাকলে উচ্চরক্তচাপের সমস্যা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়
  • ধূমপান ত্যাগ করা। তামাক রক্তনালিগুলির দেয়ালগুলিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং ধমনীকে কঠিন করে তোলে। ফলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা তৈরি হয়।
  • নিয়ন্ত্রিত খাওয়াদাওয়া করা প্রয়োজন, যা উচ্চ রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে। সবুজ শাকসবজি, ফল, গোটা শস্য, মাছ, মুরগির মাংস, বাদাম এবং মটরশুটি খাওয়া প্রয়োজন। উচ্চ পটাশিয়াম-যুক্ত খাবার যেমন— অ্যাভোকাডো, কলা, ড্রাই ফ্রুটস, টম্যাটো এবং কালো বিন খাদ্য-তালিকায় রাখা বিশেষ আবশ্যক। তবে অতিরিক্ত পরিমাণে চিনিযুক্ত পানীয়, মিষ্টি, চর্বিযুক্ত মাংস এবং দুগ্ধজাত দ্রব্য নৈব নৈব চ
  • উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা থাকলে ডায়েটে সোডিয়ামের পরিমাণ দিনে ১,৫০০ মিলিগ্রামের কম রাখতে হবে। সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রেও সোডিয়াম গ্রহণের পরিমাণ দিনে ২,৩০০ মিলিগ্রামের বেশি (প্রায় ১ চা চামচ লবণ) হওয়া উচিত নয়। এছাড়াও অনেক প্রক্রিয়াজাত খাবারে প্রচুর পরিমাণে লবণ থাকে। উদাহরণস্বরূপ, একজন সাধারণ মানুষের প্রতিদিন যা লবণ গ্রহণ করা উচিত তার ৭৫ শতাংশ বেশি থাকে প্রক্রিয়াজাত স্যুপ, মশলা এবং টম্যাটো সসে। খাবারের পিছনে থাকা লেবেল (যেখানে সোডিয়াম লবণ হিসাবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে) দেখে ব্যবহার করা উচিত। পরিবর্তে খাবারের স্বাদ বাড়াতে মশলা এবং ভেষজ হার্ব ব্যবহার করা যেতে পারে
  • নিয়মিত অ্যারোবিক এক্সারসাইজ করা। সপ্তাহে বেশ কয়েকদিন ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটা। যোগাসন, বাইক চালানো বা সাঁতার কাটা যেতে পারে
  • আপনার বয়স এবং উচ্চতা অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট ওজন রাখা গুরুত্বপূর্ণ। যদি ওজন বেশি হয় বা স্থূলতা থাকে তবে মাত্র ৫ পাউন্ড (২.২৬৮০ কিলোগ্রাম) ওজন কমিয়েও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা যেতে পারে
  • অ্যালকোহল সেবন নিয়ন্ত্রণে রাখা উচিত কিংবা বন্ধ করা উচিত। অতিরিক্ত অ্যাকলকোহল সেবন করলে নানারকম শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়
  • মানসিক চাপ কমানো। এর জন্য একজন কাউন্সেলর-এর সঙ্গে কথা বলুন। মেডিটেশন, রাগ-নিয়ন্ত্রণ করার কৌশল শেখা বা নিয়মিত বডি মাসাজ করার মতো পন্থা অবলম্বন করা যেতে পারে।

উচ্চ রক্তচাপের কারণে কিডনির রোগ, ডায়াবেটিস, স্লিপ অ্যাপনিয়া, হরমোনের সমস্যা, কানেকটিভ টিস্যু ডিসওর্ডার এবং বিশেষ ভাবে হৃদরোগ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

গর্ভনিরোধক ট্যাবলেট, স্টেরয়েড, কিছু ব্যথানাশক ওষুধ, কিছু ভেষজ ওষুধ বিশেষ করে যেগুলির মধ্যে লিকার আইস, রিক্রিয়েশনাল ড্রাগস যেমন কোকেন অ্যামফিটামাইনস ও অ্যান্টি-ডিপ্রেসেন্টস থাকে, সেগুলিও রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়।

হাইপার টেনশন বা উচ্চ রক্তচাপ বর্তমান শতাব্দীতে সবচেয়ে প্রচলিত লাইফস্টাইল রোগের মধ্যে অন্যতম হয়ে উঠেছে। ভারতে প্রতি তিনজন প্রাপ্ত-বয়স্কের উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে এবং আক্রান্তদের বেশিরভাগই এ বিষয়ে সচেতন নয়। আমাদের জীবন আগের চেয়ে অনেক বেশি সহজতর হয়ে গিয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে একই জায়গায় বসে কাজ করা, অলসতা, খারাপ খাদ্যাভ্যাস, অত্যাধিক মানসিক চাপ এবং কায়িক পরিশ্রমের অভাব মানুষকে উচ্চ রক্তচাপের সমস্যায় ফেলছে।

উচ্চ রক্তচাপের দুটি ধাপ রয়েছে। প্রাইমারি এবং সেকেন্ডারি। প্রাথমিক ভাবে অনিয়ন্ত্রিত জীবনধারা এবং জেনেটিক কারণে উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা দেখা দিতে পারে। দ্বিতীয়ত, কিডনির সমস্যা-সহ নানারকম ক্রনিক অসুখের কারণেও উচ্চ রক্তচাপ দেখা যায়।

উচ্চ রক্তচাপের শ্রেণীবিভাগ:

সাধারণ— বিপি এসবিপি < ১৩০ এবং ডিবিপি < ৮৫।

উচ্চ— স্বাভাবিক বিপি এসবিপি ১৩০-১৩৯ এবং ডিবিপি ৮৫-৮৯। গ্রেড-১ হাইপারটেনশন— এসবিপি ১৪০-১৫৯ এবং ডিবিপি ৯০-৯৯।

গ্রেড-২ হাইপারটেনশন— এসবিপি > ১৬০ এবং অথবা ডিবিপি > ১০০।

উচ্চ রক্তচাপের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ মানুষেরই কোনও উপসর্গ থাকে না। এমনকী রক্তচাপ বিপজ্জনক ভাবে উচ্চ মাত্রায় পৌঁছোলেও তা বোঝা যায় না। কোনও লক্ষণ ছাড়াই বছরের পর বছর ধরে কারও উচ্চ রক্তচাপ থাকতে পারে।

উচ্চ রক্তচাপের নানাবিধ কারণ রয়েছে। বিভিন্ন ঝুঁকির কারণগুলি হল:

  • ধূমপান
  • অতিরিক্ত ওজন বা মোটা হওয়া
  • শারীরিক পরিশ্রমের অভাব
  • খাবারে অত্যধিক লবণ
  • অত্যধিক অ্যালকোহল সেবন
  • মানসিক চাপ
  • বয়সজনিত
  • জিনঘটিত

উচ্চ রক্তচাপের লক্ষণ :

  • মাথাব্যথা
  • শ্বাসকষ্ট
  • নাক দিয়ে রক্ত পড়া।

তবে এই লক্ষণগুলি সকলের ক্ষেত্রে দেখা নাও যেতে পারে। উচ্চ রক্তচাপ গুরুতর বা প্রাণঘাতী পর্যায়ে না পৌঁছানো পর্যন্ত এগুলি সাধারণত ঘটে না।

উচ্চ রক্তচাপের কারণে ধমনীর দেয়ালে অতিরিক্ত চাপ রক্তনালি এবং শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ক্ষতি করতে পারে। রক্তচাপ যত বেশি হবে এবং তা যত বেশিক্ষণ অনিয়ন্ত্রিত হবে, তত বেশি ক্ষতিকারক হবে।

অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ নানারকম জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে :

হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক: উচ্চ রক্তচাপ বা অন্যান্য কারণে ধমনী শক্ত হওয়া এবং রক্ত ঘন হয়ে যাওয়া হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক বা অন্যান্য জটিলতার কারণ হতে পারে।

অ্যানিউরিজম: বর্ধিত রক্তচাপ একটি রক্তনালিকে দুর্বল করে দিতে পারে। রক্তনালি ফুলে গিয়ে অ্যানিউরিজম গঠন করতে পারে। সেক্ষেত্রে অ্যানিউরিজম যদি ফেটে যায় তবে এটির ফলে জীবন-সংকট দেখা দিতে পারে।

হার্ট ফেইলিওর: উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা থাকলে হৃদপিণ্ডকে রক্ত পাম্প করার জন্য আরও কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। স্ট্রেন হার্টের পাম্পিং চেম্বারের দেয়ালকে ঘন করে তোলে। এই অবস্থাকে লেফট ভেন্ট্রিকুলার হাইপারট্রফি বলা হয়। অবশেষে, হৃদপিণ্ড শরীরের প্রয়োজন মেটাতে পর্যাপ্ত রক্ত পাম্প করতে পারে না, যার ফলে হার্ট ফেইলিওর হয়।

কিডনির সমস্যা: উচ্চ রক্তচাপের কারণে কিডনির রক্তনালিগুলো সরু বা দুর্বল হয়ে যেতে পারে। এতে কিডনির ক্ষতি হতে পারে। চোখের সমস্যা: বর্ধিত রক্তচাপ চোখের রক্তনালি ঘন কিংবা সরু করে দিতে পারে অথবা তা ছিঁড়ে যেতে পারে। এর ফলে দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হতে পারে।

বিপাকীয় সিন্ড্রোম: এই সিন্ড্রোম হল শরীরের বিপাকের ব্যাধিগুলির মধ্যে অন্যতম। এতে শরীরে চিনি বা গ্লুকোজ অনিয়মিত হয়। এর ফলে কোমরের আকার বৃদ্ধি পেতে থাকে, ট্রাইগ্লিসারাইড বাড়তে থাকে, উচ্চ ঘনত্বের লাইপোপ্রোটিন (এইচডিএল বা ‘ভাল্’) কোলেস্টেরল কমে যায়, রক্তচাপ ও রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়। এক্ষেত্রে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ এবং স্ট্রোক হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়।

ভাবনাচিন্তা: মনে রাখার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে। অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ চিন্তা করা, মনে রাখার এবং শেখার ক্ষমতাকে হ্রাস করতে পারে। ডিমেনশিয়া: সংকীর্ণ বা অবরুদ্ধ ধমনী মস্তিষ্কে রক্ত প্রবাহ সীমিত করতে পারে। এটি ভাস্কুলার ডিমেনশিয়া নামক একটি নির্দিষ্ট ধরনের ডিমেনশিয়া হতে পারে। স্ট্রোক যা মস্তিষ্কে রক্ত প্রবাহকে বাধা দেয় তাও ভাস্কুলার ডিমেনশিয়া ঘটাতে পারে।

উচ্চ রক্তচাপ: এটা প্রতিরোধের জন্য জীবনযাত্রার পরিবর্তন অপরিহার্য এবং এটি সাধারণত উচ্চ রক্তচাপ পরিচালনার প্রাথমিক পদক্ষেপ। যেহেতু উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে কার্ডিওভাসকুলার রোগের ঝুঁকির কারণগুলি মূল্যায়ন করা হয়, তাই জীবনধারার দিকে মনোযোগ দিন। ফলে বিপি স্তর নিরাপদ মাত্রায় থাকবে এবং সামগ্রিক কার্ডিওভাসকুলার রোগের ঝুঁকি হ্রাস পাবে।

উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধ করার জন্য, প্রত্যেককে জীবনযাত্রার পরিবর্তন করতে উৎসাহিত করা উচিত। যেমন স্বাস্থ্যকর খাদ্যগ্রহণ, ধূমপান ত্যাগ করা, ব্যায়াম করা, সঠিক ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা প্রভৃতি।

কেক-স্পেশাল কিছু রেসিপি

বাজার থেকে কেনা কেক তো খেয়েছেন অনেক কিন্তু নিজের হাতে কেক বানিয়ে  খাওয়া কিংবা অন্যকে খাওয়ানোর মজা-ই আলাদা। রইল রেসিপি।

অ্যাপেল সিনামন কেক

উপকরণ: ৩-টে ডিম, ৩/৪ কাপ চিনি, ১ ছোটো চামচ ভ্যানিলা এসেন্স, ৩ কাপ ময়দা, ১ ছোটো চামচ বেকিং পাউডার, ১ ছোটো চামচ দারচিনি, ২টো আপেল, ১/২ কাপ মাখন, এক চিমটে নুন।

প্রণালী: ডিম ফাটিয়ে একটা বোল-এ রাখুন। এর মধ্যে চিনি দিয়ে ভালো করে ফেটাতে থাকুন। এবার কয়েক ফোঁটা ভ্যানিলা এসেন্স দিন এতে। এর পর মাখন মেশান। ফেটাতে থাকুন। অন্য একটি পাত্রে ময়দা, বেকিং পাউডার, দারচিনিগুঁড়ো ও নুন দিয়ে ভালো ভাবে মিশিয়ে নিন। এর পর খোসা ছাড়িয়ে মিহি করে কুচোনো আপেল দিন। এবার বেকিং টিনের মধ্যে অ্যালুমিনিয়াম বেকিং ফয়েল-এ রেখে, ময়দা-আপেলের মিশ্রণ ঢেলে দিন। ২০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় প্রি-হিটেড আভেনে বাদামি রং না ধরা পর্যন্ত ৪০ মিনিট বেক করুন। একটা টুথপিক গেঁথে দেখে নিন কেকের ভিতরটা কাঁচা আছে কিনা। চটচটে ভাব যদি না থাকে টুথ পিক-এ, বুঝবেন কেক তৈরি। নামিয়ে নিয়ে সার্ভ করুন।

ব্যানানা কেক

উপকরণ : ১ কাপ ময়দা, ১ ছোটো চামচ বেকিং পাউডার, ১ ছোটো চামচ বেকিং সোডা, ১ বড়ো চামচ কর্নফ্লাওয়ার, ১ বড়ো চামচ মিল্ক পাউডার, ১/৪ কাপ মাখন, ১টা চটকানো কলা, ১০০ গ্রাম কনডেন্সড মিল্ক, অল্প আখরোট, নুন স্বাদমতো।

প্রণালী: কলাটা চটকে রাখুন। ময়দা, বেকিং পাউডার, বেকিং সোডা, কর্নফ্লাওয়ার, মিল্ক পাউডার আর নুন একসঙ্গে মিশিয়ে ছেঁকে নিন। এই ময়দার মিশ্রণে কলা ও কনডেন্সড মিল্ক মেশান। ভালো করে ফেটিয়ে মসৃণ করে নিন। এবার বেকিং টিন-এ মাখন বুলিয়ে এই মিশ্রণ ঢেলে দিন। প্রি-হিটেড আভেনে ৪০ মিনিট বেক করুন। ভালো ভাবে বেক হয়ে গেলে বের করে একটু ঠান্ডা হতে দিন। তারপর সার্ভ করুন।

চকোলেট কেক

উপকরণ: ১ কাপ ময়দা, ১/২ কাপ কোকো পাউডার, ১ কাপ ইয়োগার্ট, ১ কাপ ক্যাস্টর সুগার, ১/২ ছোটো চামচ বেকিং সোডা, ১/২ ছোটো চামচ বেকিং পাউডার, ১/২ কাপ সাদা তেল, ১ ছোটো চামচ ভ্যানিলা এক্সট্র্যাক্টস।

প্রণালী: আভেন অন করে ২০০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় গরম হতে দিন। বেকিং টিন-এ মাখন বুলিয়ে রেডি রাখুন। এবার একটা পাত্রে ময়দা, কোকো পাউডার ছেঁকে নিন। একটা বোল-এ ইয়োগার্ট, চিনি আর ভ্যানিলা দিয়ে ভালো ভাবে ফেটাতে থাকুন। এবার এতে বেকিং সোডা আর বেকিং পাউডার দিয়ে দিন। ভালো ভাবে মিক্স করুন। এর সঙ্গে তেল আর ময়দা-কোকোর মিক্সচারটা দিয়ে দিন। ভালো ভাবে ফেটানো হলে, এটা মাখন বোলানো বেকিং টিন-এ ঢেলে দিন। ৪০ মিনিট বেক করুন। কেক তৈরি হলে ১৫ মিনিট রেখে দিন ঠান্ডা করার জন্য। এর পর সার্ভ করুন।

কফি কেক

উপকরণ: ২০০ গ্রাম ময়দা, ১ ছোটো চামচ বেকিং পাউডার, ২ ছোটো চামচ কফি পাউডার, ৪টে ডিম, ২০০ গ্রাম মাখন, ২০০ গ্রাম চিনি, ২ ছোটো চামচ মিল্ক পাউডার, নুন স্বাদমতো।

প্রণালী: আভেন ১৬০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় প্রি-হিট করে রাখুন। এবার সমস্ত উপকরণ, একটি পাত্রে মিক্স করুন। এবার বেকিং টিন-এ মাখন বুলিয়ে মিশ্রণ ঢেলে দিন। ৪০ মিনিট বেক করুন। একটু ঠান্ডা হলে সার্ভ করুন।

লেমন কেক

উপকরণ : ৩টি লেবু, ১৮০ গ্রাম ময়দা, ১৫০ গ্রাম চিনি, ২টি ডিম, ১ ছোটো চামচ বেকিং পাউডার, ১২৫ গ্রাম মাখন, ৬০ মিলি দুধ।

প্রণালী : আভেন ১৮০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় প্রি-হিট করুন। এবার একটা পাত্রে মাখন, চিনি ও ডিম ঢেলে ভালো ভাবে ফেটিয়ে নিন। এবার এতে লেবুর রস দিন। সমস্ত শুকনো উপকরণ ঢেলে ভালো ভাবে মিক্স করুন। এবার বেকিং টিন-এ মাখন বুলিয়ে এই মিশ্রণ ঢেলে দিন। প্রি-হিটেড আভেনে ৪৫ মিনিট বেক করুন। বেক হওয়ার পর ৫ মিনিট সময় দিন ঠান্ডা হওয়ার। তারপর প্লেটে সার্ভ করুন। এই কেকটি কমলালেবুর রস দিয়েও করতে পারেন।

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব