সামার সিজনে নিজেকে সাজিয়ে তুলুন নতুন স্টাইল-এ

লেটেস্ট ট্রেন্ড-এর ক্ষেত্রে ভারতের শীর্ষস্থানীয় ফ্যাশন হাউসগুলি এনেছে নতুন স্টাইলিশ কালেকশন, যা ভাইব্র্যান্সি ও কমফোর্ট-এর ক্ষেত্রে অনেক উচ্চ মাত্রার। এগুলি আপনার গ্রীষ্মের পোশাকের ক্ষেত্রে একটি সঠিক পছন্দ  হয়ে উঠবে।

ফ্লোরাল প্রিন্ট, উজ্জ্বল রং বা প্যাস্টেল টোন, পরার জন্য গ্রীষ্ম এবং বসন্ত হল আদর্শ ঋতু। সমস্ত ট্রেন্ডি মহিলাদের জন্য,  জিঞ্জার-এর নরম প্যালেটগুলির মধ্যে পপ রং সহ চটকদার সিলুয়েট রয়েছে। বুটকাট কো-অর্ড সেটগুলি বন্ধুদের সঙ্গে ব্রাঞ্চ আউটিংয়ের জন্য নিখুঁত কালেকশন। এছাড়াও সলিড এবং মাল্টি-কালার প্রিন্টের শিফলি এবং কোরসেট পোশাক রয়েছে যা আপনি সেই বাকেট-লিস্টেড বিচ হলিডে`র জন্য বেছে নিতে পারবেন। যারা তাদের ডেট আপ করতে চাইছেন, তাদের জন্য রয়েছে মজাদার এবং পপিং রঙের ফুশিয়া পিঙ্ক ও উজ্জ্বল নীল রঙের কম্বোস-এর কো-অর্ড সেটগুলি, যা বোল্ড অ্যাবস্ট্রাক্ট স্ট্রাইপে এবং ওয়ান-শোল্ডার-এর। এগুলি অনায়াসে একটি স্টাইলিশ ইমপ্রেশন নিশ্চিত করবে।

যারা কমফোর্ট পছন্দ করেন, তাদের জন্য, হাল্কা ওজনের মার্জিত এবং ট্রেন্ডি পোশাকের বিস্তৃত রেঞ্জ রয়েছে।সূক্ষ্ম ফ্লোরাল প্রিন্ট এবং শিফলি এমব্রয়ডারি সহ প্রশান্তিদায়ক প্যাস্টেল রঙের প্যালেটগুলি একটি স্মার্ট ক্যাজুয়াল আউটিংয়ের জন্য আপনার পছন্দের পোশাক হয়ে উঠবে অনায়াসে।

আপনার পছন্দের তালিকায় যোগ করতে পারেন স্মার্ট ওয়ার্কওয়্যার কুর্তা, যা বিভিন্ন ফেব্রিক এবং প্রিন্টে ভারতীয় পাওয়ার ড্রেসিংকে সংজ্ঞায়িত করে, যেগুলি দিয়ে সহজেই স্টাইল করা যায়।

পুরুষেরা নিওন-রঙের গ্রাফিক টি-শার্ট-এর সঙ্গে তাদের স্টাইলিশ গ্রীষ্মের পোশাকে রঙের পপ যোগ করে দেখতে পারেন। ফ্যাশন ডেনিম এবং ট্রাকার জ্যাকেট আপনার সংগ্রহে থাকলে আপনার স্টাইলে একটি নতুন মাত্রা যোগ করবে।

লাইফস্টাইলের অ্যাক্টিভওয়্যার পোশাকের সঙ্গে ব্লু এবং হোয়াইট রঙের নটিক্যাল রঙের প্যালেটে কাপ্পা`র সঙ্গে অ্যাথলেটিক পোশাক বেশ আকর্ষনীয়। মূল উপাদানগুলির মধ্যে রয়েছে হুডেড টি-শার্ট, যা আপনাকে স্টাইলিশ দেখাবে এমনকি একটি ক্যাজুয়াল সোয়েটশার্ট, প্রিন্টেড ট্রাকার, যা সহজে চলা ট্র্যাকপ্যান্ট এবং স্লাউচি ডেনিমের সঙ্গে আপনি পরতে পারেন। এটি আপনার দৈনন্দিন পরিধানে আরাম এনে দেবে। চিনোস  গ্রীষ্মের একটি প্রধান পোশাক যা উপরে বা নীচে পরা যেতে পারে।

 মেয়েদের জন্য কেউ ইউনিকর্ন-থিমযুক্ত পার্টি ড্রেস বা রঙিন ভাইব্র্যান্ট টাই ও ডাই টপস, স্কার্ট, শর্টস এবং প্লেস্যুট থেকে বেছে নিতে পারেন, যা উপেক্ষা করা কঠিন। ফ্রুট প্রিন্টস ছোটো বাচ্চাদের এবং অল্পবয়সী মেয়েদের পুতুলের স্টাইল এনে দেবার জন্য একটি জনপ্রিয় পছন্দের আইটেম।

অন্যদিকে, ছোটো বাচ্চা এবং অল্প বয়সি ছেলেদের জন্য মোটরস্পোর্ট ফ্যাশন রয়েছে। অপ্রচলিত ডিজাইনের ডিটেল সহ শার্ট, শর্টস, জগার এবং ডেনিমে সমস্ত রেস কার এবং মনস্টার ট্রাকের অনুপ্রাণিত চেহারাও আপনি খুঁজে নিতে পারেন।

সংঘাত (শেষ পর্ব)

স্যারের সঙ্গে আলোচনা করার পরে সেদিনকার মতো শিঞ্জিনি ইন্সটিটিউট থেকে বেরিয়ে এসোপ্ল্যানেড থেকে ভলভো বাস ধরে আসানসোলে ফিরে গিয়েছিল। তারপর দিন পনেরো আর কোনও সাড়াশব্দ নেই শিঞ্জিনির। সোহম সেন প্রায় রোজই ভাবেন, কী হল মেয়ের কে-জানে। হঠাৎ সেদিন ইন্সটিটিউটে পৌঁছে নিজের চেম্বারে ঢুকতেই, টেবিলের উপরে রাখা ল্যান্ডলাইন ফোনটা ঝনঝন শব্দে বেজে উঠল। ফোনের রিসিভার তুলতেই, ওপার থেকে শিঞ্জিনির গলা ভেসে এল,

—স্যার, শিঞ্জিনি কথা বলছি, জয়পুর থেকে। আজ তিনদিন হল আমি জয়পুর এসেছি। আপনার কথাই একদম ঠিক স্যার! আপনি যে বলেছিলেন, ছেলেটার ডাল মে জরুর কুছ কালা হ্যায়, সেটাই সত্যি। বয়স অনুসারে পিছিয়ে থাকা একটা মানুষ। গত বছর-বারো ধরে স্পেশাল এডুকেটরের কাছে বেশ কিছু জিনিস শিখে খানিকটা ডেভেলপমেন্ট হয়েছে। ছেলেটার বাবার প্রস্তাব, ছেলেটার পাশে দাঁড়িয়ে ওদের ব্যবসাটাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে আমাকে।  ওনারা আমাকে বনসল ফার্মাসিউটিকাল এবং সফ্টওয্যার কোম্পানির পার্টনার করে নিতে চাইছেন। প্রতি মাসে ওরা আমাকে দশ লক্ষ টাকা করে দেবেন।

শিঞ্জিনিকে মাঝপথে থামিয়ে সোহম সেন বললেন, কিন্তু এর পরিবর্তে ওরা তোমার পায়ে দশ লক্ষ শিকল পরাবে, সেটা মাথায় রেখো। তুমি তোমার পেশায় অনেক উপরে উঠতে চাও, সেটা ভালো কথা। কিন্তু তোমাকে ওরা ফিউডাল সংস্কৃতির কোন বাঁধনে বাঁধতে চাইছে, তা তোমাকে বুঝতে হবে।

সোহম সেনের কথায় শিঞ্জিনি মনে জোর পায়। ও সঙ্গে সঙ্গে জোর গলায় বলে ওঠে, ওরা আমাকে কোনও বাঁধনে বাঁধতে পারবে না। আমি আমার বাবা-কাকা সকলকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছি, আমি তোমাদের হবু জামাইয়ে নার্স হতে যেমন পারব না, তেমনই ওই ছেলের ঔরসে সন্তান ধারণ করলে, সেই সন্তানও মানসিক ভাবে দুর্বল হতে বাধ্য। কিন্তু আমার কথা শোনার পরে বাবা ভয় পাচ্ছেন, ডাউরি হিসাবে দেওয়া বাবার তিরিশ লক্ষ টাকার পুরোটাই বুঝি জলে চলে গেল।

কাকারা বাবাকে বুঝিয়েছেন, ওদের ব্যাবসার পার্টনার হতে পারলে, ওই টাকাটা ফিরে আসতে ছয় মাস সময়ও লাগবে না। তাছাড়া ওই পরিবারে বিয়ে হলে, আমার সারাটা জীবন ফিনান্সিয়ালি সিকিওর্ড থাকবে। বেশ জোরের সঙ্গে কথা বলতে বলতে হঠাৎ করে চুপ করে যায় শিঞ্জিনি।

কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পরে আবার কথা বলে সে, আমার কোনও ড্রাস্টিক ডিসিশন বাবা যে সহ্য করতে পারবেন না, সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত। আমি চাই না আমার কারণে বাবার কোনও ক্ষতি হয়ে যাক। এ এক নতুন সংঘাত! আমি বুঝে উঠতে পারছি না, এই সংঘাতের থেকে আমি মুক্তি পাব কীভাবে!

—তুমি কর্পোরেট কালচারের অভিজ্ঞতা অলরেডি অর্জন করেছ। সেখানে শোষণ আছে কিন্তু তার পাশাপাশি ফ্রিডম অফ সেক্স আছে, তোমার ব্যক্তিগত জীবনের সবরকমের স্বাধীনতা আছে। কিন্তু ফিউডাল সোসাইটির ম্যারেজ কালচারে তোমাকে স্লেভ হয়ে থাকতে হবে সারাজীবন। তুমি তোমার হবু স্বামীর ব্যাবসায় যোগ দিলে, তোমার জয়েন্ট প্রপার্টি থাকবে, জয়েন্ট ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকবে। কিন্তু কোথাও নিজের কোনও ফিনান্সিয়াল কন্ট্রোল থাকবে না কখনও। তুমি জয়পুরের ব্যাংকে স্যালারি অ্যাকাউন্ট ওপেন করে, স্যালারিড মেম্বার হয়ে থেকে যেতে পারো, তাদের ব্যাবসায়। দ্যাখো শিঞ্জিনি, আমি জানি তোমার হাতের লেখায় মাল্টি-স্ল্যান্টের ছড়াছড়ি। অত সহজে তোমার মনের সংশয় দূর হওয়ার নয়। এত দূর থেকে এইভাবে তোমার মনের সংশয় দূর করা সম্ভবও নয়। ফিউডাল সংস্কৃতি আর কর্পোরেট সংস্কৃতি এই দুই সংস্কৃতির মধ্যে বিদ্যমান যে-সংঘাতের মধ্যে তুমি পড়েছ, তার মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসার প্রচেষ্টা তোমাকেই করতে হবে। আমি শুধু তোমার সামনে বড়োজোর এই সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার একটা রূপরেখা এঁকে দিতে পারি। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তোমাকেই নিতে হবে শিঞ্জিনি!

–ঃসমাপ্তঃ–

সংঘাত (পর্ব-০৩)

শিঞ্জিনির কথা শুনে এবং ওর এহেন অবস্থা দেখে সোহম সেনের মতো শক্ত মানুষেরও ভিতরটা নাড়া খেয়ে যায়। শিঞ্জিনিকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো ভাষা খুঁজে পান না সোহম সেন। খানিকক্ষণ চুপ করে থাকার পরে তিনি বললেন, এসব তুমি কী বলছ! আজকের দিনে এমন কোথাও ঘটে না-কি! তুমি সব জেনে বুঝে চাকরি ছাড়ার জন্য পেপার ডাউন করলে কী মনে করে। তুমি একবারও ভাবলে না, এর পিছনে তোমার শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে তোমার কাকাদের বিশাল কোনও লেনদেনের ব্যাপার থাকতে পারে!

—আপনি মাড়োয়ারি পরিবারের ব্যাপার-স্যাপার জানেন না স্যার। শ্বশুরবাড়িপক্ষ যত বড়ো ধনীই হোক না কেন, আমার বাবার মতন একজন মানুষের কাছ থেকে বহু দর-দস্তুর করার পরে তিরিশ লক্ষ টাকার দহেজ অর্থাৎ পন ক্লেইম করেছে। এবং সবচেয়ে অবাক হওয়ার বিষয় হল, বাবা সেই তিরিশ লক্ষ টাকা ইতিমধ্যে হ্যান্ডওভার করে দিয়েছেন তার মেয়ে বিয়ে বায়না হিসাবে। এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে আমি এই বিয়ে ভেঙ্গে দিতে চেয়েছিলাম।

—বাবা আমার কাছে আকুতি জানিয়ে হাত-জোড় করে বলেছিলেন, তুই এই বিয়ে ভেঙে দিলে আমার মরে যাওয়া ছাড়া সামনে আর কোনও পথ খোলা থাকবে না। তোর কাকারাও আমাদের পাশ থেকে সরে দাঁড়াবে। এই বয়সে আমি এই শরীরে কোথায় গিয়ে দাঁড়াব বলতে পারিস! বাবা আমাকে অনেক করে বুঝিয়েছিলেন, এই টাকার অঙ্কটা ওদের কাছে কিছুই নয়। ওরা নিয়ম রক্ষার্থে এই ডাউরির টাকা চেয়েছে। উলটে ওরা নাকি এই প্রস্তাব দিয়ে গিয়েছে, ওরা আমাকে ওদের ফার্মাসিউটিকাল  সফ্টওয্যার তৈরির ব্যাবসায় পার্টনার করে নেবে। একেবারে লিখিত-পড়িত ভাবে এবং সেইসব ওরা বিয়ে আগেই সেরে ফেলতে চায়।

—ভালোই তো হল! ছিলে একটা সফ্টওয্যার কোম্পানির সাধারণ একজন কর্মচারী। সেখান থেকে পদোন্নতি ঘটিয়ে একেবারে একটা সফ্টওয্যার কোম্পানির পার্টনার! এইরকম স্কাই-রকেটিং কেরিয়ার কজনের কপালে জোটে! বাবা-কাকাদের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে বিয়ে যখন ভাঙতে পারবে না, তখন আজ এত দূর থেকে ছুটতে ছুটতে এই ইন্সটিটিউটে এসেছ কী জন্য! এয়ারপোর্টে নেমে সোজা আসানসোলে যাওয়ার ভলভো ধরলেই তো ভালো করতে। রীতিমতো শ্লেষের সঙ্গে শিঞ্জিনির উদ্দেশ্যে কথাগুলো বললেন সোহম সেন।

শিঞ্জিনি বুঝতে পারছে, স্যার ওর এই নড়বড়ে আচরণে বেজায় চটে গিয়েছেন। স্যারের মুখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে সংকোচ বোধ করে শিঞ্জিনি। মাথা নীচু করে, চুপ করে বসে থাকে সে। কিন্তু ওর ভিতরটা চুপ করে থাকতে পারে না। নিদারুণ এক অসহায়তায় হাজার একটা কষ্ট ওর বুক বেয়ে গলার কাছে দলা পাকিয়ে উঠতে চায়।

শিঞ্জিনির অবস্থা হৃদয়ঙ্গম করতে পেরে, সোহম সেন ফিরে আবার ওকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন, এরকম ভাবে চুপ করে থাকলে জীবনে এক পা-ও এগোতে পারবে না শিঞ্জিনি। তুমি ইমিডিয়েলি বাবা-কাকাদের সঙ্গে কথা বলে, নিজে সোজা জয়পুরে চলে যাও। তোমার হবুবরের সঙ্গে, হবু শ্বশুর-মশাইয়ে সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করো। নিজের চোখে, নিজের কানে সব দেখে-শুনে, নিজে একশো শতাংশ নিশ্চিত হলে, তবেই বিয়ে পিঁড়িতে বসার সিদ্ধান্ত নেবে। একটা চাকরি ছেড়েছ, মানে দ্বিতীয় চাকরি তুমি আর জোগাড় করতে পারবে না, এটা মনে করার কোনও অর্থ নেই। একটা কথা শুধু মনে রাখবে, এত ধনী লোকেরা যখন এত দ্রুত তাদের ছেলের বিয়ে ব্যবস্থা করতে চাইছে, নিশ্চয়ই তাদের ছেলের ডাল মে কুছ তো কালা রহেগাই!

সংঘাত (পর্ব-০২)

চোখের জল মুছতে মুছতে শিঞ্জিনি সেদিন সোহম সেনকে জানাল, আমার এই যন্ত্রণার কথা আমি কাকে বলব! আমার যখন মাত্র দশ বছর বয়স, তখন এক কঠিন অসুখে ভুগে আমার মা মারা যান। মা মারা যাওয়ার পরে, বাবা কেমন যেন নৈরাশ্যের শিকার হয়ে পড়লেন। আমাদের মারোয়াড়ি যৌথ ব্যবসায়ী পরিবার। আসানসোলে জিটি রোড লাগোয়া আমাদের বাড়ি। মার্বেল টাইলস-এর ব্যাবসা আমাদের। আসানসোলে রাঠোড়-টাইলস ফ্যাক্টরির নাম সবাই এক-ডাকে চেনে। বাবার ওইরকম অবস্থার পরে কাকারা পারিবারিক ব্যাবসার হাল ধরার সঙ্গে সঙ্গে, আমার সব দায়ভারও তাদের ঘাড়ে তুলে নিয়েছিলেন। এখানে কলকাতায় আমার মাসির বাড়িতে থেকে ইঞ্জিনিয়রিং পড়ছিলাম কিন্তু কোত্থেকে যে কী…!

সোহম সেন সেদিন শিঞ্জিনিকে কেবলমাত্র সান্ত্বনাই দেননি, গ্রাফোলজির পাঠ প্রদানের পাশাপাশি দিনের পর দিন গ্রাফোথেরাপির মাধ্যমে শিঞ্জিনির হাতের লেখা সংশোধন করে দিয়ে ওকে সুস্থ-সবল ব্যক্তিত্ত্ব সম্পন্ন একজন মানুষ হিসাবে গড়ে দিয়েছিলেন। গ্রাফোলজি কোর্স শেষ হওয়ার পরেই শিঞ্জিনি সেক্টর ফাইভের নতুন চাকরিতে জয়েন্ট করেছিল। নতুন কোম্পানিতে বছর খানেক চাকরি করার পরে, কোম্পানি শিঞ্জিনিকে তাদের বেঙ্গালুরু অফিসে ট্রান্সফার করে দিল। তার আগে অবশ্য তারা ওকে ছয় মাসের জন্য ক্যালিফোর্নিয়া থেকে ট্রেনিং দেওয়ারও ব্যবস্থা করেছিল।

আজ প্রায় তিনবছর বাদে, শিঞ্জিনি এই গ্রাফোলজি ইন্সটিটিউটে পা দিল। ওকে বসতে বলে সোহম সেন ওর কাছে জানতে চাইলেন, তারপরে কেমন আছো বলো! তুমি এখন আসছ কোত্থেকে? বেঙ্গালুরু না, আসানসোল? হ্যান্ডরাইটিং প্র‌্যাকটিস চলছে?

সোহম সেনের পরপর এতগুলো প্রশ্ন শোনার পরেও শিঞ্জিনি নির্বাক। সোহম সেন ফিরে প্রশ্ন করলেন, কী হল! তুমি চুপ করে আছো কেন! ইজ দেয়ার এনিথিং রং?

এবার শিঞ্জিনি ঘাড় তুলে, চোখের কোণে আঙুল ঠেকাল। তারপরে খুব নীচু গলায় জানাল, আমি আজই সকালের ফ্লাইটে বেঙ্গালুরু থেকে কলকাতায় এসেছি। আজই বিকেলে ভলভো ধরে আমার আসানসোল যাওয়ার কথা।

—তা এর জন্য এত মন খারাপ করার কী আছে!

—বেঙ্গালুরুর সঙ্গে সব সম্পর্ক চুকিয়ে দিয়ে এসেছি। গতকাল চাকরি ছাড়ার জন্য পেপার ডাউন করেছি। সিক্সটি ডেজের অ্যাডভান্স নোটিশ পিরিয়ড।

—চাকরি ছেড়ে তুমি কোথায় জয়েন্ট করছ? আর ইউ গোইং অ্যাব্রড! সোহম সেনের এই কথায় শিঞ্জিনির সব আবেগের বাঁধ ভাঙল।

হাপুস নয়নে কাঁদতে কাঁদতে শিঞ্জিনি জানাল, আমার জীবনটা আবার একটা কানা গলির মুখে এসে আটকে গেল স্যার। আমার বাড়ি থেকে বিয়ে ঠিক করেছে। বাবার অক্ষমতার সুযোগ নিয়ে কাকারা আমার সঙ্গে কোনও আলোচনা না করে, আমাকে ছেলেটার সঙ্গে কোনওরকম কথা বলার সুযোগ না দিয়ে আমার বিয়ে ঠিক করে ফেলেছে। ছেলেটাকে কেমন দেখতে সেটা পর্যন্ত আমি জানি না। শুধু একটা জিনিসই আমি জানি যে, আমার শ্বশুরবাড়ি বিশাল ধনী।

জয়পুরের একটা কর্পোরেট হাউসের মালিক ওই পরিবার। নাম বললে সবাই চিনবে— বনসল হাউস। বনসল স্টিল, বনসল ফার্মাসিউটিকাল, বনসল ফার্মাসিউটিকাল সফ্টওয্যার কী ব্যাবসা নেই তাদের! কাকারা বাবার মানসিক অবস্থার সুযোগ নিয়ে বাবাকে এমন ভাবে বুঝিয়েছে যে, বাবাকে এই ভাবনা থেকে বের করে আনা আমার কর্ম নয়।

বাবাকে কড়াভাবে কিছু বললে, বাবা এমনভাবে রিঅ্যাক্ট করছে যে, তা দেখলে আমার ভয় লাগছে। আমার কারণে বাবার যদি কিছু হয়ে যায়! মা-কে তো সেই কবেই হারিয়েছি, এরপরে বাবাকেও যদি হারাতে হয়, তাহলে আমার বাকি জীবনটা…! কথা শেষ করতে পারে না শিঞ্জিনি। মাথা নীচু করে, দু-হাতে মুখ চাপা দেয় সে।

ক্রমশ…

সংঘাত (পর্ব-০১)

আজ প্রায় বছর তিনেক বাদে, শিঞ্জিনি এসেছে কলকাতায়। কলকাতায় পৌঁছেই ও সোজা চলে এসেছে গ্রাফোলজি ইন্সটিটিউটে। গ্রাফোলজি ইন্সটিটিউটের ডিরেক্টর সোহম সেন। সোহম সেনের খুব প্রিয় ছাত্রী ছিল শিঞ্জিনি। সোহম সেনের চেম্বারের দরজা ফাঁক করে, মে আই কাম ইন স্যার বলতেই, সোহম সেন ঘাড় ঘুরিয়ে শিঞ্জিনিকে দেখে আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন, আরে শিঞ্জিনি! এসো, এসো! ভিতরে এসো। এতদিন কোথায় ছিলে তুমি?

শিঞ্জিনি যখন প্রথম এই ইন্সটিটিউটে এসেছিল, তখন ও ইঞ্জিনিয়রিং-এর ফাইনাল ইয়ারের স্টুডেন্ট। সে আজ থেকে প্রায় বছর পাঁচেক আগের কথা। ইন্সটিটিউটের এক পুরোনো ছাত্রী শিঞ্জিনির কাজিন সিস্টার। তাকে সঙ্গে নিয়ে ও ইন্সটিটিউটে এসেছিল গ্রাফোলজি শিখবে বলে।

আর-পাঁচজন ছাত্র-ছাত্রীর মতন শিঞ্জিনিও গ্রাফোলজি কোর্সে ভর্তি হওয়ার সময় ওর একটা আনবায়াসড হ্যান্ডরাইটিং স্যাম্পল জমা দিয়েছিল সোহম সেনের কাছে। সেই হাতের লেখা হাতে নিয়ে সোহম সেন শিঞ্জিনির কাছে জানতে চেয়েছিলেন তুমি লিখেছ ইঞ্জিনিয়রিং পাশ করতে পারলেই, সল্টলেকের  সেক্টর ফাইভে একটা মাল্টি-ন্যাশনাল কোম্পানিতে জয়েন্ট করবে। অথচ তোমার হাতের লেখা বলছে তুমি একটা নিদারুণ সংশয়ের মধ্যে রয়েছে, তোমার ভবিষ্যৎ নিয়ে শুধু তাই নয়, যখন জীবনটা তোমার সুন্দর  করে গড়ে তোলার সময়, ঠিক তখনই তুমি এমন একটা অসংশোধনীয় ভুল করে বসেছ যে, সেই ভুলের মাশুল দিতে গিয়ে তোমার জীবনটার এখন টালমাটাল অবস্থা!

শিঞ্জিনির চোখের কোণে তখন জল চিকচিক করছে। মাথা নীচু করে, ও জানতে চেয়েছিল, আমার কাজিন সিস্টার তাহলে আপনাকে সবই জানিয়ে দিয়েছে! ও ছাড়া আমার একথা অন্য কেউ আর জানে না।

ও কেন বলবে! তুমি তো গ্রাফোলজি শিখতে এসেছ এখানে, আর কদিন বাদে তুমি নিজেই নিজের হাতের লেখা দেখে সব সত্য উদ্ঘাটন করতে পারবে। তবু তোমার কৌতূহল, তোমার সন্দেহ দূর করার জন্য বলছি, তোমার কাজিন সিস্টার এ বিষয়ে কিছুই বলেনি আমাকে। আমি যা বলেছি, তার সবটুকু বলেছে তোমার এই ঢেউ খেলানো বেসলাইন, তোমার হাতের লেখায় ডাইনে-বাঁয়ে ঝুঁকে থাকা অক্ষরগুলো, আর এই ছোটো-হাতের এফ-গুলো। প্রতিটা এফ উপর থেকে নীচে নেমে উপরে ওঠার সময় ডানদিকে বাঁক না নিয়ে দ্যাখো কেমন সাপের মতো এঁকে-বেঁকে ডাইনে-বাঁয়ে কাত হতে হতে উপরে উঠেছে। এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে তোমার জীবনের ভুল-ভ্রান্তির সব গল্প!

এর পরে শিঞ্জিনি ওর মনের মধ্যে জমে থাকা যন্ত্রণার ঢেউটাকে আর আটকে রাখতে পারেনি। আবেগ আপ্লুত গলায় ও বলল, এক ইঞ্জিনিয়রিং-এর সহপাঠীর সঙ্গে আমার খুব গভীর একটা সম্পর্ক ছিল। যেদিন জানতে পারলাম, আমি সন্তান-সম্ভবা হয়ে পড়েছি, সেদিন ওর কাছে ছুটে গিয়েছিলাম বিয়ে প্রস্তাব নিয়ে আমার প্রস্তাব শুনে, ও আঁতকে উঠেছিল। ও অবলীলাক্রমে সব দায় ঝেড়ে ফেলে, এমটিপির প্রস্তাব দিল। ওর প্রস্তাব মতো প্রেগন্যান্সি টার্মিনেশনের পরেই ছিল আমাদের ফাইনাল পরীক্ষা। পরীক্ষা হয়ে যাওয়ার পরেই রাঁচিতে ওর দেশের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার সময় এক বন্ধু মারফত জানিয়ে গিয়েছিল, ওর সঙ্গে আমার নাকি আর কোনওদিন দেখাই হবে না।

১৩ বছর কাটিয়ে পর্দায় ফিরলেন শর্মিলা

পরিচালক রাহুল ভি চিট্টেল্লার হাত ধরে বলিউডে ফিরলেন Sharmila (কুসুম)। ছবির নাম গুলমোহর। এই ছবিতে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন মনোজ বাজপেয়ী (শর্মিলার ছেলে অরুণের চরিত্রে), অমল পালেকর, লাইফ অফ পাই খ্যাত অভিনেতা সুরজ শর্মা এবং সিমরণ ঋষি বাগ্গা।

মার্চের প্রথমেই ছবিটি মুক্তি পেয়েছে ওটিটি প্লাটফর্ম-এ। ডিজনি + হটস্টার-এর দর্শকরা এই ছবি দেখার সুযোগ লাভ করছেন।

দিল্লির ধনী পরিবার বাত্রা ফ্যামিলির অন্দরের কাহিনি নিয়েই ছবির গল্প এগিয়েছে। গল্পে পরিবারের প্রতিটি সদস্যকে কঠিন বাস্তব সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দেখা যায় ভেঙে পড়তে। দীর্ঘ ১৩ বছরের ব্রেকের পর এই ধরনের ফ্যামিলি ড্রামায় কাজ করার সুযোগ লুফে নিয়েছিলেন Sharmila। ছবিতে পরিবারের সদস্য, বিশেষ করে ছেলে অরুণের সঙ্গে মা কুসুমের জটিল সম্পর্ক শর্মিলা সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন।

মনোজ বাজপেয়ী স্বভাবতোই নিজের অভিনয় ক্ষমতা পুরোটা দিয়েই অভিনয় করেছেন। আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে ভোগা উচ্চবর্ণের ব্যবসায়ীর চরিত্রটি অবশ্য তাঁর কাছে নতুন।

গল্পের শুরু বাত্রা পরিবার কে দিয়ে যেখানে ‘গুলমোহর’ নামের বাড়িটিতে তাঁদের বহু প্রজন্ম ধরে বাস। বাড়ির সংস্কারের প্রয়োজনে জিনিসপত্র যখন গোছগাছ হতে থাকে তখন একে একে পরিবারের লুকোনো ইতিহাসও সকলের সামনে উন্মোচিত হতে আরম্ভ করে। ভেঙে পড়ে সম্পর্কের রসায়ন।

মীরা নায়ারের সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করার পর ‘গুলমোহর’ দিয়ে প্রথমবার ফিচার ফিলম পরিচালনায় হাত দিলেন পরিচালক রাহুল চিট্টেল্লা। অর্পিতা মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে লিখেছেন ছবির গল্প। পুরোটাই সম্পর্কের গল্প। চরিত্রগুলির অভিনয়গুণে ছবিটি আলাদা মাত্রা পেয়েছে।

গুলমোহর সিনেমার মাধ্যমে এক যুগ পর রূপোলি পর্দায় ফিরছেন কিংবদন্তি অভিনেত্রী শর্মিলা ঠাকুর (Actress Sharmila Tagore)৷ এটি 3 মার্চ থেকে হটস্টারে দেখা যাচ্ছে ৷ শর্মিলা ঠাকুরের পাশাপাশি সিনেমায় রয়েছেন মনোজ বাজপেয়ী, সিমরান এবং সুরজ শর্মা ।

সিনেমাটিতে একটি পরিবারের তিন প্রজন্মের গল্প বলা হয়েছে৷ যে-পরিবার বছরের পর বছর পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন৷ সম্পর্কের ঘোর প্যাঁচে তিনটি প্রজন্মের পারিবারিক গুপ্তকথা উঠে এসেছে এই ছবিতে। রাহুল ভি চিট্টেলার এই ছবিতে শর্মিলা ঠাকুর অভিনীত চরিত্রের নাম কুসুম বাত্রা৷ তিনি পারিবারিক ভাবে বা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া গুলমোহর বিক্রি করে পুদুচেরিতে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন৷ তাঁর এই ঘোষনা পরিবারে আলোড়ন সৃষ্টি করে৷ পরিবারে জট জটিলতার অন্ত নেই৷ অতিমাত্রায় স্বেচ্ছাচারী নাতিকে (সুরজ শর্মা)  নিয়ে কুসুমের পুত্র অরুণ ( মনোজ বাজপেয়ী ) অতি উদ্বিগ্ন৷ এমনই নানা অভিঘাত ছুঁয়ে এগিয়ে চলে গুলমোহরের গল্প৷ ছবিতে সুর দিয়েছেন সিদ্ধার্থ খোসলা৷

প্রতিধ্বনি ফেরে (শেষ পর্ব )

স্বর্ণাভর মস্কো থেকে ফেরার দিন চলে এল। পূর্ব নির্ধারিত সময়মতো সন্ধ্যা ছটায় ফ্লাইট ল্যান্ড করার কথা। নম্রতা হাতে একগোছা গোলাপ নিয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে পৌনে পাঁচটায় মৃগাঙ্ককে সঙ্গে নিয়ে এয়ারপোর্টে এল। নির্দিষ্ট সময়মতো ফ্লাইট ল্যান্ড করল। একে একে সব যাত্রীরা চলে গেল। কিন্তু নম্রতার চোখ স্বর্ণাভকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল। সে সংশয়পূর্ণ গলায় মৃগাঙ্ককে বলল, মৃগাঙ্কদা, সব যাত্রী তো চলে গেল। স্বর্ণাভ কোথায়! ও কি ফ্লাইট মিস করল!

সব যাত্রী চলে যাবার পরও নম্রতা বেশ কিছুক্ষণ স্বর্ণাভর জন্য অপেক্ষা করল। তার সে অপেক্ষা অপেক্ষাই থেকে গেল। স্বর্ণাভ ফিরল না। মৃগাঙ্ক বলল, বাড়ি ফিরে চলো। স্বর্ণাভ আজ আসবে না। হয়তো পরের কোনও ফ্লাইটে ফিরবে। ফোনও তো করা যাবে না। স্বর্ণাভ নিজে থেকে নিশ্চয়ই যোগাযোগ করবে। ও জানে তুমি ওর জন্য চিন্তা করবে। দেখো, ঠিকই সময় করে কাল ফোন করে নেবে।

প্রবহমান সময় বয়ে গেল। সময় করে স্বর্ণাভর কোনও ফোন নম্রতার কাছে এল না। তারপর বিদেশ থেকে কত ফ্লাইট দেশে ল্যান্ড করল। নম্রতার অপেক্ষার পথ ধরে স্বর্ণাভ ফিরে এল না। মৃগাঙ্ক দুএকবার নম্রতাকে অনুরোধ করল তার বাবার কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য। কিন্তু বাবার মুখোমুখি দাঁড়ানোর মতো নম্রতার মুখ ছিল না। বেশ কয়েক মাস তার ছন্নছাড়া জীবন কাটল। সে মানসিক দিক থেকে খুবই ভেঙে পড়ল। এর প্রতিফলন তার শরীরে এবং বাহ্যিক চেহারায় পড়ল। এরই মধ্যে জীবন গতিপথ বদলাল।

এক রাতে নম্রতা মদ্যপ অবস্থায় ট্যাক্সি থেকে নেমে বাড়ি ফেরার রাস্তায় হাঁটছিল। নেশার ঘোরে তার দুপা টলছিল। সে আপন মনেই বলে উঠল, আজ ডিস্কোয় ড্রিংকটা খুব বেশি হয়ে গেল। এতটা না খেলেই হতো। ট্যাক্সির ড্রাইভারও বাজে। সবে এগারোটা বাজে। গভীর রাত আমাকে বুঝিয়ে বাড়ি পর‌্যন্ত এল না। সব বেইমান। পৃথিবীতে সব বেইমান। আনমনে হাঁটতে হাঁটতে একজন ভদ্রলোকের সামনে টাল সামলাতে না পেরে সে পড়ে গেল। সে ভদ্রলোক অপরিচিত কেউ নন। নম্রতার বাবা প্রভাসবাবু। নম্রতা চোখটা ঈষৎ খুলে প্রভাসবাবুকে অস্ফুট কণ্ঠে ডাকল, বাবা। তারপরই সে জ্ঞান হারাল।

সকালে যখন নম্রতার হুঁশ ফিরল তখন দেখল সে বাবার কাছে। নিজের বাড়িতে বাবার সেবা শুশ্রূষায় সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠল। প্রভাসবাবু সব ভুলে মেয়েে ক্ষমা করে দিলেন। তিনি নম্রতাকে এটাও জানিয়ে দিলেন যে, এক মাসের মধ্যে নম্রতার বিয়ে দেবেন। বাবার কথার উপর কথা বলার ক্ষমতা নম্রতার ছিল না। স্বর্ণাভ যেন তার সমস্ত ক্ষমতা নিংড়ে নিয়ে চলে গেছে। একরকম পরিস্থিতির চাপে বাধ্য হয়ে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির এমডি ধ্রুব অধিকারীকে নম্রতা বিয়ে করে।

বিয়ে দীর্ঘ পনেরো বছর স্বর্ণাভর খোঁজ পাওয়ার বহু চেষ্টা সে করেছে। কিন্তু প্রতিবার ব্যর্থই হয়েছে। আজ না চাইতেই নম্রতার ভালোবাসার মানুষ স্বর্ণাভ তার দুহাতের নাগালে এসেছে। কিন্তু পূর্বের পরিচিত স্বর্ণাভ আর যে-মানুষটা আজ নম্রতার সামনে দাঁড়িয়ে তাদের মধ্যে বিস্তর ব্যবধান। দূর নক্ষত্রের মতো আজকের এই স্বর্ণাভ নম্রতার কাছে ভীষণ অপরিচিত।

নম্রতার গলায় কান্না দলা পাকিয়ে এসেছিল। সে সামলে নিয়ে বলল, সময় কারওর জন্য অপেক্ষা করে না ঠিকই। একটা মানুষ তার ভালোবাসার মানুষের জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে পারে। তোমার আসার জন্য আমি আজও অপেক্ষা করে আছি।

—তুমি ভীষণ বোকা আর ছেলেমানুষ। আমি অপেক্ষা করিনি তোমার জন্য। অতীত সবসময় অতীত, বর্তমানটাই জীবন। আমার বর্তমান আমার নাম, যশ, খ্যাতি, অর্থ এনে দিয়েছে। ওই দ্যাখো আমার স্ত্রী, আমার বর্তমান।

স্বর্ণাভর প্রসারিত হাতের দিকে নম্রতা চেয়ে দেখল একটু দূরে কাঠের বেঞ্চে একজন ভদ্রমহিলা বসে আছেন। স্বর্ণাভ নম্রতার হাত ধরে বলল, চলো তোমার সঙ্গে আমার স্ত্রী অ্যাবেলার পরিচয় করিয়ে দিই।

নম্রতার মুখচোখ রাগে বিরক্তিতে লাল হয়ে উঠল। সে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে স্বর্ণাভকে বলল, ছি! ছি! তোমার মতো বিশ্বাসঘাতকের জন্য আমি এতদিন অপেক্ষা করেছি। এটা ভাবলে আমার নিজের উপরে ঘৃণা হচ্ছে। তোমার জন্য আমি আমার স্বামী ধ্রুবকে আঘাত করেছি প্রতিটা মুহূর্তে। নাম, যশ, খ্যাতি, অর্থের এত লোভ তোমার স্বর্ণাভ যে, সব অতীত ভুলে বিদেশিনিকে ঘরে তুলে স্ত্রীর মর‌্যাদা দিতে হয়েছে। আমার বাবাই ঠিক ছিল। আমি সবটাই ভুল করেছি। নম্রতা কথা শেষ করে কাঁদতে কাঁদতে একটা চড় মারল স্বর্ণাভর গালে। তারপর লন ছেড়ে ছুটতে ছুটতে হোটেলের ঘরের দিকে পা বাড়াল। কিছুটা পথ গিয়ে ধ্রুবর সঙ্গে তার সজোরে ধাক্কা লাগল। ধ্রুবও হোটেলের রুম থেকে নম্রতাকে খুঁজতে বেরিয়েছিল।

ধ্রুবর প্রতি নম্রতা স্বভাবিক আড়ষ্টতাবশত নিজেকে সামলে নিল। ধ্রুব বলল, জীবনে চলার পথে অসতর্ক হতে নেই নম্রতা। সাবধানে দেখে পা ফেলতে হয়। আজ তোমার চোখ মুখ দেখে আমি জিজ্ঞাসা করব না যে তোমার কী হয়েছে। কারণ তোমার চোখ মুখ তা বলে দিচ্ছে। তোমার সঙ্গে যা হয়েছে তা ভালো হয়নি। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা সস্ত্রীক স্বর্ণাভকে দেখে ধ্রুব হালকা নিঃশ্বাস ছাড়ল।

নম্রতা ধ্রুবর বুকে মাথা রেখে জ্যাকেটটা দুহাতে আঁকড়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল, আমি তোমার সঙ্গে যা করেছি ভুল করেছি। জানি এই ভুলের কোনও ক্ষমা হয় না। পারলে আমাকে ক্ষমা কোরো।

ধ্রুব নম্রতার মুখটা একটু তুলে বলল, চলো রুমে। আশা অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। তোমার চোখে আমি জল দেখতে চাই না। তোমাকে সারাজীবন হাসিখুশি দেখতে চাই। যার জন্য তুমি জল ফেলছ মনে রেখো সে তোমার চোখের জলের যোগ্যই নয়। ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে ক্ষমার সম্পর্ক হয় না। আর তুমি আমাকে না ভালোবাসলেও আমি তো তোমাকে ভালোবাসি। আমার বর্তমান-ভবিষ্যৎ সবকিছুই তোমাকে ঘিরে। আর ভাগ্যিস তুমি এখানে বেড়াতে এলে নাহলে বাকি জীবনটাও আমি তোমার ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হতাম। হোল্ড মি টাইট নম্রতা। জ্যাকেটের কলারটা আর একবার ধরো প্লিজ।

ধ্রুবর কথা শুনে নম্রতা হাসতে হাসতে তাকে জড়িয়ে ধরল। ধ্রুবও নম্রতাকে সজোরে জড়িয়ে ধরে দীর্ঘ চুম্বন করল। মনে হল নির্জনতার বুকে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল নম্রতা। ধ্রুবর বুকে মাথা রেখে সে অদূর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখল।

ধীর পায়ে সন্ধ্যা নামছে হিমালয়ে কোল জুড়ে। ঠান্ডা হাওয়ায় ভেসে আসছে পাহাড়ি ফুলের গন্ধ। ঠান্ডায় প্রায় জনমানবশূন্য হয়ে গেল হোটেলের বাইরের লন। ঝিঁঝি পোকার ডাক, অদূরে ঝরনার শব্দ কানে আসছে। আকাশ, বাতাস, একটা পাহাড়ি-সন্ধ্যা সাক্ষী থাকল ধ্রুব-নম্রতার ভবিষ্যৎ স্বপ্নের।

প্রতিধ্বনি ফেরে (পর্ব ৪ )

ধ্রুবর প্রতি নম্রতার খারাপ আচরণের একটাই সঙ্গত কারণ ছিল জোরপূর্বক বিয়ে নম্রতার মতের বিরুদ্ধে বাবা প্রভাসবাবু ধ্রুবর সঙ্গে তার বিয়ে দেন। একসময় নম্রতার ভালোবাসার মানুষ ছিল বিখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব স্বর্ণাভ মিত্র। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন স্বর্ণাভর সঙ্গে তার পরিচয় হয়। স্বর্ণাভর সঙ্গে তার বয়সের ফারাক ছিল প্রায় পনেরো বছর। প্রথম প্রথম তাদের সম্পর্ক ছিল শিক্ষক এবং ছাত্রীর। স্বর্ণাভর নবজন্ম নামে একটি নিজস্ব নাট্যদল ছিল। ছাত্রী হিসাবে নম্রতা নবজন্ম নাট্যদলে যোগ দেয়। প্রায় চার বছর সে ওই দলে যুক্ত ছিল। স্বর্ণাভর প্রতি তার ভালোলাগার সূত্রপাত তখন থেকেই। সেই নাট্যদল প্রায় কুড়ি বছর রংমহল থেকে স্টার, নন্দন থেকে রবীন্দ্রসদন মাতিয়ে রেখেছিল বিপুল পরিমাণে দর্শককে।

ছত্রিশ বছরের স্বর্ণাভর প্রতি একুশ বছরের নম্রতার ভালোলাগা, দায়িত্ববোধ, নম্র ব্যবহার নাট্যদলের অন্যান্য সদস্যের চোখ এড়ায়নি। স্বর্ণাভও নম্রতার আচার-আচরণ সম্বন্ধে বিশেষ ভাবে অবহিত ছিল। শিক্ষিতা, সুন্দরী, মার্জিত রুচিবোধের অধিকারী নম্রতার ভালোবাসার কাছে ধরা দেয় স্বর্ণাভ। এই পৃথিবীতে স্বর্ণাভর আপন বলতে কেউ ছিল না। তার যখন পনেরো বছর বয়স, তখন একটা রেল দুর্ঘটনায় বাবা-মা দুজনেই মারা যান। জীবনের সঙ্গে একাকী লড়াই করতে করতে একসময় তার মাথায় জয়ে মুকুট ওঠে।

নম্রতার কাছে আশ্রয় পেয়ে স্বর্ণাভ জীবনের সমস্ত না পাওয়া ভুলে যায়। পাঁচ বছর ঘুরতে না ঘুরতেই তারা দুজনে একে অপরকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। বাবা প্রভাসবাবু থিযোর অভিনেতা স্বর্ণাভর সঙ্গে মেয়ে বিয়ে দিতে রাজি হলেন না। তিনিও জেদের বশবর্তী হয়ে সাত দিনের মাথায় সুপাত্রের সঙ্গে মেয়ে বিয়ে দেবার সিদ্ধান্ত নেন। শৈশবে মাতৃহারা নম্রতাকে কোলে পিঠে করে অপার স্নেহে মানুষ করার অধিকারবশত প্রভাসবাবু মেয়ে বিয়ে তড়িঘড়ি করে ঠিক করে ফেলেন দিল্লিনিবাসী এক আইপিএস অফিসারের সঙ্গে।

নম্রতা প্রভাসবাবুর এই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি। বিয়ের ঠিক তিনদিন আগে নম্রতা বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। কয়েক মাস স্বর্ণাভর সঙ্গে সে কলকাতার বাইরে চলে যায়। কিছুদিন কাটিয়ে আবার তারা কলকাতায় ফিরে আসে। নম্রতার বাবা, মেয়ে আচরণে চাপা অভিমানবশত কোনও খোঁজখবর নেন না। তিনি ভাবেন যে তাঁর একমাত্র মেয়ে লোকসমাজে তাঁর উঁচুমাথা ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে যখন চলে গেছে তখন সে মেয়েে ভুলে যাওয়াই শ্রেয়। ফলে তিনি নিশ্চুপ থাকেন।

এদিকে স্বর্ণাভর বালিগঞ্জের বাড়িতে নম্রতা তার সঙ্গে লিভ-ইন সম্পর্কে থাকতে শুরু করে। বেহিসেবি রঙিন জীবন কাটাতে কাটাতে সাত বছর চোখের নিমেষে কেটে যায়। ভালোবাসার বিভিন্ন মুহূর্ত উদ্যাপন করতে ইউরোপের দর্শনীয় স্থানগুলিতে নম্রতাকে নিয়ে পাড়ি দেয় স্বর্ণাভ। পাহাড়ি খরস্রোতা নদীর মতো দুজনের জীবন নিজস্ব ছন্দে ভেসে যেতে থাকে। কিন্তু জীবন সবসময় একই ছন্দে একই গতিতে বয়ে চলে না। জীবনেও ছন্দপতন হয়, গতি ও গতিপথ দুই বদলায়। স্বর্ণাভ-নম্রতার জীবনেও ছন্দপতন হল।

দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের পর কেরিয়ারে সাফল্য অর্জন করে মস্কোর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উত্সবে যোগ দেবার আমন্ত্রণ স্বর্ণাভর কাছে এল। মস্কো থেকে যেসময় তার ডাক এল সেসময় নম্রতা খুব অসুস্থ। ইউরিলিথিয়সিসে আক্রান্ত হয় নম্রতা। ডাক্তার তাকে পরীক্ষা করে জানান অপারেশন করানো ছাড়া অন্যত্র উপায় তিনি দেখছেন না। পাঁচ দিনের মধ্যে নম্রতার অপারেশন করাতে হবে। স্বর্ণাভর পক্ষে নম্রতাকে কলকাতায় এভাবে ফেলে রেখে মস্কো যাওয়াতে তার মন সায় দিচ্ছিল না। স্বর্ণাভর এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু মৃগাঙ্কর উপর নম্রতার দেখভাল ও অপারেশনের দায়িত্ব দিয়ে সে কিছুটা নিশ্চিন্ত হল।

নম্রতা স্বর্ণাভকে একরকম জোর করেই মস্কো যেতে রাজি করাল। সে স্বর্ণাভকে বলল, দেখো, তুমি যখন সম্মান, পুরস্কার নিয়ে কলকাতায় ফিরবে তখন আমার চেয়ে কেউ এত গর্বিত হবে না। আমি একদম সুস্থ হয়ে যাব। তোমার সাফল্যে আমি যে কতটা খুশি হব তা তোমাকে বলে বোঝাতে পারব না। মৃগাঙ্কদা তো রইলই আমার দেখভাল করার জন্য। তুমি চিন্তা কোরো না। আমি তোমার জন্য দুহাত বাড়িয়ে অপেক্ষা করব স্বর্ণাভ। তুমি তো জানো তোমাকে ছাড়া আমি নিজের অস্তিত্বকে কল্পনা করতে পারি না।

স্বর্ণাভ নম্রতাকে বুকের কাছে টেনে কপালে চুম্বন করে বলল, লাভ ইউ মাই হার্ট। তুমি আমার সবকিছু। তুমি ছাড়া আমার জীবনে আমি কিছু ভাবতে পারি না। আমাকে এভাবে বিদায় জানাতে তোমার ইচ্ছে করছে!

নম্রতা আধো গলায় স্বর্ণাভকে জড়িয়ে ধরে বলল, তুমি যেভাবে আমার শরীরের প্রতিটি রক্তবিন্দুতে মিশে থাকো সেখানে তোমাকে ছাড়া একটা সেকেন্ড থাকা আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে। কিন্তু কী করব বলো! ইচ্ছার বিরুদ্ধেও কখনও কখনও কাজ করতে হয় মানুষকে। দশটা দিনই তো, দশ বছর তো নয়! তোমার কথা ভাবতে ভাবতে আমার এক একটা দিন, চব্বিশ ঘণ্টা কেটে যাবে। আমি তোমার ভালোর জন্য সবকিছু করতে পারি। তোমার জন্য আমি এ পৃথিবী ছাড়তে পারি। শুধু তুমি আমায় ছেড়ে যেও না তাহলেই হবে।

—একদম এসব কথা বলবে না। একবার ভেবে দেখেছ তুমি পৃথিবীতে না থাকলে আমার কী হবে!

—মজা করে বললাম তো। তুমি সিরিয়াসলি নিয়ে নিলে।

—এসব বিষয় নিয়ে মজা করবে না। তুমি জানো এগুলো আমি পছন্দ করি না।

নম্রতা হাসতে হাসতে বলল, সরি বাবা। কান ধরছি। নম্রতা স্বর্ণাভর ভেজা ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে অপ্রত্যাশিত দীর্ঘ একটা চুমু খেল। তার ঈষৎ বাদামি চোখের তারায় দুষ্টুমি খেলে গেল।

—ম্যাডাম, এটা আমার উপরি পাওনা ছিল।

—না মশাই, তোমার উপরি পাওনা নয়। এটা ভালোবাসার ঘুস। আমার দেওয়া একটা স্মৃতিচিহ্ন যা তোমার কাছে আমৃত্যু থেকে যাবে।

মস্কো যাওয়ার দিন স্বর্ণাভকে ফ্লাইটে বিদায় জানাতে মৃগাঙ্কর সঙ্গে নম্রতা এল। স্বর্ণাভ চলে যাওয়ার পরের দিন নম্রতার অপারেশন। ভালোভাবেই সম্পন্ন হল। দিন তিনেক রেস্টে থাকার পর স্বাভাবিক জীবনযাপনে ফিরল নম্রতা। বিদেশ থেকে স্বর্ণাভ টেলিফোনে মৃগাঙ্কর কাছে সব খবরাখবর পেল। একদিন তার নম্রতার সঙ্গেও কয়েক মিনিট কথা হল। দেখতে দেখতে এক সপ্তাহ কেটে গেল।

ক্যালেন্ডারের পাতায় কালির দাগ দিয়ে দিনের হিসাব করতে করতে নম্রতা মৃগাঙ্ককে বলল, আর তিনটে দিন বাকি তোমার বন্ধুর ফিরতে। আমায় ছেড়ে যাব না যাব না করতে করতে গেল। আর গিয়ে দেখো ফোন করতে ভুলে গেল। জানি ওখান থেকে ফোন করা সমস্যা। তবু চারদিন হল বোধহয় ফোন করেনি। এইজন্যই বলে যে বিদেশে গেলে মানুষ দেশকে ভুলে যায়। দুদিন ফোনেই যা খবর নেবার তোমার কাছে নিয়ে নিয়েছে।

—তুমি মিথ্যাই রাগ করছ। হয়তো কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। আর তিনদিন পর ফিরবে বলে তোমাকে অপেক্ষা করাচ্ছে। তোমাকে আমার বন্ধু অবসরে মিস করবেই। তুমি মিলিয়ে নিও আমার কথা তিন দিন পর।

—ধুর, মিস করবে না ছাই! বিদেশিনি মহিলাদের দেখতে দেখতে ওর সময় ভালোই কাটছে। ওর কি এদিককার কথা মনে আছে!

—অত যখন বিশ্বাস করে ছাড়ার ক্ষমতা নেই তখন যেতে দিলে কেন! আমার বন্ধু তো তোমায় ফেলে যেতে চায়নি। তুমিই জোর করে পাঠালে। এখন দোষারোপ করছ!

—মৃগাঙ্কদা, আমার ওর উপর সম্পূর্ণ বিশ্বাস আছে। ও কী করতে পারে কী পারে না সেটা বোধহয় আমার থেকে ভালো কেউ জানে না। সেদিন বিকেলে ঘণ্টাখানেক চায়ে আসরে নম্রতার সঙ্গে গল্প করে মৃগাঙ্ক চলে গেল।

পোস্ট মেনোপজাল রক্তপাত

মেনোপজ মহিলাদের জীবনের এমন একটি অবস্থা, যখন তাদের রজঃস্রাব সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যায় এবং তারা আর গর্ভধারণ করতে পারে না।

একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর মেয়েদের পিরিয়ড বা মাসিক শুরু হয়। আবার একটি নির্দিষ্ট বয়সের পর সেই মাসিক বন্ধও হয়ে যায়। যাকে মেনোপজ বলে। মেনোপজ একটি স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া। তবে, পিরিয়ড চলাকালীন মহিলাদের হরমোনাল ডিসব্যলেন্সের পাশাপাশি বহু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। তেমনই, মেনোপজের সময়ও কিছু শারীরিক পরিবর্তন হয়। যা থেকে বহু ক্ষেত্রে যৌন জীবনেও পরিবর্তন আনে। তবে মেনোপজ মানেই যে যৌন জীবন শেষ, এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।

মেনোপোজ সাধারণত ৪৯ থেকে ৫২ বছর বয়সে হয়ে থাকে।সাধারণত মহিলাদের একবছর রজঃস্রাব বন্ধ থাকলে চিকিৎসকরা এটাকে মেনোপোজ বলে থাকেন। এসময় ডিম্বাশয়ের কার্যক্রম  বন্ধ হয়ে যায়।

মেনোপজের লক্ষণ কী কী?
মাসিকের অনিয়ম যেমন পিরিয়ড বন্ধ হওয়া, বাধাগ্রস্ত হওয়া, ভারী বা কম প্রবাহ ইত্যাদি মেনোপজের সাধারণ লক্ষণ। এছাড়া মেনোপজ আসছে নিম্নোক্ত লক্ষণগুলি দ্বারা ধারণা করা যেতে পারে। হঠাৎ করে সারা শরীরে তাপ ছড়িয়ে পড়া, যা সাধারণত মুখ, ঘাড় এবং বুকে সবচেয়ে তীব্র হয়, সঙ্গে ঘাম হয়।

পোস্ট মেনোপজাল রক্তপাত কী?

  • পোস্ট মেনোপজাল রক্তপাত হল যোনিপথে রক্তপাত যা আপনার শেষ মাসিকের এক বছর বা তার বেশি পরে ঘটে। এটি যোনিপথের শুষ্কতা, পলিপস (ক্যান্সারবিহীন বৃদ্ধি) বা আপনার প্রজনন ব্যবস্থার অন্যান্য পরিবর্তনের লক্ষণ হতে পারে।
  • প্রায় ১০% মহিলাদের মধ্যে মেনোপজের পরে রক্তপাত জরায়ু ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে।

পোস্ট মেনোপজাল রক্তপাতের কারণ কী?

হরমন প্রতিস্থাপনের চিকিৎসা

  • জরায়ু পলিপ (জরায়ুতে বৃদ্ধি)
  • জরায়ুর টিউমার
  • এন্ডোমেট্রিয়াল হাইপারপ্লাসিয়া
  • এন্ডোমেট্রিয়াল ক্যান্সার (জরায়ুর আস্তরণে ক্যান্সার)
  • এন্ডোমেট্রিয়াল অ্যাট্রোফি (জরায়ু বা যোনির আস্তরণ পাতলা এবং শুষ্ক হয়ে যায়)
  • সার্ভিকাল ক্যান্সার

পোস্ট মেনোপজাল রক্তপাতের লক্ষণ:

হট ফ্লাশ (hot flushes)

যোনির শুষ্কতা

যোনিপথের ঝিল্লি পাতলা হওয়া ও স্থিতিস্থাপকতা কমে যাওয়া

প্রস্রাব আটকে রাখার অক্ষমতা (ইউরিনারি ইনকন্টিনেন্স)

ত্বকের শুষ্কতা

ওজন বৃদ্ধি

স্তনের আকার বৃদ্ধি ও ব্যথা

জয়েন্টে ব্যথা

মাথা ব্যথা

বুক ধড়ফড়

অনিদ্রা

মূত্রনালীর সংক্রমণ বৃদ্ধি

ওজন বৃদ্ধি

স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া

অ্যাথেরোসক্লেরোসিস, অস্টিওপোরোসিস বা অস্থিক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে।

পোস্ট মেনোপজাল রক্তপাত কীভাবে নির্ণয় করা হয়?

  • শারীরিক পরীক্ষা এবং একটি কেস হিস্ট্রি বিশ্লেষণ
  • পেলভিক পরীক্ষার অংশ হিসেবে প্যাপ স্মিয়ার
  • ট্রান্সভ্যাজিনাল আল্ট্রাসাউন্ড
  • হিস্টেরোস্কোপি: এটি একটি ক্যামেরা দিয়ে  সার্ভিক্স এবং জরায়ু পরীক্ষা করার একটি পদ্ধতি
  • প্রসারণ এবং কিউরেটেজ (D & C): এই পদ্ধতিতে একটি বড়ো টিস্যুর নমুনা পাওয়ার জন্য জরায়ুর মুখকে প্রসারিত করা বা প্রশস্ত করা হয়
  • এন্ডোমেট্রিয়াল বায়োপসি: এই পদ্ধতিতে জরায়ু থেকে টিস্যুর আস্তরণের নমুনা নেওয়া হয়

কী করা উচিত?

  • আপনি যদি মেনোপজ-এর পর যোনিপথে রক্তপাত অনুভব করেন, তবে আপনার চিকিৎসকের সঙ্গে  যোগাযোগ করুন।
  • আপনার মাসিক বন্ধের পরে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন ।

প্রতিধ্বনি ফেরে ( পর্ব ৩ )

নম্রতারা গাড়িতে ওঠামাত্র গাড়ি ছেড়ে দিল। হোটেলের উদ্দেশ্যে পাহাড়ের নীচে দিয়ে গাড়ি নামতে থাকল। ঘড়িতে আড়াইটে বেজে গেছে। রৌদ্রোজ্জ্বল নীলাকাশ কোথা থেকে হঠাৎ করে কালো মেঘে ছেয়ে গেল। নম্রতার মতোই মেঘেরও মুখ ভার। কখন যে মনের আকাশ ঘন কালো মেঘে ছেয়ে বৃষ্টি নামবে স্বামী ধ্রুব বোধ হয় তার আঁচও পাবে না।

নম্রতা জানলার দিকে উদাসীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে ধাক্কা লাগা ওই অচেনা ভদ্রলোকের কথা ভাবতে লাগল। নম্রতার মন কেন তোলপাড় হচ্ছে আজ। নম্রতা ভাবল যে কেনই বা ওই একঝলক ভদ্রলোকের চোখের চাহনি তার মনকে এত নাড়িয়ে দিয়ে গেল। অত্যধিক ঠান্ডায় ভদ্রলোকের মুখের অর্ধেক অংশ মাফলারে ঢাকা ছিল। সে তো তার সম্পূর্ণ মুখ দেখতে পায়নি। শুধু ভদ্রলোকের চোখ নয়, তার গলার স্বর, হাঁটাচলা সবটাই নম্রতার পূর্ব পরিচিত। এসব কেন মনে হচ্ছে!

আশার গলার আওয়াজে নম্রতার সম্বিত ফিরল। হোটেলের সামনে গাড়ি দাঁড়াতেই আশা চিত্কার করে বলল, মাম্মা, আমরা হোটেলে চলে এসেছি। গাড়ি থেকে নেমে হোটেলের ঘরে ঢোকামাত্র অঝোরে বৃষ্টি শুরু হল।

বাথরুম থেকে নম্রতা ফ্রেশ হয়ে বেরোতেই ধ্রুব বলল, হোটেলের রুমেই খাবার দিয়ে যেতে বললাম। ওয়েট করো একটু। ধ্রুব আশাকে নিয়ে বাথরুম গেল হাত মুখ ধুতে। মিনিট পনেরোর মধ্যে একটি অল্পবয়সি মেয়ে ঘরে খাবার দিয়ে গেল। খাবার খেয়ে ধ্রুব আশাকে ঘুম পাড়াতে পাড়াতে নিজেও ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ল।

বালিশে মাথা দিয়ে নম্রতার চোখে ঘুম নেই। একটা অপরিচিত অথবা একটা অর্ধপরিচিত চোখ তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। নম্রতা আপন মনেই বলে উঠল, ইস, লোকটা তাড়াহুড়ো করে না চলে গেলে অন্ততপক্ষে নামটা জিজ্ঞাসা করা যেত। কিন্তু কেন ওই অপরিচিত লোকটার সবকিছু আমার এত চেনা লাগল! লোকটি কী সত্যিই আমার পূর্বপরিচিত! কে ওই ভদ্রলোক? লোকটার সঙ্গে আমার কি আর দেখা হবে? ধ্রুবর কথায় লোকটি টুরিস্ট যদি হয় তাহলে আবার দেখা হওয়ার সম্ভবনা আছে। দেখা হওয়ার সম্ভবনা থাকলেই বা কী লাভ! কিন্তু কী কারণে আমি লোকটিকে খুঁজছি!

ধ্রুব অর্ধ্বউন্মীলিত চোখে নম্রতার গায়ে হাত দিয়ে বলল, কী এত ভাবছ! একটু ঘুমোলে শরীরটা ফ্রেশ হতো।

নম্রতা হাত সরিয়ে দিয়ে বলল, দুপুরে ঘুমোনো আমার কোনওদিনই অভ্যাসে নেই। তাছাড়া সন্ধে হয়ে গেছে অনেকক্ষণ।

ধ্রুব চোখ রগড়াতে রগড়াতে বিছানা ছেড়ে উঠে দেখল পাহাড়ের গায়ে চাপ চাপ অন্ধকার নেমে এসেছে। বৃষ্টি থেমে গেছে। প্রচণ্ড ঠান্ডা হাওয়া বইছে সোঁ সোঁ শব্দে। বৃষ্টির হওয়ার ফলে বাইরে বরফ পড়ার মতো আবহাওয়া। লাচেন নদীর গর্জন শোনা যাচ্ছে জানলার কাছে দাঁড়ালে। হোটেলের একটি ছেলে ধোঁয়া ওঠা দুকাপ কফি দিয়ে গেল। কফির কাপে চুমুক দিয়ে নম্রতা একটা দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়ল। আশা বিছানায় অকাতরে ঘুমাচ্ছে।

ঘরের নিস্তব্ধতাকে ভেঙে ধ্রুব নম্রতাকে বলল, তুমি আমাকে এড়িয়ে গিয়ে ভুল করছ। আমি কোনও দোষ না করেও শাস্তি পাচ্ছি। স্বাভাবিক সহজ একটা সম্পর্ককে অযথা অস্বাভাবিক জটিল করে তুলে আমরা দুজনেই ভালো থাকব না। আমিও এতে ভালো নেই। আর তুমিও ভালো থাকবে না।

নম্রতা ধ্রুবর কথার জোরপূর্বক প্রতিবাদ করে একটু উঁচু স্বরে বলল, কে বলল তোমাকে যে আমি ভালো নেই! আমি খুব ভালো আছি। ভালো না থাকার মতো তো কিছু ঘটেনি।

ধ্রুব শান্ত স্বরে বলল, জোর গলায় ভালো আছি বললেই কি ভালো থাকাটা প্রমাণিত হয়! ধ্রুবর এই কথার কোনও প্রত্যুত্তর নম্রতা দিল না। কফি শেষ করে শূন্য কফি মগটা টেবিলে নামিয়ে আশার কাছে চলে এল। আশা ঘুম থেকে উঠে পড়ে যেন নম্রতাকে স্বস্তি দিল।

দুটো দিন লাচেনে কাটানোর পর নম্রতা-রা গ্যাংটকে ফিরে এল। গ্যাংটকের হোটেলে ওরা যখন পৌঁছোল তখন ঘড়ির কাঁটায় বিকাল চারটে। ধ্রুব আর আশা গাড়ি থেকে নেমে হোটেলের রুমে চলে গেল। নম্রতা বাইরে হোটেলের লনে পায়চারি করতে করতে মেঘলা বিকেল উপভোগ করতে লাগল।

বড়ো লন জুড়ে দেশি-বিদেশি ফুলের মেলা। অদূরে পাহাড়ের চূড়ায় সূর্য মুখ লুকাচ্ছে। সকাল থেকেই ঠান্ডা বেশ জাঁকিয়ে পড়েছে। মাথার উপর দিয়ে তুলোর মতো মেঘগুলো বিক্ষিপ্ত ভাবে চলে যাচ্ছে। ফুরফুরে ঠান্ডা হাওয়া এসে নম্রতার চোখে মুখে চুম্বন করে যাচ্ছে। সে গায়ে উপর শালটা ভালো করে জড়িয়ে হালকা শ্বাস ছেড়ে কাঠের বেঞ্চে বসল। নম্রতার এক হাত দূরত্বে একটা লোক দাঁড়িয়ে ঘনঘন সিগারেট খাচ্ছিল। সিগারেটের গন্ধ নম্রতার কোনওদিনই সহ্য হয় না। ওই গন্ধে নম্রতার অস্বস্তি হতেই নম্রতা বেঞ্চ ছেড়ে উঠে লোকটির কাছে দাঁড়িয়ে বলল, এক্সকিউজ মি। শুনুন, আপনি স্মোক করলে দূরে গিয়ে করুন। সিগারেটের পোড়া গন্ধে আমার অসুবিধা হয়।

লোকটি মুখ থেকে মাফলার নামিয়ে বলল, আপনার যদি অসুবিধা হয় আপনি সরে বসুন। পাশে আরও বেঞ্চ রয়েছে। লোকটির গলার ভারী কণ্ঠস্বর চিনতে ভুল হল না নম্রতার। লোকটির মুখের দিকে তাকাতেই নম্রতার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার অবস্থা। নম্রতার গোলাপি দুটো ঠোঁট ঈষৎ কেঁপে উঠল। কম্পিত গলায় সে বলল, স্বর্ণাভ। তুমি বেঁচে আছো!

বয়সের সঙ্গে স্বর্ণাভর কিছু পরিবর্তন বাহ্যিক রূপের হয়েছে। লম্বা চওড়া সুদর্শন পুরুষ স্বর্ণাভ। টিকালো নাক। বুদ্ধিদীপ্ত মুখ। ফরসা গায়ে রং বয়স বাড়ার সঙ্গে যেন আরও ঔজ্জ্বল্য বাড়িয়েছে। মাথাভর্তি কালো ঢেউখেলানো চুলে অল্পবিস্তর পাক ধরেছে। শরীর স্বাস্থ্য আগের চেয়ে অনেক ভালো। ভোরের নরম আলোর মতো দুচোখে সেই পূর্বের মতোই মোহময় দৃষ্টি। বয়স প্রায় আটান্নর ঘর ছুঁয়েছে।

নম্রতারও অবশ্য বাহ্যিক পরিবর্তন হয়েছে। বয়স তেতাল্লিশের ঘরে পা দিয়েছে। আগের মতো গোলগাল চেহারা নম্রতার নেই। শরীর অনেক ভেঙে গেছে। ধবধবে ফরসা রং অনেকখানি ম্লান হয়েছে। মুখের মধ্যে হালকা বয়সের ছাপ পড়েছে। মুখে সারল্যের চিহ্নমাত্র নেই। বয়স বাড়ার ফলে মুখ অনেকখানি দৃঢ় এবং আত্মবিশ্বাসে পরিপূর্ণ। ঈষৎ বাদামি চোখের তারা ধূসর বর্ণ নিয়েছে। চোখে কালো মোটা ফ্রেমের চশমা। কালো মেঘের মতো একঢাল ঘন কালো চুল উঠে তার ঘনত্ব কমিয়েছে।

স্বর্ণাভ নম্রতার কথার উওর খুঁজে না পেয়ে স্মিত হাসল শুধু। স্বর্ণাভর থেকে কোনও প্রত্যুত্তর না পেয়ে নম্রতা উঁচু গলায় বলল, তুমি হাসছ? জানো, তোমার অপেক্ষায় আমি আজও কাউকে নিজের ভাবতে পারি না। তোমার জন্য আমি সংসার করেও সংসারী হতে পারিনি। তুমি এই পৃথিবীতে থাকা সত্ত্বেও একবার আমার সঙ্গে এতগুলো বছর দেখা করলে না! কেন? কী অপরাধ করেছি আমি? এভাবে তুমি কেন মুখ লুকিয়ে থেকে গেলে!

স্বর্ণাভ হাসতে হাসতে বলল, তোমার স্বামী আছে। তোমার তো একটা মেয়ে আছে শুনেছি। অথচ তুমি কিনা সংসারী হতে পারোনি! এই কথাগুলো ফিল্মের ডায়লগের মতো। এই পৃথিবীতে কেউ কারও জন্য অপেক্ষা করে না। আমিও করিনি। সময় নিজের নিয়মে নিজের মতো বয়ে যায়। তুমিই তো নিজে তার জলজ্যান্ত প্রমাণ।

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব