আত্মহত্যা করার জন্য দমদমে রেল-লাইনের ধারে এসে দাঁড়াল অম্বরীশ। রাত তখন দশটা বেজে গেছে। মাঘ মাসের রাত। বেশ ঠান্ডা। অম্বরীশের হাতে সিগারেট। একটা লম্বা টান দিতেই, আগুনটা জোরালো হল। সেই আগুনের হালকা আলোয় দেখতে পেল, তিনটে ইটের ওপর মাটির হাঁড়ি রেখে লাইনের ধারে ঝোপের পাশে একটা লোক ভাত রান্না করছে। পাশে একটা বাচ্চা খেলা করছে।

অম্বরীশের মায়ের কথা, বেশি করে, মায়ের মুখটা মনে পড়ছে। দুর্বল করে দিচ্ছে তাকে। পরক্ষণেই শক্ত করে নিচ্ছে নিজেকে। না হলে সে পারবে না। সবাইকে নিজের কাছে খারাপ করে তুলতে হবে। মনকে বিষিয়ে নিতে হবে। অনুভূতিটাকে কেউ ভালোবাসে নার জায়গায় নিয়ে যেতে হবে। অম্বরীশ ভাবে, শুধু তো মালবিকার বাবা-মা নয়, আমার নিজের বাবা-মা-ও তো ষড়যন্ত্রী। তারাও তো একবারও ভাবেনি মালুকে না পেলে অম্বুর কতটা কষ্ট হবে!

আজকে এই বিংশ শতাব্দীর শেষ লগ্নে এখনও রাশি, গণ, গোত্র, কুষ্ঠির দোহাই দিয়ে একটা প্রেমকে ওরা হত্যা করল। অম্বরীশ শুধু একটা রহস্যই ভাবতে লাগল যে, কীভাবে ভবিষ্যতের অকল্যাণের ভয় দেখিয়ে ওরা মালবিকাকে রাজি করাল। দূরে সরিয়ে দিল আমার থেকে। এক কথায়, ওর বাবার পছন্দ করা ছেলেকে বিয়ে করতে রাজি হয়ে গেল। আমি হাতজোড় করে, বুক চিরে মনটা দেখাতে চেয়েছি, কেউ করুণা করেনি। আজকে সব শেষ করে বুঝিয়ে দেব, আমাদের কীসে কল্যাণ।

যে-মালবিকার ভোরবেলা ভৈরবী রাগের আরোহণ, অবরোহণের প্রতিটি স্বরনিক্ষেপ জানলা দিয়ে ভেসে এসে হৃদয় আন্দোলিত করে দিত। প্রথম বুঝেছিলাম কর্ণ একটা ইন্দ্রিয়। সামান্য হলুদ জামাটা বারান্দায় একবার চোখের দেখা দেখলে বুঝতাম ইন্দ্রিয়সুখ কাকে বলে। গত অষ্টমীতে, পাশে দাঁড়িয়ে অঞ্জলি দেবার সময় যে-গন্ধটা পেয়েছিলাম, সেটা আজও নাকে স্পষ্ট। গত বছর দোলে মালু বুঝিয়ে দিয়েছিল, জিহ্বা, ত্বক সবই ইন্দ্রিয়। সেই মালবিকাকে তোমরা কেড়ে নিলে! শাস্তি তোমাদের পেতেই হবে।

পাঁচ নম্বর রেল লাইনের দিকটা নির্জন কিন্তু অনেকক্ষণ কোনও ট্রেন আসছে না। দেরি হয়ে যাচ্ছে। আবার; গত বছর সরস্বতী পুজোয় শাপমোচন নৃত্যনাট্যর কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। আলোকের এই ঝরনাধারায় গানের সাথে আলতার ফোঁটা দেওয়া নরম ফর্সা রক্তাভ ওই পেলব হাতের যে-নৃত্যভঙ্গিমা আজও আমার বুকে মোচড় দেয়, সেই হাত দুটো আজ মঙ্গলঘটে অন্য পুরুষের হাতের ওপর। এ অসম্ভব! এ নিয়ে বেঁচে থাকা যায় না।

আমি মঞ্চের পিছনে অন্ধকারে ভাষ্যপাঠ করছি, গন্ধর্বকুমার, অরুনেশ্বরের কথা কমলিকাকে…। কিন্তু না! কেন এত ভালো হচ্ছে, আমি জানি। আসলে অম্বরীশ তো মালবিকাকেই বলছে। সবাই মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছে। নাচের সাথে, মালবিকার যে-হাসিটা আমি প্রাণভরে দেখেছি, সেটার জন্য, শুধু সেটার জন্য, আমি এক পৃথিবী সুখ হেলায় ছেড়ে দিতে পারি। ওই তো! ট্রেন আসছে। অম্বরীশ প্রস্তুত। একবার আকাশের দিকে তাকাল, চাঁদের দিকে, নাকি তার জ্যোত্স্নার দিকে। বিদায় পৃথিবী। ঝাঁপ দিয়ে দিল অম্বরীশ।

চোখে একটা ঠান্ডা জলের ঝাপটা। তা-ও চোখ খুলতে পারছে না অম্বরীশ। মাথার পিছনে অসহ্য একটা ব্যথা অনুভব হচ্ছে। ধীরে ধীরে একটু ফাঁক করল চোখটা। আবার সেই একই চাঁদ-টা মুখের ওপর। তবে জ্যোত্স্না-টা এবার ভেজা। সেই পাগলাটে ধরনের লোকটা, মুখটা ওর মুখের কাছে নিয়ে এসে পরিষ্কার ঝকঝকে বাংলায় বলল, মরতে যাচ্ছিলেন কেন? পৃথিবীতে এমন কোনও কারণ হতে পারে না, যা থেকে আত্মহত্যা ছাড়া আর কোনও পথ খোলা নেই। মৃত্যু কোনও সমাধান নয়, ওটা হেরে যাওয়া। বাঁচার রসদ সবসময় আছে, মানুষ খুঁজে পায় না। আপনার ইচ্ছে করলেও আপনি চিরকাল বাঁচতে পারবেন না। এত তাড়া কীসের? অম্বরীশ বোকার মতো তাকিয়ে আছে।

আমার গল্প শুনলে তাহলে আপনি কী করবেন?

অম্বরীশ ধীরে ধীরে উঠে বসল।

লোকটি শুরু করল, আমি মালদার বাসিন্দা। কলেজের পড়াশোনা শেষ করে, একটা ছোটো চাকরি নিলাম। মন বসছিল না সেই চাকরিতে। নিজের ব্যাবসা ছোটো করে শুরু করলাম। একটা ছোটো ঘর নিয়ে এসটিডি বুথ করলাম। ফ্যাক্সও বসালাম। বেশ ভালো চলছিল। বিয়ে করলাম। একটি ছোটো ফুটফুটে মেয়ে হল। মেয়ে আমার লক্ষ্মী। পেজার-এর ব্যাবসায় নামলাম। ব্যাবসা ফুলেফেঁপে উঠতে লাগল। বাড়ি, দোকান, ব্যাংক-এ বন্ধক দিয়ে অনেক টাকা লোন নিয়ে ব্যাবসায় পুঁজি বাড়ালাম। পেজার তখন মুড়ি-মুড়কির মতো বিক্রি হতো। প্রচুর টাকার মাল, সস্তায় তুললাম। হঠাৎ বাজারে এল মোবাইল। ধীরে ধীরে তার দাম, কলচার্জ সব কমতে লাগল। মানুষ পেজার ছেড়ে মোবাইলের দিকে ঝুঁকে পড়ল। এসটিডি, ফ্যাক্স সব ধীরে ধীরে বন্ধ হতে শুরু করল। যাদের পুঁজি অনেক বেশি, তারা লাইন চেঞ্জ করতে পারল।

প্রচুর ছোটো ব্যবসায়ী নিঃশব্দে নিঃস্ব হয়ে গেল। আমার বাড়ি দোকান সব চলে গেল। সংসারে শুরু হল চরম অশান্তি। স্ত্রী একদিন মেয়েকে নিয়ে বিষ খেল। সব শেষ। ছমাসের মধ্যে আমার সুন্দর পৃথিবী অন্ধকার হয়ে গেল। ওখানে আর লজ্জায় থাকা সম্ভব নয়। অল্প

যে-টাকাপয়সা ছিল, সঙ্গে নিয়ে অজানার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম। এক স্টেশন থেকে আর এক স্টেশনে।

মাস ছয়েক হল এই দমদম স্টেশনে এসেছি। উদ্দেশ্যবিহীন ভাবে বেঁচে থাকার শক্তি ক্রমশ হারিয়ে ফেলছিলাম। একদিন মোটামুটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম, সব যখন শেষ হয়ে গেছে,আর এভাবে জীবনকে টেনে লাভ নেই। সেই সময় ঈশ্বর বাঁচার রসদ জুগিয়ে দিলেন। ওই বাচ্চা মেয়েরা। কে যেন ফেলে দিয়ে চলে গেছে। সেই থেকে ওকে নিয়ে আছি।

দু-তিনটে দোকানে ফাইফরমাস খাটি। ভালোই আছি। রান্না করি, দুজনে খাই। তবে এবার ওই সামনের বস্তিতে একটা ঘরভাড়া নেব।

অম্বরীশ মৃত্যুকে খুব কাছে থেকে দেখে নিয়েছে। এবার যেন জীবনকে দূর থেকে দেখতে পাচ্ছে। সারা শরীরে অসহ্য ব্যথা নিয়ে বাড়ির পথে রওনা হল।

বিশ বছর কেটে গেছে। যাদবপুর থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করে কিছুদিন পর চাকরি নিয়েছিল অম্বরীশ। বাবা-মার অনুরোধে সংসারও পাতল। স্ত্রী অতসী। ভারী ভালো মেয়ে প্রেমিকার গুণ কম থাকলে, স্ত্রীগুণ বেশি থাকে মেয়েদের। সেটাই সংসার গড়তে বেশি কাজের। আর ছেলেদের কথা আমি লিখতে পারব না, কারণ কোনও ক্ষেত্রেই আমি সফল নয়। যে-সব পুরুষের কাছে সেই শংসাপত্র আছে, অন্তত পরিপূর্ণ প্রেমিক বা সফল স্বামী যে-কোনও একটা বা দুটোই তকমা আছে তারা বলতে পারবে। ওদের দুটো

ছেলে-মেয়ে আছে। বজ্র, আর বৃষ্টি। ছেলে বড়ো, মেয়ে ছোটো। এখন অম্বরীশ প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। দক্ষিণ কলকাতায় থাকে।

ওদিকে মালবিকার বিয়ে হয়েছিল মযূখের সাথে। মযূখ ব্যাংক-এ চাকরি করে। যাদবপুরে নিজেদের বাড়ি। ওদের একটাই ছেলে। মৈনাক, ডাক্তারি পড়ে। মালবিকা বরাবরই নাচে গানে পারদর্শী। ছেলেকে তবলা শিখিয়েছে। ভালোই বাজায়।

ঘটনাটা ঘটল একদিন প্যান্ট কাচতে গিয়ে মালবিকার বরাবরের অভ্যাস সব পকেট হাতড়ে তারপর ওয়াশিংমেশিনে দেওয়া। মৈনাকের প্যান্টে মানিব্যাগটা থেকে গেছে। ব্যাগের ভেতরের খাপে একটি মেয়ে ফটো। মুখটা মালবিকার খুব চেনা। কিন্তু কোথায় দেখেছে, মনে করতে পারছে না।

মেয়ে বন্ধু এখন সব ছেলেরই অনেক থাকে। সবই এখন কো-এডু স্কুল। সেই আগের পাঁচিল এখন ভেঙে গেছে। আগে যেমন আইবুড়ো ছেলেমেয়ে কথা বললেই, বড়োরা ভাবত প্রেম করছে। আর এখন প্রেম করলেও কথা বলে না। সবটাই তরঙ্গবাহিত। ডিজিটাল প্রেম। তবে প্রেম করলে, সাজ বাড়বে, আর গলায় সুর না থাকলেও একটু গুন গুন করবেই। মালবিকারও ছেলের হাবভাব কিছুদিন হল ভালো ঠেকছিল না।

মৈনাক বাথরুমে ঢোকার পর ওর মোবাইলটা দেখল মালবিকা। একটা মেসেজ রয়েছে একটা নাম্বার থেকে, প্রোফাইলে কোনও ছবি নেই। একটা গোলাপ ফুলের ফটো। লেখা রয়েছে বৃষ্টি ঠিক সময়ে আসবে, তুমি দেরি করবে না।

বাথরুম থেকে বেরাবোর পর মালবিকা সরাসরি মৈনাক-কে জিজ্ঞেস করল, মানিব্যাগের ভেতর ছবিটা কি বৃষ্টির? এসব ক্ষেত্রে আত্মরক্ষার সেরা উপায় হল আক্রমণাত্মক হওয়া। স্বাভাবিক ভাবেই মৈনাক সেই রাস্তাই নিল। বলে উঠল, কে বৃষ্টি?

মালবিকা অনেক বুঝিয়ে বলল, এটা কোনও অপরাধ নয়। আসলে এখনকার অভিভাবকরা অনেক আধুনিক। সাহস পেয়ে মৈনাক স্বীকার করল। ওরা পরস্পরকে ভালোবাসে। পুরো নাম বৃষ্টি সেনগুপ্ত।

এক নিঃশ্বাসে মালবিকা প্রশ্ন করল, বাবার নাম?

অম্বরীশ সেনগুপ্ত।

মুহূর্তে, তদন্ত করতে গিয়ে নিজের মুখটাই অপরাধীর মতো হয়ে গেল মালবিকার। মুখে আচ্ছা বলে নিজেই প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে নিল। চোখ দুটো কিন্তু অম্বরীশের মতো টানা আর উজ্জ্বল। তবে হোয়াটসঅ্যাপ থেকে বৃষ্টির নাম্বারটা আগেই টুকে রেখেছে। মৈনাক বেরিয়ে যাবার পর, অনেক দোটানা কাটিয়ে মালবিকা বৃষ্টি-কে ফোন করল।

হ্যালো? আমি মৈনাকের মা বলছি।

হ্যাঁ আন্টি, বলো…।

মালবিকা ভাবল নতুন প্রজন্মের মেয়েরা কত চৌখস। জানা নেই, শোনা নেই, দ্বাদশ শ্রেণীতে পড়া একটা মেয়ে প্রথমেই তুমি, আর কী আপন সম্মোধন!

তুমি মৈনাককে চেনো?

হ্যাঁ আন্টি, আমি তো ঢাকুরিয়া কলাকুঞ্জে নাচ শিখি। ওখানেই আলাপ।

মৈনাক কি তোমার বন্ধু?

হ্যাঁ, আমাদের নাচের ক্লাসে তবলা বাজায় তো।

জানি, তোমরা কি শুধুই বন্ধু?

হ্যাঁ আন্টি, মৈনাকদা খুব ভালো ছেলে।

মালবিকা মনে মনে ভাবল, অম্বরীশের মেয়েটা খুব পাকা হয়েছে তো! ওইটুকু মেয়ে দুমিনিটে ফোনেই মুগ্ধ করার ক্ষমতা রাখে। মেয়েটিকে ভালো লাগছে মালবিকার। দেখতেও বেশ চটক আছে। মালবিকা ওর বাবার ফোন নাম্বারটা চাইল।

এবার একটু ভয় পেয়েছে বৃষ্টি! জিজ্ঞেশ করল, কেন আন্টি? না মানে; আমি কিন্তু কোন ইয়ে..

তোমার কোনও ভয় নেই। তোমার বাবা তোমায় একটা কথাও বলবে না। আমি কথা দিলাম।

বাবা বকবে না তো আন্টি?

না রে বাবা, তোর কোনও ভয় নেই। ফস্ করে মুখ থেকে তুই বেরিয়ে গেল মালবিকার। বৃষ্টি, ওর বাবার নাম্বার পাঠিয়ে দিল।

মালবিকা ভাবছে, এই মেয়ে তুলনায় ওর ছেলে তো ভীষণ বোকা। আসলে, ছেলেরা পুরুষ হয় বিয়ে পর। আর মেয়েরা বযঃসন্ধিতেই নারী হয়ে যায়। তবে মেয়েটি ভারি মিষ্টি। অম্বরীশকে কি ফোন করা উচিত হবে? মযূখ যদি জানতে পারে। মযূখ ওকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করে। পরক্ষণেই ভাবল, একজন অভিভাবক আর একজন অভিভাবকের সঙ্গে দেখা করবে, এতে বিশ্বাসভঙ্গের কোনও ব্যাপার নেই। সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে অম্বরীশকে ফোনটা করেই ফেলল মালবিকা।

হ্যালো… হ্যালো… হ্যালো…? কথা বলতে পারছে না মালবিকা।

অম্বরীশ গম্ভীর গলায় আবৃত্তি করত। এখন গলা আরও গম্ভীর হয়ে গেছে। মালবিকার গলা কেঁপে গেল।

আ…মি মালু।

ওপারেও নীরবতা। তারপর ভীষণ আস্তে। কেমন আছো?

সুখের সংসারে যেমন সবাই ভালো থাকে। তোমার খবর বলো।

ভালোই। আমার নাম্বার পেলে কোত্থেকে?

বৃষ্টি দিয়েছে।

তুমি বৃষ্টিকে চেনো?

হ্যাঁ, কলাকুঞ্জে আমার ছেলে তবলা বাজায়।

একদিন দেখা করবে?

বলো… কোথায়?

শনিবার বিকেল চারটে, গড়িয়াহাট আনন্দমেলা।

আসার আগে ফোন করে নিও। আমি এখন অন্যের বউ, তোমার প্রেমিকা নয়। বলে হাসল।

ফোন রেখে মালবিকা ভাবতে লাগল, সে আবার দুর্বল হয়ে পড়বে না তো! পরক্ষণেই ভাবল, জীবনের মধ্যাহ্বে যে-উত্তাপকে সে চেপে রাখতে পেরেছে, এখন এই গোধূলি বেলায় রং ছড়াতে পারে বড়োজোর, রঙিন করতে পারবে না।

কেন জানি না! আজ একটু অন্যরকম সাজল মালবিকা। আবির রঙের ফিনফিনে সিফনের শাড়ি, সঙ্গে ফিরোজা ব্লাউজ। পিঠে একরাশ খোলা চুল। কয়েক গোছা অবাধ্য কপালের ওপর। চল্লিশ পেরিয়ে শাঁখের মতো বক্ষ। কলকে ফুলের মতো নাভি। মনকে যতই অভিভাবক বলে সান্ত্বনা দিক, পুরোনো ব্যথা সারে না। আজকে আয়নায় একটু বেশিই দেখছে নিজেকে। হয়তো আর একবার একটু দুর্বল করতে চাইছে অম্বরীশকে। এমনিই…।

ঠিক বিকেলবেলা গড়িয়াহাট মোড়ে গিয়ে দাঁড়াল। দূর থেকে দেখল, অম্বরীশ আসছে। বরাবরই গম্ভীর প্রকৃতির। গাম্ভীর‌্যটা আরও বেড়েছে। দুজনে চোখাচোখি হল। পুরোনো হিন্দি সিনেমায়, মেলায় বা নৌকাডুবিতে হারিয়ে যাওয়া যমজ ভাইকে খুঁজে পেলে যে-দৃষ্টি বিনিময় হতো, ঠিক সেই ভাবে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে থাকল। দুজনে গিয়ে কফি ক্যাফে ডে-তে বসল। দু-একটা কথা বলার পরেই স্বাভাবিক নারীসুলভ প্রশ্নটাই করল মালবিকা, তোমার বউয়ের কথা বলো।

অম্বরীশ বলল, ভালো।

আমার থেকে সুন্দরী?

মোবাইলে অতসীর ছবিটা দেখাল, তারপর বলল, পাহাড়ও সুন্দর, আবার সমুদ্রও সুন্দর। এর তুলনা চলে না। এক জায়গায় ঢেউ বিশেষ মুহূর্তে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে, অপর জায়গায় অনন্তকাল ধরে তরঙ্গ গতিশীল।

বাব্বা! এখনও সেই গম্ভীর গলায় ভারী ভারী কথা।

যাকগে, তোমার কথা বলো।

মযূখ দারুণ মানুষ। ছেলেটাকেও ভালো মানুষ করেছি। ঠিকই আছে। আচ্ছা, আমাদের বিয়ে হলে কি আমরা বেশি সুখী হতাম?

প্রেমের শ্রেষ্ঠ পরিণতি বিরহ, বিবাহে তার মৃত্যু। সংসারে একটা সুখের অভ্যাস আছে, বিরহবেদনায় একটা বিলাস আছে। দৈনন্দিন জীবনের বিক্ষিপ্ত মনামোলিন্য, কখনও হতে পারে তিক্ত। কিন্তু সেটার অভাবে তুমি আরও বেশি রিক্ত।

তাহলে মশাই, আমদের ছেলে-মেয়েরা যে প্রেম করছে তার কী হবে?

মনে করো না একই হিমবাহ থেকে তৈরি দুটো ঝরনা। নদী হয়ে কিছুটা যাবার পর আবার সমুদ্রে মিশছে। ওদের-কে এখন ওদের মতো ভাসতে দাও।

মালবিকা অম্বরীশের হাতের ওপর হাত রাখল। ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামছে। গোধূলির আকাশে শরীর না মিললেও, দিগন্তে রক্তের সাথে রক্ত মিশে যাচ্ছে।

Tags:
COMMENT