আড্ডাঘরের আমেজ

একসময় আড্ডাপ্রিয় বাঙালির বড়ো সাধের জায়গা ছিল তার বৈঠকখানা বা আড্ডাঘর৷ অভ্যাগতদের ভিতরমহলে যাওয়ার প্রয়োজন যাতে না পড়ে এবং বাড়ির মহিলাদের যাতে আব্রু রক্ষা হয়, তাই বাড়ির কর্তারা বন্ধু বান্ধবদের জন্য বসার ঘরে ফরাস পেতে আড্ডার আয়োজন করতেন৷

এখন সেই কনসেপ্ট বদলে গেছে৷দিন দিন ব্যস্ত শহরে ফ্ল্যাটের ঘরগুলো ছোটো হচ্ছে।এখন নামমাত্র লিভিংরুমই ভরসা৷ বিশেষ করে অতিথিদের জন্য এ রুম ছাড়া বিকল্প নেই বললেই চলে। আবার পরিবারের সবাই মিলে টিভি দেখা, আড্ডা, বই পড়া, বাইরে থেকে এসে বিশ্রামের জন্য এ ঘরেই সময় কাটিয়ে থাকেন। তাই এ ঘরের সাজ হওয়া চাই একটু আরামদায়ক ও রুচিশীল৷।

ঘর সাজানোর কথা ভাবলে প্রথমেই সবার মাথায় আসে বসার ঘর কিংবা লিভিংরুম।ফলে ঘরের সাজের শুরুটা করতে পারেন বর্ণিল নান্দনিক নকশার কার্পেট কিংবা শতরঞ্জি দিয়ে। বাজারে দুই ধরনের কার্পেট রয়েছে- একটি পিস কার্পেট, অন্যটি ওয়াল টু ওয়াল কার্পেট। মূলত পিস কার্পেট গৃহের জন্য ব্যবহৃত হয়ে থাকে। নান্দনিক বাহারি রঙ ও কারুকার্য করা দরি কিংবা কার্পেট, দুই-ই ঘরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করবে। আপনার সুবিধামতো বিভিন্ন পিসের কার্পেট কিনতে পারবেন ১ হাজার ৮০০ থেকে ১২ হাজার টাকায়।

আপনার ঘরের স্পেস অনুযায়ী আসবাবপত্র বাছাই করা শ্রেয়। যেমন- আপনার লিভিংরুম যদি একটু বড়ো হয়, তা হলে একপাশে উঁচু সোফা ব্যবহার করতে পারেন এবং অন্যপাশে মেঝেতে ফোম বিছিয়ে নানা ছোটো-বড়ো কুশন রাখতে পারেন। তা আপনার লিভিংরুমকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলবে।

তবে খেয়াল রাখুন বয়স্ক ব্যক্তিরা যেন আরামে বসতে পারেন। নিচু জায়গায় তাদের সমস্যা হতে পারে। তাই বসার জন্য পরিবারের সদস্যদের শারীরিক অবস্থা খেয়াল রেখে উঁচু-নিচু দুটি অপশনই রাখতে পারেন।

একটা টি টেবল অবশ্যই রাখুন৷ অতিথি আপ্যায়নে কাজে লাগবে৷ সোফার সঙ্গে সংযুক্ত কর্নার টেবিলের ওপর ফুল বা কৃত্রিম ক্যান্ডেলের সুবাস আপনার ঘরকে মায়াময় করে তুলবে।

লিভিংরুমের দরজা-জানালা থাকলে ভারী পর্দা ব্যবহার করতে পারেন। এতে গ্রীষ্মের রোদ আর শীতের কনকনে হাওয়া থেকে রেহাই পাবেন। তবে পর্দা কিংবা আসবাবপত্রের ক্ষেত্রে রুচি অনুযায়ী রং বাছাই করতে হবে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে- লাল, সবুজ, হলুদ, নীলের সঙ্গে হালকা বাদামি রঙের কম্বিনেশন বসার ঘরে মানুষের মধ্যে আড্ডার আমেজ তৈরি করে। তাই আপনি চাইলে এ ধরনের নান্দনিক রং ব্যবহার করতে পারেন। লিভিংরুমে ওপরের অংশে বিভিন্ন পেইন্টিং, ক্যানভাস, ফ্যামিলি ফটোফ্রেম রাখতে পারেন। সফ্ট টয়, ম্যাগাজিন এবং কিছু তাজা ফুল অবশ্যই মন ভালো করে দেবে সবার৷

হনন (শেষ পর্ব)

শেষ পর্ব

শ্রীর সঙ্গে প্রতি পদে পদে ঝগড়া ও আপস করে করে ধুঁকতে ধুঁকতে জীবন কাটতে থাকে বিতানের। শ্রীর জন্য দামি দামি শাড়ি, গয়না, দামি কসমেটিক, পারফিউমের জোগান দিতে দিতে কখনও কখনও তার পকেটের অবস্থা শোচনীয় হয়ে যায়। সমতা রক্ষা করতে পারে না অনেক সময়। সহ্য করতে না পেরে একদিন ফোন করে ফেলল শ্বশুরমশাইকে।

—নিজের লুকস আর আমাকে ঘিরে শ্রীর অবসেশন যে রোগের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। প্লিজ কিছু করুন, বাবা।

—না না, বাবা। মা মরা মেয়ে তো। আদরে আদরে মানুষ। একটু জেদি হয়ে গেছে। তুমি ওকে একটু সামলে রেখো। চিন্তা কোরো না সব ঠিক হয়ে যাবে একদিন।

ফোনের ও প্রান্তে কাঁদতে থাকেন পঁয়ষট্টি বছরের বৃদ্ধ। মুখে আর কোনও কথা সরে না বিতানের। বাড়িতে মাকে কিছু বললে মা-ও সেই একই কথা বলে, ‘ঠিক হয়ে যাবে।’ বন্ধু আবারও বলে, ‘এ যুগের মেয়ে। মানিয়ে নিতে হবে রে, ভাই। তোকে খুব ভালোবাসে। চোখে হারায়। ভালোই তো।’

ভালো আর কিছুতেই হয় না বিতানের জীবনে। এভাবেই চলতে থাকে প্রতিটা দিন। ভিতরে ভিতরে ক্ষয়ে যেতে থাকে সে। নিজেকে যেন শ্রীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না। রাতে ঘুমের মধ্যেও শ্রীর এই ভয়ানক অবসেশন তাড়া করে ফেরে তাকে! নিজের জীবনটা যেন আঁজলা গলে বেরিয়ে যেতে থাকে ধীরে ধীরে।

এই করতে করতে প্রথম বিবাহবার্ষিকী এগিয়ে আসে বিতান আর শ্রীদর্শিনীর। খুব ধুমধাম করে উদযাপন করবার পরিকল্পনা নেয় তারা। আত্মীয়, বন্ধু-বান্ধবকে নিমন্ত্রণ করবার লিস্ট তৈরি হয়। কিন্তু লিস্ট দেখে প্রথমেই বাদ সাধে শ্রী, ‘তোমার মায়ের বান্ধবী রঞ্জনামাসিকে নিমন্ত্রণ করা যাবে না। ওঁর মেয়ে রনিতা খুব সুন্দরী, না? তোমার সঙ্গে তো ওর বিয়ের কথা হয়েছিল, অ্যাম আই রাইট? পুরোনো প্রেম চাগাড় দিক আর কি! আর তোমার অফিসের ওই দুই সুন্দরী মৃদুলা আর সেবন্তীও বাদ কিন্তু…’

—শোনো না, আমার কিন্তু অ্যানিভার্সারির গিফটে হিরের দুল চাই। হঠাৎ একেবারে প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে আদুরে গলায় বলে ওঠে শ্রী। প্রথম অ্যানিভার্সারিতে শ্রীকে সোনার কোনও গয়না দেবে ভেবে রেখেছিল বিতান। হিরের গয়নার কথা ঠিক ভাবেনি। এটা তার বাজেটের বাইরে।

রঞ্জনামাসিকে নিমন্ত্রণ লিস্ট থেকে বাদ দেওয়ায় বিতান বোঝে মায়ের মনটা খারাপ হয়ে গেছে। কিন্তু বউমাকে খুশি করতে মুখ ফুটে মা কিছুই বলে না। বিতান শ্রীর মতের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গেলে সে না খেয়েদেয়ে কান্নাকাটি করে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকে। সেই রাতেই ব্লেড দিয়ে হাত কেটে সে ভয়ানক এক হুলস্থুল কাণ্ড বাঁধাল। শেষপর্যন্ত শ্রীর সব কথাই তাদের মেনে নিতে বাধ্য হতে হল। ধুঁকতে ধুঁকতে বাঁচতে থাকে বিতান। মাঝে মাঝেই নিজেকে শেষ করে দেবার আগুনে-ইচ্ছে জেগে ওঠে তার মনে!

অনুষ্ঠানের দিন কয়েক আগে শ্রীর আবদারে অফিস থেকে ছুটি নেয় বিতান। শপিং-এ যাবে সে। দুপুরের ঠিক আগে আগে দু’জনে বেরিয়ে যায়। উদ্দেশ্য শপিং করে বাইরে কোথাও লাঞ্চ সেরে একেবারে বাড়িতে ফিরবে। পাঁচতলা বিখ্যাত বস্ত্রবিপনি সংস্থায় ঢোকে তারা। দোকানের মালিক বিতানের বাবার আমল থেকে পরিচিত। সাদরে অভ্যর্থনা জানায় তাদের। নিজের আর বিতানের পোশাক পছন্দ করতে শুরু করে শ্রী।

নিজের জন্য তুলে নেয় মটকা সিল্কের হাত বাটিক, র’তসরের ব্লক প্রিন্ট, স্ট্রাইপড কাতান, বিষ্ণুপুরী সিল্কের ওপর অ্যাসিড পেইন্টেড শাড়ি। এ কাউন্টার থেকে ও কাউন্টারে ছুটোছুটি করে যেন ছোঁ মেরে তুলে নিতে থাকে ব্যাঙ্গালোর সিল্কে কাঁথার কাজ, কোসাসিল্ক শাড়ি, কাঞ্জিভরম, ইক্কত, গাদোয়াল, নয়েল সিল্ক-কুর্তি, পালাজো, লং স্কার্ট, আনারকলি স্টাইলের লং কামিজ ও চুড়িদার কিছুই বাদ যায় না! তারপর নিতে থাকে বিতানের পাঞ্জাবি, জিন্স, শার্ট, শ্রী যেন হুঁশ হারিয়ে ফেলেছে। মুখে তার লেগে আছে অলৌকিক এক টুকরো হাসি। হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে একতলা থেকে পাঁচতলা গোটা দোকানময় ছুটে বেড়াচ্ছে সে। খিদে তৃষ্ণাও ভুলে গেছে যেন!

—মুর্শিদাবাদি সিল্কে বাঁধনি আর অজরখ প্রিন্টের কম্বিনেশনের এই শাড়িটা নিই, বিতান? দু’ধরনের প্রিন্টে একটা এক্সক্লুসিভ মাত্রা পেয়েছে শাড়িটা, দ্যাখো দ্যাখো! বিতানকে শাড়িটা দেখিয়ে আদুরে গলায় বলে ওঠে শ্রী। তার উজ্জ্বল চকচকে চোখদুটোর দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে সম্মতি জানায় বিতান।

—আর বাঁদিকে কোণের ওই শাড়িটা দ্যাখো! অলিভ গ্রিন বাফতা সিল্কের উপর কলমকারি প্রিন্টে স্মার্ট লুক! শাড়িতে এইসব প্রিন্টের বৈচিত্র এখন ট্রেন্ডিং, জানো? এ শাড়িটাও নিয়ে নেব? ঘামতে থাকে বিতান। দমবন্ধ হয়ে আসতে থাকে তার।

—আমি একটু বাইরে থেকে আসছি শ্রী। তুমি কেনাকাটা করো…

সন্ধে হয়ে এসেছে। সময় যেন উড়ে উড়ে মিলিয়ে যাচ্ছে গোটা দোকানের আনাচকানাচে। হঠাৎ তার বাবার ফোনে হুঁশ ফেরে শ্রীদর্শিনীর।

—শিগগির বাড়িতে এসো। এক্ষুনি। রাইট নাও।

বাড়ি ফিরে শ্রী জানতে পারে একে একে প্রতিটি ধাপ। বিতান কাপড়ের দোকান থেকে বেরিয়ে বাড়ি এসে সোজা ঢুকে গিয়েছিল নিজের ঘরে। দরজা বন্ধ করে দিলেও জানালা দিয়ে বিতানকে সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখেন তার মা। চিৎকার করে পড়শিদের ডাকেন তিনি। তারা এসে দরজা ভেঙে বিতানের দেহ নামিয়েছে। সবটা শোনার পর কেমন হতভম্ব হয়ে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে শ্রী। যেন বুঝতেই পারে না কোথায় বাঁধল গোলমালটা! বিড়বিড় করে অসংলগ্ন কথাবার্তা বলতে থাকে।

পুলিশ আসে অনেক রাতে। আর শ্রীকে তখনও দেখা যায় বারান্দার এক কোণে জামাকাপড়ের প্যাকেটগুলো খুব শক্ত করে বুকে জাপটে ধরে মুখ নামিয়ে বসে আছে।

দিন সাতেক পরে শ্রীর বাবা তাঁর সাইকিয়াট্রিস্ট বন্ধু ডা. বসুর চেম্বারে যান শ্রীকে নিয়ে। সমস্তটা শুনে ডাক্তারবাবু বলেন, ‘সময়মতো প্রপার মেডিকেশন আর সাইকোথেরাপি শ্রীদর্শিনীকে তার সুস্থ জীবন যাপনে ফিরিয়ে দিতে পারত। সেটা তো গেল শ্রীর কথা। উলটো দিকে শ্রীর অস্বাভাবিকতার জন্য একটা তাজা তরুণ প্রাণ এভাবে অকালে যে চলে গেল, সেটাও হয়তো আটকানো যেত। আগে কেন গুরুত্ব দিলে না, বন্ধু!’

 

হনন (পর্ব ২)

২য় পর্ব

—এ কি! তুমি এত সাজগোজ করে জামা-কাপড় পরে বসে আছ কেন? কোনও অনুষ্ঠানে যাবে বুঝি?

কথার উত্তর না দিয়ে শ্রী বিতানকে জাপটে ধরে খাটে বসিয়ে দেয়। তারপর বলে, ‘কেন আমাকে দেখতে যথেষ্ট সুন্দর লাগছে না বুঝি? দ্যাখো… দ্যাখো… দ্যাখো ভালো করে। তোমার জন্যই তো সাজলাম। এগুলো কেরালার গয়না, জানো? বাবা কেরালার কান্নুরে পোস্টেড ছিলেন। তখন কিনে দিয়েছিলেন এগুলো।’ বিরক্ত হয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় বিতান।

—আঃ শ্রী! কী যে ছেলেমানুষি করো না! তোমাকে তো রোজই দেখছি। আমার জন্য এত সাজগোজ করবার তো কিছু নেই! বিতানের আরও কাছে এগিয়ে এসে তার বুকে মুখ গুঁজে শ্রী বলে ওঠে, ‘উঁহু, অনেকক্ষণ দ্যাখোনি তো আমায়। সারাটা দিন। মানে ঠিক আট ঘন্টা, ত্রিশ মিনিট, দশ সেকেন্ড।’ শ্রীর আলিঙ্গনে বিরক্তি যেন জাপটে ধরে বিতানকে।

—আঃ ছাড়ো এখন! সারাদিন পর অফিস থেকে ফিরেছি। এখন বড্ড ক্লান্ত, শ্রী। কোথায় চা, জলখাবার দেবে তা নয়… কী যে করো না এসব!

ফ্রেশ হতে বাথরুমের দিকে চলে যায় বিতান। পিছনে শ্রীদর্শিনীর মাথায় যে নীরবে ভিসুভিয়াস ফুটছে, তা বেশ বুঝতে পারে সে। বাথরুম থেকে বেরিয়ে সোজা মায়ের ঘরে ঢোকে বিতান। দেখে মা শরৎকাহিনিতে মগ্ন। দেখেই মাথায় রক্ত উঠে গেল। এতক্ষণ মনে যে-ক্ষোভ, বিরক্তি জমেছিল পুরোটা উগরে দিল মায়ের উপর।

—বেশ ভালোই আছো তোমরা। একজন সাজগোজে বিভোর, আর একজন কাব্য-কাহিনি পড়তে ব্যস্ত। বাহ্! আমি যে সারাদিন পর অফিস থেকে ফিরে এসেছি সে দিকে কারও নজর নেই। বিতান দেখল ছায়া ঘনিয়ে এল মায়ের মুখে। লজ্জিত মুখে মা বলল,

—এইমাত্র সব সেরে এসে একটু বসলুম রে, বাবা। ওবেলার রান্নাটাও সেরে নিলুম। রাতে শুধু গরম গরম ভাত নামিয়ে খেতে দেব তোদের। তা এখন জলখাবারে কী দেব, বল?

গজগজ করতে করতে বিতান বলে, ‘কেন? একা সব কাজ করো কেন? তোমার আদরের বউমাটিকে একটু শিখিয়ে পড়িয়ে নিলেও তো পারো! শেখালে কি সে শিখবে না?’ মায়ের মুখটা যেন আরও কালো হয়ে যায়। মৃদু কণ্ঠে বলে উঠল, ‘আসলে সে তো এ সংসারের নতুন মানুষ। এখন একটু সাজগোজ-আমোদ-আহ্লাদ করুক না মেয়েটা। ক’দিন পরে তো সংসারের জোয়ার  কাঁধে নিতেই হবে। যাক গে, তোকে একটু মুড়ি মেখে দিই, শসা-পেঁয়াজ দিয়ে?’

—নাঃ, শুধু চা আর বিস্কুট দাও। বলেই গট গট করে ড্রয়িংরুমের দিকে হেঁটে যায় বিতান। যেতে গিয়ে আড় চোখে শোবার ঘরের দিকে তাকায়। সেখানে যেন কঠিন নীরবতা বিরাজ করছে! আসন্ন ঝড়ের পূর্বাভাষ! টিভিটা চালিয়ে অস্থির ভাবে চ্যানেল ঘোরাতে থাকে বিতান।

মা কিছু না বললেও বিতান জানে সারাদিন রূপচর্চায় মত্ত থাকতে চায় শ্রীদর্শিনী। নানারকম রূপটান বা ফেসপ্যাক, হেয়ার প্যাক তৈরির উপকরণ বিতানই তো কিনে আনে শ্রীর ফরমায়েশ অনুসারে।

সকালে উঠে এক কাপ ঈষদুষ্ণ জলে একটা পাতিলেবু আর এক চামচ মধু মিশিয়ে খায় শ্রী। তারপর মুসুরডাল বাটা আর হলুদ দিয়ে একটা প্যাক তৈরি করে মুখে লাগায়। শেষে ঈষদুষ্ণ নারকেল তেলে এক চামচ লবঙ্গ তেল মিশিয়ে ভালো করে স্ক্যাল্পে মাসাজ করে। প্রায় দিনই বিতান দেখে বাড়িতে লবঙ্গ তেল তৈরি করে শ্রী।

লবঙ্গ, মিক্সার গ্রাইন্ডারে গুঁড়ো করে নারকেল তেলে মিশিয়ে একটা কাচের বোতলে ঢেলে খাটের নীচের অন্ধকারে রেখে দেয় এক সপ্তাহ। এক সপ্তাহ পর মসলিন কাপড়ে ছেঁকে নিয়ে সেই তেল মাথায় লাগায়। বিতান লক্ষ্য করে শ্রীর এইসব রূপচর্চা ও তার উপকরণ তৈরি করা শেষ হতে হতে মায়ের একটা ভাজা, মাছের ঝোল, ডাল নেমে যায়। বিষয়টা খুবই দৃষ্টিকটু ও বিরক্তিকর লাগলেও নতুন বউকে কড়া ভাবে কিছু বলতে পারে না সে।

কিছুক্ষণ পরে শোবার ঘরে ঢুকে মনটা ভারী হয়ে ওঠে বিতানের। দেখে ঘরের সারা মেঝে জুড়ে গয়নাগাটি, মেক-আপের জিনিস ছড়ানো। লিপস্টিক, আইলাইনারগুলো ভেঙে কুটিকুটি করে ফেলেছে। আর বিছানায় শুয়ে ফুলে ফুলে ফুঁপিয়ে কাঁদছে শ্রী। কাছে গিয়ে তার পিঠে হাত রাখে বিতান। শ্রীর কান্নার তোড় আরও বাড়তে থাকে। মনে মনে অনুশোচনা হতে থাকে বিতানের। এতটা আঘাত না দিলেও হতো মেয়েটাকে। না হয় একটু সেজে তাকে দেখাতেই এসেছিল। একটু অবুঝ মা মরা মেয়েটা, বাবার আদরের। বুঝিয়েসুজিয়ে বললে নিশ্চয়ই একদিন ঠিক হয়ে যাবে সব। আদর করে শ্রীকে কাছে টেনে নেয় বিতান। শ্রীকে যে সত্যিই সে ভীষণ ভালোবাসে।

কিন্তু কিছুই ঠিক হল না। নিজের রূপচর্চা-সাজগোজ আর বিতানকে ঘিরে শ্রীর ভয়ংকর অবসেশন দিনের পর দিন বাড়তেই লাগল। সবসময় শ্রীর এক অমূলক ভয় যে, সে দেখতে খারাপ হয়ে যাচ্ছে আর বিতান অন্য মেয়েদের দিকে ঝুঁকে পড়ছে…

—পুজোর দিনগুলোতে নিজের সাজপোশাকে সেরাটা দেওয়া মাস্ট। ভিড়ের মাঝে, বিশেষ করে তোমার অফিসের বিশ্বকর্মা পুজোর দিনের ওই গেট টুগেদারে নজর কাড়তে গেলে পোশাকের কালার, কাট, ফ্যাব্রিক সব হতে হবে একদম এক্সক্লুসিভ। জানো? কীভাবে সাজতে হবে ও ঘরোয়া রূপচর্চার নানা গাইড লাইন দিচ্ছে বহু প্রিন্টেড ও অন-লাইন ফ্যাশান ম্যাগাজিনগুলো। নেইলপলিশ পরতে পরতে এক নাগাড়ে বলে চলে শ্রী।

—সেবার তুমি অফিসের কম্পিউটার সেকশানের মৃদুলার দিকে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে দেখছিলে। সেবন্তীর সঙ্গে তোমার সে কী হাহা হিহি! এবার আমি আর কোনও রিস্ক নেব না বাবা। এবার আমার ড্রেস হবে এক্কেবারে হটকে! আর জানো তো আজকাল পুরো মুখের সাজে একই রঙের আধিক্য। এই মনোক্রোম মেক-আপ এখন রীতিমতো ভাইরাল।

শ্রীর স্বরে যেন একেবারে কোনও ক্লান্তি নেই! শুনতে শুনতে মাথা ধরে যায় বিভানের।

—জীবনটা শুধু সাজগোজ আর গয়নাগাটি নয়, শ্রী। প্লিজ বোঝার চেষ্টা করো লক্ষ্মীটি! এ তো মানসিক অসুখ! চলো তোমাকে নিয়ে কোনও সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে যাই। তিনি হয়তো তোমাকে কোনও ভাবে হেল্প করতে পারবেন।

—কী বললে? আমি পাগল? আমি পাগলের ডাক্তারের কাছে যাব? হাউ ডেয়ার ইউ! রাগে হাতের কাছে যা থাকে বিতানের দিকে ছুড়তে থাকে শ্রী!

 

 

বিয়ের প্রস্তুতি নিন দু’জনে মিলে (শেষ পর্ব)

বিয়ের কার্ড অর্থাৎ আমন্ত্রণপত্রের ডিজাইন কেমন হবে, তা ঠিক করুন দু’জনে মিলে। এর জন্য সাহায্য নিতে পারেন গুগল- এরও কিংবা শিয়ালদা বৈঠকখানা বাজারে গিয়ে বেছে নিতে পারেন কার্ড। কোনও আর্টিস্ট বন্ধু থাকলে তারও সাহায্য নিতে পারেন এই বিষয়ে। এই বিষয়ে উল্লেখ্য, এখন ই-কার্ড-এরও প্রচলন আছে। তাই যদি আমন্ত্রণপত্র হাতে হাতে পৌঁছে দিতে না পারেন কিংবা যদি দূর-দুরান্তে থাকা কোনও আত্মীয়স্বজনকে আমন্ত্রণ করতে হয়, তাহলে তা মেইল বা হোয়াটস অ্যাপ কিংবা ম্যাসেঞ্জারে পাঠিয়ে একবার ফোন করে দেবেন অমন্ত্রিত অতিথিদের।

বিয়ের অনুষ্ঠানের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল-পোশাক। গায়েহলুদ, বিয়ের দিন, বউভাতের দিন ভিন্ন পোশাকের প্রচলন আছে আমাদের ভারতীয় বিয়েতে। তাই পোশাক কেনার ব্যাপারেও আগাম পরিকল্পনা দরকার। দু’জনের রুচি এবং পছন্দ এবং বাজেট অনুযায়ী কিনে রাখুন এইসব প্রয়োজনীয় পোশাকগুলি। এক্ষেত্রে পরস্পরের পছন্দকে গুরুত্ব দিন।

শপিংমল কিংবা ফ্যাশন ডিজাইনার-এর থেকেও সংগ্রহ করতে পারেন বিয়ের পোশাক। আর আত্মীয়স্বজনদের জন্য অপরিহার্য পোশাকগুলি কেনার আগে গুরুজন এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে নেওয়া ভালো। শুধু তাই নয়, যাকে পোশাক উপহার দেবেন, প্রয়োজন মনে করলে তার সঙ্গে কথাপ্রসঙ্গে আলোচনা করে নিয়েও কিনতে পারেন পোশাক। যদি অনেক শাড়ি কিনতে হয়, তাহলে নদিয়া জেলার ফুলিয়া থেকেও কিনতে পারেন শাড়ি, কারণ ওখানে কম দামে ভালো শাড়ি পাওয়া যায়।

বিয়ের দিন কিংবা বউভাতে কী মেনু হবে তা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অলোচনায় বসতে পারেন দু’জনে। এক্ষেত্রে সাহায্য নিতে পারেন কোনও ভালো ক্যাটারার-এরও। ভেজ এবং ননভেজ এমন ভাবে রাখুন মেনুতে, যাতে সবাই খেয়ে তৃপ্তি পান এবং কারওর কোনও অসুবিধা না হয়।

কেমন হবে বিয়ের সময় দু’জনের লুকস, তা পরস্পরের সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করুন। অর্থাৎ একে অপরের পছন্দকে গুরুত্ব দিন এবং সেইমতো রূপচর্চা করে নিজেদের আকর্ষণীয় করে তুলুন বিয়ের আগে। মনে রাখবেন, এই বিষয়টাও কিন্তু বিয়ের প্রস্তুতির মধ্যে পড়ে৷ এছাড়া, মেডিকেলি উভয়ে ফিট কিনা তাও যাচাই করে নেওয়া উচিত। এর জন্য যাবতীয় ব্লাড টেস্ট করে ফিট সার্টিফিকেট নিন। কারণ মেডিকেল ফিটনেস যেহেতু সারা জীবনের বিষয় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভালো-মন্দের বিষয়ও নির্ভর করছে, তাই বিয়ের প্রস্তুতির মধ্যে ব্লাড টেস্টও বাধ্যতামূলক।

কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

  • প্রত্যেকের জীবনের একটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থাকতে পারে, তাই আপনার সম্মিলিত জীবন শুরুর অনুষ্ঠানও কীভাবে করা উচিত, সে সম্পর্কে উভয়ে আলোচনা করে নিন।
  • একজন হয়তো বিয়ের অনুষ্ঠানকে একসঙ্গে বসবাস করার নিছক সামাজিক স্বীকৃতি ভাবতে পারে, আর অন্যজন হয়তো এটাকে দুটি পরিবারের একত্রিত হওয়া এবং ভরপুর আনন্দ উপভোগ করা মনে করতে পারে
  • বিয়ের জন্য প্রস্তুত করার জিনিসগুলি আগামী দাম্পত্য সম্পর্কের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই বিয়ের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার সময়, আপনি এবং আপনার সঙ্গী কী ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজন চান, তা কথা বলে ঠিক করুন
  • কত বড়ো বা কত ছোটো বিয়ের অনুষ্ঠান করতে চান এবং অতিথি তালিকায় কাকে অন্তর্ভুক্ত বা বাদ দিতে চান, সেই বিষয়ে গুরুত্ব দিন
  • বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাবের সঙ্গে আপনার ক্যাটারার, পোশাক, মেনু, আমন্ত্রণের তালিকা ইত্যাদি ঠিক করুন
  • হবু স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের মতামতকে গুরুত্ব দিন।

স্বামী কি পরকীয়ায় লিপ্ত!

প্রঃ আমার বয়স ত্রিশ৷ বিয়ে হয়েছে পাঁচবছর৷ পারিবারিক পরিচিত বৃত্তের মধ্যে আমাদের সম্বন্ধ করে বিয়ে৷ স্বামীর যে আমায় শুরু থেকে অপছন্দ ছিল তা নয়, কিন্তু আমি বাচ্চা নেওয়ার কথা বললেই সে নানা কারণ দেখিয়ে তা এড়িয়ে যেত৷ ইদানীং সে আমায় অতিরিক্ত অবহেলা করা শুরু করেছে৷ স্বামীর কাছ থেকে  অবহেলার শিকার হয়ে, বুঝতে পারছি সে অন্য কার প্রতি আসক্ত। আমার সন্দেহ সে পরকিয়ায় জড়িয়ে পড়েছে৷

আমরা শোওয়ার ঘরে কিছুটা ব্যক্তিগত সময় কাটাব মনে করলেও দেখেছি, সঙ্গী ফোনের পেছনে সময় ব্যয় করছে। একসঙ্গে বসে থেকে বা ঘুরতে গেলেও সে ফোন নিয়েই ব্যস্ত থাকে, মেসেজ বা ইন্টারনেট ব্রাউজিং করে৷ আমার মনে হচ্ছে নিশ্চিতভাবে এটা অন্য একটি সম্পর্কেরই ইঙ্গিত।

বিনা কারণে অযৌক্তিক রাগ করে, সবসময় খিটখিট করে৷ খেয়াল করে দেখেছি, যে-বিষয়গুলো আগে তার রাগের উদ্রেক করত না, সেসব বিষয়েও ইদানীং সে অকারণে অসহনশীল হয়ে গেছে৷ কথায় কথায় আমাদের দাম্পত্য জীবনকে অভিশাপ হিসেবে অভিহিত করছে৷

আমি কী করব বুঝতে পারছি না৷ আমার সন্দেহ কি অমূলক?

উঃ সমাজ দ্রুত বদলাচ্ছে৷ আজকাল দাম্পত্যজীবন আগের চেয়ে অনেক জটিল হয়ে গেছে৷ বিয়ের সম্পর্ক টিকছে না বেশি দিন। অহরহ ঘটছে বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা। তবে বিবাহ বিচ্ছেদের পেছনে অনেক কারণ থাকলেও পরকীয়া একটি অন্যতম কারণ বলে মনে করেছন মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা।

পরকীয়ার সম্পর্ক একটি বিষাক্ত সম্পর্ক। একটি সুন্দর, হাসিখুশি সুখের সংসার নিমেষেই গুঁড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে৷ দাম্পত্য সম্পর্কে অসুখী হয়ে অশান্তির মধ্যে যারা রয়েছেন, তাদের মধ্যে অনেকেই বিবাহ বিচ্ছেদে যেতে পারছেন না বা যেতে চাইছেন না৷ তাদের মধ্যে অনেকেই কিন্তু পরকীয়ার মতো অবৈধ একটি সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছেন। অনেকের আবার পরকিয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনও কারণ লাগে না৷ তারা স্বভাবদোষে পরনারীতে আসক্ত হন৷

পরকীয়ার একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে ফেসবুক। আপনার স্বামীর ক্ষেত্রে শুধুমাত্র ফোন নয়, ফেসবুক কিংবা অন্যান্য যোগাযোগের মাধ্যমের প্রতি আসক্তির মাত্রার ওপরও নজর দেবেন।

আপনার স্বামী যদি আপনার ও পরিবারের পেছনে কম সময় ব্যয় করেন, তাহলে এটিও একটি লক্ষণ হিসেবে ধরে নেওয়া যায়। খুব ভালো করে আপনার সঙ্গীর প্রতিদিনকার কাজকর্ম লক্ষ্য করুন। যদি বুঝতে পারেন যে আগের চেয়ে কম সময় পাচ্ছেন, তাহলে বোঝার চেষ্টা করুন সেই বাড়তি সময়টা তিনি কীভাবে ব্যয় করছেন। স্বামী  যদি পরিবার ও বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করেন বিনা কারণে, তাহলে ধরে নিতে পারেন তিনি পরকীয়ায় লিপ্ত।

স্বামী যদি কারণে-অকারণে অজুহাত দেখান তবে বুঝতে হবে এটি পরকীয়ার লক্ষণ। তাকে সময় দেওয়ার কথা বলে দেখুন, একসঙ্গে বসে টিভি দেখার কথা বলুন, তাকে নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানান, আত্মীয়স্বজনদের ও পারিবারিক বন্ধুদের সময় দেওয়ার কথা বলুন। তিনি যদি আপনাকে অজুহাত দেখিয়ে না বলেন, তাহলে জানার চেষ্টা করুন অজুহাতটি সত্যি কিনা।

আপনার সঙ্গে যৌনসম্পর্কে সঙ্গী যদি উদাসীনতা দেখান তাহলে আপনি এটি পরকীয়ার নিশ্চিত লক্ষণ হিসেবে ধরতে পারেন। যিনি অন্যের সঙ্গে সময় কাটিয়ে আপনার প্রতি উদাসীন, তার মুখের অভিব্যক্তিই আপনাকে সব কথা বলে দেবে। আপনার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে সঙ্গী আগ্রহী নন, অর্থাৎ তার চাহিদাটি পূরণ হচ্ছে অন্য কারও মাধ্যমে। এ ছাড়াও অভ্যাসবশত যৌন সম্পর্ক করছেন কিনা- স্রেফ আপনাকে খুশি করতে, সেটিও লক্ষ্য করুন।

আপনার স্বামীর মুখে যদি নতুন কোনও একটি নাম ঘনঘন শুনতে পান, তবে একেও পরকীয়ার লক্ষণ হিসেবে ধরে নিতে পারেন। সঙ্গীর যে-বন্ধুটির কথা আগে কখনও শোনেননি, এমন কারও কথা ঘনঘন শুনলে তাকে জিজ্ঞেস করুন এবং তার মুখের ভাব লক্ষ্য করুন। যদি তিনি প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যান, কিংবা তার মুখের অভিব্যক্তি বদলে যায়, তবে বিষয়টি অবশ্যই  চিন্তার।

আপনি আপনার বিশ্বস্ত কোনও বন্ধু বা স্বামীর কোনও সহকর্মী বা বন্ধুর সাহায্য নিতে পারেন সত্যটি খুঁজে বের করার জন্য৷ তবে অবশ্যই  খেয়াল রাখবেন এই অনুসন্ধান পর্ব কিন্তু রিস্কি গেম৷ আপনার সন্দেহ অমূলক হলে এবং আপনার স্বামী আপনার পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে পারলে, ফল মারাত্মক হতে পারে৷ তাই পাঁচকান না করে আগে নিজে বিষয়টি সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে তবে পদক্ষেপ করুন৷

হনন (পর্ব ১)

বিতানদের বাড়িটা সাবেকি আমলের। বাবার তৈরি বাংলো প্যাটার্নের কাঠের বাড়ি। বাড়ির সামনে ছোট্ট একখানি বাগানের বুক চিরে হাঁটাচলা করার সরু একটা মোরামের পথ। বাবা চলে যাবার পর একবার ভেবেছিল বাড়িটাকে রি-মডেলিং করবে। কিন্তু মা একদম রাজি হয়নি। আর ছোটোবেলার গন্ধমাখা এই বাড়িটা বিতানেরও খুব প্রিয়।

আজ অফিস থেকে ফিরে সামনের গেট দিয়ে ঢুকে বাগান পেরোতে পেরোতে নানান ফুলের একটা ককটেল সুবাস যেমন বিতানের নাকে এসে লাগে, সেই সঙ্গে কান ছুঁয়ে দেয় শ্রীদর্শিনীর গান— সাজনা হ্যায় মুঝে সজনা কে লিয়ে…। ভারি সুরেলা গলা তার।

শ্রীদর্শিনী বিতানের স্ত্রী। মাত্র তিনমাস আগে এক মাঘীপূর্ণিমার সন্ধেতে শ্রীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে। বিতান আর শ্রীদর্শিনীর পরিচয় হয়েছিল এক বছর আগে একটি সোশ্যাল ম্যাট্রিমোনি সাইটে। তিন মাস তারা একে অপরের সঙ্গে কথাবার্তা বলার পর, মেলামেশা করবার পর দু’জনে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তারপর চলেছিল ছ’মাসের কোর্টশিপ।

শ্রীদর্শিনী তার বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। বিতানের চেয়ে অনেক বেশি বৈভবে মানুষ সে। শ্রীর বাবা রিটায়ার্ড আর্মি অফিসার। এছাড়াও তাদের পারিবারিক ব্যাবসা আছে। ভারতের নানা প্রান্তের সংস্কৃতি, সাজগোজ সম্পর্কে শ্রী বেশ ওয়াকিবহাল। এছাড়া গণিতে স্নাতকোত্তর শ্রীদর্শিনী পড়াশোনাতেও বেশ মেধাবী। অন্যদিকে, বিতান নিতান্তই সাধারণ। অ্যালুমিনিয়াম প্রস্তুতকারক সংস্থায় কোয়ালিটি কনট্রোল ইঞ্জিনিয়র সে।

বাবা ছিলেন ন্যাশনালাইজড ব্যাংকের ক্লার্ক। ছোটোবেলা থেকে তেমন কোনও বিলাসবহুল জীবনযাপন তাদের ছিল না। জীবনটা ছিল আর দশটা মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলের মতো অত্যন্ত সাদামাটা। তাই মাঝে মাঝে বিতানের বেশ আশ্চর্য লাগে এটা ভেবে যে, তার মতো একজন সাধারণ ছেলেকে কীভাবে মনে ধরল অত উচ্চবিত্ত পরিবারের মেয়ে শ্রীদর্শিনীর!

বাগান পেরিয়ে এসে নিজেদের শোবার ঘরে ঢুকতেই ভীষণ চমকে উঠল বিতান। দেখল গা ভর্তি নানারকম সোনার গয়না পরে সেজেগুজে বসে আছে শ্রী। পরনে দামি শাড়ি, গলায় সীতাহার, কানে বড়ো ঝোলাদুল, হাতে মোটা সোনার চুড়ি, খোঁপায় বেলকুঁড়ির মালা। সামনে খোলা মেক-আপ বক্স, লিপস্টিক, আইলাইনার, আই-শ্যাডো — আয়নার সামনে বসে গভীর ভাবে নিজেকে দেখতে দেখতে মিটি মিটি হাসছে শ্রী। দেখেই চলেছে নিজেকে। যেন নিজের প্রেমে নিজেই বিভোর। চারপাশের কোনওকিছু সম্পর্কে তার যেন কোনও চেতনাই নেই।

বিয়ের আগে থেকেই বিতান জানত ভীষণ সাজতে ভালোবাসে শ্রীদর্শিনী। শ্রী সুন্দরী কিন্তু তার সাজগোজের জন্য অপরূপা হয়ে ওঠে সে। বিতানের সঙ্গে যখন দেখা করতে আসত তখন বরাবরই তার রুচিসম্মত সাজগোজ তাকে মুগ্ধ করত। শ্রীর দৌলতেই বিতান জেনেছে মেক-আপের খুঁটিনাটি, বিভিন্ন বিউটি প্রোডাক্টের কার্যকারিতা, ঘরোয়া রূপটানের উপকারিতা ইত্যাদি নানা বিষয়। তখন থেকেই বিতান লক্ষ্য করত তাদের কথোপকথনের বেশ অনেকটা অংশ জুড়েই যেন থাকছে সাজগোজ, রূপচর্চা বিষয়ক আলোচনা।

বিতান ছোটোখাটো সোনার গয়না বা জাংক জুয়েলারি, কিংবা লিপস্টিক, নেলপলিশ এসব উপহার দিলে ভীষণই খুশি হতো শ্রী। তাকে দেখতে খুব সুন্দর লাগছে বিতানের কাছ থেকে এমন কমপ্লিমেন্ট পেলে শিশুর মতো আনন্দে উদ্বেল হয়ে উঠত। এমন কি পথ চলতি কোনও সুন্দরী মেয়ের দিকে বিতানের চোখ গেলে, ভারি অভিমানী গলায় শ্রী জিজ্ঞেস করত, ‘ওকে কি আমার চেয়েও বেশি সুন্দর লাগছে দেখতে, বিতান? আমি কি তেমন সুন্দরী নই?’

বিতান খুব আনন্দিত হতো। মেতে উঠত খুনশুটিতে। ভাবত শ্রী তাকে এত ভালোবাসে যে সবসময় তার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে চায়। ভাবলেই বুক ভরে উঠত তার। কিন্তু কথায় আছে একজনের সঙ্গে এক ছাদের নীচে চাল-ডাল-তেল- হলুদের আটপৌরে জীবন শুরু না হলে তাকে সম্পূর্ণ চেনাই যায় না। বিতানের ক্ষেত্রে ঠিক সেটাই ঘটেছিল।

 

কুইবেকে ক’দিন (শেষ পর্ব)

নতুন কুইবেকের মধ্যমণি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কুইবেকের আঞ্চলিক (প্রাদেশিক) পার্লামেন্ট। ঠিক পুরোনো শহরের দেয়ালের বাইরে একটি টিলার উপর তৈরি কুইবেকের আঞ্চলিক জাতীয় সংসদভবন। ছবির মতো সাজানো পার্কের (পার্লামেন্ট গার্ডেন) মাঝখানে বিশাল সুউচ্চ সুদৃশ্য আটতলা অট্টালিকা সদম্ভে তার অস্তিত্ব ঘোষণা করছে। সামনে সাজানো বাগানের মাঝখানে সুদৃশ্য বিশাল মনোরম ফোয়ারা থেকে অনবরত জল উঠছে। জানা গেল, এটি বানাতে ৯ বছর (১৮৭৭-১৮৮৬) সময় লেগেছিল।

এই অট্টালিকায় কুইবেকের লেফটেন্যান্ট গভর্নরের সরকারি আবাস আর কুইবেকের জাতীয় সংসদ (বিধানসভা) সদন। এই পার্লামেন্ট গার্ডেনের সন্নিকট ‘এসপ্ল্যানেড পার্ক”-এর দক্ষিণ-পূর্ব কোণে সেন্ট লুই গেটে আছে বিখ্যাত ভারতীয় শিল্পী গৌতম পাল কৃত সুদৃশ্য মহাত্মা গান্ধির আবক্ষ মূর্তি। আর একবার মনে হল, পৃথিবীর প্রায় সব বড়ো বড়ো শহরেই মহাত্মার এক বা একাধিক মূর্তি আছে। মহাত্মাকে শ্রদ্ধা নিবেদন করে সামনের রাস্তা ধরে এগিয়ে চললাম পুরোনো শহরের দিকে।

এখান থেকে পাথরের রাস্তা নীচে নামতে শুরু হল, চললাম পুরোনো কুইবেকের দিকে। দেখতে দেখতে দৃশ্যটা কেমন বদলে যেতে লাগল। দুপাশে সাজানো ঘেঁষাঘেঁষি দোকানপাঠ, রেস্টুরেন্ট, মল, সিনেমাহল ইত্যাদি শুরু হয়ে গেল। কয়েক পা হাঁটার পর দেখতে পেলাম বাঁদিকে সুউচ্চ আর সুদৃশ্য নর্টারদাম গির্জা ! (Basilica De Notre Dame) এটি কানাডার সবচেয়ে পুরোনো গির্জা। গির্জার ভূগর্ভে চির শান্তিতে শয়ন করে আছেন কুইবেকের অতীতের চারজন শাসক (গভর্নর) আর তৎকালীন বিশপ। এটি কানাডার ন্যাশনাল হিস্টোরিক্যাল সাইটেরও অন্যতম।

শুনলাম আগুনে পুড়ে যাবার পর নতুন করে এটাকে বানানো হয়েছে। এখানে কোনও প্রবেশ দক্ষিণা নেই। নেই কোনও ধর্মমত ভেদাভেদ। সকলেরই প্রবেশাধিকার আছে। ভিতরে ঢুকে দর্শন ও শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করার পর, সামনের রাস্তা ধরে এগিয়ে যেতেই আবার দেখা হল মনমোহক নদী ‘সেন্ট লরেন্স’-এর সঙ্গে।

নদীর বাঁধানো পাড় বা স্ট্যান্ডে অগুণিত মানুষ ঘুরে বেড়াচ্ছে। নদীর ওপারে ‘লেভিস’ শহর আর তার শহরতলি এলাকা৷ লঞ্চঘাট থেকে অনবরত লঞ্চ এপার ওপার করছে, এছাড়া দুটি চওড়া সেতু মারফতও চলছে এপার ওপার যাতায়াত। কয়েক পা এগুতেই চোখ ধাঁধিয়ে গেল! নজরে এল বিশ্ব বিখ্যাত প্রাসাদসম হোটেল, শ্যাটু ফ্রন্টেনাক (Chateau Frontenac)। সত্যিই চোখ ধাঁধিয়ে যাবার মতোই ২৬০ ফুট উঁচু, ১৮ তলার ৬১১টি ঘর আর সুইট বিশিষ্ট এই বিশাল আর ব্যয়বহুল হোটেল। মোটেই আশ্চর্য হলাম না, যখন শুনলাম এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ছবি তোলার (Most – Photographed) খ্যাতি সম্পন্ন অট্টালিকা! ঠিক যেন একটি বিশাল সুদৃশ্য রাজপ্রাসাদ দাঁড়িয়ে আছে সেইন্ট লরেন্স নদীর পাড়ে। এমন সুন্দর স্থাপত্যের নিদর্শনকে কে আর ক্যামেরায় বন্দি করতে না চাইবে?

বিখ্যাত স্থাপত্যশিল্পী, ব্রুস প্রাইস (Bruce Price)-এর নকশা অনুযায়ী ১৮৯২-৯৩ সনে এটির নির্মাণ সম্পন্ন হয়। তারপর অবশ্য অনেক রদলবদল, কিছু যোগবিয়োগ করা হয়েছে, কিন্তু মূল কাঠামোটি অপরিবর্তিতই আছে। ব্রুস প্রাইসের একটি পূর্ণাবয়ব মূর্তিও স্থাপিত আছে হোটেলে ঢোকার মুখেই। ১৯২৪ সাল পর্যন্ত এটিই ছিল কুইবেকের সর্ব্বোচ্চ অট্টালিকা। আটটি বিশেষ ‘সুইট’আছে যাদের নামকরণ হয়েছে পৃথিবীর কয়েকজন বিখ্যাত মানুষের নামানুসারে। যেমন ‘রুজভেল্ট’, ‘চার্চিল’, ‘দ্য-গল’, ‘রাণী এলিজাবেথ’ সুইট ইত্যাদি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গতি-প্রকৃতি আর ভবিষ্যৎ আলোচনার জন্য মিত্রশক্তির প্রধানদের প্রথম (১৯৪৩ সন) আর দ্বিতীয় (১৯৪৪ সন) কুইবেক সম্মেলন এই হোটেলের অদূরে অবস্থিত কুইবেক দুর্গেই হয়েছিল। চার্চিল, রুজভেল্ট-সহ মিত্রপক্ষের অনেক বড়ো বড়ো নেতা তখন এই হোটেলেই অবস্থান করেছিলেন। জানা গেল যে মিত্রশক্তির বিখ্যাত ডি-ডের (D-Day) নরম্যান্ডি অভিযান (৬ই জুন, ১৯৪৪)-এর পরিকল্পনার জন্ম নাকি এই হোটেলের একটি ঘরেই হয়েছিল।

প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক হিচকক্-এর নামেও আছে একটি সুইট, কেন না ওঁর I Confess নামক চলচ্চিত্রটির অনেকটা অংশই নাকি এখানেই শুটিং করা হয়েছিল। কুইবেক শহরের যে-কোনও স্থান থেকে দেখা যায় এই হোটেলের চূড়া। আমরা যে- হোটেলে ছিলাম তার বারান্দায় দাঁড়ালে এই হোটেলের দৃশ্য পরিষ্কার দেখা যেত। দুর থেকে একটি বিশাল রাজপ্রাসাদ বলেই মনে হয়।

আর একটি দর্শনীয় অট্টালিকা হল ‘শ্যাটু’র অনতিদূরেই অবস্থিত পাথরের তৈরি ‘কুইবেক দুর্গ”। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের গতি-প্রকৃতি আলোচনার জন্য মিত্রশক্তির প্রধানদের প্রথম আর দ্বিতীয় গুপ্ত ‘কুইবেক সম্মেলন’ হয়েছিল এখানেই। সেন্ট লরেন্সের পাড়েই এই সুন্দর দুর্গ।

শুনলাম, কয়েক বছর আগে ২০০৮ সালে কুইবেক শহর ধূমধামের সঙ্গে শহরের প্রতিষ্ঠার চতুর্থ শতাব্দী উদ্যাপন করেছে। আরও অনেক দেখার ও ঘোরার স্থান আছে কুইবেক শহরে। আসলে, কুইবেক শহরের রাস্তায় শুধু ঘুরে বেড়ানোই কম আনন্দের কথা নয়। কিন্তু সময় আর ‘রেঁস্তো’ তো আর অফুরন্ত নয়। তাই পাততাড়ি গুটিয়ে ফিরতেই হয় আমাদের মতো পর্যটককে। অতীতের সুগন্ধ মাখা কুইবেকের স্মৃতি মাথায় নিয়ে আমরাও ফিরে এলাম।

সহায়ক তথ্য: ‘জেন লে-সেজ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট’ (Jean Lesage international Airport) ‘কুইবেক সিটি’ শহরের ১১ কিলোমিটার পশ্চিমে। পৃথিবীর প্রায় সব বড়ো শহর থেকেই বিমানপথে যুক্ত। পুরোনো শহরে খাবার থাকার অনেক ‘বাজেট হোটেল’ আছে। নামি-দামি বড়ো হোটেলগুলি প্রায় সবই নতুন কুইবেক শহরে।

বিয়ের প্রস্তুতি নিন দু’জনে মিলে (পর্ব-০১)

ভারতীয় বিয়ে কোনও বড়ো উৎসবের থেকে কম নয়। যে-কোনও উৎসব শুরু হওয়ার আগে আমরা যেমন প্রস্তুতি নিই, তেমনই বিয়েও একটা বড়ো উৎসবের মতো।

আগে থেকে পড়াশোনা না করে পরীক্ষা দিলে যেমন ফল ভালো হয় না, রেসের আগে ব্যাপক প্রশিক্ষণ ছাড়া আপনি যেমন ম্যারাথন চালাতে পারবেন না, ঠিক তেমনই বিবাহের ক্ষেত্রেও এটি একই ভাবে প্রযোজ্য। আগামী বিবাহিত জীবনের পথকে মসৃণ করার জন্য, সঠিক ভাবে বিয়ের প্রস্তুতি নেওয়া আবশ্যক।

মনে রাখবেন,বিয়ের আগে অনেক কিছু করার আছে। ভেবেচিন্তে সবকিছু পরিকল্পনা করলে আত্মীয়স্বজনকে যেমন খুশি করতে পারবেন, ঠিক তেমনই নিজেরাও তৃপ্তি পাবেন। তাই হবু জীবনসঙ্গীর সঙ্গে আলোচনা করে বিয়ের প্রস্তুতি নিন। আর এই প্রস্তুতি যাতে নিঁখুত হয়, তার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মাথায় রাখা দরকার। এই বিষয়ে রইল বিশেষ পরামর্শ।

প্রেম কিংবা দেখেশুনে, যে-বিয়েই করুন-না কেন, বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর, হবু স্বামী-স্ত্রী দু’জনে মিলে বিয়ের অনুষ্ঠানের প্রস্তুতির নিতে একান্তে আলোচনায় বসার জন্য সময় বের করুন।

যেদিন আলোচনায় বসবেন, কাগজ-কলম নিয়ে বসুন। কাজকর্ম থেকে অন্তত এক সপ্তাহের জন্য দু’জনে বিরতি নিতে পারবেন, এমন একটা সময়কে বেছে নিন বিয়ের জন্য। এক্ষেত্রে মনে রাখবেন, বিয়ের জন্য যদি দিন পনেরোর কর্মবিরতি নিতে পারেন, তাহলে ভালো হয়। কারণ, বিয়ের ঠিক পরেই হনিমুনও সেরে নিতে পারবেন এবং তা খুব সুখকরও হবে।

যাইহোক, হবু স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কেউ যদি শুভ-অশুভ সময়ের বিষয়টি মানেন, তাহলে পুরোহিতের সঙ্গে কথা বলে বিয়ের দিন ঠিক করুন। এরপর আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিন যে, বিয়ের অনুষ্ঠান কোথায় করবেন— বাড়িতে নাকি অনুষ্ঠান বাড়ি ভাড়া নিয়ে? এক্ষত্রে ভাবতে পারেন ডেস্টিনেশন ম্যারেজ-এর বিষয়টিও, অবশ্য যদি বাজেট বেশি থাকে৷ কারণ ডেস্টিনেশন ম্যারেজ মানেই তো দূর-দুরান্তে গিয়ে বিয়ে এবং তা যথেষ্ট খরচ সাপেক্ষ। তবে খরচ করতে পারলে, ডেস্টিনেশন ম্যারেজ-এর মজাই আলাদা।

বিয়ের অনুষ্ঠান আয়োজন করার আগে মাথায় রাখুন বাজেটের বিষয়টি। অর্থ সাশ্রয় করতে চাইলে, বরপক্ষ এবং কনেপক্ষ মিলে এক জায়গায় বিয়ের অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে পারেন। যদি বাড়ি ভাড়া নিয়ে বিয়ের অনুষ্ঠান করেন, তাহলে জেনে নিন কত টাকা ভাড়া এবং কী কী সুবিধা পাওয়া যাবে। আর যদি ডেস্টিনেশন ম্যারেজ-এর কথা ভাবেন, তাহলে যে-লোকেশন-এ বিয়ের অনুষ্ঠান করবেন, সেখানে যাতায়াতের জন্য এবং অনুষ্ঠান করার জন্য কত টাকা খরচ হবে, তার হিসেব করুন খোঁজখবর নিয়ে।

বরযাত্রী, কনেযাত্রী এবং বউভাতে আমন্ত্রিত অতিথিদের তালিকা তৈরি করে রাখুন আগেভাগে। কারণ, আমন্ত্রিত অতিথির সংখ্যার উপর অনেকটাই নির্ভর করবে বিয়ের অনুষ্ঠানের খরচ। প্রি-ওয়েডিং এবং ওয়েডিং টাইম-এ স্টিল এবং ভিডিয়ো শুট-এর ইচ্ছে থাকলে সেই বিষয়টিও রাখতে হবে বাজেটে।

যদি নিজেরা অনুষ্ঠান অয়োজনের দায়িত্ব না নিতে চান, তাহলে কোনও ওয়েডিং প্ল্যানার এজেন্সি-কে দিয়ে সবকিছু করিয়ে নিতে পারেন, তবে তা ব্যয় সাপেক্ষ। আর যদি নিজেরা সবকিছু করতে চান তাহলে বাড়ির লোকজনদের বিয়ের অনুষ্ঠানের দায়িত্ব ভাগ করে দিন। কে অনুষ্ঠান বাড়ি সাজানোর দায়িত্ব নেবে, কে বিয়ের কার্ড পৌঁছে দেবে আমন্ত্রিত অতিথিদের বাড়িতে, কে কেটারিংয়ের দায়িত্ব নেবে, কে আপ্যায়নের ভার নেবে, কে ছোটোখাটো প্রয়োজন মেটাবে, কে সবকিছু তদারকি করবে— এই সবকিছুর দায়িত্ব আগেভাগে ভাগ করে দিন। তবে এক্ষেত্রে যে-ব্যক্তি, যেই বিষয়টিতে পারদর্শী বলে জানেন, তাকে সেই কাজটাই দিন বুঝেশুনে।

IVF-এ বাচ্চার শারীরিক বিকৃতির সম্ভাবনা থাকে?

এখন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় প্রমাণিত যে, সর্বশ্রেষ্ঠ ভ্রূণ বেছে নেওয়ার অত্যাধুনিক যে-পদ্ধতি বার হয়েছে, তার সাফল্য IVF-এর সাফল্যকে ৭৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে সাহায্য করেছে।

আমার বয়স ৩১ বছর, চাকরি করি না। ১০ বছর হয়েছে আমার বিয়ের কিন্তু আমাদের কোনও সন্তান নেই। আমি IVF করাতে চাই কিন্তু শুনেছি এই পদ্ধতিতে জন্মানো বাচ্চার মধ্যে জন্মগত শারীরিক বিকৃতি ঘটার সম্ভাবনা বেশি থাকে। এটা কি ঠিক?

স্বাভাবিক ভাবে জন্মানো বাচ্চার থেকে আইভিএফ পদ্ধতিতে জন্মানো বাচ্চার জন্মগত শারীরিক বিকৃতি হওয়ার সম্ভাবনা মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ বেশি থাকে। স্বাভাবিক গর্ভধারণের ক্ষেত্রে এই আশঙ্কা প্রতি ১৫টি বাচ্চার মধ্যে ১ জনের হওয়ার ভয় থাকে। সেই তুলনায় আইভিএফ-এর ক্ষেত্রে প্রতি ১২টি বাচ্চার মধ্যে ১জনের হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। IVF প্রক্রিয়ায় বাচ্চাদের ক্রসোসোমাল ডিফেক্ট থেকে নিরাপদে থাকার জন্য সময় থাকতে ভ্রূণের প্রাইমপ্লাইটেশান পরীক্ষার সুযোগ করে দেয়। অ্যাসিস্টেড রিপ্রোডাক্টিভ টেকনিকের সাহায্যে নতুন পদ্ধতি আবিষ্কারের চেষ্টা চলছে। মহিলার বয়স ৩৫ এবং পুরুষের বয়স ৪৮ এর বেশি হলে অথবা বংশগত রোগের পারিবারিক ইতিহাস থাকলে এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সে সব বিষয় যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়। যারা কোনও কারণবশত সন্তান ধারণ করতে পারেননি তাদের এবং বংশানুক্রমে সুস্থ বাচ্চা যাতে জন্ম দেওয়া যায় — এ দুটোর ক্ষেত্রেই এই পদ্ধতি অনেকটা সাহায্য করবে।

স্বাভাবিক কোনও দম্পতি যাদের বন্ধ্যাত্বের সমস্যা নেই অথচ এমন কোনও জিন তাদের শরীরে রয়েছে যেটা সম্পূর্ণ বংশানুক্রমিক যেমন থেলাসিমিয়া, ইনটেসটাইন ডিজিজ, ডাউন সিন্ড্রোম, টার্নার সিন্ড্রোম ইত্যাদি, এই পদ্ধতিটি সেইসব দম্পতিও যাতে সুস্থ বাচ্চার জন্ম দিতে পারে তাতেও সাহায্যে করবে। ভ্রূণকে বিকশিত করার পর ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়। যেসব ভ্রূণে, জেনেটিকালি কোনও সমস্যা থাকে না, সেই ভ্রূণই একমাত্র মহিলাদের গর্ভে ইমপ্লান্ট করা হয়। প্রথম প্রথম আইভিএফ-এর সাফল্য ২০ থেকে ৪০ শতাংশ হতো। এখন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় জানা গেছে যে, সর্বশ্রেষ্ঠ ভ্রূণ বেছে নেওয়ার অত্যাধুনিক যে-পদ্ধতি বার হয়েছে, তার সাফল্য IVF-এর সাফল্যকে ৭৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে সাহায্য করেছে।

কুইবেকে ক’দিন (পর্ব ২)

এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে একটা ট্যাক্সি ভাড়া করে শহরের দিকে চললাম। পথের বাঁকে বাঁকেই কানাডার বিখ্যাত ‘সেন্ট লরেন্স’ নদীর সঙ্গে দেখা হতে লাগল।

রতন সরকার প্রশ্ন করার আগেই বলতে লাগলাম, ‘এখানের প্রধান নদী সেন্ট লরেন্স। ছেলেবেলায় ভূগোলের বইতে পড়া উত্তর আমেরিকা মহাদেশের পাঁচটি বিশাল হ্রদ-সুপিরিয়র, মিশিগান, হুরণ, ইরি, অন্টারিও-কে মনে পড়ে কি? এই ইরি হ্রদ থেকে উপচে পড়া জল হয়ে গেল বিশাল নায়াগ্রা জলপ্রপাত। প্রায় ১৭২ ফুট নীচে লাফিয়ে পড়ে এই প্রপাত নায়াগ্রা নদীতে একাকার হয়ে যায়। আবার এই বিশাল নদীই পঞ্চম বিশাল হ্রদ অন্টারিওতে নিজেকে মিলিয়ে দেয়। ওদিকে এই অন্টারিও-র উপচে পড়া জল এক বিশাল নদী হয়ে বেরিয়ে পড়ে। এই উপচে পড়া নদীই হল উত্তাল সেন্ট লরেন্স নদী। সেন্ট লরেন্স নদীর পাড়ের আনাচে-কানাচেই বাস করত কুইবেক অঞ্চলের আদিবাসীরা— আবেনাকি, এলগোকুইন, ইনু ইত্যাদি।

কুইবেক শহরের পূর্ব প্রান্তেই রয়েছে সুউচ্চ মন্টমরেন্সি জলপ্রপাত। এই প্রপাতটি প্রায় শহরের মধ্যেই বলা চলে। শহরের এত কাছে বলেই বোধহয় এই সুন্দর জলপ্রপাতটিকে মানায় না। প্রথমেই তাই আমাদের গন্তব্য হল মন্টমরেন্সি জলপ্রপাত। এটি আমেরিকা-কানাডার বর্ডারে অবস্থিত পৃথিবী বিখ্যাত নায়াগ্রা জলপ্রপাতের থেকেও ৯৯ফুট উঁচু। বিশাল গর্জন করে দুই ধারায় মন্টমরেন্সি নদী এক লাফে ২৭২ ফুট নীচে নেমে এসে সৃষ্টি করেছে ভুবন বিখ্যাত মন্টমরেন্সি জলপ্রপাত। নীচে নেমে সমতলের উপর কিছুদূর গড়িয়ে মিশে গেছে সেন্ট লরেন্সে। টিকিট কিনে কেবলকারে চড়ে জলপ্রপাতের একেবারে মাথার উপরে গিয়ে নামলাম। বেশ অনেকটা খাড়া পথ, দ্রুত গতির কেবলকারেই ১১মিনিট লাগল।

বেশ খাড়াই এই কেবল পথ। কেবলকারের হাতল শক্ত করে ধরে থাকতে হয়। ভয় ভয় করছিল কেবলকার উপরের বদলে নীচে না গড়িয়ে আসে! কেবলকার থেকে নেমে পাহাড়ি রাস্তায় সামান্য হেঁটে এসে গেলাম একেবারে জলপ্রপাতের মাথার উপরে। এখানে এক ঝুলন্ত পুলের উপরে দাঁড়িয়ে পায়ের নীচে গড়িয়ে পড়া মন্টমরেন্সি নদীকে দেখে ভীষণ ভয় করছিল। নদীর জল ফুলে ফেঁপে উঠে উপরে আমাদেরও না ভাসিয়ে নিয়ে যায়। ঠিক পায়ের নীচেই ওই শক্তিশালী নদী গর্জন করতে করতে গড়িয়ে পড়ছিল ২৭২ ফুট নীচে।

কেবলকারে একসঙ্গে আসা কয়েকজন যাত্রী তো ভয়ে পুলের উপরই উঠল না। পায়ের ঠিক নীচে বিপুল গর্জনে বয়ে যাচ্ছিল মন্টমরেন্সি জলপ্রপাত। রতন সরকারও ভয়ে ভয়ে আমার একটা হাত ধরে রেখেছিল। আমরা হেঁটে লোহার পুল পেরিয়ে ওপারে চলে গেলাম। এখানে আছে একটি সুন্দর ফুলফলে ভরা সাজানো বাগান। এই পাড়ে একটি ছোটো টিলা থেকে আঁকাবাঁকা কাঠের সিঁড়ি বেয়ে, একেবারে জলপ্রপাতের পায়ের কাছে যাবার ব্যবস্থা আছে। কয়েকজন দুঃসাহসী সেই পথে নেমে জলপ্রপাতের পদপ্রান্তে গিয়ে আনন্দ নিচ্ছিল।

রতন তখনও আমার হাত ছাড়েনি। শুনলাম, শীতের সময় এই বিশাল প্রপাত সম্পূর্ণ জমে যায়, তখন দেখলে মনে হবে এক মহান জটাজুটধারী ধ্যানমগ্ন তপস্বী বিশাল আকার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন আর তাঁর পায়ের কাছে ছেয়ে রয়েছে সাদা বরফের টিলার সমারোহ। বেশ খানিকটা সময় কাটিয়ে আবার কেবলকারে চড়ে নেমে এলাম সমতলে।

কুইবেক শহর দু’ভাগে বিভক্ত— পুরোনো কুইবেক আর নতুন কুইবেক। অনেকটা আমাদের নতুন দিল্লি, পুরোনো দিল্লির মতো। শক্ত পাথরের দেয়াল আর উঁচু উঁচু সিঁড়ি আলাদা করে রেখেছে নতুন আর পুরোনো কুইবেক শহরকে। পুরোনো কুইবেক সেন্ট লরেন্স-এর পাড়ে অপেক্ষাকৃত নীচু স্থানে অবস্থিত। ইউনেসকো ১৯৮৫ সালে এই পুরোনো শহরকে ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ’ বলে ঘোষণা করেছে। পুরোনো কুইবেক পাথরের দেয়ালে ঘেরা সেন্ট লরেন্স নদীর কাছাকাছি অপেক্ষাকৃত নীচু স্থানে গড়ে উঠেছিল, আর নতুন কুইবেক শহর নদী থেকে দূরে উঁচু জায়গায় গড়ে উঠেছে। এখানে আছে হাল ফ্যাশনের হাই রাইজ অট্টালিকার সমারোহ।

পুরোনো কুইবেক ঠিক ইউরোপের পুরোনো শহরগুলির মতো— সরু সরু ঘোরানো পাথর বিছানো রাস্তা আর দু’পাশে সাজানো দোকানপাট, রেস্টুরেন্ট আর সুভেনির দোকানের ভিড়। পুরোনো কুইবেক শহরে এখনও অতীত যুগের নিদর্শনস্বরূপ ছোটো ছোটো লাল ছাদওয়ালা বাড়ি দেখা যায়। টুরিস্টরা এইসব বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে সেলফি নেয়। আমরাও নিলাম।

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব