স্পা টুরিজম (২ পর্ব)

স্পা-শব্দটি এসেছে ল্যাটিন ভাষা থেকে। যার অর্থ জলের মাধ্যমে উপশম। Spa সাধারণত স্বাস্থ্যর জন্য বা বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসার জন্য কাদা স্নানের অফার দেয়। বিভিন্ন ধরনের ঔষধি যুক্ত মাটি এবং পিট ব্যবহার করা হয়। স্পা সহজেই শরীরে আনে সতেজভাব আর প্রশান্তি। ক্লান্তি উপশম তো বটেই নানাবিধ ব্যথার উপশমও হয়ে থাকে। ত্বককে ভিতর থেকে উজ্জ্বল করতেও স্পা সহায়তা করে। হাতে তৈরি তেল ও অন্যান্য আয়ুর্বেদিক উপকরণও ব্যবহার করা হয়ে থাকে Spa করার সময়।

ডেস্টিনেশন Spa এনার্জি বাড়ানোর পাশাপাশি মাইন্ড তথা বড়ি ফিটনেসের জন্যও আদর্শ। শুধু তাই নয় হেলদি ফুড এবং পূর্ণ রিলাক্সেশন-এর বিষয়টিকে প্রাধান্য দেওয়া হয় এতে। পর্যটকের সুবিধা এবং আরামের কথা মাথায় রেখেই তৈরি হয় রিসর্ট স্পা। সাধারণত বিজনেসের জন্য আসা পর্যটকরাই এই স্পা-র সুবিধা নিয়ে থাকেন। ডে-স্পাতে ডে বাই ডে ট্রিটমেন্ট করা হয়ে থাকে। যার মধ্যে রয়েছে ম্যানিকিওর, পেডিকিওর, ফেশিয়াল এবং বড়ি মাসাজ। হেল্‌থ্ স্পা-তে মূলত স্বাস্থ্যের শুশ্রূষা করা হয়। চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে চলে এই স্পা ট্রিটমেন্ট। ক্লান্তি

মেডিকেল Spa-তে কেবলমাত্র কসমেটিক ট্রিটমেন্ট, যেমন বোটক্স ইনজেকশন দেওয়া হয়ে থাকে, সঙ্গে স্পা-এর নিজস্ব ট্রিটমেন্ট-ও করা হয়ে থাকে। মিনারেল স্প্রিং স্পা-তে ন্যাচারাল মিনারেল, থার্মাল অথবা সি ওয়াটার ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ক্রুজ শিপ স্পা-তেও ফিটনেস এবং ব্যালেন্স ভিত্তিক স্পা ট্রিটমেন্ট দেওয়া হয়ে থাকে। এয়ারপোর্ট স্পা-তে যাত্রীরা শর্ট ট্রিটমেন্ট নিতে পারেন। যার মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ হল ১৫ মিনিটের চেয়ার মাসাজ এবং অক্সিজেন থেরাপি।

স্পা-র রকমফের

স্টোন স্পা: এতে কিছু বিশেষ ধরনের পাথরের প্রয়োগ করা হয়ে থাকে, যাতে একধরনের চুম্বকীয় শক্তি থাকে। এই সমস্ত পাথর দিয়ে যখন শরীরে মাসাজ করা হয়, তখন শিরা-উপশিরায় বিশেষ স্পন্দন হওয়ার কারণে ত্বক হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত, উজ্জ্বল। আয়ুর্বেদিক তেল গরম করার সময় পাথরগুলিকে তার মধ্যে ডুবিয়ে রাখা হয়। একটু ঠান্ডা হলে শরীরের বিভিন্ন জয়েন্টে রাখা হয়, যাতে খুব সহজেই ব্যথার উপশম হয়।

Fruit Spa: এই Spa-তে বিভিন্ন প্রকারের তেল, আয়ুর্বেদিক শিকরবাকড় আর দেশি-বিদেশি ফলের রস মিশিয়ে মাসাজের জন্য সামগ্রী বানানো হয়ে থাকে। এই সামগ্রীতে প্রয়োগ করা উপচারের পরিমাণ কতটা হওয়া উচিত, তা নির্ভর করে ত্বকের প্রকৃতির উপর।

স্নেক স্পা : আশ্চর্যজনক শোনালেও, ক্লান্তি আর অবসাদ দূর করার জন্য বিষহীন সাপ দেহে ছেড়ে দেওয়া হয়। সত্যিই এটা রোমাঞ্চকর অনুভূতি। এটি শরীরে স্ফূর্ত্তি আনে কিন্তু এই ট্রিটমেন্ট নিতে হলে আপনাকে কিঞ্চিত সাহসী হতে হবে।

প্রেমের বাঁধন (প্রথম পর্ব)

তুই কি পাগল! তোর থেকে মিনিমাম দশ বারো বছরের বড়ো হবেন। স্যার বিবাহিত কিনা তাও জানিস না। আর বিবাহিত না হলেও প্রেমিকাও থাকতে পারে! কী এমন দেখলি স্যারের মধ্যে? সোহা বলে প্রিয় বান্ধবী প্রিয়াকে।

জানি না কেন ভালো লাগে! কেন এত ভালোবাসি। স্যার হয়তো বা কোনও দিন জানতেও পারবেন না।

প্রিয়া দাস। কলেজে সেকেন্ড ইয়ার বোটানি অনার্সে যখন, তখনই জয়েন করলেন নির্মল রায় স্যার। লম্বা, শ্যামবর্ণ অতি সাধারণ মানের দেখতে স্যারকে কিন্তু মন দিয়ে বসল প্রিয়া। কেন জানে না! ভীষণ টান অনুভব করে স্যারের প্রতি। স্যারের বুদ্ধিদীপ্ত চোখজোড়ার দিকে তাকিয়ে কাটিয়ে দিতে পারে ঘন্টার পর ঘন্টা। কী যে ভীষণ আকর্ষণীয় ! কী ভীষণ টানে ওকে।

প্রাক্টিক্যাল ক্লাসে ল্যাবে স্যার প্রত্যেকের কাছে এসে কাজ দেখেন। প্রিয়ার কাছে এলে ওর বুক তোলপাড় করে। অসম্ভব একটা ভালো লাগায় মনটা ভরে যায়।

চোখের পলকেই যেন কেটে যায় একটা বছর। থার্ড ইয়ারের পরীক্ষার সিট পড়েছে অন্য কলেজে। পরীক্ষার পর খুব মিস করতে থাকে স্যারকে, কতদিন দেখেনি। বরাবরের ভালো ছাত্রী প্রিয়ার রেজাল্টও ভালো হয়। রেজাল্ট নিয়ে ডিপার্টমেন্টে স্যার, ম্যাডামদের প্রণাম করলে সকলে আশীর্বাদ করেন। নির্মল স্যার বলে ওঠেন, আরে না না প্রণাম করতে হবে না। শোনে না প্রিয়া। প্রণাম করে। স্যারকে একটু ছোঁয়া যে কতদিনের ইচ্ছে। মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করেছিলেন সুখী হও। স্বাবলম্বী হও।

ইউনিভার্সিটির পাঠ চুকিয়ে সরকারি চাকরির পরীক্ষা দিয়ে চাকরি পেয়েছে। সেদিন অফিসে ফোনটা এসেছিল। তারপর সেন্সলেস হয়ে পড়ে গিয়েছিল। মাথায় জল দেয় কলিগরা। কেমন যেন হয়ে গিয়েছিল। বাকরুদ্ধ, হতবুদ্ধি। কী করণীয়, কী করা উচিত, ভাবতে পারছিল না।

প্রিয়ার ফোনটা নিয়ে রিং ব্যাক করে কলিগ দেবরাজ। জানতে পারে সবটা। কতটা শক পেয়েছে প্রিয়া অনুধাবন করতে পারে। দেবরাজ- সহ অফিসের আরও দু’জন কলিগ মিলে প্রিয়ার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। প্রিয়ার বাড়িতে পৌঁছোনোর আগেই বাড়িতে লোকজনের আনাগোনা শুরু হয়েছে। হসপিটাল থেকে বডি আসতে সময় লাগবে। সারা রাস্তা প্রিয়া কথা বলেনি একটাও। কান্নার আওয়াজে যেন গোটাপাড়া ভেঙে পড়েছে। আজ বেলা দশটায় যারা জীবিত ছিল। হাসিখুশিতে কলকল করছিল। বিকালে তারা ফিরে এল শববাহী দুটো গাড়িতে। কোন মা এটা সহ্য করতে পারে! কোন বোন মেনে নিতে পারে তার প্রিয় দাদা বউদির এমন আকস্মিক মৃত্যু। তিন বছরের শিশুকন্যাকে রেখে লরির ধাক্কায় প্রাণ দিল ওরা। বাজারে বেরিয়েছিল ফিরে এসে দুপুরে ভাত খাবে বলে গিয়েছিল।

এরপরে জীবনটা বদলে গেল প্রিয়ার। তার মাথায় তিন বছরের শিশুকন্যা সুকন্যার দায়দায়িত্ব এসে পড়ল। সুকন্যার জগতে ঠাম্মা আর পিসি। মা ছাড়া বেশ কিছুদিন খুব কেঁদেছিল সুকন্যা। তারপর আস্তে আস্তে ভুলে গেল। প্রিয়াই ওর মা হয়ে ওঠে। প্রিয়ার জগৎ সুকন্যাকে ঘিরেই।

সুকন্যার এখন বয়স দশ। শহরে নামি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী। সুকন্যার স্কুলের অ্যানুয়াল ফাংশন আছে। পড়াশোনায় যেমন ভালো, তেমন ভালো গান গায়। প্রিয়া নিজে গান শিখিয়েছে। দুর্দান্ত গানের গলা ছিল দাদার। সুকন্যা বাবার গুণ পেয়েছে। সুকন্যা আর গান এই দুটোই এখন প্রিয়ার বাঁচার অবলম্বন। গানই ওর মন ভালো রাখে। বাঁচার অনুপ্রেরণা দেয়। অফিসে যখন কাজ করে তখনও ওর মোবাইলে খুব আস্তে রবীন্দ্র সংগীত বাজে। মন ভালো থাকে।

(ক্রমশঃ…)

স্পা টুরিজম (১ পর্ব)

বর্তমানে স্পা একটি হ্যাপেনিং বিউটি থেরাপি। রিলাক্সেশন ছাড়াও নিজেদের সৌন্দর্য ধরে রাখতে বা ফিরিয়ে আনতে এটি সত্যিই অনবদ্য। তাই আজ মানুষ শুধুমাত্র নিজেদের শহরেই নয়, পর্যটনের সময়ও হাতে কিছুটা সময় রাখছেন এই থেরাপির জন্য। এমনকী কিছু কিছু ক্ষেত্রে ডাক্তারও ওষুধের পরিবর্তে মাসাজ সাজেস্ট করছেন। সেই কারণেই আজ সর্বত্র গড়ে উঠেছে স্পা-সেন্টারগুলি। শুধু তাই নয়, Spa Tourism-এর গ্রহণযোগ্যতাও বেড়েছে অনেক। সে কথা মাথায় রেখেই স্পা-সেন্টারগুলির ইন্টিরিয়র এমন ভাবে সাজানো হচ্ছে যে, সেখানে ঢুকলেই মনে হবে প্রকৃতির কোলে এসে পড়েছেন জীবন যুদ্ধে ক্লান্ত পর্যটক।

হালকা মিউজিক, মৃদু আলো, ফুলের সুগন্ধ, সুন্দর ডেকর, শান্ত পরিবেশ আর হার্বাল তেল দিয়ে মাসাজ— শরীরকে একদম হালকা করে দেবে। আর স্টিম বাথ আপনার ক্লান্তি ও অবসাদ দূর করতে সাহায্য করবে। ব্যস্ত জীবনশৈলী থেকে একটু সময় বার করে চলে যান সেইসব পর্যটন কেন্দ্রে, স্পা যার অপরিহার্য অঙ্গ। মানসিক এবং শারীরিক ক্লান্তির পাশাপাশি মনের অস্থিরতাও অনেক কমে যাবে। তরতাজা অনুভব করবেন।

আজ বিউটি স্যালন, স্পা-স্যালন-এ পরিবর্তিত হওয়ার এটাই বোধহয় মূল কারণ। যার কারণেই আজ স্পা ট্রিটমেন্ট ধনী আর ফাইভস্টার হোটেলেই সীমাবদ্ধ নেই। চলে এসেছে সাধারণ মানুষের অধিকারেও।

স্পা-শব্দটি এসেছে ল্যাটিন ভাষা থেকে। যার অর্থ জলের মাধ্যমে উপশম। বহু যুগ আগেই রাজা মহারাজারা তাদের মহলে সুগন্ধিত ফুল, জড়িবুটি দিয়ে স্পা বাথ নিতেন। আজ সব বয়সের মহিলারাই তাদের স্বাস্থ্য এবং সৌন্দর্যের ব্যাপারে যথেষ্ট কনশাস। সেই কারণেই তারা বেছে নিচ্ছেন প্রাচীন এই পন্থা স্পা-বিউটি থেরাপিকে। অবশ্য পুরুষরাও ব্যতিক্রম নন।

ডেস্টিনেশন স্পা এনার্জি বাড়ানোর পাশাপাশি মাইন্ড তথা বড়ি ফিটনেসের জন্যও আদর্শ। শুধু তাই নয় হেলদি ফুড এবং পূর্ণ রিলাক্সেশন-এর বিষয়টিকে প্রাধান্য দেওয়া হয় এতে। পর্যটকের সুবিধা এবং আরামের কথা মাথায় রেখেই তৈরি হয় রিসর্ট স্পা। সাধারণত বিজনেসের জন্য আসা পর্যটকরাই এই স্পা-র সুবিধা নিয়ে থাকেন। ডে-স্পাতে ডে বাই ডে ট্রিটমেন্ট করা হয়ে থাকে। যার মধ্যে রয়েছে ম্যানিকিওর, পেডিকিওর, ফেশিয়াল এবং বড়ি মাসাজ। হেল্‌থ্ স্পা-তে মূলত স্বাস্থ্যের শুশ্রূষা করা হয়। চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে চলে এই স্পা ট্রিটমেন্ট।

ইতিহাসের কাছে মুর্শিদাবাদে (পর্ব ৫)

পলাশীর যুদ্ধে পরাজয়ের কিছুদিন পর রাজমহলে ধরা পড়েন সিরাজ গুপ্তচরের মাধ্যমে। ক্লাইভের সহায়তার মীরজাফর তখন বাংলার নবাব। মীর দাউদ ও মীরকাসেম খান দ্বারা বন্দি সিরাজকে নিয়ে আসা হয় মুর্শিদাবাদে। মীরজাফর পুত্র মীরণ, সিরাজের দেখাশুনার দায়িত্ব নিলেন। ওই রাতেই মীরণের নির্দেশে মহম্মদী বেগ বন্দি সিরাজকে হত্যা করে পলাশী চক্রান্তের বৃত্ত পূর্ণ করেন।

আমরা এবার পৌঁছোলাম মাটির নীচে অবস্থিত এক গোপন কক্ষে, যেখানে অবৈধ ব্যাবসার পরিকল্পনা করা হতো। জগৎ শেঠদের বাড়ি ১৯৮০ সালে মিউজিয়ামে পরিণত হয়। এখানে বিভিন্ন ঘরে সাজানো রয়েছে জগৎ শেঠ পরিবারের ছবি, পূর্বের ও তৎকালীন মুদ্রার সংগ্রহ, বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্র, বহুমূল্যের সব পোশাক এবং সোনা-রুপোয় খচিত অসাধারণ কয়েকটি বেনারসি শাড়ি। নিজস্ব তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হলেও এই মিউজিয়াম রাজ্যের অন্যতম সংরক্ষিত স্মারক। চমকপ্রদ ইতিহাসকে মনে রেখে অটোতে এসে বসলাম।

কয়েক মিনিট পরে অটো এসে থামল নসিপুর রাজবাড়ির সামনে। প্রথম দর্শনেই রাজবাড়ির সঙ্গে বিখ্যাত হাজারদুয়ারি প্যালেসের সাদৃশ্য খুঁজে পেলাম। ব্রিটিশ আমলের কর সংগ্রাহক দেবি সিং-এর ভাইপো রাজা উদ্বন্ত সিংহ এবং তাঁর ছেলে রাজা কীর্তিচন্দ্র সিংহ দ্বারা তৈরি এই প্রাসাদের সম্মুখ অংশে গ্রীক ও রোমান স্থাপত্যরীতির মিল পাওয়া যায়।

এরপর গেলাম জাফরাগঞ্জে ‘১১০০ কবর স্থান’-এর কাছে। এই সমাধিক্ষেত্র মীরজাফর বংশের পারিবারিক কবর স্থান, যেখানে নাকি ১১০০টি কবর রয়েছে। মাথাপিছু ১০ টাকা মূল্যের টিকিট কেটে আমরা প্রবেশ করলাম কবরস্থানে। পাঁচিলে ঘেরা অনেকটা জায়গা জুড়ে সারিবদ্ধ কবরগুলি। মীরজাফরের কবর ছাড়াও তাঁর পিতা, দুই বিধবা পত্নী, আলিবর্দী খাঁর বোনের কবরও রয়েছে এই সমাধি ক্ষেত্রে। মীরজাফরের বড়ো পুত্র মীরণ এবং মীরকাশিম ছাড়া ওই বংশের সব নবাব ও নাজিমদের কবর সংরক্ষিত আছে সেখানে। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য স্থান খোসবাগ।

প্রায় ১৫ মিনিট অটো চেপে এসে পৌঁছোলাম ভাগিরথীর পূর্ব তীরে অবস্থিত লালবাগের অন্তর্গত জিয়াগঞ্জ এলাকায় খোসবাগের অবস্থান। অটো থেকে নেমে মাথাপিছু ২০ টাকার টিকিট কিনে বিশাল এক বার্জ-এ চড়ে পৌঁছে গেলাম নদীর পশ্চিম পাড়ে। বার্জ থেকে নেমে, একটু হেঁটে এসে বসলাম অটোয়। খোসবাগের পথে একটু এগোতেই বাঁ দিকে রাস্তা চলে গেছে হীরাঝিল ও সিরাজদৌল্লার মনসুরগঞ্জ প্রাসাদের দিকে। মাত্র ৬-৭ মিনিট পরেই পৌঁছে গেলাম খোসবাগে, নবাব আলিবর্দী খাঁ এবং তাঁর দৌহিত্র তথা বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব, সিরাজদৌল্লার সমাধিস্থলের প্রবেশদ্বারে।

খোসবাগে এসে মনে হচ্ছে, পাঠকদের নবাব আলিবর্দী খাঁর রাজত্বকালের কয়েকটি কথা না জানালে এই লেখা অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে। নবাব মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তাঁর জামাতা নবাব সুজাউদ্দিনের বেগম জিন্নতউন্নেসা মনস্থির করেছিলেন আলিবর্দী খাঁকে বিহারের ছোটো নবাব করার। সরফরাজ রয়ে গেলেন বাংলার দেওয়ান। আলিবর্দী খাঁ বিহারের ছোটো নবাব হওয়ার কিছুদিন আগে তাঁর কনিষ্ঠ কন্যা আমিনা বেগমের এক পুত্র সন্তান হয়। আলিবর্দী প্রিয় দৌহিত্রের নাম রাখলেন মির্জা মহম্মদ যিনি পরবর্তী কালের নবাব সিরাজদৌল্লা।

সুজাউদ্দিনের মৃত্যুর পর নবাব হলেন তাঁর অপদার্থ পুত্র সরফরাজ। বিভিন্ন কারণে তাঁর সঙ্গে মতবিরোধ শুরু হল অমাত্য হাজি আহম্মদ, দেওয়ান আলমচাঁদ এবং ব্যাঙ্কার জগৎ শেঠ ফতেচাঁদের। একই বছরে দ্বিতীয়বার রাজস্ব প্রদান নিয়ে নবাব সরফরাজের সঙ্গে মতবিরোধ হল দিল্লির দুর্বল সম্রাট মহম্মদ শাহের। সরফরাজ দ্বারা অপমানিত হাজি আহম্মদ সেই সুযোগে ভাই আলিবর্দী, আলমচাঁদ ও জগৎ শেঠের সঙ্গে যুক্তি করলেন। তাঁরা সম্রাটকে দিলেন উৎকোচ এবং সেই বছরেই রাজস্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি এবং তার বিনিময়ে চাইলেন বাংলা, বিহার ও ওড়িশার নবাবি। মহম্মদ শাহ রাজি হলেন। ইতিমধ্যে সরফরাজের ছাঁটাই করা সৈন্যরা গোপনে যোগ দিলেন আলিবর্দীর সৈন্যবাহিনীতে। আলিবর্দী যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করলেন নবাব সরফরাজের বিরুদ্ধে। দূত মাধ্যমে খবর পৌঁছোল নবাবের কাছে। স্তম্ভিত সরফরাজ বাধ্য হয়ে আলিবর্দীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা স্থির করলেন। ভাগিরথীর তীরে গিরিয়া নামক স্থানে দুই পক্ষের সৈন্যবাহিনী মুখোমুখি হল। দুই পক্ষের দূতের মাধ্যমেও সন্ধির চেষ্টা ব্যর্থ হল। তিনদিক দিয়ে ঘিরে ফেলা হল সরফরাজের সৈন্যদলকে। যুদ্ধক্ষেত্রে বীরের মতো মৃত্যু হল মুর্শিদকুলির দৌহিত্র নবাব সরফরাজের। মুর্শিদাবাদে তাঁর মৃতদেহের সমাধি দেওয়া হয়। অবসান হল মুর্শিদকুলি বংশের যুগ। আলিবর্দী বসলেন মুর্শিদাবাদের মনসদে।

বর্ষায় Stylish হয়ে উঠতে এই ৯টি টিপস ফলো করুন

ফ্যাশনের জন্য সময়-কাল যেমন গুরুত্বপূর্ণ ঠিক তেমনি এর রূপ-রঙও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলায় ঋতু পরিবর্তন হয় বছরে ছ’বার। আর এই ছয় ঋতুতে আলাদা ধরনের পোশাক বাজারে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। মানুষের দেখে শেখা কিংবা ফ্যাশনে নিজেই সচেতন হওয়া, যে কারণই হোক না কেন; বৈচিত্র্যময় ঋতুতে বৈচিত্র্যের ছোঁয়া পোশাকেও য়ে শুরু হয়েছে, তা আজ অস্বীকার করার জো নেই। বর্ষাকালে অফিসে একইসঙ্গে প্রফেশনাল ও আরামদায়ক দেখানোটা একটু কঠিন হয়ে পড়ে। তবে বিশেষজ্ঞদের এই পরামর্শ মেনে চললে বর্ষাতেও Stylish দেখাতে পারবেন। বর্ষার কথা মাথায় রেখে এমনই কিছু প্রয়োজনীয় টিপস এখানে রইল:

 উজ্জ্বল রং ব্যবহার করুন:

বর্ষাকালে নীল, লাল ও কমলা রঙের পোশাক পরলে বর্ষার আবহাওয়াতেও অপরের দৃষ্টি সহজেই আকর্ষণ করতে পারবেন এবং মন থেকেও গ্লুমিনেস চলে গিয়ে মন প্রফুল্ল বোধ হবে। এই ঋতুতে সাদা পোশাক পরবেন না। বৃষ্টিতে ভিজে গেলে, সাদা পোশাক ট্রান্সপারেন্ট হয়ে পড়ে এবং সঙ্গে সহজে তাদের উপর জল, নোংরার দাগও পড়ে যায়।

 প্যান্ট এবং স্কার্ট:

লম্বা প্যান্ট পরবেন না কারণ এগুলি দ্রুত নোংরা হয়ে যায়। আপনি চাইলে এগুলো কে আপনার সুবিধা ও পরিবেশ অনুযায়ী নিচ থেকে গুটিয়ে নিতে পারেন। স্মার্ট ফর্মাল স্কার্ট এই মরশুমের জন্য দুর্দান্ত।

 কোট এবং জ্যাকেট:

বৃষ্টির কোট (Rain Coat) বা জ্যাকেটের সাথে আপনি Western পোশাক পরতে পারেন।

  ভারতীয় পোশাক:

আপনি যদি বর্ষাকালে ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় পোশাক পছন্দ করেন তবে সালোয়ার এবং পাতিয়ালার পরিবর্তে ছোটো কুর্তি সহ লেগিংস বা চুড়িদার ব্যবহার করে দেখুন। এই মরশুমে, বড়ো দোপাট্টাগুলি স্কার্ফ বা স্টোল দিয়ে রিপ্লেস করুন। বৃষ্টিতে এমন প্রিন্ট ও রঙের পোশাক পরবেন না, যা ভিজে গেলে রং ছেড়ে দেয়।

  জুতো স্লিপার:

এই ঋতুতে চামড়ার জুতো বা স্যান্ডেল পরবেন না কারণ এগুলি দ্রুত ভিজে যায় এবং শুকোতে অনেক সময় নেয়। জেলি জুতো, হিলবিহীন স্লিপার এবং জুতো এবং অন্যান্য শক্ত, স্যানডাক, রাবারের জুতো পরুন। বর্ষায় একের বেশি জুতো অবশ্যই সঙ্গে রাখুন। কখন রাস্তায় আপনার জুতো ভিজে গিয়ে ছিঁড়ে যেতেই পারে যে কোনও সময়৷ বর্ষায় প্লাস্টিক বা নন লেদার মেটিরিয়ালের জুতো পরুন। বর্ষা স্পেশাল বিভিন্ন স্টাইলের প্লাস্টিকের জুতো পেয়ে যাবেন ফুট থেকে ব্যান্ডেড শু-স্টোরে৷

 মেক-আপ:

ওয়াটার প্রুফ মাস্কারা এবং আই-লাইনার প্রয়োগ করুন। বর্ষাকালে ফাউন্ডেশন ব্যবহার করবেন না এবং যদি এটি প্রয়োগ করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয় তবে এটি হালকাভাবে প্রয়োগ করুন।

  চুল:

বর্ষাকালে বায়ুমণ্ডলে উপস্থিত আর্দ্রতা আপনার চুলের জন্য ক্ষতিকারক হতে পারে। বাইরে বেরোবার সময় চুলে খোঁপা বা বিনুনি করতে পারলে চুল ভালো থাকবে।

 ডেনিম:

বর্ষায় ডেনিমের ব্যবহার একেবারেই করবেন না। এগুলি শুকোতে অনেক সময় লাগে।

ছাতা:

পোশাকের সাথে ম্যাচিং করে ছাতা চয়ন করুন।

গর্ব ( শেষ পর্ব )

দেখতে দেখতে ক”টাদিন পার হয়ে গেল। এখানে আসার আগে রমেন্দু মনে মনে ধরেই নিয়েছিলেন তিনি এই শহরের একজন বিস্মৃত মানুষ। হয়তো সবাই তাঁকে ভুলেই গিয়েছে। কিন্তু এখানে আসার পর সেই ধারণা সম্পূর্ণ পালটে গেল। আশ্চর্য! এখনও বহু মানুষ তাঁকে মনে রেখেছে। এমনকী তাঁর ছেলেদের কৃতিত্বের কাহিনি পরবর্তী প্রজন্মের কচিকাঁচাদের উদাহরণ হিসেবে শোনানো হয়।

কথায় কথায় শিবতোষ বললেন, ‘তুই হলি গিয়ে গর্বিত পিতা। তোর দু’ছেলে যাকে বলে জুয়েল। ওরা দুইভাই যেসময় বোর্ডের পরীক্ষায় স্ট্যান্ড করে দেখিয়েছিল, সেটা নিঃসন্দেহে বিরল নজির। তোদের কথা এই ছোটো শহরের মানুষ কী করে ভুলবে বল? ওদের জন্য কত সন্মান এসেছিল এখানে। তোরা ভুলে গেলেও, তোদের কথা আমরা ভুলতে পারব না।’

শিবতোষের শেষটা মর্মে বিধল রমেন্দুর। এই পথ দিয়েই একদিন গন্তব্যের দিকে গিয়েছিলেন, সেই পথটাকে আজ ভুলে বসে আছেন! মাথা নত করে রইলেন বেশ কিছুটা সময়।

শিবতোষের ছোটো বউমা রিনিকেই সঙ্গী হিসেবে বেছে নিলেন রমেন্দু। রিনি বেশ উচ্ছ্বল, টুকির চেয়ে চালাকচতুরও বটে। বুনিয়াদপুর তার স্মৃতির কায়া পালটেছে, অঙ্গসজ্জা বেড়েছে অনেক। এখন মিউনিসিপ্যালিটি। বড়ো বড়ো দোকান গজিয়েছে। বিশ্বায়নের ধাক্কায় শপিং মল তৈরি হয়েছে দু’দুটো। তিনি যখন ছেড়ে যান তখন ‘মা কালী বস্ত্রালয়’ ছাড়া আর কোনও কাপড়ের দোকান ছিল না। ভালো কিছু কিনতে হলে যেতে হতো সদরে।

নতুন শপিং মল ‘ড্রেসিং বাজার’-এ ঢুকলেন রমেন্দু। সঙ্গে রিনি। শপিং জিনিসটা কোনও দিনই পছন্দের ছিল না রমেন্দুর। ওসব লতাই সামলেছে। মেয়েদের একটা সহজাত দক্ষতা থাকে ওই বিষয়ে৷ শপিং করতে পছন্দ করে না এমন মেয়ের সংখ্যা খুব কম। তবে রিনি বেশ পটু। রমেন্দু শুধু সাজেশন দিলেন, রিনি বেছে বেছে কিনে ফেলল সেসব। সব শেষে টাকার অঙ্কটা দেখে রিনি বলল— “আমাদের জন্য এত দামি দামি জিনিস কেনার কী দরকার ছিল কাকাবাবু?”

কার্ডে পেমেন্ট করে রমেন্দু বললেন, ‘টাকা আসবে যাবে আমি আর আসতে পারব কিনা কোনও গ্যারান্টি আছে? তোমাদের এটুকু দিতে পারলে আমার খুব ভালো লাগবে। ওসব কথা ছাড়ো, তোমার জন্য যে-শাড়িটা নিয়েছি সেটা একবার পরে দেখিও কিন্তু। আমি ছবি তুলে রাখব।’

রিনির চোখ দুটো আনন্দে ঝকঝক করে উঠল, “আমি আজকেই পরে দেখাব।”

সবার জন্যেই কিছু না কিছু নিয়েছেন রমেন্দু। ভাইয়েরা এটাকে লোক দেখানো প্রদর্শন মনে করলেও কিছু মনে করেননি। ওরা এখনও ভাবে, সাফল্যটা দাদার যেন বাঁধা লক্ষ্মী। এখনও সেই ভয়ংকর ঈর্ষা বয়ে চলেছে! ঈর্ষার জায়গায় যদি একটু অন্য ভাবে দেখত? একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। আপন মনেই স্বগতোক্তি করেন রমেন্দু — সাফল্য আর জয় এক জিনিস নয়। অথচ এরা সেটাকেই অমোঘ সত্য ধরে জীবনটাকে…।

আজ রাতে শিবতোষের বাড়িতে নেমন্তন্ন। এই নিয়ে দু’তিন দিন তো হয়েই গেল। আজকেরটা স্পেশাল কারণ কাল সকালের ট্রেনে কলকাতা ফিরে যাচ্ছেন রমেন্দু। মেয়েরা ভেতরে রান্নায় ব্যস্ত। বাইরের বারান্দায় ছেলেরা মাদুর বিছিয়ে গোল হয়ে বসেছে। চা আর মুড়ি সহযোগে আড্ডা জমে উঠেছে।

শিবতোষ বললেন, “একবার সময় করে ওদের সবাইকে নিয়ে আয়। খুব ভালো লাগবে।’

শিবতোষের বড়ো ছেলে শেখর বলল, ‘হ্যাঁ কাকাবাবু। রিটায়ার করেছেন আর তো কোনও টান নেই।”

রমেন্দু বললেন, “ওদের কথা বলতে পারি না, তবে আমি আসব। লতাকেও আনার চেষ্টা করব। আসলে, না আসতে আসতে এমন একটা দূরত্ব তৈরি হয়ে গিয়েছিল। এই আসা তো কিছুটা জোর করেই। কী মনে হল ভাবলাম জীবনের শেষ প্রান্তে এসে একবার জন্মভিটেটা দেখেই আসি। তাছাড়া এখন আমার হাতে অফুরন্ত সময়। ছেলেরা বিদেশে, শেষ কবে সবাই একসঙ্গে হয়েছি বলা মুশকিল। বাড়িতে তো দুটো প্রাণী, আমি আর লতা। লতা ওর ভাইয়ের বাড়ি গেল ধানবাদ, আমি ভাবলাম এই সুযোগে…

শিবতোষ বললেন— আমি যে কী খুশি হয়েছি বলে বোঝাতে পারব না। তোর ছেলেরাও এখানেই জন্মেছে, তবুও ওদের ফিলিংস একটু অন্যরকম হবেই। তাছাড়া পড়ুয়া ছেলেদের মাঠঘাট, বনবাদাড়ের স্মৃতি কম থাকে। ওদের লক্ষ্য সব সময় উঁচুতে ছিল। ক’জন আর ওরকম হতে পারে? কিন্তু তুই তো বনেবাদাড়ে ঘোরা ছেলে, তোর আমাদের সেইসব দিনের স্মৃতি মনে পড়ত না? অবশ্য ওদের পিছনে তোকে তো কম সময় দিতে হয়নি। সেদিক থেকে তুই সফল।

ভেতর থেকে বেরিয়ে এল রিনি। ডানহাতে জলের গেলাস বাঁ হাতে ওষুধ। শিবতোষের দিকে এগিয়ে ধরে বলল, “বাবা তোমার প্রেশারের ওষুধ। দিদি পাঠিয়ে দিল। ঝটপট খেয়ে নাও।’

বাধ্য ছেলের মতো খেয়ে নিল শিবতোষ। রিনি এবার রমেন্দুর দিকে তাকিয়ে বলল— দিদি বলল, আর একবার চা দেব কাকাবাবু? রান্না কমপ্লিট হতে কিছুটা সময় লাগবে।

—দেবে, তবে দাও। চা-তে আমার আপত্তি থাকে না, জেনে ফেলেছ দেখছি!

রিনি মিষ্টি হেসে চলে যাচ্ছিল, পিছু ডাকল শেখর— বাবার প্রেশারের ওষুধ আর ক’টা আছে টুকিকে একটু দেখে রাখতে বোলো তো রিনি, কাল সকালে এনে রাখব তাহলে।

রিনি মাথা নেড়ে চলে যেতেই শেখর রাজার দিকে তাকিয়ে বলল- মায়ের চশমাটা ঠিক করতে দিয়েছিলি, ওটা এনেছিস রাজা ?

রাজা বলল— গিয়েছিলাম। কিন্তু বিল্টুদা বলল, মায়ের পাওয়ার সম্ভবত বেড়েছে। কলকাতার ডাক্তার আসবে পরশু, তাকে একবার দেখিয়ে নিতে বলল। আমিও ভাবলাম সেটাই ভালো হবে। নাম লিখিয়ে দিয়েছি, পরশু রিনি দেখিয়ে আনুক মাকে। তারপরেই না হয় চশমা বানানো যাবে।

কবজি ডুবিয়ে খেলেন রমেন্দু। তারপর অনেক রাত পর্যন্ত চলল গল্প গুজব আর আড্ডা। জমাটি আড্ডা ছেড়ে কিছুতেই উঠতে ইচ্ছে করছিল না রমেন্দুর। কলকাতায় ফিরে আবার তো সেই একঘেয়ে জীবন। অবসরপ্রাপ্ত বুড়ো বুড়ির উপাখ্যান। প্রতিদিনের ছাঁচে ঢালা রুটিন। মর্নিং ওয়াক, বাজার, খবরের কাগজ, টিভি, মোবাইল – একটা যান্ত্রিক বৃত্ত!

শিবতোষই স্মরণ করিয়ে দিলেন- অনেক রাত হল রে, এবার শুয়ে পড়গে যা। তোকে আবার ভোরের ট্রেন ধরতে হবে।

হঠাৎ রমেন্দুর চোখ ছলছল করে উঠল। শিবতোষ অবাক হয়ে বললেন— কী হল রে?

রমেন্দুর গলা ভার। ‘আমার সব গর্ব চুরমার হয়ে গেছে রে শিবু! বহুকাল একটা অহংকার মনে বাসা বেঁধে ছিল। মনে মনে ভাবতাম, আমি সত্যি সত্যি এক গর্বিত পিতা। আমার সমকক্ষ হতে পারা সহজ কাজ নয়। এখন মনে হয় ওটা আমার পরাজয় ছাড়া আর কিছুই নয়। আমার বড়ো হওয়া সন্তানেরা হয়তো অনেক বড়ো বড়ো কাজ করবে কিন্তু কোনও দিন এসে মাকে বলবে না, চলো মা তোমাকে ডাক্তার দেখিয়ে আনি। পুত্রবধূরা কোনও দিন বলবে না, বাবা এই নিন আপনার প্রেশারের ওষুধ। এ বড়ো যে অনেক বড়ো রে শিবু, ধরাছোঁয়ার বাইরে।’

শিবতোষ অবাক হয়ে দেখলেন, রমেন্দুর মুখে চোখে সেই ঝলমলে দীপ্তি আর নেই। সেই জায়গায় শেষ বিকেলের অসীম শূন্যতা। কোনও উত্তর দেওয়ার মতো ভাষা খুঁজে পেলেন না শিবতোষ ।

 

ইতিহাসের কাছে মুর্শিদাবাদে (পর্ব ৪)

পলাশীর যুদ্ধে পরাজয়ের কিছুদিন পর রাজমহলে ধরা পড়েন সিরাজ গুপ্তচরের মাধ্যমে। ক্লাইভের সহায়তার মীরজাফর তখন বাংলার নবাব। মীর দাউদ ও মীরকাসেম খান দ্বারা বন্দি সিরাজকে নিয়ে আসা হয় মুর্শিদাবাদে। মীরজাফর পুত্র মীরণ, সিরাজের দেখাশুনার দায়িত্ব নিলেন। ওই রাতেই মীরণের নির্দেশে মহম্মদী বেগ বন্দি সিরাজকে হত্যা করে পলাশী চক্রান্তের বৃত্ত পূর্ণ করেন।

আমরা এবার পৌঁছোলাম মাটির নীচে অবস্থিত এক গোপন কক্ষে, যেখানে অবৈধ ব্যাবসার পরিকল্পনা করা হতো। জগৎ শেঠদের বাড়ি ১৯৮০ সালে মিউজিয়ামে পরিণত হয়। এখানে বিভিন্ন ঘরে সাজানো রয়েছে জগৎ শেঠ পরিবারের ছবি, পূর্বের ও তৎকালীন মুদ্রার সংগ্রহ, বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্র, বহুমূল্যের সব পোশাক এবং সোনা-রুপোয় খচিত অসাধারণ কয়েকটি বেনারসি শাড়ি। নিজস্ব তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হলেও এই মিউজিয়াম রাজ্যের অন্যতম সংরক্ষিত স্মারক। চমকপ্রদ ইতিহাসকে মনে রেখে অটোতে এসে বসলাম।

কয়েক মিনিট পরে অটো এসে থামল নসিপুর রাজবাড়ির সামনে। প্রথম দর্শনেই রাজবাড়ির সঙ্গে বিখ্যাত হাজারদুয়ারি প্যালেসের সাদৃশ্য খুঁজে পেলাম। ব্রিটিশ আমলের কর সংগ্রাহক দেবি সিং-এর ভাইপো রাজা উদ্বন্ত সিংহ এবং তাঁর ছেলে রাজা কীর্তিচন্দ্র সিংহ দ্বারা তৈরি এই প্রাসাদের সম্মুখ অংশে গ্রীক ও রোমান স্থাপত্যরীতির মিল পাওয়া যায়।

এরপর গেলাম জাফরাগঞ্জে ‘১১০০ কবর স্থান’-এর কাছে। এই সমাধিক্ষেত্র মীরজাফর বংশের পারিবারিক কবর স্থান, যেখানে নাকি ১১০০টি কবর রয়েছে। মাথাপিছু ১০ টাকা মূল্যের টিকিট কেটে আমরা প্রবেশ করলাম কবরস্থানে। পাঁচিলে ঘেরা অনেকটা জায়গা জুড়ে সারিবদ্ধ কবরগুলি। মীরজাফরের কবর ছাড়াও তাঁর পিতা, দুই বিধবা পত্নী, আলিবর্দী খাঁর বোনের কবরও রয়েছে এই সমাধি ক্ষেত্রে। মীরজাফরের বড়ো পুত্র মীরণ এবং মীরকাশিম ছাড়া ওই বংশের সব নবাব ও নাজিমদের কবর সংরক্ষিত আছে সেখানে। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য স্থান খোসবাগ।

প্রায় ১৫ মিনিট অটো চেপে এসে পৌঁছোলাম ভাগিরথীর পূর্ব তীরে অবস্থিত লালবাগের অন্তর্গত জিয়াগঞ্জ এলাকায় খোসবাগের অবস্থান। অটো থেকে নেমে মাথাপিছু ২০ টাকার টিকিট কিনে বিশাল এক বার্জ-এ চড়ে পৌঁছে গেলাম নদীর পশ্চিম পাড়ে। বার্জ থেকে নেমে, একটু হেঁটে এসে বসলাম অটোয়। খোসবাগের পথে একটু এগোতেই বাঁ দিকে রাস্তা চলে গেছে হীরাঝিল ও সিরাজদৌল্লার মনসুরগঞ্জ প্রাসাদের দিকে। মাত্র ৬-৭ মিনিট পরেই পৌঁছে গেলাম খোসবাগে, নবাব আলিবর্দী খাঁ এবং তাঁর দৌহিত্র তথা বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব, সিরাজদৌল্লার সমাধিস্থলের প্রবেশদ্বারে।

খোসবাগে এসে মনে হচ্ছে, পাঠকদের নবাব আলিবর্দী খাঁর রাজত্বকালের কয়েকটি কথা না জানালে এই লেখা অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে। নবাব মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তাঁর জামাতা নবাব সুজাউদ্দিনের বেগম জিন্নতউন্নেসা মনস্থির করেছিলেন আলিবর্দী খাঁকে বিহারের ছোটো নবাব করার। সরফরাজ রয়ে গেলেন বাংলার দেওয়ান। আলিবর্দী খাঁ বিহারের ছোটো নবাব হওয়ার কিছুদিন আগে তাঁর কনিষ্ঠ কন্যা আমিনা বেগমের এক পুত্র সন্তান হয়। আলিবর্দী প্রিয় দৌহিত্রের নাম রাখলেন মির্জা মহম্মদ যিনি পরবর্তী কালের নবাব সিরাজদৌল্লা।

সুজাউদ্দিনের মৃত্যুর পর নবাব হলেন তাঁর অপদার্থ পুত্র সরফরাজ। বিভিন্ন কারণে তাঁর সঙ্গে মতবিরোধ শুরু হল অমাত্য হাজি আহম্মদ, দেওয়ান আলমচাঁদ এবং ব্যাঙ্কার জগৎ শেঠ ফতেচাঁদের। একই বছরে দ্বিতীয়বার রাজস্ব প্রদান নিয়ে নবাব সরফরাজের সঙ্গে মতবিরোধ হল দিল্লির দুর্বল সম্রাট মহম্মদ শাহের। সরফরাজ দ্বারা অপমানিত হাজি আহম্মদ সেই সুযোগে ভাই আলিবর্দী, আলমচাঁদ ও জগৎ শেঠের সঙ্গে যুক্তি করলেন। তাঁরা সম্রাটকে দিলেন উৎকোচ এবং সেই বছরেই রাজস্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি এবং তার বিনিময়ে চাইলেন বাংলা, বিহার ও ওড়িশার নবাবি। মহম্মদ শাহ রাজি হলেন। ইতিমধ্যে সরফরাজের ছাঁটাই করা সৈন্যরা গোপনে যোগ দিলেন আলিবর্দীর সৈন্যবাহিনীতে। আলিবর্দী যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করলেন নবাব সরফরাজের বিরুদ্ধে। দূত মাধ্যমে খবর পৌঁছোল নবাবের কাছে। স্তম্ভিত সরফরাজ বাধ্য হয়ে আলিবর্দীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা স্থির করলেন। ভাগিরথীর তীরে গিরিয়া নামক স্থানে দুই পক্ষের সৈন্যবাহিনী মুখোমুখি হল। দুই পক্ষের দূতের মাধ্যমেও সন্ধির চেষ্টা ব্যর্থ হল। তিনদিক দিয়ে ঘিরে ফেলা হল সরফরাজের সৈন্যদলকে। যুদ্ধক্ষেত্রে বীরের মতো মৃত্যু হল মুর্শিদকুলির দৌহিত্র নবাব সরফরাজের। মুর্শিদাবাদে তাঁর মৃতদেহের সমাধি দেওয়া হয়। অবসান হল মুর্শিদকুলি বংশের যুগ। আলিবর্দী বসলেন মুর্শিদাবাদের মনসদে।

গর্ব (পর্ব ১)

বহুদিন পর নিজের জন্মস্থানের মাটিতে পা রাখলেন রমেন্দু সমাজপতি। মনে মনে হিসেব করে দেখলেন তা প্রায় কুড়ি বছর তো হল বটেই! বড়ো ছেলে রঞ্জন মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক দুটোতেই অসাধারণ রেজাল্ট করে আইআইটি-তে খুব সহজেই চান্স পেয়ে গিয়েছিল।

ছোটো ছেলে রাহুলও দাদার মতো দুর্দান্ত রেজাল্ট করে যাচ্ছিল। এইসময় রমেন্দুর ট্রান্সফার অর্ডার এল কলকাতায়। ওদের পড়াশোনোর কথা চিন্তা করে রমেন্দু কলকাতায় একটা ফ্ল্যাটও কিনে ফেললেন। এরপর হঠাৎ করেই পর পর দু’বছরের মধ্যে বাবা মা দু’জনেই গত হলেন।

সম্পত্তির ভাগ বাঁটোয়ারা নিয়ে অহেতুক কিছু বিবাদ তৈরি হল পরিবারে। রমেন্দু দেখলেন, কলকাতাতেই যখন তাঁর সবকিছু তখন দেশের বাড়ি ঘরদোর রেখে লাভ কী? ভাগের সম্পত্তি বিক্রি করে দিলেন। শিকড়টা ছিঁড়ে গেল চিরদিনের মতো।

সবকিছু বিক্রি করার যে খুব ইচ্ছে ছিল তা নয়, কিছুটা অভিমানেই অমনটা করেছিলেন রমেন্দু। বাবা মারা যেতেই ভাইয়েরা সম্পত্তির ভাগ নিয়ে এমন শুরু করে দিল যে, রমেন্দুর মন একদম ভেঙে গিয়েছিল। রাতারাতি ডিসিশন নিয়ে ফেললেন, আর এখানে কোনও দিন আসবেন না, ওদের মুখ দর্শনও করবেন না। যে-ব্যবহারটা ভাইয়েরা করেছিল তাতে ভবিষ্যতে ওদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার ইচ্ছেটাই মরে গিয়েছিল। জ্যাঠতুতো ভাই তিনুর কাছে রমেন্দু প্রায় অর্ধেক দামে বিক্রি করে দিয়েছিলেন নিজের অংশ।

বাড়ির সামনের কৃষ্ণচূড়া গাছটি আর নেই। ওরা কেটে ফেলেছে, কিংবা একা একাই মরে গিয়েছে। তিনু তিনতলা বাড়ি হাঁকিয়েছে। নীচে ওপরে ভাড়া, মাঝের তলায় তারা থাকে। তিনু এখন বেশ বড়োলোক। অঢেল টাকার মালিক।

অভিমান ভুলে ছোটো ভাই রাখালের বাড়িতেই উঠেছেন রমেন্দু। সম্পত্তি নিয়ে সবচেয়ে বেশি গোলমাল পাকিয়েছিল রাখালই। এখন বিশেষ ভালো নেই রাখাল। একটা কিডনি ড্যামেজ। ছেলে মেয়ে দুটো একেবারেই মানুষ হয়নি। কোনওরকমে চলছে তার।

ভাইদের জন্য নয়, জন্মভূমি আর বাল্যবন্ধু শিবতোষের টানেই এসেছেন রমেন্দু। শিবতোষের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ আছে। শিবতোষ সুযোগ পেলেই বলে, একবার এসে ঘুরে যা। কাদের ওপর অভিমান করছিস? কত পালটে গেছে আমাদের জন্মভূমি, একবার দেখতে ইচ্ছে করে না তোর?

রিটায়ার করার পর রমেন্দুর মনে হয়েছে, জীবনের মেয়াদ ফুরিয়ে আসছে। সত্যি তো, কার ওপর অভিমান করছে সে! উপলব্ধির দরজা কখন যে খুলে যায়!

বুনিয়াদপুরের মাটিতে পা রেখেই মনে মনে হেসেছিলেন রমেন্দু। শিবতোষের কথাটা ডাহা ভুল। মায়ের শরীরের গন্ধটা কুড়ি বছর পরেও একইরকম অমলিন। মায়ের শরীরের গন্ধ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পারফিউম এবং সেটা যে-কখনও মুছে যায় না, বুঝতেই পারেননি শিবতোষ।

—অবশেষে এলি তাহলে!

অনেকটা বুড়িয়ে গেলেও শিবতোষের হাসিটা একইরকম ঝকঝকে। কতকাল পরে সামনাসামনি দেখা! ক্র্যাচে ভর দিয়ে চলতে হয় শিবতোষকে। একটা অ্যাক্সিডেন্টে বাঁ-পা কাটা পড়েছে। রমেন্দু তখন চেন্নাই, খবরটা পেলেও আসা হয়নি। শিবতোষদের বাড়িটা একসময় টিনের ছিল। টিনের দেয়াল, টিনের চাল, মেঝেটা পাকা। বৃষ্টির সময় টিনের চালে অদ্ভুত সুন্দর একটা মিউজিক তৈরি হতো। এখন সবকিছু পাকা। তবে তেমন শৌখিনতার ছাপ নেই, নেহাতই আটপৌরে।

—ভালো আছিস তো সবাই? ভেলভেটের গদি আঁটা একটা কাঠের চেয়ারে বসতে বসতে বললেন রমেন্দু।

বছর বাইশ তেইশের ভারি মিষ্টি মুখের একটা মেয়ে জলের গেলাস হাতে নিয়ে সামনে এসে দাঁড়াল। হাতে শাঁখা-পলা, সিঁথিতে সিঁদুর।

শিবতোষ বললেন, “আমার ছোটো বউমা। গতবছর বিয়ে হয়েছে ওদের। তোকে কিন্তু চিঠি পাঠিয়েছিলাম।’

রমেন্দু সে কথার জবাব না দিয়ে বললেন, “তোর ছোটো ছেলে এখন কী করছে? কী যেন নাম ওর?’

—রাজা। ভালো নাম রণতোষ। বিএসসি পাশ করার পর কিছুদিন বসেছিল। চেষ্টা চরিত্র করে একটা প্রাইমারি স্কুলে ঢুকিয়ে দিয়েছি। চাকরি করে, সঙ্গে টিউশনিও করে, সব মিলিয়ে ভালোই আয় করে। বড়ো ছেলে শেখর বাজারে বইখাতার দোকান করেছে।

রমেন্দু, রাজার বউয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার নাম কী মা?”

—রিনি।

রিনি পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল। রমেন্দু মনে মনে ভাবলেন, আগে জানলে কিছু একটা উপহার আনতে পারতেন। কিন্তু সেটা যখন হয়নি তখন এখান থেকেই কিছু একটা কিনে দেবেন। প্রথম দেখাতেই মেয়েটাকে ভালো লেগে গিয়েছে তাঁর। কী সুন্দর প্রতিমা প্রতিমা গড়ন! টানা টানা চোখে অদ্ভুত এক মায়া মেশানো।

রিনি হেসে বলল, “বাবার মুখে আপনার কথা অনেক শুনেছি। বাবা তো আপনাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। আপনাদের কথা উঠলে আর থামতেই চায় না।’

—তাই? কী কী বলে তোমার শ্বশুর? হাসলেন রমেন্দু।

—সে অনেক কথা। আপনি কত্তবড়ো চাকরি করতেন। আপনার এক ছেলে ইঞ্জিনিয়র, এক ছেলে ডাক্তার— দু’জনেই বিদেশে থাকে। আরও কত্ত কী। একটা কথা জিজ্ঞেস করব কাকাবাবু? না মানে আমার কৌতূহল আর কি…।

রমেন্দু অবাক হয়ে বললেন, ‘কী?’

—শুনেছি আপনার বড়ো ছেলের বউ বিদেশিনি, মেমসাহেব। আপনারা ওর সঙ্গে কোন ভাষায় কথা বলেন? ইংরেজিতে? হো হো করে হেসে উঠলেন রমেন্দু। প্রাণখোলা হাসি। মনে হল বহুদিন পর যেন অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে একটা বিশুদ্ধ হাসি উঠে এল। রিনি কিছুটা অপ্রস্তুত, মুখে বোকা হাসি!

—না না মা, তোমার কৌতূহল যুক্তিসঙ্গত। আমার বিদেশিনি বউমা বাংলার ‘ব’ও বোঝে না। ইংরেজিতেই কথা হয়। তবে এবার দেখলাম দু’চারটে বাংলা শব্দ শিখেছে সে। সবমিলিয়ে ভাব বিনিময় ঠিক হয়ে যায়। ওরা যখন আসে ক’টাদিন খুব মজা হয়। মারিয়া মানে আমার পুত্রবধূটি বেশ মিশুকেও বটে।

শিবতোষের বড়ো বউমা প্লেট ভর্তি করে মিষ্টি নিয়ে এসেছে। প্রণাম পর্ব সে আগেই সেরে নিয়েছিল। টুল টেনে প্লেটটা রাখতে রাখতে বলল, “আপনার বউমার কথা শুনেই খুব দেখতে ইচ্ছে করছে কাকাবাবু। অবশ্য দেখা হলে আমরা দেখা ছাড়া আর কিছুই করতে পারব না। কী কথা বলব? আমাদের ইংরেজি শুনলে সে নিজের মাতৃভাষাই ভুলে যাবে, এটা নিশ্চিত করে বলতে পারি। তবুও দেখতে ইচ্ছে করছে।’

রিনি বলল, ‘আমারও। মেমবউ তো জীবনে কোনও দিন দেখিনি।’

—বেশ বেশ, সুযোগ পেলে একবার নিশ্চয়ই দেখাব তোমাদের। কিন্তু এত মিষ্টি কে খাবে? আমার যে সুগার।

শিবতোষের বড়ো বউমার নাম ইন্দ্রাণী। সবাই টুকি বলেই ডাকে। দেখতে শুনতে অতি সাদামাটা। পড়াশোনোর গণ্ডিও যৎসামান্য। তবে ভীষণ আন্তরিক আর দায়িত্বশীলা। রমেন্দু এসে অবধি দেখছেন, পরিবারের প্রতিটি সদস্যের প্রয়োজন- অপ্রয়োজনের খবর রাখে মেয়েটা। যথাসাধ্য সেসব পূরণও করার চেষ্টা করে। তার সঙ্গে সঙ্গে সংসারের কাজকর্ম করে চলেছে দিব্যি।

ক্রমশ…

ইতিহাসের কাছে মুর্শিদাবাদে (পর্ব ৩)

ইতিহাস থেকে আবার বর্তমানে ফিরি। কাটরা মসজিদে বেশ কিছুটা সময় কাটিয়ে উঠে বসি অটোয়। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য কাঠগোলা বাগান। বহুরকম গাছপালায় ভরা প্রায় সীমাহীন বাগানের মাঝে অবস্থিত কয়েকটি প্রাসাদ তৈরি হয়েছিল, মুখ্যত নবাবের ইউরোপিয়ান ও মুসলিম অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য। প্রাসাদ তৈরির আগে এই অঞ্চলে ছিল কাঠের গোলা বা ভাণ্ডার, তাই জায়গাটির নাম কাঠগোলা। মাথাপিছু ৩০ টাকা প্রবেশমূল্য কেটে ঢুকতে হল বাগানে। প্রাসাদের সুড়ঙ্গপথ, নাচমহল এবং কয়েকটি অসাধারণ অয়েল পেন্টিং-এর সমাহার অবাক করে দিল আমাদের। আরও কিছুটা এগিয়ে একটি জৈন মন্দির, সেখানে আদিনাথ (মতান্তরে পরেশনাথ)-এর সুন্দর একটি পাথরের মূর্তি প্রতিষ্ঠিত। এছাড়া এখানে একটি চিড়িয়াখানা রয়েছে, যেটা আমরা না দেখে অটোতে চেপে এগিয়ে চললাম জগৎ শেঠ-এর বাড়ির উদ্দেশে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই নসিপুর এলাকায় অবস্থিত জগৎ শেঠ-এর সুদৃশ্য বাড়ির কাছে এসে পৌঁছোলাম। একে প্রাসাদ বললেও অত্যুক্তি হয় না, যা আজ এক মিউজিয়ামে পরিণত। এখানে মাথা পিছু ২০ টাকার টিকিট কিনে একজন গাইড নিলাম মাত্র ৫০ টাকায়। অল্পবয়সি গাইড আমাদের সঙ্গে নিয়ে জগৎ শেঠ বংশের বাড়ি তথা মিউজিয়াম ঘুরিয়ে দেখাতে লাগল। নবাবশাসিত তৎকালীন বাংলার ছবি ক্রমশ দৃশ্যমান হতে লাগল মিউজিয়ামে রক্ষিত বিভিন্ন জিনিসপত্রের মাধ্যমে। বুঝতে পারলাম, ইতিহাস আবার আমাকে কাছে ডাকছে।

মিউজিয়ামে দাঁড়িয়ে প্রথমেই পাঠকদের জানাতে চাই যে, জগৎ শেঠ কোনও এক ব্যক্তি বিশেষের নাম নয়, বরং নবাবি বাংলা তথা মুর্শিদাবাদের এক ধনী, ব্যবসায়ী পরিবার তথা বংশের নাম। ‘জগৎ শেঠ’ শব্দ দুটির অর্থ ‘জগতের ব্যবসায়ী তথা মহাজন’। ইতিহাস জানায় ওই বিশেষ বাড়িটির প্রতিষ্ঠাতা হিরানন্দ শাহ, যিনি রাজস্থানের নাগর থেকে পাটনায় আসেন ১৬৫২ সালে। তাঁর উত্তরসূরি মানিক চাঁদ ১৭০৭ সালে প্রিন্স ফারুকশিয়ারকে আর্থিক দানের মাধ্যমে মুঘল সম্রাট হতে সাহায্য করেন। প্রতিদানে সম্রাট ফারুকশিয়ার ওই পরিবারের প্রধান মানিক চাঁদকে ‘জগৎ শেঠ’ উপাধি প্রদান করেন। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়ার সরকারি ঐতিহাসিক রোবেন ওরমে জগৎ শেঠকে তৎকালীন পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যবসায়ী তথা মহাজন হিসেবে বর্ণনা করেন। জগৎ শেঠ পরিবার সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত দেশের সবচেয়ে বড়ো ব্যাংকিং হাউস ছিল। ১৭৫০ সালে তাঁদের সম্পত্তির পরিমাণ ছিল প্রায় ১৪ কোটি টাকা।

মিউজিয়ামে ঘুরতে ঘুরতে গাইডের থেকে আরও জানলাম, পরবর্তী জগৎ শেঠ-রা ছিলেন যথাক্রমে ফতে চাঁদ, মেহতাব চাঁদ এবং মহারাজ স্বরূপ চাঁদ। নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ জগৎ শেঠ পরিবারের জমা পুঁজির সাহায্যে দিল্লির মুঘল সম্রাটকে বার্ষিক রাজস্ব মিটিয়েছিলেন। পরে আলিবর্দী খাঁ জগৎ শেঠের পরামর্শ ও আর্থিক সাহায্যে সামরিক বিদ্রোহ ঘটিয়ে বাংলার নবাব হয়েছিলেন। ঐতিহাসিক উইলিয়াম ডারিম্পল-এর মতে, অসীম প্রতিপত্তিশালী জগৎ শেঠরা বাংলায় শাসক সহ যে-কারুর উত্থান বা পতন ঘটাতে পারতেন।

মিউজিয়ামের গোপন সুড়ঙ্গ পথ দিয়ে হাঁটার সময় মনে পড়ল, বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা জগৎ শেঠের কাছে তিন কোটি টাকার আর্থিক অনুদান চেয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন। ক্রোধে উন্মত্ত নবাব সিরাজ জগৎ শেঠকে আঘাত করেন। অপমানিত জগৎ শেঠ পরে অন্যান্য বিচ্ছিন্নতাবাদীদের (মীরজাফর, কৃষ্ণচন্দ্র রায়, উমিচাঁদ ও রায় দুর্লভ) সঙ্গে নিয়ে রবার্ট ক্লাইভ- এর মাধ্যমে পলাশীর যুদ্ধে সিরাজের পতনে সাহায্য করেন। সেখান থেকেই শুরু হয় হতভাগ্য সিরাজের করুণ সমাপ্তির।

কিডনিতে পাথরের সমস্যা নিয়ে আমার স্বামী কষ্ট পাচ্ছেন

আমার স্বামীর বয়স ৪৮ বছর। ওনার ডান কিডনিতে পাথর হয়েছে। আল্ট্রাসাউন্ড রিপোর্ট দেখে ডাক্তার জানিয়েছেন, পাথরের আকার ৫.৫ মিলিমিটার। এও বলেছেন, পাথর নিজে থেকেই বেরিয়ে যেতে পারে। তবে স্বামীকে রোজ ২-৩ লিটার জল এবং অন্যান্য তরল কিছু খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। কুলমি-র পাহাড়ি ডাল যেটার চলতি নাম ‘হর্স গ্রাম’, সেটি খেতে বলেছেন এবং ব্যথা হলে ওষুধ খেলেই হবে বলেছেন। কিন্তু আমার মনের সংশয় দূর হচ্ছে না। খালি মনে হচ্ছে এতে কিডনি খারাপ হয়ে যাবে না তো? Kidney Stone কি নিজে থেকে বেরিয়ে যাওয়া সম্ভব? সার্জারি করানোটা কি ভালো বিকল্প নয়?

ডাক্তার আপনাদের সঠিক পরামর্শই দিয়েছেন। বহু ক্ষেত্রেই দেখা যায় কিডনির পাথর নিজে থেকেই নীচের দিকে নেমে আসে এবং ইউরিনের সঙ্গে নিজে থেকেই বেরিয়ে যায়। কিন্তু একটা জিনিস মনে রাখা ভালো পাথরের আকার যদি ৭ মিলিমিটার থেকে ছোটো হয়, বাইরের পরত খুব মসৃণ হয়, পাথরটি যদি ট্রিপল ফসফেট দ্বারা তৈরি হয়, অক্সালেট দ্বারা নয় এবং ব্যক্তির মূত্র নিকাশি তন্ত্রে যদি কোনওরকম বাধা না থাকে তাহলে মূত্রের সঙ্গে Kidney Stone বেরিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে ৯০ শতাংশ। যদি পাথরটি আকারে ধীরে ধীরে বড়ো হতে থাকে তাহলে বেরিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও কমতে থাকে।

আপনার স্বামীর ক্ষেত্রে পাথরের আকার বাড়েনি সুতরাং কিডনির ফাংশনে কোনও বাধা হচ্ছে না এবং অন্য কোনও সমস্যাও তৈরি হয়নি। মাঝে মাঝেই আল্ট্রাসাউন্ড করিয়ে নজর রাখতে থাকুন। মূত্রত্যাগের সময় যদি জ্বালা করে বা ঠান্ডা লেগে প্রচণ্ড জ্বর আসে তাহলে বুঝতে হবে মূত্রনালিতে সংক্রমণ হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তার দেখিয়ে ওষুধ শুরু করা খুবই জরুরি। কিডনি স্টোন অপারেশন খুব ছোটো অপারেশন নয়। সুতরাং আগে চিকিৎসা করিয়ে চেষ্টা করুন তারপর না হয় অপারেশনের কথা চিন্তা করবেন।

বিগত কয়েক বছর ধরে কোনওরকম কাটাছেঁড়া না করেই শক ওয়েভ লিথোট্রিক্স পদ্ধতির মাধ্যমে বিশেষ মেশিন দ্বারা শরীরের বাইরে থেকেই Kidney Stone-এর উপর উচ্চশক্তির লেজার-রে ফেলে পাথরটিকে বহু ছোটো ছোটো টুকরোয় ভেঙে ফেলতে ডাক্তাররা সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু কোনও পদ্ধতিই একশো শতাংশ সুরক্ষিত নয় যে, সেটার কথা সবার আগে ভাবা যেতে পারে। সুতরাং এটাই বাঞ্ছনীয়— আপনারা ডাক্তারের পরামর্শ মতোই চলুন এবং অত্যধিক চিন্তা করার কোনও আবশ্যকতা নেই।

 

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব