গত কয়েক বছরে এমনিতেই বাজারে তিন-চার গুন দাম বেড়েছে জিনিসের। কিন্তু সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হল এই যে, এত বেশি দাম দিয়েও আসল জিনিস হাতে পাচ্ছেন না ক্রেতারা। বেশিরভাগই ভেজাল খাদ্যসামগ্রীতে ভরে উঠেছে বাজারগুলি। শুকনো খাদ্যদ্রব্য থেকে শুরু করে তেল, দুধ, মশলাপাতি কোনওকিছুই বাদ নেই ভেজালের আওতা থেকে। তবে ক্রেতারা অনেকেই জানেন না যে, কোন জিনিসের সঙ্গে কী মেশানো হয়। তাই এসব জেনে নিয়ে শরীর বাঁচাতে আসল জিনিস কেনার চেষ্টা করুন এবং ভেজাল জিনিস বিক্রির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আন্দোলন গড়ে তুলুন।

ভোজ্য তেল

নতুন নতুন ব্র্যান্ডের প্রচুর ভোজ্য তেল বাজারে এসে গেছে। এগুলি সঠিকভাবে পরীক্ষা করলে বোঝা যাবে, বেশিরভাগই ভেজাল দেওয়া। কোনওটাতে পাম তেল, আবার কোনওটাতে রেপসিড তেল মেশানো থাকে।

আসলে পাম কিংবা রেপসিড তেল সস্তায় পাওয়া যায়। তাই দামি তেলের সঙ্গে এইসব তেল মিশিয়ে বাজারে ছাড়া হয়। যেমন সরষের তেলের সঙ্গে মেশানো হয় শিয়ালকাঁটার তেল। আর এই ভেজাল সামগ্রী এমনই বর্ণ ও গন্ধযুক্ত হয় যে, আসল নাকি নকল— এটা বোঝা সাধারণ লোকের পক্ষে খুব কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

সূর্যমুখী, সোয়াবিন প্রভৃতি তেলেও আজকাল মেশানো হচ্ছে রাইস অয়েল। কারণ সূর্যমুখী কিংবা সোয়বিন তেলের দামের থেকে অনেক কম দামে পাওয়া যায় রাইস অয়েল। তবে শুধু ভোজ্য তেলই নয়, মাথায় ব্যবহারের তেলেও ভেজাল দেওয়া হয়। এই তেলে নানারকম সুগন্ধি মিশিয়ে এবং অনেকরকম লেবেল এঁটে বাজারে ছাড়া হয়। ক্রেতারাও আসল-নকল না বুঝে, শুধু গন্ধে আকৃষ্ট হয়েই কিনে নিয়ে যান ওইসব ভেজাল তেল, চুলের স্বাস্থ্য-হানি ঘটাতে এসব তেলের জুড়ি নেই।

দুধ

অনেকের ধারণা, শুধু প্যাকেট দুধেই ভেজাল থাকে, গোয়ালার বিক্রি করা দুধে নয়। কিন্তু এই ধারণা ভুল। কারণ গোয়ালার বিক্রি করা দুধেও ভেজাল দেওয়া হয়। জল তো মেশানো হয়ই, এমনকী গরুকে অক্সিটোসিন ইঞ্জেকশন দিয়েও দুধের পরিমাণ বাড়ানো হয়। এই দুধ এতটাই পাতলা হয়ে যায় যে, তা শরীরের কোনও উপকারে লাগে না। আসলে প্যাকেট দুধের থেকে যেহেতু গোয়ালার বিক্রি করা দুধের দাম বেশি, তাই গোয়ালারা ভেজাল দুধ বিক্রি করে বেশি টাকা উপার্জন করে। তাছাড়া এই দুধ বৈজ্ঞানিক উপায়ে পরিশুদ্ধও থাকে না। অতএব ক্রেতারা এই দুধ পান করে উপকারের বদলে ক্ষতির শিকার হন বেশি।

মশলা

একটা সময় ছিল যখন প্রায় প্রতিটি গৃহস্থের বাড়িতেই শিলনোড়া থাকত। আর সেই বাটা মশলায় রান্না করা খাবার যারা খেয়েছেন, তারা জানেন কী সুস্বাদু হতো সেই খাবার। কিন্তু সেইসব দিন চলে গেছে। এখন জীবন অনেক গতিশীল। মহিলারা এখন রান্নাঘর সামলানোর পাশাপাশি চাকরিও করেন। অতএব সময়ের অভাব এবং পরিশ্রম থেকে রেহাই পেতে এখন বাটা মশলার জায়গায় গুঁড়ো মশলার ব্যবহার শুরু করেছেন গৃহিণীরা। আর এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করছেন কিছু অসাধু মশলা ব্যবসায়ী। এরা নিজেদের পকেট ভারী করার জন্য মশলার সঙ্গে এমনকিছু মেশাচ্ছেন, যা স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকারক। রান্নার স্বাদেও বেশ হেরফের হচ্ছে। বিভিন্ন মশলার প্যাকেট পরীক্ষা করে দেখা গেছে, জিরে এবং ধনের সঙ্গে কাঠের গুঁড়ো, লংকাগুঁড়োয় ইঁটের গুঁড়ো ইত্যাদি মেশানো থাকে।

বিস্কুট

ময়দা দিয়েই তৈরি হয় বিস্কুট। কিন্তু অনেকসময় ময়দার পরিমাণ বাড়াবার জন্য তেঁতুলদানার গুঁড়ো মেশানো হয়। এতে বিস্কুট তৈরির খরচ অনেক কমে যায় এবং বিস্কুট কোম্পানিগুলি অনেক বেশি লাভ করে। এভাবে অসাধু ব্যবসায়ীদের দ্বারা প্রতিদিন ঠকছেন ক্রেতারা।

কোল্ড ড্রিংক্স

সারা পৃথিবীতে কোল্ড ড্রিংক্স-এর চাহিদা এখন তুঙ্গে। প্রায় সকলেই ঠান্ডা পানীয়র স্বাদ নেন। কিন্তু অনেকেই জানেন না যে, এই ঠান্ডা পানীয়তে ব্যবহৃৎ জল পরিশুদ্ধ থাকে না সবসময়। শুধু তাই নয়, বিশেষজ্ঞরা কোল্ড ড্রিংক্স পরীক্ষা করে এও দেখেছেন যে, ক্ষতিকারক পদার্থ ক্যাফিন ছাড়াও এতে নানারকম ক্ষতিকারক অ্যাসিডও পাওয়া গেছে। ম্যালিক অ্যাসিড, ফসফোরিক অ্যাসিড, কার্বলিক অ্যাসিড, সাইট্রিক প্রভৃতি অ্যাসিডের মিশ্রণে তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন কোম্পানির কোল্ড ড্রিংক্স। আর এসব জেনেবুঝেও আমরা ঠান্ডা পানীয়কে দূরে সরিয়ে রাখতে পারি না এবং স্বাস্থ্যের ক্ষতি করি।

মিনারেল ওয়াটার

সাধারণ লোকেরা জানেন সিল করা বোতলের জল মানেই বিশুদ্ধ। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল এই যে, সবসময় তা হয় না। আর অনেকে যেহেতু সিল করা বোতলের জলই পান করতে বেশি পছন্দ করেন, তাই বাজারে বহু নতুন নতুন কোম্পানি এই জল বিক্রি করছে। কিন্তু এই জল যে বৈজ্ঞানিক উপায়ে বিশুদ্ধিকরণের পরে বাজারে আসছে, তা সবসময় নয়। অনেক কোম্পানির সিল করা বোতলের জল পরীক্ষা করেও বিশেষজ্ঞরা দেখেছেন, তা বিশুদ্ধ নয়, নানারকম জীবাণু রয়েছে তাতে। আর সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হল এই যে, জল যেহেতু শরীরকে ঠিক রাখার অন্যতম রসদ, তাই জল পান করতেই হবে। সমস্যা হল, যে জল আমরা পান করছি তা বিশুদ্ধ কিনা তা সাধারণভাবে বোঝাও মুশকিল।

সস

বাড়ি কিংবা রেস্তোরাঁ, সর্বত্র খাবারকে সুস্বাদু করার জন্য আমরা সস খেয়ে থাকি। তাই বাজারে টম্যাটো এবং চিলি সসের বেশ চাহিদা আছে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে আসল টম্যাটো এবং চিলি সস আমরা পাই না। বেশিরভাগই টম্যাটোর সঙ্গে কুমড়ো মিশিয়ে সস তৈরি করা হয়। আবার পচা টম্যাটো কিংবা পচা লংকা দিয়ে তৈরি সসও বিক্রি করে অনেক ব্যবসায়ী।

আসলে যুগযুগ ধরে নানাভাবে ক্রেতাদের ঠকিয়ে চলেছেন ব্যবসায়ীরা। শুধু তেল, মশলা, দুধ, বিস্কুট, সস কিংবা কেক নয়,  যা আমরা বাজার থেকে কেনাকাটা করি, তার বেশিরভাগই ভেজালে ভরা। অনেকসময় না জেনে ঠকতে হয়, অনেকসময় জেনে। মোটকথা, সরকার যদি অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ না নেন, তাহলে ক্রেতারা সজাগ থাকলেও এককভাবে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। পথ একটাই, ভেজাল জিনিসের বিরুদ্ধে, প্রতিবাদ আন্দোলন গড়ে তুলুন।

Tags:
COMMENT