‘রঙ্গকর্মী’-র পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে কলকাতা-য় পাঁচ দিনের উৎসব

বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব ঊষা গঙ্গোপাধ্যায় আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে ১৯৭৬ সালের ১৬ জানুয়ারি তৈরি করেছিলেন জাতীয় নাটকের দল— ‘রঙ্গকর্মী’। এবার পঞ্চাশ বছর পূর্ণ করছে সেই কিংবদন্তি নাটকের দল। পঞ্চাশ বছর সময় ধরে অনেক উত্থান-পতন, অনেক প্রতিকূলতার মধ্যেও, পরিবর্তন, পরিমার্জন এবং পরিবর্ধন নিয়ে এসেছে ‘রঙ্গকর্মী’। গড়ে উঠেছে একটা বৃহৎ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে।

নিজের শহর কলকাতা থেকে শুরু করে, দেশের তথা আন্তর্জাতিক মঞ্চে ‘রঙ্গকর্মী’ ভালোবাসার বিশেষ আসন প্রতিষ্ঠা করে নিয়েছে। দেশের মাটির বাইরে জার্মানি, পাকিস্তান, বাংলাদেশ প্রভৃতি দেশে নিজেদের নাটক মঞ্চস্থ করে নাটকপ্রেমীদের অন্তরে স্থান পেয়েছে এই দল। দর্শক সমাদৃত নাটকগুলোর মধ্যে কোর্ট মার্শাল, রুদালি, চন্ডালিকা, অন্তর্যাত্রা, মাইয়াৎ, বদনাম মন্টো, লোক কথা উল্লেখযোগ্য। বতর্মানে, ঊষা গঙ্গোপাধ্যায়-এর পদাঙ্ক অনুসরণ করে নাট্য-নির্দেশক অনিরুদ্ধ সরকারের তত্ত্বাবধানে ‘রঙ্গকর্মী’ তার জয়যাত্রা অব্যাহত রেখেছে। নাটকগুলোর গল্প যেমন সামাজিক প্রেক্ষাপট নির্ভর, তেমনই নাটক  নিয়ে চলে কর্মশালা।

পঞ্চাশ বছর পূর্ণ হবে আগামী ১৬ জানুয়ারি। তাই, এই বিশেষ বছরকে মনে রেখে, পাঁচ দিন ধরে কলকাতা-য় আয়োজিত হতে চলেছে নানা ধরনের অনুষ্ঠান। এই পাঁচ দিনের উৎসব চলবে চলতি বছরের ১৬ জানুয়ারি থেকে ২০ জানুয়ারী পর্যন্ত।

১৬ জানুয়ারী সুজাতা সদনে বিকেল সাড়ে পাঁচটায় উৎসবের সূচনা হবে এবং তারপরে থাকছে বিশেষ ভিডিও স্ক্রীনিং— রঙ্গকর্মীর নাটক ‘লোককথা’, যা পরিচালনা করেছিলেন উষা গঙ্গোপাধ্যায়।

১৭ জানুয়ারী আকাদেমি অফ ফাইন আর্টস-এ, দুপুর ৩-টেয় পরিবেশিত হবে ‘বিডন স্ট্রিট শুভম’-এর ‘হ-জ-ব-র-ল’, পরিচালনায় অনমিত্র খান। এরপরে মঞ্চস্থ হবে রঙ্গকর্মীর ‘চন্দা বেড়নি’, পরিচালনায় অনিরুদ্ধ সরকার।

১৮ জানুয়ারী রঙ্গকর্মীর স্টুডিও-তে বিকেল ৫টায়- মাইম; নীরব প্রতিফলনের মাধ্যমে একটি যাত্রা ,পরিচালক-পালি পাল এবং দেব কুমার পাল। তারপরে মঞ্চস্থ হবে রঙ্গকর্মীর নাটক ‘অভি রাত বাকি হ্যায়’ , পরিচালনায় সৌতি চক্রবর্তী।

১৯ জানুয়ারী রঙ্গকর্মীর স্টুডিও থিয়েটার-এ, বিকেল ৫-টায় রঙ্গকর্মীর নাটক ‘আধে আধুরে’ , পরিচালনায় অনিরুদ্ধ সরকার। এরপরে গানের অনুষ্ঠান। শেষ দিনে অর্থাৎ ২০ জানুয়ারী রঙ্গকর্মীর স্টুডিও থিয়েটার-এ বিকেল ৫টায় রঙ্গকর্মীর নাটক  ‘পশমিনা’, পরিচালক সাজিদা সাজি। সবশেষে বাউল গানের পরিবেশনা।

সংস্থার পক্ষে অনিরুদ্ধ সরকার জানিয়েছেন, ‘ঊষা গঙ্গোপাধ্যায়-এর মৃত্যুর পর, রঙ্গকর্মীর পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে  প্রতিষ্ঠাতার শৈল্পিক ও নৈতিক লক্ষ্যের প্রতি অবিচল থেকে নতুন নতুন প্রযোজনা করে চলেছি। আশা করি সবার ভালো লাগবে।’

অন্ধবিশ্বাসের শিকার হয়ে চলেছেন নীরবে

আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং সিরিয়ার কিছু অংশে উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলি বাড়াবাড়ি করছে, যা কড়া হাতে দমন করা উচিত। তবে, আমেরিকায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে স্লোগান উঠেছে— ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’। আর ছোটো-বড়ো কিছু দেশও এখন আমেরিকার মতো একই ভাবে স্লোগান তুলতে চাইছে। অন্যদিকে নেপালের রাষ্ট্রীয় গণতান্ত্রিক দল রাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনার জন্য জমায়েত করছে আর নির্বাচিত সরকার এই পরিস্থিতি নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করেছে। অর্থাৎ, ভিন্ন দেশ, ভিন্ন পরিস্থিতি।

অবশ্য, সর্বত্র একটি বিষয়ে কোনও তফাত নেই! আর এই বিষয়টি হল- -ধর্ম। সর্বত্র ধর্মের ব্যবসায়ীরা রাজনীতি ও সমাজে প্রবেশ করেছে। সর্বত্র ভগবান, যীশু, আল্লাহ প্রভৃতিকে মাধ্যম করে চলছে মানুষকে বোকা বানানোর কর্মশালা। শাসন করার ক্ষেত্রে রাজনীতির চেয়ে বেশি ক্ষমতা ভোগ করছে ধর্মের দোকানদাররা। তাই, এখন ধর্মস্থানে নারীদের দাসত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সমাজে বৈষম্য বৃদ্ধি পেয়েছে। আর যারা ভণ্ড ধার্মিকদের নির্দেশ অনুসরণ করছে, তারা শুধু নিজেদের ক্ষতি করছে না, পরবর্তী প্রজন্মকেও অন্ধবিশ্বাসের ফলোয়ার বানাচ্ছে। এর জন্য সবচেয়ে বেশি কুফল ভোগ করতে হচ্ছে মহিলাদের।

ভারতীয় হিন্দু মহিলারা মাথায় হাঁড়ি নিয়ে দীর্ঘ পথ হাঁটছেন এবং ঠান্ডা জলে দাঁড়িয়ে থেকে শরীরের ক্ষতি করছেন অন্ধবিশ্বাসের শিকার হয়ে। আবার মুসলিম দেশগুলিতে প্রাচীন ধর্মীয় নীতির কারণে মহিলাদের আজও বোরখার আড়ালে থাকতে হচ্ছে। পশ্চিমী কিছু দেশেও শিক্ষিত মহিলারা যারা ঘরের বাইরে কাজ করতে সক্ষম, তাদেরও সঙ্গী বেছে নেওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। আর ধর্ম এখন এতটাই জনপ্রিয় যে, ধর্মস্থানগুলোকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলা হচ্ছে।

নতুন এই ধর্মীয় জোয়ার সভ্যতার অগ্রগতির পরিবর্তে, শতাব্দী প্রাচীন দাসত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে মহিলাদের। আসলে, মহিলাদের ধর্মে ব্যস্ত রেখে ফায়দা তুলছে ধান্দাবাজরা। যেখানে নারী-পুরুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা, সেখানে মহিলাদের আরও বেশি করে পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আর এই সুযোগে সুবিধাবাদীরা কেড়ে নিচ্ছেন মহিলাদের স্বাধীন ভাবে বাঁচার অধিকার।

আমেরিকা, ভারত, ইউরোপ, চীন এবং জাপানের সর্বত্র এখন এই ধরণের ধর্মের দোকারদারদের সংখ্যা বাড়ছে। আর এসব চলছে ক্ষমতার অপব্যবহার করে। যেখানে গণতন্ত্রের মাধ্যমে নারীর অধিকার, সম্মান রক্ষা করার কথা, সেখানে একের পর এক কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে মহিলাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার এবং স্বাধীনতা।

নেপাল খুবই ছোটো একটি দেশ কিন্তু অনেক কষ্টে তারা রাজতন্ত্র থেকে মুক্তি পেয়েছিল। অথচ একসময় ওখানে মহিলাদের দাসী করে রাখা হয়েছিল। আসলে, কমিউনিস্ট দলগুলি ওখানে লড়াই করে জনগণের অধিকার আদায় করেছে, নারীদের সম্মান দিয়েছে। এভাবেই সে দেশে রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি বৃদ্ধি করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও মান উন্নত করেছে নেপাল। কিন্তু এখন নেপালেও আবার নতুন করে চলছে ধর্মের রাজনীতি। আর যেসব দেশে ধর্মের ভণ্ডামি বেড়েছে, সেইসব দেশ ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছে। ইরান, আফগানিস্তান এবং লিবিয়ায় সবচেয়ে বেশি চলছে ধর্ম নিয়ে মাতামাতি।

মনে রাখবেন, ধর্মের দোকানদাররা দেশে সুশাসন চান না। কারণ, সুশাসন মানেই তো অন্যায় রুখে দেওয়া, অপরাধ দমন করা। আসলে ধান্দাবাজরা চায় এমন এক পরিবেশ, যেখানে তাদের কথা প্রাধান্য পাবে, তাদের কথায় সবাই দাসত্ব করবে আর অন্ধবিশ্বাসীদের দানের টাকায় আরাম-আয়াসের জীবনযাপন করবে তারা। অথচ, আসল ধর্ম মানুষকে বিনয়ী করে তোলে, মানবিক করে তোলে, সৎ পথে চলতে শেখায়।

সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হল এই যে, মহিলাদের এখন ধর্ম আর মোবাইল ফোনে বন্দি করে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আসলে, মহিলাদের বাস্তব থেকে আরও দূরে সরিয়ে রাখার এ এক বিরাট কৌশল। এখনও যদি মা-বোনেদের ঘুম না ভাঙে, তাহলে তারা এভাবেই নীরবে অন্ধবিশ্বাসের শিকার হয়ে, প্রকৃতপক্ষে হারাবেন স্বাধীনতা এবং বাঁচার অধিকার।

ইতিহাসের গন্ধমাখা হো চি মিন সিটি (শেষ পর্ব)

প্রবেশদ্বার পেরিয়েই মৈত্রেয় বুদ্ধের হাসিমুখ, শায়িত বুদ্ধের প্রশান্তি ও অমিতাভ বুদ্ধের আশীর্বাদী দৃষ্টি যেন মনে এক অদ্ভুত শীতলতা বয়ে আনল। স্বর্ণাভ মূর্তির দীপ্তি, ধূপের সুগন্ধ আর প্রার্থনার নীরবতা মন্দিরের ভিতরে এক পবিত্র আবহ সৃষ্টি করেছে।

পিছনের বাগানে ছোট্ট পুকুরের জলে কই মাছের খেলা আর বাতাসে ভেসে আসা ঘণ্টার ধ্বনি যেন সব দুশ্চিন্তা মুছে দিল। এখানে সময় যেন থমকে গেছে, অথবা হয়তো বয়ে চলেছে এক অনন্ত প্রবাহে, যেখানে জাগতিক ব্যস্ততার কোনও স্থান নেই। ভিন ট্রানগ প্যাগোডা শুধুমাত্র একটি দর্শনীয় স্থানই নয়, বরং এক অভিজ্ঞতা, এক অনুভূতি, এক নিরবধি শান্তির স্পর্শ!

আজ হো চি মিন সিটিতে আমাদের চতুর্থ দিন। বেশ কিছু জায়গা এখনও দেখা হয়নি। তাই সময় নষ্ট না করে বেরিয়ে পড়লাম! আমাদের প্রথম গন্তব্য রি-ইউনিফিকেশন প্যালেস। এটি ভিয়েতনামের ইতিহাসের প্রতীক, এক অমর মুহূর্তের সাক্ষী। ভিয়েতনাম যুদ্ধের যবনিকা পতন এই প্যালেসেই হয়েছিল। এটি এখন ভিয়েতনামের ঐক্যের প্রতীক।

১৯৬৬ সালে তৈরি এই প্রাসাদ ছিল দক্ষিণ ভিয়েতনামের রাষ্ট্রপতির অফিস এবং বাসস্থান। তবে, সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা ঘটে ১৯৭৫ সালের ৩০ এপ্রিল, যখন উত্তর ভিয়েতনাম দক্ষিণ ভিয়েতনামকে পরাজিত করে এবং একটি উত্তর ভিয়েতনামি ট্যাঙ্ক এই প্রাসাদের গেট ভেঙে ভিতরে ঢুকে ভিয়েতনামের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিল।

রি-ইউনিফিকেশন প্যালেসের স্থাপত্য নজর কাড়তে বাধ্য। কিউবান শৈলীতে তৈরি, সাদা দেয়াল, উজ্জ্বল রঙের টাইলস এবং বিশাল আঙিনা প্রাসাদটিকে একটি চোখধাঁধানো সৌন্দর্য দিয়েছে। প্রেসিডেন্সিয়াল কক্ষ এবং যুদ্ধ কক্ষ প্যালেসের প্রধান আকর্ষণ। এখানে যুদ্ধের সময় ব্যবহার করা টেলিফোন এবং ম্যাপের সাহায্যে পরিকল্পনা করার স্মৃতিচিহ্ন এখনও রয়েছে। দোতলায় রয়েছে দক্ষিণ ভিয়েতনাম সরকারের অফিস এবং গেস্ট রুম। সবশেষে ছাদে গিয়ে দাঁড়ালাম। এখান থেকে পুরো হো চি মিন সিটি দেখা যায়। এখান থেকে সাইগনের স্কাইলাইন এবং রাস্তাগুলির দৃশ্য যেন এক অন্য রূপে ধরা দিল!

অনেক ঘোরাঘুরি হয়ে গেছে! এবার বিশ্রাম নেওয়ার সময় এবং সঙ্গে লাঞ্চও সেরে নিতে হবে। তাই ট্যাক্সি নিয়ে চলে গেলাম সাইগনের প্রাণকেন্দ্র বেন থান মার্কেট। বেন থান মার্কেট হল হো চি মিন সিটির সবচেয়ে বিখ্যাত ও প্রাচীন বাজার। এখানে স্থানীয় বাসিন্দা এবং পর্যটকরা কেনাকাটা, খাওয়া-দাওয়া ও শহরের প্রাণবন্ত পরিবেশ উপভোগ করতে আসে। এখানে একাধিক রেস্তোরাঁ রয়েছে, তাই একটু দেখেশুনে খাবার খেলাম। তবে মনের মধ্যে তখন ছিল বেন থান মার্কেটের শপিং কমপ্লেক্স।

মার্কেটের ভিতরে ঢোকার পর বুঝতে পারলাম, এর থেকে পরিকল্পিত ও সংগঠিত বিশৃঙ্খল জায়গা আগে হয়তো দেখিনি। তবে জায়গাটা বেশ প্রাণবন্ত, রঙিন এবং স্থানীয় ভিয়েতনামিজ জীবনযাত্রার এক আদর্শ প্রতীক। বেন থান মার্কেট দর কষাকষির জন্য বিখ্যাত। এখানে ভিয়েতনামি সামগ্রী, স্যুভেনির, জামাকাপড়, খাবার এবং নিত্য প্রয়োজনীয় প্রায় সবকিছু পাওয়া যায়।

আমি আমার দর কষাকষির দক্ষতাটা একটু ঝালিয়ে নেব ভেবে কয়েকটি জিনিসের দাম জিজ্ঞেস করলাম। কিন্তু একদিকে ভাষার বিভ্রাট, অন্যদিকে দরদাম করতে আমার অপারদর্শিতা— দুইয়ের সমন্বয়ে আমার শপিং বেশিদূর এগোচ্ছে না দেখে, শেষ পর্যন্ত আমরা একটি বড়ো দোকানে গেলাম। এখানে দরদামের প্রয়োজন নেই। এখানে সবকিছু বাঁধা দামে বিক্রি হয়। এখান থেকেই কিছু জিনিসপত্র কিনে বাইরে বেরিয়ে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। এখন হোটেলে ফিরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার পালা।

আজ হো চি মিন সিটিতে আমাদের শেষ দিন। সন্ধ্যার পরিকল্পনাটা আগে থেকেই করে রেখেছিলাম। বিটেক্স কোফাই ন্যান্সিয়াল টাওয়ার, ২৬২ মিটার উচ্চতার ৬৮ তলা বিশিষ্ট টাওয়ার হো চি মিন সিটির অন্যতম আইকনিক স্থাপত্য। এটি শুধু একটি আকাশচুম্বী ভবন নয়, এটি ভিয়েতনামের দ্রুত নগরায়নের জীবন্ত প্রতীক। যখন আমরা বিকেলে এখানে পৌঁছালাম, তখন কাচের তৈরি টাওয়ারের বাইরের অংশ সূর্যের আলোতে এক মায়াবী পরিবেশ সৃষ্টি করছিল। চারদিকে সোনালি রঙের আভা ছড়াচ্ছিল, যেন এক সোনালি দিন!

এই টাওয়ার-এ অনেকগুলো দেখার জিনিস রয়েছে। তার মধ্যে প্রথমেই বলতে হয় সাইগন স্কাইডেকের কথা। ৪৯তম তলার সাইগন স্কাইডেকে যাওয়ার যাত্রা শুরু হয় ভূমিতল লবি থেকে। মাত্র ৩৫ সেকেন্ডে দ্রুতগতির এলিভেটর পৌঁছে দিল আমাদের গন্তব্যে। দরজা খোলার পর প্রথমেই মুগ্ধ হলাম ৩৬০ ডিগ্রি প্যানোরামিক ভিউ দেখে।

উপর থেকে নীচে তাকালে প্রথমেই চোখে পড়ে সাইগন নদী। সন্ধ্যার আলোতে সাইগন নদীকে যেন নব-বিবাহিতা বধূর মতো দেখাচ্ছে। ডেকের চারদিকে ঘুরে ঘুরে দেখতে বেশ ভালো লাগছিল। পশ্চিমদিকে ডিস্ট্রিক্ট ৫-এর চায়নাটাউন, আর পূর্বদিকে দ্রুত উন্নয়নশীল থু থিয়েম নিউ আরবান এরিয়া দেখা যাচ্ছে। এছাড়াও এখানে ডিজিটাল টাচস্ক্রিনের মাধ্যমে যেমন শহরের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান দেখা যায়, তেমনই তাদের সম্পর্কে নানারকম তথ্যও জানা যায়।

সাইগন স্কাইডেকে কিছুটা সময় কাটিয়ে আমরা আবার উপরে ৬০ তলায় গেলাম। এখানে রয়েছে সাইগনের বিখ্যাত হেইনেকেন বিয়ার কোম্পানির একটি ইন্টার্যাক্টিভ ব্রুয়ারি ট্যুর। এই ট্যুর থেকে হেইনেকেন বিয়ারের ইতিহাস, প্রস্তুত প্রক্রিয়া এবং সাংস্কৃতিক গুরুত্ব সম্পর্কে অনেক কিছু জানা যায়। ১৮৬৭ সালে এই হেইনেকেন ব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এখানে হ্যান্ডস-অন প্রদর্শনীর মাধ্যমে একটি মাল্টি-সেন্সরি ট্যুর উপভোগ করার পর, সাইগন শহরের সূর্যাস্ত দেখার অভিজ্ঞতা সন্ধ্যার আমেজটাকে যেন অনেকটা বাড়িয়ে দিল।

বিটেক্সকো টাওয়ারের ৫০ তলায় রয়েছে সাইগণ রেস্টুরেন্ট। এখানে ভিয়েতনামি এবং আন্তর্জাতিক খাবার পরিবেশন করা হয়। মার্জিত পরিবেশ এবং উচ্চমানের পরিসেবার জন্য এই রেস্তোরাঁ বিখ্যাত। এখানে ডিনার করার পাশাপাশি, এখান থেকে রাতের হো চি মিন সিটির অপরূপ রূপ উপভোগ করার অভিজ্ঞতা হল। দিনের ব্যস্ত হো চি মিন সিটির সঙ্গে রাতের আলো ঝলমলে রুপসি শহরের যেন কোনও মিল নেই। দিনের সব কালিমা মুছে দিয়েছে চারিদিকে হাজার হাজার আলোর রশ্মি! সারাদিনের ঘোরাঘুরি ব্যস্ততার শেষে এই অল্প কিছুটা সময় যেন মুঠোয় ভরে সঙ্গে নিয়ে যেতে মন চাইছে!

এখন ফিরে যাওয়ার সময়। কাল নিজের দেশে ফিরে যেতে হবে। এবারের হো চি মিন সিটি ভ্রমণের অভিজ্ঞতা ছিল টক, ঝাল, মিষ্টির একটা সুন্দর মিশ্রণ। ভিয়েতনাম যুদ্ধের ইতিহাসকে যেমন নিজের চোখে দেখলাম, তেমনই আবার মেকং নদীর বুকে ভিয়েতনামের সেই প্রাণভোমরাকেও খুঁজে পেলাম। কোনও বিদেশি শক্তি এত শক্তিশালী নয় যে, এই প্রাণভোমরাকে এদের কাছ থেকে নিয়ে যাবে। আমি স্যুভেনির ভরা একটি স্যুটকেস, হৃদয়ভরা স্মৃতি এবং ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি নিয়ে বিমানবন্দরের দিকে রওনা হলাম। সম্ভবত আরও ভালো দর কষাকষির দক্ষতা এবং রাস্তার খাবারের জন্য একটি শক্তিশালী পেট নিয়ে ভবিষ্যতে আবার ফিরে আসব।

স্মৃতির অতলে (পর্ব-০১)

সময় স্মৃতির উপর ধুলোর প্রলেপ ফেলে। কিন্তু স্মৃতিকে কখনওই পুরোপুরি মুছে ফেলতে পারে না। সবাই বলে সময়ের অনেক ক্ষমতা। কিন্তু স্মৃতিকে বিস্মৃতিতে বদলে দেবার ক্ষমতা তার নেই। আর তাই দুই কুড়ি বছর আগের আমার এই স্মৃতি আমি সযত্নে লালন-পালন করে চলেছি আমার মনের মণিকোঠায়। তবে আমি যে এই স্মৃতিগুলোকে এখনও বহন করে চলেছি, সেটাই এতগুলো বছর নিজে বুঝে উঠতে পারিনি।

আজ হঠাৎ মনে হল এতগুলো বছর পেরিয়েও আমি সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি। চাকরি জীবনের ব্যস্ততা, সংসার জীবনের দীর্ঘ টানাপোড়েন সব কিছুর মাঝে নদীর মতো বয়ে চলা সময় সেই স্মৃতির স্তরে স্তরে এমন ভাবে পলি জমিয়েছিল যে, ভেবেছিলাম হয়তো সব কিছু ভুলেই গেছি। কিন্তু আজ চল্লিশটা বসন্ত পেরিয়ে এসে হঠাৎ সেই পুরোনো গ্রাম, পুরোনো নদী, পুরোনো গাছ— সব কিছুর মাঝে সেই পুরোনো স্পর্শ অনুভব করলাম। সেই তোমার প্রথম স্পর্শ।

এখন এই মুহূর্তে নদীর জলের বয়ে চলার তির তির শব্দ কিংবা গাছের পাতায় পাতায় হাওয়া লেগে ঝির ঝির শব্দ, সব কিছু যেন আমার কানে ফিসফিস করে বলে চলেছে— – তুমি আছো, তুমি আছো, আমার মনে তুমি একই ভাবে আছো, সেই প্রথম দিনের মতো।

বছর বাইশের সদ্য কলেজ পেরোনো তরুণীর জীবনের প্রথম বসন্তের ছোঁয়া নিয়ে এসেছিলে তুমি। আমাদের সমাজের তথাকথিত সুন্দরীদের দলে আমি কোনওদিনই ছিলাম না। তাই কোনও পুরুষের প্রেয়সীও আমি হয়ে উঠতে পারিনি। কারওর খাতার পিছনে লেখা হয়নি আমার নাম কিংবা কারওর হাতের মুঠোয় কোনওদিন ধরা হয়নি আমার হাত। তা নিয়ে অবশ্য একেবারেই কোনও দুঃখ ছিল না আমার মনে কোনওদিন। বেশ ছিলাম নিজেকে নিয়ে, নিজের মতো। চেনা ছন্দে বয়ে চলছিল জীবননদীর ধারা।

তারপর হঠাৎ একদিন তুমি এই গ্রামে এলে স্কুলের চাকরি নিয়ে। তোমার সঙ্গে প্রথম দেখা এই নদীর পাড়টাতেই। আমি ছিলাম হাসি গল্পে মত্ত আমার বন্ধুদের সঙ্গে। তুমি আমাদের লক্ষ্য করে সেদিন জিজ্ঞাসা করেছিলে, ‘আচ্ছা, গ্রামের হাই স্কুলটা কোন দিকে?’ একবার মুখ ঘুরিয়ে তোমায় দেখে নিয়ে স্কুলবাড়িটা দেখিয়ে দিয়েছিলাম আঙুল তুলে। ব্যস, ওইটুকুই। তখনও ভাবিনি পরে কখনও তোমাকে নিয়ে আবারও ভাবতে বসতে হবে। ভাবিনি আজ এত এত বছর পরও তোমার ছবি আঁকা হয়ে থাকবে আমার স্মৃতিপটে।

পরে বেশ কয়েকবার রাস্তাঘাটে চোখাচুখি হয়েছিল আমাদের। তোমার মনে কী ছিল জানি না, আমি কিন্তু তোমাকে নিয়ে বিশেষ ভাবিনি। কিন্তু পরে তুমি আমাকে বাধ্য করলে বিশেষ ভাবে ভাবতে। স্কুলের রবীন্দ্র জয়ন্তী অনুষ্ঠানে আমি গিয়েছিলাম গান গাইতে, প্রাক্তন ছাত্রী হিসেবে। গানটা আমি ছোটো থেকে ভালোই গাইতাম, যদিও প্রথাগত ভাবে কখনও কারওর কাছে শিখে ওঠা হয়নি কোনওদিন। ভালো গান গাইতাম বলে স্কুলে আমার বেশ নাম ছিল। তাই প্রত্যেক বছরই স্কুলের রবীন্দ্র জয়ন্তী অনুষ্ঠানে আমাকে ডাকত গান গাওয়ার জন্য। আমিও এই সুযোগ পেয়ে খুশি মনে গান গাইতাম। তাই এটা আমার কাছে নতুন কিছু ছিল না।

গান গাওয়ার সময় সেদিন লক্ষ্য করেছিলাম মুগ্ধ নয়নে তুমি আমার দিকে তাকিয়েছিলে, একদৃষ্টে। চোখের পলক পড়ছিল না। একটু অস্বস্তি হচ্ছিল। তাই বারবার চোখ সরিয়ে নিচ্ছিলাম। কিন্তু কী যেন একটা ছিল তোমার মধ্যে, তোমার ওই চোখের মধ্যে। তাই বারবার গান গাইতে গাইতে তোমার দিকেই চোখ চলে যাচ্ছিল।

আমার গান শেষ হয়ে যাওয়ার পর তুমি এসেছিলে আমার কাছে, পাশে বসে জিজ্ঞাসা করেছিলে আমার নাম। প্রশংসা করেছিলে আমার গানের গলার। যদিও এটা আমার কাছে নতুন কিছু নয়। গ্রামের সবাই বলে গানটা নাকি আমি ভালোই গাই। তবুও সেদিন তোমার মুখ থেকে প্রশংসা শোনার পর কেন জানি না আমার সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছিল, বেড়ে গিয়েছিল হৃদস্পন্দন।

কেন যে এমনটা হয়েছিল তা সেদিন সারা রাত জেগে থেকে অনেক ভেবেও বুঝে উঠতে পারিনি। বাকি পুরো অনুষ্ঠানটা তুমি আমার পাশে বসেই দেখেছিলে। মাঝে মাঝে দু’একটা কথা বলছিলে। জিজ্ঞাসা করছিলে আমার ব্যাপারে। ঠিক কী কী কথা সেদিন বলেছিলে আজ আর মনে নেই। শুধু মনে আছে তোমার প্রতিটা কথা আমার শরীরে শিহরণ জাগিয়েছিল। আমারও ভীষণ ইচ্ছে করছিল তোমার সম্পর্কে জানার, অনেক কিছু জানার। কিন্তু কিছুই আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করতে পারিনি। কেন জানি না বারবার কণ্ঠরুদ্ধ হয়ে আসছিল। সে এক অদ্ভুত অনুভূতি ছিল। তুমি তোমার ব্যাপারে যেটুকু বলেছিলে সেটুকুই শুনেছিলাম।

অনুষ্ঠান শেষে আমাকে তুমি এগিয়েও দিয়েছিলে বাড়ির দিকে। পড়ন্ত বিকেলের সূর্যের লাল আভায় তোমাকে একেবারে মায়াবী লাগছিল। মনে হচ্ছিল কোনও এক নাম না জানা দূর গ্রহ থেকে তুমি আমাদের গ্রামে এসে পড়েছ। একবারই তাকিয়েছিলাম তোমার দিকে। তাতেই তোমার ওই মোহময় রূপ দেখতে পেয়েছিলাম। লজ্জায় আর তাকাতে পারিনি তোমার মুখের দিকে। শুধু এক অদ্ভুত ভালো লাগার আবেশে ছেয়ে গিয়েছিল আমার মন।

তারপর থেকে যতবার তোমার সঙ্গে দেখা হতো, চোখে চোখ পড়ত, আমি চোখ নামিয়ে নিতাম। কেমন যেন একটা লজ্জা করত। তুমি হাসতে দেখতাম। মাঝে-সাঝে কথাও বলতে তুমি। আমি শুধু কোনওরকমে উত্তর দিয়েই পালিয়ে আসতাম। আসলে তখন যে আমার মনের মধ্যে উথালপাথাল ঝড় চলত। ভয় হতো; বেশিক্ষণ তোমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকলে বা বেশি কথা বললে সেই ঝড়টা বুঝি তুমিও বুঝে যাবে। ভালোবাসা কী তখনও বুঝিনি। শুধু বুঝতাম তোমাকে সামনে দেখলেই আমার সব কিছু কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যায়!

(ক্রমশ…)

প্রেগনেন্সি এবং কিছু প্রশ্ন

আমার প্রেগনেন্সির ২ মাস হয়েছে। এই সময় কি যৌনসম্পর্ক স্থাপন করা উচিত ?

প্রেগনেন্সির প্রথম তিনমাস ইন্টরকোর্স বা যৌনসম্পর্ক গড়া সেফ নয়। এর ফলে গর্ভপাত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এর পরের তিনমাস আবার সেফ, যৌনসম্পর্ক গড়ার জন্য। ইন্টারকোর্স করার সময় খেয়াল রাখা উচিত ফোরপ্লে এবং হৃদয়ের ভালোবাসার সংমিশ্রণ এই ক্ষেত্রে বেশি থাকা উচিত। অর্থাৎ পার্টনারের সঙ্গে জোরজবরদস্তি করা একেবারেই অনুচিত। যৌনসম্পর্কের মধ্যে দিয়ে দম্পতি উভয়ের মানসিক ভাবে আরও কাছাকাছি চলে আসেন। দ্বিতীয় তিনমাসের সময়কাল অতিবাহিত হয়ে গেলে যৌনমিলনের সময় অক্সিটোসিন নামক লভ হরমোন রিলিজ হয়, যার ফলে মা-বাবা ও সন্তানের মধ্যে বন্ধন আরও মজবুত হয়। সুতরাং সেক্স নিয়ে ঘাবড়াবার কোনও কারণ নেই। জানবেন এর ফলে নর্মাল ডেলিভারি হওয়ার সম্ভাবনা আরও বেড়ে যাবে। হাইজিন মেনটেইন করা অবশ্য দরকার এবং কনডোম ব্যবহার করতে ভুলবেন না। মনে রাখবেন, এনজয় সেক্স, সেফ সেক্স-এর ক্ষেত্রে ডেলিভারিও সেফ।

আমি ৩ মাসের সন্তানসম্ভবা। এই সময় হাই হিল স্যান্ডাল পরা কি ঠিক হবে?

গর্ভাবস্থায় হাইহিল স্যান্ডাল পরলে শারীরিক ভাবে আপনারই বেশি কষ্ট হবে। সুতরাং প্রেগনেন্সির ৯ মাস এই ইচ্ছাকে দূরে রাখাই আপনার জন্য মঙ্গল। এই সময় শরীরে রিল্যাক্সিন নামক একটি হরমোন রিলিজ হয়, যেটি শিশুর জন্ম নেওয়ার প্রক্রিয়াকে সহজ করে তুলতে সাহায্য করে। কিন্তু এই হরমোনের কারণে পায়ে ব্যথা, জয়েন্ট পেইন ইত্যাদি সমস্যা হয়ে থাকে। হাই হিল পরলে পা-ফোলার সমস্যা হতে পারে। পেট নীচের দিকে ঝুঁকে যাওয়ারও ভয় থাকে কারণ পায়ের উপর ভারটা বেশি পড়ে। সুতরাং ফ্ল্যাট স্যান্ডাল পরাই শ্রেয়। প্রয়োজনে ব্লক বা প্ল্যাটফর্ম হিল পরা সেফ হবে।

আমি ৫ মাসের সন্তানসম্ভবা। মায়ের কাছে যাব ঠিক করেছি। ট্রেন, এরোপ্লেন না গাড়ি, কোনটা সবথেকে সুরক্ষিত এই ক্ষেত্রে জার্নি করার জন্য?

আপনি প্রেগনেন্সির দ্বিতীয় ত্রৈমাসিক সময়কালে রয়েছেন। সুতরাং ট্রেন, প্লেন বা গাড়ি কোনও একটা-তেই আপনি ইচ্ছেমতন সফর করতে পারবেন। মা ও শিশুর জন্য এই সময়টা সেফ। ট্রেন যেহেতু সোজা লাইনে চলে, এবড়োখেবড়ো রাস্তায় ঝাঁকানি কিংবা হঠাৎ করে ব্রেক লাগা এগুলো একেবারেই থাকে না। জল খাওয়ার হলে বা আরাম করার হলে সহজেই ট্রেনের মধ্যে সেগুলো করা যায়৷

প্লেনে ৩২ সপ্তাহ পর ট্রাভেল করার অনুমতি পাওয়া যায়। গাড়িতে ধাক্কা লাগা বা ব্রেক কষার একটা আশঙ্কা থাকে। প্লেনে নিঃশ্বাস নিতে অসুবিধা হতে পারে। সুতরাং ৩২ মাসের আগে প্লেনে ট্রাভেল করতে হলে ডাক্তারের পরামর্শ অবশ্যই নেবেন। গাড়িতে ট্রাভেল করতে হলে মূত্রত্যাগের একটা বড়ো সমস্যা হয়, কারণ রাস্তার টয়লেট ব্যবহার হাইজিনের দিক থেকে সেফ নয়। এছাড়াও রাস্তায় বমির সমস্যাও হতে পারে। সেজন্য সুরক্ষিত এবং আরামে ট্রাভেল করার জন্য ট্রেন হল সবথেকে ভালো উপায়। হাত-পা ছড়িয়ে আরামে আপনি যাত্রা করতে পারবেন।

ডা. সোনাম গুপ্ত, প্রসূতি এবং স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ক্লাউড নাইন হসপিটাল, নতুন দিল্লি।

ইতিহাসের গন্ধমাখা হো চি মিন সিটি (পর্ব-০৪)

ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় মার্কিন বাহিনী বনভূমি ধ্বংস এবং শত্রুদের গোপন আশ্রয়স্থল উন্মোচনের জন্য যে বিষাক্ত রাসায়নিক ‘এজেন্ট অরেঞ্জ’ ব্যবহার করেছিল, তা শুধু পরিবেশ নয়, মানুষের জিন পর্যন্ত বিকৃত করে দিয়েছে! একটার পর একটা ছবি— বিকলাঙ্গ শিশু, জন্মগত ত্রুটি, দগদগে ক্ষত, বিকৃত মুখের মানুষ! মনে হল কেউ যেন আমার বুকে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করছে!

এজেন্ট অরেঞ্জের প্রভাব এখনও রয়ে গেছে! শুধু ভিয়েতনামের সাধারণ মানুষ নয়, যুদ্ধে অংশ নেওয়া মার্কিন সেনারা আজও এই বিষের অভিশাপে ভুগছে। ক্যান্সার, স্নায়ুরোগ, চর্মরোগ, শারীরিক বিকলাঙ্গতা! কেবল একটা যুদ্ধ জেতার জন্য লক্ষ লক্ষ নিরীহ মানুষের জীবন ধ্বংস করে দেওয়া— এ কি কোনও সভ্যতার পরিচয় হতে পারে?

এরপর ঢুকলাম কারাগার প্রদর্শনীতে। প্রথমেই চোখে পড়ল ‘টাইগারকেজ’– এক ভয়াবহ নির্যাতনের স্থান। মার্কিন-সমর্থিত দক্ষিণ ভিয়েতনামের সরকার এখানে রাজনৈতিক বন্দিদের অমানবিক ভাবে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করত। এই কেজগুলো মূলত কন দাও কারাগার এবং ফুকুয়ক কারাগারে অবস্থিত ছিল। ছোটো ছোটো কেজগুলোতে একসঙ্গে অনেক বন্দিকে গাদাগাদি করে রাখা হত। উপরে থাকত কাঁটাতারের জাল। সেখান থেকে বন্দিদের উপর বেয়নেট বা লাঠি দিয়ে আঘাত করা হতো। দিনের পর দিন বন্দিদের খেতে দেওয়া হতো না। জলের বদলে সাবান জল খেতে বলা হতো।

১৯৭০ সালে ‘আমেরিকান কংগ্রেস ম্যান’ টম হারকিন এই অত্যাচারের কথা জনসমক্ষে প্রকাশ করেন। তারপর আন্তর্জাতিক নিন্দা ও সমালোচনা সত্ত্বেও, আমেরিকা ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বন্দিদের এই কেজ-এ আটকে রেখে অত্যাচার করেছিল। হাজার হাজার বন্দি এই নির্মম নির্যাতনে প্রাণ হারিয়েছে।

আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল। ইতিহাসের কতটা ভয়ংকর দিক যে এই মিউজিয়ামের দেয়ালে লুকিয়ে আছে! যুদ্ধ মানে শুধু যোদ্ধাদের মৃত্যু নয়, যুদ্ধ মানে প্রজন্মের পর প্রজন্মের উপর ধ্বংসের ছায়া। আজ ভিয়েতনাম যুদ্ধ শেষ হয়েছে পঞ্চাশ বছর। কিন্তু সেই ক্ষত আজও শুকোয়নি। হোটেলে ফেরার পথে মনে হল মানুষ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় তো? নাকি ভবিষ্যতেও আমরা সেই একই ঘৃণা, লোভ আর ক্ষমতার লড়াইয়ে নিজেদের ধ্বংস করব?

গতকাল যুদ্ধবিধ্বস্ত ইতিহাসের সঙ্গে দিনযাপন করে আজকের দিনটা শুধুই আনন্দে কাটানোর পরিকল্পনা করে রেখেছিলাম। সকালে উঠে তৈরি হয়ে নিলাম মেকং রিভার ক্রুজের জন্য। মেকং নদী শুধুই একটা জলধারা নয়, এটা ঐতিহ্যের ধারক, সভ্যতার সাক্ষী। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনের কাহিনি বয়ে চলেছে এই নদী। চীন, মায়ানমার, লাওস, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে এশিয়ার সপ্তম দীর্ঘতম নদী মেকং, ডেল্টায় এসে এক অন্যরকম প্রাণচঞ্চল রূপ ধারণ করেছে। ভিয়েতনামের মেকং ডেল্টা অঞ্চল হল নদীটির সবচেয়ে ঐতিহাসিক ও প্রাণবন্ত অংশ। এখানে ভাসমান গ্রাম, ঐতিহ্যবাহী জীবনধারা ও প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য একসঙ্গে মিশে আছে।

মেকং রিভার ক্রুজ এই বিস্তীর্ণ জলপথের সৌন্দর্য উপভোগের জন্য আদর্শ। এটি ভাসমান বাজার, ছোটো ছোটো গ্রাম, নারকেল বাগান, ম্যানগ্রোভ বন এবং আশপাশের মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার এক অনন্য অভিজ্ঞতা দেবে। ফ্লোটিং মার্কেট-এর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একটু থমকে গেলাম— সবকিছু এত বিশৃঙ্খল অথচ সুন্দর! প্রথমে বড়ো নৌকাতে করে প্রশস্ত মেকং নদীর বুকে ঘুরে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা। তারপর ছোটো এবং সরু নৌকাতে চড়ে সরু খালের মধ্যে দিয়ে বেন ত্রে-তে গিয়ে পৌঁছালাম। নদীর দু’ধারে নারকেল গাছগুলো জলের উপর এমন ভাবে ঝুঁকে পড়েছে, ভয় লাগছিল, এই বুঝি আমাদের নৌকার উপর ভেঙে পড়বে।

এরপর গেলাম নারকেল ক্যান্ডি তৈরির কারখানায়। চারপাশে অগণিত নারকেল গাছ, তার সঙ্গে প্রতিদিন হাজারো পর্যটক! তাই এই কারখানা বেশ ভালোই ব্যাবসা করছে। কিন্তু যারা সেখানে কাজ করছে, বিশেষকরে মহিলারা, তাদের দেখে মনে হল তারা হয়তো দিনের শেষে খুব সামান্যই উপার্জন করতে পারে। এই ভাবনা থেকেই তিন প্যাকেট ক্যান্ডি কিনে নিলাম। এটা খুব ছোটো কিছু, তবুও মনে হল, হয়তো কারও মুখে একটু হাসি ফোটাতে পারব!

এরপর নদীর ধারে মধ্যাহ্নভোজ। প্রকৃতির কোলে এক অনন্য অভিজ্ঞতা! লাঞ্চের জন্য আমাদের নিয়ে যাওয়া হল নদীর ধারে একটি খোলা জায়গায়। চারদিকে গাছপালা, প্রকৃতির কোলেই যেন গড়ে উঠেছে রেস্তোরাঁ। এখানে একসঙ্গে অনেকগুলো ক্রুজ আসে, তাই পর্যটকদের ভিড় বেশ ভালোই ছিল। ধোঁয়া ওঠা ভাত, মাছভাজা, নারকেলের দুধে রান্না করা খাবার ও ঐতিহ্যবাহী স্প্রিং রোল— সবই ছিল মেনুতে। তবে একটা বড়োসড়ো আস্ত মশলাদার সামুদ্রিক মাছভাজা ভোলার নয়। এত সুন্দর করে পরিবেশন করল, সবাই খাওয়ার আগে ছবি তুলতে ব্যস্ত। রান্না এবং পরিবেশন করা— দুটোই যে শিল্প, আজ আবার বুঝতে পারলাম। এরপর ফেরার পালা। এখান থেকে ফিরে আসার সময় মনটা বেশ খারাপ লাগছিল। মনে হল বিশেষ পরিচিত কোনও একটা জায়গাকে বিদায় জানাতে হচ্ছে। হয়তো আবার কখনও…।

মেকং ডেল্টার বিস্তীর্ণ জলধারা ও নিবিড় সবুজের বুকে লুকিয়ে আছে আরও এক বিস্ময়— ভিন ট্রানগ প্যাগোডা। সময়ের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দির, যেন আকাশের নীচে এক শান্তির দ্বীপ। ভিয়েতনামের মাই থো শহরের কোলাহল থেকে একটু দূরে, এই পবিত্র আশ্রয়ে পা রাখতেই মনে হল, আমি যেন এক অন্য জগতে প্রবেশ করেছি।

তিনটি সুসজ্জিত খিলান পেরিয়ে যখন ভিতরে এলাম, চোখে পড়ল এক অনন্য স্থাপত্যশৈলীর মহিমা। যেখানে ভিয়েতনামী, চিনা ও ফরাসি সংস্কৃতির মিশেলে গড়ে উঠেছে এক মোহময় শিল্পকলা। প্রবেশদ্বারের উজ্জ্বল মোজাইক, সূক্ষ্ম খোদাইয়ের অলংকরণ, আর পুরোনো কাঠের দরজায় সময়ের ছাপ যেন অতীতের গল্প বলে!

স্মৃতি স্তম্ভ (শেষ পর্ব)

অটোচালক গাড়ির গতি একটু ধীর করে দিল। টানা টানা বাংলায় বলে চলল— এ রাজপথের নাম এখন হয়েছে কর্তব্যপথ। প্রজাতন্ত্র দিবসের দিন রাজপথের দু-পাশে ব্যারিকেড করে দেওয়া হয়, যাতে ব্যারিকেড ভেঙে কেউ ভিতরে এসে কুচকাওয়াজে ব্যাঘাত ঘটাতে না পারে।

—আপনারা লোকাল লোক কুচকাওয়াজ দেখতে আসেন?

স্টিয়ারিং-এ হাত রেখে মাথা নেড়ে উত্তর দেয়, ‘কভি, কভি।”

হাসে সুবর্ণ। সবসময় ব্যারিকেড করে কি সব আটকানো যায়? সেও একবার ব্যারিকেড ভেঙেছিল। স্মৃতিতে তার এখনও পরত পড়েনি। মনোরমার জন্মদিন। অন্য বন্ধুদের সঙ্গে সুবর্ণও নিমন্ত্রিত মনোরমার বাড়িতে। কী সুন্দর লাগছিল মনোরমাকে। হইহুল্লোড় আনন্দের মধ্যে বারবার মনোরমাকে পেতে মন চাইছিল।

মনোরমা ইঙ্গিতে জানিয়ে দিল— পরে সুযোগ হলে।

পার্টি তখন শেষের দিকে। আলমারির পিছন দিকে এল মনোরমা। মনোরমাকে জড়িয়ে ধরে একটা মাত্র চুমু…।

মনোরমার মা চেঁচিয়ে উঠলেন, —এসব কী!

কখন ওদের পিছনে এসেছিলেন, ওরা টের পায়নি।

বাড়িতে ফিরে এসে বেশ টালমাটাল লাগছিল সুবর্ণর। বিপন্ন লাগছিল নিজেকে, মনোরমাকে। মা-বাবাকে সব খুলে বলেছিল সুবর্ণ।

সব শুনে বাবা চুপ করে গেছিল। মা কথা বলেছিল খুব ধীরে। বুঝিয়েছিল— এখন এসবের সময় নয়। তাছাড়া ওনারা রাজি হবেন না।

মাকে বলেছিল সুবর্ণ— আমরা দু’জনে তো দু’জনের কাছে কমিটমেন্ট করেছি।

মনোরমা আর কলেজে আসেনি। শুনেছিল ওর বাবার ট্রান্সফার হয়ে গেছে মহারাষ্ট্রে।

ইন্ডিয়া গেটের রাস্তা পার করে হায়দ্রাবাদ হাউসের সামনে এসে অটোচালক জানতে চাইলেন, ডানদিকে বেঁকে কস্তুরবা গান্ধী মার্গে সি আর হোস্টেল তো?

—হ্যাঁ। মাথা নাড়ে সুবর্ণ।

অটো থেকে নেমে মোবাইলে টাইম দেখল, এখন হোস্টেলে ডিনার দেবে। রুমে গিয়েই ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে আসবে, খুব খিদে পেয়েছে, সারাদিন সেভাবে…। সিঁড়ির মুখেই মিঃ দস্তিদারের সঙ্গে দেখা।

—এই ফিরলেন? আমি দুপুরেই ফিরেছি।

—ও। আসলে কাজ শেষ হতে দেরি হল। আপনি কি ক্যান্টিন থেকে ডিনার করে ফিরছেন?

—না, না। সবে তো সাড়ে আটটা বাজে, একটু পরে যাব।

ক্যান্টিনের মেনুতে দুটো রুটি, আচার, রাইস আর ডাল সবজি। রুটি খেতে খেতে সুবর্ণ ভাবে, কাল বাংলা ভবনের রেঁস্তোরা থেকে ডিনার করবে। গতবারে এসে পাশে তেলেঙ্গানা হাউসের রেস্টুরেন্ট থেকে সাউথ ইন্ডিয়ান ডিশ খেয়েছিল।

—হ্যালো, কখন এলেন?

মুখ তুলে দেখে পাশের টেবিলে মিঃ দস্তিদার। আর ওনার সঙ্গে! দস্তিদার পরিচয় করিয়ে দিলেন— ‘আমার স্ত্রী’। সৌন্দর্য আর বয়স বাড়ার ব্যক্তিত্বে কী অপরূপা লাগছে! সুবর্ণকে দেখে তার নদীর গাঙের মতো অপূর্ব মায়াবী চোখ দুটি তুলে নামিয়ে নিলেন তিনি। সুবর্ণর মুখে আলাপের একটু হাসি ফুটে রইল।

রুটির পর, রাইসও খেতে ইচ্ছে করল না সুবর্ণর। সবজিও তেমন না। শরীরটা কি ভালো নেই তবে? হাতেই ডালমাখা শুকিয়ে গেল। ওয়েটার বারবার এসে জিজ্ঞেস করে— আর কিছু লাগবে স্যার? সুবর্ণ মাথা নেড়ে উঠেই পড়ে।

হোস্টেলের রুমে এসে বিছানায় টানটান হয়ে শুয়ে পড়ে। মাথা শরীর জুড়ে একটা যন্ত্রণা বাড়ছে। এখনও তিনদিন বাড়ি ফিরতে। তবে কি ঘুম হলে সে সুস্থ বোধ করবে? লম্বা ঘুম। কিন্তু আসে না যে। ব্যালকনিতে এসে সিগারেট ধরায়। তারা ভরা আকাশের দিকে একরাশ ধোঁয়া ছুঁড়ে দেয়। এখান থেকে ইন্ডিয়া গেট দেখা যাচ্ছে না। হায়দ্রাবাদ হাউসের মাথা দেখা যাচ্ছে। যেমন দেখা যাচ্ছে না পাশের তিনশো তেইশের ব্যালকনিটা। একটা লম্বা দেয়াল খাড়া হয়ে আছে।

পরের দিন দুপুরে ইন্ডিয়া গেট ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকে সুবর্ণ। আগেরবারেও এসে দেখেছিল ইন্ডিয়া গেটের ভিতরে অমর জওয়ান জ্যোতি জ্বলছে। না, এবারে তা নেই। সরিয়ে ফেলা হয়েছে। এখন সেখানে লোটাস বানানো হয়েছে। তার একটু আগে সুভাষচন্দ্রের একটা স্ট্যাচু বসানো হয়েছে। ইন্ডিয়া গেটের বামদিকে কর্তব্যপথ ধরে ঝিলটা খুব সুন্দর করে সাজিয়েছে। ঝিলের পাশে খাওয়ার স্টল। অনেক বদলে গেছে চারদিক। সুবর্ণ ইন্ডিয়া গেটের পাশে দাঁড়িয়ে উপর দিকে তাকিয়ে দেখতে থাকে ইন্ডিয়াগেটের কারুকার্য। -আমাদের একটা ছবি তুলে দেন তো। এই ইন্ডিয়া গেটের ফ্রন্টের দিকে।

সুবর্ণ ঘুরে তাকাতেই মিঃ দস্তিদার বলে উঠলেন, ‘আরে আপনি? কখন এসেছেন?”

—অনেকক্ষণ। দিল্লি এলেই এখানে আসি। এ জায়গাটা আমায় টানে।

—আমি ভাবলাম আজ সানডে-তে আর কোথাও যাব না, হোস্টেলের ঘরে একটু আয়েশ করি। আমার স্ত্রী মনোরমা জোর করে নিয়ে এল। দিল্লি এলে ইন্ডিয়া গেট ওর দেখা চাই-ই চাই। ও বলে— স্মৃতিস্তম্ভ শুধু ইট পাথরের নয়, মানুষ নিজেও এক একটা স্মৃতিস্তম্ভ। যতদিন বেঁচে থাকে, কত স্মৃতি বুকে বয়ে বেড়ায়!

মনোরমা মিঃ দস্তিদারের পাশে দাঁড়িয়ে উলটো দিকে মুখ করে। সুবর্ণ মাথা নিচু করে মিঃ দস্তিদারের কথায় বলে— বাঃ সুন্দর বলেছেন তো উনি।

বাই দ্য ওয়ে, মিঃ দস্তিদার এবার বলে উঠলেন— গতকাল আপনি বলছিলেন না, আপনার বাড়ি কলকাতার সোদপুরে?

—হ্যাঁ৷

মনোরমারাও একসময় সোদপুরে ছিল।

—ও তাই!

এরপর দু’একটা কথা।

শীতের মিঠে ভাব উধাও হয়ে দুপুরের রোদটা চিড়বিড় করে বাড়ছে। ইন্ডিয়া গেটের ময়দানের সতেজতা বজায় রাখতে হোস পাইপ দিয়ে জল ঢালছে কর্মীরা। মানুষজন এদিক ওদিকে, কেউ কেউ নিজস্বী তোলাতে ব্যস্ত। মিঃ দস্তিদার ছাওয়ার দিকে সরে গিয়ে গেটে প্রহরারত আর্মিদের সঙ্গে কথা বলতে লাগলেন।

সুবর্ণও কর্তব্যপথের পাশে গাছের ছায়ায় সরে এসে দাঁড়ায়। রুমাল দিয়ে মুখটা মুছে নেয়। মুখ তুলে সামনে তাকাতেই দেখে মিঃ দস্তিদারের পাশে দাঁড়িয়ে, তার দিকে তাকিয়ে আছে ম…নো…র…মা! নদীর গাঙের মতো অপূর্ব মায়াবী চোখ দুটি।

ইন্ডিয়া গেটের ময়দান জুড়ে একটা উত্তুরে হাওয়া পাক খেতে থাকে। অল্প দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকে দুই স্মৃতিস্তম্ভ, যাদের বুকে বয়ে চলেছে একই স্মৃতি।

স্মৃতি স্তম্ভ (পর্ব-০১)

বাপ রে এমন মোষের রঙের মতো ঘন কুয়াশা! সি আর হোস্টেলের আশপাশের সবুজ গাছগুলোর মাথা জড়িয়ে তা যে থমকে দাঁড়িয়ে! বেলা ন’টার আগে এই শীতে, রাজধানী দিল্লিতে সূর্যের ঘুম ভাঙে না বললেই চলে স্যার— হোস্টেলের ছেলেটা ব্যালকনি সাফ করতে করতে বলে। কোনও কোনও দিন তো সূর্যের আলোর উপর ইরেজার ঘষার মতো লাগে সকালের আকাশকে।

—তাই!

—হ্যাঁ স্যার।

হোস্টেলের ব্যালকনি থেকে সুবর্ণ দেখে রাষ্ট্রপতি ভবন ও পার্লামেন্ট হাউসটাকে ইলিশ রঙের ঝুরো কুয়াশার ভিতর একটা কার্ভ লাইনের মতো দেখাচ্ছে। হোস্টেলের পিছনে কস্তুরবা গান্ধী মার্গ ধরে দু-পা দূরেই ধূসর চাদর গায়ে জড়িয়ে ইন্ডিয়া গেট। সামনের ময়দানে হাঁটতে থাকা মানুষগুলোকে অবনীন্দ্রনাথের আঁকা ছবির বিন্দুর মতো লাগছে।

পাঁচ দিনের ডেপুটেশনে দিল্লিতে এসেছে সুবর্ণ। বরাবরের মতোই সি আর হোস্টেলে উঠেছে। আগেই অনলাইনে হোস্টেল বুক করে নিয়েছিল। দিল্লির এই অভিজাত এলাকায় সি আর হোস্টেল সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট এমপ্লয়িজদের জন্য বেশ চিপেস্ট। থাকা-খাওয়া বেশ সুন্দর ও সু-উপভোগ্য। সুবর্ণ বাথরুমে গিজার অন করে জল গরম করতে দিয়ে হোস্টেলের চারতলার ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ায়। এই সকালেই ঠান্ডা উপেক্ষা করে লোকজন কাজে বেরিয়ে পড়েছে। সুর্বণ আর দাঁড়ায় না। মনে মনে হিসেব করে আজ দ্বিতীয় দিন, কাল সানডে ছুটি, তারপর মাত্র দু-দিন। তাড়াতাড়ি কাজ গুছিয়ে নিতে হবে। ছ’দিনের দিন সকালে হোস্টেল ছেড়ে দিতে হবে। তাছাড়া ওই দিনই তার ফেরার টিকিট।

এত সকালে হোস্টেলের ক্যান্টিনে নাস্তা হবে না। হোস্টেল থেকে বেরিয়ে গেটে এসে দাঁড়ায় সুবর্ণ। ডানদিকে কস্তুরবা গান্ধী মার্গের ফুটের দোকানে গরম গরম ধোঁয়া ওঠা চা হচ্ছে। কয়েকজন দাঁড়িয়ে খাচ্ছে। এখান থেকেই অটো ধরবে অফিসে যেতে। এদিকে ওদিকে তাকিয়ে দেখে কোথাও অটো দাঁড়িয়ে নেই, অন্যদিন অটো দাঁড়িয়ে থাকে। এত সকাল, তাই এই জবুথবু ঠান্ডায় আজ অটো বা ট্যাক্সি পাওয়া মুশকিল হবে বোধহয়! ফুটে এসে এক কাপ চা নেয়, উদ্দেশ্য অটো বা ট্যাক্সি পেলে উঠে পড়বে। মিনিট দশেক পর একটা অটো এসে দাঁড়ায়।

দিল্লিতে অটোর সামনের সিটে প্যাসেঞ্জার ওঠায় না। কেবল অটোর পিছনের সিটে বসতে হবে। পিছনের সিটে তিনজন মতো বসতে পারে। কম্যান্ড হসপিটালের প্রায় কাছাকাছি অফিসে যেতে হবে। মেট্রো ধরে যাওয়া যায়, কিন্তু ট্যাক্সি ধরে যাবে ঠিক করেছিল। সুবর্ণ। অটো রাজি হল না। পাশের ভদ্রলোকও অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে। ওনার গন্তব্য কম্যান্ড হসপিটাল। এগিয়ে এসে বললেন, “চলুন বুক করে যাওয়া যাক। আজ ট্যাক্সি পাওয়া মুশকিল।”

গাড়িতে বসে সুবর্ণই প্রথম কথা বলা শুরু করে।

—বাঙালি?

—হ্যাঁ। সল্টলেক, কলকাতা-র।

—আপনি?

সুবর্ণ উত্তর দেয় বাঙালি, তবে কলকাতার নয়, কলকাতার কাছাকাছি সোদপুরের।

আলাপ জমে যায় আলাপচারিতায়। ভদ্রলোক বেশ আলাপি। কথা বলতে ভালোবাসেন। জানান— ওনার নাম অমিতাভ দস্তিদার। আর্মি অফিসার ছিলেন। স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে দিল্লি ঘুরতে এসেছেন। স্ত্রীর দিল্লি খুব প্রিয় জায়গা। অনেকবার এসেছেন, এখানে পোস্টিংও ছিল একবার। এছাড়া কম্যান্ড হসপিটালে কিছু কাজও আছে ওনার। আরও জানা গেল সি ব্লকের চারতলায় তিনশো তেইশ, মানে সুবর্ণর পাশের রুমেই আছেন।

গাড়ি থেকে নেমে সুবর্ণ নিজের মুঠোফোন থেকে বাড়িতে একটা ফোন করে দেয়। অফিসে অনেক কাজ। যতদূর সম্ভব কাজ গোছাতে চেষ্টা করে। ফাইলপত্র রেডি করে এনেছে। নতুন মেশিনের নকশা, ভিতরকার কলকবজা, ইন ফিউচারে সার্ভিসিং-এর দায়িত্ব সব বুঝিয়ে দিতে বেশ সময় লাগল। ততক্ষণে দুপুর গড়িয়ে নিভু নিভু সূর্য। আরও একদিন লাগবে সব কাজ শেষ হতে, তারপর পরের দিন পেপার ওয়ার্কস।

সন্ধ্যার মুখেই রাজধানী শহর সেজেছে আলোকমালায়। ফেরার সময় দূর থেকেই সুবর্ণ দেখে ইন্ডিয়া গেটকে। কী অপূর্ব লাগছে সেই আলোকসজ্জা! লাগোয়া ময়দানে সন্ধ্যায় বেড়াতে আসা মানুষের ভিড়। রাজপথ ধরে রাষ্ট্রপতি ভবনের দিকে কত মানুষ হেঁটে যাচ্ছে। বেলুনওয়ালা, খেলনা, ফুচকা— হরেক কিসিমের দোকান পসরা সাজিয়েছে মেন রাস্তার পাশে। মনে মনে ভাবে, কালকে ছুটির দিন দুপুরবেলাটা সে এখানে কাটাবে।

একুশ বছর আগে এখানে প্রথমবার সে এসেছিল। হেঁটে ছিল ইন্ডিয়া গেটের সামনে রাজপথ ধরে রাষ্ট্রপতি ভবনের দিকে। এখনও এই সেদিন মনে হয়। আসলে দিন মাস বছর ধরে জীবন এগোয়, অভিজ্ঞতা বাড়ে। কিন্তু স্মৃতিরা যে হারায় না। এক জায়গায় থেমে যায়, থেকে যায়। কিছু কিছু স্মৃতি তো মৃত্যুর আগে মোছে না, বোধহয় মোছাও যায় না।

সেদিন ছাব্বিশে জানুয়ারি। প্রজাতন্ত্র দিবস। প্রজাতন্ত্র দিবসের প্যারেড এই রাজপথ ধরে রাষ্ট্রপতি ভবন ও পার্লামেন্ট হাউসের দিকে চলছে। সৈনিকদের কুচকাওয়াজ, সেই সঙ্গে বিভিন্ন স্টেটের ট্যাবলো নিজস্ব সংস্কৃতির প্রদর্শনী করতে করতে চলেছে। ওরা ছিল পশ্চিমবাংলার ট্যাবলোর গানে, মনোরমাদের স্কুল ছিল রবীন্দ্রনৃত্যে। তার আগে ট্রেনে আসার সময়ই মনোরমার সঙ্গে মনের সখ্যতা তৈরি হয়েছিল। অনুষ্ঠানের ভিতরে গান করতে করতে বারবার চোখ যাচ্ছিল মনোরমার দিকে। মনোরমাও নাচের ভিতর সুবর্ণকে দেখছে। বাড়ি ফিরে মনোরমাই যোগাযোগ করে। পাশাপাশি স্কুল ছিল বলে সুবিধা হয়েছিল।

ক’দিন পর উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেই কলেজে। মনোরমাও ভর্তি হল একই কলেজে। বন্ধু হিসেবে মনোরমার বাড়িতে যাতায়াতে আর বাধা রইল না।

—সাব, রাতের ইন্ডিয়া গেট দেখছেন! অটোচালক ইন্ডিয়া গেটের সামনে মেন রোডে আসতেই আঙুল তুলে দেখালেন। ওই যে দু-পাশে আলোর ফোয়ারাগুলো দেখছেন, ওগুলো নতুন হয়েছে।

মুগ্ধ হয়ে দেখতে থাকে ইন্ডিয়া গেটকে সুবর্ণ। চলন্ত অটো থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে যতটুকু দেখা যায়। মনে মনে ভাবে— স্মৃতিস্তম্ভ স্মৃতির উদ্দেশ্যে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও আফগান যুদ্ধে মারা যাওয়া বৃটিশ ভারতের সৈনিকদের নাম খোদাই করা আছ এতে। কত মানুষ আসে, তা দেখে আবার চলে যায়। কিন্তু মৃত স্মৃতি কেবল একা স্মৃতিস্তম্ভের, তা সে নীরবে বহন করে চলে। এখন তো এই ময়দানে কত মানুষ পিকনিক করতে আসে, অবস্থান বিক্ষোভকারীরা ধর্ণামঞ্চেও বসে এখানে।

নবজাতকের সামগ্রিক যত্ন

নবজাতকের স্বাস্থ্য-সুরক্ষার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে শুরু থেকেই। মেনে চলতে হবে স্বাস্থ্যবিধি। কারণ, খালি চোখে দেখা যায় না এমন রোগজীবাণু ছড়িয়ে রয়েছে চারিদিকে। একটু অসতর্ক থাকলে যা বাসা বাঁধতে পারে ছোট্ট শিশুর শরীরে। অতএব, আপনার ছোট্ট শিশুটি যাতে সর্বদা জীবাণুমুক্ত থাকে, তার জন্য আপনাকে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে।

হাত ধুয়ে বাচ্চাকে কোলে নিন

নবজাতকদের ইমিউন সিস্টেম খুব স্ট্রং হয় না, তাই সংক্রমণের ভয় থাকে সব সময়। সুতরাং বাচ্চাকে স্পর্শ করার আগে ভালো করে হাত ধুয়ে নিন অথবা হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করুন। সেইসঙ্গে, অপরিষ্কার হাতে বাচ্চাকে ধরতে কাউকেই অনুমতি দেবেন না।

মাথা এবং ঘাড়ে সাপোর্ট দিন

যখনই বাচ্চাকে কোলে নেবেন, ঘাড়ে এবং মাথার নীচে হাত রাখুন যাতে ঘাড় এবং মাথার পিছনে সাপোর্ট থাকে। বাচ্চাকে শোয়াবার সময়ও একই নিয়ম মেনে চলুন। বাচ্চাকে নিয়ে বাড়ির বাইরে ট্রাভেল করলে খেয়াল রাখতে হবে, যাতে যাত্রাপথ খুব রাফ বা বাউন্সি না হয়।

বেশি নাড়াচাড়া নয়

অনেক সময় বাচ্চা কাঁদতে থাকলে, বাচ্চাকে হাসাবার জন্য কিংবা নিছকই খেলার ছলে বাচ্চাকে শূন্যে ছুঁড়ে আবার ধরে নেন অনেকে। কিন্তু বাচ্চাকে অতিরিক্ত ঝাঁকানো একেবারেই অনুচিত। এতে শিশুর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। বাচ্চাকে ঘুম থেকে তুলতে তাকে ঝাঁকাবার দরকার নেই বরং পায়ের তলায় সুড়সুড়ি দিন বা গালে আঙুল দিয়ে আলতো করে টোকা দিন।

পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখুন

বাচ্চাকে নিয়ে বাড়ি ফিরে সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার যে, ডায়াপার ব্যবহার করবেন নাকি কাপড়ের ন্যাপি। যাই ব্যবহার করুন না কেন, দিনে অন্তত দশবার ন্যাপি বদলাবার দরকার পড়ে। সুতরাং মজুত রাখা দরকার পরিষ্কার ডায়াপার। কাপড় ব্যবহার করলে ডায়াপার পিনস, ডায়াপার ক্রিম এবং একটি পাত্রে হালকা গরমজল এবং মোছার নরম সুতির পরিষ্কার কাপড় এবং তুলো রাখা দরকার।

বাচ্চাদের প্রায়ই ডায়াপার র‍্যাশ হতে দেখা যায়। সেই ক্ষেত্রে হালকা গরমজলে বাচ্চাকে পরিষ্কার করে ভালো করে সেখানে ক্রিম লাগিয়ে রাখতে হবে এবং ডায়াপার ছাড়া বাচ্চাকে কিছুটা সময় রাখতে হবে।

৩ দিনের মধ্যে র‍্যাশ না সারলে, চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে, কারণ ফাংগাল সংক্রমণের কারণেও এমনটা হতে পারে।

স্নানের নিয়ম

নবজাতককে স্পঞ্জ বাথ দেওয়া বাঞ্ছনীয়, যতদিন না আমবিলিকাল কর্ডটা পড়ে যায় এবং নাভি সম্পূর্ণ শুকিয়ে যায়। সপ্তাহে ৩ থেকে ৪ বার বাচ্চাকে স্নান করালেই যথেষ্ট, কারণ বাবাবার স্নান করালে বাচ্চার ত্বক ড্রাই হয়ে যায়। বাকি দিনে স্পঞ্জ বাথ দিন বাচ্চাকে।

খাওয়ানো এবং ঢেঁকুর তোলানো

সাধারণত খিদে পেলে তবেই খাওয়ানো উচিত বাচ্চাকে। খিদে পেলে বাচ্চা নয় কাঁদবে কিংবা মুখে হাত ঢুকিয়ে আঙুল চুষতে থাকবে। বাচ্চাকে ফিডিং করাবার সময় অনেকবার হাওয়া গিলে নেয় বাচ্চা, ফলে পেটে ব্যথা হয় এবং বাচ্চা কাঁদতে থাকে। এই সমস্যা যাতে না হয়, তার জন্য মাঝেমধ্যেই খাওয়াবার মাঝে বাচ্চাকে পিঠের উপর ফেলে ঢেঁকুর তোলানো খুব জরুরি।

ঘুমের অভ্যাস

নবজাতক সাধারণত ১৬ ঘণ্টা বা তার বেশি ঘুমোয়। কিন্তু টানা এক ভাবে নয়। ২ থেকে ৪ ঘণ্টা টানা ঘুমোয় বাচ্চা। ৪ ঘণ্টার মধ্যে বাচ্চা ঘুম থেকে না উঠলে, বাচ্চাকে ঘুম থেকে তুলে ফিড করানো দরকার। বাচ্চারা নিজেরাই একটা ঘুমের প্যাটার্ন তৈরি করে নেয়। সাধারণত ৩ মাস বয়স থেকে বাচ্চা ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা টানা ঘুমোয়। যদি সেটা নাও হয়, ভয় পাওয়ার কোনও দরকার নেই। যদি দেখেন বাচ্চার ওজন বাড়ছে এবং দেখে মনে হয় সুস্থ, তাহলে ৩ মাস বয়সে পুরো রাত না ঘুমোলেও চিন্তার কোনও কারণ নেই।

সব মিলিয়ে নবজাতকের দেখাশোনার জন্য মা-বাবা এবং বিশেষ করে মা-কে সবসময় সজাগ থাকতে হয়। ধীরে ধীরে স্বাভাবিক নিয়মেই শিশু বড়ো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পারিপার্শ্বিক পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে শিখতে থাকে এবং তার জীবনযাত্রা ছন্দে ফিরতে আরম্ভ করে। কিন্তু তার আগে পর্যন্ত শিশুকে সাবধানে রাখা মা-বাবার কর্তব্য।

শিশুর সঙ্গে বন্ডিং

নবজাতকের যত্নে, মা-বাবার সঙ্গে বন্ডিং হওয়াটা খুব জরুরি। বাচ্চার সঙ্গে ফিজিক্যাল ক্লোজনেস, ইমোশনাল কানেকশন বাড়ায়। বাবা-মায়ের সঙ্গে অ্যাটাচমেন্ট, বাচ্চার ইমোশনাল গ্রোথ হতে সাহায্য করে এবং শারীরিক ডেভেলপমেন্ট হতেও সাহায্য করে। বন্ডিং-এর শুরু হয় বাচ্চাকে যেই নিজের কোলে নিচ্ছেন এবং ধীরে ধীরে তার সারা গায়ে হাত বুলোচ্ছেন। ব্রেস্ট ফিড করাবার সময়ও মা ও সন্তানের ত্বকের সংস্পর্শে বাচ্চা এবং মা উভয়ের মনেই আনকন্ডিশনাল ভালোবাসার বন্ধন তৈরি হয়। বাচ্চারা গলার স্বর শুনতে ভালোবাসে, সুতরাং বাচ্চার সঙ্গে মাঝেমধ্যে কথা বলুন, গান শোনান।

সামগ্রিক যত্ন

মানব শরীরের অঙ্গগুলির মধ্যে সবথেকে বেশি ব্যবহৃত হয় হাত। এই হাত প্রতি মুহূর্তে অন্যান্য উপাদানের সংস্পর্শে আসে এবং ওইসব উপাদানে থাকা জীবাণু আশ্রয় নেয় হাতে। তাই, নবজাতককে কোলে নেওয়ার আগে কিংবা খাওয়ানোর আগে, নিজের হাত সাবান দিয়ে ভালো ভাবে ধুয়ে নেওয়া প্রয়োজন। বাইরে থাকলে স্যানিটাইজার হাতে নিয়ে তারপর বাচ্চাকে খাওয়ান।

শিশুর হাইজিন মেনটেইন করতে হলে বাড়ির অন্যান্য সদস্যদেরও জীবাণুমুক্ত থাকতে হবে। অর্থাৎ, বাইরে থেকে ঘেমো গায়ে বাড়িতে ঢুকেই শিশুকে কোলে তুলে নেবেন না। এতে আপনার দ্বারা বাহিত জীবাণু শিশুর শরীরেও সংক্রমিত হতে পারে। তাই বাইরে থেকে বাড়ি ঢুকে, প্রথম নিজে মেডিকেটেড লিকুইড সোপ দিয়ে হাত ধুয়ে এবং সম্ভব হলে সম্পূর্ণ স্নান সেরে তবেই সন্তানকে কোলে তুলুন। এই অভ্যাস আপনার এবং আপনার সন্তান উভয়ের পক্ষেই লাভজনক হবে।

এছাড়া, মাঝেমধ্যে ছোট্ট শিশুকেও বেবি সোপ দিয়ে সম্পূর্ণ স্নান করিয়ে দিন। ব্র্যান্ডেড বেবি সোপ শিশুর চোখে গেলেও, জ্বালা কিংবা ক্ষতি করবে না। অবশ্য শিশুকে শুধু হ্যান্ডওয়াশ কিংবা বডিওয়াশ-ই নয়, শিশু যাতে ময়লা কিংবা ক্ষতিকারক কোনও উপাদান হাত দিয়ে না ধরে কিংবা মুখে না তুলে নেয়, এ বিষয়েও মা-বাবাকেই সতর্ক থাকতে হবে। কারণ, শিশুর সুস্থতার জন্য এই সতর্কতা ভীষণ জরুরি।

এছাড়া, বাচ্চারা মল-মূত্র ত্যাগ করার পর, জলে সামান্য জীবাণুনাশক তরল ফেলে বাচ্চার রেচনাঙ্গ ধুয়ে দেওয়া উচিত। এ প্রসঙ্গে আরও একটি বিষয় মনে রাখতে হবে যে, শুধু বাহ্যিক নয়, শিশু যেন সম্পূর্ণ (অভ্যন্তরীণ) সুস্থ থাকে। আর এই সম্পূর্ণ সুস্থতার জন্য শিশুকে উপযুক্ত পরিমাণে শুদ্ধ জলও খাওয়াতে হবে। কারণ, মূত্রের মাধ্যমে শরীরের অনেক বর্জ্য এবং রোগজীবাণু বাইরে বেরিয়ে যায়।

শিশুদের স্নান করানোর জন্য ব্যবহৃত জলে সামান্য গরমজল মিশিয়ে নিলেও ভালো। এতে চট করে যেমন ঠান্ডা লাগবে না, ঠিক তেমনই স্নানের জন্য ব্যবহৃত জলকেও জীবাণুমুক্ত রাখা যাবে। কখনও যদি শিশু বৃষ্টিতে ভিজে যায়, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে হালকা গরমজলে তোয়ালে ভিজিয়ে শিশুর গা মুছে দিন। এতে বৃষ্টির জলের সঙ্গে মিশে থাকা জীবাণু সংক্রমিত হবে না শিশুর শরীরে।

রাতে যদি বাচ্চাদের ন্যাপি পরিয়ে রাখেন, তাহলে মল-মূত্র ত্যাগ না করলেও ন্যাপি বদলে ফেলুন। কারণ, দীর্ঘ সময় হাওয়া না ঢুকলে ন্যাপিতে জীবাণু সংক্রমণ হতে পারে। বাচ্চার জন্য ব্যবহৃত বিছানা এবং জামাকাপড় সাবান দিয়ে ভালো ভাবে কেচে ধুয়ে কড়া রোদে শুকিয়ে নিন। এতে বিছানা এবং জামাকাপড়ে জীবাণু বাসা বাঁধতে পারবে না। যে-বোতলে বাচ্চাকে দুধ খাওয়ান, সেই বোতল প্রতিদিন অন্তত কুড়ি মিনিট গরমজলে ফুটিয়ে নিন। কারণ, ঠান্ডা জলে দুধের বোতল ধুলে, তা পুরোপুরি জীবাণুমুক্ত হয় না। এভাবেই হাইজিন মেনে চললে আপনার বাচ্চা শারীরিক ভাবে সুস্থ থাকবে এবং দীর্ঘজীবন লাভ করবে।

ইতিহাসের গন্ধমাখা হো চি মিন সিটি (পর্ব-০৩)

আমি এক কাপ চা নিয়ে বসলাম। চায়ের ধোঁয়া আর বইয়ের গন্ধ মিলেমিশে এক অদ্ভুত প্রশান্তি এনে দিল। শহরের ব্যস্ততা, ইতিহাস, বইয়ের রাজ্য ঘুরে সন্ধ্যায় হোটেলে ফিরে নরম বিছানায় শুয়ে মনে হল— এই যে ঘুরলাম, শিখলাম, অনুভব করলাম, সেটাই তো প্রকৃত ভ্রমণ! সত্যিই, কিছু জায়গা শুধু দেখা যায় না, অনুভব করতে হয়!

আজকের দিনটা যে অ্যাডভেঞ্চারে ভরপুর হতে চলেছে, সে ব্যাপারে কোনও সংশয় নেই। বহু প্রতীক্ষিত কু চি টানেল দেখার দিন আজ! উত্তেজনায় তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে হোটেলের রিসেপশনে নেমে এলাম। মিনিট দশেক অপেক্ষার পর আমাদের ট্রাভেল গ্রুপের বাস এল। আমরা রওনা দিলাম এক অনন্য ইতিহাসের সাক্ষী হতে।

হো চি মিন সিটির ব্যস্ততা ধীরে ধীরে পিছনে ফেলে, আমরা প্রবেশ করলাম সবুজ মাঠ, সরল প্রকৃতি আর নিস্তব্ধ এক গ্রামীণ পরিবেশে। আমাদের গাইড বেশ প্রাণবন্ত, গল্প বলতে বলতে ইতিহাসের গভীরে নিয়ে যাচ্ছে। শুধু গল্প নয়, যেন যুদ্ধকালীন দিনের চিত্র চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠছে! ইতিহাস বইয়ে বহুবার পড়েছি এই টানেলের কথা, কিন্তু এবার আমি তার সামনে দাঁড়িয়ে! এক অদ্ভুত অনুভূতি হল। উত্তেজনা, কৌতূহল আর একরাশ নীরব শ্রদ্ধা মিলেমিশে এক হয়ে গেল!

ভিয়েত কং সৈনিকরা এখানে বছরের পর বছর লুকিয়ে থেকেছে। আমরা আধঘণ্টা মোবাইল ছাড়া থাকতে পারি না, আর ওরা মাটির নীচে বছরের পর বছর কাটিয়েছে! তার উপর অন্ধকার, গরম, অক্সিজেনের অভাব, বিষাক্ত সাপ, বাদুড়, পোকামাকড় — সব মিলিয়ে এক ভয়ানক বাস্তবতা!

এই টানেলগুলো প্রথমে ফরাসি ঔপনিবেশিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় এগুলো হয়ে উঠল এক জটিল গোপন ছক। শুধু লুকানোর জায়গা নয়। হাসপাতাল, রান্নাঘর, যুদ্ধ পরিকল্পনার ঘর, এমনকী অস্থায়ী স্কুল পর্যন্ত ছিল এখানে! মোট ২৫০ কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ এই টানেল বহুস্তর বিশিষ্ট ছিল, বোমার আঘাতেও ভাঙত না। শত্রুদের ধোঁকা দিতে চতুর সব ফাঁদ, বুবিট্র্যাপ ব্যবহার করা হতো।

একজন সৈনিক এসে দেখালেন কীভাবে ভিয়েত কং যোদ্ধারা মুহূর্তের মধ্যে গর্তে ঢুকে অদৃশ্য হয়ে যেত। এবার আমাদের পালা! আমার গায়ে কাঁপুনি দিচ্ছিল, তবুও ভিতরে ঢুকলাম। মাথা নিচু করে কাঁকড়ার মতো হামাগুড়ি দিয়ে এগোতে হচ্ছে। চারপাশে স্যাঁতসেঁতে মাটির গন্ধ। দেয়ালের সঙ্গে শরীর লেগে আসছে। এক মুহূর্তের জন্য মনে হল আমি আটকে যাব! কিন্তু ভাবলাম, আমার এই সামান্য অস্বস্তি, আর যারা এখানে বছরের পর বছর কাটিয়েছে, তাদের কষ্টের তুলনায় কিচ্ছু না! তবুও, ভিতরে থাকতে থাকতে এক মুঠো রোদ আর মুক্ত বাতাসের জন্য মন আনচান করতে লাগল। অবশেষে যখন বেরিয়ে এলাম, মনে হল, এরপর থেকে নিজের ঘর কখনও ছোটো বলে মনে হবে না!

সব শেষে আমাদের দেওয়া হল যুদ্ধকালীন ভিয়েতনামি সৈনিকদের প্রধান খাবার- — সেদ্ধ কাসাভা আর বাদামের চাটনি। এখনকার শহুরে খাবারের সঙ্গে এই স্বাদের তুলনা হয় না। কিন্তু এটা খেতে খেতে মনে হল, যেন পঞ্চাশ বছর আগের ইতিহাসের এক টুকরো আমি নিজেই চিবিয়ে খাচ্ছি! এটাই ছিল সেই খাবার, যার জোরে ভিয়েত কং যোদ্ধারা আমেরিকার সৈনিকদের শুধু প্রতিরোধই করেনি, তাদের হার মানতে বাধ্য করেছিল।

বাসে ফেরার পথে জানলার বাইরে তাকিয়ে ভাবছিলাম, যুদ্ধের আসল শক্তি কি অস্ত্র? নাকি ধৈর্য, কৌশল আর অদম্য মানসিক শক্তি? ভিয়েত কং যোদ্ধারা যুদ্ধ জিতেছিল মাটির নীচে, অন্ধকারে, ইতিহাসের পাতায় নয়, বাস্তবের ময়দানে! আমি ফিরে যাচ্ছি, কিন্তু কু চি টানেলের স্মৃতি আর অনুভূতি মনে থাকবে আজীবন!

কু চি টানেল থেকে ফেরার পথে ইতিহাসের আরেকটি অধ্যায় অনুভব করতে চাইলাম — হো চি মিন সিটির ওয়ার রেমন্যান্টস মিউজিয়াম। আমেরিকার ওয়াশিংটন ডিসির ভিয়েতনাম ভেটেরানস মেমোরিয়ালের সঙ্গে এর অনেক তফাৎ। যুদ্ধের ভয়াবহতা পুরোপুরি বুঝতে চাইলে দুই পক্ষের দৃষ্টিকোণই জানা প্রয়োজন। কিন্তু এই মিউজিয়ামে ঢোকার আগে বুঝতেই পারিনি যে, আমি একটাই মোশনাল রোলার কোস্টারে উঠতে চলেছি! বিস্ময়, দুঃখ, রাগ, ঘৃণা, করুণা, অবসাদ— সব অনুভূতি যেন আমাকে একসঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল।

প্রবেশ মুখে বিশাল এক মার্কিন যুদ্ধবিমান আর পাশে দাঁড়িয়ে আছে যুদ্ধের ক্ষত বহনকারী এক ট্যাংক। অনেকেই সেলফি তুলতে ব্যস্ত। কিন্তু আমি কিছুতেই মনের সায় পেলাম না। তাই মিউজিয়ামের ভিতরে ঢুকলাম। মিউজিয়ামের ভিতরের পরিবেশ আরও কষ্টদায়ক। দেয়ালজুড়ে কালো-সাদা দুর্বিষহ ফটোগ্রাফ। একটির পর একটি আরও বিধ্বংসী দৃশ্য! কিন্তু যা আমাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিল, তা হল ‘এজেন্ট অরেঞ্জ’ প্রদর্শনী।

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব