ইতিহাসের কাছে মুর্শিদাবাদে (পর্ব ২)

দীর্ঘদিনের দাক্ষিণাত্য যুদ্ধে ঔরংজেব যখন চরম আর্থিক অনটনের মধ্যে, বিশাল মুঘল সাম্রাজ্যের প্রায় সব অঞ্চল থেকে যখন দিল্লিতে অনুপস্থিত সম্রাটকে রাজস্ব পাঠানো বন্ধ— তখন শুধু করতলব খাঁ-ই বাংলার রাজস্ব বিভাগ সংস্কার করে দিল্লির অসহায় সম্রাটকে নিয়মিত রাজস্ব পাঠিয়েছেন। সেই সময় বাংলার রাজধানী ছিল জাহাঙ্গীরনগর (বর্তমানে ঢাকা) এবং সুবাদার ছিলেন ঔরংজেবের পৌত্র আজিম-উস-শান। করতলব খাঁর বাংলায় দেওয়ান হিসেবে আগমন সুবাদার ভালো মনে গ্রহণ করেননি। কারণ এতদিন তিনি একাই বাংলার ঐশ্বর্য ভোগ করছিলেন। করতলব খাঁ রাজস্ব বিভাগের সংস্কার করে অপচয় বন্ধ করেন এবং প্রথম বছরেই সম্রাট ঔরংজেবকে এক কোটি টাকা রাজস্ব পাঠান।

অসন্তুষ্ট সুবাদার আজিম-উস-শান এবার ভাড়াটে সৈন্যদলের নেতা আব্দুল ওয়াহিদ-এর সঙ্গে মিলে করতলব খাঁকে রাস্তার মাঝেই হত্যার ষড়যন্ত্র করেন এবং ব্যর্থ হন। করতলব খাঁ জানতেন চক্রান্তের মূল নায়ক সুবাদার স্বয়ং। তিনি সুবাদারকে অবিচলিত ভাবে জানালেন যে, তাঁকে হত্যার চক্রান্তের কথা সম্রাটকে জানানো হবে। শাস্তির ভয়ে সুবাদার ভীত হলেন এবং আব্দুল ওয়াহিদকে ভীষণ তিরস্কার করে অবস্থার সামাল দিলেন। করতলব খাঁ আব্দুল ওয়াহিদকে সঙ্গে নিয়ে নিজ দফতরে এসে, হিসেবপত্র দেখে মিটিয়ে দিলেন ভাড়াটে সৈন্যদের প্রাপ্য এবং বরখাস্ত করলেন সব ভাড়াটে সৈন্যকে। নিজেই সমস্ত ঘটনার বিবরণ লিখে সম্রাটকে জানালেন। সম্রাট সুবাদারকে কড়া ভাষায় জানালেন, বিশ্বাসী করতলব খাঁর কোনওরকম ক্ষতি হলে তিনিও রেহাই পাবেন না।

সম্রাটের আশ্বাস সত্বেও করতলব খাঁ সুবাদারকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। তিনি জাহাঙ্গীরনগর থেকে তাঁর কার্যালয় বাংলার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত মুখসুদাবাদ (বর্তমানে মুর্শিদাবাদ)-এ স্থাপন করার সিদ্ধান্ত নিলেন, কারণ করতলব খাঁ নিজেই ছিলেন মুখসুদাবাদের ফৌজদার। তাছাড়া এই স্থান থেকে গঙ্গার তীরবর্তী কাশিমবাজার, চন্দননগর ও কলকাতায় অবস্থিত ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর উপর নজরদারি করাও সুবিধেজনক হবে। এরপর করতলব খাঁ রাজস্ব বিভাগের সংস্কার করায়, বৃদ্ধি হতে থাকল রাজস্ব। দূরদর্শী দেওয়ান মনস্থির করলেন, নিজে রাজস্ব নিয়ে সম্রাটের সঙ্গে দাক্ষিণাত্যে সাক্ষাৎ করবেন। মুখসুদাবাদ থেকে বহুরকম দুর্লভ উপহার সামগ্রী, নগদ টাকা, কয়েকশো অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনী নিয়ে দাক্ষিণাত্যে পৌঁছোলেন।

সম্রাট ও তাঁর মন্ত্রীদের দিলেন অমূল্য সব উপহার। সম্রাট খুশি হয়ে করতলব খাঁ-কে বহু উপহার সহ ‘মুর্শিদকুলি খাঁ’ উপাধিতে ভূষিত করলেন এবং মুখসুদাবাদকে ‘মুর্শিদাবাদ’ নাম করার অনুমতি দিলেন। করতলব খাঁ দাক্ষিণাত্য থেকে ফিরে মুখসুদাবাদের নতুন নাম দিলেন মুর্শিদাবাদ এবং চালু করলেন নতুন এক টাঁকশাল। শুরু হালে মুর্শিদাবাদের অগ্রগতি।

ক্রমে ব্যবসায়ীরা নির্মাণ করলেন ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান, আমলা ব্যাংকার-রা তাঁদের কার্যালয় স্থাপন করলেন। ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে আসা রাজকর্মচারী ও বিশিষ্ট মানুষেরা নিজেদের বাসস্থান নির্মাণ শুরু করলেন। মুর্শিদাবাদ এক অনন্য নগরীর রূপ পেতে শুরু করল। ঔরংজেবের মৃত্যুর পর দিল্লির মসনদে বসেন একে একে আজম শাহ, বাহাদুর শাহ (প্রথম), জাহানদার শাহ এবং ফারুক শিয়র, যিনি ১৭১৬ সালে মুর্শিদকুলি খাঁকে বাংলার সুবাদার ঘোষণা করেন। ফলস্বরূপ ঢাকার পরিবর্তে বাংলার রাজধানী হল মুর্শিদাবাদ এবং সেখানে ব্যাবসা-বাণিজ্যের প্রভূত বিকাশ ঘটল। তখন বাংলার রাজস্বই দিল্লির আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস ছিল বলে মুর্শিদকুলি খাঁ হয়ে উঠলেন বাংলার সর্বেসর্বা। তাই বলা হয়, বাংলায় স্বাধীন নবাবির প্রতিষ্ঠাতা মুর্শিদকুলি খাঁ।

ইতিহাসের কাছে মুর্শিদাবাদে (পর্ব ১)

এবার বেড়াতে চলেছি মুর্শিদাবাদ, যা ছিল ব্রিটিশ শাসনের পূর্বে স্বাধীন বাংলার শেষ রাজধানী। ভাগীরথীর তীরে অবস্থিত এই শহরের নামকরণ হয় বাংলা, বিহার ও ওড়িশার দেওয়ান তথা সুবাদার, নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ-এর নাম থেকেই। ১৭১৭ সালে মুর্শিদাবাদকে করা হয় বাংলার রাজধানী। ঐতিহাসিক পলাশীর যুদ্ধ হয় ১৭৫৭ সালে এবং ব্রিটিশরা কলকাতায় রাজধানী স্থানান্তর করে ১৭৭৩ সালে।

কলকাতা স্টেশন থেকে সকাল ৬টা ৫০ মিনিটের হাজারদুয়ারি এক্সপ্রেস, গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ঠিক সময়েই যাত্রা শুরু করে দিল। একে একে ব্যারাকপুর, রানাঘাট ছাড়িয়ে ট্রেন কৃষ্ণনগর সিটি জংশনে পৌঁছোল। সকাল সাড়ে ১০টার আগেই এসে পৌঁছোলাম বহরমপুর কোর্ট স্টেশনে। প্লাটফর্মের বাইরে এসে আমরা একটা টোটোয় চড়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম পঞ্চাননতলায় অবস্থিত আমাদের নির্দিষ্ট হোটেলে।

দুপুরে লাঞ্চ করে, একটি অটো নিয়ে দ্রষ্টব্য স্থান দেখতে বেরিয়ে পড়লাম। স্থানীয় যুবক ড্রাইভার আকবর জানাল, আমাদের প্রথম গন্তব্য তাপেখানা, জলঙ্গী রোড ধরে চলেছি। মুর্শিদাবাদ শহরের এক মাইল উত্তর-পূর্বে অবস্থিত কাটরা মসজিদ এবং সেখান থেকে মাত্র আধ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে নবাবের তাপেখানা বা আর্টিলারি পার্ক। এখানেই রয়েছে বিখ্যাত ‘জাহানকোষা’ কামান, যার অর্থ পৃথিবী ধ্বংসকারী। ১৮ ফুট দীর্ঘ সাত টন ওজনের ওই বিশাল কামানের নির্মাতা ছিলেন তৎকালীন ঢাকা শহরের দক্ষ কারিগর জনার্দন কর্মকার। কামানের ওপর খোদিত লিপি থেকে জানা যায়, সম্রাট শাজাহানের রাজত্বকালে সুবাদার ইসলাম খাঁর আদেশে ১৬৩৭ খ্রিস্টাব্দে ওই কামান তৈরি হয়।

পরের গন্তব্য নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ-র সমাধিস্থল ‘কাটরা মসজিদ’। ৫৪ মিটার উঁচু বর্গাকার স্তম্ভমূলের উপর দণ্ডায়মান ইটের তৈরি ওই মসজিদ দ্বিতলবিশিষ্ট গম্বুজাকৃতি কক্ষ দ্বারা পরিবেষ্টিত। সামনে প্রশস্ত অঙ্গন। বর্গাকৃতি মসজিদ প্রাঙ্গণের চার কোণে নির্মিত হয়েছিল চারটি বিশাল, আটকোনা মিনার— যাদের মধ্যে কেবল দুইটি (উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমে) মিনার আজও অক্ষত। পূর্ব দিক থেকে আগত ১৪টি সিঁড়ির নীচে শায়িত মুর্শিদকুলি খাঁ-এর পার্থিব শরীর সমাধিস্থ করা হয় ১৭২৭ সালে। কাটরা মসজিদ প্রাঙ্গণে ৭০০ জন একসঙ্গে কোরান পড়তে পারে। মসজিদের ভিতরে একই সময়ে ২০০০ জন নমাজ পড়তে পারে। কাটরা মসজিদ সত্যিই দেখার মতো এক সৌধ।

একটা কথা প্রায়ই মনে হচ্ছে, মুর্শিদাবাদ এসে সেই নগরের স্রষ্টা ও রূপকার নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ-এর সম্বন্ধে কিছু তথ্য পাঠকদের না জানালে এই লেখা সঠিক রূপ পাবে না। তাঁর জন্ম তৎকালীন দক্ষিণ ভারতের বেরার প্রভিন্স-এর এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে। দারিদ্র্যের তাড়নায় তাঁকে হাজি সফি নামে এক পারসিক ব্যবসায়ীর কাছে ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি করা হয়। হাজি সফি তাঁকে ইরানের ইস্পাহান শহরে নিয়ে যান এবং ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করেন। ব্রাহ্মণ বালকের নতুন নাম হয় মহঃ হাদি। হাজি সফি ক্রীত বালককে নিজ সন্তানের মতো সুশিক্ষিত করে তোলেন। হাজি সফির মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরাধিকারীরা মহঃ হাদিকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দিয়ে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেন।

দাক্ষিণাত্যে এসে তিনি বেরারের দেওয়ান হাজি আবদুল্লার কাছে কাজ নেন। সেখানে হিসেবরক্ষার কাজে নিজের দক্ষতা প্রমাণ করে তিনি বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। সম্রাট ঔরংজেবের কানে আসে মহঃ হাদির কথা। সম্রাট তখন মহঃ হাদিকে হায়দরাবাদের দেওয়ান নিযুক্ত করেন। দাক্ষিণাত্যের যুদ্ধে কপর্দকহীন ঔরংজেব হাদিকে বাংলার দেওয়ান করে পাঠান এবং তাঁকে করতলব খাঁ উপাধি দেন।

এডিনবরার পথে (শেষ পর্ব )

সময়টা তখন ১৭৮৬, এক গ্রীষ্মে জর্জ স্মিথ নামে একজন দুষ্কৃতী লন্ডন থেকে এডিনবরা শহরে এসে ক্যাননগেট অঞ্চলে মুদির দোকান খুলে বসলেন। খুব শীঘ্রই নজরে পড়লেন ডিকন ব্রডি’র। এই স্মিথ ও ব্রডি’র শিকার হলেন, বড়ো বড়ো সব ব্যবসায়ী ও সাধারণ গৃহস্থরা। ওই ১৭৮৬ সালে প্রথমে তারা রাতের অন্ধকারে লুঠ করলেন শহরের এক স্বর্ণকার ও এক তামাক ব্যবসায়ীর দোকান। দিনটা ছিল ক্রিসমাসের রাত। এর পরে ব্রডি ও স্মিথ জড়িয়ে পড়লেন আরও দুই দুষ্কৃতীর সঙ্গে, যারা হলেন সাত বছরের জেল খেটে বেরোনো আসামি জন ব্রাউন এবং এক জুতো প্রস্তুতকারক অ্যান্ড্রু এইন্সলি। এই চারজন মিলে ১৭৮৭ সালে একটা চায়ের গুদাম থেকে মহামূল্যবান চা চুরি করেন। এর কয়েকদিনের মধ্যেই ১৭৮৮ সালে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হানা দিলেন এডিনবরা শহরের রয়াল মাইল সড়কের উপরে অবস্থিত চেসেল কোর্টের সরকারি আবগারি দফতরের অফিসে। কিন্তু ব্যর্থ হয়ে মাত্র ১৬ পাউন্ড চুরি করে সেখান থেকে পালিয়ে যেতে হয় তাদের।

দাগি আসামি জন ব্রাউনকে ১৫০ পাউন্ডের প্রলোভন দেখিয়ে, তার থেকে ওই ডাকাতির পান্ডাদের নাম-ধাম জানতে চাওয়া হলে, শেরিফের দফতরের কেরানির কাছে গিয়ে সে এইন্সলি এবং স্মিথের নাম ফাঁস করে দেয়। তাঁর সব খেলা শেষ বুঝে ডিকন ব্রডি এডিনবরা ছেড়ে পালিয়ে প্রথমে লন্ডনে চলে যান। সেখান থেকে জাহাজে চেপে হল্যান্ডের রাজধানী আমস্টার্ডামে। কিন্তু ব্রডিকে গ্রেফতারের জন্য পুরস্কার ঘোষণার সাথে সাথেই তাকে আমস্টারডামের এক সরাইখানার কাঠের আলমারির ভিতর থেকে গ্রেপ্তার করে এডিনবরা শহরে নিয়ে আসা হয়। এর পরে স্মিথের সাথে তারও বিচার হয়। আভিজাত্যের মুখোশ খসে পড়ে ব্রডির। মাত্র ২১ ঘণ্টার বিচারের পরে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে, ফাঁসির আদেশ প্রদান করে আদালত।

১৭৮৮ সালের পয়লা অক্টোবর ‘ক্যাননগেট’ অঞ্চলে প্রকাশ্যে রাজপথের উপরে চল্লিশ হাজার জনতার উপস্থিতিতে ডিকন ব্রডি’র ফাঁসির আয়োজন করা হয়। সেখানেও ফাঁসুড়েকে হাত করে গলায় রুপার নল লাগিয়ে, তার উপরে ইস্পাতের কলার চাপিয়ে ডিকন ব্রডি ফাঁসির কাঠগড়ায় এসে হাজির হন। উদ্দেশ্য ছিল ফাঁসির পরেই ফাঁসুড়ে দ্রুত তাঁর দেহ সরিয়ে ফেলতে পারলেই, সেই যাত্রায় পরিত্রাণ পেয়ে পালাতে সক্ষম হবেন তিনি। কিন্তু তার পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার পরে, ডিকন ব্রডি’র মৃতদেহ চ্যাপেল স্ট্রিটের এক অখ্যাত চার্চের সামনে কবর দেওয়া হয়। সেই স্থানটি বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের পিছনে একটি গাড়ি রাখার (Car Parking) স্থান হিসাবে ব্যবহৃত হয়।

এডিনবরা শহরের বুকে এখনও জনশ্রুতি হিসাবে মুখে মুখে ঘোরে যে, ফাঁসি কাঠ (Gallow) স্কটল্যান্ডে প্রথম নির্মিত হয়েছিল। প্রখ্যাত হস্তশিল্পী ও স্থপতি ডিকন ব্রডি’র হাতে। শেষপর্যন্ত সেই ফাঁসিকাঠেই ঝোলানো হয়েছিল তাকেই!

আর ব্রডি’স ক্লোস্-এর সামনে থেকে রোজ রাতে কালো রঙের যে বাসে করে Ghost Bus Tour-এর আয়োজন করা হয়, তার সমাপ্তি হয় ওই ব্রডি’স ক্লোস্-এর প্রবেশ পথের সামনে। চারদিকে বৈপরীত্যে ভরা “ডিকন ব্রডি’র অতৃপ্ত আত্মার আর্তনাদের সঙ্গে, যা প্রতিধ্বনিত হতে হতে মিলিয়ে যায় ব্রডি’স ক্লোস-এর গভীর থেকে গভীরতর অভ্যন্তরে।

এডিনবরার পথে (দ্বিতীয় পর্ব)

ওই ব্রডি’স ক্লোসের খানিকটা ভিতরেই রয়েছে ডিকন ব্রডির পৈতৃক আবাসগৃহ এবং ডিকন ব্রডি’র কর্মশালা। সেই আবাসগৃহে এখনও বসবাস করে ব্রডি পরিবারের উত্তরসূরীরা। ওই ব্রডি’স ক্লোসের পাশেই দাঁড়িয়ে রয়েছে ‘ডিকন’স হাউস কাফে’। ওই বাড়ির পাশেই, লন-মার্কেট ও ব্যাংক স্ট্রিটের সংযোগস্থলে অবস্থান করছে ‘ব্যাংক অব স্কটল্যান্ড’-এর আন্তর্জাতিক সদর দফতর। ব্যাংক অব স্কটল্যান্ডের বিপরীত দিকে ব্যাংক স্ট্রিটের যে-পথ সোজা ‘লয়েডস ব্যাংক”-এর প্রধান শাখার অভিমুখে ঢুকে যাচ্ছে, তার কোনায় চোখে পড়ল ‘ডিকন ব্রডি’স ট্যাভার্ন’ (Deacon Brodie’s Tavern)। রাস্তা পার হয়ে পায়ে পায়ে সিঁড়ি দিয়ে বাড়িটার দোতলায় উঠতেই, বুকের ভিতরটা ভারী হয়ে উঠল। নিজের বৈঠকখানার টেবিলের সামনে বসে আছেন হ্যাট পরিহিত ‘ডিকন ব্রডি’।

সে নিখুঁত এক সৃষ্টি। উপরতলার দেয়ালে সযত্নে সংরক্ষিত রয়েছে দু’-খানি কাচের বাক্স। এর মধ্যে যে-সব যন্ত্রপাতি ও চাবিসমূহের সাহায্যে ব্রডি তার পেশাগত কর্ম সম্পাদন করতেন, তার সবটুকু সংরক্ষিত আছে। নীচে নেমে এসে রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে, একমনে চেয়ে রইলাম, ‘ডিকন ব্রডি’স ট্যাভার্ন’ নামক বাড়িটার গায়ে আঁকা ‘ডিকন ব্রডির’ অবয়ব-সহ সযত্নে লিপিবদ্ধ তার ‘জীবন ও কর্মবৃত্তান্ত’-এর দিকে।

পাঠক বর্গের স্বাভাবিক ভাবেই কৌতূহলের উদ্রেক হবে— কে এই ডিকন ব্রডি! স্কটল্যান্ডের কৃতি সন্তান লেখক, রবার্ট লুই স্টিভেনসনের নাম আমরা সবাই যেমন জানি, তেমনই এটাও জানি ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে (ডিকন ব্রডির মৃত্যুর প্রায় একশো বছর পরে) রচিত তাঁর যুগান্তকারী উপন্যাস স্ট্রেঞ্জ কেস অব ডক্টর জেকিল অ্যান্ড মিস্টার হাইড (Strange case of Dr. Jekyll and Mr. Hyde)-এর নাম। যে-চরিত্রের ‘ডাইকোটমি’ (Dichotomy) বা চারিত্রিক বৈপরীত্য দ্বারা আকৃষ্ট হয়ে রবার্ট লুই স্টিভেনসন এই উপন্যাসটি রচনা করেছিলেন, তিনি হলেন ‘ডিকন ব্রডি’। আসল নাম উইলিয়াম ব্রডি।

স্কটল্যান্ডের রাজধানী এডিনবরা শহরের ‘রয়াল মাইল’ সড়কের ‘ব্রডি’স ক্লোস্’-এর ভিতরঘরে তাঁর জন্ম হয়েছিল ২৮ সেপ্টেম্বর ১৭৪১ সালে। উইলিয়াম ব্রডি’র বাবা ছিলেন শহরের একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী এবং তাঁর পিতামহ ছিলেন একজন প্রতিষ্ঠিত আইনজীবী। কিন্তু উইলিয়াম ব্রডি তাঁর পূর্বসূরিদের পেশা অনুসরণ না করে, বেছে নিয়েছিলেন এক কারিগরি শিল্পীর (Craftsman) পেশা। তিনি ঘরের আসবাব, আলমারি, ক্যাবিনেট প্রভৃতি যেমন বানাতে পারতেন, তেমনই ছিলেন একজন দক্ষ তালাচাবি প্রস্তুতকারক (Locksmith)।

এই পেশার সুবাদে উইলিয়াম ব্রডি’র আসা-যাওয়া শুরু হল শহরের মস্ত মস্ত সব ধনী সম্প্রদায়ের মানুষদের ঘরে। ধীরে ধীরে এইভাবে তিনি যেমন শহরের ধনী, প্রভাবশালী মানুষদের সঙ্গলাভ করলেন, তেমনই প্রচুর অর্থ উপার্জন করার সুবাদে এডিনবরা শহরের নির্মাতা ও স্থপতিদের সংগঠন Wrights and Masons’ Incorporation-এর ‘Deacon’ বা সভাপতিপদ প্রাপ্ত করলেন। নাম হল তাঁর ‘ডিকন ব্রডি’। এর ফলে ‘শহর পরিচালন সমিতি’ বা কাউন্সিল-এর সভ্যপদ লাভ করলেন।

কিন্তু পেশাগত কারণে দিনেরবেলায় যে-সব বাড়িতে তিনি যেতেন, সেই সব বাড়ির মূল ফটক, ধনসম্পদ রাখার ক্যাবিনেটের চাবি বানিয়ে দেওয়ার পরে, মোমের পাতের উপরে সেই চাবির ছাপ তুলে রেখে, পরে তার থেকে নকল চাবি বানিয়ে রাতের অন্ধকারে শহরের ধনীদের ঘরে ঢুকে শুরু করলেন চুরি-ডাকাতি। এইভাবে ১৭৬৮ সালে একটা ব্যাংক-এর দরজার চাবি নকল করে, রাতের অন্ধকারে ব্যাংক-এ প্রবেশ করে লুঠ করলেন আটশ’ পাউন্ড৷

এর মধ্যেই ১৭৮২ খ্রিস্টাব্দে ডিকন ব্রডি’র পিতৃবিয়োগ হয়। এবং মৃত্যুর আগে তিনি দশ হাজার পাউন্ড রেখে যান ডিকন ব্রডি’র জন্য। এই পিতৃধন এবং স্ব-উপার্জিত বিপুল সম্পত্তি তাঁকে সমাজে প্রতিষ্ঠা এনে দিলেও, তা সযত্নে রক্ষা করতে পারেননি ডিকন। ইতিমধ্যেই এডিনবরা শহরে তাঁর দুটি স্ত্রী ও পাঁচটি সন্তান বর্তমান। যদিও সেই স্ত্রী-রা কেউই পরস্পরের সাথে পরিচিত ছিল না।

ডিকন ব্রডি ছিলেন তৎকালীন এডিনবরা শহরের অভিজাত ‘দি কেপ’ (The Cape) ক্লাবের সদস্য এবং তৎসুবাদে ‘স্যার লয়েড’ ছদ্মনামেও পরিচিত ছিলেন তিনি। এই সুবাদেই শুরু হল, সমাজের নানান প্রতিথযশা ব্যক্তিদের সঙ্গে ওঠাবসা। কবি রবার্ট বার্নস, অঙ্কন শিল্পী হেনরি রেবার্ন-এর মতো প্রতিভাধর মানুষেরা ছিলেন ডিকন ব্রডি’র দিনের বেলার সাথি। কিন্তু প্রভূত সম্পত্তি তাঁকে দিনেরবেলায় যেমন আভিজাত্য এনে দিয়েছিল, তেমনই রাতের অন্ধকারে জুয়া, কক-ফাইটিং, মাদকাসক্তিতে ডুব দিতেন। দু-দুটো পরিবারের রক্ষণাবেক্ষণের পিছনে নদীর স্রোতের মতো অর্থ ব্যয় করতেন ডিকন। আর তাই ক্রমে ক্রমে নিয়মিত ভাবে উপার্জনের নতুন পথ হিসাবে আঁকড়ে ধরলেন, ধনীর ঘরে রাতের অন্ধকারে চুরির পেশা।

এডিনবরার পথে (প্রথম পর্ব)

দিন তিনেক হয়েছে লন্ডন থেকে স্কটল্যান্ডে এসেছি। মোহময়ী, লাস্যময়ী স্কটল্যান্ডের প্রকৃতি সুন্দরীকে মনপ্রাণ দিয়ে উপভোগ করার পরে, আজ মনস্থ করেছি স্কটল্যান্ডের রাজধানী শহর এডিনবরা ঘুরে দেখব।

হোটেল থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এডিনবরার প্রাণকেন্দ্র ‘রয়াল মাইল’ সড়কের উপরে এসে পড়লাম। রাস্তাটা ব্যস্ততায় আমাদের দক্ষিণ কলকাতার গড়িয়াহাট বা উত্তর কলকাতার হাতিবাগান অঞ্চলকে হার মানিয়ে দেবে। রাস্তার দু’ধারে প্রতিটি বাড়ির নীচে থিক থিক করছে বড়ো বড়ো দোকান, রেস্তোরাঁ আর পাব। পরিচ্ছন্নতা ও আভিজাত্যের দিক থেকে বিচার করলে, কলকাতার কোনও অঞ্চলের সঙ্গেই এর তুলনা চলে না। এমনকী দিল্লি’র কনট প্লেসের সঙ্গেও না।

এডিনবরা শহরের প্রাণকেন্দ্র ‘রয়াল মাইল’ সড়কের অধিকাংশ বাড়িগুলোই ত্রয়োদশ, চতুর্দশ শতকে নির্মিত। প্রায় পাঁচ-ছ’শো বছর ধরে ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছে রয়াল মাইলের উপরে। কোনও জায়গাতেই একটা বাড়ির সাথে পাশের বাড়ির মধ্যে কোনও ফাঁক পরিলক্ষিত হবে না।

কলকাতা শহরের উত্তরের বা দক্ষিণের যে-কোনও পথ ধরে চলতে থাকলে, মাঝে মাঝেই দুটো বাড়ির মাঝে সরু গলি দেখতে পাই। এইসব গলির ভিতরে প্রবেশ করলে, এঁকেবেঁকে যেমন বহু দূরের কোনও অঞ্চলে পৌঁছে যাওয়া যায়, তেমন কোনও গলি এই ‘রয়াল মাইল’ সড়কে চোখে পড়বে না কারও। এর একটা বিশেষ কারণ হচ্ছে, এখানকার বাড়িগুলো সর্বত্রই পাশের বাড়িগুলোর সাথে জোড়া অবস্থায় দণ্ডায়মান।

কিন্তু এক্ষেত্রে আশ্চর্যজনক ভাবে যা চোখে পড়ল, তা হল অধিকাংশ বাড়ির নীচে ঠিক মাঝখান দিয়ে একটা গুহাপথের মতো প্রবেশ-পথ রয়েছে। যে-পথ বাড়িগুলোর নীচ দিয়ে এগিয়ে ক্রমশ পিছন দিকে এগোতে এগোতে হয় ঊর্ধ্বমুখী বা নিম্নমুখী হয়ে গিয়ে মিশেছে দূর থেকে বহুদূরের অন্য কোনও অঞ্চলের অপর কোনও রাজপথের সঙ্গে। এই গুহাপথ-সম এডিনবরার এই গলিগুলোকে স্থানীয় গেলিক ভাষায় বলা হয় ‘ক্লোস্‌’ (Close)।

এডিনবরা ক্যাসল্-হিল থেকে ‘রয়াল মাইল’ সড়ক ধরে পূর্বমুখী পথে যত এগিয়েছি, ততই চোখে পড়েছে নানান রকমের “ক্লোস্’। মেরি কিংস ক্লোস্, অ্যাঙ্কর ক্লোস্, অ্যাডভোকেটস্ ক্লোস্, মেলরোজ ক্লোস্, ফিশার ‘সক্লো লোস্, বুকানন ক্লোস্-এর মতো বিভিন্ন ক্লোস্। এই রকম বহু ক্লোস পার করে ‘লন-মার্কেট অঞ্চল-এ এসে থামলাম, ‘ব্রডি’স ক্লোস’-এর (Brodie’s close) সামনে।

“ব্রডি’স ক্লোস্‌’ লেখা বড়ো গেটটার মাথায় লেখা ‘ডিকন’স হাউস’ (Deacon’s House ) । ক্লোস্-এর প্রধান ফটকের সামনে একরাশ কৌতূহল নিয়ে থমকে দাঁড়ালাম। মনে মনে ভাবলাম, এটাই কী তাহলে ‘ডিকন ব্রডির’ আস্তানা ছিল! মনে শঙ্কা আর কৌতূহল নিয়ে ঢুকে পড়লাম ‘ব্রডি’স ক্লোস্‌’-এর অভ্যন্তরে। দিনেরবেলাতেও ঘুটঘুটে অন্ধকার! খানিকটা পথ এগোনোর পরে আলো না জ্বালিয়ে পাশের লোকটাকেও চেনা দুরূহ। দু’ ধারের পাঁচিলে সার সার দাঁড়িয়ে মাদকাসক্তের দল। ধোঁয়ায় ধোঁয়ায় অন্ধকার এক দম বন্ধ করা জগৎ! শঙ্কাহত অবস্থায় আরও ভিতরে প্রবেশ করাটা দুঃসাহস-সম এবং অনুচিত মনে করে, বেরিয়ে এলাম ব্রডি স ক্লোসের বাইরে রয়াল মাইল সড়কের উপরে।

ব্রডি’স ক্লোস্-এর প্রবেশ ফটকের সামনে থেকেই ছাড়ছে ‘ঘোস্ট বাস ট্যুরের ( Ghost Bus Tour) কালো রঙের বাস। বাসের ভিতরে দরজার পাশে একটা সিটে বসে আলাপচারিতায় ব্যস্ত বাস ড্রাইভার এবং ভ্রমণ-সঞ্চালক। কৌতূহল নিরসনের জন্য তাদের সাথে আলাপ করে ডিকন ব্রডি (Deacon Brodie) সংক্রান্ত অনেক তথ্য অবগত হওয়া গেল।

বড়োপর্দায় ব্যোমকেশ বক্সীর ভূমিকায় এবার দেব

১৯৫২ সালে প্রকাশিত হয়েছিল শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘ব্যোমকেশ ও দুর্গ রহস্য’। এটি শরদিন্দু-র লেখা ব্যোমকেশ সিরিজের বারোতম উপন্যাস। এই মর্মস্পর্শী উপন্যাসে ব্যোমকেশ তাঁর বিশ্বস্ত সহযোগী অজিতকে সঙ্গে নিয়ে অধ্যাপক ঈশান চন্দ্র মজুমদারের অকালমৃত্যুর তদন্ত শুরু করেন।

ঈশান চন্দ্র মজুমদারের মৃত্যুটা সত্যিই সাপের কামড়ে হয়েছিল নাকি অন্য কোনও কারণে হয়েছিল, সেই রহস্য উন্মোচন করতে ডিএসপি পুরন্দর পান্ডের সঙ্গে দল বেঁধে তদন্ত শুরু করেছিলেন ব্যোমকেশ। আর এই রহস্য উন্মোচন করতে গিয়ে এসে যায় এক পাহাড়ের দুর্গের বিষয়। সেই দুর্গে-ই নাকি লুকিয়ে আছে অধ্যাপক ঈশান চন্দ্র মজুমদারের মৃত্যু রহস্য। এরপর সত্য ও ন্যায়ের জন্য ব্যোমকেশ কীভাবে তাঁর বুদ্ধি এবং কৌশল প্রয়োগ করে রহস্য উন্মোচন করবেন, তা-ই ‘ব্যোমকেশ ও দুর্গ রহস্য’-র ক্লাইম্যাক্স। আর এই কাহিনিকে এবার বড়োপর্দায় তুলে ধরতে চলেছেন পরিচালক বিরসা দাশগুপ্ত।

বিরসা পরিচালিত ‘ব্যোমকেশ ও দুর্গ রহস্য’ ছবির মাধ্যমে ব্যোমকেশ বক্সির ভূমিকায় প্রথমবারের মতো পর্দায় আত্মপ্রকাশ করতে চলেছেন সুপারস্টার দেব। বিখ্যাত অভিনেতাদের মধ্যে উত্তম কুমার,  রজিৎ কপুর, ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়, জিশু ইউ সেনগুপ্ত, আবির চট্টোপাধ্যায়, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, সুজয় ঘোষ, সুশান্ত সিং রাজপুত, অনির্বাণ ভট্টাচার্য এবং গৌরব চক্রবর্তী-র পর এবার দেব-এর নামও যুক্ত হল ব্যোমকেশ-এর চরিত্রাভিনেতার তালিকায়। বলা বাহুল্য, ব্যোমকেশ-এর চরিত্রে দেব-কেও দেখার চরম আগ্রহ তৈরি হয়ে গেছে দর্শকদের মধ্যে।

‘ব্যোমকেশ ও দুর্গ রহস্য’ ছবিতে ব্যোমকেশ রূপী দেব-এর সঙ্গে সত্যবতীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন রুক্মিণী মৈত্র। অজিতের ভূমিকায় দেখা যাবে অম্বরীশ ভট্টাচার্য-কে। অন্যান্য চরিত্রে রূপদান করেছেন রজতাভ দত্ত, শান্তিলাল মুখোপাধ্যায় এবং দেবেশ চট্টোপাধ্যায়।

বিরসা দাশগুপ্ত পরিচালিত ‘ব্যোমকেশ ও দুর্গ রহস্য’ ছবিতে অভিনয় প্রসঙ্গে দেব জানিয়েছেন, ‘আমি বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জিং চরিত্রে অভিনয় করতে পছন্দ করি। তাই অত্যন্ত জনপ্রিয় কাল্পনিক গোয়েন্দা চরিত্র ব্যোমকেশ-এর ভূমিকায় অভিনয় করতে পেরে আমি ভীষণ আনন্দিত। আশা করি, ব্যোমকেশ বক্সী হিসাবেও আমাকে মনে রাখবেন সিনেমাপ্রেমীরা । আসলে, ব্যোমকেশ চরিত্রের বুদ্ধিমত্তা এবং সত্যের জন্য নিরলস সাধনা, আমাকে সর্বদা কৌতূহলী ও আকর্ষণ করেছে। অতএব, ‘ব্যোমকেশ ও দুর্গ রহস্য’ ছবিতে ব্যোমকেশ-এর চরিত্রে রূপদান করে আমি অন্যরকম এক রোমাঞ্চকর সিনেমাটিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি।’

‘ব্যোমকেশ ও দুর্গ রহস্য’ ছবির চিত্রনাট্য ও সংলাপ লিখেছেন শুভেন্দু দাশমুন্সি। সিনেমাটোগ্রাফার শুভঙ্কর ভড়। সম্পাদনা করেছেন সুমিত চৌধুরি। সংগীত ও আবহে দীপ্তরকা বোস। প্রযোজনা ডিজাইনের দায়িত্বে  শাশ্বতী কর্মকার এবং মৃদুল বৈদ্য। কস্টিউম জয়ন্তী সেনের। এই ছবির সহযোগী পরিচালক শাকেত বন্দ্যোপাধ্যায়। সহযোগী প্রযোজক সারথি গুহ এবং কার্যনির্বাহী প্রযোজক সায়ক খান। ‘শ্যাডো ফিল্মস’ এবং ‘দেব এন্টারটেইনমেন্ট ভেঞ্চারস’-এর ব্যানারে নির্মিত ‘ব্যোমকেশ ও দুর্গ রহস্য’ ছবিটি বাণিজ্যিক ভাবে মুক্তি পাবে আগামী ১১ আগস্ট। সম্প্রতি কলকাতা-র এক অভিজাত হোটেলে ছবির টিজার উন্মোচন করা হল আনুষ্ঠানিক ভাবে।

সম্পত্তির বিবাদ ও প্রকৃত উত্তরাধিকারী

জেমস বন্ড খ্যাত অভিনেতা ড্যানিয়েল ক্রেগ সাম্প্রতিক একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন— তাঁর পেশায় অর্জিত স্থাবর অস্থাবর সমস্ত সম্পত্তি, তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর সন্তানদের হাতে তিনি পুরোপুরি সঁপে দিতে চান না।

প্রতিটি ছবি বাবদ ড্যানিয়েলের উপার্জন কয়েক কোটি ডলার। সাক্ষাৎকারে বলা কথার স্বপক্ষে তিনি জানিয়েছেন, এই বিপুল অর্থরাশি উপার্জনের কষ্ট সন্তানরা বুঝবে না, যদি তা উত্তরাধিকার সূত্রে অনায়াসে তাদের হস্তগত হয়। ক্রেগের দুই সন্তান। একজন ২৯ বছর বয়সি ছাড়াও তাঁর ২ বছরের একটি কন্যা আছে।

কয়েক দশক আগে অ্যান্ড্রু কার্নেগি, তাঁর যাবতীয় সম্পত্তি যার পরিমাণ ১১ মিলিয়ন ডলার কার্নেগি ফাউন্ডেশন-এর তহবিলে দান করে দেন।

পিতা-মাতার সম্পত্তি সবসময় যে সন্তানরেই প্রাপ্য হবে, এমনটা না-ও ঘটতে পারে। সমাজ-সংসারের যদিও সেটাই প্রত্যাশা থাকে। সন্তান জন্মানোর পর কায়-ক্লেশহীন জীবন অতিবাহিত করে পিতার সচ্ছলতার কারণে। এই জেনারেশনের অধিকাংশ তরুণ তাই ভোগবিলাসে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে।

সন্তানকে অঢেল অর্থ হাতে তুলে দিয়ে বিলাসিতার জীবনের বদলে তাকে উত্তরাধিকার সূত্রে বুদ্ধি দিন, বিচক্ষণতা দিন, পরিশ্রমের মন্ত্র দিন। তাকে আগে যোগ্য হতে দিন আপনার উপার্জিত অর্থের মূল্য বোঝার।

আজকাল সন্তানের ভাবগতিক দেখে অনেকেই তাঁদের সম্পত্তি দান করে যাচ্ছেন কোনও প্রতিষ্ঠানে। কিন্তু ভেবে দেখেছেন কি, সেই প্রতিষ্ঠানও কি মূল্য দিচ্ছে আপনার পরিশ্রম করে উপার্জন করা অর্থের? তারা আদপে এই বিত্তের কতটা অধিকারী?

সামাজিক কাজের জন্য সচ্ছল কোনও ব্যক্তি হয়তো তাঁর অর্থ দান করলেন কোনও ধর্মীয় বা সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠানে। আখেরে দেখা যায় সেই অর্থের প্রতি কোনও মমত্ববোধ থাকে না প্রতিষ্ঠানগুলির এবং আর্তের সেবায় না লেগে সে টাকা নয়ছয় হয়।

কিছুদিন আগেই বিসলেরি কোম্পানির মালিক তার প্রতিষ্ঠান বিক্রি করে দিলেন কারণ তাঁর একমাত্র কন্যার এই ব্যাবসার প্রতি কোনও টান নেই। সে শিল্পকলায় আগ্রহী। প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার রমেশ চৌহান এই বৃদ্ধাবস্থায় প্রতিষ্ঠান চালাতে অপারগ। ফলত – এই কোম্পানি এখন ক্রয় করেছেন তাঁর চাটার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট।

এইরকমই ঘটনা ঘটে নানা যৌথ পরিবারের ব্যাবসার ক্ষেত্রেও। পরিবারের মধ্যে বিবাদের জেরে ব্যাবসা ভাগ বাটোয়ারা হয়ে যায় বা বছরের পর বছর বাদানুবাদের মামলা চলে। আবার কেউ যদি মনে করেন তাঁর সারাজীবনের অর্থ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চার্চ, মন্দির বা মাদ্রাসায় দিয়ে যাবেন, তাহলেও কিন্তু নিশ্চিত হওয়া যায় না যে, এই অর্থ সৎকাজে সদ্ব্যবহার হবে।

তাই সন্তানদের কাছে পারম্পরিক ভাবে বিত্ত হস্তান্তরিত হওয়া ছাড়া বিকল্প প্রায় নেই বললেই চলে। এই দানের অর্থের মূল্য কোনও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দেওয়া অর্থহীন। মাঝে সরকার এই দাতব্য বিত্তের উপর এস্টেট ডিউটি লাগু করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু এই ব্যবস্থা পৃথিবীর কোনও দেশেই কার্যকর হয়নি। ফলে এখন আইনি জটিলতায় না গিয়ে, সন্তান বা সন্ততিরাই উত্তরাধিকার সূত্রে বাবা-মার বিত্তের অধিকারী হবে, ভারতীয় আইনে এই ব্যবস্থাই কায়েম রয়েছে।

সন্তানকে বিদেশে পাঠাতে হলে

অতিমারির প্রভাব কাটিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থা ধীরে ধীরে আবার স্বাভাবিক লয়ে ফিরছে। গত দু’তিন বছর সেভাবে বিদেশে পড়তে যাওয়া প্রায় বন্ধ হতে বসেছিল। যে-অভিভাবকেরা তাঁদের সন্তানদের বিদেশে হায়ার স্টাডিজ করাবার জন্য আগ্রহী, তাঁরা এই প্রক্রিয়া এখন থেকেই শুরু করে দিতে পারেন। তবে বিদেশের মাটিতে সন্তানের শিক্ষা গ্রহণের অভিপ্রায় যদি থেকে থাকে— প্রস্তুতি নেওয়ার আগে কয়েকটি বিষয়ে খেয়াল রাখা একান্ত কাম্য।

পুরো রিসার্চ দরকার

বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মকানুন, চাহিদা, টিউশন ফি— সব একে অপরের থেকে আলাদা হয়। আপনার সন্তান কোন দেশে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে আগ্রহী সেটা আগে জানতে হবে। প্রতিটা দেশেই পড়াশোনার খরচ, ভর্তির নিয়ম ইত্যাদিতে বিস্তর পার্থক্য থাকে। কোন দেশে পড়তে যেতে ইচ্ছুক শিক্ষার্থী সেটা স্থির হলে, কোন বিষয় এবং আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় চয়ন করা প্রয়োজন।

সাধারণত Foreign Education-এর জন্য প্রস্তুতি পর্ব শুরু করা উচিত অন্তত এক বছর আগে থেকে। বেশিরভাগ দেশে সেপ্টেম্বরে ভর্তির সেশন শুরু হয়। যে-বিষয় নিয়ে শিক্ষার্থী পড়তে চায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের চাহিদা অনুযায়ী সেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া দরকার। বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ, আবেদন— এগুলি বছর থাকতেই শুরু করতে হবে।

বিস্তারিত সবকিছু তথ্য জোগাড় করতে গুগল-এর উপর পুরো ভরসা করা উচিত হবে না। ভালো হয় আপনার পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো বিদ্যার্থীর সঙ্গে সম্ভব হলে যোগাযোগ করে, সব কিছু ভালো করে জেনে নেওয়া। বিদেশে কারেন্সি এক্সচেঞ্জ করার নিয়ম আগে থেকে ভালো করে জেনে রাখা বাঞ্ছনীয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে খাওয়াদাওয়ার কী সুবিধা রয়েছে, যে দেশে সন্তানকে পাঠাচ্ছেন সেখানকার আবহাওয়া কেমন— এই সব তথ্যও জোগাড় রাখা দরকার। অনেক সময় বিশেষ কোনও আবহাওয়ায় সন্তানের কোনওরকম শারীরিক সমস্যা থাকতে পারে। তাই আগে থাকতে সবকিছু জেনে নেওয়া একান্ত দরকার।

পেপার ওয়ার্ক

পাসপোর্ট-এর সঙ্গে সমস্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সাবধানে রাখা উচিত যাতে Foreign Education-এর জন্য ছাড়পত্র দেওয়া আছে। সেই দেশে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য জরুরি প্রুফ প্রথম থেকেই জেনে রাখুন এবং সেটাও যত্ন করে কাগজপত্রের সঙ্গে রাখা বাঞ্ছনীয়। হেল্থ ইনশিয়োরেন্স সংক্রান্ত কাগজপত্রও সঙ্গে রাখা দরকার। বিদেশে যদি তার ভ্যালিডিটি না থাকে তাহলে সেটাকে কীভাবে আপডেট করা যাবে, সেই তথ্যও জোগাড় করা জরুরি। এটিএম কার্ড ইন্টারন্যাশনাল ট্রানজ্যাকশন-এর জন্য আগে থেকেই অ্যাপ্লাই করতে হবে।

প্রস্তুতি দরকার

ভাষার দক্ষতা জরুরি। অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপীয় দেশগুলিতে, যুক্তরাজ্যের বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে আইইএলটিএস-এ ব্যান্ড স্কোর অন্তত ৬ থাকা দরকার। তবে অনেক ইউনির্ভাসিটি এর চেয়ে বেশিও চাইতে পারে। এছাড়া আমেরিকা-সহ অন্যান্য আরও দেশে কোনও কোনও বিষয়ে টোফেল, স্যাট বা ডিআরআই দরকার হতে পারে। জার্মানি, ফ্রান্স, সুইডেন-এর মতো ইউরোপীয় দেশে পড়তে গেলে ইংরেজিতে পড়াশোনা করার সুযোগ রয়েছে। আবার কোনও কোনও ক্ষেত্রে সেই দেশের ভাষার দক্ষতাও দরকার পড়ে। জার্মানিতে বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ নিতে হলে জার্মান ভাষা জানাটা একান্ত প্রয়োজন।

ভর্তির প্রক্রিয়া শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিষয় বাছাই করার পরে, অনলাইনের মাধ্যমে পছন্দের ইউনির্ভাসিটি-তে আবেদন জানাতে হয়। ইংরেজি দক্ষতার ব্যান্ডস্কোর ভর্তি বা বিষয় পাওয়ার ক্ষেত্রে বড়ো ভূমিকা গ্রহণ করে। অনেক দেশেই কেন্দ্রীয় ভর্তি হওয়ার ব্যবস্থাপনার ওয়েবসাইট রয়েছে। সেখানে আবেদন করলে শিক্ষার্থীর যোগ্যতা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় রেকমেন্ড করা হয়। তবে বেশির ভাগই সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে আবেদন জানাতে হয়। এতদিন যা যা পড়াশোনা করেছে আপনার সন্তান তার সমস্ত নথিপত্র স্ক্যান করে পাঠাতে হতে পারে। একই সঙ্গে সেগুলির ফটোকপি কুরিয়্যারের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ঠিকানায় পাঠাবারও দরকার পড়তে পারে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আবেদন গ্রহণের সিদ্ধান্ত ই-মেইল করে জানানো হয় যে, সেটি গ্রহণ করা হয়েছে নাকি বাতিল হয়ে গেছে। আবেদনপত্র গ্রহণ করা হলে ভিসা আবেদনের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে।

ব্যাগ গোছানো দরকার

অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, জার্মানি, রাশিয়ায় ও কানাডায় শীতকাল— ভারতের উইন্টার সিজন থেকে অনেকটাই আলাদা। সন্তান যদি এইসব কোনও একটা দেশে পড়তে যায়, তাহলে সবকিছু ভালো করে জেনে নিয়ে পোশাক কিনুন। ইলেক্ট্রনিক উপকরণ চার্জ করার অ্যাডাপ্টর ইত্যাদি সম্পর্কেও ভালো করে জেনে নিন কারণ প্রতিটা দেশে সুইচ পয়েন্টস- এর প্যাটার্ন আলাদা আলাদা হয়। যে-দেশে যাচ্ছে সেখানকার ট্র্যাভেল গাইডও সঙ্গে রাখা উচিত।

বিদেশে থাকার প্রস্তুতি

প্রতিটা দেশের ভাষা, সংস্কৃতি সব আলাদা হয় যেগুলো নিয়ে আমাদের দেশের মানুষজন খুব সংবেদনশীল হয়ে থাকে। যে-দেশে পড়তে যাচ্ছে আপনার সন্তান সেখানকার ভাষা শিখে নিতে পারলে খুব ভালো হয়। সবসময় শুধু ইংরেজি জানলে কাজ হয় না। বিদেশ যাওয়ার আগে নিজের ডাক্তারের কাছ থেকে জরুরি কিছু প্রেসক্রিপশন অবশ্যই করিয়ে নেওয়া বাঞ্ছনীয়। দেশটির ইতিহাস এবং রাজনীতি সম্পর্কেও সম্ভব হলে কিছুটা জ্ঞান সংগ্রহ করে রাখুন।

বিদেশে পৌঁছোবার পরে

বিদেশে পৌঁছোবার ২৪ ঘন্টার ভিতর নিজের রেজিস্ট্রেশন করিয়ে নেওয়া জরুরি। দেশ অনুযায়ী সব জায়গায় নিয়ম আলাদা আলাদা। কিন্তু ভারতীয় দূতাবাসে নিজস্ব রেজিস্ট্রেশন করিয়ে নিলে পরে গিয়ে অনেক সুবিধা হবে। করোনাকালীন গত দুই বছরে এবং রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধচলাকালীন, বিদেশে আসা ছাত্রদের অনেকরকম সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে, যার কোনও ইনফর্মেশন দূতাবাসগুলির কাছে ছিল না।

পড়াশোনার সঙ্গে রোজগার

এই সংস্কৃতি ভারতে খুব বেশি দেখা না গেলেও বিদেশে এর যথেষ্ট প্রচলন আছে। আপনার সন্তান যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, সেই সংস্থা যদি অনুমতি দেয় তাহলে পড়াশোনা করার সঙ্গে সঙ্গে কিছু অর্থও উপার্জন করা যেতে পারে। এতে ভবিষ্যতে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ারও সুবিধা হবে। কোনও কোনও দেশের এর জন্য লোকাল পারমিশন নেওয়ার দরকার পড়তে পারে আবার কোথাও কোথাও ওয়ার্ক পারমিট-এর দরকার হয় ৷

ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট আইডেন্টিটি কার্ড

বিদেশে পড়তে গেলে এই কার্ড করিয়ে নিলে অনেক সুবিধা পাওয়া যাবে। লোকাল ট্র্যাভেলিং-এর সঙ্গে সঙ্গে কিছু কিছু শপিং সেন্টারেও এই কার্ড দিয়ে ডিসকাউন্ট পাওয়া যায়। এটি পাওয়ার জন্য আইএসআইসি-এর ওয়েবসাইট দেখতে হবে। তাদের চাহিদামতো কিছু প্রুফ আপলোড করে জমা দিলে ওখান থেকে অনলাইনেও আপনি কার্ড করিয়ে নিতে পারবেন। কোনও কোনও দেশে এই কার্ড ব্যবহার করে ফুডিং এবং লজিং-এর উপরেও ডিসকাউন্ট পাওয়া যায়।

বিদেশে পড়াশোনা করতে গেলে এই সবকিছুর সঙ্গে সঙ্গে ওখানে থাকার জন্য আপনার সন্তানকে মানসিক ভাবে নিজেকে তৈরি করতে হবে। ওখানে গিয়ে প্রথম দিকে সমস্ত কাজ নিজেকেই করতে হবে সুতরাং মানসিক প্রস্তুতি অত্যন্ত জরুরি।

 

তেলতেলে ত্বক থেকে কী ভাবে পাব মুক্তি?

আমার ত্বক এতই তৈলাক্ত যে এতে ব্রণ ও ফুসকুড়ির সমস্যা লেগেই থাকে৷ এতে আমাকে দেখতে খুব খারাপ লাগে৷ ত্বকের তেলাভাব দূর করব কী ভাবে৷কী করলে পাব সুন্দর মসৃণ ত্বক? আমি নানা কারণে মানসিক উদ্বেগে ভুগি৷ শুনেছি ত্বকের সমস্যা এটাতে বাড়ে৷ এটা কি সত্যি?

ব্রণর সমস্যায় পুরুষ ও নারী নির্বিশেষে প্রায় সবাই ভোগেন। বিশেষত তৈলাক্ত ত্বকে ব্রণ, ফুসকুড়ি, ব্রেকআউট লেগেই থাকে। কারণ তৈলাক্ত ত্বকের ছিদ্র বা পোর্স বন্ধ হয়ে যায়। আর এর ফলেই বাড়তে থাকে ব্রণর সংখ্যা। এছাড়া  হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, আর্লি মেনোপজ, পিরিয়ডের সমস্যা এবং অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার কারণে ব্রণ হতে পারে।

অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণে ত্বকে অ্যান্ড্রোজেন হরমোন ক্ষরণ হয়। ফলে তৈলাক্ত ত্বক আরও বেশি তৈলাক্ত হয়ে ওঠে। যে কারণে ব্রণ আরও বেশি হয়।অত্যধিক অতিরিক্ত  মানসিক চাপের কারণে একজিমা পর্যন্ত হতে পারে।
একজিমা এমন একটি চর্মরোগ, যা ত্বককে লাল করে তোলে। একজিমার ফলে ত্বক শুষ্ক, জ্বালা এবং চুলকানি হয়। অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়াও হতে পারে। তা ছাড়া অতিরিক্ত মানসিক চাপের ফলে মুখে ও চোখের পাশে বলিরেখা ফুটে ওঠে। ত্বক শুষ্কও হয়ে যেতে পারে। তবে  মানসিক চাপ কমানোর কৌশল অনুসরণ করলে ত্বকের অনেক সমস্যা প্রতিরোধ হতে পারে।

দ্রুত ত্বকের তৈলাক্ত ভাব দূর করতে লেবু কার্যকর। সরাসরি ত্বকে লেবু ব্যবহার করা উচিত নয়। লেবুর রসের সঙ্গে সর মিশিয়ে ব্যবহার করতে পারেন। তুলায় দুধ ভিজিয়ে নিয়ম করে প্রতিদিন দুবার ত্বকে ব্যবহার করলে ভালো ফল পাওয়া যাবে। দুধের সঙ্গে কয়েক ফোঁটা লেবুর রস মিশিয়ে নিলে ত্বক পরিষ্কারও হবে।

শসা ব্লেন্ড করে টক দই মিশিয়ে নিন ভালোভাবে। এরপর ১০ মিনিট মুখে লাগিয়ে রাখুন। এটা তৈলাক্ত ত্বকে একই সঙ্গে ক্লিনজার ও টোনারের ভূমিকা পালন করবে। কমলার রস মুখে লাগিয়ে ১৫ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন। এতে তৈলাক্ত ভাবও অনেকটা কমে যাবে।

তৈলাক্ত ত্বকে ব্রণর সমস্যা দূর করতে নিম ভালো প্রতিষেধক। সিদ্ধ নিমপাতা থেঁতো করে পুরো মুখে লাগিয়ে রাখুন আধ ঘণ্টা। এরপর হালকা গরম জলে দিয়ে ধুয়ে নিন।

ত্বক ভালো রাখতে নিয়মিত ত্বকের সঠিক যত্ন নিতে হবে। প্রতিদিন প্রচুর জল পান করতে হবে, সকালে এবং রাতে ভালো ভাবে মুখ পরিষ্কার রাখতে হবে। প্রতিদিন ব্যায়াম ও পর্যাপ্ত অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট ভিটামিন গ্রহণ করতে হবে। এসব নিয়ম সঠিক ভাবে মেনে চলতে পারলেই ত্বক থাকবে স্বাস্থ্যকর ও উজ্জ্বল।

মহিলাদের ডায়াবেটিস এবং প্রতিকার (শেষ পর্ব)

মেনোপজের সময় ও মেনোপজের পরে মহিলাদের ঘুমে ব্যাঘাত বা ওজন বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়, যা তাদের রক্তের শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে বাধা দেয়। অনেক সময় এইসব কারণে মহিলাদের নির্দিষ্ট সময়ে আগেই মেনোপজ হয়ে যায়। যে-সমস্ত মহিলাদের ডায়াবেটিস নেই, তাদের ক্ষেত্রে সাময়িক জেস্টোশনাল ডায়াবেটিস হতে পারে। গর্ভাবস্থায় ২৪তম সপ্তাহ বা তার পরেও এই ডায়াবেটিস হতে পারে, কারণ ইনসুলিন গর্ভস্থকালীন হরমোনকে প্রভাবিত করে। এর কারণে শিশুর জন্মকালে মায়ের উচ্চ রক্তচাপজনিত সমস্যা হতে পারে। শিশুর জন্মের পর মায়ের রক্তে শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে চলে আসে কিন্তু এই সমস্ত মহিলারাই ভবিষ্যতে ডায়াবেটিস সংক্রান্ত ঝুঁকির শিকার হন।

বেড়ে চলা ডায়াবেটিসএর মাত্রা নিয়ন্ত্রণে মহিলাদের কী কী সতর্কতা নেওয়া উচিত?

বেড়ে চলা ডায়াবেটিস-এর মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে মহিলাদের এই তিনটি কাজ করা উচিত—

উপযুক্ত খাদ্যাভ্যাস : পুষ্টিকর খাবার খাওয়া উচিত। যার মধ্যে কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন ও ফ্যাট নির্দিষ্ট পরিমাণে থাকে। চিনি ও স্যাচুরেটেড ফ্যাট জাতীয় খাবার কম খাওয়া দরকার। কোনও অনুষ্ঠান ছাড়া ময়দা জাতীয় খাবার না খাওয়াই ভালো।

সুস্থ থাকুন : মহিলাদের সপ্তাহে প্রায় ১৫০ মিনিট অর্থাৎ গড়ে দৈনিক পঁচিশ মিনিট অ্যারোবিক (হাঁটা, দৌড়ানো) ও ওজন তোলার মতো ব্যায়াম করা প্রয়োজন।

ওজন কমানো : যেসব মহিলা স্থূলতাজনিত সমস্যায় ভুগছেন, তাদের উপযুক্ত খাদ্যাভ্যাস ও ব্যায়ামের মাধ্যমে ওজন কমানো উচিত। যাদের ওজন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, তাদেরও উচিত বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের স্বাস্থ্যের খেয়াল রাখা।

যেসব মহিলা ইতিমধ্যেই ডায়াবেটিস আক্রান্ত, তারা কীভাবে ডায়াবেটিস সংক্রান্ত সমস্যার থেকে মুক্তি পেতে পারেন?

রক্তে শর্করার মাত্রা অনিয়ন্ত্রিত থাকার কারণে বিভিন্ন ধরনের রোগ যেমন হৃদরোগ, কিডনির রোগ, চোখজনিত সমস্যা ও স্নাযুরোগ বিশেষত পায়ে স্নাযুরোগ হওয়ার সমস্যা থাকে। যদিও এই সমস্যাগুলি আবশ্যক নয়। নিয়মিত রক্তে শর্করার মাত্রা, কোলেস্টেরল ও রক্তচাপ পরীক্ষার মাধ্যমে মহিলারা এইসব অঙ্গের ক্ষতি ও বিভিন্ন সমস্যা কমাতে পারেন। মহিলাদের উচিত ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে ডায়াবেটিস-এর যথাযথ ওষুধ খাওয়া। বর্তমানে অনেক ধরনের ওষুধই বাজারে পাওয়া যায়, যার ফলে চিকিৎসকরা রোগীদের ঠিক ওষুধ দিতে পারেন। রোগীদের অবশ্যই প্রতিদিন নিয়ম করে ওষুধ খাওয়া উচিত কিংবা সপ্তাহে একদিন করে ইঞ্জেকশনও নিতে পারেন।

(সমাপ্ত)

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব