আবেগের ছবি মৈনাক ভৌমিকের ‘চিনি ২’

শাক, সবজি, ডাল কিংবা মাছ, মাংস, ডিম ইত্যাদিতে একটু চিনি না দিলে যেন খেয়ে তৃপ্তি পাওয়া যায় না। তাই শারীরিক নানারকম সমস্যার কারণে অনেকের ক্ষেত্রে চিনি ‘হোয়াইট পয়জন’(white poison) হয়ে ওঠলেও, থোড়াই কেয়ার। চিনি মাস্ট। আর এই রসায়নের কথা মাথায় রেখেই হয়তো পরিচালক মৈনাক ভৌমিক ‘চিনি’ শীর্ষক ছবি উপহার দিয়েছেন এবং বাংলা ছবির দর্শকদের থেকে প্রচুর ভালোবাসাও কুড়িয়েছেন ইতিমধ্যেই। শুধু তাই নয়, সেই সাফল্যের স্বাদ জিভে রেখে আবারও তিনি বাংলা ছবির দর্শকদের উপহার দিলেন ‘চিনি ২’।

মৈনাকের আগের ‘চিনি’-তে যেমন সম্পর্কের টানাপোড়েন, মজা, আনন্দ কিংবা আড্ডার আবহ ছিল, এবার ‘চিনি ২’ ছবিতে ওসব তো থাকবেই, সেইসঙ্গে আরও ভরপুর আবেগ থাকবে বলেও জানানো হয়েছে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, মা-মেয়ের ভালোবাসা আর খুনসুটিতে ভরা ছিল মৈনাকের আগের ছবি ‘চিনি’। ওই ছবিতে মা-মেয়ের চরিত্রে রূপদান করেছিলেন যথাক্রমে অপরাজিতা আঢ্য এবং মধুমিতা সরকার। এবার ‘চিনি ২’-তেও অপরাজিতা এবং মধুমিতা-কে এক ফ্রেমে দেখা যাবে ঠিকই কিন্তু মা-মেয়ের চরিত্রে নয়। ভিন্ন প্রেক্ষাপট থেকে আসা দুটো ভিন্ন সত্তা নিয়ে ‘চিনি ২’-তে আত্মপ্রকাশ করতে দেখা যাবে এই দুই অভিনেত্রীকে। তবে এঁরা ছাড়াও ‘চিনি ২’ ছবির অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে রূপদান করেছেন লিলি চক্রবর্তী, অনির্বাণ চক্রবর্তী, সৌম্য মুখোপাধ্যায় এবং পিঙ্কি বন্দ্যোপাধ্যায়।

আগের ‘চিনি’ ছাড়াও অপরাজিতা এর আগে মৈনাকের ‘জেনারেশন আমি’-তে নজর কেড়েছেন। আর ‘চিনি’-র পর ‘চিনি ২’-তেও মৈনাকের ছবিতে দ্বিতীয়বার মধুমিতা সরকার–কে অভিনয় করতে দেখবেন দর্শকরা। উল্লেখ্য, মধুমিতা সরকার ‘সেনকো গোল্ড অ্যান্ড ডায়মন্ডস’-এর  ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর এবং এই জুয়েলারি ব্র্যান্ড-ও ‘চিনি ২’ ছবিটির সঙ্গে অ্যাসোসিয়েটেড। তাই ছবিটির মুক্তি উপলক্ষ্যে  ‘সেনকো গোল্ড অ্যান্ড ডায়মন্ডস’-এর এভারলাইট ব্র্যান্ড-এর  ‘জিঙ্কগো অ্যান্ড মারিপোসা কালেকশন’ প্রোমোট করলেন মধুমিতা। সেইসঙ্গে এই জুয়েলারি ব্র্যান্ড-এর বউবাজারের শোরুম-এ উপস্থিত থেকে সংবাদমাধ্যমকে জানালেন, ‘আমি সেনকো গোল্ড অ্যান্ড ডায়মন্ডস-এর সঙ্গে যুক্ত হতে পেরে সম্মানিত বোধ করছি। এভারলাইট -এর মারিপোসা এবং জিঙ্কগো কালেকশন-এর সঙ্গে আমার মুভির অ্যাসোসিয়েশন নিয়েও আমি উচ্ছ্বসিত। ছবিতে আমার ব্যবহৃৎ সোনার কানের দুল, নেকলেস এবং রিংগুলির একটি অত্যাশ্চর্য  বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা ছবির গল্প বলার একটি সুরেলা মিশ্রণ তৈরি করে।’ এই উপলক্ষ্যে সেনকো গোল্ড অ্যান্ড ডায়মন্ডস- এর ডিরেক্টর এবং হেড অফ ডিজাইন অ্যান্ড মার্কেটিং, মিসেস জয়িতা সেন জানিয়েছেন, ‘আমরা চিনি ২ সিনেমার সঙ্গে সহযোগিতায় এভারলাইট – এর মারিপোসা কালেকশন উপস্থাপনা করতে পেরে ভীষণ খুশি।’

Film Chini 2

মাঝে কিছুদিন থ্রিলার ছবি করলেও, মৈনাক আবার ফিরছেন তাঁর চেনা পরিসরে। ‘চিনি’-র আগে ‘বর্ণ পরিচয়’ এবং ‘গোয়েন্দা জুনিয়র’ সঠিক প্রশংসা পায়নি বলেই হয়তো মৈনাক আবার চেনা পথ ধরে এগোতে চাইছেন। তবে প্রযোজনা সংস্থা  ‘এসভিএফ’ (শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মস) ‘চিনি’-র থেকেও ‘চিনি ২’ ছবির সাফল্যের ব্যাপারে আর বেশি আশাবাদী। তাঁরা জানিয়েছেন, আরও বেশি ভালোলাগার অনুভূতি নিয়ে প্রেক্ষাগৃহ থেকে বাড়ি ফিরবেন দর্শকরা।

এই ছবিতে অপরাজিতা-র চরিত্রের নাম ‘মিষ্টি’ এবং মধুমিতা-র চরিত্রের নাম ‘চিনি’। মৈনাকের মতে, ‘চিনি ২’ খুব সাধারণ একটি পারিবারিক ও সামাজিক গল্প, যেখানে একজনের সঙ্গে অন্যজনের আবেগের সম্পর্ক প্রাধান্য পেয়েছে। অপরাজিতা এবং মধুমিতা-র সঙ্গে আবার কাজ করতে পেরে আনন্দ প্রকাশ করেছেন মৈনাক। তবে জানা গেছে, মৈনাকের সঙ্গে চারটি ছবির চুক্তি ছিল ‘এসভিএফ’-এর। ‘চিনি ২’ সেই অর্থে চতুর্থ ছবি। ‘চিনি ২’-র সংগীতায়োজন করেছেন মৈনাক মজুমদার। সিনেমাটোগ্রাফি-তে মধুরা পালিত। ইতিমধ্যেই মুক্তি পেয়েছে ছবিটি।

তিনটি ছোটো গল্পে সমৃদ্ধ ‘ফ্লাওয়ার্স অফ দ্য মাউন্টেন’

তিনটি ছোটো গল্পকে এক সুতোয় গেঁথে একটি হিন্দি ছবি উপহার দিতে চলেছেন পরিচালক শুভ্র রায়। ছবির নাম—‘ফ্লাওয়ার্স অফ দ্য মাউন্টেন’। নাম থেকেই আন্দাজ করা যায়, পাহাড়ি প্রকৃতি প্রাধান্য পেয়েছে এই ছবিতে। তবে শুধু পাহাড়ি প্রকৃতি-ই নয়, জানা গেছে, প্রকৃতি এবং প্রেমের সঙ্গে শিল্প মিলেমিশে একাকার হয়ে এ ছবি নাকি এমন এক মাত্রা পেয়েছে, যা দর্শকচিত্ত জয় করে নেবেই। পরিচালক শুভ্র রায় অন্তত এমন্টাই মনে করেন। তাঁর মতে, ‘প্রেম এবং শিল্প প্রতিদিন নতুন জন্ম দেয়, অন্যরকম ভাবে বাঁচার রসদ জোগায়।’

তিন বছর আগে ‘ঘুণ’ শীর্ষক একটি ছবি পরিচালনা করেছিলেন শুভ্র রায়। সেই ‘ঘুণ’ ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রে রুপদান করেছিলেন সমদর্শী দত্ত এবং সৌরভ দাস। যাইহোক, তিন বছর বাদে শুভ্র এবার দর্শকদের উপহার দিতে চলেছেন ‘ফ্লাওয়ার্স অফ দ্য মাউন্টেন’ শীর্ষক এই হিন্দি ছবিটি।

‘ফ্লাওয়ার্স অফ দ্য মাউন্টেন’ ছবির প্রচার উপলক্ষ্যে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখিত, ‘ফিল্ম মেকিং হল নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ।’ এই উক্তির স্রষ্টা রবার্ট অল্টম্যানের ভাবধারায় পরিচালক শুভ্র রায়ও যে বিশ্বাসী, তা তিনি স্পষ্ট করেছেন। সেইসঙ্গে শুভ্র আরও জানিয়েছেন, ‘আমি মনে করি প্রেম এবং শিল্প আমাদের প্রতিদিন নতুন জন্ম দেয়, জীবনকে ভিন্নভাবে দেখার সুযোগ দেয়। এই পৃথিবী এক মায়ার জগত ছাড়া আর কিছুই নয়। আজ আমরা এখানে আছি কিন্তু একদিন আমরা সেখানে ফিরে যাব যেখান থেকে আমরা এখানে এসেছি। কিন্তু আমি মনে করি, প্রেম এবং শিল্প এমন জিনিস যা চিরন্তন, যা অন্তহীন। আমি জীবনকে ভিন্নভাবে দেখি এবং আমি এটাও বিশ্বাস করি যে, শুধু সিনেমাতেই নয়, আমাদের সকলেরই আমাদের এক জীবনে বহু জীবন চলার সুযোগ আছে। আর তা করার জন্য আমাদের যা করতে হবে তা হল–ভিন্নভাবে চিন্তা করা। এটাই আমি আমার সিনেমায় মানুষকে দেখাতে চাই। মানুষ আমার সিনেমা উপভোগ করবে এবং তারা অনুপ্রাণিত হবে, এটাই আমার লক্ষ্য। তিনটি ছোটো গল্পের উপর ভিত্তি করে তৈরি ‘ফ্লাওয়ার্স অফ দ্য মাউন্টেন’। এই তিনটি ছোটোগল্প বিভিন্ন শিল্প, চিত্রকলা, অভিনয়, গান এবং নৃত্যের উপর ভিত্তি করে তৈরি। প্রথম গল্পটি একজন চিত্রকরের এবং প্রকৃতিতে তার ভালোবাসা এবং সৃজনশীলতা খুঁজে পাওয়ার জন্য সফর। দ্বিতীয় গল্পটি একজন অভিনেতা এবং তার প্রিয়জনের একটি সুন্দর প্রেমের গল্প, যা আমাদের দেখায় যে, প্রেম এবং শিল্প এই 3D জগতের বাইরে, এমনকি মৃত্যুরও ঊর্ধ্বে। তৃতীয় গল্পটি একটি মেয়ের সুন্দর গল্প বলে, যে একটি ছোটো  পাহাড়ি এলাকায় থাকে। তার স্বপ্ন নৃত্যশিল্পী হওয়ার। কিন্তু আকস্মিক দুর্ঘটনার পর সে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। তারপরে এক রাতে তার স্বপ্নে একটি ছেলের সঙ্গে দেখা হয় এবং যে তাকে বিশ্বাস করায় যে, ভালোবাসা, যত্ন এবং ইচ্ছাশক্তি দিয়ে যে কোনও কিছু অর্জন করতে পারা যায়, তার শারীরিক অবস্থা যাই হোক না কেন। সর্বোপরি, প্রেম এবং শিল্পের একটি অনুপ্রেরণামূলক চলচ্চিত্র ‘ফ্লাওয়ার্স অফ দ্য মাউন্টেন’। আমি আশা করি, দর্শকরা এই সিনেমাটি পছন্দ করবেন এবং তারা প্রেম এবং শিল্পের নতুন অর্থ খুঁজে পাবেন।’

‘ফ্লাওয়ার্স অফ দ্য মাউন্টেন’ ছবির বিভিন্ন চরিত্রে রুপদান করেছেন সুব্রত দত্ত, জয়া শীল ঘোষ, দেবাশিস মণ্ডল, দিগন্ত সাহা, পায়েল মুখোপাধ্যায়, কৌশিকী চক্রবর্তী, শ্রেয়সী রায় বন্দ্যোপাধ্যায়, দেবার্ঘ্য মজুমদার, রঞ্জন দাস, পায়েল চৌধুরি, শুভায়ন রায়, নীলাঞ্জনা বিশ্বাস, তানিশা রায়, স্বপন রায় প্রমুখ।ছবিটির কাহিনি এবং চিত্রনাট্য লিখেছেন শুভ্র রায় ও মৌপর্ণা দত্ত। ডিওপি এবং কালারিস্ট স্মৃতি। প্রোডাকশন ডিজাইন অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েট ডিরেক্টর: শক্তি ধর বীর।  সৃজনশীল পরিচালক দেবরাজ তালুকদার। কার্যনির্বাহী প্রযোজক পায়েল চৌধুরি। সম্পাদক রবি রঞ্জন মৈত্র। সঙ্গীত পরিচালক বিক্রম ঘোষ। সাউন্ড ডিজাইনার অয়ন ভট্টাচার্য। কস্টিউম ডিজাইনার নূপুর রায়। প্রধান সহকারী পরিচালক শুভজিৎ হালদার। সহকারী পরিচালক রঞ্জন দাস, সলমন পল, স্নেহা সরকার, কিরণ মজুমদার এবং দীপু তাঁতি। চিত্রনাট্যের হিন্দি অনুবাদক এবং তত্ত্বাবধায়ক রিয়া দাস। মেক-আপে এএডি কস্টা।

‘ফ্লাওয়ার্স অফ দ্য মাউন্টেন’ ছবির প্রযোজক ‘দ্য নেক্সট আইডিয়াশন এন্টারটেইনমেন্ট’। ছবিটির নিবেদক অধ্যাপক রঞ্জন দাস। ছবিটির মুক্তি প্রসঙ্গে জানানো হয়েছে, বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে আগে পাঠানো হবে, তারপর বানিজ্যিক মুক্তির কথা ভাবা হবে।

কুড়িয়ে পাওয়া স্বপ্ন (পর্ব ২)

স্যমন্তক খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল ঘরের প্রতিটা জিনিস। বোঝার চেষ্টা করছিল ঠিক কোন গাঙে আজকাল তরী ভাসিয়েছেন মধুরিমা। একসময়ে খ্যাতির শীর্ষে থাকা গায়িকার এহেন স্বেচ্ছা নির্বাসন অনেকের কাছেই কৌতূহলের বিষয়। জনপ্রিয়তার মধ্যগগনে থাকতে থাকতেই কোনও এক অজ্ঞাত কারণে মঞ্চ সংগীতের জগৎ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন তিনি। তারপর হঠাৎই একদিন উবে গেলেন কপূরের মতো। মানুষের মন থেকেও আস্তে আস্তে ফিকে হতে থাকলেন মধুরিমা সরকার নামের সুরেলা কণ্ঠের অধিকারিণী। তাঁর ফেলে যাওয়া আসন ভরাট করতে এগিয়ে এল একঝাঁক নতুন মুখ। এখনও কিছু রসিক শ্রোতার সংগ্রহ খুঁজলে মধুরিমার অনেক কালজয়ী গানের হদিশ পাওয়া যাবে।

মধুরিমা সরকারের নাগাল পেতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে স্যমন্তককেও। পুরোনো বাড়িতে ঢুঁ মেরেছে বার কতক। ফোন নম্বরও বদল হয়েছে। বহু চেষ্টার পর অবশেষে জানতে পেরেছে মধুরিমার বর্তমান ঠিকানার সন্ধান। ধরতে পেরেছে ফোনে। আর আজ বহুপ্রতীক্ষিত সেই সাক্ষাতের সময় উপস্থিত। স্যমন্তকের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছিল ক্রমশ। মনের ভেতরে জন্ম নিচ্ছিল অস্থিরতা। ঠিক তখনই ঘরে ঢুকলেন। সাদা পোশাক পরিহিতা মধুরিমা। মাথা ভর্তি কাঁচাপাকা চুল। মুখে আলতো বলিরেখার আভাস।

স্যমন্তকের দিকে প্রসন্ন মুখে চেয়ে বললেন, ‘কত বড়ো হয়ে গিয়েছ বুম্বা! বহু বছর বাদে তোমায় দেখলাম। ওম শান্তি!”

গভীর বিস্ময়ে স্যমন্তক দেখছে মধুরিমাকে। নিজের অজান্তেই মুখ থেকে বেরিয়ে এল, ‘ছোটোমা!”

স্যমন্তকের বয়স যখন নয় কী দশ বছর তখন তার কাকার সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল মধুরিমার। তাঁর গানের স্কুলের সবথেকে ভালো ছাত্রীটির প্রেমে পড়েছিলেন স্নেহাংশু। বিয়ে করেছিলেন সকলের অমতে বয়সে অনেক ছোটো মধুরিমাকে। স্নেহাংশুর বাড়ির লোকেরা অনিচ্ছা সত্ত্বেও মেনে নিয়েছিলেন সম্পর্কটা। কিন্তু বেঁকে বসলেন মধুরিমার পরিবারের লোকজন। বাপেরবাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছিল তাঁর।

প্রথম প্রথম সব কিছুই ঠিকঠাক চলছিল। নতুন কাকিমার ভীষণ ন্যাওটা ছিল স্যমন্তক। ডাকত ছোটোমা বলে। কিন্তু ধীরে ধীরে খারাপ হচ্ছিল পরিস্থিতি। গানের জগতে মধুরিমার পরিচিতি বেড়ে যাচ্ছিল দিন কে দিন। অপরদিকে হীনম্মন্যতা গ্রাস করছিল স্নেহাংশুকে। গুরুর কাছে ছাত্রীর উন্নতি সুখের হলেও একজন স্বামীর কাছে তাঁর স্ত্রীর বাড়তে থাকা উচ্চতা মেনে নেওয়া খুব কঠিন। যত দিন এগোতে লাগল তত গরিমা বাড়তে লাগল মধুরিমার।

মুগ্ধ শ্রোতার দল ঘিরে থাকত তাঁকে। রেগে যেতেন স্নেহাংশু। ভেবেছিলেন সন্তান এলে হয়তো ভাটা পড়বে মধুরিমার সংগীত চর্চায়। কিন্তু দেখা গেল মিতিনের জন্মের পর দ্বিগুন উৎসাহে গান গাইছেন তিনি। একের পর এক আসছে কনসার্ট, সিনেমায় প্লে-ব্যাকের প্রস্তাব। ঈর্ষার বশে স্নেহাংশু বন্ধ করলেন গান শেখানো। ঝাঁপ পড়ল স্কুলের।

নেশার প্রতি আসক্ত হচ্ছিলেন স্নেহাংশু। মধুরিমার ওপর বাড়তে থাকা ক্রোধ তাঁকে ঠেলে দিচ্ছিল অন্ধকারের দিকে। সে সময় স্যমন্তক নেহাতই শিশু। অতশত বুঝত না কিছু। তবুও বেশ মনে পড়ে, প্রায় রোজ রাতেই ঝামেলা করতেন স্নেহাংশু। কিন্তু কোনও দিন সে তার প্রত্যুত্তরে রা কাড়তে শোনেনি মধুরিমাকে। নিত্য অশান্তিতে বিরক্ত হয়ে একদিন বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন মধুরিমা।

স্যমন্তকের মনে আছে সেই দিনটার কথা। তার ছোটোমার মাথায় আঘাত করেছিলেন কাকু। রক্ত ঝরছিল সেখান থেকে। কাঁদতে কাঁদতে ব্যাগ গোছাচ্ছিলেন মধুরিমা। ছোট্ট মিতিনকে সঙ্গে নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু স্নেহাংশুর তীব্র বিরোধিতায় একরত্তি মেয়েটাকে না নিয়েই বাড়ি ছেড়েছিলেন। পরিবারের সকলে হতভম্ব হয়ে দেখেছিল সব ঘটনা। মধুরিমা চলে যাবার মাস খানেক পর মিতিনকে নিয়ে গৃহত্যাগ করেন স্নেহাংশুও। ছিঁড়ে যায় মধুরিমার সঙ্গে স্যমন্তকের যোগাযোগের শেষ সুতোটাও। আজ আঠারো বছর পর আবার মুখোমুখি বুম্বা আর তার ছোটোমা।

(চলবে)

মহারাষ্ট্রের কেলভা সৈকত (শেষ পর্ব)

বিকেল চারটে নাগাদ গেলাম প্রথমে কেলভার শীতলাদেবী মন্দির। পুজোর নৈবেদ্য-ডালির কিছু দোকান, শতাব্দী প্রাচীন মন্দিরটির রানি অহল্যাবাঈ হোলকরের তত্ত্বাবধানে প্রভূত সংস্কার হয়। স্থানীয় কথন-এক কৃষক দেবীমাতার স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে মাটি খনন করে পাথরের এক দেবীমূর্তি পান। যে-স্থানে খনন করা হয়েছিল সেইখানেই প্রতিষ্ঠিত করা হয় মন্দির।

১৯৮৬ সালে মহারাষ্ট্র সরকার মন্দিরটির পুনঃসংস্কার করে। মার্বেলখোদিত মন্দিরের গর্ভগৃহে রুপোর চূড়ামুকুট, সবুজ-কমলাজরির শাড়ি পরিহিতা একখণ্ড পাথরের মূর্তি। মূর্তির অবয়বে শান্তশ্রী রূপটান। সামনে দানপেটিকা। একই চত্বরে শ্রীহনুমান মন্দির ও রামকুণ্ড নামে বাঁধানো জলাশয় রয়েছে। মন্দিরদ্বয়ের মাথায় কমলা নিশান সাগরের লোনা হাওয়ায় পতপত করে উড়ছে।

সাগরসৈকতের কিছুটা উঁচুতে ঝাউ বনবীথির পাশ দিয়ে পায়ে চলা পথ। সেখানে সাগরের দিকে মুখ করে অঢেল বসার ব্যবস্থা। সুরুবন তথা ঝাউবনে ভাড়া করা প্লাস্টিকের মাদুর বিছিয়ে বিভিন্ন দলবদ্ধ হয়ে আড্ডায় মেতেছেন অনেক পরিবার। কেউ বসে, কেউ দু’পা ছড়িয়ে, কেউ আধ শোয়া হয়ে। এখানে প্রায় প্রতিটি দোকানেই অন্যান্য বিক্রয়লব্ধ সামগ্রীর সঙ্গে ঘন্টা প্রতি ভাড়া দেওয়ার জন্য প্লাস্টিকের মাদুরের ব্যবস্থা রয়েছে। সিমেন্ট বাঁধানো ছাউনির তলায় বেলা বয়ে যায় চূড়ান্ত আলস্যে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল, বিকেল গড়িয়ে সূর্য পাটে নামার ক্ষণ আসে। সেই চিরন্তন ক্ষণে হেমন্তের আকাশ জুড়ে ম্যাজিক শুরু হয়ে যায়।

রোদ্দুর সামান্য ফিকে হতে গড়ানে বালুপথে সৈকতে নেমে আসি। সাগরজল তখন যদিও আর নাগালে নেই। আরবসাগর তখন বিশ্রাম নিচ্ছে একেবারে দিগন্তের গায়ে ঠেস দিয়ে। ভাটার টানে সাগর এতটাই সরে যায় যে, অনায়াসে পরপর তিন-চারটে ফুটবল ম্যাচ খেলার জায়গা হয়ে যাবে। ইতিমধ্যে সূর্যগোলক আকাশে গোলাপি-কমলা আভা ছড়াতে ছড়াতে হেলে পড়তে শুরু করেছে। ভেজা বালির বুকে তার দীর্ঘ বিচ্ছুরণ। পর্যটকদের মোবাইল ক্যামেরা এন্তার ঝলসে উঠছে সেই সূর্য ডোবার পালাকে ধরে রাখার জন্য।

পরদিন সকালে গাড়ি বুক করে চলে এলাম Kelva দুর্গের গর্বিত ইতিহাসকে ছুঁয়ে দেখতে। সাগরের জলশরীরের মাঝে দুর্গটির উপস্থিতি কোনও সমীকরণ বদলাতে পারে না। অনেকটা বেহালা সদৃশ্য কেল্লাটির আকার। ষোলোশো শতকে কেলভা সৈকতের দক্ষিণে সাগরজলের অভ্যন্তরে দুর্গটি নির্মিত হয় মূলত পর্তুগিজ জলদস্যুদের অতর্কিত হামলা প্রতিহত করতে। মরাঠারাজ ছত্রপতি শিবাজী এখান থেকেও শাসন করতেন।

সাগরপৃষ্ঠ থেকে মাত্রই ৮ ফুট উঁচুতে এই দুর্গে ভরা জোয়ারের সময় সহজে নৌকায় পৌঁছে গেলেও, ভাটার সময় ওই উচ্চতাটুকু পার হতে হয় পদব্রজেই। কেল্লাটির আশ্চর্য গঠন, কারিগরি স্থাপত্য, খিলানযুক্ত প্রবেশপথ ও প্রকোষ্ঠ, পাথুরে সোপানগুলি নির্ঘাত প্ররোচিত করবে কেল্লার ওপরমহলে সার দিয়ে গড়া সশস্ত্র প্রহরীদের বুরুজগুলির কাছে যেতে। দুর্গের অলিন্দে বাতায়নে ইতিহাসের বোবা সাক্ষ্য। এখানে কোনও রহস্যগল্পের শুটিং হতে পারে দিব্য। স্থানীয় অনেকেই একে ‘কেলভা প্যানকট’ বলে থাকেন।

কেল্লার ভেতর এত নরম আলো, এত নরম লোনা হাওয়া, হৈমন্তী সকালে আবছা দেখায় অভ্যন্তর। যদিও সূর্যের আলো ঝিলমিল করছে কেল্লার বাইরে আরবসাগরের জলে। আনমনা হয়ে ভাবি দুর্গের মতো একাকীত্বের যন্ত্রণা যেন আর কোথাও নেই। তারও তো কাঁহাতক আর আদিগন্ত সাগর, পাথর আর কদাচ এই চত্বরে আসা পর্যটকদের পায়ের ধুলোর সঙ্গ যাপনে খুশি থাকা যায়! দিকচক্রবাল জুড়ে সাগরের স্পর্ধা দেখে যাই। এও এক বাহানা।

কীভাবে যাবেন: কলকাতা থেকে রেলপথ বা উড়ানপথে মুম্বই। সেখান থেকে ওলা বা ক্যাব ভাড়া করে ১১০ কিলোমিটার দূরত্বে Kelva পৌঁছোতে সময় লাগে কমবেশি আড়াই ঘন্টা। শহরতলির ওয়েস্টার্ন এক্সপ্রেস রেলপথে কেলভা রোড স্টেশনে নেমে, আট আসনের ‘টুকটুক’ নামের ডিজেলচালিত বড়ো আকারের অটোতে Kelva সৈকতগ্রামে পৌঁছোনো যায়।

কোথায় থাকবেন: অনেক রিট্রিট, হোটেল, ফার্মহাউস রয়েছে। নির্ভেজাল মহারাষ্ট্রিয়ান খাবারের স্বাদ নেওয়া যেতে পারে। কখন যাবেন: বছরের যে-কোনও সময়ই যাওয়া যেতে পারে।

 

কুড়িয়ে পাওয়া স্বপ্ন (পর্ব ১)

রাস্তার পাশে জমে থাকা জলে চাকাটা পড়তেই ছপাৎ করে শব্দ হল একটা। মাঝবয়সি রিকশাচালক বলল, ‘ইয়ে লিজিয়ে ভাইয়াজি আগয়ি আপকি শান্তিকুঞ্জ।’

রিকশায় বসেই অবাক চোখে স্যমন্তক তাকাল বাড়িটার দিকে। ছোটোখাটো চেহারার একতলা বাড়ি। সামনে একফালি সবুজ ঘাসে ঢাকা জমি। দু’চারটে ফুল আর গোটা কয়েক সুপুরি গাছ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। রিকশার ভাড়া মিটিয়ে ছোটো লোহার গেটটা খুলল স্যমন্তক। ক্যাঁচ করে শব্দ হল একটা। বাড়ির হাতা পেরিয়ে এসে দাঁড়াল সদর দরজার সামনে। পুরোনো আমলের ডোরবেলটা বাজাতেই ভেতর থেকে শোনা গেল নারী কণ্ঠ, ‘কে?’

—আমি স্যমন্তক, স্যমন্তক সরকার। ম্যাডামের সঙ্গে আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া ছিল।

খুট করে একটা শব্দ হল দরজায় আর সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ পাল্লা খুলে বেরিয়ে এল ফরসা, ছিপছিপে চেহারার একটা মেয়ে। বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশের বেশি হবে না। জিন্‌স, টি-শার্ট পরা, পিঠব্যাগ কাঁধে স্যমন্তককে মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখে সে বলল, ‘ও, আপনি? আপনার তো সকালের দিকে আসার কথা ছিল, তাই না?”

—হ্যাঁ কথা তো তেমনই ছিল। কিন্তু রাস্তায় একটু ফেঁসে গিয়েছিলাম। হাইওয়েতে সকালে একটা বড়োসড়ো অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে। তাই পথ অবরোধ ছিল অনেকক্ষণ। তার উপর জ্যাম, প্রায় ঘণ্টা তিনেক আটকে থাকতে হল ওখানে। ঝড়ের গতিতে কথাগুলো বলে থামল স্যমন্তক। তারপর জিজ্ঞেস করল, আজ কি তাহলে দেখা হবে না ম্যাডামের সঙ্গে? আসলে আমার দেখা করাটা খুব দরকার। অনেকটা দূর থেকে এসেছি।

ঘিয়ে রঙের সালোয়ার কুর্তি পরা মেয়েটি মাথা নেড়ে বলল, “আপনি ভেতরে এসে বসুন। আমি মাসিমণিকে খবর দিচ্ছি। যদি উনি দেখা করতে চান তবে নিশ্চয়ই দেখা হবে।’

স্যমন্তককে বৈঠকখানায় বসিয়ে সে চলে গেল বাড়ির ভেতরে। ধবধবে সাদা দেয়াল। জানলা-দরজার পর্দা, সোফার কভার এমনকী ছোট্ট ডিভানের ঢাকাটা পর্যন্ত সাদা! একটা হালকা লাল আলো জ্বলছে ঘরে। চন্দনের সুবাসে ভরে আছে চারপাশ। ঘরটাতে ঢুকেই একটা অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরে গেল স্যমন্তকের মন। একটু ইতস্তত করে স্যমন্তক বসল দুধ সাদা সোফার ধার ঘেঁষে। চারদিকটা ভালো করে দেখছিল সে।

ঘরের মেঝে থেকে টি-টেবিলের ঢাকনা, সবেতেই যত্নের ছাপ স্পষ্ট। ডানদিকের বড়ো দেয়াল জুড়ে রয়েছে একজন শুভ্র কেশ প্রৌঢ়ের ছবি। নীচে বড়ো বড়ো করে ইংরেজি হরফে লেখা ওম শান্তি। ধুপকাঠি জ্বলছে দু’খানা। কুণ্ডলী পাকানো ধোঁয়া বেরিয়ে আসছে সেখান থেকে। বোধহয় গুরুদেব-টেব হবেন। ছোটো একটা ট্রেতে এক গেলাস জল আর দুটো সন্দেশ নিয়ে ঘরে ঢুকল মেয়েটি। বলল, ‘মাসিমণি আপনাকে একটু অপেক্ষা করতে বললেন। একটু পরে আসছেন উনি।’

সে ভেতরে যাবার জন্যে পা বাড়াতেই স্যমন্তক পেছন থেকে আচমকা বলে উঠল, ‘ছোটোমা, মানে মধুরিমা ম্যাডাম কি আপনার আপন মাসি?’

প্রশ্ন শুনে ঘুরে তাকাল মেয়েটি। একটা সৌজন্যমূলক হাসি হেসে বলল, ‘না ঠিক আপন নয়। একটু দূর সম্পর্কের। খুব ছোটো বয়সে আমার মা-বাবা মারা গিয়েছিলেন। তাই মাসিমণি নিজের কাছে রেখে মানুষ করেছেন আমাকে।’

—আমিও সেরকমই কিছু আন্দাজ করছিলাম, কারণ মিসেস মধুরিমা সরকারের কোনও ভাই বা বোন ছিল না বলেই জানতাম। কথাটা বলে ঠান্ডা জলের গেলাসে চুমুক দিল স্যমন্তক।

মেয়েটি খানিকক্ষণ ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে থাকল স্যমন্তকের দিকে। ভর দুপুরে আসা এই আগন্তুকের প্রতি যে তার অসীম কৌতূহল সে বিষয়ে স্যমন্তক নিশ্চিত। মধুরিমাদেবী মেয়েটিকে স্যমন্তকের বিষয়ে একেবারে অন্ধকারে রেখেছেন, বোঝা যাচ্ছে। মেয়েটিকে একটু খেলাতে ইচ্ছে করল।

এমনিতে তার সুপুরুষ চেহারা, তুখোড় বুদ্ধিদীপ্ত কথাবার্তা যে-কোনও নারীর মনকেই টেনে নেয় চুম্বকের মতো। রমণীমোহন হিসেবে তার ভালোরকম খ্যাতি আছে বন্ধুমহলে। বান্ধবীর সংখ্যাও নেহাত কম নয়।

জলের গেলাসটা টেবিলে রেখে বলল, উফ, প্রাণটা জুড়োল। এই রোদে ভিড় বাসে ট্র্যাভেল করা যে কী হ্যাপা, সেটা যারা করে তারাই জানে। তার উপর এই বিরক্তিকর জ্যাম! একবার ভাবলাম বাড়ি ফিরে যাই। পরক্ষণেই মনে হল মধুরিমাদেবী হয়তো অপেক্ষা করে বসে থাকবেন। কথার খেলাপ করাটা ঠিক হবে না। তাই তেতে পুড়ে হলেও চলে এলাম। বড্ড তেষ্টা পেয়েছিল, জানেন? জলটা দিয়ে আপনি আমাকে বাঁচালেন মিস…?

—তন্দ্ৰা৷

—বাহ, বেশ সুন্দর নাম তো আপনার!

—আপনি বিশ্রাম নিন, আমি দেখি ওদিকে মাসিমণির হল কিনা। লাজুক হেসে তন্দ্রা আবার চলে গেল ভেতরে।

 

(চলবে)

দ্রুত মেজাজ হারাচ্ছি, পরে অনুতাপ হচ্ছে

প্র: আমার বয়স ৪৫৷ একটি কর্পোরেট সংস্থায় প্রায় ২৬ বছর কর্মরতা৷ কাজের দক্ষতা অর্জন করে, পদাধিকার বলে আমি এখন উচ্চ পদে আসীন৷ কিন্তু ইদানীং একটা সমস্যা হচ্ছে৷ আমি চট করে মেজাজ হারিয়ে ফেলছি৷ অধস্তনদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে ফেলছি৷ পরে অনুতাপ হচ্ছে৷ কখনও কখনও তাদের ডেকে পরে ক্ষমাও চেয়েছি৷ কিন্তু বাস্তবিক ক্ষেত্রে অনেক চেষ্টা করেও রাগকে সংযত করতে পারছি না৷ একটু কাজের চাপে থাকি৷ হতে পারে মেজাজ হারানোর সেটা একটা কারণ৷ কিছু উপায় বলুন নিজেকে নিয়ত্রণ করার৷

 

উ: রাগ ও দুশ্চিন্তা হল প্রতিটি মানুষের নিজের চিন্তা ভাবনার বহিঃপ্রকাশ। একটু সচেতন হলেই আপনি এই দুটোই কমাতে পারেন। অসলে রাগ কখনও আমাদের উপর এসে ভর করে না। আমরাই একে ডেকে আনি।  আমাদের প্রতিকূলে কোনও কিছু যেমন কারও কথা, আচরণ কিংবা কাজে অবহেলা দেখলে আমরা মনের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলি। আসলে আমাদের নিজেদের মতো কাজের পারফেকশন অন্যদের মধ্যেও খোঁজার চেষ্টা করি৷ অশানুরূপ ফল না পেলে আমাদের মন প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।

যে-কোনো মানুষের শরীরেই রাগ থাকে, তবে অতিরিক্ত রাগ হলে সেটা অস্বাভাবিক। এটাকে বলে  ইমপালস কন্ট্রোল ডিসঅর্ডার৷ যারা কোনও কারণ ছাড়াই রাগে ফেটে পড়েন,  অস্বাভাবিক আচরণ করেন, পরে ভুল বোঝেন। অপনি একা নন, আমাদের সমাজে অনেক মানুষ আছেন যারা এই রোগে ভুগছেন।এর পেছনে লুকিয়ে থাকে কোনও না কোনও মানসিক বা সামাজিক সমস্যা। অতিরিক্ত রাগ শরীরে নেতিবাচক প্রভাবও ফেলে। পারিবারিক, সামাজিক জীবন ও পেশাগত জীবনকে ব্যাহত করে।

কোনও কিছুর প্রভাব যখন আপনার স্নায়ুকে উত্তেজিত করে তখনও আবেগের বহিঃপ্রকাশ হয় রাগের মাধ্যমে৷ আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে রাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন৷ নিউরোট্রান্সমিটারের ইমব্যালেন্স যেমন, মস্তিষ্কে সেরোটিনের অভাব হলে রাগ বেড়ে যায়। এছাড়া অস্বাভাবিক বিষণ্নতা, অতিরিক্ত টেনশন,  বাইপোলার মুড ডিসঅর্ডার—এগুলিও রাগের কারণ হতে পারে৷ দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক অসুস্থতা যেমন উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হাঁপানি, হৃৎপিণ্ডের সমস্যা, এই জাতীয় কিছু আপনার আছে কিনা সেটা পরীক্ষা করান এবং উপযুক্ত চিকিৎসা শুরু করুন৷

তবে আমার মতে রাগ মনের ভিতর পুষে রাখার চেয়ে সেটা প্রকাশ করে ফেললে তা আপনার মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। কিন্তু অফিস কাছারিতে এটা করাটা দস্তুর নয়৷ তাহলে এই রাগের প্রতিকার কী?  যখন আপনি বুঝবেন যে আপনি মেজাজ হারাতে চলেছেন, তখন অবিলম্বে নিজের নিঃশ্বাসের দিকে মন দিন এবং চিন্তা করুন যে কেন? ঠিক কী কারণে আপনি রাগ করছেন? আপনার কি রাগ করাটা জরুরি? আপনি তো রাগ কমাতে চান! তখন অন্যকে এবং নিজেকে ক্ষমা করে দিন। দশ অবধি মনে মনে গুনুন৷ আস্তে আস্তে মনের স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে পাবেন৷

স্বার্থপর (শেষ পর্ব)

রীতা খুব বিনম্র গলায় বলল, আমি কাল থেকেই শুরু করব। আপনাকে যে কী বলে ধন্যবাদ দেব, জানি না, স্যার।

—না আমাকে ‘স্যার’ বলতে হবে না। তুমি কুহেলির মতো আমাকে সুব্রতদা বলতে পারো। আর ধন্যবাদ দিতে হবে না। আমার একজন রিসেপশনিস্ট দরকার ছিল, আর তোমার একটা চাকরি। ব্যস, হয়ে গেল ‘দুই আর দুইয়ে চার’। তবে তুমি তোমার বন্ধু কুহেলিকে একটা ধন্যবাদ দিতেই পারো। কথাটা শুনে দু’জনেই হাসল।

বাড়ি ফেরার আগে রীতা কুহেলিকে জিজ্ঞেস করল, “ওদের হোস্টেলে রীতার থাকার ব্যবস্থা করতে পারবে কি না।’ কুহেলি খোঁজ নেবে কথা দিল।

বাড়ি ফিরে রীতা ওর মাকে চাকরির খবরটা দিল। মুহূর্তে মায়ের চেহারাটা বদলে যেতে দেখল রীতা।

–বাহ তাই নাকি, আমি জানতাম আমার মেয়ে একদিন ভালো চাকরি পাবেই। ও আমাদের সব দুঃখ-কষ্ট দূর করে দেবে একদিন। আমার ছেলে নেই তো কী হয়েছে, আমার মেয়ে একজন ছেলের থেকে কোনও অংশে কম নয়। তারপর কিছু একটা ভেবে নিয়ে আবার বললেন, আজ আর তোকে রান্না করতে হবে না, আমিই না হয় আজকের রান্নাটা করে নিচ্ছি।

রীতা মনে মনে একটু হেসে বলল, “না মা তুমি বিশ্রাম করো, আমি রান্না করছি।

রীতা চাকরিতে জয়েন করেছে এক সপ্তাহ হয়ে গেছে। কুহেলি তার জন্য ওদের হোস্টেলে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। রবিবার অফিস ছুটির দিন রীতা হোস্টেলে চলে আসবে ঠিক করেছে। শনিবার রাতে বাড়ি ফিরে রান্না শেষ করে, বাবা মা-কে খেতে দিয়ে রীতা বলল, “মা আমি কাল কলকাতা চলে যাচ্ছি, ওখানে একটা হোস্টেলে থাকব ঠিক করেছি।”

মা ঝাঁঝালো গলায় বলল, ‘কেন, এখানে তোমার কী অসুবিধা হচ্ছে? নাকি এখন চাকরি পেয়েছ বলে আর আমাদের প্রয়োজন নেই? আমার এখন বয়স হচ্ছে, এখানে কাজ কর্মগুলো কে করবে তাহলে?”

রীতা খুব শান্ত গলায় বলল, ‘মা আমি গত তিন বছর তোমাকে আমার থাকা-খাওয়ার টাকা দিয়েছি। তাছাড়া, বাড়ির সব কাজ আমিই করেছি। তুমি বিছানায় বসে বসে সারাদিন চা আর পান খেয়েছ। এবার থেকে তোমার সংসারের ভার আবার তোমাকেই নিতে হবে।

রীতার মা আরও রেগে গিয়ে বলল, ‘আমি জানি তো, মেয়েরা এরকমই স্বার্থপর হয়। আজকে একটা ছেলে থাকলে আমার এরকম হতো না।’

রীতা একটু হেসে বলল, “ঠিকই বলেছ মা, মেয়েরা জন্মগত স্বার্থপর।’

পরদিন সকালে উঠে রীতা বাবা-মার জন্য অনেক পদ রান্না করে, নিজের ব্যাগ গুছিয়ে হোস্টেল যাবার জন্য তৈরি হল। প্রায় এগারোটা বেজে গেল, বাবা-মা কেউ দরজা খুলে বের হল না। শেষমেশ রীতা ওদের দরজার বাইরে থেকেই প্রণাম জানিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল।

মনে মনে ভাবল, ‘মেয়েরা মা হয়ে গেলেও স্বার্থপর-ই থেকে যায়।’

(সমাপ্ত)

স্বার্থপর (পর্ব-০৪)

গতকাল রাতে ফোনে বাবার গলা শুনে কুহেলি যতটা ভয় পেয়েছিল, বাড়িতে এসে মাকে দেখে ততটা খারাপ মনে হল না। উদ্বিগ্ন স্বরে জিজ্ঞেস করল, “কেমন আছো এখন, মা?’

—আজকে একটু ভালোই আছি। তোর সঙ্গে ও কে?

—ও রীতা, কল্যাণীতেই থাকে। আমরা একসঙ্গে স্কুলে পড়তাম। ট্রেনে দেখা হয়ে গেল অনেক বছর পর। তাই নিয়ে এলাম। —ঠিক আছে। তোরা বসে কথা বল, আমি তোদের জন্য চা বানিয়ে নিয়ে আসছি। কুহেলির মা রীতাকে বসতে বলল।

—না মা, তোমার শরীর ভালো নেই, তুমি বসো, আমি চা করে আনছি। বাবা কোথায় ?

—বাবা এখনও ফেরেনি অফিস থেকে, বলে কুহেলির মা একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসলেন।

কুহেলি রান্না ঘরে গিয়ে চায়ের জলটা বসিয়ে সুব্রতদাকে ফোন করল। ‘হ্যালো, সুব্রতদা, কুহেলি বলছি।’

—হ্যাঁ, বল। তোর মা ঠিক আছে তো?

—হ্যাঁ, মা আজ একটু ভালো আছে। তবে আমি আপনাকে অন্য একটা কারণে ফোন করেছি।

—কী ? বল না?

—কিছুদিন আগে আপনি একজন রিসেপশনিস্ট নেবার কথা বলেছিলেন, সেই চাকরিটা কি এখনও আছে? নাকি আপনি কাউকে পেয়ে গেছেন?

—না রে, এখনও ভালো কাউকে পাইনি। কেন রে? তোর পরিচিত কেউ আছে কি?

—হ্যাঁ সুব্রতদা, আছে। আমার বন্ধু। মেয়েটি খুব ভালো, আর ওর একটা চাকরির খুব প্রয়োজন।

—ঠিক আছে, তাহলে ওকে সামনের সপ্তাহেই এসে আমার সঙ্গে দেখা করতে বল। তুই যখন ভালো বলেছিস, তখন আর চিন্তা কী ?

—থ্যাংক ইউ, দাদা। কথাগুলো বলে কুহেলি চা নিয়ে বসার ঘরে গেল। চা-টা খুব তাড়াতাড়ি শেষ করে কুহেলি রীতাকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। কুহেলি ওর মায়ের সামনে কোনও কথা বলতে চাইছিল না। তাই রীতাকে বাইরে নিয়ে এসে সুব্রতদার সঙ্গে ওর হওয়া কথাগুলো বলে, দু’দিন পরে রীতাকে ওদের অফিসে যেতে বলল।

রীতা কুহেলির ফোন নম্বর আর অফিসের ঠিকানা নিয়ে বাড়ি ফিরল। বাড়ি পৌঁছোতে সন্ধ্যা হল। দরজা খুলতে খুলতে রীতার মা জিজ্ঞেস করল, “এত রাত করে

নবাব-নন্দিনীর বাড়ি ফেরা হল! তা রাতের রান্নাটা কে করবে, শুনি?”

—তুমি কিছু ভেব না মা, আমি এক্ষুনি সব ব্যবস্থা করছি। কথাগুলো বলতে বলতে রীতা নিজের ঘরের দিকে গিয়ে শাড়িটা পালটাতে লাগল।

পিছন থেকে মাকে গলা চড়িয়ে বলতে শুনল, ‘আমার জন্য এক কাপ চা বানিয়ে দিস, আজ আমার চা খাওয়া হয়নি এখনও।’

দু’দিন পর বাড়িতে কাউকে কিছু না জানিয়ে রীতা কুহেলির অফিসে গেল। রীতার সঙ্গে কথা বলে সুব্রতদা খুব খুশি হয়ে বললেন, ‘রীতা, তোমার যদি কোনও অসুবিধা না থাকে, তাহলে তুমি কাল থেকেই এখানে জয়েন করতে পারো।’

রীতা যেন হাতে চাঁদ পেল! কী করবে, কী বলবে কিছুই বুঝতে পারছে না। গত তিন বছর হল কত ইন্টারভিউ দিয়েছে কিন্তু আজকাল চাকরির আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছে।

(ক্রমশঃ…)

স্বার্থপর (পর্ব-০৩)

এদিকে অসহিষ্ণু কুহেলি আবার জিজ্ঞেস করল, ‘তারপর’?

—তারপর আর কী? ভাবলাম একটা সন্তান হলে হয়তো আমার স্বামীর একটু সুবুদ্ধি আসবে। এই নিয়ে কথাও বললাম একদিন ওর সঙ্গে। কিন্তু ওর কাছে পরিবারের কোনও মূল্য নেই। সন্তান ও চায় না। একটা জিনিসই ও বোঝে, ভালোবাসে, পূজা করে— সেটা হল টাকা। এরপর আর সময় নষ্ট না করে একদিন রাতের অন্ধকারে, সবাই যখন পার্টিতে মদ আর মেয়ের নেশায় চুর, আমি পিছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে আসি। সেই থেকেই বাপের বাড়িতে আছি।

কুহেলি কী বলবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। ছোটোবেলার রীতা আর আজকের রীতার মধ্যে কোনও মিল খুঁজে পাচ্ছে না। কী করে সেই রীতা হারিয়ে গেল? কোথায় গেল? কার দোষে গেল ?

কুহেলির মনে পড়ে ছোটোবেলায় ওর মা সবসময় বলত, “টাকা পয়সাটাই সব নয়’। কিন্তু আজ রীতার মুখোমুখি বসে মনে হচ্ছে, “সত্যি কি তাই? আজ যদি রীতা কোনও বড়োলোক বাবা-মা’র একমাত্র মেয়ে হতো তাহলেও কি রীতার ভাগ্যটা এরকম‍ই হতো? ওকে কি টাকার অভাবে পড়াশোনা শেষ না করেই একজন লম্পটকে বিয়ে করতে হতো? আর ওর স্বামীও কি সাহস পেত রীতার সঙ্গে এরকম ব্যবহার করার ?’

—তাহলে এখন তুই কী করছিস? পড়াশোনাটা আবার শুরু করেছিস? নাকি চাকরি করছিস?

—কোনওটাই করছি না রে। ভীষণ ভাবে একটা চাকরি খুঁজছি। বাড়িতে কাজের লোক ছাড়িয়ে আমার মা এখন আমাকে সেই জায়গায় নিয়োগ করেছে। আর পাড়ায় কয়েকটা টিউশনি করে মায়ের হাতে আমার খাবার খরচটা তুলে দিই। তা না হলে মা আমাকে আবার সেই স্বামীর ঘরে পাঠিয়ে দেবে।

তারপর বেশ কিছুক্ষণ দু’জনেরই মুখে কোনও কথা নেই। আবার নীরবতা ভাঙল রীতা। ‘আজকে একটা চাকরির ইন্টারভিউ দিতে কলকাতা এসেছিলাম। প্রতি মাসেই তো এরকম কত ইন্টারভিউ দিচ্ছি। কিন্তু…।’

কুহেলি কী যেন ভাবল। ওর মনে পড়ল বেশ কয়েকদিন আগে ওদের অফিসেই একজন রিসেপশনিস্ট-এর প্রয়োজন ছিল। সুব্রতদা, ওদের ম্যানেজার, জিজ্ঞাসা করেছিল ওর চেনাজানা কেউ আছে কি না। কুহেলির জানাশোনা কেউ ছিল না, তাই কারও নাম বলতে পারেনি। কয়েকদিন আগে রীতার সঙ্গে দেখা হলে ও রীতার নামটাই বলে দিতে পারত। হঠাৎ কিছু একটা ভেবে আবার রীতাকে জিজ্ঞেস করল, “তুই কী রকম চাকরির চেষ্টা করছিস?’

—যে-কোনও একটা কিছু হলেই হবে। শুধু নিজেরটা নিজে চালিয়ে নিতে পারলেই আমি এই বাড়ি থেকে চলে যাব।

—কল্যাণী স্টেশনে নেমে আমার সঙ্গে আমাদের বাড়িতে একটু যেতে পারবি? পথে যেতে যেতে এক জনের সঙ্গে একবার কথা বলে দেখতে পারি, যদি কিছু করা যায়।

স্টেশন থেকে নেমে কাছেই কুহেলির বাড়ি। বাড়ি পৌঁছে কুহেলি প্রথমেই মায়ের ঘরে গেল।

(ক্রমশঃ…)

স্বার্থপর (পর্ব-০২)

খুব ভালো চাকরি করিস নিশ্চয়ই? তোর মতো স্মার্ট আর ইন্টেলিজেন্ট মেয়ে! তোকে ছোটোবেলায় মনে মনে খুব হিংসে করতাম, জানিস রীতা?

—আমার কথা ছাড়, তোর কথা বল, তুই কী করছিস? তুই কি কল্যাণীতেই থাকিস? রীতা যেন কিছুটা প্রসঙ্গ এড়াতে প্রশ্নগুলো করল।

—না রে, কালকে বাবা ফোন করে খবর দিল, মার শরীরটা ভালো নেই। তাই আজ অফিস থেকে একটু তাড়াতাড়ি বেরিয়ে মা-কে দেখতে যাচ্ছি। আমি কলকাতায় একটা মেয়েদের হোস্টেলে থাকি। কাল ছুটি আছে, তাই আজকের রাতটা মার কাছেই থাকব। একটু থেমে, রীতাকে চুপ করে থাকতে দেখে কুহেলি আবার জিজ্ঞেস করল, তুই কি বাড়িতে যাচ্ছিস। তুই এখানে কোথায় থাকিস? কাকু কাকিমা কেমন আছেন? কতদিন তোদের বাড়ির ওই দিকে যাওয়া হয়নি।

—আমি এখন কল্যাণীতে বাবা-মার সঙ্গেই থাকি। কলকাতায় একটা কাজে এসেছিলাম, এখন বাড়ি ফিরছি। বাবা-মা ভালোই আছেন। খুব ক্লান্ত গলায় রীতা জবাব দিল।

রীতার কথাগুলো শুনে মনে হল কুহেলি আকাশ থেকে পড়ল। ছোটোবেলায় রীতা ওর বিদ্যা, বুদ্ধি আর সৌন্দর্যের জন্য সুপরিচিত ছিল। ওর সমবয়সি বা অসমবয়সি অনেকেই ওকে হিংসে করত। কলেজে ভর্তি হওয়ার পর থেকে অবশ্য কুহেলি রীতার আর কোনও খোঁজ পায়নি। কুহেলির ঘোর কাটলে ও আবার জিজ্ঞেস করল, ‘তুই কল্যাণীতে আছিস, মানে? তুই কি এখানেই চাকরি করিস? তুই বিয়ে করিসনি?”

—সে অনেক কথা। বিয়ে করিনি, তবে আমার বিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বাবা-মার অভাবের সংসারে আমাকে বেশিদিন রাখতে না পেরে বিয়ে দিয়েছিল একজন বড়োলোক ব্যবসায়ীর সঙ্গে। সে আমার রূপটা দেখেছিল কিন্তু গুণটা নয়। তাই বিয়ের পর পড়াশোনায় ইতি টানতে হয়। ইচ্ছে ছিল ইউনিভার্সিটির পড়া শেষ করে একদিন কলেজে চাকরি করব। না, সেটা আর হয়ে ওঠেনি। রীতার স্বরে রাগ না দুঃখ, সেটা কুহেলি ঠিক বুঝতে পারল না।

—তোর বর তো বললি বড়োলোক, তাহলে বিয়ের পর পড়াশোনাটা করলি না কেন? কুহেলি অবাক গলায় জিজ্ঞেস করল।

—আমি পড়াশোনা করলে যে আমার বরের অসুবিধা হতো। বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই বুঝতে পারি সে আমাকে একজন উঁচু দরের কল গার্ল তৈরি করার চেষ্টা করছে। আমাকে ওর সঙ্গে সব পার্টিতে গিয়ে ওর বন্ধুদের, বসদের, ক্লায়েন্টদের মনোরঞ্জন করতে হতো।

—তুই কোনও প্রতিবাদ করিসনি? তুই তো এত স্মার্ট ছিলিস। কুহেলি রেগে গিয়ে রীতাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই জিজ্ঞেস করল।

—করেছিলাম। প্রতিবাদ করেছিলাম। তারপর থেকেই শুরু হয় শারীরিক আর মানসিক নির্যাতন। মার খেয়ে মার হজম করতে হতো। কী করব? কোথায় যাব। বাবা-মা দায়মুক্ত হওয়ার জন্য আমার বিয়ে দিয়েছিল। এখন আবার তাদের কাছেই ফিরে যাই কী করে? তাই নিজের ভাগ্যকে মেনে নিয়ে মুখ বুজে সব সহ্য করে যেতে লাগলাম। কথাগুলো বলে রীতা হয়তো চোখের জল লুকানোর জন্য ট্রেনের জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইল।

(ক্রমশঃ…)

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব