সুন্দরী সিমলা আর মনভোলানো মানালি (পর্ব-০৩)

আমাদের ড্রাইভার বলেছিল যে, রোটাং পাস ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল সাদা বরফের চাদরে আবৃত থাকে। অধিকমাত্রায় বরফ পড়লে গাড়ি যেতে পারে না। সম্পূর্ণ রাস্তা ব্লক হয়ে যায়। অল্পস্বল্প বরফ এখানে পর্যটকরা ভীষণ উপভোগ করেন। এখানে স্কিং, স্লেজিং, প্যারাগ্লাইডিং ইত্যাদি নানারকম অ্যাডভেঞ্চার ক্রিয়াকলাপ পর্যটকদের জন্য রাখা হয়। যেহেতু আমরা অক্টোবরের শুরুতে গিয়েছিলাম, তাই বরফের দেখা মেলেনি। বরফ না মিললেও সবুজের চাদরে আবৃত রোটাং পাস দু-চোখকে ভীষণ ভাবে আরাম দিচ্ছিল।

ড্রাইভার যথাস্থানে গাড়ি পার্ক করল। গাড়ি থেকে নেমে দেখলাম কিছু পর্যটক এটিভি বাইক ভাড়া করছেন রোটাং লেক এবং পাহাড়ের উপরের ভিউ পয়েন্টে যাওয়ার জন্য। আমরাও তাদের দেখে এটিভি বাইক ভাড়া করলাম। দরদাম করে মাথাপিছু ১০০০ টাকা ভাড়া ঠিক হল। রাস্তা এখানে বড্ড খারাপ। চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আধ ঘণ্টার মধ্যেই গাড়ি সেই ভিউ পয়েন্টে নিয়ে এল। বাইকচালক জানাল যে, ভিউ পয়েন্ট থেকে ফেরার পথে লেক দেখিয়ে নিয়ে যাবে।

বেশ জমজমাট ভিড় উপরে। সকলেই প্রায় বাইক থেকে নেমে ছবি তুলতে ব্যস্ত। রৌদ্রোজ্জ্বল দিন। সূর্যের সোনালি আলো পাহাড়ের গায়ে পড়ে যেন পিছলে যাচ্ছে। পায়ের তলায় ঘাসের সবুজ গালিচা, উপরে নীল উন্মুক্ত আকাশ, সবুজ গাছগাছালিতে ঘেরা উপত্যকা, নাম না জানা পাহাড়ি ফুলের মেলা, কত শত কোটি বছর ধরে মেঘ গায়ে মেখে হিমালয়ের অসীম শূন্যতাকে ছুঁতে চাওয়ার প্রচেষ্টা— এই দৃশ্য এককথায় অবর্ণনীয়। চোখে না দেখলে সে তৃপ্তির আস্বাদ অসম্ভব। কিছু মুহূর্তকে আমরা লেন্সবন্দি করলাম। ঠান্ডা হিমেল বাতাস প্রাণে ছুঁয়ে যাচ্ছে।

আমরা চারিদিকটা অবিন্যস্ত ভাবে ঘুরে এটিভি বাইকে উঠলাম রোটাং লেকে যাওয়ার জন্য। বিস্তীর্ণ ধূলিধূসর পাথুরে পথ ধরে বাইকচালক আমাদের নিয়ে এল রোটাং লেকে। পাহাড়ের উপর থেকে নেমে আসার পর সূর্যালোক কমে যাওয়ায় ঠান্ডাটা প্রবল থেকে প্রবলতর হয়েছে। বাইকচালক জানাল, লেকে যে-পরিমাণ জল থাকে, এই অক্টোবরে জল কিছুটা কম। শীতকালে বরফে জমে যায়। এই লেক। জলে নীল আকাশের প্রতিচ্ছবি পড়ে আরও মোহময়ী করে তুলেছে লেকটিকে। আমরা লেকের চারিদিক ঘুরে বাইকে করে নেমে এলাম, যেখানে আমাদের পূর্বের ড্রাইভার অপেক্ষা করছিল।

খিদে পাওয়ায় আমরা একটু গরম ম্যাগি আর চা খেলাম। প্রায় এক ঘণ্টার কাছাকাছি সময় কাটানোর পর আমার হালকা মাথাব্যথা করছিল। তবে পাহাড়ের এই উচ্চতায় এলে হাই অল্টিটিউড সিকনেস অনেকেরই হয়। রোটাং লেকের ধারে অনেকেরই ব্রিদিং প্রবলেম হচ্ছিল। রোটাং পাসে আসার সময় এই সমস্যাগুলি থাকলে একটু সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

যাইহোক, মাথাব্যথা কমাতে আমি গাড়িতে উঠে পড়লাম। পাহাড় থেকে কিছুটা নেমে আসার পর মাথাব্যথা গায়েব। দেখলাম আমরা পাহাড়ের পূর্বের উচ্চতা থেকে অনেকটা নেমে এসেছি। প্রায় দেড় ঘণ্টা পথ অতিক্রম করে আমরা অটল টানেলের গেটে এসে পৌঁছালাম। এই টানেলটির দৈর্ঘ্য ৯.০২ কিমি। বর্ডার রোড অর্গানাইজেশনের তত্ত্বাবধানে এটি তৈরি হয়। টানেলটি মানালি এবং লাহৌল-স্পিতি উপত্যকাকে সংযুক্ত করেছে এবং প্রায় ৬০ কিমি রাস্তার দূরত্বও কমিয়েছে এই টানেলটি। অন্যান্য পর্যটকদের মতো এখানে আমরা কয়েকটি ছবি তুলে হোটেলে ফেরার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। ঘড়ির কাঁটায় তখন আড়াইটে বাজে।

প্রায় এক ঘণ্টা জার্নি করে হোটেলে পৌঁছালাম। একটু আগেই হোটেলে পৌঁছানোয় ড্রাইভার বলেছিল, এক ঘণ্টা রেস্ট করে মানালি ম্যাল ঘুরিয়ে আনবে। আমরা তার কথামতো রাজি হলাম। হাতমুখ ধুয়ে একটু বিশ্রাম নিলাম। পৌনে পাঁচটায় বেরিয়ে পড়লাম মানালি ম্যালের দিকে। আমাদের হোটেল থেকে গাড়িতে করে পনেরো মিনিটের রাস্তা মানালি ম্যাল। ড্রাইভার আমাদের ম্যালে ছেড়ে দিয়ে বলেছিল ঘোরা হয়ে গেলে হোটেলে নিয়ে যাবে। আমরা নেমে ম্যালে ঘুরতে লাগলাম। বিভিন্ন দোকান থেকে কিছু শীতের পোশাক, কিছু দুর্দান্ত ডিজাইনের হ্যান্ড ব্যাগ, পাথরের কারুকার্য করা ঘর সাজানোর জিনিস ইত্যাদি কিনলাম। ঘণ্টাখানেক ঘুরে আমাদের খিদেও পেয়েছিল, তাই মোমোর স্বাদ নিলাম।

ফোন করতেই গাড়ি নিয়ে ড্রাইভার হাজির। হোটেলে পৌঁছালাম ঘড়ির কাঁটা আট-টা ছুইছুই। হোটেল রুমের ব্যালকনি থেকে রাতের ভিউ অসম্ভব সুন্দর ছিল। পাহাড়ের উপরে বাড়ি-ঘরগুলি থেকে আসা আলো যেন আজস্র জোনাকির মতো পাহাড়কে আলো আবছায়ায় ঘিরে রেখেছিল৷ কিছুক্ষণ আড্ডা, গল্পে সময় কেটে গেল৷ ঠান্ডাও জাঁকিয়ে পড়েছে। রাত দশটায় বিছানায় আশ্রয় নিলাম।

মানালিতে থাকাকালীন দ্বিতীয় দিন দুটি জায়গা ঘোরার কথা আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল। সেই দুটি হল মণিকরণ এবং কাসোল। সকাল সাড়ে আটটায় আমরা তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম। আমাদের গন্তব্য ছিল মণিকরণ। মানালি থেকে কুল্লু পার হয়ে খরস্রোতা বিয়াসকে সঙ্গী করে গাড়ি ছুটল। রৌদ্রোজ্জ্বল দিন। সূর্যের আলো পাহাড়ের সর্বাঙ্গকে সোনালি আভায় মুড়ে দিচ্ছে। নীচে উত্তাল বিয়াসের বুকে অ্যাডভেঞ্চার-প্রেমীরা রিভার রাফটিং-এ মত্ত। কাসোল থেকে মণিকরণ যাওয়ার রাস্তা একেবারে জলছবির মতো। এই দৃশ্য চোখ আর মনকে মুগ্ধ করে। বিয়াস আর পার্বতীর মিলনস্থল পেরিয়ে প্রায় আড়াই ঘণ্টা জার্নির পর আমরা মণিকরণ পৌঁছালাম। হিমাচল প্রদেশের কুল্লু জেলার ভুন্টারের উত্তর-পূর্বে পার্বতী নদীর তীরে এবং পার্বতী নদীর উপত্যকায় অবস্থিত একটি ছোটো শহর মণিকরণ। এটি প্রায় ১৭৬০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। পার্বতী নদীর তীরে মণিকরণ গুরুদ্বারা সাহিব এবং শিব-পার্বতীর মন্দির দেখতে সব পর্যটকদের ভিড় দেখার মতো। শিখ এবং হিন্দুদের পবিত্র তীর্থস্থান একদম পাশাপাশি রয়েছে। এখানে একটি উষ্ণ প্রস্রবণ এবং জিওথার্মাল এনার্জি প্ল্যান্টও রয়েছে। নির্দিষ্ট স্থানে জুতো খুলে রেখে প্রথমে গুরুদ্বার দর্শনের জন্য লাইন দিলাম। অনেক ভক্ত এখানে উষ্ণ প্রস্রবণে স্নানও করছিল। সকলে পাট্টায় (কমলা রঙের কাপড়ে) নিজেদের মাথা আবৃত করে গুরুদ্বারে প্রবেশ করলাম। পনেরো কুড়ি মিনিট বসে বাইরে এলাম৷ সবাই একসঙ্গে বসে লঙ্গরে প্রসাদ গ্রহণ করলাম।

গুরুদ্বার দর্শন ও লঙ্গর গ্রহণের পর মনিকরণের শিব-পার্বতীর মন্দির দর্শন করলাম। গুরুদ্বারের ভিতরে প্রবেশ করে ডানদিকে একটি পথ মন্দির প্রবেশের পথ। ওই পথ ধরেই আমরা সেখানে পৌঁছালাম। মন্দিরে পুজো নিবেদন করে মন্দির চত্বর ঘুরলাম। এখানে প্রচুর মানুষের ভিড়। স্থানীয়দের বিশ্বাস, ভগবান শিব-পার্বতী নাকি এই জায়গায় এগারো শত বছর কাটিয়েছিলেন। তাঁরা পাহাড়ের উপরে সবুজে ঘেরা জায়গায় নিভৃত সময় কাটাতে এসে জায়গাটির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছিলেন। শিব-পার্বতী থাকাকালীন পার্বতীর কানের দুল হারিয়ে যায়। ভগবান শিবকে তিনি সেটি খুঁজে দেওয়ার কথা বলেন। ভগবান শিব তাঁর পরিচারককে পার্বতীর কানের দুল খোঁজার দায়িত্ব দেন। কিন্তু পরিচারক একাজে ব্যর্থ হলে তিনি ক্ষুব্ধ হন। তিনি তাঁর তৃতীয় নয়ন খুললে মহাবিশ্বে অশান্তি সৃষ্টি হয়েছিল। এখানে তাই শিবের রুদ্রমূর্তি।

শিবকে শান্ত করার জন্য সর্প দেবতা শেষনাগের কাছে প্রার্থনা করা হয়। শেষনাগ হেসে উঠলে ফুটন্ত জলের প্রবাহ শুরু হয়ে জল সমগ্র এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। পার্বতীর দুল উদ্ধার হয়। শিব-পার্বতী এই ঘটনায় খুশি হন। পার্বতী উপত্যকায় প্রতিষ্ঠিত হয় শিব-পার্বতীর মন্দির। যাইহোক, মন্দির দর্শন নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করে আমরা গাড়িতে উঠে বসলাম। গাড়ি ছুটল কাসোলের পথে।

সুন্দরী সিমলা আর মনভোলানো মানালি (পর্ব-০২)

দ্বিতীয় দিন সকাল আটটায় আমরা প্রস্তুত কালীবাড়ি যাবার উদ্দেশ্যে। সিমলা ছাড়ার আগে কালী মন্দির দর্শন করলাম আমরা। সিমলা ম্যাল থেকে কিছুটা হাঁটা দূরত্বে এই মন্দিরটি। হিন্দু সম্প্রদায়ের জনপ্রিয় এই কালীবাড়ি বান্টন পাহাড়ের কোলে অবস্থিত। মন্দিরের বাহ্যিক কাঠামোয় হিন্দু শৈলীর স্থাপত্য লক্ষণীয়। মন্দিরটি কিছুটা দক্ষিণেশ্বরের কালী মন্দিরের আদলে যেন তৈরি। এখানে দেবীমা-র কাঠের মূর্তি। মন্দির প্রাঙ্গণে ভক্তরা ভক্তিভরে পুজো দিতে ব্যস্ত। আমরাও পুজো দিলাম।

মন্দিরের চারপাশের দৃশ্য অবর্ণনীয়। সূর্যের আলোয় সোনালি পর্বতের উন্নত শির, সবুজ বনানী, পাহাড়ি নিস্তব্ধতাকে ভেঙে পাখিদের ডাক— এসবই মন ভরিয়ে দেওয়ার মতো। মন্দিরটির আশপাশে কিছু আবাসন রয়েছে পর্যটকদের থাকার জন্য। মন্দির সংলগ্ন একটা ক্যান্টিনও রয়েছে যেখানে অনায়াসে আহার গ্রহণ করা যায়। মন্দিরের আশপাশে বানরদের উপদ্রবও আছে। গাছের এই ডাল থেকে ওই ডাল নির্ভয়ে বিচরণ করছে তারা।

এরপর আমাদের গন্তব্য ছিল আনন্দালে। সিমলা কালীবাড়ি থেকে ছোটো গাড়িতে এখানে আসতে প্রায় পনেরো মিনিট লাগল। পাহাড়ের কোলে এক টুকরো মনোরম সমতল ভূখণ্ড আনন্দালে। ব্রিটিশ আমল থেকেই এই স্থানটি ক্রীড়াক্ষেত্র হিসাবে পরিচিত। এই স্থানটির জনপ্রিয়তা ক্রমবর্ধিত হয়েছে। গলফ, ক্রিকেট, পোলো, রেসিং ইত্যাদি খেলা এখানে হয়। দেওদার এবং ওক গাছ আনন্দালেকে ঘিরে রেখেছে। অপূর্ব সুন্দর এখানকার সবুজ পরিবেশ। স্থানীয়রা এই স্থানটিকে “দি হার্ট অফ সিমলা’ বলেন। এই উপত্যকা সংলগ্ন একটি আর্মি হেরিটেজ মিউজিয়াম এবং একটি সেনানিবাস আছে, যা সব পর্যটকদেরই আকর্ষণের বিষয়। বিনামূল্যে যে কেউ এই মিউজিয়ামে প্রবেশ করতে পারেন।

এখান থেকে যখন আমরা বেরোলাম তখন দুপুর বারোটা। আমাদের গাড়ি আবার চলতে শুরু করল। কিছুদূর গিয়ে রাস্তার পাশে একটা সুসজ্জিত রেস্টুরেন্টে গাড়িচালক আমাদের লাঞ্চ করার পরামর্শ দিলেন। উনিও এখানেই আমাদের সঙ্গে লাঞ্চ সারলেন। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে আমাদের খাওয়া শেষ করে রওনা দিলাম মানালির উদ্দেশে।

মানালি যাওয়ার রাস্তাতেই শ্রীমহাদেবী তীর্থ বৈষ্ণোমাতা মন্দির পড়ল। মন্দিরটি কুল্লু-মানালি ২১ নম্বর জাতীয় সড়কে অবস্থিত। খরস্রোতা বিয়াস নদীর তীরে এই মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬৬ সালে। ড্রাইভার রাস্তার পাশে গাড়ি নিরাপদ দূরত্বে রেখে মন্দিরের উলটো দিকে চা পান করতে গেল। আমরা মন্দির দর্শন করার জন্য মন্দিরের ভিতরে প্রবেশ করলাম। কথিত আছে ভগবান শিবের স্ত্রী পার্বতীকে উৎসর্গ করা হয় এই মন্দির। এখানে বেশ ভিড়। মন্দিরে প্রবেশ করে শুনলাম নবরাত্রির জন্য এই জনসমাগম। পাহাড়ি শৈলীর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মন্দিরের স্থাপত্য এবং বাহ্যিক কারুকার্য অসাধারণ। মন্দিরের কাঠের বারান্দা থেকে চারপাশের দৃশ্য মনোমুগ্ধকর। মন্দিরটির তিনতলা কাঠামো কারুশিল্প সুরুচিবোধের পরিচায়ক। মন্দিরের অভ্যন্তর কক্ষগুলি ঝাড়বাতি, খোদাই করা পেইন্টিং এবং আসবাবপত্র দিয়ে সুসজ্জিত।

সমগ্র মন্দিরের ভিতর ঊনিশটি ছোটো ছোটো বিভিন্ন দেবতার মন্দির আছে। মন্দির প্রাঙ্গণে একটি শিব মন্দিরও আছে। মন্দিরটি ট্রাস্ট দ্বারা পরিচালিত হয়। এখানে তীর্থযাত্রীদের জন্য বিনামূল্যে একটি লঙ্গর এবং একটি আকুপ্রেশার চিকিৎসা কেন্দ্রও রয়েছে। মন্দিরের ভিতর একটি ছোটো দোকানও আছে, যেখানে পুজোর উপকরণ সহ আরও নানান দ্রব্য সামগ্রী বিক্রি করা হচ্ছে। মন্দিরের উপর থেকে কুল্লু উপত্যকা এবং প্রাণচঞ্চল বিয়াস নদীর দৃশ্য এককথায় অপূর্ব। বিয়াসের বুকে তখন রিভার রাফটিং চলছিল। আমরা মন্দির থেকে বেরিয়ে বিয়াসের তীরে চায়ের দোকানে চা পান করে আবার যাত্রা শুরু করলাম।

মানালির হোটেল আমাদের অনলাইন বুক করাই ছিল। পাহাড়ের বুক চিরে গাড়ি ছুটল। সবুজ গাছগাছালি, অজানা পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে রহস্যময় সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে আমরা প্রায় সাড়ে সাত ঘণ্টার পথ অতিক্রম করে মানালির হোটেলে পৌঁছালাম। দীর্ঘ জার্নি করে রাত আটটায় হোটেলে পৌঁছে, ডিনার করে যথাসময়ে শুয়ে পড়লাম। সকাল ন’টার মধ্যেই আমাদের ড্রাইভার বেরোনোর পরামর্শ দিয়েছিলেন।

মানালিতে প্রথম দিন আমাদের গন্তব্য ছিল রোটাং পাস। সকালে হালকা ব্রেকফাস্ট সেরে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। আমাদের হোটেল থেকে প্রায় ৩৮ কিমি দূরে রোটাং পাস, হিমাচল প্রদেশের উচ্চ গিরিপথ। ড্রাইভারের মুখে শুনেছিলাম রোটাং পাস যাওয়ার জন্য ৬০টি পেট্রোল যান এবং ৪০টি ডিজেল যানের অনুমতি রয়েছে। এর বেশি যানবাহন যাওয়ার অনুমতি নেই। হিমালয়ের চোখ ধাঁধানো নৈসর্গিক সৌন্দর্য, বিয়াস নদীর ঝংকার শুনতে শুনতে আমরা প্রায় দেড় ঘণ্টা পাহাড়ি পথ অতিক্রম করে রোটাং পাসে পৌঁছালাম। পথে ছোটো বড়ো কিছু টানেল পড়ল।

পথে হিমাচলের দীর্ঘতম অটল টানেলও পড়ল। ড্রাইভার জানাল, ফেরার পথে আমরা এখানে কিছুক্ষণ দাঁড়াব। আবহাওয়া ভালো থাকতে থাকতে রোটাং পাস দেখে আসা ভালো। যে-কোনও মুহূর্তে খারাপ আবহাওয়ার কারণে এই পাস বিপজ্জনক হতে পারে। এই রেঞ্জ অতিক্রম করতে গিয়ে অনেকের মৃত্যু হয়েছে বলে, স্থানীয়রা এই জায়গাকে ‘রোটাং’ বা ‘ডেথ প্লেস’ বলে। বাংলায় যার অর্থ ‘মৃতদেহের ভূমি’। এই গিরিপথটি হিমালয়ের পীরপাঞ্জাল রেঞ্জের। এটি কুল্লু উপত্যকাকে হিমাচলের লাহৌল এবং স্পিতি উপত্যকার সঙ্গে সংযুক্ত করেছে। এটির উচ্চতা প্রায় ১৩,০৫৮ ফুট।

হিমেল আবহে রকমারি রান্না (পর্ব-০১)

আমাদের দেশে শীতকাল মানেই প্রচুর খাওয়া আর ঘোরাঘুরি। তাই, যারা রাঁধতে ভালোবাসেন, তারা এই সময় নানারকম রান্নার এক্সপেরিমেন্ট করতে পারেন। কারণ, হিমেল আবহে বাজারে সতেজ শাক-সবজি সহজলভ্য। যারা সবজি পছন্দ করেন, তাদের জন্য এই সময়টা খুবই প্রিয়। তাছাড়া, শীতের শাক-সবজি পুষ্টিগুণেও ভরপুর। আবার শরীরে প্রোটিনের চাহিদা পূরণের জন্য প্রয়োজন ননভেজ খাবার। তাই, এবার আমরা এমনই কিছু রেসিপি দিচ্ছি, যা ছোটো বড়ো সবারই পছন্দের টেস্টি ডিশ হয়ে উঠবে। শুধু তাই নয়, স্বাদ সম্পূর্ণ করতে আমরা শেষ পর্বে পরিবেশন করবো চমকপ্রদ কিছু মিষ্টি। অতএব, যে-কেউ এই রেসিপিগুলো ট্রাই করুন এবং খেয়ে-খাইয়ে খুশি থাকুন।

মিক্সড ভেজ-ফ্লাই

উপকরণ: ২টো ব্রেড, ২ চামচ বাটার, ১টা টম্যাটো, ১টা শসা, বাঁধাকপিকুচি ১ কাপ, লাল-হলুদ-সবুজ ক্যাপসিকামকুচি ১ কাপ, পেঁয়াজকলির কুচি হাফ কাপ, চাটমশালা স্বাদমতো, সেদ্ধ করা ভুট্টার দানা ১ কাপ এবং ১ চা চামচ গোল মরিচের গুঁড়ো।

প্রণালী: গ্যাস আভেনে ফ্রাইং প্যান বসান। হালকা আঁচে প্যান গরম করে সামান্য বাটার দিয়ে গরম করুন। ব্রেড কেটে ছোটো ছোটো টুকরো করে বাটারে হালকা ভেজে রাখুন। এবার টম্যাটো কেটে দানা বের করে নিন এবং ক্যাপসিকামকুচি ও বাঁধাকপির কুচি বাটার দিয়ে ভাজুন। এরপর সেদ্ধ করে রাখা ভুট্টার দানা এবং পেঁয়াজকলির কুচি দিন ফ্রাইং প্যান-এ। হালকা ভেজে রাখা ব্রেড মিশিয়ে নাড়াচাড়া করে ভাজুন কিছুক্ষণ। সবশেষে চাট মশালা এবং গোল মরিচের গুঁড়ো ছড়িয়ে দিয়ে নামিয়ে নিন এবং গরম গরম পরিবেশন করুন।

ভেজ পাস্তা-য় ভুরিভোজ

গ্রিল্ড কলিফ্লাওয়ার পাস্তা

উপকরণ: ১ কাপ ফুলকপির টুকরো, ১ কাপ পাস্তা সেদ্ধ করা, ১ ছোটো চামচ মিক্সড হার্বস, ১ বড়ো চামচ অলিভ অয়েল, ১ ছোটো চামচ এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল, অল্প পরিমাণে লাল, সবুজ ও হলুদ ক্যাপসিকামকুচি, ১/৪ ছোটো চামচ গোলমরিচের গুঁড়ো, নুন স্বাদমতো।

প্রণালী: গ্রিলারে ফুলকপির টুকরো, লাল, সবুজ, হলুদ ক্যাপসিকামের টুকরো, অলিভ অয়েল ছড়িয়ে গ্রিল করে নিন। এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল প্যানে দিয়ে গরম করুন। এবার পাস্তার সঙ্গে নুন, মিক্সড হার্বস ও গ্রিলড সবজি, হালকা নাড়াচাড়া করে নামিয়ে নিন। গরম গরম সার্ভ করুন।

রোস্টেড বেল পেপার পাস্তা ইন ক্রিম

উপকরণ: ১টা সবুজ ক্যাপসিকাম, ১ কাপ পাস্তা সেদ্ধ করা, ২টো পেঁয়াজকলি, ১টা কাঁচালংকা, ১/২ কাপ পনিরের ছোটো ছোটো টুকরো, ১ বড়ো চামচ তেল, ১ বড়ো চামচ ক্রিম, নুন স্বাদমতো।

প্রণালী: ক্যাপসিকাম ভালো ভাবে ধুয়ে বীজ পরিষ্কার করে একটু রোস্ট করে নিন। এর ফলে উপরের খোসা নরম হয়ে যাবে। একই ভাবে পেঁয়াজও রোস্ট করে নিন। মিক্সিতে পেঁয়াজ, ক্যাপসিকাম আর কাঁচালংকা একসঙ্গে বেটে একটা পেস্ট তৈরি করে নিন। প্যানে অল্প তেলে এই পেস্ট নাড়াচাড়া করার পরে, পনির আর পাস্তা দিয়ে নাড়াচাড়া করুন। ক্রিম ছড়িয়ে, গরম গরম সার্ভ করুন।

কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা এবং সমাধানের সঠিক উপায়

অনিয়মিত মলত্যাগ, শক্ত মল ও পেট ফাঁপার মতো সমস্যার ক্ষেত্রে চিকিৎসা নিতে উৎসাহিত করার জন্য প্রতি বছর ডিসেম্বর-এ ‘ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন ফর ফাংশনাল গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল ডিসঅর্ডারস’ (IFFGD) সংস্থার নেতৃত্বে ‘ইন্টারন্যাশনাল কনস্টিপেশন অ্যাওয়ারনেস মান্থ’ পালিত হয়। কিন্তু এখনও কোষ্ঠকাঠিন্যের বিষয়ে সম্পূর্ণ এবং সঠিক ধারণা নেই অনেকের। তাই এই বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন ফর্টিস হাসপাতাল-এর রোবোটিক্স এবং জিআই সার্জন এবং বিভাগীয় পরিচালক ডা. উদীপ্ত রায়।

প্রথমেই মনে রাখবেন, কোষ্ঠকাঠিন্য একটি সাধারণ গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সমস্যা। সাধারণ ভাবে সপ্তাহে তিনবারের কম মলত্যাগ হওয়া, অতিরিক্ত চাপ দিয়ে মলত্যাগ, শক্ত মল কিংবা মলত্যাগের পরও অসম্পূর্ণতার অনুভূতিকে কোষ্ঠকাঠিন্যের লক্ষণ হিসেবে ধরা হয়। বিশ্বব্যাপী প্রায় ৯–২০ শতাংশ মানুষ এই সমস্যায় ভোগেন এবং এটি নারীদের ও বয়স্কদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। তা সত্ত্বেও, কোষ্ঠকাঠিন্যকে প্রায়ই একটি রোগ হিসেবে ধরা হয়, অথচ এটি আসলে জীবনশৈলী কিংবা অন্তর্নিহিত কোনও শারীরিক সমস্যার লক্ষণ।

ভারতে অনেকেরই মনে হয়, প্রতিদিন সকালে পেট পরিষ্কার না হলে শারীরিক ও মানসিক অস্বস্তি থাকে। অন্যদিকে, ঠান্ডার দেশের মানুষদের ক্ষেত্রে দুই–তিন দিন অন্তর মলত্যাগ স্বাভাবিক বলে ধরা হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, কোষ্ঠকাঠিন্য শুধু কতবার মলত্যাগ হচ্ছে সেই বিষয় নয়, বরং মলত্যাগের সময় কষ্ট ও অসুবিধার ভিত্তিতেই নির্ধারিত হয়।

Dr Udipta Ray
Dr. Udipta Ray

কোষ্ঠকাঠিন্যের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে। বংশগত প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ। একই পরিবারের একাধিক সদস্যের মধ্যে এই সমস্যা দেখা যায়। আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, অন্ত্রে স্নায়ু ও নিউরোট্রান্সমিটারের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক রয়েছে এবং সামান্য ভারসাম্যহীনতাও অন্ত্রের কার্যকারীতাকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে সবচেয়ে সাধারণ কারণ হল— জীবনযাত্রার ধরণ। শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, দীর্ঘ সময় বসে থাকা এবং চলাফেরার অভাব, বিশেষকরে বয়স্কদের ক্ষেত্রে অন্ত্রের স্বাভাবিক সংকোচনকে ধীর করে দেয়। চিকিৎসকদের ভাষায়, শরীর নিষ্ক্রিয় হলে অন্ত্রও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।

খাদ্যাভ্যাস মলত্যাগে বড়ো ভূমিকা রাখে। পরিশোধিত ও রেডি-টু-ইট খাবার খাওয়ার অভ্যাস এবং শাকসবজি ও ফল কম খাওয়ার ফলে ফাইবার-এর ঘাটতি হয়, যা অন্ত্রের কার্যকারিতায় বিঘ্ন ঘটায়। এক্ষেত্রে পর্যাপ্ত জলপান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ ভাবে প্রতিদিন শরীরের প্রতি ২০ কেজি ওজনের জন্য ১ লিটার জল প্রয়োজন, যদিও আবহাওয়া ও অন্যান্য শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে এই পরিমাণ কমবেশি হতে পারে। ঘুমের অনিয়ম, নাইট শিফট ও অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শরীরের স্বাভাবিক পরিপাক ছন্দকে ব্যাহত করে।

কোষ্ঠকাঠিন্য সবসময় মানসিক কারণে হয় না, যদিও মানসিক চাপ উপসর্গ বাড়াতে পারে। হাইপোথাইরয়েডিজম, শরীরে পটাশিয়ামের ঘাটতি, ইনফ্ল্যামেটরি বাওয়েল ডিজিজ, অন্ত্রের সংকোচন কিংবা কোলন ও রেকটামের টিউমারের মতো সমস্যাও কোষ্ঠকাঠিন্যের মাধ্যমে প্রকাশ পেতে পারে।

যদি কোষ্ঠকাঠিন্য দীর্ঘদিন ধরে থাকে কিংবা এর সঙ্গে রক্তপাত, পেটব্যথা, জ্বর, ক্ষুধামান্দ্য কিংবা অকারণ ওজন কমার মতো সতর্কতামূলক লক্ষণ দেখা যায়, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষকরে ব্যথা কিংবা পেট ফাঁপার সঙ্গে নিজের ইচ্ছেমতো গ্যাসের ওষুধ খাওয়া উচিত নয়। কারণ এতে অজানা অন্ত্রজনিত সমস্যা আরও জটিল হতে পারে। প্রাথমিক চিকিৎসায় সাধারণত ইসবগুলের ভুসির মতো ফাইবার সাপ্লিমেন্ট, পর্যাপ্ত জলপান এবং জীবনযাত্রার সংশোধন অন্তর্ভুক্ত থাকে।

অস্ত্রোপচার খুব কম ক্ষেত্রেই প্রয়োজন হয় এবং তা শুধুমাত্র রেকটাল প্রোল্যাপ্স, অবস্ট্রাক্টেড ডিফেকেশন সিনড্রোম বা অন্ত্রে বাধা সৃষ্টিকারী টিউমারের মতো নির্দিষ্ট সমস্যার ক্ষেত্রে করা হয়। তাই, কোষ্ঠকাঠিন্যের ক্ষেত্রে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল— ভালো ভাবে চিবিয়ে খাচ্ছেন কি না, ঠিকমতো ঘুমোচ্ছেন কি না এবং নিয়মিত ব্যায়াম করছেন কি না। অতএব, কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ করতে হলে ঠিকমতো খাবার খেতে হবে, সঠিক সময়ে পর্যাপ্ত  সময় নিয়ে ঘুমোতে হবে আর নিয়মিত শরীরচর্চা করতে হবে। এরপরও যদি কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যার সমাধান না হয়, তাহলে এই সমস্যা অন্য কোনও শারীরিক সমস্যার কারণে হচ্ছে ধরে নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ মতো চিকিৎসার সাহায্য নিতে হবে।

সুন্দরী সিমলা আর মনভোলানো মানালি (পর্ব-০১)

বহুদিনের ইচ্ছা ছিল হিমাচলে ঘুরে আসার। নানা কারণে তা হয়ে উঠছিল না। খানিকটা অবসর পেয়ে প্রিয়জনদের সঙ্গে ২০২৪-এর অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহের শুরুতেই দশ দিনের ছুটিতে বেরিয়ে পড়েছিলাম। প্রথমে হাওড়া থেকে বিকেলে রাজধানী এক্সপ্রেস ধরে এক রাতের জার্নি করে সকাল সাড়ে দশটায় দিল্লি পৌঁছালাম। দিল্লি প্ল্যাটফর্মের জনসমুদ্র ঠেলে বাইরে বেরিয়ে পার্কিং-এ এসে ছোটো গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিলাম। আমাদের পিক আপ করার ছোটো গাড়ি আগে থেকেই বুকিং করা ছিল। আধ ঘণ্টা পর রাজধানীর ট্র্যাফিক জ্যাম কাটিয়ে গাড়ি এসে পৌঁছাল। তড়িঘড়ি করে লাগেজ সহ গাড়িতে উঠলাম।

আমাদের গাড়ির চালক লালকেল্লাকে পিছনে ফেলে সাঁ সাঁ করে ছুটল পাহাড়ি শহর সিমলার উদ্দেশে। আমাদের অনলাইনে হোটেল বুক করা ছিল। ছোটো গাড়িতে প্রায় এগারো ঘণ্টা জার্নির পর রাত এগারোটায় হোটেলে পৌঁছালাম। গাড়ির ড্রাইভার জানাল যে, কাল সকাল আটটা থেকে সাড়ে আটটার মধ্যে প্রস্তুত থাকতে, সিমলার স্থানীয় কিছু জায়গা ঘুরিয়ে দেখাবেন। আমরা তার কথায় সায় দিলাম। দীর্ঘপথ জার্নি করে আমাদের অবসন্ন শরীর রাতের খাবার খেয়ে বিছানায় এলিয়ে পড়েছিল।

সিমলার হোটেলে প্রথম দিন সকালে যথারীতি সাড়ে সাতটায় ঘুম ভাঙল। স্নান সেরে ব্রেকফাস্ট করে আমরা ড্রাইভারের পূর্বের কথামতো প্রস্তুত ছিলাম। আমাদের সঙ্গে নিয়ে গাড়ি ছুটল পাহাড়ি রাস্তার অজানা বাঁকে বাঁকে। পাহাড়ি গন্ধ গায়ে মেখে পাহাড়ের প্রতিটি বাঁকের রহস্যময় অবর্ণনীয় সৌন্দর্য উপভোগ করতে বেশ ভালোই লাগছিল। পাহাড়ের উন্নত শিরে সূর্যের উজ্জ্বল আলো পড়ে সোনালি রঙের আভা ছড়িয়ে পড়ছিল দিকে দিকে। গাড়ির জানলা দিয়ে ঠান্ডা হিমেল হাওয়া ঝাপটা দিচ্ছিল চোখে মুখে। হোটেল থেকে প্রায় কুড়ি কিলোমিটার জার্নি করে পৌঁছালাম কুফরি। ওখানে বিভিন্ন পয়েন্ট দেখার জন্য আমরা ঘোড়া ভাড়া করে কয়েক কিলোমিটার পথ পেরোলাম। রৌদ্রোজ্জ্বল দিন থাকায় মাহাশু পিকে বদ্রীনাথ ও কেদারনাথ রেঞ্জ দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল।

কুফরি ভ্যালিতে এসে বরফ না পেয়ে একটু হতাশ হয়েছিলাম। কুফরিতে বরফ ছিল না। স্থানীয়দের মুখে শুনলাম যে, অক্টোবরের মাঝামাঝি কুফরিতে বরফ পড়ে। তবে ঘোড়া থেকে নেমে প্রায় সাতশো মিটার পথ হেঁটে কুফরি ভ্যালিতে কিছুটা চড়াই উতরাই পেরিয়ে নাগ মন্দির দর্শন করলাম। ভ্যালিতে নানারকম খাবার, পোশাকের দোকান, উপহার সামগ্রীর দোকান পসরা সাজিয়ে বসেছিল। ঠান্ডার মধ্যে উষ্ণ চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে প্রাকৃতিক শোভা দেখতে ভালোই লাগছিল। পুরো কুফরি ভ্যালি ঘুরে ফিরে আমরা ভ্যালির একটু নীচে জিপসি ভাড়া করে কুফরি ফান ওয়ার্ল্ডে পৌঁছালাম। ওখানে গিয়ে টিকিট কেটে কিছু ফান অ্যাক্টিভিটিজ জিপ লাইন, কার রেসিং, জিপ সাইক্লিং করলাম। বাচ্চাদের জন্য ফান ওয়ার্ল্ডে বিভিন্ন রকম অ্যাক্টিভিটিজ এখানে আছে। হিমালয়ের বিভিন্ন ভিউ পয়েন্ট এখান থেকে ভালো দেখা যাচ্ছিল। এখানে লোকজনের যাতায়াত অনেকটাই হালকা ছিল। কুফরি ফান ওয়ার্ল্ড ঘুরে এসে আমরা ঘোড়ার পিঠে চড়ে গাড়ি পার্কিং-এ ফেরত এলাম।

আমাদের ড্রাইভার সময় নষ্ট না করে পাহাড়ি পথের বুক চিরে গাড়ি ছোটাল। ফেরার পথে ঘণ্টাখানেক জার্নি করার পর রাস্তার একপাশে গাড়ি থামল। রাস্তার উপরেই পড়ল গ্রিন ভ্যালি ভিউ পয়েন্ট। পর্যটকদের ভিড় এখানে একটু বেশি। গ্রিন ভ্যালির সৌন্দর্য চোখ জুড়ানো। যে দিকেই চোখ যায় সবুজের সমারোহ। হিমালয়ের নানা নাম না জানা গাছ পুরো উপতক্যায় আধিপত্য বিস্তার করেছে। গ্রিন ভ্যালি দেখে আমরা হোটেলের কাছাকাছি আসতে বিকেল গড়িয়ে গেল। ঘড়িতে প্রায় তিনটে। ড্রাইভার আমাদের পরামর্শ দিল বিকেলে সিমলা ম্যাল ঘুরে দেখতে।

গাড়ি পার্কিং-এ দাঁড়াতে আমরা নেমে সিমলা ম্যালে যাওয়ার রাস্তা ধরলাম। এক মিনিট হাঁটার পর সিমলা ম্যালে-র লিফট-এ পৌঁছালাম। লিফট সোজা ম্যালে নিয়ে এল। লিফট থেকে বেরিয়ে ম্যালে পর্যটকদের অন্যতম দর্শনীয় স্থান ক্রাইস্ট চার্চ। গির্জার ভিতর স্থাপত্যশৈলী মুগ্ধ করল আমাদের সকলকে। শান্ত পরিবেশ বরাবর আমার ব্যক্তিগত পছন্দ। খুব একটা ভিড় ছিল না। তিন-চারজন পর্যটক ক্যান্ডেল জ্বালাচ্ছিলেন। এই গির্জাটি ভারতের দ্বিতীয় প্রাচীনতম গির্জা। গির্জাটি রিজের উপর ১৮৫৭ সালে স্থাপিত হয়। কলোনিয়াল আর্কিটেকচারের প্রতিফলন এখানে সুস্পষ্ট।

হাতে কিছু সময় বেশি থাকার জন্য আমরা গির্জা থেকে কিছু পথ হেঁটে পৌঁছালাম রোপওয়েতে করে জাখু টেম্পল। এই মন্দিরটি জাখু পাহাড়ের উপর অবস্থিত। এই মন্দিরে হনুমান পূজিত হন। হনুমানের মূর্তির উচ্চতা প্রায় ১০৮ ফুট। স্থানীয় লোকজনের মুখে শুনলাম, রামায়ণে কথিত লঙ্কা যুদ্ধের সময় লক্ষ্মণের প্রাণ ফেরাতে সঞ্জীবনী বুটি আনার জন্য ভগবান হনুমান কিছুক্ষণ এখানে বিশ্রাম নিয়েছিলেন। সেইজন্যই নাকি এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করা হয়। মন্দির প্রাঙ্গণ বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। এখানে পাইন, দেওদার গাছের সমারোহ দু-চোখকে প্রশান্তি দিচ্ছিল। অনবদ্য ভিউ এককথায় অবর্ণনীয়। এখানে ভিড় একটু বেশি ছিল। কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে আমরা ম্যালে ফিরলাম।

ধীর পায়ে সন্ধ্যা নামছে। হালকা হালকা ঠান্ডা হাওয়া বইতে শুরু করেছে। প্রায় সাড়ে পাঁচটা বেজে গেছে। সিমলা ম্যাল আলোয় ঝলমল করছে। ম্যালে বসে আমরা গরম গরম মোমোর স্বাদ নিলাম। এককথায় অতুলনীয় স্বাদ। আমরা এক ঘণ্টা সময় নিয়ে ম্যাল ঘুরে বাড়ির সদস্যদের জন্য বেশ কিছু জিনিসপত্র কিনলাম। তারপর লিফট ধরে আমরা গাড়ি পার্কিং-এ এসে পৌঁছালাম। গাড়ির চালক আমাদের অপেক্ষাতেই ছিলেন। গাড়ি হোটেলের উদ্দেশে ছুটল। ড্রাইভার আমাদের বলল যে আগামীকাল সিমলা কালীবাড়ি নিয়ে যাবে। সে সিমলা কালীবাড়ি থেকে আনান্দলে হয়ে মানালি হোটেলে নিয়ে যাবে আমাদের। সকাল আটটার মধ্যে আমরা যেন প্রস্তুত থাকি৷

রায়চকে গঙ্গার আবহে উপভোগ করুন বছর শেষের সফর

আর মাত্র কয়েকদিন পর চলতি বছরকে বিদায় জানিয়ে আমরা বরণ করে নেবো নতুন বছরকে। আর এই পুরোনোকে বিদায় আর নতুনকে বরণ করে নেওয়ার সন্ধিক্ষণে সুযোগ আসে অবসর যাপনের। তাই এই সময় চাই বিশ্রাম আর বিনোদনের রসদ। কিন্তু অবসরে হোটেলে গিয়ে বিশ্রাম নেওয়া কিংবা পার্টি-তে নাচ-গান করার পাশাপাশি যদি  দু চোখ দিয়ে প্রকৃতিকে উপভোগ করার সুযোগ করে নেওয়া যায়, তাহলে স্মররণীয় হয়ে থাকবে বছর শেষ আর শুরুর এই সময়টা। এরজন্য অবশ্য বহু দূরে যেতে হবে না, মাত্র কয়েক ঘন্টা জার্নি করেই পৌঁছে যাওয়া যায় রায়চকের গঙ্গাবক্ষের রাজকীয় পরিবেশে। এখানে সুন্দর প্রকৃতির পাশাপাশি, বিলাসবহুল আরাম-আয়াসের সমস্ত সুযোগ পাওয়া যাবে সহজে। প্রসঙ্গত ‘তাজ গঙ্গা কুটির রিসর্ট অ্যান্ড স্পা’-এর ক্লাস্টার জেনারেল ম্যানেজার ইন্দ্রনীল রায় জানিয়েছেন, রায়চকে গঙ্গার আবহে বর্ষবরণের সমস্ত ব্যবস্থা আছে। কেউ চাইলে মাত্র দু-তিন ঘন্টার জার্নি করে রায়চকে পৌঁছে, গান-বাজনা শুনতে শুনতে গালা ডিনার-এ মন ভরিয়ে নিতে পারবেন অনায়াসে।

আসলে, এখানে গঙ্গা-স্নান থেকে শুরু করে নৌকা ভ্রমণ, নদীর মাছের স্বাদ নেওয়া সবই সম্ভব। দিনে-রাতে মনোরম হাওয়া গায়ে মেখে, অবসর যাপনের মজা-ই আলাদা। এখানে একাধিক রেঁস্তোরায় আমিষ, নিরামিষ সবরকম খাবারের স্বাদ নিয়ে, লোকগান শোনার দারুণ সুবিধেও রয়েছে। শুধু কী তাই? যারা নদীতে স্নান না করে সুইমিং পুল-এ স্নান করতে চান, তাদের জন্য রয়েছে একাধিক সুইমিং পুল-এ স্নান করার ব্যবস্থা। রয়েছে ছোটো-বড়ো সবার জন্য বিস্তৃত খেলার জায়গা এবং শরীরচর্চার জায়গা। নীচে ঘাসের সবুজ চাদর, চারিদিকে সবুজ গাছ-গাছালি, সামনে বহমান গঙ্গা আর উপরে নীল আকাশের চোখ জুড়ানো শোভা, আহা, নয়নাভিরাম!

এখানে ঐতিহ্য এবং আধুনিকতার মেলবন্ধন ঘটেছে। গ্রাম্য আবহ যেমন রয়েছে, ঠিক তেমনই বিলাসবহুল সুযোগ-সুবিধাও রয়েছে এখানে। গঙ্গার মনোরম দৃশ্য সফরকে করে তুলবে সার্থক। এছাড়া, অতিথিরা কিউরেট করা খাবার উপভোগ করতে পারবেন এই রিসর্টের সিগনেচার রেস্তোরাঁ মাচান আর হাউজ অফ মিং-এ। এই দুই রেস্তোরাঁর অনুপ্রেরণা হিসাবে কাজ করেছে গঙ্গার জলের মৃদু ছন্দ। রিভার ভিউ লাউঞ্জ আর বারান্দা বিশ্রাম নেওয়ার জন্য আদর্শ।  খোলামেলা পরিবেশ, ইনফিনিটি-এজ পুল, আউটডোর পুল আর অত্যাধুনিক ফিটনেস সেন্টার-এ তাজা হয়ে ওঠার এবং অবসর বিনোদনের সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে এখানে। সঙ্গে আছে ইনডোর ও আউটডোর খেলাধুলোর সুযোগ। সামগ্রিক সুস্থতার অভিজ্ঞতা দেওয়ার জন্য রয়েছে স্পা সেন্টার। বিশাল চত্বরে উৎসব উদযাপন, ডেস্টিনেশন ওয়েডিং এবং কর্পোরেট রিট্রিট হিসাবেও আদর্শ।

গঙ্গার ধারে এই লোকেশন-এ আছে দুর্গের মতো সব স্থাপত্য আর নদীতীরের সৌন্দর্য। অতিথিরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করতে পারেন, গ্রামে ঘুরে বেড়াতে পারেন আর বাংলার বিখ্যাত চায়ের ব্লেন্ডগুলো উপভোগ করতে পারেন এমন এক পরিবেশে, যা এই অঞ্চলের চিরকালীন মেজাজের উদযাপন।

কিতকিত (শেষ পর্ব)

তারপর আরও অনেক কথা হলেও সোনালি আর বিয়েতে রাজি হয় না। অপূর্ব বয়সে ছোটো। এই হাসপাতালে কর্পোরেট বিল সেকশনের ইনচার্জ হয়ে সোনালির এক বছর আগে থেকে কাজ করছে। সোনালি মেডিক্লেম সেকশনের অ্যাসিস্ট্যান্ট। আলাপ এই ছয় মাসের। তার সঙ্গে সোনালি সেরকম ভাবে বিয়ের কোনও কথা বলেনি। তবে ছেলেটা কথায় কথায় সেদিনও বলেছে, ‘বাড়িতে তো শুধু বাবা আর আমি, যাকেই বিয়ে করব বাবা কিছু বলবে না। শুধু বিয়েটা করতে হবে।’

তাও সোনালির মনে হয় শুধু কয়েকটা দিন একটু ঘোরা, ক্যান্টিনে কয়েক কাপ চা, টিফিন, আর দু’দিন ওর এই বাড়িতে আসা, তাও দিনের আলোতে, সন্ধেবেলায় আসার কথা বলবার সাহস হয়নি— এই নিয়ে তো আর মানুষ চেনা যায় না।

‘তুই চিনতে পেরেও কী করবি? এই আমাকে দ্যাখ, এক্কেবারে মা-বাবা দেখেশুনে বিয়ে দিল। কুঠি মেলাল, ব্লাড টেস্ট হল, তাও বিয়ের এক মাসের মধ্যে জানলাম নিজের মামির সাথে ওর সম্পর্ক আছে, ঘর ছাড়তে হল। কিন্তু বিয়ের পর মা-বাবার কাছেও মেয়ে কিন্তু একটা অন্যরকমের বার্ডেন হয়ে যায়। এটা হয়তো স্বাভাবিক। এত খরচ করে বিয়ে দেওয়া, মেয়ে যদি সংসার না করে! তবে এখন ভালো আছি৷’ রেবা একদিন কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলে।

অপূর্ব ছেলেটা কোনও দিন দিদি বলে না। সোনালি একদিন জিজ্ঞেস করতে উত্তর দেয়, ‘আমি তোমাকে বড়ো ভাবি না। দিদি বললে সমস্যা হবে।’

—কীসের সমস্যা?

—উফঃ একদিনে সব কিছু বলা যায় না। যখন সময় হবে তোমাকে ঝুড়ি কোদাল নিয়ে বোঝাব।

মাঝে মাঝে মনে হয় নিজের দিদি হলেও এইসব খবরের জন্যে দুই দিদি জামাইবাবুদের সঙ্গে বসে থাকে। পাশের বাড়ির তপুর মাকে দুই দিদি মাঝে মাঝেই ফোন করে। তবে সব খবর পায় না অথবা পেলেও শোনে না। যেদিন ‘স্বামীজি হাসপাতাল’ কোনও কারণ ছাড়াই চাকরি থেকে তাড়িয়ে দিল, সেদিন ওদের কেউ কোনও খবর পায়নি।

প্রায় দেড় মাস সোনালির কোনও চাকরি ছিল না। তাও মা’কে কোনও খবর জানতে দেয়নি। প্রত্যেকদিন নিয়ম করে খেয়ে কোনও দিন বাসে, কোনও দিন স্কুটি নিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেছে। কিন্তু প্রতিদিন তো কোথাও বায়োডেটা জমা দিতে যাওয়া যায় না। এক এক দিন সারাটা শহর কোনও কাজ ছাড়াই ঘুরে বেড়িয়েছে। কোনও জায়গায়, চায়ের দোকানে বসে বসে সময় কাটিয়েছে। আগে ফিরলেও মা জিজ্ঞেস করত, ‘কী রে আজ এত আগে ফিরে এলি, শরীর খারাপ?’

কতদিন বাড়ির কাছে এসেও আবার ফিরে গেছে। স্কুটি নিয়েও বেশি ঘোরা যায় না। হু হু করে তেলেরও দাম বাড়ছে, মায়ের থেকে টাকা চাইলেও সমস্যা। এক এক দিন সাইকেল নিয়ে বেরোত। ‘বাস স্ট্যান্ডের সাইকেল স্ট্যান্ডে রেখে বাসে যাব। আজ মিটিং আছে, রাস্তায় ভিড় হবে।’ মা-কে বোঝাত। তারপর আরেকটা নার্সিংহোমে চাকরি পেল। পেমেন্টটা খুব কম, কিন্তু তাও যা পাওয়া যাবে। সেই নার্সিংহোম থেকে অন্য আরেক হাসপাতালে কিছুদিন চাকরি করবার পর এখানে চাকরি পেল। এক বন্ধুর মুখে ভ্যাকেন্সির খবরটা শুনতে পায়।

বড়ো জামাইবাবুর কোনও এক বন্ধুর আত্মীয় এখানে কাজ করে। তার মাধ্যমেই সম্ভবত অপূর্বর খবরটা পেল। কিন্তু একবারের জন্যেও সেই সময় ভ্যাকেন্সির খবরটা দিল না। চাকরি পাবার পর বড়ো জামাইবাবু বলে, ‘ও তুই ওখানে চাকরি পেলি, খুব ভালো। আমাদের অমলের শালাও তো এখানে কাজ করে। কিছু দরকার হলে বলবি। আমি ফোন করে বলে দেব।’

তার মানে এটাও অমলের শালাই বলেছে। শুধু এই ঘোরা, একসাথে কয়েকটা বসা, তাতেই এই। তাহলে আজকের এই ঘাড়ে হাত দেওয়াটা দেখতে পেলে তো ‘সুইসাইড’ করে নেবে। নাকি আজকের খবরটাও চলে গেছে!

বাথরুম থেকে বাইরে বেরিয়ে ঘড়ির দিকে তাকাতে খারাপ লাগল। ন’টা বেজে গেছে। এখন সন্ধে দিলে পাড়ার লোক খ্যাপা ভাববে। তাও মায়ের কথাগুলো তো ফেলে দিতে পারে না। মা বেঁচে থাকাকালীন সোনালির হাসপাতাল থেকে ফিরতে দেরি হলে অসুস্থ শরীরে নিজেই উঠোনের তুলসীতলায় সন্ধে দিতে চলে যেত। শাঁখটা বাজাতে পারত না, তবে ঘরে একটা ধূপ জ্বালিয়ে চেয়ার নিয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে বসে থাকত। সোনালি এলে চা করতে যেত, কিছু টিফিন করে দিত। শরীর যেদিন খুব খারাপ করত সেদিন শুয়ে শুয়ে বলত, “কিছু ভেজে নে, মুড়ি খাবি। আমাকে একটু লিকার চা দে।’

এখন অর্ধেকদিন সোনালি রাতেও কিছু রান্না করে না। দুধ থাকে গরম করে একটু চিড়ে বা মুড়ি ভিজিয়ে খেয়ে নেয়। কোনওদিন আবার ফেরার রাস্তায় চাউমিন কিংবা মোগলাই কিনে আনে। মা এগুলোও বারণ করত।

ঘাড়ের সঙ্গে মাথাতেও খুব ব্যথা করছে। আদা দিয়ে চা ফোটায়। বিছানাতে বসে চায়ের কাপে চুমুক দেওয়ার সময় বিছানার উপরে সেদিনের কাগজটাতে একটু চোখ বোলায়। শেষের দিকে একটা খবরে চোখ আটকে যায়। কোনও এক অভিনেত্রী তার থেকে পনেরো বছর বয়সে ছোটো এক অভিনেতাকে বিয়ে করেছে। সেই নিয়েই কীসব লিখেছে।

কয়েকদিন আগে অফিস ছুটির পর অপূর্ব জোর করে ক্যান্টিনে নিয়ে গিয়ে কফির কাপে চুমুক দিয়ে এইরকম একটা লম্বা লিস্ট বলছিল। বাংলাতেও অনেক অভিনেত্রী তাদের থেকে কম বয়সের ছেলেদের বিয়ে করেছে। ‘কে বড়ো সেটা ম্যাটার নয়, বয়স জাস্ট একটা সংখ্যা। তোমার মনের মিল হবে, মনে হবে এই লোকটা কেয়ারিং, দেন গো অ্যাহেড।’

বড়দি, মেজদি বা জামাইবাবুর কথাগুলো শুনতে পেলেই একটা খারাপ কথা মুখে এনে কিছু একটা বলবেই। সোনালি বারণ করলে হয়তো প্রতিবারের মতো বলে উঠবে, ‘এই বস্তাপচা ধারণা, তুমি কান দিয়ে শোনো। এখন কানটা বললে দোষ নেই, কিন্তু আরও অনেক জায়গা দিয়ে অনেক কিছু করি, শুধু মুখে তাদের নাম আনলেই…’।

—ঠিক আছে এখানেই ইতি করো।

কথাগুলো মনে করে সোনালি নিজের মনেই হেসে উঠল। কাপটা ধুতে যাবে এমন সময় স্ক্রিনে ভেসে উঠল, ‘অপূর্ব কলিং।’

রাতটা খুব অদ্ভুত। সোনালির ঘুম এল না। চোখ দুটো বন্ধ করলেই অপূর্বর বলা কথাগুলো কানে বাজছে, ‘কেমন আছো, ঘাড়ে ব্যথা কমেছে? নাকি আমি যাব, সারা রাত মালিশ করে দেব।’ রাতে কিছু তৈরি করেনি। দুধ আর বিস্কুট খেয়েই শুয়ে পড়েছে।

আচ্ছা এটা ওর ইনফ্যাচুয়েশন নয় তো? কোনও অসুবিধা হলে মুখ দেখাতে পারবে না। কিন্তু দিদিরা তো এমনিই দেখে না। আর একটু বয়স বাড়লে কে দেখবে? নিজে নিজেকে আর কতদিন দেখে বেড়াবে?

সোনালি একটা ঢেঁকিতে একবার উঠছে আর নামছে। বিছানার পাশের জানলা দিয়ে অন্ধকার আকাশে ভেসে বেড়ানো তারাদের দেখতে দেখতেই অপূর্বর কথাগুলো আবার মনের ভিতর ভেসে বেড়াতে লাগল। সঙ্গে মা, দুই দিদি, জামাইবাবু, এমনকি বোনপো দুটোও। ঘাড়ে, মাথায় ব্যথা হলেও ঘুম এল না। মা বেঁচে থাকলে রাজি হত?

সোনালি হোয়াটসঅ্যাপ খুলল। অপূর্ব অনলাইন। সোনালি অনলাইন হতেই লিখল, ‘ঘুম আসছে না, মনে হচ্ছে কোলে তোমার মাথাটা রেখে ঘাড়ে মাথায় ওষুধ লাগিয়ে ম্যাসাজ করে দিই।’

সোনালির সারাটা শরীরে আবার ঢেউ জেগে উঠল। চোখ দুটো নিজের থেকেই বন্ধ হয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। অন্ধকার অবশ্য সেই জল দেখতে পায়নি।

কিতকিত (পর্ব-০১)

বাড়ি ফেরার পরে পোশাকটা তখনও ছাড়েনি। বড়দির পরপর ফোন, তাও আবার অফিসের ফোনে। প্রথমটাতে একটু ঘাবড়ে গেছিল সোনালি। এমনি সময় অফিসে মানে হাসপাতালে ডিউটিতে থাকলে, দুই দিদির কেউই ফোন করে না। সোনালিই বারণ করে দিয়ে বলেছে, “খুব দরকার থাকলে অফিসের নম্বরে মিস কল দিবি, আমি ঠিক সময় মতো রিটার্ন ফোন করে নেব।”

হাসপাতালে থাকাকালীন সাধারণত বাড়ির ফোনটাকে সাইলেন্ট মোডে করে রাখে। আজ অফিস থেকে বাড়ি ঢুকতেও একটু দেরি হয়েছে। বদমাস এই ডিপার্টমেন্টাল হেডটা। ছ’টা-সাড়ে ছ’টাতেও বেরোতে দিচ্ছে না। নিজে ব্যাটা ঠিক দুপুর বারোটার সময় হাসপাতালে ঢুকছে। স্বাভাবিক ভাবেই আটটা সাড়ে আটটা পর্যন্ত অনায়াসে থাকতে পারছে। কিন্তু যে-মানুষটা সকাল সাড়ে আটটা থেকে ন’টার মধ্যে হাসপাতালে আসে তার কাছে রাত সাড়ে আটটা ন’টা মানে তো বারো ঘণ্টা।

এতক্ষণ কেন থাকবে? কিছু বলবার উপায় নেই। ডিএইচ হলেও ভদ্রলোক তো প্রায় ডিরেক্টর র‍্যাংক-এর, ওনার সাথে খারাপ ব্যবহার করা মানেই নেগেটিভ ইমপ্যাক্ট পড়বে। দিদিদের তো এইসব কথা বলে বোঝানো যায় না। প্রথম কয়েকবার রিং হয়ে যাওয়ার একটু পরে ধরবে ভেবেও উপায় নেই। পরপর রিং হয়েই যেতে লাগল। সোনালি বাধ্য হয়ে ফোনটা রিসিভ করতেই উলটো দিক থেকে একরকম বাজ পড়বার মতো শব্দ শুনতে পেল— “তুই কী আরম্ভ করেছিস রে? আমাদের তো একটা মান সম্মান আছে।”

সোনালি সব শুনল। কিছু সময় পর বড়দি ক্লান্ত হয়ে পড়লে সোনালি জিজ্ঞেস করে, “আর কিছু বলবি?’ এই কথাতে বড়দি আরও রেগে ওঠে। ফোনটা রেখে দেওয়ার আগে বলে উঠল, “তোর জামাইবাবুকে আমি পাঠাচ্ছি, তোর এই ধ্যাষ্টামো বার করছি।”

ফোনটা রেখে ঠোঁটদুটো চেপে কিছু সময় সোনালি বসে থাকল, ধ্যাষ্টামোই বটে। পঁয়তাল্লিশ বছরের একটা মেয়ে এতদিন ধ্যাষ্টামো করল না, আজ করবে?

গত বছর শীতের সময় একদিন ভোর চারটের সময় মাকে ভর্তি করতে হল, টানে খুব কষ্ট হচ্ছিল। এই পাড়ার বাবলুদার গাড়িটা পাওয়া গেল না। পাশের পাড়ায় টুকাইদার গাড়িটা বলবার জন্যেও মাকে একা রেখে যেতে হয়েছিল। আগের রাত থেকে মায়ের শরীর খারাপ ছিল। বড়দিকে ফোন করে জামাইদাকে একদিনের জন্যে আসতে বললেও জামাইদা আসেনি। কী একটা অর্ডারের কথা বলে এড়িয়ে গেছিল। অথচ ‘নিজের গ্রামে ভালো স্কুল নেই,’ এই কথা বলে সেই কেজি থেকে ক্লাস টুয়েলভ পর্যন্ত এতগুলো বছর বড়দি ও বুবাই এই ঘরেই থেকেছে। মাকে এক পয়সা খাওয়ার খরচ দেয়নি। পুরোটা হয়েছে বাবার ডেথ কেস-এ পাওয়া মায়ের চাকরি ও পরে পেনশনের টাকায়।

কথাগুলো মনে পড়লেও সোনালি কোনও উত্তর না দিয়ে একটা লম্বা শ্বাস ফেলে। অফিসের জামা কাপড়গুলো চেঞ্জ করতে যাবে এমন সময় ওর নিজের ফোনটা বেজে ওঠে। একটু পরে হলে হয়তো রিসিভ করা যেত না। ফোনটা তুলতেই দেখে, ‘মেজদি কলিং।’ এটাই মনের মধ্যে ঘুরঘুর করছিল। মেজদির কানে কি খবরটা যায়নি? ফোনটা রিসিভ করে হ্যালো বলবার আগেই ওদিক থেকে আরেকটা ঝাঁঝালো প্রশ্ন, “তোর নামে এসব কী শুনছি বল তো? এই বয়সে এইসব শুনতে ভালো লাগে। বুবাই, টুবলু দু’জনেই এখন অ্যাডাল্ট। ওদের নামে কোনওদিন কিছু শুনলাম না, আর তোর নামে এইসব শুনতে হচ্ছে।’

—তুই কি আর কিছু বলবি, না হলে আমি রাখছি। আজ কাজের খুব চাপ ছিল। ফ্রেশ হয়ে এবার একটু শুতে হবে।

সোনালির কথাগুলো শুনে ও-প্রান্ত থেকে ফোন কেটে দেওয়াটা বোঝা গেল। একটু বাঁচল সোনালি। যাক, মেজদি আর জামাইবাবুর কথা বলেনি। শুকনো জামাকাপড় নিয়ে বাথরুমে ঢোকার সময় পাশের দেয়ালে মায়ের ঝোলানো ছবিটার দিকে চোখ গেল। একটু থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। বেশি সময় দাঁড়াতে পারল না, ছবিটা দেখে রাগও হল। কেমন হাসছে, যেন বলছে, ‘ঠিক হয়েছে, ঠিক হয়েছে, তখন বারবার বলার পরেও বিয়েতে রাজি হলি না, এখন নিজেই বোঝ। তিন বছর বয়সে তোর বাবা মারা যাবার পর তোকে এই বড়ো করলাম, কিন্তু তুই কোনও কথা শুনলি না।”

মা কি বোঝেনি, বিয়ে করলে এই বাড়িতে তাকে দেখবার কেউ থাকত না?

সোনালি বাথরুমে ঢুকে শাওয়ারের নীচে দাঁড়িয়ে থাকল। হাসপাতাল থেকে এই সন্ধেবেলাতে ফিরেও সবদিন স্নান করে না। আজ স্নান করতে ইচ্ছে হল, অন্তত কিছু সময়ের জন্যে নেমে আসা জলের ধারার নীচে দাঁড়িয়ে থাকলে একটু শান্তি আসে, কান্নার ফোঁটাগুলো জলের ধারাতে ধুয়ে নেমে গেলে নিজেকে কিছু বলার থাকে না।

ঘাড়ের কাছে জল লেগে কেমন যেন জ্বলছে। পিঁপড়ে কামড়াল, নাকি অন্য কিছু? ডান হাতটা ঘাড়ে রাখতেই একটা ছড়ে যাওয়ার দাগ বুঝতে পারল। তাহলে কি অপূর্বের আংটিতে ছড়ে গেল? লাঞ্চের সময় ছেলেটা এসেছিল। সোনালি তখন টেবিলে মাথা রেখে বসেছিল। অপূর্ব এসে এভাবে বসে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করে, “কি গো, এখনই ক্লান্ত হয়ে গেলে, আজ তোমায় অনেকগুলো বিল রেডি করতে হবে।”

—সেই তো রে, কিন্তু ঘাড়ে খুব লাগছে।

—হঠাৎ, আমি তো রাতে তোমার কাছে যাইনি?

চমকে উঠল সোনালি। ‘তুই এসে কী করতিস?’

—না ওই অনেক সময় টানাটানিতে ব্যথা…

—খারাপ হয়ে যাচ্ছে কিন্তু…

শেষের কথাগুলো বলে ঘাড়টা তার দিকে ঘোরাতেই ব্যথাটা আরও বেড়ে যেতে সোনালি টেবিলে মাথাটা রেখে আবার বসে যায়।

—খুব ব্যথা করলে বসকে বলে বাড়ি চলে যেতে পারো।

কথাগুলো কানে গেলেও কোনও উত্তর দিল না। কী বলবে, এই সময় বাড়ি যাওয়া আর এখানে থাকা দুটোই সমান। তাও এখানে প্রয়োজনে ফিজিও-র কাছে গিয়ে একটু দেখিয়ে নেওয়া যাবে। বাড়ি গেলে শুধু শূন্যতাকে আঁকড়ে ধরে থাকা। তাও মা যতদিন বেঁচেছিল কিছু না পারলেও জিজ্ঞেস করত।

কিছু সময়ের মধ্যেই ঘাড়ে একটা হাতের স্পর্শ পেতেই পায়ের নীচ থেকে সারাটা শরীরে একটা অদ্ভুত শিহরণ লাগল। জোরে শ্বাস পড়তে আরম্ভ করল। সোনালির বন্ধ চোখ দুটো আরও বন্ধ হয়ে আসছিল। সেদিন ভাগ্যিস পার্টনার রুমা শরীর খারাপের জন্যে আসেনি। সকালে উঠে সোনালিকেই পেটে ব্যথার কথা জানায়। সোনালি তাও কিছু সময়েই নিজেকে সামলে বলে উঠল, ‘এই অপূর্ব, কী হচ্ছে, এটা অফিস…. ‘

—চলো ক্যান্টিন থেকে চা খেয়ে আসি। বস ডাকলে বলবে, মাথায় খুব ব্যথা করছিল। রুমের মেশিনে কফি, তাই চা আনতে গেছিলাম।

কথাগুলো শুনে ভালো লাগলেও যাওয়া হয়নি। অ্যাকাউন্টসের রুম থেকে হঠাৎ ডাক আসতেই চলে যেতে হল। চা পড়ে থাকলেও ঘাড়ের কাছে ছড়ে যাওয়াটা রয়ে গেল। সেটাও অবশ্য এই বুঝতে পারে।

ছেলেটা একটু অদ্ভুতরকমের। বয়সে সোনালির থেকে তেরো বছরের ছোটো। বড়দির ছেলে বুবাই এখন ছাব্বিশ, মেজদিরটা বাইশ। অপূর্বর একটাই বদ অভ্যাস। কথা বলবার সময় খারাপ শব্দ ব্যবহার করে। জিজ্ঞেস করলে উত্তর দেয়, “আমার ব্যাড হ্যাবিটটাই খুব খারাপ।’

প্রতিদিন নীল রঙের জামা পরে অফিসে আসে। সোনালি একদিন কারণ জিজ্ঞেস করেছিল। উত্তর না দিয়ে হেসে উঠেছিল। জন্মদিনে ডিপার্টমেন্ট থেকে নীলের বদলে একটা কালো শার্ট দিলে উত্তর দেয়, ‘এই রে আমার পরিচয়টা তো বদলে দিলে গো।’

আচ্ছা বর্ধমানের সেই ছেলেটা তো বয়সে বড়োই ছিল। ওরা নিজে থেকে সোনালির মাকে বলেছিল। সেটা তো এগারো-বারো বছর আগের কথা। তখন বড়দি কিছু না বললেও মেজদি বলে, ‘বর্ধমান চলে গেলে মাকে কে দেখবে শুনি, আমি অত কাজ ফেলে আসতে পারব না। এখন দিদি আছে, যেদিন বুবাইয়ের পড়া হয়ে যাবে?’

বড়দি কিছু না বললেও রাতে দুবোনের আলোচনা সোনালিরও কানে এসেছিল। ‘ফুচিকে বলব, মাঝে মাঝে এখানে এসে থাকতে। ছেলেটা তো চাকরি করে, একটু মানিয়ে নেবে। আমিও মাকে নিয়ে যাব।’

সকালে উঠে মায়ের সামনে বাড়িটা বিক্রির কথা উঠলে সোনালি মায়ের চোখে জলের দাগ লক্ষ করে। সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে, ‘শোন, তোদের অত চিন্তা করতে হবে না, আমি বিয়ে করছি না। মাকে নিয়েই এই বাড়িতে থাকব। তোরা সময় সুযোগ পেলে এখানে আসবি, থাকবি।”

শীতের সন্ধ্যায় দুদিনের শাস্ত্রীয় সেতার সম্মেলন এবার কলকাতায়

আগামী ২৩ এবং ২৪ ডিসেম্বর শহর কলকাতার বালিগঞ্জের ‘দাগা নিকুঞ্জে’ বসতে চলেছে দুদিনের শাস্ত্রীয় সেতারবাদনের অনুষ্ঠান “দ্যা ক্যালকাটা সিতার কনসার্ট”। ‘যাত্রাপথ কালচারাল সোসাইটি’-র উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হবে এই শাস্ত্রীয় সম্মেলন। তত্ত্বাবধানে— বিশিষ্ট সেতারবাদক তথা যাত্রাপথের কর্ণধার অভিরূপ ঘোষ।

দুদিনের এই সংগীত সম্মেলনে অংশগ্রহণ করবেন বিশ্ববিখ্যাত সেতারবাদক এবং তাবলাবাদকেরা। বিষ্ণুপুর ঘরানার প্রসিদ্ধ সেতারবাদিকা বিদুষী মিতা নাগ থেকে শুরু করে সেনিয়া মাইহার ঘরানার সেতারবাদক পন্ডিত পার্থ বসু , পন্ডিত নীলাদ্রি সেন এবং আরও অনেক গুণীদের সুরের মূর্ছনায় ভরে উঠবে তিলোত্তমা কলকাতা। শোনা যাবে নতুন প্রজন্মের দু’জন গুণী শিল্পী অভিষেক মল্লিক ও অভিরূপ ঘোষ-এর সেতারবাদন শোনা যাবে এই সম্মেলনে। কিংবদন্তি তবলাবাদক পন্ডিত কুমার বোস এবং বিশ্বখ্যাত পন্ডিত বিক্রম ঘোষের তবলাবাদন শোনা যাবে এই দুদিনের আসরে। এছাড়াও থাকবেন পন্ডিত সমর সাহা, রোহেন বোস সহ অনেকে।

“যাত্রাপথ কালচারাল সোসাইটির এই অভিনব উদ্যোগ ইতিমধ্যেই শহর কলকাতা-র বহু সংগীত রসিক এবং সংস্কৃতি মনস্ক মানুষজনের প্রশংসা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। বহুমানুষ এই সংগীত সম্মেলন সম্পর্কে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন” বলে দাবি করেন তবলাবাদক রোহেন বোস।  দুদিনের এই শাস্ত্রীয় সংগীত সম্মেলনে বিশ্ববন্দিত সেতারবাদক, তবলাবাদকদের পাশাপাশি উপস্থিত থাকবেন সংস্কৃতি জগতের বহু উজ্জ্বল নক্ষত্র।

সংস্থার তরফ থেকে সেতারবাদক অভিরূপ ঘোষ জানান, “প্রতিবছরই কিছু অভিনব ভাবনার মাধ্যমে যাত্রাপথের শাস্ত্রীয় সংগীত সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। বর্তমানে নতুন প্রজন্মের মধ্যে বিশেষকরে স্কুলপড়ুয়াদের মধ্যে শাস্ত্রীয় বাদ্যযন্ত্র শেখার উৎসাহ দেখা দিচ্ছে, তাই আসন্ন সংগীত  সম্মেলনের আগে কলকাতার বেশ কিছু স্কুলে সংগঠনের তরফ থেকে শাস্ত্রীয় সংগীতের পারম্পরিক সুপ্রাচীন ঐতিহ্য সম্পর্কে আগামী প্রজন্মকে উৎসাহিত করতে কিছু কর্মশালার আয়োজন করা হচ্ছে, দুদিনের এই সংগীত সম্মেলনে তাই শুধু সেতারবাদন নয়, উঠে আসবে ভারতীয় সেতারবাদনের সঙ্গে জড়িত ইতিহাসের নানান বর্ণনা” ।

‘যাত্রাপথ’-এর পক্ষ থেকে এবছর রৌপ্য জীবনকৃতি সম্মান প্রদান করা হবে কিংবদন্তি তবলাবাদক পন্ডিত কুমার বোস , বিশিষ্ট সন্তুরবাদক পন্ডিত তরুণ ভট্টাচার্য এবং বিশিষ্ট সংগীত  শিল্পী ঊষা উত্থুপ’কে।

‘যাত্রাপথ’-এর এই দুদিনের সংগীত সম্মেলন উৎসর্গ করা হয়েছে সংগীত গুরু সেতারবাদক আচার্য পন্ডিত শ্যামল চট্টোপাধ্যায় এবং তাঁর সঙ্গে ভারতবর্ষের বিশিষ্ট সেতারবাদকদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে।

সেতারবাদিকা বিদুষী মিতা নাগ জানিয়েছেন, “কলকাতা-র সঙ্গে শাস্ত্রীয় সংগীতের ইতিহাস বহুদিনের, বহু কিংবদন্তি সংগীত শিল্পী তথা প্রবাদপ্রতীম সেতারবাদক এই শহরে অনুষ্ঠান করেছেন, যাত্রাপথের এই উদ্যোগ তাই শীতের সন্ধ্যায় কলকাতার সেই পুরোনোদিনের গান বাজনার ঐতিহ্যকে নতুন ভাবে, নতুন রূপে ফিরিয়ে আনবে।”

এই অনুষ্ঠানটির সহযোগতিতায় আছে তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রক, ভারত সরকার, ভারতীয় বিদ্যা ভবন সহ আরও অনেকে।

সমাজ আজও বিভক্ত

হিন্দুত্বের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে এক রাজনীতিবিদ বলেছেন যে, আমরা বিভক্ত হয়েছি, সে কারণেই আমরা বারবার পরাজিত হয়েছি এবং বিদেশীরা বারবার আমাদের শাসন করেছে। হিন্দু ধর্মে সবকিছু ঠিক আছে কিন্তু যেহেতু অনুগামীরা বিভক্ত, তাই হয়তো রাম জন্মভূমি ৫০০ বছর ধরে বিধর্মীদের হাতে ছিল।

এই ভাগাভাগি সমাজের দ্বারা, রাজার দ্বারা, প্রজাদের দ্বারা বা ধর্মের দ্বারা করা হয়। আমরা যদি রামায়ণ ও মহাভারতের স্মৃতি এবং পৌরাণিক কাহিনি পড়ি, তাহলে ভাগাভাগির বিষয়টিকে যেভাবে মহিমান্বিত করা হয়েছে, তার জন্য প্রজা বা রাজা কেউই দায়ী নয়, ধর্মগ্রন্থের লেখকরাই দায়ী।

তাহলে কে সমাজকে সুর-অসুরে বিভক্ত করেছে? প্রত্যেক দেব-দেবীর হাতে অসুর নিধনের জন্য অস্ত্র থাকলেও, ধনুর্ধারী মানুষের তীর তার নিজের লোকদের হত্যা করেছে যুগ যুগ ধরে। শাস্ত্রে এই শত্রুতা কিংবা লড়াইয়ের বিষয়গুলি গর্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। আজও এসব গ্রন্থ শ্রবণ ও পাঠ করাকে ধর্মের কাজ বলে মনে করা হয়। তাহলে ভাগাভাগি নিয়ে চোখের জল কেন?

রামায়ণ ও মহাভারত, যার উপর ভিত্তি করে আমাদের বর্তমান রাজনীতি গড়ে উঠেছে, তা ঘর-বাড়ি ভাগেরই তো গল্প বলে। উভয় গল্পেই ক্ষমতা লাভের জন্য একজন অন্যজনকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করেছে কিংবা তৃতীয়জন উচ্ছেদে মদত জুগিয়েছে।

আমাদের যৌথ পারিবারিক ঐতিহ্য সুফল দেয়নি। যৌথ পরিবারে সবাই অংশীদার এবং যে বাড়িতে একসঙ্গে রান্নাঘর থাকে, সেখানে অর্ধেক সময় ঝগড়া হয়। আর এরপর যা ঘটে তা হল— বিভাজনের বিষয়টি ঘরের বাইরে দলাদলিতে পরিণত হয় এবং সম্পর্কগুলো নষ্ট হতে শুরু করে।

সমাজকে বিভক্ত করে পুনর্জন্মের ধারণা। এক জন্মের পাপের কারণে অন্য জীবনে নাকি নিম্নবর্ণে জন্ম নিতে হবে— এমন ভাবনা গ্রামের মানুষকে আরও কুসংস্কারের দিকে ঠেলে দেয়। জাত-পাতের বিভাজন অস্পৃশ্যতাকেও ছড়িয়ে দিয়েছে। জাত-পাতের বিষয়টি তাই শুধু ঈশ্বরের মধ্যেই আটকে নেই, খাদ্যাভ্যাসের মধ্যেও ঢুকে পড়েছে।

প্রত্যেক জাতি আলাদা, তার আলাদা দেবতা আছে, সাধারণ মানুষ উচ্চবিত্তদের থেকে আলাদা— ধর্ম তো তাই শিক্ষা দেয়। আর তাই হিন্দু সমাজ হিন্দু ধর্মের দেখানো পথে চলতে বাধ্য। অতএব, হয় বিশ্বাস করুন ধর্ম অকেজো, সমাজে এর কোনও প্রভাব নেই। ধর্ম আসলে পাণ্ডাদের উপার্জনের মাধ্যম, আসলে নারীদের দাসী বানিয়ে রাখার ষড়যন্ত্র মাত্র।

প্রত্যেক ধর্মই সমাজকে কমবেশি বিভক্ত করেছে তার পরিধির মধ্যে। কিন্তু বিজ্ঞান বিশ্বকে একত্রিত করছে, যা ইন্টারনেটের মাধ্যমে এবং আগে বই, রেডিও তরঙ্গ, টেলিভিশন, ট্রেন, জাহাজের মাধ্যমে বিশ্বকে সংযুক্ত করেছে। তাই যদি পুজো করতে চান, তাহলে বিজ্ঞানের পুজো করুন।

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব