চার্লস বনেট সিন্ড্রোম

একজন ব্যক্তি যদি দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হন, তাহলে তিনি হয়তো সবকিছু হালকা ভাবে আন্দাজ করতে পারেন। কিন্তু ‘ভিস্যুয়াল হ্যালুসিনেশন’ চোখের একটি গুরুত্বপূর্ণ অসুখ। চিকিৎসা বিজ্ঞানে চোখের এই অসুখটিকে বলা হয়— চার্লস বনেট সিন্ড্রোম। এই প্রসঙ্গে চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. রুবি মিশ্র জানিয়েছেন বিস্তারিত।

বাইলেটাল অ্যাডভান্সড ওপেন অ্যাঙ্গেল গ্লুকোমা আক্রান্ত ৭০ বছর বয়সি এক মহিলা নিয়মিত চেক-আপের জন্য হাসপাতালের বহির্বিভাগে যেতেন। তিনি কোনও স্নায়বিক বা মানসিক অক্ষমতা ছাড়াই সম্পূর্ণ সুস্থ ছিলেন। গত পাঁচ বছর ধরে তার উভয় চোখেই দৃষ্টিশক্তি কম ছিল। তার অ্যাপয়েন্টমেন্টের কয়েক সপ্তাহ আগে, তিনি আলোর ঝলক দেখতে শুরু করেন। কয়েক দিন পরে, তিনি তার ঘরের সোফায় বসে ধূসর মানব মূর্তি দেখতে পান। তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকত চোখের সামনে এবং তারপর বাতাসে মিলিয়ে যেত— এমনটাই জানিয়েছেন ওই রোগী। তিনি এও জানিয়েছেন যে, পাগল বলে চিহ্নিত হওয়ার ভয়ে তিনি কাউকে এই কথা বলতে পারেননি। কিন্তু তিনি ডা. রুবি মিশ্র-র কাছে এসে স্বীকার করেছিলেন তার সমস্যার কথা। আসলে, স্নায়বিক এবং মানসিক কারণ, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং বিপাকীয় সমস্যার কারণে তিনি চার্লস বনেট সিন্ড্রোম-এ (সিবিএস) ভুগছেন বলে নির্ণয় করা হয় ফাইনালি৷

চার্লস বনেট সিন্ড্রোম, যাকে ‘ফ্যান্টম ভিশন’ও বলা হয়, এমন একটি অবস্থা, যেখানে রোগীর দৃষ্টিপথের ক্ষতির ফলে দৃষ্টিভ্রম হয়। অর্থাৎ রোগী হ্যালুসিনেশন-এর শিকার হন।

১৭৬০ সালে, চার্লস বনেট প্রথম তার নব্বই বছর বয়সি দাদার দুর্বল দৃষ্টিশক্তির অভিজ্ঞতার সঙ্গে সম্পর্কিত ভিস্যুয়াল হ্যালুসিনেশন বর্ণনা করেছিলেন। তাই এই ভিস্যুয়াল হ্যালুসিনেশন-কে ‘চার্লস বনেট সিন্ড্রোম’ বলা হয়।

চার্লস বনেট সিন্ড্রোম-এর ক্রমবর্ধমান সমস্যা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে ডা. রুবি মিশ্র জানিয়েছেন, ‘এটি একটি অত্যন্ত বিরল দৃষ্টি-ব্যাধি এবং চোখের গুরুতর সমস্যা বলা যায়। এই সমস্যা বা রোগের প্রধান কারণ হল— বয়স্কদের মধ্যে সচেতনতার অভাব এবং সমস্যা লুকিয়ে রাখার কুঅভ্যাস। আমরা নিশ্চিত যে, যদি ম্যাকুলার অবক্ষয়ের রোগীদের সঙ্গে যোগাযোগের একটি সঠিক মাধ্যম স্থাপন করা যায়, তাহলে সঠিক সময়ে রোগী চিকিৎসা পাবেন এবং স্বাভাবিক দৃষ্টি ফিরে পাবেন।”

ডা. রুবি মিশ্র প্রসঙ্গত আরও জানিয়েছেন, একটি প্রতিবেদন অনুসারে, চার্লস বনেট সিন্ড্রোম বা CBS-এর সামগ্রিক প্রকোপ ০.৫ শতাংশ (৫/১০০০), কম দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন ব্যক্তিদের মধ্যে ০.৮ শতাংশ (১/১২০), বয়স্কদের মধ্যে ০.৬ শতাংশ (২/৩৪৬), বয়স্ক এবং কম দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন ব্যক্তিদের মধ্যে ০.৮ শতাংশ (১/১২০) পাওয়া গেছে। ম্যাকুলার রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের যারা ভিস্যুয়াল হ্যালুসিনেশনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তাদের মধ্যে ৩৯ শতাংশ গ্লুকোমা আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ সমস্যা রয়েছে।

চার্লস বনেট সিন্ড্রোম বা CBS-এর ঘটনার ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য বিভিন্ন থিওরি রয়েছে। এর মধ্যে ‘ডিঅ্যাফারেন্টেশন থিওরি’ অন্যতম। এই থিওরি অনুসারে জানা যায় যে, চোখের সংবেদনশীল ইনপুট হ্রাসের কারণে অক্সিপিটাল কর্টেক্সে বর্ধিত কার্যকলাপের কারণে হ্যালুসিনেশন হয়। সাধারণ কারণগুলির মধ্যে রয়েছে ম্যাকুলার ডিজেনারেশন, গ্লুকোমা, ছানি, রেটিনাইটিস পিগমেন্টোসা, উচ্চ মায়োপিয়া, সেরিব্রাল ইনফার্কশন, ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি এবং শিরাস্থ অবক্লুশন।

CBS-এর প্রাদুর্ভাব ৬.৭ শতাংশ থেকে বর্তমানে ৮.১ শতাংশ-এ পৌঁছেছে। হ্যালুসিনেশনগুলি সাধারণ ফটোপসিয়া, গ্রিডের মতো প্যাটার্ন এবং শাখা-প্রশাখা আকারে হতে পারে— যা মানুষ, যানবাহন এবং ক্ষুদ্র বস্তুর জটিল চিত্রের হ্যালুসিনেশন হতে পারে। এগুলি কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন স্থায়ী হতে পারে।

সাধারণত রোগীরা এই সমস্যায় জর্জরিত হন সচেতনতার অভাবে এবং মনগড়া ভয়ের কারণে। মানসিক ভাবে অসুস্থ হিসেবে চিহ্নিত হতে পারেন— এই ভয়ে বেশিরভাগ রোগী সিবিএস-এর শিকার হয়ে থাকেন। একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, মোট রোগীর মাত্র ৪৭ শতাংশ রোগী তাদের হ্যালুসিনেশন সম্পর্কে রিপোর্ট করেছেন এবং এক-তৃতীয়াংশ চিকিৎসক এই অবস্থা সম্পর্কে অবগত ছিলেন না বা অনিশ্চিত ছিলেন।

আসলে, ভিস্যুয়াল হ্যালুসিনেশন বা চার্লস বনেট সিন্ড্রোম চোখের সমস্যার একটি পর্যায়, যা চোখের নানারকম সমস্যার কারণে তৈরি হয়। তাই ভিস্যুয়াল হ্যালুসিনেশন-এর সমস্যা দূর করতে হলে চোখ পরীক্ষা করে সমস্যার কারণ খুঁজে বের করতে হবে এবং সেইমতো চিকিৎসা করতে হবে। তাই, রোগীকে আশ্বস্ত করা উচিত যে, ভিস্যুয়াল হ্যালুসিনেশন আসলে দৃষ্টিশক্তি হ্রাসের প্রতিক্রিয়া হিসেবে ঘটেছে, তবেই রোগীর উদ্বেগ এবং মানসিক যন্ত্রণা কমতে পারে।

হ্যালুসিনেশন-এর সমস্যা কমানোর কয়েকটি কৌশলের মধ্যে রয়েছে— দ্রুত চোখের পলক ফেলা, পর্যাপ্ত আলোয় থাকা, পর্যাপ্ত আলোয় টিভি দেখা। ধ্যান এবং অন্যান্য শিথিলকরণ পদ্ধতিও রয়েছে এক্ষেত্রে। আর সবার আগে যা প্রয়োজন তা হল— সমস্যার বিষয়টি লুকিয়ে না রেখে, দ্রুত চোখের চিকিৎসককে বলে, চোখের চিকিৎসা করানো। উল্লেখ্য, ভিস্যুয়াল হ্যালুসিনেশন-এর জন্য তৈরি হওয়া মানসিক সমস্যা দূর করার জন্য মনরোগ বিশেষজ্ঞরা অনেক সময় ওলানজাপাইন, প্রেগাবালিনের মতো ওষুধ প্রেসক্রাইব করে থাকেন।

ডা. রুবি মিশ্র প্রসঙ্গত জানিয়েছেন, ‘ভিস্যুয়াল কর্টেক্স’-এ ‘ট্রান্সক্র্যানিয়াল ডাইরেক্ট কারেন্ট স্টিমুলেশন’ (TDCS), হ্যালুসিনেশনের ফ্রিকোয়েন্সি কমাতে পারে। তাই, ভিস্যুয়াল হ্যালুসিনেশন বা চার্লস বনেট সিন্ড্রোম-এর রোগীদের সচেতনতা অপরিহার্য। সেইসঙ্গে, এক্ষেত্রে চক্ষু বিশেষজ্ঞদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কারণ, শুধু চোখের রোগের চিকিৎসা-ই নয়, চোখ পরীক্ষা করার পর, রোগীকে রোগের আসল কারণ ব্যাখ্যা করে, রোগীর ভুল ধারণা দূর করতে হবে। তবেই রোগীর মানসিক বিকার দূর হবে।

কলকাতা-র ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল-এ পালিত হল পরাক্রম দিবস

২৩ জানুয়ারি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষ্যে ভিক্টোরিয়া গ্রাউন্ড-এ পালিত হল পরাক্রম দিবস। আর এই পরাক্রম দিবসের অনুষ্ঠানটির আয়োজক ছিল ভারত সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রক। ‘জয় হিন্দ – দ্য কল অফ এ রেভোলিউশনারি’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানে দেশ মাতৃকার বীর সন্তান নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু-র জীবন, দর্শন এবং চিন্তনকে স্মরণ ও উদযাপন করা হয় সংগীত ও নৃত্যের মাধ্যমে।

নৃত্য পরিকল্পনায় ছিলেন বিশিষ্ট ওড়িশি নৃত্য শিল্পী ডোনা গঙ্গোপাধ্যায়। তাঁর সঙ্গে ছিলেন রঘুনাথ দাস এবং ‘দীক্ষামঞ্জরী’-র ছাত্র -ছাত্রীরা। সংগীত পরিবেশন করেন রাঘব চট্টোপাধ্যায়,ইমন চক্রবর্তী ও তাঁর মিউজিক আকাদেমির ছাত্র -ছাত্রীরা। এই তালিকায় ছিলেন আরশাদ আলি খান, দূর্ণিবার সাহা, আরফিন রানা এবং আরাত্রিকা সিনহা। সংগীত পরিচালনায় ছিলেন নীলাঞ্জন ঘোষ। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দেশের উপরাষ্ট্রপতি  সি.পি. রাধাকৃষ্ণণ, পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস প্রমুখ।

এই দিনেই ছিল এবছরের সরস্বতী পুজো। সকাল থেকেই পুজোর ব্যস্ততার মধ্যেও বিকেলে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে ভিড় জমান দর্শকেরা। ভিক্টোরিয়ার মেমোরিয়ালের মূল সিঁড়ি জুড়ে হল এই আরাধনা। অর্থাৎ, দেশ মাতৃকার আরাধনা এবং এ দেশের এক ব্যতিক্রমী বীর সন্তান নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মজয়ন্তী উদযাপন।

এই আয়োজনে অংশগ্রহণ করতে পারার আনন্দ ভাগ করে নিয়ে নৃত্যশিল্পী ডোনা গঙ্গোপাধ্যায় এবং সংগীতশিল্পী ইমন চক্রবর্তী জানিয়েছেন, “এ নিবেদন আমাদের গর্বের। মাতৃভূমির বন্দনা, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষ্যে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানের অংশ হতে পেরে ভালো লাগছে।”

এই অনুষ্ঠানে দর্শকদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। দর্শকরা তাদের ভালোলাগার আনন্দ প্রকাশ করেন করতালির মাধ্যমে। আর অনুষ্ঠানের এই সাফল্য দেখে আপ্লুত নৃত্যশিল্পী ডোনা গঙ্গোপাধ্যায়, সংগীতশিল্পী ইমন চক্রবর্তী এবং রাঘব চট্টোপাধ্যায়। বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও উপস্থিত ছিলেন এই অনুষ্ঠানে।

পুরুষের সম্পত্তি নয় কোনও মহিলা

সংবিধানের প্রস্তাবনায় ধর্মনিরপেক্ষ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে কিন্তু যারা হিন্দুত্বের দৃঢ় সমর্থক, তারা এই শব্দটি অপসারণ করতে চায়, যাতে ভারতকে এক ভাবে হিন্দু রাষ্ট্র ঘোষণা করা যায়। কিন্তু কী রকম হিন্দু রাষ্ট্র চান তারা? ভারতে কি হিন্দু ধর্মের উপর কিংবা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের উপর কোন নিপীড়ন চলছে?

এই ধর্মনিরপেক্ষ শব্দটির কারণে কি হিন্দুরা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত হয়ে উঠেছে? এই ধর্মনিরপেক্ষ শব্দটির কারণে কি হিন্দুরা অনিরাপদ বোধ করছে? ধর্মনিরপেক্ষ শব্দটি মুছে ফেলার পর কি দেশে স্বর্ণবৃষ্টি হবে? দরিদ্র হিন্দুরা কি আরও বেশি টাকা পেতে শুরু করবে?

আসলে এরকম কিছুই ঘটবে না। ধর্মনিরপেক্ষ শব্দের সহজ অর্থ হল— সরকার হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন, খ্রিস্টান, পারসি কিংবা নাস্তিকদের প্রতি বৈষম্য করবে না। এই ধর্মের অনুসারীদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক করা হবে না। তাহলে ধর্মনিরপেক্ষ শব্দটি বাদ দিলে, সংখ্যাগরিষ্ঠ ৮০ শতাংশ হিন্দুর কী লাভ হবে?

এর পেছনে সবচেয়ে বড়ো উদ্দেশ্য হল— প্রাচীন যুগকে ফিরিয়ে আনা। লক্ষ্য হল— এমন একটি যুগকে ফিরিয়ে আনা, যার ফলে আসলে হিন্দুদেরই অধিকার লঙ্ঘিত হতে পারে। আর এর কুফল ভোগ করতে হতে হবে মহিলাদের। তাই, মনে রাখতে হবে, ধর্মনিরপেক্ষ শব্দ জারি থাকার কারণে, ৮০ শতাংশ হিন্দু জনসংখ্যা এবং অর্ধেক হিন্দু নারী অনেক ধর্মীয় অবিচার থেকে মুক্তি পেয়েছেন। ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সমতার কথা বলার কারণে, সতীনের সঙ্গে বাস করতে হয় না হিন্দু মহিলাদের। তারা সহ-স্ত্রী হওয়ার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়েছেন। তারা তাদের পিতা এবং স্বামীর সম্পত্তিরও অধিকারী হতে পারেন।

সংবিধান ধর্মনিরপেক্ষতা বলবৎ রাখার কারণে, স্কুল-কলেজের দরজা সকলের জন্য খুলে গিয়েছে এবং সব ধর্মের মহিলারা শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছেন। সব ধর্মের মানুষ যেমন রাস্তায় হাঁটার মৌলিক অধিকার পেয়েছেন, মহিলারাও এই অধিকারের সুফল ভোগ করছেন। তারা যেমন খুশি পোশাক পরতে পারছেন, যেখানে খুশি যাওয়ার এবং প্রতিটি পাবলিক প্লেসে প্রবেশের অধিকার পেয়েছেন।

নারীদের পৃথক করা, অবমূল্যায়ন করা বা দুর্বল করে তোলার কুচক্র থেকে অনেক ক্ষেত্রে রক্ষা করেছে সংবিধান। সাংবিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে, আইনি ক্ষেত্রে, পুরুষ এবং মহিলা সমান, সধবা এবং বিধবা সমান, পুত্র এবং কন্যা সমান, কিন্তু পৌরাণিক ভাবধারার লোকেরা এটি পছন্দ করেন না। তারা ধর্মনিরপেক্ষতা এবং লিঙ্গ সমতার অধিকারের সমাপ্তি ঘটাতে চাইছে। পাকিস্তান, ইরান এবং আফগানিস্তানে ধর্মনিরপেক্ষতা কিংবা লিঙ্গ সমতা নেই। মহিলাদের হিজাব, বোরকা এবং পর্দার আড়ালে রাখা হয়। তাদের কাজে যেতে দেওয়া হয় না। তারা এখন পুরুষের সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে, ঠিক যেমনটি সংবিধান তৈরি হওয়ার আগে ভারতে ছিল। কট্টরপন্থীরা চান মহিলারা মন্দিরের সামনে কলস বহন করুক, ধর্মগুরুদের সেবা করুক এবং তাদের স্বামীদের ইশারায় চলুক। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতা জারি থাকার ফলে, কুচক্রীদের কু-উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না।

যদি ধর্মনিরপেক্ষ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়, কোনও নির্দিষ্ট একটি ধর্মের হয়তো জয় হবে, সেই ধর্মের ভণ্ড গুরুদের হয়তো জয় হবে কিন্তু এর ফলে তৈরি হবে আরও বড়ো সমস্যা। বিশেষকরে মহিলারা বড়ো বিপদে পড়বেন, আমরা ফিরে যাব সেই আদিম যুগে এবং যা মোটেই কাম্য নয়। তাই, বৃহত্তর কল্যাণের কথা ভেবে, বজায় রাখতে হবে ধর্মনিরপেক্ষতা। নয়তো সমতাও বজায় থাকবে না।

নাচনি (শেষ পর্ব)

বেলা চারটের পর থেকে একটু একটু করে মেলায় লোক আসতে থাকে। পুতুলনাচের শো পাঁচটা থেকে এক ঘণ্টা অন্তর অন্তর। বেশ খাটুনি আছে এতগুলো শো পরপর করার। পুতুল নাচানোর ক্ষেত্রে হাত-বদলের দরকার আছে। ঠিক হল বিশু আর ভোম্বলদাও কিছুটা সাহায্য করবে। সময় যত এগিয়ে আসছে ইরফান চাচা যেন ততই চ্যাঁচামেচি করছে। তবে এটা সকলের গা সওয়া হয়ে গেছে।
সাড়ে চারটে থেকে টিকিটের লাইন। একসঙ্গে তিন-চারশোজন লোক বসতে পারবে তাঁবুতে। সামনের দিকে ত্রিপল পাতা আছে। তবে সাইডে সাইডে চেয়ারও আছে। লোক প্রায় ভর্তি। চাচা প্যান্ডেলের ফাঁক দিয়ে একটু উকি মেরে দেখে মুচকি হাসল। চাচার হাসি দেখে সকলের মুখেও চওড়া হাসি ফুটল। প্রথম শো বলে শুরু করতে করতেই আধ-ঘণ্টা দেরি হল। মাইকের একটু সমস্যা ছিল। সেটা ঠিক করা হল শেষ মুহূর্তে।
প্রথম শোতে বিশুর তেমন কাজ ছিল না। আদিলদা, মোহনদারা সামলে নিয়েছে। তবে ফাটিয়ে দিয়েছে ইরফান চাচা। অনেক দর্শক পেয়ে মেয়েদের গলায় কী দারুণ গান গাইল। তালে তালে নাচল নাচনি। সেও কি একটু বেশি ভালো নাচল? বিশু এই সময় মাঝে মাঝেই বাইরে বেরিয়ে এসে ভিড়ের পিছনে দাঁড়িয়ে পড়ে। প্রাণভরে নাচনির নাচ দেখে।
পালার একটা দৃশ্য আছে যেখানে নবাব নাচনির চুল ধরে টেনে আনবে রাজসভায়। এই অংশটুকু একেবারেই পছন্দ নয় বিশুর। নবাবের উপর খুব রাগ হয়। বিশু একবার চাচাকে বলেছিল, এই দৃশ্যটা না রাখলেই নয়!
ইরফান চাচা হেসে বলেছিল, ‘ধুর পাগল! সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না না থাকলে পালা জমবে কেন!” বিশু বুঝেছিল নিতান্তই সহজ এই সত্যটা। তবে ইরফান চাচাও জানে, নাচনিকে প্রাণের থেকেও বেশি ভালোবাসে বিশু।
প্রথম দু’দিন হইহই করে কেটে গেল। বৃষ্টিটা আর যেন এলই না। মেলাও ভালোই জমছিল। এখানে চারদিন থাকার কথা ছিল ওদের। কিন্তু মানুষের উৎসাহ দেখে মেলার দিন আরও বাড়ানো হয়েছে। পুতুলনাচও আরও দু’দিন বাড়ল। মেলা কমিটির লোক এসে এসবই বলে গেল৷ পেমেন্টও বেশি পাবে ভেবে সকলেই খুশি। শুধু রাজুদা মুখ ভার করে আছে। তার মন যেন এখানে আর নেই। সে তার প্রেমিকার সঙ্গে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হেস্তনেস্ত করতে চায়। বিশুর কাছে গজগজ করতে থাকে।
মাঝখানে একদিন বিকেলের শো”টা হয়নি। মেলা কমিটির সংবর্ধনা অনুষ্ঠান ছিল। ওরা সবাই গিয়েছিল। ইরফান চাচাকে ওরা কত্ত সম্মান করে স্টেজে নিয়ে গেল। একটা মানপত্র দিল আর একটা ইয়া বড়ো ট্রফি। কী যে আনন্দ হচ্ছিল বিশুর। বাবার কথা খুব মনে হচ্ছিল। ইরফান চাচা তো আনন্দে শুধুই কাঁদছে। এইরকম সম্মান আগে তো তাকে কেউ দেয়নি! তাকে দেখেই আদিলদা, মোহনদা, কুবেরদা সকলেরই চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়েছে।
সেদিনের শোগুলো স্পেশাল ছিল। এই সংবর্ধনার পর তারা যেন দ্বিগুন উৎসাহে পালা শুরু করল। কত মানুষ হাততালি দিচ্ছে। কেউ উকিঝুঁকি মেরে ভিতরটা একবার দেখতে চায়। খুব আনন্দ পাচ্ছিল বিশু।
শেষ শো হতে হতে ন’টা বেজে গেল। সকলে ক্লান্ত। বিশু উনুন জ্বেলে রান্না চাপাল। ইরফান চাচা আজ তাঁবুর বাইরে এসে দাঁড়িয়ে বিড়ি ধরিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল। আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকল ঠায়। কাউকে কি ‘শুকরিয়া’ জানাল? রান্না শেষ করে হাত-পা’র জড়তা ছাড়াতে বিশুও বাইরে এল। ইরফান চাচা বিশুকে কাছে টেনে নিল। হাতটা ধরে বলল, ‘নাচনিকে এবার তুই নাচাবি।”
বিশু যেন আনন্দে লাফিয়ে উঠল। ওর অনেকদিনের ইচ্ছে নাচনিকে ও-ই নাচাবে। আদিলদা আর রাজুদা না হয় অন্য পুতুলগুলো নাচাবে। কিন্তু একটা কথা সে বুঝতে পারছে না, হঠাৎ চাচা একথা বলল কেন? বিশু আকাশের তারাদের দিকে তাকাল। কী খুঁজছিল কে জানে? বাবা-কে কি?
রাজুদা রাতে চুপিচুপি বিশুকে বলল, ‘আজ রাতে আমি পালাব। খবরদার কাউকে বলবি না।’
ধর্মসংকটে পড়ে গেল বিশু। আগেও এরকম ঘটনা ঘটেছে। রাজুদা শুধু তাকেই বলে পালায়। বিশুকেই শেষ পর্যন্ত ম্যানেজ করতে হয়। তবে একটা কথা ভেবে অবাক হল। চাচা তাকে নাচনির দায়িত্ব দিয়েছে, তার মানে চাচা কি জানত — রাজুদা পালিয়ে যাবে? তবে বিশুর একদিক থেকে ভালোই হল। তার অনেকদিনের ইচ্ছে অবশেষে সত্যি হবে। খাওয়ার পর সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়েছে, বিশু নাচনির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। লাঠিটাকে উঁচু করে নাচনিকে কোলে নিল। সারা মুখে চুমু খেল খুব। মনে মনে বলল, আমি তোকে যেমন করে নাচাব এবার থেকে তেমন করে নাচবি।
গভীর রাতে ঝলমলে চাঁদ জ্যোৎস্নার আলো দিয়ে ভরিয়ে রেখেছে মেলার মাঠ। সাদা তাঁবুকে দেখে মনে হচ্ছে যেন দুধের সাগর। রাত তখন শেষ প্রহরে। হঠাৎ যেন একটা পোড়া গন্ধ। ঠিক এই সময় দাউদাউ করে জ্বলে উঠল তাঁবু। প্রথমে শুধু আগুনের চড়চড় আওয়াজ। তারপর চারিদিকে কান ফাটানো আর্তনাদ। আগুনের শিখা যেন আকাশ ছুঁয়ে যাচ্ছে। আর তেমনই বিভৎস কালো ধোঁয়া। মেলার অন্যদিকের দোকানগুলো থেকেও বেরিয়ে পড়েছে মানুষজন। সামনের পুকুর থেকে বালতি করে জল নিয়ে আসছে অনেকে। কিন্তু এই প্রবল আগুনের সামনে তা যেন নেহাৎ নগণ্য। মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে এত বড়ো তাঁবুটা ছাই হয়ে গেল।
মেলা কমিটির কয়েকজন লোক এসেছে। তারা উদ্বিগ্ন। ধিকিধিকি ছাইয়ের মধ্যে বাঁশ দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে দেখছে। তারা কোথায়? পুতুলনাচের দল? এক অজানা আশঙ্কায় সকলেই তাকিয়ে আছে ধ্বংসস্তূপের দিকে।
তাঁবুর পিছনদিকে দাঁড়িয়ে আছে ইরফান চাচা। ঠকঠক করে কাঁপছে। তাকে জড়িয়ে ধরে আছে আদিল আর কুবের। মোহনদা শুয়ে আছে একটু দূরে। তার একটা হাত জ্বলে গেছে। ছটফট করছে যন্ত্রণায়। ভোম্বলদাকেও পাওয়া গেল মোটামুটি অক্ষত অবস্থায়। ইরফান চাচা খোঁড়াতে খোঁড়াতে বলল, ‘বিশু? বিশু কই?’ বুক চাপড়াতে লাগল আর বিশুর নাম ধরে ডাকতে লাগল ইরফান চাচা। আদিলদা অবশ্য জানে। পুরোটাই দেখেছে সে। কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলতে পারছে না। চাচা সইতে পারবে না।
লোকজন ছাই ঘেঁটে ঘেঁটে দেখছে। কিচ্ছুটি আর অবশিষ্ট নেই। চাচা চোখ মুছতে মুছতে দেখল তার হাতে গড়া পুতুলগুলো কেমন ছাই হয়ে গেছে।
পুলিশ এসেছে। তারা প্রথমে সবাইকে সরিয়ে দিল। মোহনদাকে নিয়ে গেল কাছাকাছি কোনও এক হাসপাতালে। রাজুদা ফিরে এসেছে। পালিয়েছিল রাতে। স্টেশনে খবর পেয়ে ফিরে এসেছে। তার কী কান্না। শুধু বিশুর নাম ধরে ডাকছে। আর হাউহাউ করে কাঁদছে।
তাঁবুর পিছনে একটা ঝোপের কাছে ওরা দাঁড়িয়ে দেখছিল ছাইয়ের স্তূপটাকে। হঠাৎ ইরফান চাচাই পাশে একটা ঝোপের মধ্যে কী যেন দেখতে পেল। একটু কাছে যেতেই ঠাওর করতে পারল। গোলাপি পোশাকে ঝলমল করছে নাচনি। গায়ে তার আগুনের আঁচড়টি পর্যন্ত নেই। কারওরই যেন বিস্ময় কাটছে না।
একমাত্র আদিলদাই দেখেছে বিশু কেমন দাউদাউ করে জ্বলতে জ্বলতে নাচনিকে ছুঁড়ে দিয়েছে ঝোপের আড়ালে, নিরাপদ জায়গায়।

নাচনি (পর্ব-০২)

মেলা কমিটির লোক এসেছিল। তাঁবুর মধ্যেই ওদের থাকার ব্যবস্থা। ভিতরে পুতুলনাচের ঘরটা অবশ্য খুব সুন্দর করে তৈরি করা। সামনের যে ঘেরা অংশটা থাকে, সেটা বেশ রংচঙে কাপড় দিয়ে সাজানো। ইরফান চাচা অবশ্য দুশ্চিন্তায় মুখ গম্ভীর করে আছে। মেলা কমিটির লোকগুলোকে বলল, “ছাই ফেলে মাঠটা ঠিক করতে হবে।”

সেদিন রান্নাবান্না করতে হয়নি। কমিটি-র লোকেরা খাবার দিয়ে গেছে। খেয়েদেয়ে ওরা তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়েছিল। কাল সারাদিন অনেক কাজ। পুতুলগুলোকে যে করে হোক শুকোতে হবে। বিশু এসবই ভাবছিল। রাতের দিকে সকলেই ঘুমিয়ে কাদা। বিশুর ঘুম আসেনি। জেগে জেগে শুনল বৃষ্টির আওয়াজ। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে আবার। বৃষ্টির ছমছম আওয়াজে বিশুর মনে হচ্ছিল নাচনি যেন সারা তাঁবু জুড়ে নেচে বেড়াচ্ছে।

পরের দিন যেন ভোজবাজির মতো বৃষ্টি উধাও। সকলকে অবাক করে দিয়ে রোদও দেখা দিল। ইরফান চাচা আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আল্লার মেহেরবানি।”

বিশুর অবশ্য কাজ অনেক। ভোর ভোর উঠে পুতুলগুলোর পোশাক খুলতে লাগল। শুকোতে দিতে হবে। নবাব, বেগম, বামুন— সমস্ত পুতুলের পোশাক জড়ো করে এক জায়গায় রাখল। মোহনদা নাচনির দিকে তাকিয়ে ছিল। কিছু বলার আগেই বিশু বলল, ‘নাচনি ভেজেনি গো দাদা।”

পাশ থেকে কুবেরদা হাসতে হাসতে বলল, ‘ভেজেনি, না ভিজতে দিসনি?’ একথার উত্তর হয় না।

বিশু মনে মনে ভাবল, সে তোমরা যাই ভাবো, নাচনির পোশাক খুলতে আমি দেব না।

রোদ উঠতেই তাঁবুর বাইরে একটা লম্বা দড়ি টাঙিয়ে পোশাকগুলোকে ঝুলিয়ে দেওয়া হল। রোদ খুব কড়া। মনে হয় শুকোতে বেশিক্ষণ সময় লাগবে না। এইসময় কমিটির একজন লোক এল। কিছু পেমেন্ট করে গেল। আদিলদা ওদিকে তাকাতেই ইরফান চাচা বলল, ‘দুপুরে তোদের পেমেন্টগুলো নিয়ে নিস।’

রান্না চাপানো হয়েছে তাঁবুর বাইরে। কমিটি আর খাবার দেবে না। গতকাল ঝড়-বৃষ্টি ছিল বলে কমিটি একবেলা খাবার দিয়েছে। রোজ দিতে পারবে না। ওরা অবশ্য সেটা জানে। বস্তায় কিছু সবজি আনাও হয়েছে। সেগুলো কাটছিল রাজুদা। তবে মন যেন তার অন্য দিকে। একটা মেয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক আছে। ঘণ্টায় ঘণ্টায় তার সঙ্গে কথা না বললে তার হয় না। ইরফান চাচা মাঝে মাঝে বকুনিও দিয়েছে। কিন্তু রাজুদার ফোন করা কমেনি। তবে সেই সম্পর্ক বুঝি তেমন সুমধুর নেই এখন। বিশু ফোনের কথা শুনেই বুঝতে পারে রাজুদা কী একটা ব্যাপার নিয়ে ঝগড়া করে। বিশু মনে মনে ভাবে, একদিক থেকে ভালো, নাচনি অন্তত তাকে ধোঁকা দেবে না। রান্না শেষ হতেই বিশু বাইরে এসে দেখল, একদল বাচ্চা ছেলে তাঁবুর বাইরে উঁকিঝুঁকি মারছে। বিশেষ করে রংচঙে পোশাকগুলোকে বাইরে দেখে তাদের কৌতূহল যেন বেড়ে গেছে। পুতুলগুলোকে তারা দেখতে চায়। ভোম্বলদা ওদেরকে প্রায় তেড়ে হটিয়ে দিল।

পুতুলনাচের তাঁবুটা মেলার একটা সাইডে। তাই এখানে অন্যান্য দোকানপত্তর তেমন নেই। কিন্তু কিছুটা দূরেই সারি সারি দোকান দেখা যাচ্ছে। ‘বেশ বড়োসড়ো মেলা, কী বলিস!’ রোদ পোহাতে পোহাতে বলল কুবেরদা। বিশু বলল, “জয়নগরের মেলাটার মতো।’ ইরফান চাচা ওদের কথা শুনতে পেয়ে বলল, “এ আর কী এমন মেলা! মেলা ছিল বনগাঁয়ের একটা গ্রামে। তা পঁচিশ বছর আগেকার কথা হবে। দু’হপ্তা ধরে পুতুলনাচ চলছিল। মেলা শেষ হয়ে গেলেও পুতুলনাচ চালিয়ে যেতে হয়েছিল। সে এক দিন ছিল!’ ইরফান চাচা মাঝে মাঝেই এরকম পুরোনো দিনের গল্প বলে। বিশুর শুনতে খারাপ লাগে না। আর শোনে ওর বাবার কথা। তখন এমনি এমনি চোখ ভরে যায় জলে।

সামনে একটা পুকুর আছে। মেলার সব লোক সেখানে চান করছে। একটু বেলা করে নাইতে গেল বিশু আর রাজুদা। জল তখন ঘোলা হয়ে গেছে একদম। উপায় নেই, বিশু ঝাঁপিয়ে পড়ল জলের উপর। তারপর চিতসাঁতার কাটতে কাটতে ভেসে থাকল অনেকক্ষণ। ভাসতে ভাসতে পেরিয়ে গেল পুকুরের এই দিক থেকে অন্য দিকে। নিজেকে যেন কেমন হালকা মনে হচ্ছে। যদি এরকম ভেসে থাকা যেত সারাজীবন, কেমন হতো? মনে মনে ভাবল, তার কোনও বাঁধন নেই। কিন্তু পুতুলগুলো কেমন বন্দি। লাঠি ধরে মানুষ যেমন নাচায় তারা তেমন নাচে। রাজুদার ডাকে চোখ গেল ঘাটের দিকে। রাজুদা উঠে পড়েছে জল থেকে। বিশুও আর দেরি করল না।

দুপুরে খাওয়া হল ভাত আর সবজি। বেশি কিছু করা যায়নি। কুবেরদা মুরগি নিয়ে এসেছে। ওটা রাতে হবে। খাওয়ার পর একটু জিরানোর জো নেই। পোশাকগুলো শুকিয়ে গিয়েছে। বিশু সেগুলো এনে পুতুলগুলোকে পরিয়ে দিচ্ছিল। ইরফান চাচা ‘অন্নদামঙ্গল’ করবে ভেবেছিল, কিন্তু এখন মত বদলেছে। আগের মেলায় যেটা চলছিল ‘নবাবের কিসসা’, সেটাই চলবে। নতুন পালার গানগুলো এখনও ঠিকঠাক তোলা যায়নি। বিশু তাই পোশাকগুলোকে একইরকম ভাবেই পরাল। এ কাজটা বেশ ভালোই শিখেছে সে। বেশ কায়দা করে পোশাকগুলো পরাতে হয়। সবাই কিন্তু পারবে না। নবাবের পোশাক পরাতে গিয়ে বেশ মজা পাচ্ছিল সে। কত আড়ম্বর তার!

নাচনিকে একটু দূরে দাঁড় করিয়ে রাখা আছে। সে যেন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বিশুর দিকে। বিশুর শুধু মনে হয় সারাদিন নাচনি বোধহয় তাকেই দেখে। পোশাক পরানো হয়ে গেলে, চাচা একবার এসে দেখে গেল। “বা! সুন্দর হয়েছে। গয়নাগুলো এবারে পরিয়ে দিস।’ গয়না বলতে কিছু পুঁতির হার আর ছোটো ছোটো রঙিন স্টোনের মালা। বেগমকে একটু বেশি পরাতে হয়। নাচনি পরে, তবে কম। সে তো রানি নয়, নাচনি। সাধারণত রাজুদা এই অলংকারের কাজটা করে। কিন্তু রাজুদার উপর কোনও কারণে সকাল থেকে খেপে আছে চাচা, তাই হয়তো তাকে বলে গেল।

(ক্রমশ…)

ডালের ফ্রাই আর নাচোস প্ল্যাটার

নোনতা খাবারের প্রতি আমাদের আকর্ষণ চিরকালীন। বিশেষকরে বিকেলের আড্ডায় তো এই খাবার জনপ্রিয়তার শীর্ষে। তাই, আপনজনের সঙ্গে আড্ডা আর হই-হুল্লোড় সম্পূর্ণ করতে হলে, নোনতা খাবার চাই-ই চাই। অতএব, এবার উপভোগ করুন টেস্টি-টেস্টি নোনতা খাবার। রইল রেসিপিজ।

ডালের ফ্রাই:

উপকরণ: ১/২ কাপ ছোলার ডাল, ২ ছোটো চামচ আদাকুচি, ২টো কাঁচালংকা কুচি, ৩ কোয়া রসুন, ১/২ ছোটো চামচ হলুদগুঁড়ো, ১ বড়ো চামচ ধনেপাতাকুচি, ১ ছোটো চামচ আমচুরগুঁড়ো, ৩/৪ কাপ আটা, ১/২ কাপ চালের গুঁড়ো, ২ ছোটো চামচ ‘সুমন’ ব্র্যান্ডের তেল ময়ানের জন্য, ১/৮ ছোটো চামচ খাবার সোডা, ভাজার জন্য তেল, অল্প চাটমশলা, লংকাগুঁড়ো ও নুন স্বাদমতো।

প্রণালী: ছোলার ডাল ৬ ঘণ্টা জলে ভিজিয়ে রাখুন। এবার জল ছেঁকে ডালটা রসুন দিয়ে বেটে নিন। বাকি উপকরণ ডালের সঙ্গে মিশিয়ে নিন। এরপর একটা পাত্রে আটা ও চালের গুঁড়ো মিশিয়ে নিন। ময়ানের মতো তেল দিন ও খাবার সোডা মিশিয়ে মেখে নিন। ২০ মিনিট ঢেকে রাখুন। এই মিশ্রণ থেকে লেচি কেটে পাতলা করে বেলে নিন। এই পাতলা রুটির উপর ডালের মিশ্রণ ভালো ভাবে চারিয়ে দিন। এবার আলতো করে রোল করে নিন। রোলের দুর্দিকের মুখ বন্ধ করে দিন। এবার রোলগুলো ফুটন্ত জলের উপর ছেড়ে দিন ও ১০ মিনিট ওভাবেই রেখে দিন। জল থেকে তুলে ঠান্ডা করুন। তারপর গোল গোল টুকরোয় কেটে নিন। কড়ায় তেল গরম করে ডিপফ্রাই করুন। কড়া থেকে তুলে, সার্ভিং প্লেটে রেখে, চাট মশলা ছড়িয়ে পরিবেশন করুন।

নাচোস প্ল্যাটার

উপকরণ: ১ বড়ো চামচ সেদ্ধ করা রাজমা, ১ বড়ো চামচ কাবলি ছোলা সেদ্ধ করা, ১ বড়ো চামচ পেঁয়াজ পাতা কুচোনো, ১ বড়ো চামচ গাজর মিহি করে কাটা, ১ বড়ো চামচ কড়াইশুঁটি সেদ্ধ, ৪-৫টা মাশরুম সেদ্ধ করা, ১/৪ কাপ লাল-সবুজ-হলুদ ক্যাপসিকাম মিহি কুচো করা, ১ বড়ো চামচ রেড চিলি সস, ১ বড়ো চামচ গ্রিন চিলি সস, ১/২ কাপ চিজ গ্রেট করা, ১ ছোটো চামচ চিলি ফ্লেক্স, ১ বড়ো চামচ টম্যাটো কেচআপ, ১ বড়ো চামচ মেয়োনিজ, ১ প্যাকেট নাচোস, গার্লিক সল্ট স্বাদমতো।

প্রণালী: সমস্ত সবজি, রাজমা, কাবলি ছোলা, সস, অল্প নুন, চিজ এবং মেয়োনিজ দিয়ে মেখে নিন। একটি প্লেটে এই স্যালাড রাখুন। ধার দিয়ে নাচোস সাজিয়ে দিন। অল্প চিজ আর গার্লিক সল্ট মিক্স করে উপর থেকে ছড়িয়ে পরিবেশন করুন।

নাচনি (পর্ব-০১)

বিশু পুকুর থেকে আঁজলা জল নিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে নিচ্ছিল। তার ছায়া পড়েছে জলে। সেই জলে হাত দিতেই ছায়াও কেমন নাচছে। অনেকটা নাচনির মতো। খুব মজা পাচ্ছিল সে।

ইরফান চাচা ডাকল, “কীরে বিশে! হাত ধোওয়া হল?”

বিশু দৌড়ে প্যান্ডেলের মধ্যে ঢুকে হাতটা গামছায় মুছল।

—এত সময় লাগে? ভালো করে দ্যাখ ভাতটা ফুটল কিনা, তাড়াতাড়ি খেয়ে নেয়ে বেরোতে হবে। পটাশপুর তো আর কম দূর নয়।

ইরফান চাচার এই এক দোষ, বড্ড অস্থির হয়ে ওঠে। বিশু ভাতটা স্টোভ থেকে নামিয়ে নিল। এখনই গরম-গরম ডাল-ভাত মুখে গুঁজে নিতে হবে। কাল রাতে পেটে তেমন কিছু পড়েনি।

আসলে বিশু এসেছে একটা পুতুল নাচের দলের সঙ্গে। ফাইফরমাশ খাটে। বিশুর বাবা আগে এই দলের লিডার ছিল। তিনি চলে যাওয়ার পর সংসার আর চলে না। ইরফান চাচাই বিশুর মা’কে বলেছিল, ‘ভাবি, ছেলেটারে না হয় পাঠাও। দু’পয়সা যা হবে, তোমাদের দু’জনের চলে যাবে।’

বিশুর বাবা হরেন দাসকে সবাই ওস্তাদ বলে মানত। এই দল কবেই ভেঙে যেত যদি না হরেনদা থাকত! কে আর মাঠে-ঘাটে পুতুল নাচাতে যাবে? ক’পয়সা আর হয়! হরেনদা শক্ত করে ধরে রেখেছিল বলে এই দল এখনও টিকে আছে। নতুন নতুন পালা তৈরি করেছিল। আর গানের গলা? আহা! লোকে কত হাততালি দিত। ইরফান চাচা পুতুলগুলোর চুল আঁচড়ে দিতে দিতে এসবই ভাবছিল। বিশুর ভাত নামাতে দেখেই চাচা বুঝল, খাবার রেডি।

ওরা মোট সাতজনের দল। এখন ইরফান চাচাই ওদের লিডার। পুরোনো লোক বলতে— আদিলদা, কুবের আর মোহনদা। মোহনদা আর আদিলদা পুতুল নাচায়। কখনও কখনও রাজুদাও নাচায়। তবে শুধুই নাচনিকে। ইরফান চাচা নানা কণ্ঠে সংলাপ বলে, প্রায় নয়-দশ রকমের কণ্ঠ করতে পারে। এমনকী মেয়েদের গলাতেও কথা বলতে পারে। বিশুকেও শেখাবে বলেছে। ভোম্বলদা চাচার সহকারী হিসেবে আছে। বিশু পুতুল নাচাতে পারে না। অত বড়ো বড়ো পুতুলগুলোকে নাচাতে দম লাগে। শক্তি লাগে।

ভাত মুখে দিয়ে আদিলদা বলল, ‘চাচা, পেমেন্টের বাকিটা দিয়েছে?”

ইরফান চাচা একটা কাঁচা লঙ্কা চিবোতে চিবোতে বলল, “দিয়েছে রে দিয়েছে, কালকের পটাশপুরের শোটা হোক। এক সঙ্গে পেয়ে যাবি।’

আসলে এইখানে একটা মেলা হচ্ছে। মেলা কমিটি প্রতিবারেই তাদের নিয়ে আসে। দু’দিন খোলা মাঠে প্যান্ডেল করে পুতুলনাচ হল। ভালোই লোক হয়েছিল। এত লোক মজা করে পুতুলনাচ দেখছে দেখে চাচার চোখে জল এসে গিয়েছিল আনন্দে। অবশ্য মোহনদা বলেছিল, “পকেটের কড়ি লাগেনি তো তাই দেখছে। পটাশপুরে বোঝা যাবে! এখেনে মাগনায় হবে না, টিকিট লাগবে।’ পটাশপুরেও মেলা হচ্ছে। ওখানে ওরা আগে কখনও যায়নি। তবে শুনেছে তাঁবু খাটিয়ে পুতুলনাচ হবে। ইরফান চাচা বলেছে ওখানে অন্নদামঙ্গল পালা করবে। জমবে ভালো।

খাওয়া হতে হতে একটা বেজে গেল। একটা ছোটো ম্যাটাডোর চলে এসেছে। রাজুভাই নতুন। মাস চারেক দলের সঙ্গে এসেছে। সে আর বিশু মিলে পুতুলগুলো ম্যাটাডরে তুলে গাড়ির পাটাতনে ঠেস দিয়ে রাখছিল। বেশ কায়দা করে দাঁড় করিয়ে রাখতে হচ্ছিল। কারণ, পুতুলের নীচের অংশে যে লম্বা লাঠিটা থাকে, সেটার জন্য দাঁড় করিয়ে রাখা বেশ কঠিন কাজ।

নবাবের পুতুল, বেগমের পুতুল, বামুনের পুতুল আরও কত পুতুল৷ গায়ে কেমন ঝকমকে ড্রেস। তবে নাচনি-পুতুলটাকে সবচেয়ে ভালোবাসে বিশু। গোলাপি রঙের একটা ঘাগরা পরে আছে। মাথায় বাঁধা আছে বেগুনি ওড়না। আদিলদা কী সুন্দর নাচাত। এখন রাজুদাও শিখে নিয়েছে। চাচা যখন মেয়েলি কণ্ঠে গান ধরে, দু’টো হাত নাড়িয়ে কী সুন্দর অঙ্গভঙ্গি করে নাচনি। ওই সময়টা বিশু শুধু হাঁ করে দ্যাখে।

বিশু নাচনিকে ম্যাটাডোরের একটা ধারে যত্ন করে দাঁড় করিয়ে রাখল। ইরফান চাচা বলেছিল— নাচনির যেদিন জান আসবে, সেদিন বিশুর সঙ্গে তার শাদি করাবে। বিশু হাসে না। সে জানে পুতুল কখনও জ্যান্ত হবে না।

ম্যাটাডোর ছাড়ার আধা ঘণ্টার মধ্যে আকাশ কেমন কালো করে এল। কিছুক্ষণ আগেই রোদ ঝলমলে দিন ছিল। হঠাৎ যেন ভোল বদল। ম্যাটাডোরে তো আর ছাউনির ব্যবস্থা নেই। ইরফান চাচা চেঁচামেচি করতে লাগল।

—ওরে মোহন, ওরে বিশে ত্রেপলটা দ্যাখ কোথায় আছে। গাড়ি একটা গাছতলায় থামিয়ে ত্রিপল দিয়ে একটা ছাউনি করা হল। তবে খুব যে জুতসই হল বলা যায় না। আবার গাড়ি চলল। ত্রিপলের কোণাটা চেপে ধরে আছে বিশু। নাহলে দমকা হাওয়ায় ত্রিপল উড়ে যেতে পারে।

পটাশপুর যত এগিয়ে আসে তত যেন বৃষ্টির বেগ বাড়ে। কত আর আটকানো যায়। পুতুলগুলোতেও বৃষ্টির ছিটে এসে লাগল। রাজুভাই ত্রিপলটাকে টেনে টেনে আড়াল করার চেষ্টা করলেও কাজের কাজ কিছু হল না। মোহনদা মাথায় হাত দিয়ে বলল, ‘বৃষ্টির যা অবস্থা, মেলা ভালো জমবে না।’ আদিলদা দাঁত দিয়ে নখ খুঁটতে খুঁটতে সায় দিল। ঘণ্টা দু’য়েক লাগল। বৃষ্টিটার জন্য কিছুটা দেরি হল যেতে। মেলার মাঠের এককোণে তাঁবু ফেলা আছে। গাড়ি গিয়ে দাঁড়াল তাঁবুর একেবারে গা ঘেঁষে। মাঠ আর মাঠ নেই। কাদায় একেবারে যা-তা অবস্থা। তবে বৃষ্টিটা একটু ধরেছে তাই রক্ষে! মোহনদা ম্যাটাডোরের উপর থেকে একটা একটা করে পুতুল নামাচ্ছে, নীচে বিশু ধরে নিয়ে পরপর সাজিয়ে রাখছে।

ইরফান চাচা ওদিকে তাকিয়ে জিভ দিয়ে একটা আপশোস করার মতো শব্দ করে বলল, “পুতুলগুলো তো ভিজে যা-তা অবস্থা। কাল পালা হবে কী করে?’

সকলেই পুতুলগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। নবাবের দাড়ি দিয়ে জল টসটস করে ঝরছে, বেগমের শাড়ি ভিজে যা-তা অবস্থা। সব পুতুলগুলোই কম বেশি ভিজেছে। তবে বিশু জানে, নাচনির গায়ে জলের ফোঁটাটি পর্যন্ত পড়েনি। সে প্রায় আগলে রেখেছিল নাচনিকে।

জীবনে যা অপরিহার্য

মুখে যে যা-ই বলুন না কেন, স্বীকার করতেই হবে যে, জীবনের অন্যতম অপরিহার্য বিষয়— যৌনতা। আর আপনার যৌনজীবন যদি সুখের না হয়, তাহলে জীবনের বাকি সব আনন্দ ফিকে হয়ে যেতে পারে। কেউ কেউ একঘেয়েমিতে আক্রান্ত, আবার অনেকে ব্যস্ততার ও ক্লান্তির জেরে যৌনতাবিমুখ। বাড়িতে বসে খাবার খাওয়ার সময় নেই, লাইফ-পার্টনারকে নিয়ে বেড়ানোর সময় নেই, শরীরের যত্ন নেওয়ার সময় নেই, এমনকী সেক্স-এর প্রাথমিক পর্বে ফোরপ্লের ও সময় নেই। অর্থাৎ, ‘নেই’-এর তালিকাটা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে ক্রমশ। ‘আছে’-র তালিকায় রয়েছে শুধু একঘেয়ে জীবন, মানসিক অবসাদ এবং খিটখিটে মেজাজ। ফলে কমছে যৌন-ইচ্ছা, পুরুষের শুক্রাণু এবং নারীর ডিম্বাণু। বাড়ছে বন্ধ্যাত্ব।

সাম্প্রতিক সমীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে, মোবাইল ফোন, কম্পিউটার প্রভৃতি বৈদ্যুতিন যন্ত্রের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে বাড়ছে ক্লান্তি, অবসাদ এবং কমছে সেক্স। ব্যাহত হচ্ছে পুরষদের শুক্রাণু এবং মহিলাদের ডিম্বাণু উৎপাদনের ক্ষমতাও। আজকাল বন্ধ্যাত্বের সমস্যা প্রকট রূপ নিয়েছে। কিন্তু এটা তো কোনও সার্থক বেঁচে থাকা নয়! দীর্ঘদিন ভালো ভাবে বেঁচে থাকার জন্য জীবনকে করে তুলতে হবে বর্ণময়। কারণ আগেই বলেছি, জীবনের সাত রং-এর একটি অবশ্যই যৌনসুখ।

কিন্তু দুঃখের বিষয় হল এই যে, অধিকাংশ নারী-পুরুষ এখনও সেক্সকে শুধু সন্তান উৎপাদনের মাধ্যম মনে করেন। আধুনিক নারী-পুরুষেদের একাংশের যৌন-ইচ্ছা থাকলেও, নানা কারণে যৌনসুখ থেকে বঞ্চিত হন। অতিরিক্ত ধূমপান, মদ্যপান, ভেজাল খাবার কিংবা দীর্ঘ রোগভোগও কমিয়ে দেয় যৌন-ইচ্ছা। আবার দীর্ঘদিন একটানা গর্ভনিরোধক ওষুধ সেবন করলেও সেক্স-এ অনীহা আসতে পারে। তাই প্রথমে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন, শারীরিক পরীক্ষানিরীক্ষার মাধ্যমে যৌন সমস্যার সমাধানের জন্য উপযুক্ত চিকিৎসা করান।

এটা আপনার যৌন-জীবনের প্রস্তুতি পর্ব। বাকিটা নিজের হাতে। কারণ, সেক্স ঠিক ছাইচাপা আগুনের মতো। একটু উসকে দিলেই উত্তাপ তীব্র হয়। আর এই উসকে দেওয়ার কাজটা করবে আপনার মন। অর্থাৎ, যৌনসুখ লাভের ইচ্ছাকে জাগিয়ে রাখতে হবে। অবশ্য সঠিক যৌনসুখ পাওয়ার জন্য উপযুক্ত যৌনশিক্ষা নেওয়ারও প্রয়োজন আছে। এ প্রসঙ্গে হয়তো অনেকে ভাববেন, যৌনতার আবার শিক্ষা কী? এ তো প্রাকৃতিক ব্যাপার। ঠিকই। কিন্তু মনে রাখবেন, স্বাভাবিক যৌনতৃপ্তির জন্য দু’জনের কমপ্যাটিবিলিটি প্রয়োজন। সেইসঙ্গে আছে টেকনিক্যাল পার্ট। আর এই টেকনিক্যাল পার্ট-কে সহজ করে বলা হয় ‘কৌশল’। তাই, কৌশল রপ্ত করতে হবে। কিন্তু কীভাবে? এজন্য রইল পাঁচটি ভাইটাল গাইডলাইন।

পরামর্শ

লভ মেকিং-এর সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রাতে খাওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে সঙ্গমে লিপ্ত হবেন না। প্রথমে ঘুমিয়ে নিন। এতে শরীর বিশ্রাম পাবে। সারারাত বিশ্রামের পর, ভোররাতই হল সঙ্গমের উপযুক্ত সময়। ওই সময় উত্তেজনা আয়ত্তে থাকে এবং দীর্ঘক্ষণ স্টে করা যায়।

পরামর্শ

সেক্স মানে উত্তেজনা। তাই শরীরে উত্তেজনা যেমন তৈরি করতে হবে, ঠিক তেমনই উত্তেজনাকে আয়ত্তে রাখতে হবে দীর্ঘ সময় ধরে সঙ্গমের জন্য। তাই প্রথমে মনকে তৈরি করুন। একে অন্যকে ধীরে-ধীরে বিবস্ত্র করুন। বেডরুম-এ বড়ো আয়নার সামনে দাঁড়ান। আলিঙ্গন এবং চুম্বনে ভরিয়ে দিন পরস্পরকে। ফোরপ্লে দীর্ঘতর করুন। যৌনতার প্রাথমিকপর্বে ওরাল সেক্স এনজয় করুন। এরপর পুরুষসঙ্গী শায়িত অবস্থায় থেকে নারীকে লিড করতে দিলে সেক্স দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং দারুণ তৃপ্তি পাওয়া যাবে।

পরামর্শ

অনেক পুরুষের তাড়াতাড়ি ডিসচার্জ হয়ে যাওয়ার সমস্যা থাকে। সেক্ষেত্রে সেক্স-এর অন্তত ঘণ্টাখানেক আগে হস্তমৈথুন করে নিন। এতে সমস্যা মিটবে। অর্থাৎ, দ্বিতীয়বার সেক্স-এ স্থায়ীত্ব বাড়বে।

পরামর্শ

যৌনক্রিয়াও করুন থেমে থেমে। অর্থাৎ, স্খলনের ঠিক আগে কয়েক সেকেন্ড-এর বিরতি। এভাবে তিন-চারটে বিরতির পর যখন স্ত্রী চূড়ান্ত উত্তেজিত হয়ে উঠবে, ঠিক তখনই স্খলন করুন।

পরামর্শ

সেক্স-এ স্থায়ীত্বের জন্য সাধারণ ব্যায়াম ছাড়াও রয়েছে এক বিশেষ ব্যায়াম। মলত্যাগের সময় যেভাবে মলদ্বার সংকোচন-প্রসারণ করা হয়, পদ্মাসন, বজ্রাসন, শবাসন অথবা সোজা হয়ে বসে প্রক্রিয়াটি নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে নির্দিষ্ট সংখ্যকবার করতে হবে। যোগাসনের ভাষায় একে বলা হয় অশ্বিনিমুদ্রা। নিয়মিত ভাবে অভ্যেসের মাধ্যমে সময় প্রলম্বিত করলে যৌনক্ষমতা বাড়ে। তবে কেবলমাত্র একজন যোগ শিক্ষকের পরামর্শ নিয়ে তবেই এই মুদ্রা করা উচিত।

স্মৃতির অতলে (শেষ পর্ব)

আমার গোটা জীবনটা চোখের জলে ভেসে যায়নি। আমাদের বয়সের অনেকটা ব্যবধান সত্ত্বেও আমি আস্তে আস্তে তাঁকে ভালোবাসতে শুরু করলাম। আর আস্তে আস্তে তোমাকে আমি আমার মনের গোপন কুঠুরিতে সযত্নে বন্দি করে শিকল তুলে দিলাম।

বিয়ের পর এই গ্রামের সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল মাত্র চারবছর। বছরে দু’বার করে আসতাম এই গ্রামে। তোমার সঙ্গে বেশ কয়েকবার দেখাও হয়েছিল। জানি না কেন, আমার চোখে তুমি চোখ রাখতে পারোনি কখনও। ইতস্তত করে মাথা নামিয়ে চলে যেতে প্রতিবার। কেন বলো তো? কীসের লজ্জা? তোমার তো কোনও দোষ ছিল না। আমি তো অন্তত কোনওদিন তোমাকে দোষ দিইনি। শেষবার যখন এসেছিলাম গ্রামে, তখন শুনলাম বিয়ে করেছ। বিশ্বাস করো, শুনে খুশিই হয়েছিলাম।

অতীতকে পিছনে ফেলে তুমিও যে এগিয়ে যেতে পেরেছ জেনে ভালো লেগেছিল। মন থেকে চেয়েছিলাম তুমি সুখী হও। তোমার বউকে দেখার খুব সাধ হয়েছিল, কিন্তু আর দেখা হয়ে ওঠেনি। তারপরই বাবা মারা গেলেন। মাকে নিয়ে আমি আমার শ্বশুরবাড়িতে চলে গেলাম। বছরখানেক বাদে কাকারাও এখানকার সব জায়গা-জমি বিক্রি করে চলে গেলেন অন্যত্র। ব্যস, আমার জন্মভিটের সঙ্গে সরু সুতোর মতো ঝুলে থাকা সম্পর্কটুকুও চুকে গেল।

তারপর থেকে এতগুলো বছরে আর কোনওদিন তোমার সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। আসলে দেখা করার কথা ভাবিওনি কখনও। আজ এত বছর বাদে তোমার সঙ্গে দেখা করার জন্য আমি এই গ্রামে আসিনি। এসেছিলাম আমার শৈশবের টানে। বার্ধক্যের জরাজালে জীর্ণ এই শরীরটা যখন চিরমুক্তির জন্য দিন গুনছে, তখন বড্ড ইচ্ছে করছিল আবার ছোটোবেলায় ফিরে যেতে। ছোটোবেলার সেই চেনা জায়গা, চেনা পরিবেশ, চেনা গন্ধ, সব কিছুকে আমার সমস্ত শরীর, সমস্ত মন দিয়ে জাপটে জড়িয়ে ধরতে চেয়েছিলাম শেষবারের মতো। শুষে নিতে চেয়েছিলাম আমার ছোটোবেলার সেই ঘ্রাণ। আর তাই এসেছিলাম এখানে। কিন্তু এখানে আসার পর তোমার সঙ্গে কাটানো পুরোনো সব স্মৃতিগুলো দমকা হাওয়ার মতো মনের সেই গোপন কুঠুরিতে গিয়ে ধাক্কা দিল। আবার এক ঝড় উঠল আর সেই ঝড়ে এত বছর ধরে আটকে রাখা শিকলটা নিমেষে খুলে পড়ে গেল।

আচ্ছা, কাজের ফাঁকে কিংবা অবসরে তোমার কি কখনও মনে পড়ে আমার কথা? এতগুলো বছরে একবারও কি ভেবেছ আমার কথা? একবারও কি আমার মুখটা ভেসে উঠেছে তোমার চোখের সামনে? আচ্ছা, এই চল্লিশ বছর বাদে আজ যদি হঠাৎ করে তুমি আমার সামনে এসে দাঁড়াও, আমি কি পারব তোমাকে চিনতে? সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তোমার চেহারার পরিবর্তন হয়েছে নিশ্চয়ই। মাথাভর্তি সেই ঝাঁকড়া কালো চুল নিশ্চয়ই আর নেই। হয় সেগুলো সাদা বর্ণে রূপান্তরিত হয়েছে আর নয়তো দেখা দিয়েছে ইন্দ্রলুপ্ত। সুন্দর মুখটাতে নিশ্চয়ই দেখা দিয়েছে বলিরেখা।

আমার নিজের চেহারারই কত পরিবর্তন হয়েছে এত বছরে। স্বামীর মৃত্যুর পর কম ঝড়ঝাপটা তো সামলাতে হয়নি আমাকে। তখন আর আমার কতই বা বয়স। ছোটো ছেলেটাকে নিয়ে অনেক লড়াই করে অনেক পথ পেরোতে হয়েছে। সেসব কথা আজ থাক। আজ অবশ্য ছেলেটা প্রতিষ্ঠিত। আজ আর কোনও চিন্তা নেই আমার। তবে হ্যাঁ, বয়সজনিত কারণে পায়ে ব্যথা, চোখে চালশে এলেও এখনও বেশ শক্ত সমর্থই রয়েছি। তুমিও কি এমনই আছো, নাকি বয়স একটু বেশিই থাবা বসিয়েছে তোমার উপর? আজ চেহারার পরিবর্তন ছাপিয়ে মনের চোখ দিয়ে কি চিনে নিতে পারব তোমাকে? তুমিও কি পারবে চিনতে আমায়?

সন্ধে হয়ে আসছে। এবার ফিরতে হবে। ছোটো ছোটো পায়ে হেঁটে স্টেশনে এসে ছোটো বেঞ্চটায় বসলাম ট্রেনের অপেক্ষায়। মনের মধ্যে এখনও পুরোনো স্মৃতিরা ভিড় জমাচ্ছে। হঠাৎ ট্রেনের বাঁশির শব্দে চমক ভাঙল। স্টেশনে ট্রেন ঢুকছে। ছোটোবেলার স্মৃতিমাখা এই গ্রামকে চির বিদায় জানিয়ে ফিরে যেতে হবে আমাকে। আর সময় নেই। আর কখনও আসা হবে না জানি। জীবননদী যে প্রায় সাগর কিনারে এসে গেছে। এখন শুধুই সাগরে মিশে বিলীন হওয়ার অপেক্ষা। শেষবারের মতো একবার চারিদিকে তাকিয়ে দেখলাম। চোখটা একটু ঝাপসা হয়ে এল। আর এখানে থাকা যাবে না। তারপর আস্তে আস্তে উঠে এগিয়ে গেলাম। ট্রেন এসে সামনে দাঁড়াল।

ট্রেনের দরজায় পা দিতে যাব এমন সময় হঠাৎ কানে এল— সাবধানে থেকো মা, আমাকে নিয়ে চিন্তা কোরো না। আবার সামনের মাসে আমি আসব তো। বাবার খেয়াল রেখো। গলাটা যে ভীষণ চেনা আমার। চমকে উঠে পাশে তাকালাম। দেখি চল্লিশ বছর আগের তুমি পাশের কামরার দরজা থেকে হাত নাড়ছ। একটা ঘোরে চলে গেছিলাম। সেই এক চেহারা, এক কণ্ঠস্বর। আশ্চর্য হয়ে গেলাম। চল্লিশ বছরে তোমার এতটুকু বয়স বাড়েনি! এ কী করে সম্ভব! ঘোর কাটল। তাকিয়ে দেখি স্টেশনে দাঁড়িয়ে এক প্রৌঢ় দম্পতি।

ভদ্রমহিলা শাড়ির আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে হাত নাড়ছেন। আর তাঁর পাশে তাঁরই কাঁধে হাত রেখে মুখে হাসি ধরে রেখে হাত নাড়ছেন এক বয়স্ক ভদ্রলোক। তাঁর গায়ে জড়ানো একটা শাল। সেই শালটা আমার বড্ড পরিচিত। শালটার কোণের কাজগুলো আমার নিজের হাতের সৃষ্টি। নিজের বোকার মতো ভাবনায় নিজেরই হাসি পেল। আনমনে একটু হেসে ট্রেনে উঠে পড়লাম। জানলার ধারে একটা সিট খালি ছিল। গিয়ে বসলাম। আবার ট্রেনের বাঁশি শোনা গেল।

এক পা, এক পা করে গড়াতে শুরু করল ট্রেনের চাকা। স্টেশনে যে বেঞ্চটায় আমি বসেছিলাম, সেই বেঞ্চটা, স্টেশনের দোকানটা একটু একটু করে পিছাতে শুরু করল। তারপর তোমাদের সামনে এসে গেল আমার পাশের জানলাটা আর সঙ্গে আমিও। তোমরা তখনও হাত নেড়ে চলেছ। জানি আমাকে না, তোমাদের ছেলেকে। কিন্তু আমার যে ভীষণ বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছিল যে, তুমি আমাকেই হাত নাড়ছ। চল্লিশ বছর বাদে বিদায় জানাচ্ছ আমাকে শেষবারের মতো, হাসিমুখে। নিজের অজান্তেই কখন যেন আমার হাতটাও উঠে গেল। হাত নাড়লাম আমি।

এতগুলো বছরে তোমার চেহারার পরিবর্তন হয়েছে অনেক। তবু চিনতে অসুবিধা হচ্ছে না। মনের চেহারার পরিবর্তন যে হয় না। তুমি কি চিনতে পারলে আমায়? জানি না, জানতে চাইও না। শুধু জানি, এ জীবনে আর কখনও দেখা হবে না তোমার সঙ্গে। এ আমাদের শেষ দেখা। চোখটা কেমন ঝাপসা হয়ে আসছে। বাইরেটা আর পরিষ্কার দেখতে পারছি না। আমার শরীর ফিরে চলেছে আমার বর্তমান ঠিকানায়, আর আমি ফিরে যাচ্ছি অতীতের পাতায়।

স্মৃতির অতলে (পর্ব-০২)

তারপর একদিন এমনই এক বিকেলে এই নদীর ধারে আমাকে একা বসে থাকতে দেখে তুমি এগিয়ে এলে, বসলে আমার পাশে। আমার কোলের উপর পড়ে থাকা আমার হাতটা নিজের হাতের মুঠোর মধ্যে তুলে নিলে। সেদিন প্রথম তোমার স্পর্শ পেলাম। আবার শিহরিত হলাম, ভীষণরকম ভাবে শিহরিত হলাম। এই প্রথম কোনও পুরুষের স্পর্শ পেলাম আমি। আস্তে আস্তে তুমি তোমার মনের কথা জানালে আমাকে। তোমার কাছে সেদিন জানতে পারলাম এতদিন তুমি সামনে থাকলে আমার ভিতর যা যা ঘটত, তোমারও নাকি তেমনই হতো আমি সামনে থাকলে। তোমার কাছে জানতে পারলাম এরই নাম ভালোবাসা।

হঠাৎ করেই যেন সব কিছু এলোমেলো হয়ে গেল আমার। নিস্তরঙ্গ হয়ে বয়ে চলা কোনও নদীর বুকে হঠাৎ কিছু এসে পড়লে যেমন তাতে তরঙ্গের সঞ্চার ঘটে, আমার জীবনেও তোমার বলা কথাগুলোতে ঠিক তেমন ঘটল। তুমি প্রথম মানুষ, যে আমাকে উপলব্ধি করিয়েছিলে যে, আমি শুধুমাত্র একটি মেয়ে নই, আমার মধ্যেও এমন কিছু আছে যা অন্য কাউকে আকর্ষণ করতে পারে। তোমার স্পর্শেই প্রথম আমি তরুণী থেকে যুবতীতে পরিণত হলাম। পদার্পণ করলাম এক নতুন জীবনে। প্রথম প্রেমের আবেশে মুগ্ধ সেই যুবতী তোমাকে নিয়ে সেদিন অনেক স্বপ্নের জাল বুনেছিল।

প্রতিদিন বিকেলে স্কুল ছুটির পর এই নদীর পারে নিভৃতে আমরা বসে গল্প করতাম আর দিগন্ত রাঙিয়ে সূর্যের বিদায়যাত্রা দেখতাম। সারাদিনের যত জমানো কথা উজাড় করে দিতাম একে অপরের কাছে। কখনওবা দু’জনের কেউই কোনও কথাই বলতাম না, শুধুই হাতের উপর হাত রেখে একে অপরের মনের কথা বুঝে নিতাম। এই নদীর সঙ্গে তুলনা করে তুমি বলতে আমাদের প্রেম ঠিক এই নদীটার মতোই শান্ত অথচ গভীর৷ আর তাই প্রতিদিন অন্য কোথাও নয়, এই নদীর কাছেই আমরা ছুটে আসতাম। আজও একই ভাবে নদীর জল আর আকাশকে রক্তিম আভায় মাতিয়ে সূর্য অস্ত যাচ্ছে। কিন্তু আজ এইখানে এই নদী পাড়ে আমি একাই তার প্রত্যক্ষদর্শী।

আমার দীর্ঘ জীবনে তোমার উপস্থিতি যে এত সংক্ষিপ্ত হবে সেদিন তা বুঝিনি। অল্পদিনের মধ্যেই গোটা গ্রামে ছড়িয়ে পড়ল আমাদের সম্পর্কের কথা। সদ্য আধুনিকতার হালকা ছোঁয়া লাগা গ্রামের রক্ষণশীল পরিবার তখনও বাড়ির মেয়ের এমন উন্মুক্ত প্রেম মেনে নিতে অভ্যস্ত ছিল না, তাও আবার নীচবর্ণের কোনও ছেলের সঙ্গে। ফলত আমাদের পরবর্তী গল্পটা খুবই সাধারণ এবং সহজেই অনুমানযোগ্য।

বাবা, কাকারা তাড়াহুড়ো করে পাত্র জোগাড় করে আমাকে গ্রাম থেকে অনেক দূরে পাঠিয়ে দিলেন প্রায় নির্বাসনে। শুনলাম পাত্র আমার থেকে বয়সে অনেকটাই বড়ো। কিন্তু বড়ো ছোটো যাইহোক, তা নিয়ে আমার তখন মাথা ব্যথা ছিল না। আমার তখন একটাই চিন্তা, তোমাকে ছেড়ে যেতে হবে। প্রতিবাদ যে করিনি তা নয়, কিন্তু আমাদের দেশের হাজার হাজার মেয়ের এমন শত প্ৰতিবাদ বন্ধ ঘরের দরজায় নীরবে মাথা ঠুকে মরে। তুমিই বা সেদিন আর সাহস করে সকলের সামনে আমার হাত ধরতে পারলে কই? কারণটা অবশ্য আমার অজানা ছিল না।

তুমিই বলেছিলে, তোমার মা আমার ছবি দেখে এক কথায় না করে দিয়েছিল। শুনে আমি একটা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিলাম। কারণ বুঝেছিলাম তোমার মায়ের আচরণ খুব একটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। সরকারি চাকরি করা শহুরে আধুনিক ছেলের জন্য গ্রামের আটপৌরে কালো মেয়ে কোন মা পছন্দ করবেন? বাড়ির অমতে বিয়ে করার সাহস সেদিন তোমার ছিল না। তোমাকে দোষ দিই না। আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে এই গল্পটা খুবই সাধারণ ছিল। ভারতবর্ষের কত সহস্র ঘরের দেয়ালে আমাদের এই গল্পটাই গাঁথা আছে। কষ্ট পেয়েছিলাম, ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম তোমাকে ছাড়া হয়তো বাঁচতেই পারব না। কিন্তু জানো তো, ভুল ভেবেছিলাম। এই তো এক দুটো নয়, রীতিমতো চল্লিশটা বছর পেরিয়ে গেল। দিব্যি বেঁচে আছি, ভালোই আছি।

আসলে এই পৃথিবীতে জল, হাওয়া ছাড়া বেঁচে থাকার জন্য কেউই বোধহয় অপরিহার্য নয়। এ এক নির্মম সত্য। তবে আমার মতো তুমিও যে সেদিন কষ্ট পেয়েছিলে তা আমি জানি। তাই তো আমার বিয়ের দিন রাতে সকলের অলক্ষ্যে যখন তুমি এসে দাঁড়িয়েছিলে, তখন তোমার চোখের জলে সেই কষ্টের প্রতিবিম্ব আমি দেখেছিলাম। তুমি শেষবারের মতো কথা বলতে চাইলেও আমি আর কথা বলিনি। না, তোমার উপর রাগ করে নয়। আসলে আর মায়া বাড়াতে চাইনি। ভাগ্যের হাতে একবার যখন নিজেকে সঁপেই দিয়েছি তখন আর পিছনে তাকিয়ে কী লাভ? আমাদের সকলের প্রিয় রবি ঠাকুরের ভাষায়, ‘অধিকার ছাড়িয়া দিয়া অধিকার ধরিয়া রাখার মতো বিড়ম্বনা আর হয় না।’

তবে ভাগ্যদেবতা আমার উপর একেবারেই যে অপ্রসন্ন ছিলেন তা বলা যাবে না। আমার স্বামী এবং শ্বশুরবাড়ির সকলেই খুবই ভালো মানুষ ছিলেন। আমাকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার সমস্তরকম চেষ্টা এবং ব্যবস্থা আমার স্বামীই করেন। আমিও যে চাকরি করতে পারি, নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে স্বাবলম্বী হতে পারি, সেই ভাবনাও আমার মধ্যে আমার স্বামী তৈরি করেছিলেন। আমার গায়ের রং নিয়েও তাঁর বা তাঁর বাড়ির কারওরই খুব একটা মাথাব্যথা ছিল না। প্রথম থেকেই মানুষটার প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা ছিল। তবে খুব সহজে তাকে আমি ভালোবাসতে পারিনি। কারণ আমার মন জুড়ে যে তখন শুধুই তুমি ছিলে। কিন্তু মিথ্যা বলব না, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমার স্বামী নিজের অফুরন্ত ভালোবাসা দিয়ে আমার মনে তার জায়গা তৈরি করে নিয়েছিলেন। আর এখানেই হয়তো আমাদের দেশের হাজার হাজার মেয়ের থেকে আমার গল্পটা আলাদা হয়ে গেল।

(ক্রমশ…)

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব