পরদিন আমরা হালকা ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়ে পড়লাম। অভিদা আফটারনুন সেশনে অফিস থেকে সরাসরি এসে জয়েন করবে। বেনাচিতি মার্কেটে দু’বার ফুচকা খেয়ে ফুটপাত ধরে হাঁটছি আর হা হা করে হাসছি। হঠাৎ অভিদার গাড়ি ঘ্যাঁচ করে ব্লেক মেরে দাঁড়িয়ে গেল। ড্রাইভার নেমে আমাদের হাত থেকে প্যাকেটগুলো নিয়ে ডিকিতে রাখল। আমরা হুড়মুড় করে পিছনের সিটে বসে গেলাম। গাড়ি বেশ কিছুটা গিয়ে একটা সুন্দর পার্কের সামনে থামল। নেমে দেখি একটা নামি রেস্তোরাঁ। সবাই হই হই করে ভিতরে ঢুকলাম। ওরা দুই বোন ওয়াশরুমে গেলে, অভিদা আমায় দেখাল, একটা রাস্তা সোজা বিশাল শপিং মলে মিট করেছে। সেখানে সব চোখধাঁধানো শোরুম। অভিদা ফিসফিস করে আমার কানের কাছে মুখ এনে বলল, ‘সারপ্রাইজ আছে।”

জমিয়ে মোগলাই লাঞ্চ সেরে আমরা শপিং মলে ঢুকলাম। এবার অভিদা হাটে হাঁড়ি ভেঙে বলল, ‘আমি আমার সুন্দরী স্ত্রী-কে একটি হিরের সেট প্রজেন্ট করব। তোমরা সেটা পছন্দ করে দেবে।’ টাপুর আর আমি লাফিয়ে উঠলাম। টুপুর কিন্তু একদম উলটো সুর গাইল। বলল, ‘কী দরকার অভি, এত খরচ করে দামি গিফট দেবার; সত্যিই চাই না।’

টাপুর বলল, ‘দেখলি বস; বর দিতে চাইছে বউ নিচ্ছে না। ওহ, পুরো কেস জন্ডিস!”

দোকানে ঢোকামাত্র কোক-এর গেলাস এগিয়ে ধরল নীল বসনা এক সুন্দরী। ম্যানেজার সায়ন্তিকা এগিয়ে এসে হ্যান্ডশেক করল অভিদার সঙ্গে। ওরা সবাই পূর্ব পরিচিত। কারণ অভিদা বিয়ের সব গয়না এখান থেকেই কিনেছিল, তাই খুব খাতির। আমার আবার গয়না-গাটিতে বিশেষ আকর্ষণ নেই। কিছুক্ষণ দেখে আমি সোফায় বসে কোকে সিপ দিয়ে ম্যাগাজিনের পাতা ওলটাতে লাগলাম।

আমি জরিপ করছি ম্যানেজার মেয়েটি ভাবছে তার টার্গেট রিচ করতে হলে এই ‘মেড ফর ইচ আদার’ কাপলকে বধ করতেই হবে। নামতার মতোন বিভিন্ন ডিসকাউন্টের টোপ এগিয়ে দিচ্ছে। মাঝে মাঝে টাপুর আমার দিকে কটমট করে তাকাচ্ছে। অবশেষে মিয়া-বিবির পছন্দ হল একটা সেট। অপূর্ব সুন্দর পেন্ডেন্ট আর ম্যাচিং কানের দুল। পেন্ডেন্টের মাঝখানে একটা মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো ছোট্ট নীলা, যার চারপাশ হীরককুচি শোভিত। পুরো সেটটা পরে টুপুর-কে ঠিক পরীর মতো লাগছিল। আমি আবার যথাস্থানে গা হেলিয়ে দিলাম। মনে মনে ওই ম্যানেজারের তারিফ না করে পারলাম না। অভিদা ক্লিন বোল্ড। টাপুর টুপুর দু’জনেই ফিল্ডিং করে অভিদা কে বাঁচাতে চেষ্টা করেছিল। কিন্তু যে হারবে ঠিক করে আছে, তাকে কে বাঁচায় !

ঘড়ির কাঁটা সাতটা ছুঁতে চলল, আমি গার্জেনের মতো তাড়া লাগিয়ে ওয়াশরুম ঘুরে এসে কাউন্টারে ওদের কাউকে দেখতে পেলাম না। একটু পরে টাপুর ছুটে এসে বলল, “টুষ্কা তোর কাছে ক্যাশ হবে? প্রচুর টাকার বিল হয়েছে। এই মুহূর্তে এত ফান্ড নেই অভিদার৷’ বললাম, “আইটেম কমিয়ে দে, বিল হুহু করে নেমে যাবে।” তাকিয়ে দেখি টাপুরের চোখভর্তি জল।

টাপুর নিচু স্বরে বলল, “ওরা বলছে টুপুর ওই সেটটা ছাড়া আরও একটা ব্রেসলেট নিয়েছে।’ শুনে আমার মাথাটা চোঁ করে একটা চক্কর দিয়ে উঠল। কোনও মতে সামলে ফ্লোর ম্যানেজারের ঘরে ছুটলাম। গিয়ে দেখি টুপুর সিদ্ধের শাড়ির আঁচলের কোনা কামড়ে প্রায় ছিঁড়ে ফেলেছে। অভিদা প্রাণপণে বোঝাচ্ছে, “বিশ্বাস করুন ম্যাম, আমার মিসেস এমন কাজ করতেই পারে না, নেভার। নিশ্চিত ভুল হচ্ছে।’’

অভিদার কাছে গিয়ে বললাম, “তুমি আমার কার্ডটা ইউজ করো।’ তখনই সেই টার্গেট ফিক্স করা ম্যানেজার প্যাঁচার মতো মুখ করে বলল, ‘উইথ অল রেসপেক্ট স্যার, এতক্ষণ কনসিডার করেছি। প্লিজ লুক থ্রু দ্য ভিডিও ফুটেজ অ্যান্ড সি ইট থরোলি।”

ফুটেজে দেখা যাচ্ছে, টাপুর আমার কাছে এসেছে, আমরা কথা বলছি। অভিদা ফোনে ক্যালকুলেট করছে আর টুপুর কোনওদিকে না তাকিয়ে ব্রেসলেটটা ওর হ্যান্ড ব্যাগে ভরে ফেলল। সেই দৃশ্য দেখে অবাক বিস্ময়ে অভিদা থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে ধপাস করে চেয়ারে বসে পড়ল। ততক্ষণে দু’জন লেডি সিকিউরিটি চলে এসেছে। তাই দেখে ঘাবড়ে গিয়ে টাপুর ম্যানেজার-সহ সবাইকে বোঝাতে চেষ্টা করল, “প্লিজ পার্ডেন অ্যাজ মাই সিস্টার ইজ আ ক্লেপ্টোম্যানিয়াক পেশেন্ট। শি ইজ আন্ডার ট্রিটমেন্ট।’’

এটা শুনে অভিদা চিৎকার করে বলল, ‘হোয়াট?’

টুপুরের কেমন একটা হিস্টিরিয়া অ্যাটাক হল যেন। ও ছুটে গিয়ে অভিদার পা জড়িয়ে ধরল। অভিদা ‘না না’ বলে টুপুরকে তুলে দাঁড় করিয়ে গালে হাত বুলিয়ে চুল সরিয়ে দিয়ে বলল, ‘এদের তিনজনকে এখানে রেখে দিন আর আমার সঙ্গে একজন চলুন। আমি আমার অন্য কার্ড নিয়ে এসে পেমেন্ট ক্লিয়ার করে, ওদের নিয়ে যাব।” বলে আর দাঁড়াল না, গটগট করে বেরিয়ে গেল। আমি ছুটে গেলাম। “প্লিজ অভিদা ইউ ক্যান ইউজ মাই কার্ড প্লিজ।’ অভিদা আমার হাত ধরে ফিসফিস করে বলল, “সারপ্রাইজ টুঙ্কা, রিয়েলি সারপ্রাইজ ফর মি!’

প্রায় দু-ঘণ্টা হতে চলল অভিদা আসছে না, কত রাত হয়ে গেল। ফোন নটরিচেবল শুনতে শুনতে হয়রান। টুপুর-কে আর আটকে রাখা যাচ্ছে না, পাগলের মতো করছে। লেডি সিকিউরিটিকে অনুরোধ করায় তারা তৎপর হয়ে, যিনি সঙ্গে গেছেন তাকে ফোন করলেন। আরও মিনিট চল্লিশেক পর একটা পুলিশের জিপ এল। ওসি আমাদের কাছে এসে অভিদার নাম বলায় আমরা ঘাড় নাড়তেই বললেন, ‘জিপে উঠুন।’ বললাম, ‘হোয়াই? হোয়াট হ্যাপেন্ড অফিসার?’

উনি তাচ্ছিল্য ভরে তাকিয়ে বললেন, “গিয়েই দেখতে পাবেন। কাম অন লেডিস, হ্যারিয়াপ।’ আমি বললাম, ‘ওয়েট আ মিনিট অফিসার।’ ম্যানেজার সায়ন্তিকা-কে চিবিয়ে বললাম, “আই ওয়ান্ট টু পে দ্য ডিউ অ্যামাউন্ট ইমিডিয়েটলি, প্লিজ প্রসিড।”

আমি কোথাও গেলে এখনও বাবা টুক করে নিজের এটিএম কার্ডটা আমায় দিয়ে দেয়। সেই বাবার কার্ডটা দিয়ে আমি ডিউ পেমেন্ট অল ক্লিয়ার করে গাড়িতে উঠে বসলাম। সারাটা রাস্তা অভিদার ‘সারপ্রাইজ’ কথাটা কানে বাজতে লাগল। কে কাকে সারপ্রইজ দিল!

বাংলোয় পৌঁছে দেখি, সবদিকে লাইট জ্বালানো। অনেক লোকজন জমা হয়েছে। মিত্র দম্পতি আরও অনেকে। টুপুর নেমেই ছুটতে শুরু করেছে। আমরাও পিছন পিছন দৌড়ে ড্রইংরুম পার করে ওদের বেডরুমে ঢুকে দেখি, ফ্যানের সঙ্গে টুপুরের দোপাট্টা দিয়ে অভিদার ঝুলন্ত দেহ হালকা দুলছে। বিছানার উপর সাইড টেবিল ব্যবহার করে ঝুলছে, তাই কোনও শব্দ হয়নি। আমি আর টাপুর আর্তনাদ করে উঠলাম— ‘অভিদা’। টুপুর একদম পাথর হয়ে গেল।

বাবা, মা, সেন কাকু-কাকি প্রায় ভোরের দিকে এসে পৌঁছোল। টুপুর শুধু একটা কথা বলছে, ‘কেন? কেন? কেন বলতে দিলে না মা ওকে? ও যে আমায় ভীষণ ভালোবাসত! খুব ভালোবাসত মা…! অ-ভি-গো অভি, ক্ষমা করো।

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...