আলো আঁধারির গপ্পো

সাউথ ফেসিং অ্যাপার্টমেন্ট। জি-প্লাস ফোর ফ্ল্যাট। সুনন্দের ফ্লাটটা ঠিক মাঝখানে। ব্যালকনিটাও সাউথ ফেসিং। সামনে ছোটো একটা মাঠ। তারপরে সবুজ বনানী। আগাছা জঙ্গল ভরা নয়। নানা রকম বাহারি ফুল, বাহারি জঙ্গল। বনানি দেখভালের জন্য একজন মালিও নিয়োজিত। তারও ওপারে একটা দিঘি। কাচের মতো স্বচ্ছ তার জল। সুইমিং, বোটিং। গোটা কতক দশাসই আমগাছ তুলে এনে ‘ইনস্টল’ করা হয়েছে। নতুন নাম ‘মাঝের গাঁ’। এ সবই খদ্দের পটানোর বন্দোবস্ত।

একটা লম্বা হাই তুলে সুনন্দ ব্যালকনির ইজি চেয়ারটাতে বসেছে। দুপুরের ভাত ঘুম। পাতলা ঘুম। পাতলা ঘুম অতল স্পর্শ করে না। অগভীর ঘুমে মনের সুখ বাসনাগুলি ছেঁড়া ছেঁড়া পেঁজা তুলার মতো ভাসতে থাকে। বাসনার বিপরীত মুখী হয়ে অবচেতন মনের সামনে বিরক্তি ঘটায়। না পাওয়ার অস্বস্তিতে হতাশা আসে। বাইরে প্রকৃতির অনাবিল রূপের ডালি! সুনন্দর নজর সেদিকে নেই। আকাশে মেঘ নেই। সুনন্দর মুখে আছে। এক রাশ ঘনীভূত আষাঢ়ের মেঘ। ঝরব ঝরব করছে। ঝরেনি। বাইরে অসহায়ের মতো ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে।

পড়ন্ত বিকেল। সূর্য এক অত্যাচারী শাসক। সারাদিন রক্তচক্ষু দিয়ে জগৎ শাসন করেছে। বসুন্ধরার রক্তরস ছিবড়ে করে নিজেই ক্লান্ত। বিশ্রামের জন্য পশ্চিমে রওনা হয়েছে।

হাতে এক কাপ চা। মধুছন্দা দেবী ব্যালকনির দরজায় দাঁড়িয়ে। টের পায়নি। –কী দেখছিস ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে? ব্যাবসার কথা ভাবছিস? ভাবিস না। সব ঠিক হয়ে যাবে।

একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বলে –নাঃ তেমন কিছু না। মাথা তুলতেই মায়ের দৃষ্টি এড়ায় না।

–ও মা এ কি! চোখ দুটো অমন লাল কেন? মুখ খানাও কেমন গোমড়া। ব্যাবসায় আরও কিছু ক্ষতি হ’ল নাকি?

–না সেসব কিছু না। একটা আজেবাজে স্বপ্ন দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেল। মায়ের মন অস্থির হয়ে ওঠে।

–ও মা সে কি? কী বাজে স্বপ্ন? কু-স্বপ্ন মনে চেপে রাখতে নেই। বলে দে। মায়ের পীড়াপীড়ি এড়াতে পারে না।

মেঘমুক্ত আকাশ। পশম মেঘ। বুনো মেঘ। গোটা আকাশে কিছু নেই। হঠাৎ কোথা থেকে কচিকাঁচা মেঘেরা মুক্ত আকাশে খেলতে নেমেছে। আমাকে হাত ধরে টানাটানি। আমি বললাম– আরে আমি কি তোদের সাথে খেলতে পারব?

–এসো না। খুব পারবে।

ওদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলতে লাগলাম। তারপর যা হওয়ার তাই। অল্প সময়েই হাঁপিয়ে পড়লাম। ওরা বলল– এসো তবে কিছু জলযোগ করে নিই। বলে আমাকেও চাট্টি মুড়ি দিল। আমি পরমানন্দে খেতে লাগলাম। তারপরই হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেল।

–ওহ, এটা আবার দুঃস্বপ্ন কীসের?মুড়ি তো ভালো জিনিস। এতে মুখ গোমড়া করে বসে থাকার কি হয়েছে?

–না আমি ভাবছি অন্য কথা। তারপরই মাকে প্রশ্ন করে –আচ্ছা মা, মেঘেদের খাবার কিনতে শুধু খাবার কেন কোনও কিছুই জোগাড় করতে তো পয়সা লাগে না। এত ভালো ভালো খাবার থাকতে শুধু মুড়ি। তাই ভাবছি বাকি জীবনটা কি তাহলে আমাকে মুড়ি…।

–ছিঃ বাবা অমন কথা বলতে নেই। ঘুমটা ভালো হয়নি তো! পাতলা ঘুমে ওরকম হিজিবিজি স্বপ্ন দেখে মানুষ। ওসব কথা মনে করে কষ্ট পেতে নেই।

ড. ডি কে বাসু! এটা কেতাবি নাম! বাপ-মায়ের দেওয়া নাম দিলীপ কুমার বোস। বিদেশে গিয়ে সাহেবি নাম হয়েছে। প্রথম নামটি। বার্কিংহাম ইউনিভার্সিটিতে অর্থনীতির প্রফেসরের পাশাপাশি গোটা ইউরোপ ঘুরে জ্ঞানের ঝুলিটা ফুলে ফেঁপে লাউ। জ্ঞানের ঝুলিটা যত ভারী, দাম্ভিকতার তবলা সমপরিমাণে টিউনিং। মুখে লেগে থাকে নেটিভ ইন্ডিয়ান। ইন্ডিয়ান কালচারটা একেবারে বস্তাপচা। জ্ঞানের ভান্ডার দিয়ে ইউরোপকে সমৃদ্ধ করেছে, মাতৃভূমিকে ছড়িয়েছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস।

কৌতুকবশত সুনন্দ বলেছিল– মামা, তুমি গেঞ্জিটা উলটো পরেছ।

ড. বাসু একগাল তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলে– আসলে কি জানিস, ইন্ডিয়ানরা কমফর্ট ব্যাপারটা ঠিক বোঝে না। সেলাইয়ের দিকটা ভেতরে থাকলে কমফর্ট ব্যাপারটা ডিসটার্ব হয়। এ গল্পে ড. বাসুর প্রবল আত্মকেন্দ্রিকতা, মাতৃভূমির উপর ঘৃণা, ইউরোপিয়ান আদব-কায়দা ইত্যাদি বিশ্লেষণ করা। এসব একান্তই অনাবশ্যক ছিল! যদি না দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর পর দেশের মাটিতে পদার্পণ ঘটিয়ে, বোনের বাড়িতে সটান এসে স্বঘোষিত অভিভাবক হয়ে না উঠত।

সুনন্দের হাতে এখন অঢেল সময়। ডিমনিটাইজেশনের জেরে ট্রাভেলিং-এর ব্যাবসা যত তলানিতে ঠেকছে বিশ্রামের সময় ততই বাড়ছে। ব্যাবসা এখন চড়ায় আটকে যাওয়া নৗকার মতো। পরিশ্রম কম হলে ঘুম আসে না। পায়চারি করে।

ব্যালকনির কর্নারে একটা টব। গোলাপ গাছ। বেচারা। অনাদরে অবহেলায় শুকিয়ে কঙ্কাল। সময় আছে যথেষ্ট। উৎসাহে গলগ্রহ। সেই গলগ্রহে গাছটার অকাল প্রয়াণ। পাশ দিয়ে আরও এক অবহেলিত অনাহুত গাছ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। পথ শিশুদের আদর যত্নের প্রয়োজন হয় না।

জাত ধর্ম সবারই আছে। গাছেরও আছে। শুধু অনাহুত গাছটা শনাক্ত কেউ করতে পারল না। কৗতুহলটা ঘরের চৗকাঠ পেরিয়ে দোতলা তিনতলা। গোটা অ্যাপার্টমেন্টময় ছড়িয়ে পড়ে।

অবশেষে এলেন পরান হালদার। উড়িষ্যার জঙ্গল। আদিবাসীপাড়া। ঝাড়ফুক। তুকতাক। ঘরবন্ধন। ভূত ছাড়ানো। এসবে হাত যশ আছে। সব ছাড়িয়ে পয়সার ঝোলাটা আরও ভারী।

পরান হালদার গাছটা দেখেই অাঁতকে ওঠে। কি সর্বনাশ! এ-তো এক ভয়ংকর বিপদের ইঙ্গিত। গাছটা তোমরা চিনতে পারলে না? –সুনন্দের কৗতুহল বাড়তে থাকে।

–কেন কি গাছ?

–আরে, এ-তো ভূতের বাসস্থান।

–সেটাই তো জানতে চাইছি। এটা কি গাছ? ভূতেরা আবার আলাদা গাছে থাকে না কি?

–থাকে বাবা থাকে। তোমরা শিক্ষিত। এ যুগের ছেলে। ওসব বুঝবে না।

–না, বলছি গাছটার একটা নাম তো আছে?

–আছে বাবা আছে। এটা শ্যাওড়া গাছ। বলে দাঁড়ায় না। পাঞ্জাবির পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখে চাপা দিয়ে হন্ হন্ করতে করতে বের হয়ে যায়। পরানবাবু ভয় পেয়েছে। নাক মুখ দিয়ে সুরুৎ করে ভুতের বাচ্চা শরীরে ঢুকে গেলে আর রক্ষে নেই।।

সুনন্দ ভাবছে। নোট জেলে বন্দি। কবে ছাড়া পাবে কে জানে। ট্যুরিস্টেরের পকেটে নেই টাকা। তাই গাড়ির ঘোরেও না চাকা। নোট বন্দি। না বাক্বন্দি। বাক্বন্দি না জীবনবন্দি। ধ্যাৎ! যত্তসব! ঘরের ভিতরটা কেমন গুমোট হয়ে আসছে। মাথার পেছনটা কেমন ভারী ভারী লাগছে। কোন আগন্তুকের পদশব্দ! সুনন্দ চমকে ওঠে।

একটা কিশোর। বয়স বছর বারো তেরো। খালি গা। পরনে ছেঁড়া হাফ প্যান্ট। গায়ে খড়ি উঠে গেছে। তেল সাবান বহুদিন পড়েনি বোধ হয়। মাথায় শেষ কবে চিরুনি পড়েছিল কে জানে! চোখ দুটো অস্বাভাবিক রকম জ্বল জ্বল করছে। তবু কেমন নিরীহ নিরীহ লাগে।

সুনন্দ ধড়মড় করে উঠে বসে। –আরে রে রে। তুই কোথা থেকে এলি? দরজা তো বন্ধ।

–ওই তো দরজা খুলে।

সুনন্দ ভাবছে বাঁ দিকে ব্যালকনির দরজাটা খোলা। কিন্তু সেদিক থেকে দোতলা উঠবে কি করে! আরও এক ঝলক ভাবে– ডানদিকের দরজা এখনও বন্ধ। লক করা ছিল না হ্যান্ডেল লকটা খুলল। ঢুকল। আবার বন্ধ করল। আমি কিছুই টের পেলাম না। সে যাক্।

–এখানে এসেছিস কেন?

–একটু থাকতে দেবে দাদাভাই?

–তোর বাড়ি কোথায়? নামটাই বা কি?

–জন্ম উড়িষ্যায়। এখন থাকি ফুটপাথে। আর নাম লালু! লালু নায়েক ছিল। এখন যে যা বলে তাই।

–কী করে চলে? মানে খাস কি?

–ভিক্ষা করে। তা-ও ঠিক হচ্ছে না।

তারপরেই লালু পা-দু’টো ধরে বলে– দাও না দাদাভাই একটু থাকতে। আমি তোমাদের সব কাজ করে দেব। এই ধরো হাট বাজার। ঘরের কাজ সব কিছু পারি। ছেলেটার কথায় একটা মাদকতা আছে। সুনন্দ নরম হয়। তারপরই বলে– সবই তো বুঝলাম। কিন্তু তুই এখন যা বাপু! আমার এখন কাজের লোক রাখার সামর্থ্য নেই। আর তা ছাড়া থাকবিই বা কোথায়? আমাদের তো মাত্র তিনটে বেডরুম। লালু মনের ভাব বুঝতে পারে। বলে, –দাদাভাই তোমাদের এঁটো কাঁটা যা দেবে তাতেই আমার হবে। আর থাকার কথা বলছ, সে তোমাদের স্টোররুমেই চলে যাবে। থাকতাম তো ফুটপাথে।

সুনন্দ বিরক্ত হয়। ভাবছে, আচ্ছা মুশকিলে ফেলল তো ছেলেটা। ওকে বোঝাই কি করে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে খাওয়ার মতো অবস্থাতেও আমি নেই।

কথার শব্দে মধুছন্দার ভাত ঘুমটা ভাঙে। হাঁটুর আড়ষ্ঠতা কাটিয়ে সুনন্দর ঘরে ঢুকে বলে, ‘ও মা এ ছেলেটা কে? কী চায়?’

লালু মধুছন্দার পা জড়িয়ে বলে, – মা, ওমা, একটু থাকতে দাও। দাদাভাইকে একটু বলো না। মায়ের মন। ‘মা’ সম্বোধনে গলে জল!

সুনন্দ বিরক্ত হয়ে বলে– আচ্ছা ঝামেলায় পড়া গেল তো। কোথা থেকে এসে কাঙালিপনা করছে। একে কীভাবে বিদায় করি বলো তো?

–থাক। থাক। মা বলে ডেকেছে। ও আমি সামলে নেব। দু’মুঠো কম খেলে আমার কিছু হবে না। তাছাড়া ঘরের কাজ সামলে বাজার হাট করা। এখন শরীর দেয় না। হাঁটুর ব্যথাটাও ইদানীং বড্ড বেড়েছে।

মধুছন্দা আঁচলের খুট থেকে পঞ্চাশ টাকার নোটটা দিয়ে লালুকে বলে– যা তো বাবা এক কেজি চাল আর এই শিশিতে একটু সরষের তেল নিয়ে আয়। লালু কাগজের ঠোঙায় চাল আর তেলের শিশিটা ধরিয়ে দিয়ে কোথায় ফুড়ুত করে হাওয়া। আপতত আর দেখা গেল না।

কাজ কম তাই হিজিবিজি ভাবনাটা বেশি। সুনন্দ ভাবছে। ঘরটা কেমন নির্জন নীরব মনে হচ্ছে কেন? তিন জনের সংসারে এখন চারজন। মামা থেকেও নেই। দুপুরে বেরোয়। গভীর রাতে দুলে দুলে ঘরে ফেরে। অশীতিপর বৃদ্ধ। চলাফেরায় এখন আর বলিষ্ঠতা নেই। লালুটা কখন যে কোথায় থাকে বোঝা ভার। অথচ ডাকলেই হাজির। গোটা ঘরটা এক অদ্ভূত রকমের রহস্যময় লাগছে।

জ্যৈষ্ঠের দুপুর। দূরে একটা তৃষ্ণার্ত কাকের ‘কা’ ‘কা’ শব্দে সুনন্দের গলা শুকিয়ে আসছে। টেবিলের উপর বোতলগুলো সার সার খালি। মাকে বিরক্ত করতে মন সায় দেয় না। ডাকে– লালু একটু আয় তো। সাড়া নেই। এবার তৃতীয় স্বরে– লালু। নিস্তব্ধ। এবার সপ্তমে চড়িয়ে ডাকে– লালু। নাঃ ছেলেটা গেল কোথায় এই ভরদুপুরে। ছেলেটা মনে হয় ঘুমোচ্ছে। স্টোর রুমের দরজাটা খুলতেই আঁতকে ওঠে। উফ্। এ-কি দেখলাম। ক্যাম্প খাটে যেটা শুয়ে আছে সেটা কি? একটা কঙ্কাল! গোটা শরীরটা হিম হয়ে আসছে। পা দুটো অসাড়। কোনওরকমে মাতালের মতো টলতে টলতে নিজের ঘরে ঢুকতেই লালু বলে– দাদাভাই ডাকছিলে? একটু বাইরে গেছিলাম।

সুনন্দের ঠোট দুটো তখনও কাঁপছে। অনেক কষ্টে স্বর বেরোয় –তোর ঘরের খাটে ওটা কী?

–কী?

–একটা কঙ্কাল। ওটা কোথা থেকে এল?

তুই এনেছিস?

–কই না-তো।

চল তো দেখি! পা দুটো তখনও কাঁপছে। সাহসের ভাঁড়ার শূন্য। লালু হাতটা ধরে জোর করেই নিয়ে গেল। দরজা খোলাই ছিল। ক্যাম্প খাটের দিকে তাকাতেই তাজ্জব।

–একি! বিছানা শূন্য। ছাপা বেডশিট পরিপাটি করে সাইড মোড়া। এ বিছানায় আজ কেন, দু’চার দিনেও কেউ গা দিয়েছে বলে মনে হয় না। তাহলে তখন…। বার বার চোখ কচলে নেয় সুনন্দ। অদ্ভুত! সুনন্দ স্তম্ভিত। সমস্ত জমাট বাঁধা রক্ত যেন ঝরঝর করে নীচে নেমে যাচ্ছে। লালু হাতটা ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে বলে– হি হি, হি হি। দাদাভাই তুমি ভুল দেখেছিলে। কাল রাতে মনে হয় ভূতের স্বপ্ন দেখেছ।

মধুছন্দার বয়স বেড়েছে। নানা কাজে ভুল হচ্ছে। রান্না ঘরে ঢুকে অাঁচলের খুট খুলতে গিয়ে কী মনে হয়, চালের টিন খুলেই তাজ্জব! টিন প্রায় ভর্তি চাল। ষোলো কিলোর টিন। তিন দিন খেয়েও টিন প্রায় ভর্তি। তেলের শিশির দিকে তাকিয়ে দেখে সামান্য খালি। কি হচ্ছে এসব! মাথাটা আমার গেছে! এত দিন সংসার করছি…।

লালুকে ডেকে বলে– তোকে কবে চাল আনতে বলেছি, আর ক’কেজি?

–কেন পরশু। এক কেজি চাল এনে দিলাম। দুশো সরষের তেল। মনে নেই মা? কেন?

–তা-তো ঠিক। কিন্তু টিন ভর্তি চাল। তেলের শিশি ভর্তি…।

–তাহলে চাল, তেল সব আগে থেকেই ছিল। তুমি ভুল করেই আবার আনতে দিয়েছ।

–হবেও হয়তো। মধুছন্দা ভাবে। নাই ঘরে চাহিদা বেশি। শুধু নাই নাই মন।

আওয়াজটা প্রথমে মধুছন্দাই পেয়েছে। দাদার ঘর থেকে একটা গোঙানির শব্দ। দৗড়ে গিয়ে দেখে গলা দিয়ে কেমন ঘড় ঘড় আওয়াজ। মুখ দিয়ে কালো রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। উদভ্রান্ত মধুছন্দা সুনন্দকে ফোন করে। সুনন্দ শিগগির ঘরে আয়। তোর মামার শরীর খুব খারাপ।

সুনন্দ বিভ্রান্ত। তর তর করে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে ছুটোছুটি করতে থাকে। যাকে দেখছে বলছে– দাদা একটা অ্যাম্বুল্যান্স জোগাড় করে দিতে পারেন? আচমকাই সুনন্দের নজরে পড়ে গলি দিয়ে এমার্জেন্সি হর্ন বাজিয়ে একটা অ্যাম্বুলেন্স তীব্র গতিতে এগিয়ে আসছে। বাঁদিকের জানালা দিয়ে একটা কচি হাত বার করে ইশারা করছে। সুনন্দ বুঝতে পারছে না। সামনে আসতেই গাড়ি থেকে বেরিয়ে এল লালু। বলে– দাদাভাই আমি রাস্তাতেই খবর পেয়েছি। তাই অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে এলাম।

নার্সিংহোমে যখন পৗঁছোল রাত দশটা। ডাক্তার এস দত্ত বললেন– পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে। রেডি থাকুন।

ভোর রাতে সুনন্দকে ডাক্তার বলে– কে হন ইনি?

– আমার মামা।

– সরি। উই আর কমপ্লিটলি হেল্পলেস।

অনেকদিন পর আজ সুনন্দ ঘুমিয়েছে। যাকে বলে একেবারে সাউন্ডস্লিপ। সেই ঘুমে সুনন্দের সামনে এক ছায়ামূর্তি। ছায়ামূর্তি বলছে – দাদাভাই আমি চলে যাচ্ছি। আমার কাজ শেষ। তবে বিশ্বাস করো। মামাবাবুকে আমি মারিনি। শুধু আমার স্বরূপ দেখিয়েছি। বোধহয় তাতেই…। সেটা তুমি স্টোররুমেই সেদিন দেখেছ। আমি তোমাকে হ্যালুসিনেশনের লেবেল সেঁটে দিয়েছিলাম। এছাড়া আমার কোনও গতি ছিল না। তোমার মামাবাবুর অঢেল টাকা। কলকাতায় দু’টো ফ্ল্যাট, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নিয়ে আনুমানিক প্রায় দশ কোটি। তোমরা হয়তো জানো না। মামাবাবু দুপুরে বেরিয়ে কোথায় যেতেন! রেসের মাঠে। অঢেল টাকা ওড়াতেন। আরও অনেক বাজে অভ্যেস ছিল। অথচ তোমাদের এই সংকটে পাশে দাঁড়াননি। আমি জানি তোমার ব্যাবসা এখন ডুবন্ত নৗকা। অবশ্য একটা মহৎ কাজ তিনি করেছেন। সেটা পরে বুঝবে। আর একটা কথা। টবের গাছেই আমি থাকতাম। টবটা এখুনি ফেলে দাও। গাছটা আমি নিয়ে গেলাম। ভালো থেকো।

সুনন্দ খাটে শুয়ে আছে। ভাবছে। বিষয়- লালুর আগমন নিঃস্্ক্রমণের হেতু। কলিং বেলটা ডিং ডং আওয়াজ। সুনন্দ দরজা খুলতেই কালো কোট প্যান্ট পরা এক অপরিচিত মানুষ। হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। নীরবতা নব আগন্তুকই ভাঙে।

–নমস্কার। আমি অ্যাডভোকেট পার্থ সান্যাল। বারাসাত কোর্টে প্র্যাকটিস করি। এসেছি মধুছন্দা দেবীর কাছে। যদি ভুল না করি আপনি…।

– একমাত্র ছেলে সুনন্দ ঘোষ।

–একটু বসতে পারি?

– ওহ, নিশ্চই।

তাহলে মাকে একটু ডেকে দিন।

অ্যাডভোকেট বলছে– ড. ডি কে বাসু আমার ক্লায়েন্ট। উনি একটা উইল করে গেছেন। ওর সমস্ত সম্পত্তি দান করেছেন। সম্পত্তির আনুমানিক মূল্য প্রায় দশ কোটি। অবশ্য কিছু শর্ত সাপেক্ষে। ওর শেষ জীবনে যে বা যারা দেখভাল করবে সে সম্পত্তি তারই প্রাপ্য। এ-ও উল্লেখ করেছেন বর্তমানে তার বোন শ্রীমতী মধুছন্দা ঘোষ-এর বাড়িতেই বসবাস করছেন। ডিটেলসটা পরে নেবেন। সম্মতি থাকলে প্রসিডিংস-টা স্টার্ট করি?

সুনন্দ ধড়মড় করে উঠে পড়ে। ছুটে যায় ব্যালকনিতে। আশ্চর্য! কালকেও দক্ষিণা হাওয়ায় গাছটার পাতাগুলো পত পত করে দোল খাচ্ছিল। এখন গাছটা শুকিয়ে দড়ি হয়ে আছে। সুনন্দের চোখ দিয়ে ঝর ঝর করে জল পড়ে গাছের গোড়াটা সিক্ত করে দিল।

শুধু একটু ভালোবাসা

বড়দার কাছে মাকে পৌঁছে দিয়ে কিছুটা স্বস্তি বোধ করল শিউলি। এখানে কাজের লোকের সমস্যায় জেরবার হয়ে উঠেছিল। অথচ সে কথাটা কিছুতেই বোঝানো যাচ্ছিল না ওদের, বিশেষ করে বড়োবউদিকে। বড়োবউদির ধারণা এটা শিউলির একটা চাল। কথাটা এরমধ্যেই কানেও এসেছে শিউলির। অদ্ভুত! শিউলি অবাক হয়ে ভাবে, যখনই ও কোনও অসুবিধার কথা বলেছে তখনই এই ধরনের প্রতিক্রিয়া দিয়েছে বড়োবউদি। একা থাকে বলে মাকে দেখার দায়িত্বটা নিতে হয় শিউলিকেই। অথচ এটা তো ওদেরই করার কথা। তবুও করে শিউলি। কারণ মা ওর কাছে এলে একটু প্রাণ খুলে বাঁচতে পারে, দুটো মনের কথা বলতে পারে। মা ওদের কাছে এখন উচ্ছিষ্ট বস্তু, নেহাত ফেলে দিতে পারে না তাই রেখেছে।

মায়ের অবদান ওরা মানে না। বড়দার ডাক্তারি পড়া প্রায় বন্ধ হতে বসেছিল। মা নিজের গয়না বন্ধক রেখে বাবার হাতে টাকা তুলে দিয়ে বলেছিল, আমরা আধপেটা খেয়ে থাকব, কিন্তু ওর পড়া বন্ধ করতে দেব না। বড়দা ডাক্তারি পাশ করল। ধীরে ধীরে যত ওর পসার বাড়তে লাগল, একটা চমকপ্রদ বিলাসবহুল জীবন নাগালের মধ্যে ধরা দিল, বড়দা তত বেশি করে অতীতটাকে ঝেড়ে ফেলতে চাইল। অতীত যেন একটা সিঁড়ি, শুধু ওপরে ওঠার কাজে লাগে। এ কেমন ওপরে ওঠা! ভেবে পায়নি শিউলি।

বখাটে, বাউন্ডুলে মেজদা যখন বন্ধু-বান্ধব আর রাজনীতির চক্বরে পড়ে উচ্ছন্নে যেতে বসেছিল, বাবা হাল ছেড়ে দিলেও মা কিন্তু বুক চিতিয়ে লড়েছিল। একটু একটু করে তুলে এনেছিল ডুবন্ত ছেলেকে। পায়ের তলায় মাটি দিয়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল শক্ত ভূমিতে। মেজদা এখন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে রয়েছে ওর কারবার। সুযোগ পেলেই উপদেশ দেয়, মানুষ নিজেই নিজের ভাগ্যের নির্মাতা। অর্থাৎ ওর ভাগ্যের বাড়বাড়ন্তের মাঝখানে কেউ নেই, কেউ কোনও দিন ছিল না। কত বড়ো বেইমান! ওদের জীবন কাহিনি তো শিউলির জানা। কী করে পারে এত বড়ো মিথ্যে বলতে?

শিউলির ডিভোর্স নিয়েও কম কথা বলেনি ওরা। বড়দা তো সুযোগ পেলে এখনও শোনায়– ডিসিশনটা একটু বেশি তাড়াতাড়ি নিয়ে ফেললি বুড়ি… আর একটু ভাবতে পারতিস।

বড়দার সাথে সমান ভাবে তাল মিলিয়ে গেছে বড়োবউদি, মেজদা, মেজবউদি। আত্মীয়স্বজন, পাড়া প্রতিবেশী সবাইকে বলে বেড়িয়েছে, দোষটা আসলে শিউলির-ই। সুযোগ বুঝে দেবদাস নিজেকে দেবদূত প্রতিপন্ন করার সব চেষ্টাই করে যাচ্ছে। ওদের সাথে দেবদাসের এখনও যোগাযোগ আছে, জানে শিউলি। পর হয়ে গেছে শিউলিই। বড়দা, মেজদা কেউই দরকার ছাড়া কথা বলে না শিউলির সাথে। দরকার বলতে অবশ্য একটাই, সেটা হল মা। মায়ের জন্য ওদের ফরেন টুর আটকে যায়, ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার ভীষণ ক্ষতি হয়। স্বাভাবিক আনন্দ উৎসবে একটা বিষাদের ছায়া হয়ে সব আনন্দটাকে শুষে নেয় মা। সেই বিষাদমূর্তিকে শিউলির ঘাড়ে চাপিয়ে ওরা মাঝেমধ্যে একটু আনন্দ উপভোগের অবকাশ পায়। মায়ের মৃত্যুর সাথে সাথে শিউলির এই কদর এক লহমায় ধূলিসাৎ হবে জানে শিউলি।

বলার কিছুই নেই, তবুও বড়ো বউদি খোঁটা দিতে ছাড়ল না– ‘মা ছেলের কাছে আসবে, থাকবে, এ তো ভালো কথা। এই কর্তব্য তো করতেই হবে। তোমার দাদাও সে কথা বলে। কিন্তু বলতে বাধ্য হচ্ছি শিউলি, তোমার মায়েরও কিছু দোষ আছে গো। সব ব্যাপারে নাক না গলিয়ে উনি থাকতে পারেন না। সংসারটা আমাকে সামলাতে হয়। হঠাৎ করে উনি মাঝখানে না বুঝেশুনে মন্তব্য করে বসলে কেমন লাগে বলো তো?’

শিউলি জবাব দিতে গিয়েও থেমে গেল। মাকে ভালো করেই চেনে শিউলি। একসময় স্কুলের দিদিমণি ছিল। যথেষ্ট ব্যক্তিত্বময়ী মহিলা। সেই তুলনায় বিদ্যে ও ব্যক্তিত্বের দৗড়ে অনেক পিছিয়ে বড়োবউদি ও মেজবউদি দুজনেই। আর এখানেই বউদি-দের সমস্যা। মায়ের ব্যক্তিত্বের মোকাবিলা করতে না পেরে এভাবে বদনাম করে বেড়ায়।

বড়োবউদির পক্ষ নিয়ে বড়দা বলল– ‘কথাটা সত্যি রে। মা আজকাল কেমন জানি হয়ে গেছে। সব কিছুতেই বড্ড বেশি রিআ্যক্ট করে। আরে বাবা, তোমার বয়স হয়েছে, খাও দাও, রেস্ট করো। সব কথার মাঝখানে যাওয়ার কী দরকার? যাইহোক যাওয়ার আগে সেই কথাটা মাকে একটু ভালো করে বুঝিয়ে দিয়ে যাস।’

এসব কথা মাকে বলার প্রয়়োজন বোধ করেনি শিউলি। বলা মানে ওদের মিথ্যেটাকে প্রশ্রয় দেওয়া। কেন বলবে এসব?

প্রণাম করে বেরিয়ে আসার সময় মায়ের সজল চোখের দিকে তাকিয়ে বুকের ভেতর কেমন জানি করে উঠল। কোনওরকমে বলল– ‘লেখাটা থামিও না মা। আমি পৌঁছে ফোন করব।’

শিউলির স্কুলটা কলকাতা থেকে ঘণ্টা তিনেকের পথ। এমন একটা দূরত্ব, না ডেইলি প্যাসেঞ্জারি করা যায়, না ওখানকার গ্রাম্য পরিবেশে থাকা যায়। শেষপর্যন্ত স্কুলের কাছাকাছি একটা গঞ্জ এলাকায় বাড়ি ভাড়া নিয়েছে দুজনে মিলে। ইচ্ছে করলেই ছুটির দিনগুলোতে কলকাতায় আসতে পারে। কিন্তু আসে না। উঠবে কোথায়? ডিভোর্সের পর নিজের ঘর বলতে তো আর কিছু নেই। বড়দা বা মেজদার বাড়িতে থাকার প্রশ্নই ওঠে না। ওরাও সেটা বোধহয় চাইবে না। সব মিলিয়ে শিউলি এখন কলকাতা থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন বলা যায়।

সুধাদেবী ব্যালকনিতে দাঁড়িয়েই রইলেন যতক্ষণ না শিউলির গাড়ি গলি পেরিয়ে বড়ো রাস্তায় অদৃশ্য হল। মেয়েটা চলে গেল। বেশ কিছুক্ষণ একটা অসীম শূন্যতা গ্রাস করে রাখল সুধাদেবী-কে। মেয়েটা তার অন্য রকম। ছেলে দুটোর মতো স্বার্থপর, বিবেকহীন নয়। তবু মেয়ে তো ! ওর কাছে থাকতে মন চাইলেও উপায় থাকে না। ওর দিকটাও দেখতে হয়। ওর অসুবিধাগুলো নিজের চোখে দেখে এসেছেন সুধাদেবী। স্থায়ী কোনও কাজের লোক নেই। ঠিকে কাজের মেয়েটা অসম্ভব কামাই করে। এই অবস্থায় শিউলি চাকরি সামাল দেবে, না মায়ের সেবা করবে? তবুও ওর মধ্যেই যথাসাধ্য করে যাচ্ছিল। কিন্তু সুধাদেবীরই ভালো লাগছিল না। জেদটা তিনিই ধরেছিলেন। নিজের সুখের জন্য ওকে কষ্টে রাখতে মোটেও ভালো লাগছিল না।

একসময় অলস পায়ে ঘরে এসে ঢুকলেন। কিছুই ভালো লাগছিল না। বারবার শিউলি আর মণিদীপার কথা মনে পড়ছিল। ওর স্কুলের আর এক দিদিমণি। ওরা দুজনে মিলেই একটা বাড়ির দুটো পার্টে ভাড়া নিয়েছে। মণিদীপা শিউলির চেয়ে বছর তিন চারেকের বড়ো। ভারি আন্তরিক স্বভাবের মেয়ে। ওর বাড়ি ঘর, স্বামী, সন্তান সবই আছে। কিন্তু দূরত্বের কারণে ভাড়া নিতে হয়েছে। ছুটির দিনগুলো বাড়িতে কাটিয়ে আসে। ওই মেয়েটা-কেও ভালোবেসে ফেলেছেন সুধাদেবী। আসার সময় কান্না চেপে রাখতে পারেননি। মণিদীপাও কাঁদছিল।

এখন আর বেশি কথা বলেন না সুধাদেবী। অবসর সময় লেখালেখি করেন। একটা সময় লেখার অভ্যাস ছিল। মাঝখানে ছেদ পড়ে গিয়েছিল। শিউলির তাগিদেই আবার শুরু। সেসব সত্যিকারের সাহিত্য হয়ে ওঠে কিনা বুঝতে পারেন না। তবে লিখতে ভালো লাগে। মনের জমে থাকা কথাগুলো একটা পথ খুঁজে পায় যেন। শিউলি পড়ে। পড়ে বলে, দারুণ লিখেছ মা, আরও লিখে যাও। হয়তো মন জোগানোর জন্য বলে। তবুও সুধাদেবী খুশি হন।

সুধাদেবীর এই পরিবর্তন দেখে তার বড়োবউমা তো হেসেই অস্থির! ছেলেরাও…

–খাতা ভর্তি করে এসব হিজিবিজি কী লিখছেন মা?

সুধাদেবী হাসেন– ওসব তুমি বুঝবে না মা। আমিও কী সব বুঝি? মন বলে, আমি লিখে যাই। সব সময় বকবক করার চেয়ে তো ভালো। এই জগতের মধ্যেই এ এক আলাদা জগৎ যেন। চাইলে তুমিও পড়তে পারো।

–দূর… ওসব পড়ার সময় কোথায় আমার?  ওতে আপনি কী লিখবেন সেটা তো বুঝতেই পারছি। নিশ্চয়ই আমাদের নিন্দা দিয়ে ভরিয়ে রেখেছেন। আমরা আপনাকে কতভাবে কষ্ট দিই এই সবই তো?

–তোমাদের নিন্দা গাথা লিখে আবার তোমাদেরকে সেটা পড়তে দেব… এটুকু বোধও তোমার কাজ করল না? না পড়েই তুমি অদ্ভুত একটা মন্তব্য করে দিলে। ওসব কথা আমি লিখিনি। কেন লিখব? তোমাদের নিন্দে করা মানে তো আমার নিজেকেই নিন্দে করা। এই বয়সে এসে আর জীবনটাকে নীচে নামাতে ইচ্ছে করে না। যদি কোনওদিন মনে হয়, একটু পড়ে দেখো। আসলে আমার লেখার মধ্যে দিয়ে আবার একবার নিজেকে দেখার চেষ্টা করে যাচ্ছি। পুরোনো আমিটাকে দেখতে গিয়ে দেখছি, সারা জীবনে কত না ভুল করেছি!

–বাববা… এইটুকু লিখেই তো দেখছি আপনার মাথা ঘুরে গেছে। এসব পোকা কী শিউলি আপনার মাথায় ঢুকিয়েছে?

–যদি ঢুকিয়েই থাকে অন্যায় তো কিছু করেনি। সবদিক থেকেই ভালো হয়েছে। মাঝখানে আমি কেমন জানি হয়ে গেছিলাম! তোমাদের অহেতুক বিরক্ত করতাম। তখন বুঝতাম না, এখন একটু একটু করে তফাতটা বুঝতে পারছি। ভালো করে বেঁচে থাকতে হলে নিজস্ব একটা জগৎ তৈরি করে নিতে হয়। শিউলি সেটাই শিখিয়েছে আমাকে। শিউলির জায়গায় তুমিও হতে পারতে সেটা। সব সময় মা-ই যে শেখাবে এমন তো কোনও কথা নেই। কখনও কখনও মেয়েরাও মাকে অনেক কিছু শিখিয়ে দিতে পারে।

–আপনারা দুজনেই স্কুলের দিদিমণি, কত কিছু জানেন। আমরা তো আবার ওসব হতে পারিনি। ঘরদোর, সংসার, ছেলে-পুলে এসব নিয়েই কাটিয়ে দিলাম। শিউলি একদিক থেকে ভালোই করেছে। একটা মুক্ত, স্বাধীন জীবনযাপন করতে পারছে। নিজের মতো যেমন খুশি চলতে পারছে। বাধা দেওয়ার কেউ নেই।

ইঙ্গিতটা ধরতে অসুবিধা হল না সুধাদেবীর। নোংরা ঘেঁটে যার আনন্দ, তার মন সব কিছুতেই নোংরা দেখে। সুধাদেবী কোনও কথা বললেন না। এসব কথার কোনও প্রতিবাদ হয় না। প্রতিবাদ করতে গেলে সেটার অন্য ব্যাখ্যা করে এক্ষুনি কাদার মধ্যে নামিয়ে আনা হবে, জানেন সুধাদেবী। হয়তো সেটাই চাইছে তার বড়োবউমা। কিন্তু সতর্ক সুধাদেবী আজ সেই সুযোগটা দিলেন না।

দেবদাস এখন এ বাড়িতে নিয়মিত আসা যাওয়া করছে।

খাওয়া-দাওয়া, হই-হুল্লোড়, সবকিছুতেই ওর ডাক পড়ে। সুধাদেবীর কয়েক মাস অনুপস্থিতির সুযোগে ওরা এটা নিয়ম বানিয়ে ফেলেছে। সুধাদেবী অবাক হন। কেমন ভাই তোরা? যে-ছেলেটা তোদের বোনকে অপমান করে ডিভোর্স দিল, তার সাথেই তোরা এভাবে মেলামেশা করছিস? বোনের মনে কতটা কষ্ট হবে একবারও ভেবে দেখলি না? বউমাদের আদিখ্যেতা দেখলে মনে হয় ওরা ইচ্ছে করেই আরও বেশি করে এসব করছে।

সুধাদেবী ওদের পাতা ফাঁদে পা দিলেন না। এখন কিছু বলতে যাওয়া মানেই ওদের হাতে ঝগড়ার উপাদান তুলে দেওয়া এবং সবশেষে সবার কাছে ‘দজ্জাল বুড়ি’ হিসেবে নিজেকে প্রতিপন্ন করার সুযোগ করে দেওয়া। হঠাৎ সুধার মনে হল, শিউলি কী এসব জানে? আজ না জানলেও একদিন তো ঠিক জানতে পারবে। তখন? সেদিন অসম্ভব কষ্ট পাবে মেয়েটা। বউদিরা না হয় পরের মেয়ে, কিন্তু নিজের দাদারা কী করে এতটা নিষ্ঠুর হতে পারে? এমন ছেলেদের পেটে ধরেছিলেন তিনি? কেমন জানি অসহায় লাগে সুধাদেবীর।

কিন্তু সহ্যের তো একটা সীমা থাকে। সেটারই বাঁধ ভেঙে গেল একদিন। শিউলিকে নিয়ে ওরা সেদিন ওনার সামনেই যা নয় তাই শুরু করে দিল। নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলেন না সুধাদেবী। নিজের ছেলে বউমাদের না ধরে সরাসরি দেবদাসকেই ধরলেন। –তুমি কেমন ধরনের ছেলে বাবা! লজ্জা শরম বলে কী কিছুই নেই তোমার শরীরে? এভাবে এই বাড়িতে তোমার আসাটা কি ঠিক বলে মনে করো তুমি? কোন সম্পর্কের ভিত্তিতে তুমি এখানে আসো? একসময় তুমি আমাদের জামাই ছিলে, এখন তো নেই তাই না?

দেবদাস রাগ দেখাল না। খুব শান্ত ভাবে মাথাটাকে হেলিয়ে ঠোঁটের কোণে একটা দুষ্টু হাসি খেলিয়ে বলল– ‘এসব কথা আমাকে না বলে ওনাদের-কে বলুন না। বড়দাই তো আমাকে ডেকে আনেন। আমি যে ইচ্ছে করে আসি তা কিন্তু নয়।’

সুধাদেবী বড়োছেলে তথাগতের দিকে তাকালেন।

তথাগত ভীষণ অপ্রস্তুত। বড়োবউমা সুতপা অবস্থা বেগতিক দেখে ড্যামেজ কন্ট্রোলে নেমে পড়ল। –আপনি বোধহয় ভুলে গেছেন মা, দেবদাস একজন মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ। ডাক্তারদের সাথে মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ-দের একটা সম্পর্ক থাকে। বিজনেস ফিল্ডে দেবদাসের খুব নাম। আপনার মেয়ে ওর সাথে সম্পর্ক রাখতে পারেনি। তার দায় আপনি সবার ওপর চাপিয়ে দিতে পারেন না। দেবদাস তবুও নানা ভাবে আপনার ছেলেকে হেল্প করে। নেহাত ওর বড়ো মন তাই।

সুধাদেবী ভীষণ অবাক হন। বিজনেসের সম্পর্ক আর পারিবারিক সম্পর্ক এক হল! কথাগুলো শিউলিকে আর না জানিয়ে পারলেন না। অন্য লোকের মুখে শোনার চেয়ে নিজের মায়ের মুখেই শুনুক নির্মম সত্যটা। ফোনে সবটাই খুলে বললেন।

সব শুনে শিউলি হেসে বলল– ‘আমি সব জানি মা। তুমি এসব নিয়ে মন খারাপ কোরো না। কাউকে কিছু বলতেও যেও না।’

সুধাদেবী অবাক হয়ে বলেন– ‘কার মুখে শুনলি তুই এসব? কে বলল?’

–বড়োবউদিই বলেছে। বলে অনেক আনন্দও পেয়েছে। আসলে দেবদাস ওদের কোম্পানি থেকে বড়দাকে একটা ইউরোপ টুরের বন্দোবস্ত করে দিচ্ছে। পুরো ফ্যামিলি সমেত। সমস্ত খরচা ওরাই দেবে। তার জন্যেই এত খাতির যত্ন। হয়তো মেজদাও কিছু সুযোগ পাবে। শুধু তাই নয়, ওরা সবাই মিলে দেবদাসের জন্য একটা পাত্রীরও সন্ধান করেছে। বড়োবউদি যে-পাত্রীর খবর দিয়েছে, ঘটনাক্রমে মেয়েটি আমার চেনা। ওরা অবশ্য সেটা জানে না। ওই মেয়েটাই ফোনে আমার সাথে যোগাযোগ করেছিল। গল্পের ছলে জানতে চাইছিল, ডিভোর্সটা কেন হয়েছিল।

–তুই কী বললি? সত্যিটাই বলে দিয়েছিলি তো…?

–আমি শুধু বলেছি, এসব প্রশ্ন আমাকে কোরো না, কারণ আমার উত্তর তোমার কাছে একতরফা লাগবে। ওর সাথে কথা বলে যেটুকু বুঝলাম তাতে বড়দা, বড়োবউদি ডিভোর্সের সমস্ত দায় আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে ভালো রকমের ব্রেন ওয়াশ করে দিয়েছে। তারপরে অবশ্য আর কোনও প্রশ্ন করেনি। তবুও বিয়েটা যদি কোনও ভাবে ভেঙে যায়, দোষটা ঘুরেফিরে আমার ঘাড়েই এসে পড়বে জানি। আমার কপালটাই বোধহয় এমন!

কিছুক্ষণ কোনও কথা বলতে পারলেন না সুধাদেবী। ফোনের ওপার থেকে ক্লিষ্ট হাসি হেসে শিউলি বলল– ‘বুঝতে পারছি এসব দেখেশুনে তুমি খুব কষ্ট পাচ্ছ। কিন্তু এটাই তো সত্যি মা। সত্যি নির্মম হলেও তাকে মেনে নিতেই হয়। তোমার মেয়ের ভাগ্যটাই যে এমন! তবে বেশি ভাবার কিছু নেই। আমি তো একেবারে জলে পড়ে নেই। দু-মুঠো অন্ন সংস্থানের ব্যবস্থা তো আছে। কেউ তোমার মেয়েকে মাটিতে ফেলে পিষে অন্তত মারতে পারবে না। লতানো গাছেরাও পৃথিবীতে বেঁচে থাকে মা।’

সুধাদেবী অসহায় ভাবে বললেন– ‘কিন্তু একটা অবলম্বন লাগে তাদের… বাড়তে, ফুল দিতে, ফল দিতে। আমি বলি কি, তুই একটা বিয়ে করে নে মা। দেবদাস যদি করতে পারে, তবে তুই কেন পারবি না?’

শিউলি হেসে বলল– ‘তুমি কী আমাকে প্রতিযোগিতায় নামাতে চাইছ?’

তারপরেই অন্যমনস্ক ভাবে বলল– ‘বিয়ে মানে তো দেবদাসের মতো পুরুষের সাথে একটা বন্দোবস্ত। যে-বন্দোবস্তে একতরফা ভাবে কতকগুলি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পরাজিত পক্ষের মতো মেয়েদের-কেই সব সময় চুক্তির সমস্ত শর্ত মেনে নিতে হয়। না মানলেই শর্ত লঙঘনের দায় চাপিয়ে চলে পেষণ। তবে এটাও মানি, সহমর্মী পুরষেরাও এই পৃথিবীতেই থাকে। যদি কখনও তেমন কারও সাথে দেখা হয়ে যায়… অবশ্যই বিয়ে করব।’

সুধাদেবী আর কোনও কথা বললেন না। অদ্ভুত একটা অনুভূতি খেলে গেল তার মস্তিষ্কে। তার মনে হল, আর একটা সুধা যেন তার মধ্যে থেকে বেরিয়ে নিঃশব্দে চলে গেল বহু দূরে শিউলির ঘরে। শিউলির মাথায় হাত রেখে সে পরম মমতায় বলল, ‘অন্তরের টান থাকলে মানুষ সব পায়। অন্তরের শক্তিই তাকে সব এনে দেয়। টাকা, গাড়ি, বাড়ি নয়… তুই শুধু একটু ভালোবাসা চেয়েছিস। ঠিক পাবি মা! এ আমার আশীর্বাদ। মায়ের আশীর্বাদ কখনও বিফলে যায় না।’

আবার আমরা বন্ধুরা

ছোটোবেলার বন্ধুরা এক এক করে সবাই দূরে সরে যাচ্ছে। ছুটির দিনের আড্ডাটা এখন আর বসে না। দিনে দিনে নিঃসঙ্গতা চেপে ধরছে সুজনকে। অনির্বাণ, ব্রজেশ সেই কবেই দূরে সরে গিয়েছে। বছর দুই হল ফারুকও আর আড্ডায নেই। পুরোনো বন্ধুদের কথা, একসঙ্গে কাটানো দিনগুলোর কথা, আজকাল খুব মনে পড়ে সুজনের।

পুরুলিযার অযোধ্যা পাহাড়, বাগমুন্ডি, চড়িদা, সুন্দরবনের ধুচুনিখালি, কোরাকাটি, সন্দেশখালি, মরিচঝাঁপি, কিংবা ডুযার্সের চালসা, সামসিং, সান্তালেখোলা কত জাযগায যৌবনের দস্যিপনায চষে বেড়িয়েছে একসঙ্গে। সব যেন মনে হয়, এই তো সেদিনের কথা। দেখতে দেখতে বযসটা যে আটান্নতে পৌঁছে গিয়েছে, খেযালই হয়নি!

প্রায় আটত্রিশ বছর আগে বন্ধুত্বের শুরু। হোস্টেল-এর দিনগুলো কেমন যেন জুম ইন করে চোখের সামনে চলে আসে। একটুও ফিকে হয়নি সেই সুখের মুহূর্তগুলো। রং-বেরঙের খুশি, দুষ্টুমি ভরা ঘটনা, সব মনের পর্দায চলচ্ছবি হয়ে এসে সুখের অনুভতিতে ভরিযে দেয়। একাকী অন্ধকার ঘরে চোখ বুজলেই, অতীত স্মৃতিগুলো নড়েচড়ে বসে বন্ধুদের কাছে নিয়ে আসে। অনির্বাণ, ব্রজেশ, ফারুক সবাই তখন তার চারপাশে ঘিরে এসে বসে। হোস্টেল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি শেষে চাকরি জীবন, কত না ঘটনা গল্পে জুড়ে যায়।

বন্ধুদের মধ্যে অনির্বাণ ছিল সবথেকে হ্যান্ডসাম। ছয ফুট এক ইঞ্চি লম্বা, সুন্দর পেটানো স্বাস্থ্য। সুন্দর মুখে উজ্জ্বল হয়ে থাকা হাসি। অনির্বাণই সবার আগে চাকরি পেয়েছিল। সেরিকালচার অফিসার, কালিম্পং-এ পোস্টিং। ছুটি পেলেই চলে আসত বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে। অফিসের নেপালি সুন্দরী সহকর্মীর সঙ্গে প্রেমের গল্প শোনাত বন্ধুদের। তার ওখানে বেড়াতে যাওযার আমন্ত্রণ জানাত। শুনে শুনে বন্ধুদের বুক জ্বলত। বেকারদের হাতে তখন পযসা কোথায! কারওরই স্টাডি কমপ্লিট হয়নি, ফারুক ছাড়া আর কারওর গার্লফ্রেন্ডও নেই।

অনির্বাণ সাযে্নস-এর পাস কোর্সে পড়ত, ফারুকও তাই। ওরা একই ক্লাসের কলেজ-পড়ুযা ছিল। ব্রজেশের কেমিস্ট্রি অনার্স আর সুজনের ছিল বোটানি অনার্স। ওদের মধ্যে ফারুক ছিল সব থেকে প্রাণবন্ত। নিয়ম ভাঙার সব কিছু ওর কাছেই শেখা। সেই সমযে ও ছিল অন্যদের থেকে অনেকটা এগিয়ে সবার আগে কোরিযান জিনস ওই কিনেছিল ফ্যান্সি মার্কেট থেকে। আর জাতি ধর্ম নির্বিশেষে ওর ছিল অগুনতি গার্লফ্রেন্ড।

(দুই)

পুরোনো স্মৃতিটা উস্কে দেয ব্রজেশ। মনে আছে সেই ঘটনাটা ফারুকের কোনও এক বান্ধবীর বাবা নেভিতে চাকরি করতেন। সেই বান্ধবী এক বোতল বিদেশি হুইস্কি প্রেজেন্ট করেছিল। অতি যত্নে ফারুক একটা ছোটো ব্রিফকেস-এ ঢুকিযে তালাবন্দি করে লুকিযে রেখেছিল সেটা। হুইস্কির ঘটনাটা সবাই জানত কিন্তু জিনিসটা যে কোথায লুকানো আছে, জানত না কেউ। কোনও এক বিশেষ দিনেই নাকি সেটা খোলা হবে! কিন্তু ব্রজেশ আর অনির্বাণের দেরি সহ্য হচ্ছিল না।

ফারুকের অনুপস্থিতিতে সুযোগ পেলেই অন্য বন্ধুরা সেটা খুঁজে বের করার চেষ্টা করত। এক শীতের রাতে ফারুক তখন ডিনারে গিয়েছে, এদিক ওদিক খুঁজতে খুঁজতে সুজন ফারুকের বেডের নীচে লম্বা ড্রযারের মধ্যে বইপত্র, জামা কাপড়ের পিছনে খুঁজে পেল খবরের কাগজে মোড়া ব্রিফকেসটা। হাতে নিয়ে নাড়িযে তার মধ্যে হুইস্কির বোতলের উপস্থিতি প্রায় নিশ্চিত হল। ফারুক ঘরে ফেরার আগেই সুজন আর ব্রজেশ ব্রিফকেস নিয়ে দিল চম্পট। খবর পেযে ফারুক আর অনির্বাণ ধাওযা করেছে ওদের। শীতের কনকনে ঠান্ডায মাঝরাত্রিতে হোস্টেল-এর সামনের ফুটবল মযদানে, এপাশ থেকে ওপাশ ব্রিফকেস বুকে জড়িযে ছুটছে সুজন। সাথে সাথে ছুটছে ব্রজেশ। তাদের পিছনে পিছনে অনির্বাণ আর ফারুক। এক সময ফারুক ধরেই ফেলল ব্রিফকেসের হ্যান্ডেলটা। সেই অবস্থাতেই ছুটছে সুজন। টানাটানি জোরাজুরিতে হ্যান্ডেল খুলে চলে এল ফারুকের হাতে, আর সে সজোরে আছড়ে পড়ল মযদানে। অনির্বাণ তাড়াতাড়ি টেনে তোলে ফারুককে।

আবার ছুট… দৌড়াতে দৌড়াতে হাঁপিযে উঠেছে সুজন-ব্রজেশ। দাঁড়িযে পড়ে ওরা। এবার ব্রিফকেস নিয়ে টানাটানি, একদিকে ব্রজেশ-সুজন অন্যদিকে অনির্বাণ-ফারুক। টানাটানিতে ব্রিফকেস খুলে, পড়ে ভেঙে গেল হুইস্কির বোতল। সবাই চুপ, যেন দোষীরা সব কাঠগড়ায দাঁড়িযে ফারুকের কি সে ভীষণ মন খারাপ! তার মধ্যেই আবার সকলে মিলে টর্চ জ্বেলে মযদান থেকে একটা একটা করে ভাঙা কাচের টুকরো তুলে পরিষ্কার করতে হল। সকাল হলেই যে এই মাঠেই দৌড়াতে, খেলতে হবে সকলকে।

এরপর ফারুক দুদিন কথা বলেনি কারও সঙ্গে। সুজন ফারুকের ঘরে গিয়ে কান ধরে উঠ-বস করে এসেছে, তা-ও না। ফারুকের পচ্ছন্দের হরিদার দোকানের মোগলাই পরোটা এনে খাওযানোর পর রাগ কমেছিল। আবার সম্পর্ক স্বাভাবিক। হোস্টেল-এর নেড়া ছাদে উঠে চারজনে মিলে জমিযে তাস খেলা। এমনই ছিল বন্ধুত্ব। ওরা কেউই কিন্তু মদ্যপানে আসক্ত ছিল না। এটা একটা অনাস্বাদিত বস্তুর প্রতি কৌতূহলী আকর্ষণ। যাক বোতলটা পড়ে ভেঙে ভালোই হয়েছিল।

(তিন)

হোস্টেল জীবনটা ছিল একটা স্বঅভিভাবকত্বের সংসার। এখানে ছিল না কোনও হোস্টেল সুপারিন্টেন্ডেন্ট, না ছিল কোনও অ্যাডমিনিস্ট্রেশন-এর নজরদারি। ছাব্বিশটা ঘরের দোতলা হোস্টেল। বাহান্নজনের বাস, সকলেই স্বঅভিভাবক। হোস্টেল-এর বাহান্নজনের সকলেই এসেছে ১৯৭৮-৭৯ তে। ব্রজেশ আর কযেজন মিলে ১৯৭৮-এ প্রথম হোস্টেলকে নতুন ভাবে চালু করেছিল। ওদের বন্ধুবান্ধবরাই পরে এসে একে একে সংখ্যা বাড়িয়েছে।

সুজন এসেছিল ব্রজেশের যোগাযোগে, ওরা হাযার সেকেন্ডারিতে এক সঙ্গে পড়ত। শুনেছে, ১৯৭১-এর রাজনৈতিক অস্থিরতার সমযে কোনও এক ভোরবেলায কেযারটেকার পাম্প চালাতে গিয়ে দেখে, হোস্টেল-এর পিছনের দিকে পাম্প হাউসের পাশে এদিকে ওদিকে ছড়িযে পড়ে রয়েছে পাঁচটা ডেডবডি। রাত্রিতে কোথাও মার্ডার করে ওদের ওখানে ফেলে রেখে গিয়েছে। অন্ধকার না কাটা ভোরে খবর পৌঁছে গেল ঘরে ঘরে। পুলিশি ঝামেলার ভযে আতঙ্কিত হয়ে তখনই যে-যার মতো ঘর খালি করে পালাল হোস্টেল ছেড়ে। ঘরে ঘরে আলো জ্বলছে, পাখা চলছে।  পোড়ো হোস্টেলটায় কেউ আর পা মাড়াযনি সাত-আট বছর। কলেজ অফিসিযাল বা ইলেক্ট্রিক অফিসের কেউ-ই আর আসেনি এদিকে।

রাজনৈতিক পালা বদলের পরে শান্ত সময়ে ১৯৭৮-এর শেষ দিকে ব্রজেশ আর অন্য কযেজন কলেজের দূরের ছাত্র, সাহস করে হোস্টেল খুলে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করিযে থাকতে শুরু করে। হোস্টেল ফিস দিতে হয় না, কোনও ইলেকট্রিক বিল আসে না তাই তাও দিতে হয় না। নিজেদের খাওযার খরচাটাই একমাত্র খরচা। এমন মজার জাযগা কার না পছন্দ!

ব্রজেশ প্রথমে হোস্টেল-এ এসেছিল বলে এলাকার লোকজনের সঙ্গে ভালো পরিচিতি তার। তাছাড়া ডাকাবুকো ব্রজেশের মধ্যে একটা দাদা দাদা ভাবও ছিল। ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান-এর ফুটবল খেলা টিভিতে দেখার জন্য ব্রজেশের সঙ্গে ফুটবল মাঠের শেষ কোণায মোহনদার বাড়ি যেত সুজনরা। মোহনদার বাড়ির সকলে মোহনবাগান-এর সমর্থক আর হোস্টেল-এর ওরা ইস্টবেঙ্গল সমর্থক।

খেলা শুরু হতেই দুপক্ষের চিৎকার চ্যাঁচামেচি শুরু। মোহনদার মা ছিলেন বড়ো ভালো মানুষ। সকলকে আদর করে বসিযে মুড়ি চানাচুর খাওযাতেন। সুজনের মনে পড়ে, মোহনদাদের বাড়িতে একটা বড়ো লিচুগাছ ছিল। লিচুর সময লিচুর থোকাগুলো কাপড় দিযে বেঁধে রাখত, যাতে পাখিতে বা বাদুড়ে না খেতে পারে।

এরকম সমযে একদিন সকালে দেখা গেল ফারুক-অনির্বাণ ব্যাগ ভর্তি লিচু নিয়ে হোস্টেল-এর সকলকে লিচু বিতরণ করছে। কেউ জিজ্ঞাসা করতে ফারুক বলল, কাল মামারবাড়ি থেকে দিয়ে গিয়েছে। রাত্রিতে সময পাইনি, তাই সকালে…। লিচু পেযে তো সকলেই বেশ খুশি। কিন্তু সে খুশি বেশিক্ষণ স্থাযী হল না।

সেদিনই বিকেলে সুজনরা সাত-আট জন মিলে মোহনদার বাড়ি গিয়েছে খেলা দেখতে। সেই দলে ফারুক, অনির্বাণও আছে। মোহনদাও সেদিন বাড়িতেই ছিল কিন্তু মেজাজটা যেন ঠিক ভালো নেই। মোহনদার মা মন খারাপ করে এসে বললেন, জানো তো বাবা, কাল একদল বদমাইশ ছেলে মাঝরাত্রিতে সব লিচু চুরি করে নিয়ে গিয়েছে। ভেবেছিলাম তোমাদের সকলকে এবার লিচু খাওযাব, সে আর পারলাম না।

সুজন মুখ ফসকে বলেই ফেলছিল, না মাসিমা আজই তো লিচু খেয়েছি। ফারুক পিছন থেকে জোরে চিমটি কাটে। সুজন পিছন ঘুরতে ইশারায চুপ করতে বলে। সেদিন হস্টেলে ফিরে সুজন, ব্রজেশ-এর সঙ্গে ফারুক আর অনির্বাণ-এর হেভি ঝামেলা। শালা যার বাড়িতে প্রতিদিন টিভি দেখতে যাচ্ছিস তার বাড়িতেই চুরি। নিমক হারাম। আরও কত কী খারাপ খারাপ কথা।

অনির্বাণ বলে, সে গাছে চড়েনি, নীচে টর্চ হাতে দাঁড়িযে ছিল।

ব্রজেশ প্রশ্ন করে, তবে লিচুগুলো কুড়োল কে?

ফারুক মিনমিনে গলায় বলে, জগন্নাথ আর মাধব ছিল সাথে।

ব্রজেশ আরও ক্ষেপে যায়, দলটা বেশ বড়োই বানিয়েছিস। এবার তাহলে ডাকাতি করতে নেমে পড়। মোহনদাকে সব বলব আমি, তোদের টিভি দেখার পাট চুকাব।

ফারুক, অনির্বাণ, ব্রজেশের হাতে পাযে ধরে মিনতি করে, না বলার জন্য। ব্রজেশ শর্ত দেয, সব ঘর ঘুরে ঘুরে যার কাছে যতগুলো লিচু বেঁচে আছে সেগুলো জোগাড় করে নিয়ে আসতে হবে। ওগুলো সে মোহনদাদের বাড়িতে গিয়ে দিযে আসবে। বলবে, চোরেরা একটা লিচুর ব্যাগ হোস্টেল-এর পিছন দিকে ফেলে গিয়েছিল, সেটা নিয়ে এসেছে। সে রকমই হল। কিন্তু মোহনদা বোধহয় কিছু একটা আঁচ করতে পেরেছিল।

পরের দিন দলশুদ্ধ খেলা দেখতে গেলে বলে দিল, খেলা দেখা যাবে না, টিভি খারাপ। তারপর আর টিভি ঠিক হল কিনা খবর পাওয়া গেল না। টিভি তে খেলা দেখার পাটও উঠল।

(চার)

কলেজ পাশ করার পর সবাই আলাদা হয়ে গেল হাযার স্টাডিজের জন্য। মাঝেমধ্যে চিঠিতে যোগাযোগ হতো। তবে পুজোর ছুটিতে, বড়োদিন আর নিউ ইযারের ছুটিতে সকলে মিলে নির্ঘণ্ট মেনে আড্ডা দেওয়াটা ছিল অনিবার্য। একসঙ্গে ঘোরা, খাওয়া, আড্ডা সব মিলিযে পুরোনো হোস্টেল-এর দিনগুলো যেন আবার ফিরে আসত তখন। অনেক কিছু পরিবর্তনের মধ্যেও ওদের বন্ধুত্বটা ছিল সেই আগেরই মতন।

এর মধ্যে সুজন ব্যাংক-এ চাকরি পেযে হুটপাট বিযে করে ফেলল বাড়ির অমতে। কালিম্পং থেকে ট্রান্সফার হওযার পর, অনির্বাণের আগের প্রেম কেটে গেছে, এখন আবার সিঙ্গেল। বাড়ির দেখা মেয়েছেই বিযে করবে মত দিয়েছে, দেখাশোনা চলছে। ব্রজেশ চাকরি-বাকরির ইঁদুর দৌড়ে নাম না লিখিযে পারিবারিক ব্যবসাতেই ঢুকে গিয়েছে। সুজন চাকরি পাওযার বছর খানেক পর ফারুকও চাকরি পেয়েছে, সিবিআই অফিসার-এর। বন্ধুদের মধ্যে ওর এখন ভাও বেশী।

বছরগুলোর এগিয়ে চলার সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুত্বের বযসও গড়িযে গিয়েছে বছর ত্রিশ। এখন সকলের সংসার হয়েছে। নিয়ম করে বছরে দুবার চার বন্ধু পরিবারের সকলকে নিয়ে ঘুরে আসে কাছে দূরে কোথাও। সুজন আর ফারুক কাছাকাছি থাকে। সেজন্য দুজনের নিযমিত যোগাযোগ আছে, মন করলেই এ ওর বাড়ি পৌঁছে যায়।

ফারুকের দেশের বাড়ির পাশের গ্রামে অনির্বাণ-এর বাড়ি। ছুটির দিনে ফারুক নিয়ম করে দেশের বাড়ি যায়, সে সময অনির্বাণ-এর বাড়ির খোঁজখবরও পায। সেই রবিবার দেশের বাড়ি গিয়ে খবরটা পেয়েছিল, গতকালই অনির্বাণ মারা গিয়েছে, লাং ক্যান্সার হয়েছিল। হঠাৎ বেশি অসুস্থ হয়ে কয়েক দিন আগে হসপিটালে ভর্তি হয়েছিল।

ফারুকের সামনেই অনির্বাণ-এর ডেডবডি এল। বাড়ির লোকজন, আত্মীয-স্বজন কাউকেই এতদিন জানায়নি নিজের অসুস্থতা। বন্ধুরাও কেউ জানত না ওর অসুস্থতার কথা। এত কষ্ট নিজের বুকে চেপে রেখেছিল ও, সে কষ্টের ছোঁযা যেন না লাগে নিকট কারও। ফারুকের মুখে খবরটা শুনে আঁতকে ওঠে সুজন, বিশ্বাস হয় না। পরদিন সুজন আর ফারুক কারওরই অফিস যাওয়া হল না।

বুকের মাঝে যেন একটা গভীর ক্ষত অনবরত ব্যথা জাগিয়ে তুলছে। হোস্টেল-এর নেড়া ছাদে বসে লুকিযে তাস খেলার চার সঙ্গীর একজন কেটে পড়ল। স্টেশনের বেঞ্চে দুই বন্ধু হাতে হাত রেখে অনেকক্ষণ বসে থাকে। একটার পর একটা ট্রেন আসছে, থামছে আবার তার গন্তব্যে চলে যাচ্ছে। স্টেশনে নামা মানুষজন ভীড় ভেঙে যে-যার মতো চলে যাচ্ছে। ওদের দুনিযাটা যেন থমকে দাঁড়িযে গিয়েছে। ফারুক-ই প্রস্তাব রাখে, চল। ব্রজেশের কাছে যাই।

সে-রাতটা ব্রজেশের বাড়িতে কাটিয়ে পরদিন সকালে বনগাঁ থেকে ট্রেন ধরে অফিস করেছিল সুজন আর ফারুক। কোনও কোনও সময সবকিছু যেন কেমন দ্রুত বদলে যায়। নাটকের শেষ দৃশ্যে পেঁছোনোর জন্য খুব তাড়াহুড়ো।

অনির্বাণের মৃত্যুর পর বছর ঘুরতে না ঘুরতে, একদিন ব্রজেশও টেলিভিশন, খবরের কাগজে খবর হয়ে এল। মহালয়া সবে পার হয়েছে, চারিদিকে পুজো পুজো ভাব। অফিস যাওযার আগে সকালে টিভিতে খবর দেখতে গিয়ে সেই নিদারুণ কষ্টের খবরটা পেল সুজন। সঙ্গে সঙ্গে ফারুককে জানায়।

ব্রজেশদের বাড়ি বাংলাদেশ সীমান্তের শহর বনগাঁয়ে। সেখানে ওদের অনেক রকম ব্যাবসা। মেডিসিন, শাড়ি, রেডিমেড পোশাক, জুযোরির ব্যাবসা ছাড়াও, আরও অনেক রকমের ব্যাবসা। এলাকার প্রভাবশালী ব্যবসাযী পরিবার ওরা। এলাকার নব্য তোলাবাজদের দাবিমতো দুর্গাপুজোর জন্য ধার্য এক লাখ টাকা চাঁদা না দেওযায়, সন্ধের অন্ধকারে বেশ কযেজন এসে দোকানের মধ্যেই, ব্রজেশকে পয়েন্ট ব্ল্যাংক থেকে গুলি করে মার্ডার করেছে।

আবার দলছুট একজন! দুর্গার যেন কিছু করার নেই, এখন সব ক্ষমতা অসুরের। এখন যে অসুররাজ চলছে! সুজন-ফারুক যেন নিজেরাও মনে মনে মরে যাচ্ছে একটু একটু করে। এক একটা মৃত্যু যেন, বন্ধুত্বের গুচ্ছ ফুলের তোড়া থেকে খসে পড়া এক একটা ফুল। তোড়াটাকে দিন দিন হালকা করে ফেলছে।

দুই বন্ধুকে হারানোর পর শূন্যতা ভুলে থাকতে দুই বন্ধু যেন আরও কাছের হয়েছে। আর সেই বৃত্তে সামিল হয়েছে দুই বন্ধুর পরিবার। বছর পাঁচেক হল ব্রজেশ নেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বন্ধু হারানোর ক্ষতটা এখন অনেকটা নরম হয়েছে। কিন্তু সব তো মানুষের মর্জিতে চলে না!

জীবন নাটকের এক অঙ্কের পর, অন্য অঙ্ক লেখা হচ্ছে অন্য কোনও নাট্যকারের মর্জিতে। তার নাটকের একটি দৃশ্যও পরিবর্তনের ক্ষমতা নেই অন্য কারও। সে-ই নাট্যকার, সে-ই পরিচালক।

(পাঁচ)

অফিসে কাজের মাঝে হঠাৎ ফোনটা পেল সুজন। ফারুকের স্ত্রী সানা ফোন করেছে মুম্বই থেকে। চেনা গলা কেমন যেন অচেনা লাগছে। ওরা দুদিন আগে মুম্বই গিয়েছিল এলএফসি টুরে। মুম্বই-গোয়া ঘুরে দিন সাতেক পরে ফেরার কথা। সানা বলল, টাটা ক্যান্সার সেন্টার থেকে বলছে। কালকে খুব অসুস্থ হওযায় ফারুকের কথামতো ওই হসপিটালে ভর্তি করিয়েছিল। হসপিটাল থেকে বলেছে, ওখানে নাকি ও আগে থেকেই ট্রিটমেন্ট করাত, বাড়িতে কাউকে কিছু বলেনি। আজ কিছুক্ষণ আগেই মারা গিয়েছে ফারুক।

খবরটা শুনে স্তব্ধ হয়ে যায় সুজন। এত সিরিযাস খবরটা সে জানত না! তেমন হলে সেও তো সঙ্গে যেতে পারত। খবর পেযে ফারুকের মুম্বই অফিসের কযেকজন কলিগ সানার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। তারাই ডেথ সার্টিফিকেট নিয়েছে, কফিন জোগাড় করেছে, ফ্লাইট-এর টিকিটের ব্যবস্থা করেছে। কফিনবন্দি ফারুকের মৃতদেহ নিয়ে একাই ফিরছে সানা। এযারপোর্টে ফ্লাইট আসার অনেক আগে থেকেই সস্ত্রীক উপস্থিত সুজন। ফারুকের বাড়ির লোকজনও সেখানে উপস্থিত। এই এযারপোর্টে সুজন আগেও এসেছে ফারুকের সঙ্গে দেখা করতে, আড্ডা দিতে। তখন সে এখানে ইমিগ্রেশন অফিসার হিসাবে পোস্টেড ছিল।

খেযালি ঝোড়ো হাওযা স্মৃতির পাতাগুলো উড়িযে দিযে দাঁড় করায রুক্ষ বাস্তবের সামনে। এযারলাইন্সের দুজন কর্মী ট্রলি ঠেলতে ঠেলতে ফারুকের কফিন বযে নিয়ে আসছে। সাথে পা মিলিযে এগিয়ে আসছে বিধ্বস্ত, ক্লান্ত, নিঃসঙ্গ এক মহিলা! ফারুকের স্ত্রী সানা, দেখে মনে হচ্ছে এই কদিনে সে যেন কযেটা বছর পার করে এসেছে।

দূর থেকে দেখে সুজন এগিয়ে যায় গেটের কাছে। নিরাপত্তারক্ষীরা গেটের সামনে থেকে ঠেলে সরাতে গেলে, সুজন ব্যালেন্স হারিযে পড়ে যায় পাশের লোহার রেলিং-এর উপর। চোট লাগে মাথায়। লোকজন ধরে উঠিযে জল দেয় মাথায়। এযারপোর্ট থেকে ফেরার পথে সারাটা পথ শববাহী গাড়িতে কফিনের পাশেই বসে ছিল সুজন।

কবরে মাটি দেওযার পর থেকে কেমন যেন নির্বাক, নিশ্চুপ হয়ে গিয়েছে সে। দিন-মাস এগিয়ে যায়, সুজন যেন আরও একাকিত্ব অনুভব করে। মাথার ভিতর টিশটিশ ব্যথাটা যেন তার মধ্যে মিলন সুখের বাসনা জাগায়। অফিস শেষে কোথাও আড্ডা না মেরে সোজা বাড়ি ফেরে। রবিবার আর ছুটির দিনে সকালের আড্ডাও এখন বন্ধ, আড্ডার সঙ্গীই যে নেই!

অনেক দিনই রাত্রিতে বাড়ির ছাদে উঠে আকাশের তারাদের দিকে তাকিযে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। হয়তো ওদের মাঝেই খোঁজে অনির্বাণ, ব্রজেশ এবং ফারুককে। মেঘেদের বাধা সরিযে কখনও দিনের আলোয়, কখনও বা তারাদের আলোর পথ বেয়ে দেশ-পৃথিবীর এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত ঘুরে আসে, অনির্বাণ-ব্রজেশ-ফারুক-সুজন-এর উত্তরসূরিদের আকাশযান।

ওদের কি কখনও দেখা হয় আকাশ পথে বা আকাশ জুড়ে ছড়ানো বন্ধুত্বের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে? ওদের বুকেও কি বয়ে যায় পাহাড়ি নদীর মতো নুড়ি পাথরের মধ্যে দিযে বয়ে চলা বন্ধুত্বের স্রোত? সুজন মাথার উপর ঝোলানো তারার শামিইয়ানা ছেড়ে নেমে আসে ছাদ থেকে নিজের অন্ধকার ঘরে।

মাথার ভিতরের টিশটিশ করা ব্যথাটা যেন ঘুমের দেশে ডেকে নিয়ে যায়। বিছনাতে শুয়ে আলতো করে চোখের পাতা বন্ধ করতেই যেন অনির্বাণ-ব্রজেশ-ফারুক এসে তার চারপাশ ঘিরে দাঁড়ায। হাসতে হাসতে বলে, একা একা কী করছিস? মন খারাপ, বোর হচ্ছিস? চল আমাদের সঙ্গে। আবার আমরা বন্ধুরা সবাই মিলে একসঙ্গে হুল্লোড় করব, মজা করব।

ওরা সুজনের হাত ধরে টানতে থাকে! মাথার মধ্যে জেগে থাকা টিশটিশ ব্যথাটা হঠাৎ শান্ত হয়ে যায়। সুজন ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা টেনে দুহাত বাড়িয়ে দেয়।

 

 

অপেক্ষা

এটাই লাস্ট সেমিস্টার। সিদ্ধার্থ কিছুটা অধৈর্য হয়ে উঠছিল ধীরে ধীরে। বিবিএ পাশ করে ইচ্ছে ছিল এমবিএ-টা করে নেবে কিন্তু টাকা কোথায়? বাবা চাকরি থেকে রিটায়ার করেছেন। চাকরি থাকতেই বড়ো দুই দিদির বিয়ে শুধু বাবা দিতে পেরেছিলেন, তাও পিপিএফ থেকে বড়ো একটা অঙ্কের টাকা বার করে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। ছোড়দির বিয়ে দুমাস পরেই মা-ও হঠাৎই মারা যান।

বাবার পেনশনের টাকায় ওদের দুজনের ভালোমতোই চলে যায় সেটা সিদ্ধার্থ জানে। বাবার কথাতেই বিবিএ পড়তে ও রাজি হয়ে গিয়েছিল। সিদ্ধার্থ ভেবেছিল বিবিএ করে ব্যাবসার কিছু কিছু ও জেনে যাবে। সুতরাং চাকরি না পেলেও ক্ষতি নেই, কিছু একটা ব্যাবসা শুরু করবে। টাকা রোজগার করতে আরম্ভ করলে এমবিএ-টাও করে নেবে। বাবা অবশ্য সিদ্ধার্থকে বলে রেখেছেন, ওর প্রয়োজন পড়লে পড়াশোনার জন্য বাড়িটা বন্ধক রাখতেও রাজি আছেন। ওদের এই একটাই সম্বল, ঠাকুরদার বাবা এই বাড়িটা তৈরি করে গিয়েছিলেন।

এইসব নানা কথা ভাবতে ভাবতেই সিদ্ধার্থ বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটছিল। হঠাৎ-ই তার চোখে মুখে, কিছুটা জলের ছিটে এসে স্বপ্নভঙ্গ করল। বর্ষাকাল নয়, আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিটেফোঁটা মেঘও সে দেখতে পেল না। আবার একটু জলের ছিটে তার মাথায় আর মুখে এসে লাগল। উপরের দিকে তাকাতে গিয়ে নজর পড়ল যেখানে ও দাঁড়িয়ে ঠিক তার পাশের বাড়ির দোতলায় দাঁড়িয়ে একটি মেয়ে বারান্দায় তোয়ালে দিয়ে নিজের ভিজে চুল ঝাড়ছে।

চোখাচোখি হতেই মেয়েটির মুখে লজ্জিত হাসি ফুটে উঠল। ধীর স্বরে কিছু একটা বলল, যেটা সিদ্ধার্থর কানে এসে পেঁছোল না। তবে ওর মনে হল মেয়েটি সরি বলছে। সিদ্ধার্থর মাথায় একটু দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গেল। সে হাত তুলে মেয়েটিকে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বলল, না না ঠিক আছে তবে আপনার হাসিটা কিন্তু বড়ো অমায়িক। আর একবার প্লিজ হেসে দিন।

সিদ্ধার্থের কথা শুনে মেয়েটি জোরে হেসে উঠল। তারপর হঠাৎই নিজের ব্যবহারে লজ্জিত হয়ে ভিতরে চলে গেল। সিদ্ধার্থও নিজের মুগ্ধতা কাটিয়ে আবার হাঁটা শুরু করল।

এই ঘটনার দুদিন পর ওই একই রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে নিজের অজান্তেই সিদ্ধার্থর চোখ চলে গেল আগের দিনের মেয়েটি যে-বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছিল, সেই বারান্দার দিকে। দেখল মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার দিকে তাকিয়ে আজ চুল বাঁধা আছে বলেই মনে হল সিদ্ধার্থর। হঠাৎই মেয়েটির চোখ পড়ল সিদ্ধার্থর উপর আর সঙ্গে সঙ্গে ওর সুন্দর মুখশ্রী মৃদু হাসিতে ঝলমল করে উঠল। অদ্ভুত এক ভালোলাগায় সিদ্ধার্থর বুক ভরে উঠল। এই অনুভূতি আগে কোনওদিন সিদ্ধার্থ অনুভব করেনি। এরপর প্রায় দুই সপ্তাহ মেয়েটিকে দেখতে পেল না সে।

হঠাৎই একদিন বাজারে গিয়ে আবার মেয়েটির মুখোমুখি হল। মেয়েটি সবজি কিনতে ব্যস্ত ছিল, ফলে সিদ্ধার্থকে দেখতে পায়নি। সিদ্ধার্থ-ই সাহস করে এগিয়ে গিয়ে প্রথম কথা বলল, কযেদিন আপনাকে দেখতে পাইনি, কোথাও গিয়েছিলেন বুঝি?

চমকে তাকাতেই সিদ্ধার্থর দিকে চোখ পড়ল মেয়েটির। সঙ্গে সঙ্গে একমুখ হাসি নিয়ে সে জবাব দিল,হ্যাঁ , ছুটি ছিল। দিদির কাছে বেড়াতে গিয়েছিলাম। গতকালই ফিরেছি।

সিদ্ধার্থ ভাবতেই পারেনি মেয়েটি ওর প্রশ্নের উত্তর এত সাবলীল ভঙ্গিতে দেবে। মেয়েটির হাতে দুটো ব্যাগ-ভর্তি সবজিপাতি ছিল। মেয়েটি দুই হাতে ব্যাগদুটো ভাগ করে নিয়ে সিদ্ধার্থের সঙ্গে হাঁটতে শুরু করল। সিদ্ধার্থ ওর হাত থেকে ব্যাগ নেওয়ার চেষ্টা করল কিন্তু মেয়েটি কিছুতেই রাজি হল না, না না আপনাকে কষ্ট করতে হবে না। আমার দুটো ব্যাগ নিতে কোনও অসুবিধা হচ্ছে না। বাড়ি তো কাছেই আর অসুবিধা বোধ করলে একটা রিকশা নিয়ে নেব।

মেয়েটির কথায় সিদ্ধার্থ আমল না দিয়ে ওর হাত থেকে একটা ব্যাগ একপ্রকার ছিনিয়ে নিয়ে নিজের হাতে নিল, আরে এতে কষ্টের কী আছে? আর রিক্শার পয়সা বাঁচিযে রাখুন, চা খাওয়া যাবে।

বলতে বলতেই সামনে চায়ের দোকান দেখে সিদ্ধার্থ বেঞ্চের উপর সবজির ব্যাগ নামিয়ে রেখে দুটো স্পেশাল চায়ের অর্ডার দিল। চা খেতে খেতে দুজনে নিজেদের মধ্যে পরিচয় আদান-প্রদান করে নিল। মেয়েটি জানাল তার নাম সুলগ্না। মায়ের সঙ্গে থাকে। বাবা অনেকদিন হল মারা গেছেন। কম্পিউটার নিয়ে পড়াশোনা করে একটি প্রাইভেট স্কুলে কর্মরতা। সিদ্ধার্থও নিজের পড়াশোনা আর ভবিষ্যতের ইচ্ছের কথা মন খুলে মেয়েটিকে জানাল। চায়ের পয়সা দেওয়ার জন্য পার্স বের করতেই মেয়েটি সিদ্ধার্থের হাত চেপে ধরল, রিকশার টাকা বেঁচে গেছে সুতরাং চায়ের টাকা আমি দেব।

সুলগ্নার চায়ের টাকা দিয়ে দেওয়াটা সিদ্ধার্থর ভালো লাগল না। তবুও সে আর কিছু বলল না। দাম মিটিয়ে বাড়ির পথ ধরল ওরা। প্রথমে সুলগ্নার বাড়ি। বাড়ির দরজায় এসে সিদ্ধার্থর হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে ওকে থ্যাংকস জানিয়ে সুলগ্না বাড়ির ভিতর ঢুকে গেল। সিদ্ধার্থ নিজের বাড়ির দিকে পা চালাল।

এরপর প্রায়শই সুলগ্না আর সিদ্ধার্থ বাড়ির বাইরে দেখা করতে শুরু করল। সুলগ্নার ভালো চাকরি ছিল ঠিকই কিন্তু সিদ্ধার্থ কিছুতেই মনের মতো চাকরি পাচ্ছিল না। বিবিএ-র রেজাল্ট তার ভালো হওয়া সত্ত্বেও যে-চাকরিগুলো পাচ্ছিল সেগুলো কম মাইনের। ব্যাবসা শুরু করার কথাও মাথাতে ছিল সিদ্ধার্থর। সুলগ্নাও সবসময় ওকে উৎসাহ জোগাতে থাকত, নানা লোকের উদাহরণ দিত, যারা জীবনের প্রথমে কঠিন সংঘর্ষ করলেও পরে তারা সকলেই জীবনে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।

সিদ্ধার্থ দিনের অনেকটা সময় ল্যাপটপে কাটিয়ে দিত চাকরি খুঁজতে আর নয়তো বিকল্প কোনও ব্যাবসার সন্ধানে। মাঝেমধ্যে সুলগ্নার সঙ্গে ওর বাড়িতেও যেত সিদ্ধার্থ। সুলগ্নার মা ওকে খুবই স্নেহ করতেন। একদিন সুলগ্না এসে জানাল যে, ওদের স্কুলে প্রাইভেটে কম্পিউটার ক্লাস খোলার কথা চলছে, যার জন্য অনেক কম্পিউটার একসঙ্গে স্কুল কিনবে। এই সংক্রান্ত একটা প্রোজেক্ট রিপোর্ট আর টেন্ডার তৈরি করতে বলে, সুলগ্না।

সিদ্ধার্থর কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশনের কোর্স করাই ছিল এবং পড়ার সময় টেন্ডার, মার্কেটিং বিষয়ে অনেক কিছু শিখেও ছিল। সিদ্ধার্থর বাবা ছেলেকে এই সুযোগ না ছাড়ার পরামর্শ দিলেন।

সিদ্ধার্থ টেন্ডার ভরল। ভাগ্যও ওর সহায় ছিল। জীবনে প্রথম সুযোগ পেল ভালো কিছু করে দেখানোর। সিদ্ধার্থর টেন্ডার পাস হয়ে গেল। সুলগ্নাদের স্কুলের অনেকগুলো ব্রাঞ্চ ছিল সারা রাজ্যজুড়ে এবং এই কম্পিউটার প্রোজেক্টটার প্রধান ইনচার্জ ছিলেন সুলগ্নার স্কুলের প্রিন্সিপাল। প্রিন্সিপাল সিদ্ধার্থ-কে ডেকে জানালেন, তিনি সিদ্ধার্থর কাজে খুশি হলে রাজ্যের বাইরে তাঁদের যতগুলি স্কুল আছে সেখানেও সিদ্ধার্থর নাম রেকমেন্ড করবেন। যখন তাদের স্কুলেও একই প্রোজেক্ট নিয়ে কাজ শুরু হবে, তখন সিদ্ধার্থর কাজের আরও সম্ভাবনা বাড়বে।

সুলগ্নার সঙ্গে দেখা হলে সিদ্ধার্থ ওকে জানাল, সুলগ্না, আমি কিন্তু টিচার হতে চাই না। আমি একটা কাজ করে দিতে পারি, সেটা হচ্ছে কম্পিউটারগুলো ইন্সটল করে নেটওয়ার্কিং ইত্যাদি। এরপর বেসিক-টা না হয় একজন টিচার এবং কযেজন স্টুডেন্টকে শিখিয়ে দেব। তারপর তোমরা কী করে এগোবে সেটা কিন্তু সম্পূর্ণ তোমাদের দায়িত্ব। এই নিয়ে তোমার স্কুলের সঙ্গে কোনও কথা হয়নি।

ঠিক আছে, তুমি আমাকে পুরোটা শিখিয়ে দিও। আমারও কম্পিউটার নিয়ে অল্প পড়াশোনা আছে সেটা তুমি ভালো করেই জানো।

এই প্রথম কাজটাতেই সিদ্ধার্থ আশাতীত সাফল্য পেল। সিদ্ধার্থর কাজে প্রিন্সিপাল এতটাই খুশি হলেন, তিনি সিদ্ধার্থকে বাকি বারোটা স্কুলের টেন্ডার জমা দিতে বললেন। সুযোগটা পেয়ে সিদ্ধার্থর আনন্দের সীমা থাকল না। খবরটাতে সিদ্ধার্থর বাবাও অত্যন্ত খুশি হলেন। তিনি ছেলেকে ডেকে বললেন, মেয়েটি তোর জন্য অত্যন্ত শুভ। ওর সঙ্গে আলাপ হতে না হতেই এত বড়ো কাজটা হাতে পেলি। আমার মনে হয় সিদ্ধার্থ তোরা দুজনে একসঙ্গে মিলে কাজটা কর। একটু চুপ করে থেকে আবার বললেন, সিদ্ধার্থ, এটা আমার মনের কথা, মেয়েটাকে বড়ো পছন্দ আমার। তোর সঙ্গে ওকে মানাবে ভালো।

সুলগ্নার মায়েরও মনে এই ইচ্ছেটাই শাখা-প্রশাখা বিস্তার করছিল। সিদ্ধার্থ, সুলগ্নাকে নিজের করে পাওয়ার ইচ্ছে অনেকদিন ধরেই মনের মধ্যে সুপ্ত রেখেছিল, কাউকেই বুঝতে দেয়নি। সে জানত আগে তাকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে, তবেই চাঁদের দিকে হাত বাড়ানোর যোগ্য হয়ে উঠবে।

বাবার আশীর্বাদ আর ব্যাবসায় সাফল্য পেযে সিদ্ধার্থ নিজের বাড়ি থেকেই, নতুন কোম্পানির উদ্বোধন করল, সিদ্ধার্থ ডট কম। বাকি স্কুলের টেন্ডারগুলো আগেই সিদ্ধার্থ ভরে জমা দিয়ে দিয়েছিল। ওই কাজগুলোও সে পেল। ছেলেকে ব্যাবসায় প্রতিষ্ঠিত হতে দেখে তার বাবা সুলগ্নার মায়ের সঙ্গে দেখা করে, ওদের দুজনের বিয়ের কথা পাকা করে ফেললেন। শুভদিন দেখে ওদের বিয়ের ভালোমতো ব্যবস্থা করলেন। ধুমধাম করে বিয়ে দিয়ে সুলগ্নাকে বাড়ির বউ করে বাড়িতে নিয়ে এলেন।

বিয়ের পর দিনগুলো ভালোই কাটতে লাগল সিদ্ধার্থর। প্রচুর কাজও পেতে আরম্ভ করল সে। কাজের চাপ এতটাই বেড়ে গেল, একা আর সবদিক দেখা তাদের পক্ষে সম্ভবপর হল না। দুজন লোক রাখতে সিদ্ধার্থ বাধ্য হল। বাড়ি থেকে অফিস শিফট করে একটু বড়ো জায়গা নিল ভাড়ায়। বাইরের ঘরটায় দুজন স্টাফের বসার বন্দোবস্ত করল আর ভিতরের ঘরটায় নিজের বসার। প্রয়োজনমতো অফিসটাকে কাজের জন্য গুছিয়ে সাজাল। সুলগ্নাও সময় করতে পারলে মাঝেমধ্যেই সিদ্ধার্থর অফিসে চলে আসত তার কাজে সাহায্য করতে। বেশ সুখেই কাটতে লাগল তদের দাম্পত্য জীবন।

দুবছর এ ভাবেই কাটার পর সুলগ্না সন্তানসম্ভবা হল। সিদ্ধার্থর জীবনে নতুন করে আনন্দর জোয়ার সব বাধা অতিক্রম করে গেল। কাজের চাপে বাড়িতে আগে বেশি সময দিতে পারত না সে। এখন সেই সিদ্ধার্থই কাজ ফেলে সুলগ্নার কাছাকাছি সবসময় থাকার চেষ্টা করতে লাগল, যাতে সুলগ্নার যত্নের কোনও ত্রুটি না হয়। বরং সুলগ্নাই বকাবকি করত সিদ্ধার্থর এই অবুঝ ব্যবহারের জন্য, আমি কি পালিযে যাচ্ছি নাকি আমি নিজের যত্ন ঠিক করে নিতে পারব না? তুমি কাজ ফেলে বাড়িতে সময বেশি দিচ্ছ, এটা ঠিক হচ্ছে না। এতে তোমার কাজের ক্ষতি হবে।

সিদ্ধার্থও বুঝত এতে কাজের ক্ষতি হচ্ছে। বাজারে একবার বদনাম হয়ে গেলে কেউ তাকে আর কাজ দেবে না। কিন্তু তাও নিজেকে শোধরাবার চেষ্টা করল না সে। এরই মধ্যে সুলগ্নার মা হঠাৎই মারা গেলেন। সুলগ্না শোকে যেন পাথর হয়ে গেল। দুর্ভাগ্যবশত গর্ভাবস্থা চারমাসে পড়তেই সুলগ্নার মিসক্যারেজ হয়ে গেল। এই ঘটনার পর সে পুরোপুরি ডিপ্রেশনে ডুবে যেতে থাকল।

এমন দুঃসময়ে সিদ্ধার্থ আরও বেশি করে সুলগ্নার কাছে থাকতে শুরু করল। সুলগ্না চেষ্টা করত নিজে থেকেই ডিপ্রেশন কাটিয়ে উঠতে। সিদ্ধার্থকেও বোঝাবার চেষ্টা করত কাজে যাওয়ার জন্য। কিন্তু সিদ্ধার্থর সেই এক গোঁ, তুমি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যাও, তারপরেই আমি কাজে যাব।

সিদ্ধার্থ কারও কথা শুনল না। এই করে তার প্রোজেক্টগুলোও ডেডলাইন মিস করতে লাগল। নতুন কাজ আসা প্রায় বন্ধ হয়ে গেল। পুরোনো ক্লায়েন্টরাও আর তার উপর ভরসা রাখতে পারল না। সুলগ্নার শরীর ধীরে ধীরে ঠিক হতে আরম্ভ করলেও সিদ্ধার্থর ব্যাবসার ভরাডুবি ঘটল।

দুজন স্টাফকে ছাঁটাই করতে বাধ্য হল সিদ্ধার্থ। ভাড়ার অফিস ছেড়ে দিয়ে আবার বাড়ি থেকেই কাজ করা আরম্ভ করল সে। তবে কাজ বলতে, এখন নতুন কাজের অনুসন্ধান। কারণ সিদ্ধার্থর হাতে কোনও কাজই ছিল না। সুলগ্নাও তাকে নতুন কাজ খোঁজার জন্য চাপ দিতে শুরু করল। এটা সিদ্ধার্থর কিছুতেই সহ্য হতো না, সম্মানে বাধত। এতদিন সে সবাইকে কাজ দিয়ে এসেছে, এখন লোকের দরজায় কড়া নেড়ে কাজ খুঁজতে যাওয়াটায় তার অপমান বোধ হতো। মনে হতো এটা নিয়ে সুলগ্নার সঙ্গে ওদের যত দ্বন্দ্বের সূত্রপাত।

একদিন কাজের সন্ধানে বেরিয়ে বাড়িতে ফিরে সিদ্ধার্থ দেখল সুলগ্না বাড়িতে নেই। টেবিলে তার লেখা একটা কাগজ পড়ে আছে। তাতে লেখা, আমি তোমাকে ছেড়ে, এমনকী এই শহর ছেড়েও চলে যাচ্ছি। আমাকে নিয়ে চিন্তা করা ছেড়ে দাও। আমি তোমার জীবনে ফিরে আসব কিনা এখনই বলতে পারছি না। তবে প্রতি মুহূর্তে তোমার কথা আমার মনে পড়বে এবং এটাই আমার বেঁচে থাকার জন্য যথেষ্ট। একটা কথা মনে রেখো সিদ্ধার্থ জীবন কাটানো খুব সহজ কাজ নয়। লড়াই ছাড়া কেউ প্রতিষ্ঠা পেতে পারে না। সোনাকেও আগুনে পুড়িয়ে হাতুড়ির বাড়ি মেরে তবেই আকার দেওয়া যায়। তুমিও চেষ্টা ছেড়ো না। পরিশ্রম করে যাও, ফল একদিন পাবেই, এই আমার বিশ্বাস। ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি যাতে জীবনে তুমি সফল হও। তোমার জন্য রইল আমার শুভকামনা।

এত বড়ো আঘাতের জন্য সিদ্ধার্থ প্রস্তুত ছিল না। সুলগ্না কেন এই সিদ্ধান্ত নিল কিছুতেই বোধগম্য হল না সিদ্ধার্থর। বাবাকেও জিজ্ঞেস করল, সুলগ্না কিছু বলেছে কিনা কিন্তু বাবাও মাথা নাড়লেন। সিদ্ধার্থর মতো তিনিও সম্পূর্ণ অন্ধকারে।

আঘাতের উপর আঘাত। খড়কুটোর মতো একমাত্র বাবাকেই আঁকড়ে ধরল সিদ্ধার্থ, ডুবন্ত জাহাজের নাবিকের মতো। সুলগ্নার স্কুলে খোঁজ করেও তার কোনও ঠিকানা জোগাড় করতে পারল না। তার মনে আশা ছিল অন্য শহরের ব্রাঞ্চে হয়তো সে ট্রান্সফার নিয়েছে। কিন্তু সেখানেও আশাহত হতে হল। কাজে কিছুতেই মন বসাতে পারছিল না সিদ্ধার্থ। বাবা পরামর্শ দিলেন, এক কাজ কর সিদ্ধার্থ, কাজের ব্যাপারে এখন ভাবা ছেড়ে দে, বরং ম্যানেজমেন্ট-টা করেনে। গ্র‌্যাজুয়েশন তো করাই আছে, মাস্টার্স কমপ্লিট কর। তাহলে মাস্টার্সের পর অনেক দিক তোর কাছে খুলে যাবে। আমি, বাড়ি বন্ধক রেখে তোর পড়ার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।

পড়াশোনায় বরাবরই সিদ্ধার্থ ভালো ছিল। সুতরাং কটা মাস প্রচণ্ড পরিশ্রম করার পর পরীক্ষা দিয়ে আহমেদাবাদে আইআইএম-এ ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেল। নিজেকে পড়াশোনার মধ্যে ডুবিয়ে দিল সে। পড়তে পড়তেই দ্বিতীয় বছরেই একটা নামি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে ভালো প্লেসমেন্ট পেয়ে গেল সিদ্ধার্থ। পড়া শেষ হতেই ছয় মাসের জন্য কোম্পানি তাকে লন্ডন পাঠাল ট্রেনিংয়ের জন্য। কোম্পানির নিয়ম অনুযায়ী ট্রেনিংয়ের পর ইচ্ছেমতো বিদেশে ওদের যতগুলো অফিস আছে, সেখান থেকে বেছে কোনও একজায়গায় সিদ্ধার্থ চাকরি করার সুযোগ পাবে।

লন্ডনে তিন বছর চাকরি করে সে আরও অনেক জায়গায় পোস্টিং পেল। দুই-তিন বছর পর পরই ওকে জার্মানি, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া পোস্টিং দেওয়া হল আর সঙ্গে প্রতিবারই প্রোমোশন। এভাবেই দশ-দশটা বছর কাটিয়ে ফেলল সিদ্ধার্থ। প্রথম প্রথম সুলগ্নার কথা খুবই মনে পড়ত। কিন্তু প্রোমোশনের সঙ্গে সঙ্গে টার্গেট পুরণ করার চাপে সিদ্ধার্থ তার নিজের জীবন সম্পর্কে ভাবার আর সময় পেত না। বাবার সঙ্গে ফোনে মাঝেমধ্যে কথা হতো।

দু-তিন বছর পর পর সময় করে বাবাকে এক সপ্তাহের ছুটি নিয়ে দেখে যেত। মনের মধ্যে শুধু একটা ক্ষীণ আশা বেঁচে ছিল যে, হযতো কোনও এক দিন সুলগ্না আবার তার জীবনে ফিরে আসবে।

সিদ্ধার্থদের কোম্পানি মুম্বইতে একটা নতুন ব্রাঞ্চ খোলার পরিকল্পনা নিলে, ঠিক হয় সিদ্ধার্থকে ওই অফিসের চিফ করে পাঠানো হবে। অফিস পুরো সেট-আপ হয়ে গেলে সিদ্ধার্থর এক জুনিয়র কলিগকে মুম্বই পাঠায় কোম্পানি, ওখানকার সব কাজ সুষ্ঠু ভাবে তদারকি করার জন্য। নতুন অফিসের জন্য কিছু সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়রের প্রয়োজন ছিল। এটার জন্য সিদ্ধার্থর জুনিয়র কলিগই প্রথম রাউন্ড ইন্টারভিউ নিয়ে তার সম্পূর্ণ ডিটেলস সিদ্ধার্থকে পাঠিয়েরাখত। ফোন এবং ভিডিও কনফারেন্সে ফাইনাল ইন্টারভিউ করার দায়িত্ব সিদ্ধার্থর উপরে ছিল।

মোট বারো জনের লিস্ট তৈরি করে সিদ্ধার্থকে পাঠানো হলে, লিস্ট দেখে ও চমকে উঠল। প্রথম নামটাই সুলগ্নার। বারোজনের মধ্যে সাতজনকে সিলেক্ট করার দায়িত্ব তার কাঁধে। প্রথমে সন্দেহ ছিল অন্য কোনও সুলগ্না হবে হয়তো কিন্তু সিভি দেখার পর সে নিশ্চিত হয়ে গেল, এ তারই সুলগ্না। সে এমসিএ করে গত ছবছর ধরে একটি কোম্পানিতে সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়র হিসেবে কাজ করছে।

সিদ্ধার্থ ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সুলগ্নার ফাইনাল ইন্টারভিউ নিল। এই দশ বছরে সিদ্ধার্থ দাড়ি রাখতে আরম্ভ করেছিল, চোখে চশমা উঠেছিল। কানের পাশের চুলগুলো সব সাদা হয়ে গিয়েছিল। আগের সিদ্ধার্থকে চেনার কোনও উপায় ছিল না। অফিসকেও ইন্সট্রাকশন দেওয়া ছিল যেন সিদ্ধার্থের নাম প্রকাশ না পায়। শুধু চিফ এগজিকিউটিভ বলেই সুলগ্নাকে জানানো হয়।

বহুদিন পর সুলগ্নাকে দেখে সিদ্ধার্থ চোখের জল লুকোতে পারল না। সুলগ্না আগের মতোই সুন্দর আছে। নিজেকে খুব ভালো মেইনটেন করেছে। সিদ্ধার্থও সিলেকশন লিস্টের প্রথমে সুলগ্নার নামটাই রাখল। ওকে এখনও ভালোবাসে বলে নয় বরং পোস্টটার জন্য ওর যোগ্যতাই সবচেয়ে বেশি বলে।

মুম্বই অফিস সেট করার জন্য সিদ্ধার্থের যে-কলিগ গিয়েছিল, সে কোম্পানিতে জুনিয়র হলেও সিদ্ধার্থর অতীত সম্পর্কে সে সবই জানত। অফিসের বাইরে ওরা বন্ধুই ছিল। ওকে সিদ্ধার্থ জানাল যে, এই সুলগ্নাই তার এক সময়ের স্ত্রী। ভাগ্য আজ আবার দুজনকে মুখোমুখি এনে ফেলেছে।

তাকে অনুরোধ করল সিদ্ধার্থ, সুলগ্নার মনের কথা যদি কোনও ভাবে জানতে পারে, তাহলে যেন অবশ্যই তাকে জানায়। কিন্তু কাজটা এমন ভাবে করতে হবে যাতে সুলগ্নার মনে কোনও সন্দেহ না জাগে।

কিছুদিন পরেই সিদ্ধার্থ জানতে পারল, সুলগ্না আজও সিংগল। ওর ফ্যামিলি বলতে ও একাই। তবে সুলগ্না আজও নিজেকে বিবাহিতাই মনে করে। যদিও দশ বছরের উপর হয়ে গেছে স্বামীর সঙ্গে তার কোনও সম্পর্ক নেই। সে নাকি আজও সিদ্ধার্থকেই সম্মান করে, ভালোবাসে। সে চেয়েছিল সিদ্ধার্থ জীবনে অনেক উন্নতি করুক, যেটা তার জন্যই সম্ভব হচ্ছিল না। সে সিদ্ধার্থর উন্নতির পথে কাঁটা হয়ে উঠেছিল। তাই ভালোর জন্যই সিদ্ধার্থকে ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু এই দশ-বারো বছরে দূরত্ব এতটাই বেড়ে গেছে যে, সিদ্ধার্থ কোথায় আছে, কী করছে জানার কোনও উপায়ই তার ছিল না,কারণ ততদিনে সিদ্ধার্থরা বাসস্থান বদলে ফেলেছে।

সুলগ্না শুধু এটুকুই জেনেছিল মুম্বই-তে তার যে ইন্টারভিউ নিয়েছে সেই ভদ্রলোক সিদ্ধার্থর পুরোনো বন্ধু। সুলগ্নাকে জিজ্ঞেস করেছিল সে, আমার বন্ধুর সঙ্গে যদি দেখা হয়ে যায় তাহলে আপনি কি তার কাছে ফিরে যাবেন? তাতে সুলগ্না বলেছে, আমার ছেড়ে যাওয়াতে যদি সিদ্ধার্থ নিজের পথ খুঁজে পেয়ে জীবনে সফল হয়ে থাকে, তাহলে বুঝব আমার এই ত্যাগ স্বীকারই সত্যি করে একজন মানুষের জীবন তৈরি করে দিতে পেরেছে। আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করব।

কিন্তু সে কোথায় রয়েছে আজকাল? আমি শুনেছিলাম যে, এমবিএ করে বিদেশ চলে গেছে? সুলগ্না জানতে চেয়েছিল।

বন্ধুটির উত্তর ছিল, আমিও ঠিক জানি না। তবে কোনও খবর জানতে পারলে আপনাকে নিশ্চয়ই জানাব কথা দিচ্ছি। এরপর জয়েনিং লেটার তৈরি করে সুলগ্নার হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল।

আজ শুক্রবার, আপনি সোমবার থেকে কাজে জয়েন করুন। আমাদের চিফ-ও উইক-এন্ডে মুম্বই পৌঁছোবেন। সোমবার থেকে উনিও এখানে অফিস জয়েন করবেন। শেষ অবধি এই কথাই হয়েছিল ওদের দুজনের মধ্যে।

সোমবার সিদ্ধার্থ নিজের কেবিনে বসেছিল।  তার পিএ ফোনে জানাল, স্যার, সুলগ্না ম্যাম হ্যাজ কাম। শি ইজ গোয়িং টু রিপোর্ট ইউ।

প্লিজ সেন্ড হার ইন।

গুড মর্নিং স্যার। দিস ইজ সুলগ্না, ইয়োর কোম্পানিজ নিউ সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়র, সুলগ্না জানাল।

ওয়েলকাম ইন আওয়ার ফ্যামিলি।

আমার কোম্পানিই আমার এখনকার ফ্যামিলি।

সুলগ্না এখনও সিদ্ধার্থকে চিনতে পারল না, এতটাই পরিবর্তন হয়েছিল তার চেহারায়। সিদ্ধার্থই বলল, আপনি আপনার কেবিনে গিয়ে বসুন। আপনাকে কাজ বুঝিযে দেওয়া হবে। কাল সকালে যখন আসবেন, আমি বাকি সব কাজ বুঝিযে দেব।

পরের দিন সিদ্ধার্থ কেবিনের সামনে নিজের নেমপ্লেট সিদ্ধার্থ সেন ঝুলিয়ে  দিয়ে চেয়ারে এসে বসল। আজ সে ক্লিন শেভ হয়ে অফিস এসেছে। সুলগ্না নক করে কেবিনে ঢুকতেই সিদ্ধার্থকে দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল। আজ আর সিদ্ধার্থকে চিনতে কোনও অসুবিধাই হচ্ছে না। অস্ফুটে সুলগ্না বলে উঠল, সিদ্ধার্থ তুমি?

দরজার বাইরে নেমপ্লেট দ্যাখোনি?

ঠিক খেয়াল করিনি।

সুলগ্না, এটাই আমার কোম্পানি, আমার ফ্যামিলি। আজ থেকে তুমিও এই ফ্যামিলির একজন বিশিষ্ট সদস্য। আমার আশা ছিল একদিন না একদিন তুমি নিশ্চয়ই ফিরে আসবে। তোমাকে ছাড়া অন্য কারও কথা আমি কোনওদিন ভাবতেই পারিনি।

কিন্তু তুমি… সুলগ্না থেমে যায়।

হ্যাঁ সুলগ্না, আমার এই বন্ধুই তোমার সম্পর্কে সব জানায় আমাকে, বিশেষ করে আমাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার কারণ। তোমার আত্মত্যাগের জন্যই আজ আমি সাফল্যের চূড়া, ছুঁতে পেরেছি। এর পুরো ক্রেডিট তোমার প্রাপ্য।

সিদ্ধার্থ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে সুলগ্নাকে কাছে টেনে নিয়ে ওর চুলে মুখ রাখে। কাচের দরজার বাইরে কলিগের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই সিদ্ধার্থ আর ওর বন্ধুর মুখে হাসি ছড়িয়ে পড়ে। হাতে থামস আপ সাইন দেখিয়ে সিদ্ধার্থের কলিগ দুজনকে একটু একা থাকার সুযোগ দিয়ে ওই ঘরটা ছেড়ে চলে যায়।

ফিরে এসো পিউ

‘তোর একটা কবিতায় দেখলাম লিখেছিস, ‘সাদা তালের মতো তুলতুলে। তুই দেখেছিস কোনও সাদা তাল?’

‘না, মানে…’ তো তো করতে থাকে পথিক।

‘তোকে বলেছি না, যা দেখিসনি তা নিয়ে লিখবি না, ভুল লিখবি…’

একমুখ ধোঁয়া হতভম্ব পথিকের মুখের উপর দিয়ে আকাশে ছুড়ে দেয় লেনাদি। বয় কাট চুল, টিকালো নাক, ধারালো মুখ, সাদা শার্ট আর নীল ফেডেড জিন্স পরা লেনাদি, কলেজের মারকাটারি সুন্দরীদের মধ্যে একজন।

‘দেখিসনি তো…?’ গলার স্বর খাদে নামিয়ে লেনাদি বলল, ‘আমি দেখাব তোকে…।’ বলেই স্কুটিতে চড়ে সাঁ করে বেরিয়ে গেল কলেজ থেকে।

হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল পথিক!

একদিন এতটা লাজুক ছিল সে, মুখে ভালোবাসার কথাও কাউকে বলতে পারেনি। তখন ইলেভেন চলছে। সে এক নভেম্বরের সকালবেলা। পিউ টিউশানি যাচ্ছে। পথিক পিছু পিছু হাঁটছে। আর তার বুকের মধ্যে ধুকপুকুনি। হাতে রাখা চিরকুট ঘামে ভিজছে। নির্জন জায়গার অপেক্ষায়।

ফলো করে কিছুটা যাবার পর পিউ বুঝতে পারে পথিক ওকে অনুসরণ করছে। ও ঘুরে দাঁড়ায়।

‘কী রে পথিক, তুই এই রাস্তায়…কোথায় যাবি?’

‘তোর সাথে একটা কথা ছিল…’

‘ওহ, হ্যাঁ, বল…’

চিঠিটা হাত বাড়িয়ে এগিয়ে দেয় পথিক। ‘এটা একটু পড়ে দ্যাখ।’

পথিক মাথা নীচু করে দাঁড়িয়েছিল দুরুদুরু বুকে। এভাবে আগে কেউ কাউকে প্রোপোজ করেছে কি না তার জানা নেই। চিঠিতে লেখা ছিল ‘আই লভ ইউ, পিউ’ ব্যস, এতটুকুই।

‘তুই এই কথাটা তো আমাকে মুখেও বলতে পারতিস…’

প্রায় তিরিশ সেকেন্ড পর স্তব্ধতা ভেঙে বলেছিল পিউ।

ওদিকে তখন পথিকের বুকে অবিরাম হাতুড়ি পেটা চলেছে। তার পরের শব্দগুলো শোনার জন্য।

‘দ্যাখ, আমি তোকে বন্ধুর মতো দেখি। তোর সাথে আমার সম্পর্কটা বন্ধুর মতো থাকলেই ভালো!’

হিমালয়ের চূড়া থেকে কোন অতল খাদের গভীরে যেন তলিয়ে যেতে লাগল পথিক। শরীর যেন ভারশূন্য পালকের মতো ভাসছে। যে-কোনও দিকেই উড়ে চলে যেতে পারে। শহরের সব শব্দ, সব কোলাহল যেন তার কানের তিন ফুট দূরে এসে থমকে গেছে। আর কিছুই শুনতে পাচ্ছে না পথিক। কতক্ষণ এভাবে দাঁড়িয়ে ছিল সে, জানে না। আবার সম্বিত ফেরে পিউ-এর কথায়। ‘সরি, কিছু মনে করিস না। টিউশনির দেরি হচ্ছে, চলি…’

চলে গেছিল পিউ। আর তখনই মুখ তুলে তাকিয়ে ছিল পথিক। নাহ, পিউ আর পিছন ফিরে তাকায়নি। মেয়েরা সত্যিই কখনও পিছন ফিরে তাকায় না…

‘কী রে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অত কী ভাবছিস?’ দূর থেকে হাঁক দেয় সঞ্জয়দা ‘ইউনিয়ন রুমে আয়, কথা আছে।’

লেনাদির আহ্বানে মশগুল থাকা পথিক চমকে ওঠে। লেনাদির সাথে পথিকের পরিচয়ও ইউনিয়ন রুমেই। তখন ওরা সদ্য ঢুকেছে। ফ্রেশারস ওয়েলকাম হয়নি তখনও।

দুই

কলেজ শুরুর প্রথম দিনই পিউকে দেখেছিল পথিক। ও উইমেন্স এ ভর্তি না হয়ে বিবেকানন্দে ভর্তি হয়েছে, জেনে ভিতরে ভিতরে খুশিই হয়েছিল। তবে পিউ কে সিগারেট খেতে দেখে খুব অবাক হয়েছিল।

 

কলেজে গিয়ে তার মনে হয়েছিল পুকুর থেকে যেন সমুদ্রে এসে পৗঁছেছে। গার্জেনদের চোখ রাঙানি নেই, মাস্টারমশাইদের শাসন নেই। হঠাৎ এতটা স্বাধীনতা পেয়ে গিয়ে বেশ মজাই লাগছিল পথিকের।

 

পথিক ভেবেছিল পড়াশোনার সাথে হালকা করে থাকবে ছাত্র রাজনীতিতে। আর সবাই যেমন থাকে। কিন্তু ইউনিয়ন রুমের মোহ ক্রমশ বাড়তে থাকে তার কাছেও। কারণ পিউও সেখানে যাতায়াত শুরু করেছে ততদিনে। স্কুলের রাজনীতি-নির্বোধ ছেলেগুলো এখানে এসে কীভাবে তুখোড় নেতা হয়ে ওঠে, সে দেখতে থাকে চোখের সামনে।

 

সঞ্জয়দা তখন নতুন ব্যাচকে সমাজতন্ত্রে দীক্ষিত করতে উন্মুখ। কলেজ শুরুর দু’একদিনের মধ্যেই ফাঁকা ক্লাসগুলোয় গিয়ে শুরু করল রুম মিটিং। তারপর ইউনিয়ন রুমে নিরন্তর দীক্ষাদান তো আছেই।

 

‘শোন, সেকেন্ড ইয়ার, থার্ড ইয়ারে অলরেডি আমাদের তৈরি ছেলেরা আছে। সে নিয়ে চিন্তা নেই। এই যে ফ্রেশ মাইন্ডগুলো স্কুল পেরিয়ে কলেজে এল, এদের মাথায় কোনও পলিটিক্যাল থট নেই। অন্য কেউ চষে দেবার আগে রাজনীতির বীজটা আমাদের পুঁতে দিতে হবে। দেখতে হবে আমাদের ছেড়ে কেউ অন্যদিকে চলে না যায়…’

 

সিগারেট ধরিয়ে নিজের মার্ক করা চেয়ারে বসে ধোঁয়া ছাড়ল সঞ্জয়দা। বাকিরা উলটো দিকের সারি সারি চেয়ারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসা। কয়েকজন নীচে পাতা ম্যাট্রেসের উপর গোল হয়ে বসে ওয়াল ম্যাগাজিনের ছবি অাঁকছে।

 

‘আয় লেনা…আয়…এই এদের একটু ক্লাস নিচ্ছিলাম।’

 

লেনা নাম্নি ফরসা, লম্বা, সুন্দরী, জিন্স পরিহিত সঞ্জয়দার সহপাঠিনী কমরেড ইউনিয়ন রুমে ঢুকল। তার সাথে পাঁচটা মেয়ে। সব ফাস্ট ইয়ারের। যাদের মধ্যে পিউ একজন।

 

তাদের দেখিয়ে বলল, ‘এই যে আমার লেডি ব্রিগেড… কী বলছিলি বল, এরাও শুনুক…’

 

‘তোমাদের ক’জনের উপরেই আমরা ভরসা করছি। তোমাদের যে যার নিজের নিজের ক্লাসকে নেতৃত্ব দিতে হবে। তাছাড়াও সার্বিক ভাবে কলেজে পার্টির স্বার্থটা দেখতে হবে।’ সিগারেটে টান দেওয়ার ফাঁকে ফাঁকে যথেষ্ট পজ দিয়ে কথাগুলো আমাদের সবার দিকে ছুড়ে দিল সঞ্জয়দা।

 

ম্যাগাজিনের কাজ করতে থাকা সেকেন্ড ইয়ারের একজন পকেট থেকে বের করে একটা সিগারেট ধরাল। দু’টান দিয়েই পাশের জনকে ধরিয়ে দিল। তারপর এল ফার্স্ট ইয়ারের হাতে। দু’একজন টান দিয়েই কেশে ফেলল। বাকিরা তাই দেখে হাসতে লাগল।

 

দীপাঞ্জন তার কানে কানে বলল, ওটা সিগারেট নয় শালা, ব্যাগড়া ভরা আছে। তাই দু’টান করে দিচ্ছে…’

 

পথিক তখনও ‘ব্যাগড়া’ মানে শোনেনি। পরে জানল গাঁজা ভরা আছে। কলেজের গেটেই ছাত্রদের জন্য নাকি গাঁজা ভরা সিগারেট বিক্রি করা হয়। ছাত্ররা তো আর ক্যাম্পাসে কলকে মুখে দিয়ে গাঁজা টানতে পারে না!

 

কথা শেষ করে সঞ্জয়দা আর লেনাদি ভিতরের কেবিনে গিয়ে বসল। বাইরের ঘরে নতুন পুরোনো ইউনিয়নপন্থী ছাত্র ছাত্রীরা গল্প, গান, কবিতায় মশগুল হয়ে গেল।

 

পথিক যেন সেদিন নতুন করে মানুষ চিনল। মানুষ যে এত ক্যালকুলেশন করে অন্য মানুষের সঙ্গে মেশে, তা ওর অজানা ছিল। কমরেডদের কথা বলা, গল্প করার পিছনেও যে পার্টি তথা সমাজতন্ত্রকে এগিয়ে নিয়ে যাবার তাগিদ থাকে, সে তখনই জানতে পারল।

 

পথিক বারবার পিউয়ের দিকে তাকাচ্ছিল। পিউয়ের কোনও হেলদোল নেই। ও কী অনায়াসে তার এতদিনের সহপাঠী, তার প্রেমে প্রত্যাখ্যাত ছেলেটাকে অগ্রাহ্য করছে! মেয়েরা পারেও বটে!

 

তিন

 

পথিকের কাছে কলেজ আর ইউনিয়ন রুমের আকর্ষণটাই ছিল পিউয়ের জন্য। সারাক্ষণ ক্লাসে মন বসত না। শুধু বসে বসে ওর কথা ভাবত। আর ক্যান্টিন, ইউনিয়ন রুম, লাইব্রেরি, কলেজের মাঠ, শালজঙ্গল যেখানেই ওর দেখা পেত পথিকের শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে যেত।

 

দু’এক বার সামান্য দলবদ্ধ হাই হ্যালো ছাড়া অন্য কথাই বলেনি আজ পর্যন্ত। বর্ধমান শহরের অন্য আর পাঁচটা অচেনা মেয়ের মতোই শীতল সম্পর্কটা। কিন্তু কেন হবে? নিজেকে প্রশ্ন করে পথিক, কিন্তু উত্তর খুঁজে পায় না। ওর সাথে ছ’টা বছর একসাথে পড়ার কোনও রেখাপাতই নেই! পথিকও নাছোড়…। সে নিজেকে বলে এর শেষ দেখবই…কী এমন রহস্য আছে, যে বন্ধু বন্ধুই রয়ে যাবে? প্রেমিক হতে পারবে না!

 

সেদিন ওদের কবিতা পত্রিকার নতুন সংখ্যাটা ইউনিয়ন রুমে কয়েকজন বন্ধুকে দিচ্ছিল পথিক। লেনাদি বলল, ‘পথিক তুই নাকি ‘ভূমি’তে, লিখিস!’

 

‘ওই আর কি…’ মৃদু হেসে জবাব দেয় পথিক।

 

পত্রিকার পাতা ওলটাতে ওলটাতে তার প্রেমের কবিতাটা দেখে বলল, ‘ও! এটা তোর লেখা…?’

 

পথিক ঘাড় নাড়ে।

 

পড়া শেষ করে তার দিকে চেয়ে হাসে লেনাদি। সিগারেটে টান মেরে বলে, ‘উমম্….কী লিখেছিস যেন… ‘তারপর লঘু অথচ গম্ভীর পদক্ষেপে হেঁটে চলে গেলে তুমিয একবারও পিছন ফিরে তাকালে নায সত্যি, মেয়েরা কখনও পিছন ফিরে তাকায় না…!’

 

‘তুই মেয়েদের কী জানিস? অ্যাঁ? এর আগে কটা প্রেম করেছিস? আর এখন তোর কটা গার্লফ্রেন্ড আছে, বল শুনি….’ তর্জনি আর মধ্যমার মাঝে চেপে ধরা সিগারেট নাচিয়ে জিজ্ঞেস করে লেনাদি।

 

‘এর আগে একটাও প্রেম করেনি’, বলল দীপাঞ্জন।

 

‘আর একটাও গার্লফ্রেন্ড নেই বেচারির’, যোগ করেছিল গণেশ।

 

‘একটাই সরু লাইন করতে গেছিল, মেয়েটি প্রথম দিনই ভাই না বন্ধু কী একটা বলে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছিল।’ হি হি করে হাসে আলতাফ।

 

‘হুম… তোর ক্লাস নিতে হবে রোজ। না হলে মেয়েদেরকে না জেনেই প্রেমের কবিতা লিখতে যাবি, দিয়ে হোঁচট খাবি। আই মিন, ভুলভাল লিখবি। কাল থেকে অফ পিরিয়ডে আমার কাছে আসবি, রোজ আধঘন্টা করে মেয়েরা কী করে, কী চায় তোকে শেখাব…’

 

‘হা হা হি হি…।’ লেনাদির সাথে সবাই যোগ দেয় হাসিতে।

 

ইউনিয়ন রুমে সেদিন অনেকক্ষণ ধরে গান, কবিতা, গল্প হল। পিউ কী রকম একটা গম্ভীর হয়ে বসে রইল। সঞ্জয়দা তার সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন আমাদের চোখে একটু পর পর মাখিয়ে দিতে থাকল।

 

‘শোন, শোন… হো চি মিন বলেছিলেন, ‘পোয়েট্রি মাস্ট বি ক্ল্যাড ইন স্টিল। আ পোয়েট শুড নো হাউ টু ফাইট।’ তোদের ওই শান্তনু রায় এর ছেলে ভোলানো কবিতায় শুধু ‘আমি-তুমি’… এই তো…? এর বাইরে খেটে খাওয়া মানুষের কথা কোথায়! যত বোগাস কবিতা সব!’

 

‘আরে কী বলছ? জানো তুমি লোকটার কী বিশাল ফ্যান

 

ফলোয়িং?’

 

‘রাখ তোর ফ্যান। আগে ভাতের কথা ভাব, তারপর ফ্যান নিয়ে ভাববি। আমার সব ভালো করে পড়া আছে। মানুষে মানুষে সম্পর্ক বলতে উনি বোঝেন প্রেম, অবৈধ প্রেম, ভাই বোনে প্রেম…তোরাও তাই গিলছিস, আর নিজেরাও তেমন লিখছিস…’

 

সেদিন ইউনিয়ন রুম থেকে বেরিয়ে একা একা হাঁটছে পথিক। দ্রুত পা চালিয়ে পাশাপাশি এল পিউ। ‘তুই খবরদার লেনাদির কাছে যাবি না। ফরসা কচি ছেলেদের খুব পছন্দ করে ডাইনিটা। আর ব্যাগে সবসময় কন্ডোম নিয়ে ঘোরে…’ দাঁড়ায় না পিউ, পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে কথাগুলো ছুড়ে দিয়ে হনহনিয়ে হেঁটে চলে যায়।

 

চার

 

‘কী, আমার কাছে ক্লাস করতে এলি না তো?’ সিগারেটে টান দিতে দিতে বলল লেনাদি।

 

দিন পনেরো পর বাইক শেডের সামনে মুখোমুখি দেখা। ইউনিয়ন রুমে এর মধ্যে বারকতক দেখা হলেও কিছু বলেনি লেনাদি। পথিক সেদিনের কথাটাকে ঠাট্টাই ভেবেছিল।

 

তাই কী উত্তর দেবে পখিক ভাবছিল।

 

‘না, মানে…’ তো তো করতে থাকে ঊনিশ বছরের পথিক।

 

‘তোকে বলেছি না, যা দেখিসনি তা নিয়ে লিখবি না, ভুল লিখবি…। আমার কাছে আসিস, দেখাব…’ বলে স্কুটিতে চড়ে সাঁ করে চলে যায় লেনাদি।

 

সাতপাঁচ ভাবছিল পথিক। সত্যি-মিথ্যা, রোমাঞ্চ, পিউয়ে-র সাবধানবাণী…। তার মাঝে হাঁক দিয়ে গেল সঞ্জয়দা। তবু ইউনিয়ন রুমে গেল না পথিক।

 

পাঁচ মিনিট পর তার মোবাইলে একটা মেসেজ ঢুকল। ন্তুপ্প ২ প্পম্ভ ব্জপ্প ্ত্রব্ধ ন্সন্ধ্রুন্ন্স্ত্র, ্ত্রন্দ্রব্ধব্জ ন্ধ্রচ্ঞন্দ্র ু ন্ধ্রব্জ, ঢঅচ্ঞচ্ঞ ব্দন্ধ্রভ্র ব্ভ ভ্রন্ধ্রব্ধ হ্মব্জপ্সপ্পব্দস্তু.

 

বুক ধড়ফড় করতে থাকে পথিকের। ও মাঠের ঘাসে বসে পড়ে। পা কাঁপছে, দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। ভাগ্যিস আশেপাশে কেউ নেই এখন। ঘাসের উপর পিঠ এলিয়ে দিয়ে আকাশের দিকে তাকায়। উত্তেজনায় তার নিঃশ্বাস ক্রমশ গরম হয়ে উঠছে, বুঝতে পারে পথিক। সে কলেজের আনাড়ি ছোকরা। সদ্যাগত, তাকে ‘সাদা তাল’ দেখতে আমন্ত্রণ করছে কলেজের হার্টথ্রব ইউনিয়ন নেত্রী থার্ড ইয়ারের লেনাদি! নিষিদ্ধ ফলের আকর্যণ পথিককে চুম্বকের মতো টানতে থাকে।

 

আবার মনে পড়ে পিউয়ে-র কথা। ভীষণ রাগ হয় পিউয়ে-র উপর। মনে হয় কেন শুনবে সে ওর কথা? সবাই কত হাসি গল্প করে তাদের বান্ধবীদের সাথে। ফোন করে, মেসেজ করে। ঘুরতে যায়… আরও কত কী… সে কেন বঞ্চিত থাকবে এই সুখ থেকে…

 

এক অপ্রতিরোধ্য রোমাঞ্চ তাড়িয়ে নিয়ে যায় পথিককে। কলেজের খেলার মাঠ, শাল জঙ্গল ছাড়িয়ে, বাজারের শেষে ছাতার দিঘির পাড়ে ছোট্ট অতিথিনিবাস, ক্ষণিকা। হাফ প্যান্ট আর ফিনফিনে গেঞ্জিতে অপেক্ষা করছিল লেনাদি…

 

সেদিন লেনাদি আরও অনেক কিছু দেখিয়েছিল। এক প্রকার হাতে ধরে শিখিয়েছিল শরীরের কোন ভাঁজে লুকিয়ে আছে কতটা সুখ, দুগ্ধফেননিভ ফর্সা নরম তাল তাল মাংসের মধ্যে হারিয়ে যেতে যেতে পথিকের প্রথমবারের জন্য মনে হয়েছিল জীবনটা সত্যিই সুন্দর…।

 

লেনাদি আলস্য জড়ানো চোখে বিড়বিড় করছিল, ‘হোয়াই ইউ পিপল ডোন্ট ডু ইট ফর আওয়ারস!

 

পাঁচ

 

সেদিন মাথায় একটা কবিতা ঘুর ঘুর করছিল পথিকের। একটা অফ পিরিয়ড পেতেই ও ভাবল কবিতাটা নামিয়ে ফেলতে হবে। সাদা কাগজ আর পেন তার পকেটেই থাকে। বই খাতা ক্লাস রুমে রেখে ও হাঁটতে লাগল। খেলার মাঠ, শাল জঙ্গল পেরোলে কলেজের পাঁচিল। পাঁচিলের ওপারেই ছোট্ট ক্যানেল। কুলকুল জলের শব্দ। দূরে তাকালে দেখা যায় ছাতার দিঘির বিস্তৃত জলরাশি। ভিতরের দিকের প্রাচীরের গায়ে একজায়গায় পুরানো ইট ঢিবি হয়ে আছে। তাতে পা দিয়ে অনায়াসে সীমানা প্রাচীরের উপর বসে সৗন্দর্যে বিভোর হয়ে কবিতার কথা ভাবা যায়। জায়গাটা খুব পছন্দ পথিকের। সেদিকেই হাঁটছিল ও। হঠাৎ জঙ্গলের ভিতর খুক খুক কাশির শব্দে থমকে দাঁড়াল সে। পিউ আর কেমিস্ট্রির রুষা। রুষার হাতে একটা কল্কে, যা থেকে দু’জনেই একবার করে টান মারছে। পথিককে দেখে পিউ ডাকে, ‘এই গুড বয়, শোন শোন, এদিকে আয়, একা একা কোথায় যাচ্ছিস? তোর সখীরা কই?’

 

পথিক বুঝতে পারে পিউয়ে-র নেশা হয়ে গেছে। এই কারণে ও সব ক্লাস করে না আজকাল।

 

‘তোরা কল্কে নিয়ে…’

 

‘সিগারেটে পুরে হয় না রে মাইরি। গাঁজা খেলে কল্কেতে ফেলেই খাওয়া উচিত…উঁহ…কী স্বাদ । মাইরি! দু’টান মেরে দ্যাখ…’

 

‘আমি গাঁজা খাই না, নট ইভন বিড়ি, সিগারেট, চা…’

 

‘চা খাস না… হি হি… চা খায় না…দুধ তো খাস…’

 

‘না, তাও খাই না।’ নাকের পাটা ফুলিয়ে জবাব দেয় পথিক।

 

‘অলে বাবা… কচি ছেলে দুদুও খায় না…।’ হঠাৎ তড়াক করে রুষার গায়ের হেলান ছেড়ে উঠে বসে পিউ। ‘সেদিন তাহলে লেনাদির ঘরে গিয়ে কী খেয়ে এলি?’

 

পিউ আর রুষা দুজনেই হাসতে থাকে হো হো করে।

 

চমকে ওঠে পথিক। তার লেনাদির ঘরে গোপন অভিসারের কথা এরা জানল কী করে!

 

‘শালা ভাবছিস চুপি চুপি করে গেলাম, এরা জানল কী করে?

 

হা-হা-হা… এমন অভিসারের কথা এই মফস্সলে চাপা থাকে না সোনা…। গেছিলি তো একা একা…পায়ে হেঁটে। আসার সময় যে স্কুটিতে চড়ে একেবারে কলেজের গেট পর্যন্ত চলে এলি…হি হি… কচি ছেলেটার খিদে পেয়েছে রে রুষা, একটু দুদু খাওয়া…’

 

মাথা ঘুরতে থাকে পথিকের। সময়টা বড়ো দ্রুত বদলে যাচ্ছে। তার সাথে তাল রেখে হাঁটতে পারে না সে… ছোট্ট থেকেই দেখেছে তার শিক্ষক বাবা সমাজতন্ত্রের আদর্শে বিশ্বাসী। তাদের ঘরে রুশ দেশের বাংলা পত্র-পত্রিকা, বই-সাহিত্য ছিল ঠাসা। সেগুলো ছোটো থেকে গোগ্রাসে গিলেছে সে। তাদের মতাদর্শের অনুসারী এই অঙ্গরাজ্যের হাত ধরে সারা দেশে একদিন সমাজতন্ত্র আসবে এমন স্বপ্ন ছিল বাবার, যা ক্রমশ ফিকে হয়ে যাচ্ছে। এখন ভোটে জিতে ক্ষমতায় টিকে থাকাই আসল। কলেজগুলোতেও ভোটে জেতার জন্য কী সুবিশাল আয়োজন! বাবা যে কমিউন গড়ার গল্প শোনাতেন তা আজ প্রলাপ বা বিলাপের মতন শোনায়…

 

‘উরুর তিলটা দেখেছিস… লেনাদির উরুর সেই বিখ্যাত তিল…’

 

‘বিদ্যুতের শক খাওয়ার মতো চমকে ওঠে পথিক। লেনাদির ডান দিকের ফরসা উরুর মাঝ বরাবর কপালের বড়ো টিপের সাইজের একটা ঘোর কালো তিল…সেদিন হাত বুলিয়ে দেখেছিল সে…’

 

তার কান গরম হতে থাকে…কী করে সম্ভব…

 

‘তুইও যেমন… শালা একটা প্রসের সাথে শুতে গেছিস…গোটা কলেজ জানে ওর সারা শরীরের কোথায় ক’টা তিল আছে…’ ভক ভক করে গাঁজার ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলে রুষা।

 

মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকা কবিতাটা কোথায় চলে যায়… শাল জঙ্গলের মধ্যে ধপ করে বসে পড়ে পথিক।

 

ছয়

 

পরদিন তার কবিতা আশ্রমে যাবার পথে পিউকে একা বসে থাকত দেখল পথিক। খেলার মাঠের শেষে। শাল জঙ্গলের শুরুতেই। টান মারার জন্য জাস্ট আড়াল নেওয়া আর কি!

 

‘আসতে পারিস। কোনও পরিশ্রম করাব না… নেশালু কণ্ঠে বলে পিউ।’

 

বিনা বাক্যব্যয়ে পাশে গিয়ে বসে পথিক। বুঝতে পারে আগে থেকেই টান দিচ্ছে পিউ। তাই ক্লাসে যায়নি।

 

‘তোদের তো ভালোই হল…’ জড়ানো গলায় বলে পিউ।

 

‘কেন?’

 

‘শুনিসনি?

 

‘না তো, কী?’

 

‘তোদের কিছু ক্যান্ডিডেট পারচেজ করতে চাইছে বিপ্লব বাবুদের দল। দু’হাতের উপর পিঠ হেলিয়ে বিড়বিড় করে পিউ।

 

এরকম কথা আগে একবার শুনেছিল পথিক।।

 

‘সেজন্য নমিনেশন জমা দেবার পরই তোদের গাড়ি করে নিয়ে চলে যাওয়া হবে মাইথনের একটা হোটেলে। চারবেলা খাওয়া,

 

মউজ-মস্তি। তোদের পাহারায় থাকবে সঞ্জয়দা, লেনাদি। কটা দিন লেনাদির কাছাকাছি থাকবি…’

 

‘বেশ করব থাকব।’ রাগ দেখিয়ে বলে পথিক। ‘আমারও একটা গার্ল ফ্রেন্ড-এর দরকার আছে…’

 

‘মাই গড, লেনাদি তোর গার্ল ফ্রেন্ড! থার্ড ইয়ারে তিনবছর ড্রপ… পার্টির নির্দেশে ও আর সঞ্জয়দা কলেজ দেখছে। ছাত্র না থাকলে ‘বহিরাগত’ হয়ে যাবে, তাই…’

 

‘হোক ছ’বছরের বড়ো, তবু তাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে পারব আমি।’

 

রাগ দেখিয়ে বলে পথিক। পিউ-র প্রত্যাখানের জ্বালা মেটাতে। কিন্তু সে জানে আর তার লেনাদিকে চুমু খাওয়া হবে না। চারদিন আগেই সে দেখেছে সেকেন্ড ইয়ারের লম্বা বীরুকে। স্কুটি চড়ে লেনাদির সাথে ক্ষণিকায় যেতে। তখনই সে বুঝতে পারে, কেন ক’দিন ধরে কাছাকাছি ঘুর ঘুর করলেও তাকে আর ডাকছে না লেনাদি, তার সফেন সমুদ্রের জোয়ারের জলে নামতে। এদিকে জীবনের প্রথম নারী সঙ্গমের পর পথিকের তখন পাগলের মতো অবস্থা। চোখ বুজলেই সফেন সমুদ্র… কালো টিপের মতো তিল। তাল তাল নরম মাংসের মধ্যে স্বর্গের সমস্ত সুখ। অথচ লেনাদি কী নিস্পাপ ভাবে কবিতার কথা, ইউনিয়ন ভোটের কথা, সমাজবাদের কথা আওড়ে যায়! যেন তাদের মধ্যে কিছুই হয়নি কোনওদিন! লেনাকে জানার ইচ্ছা তাকে পাগল করে দিয়েছিল। সেই ইচ্ছাই তাকে জানিয়েছে কলেজের লেকচারার জাহিরবাবুর ভাড়া বাড়িতে প্রায়ই রাত কাটায় সে। আর কলেজের লালটুস দেখতে জুনিয়র, সিনিয়র অনেকেই চেনে তার শরীরের ঘাত প্রতিঘাত, চড়াই উতরাই। সেদিনের জড়নো গলায় বলা কথাটার মানে এদ্দিনে বুঝতে পারে পথিক, ‘হোয়াই ইউ পিপল ডোন্ট ডু ইট ফর আওয়ারস!’

 

লেনাদি এক পুরুষে তৃ৫ হবার মতো মেয়েই নয়। তবে তার এই আবিষ্কার সে পিউ-র কাছে চেপে যায়।

 

‘খা শালা, কত চুমু খাবি পিসিমাকে, ফ্রি তে খেয়ে নে…হা-হা-হা-হা, হাসির দমকে কাশতে থাকে পিউ।

 

‘হাসির কী হল?’ জিজ্ঞেস করে পথিক।

 

‘আমার সেই দিনটার কথা মনে পড়ছে। মুখে ‘আই লাভ ইউ’ বলতে না পারা সেই ছেলেটার কথা…. একটা চিরকুট কাগজ নিয়ে আমার পিছু পিছু ঘুরে বেড়াচ্ছিল…’

 

হঠাৎ ধবক করে জ্বলে ওঠে যেন পিউর চোখ। কিড়মিড় করে দাঁত। পথিকের বুকের কাছের জামা খামচে ধরে বলে ওঠে, ‘ক্যান ইউ ব্রিং দ্যাট গাই ব্যাক টু মি…?’

 

‘ছাড়…বোতাম ছিঁড়ে যাবে…’

 

‘পারবি না বল? জানতাম…’ শিথিল হয়ে যায় পিউ এর হাত।

 

একটা সিগারেট বের করে লাইটার জ্বালায় পিউ। টান দিতে দিতে বলে, ‘ডু ইউ নো, হু ইজ মাই ফার্স্ট ক্রাশ?’

 

পথিক কিছু না বলে চুপ করে থাকে।

 

‘ইউ… ব্লাডি শিলি ইউ… পথিক রায়… মাই ক্লোজ কম্পিটিটর ইন দ্য ক্লাস। বাট দেয়ার ইন দ্য ভিলেজ ইজ নো অ্যাটমোস্ফিয়ার ফর আওয়ার লাভ। নাইদার ইউ কুড টেল মি এনিথিং, নর আই…’

 

শূন্যে ক’বার ধোঁয়া ছাড়ে পিউ।

 

‘তখন রাতদিন পড়ছি জয়েন্টের জন্য। স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হব।

 

যে-স্যারের কাছে টিউশন নিতাম… বায়োলজির সুনীল স্যার…তাঁর ছেলে উদ্দী৫ তখন ডাক্তারির সেকেন্ড ইয়ারের স্টুডেন্ট। মাঝে মাঝে ছুটিতে বাড়ি আসত… জয়েন্ট অ্যাস্পিরান্ট আমাদের কাছেও তখন হিরো। ওই শালা আমাকে বলেছিল রাতে ঘুম পেলে সিগারেট খাবে…। সেই থেকে…’

 

পথিক অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে পিউয়ে-র দিকে।

 

‘আর কী বোকা ছিলাম আমি! ওর বাবা মা দু’জনেই টিচার। ফাঁকা বাড়িতে একদিন ডাকল। আমিও গেলাম গাইডেন্স-এর লোভে। বাঁধভাঙা ভালোবাসার কথা শুনতে শুনতে নিজেকে হারিয়ে ফেলল একটা সতেরো বছরের মেয়ে। টোটালি আন প্রিপেয়ার্ড অবস্থায় একটা আন প্রোটেক্টেড সেক্স। সব মিটে গেলে নিজের ভুল বুঝতে পারলাম। ও তখন ডেট-ফেট কী সব হিসেব করে বলল আমার সেফ পিরিয়ড চলছে… ওরিড হবার কিছু নেই। তারপরও ওর ডাকে সাড়া দিয়ে পাঁচবার মিলিত হয়েছি। তবে প্রত্যেকবার উইথ প্রোটেকশন। কিন্তু দেড়মাসের মাথায় আমি বুঝতে পারলাম আই ওজ মিসিং মাই পিরিয়ড…’

 

‘ওই টার্মিনেশনের জন্য অ্যারেঞ্জ করেছিল একটা নার্সিংহোমে। তারপর কুড়ি দিন বাড়ি থেকে বেরোতে পারিনি। মা-কে ঝুড়ি ঝুড়ি মিথ্যা বলেছি। আর তারপর থেকেই ওর সুইচ অফ। সারাদিন শুধু অঝোরে কেঁদেছি। এমন সময় একটা মেয়ের মনের অবস্থা কী হয়… সেসময় কাকে পাশে দরকার হয়…। তোর ওই ‘মেয়েরা যেমন হয়’ কবিতা পড়ে বোঝা যাবে না কোনওদিনও, রাস্কেল…’

 

হঠাৎ কেঁদে ফেলে পিউ। আই ওয়াজ টোটালি ডিভাস্টেটেড। অ্যাট দ্যাট টাইম ইউ কেম টু টেল মি ‘আই লাভ ইউ’। ইট ওয়াজ আ লেট কল, পথিক…’

 

‘স্যারের কাছে একদিন সব বলে কান্নায় ভেঙে পড়ি। স্ত্বান্নার জন্য তাঁর হাতের স্পর্শ মাথা থেকে নেমে ক্রমশ আমার সারা শরীর ঘুরতে শুরু করে… ছেলের সাথে শুয়েছি শুনেই ওঁর চাউনি কেমন যেন বদলে গেল। ভাবছিলাম… সেদিন ওই বাস্টার্ডের মুখে থুতু ছিটিয়ে বেরিয়ে আসি। জয়েন্টের স্বপ্ন ফিনিশড…’

 

‘যে-ছেলেটা মুখে বলতে পারে না ‘আই লভ ইউ’, তার হাতে একটা অ্যাবরশন হওয়া মেয়েকে তুলে দিতে মন চায়নি সেদিন। তাই ফিরিয়ে দিয়েছিলাম।’

 

‘কিন্তু সে যদি আজও চায়?’ পিউয়ে-র একটা হাত খপ করে নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে প্রশ্ন করে পথিক। ‘সেও তো একটা ভুল তোরই মতো করে বসেছে? তোকে একজন পুরুষ ব্যবহার করেছিল, আমাকে একজন নারী। যে-দুটোর কোনওটার মধ্যে ভালোবাসা ছিল না…’

 

‘তোকে ফিরিয়ে দিয়ে কতরাত কেঁদেছি জানিস, রাস্কেল…।’ তারপর ডিপ্রেশন শুরু হয়। বন্ধুদের কাছ থেকে মদ গাঁজা সব খাওয়া আস্তে আস্তে শিখে যাই।’

 

‘এখনও কি ফিরে আসা যায় না?’

 

‘কে ফেরাবে তারে… সব স্বপ্ন লুঠিত হয়ে গেছে যার, সবার অগোচেরে…’

 

‘আছে একজন।’

 

‘সে ইউনিয়নের পঙ্কিলতায় নিমজ্জিত।’

 

‘ছেড়ে দেবে সে ইউনিয়ন।’

 

‘বেট?’

 

‘বেট।’

 

ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে পিউ।

 

পিউয়ে-র হাতে ধরা রুমাল নিয়ে চোখের জল মুছিয়ে দেয় পথিক। নির্জন চরাচরে দু’জন মানব মানবী দু’জনকে নতুন করে দেখতে থাকে। চার চোখের মুগ্ধতায় তখন ভর করে হাঁটতে থাকে ভাষাহীন শব্দেরা। অনেক না বলা কথা যেন বলা হয়ে যায় মুহর্তে। একে অপরকে পরম আশ্লেষে বুকে জড়িয়ে ধরে ওরা। পিউ-র কাঁধে পথিক-এর মাথা। তার হাতে ধরা রুমালে একটা মৗমাছি এসে বসে। পথিক ফিসফিস করে বলে, ‘পিউ তোর রুমালে মৗমাছি…’

 

পিউ নেশা ধরানো গলায় প্রশ্নের স্বরে আওয়াজ দেয়, ‘উমমম…’

 

পথিক পিউ এর কানের কাছে মাথা রেখে অস্ফুটে বলতে থাকে,

 

‘দুহাতে কোনও কাজ ছিল না, দুটোই মারকুটে

 

দুহাত ভরে সেলাই এলো নাইন-টেনে উঠে

 

এহাতে এল রান্নাঘর, ওটায় তানপুরা

 

হাতের কথা জেনেও গেল দাদার বন্ধুরা

 

দুহাতে আজ ভরা সেলাই, আঙুলে সুতো কাঁচি

 

টেবিল ক্লথে ভ্রমর এলো, রুমালে মৗমাছি…’

 

আরও গভীর ভাবে পথিককে চোখ বুজে জড়িয়ে ধরল পিউ। শালের পাতায় পাতায় তখন লুটোপুটি খাচ্ছে শীতের রোদ। দূরে কোথাও একটা সুখপাখি ডেকে উঠল। তিনবার।

(কবিতার ঋণছ ‘সেলাই খাতার নকশা’ –শিবাশিস মুখোপাধ্যায়)

শিল্পী

আমার শ্যালক সুজয়কুমার শিল্পী। শিল্পীরা একটু খামখেয়ালি হয়। আর শিল্পী মানেই বড়ো মাপের প্রেমিক। সবকিছু ঠিকঠাক চললে তার প্রেমের নিদর্শন এতদিনে দৃষ্টান্ত হতো। অন্তর্ঘাতের জন্যে হয়নি। নিজেকে প্রমাণ করতে না পারার ব্যর্থতা তাকে আজও কষ্ট দেয়। বাড়িতে নতুন কেউ এলে যে-কোনও অজুহাতে ছাদে নিয়ে যায়, যেখানে খোদাই করে লিখেছিল ‘দোলনচাঁপা’। পাশে পায়রার ফাঁকা বাক্স। এখানে দাঁড়িয়ে দোলনচাঁপাদের বাড়ির ছাদ এবং ওর ঘরের জানালা দেখা যায়। প্রথম পরিচয় থেকে শুরু করে দোলনচাঁপার বিয়ে পর্যন্ত সবটাই শ্রোতাকে ধৈর্য ধরে শুনতে হয়। কেবল ব্যাগ চুরির ঘটনাটা চেপে যায়। হয়তো দোলনচাঁপার থেকেও গৃহত্যাগ করতে না পারার ঘটনা তাকে বেশি কষ্ট দেয়। আরও কষ্ট হয় যখন বাড়ির মানুষগুলো উপহাস করে। যেন প্রেমে ব্যর্থ হওয়ার থেকে হাস্যকর আর কিছু হয় না।

কাউকে বিশ্বাস করে না সুজয়। না বাড়ির, না বাড়ির বাইরে কারওকে। একমাত্র আমাকে যা একটু ভরসা করে। হতে পারে একসময় আমি শিল্পচর্চা করতাম বলে, এখনও খোঁজখবর রাখি বলে। তার চেয়েও বড়ো কথা সুজয়ের ছবির সমঝদার। দ্বিতীয় কারণটি পারিবারিক। সুজয়ের দিদিকে আমি ভালোবেসে বিয়ে করেছি। বাড়ির অমতে, পালিয়ে। সুজয়দের বাড়ি থেকে মেনে নিয়েছে বছরখানেক পরে। সেখানে মধ্যস্থতাকারী হিসাবে বড়ো ভূমিকা ছিল সুজয়ের। এখন সকলের সাথে ভালো সম্পর্ক। একমাত্র শ্বশুরমশাই এখনও সেভাবে মেনে নিতে পারেননি। কথা বলেন প্রয়োজনে।

আমার শ্বশুরবাড়ি এখনও একান্নবর্তী। শ্বশুরমশায়ের পাঁচ মেয়ে চার ছেলে, আমি বলি নবরত্ন। জ্যাঠতুতো ভাইবোন ধরলে পনেরো। ভাগ্যিস কাকাশ্বশুর বিয়ে করেননি। করলে সংখ্যাটা কোথায় যেত সন্দেহ! সব পিঠোপিঠি ভাইবোন। বন্ধুর মতো সম্পর্ক। দল বেঁধে ফুটবল খেলছে, সিনেমায় যাচ্ছে, এ ওর পেছনে লাগছে, হৈ-হুল্লোড় লেগে আছে সবসময়। সবচেয়ে বেশি পেছনে লাগে সুজয়ের। সুজয়ের খ্যাপাটে আচরণ, গোলমেলে কথাবার্তা আর আজব কাজকর্মের জন্যই হয়তো।

শিল্পী সুজয়ের কদর কেউ না বুঝুক সুজয় জানে, এই সময়ের সে ব্যতিক্রমী প্রতিভা। ছবির বিষয়, আঙ্গিক এবং উপস্থাপন সবেতেই স্বতন্ত্র। তবে চিত্রকলা নয়, ভাস্কর্যে তার আগ্রহ বেশি। কিছু দিন মূর্তি নির্মাণ শিখেছিল। ইচ্ছা আছে শুশুনিয়া পাহাড়কে ভবিষ্যতে সাধনপীঠ হিসাবে বেছে নেবে। দেশে হিমালয়ের মতো পাহাড় থাকতে শুশুনিয়া কেন? কারণ শুশুনিয়া চুনা পাথরের। চুনা পাথরই বিবর্তনের ফলে মার্বেল পাথরে রূপান্তরিত হয়। শুশুনিয়া এখন মাঝামাঝি অবস্থায়। অপেক্ষাকৃত নরম চুনা পাথর কুঁদে মূর্তি বানানোয় কষ্ট কম, ভবিষ্যতে সেই মূর্তি মার্বেল মূর্তিতে পরিণত হবে। কয়েক হাজার বছর সময় লাগবে হয়তো। মহাকালের নিরিখে এটা এমন কিছু সময় নয়। কেবল সে থাকবে না তখন। না থাকুক, তার শিল্প থাকবে। আর শিল্প থাকলেই শিল্পীর অমরত্ব। কাজটা সময়সাপেক্ষ। প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। সুজয় পয়সা জমাতে শুরু করেছিল।

একসময় তার জীবনে প্রেম এল।

বাড়ির উলটো দিকে ফাঁকা জায়গাটা কিনে বাড়ি বানালেন একজন মাস্টারমশাই। স্বামী-স্ত্রী আর তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে ছোটো সংসার। ছেলেটি ছোটো। বড়ো মেয়ে দোলনচাঁপা প্রথমবর্ষের ছাত্রী। সুজয়ের ঘরের জানলা দিয়ে বাড়িটা দেখা যায়, ছাদে উঠলে দোলনচাঁপার ঘরের জানলা। কিছু দিনের মধ্যে সুজয়ের বোনেরা আবিষ্কার করল, সুজয়ের ক্যানভাস জুড়ে দোলনচাঁপার মুখ। ততদিনে দুই পরিবারের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা হয়েছে, সুজয়ের বোনদের সাথে দোলনচাঁপার বন্ধুত্ব হয়েছে, বিকালের দিকে সুজয়দের বাড়ি আসে গল্পগুজব করতে। কথাটা তার কানেও উঠল এবং সুজয়ের বোনদের সাথে হাসিতে মাতল। আড়াল থেকে লক্ষ্য করল সুজয়, খারাপ লাগল তার। অপমানটা জমে থাকল ভেতরে।

দুদিন বাদে কলেজ থেকে ফেরার সময় দোলনচাঁপার পথ আটকাল সে, আপনার সাথে কথা আছে।

দোলনচাঁপা জানত সুজয়ের দুর্বলতা, এমন কিছু যে ঘটতে পারে সে আশঙ্কাও ছিল। মানসিক ভাবে একরকম প্রস্তুত ছিল। তবু না বোঝার ভান করল, ওমা এখানে কেন! বাড়িতে বললেই তো পারতেন।

–সব কথা বাড়িতে বলা যায় না। আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে।

–তাহলে তো আমার মা-কে জানানো উচিত। একদিন আসুন না আমাদের বাড়ি। মা-র সাথে আলাপ করিয়ে দেব।

–সেদিন অমন বিশ্রী ভাবে হাসলেন কেন? আপনার ছবি অাঁকা অন্যায় না হাস্যকর? আপনি আপনাকে হাস্যকর ভাবতে পারেন, আমি ভাবি না। আমার জীবনে আপনি…

–এমা ছিছি, এ তো আমার সৗভাগ্য। আপনার মতো গুণী শিল্পী…

সুজয় খুশি হল, আপনি দেখেছেন?

–দেখেছি। আপনার অনুমতি না নিয়েই আপনার ঘরে ঢুকেছিলাম।

–ভালো লেগেছে?

–ভীষণ।

–আসলে ছবির আপনি তো শুধু আপনি নন, কল্পনায় আপনাকে যেভাবে দেখি… কথাটা কীভাবে বলব ঠিক বুঝতে পারছি না। আপনি ভুল বুঝলে…

দোলনচাঁপা বিষম খেতে খেতে সামলে নেয়, বুঝেছি। সত্যিই অন্যায় হয়ে গেছে। আপনার অনুমতি ছাড়া ঘরে ঢোকা উচিত হয়নি।

–আমি সে কথা বলছি না। আপনার যখন খুশি যাবেন, যতক্ষণ খুশি থাকবেন, চাইলে সারা জীবন…

এবার আর সামলাতে পারল না, বিষম খেল। একটু ধাতস্থ হলে বলল, ফুচকা খাবেন? আমার ফেভারিট।

–আমারও।

–চলুন।

–পয়সা কিন্তু আমি দেব।

–অফার আমি করেছি, আপনি কেন দেবেন?

–আমার ইচ্ছা।

–পরের দিন কিন্তু আমি দেব।

পরের দিন ফুচকা নয়, রেস্টুরেন্ট। ফিস কবিরাজির ভিতর কাঁটা চামচ চালাতে চালাতে আসল কথাটা বলে ফেলল সুজয়, কিছু বুঝতে পারছেন?

–কী?

–আমি আপনার প্রেমে পড়েছি।

টকাস করে এক টুকরো ফিস কবিরাজি মুখে পুরে দোলনচাঁপা বলল, থ্যাংক য়ু।

সুজয় থতমত খেল। এই কথায় এই উত্তর! তালগোল পাকিয়ে যায় কেমন। কথা খুঁজে পায় না। দোলনচাঁপা মুখ নামিয়ে হাসি চাপার চেষ্টা করছিল। মুখের খাবার শেষ হলে সোজা তাকাল সুজয়ের দিকে। স্বাভাবিক ভাবে বলল, কেউ ভালোবাসে শুনলে কার না ভালো লাগে বলুন। এই একটা ব্যাপারে আমি কিন্তু ভাগ্যবান, অনেকের মুখেই কথাটা শুনেছি। তবে আপনার মতো শিল্পী যখন বলে…

–আমি বোধহয় আপনাকে বোঝাতে পারছি না।

–পেরেছেন। সত্যি কথা বলতে কী, এ ব্যাপারে আমি অসহায়। দোলনচাঁপা এবার সিরিয়াস হয়, মেঘ করে আসে মুখে। দমধরা গলায় বলে, সাধ থাকলেও সাধ্য নেই। বাবার আবদার তার পছন্দে বিয়ে করতে হবে, না হলে আত্মহত্যা করবে। বাবাকে আমি ভীষণ ভালোবাসি, সে আঘাত পায় এমন কোনও কাজ করতে পারব না।

–বিষয়টা আমার উপর ছেড়ে দাও। তোমার বাবাকে রাজি করানোর দায়িত্ব আমার। আমি তোমার মতামত জানতে চাইছি।

–বললাম তো, বাবার ইচ্ছাই আমার ইচ্ছা।

সুজয় খুশি হয়। দোলনচাঁপা তাকে হতাশ করেনি, বরং আশার আলো দেখিয়েছে। এই ছোট্ট আলোকবিন্দু একদিন দাবানলে পরিণত হবে।

সুজয় পক্ষীরাজ হয়ে ওড়ে, পিঠে দোলনচাঁপা। কখনও ভিক্টোরিয়া, রবীন্দ্রসদন, কখনও সিনেমা, নাটক। দেদার পয়সা ওড়ে। জমানো টাকায় হাত পড়ে একসময়। তবে এসব প্রসঙ্গ গৗণ। ভালোবাসার কাছে পৃথিবীর সমস্ত অর্থও কিছু না। তার শিল্পকর্মেও জোয়ার আসে। একটার পর একটা দোলনচাঁপার পোর্টেট। কখনও ওয়াটার কালার, কখনও অয়েল পেইন্টিং, কখনও স্রেফ পেন্সিল স্কেচ। ততদিনে দোলনচাঁপাদের বাড়ির দরজাও খুলে গেছে। দোলনের মা তাকে পছন্দ করে। সুজয় ডাকে মাসিমা। মাসিমার এটা-ওটা ফাইফরমাস খেটে দিতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে করে।

বছর দুই কেটে যায় এভাবে উড়তে উড়তে। দোলনচাঁপা বিএ ফাইনাল দেয়। সুজয়ের মনে হয় এবার দোলনের বাবাকে জানানো উচিত। অথচ বলি বলি করেও বলা হয় না।

মাসখানেক বাদে একদিন অসময়ে সুজয়ের ঘরে এসে হাজির হয় দোলনচাঁপা। অপরাধী অপরাধী ভঙ্গিতে একটা বিয়ের কার্ড সুজয়ের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে, বাবা হঠাৎ ঠিক করে ফেলল।

আচমকা আঘাতে সুজয় হতভম্ব। কার্ডটা মুঠো করে ধরে চুপচাপ বসে রইল। কিছু বলতে পারল না।

কাছে এগিয়ে এল দোলনচাঁপা, সুজয়ের ডানহাতটা চেপে ধরে অনুনয় করল, বিয়েতে থেকো কিন্তু। না হলে বুঝব… শিল্পীর ভালোবাসার কোনও মূল্য নেই। সব মিথ্যে…

সাচ্চা প্রেমের প্রমাণ দিতে বিয়ের দিন আর পাঁচজন নিমন্ত্রিতের মতো সেও উপস্থিত থাকল। কিছু কিছু দায়িত্ব পালন করল। সাতপাকের সময় পিঁড়ি ধরল। শুভদৃষ্টির সময় প্রত্যাশা করল এক বারের জন্য হলেও তার দিকে তাকাবে। শেষপর্যন্ত না তাকালেও দুঃখ পেল না। ভাবল সংকোচে…

পরদিন সন্ধ্যায় চাকুরীজীবী বরের হাত ধরে শ্বশুরঘরে যাওয়ার পর সবার অলক্ষ্যে ছাদে উঠে এল সুজয়। বিয়ের চিঠি হাতে পেয়ে দুঃখে ছাদ খোদাই করে সেখানে দোলনচাঁপার নাম লিখেছিল। পাশে পায়রার বাক্স। পায়রা পোষার শখ সুজয়ের ছোটোবেলা থেকে। বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় গোটা তিরিশেক পায়রা এই মুহূর্তে তার জিম্মায়। দরজা খুলে সবগুলোকে উড়িয়ে দিল। অনেক রাত অবধি চোখের জল ফেলল। চাঁদ তারা সাক্ষী রেখে প্রতিজ্ঞা করল, শিল্পীর ভালোবাসায় খাদ থাকে না। প্রমাণ আমি করবই। কেবল তোমার কাছে না, তামাম দুনিয়ার কাছে…

এরপর থেকে সময় পেলেই ছাদে আসে। বিশেষ করে রাতের দিকে। দোলনচাঁপা-র সামনে। ফাঁকা পায়রার খোপের দিকে তাকিয়ে থাকে। দোলনচাঁপাদের বাড়ির দিকে তাকায় না। দিনেরবেলা যতক্ষণ ঘরে থাকে দরজা বন্ধ করে রাখে। বোনেদের কারও কারও সন্দেহ হওয়ায় গোয়েন্দাগিরি শুরু করে দিল। বিশেষ কিছু উদ্ধার করতে না পারলেও এটুকু বুঝছে, রহস্যের মূলে আছে একটা বড়ো ব্যাগ। সাধারণত টুরে যাওয়ার সময় যে-ধরনের ব্যাগ ব্যবহার হয়। তবে কি সুজয় কোথাও যাচ্ছে! বাড়ি থেকে বেরনোর সময় দরজায় তালা লাগিয়ে বেরোয়। কোথায় যাচ্ছে জিজ্ঞাসা করলে বলে না। তবু খবর আসে বাড়িতে। বন্ধু-বান্ধব আত্মীয়-স্বজন পরিচিত সকলের কাছ থেকে টাকা ধার করছে। কারও কারও কাছে অনুদান হিসাবেও নিয়েছে। কারণ হিসাবে বলেছে, বাড়িতে আর ভালো লাগছে না। গৃহত্যাগী হয়ে পাহাড়ে যাবে।

বাড়ির লোকজন ভয় পায়। এবার আর সুজয়ের আচরণে হাসে না। সুজয়ের অনেক বিপজ্জনক ক্ষ্যাপামির স্মৃতি এখনও তারা ভুলতে পারেনি। সুজয়ের বাবাও চিন্তায় পড়েন। ছেলের জেদ তিনি জানেন। কারও কথায় সিদ্ধান্ত বদলাবে না। একমাত্র তার এই অপ্রিয় জামাইটি চেষ্টা করলে হয়তো পারতে পারে। এই একটি মানুষকেই সে যা একটু সমীহ করে। তাই জরুরি তলব পাঠালেন।

গেলাম। প্রথমে দেখা করলাম সুজয়ের সাথে। দোলনচাঁপার বিয়ের খবর আগেই পেয়েছিলাম। স্ত্বান্না দিলাম ভুলে যাওয়ার জন্যে। নতুন করে জীবন শুরু করার পরামর্শ দিলাম। সুজয় উত্তর দিল না। চুপচাপ শুনল। বুঝলাম আমার কথা ভালো লাগছে না। বাধ্য হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, গৃহত্যাগী হচ্ছ শুনলাম?

–হু।

–দোলনচাঁপার মতো একটা ফালতু মেয়ের জন্য?

-না, আমার প্রেমের প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে।

–কোথায় যাচ্ছ?

–শুশুনিয়া।

–তোমার সেই প্রোজেক্ট?

–হ্যাঁ।

–বিষয় ঠিক হয়েছে?

–আমার প্রেম। দোলনচাঁপা। দোলনচাঁপার মূর্তি বানাব।

ব্যাখ্যা যাই হোক রোগের নাম দোলনচাঁপা। শিল্পী মেয়ে। ও মেয়ে যে দাগা দেবে প্রথমবার দেখেই মনে হয়েছিল। বাড়ির সবাই বুঝত। যে কারণে কেউ মাথা ঘামায়নি। কিন্তু তার পরিণতি এমন হবে কেউ কল্পনাও করেনি।

বললাম, গুড আইডিয়া। কবে যাচ্ছ?

–সামনের বুধবার। কিছু ছেনি ছিল, কিছু বানাতে দিয়েছি। ওগুলো পেতে পেতে মঙ্গলবার। বিভিন্ন মাপের গোটা দশেক হাতুড়ি কিনেছি।

–আমার কোনও সাহায্য লাগলে বোলো। সাধ্যমতো চেষ্টা করব।

–দেখবেন বাড়ির কেউ না জানে। আটকাতে পারবে না জেনেও দল বেঁধে ঝামেলা পাকাবে। শুভকাজে যাওয়ার আগে ঝামেলা ভালো লাগে না।

–বেশ, তুমি যা চাও তাই হবে।

সুজয়ের পর শ্বশুরমশাই। সে অর্থে এই প্রথমবার মুখোমুখি। প্রথমবার কোনও সিরিয়াস বিষয় নিয়ে আলোচনা। এর আগে কুশল বিনিময় ছাড়া কোনও কথা হয়নি। বেশ অসহায় আর উৎকণ্ঠিত মনে হল ভদ্রলোককে। জানতে চাইলেন, কিছু জানতে পারলে?

–জেনেছি। আমাকে বিশ্বাস করে বলেছে। কাউকে বলতে বারণ করেছে। তবু আপনাকে বলব, বলা প্রয়োজন তাই…। কাউকে বলতে পারবেন না। কথা দিতে হবে।

–বিশ্বাস করতে পারো।

শ্বশুরমশাইকে সব কথা বললাম। শুনে তাঁর কপালের ভাঁজ আরও গভীর হল। চুপচাপ ভাবলেন কিছুক্ষণ, তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, কী মনে হয়, সত্যিই যাবে?

–আপনার ছেলেকে আপনি জানেন। যেভাবে ক্ষেপে উঠেছে মনে হয় না আটকানো যাবে।

–কত দিনের প্রোগ্রাম?

–বলা কষ্ট। দু বছর হতে পারে, পাঁচ বছর হতে পারে আবার সারা জীবনের জন্যও হতে পারে।

–অসম্ভব। এ হতে দেওয়া যায় না। ওকে আটকাও। একাজ একমাত্র তুমি পারবে। তোমার কথা শুনবে।

–কারও কথা শোনার মতো মানসিকতা ওর নেই।

–তোমার উপর আমার ভরসা আছে।

খুশি হই। উপভোগ করি ভদ্রলোকের অসহায়তা। আনন্দ হয় আমার শরণাপন্ন হওয়ায়। গত দশ বছর ধরে নিঃশব্দে আমাকে অপমান করে চলেছে। এখন বিপদে পড়ে…

আমি চুপ করে থাকি।

এক ভোরে বাড়িসুদ্ধ মানুষের ঘুম ভাঙল সুজয়ের চিৎকারে। সবাই ছুটে এল। ঘটনা গুরুতর, টাকাপয়সা ছেনি-হাতুড়ি সহ পুরো ব্যাগটাই গায়েব। অথচ দরজা জানলা যেমন বন্ধ ছিল তেমনই আছে। পড়ে আছে কেবল একটা বাটালির আছার। রসিকতা করতে ইচ্ছে করে ফেলে গেছে। বাড়ির সবাইকে উদ্দেশ্য করে হুংকার ছাড়ল, একাজ তোমরা করেছ। ভালো চাও তো ফেরত দাও।

এ ওর মুখের দিকে চাইল। কথা বলল না। এত বড়ো বুকের পাটা কার আছে ভাবার চেষ্টা করল সবাই। সবাই সবাইকে সন্দেহ করল। সিদ্ধান্তে পৌঁছোতে না পেরে আবার প্রথম থেকে ভাবতে শুরু করল…। সবাই সবাইকে জিজ্ঞাসা করল। শেষপর্যন্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছোল, ব্যাগটা চোরেই নিয়েছে।

সুজয়ের হম্বিতম্বিতে চোরের বিশেষ কিছু এসে গেল বলে মনে হল না।

সর্বস্ব খুইয়ে সব দিক থেকেই ভেঙে পড়ল সুজয়। সারাদিন বাড়িতে থাকে। ঘর থেকে বেরোয় না। দরকার ছাড়া কথা বলে না। ভাইবোনেরাও তার পেছনে লাগে না। তবে চোখে চোখে রাখে। অসঙ্গতি কিছু দেখলে নজরদারি আরও বাড়িয়ে দেয়।

স্বাভাবিক হতে অনেকদিন সময় লেগেছিল সুজয়ের।

এর পরের গল্পে কোনও বৈচিত্র্য নেই। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় পাত্রী খুঁজে বছরখানেকের মধ্যে সুজয়ের বিয়ে দিলেন শ্বশুরমশাই। বছর দেড়েকের মাথায় একটি কন্যাসন্তান হল। এখন সেই মেয়ের বয়স আড়াই বছর। পাঁচ বছরের ব্যবধানে দোলনচাঁপার শোক এখন ফল্গুধারায়, আলাদা করে কোনও বহিঃপ্রকাশ নেই। দোলন বাপের বাড়ি ঘুরতে এলেও মুখোমুখি হয় না। তবু কোনও কোনও তারাভরা রাতে ছাদে গিয়ে দাঁড়ায়। লেখাটা এখনও একইরকম আছে, একটু যা ছ্যাতলা পরেছে। পায়রার খোপগুলো ফাঁকা।

দোলনচাঁপার ঘরে এখন তার ছোটোভাই থাকে।

কেবল খোয়া যাওয়া ব্যাগটার দুঃখ এখনও ভুলতে পারেনি। সুজয়ের বিশ্বাস, তার সাথে অন্তর্ঘাত হয়েছিল। বাড়িরই কেউ বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। ব্যাগটার প্রসঙ্গ উঠলে এখনও সে উত্তেজিত হয়ে ওঠে। সারাজীবনের সমস্ত স্বপ্ন ওই ব্যাগটায় গচ্ছিত ছিল। প্রেমিকা তো গেছেই, ব্যাগটার সাথে প্রেমও গেল। গ্রীষ্মের দুপুরে কিংবা শীতের ভোরে, বর্ষার মেঘে কিংবা বসন্তের পলাশে-মাদলে শুশুনিয়ার নেড়া মাথায় তা দীর্ঘশ্বাস হয়ে ঘোরে।

আর কোনওদিনও শুশুনিয়া যাবে না সুজয়।

সুজয় এখন আর ছবি অাঁকে না।

গত পাঁচ বছরে শ্বশুরবাড়ির সাথে আমার সম্পর্কের আরও উন্নতি হয়েছে। গুরুত্ব বেড়েছে। গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে। সামান্য পারিবারিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেও আমার পরামর্শ নিতে ভোলেন না আমার শ্বশুরমশাই। তাঁর সাথেও সম্পর্কের উন্নতি হয়েছে। এখন আমি তাঁর প্রিয় জামাই।

ব্যাগটা শুধু অণুঘটকের কাজ করেছে।

ফান্ড রেইজিং

বুদ্ধিটা প্রথমে দিগন্তর মাথায় এসেছিল। রাহুলকে নিয়ে যদি একটা তিন চার মিনিটের ভিডিও বানিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া যায় তাহলে হয়তো কিছু একটা করা যেতে পারে। তিন্নি শুরুতে মোটেই রাজি হচ্ছিল না। কিন্তু ওর বাকি বন্ধুরাও ব্যাপারটাতে সায় দিল। বলল রাহুলের জন্য ফান্ড রেইজিং… এরচেয়ে ভালো উপায়ে আর করা যাবে না। ওদের জোরাজুরিতে নিমরাজি হলেও তিন্নি বলল রাহুলের সঙ্গে কথা বলে ও দু তিন দিনের মধ্যে ওদেরকে জানাবে।

দীপা, অরুণাভ আর সুপর্ণা নিজেদের মধ্যে চোখাচোখি করে তিন্নিকে আবার বোঝাবার চেষ্টা করতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই দিগন্ত বলে উঠল, ‘দেখ তিন্নি, রাহুল যেমন আমাদের বন্ধু তেমনই তুইও। গত চার পাঁচ মাস থেকে তোর ওপর দিয়ে কেমন ঝড় ঝাপটা যাচ্ছে আমরা সবাই সেটা দেখতে পাচ্ছি। সত্যি বলতো আর কত দিন তুই এভাবে টানতে পারবি? তোর ফিজিক্যাল স্ট্রেন, মেন্টাল স্ট্রেস তো আমরা শেয়ার করতে পারব না কিন্তু বন্ধু হিসেবে যদি ফিন্যানশিয়াল প্রবলেম কিছুটা লাঘব করতে পারি তো তাহলে আমাদেরও ভালো লাগবে। তুই চিন্তা করে রাহুলের সঙ্গে কথা বলে আমাদের তাড়াতাড়ি জানাস।’

দিগন্তর গলার আওয়াজটা বোধহয় সামান্য উঁচুর দিকে ছিল, তিন্নি ওকে ইশারাতে আস্তে কথা বলতে বলল তারপর চট করে উঠে গিয়ে ওদের এই বাড়ির একমাত্র বেডরুমের দরজাটা আলতো করে খুলে দেখে নিল রাহুল জেগে আছে কিনা। রাহুলকে চোখ বন্ধ করে ঘুমোতে দেখে দরজাটা সাবধানে টেনে দিয়ে বসার ঘরে এসে দেখল ওর বন্ধুরা ভিডিও বানাবার আলোচনায় মগ্ন।

তিন্নির মনে পড়ে যায় মাত্র সাত বছর আগে ওদের জীবনটা কত অন্যরকম ছিল। এমএসসি-র রেজাল্ট বেরোবার পরে ওরা সবাই যখন সেলিব্রেট করতে গিয়েছিল সেখানেই রাহুল হাটে হাঁড়িটা ভাঙল যে ও আর অপরাজিতা মানে তিন্নি ডেটিং করছে আর খুব তাড়াতাড়ি বিয়ে করতে চলেছে। সবাই ভীষণ ভাবেই চমকে উঠেছিল। চোখে মোটা পাওয়ারের চশমা পরা গুড বয় রাহুল আর দুই বেনি ঝুলিয়ে শাড়ি পরে শহরতলি থেকে কলকাতার কলেজে পড়তে আসা সাধাসিধে মেয়ে তিন্নির মধ্যে তলে তলে প্রেম চলছে।

তিন্নির বাড়ি থেকে এই বিয়েতে মত থাকলেও রাহুলের বাড়ি থেকে ছিল না। রাহুলের মা বাবা না থাকাতে দিদি জামাইবাবু-ই ছিলেন ওর অভিভাবক। তারা প্রথমে রাজি না হলেও পরে মেনে নেন আর পাঁচ বছর আগে তিন্নি, অপরাজিতা চৗধুরী থেকে মিসেস সেন হয়ে এই ওয়ান বিএইচকে ফ্ল্যাটে প্রবেশ করে। রাহুলকে নিয়ে নিজের সংসার সাজাতে তিন্নি এতই ব্যস্ত ছিল যে ওর মনেই হয়নি বাকি বন্ধুদের মতো ওরও একটা চাকরি করা দরকার। এমনকী রাহুল বার বার বলা সত্ত্বেও পিএইচডি করার কথাও ভাবেনি। তিন্নি জানত রাহুল সবসময় ওর সাথে আছে বড়ো একটা গাছ হয়ে, যার ছায়ায় তিন্নি নিরাপদে থাকবে। বছরে একবার দুবার দূরে কোথাও বেড়াতে যাওয়া ছাড়াও টুকটাক উইক এন্ডে কাছাকাছি কোথাও যাওয়া বা বন্ধুদের বাড়িতে গিয়ে গল্পগুজব করা, মাসে একবার বা দুবার উত্তরপাড়ায় গিয়ে মাকে দেখে আসা এসব নিয়ে তিন্নির পাঁচটা বছর যে কীভাবে কেটে গেল বুঝতেই পারল না।

রাহুলের অসুখের ব্যাপারটা প্রথম প্রকাশ পেল গত বছর উটিতে বেড়াতে গিয়ে। একদিন একটু চড়াই রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে হঠাৎ হোঁচট খেয়ে রাহুল পড়ে গেল। তারপর কোনওমতে দাঁড়িয়ে হাঁটতে গিয়ে দেখল ওর ডান পা-টায় তেমন জোর পাচ্ছে না। কোনওমতে হোটেলে ফিরে এসে ডাক্তার দেখাবার কথা বলাতে রাহুল প্রস্তাবটা হেসে উড়িয়ে দিল। পরেরদিন আবার সব ঠিকঠাক।

কলকাতায় ফিরে তিন্নি আর রাহুল ব্যাপারটা সম্পূর্ণ ভুলেই গিয়েছিল। কিন্তু সপ্তাহ দুয়েক পরে রাহুল একদিন অফিসের সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে পড়ে গেল। অফিসের লোকজন ওকে নিয়ে কাছাকাছি একটা হাসপাতালে দেখিয়ে কিছু ওষুধপত্র দিয়ে বাড়ি পৌঁছে দিল। পরদিন তিন্নি রাহুলকে অফিস যেতে দিল না। বন্ধুবান্ধবরা বাড়ি এসে একচোট হইচই করে গেল। বলল রাহুলের পদস্খলন হয়েছে– সব সময় বউ-এর কথা চিন্তা করে তাই  আশে পাশে চোখ রেখে চলতে পারে না, এর একমাত্র চিকিৎসা সংসারে তৃতীয় জনের আগমন।

তিন্নির মা আর বড়ো ননদ একই কথা অন্য ভাবে তিন্নিকে বলেছে বেশ কয়েকবার। কিন্তু ও যখনই রাহুলকে এ ব্যাপারে কিছু বলতে গেছে রাহুল বলেছে, ‘আরে আগে লাইফটাকে এনজয় করো। ছেলে-মেয়ে মানুষ করার জন্য তো সারা জীবন পড়ে আছে, কথা দিচ্ছি পঁয়ত্রিশ হবার আগেই বাবা হয়ে যাব।’

তিন্নি আঁতকে উঠে বলেছিল, ‘তোমার পঁয়ত্রিশ মানে তো আমারও পঁয়ত্রিশ। বাচ্চা বড়ো হবার আগেই তো আমি বুড়ি হয়ে যাব।’

‘ভেব না তুমি বুড়ি হলেও আমি অত সহজে বুড়ো হব না। আমি তোমাদের সবার খেয়াল রাখব’, তিন্নিকে স্ত্বান্না দিয়ে রাহুল বলেছিল। কিন্তু সেই রাহুল আজ গত দু-মাস থেকে সম্পূর্ণ শয্যাশায়ী। অফিস যাওয়া বন্ধ করেছিল পাঁচমাস আগে। বার কয়েক যেখানে সেখানে পড়ে যাবার পর তিন্নি ওকে বেশ কিছু ডাক্তার দেখিয়ে নানা রকম পরীক্ষা করিয়ে যেদিন জানল, রাহুলের মোটর নিউরন ডিজিজ হয়েছে– ওর জীবনের সব আলোগুলো হঠাৎ করে নিভে গিয়েছিল।

শহরের বিখ্যাত নিউরোলজিস্ট যখন ওদের ওই অসুখ সম্বন্ধে বিভিন্ন রকম তথ্য দিচ্ছিলেন তখন তিন্নির মাথায় কিছু না ঢুকলেও, রাহুল কিন্তু আগ্রহ নিয়ে ডাক্তারের সব কথা শুনেছে, প্রশ্ন করেছে, চিকিৎসা সম্বন্ধে জানতে চেয়েছে। তারপর বাড়িতে এসে তিন্নিকে বলেছে, ‘এবার তোমাকে একটা চাকরি জোগাড় করতে হবে তিন্নি। আমি হয়তো কিছুদিনের মধ্যেই গৃহবন্দি হব। হাঁটতে চলতে এমনকী হয়তো কথা বলতেও পারব না। তোমার জন্য কিছুই করতে পারব না। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তোমার একটা চাকরি মানে সোর্স অফ ইনকাম জোগাড় করা খুবই দরকার।’

তিন্নি বোঝাবার চেষ্টা করেছিল, ‘ডাক্তারবাবু তো বললেন কত রকমের চিকিৎসা আছে এই অসুখের। তুমি এখনই ভেঙে পড়ছ কেন?’

একটা বিষাদভরা হাসি হেসে রাহুল বলেছিল, ‘তিন্নি এটা সাধারণ অসুখ নয় যে ওষুধ খেলাম আর অসুখ সেরে গেল। এটা মোটর নিউরন ডিজিজ, যেখানে আমাদের ব্রেনের আর স্পাইনাল কর্ডের নার্ভগুলো ড্যামেজ হয়ে যায়, যার ফলে আমাদের শরীরের পেশিগুলো কাজ করতে পারে না, কমজোর আর ক্ষয় হয়ে যায়। মজার কথা কি জানো– আমি দেখতে পারব, শুনতে পারব, কে কি করছে বা বলছে, বুঝতে পারব কিন্তু রিঅ্যাক্ট করতে পারব না।’

তিন্নি রাহুলের মুখে হাত চাপা দিয়ে বলেছিল, ‘চুপ করো, একদম বলবে না ওসব কথা। আমরা কাল থেকেই ডাক্তারবাবুর কথা মতো চিকিৎসা শুরু করব।’

তিন্নিকে জড়িয়ে ধরে রাহুল বলেছিল, ‘আই লভ ইউ তিন্নি। কিন্তু একটা সময় আসবে যখন আমি এই কথাগুলো বলতে পারব না। ট্রিটমেন্ট আমি করাব কিন্তু জানি এই অসুখ সারানো যায় না, শুধু অসুখের লক্ষণগুলোকে বিলম্বিত করা যায়।’

পরেরদিন রাহুল তার অফিসে অসুস্থতার কথা জানিয়ে ছুটির দরখাস্ত করে। তার সঙ্গে আরও জিজ্ঞেস করে যদি সে কর্মক্ষম না থাকে তাহলে ওর স্ত্রী তিন্নির ওখানে কোনও চাকরি পাবার সম্ভাবনা আছে কিনা। ওদের কোয়ালিফিকেশন তো একই। অফিস থেকে রাহুলের ছুটি মঞ্জুর হলেও তিন্নির ব্যাপারে ম্যানেজমেন্ট পরিষ্কার জানিয়ে দেয় তিন্নির কোনও জব এক্সপিরিয়েন্স না থাকাতে দুর্ভাগ্যবশত ওরা ওকে কোনও চাকরি দিতে পারবে না। এই প্রাইভেট কোম্পানির নিয়ম অনুযায়ী ওদের ব্যাপারটা ‘কম্প্যাশনেট জব অফারের’ এক্তিয়ারে পড়ে না, তাই ম্যানেজমেন্ট চাইলেও কিছু করতে পারছে না, –যদিও ওরা সব সময়ে রাহুলের পাশে আছে আর ওর দ্রুত আরোগ্য কামনা করছে।

এদিকে রাহুলের চিকিৎসা আর ওদিকে তিন্নির জন্য নানা জায়গায় চাকরির দরখাস্ত করা, দুটোই একসাথে চলতে থাকল কিন্তু কোনওটাতেই কিছু করা গেল না। যথাসম্ভব চিকিৎসা চললেও রাহুলের শরীরের দ্রুত অবনতি হতে থাকল। প্রথমে ডান-পা তারপর বাঁ-পা তারপর কোমরের নীচে থেকে পুরোটাই প্যারালিসিস হয়ে যায়। তিন্নি খোঁজখবর নিয়ে একটা মোটর অপারেটেড হুইল চেয়ার নিয়ে আসে যাতে রাহুল অন্তত ঘরের মধ্যে চলা ফেরা করতে পারে।

কিন্তু মাস খানেকের মধ্যে রাহুলের শরীরের উপর অংশ-ও কমজোর হতে হতে সম্পূর্ণ অচল হয়ে যায়। তখন থেকে তিন্নি

সকাল-দুপুর-সন্ধে-রাত্রি শুধু রাহুলের সেবা-শুশ্রুষায় নিজেক ব্যস্ত রাখল। শুরুতে অনেকে নার্স রাখতে বলেছিল, কিন্তু আর্থিক অবস্থার কথা ভেবে তিন্নি নার্স বা রাতে একজন আয়া রাখার পরিকল্পনাও ত্যাগ করল। প্রতিদিনের ঠিকে কাজের মাসিকেও ছাড়িয়ে দিল। ধীরে ধীরে তিন্নির সাধের বাড়ি, সাধের সংসারে দৈন্যতা গ্রাস করল।

তিন্নি আজ সকাল সকাল উঠে পড়েছে। অবশ্য রাতে তাকে তিন চার বার এমনিতেই উঠতে হয় রাহুলের জন্য। কিন্তু আজকে তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে না উঠলে চলত না। বাড়ি-ঘরদোর পরিষ্কার করে ওদের জন্য কিছু খাবার-দাবারও তো বানাতে হবে। রাহুলকেও তৈরি করতে হবে। দিগন্তর কথামতো তিন্নি গতকাল রাহুলের দাড়ি কামিয়ে দিয়েছিল। দিগন্ত বলেছিল একদম ক্লিনশেভ হলে অসুস্থ মনে হবে না আবার চার পাঁচ দিনের বেড়ে যাওয়া দাড়িতে ভীষণ অপরিচ্ছন্ন লাগবে তাই ভিডিও তোলার সময় যেন রাহুলের গালে একদিনের দাড়ি থাকে।

এই ভিডিও তোলার ব্যাপারে রাহুলের সেরকম সায় ছিল না। কিন্তু রাহুল আজকাল ভালো করে কথা বলতেও পারে না। দুটো তিনটে শব্দ বললেই হাঁপিয়ে যায়। তাই তিন্নির কাছে ফান্ড রেইজিং-এর ব্যাপারটা শুনেও নিজের অপরাগতার কথাটাও বলতে পারেনি। তিন্নি রাহুলের মনের কথাটা বুঝতে পেরেও না বুঝতে চাইছিল। সত্যিই তো তিন্নির থেকে কে আর ভালো জানে যে ওদের আর্থিক অবস্থা কতটা খারাপ। আর বন্ধুরা তার জন্য এতটা ভাবছে তারও তো একটা মুল্য আছে।

সুপর্ণার পিসতুতো বোন কৃপা এসেছে আমেরিকা থেকে। সুপর্ণার কথায় সেও রাজি হয়েছে ভিডিওতে থাকতে, যাতে ও ওর আমেরিকার বন্ধুদের কাছেও ভিডিওটা শেয়ার করে ফান্ড রেইজিং এ অ্যাপিল করতে পারে এবং আশা করা যায় সেক্ষেত্রে রেসপন্স ভালো পাওয়া যাবে।

ঠিক দশটার সময় ওরা মানে দিগন্ত, দীপা, অরুণাভ, সুপর্ণা আর কৃপা চলে এল। বেশ গল্প করার মতো করে একটা তিন চার মিনিটের ভিডিও তুলল দিগন্ত। রাহুলের চার পাশে বসে তিন্নি আর বাকি বন্ধুরা কিছুটা বাংলায় কিছুটা ইংরেজিতে রাহুলের ব্রাইট পাস্ট ও স্ট্রাগলিং প্রেজেন্ট সম্বন্ধে বলল। তারপর সবার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়ে দিল, ‘আমরা কি কিছুই করতে পারি না রাহুলের জন্য।’

ওরা চলে যাবার পর তিন্নি বেশ হাসি মুখে রাহুলের কাছে এসে বলল, ‘কি কেমন লাগছে? এখন কত লোক তোমার ভিডিও দেখবে, তোমার কথা জানবে। কৃপা তো বলছিল অনেক দেশে নাকি এমএনডি সোসাইটি বলে সংস্থান আছে, যারা এমএনডি পেশেন্ট নিয়ে রিসার্চ করে, ওদের নানা ভাবে সাহায্য করে এমনকী ওদের বাড়ির লোকেদেরও নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে বলে, মানে শেয়ারিং দ্য এক্সপিরিয়েন্স আর কি।’ তিন্নিকে খুশি দেখে রাহুলেরও খুব ভালো লাগছিল। ও তিন্নির চোখে চোখ রেখে হাসবার চেষ্টা করল কিন্তু পারল না।

তিন্নি এগিয়ে এসে রাহুলের মাথাটা নিজের বুকের মধ্যে চেপে ধরে বলল, ‘আর চিন্তা কোরো না। আজকে রাতের মধ্যে ভিডিওটা সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড হয়ে যাবে। দিগন্ত ওর ব্যাংকে আমার নামে তোমার জন্য একটা অ্যাকাউন্ট খুলে দিচ্ছে। ও তো বলছিল প্রচুর ডোনেশন আসবে। এমন কি বাইরের দেশ থেকেও কেউ হয়তো তোমার চিকিৎসার জন্য স্পনসরও করতে পারে। আমি তো বলেছি ওদের যে আমাদের পাসপোর্ট তৈরি করা আছে।’

তিন্নি হয়তো আবেগের বশে আরও কিছু বলত কিন্তু তার আগেই রাহুলের চোখের জলে ওর কামিজের বুকের কাছটা ভিজে যাওয়ায় ও চুপ করে যায়। তারপর নিজের চোখের জল চেপে রেখে রাহুলের চোখ দুটো পরম আদরে মুছিয়ে দেয়।

তিন

আজ পুরো এক মাস হয়ে গেল রাহুলের ভিডিওটা সোশ্যাল মিডিয়ায় আসার পর। আগে থেকে করা প্ল্যানমতো ওরা বন্ধুরা একে অন্যকে ট্যাগ করে শেয়ার করছিল যাতে ওটা বেশ কিছুদিন মিডিয়াতে থাকে। এই এক মাসে প্রচুর লোকে প্রচুর কমেন্ট করেছে , চোখের জল ফেলেছে, এমএনডি-র চিকিৎসা নিয়ে কথা বলেছে, তিন্নির প্রশংসা করেছে, পুরোনো বন্ধু-বান্ধবরা ফোন করেছে। ফুলের তোড়া, ফলের ঝুড়ি নিয়ে দেখা করে উঁহু-আহা করে গেছে কিন্তু তার নতুন খোলা অ্যাকাউন্টে মাত্র সাড়ে চোদ্দো হাজার টাকা জমা পড়েছে। আর তার মধ্যে আত্মীয়স্বজনরা এই নিয়ে খোঁটা দিতেও ছাড়ছে না।

ওর নিজের বউদি তো সেদিন বাড়ি বয়ে এসে শুনিয়ে গেল, ‘তোর তো অনেক বুদ্ধিরে তিন্নি, কি মর্মস্পর্শী ভিডিও বানিয়েছিস নিজের স্বামীকে নিয়ে। তা এখন অবধি কত পেলি ওটা থেকে?’ তারপর তিন্নি কোনও উত্তর দিচ্ছে না দেখে নিজে থেকেই আবার বলে উঠল, ‘আর আমাদের দ্যাখ, তোর দাদার একার রোজগারে আমাকে পাঁচজনের

সংসার চালাতে হয়। মায়ের ওষুধের জন্যই তো কত টাকা খরচা হয়ে যায়, কিন্তু তা বলে তো লোকের কাছে হাত পাততে পারব না। তোর দাদার সন্মানটারও তো খেয়াল রাখতে হবে।’

তিন্নি জানে মায়ের টুকটাক অসুখবিসুখ প্রায়ই হয়। আগে তিন্নি গিয়ে মাকে ডাক্তার দেখানো বা ওষুধ কেনা এগুলো করত। কিন্তু এখন সেটা করতে পারছে না। এমনকী আগে মাকে যে হাত খরচের টাকা দিত সেটাও গত দুমাস দেয়নি, দাদাই মানা করেছিল। কিন্তু বউদি যে পাঁচজনের সংসার বলল তার মধ্যে চারজন তো ওরাই , তাহলে সব অসুবিধা মা-কে নিয়েই। তিন্নি যে মা-কে নিয়ে এসে এখানে রাখবে তাও তো সম্ভব নয়, তাই সেদিন বউদির কথাগুলো চুপচাপ শুনে যাওয়া ছাড়া তিন্নির আর কিছু করার ছিল না।

তিন্নির চিন্তার জালটা ভেঙে হঠাৎ মোবাইলটা বেজে উঠল। ফোনটা চালু করে বলল, ‘হ্যালো।’ ও-প্রান্ত থেকে এক মহিলা কণ্ঠস্বর, ‘হ্যালো অ্যাই অ্যাম সারা কলিং ফ্রম মুম্বই। অ্যাম অ্যাই স্পিকিং টু মিসেস অপরাজিতা সেন?’

অপরিচিত আওয়াজে অন্যরকম উচ্চারণে নিজের নামটা শুনে তিন্নি বেশ ঘাবড়ে গিয়ে কোনওমতে বলল, ‘ইয়েস আমি তিন্নি মানে, অ্যাই অ্যাম অপরাজিতা সেন।’

‘দ্যটস্ গুড! ইয়োর ফ্রেন্ড কৃপা গেভ মি ইয়োর ডিটেলস্ অ্যাজ উই আর ডুইং রিসার্চ অন এমএনডি। ওয়ান অফ আওয়ার ক্লায়েন্ট হ্যাজ পাসড্ অ্যাওয়ে ডে বিফোর ইয়েস্টারডে সো উই আর লুকিং ফর আনাদার পার্শন হু ক্যান হেল্প আস টু ফিনিশ আওয়ার রিসার্চ। ডু ইউ থিংক ইয়োর হ্যাজবেন্ড উইল লাইক টু গেট ইনভলভড ইন দিস রিসার্চ?’

হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো করে তিন্নি বলল, ‘ইয়েস ইয়েস উই আর রেডি।’

‘নো ইট ইজ নট ফর ইউ বাট ফর ইয়োর হাজবেন্ড। উই নিড হিজ কনসেন্ট আনলেস ইউ হ্যাভ দ্য মেডিকেল পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি ফর হিম। ইউ নো উই হ্যাভ টু কাম ফ্রম মুম্বই সো উই ডোন্ট ওয়ান্ট এনি লিগ্যাল হ্যাসেল।’

‘ইয়েস হি ইজ উইলিং টু পার্টিসিপেট, ইউ ক্যান টক টু হিম’ বলে দৗড়ে গিয়ে রাহুলের কাছে গিয়ে বলল, ‘ওরা ফোন করেছে ফরেন থেকে– মানে এখন মুম্বই থেকে, তোমার সঙ্গে কথা বলবে, মানে কনসেন্ট না কি যেন নেবে, তুমি কিন্তু হ্যাঁ বলবে।’

রাহুল ফোনে এক দুবার ‘ইয়েস’ আর ‘ওকে’ বলার পর ফোনটা তিন্নিকে দিল। সারা জানাল ও আর শ্যাম, ওর রিসার্চ পার্টনার কাল বা পরশু রাহুলকে দেখতে আসবে, হয়তো দু তিন দিন লাগবে ওদের কাজ শেষ করতে। তিন্নির মুষড়ে পড়া মনটা আবার একটা আশার আলো দেখতে পেল। শোবার ঘরে গিয়ে রাহুলের পাশে শুয়ে পড়ে দেখল রাহুল টিভি-টার দিকে তাকিয়ে থাকলেও যেন অন্য কিছু ভাবছে। জিগ্যেস করল, ‘কী হল তুমি কি ভাবছ?’

বড়ো একটা শ্বাস টেনে রাহুল বলল, ‘কত দেবে?’

‘কি কত দেবে?’

‘টাকা কত দেবে?’

তিন্নি অবাক হয়ে উঠে বসে বলল, ‘টাকা কেন দেবে? ওরা তো রিসার্চ করবে, আমরা কত লাকি বলো যে ওরা আসছে আমাদের এখানে।’

‘গিনিপিগ-রা লাকি হয় না’ রাহুল হাঁপাতে হাঁপাতে বলল ‘রেমিউনিরেশন দেওয়া নিয়ম, টাকাটা অবশ্য নিও।’

তিন্নি আর কথা না বাড়িয়ে তাড়াতাড়ি রাহুলকে অক্সিজেন মাস্কটা দিল।

রাহুলের মাস্কটা লাগিয়ে তিন্নি ভাবল, দিগন্তকে ফোন করে খবরটা দেবে। কিন্তু এরই মধ্যে কলিংবেল বেজে উঠল, কেউ এসেছে। দরজার আইহোল দিয়ে দেখল এক মধ্য তিরিশের ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছেন দরজার সামনে, দেখে মোটেই সেলসম্যান মনে হচ্ছে না। দরজাটা সামান্য খুলে তিন্নি জানতে চাইল, ‘কাকে চাইছেন?’ হাতজোড় করে নমস্কার করে ভদ্রলোক বললেন, ‘নমষ্কার বউদি আমি মৃদুল, বাবলুদা-র কাছ থেকে আসছি।’ তারপর তিন্নিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে আবার বলল, ‘বাবলুদা মানে অনুপম সিকদার যাকে আপনারা ভোট দিয়ে জেতালেন এবার। আমাকে বাবলুদা পাঠালেন আপনাদের মানে রাহুলবাবুর খোঁজখবর নেবার জন্য। উনি নিজেই আসতেন কিন্তু একটা বিশেষ কাজে ওনাকে দিল্লি যেতে হল হঠাৎ তাই–’

নিজের অজান্তেই থতোমতো খেতে খেতে তিন্নি কখন যে দরজাটা খুলে দিয়েছিল তা সে নিজেই বুঝতে পারেনি। তারপর খেয়াল হতেই হাত জোড় করে নমস্কার করে বলল, ‘দেখুন আপনাকে তো আমি ঠিক চিনি না, তাছাড়া আমি তো অনুপমবাবুকে কিছু বলিনি রাহুলের সম্বন্ধে। এখন একটু ব্যস্ত আছি, তাই–’

‘না না বউদি আমি আপনার সময় নষ্ট করব না, আমি জানি আপনি রাহুলদাকে নিয়ে কতটা ব্যস্ত, বাবলুদা কিছু ফল টল পাঠিয়ে ছিল সেটা যদি আপনি নিতেন তাহলে বাবলুদার ভালো লাগত। তারপর তিন্নিকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই ঘাড় ঘুড়িয়ে হাঁক দিল, ‘অ্যাই বিশু ওটা বউদির ঘরে রেখে দে।’

এতক্ষণে তিন্নির নজরে পড়ল আরেকটি বেঁটে, গাঁট্টা-গোট্টা ছেলে সিঁড়ির একধাপ নীচে দাঁড়িয়ে ছিল। সে পায়ের কাছে রাখা পেল্লাই একটা ঝুড়ি তুলে নিয়ে তিন্নিকে প্রায় ধাক্বা দিয়ে সরিয়ে ঘরে ঢুকে টেবিলে ঝুড়িটা রেখে ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে যেতে যেতে বলল– ‘চললাম মৃদুলদা,আমার ব্যাপারটা ভুলো না কিন্তু। কাল ক্লাবে আসব।’

হতবাক তিন্নিকে কথা বলা থেকে রেহাই দিয়ে মৃদুল নিজেই বলে চলল, ‘কি আশ্চর্য দেখুন আমরা প্রায় একই পাড়ায় থাকি অথচ রাহুলদার ব্যাপারটা জানতেই পারিনি। ক্লাবের একটা ছেলে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে ওনার অসুস্থতার কথাটা জানতে পেরে আমাদের বলল! আসলে বুঝলেন তো সারাদিন এত ব্যস্ত থাকি। বাবার বয়স হয়েছে তাই পারিবারিক ব্যাবসাটাও দেখতে হয় তার ওপর অনুপমদার-ও টুকটাক বেশ কিছু কাজ থাকে। সেগুলো করতে হয়, উনি আমাকে ছোটোভাই-এর মতো দেখেন। মা-তো বলেন আমি ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াই। কিন্তু বলুন বউদি বনের মোষ তাড়াবার জন্যও তো উপযুক্ত লোক দরকার।’ মৃদুল হয়তো আরও কিছু বলে যেত কিন্তু ঘরের ভিতর থেকে রাহুলের আওয়াজ পেয়ে তিন্নি তাড়াতাড়ি বলল, ‘রাহুল বোধহয় কিছু চাইছে। আপনি যদি কিছু মনে না করেন তাহলে পরে কথা বলব– বুঝতেই পারছেন তো।’

মৃদুল অমায়িক হাসি হেসে পকেট থেকে একটা কার্ড বের করে তিন্নির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘না না মনে করব কেন। আমি তো জানি আপনি কত ব্যস্ত। মনে রাখবেন আজ থেকে আপনি একা নন আপনার সঙ্গে আমরা আছি। আমার কার্ডটা রাখুন, প্রয়োজন হলে জাস্ট একটা ফোন করে নেবেন, আমি চলে আসব।’

তিন্নির হাতে কার্ড ধরিয়ে হাত জোড় করে নমস্কার করে মৃদুল যখন সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল তিন্নি বুঝতে পারল না মৃদুলের আঙুলগুলো কি ইচ্ছাকৃত ভাবেই তিন্নির আঙুলগুলোকে একটু অন্যরকম ভাবে ছুঁয়ে গেল নাকি ওর বুঝতে ভুল হল।

ওরা মানে শ্যাম আর সারা প্রায় আধ ঘন্টা আগে চলে গেছে। ছিল প্রায় ঘন্টাখানেক। তিন্নি ভাবেইনি এতো তাড়াতাড়ি ওদের কাজ হয়ে যাবে। শুরুতে ওদের সাথে রাহুলের কাছে মিনিট দশেক ছিল তারপর ওরা যখন রক্ত আর স্যালাইভা স্যাম্পল নেওয়া শুরু করল তখন তিন্নি আর ওখানে বসে থাকতে পারেনি। ওদেরকে বলেই শোবার ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বসার ঘরটায় বসেছিল। কাল রাতে এমনিতেই ঘুম হয়নি।

মৃদুলবাবু চলে যাবার পর তিন্নি যখন দিগন্তকে ফোন করে আজকে রাহুলের অ্যাপয়েন্টমেন্টের কথাটা বলে ছোট্ট করে মৃদুলের কথাটাও বলেছিল, তখন মনে হল দিগন্ত যেন ওর কথাগুলো শুনেও শুনছে না। তিন্নি তো সময়টা দেখেই ফোন করেছিল যাতে দিগন্ত বাড়ি ফিরে ফ্রেশ হয়ে নিতে পারে। তিন্নি ভেবেছিল দিগন্তকে আজকে আসতে বলবে কারণ ও যদি সারাদের সঙ্গে ঠিকঠাক কথা বলতে না পারে। কিন্তু দিগন্তর কেমন গা ছাড়া ভাব দেখে তিন্নি আর কিছু বলে উঠতে পারেনি। পরে বেশ রাতে সুপর্ণার ফোন পেয়ে তিন্নির কান্না পেয়ে গিয়েছিল। অত রাতে সুপর্ণার ফোন পেয়ে তিন্নি বেশ অবাক হয়ে গিয়েছিল।

রাহুলের পাশ থেকে উঠে গিয়ে বসার ঘরে ঢুকে সুপর্ণার সঙ্গে কথা বলে তিন্নি যা বুঝল সেটা হল সোশ্যাল মিডিয়ায় রাহুলের

ভিডিওটা-তে কেউ একজন গত মাসে তিন্নির প্রেগন্যান্সি টারমিনেশনের কথাটা পোস্ট করেছে আর সেই নিয়ে বেশ কিছু খারাপ মন্তব্য আসছে। কোনওমতে কথাটা শেষ করে সুপর্ণা বলেছিল, ‘দ্যাখ তিন্নি কাউকে প্লিজ বলিস না যে আমি তোর সঙ্গে গিয়েছিলাম তোর টারমিনেশন করাতে। জানিস তো আমাদের জয়েন্ট ফ্যামিলি। যাতে কেউ জানতে না পারে তাই সবাই ঘুমোবার পর তোকে ফোন করছি। আমার শ্বশুরবাড়ি ভীষণ রক্ষণশীল, আমি এর মধ্যে আছি জানলে আর রক্ষা নেই!’

সুপর্ণার সঙ্গে কথা বলার পর তিন্নি বাকি রাতটা আর ঘুমোতে পারেনি, এমনকী ভিডিওটায় পোস্ট করা কমেন্টগুলো পড়বার সাহসও পায়নি। তিন্নি যখন তার প্রেগন্যান্সির কথা জানতে পেরেছিল ততক্ষণে রাহুলের অসুখ অনেক অ্যাডভানস্ড স্টেজে পৗঁছে গিয়েছিল, তাই রাহুলকে ব্যাপারটা বলে ওর কষ্ট আর বাড়াতে চায়নি। দোনামনা করে একটু সময় নিয়েই টারমিনেশন করাবার সিদ্ধান্তটা নিয়েছিল কারণ ওদের পক্ষে সত্যি করে বাচ্চা রাখা সম্ভব ছিল না। তিন্নি আর কী করতে পারত? ওর নিজের মনে যে কত কষ্ট জমে আছে তা কি লোকে বুঝতে পারছে না?

পড়ন্ত বিকেলের দিকে তাকিয়ে তিন্নি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল, রাহুলের বিকেলের খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। রাহুল তো ভালো করে চিবিয়ে খেতে পারে না, আর আজকে অনেকটা ধকল গেছে ওর ওপর দিয়ে। তাই ভাবল আজকে একটু নরম করে নোনতা সুজি বানিয়ে দেবে। রাহুলের বেশ পছন্দের খাবার এটা। রাতের জন্য চিকেন স্যুপটা পরে না হয় চটপট বানিয়ে নেবে।

রান্নাঘরে ঢোকা মাত্র ওর ফোনটা বেজে উঠল, দেখল দিগন্তর ফোন।

‘কি রে কেমন আছিস? রাহুলের কি খবর? ওরা এসেছিল?’ দিগন্ত জানতে চাইল।

‘হ্যাঁ একটু আগে কাজ শেষ করে ওরা গেল।’ তিন্নির ছোট্ট উত্তর।

ওপাশ থেকে দিগন্ত কিছু বলছে না দেখে তিন্নি জিজ্ঞেস করল, ‘তোর কী খবর? কোনও কারণে আপসেট আছিস মনে হচ্ছে?’

‘একটু আপসেট আছি রে। বাড়িতে প্রবলেম হচ্ছে।’

‘কেন রে? কী হল হঠাৎ? সংগীতা ঠিক আছে তো?’ তিন্নি উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করল।

‘জানিস তো সংগীতা প্রেগন্যান্ট– সিক্স মান্থ চলছে। তোর ব্যাপারে কিছু লোক উলটো-পালটা কথা লিখছে আর এদিকে আমার বউ আমাকে সন্দেহ করছে। কাল তোর সঙ্গে কথাও বলতে পারলাম না সেইজন্য। ভাবলাম অফিসে এসে তোকে বুঝিয়ে বলব।’

তিন্নি বুঝতে পারছিল না এর থেকে আর কী খারাপ হতে পারে। কোনওমতে বলল, ‘তুই কি চাইছিস আমি সংগীতার সঙ্গে কথা বলি? ওকে আমার অবস্থাটা বুঝিয়ে বলব।’

‘না না প্লিজ ওকে ফোন করিস না। তোর সঙ্গে আমি কথা বলেছি জানলে আরও ঝামেলা হবে। আমার এত খারাপ লাগছে যে কী বলব। তোর এই বিপদে তোর পাশে থাকব বন্ধুর মতো তা নয়, আমি এখন আমার ঘর সামলাতে ব্যস্ত। শোন প্লিজ আমাকে ভুল বুঝিস না। আমার মোবাইলে বা বাড়িতে ফোন না করে প্রয়োজন হলে তুই আমার অফিসের নাম্বারে ফোন করিস। তা ছাড়া আমি তোকে রেগুলার ফোন করব অফিস থেকে।’

‘আচ্ছা, ভালো থাকিস।’ দিগন্তকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে তিন্নি ফোন অফ করে দিল।

নিজেকে যতটা পারে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করলেও রাহুলের কাছে তিন্নি বোধহয় ধরা পড়ে গেল। যখন ওকে সুজিটা খাওয়াতে গেল রাহুল প্রথমে চোখের ইশারায় বার কয়েক জানতে চাইল কী হয়েছে? তারপর তিন্নি এড়িয়ে যাচ্ছে দেখে মুখ ফুটে জিগ্যেসই করে ফেলল, ‘কী হয়েছে?’

তিন্নি একটু শুকনো হাসি হেসে বলল, ‘কী আবার হবে? কিছু হয়নি। একটু টায়ার্ড লাগছে। আজ একটু তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়ব। কাল রাতে ভালো ঘুম হয়নি।’

তিন্নি যখন রাহুলের চোখকে ফাঁকি দেবার আপ্রাণ চেষ্টা করছে তখন ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেনি তার জন্য আরও কী অপেক্ষা করছে।

সন্ধ্যাবেলায় রাহুলের সঙ্গে বসে ঘন্টাখানেক টিভি দেখার পর সবে চিকেন স্যুপটা বানাতে গেছে, দরজায় ঘন্টির আওয়াজ পেল।

দরজার সামনে রাহুলের দিদি আর জামাইবাবুকে দেখে বেশ ঘাবড়ে গিয়ে দরজা খোলামাত্র দিদি ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকে সোজা রাহুলের কাছে গিয়ে কেঁদে বলল, ‘তুই আমাদের কি নিজের বলে ভাবিস না ভাই? কেন এটা করলি?’

রাহুলের থতোমতো ভাব দেখে দিদি আবার বলে উঠল, ‘তোরা একবার তো আমাদের জিগ্যেস করতে পারতিস, তোরা না পারলেও তোদের বাচ্চার দায়িত্ব না হয় আমরা নিতাম। কেন ওকে পৃথিবীতে আসতে দিলি না?’

রাহুল লম্বা শ্বাস নিয়ে বলল, ‘কার বাচ্চা? কী বলছ?’

‘তোদের বাচ্চা। আজকেই তো জানলাম যে তিন্নি গতমাসে টারমিনেশন করিয়েছে। কেন করলি তিন্নি? রাহুল বললেই কি তোকে মানতে হবে?তোর তো বাচ্চা, তুই তো আটকাতে পারতিস।’

‘রাহুল এ ব্যাপারে কিছু জানে না দিদিভাই। ওকে আমি জানাইনি। যা করার আমিই করেছি।’ তিন্নি শান্ত স্বরে প্রতিটা কথা কেটে কেটে বলল।

দিদি তার কান্না ভুলে রাহুলের পাশ থেকে সরে এসে তিন্নির সামনে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে উঠল, ‘কি বললি ভাই জানতই না তোর প্রেগন্যান্সির কথা। তার মানে তুই টারমিনেশন করিয়েছিস সেটাও জানে না। তুই কী করে এত নিষ্ঠুর হতে পারলি তিন্নি?’

রাহুলের দিকে না তাকিয়েও তিন্নি বুঝতে পারছিল যে ওর শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। ও খুব জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে। তাড়াতাড়ি ওকে অক্সিজেন মাস্কটা দিতে গেল কিন্তু রাহুল বার বার মাথা সরিয়ে নিল। কিছুতেই মাস্ক পরাতে দিল না।

তিন্নি সামান্য হেসে বলল, ‘দিদিভাই আমি একটা বাচ্চা নিয়েই খুব ভালো আছি– আরেকটা নিয়ে কি করতাম? রাহুলই আমার সবকিছু দিদিভাই। আমার যে আর কিছুর দরকার নেই।’

তিন্নির গলার আওয়াজে হয়তো এমন কিছু ছিল যে, দিদি একটু থমকে গেল কিন্তু তার পরেই আবার বলল, ‘তুই এসব কথা বলে রাহুলকে চুপ করাতে পারবি তিন্নি কিন্তু আমাকে নয়। তোর একবারও মনে হল না যে, রাহুল না থাকলেও ওর একটা অংশ তোর সঙ্গে থাকতে পারত। তোর একবারও মনে হল না বাচ্চাটা থাকলে আমাদের বংশটা এখানেই শেষ হতো না? তুই নিজে হাতে আমাদের বংশটাকে শেষ করে দিলি তিন্নি।’

তিন্নি চোখের জল চেপে ছুটে রান্নাঘরে যাবার চেষ্টা করতেই দিদি পিছন থেকে ওর হাতটা টেনে ধরে বলল, ‘কোথায় যাচ্ছিস? তোকে বলতে হবে কার পারমিশন নিয়ে তুই এটা করালি?’

দিদি হয়তো আরও কিছু বলত কিন্তু জামাইবাবু বসার ঘর থেকে উঠে এসে দিদিকে ধমক দিয়ে বলল, ‘কী আরম্ভ করেছ রেখা? চ্যাঁচামিচি কোরো না। রাহুল অসুস্থ এটা ভুলে যেও না।’

দিদিও ফোঁস করে উঠল, আমার ভাই যে ভীষণ অসুস্থ সেটা আমি ভালো করেই জানি। আর তাই তো বলছি ভাইয়ের শেষ চিহ্নটাও তিন্নি মুছে ফেলল। মানুষ কী করে এত নিষ্ঠুর হতে পারে? নাকি লোকে যা বলছে সেটাই সত্যি! –ওটা আদৗ ভাই এর ছিল না।’

তিন্নি ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে গিয়েও ঘুরে দাঁড়াল, তারপর দিদির চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘একটু আগেই তুমি বললে না বাচ্চাটা আমারও ছিল। হ্যাঁ, এটা আমার বাচ্চাই ছিল তাই যেটা উচিত মনে হয়েছে আমি করেছি। বাচ্চার বাবার বা বাড়ির লোকের পারমিশন নেবার দরকার মনে করিনি।’

‘তা করবি কেন? এটা তো তোর পাপ তিন্নি। রাহুল তো কবে থেকেই–’

‘চুউপ, চুউ’ দিদির কথা শেষ হবার আগেই রাহুল বীভৎস চিৎকার করে উঠল।

রাহুলকে নিয়ে ওরা যখন চলে গেল তখনও তিন্নি কাঁদতে পারল না। রাহুলের শান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে ওর মনে অজস্র প্রশ্ন একের পর এক জমা হচ্ছিল। তাহলে সবার মতো রাহুলও ওকে ভুল বুঝল। রাহুলের জন্য ওর ভালোবাসা, ওকে ভালো করে তোলার এত প্রচেষ্টা, এত কষ্ট সহ্য করা সব বিফলে গেল, শুধুমাত্র একটা সিদ্ধান্ত নিজে নেবার জন্য! রাহুল যদি জানত তাহলে কি তিন্নিকে টারমিনেশন করাতে দিত? যদি বাচ্চাটা আসত। পৃথিবীতে তাহলে তিন্নি কী ওকে একা মানুষ করতে পারত? রাহুল ছাড়া তিন্নি নিজেকে কী করে সামলাবে তাই জানে না সেখানে একটা বাচ্চা না নিয়ে ও কি খুব ভুল করেছে? সারা জীবন প্ল্যান করে চলা রাহুল কেন তাদের আনপ্ল্যান্ড প্রেগন্যান্সি নিয়ে তিন্নিকে ভুল বুঝল? না কি কারওর অনুমতি না নিয়ে নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়াটাই তার অপরাধ?

রাহুলের এভাবে চলে যাবার জন্য কি তিন্নি দায়ী?

তিন্নির এইসব আকাশ-পাতাল চিন্তার মাঝে বাড়ি ধীরে ধীরে খালি হয়ে গেল। কাল রাতে বাড়ি চলে যাবার পর দিদি খবর শুনে আজ সকালেই আবার চলে এসেছিল, অনেক কান্নাকাটি করেছে কিন্তু তিন্নির দিকে ঘুরেও তাকায়নি কথা বলা তো দুরের ব্যাপার। জামাইবাবু যতটা সম্ভব সব কিছু সামলেছেন। দিদি কাঁদতে কাঁদতে কয়েকবার অজ্ঞান হয়ে যাবার পর তাকে ডাক্তার দেখিয়ে বাড়ি পৗঁছে দিয়ে আবার ফেরত এসেছেন। বন্ধুদের কয়েকজন রাহুলের সঙ্গে গেছে। দিগন্ত কোনও কাজে আটকা পড়ে এখানে আসতে পারেনি বলেছে সোজা ওখানে চলে যাবে রাহুলকে শেষবারের মতো দেখতে।

দাদা গেছে বউদিকে উত্তরপাড়ায় রেখে আসতে। ছেলে দুটোর পরীক্ষা তাই বউদি ওদের পাশের বাড়িতে রেখে এসেছিল। দাদা বলেছে যত রাতই হোক বউদিকে বাড়ি পৌঁছিয়ে ও এখানে ফেরত আসবে। থাকবে ক’দিন তিন্নির কাছে। এখন বাড়িতে শুধু তিন্নি আর মা রয়েছে। এমন সময় হঠাৎ করে শ্যাম হাজির। ও গতকালই বলেছিল যে আজ বিকেলে আসবে রাহুলের আরও কয়েকটা টেস্ট করার জন্য। এত কিছুর মধ্যে তিন্নি ওকে ফোন করতে ভুলেই গিয়েছিল। শ্যাম চটপট ব্যাপারটা বুঝে যথা সম্ভব দুঃখ প্রকাশ করে যখন বেরিয়ে যাচ্ছে, সে সময়ে দরজায় মৃদুলবাবু আর তার সেদিনের সাকরেদের আবির্ভাব। তিন্নি চটপট শ্যামকে বলল,  শ্যাম কুড ইউ প্লিজ স্টে হিয়ার ফর সাম টাইম। আই নিড টু ডিসকাস সামথিং উইথ ইউ।’

তারপর মৃদুলবাবুর মুখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলল, ‘আমি দুঃখিত মৃদুলবাবু। শুনেছেন বোধহয় যে আজ ভোরে রাহুল চলে গেছে। বাড়ি-তে এখন কেউ নেই তাই যদি পরে আসতেন তো ভালো হতো।’

মুখে কোনওমতে একটা সহানুভূতির ভাব এনে মৃদুল বলল, ‘হ্যাঁ খবরটা একটু আগেই পেলাম আর শুনেই তাই ছুটে এসেছি। জানেন তো সারাদিন এতো কাজে ব্যস্ত থাকি তাই হয়তো খবরটা পেতে দেরি হল। ভাবলাম বাড়িতে হয়তো একা আছেন একটা কথা বলার লোক পেলে হয়তো ভালো লাগবে। তাই খবরটা শোনা মাত্রই কাজ ফেলে ছুটে এলাম, বলেই ঘাড় ঘুড়িয়ে হাঁক দিল, অ্যাই বিশু ফুলগুলো রাহুলবাবুর ঘরে রেখে আয়।

বিশু একপা এগোবার আগেই তিন্নি দরজা আগলে দাঁড়িয়ে বলল, ‘অতগুলো ফুল রাখার জায়গা তো নেই আমার বাড়িতে। কিন্তু আপনারা কষ্ট করে এনেছেন বলে একটা মালা খালি আমি নিচ্ছি আর শুনুন আমি এখন ব্যস্ত আছি আপনার সঙ্গে এখন কথা বলার সময় পাব না। কিছু মনে করবেন না যেন।’

‘না না ঠিক আছে। দেখতেই পারছি আপনি ব্যস্ত আছেন। পরে কখনও না হয় আবার আসব।’ শ্যামের দিকে একঝলক তাকিয়ে মুখটা স্বাভাবিক রেখে মৃদুল কথাগুলো বললেও তার আওয়াজে মনের রাগটা সহজেই বোঝা গেল।

মৃদুলবাবু সিঁড়ি দিয়ে নামার আগেই তিন্নি শুনতে পেল ফিচেল স্বরে বিশু বলছে– ‘শ্যাম এসেছে রাধার কাছে, গুরু তুমি কি আর নাগাল পাবে?’

সকাল চারটে– ঠিক চব্বিশ ঘন্টা আগে রাহুল চলে গেছে। হয়তো অভিমান নিয়ে, তিন্নির ওপর রাগ করেই রাহুল চলে গেছে। এই চব্বিশ ঘন্টায় তিন্নি অনেক ভেবেছে, নিজের জীবনটাকে ফালা ফালা করে চিরে দেখেছে, নিজেকে আসামির কাঠগোড়ায় দাঁড় করিয়ে নিজেই সওয়াল জবাব করেছে। এখন তার মন অনেকটা শান্ত হয়েছে। ধীরে ধীরে মায়ের পাশ থেকে উঠে রান্নাঘরে ঢুকে দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে ল্যাপটপটা খুলল। ভিডিওতে যত সব মন্তব্য এসেছে সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ল তারপর টাইপ করতে লাগল–

‘কাল ভোর রাতে রাহুল চলে গেল। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে আপনারা নানাভাবে আমার মনোবল বাড়িয়েছেন। আপনাদের সহানুভূতি, বক্রোক্তি, কটূক্তি সব কিছুই আমাকে নিজেকে খুঁজে পেতে সাহায্য করেছে। আমি নিজের নারীসত্ত্বাকে চিনতে পেরেছি, আর তাই আমি মাথা উঁচু করে কোনওরকম দ্বিধা না রেখেই বলছি, আমি আমাদের পরিস্থিতি চিন্তা করেই আমার বাচ্চাকে সরিয়ে নিয়েছি পৃথিবী থেকে। এব্যাপারে আমি মনে করি না যে আমার কারওর থেকে অনুমতি নেবার দরকার ছিল বা আমাকে কারওর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। আর কয়েক ঘন্টা পরে ভিডিয়োটা তুলে নেওয়া হবে। কিন্তু আপনাদের কাছে অনুরোধ আমাকে বা আমার মতো অন্য হতভাগ্যাদের-কে নিজের মতো করে বাঁচতে দিন।’

তার কমেন্টটা পোষ্ট করে দিয়ে তিন্নি কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে নিজেকে সামলে নিল। তারপর যখন চোখ খুলল দেখল রান্নাঘরের পুব দিকের একমাত্র জানলা দিয়ে ভোরের সূর্য উঁকি মারছে।

মৃত্যু রহস্য

ঘরে ঢুকতেই দেব আশ্চর্য হয়ে গেল। নয়না আর রাজেন কিছু একটা আলোচনায় এতটাই মশগুল যে দেবের উপস্থিতি টেরই পেল না। দেব-ও এই দৃশ্য চোখের সামনে দেখবে একেবারেই ভাবেনি। দুজনের মুখোমুখি বসে কথা বলা সত্যি করেই এক অভাবনীয় দৃশ্য।

‘বাবাঃ কী এত আলোচনা চলছে? সারা বাড়িতে একটা পিন পড়লেও শোনা যাবে মনে হচ্ছে। এত কী গোপন কথোপকথন?’ দেব খানিক অপেক্ষা করে জিজ্ঞেস করল। দুইজনেই চমকে মাথা তুলল। দুজনকেই খুব চিন্তিত মনে হচ্ছিল।

‘সব ঠিকঠাক তো?’ দেব আবার প্রশ্ন করল।

‘হ্যাঁ রে ভাই, বাড়িতে তো সবকিছু

ঠিক-ঠাকই আছে…’

‘তাহলে তোদের এত চিন্তিত দেখাচ্ছে কেন?’ রাজেনকে থামিয়ে দেব জিজ্ঞেস করল।

‘সেটা ঝুমার জন্য ভাই।’ নয়না উত্তর দেয়, ‘তাও বলতে পারিস প্রায় বিনা কারণে… বুঝতেই পারছি না কী করে ওকে সাহায্য করব।’

ঝুমা নয়নার সব থেকে কাছের বান্ধবী এবং রাজেনেরও যে ঝুমার প্রতি একটা বিশেষ দুর্বলতা রয়েছে এটাও দেবের তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সামনে অনেকবারই ধরা পড়ে গেছে।

‘খুলেই বল পুরোটা, আরাম করে সোফায় গা এলিয়ে বসল দেব, ‘এমনও হতে পারে যে আমি তোদের কিছুটা সাহায্য করতে পারব।’

রাজেনই মুখ খোলে, ‘আরে আগে তো সবই ঠিকঠাক ছিল, অলোকের দাদু খুন হওয়ার পর থেকেই যে দিদির কি হল, বিয়ে করতে কিছুতেই রাজি হচ্ছে না… দিদি… মানে ঝুমার দিদি সীমাদি।’

রাজেনের কথা শেষ হওয়ার আগেই নয়না বিরক্তি ভরা কণ্ঠে বলে ওঠে, ‘খুনের সঙ্গে ঝুমা বেচারির কি লেনদেন? যাক গে, ঝুমার জন্য ভাই কিছু তো করতেই পারে, তারপর দেবের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘তুই তো জানিস, ঝুমাও রাজেনের সঙ্গেই এমবিএ-র জন্য প্রবেশিকা পরীক্ষা দিয়েছে আর ও শিওর যে ভালো কোথাও ও চান্স পেয়েই যাবে। কিন্তু ওর বাড়ির লোকেরা চাইছে পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোবার আগেই ওর বিয়ে দিয়ে দিতে। শ্বশুরবাড়ি যদি রাজি হয় তাহলে ওখান থেকেই ও পড়াশোনা চালাতে পারে। টাকাটা কোনও ব্যাপার নয়… ঝুমার বাবা-ই মেয়ের পড়ার সব খরচ দেবেন বলেছেন।’

‘বিয়ে কার সঙ্গে ঠিক হয়েছে?’ দেব জানতে চায়।

‘ঝুমা কাউকে বিয়ে করতে চায় কিনা ওরা জানতে চেয়েছে। এমনকী ছেলেটি যদি ছাত্র হয় তাহলেও ওদের আপত্তি নেই। পাত্রেরও পড়াশোনার সব খরচ দিতে রাজি ঝুমার বাবা। আর যদি ঝুমার নিজের পছন্দ কিছু না থাকে তাহলে ওরাই উপযুক্ত পাত্রের সন্ধান করবে ঝুমার জন্য।’

‘তার মানে কোনও ভাবে ঝুমার তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে দিতে চান ওনারা, কিন্তু কেন?’ দেব আশ্চর্য হয়।

দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়ে নয়না, ‘কারণ হল ঝুমার দিদি সীমাদি এবং ওর অদ্ভুত আচরণ। ঝুমাদের বাড়ির কাছেই অলোকের বাড়ি। ছোটো থেকেই সীমাদি আর অলোকের বন্ধুত্ব এবং পরে সেটা ভালোবাসায় পরিণত হয়। কারও বাড়িতেই বিয়ে নিয়ে আপত্তি ওঠেনি সুতরাং বিয়ের দিনও স্থির হয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ-ই সীমাদি জানিয়ে দেয় ও অলোককে বিয়ে করবে না এমনকী অন্য কোনও ছেলেকেও বিয়ে করতে রাজি নয়। কারণ জিজ্ঞেস করলে জানায় ওর নাকি একটু সময় দরকার। মনস্থির করতে বাড়ির লোকেরা ওকে দুবছর সময় দিয়েছে, কিন্তু এখন সীমাদি আরও সময় চাইছে। বাড়ির লোকেরা পড়েছে মুশকিলে। ওদের ধারণা সীমাকে চাকরি করতে দিয়ে ওরা ভুল করেছে। এই একই ভুল ওরা ঝুমার বেলায় করতে চায় না।’

‘সীমার বিয়ে না করার কারণটা কী?’ জানতে চায় দেব।

‘এটাই তো কিছুতেই বলছে না ও। কারণ জানতে পারলে তো ঝুমাও সবাইকে নিজের দিকটা বোঝাতে পারত। পড়াশোনা শেষ করে ও বিয়ে করতে প্রস্তুত কিন্তু এখন এমবিএ-র জন্য পড়াশোনা আর বিয়ে দুটো একসঙ্গে করাটা একেবারেই অসম্ভব ওর পক্ষে।’

‘হ্যাঁ, এটা তো হল… কিন্তু খুনের ব্যাপারটা কী বলছিলি রাজেন?’

দেব, পুলিশকে নানা তথ্য দিয়ে সাহায্য করে এমনকী অনেক বড়ো মার্ডারের ঘটনায় পুলিশকে আসামী ধরিয়ে দিতেও যে দেবের অনেক অবদান আছে, ভাইয়ের এই গোপন পরিচয়টা রাজেনের অজানা ছিল না। তাই চিত্রটা পরিষ্কার করে তুলে ধরার জন্য দেবকে বলল রাজেন, ‘সীমা আর অলোকের বিয়ে ঠিক হয়ে যাওয়ার প্রায় আড়াই মাস পরে হঠাৎ-ই অলোকের দাদু খুন হন। খুনের কারণ এবং খুনির পরিচয় আজ পর্যন্ত অজানা।’

‘কিন্তু খুনের সঙ্গে সীমার বিয়েতে রাজি না হওয়ার কী সম্পর্ক, বিরক্ত হয়ে নয়না জানতে চায়।

‘হতেও পারে, সীমা আর অলোক নামটা খুব পরিচিত লাগছে, খানিকটা ভেবে দেব আবার বলে, ‘আচ্ছা এরা কি শকুন্তলা পার্কের কাছে একই পাড়ায় থাকে?’

‘হ্যাঁ, তো, নয়না বলে, ‘তুই জানলি কী করে?’

‘তুই আর রাজেন আমার থেকে এতটা ছোটো তবুও আমাকে তুই তোকারি করিস, গুরুত্ব দিতে চাস না আমাকে। সবাই কি আর তোদের মতো? সীমা আর অলোক কলেজে আমার দু’বছরের জুনিয়র ছিল। কলেজে থাকতে আমার নির্দেশনায় ওরা নাটকে অভিনয় করেছে। অখিল ভারতীয় নাটক প্রতিযোগিতা-তে আমার একটা নাটক একবার চান্স পেয়েছিল। সেটা মঞ্চস্থ করতে আমাকে অন্য শহরে যেতে হয়েছিল। সেই গ্রুপে ওরাও ছিল এবং তখন ওদের সঙ্গে আমার ভালো বন্ধুত্ব হয়ে যায়। মনে আছে অলোককে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম সীমাকে ও বিয়ে করবে কিনা এবং তাতে ও সিরিয়াসলি জানিয়েছিল যে ও সীমাকে বিয়ে করবে।’

‘হ্যাঁ, অলোক নয়, সীমাদি বিয়ে করবে না বলেছে। মধ্যে অলোক-ও কাজ নিয়ে খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল, তাই বিয়ের কথা চাপা পড়ে গিয়েছিল কিন্তু এখন অলোক সীমার বাড়িতে জানিয়েছে যে ও বিয়ের জন্য প্রস্তুত। ভাই তুই যখন ওদের দুজনকেই চিনিস তাহলে অলোকের সঙ্গে একটা কথা বল না, আশার আলো দেখে নয়না।

‘সীমা যেখানে বিয়ে করবে না বলছে সেখানে অলোকের সঙ্গে কথা বলে কী হবে? বরং সীমার সঙ্গে দেখা করার একটা ব্যবস্থা করে দে।’

‘ঠিক আছে তুই যবে বলবি। বিয়ে ছাড়া আর কিছুতে ওর না নেই, নয়না বলে, ‘মানে কারও সঙ্গে দেখা করতে ওর কোনও অসুবিধা নেই। কাল বরং সন্ধেবেলায় আমি ঝুমাদের বাড়ি চলে যাব আর পরে তুই আমাকে ওখানে নিতে আসিস।’

‘তাহলে কাল অফিস থেকে বেরোবার আগে তোকে ফোন করে দেব যাতে তুই সীমার সঙ্গে কথা বলার একটা সুযোগ করে দিতে পারিস।’

পরের দিন দেব যখন নয়নাকে নিতে ওখানে পৌঁছোল তখন ড্রইংরুমে বসে সীমা, ঝুমার সঙ্গে নয়নার জোর আড্ডা চলছে।

দরজা খুলে দেব-কে দেখে সীমা আশ্চর্য হয়ে গেল, ‘স্যার আপনি?’

‘আরে সীমা যে, তুমি এখানে?’ দেবও আশ্চর্য হওয়ার ভান করে। তারপর নয়না আর ঝুমার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘আরে সীমা আমার নাটকের পাত্রী। আমি যেহেতু নাটকের ডিরেক্টর এবং সিনিয়র, স্বাভাবিক ভাবে তাই ও-ও আমাকে ‘স্যার-ই সম্বোধন করে। ঝুমা তুই তো কখনও আমাকে বলিসনি যে তোর দিদি অখিল ভারতীয় নাটক প্রতিযোগিতার বিজেতা?’

‘নয়নাও কখনও আপনার সম্পর্কে কিছু বলেনি। এখনকার মেয়েগুলোর অন্যদের সম্বন্ধে কিছু বলার সময় কোথায়?’ সীমা কপট রাগ দেখায়, ‘স্যার ভালোই হয়েছে আপনার সঙ্গে দেখা হওয়াতে। আপনার মতামতের একটু দরকার ছিল। একটা দিন আমাকে একটু সময় দিতে পারবেন?’

‘একটা দিন কেন? আজ-ই এক্ষুনি কথা হতে পারে তবে এক কাপ চায়ের বদলে, বলে দেব মুচকি হাসে।

‘চা না খাইয়ে এমনিতেও আপনাকে ছাড়তাম না, বলে ঝুমা উঠে দাঁড়ায়, ‘দিদি তুই দেবদাকে নিয়ে ও-ঘরে বসে নিশ্চিন্তে কথা বল, আমি চা করে নিয়ে আসছি। মা-বাবার ফিরতে এখনও অনেক দেরি।’

সীমার ঘরে এসে বসতেই দেব জিজ্ঞেস করল, ‘অলোকের কী খবর? অনেকদিন ওর সঙ্গে কোনও যোগাযোগ নেই।’

লম্বা নিঃশ্বাস টেনে সীমা উত্তর দিল, ‘হ্যাঁ পাড়াতেই রয়েছে তবে দেখাসাক্ষাৎ হয় না বললেই চলে।’

‘কেন? ব্যস্ততার কারণে নাকি ঝগড়া হয়েছে?’

‘কোনওটাই নয় স্যার। আমারই হয়তো ভুল বোঝার কারণে এমনটা হয়েছে, একটু চুপ থাকে সীমা, তারপর আবার বলে, ‘ওই ব্যাপারেই আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাই। আপনার সম্পর্কে কাগজে প্রায়শই লেখা দেখতে পাই। অনেকবার দেখা করার কথাও ভেবেছি কিন্তু কী করে সেটা বুঝতে পারিনি। আমার মনে হয় অলোক নিজের দাদুকে খুন করেছে।’

দেব মনে মনে চমকে ওঠে, তবে কি এটাই কারণ অলোককে বিয়ে না করার? কিন্তু মুখে গাম্ভীর্য বজায় রেখেই জিজ্ঞেস করে, ‘সন্দেহ করার কারণ?’

‘যে রাতে অলোকের দাদু খুন হন আমি একটা নেমন্তন্ন বাড়ি থেকে রাত করে বাড়ি ফিরেছিলাম। আমি অলোককে ওদের বাড়ির ছাদ থেকে লাফিয়ে গাছ ধরে পালাতে দেখেছি। কিন্তু অলোক বলছে ও তখন ওদের উলটো দিকের রাস্তার ওপারে বন্ধুর বিয়ের প্যান্ডেল-এ ব্যস্ত ছিল। ওখানেই ও দাদুর মৃত্যুর খবরটা পায়।’

‘কিন্তু তোমার মনে হয় যাকে তুমি পালাতে দেখেছ সে অলোক?’

‘হ্যাঁ স্যার। খুনের কারণ এখনও বোঝা যাচ্ছে না। বাড়ি থেকেও কিছু চুরি হয়নি আবার অলোকের দাদুর সঙ্গে কারও শত্রুতাও ছিল না।’

‘ওনার মৃত্যুতে কারও ব্যক্তিগত লাভের সম্ভাবনা আছে কি?’

‘একমাত্র অলোকেরই লাভ হতে পারে যতদূর আমি জানি। এমনিতে সকলেই জানে যে অলোককেই ওর দাদু নিজের সমস্ত সম্পত্তি লিখে দিয়ে গেছেন।’

‘সীমা তুমি যা কিছু জানো বা যা সন্দেহ করছ সব আমাকে পরিষ্কার করে খুলে বলো। কথা দিচ্ছি আমি যতটা পারব তোমাকে সাহায্য করব।’

‘মায়ের একদম ইচ্ছে ছিল না যে আমি কলেজে লেকচারারের কাজ করি। কারণ মায়ের মনে হয়েছিল লেকচারার হলে যেহেতু অলোক ওর দাদুর টিভি, ফ্রিজের শোরুমে বসে আর দাদুর ব্যাবসাটার দেখাশোনা করে সেহেতু আমি অলোককে বিয়ে করতে রাজি হব না। অলোক নিজেও টিভি ফ্রিজের ব্যাবসাটা চালাতে চাইছিল না। ওর ইচ্ছে ছিল বিদেশি কম্পিউটারের এজেন্সি নেওয়ার। বাবার সঙ্গেও আলোচনা হয়েছিল যে এজেন্সি নেওয়ার জন্য কোনওরকম আইনি বাধ্যবাধকতা পেরোতে হবে কিনা। পরে খবরাখবর নিয়ে জানা যায় এজেন্সি নেওয়ার জন্য আইনি কোনও জটিলতা নেই। আমার মা-ও নিশ্চিত হন যে লেকচারার মেয়ে কম্পিউটার বিক্রেতা-কে বিয়ে করতে রাজি হবে।

কিন্তু বেঁকে বসেন অলোকের দাদু। যদিও শোরুম অলোকের নামেই লিখে দিয়েছিলেন উনি কিন্তু ব্যাবসার চাবিকাঠি ওনার হাতেই ছিল। ওনার বক্তব্য ছিল টিভি, ফ্রিজের মতো কম্পিউটার, দৈনন্দিন প্রয়োজনীয়তার মধ্যে পড়ে না সুতরাং তার চাহিদাও সীমিত। তাই উনি জীবিত থাকতে অলোককে টিভি, ফ্রিজ বিক্রি করেই খুশি থাকতে হবে, ওনার মৃত্যুর পরই নতুন চিন্তাভাবনা করার স্বাধীনতা পেতে পারে অলোক।

দাদুর জন্যই অলোকের আইবিএম-এর এজেন্সি নেওয়ার স্বপ্ন ভেঙে গুঁড়িয়ে যায়। এই লোভেই ও ওর বাবা, দাদার মতো চাটার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট হতে চায়নি। ও কিছু না কিছু করে নিজের হাতখরচা ঠিকই চালিয়ে নিত, শোরুমের একটা টাকাও নিত না। দাদু মারা যাওয়ার আগেই ও আমাকে বলেছিল, কেরিয়ার তৈরি না করে ও কিছুতেই বিয়ে করবে না।’

‘অলোকের সঙ্গে কথা বলার পর তুমি কী ডিসাইড করলে?’ দেব প্রশ্ন করে।

‘আমারও স্যার, অলোকের সিদ্ধান্তই সঠিক মনে হয়েছিল। মনে মনে ভেবেই রেখেছিলাম, বিয়েটা যেমন করেই হোক পিছোতে হবে। কিন্তু বাড়িতে কিছু জানাবার আগেই অলোক আমাদের বাড়ি এল। ওকে খুব চিন্তামুক্ত দেখাচ্ছিল সেদিন। বাড়িতে আমাকে কিছু বলতে মানা করল, বলল কয়েকদিনেই সব ঠিক হয়ে যাবে। কয়েকদিন পরেই আমাদের বন্ধু রঞ্জনের বিয়ে ছিল। আমরা বিয়েতে খুব মজা করেছিলাম। রাত্রে বন্ধুদের পীড়াপীড়িতে অলোক ওখানেই থেকে যায় আর আমি বাড়ির সকলের সঙ্গে নিজের বাড়ি ফিরে আসি।

অলোকের বাড়িটা আমাদের বাড়ির ঠিক পিছন দিকটায়। ওদের বাড়িতে একটা জাম গাছ আছে যেটা আমাদের ছাদের কিছুটা নিয়েও ডালপালা বিস্তার করেছে। আমি তখন ছাদের ঘরটায় থাকতাম। ওদের ছাদটাও অলোক আর ওর দাদুর ঘরের লাগোয়া ছিল। অনেকদিনই এমন হয়েছে যে ওর দাদু ঘুমিয়ে পড়ার পর অলোক জাম গাছের ডাল ধরে আমাদের ছাদে চলে এসেছে।’

দেব কথার মাঝেই সীমাকে থামিয়ে দেয়, ‘চলে এসেছে… মানে এখন আর আসে না?’

‘দাদুর খুন হওয়ার পর বাবা আমাকে একলা আর উপরের ঘরে শুতে দেয় না। হ্যাঁ স্যার যা বলছিলাম, সেদিন রাত্রে গাছের পাতার আওয়াজ হওয়াতে আমি ভেবেছিলাম বুঝি অলোক এসেছে। আমি বাইরে বেরিয়ে আসি। গাছের ডাল তখনও নড়ছিল কিন্তু ছাদে কেউ ছিল না। আমি কার্নিশ থেকে নীচে তাকিয়ে দেখি গাছ থেকে নেমে কেউ পালিয়ে যাচ্ছে। আর ঠিক তক্ষুনি দাদুর ঘর থেকে ওদের বাড়ির পুরোনো চাকর রমাদার আওয়াজ পাই যে দাদামশাইয়ের কিছু একটা হয়ে গেছে। আমি দৗড়ে নীচে এসে সবাইকে জাগিয়ে রমাদার চ্যাঁচাবার কথাটা বলি। সবাই যখন অলোকদের বাড়ি পৌঁছোই, দাদুর ঘরে গিয়ে দেখি ওনার মুখের উপর বালিশ চাপা দিয়ে কেউ ওনাকে খুন করেছে।

আমি কাউকেই বলতে পারিনি যে আমি স্বচক্ষে খুনিকে গাছ ধরে নীচে নেমে যেতে দেখেছি। মুখ দেখতে পাইনি ঠিকই কিন্তু খুনির পোশাক স্পষ্ট দেখেছিলাম রাস্তার আলোয়। অলোক বিয়েবাড়িতে সিল্কের যে কুর্তা-পাজামা পরেছিল একদম সেরকমই। বাবা আমার ছোটো ভাইকে পাঠায় অলোককে বিয়ে বাড়ি থেকে ডেকে আনার জন্য। কিন্তু আমি নিশ্চিত ছিলাম বিয়েবাড়িতে ভাই অলোককে পাবে না অথচ কিছুক্ষণ পরেই ভাই অলোককে নিয়ে আসে। আমি ভালো করে লক্ষ্য করি কিন্তু গাছে চড়া বা নামার কোনও দাগ অলোকের জামাকাপড়ে ছিল না। ও-ও সবার মতো হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল দাদুর ঘরে ঢুকে।’

‘তাহলে তোমার কেন সন্দেহ হচ্ছে যে অলোকই খুনটা করেছে?’

‘কারণ পরের দিনই পুলিশ এসে গাছের নীচে জুতোর দাগ দেখতে পায়। জুতোর দাগ দেখেই সনাক্ত করে যোধপুরী জুতোর ছাপ ওগুলি। ওই একই জুতো অলোকের পায়েতেও ছিল। অপরাধীর পালাবার তাড়া থাকাতে জুতোর পুরো ছাপ যেহেতু মাটিতে পড়েনি তাই জুতোর সঠিক সাইজ পুলিশ ধরতে পারেনি। অলোককে ওরা সন্দেহ করছিল কিন্তু ওই সময় ও যে বিয়েবাড়িতেই ছিল, বন্ধুদের সঙ্গে তোলা ছবি দিয়ে ও প্রমাণ করে দেখিয়ে দিয়েছে। পুলিশ ওকে ছেড়ে দিয়েছে ঠিকই কিন্তু আমার মন বলছে ওটা অলোকই ছিল কারণ গাছ বেয়ে উপরে চড়া বা নীচে নামার রাস্তাটা ওই জানত আর দ্বিতীয়ত দাদুর মৃত্যুতে ওই সবথেকে লাভবান হল।’

‘দাদুর শ্রাদ্ধশান্তির কাজ মিটে যাওয়ার পরপরই অলোক এজেন্সি নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছিল। যেন বাড়িতে কিছুই হয়নি। আর যদি বিয়েবাড়ির ছবির কথাই বলেন, তাহলে সেই ছবি যখন খুশি তোলা হয়ে থাকতে পারে। খাবার খাওয়ার সময় থেকে বিয়েতে বসা পর্যন্ত কে আর সমানে ছবি তুলতে থাকে? ফোটোগ্রাফার-রাও তো খাবে। আর বিয়ের হল লাগোয়া খাবার জায়গা করা হয়েছিল বিয়েবাড়ির ঠিক উলটো রাস্তাতেই অলোকদের বাড়ি। লুকিয়ে একবার বেরিয়ে গিয়ে একটা বৃদ্ধ মানুষকে মুখে বালিশ দিয়ে মারতে কত আর সময় লেগে থাকবে?’

‘অলোকের সঙ্গে এটা নিয়ে কথা বলেছ?’

‘না স্যার, এই প্রথম আপনাকে সব খুলে বললাম।’

‘বিয়েটা কী বলে আটকালে?’

‘দাদুর মৃত্যুর পর সঙ্গে সঙ্গে বিয়ে সম্ভবও ছিল না। অলোকও খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। বাড়িতে বাবার পরামর্শ নিতে প্রায়শই আসত কিন্তু আমি একা দেখা করাটা এড়িয়ে চলতাম। এরপর মা যখন বিয়ের জন্য তাড়া দেওয়া আরম্ভ করল, আমি পরিষ্কার বলে দিলাম যে বিয়ের জন্য আমার একটু সময় দরকার। তাছাড়া অলোকের ব্যস্ততা দেখে ওর বাড়ির সকলেও বিয়েটা পিছিয়ে দেওয়া যখন মনস্থ করল, তখন আমার বাড়ি থেকেও সকলে এটা মেনে নিল।’

‘অলোকের সঙ্গে দেখা করো না, এটা নিয়ে ও কিছু বলে না তোমাকে? দেব জানতে চায়। সীমা হেসে ফেলে বলে, ‘স্যার ওকে এটা বুঝিয়েছি যে মা আমাদের বেশি মেলামেশা করতে দেখলেই বিয়ের জন্য তাড়া দেবে। আপনিই বলুন স্যার যাকে আমি অপরাধী মনে করে সন্দেহ করি, তাকে আমি কী করে বিয়ে করব?’

‘না, না, সেটা কখনওই সম্ভব নয়। তুমি বরং দাদুর নাম আর মৃত্যুর তারিখটা বলো। আমি এই কেসটার ফাইলটা দেখি। আর সীমা, তুমি বিয়ের জন্য রাজি হয়ে যাও। বিয়ের গোছগাছ কমপ্লিট হতে হতে আশা করা যায় খুনি ধরা পড়বে। অলোক যদি অপরাধী হয় তাহলে বিয়ে এমনিই ভেঙে যাবে। আর অপরাধী যদি অন্য কেউ হয়ে থাকে তাহলে তোমার রাজি না হওয়ার বা বাড়ির লোকেদের মিথ্যা চিন্তা করাবার কি কোনও দরকার আছে?’

‘সেটা ঠিকই বলেছেন স্যার।’

রাস্তায় আসতে আসতে দেব নয়না-কে জানাল যে ও সীমাকে বিয়ে করতে রাজি করিয়েছে। সুতরাং ঝুমার আর কোনও সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

পরের দিন কমিশনারের সঙ্গে কথা বলে দেব কেসটার ফাইল বার করিয়ে নিল। যা তথ্য পাওয়া গেছে তাতে প্রায় কিছুই প্রমাণ হওয়া সম্ভব না। স্পেশাল পারমিশন নিয়ে পুলিশকে সাহায্য করার অছিলায় কেসটার দায়িত্বভার ও নিজের উপর নিয়ে নিল।

কেসটা নিয়ে আবার নতুন করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে শুনে অলোকের বাড়ির লোকেরা যেমন আশ্চর্য হল, তেমনি খুশিও হল। সবথেকে খুশি মনে হল অলোককে।

‘আমি ইচ্ছে করেই নিজেকে ব্যস্ত রাখি কারণ স্যার, সময় থাকলেই খালি মনে হয় দাদুকে কে খুন করে থাকতে পারে?’

‘এবং কেন খুন করেছে?’ দেব বাকিটা জুড়ে দেয়।

‘স্যার, দাদুর গলায় মোটা সোনার চেন, হাতের আঙুলে চারটে মোটা মোটা সোনার আংটি দামি পাথর বসানো, হাতে সোনার ঘড়ি, পাঞ্জাবিতে সোনার বোতাম লাগানো ছিল এছাড়াও আমার ল্যাপটপ, আইপ্যাড সবই টেবিলের উপর রাখা ছিল। আমার মনে হয় ওই সময় রমাদা দাদুর জন্য দুধ নিয়ে উপরে উঠছিল, ওরই পায়ের আওয়াজ পেয়ে চোর আর চুরি করার সময় পায়নি, পালিয়েছে। মধ্যিখান থেকে দাদুর প্রাণটা চলে গেল, অলোক বলে।

‘গাছে চড়া-নামার রাস্তাটা তো আর নতুন লোকের পক্ষে জানাটা সম্ভব নয়?’ সন্দেহ উঁকি মারে দেবের কথায়।

‘সেটাই তো সবথেকে আশ্চর্যের ব্যাপার। চেনাশোনার মধ্যেই কেউ খুনটা করেছে। গাছের নীচে মাটিতে জুতোর ছাপ দেখে পুলিশ প্রথমে আমাকেই সন্দেহ করেছিল। কিন্তু সেদিন আমার একটা বন্ধুর বিয়ে ছিল। ওখানে যত ছবি তোলা হয়েছে এবং প্রত্যেকটা ভিডিও ফ্রেমে আমার ছবি থাকাতে বা আমার উপস্থিতির কারণে আমি বেঁচে যাই।’

‘আমি ওই অ্যালবাম এবং ভিডিও দেখতে পারি?’

‘নিশ্চয়ই স্যার। আমি বন্ধুর বাড়ি থেকে অ্যালবাম আর ভিডিও ক্যাসেট-টা নিয়ে এসে আপনাকে ফোন করে দেব।’

প্রায় ঘন্টা দেড়েক বাদে অলোক দেব-কে ফোন করল, ‘স্যার অ্যালবামটা নিয়ে এসেছি কিন্তু ভিডিও ক্যাসেট-টা বারবার চালাবার জন্য জায়গায় জায়গায় ঘষে গেছে। তাই ওরা ওটা কোথাও রেখে দিয়েছে, এখন আর খুঁজে পাচ্ছে না। আমি অবশ্য ওদের খুঁজতে বলে দিয়েছি।’

‘ভালো করেছ। তুমি অ্যালবামটা আমার অফিসে পাঠিয়ে দাও।’

‘ঠিক আছে স্যার। আর কোনও দরকার হলে আমাকে ফোন করে দেবেন, আমি পৌঁছে যাব।’

অ্যালবাম দেখা শেষ করে দেব সীমাকে ফোন করল, ‘সীমা, সেদিন রাতে তুমি যাকে পালাতে দেখেছিলে তার কুর্তা-পাজামার রং কী ছিল বলতে পারবে?’

‘না স্যার… আলো খুবই কম ছিল। মেটেরিয়ালের শাইন আর কুর্তার লম্বাটা শুধু চোখে পড়েছিল।’

‘আচ্ছা ওই বিয়েতে অলোক ছাড়াও তো অনেকেই নিশ্চই কুর্তা-পাজামা পরেছিল। তাহলে যাকে পালাতে দেখেছিলে সেটা অলোক না হয়ে অন্য কেউ-ও তো হতে পারে।’

‘কুর্তা-পাজামা তো অনেকেই পরেছিল কারণ এখন এটাই ফ্যাশন কিন্তু ওটা অলোক-ই ছিল এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। কারণ পালাবার রাস্তাটা একমাত্র ওরই জানা এবং দাদু মারা যাওয়ায় ওরই লাভ হয়েছে সবথেকে বেশি।’

দেব তর্ক বাড়াল না কারণ সীমার কথাতে একটা জোর ছিল। কিন্তু দেবের মন সেটা মেনে নিতে পারছিল না। ছবিগুলো আবার ভালো করে দেখল। কী মনে হতে অলোককে ফোন করে ওর অফিসে আসতে বলল।

‘সব ছবিগুলোতে যে বর আর তোমরা যারা একসঙ্গে রয়েছ, সবাই তো কলেজ ফ্রেন্ড্‌স, তাই না অলোক?’ দেব জিজ্ঞেস করে।

‘হ্যাঁ স্যার, শুধু একজন ছাড়া। যে ছেলেটি আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছে সে শুধু কলেজের বন্ধু নয়।’

‘ও-ও হ্যাঁ। ও তো প্রায় প্রতিটা ছবিতেই তোমার গায়ের সঙ্গে ঘেঁসে দাঁড়িয়ে আছে দেখছি।’

‘ও আমার বিজনেস পার্টনার স্যার, ওর নাম সৌম্য। আমেরিকা থেকে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে এসেছে। আপনি নিশ্চই জানেন, আইবিএম-এর ডিলারশিপ নিতে গেলে কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ হওয়াটা মাস্ট। এছাড়াও ইলেক্ট্রনিক প্রোডাক্ট বিক্রি করার অভিজ্ঞতা এবং একই সঙ্গে এয়ারকন্ডিশনড্ শোরুম থাকাটাও জরুরি। আমরা দুজনে মিলে এই সব শর্তসাপেক্ষে জোনাল ডিস্ট্রিবিউটরশিপটা নিয়েছি।’

‘সৌম্যর সঙ্গে কতদিনের পরিচয়?’

‘ছোটো থেকে স্যার। আমাদের বাড়িতে একটা বড়ো জাম গাছ আছে। আমরা ছোটোবেলায় ওই গাছে চড়ে বসে থাকতাম। ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতাম। ওই গাছের মতোই বড়ো বড়ো স্বপ্ন। সৌম্য তো আমেরিকা চলে গেল। আমি দাদু আর সীমার জন্য যেতে পারলাম না কারণ ওদের না দেখে থাকতে পারতাম না। কিন্তু সৌম্য ছোটোবেলার বন্ধুত্ব আর স্বপ্ন কোনওটাই ভোলেনি। ফেরত এসে আমাকে দিয়ে এই বড়ো কাজটা করিয়েই নিল।’

‘অলোক এই কেসটা সল্ভ করতে হয়তো ছবিতে থাকা তোমার সব বন্ধুদেরকেই ডেকে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করতে হতে পারে, দেব বলে।

‘আপনি বললেই আমি সবাইকে ডেকে আনব। কিন্ত আমার মনে হয় সবথেকে আগে আপনি সীমার সঙ্গে কথা বলুন। হয়তো ও এই কেস সম্পর্কে কিছু আলোকপাত করতে পারে।’

‘কেমন করে?’

‘ঠিক বলতে পারব না স্যার, তবে কেন জানি না আমার মনে হচ্ছে ও কিছু একটা জানে। দাদুর মৃত্যুর পর থেকেই ও কেমন জানি চুপচাপ হয়ে গেছে। আগের সীমাকে আর খুঁজে পাই না।’

‘দাদুকে খুব ভালোবাসত নাকি সীমা?’

‘সে তো সকলেই দাদুকে ভালোবাসত কারণ মানুষটাই তো ভালোবাসার যোগ্য ছিলেন।’

‘দাদুর মৃত্যুর খবর পেয়ে তোমার সঙ্গে কতজন বন্ধু এসেছিল?’

‘কেউ আসেনি কারণ সীমার ভাইয়ের মুখে খবরটা শুনতেই আমি কাউকে কিছু না বলেই ওর স্কুটারে চেপে বাড়ি চলে আসি।’

‘তোমাকে খুঁজতে তোমার পিছনে পিছনে কেউ আসেনি?’

‘না স্যার, অলোক মাথা নাড়ায়। ‘আমার খুব ভালো করে মনে আছে সেদিন রাতে ডাক্তার আর পুলিশ ছাড়া আমাদের সঙ্গে সীমার বাড়ির সকলে ছিলেন। সকালবেলায় ওরাই সকলকে খবর দেন।’

পরের দিন দুপুরবেলা সীমা আর দেবকে একসঙ্গে শোরুমে আসতে দেখে অলোক অবাক হয়ে গেল, ‘সব ঠিক আছে?’

‘আপাতত তো সব ঠিক আছে, গা ঝাড়া দেয় দেব, ‘তুমি বলেছিলে সীমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে, তাই ওকে এখানে নিয়ে এসেছি। তোমার বিজনেস পার্টনার আসেনি?’

‘হ্যাঁ এসেছে, ওর নিজের কেবিনে রয়েছে।’

‘বেশ, তাহলে চলো ওর কেবিনে গিয়েই বসা যাক।’

অলোক ওদের দুজনকে নিয়ে সৌম্যর কেবিনে পৌঁছোল। দেবের সঙ্গে সৌম্যর পরিচয় করিয়ে দিল।

‘কী খাবেন, ঠান্ডা না গরম?’ আন্তরিকতার সঙ্গে সৌম্য জিজ্ঞেস করল।

‘সে-সব পরে হবে। এখন শুধু অলোকের দাদুর খুনের ব্যাপারে কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর দিন, ঠান্ডা গলায় দেব বলে। মুহূর্তে রক্তশূন্য হয়ে যায় সৌম্যর মুখ। তোতলাতে তোতলাতে কোনওরকমে বলে, ‘আমি… আমি এই সম্পর্কে কী বলব? আমি তো সীমার মুখ থেকে পরের দিন খুনের খবরটা জানতে পারি।’

‘সেটাই তো আমার প্রশ্ন সৌম্য। সারা বিয়েবাড়িতে আপনি সমানে অলোকের সঙ্গে সঙ্গে ছিলেন অথচ অলোক সীমার ভাইয়ের সঙ্গে বাইকে উঠে চলে এল আর আপনি জানতেই পারলেন না?’

সৌম্য হকচকিয়ে গেল। অলোকই উত্তর দিল, ‘আসলে স্যার ওই সময় বিয়ের নিয়ম হিসেবে আংটি খেলা চলছিল। বন্ধুরা সকলে মিলে বরপক্ষকে সাপোর্ট করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল।’

‘হ্যাঁ ঠিক তাই, আমিই সবাইকে ওখানে আটকে রেখেছিলাম যাতে আমরা আমাদের বন্ধুকে জেতাতে পারি’, সৌম্য নিঃশ্বাস ছেড়ে উত্তর দেয়।

‘কিন্তু আপনি নিজে তো ওই সময় ওখানে ছিলেন না…’

‘কী বলছেন আপনি?’ সৌম্য উত্তেজিত হয়ে দেবের কথার মধ্যেই বলে ওঠে, ‘আমি তন্ময়ের পাশে বসে ওর পিঠ চাপড়ে ওকে উৎসাহিত করছিলাম।’

‘তাহলে আপনাকে এই ছবিতে কেন দেখা যাচ্ছে না?’ দেব সৌম্যর দিকে অ্যালবামটা এগিয়ে দেয়। ‘এই ছবিটাতে আপনি নেই এবং এর পরের কোনও ছবিতেই আপনাকে দেখা যাচ্ছে না। না… না… আপনাকে শুধু শুধু কষ্ট করতে হবে না, আমিই বলে দিচ্ছি আপনি কোথায় ছিলেন?’

‘আমি বাথরুমে গিয়েছিলাম। খাওয়া-দাওয়াটা একটু বেশিই হয়ে গিয়েছিল, সৌম্যর স্বরে বিরক্তি ঝরে পড়ে।

‘না, ওই সময় আপনি অলোকের দাদুর ঘরে ছিলেন, দেব শান্ত কণ্ঠে বলে, ‘আপনি হয়তো ভেবেছিলেন দাদুকে খুন করে আপনি আবার বিয়েবাড়িতে ফিরে আসবেন কিন্তু তাড়াহুড়োতে গাছ থেকে নামতে গিয়ে নিশ্চয়ই আপনার জামাকাপড় খারাপ হয়ে গিয়ে থাকবে তাই বিয়েবাড়িতে ফিরে যাওয়াটা আপনি উচিত মনে করেননি।’

‘আপনি যা বলছেন তার কোনও প্রমাণ দেখাতে পারবেন?’ চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় সৗমেন।

‘দয়া করে আপনি একটু উঠে দাঁড়িয়ে দেয়ালের দিকে মুখ করে দাঁড়ান। আর অলোক তুমিও সৌম্যর পাশে ওই একই ভাবে দাঁড়াও, এই বলে দেব সীমার দিকে তাকায়, ‘আচ্ছা এবার তুমি এই দুজনকে ভালো করে দ্যাখো। দুজনেরই শরীরের গঠন কাঁধের ব্যাপ্তি প্রায় একইরকম। অন্ধকারে ঢিলেঢালা জামাকাপড়ে কে অলোক আর কে সৌম্য বোঝাটা সত্যি মুশকিল।’

‘আপনি ঠিক বলেছেন স্যার, উত্তেজনায় সীমার স্বর কেঁপে যায়, ‘আমার আগে কেন এটা মনে হল না যে সৌম্যও অলোকের মতন একই রঙের পোশাক পরেছিল এবং অলোকের থেকেও ওর কাছে দাদুকে খুন করার আরও বড়ো কারণ রয়েছে। ও-তো আইবিএম-এর এজেন্সি নেওয়ার জন্য নিজের সবকিছু ইনভেস্ট করে ফেলেছিল। এমনকী আমেরিকার চাকরি ছেড়ে, গ্রিন কার্ডও ফেরত দিয়ে ও ইন্ডিয়ায় চলে আসে। দাদু বেঁচে থাকলে ডিস্ট্রিবিউটারশিপ-টা কিছুতেই নেওয়া হতো না কারণ অলোককে তো পাওয়া যেত না…’

অলোক হঠাৎ-ই জিজ্ঞেস করে, ‘এসব তুমি কী বলছ সীমা? আগে তো কখনও বলোনি যে, তুমি দাদুর খুনিকে পালাতে দেখেছ?’

‘কী করে বলত, ওর তো পুরো সন্দেহটাই তোমার উপর গিয়ে পড়েছিল আর বেচারি বিয়ে পিছোতে বাধ্য হয়েছিল। ওর সঙ্গে হঠাৎ-ই আমার দেখা হয়ে যায় আর আসল সত্যটা বেরিয়ে আসে… উঁহু, পালাবার চেষ্টা কোরো না সৌম্য কারণ পুলিশ শোরুমের বাইরে অপেক্ষা করছে। আমি চাই না তোমার কর্মচারীদের সামনে তোমাকে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়া হোক, সুতরাং চুপচাপ আমার সঙ্গে বাইরে চলো। আর প্রমাণ, সে তো পুলিশ দাদুর ঘরের দরজা, খাট ইত্যাদি থেকে যে আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করেছে তার সঙ্গে তোমার আঙুলের ছাপ যে ম্যাচ করবে সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। এমনিতে সীমা খুনের কারণ কিছুটা বললেও বাকিটা পরিষ্কার করে বন্ধুকে বলো যে কেন এমনটা করলে,’ দেব বলে।

‘হ্যাঁ সৌম্য, তুই আমাকে ভরসা দিয়েছিলি যে লাভের পুরো টাকাটা তুই দাদুর হাতে তুলে দিয়ে দাদুকে রাজি করিয়ে নিবি আর নয়তো আর একটা শোরুম নেওয়ার ব্যবস্থা করবি, তাহলে তুই কেন এমনটা করলি?’ ব্যথিত কণ্ঠে বলে অলোক।

‘এছাড়া আমার আর কী বা করার ছিল? দাদু কিছু শুনতে বা শোরুমের জিনিস ছোটো শোরুমে শিফ্ট করত কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না। আর বড়ো শোরুম নেওয়ার মতো আমার আর্থিক অবস্থা ছিল না। তুই যখন আমায় জানালি যে দাদু তোর নামে শোরুম-টা লিখে দিয়েছেন, আমি আমার চাকরি আর গ্রিন কার্ড ছেড়ে দিয়ে নিজের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা না করেই এখানে চলে এসেছিলাম। দাদু খুব ভালো করেই জানতেন কম্পিউটার বিক্রি করলে অনেক বেশি লাভ তবুও নিজের এই পুরোনো ব্যাবসা ছাড়তে রাজি ছিলেন না। ওনার এই জেদের জন্য আমি কেন সাফারার হতে যাব?’ তিক্ততা ঝরে পড়ে সৌম্যর কথায়।

‘ভালোই হল, সবকিছু ছবির মতো পরিষ্কার হয়ে গেল। তোমার জন্য একটা কাজ করতে পারি। জেলে বসে যাতে আরও কয়করকমের ব্যবসার ব্লু প্রিন্ট তৈরি করতে পারো, তার ব্যবস্থা করে দিতে পারি।’ দেবের পরিহাসে ওই মানসিক টানাপোড়েনের মধ্যেও অলোক আর সীমা না হেসে পারে না।

আলমারি

–হ্যাঁ মা বলো।

–কোথায় আছিস রে? এতক্ষণ ধরে ফোন করেই যাচ্ছি কোনও রেসপন্স নেই।

–কেন আমি তো টিউশনে ছিলাম। তোমাকে তো বলেই এলাম, কলেজ ফিরতি টিউশন করে ফিরব। কিছু কি দরকার আছে? এতগুলো মিস্ কল!

–তোর বাবার ফোন অনেকক্ষণ ধরে বন্ধ আছে। তোকে কি কিছু বলে গেছে?

–না তো। দুটো নম্বরই বন্ধ?

–হ্যাঁ। অনেকক্ষণ ধরে চেষ্টা করছি। সেই দুপুর থেকে।

–কোথাও গেছে হয়তো।

–আজ পর্যন্ত কোনও দিন তোর বাবা না বলে কোথাও গেছে? অফিসে দেরি হলেও ফোন করে জানিয়ে দেয়।

–তুমি চিন্তা কোরো না, আমি দেখছি। তুমি একবার বীরেনকাকুকে ফোন করে দ্যাখো।

–তিন্নি, অফিসে ফোন করেছিলাম। বলল, সেই দুপুরেই বেরিয়ে গেছে।

তিন্নি আর কথা না বাড়িয়ে ফোনটা কেটে বাবার নাম্বার ডায়াল করল। বাবা ওয়ান, বাবা টু। সুইচড অফ। মোবাইলে দেখল আটটা কুড়ি। স্ট্যান্ডে না গেলে অটো পেতে সমস্যা হবে। কিন্তু বাবা গেল কোথায়? একে একে ব্যাচের ছেলে মেয়েরা সব বাড়ির দিকে পা বাড়াল। তিন্নির সাথেও দুজন এল। একজন মাঝ রাস্তাতেই অটো পেয়ে গেল। তিন্নি অন্য আরেক ব্যাচমেটের সাথে কয়েকটা পা এগিয়ে এসে একটা এটিএম কাউন্টারের কাছে দাঁড়িয়ে সঙ্গীকে এগিয়ে যেতে বলে, নিজে এটিএম কাউন্টারের ভিতরে ঢোকে। টাকা তুলে স্ক্রীন-এ চোখ রাখতেই চমকে ওঠে। একি! এত টাকা! প্রিন্ট বের হল না। এই এক নতুন সমস্যা এসেছে, অর্ধেক কাউন্টারে প্রিন্ট বের হয় না। মেসেজটা বাবার মোবাইলে যাবে, তিন্নির নাম্বার ট্যাগ করেনি। কিন্তু এতগুলো টাকা হিসেব মিলছে না। কেউ কি, তাহলে ইচ্ছে করে এতগুলো টাকা ব্যাংকের আকাউন্টে ফেলে দিল? তাও আবার দু’লাখ। বাবার চিন্তার মাঝে আচমকা এই টাকার চিন্তাও পেয়ে বসল। এত সমস্যা এই ভাবে চলে আসবে ভাবেনি, তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে হবে। বাবা এতক্ষণেও না ফিরলে মা এখন একা।

(২)

এক কথা বলতে বলতে প্রকাশের জিভে পলি পড়ে গেল। একেক সময় রেগে যায়, পরেক্ষণেই নিজেকে বোঝায়, বেচারা এরাই বা কোথায় যাবে, কয়েকদিন আগেই সেই টাক মাথার ভদ্রলোক এসে প্রকাশের ডেস্কে চেল্লাতে আরম্ভ করেছিলেন, ‘এর থেকে আমাকে একটু বিষ এনে দিন, খেয়ে সবাই মিলে বাঁচি। কোথায় ছিল আর কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে।’প্রকাশ সেদিন রাগেনি। ক্যাজুয়াল স্টাফ সমীরকে বলে, ‘এনাকে এক গেলাস ঠান্ডা জল দাও তো।’ জল পান করে ভদ্রলোক বেশ শান্ত স্বরেই বলেন, ‘বলুন তো ম্যানেজারবাবু, এভাবে ইন্টারেস্ট কমালে খাব কি? রাজ্য সরকারের চাকরি করতাম, রিটায়ার করে কতই বা পেয়েছি। এতে খাব, ডাক্তারকে দেব, না জমাব।’

ভদ্রলোকও সব বোঝেন, কিন্তু কী করা যাবে, নিয়ারেস্ট গায় দ্য গিলটি ওয়ান। এদিকে দিন দিন কাজের চাপটাও বাড়ছে। টিফিন খেতেই সময় পায় না। দুটো থেকে আড়াইটের সময় কিছু না কিছু কাজ এসে যায়। নিদেন পক্ষে লিংক ফেলিওর। একে ওকে ফোন করা তো আছেই। তবে কাস্টমাররা ভাবে এটা হয়তো ব্যাংকের লোকেদের ফাঁকিবাজির নতুন অস্ত্র। কথায় কথায় লিংক ফেলিওর। অর্ধেকজন বোঝে না এই ভার্চুয়াল ব্যাংকিং-এর যুগে অন্তর্জালই প্রধান স্তম্ভ। এত বোঝা সবার কম্ম নয়। ঘরের ভদ্রমহিলাই বোঝে না। কাজ করবার ফাঁকে একবার মোবাইলের স্ক্রীন-এ চোখ রাখল। না, এখনও পর্যন্ত মিস কল নেই। ভালোই আছে, দরকার হলে মিস্ কল দিয়ে ছেড়ে দেয়। কিছু বললে জবাব দেয়, ‘তুমি কেন্দ্রীয়, আমি রাজ্য। জানোই তো কতটাকা কম বেতন পাই।’ মায়ের দেখে মেয়েটাও হয়েছে ওইরকম। কথা বলতে না বলতেই, ‘বাপি কিছু ফান্ড ট্রান্সফার করে দেবে?’

–কত?

–বেশি নয়, হাজার পাঁচেক দিলেই হবে।

–হাজার পাঁচ! ভগবান, বাড়ি ভাড়া লাগে না নিজেরা রান্না করে খায়, তাও হাত খরচ হাজার পাঁচ, সেটা আবার শেষ মাসে। প্রথমে আরেক প্রস্থ পাঠানো হয়। মায়ের থেকে টাকা নেওয়া তো আছেই। প্রকাশ ঘড়িটার দিকে আরেকবার তাকাল। দুটো চল্লিশ। সিগারেট খেতে হবে। খিদেও পেয়েছে। কী টিফিন দিয়েছে কে জানে? প্রকাশ ব্যাগ খুলে টিফিন কন্টেনার বের করল। মুড়ি, একটুকরো শসা। প্রতিদিন এক। নিকুচি করেছে টিফিনের। উঠে ডাস্টবিনে পুরো টিফিনটা ফেলে সমীরকে বলল, ‘রায়বাবুকে বলবে খেতে যাচ্ছি। দেরি হবে একটু।’ম্যানেজার শোনে, কিন্তু রুমা শোনে না। ব্যাংকের দরজার বাইরে পা দেওয়া মাত্র মিস্ কল। একসাথে পাঁচবার। প্রকাশ একটু বিরক্তির সাথেই ফোন ডায়াল করে বলল, ‘কী হলটা কী? এত তাড়া কীসের?’

–কোথায় আছো?

–ভাগাড়ে। এইসময় কোথায় থাকি তুমি জানো না?

–শোনো আমি আজ বিকালেই তিন্নির কাছে যাচ্ছি। ওর শরীর খারাপ। তুমি এই কটা দিন একটু হোম ডেলিভারি থেকে আনিয়ে চালিয়ে নেবে। আমি কবে ফিরব জানি না।

–তিন্নির কী হয়েছে? চমকে ওঠে প্রকাশ।

–শরীর খারাপ বললাম না।

–শরীর খারাপ শুনলাম, কিন্তু কী হয়েছে সেটা তো জানতে হবে।

–তোমায় এইসব মেয়েলি ব্যাপারে নাক গলাতে হবে না।

–অদ্ভুত তো। মেয়েটা কি তোমার একার?

–শোনো অতো বকার সময় নেই। আমি রাখছি, আর হ্যাঁ কিছু টাকা ট্রান্সফার করে দেবে।

–কেন সিরিয়াস কিছু, ভর্তি করতে হবে?

–তুমি বড্ড ইনকুইজিটিভ হয়ে যাচ্ছ।

–এক কাজ করো কার্ড নিয়ে যাও সে রকম হলে কোথাও ভর্তি করে দেবে। ক্যাশলেস হয়ে যাবে।

–তোমাকে যা করতে বললাম তাই করো। এরকম বেসলেস কথা বোল না। আমি চিন্তা ভাবনা করে যেটা ভালো ভাবব, সেটাই করব। তোমাকে কিছু বলতে হবে না।

–ভালো। আমি টাকা দেব, কিন্তু কোনও আলোচনাতে থাকব না? আমার মেয়ে অথচ শরীর খারাপ হলে কী করবে সেটা বলবারও অধিকার নেই। এই না হলে বাবা। তা তুমি যাচ্ছ যে তোমার অফিস কী হবে?

–ইন্টিমেশন দিয়ে যাচ্ছি, ছুটি নিয়ে নেব। আর শোনো ডোন্ট বি সেন্টিমেন্টাল প্রকাশ। এখন ওসবের সময়ও নেই, লেট হার কিওর সুন।

প্রকাশ অনেকক্ষণ ধরে চেপে রাখা একটা শ্বাস ছাড়তে ছাড়তে বলল, ‘আমি একবার তিন্নিকে ফোন করছি।’

– না না। রুমা প্রায় চমকে উঠল।

–না না মানে?

–ওকে এখন ফোন করতে হবে না। আমি পৗঁছে সব কিছু তোমাকে জানাব।

রুমার ফোনটা রাখবার সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশ কিছুসময় হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কী হল তিন্নির! আর খাবার মুখে উঠবে না। এক কাপ চা বলল। বিস্কুটটা ভিজিয়ে মুখে তোলার আগেই মাটিতে পড়ে গেল। এরা বড্ড বেশি চিন্তা দেয়। রুমার এই স্বভাবটা ইদানীং হয়েছে। আগে এরকম করত না! কথাবার্তা সমস্ত কিছু শেয়ার করত। এমনকী চাকরি পাওয়ার বছর দুই পরে আপার ডিভিশনের একটা ছেলেকে ভালো লাগত। সে কথাও গোপন করেনি। তিন্নির স্কুলে পড়বার সময় অঙ্কে রিপিটেড কম নম্বর পাওয়া, বা এক বন্ধুর বার্থডে পার্টিতে ড্রিংক করে বাড়ি আসা, সবই প্রকাশের থেকে রুমাই বেশি বলত। সেসময় বরং প্রকাশ বোঝাত, শান্ত করবার চেষ্টা করত। এইচএস পাস করবার পরেই সব হিসাব কেমন যেন গোলমাল হয়ে যেতে আরম্ভ করল। উলটে যেতে লাগল সব কিছু। তিন্নি কোনওরকমে ফাস্ট ডিভিশনে পাশ করল। প্রকাশ বলল, ‘শোনো ওর যা মেরিট তাতে সাধারণ লাইনে গ্র্যাজুয়েশন করুক। তারপরে না হয় কোনও একটা প্রফেশনাল কোর্স করানো যাবে। রুমা প্রথমে সব কথা শুনেও ছিল। প্রকাশের কথাতে রাজিও হল। কিন্তু বাধা এল রুমার দিদির কাছ থেকে। দিদির ছেলেটাও হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করেছে। জামাইবাবু একটা সরকারি জীবনবিমা কোম্পানির ডেভেলপমেন্ট অফিসার। হাবেভাবে টাকা আছে জাহির করে। কথায় কথায় বলে, ‘বুঝলে ভায়া সন্ধেবেলা ঠিক জল খেতে ইচ্ছে করে না।’ ঘরে ড্রিংক ক্যাবিনেটও আছে। বছরে দু’একবার প্রকাশও যায়। তবে দুইবোনের সাথে কী সব কথা হয় কে জানে?

একদিন অফিস থেকে প্রকাশ বাড়ি ফিরতেই রুমা বলে, ‘তিন্নিকে ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ভর্তি করে দাও। রাকাও ভর্তি হচ্ছে।’

–কোথায়?

–কলকাতায়।

কথাগুলো শুনে প্রকাশ এক্বেবারে আকাশ থেকে পড়ল। রুমার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, ‘আরে দাঁড়াও, আমি সব কিছু আগে ভেবে দেখি। কোন কলেজ, কি তার ইনফ্রাস্ট্রাকচার, ক্যাম্পাসিং কী হচ্ছে, এই সব কিছু না দেখে শুনে তো আর ভর্তি করা যায় না। তাছাড়া এখন ইঞ্জিনিয়ারিং-এর বাজার ভালো নয়।’

–ও সব কিছু তোমাকে দেখতে হবে না। তুমি ও-সব বুঝবেও না, তার থেকে যে দেখছে তার ওপরেই সব কিছু ছেড়ে দাও।

–কার ওপর, তোমার জামাইবাবু? তা হলেই হয়েছে।

–সে তো হবেই দু দুটো ফ্ল্যাট, গাড়ি, সব তো তুমি কিনেছ তাই না?

– বাদ দাও।

–বাদ দেওয়ার কিছু নেই, জামাইবাবু সব কিছু দেখে এসেছে। খোঁজ খবরও নিয়েছে। রাকা তিন্নি দুজনেই ওখানে ভর্তি হবে।

–থাকবে কোথায়?

–কেন, গড়িয়াতে জামাইবাবু অতো বড়ো ফ্ল্যাট কিনেছে, ওখানেই থাকবে।

–শুধু দু’জন এই বয়সে এক সাথে! ব্যাপারটা ক্রুশিয়াল হয়ে যাবে না?

–তোমার কাছে হতে পারে, আমার কাছে নয়, ওদের কাছে তো নয়ই। তাছাড়া মাঝে মাঝে আমরা যাব, জামাইবাবুরা যাবে।

প্রকাশ আর কথা না বাড়িয়ে উত্তর দিল ‘ভালো। সবই যখন ঠিক করেই নিয়েছ তখন আর আমাকে বলবার কী আছে?’

রুমার কথামতোই তিন্নি ভর্তি হল। ক্লাসও চলল। সাত মাস কেটেও গেল। তারপরেই একদিন অফিসে ফোন করে রুমার এই সব কথা বলে, তিন্নির শরীর খারাপ নিয়ে এই রকম অদ্ভুত নাটক তৈরি করে, এই রকম আচমকা চলে যাওয়া।

রুমা ফোন করতে বারণ করলেও প্রকাশ তিন্নিকে ফোন করে। এক, দুই, তিন বার। না ফোন সুইচ অফ। রাকাকেও ফোন করে। বেজে গেল, ধরল না।

রুমার ফিরতে ফিরতে দিন দশ কেটে গেল। এর মাঝে প্রতিদিনই প্রকাশ ফোন করে যাওয়ার কথা বলতেই রুমা বলে ওঠে, ‘না না আমি যখন তোমাকে বারণ করেছি তখন তুমি আসবে না।’ একদিন অফিস ফেরত রাকাকেও ফোন করে এই ব্যাপারে জিজ্ঞেস করল। রাকাও কোনও স্পষ্ট উত্তর না দিয়ে ফোন কেটে দিল। সীমা আবার নিজের বোন রুমাকে দোষ দিয়ে বলল, ‘আমার বোনটাই বাজে। সাধারণ একটা ঘটনাকে তাল বানিয়ে দিল।’ ভাইরাভাই আবার হাসতে হাসতে বলে উঠল, ‘আমি আবার ওসব মেয়েলি ব্যাপারে থাকি না।’

তিন্নি বাড়িতে ফিরে আসার পরেও প্রকাশ কিছুই জানতে পারেনি। তিন্নি সব সময় চুপ থাকে। রুমাকে কিছু প্রশ্ন করলেই রেগে রেগে উত্তরটা দেয়, ‘তুমি বড্ড বেশি মেয়েলি স্বভাবের হয়ে যাচ্ছ। মেয়ের গাইনিকোলজিক্যাল প্রবলেম, তোমাকে সব জানতে হবে? যেগুলো মেয়েলি ব্যাপার সেগুলো আমাদের মধ্যেই রাখতে দাও। তুমি ফল টল আনো। ওকে এখন বেশি করে ফল খেতে হবে। আর একটু সুস্থ হলে এখানকার কোনও একটা কলেজে ভর্তি করে দাও, ও আর ওখানকার কলেজে পড়বে না।’

এরপর প্রকাশ আর একবারের জন্যেও কাউকে কোনও প্রশ্ন করেনি। অফিস থেকে দেরি করে বাড়ি ফিরে খেয়ে শুয়ে পড়ে। ছুটির দিনে কোনও না কোনও কাজ নিয়ে বাইরে বেরিয়ে যায়। রুমার কথা মতো তিন্নিকে একটা প্রাইভেট কলেজে একটু বেশি ফিজ দিয়ে ভর্তি করে দিয়েছে। এরপর শুধু ফল কেনা, টাকা পয়সা দেওয়ার কোনও রকম গাফিলতি করে না। প্রয়োজনের থেকে বেশিই কেনে। ফল পচে যায়, জামাকাপড় আলমারি ছাড়িয়ে যায়। কারওর সাথে কোনওরকম অতিরিক্ত কথা বলে না। একদিন শুধু একটা দরকারে তিন্নির আলমারি খুলে একটা ব্যাগ বের করে প্যান কার্ড আর আধার কার্ড বের করেছে, তাও অবশ্য তিন্নিকে বলেই। এর বেশি আর কিছু না।

(৩)

প্রকাশের নিরুদ্দেশ হওয়ার প্রায় মাস সাত হয়ে গেল। তিন্নি ও রুমা অনেক চেষ্টা করেও প্রকাশের কোনও ঠিকানা জোগাড় করতে পারল না। এমনকী মানুষটা বেঁচে আছে না মারা গেছে, প্রথম কয়েক দিন তো সেটাই বুঝতে  পারেনি। সাতদিন পরেই তিন্নির মোবাইলে ব্যাংকে দ্বিতীয়বারের জন্যে টাকা ক্রেডিট হওয়ার মেসেজ আসে। ব্র্যাঞ্চে গিয়ে শোনে ড্রপ বক্সের চেক থেকে ক্যাশ করা হয়েছে। যে ফেলেছে তার ঠিকানা বলা সম্ভব নয়। প্যান নম্বর দেওয়া থাকায় সমস্যা হওয়ারও কোনও কথা নয়। তবে ব্রাঞ্চের এক চেনাজানা কাকুকে প্রকাশের কথা জিজ্ঞেস করতে উনি বলেন, উনি তো ভিআরএস নিয়ে নিয়েছেন, এখন কোথায় আছেন কেউ জানে না। টাকা পাওয়ার আগে মাঝে মাঝেই আসতেন, সব টাকা পেয়ে যাওয়ার পরে আর তো আসেননি। এর মাঝে মা মেয়েতে অবশ্য অনেক জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছে। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব বাদ পড়েনি কেউই। সবার মুখে সেই এক কথা। মাঝে অবশ্য বেশ কয়েকবার তিন্নির মোবাইলে টাকা জমা পড়বার মেসেজ এসেছে। রুমা ও প্রকাশের জয়েন্ট আকাউন্টেও টাকা জমা পড়বার মেসেজ এসেছে। এই কয়েকমাসে দিদির সাথে সম্পর্ক খারাপ হয়ে গেলেও দিদি জামাইবাবু এমনকী রাকাও এসেছে। সব শুনে পাশে থাকবার আশ্বাস দিয়ে গেছে। প্রকাশকে খোঁজার চেষ্টা করবার কথাও বলেছে। কিন্তু সেখানে কিছুই লাভ হয়নি।

দিনদিন তিনকামরার ফ্ল্যাটের ভিতরের শূন্যতা দুটি মানুষকে গ্রাস করে ফেলেছে। সেই একাকিত্ব এতটা তীব্র, কষ্টদায়ক, এর আগে কোনওসময় কেউই বোঝেনি। অথবা বোঝবার চেষ্টাও করেনি। প্রয়োজনের আগেই প্রয়োজন মেটানোর যে দায় একজন কাঁধে চাপিয়ে নিয়েছিল, তার কাঁধের ব্যথা বা না ব্যথার কথাও কেউ জিজ্ঞেস করেনি। কিন্তু আচমকা কাঁধ অর্ধেকটা সরে যাওয়াতে ভূমিকম্পের আরম্ভ। সেখান থেকেই টালমাটাল অবস্থা। রুমা বা তিন্নিকে হাতে হাতে সব কাজ করা আরম্ভ করতে হল। সেই দোকান, বাজার, ইলেকট্রিক বিল এমনকী ব্যাংকে লাইন দিয়ে টাকা তোলা। দুজন এক সাথে এই প্রথম তৃতীয় আরেকজনের জন্যে অকাতরে কাঁদতে আরম্ভ করল। অবশ্য এই কান্না তৃতীয়জনের অলক্ষে।

রুমা এই কয়েকমাসে নিজের অফিস আর বাড়ির চাপে আরও অসুস্থ হয়ে গেল। কথায় কথায় রেগে যায়, তিন্নির ওপর তো এক্বেবারে খাপ্পা হয়ে থাকে। মাঝে মাঝে হাতও চালিয়ে দেয়। তিন্নিও গুম হয়ে থাকে। কিছু বলতে পারে না। কলেজেও নিয়মিত যায় না, টিউশনেও অনিয়মিত। নিজেকেই সব সময় দোষারোপ করে, মাঝে মাঝে নিজেকে শেষ করে দেওয়ার কথাও ভাবে, পরেই আবার নিজেকে সামাল দেয়। মাকে মাঝে মাঝেই ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হয়। এমনি চেক আপ হলেও ডাক্তার বলেন, টেনশনের থেকে হাই সুগার ধরেছে, সঙ্গে প্রেশার, কোলেস্টেরল, রক্তে ক্রিয়েটিনিন বেশি থাকায় কিডনিও কিছুটা আক্রান্ত হয়ে গেছে। নিশ্চিন্তের বিশ্রাম দরকার, শারীরিক ও মানসিক। অফিস থেকে ছুটি নেয়, কিন্তু মানসিক বিশ্রাম?

আরও দুই মাস পরে এক দুপুরে খেতে বসে ভাতের থালাতে আঙুল দিয়ে নাড়াচাড়া করবার সময় দিদির ফোন পেয়ে রুমা চমকে ওঠে। ফোনটা রেখেই মাখা ভাত ফেলে তিন্নিকে বলে, ‘রেডি হয়ে নে, মাসিরা আসছে। তোর বাবাকে খুঁজে পাওয়া গেছে, তবে কোথায় জানি না, মেসো জানে।’

কলকাতা শহর ছাড়িয়ে গাড়ি ছুটে যায় উত্তর চবিবশ পরগণার বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে। রুমা, তিন্নি ছাড়াও দিদি জামাইবাবু এমনকী রাকাও সঙ্গে থাকে। অবশ্য রাকা আর তিন্নি দুজন বসে দু’প্রান্তে। একজন পিছনের সিটে  একজন সামনের সিটে। গ্রামের মেঠো রাস্তার বুক ধরে কিছুটা গিয়ে গাড়ি দাঁড়াল একটা ছোটোগাছ আর বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা জায়গায়। অনেকটা জায়গা। ভিতরে ছোটো ছোটো ঘর। গাড়িতে যেতে যেতে রুমা শুনল জামাইবাবু আগে একবার নিজে এসে সব খোঁজ খবর নিয়ে গেছে। প্রকাশের সাথেও দেখা করে সবাইকে নিয়ে আসবে কিনা জিজ্ঞেস করে গেছে। প্রকাশের একটা জীবনবিমার পলিসি ম্যাচিওর হয়ে যাওযার সূত্র ধরেই গোপনে খোঁজ খবর চালিয়ে প্রকাশের ডেরা খুঁজে পেয়েছে। গাড়ি থেকে নেমে দিদি জামাইবাবু, রুমা আর তিন্নিকে ভিতরে যেতে বলে নিজেরা বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে। রুমা জিজ্ঞেস করলে উত্তর দিল, ‘তোমরা আগে যাও আমরা একটু পরে যাচ্ছি।’

বাইরে তখন পচা ভাদ্রের রোদ। শরীরে আছড়ে পড়া ঝলসানো আলো আর তাপ সহ্য করে রুমা আর তিন্নি এদিক ওদিক তাকিয়ে ঘেরা জায়গাটার ভিতরে ঢুকে এগিয়ে চলে। কিছুদূর যাওয়ার পরেই কমবয়সি একটা ছেলে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনারা কি কাউকে খুঁজছেন?’

রুমা একটু আমতা আমতা করে সব কিছু বলতেই সেই নাম না জানা ছেলেটি একটা ঘরের দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বলে, ‘উনি এখন ওই ঘরে ক্লাস নিচ্ছেন।’

– ক্লাস নিচ্ছেন!

চাকরি পাওয়ার আগে প্রকাশ চাকরির পরীক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি টিউশন করত। চাকরি পাওয়ার পরেও প্রথম দিকে অভ্যাসটা চালিয়ে গেছিল। তারপর টুকটাক একে ওকে এমনি দেখিয়ে দিলেও আর টিউশন আরম্ভ করেনি। তিন্নিকে পড়াত। নিজেও অবসর সময়ে চাকরির বিভিন্ন বইপত্র নাড়াচাড়া করত। রুমা কিছু জিজ্ঞেস করলে বলত, ‘আপডেট থাকা যায়।’

কিন্তু সেদিন কথাগুলো শুনে দুজনেই অবাক হয়ে একে অন্যের দিকে তাকিয়ে ছেলেটির দেখানো ওই ঘরটির দিকে এগিয়ে এসে দরজার সামনে দাঁড়াল। ঘরের ভিতর তখন তিন্নির বয়সি বা ছোটো বড়ো, জনা কুড়ি ছেলেমেয়ের সামনে ক্লাস নিচ্ছে প্রকাশ। দরজার বাইরে দুজনকে আকস্মিক দেখে প্রথমে কেউ কোনও কথা বলতে পারল না। কিছু সময় পরে প্রকাশ বলল, ‘আমার ঘরে গিয়ে বোসো আমি আসছি।’ তারপরেই একজন ছাত্র এগিয়ে এসে রুমা আর তিন্নিকে প্রকাশের ঘরে বসিয়ে এল।

রুমা ও তিন্নি ঘরের ভিতরে একটা তক্তার ওপর বসে চারদিকটা দেখতে লাগল। সাদামাটা ছিটে বেড়ার ঘর। দুটো জানলা আছে। একটা টুলের ওপর রাখা রয়েছে একটা টেবিল ল্যাম্প। চারদিকে ঝোলানো রয়েছে কয়েকটা শার্ট, প্যান্ট কয়েকটা গেঞ্জি। এককোণে থাক থাক করে বেশ কয়েকটা বই। দরজার বাঁদিকের দেয়ালে টাঙানো রয়েছে রুমার শ্বশুর-শাশুড়ির একসাথে একটা ছবি। নতুন ঘরে আসার পরে ছবিটা স্টোররুমের স্ল্যাবে তোলা ছিল।

কিছুসময় পরে প্রকাশ ঘরের ভিতর আসতেই রুমা বেশ উত্তেজিত ভাবে বলে উঠল, ‘এর মানে কী? এরকম ভাবে কাউকে কিছু না বলে চাকরি বাকরি ছেড়ে, এই অজ গ্রামে এসে তুমি কী আরম্ভ করেছ?’

–চা খাবে? এই কয়েকমাসেই তো খুব রোগা হয়ে গেছ।

–যা জিজ্ঞেস করলাম উত্তর দাও।

প্রকাশ একটা শ্বাস নিয়ে বলল, ‘আমাকে আর তোমাদের দরকার নেই এই সত্য উপলব্ধি করেই চলে এলাম। তবে তোমাদের কাউকে ঠকাইনি। ব্যাংক থেকে একপয়সাও তুলিনি। যা টাকা পেয়েছি সব দিয়ে দিয়েছি।’

–বাবা সব কিছু কি টাকার হিসাবে মেলে, না চলে?

–ঠিক তো আজ তোরা বুঝেছিস, কিন্তু যেদিন আমার আপত্তি অগ্রাহ্য করে মায়ের কথা শুনে রাকার সাথে থাকতে গেলি, তারপর…। প্রকাশ একটা লম্বা শ্বাস ফেলে কথা বন্ধ করে দিল।

পাশ থেকে তিন্নি বলে উঠল, ‘থামলে কেন? বলো…’

–থাক। আমার কাছে তো সব কথাই গোপন করেছিলি, তাই না। খুব রাগ হয়ে ছিল, ভাবলাম এবার তোরা তোদের মতো করে থাক আমি আমার মতো। তবে এখন আর অতটা রাগ নেই, তোদের খুব দেখতে ইচ্ছে করছিল।

প্রকাশের কথা শুনেই রুমা তিন্নি দুজন দুজনের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কিছুসময় পরে তিন্নি বলে, ‘আমি তো কিছু গোপন করিনি বাবা।’

প্রকাশ মুচকি হাসে, ‘সবাই খরগোশ নয় রে। তারপর আবার কিছুসময় চুপ থেকে বলে, ‘জানিস আমাদের সমাজ, শাস্ত্র, কাছের আত্মীয়দের সাথে বিয়ের অনুমতি দেয় না, তবে আগে দিত। মহাভারতে অনেক উদাহরণ আছে। আবার তুতেনখামেন তার নিজের বোন আনাক-সু-নামুনকে বিয়ে করেছিল। দক্ষিণ ভারতের কয়েকটি সম্প্রদায়ের মধ্যে এই বিয়ে এখনও প্রচলিত।’

–এসব আমাকে বলছ কেন? আমি জেনে কী করব?

প্রকাশ তিন্নির মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, আসলে এখানে ক্লাস নেওয়ার ফাঁকে শুধু তোর কথাই ভেবেছি, ভেবেছি ভুল কার তোর, না আমার?’

–তুমি যে কী বলছ কিছুই বুঝতে পারছি না।

একটা লম্বা শ্বাস ফেলে প্রকাশ বলে উঠল, ‘তোরা কিছু না বললেও আমি কিছুটা আন্দাজ করেছিলাম। তোর মনে আছে একদিন তোর আলমারি খুলে তোর প্যান কার্ড বের করেছিলাম, সেদিন ব্যাগের মধ্যে নার্সিংহোমের একটা ফাইল পাই। প্রথমে ভয় লেগে গেছিল তারপর কয়েকটা পাতা পড়তেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হল। তাও রাকাকে ফোন করে ওর কলেজ গেলাম। প্রথমে রাকাও সব অস্বীকার করছিল, একটু জোর করতে হয়েছিল, বুঝলাম এত বড়ো ঘটনা যখন আমার কাছেই গোপন করা হল, তখন তোদের কাছে আমার কোনও মূল্যই নেই।’

রুমার গলাতে অবাক হয়ে যাওযার স্বর।

‘না শোনো তুমি ব্যাপারটা ওরকম ভাবে ভেব না। আসলে তিন্নির সাথে আমার নিজেরও খুব লজ্জা করছিল। তিন্নি যে এত বড়ো একটা ঘটনা ঘটিয়ে ফেলবে ভাবতে পারিনি।’

–এটা তোমার দূরদৃষ্টির অভাব রুমা। আমি কিন্তু প্রথমদিনেই বলেছিলাম। তুমি বিশ্বাস করোনি আমার ওপরেই রেগে উঠে বলেছিলে, ‘নোংরা হয়ে যাচ্ছ তুমি, ভাই বোন একসাথে থাকবে তাতে এরকম ভাবাটাই অন্যায়।’

–তুমি বিশ্বাস করো আমার খুব খারাপ লেগেছিল।

–খারাপ! কীসের খারাপ? সব কিছু হয়ে যাওয়ার পরে খারাপ? রুমা আমরা তো বুদ্ধি দিয়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করি। এখানে খারাপ ভালোর তো কোনও প্রশ্ন নেই। দুটো টিনএজ ছেলেমেয়ে এক সাথে এক ঘরে থাকলে অনেক কিছুই হতে পারে, সেখানে অনেক সম্পর্কই গৌণ হয়ে যায়। আবার একটা দুর্ঘটনাও ধরা যায়।

–তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে, তুমি এখন সব সাপোর্ট করছ। এমনি ভাবে তুমি সবকিছু মেনে নেবে? তুমি এমন ভাবে বলছ যেন কোনও ব্যাপারই ঘটেনি। বিয়ে, মহাভারত সব কিছু নিয়ে আসছ।

–আমাদের এই বাংলার হিন্দু সমাজে এইরকম মাসতুতো ভাইবোনের মধ্যে বিয়ের প্রচলন নেই। তবে ওদের ক্ষেত্রে আমার মেনে নেবার বা না নেবার সাথে কি কিছু এসে যায়? যেটা ওরা ঠিক করবে সেটাই হবে। আমি অবশ্য এটাও জানি না ওদের এটা প্রেমশূন্য না অন্যকিছু?

–না, ওদের ঠিক করবার কিছু নেই। রাকার সাথে তিন্নি এখন আর মেশে না।

–বেশ ভালো তো। তবে বিপদের আগে সাবধান করতে হয়, কিন্তু বিপদে পড়লে তো সাহায্য করতেই হবে। প্রকাশ আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল।

তিন্নি থামিয়ে বলে উঠল, ‘বাবা, তুমি কবে ফিরে আসবে বলো?’

প্রকাশ হালকা হেসে উঠল, ‘মা’ রে তোদের জন্যে মন খারাপ করলেও এখানে দিব্যি আছি। সকালে একটা স্কুল চলে বিকালের দিকে আশেপাশের ছেলে মেয়েদের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি হয়। আজকে অবশ্য স্কুল ছুটি তাই ওরা এই সময় ক্লাস করছে। এরা সবাই আমাকে খুব ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে। বেশ ভালো আছি বুঝলি, বেশ ভালো।’

–তাহলে আমরা কী করব? রুমা প্রকাশের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল।

–তোমার দিদি জামাইবাবু এসেছে তো?

–রুমা কিছুসময় চুপ থেকে উত্তর দিল, হ্যাঁ। কথাতে জড়িয়ে থাকা কান্নাটা প্রকাশের কানে গেল।

–ওদের ডাকো। তারপরেই তিন্নির দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, ‘কিরে তুই কি করবি? রাকাকেও ডাকব?’

রুমা তখন সেই মাত্র উঠে বাইরে দিদি জামাইবাবুদের ডাকতে যাচ্ছিল। তিন্নি পিছন থেকে ডেকে বলে উঠল, ‘মা, দাঁড়াও। মাসিদের ডাকতে হবে না।’ তারপরেই প্রকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বাবা যেটা বেরিয়ে গেছে সেটা শুধু মাত্র একটা প্রাণ ছিল না। তাও বলছি সব দোষও আমার, ভুলও। আমাকে আর একটা সুযোগ দেবে না? আমি আর ওই সম্পর্কের কথা ভাবতেও চাই না। শুধু তোমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাই। তুমি বাড়ি ফিরে চলো।’

বাইরে তখন দারুণ রোদ। গরম হাওয়া দরমার ঘরে ঢুকলেও প্রকাশের বেশ শান্তি লাগল। তিন্নিকে কাছে ডেকে মাথায় হাত বুলিয়ে বলে উঠল, ‘খেপি একটা।’

ঠেলা

সামনের রোববার বিকেলে যেন কোনও কাজ রেখো না।

শ্রীদীপ্তা ড্রেসিং টেবিলের টুলটায় বসে মুখে ময়েশ্চারাইজার ঘষছিল। বাড়তি যত্ন চল্লিশ-এর দিকে ছুটে যাওয়া শরীর চায়। শ্রীদীপ্তা সে চাওয়া সারাদিনে না পারলেও রাতে মেটায়। কমপিউটার সি্্ক্রন থেকে মুখ তুলল না জয়। রীতিমতো উপেক্ষা মনে হয় শ্রীদীপ্তা’র। বেশ কিছু বছর ধরেই চলে আসছে এই ঘটনা। শুধু ছোট্ট একটা জবাব বুঝিয়ে দিল শোবার ঘরটায় শ্রীদীপ্তা একা নেই।

–আচ্ছা।

জয় এ রকমই। সবেতেই হ্যাঁ। অথচ থেকেও যেন নেই। সবার মতের বিপক্ষে বেরিয়ে আসা। ঘুপচি একটা ঘরে ভাড়া থেকে জীবন শুরু। তখন কিন্তু জয়ের মধ্যে তাপ পেয়েছে। দাঁতে-দাঁত চিপে দু’জনের লড়াই চালানো। জীবনের সিঁড়ি দিয়ে পাঁচজনের চেয়ে একটু দ্রুতই উঠেছে। রোজগার বেড়েছে। বেড়ে গেছে দু’জনের দূরত্ব। আগে রাগ হয়ে যেত। এখন সয়ে গেছে। এই ফ্ল্যাট, তার গোছগাছ, অর্পর স্কুলে ভর্তি হওয়া–সব ব্যাপারগুলোতেই যেন জয় নিজেকে কীভাবে আলগা করে নিয়েছে। শ্রীদীপ্তা মানে, একজন মাল্টিন্যাশনাল এক্সিকিউটিভ-এর হাতে আজকাল খুব বেশি সময় থাকে না তার পরিবারের জন্য। তবুও যেখানটায় ন্যূনতম দায়িত্ব পালন বা সিদ্ধান্ত নিতে মতামত দেবার দরকার, তাও পাওয়া যায় না আজকাল ।

–শুনলে?

ল্যাপটপ বন্ধ হয়েছে এতক্ষণে।

–হ্যাঁ, শুনেছি। তুমি শনিবার সকালে একবার মনে করিয়ে দিও। সোমবার হেড অফিস রিপোর্টিং থাকলে, ক্যানসেল করাতে হবে ফ্লাইটের টিকিট।

চুপ আবার জয়। অসহ্য! ছেলেও ঠিক একই স্বভাবের হয়েছে। যত কম কথা বলা যায়! বাধ্য হয়ে শ্রীদীপ্তা বলে ওঠে, –জানতে চাইলে না, কেন?

–কেন?

বিছানায় শরীর এলিয়ে দিয়েছে জয়। বুঝতে পারল না শ্রীদীপ্তা, চুপ করে যাবে না কথাবার্তা আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে। বলেই ফেলে শেষমেশ।

–তোমার ছেলে এবার চেস-এ ডিসট্রিক্ট চ্যাম্পিয়ন হয়েছে জুনিয়র লেভেলে। রোববার রবীন্দ্রভবনে ওরা প্রাইজ ডিস্ট্রিবিউশন সেরিমনিটা রেখেছে। কে একজন গ্রান্ড-মাস্টার আসছে। চিঠি দিয়ে ওরা ইনভাইট করেছে পেরেন্ট-দের।

আয়নায় নিজের ক্রিম ঘষা মুখটা ভালো করে দেখল শেষবার শ্রীদীপ্তা। এবার আলো নেভাবে। গর্ব না ক্রিম কীসে মুখ এত জ্বলজ্বল করছে, হদিস পেল না। কোনও কথা ভেসে এল না দেখে বিছানার দিকে ফিরে তাকায় শ্রীদীপ্তা।

অঘোরে ঘুমিয়ে পড়েছে মাল্টিন্যাশনালের এক্সিকিউটিভ।

দুই

বাইরে হর্ন-এর আওয়াজ। মানে, সাড়ে তিনটে। ফিরল ছেলে। ম্যাগাজিনটা কোল থেকে সরিয়ে সেন্টার টেবিলের উপর রেখে সোফা ছাড়ে শ্রীদীপ্তা।

দরজা খুলতেই হুড়মুড় করে ফ্ল্যাটে ঢুকল ছেলে। স্কুল ইউনিফর্মে যুদ্ধের চিহ্ন। একটা জুতোর ফিতে কখন খুলে গেছে। প্রায় নিজের ওজনের থেকেও ভারী একটা ব্যাগ পিঠে। খালি হয়ে যাওয়া ওয়াটার বটলটা বেসিনের নীচে প্রায় ছুড়ে ফেলে দিয়েই সোফায় বই-এর ব্যাগটাকে নামায় অর্প। সারাটাদিন স্কুলের ধকল সামলেও ছেলে যে এখনও কিছুটা তরতাজা, এতেই শান্তি পায় শ্রীদীপ্তা।

কতকগুলো বাঁধা প্রশ্ন থাকে ছেলের জন্য রোজ। আজকেও

একটা-একটা করে ছুড়ে দেবার জন্য তৈরি হল। অর্প এখন কিছু খুঁজছে সোফায়। টিভির রিমোটটা পেয়ে যেতেই সুইচ টিপে অন করে। চ্যানেল সার্ফ করতেই চোখের সামনে সব কিম্ভূতকিমাকার কার্টুন। বিস্ময় আর আনন্দ অর্পর মুখে। কিছু বলার নেই শ্রীদীপ্তার। ক্লাস সিক্সে পড়া তার ছেলে এখনই আওয়াল নাম্বার প্রায় সবেতেই। সেন্ট নিকোলাস-এর মতো স্কুলে ফার্স্ট বয়। কমপিউটার জিনিয়াস। ড্রয়িং-এ অন্তত ছ’টা জায়গার চ্যাম্পিয়ন। উপরি পাওনা, জেলা দাবা প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছে কিছুদিন হল। স্কুল থেকে ফিরে এই আধঘন্টা তাই ছেলে কার্টুন নেটওয়ার্কে সময় ব্যয় করলেও খুব একটা আপত্তি থাকার কথা নয়।

ছেলের পাশে এসে বসে শ্রীদীপ্তা। চ্যানেলের আলো ছেলের চোখের মণি আর মুখটায় মেখে গেছে। বেশ মায়াবী। এলোমেলো চুলে সিঁথিটা সারাদিনের ধকলে কোথাও হারিয়েছে। মমতা মাখিয়ে প্রশ্ন ছোড়ে শ্রীদীপ্তা –টিফিন শেষ করেছ আজ?

–হুঁ।

ছেলের মনের বেশিরভাগ জায়গা জুড়েই এখন কার্টুনের দাপাদাপি। অবশ্য প্রশ্নটা না করলেও চলত। টিফিনে আজ মিক্সড চাউমিন করে দিয়েছিল। টিফিন ফেরত আসার কথা নয়। ভীষণ পছন্দ করে চাইনিজ অর্প।

–হোমওয়ার্ক কপি সব ঠিক আছে?

– হ্যাঁ।

এ প্রশ্নটাও না করলে চলত। শেষ কবে অর্প-র হোমওয়ার্ক কপিতে কারেকশান হয়েছে, মনে পড়ে না শ্রীদীপ্তার। ঘামের গন্ধ ভেসে আসছে ছেলের গা থেকে। স্কুলের ইউনিফর্মটাও বেশ নোংরা লাগছে। এবার বিরক্তি জন্মাচ্ছে শ্রীদীপ্তার ভেতর। প্যান্টের দু’পাশটা তো রীতিমতো কালো। কীসের যেন ছোপ লেগে রয়েছে। কালকেই ফ্রেশ ইউনিফর্ম দিয়েছে। অথচ আজকের মধ্যেই ড্রেসটার এই অবস্থা! কী করে অর্পটা স্কুলে! মারপিট না কি ধুলোয় গড়াগড়ি খায়! এতক্ষণে জুতসই প্রশ্ন খুঁজে পেয়েছে ছেলেকে করার মতো!

–কালকেই তো নতুন ড্রেস দিলাম। এর মধ্যেই এই অবস্থা! করোটা কী স্কুলে!

–স্কুলে নয়।

ছেলে পাত্তাই দিল না প্রশ্নটায় যেন। রাগে ভিজছে শ্রীদীপ্তা।

–তবে?

ফিরল ছেলে ওর দিকে। চোখে মুখে হাসি ছড়িয়ে পড়েছে। নরম হচ্ছে শ্রীদীপ্তার রাগ।

–মাঝ রাস্তায় আজ পুলকার স্টপ হয়ে গিয়েছিল। ঠেলতে হল।

–মানে! কারা ঠেলল!

শ্রীদীপ্তা অবাক। মুখ দিয়ে বিরক্তিকর শব্দ বেরিয়ে আসে ছেলের। তারপর বলে– কারা? মনীষ, অঙ্কুর, জিৎ আর আমি।

কঠোর হতে চেষ্টা করে শ্রীদীপ্তা এবার।

–যা করেছ, করেছ। তুমি গাড়ি থেকে নামবে না। বলবে ড্রাইভার আঙ্কলকে– মা বারণ করেছে।

–কেন! ওরা একা-একা লেবার দেবে! নাঃ, স্কুলে ফাদার ব্রুজ সবসময় আমাদের টিম এফোর্ট দিতে বলেন।

শ্রীদীপ্তা চোখ পাকাতেই চুপ করে যায় ছেলে। অর্প আবার ওই একই কাজ করবে! কথা শুনবে না! শ্রীদীপ্তা জানে, তার ছেলে এরকম নয়!

তিন

বেস ফোনটা বেজে উঠতেই বিরক্ত হল শ্রীদীপ্তা। বাথরুমে চানে মগ্ন ছিল। ভেজা শরীর নিয়ে ড্রয়িং-এ আসতে ভালো লাগে না। মেঝেটা জলে জলময় হয়ে যায়। অথচ আসতেই হবে। অর্প স্কুলে, জয় অফিসে। জয়-এর ফোন করার হ্যাবিট বিয়ের বছরখানেক পরই চলে গেছে। দাদা কি! হতেও পারে। চুলে একটা তোয়ালে জড়িয়ে ভেজা শরীরেও একটা তোয়ালে জড়াল শ্রীদীপ্তা। বাথরুম থেকে বেরিয়ে এল। ফোনটা তুলে হ্যালো বলতেই অপর প্রান্তে একটা গম্ভীর গলা সরব হয়।

– হ্যাঁ, এটা কি ৩ছছ…..?

– হ্যাঁ, বলুন।

শ্রীদীপ্তা সহজ হচ্ছিল। আবার প্রশ্ন। এবার শ্রীদীপ্তা সচকিত হয়ে ওঠে। –আসলে… একটা পুলকার অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। একটু চুঁচুড়া হাসপাতালে আসুন।

মাথাটা বোঁ করে ঘুরে গেল। নীচের তোয়ালেটা খুলে পড়ে গেল। গা-এর জল কখন শুকিয়ে গেছে শ্রীদীপ্তার।

–অ্যাঁ!

আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে গলাটা ওকে।

–না, দেখুন সবাইকেই হসপিটালাইজড করা হয়েছে। প্রত্যেকেই স্থিতিশীল। আমরা গাড়ির মধ্যে স্কুলের ব্যাগ সার্চ করে যাদের যাদের স্কুল ডায়ারি পেয়েছি, খবর দিচ্ছি।

হাত থেকে রিসিভার পড়ে যাচ্ছিল। তবুও সব শক্তিকে একত্রিত করল শ্রীদীপ্তা।

–আপনি কে বলছেন?

–আমি সন্দীপ নন্দী, ইনভেস্টিগেটিং অফিসার, লোকাল থানা।

আর কিছু বলার আগেই ফোন কেটে যায়।

চোখ জ্বালা করছে। কান-মাথা ঝাঁ ঝাঁ করছে। দেয়ালে ঠেস দিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছে শ্রীদীপ্তা। কী করবে এখন! কেউ ইয়ার্কি মারল না তো!

হঠাৎ করে খেয়াল পড়ল ড্রাইভারের ঠিকানা আর ফোন নাম্বার। নোট করা আছে ডায়ারিতে। কোনওক্রমে একটা ম্যাক্সি গলিয়ে নিজেকে ঢাকল। তারপর ডায়ারি বের করে ফোন করল। নাঃ, সুইচ অফ। তাহলে কি সত্যি সত্যিই–? চোখ দিয়ে আপনা থেকেই জলের ধারা নোনতা স্বাদ নিয়ে মুখের গোড়ায় চলে আসছে। দু’বছর চেষ্টা করেও কনসিভ হয়নি অর্প। তারপর হঠাৎই একদিন ওর আসার অস্তিত্ব ধরা পড়া! কী আনন্দ, কী খুশি! এগারোটা বছর ধরে তিলে তিলে বেড়ে ওঠা…।

চোখের জল মুছে আবার কাঁপা-কাঁপা হাতে ডায়াল করল জয়-এর মোবাইলে। অফিস থেকে আসতেও ওর সময় লাগবে। রিং হচ্ছে। তুলল জয়।।

–হ্যালো-তুমি? শোনো, এই… এইমাত্র একটা ফোন এল থানা থেকে। বলছে, অর্পদের পুলকারটা নাকি অ্যাক্সি…।

কথা শেষ করতে পারল না শ্রীদীপ্তা। গলা ভিজে গেল। দম আটকে এল। জয়-এর গলা আশ্চর্য রকম শান্ত!

–কেউ ইয়ার্কি-ফিয়ার্কি–।

–না গো না। গলাটা ভীষণ সিরিয়াস লাগল। আর তাছাড়া অমিত-এর মোবাইলেও ট্রাই করলাম। সুইচ অফ। আমি কী করব! তুমি এখুনি…।

– হ্যাঁ, আসছি। আর এমনি কেমন আছে, কিছু বলল?

– স্টেবল, হসপিটালাইজড হয়েছে।

একটু চুপ থেকে জয় ভরসা জোগাল।

–তুমি একদম সোজা হসপিটালেই যাও। আর পারো তো, লোকাল থানায় যাচাই করে নাও। আমি আসছি। আর শোনো, সাবধানে।

মাল্টিন্যাশনাল এক্সিকিউটিভ-এর গলাকে অনেকদিন পর কেঁপে যেতে শুনল শ্রীদীপ্তা।

চার

হাসপাতালের সিঁড়িতেই বসে পড়েছে শ্রীদীপ্তা। একদিক থেকে চিন্তা মুক্ত হয়েছে। অন্যদিক থেকে চিন্তা শতগুণ বেড়ে গেছে। প্রাথমিক শোকের ধাক্বা কাটিয়ে এখন ও উদ্বেগের শিকার। একটু দূরে করিডরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন পুলিশ অফিসার আর কনস্টেবল-এর সঙ্গে কথা বলছে জয়।।

ঘন্টা দু’য়েক হয়েছে হসপিটালে এসেছে শ্রীদীপ্তা। জয় আসার আগেই পৗঁছে গিয়েছিল। খবর পেয়ে একে একে পৌঁছে গিয়েছিল অনিরুদ্ধ, জিৎ আর মনীষ-এর বাবা-মাও। প্রত্যেকেরই চোখে জলের রেখা। উদভ্রান্ত চেহারা। গোটা হসপিটালটায় ভিড়েভিড়াক্বার। বেশ কিছু পুলিশ। খবর পেয়ে দু-তিনজন সাংবাদিকও এসে গেছে। মৃত্যুর খবর বিক্রি করে ব্যাবসা– এখনকার সমাজের নতুন ট্রেন্ড। হাত-পা থর-থর করে কাঁপছিল। অপেক্ষা বাঁধ মানছিল না। হাসপাতাল চত্বরে আসতেই এবার নিজেকে একা লাগছে শ্রীদীপ্তার।

টুকরো টুকরো আলোচনা আর ইনভেস্টিগেটিং অফিসারের কথা থেকে কাহিনিটা খাড়া করল কোনওক্রমে শ্রীদীপ্তা। পুলকার কোনও কারণে আজ আবার জিটি রোডের উপর বিগড়োয় স্কুল যাবার পথে। কিছু ছেলে ঠেলতে নেমেছিল। গাড়ি স্টার্ট হতে তারা আবার উঠেও পড়ে। হঠাৎই উলটোদিক থেকে আসা একটা লরি পুলকারটাকে ধাক্বা দেয়। আন্দাজ তখন সাড়ে আটটা। চারপাশের সব দোকান খোলেওনি। রাস্তায় সেভাবে ভিড়ও ছিল না। ভিড় জমার আগেই লরিটা পালিয়ে যায়। ড্রাইভার স্পটেই শেষ। অন্তত ছ’টা বাচ্চা মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে এখন।

খুব তাড়াতাড়ি বাকি বাবা-মা’র সাথে এর্মাজেন্সি ইউনিটে পৗঁছেছিল শ্রীদীপ্তা। প্রত্যেকেরই পেটে আর বুকে সিরিয়াস চোট ছিল। একজনের ব্রেনে। ব্লাডের ব্যাগ, স্যালাইনের বোতল, ব্যান্ডেজ আর ছোপ ছোপ রক্তের মধ্যে আলাদা করে অর্পকে খুঁজে পাচ্ছিল না মা’র চোখ। কাচের দরজার উলটোদিকে দাঁড়িয়ে কেবলই ভগবানকে ডাকছিল শ্রীদীপ্তা। মস্তিষ্কে চোটটা যেন অর্প’র না লাগে। ওর ব্রেনের অনেক দাম। মুহূর্তে ও যেন স্বার্থপর হয়ে উঠছিল। দু’জন তাদের ছেলেকে চিহ্নিত করে আসার পরই শ্রীদীপ্তাকে ইশারা করে একজন নার্স। থর থর করে কাঁপতে থাকা পা দুটো নিয়ে এগিয়ে যায় শ্রীদীপ্তা।

একইরকম স্কুলড্রেস, ব্যান্ডেজ, আর ওষুধের গন্ধে হারিয়ে যাচ্ছিল সবকিছু। চোখে জলের ধারা কখন বন্ধ হয়ে গেছে। বমি পেয়ে যাচ্ছে তার বদলে। বার বার চোখের দৃষ্টি ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে চেনার চেষ্টা করছিল শ্রীদীপ্তা যুঝতে থাকা দেহগুলোর মধ্যে তার নিজের দেহের অংশটা কোথায়! ভীষণ অবাক হয়ে যাচ্ছিল ও। অন্য রকম অস্বস্তি গ্রাস করছিল ওকে। মা হয়েও চিনতে ভুল হবে!

জয় আসতে ও আবার ছুটেছে ওয়ার্ডে। জয়ও চেষ্টা করেছে। নাঃ, আহতদের মধ্যে অর্প নেই। পুলিশ ওদের কাছ থেকে সেইমতো স্টেটমেন্টও নিয়েছে। কিছুতেই শ্রীদীপ্তা বুঝতে পারছে না, ছেলেটা কোথায় গেল! গাড়িতে অর্পর ব্যাগ, বই, টিফিনবক্স, ডায়ারি– সবকিছুই রয়েছে। অ্যাটেন্ডিং ডাক্তার ওকে অ্যাসিওর করেছে, যে মারা গেছে সে ড্রাইভার-ই। তার বাড়ির লোক আইডেন্টিফাই-ও করেছে।

কথা বলা শেষ পুলিশের সাথে। জয় এগিয়ে আসছে। শ্রীদীপ্তা বলল, ‘কী বলছে ওরা?’

–ব্যাপারটা বেশ মিস্টিরিয়াস! ওরা বলছে, ব্যাগ গাড়িতে ছিল। গাড়ি ওরা মাইনুটলি সার্চ করেছে। আশে-পাশেও। বডি বা ইনজিওরড– কাউকেই ওরা পায়নি।

–টয়লেট করতে-টরতে–।

–মনে হয় না।

–আমাদের একবার গেলে হয় না!

–আমাদের থেকেও ওদের এসব সেন্স অনেক বেশি। এটা ওদের প্রফেশন। ওরা ঠিক যেটা দেখার দেখে নিয়েছে।

জয় বিপদেও মাথা ঠান্ডা রাখতে পারে। শ্রীদীপ্তা পারছে না। ছেলেটার মুখটা! উঃ! চোখে জলের ধারা বাঁধ মানছে না শ্রীদীপ্তার! মাতৃস্নেহ…।

–ওরা যে ঠিক বলছে, তার কী মানে?

সিঁড়িতে ওর পাশটাতেই বসে পড়ল জয় হঠাৎ। ফরসা মুখটা লাল। চোখেতে জল আসব আসব করেও উথলে ওঠেনি। বাবাদের কি কাঁদতে নেই! শ্রীদীপ্তার কাঁধে একটা হাত তুলে দিল।

–ভেবে দ্যাখো একবার। বেশ পাবলিক সিমপ্যাথি পেয়েছে ঘটনাটা। আর মিডিয়া তো এখন ঝাঁপিয়ে পড়েছে। পুলিশকে তার দায়িত্ব পালন করতেই হবে।

নরম জয়-এর গলা। এ গলার অাঁচ অনেকদিন পরে পাচ্ছে শ্রীদীপ্তা। ভালোবাসা বোধহয় মরে না। এতদিন পরে যেন খুব হালকা ছোঁয়া পাচ্ছে। অনেকটা দুধ কড়ায় ফোটালে পরিমাণে কমে যায়। তৈরি হওয়া সলিড ক্ষীরটা তখন বোধহয় আরও টেস্টি। এরকম বিপদে জয়কে পাশে পাচ্ছে। যেভাবে জয় ওর দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে, এও তো একধরনের প্রেমই। এ রকম দুর্ঘটনাই বোধহয় মানুষের মধ্যে বোধশক্তিকে জাগিয়ে দেয়। শ্রীদীপ্তা নতুন করে জয়কে আবিস্কার করছে। জয় আর ও আবার একসাথে লড়ছে। ঠিক যেভাবে বেশ কিছু বছর আগে বাড়ি থেকে বেরিয়ে শুরু করেছিল। লড়াইটা সেবারও ওরা জিতেছিল। এবারও…

আপনি কি জয় ঘোষ?

সামনে খেঁকুড়েপনা একটা লোক এসে দাঁড়িয়েছে। করিডরে দাঁড়িয়ে থাকা বাকি বাবা-মা’র দিকে একবার তাকিয়ে নেয় শ্রীদীপ্তা। জয় উঠে দাঁড়িয়েছে।

– হ্যাঁ, বলুন।

– আপনার সঙ্গে একটা কথা ছিল। আপনার মোবাইল নাম্বার তো…জ্ঝজ্জ্ব্ব….।

– হ্যাঁ, হ্যাঁ বলুন না, কী ব্যাপার।

জয়-এর ভ্রু কুঁচকে গেছে। বুকে এবার হাতুড়ি পিটছে ওর। জয় এগিয়ে গেল লোকটার সাথে। শ্রীদীপ্তাও হাঁটা দিল পেছন পেছন। কথাগুলো ভেসে আসছিল ওর কানে।

–আমার একটা চা-এর দোকান আছে। যেখানে অ্যাক্সিডেন্টটা হয়েছে, সেখান থেকে একটুখানি।

শ্রীদীপ্তা পা চালিয়ে ওদের মধ্যে পৗঁছে গেছে। জয় দাঁড়িয়ে গেছে। ওরা এখন হসপিটাল মেন গেটের কাছাকাছি।

–হ্যাঁ, কিন্তু আমার মোবাইল নাম্বার কী করে আপনার কাছে –!

লোকটা চারদিক তাকিয়ে নেয়। তারপর হেসে বলে ওঠে– আপনার ছেলে দিল।

–মানে!

জয় চিৎকার করে উঠেছে। শ্রীদীপ্তার মনে নতুন শঙ্কা। শেষে কি ছেলে অপহরণ হল!

–কিন্তু ও কোথায়?

জয় দাঁতে দাঁত ঘষছিল। অজান্তেই খামছে ধরেছে

জয়-এর জামাটা ও।

–বাইরেই রিকশায় বসে আছে। ফোনই করতাম। একটু কিন্তু কিন্তু লাগল।

–ওর কাছে নিয়ে চলুন।

এবার শ্রীদীপ্তা মুখ খুলেছে।

–হ্যাঁ, আসুন না।

লোকটার ব্যবহারে এবার একটু একটু করে সন্দেহ কমছে শ্রীদীপ্তার।

– হ্যাঁ, ব্যাপারটা কী হল! যেতে যেতেই পুরো ব্যাপারটার রহস্য ভেদ করতে চাইছে জয়।

লোকটাও যেন তৈরিই ছিল বলার জন্য।

–আসলে অ্যাক্সিডেন্ট হবার সময় আপনার ছেলেও গাড়িটাকে বাইরে থেকে ঠেলছিল। কোনও কারণে গাড়ি বা ওর বন্ধুরা এগিয়ে যায়। আর প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই ঘটনাটা ঘটে আপনার ছেলের চোখের সামনে। ভয়ে, আপনার ছেলে আমার দোকানে ঢুকে যায়। জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।

মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিল শ্রীদীপ্তা। লোকটা থামতেই জয় বলে ওঠে, –তারপর?

–দোকানে তখন আমি আর আমার কর্মচারি ছিলাম। ওদিকে কিছুক্ষণের মধ্যেই ভিড় জমে গেল। এদিকে আপনার ছেলের এই অবস্থা। তখনও আমরা ভাবছি, ছেলেধরা-টরা হবে। দোকানের ঝাঁপ ফেলে দিলাম ভয়ে। দুধ খাইয়ে ওকে চাঙ্গা করতে আপনার নাম, ফোন নাম্বার পেলাম! খবর পেলাম, সব বাবা-মা’রা এখানেই আসছে। তাই…।

চোখে পড়েছে শ্রীদীপ্তা-র অর্পকে। চুপটি করে বসে আছে রিকশায়। দৗড়ে চলে যায় ছেলের কাছে। রিকশা থেকে ছেলে নেমে আসতেই ছেলেকে জড়িয়ে ধরে। একদম অক্ষত ছেলে। এগিয়ে আসে জয় আর লোকটি। জয় লোকটার একটা হাতকে দু’মুঠোর মধ্যে ধরে নিয়েছে।

–কী বলে যে আপনাকে…।

– না, না। কোনও ব্যাপার নয়। আসলে ভয়ই লাগছিল নিজেরও। না কেস খাই! নতুন দোকান। কারওর ভালো করতে যাওয়াটাও আজকাল বিপদ!

শ্রীদীপ্তা ছেলের দিকে তাকায়। আর পুলকার নয়। এবার নিজেই।

নাম, ঠিকানা জানার পর ভদ্রলোককে একদিন বাড়িতে আসতে বলল জয়। হঠাৎই দিনটাকে আবার ভালো লাগতে শুরু করেছিল শ্রীদীপ্তা-র। সব রাতের শেষেই যেমন দিন, সব টেনশনের শেষে একটা স্বস্তি লুকিয়ে থাকে। শ্রীদীপ্তা’র সব টেনশন এখন যেমন আছড়ে পড়েছে হসপিটাল চত্বরে দাঁড়িয়ে থাকা কিছু বাবা-মা’র উপর।

শ্রীদীপ্তা হালকা ঝাঁকুনি দেয় অর্পকে।

–ওরা তো দৗড়ে ঢুকে পড়েছিল গাড়ির ভেতর। তুই কোথায় ছিলিস! অর্পর মুখ নীচু।

–জুতোর ফিতেটা খুলে গেল! বাঁধছিলাম আর ঠিক…তখনই…  ঞ্জ

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব