গরমাগরম আলু টিক্কি

সাধারণ আলু দিয়েও তৈরি করে নেওয়া যায় মুখরোচক খাবার। আজ আমরা দিলাম মশলাদার আলু টিক্কি এবং স্পেশাল আলু টিক্কি বানানোর পদ্ধতি। নিজের হাতে বানিয়ে গরমাগরম খান এবং অতিথিদের খাওয়ান।

মশলাদার আলু টিক্কি

উপকরণ: ৪-টে আলু সেদ্ধ করা, ১টা পেঁয়াজ মিহি করে কাটা, ১ ছোটো টুকরো আদা মিহি করে কুচি করা, ৬টা কাঁচালংকা কুচোনো, ১ কাপ ধনেপাতা মিহি কাটা, ৪- ৫টা গাজর গ্রেট করা, ১০০ গ্রাম তোফু গ্রেট করা, ‘সুমন’ ব্র্যান্ড-এর লাললংকাগুঁড়ো ও নুন স্বাদমতো।

প্রণালী: একটা পাত্রে আলু সেদ্ধ চটকে নিন। এতে সব উপকরণ মিশিয়ে নিন। কড়ায় তেল গরম করুন। একটা প্লেটে ময়দা ঢেলে নিন। অল্প করে আলুর মিশ্রণ হাতের তালুতে নিয়ে, উপরে ময়দা ছড়িয়ে টিক্কি তৈরি করে নিন। গরম তেলে বাদামি করে ভেজে নিন। তেল থেকে তুলে চা বা কফির সঙ্গে সার্ভ করুন।

স্পেশাল আলু টিক্কি

উপকরণ: ২০০ গ্রাম সিদ্ধ এবং ম্যাশ করা আলু, এক কাপ দই, দুই টেবিল চামচ অ্যারারুট পাউডার, এক টেবিল চামচ চালের আটা। আধা কাপ ব্রেড ক্রাম্বস। পরিমাণমতো সাদা তেল, স্বাদ অনুযায়ী নুন।

স্টাফিং উপাদান: আধা কাপ ধোয়া মুগ ডাল, এক টেবিল চামচ সিদ্ধ মটর ডাল, এক টেবিল চামচ কাজুবাদামের গুঁড়ো, ১০-১২টা কিশমিশ, এক টেবিল চামচ চিনাবাদাম গুঁড়ো, আধা চা চামচ ‘সুমন’ ব্র্যান্ড-এর জিরেগুঁড়ো, এক চা চামচ ধনে ও মরিচগুঁড়ো, এক চা চামচ আদাকুচি, কাঁচালংকার কুচি, এক চা চামচ চাট মশলা, দুই চামচ সাদা তেল, এক টেবিল চামচ বেসন, এক টেবিল চামচ ধনেপাতা কুচি এবং স্বাদ অনুযায়ী নুন।

প্রণালী: ডালে জল যোগ করুন এবং সিদ্ধ করুন। ডাল গলে যাওয়ার আগে নামিয়ে রেখে জল ঝরিয়ে রাখুন। একটি নন-স্টিক প্যানে তেল গরম করে বেসন দিন। তারপর ডাল যোগ করুন এবং কম আঁচে ভালো করে ভাজুন। এতে সব মশলা, মটর, ড্রাই ফ্রুট ইত্যাদি যোগ করুন।

ম্যাশ করা আলুতে অ্যারারুট পাউডার, চালের গুঁড়ো এবং নুন ভালো করে মিশিয়ে নিন। লেবুর রস মেশান। প্রতিটি টিক্কি ব্রেডক্রাম্বে ডুবিয়ে একটি নন-স্টিক প্যানে সোনালি হওয়া পর্যন্ত ভাজুন। চাটনি, আদাকুচি, দই, নুন এবং ঝুরিভাজা দিয়ে পরিবেশন করুন।

কালো পেন

কালীপদবাবু ছাপোষা মানুষ, একটা ছোটোখাটো প্রাইভেট কোম্পানিতে কেরানির চাকরি করেন। বিয়ে করেননি, একা মানুষ। থাকেন বাগবাজারের পৈতৃক বাড়িটাতে আর থাকে এক ঘর ভাড়াটে। শরিকি বিবাদে দীর্ঘদিন বাড়িটাতে কোনও রক্ষণাবেক্ষণ হয়নি। শুধু একটা দিক কোনওমতে এখনও টিকে আছে।

ওর শখের মধ্যে শুধু পুরোনো গ্রামোফোন রেকর্ড সংগ্রহ করা। খুঁজে পেতে নানা পুরোনো রেকর্ড কিনে আনেন ওয়েলিংটন, সদর স্ট্রিট বা ফ্রি স্কুল স্ট্রিট থেকে। প্রায় সারাদিনই বাবার আমলের পুরোনো রেকর্ড-প্লেয়ারটায় সেসবই চালান। ভীমসেন যোশী, পাহাড়ী সান্যাল, গীতা দত্ত, পিট সিগার বা পালুসকরের গান তাকে নিয়ে যায় কোনও না-পাওয়া স্বর্গরাজ্যে।

আজ মাসের প্রথম দিন। মাইনে পেয়েই কালীপদবাবু ঠিক করলেন লেনিন সরণিতে একবার ঢু মারবেন জামালউদ্দিনের দোকানে। যদি কিছু মণিমুক্তো পাওয়া যায় কম দামে। দু-তিন হাজার টাকা খরচা করে দুর্লভ অ্যান্টিক রেকর্ড কেনার সামর্থ্য তার নেই। তবু চোখের দেখা। গিয়ে দেখেন জামালের দোকান সেদিন বন্ধ। ওরও বাপ ঠাকুরদার ব্যাবসা। আজকাল সব পেন ড্রাইভ, মোবাইল আর ইউটিউবের যুগ। বিক্রিবাটা প্রায় নেই বললেই চলে। তবুও কী যে মায়া-ভালোবাসা জড়িয়ে আছে পুরোনো দিনের স্মৃতি ঘিরে, ওই জানে, আর জানেন কালীপদবাবু।

যা হোক চলেই যাচ্ছিলেন, হঠাৎ একটা ফ্যান্সি আইটেমের দোকানে চোখ পড়ল রাস্তায়। কত সুন্দর সুন্দর ঘড়ি, শোপিস, সিগারেট কেস, টর্চ, লাইটার, নানারকম বিদেশি জিনিস ধরে থরে সাজানো দেখে, বেশ লোভ লেগে গেল কালীপদবাবুর। একটা পেনের দিকে তার নজর পড়ল, হাতে নিয়ে বেশ পছন্দ হল। চকচকে কালো মেটালিক ফিনিশ, সঙ্গে গোল্ডেন টিপ আর হ্যান্ডেল। কিন্তু যেখানে চোখ আটকে গেল সেটা আর কিছুই নয়, কালোর উপরে গোল্ডেন কালারে খোদাই করা ইংরেজিতে ‘কালি’ নামটা, তার নামের সঙ্গে তো বেশ মিলে যাচ্ছে। হতে পারে কোম্পানির নাম।

দোকানিকে জিজ্ঞেস করতে বলল জাপানি পেন, দেড়শো টাকা দাম। কিন্তু ওই চকচকে কালো রঙের পেন আর ওই স্বর্ণাক্ষরে লেখা ‘কালি’র মোহে ততক্ষণে পড়ে গেছেন কালীপদবাবু। দরদাম আর বেশি না করে, পেনটি পকেটস্থ করলেন। মনটা তার বেশ প্রফুল্ল হয়ে গেল, এতদিনে মনের মতো একটা পেন পেলেন। এমন একটা মহার্ঘ জিনিস যে হঠাৎ করে এইভাবে হস্তগত হয়ে যাবে, তা তিনি ভাবতেও পারেননি। ঠিক করলেন, এবার থেকে এই পেনটাই সবসময় ব্যবহার করবেন, অফিসের কাজে হোক বা বাড়িতে শখের কবিতা লেখাতেই হোক৷

পাড়ায় ঢুকতেই হঠাৎ দেখা হয়ে গেল পুরোনো বন্ধু অনুপের সঙ্গে। “কি রে কালী, কোথায় গেছিলি?’ নিজেই এগিয়ে এসে কথা বলল অনুপ৷

একবার শ’পাঁচেক টাকা ধার নিয়ে আর এ তল্লাট মাড়ায়নি অনুপ, কথাবার্তাও হয়নি দীর্ঘদিন। পথে-ঘাটে দু’একবার দেখা হলেও এড়িয়ে চলত। সেই অনুপই আজ নিজে এসে পকেট থেকে পাঁচশো টাকা ফেরত দিয়ে দেঁতো হেসে বলল, “কিছু মনে করিস না রে ভাই, সেই কবে থেকে তোকে টাকাটা দেব দেব করেও দেওয়া হয়নি। একটি ফাস্ট ফুডের স্টল দিয়েছি, ভালোই চলছে।”

—তাই নাকি? ভালোই করেছিস, তা আসিস একদিন বাড়িতে। যা দিনকাল পড়েছে। আজ আছি, কাল নেই। বলে এগোলেন কালীপদবাবু।

বাড়িতে ঢুকতে গিয়েই চমক, একটা বড়োসড়ো খাম এসে পড়ে আছে। খুলে দেখেন, সেই কবে একটা কবিতা পাঠিয়েছিলেন নামী পত্রিকায়। এতদিন কোনও খবরই ছিল না। ভেবেছিলেন হয়তো মনোনীত হয়নি। হঠাৎ সেই পত্রিকাই আজ এতদিন পরে ছেপেছে কবিতাটা। আজকাল ফেসবুকের যুগে বাংলা বই পড়ার লোকজন এত কমে গেলেও, এই পত্রিকাটি ছাপা পত্রিকা বের করছে কষ্ট করে। পত্রিকার সঙ্গে একটা হাজার টাকার চেকও পাঠিয়ে দিয়েছে। পরপর এতগুলো প্রাপ্তিযোগে কালীপদবাবু একেবারে দিশাহারা হয়ে গেলেন। হাওয়ায় যেন তিনি ভাসছিলেন!

বিকেলে ইজিচেয়ারে বসে, তিনি একটা কবিতা লিখে ফেলবেন ঠিক করলেন। মনটা আজ বেশ উড়ু উড়ু। কথারা ঝাঁক বেঁধে আসছে। তার উপর নতুন পেন। পেনটা বের করেই খেয়াল হল, আচ্ছা পেনটা বেশ পয়া তো!

সবে ভাবটা এসেছে, দু-এক লাইন লিখেছেন, তখনই সবিতা আসে চা নিয়ে, সঙ্গে আজ পিঁয়াজি-মুড়ি। ওপাশে ভাড়া থাকে ওরা। সবিতার মা-ই মাঝেমধ্যে বিকেলে চা-টা পাঠিয়ে দেয়। তবে আজকাল এ বাড়ি ও বাড়ি মানুষজনের যাওয়া আসা প্রায় বন্ধই হয়ে গেছে, সবাই মোবাইলে ব্যস্ত।

—কী রে আজকে দারুণ ব্যাপার যে, দে দে। হঠাৎ পেঁয়াজি ভাজল তোর মা! বলেই ফেলেন তিনি।

—না গো জেঠু, আজ বাবা ফিরেছে না দিল্লি থেকে বোনাস পেয়ে, তাই বাড়ির সবাই খুব খুশি। তোমার ছ’মাসের বাকি বাড়িভাড়াও পাঠিয়ে দিয়েছে মা। এই নাও। বলে একটা খাম বাড়িয়ে দেয় সবিতা।

নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছেন না বাক্যহারা কালীপদবাবু। কী সব হচ্ছে আজকে! এত সব ভালো ভালো ব্যাপার একদিনেই ঘটছে কী করে? তিনি স্বপ্ন দেখছেন না তো? চিমটি কাটতে গিয়ে বিস্তর লাগল, বুঝলেন সব সত্যি। সবিতা চলে যেতে তিনি সকাল থেকে হয়ে যাওয়া ঘটনাগুলো পরপর ভাবতে লাগলেন। সবই তার পাওনা ছিল কিন্তু আটকে ছিল। একদিনে সব একসঙ্গে হওয়াটা কি স্রেফ কাকতালীয়? ভাগ্যের চাকা হঠাৎ এইভাবে ঘুরে গেল? কালীপদবাবু আদর করে পেনটায় হাত বোলাতে লাগলেন, সঙ্গে পিঁয়াজিতে কামড়। হঠাৎ দরজায় কে যেন কড়া নাড়ল।

—কে? বলে গেঞ্জিটা পরে দরজাটা খুলতে গেলেন। ওদিক থেকে কে যেন বলে উঠল ‘মামা, আমি’।

দরজা খুলে দেখেন বড়দির ছেলে সুবিমল। ওদের সঙ্গেই তো শরিকি মামলাটা চলছে। বাড়িটা এতদিন এভাবে পড়ে আছে, না বিক্রি হচ্ছে, না সারানো যাচ্ছে। সেই সুবিমল এই সময়!

—কীরে, কী ব্যাপার? হঠাৎ ?

—না গো মামা। এই এলাম আর কী। অনেকদিন আসা হয় না তো। তা বাড়িটার কী দশা হয়েছে গো? সুবিমল বলে।

—হবে না? কী করব বল।

কোর্ট-কাছারি, মামলাতেই তো সব আটকে আছে, জানিস তো।

—সেই জন্যই তো এলাম মামা। আমরা মামলা তুলে নিয়েছি। এই নাও কোর্টের কাগজ। বাড়ি এখন থেকে তোমার, তুমি যা করার করবে। সুবিমল এক নিঃশ্বাসে বলে কথাগুলো।

—সে কী রে? হঠাৎ কী মনে করে! আয় আয় ঘরে এসে বোস। কালীপদবাবুর গলায় উৎফুল্লতা।

—না গো মামা, ভিতরে আর ঢুকব না। আজ রাতেই ফ্লাইট। জানো, আমার ইউকেতে পোস্টিং হয়ে গেছে। বাবাও মারা গেল, কোর্ট কাছারি করে কী আর হবে! আর এইসব মামলা-মোকদ্দমা ভালো লাগছে না। মা যতদিন বেঁচেছিল, মা-ও তো চায়নি। সুবিমল সব কাগজপত্র দিয়ে চলে গেল।

—এ-ও হয়! এ যে মেঘ না চাইতেই জল। বাড়ির মামলা তাহলে মিটল। এবারে বাড়িটাকে মনের মতো করে সারানো যাবে। তিনিই এখন মালিক, বিক্রিও করে দিতে পারেন, করলে অবশ্য সবাইকে ভাগ দেবেন। অনেকদিন ধরে তেওয়ারি বলে একটা প্রোমোটার ছুঁকছুঁক করছে। তিনি ভালো করেই জানেন এ বাড়ি বিক্রি করলে কোটি খানেকের বেশি টাকা পাওয়া যাবে।

খুশিমনে কালীপদবাবু আবার ইজি চেয়ারটায় এসে বসলেন। সামনে সাদা পাতাটা খোলা আর তার উপর পেনটা রাখা। আর কবিতা লেখা হল না। আলগোছে পেনটাকে হাতে তুলে নেন তিনি, অদ্ভুত তো পেনটা! এটার মধ্যে কি জাদু আছে? কেনার পর থেকেই তো একের পর এক সুখবর! পেনটাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে থাকেন কালীপদবাবু।

পরদিন সকালে কাজের মেয়ে কলি বারবার দরজা ধাক্কা দিয়েও কোনও সাড়া পেল না। একা থাকে মানুষটা, কী হল! লোকজন ডেকে আনল সে। দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকতেই খাটে শোওয়া অবস্থায় কালীপদবাবুকে পাওয়া গেল। শরীরটা প্রাণহীন, ঠান্ডা অথচ মুখে কী সুন্দর একটা হাসির রেখা লেগে আছে।

ডাক্তার এসে দেখে বলল, ঘুমের মধ্যেই হার্ট অ্যাটাক। মৃত্যুকে যেন তিনি আলিঙ্গন করে নিয়েছেন খুশি মনে, হাসতে হাসতেই। ডান হাতে তখনও মুঠো করে কী একটা ধরা… কলি দেখে একটা কালো পেন। ইভিনিং স্কুলে পড়ে কলি, পেন সে-ও ভালোবাসে। কৌতূহলবশত চুপিচুপি পেনটা নিজের হাতে নিয়ে দেখে ওরই নাম লেখা আছে পেনটাতে ‘কলি’। অদ্ভুত তো! লোভ সামলাতে পারে না কলি। এ মাসের মাইনেটা তো গেল, কলি পেনটা ব্লাউজে গুঁজে বিলাপ করে কেঁদে ওঠে।

ওদিকে ঘরে তখনও লং প্লেয়িং রেকর্ডটা কীসের যেন দুঃখে বিদীর্ণ হয়ে কেটে গিয়ে, বেজে চলেছে নজরুলের গাওয়া গানখানি ‘ঘুমিয়ে গেছে শ্রান্ত হয়ে আমার গানের বুলবুলি’।

পরিষ্কার করা কারওর একার দায়িত্ব নয়

চারপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য অনেক সময় আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রচার চালাতে হয় আমাদের দেশে। অথচ পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মানুষ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে অনেক বেশি সচেতন। আর আমাদের দেশে শুধু পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষ স্বাভাবিক ভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখেন তাদের চারপাশ। কিন্তু এই সচেতনতা কিংবা স্বভাব দেশের আপামর জনগণের মধ্যে নেই। বরং দেখা যায়, রাজনৈতিক পোস্টারে নোংরা হয়ে আছে গ্রাম এবং শহরের অনেক দেয়াল। অবশ্য শুধু রাজনৈতিক পোস্টার-ই নয়, যত্রতত্র ময়লা ফেলার প্রবৃত্তি আছে অনেক মানুষেরই। রাজধানী দিল্লিতেও এই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি এক সময় খুব জোরদার ছিল কিন্তু এখন শুধু সচেতনতার পোস্টারই চোখে পড়ে।

আসলে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা কিংবা রাখার বিষয়টি আজও অনেকের মন-মস্তিষ্কে বাসা বাঁধেনি ঠিক ভাবে। তাই, আজও যত্রতত্র নোংরা ফেলা হয় নির্দ্বিধায়। শুধু তাই নয়, ময়লা ফেলার জন্য নির্দিষ্ট জায়গা করে দিলেও, অনেকে সময়-সুযোগ বুঝে এখানে-ওখানে ময়লা ছুঁড়ে দেন নিঃসংকোচে।

অবশ্য শুধু সাধারণ মানুষকেই দোষ দিলে চলবে না, কিছু জায়গায় ময়লা ফেলার সঠিক ব্যবস্থাও থাকে না কিংবা বলা যায় পরিকল্পনার অভাবে বৈজ্ঞানিক উপায়ে সর্বত্র পরিষ্কার রাখা হয় না। অনেক জায়গায় দেখা যায় ভ্যাটে এত ময়লা জমে যায় যে, তা রাস্তার অর্ধেক অংশ গ্রাস করে নেয় এবং দুর্গন্ধ ছড়াতে থাকে। তাই, শুধু কিছু সংখ্যক মানুষ চারপাশ পরিষ্কার রাখতে চাইলে কখনও সর্বত্র পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা সম্ভব নয়। কারণ, যাদের মস্তিষ্কে পরিষ্কার রাখার বিষয়টাই নেই, তারা তো পরিষ্কার জায়গাটাকেও ময়লা করে তুলবে স্বভাবতই।

মনে রাখতে হবে, স্বচ্ছ ভারত গড়ার স্বপ্ন তখনই সঠিক ভাবে পূরণ হবে, যখন প্রত্যেক ভারতবাসীর মন-মস্তিষ্কে চারপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার ইচ্ছে জাগবে। দুঃখের বিষয় হল এই যে, এখনও অনেকে মনে করেন, ঝাড়ু হাতে নিলে কিংবা ময়লা সরালে তার আভিজাত্য কমে যাবে। কিন্তু ভেবে দেখুন, সমস্ত ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড কান্ট্রি-তে কোনও কাজকে ছোটো মনে করেন না কেউ।

যদি সপ্তাহে অন্তত একদিন ঝাড়ু হাতে নিতে হয়, তাহলে তাতে লজ্জার পরিবর্তে গর্ব অনুভব করা উচিত। আর সবচেয়ে ভালো হয় যদি ছুটির দিন সমবেত ভাবে নিজেদের অঞ্চল পরিষ্কার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কারণ, এই উদ্যোগ সবাই নিলে, কেউ আর যত্রতত্র নোংরা ফেলার সাহস পাবে না কিংবা নোংরা করার মানসিকতার পরিবর্তন হবেই।

দত্তক আইন আরও সহজ হওয়া উচিত

সন্তানহীন দম্পতিরা অনেকে যে-কোনও মূল্যে পেতে চান সন্তানসুখ। তাই তাদের মধ্যে অনেকে অর্থের বিনিময়েও নিজের ঘরে আনতে চান শিশু-সন্তানকে। কিন্তু অর্থের বিনিময়ে সন্তান দত্তক নেওয়া বে- আইনি। অবশ্য, যারা নিঃসন্তান, তারা অনেক সময় নৈতিকতা কিংবা আইনি বিষয়টি মাথায় রাখতে পারেন না। বরং সন্তানহীনতার শূন্যতা তাদেরকে বড়ো বেশি সাহসী করে তোলে অনেক সময়।

বর্তমান সময়ে নানারকম কারণে বাড়ছে বন্ধ্যাত্ব। আর তাই সন্তান দত্তক নেওয়ার চাহিদাও বাড়ছে হু- হু করে। আর এই চাহিদার কারণে, অর্থের বিনিময়ে বাচ্চা পাইয়ে দেওয়ার কালোবাজারি চলছে কিছু ক্ষেত্রে। তবে এইসব কারবার এতটাই কৌশলে চলে যে, তা প্রকাশ্যে আসে না সচরাচর। অনেকে তো দূর-দূরান্ত থেকে অর্থের বিনিময়ে কিংবা আরও নানারকম উপায়ে বাচ্চা নিয়ে এসে, নিজের গর্ভস্থ সন্তান বলেও সামাজিক স্বীকৃতি আদায়ের চেষ্টা করেন। তাই, কাছাকাছি কোনও গরীর মানুষ তাদের সন্তানকে লালন-পালনের জন্য স্ব-ইচ্ছায় এবং আইন মোতাবেক নিঃসন্তান দম্পতিকে দিতে চাইলেও, নিতে চান না অনেকে। আসলে বন্ধ্যাত্বের বিষয়টি অনেকে পাঁচকান করতে চান না সামাজিক সম্মান হারানোর ভয়ে কিংবা লজ্জায়।

অবশ্য শুধু সামাজিক সমস্যার বিষয়-ই নয়, দত্তক নেওয়ার বিষয়ে আইনি জটিলতার কারণেও অনেক নিঃসন্তান দম্পত্তি ঘুরপথে অর্থের বিনিময়ে অন্যের থেকে বাচ্চা নিয়ে আসেন চুপিচুপি এবং সেই বাচ্চাকে নিজেদের সন্তান বলে স্বীকৃতি পাওয়ার চেষ্টাও চলতে থাকে। আসলে, বাচ্চা নিজেদের হোক কিংবা অন্যের থেকে সংগ্রহ করেই হোক— নিঃসন্তান দম্পতির কোল আলো করতে পারাটাই সবচেয়ে বড়ো বিষয় বলে মনে করেন অনেকে। কোনও গরীব, অসহায় মা-বাবার সন্তানকে নিয়ে এসে যদি আর্থিক ভাবে স্বচ্ছল কোনও দম্পতি লালনপালন করে বাচ্চাকে যোগ্য মানুষ করে তোলেন, তাহলে তাও মানবিক বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, সন্তান দত্তক নেওয়ার প্রক্রিয়া আইনি ভাবে যত জটিল হবে, চাইল্ড ট্রাফিকিং হয়তো আরও বাড়বে। বরং কেউ যদি কোনও অসহায় বাচ্চাকে বৈধ উপায়ে নিয়ে গিয়ে লালন- পালন করেন, তাহলে হয়তো সমাজ আরও সুন্দর হয়ে উঠবে। নিঃসন্তান দম্পতি চাইলে পরিত্যক্ত কিংবা অনাথ শিশুদের নিয়ে গিয়ে সহজ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিজের সন্তান-স্নেহে যদি মানুষ করতে চান, তাহলে তাদের সেই সুযোগ করে দেওয়া উচিত বলে মনে করেন প্রতিটি শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ। কারণ, কিছু অনাথ আশ্রমের আবাসিকদের যে ধরনের অমানবিক অত্যাচারের শিকার হওয়ার খবর সামনে আসে মাঝেমধ্যে, তা খুবই মর্মান্তিক! তাই, সন্তান দত্তক নেওয়ার আইনি প্রক্রিয়া আরও সহজ হওয়া দরকার বলেই মনে হয়।

পুষ্টির ঘাটতি দূর করা আবশ্যক

আমরা জাতীয় পুষ্টি সপ্তাহ পালন করছি এখন, কিন্তু জাতীয় স্বাস্থ্য সমীক্ষা অনুসারে, কিশোর-কিশোরীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ রক্তাল্পতা, ভিটামিনের ঘাটতি এবং অপুষ্টির সমস্যায় ভোগে।

আসলে, বয়ঃসন্ধিকাল শারীরিক বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়, কিন্তু ভারতে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে পুষ্টির ঘাটতি এখনও একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। এর অর্থ হল, কিছু কিশোর-কিশোরী কম ওজনের, আবার কিছু অতিরিক্ত ওজন এবং স্থূলতার ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, অভিভাবকদের পুষ্টি জ্ঞানের অভাব এবং অতিরিক্ত ক্যালোরি যুক্ত অথচ পুষ্টির ঘাটতিযুক্ত খাবারের সহজলভ্যতার কারণে অপুষ্টির সমস্যায় ভোগে কিশোর-কিশোরীরা। অথচ, উন্নত জীবনের জন্য সঠিক খাবার খাওয়া বাঞ্ছনীয়। কিন্তু কী খাবেন, কীভাবে দূর করবেন পুষ্টির ঘাটতি? এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন কলকাতা-র ফর্টিস হাসপাতাল-এর প্রধান ডায়েটিশিয়ান ডা. শ্রাবণী মুখোপাধ্যায়।

Dr Shrabani Mukhopadhyay

Dr Shrabani Mukhopadhyay

কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে যারা প্রায়ই ভাজা খাবার, প্যাকেটজাত ফাস্ট ফুড এবং চিনিযুক্ত পানীয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তাদের রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়।  লবণ, চিনি এবং অস্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত এই খাবারগুলি সুস্বাদু হতে পারে, কিন্তু এগুলি আয়রন, ক্যালসিয়াম, প্রোটিন এবং ভিটামিনের মতো প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়। এই ধরনের খাদ্যাভ্যাস রক্তাল্পতা, বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া, দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং এমনকি ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং স্থূলতার মতো লাইফস্টাইল ডিজিজ-এর প্রাথমিক সূত্রপাত ঘটায়।

vegetables and fruits

এই সমস্যা সমাধানের জন্য বহু-স্তরের পদ্ধতির প্রয়োজন। স্কুল, কলেজ এবং সমাজ সচেতনতামূলক প্রচারের প্রয়োজন। তাছাড়া, এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা উচিত, যেখানে পুষ্টিকর বিকল্পগুলি সহজেই পাওয়া যায় এবং তা সাশ্রয়ী মূল্যেরও। জেনে রাখুন, মৌসুমী ফল, শাকসবজি, গোটা শস্য, ডাল, দুগ্ধজাত দ্রব্য এবং বাদাম সমৃদ্ধ খাবার শুধুমাত্র শারীরিক বিকাশকেই উন্নত করে না, পাশাপাশি মানসিক স্বচ্ছতা এবং শক্তির স্তরও বৃদ্ধি করে।

মনে রাখবেন, স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অভিভাবক এবং শিক্ষকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, অন্যদিকে নীতিনির্ধারকদের উচিত পুষ্টি-কেন্দ্রিক উদ্যোগ এবং নিয়মকানুন বৃদ্ধি করা, যাতে শিশুদের লক্ষ্য করে জাঙ্ক ফুডের বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করা যায়। সেইসঙ্গে, অভিভাবক, শিক্ষক এবং সরকারের নিশ্চিত করা উচিত যে,  ভারতের যুবসমাজ যেন পুষ্টিকর খাবার পায় এবং অস্বাস্থ্যকর খাবার থেকে দূরে থাকে।

সন্তানের আদর্শ পথ-প্রদর্শক হওয়া জরুরি

সন্তানকে সুশিক্ষিত এবং সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হলে, তাকে যেমন স্বাধীনতা দিতে হবে, ঠিক তেমনই গুরুদায়িত্ব পালন করতে হবে মা-বাবা দু’জনকেই। মনে রাখবেন, সন্তান যেন তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করতে ভুল না করে। কারণ, ওরাই সমাজ, দেশ তথা বিশ্বের ভালোমন্দের ভবিষ্যৎ। আবার প্রতিটি সন্তান মা-বাবার আশা-আকাঙ্ক্ষারও প্রতিফলন। তাই, সন্তানের ভবিষ্যৎ সুন্দর এবং সফল করে তুলতে মা-বাবাকে সবরকম প্রচেষ্টা করতেই হবে।

মা-বাবা সন্তানের প্রথম শিক্ষক এবং আদর্শ পথ-প্রদর্শক। মানুষের জীবনে পড়াশোনার গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। বাড়ির শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে সন্তানের পুঁথিনির্ভর শিক্ষাদীক্ষা তথা গুড স্কুলিং এবং সম্পূর্ণ ভাবে সন্তানের প্রতি যত্ন নিতে হবে অভিভাবকদের। তবে মেধার নিরিখে সব শিশু সমান হয় না। অনেক শিশুই পড়াশোনায় মনোনিবেশ করতে পারে না, কেউ কেউ আবার পরিশ্রম করেও কাঙ্ক্ষিত ফললাভ করতে পারে না। এর ফলে সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে অভিভাবকদের চিন্তা হয় অনেকসময়।

আজকাল প্রযুক্তির যুগে বাচ্চারা মোবাইল, ল্যাপটপ গেমস ইত্যাদি নিয়েই ব্যস্ত থাকতে ভালোবাসে। সেই তুলনায় লেখাপড়ায় মনোযোগ দেওয়া, কিছু মুখস্থ করা ইত্যাদির ক্ষেত্রে অমনোযোগী হতে দেখা যায়। অনেক বাচ্চা একটানা বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়ায় মনোযোগ রাখাটায় একঘেয়েমি অনুভব করে। তাই, বাচ্চাদের মনোযোগ বাড়াতে মা-বাবাকে সাহায্য করতে হবে। কীভাবে সহজ উপায়ে বাচ্চার মনোযোগ বাড়ানো যেতে পারে, তা জানা জরুরি।

লক্ষ্য ঠিক করুন

লক্ষ্য স্থির করে চললে সঠিক পথে চলতে সুবিধা হবে। পড়াশোনার জন্য সময় বরাদ্দ করুন, এতে বাচ্চা পড়ার সময় নিয়ে নিশ্চিত হতে পারবে। ‘পড়াশোনা শেষ করে কখন উঠতে পারব’ —এই দুশ্চিন্তা হবে না আপনার সন্তানের। পড়ার মাঝে ৪৫ মিনিট বা ১ ঘণ্টা পরপর একটা ব্রেক-এর ব্যবস্থা থাকলে পড়ায় একঘেয়েমি আসবে না।

পড়ার জায়গা নির্দিষ্ট করুন

খুব বেশি কোলাহলের মধ্যে বাচ্চার পড়ার জায়গা হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। কোলাহলমুক্ত, শান্ত, আরামদায়ক হওয়া উচিত বাচ্চার পড়ার জায়গাটি। সকলের যাতায়াতের পথে যেন পড়ার জায়গা না হয়। বাচ্চার পড়াশোনার জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু যাতে একজায়গায় রাখা যেতে পারে, তারজন্য পড়ার টেবিল একটু বড়ো রাখুন। বসার চেয়ারটিও আরামদায়ক হওয়াটা একান্তই জরুরি। পড়াশোনার সময় বাচ্চার যাতে খিদে না পায়, তাই হালকা কিছু জলখাবার খাইয়ে বাচ্চাকে পড়াতে বসান।

মনোযোগ আকর্ষণের বিষয়ে গুরুত্ব

গল্পের মাধ্যমে বা ছবি এঁকে পড়া বোঝাতে পারেন, বিশেষকরে ছোটো বাচ্চাদের ক্ষেত্রে। এর ফলে লেখাপড়ায় তাদের আগ্রহ বাড়বে। বাচ্চাকে লেখার অভ্যাস করান। কী পড়ছে তার একটা নোট ডায়ারিতে রাখতে বলুন। বিভিন্ন রঙের পেনসিল ব্যবহার করে লিখলে দেখতেও আকর্ষণীয় হবে, চোখেও চট করে পড়বে। যা পড়ছে সেটা সঙ্গে সঙ্গে খাতায় লিখে ফেলতেও অভ্যাস করান বাচ্চাকে। যা লিখছে বাচ্চা, যেন মুখে সেটা জোরে জোরে বলারও অভ্যাস করে।

বাচ্চার পড়াশোনার সময় হাতের কাছে মোবাইল, ভিডিও গেমস কিছুই রাখবেন না যেগুলো তার মনোযোগ নষ্ট করতে পারে। ঘরে টিভি বন্ধ রেখে বাচ্চাকে পড়াতে বসান কিংবা দরজা বন্ধ রাখুন, যাতে অন্য ঘরে আওয়াজ হলেও তার শব্দ বাচ্চার কানে না পৌঁছায়।

উপহার

বাচ্চারা সহজে পড়তে বসতে চায় না। তাই মাঝেমধ্যে পড়ার চাপ বেশি থাকলে, বাচ্চাকে বলতে পারেন, সেদিন তিরিশ মিনিট একটু বেশি পড়াশোনা করতে, তার বদলে পরের দিন তিরিশ মিনিট বেশি খেলার স্বাধীনতা দিন। অথবা কোনও দিন আপনার কথা শুনে বাচ্চা বেশি পড়াশোনা করলে, উপহার হিসাবে তার পছন্দের খেলনা কিংবা খাবার তাকে দেবেন। এতে বাচ্চাকেও মানসিক ভাবে আনন্দে রাখা সম্ভব।

প্রশংসা

বাচ্চা পড়াশোনা পারুক বা না পারুক, মাঝেমধ্যে হালকা প্রশংসা করুন। বাচ্চা এতে উৎসাহ পাবে। শিশুরা প্রশংসা বা উৎসাহ পেতে দারুণ ভালোবাসে। তাই পড়াশোনার কারণে এই প্রশংসা যদি পায় ওরা, তাহলে লেখাপড়ায় আগ্রহ বাড়বে ওদের।

গেমস

এখন প্রচুর ইন্ডোর গেমস, বই ইত্যাদি পাওয়া যায়, যা বাচ্চার কগনিটিভ স্কিল বাড়াতে সাহায্য করে। যেমন নানা ধরনের অ্যাক্টিভিটি বুক, বিল্ডিং ব্লকস, পাজলস ইত্যাদি। স্মার্টফোন, কম্পিউটারের বদলে এই ধরনের খেলা বা বই বাচ্চাকে দিলে, তাদের মনোযোগের সমস্যা অনেকটাই কমানো যাবে। এছাড়াও মিউজিক ইনস্ট্রুমেন্টেও তালিম দেওয়াতে পারেন। কারণ, সুর তোলার মধ্যে দিয়ে, কনসেনট্রেশন লেভেল বাড়ানো যেতে পারে।

এগুলো ছাড়াও বাচ্চার সঙ্গে নানারকম শিক্ষামূলক বিষয় নিয়ে কথা বলুন। বাচ্চার কথাও মনোযোগ দিয়ে শুনুন। অভিভাবকেরা মনোযোগ সহকারে বাচ্চার কথা শুনলে, বাচ্চার ছটফটে ভাব অনেকটা কমে যাবে। কিন্তু স্কুলের হোমওয়ার্ক করে দেবেন না, বাচ্চাকে নিজেকেই করতে দিন। স্কুলে যদি বাচ্চা বকুনি খায়ও, তাতে মনখারাপ করবেন না, এতে বাচ্চা পড়ার গুরুত্ব বুঝবে।

গুরুদায়িত্ব পালন

বাড়ির পরিবেশ শান্ত, স্বচ্ছন্দ থাকলে বাচ্চার স্বভাবেও তার প্রভাব পড়বে। তাই নিজেদেরও টেনশনমুক্ত রাখার চেষ্টা করুন অন্তত বাচ্চাদের সামনে। আর বাচ্চাকে সবসময় পজিটিভ থাকতে শেখান। ছোটোখাটো কোনও সমস্যা এলে, তা কীভাবে ধৈর্য নিয়ে এবং বুদ্ধি দিয়ে সমাধান করতে হবে, সেই বিষয়ে সঠিক ভাবে পথ দেখান আপনার সন্তানকে। সেইসঙ্গে, বাচ্চা যাতে মিশুকে, সামাজিক হয়ে ওঠে, সেই শিক্ষাও দিন ওদেরকে। কারওর ভালো করতে না পারুক, কিন্তু কারওর যাতে ক্ষতি করার ইচ্ছে তৈরি না হয় আপনার সন্তানের, সেই মানসিকতা তৈরি করিয়ে দিন অভিভাবক হিসাবে।

কলকাতায় ‘উড়ান’-এর আসরে তাল-ছন্দে মঞ্চ কাঁপাবেন প্রতিভাবান শিল্পীরা

আবারও কলকাতা ভাসতে চলেছে শাস্ত্রীয় সংগীত এবং নৃত্যের জোয়ারে। আগের বছরের মতো এবারও এই সুযোগ করে দিচ্ছে ‘ভারতীয় বিদ্যাভবন’ এবং ‘সংষ্কৃতি সাগর’। ওদের যৌথ উদ্যোগে একঝাঁক তরুণ প্রতিভাদের নিয়ে জি ডি বিড়লা সভাঘরে ৬ সেপ্টেম্বর বিকেল সাড়ে পাঁচটায় বসতে চলেছে অভিনব শাস্ত্রীয় সংগীতের আসর—- ‘উড়ান’। এটা দ্বিতীয় বছর। নিঃসন্দেহে কলকাতার শ্রোতাদের জন্য এটা একটা বড়ো সুখবর। তরুণ প্রতিভাদের কাছেও খুব বড়ো একটা সুযোগ। কলকাতার মতো সমঝদারি শ্রোতাদের শহরে ওরাও পাবে নিজেদের মেলে ধরার সুবর্ণ সুযোগ।

আসলে, শাস্ত্রীয় সংগীতের আসর কলকাতায় নতুন কিছু নয়। তাবড় তাবড় শিল্পীরা কলকাতার শ্রোতাদের সমীহ করেই চলেন পন্ডিতজী, উস্তাদজীদের গান-বাজনা তো লেগেই আছে, কিন্তু শাস্ত্রীয় সংগীতে দেশের তরুণ তুর্কিরা কেমন তৈরি হচ্ছে, তা জানার খুব একটা সুযোগ তৈরি হয় না। অথচ এই তরুণ প্রতিভারাই দেশের ভবিষ্যৎ।

এবারের ‘উড়ান’-এ মঞ্চ মাতাবেন দেশের বাছাইকরা তরুণ প্রতিভাবান শিল্পীরা। এঁরা ইতিমধ্যেই মাতিয়ে তুলেছেন দেশ-বিদেশের মঞ্চ। তাই, শাস্ত্রীয় সংগীতের শ্রোতারাও ভালোবাসায় ভরিয়ে দিচ্ছেন এই তরুণ শিল্পীদের। যাইহোক, ‘উড়ান’-এর আসর সমৃদ্ধ হবে তাল-ছন্দের সংমিশ্রণে। নৃত্য এবং তালবাদ্যের অভিনব মিশেল। থাকছে কত্থকের যুগলবন্দি—- ‘কৃষ্ণপ্রিয়া’।  এই সময়কার দুই প্রতিভাবান শিল্পী বিশাল কৃষ্ণ এবং রাগিনী মহারাজ কত্থক পরিবেশন করবেন। থাকছে ‘হিন্দুস্থানী-কর্ণাটকী যুগলবন্দি’। এই অভিনব যুগলবন্দি তৈরি হবে হিন্দুস্থানী এবং কর্ণাটকী ভায়োলিন, তবলা এবং মৃদঙ্গমের সংমিশ্রনে। হিন্দুস্থান ভায়োলিন বাজাবেন ইয়াদনেশ রায়কর, কর্ণাটকী ভায়োলিনে সুমন্ত মঞ্জুনাথ, তবলায় আর্চিক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মৃদঙ্গমে নন্দন।  তরুণ তুর্কিদের এমন অভিনব যুগলবন্দির সাক্ষী থাকতে চলেছে কলকাতা। চমক এখানেই শেষ নয়। থাকছে অন্যধারার ‘তালবাদ্য যুগলবন্দি’। ডিজেম্বে, ড্রামস এবং হারমোনিয়ামের মিশেলে তৈরি হবে এই অভূতপূর্ব যুগলবন্দি। বাজাবেন একঝাঁক তরুণ প্রতিভা। এঁরা সবাই এক একজন ছাইচাপা আগুন। ডিজেম্বে বাজাবেন শিখর নাদ কুরেশি, ড্রামসে থাকবেন শ্রাবণ সামসি এবং হারমোনিয়ামে জ্যোতির্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়। কলকাতার শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে শুনবেন তারুণ্যের রাগরাগিনী।

তরুনদের নিয়ে এমন শাস্ত্রীয় সংগীতের আসর খুব একটা হয় না। তরুণদের মেলে ধরার জন্য ‘ভারতীয় বিদ্যাভবন’ এবং ‘সংষ্কৃতি সাগর’ তাই বড়ো ভূমিকা পালন করে নিঃসন্দেহে। শারদোৎসবের প্রাক্কালে এক নতুন যৌবনের ডাকে শামিল হবে গোটা কলকাতা। আর মাত্র একটা দিনের পর অবসান ঘটবে অপেক্ষার।

সুপার সফট হোম-মেড কেক

কোনও অনুষ্ঠান-উপলক্ষ্য ছাড়াই কেক খাওয়ার মজা নেওয়া যায় বাড়িতেই। আর সকাল- সন্ধে যে-কোনও সময় উপভোগ করা যায় কেকের স্বাদ। তবে মনে রাখবেন, দোকান থেকে কেনা কেক নয়, বাড়িতে বানানো কেক খাওয়ার মজাই আলাদা। তাই, আন্তরিক ইচ্ছে আর হাতে কিছুটা সময় নিয়ে বাড়িতেই বানিয়ে নিন সুপার সফট কেক। শুধু বেক করার আগে, নিয়ম মেনে সমস্ত উপকরণের মিশ্রণ তৈরি করতে হবে যত্ন নিয়ে।

ভ্যানিলা স্পঞ্জ কেক

উপকরণ: ১০০ গ্রাম ময়দা, ৩০ গ্রাম মাখন, ৩টি ডিম, ৯০ গ্রাম ক্যাস্টর সুগার, ১ ছোটো চামচ বেকিং পাউডার, ১-২ ফোঁটা ভ্যানিলা এসেন্স।

প্রণালী: ময়দা আর বেকিং পাউডার মেশান, ডিম ফাটিয়ে মাখন ও ক্যাস্টর সুগারের সঙ্গে ফেটাতে থাকুন। এবার অল্প অল্প করে ময়দা মিশিয়ে একটি মিশ্রণ তৈরি করুন। ভ্যানিলা এসেন্স দিন। ভালো ভাবে মিশিয়ে মাখন মাখানো বেকিং ডিশ-এ মিশ্রণ ঢেলে আভেনে ২০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় ১৫ মিনিট বেক করুন। কেক তৈরি।

পাইনঅ্যাপল কাপ কেক

উপকরণ: ১ ছোটো চামচ পাইনঅ্যাপল এসেন্স, প্রয়োজনমতো ক্রিম, ২-৩ ফোঁটা হলুদ রং, , কালার্ড চকোলেট স্প্রিংকল্স, আনারসের টুকরো অল্প।

প্রণালী: ভ্যানিলা স্পঞ্জ কেকের মতো করেই মিশ্রণ তৈরি করুন। এবার এতে ১ ছোটো চামচ পাইনঅ্যাপল এসেন্স ভালো ভাবে মেশান। এবার মাখন মাখানো মোল্ড-এর অর্ধেক পূর্ণ করে মিশ্রণ ঢালুন ও আভেনে ঢুকিয়ে ১৬০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় ১০ মিনিট বেক করুন। ঠান্ডা হলে হলুদ রং, পাইনঅ্যাপল এসেন্স ও ক্রিম ভালো ভাবে মেশান। প্রত্যেকটি কাপ মোল্ড-এ কেকের উপর এই মিশ্রণ দিয়ে সাজিয়ে, পাইনঅ্যাপলকুচি ও কালার্ড চকোলেট স্প্রিংকল্স ছড়িয়ে পরিবেশন করুন।

ঘর (শেষ পর্ব)

বুঝল দীঘল। অনেক দিনের পরে ফের যেন সানাই সহকারে আজ সুবাসিত বাতাস বইছে। প্রেমের ঢেউ গুনে গুনে অনেকগুলো সমুদ্র পেরিয়ে এলেও অগুন্তি ঢেউ অপেক্ষমান। সারাজীবন এই ভাবেই কাটাবে দু’জনে। ও ঘরেই আছে সারপ্রাইজ। সোহা জানে ও ঘরই হল দীঘলের প্রাইভেট স্পেস। সোহা বিরক্ত করে না যখন ও ঘরে বসে সেতারে ডুবে যায় দীঘল। ওখানেই কি গন্ধরাজ এনে রেখেছে সোহা? ও জানে দীঘলের গন্ধরাজ প্রীতির কথা।

দরজার পর্দায় জোড়া ময়ূর। এদিকে দীঘল সদ্য স্নানের পরে স্বতঃস্ফূর্ত গন্ধরাজ যেন। পর্দা অল্প সরিয়ে দেয়াল ঘেঁষে রাখা ফ্লাওয়ার ভাসের দিকে তাকিয়ে গন্ধরাজ দেখতে পেল। গোছা গোছা গন্ধরাজ সাজিয়ে রেখেছে সোহা। অসাধারণ সারপ্রাইজ। মন মুহূর্তে স্নিগ্ধ হয়ে উঠতে উঠতে পর্দা পুরো সরিয়ে সোহাকে ডাকতে যেতেই দীঘল স্তম্ভিত হয়ে গেল। দীঘলের সুরের মূর্ছনায় ডুবে যাওয়ার ঘরে বসে সোহার বাবা-মা হাসছেন। আজ সেতার নিয়ে বসার ইচ্ছেটা মুহূর্তে খোলা জানলা দিয়ে উড়ে গেল। দীঘল নিজেকে সামলে নিতে নিতে বলল, ‘আপনারা? কখন এলেন? কীভাবে? লকডাউনের মধ্যে…?’

—সে কী? আমরা যে আসব, তুমি জানতে না বুঝি? মেয়েটা চিরকাল বাচ্চাই রয়ে গেল। আমাদের বলেছে, দীঘল এলেই যেন সামনে না যাই। চমকে দেবে। তা, আসব যে, সেটা বলেনি? সোহার বাবা হাসছিলেন। দীঘল তাড়াতাড়ি করে প্রণামপর্ব সেরে নিল।

সোহা পিছন থেকে হেসে উঠেছে, ‘সারপ্রাইজ। চমকে গেলে তো? তুমি তো জানো, মা, বাবা লকডাউনের আগেই বাগুইহাটিতে মামার গৃহপ্রবেশে এসে আটকে পড়েছিল। সাতাশটা দিন ওখানে ছিল। আমি মামাকে বললাম, পুলিশের অনুমতি নিয়ে আমার এখানে দিয়ে যাও বাবা-মাকে। ব্যস। আজ দুপুরে চলে এল মামা। বাবা, মাকে নামিয়ে চলে গেল। নিজে থাকতে পারবে না। রাস্তায় আবার কোন ঝামেলা হয়, কে জানে! এখন যদ্দিন না লকডাউন উঠে যায়, বাবা-মা এখানেই…! কী মজা। আচ্ছা, তুমি কাল একবার বুধু মাছওলাকে ফোন করো। ভালো আড় যেন দেয়। মায়ের হাতের আড় মাছের ঝোল কতদিন খাইনি।’

দীঘলের শাশুড়ি হেসে বললেন, “আছি তো এখন। খাওয়াব, যা খেতে চাস। দীঘল কী খাবে এখন? সোহা, তুই দেখ, ওদিকটা।”

—অফিস থেকে ফিরে ও-ই চা, কফি করে। আজ তোমাদেরটাও করবে। খেয়ে বলো, কেমন হয়েছে। সোহা বালিকা বয়সের মতো হি হি করছিল। দীঘল কথা খুঁজে পাচ্ছিল না। কফি, কাপ, দুধ, চিনি… সব এলোমেলো হয়ে যচ্ছিল। কতদিন পরে লকডাউন উঠবে টিভিতে বলছে কিছু? ডিপ্রেসড লাগছিল ওর। কিচেন থেকে ওয়াশরুমের দিকে যেতে সরু প্যাসেজের মধ্যে নিজেকে লুকিয়ে রাখল দীঘল। নিজেকে একটু স্পেস দিতে হবে। কনফিউজড হয়ে আছে মাথাটা। প্রাইভেট স্পেস বলে আর কিচ্ছু থাকল না। স্টে হোমের মজাটাই রইল না বোধহয়।

( ২ )

কফির কাপ তিনজনের সামনে রেখে নিজের কাপটা নিয়ে, ‘আসছি” বলে সোজা বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল দীঘল। বৃষ্টির জোশ বেড়েছে। রাস্তার ওপারটা দেখা যাচ্ছে না। রোজ এই সময়ে একটি ভিখিরিটাইপ বৃদ্ধ শাটার টানা দোকানের সামনে একটা চাদর বিছিয়ে চুপ করে বসে থাকে। অফিস থেকে ফিরে কফির কাপ নিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে লোকটাকে দেখতে দেখতে অভ্যেস হয়ে গিয়েছে। এখন আর লোকটির অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতনই নয় ওরা দু’জনে। এই বারান্দায় দাঁড়িয়ে কত খুনসুটি…! মনে হয়নি বাইরের একজন ওদের মধ্যে রয়েছে। মনেই হয়নি! কী আশ্চর্য। আজ, এতদিন পরে এ কথাটা মাথায় এল কেন? ও মন খারাপ করেছে বাইরের দু’জন ওদের প্রাইভেট স্পেস কেড়ে নিতে এসেছে বলে। ওই লোকটা রোজই চুরি করে ওদের একান্ত যাপনের মুহূর্ত। এখন তো রীতিমতো ডাকাতি হয়ে গেল ফ্ল্যাটে। সোহার কী আক্কেল ? বাবা, মাকে এখানে নিয়ে এল অনির্দিষ্ট কালের জন্য? ওর দীঘলের অনুমতি নেওয়ার কথা মনে এল না একবারের জন্য?

—কী হল? এখানে এসে দাঁড়িয়ে আছো যে! বাবা তোমার সঙ্গে কথা বলতে চান। সোহা একটা সিল্যুট মূর্তি হয়ে দরজার মুখে দাঁড়িয়ে আছে। দীঘল বাকি কফিটুকু শেষ করল। তারপর সোহার দিকে তাকাল, টায়ার্ড লাগছে। আজ থাক। কাল আড্ডা হবে। আছেন তো।”

—তুমি খুশি হওনি ওঁরা আসাতে। বুঝতে পারছি। কিন্তু কিছু করার নেই। ওঁরা থাকবেন এখন। আমি থাকতে দিনের পর দিন মামার বাড়িতে থাকাটা কি ভালো দেখাচ্ছিল? মা অস্বস্তিতে ছিল। বুঝতে পেরেই আমি দিয়ে যেতে বলেছি। সোহা দাঁড়াল না। দীঘল না তাকিয়েও বুঝল সোহা চলে যাচ্ছে। আশ্চর্য। সোহা দীঘলকে বুঝল না? ওদের একান্ত যাপনের তছনছ হয়ে যাওয়া নিয়ে ওর মনে খেদ নেই ?

শূন্য কাপ নিয়ে বারান্দা থেকে কিচেনের দিকে যেতে যেতে পর্দার আড়ালের শব্দগুলো গন্ধরাজের সুবাসের সঙ্গে বেরিয়ে এল। সোহার বাবা কিছু বলছিলেন যেন। ঠিক বুঝতে পারল না দীঘল। কিন্তু সিংক-এ কাপ রাখতে রাখতে শুনল সোহা প্রায় চেঁচিয়ে উঠেছে, “আই বট দ্য ফ্ল্যাট। আমার নিজস্ব টাকায় কেনা। তোমরা এখানে মেয়ের ফ্ল্যাটে আছো। সরি হওয়ার কারণ নেই।”

কাপটা সিংক-এ রাখা হল না। দীঘল শ্বাস নিল। পা টিপে টিপে ফের বারান্দায় গিয়ে নিজেকে লুকিয়ে ফেলা ছাড়া উপায় নেই। বৃষ্টি কমেছে। রাস্তার ওপারের লোকটা এক ভাবে রাস্তার দিকে তাকিয়ে বসে আছে। ওর ঘর নেই। দীঘল হেসে ফেলল। “স্টে হোম স্টে সেফ’ নিয়ে লোকটার ভাবনা নেই। নিজের ঘর না থাকলে কীসের সেফ থাকা? কীভাবে? দীঘলের ঘর নেই। ভুলে গিয়েছে ও যে, এই স্বস্তির জায়গাটা কিনেছে সোহা। দীঘল নয়।

ছাদ ফুঁড়ে টুপুস করে জলের ফোঁটা পড়ল মাথায়। যাহ! ছাদ ক্র্যাকড নাকি?

বারান্দা থেকে জোড়া ময়ূরের পর্দা সরাতে গিয়ে শাটার টানা দোকানের কথা মনে হল দীঘলের। ও ডেকে বলল, ‘সোহা, গন্ধরাজ ফুলে আজকাল সুবাস নেই আগের মতো।”

সোহার বাবা ডাকলেন, “এসো, এসো। সুবাস নিজেদেরই বানিয়ে নিতে হয়। লকডাউন থেকে বেরিয়ে আসতে হবে, বুঝলে?” এক প্রৌঢ়ের নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে বিড়ম্বনা কাটানোর চেষ্টা কষ্ট দিচ্ছিল দীঘলকে। ওঁরা জানেন না, দীঘল এখন ওঁদেরই আশ্রয়প্রার্থী। এই ঘরে ও মোটেই সেফ নেই আর।

(সমাপ্ত)

বিলাসবহুল জীবনযাপন এবং আত্মহত্যা

কারওর স্ত্রী আত্মহত্যা করলে তা আলোচনার শীর্ষে থাকে, কিন্তু আত্মহত্যার সঠিক কারণ খোঁজার চেষ্টা করা হয় না সবসময়। বাস্তব হল এই যে, শুধু অত্যাচারিত স্ত্রী-ই নয়, ঋণগ্রস্তরা ঋণ পরিশোধ করতে না পেরেই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আত্মহত্যা করছেন। চাকরিজীবি থেকে শুরু করে গরিব কৃষক কিংবা শ্রমিক, অনেকেই ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে, অবসাদগ্রস্ত হয়ে আত্মহত্যাকে ঋণ মুক্তির একমাত্র পথ হিসাবে বেছে নিচ্ছেন।

দিল্লিতে ১২ বছরের ছেলেকে রেখে মা-বাবা আত্মহত্যা করে নিয়েছেন। কারণ করোনা-র পর থেকে ব্যবসায়িক ক্ষতির শিকার হয়ে ঋণ পরিশোধ করতে পারছিলেন না ওই কিশোরের বাবা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে কিংবা কোনও ক্রেডিট কার্ড-এর মাধ্যমে টাকা খরচ করে, সেই টাকা সুদে-আসলে ফেরৎ দিতে না পারার জন্য সমস্যার মুখোমুখি হন অনেকেই। কেউ-কেউ আবার আত্মীয়-বন্ধুদের থেকেও টাকা ধার নিয়ে শোধ করতে না পেরে লজ্জায় পড়েন এবং সেই লজ্জার হাত থেকে বাঁচার জন্য অন্য কোনও পথ খুঁজে না পেয়ে, বেছে নেন আত্মহত্যার পথ।

সমস্যার সূত্রপাত হয়, যখন ঋণ নেওয়ার পরও ব্যক্তিগত এবং সাংসারিক খরচে লাগাম লাগাতে পারেন না, যার ফলে ঋণ পরিশোধ করা অসম্ভব হয়ে যায় তাদের ক্ষেত্রে। আসলে আয় কমলে কিংবা ব্যবসায়িক ক্ষতির শিকার হলেও, যদি ব্যক্তিগত খরচ কিছুটা কমানো যায় ঋণ নেওয়ার পর, তাহলে হয়তো আর আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হয় না।

দিল্লিতে ফ্ল্যাটে বসবাসকারী এক দম্পতিকে বিলাসবহুল জীবনযাপনের মাশুল দিতে হয়েছিল। আত্মহত্যা করে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল, আত্মহত্যার এক সপ্তাহ আগেও ওই দম্পতির নিজস্ব গাড়ি ছিল, ওরা এক রেস্তোরাঁও খুলেছিলেন। কিন্তু লাগামহীন বিলাসিতার কারণেই সবকিছু হারাতে হয় হঠাৎই।

আসলে ঋণ নিয়ে শোধ করতে না পারার একাধিক কারণ থাকে। কখনও হয়তো ব্যবসায়িক ক্ষতির কারণে, আবার কখনও নিজেকে উচ্চবিত্ত জাহির করার কারণে, আবার কখনও অধরা স্বপ্ন পূরণ করতে চাওয়ার কারণে, কখনও আবার পরিবারের সদস্যদের অসীম চাহিদা পূরণ করার কারণে ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব হয় না অনেকের ক্ষেত্রে। মূলত আয় এবং ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে না পারার কারণেই তৈরি হয় অর্থনৈতিক বিপর্যয়। বিজয় মালিয়ার ভরাডুবির পিছনেও ছিল ওই বিলাসিতার কারণ। ললিত মোদীকেও দেশ ছাড়তে হয়েছে ঋণ নিয়ে পরিশোধ করতে না-পারার জন্য।

সবচেয়ে মজার বিষয় হল এই যে, বিজয় মালিয়া এবং ললিত মোদী-র দেখানো পথ অবলম্বন করার চেষ্টা করছেন অনেকে। ওরা যেন রোল মডেল হয়ে উঠেছেন। অল্প টাকা নয়, হাজার-হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েও পালিয়ে বাঁচা যায়, এমন উদাহরণ হয়ে কিছু মানুষকে বিপথে চালিত করছেন ওই বিজয় মালিয়া কিংবা ললিত মোদীর মতো লোকেরা। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল এই যে, মা-বাবা আত্মহত্যা করে যে কিশোর সন্তানকে রেখে চলে গেলেন, তার কী হবে! হয়তো কোনও অনাথ আশ্রমে অবহেলায়, অনাদরে কাটবে তার জীবন। এর থেকে দুঃখের আর কী হতে পারে!

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব