ধনুশকোডি (এন্ড অফ দ্য বো) শেষ পর্ব

রামায়ণের কাহিনি এই অঞ্চল জুড়েই। এখনও অনেক নিদর্শন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। যেতে যেতে আমাদের বাঁ-হাতে ঘন জঙ্গলের দিকে ইশারা করল ড্রাইভার। একটা কাঁচা সরু পথ ভিতরে চলে গেছে এঁকেবেঁকে। ড্রাইভার বলল, এটাই নাকি জটায়ু মন্দির অর্থাৎ রামায়ণে জটায়ু নাকি এখানেই আহত অবস্থায় পড়েছিলেন! অসম্ভব কিছুই নয়, হতেই পারে। সব ইতিহাস। বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর।

পথে কিছু দর্শনীয় জায়গা আছে বৈকি। অনেকেই নামছে, তবে আমরা সেখানে দাঁড়ালাম না। আমাদের মন টানছে ধনুশকোডি। সন্ধের আগেই ধনুশকোডি থেকে ফিরতে হবে। কারণ, রাতে সেখানে নাকি মানুষ নয়, অতিপ্রাকৃতরা ঘুরে বেড়ায়। গাড়ি এগোচ্ছে, দুই দিকেই কেবল গাছ আর গাছ, সবুজের বাহার।

মুগ্ধ হয়ে দুই ধারে নারকেল গাছের বাগান দেখতে দেখতে ধনুশকোড়ি পৌঁছে গেলাম। ধীরে ধীরে সবুজ বনানী সরে গেল। পথে ধনুশকোডি গ্রাম, টপকে চলে গেলাম। আগে দুটি সাগরের মিলনস্থল দেখে আসি। ধনুশকোড়ি পিছনে ফেলে আমাদের গাড়ি নাক বরাবর ছুটে চলেছে।

এবার কিন্তু পথের দু-পাশে ছোটো ছোটো বালিয়াড়ি, পাথর। এগোতে এগোতে হঠাৎ দেখলাম চওড়া পাকা রাস্তা দিয়ে আমরা এগোচ্ছি, কিন্তু রাস্তার দু’পাশেই গভীর জলরাশি! যেন হাত বাড়ালেই জল ছোঁয়া যায়। একটু নামলেই সাগর জলে ডুব মারা যায়। এটি দুটি সাগরের সঙ্গমস্থল। এক কথায়— -অপূর্ব! নয়নাভিরাম!

আমার এক হাতে ভারত মহাসাগর আর অন্য হাতে বঙ্গোপসাগর। আপ্লুত হয়ে গেলাম। আমাদের রাস্তা এসে একটি পয়েন্টে শেষ হয়ে গেল, সেখানেই গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালাম। সূচালো হয়ে আসা ভারতবর্ষের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলের একেবারে শেষ সীমান্ত, তীরের ফলার মতো দেখতে কিছুটা। এই বিন্দুতে দুই সাগর মিলেমিশে একাকার। কিন্তু দু’জনেই তাদের নিজেদের স্বাতন্ত্র্য সম্পূর্ণ ভাবে বজায় রেখেছে, একেই বলে প্রকৃতির খেলা।

ভারতবর্ষের পূর্ব উপকূলের একেবারে শেষ বিন্দুতেই আমি দাঁড়িয়ে, ভাবা যায়! ঘন নীলাকাশের নীচে শোভা পাচ্ছে অশোক স্তম্ভ। আমার সামনে, ডাইনে, বাঁয়ে— কেবল জল আর জল। একেবারে সামনে নাক বরাবর ২০ কিমি দূরে শ্রীলংকা আর পিছনে আমার দেশ।

মিলেমিশে একাকার হলেও কিন্তু দুই সাগরের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অক্ষুন্ন রেখেছে। একদিকে নীল জল, অন্যদিকে অলিভ গ্রিন জলরাশি। মাঝে হালকা একটি রেখা বোঝা যায়, যদিও দুই সমুদ্র একেবারে আলিঙ্গনাবদ্ধ। অশান্ত ভারত মহাসাগরে আছড়ে পড়ছে ঢেউয়ের পর ঢেউ। সাদা ফেনায় ভরে যাচ্ছে…। সেই সমুদ্রে নামা নিষেধ, পুলিস পাহারা দিচ্ছে। এদিকে বঙ্গোপসাগর একেবারে শান্ত সমাহিত যেন গভীর ধ্যানে মগ্ন ঋষি। একেবারেই স্থির। এও সম্ভব! মিলেমিশে গেছে তবু পার্থক্য স্পষ্ট। যেন মায়ের দুই ছেলে, একটি দামাল, অন্যটি একেবারে ধীর স্থির।

এটিই নাকি রামসেতুর অংশ। দেহ মন কেঁপে উঠল। আমি হয়তো সেই সেতুর উপরেই দাঁড়িয়ে আছি। যদিও বর্তমানে খালি চোখে সেই সেতু মোটেই দেখতে পেলাম না। তবে অনুভব করলাম। সেতু প্রায় দেড় কিলোমিটার গভীরে আছে এবং ধীরে ধীরে আরও গভীরে ঢুকে যাচ্ছে। সমুদ্রপথে যেতে হলে একমাত্র এখান দিয়েই লংকা যাওয়া সম্ভব। অনেকে বাইনোকুলারে শ্রীলংকা দেখার চেষ্টা করছে। চারিদিকে পর্যটকদের ভিড়। কাটা ফল, আইসক্রিম, ইডলি বিক্রি হচ্ছে।

এবার ধনুশকোডি গ্রামে যাওয়া যাক। ফেরার পথে এই একই রাস্তায় এল ধনুশকোডি গ্রাম। দুই দিকে বালিয়াড়ি আর পাথর, ধুধু প্রান্তর,ওই বহুদূরে সমুদ্র। একদা ছোট্ট একটি গ্রাম বর্তমানে জনশূন্য। খাঁ খাঁ করছে। এখনও ভাঙা কিছু বাড়ি, সরকারি অফিস, একটি চার্চের কিছু অংশ, বাজার, রেলওয়ে স্টেশন ভেঙে চুরে দুমড়ে-মুচড়ে দাঁড়িয়ে আছে। নিজেদের অস্তিত্বের স্বাক্ষর রেখেছে। সবাইকে যেন জানাচ্ছে এই যে, এটি এখন ধ্বংসস্তূপ হলেও আমরা কিন্তু এখনও সেই গ্রামের অস্তিত্ব বয়ে বেড়াচ্ছি।

দেখতে দেখতে এক পশলা মেঘ এসে আমাদের ভিজিয়ে দিয়ে গেল। জায়গাটি দেখে বড়ো কান্না পায়! বড়ো মন খারাপ করা জায়গা। জানা গেল শ্রীরামচন্দ্র নাকি সেতু বানানোর জন্য এখানেই প্রথম বসতি শুরু করেন। ওই যে বললাম— বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর। সেই শুরু। তারপর থেকেই এই গ্রামটি রয়ে যায়। আসে ব্রিটিশরা, বহু লোক খ্রিস্ট ধর্মালম্বী হয়। তারই সাক্ষী ভেঙে যাওয়া চার্চ। এখনও চার্চের ভিতরের অংশ তেমনই রয়েছে। চার্চের ভগ্নাংশ দেখলে আন্দাজ করা যায়, বেশ বড়ো মজবুত ছিল অনেকটা জায়গা জুড়ে। গা ছমছমে, শিহরণ জাগানো একটি জায়গা। কিন্তু কেন?

জানলাম ১৯৬৪ সালে এক বিরাট ঘূর্ণিঝড়ে রাতারাতি ধনুশকোডি গ্রাম ধ্বংস হয়ে যায়। সেদিনটি ছিল ২২ ডিসেম্বরের রাত। সারা গ্রাম, চার্চ তখন সেজে উঠেছে বড়োদিনের আনন্দে। ঠিক সেই সময়… প্রায় দুই হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারায় সমুদ্রের তলায় চাপা পড়ে। ধ্বংস হয়ে যায়, তলিয়ে যায় চলন্ত যাত্রীবোঝাই পম্বন-ধনুশকোডি প্যাসেঞ্জার ট্রেন। ট্রেনটিতে ছিল ১১৫ জন যাত্রী। এতগুলো মানুষের ত্রাহি ত্রাহি চিৎকার চাপা পড়ে গিয়েছিল ঘূর্ণিঝড়ের দাপটে।

চমকে উঠলাম, হয়তো আমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছি আমার পায়ের তলায় এখনও রয়ে গেছে কিছু কঙ্কাল! এখনও খুঁজলে হয়তো পাওয়া যাবে অসংখ্য নরদেহ! উদাসী জায়গা, মন খারাপ করা জায়গা। কেবল সোঁ সোঁ হাওয়ার শব্দ! যেন আজও বাতাসে তাদের দীর্ঘশ্বাস! সাইক্লোনে কত প্রাণ অকালে চলে গেল! সেই সময় ছিল না ইন্টারনেট, ছিল না এমন অত্যাধুনিক প্রযুক্তি। আগে থেকেই বিধ্বংসী ঝড়ের খবর কেউ পায়নি। তাই অতর্কিতে আচমকাই তলিয়ে গেল একটি আস্ত গ্রাম, একটি যাত্রীবাহী ট্রেন। স্টেশনের ধ্বংসাবশেষ আজও পড়ে আছে। তারপর থেকেই সরকার গ্রামটিকে বসবাসের অযোগ্য বলে ঘোষণা করেছে।

একদা জনবহুল আজ জনশূন্য, ভূতুড়ে বলে পরিচিত। গ্রামের বেশিরভাগ মানুষই ছিল মৎস্যজীবী। তবে আজও কিছু নৌকা চোখে পড়ল। শহর থেকে এসে জেলেরা মাছ ধরতে যায় গভীর সমুদ্রে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। যদিও বিকেল হলেই একটি মানুষও আর ওই তল্লাটে থাকে না। এই জায়গায় বিকেলের পর আর কেউ আসে না। তখন নাকি সেখানে নানা অদ্ভুত শব্দ শোনা যায়! শোনা যায় কান্না! শোনা যায় ঘণ্টাধ্বনি। অনেকেই এসব ভূতুড়ে বলে মনে করে। ভারতবর্ষের হনটেড প্লেসের মধ্যে এটি অন্যতম।

ট্যুরিস্টদের জন্য কিছু চিপস, কোলড্রিংস, ডাবের ছোটো ছোটো দোকান আছে। আর আছে ঝিনুকের তৈরি কিছু ঘর সাজানোর জিনিস, মেয়েদের চুড়ি-মালা। সবকিছু ছাপিয়ে যেন বিষাদ ভরা বাতাস বইছে সর্বক্ষণ নীরবে, আমার তো তেমনটাই মনে হল। কিছুক্ষণ পরেই সন্ধে নামবে। ভাবলাম, এবার রাতের অন্ধকারে চাক্ষুষ করি প্রান্তিক এই ভূতুড়ে গ্রাম! দেশের একেবারে শেষ প্রান্ত, পূর্ব উপকূলের। কিন্তু না, বুকটা দুরু দুরু করে কেঁপে উঠল। আর দুঃসাহস দেখিয়ে কাজ নেই। ড্রাইভার তো শুনে রেগেই আগুন, সে আমাদের ছেড়েই চলে যেতে চায়। মাথায় থাকুক আমার ভূত দেখা!

এরই মাঝে জেনে নিলাম গ্রামের এই অদ্ভুত একেবারে নতুন ধরনের নামের হেতু। স্থানীয় দু-একজন যেমনটা ব্যাখ্যা করল- শ্রীরামচন্দ্রের লংকা জয়ের পর বিভীষণ এখানে আসেন। ঠিক এই জায়গাটিতে বিভীষণ এবং শ্রীরামচন্দ্র তাদের ধনুক সমুদ্রের জলে নিক্ষেপ করে যুদ্ধ সমাপ্তি ঘোষণা করেছিলেন। সেই থেকে নাম হয়েছে— ধনুশকোডি (এন্ড অফ বো)।

আবার অনেকের মতে, পূর্ব উপকূলের এই শেষ বিন্দুটি দেখতে ঠিক ধনুকের মতো অর্ধগোলাকার আবার তীরের ফলার মতো ছুঁচলো একটি বিন্দু। সেই থেকে নাম হয়েছে ধনুশকোডি। (কোডি অর্থ এন্ড)।

ধনুশকোডি থেকে ফেরার পথে কিছু জঙ্গলাকীর্ণ জায়গা ঘুরে দেখা হল। ছোট্ট টিলা মতোন। টিলার উপর থেকে রামেশ্বরম দ্বীপটির চারিদিক একেবারে স্পষ্ট। প্রতিটি পথ, প্রতিটি খাঁজ। কেবল সবুজ, নিশ্ছিদ্রঘন সবুজ আর নীল জল। একমাত্র এইখান থেকেই হয়তো শ্রীলংকায় যাওয়ার পথ খোঁজা সম্ভব ছিল। এর নাম গন্ধমাদন মন্দির। ঠিক এই জায়গাটিতে বসেই নাকি রামচন্দ্রের সঙ্গে হনুমান লঙ্কার দিক নির্ণয় করেছিল।

দেখলাম মিষ্টি জলের কুয়ো। অদ্ভুত! কে কবে কীভাবে মিষ্টি জলের একটি স্রোত আবিষ্কার করল! চারিদিকে লোনাজল কিন্তু কুয়োর জল একেবারে নরমাল। পান করার উপযোগী। বেশ মিষ্টি জল! স্থানীয় লোকেদের বিশ্বাস, এইখানেই নাকি শ্রীরামচন্দ্র সীতাদেবীর জন্য পানীয় জলের ব্যবস্থা করেছিলেন।

সত্যি-মিথ্যা জানি না, তবে ব্যাপারটি সত্যিই ভাবায়। সবাই জল খাচ্ছে, আমি নিজেও খেয়ে দেখলাম। সমুদ্রের জল মুখে দিতেই আমার মুখটা জ্বলে গেল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে কুয়ো থেকে জল নিয়ে দেখলাম, একেবারে মিষ্টি জল। যেই আবিষ্কার করুক, যিনিই এটি তৈরি করুন, তিনি সাধারণ নন।

দেখলাম জটায়ু মন্দির। কাঁচা রাস্তা দিয়ে গভীর জঙ্গলের ভিতরে কিছুটা জায়গা, মন্দির বলে তেমন কিছু না থাকলেও, জায়গাটি কিন্তু আছেই৷ এই মাটি একসময় হয়তো জটায়ুর রক্তে লাল হয়ে উঠেছিল। মাটি ছুঁয়ে কপালে হাত ঠেকালাম, বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর। আবার বৃষ্টি! সর্বক্ষণই সমুদ্রের ধারে রৌদ্র ছায়া, মেঘ-বৃষ্টির খেলা চলল।

রাত সাড়ে আটটায় ট্রেন, চেন্নাই এক্সপ্রেস। মাত্র দুটি ট্রেন আছে। ট্রেন এগিয়ে চলল। কিছুটা এসেই ব্রেক! ধীরে, অতি ধীরে সমুদ্রের উপর দিয়ে চলতে লাগল। সেই বিখ্যাত পম্বন ব্রিজের পাশ দিয়ে। গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল! ফারাক্কা ব্রিজের মতো দুই পাশে লোহার গরাদ নেই, কেবল জলের উপর রেললাইন পাতা। ঝিকঝিক করে সমুদ্র পেরিয়ে ট্রেন আবার মাটি স্পর্শ করল। থ্যাঙ্ক গড! তবে সব কি আর সম্পূর্ণ হয়! ভ্রমণের কিছু বাকি রয়েই যায়। সেই বাকিটুকু সম্পূর্ণ করার জন্য আবার হাতছানি দিয়ে ডেকে নিয়ে যায় অজানায়। ভ্রমণপিপাসু আমরা আবার ঘর ছাড়ি। পরের বার সকালবেলার টিকিট নেব। সাগরের উপর দিয়ে ট্রেনে চড়ার থ্রিল নেব, নীল জলরাশির সৌন্দর্য দেখব। এবার সেটা মিস করলাম। কারণ রাত ন’টায় জল-স্থল-অন্তরীক্ষ আঁধারে মিলেমিশে একাকার। বাইরের দৃশ্য কিছুই উপভোগ করতে পারলাম না। কেবল অনুভব করলাম, আমরা সাগর পাড়ি দিচ্ছি, কু-ঝিক-ঝিক…।

পিছনে পড়ে রইল সেই ধনুশকোডি, যেখানে এই রাতে ঘুরে বেড়াচ্ছে অশরীরীরা! হয়তো খুঁজে বেড়াচ্ছে সমুদ্রে তলিয়ে যাওয়া তাদের ঘর! খুঁজে বেড়াচ্ছে ঘূর্ণি ঝড়ে হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জন। হয়তো এই সময় ধনুশকোডি অশরীরীদের হাহাকারে ভরে উঠেছে। হয়তো তারা দূর থেকে আমাদের দেখছে, ভাবছে কত শত রোজ এমন আসে, আবার চলে যায়। কেউ থাকে না ভয়ে। কিন্তু কেউ কি দেখেছে তাদের! সে দুঃসাহস কারও হয়নি। অদ্ভুত এক রহস্য।

বিরল অসুখ— ফোকোমেলিয়া

ফোকোমেলিয়া একটি বিরল জন্মগত ব্যাধি। যার বৈশিষ্ট্য হল— অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অনুপস্থিতি বা খুব ছোটো হয়ে যাওয়া। যার ফলে ওই অঙ্গকে মাছের পাখনার মতো দেখতে লাগে। ফোকোমেলিয়া-র কারণে বাহু, পা অথবা উভয় অঙ্গেরই স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়ে অঙ্গগুলি ছোটো থেকে যেতে পারে। আর এই ‘ফোকোমেলিয়া’ শব্দটি গ্রিক শব্দ ‘ফোক’ থেকে এসেছে। যার অর্থ— সিল মাছের মতো অঙ্গ বা পাখনা। এই বিষয়ে তুলে ধরা হচ্ছে টেকনো ইন্ডিয়া ডামা হাসপাতাল-এর শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ধ্রুবজ্যোতি হালদার-এর বক্তব্য এবং পরামর্শ।

২০২৪ সালের প্যারা অলিম্পিকে মিক্সড কম্বাইন্ড আর্চারিতে ব্রোঞ্জ পদক প্রাপ্ত শীতল দেবী এই ফোকোমেলিয়া নামক গুরুতর রোগ নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু, জম্মু ও কাশ্মীরের একটি ছোট্ট গ্রাম লোইঘর অঞ্চলের এই মেয়ে তাঁর শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে উপেক্ষা করে, খেলার জগতে প্রবেশ করেছিলেন এবং তিনি প্রমাণ করেছেন যে, সাহস রাখলে শারীরিক প্রতিবন্ধকতাও হার মানে।

আসলে, ফোকোমেলিয়া এমন এক অসুখ, যেখানে হাত কিংবা পায়ের বিকাশ বন্ধ হয়ে যায় এবং শীতল দেবী-রও তাই হয়েছিল। অর্থাৎ, তাঁর হাত আর বৃদ্ধি পায়নি। তবে তিনি হার মানেননি। ব্রোঞ্জ পদক জিতে তিনি ভারতের সর্বকনিষ্ঠ প্যারা অলিম্পিক পদকজয়ী এবং প্যারা অলিম্পিকের ইতিহাসে দ্বিতীয় বাহুবিহীন তিরন্দাজ হয়ে ওঠেন। শীতল দেবীর এই সাফল্য প্রেরণাদায়ক।

ফোকোমেলিয়া কারণ

জেনেটিক কারণ, পরিবেশগত প্রভাব অথবা উভয় কারণেই কারওর সন্তান ফোকোমেলিয়া-র শিকার হতে পারে। ফোকোমেলিয়া- 1-র সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কারণগুলির মধ্যে একটি হল— গর্ভাবস্থায় থ্যালিডোমাইড ওষুধের ব্যবহার। এই ঘটনা প্রথম সামনে এসেছিল ১৯৫০ সালের শেষের দিকে। সাধারণ অসুস্থতা দূর করার জন্য গর্ভবতী মহিলাদের থ্যালিডোমাইড দেওয়া হতো। কিন্তু পরে দেখা যায় যে, এটি বিশ্বব্যাপী হাজার হাজার শিশুর মধ্যে ফোকোমেলিয়া সহ গুরুতর জন্মগত ত্রুটি সৃষ্টি করছে।

অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বিকাশ ব্যাহত হওয়ার জন্য দায়ী থাকতে পারে নির্দিষ্ট জিনের পরিবর্তনের বিষয়টিও। এই জিনগত পরিবর্তনগুলি উত্তরাধিকারসূত্রে আসতে পারে কিংবা স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে ঘটতে পারে। গর্ভাবস্থায় নির্দিষ্ট রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া কিংবা ভুল ওষুধ সেবনের ফলেও সন্তান ফোকোমেলিয়ার শিকার হতে পারে।

লক্ষণ এবং রোগ নির্ণয়

ফোকোমেলিয়া-র প্রাথমিক লক্ষণ হল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হওয়া। যা হালকা থেকে গুরুতর পর্যন্ত হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে শিশুর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আংশিক ভাবে গঠিত হতে পারে আবার কিছু ক্ষেত্রে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সম্পূর্ণরূপে অনুপস্থিত থাকতে পারে। অতিরিক্ত লক্ষণগুলির মধ্যে মুখের অস্বাভাবিকতা, যেমন ঠোঁট কাটা-ফাটা অবস্থায় সন্তান জন্ম নিতে পারে।

ফোকোমেলিয়া-র রোগনির্ণয় সাধারণত গর্ভাবস্থায় মায়ের শারীরিক পরীক্ষা এবং ইমেজিং স্টাডি, অর্থাৎ এক্স-রে কিংবা আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে করা হয়, যাতে সন্তানের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বৃদ্ধি ব্যাহত হবে কিনা তার আভাস পাওয়া যায়। যে-কোনও অন্তর্নিহিত জিনগত পরিবর্তন শনাক্ত করার জন্য জেনেটিক পরীক্ষাও করা যেতে পারে।

চিকিৎসা এবং পরিসেবা

ফোকোমেলিয়া-র নির্দিষ্ট কোনও চিকিৎসা নেই। তবে বিভিন্ন সহযোগী চিকিৎসার মাধ্যমে জীবনের মান উন্নত করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে মেডিসিন এবং মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসা পরিসেবা দেওয়া হয় রোগীর চাহিদা অনুসারে।

প্রস্থেটিক্স এবং অর্থোটিক্স: কৃত্রিম অঙ্গ প্রতিস্থাপন করে (প্রস্থেটিক্স এবং অর্থোটিক্স) ফোকোমেলিয়া আক্রান্ত ব্যক্তিদের জীবনযাপনের মান উন্নত করা যেতে পারে।

শারীরিক পেশাগত থেরাপি: এই থেরাপিগুলি শক্তি, সমন্বয় এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে, যা ফোকোমেলিয়া-র শিকার হওয়া ব্যক্তিদের মনোবল বাড়িয়ে দিতে পারে।

শল্য চিকিৎসা: কিছু ক্ষেত্রে, সংশ্লিষ্ট অস্বাভাবিকতা হ্রাস করতে কিংবা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কার্যকারিতা উন্নত করতে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।

চোখের নানারকম সমস্যায় ভুগছি, কী করা উচিত?

আমি ২৫ বছর বয়সি কর্মরতা। শুনেছি এই সময় চোখের সংক্রমণ হওয়ার বিপদ অনেক বেড়ে যায়। এটা কি ঠিক? তাহলে সংক্রমণ থেকে বাঁচতে কী করা আবশ্যক?

এই সময় সত্যিই চোখে সংক্রমণ হওয়ার ভয় বেশি থাকে। কারণ, এই সময় নানারকম ব্যাক্টেরিয়া জন্ম নেয় এবং পোকামাকড়ের সমস্যাও বাড়ে। বাতাসে অতিরিক্ত আর্দ্রতা এবং ব্যাক্টেরিয়ার কারণে সংক্রমণ হওয়ার ভয় সবসময় থাকে। এর জন্য ব্যক্তিগত ভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা খুব প্রয়োজন। চোখে হাত দেবেন না, চোখ রগড়াবেন না। সারা দিনে তিন থেকে চারবার চোখে পরিষ্কার ঠান্ডা জল দিয়ে ঝাপটা মারুন। এতে সংক্রমণ হওয়ার ভয় অনেক কম হবে। যেখানে জল জমে রয়েছে সেই সব জায়গা এড়িয়ে চলুন। বর্ষার জল চোখের ভিতর যাতে না ঢোকে খেয়াল রাখবেন।

আমার বয়স ২১। এই সময় কতরকম চোখের অ্যালার্জি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে? এগুলি রোধ করার কোনও উপায় আছে কি?

এই সময় চোখের সংক্রমণ খুবই সাংঘাতিক আকার ধারণ করতে পারে। এর মধ্যে সবথেকে কমন হল কনজাংটিভাইটিস, আই ফ্লু, আঞ্জনি এবং কর্নিয়াল আলসার। এগুলো রোধ করার উপায় হল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা। ঠান্ডা জল দিয়ে তিন চারবার চোখ ভালো করে ধুতে হবে। ঘুম থেকে উঠে, কনট্যাক্ট লেন্‌স খোলার পর চোখ একেবারেই রগড়াবেন না। এই অভ্যাস কর্নিয়ার স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে। পুষ্টিকর খাবার খান, পর্যাপ্ত পরিমাণে জল পান করুন। নিজস্ব জিনিস যেমন তোয়ালে, চশমা, কনট্যাক্ট লেন্স অপরকে ব্যবহার করতে দেবেন না। বাড়ি থেকে বাইরে বেরোলে রোদ চশমা ব্যবহার করতে যেন ভুল না হয় ।

মাঝেমধ্যে আমার চোখ ভীষণ জ্বালা করে। এর থেকে মুক্তির উপায় কি?

সাধারণত গরমকালে চোখ জ্বালা করার সমস্যা হয়ে থাকে। তবে এই সময়ও এই সমস্যা দেখা যাচ্ছে। চোখ জ্বালা দূর করতে শসার টুকরো কেটে চোখের উপর রাখুন। শসা চোখ ঠান্ডা রাখে। অনেক সময় ময়েশ্চারাইজার থেকেও চোখ জ্বালা করে। আপনি অন্য কোম্পানির ময়েশ্চরাইজার ট্রাই করে দেখতে পারেন। এছাড়াও সারাদিনে দুবার চোখে ড্রপ দিন। চোখের জন্য গোলাপজলও খুব ভালো বিকল্প। সকালে মুখ পরিষ্কার করার পর কাঁচা দুধে তুলো ভিজিয়ে চোখের উপর খানিক্ষণ রেখে দিন। দুধে চোখে সংক্রমণ দূর হয়। এতেও সমস্যা না মিটলে অবশ্যই ডাক্তার দেখান।

আমার স্বামী আর সন্তানকে সারাদিন ল্যাপটপের সামনে বসে কাজ করতে হয়। আমার ভয় হচ্ছে, এতে ওদের চোখে প্রেশার পড়ছে। ফলে চোখ দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এটা সত্যিই কতটা ক্ষতিকারক এবং এই সমস্যার সমাধান আদৌ কি করা সম্ভব?

কাজের জন্য তো বটেই, বহুলোক এমনিতেও সারাদিন মোবাইল বা ল্যাপটপে কিছু না কিছু দেখতেই থাকে। খুব মনোযোগ সহকারে স্ক্রিনের লেখাগুলো পড়তে হয় ফলে চোখে খুবই প্রেশার পড়ে। দৃষ্টিশক্তি কমতে থাকে। ড্রাই আই, চোখ থেকে জলপড়া, চোখ লাল হয়ে যাওয়া, দূরের জিনিস দেখার সমস্যা, চোখের সামনে ধোঁয়াশা, চোখে ব্যথা, জ্বালা করা ইত্যাদি নানা চোখের সমস্যা ধীরে ধীরে দেখা দিতে পারে। আপনার স্বামী এবং সন্তানের যাতে এই সমস্যাগুলো না হয়, তার জন্য ওদের বলবেন কাজ এবং পড়াশোনা শেষ করে সকলের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটাতে। এতে মোবাইল আর ল্যাপটপের ব্যবহার কিছুটা হলেও কমবে। ল্যাপটপে কাজ করার সময় অ্যান্টিগ্লেয়ার চশমা ব্যবহার করলে ভালো হয়।

মশালা-রাইস বড়া এবং আলু-পনির পকোড়া

মুচমুচে খাবারে জমিয়ে দিতে পারেন বিকেলের আড্ডা। আপনাদের আজ আমরা দিচ্ছি মশালা-রাইস বড়া এবং আলু-পনির পকোড়া-র রেসিপিজ।

আলু-পনির পকোড়া

উপকরণ: ২৫০ গ্রাম পনির, চারটে বড়ো আলু সেদ্ধ, ২ বড়ো চামচ ময়দা, ২ বড়ো চামচ কর্নফ্লাওয়ার, ১ ছোটো চামচ কাঁচালংকার পেস্ট, ১ ছোটো চামচ আদাপেস্ট, হাফ চামচ গরমমশালা, হাফ ছোটো চামচ হলুদগুঁড়ো, ১ ছোটো চামচ লেবুর রস, হাফ কাপ ধনেপাতা কুচো, হাফ চামচ গোলমরিচের গুঁড়ো, হাফ ছোটো চামচ লাললংকার গুঁড়ো, পরিমাণ মতো তেল এবং নুন স্বাদমতো।

প্রণালী: পনিরকে হালকা ভেজে নিয়ে চটকে রাখুন। ওর সঙ্গে সেদ্ধ আলু, ময়দা, কর্নফ্লাওয়ার পাউডার, কাঁচালংকার পেস্ট, আদার পেস্ট, হলুদগুঁড়ো, গোলমরিচের গুঁড়ো, ধনেপাতার কুচো, লেবুর রস, গরমমশালা এবং স্বাদমতো নুন মিশিয়ে নিয়ে রেখে দিন কিছুক্ষণ। এরপর হাতের তালুতে সামান্য তেল লাগিয়ে, ভালো ভাবে মেশানো ওই উপকরণকে ছোটো ছোটো আকার দিয়ে রাখুন। কড়াইতে তেল গরম করুন। ভালো ভাবে তেল গরম হয়ে গেলে, সমস্ত উপকরণ দিয়ে তৈরি ওই ছোটো ছোটো বলগুলোকে হালকা আঁচে ভাজুন। বাদামি রং ধারণ করলে কড়াই থেকে তুলে নিন। এরপর ধনেপাতার চাটনি কিংবা টম্যাটোর চাটনি দিয়ে গরম গরম পরিবেশন করুন।

মশালা-রাইস বড়া

উপকরণ: ২ কাপ ভেজানো চাল, ২ বড়ো চামচ কর্নফ্লাওয়ার, ৩টে আলু সেদ্ধ, ১টা বড়ো পেঁয়াজের কুচো, ২টো কাঁচালংকার কুচো, ১ ছোটো চামচ আদাকুচো, হাফ চামচ আমচুর, হাফ চামচ লাললংকার গুঁড়ো, হাফ ছোটো চামচ চাটমশালা, হাফ ছোটো চামচ গরমমশালা, ২ বড়ো চামচ সেদ্ধ ছোলা, পরিমাণ মতো তেল এবং নুন স্বাদমতো।

প্রণালী: সেদ্ধ আলুর খোসা ছাড়িয়ে নিয়ে রাখুন। ১টা সেদ্ধ আলু কেটে ছোটো ছোটো টুকরো করে নিন এবং বাকি ২টো আলু চটকে নিন ভালো ভাবে। ভেজা চাল মিক্সিতে পেস্ট বানিয়ে নিন। এরপর চটকানো আলুর সঙ্গে চালের পেস্ট এবং কর্নফ্লাওয়ার মেশান। ওর সঙ্গে পেঁয়াজকুচো, আদাকুচো, লংকাকুচো, আমচুর, চাটমশালা, গরমমশালা মিশিয়ে নিয়ে ছোটো ছোটো রিং তৈরি করে রাখুন। এরপর কড়াইতে তেল গরম করে, আলু-চালের রিংগুলো ভাজুন হালকা আঁচে। বাদামি রং ধারণ করলে নামিয়ে নিন রিং এবং আলু-ছোলার টুকরোয় গোলমরিচ ছড়িয়ে দিয়ে, চাটনির সঙ্গে মশালা-রাইস বড়া গরম গরম পরিবেশন করুন।

সন্ধ্যাতারা (শেষ পর্ব)

বারান্দায় পেতে রাখা চেয়ারে আমি বসতেই প্লেটে করে কিছু মিষ্টি এনে উনি আমাকে দিয়ে বললেন, ‘লাস্ট তোমাদের গ্রাম যখন গিয়েছি তখন বন্দনার বয়স ১৩-১৪ বছর হবে, তুমিও তখন তেমনই হবে। হয়তো তোমাকেও দেখেছি তখন, এখন তো সব কত বড়ো হয়ে গেছ।’

আমি বললাম, ‘এবার আর একবার যাবেন কাকিমা আমাদের গ্রাম।’

যেতে তো ইচ্ছে করে কিন্তু তোমার কাকুর যে খুব কাজের চাপ, দেখছ না এখনও ফিরে আসেননি।

—হ্যাঁ তা ঠিক, তবুও সময় করে…

—আচ্ছা বাবা, সুযোগ পেলেই যাব। ইন্দু মানে বন্দনার মা প্রায়ই যেতে বলে, আর যেতে পারি না বলে ওর রাগ হয়। ওকেও বলেছি এখন তো কাছেই থাকছি, ঠিক যাব।

মিষ্টি খাওয়া হলে কাচের গেলাসের জলটা খেয়ে টেবিলে নামিয়ে রেখে বললাম, ‘কাকিমা আজ আমি আসি, সাড়ে দশটায় মেসের বাইরের গেট বন্ধ করে দেয়।”

সন্ধ্যাতারা এতক্ষণ দাঁড়িয়েছিল আমাদের সামনেই। আমাকে উঠতে দেখে এগিয়ে এল। গেট পর্যন্ত বেরিয়ে এল ওর মা আর ও। এর প্রায় এক সপ্তাহ পর কলেজে একদিন বন্দনা আমাকে বলল, ‘রাতে টিউশন থেকে ফেরার পথে সুরুচির খুব ভয় করছে। যদিও সামান্য রাস্তা, তবুও শহরের মেয়ে তো এমন রাস্তায় অভ্যস্ত নয়। আমি যে ওকে নিয়ে আসব তারও উপায় নেই। ওর যে তিনদিন টিউশন সেই তিনদিনই তো একই সময়ে আমাদের মেসেও বিকাশ স্যার পড়াতে আসেন।’

আমি একটু চুপ থেকে বললাম, ‘আচ্ছা, আমি তো আছি, আমাদের মেসের পাশ দিয়েই তো রাস্তা, আমি ৯টার সময় একবার চলে যাব।”

—না না, তুই এত করবি কেন? তাছাড়া তোরও তো পড়াশোনা আছে।’

—মাত্র তো ১০ মিনিটের পথ, আসা যাওয়া তে খুব বেশি হলে আধ ঘণ্টা। এত ভাবিস না আমি নিয়ে আসব।

এবার আমার অপেক্ষা শুরু হল সপ্তাহের তিনটে দিনের। সোম, বুধ আর শুক্র। ঘড়িতে তাকিয়ে থাকতাম কখন ৮ টা ৪৫ বাজে। সন্ধ্যাতারা একটা গোলাপি রঙের লেডি বার্ড সাইকেল নিয়ে যেত, আর ফেরার সময় দু’জনে পাশাপাশি হেঁটে ফিরতাম। শুরু হল কথায় কথায় আমাদের ভেসে যাওয়া। খুব কথা বলত সন্ধ্যাতারা। আমি শুধু ওর মুখের দিকে তাকিয়ে হারিয়ে যেতাম। এভাবেই পেরিয়ে গেল অনেকগুলো দিন।

সন্ধ্যাতারা এখন ক্লাস টুয়েলভ। সামনেই ফাইনাল পরীক্ষা। আমারও থার্ড ইয়ার। এরই মাঝখানে বন্দনার বিয়ে হয়ে গেছে। থার্ড ইয়ারের ফাইনাল পরীক্ষাটা শ্বশুরবাড়ি থেকেই দেবে। আমার সব বন্ধুদের মধ্যে রটে গেছে সন্ধ্যাতারা আর আমার মধ্যে দারুণ প্রেম চলছে। অথচ, আজও আমি সন্ধ্যাতারাকে মনের কথা কিছুই বলতে পারিনি। আমরা এখনও কেবল ভালো বন্ধুর মতো। কিন্তু তাদের এ কথা বিশ্বাস করাবে কে?

আজ সন্ধ্যাতারার টিউশনের শেষ দিন। ক’দিন আগেই তার মুখে শুনেছি, ওর বাবার ট্রান্সফার অর্ডার এসে গেছে। হাওড়ার একটা মফস্বল এলাকায় নতুন পোস্টিং। পরীক্ষা শেষ হলেই ওরা চলে যাবে। কলকাতার বাড়ি থেকেই ওর বাবার যাতায়াত করা যাবে। আজ যে ভাবেই হোক চিঠিটা দিতেই হবে ওকে। কাল সারারাত জেগে লিখে রেখেছি মনের সব কথা।

সন্ধ্যাতারা আমার পাশে পাশে হাঁটছে তার সাইকেল ঠেলে ঠেলে। আজও সেই চাঁদের মায়াবী আলো। সন্ধ্যাতারাকে বললাম ভালো করে পরীক্ষা দেওয়ার কথা। ও আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আমার বুকে সেই তোলপাড় করে দেওয়া হাসিটা হেসে মাথা নাড়ল কেবল। টুকটাক কথার মাঝেই ও আমাকে হঠাৎ বলল, ‘তুমি আমায় সন্ধ্যাতারা নাম দিয়েছিলে?’

আমি বোবার মতো চুপ করে থমকে দাঁড়ালাম। কী করে জানল ও! আমি জিজ্ঞেস না করলেও উত্তর ওর কাছেই পেলাম। ‘বন্দনাদিকে তোমার বন্ধুরা বলেছিল, আমার নাম নাকি সন্ধ্যাতারা। তুমি বলেছ। একদিন বন্দনাদিই আমাকে বলেছিল। নামটা কিন্তু খুব পছন্দ হয়েছে আমার।’

কীভাবে দেব ওকে চিঠিটা! বুক পকেটে বারবার হাত রেখে নামিয়ে নিচ্ছি। হাত কাঁপছে। হায় ভগবান! রাস্তা শেষ হয়ে এল। তার বাড়ির কাছে পৌঁছে কেবল অস্ফুট স্বরে বললাম, ‘ভালো থেকো, মনে রেখো’।

আগামীকাল সন্ধ্যাতারা-রা ফিরে যাচ্ছে কলকাতায়, সারাজীবনের জন্য। আর কখনও হয়তো দেখা হবে না তার সঙ্গে। আজ ওদের বাড়িতে কাকিমা আমাকে নিমন্ত্রণ করেছিলেন বলে সন্ধেবেলায় ওদের বাড়ি এসেছি। সবকিছু গোছগাছ হয়ে গেছে। আমার ভিতরে একটা শূন্যতা কেমন যেন হু হু করে বইছে।

কাকু-কাকিমার সঙ্গে দু’একটা কথা বলার পর খাবার টেবিলে বসলাম। কাকিমা কাকুর কাছে অনেক নাম করলেন আমার। কাকু আর আমি একসঙ্গে খেতে বসলাম। কাকিমার সঙ্গে সঙ্গে সন্ধ্যাতারাও পরিবেশনে হাত লাগিয়েছে।

—কাল কখন বেরোবেন কাকু? খেতে খেতেই জিজ্ঞেস করলাম।

—খুব সকালেই বেরিয়ে পড়ব। রোদ্দুর হলে অসুবিধা হবে।

—হ্যাঁ তাই ভালো। আমার গলাটা কেমন কেঁপে উঠল! মুখ তুলতেই ডিনার টেবিল থেকে দু’হাত দূরে তার বাবার পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা সন্ধ্যাতারার মুখোমুখি হয়ে পড়লাম। ওর সেই চিকচিক করে ওঠা চোখের মায়াবী দৃষ্টি আমি কখনও ভুলব না। ফিরে আসার সময় সন্ধ্যাতারা ওর পড়ার ঘর থেকে একটা বক্সের ভিতরে প্যাকিং করা কিছু এনে আমার হাতে দিল।

—এটা রেখে দাও বাবা, এটা তোমার গিফট সুরুচিই পছন্দ করে কিনে এনে প্যাকিং করে রেখেছে তোমাকে দেওয়ার জন্য। তুমি সুরুচির জন্য অনেক করেছ বাবা। তোমার কথা আমরা কেউ ভুলব না। কাকিমা অত্যন্ত স্নেহের সঙ্গে আমাকে কথাগুলো বললেন।

গিফটা নিয়ে মেসে ফিরে এলাম। অন্যবারের মতো এবারও সন্ধ্যাতারা আর কাকিমা আমার সঙ্গে সঙ্গে মেইন গেটের বাইরে বেরিয়ে এসেছিলেন। কী অসহ্য কষ্ট হয়েছিল সেদিন। শুয়ে আছি। ঘুম আসছে না কিছুতেই। বালিশের পাশে বিছানার চাদরে আড়াল করে নামিয়ে রেখেছি গিফট প্যাকেটটা। আমার রুমমেট অর্ণব ঘুমিয়ে পড়লেই খুলব। ও দেখলে এটা নিয়েও সব বন্ধুদের মধ্যে ছড়িয়ে দেবে। ঘড়িতে রাত্রি দুটো। অর্ণব ঘুমাচ্ছে। এটাই ঠিক সময়!

প্যাকেট কাটতেই বেরিয়ে এল একটা গোলাপ আকৃতির লাল অ্যালার্ম ঘড়ি। সঙ্গে ভাঁজ করা একটা কাগজের চিরকুট। তাড়াতাড়ি হাতে নিয়ে খুলে ফেললাম। লাল কালি দিয়ে লেখা আছে, ‘আমার পরাণ যাহা চায় তুমি তাই…’। তার নীচে লেখা ‘তুমি একা আমার নাম দেবে তা তো হয় না। তোমারও আমি নাম দিলাম আকাশ, সন্ধ্যার আকাশ।’ এই দু’টি লাইন। শেষে নীচের দিকে এককোণে লেখা ‘সন্ধ্যাতারা’।

সারারাত ঘুমাতে পারিনি সেদিন। সকালে মেসের মেইন গেট খোলার পর ছুটে গিয়েছি সন্ধ্যাতারাদের বাংলোর দরজায়। তখন সবকিছু খাঁ খাঁ করছে। অনেক আগেই তারা এই বাংলো ছেড়ে শিমুলতলা ছেড়ে চলে গেছে।

সেই সন্ধ্যাতারা যার জন্য আজও আমি অপেক্ষা করে আছি, আমার সেই সন্ধ্যাতারাকে আজ এভাবে পেয়ে মনের ভিতরে এক আনন্দের ঢেউ উঠেছে। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম। ও আমাকে লক্ষ্য করেনি। ‘আপনি সুরুচি তো? সুরুচি বিশ্বাস?” মুখ তুলে আমার দিকে তাকাল ও। আমাকে দেখেই ওর চোখেও জ্বলে উঠল এক আনন্দের আলো।

—প্রশান্তদা? তুমি? বন্দনাদির সঙ্গে কথা হলেই তোমার খোঁজ নিই। তোমাদের গ্রামের বাড়িতে তো আর কেউ থাকো না। বন্দনাদির সঙ্গেও তোমার যোগাযোগ নেই। জানো, ফেসবুকেও তোমাকে কত খুঁজেছি।

—আমিও তো তোমাকে ফেসবুকে খুঁজেছি সুরুচি।

—কী নামে খুঁজেছ?

—সুরুচি বিশ্বাস। তবে কি তোমার টাইটেল…’

ঠোঁটে দুষ্টুমি ভরা একটা হাসি লাগিয়ে সুরুচি বলল, ‘না মশায় বিশ্বাস করতে পারেন বিশ্বাসই আছি।’ —তাহলে? পেলাম না কেন তোমায়?

—বাংলায় ‘সন্ধ্যাতারা” লিখে সার্চ করে দেখবে। আমি হাজির। কিন্তু তোমাকে পাইনি কেন?

আমি উত্তর দেবার আগে সন্ধ্যাতারার পাশে বসে থাকা কলিগ বলে উঠল, ‘বাস এসে গেছে, চলো।’

—আমি পরের বাসে যাচ্ছি কণকদি। আপনি চলুন।

উনি উঠে যেতেই সন্ধ্যাতারা আমাকে পাশে বসতে বলল। সেই সুবাস, সেই অনুভূতি।

—বলো তোমাকে ফেসবুকে পাইনি কেন?

—আমারও প্রোফাইল যে ‘সন্ধ্যার আকাশ’ নামে।

এবার দু’জনেই হেসে ফেললাম। হাসতে হাসতে আমি আমার মানিপার্সে রাখা সেই না দিতে পারা চিঠিটা বের করলাম। ওর সেই চিরকুট আর, আমার না দেওয়া চিঠি দুটোই সবসময় আমি নিজের কাছে রাখতাম। এই বারো বছরে চিঠির কাগজের রং চেঞ্জ হয়ে গেছে। আর ভাঁজগুলো অনেক জায়গায় কেটে গেছে। তবুও ওটাই সন্ধ্যাতারার হাতে ধরিয়ে বললাম, ‘চিঠি পৌঁছাতে বারো বছর লাগে শুনেছিলে কখনও?’

মুখরোচক স্ন্যাকস

টম্যাটো, লাউ, পালং এবং ব্রেড— এইসব উপকরণ দিয়ে বাড়িতেই বানিয়ে নেওয়া যায় মুখরোচক খাবার। আজ আমরা দিলাম এমনই তিনটে মুচমুচে এবং মুখরোচক রেসিপিজ।

মুচমুচে টম্যাটো ফ্ৰাই

উপকরণ: ৪টে পাকা টম্যাটো, ধনে পাতার চাটনি হাফ কাপ, ১ কাপ বেসন, ১ বড়ো চামচ চালের গুঁড়ো, গোলমরিচের গুঁড়ো হাফ চামচ, হাফ চামচ আজোয়ান, ১ ছোটো চামচ ‘সুমন’ ব্র্যান্ড জিরে গুঁড়ো, সামান্য হিং, ১ চামচ চাটমশালা, পরিমাণ মতো তেল এবং নুন স্বাদ অনুসারে।

প্রণালী: টম্যাটো পাতলা করে কেটে নিন। প্রতিটা টম্যাটোকে চারটি করে স্লাইস করবেন। কাটা টম্যাটোতে ধনে পাতার চাটনি মাখিয়ে রেখে দিন। একটা পাত্রে বেসন এবং চালের গুঁড়ো নিয়ে, ওর সঙ্গে চাটমশালা, স্বাদ বাড়ানোর জন্য ‘সুমন’ ব্র্যান্ড জিরেগুঁড়ো, গোলমরিচের গুঁড়ো, আজোয়ান এবং স্বাদমতো নুন মিশিয়ে নিয়ে অল্প জল দিয়ে মেখে রাখুন। ওই মিশ্রণ অন্তত ১০ মিনিট ঢাকা দিয়ে রেখে দিন। এরপর কড়াইতে তেল দিয়ে গরম করুন। তেল গরম হয়ে গেলে, ধনেপাতা মাখানো টম্যাটোর পিসগুলো এক এক করে বেসন ও চালের গুঁড়োর গ্রেভিতে চুবিয়ে তেলে ভাজুন মধ্যম আঁচে। লালচে রং এসে গেলে টম্যাটো ভুজিয়া তৈরি। টম্যাটো সস-এর সঙ্গে গরম গরম পরিবেশন করুন।

ব্রেড চপ

উপকরণ: স্লাইস ব্রেড ৬ পিস, ২ টো বড়োমাপের আলু সেদ্ধ, ১ কাপ বেসন, ১ ছোটো চামচ কাঁচালংকাকুচো, ১ ছোটো চামচ আদাকুচি, বিটনুন হাফ চামচ, হাফ চামচ গোলমরিচের গুঁড়ো, হাফ চামচ লাললংকাগুঁড়ো, হাফ চামচ জিরেগুঁড়ো, ১ ছোটো চামচ চাটমশালা, ২ বড়ো চামচ ধনেপাতার চাটনি, ২ বড়ো চামচ তেঁতুলের লেই, ১টা বড়োমাপের পেঁয়াজ কুচো, ১টা বড়োমাপের টম্যাটো কুচো, ১ বড়ো চামচ ধনেপাতা কুচি, ২ বড়ো চামচ তেল এবং নুন স্বাদমতো।

প্রণালী: স্লাইস ব্রেডগুলো জলে চুবিয়ে নিয়ে তুলে রাখুন ২ মিনিট। ব্রেড-এর গা থেকে জল ঝরে গেলে, ওর সঙ্গে সেদ্ধ আলু, কাঁচালংকাকুচো, জিরেগুঁড়ো, গোলমরিচের গুঁড়ো, আদাকুচি, চাটমশালা এবং বেসন ভালো ভাবে চটকে মিশিয়ে নিন। এবার ওই মিশ্রণকে ছোটো ছোটো চ্যাপ্টা আকার দিয়ে রাখুন। এরপর ফ্রাইং প্যান-এ তেল গরম করে হালকা আঁচে ভাজুন এবং বাদামি বর্ণ ধারণ করলে নামিয়ে নিন। ওর উপর বিটনুন, পেঁয়াজকুচি, টম্যাটোকুচি ছড়িয়ে দিয়ে, ধনেপাতার চাটনি এবং তেঁতুলের লেই সহযোগে গরম গরম পরিবেশন করুন।

লাউ-পালং পকোড়া

উপকরণ: কুচো করা তিন কাপ লাউ, পালং শাক কুচো করা দু’কাপ, ২টো কাঁচালংকার কুচো, হাফ কাপ বেসন, ১ ছোটো চামচ জিরেগুঁড়ো, হাফ চামচ আমচুর, সামান্য হিং, হাফ কাপ পেঁয়াজপাতা কুচো, ভাজার জন্য পরিমাণ মতো তেল এবং স্বাদমতো নুন।

প্রণালী: লাউয়ের কুচো এবং পালং শাকের কুচো ভালো ভাবে ধুয়ে জল ঝরিয়ে রাখুন। এর সঙ্গে কাঁচালাংকার কুচো, গোলমরিচের গুঁড়ো, জিরেগুঁড়ো, আমচুর, হিং, পেঁয়াজপাতা এবং বেসন মিশিয়ে নিয়ে ছোটো ছোটো বল তৈরি করুন। এবার কড়াইতে তেল গরম করে হালকা আঁচে ভাজুন এবং বাদামি রং এসে গেলে নামিয়ে নিয়ে ধনেপাতার চাটনি কিংবা টম্যাটো সস সহযোগে গরম গরম পরিবেশন করুন।

সন্ধ্যাতারা (পর্ব-০১)

বিকেলের আলো এসে পড়েছে ওর মুখের উপর। হলুদ রঙের জমির উপর কালো রঙের কারুকাজ করা শাড়ি পরেছে। সন্ধ্যাতারা, আমার সন্ধ্যাতারা। একদম অন্যরকম লাগছে ওকে। ওই চিবুকের কালো তিল আর ওর আশ্চর্যরকম সুন্দর সেই টানা টানা চোখ ছাড়া হয়তো চিনতেই পারতাম না। আর পারতামই বা কেন? পেরিয়ে গেছে তো বারোটা বছর! ও কি আমাকে চিনতে পেরেছে? বোধহয় পারেনি। পারবেই বা কী করে?

সেদিনের সেই লাজুক কলেজ পড়ুয়া ছেলেটা তো আজ নামি কর্পোরেট কোম্পানির স্মার্ট অফিসার। চেহারাতেও এসেছে প্রচুর পরিবর্তন। আর ও কী করেই বা জানবে, কলকাতা থেকে ২০০ কিলোমিটার দূরে কোন প্রত্যন্ত গাঁয়ের ছেলে এই উত্তর কলকাতার একটা বাসস্ট্যান্ডের শেডের নীচে এখন বসে আছে। কথা বলব ওর সঙ্গে? ভীষণ ইচ্ছে করছে যে! কিন্তু কী বলে শুরু করব? এখন তো আমি সেই আগের মতো লাজুক নই। সারাদিনে কাজের প্রয়োজনে অজস্র সুন্দরী মেয়েদের সঙ্গে স্মার্টলি আলাপ জমিয়ে নিই। এই ব্যাপারে আমার সুনাম আছে কোম্পানিতে। তবু কেন এত জড়তা আসছে!

ওর পাশেই বসে আছেন ওর চেয়ে বছর কয়েক বড়ো আরেকজন ভদ্রমহিলা। দু’জনই গল্প করে চলেছে। ওদের কথাবার্তা থেকে বুঝলাম সন্ধ্যাতারা উত্তর কলকাতার একটি স্কুলের দিদিমণি এখন। পাশের জন ওর কলিগ। প্রতিদিন তারা বাস ধরার জন্য এখানে অপেক্ষা করে। আমি প্রতিদিন পার্সোনাল কারে যাতায়াত করি। কাল ফেরার পথে ইঞ্জিন বিগড়েছে। তাই আজ বাসেই আসা।

সন্ধ্যাতারার সঙ্গে যখন আমার প্রথম দেখা হয়েছিল তখন আমি শিমুলতলা কলেজের বিএসসি সেকেন্ড ইয়ার স্টুডেন্ট। থাকি শিমুলতলাতেই। ‘ছাত্রবন্ধু’ বয়েজ হোস্টেল। আমাদের হোস্টেলের খুব কাছেই ছিল ভুবনবালা দেবী গার্লস স্কুল। আমাদের হোস্টেল আর ওই গার্লস স্কুলের মাঝ বরাবর চলে গেছে প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনার একটি পাকা রাস্তা। ওই রাস্তা দিয়ে পশ্চিম দিকে কিছুটা গেলে একটা ফাঁকা মাঠ। কলেজের ক্লাস করে এসে রোজ বিকেলে আমরা হোস্টেলের সমস্ত বন্ধুরা ওখানে গিয়ে আড্ডা মারতাম। আর মাঠের অন্যপাশে ‘বাগদেবী ছাত্রীনিবাস’-এর মেয়েরা এসে বসত।

এমনই একদিন গ্রীষ্মের বিকেলে অন্যান্য মেয়েদের সঙ্গে দেখেছিলাম সন্ধ্যাতারাকে। এখনও স্পষ্ট মনে আছে সেদিন সন্ধ্যাতারা একটা গোলাপি টপের সঙ্গে কালো জিনস পরেছিল। নতুন মেয়ে দেখেই আমাদের ছেলেরা বেশ উশখুশ করতে লাগল তার সঙ্গে পরিচয় করতে যাওয়ার জন্য।

অর্ণব বলল, ‘মেয়েটা দারুণ স্মার্ট মনে হচ্ছে। কোথা থেকে এসেছে বলতো?” স্বপন নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে উঠল, ‘না জানি কাহার ঘুম হরণ করিতে তাহার আগমন।’ নতুন কেউ এলেই এমন হয়।

আমি সব সময় চুপচাপ থেকেছি। ওদের এইসবে আমার আগ্রহ কোনওদিন ছিল না। ছেলেদের যখন এসব কথাবার্তা চলছে তখনই বন্দনা হঠাৎ আমায় ডাকল। বন্দনা আমার গ্রামেরই মেয়ে। ও আমাদের কলেজে আর্টস বিভাগে ইতিহাস নিয়ে পড়ছে। আমরা ছেলেবেলা থেকেই বন্ধু। থাকে বাগদেবী ছাত্রীনিবাসে। ও আমাকে ডাকতেই সব ছেলেদের মধ্যে একটা আলাদা উত্তেজনা।

—কেমিস্ট্রির একটা ভালো টিউশন দেখে দে তো প্রশান্ত, তুইতো ইন্দ্র স্যারের কাছে পড়তিস। তাঁকেই বল না, আমার ছোটো মাসির মেয়ে পড়বে। ক্লাস ইলেভেন। আমি যেতেই বন্দনা কথাগুলো আমাকে বলল।

—আজ ফিরেই স্যারের সঙ্গে কথা বলব।

বন্দনার সঙ্গে এইটুকু কথার মাঝে আমি প্রথম সন্ধ্যাতারা-কে কাছ থেকে দেখলাম। এই প্রথম কোনও মেয়েকে দেখার পর তার প্রতি আমার ভীষণ আগ্রহ বাড়তে লাগল। কিন্তু তার সম্পর্কে বন্দনা-কেও জিজ্ঞেস করার মতো সামর্থ্য আমার ছিল না। হয়তো যদি কিছু ভাবে, এই ভয়ে। চলে এলাম বন্ধুদের কাছে, কিন্তু মনের ভিতরে ওই মেয়েটার মুখ জলছবির মতো ভাসতে লাগল। —মেয়েটার নাম জিজ্ঞেস করলি? অতি উৎসাহে আমাকে প্রশ্ন করল চন্দন।

কিন্তু আমি তো মেয়েটার নাম জিজ্ঞেস করিনি। অথচ ওদের যদি কিছু না বলি, ওরা আমার লাজুকতা নিয়ে ঠাট্টা করবে। তখন আকাশে সন্ধ্যাতারা উঠেছে। আমি তখনকার মতো ম্যানেজ করার জন্য কিংবা হয়তো ওকে নিজের পছন্দমতো কোনও একটা নামে ডাকতে ইচ্ছে করছিল বলে বললাম, ‘সন্ধ্যাতারা’।

ফেরার পথে মেসে না ঢুকে সোজা স্যারের বাড়ি গিয়ে কথা বললাম স্যারের সঙ্গে। স্যার আগামীকাল সন্ধ্যা সাতটায় তাঁর বাড়িতে নতুন ছাত্রীকে পৌঁছে যেতে বললেন। পরের দিন কলেজে জানালাম বন্দনাকে। সেদিন বন্দনার অনুরোধে আমার দায়িত্ব পড়ল সন্ধ্যাতারাকে স্যারের কাছে নিয়ে যাওয়ার।

সন্ধ্যাতারা? হ্যাঁ সন্ধ্যাতারাই। এই নামেই তো আজও মনে রেখেছি তাকে। যদিও তার নিজস্ব একটা নাম ছিল। সেই নামটা প্রথম জেনেছিলাম সেদিন সন্ধ্যাবেলায়। স্যারের বাড়ি চিনিয়ে দেওয়ার পথে। সুরুচি বিশ্বাস। কলকাতার উলটোডাঙায় বাড়ি। বাবা বনবিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মী। এখানে নতুন পোস্টিং। রাস্তা দিয়ে পেরোবার সময় বনের ভিতরে যে বড়ো বাংলোটা দেখেছি এতদিন, সেটাই এখন সন্ধ্যাতারাদের বাসভবন।

এখনও স্পষ্ট মনে আছে সেই সেদিনের পথে দু’জনের পাশাপাশি হাঁটা। তখন ঘড়িতে ৬.৪০ কী ৪৫ হবে। চৈত্র মাসের সন্ধ্যা। ধীরে ধীরে আঁধার নেমে আসছে। আর গোল থালার মতো চাঁদ সেই আঁধারের গায়ে মাখিয়ে দিচ্ছে নীলাভ জ্যোৎস্না। দু’পাশে ইউক্যালিপটাস বনের থেকে ভেসে আসা ফুলের গন্ধের মাদকতা। আর সেই গন্ধও যেন ম্লান হয়ে যাচ্ছে আমার খুব কাছে হাঁটতে থাকা সন্ধ্যাতারার শরীর থেকে বেরিয়ে আসা এক অপূর্ব স্বর্গীয় গন্ধে৷ যারা প্রেমে পড়ে তারা এই গন্ধ জানে, এই গন্ধ পায়।

প্রথমে দু’একটা কথা তারপর জড়তা ভাঙলে দু’জনেই বেশ কথা বলতে বলতে হাঁটছিলাম। গাঁয়ের রাস্তায় এই সন্ধ্যাবেলাতেই তেমন লোক নেই। দু’পাশে ঘন না হলেও বেশ গাছগাছালি। অনেক কথার মাঝে ও বলে উঠল, ‘প্রশান্তদা এই রাস্তায় ফিরতে তো ভয় করবে, তুমি থাকবে তো?’ আমি তো এটাই চাইছিলাম মনে মনে। বললাম, “ঠিক আছে তোমার ভয় করছে যখন, আমি আজ থাকব।’

সেদিন টিউশন শেষ করে ওকে ওর বাড়িতে পৌঁছে দিই যখন তখন রাত্রি সাড়ে ন’টা হবে। সুরুচির বাবা তখনও কোয়ার্টারে ফেরেননি। ওর মা আমাকে অমায়িক ভাবে ডাকলেন, ‘এসো বাবা এসো, প্রথম এলে একটু মিষ্টিমুখ করো, বন্দনা তোমার খুব নাম করছিল। তুমি তো আমাদের বন্দনার ছেলেবেলার বন্ধু।’

ভেজ স্যান্ডউইচ,ম্যাকারনি স্যালাড এবং স্ট্রবেরি স্মুদি

তিনটি ভিন্ন স্বাদের মুখরোচক খাবার বাড়িতেই বানিয়ে নিতে পারেন আপনি নিজেই। রইল রেসিপিজ।

ভেজ স্যান্ডউইচ

উপকরণ: ৪-টে ব্রেড স্লাইস, ১/২ সবুজ ক্যাপসিকাম কুচি করা, ১/২ লাল ক্যাপসিকাম কুচি করা, ১/২ পেঁয়াজ মিহি করে কাটা, মেয়োনিজ ব্রেড-এর উপর লাগানোর জন্য।

প্রণালী: প্রথমে ব্রেড হালকা সেঁকে নিয়ে ভালো ভাবে এর উপর মেয়োনিজ লাগান। দু’রঙের ক্যাপসিকাম ও পেঁয়াজকুচি ছড়িয়ে দিন। এবার অন্য ব্রেডের উপর মেয়োনিজ লাগিয়ে ঢেকে দিন। চাইলে প্রথমে ব্রেড না সেঁকে, স্যান্ডউইচ-এর উপর ক্যাপসিকাম পেঁয়াজ ছড়ানো হলে এবং অন্য টুকরো দিয়ে ঢাকার পর, প্যানে মাখন গলিয়ে এই স্যান্ডউইচ হালকা ভেজে নিতে পারেন।

ম্যাকারনি স্যালাড

স্যালাড ড্রেসিং জন্য উপকরণ: দুই টেবিল চামচ ভিনিগার, আধা চা চামচ লেবুর রস, এক টেবিল চামচ অলিভ অয়েল, দুই টেবিল চামচ আনারস সিরাপ, এক চামচ রসুন বাটা এবং নুন স্বাদমতো।

স্যালাডের উপাদান: পরিমাণ মতো ম্যাকারনি, একটা শসার কুচি, একটি পেঁয়াজ কুচি, আনারস কাটা, একটি গাজরের টুকরো এবং লাল-হলুদ-সবুজ ক্যাপসিকামের টুকরো।

প্রণালী: একটি প্যানে ম্যাকারনি সিদ্ধ করে ছেঁকে নিন। তারপর এতে সব কাটা সবজি দিন। সবশেষে স্যালাড দিয়ে সাজিয়ে, ফ্রিজে রেখে ঠান্ডা করে পরিবেশন করুন।

স্ট্রবেরি স্মুদি
মূল উপকরণ: এক কাপ স্ট্রবেরির টুকরো, ২ কাপ ফেটানো দই, ১ কাপ দুধ, ৬-৭টি পেস্তার টুকরো এবং ২ চামচ মধু। লেয়ারিং-এর উপকরণ: আধা কাপ খোসা ছাড়ানো তিল ভিজিয়ে রাখুন এবং ভাজা ভুট্টার গুঁড়ো।
গার্নিশিং-এর উপকরণ: ২ চামচ পেস্তা বাদামের টুকরো এবং সামান্য পুদিনাপাতা৷
স্মুদি তৈরির পদ্ধতি: স্ট্রবেরি, দুধ এবং দই ভালো ভাবে ফেটিয়ে নিন মিক্সারে। এরপর দুটো কাচের গেলাস নিন। লেয়ারিং-এর পদ্ধতি: প্রথমে ভাজা ভুট্টার গুঁড়ো ঢালুন গেলাসে। এরপর স্ট্রবেরি, দুধ, দইয়ের মিক্সচার ঢালুন সামান্য পরিমাণে। এবার দিন ভেজানো তিল। এর উপর আবার ঢালুন দুধ, দই এবং স্ট্রবেরির মিশ্রণ। এবার উপরে ছড়িয়ে দিন পেস্তা বাদামের টুকরো এবং পুদিনাপাতা। ব্যস স্মুদি তৈরি, এবার ট্রে-তে সাজিয়ে পরিবেশন করুন।

ধারাবাহিক ‘জোয়ার ভাটা’-র সম্প্রচার শুরু হল জি বাংলা-য়

নিষিদ্ধ প্রেম, প্রতিশোধের আগুন এবং সম্পর্কের জটিলতার মিশ্রণে সমৃদ্ধ হয়ে দর্শকদের সামনে এল ‘জোয়ার ভাটা’। এই ইমোশনাল থ্রিলার-টি গ্রামীণ বাংলার পটভূমিতে নির্মিত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে। ‘বয়হুড প্রোডাকশনস’-এর ব্যানারে নির্মিত নতুন এই ধারাবাহিকটি দর্শকদের মন জয় করার প্রতিশ্রুতি নিয়ে এল ‘জি বাংলা’-র পর্দায়।

এই ধারাবাহিকে উজির চরিত্রে অভিনয় করছেন আরাত্রিকা মাইতি এবং উজির বোন নিশার চরিত্রে রূপ দিয়েছেন শ্রুতি দাস। উজি কোমল, শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী। অন্যদিকে ওর বোন নিশা ধৈর্যহীন এবং উগ্র। সে অচল জীবন থেকে মুক্তি পেতে শর্টকার্ট পথে সাফল্য পেতে চায় কিন্তু অনলাইন প্রতারণার শিকার হয়। এরপর ‘জোয়ার ভাটা’-র কাহিনি মোড় নেয় অন্য দিকে।

প্রভাবশালী ব্যানার্জি পরিবারের সঙ্গে একটি জমির চুক্তি ভেঙে গেলে নিশাদের স্বপ্নের পৃথিবী ভেঙে যায়, যার ফলে নিশা এবং উজি-র বাবা হরিপ্রসাদের আকস্মিক মৃত্যু হয়। প্রতিশোধের নেশায় আচ্ছন্ন নিশা, উজিকে একজন ধনী এনআরআই-এর ছদ্মবেশে ব্যানার্জি পরিবারে অনুপ্রবেশ করতে বাধ্য করে। উজি যখন তাদের বিশ্বাস এবং সিদ্ধার্থ ব্যানার্জির হৃদয় জয় করে, তখন সে তার বোনের প্রতি আনুগত্য রেখেও এক অদ্ভুত অবস্থার মধ্যে পড়ে। এক সময় উজির নিজের আশা-আকাঙ্ক্ষা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। যার পরিণতিতে বদলে যায় আবহ। উজি ধীরে ধীরে আবেগের মধ্যে আটকে পড়ে এবং নিজেকে সে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। এরপর সে তার বোনের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবে নাকি তার ভালোবাসার মানুষটির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবে, তা-ই এই ধারাবাহিকের ক্লাইম্যাক্স।

‘আমাদের লক্ষ্য সবসময় এমন গল্প উপস্থাপন করা, যা দর্শকদের মনে গভীর ভাবে অনুরণিত হবে এবং একইসঙ্গে নতুন ও আকর্ষণীয় কিছু উপহার দেবে। ‘জোয়ার ভাটা’ প্রেম, প্রতিশোধ এবং নৈতিক দ্বন্দ্বের বিষয়বস্তুকে একত্রিত করে, যা দুই বোনের গল্পের মধ্যে স্তরে স্তরে প্রকাশিত হবে। টেলিভিশনে দুই বোনের এই ধরনের সম্পর্কের কাহিনি সমৃদ্ধ ধারাবাহিক খুব কমই দেখা যায়। তাই, আমরা নিশ্চিত যে, এটি সমগ্র বাংলার দর্শকদের চিত্ত জয় করে নেবে।’— প্রসঙ্গত জানিয়েছেন ‘জি এন্টারটেইনমেন্ট এন্টারপ্রাইজেস লিমিটেড’-এর পূর্ব, উত্তর এবং প্রিমিয়াম ক্লাস্টারের প্রধান ক্লাস্টার অফিসার সম্রাট ঘোষ।

‘আজকের দর্শকরা এমন আখ্যান খুঁজছেন, যা হৃদয় আলোড়িত করবে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে ‘জোয়ার ভাটা’ একেবারে উপযোগী একটি ধারাবাহিক। এর আবেগগত উচ্চতা, নাটকীয় মোড় দর্শকদের সঙ্গে গভীর সংযোগ তৈরি করবে। আরাত্রিকা মাইতি এবং শ্রুতি দাসের অভিনয়ও সবার ভালো লাগবে।‘ — জানালেন  ‘জি বাংলা’-র বিজনেস হেড এবং জি টিভির প্রধান কন্টেন্ট অফিসার নবনীতা চক্রবর্তী।

ধারাবাহিকটির সম্প্রচার শুরু হয়েছে ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ থেকে। প্রতি সোম থেকে শনিবার রাত ৯-টায় জি বাংলায় দেখা যাবে ‘জোয়ার ভাটা’।

ধনুশকোডি (এন্ড অফ দ্য বো) পর্ব-০১

আমাদের যাত্রা শুরু হল মাদুরাই থেকে। গন্তব্য দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলবর্তী ভারতের একেবারে শেষ বিন্দু। ভ্রমণপিপাসু আমি যখনই যেখানে যাই, সেই জায়গার ভৌগোলিক, ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক— সবটারই গুরুত্ব জানবার চেষ্টা করি। খুঁজে বেড়াই জায়গাটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা পৌরাণিক গল্পগাথা। কিংবা অদ্ভুত অলৌকিক কোনও অবাক করা অবিশ্বাস্য ঘটনা। আর চোখ ভরে নিয়ে আসি প্রকৃতির সৌন্দর্য।

এবার চললাম ধনুশকোডি (তামিলনাড়ু)। নামটা শুনে চমকে উঠেছিলাম, এ আবার কী নাম রে বাবা! অদ্ভুত একটি নাম! কী এর অর্থ? কেন এই নাম? কবে কে এই নাম দিল? একে একে আমার সব প্রশ্নের উত্তরই আমি পেলাম সেই জায়গায় গিয়ে। সে কারণে অবশ্য কিছু স্থায়ী বাসিন্দাদের সঙ্গে আমার আলাপচারিতা করতে হয়েছে বৈকি। যদিও বর্তমান সময়ে নেট ঘেঁটে অনেক তথ্য পাওয়া যায়, তবু স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করাতে একটা আলাদা আনন্দ, থ্রিল আছে। দোকানদার কিংবা পথচারী কিংবা বাড়ির গেটে দাঁড়ানো কোনও মহিলাকে জিজ্ঞেস করলে তারাও কিন্তু সোৎসাহে এগিয়ে আসে বলবার জন্য।

মাদুরাই থেকে বেরোতে বেরোতে বেশ বেলা হয়ে গেল। তড়িঘড়ি একটি ট্যাক্সি ধরে আমরা রওনা হলাম ধনুশকোডি-র উদ্দেশে ঠিক বেলা আড়াইটেয়। বাস কিংবা ট্রেন থাকলেও ট্যাক্সি নিলাম। কারণ, সবুজেভরা মাদুরাই-এর দৃশ্যপট নিজের মতো করে দেখতে আর মাঝেমধ্যে একটু বিশ্রাম নিতে নিতে আনন্দ নেব বলে। ধারায় বসে একটু চা, পকোড়া খেয়ে যাওয়া যাবে। ব্যাপারটা বেশ জমে যাবে। ন্যাশনাল হাইওয়ে-৮৭ ধরে আমরা এগোলাম। প্রথমে প্রায় ১০০ কিলোমিটারের একটু বেশি ন্যাশনাল হাইওয়ে ধরে টানা যেতে হবে, তারপর ৬০-৬২ কিলোমিটার স্টেট হাইওয়ে। তারপরেই আমরা পৌঁছে যাব রামেশ্বরম। আর রামেশ্বরমে পৌঁছে গেলে ধনুশকোডি আমাদের হাতের মুঠোয়। সে এক অতি ক্ষুদ্র একটা ভুতুড়ে গ্রাম দেশের একেবারে শেষ বিন্দুতে।

তর সইছে না। শুধু ভাবছি তখন, কখন পৌঁছাব, কখন পৌঁছাব। প্রায় সাড়ে ৩ ঘণ্টা পর এসে পৌঁছালাম রামেশ্বরমের কাছে। দেশের মূল ভূখন্ড থেকে রামেশ্বরমের মাঝ দিয়ে গড়িয়ে গেছে সমুদ্র। তো যাবার উপায়! আসলে রামেশ্বরম মূলত একটি দ্বীপ, মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন।

বিখ্যাত পম্বন ব্রিজ (১৯১৪) যুক্ত করেছে রামেশ্বরমকে দেশের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে। জানা গেল, মাঝেমধ্যে ব্রিজের মাঝ বরাবর খুলে দেওয়া হয় জাহাজ যাতায়াতের জন্য। গাড়ি থেকে নামলাম, ব্রিজে দাঁড়ালাম। চিরকাল এই পম্বন ব্রিজ পর্যটকদের আকর্ষণ করে। সত্যিই অপূর্ব! চারিদিকে কেবল জল আর জল। আমার ডান হাতের সমুদ্রে অসংখ্য মাছ ধরার নৌকা, ছোটো-বড়ো। দূর থেকে ডিঙি নৌকাগুলো লেডি বার্ডের মতো লাগছে। যেন লেডি বার্ড হেঁটে চলেছে।

স্থির জলের উপর সূর্যের আলো পড়ে কেমন অদ্ভূত রং তৈরি হয়েছে জলের। সেই রঙের নাম আমার জানা নেই। নীল! আকাশি! সবুজ! কমলা! সব মিলেমিশে একাকার মায়াময় এক রং। দূরে বড়ো বড়ো সারিবদ্ধ নারকেল গাছ, কতক গোয়ার বিচের মতো লাগল। কত গাড়ি ছুটে চলেছে ব্রিজের উপর দিয়ে। ট্যুরিস্টদের জন্য ফুটপাত রয়েছে, পুলিশ সর্বদা প্রহরারত।

পম্বন ব্রিজের ঠিক বাঁ-পাশ দিয়ে রেলওয়ে ট্র্যাক। একেবারে নীল জলরাশির উপর। আগে কোনও দিন এমনটা দেখিনি। অবাক হয়ে গেলাম। কেবলমাত্র রেলের লাইন পাতা। ওই ভূখণ্ড থেকে এই ভূখণ্ড পর্যন্ত টানা। কী করে বানাল! যারা বানাল তাদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা সত্যি প্রশংসনীয়। রেল সেতুর পাশে লোহার গরাদ পর্যন্ত নেই, কেবল সেতুটা জলের উপরে ঠিক যেন ঝুলছে, বলা যায় ভাসছে।

কপাল ভালো সেই সময় একটি যাত্রীবাহী ট্রেন ঝিক ঝিক করে শম্বুক গতিতে সমুদ্র পার হল একেবারে ধীরে ধীরে। এতটুকু এদিক-ওদিক হলেই একেবারে বঙ্গোপসাগরের তলদেশে। আমরাও যেন দমবন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। এমনটা তো দেখিনি! ট্রেন চলে যাবার পর একটি নিশ্চিন্তের নিঃশ্বাস ফেললাম। আবার হইহই করে গাড়িতে চড়ে বসলাম। নিরাপত্তারক্ষীরা খুব বেশিক্ষণ দাঁড়াতে দেয় না।

উল্লেখ্য, বর্তমানে পুরোনো পম্বন ব্রিজের পাশ দিয়ে নতুন ব্রিজের কাজ চলছে। জানা গেল, খুব শিগগির চালুও হবে।

এবার পম্বন ব্রিজ পেরিয়ে এলাম রামেশ্বরম শহরে। চওড়া রাস্তার দু’ধারে হোটেল। আমাদের আগে থেকে বুকিং করা ছিল। হোটেল পৌঁছাতে পৌঁছাতে ততক্ষণে চারিদিক অন্ধকার হয়ে গেছে। অচেনা জায়গায় রাত-বিরাতে বেরিয়ে লাভ নেই, বরং নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে নেওয়া যাক। কাল সকালেই আমরা যাব আমাদের বহু প্রতীক্ষিত গন্তব্য ধনুশকোডি, একটি গা ছমছমে, পাণ্ডববর্জিত, ভূতুড়ে, রহস্যময় জায়গা। কিন্তু কেন? কী রহস্য?

পরদিন চললাম ধনুশকোডি। শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে পম্বন দ্বীপে এই ছোট্ট গ্রাম। শহর থেকে বেরিয়েই একটি নির্জন রাস্তা ধরে এগোলাম আমাদের ভাড়া গাড়ি নিয়ে। বেশ চওড়া সুন্দর রাস্তা। দুইদিকে ঘন সবুজ, যাকে ফরেস্ট বললে ভুল হবে না। আরও কিছু গাড়ির আসা যাওয়া চলছে বটে। চলতে চলতে ড্রাইভার ভাই আমাদের অনেক গল্প শোনাল। লোকাল ড্রাইভার নিলে তারাই কিন্তু গাইডের কাজটা সেরে দেয়। অনেক তথ্য তাদের কাছ থেকে পাওয়া যায়।

(ক্রমশ…)

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব