বিবাহবিচ্ছেদের পর সন্তানের অধিকার কার বেশি?

সুপ্রিম কোর্ট এক মামলার পরিপ্রেক্ষিতে জানিয়েছে যে, ৮ বছর বয়সি মেয়েকে মাসে ১৫ দিনের জন্য বাবার হেফাজতে দেওয়ার আদেশ ভুল, যদি বাবা তার মেয়েকে ঘরের খাবার না খাইয়ে রেস্তোরাঁর খাবার খাওয়ান। তাই, সুপ্রিম কোর্ট নিম্ন আদালতের সঙ্গে সম্পূর্ণ সহমত না হয়ে জানিয়েছে, মাসে মাত্র দুই দিন করে বাবা সঙ্গে রাখতে পারবেন তার মেয়েকে।

আসলে, এই মামলার স্বামী-স্ত্রীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে, স্বামী কর্মরত সিঙ্গাপুরে এবং তিনি ভারতে এসে প্রতি মাসে মেয়েকে কিছুদিন রাখতে চেয়েছিলেন নিজের সঙ্গে। কিন্তু মেয়ের মায়ের অভিযোগ ছিল এই যে, তার মেয়ের বাবা সিঙ্গাপুরে কর্মরত এবং তিনি তিরুবনন্তপুরমে এসে, একটি ভাড়া বাড়িতে মেয়েকে রেখে বাড়ির খাবার না খাইয়ে রেস্তোরাঁর খাবার খাওয়াচ্ছেন। ফলে মেয়ের শরীর খারাপ হচ্ছে।

যাইহোক, যা হওয়া উচিত ছিল তাই হল, যদি বাবা সন্তানের সঠিক যত্ন নিতে না পারেন, তাহলে সন্তানকে মায়ের কাছেই রেখে দেওয়া উচিত, যতক্ষণ না মা নিজেই অন্য কারণে সন্তানদের বাবার কাছে রেখে যেতে চান। যদি মা সন্তানের উপর তার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন সন্তানের মঙ্গলের জন্য, তাহলে কর্তব্য পালনে অক্ষমতার কারণে বাবার উচিত চুপচাপ মেয়ের মায়ের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া। তবে হ্যাঁ, পিতা হিসাবে সন্তানকে দেখার কিংবা সন্তানের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোর অধিকার তার অবশ্যই থাকা উচিত। এই বিষয়েও মেয়ের মা-কে সহযোগিতা করতে হবে।

সারা বিশ্বের আদালত এমন মামলায় ভরে আছে, যেখানে সন্তানদের হেফাজতের জন্য আদালতে আইনজীবীদের পিছনে প্রচুর অর্থ ব্যয় করছেন অনেক মা-বাবা। তারা দুজনেই যে টাকা খরচ করছেন, তা আসলে বাচ্চাদের ভবিষ্যতের মূলধন, যা বাবা-মায়েরা বোকার মতো বাচ্চাদের হেফাজতের জন্য নষ্ট করছেন। বাচ্চারা মায়ের সঙ্গে থাকবে এবং সন্তানের খরচ বাবা বহন করবেন, এটা মেনে নিতে কোনও আপত্তি থাকা উচিত নয়। এটি বিবাহ এবং সংসারধর্ম পালনে একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া এবং শর্ত। কারণ সন্তান উভয়ের হলেও, মা গর্ভধারণ করেন এবং বুকের দুধ খাইয়ে তাকে বড়ো করে তোলেন। আর তাই সন্তানকে বড়ো করে তোলার জন্য বাকি দায়িত্ব সন্তানের বাবাকেই বহন করতে হবে বিবাহবিচ্ছেদের পরও।

এই মামলায় আদালত সঠিক রায়-ই দিয়েছে। কারণ, সিঙ্গাপুরে বসবাসকারী একজন বাবা কীভাবে টানা ১৫ দিন ভারতে থাকতে পারেন? যাইহোক না কেন, অভিভাবকদের এইরকম একগুঁয়েমির ক্ষেত্রে আদালতও অনেক সময় অসহায় হয়ে রায়দান করে।

সম্পর্কের অবনতি হলেও মা-বাবাকে একসঙ্গে থাকতে হবে, এমন আদেশ কিংবা অনুরোধ কেউ করছেন না। কিন্তু, সন্তানের জন্য বাবাকে অনেকটা ত্যাগ স্বীকার করতেই হবে। কারণ, একা সন্তানকে বড়ো করা এবং সন্তানের জন্য আত্মসুখ বিসর্জন দিয়ে মা-ও তো চরম ত্যাগ স্বীকার করবেনই। অতএব, সন্তানের জন্য বাবা- কে আরও নমনীয় হতেই হবে।

ছদ্মবেশী (শেষ পর্ব)

কিছুই মাথায় ঢুকছিল না সুধাকরের। অফিস গেল না, সোজা ঘরে চলে এল। সুবোধকে একটা ফোন করে দিল— তুই এখুনি একবার আমাদের বাড়ি চলে আয়, জরুরি কথা আছে।

বাড়িতে গিয়ে সুধাকর দেখল চন্দ্রা এখনও বাজার থেকে ফেরেনি। বসার ঘরে বসে অপেক্ষা করতে লাগল ছেলেটির। মনে মনে ভাবতে লাগল কী করবে এবার? কী ব্যবস্থা করবে ওর?

একটু পরে সুশান্ত ঘরে ঢুকতেই সুধাকর শিকারি বাঘের মতো তার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল। কলার ধরে চেঁচিয়ে উঠল, “মিথ্যাবাদী, ঠগবাজ, ধাপ্পাবাজ কোথাকার! ছেলে সেজে আমাদের ঘরে ঢুকেছিস কী মতলবে? আমাদেরকে বশ করে টাকাকড়ি, গয়নাগাঁটি, সম্পত্তি হাতিয়ে নেওয়ার মতলব করেছিলি, না? সে গুড়ে বালি, তোর সব কেরামতি ধরা পড়ে গিয়েছে।’

আচমকা আক্রমণে হকচকিয়ে গিয়েছিল সূর্য। নিজেকে ছাড়াবার ব্যর্থ চেষ্টা করে বলতে লাগল, ‘আমি ঠগ জোচ্চোর নই। কোনও মতলবেও আসিনি। আমি কেবল…।’

—চোপ বদমায়েশ, একদম মিথ্যা কথা বলবি না। সত্যি করে বল, তুই আমাদের ছেলে সূর্য কিনা?

সুশান্ত ক্ষীণস্বরে বলল, ‘না, আমি সূর্য নই।’

—তাহলে কেন মিথ্যা কথা বলেছিলি? কেন মিথ্যা পরিচয় দিয়ে ঢুকেছিলি আমাদের ঘরে? কী ভেবেছিলি, আমরা ধরতে পারব না, সেই সুযোগে আমাদের সবকিছু আত্মসাৎ করে পালাবি, তাই না? বলে তার গালে দিল এক থাপ্পড়।

সুশান্ত নিজেকে সামলে মিনতি করে বলল, ‘আমি কোনও খারাপ মতলবে আসিনি। ডাক্তারকাকুর কথায় আপনাদের…।’

—চুপ কর বদমায়েশ, একদম মিথ্যা কথা বলবি না। আর তোর ষড়যন্ত্রে ডাক্তারকেও জড়াবি না। সত্যি করে বল তোর আসল মতলব কী? আর কার কার বাড়িতে এমন কীর্তি করেছিস?

—ও ঠিকই বলছে সুধাকর, মিথ্যা বলছে না।

চমকে উঠল সুধাকর। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল দরজায় দাঁড়িয়ে সুবোধ ডাক্তার, কখন এসে দাঁড়িয়েছে বুঝতে পারেনি।

রাগের স্বরে বলল, ‘আরে জানিস না তুই, ও আমাদের সূর্য নয়, একটা ধাপ্পাবাজ, সূর্য সেজে এসেছে। এটা ওর পেশা, আরও অনেকের বাড়িতে এই কীর্তি করেছে। আজ হাতেনাতে ধরা পড়ে গিয়ে গল্প ফাঁদছে। আবার তোকেও জড়াচ্ছে এর মধ্যে।’

—আমাকে জড়াচ্ছে না বন্ধু। আর ব্যাপারটা আমার অজানাও নয়। সত্যি বলতে কী, আমিই ওকে নিয়ে এসেছিলাম তোদের কাছে৷

—কী বলছিস তুই? সুধাকর তো অবাক।

—ঠিকই বলছি। কিন্তু আগে ওর কলার ছেড়ে শান্ত হয়ে বোস, তারপর সব বলব।

দু’জনে সোফায় বসল। সুশান্ত দাঁড়িয়ে রইল অধোবদনে। তারপর সুবোধ ডাক্তার বলতে শুরু করল আসল ঘটনাটা।

—বউদির অবস্থা দিনদিন খারাপ হতে দেখে আমার খুব চিন্তা হচ্ছিল। বুঝতে পারছিলাম এভাবে চললে উনি আর বেশিদিন বাঁচবেন না। ছেলের ফিরে আসাই একমাত্র পারে ওনাকে বাঁচাতে। কিন্তু তা কীভাবে সম্ভব? এরই মধ্যে হঠাৎ আমার কানে এল আমার এক পুরোনো রোগীর কথা। তারও খানিকটা একইরকম কেস। এক ক্ষীণদৃষ্টি বৃদ্ধার একমাত্র অবলম্বন নাতনিকে দুর্ঘটনায় হারিয়ে খুবই হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন, মৃত্যু ত্বরান্বিত হচ্ছিল। তখন নাকি তার নাতনির মতো একটি মেয়ে তার নাতনি সেজে এসে বৃদ্ধাকে সারিয়ে তুলেছিল। যদিও তারপর বৃদ্ধা বেশিদিন বাঁচেননি। হঠাৎ ডেঙ্গিতে মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু তার শেষ ক’টা বছর খুব আনন্দে কেটেছিল। তখন সেই মেয়ের খোঁজ করে করে আমি পৌঁছাই এই সুশান্তর কাছে। দেখলাম ওরা কয়েকজন ছেলেমেয়ে মিলে এইরকম বৃদ্ধবৃদ্ধাদের সেবা করে, তাদেরকে সারিয়ে তোলে। বিনিময়ে সামান্য কিছু অর্থ নেয় ওদের খরচ চালাবার জন্যে। ওদের পরার্থপরতা, বয়স্কদের প্রতি ওদের ভক্তিশ্রদ্ধা দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। তারপর যখন দেখলাম সুশান্তর সঙ্গে তোদের সূর্যের মুখের আদলে অনেকটা মিল আছে আর বয়সটাও সূর্য বেঁচে থাকলে এইরকমই হত, তখনই আমি ঠিক করি ওকে সূর্য সাজিয়ে তোদের বাড়িতে নিয়ে আসব। ওকে রাজি করিয়ে নির্দিষ্ট ফি জমা করে দিলাম। তারপর তোকে আমার দার্জিলিং বেড়াতে যাওয়ার এবং সেখানে খুঁজে পাওয়ার মিথ্যা গল্প ফেঁদে ওকে নিয়ে এসেছিলাম তোদের ঘরে। তারপর যা যা হয়েছে সবই তোর জানা। এবার তুইই ঠিক কর কী করবি? ওকে তাড়িয়ে দিবি, না পুলিশের হাতে দিবি। তবে হঠাৎ ও চলে গেলে বউদির মনের অবস্থাটা কী হবে সেটাও একটু মাথায় রাখিস।

—না না, তুই যা-ই বল, ও ঠকিয়েছে আমাদের। চন্দ্রাকে তো ঠকিয়েছেই, আমাকেও ঘুণাক্ষরে কিছু জানতে দেয়নি। ডেঞ্জারাস ছেলে ও, ওকে আমি পুলিসে দেব।

—না, ওকে কোথাও দেবে না তুমি।

পিছন ফিরে সুধাকর দেখে বাজারের ব্যাগ হাতে চন্দ্রাবলী দাঁড়িয়ে। সুধাকর বলল, ‘তুমি জানো না চন্দ্রা, ও আমাদের…।

—সূর্য নয়, তাই তো? সেটা আমি জানি।

—কী বলছ তুমি? সুধাকর তো হতবাক।

—ঠিকই বলছি গো। তবে সত্যিটা জেনেছি বেশ কিছুদিন পরে। ও যখন তোমার অফিসে গিয়ে বসতে রাজি হল না, আমি একটু আশ্চর্য হয়েছিলাম। তোমাদের অফিসে কাঁচাটাকার লেনদেন, তবুও গেল না কেন? আরও অবাক হলাম তোমার উইলে ওর নাম দিতে মানা করতে দেখে। অর্থ বা সম্পত্তি নিতে আবার কেউ অস্বীকার করে নাকি? নিজের ছেলেও না বলবে না। বুঝেছিলাম কিছু একটা ব্যাপার আছে। আর মায়ের চোখকে ফাঁকি দেওয়া অত সহজ নয়। যতই সূর্যর মতো দেখতে হোক, ও যে আমার সূর্য নয়, সেটাও আমি আস্তে আস্তে বুঝতে পারছিলাম। তখন একদিন আদর করে গায়ে হাত বুলিয়ে জেনে নিলাম আসল সত্যটা। ডাক্তারের কথায় ঝুঁকির পরোয়া না করে সূর্য হয়ে এসেছে আমার মতো এক মুমূর্ষু মানুষকে বাঁচাতে। অভিভূত হয়ে গেলাম আমি। ও যেভাবে সেবাযত্ন করে আমাকে সারিয়ে তুলেছে, আমার সূর্যের অভাব পূরণ করে অন্তরে মমতার ফল্গুধারা বইয়ে দিয়েছে, তার তুলনা হয় না। সেদিন মনে হল, আজ আমার সূর্য বেঁচে থাকলেও বোধহয় আমার জন্যে এতখানি করত না।

সব শুনে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল সুধাকর। বলল, ‘তুমি তো এসব কিছুই বলোনি আমাকে?’

—কী আর বলব? বললে তুমি ওকে রাখতে? তখনই তাড়িয়ে দিতে।

স্বাভিমানে ঘা লাগল সুধাকরের। রাগের স্বরে বলল, ‘না, সে যাই হোক, ও যে মিথ্যাচার করেছে তার শাস্তি তো পেতেই হবে। ও আমাকে এসব কথা এতদিন বলেনি কেন?’

চন্দ্রাবলী ক্ষণিক তাকাল সুশান্তর দিকে। বেচারি মাথা নিচু করে অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে আছে। কৃত্রিম রাগের সুরে বলল, “ঠিকই বলেছ, শাস্তি তো ওকে পেতেই হবে। তবে সে শাস্তি আমি দেব।’

ডাক্তার অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কী শাস্তি দেবে বউদি?”

—ওর শাস্তি হল… আমার সূর্য হয়ে এই বাড়িতে ওকে বন্দি থাকতে হবে সারা জীবন। কখনও আমাকে ছেড়ে যাবে না। বলে সুশান্তর মাথাটা বুকে টেনে নিল।

আনন্দে ভরে উঠল ডাক্তারের মনটা। হাতের মোবাইল যে বেজে চলেছে সেদিকে খেয়াল ছিল না।

সুধাকরও সেই আনন্দের ছোঁয়াচ এড়াতে পারল না। এগিয়ে গিয়ে স্ত্রী-পুত্রকে আবদ্ধ করল উষ্ণ বাহুবন্ধনে।

রেডিওর নস্টালজিয়া এবং এক গুচ্ছ বাংলা গানে মঞ্চ মাতাবেন শ্রাবন্তী মজুমদার

শ্রাবন্তী মজুমদার একটা নাম, একটা সময় আর একরাশ নস্টালজিয়া। বাঙালির ঘরে ঘরে বহুশ্রুত এক কন্ঠ, যা বুঁদ করে রাখত এক প্রজন্মের রেডিওর শ্রোতাদের। তাঁর স্বকীয়তা, বাচনভঙ্গি, বিজ্ঞাপনের গান আর পাশাপাশি তাঁর বাংলা নন-ফিলমি সঙস। বাংলার সেই জিঙ্গল কুইন শ্রাবন্তী এখন আছেন এই শহর কলকাতা-য়। শুধু তাই নয়, আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিট থেকে কলামন্দির প্রেক্ষাগৃহের মঞ্চ মাতাবে তাঁর একক— “আয় খুকু আয়”। আয়োজনে ‘বেঙ্গল ওয়েব সলিউশনস’ এবং নিবেদনে ‘বোরোলিন’।

বাংলা আধুনিক গানের জগতে “আয় খুকু আয়” একটা ক্লাসিক। আর সেই গানের পঞ্চাশ বছর উদযাপনে গানের শিল্পী সুদূর আইলস অফ ম্যানের দ্বীপ থেকে নিজের শহর কলকাতায় এলেন।

শ্রাবন্তী মজুমদার স্বয়ং জানিয়েছেন, “একসময় এই গানটা (আয় খুকু আয়) হেমন্ত বাবু ছাড়া গাইব না মনে-মনে ঠিক করে ফেলেছিলাম। তবে এও জানতাম না যে, উনি গাইতে রাজি হবেন কিনা। তবে গানের বিষয়, সুর শুনে উনি রাজি হয়ে যান। কিন্তু গানটা পপুলার হতে সময় লেগেছিল। অনেকটা বড়ো গান, তাই রেডিওতে বাজাতেও সমস্যা হতো। সেই সময় পুজো মণ্ডপেও নতুন গান বাজানোর খুব চল ছিল। যাইহোক, এমন অনেক অজানা গল্প আমার শ্রোতাদের শোনাব কলামন্দিরের মঞ্চে”

শ্রাবন্তী মজুমদারের সঙ্গে আলাপচারিতায় থাকবেন বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী শ্রীকান্ত আচার্য। প্রাক কথনে সতীনাথ মুখোপাধ্যায় এবং বিশেষ ভূমিকায় থাকবেন সৌমিত্র বসু।

সেই কালজয়ী বিজ্ঞাপনের গান “সুরভিত অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম বোরোলিন”, হোক বা ওয়েসিস-এর “মাথার ঘন চুল যখন মরুভূমি হয়ে যায়”, শ্রাবন্তী মজুমদারের কন্ঠ মানেই ছিল ম্যাজিক।  সেই জাদু কন্ঠ কলকাতার শ্রোতাদের জন্য আবার ফিরে আসছে “আয় খুকু আয়” শীর্ষক এই বিশেষ অনুষ্ঠানে।

উল্লেখ্য, শ্রাবন্তী মজুমদার কাজ করেছেন দিকপাল সব শিল্পীদের সঙ্গে। সলিল চৌধুরী, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, কিশোর কুমার, সুধীন দাশগুপ্ত, নচিকেতা ঘোষ , ভি. বালসারা, বাসু-মনোহরি, বাপি লাহিড়ীদের মতো শিল্পীদের পাশাপাশি বাংলায় আধুনিক গান করিয়েছেন অনু মালিককে দিয়ে। তাঁর আধুনিক বাংলা গানের রেকর্ডে গান করেছেন ভূপিন্দর সিং এবং  অমিত কুমার। এমন অনেক গান, গানের গল্প নিয়ে হাজির হবেন শ্রাবন্তী মজুমদার আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি কলামন্দির প্রেক্ষাগৃহে।

ছদ্মবেশী (পর্ব-০৩)

পাক্কা দশদিন হাসপাতালে থেকে তবে ছাড়া পেল। বাড়িতে এসে সুধাকর নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ল। ঠিক করল উইলের কাজটা তাড়াতাড়ি সেরে ফেলবে। ছেলের নামে ব্যাবসাপত্র লিখে দেবে। কিন্তু সূর্য বেঁকে বসল, কিছুতেই রাজি হল না। বলল, ‘আমার নামে নয়। মা তো এখন পুরো সুস্থ, তুমি মায়ের নামেই সব করে যাও।’ ছেলের কথা শুনে অভিভূত হয়ে গেল দু’জনে। সুধাকর বলল, ‘মাকে দিলেও তো একদিন তুইই পাবি?’

—সে তখন যা হয় হবে, এখন মায়ের নামেই থাক।

গালে চুমু খেয়ে চন্দ্রাবলী ঠাট্টা করে বলল, “একেবারে সন্ন্যাসী ছেলে, কোনও চাহিদা নেই।”

এইভাবে প্রায় মাস সাতেক কেটে গেছে। চন্দ্রাবলী এখন পুরোপুরি সুস্থ। সূর্যও হয়ে গেছে ঘরের ছেলে। দেখে মনেই হয় না এতদিন সে ঘরের বাইরে ছিল। তার আচার-ব্যবহারে মা বাবার মন জুড়িয়ে যায়। কিন্তু একটা জিনিস কেমন যেন বিসদৃশ লাগে সুধাকরের। ছেলেটা মাঝে মাঝে কোথাও বেরিয়ে যায়, ফিরে আসে কয়েক ঘণ্টা পরে। জিজ্ঞেস করলে বলে, ‘কলকাতায় ওর পরিচিত কয়েকজন বন্ধুবান্ধব আছে। তাদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল।’

চন্দ্রাবলী বলেছিল, ‘ওদেরকে নিয়ে আয় আমাদের বাড়িতে, আলাপ করা যাবে।’

—আচ্ছা আনব বললেও, আজ পর্যন্ত সূর্য তাদেরকে বাড়িতে নিয়ে আসেনি।

আরও একটা জিনিস সুধাকরের কেমন যেন লাগে। ডাক্তার এলে মাঝে মাঝে ফিরে যাবার সময় ওকে ডেকে আলাদা করে কথা বলে। কী কথা বলছিল জিজ্ঞেস করলে সূর্য উত্তর দেয়— মায়ের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করছিল।

সুধাকর অবাক হয়! ভাবে, চন্দ্রার ব্যাপারে তো সামনাসামনি বসেই আলোচনা হয়। তার জন্যে ওকে আলাদা করে ডাকতে হবে কেন? মাঝে মাঝে ছেলেটা কেমন যেন অন্যমনস্কও হয়ে পড়ে। কী এত ভাবছে জিজ্ঞেস করলে ‘কিছু না’ বলে এড়িয়ে যায়। তারা ভাবে— হয়তো ফেলে আসা নেপালি বাবা-মায়ের কথা মনে পড়েছে, তাই বেশি বিরক্ত করে না ওকে।

একদিন কী একটা কাজে সুধাকর ছেলের ঘরে গিয়েছিল। দেখে ছেলে গেঞ্জি পরে অঘোরে ঘুমাচ্ছে, একটা হাত কপালে রাখা। ‘আহা রে’ বলে আলতো করে হাতটা নামিয়ে রেখে দিল নীচে। হঠাৎ বাহুর দিকে নজর পড়তেই দেখল ছেলেবেলার সেই ছড়ে যাওয়া দাগটা নেই। মনটা প্রথমে সন্দিহান হয়ে উঠলেও পরক্ষণে ভাবল ছোটো কাটা দাগ, বড়ো হতে ধীরে ধীরে হয়তো মিলিয়ে গিয়েছে।

একদিন সকালে জলখাবার খেয়ে সুধাকর ছেলেকে নিয়ে বেরোল গাড়িতে করে, পোস্ট অফিসে কী কাজ আছে ওর, নামিয়ে দিয়ে অফিস চলে যাবে। ছেলে নেমে যাওয়ার পর গাড়িটা নিয়ে একটু গিয়েছে কী নজরে পড়ল বালিগঞ্জের ঠিকানা লেখা একটা খাম সিটে পড়ে। বুঝতে পারল সূর্যের হাত ফসকে পড়ে গিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি ঘুরিয়ে গেল পোস্ট অফিসে।

গাড়ি রেখে খামটা নিয়ে ভিতরে ঢুকে দেখে, সূর্য একটা কাউন্টারে দাঁড়িয়ে পোস্টাল ক্লার্কের সঙ্গে কথা বলছে। লোকটা ওকে বলছে— গড়িয়ার ওরা কিন্তু আপনাকে খুব মিস করে সুশান্তবাবু, বলে ঘরের ছেলেও এমন হবে না। এত সুন্দর অভিনয় করেছিলেন, বুড়োবুড়ি বুঝতেই পারেনি যে, আপনি তাদের নিজেদের নাতি নন।

কথাটা কানে লাগল সুধাকরের। একপাশে দাঁড়িয়ে শুনতে লাগল তাদের কথাবার্তা।

সূর্য বলল, ‘না তেমন কিছু না, আমার পক্ষে যেটুকু করা সম্ভব করেছি। আমার কি আর এক জায়গায় থাকলে চলবে? আবার যেতে হবে অন্য কোথাও।’

—ওখানে পুরো টাকাটা পেয়েছিলেন?

—হ্যাঁ।

—আচ্ছা আপনি গড়িয়া পোস্ট অফিস থেকে এখানে কবে বদলি হয়ে এলেন?

—এই মাস ছয়েক হল।

—আচ্ছা, কত হয়েছে?

—তিনটে খামে মোট একশো আঠারো টাকা।

—তিনটে নয়তো, চারটে।

—চারটে কোথায়? আপনি তো আমাকে তিনটে খাম দিলেন।

—সেকি? তাহলে আরেকটা কোথায় গেল? বলে সূর্য ঝুঁকে দেখতে লাগল খামটা নীচে পড়ে গেছে কিনা।

কথাগুলো সুধাকরের কানে যেন গরম সিসার মতো ঢুকছিল। ছেলেটা তাহলে আদৌ দার্জিলিং থেকে আসেনি? কলকাতাতেই অন্য একজনের বাড়িতে নাতি সেজে ছিল। ও তাহলে সূর্য নয়, কোনও মতলবে সূর্য সেজে রয়েছে তাদের ঘরে!

—নাও তোমার খাম, গাড়িতে রয়ে গিয়েছিল, বলে খামটা তার হাতে দিয়ে উত্তরের প্রতীক্ষা না করে হনহন করে বেরিয়ে এল।

গাড়িতে গিয়ে দরজা বন্ধ করে চাবিতে হাত দিয়ে মূর্তিবৎ খানিকক্ষণ বসে রইল সুধাকর। নাকমুখ দিয়ে গরম নিঃশ্বাস বইছিল। বুকটা লাফাচ্ছিল ধড়াস ধড়াস করে। মাথা কাজ করছিল না। ছেলেটা এইরকম ধাপ্পাবাজ? সূর্য সেজে ঢুকে পড়েছে তাদের ঘরে? এমন নিখুঁত অভিনয় করছে বুঝতেই দেয়নি নকল বলে। সকলকে কেমন সুন্দর বশ করে নিয়েছে এই ক’মাসে। কী ধুরন্ধর ছেলে!

আপশোশ হচ্ছিল নিজের নির্বুদ্ধিতার জন্যে। ওর গোবেচারা চেহারা আর মিষ্টি কথায় ভুলে গিয়ে একেবারে নিজের ছেলে বলেই ধরে বসল সে? একবারও ভালো করে যাচাই করে দেখল না? ওর সবকথা সরল মনে বিশ্বাস করে নিল? নিজে তো ঠকলই, চন্দ্রাকেও ঠকাল? এমন ভুল তার মতো বিচক্ষণ লোক করল কী করে?

প্রচণ্ড রাগ হচ্ছিল সুবোধ ডাক্তারের উপরেও। সেই যত নষ্টের গোড়া, ওকে সূর্য বলে তাদের ঘরে ঢুকিয়েছিল? কী করে করতে পারল ও এমন জঘন্য কাজ? ও কি সত্যিই ওকে দার্জিলিং থেকে নিয়ে এসেছে, না এখানেই ধরে এনে দার্জিলিং-এর গল্প ফেঁদেছে? কিন্তু ওর মতো বন্ধুলোক এমনটা করবে কেন? তবে কি ছেলেটাও দার্জিলিং ঘুরতে গিয়েছিল, সেখানেই ডাক্তারকে বশ করে সঙ্গে চলে এসেছে?

(ক্রমশ…)

ছদ্মবেশী (পর্ব-০২)

ছেলেটিকে বলল, “ইনিই তোমার বাবা সুধাকর বণিক। আর তোমার মা চন্দ্রাবলী তোমার শোকে শয্যাশায়ী, মৃত্যুর প্রহর গুনছে। যাও মায়ের কাছে।’ তারপর সুধাকরকে বলল, “আমি এখন যাই, পরে আবার কথা হবে।”

—একটু বসবি না?

—না রে, অনেক কাজ আছে। আমি যাই, তোরা ছেলেকে নিয়ে আনন্দ কর। বলে ডাক্তার বেরিয়ে গেল।

ছেলেটি হাঁ করে তাকিয়েছিল সুধাকরের দিকে। তাকে প্রণাম করতেই সুধাকর ছলছল চোখ মুছে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে ‘হয়েছে বাবা, আগে চল মায়ের কাছে’ বলে ভিতরে নিয়ে গেল। দূর থেকে স্ত্রীকে ডেকে বলল, “দেখো চন্দ্রা কে এসেছে।”

শোবার ঘরে ঢুকে ছেলেটি খানিক থমকে দাঁড়াল বিছানার পাশে। তারপর ‘মা’ বলে চন্দ্রাবলীর পা ছুঁতেই সে আস্তে আস্তে উঠে বসে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল তার মুখের দিকে।

সুধাকর বলল, “তোমার সূর্য গো, চিনতে পারছ না?”

বিস্ময়ের ঘোর কাটল চন্দ্রাবলীর, সম্মোহিতের মতো দু’হাত বাড়িয়ে বলে উঠল, ‘সূর্য, তুই এসেছিস বাবা? আয় বাবা বুকে আয়।”

সূর্য আস্তে আস্তে বিছানায় বসতেই চন্দ্রাবলী তাকে বুকে টেনে নিয়ে সারা মুখ আদরে ভরিয়ে দিল। অশ্রুসাগরে ভাসতে ভাসতে বইয়ে দিতে লাগল অভিযোগের বন্যা। কোথায় ছিলি বাবা এতদিন? মায়ের কথা কি একটুও মনে পড়ে না? মাকে এভাবে কষ্ট দিতে হয়…?

সুধাকর চোখ মুছে বলে উঠল, ‘ছেলেটা গোটা রাত জার্নি করে এসেছে। আগে ওকে খেতে দাও, তারপর যত খুশি আদর কোরো।”

—হ্যাঁ হ্যাঁ দিচ্ছি, বলে আস্তে আস্তে বিছানা থেকে নামতে যেতেই সুধাকর বলল, ‘তোমাকে যেতে হবে না, আমি আনছি, তুমি ওর সঙ্গে কথা বলো।’

স্বামী রান্নাঘরে চলে যাওয়ার পর চন্দ্রাবলী সূর্যর গায়ে হাত বুলিয়ে বলল, ‘কোথায় ছিলি বাবা এতদিন? ওরা খেতেটেতে দেয় না। নাকি, কেমন রোগা রোগা লাগছে?’

সূর্য কিছু বলতে যাচ্ছিল। তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে উঠল, ‘তার আগে বল এতদিন ছিলি কোথায়? পাহাড়ের খাদ থেকে বাঁচলি কী করে?”

সুধাকর চা-জলখাবার নিয়ে এসেছিল। বিছানায় রেখে বলল, ‘হ্যাঁ বাবা, বল তো কে তোকে বাঁচিয়েছিল? কাদের কাছে ছিলি এতদিন? আমাদের কথা একটুও কি মনে পড়েনি?”

খেতে খেতে সূর্য বলতে লাগল তার বিগত কুড়ি বছরের জীবনের কথা— কীভাবে তাকে অচৈতন্য অবস্থায় এক নেপালি দম্পতি খরস্রোতা নদীর পাড় থেকে কুড়িয়ে নিয়ে এসেছিল, তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিল, আগেকার স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়ায় তাকে নিজেদের সংসারে ঠাঁই দিয়েছিল, স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিল ইত্যাদি। শেষে বলল পরে একটু একটু মনে পড়ত মা-বাবার কথা। কিন্তু নতুন মায়ের কাছে সে কথা বললেই সে কেঁদে উঠত। তাই তাদেরকে কাঁদিয়ে আসতে পারিনি। কালও আসার সময় বলে দিয়েছে যেন তাড়াতাড়ি আবার দার্জিলিং ফিরে যাই।”

—না, আর কোথাও যেতে দেব না তোকে। একবার যখন ফিরে পেয়েছি আর ছাড়ব না তোকে। বলে চন্দ্রাবলী তাকে বুকে জড়িয়ে ধরল।

—ঠিক আছে বাবা, সেসব পরে দেখা যাবেখন। এখন চল তো দেখি, বাসি জামাপ্যান্টগুলো বদলে ফেল। বলে সুধাকর তাকে নিয়ে চলল পাশের ঘরে, আর চন্দ্রাবলী কৌতূহলভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ছেলের দিকে।

আস্তে আস্তে সুধাকরের বাড়ির পরিবেশটাই পালটে গেল। গোটা বাড়ি গমগম করতে লাগল আনন্দ-কোলাহলে। আত্মীয়-পরিজনদের আনাগোনাও বেড়ে গেল। সবাই দেখতে এল ফিরে আসা চন্দ্রাবলীর ছেলেকে। সবাই খুব খুশি হয় সূর্যকে দেখে। তবে কেউ কেউ আড়ালে আবডালে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে, “কোথাকার কে এসে জুটেছে কে জানে? হয়তো কোনও ধান্দা আছে! তাদের দু-একজনের ফিসফিসানি কানে যায় চন্দ্রাবলীর। কিন্তু বিশেষ পাত্তা দেয় না। বলে, ‘এসব নিন্দুকের কথা, হিংসায় জ্বলছে।’

কথাটা কানে গিয়েছিল সুধাকরেরও। কিন্তু তার মুখে আত্মীয়স্বজনের নাম, স্কুলের কথা আর ছেলেবেলার দু-একটা ঘটনার কথা শুনে সব সন্দেহ দূর হয়ে যায়। সর্বোপরি মা-বাবার প্রতি তার ভক্তিশ্রদ্ধা দেখে আরও আপ্লুত হয়ে যায় মনটা। সবসময় মায়ের পাশে পাশে থাকে। তার সুখসুবিধা খাওয়াদাওয়ার খেয়াল রাখে। ওষুধ খেতে একটু দেরি হলে বকুনি দেয় ছোট্ট মেয়ের মতো।

চন্দ্রাবলী মাঝে মাঝে বলে, ‘তুইই তো আমার ওষুধ বাবা। অন্য ওষুধের দরকার নেই।”

সূর্য তখন চোখ পাকিয়ে বকুনি দেয়—ওসব অজুহাত চলবে না। সময়মতো ওষুধ না খেলে শরীর ঠিক হবে কী করে? আর আবার যদি শরীর খারাপ করে বসে, তাহলে কিন্তু আমি দার্জিলিং পালিয়ে যাব, আর আসব না।

অগত্যা ছেলের কথাই শুনতে হয় চন্দ্রাকে, ‘আচ্ছা বাবা খাচ্ছি’ বলে ছেলেকে বুকে টেনে নেয়।

এইভাবে মাস তিনেক কেটে গেছে। চন্দ্রাবলীর মুখে হাসি ফুটেছে। এখন সুস্থ হয়ে উঠেছে অনেকটা। সুধাকরও আস্তে আস্তে ব্যাবসার কাজ দেখতে শুরু করেছে। নিয়ম করে প্রতিদিন অফিসে বেরিয়ে যায়। সুবোধ ডাক্তার মাঝে মাঝে যথারীতি আসে চেকআপে। হেসে হেসে বলে, ‘সূর্য ফিরে আসায় আমারই ক্ষতি হয়ে গেল। রোগী যেভাবে কলকল করে ছুটে বেড়াচ্ছে তাতে হয়তো ক’দিন বাদে আর আমার আসার দরকারই পড়বে না।”

চন্দ্রাবলী উত্তর দেয়— সবকিছু তো তোমারই কল্যাণে ডাক্তার। তুমি না থাকলে আমি কখনও আমার সূর্যকে ফিরে পেতাম না।’

সুধাকরও হেসে বলে, ‘চিন্তা করিস না। তোর ক্ষতির ডবল পুষিয়ে দেব। খালি ভগবানকে জানা আমার সূর্য যাতে ভালো থাকে। জীবনে অনেক উন্নতি করে।”

মাঝে মাঝে ছেলেকে সুধাকর বলে, “মা তো এখন অনেক ভালো আছে। এবার আমার ব্যাবসার কাজটা একটু দ্যাখ বাবা, আমার সঙ্গে অফিসে চল।”

সূর্য ঘাড় নাড়ে— ওসব ব্যাবসার কাজ আমার দ্বারা হবে না, ও তুমিই সামলাও।

—ব্যাবসার কাজ ভালো না লাগে অন্য কিছু কর। পিএইচডি করার ইচ্ছা ছিল বলছিলি, সেটাই নয়তো কর।

—আগে মা পুরোপুরি ঠিক হয়ে যাক, তারপর ওসব ভাবব। বলে সরে যায় সূর্য।

—পাগল ছেলে, বলে সুধাকরও বেরিয়ে যায় কাজে।

কিছুদিন পরে হঠাৎ বুকে ব্যথা নিয়ে সুধাকরকে ভর্তি হতে হল হাসপাতালে। প্রথমে সুবোধ ডাক্তারকে ডেকেছিল। কিন্তু সে বলল, “আমি সাইকিয়াট্রিস্ট, হার্টের কী বুঝব? এখুনি হাসপাতালে যাও।’ সেখানে গিয়ে জানা গেল মাইল্ড হার্ট অ্যাটাক।

(ক্রমশ……)

চার্মিং চামুর্চি (শেষ পর্ব)

ডায়না নদীকে দূর থেকে দেখলে মনে হয় একটা রুপোলি সরু ফিতের মতো কোনও ধারা প্রবাহিত হয়ে গেছে। মনে পড়ে ছোটোবেলায় পড়া সেই কবিতার কথা: ‘আমাদের ছোটো নদী চলে আঁকে বাঁকে/ বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে’।

এখানে বৈশাখ মাস কেন, এখন অক্টোবর মাসেও এর জল অনেকটাই কম। তার কারণ বৃষ্টির পরিমাণ এ বছর যথেষ্ট কম। রিসর্টের একদম কাছে পৌঁছে দেয় গাড়ি। তাই সঙ্গে বয়স্ক মানুষ থাকলেও, কোনও অসুবিধা নেই। করোনাকালীন সময়ে বন্ধ থাকলেও তারপরে নতুন সাজে সজ্জিত হয়ে উঠেছে এই রিসর্টটি। রাত্রিযাপন না করলেও কোনও অসুবিধা নেই। ইকো রিসর্টের পাশেই অবস্থিত ইকো পার্কটিও ঘুরে দেখা যায়। জঙ্গল -নদী-পাহাড়ের মেলবন্ধনে অপূর্ব এই জায়গাটি একেবারেই নির্জন। টিকিট কেটে ইকোপার্কটি পুরোটা ঘুরে দেখা যায়। এখানে একটি বিষয় বলে নেওয়া ভালো। যারা ইকো রিসর্টে থাকেন, তাদের জন্য ইকো পার্কে প্রবেশের কোনও মূল্য লাগে না।

একটি নজর মিনার আছে, তার উপর থেকে উঠে গোটা এলাকা ৩৬০ ডিগ্রি ভিউ পয়েন্টে দেখে নেওয়া যায়। একদিকে সবুজ পাহাড় আর একদিকে তার উপরে নীল আকাশের শামিয়ানা। ভুটান পাহাড়ের ওদিকে তাকিয়ে দেখি বাউণ্ডুলে মেঘের দল এদিক- ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। ভুটান পাহাড়ের উপর নীল আকাশের বুকে পেঁজা তুলোর মতো সাদা মেঘেদের দেখে চোখ ফেরানো যায় না। আসলে শরতের আকাশের কোনও জায়গা বিভেদ হয় না। কোলাহল থেকে শত আলোকবর্ষ দূরে এ জায়গায় এসে মনে হয় নিস্তব্ধতারও একটা ভাষা আছে, যা হৃদয় দিয়ে শুনতে হয়। দুপুরের খাওয়ার অর্ডার দিয়ে আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখা যায়। এটা আগে থেকে ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছিলাম। তাই ফিরে এসে এখানেই দুপুরে খাওয়ার কথা বলে রেখে, গিয়েছিলাম ভুটানের সীমান্তে।

চামুর্চি থেকে মোটামুটি ৩ কিলোমিটার গেলে পৌঁছানো যায় এক অলৌকিক রহস্যময় গুহায়। আগে হেঁটেই যেতে হতো। তবে এখন অনেকটা দূর পর্যন্ত গাড়ি যায়। শেষ প্রায় ৬০০-৭০০ মিটার হাঁটতে হয়। হাতে যথেষ্ট সময় থাকায় লোকাল একজনকে সঙ্গে নিলাম, যিনি গাইডের কাজ করেন। ডায়না নদীর তীর ধরে ঘন অরণ্যপথে হাঁটতে বেশ ভালোই লাগছিল। পাশেই রয়েছে গারুচিরা, কালাপানি ও রোহিতি অরণ্য। গাইড শিরিংয়ের কথা অনুযায়ী এখানে মাঝে মাঝেই জল খেতে আসে হরিণের দল, হাতির পাল, গাউর, এমনকী চিতাবাঘও।

সেগুন, শাল, বয়রাঘেরা অরণ্য ছায়াপথে হাঁটতে হাঁটতে একসময় এমন এক জায়গায় পৌঁছালাম যাকে দেখে প্রথম দর্শনেই মনে হয় প্রাগৈতিহাসিক যুগের সেই আদিম মানুষদের আবাসস্থল। ঘন অরণ্য মাঝে এমন একটি গুহা দেখে প্রথমে একটু ভয় লাগলেও, গাইডের অভয়বাণীতে নিশ্চিন্ত হয়ে গুহার ভিতরে প্রবেশ করে অন্য এক জগতে চলে গেলাম। চারিদিকে যখন ভালো করে নজর রাখছি, ততক্ষণে দেখি শিরিং-ভাই একটি নুড়ি পাথর কুড়িয়ে ছুঁড়ে দিয়েছেন সামনের একটি পাথরকে কেন্দ্র করে। তার ফলে একটি সুরেলা আওয়াজ শুনতে পাই। আবারও একটি পাথর ছুঁড়ে দিতেই আরেক রকম ধ্বনি ভেসে আসে। ব্যস, একের পর এক পাথর ছুঁড়ে দিয়ে এরপর আমরাও যেন বিঠোফোনের মতো নতুন নতুন সিম্ফনি সৃষ্টিতে মেতে উঠতে থাকি। এই কারণেই এই গুহার নাম “মিউজিক্যাল কেভ’।

বহু জায়গায় বহু গুহা দেখেছি। কিন্তু এত সুন্দর সুর সৃষ্টিকারী গুহায় কোনওদিনও যাইনি। প্রকৃতি যেন নতুন নতুন রাগ-রাগিনী শুনিয়ে চলেছে তার কাছে আসা পর্যটকদের। স্থানীয়দের কাছে এই জায়গা ‘মহাকাল মন্দির’ নামে পরিচিত। বক্সা-জয়ন্তীর দিকে যে বড়ো মহাকাল ও ছোটো মহাকাল মন্দির আছে, তার থেকে অনেকটা পার্থক্য রয়েছে এই জায়গার। এখানে পুজো করার জন্য মূর্তি নেই। বড়ো গুহাটিকেই স্থানীয়রা মহাদেবের মূর্তির প্রতীক মনে করে পুজো করেন। শিবরাত্রিতে এখানে বড়ো করে মেলা হয়। দূর- দূরান্ত থেকে বহু মানুষ আসেন পুজো দিতে। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী এখানে এসে মানত করলে তা পূরণ হয়।

জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে ছোট্ট গ্রাম্য কিন্তু সুষমামণ্ডিত একটি মন্দির চোখে পড়ল। শিরিং বলতে শুরু করল এই মন্দির স্থাপনের পিছনে একটা অলৌকিক কাহিনির কথা। আসলে যেখানে দেবতার স্থান, সেখানেই মিশে থাকে কোনও না কোনও লোককাহিনি। এই মন্দিরের স্থানীয় নাম কাঠালগুড়ি মন্দির। কয়েক বছর আগে এখানকার কিছু স্থানীয় মানুষ মাটি খুঁড়তে গিয়ে এক অদ্ভুতরকমের শিলার দর্শন পায়। নানা ধরনের লতাপাতা, চরণ চিহ্ন, নয়ন চিহ্ন দেখে তারা ভক্তি করে পুজো করতে থাকে। মন্দির বন্ধ ছিল। কিন্তু বাইরে থেকেই দেবদর্শন করা যায়। গরাদের ফাঁক দিয়ে শিলাকে প্রত্যক্ষ করলাম। নিত্য পুজোর নানা উপকরণও দেখা গেল।

এবার গাড়িতে উঠে এগিয়ে চলি আরেকটি জায়গার দিকে। ভারতের সঙ্গে ভুটানের সংযোগকারী বেশ কয়েকটি প্রবেশদ্বার রয়েছে। এদিক থেকে গেলে একটা প্রবেশদ্বার পড়ে, যার নাম চামুর্চি গেট। রাজকীয় গেটটির অপূর্ব নির্মাণশৈলী দেখে মুগ্ধ হতে হয়। ওপারে এর নাম সামসি গেট৷ আমরা অনেকেই জানি ভুটানকে ‘সুখী দেশ’ বলা হয়। এপাশ থেকে দাঁড়িয়েই দেখা যায় ওপাশের পথ- ঘাট, বাজার। দু’পাশেই দু’দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী উপস্থিত। হঠাৎ করে আকাশের দিকে চোখ যায়। বাউণ্ডুলে মেঘের দলের পারাপার দেখে মনে হয় তারা যেন কোনও আইনের শাসন মানে না। তাদের দেখাতে হয় না কোনও পরিচয়পত্র। তাই নীল আকাশের ভেলায় চেপে তারা দিব্যি এপার-ওপার করছে। কাঁটাতারের বেড়া শুধুমাত্র মানুষের জন্য। যদিও ভারত এবং ভুটানের মধ্যে সম্পর্ক খুব ভালো হওয়ায় কোনও কাঁটাতারের বেড়া নেই। সীমান্ত মানেই যে কাঁটাতারের বেড়া, একথা এখানে প্রযোজ্য নয়।

ভুটানের প্রকৃতিগত অবস্থান এরকমই যে, প্রকৃতিই তার নানা সম্ভার দিয়ে বর্ডার হিসেবে এই ছোট্ট সুখী দেশটিকে নিজের সন্তানের মতো আগলে রেখেছে তার যাবতীয় স্নেহবন্ধন দিয়ে। ভারত-ভুটানের এই প্রবেশদ্বার পণ্যবাহী জিনিসপত্র আদান-প্রদানের জন্য বিশেষ ভাবে ব্যবহৃত হয় বলে সারি সারি ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় আর এই ট্রাকের জন্যই রাস্তায় শুধু ধুলো। ইচ্ছে করলে ওদেশ থেকে ঘুরে আসা যায়। ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে পরিচয়পত্র দেখিয়ে কিছুটা সময়ের জন্য ওপারে যাওয়ার ছাড়পত্র মেলে। মনের উচ্ছ্বাসকে দ্বিগুন করতে পরিচয়পত্র দেখিয়ে, গেট পেরিয়ে ওপারে চলে যেতেই মনে হল, এ যেন দু’পা বাড়ালেই বিদেশে এসে প্রবেশ করলাম।

ভুটানের এই ছোট্ট গ্রামটির নাম সামসি। গাড়ির স্ট্যান্ড আছে। পর্যটকরা ইচ্ছা করলে এখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে ভুটানের বেশ কিছু অংশ ঘুরতে পারেন। স্ট্যান্ডে থাকা গাড়ির ড্রাইভারদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম, মাথা প্রতি ৫০০ টাকা ভাড়ায় এখান থেকে গাড়িতে দু’ঘণ্টা গেলেই ভুটানের আরেকটি সীমান্ত শহর ফুন্টশোলিং-এ যাওয়া যায়। চুখা জেলাতে অবস্থিত ভুটানের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহরটি শিল্প ও বাণিজ্যের শহর হিসেবেও পরিচিত। পায়ে হেঁটেই দেখে নেওয়া যায় এখানকার বেশ কিছু জায়গা। যেমন শিব মন্দির, একটি সুন্দর পার্ক, ফুটবল খেলার মাঠ, যেখানে দেখতে পাই ফুটবল অনুশীলনে ব্যস্ত রয়েছে স্থানীয় কিছু ছেলেমেয়ে ।

কিছুটা এগিয়ে গেলেই এক শান্ত নিরিবিলি পরিবেশে দেখতে পেলাম একটি মনাস্ট্রি, যা এখানে ‘সামসি মনাস্ট্রি’ নামে পরিচিত। ওপারের চামুর্চির নজরমিনার থেকে যার একটু অংশ দেখতে পেয়েছিলাম। বেশ কিছুটা সময় এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করে চলে আসি গেটের ওপারে, যেখানে নির্দিষ্ট কাউন্টার থেকে পরিচয়পত্র নিয়ে গাড়িতে করে রওনা দিই আবার নিজেদের অস্থায়ী আবাসের দিকে।

কীভাবে যাবেন: কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেসে গেলে বানারহাট স্টেশনে নামতে হবে। এখান থেকে চামুর্চি মাত্র ১০ কিলোমিটার। ছোটো গাড়ির ভাড়া মোটামুটি ৮০০ টাকা। নিউ জলপাইগুড়ি থেকে চামুর্চির দূরত্ব প্রায় ৯৬ কিলোমিটার।

কোথায় থাকবেন: এখানে থাকার জন্য সবচেয়ে ভালো ব্যবস্থা আছে পশ্চিমবঙ্গ বনদপ্তরের অধীনে থাকা চামুর্চি ইকো রিসর্ট। এখানে নানা মানের ও দামের ঘর আছে। ওয়েবসাইটের মাধ্যমে বুকিং করা যায়। গুগলে ওয়েবসাইট সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পেয়ে যাবেন।

কখন যাবেন: চামুর্চি বছরের যে-কোনও সময় যাওয়া যায়। তবে বর্ষাকালে এর সৌন্দর্য অপরূপ।

বিশেষ তথ্য: চামুর্চি থেকে ভুটান সীমান্তে বেড়াতে যেতে হলে সঙ্গে ভারতীয় নাগরিকত্বের বৈধ পরিচয়পত্র— যেমন আধার কার্ড, ভোটার কার্ড ইত্যাদি অবশ্যই সঙ্গে রাখতে হবে।

(সমাপ্ত)

ছদ্মবেশী (পর্ব-০১)

কোনওরকমে স্ত্রীকে দুটো খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে নিজে খাবার টেবিলে গিয়ে বসল সুধাকর। খাবার মুখে তুলতে গিয়ে নজর চলে গেল দেয়ালে টাঙানো শ্রীরামকৃষ্ণের ডানহাত তোলা কল্পতরু ছবিটার দিকে। হাতটা কেঁপে উঠল, হাত থেকে খসে পড়ল রুটির টুকরো। আকুল নয়নে বিড়বিড়িয়ে উঠল, “এতই যদি দয়া তোমার, তাহলে কেন ওকে এত কষ্ট দিচ্ছ ঠাকুর? কেন তিলতিল করে নিভিয়ে দিচ্ছ ওর প্রাণের বাতি, কেড়ে নিচ্ছ ওকে আমার থেকে?”

কোনওরকমে দুটো মুখে দিয়ে শুতে গেল সুধাকর। দেখল চন্দ্রা অঘোরে ঘুমাচ্ছে। মোবাইলটা সাইলেন্ট মোডে করে টেবিলে রেখে দিল যাতে ইনকামিং কলের আওয়াজে ওর ঘুম না ভেঙে যায়। তারপর বিছানায় শুয়ে ডান হাতটা কপালে রেখে চোখ দুটো বোজার চেষ্টা করল। গোটাদিনের ক্লান্তিতে শরীরটা ভেঙে আসছিল, কিন্তু চোখে ঘুম এল না। বুক ফেটে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। এক অজানা ব্যথায় গুলগুল করে উঠল বুকের ভিতরটা।

এমন দিনে যে সবথেকে বেশি আনন্দ-উচ্ছল হয়ে উঠত, আজ তার মনেই নেই দিনটার কথা। নিরাসক্তের মতো মিষ্টির টুকরোটুকু খেয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল। ডুকরে কেঁদে উঠতে ইচ্ছা হল সুধাকরের, মনটা অভিমানে ভেঙে পড়ল— কী এমন পাপ করেছিলাম আমরা যে এই শাস্তি দিলে দয়াময় ? কেন এভাবে কেড়ে নিলে বুকের ধনকে? কেন তার দেহটুকু পর্যন্ত দেখতে দিলে না? এ তোমার কেমন বিচার প্রভু?

হঠাৎ চিন্তাসূত্র ছিন্ন হল মোবাইলের আলো জ্বলতে দেখে। বিরক্ত হল সুধাকর, এই রাতে কে আবার জ্বালায়? আস্তে আস্তে উঠে গিয়ে দেখে সুবোধ ডাক্তারের ফোন। ফোনটা নিয়ে পাশের ঘরে গিয়ে ‘হ্যালো’ বলতেই ওপার থেকে ভেসে এল উচ্ছ্বসিত কণ্ঠস্বর একটা দারুণ খবর আছে সুধা। বল কী খাওয়াবি? অবাক হল সুধাকর!

—তুই তো দার্জিলিং বেড়াতে গিয়েছিলি না? ওখান থেকে এই রাতেরবেলা আবার কী দারুণ খবর দিবি?

—আছে বন্ধু আছে, জবর খবর আছে। শুনলে তোদের একেবারে মাথা ঘুরে যাবে।

—আর সাসপেন্স বাড়াস না তো, তাড়াতাড়ি বল কী বলবি?

—তোদের সূর্যশেখর মরেনি, বহাল তবিয়তে বেঁচে আছে। আকাশ থেকে পড়ল সুধাকর!

—কী সব উলটোপালটা বকছিস বল তো? রাত দুপুরে গাঁজা টেনেছিস নাকি?

—না রে, সত্যি বলছি। আজ বিকেলে হোটেলে ফেরার পথে রাস্তায় ওকে দেখে আমিও চমকে উঠেছিলাম। ঠিক তোর সূর্যর মতো দেখতে। তারপর কথায় কথায় জানতে পারলাম ওর মা-বাবা নেই, এক নেপালি পরিবারে মানুষ। তবে বাংলা ভালোই বলতে পারে। ওরা নাকি ওকে বছর কুড়ি আগে খুঁজে পেয়েছিল এক পাহাড়ি ঝোরার ধারে। স্মৃতিশক্তি হারিয়ে গিয়েছিল, তাই আগেকার কথা কিছু মনে ছিল না। তারপর চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ হয়ে ওঠার পর তারাই ওকে বড়ো করেছে। আমি ওকে বলেছি তোদের কথা। ওর নেপালি মা-বাবার সঙ্গেও কথা বলেছি। ও রাজি হয়েছে আমার সঙ্গে কলকাতা যেতে।

কথাগুলো বিশ্বাস হচ্ছিল না সুধাকরের। মনটা ছটফট করে উঠল ছেলেটিকে একবার দেখার জন্যে। বলল, ‘কখন নিয়ে আসবি ওকে?”

—কাল সকালেই। আমি তো ট্রেন থেকেই বলছি।

—ঠিক আছে, তাড়াতাড়ি আয়।

–আচ্ছা, বউদি কী করছে? ওকে কিছু বলিস না এখন, একেবারে পৌঁছে সারপ্রাইজ দেব।

—আচ্ছা ঠিক আছে, বলে সুধাকর ফোনটা টেবিলে রেখে আস্তে আস্তে গিয়ে ঢুকল বিছানায়। আলতো করে স্ত্রীর কপালে হাতটা বুলিয়ে দিয়ে শুয়ে পড়ল। মনের মধ্যে ভিড় করে এল ছেলের ছোটোবেলার স্মৃতিগুলো। কল্পনায় ভেসে ভাবতে লাগল ছেলেকে ফিরে পেয়ে চন্দ্রার হাসিমুখের ছবি।

সারাটা রাত দু’চোখের পাতা এক করতে পারল না সুধাকর। মনটা এক অদ্ভুৎ আনন্দে ভরে গিয়েছিল— এবার হয়তো তার চন্দ্রা ধীরে ধীরে সেরে উঠবে। আবার তাদের জীবন ভরে উঠবে হাসিগানে। সকাল সকাল উঠে শৌচকর্ম সেরে বসে রইল বিছানার পাশে। চন্দ্রার চোখ খুলতে একটু বেলা হল। তাকে আস্তে আস্তে তুলে বসিয়ে নিয়ে গেল বাথরুমে। হাতমুখ ধুয়ে বেরিয়ে আসতেই বিছানায় বসিয়ে দিয়ে বলল, ‘বোসো, আমি চা করে আনছি।’

খানিক পরে চা করে নিয়ে এসে দু’জনে খেতে বসল। দুটো বিস্কুট দিতে মুখ ঘুরিয়ে নিল। অনেক সাধ্যসাধনা করে একটা বিস্কুট নিয়ে মুখে দিয়ে তাকিয়ে রইল দেয়ালে টাঙানো ছেলের ছোটোবেলার ছবিটার দিকে। সুধাকর অন্য কথা বলে মন ভোলাবার চেষ্টা করেও সফল হল না। শেষে কী জানি কী মনে করে বলেই ফেলল, ‘আচ্ছা আজ যদি ছেলে তোমার সামনে এসে দাঁড়ায়, চিনতে পারবে তাকে?’

চমকে উঠল চন্দ্রাবলী। স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল, “এরকম নিষ্ঠুর ঠাট্টা কোরো না তো আমার সঙ্গে!” অনেক কষ্টে তাকে শান্ত করে বলল, “দেখো, আসতেও তো পারে। ঈশ্বরের বিচিত্র দুনিয়ায় কত কিছু ঘটে। এটাও যে হবে না। তার ঠিক কী?”

—এই পোড়া কপালে কিছুই হবে না। আমিই তাকে খেয়েছি। হাত ফসকে তাকে ফেলে দিয়েছি খাদে। সে রাগ করেছে, আর আমার কাছে আসবে না। বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বালিশে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে উঠল।

হঠাৎ বাইরে থেকে কলিং বেলের শব্দ শুনে সুধাকর চমকে উঠল। ছুটে গিয়ে দরজা খুলে দেখে সুবোধ ডাক্তার, সঙ্গে একটা বছর চব্বিশ-পঁচিশের ছেলে। মুখের আদল খানিকটা তাদের সূর্যের মতো।

ডাক্তার বলল, ‘এই তোদের সূর্য, এর কথাই কাল তোকে বলেছিলাম।’

( ক্রমশ…)

চার্মিং চামুর্চি (পর্ব-০১)

কেন যাই তার কাছে বারবার? হয়তো নতুন কিছু পাই। সাঁঝবেলা কিংবা ভোর! আর সেই ভোর-সকালের সন্ধিক্ষণে সূর্যোদয় অথবা গোধূলিবেলার সূর্যাস্ত, যা আলোর ভৈরবী অথবা পূরবী সংগীত হয়ে থেকে যায়। আসলে নিত্যদিনের দুঃখ-কষ্ট-যন্ত্রণাগুলো বুকের মধ্যে চেপে নকশি কাঁথার মাঠের আলপনা না এঁকে, নিজের সব ইচ্ছে, স্বপ্ন, ভালোলাগাগুলো মেঘে ঢাকা তারার মতো সুপ্ত করে না রেখে বরং কোনও ধানসিঁড়ি নদীর তীরে অথবা কোনও হাঁসুলি বাঁকে কিংবা কোনও তিস্তা পাড়ে গিয়ে সেগুলো পাখা মেলে উড়িয়ে দিয়ে আসি।

মধ্যবিত্ত গড়পড়তা বাঙালি প্রতিদিন টিকে থাকার ইঁদুর দৌড়ে শামিল হওয়ার যুদ্ধে বিধ্বস্ত হয়ে তার অন্তরমহলে বসতকরা একজন জর্জ ম্যালোরির “Because it’s there”-এর উদাত্ত আহ্বান শুনে শংকরের মতো মাঝে মাঝে ‘চাঁদের পাহাড়’ খুঁজতে বেরিয়ে পড়ে। আর ফিরে আসে রবিমামার বর্ণচ্ছটায় সজ্জিত হয়ে কাঞ্চনকন্যা তিস্তা অথবা হিমালয় কন্যা বিপাশা, বিয়াস, লিডার, অলকানন্দা, মন্দাকিনীদের সঙ্গে দেখা করে। অবশেষে তার মনের গহিনে থেকে যায় চতুর্দিকঘেরা ঘন সবুজ অরণ্য, নিকষ অন্ধকার আর নৈঃশব্দের উদযাপনের মহাজাগতিক মোহময়ী মায়া।

নিত্যদিনের ডেবিট-ক্রেডিট-এর হিসাব-নিকাশ করতে করতে হাঁপিয়ে উঠে কংক্রিটের জঙ্গল ছেড়ে দু-একদিনের জন্য হারিয়ে যাওয়ার সেরা ঠিকানা ডুয়ার্স, যেখানে গেলে মনের শান্তি আর প্রাণের আরাম দুই-ই মেলে। ডুয়ার্স মানেই তুষারমৌলি হিমালয়ের পাদদেশে রূপের অনন্তসম্ভার নিয়ে মেলে ধরা এক সবুজকন্যা, যার কাছে রয়েছে খরস্রোতা বা জলতরঙ্গের মিঠে সুরে বয়ে চলা স্রোতস্বিনী নদী আর ঝরনা, যারা কখনও একাকী, কখনও বা যৌথ ভাবে তৈরি করে নতুন নতুন সিম্ফনি। জানা-অজানা পাখিদের কলকাকলিতে এখানে যেমন ঘুম ভেঙেছে, তেমনই রাতে ঘুমোতে যাওয়ার সময় দূরের ঘন জঙ্গল থেকে ভেসে আসা হায়না কিংবা অন্য কোনও বন্যপ্রাণীর গর্জন শুনে শিরদাঁড়া দিয়ে বয়ে গেছে হিমেল স্রোত।

তবুও ডুয়ার্সের হাতছানি উপেক্ষা করা বড়োই কঠিন। তাই বারবার এদের টানেই চলে যাই কুয়াশা-মেঘ-রোদ্দুরের চাদরে মুড়ি দিয়ে বসে থাকা নতুন নতুন ডুয়ার্স-কন্যাদের কাছে। এরা সবাই হয়তো সৌন্দর্যের দিক থেকে চোখধাঁধানো রূপসি নয়। কিন্তু একান্ত নিরিবিলিতে থাকার জন্য এক নিরাপদ ঠিকানা, যেখানে গেলে পাওয়া যায় অনাবিল শান্তি আর নির্জনতা। যা ইদানীং ভ্রমণ মানচিত্রে থাকা জনবহুল পাহাড়ি পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে ক্রমশ বিরল হয়ে উঠছে। এমনই এক মুখচোরা কন্যা চামুর্চির কথা শুনে মনের পাখা মেলে দিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম তার সন্ধানে।

ভারত-ভুটান সীমান্তে অবস্থিত নদী আর পাহাড়ঘেরা একটি ছোট্ট আদুরে গ্রাম চামুর্চি। জলপাইগুড়ি জেলার ধূপগুড়ি ব্লকের বানারহাট ডুয়ার্সের এক গুরুত্বপূর্ণ শহর, যার একপাশ দিয়ে বয়ে গেছে হাতিনালা নদী আর শহরের বুক চিরে নাগরিক সভ্যতার নিদর্শন হিসেবে চলে গেছে কালো পিচের ১৭ নম্বর জাতীয় সড়ক। এখান থেকে মাত্র ৭ কিলোমিটার দূরে আছে পাহাড়ি সবুজ হ্যামলেট চামুর্চি। নদী, পাহাড়, চা-বাগান এবং তার পাশে নয়নাভিরাম ডুয়ার্সের এই সবুজ কন্যাটির দিকে এখনও সেভাবে পর্যটকদের নজর পড়েনি বলে অন্যান্য জায়গার মতো পর্যটকদের ভিড়ের চাপে এখনও পর্যন্ত তার নাভিশ্বাস ওঠেনি। গ্রামটি ছোটো হলেও এর ব্যাপ্তি অনেকটা এলাকা জুড়ে।

সকালবেলা গরুমারা অভয়ারণ্যের জিপ সাফারি করে আমরা এই জায়গায় দিন-সফরের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম। ততক্ষণে মিঠে রোদ্দুর আর কুয়াশাভেজা হিমেল হাওয়া সঙ্গী হয়েছে। পথের মাঝে একটু চা আর জলখাবার খাওয়ার বিরতি। এবার বানারহাট পেরিয়ে হাতিনালা মোড় থেকে কিছুটা ঘুরে যেতেই শুরু হল একের পর এক ঢেউখেলানো সবুজের সাম্রাজ্য। সবুজ রঙের যে এত বিভাজন হতে পারে, সেটা বোধহয় ডুয়ার্স ভ্রমণ না করলে আর কোথাও গিয়ে বোঝা যায় না। এখানে প্রায় ২৩টির উপর চা-বাগান রয়েছে। ডুয়ার্সের চা-বাগান মানেই চিরপরিচিত সেই দৃশ্য— সকালবেলায় একদল চা-শ্রমিক দল বেঁধে বেরিয়ে পড়েছেন, কেউ কেউ ইতিমধ্যেই শুরু করেছেন একটি পাতা দুটি কুড়ি তোলা।

চারিদিকে ঢেউখেলানো চা-বাগানের সবুজ শামিয়ানা। বর্ষায় সদ্যস্নাত গাছগুলো যেন আরও সতেজ হয়ে নতুন রং তুলে ধরেছে। নিত্যদিনের কর্মচাঞ্চল্যে মুখর মহিলা শ্রমিকরা যথারীতি ব্যস্ত গাছের পরিচর্যায়। পিঠের টুকরির মধ্যে একে একে জড়ো হয় “একটি কুঁড়ি দুটি পাতা’। তাদের রংবেরঙের পোশাক ফুল গাছের সঙ্গে মানানসই, কিন্তু কাছে গেলে দেখা যায় বিষণ্ন মুখ। জীবনের সমস্ত সুখ, বেঁচে থাকার আনন্দ, আকাঙ্ক্ষা কেড়ে নিয়েছে। সেটা একমাত্র তাদের মুখের দিকে নিবিড় ভাবে পর্যবেক্ষণ করলে তবেই জানা যায়। এত অজস্রবার এ পথে যাতয়াত, তবুও সবুজ চা-বাগান দেখলে কিছুক্ষণের জন্য বিরতি নিয়ে ছবি তোলা যেন একপ্রকার বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছবি তুলে আবার গাড়িতে করে পথ চলা।

পাহাড়ে মরশুমি ফুলের বান ডেকেছে। সারা রাস্তায় যেন ফুলের জলসা বসেছে পর্যটকদের মনোরঞ্জনের জন্য। তাদের রূপের বাহারে আর রঙের ছটায় চোখে লাগে নেশা, তা সে বসতবাড়িতে সযত্নে লালন করাই হোক কিংবা পথের ধারে অযত্নে জঙ্গলে বেড়ে ওঠাতেই হোক৷ এক সময় শেষ হয় সবুজের এই অন্তহীন সাম্রাজ্য। যেহেতু কাছেই ভুটান সীমান্ত, গাড়ি যত এগোতে থাকে ততই চোখে পড়তে থাকে একটা মিশ্র ধরনের সংস্কৃতি। দেখতে দেখতে চলে আসি চামুর্চি বাজারে। হঠাৎ করেই যেন এই বাজারের হই- হট্টগোল, চেঁচামেচি, ধুলোবালিময় রাস্তা, দোকানপাট, গাড়ির হর্ন একটু বিসদৃশ লাগে।

একসময় পথের বাঁক পেরোতেই দূর থেকে দেখা যায় সবুজ পাহাড়। ওটাই ভুটান পাহাড়। প্রথম দর্শনেই যাকে দেখে মুগ্ধ হতে হয়। এই পাহাড় থেকে নেমে আসা ডায়না নদীর থেকে বিভক্ত হওয়া কৃতি-সুকৃতির সঙ্গমস্থলে অবস্থিত ধূপগুড়ি ব্লক পঞ্চায়েত সমিতির নির্মিত ইকো রিসর্ট। তবে এখানে যেতে গেলে ডায়না নদী পেরিয়ে যেতে হয়। এর সরু একটা রুপোলি রেখা জয়ন্তী নদীর কথা মনে করিয়ে দেয়। ডায়না রিভার বেড, বছরের অন্যান্য সময় শুষ্ক থাকলেও বর্ষাকালে জলে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। তখন এপারে গাড়ি রেখে ওপারে যেতে হয়। রিসর্টে বলা থাকলে সেখান থেকেই গাড়ি পাঠিয়ে দেয় তারা।

(ক্রমশ…)

ব্রেন টিউমার এবং আধুনিক চিকিৎসা

ব্রেন টিউমার হল মস্তিষ্কে অস্বাভাবিক কোষের বৃদ্ধি। এই বৃদ্ধি বিনাইন (Benign অর্থাৎ ক্যান্সারবিহীন) বা ম্যালিগন্যান্ট (Malignant অর্থাৎ ক্যান্সারযুক্ত) হতে পারে। এমনকী বিনাইন টিউমারও বিপজ্জনক হতে পারে। কারণ মস্তিষ্কে যে-কোনওরকম টিউমার-এর অতিরিক্ত চাপ সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। আর এই ব্রেন টিউমারের আধুনিক চিকিৎসার বিষয়ে বিস্তারিত জানালেন কনসালট্যান্ট নিউরোসার্জন ডা. অমিতাভ দাস।

ব্রেন টিউমার হয় কেন?

অনেক ক্ষেত্রে কোষের ডিএনএ-তে পরিবর্তনের (মিউটেশন) কারণে ব্রেন টিউমার তৈরি হয়। এর ফলে কোষগুলি অনিয়ন্ত্রিত ভাবে বৃদ্ধি পায় এবং বিভাজিত হয়। কিছু কারণ মস্তিষ্কের টিউমারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কিছুটা বাড়িয়ে দিতে পারে। যেমন— রেডিয়েশন-এর কারণে: যারা অন্য কোনও চিকিৎসার জন্য রেডিয়েশন-এর সংস্পর্শে এসেছেন, তাদের ঝুঁকি বেশি।

পারিবারিক ইতিহাস: পরিবারে কিছু বিরল জিনগত অবস্থা বিদ্যমান থাকলে মস্তিষ্কের টিউমারের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলতে পারে (যেমন— নিউরোফাইব্রোমাটোসিস)।

বয়স: মস্তিষ্কে কয়েক ধরনের টিউমার শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। আবার কয়েক ধরনের টিউমার বয়স্কদেরও হয়। পরিবেশগত কারণ: হাওয়ায় ভেসে বেড়ানো কিছু নির্দিষ্ট রাসায়নিক থেকেও মস্তিষ্কের টিউমার হওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিতে পারে। তবে গবেষকরা এই বিষয়ে এখনও নিশ্চিত নন।

বেশিরভাগ ব্রেন টিউমার কোনও স্পষ্ট কারণ ছাড়াই ঘটে। তাই, যদি আপনার বা আপনার পরিচিত কারওর ব্রেন টিউমার হয়, তাহলে মনে রাখবেন— এর জন্য কেউ দায়ী নয়।

ব্রেন টিউমারের ধরন

ব্রেন টিউমার দুই ধরনের— বিনাইন এবং ম্যালিগন্যান্ট।

বিনাইন টিউমার ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়, কিন্তু শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে না।

ম্যালিগন্যান্ট টিউমার (ক্যান্সারযুক্ত) দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে এবং মস্তিষ্কের টিস্যুর উপর আক্রমণ করতে পারে। এই ধরনের টিউমার-এরও কিছু প্রকারভেদ রয়েছে। যেমন—

মেনিনজিওমাস: সাধারণত বিনাইন জাতীয় এবং এগুলি মস্তিষ্কের আচ্ছাদনকারী স্তরগুলিতে শুরু হয়।

গ্লিওমাস: অ্যাস্ট্রোসাইটোমাস এবং গ্লিওব্লাস্টোমাস অন্তর্ভুক্ত। এগুলি মস্তিষ্কের সহায়ক কোষ থেকে আসে। পিটুইটারি টিউমার: বিনাইন জাতীয় এবং মস্তিষ্কের গোড়ায় অবস্থিত ছোটো গ্রন্থিতে শুরু হয়। মেডুলোব্লাস্টোমাস: শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।

মনে রাখবেন, টিউমারের ধরনের উপর নির্ভর করে চিকিৎসা পদ্ধতি এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে চিকিৎসার ফলও ভিন্ন হয়। নড়াচড়া, কথা বলা, স্মৃতিশক্তি এবং আরও অনেক কিছু নিয়ন্ত্রণ করে আমাদের মস্তিষ্ক। তাই যখন একটি টিউমার বৃদ্ধি পায়, তখন মস্তিষ্কে চাপ তৈরি হয় এবং মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রিত সবরকম কার্যকলাপে ব্যাঘাত ঘটে। তাই, কোনও কিছু অস্বাভাবিক মনে হলেই সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে এবং যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

লক্ষণ এবং সতর্কতা

  • সকালে কিংবা রাতে প্রায়ই যদি মাথাব্যথা করে
  • যদি স্বাভাবিক মাথাব্যথার চেয়ে বেশি কষ্ট অনুভূত হয়
  • হাঁচলে কিংবা কাশলে যদি মাথাব্যথা বেড়ে যায়
  • হঠাৎ ঝাঁকুনি বা শরীর শক্ত হয়ে যাওয়া
  • অকারণে বিভ্রান্তি তৈরি হলে কিংবা স্বাভাবিকতা হারালে
  • ঝাপসা বা ডাবল দৃষ্টি
  • শ্রবণশক্তি হ্রাস পাওয়া কিংবা কানে অনবরত ‘ভোঁ-ভোঁ’ শব্দ শোনা
  • হাত কিংবা পা নাড়াতে সমস্যা
  • শরীরের কিছু অংশে অকারণে অসাড়তা বা ঝিঁঝিঁ লাগা
  • ভারসাম্য বা হাঁটার সমস্যা
  • চিন্তাভাবনা বা আচরণে পরিবর্তন
  • স্মৃতিশক্তির সমস্যা তৈরি হলে
  • মেজাজ কিংবা ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন হলে
  • কথা বলতে বা বুঝতে অসুবিধা হলে।

তবে এইসব লক্ষণ দেখা দিলেই যে আপনার ব্রেন টিউমার হয়েছে এমনটা নয় এবং ভয় পাওয়ারও দরকার নেই। কিন্তু তখন সতর্কতা এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা জরুরি। এই লক্ষণগুলি দেখা দিলে অবশ্যই একজন নিউরোসার্জন-এর পরামর্শ নেওয়া উচিত। স্বাভাবিক ব্যথানাশক ওষুধে যদি সাড়া না দেয়, তাহলে বাড়তি সতর্কতার প্রয়োজন আছে।

টিউমার শনাক্ত করার জন্য মস্তিষ্কের স্ক্যান (যেমন এমআরআই বা সিটি) করার প্রয়োজন হতে পারে।

এমআরআই স্ক্যান: মস্তিষ্কের বিস্তারিত ছবি দেখার এটি সর্বোত্তম উপায়। এটি টিউমারের আকার এবং অবস্থান খুঁজে পেতে সাহায্য করে।

সিটি স্ক্যান: কখনও কখনও জরুরি পরিস্থিতিতে কিংবা এমআরআই সম্ভব না হলে সিটি স্ক্যান করা হয়।

বায়োপসি: কিছু ক্ষেত্রে টিউমারের একটি ছোটো অংশ নিয়ে তা পরীক্ষা করা হয়।

আধুনিক চিকিৎসা

বর্তমানে ব্রেন টিউমারের চিকিৎসার অনেক উন্নতি হয়েছে। যেমন—

  • এআই মাধ্যমে নিউরোমাইক্রোস্কোপ এবং নিউরোনেভিগেশন
  • নিউরো-রোবোটিক্স এবং অগমেন্টেড রিয়েলিটি
  • কীহোল বা এন্ডোস্কোপিক সার্জারি

সংবেদনশীল অঞ্চলে কিছু টিউমারের জন্য সম্পূর্ণ টিউমার অপসারণ সম্ভব নয়। এই ক্ষেত্রে টিউমারের কিছু অংশ অপসারণের জন্য অস্ত্রোপচার করা হয় (লক্ষণগুলি কমাতে), তারপরে অন্যান্য চিকিৎসা করা হয়।

স্টেরিওট্যাকটিক রেডিওসার্জারি (SRS) এবং গামা নাইফ রেডিওসার্জারি-ও (GKRS) সুফল দিচ্ছে এখন। কখনও কখনও, ঐতিহ্যবাহী ওপেন সার্জারি সর্বোত্তম বিকল্প নাও হতে পারে। বিশেষকরে যদি টিউমারটি মস্তিষ্কের একটি সূক্ষ্ম অংশে থাকে অথবা রোগীর সামগ্রিক স্বাস্থ্যের কারণে ওপেন সার্জারি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই ক্ষেত্রে স্টেরিওট্যাকটিক রেডিওসার্জারি (SRS) নামক একটি বিশেষ ধরনের উচ্চ-কেন্দ্রিক বিকিরণ ব্যবহার করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে বিকিরণ রশ্মি ব্যবহার করে, কাছাকাছি সুস্থ মস্তিষ্কের টিস্যুকে বাঁচানোর সময় ক্যান্সার কোষগুলিকে ধ্বংস করা হয়। এটি ছোটো, সুনির্দিষ্ট টিউমারের জন্য বিশেষ ভাবে সহায়ক হতে পারে। SRS-এর সবচেয়ে উন্নত রূপগুলির মধ্যে একটি হল গামা নাইফ রেডিওসার্জারি (GKRS)। নাইফ শব্দটি থাকলেও, এক্ষেত্রে কোনও ছুরি ব্যবহার করা হয় না। এটি শত শত কেন্দ্রীভূত বিকিরণ রশ্মি ব্যবহার করে চিকিৎসা করা হয়।

SRS এবং GKRS পদ্ধতির প্রয়োগ

  • মস্তিষ্কের ছোটো টিউমার বা মেটাস্টেস (অন্য কোথাও থেকে মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়া ক্যান্সার) দেখা দিলে
  • মেনিনজিওমাস বা অ্যাকোস্টিক নিউরোমাসের মতো কিছু বিনাইন টিউমার হলে
  • সংবেদনশীল স্থানে টিউমার হলে।

রেডিয়েশন থেরাপি

  • অস্ত্রোপচারের পরে অবশিষ্ট টিউমার কোষ ধ্বংস করার জন্য
  • টিউমারের সংবেদনশীল স্থানে অবস্থানের কারণে যখন অস্ত্রোপচার সম্ভব হয় না।

কেমোথেরাপি এবং টার্গেটেড থেরাপি

কিছু টিউমার কেমোথেরাপির ওষুধে ভালো সাড়া দেয়, যা ক্যান্সার কোষকে মেরে ফেলে বা তাদের বৃদ্ধি ধীর করে দেয়। এগুলি ট্যাবলেট কিংবা ইনজেকশনের মাধ্যমে দেওয়া যেতে পারে।

টার্গেটেড থেরাপিতে এমন ওষুধ ব্যবহার করা হয়, যা ক্যান্সার-কোষের উপর আক্রমণ করে। এটি ঐতিহ্যবাহী কেমোথেরাপির তুলনায় আরও কার্যকর হতে পারে এবং কম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে।

ইমিউনোথেরাপি: যা আপনার শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে টিউমারের সঙ্গে লড়াই করতে সাহায্য করে।

গ্লিওব্লাস্টোমাসের মতো নির্দিষ্ট টিউমারের জন্য একটি নতুন চিকিৎসা পদ্ধতিও রয়েছে এখন। রোগীরা একটি বিশেষ ক্যাপ পরেন, যা ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি বন্ধ করার জন্য মৃদু বৈদ্যুতিক তরঙ্গ পাঠায়। এটি কেমোথেরাপির সঙ্গে ব্যবহার করা যেতে পারে।

মনে রাখা জরুরি

  • মেনিনজিওমাসের মতো বিনাইন টিউমার সম্পূর্ণরূপে অপসারণ এবং নিরাময় করা যেতে পারে। গ্লিওব্লাস্টোমাসের মতো ম্যালিগন্যান্ট টিউমারের চিকিৎসা করা কঠিন, তবে নতুন থেরাপি মানুষকে আরও সময় এবং উন্নত জীবনযাপনের মান প্রদান করছে।
  • মস্তিষ্কের যে অংশ কথা বলা কিংবা অঙ্গ সঞ্চালন নিয়ন্ত্রণ করে, সেই স্থানের টিউমার সম্পূর্ণরূপে অপসারণ করা কঠিন হতে পারে।
  • অল্পবয়সি রোগী এবং যাদের সাধারণ স্বাস্থ্য ভালো, তাদের চিকিৎসা করা যায় নিশ্চিন্তে। কিন্তু অন্যান্য রোগে আক্রান্ত থাকলে কিংবা বয়স বেশি হলে টিউমার-এর চিকিৎসা খুব সাবধানে করতে হয়। তবে, ব্রেন টিউমার আছে শুনে ভয় পাবেন না। মনে রাখবেন, সব ব্রেন টিউমার-ই ক্যান্সারযুক্ত নয়। অনেক টিউমার সফল ভাবে চিকিৎসা করা যেতে পারে। প্রাথমিক রোগ নির্ণয় এবং আধুনিক চিকিৎসা আপনাকে ভালো ফলাফলের জন্য সর্বোত্তম সুযোগ দেয়। আসলে আমাদের মস্তিষ্ক একটি আশ্চর্যজনক এবং জটিল অঙ্গ। তাই এর যত্ন নেওয়া জরুরি।

Tasty Tasty মিষ্টি

মিষ্টি খাবারের প্রতি আমাদের আকর্ষণ চিরকালীন। বিশেষকরে আপনজনের সঙ্গে আড্ডা আর হই-হুল্লোড় সম্পূর্ণ করতে হলে, মিষ্টি চাই-ই চাই। তাই, এবার উপভোগ করুন টেস্টি-টেস্টি মিষ্টি। রইল উপকরণ এবং প্রণালী।

স্ট্রবেরি লাড্ডু

উপকরণ (ব্যাটার-এর জন্য): ১.১/২ কাপ বেসন, ১ কাপ জল, ২ ছোটো চামচ রোজ পিংক কালার, ভাজার জন্য ঘি, নুন স্বাদমতো৷

উপকরণ (সুগার সিরাপ উইদ স্ট্রবেরি ক্রাশ): ১.১/২ কাপ চিনি, ২/৩ কাপ জল, ২ কাপ স্ট্রবেরি ক্রাশ।

উপকরণ (সুগার সিরাপ উইদআউট স্ট্রবেরি ক্রাশ): ১.১/২ কাপ চিনি, ১ কাপ জল, ১/২ কাপ স্ট্রবেরি এসেন্স, ১০ ড্রপ স্ট্রবেরি রং। উপকরণ সাজানোর জন্য: কুচোনো পেস্তা, তৰক৷

প্রণালী (ব্যাটার তৈরির): একটা পাত্রে বেসন, জল, নুন দিয়ে ভালো ভাবে মিশিয়ে নিন। এতে রোজ পিংক কালার দিয়ে মসৃণ ভাবে ব্যাটার গুলে নিন। ১০ মিনিটের জন্য আলাদা করে রেখে দিন।

প্রণালী (ভাজার জন্য): বোঁদে ভেজে তুলুন। এই ভাজা বোঁদে প্রথমে সাধারণ সুগার সিরাপের মধ্যে ঢেলে দিন। রস ঢুকলে দ্বিতীয় সিরাপের মধ্যে ঢেলে মাখিয়ে নিতে হবে।

প্রণালী (সুগার সিরাপ স্ট্রবেরি ক্রাশ-এর জন্য): একটা সসপ্যানে চিনি আর জল দিয়ে রস ঘন করতে থাকুন। এতে স্ট্রবেরি ক্রাশ ঢেলে ভালো ভাবে মেশান। এবার ততক্ষণ নাড়াচাড়া করুন, যতক্ষণ না রস ঘন হয়ে যায়। এবার সুগার সিরাপে ঢেলে রাখা বোঁদে, এই স্ট্রবেরি ক্রাশ দেওয়া রসের সঙ্গে ভালো ভাবে মাখিয়ে নিন।

লাড্ডু তৈরির জন্য: রসে ভেজানো বোঁদে একটা থালায় ছড়িয়ে নিন। হালকা গরম থাকা অবস্থায় হাতের তালুতে চেপে লাড্ডু গড়ে নিন। পেস্তা ও তবক দিয়ে সাজিয়ে পরিবেশন করুন।

এলাইচি প্যাড়া

উপকরণ: ১ লিটার ফুলক্রিম দুধ, ২ ছোটো চামচ কর্নফ্লাওয়ার, ৩ বড়ো চামচ চিনি, ১/৮ ছোটো চামচ সিট্রিক অ্যাসিড, ১/৪ কাপ মিল্ক পাউডার, ১/৮ ছোটো চামচ কেসর রং, ১/৪ ছোটো চামচ ছোটো এলাচগুঁড়ো, অল্প সাদা ও ব্রাউন চকো চিপ্‌স।

প্রণালী: ২ বড়ো চামচ কর্নফ্লাওয়ার দুধে গুলে রাখুন। এবার অল্প সিট্রিক অ্যাসিড আলাদা পাত্রে নিয়ে, ১ চামচ জল দিয়ে গুলে রাখুন। দুধ ফুটতে দিন। দুধের পরিমাণ শুকিয়ে অর্ধেক হয়ে এলে অল্প কর্নফ্লাওয়ার মেশানো দুধ ঢেলে দিন এবং সিট্রিক অ্যাসিডের মিশ্রণও ঢেলে দিন। সমানে নাড়তে থাকুন। মিশ্রণ ঘন হয়ে গেলে মিল্ক পাউডার, কেসর রং, চিনি ও এলাচগুঁড়ো নিয়ে নাড়াচাড়া করুন। দুধ শুকিয়ে চটচটে হয়ে এলে আঁচ বন্ধ করুন। ঠান্ডা হলে এই মিশ্রণ থেকে ছোটো ছোটো বল নিয়ে হাতের তালু দিয়ে চেপে প্যাড়া গড়ে নিন। সাদা ও ব্রাউন চকো চিপ্‌স দিয়ে সাজিয়ে পরিবেশন করুন।

বাদাম-খেজুর লাড্ডু

উপকরণ: ১৫০ গ্রাম শুকনো খেজুর, ১৫০ গ্রাম দুধ, ২০টা বাদাম, ২ বড়ো চামচ কাজু, ২ বড়ো চামচ খরবুজার বীজ শুকনো খোলায় ভাজা, ১ ছোটো চামচ এলাচগুঁড়ো, ১০টা গোটা কাজু, ২ বড়ো চামচ দেশি ঘি।

প্রণালী: খেজুর সারারাত দুধে ভিজিয়ে রাখুন। সকালে বীজ বের করে বাদামের সঙ্গে মিক্সিতে মিহি করে বেটে নিন। একটা ননস্টিক প্যানে ঘি গরম করে গোটা কাজু ভেজে নিন। এবার কড়ায় আবার ঘি, খেজুর-বাদামের মিশ্রণ দিয়ে ভালো ভাবে নাড়াচাড়া করুন। ১৫ মিনিট পর নামিয়ে ঠান্ডা করুন। এতে গোটা কাজু বাদ দিয়ে মেওয়া ও এলাচগুঁড়ো ঢেলে দিন। এই মিশ্রণ থেকে ছোটো ছোটো লাড্ডু গড়ে নিন। প্রত্যেকটায় কাজু আটকে দিন। এবার পরিবেশন করুন।

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব