অন্য স্বাদে উদযাপন করুন পয়লা বৈশাখ

পয়লা বৈশাখকে ঘিরে বাঙালি তথা আপামর বাংলার মানুষ মেতে ওঠেন এক অন্যরকম আনন্দে। নতুন পোশাক আর সাজগোজের পরে যে বিষয়টি প্রাধান্য পায়, তা হল—খাওয়া-দাওয়া। বাংলা বছরের নতুন এই দিনটিকে কেন্দ্র করে বন্ধু কিংবা আত্মীয়-স্বজনদের নিয়ে সকাল থেকে রাত্রি পর্যন্ত কাটে হইহুল্লোড়ে। আর এই হইহুল্লোড়ের মধ্যে গল্প এবং আড্ডার পরে অবশ্যই প্রাধান্য পায় সুস্বাদু কিছু খাওয়ার বিষয়টি।

এখন বেশিরভাগ মানুষই প্রতিদিন কর্মব্যস্ত থাকেন। তাই প্রত্যেকে মুখিয়ে থাকেন কোনও ছুটি কিংবা উৎসব-অনুষ্ঠানের দিনের জন্য। আসল কথা হল, নানান বাহানায় কর্মব্যস্ত জীবনকে কিছুটা সময়ের জন্য হলেও উপভোগ্য করে তোলা।

প্রকৃতিগত ভাবেই মানুষ খেতে ভালোবাসে। আসলে সুস্বাদু কিছু খাওয়ার মধ্যেই এক অন্যরকম তৃপ্তি পাওয়া যায়। বিশেষকরে বাংলার মানুষ একটু বেশি খাদ্যরসিক। বাড়ির মেয়েরা তো উৎসব-অনুষ্ঠানে ভালো এবং নতুন কোনও খাবার বানিয়ে যেমন আনন্দ পান, ঠিক তেমনই নতুন কোনও খাবার প্রিয়জনদের খাইয়ে নিজেদের ধন্য মনে করেন।

এমন অনেক খাবার আছে, যেগুলো আমাদের ঠাকুমা, দিদিমারা বানাতেন এবং আমরা সেসব খাবার খেয়ে চরম তৃপ্তি পেতাম। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন আর বাড়িতে সময় নিয়ে খাবার বানানোর রীতি রেওয়াজ প্রায় নেই বললেই চলে। তাই রেস্তোরাঁর থেকে খাবার খেয়েই আমরা রসনা তৃপ্তি করি। কিন্তু সবার তো আর আর্থিক সামর্থ সমান নয়, তাই ইচ্ছে থাকলেও রেস্তোরাঁয় গিয়ে খাবার খাওয়ার উপায় থাকে না। আর এই আর্থিক বিষয়টি মাথায় রেখে অনেকে সারাবছর কিছু টাকা জমিয়ে রাখেন রেস্তোরাঁয় বসে ভালো কিছু খাবারের স্বাদ উপভোগ করার জন্য। অবশ্য খাবার ঘরোয়াই হোক কিংবা রেস্তোরাঁর, প্রয়োজন নতুন স্বাদের ভালো খাবার। আর এসব কথা মাথায় রেখেই এবারের বাংলা নববর্ষের আগে জেনে নিন নতুন কিছু পদের খাবারের বিষয়ে।

পয়লা বৈশাখের স্পেশাল মেনু লঞ্চ উপলক্ষ্যে কলকাতা-র পোলো ফ্লোটেল-এর জেনারেল ম্যানেজার সৌমেন হালদার জানিয়েছেন, ‘প্রতিটি বাঙালি পরিবারের হৃদয়ে রয়েছে খাঁটি ঘরোয়া স্বাদের স্মৃতি, যা ঐতিহ্য এবং ভালোবাসাকে ফিরিয়ে দেয়। যা এই দ্রুত গতির বিশ্বে খুব কমই পাওয়া যায়। এই পয়লা বৈশাখে, শুধুমাত্র হারিয়ে যাওয়া রেসিপিগুলির স্বাদই নয়, বরং ঠাকুমা-দিদিমাদের উত্তরাধিকারকে লালন করার সুযোগও করে নেওয়া উচিত। কারণ, তারাই আমাদের রন্ধনসম্পর্কীয় ঐতিহ্যকে যুগে যুগে সংরক্ষণ করেছেন। এই ভুলে যাওয়া খাবারগুলিকে পুনরুজ্জীবিত করার মাধ্যমে, আমরা সেই মহিলাদের ভালোবাসা, মহত্ব এবং সরলতার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পারি এই সুযোগে।’

ঐতিহ্যবাহী খাঁটি বাঙালি খাবারের পুরনো স্বাদ এবং স্মৃতি ফিরিয়ে আনতে পারবেন আপনিও। অবশ্য এরজন্য আপনাকে পাতে রাখতে হবে নতুন কিছু পদের খাবার। এর মধ্যে রয়েছে মাংস-কিমার দই বড়া, পাতা মোড়া চিকেন,  চিকেনের রসোল্লা, মাংসের গড়গড়া, সাজা মাছ কিংবা সাত্ত্বিক সুক্তনি প্রভৃতি।

আসলে উল্লেখিত এই পদগুলির মধ্যেই লুকিয়ে আছে উপকরণ এবং প্রণালী। যেমন, মাংসের কিমার সঙ্গে দই-এর মিশ্রণ ঘটিয়ে তৈরি করা যায় মাংস-কিমার দই বড়া। তবে এই বিষয়ে আপনাকে একটা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আপনি যদি নতুন এই পদটি তৈরি করতে না পারেন, তাহলে আপনাকে রেস্তোরাঁয় যেতেই হবে। আসল বিষয় হল খেয়ে তৃপ্তি পাওয়া, সে ঘরে কিংবা বাইরে যেখানেই হোক।

বিবাহিত জীবনে সুস্থ ও সুন্দর থাকার কৌশল রপ্ত করুন

অপর্ণা পেশায় জুয়েলারি ডিজাইনার। এই পেশাগত কারণে দীর্ঘ সময় এক জায়গায় বসে কাজ করতে হয় তাকে। তাই অপর্ণা কিছুটা ওভার-ওয়েট। অতএব, বিয়ের আগে সেও কিছুটা চিন্তিত। তাই সাতপাঁচ ভেবে নিয়ে অপর্ণাও জিম জয়েন করে এবং নিয়মিত মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ধীরে ধীরে নিজের ওজন অনেকটাই কমাতে চেষ্টা করল। অবশ্য শুধু জিমে গিয়ে শরীরচর্চা-ই নয়, শোভন এবং অপর্ণা দু’জনেই সঠিক মাত্রায় খাদ্যগ্রহণ করে নিজেদের ফিট রাখার চেষ্টায় সফল হল বিয়ের আগেই।

জিমে যাওয়ার সুফল কী?

জিমে গিয়ে লাভবান হয়েছেন এমন একজন প্রসঙ্গত জানালেন, ‘প্রত্যেকেরই শারীরিক গঠন আলাদা হয়। কারও বুকের ছাতি ঠিক থাকে না, আবার কারও নিতম্ব থাকে ভারী। এছাড়া হাইট অনুযায়ী ওজন ঠিক থাকে না অনেকের। আর এসব বাড়িতে নিজের মতো শরীরচর্চা করে কিংবা খাবার খেয়ে ঠিক করা যায় না। এর জন্য ট্রেন্ড কারও-র পরামর্শ ও সাহায্য চাই। জিম-ই এর জন্য অন্যতম উপযুক্ত জায়গা যেখানে ট্রেনার আপনাকে সঠিক ভাবে গাইড করবে। প্রয় সব জিমেই জিম ইন্সট্রাক্টর থাকেন,আর থাকেন ডিগ্রি-হোল্ডার ডায়েটিশিয়ান। তাদের থেকে সঠিক গাইডেন্স-এ ব্যায়াম করলে কিংবা খাবার গ্রহণ করলে নিজেকে ফিট এবং ফাইন রাখা যায়।”

বিবাহপূর্ব শরীরচর্চার অন্যান্য সুফল

শুধু বিয়ের দিন সুন্দর ও স্বাস্থ্যোজ্জ্বল থাকাই নয়, হনিমুন থেকে শুরু করে পরিবার পরিকল্পনা পর্যন্ত দারুণ কাজে আসে বিবাহপূর্ব শরীরচর্চা। কারণ, নিজেকে স্বাস্থ্যোজ্জ্বল এবং সুন্দর রাখলে নিজের শরীর- -মন যেমন ভালো থাকবে। আপনি কম অসুস্থ হলে পরিবারের বাকিদেরও খুশি রাখা যাবে। এর ফলে পুরো পরিবারটাই থাকবে আনন্দে উচ্ছল। শুধু তাই নয়, বিয়ের কয়েকবছর পর যখন দেখবেন বিয়ের দিনের মতো তখনও প্রায় একই রকম আছেন, তখন বেশ ভালো লাগবে। বিয়ের ফোটো কিংবা ভিডিয়ো অ্যালবাম দেখে যখন নিজের বর্তমান ফিগার মেলাবেন, তখন যদি দেখেন স্বাস্থ্য কিংবা সৌন্দর্য আগের থেকে খুব বেশি বদলায়নি, তখন তা আপনাকে আনন্দে ভরিয়ে রাখবে।

এ প্রসঙ্গে একটা কথা মনে রাখবেন, স্বামী-স্ত্রীর শরীর-স্বাস্থ্যের উপরই অনেকটা নির্ভর করে পরবর্তী প্রজন্মের শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্য। আপনারা যদি সুস্থ, সুন্দর এবং নীরোগ থাকেন— তাহলে আপনাদের সন্তানের শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যও ভালো থাকার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। অতএব, বিয়ের আগে সঠিক মাত্রায় পুষ্টিকর খাবার খান এবং নিয়মিত শরীরচর্চা করুন।

দাম্পত্য জীবনকে আনন্দে ভরিয়ে রাখুন

বিয়ের আসরে পা রাখা তরুণ প্রজন্মের নব দম্পতিরা সকলেই চান রুপোলি পর্দার নায়ক-নায়িকাদের মতো স্মার্ট এবং প্রেজেন্টেবল হতে। কারণ, তারা স্মরণীয় করে রাখতে চান বিয়ের দিনটিকে। কিন্তু শুধু বিয়ের দিনটিকেই নয়, পুরো দাম্পত্য জীবনটাকেই আনন্দে ভরিয়ে রাখতে শিখুন। বলা বাহুল্য, বিয়ের অনুষ্ঠান মানেই সব দায়-দায়িত্বের ভার নিতে হয় পরিবারের সদস্যদের। সেই তুলনায় বিয়ের পাত্র-পাত্রীর ঝক্কি- ঝামেলা কম। বর-কনে এই সময় শুধু ব্যস্ত থাকেন তাদের বিয়ের আকর্ষণীয় পোশাক কিনতে কিংবা বন্ধু-বান্ধবদের বিয়েতে নিমন্ত্রণ করতে। আর যা নিয়ে বর-কনে ব্যস্ত থাকেন এই সময়, তা হল— শরীরচর্চা এবং রূপচর্চায়। অতএব কেউ জিমে যান তো কেউ যান বিউটি পার্লারে। মোটকথা, বিয়ের দিনে নিজেকে ফিট ও ফাইন রাখতে চান বর এবং কনে দু’জনেই। কিন্তু কীভাবে নেবেন সুস্থ দাম্পত্য জীবনের প্রস্তুতি? জেনে নিন সেই বিষয়ে।

সঠিক আহার এবং নিয়মিত ব্যায়াম

শোভনের সঙ্গে অপর্ণার বিয়ে ফাইনাল হয়ে গেছে। আর মাত্র দু’মাস পর বিয়ে। হাতে খুব বেশি সময় নেই। তাই শোভন এবং অপর্ণা দু’জনেই এখন ব্যস্ত বিয়ের জন্য নিজেদের শরীরচর্চা এবং সৌন্দর্যচর্চায়।

শোভনকে ওর বন্ধুরা বলেছে, ‘শরীরচর্চা করে নিজেকে এমন ভাবে তৈরি কর, যাতে ফিল্ম-স্টার রণবীর কপুর কিংবা রণবীর সিং-এর মতো ফিট এবং স্মার্ট মনে হয়। যাতে তোর শ্বশুরবাড়ির লোকেরা বলে, তাদের জামাই যেমন বিদ্যান, বুদ্ধিমান, রোজগেরে, ঠিক তেমনই স্বাস্থ্যবান ও সুন্দর।’ বন্ধুদের এই উপদেশ যুক্তিযুক্ত মনে হয় শোভনের।

সবকিছু ভেবেচিন্তে জিম জয়েন করল শোভন এবং খুব নিষ্ঠার সঙ্গে শুরু করে দিল শরীরচর্চা। শোভনের শরীরচর্চার বিষয়ে এক বন্ধু যখন শোভনকে প্রশ্ন করল, এতদিন শরীরচর্চা না করে হঠাৎ বিয়ের আগে কেন এত মনযোগী হয়ে উঠল শরীরচর্চায়? এর উত্তরে শোভন জানায়, “আসলে এতদিন আমি শরীর-স্বাস্থ্য নিয়ে সিরিয়াসলি ভাবতাম না কিন্তু আমার অফিসের সহকর্মী গৌতমের বিয়েতে গিয়ে আমার এক নতুন অভিজ্ঞতা হয়েছিল। বিয়ের সময় গৌতমের বউ প্রিয়ার মেয়ে বন্ধুদের ফিসফাস করতে শুনলাম। ওরা বলছে, প্রিয়া এত ফিট এবং সুন্দরী কিন্তু এই ছেলেটির সঙ্গে প্রিয়াকে বেমানান লাগবে। প্রিয়ার বাড়ির লোক সম্ভবত ছেলেটির শুধু রোজগার দেখে বিয়ে দিচ্ছেন।”

শোভন এই প্রসঙ্গে আরও জানায়, ‘গৌতম-প্রিয়ার বিয়ের দিন প্রিয়ার বন্ধুদের ওই সমালোচনা শুনে আমি ঠিক করে ফেললাম, আমার বিয়ের আগে আমাকে সুপার ফিট থাকতে হবে। যাতে কেউ বলতে না পারে যে, মেয়েটির সঙ্গে ছেলেটিকে বেমানান লাগছে! বরং এমন ভাবে নিজের শরীরস্বাস্থ্য ঠিক রাখব যে, সবাই যেন বলে, বাহ! অসাধারণ জুটি, একেবারে রাজযোটক!”

অবশ্য শুধু শোভন-ই নয়, ওর হবু বউ অপর্ণাও বিয়ের জন্য নিজের ফিগার আকর্ষণীয় করে তুলতে ব্যস্ত। এর জন্য দিনরাত সেও ঘাম ঝরাচ্ছে।

উপনয়ন (শেষ পর্ব)

মেজদা ছিল খুবই শান্ত স্বভাবের। ঘরে-বাইরে, পাড়া-প্রতিবেশি, এমনকী স্কুলেও তার খুবই সুনাম ছিল। সংসারের খুঁটিনাটি অনেক ব্যাপারে মেজদা মায়ের কাছে বেশি গুরুত্ব পেত। মা সব্বাইকে বলত, ওর বয়স কম হলে কী হবে, অপু আমার খুব বুঝদার ছেলে। আমি খুব ভরসা করি ওকে।

আমার বেশ মনে পড়ে, বিকেলে মেজদা সেজদা খেলতে গেলেও আমাদের ছোটো দুই ভাইবোনকে হাত ধরে নিয়ে গিয়ে মাঠের ধারে বসিয়ে রাখত। কখনও খেলা ফেলে এসে আমাদের সঙ্গ দিত। এ হেন মেজদার ওই অবস্থা দেখে আমরা একেবারে চুপ হয়ে গিয়েছিলাম। বড়ো হয়ে মায়ের কাছে শুনেছি, কখনও সখনও জ্বরজারি হলে বা শরীর খারাপ করলেও সেই কষ্টটা মেজদা প্রকাশ করত না। বলত, ‘না না, আমার তেমন কিছুই হয়নি মা গো।”

মেজদাকে যে-ঘরে শোয়ানো ছিল সেই ঘরের মেঝেতে আমরা বসেছিলাম। বাবার বন্ধু প্রফুল্ল কাকু রোজ আমাদের বাড়ি আসতেন। তিনি প্রায় আমাদের বাড়ির একজন সদস্য হয়ে গিয়েছিলেন। কাকু দুঠোঙা মুড়ি মুড়কি এনে আমাদের হাতে দিয়ে বললেন তোরা বসে কী করবি। সেই দুপুরে তো খেয়েছিস। নে মুড়ি ক’টা খেয়ে নে। এক মুহূর্তে যেন আমরা অনেকটা বড়ো হয়ে গিয়েছিলাম। ঠোঙাটা মুড়ে রেখে দিয়েছিলাম। তা থেকে একটা দানাও মুখে তুলতে পারিনি।

খানিকবাদে আবার বমি হল মেজদার। আশেপাশে দাদা, দিদি, ছোড়দি, মেজদি সবাই ঘিরে বসে রয়েছে। দিদি বলছে অপু, বাবা ডাক্তারবাবুকে নিয়ে এখনই এসে পড়বে। কিন্তু মেজদা অস্ফুট গোঙানির স্বরে বলতে লাগল, “দিদি, আমি আর ভালো হবো না রে! মা কোথায়? আমার চোখটা কেমন যেন ঝাপসা লাগছে, কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছি না! মা… মা তুমি একবার আমার হাতটা ধরো না।’ মেজদার মুখের সামনে মুখ নিয়ে এসে মা বলল, এই তো আমি বাবা!

এতক্ষণ মা মেজদার পাশেই বসে ওর মাথায় গায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। হঠাৎই মেজদাকে ভীষণ রকম শ্বাসকষ্টে ছটফট করতে দেখে মা উঠে পাশের ঘরে গিয়ে ঠাকুরের সামনে পড়ল।

বৃষ্টি যখন একটু ধরে এসেছে বাবা ডাক্তারবাবুকে নিয়ে ফিরলেন। ডাক্তারবাবু এসে মেজদাকে দেখে বললেন, এক্ষুনি অক্সিজেন দেওয়া দরকার। আপাতত, একটা ইনজেকশন দিচ্ছি। একটু চেষ্টা করে দেখুন যদি অক্সিজেনের ব্যবস্থা করতে পারেন। গোবিন্দকাকুকে নিয়ে বাবা আবার বেরোলেন।

বাইরে ঝড়বৃষ্টি থেমে গিয়েছে। ডাক্তারবাবু ঘনঘন ঘড়ি দেখছেন। ঝাপসা দৃষ্টি নিয়ে মেজদা যেন শুধু মাকেই খুঁজে চলেছে, আর বিড়বিড় করে অনেক কিছু বলে চলেছে। আমি আমার হাতদুটো মেজদার পায়ের উপর রাখলাম। একবার চোখটা একটু আধখোলা করে বলল, “তোরা ভালো হয়ে থাকবি। মাকে জ্বালাতন করবি না।”

জেঠিমা পাশের ঘরে গিয়ে মাকে বললেন থাক পড়ে তোর ঠাকুর। আগে ছেলের কাছে চল, বলে মাকে ধরে নিয়ে এসে মেজদার পাশে বসিয়ে দিল। মেজদা কষ্ট করে ওর হাতটা তোলার চেষ্টা করতেই মা হাতটা ধরে ফেলে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল অপু, এই তো আমি। দেখ বাবা, এই তো আমি!

মেজদা অস্ফুটে বলল, ‘মা মাগো, আর পারছি না, এবার আমি ঘুমোব। বড্ড ঘুম পাচ্ছে। ছোটোদুটোকে (আমাদের দুই ভাইবোনকে) তুমি দেখো, দুষ্টমি করলে ওদের বকবে কিন্তু মারবে না!”

কথা থেমে আসছিল মেজদার। তাও জোর করে বলল, ‘মা… আর বোধহয় তোমার সঙ্গে দেখা হবে না।’

মা বলল, “না বাবা না, দেখা হবে। আমি বলছি দেখা হবেই, আর একটু কষ্ট কর, তোর বাবা এখনই এসে পড়বে!”

দুর্যোগ একেবারে থেমে গিয়েছে। বাইরে গাড়ির শব্দ। বাবা অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে একছুটে ঘরের মধ্যে ঢুকে এলেন। তখনও মায়ের হাতের মধ্যে মেজদার হাতটা ধরা রয়েছে। মেজদা খুব জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। হুঁ… উ… হুঁ… উ, তার চোখ ততক্ষণে বন্ধ হয়ে গিয়েছে। গোঙানির শব্দে মেজদা তখনও বলে চলেছে, ‘বাবা… তাড়াতাড়ি এসো না। আর সময় নেই যে! আর সময়…।’ থেমে গেল মেজদার কথাগুলো। অঘটন যে ঘটতে চলেছে সেটা বুঝতে কারওরই বাকি রইল না।

মা মেজদার হাতটা নিজের হাতে নিয়ে বুকে চেপে ধরে বলতে লাগল— দেখা হবে বাবা, নিশ্চয়ই দেখা হবে।

বাবা ঘরে ঢুকেই বললেন ডাক্তারবাবু, শিগগিরই অক্সিজেনটা লাগান। ও ভালো হয়ে যাবে! মেজদার হাতটা মায়ের হাতে তখনও ধরা ছিল।

ডাক্তারবাবু মেজদার হাতটা মায়ের হাত থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বললেন, ‘অক্সিজেন আর লাগবে না!” বলেই মাথা নীচু করে নিলেন। সকলে স্তম্ভিত। কাকিমা জেঠিমাদের মুখে আঁচলের খুঁট। দাদা দিদি চিৎকার করে উঠল। তখনই মা ছুটে গিয়ে পাশের ঘরে দরজা দিয়ে দিলেন। আর বাবা ধপ করে মাটিতে বসে পড়লেন। সেই রাতটাও চোখের সামনে আজও দেখতে পাই।

দুঃসংবাদ পৌঁছোতে সময় লাগেনি। ভোরের আলো ফুটতেই বুঝেছিলাম আজকের ভোরটা সম্পূর্ণ অন্যরকম। বড়দা আর বাবা ছোটাছুটি করছে আত্মীয় পরিজনকে দুঃসংবাদ পাঠানোর জন্যে। আমার মনে আছে, মেজদার নিষ্প্রাণ দেহটা শোয়ানো আছে আর আমরা ছোটো দুজন পাশে বসে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছি মুখের দিকে। কান্না গুমরে উঠলেও চোখের জলটা পড়ছে না, শুকিয়ে গিয়েছে। মৃত্যু সম্বন্ধে ধারণাটা তখনই সদ্য পাকাপোক্ত হয়ে উঠছে।

ধীরে ধীরে সারা বাড়িটা লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠল। প্রত্যেকের মুখেই মেজদার প্রশংসা শুনছি। ওতটুকু বয়সে সে সকলের মন জয় করে নিয়েছিল। মেজদাকে দাহ করার জন্যে নিয়ে যাবার সময় অনেক ডাকাডাকি করার পরেও মা দরজা খোলেনি। পরে কাঠ-মিস্ত্রি নিয়ে এসে দরজা খুলিয়ে দেখা গিয়েছিল মা অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে আছে।

সব শেষ! জোড়া উপনয়ন ভেঙে গেলো…

মেজদা মারা যাবার পর মা ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। একঢাল কালো চুল পিঠ ছাড়িয়ে হাঁটুর নীচে দুলত আর প্রতিমার মতো মুখ আমার মা খুব উদাস মুখে আমাদের সামনে ঘুরে বেড়াত। যেন শরীরটাই আছে বাকি সবটুকু মেজদা নিয়ে চলে গিয়েছে। আমরা কাছে গেলে মা সহ্য করতে পারত না। ঠেলে সরিয়ে দিত। বারকয়েক বিভিন্ন ভাবে নিজেকে শেষ করে দেবার চেষ্টাও করেছিল! মাকে সুস্থ করার জন্যে বাবা আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলেন। কিছুতেই মাকে প্রতিদিনের জীবনে ফেরানো যাচ্ছিল না। শেষে ডাক্তারের পরামর্শে ওই বাড়িটা ছেড়ে আমরা অন্যত্র চলে গিয়েছিলাম।

সেখানে একদিন মাঝরাতে মা বিছানা ছেড়ে ঘর থেকে সবে বাইরে বেরোতে যাচ্ছে, ঘুম ভেঙে গেল আমাদের। আমরা ছোটো দুই ভাইবোন মায়ের শাড়ির আঁচলটা চেপে ধরে মাকে জড়িয়ে ধরলাম। হঠাৎই মা আমাদের দু’জনকে বুকের সঙ্গে চেপে ধরল আর তারপর মা যত কাঁদছে আমরাও তত কাঁদছি। মেজদা মারা যাওয়ার পর মাকে সেই প্রথম কাঁদতে দেখেছিলাম। এর পর ধীরে ধীরে মা স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল।

তারপর বহু বছর কেটে গিয়েছে। স্মৃতি ফিকে হয়ে গিয়ে জীবন স্বাভাবিক ছন্দে চলতে চলতে অনেকটা পথ পেরিয়ে গিয়েছে। ততদিনে বাবা মারা গিয়েছেন। আমার অসুস্থ মেজদিও মারা গিয়েছে। মা সব শোকতাপ মেনে নিয়ে ঠিকই ছিলেন। আমরা ভেবেছিলাম মা হয়তো মেজদার কথা ভুলে গিয়েছে।

ক্রমে ক্রমে মায়েরও বয়স বাড়ল। হঠাৎ-ই একদিন মা অসুস্থ হয়ে পড়ল। ডাক্তার ঘর আমাদের সব প্রচেষ্টা বিফলে গেল। হাসপাতালের ডাক্তারবাবু বললেন, ‘ক’টা দিন বাড়িতেই রাখুন। সময় বেশি নেই।”

দিন চারেক ঠিকই ছিল। মারা যাওয়ার আগেরদিন রাত্রিবেলা থেকে সবাইকে চমকে দিয়ে মা মেজদার নাম ধরে ডাকতে শুরু করল— অস্ফুট ক্ষীণ স্বরে অপু, অপু…

মুখের কাছে মাথা নিয়ে গিয়ে কান পেতে শোনার চেষ্টা করলাম। আমরা ভাইবোনেরা মা মা করে ডেকেও কিছুতেই সাড়া পাইনি। সন্ধে থেকেই মা কিছুটা যেন ঘোরের মধ্যে ছিল। যদিও একই ঘরে আমরা সকলেই ছিলাম তবুও সবাইকে ঘুমোতে বলে আমি মায়ের পাশে বসেই রইলাম। ভোরের দিকে আমার একটু তন্দ্রা এসে গিয়েছিল। অপু নামটা আবার কানে আসতেই তাকিয়ে দেখি, মা ভীষণরকম ছটফট করছে আর খুব জোরে জোরে নিঃশ্বাস পড়ছে।

অসংলগ্ন ক্ষীণ স্বরে একই কথা বলছে— অ…প..পু, এ…ই তো আ…মি! আসছি… দেখা অ…বে..ই! বুঝলাম মাকে আর ধরে রাখা যাবে না! ‘মা মা’ করে ডেকেও সাড়া না পেয়ে আমি মায়ের হাতটা ধরতেই, হাতটা পড়ে গেল বিছানায়। মা চলে গেলেন।

মেজদার সঙ্গে মায়ের দেখা হয়েছিল কি না আমার জানা নেই। ভেবেছিলাম হয়তো সময়ের সাথে সাথে মা নিশ্চয়ই ভুলে গিয়েছে। কিন্তু মৃত্যুশয্যায় মেজদাকে দেওয়া কথাটা আমার মা যে হৃদয়ের এত গভীরে এতদিন ধরে লালন করে রেখেছিল। সেটা মায়ের মৃত্যুশয্যায় আমরা জানতে পারলাম।

আমাদের মনের গহিনে অনেক কিছুই লুকিয়ে বিরাজ করে। অবচেতনে সুপ্ত থেকে যায় অনন্তকাল। আজও মাঝে মাঝে মায়ের কথা মনে এলেই মায়ের গায়ের সেই গন্ধটা অনুভব করতে পারি। মনে মনে মায়ের দিকে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ি।

পাকযন্ত্রকে সুস্থ রাখার উপায়

প্রাত্যহিক কর্মজীবনে পাকযন্ত্রকে সুস্থ রাখার জন্য কোন কোন বিষয়গুলিকে মাথায় রাখতে হবে, তা জেনে নেওয়া জরুরি। যেমন, ব্রেকফাস্ট করতে হবে ভারী। লাঞ্চ হবে হালকা এবং ডিনারটিও করতে হবে হালকা। এটাই হচ্ছে প্রাত্যহিক জীবনের ভালো খাদ্যাভ্যাস। তাছাড়া তেল-মশলা জাতীয় খাবারকে বর্জন করতে হবে। অ্যালকোহল ও ধূমপান বর্জন করতে হবে। ভালো ভাবে তৈরি টাটকা খাবার খেতে হবে এবং রেস্তোরাঁর খাবারকে এড়িয়ে চলতে হবে। কলকাতা-র সল্টলেক-এ অবস্থিত, এএমআরআই হাসপাতাল-এর অঙ্কোসার্জারি এবং অ্যাডভান্সড ল্যাপারোস্কোপিক কনসালটেন্ট জিআই সার্জন ডা সঞ্জয় মণ্ডল এই বিষয়ে জানিয়েছেন বিস্তারিত।

বর্তমান সময়ে পড়াশোনার কারণে ছাত্রদের মধ্যে প্রচণ্ড ভাবে মানসিক চাপ তৈরি হচ্ছে। একইসঙ্গে দেখা যায় যে তাদের পাচন প্রক্রিয়াটিও যথাযথ নয়। ছেলেমেয়েদের পাকযন্ত্রকে সুস্থ রাখার জন্য তাদের বাবা-মায়েদের কী টিপস দেবেন ?

ছেলেমেয়েদের বাড়িতে তৈরি খাবার দিতে হবে। খাবার হতে হবে সুষম ও পুষ্টিকর। বাইরের রেস্তোরাঁর খাবার থেকে তাদের দূরে রাখতে হবে। ছেলেমেয়েদের টাটকা ফল ও তরিতরকারি খেতে উৎসাহিত করতে হবে। ঠান্ডা ও নরম পানীয় এড়িয়ে চলতে হবে।

কেউ যদি তার জীবনচর্যার প্রাত্যহিক নির্ঘন্টকে নতুন করে সাজাতে চায়, তাহলে সেখানে স্বাস্থ্যকর পরিকল্পনা কী হতে পারে?

নিয়মিত ভাবে ব্যায়াম করতে হবে। সময়মতো এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে ও সঠিকমাত্রার ক্যালোরি যুক্ত খাবার খেতে হবে। অস্বাস্থ্যকর খাবার বর্জন করতে হবে।

ডায়েটিং কতটা স্বাস্থ্যসম্মত অথবা সঠিক ডায়েটটাই বা কী?

খাবার এড়িয়ে গিয়ে কখনওই ডায়েটিং হতে পারে না। সঠিক সময় উপযুক্ত ও পর্যাপ্ত মাত্রায় খাবার গ্রহণ করেই সঠিক ডায়েটিং হতে পারে। অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার, চিনি ও তেল-মশলা জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলতে হবে।

অ্যাসিডিটি’র কারণ কী? এর প্রভাব এবং এর থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?

অ্যাসিডিটি হল কোনও মানুষের দেহের পাকস্থলি থেকে অতিরিক্ত মাত্রায় অ্যাসিড ক্ষরণের ঘটনা। এর কারণে পেটের উপরের দিকে ব্যথা হয় এবং বমি বমি ভাব তৈরি হয়। এর মাত্রা বেড়ে গেলে পাকস্থলিতে ক্ষতের সৃষ্টি হয়। সেখান থেকে রক্ত বের হয় এমনকী অন্ত্রে ছিদ্রও হয়ে যেতে পারে। এর চিকিৎসায় অ্যান্টাসিড খেতে হয়। কোনও কোনও ক্ষেত্রে চিকিৎসা হয় প্রোটন পাম্প ইনহিবিটার-এর সাহায্যে, যাকে পিপিআই বলা হয়ে থাকে।

সুস্থ পাকযন্ত্রের জন্য কোনও ব্যায়াম কি রয়েছে?

সুস্থ পাকযন্ত্র তৈরির ক্ষেত্রে কোনও সুনির্দিষ্ট ব্যায়াম নেই। তবে সার্বিক ভাবে নিয়মিত ব্যায়াম করলে সেটা শরীর এবং পরিপাক প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে ভালো হয়৷

সুস্থ জীবনপ্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে হলে দিনের শুরুতে ব্রেকফাস্ট কীরকম হতে হবে?

ব্রেকফাস্ট হল দিনের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আহার। ব্রেকফাস্ট-এ সবচেয়ে বেশি পরিমাণে ক্যালোরি যুক্ত খাবার রাখতে হবে। ব্রেকফাস্ট কিংবা অন্য যে-কোনও খাবারই হোক না কেন, খাবার হতে হবে প্রাকৃতিক ও স্বাস্থ্যকর। রিফাইন্ড কার্বোহাইড্রেট এবং অত্যধিক পরিমাণে তেল ও চর্বি জাতীয় খাবার বর্জন করতে হবে।

ভারী অথবা তেল, মশলাযুক্ত খাবার গ্রহণের পর তাৎক্ষণিক ভাবে এর প্রতিকার কী হতে পারে?

যে-কোনও মানুষেরই উচিত সবসময় ভারী আহার এড়িয়ে চলা। তবে যদি কোনও কারণে ভারী আহার হয়ে যায়, তখন সমস্যা দেখা দিলে অ্যান্টাসিড খাওয়া যেতে পারে। সঙ্গে এনজাইমও খেতে হবে। এই এনজাইম খাবারকে হজম করতে সাহায্য করে।

সুস্থ ও কর্মঠ ভাবে বাঁচার জন্য দৈনন্দিন রুটিন কী হওয়া উচিত?

নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে। নিয়ম করে আহার গ্রহণ করতে হবে। মানসিক চাপমুক্ত হয়ে থাকতে হবে। পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমোতে হবে। অতিরিক্ত মাত্রায় চা, কফি ও এনার্জি ড্রিংকস বর্জন করতে হবে।

নানান কারণে ক্ষুধামান্দ দেখা দিতে পারে। অধিকাংশ সময়ই এটা দেখা দেয় সীমিত সময়ের জন্য। তখন এর জন্য কোনও চিকিৎসারও প্রয়োজন হয় না। তবে যদি এই ঘটনা বেশিদিন ধরে চলতে থাকে এবং দিন দিন দেহের ওজন কমে যেতে থাকে, তখন অবশ্যই এই বিষয় নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

৫০ বছরের বেশি বয়সি মানুষের পরিপাক ক্রিয়া সঠিক ভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় টিপ্‌স কী হতে পারে ?

প্রতি ঘন্টা ছাড়া ছাড়া হালকা খাবার গ্রহণ করতে হবে। অতিরিক্ত লবণ এবং অতিরিক্ত চিনি খাওয়া বর্জন করতে হবে।

উপনয়ন (পর্ব-০১)

শৈশবের পৃথিবীটা আমাদের কাছে একটু অন্যরকমই ছিল। ঠিক যেন মিহি সুতোয় বোনা বিচিত্র ফুলতোলা নকশার মতো। পায়ের তলার মাটি, গাছপালা, মাথার উপর আকাশ সবই রয়েছে আগের মতোই, কিন্তু না! এখন কেমন যেন সবটুকু হারিয়ে গিয়েছে বলে মনে হয়।

কালবৈশাখী ঝড়ের পর প্রথম বৃষ্টির ফোঁটায়, ভিজে মাটির সোঁদা গন্ধ আর অনুভব করতে পারি না। এক বুক নিঃশ্বাস নিলেও কুয়াশায় ছাওয়া শীতের সকালে ভেজা ঘাসের গন্ধ আর আগের মতো টের পাই না। সন্ধেবেলায় মা নিজের হাতে পরিপাটি করে নিকোনো মাটির উনুনে আঁচ দিলে, উনুনের সেই ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে উপরে উঠে যেত। সেই ধোঁয়ার অদ্ভুত একটা গন্ধ আমাকে কতবার ভিন্ন ভিন্ন স্মৃতিতে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছে।

কিছু গন্ধ এখনও অনুভূত হলে তা আজও টেনে নিয়ে যায় সেই ছোট্টবেলায়। যেমন, মায়ের গায়ের গন্ধ আজও লেগে আছে আমার সারা শরীরে-মনে। সব কাজ সেরে অনেক রাতে মা যখন বিছানায় আসত, তখন ঘুমের মধ্যেও মায়ের অস্তিত্ব টের পেয়েই মায়ের দিকে ফিরে শুতাম। শীতকালে পয়লা গুড় আর পুলি-পিঠের গন্ধ, আহঃ! বছর শেষে নতুন ক্লাসে নতুন বইয়ের পাতায় পাতায় জমে থাকা গন্ধ সে কি ভোলা যায়!

শৈশবের কথা মনে আসলেই মনের কোণে জমে থাকা অজস্র স্মৃতির ভিড়ে হারিয়ে যাই। মনে পড়ে বর্ষাকালে কাপড় টাঙিয়ে অন্ধকার ঘরে ভূত ভূত খেলতাম। কিন্তু সন্ধে হলেই ভূতের ভয়ে এক ঘর থেকে অন্য ঘরে যেতে পা সরত না। জানি না কী ছিল সেই শৈশবে! তবে, অফুরন্ত প্রাণচাঞ্চল্য ছিল আমাদের মধ্যে।

তখন ঘরবাড়ি রাস্তাঘাট এত আলো ঝলমলে ছিল না। সন্ধে নামলেই অন্ধকার ঘিরে ধরত। হলুদ বাল্বের টিমটিমে আলোয় কোনওরকমে রাতটা কেটে গেলে ভোর হতে না হতেই, ঘুম ভাঙা চোখে ছুটে বাইরে চলে আসতাম। ততক্ষণে সাজি হাতে সঙ্গী-সাথিরা সকলে এসে হাজির হতো ফুল তুলতে যাওয়ার জন্যে। ভোরের আকাশ দেখে ঘোর বিস্ময় লাগত। উদিত রবির কিরণে রাঙা হয়ে উঠছে পুবদিক! কত পাখি ডাকছে! কত ফুল ফুটেছে!

বড়ো হবার পর কখনও কখনও আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে হতো গতকাল সকালে কি সবকিছু ঠিক এমনই ছিল! কি জানি! তবে কিছু ঠিক থাকুক আর নাই থাকুক, সীমাহীন আনন্দ ছিল।

আমরা গুটিকয়েক ভাইবোন, তার সঙ্গে পাড়ার ছেলেমেয়ের দল এসে জুটত আমাদের বাড়িতে। সারাদিন হইচই, খেলাধুলা লাফঝাঁপ— কিছুর কমতি ছিল না। কিন্তু সেই আনন্দময় ছেলেবেলায় আমাদের বাড়িতে একটা দুঃখের ঘটনা ঘটে গিয়েছিল। আচমকা আমার মেজদার মৃত্যু! মেজদার নাম ছিল অনুপম। মা ডাকত অপু বলে। ছোটোবেলার সেই ঘটনাটা ভাবলে আজও মুচড়ে ওঠে বুকের ভেতরটা।

ঘটনাটা যখন ঘটেছিল তখন আমি খুবই ছোটো। আমার বাবা, বড়দা ও মেজদার জোড়া উপনয়নের আয়োজন করেছিলেন। সেই উপনয়ন অনুষ্ঠানকে ঘিরে আমাদের উচ্ছলতা এবং উচ্ছ্বাসের শেষ ছিল না। এপ্রিল মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের শনিবার অনুষ্ঠান হবে বাড়িতে। মা-বাবা ব্যস্ত অতিথি নিমন্ত্রণ, বাজার দোকান এবং উপনয়নের বিভিন্ন আয়োজনের ব্যবস্থাপনায়৷

অভিশপ্ত সেই দিনটা ছিল মঙ্গলবার। সন্ধেবেলা দিম্মা আর মেজো মাসি আসবে শুনে আমাদের আনন্দ আরও দ্বিগুন হয়ে উঠেছে। দিম্মা আসা মানেই আমাদের ‘পোয়া বারো’। বড়দা তখন সদ্য ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হয়েছে, কাজেই কলেজে তাকে যেতেই হবে। শাস্ত্রের বিধান অনুযায়ী উপনয়নের পর তিনদিন ওদের দু’জনকে দণ্ডিঘরে থাকতে হবে। তারপর আত্মীয়স্বজন চলে গেলে তবে বাড়ি স্বাভাবিক ছন্দে ফিরবে। আমরা ছোটোরা তো মহা আনন্দে আছি। স্কুলে যেতে হবে না! পড়তে বসতে হবে না! এই ক’দিন শুধুই আনন্দ আর আনন্দ।

দুপুর শেষে আমাদেরকে বাড়ির ভেতরে রেখে, বাইরে থেকে খিড়কি দরজায় শিকল তুলে দিয়ে, মা পাশের বাড়িতে গিয়েছিলেন ঘর-যগ্যির বাসন আনতে। তখন তো বিবাহ, উপনয়ন, অন্নপ্রাশনের মতো সব অনুষ্ঠানগুলো বাড়িতেই হতো। অন্তত তিন-চার দিন আগে থেকেই খুব নিকট আত্মীয়রা চলে আসতেন অনুষ্ঠানের আয়োজনে সহযোগিতা করার জন্যে।

আমাদের বাড়ির বাগানে আম, জাম, কাঁঠাল গাছের সঙ্গে একটা লিচুগাছও ছিল। এইসময় লাল লাল লিচুতে ভর্তি হয়ে যেত গাছটা। সকলেরই নজর পড়ত গাছটার দিকে।

মা পাশের বাড়িতে চলে যাবার পরেই মেজদা আর সেজদা খিড়কি দরজা বেয়ে পাঁচিল পেরিয়ে সোজা গিয়ে উঠল লিচুগাছে। পাশের বাড়ির বারান্দা থেকে দেখতে পেয়ে মা বারণ করতেই ওরা নেমে এসেছিল গাছ থেকে। কিন্তু মা বারান্দা থেকে সরে যেতেই আবার গিয়ে গাছে উঠে পড়েছিল। সেইসময় মেজদি ছোড়দি ঘরের ভেতরে ছিল আর আমরা ছোটো দুই ভাইবোন বাড়ির উঠোনে বসে দেখছি, ওরা গাছ থেকে নামছে আর উঠছে। পাঁচিলে উঠতে যাবার সময় সেজদা আমার মাথায় টোকা মেরে বলেছিল— মাকে বলে দিলে কিন্তু একটাও লিচু পাবি না! আমি শুধু মাথা নেড়েছিলাম।

দুইভাই মনের সুখে লিচু ছিঁড়ছে আর ব্যাগে ভরছে। আচমকা ভীষণ জোরে মড় মড় করে গাছের ডাল ভেঙে পড়ার শব্দ হল। সেই বিকট শব্দ আর সেজদার চিৎকারে সকলে ছুটে এসে দেখে ডাল ভেঙে মেজদা পড়ে গিয়েছে। গাছের নীচে একটা সরু শুকনো নালি ছিল। তার মধ্যে মেজদার মাথাটা আটকে গিয়েছে। আর বাকি শরীরটা নালির বাইরে উঁচু হয়ে উঠে রয়েছে। সবাই এসে কোনও মতে মাথাটা টেনে বার করে মেজদাকে তুলে নিয়ে গিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল। ঘটনার আকস্মিকতায় সেজদা হতচকিত হয়ে পড়েছিল।

আমার বেশ মনে আছে, সময়টা ছিল কালবৈশাখীর। সহসা নির্মেঘ আকাশে দুর্যোগ ঘনিয়ে এল। সারা আকাশ কালো করে কালবৈশাখী ঝড় উঠল। চারিদিক ধুলোয় ধুলো। গাছের ডালপালা ভেঙে পড়ছে, টালির চাল উপড়ে যাচ্ছে, সেইসঙ্গে বাঁধভাঙা বৃষ্টিও শুরু হয়েছিল অঝোর ধারায়।

বাবা দুপুরে বেরিয়েছিলেন শুভ উপনয়নের আচার-উপচার সম্বলিত পুরোহিতের দেওয়া তালিকা নিয়ে। আয়োজনে যেন কোনও ত্রুটি না থাকে। লিচুগাছ থেকে মেজদার পড়ে যাওয়ার খবর মুহূর্তে ঝড়ের বেগে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল। বাবা খবর পাওয়া মাত্রই বাজার দোকান সব ফেলে দিয়ে ঝড় মাথায় নিয়ে বাড়িতে চলে এল।

একটু পরে মেজদা বমি করতে শুরু করল। মা খুব উদ্বিগ্ন হয়ে গিয়ে কী করবে ভেবে উঠতে পারছে না। তখনও মেজদা শান্ত অস্ফুট স্বরে বলে চলেছে, ‘মা তুমি চিন্তা কোরো না, আমার কিচ্ছু হয়নি। এখনই ঠিক হয়ে যাবে…’

এদিকে ঝড়- -বৃষ্টি থামার কোনও লক্ষণ নেই। হ্যারিকেনের আলো আর ঘন ঘন বিদ্যুতের চমকে হঠাৎই যেন ভয়ংকর চেহারা নিয়ে হাজির হয়েছিল সন্ধেটা। ভয়ে সিঁটিয়ে বসেছি আমরা ছোটো দুই ভাইবোন। প্রতিবেশী কাকিমা জেঠিমারাও এসেছেন। সামাল দিতে পারছে না কেউই। মেজদা আরও দু’বার বমি করল। বাবা ঝড়-বৃষ্টির মধ্যেই পাশের বাড়ির জেঠুকে নিয়ে ওদের জিপ গাড়ি করে বেরিয়েছেন ডাক্তার আনতে। সকলেই উতলা হয়ে উঠেছে কতক্ষণে ডাক্তার আসবে! রাস্তায় গাছের ডাল ভেঙে পড়েছে, সেইসঙ্গে ইলেক্ট্রিকের তারও ছিঁড়ে পড়ে আছে। সবরকম যানবাহন চলাচল বন্ধ।

গরমকালে হজমের সমস্যা এড়ানোর উপায়

ভালো খাবার আমরা সকলেই উপভোগ করি কিন্তু সেই খাবার কীভাবে হজম হবে তা আমরা ভাবি না। আমাদের মতো গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশগুলিতে গরম এবং আর্দ্র আবহাওয়ার মিশ্রণ কখনও কখনও খাবারের হজম ব্যাহত করে।

তাই, আমরা যদি খাদ্যাভ্যাসের প্রতি যত্নবান না হই, তাহলে আমাদের স্বাস্থ্য গভীর সমস্যায় পড়তে পারে। পর্যাপ্ত সূর্যালোকের অভাব এবং সূর্যালোকের পর্যাপ্ত এক্সপোজারের অভাবের সঙ্গে সম্পর্ক-যুক্ত হজম। এর ফলে আমাদের শরীরে ভিটামিন ডি-র সংশ্লেষণ হ্রাস করে, যার পরিণাম দুর্বল হাড়। চা এবং কফির মতো প্রচুর গরম পানীয়, এগুলিতে প্রচুর ক্যালোরি থাকে এবং ক্যালোরি ক্ষয় না হলে দীর্ঘমেয়াদে আমাদের জন্য ক্ষতিকারক। এর উপরে, কোনও রকম ওয়ার্কআউট করা বন্ধ থাকলে আরও ওজন বৃদ্ধি পেতে পারে।

আরেকটি পানীয় যা কিছু মানুষের পান করার অভ্যাস থাকে, তা হল অ্যালকোহল। তবে এটি অতিরিক্ত গ্রহণ করলে তা শুধুমাত্র স্বল্পমেয়াদে নয়, দীর্ঘমেয়াদেও ক্ষতিকারক। অত্যধিক অ্যালকোহল স্বল্প মেয়াদে রিফ্লাক্স এসোফ্যাগাইটিস, গ্যাস্ট্রাইটিস এবং দীর্ঘমেয়াদে লিভারের সিরোসিস, হৃদরোগ, প্যানক্রিয়াটাইটিস এবং স্থূলতার দিকে পরিচালিত করে। অনেকের জল কম পান করার প্রবণতা রয়েছে। এর ফলে ডিহাইড্রেশন হতে পারে, যা কিডনির সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে, বিশেষত তাদের, যাদের কিডনিতে পাথর রয়েছে।

ডিহাইড্রেশনের ফলে কোষ্ঠকাঠিন্যের সম্ভাবনা এবং পাইলস ও ফিসারের সমস্যাও বেড়ে যায়। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে, নিয়মিত ভালো পরিমাণে তরল, বিশেষ করে জল গ্রহণ করে হাইড্রেটেড থাকতে হবে। গরমকালে শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণের সম্ভাবনা বেশি থাকে। তাই আমাদের সঠিক যত্ন এবং সুষম খাদ্য গ্রহণ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রোগ এবং সংক্রমণের সম্ভাবনা হ্রাস পেলেই নিশ্চিন্তে জীবনযাপনের সুযোগ মিলবে।

প্রবাদ আছে— যার পেট ভালো, তার সব ভালো। যারা পেটের অসুখে ভুগেছেন অথবা ভুগছেন, তারা অন্তত এই প্রবাদের যথার্থতা উপলব্ধি করতে পেরেছেন। আসলে, শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ভালোমন্দ অনেকটাই নির্ভর করে পেটের সুস্থতার উপর। একটু ভালো ভাবে নজর রাখলে প্রমাণ পাবেন, মাথার চুল পড়ে যাওয়া এবং ত্বকের জৌলুস হারিয়ে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হল ওই পেটের অসুখ।

তবে শুধু চুল পড়া কিংবা ত্বকের সমস্যাই নয়, পেপটিক আলসার কিংবা লিভার ক্যানসারের মতো বড়ো অসুখগুলির সূত্রপাতও কিন্তু নিয়মিত হজমের গোলমাল কিংবা অ্যাসিডিটি থেকে। অতএব, পেটের সুস্থতা জরুরি। কীভাবে পেট ভালো রাখবেন, সেই বিষয়ে একগুচ্ছ গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিলেন ডা. সঞ্জয় মণ্ডল।

প্রতিদিন সকালে অ্যান্টাসিড খাওয়া কি পাকযন্ত্রের পক্ষে ভালো?

বিনা প্রয়োজনে ওষুধ খাওয়া উচিত নয়। কেবলমাত্র সেই সমস্ত মানুষেরই ওষুধ খাওয়া উচিত, যাদের শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। এই বিষয়টি অ্যান্টাসিড গ্রহণের ক্ষেত্রেও সমান ভাবে প্রযোজ্য। নিয়মিত কখনওই অ্যান্টাসিড খাওয়া উচিত নয়।

একজন ডায়াবেটিক রোগী কীভাবে তাঁর পরিপাক সম্পর্কিত বিষয়গুলিকে বিবেচনা করবেন ?

একজন ডায়াবেটিক রোগীকে প্রথমেই চিনি ও কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাদ্য বর্জন করতে হবে। তাঁদের খাদ্য তালিকায় রাখতে হবে প্রোটিন জাতীয় খাবার। অন্যান্য সাধারণ মানুষের মতোই অত্যধিক তেল ও মশলা জাতীয় খাবারকে তাদের খাদ্য-তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে। খাদ্য-তালিকা হতে হবে সুষম এবং খাদ্য গ্রহণ করতে হবে পর্যাপ্ত সময়ের ব্যবধানে। ডায়াবেটিক রোগীকে ভরপেট খাওয়া এড়িয়ে চলতে হবে। খাবারের মধ্যে ক্যালোরি’র মাত্রাকে সঠিক ভাবে ধার্য করে খাবার খেতে হবে। একজন ডায়াবেটিক রোগীকে ইনসুলিন ও ওরাল হাইপোগ্লিসিমিক্সকে এড়িয়ে যাওয়া বন্ধ করতে হবে।

পাত্রপক্ষ

পিসিমা হাই সুগারের রুগি, তাই মিষ্টি খাওয়া একেবারে মানা। এটা শুনে পাত্রীর বাবা দৌড়ে গিয়ে পাড়ার হরি ময়রার দোকানের বিখ্যাত হিংয়ের কচুরী নিয়ে এলেন। লোভে পড়ে পিসিমার দ্বারা গোটা পাঁচেক কচুরী সাবাড়। আর তারপরই শুরু হল পিসিমার পেটে মোচড় দেওয়া। সে ভয়ংকর মোচড়, কোনও বাধা মানতে চায় না। পিসিমা প্রমাদ গুনলেন।

পিঠ সোজা করে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আপনাদের বাথরুমটা কোথায় দেখান। আর একটা গামছা দেন আমারে।” পিসিমার ভাইঝি অর্থাৎ আমার শ্যালিকা পিসিমার এই কাণ্ড দেখে লজ্জায় মরে যায় আর কী। এরপর ওই বিবাহের প্রস্তাবের গাড়ি সে যে কারণেই হোক বেশি দূর এগোয়নি। শ্যালিকাও পিসিমার সাথে আর কোনও পাত্রী দেখতে যায়নি।

আমার এক খুড়শ্বশুর ভীষণ রসিক মানুষ। এবার শোনাই ওনার মুখে শোনা গল্প। আগেকার দিনে কিছু ছেলে থাকত ভীষণ লাজুক। বাবা মাকে বলত, ‘মেয়ে তোমরাই দেখে পছন্দ করো। আমার যাওয়ার দরকার নেই।”

জলপাইগুড়িতে এরকমই একটি ছেলে আমার খুড়শ্বশুরের বন্ধু, তার সম্বন্ধ এল জলপাইগুড়ির এক বিত্তশালী পরিবার থেকে। ছেলেটি দিল্লিতে চাকরি করে। বাড়িতে আসবে বিয়ের আগে। বাবা, ছেলেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াতে গিয়ে প্রচুর ধারদেনা করেছেন। দেনা তখনও সব মিটিয়ে উঠতে পারেননি। ছেলে এসে বিয়ের আগে বন্ধুদের আড্ডাতে পৌঁছল। বন্ধুদের মধ্যে ফিসফিসানি! এক বন্ধু বলেই ফেলল, “হ্যাঁ রে তুই মেয়ে দেখেছিস!”

ছেলে বলল, “ওসব বাবা-মা সেরেছেন। ওনাদের পছন্দ ই আমার পছন্দ।”

এরপর ছেলে বহুবন্ধু পরিবৃত হয়ে টোপর পরে ছাদনাতলায় উপস্থিত হল। কনে এল পানপাতা দিয়ে মুখ ঢেকে জামাইবাবুদের ধরা পিঁড়িতে চড়ে। ঘনিয়ে এল শুভদৃষ্টির সময়। মুখের সামনে থেকে হাতের পান সরল। ছেলে অতি আকাঙ্ক্ষিত দর্শনের পরই আমার খুড়শ্বশুরের কাঁধে মাথা দিয়ে জ্ঞান হারাল।

কনের সামনের দিকের তিনটি দাঁত বিসদৃশ ভাবে উঁচু হয়ে ছিল। তখনকার দিনে উঁচু দাঁত নীচু করে স্বাভাবিক করার চিকিৎসা আসেনি। সব শোনার পর খুড়শ্বশুরকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘তারপর।ত

উনি বললেন, ‘তারপর আর কী! জ্ঞান ফিরতে ওই বিয়ে করবে না বলে জেদ ধরেছিল। বিয়ের জন্য মেয়ের বাবার থেকে অনেক টাকা পণ নিয়েছিলেন ছেলের বাবা। ধমকে ছেলেকে বিয়ের পিঁড়িতে বসালেন।”

আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, ‘তারপর!’

শ্বশুরমশাই বললেন, ‘তারপর আর কী, তিনটে বাচ্চা হল। সব ঠিক হয়ে গেল।”

এর বেশি আর ‘তারপর শ্বশুরমশাইকে জিজ্ঞেস করা যায় না। তার উপর রসিকবাচন পারদর্শী শ্বশুরমশাই।

এক আত্মীয়র আন্দামানে মারাঠি মেয়ের সাথে প্রেম হয়। মেয়েটি বাংলা ভাষা খুব তাড়াতাড়ি ভালোরকম শিখে ফেলে। এতে অবশ্য তার বাঙালি প্রেমিকেরও অবদান ছিল। বিয়ের আগে মেয়ের বাড়িতে এসে মেয়েটির ভবিষ্যতের নন্দাই মজা করে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘গুঁতোর মানে জানেন’

স্মার্ট উত্তর দেয়, ‘একটু এদিকে আসলেই বুঝিয়ে দিতে পারব।’

নন্দাইমশাই উত্তর দেন, ‘যাওয়ার দরকার নেই, বুঝেছি বাংলা শেখা অনেক দূর এগিয়েছে।”

মেয়ে দেখতে আসার আগে কমজোর মেয়েদের আগে ভালো করে ট্রেনিং দেওয়া হতো। প্রথম সতর্কবাণী, বেশি কথা বলবে না। দ্বিতীয় সতর্কবাণী, আজ অন্তত লাজুক ভাবে বসে থাকবে। তৃতীয় সতর্কবাণী, গুরুজন সবাইকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করবে। ঠাকুমার মুখে শুনেছি কোনও একটি মেয়েকে পছন্দ হওয়ার পর সম্বন্ধ ভেঙে যায়। কারণ বেরনোর সময় মেয়েটির কথায় নির্বুদ্ধিতার প্রকাশ হওয়াতে।

মেয়েটি দরজায় দাঁড়িয়ে বিনয়ের সাথে বলেছিল, ‘এখানে সম্বন্ধ পাকা না হলেও আপনারা আবার আসবেন।’ কথাটা খারাপ কিছুই বলেনি, লোকজন খারাপ ভাবে নিয়ে নেয়।

আর আরেক জায়গায় পাত্রী অতিরিক্ত মাথা নীচু করে প্রণাম করতে করতে পাত্রপক্ষের সাথে বসে থাকা নিজের ছোটো বোনকেও প্রণাম করে ফেলেছিল।

আমার এক পরিচিতা সাত তাড়াতাড়ি বিয়ের পিড়িতে বসবে না বলে জেদ করে কোনও মেক-আপ ছাড়াই, হাওয়াই চটি পরে, গায়ে কালো শাল জড়িয়ে অনিচ্ছুক ভঙ্গিমাতে পাত্রপক্ষের সামনে এসে বসে। সেই পরিচিতা যথেষ্ট সুন্দরী এবং ভালো মনের মেয়ে ছিল। জহুরির চোখকে ফাঁকি দিতে পারেনি সে। পাত্র বাবা-মার অনিচ্ছা সত্ত্বেও সেই মেয়েকে ওখানেই পছন্দ করে জানিয়ে দেয়। পরবর্তী জীবনে শ্বশুরবাড়িতে পুরো পরিবারের সবচেয়ে পছন্দের মানুষ হয়ে ওঠে মেয়েটি।

আগেকার দিনে মেয়ে গান গাইতে জানে কিনা সেটা সবচেয়ে আগে জিজ্ঞেস করা হতো। একটু আধটু গান গাইতে জানলেই চলত। মোটা মেয়ে হলে গান ধরত— আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে… আর তারপর আমার এই দেহ খানি তুলে ধর…।

আর কালো মেয়ে গাইত আপনারা ভাবছেন— কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি, মোটেই না। আগ বাড়িয়ে নিজের উইক পয়েন্টের ঢাক কেউ পেটায় নাকি?

একটু বিনয়ী কালো মেয়েরা গাইত— তুমি নির্মল কর মঙ্গল কর মলিন মর্ম মুছায়ে/ তব পূণ্য-কিরণ দিয়ে যাক মোর মোহ কালিমা ঘুচায়ে। অর্থাৎ আমি যেরকমই দেখতে হই না কেন, তুমি তোমার অন্তরের মহানুভবতা দিয়ে আমাকে উদ্ধার করো।

আবার একটু উদ্ধত কালো মেয়েরা গাইত — আমি রূপে তোমায় ভোলাব না, ভালোবাসায় ভোলাব / আমি হাত দিয়ে দ্বার খোলাব না, গান দিয়ে দ্বার খোলাব।

শেষ করি একটি মিষ্টি প্রেমের মিষ্টি পরিণতি দিয়ে। একই পাড়াতে থাকত একটি সুদর্শন ছেলে এবং অতি সুন্দরী একটি মেয়ে। দুজনেরই দু’জনকে খুব ভালো লাগত। আসতে যেতে একজন আরেকজনের দিকে না তাকিয়ে পারত না। দু’জনে সমবয়সি ছিল। ছেলেটি ভীষণ লাজুক, মেয়েটিকে গুছিয়ে কিছু বলার আগেই মেয়েটির সম্বন্ধ দেখে দিল্লিতে বিয়ে হয়ে গেল।

এরপর কর্মসূত্রে ছেলেটিও দিল্লি চলে যায়। সংসার হয় এবং পাকাপাকি ভাবে দিল্লিবাসী হয়ে যায়। এর অনেক দিন পর নিজের বিবাহযোগ্য ছেলের জন্য পাত্রী দেখতে দিল্লিতে সেই মেয়েটির বাড়িতেই পৌঁছোয় ছেলেটি পাত্রর বাবা হয়ে। আর পাত্রী ছিল অল্প বয়সের প্রেম নিবেদন করতে না পারা সেই মেয়েটিরই কন্যা। এক দেখাতেই বিয়ে পাকা।

সবার আগে লাফিয়ে পড়ে ছেলের বাবা মেয়ে পছন্দ হওয়ার সম্মতি জানিয়ে দিল। দুজনেই সযত্নে এড়িয়ে গেল নিজেদের পূর্ব পরিচয়ের ঠিকানা। আইনি জীবনসঙ্গী হিসেবে জীবনে পাওয়ার প্রাপ্তি অপূর্ণ থাকলেও, ‘বেয়াইন’ হিসেবে প্রেমিকাকে ফিরে পাওয়ার প্রাপ্তির মূল্য কম কীসে?

চেহারায় ঔজ্জ্বল্য ফিরিয়ে আনার ৭টি টিপ্স

আসছে বাংলা নতুন বছর। আর এই উপলক্ষ্যে সকলে নিজের পরিবার, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে হাসি আড্ডায় মেতে উঠতে চাইবেন। শুধু তাই নয়, সৌন্দর্যেও একে অপরকে টেক্কা দিতে শুরু হয়ে যায় উৎসবের আগে থেকেই ব্যস্ততা। এই প্রচেষ্টা নিজেকে আরও সুন্দর করে তোলার জন্য— যাতে শত শত মানুষের ভিড়ে আপনার সৌন্দর্য হারিয়ে না যায়।

এই প্রসঙ্গে কিউটিস স্কিন স্টুডিও-র কসমেটোলজিস্ট এবং ডার্মাটোলজিস্ট ডা. অপ্রতিম গোয়েল-এর মত হল— উৎসব অনুষ্ঠানে সকলেই চায় সুন্দর এবং আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে, যেটা মোটেই দোষের নয়। এই সময়গুলোতেই পরিবার কিংবা বন্ধুবান্ধব নিয়ে সকলে একসঙ্গে উৎসবে আনন্দ উপভোগ করে। সুতরাং দাগহীন ফ্ললেস ত্বক এই সময় সকলেরই চাহিদা থাকে। আর ঠিক এই কারণে দেওয়া হল অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ৭টি টিপ্‌স।

ময়েশ্চারাইজ করুন

ত্বককে ময়েশ্চারাইজ করা সব থেকে জরুরি এবং সহজ পদক্ষেপ। ত্বক হাইড্রেটেড রাখতে এবং ত্বকের উজ্জ্বলতা ফিরে পেতে দিনে ২-বার ত্বক ময়েশ্চারাইজ করুন।

এক্সফলিয়েট

মাইল্ড ফ্রান্স ব্যবহার করে সপ্তাহে ২-বার ত্বককে এক্সফলিয়েট করুন। এর ফলে ত্বকের বাইরের পরত থেকে ত্বকের মৃত কোশ সরাতে সুবিধা হবে। এটি ত্বকের নোংরা ও দূষণের প্রভাব দূর করে ত্বকের গ্লো ফিরিয়ে আনবে। এছাড়াও ত্বকের যত্নের জন্য যে-উপাদানগুলি আমরা ব্যবহার করি, সেগুলি যাতে সহজে ত্বকের গভীরে প্রবেশ করতে পারে, সেটাতেও অনেক সাহায্য পাওয়া যায়।

ক্লিনজিং

ত্বকের ধরন অনুযায়ী সঠিক ক্লিনজার ব্যবহার করে ত্বক পরিষ্কার রাখুন। ক্লিনজিং-এর আগে মুখে মেক-আপ থাকলে মাইসেলার ওয়াটার দিয়ে ত্বক অবশ্যই পরিষ্কার করে নিন।

হেলদি ডায়েট

  • ডায়েটে লবণ ও শর্করার পরিমাণ কম করুন। উৎসবে ডায়েট মেনে খাওয়া-দাওয়া করা মুশকিল ঠিকই কিন্তু এটা মেনে চলতে পারলে উজ্জ্বল ত্বকের সঙ্গে সঙ্গে দিনভর এনার্জিতে ভরপুর থাকতে পারবেন।
  • রিচ অ্যান্টিঅক্সিড্যান্টস-যুক্ত ফল যেমন সিট্রাস ফ্রুটস, বেরিজ, অ্যাভোকাডো রাখুন ডায়েটে।
  • ত্বকের ঔজ্জ্বল্য বাড়াতে রোজ ভিটামিন সি- ১০০০ মিলিগ্রাম ক্যাপসুল খান।
  • ত্বকের ইলাস্টিসিটি বজায় রাখতে এবং ত্বক হাইড্রেটেড রাখতে প্রচুর পরিমাণে জল পান করুন। এছাড়াও হ্যালুরোনিক অ্যাসিড সিরাম-এর প্রয়োগে ত্বক হাইড্রেটেড এবং মসৃণ থাকে। কারণ হ্যালুরোনিক অ্যসিড এক ধরনের সুগার মলিকিউল। এটি প্রকৃতিগত ভাবেই ত্বকেও মজুত থাকে। এটি থাকার ফলে ত্বক প্রাণোজ্জ্বল এবং হাইড্রেটেড থাকে তাই ত্বকের হাইড্রেশন বা আর্দ্রতা বজায় রাখতে হ্যালুরোনিক অ্যাসিড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে থাকে। ফেস অয়েলও শুষ্ক ত্বকের জন্য প্রয়োগ করা যেতে পারে।
  • শিট মাস্ক বা প্যাকের ব্যবহারও সপ্তাহে ১ বার অবশ্যই করুন। এতে চেহারা থেকে ক্লান্তি উধাও হবে এবং একইসঙ্গে রিল্যাক্সড ফিল করবেন।
  • মন থেকে স্ট্রেস দূরে রাখুন এবং পর্যাপ্ত ঘুমোন। এতে চেহারায় রিল্যাক্স লুক আসবে এবং ত্বকও গ্লো করবে। উৎসবে ঠিক এমনটাই দরকার যাতে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে পারেন আপনি।

কিছু সাশ্রয়ী ঘরোয়া উপাচার

গোলাপজল: প্লেন গোলাপজল দিয়ে রোজ শোবার আগে মুখ ১০ থেকে ১৫ মিনিট মাসাজ করুন। এতে ত্বকের ক্লান্তি দূর হবে এবং ত্বকের হারানো আর্দ্রতা ফিরে আসবে। দিনে বেশ কয়েকবার মুখে গোলাপজল স্প্রে করলে ক্লান্তি দূর হবে।

অ্যালোভেরা: সপ্তাহে ১-২ দিন অ্যালোভেরা পাক্স মুখে লাগালে ত্বক ময়েশ্চরাইজড থাকবে।

কাঁচা আলু: কাঁচা আলুর রস সপ্তাহে ১ থেকে ২ বার মুখে লাগিয়ে ১৫ মিনিট মালিশ করুন। এরপর জল দিয়ে মুখ ধুয়ে ফেলুন। এতে ত্বকের রঙের অসমতা দূর করতে সুবিধা হবে।

হলুদ: কাঁচা হলুদের সঙ্গে মধু মিশিয়ে মুখের ব্রণর উপর লাগালে হলুদের অ্যান্টিসেপটিক গুণাগুণের ফলে ব্রণ যেমন কম হবে, তেমন ত্বকের যে-কোনও ধরনের ইরিটেশনও দূর হবে।

এক চিমটে হলুদের সঙ্গে বেসন বা চালের গুঁড়ো মিশিয়ে পেস্ট বানিয়ে নিন। মাসে ১৫ দিনে একবার এটি ত্বকে প্রয়োগ করুন। এটি ত্বকের তৈলাক্ত ভাব দূর করে ত্বককে ব্রণর হাত থেকে সুরক্ষিত রাখে।

সম্বন্ধ বিভ্রাট

আজকাল ছেলেমেয়ের বিয়ে দিতে গিয়ে মানুষ নাজেহাল হয়ে যাচ্ছে। যারা নিজেরা ঠিক করে নিচ্ছে, সেই ছেলেমেয়েদের গল্প এখানে নয়। এখানে তাদের নিয়ে গল্প যারা সুবোধ ছেলে বা মেয়েটির মতো পাত্রী বা পাত্র নির্বাচনের দায় বাবা-মার হাতে ছেড়ে দিয়েছে।

সম্বন্ধ আনা এবং বিয়ে করিয়ে দেওয়া কাজটি বড়োই কঠিন। সফল হলেও একটা কিন্তু লোক লাগিয়েই দেবে। আর বিফল হলে তার গুষ্টির তুষ্টি একদিন দু’দিন নয়, দীর্ঘদিন চলবে। আজকাল এই কাজটা কিছু ব্যবসায়ী সংস্থা হাতে নিয়েছে। তাতে হতাশ হয়ে ফিরে আসার লাইন অবশ্য দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে।

আগেকার দিনে ছেলের জন্য পাত্রী দেখতে পাত্রের বাড়ির থেকে দল বেঁধে পাত্রীর বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হতো। এটা ছিল এক সম্মানজনক প্রতিনিধিত্ব। মনে যাই থাকুক না কেন ভাবটা থাকত- – মশাই আপনার ঘাড়ের বোঝা কমাতে এলাম, নির্ভর করছে আপনার কৃতকর্মের উপর। তাতে ছেলের বাবা-মা ছাড়া থাকত পরিবারের বা বন্ধুবর্গের মধ্যের একজন বিচক্ষণ ব্যাক্তি।

গুষ্টিশুদ্ধ নিয়ে এসেও নীতিবাগীশ পাত্রপক্ষের বয়ঃজ্যেষ্ঠর কড়া নির্দেশ আসত— কন্যা পছন্দ না হলে সেই বাড়ির অন্ন ধ্বংস করা অনুচিত হবে। কিন্তু এটা ভুলে যেত পাড়ার মিষ্টির দোকানদার, মিষ্টি আর ফেরত নেবে না। সব ক্ষেত্রে এই আদেশ অবশ্য কার্যকারী হতো না। বিশেষ করে খাদ্যরসিক পেটমোটা পিসেমশাই যদি থাকতেন।

মেয়ে পাত্রপক্ষের পছন্দ হলে, সবচেয়ে আগে বদলে যেত পাত্রীর বাবার শারীরিক ভঙ্গিভাবটা, খুব সস্তায় ভালো মাল ছেড়ে দেওয়া ব্যাপারীর মতন।

আমার মা যেচে পড়ে অনেক সমাজসেবা করতেন। প্রায়ই আবেগমথিত হয়ে পরোপকারিকতার ভূত মাথায় চাগাড় দিত। পাড়ার এক অতি ফোঁড়ে লোক কথায় কথায় চাকরি ছেড়ে দিয়ে বাড়িতে বসে যেতেন, আর তার খেসারত দিতেন ওনার স্ত্রী। বেচারিকে প্রচুর টিউশন পড়িয়ে কোনওমতে সংসারের হাল ধরতে হতো। ঘরে চার চারটি অবিবাহিত মেয়ে। খুব নিরীহ এক পুরোহিতমশাই আসেন তাঁর একমাত্র ছেলের জন্য বড়ো মেয়েটিকে নির্বাচন করতে। সমাজসেবার অঙ্গ হিসেবে আমার মা সম্বন্ধটা এনেছিলেন।

মাড়োয়ারিদের বাড়িতে জজমানি করে পুরোহিতমশাই ভালোই উপার্জন করেন। একমাত্র ছেলেকে নিয়ে নিজের সাদামাটা পাকা বাড়িতে নির্ঝঞ্ঝাট সংসার। পত্নি অনেকদিন আগেই গত হয়েছেন। ছেলেকে কাপড়ের দোকান খুলে দিয়েছেন বেহালা চৌরাস্তায়। মেয়েটি ক্লাস সিক্সের বেড়াও ডিঙোতে পারেনি। দেখতেও সাদামাটা, তবে মনটা খুব ভালো। এর আগে অনেক সম্বন্ধ এসেছে ও গেছে। এহেন পাত্রীকে ছেলের বউ হিসাবে পছন্দ করার পর পুরোহিতমশাই যারপরনাই বিপদের সামনে পড়লেন।

পাত্রীর বাবা হঠাৎ করে তাঁকে ইংরেজিতে ইন্টারভিউ নেওয়া শুরু করেন। বেচারা পুরোহিত তখন সবে পাত্রী নির্বাচন করে রসগোল্লার দিকে হাত বাড়িয়েছিলেন। রসগোল্লা হাতে নিয়ে তিনি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে পাত্রীর বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে অকপট স্বীকারোক্তি করলেন, ‘আপনি কী কন বুঝি না আমি।’ আমার মাতৃদেবী দেখলেন হাতে পাওয়া সাফল্য ছিটকে গেল বলে! সাকসেস রেট নীচে চলে যাবে… ঝাঁপিয়ে পড়ে পরিস্থিতি সামলে দিয়ে ডিল পাকা করলেন।

আমার এক পিসি ছেলের জন্য পাত্রী দেখতে গিয়ে ছেলের উপর রাগ করে উঠে এসেছিলেন এই বলে, “তুই এক কাজ কর একটা বরমালা এনে এখনই পরিয়ে দে, আমি চললাম।’

ভাইটি খুব অল্প বয়সে চাকরি নিয়ে বাইরে যায়, হাত পুড়িয়ে খায়। বেচারার আড্ডা দেওয়ার জায়গা ছিল না। না পারত সন্ধ্যাবেলার পার্টিতে বসতে। চাকরি পাওয়ার আট বছর বাদে বিয়ে করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল। ভাইটির মা দু’বছর ধরে ছত্রিশটি পাত্রী দেখেছেন, আর সব ক’টা না করার অকাট্য যুক্তি দিয়ে সম্বন্ধ বানচাল করেছেন।

এই প্রথম ভাইটি নিজে গেছিল দেখতে। পাত্রী দেখতে ভালো, বাড়িঘর ভালো, পড়াশোনাতেও মন্দ নয়। আট মাস বাদে অনার্স নিয়ে গ্র্যাজুয়েশনের ফাইনাল পরীক্ষা দেবে। আর এইখানেতেই বাঁধল মুশকিল।

মা বললেন, ‘পরীক্ষাটা দিয়ে পাস করে নিক, তারপরে পাকা কথা হবে।’ ছেলে দেখল সমূহ বিপদ, আবার একটা অজুহাত মা পেয়ে গেছে।

ছেলের মাসি মেয়ে দেখতে এসে ছেলেকে আড়ালে ডেকে বলেছিলেন, “শোনো বাবু, যদি সারাজীবন ব্যাচেলর না থাকতে চাও, নিজের বিয়ের সিদ্ধান্ত নিজেই নিও।’

বাবু ঝাঁপিয়ে পড়ে বলল, ‘পরীক্ষা হতে এখন অনেক দেরি। বিয়ের পর অনেক সময় পাবে।’ ব্যস, এতেই আগুনে ঘি পড়ল।

—আমি থাকতে এত বড়ো কথা। তোর বিয়ে তুই কর, বলে আমার পিসি ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে যান। বিয়ে সেই পাত্রীর সাথেই হয়েছিল এবং একমাসের মধ্যে। ছেলের জেদের কাছে হার মেনে মা অবশেষে রণে ভঙ্গ দেন।

এবার শোনাই আমার এক মাসতুতো শ্যালিকার মুখ থেকে শোনা গল্প। মাসতুতো শ্যালিকার ছিল এক বিধবা পিসিমা। পিসিমা এক ছেলে নিয়ে অল্প বয়সে বিধবা হন। জীবনের অনেক ঝড় ঝাপটা একাই সামলে ছেলেকে মানুষ করেন। ছেলে বিখ্যাত মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানির রিজিওনাল ম্যানেজার। যাদবপুরে কচুরিপানা ভর্তি জমি রাত জেগে জবরদখল করে তার উপর বাড়ি তুলেছেন পিসিমা। সেই জায়গা এখন উঠতি বনেদি পাড়া, আর সেই টালির চালের বাড়ি এখন তিন তলা আলিশান অট্টালিকা। পিসিমা কর্পোরেশন স্কুলে চাকরি করেন। এইমত অবস্থায় উপযুক্ত পাত্রর জন্য পাত্রী দেখা শুরু করলেন পিসিমা।

পিসিমার আপন বলতে দাদা, বউদি আর ভাইঝি। যেখানেই পিসিমা পাত্রী দেখতে যান, সাথে যান দাদা, বউদি ও ভাইঝি। জীবন যুদ্ধে প্রচুর লড়াই করে পিসিমার রসবোধ কমে কথাবার্তায় বেপরোয়া ভাব এসে গেছিল। মেয়ে দেখা হয়েছে, মেয়ে পছন্দও হয়েছে। ঠিক হল এবার ছেলে এসে দেখলেই বিয়ের ডেট ফাইনাল হবে।

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব