চান (পর্ব ৩)

ঘণ্টাধ্বনি বাজছে। এই ধ্বনির মধ্যে কী যেন আবেশ জড়িয়ে আছে। জড়ানো মোহ আছে, মন অন্য হয়ে যায়। এবছরই গরমে দিবার সাথে গিয়েছিল বর্গভীমা মন্দিরে। সেখানে এই ঘণ্টাধ্বনি, ধূপ-দীপ, আশ্চর্য গন্ধ তাকে স্থানু করে রেখেছিল প্রায় একবেলা। আসতেই ইচ্ছে করছিল না। সেই ধ্বনি।

দূর থেকে দেখা যাচ্ছে ঝামা পাথরের পঞ্চরথ পাঢ়া দেওল। চৌকো চৌকো পাথর বসিয়ে গাঁথনি। বহু যুগের শ্যাওলা জমা। ডাইনটিকরির লোকেরা বলে সাত আটশো বছরের পুরোনো তো হবেই। মন্দির কাছাকাছি হতে একটা ভয়ও কুড়ানির ভেতর, যদি কোনও কারণে কোনও ত্রুটি হয়। দূর থেকে সিঁদুরলিপ্ত পাথরে গুড়িসুড়ি মেরে ঢুকে পড়ছিল। অষ্টভুজা মা-র কাছে যাবে, যদি একটা আবছা অবয়ব দেখে। ক্রমে তা গাঢ় হয়। ওড়িয়া ব্রাহ্মণের দুর্বোধ্য মন্ত্রপাঠ কানে যায়। বোঝে না। পূর্বমুখী মন্দির। দরজায় দাঁড়াতেই ভেতরে ছায়া পড়ে। পুরোহিত ঘুরে দাঁড়িয়ে ফুলের থালি হাতে কুড়ানিকে দেখতে পান। ইশারায় বসতে বলেন।

স্থানীয় ভক্তদের মতো পূজারিও জানেন দেবী রঙ্কিণীর আসল বাসস্থান ছোটোনাগপুরের ঘাটশিলা। এই ভৈরবভূমিতে তিনি মাত্র কয়েকটা দিনের জন্য আসেন। আসেন ওড়গন্ডায়। তবে পথে এই ডাইনটিকরির মন্দিরেও কিছুক্ষণের জন্য দেবী প্রতিষ্ঠিত হন। এই প্রতিষ্ঠাকে স্বীকৃতি দেবার জন্যই যেন এই ফুল দেয়া নেয়া।

ফেরার পথটা প্রায় উড়ে পার হতে চায় কুড়ানি। চারদিকে অদ্ভুত একটা গন্ধ। দুরের বাঁশঝাড়, বেনাবুদা, লাটকে লাট ধানখেত— সব চেনা ছবিও নতুন লাগছে।

ধানওঠা রুখা জমিগুলো, মাঝেমাঝে কাঁকরভরা রুগড়ি পাথরের লাল পথ লাফিয়ে লাফিয়ে পার হয়ে যাচ্ছে। মকরসংক্রান্তির জন্য কাসাইয়ের তীরে মেলা বসেছিল। কুড়ানি এক বান্ডিল কাচের চুড়ি কিনেছে। চুড়িপরা হাত নাড়ালেই রিনরিন করে বাজছে। হাত তুলতেই নীল কাচের চুড়ি আলো ঠিকরোচ্ছে, খুশির।

একি আত্মপ্রকাশের আনন্দ? বুনো মকাই-এর খই-এর মতো ভেতরে ভেতরে ফুটছে। কৃতজ্ঞতায় আপ্লুত হয়ে যায়। দুহাত জড়ো হয়ে মাথায় ওঠে। রঙ্কিণী মা-র জন্য নয়। মজুমদার মশাইয়ের প্রতি। তিনিই তো এইসব ব্যবস্থা করেছেন। সামান্য কুড়ানি এই একমেলা মানুষের মধ্যে আলাদা আসন পাবে এতো তারই দান। এই মানুষটিকে কুড়ানি কখনও দেখেনি। শুধু তার দানই পেয়ে এসেছে। শিলদায় মজুমদার মশাই-এর বড়ো দোকান। খড়গপুর শহরেও তার ব্যাবসা। বাস আছে। শুনেছে কলকাতায় তার ঘর আছে। তিনি পঞ্চায়েতেরও মাথা।

দূরপাল্লার এই বাসটা সেমি-ডিলাক্স। বাসে গান বাজছে। বচ্চনের। ‘মেরে অঙ্গনেমে তুমারা ক্যায়া কাম হ্যায়।’ অন্য সময় হলে মন দিয়ে শুনত। মাথা নেড়ে হিন্দি উচ্চারণ করার অক্ষম চেষ্টা করত৷ দ্রুতগামী বাস। নির্দিষ্ট সময়ের অনেক আগেই পৌঁছে যায় কুড়ানি। বাস স্টপের গায়েই ভৈরব থান। বাস থেকে নেমেই দিবাকে দেখতে পায়। ভৈরব থানের পাশে দাঁড়ানো। সাড়ে চার ফুট উঁচু মাকড়াপাথরের বেদী। বেদী সাজানো হয়েছে। আলপনা আঁকা। নানা মাটির মূর্তি বেদীতে। হাতি ঘোড়াই বেশি। উলটোদিকে ভৈরবের শক্তি রঙ্কিণী দেবীর থান। কালো পাথরে লাল কাপড় জড়ানো দেবীর অধিষ্ঠান। মাথায় সিঁদুর মাখানো। সামনে পুজোর ঘট। স্থানীয় মান্যজনেরা এসে গিয়েছেন। কুড়ানি সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে এল ভীরু পায়ে। পুরোহিতের হাতে ফুলের থালি তুলে দিতেই মন্ত্র উচ্চারণ হল। ঢাকঢোল বেজে উঠল। এতক্ষণ খেয়াল করেনি, হরিতকী, বয়রা ঘেরা মাঠে, গাছের ফাঁকে ফাঁকে সাঁওতাল খেরোয়াল আদিবাসী ভক্তরা সেজেগুজে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র আর বর্শা, টাঙি নিয়ে দাঁড়িয়ে। সামনের দিকে নাচের জন্য মেয়েরা। বাঁশ নাচে পারদর্শী ছেলেরাও। বেদীর পাশেই উঁচু মঞ্চে বসবার আয়োজন হয়েছে বিভিন্ন মান্যজনের। কুড়ানিরও ঠাই হল সেখানে।

কুড়ানি শুনেছে এই দেবীর মূর্তি আছে ঘাটশিলায়। কখনও সে দেখেনি। তাঁর মাথায় জটাজুট, আটহাত। উপরের দুটো হাত দিয়ে একটা হাতি ধরে আছেন। অন্যহাতে অস্ত্রশস্ত্র। শববাহন, রক্তমুখী, রক্তবর্ণা এই দেবী পশুরক্তে সন্তুষ্ট নন। তিনি নররক্ত চান। একসময় নরবলির রেওয়াজ ছিল। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনকালে হেজ সাহেবের হস্তক্ষেপে সে বলি বন্ধ হয়ে যায়। নরবলি দেয়া বন্ধ হলেও কুড়ানির মা বলত দেবী নিজের হাতে নরহত্যা করে রক্তপিপাসা মেটাতেন। এখন মানুষের মূর্তি দেয়া হয় দেবীর কাছে।

ক্রমশ…

চায়ের আসরে মুখরোচক ডিশ

চায়ের আসরে কাউকে নিমন্ত্রণ করেছেন ? তাহলে দোকানের খাবারের বদলে নিজেই কিছু তৈরি করে রাখুন৷আমরা সকলেই এখন ব্যস্ত৷ রান্নাঘরে খুব বেশি সময় ব্যয় করতে পারি না৷  এই পদগুলি কিন্তু খুব কম সময়ে রান্না হয়ে যাবে৷ তাছাড়া আপনি আগে থেকেই এই খাবারগুলি তৈরি করে রাখতে পারেন, অতিথি আপ্যায়নের জন্য৷

ছোলার নিমকি

উপকরণ : ২০০ গ্রাম ভেজানো কাবলি ছোলা, ১০০ গ্রাম রসুনের শাক, ৩/৪ কাপ চালগুঁড়ো, ১ ছোটো চামচ আদা-রসুন পেস্ট, ১ ছোটো চামচ কাঁচালংকা বাটা, ১ ছোটো চামচ গরমমশলা, ভাজার মতো তেল, নুন স্বাদমতো।

প্রণালী: কাবলি ছোলা ধুয়ে মিক্সিতে পেস্ট করে নিন। এবার একটা প্যানে এই পেস্টের সঙ্গে রসুনশাকের কুচি, আদা-রসুনবাটা, চালগুঁড়ো, কাঁচালংকাবাটা, নুন ও গরমমশলা মিশিয়ে নিন। কড়ায় তেল গরম করুন, অল্প করে মিশ্রণ নিয়ে পকোড়া ভেজে নিন। চায়ের সঙ্গে পরিবেশ করুন।

 

ডালের পকোড়া

Dal Pakoda recipe

উপকরণ: ১ কাপ ছোলার ডাল, ১/২ কাপ চালগুঁড়ো, ১/২ ছোটো চামচ জোয়ান, ১ চিমটে হিং, ভাজার জন্য তেল, ১/২ ছোটো চামচ হলুদ গুঁড়ো, নুন স্বাদমতো।

প্রণালী: প্রেশারে ছোলার ডাল সেদ্ধ করে নিন। নামিয়ে একটু পেস্ট করে নিন। তারপর ডালের সঙ্গে চালের গুঁড়ো, নুন, হলুদগুঁড়ো, হিং ও জোয়ান মেশান। ১ বড়ো চামচ ময়ান দিয়ে ভালো ভাবে চটকে মেখে নিন। একটু শক্ত করে মেখে ১০-১৫ মিনিট রেখে দিন। এবার এই মিশ্রণ থেকে ছোটো ছোটো লেচি তৈরি করে রুটির মতো বেলে নিন। কিন্তু একটু মোটা করে বেলবেন। এবার ছুরি দিয়ে মনের মতো আকারে টুকরো করে নিন। গরম তেলে ভাজুন ও চায়ের সঙ্গে পরিবেশন করুন।

 

রাগি বিস্কুট

Ragi biscuits recipe

উপকরণ: ১কাপ রাগি, ১/২ কাপ আটা, ১/২ কাপ মাখন, ১/২ কাপ ব্রাউন সুগার, ৩/৪ ছোটো চামচ বেকিং পাউডার, ১ বড়ো চামচ কোকো পাউডার, ১/২ ছোটো চামচ ভ্যানিলা এক্সট্রাক্ট, অল্প দুধ।

প্রণালী: একটা প্যানে রাগির আটা ১ মিনিট নাড়াচাড়া করুন। এবার আঁচ থেকে নামিয়ে বাকি সব উপকরণ মিশিয়ে নিন। একসঙ্গে শক্ত করে মেখে নিন। লেচি কেটে হাত দিয়ে চেপে কুকিজের আকার দিন। বন্ধ কৌটোয় ভরে ২০-৩০ মিনিট ফ্রিজে রেখে দিন। এবার ১৬০ ডিগ্রি প্রি-হিটেড আভেনে ১৪-১৫ মিনিট বেক করুন। ঠান্ডা হলে কৌটোয় ভরে রাখুন।

চান (পর্ব ২)

পর্ব ২

“শিল্‌দা শিল্‌দা আইছে। নামবে আস।’ বাসের হেল্পার কাম্ কন্ডাক্‌টর চেঁচিয়ে উঠল। হুড়মুড় করে একগাদা মানুষ হাঁড়িকুড়ি ছানাপোনা, পোঁটলা পুঁটলি নিয়ে নেমে যায়। আর একদল ওঠে। বাস ছেড়ে দেয়। বাঁদিকে বাঁক নিয়ে বীণপুরের উদ্দ্যেশে চলে ঝাড়গ্রামগামী বাস। বীণপুরে অনেকটা সময় দাঁড়ায় বাস। চা-জলখাবার খায় ড্রাইভার, যাত্রীরা।

সূর্য উঠে পড়েছে আলসেমি ছেড়ে। কাঁচারাস্তায় বাস হুহু করে এগিয়ে চলেছে। দুপাশে মহুয়া, শাল, বহেড়া গাছ রোদ মাখছে। শীত আর নেই। বেশ ভালো লাগে কুড়ানির। অন্যদিনের মতো সকালে পান্তা খায়নি। আজ উপোস। কিন্তু খিদের কথা মনেই আসছে না আজ। এমনিতে খিদে সইতে পারে না। ভারী শরীর। কাজও যেমন করে, খায়ও গবর গবর। শরীরও তাই বাঁধানো ঘাটের মতো। দিবা বাগ যখন তখন বাঘ হয়ে উঠেও কিছু জৌলুস কমাতে পারেনি। বরং কুড়ানিই শরীর পেতে আশ্রয় দেয়, যথেচ্ছ ব্যবহারের আনন্দ দেয় শান্তভাবে। দিবা উঠে গেলে পালদের পুকুরে একটা ডুব মেরে শরীর ঠান্ডা করে এসে ঘুমিয়ে পড়ে।

বাসের দুলুনিতে ঝিমুনি এসেছিল। দুটো গরু রাস্তার উপর হঠাৎ উঠে আসায় ড্রাইভার হাওয়া-ব্রেক মারে। বাসশুদ্ধ লোক হুড়মুড় করে এ ওর গায়ে। কুড়ানি পড়ে যাবার আগেই ডানহাত ইঞ্জিনের উপর উঁচু জায়গায় আটকে যায়। হাওয়াই চটি ছিটকে যায়। কুড়ানি লজ্জা পায়। মুখে লাজুক হাসি। এদিক ওদিক তাকায়। পা দিয়ে চটিটা টেনে নিয়ে কোনওক্রমে পায়ে গলিয়ে ফেলে। আসলে এত সকালে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস নেই অনেকদিন। আর রাতেও ভালো ঘুম হয়নি। সকালে উঠতে হবে, ভোরের প্রথম বাস ধরতে হবে এই ভেবে।

ছেলেবেলায় মার সাথে খুব ভোরে উঠত। উঠে জলা-জায়গায় যেতে হতো খড়িকাঠি চুপিচুপি আনতে। মা-র মুখে শুনেছে বাবা পানু ঘোড়ই খুব বড়ো খড়িয়াল ছিল। বাবারা এখানে থাকত না। সবং-এ থাকত। সেখানে নদী ছিল, চণ্ডী নদী। কেলেঘাই-এর শাখানদী ওটা। বাবাদের গ্রামের নাম ছিল শ্যামসুন্দরপুর। মজা- নদীর চরে খুব সরু সরু খড়িগাছ হতো। গাছ কেটে শুকিয়ে ঝোড়া বুনত ওরা। দেখতে বেতের কাঠির মতো। খুব সুন্দর বুনোট। ঝোড়ার কানার দিকে অনেকটা মোটা বেষ্টনী থাকত, ধরার সুবিধার জন্য। স্থানীয় বাজারে শুধু নয়, বাইরেও চালান যেত সে সব। খুব কদর ছিল। বাবার খুব নামডাক ছিল একাজে। মা গেঁওখালির পাল্টি ঘর। কাজ জানত। বাবা মরে গেলে কেন যে সে কাজ উঠে গেল, কেনইবা এখানে এল ওরা, তা এক রহস্য।

বাসের গতি কমে এসেছে। বীণপুর এসে গেল বোধ হয়। ছেদো অনেকক্ষণ থেকে লটপটে মাথা নামিয়ে একটা আধুলি খুঁজছে। পায়নি। রুক্ষ গলায় আধবসা অবস্থায় চ্যাঁচাতে লাগল— ‘বীণপুর, বীণপুর।’

এখানে একটা বাস এলেই ভ্যানরিকশার তোড়জোড় শুরু হয়ে যায়। নানা সুরে ভেঁপু বাজতে থাকে। গম্ভব্য সবই কাসাইঘাট পর্যন্ত।

যত্ন-পায়ে নেমে এদিক ওদিক একবার দেখে কুড়ানি। তারপর কাছের ভ্যানরিকশার সামনের দিকে উঠে পড়ে। আরও অনেকটা পথ। তাছাড়া শুধু যাওয়া তো নয়, ফিরতেও হবে বেলায় বেলায়। ভেতরে ভেতরে একটা অস্থিরতা। শুধু মজুমদার মশাই-র কাজ নয়। একজোড়া কাপড় আর আলতা-সিঁদুর পাওয়া নয়। তার নিজেরও একটা কাজ আছে। একটু বাঁকা হাসে। ঠোঁট বাঁকে।

বড়ো জাগ্রত এই দেবী। রক্তমুখী, রক্তবর্ণা দেবীকে তুষ্ট করে বর চাইলে অভীষ্ট পূর্ণ হয়। কুড়ানিও চাইবে। আজ পুজোর পরম লগ্নে দেবীর থানে মাথা কুটে বলবে, ‘মহুল বৃক্ষের মতো একটা খোকা দাও ঠাকুর হে।’ ওতো জানেই সন্ধ্যা গায়েন, নন্দীগ্রাম থেকে বিয়ে হয়ে এল, দশ-বারো বছর পার করেও সন্তান নেই। শেষে রঙ্কিণীর থানে মানত করেইতো বছর ঘুরতে ছেলে। এখন নিত্যপুজোয় সে সাহায্য করে।

ভটভটি নৌকোয় ওঠার আগে হাতে জল তুলে কপালে ছোঁয়ায়, মাথায় নেয়, বিড়বিড় করে কুড়ানি। পুরুলিয়ার কপিলা পাহাড়ের বুক চিরে নেমেছে এ নদী। অঞ্চলের মানুষেরা ভক্তি করে খুব। গঙ্গার মতো।

নৌকোয় উঠতে যেয়েই বাধা। দুটো ছোকরা সাইকেল নিয়ে একেবারে মুখেই দাঁড়িয়ে। ওঠবার জায়গা নেই। কুড়ানি বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে মুখ তুলতেই কিছুটা ভয়ে দুই কিশোর সাইকেলের হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে ওঠার জায়গা করে দেয়। ভটভটি আড়া কাসাইয়ের বুকে ঢুকে পড়ে। পাশ থেকে হলেও কুড়ানি বুঝতে পারে দুই ছোকরাই তার দিকে ড্যাবডেবে চেয়ে আছে। তাকাবে না! কেন! আজ ব্লাউজের নীচে আরও একটা টাইট, ছোটো জামা পরেছে। এ নিয়ে দুবার পরল। বিয়ের পর দিবার সাথে রেলগাড়ি চড়ে দূরের কুটুমবাড়ি যাবার সময় একবার। আজ নিজেরই লজ্জা লাগছিল। কিছুটা গর্বও। মোষের সিং-এর মতো ফুঁসে আছে, বুক যেন বাঁধ দেয়া বর্ষার কাসাই।

ক্রমশ …

সোলো ট্রাভেল-এ সতর্কতা

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চিন্তা ভাবনা বদলাচ্ছে৷ আগেকার দিনের মতো বাক্স প্যাঁটরা, হোল্ড অল গুছিয়ে, একান্নবর্তী পরিবারের সকলে মিলে বেড়াতে যাওয়ার সেই সব দিন আর নেই৷ পরিবার ছোটো হতে হতে এখন কেউ কেউ সিঙ্গল লিভিং-এও বিশ্বাসী হয়ে উঠেছেন৷ফলে একা একা বেড়াতে যাওয়া বা solo travel এখন আর শুনে আশ্চর্য হওয়ার মতো বিষয় নয়৷

কিন্তু একা ভ্রমণ করার সময় প্রতিটি ব্যক্তির কিছু না কিছুতে ভয় থাকেই। সোলো ট্রাভেলে শুধু মহিলাদেরই নয়, পুরুষদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ভয় আগে ঝেড়ে ফেলুন৷ তারপর একলা ভ্রমণের জন্য কীভাবে প্রস্তুতি নেবেন, সে বিষয়ে সচেতন হোন। যদি সুরক্ষিতভাবে ও নির্ভীকভাবে ভ্রমণ করতে চান, তাহলে এই সহজ টিপ্সগুলি মেনে চলুন।

  • যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হবেন না৷ প্রযুক্তিকে কাজে লাগানো এক্ষেত্রে ভীষণ জরুরি৷ ফোনে অবশ্যই বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ রাখবেন৷ একা ভ্রমণের সময় খেয়াল রাখবেন ফোনে যেন সবসময় চার্জ থাকে। ফোনের মাধ্যেমে ভিডিয়ো করা,ছবি তোলা হলে দ্রুত চার্জ শেষ হতে পারে৷ তাই নিজের কাছে একটি পাওয়ার ব্যাংক অবশ্যই রাখুন।
  • যে-শহরে যাচ্ছেন সেখানে কোনও পরিচিত বন্ধু বা আত্মীয় থাকলে জানিয়ে রাখুন তাকেও যে, আপনি যাচ্ছেন সেখানে৷ হোটেল প্রভৃতি বুক করার আগে ভালো করে রিভিউ পড়ে নিন৷ যে-হোটেলে আছেন, সেই পরিবেশ আদৌও নিরাপদ কিনা তা যাচাই করুন।
  • একা ভ্রমণ করার সময় নিজের মালপত্র টাকা পয়সা জরুরি ডকুমেন্ট-এর বিষয়ে অতিরিক্ত সচেতন থাকুন৷ জিনিসপত্রের ব্যাপারেও যেমন সবসময় সতর্ক থাকা উচিত, তেমনি বিবেচক ও আত্মবিশ্বাসী হওয়া দরকার। জীবনের ঝুঁকি আছে এমন অ্যাডভেঞ্চারে জড়াবেন না৷ এছাড়া পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ছাড়া ব্যক্তিগত গাড়ি বুক করে ভ্রমণ করলে, গুগল ম্যাপে নজর রাখুন।
  • একা যখন ঘুরবেন খুব বেশি টাকা হাতব্যাগে রাখবেন না৷ প্লাসটিক মানিতে ট্রানজাকশন সারুন৷ যেগুলো ইন্টারনেট-এ বুক করা সম্ভব. তা আগে থেকেই বুক করে দাম মিটিয়ে দিন৷
  • অনেকেরই গোছানোর সময় খেয়াল থাকে না ব্যাগের ওজন কত হচ্ছে। এটা একদমই করবেন না। কতদিনের tour? কোথায় কোথায় যাবেন? এই বিষয়গুলি মাথায় রেখে যতটা কম সম্ভব লাগেজ নিন। যাতে আপনি সহজেই তা বইতে পারেন।
  • একা গেলে লোকজন বুঝে মেলামেশা করবেন। কার মনে কী থাকে বলা তো যায় না! যতটা পারবেন নিজের মতো থাকবেন।
  • কখনও মনে নেগেটিভ চিন্তাভাবনাকে স্থান দেবেন না৷ মুখে চোখে যেন কোনও ভয় বা আতঙ্কের ছাপ না থাকে, সে বিষয়ে সচেতন হবেন৷ বুদ্ধি করে নিজের মতো করে ঘুরে বেড়ান, আর যেকোনও পরিস্থিতিতে পজিটিভ থাকুন ও উপভোগ করুন। আর চোখে-মুখে আত্মবিশ্বাস রাখবেন।

চান (পর্ব ১)

কুড়ানি প্রায় ঘুম চোখেই স্নানে যায় আজ। ভোরের উঠোন স্পষ্ট দেখতে পায় না, চেনা পায়েই পালদের পুকুরের দিকে ইটিতে থাকে। ঝুপ করে তিন চারটে ডুব মেরে দিতে হবে। পৌষ মাস। এ বছর ঝেপে ঠান্ডা পড়েছে। ভোরের কুয়াশাও আছে। বেশ কয়েক পা পথ। কুড়ানি শাড়ি চাপা দিয়ে কান ঢেকে কিছুটা উষ্ণতা পেতে চায়। বেশ বড়োসড়ো চেহারা তার। ফলে দশহাতি শাড়িতে টান ধরে। পিঠে পেটে ঠান্ডা বাতাস এসে ঝাঁ করে কামড় বসায়। কটা বাজে? আকাশে চোখ রাখে। ঠাহর করতে পারে না। সাদা তারারা তখনও ভাঁট ফুলের মতো ফুটে আছে। ফসল ওঠা মাটির গন্ধ নাকে। শব্দহীন এক আনন্দ শিরশির করে। ভক্তাদের বাছুর পায়ের শব্দে জেগে ওঠে, হাম্বা করে। বুকটা ছ্যাৎ করে ওঠে। একটু ভয় পায়। হঠাৎ মনে হয় সকাল হয়নি। মুখের কাঠকয়লার মাজন শব্দ করে ফেলে। ভয় কমে। মনে মনে মা রঙ্কিণীকে ডাকে।

দিবা এই সকালে ওঠার কথা ভাবতেই পারে না। তা শীত-গ্রীষ্ম যাই হোক। ওর আলসেমিটা যেন সকালেই পেয়ে বসে। খুব রাত করে জেগে থাকতে পারে। মজুমদারের ভাঁটিতে কাজ করে। অনেক রাতে ফিরতে হয়। শীতকালটাই কাজের সময়। টালির কাজ খুব বেশি। আজকাল খড়, শণের চাল আর কেউ রাখতে চায় না এখানে। দু-তিনটে বর্ষা যেতে না যেতেই জল পড়ে। সবাই তাই চেষ্টা চরিত্র করে টালির চালের জন্য। দিবাকে অবশ্য এখন আর পোণে আগুন দেয়া বা কাদা ছেনার কাজ করতে হয় না। মজুমদার মশাই ওকে বেশ ভালো চোখে দেখেন। তদারকি করেন। বছর চারেক হল বিয়ে করেছে কুড়ানিকে। শ্যামলা শরীর হলে কী হবে, একটা আলগা শ্রী আছে তার। দ্রুত চলনের মেয়েটিকে দেখলেই লাগসই একটা মন-পসন্দ চলে আসে। তো বাপ-মা মরা তিন কুলে কেউ নেই এমন নির্বান্ধব দিবার মনও যে মহুয়া ফুলের গন্ধে উড়ু- উড়ু করবে, তা বিচিত্র কি! কুড়ানিরও তিন কুলে কেউ ছিল না এক বিধবা মা ছাড়া। তা সে মা-ও বিয়ের ছ’মাসের মধ্যেই মরে গেল। এখন হাত-পা ঝাড়া দুটি প্রাণীর একান্ত বসবাস।

জলে পা রাখতেই ছ্যাঁৎ করে উঠল। কুড়ানি আস্তে আস্তে জল হাতে নিয়ে মুখে তুলল। একমুখ জল নিয়ে কুলকুচি করল। অনেকক্ষণ। চোখের কোনে জমা পিচুটি ধুলো। এভাবে জল সয়ে আসতে হাঁটুর ওপর কাপড় তুলে নেমে পড়ল। তারপর দুকানে আঙুল দিয়ে ঝুপ ঝুপ করে তিন চারটে ডুব মারল। হি হি করে কাঁপুনি আসছে। মোটা কাপড়ের আঁচল ঘুরিয়েই গলা মুখ বুক একবার ভালো করে মেজে নিয়ে একটা ডুব দিয়েই উঠে এল। পুব দিকের আকাশটা লাল লাল লাগছে। বুঝতে পারল ভোর হচ্ছে। ভেজা শাড়ি পরেই দ্রুত পা চালায় ঘরের দিকে। ভোরের প্রথম বাস ধরতে হবে।

বাঁকুড়া-ঝাড়গ্রামের প্রথম বাস ওড়গোঁদা আসে সকাল সাড়ে ছ’টায়। শিলদা হয়ে বীণপুর যেতে নিদেন দশটা বাজিয়ে দেবে। সেখান থেকে ভ্যান-রিকশায় চেপে যেতে হবে কাঁসাই-এর ঘাট। তারপর নদী পার হয়ে ডাইনটিকরি। এক বেলার হ্যাপা। কিন্তু কুড়ানির কাছে এসব আজ নেশার মতো, মিষ্টি স্বপ্নের মতো। বাপের কথা মনে নেই। সেই এটুবেলা থেকে এই পরব সে দেখে আসছে। মা-র কোলে উঠে এসেছে সে রঙ্কিণী থানে। মকরতিথিতে দেবী আসেন এখানে। তারপর তিন দিন ধরে পাতাবেদার মেলা। দূর থেকে ভয়ে বিস্ময়ে সে তাকিয়ে থাকত কতদিন, মেলা শেষ হবার পরও। ভৈরব চাতালের দিকে, রঙ্কিণী চাতালের দিকে। আজ সে এই পুজোয় সরাসরি অংশগ্রহণ করতে পারছে, একেবারে ছুঁয়ে দিতে পারবে দেবীকে, ভেবেই ভয়ে, আনন্দে একটা ঘোরের মধ্যে আছে।

কুয়াশামোড়া ভোরের একটা অন্য আমেজ আছে। সংসার এখনও ব্যক্ত হয়ে ওঠেনি। সূর্য সবে উকিঝুঁকি মারছে। ঠান্ডার সাথে একটা আবেগ জড়ো হয়ে কুড়ানিকে কাঁপাচ্ছিল। এখান থেকে তেমন কেউ ওঠার নেই, শুধু নামল কয়েকজন।

মজুমদার মশাই-এর দুটো বাস এই রুটে চলে। কথামতো ড্রাইভারের কেবিনে অহংকারী মুখে গ্যাট হয়ে বসল কুড়ানি। লালপাড়ের সাদা শাড়ি। চন্দ্রকোণা থেকে এসেছে। সাদা ব্লাউজ। মন্দিরের দেবীর পা ছুঁয়ে আবার ফিরে আসবে ভৈরবভূমিতে। হাতে রঙ্কিণীমা-র ফুল একটা সুন্দর পিতলের পাত্রে রাখা। রঙ্কিণী কুড়ানি আড়চোখে দেখছিল বাসের যাত্রীরা শুধু না, রাশভারী বিড়িও ফুঁকছে না। ড্রাইভার বলাই সামন্তও কেমন সম্ভ্রমের চোখে তাকাচ্ছে আজ, অন্যদিনের মতো নয় আজ। বীণপুর বাজারে এটা ওটা নিয়ে যাতায়াতের যত্ন আর কষ্টমাখা ব্যস্ততা নেই। পরিবর্তে অন্য এক ভালোলাগায় পেয়ে বসেছে। বাসের উইন্ডস্ক্রিন থেকে হু হু হাওয়া আসছে। গোছা গোছা ভারীচুল এলোমেলো করে দিচ্ছে। সে দিক। কপালে আজ বেশ বড়োসড়ো মেটে সিঁদুরের গোল সূর্য এঁকেছে। কুড়ানি আজ অন্যমূর্তি। কী মূর্তি? নিজেকে কি রঙ্কিণী মা মনে হচ্ছে। ইস! অমন ভাবাও পাপ। নিজের অজান্তেই একটা হাত মাথায় উঠে এল।

ক্রমশ…

 

কুড়িয়ে পাওয়া স্বপ্ন (শেষ পর্ব)

সামন্তকের মুখের সবকটা বাতি নিভে গিয়েছিল অনেকক্ষণ। কোনও রকমে আমতা আমতা করে বলল, “বিশ্বাস করুন, আমি এসবের কিছুই জানতাম না।”

জানার কথাও নয়। আপনার কাকুর মতো ক্রিমিনালরা সকলকে অন্ধকারে রেখেই নিজেদের কাজ হাসিল করেন। রাগ-অভিমান এসবের অনেক ঊর্ধ্বে উঠে গিয়েছেন এখন মাসিমণি। তাই সবকিছু জেনেও আপনার কথায় কোনও প্রতিক্রিয়া জানালেন না আর। শুধু এই টাকাটা দিলেন, রোগশয্যায় থাকা গুরুর প্রতি একজন শিষ্যার দক্ষিণা হিসেবে।

তন্দ্রার এগিয়ে দেওয়া খামটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও নিয়ে নিল স্যমন্তক। মুখে বলল, ‘আপনি না বললে এসব কথা হয়তো জানাই হতো না। নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে আমার।’

—মাসিমণি এই কথাগুলো কাউকে বলেন না। আপনাকেও হয়তো বলতেন না। কিন্তু আমি দিনের পর দিন একজন মানুষকে কষ্ট পেতে দেখতে দেখতে ক্লান্ত। তাই না পেরে বলে দিলাম। দয়া করে স্নেহাংশু সরকারকে এই বাড়ির ঠিকানা জানাবেন না।

আর আমি? আমাকেও কি আসতে বারণ করছেন আপনি? তন্দ্রার চোখে চোখ রেখে কথাটা বলল স্যমন্তক।

ঠোঁটের কোণে একটা দুর্বোধ্য হাসি লেগে আছে তার। গলার স্বরটাও কেমন যেন আবেগমাখা! নিরুত্তর তন্দ্রা তাকিয়ে আছে অপলক। দমকা হাওয়ায় মাথার ওপর বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ছে অজস্র হলুদ রঙের ফুল।

প্রায় ছুটতে ছুটতে এসে লাস্ট বাসটা ধরল স্যমন্তক। ভাগ্যক্রমে একদম শেষের জানালার ধারের সিটটা পেয়ে গেল বসার জন্যে। ব্যাগটা কোলের ওপর রেখে বুক ভরে শ্বাস নিল একটা। বাসটা চলতে শুরু করেছে। জানলা দিয়ে ঢুকছে ঠান্ডা জোলো বাতাস। পকেট থেকে সাদা খামটা বের করে মুখটা সামান্য খুলল। একবার চোখ বুলিয়ে নিল কড়কড়ে পাঁচশ টাকার নোটগুলোর ওপর। হাজার দশেক আছে মনে হয়। আপাতত চলে যাবে। মনে মনে কৃতজ্ঞতা জানাল স্নেহাংশু সরকারকে। পরলোকে যাবার আগে একটা মোক্ষম পয়সা কামানোর উপায় বাতলে দিয়ে গিয়েছেন তিনি।

স্যমন্তককে মধুরিমার কাছে যাবার কথা বলেই চোখ বুজেছিলেন স্নেহাংশু। কী একটা ভেবে স্যমন্তকও লুফে নিয়েছিল কাকুর অন্তিম ইচ্ছেটা। ভগ্যিস নিয়েছিল। ব্যাবসাপাতির এই মন্দার বাজারে এখন মাঝে মাঝেই তাঁর নাম করে বেশ কিছু মালকড়ি হাতানো যাবে ভালো মানুষ মধুরিমার কাছ থেকে।

স্যমন্তকের জীবনে মেঘ না চাইতেই জল হিসেবে এসেছেন মধুরিমা, একসময়ের নামজাদা গায়িকা। অনেক টাকার মালিক। বছর বছর রয়্যালটি হিসেবেই ব্যাংক-এ জমে গাদা গাদা টাকা। স্নেহাংশুর সঙ্গে মধুরিমার আইনত বিচ্ছেদ হয়নি। তাই হিসেব মতো স্যমন্তকই এখন তাঁর একমাত্র রক্তের সম্পর্কের উত্তরাধিকারি।

এতদিন মৃত মেয়েকে শিখণ্ডী বানিয়ে টাকা নিয়ে এসেছেন স্নেহাংশু। এবার পালা স্যমন্তকের। ফুসফুসের জটিল রোগে ধুঁকে ধুঁকে ইহলোক ত্যাগ করা কাকুর মিথ্যে অসুখের ফিরিস্তি দিয়ে যতদিন পারা যায় টানবে আর এর মধ্যে যদি পটিয়ে ফেলতে পারে মধুরিমার পালিত কন্যা তন্দ্রাকে, তাহলে তো সোনায় সোহাগা। তন্দ্রার বিহ্বল চাহনি আশা জাগাচ্ছে স্যমন্তকের মনে। তার ফেলা টোপটা বোধহয় বৃথা যায়নি। আইসিইউতে চলে যাওয়া বাবার ব্যাবসাটাকে এবার একটু একটু করে সারিয়ে তুলবে সে। সাদা খামটায় আলতো করে চুমু খেয়ে ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখল স্যমন্তক।

বাসের গতি বেড়ে গিয়েছে। হু হু হাওয়া এসে ঝাপটা মারছে মুখে। প্রসন্ন চিত্তে সিটের ব্যাকরেস্টে শরীর এলিয়ে দিয়েছে স্যমন্তক। মধুরিমার বিক্রি হওয়া বাংলোর দাম, বর্তমান বাড়ির ভ্যালুয়েশন, বছর বছর জমতে থাকা গানের রয়্যালটি এসবের একটা আনুমানিক হিসেব মনে মনে কষে চলেছে সে।

আধো ঘুম আধো চেতনার ঘোরেই চোখের সামনে একবার ভেসে উঠছে অনেক অনেক টাকা আর একবার তন্দ্রার মুখ। হঠাৎ পথ চলতে চলতে কোনও দামি জিনিস কুড়িয়ে পেলে যেমন আনন্দ হয় ঠিক তেমনই একটা খুশি চলকে উঠছে স্যমন্তকের মনে।

জীবনের এবড়োখেবড়ো পথে চলতে চলতে সেও যেন আচমকাই একটা স্বপ্ন কুড়িয়ে পেয়েছে। জোর করে চোখ বুজে থাকে স্যমন্তক ফিরে ফিরে দেখতে চায় স্বপ্নটাকে…।

একাকী মহিলার লড়াই (শেষ পর্ব)

অনেক মহিলাই চান না একাকী সন্তানের পুরো দায়িত্ব বহন করতে। কিন্তু যখন পরিস্থিতি কোনও নারীকে এই দায়িত্ব বহন করতে বাধ্য করে, তখন শত সংঘর্ষের মুখোমুখি হয়েও সর্বশক্তি এবং সাহসিকতার সঙ্গে সন্তানকে মানুষ করতে কোনও দ্বিধা তারা করেন না।

সমস্যা আসবেই

আজও অনেকেরই মনে প্রশ্ন জাগে যে, একলা থাকা যারা বেছে নেন তারা কি পারিবারিক দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার জন্য এই জীবন বেছে নেন? কিন্তু এই জীবনের রাস্তা সহজ নয়। একাকী থাকেন এমন কোনও মহিলাকে জিজ্ঞেস করলেই জানা যাবে, লোকে শুধু দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ারই দোষ দেয় না। পথভ্রষ্ট, জেদি, রহস্যময়ী ইত্যাদি নানা উপাধিতে ভূষিত করতেও পিছপা হয় না। পুরুষকেন্দ্রিক সমাজে Single woman-এর নৈতিক ব্যক্তিত্বর উপরেও কলঙ্কের দাগ লাগানো সকলেই সহজ বলেই ধরে নেয়।

৪৯ বছর বয়সি তিয়াসা একজন সোশাল কাউন্সিলর। কথায় কথায় তিনি জানালেন, ‘একাকী যুবতির জন্য নতুন শহরে গিয়ে বাড়ি খোঁজাটা খুব মুশকিল হয়ে দাঁড়ায় অনেক সময়। নিজের বয়স থেকে শুরু করে খাওয়াদাওয়ার অভ্যাস, চেনাপরিচিতি বন্ধুবান্ধবের ঠিকুজি-কুষ্ঠি — সবকিছু তথ্য বাড়ির মালিককে জানাতে হয়। তা সত্ত্বেও অবিশ্বাসের স্ক্রুটিনির মধ্য দিয়ে তাকে যেতে হয়। একাকী যুবতির আচার-আচরণ, তার জীবনশৈলী, বন্ধুবান্ধব এমনকী দৃষ্টিভঙ্গির উপরেও আঙুল তোলাটা লোকে নিজের অধিকার ভেবে নেয়।

এটাই মেনে নেওয়া সব থেকে সহজ যে, Single woman মানেই সে বিশৃঙ্খল জীবনযাপন করে। সারা দিন বাইরে বাইরে ঘুরে বেড়ায়, বাজে ছেলেমেয়েদের সঙ্গে মেশে, বাড়িতে রান্না না করে রেস্তোরাঁ থেকে রোজ খাবার আনায় ইত্যাদি কতরকম লোকে ধরে নেয়। যে-কোনও সোশাল অনুষ্ঠানে অবিবাহিত যুবতিকে ‘বেচারা’ সম্বোধন করা হয়, তার সংসার হয়নি বলে।

পল্লবী কলকাতায় আইটি-তে কর্মরত। ওর সঙ্গে কথোপকথনে সে জানাল, ‘আমি সকলের থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখার জন্য একা থাকি না। কিন্তু এক এক সময় আমার আশেপাশে কারুর উপস্থিতি আমি একেবারেই চাই না। বিবাহিত লোকেদের জীবনেও নিশ্চই এরকম পরিস্থিতি কখনও না কখনও আসেই!’

৪২ বছর বয়সি শ্রেয়া পেশায় স্থপতি। প্রায়শই ওকে বিদেশে যেতে হয়। দেশে থাকলে সময় পেলেই মা-বাবার সঙ্গে সময় কাটায়। শ্রেয়া জানালেন, “আমি বেড়াতে ভালোবাসি, আমার কাজ আমাকে সে সুযোগ করে দিয়েছে। এক জায়গায় থেমে থাকা জীবনে আমি বাঁচতে পারব না। শুধুমাত্র সামাজিক নিয়ম রক্ষার জন্য বিয়ে করার কথা কখনও আমার মাথাতেই আসেনি।’

৪৪ বছর বয়সি অনিন্দিতা মার্কেটিং কনসালটেন্ট। একাকী একটি ফ্ল্যাট নিয়ে থাকেন এবং এই জীবনে তিনি খুশি। তিনি একজন Single woman। বিয়ে করেননি। তাঁর মতামত হল, “বিবাহিত জীবনের সবরকম সুবিধা এবং অসুবিধা ভালো করে বিবেচনা করে, তবেই আমি একা থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। জীবন থেকে আমার চাহিদা অন্যদের থেকে আলাদা। বিয়ে হয়ে গেলে কেরিয়ার নিয়ে হয়তো কনসেনট্রেট করতে পারতাম না। তবে যেসব মেয়েরা সফল বিবাহিত জীবন কাটাবার আকাঙ্ক্ষা রাখে আমি কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে নই।’

‘বিয়ে না করা মানে সমাজ থেকে সরে যাওয়া নয় কিংবা সমস্ত সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসা নয়। এখন মাতৃত্ব পেতে পুরুষেরও প্রয়োজন নেই’, এমনটাই মানেন ৩৯ বছরের শ্রেয়া শর্মা। যিনি ৮ মাস আগে দেড় বছর বয়সি নেহাকে দত্তক নিয়েছেন। শ্রেয়া দু’জনের এই সংসারে যথেষ্ট আনন্দে রয়েছেন। রুপোলি পর্দার সুস্মিতা সেন এই ধরনের মানসিকতার খুবই পরিচিত একটি মুখ।

মানসিকতার পরিবর্তন

ধীরে ধীরে সমাজের মানসিকতায় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এর প্রধান কারণ হল স্ত্রী শিক্ষা এবং সমাজে মেয়েরা যে-জায়গায় নিজেদের পরিচিতি বানাতে সক্ষম হয়েছে। অন্তত বড়ো বড়ো শহরে মেয়েদের একা থাকাটা ‘বাধ্য হয়ে থাকতে হচ্ছে’ বলে ধরে নেওয়া হয় না। এটা সম্পূর্ণ তাদের নিজস্ব ইচ্ছা। এখন অফিস এবং সংসার একসাথে সামলানো সম্ভব নয় ভেবে মেয়েরা বিয়ে করতে অস্বীকার করলে, তাদের অসুবিধাটা সাধারণ মানুষ বুঝতে পারছে। তাদের নিজেদের জীবন নিজের মতো করে কাটাবার সুযোগ দিচ্ছে।

একাকী বলে দুঃখ কীসের

একা যদি কেউ জীবন কাটাতে চায় তার একটা কারণ, সে নিজের পরিচিতি হারাতে চায় না। যেসব মহিলা একা জীবন কাটাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তার সংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাওয়ার অন্যতম কারণ হল — পরিবার, বন্ধুবান্ধব এবং আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে পুরোপুরি সম্মান, সহযোগিতা এবং ভালোবাসা পাওয়া। অনেকেই একা ছেড়ে অপর কারও সঙ্গে থাকার কথা চিন্তাই করতে পারে না। কখনও তাদের মনেই হয় না তারা একা জীবন কাটাচ্ছে। তাদের বন্ধু, পরিবারের সদস্যরা সবসময় সাপোর্ট করছে। এমনকী কোনও উৎসব, অনুষ্ঠানেও সবাই একসঙ্গে এনজয় করছে।

Single woman-দের আজ মানসিকতাই হল, আমি একা আছি তো কী হয়েছে। আমার এতে কোনও দুঃখ নেই। বিয়ে করাটাই শুধু পরিচয়পত্র হতে পারে না। আমার ইচ্ছা, রুচি, স্বাধীনতা আমার কাছে অনেক বেশি প্রিয় এবং জরুরি।

শহুরে আবহাওয়া, ফাস্ট লাইফস্টাইল, পুরোনো ধ্যানধারণায় পরিবর্তন – এসব কিছুই সিংগল উয়োম্যান কনসেপ্ট-কে আরও এগিয়ে নিয়ে এসেছে। মানুষের জীবনশৈলীতে প্রচুর পরিবর্তন হয়েছে। এখন একাকী কোনও নারী বা পুরুষ বাস্তবে একাকী নয়। তারা নিজেদের মধ্যে মেলামেশা করে, ঘুরতে যায়, একে অপরের বাড়িতেও যায়। এই কারণেও বিয়ে করার বা সংসারধর্ম পালন করার কোনও প্রয়োজন তারা উপলব্ধি করতে পারে না।

কুড়িয়ে পাওয়া স্বপ্ন (পর্ব ৪)

পুরোনো কথা শোনার আগ্রহ স্যমন্তকের তেমন ছিল না। অস্থিরতা বাড়ছিল। সাড়ে চারটের বাসটা না ধরতে পারলে কেস খেতে হবে। তাই ব্যস্ত হয়ে বলল, “এবার আমায় উঠতে হবে ছোটোমা। সাড়ে চারটেতে লাস্ট বাস।’

—হ্যাঁ, তাই তো। গল্পে গল্পে সময়ের খেয়াল ছিল না। তোমাকে এ্যদ্দিন বাদে দেখে সমস্ত পুরোনো কথা মনে পড়ে গেল। তুমি আর একটু বসো, কেমন। তন্দ্রা একবারটি ভেতরে আয় তো।

যাবার আগে স্যমন্তকের মাথায় হাত রেখে মধুরিমা আরও একবার উচ্চারণ করলেন ওম শান্তি। স্যমন্তকও পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল তার ছোটোমাকে। তন্দ্রা মধুরিমাকে অনুসরণ করে ঢুকে গেল ঘরের ভেতর আবার ফিরেও এল কয়েক মিনিটের মধ্যে। হাতে একটা সাদা খাম।

—চলুন আপনাকে একটু এগিয়ে দিই।

কথাটা বলেই চলে গেল দরজার দিকে। পায়ে গলিয়ে নিল চামড়ার জুতো। তারপর স্যমন্তককে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে এল বাড়ির সীমানা ছাড়িয়ে। কয়েক মিনিট চুপচাপ হাঁটার পর স্যমন্তক বলল, ‘আপনি যে আমার সঙ্গে এসেছেন সে কথা ছোটোমা জানেন?”

—নাহ। উনি এখন মেডিটেশনে বসেছেন। কোনও দিকে মন দেবেন না। তাই চলে এলাম আপনাকে কয়েকটা কথা বলতে। —যদি কিছু মনে না করেন তবে একটা প্রশ্ন করব?

—করুন।

—কাকু না হয় অন্যায় করেছেন ছোটোমার সঙ্গে। কিন্তু মিতিন? সে তো তাঁর সন্তান। তাহলে মিতিনের প্রতি এতটা উদাসীন কীভাবে হয়ে গেলেন ছোটোমা? বিষয়টা আমার কাছে খুবই অদ্ভুত ঠেকল।

ধীর গতিতে হাঁটছিল ওরা। এবার থেমে গেল তন্দ্রা। পথে লোকজন বিশেষ নেই। সকালে বেশ কিছুক্ষণ বৃষ্টি হয়েছিল। আকাশ এখনও মেঘলা। রাস্তার পাশের রাধাচূড়া গাছটার নীচে দাঁড়িয়ে বিষণ্ণ দৃষ্টিতে স্যমন্তকের দিকে তাকাল সে। বলল, “আপনি আপনার কাকু আর ছোটোমা সম্পর্কে কতটা জানেন স্যমন্তক?’

—না মানে তেমন কিছুই আমার পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না। বললাম না আপনাকে কাকু সব যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিলেন। কাকু ফিরে আসায় একটু আধটু জেনেছি। ইতস্তত করে উত্তর দিল স্যমন্তক।

—একটু আধটু নয়, আপনি আসলে কিছুই জানেন না। আপনার কাকু মানে স্নেহাংশু সরকার আপনাদের বাড়ি ছেড়ে আসার পর কলকাতায় বাড়ি ভাড়া করে থাকা শুরু করেছিলেন মিতিনকে নিয়ে। মাঝে মাঝেই তিনি হানা দিতেন মাসিমণির বাসায় আর নানা বাহানায় টাকা নিয়ে যেতেন। বেশিরভাগ সময় টাকা চাওয়ার কারণটা হতো মিতিন। মাসিমণি অনেক খোঁজখবর করে তার আস্তানার হদিশ বের করেছিল দু’একবার কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখা পাওয়া যেত না কারওর। প্রত্যেকবার টাকা নিয়ে যাবার পর নিজের ঠিকানা বদলাতেন স্নেহাংশু। আত্মীয়স্বজনদের মুখে শুনেছি মেয়েকে একবার চোখের দেখা দেখার জন্যে পাগলের মতো করতেন মাসিমণি। কিন্তু আপনার কাকু কোনওদিনও সে সুযোগ দেননি মাসিমণিকে। শুধু দিনের পর দিন হাত পেতে টাকাই নিয়ে গিয়েছেন। ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছিলেন মাসিমণি। কমিয়ে দিয়েছিলেন গান গাওয়া।

—এসব কথা তো আমি…

—এখানেই শেষ নয় স্যমন্তক। গল্প আরও আছে। মাসিমণির সঙ্গে একবার গিয়েছিলাম হাওড়ায় এক কনসার্টে। সেখানে হঠাৎই দেখা হয়ে যায় পাপিয়ামাসির সঙ্গে। পাপিয়ামাসি মাসিমণির ছোটোবেলার সঙ্গী। একসঙ্গে গান শিখতেন স্নেহাংশু সরকারের কাছে। তিনি কলকাতার এক সরকারি হাসপাতালের নার্স। তাঁর মুখ থেকেই মাসিমণি শুনেছিলেন সেই চরম সত্যিটা যেটা দিনের পর দিন আপনার কাকু লুকিয়ে রেখেছিলেন মাসিমণির কাছ থেকে।

—চরম সত্যি? সেটা কী ?

ভ্রূ কুঁচকে তন্দ্রার দিকে তাকাল স্যমন্তক। বুজে আসা গলায় তন্দ্রা যে-কথাটা বলল সেটা শোনার জন্যে একটুও প্রস্তুত ছিল না স্যমন্তক।

—মিতিন আর বেঁচে নেই। বাড়ি ছেড়ে আসার পরপরই ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয় মিতিন। পাপিয়ামাসিদের হাসপাতালেই ভর্তি ছিল সে। আপনার কাকু বানিয়ে বানিয়ে মাসিমণির দায়িত্বজ্ঞানহীনতার প্রচুর গল্প বলেছিলেন পাপিয়ামাসিকে। তাঁর চোখের সামনেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে ছোট্ট মেয়েটা। অথচ স্নেহাংশু সরকার দিনের পর দিন সেই মৃত মেয়ের নাম করে টাকা নিয়ে আসছিলেন মাসিমণির কাছ থেকে। আজও আপনাকে পাঠিয়েছেন সেই একই কারণে। মিতিনের মৃত্যুর খবর শোনার পর থেকেই গান গাওয়া ছেড়ে দেন মাসিমণি। শান্তির খোঁজে পা বাড়ান আধ্যাত্মিকতার পথে। পুরোনো বাড়ি বিক্রি করে আশ্রয় নেন এই পাণ্ডববর্জিত জায়গায়। চলে যেতে চেয়েছিলেন। স্নেহাংশুর ধরাছোঁয়ার বাইরে। কিন্তু টাকার গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে সেখানেও পৌঁছে গিয়েছে ওই ঠগবাজ লোকটা। নিজে আসতে না পারলেও পাঠিয়ে দিয়েছে আপনাকে।

(চলবে)

কুড়িয়ে পাওয়া স্বপ্ন (পর্ব ৩)

দিঘির জলের মতো স্থির, শান্ত চাহনিতে বাঁধা পড়েছে স্যমন্তক। বলার আছে অনেক কথাই কিন্তু কোথা থেকে শুরু করবে, ঠিক ভেবে পাচ্ছে না। নীরবতা ভেঙে প্রথম কথা বললেন মধুরিমাই, ‘আমার এ বাড়ির ঠিকানা তোমায় কে দিল বুম্বা?’

গলাটা একটু পরিষ্কার করে নিয়ে স্যমন্তক বলল, “আমি আপনার কলকাতার বাড়িতে বার কয়েক গিয়েছি। কিন্তু জানতে পারলাম আপনি এখন আর সেখানে থাকেন না। বিক্রি করে দিয়েছেন বাড়িটা। তারাই আমাকে কয়েকটা সম্ভাব্য ঠিকানার কথা বলেছিল। সবগুলোতে খুঁজে খুঁজে শেষমেশ জানতে পারলাম আপনি এখানে আছেন।’

—তা এত বছর পর হঠাৎ ছোটোমাকে এমন খোঁজাখুঁজি ? কোনও বিশেষ কারণ আছে নিশ্চয়ই? ধীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন মধুরিমা।

সামন্তকের গলায় এখনও মৃদু উত্তেজনা, কারণ একটা আছে অবশ্য। কিন্তু বুম্বার কি তার ছোটোমাকে দেখতে ইচ্ছে করে না? “বিশ্বাস করুন ছোটোমা, আমি বহুবার আপনাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু কাকু নিজেই বন্ধ করে দিয়েছিলেন সব রাস্তা। তাই ইচ্ছে থাকলেও পৌঁছোতে পারিনি আপনাদের ধারে কাছে। যতদিন গায়িকা মধুরিমা সরকার প্রচারের আলোয় ছিলেন ততদিন তবুও আপনার খবরাখবর পেতাম। কিন্তু তারপর… ঠাকুমা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আপশোশ করে গিয়েছেন এই ছন্নছাড়া সংসারটার জন্যে। বাবা বরাবরই উদাসীন ছিল কাকুর প্রতি তাই ঠাকুমার হাজার বায়নাক্কার পরেও আগ বাড়িয়ে খোঁজ করতে যায়নি তাঁর। বারণ করে দিয়েছিল আমাকেও। কিন্তু সেদিন…..

—কেমন আছেন দাদামণি, দিদিভাই? স্যমন্তকের কথা মাঝ পথে থামিয়েই বলে উঠলেন মধুরিমা। —বাবা চলে গিয়েছে আজ দু’বছর হল। মা বাতের ব্যথায় কাবু। কোনওরকমে চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে।

—আর তুমি? বিয়ে থা করেছ? কাজ কারবার?

—বিয়ে এখনও করিনি ছোটোমা। বাবার ওষুধের ব্যাবসাটারই হাল ধরার চেষ্টা করছি।

ভেতর ঘরে যাবার দরজাটার দিকে এক পলক তাকিয়ে আলতো হেসে উত্তর দিল স্যমন্তক। আর ঠিক তখনই নড়ে উঠল পর্দাটা। হাতে জলখাবারের প্লেট নিয়ে ঘরে ঢুকল তন্দ্রা। টেবিলের ওপর রেখে নিঃশব্দে এসে দাঁড়াল মধুরিমার পাশে। বলল, “তুমি এখন চা খাবে মাসিমণি?”

—না রে বাবু, আজ আর চা খেতে মন চাইছে না। বুম্বা কে দে। তুইও খা।

—আমার জন্যে ব্যস্ত হবার দরকার নেই ছোটোমা। এতসব আয়োজন না করলেই হতো।

—সে কী? এতবছর পর তোমাকে দেখছি দু’চারটে মিষ্টি খাওয়াব না? আপত্তি কোরো না। এই গরমে এতটা পথ এসেছ, খিদে পেয়েছে নিশ্চয়ই?

খিদে তার জব্বরই পেয়েছিল তাই আর বেশি ভণিতা না করে দ্রুত তুলে নিল প্লেটটা। গোটা তিনেক মিষ্টি শেষ করে হাতে নিল বড়োসড়ো একটা শিঙাড়া। প্রসন্ন মুখে তার খাওয়া দেখছিলেন মধুরিমা। তন্দ্রা আড় চোখে নজর রাখছিল স্যমন্তকের ওপর।

—আর দুটো মিষ্টি দেবে?

—না না ছোটোমা, এই ঢের।

জল খেয়ে একটা মৃদু ঢেকুর তুলে জবাব দিল স্যমন্তক। খাওয়া দাওয়া সারা। এবার যত তাড়াতাড়ি কাজের কথায় আসা যায় ততই মঙ্গল। মধুরিমা বোধহয় পড়তে পেরেছিলেন স্যমন্তকের মনের কথাটা। তাই প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, “তোমার এখানে আসার পেছনে কী একটা কারণ আছে বলছিলে…।’

—হ্যাঁ ছোটো মা, আসলে যে কথাটা বলছিলাম। এতগুলো বছর আপনার, কাকুর, মিতিনের কোনও খবর না পেয়ে আমরা প্রায় ভুলতেই বসেছিলাম সবকিছু। কিন্তু হঠাৎই দিন দশেক আগে কাকুর লেখা একটা চিঠি আসে ডাকে। জানতে পারি তিনি অসুস্থ। আমাকে তাঁর ঠিকানায় যেতে লিখেছেন। রুমাল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে কথাগুলো বলে স্যমন্তক, একবার দেখে নেয় মধুরিমাকে। ভাবলেশহীন দৃষ্টিতে তিনি চেয়ে আছেন সামন্তকের দিকে।

স্নেহাংশুর অসুস্থতার খবরে একটুও বিচলিত দেখাল না তাঁকে। রুমালটা পকেটে গুঁজে আবারও বলতে শুরু করে, অনেক খুঁজে পেতে অবশেষে উপস্থিত হই উত্তর কলকাতার এক ঘুপচি ঘরে। ওটাই কাকুর আস্তানা। হাঁপানির টানে দম নিতে পারছিলেন না তিনি। অনেক কষ্টে জানালেন আপনার কথা। বললেন, আপনাকে যেন খবরটা দিই আর বলেছেন মিতিনের হস্টেলের ফিজ বাকি পড়েছে অনেকদিন হল। উনি অসুস্থ তাই কোনও ভাবেই জোগাড় করতে পারছেন না টাকাটা। আমার হাতে আপনাকে টাকা দেওয়ার অনুরোধ করেছেন কাকু।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নীচু করলেন মধুরিমা। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে অস্ফুটে বললেন, ‘এখন কোথায় আছেন তিনি?”

—হাসপাতালে ভর্তি করেছি। কিছুটা ভালো আছেন। আমি আসতে চাইনি কিন্তু কাকু বারবার জোর করতে থাকায়…

—ভালোই করেছ। এত বছর পর তোমার সঙ্গে দেখা তো হল। চেহারা অনেকটা বদলে গিয়েছে তোমার। কপালের ওই কাটা দাগটা না দেখলে চিনতেই পারতাম না হয়তো। সেবার মামা-ভাগ্নে পাহাড় দেখতে গিয়ে মাথা ফেটে সে এক কেলেঙ্কারি কাণ্ড! মনে আছে?

মধুরিমার কথা শেষ হতেই পাশে দাঁড়ানো তন্দ্রা ঝটিতি তাকাল সামন্তকের দিকে। তন্দ্রার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই কাটা দাগটায় হাত বোলাল স্যমন্তক। একটা ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি হেসে বলল, ‘সে আর বলতে?”

স্নেহাংশুর অসুস্থতা, মিতিনের হস্টেলের প্রসঙ্গ কোনও কিছু নিয়েই তেমন কৌতূহল দেখাচ্ছিলেন না মধুরিমা। বিষয়টা কেমন অদ্ভুত ঠেকছিল সামন্তকের কাছে। আঠারো বছর আগে দেখা মানুষটা অনেকটাই বদলে গিয়েছেন। এমনকী তাঁর একমাত্র মেয়েকে নিয়েও একটা শব্দ খরচ করছেন না তিনি। তাঁর প্রথম শ্বশুরবাড়ি যাওয়া, সামন্তকের সঙ্গে অন্তরঙ্গতা— এসব গল্পই তিনি শোনাচ্ছিলেন তন্দ্রা আর স্যমন্তককে।

(চলবে)

একাকী মহিলার লড়াই (পর্ব ১)

মা-দিদিমাদের সময়েই হোক অথবা বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় হোক— এই দীর্ঘ সময়ের সফরে এমন বহু মহিলা আছেন, যারা শক্তি, সংঘর্ষ এবং সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। সেইসঙ্গে পরের প্রজন্মকেও সব দিক দিয়ে পুরোপুরি তৈরি করে দিয়ে গেছেন।

“যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে’, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই শব্দ চয়ন মনে করায় একাকী নারীর সংগ্রামকেও। দেশভক্তির পরিচয়স্বরূপ প্রতিবাদমূলক এই গানটি কবি রচনা করলেও গানের কথাগুলো যেন একাকী নারীর সংঘর্ষের প্রতি কবির এক শ্রদ্ধার্ঘ্য।

আত্মবিশ্বাস হল সবচেয়ে বড়ো মূলধন

বিয়ের ১১ বছর পরে সোনালির Divorce হয়ে যায় এবং সন্তানের দেখাশোনা করার জন্য সে চাকরি করা শুরু করে। সোনালির কাছে বর্তমানটাই সব। রোজ ও নতুন করে বাঁচার চেষ্টা করে। ডিভোর্স-এর পুরো প্রক্রিয়া আজও তার কাছে অত্যন্ত বেদনাদায়ক। কিন্তু আজ সে বিশ্বাস করে, চাইলেও সবকিছু দীর্ঘদিন স্থায়ী হয় না।

ডিভোর্সের পর সে গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করে। টিচিং-এর সঙ্গে সঙ্গে ‘ল’ পড়ে। নিজের আত্মবিশ্বাস হারায়নি সোনলি, নিজের সিদ্ধান্তে দৃঢ় থেকেছে। লোকের সমালোচনা গায়ে মাখেনি। বাচ্চার জন্য নিজের মা-বাবা এমনকী সন্তানের পিতার কাছ থেকেও এতটুকু সাহায্য দাবি করেনি। সোনালির সব সময় মনে হয়েছে, ওর থেকেও দুঃখী আরও অনেক মানুষ আছেন। নিজের জন্য তো সকলেই বাঁচে কিন্তু সোনালি অপরের জন্য বাঁচতে শিখে গিয়েছিল।

মেয়েদের নিজেকে দুর্বল ভাবা উচিত নয়। আত্মবিশ্বাস থাকলে জীবনে অগ্রসর হতে কেউ আটকাতে পারবে না। কারও কাছে কিছু আশা করা উচিত নয় কারণ আশাপূরণ না হলে ব্যথা পাওয়া স্বাভাবিক। কঠিন সময়ে সান্ত্বনা বাক্য দিতে লোকের অভাব হবে না কিন্তু নিজের প্রতি বিশ্বাস রেখে এগিয়ে চলাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।

একলা অভিভাবকের দায়িত্ব

আমাদের চারপাশে এমন অনেক মহিলা আছেন যারা স্বামী ছাড়াই সন্তানকে, পরিচয় নিয়ে গর্ব করার মতোই বড়ো করেছেন। রুপোলি পর্দার জগতে এমন দৃষ্টান্ত ভুরি ভুরি আমাদের চোখে পড়ে।

আজকাল ঘরে ঘরে Divorce-এর ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মহিলারাই সন্তানের দায়িত্ব গ্রহণ করে, সসম্মানে এইরকম সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে এসে সন্তান-সহ সংসারের হাল ধরছেন। বহু ক্ষেত্রে এমনও দেখা যায়— স্বামীর অনাদর পীড়িত শ্বশুর-শাশুড়ির দায়িত্বও একা পুত্রবধূ বহন করতে বদ্ধপরিকর।

নারীর এই দায়িত্ববোধ ও আত্মবিশ্বাস রামায়ণের সময় থেকেই চর্চিত হয়ে আসছে। শ্রীরাম কর্তৃক সীতার বনবাসকালেও আত্মসম্মান ও স্বাভিমানের বিন্দুমাত্র অভাব সীতার মধ্যে দেখা যায়নি। দুই সন্তান-সহ বনবাসে একলা থেকেছেন এবং শ্রীরামের সাহায্য ছাড়াই সন্তানদের উপযুক্ত করে গড়ে তুলেছেন।

সকলের থেকে আলাদা

জয়পুরে কর্মরত বিজ্ঞাপন এজেন্সির প্রোডাকশন ডিজাইনার স্বরূপা মজুমদারের সঙ্গে হওয়া কিছু কথোপকথন, “আমি অবিবাহিত এবং এখন বয়স ৪৬। বিয়ে না কারাটা সম্পূর্ণ আমার ইচ্ছে এবং ব্যক্তিগত ব্যাপার। সেই পুরোনো সময় থকে চলে আসা, জোর করে মেয়েদের উপর চাপিয়ে দেওয়া সমাজব্যবস্থায় আমার কোনওরকম ভরসা নেই। আমি এই যুগের মহিলা এবং নিজের ইচ্ছেমতন বিকল্প আমি খুঁজে নিই। নিজের স্বতন্ত্র জীবন বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা আমার আছে বলে মনে করি। আমি আনন্দে আছি। আর দশটা লোক আমার সম্পর্কে কী বলল, তার আমি পরোয়া করি না।”

এরকম মানসিকতা যাদের আছে তারা নিজেদের একাকী মনে করে, চোখের জল ফেলে সময় কাটান না। বরঞ্চ সমাজের ভালোমন্দের প্রতি তারা যথেষ্ট সচেতন। সমাজ থেকে নিজেকে বহির্ভূত না রেখেও, তারা নিজের পছন্দের বিকল্প জীবনশৈলীর আনন্দ গ্রহণ করেন। এরা কিন্তু সকলেই শিক্ষিত, যথেষ্ট বুদ্ধিমতি এবং সংবেদনশীল। একা থাকতে এরা ভালোবাসেন। আগেকার দিনের অবিবাহিত মাসি, পিসিদের থেকে এরা অনেক আলাদা।

এই মানুষদের বন্ধুর সংখ্যা প্রচুর। এরা সম্পর্কেও আছেন কিন্তু অনেকের থেকেই তা আলাদা। এদের কাছে জীবনের অর্থ-ই হল আত্মসম্মান, বিশ্বাস এবং সৃজনশীলতা।

 

 

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব