বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক

পাশ্চাত্য দেশের তুলনায় ভারতীয় সংস্কার আজও অনেকটাই ভিন্ন, বিশেষকরে প্রেমের ক্ষেত্রে। আমাদের দেশে বিবাহিত নারী কিংবা পুরুষ অন্য কারওর প্রেমে পড়লে কিংবা শারীরিক, মানসিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লে, সমাজ সেই সম্পর্ককে ‘অবৈধ’ আখ্যা দেয়। আর যে বিবাহিত পুরুষ কিংবা নারী অন্য কারওর সঙ্গে সম্পর্কে লিপ্ত হন, তার বিবাহিত জীবনসঙ্গী সেই সম্পর্ককে মেনে তো নিতে পারেনই না, পাশাপাশি, নিরাপত্তাহীনতার কারণে ওই নতুন সম্পর্ককে ‘অপরাধ’ আখ্যা দিয়ে থাকেন। আমাদের দেশের নাগরিকদের এই মানসিকতা সঠিক নাকি বেঠিক, তা হয়তো বিতর্কের বিষয় কিন্তু এই মানসিকতা কিংবা ‘সংস্কৃতি’-র কারণে অহরহ ঘটে চলেছে অপরাধ মূলক ঘটনা।

দাম্পত্য সম্পর্কের বাইরে অন্য কোনও সম্পর্ক তৈরি হলে তা যদি জানাজানি হয়ে যায়, তাহলেই বিপদের ঘণ্টা বাজতে শুরু হয়ে যায়। কারণ, বিবাহিত সঙ্গী ওই ‘অবৈধ’ সম্পর্কের বিষয়টি জেনে যাওয়ার পর যদি দাম্পত্য বিরোধ চরমে ওঠে, তাহলে যিনি তার বিবাহিত জীবনসঙ্গীর নতুন সম্পর্ক মেনে নিতে পারছেন না, তাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালান। অবশ্য শুধু মেরে ফেলার চেষ্টা চলে না, অনেক সময় মেরেও ফেলা হয়।

তবে, রাগ, ক্রোধ কিংবা ভয়ে যাকে সরিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে নতুন সঙ্গীকে নিয়ে সুখে-শান্তিতে জীবনযাপন করার কথা যারা ভেবে থাকেন, তাদের সেই ভাবনা ভুল প্রমাণিত হয় কিছুদিন পর। কারণ, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অপরাধ ঘটানোর পর ধরা পড়ে যান ‘অপরাধী’ প্রেমিক-প্রেমিকারা। এর ফলে, যা হবার তাই হয়। দাম্পত্য জীবন যেমন শেষ হয়ে যায়, ঠিক তেমনই নতুন সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার পরিবর্তে, কাটাতে হয় জেলবন্দি জীবন।

আসলে, দাম্পত্য সম্পর্কের বাইরে যে সম্পর্ক তৈরি হয়, সেই সম্পর্ককে ভারতীয় সংস্কৃতিতে টিকিয়ে রাখা খুবই মুশকিল। কারণ, এখানে স্বামী কিংবা স্ত্রী উদার মনোভাব দেখাতে পারেন না এই ‘এক্সট্রা’ সম্পর্কের ক্ষেত্রে। তাই শুরু হয়, বাদানুবাদ এবং অনেক সময় তা জীবনহানি পর্যন্ত গড়িয়ে যায়। এমন বহু ঘটনা সামনে আসে বারবার। কিছু ক্ষেত্রে তো এই ‘এক্সট্রা ম্যারিটাল অ্যাফেয়ার্স”-এর কারণে এমন সব নৃশংস ঘটনা ঘটে যায়, যা স্মরণীয় হয়ে রয়ে যায় আমাদের সমাজে। এই যেমন দিল্লিতে ১৯৭৩ সালে ঘটে যাওয়া এক ঘটনা যা আজও স্মরণীয় হয়ে আছে।

এক আই-সার্জন বিবাহ বহির্ভূত প্রেমে পড়ার পর ‘পথের কাঁটা’ সরিয়ে দেন। অর্থাৎ, তার নতুন প্রেমের বিষয়টি স্ত্রী জেনে যাওয়ার পর, স্ত্রী-কে ভাড়াটে খুনি দিয়ে চোদ্দোবার ছুরিকাঘাত করে হত্যা করিয়েছিলেন। তবে, স্ত্রী-কে খুন করিয়ে রেহাই পাননি ওই আই-সার্জন। তিনি এবং তার প্রেমিকা দুজনকেই দীর্ঘদিন জেলবন্দি থাকতে হয়েছে। অতএব, এটা প্রমাণিত যে, বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক তৈরি হলে, ঘরে-বাইরে ভারসাম্য বজায় রাখতে না পারলে, ভরাডুবি অনিবার্য।

ইতিহাসের গন্ধমাখা হো চি মিন সিটি (পর্ব-০২)

সাইগনের ইতিহাস যেন এক রোলার কোস্টার রাইড। কখনও ফরাসি, কখনও জাপানি, আবার কখনও আমেরিকানদের দখলে! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, ফরাসিদের হাত থেকে শহরটি কেড়ে নেয় জাপান। কিন্তু সে দখলও বেশিদিন টিকল না। যুদ্ধের শেষে জাপান হেরে যেতেই ফরাসিরা আবার এসে সাইগনের মালিকানা দাবি করে বসল!

তবে স্বাধীনতার স্বপ্ন চিরদিন দমিয়ে রাখা যায় না। ১৯৫৪ সালে, প্রথম ইন্দো-চিন যুদ্ধের পর ভিয়েতনাম অবশেষে ফরাসিদের হাত থেকে মুক্তি পেল। কিন্তু এখানেই গল্পের শেষ নয়! জেনেভা চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, দেশটিকে দু-ভাগ করা হলো— উত্তর ভিয়েতনাম ও দক্ষিণ ভিয়েতনাম। উত্তর অংশটি হো চি মিনের নেতৃত্বে কমিউনিস্ট শাসনে গেল। আর দক্ষিণ অংশটি আমেরিকার সমর্থন পাওয়া অ্যান্টি-কমিউনিস্ট সরকার দ্বারা শাসিত হল।

তবে এই বিভাজন শুধু সাময়িক ছিল। ১৯৫৬ সালে ভোটের মাধ্যমে দেশ একত্রিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দক্ষিণ ভিয়েতনাম ভোট দিতে রাজি হল না। তারপরই শুরু হল ইতিহাসের এক ভয়ংকর অধ্যায়— ভিয়েতনাম যুদ্ধ! বছরের পর বছর যুদ্ধের ধ্বংসলীলা চলল, রক্ত ঝরল, মানুষ ঘরছাড়া হল। শেষে ১৯৭৫ সালে উত্তর ভিয়েতনাম বিজয়ী হল। দেশ আবার একত্রিত হল। আর সাইগন পেল নতুন নাম— হো চি মিন সিটি! তবে হো চি মিন তার জীবদ্দশায় এই স্বাধীন অবিভক্ত ভিয়েতনাম দেখে যেতে পারলেন না!

এসব ভাবতে ভাবতেই কখন হোটেলে পৌঁছে গেছি টেরই পেলাম না। কিন্তু এ তো এক নতুন বিপত্তি! ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল ১১টা, আর হোটেলের চেক-ইন টাইম দুপুর ২টো! বিদেশি পর্যটকদের জন্য হোটেল চেক-ইনে সাধারণত খুব একটা কড়াকড়ি ব্যবস্থা থাকে না। কিন্তু এই হোটেলের রিসেপশনিস্ট একগাল হেসে জানিয়ে দিল— দুটোর আগে সম্ভব না, পরে আসুন।

আমাদের দুটো বিশাল লাগেজ। ওগুলো নিয়ে ঘুরে বেড়ানো সম্ভব নয়। অনুরোধ করলাম, ‘আপনারা কি লাগেজগুলো ভিতরে রাখার ব্যবস্থা করতে পারবেন?”

মেয়েটি আধা ইংরেজি, আধা ভিয়েতনামিজ ভাষায় উত্তর দিল, “ঠিক আছে, এখানেই রেখে যান।’

আশপাশে লোকজনের ভিড়। লাগেজগুলো এখানে এভাবে রেখে যাওয়াটা ঠিক হবে কি না ভেবে একটু অস্বস্তি হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত অনেক অনুনয়-বিনয় করে আমাদের লাগেজগুলো ভিতরে রাখার ব্যবস্থা হল।

এখন হাতে প্রায় তিন ঘণ্টা সময়। হোটেলের সামনেই চোখে পড়ল একটা বড়ো শপিং মল আর তার সঙ্গে লাগোয়া ফুড কোর্ট। হোটেলের নরম বিছানায় শরীর এলিয়ে দেওয়ার স্বপ্ন মনের ভিতর পুষে রেখে ঢুকলাম ফুড কোর্টে। খাবারের বিশাল সমারোহ দেখে ক্লান্তি নিমেষে উধাও! একটা প্লেটে করে প্রথমে এল কাঁচা মাছ, চিংড়ি, মাশরুম আর নানা ধরনের সবজি। তারপর এল গ্যাস বার্নার আর একটা কড়াই! একজন মেয়েও হাজির হল আমাদের টেবিলে, শুরু করল রান্না।

এ তো দেখি টেবিল-সাইড লাইভ কুকিং শো! এখানে রান্নায় কোনও মশলা ব্যবহার করা হয় না, শুধু নানা ধরনের সস দেওয়া হয়। আমি যেহেতু ঝাল খাবার একদম পছন্দ করি না, তাই এই খাবারের ধরন দারুণ লাগল!

খাওয়া শেষে অবশেষে হোটেলে ফিরে রুমের দরজা খুলতেই যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম! বারো তলার উপরে ঘর, সঙ্গে একটা বড়ো বারান্দা। এখান থেকে শহরের অনেকটা অংশ দেখা যাচ্ছে! আমরা বেশি সময় নষ্ট না করে একটু ফ্রেশ হয়ে আবার বেরিয়ে পড়লাম হো চি মিন সিটি ঘুরে দেখার জন্য!

আমাদের হোটেল থেকে হাঁটা পথেই হো চি মিন সিটির বিখ্যাত নটর ডেম ক্যাথেড্রাল ব্যাসিলিকা — ইউরোপের গথিক স্থাপত্যের রাজকীয় এক নমুনা! ১৮৮০ সালে ফরাসিরা লাল ইট, টাইলস আর স্টেইন্ড গ্লাস সব আমদানি করে এনেছিল ফ্রান্স থেকে। এ যেন কলোনিয়াল আভিজাত্যের এক স্থাপত্যগত উচ্চকিত ঘোষণা! ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় কিছুটা ক্ষতি হলেও, এখনও স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে আছে। ভিতরে কুমারী মেরি-র এক প্রশান্ত মূর্তি, যাকে রেজিনা প্যাচিস (শান্তির রানি) বলা হয়। ১৯৬২ সালে পোপ জন (২৩-তম) একে ব্যাসিলিকার মর্যাদা দেন। নিয়তির কী পরিহাস! যে শহরের একদিকে গোলা-বারুদের ঝনঝনানি, অন্যদিকে সে শহরেই দাঁড়িয়ে আছেন শান্তির রানি!

নটর ডেম ক্যাথেড্রালের পাশেই সাইগন সেন্ট্রাল পোস্ট অফিস। তবে নাম শুনেই ভুল করবেন না, এটা কোনও সাধারণ পোস্ট অফিস নয়! ফরাসি স্থপতি আলফ্রেড ফোলহু ১৮৯১ সালে এমন ভাবে ডিজাইন করেছিলেন, যেন ভবিষ্যতের মানুষ দাঁড়িয়ে বলবে, চিঠি পাঠানোর জায়গা যদি এমন হয়, তাহলে ইমেইল আসার দরকারটাই বা কী?

গথিক, রেনেসাঁ আর ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের এক দুর্দান্ত মিশ্রণ! ভিতরে ঢুকতেই হো চি মিনের বিশাল প্রতিকৃতি। ভিয়েতনামের স্বাধীনতা আন্দোলনের মহানায়ক, যাঁর নামেই এখন এই শহরের নাম। কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকলাম, ইতিহাসের সামনে বিনম্র হওয়ার এটাই তো নিয়ম!

পোস্ট অফিস থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎই পা চলে গেল হো চি মিন সিটি বুক স্ট্রিটে। ব্যস্ত শহরের মধ্যে যেন এক আশ্চর্য নিরিবিলি জায়গা! গাড়ির শব্দ নেই, হর্নের বিরক্তি নেই। শুধু ছায়াঘেরা রাস্তার পাশে সারি সারি বইয়ের দোকান, কফির স্টল, আর পাঠকের ব্যস্ততা! বইপ্রেমীদের জন্য এক স্বর্গোদ্যান!

ইতিহাসের গন্ধমাখা হো চি মিন সিটি (পর্ব-০১)

পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো টেলিভিশনের পর্দায় যুদ্ধের ভয়াবহতা সরাসরি দেখেছিল মানুষ— সেই যুদ্ধ ছিল ভিয়েতনাম যুদ্ধ। যদিও এটি শুরু হয়েছিল আমার জন্মের অনেক আগে, তবু পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের মতো আমার মনেও এর ভয়াবহতা গভীর ভাবে নাড়া দিয়েছিল। আর সেই যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দু ছিল অতীতের সাইগন, যা আজ ‘হো চি মিন সিটি’ নামে পরিচিত। ২০২৫ সাল ভিয়েতনামের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী।

কে ছিলেন এই হো চি মিন? কেন সাইগন শহরের নাম পরিবর্তন করে তাঁর নামে রাখা হয়েছিল? কীভাবে আমেরিকার মতো শক্তিশালী দেশ ভিয়েতকং সেনাদের কাছে পরাজয় স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর আমাদের অনেকেরই কমবেশি জানা। তবে ইতিহাসের সব দিক তো একরকম হয় না। কয়েক বছর আগে যখন ওয়াশিংটন ডিসিতে ভিয়েতনাম ভেটেরানস মেমোরিয়াল ঘুরে দেখেছিলাম, তখন মনে হয়েছিল—হো চি মিন সিটির ওয়ার মেমোরিয়াল কেমন হবে? তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাধারায় নির্মিত স্মৃতিসৌধ নিশ্চয়ই আমেরিকার স্মৃতিসৌধের থেকে আলাদা হবে। সেই কৌতূহল থেকেই হো চি মিন সিটির উদ্দেশে যাত্রা।

হঠাৎ মনে প্রশ্ন জাগল, আমরা কি শুধু হো চি মিন সিটিতেই যাব? হ্যানয় যাব না? হ্যানয় তো ভিয়েতনামের রাজধানী! সেখানে না গিয়ে শুধু হো চি মিন সিটি থেকেই ফিরে আসব কেন?

মনকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, হ্যানয় তো পৃথিবীর অন্য যে-কোনও শহরের মতোই। সেখানে দেখার মতো বিশেষ কিছু আছে কি? বরং এবার হো চি মিন সিটি ঘুরে দেখি। পরে সুযোগ হলে হ্যানয়েও যাব।

দু’দিন পর নির্দিষ্ট সময়ে প্লেনে উঠলাম। সিডনি থেকে হো চি মিন সিটি পৌঁছাতে লাগবে প্রায় নয় ঘণ্টা। প্লেনে বসে মনে মনে ভাবছি— হো চি মিনের মতো একজন ব্যক্তিত্বকে পুরোপুরি বোঝা কি আদৌ সম্ভব? ইতিহাস তাঁকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করেছে। কেউ নায়ক বানিয়েছে, কেউ খলনায়ক। পশ্চিমী দেশগুলো তো একজোট হয়ে কমিউনিজমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পর্যন্ত করেছে। হো চি মিনকে বারবার বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেছে। কিন্তু তাই বলে কি তাঁর আদর্শকে উপেক্ষা করা যায়?

হো চি মিন, যাঁকে সবাই ভালোবেসে ‘আঙ্কেল হো’ বলত। তাঁর জন্ম ১৮৯০ সালে, একদম সাধারণ এক গ্রামে, এক শিক্ষক পিতার পরিবারে। ছোটোবেলায় তাঁর নাম ছিল নুয়েন সিন কুং। পরে তিনি পড়াশোনা করেন ভিয়েতনামের সবচেয়ে পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান— হু-এর ন্যাশনাল আকাদেমিতে। মজার বিষয় কী জানেন? এই আকাদেমিকে ভিয়েতনামে ‘লিডার তৈরির কারখানা’ বলা হয়! এখান থেকেই দেশের অনেক প্রেসিডেন্ট আর মন্ত্রী বেরিয়েছেন।

ভিয়েতনামের সেই সময়কার ইতিহাস বলতে গেলে রীতিমতো সিনেমার গল্পের মতো শোনায়। ফরাসি উপনিবেশের অধীনে থাকা দেশটা তখন স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখছে, আর সেই স্বপ্নের এক বড়ো অংশ হয়ে উঠলেন হো চি মিন। ১৯১১ সালে চাকরির খোঁজে তিনি পাড়ি জমালেন ফ্রান্সে। তারপর ঘুরে বেড়ালেন আমেরিকা, ব্রিটেনসহ আরও কয়েকটি দেশে। তবে শুধু চাকরি করেই সময় কাটাননি, ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়লেন স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে।

১৯১৯ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ভার্সাই শান্তি সম্মেলন চলাকালীন হো চি মিন ভিয়েতনামের স্বাধীনতার দাবিতে একটি আবেদন জমা দিয়েছিলেন। তিনি ফরাসি সমাজতান্ত্রিক দলে যোগ দেন। পরে ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতাদের একজন হন। এরপর তিনি সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং চিনে বেশ কিছুটা সময় কাটিয়েছিলেন। ১৯৩০ সালে তিনি ইন্দোচিন কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলেন, যাতে ভিয়েতনামের বিভিন্ন বিপ্লবী দল এক হয়ে উপনিবেশবাদীদের বিরুদ্ধে লড়তে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি দেশে ফিরে এসে ‘ভিয়েত মিন’ প্রতিষ্ঠা করেন, যেটি ছিল ভিয়েতনামের স্বাধীনতা আন্দোলনের মূল সংগঠন। তখন থেকেই তিনি ‘হো চি মিন’ ছদ্মনাম গ্রহণ করেন, যার অর্থ “আলো নিয়ে আসা’।

এইসব গল্পে এতই ডুবে গিয়েছিলাম যে, সময় কখন কেটে গেল টেরই পেলাম না। হঠাৎ পাইলটের ঘোষণা কানে এল— আমরা পৌঁছে গেছি তান সন নাহাত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে! ভিয়েতনামের সবচেয়ে বড়ো এবং ব্যস্ত বিমানবন্দর এটি। আমাদের হোটেল বুক করা ছিল। ডিস্ট্রিক্ট ১-এ, যা এয়ারপোর্ট থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরে।

এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে প্রথমেই মনে হল— এ যেন একটা সমুদ্র। না না, জনসমুদ্র কথাটা হয়তো বলা ঠিক হবে না। তবে ‘স্কুটি’ সমুদ্র বললে হয়তো অতিরঞ্জিত কিছু হবে না। যত দূর চোখ যায়, শুধু স্কুটার আর স্কুটার। মনে হচ্ছিল, পুরো শহর যেন স্কুটারের চাকায় ভর করে চলছে! এটাই যেন হো চি মিন সিটির সৌন্দর্যকে একটা আলাদা মাত্রা দিয়েছে।

এই শহরের ইতিহাসও কম রঙিন নয়। তিনশো বছর আগে পর্যন্ত এটি ছিল কম্বোডিয়ার খমের সাম্রাজ্যের অধীন এক ছোট্ট মাছ ধরার গ্রাম, যার নাম ছিল ‘প্রেই নোকর’। ১৬৯৮ সালে নুয়েন রাজবংশের শাসকরা এখানে বাণিজ্যকেন্দ্র স্থাপন করেন এবং নতুন নাম দিলেন “গিয়া ডিন’।

তারপর এল ফরাসিরা। ১৮৫৯ সালে তারা গিয়া ডিন দখল করে নাম দিল ‘সাইগন’। এরপর, ১৮৬২ সালে এটিকে কোচিন চিনের (দক্ষিণ ভিয়েতনাম) রাজধানী ঘোষণা করা হয়। ফরাসিরা তখন সাইগনকে ‘পূর্বের প্যারিস’ বানানোর স্বপ্ন দেখছে! কোটি কোটি টাকা ঢেলে নতুন ভবন, প্রশস্ত রাস্তা, অপেরা হাউস, ক্যাথেড্রাল— সবই তৈরি করল ইউরোপীয় ধাঁচে। আর সেই থেকেই সাইগনের আধুনিকতার যাত্রা শুরু।

আপনার সন্তানের চাই ভালো বন্ধু

শিপ্রা সদ্য তিন্নিকে প্লে-স্কুলে ভর্তি করেছে। ও একটু চুপচাপ। তাই শিপ্রা আর অচিন্ত্য দু’জনে মিলে ঠিক করেছিল, তাড়াতাড়ি মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করে দিলে কিছু বন্ধুবান্ধব হবে। ফলে মেয়ে সকলের সঙ্গে মিশতেও শিখবে এবং মুখেও বুলি ফুটবে। এই একই মানসিকতা নিয়ে বর্ণালিও একবছর আগে মেয়ে রিমাকে প্লে-স্কুলে ভর্তি করেছিল। স্কুলে এই একবছরে রিমার বন্ধুর সংখ্যা বেড়েছে। বাড়িতেও কথা বলছে খুব। এছাড়া বন্ধুবান্ধবদের জন্মদিনের পার্টিও খুব এনজয় করছে।

আসলে, বাচ্চা খুব মিশুকে না হলে, সহজে কারও সঙ্গে কথা বলতে চায় না। বন্ধু তৈরি হয় না। একা একা সবসময় নিজের সঙ্গেই থাকা আর সঙ্গী বলতে শুধু বাড়ির কয়েকজন। এর ফলে বাচ্চার পার্সোনাল ডেভেলপমেন্ট ঠিকমতো হয় না। আবার অনেক সময় বন্ধু নির্বাচনেও অনেকে ভুলভ্রান্তি করে ফেলে। সুতরাং উভয় ক্ষেত্রেই প্রয়োজন অভিভাবকদের গাইডেন্স-এর। নানারকম ভাবে একটা বাচ্চাকে গাইড করা যেতে পারে।

অনুভূতি

এখনকার মাইক্রো ফ্যামিলিতে প্রত্যেক বাচ্চার মধ্যেই একটা নেগেটিভ, স্বার্থপরতাপ্রবণ ইচ্ছাশক্তি থাকে। ছোটো থাকাকালীন যখন অনেক বাচ্চা একসঙ্গে খেলা করে অথবা বাইরের কোনও বাচ্চা নিজের মা-বাবার সঙ্গে অন্য একটি বাচ্চার বাড়িতে বেড়াতে আসে, তখন নিজের খেলনা অথবা প্রিয় জিনিস অপর কারও সঙ্গে ভাগ না করে নেওয়ার প্রবণতা বাচ্চাদের মধ্যে দেখা যায়। এই সিচুয়েশনে মা-বাবার উচিত বাচ্চাকে বকাঝকা না করে নম্রস্বরে তাকে বোঝানো বন্ধুত্বের প্রকৃত অর্থ কী।

শাসন

শাস্তির পন্থা নিয়ে অতিরিক্ত শাসন করতে গেলে বাচ্চা বিগড়ে বসবে। বাচ্চাদের নেগেটিভ ব্যবহারকে যদি কড়া শাস্তির মাধ্যমে কন্ট্রোল করার চেষ্টা করা হয়, তাহলে বাচ্চার মধ্যে বিরোধিতা করার, জেদ দেখানোর এবং মারমুখী হয়ে ওঠার মনোভাব আরও বেশি প্রবল হবে। যা একেবারেই বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহারের বিপরীত। শাসন ততটুকুই করুন, যাতে ভালোবাসার উষ্ণতা থাকবে। সন্তানকে কাছে বসিয়ে তার বোধগম্য হয় এমন আলোচনা ও উদাহরণের গল্প শুনিয়ে তার মধ্যে চলতে থাকা কনফ্লিক্টগুলোকে আয়ত্তে নিয়ে আসার চেষ্টা করতে হবে। এতে নিঃসন্দেহে বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে সুবিধা হবে।

অভ্যাস

মার্জিত কথাবার্তা চালাবার অভ্যাস বাচ্চাদের মধ্যে রোপন করার দায়িত্ব থেকেও অভিভাবকদের পিছু হটা উচিত নয়। কথা বলার অভ্যাস তৈরি হয় বাড়িতেই। যেখানে বাড়িতে অভিভাবকেরা বাচ্চাদের সঙ্গে কথা বলেন। তাদের সঙ্গে কথার মাধ্যমে অনেক সুবিধা-অসুবিধার কথা শেয়ার করেন। পরবর্তী কালে সেইসব বাচ্চারা দেখা যায় সামাজিক স্তরে অনেক বেশি যোগ্যতা অর্জন করে এবং অপরের সঙ্গে আপস করার ক্ষমতাও তাদের অনেক বেশি হয়। কথা বলার সময় চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলা, মুখে অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তোলা, অন্যেরা যখন কথা বলছে তার দিকে তাকিয়ে থেকে সম্পূর্ণ অ্যাটেনশন দেওয়া, উপযুক্ত উত্তর দেওয়ার অভ্যাসও বাচ্চাকে তার বন্ধুদের কাছে প্রিয় করে তুলতে সাহায্য করে।

প্রথম প্রথম বাচ্চারা যখন বন্ধুত্ব গড়ে তোলার চেষ্টায় রয়েছে, তখন তাদের মধ্যে তুলনামূলক কোনও খেলা খেলবার চেষ্টা থেকে বিরত হওয়া উচিত। এছাড়াও এমন কোনও সিচুয়েশন তৈরি করা উচিত নয়, যেখানে অপর বাচ্চার সঙ্গে দ্বন্দ্বের মনোভাব তৈরি হবে অথবা প্রয়োজনে অপরের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়াতে বাচ্চা দ্বিধা করবে।

বাচ্চা স্কুল যেতে শুরু করলে বাড়ি থেকে অনেক মা-বাবাই শিখিয়ে পড়িয়ে বাচ্চাদের স্কুলে পাঠান, যাতে অন্যান্য সহপাঠীদের সঙ্গে মিশতে তাদের অসুবিধা না হয়। যেমন সহপাঠীদের সঙ্গে মেশার আগে একটু লক্ষ্য রাখা যে, তারা কী করছে অথবা কী ধরনের খেলায় তারা বেশি ব্যস্ত থাকে। নিজেকে কী ভাবে ওই দলে ফিট করাবে। সহপাঠীদের সঙ্গে খেলার জন্যে তাকে ওইরকমই সংগত আচরণ করতে হবে। চোর-পুলিশের খেলায় যেমন চোর হয়ে খেলায় ঢোকার চেষ্টা চালানো। সবার খেলার মাঝে খেলা ভণ্ডুল করে দেবার প্রচেষ্টা করা উচিত নয় বা খেলা বদলে দেওয়ার আবদার করাও উচিত হবে না— এতে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠায় ব্যাঘাত ঘটতে পারে।

অভিভাবকদের খেয়াল রাখা উচিত, কী ধরনের বাচ্চাদের সঙ্গে নিজেদের সন্তান মেলামেশা বেশি করছে। কারণ যেসব বাচ্চার বন্ধুরা খুব বেশি অ্যাগ্রেসিভ হয়, পরবর্তী সময়ে সেই বাচ্চাদের মধ্যে ব্যবহারে অসামঞ্জস্যতা লক্ষ্য করা যায়। আর এই সমস্যার কারণে বন্ধুরা অনেক সময় তাদের অ্যাভয়েড করার চেষ্টা করে। সন্তানের শৈশবে অভিভাবকের তদারকির প্রয়োজন আছে। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা করে তাকে একলা ছাড়া উচিত, যাতে নিজের অসুবিধাগুলোর সুরাহা সে নিজেই করে নিতে পারে। এতে কনফিডেন্স লেভেল বাড়ে। দুর্বল বাচ্চাদের পীড়ন (বুলি) করা অনুচিত, এটা বাচ্চাকে বুঝিয়ে বলা দরকার।

তবে এত কিছুর পরেও নিয়ম মেনে বন্ধু হয় না। দেখা যায় সম্পূর্ণ বিপরীত চরিত্রের দুটি শিশুর মধ্যেই গড়ে ওঠে প্রগাঢ় বন্ধুত্ব। বাচ্চার মধ্যে অপরকে সাহায্য করার মানসিকতা, দয়া, মায়া, আনুগত্যের গুণগুলিই অন্য বাচ্চাকে তার প্রতি আকর্ষণ করে। কেউ বা ব্যবহারে আকৃষ্ট হয়ে বন্ধুত্বের হাত বাড়ায়, আবার কাউকে আকৃষ্ট করে অ্যাকাডেমিক সাফল্য। কেউ কেউ আবার এসবের পরোয়া করে না। কিন্তু অপরের খেলাধুলো অথবা এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজ-এর কারণে, অন্য বাচ্চাটি আকৃষ্ট করে। বন্ধুত্বের হাতেখড়ি সেখানেই। তাই বন্ধুত্ব গড়ে তোলার কোনও বিধি-বিধান নেই। আছে শুধু সাবলীল ভাবে ভালোবাসার তাগিদ। তাও অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার দরকার আছে। কারণ, সন্তানকে হাত ধরে কিছুটা পথ পার করে দেওয়ার দায়িত্ব তো অভিভাবকদের নিতেই হবে।

মানসিক অবসাদ বাড়ছে

একাকিত্ব এবং অবসাদ— এই দুটো শব্দ এখন কানে আসে বারবার। আমরা যত ছোটো পরিবারে বিভক্ত হচ্ছি, সোশ্যাল মাধ্যমে যত বেশি সময় ব্যয় করছি, একাকিত্ব এবং অবসাদ যেন ততই বাড়ছে। আমরা ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হচ্ছি পরস্পরের থেকে। আলগা হচ্ছে অন্তরের বন্ধন।

সম্প্রতি উত্তর প্রদেশের একটি ঘটনা ভাবিয়ে তুলেছে মনস্তাত্ত্বিকদের। বিবাহ বিচ্ছেদের পর এক মহিলা তার মায়ের বাড়িতে থাকতে শুরু করেছিলেন এবং একাকিত্ব কাটানোর জন্য তিনি একটি বিড়াল পুষেছিলেন। আর সেই বিড়ালটি যখন রোগভোগে মারা যায়, তখন সেই মৃত বিড়ালটিকে আঁকড়ে ধরে তিনদিন কাটিয়ে দেন ওই মহিলা। জানা যায়, ওই মহিলার বিশ্বাস ছিল, বিড়ালের প্রতি তার ভালোবাসায় সন্তুষ্ট হয়ে ভগবান ওই বিড়ালটির জীবন ফিরিয়ে দেবেন। কিন্তু তিনদিন অপেক্ষার পরও যখন মৃত বিড়াল বেঁচে উঠল না, তখন দুঃখে, শোকে আত্মহত্যা করলেন ওই মহিলা।

এমন অনেক মর্মান্তিক ঘটনা বারবারই উঠে আসে খবরের শিরোনামে এবং একাকিত্ব কতটা গ্রাস করছে কিছু মানুষকে, তার প্রমাণ আমরা পাচ্ছি বারেবারে। আসলে এই ধরনের একাকিত্ব কিংবা মানসিক অবসাদের শিকড় লুকিয়ে আছে অনেক গভীরে। যারা একাকিত্বে ভুগে মানসিক অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েন কিংবা মৃত্যুবরণ করেন, তাদের ভিতটা খুব দুর্বল থাকে। আর এই ভিত দুর্বল থাকার জন্য অভিভাবক এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও দায়ী থাকেন অনেকটাই। কারণ, সন্তানকে ছোটো থেকে যে সুশিক্ষা দিতে হয় কিংবা ভালোবাসা দিয়ে মনের জোর বাড়াতে হয়, তার যদি ঘাটতি থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে একাকিত্ব, অবসাদ এইসব গ্রাস করতে বাধ্য।

তবে শুধু শুধু বাস্তব বিষয় তুলে ধরলেই সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান হবে না, একাকিত্ব এবং অবসাদ দূর করতে হলে আরও অনেক বিষয়ে সতর্ক থেকে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে। যেমন, সন্তান কী করছে, কাদের সঙ্গে মেলামেশা করছে— এইসব বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে মা-বাবাকে৷ সন্তান যদি ভুল করে, তা শুধরে দিতে হবে অভিভাবককেই।

এছাড়া, কারও উপর কিংবা কোনও কিছুর উপর অতি নির্ভরতা যে ক্ষতিকারক, তা ছোটো থেকেই শান্ত মাথায় বুঝিয়ে দিতে হবে সন্তানকে। এই যেমন বিবাহিত জীবনে স্বামী কিংবা সন্তানের উপর অতিনির্ভর না থেকে, হতে হবে আত্মনির্ভর। এর জন্য উপযুক্ত শিক্ষা যেমন অর্জন করতে হবে, ঠিক তেমনই আর্থিক ভাবে স্বনির্ভর হওয়াও জরুরি। সেইসঙ্গে, ভার্চুয়াল দুনিয়ার নেশা থেকে কিছুটা নিজেকে সরিয়ে রেখে, আপনজনকে আরও বেশি সময় দিন। আর ভালো থাকার জন্য নিজেকে কর্মব্যস্ত রাখুন সর্বদা।

খুশকির সমস্যা এবং সমাধানের উপায়

বেশ কিছুদিন ধরে খুশকির সমস্যায় ভুগছি। অনেকরকম অ্যান্টি ড্যানড্রাফ শ্যাম্পু ব্যবহার করে দেখেছি কিন্তু উপকার হয়নি। এছাড়াও খুশকির জন্য মাথার স্ক্যাল্পে চুলকানিও হয়। এই সমস্যার কী সমাধান?

সাধারণত ড্রাই এবং অয়েলি দুরকমের চুলেই খুশকির সমস্যা দেখা দেয়। ঠিক সময়মতো যদি খুশকি কন্ট্রোল করা না হয়, তাহলে ত্বকে খুশকি ঝরে পড়লে সংক্রমণ ছড়াবার ভয় থেকে যায়। এছাড়াও চুলের গোড়া দুর্বল হয়ে পড়ে। এসবই কারণ হল অকালে চুল ঝরে পড়ার। সুতরাং সময় থাকতে খুশকির চিকিৎসা করানো খুব দরকার। এর জন্য সপ্তাহে অন্তত ৩বার চুলে শ্যাম্পু করুন এবং খুব বেশি গরমজলে চুল ধোবেন না, ঈষদুষ্ণ জল ব্যবহার করুন।

খুশকির সংক্রমণ থেকে বাঁচবার জন্য নিজের চিরুনি, তোয়ালে, বালিশ আলাদা রাখুন এবং বিশেষ যত্ন নিয়ে এগুলি পরিষ্কার করুন। চুল যখনই ধোবেন তখনই আগে থেকে চিরুনি, তোয়ালে এবং বালিশের ঢাকা ভালো অ্যান্টিসেপ্টিক লিকুইডে আধঘন্টা ভিজিয়ে রেখে ভালো করে রোদে শুকিয়ে তারপরেই ব্যবহার করুন।

চুল যদি তৈলাক্ত হয় তাহলে ১ চামচ ত্রিফলা পাউডার ১ গেলাস জলে দিয়ে ভালো করে ফুটিয়ে নিন। ঠান্ডা হয়ে গেলে ছেঁকে নিয়ে এর সঙ্গে ২ বড়ো চামচ ভিনিগার মিশিয়ে নিন। রাত্রে এই মিশ্রণটি দিয়ে সারা চুলে ও স্ক্যাল্পে মাসাজ করুন। সকালবেলা ভালো করে চুলে শ্যাম্পু করে নিন। সপ্তাহে ৩-৪ দিন এটি ব্যবহার করে দেখতে পারেন।

এই প্রক্রিয়াগুলি ট্রাই করা সত্ত্বেও যদি সমস্যা থেকে যায় তাহলে ভালো কসমেটিক ক্লিনিকে গিয়ে ওজোন ট্রিটমেন্ট বা বায়োপট্রন-এর সিটিং নিতে পারেন। এতে খুশকি কন্ট্রোল হবেই উপরন্তু চুল পড়ার সমস্যাও নিয়ন্ত্রণ হবে।

ত্বকে ইনস্ট্যান্ট গ্লো আনার জন্য পিল অফ মাস্ক কতটা কার্যকরী? আমি কি এটি মধুচন্দ্রিমা যাপনের সময় ব্যবহার করতে পারব? এছাড়াও আমার ত্বক খুবই স্পর্শকাতর। ওয়্যাক্সিং করার পরই ত্বকে লাল লাল ছোপ পড়ে যায়। অথচ আমি অবাঞ্ছিত রোম থেকেও মুক্তি পেতে চাই। তাহলে আমার কী করা উচিত?

­­পিল অফ মাস্ক ত্বকের যৌবন ধরে রাখতে সাহায্য করে। ত্বকও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। মুখের কমপ্লেকশন ক্লিন এবং ক্লিয়ার লাগে দেখতে। রোদে বেরোবার ফলে ত্বকের ট্যানিং-এর ক্ষেত্রেও এটি খুব কার্যকরী। এটি লাগালে সহজে ট্যানিং দূর হয়। রুক্ষ শুষ্ক ত্বকে মসৃণতা আনতেও পিল অফ মাস্ক খুবই উপকারী।

ত্বকে লাল দাগ রোধ করতে ওয়্যাক্সিং-এর আগে অ্যান্টি অ্যালার্জিক ওষুধ খেতে পারেন। অবাঞ্ছিত রোম দূর করতে আপনি পালস লাইট ট্রিটমেন্ট-এর সিটিং নিতে পারেন। এটি একটি ইটালিয়ান টেকনোলজি, যেটি কিনা খুব দ্রুত, সুরক্ষিত এবং ব্যথা ছাড়াই অবাঞ্ছিত রোম দূর করে এবং অবশিষ্ট রোম এত পাতলা এবং হালকা রঙের হয়ে যায় যে, সেটা সহজে নজরে পড়ে না।

Happy নিউ ইয়ার

মা হওয়ার পর চাকরি ছেড়ে দেয় দিশা। কিন্তু বাৎসরিক বেতন বৃদ্ধি, পদোন্নতি কিংবা কর্মক্ষেত্রের সম্মানপ্রাপ্তির কথা দিশা এখনও ভুলতে পারেনি। পুষ্পিতার বিষয়টা আবার অন্যরকম। ও কর্মহীন। কিন্তু চায়, সমাজে আকর্ষণের কেন্দ্রে থাকতে। তাই বন্ধুদের নিয়ে সবসময় আনন্দে মেতে থাকে সে। রিয়া আবার খুব ভালো রাঁধুনি। স্বামী-সন্তানকে ভালো খাবার খাওয়াতে পারলেই তার মানসিক শান্তি এবং রান্নার প্রশংসা পেলেই সে ভীষণ খুশি।

আসলে যে-যার মতো আনন্দে থাকতে চায়। তাই, ভালোলাগার বিষয় যাই হোক, উপলক্ষ্য কিন্তু একটাই— আনন্দলাভ। কারণ আমরা মনে-মনেই বাঁচি বেশি। অতএব, জীবনের সমস্ত প্রতিকূল পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠে, মানসিক শান্তি এবং আনন্দলাভের চেষ্টা করতে হবে। কারণ, জীবনকে আরও আনন্দময়, আরও সুন্দর করতে হলে, সংকল্প নিতেই হবে এবং সেই সংকল্পের সূচনা হোক ২০২৬ সালের শুরু থেকেই।

পরিকল্পনা জরুরি

প্রথমে আপনার পরিকল্পনাগুলি নথিভুক্ত করুন। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা সুষ্ঠুভাবে কাজ করতে সাহায্য করবে। আর পরিকল্পনামাফিক উপকরণ এবং সময় বরাদ্দ করুন। কর্মসাফল্য পেতে অর্থের প্রয়োজন হতে পারে, তাই আগে থেকেই মজুত করুন অর্থ। কোনও কাজ নিশ্চিন্তে সম্পূর্ণ করতে হলে, পরিকল্পনামাফিক যথেষ্ট খোঁজখবর নিয়ে কাজ শুরু করা উচিত।

কর্ম প্রাধান্য

ভাগ্য নয়, কর্ম পাক প্রাধান্য। মনে রাখবেন, সফল ব্যক্তি ভাগ্যে বিশ্বাস করেন না, কর্মময় জীবনযাপন করেন। তাই সুযোগ পাওয়ার জন্য বসে থাকবেন না, সুযোগ করে নেবেন। ‘কাল করব’ বলে কাজ ফেলে রাখলে, মহাকাল পার হয়ে গেলেও সে কাজ আর হবে না। অতএব, কাজ শুরু করুন এখনই এবং কঠিন পরিশ্রমের মাধ্যমে অসাধ্য সাধনের চেষ্টা করুন। সাময়িক বাধা এলেও নিরাশ হবেন না, অপেক্ষা করুন, বাধা কাটবেই। কারণ, ঝড় ওঠে, আবার থেমেও যায়। তাই, সাময়িক বাধা অতিক্রম করতে পারলেই জয় সুনিশ্চিত। নতুন বছরের শুরুতে তাই নিজের কাজকে প্রাধান্য দিন।

আত্ম-বিশ্লেষণ

আয়নার সামনে দাঁড়ান। দেখুন নিজেকে। কী কী দোষগুণ আছে তা বিশ্লেষণ করুন। দোষগুলিকে কাটানোর চেষ্টা করুন এবং গুণগুলির কথা ভেবে আত্মবিশ্বাস বাড়ান। প্রয়োজনে অন্যদের (শুভাকাঙ্ক্ষী) থেকে জেনে নেওয়ার চেষ্টা করুন আপনার কী কী দোষগুণ আছে। কারণ, নেগেটিভ পয়েন্টস না কাটালে, পজিটিভ কাজ আটকে যেতে পারে। অতএব, নিজেই নিজের সমালোচনা করুন এবং অন্যের থেকে সমালোচনা শুনে নিজেকে শুধরে নিন।

সামাজিকতা

টেলিভিশন কিংবা কম্পিউটারের সামনে অহেতুক দীর্ঘ সময় ব্যয় না করে, মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করুন। যত মানুষের সঙ্গে মিশবেন, ততই আপনি জ্ঞানবুদ্ধিতে সমৃদ্ধ হবেন, উপকার পাবেন। শুধু তাই নয়, অন্যের গুণগুলি নিতে পারলে আপনি আরও গুণী এবং স্মার্ট হয়ে উঠবেন। মনে রাখবেন, কূপমণ্ডূকরা কল্পনার জগতে বাস করে, কিন্তু সামাজিকতা বাস্তবের মুখোমুখি করে।

গুরুত্বের বিচার

গুরুত্ব অনুযায়ী কাজের তালিকা তৈরি করুন। কারণ, সঠিক গুরুত্ব মানেই সঠিক সাফল্য। এর ফলে বাজে কাজে সময় নষ্ট হবে না। আপনার জীবনের উপযোগী এবং লাভজনক কাজগুলিকে তালিকার শীর্ষে রাখুন। ঠান্ডা মাথায় নিজের কাজের গুরুত্ব নিজেই বিচার করুন।

স্বাস্থ্য সচেতনতা

স্বাস্থ্যই সম্পদ। শরীর-স্বাস্থ্যের যত্ন না নিলে, একসময় সব ধনসম্পদ হারাতে হতে পারে। তাই প্রতিদিন নিয়ম করে। শরীরচর্চা করুন। খাদ্যতালিকায় রাখুন শাক-সবজি এবং ফল। পান করুন পর্যাপ্ত জল। আর ফার্স্ট ফুড থেকে সরিয়ে রাখুন নিজেকে।

পারিবারিক আনন্দ

নিজেকে গুটিয়ে রাখবেন না। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আনন্দে থাকুন সর্বদা। সময় পেলেই আড্ডা-গল্পে মেতে থাকুন। বছরে অন্তত দু’বার বেড়াতে যান পরিবারের সবাইকে নিয়ে। তাই বছরের শুরু থেকেই টাকা জমাতে থাকুন।

আয়-ব্যয়ের হিসাব

একটা খাতা কিংবা ডায়ারি হাতে নিন। প্রথমে আপনার বাৎসরিক আনুমানিক আয়ের পরিমাণ লিখুন। এবার প্রতি মাসের খরচ লিখুন। যেমন সংসার খরচ, সন্তানের শিক্ষাখাতে খরচ, জামাকাপড় কেনার খরচ, ঋণ শোধের ব্যাপার থাকলে তার খরচ (ইএমআই), যাতায়াতের খরচ, অতিথি আপ্যায়নের খরচ, বিমার খরচ, উৎসব-অনুষ্ঠান প্রভৃতির খরচ হিসাব করুন।

এরপর সারা বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব কষে দেখুন আর কত টাকা আপনার হাতে থাকছে। এবার সেই মতো ভবিষ্যৎ সুরক্ষার জন্য টাকা জমান এবং কিছু টাকা রাখুন শখ-আহ্লাদ পূরণের জন্য। নতুন বছরে এটুকু করতে পারলে, আপনি থাকবেন মানসিক চাপমুক্ত এবং জীবনযাপন করতে পারবেন নিশ্চিন্তে।

গ্রুমিং জরুরি

কেরিয়ার কিংবা ব্যাবসা— যেটাই করুন না কেন, পার্সোনাল গ্রুমিং অত্যন্ত জরুরি। নিজের অ্যাটিটিউড ও সৌন্দর্যের ব্যাপারে সচেতন হওয়া উচিত। যা-ই করুন, মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের খেয়াল রাখুন, টেনশন ফ্রি থাকুন, এনার্জেটিক থাকুন।

কর্মকাল দীর্ঘ করার প্রস্তুতি

যারা নিজেরা ব্যাবসা করেন, রিটায়ারমেন্ট-এর ভাবনা তাদের মাথায় স্থান দিলে হবে না। আগের প্রজন্মের বয়ঃজ্যেষ্ঠদের থেকে বুদ্ধি নিন এবং নিজের আধুনিক মনস্কতা ও কারিগরির সহায়তায় তা বাস্তবায়িত করুন। এই ভারসাম্য রাখা অত্যন্ত জরুরি। অসম্ভব ধৈর্য এবং অধ্যবসায় লাগে নিজের ব্যাবসাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে।

দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার বদলে ভাবনা চিন্তা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন। কারণ, সাফল্যের আসল শর্তই হল মনের সন্তুষ্টি। সাফল্য অর্জন করলে মনে যেমন আনন্দ আসে, তেমনই পরিশ্রম করার ইচ্ছাও বাড়ে। আজকাল মেয়েরা যে ব্যাবসাক্ষেত্রে সাফল্য লাভ করেছে, তার অন্যতম কারণ হল তাদের ধৈর্য এবং পরিশ্রম করার মানসিকতা।

সাফল্যের মন্ত্র

সাফল্যের শীর্ষে এসেও যতটা সম্ভব নিরহংকারী জীবনশৈলী অবলম্বন করুন। ফ্যাশন, গয়না, খাওয়াদাওয়া, ভ্রমণ— সবকিছুকেই গুরুত্ব দিন, সম্মান করুন। গান শুনুন, বই পড়ুন, রিল্যাক্সড থাকুন। আর পরিশ্রম করা থেকে কখনও পিছপা হবেন না। এটাই সাফল্যের শেষ কথা।

সম্পর্কের ভারসাম্য

একটা সম্পর্কে ভালোবাসাই কি শেষ কথা? নাকি সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখতে চাই আরও কিছু? আত্মবিশ্লেষণও জরুরি। সব শেষ করার আগে আরও একবার ভেবে দেখুন।

মনে রাখবেন, ভালোবাসা এক অদ্ভুত শক্তি, যার জোরে গোটা পৃথিবী টিকে আছে। সেটা হতে পারে মা-বাবার প্রতি সন্তানের ভালোবাসা, প্রেমিকের প্রতি প্রেমিকার ভালোবাসা, বন্ধুর প্রতি ভালোবাসা, সৃষ্টিকর্তার প্রতি ভালোবাসা প্রভৃতি। ভালোবাসা হলো এক ধরনের আবেগ, যা মনকে আবিষ্ট করে। সেই অনুভূতি সেই মুহূর্তকে ভালো লাগায়, সেই ভালোলাগা মানুষ বার বার পেতে চায়।

আসলে ভালোবাসার সম্পর্কের নির্দিষ্ট কোনও নাম নেই। এটির ব্যাপ্তি বিশাল। আপনি যে-নামের সঙ্গেই একে জুড়ে দেবেন, তাকেই সে পূর্ণতা দেবে। তবে ভালোবাসার ক্ষেত্রে সম্পর্কের এই জাদুর কাঠি, সবচেয়ে বেশি কার্যকর নারী ও পুরুষের প্রেমের মধ্যে।

শুধু জানা দরকার, ব্যালেন্সড রিলেশনশিপ রাখা যাবে কীভাবে? কারণ, ভালোবাসার মূল কথা বোঝানো সম্ভব নয়। ছোটো ছোটো অনুভূতিমালা ঘিরেই তৈরি হয় ভালোবাসা। কারও জন্য অপেক্ষা, কারও হাত শক্ত করে ধরে থাকা, ছায়াসঙ্গীর মতো থাকতে পারা, এমনকী খাবার ভাগ করে খাওয়া— সবই তো ভালোবাসা।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল— ভালোলাগা থেকেই একটি সম্পর্কের শুরু, যার রেশ টেনে তৈরি হয় ভালোবাসা। এর চূড়ান্ত প্রাপ্তি ভালোবাসার মানুষটিকে বিয়ে করে একসঙ্গে সংসার পাতা। কেউ কেউ মনে করেন, বৈবাহিক সম্পর্কে আচরণে পরিবর্তন আসে। অনেক বদভ্যাসও দূর হয়। এমনকী মাদকাসক্তরাও আসক্তি-মুক্ত হতে পারে ভালোবাসার স্পর্শ পেয়ে। বিবাহের সম্পর্ক দায়িত্ববোধ তৈরি করে। তখন ভালোবাসা রূপান্তরিত হয় মায়ায়।

অনেক সময় আবার সঙ্গীকে বুঝতে ভুলও হতে পারে। আপনার মনে হতে পারে… নাহ! এভাবে আর চলছে না। মনে হচ্ছে সবকিছুই শেষ। কিন্তু প্রথমেই হাল ছেড়ে দেবেন না। সঙ্গীকে বোঝার সময় নিন। দু’জনে কয়েকটা দিন একসঙ্গে একান্তে কাটিয়ে আসুন, সব ব্যস্ততা-কে ‘গুড বাই’ বলে। হতে পারে পরস্পরকে সময় দিতে না পারাই আপনার ও আপনার সঙ্গীর মধ্যে দূরত্বের কারণ। তাই, নিজের কাউন্সেলিং নিজেই করুন।

সম্পর্কে যৌনতার গুরুত্ব

জানেন তো, সেক্স ঠিক ছাইচাপা আগুনের মতো। একটু উসকে দিলেই উত্তাপ তীব্র হয় আর গুরুত্ব না দিলে অশান্তি বাসা বাঁধে নীরবে। কিন্তু মনে রাখবেন, স্বাভাবিক যৌনতৃপ্তির জন্য দু’জনের কমপ্যাটিবিলিটি প্রয়োজন। আর কমপ্যাটিবিলিটি বা সামঞ্জস্য বজায় রাখতে হলে চাই— ‘কৌশল’। তাই, কৌশল রপ্ত করতে হবে। আর এই কৌশল হল— যৌনসুখ লাভের ইচ্ছেকে জাগিয়ে রাখা।

New Year-এ নতুনত্ব আনুন দাম্পত্যে

বিয়ের পর কয়েক বছর কেটে যাওয়ার পরে মনে হতেই পারে, দাম্পত্যের শুরুর ম্যাজিক দিনগুলো আর ফিরে আসার নয়। ভুল ভাবছেন। দীর্ঘ সময় কাটিয়ে ফেলার পরেও, স্বামী-স্ত্রীর ম্যাজিক রসায়ন ফিরিয়ে আনা সম্ভব। একটু তলিয়ে ভাবলেই দেখবেন, রসায়ন একই আছে, শুধু সম্পর্কে ধুলো পড়ে একটু বিবর্ণ হয়েছে মাত্র। দু-পক্ষের সামান্য চেষ্টাতেই আবার ফিরিয়ে আনতে পারবেন সম্পর্কের স্ফুলিঙ্গ।

সোহিনির একটাই অভিযোগ ওর স্বামী বাপনের বিরুদ্ধে, ‘বাপন বাড়িতে একটা কাজও করে না। আমিও ওর মতো অফিস করি, কিন্তু বাড়ির প্রতিটা কাজ আমাকেই করতে হয় অফিসে যাওয়ার আগে কিংবা অফিস থেকে ফিরে। বাপন কে কখনও এক কাপ চা বানিয়েও নিয়ে আসতে দেখলাম না।’

বাপন বহুবার এই অভিযোগ শুনেছে। একদিন সোহিনিকে সারপ্রাইজ দেওয়ার ইচ্ছায় বাপন সকাল সকাল উঠে ‘বেড টি’ বানিয়ে বউ-কে ঘুম থেকে ডেকে তুলল। সোহিনি অবাক! বাপনের হাত থেকে চায়ের কাপ নিয়ে চুমুক দিতেই মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে উঠল ওর, ‘কে তোমাকে চা করতে বলেছিল? একগাদা পাতা ঢেলেছ। চিনি আর দুধ এত কম দিলে চলে? জঘন্য, মুখে দেওয়া যাচ্ছে না। সেই আমাকেই আবার বানাতে হবে, একটা কাজ দু’বার করে করা।”

সোহিনি-র কথা শুনে বাপনেরও রাগ হয়ে গেল, “তোমার কাজ করে দিলেও দোষ, আবার না করলেও দোষ। আমার কোনও কাজ ভালো হয়েছে এটা তোমার মুখ থেকে কখনও শুনলাম না”, বলে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল বাপন।

এই দৃশ্য প্রতি ঘরেই উঁকি মারলে দেখা যাবে। ভারতীয় দাম্পত্যে এমন ঘটনায় কেউ অবাক বা বিচলিত হয় না। অনেক সময় স্বামী-রা চেষ্টা করেন, রান্না করতে না পারলেও রান্নার জন্য রাখা সবজিগুলো কেটে দিয়ে স্ত্রী-কে যতটা পারা যায় সাহায্য করতে। কিন্তু সেখানেও কারও কারও কপালে জোটে স্ত্রী-র কটূক্তি। “ঠিক করে সবজি কাটতে পারো না যখন, তখন কাজ দেখাতে যাও কেন।’

আবার একটু অন্য দৃশ্যও চোখে পড়ে। রাহুল আর শালিনীর তিনমাস হল বিয়ে হয়েছে। ভোপাল ছেড়ে দু’জনে ফ্ল্যাট নিয়ে দিল্লিতে থাকে চাকরির কারণে। কাজ থেকে ফিরেই রাহুল বসে পড়ে ল্যাপটপ নিয়ে, নিজের সোশ্যাল অ্যাকাউন্টের মেইল চেক করে সব উত্তর দেওয়ার জন্য। এটা নাকি ওর

মুড-কে ফ্রেশ রাখে। শালিনী এসে হাত-মুখ ধুয়ে সোজা রান্নাঘরে ঢুকে যায়। চা-জলখাবার দিয়ে রাতের খাবার বানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। রাহুলের পছন্দ জেনে নিয়ে মেনু ডিসাইড করে।

সেদিন ল্যাপটপে চোখ রেখেই রাহুল উত্তর দিল, “নিজের পছন্দের কিছু একটা বানিয়ে নাও।”

মটরপনির চলবে কিনা জেনে নিয়ে শালিনী রান্নাঘরে এসে জোগাড়ে মন দিল। ফ্রিজ খুলে দই-টা বাসি হয়ে যাচ্ছে দেখে মটরপনিরের বদলে দই দিয়ে পঞ্জাবি কারি আর ভাত রান্না করল। রাত্রে খেতে বসে মটরপনিরের জায়গায় কারি দেখে রাহুলের মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। রাগ দেখিয়ে বলল, ‘যদি নিজের ইচ্ছেতেই রান্না করবে বলে ঠিক করেছিলে, তাহলে আমাকে জিজ্ঞেস করার কী দরকার ছিল?’

রাহুলের ব্যবহারে শালিনীরও রাগ হয়ে গেল। উত্তর ওর জিভের ডগায় চলে এল, ‘বলতে কী চাও তুমি? রোজ তোমাকে জিজ্ঞেস করেই প্রতিটা রান্না করি। একটা দিন আমি নিজের মতো করেছি বলে এত রাগ হয়ে গেল তোমার।’ কাঁদতে কাঁদতে খাবার ছেড়ে শালিনী অন্য ঘরে চলে গেল। মুহূর্তের মধ্যে বাড়ির পুরো পরিবেশটাই বদলে গেল।

এই ঘটনাতেও কোনও নতুনত্ব নেই। হামেশাই চারপাশে ঘটছে। যেসব মহিলারা চাকরি করেন না, তারা সন্ধেবেলা স্বামীর ফেরার অপেক্ষায় অধীর হয়ে থাকেন, সারাদিনের সবকথা শেয়ার করবেন বলে। আবার স্বামীর পছন্দের খাবার বানানোটাও স্ত্রীর কাছে ভালো টাইমপাস। সংসারে আর্থিক স্বচ্ছলতা থাকলেও বেশিরভাগ মহিলাই ভেবেচিন্তে একটা সীমিত আর্থিক গণ্ডির মধ্যে সংসারের খরচ বেঁধে রাখাটা নিজের দায়িত্ব মনে করে।

তাই তাদের চেষ্টা থাকে, যে খাবারটার খারাপ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি, সেটা আগে রান্না করে ফেলা। সেখানে স্বামীর পছন্দ-কে প্রাধান্য না দিয়ে, নিজের বিচার-বিবেচনা দ্বারা প্রভাবিত হয় তারা। আবার কর্মরতারা চিন্তা করে সময় নষ্ট না করে, পুরো দায়িত্বটাই স্বামীর ঘাড়ে চাপিয়ে দেন। স্বামীর উত্তর যদি স্ত্রীর মনের ইচ্ছার সঙ্গে ম্যাচ করে যায়, তাহলে তো ঠিক আছে। কিন্তু যদি উত্তর সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া না যায়, তাহলে স্ত্রী অপেক্ষা না করেই নিজের মনের মতো খাবার বানিয়ে নেয়।

মজার বিষয় হল, যদি বাড়ির গৃহিণীটি বুঝতে না পারে কী খাবার বানাবে, তাহলে সেই দোষটাও এসে পড়ে বেচারি স্বামীর উপর। স্ত্রীর মুখঝামটা তৈরি থাকে, ‘এই সামান্য কাজটাও তোমার দ্বারা হয় না। কী রান্না হবে সেটাও আমাকেই দেখতে হবে!”

তাহলে কি স্বামীর কাছ থেকে সাহায্য পাওয়ার আশা করাটা স্ত্রীর অন্যায়? নাকি কোনও প্রতিকার না করেই স্বামীকে স্ত্রীর সব অনুযোগ স্বীকার করে নিতে বাধ্য থাকতে হবে? এই দুটোর কোনওটাই সুখী দাম্পত্যের সহায়ক নয়।

কী ভাবে বুঝবেন সম্পর্কে ধুলো জমেছে?

  • ভালোবাসার কথা বলার প্রযোজনীয়তা বোধ না করা
  • একসঙ্গে কিছু করার প্রচেষ্টা না করা
  • একসঙ্গে নাটক, সিনেমা, রেস্তোরাঁয় কিংবা বেড়াতে যেতে অনীহা
  • আলাদা আলাদা ঘরে শোওয়ার অভ্যাস
  • সাধারণ কথায় একে অপরের ভুল ধরা
  • মিথ্যা কথা বলা এবং চিট করার প্রবণতা
  • কখনও প্রশংসা না করা
  • শুতে যাওয়ার আলাদা আলাদা সময়
  • পার্টনারের বদলে বন্ধুর সঙ্গে ঘুরতে বেশি ভালোলাগা
  • পার্টনারের সঙ্গে কথা বলার থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশি ব্যস্ত থাকা
  • স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যৌন সম্পর্ক ধীরে ধীরে কমে আসা।

ম্যাজিক মোমেন্টস ফিরিয়ে আনতে

  • একে অপরের কথা শুনুন
  • মাঝেমধ্যেই আপনার ভালোবাসা মুখে প্রকাশ করুন
  • শারীরিক নৈকটত্ব দাম্পত্যে জরুরি। চুম্বন তার মধ্যে বিশেষ গুরুত্ব রাখে
  • কারণ ছাড়াই উপহার দিন
  • বেডরুম-এ স্পাইসি কিছু করুন
  • বাড়িতেই ক্যান্ডল লাইট ডিনার-এর আয়োজন করুন
  • আর্থিক সঙ্গতি থাকলে কোনও রোমান্টিক জায়গায় একসঙ্গে বেড়িয়ে আসুন
  • ফোন-এর থেকে দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করুন
  • একসঙ্গে কিছু নতুন এক্সারসাইজ করা শুরু করুন
  • সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যস্ততা কমান।

স্ত্রীর কর্তব্য

  • স্ত্রীর যদি মনে হয়, স্বামী তাকে সাহায্য করুক, তাহলে সব থেকে আগে দেখতে হবে সত্যি সত্যি স্বামীর কাছে স্ত্রীকে সাহায্য করার মতোন সময় আছে কিনা
  • স্বামীকে ডমিনেট করে সাহায্য চাওয়ার থেকে তাকে রিকোয়েস্ট করাটা বাঞ্ছনীয়
  • প্রথম থেকেই স্পষ্ট করুন কী ধরনের সাহায্য পেতে আগ্রহী আপনি, অন্যথায় পরে আশানুরূপ ফলাফল না হলে ঝগড়া, অশান্তি হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হবে
  • স্বামী অফিস থেকে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে কাজের ফর্দ ধরে বসে যাবেন না। স্বামীকে রিল্যাক্স হওয়ার সময় দিন, তারপরেই নিজের বক্তব্য পেশ করুন
  • পছন্দমতো কাজ হলে স্বামীর প্রশাংসা করুন। বিশেষকরে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবদের সামনে তো বটেই
  • সাংসারিক কাজে যদি স্বামীর আগ্রহ না থাকে, তাহলে বাচ্চাদের পড়াশোনাটা দেখে দিলেও আপনার অনেক সাহায্য হবে
  • আপনার মনের মতো কাজ না হলেও জিভে আগল রাখুন। কারণ, রাগ করলে কোনও লাভ হবে না বরং হতে পারে স্বামী দ্বিতীয়বার আর আপনাকে সাহায্য করার কথা ভাববেন না।

স্বামীর কর্তব্য

  • সব স্ত্রীরাই চান তাদের স্বামী তাদের কষ্টটা বুঝুক। তাই যখনই সুযোগ পাবেন, স্ত্রীকে সাহায্য করুন। স্ত্রী চাকরি করুক কি না করুক, সকলেই স্বামীর কাছ থেকে সাহায্য পাওয়ার আশা রাখে। স্ত্রীর প্রতি সহানুভূতিশীল ব্যবহার করুন, ডমিনেট করার ভুল করবেন না
  • অত্যন্ত ব্যস্ত কর্মজীবন হলেও চেষ্টা করুন ছুটির দিনগুলোতে অন্তত স্ত্রীকে কিছুটা সাহায্য করার, যাতে স্ত্রী-ও কিছুটা স্বস্তি পায়
  • স্ত্রীর যে-কোনও কাজে সাহায্য করার আগে প্রথমে কাজটা সম্পর্কে পুরোপুরি জেনে নিন যাতে স্ত্রীর মনে না হয় যে, কাজটা তার মনের মতো হল না
  • স্ত্রীকে যতই সাহায্য করুন, স্ত্রীর বান্ধবীদের সামনে বলুন, ‘আমি আর কী করতে পারি, ওই বেচারাকেই সবকিছু করতে হয়। ইচ্ছে থাকলেও আমি ওকে কোনও সাহায্যই করতে পারি না।’ এরপর দেখুন স্ত্রীর চোখে আপনার গুরুত্ব কতখানি বেড়ে গেছে
  • বাসন ধোয়া হয়ে গেলে সেটা গুছিয়ে রাখাটাও একটা বড়ো সাহায্য। শুধু খেয়াল রাখতে হবে যাতে কিছু না ভাঙে
  • সবজি কেটে দেওয়া এবং ভালো করে ধুয়ে স্ত্রীকে রান্নার সময় সাহায্য করাটাও বিফলে যাবে না।
  • রান্নার শখ থাকলে সপ্তাহে এক-আধ দিন স্ত্রীকে ছুটি দিয়ে নিজেই ঝামেলাটা সামলান, দেখবেন স্ত্রী খুশি হবে। কাজ কিছু না করেও যদি রান্নাঘরে স্ত্রীর সঙ্গে কিছু সময় কাটান, সেটাও অতিরিক্ত পাওনা হবে
  • তবে স্ত্রীর কাজের চুলচেরা বিচার কখনও করতে যাবেন না। নিজের এলাকায় দখলদারি স্ত্রী কখনওই সহ্য করেন না।

তবে, কখনও কখনও সম্পর্কে দূরত্ব রাখাটাও দরকার। সম্পর্কটার মধ্যে স্পেস রাখুন। এর ফলে পরস্পরের প্রতি নতুন করে ঔৎসুক্য তৈরি হবে এবং একে অপরের সাহচর্য নতুন করে এনজয় করা শুরু করবেন।

সুন্দরী সিমলা আর মনভোলানো মানালি (শেষ পর্ব)

কাসোল কুল্লু জেলার একটি সাজানো পাহাড়ি গ্রাম। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য এই জায়গাটিকে অনেকে মিনি ইজরায়েল বলে অভিহিত করেন। পার্বতী নদীর তীরে এবং পার্বতী উপত্যকায় নিভৃতে সময় কাটাতে চাইলে যে কেউ কাসোলকে বেছে নিতে পারেন। আমাদের গন্তব্য ছিল নেচার পার্ক কাসোল। মণিকরণ থেকে প্রায় চার কিমি রাস্তা অতিক্রম করে আমরা কাসোল নেচার পার্কে উপস্থিত হলাম। এখানে বড়োদের প্রবেশমূল্য ত্রিশ টাকা, ছোটোদের কুড়ি টাকা। পার্কের মধ্যে দিয়ে পার্বতী নদী প্রবাহিত হয়েছে। পাইন গাছের সমারোহ, শান্ত নির্জন পরিবেশ, পাখির কলতান, খরস্রোতা পার্বতী নদীর গর্জন যে কোনও দর্শনার্থীকে আকৃষ্ট করবে সন্দেহ নেই। পাইন গাছের সারির মধ্যে দিয়ে হাঁটতে মন্দ লাগছিল না। পার্কটির সামনের দিকে বাচ্চাদের একটা খেলার জায়গা আছে। পার্কটিতে একটি ভেষজ গাছের বাগান আছে। বেশ কিছুক্ষণ সময় আমরা এখানে ব্যয় করলাম। ঘড়ির কাঁটা প্রায় দুপর দুটো ছুইছুই।

পার্ক থেকে বেরিয়ে আমরা একটি ক্যাফেতে ঢুকলাম। ঘুরে ঘুরে বেশ খিদেও পেয়েছিল। খাওয়া শেষে প্রায় দু-ঘণ্টা জার্নির পর আমরা হোটেলে পৌঁছালাম। ঘণ্টাখানেক বিশ্রাম নিয়ে হোটেলের চারপাশটা একটু ঘুরে বেড়ালাম। পাইন, দেওদার গাছের সারির মধ্য দিয়ে অলস সন্ধ্যা নামছে। ঠান্ডাও বাড়তে শুরু করেছে। কাল গাড়ি করে কোথাও যাওয়ার নেই, আশপাশ পায়ে হেঁটেই ঘোরা হবে। বেশ কিছুক্ষণ পর আমরা হোটেলে ফিরে রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।

মানালিতে তৃতীয় দিন হিড়িম্বাদেবী মন্দির, ক্লাব হাউস, মনু মন্দির দেখার পরিকল্পনা ছিল। সকাল ন’টায় স্নান সেরে ভারী ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়ে পড়লাম হিডিম্বাদেবী মন্দিরের উদ্দেশ্যে। হোটেল থেকে পনেরো মিনিটের হাঁটা পথে মন্দিরটি। এই হিডিম্বাদেবী মন্দির এখানে ধুংগারি মন্দির নামেও পরিচিত। মহারাজা বাহাদুর সিংয়ের আমলে এই প্রাচীন মন্দির তৈরি হয়। ১৫৫৩ সালে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়। মন্দিরের কাঠের স্থাপত্য অসাধারণ।

এটি অন্য হিন্দু মন্দিরের আর্কিটেকচার থেকে অনেকটাই আলাদা। এরকম স্থাপত্যশৈলী প্রথমবার দেখলাম। মন্দিরটি একটি পাথরের উপর অবস্থিত। স্থানীয়রা ভীমের স্ত্রী হিডিম্বার প্রতিরূপ মনে করেন। মন্দিরটি তুষারাবৃত পাহাড় আর দেওদার গাছ দ্বারা বেষ্টিত। মন্দির চত্বরে হিডিম্বার পুত্র ঘটোৎকচকে উৎসর্গ করে আরও একটি মন্দির রয়েছে। শান্ত স্নিগ্ধ পরিবেশ চারদিকে। মন্দিরে ভিড় ছিল না একদমই। শান্তিতে মন্দির পরিদর্শন করে বেরিয়ে এলাম।

এরপর হিড়িম্বা মন্দির থেকে ওল্ড মানালি ক্লাব হাউসের উদ্দেশে পা বাড়ালাম। ক্লাব হাউসটি মানলসু নালার (বিয়াস নদীর শাখা) তীরে ম্যাল রোডের কাছে অবস্থিত। প্রায় পনেরো মিনিট হেঁটে নীচে নেমে এলাম। ক্লাব হাউসে প্রবেশমূল্য জনপ্রতি দশ টাকা। ক্লাব হাউসটি পর্যটকদের বিনোদন এবং অ্যাডভেঞ্চারের জন্য হিমাচল ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন দ্বারা পরিচালিত হয়। ক্লাব হাউসে পর্যটকদের ভিড় খুব। এখানে ইনডোর এবং আউটডোর বিভিন্ন গেমের ব্যবস্থা আছে। বাচ্চাদের পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্করাও উপভোগ করতে পারবেন। বিয়াস নদীর গর্জন, গাছগাছালি ঘেরা মনোরম পরিবেশ, পাখির কলতান— প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সান্নিধ্য অনুভব করবেন এখানে।

ইনডোর গেম বলতে বিলিয়ার্ডস, ক্যারম, ভিডিও গেমস, টেবিল টেনিস, আইস স্কেটিং, স্কেটিং ইত্যাদি পর্যটকদের এবং স্থানীয়দের মনোরঞ্জনের জন্য রাখা হয়েছে। ক্লাব হাউসের ভিতরে একটি ছোটো লাইব্রেরিও আছে। যারা প্রকৃতির কোলে বসে বইকে বন্ধু করতে চান, তাদেরও দুর্দান্ত সময় কেটে যাবে।

আউটডোর গেমের মধ্যে রয়েছে গো-কাটিং, বোটিং, জিপ-লাইনিং, রোপওয়ে ব্যবহার করে নদী পারাপার ইত্যাদি। যারা অ্যাডভেঞ্চার পছন্দ করেন তাদের জন্য এই ক্রিয়াকলাপগুলি আদর্শ। এখানে ইনডোর এবং আউটডোর গেমে যোগ দিতে আলাদা আলাদা নির্ধারিত মূল্য রয়েছে। কমপ্লেক্সের ভিতরে একটি রেস্তোরাঁ আছে। একটি ভিভিও গেম সেন্টারও রয়েছে। কিছু দোকান আছে যেখান থেকে পশমের পোশাক এবং হস্তশিল্পের বিভিন্ন জিনিস সংগ্রহ করতে পারবেন। এখানে প্রায় দু-ঘণ্টা কাটিয়ে বেরিয়ে এলাম।

আমাদের পরের গন্তব্য ছিল মনু মন্দির। ক্লাব হাউস থেকে বেরিয়ে বাঁদিকের রাস্তা ধরে স্থানীয় লোকজনদের জিজ্ঞাসা করে প্রায় এক কিলোমিটার পথ হেঁটে পৌঁছালাম মন্দির গেটে। বেশ কয়েকটা সিঁড়ি পেরিয়ে মন্দির প্রাঙ্গণে এলাম। চারদিকের দৃশ্য খুব সুন্দর। এখানে লোকজন নেই বললেই চলে। বিয়াস নদীর উপত্যকায় এই মন্দিরটি ঋষি মনুকে সম্মান জানানোর জন্য তৈরি করা হয়। মনু মন্দিরটির বিস্ময়কর প্যাগোডা-স্থাপত্যশৈলী আকর্ষণ করবে সকলকে।

কথিত আছে, রাজা মনু যে স্থানে ধ্যান করেছিলেন সেই স্থানে মন্দিরটি স্থাপিত হয়েছিল। মন্দির দর্শন করে যখন বেরিয়ে এলাম, তখন বিকাল চারটে। রোদের তেজ কমে এসেছে। দেওদারের বুক চিরে কনকনে ঠান্ডা হাওয়া বইতে শুরু করেছে। এরপর সবাই হোটেলে ফেরার পথ ধরলাম৷ পাইন, দেওদার গাছকে সঙ্গী করে আধ ঘণ্টার মধ্যে হোটেলে ফিরলাম। পরেরদিন আমাদের কালকা যাওয়ার কথা।

পরের দিন হোটেলের চেক আউট টাইম দুপুর বারোটায়। দেরি করে ব্রেকফাস্ট করে আমাদের ড্রাইভারকে দুপুর বারোটায় হোটেল ছাড়ার কথা বললাম। সে জানাল, মানালি থেকে কালকা প্রায় সাড়ে ছয় ঘণ্টার পথ। কালকা থেকে কলকাতা ফেরার রাতের নেতাজি এক্সপ্রেস ধরব আমরা। ঘণ্টাখানেক বিশ্রাম নিয়ে হোটেলের বিল পেমেন্ট করে দুপর বারোটায় হোটেল ছাড়লাম।

ড্রাইভার আমাদের নিয়ে গাড়ি ছাড়ল। মানালি ছেড়ে গাড়ি ছুটল দীর্ঘ পাহাড়ি পথ ধরে। পথ যত দূরত্ব অতিক্রম করতে লাগল, ততই মনখারাপের রেশ বাড়ল। পাহাড়কে বিদায় জানিয়ে ঘরে ফেরার পালা। মন ফিরতে না চাইলেও ফিরতে হবে। সন্ধে সাড়ে ছ’টায় আমরা কালকা রেল স্টেশন পৌঁছালাম।

হিমাচলের প্রতিটি জায়গা, বিয়াস নদী, পাহাড়ি উপত্যকা, পাহাড়ি গ্রাম, গাছগাছালি, পাইন-দেওদারের ঘন জঙ্গল, রুক্ষ্ম ধূসর চড়াই-উতরাই পথ— আমাদের স্মৃতির সরণি জুড়ে বিচরণ করতে থাকল। এই স্মৃতিটুকু সঙ্গে নিয়ে আমরা রাতের কালকা মেলে উঠলাম বাড়ি ফেরার উদ্দেশ্যে।

হিমেল আবহে রকমারি রান্না (শেষ পর্ব)

শরীরে প্রোটিনের চাহিদা পূরণের জন্য প্রয়োজন ননভেজ খাবার। তাই, এবার আমরা এমনই কিছু রেসিপি দিচ্ছি, যা ছোটো, বড়ো সবারই পছন্দের টেস্টি ডিশ হয়ে উঠবে। শুধু তাই নয়, স্বাদ সম্পূর্ণ করতে আমরা শেষ পাতে পরিবেশন করছি চমকপ্রদ কিছু মিষ্টি। অতএব, যে-কেউ এই রেসিপিগুলো ট্রাই করুন এবং খেয়ে-খাইয়ে খুশি থাকুন।

সুফিয়ানি চিকেন বিরিয়ানি

চিকেন আইটেম

উপকরণ: ১ কেজি বাসমতী চাল, ১১/২ কেজি চিকেন (হাড় সমেত), ২০ গ্রাম আদা-রসুন পেস্ট, ১০ গ্রাম কাঁচালংকা, ৪-টে লবঙ্গ, ৬০ গ্রাম কাঁচালংকা বাটা, ১ গ্রাম দারচিনি, ৫ গ্রাম শাহ জিরা, ১০ গ্রাম পুদিনা ও ধনেপাতা, ১০০ গ্রাম ভাজা পেঁয়াজ, ৫০ মিলি ঘি, ৮০ মিলি রিফাইন্ড তেল, ২৫০ গ্রাম দই, নুন স্বাদমতো।

প্রণালী: চাল ভালো ভাবে ধুয়ে রাখুন। এবার একটা পাত্রে ৫ লিটার জলে চাল, লবঙ্গ, শাহ জিরে ও দারচিনি দিয়ে চাল ৮০ শতাংশ পর্যন্ত সেদ্ধ হতে দিন। তারপর ফ্যান ঝেড়ে আলাদা রাখুন।

বিরিয়ানি বেস তৈরির জন্য: একটা হাঁড়িতে তেল ও বাকি উপকরণ দিন, যা বিরিয়ানির বেস তৈরি করবে। চিকেনটা শুধু আলাদা রাখুন। এবার মশলাটা নাড়াচাড়া করে চিকেন দিয়ে কষুন কিছুক্ষণ। হাঁড়িতে একটা করে ভাতের লেয়ার তৈরি করুন, মধ্যে দিন চিকেন কষানোটা। এর উপর আবার ভাতের লেয়ার তৈরি করুন এবং ঘি ছড়িয়ে দিন। ভাপে দেওয়ার আগে হাঁড়ির মুখ ফয়েল পেপার দিয়ে মুড়ে দিন। ভাপানো হলে ফয়েল সরিয়ে একটা পাত্রে রাখা জ্বলন্ত কাঠকয়লা হাঁড়ির ভিতর বসিয়ে চাপা দিয়ে দিন। মিনিট পাঁচেক রেখে কয়লার পাত্রটা বের করে নিন, ভালো ভাবে বিরিয়ানিটা ঝাঁকিয়ে গরম গরম সার্ভ করুন।

কুং পাও চিকেন

উপকরণ: ৮০০ গ্রাম চিকেনের থাইয়ের অংশ ছোটো টুকরো করে কাটা, ২ কোয়া রসুন কুচি করা, ১০ গ্রাম আদাকুচি, ৪টে শুকনো লংকা, ২ বড়ো চামচ সোয়াসস, ১ ছোটো চামচ তিল তেল, ২ বড়ো চামচ ওয়াইন, বাদাম তেল প্রয়োজনমতো, ১/২ কাপ কাঁচাবাদাম, ১ ছোটো চামচ কর্নফ্লাওয়ার, ৬০ মিলি চিকেন স্টক, ১/২ ছোটো চামচ চাইনিজ ফাইভ স্পাইস, ৪টে সবুজ পেঁয়াজ পাঁচ সেন্টিমিটার টুকরোয় কাটা, সাজাবার জন্য ধনেপাতা আর পেঁয়াজের রিং।

প্রণালী: ১টা বোল-এ চিকেন, আদা, রসুন, ওয়াইন, সোয়াসস আর তিল তেল মেশান। ম্যারিনেট করার জন্য সমস্ত উপকরণ মিশিয়ে প্লাস্টিক র‍্যাপিং করে ফ্রিজে ৩০ মিনিট রেখে দিন। এবার কড়ায় বাদাম তেল গরম করুন। এতে কাঁচাবাদাম দিয়ে ২ মিনিট ফ্রাই করুন। এবার বাদামগুলো একটা প্লেটে তুলে রাখুন। ম্যারিনেট করা চিকেনের টুকরো আলাদা পাত্রে রাখুন। পড়ে থাকা মিশ্রণ কর্নফ্লাওয়ার আর চিকেন স্টকের সঙ্গে গুলে নিন। এবার কড়ায় গরম করা বাদাম তেলে চিকেনের টুকরো ভেজে নিন। এবার চিকেনের টুকরোগুলো পুনরায় কর্নফ্লাওয়ারের মিশ্রণে মেশান। চাইজিন ফাইভ স্পাইসের সঙ্গে মাখুন। সবুজ পেঁয়াজ ও বাদামের সঙ্গে চিকেনগুলো আবার কড়ায় দিয়ে কষতে থাকুন। মিশ্রণ কড়ায় ঢেলে দিয়ে মাখো মাখো করুন। উপর থেকে ধনেপাতা ছড়িয়ে সার্ভ করুন।

Delicious cuisine in a snowy atmosphere

মনভোলানো মিষ্টান্ন

মাল্টিগ্রেন লাড্ডু

উপকরণ: ১/৪ কাপ ওটস গুঁড়ো করা, ১/৪ কাপ সাধারণ আটা, ১/৪ কাপ জোয়ারের আটা, ১/৪ কাপ বাজরার আটা, ১/৪ কাপ জবের আটা, ৮-১০টি বাদাম, ১% কাপ ঘি, ১/২ কাপ চিনি গুঁড়ো করা।

প্রণালী: সবরকম আটা ওটস-এর গুঁড়োর সঙ্গে মিশিয়ে নিন। কড়ায় ঘি গরম করে এই মিশ্রণ কড়ায় দিয়ে নাড়তে থাকুন এবং চিনির গুঁড়ো মেশান। আঁচ একদম ঢিমে অবস্থায় রেখে ৮-১০ মিনিট নাড়াচাড়া করুন। ঠান্ডা হতে দিন। তারপর এই মিশ্রণ থেকে লাড্ডু তৈরি করে বাদামের টুকরো দিয়ে সাজিয়ে দিন।

আপেল নারকেলের লাড্ডু

উপকরণ: ২৫০ গ্রাম আপেল, ১/২ কাপ চিনি, ১/৪ কাপ শুকনো নারকেল কোরানো, ১/৪ কাপ খোয়াক্ষীর, ৪ বড়ো চামচ বাদাম গুঁড়ো করা, ৪ বড়ো চামচ শুকনো নারকেলকুচি।

প্রণালী: আপেল ভালো ভাবে ধুয়ে খোসা ছাড়িয়ে নিন। এবার টুকরো করে মিক্সিতে পিষে নিন। একটা গভীর তল-যুক্ত পাত্রে আপেলের পেস্ট, কোরানো নারকেল ও চিনি দিয়ে নাড়াচাড়া করতে থাকুন। আঁচ অবশ্যই ঢিমে রাখবেন। আপেল সেদ্ধ হয়ে এসেছে বুঝলে বাদামের গুঁড়ো দিয়ে দিন এবং খোয়াক্ষীর দিয়ে আরও ৩-৪ মিনিট নাড়তে থাকুন। আঁচ থেকে নামিয়ে ঠান্ডা করুন। তারপর এই মিশ্রণ থেকে লাড্ডু তৈরি করে নিন। নারকেলকুচির উপর রোল করে নিয়ে পরিবেশন করুন।

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব