সুগন্ধ যখন মৃত্যু পর্ব-২০

পরীক্ষা এগিয়ে আসছিল। স্কুলে যদি টেস্টে অ্যালাউড হতে না পারে তাহলে যে কী অবস্থার সম্মুখীন হতে হবে নিজেও জানে না। স্যারের কথামতো বাড়িতে তো রাজি করিয়েছিল কিন্তু ভালোমতো জানত কোনওরকম ভাবে যদি রেজাল্টে লাল কালির দাগ পড়ে তবে পড়াশোনার ইতি এখানেই এ বছরই হবে। কেউ কোনও কথা শুনবেই না। দস্তুরমতো নিজের যতটুকু ক্ষমতা তাই দিয়ে পড়তে শুরু করেছিল। পড়ার বাইরে আর এতটুকু কথা বলার সুযোগ দিত না স্যারকেও। খুব ভয় লাগত। মনে হতো কিছু যেন একটা ঘটবে। অথচ নিজেকে কিছুতেই সরিয়ে আনতে পারত না, পারছিল না।

পরীক্ষার ঠিক এক সপ্তাহ আগে, ততদিনে যতটা পেরেছে ইংরেজি দেখে নিয়েছে। সজল স্যারের কোচিংয়ে যাবার আর কোনও প্রশ্নই ছিল না। ইতিহাস আর পলিটিক্যাল সাযে্সের আগের বছরের কোশ্চেনগুলো থেকে প্রভাস স্যার কিছুটা দাগিয়ে দেবেন বলেছিলেন। মোটামুটি ইম্পর্টেন্টগুলো পরীক্ষার আগে দেখে গেলেই হবে।

স্যারের বাড়ি ঢুকতেই দেখে কোনও এক আত্মীয়ে বাড়ি স্যার আর কাকিমা তাড়াহুড়ো করে বেরোচ্ছেন। কস্তুরী বাড়ি ঢুকতেই বলেন, শোনো আমি তোমার জন্য কয়েকটা নোট বের করে রেখেছি। ওগুলো সব আমার সময়ে। তাই এত ভাজা ভাজা হয়ে গেছে, তুমি বাড়ি নিয়ে যাওয়া অবধি আর কিছু গোটা থাকবে না। আমাদের তিনজনকেই যেতে হচ্ছে। নীচে তো মা রইল। লেখাগুলো বেশি বড়ো নয়। তুমি টুকে নিয়ে মাকে বলে নীচের দরজাটা টেনে দিয়ে চলে যেও, অসুবিধা নেই তো?

না স্যার। সত্যি অসুবিধা ছিল না। নিরিবিলিতে একটু থাকতে পাওয়াটা যে কত বড়ো সুখের সেটা জানত কস্তুরী। স্যার আর ওনার স্ত্রী, ছেলে চলে যাওয়ার পর স্যারের পুরোনো খাতাটা দেখছিল। স্যার ঠিকই বলেছেন। একেবারে হলুদ খাজা একটা ঠোঙা।

পাতা ওলটাতে গেলেই মড়মড় করে আওয়াজ হচ্ছে। পাতাটা কুঁকড়ে ভেঙে ভেঙে আছে। তবে ভগবানের দয়ায় লেখাটা অতটা অস্পষ্ট হয়নি। তাই বুঝতেও পারছে, বুঝে টুকে নিতেও পারবে।

লিখতে লিখতে বিকেল গড়িয়ে কখন যে সন্ধে নেমেছে খেয়ালই হয়নি। লেখাটা আর একপাতা মতো বাকি ছিল। আচমকা খুট করে একটা শব্দ হওয়ায় পেছনে ফিরে তাকাতেই বুকের ভেতরটা হিম হয়ে যায় কস্তুরীর। ঠিক ওর পেছনে দাঁড়িয়ে বুম্বা স্যার। ও ঘরে ঢুকল কী করে?

আপনি? আঁতকে উঠেছিল কস্তুরী।

ছেলেটার চোখ দুটো যেন জ্বলছিল। কী অসম্ভব ধূর্ততা লেগে ছিল ওঁর চোখে। কস্তুরী অবশ হয়ে আসা ভয়গুলোকে দূরে ঠেলে উঠে দাঁড়ায়। বুঝতে পারে এখনই এই মুহূর্তে ওকে এখান থেকে বেরিয়ে যেতে হবে। নাহলেই সর্বনাশ।

বাড়ি ফিরবে কী করে? স্যারের মা সন্ধ্যা প্রদীপ দিতে নীচে ঠাকুর ঘরে ঢুকেছেন হয়তো। এই ঘর থেকে চিত্কার করলে তিনি কোনওমতেই শুনতে পাবেন না। এক এক পা করে বুম্বা স্যার ওর দিকে এগিয়ে আসছে। কস্তুরী চিত্কার করবে? কী করবে ও…?

টেবিল আর বুম্বা স্যারকে পাশ কাটিয়ে দৌড়ে বেরোতে গিয়ে ঝনঝন করে একটা শব্দ হয়। আহঃ! পায়ে কী যেন একটা ফুটে যায়। যন্ত্রণা… হাঁটতে পারছে না… চোখে অন্ধকার অন্ধকার ঠেকছে। সারা শরীর শিথিল হয়ে আসছে। কাচের গেলাসটা টেবিলের ওপরেই ছিল। কস্তুরীর শরীরের ধাক্কাতেই খানখান হয়ে ভেঙে গেছে। পায়ের তলায় ফুটে গেছে টুকরোর কিছুটা।

আহঃ…। পুরো ঘরটাই অন্ধকার হল কী করে? কিছু দেখতে পাচ্ছে না কস্তুরী। স্যার কি আলো নিভিয়ে দিল? ওকে এখান থেকে উঠে দাঁড়াতেই হবে। চেষ্টা করে দাঁড়াতে চাইছে, পারছে না। কে যেন ওর পা দুটোকে রগড়ে টেনে নিজের দিকে টেনে নিচ্ছে। সমস্ত শরীরটা কাটামাছের মতো ঝটপট করছে। লোকটা অসুরের মতো শক্তি দিয়ে মুখটা একহাত দিয়ে চেপে ধরে আরেকটা হাত দিয়ে এলোপাথাড়ি খুঁড়ে যাচ্ছে শরীরের সমস্ত ঢাকা অংশ। কোনও ভাবেই কী এর থেকে মুক্তি নেই…?

সুগন্ধ যখন মৃত্যু পর্ব-১৯

পায়েলের বিয়ে হয়ে গেছিল। কিন্তু বাড়ির পরিবেশ যে কে সেই। দিদির কথাতেই চলছিল ওর জীবনের প্রতিটা বাঁক। এর থেকে রেহাই নেই, নিস্তার নেই। এর মাঝে একদিন স্কুলেও চলে গিয়েছিল পায়েল। কস্তুরীর স্কুলের বড়দির সঙ্গে কথাও বলে এসেছে ওকে না জানিয়ে স্বাভাবিক ভাবে কোনওরকম ইতিবাচক উত্তর পায়নি। বিশেষ করে ক্লাসের ইংরেজির টেস্টগুলোর নাম্বার বেশ নীচের দিকে হওয়ায় ওই বিষয়ে বিশেষ করে নজর দিতে বলেছেন উনি। সেইদিনই বাড়িতে এসে ধুন্ধুমার কাণ্ড বাধায় পায়েল। হয়তো বড়দির কথাতে আরও কয়েক দাগ রং চড়িয়ে মশলা দিয়ে বলে। জোর করে পড়াতে পাঠাতে চায় নিজের বরের কাছে।

বলে, আমার কাছে পড়তে আসলে বাবু চোখে চোখে থাকবে। বিশেষ এদিক ওদিক করতে পারবে না। ভয়ে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছিল কারণ ওর দিদির বাড়িতে পড়তে যাওয়ার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারে না ও। জামাইবাবু…। আর কোনও উপায় ছিল না তখন। কোনও কথা না ভেবে স্যারের কথাতেই রাজি হয়ে যায়। কিন্তু গোটা ব্যাপারটা মানে বুম্বা স্যারের কাছে পড়া নিয়ে কোনও কথা কস্তুরী বাড়িতে বললে কোনওমতেই বাড়ি থেকে রাজি হবে না।

এক বাড়তি টাকা খরচ, দুই পায়েলেরও নিশ্চয়ই মত থাকবে না কারণ ও জানে দিদি মুখে যাই বলুক মনে মনে কখনওই চায় না ওর রেজাল্ট আশানুরূপ হোক। তাই এক ছুটির দিনে বাজার করার সময় স্যারকে বলে বাপির কাছে কথাটা পাড়ে। স্যার বললে নিশ্চয়ই বাড়ি থেকে না করার আর কোনও প্রশ্ন আসে না। যেহেতু কস্তুরী বাকি বিষয়গুলো ওনার কাছে কম খরচেই পড়ে।

বাপিরও ভয় ছিল হয়তো কোনও কারণে ওর পড়া যদি ছেড়ে যায় প্রভাস স্যারের কোচিং থেকে, তবে বাইরের কোনও বেশি ফিজ-এর স্যারের কাছে না ভর্তি করতে হয়।

প্রায় কয়েকদিন পর একরকম জোর করেই দিদির কথার অবাধ্য হয়েছিল কস্তুরী। পরের দিকে বাপিও তেমন একটা না করেনি। ভেতর থেকে মনকে শক্ত করছিল, এবারে নিশ্চয়ই ও পারবে। পারতে ওকে হবেই। স্কুলটা পেরিয়ে গেলেই কলেজ। তারপর ঠিক একটা চাকরি…।

ছোটোবেলায় মামাবাড়িতে কোনও এক জ্যোতিষী কস্তুরীর হাত দেখে বলেছিল, ঠিক ৩৪-৩৫বছর বয়সে তোমার জীবনে খুব ভালো সময় আসবে। তুমি মাথা তুলে দাঁড়াবে।

কথাগুলো আর-পাঁচজনের কাছে ছেলেখেলা হাসির মনে হলেও, কোনও অজ্ঞাত কারণে মনে মনে কস্তুরী যেন ওই সময়টার অপেক্ষায় থেকে গেছে। মনকে দুর্দান্ত ঝড়ের সময়ে সান্ত্বনা দিয়েছে, একসময় ঠিক সব কালো হটে যাবে। প্রতিবছর জন্মদিন এলে মনে মনে গুনছে চৌত্রিশ বছর আর ঠিক কতদিন বাকি?

কিন্তু কস্তুরী তখনও জানত না, এই ভালো সময়টায় পৌঁছোতে গেলে ওকে আর কতগুলো কাঁটা মাড়াতে হবে? ক্ষত-বিক্ষত রক্তাক্ত শরীরে ও আদপেই কি ওই সময়ে পৌঁছোতে পারবে? আদৌ কি ওই সময়টা কোনওদিন আসবে? দিন একটা এসেছিল। তবে কস্তুরী যেমনটা চাইত তেমন করে নয়। একটু অন্য ভাবে।

বুম্বা স্যারের কাছে পড়তে রাজি হলেও যথেষ্ট বুঝেশুনে পা ফেলছিল ও। ছেলেটার তাকানো, কাছে এসে কথা বলার ভঙ্গিতে কেমন একটা গা রি রি করত। এতগুলো ছাত্রের মাঝে পড়ানোটায় মন দেওয়া যাবে না বলে যখন ওকে বলেছিল, তুমি আমাদের বাড়ি গিয়ে পড়ো। এখানে

ক্যালোর-ব্যালোরের মধ্যে ঠিক পড়াতে পারছি না। আর আমার সবকটা ছাত্র-ছাত্রী কলেজের। একমাত্র তুমি নীচু ক্লাস। তোমারও তো অসুবিধা হচ্ছে নিশ্চয়ই?

না আমি এখানেই কমফর্টেবল। গলায় জোর এনে বলেছিল কস্তুরী।

সামনাসামনি না তাকালেও, ও বুঝেছিল ছেলেটা চোখ সরু করে ওর দিকে তাকিয়েছিল। হয়তো মনে মনে এও বলছিল, আচ্ছা এতদূর…?

হাজার হলেও একটা বিষয়ে নিশ্চিন্ত ছিল, এটা স্যারের বাড়ি এখানে তেমন করে কোনও বিপদ আসতে পারে না। তাই দিদির বাড়ির তুলনায় এটা অনেকটাই নিরাপদ। কিন্তু বিপদ কি বলেকয়েক জাল বোনে? সে তো পথের যে-কোনও বাঁকেই তার ওৎ পেতে রাখে। অপেক্ষা শুধু উপযুক্ত সময়ে তাতে পা দেওয়া।

স্বাধীনতার ৭৫ কেমন আছেন নারীরা?(শেষ পর্ব)

সংখ্যাতত্ত্বের সত্যতা

সংখ্যাত্বত্তের বিচারে আজও প্রতিদিন ১০৬ জন মহিলা ধর্ষণের শিকার হন। এর মধ্যে ৪০ শতাংশই নাবালিকা। কিন্তু দুঃখের বিষয় ৯৯ শতাংশ ঘটনাই থানায় নথিবদ্ধ হয় না।

একদিকে যখন মহিলা সংরক্ষণ বিল দশকের পর দশক মুলতুবি রয়েছে, অন্যদিকে তখন ২০১৮ সালের আর্থিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের মোট জনসংখ্যার ৪৯ শতাংশ মহিলা হওয়া সত্ত্বেও, সংসদ ও অন্যান্য সরকারি কার্যা‌লয়গুলিতে, মহিলাদের সংখ্যা নগণ্য।

আজ যখন দেশের প্রায় ৮৫ শতাংশ পুরুষ শিক্ষিত, সেখানে মোটে ৬৫ শতাংশ মহিলা সবে সাক্ষর হয়েছে। এটা এতদিনে প্রমাণিত যে, সুযোগ পেলে মেয়েরাও দেশের যে-কোনও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় পারদর্শিতা দেখাতে সক্ষম। কিন্তু শিক্ষার সুযোগ পাওয়াটাই যেখানে বড়োসড়ো চ্যালেঞ্জ সেখানে এই আলোচনা অবান্তর। শিক্ষাকে অগ্রগণ্য না ভেবে সংসার ও সন্তানে মনোনিবেশ করাটাই মহিলাদের দায়িত্ব— এই মানসিকতাই মেয়েদের অনেকখানি পিছিয়ে দিয়েছে।

ভারতীয় মহিলাদের রোজগারের নিরিখে দেশের মধ্যে মোট আয়ের মাত্র ২৫ শতাংশ। একটি রিপোর্ট-এ বলা হয়েছে, ভারতীয় মহিলাদের আয় যদি আরও ১০ শতাংশও বৃদ্ধি পায় তাহলে দেশের সমস্ত ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট অর্থাৎ জিডিপি-তে ৭০ শতাংশ বৃদ্ধির লাভের আশা আছে।

দেশের ৮২ শতাংশ মহিলা বিবাহোত্তর জীবনে যৌন নির্যাতনের শিকার। দেশের ৬ শতাংশ বিবাহিতা মহিলা, জীবনে কখনও না কখনও যৌন হয়রানির কবলে পড়েছেন।

সমগ্র দেশে ২০২০ সালে মোট ৭৭-টি ধর্ষণের মামলা দায়ে হয়েছে এবং মোট ২৮,০৪৬টি মামলার আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বেশির ভাগ মামলাই রাজস্থানের। এর পরই আসে উত্তর প্রদেশের নাম যেখানে ২০২০ সালে মহিলাদের উপর সংঘটিত অপরাধমূলক মামলার সংখ্যা ৩,৭১,৫০৩। ২০১৯ সালে এই সংখ্যা ছিল ৪,০৫,৩২৬ এবং ২০১৮ সালে ৩,৭৮,২৩৬।

১৮তম লোকসভায় মোট ১৪.১২ শতাংশ মহিলা (৮১ জন) এবং রাজ্যসভায় সংখ্যাটা ১১.৮৪ শতাংশ। বিশ্ব ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ভারতীয় অর্থব্যবস্থায় মহিলাদের যোগদান মাত্র ১৭ শতাংশ। এই সংখ্যা বিশ্বের নিরিখে, প্রায় অর্ধেক। প্রতিবেশী দেশ চিনের জিডিপি নজর করলেই দেখবেন, সেখানে মহিলাদের যোগদান ৪০ শতাংশেরও বেশি।

এছাড়া লেবার ফোর্স-এ মহিলাদের যোগদানের নিরিখে, ১৩১টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১২০ নম্বরে। এই পরিস্থিতিতে যদি এদেশে মহিলাদের অংশীদারিত্ব পুরুষদের সমান সমান হয়ে যায় তাহলে জিডিপি-তে ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি হওয়া সম্ভব।

সংসদে মহিলা সংরক্ষণ ৩৩ শতাংশ করা হোক, এই বিলটি এখনও পাস হয়নি। পঞ্চায়েত স্তরে অবশ্য মহিলা সংরক্ষিত আসন বরাদ্দ হয়েছে। কিন্তু সেখানেও পুরুষদেরই অগ্রগণ্য মনে করা হয়।

দেশের প্রতিনিধিত্ব করার কথা উঠলে দেখা যাবে, সেখানেও মহিলাদের সংখ্যা নিছকই নগণ্য। ১৭তম লোকসভায় মোট ১৪.৯২ শতাংশ মহিলা (৮১জন) রয়েছেন। রাজ্যসভায় সংখ্যাটা আরও কম, ১১.৮৪ শতাংশ। দেশব্যাপী বিধানসভাগুলিতে, কেবল ৮ শতাংশ মহিলা প্রতিনিধি রয়েছেন।

বর্তমান সময়ে সুপ্রিম কোর্টে মোট ৩৪জন জজ-এর মধ্যে মাত্র ৪জন মহিলা। দেশের সর্বোচ্চ আদালতে মহিলাদের প্রতিনিধিত্ব ১০ শতাংশের সামান্য বেশি। হাইকোর্টে সংখ্যাটা আরও কম। ১০৯৮ জন জজ-এর মধ্যে মাত্র ৮৩ জন মহিলা রয়েছেন।

গত ৯ বছরে গৃহমন্ত্রকে অ্যাডভাইসরি জারি করা হয় যে, পুলিশ ফোর্সে মহিলাদের সংখ্যা অন্তত ৩৩ শতাংশ করা উচিত। কিন্তু ২০২০ সালে ব্যুরো অফ পুলিশ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট-এর হিসাব অনুসারে দেখা গেছে, পুলিশ বাহিনিতে মোট সংখ্যা ২০,৯১,৪৮৮ জন। এর মধ্যে মহিলাদের সংখ্যা ২,১৫,৫০৪ জন। এটি মোট সংখ্যার মাত্র ১০.৩০ শতাংশ।

সুগন্ধ যখন মৃত্যু পর্ব-১৮

( ৮ )

স্যারের কাছ থেকে স্তোকবাক্য শুনে এসেছিল বটে কিন্তু সেই একই হাসাহাসি, কথাবার্তা পড়ানোর সময় চলতেই থাকে। সেদিন অতিষ্ঠ হয়ে কস্তুরী নিজেই যায়, বাচ্চাগুলো পড়তে পারছে না। আপনারা একটু আসতে কথা বললে ভালো হয়।

দেখলি তো তোরা না সত্যি। তোদের জন্য আমাকে বকা শুনতে হল। কখন থেকে বলছি একটু গলাটা নামিয়ে..।

ছাত্র-ছাত্রীদের দিকে তাকিয়ে বুম্বা স্যার কথাগুলো বলছিলেন।

কস্তুরীর সঙ্গেও আলাপটা হয়েছিল সেদিনই ছুটির পরে।

তোমার ক্লাসে পড়াতে সমস্যা হলে তুমি আমাকে এসে জানাতে পারতে। একদম প্রভাস স্যারের কাছে…।

ওদের পড়তে অসুবিধা হচ্ছিল খুবই। আর আপনার সঙ্গে তো আমার ঠিক পরিচয় নেই..। কস্তুরী বলে।

পরিচয় নেই, পরিচয় হতে কতক্ষণ তাছাড়া আমাকে চেনে না এমন মানুষ খুব কমই আছে এই পাড়ায়।

ও। ছোট্ট করে একটা উত্তর দিয়ে ও বাড়ি ফিরে এসেছিল। ছেলেটা যে যথেষ্ট অহংকারী, দুমিনিটের কথাতেই বুঝেছিল। অসহ্য। নিজেকে কী মনে করে? কবে কোন সিনেমায় অভিনয় করেছে তার জন্য কস্তুরীকে গদগদ হয়ে যেতে হবে?

তারপরের, তারপরের দিনও ঠিক একই ভাবে ছলছুতোয় কথা বলত ছেলেটা। আরও বেশি করে আলাপ করার চেষ্টা করত ওর সাথে। কস্তুরীর ভালো লাগত না। একে তো ছেলেটার মধ্যে একটা হনু হনু গায়ে পড়া ভাব তার ওপর নিজের পড়াশোনার চাপটাও সাংঘাতিক ভাবে বাড়ছিল। সঙ্গে নানান দুর্ভাবনাও।

২০০৩-০৪ সাল। প্রত্যেকটা বিষয়ে ২০০ করে পেপার। সাযে্সে মাধ্যমিকে তেমন একটা মার্কস না থাকায় উপায়ান্তর না পেয়ে আর্টসের ইতিহাস, ফিলজফি, পলিটিক্যাল সাযে্স বিষয়গুলো নিতে হয়েছে। সমস্তগুলোতেই নম্বর তোলা যথেষ্ট কষ্টসাধ্য ব্যাপার।

স্যারের কোচিংয়ে ঢুকে সবগুলোয় মোটামুটি রেফারেন্স বই দিয়ে কাজ চালিয়ে নেবে মনে করলেও ইংলিশটা নিয়ে বেশ সমস্যায় পড়েছিল। সাহিত্যে রেফারেন্স বই দেখে আর কাঁহাতক পড়া যায়। স্যারের কাছে দেখছিল বটে, তাও সেসবে স্কুলের পরীক্ষায় পাশ করছিল প্রায় বর্ডার লাইনে এসে। শেষমেশ ইংলিশের ভালো সাজেশনের জন্য স্যারের কাছে কথাটা পাড়ে কস্তুরী। যদি উনি কোনও উপায় করতে পারেন এই আশায়?

তা তুমি বুম্বার কাছে তো দেখে নিতে পারো। অসুবিধার কী আছে? আমি ওকে বলে দেব। সেভাবে মাইনে নিয়ে ভাবতে হবে না তোমাকে। দাঁড়াও ও আছে তো তোমার কাকিমার কাছে। ডাকছি। কী স্পেশাল রান্না করেছে, নিজের ছেলেকে রেখে আগে ওর মুখে দেবে। মারাত্মক পেটুক বুঝলে না। তাই তোমার কাকিমার ওকে খাইয়ে ভালো লাগে। অ্যাই বুম্বা কী করিস? ওসব খাওয়াদাওয়া রাখ। এদিকে একটু আয়। একটা কথা শুনে যা।

দাঁড়াও দাঁড়াও আসছি।

নিজের ভাগ্যকে নিজেরই দুষতে ইচ্ছে করছিল। সত্যি কথা বলতে কী, মাথাতেই আসেনি স্যার এমন একটা প্রস্তাব রাখবেন ওর সামনে। ভেবেছিল স্যারের কোনও পুরোনো নোটস পেয়ে যাবে। সাপের ছুঁচো গেলা অবস্থা হয়েছে। না পারছে গিলতে না পারছে ওগরাতে। কী করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। এখন যদি স্যারের মুখের ওপর না করে দেয় তাহলে স্যার কারণ খুঁজবেন। যথায়থ কারণ কী দেখাবে ও? এরপরও না করে দিলে স্যার যদি রেগে যান, ওর টিউশনগুলো…! মাথাটা ভেবে ভেবে দপদপ করে উঠছিল।

আমাকে ডাকছেন?

হ্যাঁ শুনতে পাচ্ছিস না। আর তোর কাকিমাকেও বলিহারি। কত খাবি আর?

শোন, তোর আরেকটা দাযিত্ব বেড়ে গেল। আমার এই মা-টাকে পড়াতে হবে। এবছর উচ্চমাধ্যমিক ওর।

গ্রেট।

এই একটা উত্তরেই গা জ্বালা করছিল কস্তুরীর। ছেলেটা নির্ঘাত ভাবছে বাকিদের মতো ও তার সঙ্গে নিছক আলাপটাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে…। কী দুরূহ একটা পরিস্থিতি। নিজের অজান্তেই উঠে দাঁড়িয়েছিল। শরীর, মন কোনও ভাবেই যেন সায় দিচ্ছিল না।

আরে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লে কেন? কখন পড়বে আলাপ আলোচনা করে নাও বুম্বার সঙ্গে।

ঠিক আছে স্যার। আমি ঠিক কথা বলে নেব ওর সঙ্গে আপনি ভাববেন না। উফঃ, কাকিমা আড়মাছের চপটা যা বানিয়ে না। পাগলা পুরো।

স্যারের ঘর থেকে বেরিয়ে সোজা বাড়ি চলে এসেছিল কস্তুরী। কেন ভাগ্য এভাবে ওর বিপক্ষে যায়? কেন না-ভালোলাগাগুলো মাকড়শার জালের মতো আঁকড়ে ধরতে চায় ওকে। নিজেকে বড্ড একা, বড্ড অসহায় মনে হচ্ছিল।

স্বাধীনতার ৭৫ কেমন আছেন নারীরা? (পর্ব-৪ )

স্বাধীনতার ৭৫ বছর কেটে গেলেও  ভারতীয় মেয়েরা কি আদৌ সমাজে স্বাধীন হতে পেরেছে? আসুন খতিয়ে দেখা যাক৷

বিয়ের পর কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার স্বাধীনতা

ভারতে বহু সংখ্যক মহিলাই এখনও গৃহবধূ হয়ে জীবন অতিবাহিত করেন। এর মধ্যে অনেকেই হয়তো স্বেচ্ছায় এই সিদ্ধান্ত মেনে নেন কিন্তু এমনও বহু মহিলা আছেন যারা চাইলেও বেছে নিতে পারেননি চাকরি করার অপশন। বহু পরিবারই চান না, তাদের ঘরের বউ কর্মক্ষেত্রে পদার্পণ করুক। বিয়ে পর চাকরি করার স্বাধীনতা তাই বহু নারীরই খর্ব হয়।

ইচ্ছেমতো পোশাক চয়নের স্বাধীনতা

কিছুদিন আগেই বিতর্ক উস্কে তুলেছিলেন উত্তরাখণ্ডের মুখমন্ত্রী তীর্থ সিংহ রাওয়াত। তাঁর বক্তব্য ছিল হাঁটু দেখিয়ে ফাটা জিন্স পরা, মেয়েদের সংস্কারের বিপক্ষে। শুধু তীর্থই নয়, ভারতীয় সমাজে মেয়েরা কী ধরনের পোশাক পরবেন, তাও ঠিক করে দেন পুরুষ অভিভাবকরা। এই যদি আমাদের চিন্তাধারা হয়, তাহলে স্বাভাবিক ভাবেই নিজের পোশাক চয়নের অধিকার মেয়েদের থাকে না।

স্ত্রী শরীরের প্রতি পুরুষের অধিকারবোধ

সত্যি কথা বলতে কী, আজ মেয়েরা যেটুকু অগ্রসর হয়েছে, তা তাদের আত্মবিশ্বাস, পরিশ্রম আর ইচ্ছের জোরেই। কারণ সমাজ এখনও লিঙ্গ বৈষম্যকেই প্রাধান্য দেয়। মন নিয়ে কেউ ভাবিত নয়। শুধুই শরীর। স্ত্রীকে নিজের সম্পত্তি ভাবার হক পুরুষরা নিজগুণে অর্জন করে নিয়েছেন এমনটাই প্রকট হয়। শহরে মহিলাদের অগ্রসর হওয়ার ঘটনা দেখা গেলেও, এখনও ভারতের নানা প্রান্তে, প্রত্যন্ত গ্রামে মহিলারা শুধুই সন্তান উত্পাদনের একটি আধার।

বিশ্বের নানা সংসদে মহিলাদের অংশীদারিত্বের নিরিখে ভারতীয় মহিলাদের স্থান ১০৩ নম্বরে। অথচ সংসদে যোগদান করা মহিলাদের সংখ্যা আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র নেপাল, বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানেরও যথেষ্ট বেশি।

লক্ষ্য এখনও অধরা

স্বধীনতার ৭৫ বছর পরেও ভারতে মহিলাদের অবস্থান খুব সন্তোষজনক নয়। আধুনিকতার বিস্তার হয়েছে ঠিকই কিন্তু কতটা তা মন ও মানসিকতায়, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। আজও মেয়েরা নানা ধর্মীয় রীতিরেওয়াজ, যৌন শোষণ, লিঙ্গ বৈষম্য, অশিক্ষা, ম্যাল নিউট্রিশন, সামাজিক সম্মানহানির শিকার।

এই প্রতিকূলতার মধ্যেও বহু নারী সম্মানের শিখরে পেঁছেছেন। ইন্দিরা গান্ধি, প্রতিভা পাতিল, সুষমা স্বরাজ, নির্মলা সীতারমণ, মহাদেবী ভর্মা, সুভদ্রা চৌহান, অমৃতাপ্রীতম, মহাশ্বেতা দেবী, লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, মায়াবতী, জয়ললিতা, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, মেধা পাটেকর, অরুন্ধতী রায়, চন্দা কোচর, পি টি উষা, সাইনা নেহওয়াল, সানিয়া মির্জা, সাক্ষী মালিক, পি ভি সিন্ধু, হিমা দাস, ঝুলন গোস্বামী, মিতালি রাজ, হরমনপ্রীত কউর, গীতা ফোগট, মেরি কম এমনই অসাধারণ নারীদের মধ্যে অন্যতমা।

৭০-এর দশকের গোড়া থেকেই ভারতে ফেমিনিজম শব্দের চর্চা। বেসরকারি সংগঠনগুলিও অগ্রণি ভূমিকা নিয়েছে মহিলাদের কাজে নিয়োগ করা ও আর্থিক ভাবে স্বশক্তিকরণের ক্ষেত্রে। হরিয়ানা, রাজস্থান, পশ্চিম-উত্তরপ্রদেশ কন্যাভ্রূণ হত্যার ঘটনায় রাশ টেনে, পুরুষ-নারীর পরিসংখ্যানে ভারসাম্য আনার প্রয়াস করা হয়েছে। কেন্দ্র সরকারের বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও, প্রচারে মেয়েদের সামাজিক অবস্থানেও শিক্ষায় উন্নতি করার প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে।

বর্তমানে মহিলাদের সমান অধিকার প্রদান, সুযোগ সুবিধার ক্ষেত্রে প্রসার ঘটানো ও বেতনে সামঞ্জস্য আনার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। পণের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ, রাষ্ট্রীয় মহিলা আয়োগের অন্তর্গত ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স-এর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করা, কর্মস্থলে যৌন হয়রানি রোখা প্রভতি বিষয়গুলির মধ্যে দিয়ে নারীকে সুরক্ষিত করার চেষ্টা শুরু হয়েছে। বেশ কিছু রাজ্যের গ্রাম ও নগর পঞ্চায়েতে মহিলাদের জন্য আসন সংরক্ষণও করা হয়েছে।

আসলে সময় হয়েছে বোঝার, একটি দেশ তখনই অগ্রসর হতে পারে, যখন সে দেশের মহিলারা আর্থিক ভাবে স্বাবলম্বী হন ও সামাজিক সম্মানের অধিকারী হয়ে ওঠেন। রাত ৯টার পর বাড়ির মেয়েদে বাইরে যেতে দিতে এখনও বহু পরিবারেরই বুক কাঁপে। মেয়েরা যতদিন না সুরক্ষিত হচ্ছে এবং পারিবারিক হিংসার কারণ থেকে বেরোচ্ছে কোনও সমাজ যথাযথ ভাবে স্বযংসম্পূর্ণ হয়েছে বলে দাবি করতে পারবে না।

সুগন্ধ যখন মৃত্যু পর্ব-১৭

আপনি কে বলছেন? ওর কোচিং ক্লাসে… কস্তুরীর কথাটা শেষ হবার আগেই

অ্যাই স্বাগতা…। ফোনের ওপার থেকে একটা গলার আওয়াজ পায়। কে বলল কথাটা? ও? কাকে ডাকল? ইনি তাহলে ওর মা নন? স্বাগতা…? নামটা খুব খুব চেনা লাগছে কস্তুরীর। খুব চেনা। কোথায় যেন শুনেছে কিন্তু মনে পড়ছে না। হ্যাঁ তাই তো চেনে! মনে পড়ে গেছে। ওর ভাইতো এর নামই সেদিন বলেছিল? আর বলেছিল…।

রিনরিনে একটা ব্যথা চাগাড় দিয়ে ওঠে। তাহলে কী…? উফঃ মারাত্মক সেই রাতের স্বপ্ন যন্ত্রণাটা শুধু পিঠে বিঁধে থাকে না কিলবিল করে সম্পূর্ণ শরীরী অস্তিত্ব হয়ে কস্তুরীর শরীরময় কাঁটা বেঁধাতে থাকে বাস্তবে। কস্তুরী হাত দিয়ে চামড়ার ওপর থেকে বুঝতে পারে ওর সমস্ত শিরা-উপশিরাকে দলা পাকিয়ে মুচড়ে ফেলছে কাঁটাটা।

স্বাগতা ওদের বাড়িতে আসে? বাড়ির ফোন রিসিভ করে? রিসিভারটা সঙ্গে সঙ্গে নামিয়ে রাখে কস্তুরী। মনের কোণার রংমাখা পালকগুলো কখন যেন দমকা হাওয়ায় পথ ভুলে এলোমেলো উড়ে যায়।

( ৮ )

মনের দিক থেকে এতটাই এলোমেলো ছিল কস্তুরী, পড়াশুনায় তেমন করে মন দিয়ে উঠতে পারেনি। মাধ্যমিক পরীক্ষায় যথারীতি সেকেন্ড ডিভিশন। যা হওয়ার হলও তাই। বাপি মায়ের দিক থেকে তেমন করে ওকে ভবিষ্যতে পড়ানোর গরজ চোখে পড়ছিল না। এত তাড়াতাড়ি সবকিছু থেমে যাবে? নিজের স্কুলেই ইলেভেন-এর ফর্ম তুলে কোনওমতে ভর্তি হয়ে যায়। মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয়, যে করেই হোক দিদির মতো আকাশছোঁয়া রেজাল্ট না হলেও থেমে থাকা যাবে না। একটা কিছু করতেই হবে। সবাই কি আকাশের তারা হতে পারে?

পাড়ায় আশেপাশে দুচারটে টিউশনি শুরু করে। হাতখরচা আর স্যারের পড়ানোর টাকাটা মোটামুটি উঠে আসে। তবে টিউশনির ব্যাপারটা এগিয়েছিল ধীমান স্যারের জন্য। স্যারের কাছে ও পলিটিক্যাল সাযে্স আর ইতিহাসটা দেখে বুঝে আসত। একেবারে কচিকাঁচাগুলোকে কিছুতেই সামলে উঠতে না পারায় স্যার একদিন বলেছিলেন, কস্তুরী মাঝেমধ্যে ওদের একটু দেখিয়ে দিও না। এতে তোমার পড়ার কোনও ক্ষতি হবে না। বরং চর্চা আরও বাড়বে। শুধু বাবা-মাকে একটু জানিয়ে নিও।

বাপি-মাকে জানানোর আগে ও নিজেই নব্বই শতাংশ ঠিক করে নিয়েছিল পড়াতেই হবে। ফাইভ-সিক্সের গোটা দশেক ছাত্র-ছাত্রী। স্যার বলেছিলেন, ওদের পেছনে বেশি খাটতেও হবে না। পাশটা করিয়ে দিলেই ওদের বাড়ির লোক নিশ্চিন্ত। এমনই যে-কয়েক ঘর থেকে ওরা আসত তাদের কাছে নম্বর নয়, পাশ-টাই বড়ো সাকসেস।

ধীমান স্যারের কোচিংটা ছিল বেশ জমজমাট। মানে এ এক হরেক মেলার আসর। ক্লাস ওয়ান থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত। ওদিকে কলেজের থার্ড ইয়ার অবধি ঝেড়েপুঁছে সবাই আসে। স্যারের মাইনেটাও কম, গাইডেন্সটাও খুব একটা যে খারাপ তা নয়, তাই…।

কস্তুরীকে সপ্তাহে দুটো দিন সকালের দিকে এসে বাচ্চাগুলোকে দেখে দিয়ে যেতে হতো। ওই সময়টায় বাচ্চাগুলো ছাড়া একটাই ক্লাস হতো, কলেজের ইংলিশ অনার্সের। প্রথম প্রথম দুএকজন থাকলেও কয়েক মাস পর কলেজের ক্লাসটার স্টুডেন্ট হয়ে গেছিল প্রায় কুড়িজন মতো। একতলায় পাশাপাশি দুটো ঘরে ক্লাস চলত জোরকদমে। বড়োদের হই-হুল্লোড়ে অসুবিধা হলে, মাঝেমধ্যে ছাত্র-ছাত্রী পাঠিয়ে বারণ করলেও কাজ হতো না অধিকাংশ দিন। ইংলিশ স্যারটা তো বেজায় বেয়াদপ। সে পড়া নয় আড্ডাটাই বেশি চালাতে ভালোবাসে।

কম বয়সি স্যার, আড়ালে হিরো হিরো বলে ডাকত ছাত্র-ছাত্রীরা। আর ছাত্রীরা তো এককথায় ফিদা। পুরো ব্যাপারটা খোলতাই হয় সেদিন ধীমান স্যারের কথায়, ও বুম্বা? হ্যাঁ ও তো আমার কাছে সেই ছোটো থেকে পড়ছে। পড়াশোনায় মাথা আছে কিন্তু ওই টিভি সিরিয়াল নাটক নাটক করেই সময় কাটাল। কতবার বললাম অভিনয়টা ছেড়ে এমএ করে নে। তা শুনল আমার কথা? ক’পয়সা আর ইনকাম হয় ওতে?

উনি অভিনয় করেন? অবাক হয়ে স্যারের মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করে কস্তুরী!

সেকী তুমি জানো না? ওকে চেনে না এমন লোক এই পাড়ায় কমই আছে বলতে পারো। ছোটোবেলায় অনেকগুলো সিনেমা করেছে। এখন ওই টুকটাক। তুমি আর কতটা জানো। তোমার বাবা জানবে জিজ্ঞেস কোরো।

হতে পারে…।

ঠিক আছে আমি বুম্বাকে ডেকে বলে দেব। তোমার ক্লাস থাকলে একটু বুঝেশুনে পড়াতে। ছোঁড়াটা বড্ড বেশি কথা বলে…

ক্রমশ…

স্বাধীনতার ৭৫ কেমন আছেন নারীরা ? (পর্ব-৩)

স্বাধীনতার পর কেটে গেছে ৭৫টা বছর. কিন্তু সব ভালো জিনিসে কি অধিকার জন্মেছে মেয়েদের? সামাজিক ভাবে তারা এখনও কী কী বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার? আসুন জেনে নেওয়া যাক৷

বেতনে অসামঞ্জস্য

চ্যারিটি সংগঠনগুলির আন্তর্জাতিক স্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা অক্সফেম-এর রিপোর্ট অনুসারে, ভারতে পুরুষ ও মহিলাদের মধ্যে বেতনের অসামঞ্জস্য রয়েছে। এটি পৃথিবীর অন্যান্য দেশগুলির তুলনায় সবচেয়ে বেশি প্রকট। মনস্টার স্যালারি ইন্ডেক্স (MSI)-এর বিচারে পুরুষ ও মহিলা উভয়ই একই ধরনের কাজের বিনিময়ে পুরুষরা মহিলাদের তুলনায় ২৫ শতাংশ বা তার অধিক পারিশ্রমিক পেয়ে থাকেন।

ভারতীয় সমাজে মহিলাদের উপর অত্যাচারের ঘটনা অত্যন্ত বেশি। বর্তমান সমাজে এই অপরাধ প্রবণতা এতটাই লাগামছাড়া যে, মহিলাদের সঠিক আচরণ বিধি শেখানোর পরিবর্তে পুরুষদের শেখানো দরকার মহিলাদের সম্মান করুন।

দেশের পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার কারণে ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স-এর ঘটনা ক্রমবর্ধমান। বিবাহের পর শ্বশুরবাড়িতে এসে স্বামী ও তার পরিবারের হাতে হেনস্থা হওয়া প্রায় নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা, সমাজের নানা স্তরে। একটি সার্ভের মাধ্যমে ৫৭ শতাংশ পুরুষ ও ৫৩ শতাংশ মহিলাদের অভিমত, স্বামীর হাতে স্ত্রীয়ে নির্যাতন বৈধ ও অতি সাধারণ একটি ঘটনা। হায় রে স্বাধীনতা, ৭৫ বছরেও মহিলাদের উপর অত্যাচার একটি স্বীকৃত সমাজ অনুমোদিত ঘটনা বলেই প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে আমাদের সমাজে!

২০১৫ থেকে ২০১৬-র মধ্যবর্তী সময়ে করা একটি সার্ভে অনুযায়ী জানা গেছে, ৮০ শতাংশ কর্মরত মহিলা, তাদের স্বামীর দ্বারা নির্যাতিত হন। ভারতীয় সেনায় মহিলাদের অংশগ্রহণ খুবই অল্প সংখ্যায় পরিলক্ষিত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে এই অংশ গ্রহণের প্রবণতা আরও কমে গেছে বলে জানা গেছে। মহিলাদের সংখ্যা এক্ষেত্রে মাত্রই ০.৩৬ শতাংশ।

স্বাধীনতার ৭৫ বছর পেরিয়ে গেলেও মহিলারা মুক্তি পাননি কোন বিশেষ জিনিসগুলি থেকে, আসুন তা এবার দেখে নেওয়া যাক। বস্তুত স্বাধীনতার অর্থ প্রতিটি মানুষের কাছেই, অর্থাৎ পুরুষ-নারী নির্বিশেষে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত। কিন্তু মহিলারা আজও সামাজিক ভাবে নানা ক্ষেত্রে শৃঙ্খলিত। সমাজের নানা নিয়ম ও আচরণবিধির জিগির তুলে, বস্তুত তাদের বিকলাঙ্গ করে রাখা হয়। এদেশে জনসংখ্যার ৪৯ শতাংশ যেখানে মহিলা, সেখানে তাদের তো সংখ্যালঘু বলা চলে না। তবু সুরক্ষা, নির্বিঘ্নে যত্রতত্র গমন, আর্থিক স্বাবলম্বিতা, স্বেচ্ছায় বিবাহ করা বা না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং পিতসত্তাকেই সর্বাগ্রে স্বীকার করে নেওয়ার প্রবণতা থেকে মেয়েরা এখনও মুক্ত নয়। সিদ্ধান্ত নিতে তারা আজও অপারগ, সমাজে তাদের বক্তব্যকে প্রাধান্য দেওয়ার রেওয়াজ আজও নেই।

নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার নেই

যুগ যুগ ধরে চলে আসা পরম্পরা বলে, পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় পুরুষরাই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয় তারাই নিয়ম তৈরি করে। মহিলাদের সেই জোর এবং অধিকার, কোনওটাই নেই। আমাদের গ্রামীণ সমাজে এখনও মেয়েরা নিজের ইচ্ছেয় পঠনপাঠন শুরু করার কথা বলতে পারে না। খেলার জগতে পদার্পণ করার ইচ্ছের কথা জানানো তো রীতিমতো স্পর্ধা বলে গণ্য হয়। কেরিয়ার নিয়ে নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকার ঘটনা যেমন বিরল, ততটাই অপারগ তারা নিজের পছন্দের পাত্রকে বিবাহের জন্য বেছে নিতে।

পঠনপাঠন করা থেকে নিজের অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলার জন্য কর্মানুসন্ধান করা দুইয়ের ক্ষেত্রেই বাড়ির পুরুষদের সিদ্ধান্তই শেষ কথা। পুরুষ সদস্যরাই তাদের ইচ্ছের বোঝা চাপিয়ে দেন, মেয়েদের ঘাড়ে। পুরুষদের এই সিদ্ধান্তের জেরে, ভারতে আজ কণ্যাভ্রূণ হত্যার ঘটনা ন্যক্কারজনক ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পণ সংক্রান্ত বিষয়ে বধূহত্যাও লক্ষাধিক। বস্তুত বিবাহের পর মেয়েদের গণ্ডি, রান্নাঘর আর সন্তান প্রতিপালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেওয়াই, এ সমাজের রীতি।

হিংসা শোষণ থেকে মুক্তি কবে?

ভারতে মহিলাদের প্রতিদিন উপলব্ধি করানো হয় যে, পৃথিবী যতই এগিয়ে থাকুক, শারীরিক ভাবে স্ত্রীজাতি দুর্বল। তার অসুরক্ষিত হওয়ার ভাবনাটাও সঞ্চারিত হয় তাদের মনে। ঘরে, বাইরে, অফিসে, পথে সর্বত্রই অসুরক্ষিত মেয়েরা। ঘরে থাকলে তারা পরিবারিক হিংসা, স্বামীর দুর্ব্যবহার, আত্মীয়দের দ্বারা অত্যাচারের শিকার, আবার কর্মক্ষেত্রে শোষণ, যৌন হেনস্থা, মানসিক উত্পীড়নও তাদের নিত্যনৈমিত্তিক।

সোশ্যাল মিডিয়াতেও মহিলারাই ট্রোলড হন, সবচেয়ে বেশি। অশালীন কমেন্ট, টিজিং, রেপ, মোবাইলে ব্ল্যাংক কল, অশালীন ভিডিয়ো পাঠিয়ে মানসিক ভাবে নির্যা‌তনের ঘটনা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্বামীর চেয়ে বেশি রোজগার করা মহিলাদের মধ্যে ২৭ শতাংশই ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স-এর শিকার। ১১ শতাংশ-কে সহ্য করতে হয় ইমোশনাল ব্ল্যাকমেলিং।

সিভিয়ার সাইনাসাইটিস উইথ অরবাইটাল সেলুলাইটিস

গুরুতর সাইনাসাইটিস থাকা শিশুদের মধ্যে অরবাইটাল অ্যাবসেসের ঘটনা ১ শতাংশেরও কম। এ এক বিরল এবং গুরুতর অবস্থা। অভিজ্ঞ এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের হাতে জরুরি ভিত্তিতে অস্ত্রোপচার করলে তবেই এক্ষেত্রে দৃষ্টিশক্তি বাঁচানো যায়। দীর্ঘস্থায়ী সাইনাসাইটিস হতে পারে কোনও সংক্রমণ থেকে, সাইনাসে (নাকের পলিপে) কোনও বৃদ্ধি বা সাইনাসের লাইনিং ফুলে গেলে। এর লক্ষণ হিসাবে নাক আটকে যেতে পারে, যাতে নাক দিয়ে নিশ্বাস নিতে অসুবিধা হয় এবং চোখের আশপাশ, গাল, নাক বা কপাল ফুলে যেতে পারে। সাইনাসাইটিস সাধারণত ঠান্ডা লাগা বা ফ্লু ভাইরাস আপার এয়ারওয়ে থেকে সাইনাসগুলোতে ছড়িয়ে যাওয়ার ফল।

Health article

সম্প্রতি অ্যাপোলো মাল্টিস্পেশালিটি হসপিটালস কলকাতা, ৬ বছরের রুদ্রাঞ্জন সিনহা বাবুকে নতুন দৃষ্টিশক্তি দিল। রুদ্রাঞ্জন সিভিয়ার সাইনাসাইটিস উইথ রাইট সাইডেড অরবাইটাল সেলুলাইটিসের রোগী। বাঁকুড়ার জিরাবাদের এই শিশুর ডিসেম্বর ২০২২-এর প্রথম সপ্তাহ থেকে জ্বর ছিল, সঙ্গে ছিল সর্দিকাশি। ওষুধ খেয়ে জ্বর কমে গেলেও চোখ ক্রমশ ফুলছিল, সঙ্গে ছিল ব্যথা, লাল হয়ে যাওয়া এবং চোখ নাড়ানোর অসুবিধা।

স্থানীয় ডাক্তার অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে তার চিকিৎসা করেছিলেন কিন্তু অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় অ্যাপোলো মাল্টিস্পেশালিটি হসপিটালস, কলকাতায় রেফার করেন। রুদ্রাঞ্জনকে তার উদ্বিগ্ন বাবা-মা ডিসেম্বর ১০, ২০২২-এ অ্যাপোলো মাল্টিস্পেশালিটি হসপিটালস, কলকাতার সিনিয়র ইএনটি-হেড অ্যান্ড নেক সার্জেন ডা. শান্তনু পাঁজার কাছে নিয়ে আসেন। রোগী আসামাত্রই চিকিৎসা চালু করা হয় এবং পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয়। সিটি স্ক্যানে প্রকাশ পায় যে, শিশুটির গুরুতর সাইনাসাইটিস উইথ রাইট সাইডেড অরবাইটাল সেলুলাইটিস হয়েছে।

এরকম গুরুতর পরিস্থিতিতে ডিসেম্বর ১২, ২০২২ তারিখে ডা. পাঁজা ও তাঁর দল শিশুটির উপর জরুরি অস্ত্রোপচার করেন। তাঁরা এন্ডোস্কোপিক সাইনাস সার্জারি উইথ অরবাইটাল ডিকম্প্রেশন করেন এবং আই সকেট ও সাইনাসে জমে থাকা সংক্রমিত জিনিসগুলো বার করে দেন। গোটা অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে বাইরের দিকে কোনও কাটাকাটি ছাড়াই। এ এক ক্ষতহীন প্রোসিডিওর, যা এন্ডোস্কোপির মাধ্যমে করা হয়েছে। প্রথমে এন্ডোস্কোপির মাধ্যমে সাইনাসগুলোতে ঢোকা হয়েছে এবং সংক্রমিত জিনিসগুলো পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে। তারপর চোখের মণি আর সাইনাস ছিদ্রের মধ্যেকার দেয়াল সরিয়ে দেওয়া হয় এবং অরবিটের যে আবরণকে পেরিঅরবাইটা বলা হয়, তাকে সামনে আনা হয়। এরপর পেরিঅরবাইটা কাটা হয় এবং চোখের মণির উপাদানগুলো ঘেঁটে দেখা হয়। চোখের মণির ভিতরের পুঁজ ও অন্যান্য নিঃসৃত জিনিস বার করে দেওয়া হয়, ফলে অপটিক ক্যানাল সমেত সম্পূর্ণ অরবিট ডিকম্প্রেসড হয়ে যায়।

চোখের চাপ থেকে স্বস্তি মেলায় এবং পুঁজ বেরিয়ে যাওয়ায় শিশুটির ৪৮ ঘন্টার মধ্যে অভাবনীয় উন্নতি হয়। ফোলার সমস্যা কেটে যায়, দৃষ্টিশক্তির উন্নতি হয় এবং রং দেখার ক্ষমতা সম্পূর্ণ ফিরে আসে। হাসপাতালে থাকার পুরো সময়টা শিশুটির মেডিক্যাল ব্যবস্থাপনা চলেছে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. কৌশিক মৌলিক ও তাঁর দলের তত্ত্বাবধানে। তিনি অ্যাপোলো মাল্টিস্পেশালিটি হসপিটালস, কলকাতার কনসালট্যান্ট পেডিয়াট্রিক্স। দুর্গাপুরের বাসিন্দা রুদ্রাঞ্জনের বাবা-মা নিশ্চিন্ত এবং খুশি যে, যথাসময়ে হস্তক্ষেপ এবং সতর্ক যত্নের ফলে তাঁদের ৬ বছরের ছেলের দৃষ্টিশক্তি বাঁচানো গেছে।

এই উপলক্ষ্যে কনসালট্যান্ট পেডিয়াট্রিক্স ডা. কৌশিক মৌলিক জানিয়েছেন, ‘সাইনাস থেকে ইনফেকশন চোখে ছড়িয়ে গিয়েছিল আর আই সকেটে পুঁজ জমে গিয়েছিল। বাচ্চাটা খুবই অসুস্থ ছিল। চোখের মণির নড়াচড়া কমে গিয়েছিল এবং দৃষ্টিশক্তি ক্রমশ কমে যাচ্ছিল। এটা সাইনাস ইনফেকশনের সবচেয়ে ভয়ংকর জটিলতাগুলোর একটা। এখানে সময় মতো চিকিৎসা না হলে বাচ্চার দৃষ্টিশক্তি সম্পূর্ণ চলে যাওয়ার সমস্ত সম্ভাবনা ছিল।’

Health article
Dr. Shantanu Panja and the patient

ইএনটি-হেড অ্যান্ড নেক সার্জেন ডা. শান্তনু পাঁজা জানিয়েছেন, ‘এই অপারেশনটা চ্যালেঞ্জিং ছিল, কারণ বাচ্চার বয়স মাত্র ৬ বছর। এই অস্ত্রোপচার করা হয়েছে খুব সীমিত জায়গা নিয়ে চরম সূক্ষ্মভাবে, যাতে চোখের মণি আর অপটিক নার্ভের কোনও ক্ষতি না হয়। এমনকি আমরা কানের মাইক্রোসার্জারিতে যেসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয় এই অস্ত্রোপচারের বিভিন্ন স্তরে সেগুলো ব্যবহার করেছি, কারণ ওগুলো আকারে বেশি ছোটো এবং খুব ছোটো জায়গায় সূক্ষ্মভাবে ব্যবহার করা যায়।’

অ্যাপোলো মাল্টিস্পেশালিটি হসপিটালস, কলকাতায় সাম্প্রতিকতম ইমেজ গাইডেড ন্যাভিগেশন সিস্টেমের সুবিধাও আছে, যা প্রায়ই এই ধরনের গুরুতর কেসের অস্ত্রোপচারে ব্যবহার করা হয়। এটা ডাক্তারদের অস্ত্রোপচারের সময়ে শরীরের জরুরি কাঠামোগুলো খুঁজে বার করতে সাহায্য করে এবং সেগুলোর ক্ষতি আটকানো যায়।

চুলে Split Ends-এর সমস্যা নেই তো?

Split Ends-এর সমস্যা তখনই শুরু হয় যখন চুলের উপরের পরত কোনও কারণবশত ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। স্টাইলিং এবং স্ট্রেটনিং করাবার উপকরণ বেশি ব্যবহার করলে, চুলে বেশি কেমিক্যালস ব্যবহার করলে বা ড্রায়ার বেশি ব্যবহার করলে, বারবার শ্যাম্পু করা, চুলে ট্রিমিং না করানো হলে, চুলের ডগা ফেটে যায়, Split Ends-এর সমস্যা বাড়তে থাকে। চুল হেলদি করতে এবং Split Ends-এর সমস্যা রোধ করতে এই উপাদানগুলি ব্যবহার করে দেখতে পারেন।

নারকেল তেল

Split Ends-এর জন্য নারকেল তেলের ব্যবহার খুবই কার্যকরী। রুক্ষ এবং দুই মুখো চুলে পুষ্টির জোগান দিয়ে চুলের ময়েশ্চার বজায় রাখতে সাহায্য করে নারকেল তেল। নারকেল তেল হালকা গরম করে চুলের গোড়া থেকে শুরু করে পুরো চুলে লাগিয়ে রাখুন সারা রাত। সকালে চুল শ্যাম্পু করে নিন। তেলে থাকা কপার, আয়রন, ম্যাগনেশিয়াম, পটাশিয়ামের মতো খনিজ পদার্থের সঙ্গে সঙ্গে হেলদি ফ্যাটসও রয়েছে যা কিনা চুলের ড্রাইনেস রোধ করতে খুবই কার্যকরী।

আমলকী

আমলকীতে রয়েছে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট রিচ ভিটামিন-সি। হেয়ার ফলিকলস রিপেয়ার করার সঙ্গে সঙ্গে হেয়ার গ্রোথ-এও অত্যন্ত কার্যকরী। এছাড়াও ফ্রি র‌্যাডিক্যালস-এর জন্য চুলে যে ক্ষতি হয়েছে সেটা রিপেয়ার করতে এটি সাহায্য করে। আমলকীতে ভিটামিন-সি, গ্যালিক অ্যাসিড, অ্যান্টি অক্সিডেন্টস ইত্যাদি থাকে, যা কিনা চুলে প্রযোজনীয় পুষ্টির জোগাড় দেয়।

আমলকী-যুক্ত শ্যাম্পু ব্যবহার করতে পারেন অথবা 5-6 ঘণ্টা আমলকীকে জলে ভিজিয়ে রেখে সেই জল ফুটিয়ে ঠান্ডা করে চুল ধুতে পারেন। এতে চুলের ড্রাইনেস রোধ করা যাবে, চুলে শাইন আসবে এবং Split Ends-এরও সমস্যা দূর হবে।

রিঠা

মাথার খুশকি রোধ করতে রিঠার অবদান সকলেই জানেন। চুলপড়া রোধ করতে এবং চুল ড্রাই হওয়া থেকেও রিঠা সাহায্য করে। এতে আছে অ্যান্টি ব্যাকটেরিয়াল এবং অ্যান্টি ফাংগাল প্রপার্টিজ। খুশকির কারণে স্ক্যাল্পে চুলকানি এবং চুল পড়ে যাওয়ার সমস্যা তৈরি হয়। বিশেষজ্ঞের মতে রিঠা যুক্ত শ্যাম্পু এইক্ষেত্রে ব্যবহার করা উচিত। Split Ends, প্রাণহীন চুলেই সাধারণত বেশি দেখতে পাওয়া যায়। সেইক্ষেত্রে রিঠা চুলে পুষ্টি জোগায়।

অর্গ্যান অয়েল

দূষণ এবং ধুলোমাটির জন্য চুলের সাংঘাতিক ক্ষতি হয়। অর্গ্যান অয়েল সেই ক্ষতিপূরণ করতে সহায়তা করে। এছাড়াও স্ক্যাল্প হেলদি রেখে চুল পাতলা হওয়াও রোধ করে। অর্গ্যান অয়েলে রয়েছে পাওয়ারফুল অ্যান্টি অক্সিডেন্টস এবং নারিশিং ফ্যাট অ্যাসিড। এগুলি চুলকে ফ্রি র‌্যাডিকলস এবং স্টাইলিং করার ফলে হওয়া ক্ষতির হাত থেকে সুরক্ষিত রাখে। এর ফলে চুল পড়া, Split Ends-এর সমস্যা কন্ট্রোল হয়।

ভৃঙ্গরাজ

ভৃঙ্গরাজ চুলের হারিয়ে যাওয়া আর্দ্রতা ফিরিয়ে এনে ফ্রিজিনেস এবং Split Ends-এর সমস্যা দূর করতে সক্ষম। এছাড়াও ব্লাড সার্কুলেশন ইমপ্রুভ করে হেয়ার গ্রোথ বাড়াবারও কাজ করে। খুব বেশি কেমিক্যালস ব্যবহারের ফলে চুল সাদা হয়ে যেতে থাকে। ভৃঙ্গরাজ এই সমস্যা দূর করে চুল নারিশ করে।

অ্যাভোকাডো

শরীরের মতো চুলের জন্যেও এটি অত্যন্ত উপকারী। ভিটামিন এ, ডি এবং ই-তে ভরপুর অ্যাভোকাডো চুলে ঘনত্ব নিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে Split Ends-এর সমস্যাও রোধ করে। এতে রয়েছে পাটাশিয়াম এবং ম্যাগনেশিয়াম-এর মতো মিনারেল যা কিনা কিউটিকলস সেলসকে সিল করার সঙ্গে সঙ্গে চুল সফট করে।

 

স্বাধীনতার ৭৫ কেমন আছেন নারীরা? (পর্ব-২)

স্বাধীনতার ৭৫ বছর অতিক্রম করার পর কী কী ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে মেয়েদের জীবনে. আসুন দেখে নেওয়া যাক৷

নারীরা মন থেকেও স্বাধীন হয়েছেন

নারীরা এখন তাদের নিজের কথা ভাবেন। সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধাও করেন না। অর্থাৎ তারা এখন মন থেকেও স্বাধীন হচ্ছেন। সাহসী, কঠিন এবং সফল ভাবে কিছু করার জন্য নিজের মনে সংকল্পও নিয়ে থাকেন আজকের মহিলারা। নতুন কিছু করে দেখাতেও শিখেছেন। দশ বিশ বছর আগেও পুরুষরা যা কল্পনাও করতে পারতেন না, আজ নারীরা সেইসব-ই করে দেখাচ্ছেন। তারা একে অপরের দ্বারা অনুপ্রাণিত হচ্ছেন। এই স্বাধীন ভারত নারীর উদীয়মান ছবি-ই তুলে ধরছে।

নিজেকে প্রমাণ করেছেন

একটি দেশের উন্নয়ন নির্ভর করে তার মানব সম্পদের ওপর। এক্ষেত্রে পুরুষ এবং নারী উভয়ে সমান ভূমিকা নিয়ে থাকেন। স্বাধীনতার পর আমাদের দেশেও নারী-পুরুষকে সমান অধিকার দেওয়ার চেষ্টা জারি থাকার কারণে, উন্নয়নের পথ খুলে দিয়েছে। নারী প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিজের যোগ্যতা ও মেধার প্রমাণ দিয়েছেন। তা সে বিজ্ঞান, রাজনীতি, কর্পোরেট জগৎ, অভিনয় বা সামরিক ক্ষেত্র যাই হোক, মেডিসিন হোক বা ইঞ্জিনিয়রিং সবখানেই নারীরা তাদের যোগ্যতা দেখিয়ে চলেছেন। আজ পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে দায়িত্বেও আছেন নারীরা। রাষ্ট্রপতির আসনও অলংকৃত করছেন। শুধু তাই নয়, ঝুঁকিপূর্ণ কাজ যেমন ফাইটার পাইলট হয়ে দেশের প্রতিরক্ষার দায়িত্বও পালন করছেন। এইসব পরিবর্তন খুবই ইতিবাচক। বাবা হোক, ভাই হোক বা স্বামী হোক নারীর অবদানকে গুরুত্ব দিতে এবং সহযোগিতা করতে চাইছেন এখন বাড়ির পুরুষরাও।

ইচ্ছে মতো জীবনযাপন

বিশেষ করে মুম্বই এবং দিল্লির মতো ভারতের মেট্রো এবং বড়ো শহরগুলিতে বসতি গড়ে তোলার কাজেও অগ্রণী ভূমিকা নিচ্ছেন মেয়েরা। বলতে গেলে, নারীদের অবস্থার অনেক পরিবর্তন ঘটছে এখন। নারীদের আজ শারীরিক পুষ্টি ও মানসিক বিকাশে সমান সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। গভীর রাতে কাজ সেরে বাড়িও ফিরছেন তারা। নির্ভয়ে নিজের পছন্দ মতো পোশাক পরে এখন আনন্দে থাকতেও জানেন। নিজের ইচ্ছেমতো সঙ্গী বেছে নেওয়ার অধিকারও পেতে শুরু করেছেন।

পারিবারিক সম্মান

শিক্ষা ও সচেতনতা পারিবারিক জীবনেও প্রভাব ফেলেছে এখন। অবস্থার পরিবর্তন ঘটছে এখন। দাম্পত্য জীবনে হিংসার শিকার হওয়া নারীর হার ৩৭.০২ থেকে ২৮.৮ শতাংশে নেমে এসেছে। এই তথ্যও পাওয়া গেছে যে, শুধুমাত্র ৩.৩ শতাংশ গর্ভাবস্থায় নিপীড়িত হচ্ছেন। একটি সমীক্ষায় আরও জানা গেছে যে, ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সিদের মধ্যে ৮৪ শতাংশ পারিবারিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। ২০০৫-০৬ সালে এই সংখ্যা ছিল ৭৬ শতাংশ। সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী আরও জানা গেছে যে, এখন প্রায় ৩৮ শতাংশ মহিলা একা বা যৌথভাবে বাড়ির বা জমির মালিকানা ভোগ করেন।

আজকের পরিবর্তিত পরিবেশে নারীরা যেভাবে পুরুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছেন, সব মিলে উন্নতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সমাজ এবং এটা দেশের জন্যও গর্বের বিষয়। ব্যাবসা, রাজনীতি, প্রযুক্তি, নিরাপত্তাসহ প্রতিটি ক্ষেত্রেই মহিলারা নিজেদের প্রতিষ্ঠা করে চলেছেন এবং সাফল্যও পাচ্ছেন। এখন এমন কোনও জায়গা নেই, যেখানে আজকের নারীদের উপস্থিতি নেই।

সম্প্রতি নারীর ক্ষমতায়নের দিকে অভূতপূর্ব পদক্ষেপ নিয়েছে ভারত সরকার। সংসদ ও রাজ্যের আইনসভায় নারীদের অংশগ্রহণও চোখে পড়ার মতো। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। অবশ্য মুদ্রার অন্য দিকটিও বিবেচনা করার মতো। যেখানে আজও নারীদের ঘরের বাইরে যেতে দেওয়া হয় না। ধর্ষণ যখন ঘটে তখন আমাদের সমাজ নারীকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা জোগায়। শুধু কন্যা-ভ্রূণ হত্যার মতোই বিষয়ই নয়, আজও অনেক ক্ষেত্রে নারীদের প্রয়োজন মতো এগিয়ে আসতে দেওয়া হচ্ছে না। আর এর সবচেয়ে বড়ো কারণ হল আমাদের সমাজ পুরুষ শাসন থেকে পুরোপুরি মুক্ত হয়নি।

এখনও অনেকে নারীকে পুরুষের ভোগ-বিলাসের বস্তু হিসেবে বিবেচনা করেন। বিজ্ঞাপন, চলচ্চিত্রের মতো ক্ষেত্রে অশ্লীল ভাবে তাদের প্রদর্শন করা হয়। আমরা যদি ভারতের কথা বলি, তাহলে দেখতে পাব যে, আমাদের দেশেও নারীদের অবস্থার আরও উন্নতি ঘটাতে হবে। উন্নত শিক্ষা-ই এর মাধ্যম হতে পারে।

আসলে, নারীর ক্ষমতায়নের দিকটি উন্নত হচ্ছে, তবে এখনও এমন কিছু ক্ষেত্র রয়েছে যেখানে আরও প্রচেষ্টার প্রয়োজন। শহরাঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা বিস্তৃত হয়েছে, তাই হয়তো শহরে মাতৃমৃত্যুর ঘটনা কমেছে কিন্তু গ্রামের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার খুব একটা পরিবর্তন হয়নি এখনও। ইউনিসেফের মতে, ভারতে সন্তান প্রসবের সময় মৃত্যুর হার কমলেও, তা এখনও দুশ্চিন্তামুক্ত করতে পারেনি। দেশে প্রতি বছর প্রায় ৪৫ হাজার মহিলা প্রসবের সময় মারা যায়।

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব