কদমতলার মোড়ের এই ওষুধের দোকানটায় সপ্তাহে একদিন করে বসে দিগন্ত। নাগরিক জীবনে জটিলতা যত বাড়ছে, মনোরোগের চিকিৎসকের কাছে ভিড়ও বাড়ছে সেভাবে। আজ মিতুলের জন্মদিন। ষষ্ঠীকে বলা ছিল যাতে বেশি পেশেন্টের নাম না লেখে। মিতুল পুনেতে এমবিএ পড়ছে, বাড়িতে এসেছে কয়েকদিনের ছুটিতে। মা নেই, মিতুলের জীবনে বাবাই সব। এবার জন্মদিনে ঠিক হয়েছে সন্ধেবেলা বেরিয়ে পড়বে দুজনে। ডিনার করবে নিরিবিলি কোনও রেস্তোরাঁয়। সাতটার সময় শেষ পেশেন্টকে দেখে যখন উঠতে যাবে দিগন্ত, তখন ষষ্ঠী এসে বলল– স্যার, সবাইকেই কাটিয়ে দিয়েছি। কিন্তু একজনকে কিছুতেই বিদায় করতে পারলাম না। দু’ঘণ্টা থেকে মানুষটা ঠায় বসে আছে। আপনাকে না দেখিয়ে কিছুতেই যাবে না বলছে।

দিগন্তর টেবিলে কাজের জিনিসের পাশাপাশি রয়েছে একটা কাচের বোল ভর্তি ছাতিম ফুল। তার বাড়ির সামনের এক টুকরো বাগানে একটা ছাতিম গাছ আছে। দিগন্তর যেদিন যেদিন চেম্বার, সেদিন লোক দিয়ে দিগন্তর বাড়ি থেকে ছাতিম ফুল আনিয়ে রাখে ষষ্ঠী। লম্বা একটা ঘ্রাণ নিয়ে মুখটা তুলে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দিগন্ত বলল– পাঠিয়ে দাও। কিন্তু মনে রেখো এটাই লাস্ট।

ষষ্ঠী চলে গেল। পর্দা সরিয়ে একটু দ্বিধাগ্রস্ত পায়ে যে– মানুষটি ঘরে এল, তার গালে কয়েকদিনের দাড়ি, কপালে বলিরেখা, চোখের নীচে পুরু কালির আস্তরণ। দিগন্ত বলল– বসুন। নাম কী আপনার?

– ইয়ে, প্রণয় ঘোষ।

প্রেসক্রিপশনের পাতায় নামটা লিখতে লিখতে দিগন্ত কেজো গলায় বলল– হ্যাঁ, কী অসুবিধে বলুন।

– ইয়ে স্যার… মাসখানেক হল অদ্ভুত একটা শব্দ শুনতে পাচ্ছি। মনে হচ্ছে কেউ কানের কাছে এসে ফিসফিস করে আমাকে কিছু বলছে।

– পুরুষকণ্ঠ? নাকি কোনও মহিলার গলা? চিনতে পারেন গলার স্বরটা কার?

– মনে হয় গলাটা শ্রুতির, মানে আমার স্ত্রীর। একটা কথাই শুধু শুনতে পাই। ‘ভালো থেকো’। ব্যস। ওই একটাই কথা। আর কিছু নয়।

দিগন্ত চোখ কুঁচকে দেখল পেশেন্টকে। তাকিয়ে থাকল একটুক্ষণ। কপালে দুটো বাড়তি ভাঁজ ফেলে বলল– আপনার স্ত্রী আপনার সঙ্গে একবাড়িতেই থাকেন নিশ্চয়ই?

– না স্যার, ও তিন মাস আগে এক্সপায়ার করেছে।

সাইকায়াট্রিস্টদের অনেক অদ্ভুত জিনিস শুনতে হয়। তবুও মুখটা নির্বিকার করে রাখাটাই নিয়ম। দিগন্ত তার উলটোদিকের লোকটির দিকে ভাবলেশহীন মুখে তাকিয়ে থাকার চেষ্টা করল কয়েক সেকেন্ড। বলল– কথাটা কখন শোনেন? দিনে নাকি রাতে?

– দিন বা রাত বলে কিছু নেই স্যার। আসলে যখন কাজের মধ্যে থাকি তখন কিছু টের পাই না। কিন্তু একটু একা হলেই কানের কাছে ফিসফিস করে কেউ বলে ‘ভালো থেকো’। শব্দটা এমন ডিসটার্ব করছে যে, রাতে ঘুমোতে পারছি না।

– আপনার বাড়িতে কে কে আছেন? ছেলে-মেয়ে?

– একটাই মেয়ে। তিন্নি। পড়াশোনায় ভালো ছিল। বিয়ে করে বিদেশে থিতু হয়ে গেছে। জামাই এলাহাবাদের ছেলে।দু’জনে একই কোম্পানিতে চাকরি করে। বাড়িতে আমি একা থাকি। কাজের মাসি আছে একজন। সকালে এসে রান্না করে দিয়ে চলে যায়।

– এই সমস্যা নিয়ে আপনি কোনও ইএনটি-র কাছে গিয়েছিলেন কি?

– গিয়েছিলাম। বেশ কিছু পরীক্ষা করিয়ে ডক্টর দাশ বললেন, কানে কোনও সমস্যা নেই। উনি আপনার কাছে আসতে বললেন।

ফোন বাজল। মিতুল বিরক্ত হয়ে বলল– তোমার রোগী দেখা শেষ হয়নি এখনও?

দিগন্ত বলল– আর পাঁচ-দশ মিনিট লাগবে, তারপর বেরোচ্ছি। ফোনটা রেখে দিগন্ত বলল– আপনার স্ত্রী নেই বলছিলেন। কী হয়েছিল ওঁর?

– নিউরোলোজিক্যাল সমস্যা। বছর খানেক বেচারি খুব ভুগেছে। মাস তিনেক আগে– আমি তো বলব চলে গিয়ে বেঁচেছে শ্রুতি।

– কী ধরনের সমস্যা ছিল ওঁর?

– এমনিতে সুস্থই ছিল শ্রুতি। গতবারের আগের শীতে আমরা দুজনে জয়ন্তী গিয়েছিলাম বেড়াতে। একটা লজে উঠেছিলাম। পরদিন সকালে শুকনো নদীর খাত ধরে হাঁটতে বেরিয়ে দেখা হয়ে গেল একজন তান্ত্রিকের সঙ্গে। এক হাতে একটা সিঁদুরমাখা ত্রিশূল, অন্য হাতে একটা মালসা নিয়ে বিশাল চেহারার লোকটা হেঁটে আসছিল উলটোদিক থেকে। ওই শীতের মধ্যে খালি গা, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা, লাল আগুনের গোলার মতো চোখ। আমাদের দেখে দাঁড়িয়ে পড়ল। শ্রুতির দিক থেকে লোকটা চোখ সরায় না কিছুতেই।

– তারপর?

– আমার হাত শক্ত করে ধরে টেনে নিয়ে গেল একদিকে। কী শক্ত খরখরে হাত ওই লোকটার সেটা বলে বোঝাতে পারব না স্যার! আমাকে বলল বহুদিন ধরে সাধনসঙ্গিনী খুঁজছে সে। কিন্তু যোগ্য কাউকে পাচ্ছিল না। শ্রুতির মধ্যে সেই আধার সে দেখতে পেয়েছে। শ্রুতিই নাকি পারবে তার সাধনসঙ্গিনী হতে।

– হুম। তখন কী করলেন আপনি?

– আমার তখন হতবুদ্ধি অবস্থা। ফাঁকা এলাকা, আশেপাশে কেউ নেই যে সাহায্য চাইব। সেই তান্ত্রিকের হাত ছাড়িয়ে শ্রুতিকে টেনে নিয়ে হাঁটা দিলাম। লোকটা আচমকা হাতের মালসা থেকে সিঁদুর আর ছাইয়ের মতো কিছু একটা শ্রুতির কপালে লেপে দিল। তারপর হো হো করে হাসতে লাগল। আমরা পা চালিয়ে জায়গাটা ছেড়ে এলাম। যেন পালিয়ে বাঁচলাম ওখান থেকে। কিন্তু কী আশ্চর্য, পরদিন রাতেই ঘটল সেই অদ্ভুত ঘটনাটা।

– কী ঘটনা ঘটল?

– সারাদিন ধরে বক্সা ফোর্ট দেখা হয়েছিল সেদিন। অতটা উঁচুনীচু পথ হেঁটে হেঁটে রাতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম দুজনে। শুতে শুতেই আমি ঘুমিয়ে কাদা। আমার ডায়াবেটিস আছে, রাতে বাথরুমে যেতে হয়। ভোররাতে একবার ঘুম ভেঙেছিল। কিন্তু বাথরুম থেকে ফিরে এসে যা দেখলাম তাতে আমার গায়ের সব রোম খাড়া হয়ে গেল।

– কী দেখলেন?

– দেখি ওই শীতের মধ্যে শ্রুতি উদোম গায়ে বিছানার ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। যেভাবে বাসে ট্রেনে লোক দাঁড়িয়ে থাকে সেভাবে। চোখমুখ অন্যরকম। আমি অবাক হয়ে বললাম– কী করছ? নেমে এসো! শ্রুতি অদ্ভুত হেসে অচেনা গলায় বলল– এই তো পরের স্টপেজেই নামব!

দৃশ্যটা কল্পনা করে শিহরন জাগল দিগন্তর শরীরে। তবুও মুখটাকে নির্বিকার রেখে বলল– তখন কী করলেন আপনি?

– বুঝিয়ে-সুঝিয়ে অনেক কষ্টে শান্ত করে শুইয়ে লেপ দিয়ে ঢেকে দিলাম ওকে। একটু পরে ঘুমিয়েও পড়ল ও। কিন্তু জয়ন্তী থেকে বাড়ি ফিরে আসার পর আমূল বদলে গেল শ্রুতি। কথাবার্তা একটু কেমন কেমন। সব সময়েই আনমনা। কিছু বললে চমকে চমকে ওঠে। বিড়বিড় করে একা থাকলে। শেষদিকে আমাকে চিনতে পর্যন্ত পারত না। ওই তান্ত্রিকই ওর সর্বনাশ করে দিল!

দিগন্ত আশ্বাসের স্বরে বলল– আপনি যা ভাবছেন তা নয়। আপনার স্ত্রীর যেটা হয়েছিল সেটা এক রকমের নিউরোলজিকাল ডিসওর্ডার। অনেক কারণে এটা হতে পারে। ওই তান্ত্রিকের সঙ্গে এর সম্পর্ক নেই। যাক গে, স্ত্রীকে ভালো জায়গায় ট্রিটমেন্ট করানো উচিত ছিল আপনার।

– ট্রিটমেন্টের কিছু বাকি রাখিনি স্যার। কিন্তু লাভ হয়নি। শেষদিকে শ্রুতি ঘরেই পায়খানা-পেচ্ছাপ করত। যখন তখন ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ত বাইরে। সে জন্য কী বলব… এমনকী ঘরে বেঁধে পর্যন্ত রাখতে হয়েছে ওকে। কোনও উপায় ছিল না আর।

– আপনার মেয়ে-জামাই সব শুনে আসেনি বিদেশ থেকে?

– ছুটে এসেছিল দু’জনে। তখন শ্রুতির বাড়াবাড়ি চলছে। কিন্তু ওদের দু’জনকে দেখলে আরও বেশি ভায়োলেন্ট হয়ে যেত শ্রুতি। তখন সিডেটিভ ইঞ্জেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখতে হতো ওকে। কিছুদিন থেকে ওরা একরকম পালিয়ে ফিরে গেল বিদেশে।

– কে দিত ওষুধ?

– একজন অ্যাটেনডেন্ট রাখা হয়েছিল নার্সিংহোম থেকে। মাঝবয়েসি একটা মেয়ে, তার নাম বকুল। সারাদিন থাকত। স্নান করানো থেকে খাওয়ানো-দাওয়ানো সব বকুলই করত।

– আপনার স্ত্রীর ডেথ সার্টিফিকেট কে ইস্যু করেছিল বলুন তো?

– আমাদের ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান ডক্টর ধৃতিমান ব্যানার্জি।

মোবাইলটা আবার বাজল। মিতুল গজগজ করতে করতে বলল– বাবা, এনাফ ইজ এনাফ। তোমার আর আসার দরকার নেই আজ। সারা রাত্তির তুমি চেম্বারেই থেকে যেও।

দিগন্ত কিছু বলার আগেই মিতুল লাইনটা কেটে দিল। অপ্রস্তুত হয়ে ফোনটা একটুক্ষণ হাতে ধরে থাকল দিগন্ত। মিতুলের রাগ হওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু এখন তার মুখোমুখি বসা লোকটির মনের অন্ধকার অলিন্দে আলো ফেলছে সে। এই পেশেন্ট ছেড়ে সে এখন যাবে কী করে!

– কে ফোন করেছিল স্যার? আপনার মেয়ে নাকি?

দিগন্ত হেসে বলল– হ্যাঁ। আমারও স্ত্রী নেই। বাড়িতে আমাকে শাসন করার লোক আমার মেয়েই। আজ বাড়িতে একটা অনুষ্ঠান আছে। সেজন্য তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার কথা বলে রেখেছে মেয়ে।

– যদি কিছু না মনে করেন স্যার… কী হয়েছিল আপনার স্ত্রীর?

দিগন্তর মুখে একটা ছায়া পড়েই মিলিয়ে গেল। একটা শ্বাস গোপন করে বলল– ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক। রাত্রে বুকে ব্যথা হয়েছিল। হসপিটালে নিতে নিতেই সব শেষ।

– ওহ। সরি স্যার।

দিগন্তর নাকে ছাতিমের গন্ধ আসছে। তাদের বাগানের ছাতিম গাছটায় বরাবর ফুল ফোটে খুব। পারমিতার প্রিয় ছিল ছাতিমফুল। বিকেলে সেই গাছের নীচে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকত পারমিতা। মজার ব্যাপার, পারমিতা চলে যাবার পর ছাতিম ফুলের নেশা পেয়ে বসেছে দিগন্তকেও। কিছু একটা চিন্তা করে দিগন্ত বলল– আচ্ছা, হাউজ ফিজিশিয়ান ওই ডাক্তারের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক ঠিক কেমন বলুন তো?

– কার কথা বলছেন, ধৃতিমান? আমরা এক পাড়াতে থাকতাম, স্কুলে দু’জনে একসঙ্গে পড়েছি। ধৃতিমান পড়াশোনায় ভালো ছিল, জয়েন্ট এনট্রান্স পরীক্ষা দিয়ে ডাক্তারি লাগিয়ে দিয়েছিল। দিন দিন ডাক্তারিতে পসার করেছে, কিন্তু একটুও অহংকার নেই। এই যে শ্রুতিকে দেখতে আসত আমাদের বাড়িতে, কিছুতেই ভিজিট নিত না।

আন্দাজে একটা ঢিল ছুড়ে দেখতে ইচ্ছে করছে দিগন্তর। একটা চান্স নেবে নাকি? অনেক সময় এভাবেই কাজ হয়। একটা ট্রাই করে দেখা যেতেই পারে। দিগন্ত দৃঢ় গলায় বলল– দেখুন আমি জানি আপনার মধ্যে কোথাও একটা অপরাধবোধ কাজ করছে। সেজন্য আপনার মৃতা স্ত্রী আপনার অবচেতনে ঘুরেফিরে আসছেন। আপনি কিছু একটু লুকোচ্ছেন আমার কাছে। প্রণয় ঘোষ আকাশ থেকে পড়েছে যেন। বলল– কীসের অপরাধবোধের কথা বলছেন স্যার?

দিগন্ত তাকিয়ে আছে প্রণয় ঘোষের দিকে। যেন ভেতরটা পড়ে নিচ্ছে এমন গলায় বলল– একটা কথা বলুন, সিডেটিভের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়ে চিরকালের মতো কে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছিল আপনার স্ত্রীকে? আপনার সেই ডাক্তার বন্ধু? নাকি আপনি নিজে?

হঠাৎ ঝাঁকি খেয়ে গেলে যেমন হয়, তেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেছে প্রণয় ঘোষের মুখ। ঠোঁটদুটো কাঁপছে একটু একটু।আবছা গলায় বলল– ক্-কী বলছেন স্যার আপনি?

দিগন্ত নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে এসেছে। প্রণয় ঘোষের পিছনে দাঁড়িয়ে পিঠে হাত রাখল আলতো করে।নরম গলায় বলল– দেখুন আমি পুলিশের লোক নই, গোয়েন্দাও নই। আপনি তো জানেন, ডাক্তারের কাছে কিছু লুকোতে নেই। আপনি নির্দ্বিধায় আমাকে সব বলতে পারেন। যা বলবেন সেটা আপনার-আমার মধ্যেই থাকবে। কিন্তু মনে রাখবেন আপনার চিকিৎসা করার জন্য আমার সব জানা জরুরি।স-অ-ব।

প্রণয়ের মুখের প্রত্যেকটা পেশি কাঁপছে। চোখের কোলে দু’-এক বিন্দু জল এসে পড়েছে। জামার হাতা দিয়ে চোখের জল মুছে নিল প্রণয়। ভেঙে পড়া গলায় বলল– শ্রুতিকে আমি কতটা ভালোবাসতাম সেটা আমিই শুধু জানি। কিন্তু চেনা মানুষটা যখন ধীরে ধীরে অন্যরকম হয়ে গেল, সে যে কী যন্ত্রণা… বিশ্বাস করুন স্যার, আর কোনও উপায় ছিল না।

দিগন্ত একটু শক্ত গলায় বলল– ইউথেনেশিয়া বা করুণামৃত্যু বিশ্বের কিছু দেশে চালু হলেও আমাদের দেশ যে এখনও অ্যাপ্রুভ করেনি, সেটা আপনার না জানা থাকলেও আপনার ডাক্তার বন্ধুটি নিশ্চয়ই জানেন। তাহলে?

প্রণয় ঘোষ অসহায় মুখ করে বলল– বিশ্বাস করুন স্যার, শ্রুতির চিকিৎসার জন্য সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে আমি অনেক খরচ করেছি। কিন্তু কিছু হচ্ছিল না। শেষ দিকে শ্রুতি অস্রাব্য গালিগালাজ করত, হাতের কাছে যা পেত ছুড়ে মারত। এই দেখুন আমার কপালের কাটা দাগ। সাঁড়াশি ছুড়ে মেরেছিল সামনে থেকে। চারটে স্টিচ পড়েছিল এখানে। একদিন ধৃতিমানের সামনে আমার গলা টিপে ধরেছিল। সেদিন ধৃতিমান বাঁচায় আমাকে। তারপর থেকে ওর হাত বেঁধে রাখা হতো।

– তার মানে এরকম একটা ফেজ যখন চলছে তখনই ডিসিশনটা নিয়েছিলেন আপনারা। তাই না?

– কথাটা প্রথম তুলেছিল তিন্নি। ও যখন এসেছিল তখন কাছ থেকে দেখেছে সব। ওকেও শ্রুতি চড়-ঘুঁসি মেরেছে, ঘরের মধ্যে পায়খানা করে ওর মুখে লেপে দিয়েছে। বিদেশে ফিরে যাবার পর কাঁদতে কাঁদতে তিন্নি আমাকে বারবার ফোন করে বলেছে কিছু একটা করতে। চূড়ান্ত কিছু।

দিগন্ত নিস্পৃহতা ডিঙিয়ে আর্দ্র স্বরে বলল– সেই রাতের কথাটা এবার মনে করুন তো। ঠিক কী ঘটেছিল সেদিন?

প্রণয় ঘোষ নখ খুঁটতে খুঁটতে বলল– আগের সপ্তাহেই ডিসিশন নিয়েছিলাম আমরা। সেদিন রাতে বকুল চলে যাবার পর দশটা নাগাদ ধৃতিমান এল। একটা হাত বাঁধা, শ্রুতি তখন ঘুমোচ্ছিল। অন্য হাতে চ্যানেল করাই ছিল। সিরিঞ্জ রেডি করে আমার হাতে ধরিয়ে দিল ধৃতিমান।কীভাবে ওষুধ পুশ করতে হয় সেটা শিখিয়ে দিয়েছিল।

– তারপর?

– ধৃতিমান অপেক্ষা করছিল বাইরে। আমি ওষুধটা পুশ করে ওকে ডাকলাম। ধৃতিমান ঘরে এসে শ্রুতিকে দেখল। তারপর চলে গেল। আমি গেট বন্ধ করে দিয়ে জেগে রইলাম সারা রাত। পরদিন সকালে এসে ডেথ সার্টিফিকেট লিখে দিয়েছিল ধৃতিমান। সকালের মধ্যেই পাড়ার জ’না পাঁচেক ছেলের সঙ্গে মরচুয়ারি ভ্যানে করে শ্মশানঘাটে নিয়ে গিয়েছিলাম বডি। এক ঘণ্টার মধ্যে দাহ করে ফেলা হয়েছিল। কেউ কিছু বুঝতে পারেনি।

দিগন্ত ভুরু তুলে বলল– আপনার স্ত্রী কি ঘুমের মধ্যেই মারা গিয়েছিলেন?

– না ঠিক তা নয়। কী হয়েছিল পুরোটা বলি। সেদিন রাতে ধৃতিমান যখন বাইরে, তখন আমি বিবেকের তাড়নায় ছটফট করছি। কিছুতেই কাজটা করে উঠতে পারছি না। এক সময় মনের সবটুকু জোর এক করে শ্রুতির হাতের চ্যানেলে সিরিঞ্জের ওষুধ পুশ করে দিলাম। শ্রুতির শান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে সব পুরোনো কথা মনে পড়ছিল। হু হু করছিল ভেতরটা। ঠিক তখনই হঠাৎ ধীরে ধীরে চোখ মেলল শ্রুতি। কী বলব স্যার, একদম স্বাভাবিক চোখের দৃষ্টি। আমার দিকে একপলক তাকিয়ে কেমন একটু হেসে বলল– ‘ভালো থেকো’।

রোম দাঁড়িয়ে গেছে দিগন্তর। বিভ্রান্ত মুখে দিগন্ত বলল– কী বললেন?

– ‘ভালো থেকো’। একদম সুস্থ মানুষের মতো করে কথাটা বলে আবার চোখ বুজে ফেলেছিল ও। তারপর থেকেই কথাটা গেঁথে গেল আমার বুকের মধ্যে।

দিগন্ত একটু ঝাঁকি খেয়েছিল। নিজেকে গুছিয়ে নিল এবার। বলল– সেদিন কী হয়েছিল আমি বুঝিয়ে বলছি। সেই চূড়ান্ত সময়ে আপনার মস্তিষ্কের নিউরনের ব্যালান্স ঠিক ছিল না। ফলে একটা হ্যালুসিনেশনের মতো হয়েছিল আপনার। সেটা খুব স্বাভাবিক। আপনি যেহেতু খুনি নন একেবারেই নর্মাল মানুষ, তাই একটা অপরাধবোধ আপনাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। আপনার স্ত্রীর মৃত্যুর পর এই যে একটু একলা হলেই কানের কাছে ‘ভালো থেকো’ শব্দটা শুনছেন, সেটা আসলে একটা অডিটরি হ্যালুসিনেশন। বিভ্রম একরকম। যা শুনছেন সবটাই আপনার কল্পনা।

প্রণয় ঘোষ একটু অবাক হয়ে বলল– কল্পনা? কী বলছেন স্যার?

দিগন্তর হাসিতে আত্মবিশ্বাসের ঝলক। ঘাড় নেড়ে বলল– হ্যাঁ, কল্পনা। এমন কেস মোটেই রেয়ার নয়। আসলে সত্যি সত্যি কিন্তু কোনও শব্দ আসছে না। আপনি ভুল শুনছেন। আপনাকে মনের জোর বাড়িয়ে এই ফেজ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে যত শিগগির সম্ভব। নইলে কিন্তু এরপর ভিজুয়াল হ্যালুসিনেশনও হতে পারে।

– এর কি কোনও চিকিৎসা নেই স্যার?

– নিশ্চয়ই আছে। আগে মনোবিশ্লেষণের সাহায্যে আমরা চিকিৎসা করতাম। কিন্তু এখন অনেক ভালো ভালো ড্রাগস এসে গেছে আমাদের হাতে। খসখস করে প্রেসক্রিপশন লিখে প্রণয়ের হাতে দিয়ে দিগন্ত বলল– আমি ওষুধ লিখে দিয়েছি। আপনি পনেরো দিন বাদে আমাকে রিপোর্ট করবেন।

প্রণয়ের দেওয়া ফিজ নিতে নিতে দিগন্ত পেশাদারি গলায় বলল– ভয় পাবেন না। আপনার যা হয়েছে সেটা একরকম মানসিক রোগ। এই ধরনের পেশেন্টরা নিরানব্বই শতাংশই আর ডাক্তারের কাছে রিপোর্ট করতে ফিরে আসেন না। আমার দৃঢ় বিশ্বাস আপনিও আর আসবেন না।

প্রণয় ঘোষ চলে যাবার পর চেয়ারে বসে গা এলিয়ে দিল দিগন্ত। ষষ্ঠী উঁকি দিয়েছে দরজা ফাঁক করে। দিগন্ত শ্রান্ত গলায় বলল– এক কাপ কফির ব্যবস্থা করতে পারবে ষষ্ঠী? টায়ার্ড লাগছে একটু। কফিটা খেয়েই বেরোব।

দিগন্ত লম্বা শ্বাস নিল একবার। ছাতিম ফুলের ঘ্রাণের অনুষঙ্গে ফেলে আসা দিনগুলো ভেজা বাতাসের মতো ছুঁয়ে দিয়ে গেল যেন তাকে। সুখী দাম্পত্যই ছিল তাদের দু’জনের। কিন্তু পারমিতা আর তার মাঝখানে আচমকা এসে পড়েছিল তৃতীয় একজন। সদর হসপিটালের অ্যানিস্থেসিস্ট ডক্টর সেনাপতির স্ত্রী অদিতি।

রূপসি দু’ধরনের হয়। কোনও কোনও সুন্দরী নারীর রূপ হয় সুগন্ধি চন্দনের মতো, স্নিগ্ধ। কেউ কেউ আবার রূপের আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয় সব। গ্রীষ্মবনের মধ্যে এক ধরনের জ্বালা আছে। অদিতি ছিল ঠিক তেমন। তার সঙ্গে দিগন্তর আলাপ হয়েছিল একটা পার্টিতে। সাদামাটা কথা হয়েছিল একটা দুটো। তারপর থেকেই দিগন্তর দিকে একটু একটু করে ঝুঁকে পড়ল অদিতি। সাপের মতো জড়িয়ে নিল নিজের বেষ্টনীতে। ডক্টর সেনাপতি সারাদিন মদে চুর হয়ে থাকতেন। তিনি জানতেও পারলেন না তাঁর স্ত্রী কীভাবে খাদের অতলে ধীরে ধীরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে দিগন্তকে।

সেদিন সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়ে অদিতির সঙ্গে সারাটা দিন গরুমারা ফরেস্টের এক রিসর্টে কাটিয়ে এসেছিল দিগন্ত। ডক্টর সেনাপতি কিছু জানতে না পারলেও কোনও শুভানুধ্যায়ী পারমিতার কানে পেৌঁছে দিয়েছিল মুচমুচে খবরটা। সন্ধেবেলা তীব্র অশান্তি হয়েছিল দিগন্ত আর পারমিতার মধ্যে। ঝগড়াঝাঁটির পর পারমিতা থম মেরে ছিল সারাক্ষণ। দিগন্তও বউয়ের সঙ্গে কোনও কথা বলেনি। স্টাডিরুমে জার্নাল পড়ছিল অনেকক্ষণ ধরে। অনেক রাতে দিগন্ত বিছানায় এসে দেখে মিতুল ঘুমোচ্ছে অকাতরে, কিন্তু পারমিতা শোয়নি। বসে আছে বিছানায়। ঠিকরে বেরোচ্ছে চোখ। দিগন্ত সামনে যেতেই ঘরঘরে গলায় বলেছিল, বুকের মধ্যে চাপ ধরে আসছে। কষ্ট হচ্ছে খুব।

ঘুমন্ত মিতুলকে বাড়িতে তালাবন্দি করে রেখে গাড়ি চালিয়ে পারমিতাকে নিয়ে হসপিটালের দিকে যাচ্ছিল দিগন্ত। গাড়ির মধ্যেই কষ্ট বেড়ে গিয়েছিল পারমিতার। ড্রাইভিং সিটে ছিল দিগন্ত, পিছনের সিটে কোলকুঁজো হয়ে শুয়ে গোঙাচ্ছিল পারমিতা। দিগন্ত গাড়ির গতি কমিয়ে পিছন ফিরে ঝুঁকে দেখছিল বারবার। পারমিতা দিগন্তর হাত আঁকড়ে ধরেছিল শেষ সময়ে। একটা কথাই শুধু বলেছিল ফিসফিসিয়ে। ‘ভালো থেকো’। ওই একটাই কথা। তারপর চোখ বুজে ফেলেছিল চিরকালের মতো।

প্রণয় ঘোষ যতক্ষণ তার চেম্বারে ছিল দিগন্ত সারাক্ষণ চেষ্টা করেছে পেশাদারি নির্লিপ্তি বজায় রাখার। কিন্তু এই দুটো ঘটনাটার যে এমন অদ্ভুত মিল, তার বিশ্লেষণ করতে গিয়ে কিছুতেই থই পায়নি। প্রণয় ঘোষ জানে না, জানবেও না কোনওদিন যে, কিছুদিন ধরে সে যা শুনছে, গত দশ বছর ধরে সেটাই শুনে আসছে দিগন্ত। একটু একলা হলেই পারমিতা কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলে ‘ভালো থেকো’।

দিগন্ত তার ডাক্তার বন্ধুদের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধপত্র খেয়েছে বিস্তর, কিন্তু লাভ হয়নি। পারমিতার মৃত্যুর পর অদিতি ছিটকে চলে গেছে তার নিজস্ব বৃত্তে। দিগন্ত থেকে গেছে অন্যদিকে। মিতুলের সুখস্বাচ্ছন্দ্য ঘিরে এখন আবর্তিত হয় তার ভাবনা। তবুও একটু একা হলেই তার নিজস্ব নিভৃতিতে পারমিতা চলে আসে তার কাছে। কানের কাছে মুখ নিয়ে শুধু একটা কথা বলে। ‘ভালো থেকো’।

মৃত্যুর সময় আমাদের চেতনা ক্ষীণতর পর্যায়ে চলে যায়। চরমতম মুহূর্তে চেতনার পূর্ণ অবলুপ্তি ঘটে। সমস্ত স্মৃতি লোপ পায় আর জীবের মন, বুদ্ধি, অহংকার, ইন্দ্রিয়, প্রকৃতি ও কর্মফল জীবাত্মাকে অবলম্বন করে সূক্ষ্মদেহে অব্যক্ত স্থিতিতে চলে যায়। কিন্তু দিগন্ত কিছুতেই ভেবে কূল পায় না, চেতনার ক্ষীণতম মুহূর্তে দু’জন ভিন্ন মানুষ কী করে এই একটা কথাই উচ্চারণ করেছিল! এর মধ্যে কি কোনও গভীর তাৎপর্য আছে? দুটো মৃত্যুর ক্ষেত্রেই সে আর প্রণয় ঘোষ, তারা দুজনে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ ভাবে দায়ী। সেজন্য কি চরমতম সময়ে তাদের দুজনের দুর্বল হৃদয় ভুল শব্দ পৌঁছে দিয়েছিল তাদের মস্তিষ্ককে? ওই ‘ভালো থেকো’ কথাটা কি সে কারণেই শুনতে পায় তাদের অবচেতন মন?

কফির কাপটা টেবিলে রাখল দিগন্ত। কাচের পাত্র থেকে দু’হাতের অঞ্জলিতে তুলে আনল একরাশ ছাতিম ফুল। ছাতিমফুলের গন্ধের মধ্যে একটা বিধুর বিষণ্ণতা আছে। সেই বিষণ্ণতা চারিয়ে গেল তার সমস্ত শরীরে। এতদিনে দিগন্ত বুঝে গেছে যে সে নিজে শতকরা একশোভাগ মনারোগীর দলে। প্রণয় ঘোষ সেরে উঠতেও পারে কিন্তু এ জীবনে রোগমুক্তি ঘটবে না তার। কোনও নিশ্চয়তায় সে পেৌঁছোতে পারবে না কোনওদিন। ‘ভালো থেকো’ কথাটা তার রক্তের মধ্যে মিশে গেছে। বিদ্রুপের মতো ঘুরপাক খাচ্ছে অহর্নিশ তারা শিরা-ধমনি জুড়ে। এভাবেই প্রত্যয়-অপ্রত্যয়ের অনিকেত দোলাচলে তাকে কাটাতে হবে সারা জীবন। তার বাকি জীবন এভাবেই উত্তীর্ণ হবে এক আদি-অন্তহীন অনিশ্চয়তায়।

Tags:
COMMENT