প্রপঞ্চনা থেকে মুক্তি কবে?

দেশে বাড়ছে বেকারত্ব। একদিকে কর্মহীন হয়ে পড়া অজস্র মানুষ, অন্য দিকে চাকরি পেতে অপারগ যুবসমাজ। এই যখন পরিস্থিতি, তখন মেয়েদের অবস্থা আরও-ই করুণ। কিছুকাল আগে পর্যন্ত অনেক সংস্কারের বাঁধ ভেঙে, মা-বাবারা সম্মত হয়েছিলেন মেয়েদের উচ্চশিক্ষার জন্য অন্য শহরে পড়তে পাঠাতে। এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে মেয়েরাও কেরিযার তৈরিতে ব্রতী হয়েছিল। কোনও না কোনও ভদ্রস্থ চাকরিতে বহাল না হয়ে বিয়ে করার হঠকারী সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকছিল মেয়েরা। এতে পরবর্তী সময়ে সংসারে আয় বাড়ছিল তাদের। সামগ্রিক ভাবে সমাজের অর্থনৈতিক উন্নতি হচ্ছিল।

এখন করোনা পরবর্তী পরিস্থতিতে অর্থনীতির এই বেহাল অবস্থায়, পুরুষরাই একটা সম্মানজনক কাজ জোটাতে পারছে না, তো মেয়েরা। পরিবারের মধ্যেও এই বৈষম্য তো বরাবরই ছিল যে, মেয়েদের তুলনায় পুরুষদের কাজ পাওয়াটা বেশি আবশ্যক। ফলে এখন পরিস্থিতি যা দাঁড়াল, তাতে আবার মেয়েদের সেই আগের মতোই উচ্চশিক্ষার খোয়াব দেখা ছেড়ে, হাতা-খুন্তিকেই জীবনের অঙ্গ করতে হবে। বাবা-মা-রাও তাদের বোঝাচ্ছেন, সংসারধর্মই মেয়েদের জীবনের সার। ফলে গৃহকোণটিকেই তাদের বেছে নিতে হবে জীবনধারণের একমাত্র পথ হিসেবে।

এদিকে বিয়ের বাজারে মুনাফা হচ্ছে ঘটক আর পুরোহিতদের। জন্মকুণ্ডলী মিলিয়ে চার হাত এক করেই যাদের রোজগার। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়টি হল, এই সব মেয়েদের বর জুটছে অর্ধশিক্ষিত ও পণলোভীদের মধ্যে থেকে। মেয়েরা নিজেরা যদি শিক্ষিত না হয়, তাহলে তাদের অভিজাত পরিবারের পাত্র মেলা মুশকিল। শিক্ষিত ছেলেরা ভালো চাকরি পেলে বেছে নিচ্ছে বিদুষী সুশিক্ষিত কর্মরতাদের। শিক্ষার দিক থেকে ভারতীয়রা পিছিয়ে পড়া মেয়েদেরকে বেছে নিতে হচ্ছে অন্ধ চোরাকুঠুরির জীবন, যেখানে তাকে পূজাপাঠ আর সংসারের মঙ্গলকামনায় ব্রত উপবাস করেই কাটিয়ে দিতে হয় দিন।

আমাদের সরকারও হয়তো চান এমনই অনুন্নত সমাজ যাতে তাদের নিয়মনীতি নিয়ে প্রশ্ন করার কেউ না থাকে। ধর্মের নেশায় যদি সংসারের চালিকা শক্তিকেই অচল করে দেওয়া যায়, তাহলে তাদের রাজনৈতিক মুনাফা। যে নেতৃত্ব, বেহাল পরিস্থিতিকে অ্যাক্ট অফ গড হিসেবে বর্ণনা করেন, সেই দেশের আর্থিক মন্দা সহজে ঘোচার নয়। ভাগ্যের হাতে নিজেদের ভবিষ্যত্ সঁপে দেওয়া ছাড়া এরপর আর গতি কী।

মেয়েদের স্বাধীনতা, আর্থিক স্বাবলম্বিতা ও শিক্ষার অগ্রগতি নিয়ে যে-ক্ষীণ আশা দুদশক আগে দেখা দিয়েছিল, এখন তা সম্পূর্ণ ধূলিস্মাৎ।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ধর্মভীরু ট্রাম্প-এর সমর্থক কম নয়। ট্রাম্পও এই বিষয়টিকেই তাঁর তুরুপের তাস করেছেন। কিন্তু একটা কথা ভুললে চলবে না, ওদেশে নারী-পুরুষ সমান সুযোগ সুবিধা ভোগ করে। আমাদের দেশের মেয়েদের মতো তাদের অধিকার বুঝে নেওয়ার জন্য লড়াই করতে হয় না। অশিক্ষার হারও এমন নয় ওদেশে। ফলে ধর্মের ঠুলি পরিয়ে অধর্ম করে পার পাওয়া যায় না ওখানে।

আমরাই স্বেচ্ছায় অন্ধকারের পথ বেছে নিয়েছি। এরপর সরকার যদি মন্দির মসজিদ নিয়ে ব্যস্তও থাকে, তাদের সমালোচনা করার বা রুখে দাঁড়ানোর মেরুদণ্ড আমাদের হবে না। আগামী প্রজন্ম নিযুক্ত থাকবে, গ্রহ-নক্ষত্র পঞ্জিকা, কুষ্ঠি নিয়ে।

ডেস্টিনেশন উত্তরবঙ্গ

একঘেয়ে জীবনটা মাঝে মাঝে ছুটি চায়৷আর তখনই মনে হয়  হাতের নাগালে উত্তরবঙ্গ৷ কিন্তু যাবেন কোথায়? আমরা এনেছি  ভিন্ন স্বাদের দুটি ডেস্টিনেশন– যা আপনার ছুটির আমেজকে আনন্দে ভরিয়ে তুলবে৷

রকি আইল্যান্ড : শীতকাতুরে বাঙালি আর শীতপ্রবণ জায়গাগুলোতে যেতে ডরায় না শীতকালেও। তাই দিন চারেক হাতে থাকলেই উত্তরবঙ্গগামী ট্রেনে চড়ে বসুন। ছোট্ট ছুটি কাটান রকি আইল্যান্ড-এ।

ডুয়ার্স-এর এই অপরূপ স্পটটি আপনার জন্য প্রাকৃতিক নৈসর্গিক শোভার ক্যানভাস বিছিয়ে রেখেছে। বডো বড়ো চট্টানের উপর দিয়ে হেঁটে বেড়ানো, মূর্তি নদীর জলে পা ডুবিয়ে আনন্দ নেওয়া এ সবই এই সফরের বাড়তি পাওনা। রকি আইল্যান্ড নামটিও বস্তুত এই কারণেই। গোল, লম্বা, চ্যাপটা নানা আকৃতির ছোটো বড়ো পাথর, এখানে নদীর গতিপথ রোধ করে রেখেছে। নদীর কাছে বসে দুদণ্ড মনের কথা বলার এ এক অনবদ্য প্রকৃতিবাসর।

জলের শব্দ আর পাখির কলকাকলিতে মুখরিত চরাচর। চোখ রাখুন সবুজের গভীরে, নানা রঙের প্রজাপতি ডানা মেলেছে সেখানে। বুক ভরে অক্সিজেন নিন আর নিজেকে বলুন ভালো আছি।

দিন দুয়ে কাটানোর অবসরে, একজন লোকাল গাইড-কে সঙ্গী করে, পায়ে পায়ে হেঁটে আসুন জঙ্গলে। ডেস্টিনেশন তিন কাঠারিয়া বা নাগা ভ্যালির দিকে। আর সঙ্গে গাড়ি থাকলে, অবশ্যই ঘুরে নিন ঝালং, বিন্দু, প্যারেন ও সুন্তালেখোলা।

কীভাবে যাবেন : শিয়ালদহ থেকে কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেসে উঠে, নামুন মাল জংশনে। গাড়ি নিয়ে সোজা রকি আইল্যান্ড।

কোথায় থাকবেন : রকিতে থাকার জন্য নদীর ধারে কটেজ ও টেন্ট আছে। যোগাযোগ ৯৪৩৪১৪১৮১২। দু-একটা হোমস্টেও রয়েছে স্থানীয় গ্রামটিতে।

travel Bangarh

অনেকেই প্রকৃতির পাশাপাশি পছন্দ করে ইতিহাসের সাক্ষী হতে৷ তাদের যেতে হবে উত্তরবঙ্গের আরেকটি ডেস্টিনেশনে৷

বাণগড় : দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার গঙ্গারামপুর শহরে, পুরাতাত্ত্বিক স্থাপত্যে ঘেরা বাণগড়ে এলে এক টুকরো ইতিহাসকে চাক্ষুস করতে পারবেন। আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার তত্ত্বাবধানে, এখানে খননকার্যের ফলে, পাওয়া গেছে প্রাচীন স্থাপত্যের হদিশ ও নানা ঐতিহাসিক নিদর্শন।

পুরাতত্ত্ব বিভাগের জন্য বেশ খানিকটা এলাকা সংরক্ষিত থাকলেও, এর বাইরে তিনদিক ঘিরে ছড়িয়ে রয়েছে কয়েকটি আদিবাসী গ্রাম। এ জায়গাটি যাকে বলে ফটোগ্রাফারস্ ডিলাইট। শহরের কেন্দ্রে হলেও, বাণগড়কে ঘিরে থাকা গ্রামগুলি ঘুরলে, বেশ একটা ভিন্ন স্বাদ পাওয়া যায়।

যাদের ইতিহাসে আগ্রহ আছে, তারা এখানে দেখতে পাবেন পাল ও সেন যুগের স্থাপত্যর চিহ্ন। সঙ্গে গুপ্ত ও মৌর্য যুগের বহু নিদর্শন। পৌরাণিক গাথা জড়িয়ে রয়েছে বাণগড়ের ছত্রে ছত্রে। এখানে একটি দুর্গেরও সন্ধান মিলেছে। খননকার্যে প্রাপ্ত নিদর্শনগুলি সংরক্ষিত হয়েছে স্থানীয় সংগ্রহশালায়। গোটা একটা দিন বেড়ানোর পক্ষে বেশ ভালো জায়গা বাণগড়।

কীভাবে যাবেন : বাস বা ট্রেনে গঙ্গারামপুর পৌঁছোতে হবে। ধর্মতলা থেকে বাস পাবেন। ট্রেনে মালদা পৌঁছে গাড়িতে যেতে পারেন স্পটে।

কোথায় থাকবেন : বাণগড় বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বেশ কিছু হোটেল রয়েছে। খাবার হোটেলও প্রচুর আছে।

আত্মজ

রবিদার চায়ের দোকানে বসে সিগারেট টানছিল। ভাবনায় সলিলদা। যাওয়াটা ঠিক হবে? কিছুদিন হল খবর পাঠাচ্ছে। রাস্তায় দেখা হয়েছিল, প্রসঙ্গ তুলতে বলল, বাড়ি আয়। সব কথা রাস্তায় হয় না।

কী কথা কে জানে! হতে পারে সেদিনের জের। বউদি হয়তো কানে তুলেছে। ভয় হচ্ছে। সংকোচও।

পাগলিটার চিৎকার কানে আসে। অশ্রাব্য ভাষায় গাল দিচ্ছে। তেড়ে যাচ্ছে কারও দিকে। হুটোপাটি পালানোর শব্দ। হা হা হো হো…

বিভাসের অস্বস্তি হয়। ভাবনায় চিড় খাচ্ছে। কিছুতেই অনুমান করতে পারছে না সলিলদার বিষয়টা। ভদ্রলোকের সাথে দীর্ঘদিনের পরিচয়। তাকে স্নেহ করেন। তাঁর পরামর্শেই কন্ট্রাকটারি ব্যাবসায় নেমেছে। নিজে পিডব্লউডি-র অফিসার হওয়ায় কন্ট্রাক্ট পেতে সমস্তরকম সাহায্য করেন। বিনিময়ে এতটুকু সুবিধা নেননি কখনও। ভয় হচ্ছে, পাছে সম্পর্কে চিড় ধরে। কেন যে মরতে গৌরী বউদির সাথে সেদিন খারাপ ব্যবহার করল!

‘মর মর খান্কির বাচ্চারা…’

পাগলিটা গালাগাল দিচ্ছে। মাথার প্রতিটি কোশে আঘাত করে শব্দগুলো। রক্তক্ষরণ টের পায়। শেষ হয়ে আসা সিগারেটটা ছুড়ে ফেলে আরও একটা ধরায়। নিজেকে যথাসম্ভব শান্ত রাখার চেষ্টায় পুরোনো ভাবনায় ফিরে আসতে চায়। দিন পনেরো আগের ঘটনা, ব্যাবসায়িক প্রয়োজনে সলিলদার বাড়়ি যেতে হয়েছিল। সলিলদা তখন বাড়িতে ছিলেন না। গৌরী বউদি ভেতরে ডাকলেন।

অনিচ্ছা সত্ত্বেও সেদিন বসতে হয়েছিল বিভাসকে। ভদ্রমহিলাকে সে পছন্দ করে না। কেবল গৌরী বউদি কেন, কোনও মহিলাকেই সে সহ্য করতে পারে না। ঘৃণা করে। আর গৌরী বউদিকে তো অপছন্দ করার যথেষ্ট কারণ আছে। সেজেগুজে সারাদিন পটের বিবি, দিনভোর বিউটিপার্লার-ফেসিয়াল-ম্যানিকিয়োর কিংবা টিভি সিরিয়াল… শো-কেসের পুতুল যেন একটা। কেন জানে না, গৌরী বউদিকে দেখলে মনোকামিনীর কথা মনে পড়ে। ভদ্রমহিলাকে মা ভাবলেই গা ঘিনঘিন করে। সজ্ঞানে ‘মা’ শব্দটা কখনও উচ্চারণ করেনি সে। ভবিষ্যতেও করবে না।

মাথার ভিতর ঘুণপোকার উপস্থিতি টের পায়। বিভাস তবু সামলে নিতে পারত। সামাজিক ভদ্রতা রক্ষা করতে বহু অভ্যাসে, নিজের সঙ্গে লাগাতার যুদ্ধ চালিয়ে ইদানীং এ ক্ষমতা সে অর্জন করেছে। আচরণে কোনও প্রভাব পড়তে দেয় না। গৌরী বউদি বিয়ের প্রসঙ্গ তুলতেই সব গোলমাল হয়ে গেল। জানে এ প্রসঙ্গে সে বিরক্ত হয়। একাধিকবার বলেছে, কোনও মেয়ের সাথে এক ছাদের তলায় সারাজীবন কাটানো তার পক্ষে অসম্ভব। সেদিন এমন বাড়াবাড়ি করতে লাগল বউদি যে, নিজেকে আর ঠিক রাখতে পারেনি। বেশ দু’কথা শুনিয়ে, রাগ দেখিয়ে উঠে এসেছিল। পরে অবশ্য অনুতপ্ত হয়েছে।

গৌরী বউদি নিশ্চয় অপমানিত হয়েছিল। কথাটা হয়তো সলিলদার কানে তুলেছে। হতে পারে এই জরুরি তলব…

পাগলিটাকে ঘিরে ছেলেগুলোর অসভ্যতা বাড়ছে। বাড়ছে চিৎকার চ্যাঁচামেচি। সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে পাগলির খিস্তি-খেউড়… সেই সাথে মাথার ভেতর একটা চিনচিনে ব্যথার অনুভব। রবিদার চায়ের দোকানের সামনেই আইল্যান্ড, তিন রাস্তার সংযোগস্থল। মাঝখানে রবীন্দ্রমূর্তি। মূর্তির নীচে পাগলির বর্তমান ঠিকানা। কিছু কংক্রিটের বেঞ্চ আছে চারপাশে। সকাল-সন্ধে এখানেই আড্ডা মারে ছেলেগুলো। সকলে শিক্ষিত, ভালো পরিবারের। চাকরি জোটাতে না পেরে বাড়ি বাড়ি ছাত্র পড়ায়, বাকি সময়টা এখানেই। এদের কাছ থেকে এ ধরনের আচরণ মেনে নিতে পারে না বিভাস।

চায়ের দোকান থেকে বেরিয়ে পায়ে পায়ে পার্কের গেটের মুখে এসে দাঁড়ায়। পাগলিটার একটা হাত স্ফীত পেটের উপর, অন্যহাতে একটা লাঠি– কখনও এর দিকে তেড়ে যাচ্ছে তো কখনও অন্যজনের দিকে। তাড়া খেয়ে প্রথমজন দৌড়ে পালাচ্ছে তো দ্বিতীয়জন এগিয়ে আসছে… পাগলির গর্ভস্থ সন্তান চুরি করার ভয় দেখাচ্ছে। আর তাতেই পাগলির আক্রোশ। পরনের কাপড় অর্ধেকের বেশি মাটিতে লুটোচ্ছে, উপরিভাগ সম্পূর্ণ অনাবৃত।

পাগলির ভারী তলপেটের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত ঘষে বিভাস। অসুস্থ শরীরে এমন দৌড়-ঝাঁপ… ভদ্দর ঘরের বউ হলে বিছানায় কেতরে থাকত। একটা রাস্তার পাগলিকেও, কারা যে এসব করে! আজব দেশ মাইরি!

–কী হচ্ছে এখানে? এত চিৎকার কীসের?

বিভাস প্রায় গর্জন করে ওঠে। মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে যায় চারপাশ। ছেলেগুলোর সাথে সাথে পাগলিটাও থতমত খেয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। সকলের চোখে ভয়।  এলাকায় একটা ‘দাদা’ ইমেজ আছে বিভাসের।

বিভাস তখনও পাগলিটার দিকে তাকিয়ে। এই প্রথম এত কাছ থেকে, সময় নিয়ে পাগলিটাকে দেখছে। এখানে নতুন এসেছে, শরীরে বয়ে এনেছে বীজ। বয়স তিরিশ-পঁয়ত্রিশের মধ্যে। গায়ের রং একসময় ফর্সা ছিল। এখন রোদেপোড়া তামাটে। ছাই-ভস্ম মাখা চুলে জট পাকাতে শুরু করেছে। মাঝে মাঝে আঙুল ডুবিয়ে চুলকোচ্ছে। এসবের মধ্যেও বেশ একটা ঢলঢলে ভাব আছে চেহারায়। সবচেয়ে মারাত্মক পাগলির চোখদুটো। কী এক মায়ায় যেন তার দিকে অদ্ভূত ভাবে তাকিয়ে আছে। হয়তো ভরসা খুঁজছে।

চোখের এই আকুতি আগে কখনও দেখেনি বিভাস। নিজেকে সে নিষ্ঠুর, পাষাণ হূদয় হিসাবে ভাবতেই  অভ্যস্ত। তবু বুকের মধ্যে কেমন একটা অনুভূতি, শিরশির করে শরীর। পাগলিটার দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারে না। অস্বস্তি হয়। চোখ ফিরিয়ে ছেলেগুলোর দিকে তাকায়। ভয়ে চুপসে যাওয়া মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে, নিজেকে যথাসম্ভব সামলে নিয়ে বলে, তোরা সব শিক্ষিত না?

– সরি বিভাসদা, ভুল হয়ে গেছে…

বিভাস কথা বাড়াল না। শব্দ করে থুতু ফেলল একদলা। পাগলিটার দিকে তাকাল। তখনও তার দিকে তাকিয়ে। চোখে করুণ আর্তি। বিভাস চোখ সরিয়ে নিল। সকলকে চমকে দিয়ে যেভাবে আচমকা ঢুকেছিল সেভাবেই আবার বেরিয়ে এল। রবিদার চায়ের দোকানে এসে ঢুকল।

–এরা কি ভদ্দরলোকের ছেলে!

দোকানে খদ্দের ছিল না, সমস্ত ঘটনা লক্ষ্য করেছে রবিদা। ভিতরে ক্ষোভ জমে ছিল, এতক্ষণে মুখ খুলল, কী বলব বলো! ব্যাবসা করে খাই, কিছু বলতেও পারিনে–

–একটা চা দিও।

মুড অফ হয়ে আছে। কথা বলতে ভালো লাগছে না। রবিদার কথায় সরাসরি উত্তর দিল না।

–কি অমানবিক ব্যাপার বলো তো! চা দিতে দিতে রবিদা আবার আক্ষেপ করল।

যে-কোনও কারণেই হোক, বিভাস জানে, পাগলিটার উপর একটু সহানুভূতি আছে রবিদার। যখনই দোকানে এসে হাত পাতে, কেকটা রুটিটা… যা হোক কিছু একটা দেবে। ফেরায় না কখনও। বাড়ি থেকে বউদির বাদ দেওয়া একটা কাপড়ও এনে দিয়েছে।

চা খেতে খেতে মানুষটাকে খেয়াল করছিল বিভাস। তার দিক থেকে কোনও সাড়া না পেয়ে মুখ গোমড়া করে আছে। পরিবেশটা আরও গুমোট হয়ে ওঠে। বিভাসের ভালো লাগে না। উঠে পড়ে সে। সলিলদার বাড়ি থেকে বরং ঘুরে আসবে।

কাঁধ অবধি ঝাঁকড়া চুলে ঢেউ তুলে অভ্যর্থনা জানালেন গৌরী বউদি। বাব্বা, এতদিনে মনে পড়ল! আমি ভাবলাম রাগ করেছ, আর বুঝি আসবেই না। এসো ভেতরে এসো–

বিভাস অবাক হল। এমন প্রত্যাশা ছিল না। বরং উলটোটা আশঙ্কা করেছিল। ভয়ে ভয়ে ছিল। ফুরফুরে মেজাজে দেখে ভারটা নেমে গেল।

বিভাসকে বসার ঘরে বসিয়ে ভিতরে চলে গেলেন তিনি। যাওয়ার আগে বলে গেলেন, একটু বোসো। দাদা আসছে। বাথরুমে ঢুকেছে।

মিনিট দশেক পরে সলিলদা এলেন। স্নান সেরে ধোপদুরস্ত হয়ে এসেছেন। পেছনে গৌরী বউদি, তবে ভেতরে ঢুকলেন না। দরজায় দাঁড়িয়ে রইলেন পর্দা ধরে!

–সারাদিন কী এমন রাজকার্য থাকে, খবর দিয়েও পাওয়া যায় না!

–কিছুদিন আগেই তো এলাম। তাছাড়া আপনার সঙ্গে দেখা হচ্ছে–

– সব কথা সব জায়গায় হয় না। কই গো, এবার বলো কী বলবে বলছিলে।

শেষ কথাগুলো বউদিকে উদ্দেশ্য করে। বউদি মুখ নামিয়ে নিলেন। মেঝেতে ডান পায়ের বুড়ো আঙুলের আঁচড় কাটতে কাটতে সংকোচ জড়ানো গলায় বললেন, তুমি বলো। চায়ের জল চাপিয়ে এসেছি–

কথা শেষ করে ধীর পায়ে পর্দার আড়ালে চলে গেলেন তিনি।

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মুখ তুললেন সলিলদা। সরাসরি বিভাসের দিকে তাকিয়ে বললেন, কাজের কথায় আসি। মন দিয়ে শুনবে, বিষয়টা অনুভব করার চেষ্টা করবে।

বিভাস কিছু অনুমান করতে পারে না। বুঝতে পারে না সলিলদার মতো মানুষের কী এমন দরকার থাকতে পারে তার কাছে, যে জন্যে এত হেঁয়ালি। চুপ করে থাকাটাই শ্রেয় মনে হয়।

–কিছুদিন হল তোমার বউদি খুব করে ধরেছে। চেষ্টা করলে তুমিই নাকি ওর সমস্যার সমাধান করতে পারো। আমিও ভেবে দেখলাম, খুব একটা ভুল বলেনি।

–সমস্যাটা কী? বিভাস কৌতূহল চাপতে পারে না।

–বলছি। তার আগে কথা দিতে হবে, সমস্ত রকম হেলপ পাব তোমার কাছে।

–সম্ভব হলে নিশ্চয় পাবেন।

সলিলদা গম্ভীর, তুমি তো জানো, প্রায় বারো বছর হল আমাদের বিয়ে হয়েছে। সন্তানাদি কিছু হল না। হওয়ার সম্ভাবনাও নেই। গৌরীকে দু-দুবার অপারেশন করিয়েছি। নিট লাভ জিরো। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, এবার অ্যাডপ্ট করব। সেই দু’বছর হতে চলল। বিভিন্ন জায়গায় নাম লিখিয়ে রেখেছি, এখনও কোনও জায়গা থেকে গ্রিন সিগনাল আসেনি। সব জায়গায় লম্বা লাইন। যতদিন যাচ্ছে ভরসা হারিয়ে ফেলছি।

বিভাস বোঝে না এসব অতি ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ তার সাথে কেন! জিজ্ঞাসাও করতে পারে না। অস্বস্তি হয় তার।

–কিছুদিন আগে একটা পাগলির কথা বলেছিলে না? অচমকা প্রসঙ্গ বদলে ফেলেন, তোমাদের ওই রবীন্দ্রপার্কে থাকে…

–হ্যাঁ, কিন্তু…

–শুনেছি সে প্রেগন্যান্ট। তো, এর মধ্যে একদিন গিয়েছিলাম। দেখলাম তাকে। সাত-আট মাস তো হবেই, বেশিও হতে পারে। দেখে কষ্ট লাগে।

বিভাস ধন্দে পড়ে। এর মধ্যে আবার পাগলি এল কোত্থেকে! বিষয়টা কেমন জট পাকিয়ে যাচ্ছে। গালে রেখে কথা বলছে সলিলদা। অস্বস্তি হচ্ছে।

–তোমাকে একটা কাজ করতে হবে, সলিলদা আবার মুখ খোলেন, কিছুদিন একটু চোখে চোখে রাখতে হবে পাগলিটাকে। তুমি তো বেশিরভাগ সময় ও দিকেই থাকো, প্রয়োজনে একজন লোক রাখবে দেখাশোনা করার জন্য।

–আপনার কথা কিছু বুঝতে পারছি না।

–বলছি, সব খুলে বলছি। প্ল্যানটা আমার নয়, তোমার বউদির। তবে আমার সম্মতি আছে। আমরা ঠিক করেছি, পাগলির বাচ্চাটাকে আমরা অ্যাডপ্ট করব।

–এটা কী করে সম্ভব?

–তুমি হেলপ করলেই সম্ভব।

– তা বলে একটা রাস্তার পাগলির বাচ্চা!

–সন্তান সন্তানই। সে যার হোক, যেখানকার হোক।

–তা নয়, আমি ভাবছি…, ইতস্তত করেও শেষ পর্যন্ত কথাটা বলে ফেলল, আমাদের দেশে একটা রাস্তার পাগলিও প্রেগন্যান্ট হয়, এর থেকে লজ্জার আর কী হতে পারে! আর এ জন্যে যে বা যারা দায়ী, শিশুটার শরীরে সেইসব পশুর রক্ত রয়েছে।

–রক্তের পরিচয় কী সব! শিক্ষা, পরিবেশ… এসবের কোনও মূল্য নেই। তাছাড়া কোনও হোম থেকে বাচ্চা অ্যাডপ্ট করলেও তার জন্ম পরিচয় আমরা জানতে পারব না। সেখানেও তো এ ধরনের পথ শিশুদেরই ঠাঁই হয়…

–আমি রক্তের পরিচয় নয়, রক্তের সম্পর্কের কথা বলছি। জিনকে তো অস্বীকার করা যায় না।

–আমরা আমাদের ভালোবাসা দিয়ে আমাদের মনের মতো করে মানুষ করে নেব। বিভাস বোঝে, সলিলদা এ বিষয়ে আর কোনও তর্ক চাইছে না। একরকম সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছে। মাথাটা আবার টিপটিপ করতে শুরু করে তার।

–তুমি শুধু পাগলিটাকে চোখে চোখে রাখবে। দেখবে কোনও অসুবিধা না হয়। আর নিয়মিত খবরগুলো দিতে থাকবে। পারবে না?

–চেষ্টা করব। অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাজি হল সে।

–চেষ্টা নয়, পারতেই হবে–

গৌরী বউদির গলা। দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে আবার। চোখ দুটো চিকচিক করছে। বিভাস অবাক হয়, ঠিক দেখছে তো! গৌরী বউদির চোখে জল! ভদ্রমহিলা তাহলে কাঁদতে জানে! তাও সন্তানের জন্য!

বিভাস উঠে দাঁড়ায়। দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে। বেরোতে হবে।

–বিষয়টা তাহলে তোমার উপরেই ছেড়ে দিলাম।

–আপনিও আর একবার ভাবুন।

কথা শেষ করে বেরিয়ে আসে বিভাস।

মাঝে মাঝে রবিদার দোকানে আসছে সলিলদা। দীর্ঘক্ষণ কাটাচ্ছে। ইতিমধ্যে রবিদার সাথে বেশ ভাব জমিয়ে ফেলেছে। রবিদাকেও জানিয়েছে বিষয়টা। রবিদা খুশি এমন একটা সিদ্ধান্তে। অকুণ্ঠ সাধুবাদ সহ সমস্তরকম সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছে।

দোকানে খদ্দের না থাকলে পাগলিটাকে দেখতে যায় রবিদা। পাগলির সুবিধা-অসুবিধার দিকে সজাগ দৃষ্টি রাখে। সময় পেলে বিভাসও যায়। সলিলদার সিদ্ধান্ত হঠকারী মনে হলেও, তাকেও যেন কী এক নেশায় পেয়েছে। মাঝে মাঝে পার্কের ভিতরে ঢুকে যায়। খুঁটিয়ে লক্ষ্য করে পাগলিটাকে। ছেলেগুলোর সাথেও ভাব হয়েছে। সেদিনের সেই ঘটনার পর আর তারা পাগলিটাকে উত্যক্ত করেনি। বরং পাগলির সুবিধা-অসুবিধার দিকে নজর রাখছে। তবুও একটা অঘটন ঘটে গেল।

পার্কের বাইরে রিকশা স্ট্যান্ড। চালকরা মাঝে মাঝে ভিতরে গিয়ে বসে কাজের চাপ না থাকলে। তাস খেলে, গল্প গুজব করে। সেদিন কেউ একজন পাগলিকে রাগানোর জন্যে বলেছিল, তোর বাচ্চাকে নিয়ে নেব। পাগলি ইট ছুড়ে তার মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে।

ঘটনাটা জানানোর জন্যে তখনই সলিলদার বাড়ি গিয়েছিল বিভাস। সবটা শুনে গম্ভীর হয়ে গেল সলিলদা। বউদির মুখেও দুশ্চিন্তার ছায়া।

–কাজটা কি সহজ হবে?

–দেখা যাক। সলিলদার সংক্ষিপ্ত উত্তর।

আরও একটা সংশয় কিছুদিন হল বিভাসের মনে উঁকি মারছে। পাগলিটাকে নিয়ে হয়তো একটু বেশিই ভাবছে, যা আগে কখনও কারও ক্ষেত্রে হয়নি। কাজটা কি ঠিক হচ্ছে? এতদিন সলিলদাকে বলতে সাহস হয়নি। আজ হঠাৎ আবেগের বশে বলে ফেলল, আমরা বোধহয় অন্যায় করছি।

–কীসের? সলিলদার চোখে সংশয়।

–এভাবে কারও বাচ্চা…

কথা শেষ করতে পারে না, সলিলদার চোখে চোখ পড়তেই থেমে যায়। সলিলদা কিছুক্ষণ চুপ থেকে মুখ খোলে, একটা বাচ্চা, আনওয়ানটেড বেবি, এভাবে ফুটপাথে বেড়ে উঠবে! যার ভবিষ্যৎ বলে কিছু নেই। সেটা অন্যায় নয়? তাকে ভদ্রসমাজে মানুষের মতো বাঁচার অধিকার দেওয়াটা অন্যায়?

গৌরী বউদি পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এবার তিনিও মুখ খুললেন, নিজেকে দিয়ে ভাবো না, তোমার মাসি যদি দায়িত্ব না নিতেন, তোমার ভবিষ্যৎ কী হতো কল্পনা করেছ কখনও? তিনি কি অন্যায় করেছেন?

–এখানে ব্যাপারটা অন্যরকম।

–কিচ্ছু অন্যরকম না। দুটি ক্ষেত্রেই নির্ভর করছে একটা শিশুর ভবিষ্যৎ। বিনিময়ে সন্তানহীনা সন্তান পাচ্ছে। তিনি তো তোমাকে তোমার মায়ের অভাব কোনওদিন বুঝতে দেননি। তার আত্মত্যাগ, ভালোবাসা… এসব অস্বীকার করতে পারবে?

স্বীকারও করেনি কোনওদিন। আসলে ভাবেইনি মনোময়ীকে নিয়ে। হতে পারে সে মনোকামিনীর বোন, গৌরী বউদির কথায় নাড়া খেল একটু। প্রসঙ্গটা মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকল। মনোময়ী সত্যিই বিস্ময়কর।

বিভাসের বয়স তখন দু’বছর। মা মনোকামিনী বিনোদ বিশ্বাসের এক বন্ধুর সঙ্গে পালাল। আর ফেরেনি। নিঃসন্তান মনোময়ী ততদিনে বিধবা হয়েছেন। শ্বশুরবাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়ে বাপের সংসারে। অন্যদিকে দু’বছরের শিশু সন্তান নিয়ে বিনোদ বিশ্বাসের মানসিক অবস্থাও তখন শোচনীয়। এমন সময় মনোময়ী এসে সংসারের হাল ধরেছিলেন। কোলে তুলে নিয়েছিলেন বিভাসকে। সেই থেকে এ বাড়িতে। এমন নয় যে অস্তিত্বের সংকটে তিনি একাজ করেছেন। মনোময়ীর বাবা অর্থাৎ বিভাসের দাদামশায়ের আর্থিক অবস্থাও ভালো। ইচ্ছা করলেই জীবনটা অন্যরকম হতে পারত। তবু কোন স্বার্থে তিনি এখানে রয়ে গেলেন? বিভাসকে মায়ের অভাব কোনওদিন বুঝতে দেননি। বিভাসের জন্যে তার উৎকণ্ঠা বা দুশ্চিন্তাও অস্বীকার করার মতো নয়। কীসের টানে এই ত্যাগ স্বীকার? প্রশ্নগুলো মাথার ভেতরে পাক খায়। চিনচিন ব্যথাটা টের পায় আবার।

–তোমার মাসির কথা না হয় বাদ দিচ্ছি। এবার সলিলদা। দু’জনে যেন পরিকল্পনা করে তাকে আজ ধরেছে। বললেন, কিন্তু ওই পাগলি? পাগলিটার ক্ষেত্রে কী বলবে? যে-সন্তান এখনও পৃথিবীর আলোই দেখল না, তার জন্যে এখনই একজনের মাথা ফাটিয়ে ফেলল?

বিভাস চুপ করে রইল। কথাগুলো একেবারে উড়িয়ে দিতে পারছে না। ভাবাচ্ছে। ভাবাচ্ছে বলেই সলিলদার কাছে ছুটে এসেছে সংবাদটা জানানোর জন্যে। পাগলিটাও ভাবাচ্ছে। কী এক আকর্ষণে সময় পেলেই ছুটে যাচ্ছে পাগলিটাকে দেখতে। কীসের টানে? এই মুহূর্তে মনে হল, হঠাৎই মাথায় এল ভাবনাটা, পাগলির গর্ভস্থ সন্তানের সঙ্গে কোথায় যেন তারও একটা যোগসূত্র আছে। নইলে এমন টান অনুভব করবে কেন? কিন্তু সূত্রটা ধরতে পারছে না…

পাগলির জন্যে আরও অনেক ব্যবস্থা নিয়েছেন সলিলদা। পাশের হোটেলে বলে রেখেছেন, কাজের ছেলেটা দু’বেলা শালপাতার থালায় ভাত দিয়ে যায়। এক ডাক্তার বন্ধুকে এনে দেখিয়েছে দুদিন মাঝরাতে। একদিন জোর করে দুটো ইনজেকশন দিয়েছেন তিনি। ডেলিভারির জন্যে নার্সিংহোমও ঠিক করে রেখেছেন, পেইন উঠলেই…

দিন যত এগোচ্ছে, পাগলিটার উপর তাদের সতর্ক দৃষ্টি তত তীক্ষ্ণ হচ্ছে। বিভাস যদিও মানসিক ভাবে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।

আরও একটা ঘটনা সেদিন খুব স্ট্রাইক করল। পার্কের এক কোণে বসে আনমনে সিগারেট টানছিল। হঠাৎ পাগলিটার গলা কানে আসতে দেখল পাগলিটা তার স্ফীত তলপেটে হাত বোলাচ্ছে আর নাকি সুরে গাইছে–

খোকা ঘুমোল পাড়া জুড়োল

বর্গি এল দেশে

বুলবুলিতে ধান খেয়েছে…

হঠাৎ বর্গির প্রসঙ্গ কেন? কথাগুলো কি তাকে উদ্দেশ্য করে। তাদের অভিসন্ধি কিছু অনুমান করেছে? যেজন্যে এখন থেকেই গর্ভস্থ সন্তানকে সাবধান করছে। নিজেকে বর্গি বলে মনে হল বিভাসের। –অন্যায়! মনে মনে আবার বিড়বিড় করল, সলিলদা অন্যায় করছে। খবরটা তাকে জানানো দরকার।

বিভাস তখনই বাইক নিয়ে ছুটল।

আর মাত্র কয়েকটা দিন। খাওয়া-ঘুম ছুটেছে সলিলদার।

খাওয়া-ঘুম ছুটেছে বিভাসের। রবিদা এখন রাতে দোকানেই থাকছে। রাতবেরাতে কিছু একটা ঘটলে সঙ্গে সঙ্গে মোবাইলে জানাবে। রবিদার মোবাইল ছিল না, সলিলদা ব্যবস্থা করে দিয়েছে। খবর পাওয়া মাত্র ছুটে আসবে। ড্রাইভারকেও সেইভাবে বলে রেখেছে।

সেদিন সন্ধ্যা থেকে আকাশের মুখ ভার। মাঝে মাঝে টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। মাঝে মাঝে প্রবল। রাত দশটা পর্যন্ত রবিদার দোকানে কাটিয়ে গেল সলিলদা। লক্ষণ সুবিধার নয়। যাওয়ার আগে বারবার রবিদাকে সাবধান করে গেল। বিভাসকেও বলে গেল মোবাইল খোলা রাখতে।

বাড়ি ফিরে নিশ্চিন্ত হতে পারছিল না বিভাস। রবিদাকে পুরোপুরি ভরসা করা যায় না। সন্ধ্যার পর নেশায় বুঁদ হয়ে থাকে। বৃষ্টির কারণে আজ আবার বেশি টেনেছে।

এগারোটার পর মুষলধারে নামল। প্রবল বৃষ্টির শব্দে কানে তালা লাগার জোগাড়। অস্থির পায়চারি করছিল ঘরের মধ্যে। দুর্যোগের মধ্যেই যদি কিছু একটা ঘটে যায়।

আধ ঘণ্টা হতে চলল, বৃষ্টি থামার লক্ষণ নেই। বরং বাড়ছে। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে মাঝে মাঝে। উলটোপালটা হাওয়া। আকাশ যেন ভেঙে পড়েছে। ইতিমধ্যে জল জমেছে বাড়ির সামনে। ব্যাং ডাকছে। সবমিলে অদ্ভুত একটা শব্দ। বিভাসের মনে হল, দূরে কোথাও অসংখ্য মানুষ চিৎকার করছে। কে জানে এদের মধ্যে পাগলিটাও আছে কিনা!

বিভাস আর থাকতে পারে না। দরজা খুলে বাইরে আসে। সোজা রাস্তায়। দ্রুত পা চালায় পার্কের দিকে। হাতে টর্চ। ভয় রবিদাকে নিয়ে, যদি ঘুমিয়ে পড়ে! রবিদা কী শুনতে পাবে পাগলির চিৎকার? সম্ভাব্য বিপদের আশঙ্কায় সে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। হাঁটার বেগ বাড়িয়ে দেয় যথাসম্ভব। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাকে পৌঁছোতে হবে।

বাড়ি থেকে পার্কের দূরত্ব মাইলখানেক। হাঁটা পথে মিনিট পনেরো-কুড়ি। অথচ পথ যেন শেষ হচ্ছে না। অন্তহীন পথ হেঁটে চলেছে সে। কতদিন, কত মাস, বছর, যুগ ধরে… কিংবা তারও বেশি সময়… তবু গন্তব্যে পৌঁছোতে পারছে না।

বিভাস দৌড়োতে শুরু করে।

বৃষ্টিতে ঝাপসা সবকিছু। সঙ্গে ঝোড়ো হাওয়া। বিদ্যুতের আস্ফালন। টর্চের আলো বৃষ্টি ভেদ করে বেশিদূর পৌঁছোয় না। মাঝে মাঝে হোঁচট খায় রাস্তার জল জমা খানাখন্দে। তবু ভ্রুক্ষেপ নেই। পাগলের মতো সে ছুটছে। ছুটতে ছুটতে যখন পার্কের কাছাকাছি, দূর থেকে বাচ্চার কান্নার শব্দ কানে আসে। তবে কী…

সন্দেহ সত্যি। রবিদা অঘোরে ঘুমোচ্ছে। সলিলদা নেই। এদিকে রবীন্দ্রনাথের পায়ের গোড়ায় সদ্যজাতের কান্না। ভিতরে ঢুকে টর্চের আলো ফেলতেই চমকে গেল। রক্তে ভাসছে চারপাশ। একপাশে বেহুঁশ হয়ে পড়ে আছে পাগলিটা, অন্যপাশে রক্তজলে মাখামাখি একতাল মাংস পিণ্ড। গলায় তীব্র চিৎকার। একটু দূরেই ওত পেতে বসে আছে দুটো রাস্তার কুকুর। চোখের তারায় লোভের ঝিলিক।

যে-কোনও মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে পড়বে। এমন বীভৎস দৃশ্যের মুখোমুখি আগে কখনও হয়নি। শিউরে উঠল সে। অস্ফূটে কাতরে উঠল, মাগো–

বহু বছর বাদে সে ‘মা’ শব্দটা উচ্চারণ করল। নিজের অজ্ঞাতেই। তারপর টর্চ হাতে তেড়ে গেল কুকুর দুটোর দিকে। যে-কোনও মূল্যেই হোক এদের সে রক্ষা করবে। নইলে সে নিজের কাছেই মিথ্যে হয়ে যাবে। মিথ্যে হয়ে যাবে তার অস্তিত্ব।

 

ইন্টিরিয়র ও হেল্থ কানেকশন

কর্মব্যস্ত দিনের শেষে বাড়ি ফিরে সবাই চান একটু আরামে থাকতে। কিন্তু যদি অগোছালো ঘর, ফিকে হয়ে আসা রঙের দেয়াল কিংবা ম্লান আলো চোখে পড়ে ঘরে ঢুকলেই, তাহলে অবসাদ গ্রাস করার সম্ভাবনা প্রবল হয়। আসলে এ ক্ষেত্রে গৃহসজ্জার ত্রুটির কারণে যোগ হয়ে যায় স্বাস্থ্যহানির বিষয়টিও।

নিউরো স্পেশালিস্ট-এর মতে, ঘরের অভ্যন্তরীণ সজ্জা সৌন্দর্যহীন হলে এবং হাইজিনিক না হলে, এর কুপ্রভাব পড়তে পারে ওই ঘরে বসবাসকারী সদস্যদের উপর। আর আপনার গৃহসজ্জার ত্রুটি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে আপনি অবসাদগ্রস্ত হয়ে স্বাস্থ্যহানির শিকার হতে পারেন।

রঙের বৈশিষ্ট্য

ঘরের অভ্যন্তরীণ দেয়ালের রং খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর্কিটেক্ট নীতা সিন্হা দাস প্রসঙ্গত জানিয়েছেন, মানুষের  বাহ্যিক সাজপোশাক যেমন তার ব্যক্তিত্বের পরিচয় বহন করে, তেমনই, ঘরের অভ্যন্তরীণ দেয়ালের রং গৃহস্থের রুচির পরিচয় বহন করে এবং স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলে।

আসলে রঙের একটা আলাদা মাহাত্ম্য আছে। দেয়ালের রং বাসিন্দার মনের রঙের প্রতিফলন ঘটায়। ইন্টিরিয়র ডিজাইনার নাতাশার মতে, ‘দেয়ালে লাগানো ভালো রং যেমন মন ভালো করে, ঠিক তেমনই খারাপ রং অবসাদগ্রস্ত করে তোলে। তাই ঘরের দেয়ালের রং নির্বাচনের ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি।’

কোন রঙের কেমন প্রভাব পড়ে মানুষের দেহে মনে, এই প্রশ্নের উত্তরে ইন্টিরিয়র ডিজাইনার নাতাশা জানান, গাঢ় লাল, নীল, হলুদ, সবুজ রং খুব উজ্জ্বল কিন্তু বেডরুম-এ এই রং ব্যবহার করা উচিত নয়। কারণ, গাঢ় লাল রং রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয় আর গাঢ় নীল, হলুদ, সবুজ চিত্ত চঞ্চল করে তোলে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে শিশুদের উপর। অবশ্য এত-সত্ত্বেও অনেকে বেডরুম-এ গাঢ় লাল, নীল, সবুজ প্রভৃতি রং ব্যবহার করেন এবং এর কুপ্রভাবের শিকার হন। কিন্তু যদি সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার কথা ভাবা হয়, তাহলে বেডরুম-এ হালকা রং ব্যবহার করা উচিত। এ ক্ষেত্রে হালকা গোলাপি, হালকা হলুদ কিংবা হালকা নীল রং ব্যবহার করা উচিত বেডরুম-এর দেয়ালে। তবে দেয়ালে সাদা রং ব্যবহার না করলেও সিলিং-এ সবসময় সাদা রং ব্যবহার করবেন। কারণ, সিলিং-এর সাদা রং ঘরে পর্যাপ্ত আলো ছড়াতে সাহায্য করবে।

আলোর সঠিক প্রয়োগ

রঙের পর ঘরের অভ্যন্তরীণ সজ্জায় যা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তা হল আলো। বিশেষ করে বাড়ির যে-সব ঘরে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলোর অভাব রয়েছে, সেইসব ঘরে বেশি সংখ্যক সাদা আলোর প্রয়োগ করা উচিত। এরজন্য নামি ব্রান্ড-এর সরু টিউবলাইট-ই উপযুক্ত। মুখোমুখি দুটি দেয়ালে উপযুক্ত জায়গায় দুটি টিউবলাইট ব্যবহার করা উচিত। এতে ঘরে পর্যা৫ আলো হবে এবং প্রাকৃতিক আলোর অভাবও অনুভূত হবে না।

ঘরে সর্বদা স্মার্ট লাইট ব্যবহার করুন। এলইডি লাইট ব্যবহার করলে, মোটা কাচের শেড ব্যবহার করবেন না। কারণ, ভারী বস্তুর চাপ দেয়াল বেশিদিন ধরে রাখতে পারে না এবং এতে বেশি তেলময়লা আটকে যায়।

কম পাওয়ার-এর অন্তত একটা করে সবুজ আলো লাগিয়ে রাখুন ঘরে। বিশ্রামের সময় সবুজ আলো চোখকে আরাম দেয় এবং এক মায়াবি আবহ তৈরি করে। যদি সম্ভব হয় তাহলে আলোর উপকরণ (বাল্ব কিংবা টিউবলাইট) এমন ভাবে লাগিয়ে রাখুন, যা বাইরে থেকে সহজে দেখা যাবে না কিন্তু সঠিক মাত্রায় আলো ছড়াবে। এতে ঘর আরও স্মার্ট-লুক দেবে।

ফার্নিচার-এর সঠিক ব্যবহার

কী রঙের, কত সংখ্যক ফার্নিচার, কোন ঘরে কীভাবে ব্যবহার করা উচিত, তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ঘরে চলাফেরার এবং আলো-হাওয়া ঢোকার উপযুক্ত জায়গা রেখে তবেই ফার্নিচার ব্যবহার করা উচিত। কারণ, ফার্নিচার যদি ঘরের মাপের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সঠিক ভাবে ব্যবহার না করা হয়, তাহলে যেমন ঘরের অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য নষ্ট হবে, তেমনই চলতে-ফিরতে অসুবিধে হবে এবং ঘিঞ্জি পরিবেশ দেহ-মনে কুপ্রভাব ফেলবে।

বেডরুম-এ ডিজাইনার খাট এবং আলমারি ছাড়া আর কিছুই রাখা উচিত নয়। ড্রইং-রুম-এ রাখুন সিঙ্গল চারটি সোফা-চেয়ার কিংবা একটি সোফা কাম বেড। সঙ্গে একটা কাচের সেন্টার-টেবিল রাখতে পারেন। দেয়ালের একদিকে রাখতে পারেন শো-কেস। ডাইনিং রুম বা স্পেস-এ রাখুন গোল কিংবা আয়তকার ডাইনিং টেবিল এবং চারটি হাতলবিহীন চেয়ার। গেস্টরুম কিংবা এক্সট্রা রুম-এ রাখুন একটি খাট কিংবা ডিভান এবং শো-কেস-এ রাখুন বই, সিডি এবং  ডিভিডি।

ঘরের অন্যান্য সামগ্রী

বই, খাতা, বাচ্চার স্কুলের ব্যাগ কিংবা আপনার অফিস ব্যাগ রাখুন কাঠের আলমারিতে। কোনও জিনিস ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখবেন না। প্রসাধন সামগ্রী রাখুন বক্স-যুক্ত ড্রেসিং-টেবিল-এ। দেয়ালে লাগাতে পারেন এলইডি টিভি, ছোটো স্পিকার ইত্যাদি।

ঘরের দেয়ালের রঙের সঙ্গে মানানসই পর্দা ব্যবহার করুন দরজা জানলায়। এক্ষেত্রে ওয়াশেবল (ড্রাই) পর্দা ব্যবহার করা ভালো। সম্ভব হলে ঘরের সিলিং ফ্যান কিনুন ভালো ব্রান্ড-এর এবং পাখার রং অবশ্যই দেয়ালের রঙের কথা মাথায় রেখে কিনুন। ড্রইং রুম-এ কার্পেট ব্যবহার করলে তা স্টিল গ্রে রঙের হলেই বেশি ভালো লাগবে। এ ভাবেই যদি সৌন্দর্য এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে ইন্টিরিয়র ডেকোরেশন করেন, তাহলে এর সুফল পাবেন অবশ্যই।

অন্য নদীর গল্প

অফিস থেকে বাড়ি ফিরে আসবার সঙ্গে সঙ্গে মা বলল, ‘শৌভিকের একটা চিঠি এসেছে, রেজিস্ট্রি পোস্টে। পিওনটা মহা পাজি, আমাকে কিছুতেই দিতে চাইছিল না। অনেক করে বলবার পর দিল।’ রেজিস্ট্রি পোস্টের ব্যাপারটা শুনেই আমার একটু খটকা লাগল। এই তো দিন সাতেক আগে ওর সাথে ফোনে কথা হল। শুধু বলল, ‘বাড়িতে একটা ছোটো অনুষ্ঠান হবে, ইনভাইট করব।’ কিন্তু সেদিনও তো চিঠির ব্যাপারে কিছু বলেনি।

শৌভিক আমার কলেজের বন্ধু। আমরা দুজন কলেজ থেকে ইউনিভার্সিটি পর্যন্ত একসঙ্গে থেকেছি, খেয়েছি, পড়েছি। আমাদের দুজনের বাড়িও কাছাকাছি ছিল। আমি থাকতাম তেঘড়িয়া, আর ওরা কেষ্টপুরে। এখন অবশ্য ওরা এক নম্বর গেটের কাছে নতুন বাড়ি কিনেছে, আর আমাকে আসতে হয়েছে বীরভূম জেলার এক গ্রামে। শৌভিক চাকরির চেষ্টা করেনি। ইউনিভার্সিটি থেকে বেরিয়ে পারিবারিক ব্যাবসার খুঁটি ধরে বেশ জাঁকিয়ে বসেছে। ওর দাদার আবার পারিবারিক ব্যাবসা ছাড়াও আরও কী সব ব্যাবসা রয়েছে। তাদের বউরাও পারিবারিক ব্যাবসাতে সাহায্য করে। ওর দাদার এক মেয়ে, পড়াশোনার সূত্রে বাইরে থাকে। শৌভিকের এখনও পর্যন্ত সন্তান হয়নি। বাড়িতে একা থাকে শৌভিকের মা। কাকু বছর তিন আগে মারা যান।

কলেজ বা ইউনির্ভাসিটিতে পড়বার সময় প্রায় দিনই সময়ে অসময়ে ওর বাড়ি চলে যেতাম, কতদিন ওদের বাড়িতে থেকেছি, খেয়েছি তার হিসেব নেই। এখন অবশ্য আর সেরকম ভাবে ওদের বাড়িতে থাকা হয় না, সেরকম ভাবে কেন বলব, একরকম হয়ই না। ইউনিভার্সিটির পাঠ শেষ হওয়ার পরের কয়েক বছর বেকারত্বের জ্বালা রগড়াতে রগড়াতে সরকারি চাকরি পেলাম। তবে খুব ভালো চাকরি নয়, পঞ্চায়েত অফিসের সহায়কের চাকরি। প্রথম সপ্তাহে বাড়ি থেকে যাতায়াত করলাম। কিন্তু সপ্তাহের শেষে মনে হল, এই তেঘড়িয়া থেকে বাসে বাদুড় ঝুলে হাওড়া স্টেশন, সেখান থেকে ট্রেনে বোলপুর স্টেশন, তারপর বাস থেকে নেমে সাইকেল, এত সবের পর অফিস করে বাড়ি ফিরতাম প্রায় জাম্বি হয়ে। কোনওদিন আটটা বাজত, কোনওদিন নটা। তারপর কারওর ভালো কথাও খারাপ লাগত।

আমার বাবার কোনও ব্যাবসা ছিল না। বাবাও আমার মতো সরকারি কর্মচারি ছিল, তবে কেন্দ্রীয়। চাকরি জীবনে সংসার খরচ, আমাদের দুই ভাইয়ের পড়াশোনার খরচ বাদ দিয়ে যে-ক’টা টাকা বাবা জমাতে পেরেছিল, তা দিয়ে একতলার এই বাড়িটা ছাড়া আর কিছু হয়নি। তাও আবার চাকরি শেষ হবার ছয়মাস আগে কাউকে কিছু না বলে, বাবা চলে গেল। আমি, দাদা পিতৃহারা হলাম। দাদার পড়াটা সেই সময় শেষ হয়ে গেছিল। কিন্তু দাদা স্থানীয় একটি রাজনৈতিক সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছিল। কম্পিউটার নিয়ে পড়াশোনা করবার সুবাদে দাদা বিভিন্ন কোম্পানিতে চাকরির জন্য ইন্টারভিউ দিচ্ছিল। সেই অবস্থাতেই বিশেষ প্রভাব খাটিয়ে একটি বড়ো কোম্পানির চেন্নাই অফিসে পোস্টিং নিয়ে দাদা চলে গেল। ফোন করত, চিঠি লিখত, কিন্তু মায়ের মন তো, চোখের আড়াল হলেই চোখের জল ফেলত। আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করলেও খুব বেশি বোঝাতে পারতাম না। এর মধ্যেই আমার বেকারত্বের জ্বালা আরম্ভ হল। একই বাড়িতে থেকেও কিছুটা অসামাজিক হয়ে পড়লাম। নিজের চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতির মধ্যে, কোথা দিয়ে যে সময় চলে গেল বুঝতেই পারলাম না। এই সময় মা আরও একা হয়ে গেলেও আমার কিছু করবার ছিল না। মাঝে মাঝে শৌভিকদের বাড়িতে কাকিমাকে দেখলেই নিজের মায়ের কথা মনে পড়ে যেত।

শৌভিকদের বড়ো বাড়ি, তবে সবাই ব্যস্ত, ব্যতিক্রম শুধু কাকিমা। বয়সে কাকিমা মায়ের থেকে কয়েক বছরের বড়ো। ওদের বাড়িতে গেলেই কাকিমাকে দোতলার ব্যালকনিতে বসে থাকতে দেখতাম। ‘কেমন আছো?’ জিজ্ঞেস করলেই, এক বুক হতাশা নিয়ে বলত, ‘এই বাড়িটার মতো।’

তারপরেই কাকু মারা যাওয়ার পরে কীভাবে শূন্যতা, একাকিত্ব, কাকিমাকে গ্রাস করেছিল, তার বর্ণনা দিতে আরম্ভ করত। আমার তখনই নিজের মায়ের কথা মনে পড়ে যেত।

বাড়ি ফিরে মায়ের পাশে বসে কিছুক্ষণ গল্প করতে ইচ্ছে করত, করতামও। সেই দিন থেকে পরের কয়েকটা দিন নিয়ম করে বসে গল্প করবার মাধ্যমে মায়ের সাথে সময় কাটাতাম।

কয়েক দিন পরেই অবশ্য মা বলে উঠত, ‘তুই তোর পড়াশোনা কর, আমি ঠিক আছি।’ আমি আবার বাধ্য ছেলের মতো পড়াশোনাতে মন দিতাম।

এমনি ভাবেই চলছিল। তারপরেই চাকরি পেলাম। অফিসের কাছে একটা বাসা দেখে মাকে বললাম, ‘কাজের খুব চাপ, এবার থেকে আমার বাড়ি ফিরতে রাত্রি বারোটা, একটা হতে পারে।’

ভীতু মনের মা সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করল, ‘ওখানে থাকবার কোনও ব্যবস্থা করতে পারবি না? না হলে তো তুই অসুস্থ হয়ে যাবি।’

আমি একটা বাড়ি নেওয়ার কথা জানাতেই মা বলে উঠল, ‘তাহলে তো আর অসুবিধা নেই। তুই ওখানেই চলে যা। আগে তো তোর শরীর।’

জিজ্ঞেস করলাম, ‘আর তুমি? তোমারও তো বয়স বাড়ছে।’

তুই আমার কথা ভাবিস না। আমি ঠিক থাকব। তাছাড়া চুয়ান্ন বছর বয়সটা কোনও বয়স নয়, তোর কাছে মাঝে মাঝে গিয়ে তো থাকব। বুকুর কাছেও চলে যাব।

তার থেকে তুমিও আমার সঙ্গে চলো। এই ঘরটা তালাবন্ধ থাক। শনি, রবি তো আমার ছুটি, চলে আসব। তাছাড়া আরও তো ছুটি আছে, ছুটি থাকলেই এখানে চলে আসব।

তা হয় না, এটা তোর বাবার তৈরি বাড়ি। এখানে আশেপাশের সবাই আমাকে চেনে। প্রয়োজনে বিপদে আপদে আমার পাশে দাঁড়াতে পারবে। তাছাড়া তোর বাড়িতে থাকলেও সারাটা দিন তো তুই অফিসে থাকবি। আমাকে ঘরের মধ্যে ভূতের মতো একাই থাকতে হবে। ওখানে একা থাকবার থেকে এখানে একা থাকাটাই ভালো।

এরপর আমি আর কোনও কথা না বলে, আমার নেওয়া বাড়িতে চলে গেলাম। প্রথম প্রথম একাই রান্না বা অন্য কাজকর্ম করতাম। মাস দেড় পরে একটা রান্না করবার ছেলে পেলাম। ছেলেটি প্রতিদিন সকাল সন্ধে রান্না করে দিয়ে যেত। আমি রবিবার রাত্রে বাড়ি থেকে অফিসের গ্রামে চলে এসে আবার শুক্রবার কোলকাতা ফিরে যেতাম। থাকল একা মা, আর বাবার তৈরি করা বাড়ি।

এমনিভাবেই পাঁচ মাস কাটল। এই পাঁচ মাসে চাকরির জায়গায় বেশ সুনাম অর্জন করলাম। প্রধান থেকে পার্টির স্থানীয় নেতাদের সাথে সখ্যতা বাড়ল। সেই সঙ্গে নতুন আরেক উপদ্রব আরম্ভ হল। অবশ্য এই উপদ্রবে শরীর মন, ভবিষ্যতের এক অলীক আনন্দের জন্য বেশ শিহরিত হয়ে উঠত। কিন্তু মা, দাদা জীবিত, তাই এই ব্যাপারে নিজেই কোনও সিদ্ধান্ত নিয়ে নিতে আমার মরালিটিতে বাধল। দাদা তখনও পর্যন্ত সংসার করেনি।

এই সব সাতপাঁচ ভেবেই মায়ের অনিচ্ছা সত্ত্বেও, আমার বাড়িতে কয়েকদিনের জন্যে মাকে নিয়ে এলাম। দুদিনের মাথায় শৌভিকের এই চিঠি।

হাত মুখ ধোয়ার আগেই খাম খুলে চিঠিটা বের করে পড়লাম। মা পাাশ থেকে জিজ্ঞেস করল, ‘কী লিখেছে?’

‘সামনের শনিবার ওদের বাড়িতে নিমন্ত্রণ করেছে। অবশ্যই যাওয়ার জন্য লিখেছে। তোমাকেও নিয়ে যেতে বলেছে।’

আমি জানি, মা শেষের কথাগুলো শোনেনি। এত তাড়াতাড়ি কলকাতাতে ফেরার কথা শুনে, মনে মনে বেশ খুশি হয়ে গেছে। বুঝলাম যে-কাজে মা এসেছিল সেটা এবারে খুব বেশি দূর এগোতে পারবে না। সেই শনিবার আমি একাই সন্ধেবেলা শৌভিকদের বাড়ি পৌঁছলাম। আগেই জানতাম, বাড়িতে কিছু একটা উৎসব হচ্ছে। এটা অবশ্য নতুন কিছু নয়। ওরা প্রায় দিন বিভিন্ন কারণে উৎসব করে, তা সে নিজেদের বিবাহবার্ষিকী হোক, বা ছেলে মেয়েদের জন্মদিন, ওদের বাড়ি আলোতে সেজে ওঠে, সেই সঙ্গে এলাহি খাওয়াদাওয়া। শৌভিকদের বাড়িতে কোনও অনুষ্ঠান মানেই, আমার নিমন্ত্রণ পাকা। মায়েরও থাকে, তবে মা, সব অনুষ্ঠানে যায় না।

শৌভিকদের বাড়ি পৌছনো মাত্রই বউদি এগিয়ে এসে আমাকে ঘরের ভিতর নিয়ে গেল। আমি বউদিকে বললাম, ‘আমাকে যে শৌভিক এমনি আসতে বলল। কিন্তু তোমাদের বাড়িতে তো দেখছি বড়ো কিছু অনুষ্ঠান হচ্ছে। আমি কিন্তু কী অনুষ্ঠান কিছুই জানি না, কোনও কিছু উপহার আনতে পারিনি।’

আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই শৌভিকের বউদি বলে উঠল, ‘আমরা এই অনুষ্ঠানের বিষয়ে কাউকে বলিনি। সবাইকে অবাক করে দেওয়ার জন্যেই শুধু চিঠি দিয়ে নিমন্ত্রণ করলেও কী অনুষ্ঠান সে বিষয়ে কিছুই জানানো হয়নি। আর তুমি তো আমাদের ঘরের লোক, তুমি আবার উপহার কি আনবে?’ আমি আর কথা না বাড়িয়ে খাওয়াতে মন দিলাম।

নিমন্ত্রিতদের সংখ্যা খুব বেশি নয়। একশো দশ পনেরো হবে। আমার তো সবাইকে মনে হল আমারই মতো অবাক হওয়াদের দলে।

কিছু সময় পরে শৌভিকের সাথে দেখা হল। মা, না আসবার কারণ জিজ্ঞেস করতেই শৌভিক বলল, ‘আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করো ব্রাদার উত্তর পেয়ে যাবে।’

অন্য সব অনুষ্ঠানের মতো এবারেও ওদের বাড়িতে খাবারের অঢেল আয়োজন। সেইসব খাবার টুকটাক খেতে খেতে অন্য সবার সাথে কথা বলছি, এমন সময় শৌভিকের দাদা মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমাদের সবাইকে অনুষ্ঠানে আসবার জন্য ধন্যবাদ জানাল।

আমাদের মধ্যে থেকে একজন বলে উঠল, ‘আরে, আমরা তো কেউই কোন অনুষ্ঠানে এসেছি, সে সব কিছুই জানি না, সেটা আগে বল।’

দাদা মুচকি হেসে আমাদের আরও কিছুসময় অপেক্ষা করতে বলে ভিতরে চলে গেল।

অবশ্য আমাদের খুব বেশি সময় অপেক্ষা করতে হল না, কিন্তু তারপর যা দেখলাম, প্রথমে আমার নিজের চোখ দুটোকেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। এরকম কিছু একটা দেখব, তা স্বপ্নেও ভাবিনি। আমার মতো যারা নিমন্ত্রত হয়ে এসেছিল, তারা প্রায় সকলেই কয়েকটা মুহূর্তের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। একটা চাপা গুঞ্জনও আরম্ভ হল।

আমি কারওর সাথে কোনও কথা আলোচনা না করলেও সব কিছু দেখে অবাক হয়ে গেলাম। চোখ বন্ধ করলেও ভেসে উঠল একটাই ছবি, কনের সাজে কাকিমা, পাশে ষাটোর্দ্ধ এক ভদ্রলোক, সঙ্গে শৌভিকদের বাকি সবাই।

মা একা থাকবে বলে, আমি বেশিক্ষণ থাকতে পারলাম না। অল্প একটু খেয়ে, মায়ের জন্যে খাবার পার্সেল করে তাড়াতাড়ি বাড়ির দিকে পা বাড়ানোর প্রস্তুতি নিলাম। শৌভিকের থেকে বিদায় নেওয়ার সময় জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী করে সব হল?’

শৌভিক খুব স্বাভাবিক ভাবেই বলল, ‘তুই তো জানিস, আমরা সবাই ব্যাবসা নিয়ে ব্যস্ত থাকি। দাদার মেয়েটাও হস্টেলে। একা থাকতে থাকতে মা ডিপ্রেশনের পেশেন্ট হয়ে যাচ্ছিল। আর কয়েক দিন চললে অন্য রকম বিপদ হয়ে যেতে পারত। ডাক্তার দেখালাম। ডাক্তার বললেন, কম্পানির প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের মধ্যে সেরকম কে কম্পানি দেবে বলতো? একটা আয়া ঠিক করলাম। মায়ের সাথে সবসময় থাকত, তার সাথেই মর্নিংওয়াকে বের হতো। এই মর্নিংওয়াকের সময় কাকুর সাথে আলাপ পরিচয়। মায়ের সাথে বন্ধুত্ব হল। বাড়িতে কাকু আসতে লাগলেন। দেখলাম কাকু বাড়িতে আসাতে মা বেশ হাশিখুশি থাকত, সাজগোজ করত। একদিন কাকুই প্রস্তাবটা মাকে দিলেন। মা প্রথমে আপত্তি করেছিল। কাকু তখন দাদার সাথে কথা বলেন। এরপর আমরা সবাই আলোচনা করতে বসি। আলোচনাতে অনেক কিছু কনফিউশন মিটিয়ে তারপর এই অনুষ্ঠান।’

শৌভিক সেদিন ব্যস্ত ছিল। আমাকে বলল, ‘পরে আরেকদিন আসবি, চুটিয়ে আড্ডা দেব।’ তারপরেই ওদের সবাইকে বিদায় জানিয়ে, মোবাইলে কাকিমা আর নতুন কাকুর একটা ছবি তুলে, বাসস্ট্যান্ডের দিকে পা বাড়াতেই, কানে এল নিমন্ত্রিতদের মধ্যে মাঝবয়সি এক মহিলা মোনোপজ সংক্রান্ত আলোচনা করতে করতে গাড়িতে উঠছে।

আমাদের হয়তো সব বয়সেই বিশেষ কারওর কম্পানির প্রয়োজন হয়। অনেক সময় এই কম্পানি ছেলে, মেয়ে, নাতি, নাতনি দিয়ে পূরণ করা যায় না। আমরা এত কিছু বুঝি না, বুঝতে চাইও না। ইনফ্যাক্ট আমার নিজের মায়ের ব্যাপারেও এতসব ভাবার প্রয়াজন আছে বলে, মনে করিনি। এমনকী মায়ের কাছে গেলে এরপরেও অন্য কিছু ভাবব।

বাড়ি ফিরতেই মা জিজ্ঞেস করল, ‘কিরে, শৌভিকদের বাড়িতে কী ছিল?’

আমি খুব স্বাভাবিক ভাবেই বললাম, ‘কাকিমার বিয়ে।’

‘কী বাজে বকছিস! বড়োদের নিয়ে কেউ এমনি কথা বলে?

মা রেগে গেল। আমি সঙ্গে সঙ্গে মাকে সবকিছু ভালো ভাবে বলে, কিছুক্ষণ আগে মোবাইলে নেওয়া কাকিমাদের ছবিটা দেখালাম। মা সব কিছু দেখে কোনও কথা না বলে নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ল। আমি জামাকাপড় বদলে একটু ইতস্তত করে মায়ের ঘরে গিয়ে বললাম, ‘ঘুমোলে?’

মা শুয়ে শুয়েই উত্তর দিল, ‘না, কিছু বলবি?’

‘দাদাকে একটা ফোন করব?’

‘কেন?’

‘না, মানে তুমিও তো একা থাকো, তাই ভাবছিলাম…’

মা কিছু সময় চুপ করে শুয়ে থাকল। আমিও আর কোনও কথা না বলে আস্তে আস্তে মায়ের ঘর থেকে বের হওয়ার জন্যে পা বাড়াতেই মা বলল, ‘বুকু আজ ফোন করেছিল, পরের সপ্তাহে আসছে।’

 

মনোবল বাড়াতে প্রশংসা

১৫ বছরের তনিমা লেখাপড়ায় ভালো বলে স্কুলে নামডাক আছে। ক্লাস টেনের প্রি-বোর্ডের রেজাল্ট বেরোলে ও হতাশ হয়ে পড়ে। ওর আশা ছিল ৯৫ শতাংশের বেশি নম্বর পাবার। কিন্তু নম্বর কম হওয়ায় ওর চোখ জলে ভরে উঠেছিল বারবার, টিচার এবং মা-বাবার আশাপূরণ করতে পারেনি বলে। বাড়িতে এসে বাবার হাতে রেজাল্ট তুলে দিতে গিয়ে নিজের চোখের জল আর ধরে রাখতে পারে না তনিমা। বাবা মেয়েকে দেখে ভয় পেয়ে যান। রেজাল্ট খুলে দেখেন ৮৯ শতাংশ নম্বর পেয়েছে মেয়ে। বাবা মেয়েকে কাছে বসিয়ে আদর করে মাথায় হাত বুলিয়ে দেন, ‘আরে কাঁদছিস কেন? আমি খুব খুশি হয়েছি তোর রেজাল্ট দেখে। যথেষ্ট ভালো নম্বর পেয়েছিস। আর ফাইনালের জন্য এখন থেকে পড়া আরম্ভ কর। নিশ্চয়ই মনের মতো নম্বর পাবিই পাবি, আমি বলে রাখছি। মিলিয়ে নিস আমার কথা। যা এখন মুখ-হাত ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নে।’ বাবার সান্ত্বনা বাক্য তনিমার মনে নতুন আশার সঞ্চার করল। ও নিজের হারানো মনোবল ফিরে পেল।

‘মা, কেন তুমি শুধু শুধু বউদির কথায় দুঃখ পাচ্ছ। বউদি এই বাড়িতে নতুন এসেছে, তোমাকে এখনও ঠিকমতো চিনে উঠতে পারেনি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, তুমি তোমার ভালোবাসা দিয়ে বউদিকে সবকিছু শিখিয়ে নিতে পারবে। ওকে একটু সময় দাও দেখবে তোমার সঙ্গে বউদি ঠিক মিলেমিশে যাবে’, চন্দ্রার কথাগুলো এবং প্রশংসা ওর মা মিতালির হারানো বিশ্বাস নতুন করে আবার ফিরিয়ে দিয়েছিল।

এইসব পরিস্থিতিতেই, কারও প্রশংসা অথবা প্রশংসাযুক্ত কিছু কথা ব্যক্তির মধ্যে সাকারাত্মক বোধ জাগাতে সাহায্য করেছে। ছোটো বাচ্চাই হোক অথবা যুবক থেকে বয়স্ক, সকলের মনেই নিজের প্রশংসা শোনার সুপ্ত আকাঙক্ষা থাকেই। আপনজনের কাছ থেকে স্নেহভরা কিছু প্রশংসাবাক্য, মানুষের মনে ম্যাজিকের মতো কাজ করতে পারে।

আধুনিক সুবিধা এবং প্রযুক্তির ভরসায় মানুষ অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। এর ফলে অনেক সময় জটিল পরিস্থিতিরও সম্মুখীন হতে হচ্ছে এবং অবসাদ মানুষকে গ্রাস করছে। মানুষ নিরাশায় ডুবে যাচ্ছে। যদি কোনও কারণে কেউ মনের মতো কাজ না করতে পারল অথবা প্রচণ্ড পরিশ্রম করা সত্ত্বেও আশাতীত ফল পেল না, তাহলেও মানুষ জীবনের প্রতি উদাসীন হয়ে পড়ে। এই উদাসীনতাই বাড়তে বাড়তে অবসাদের রূপ নেয় এবং শেষপর্যন্ত মানুষকে আত্মহত্যা করতেও প্ররোচিত করে।

অবসাদ একবার যদি মানুষকে গ্রাস করে তাহলে জীবনকে দেখার দৃষ্টিকোণ এবং চিন্তাভাবনা সম্পূর্ণ বদলে যায় মানুষের। মনে হয় জীবনের সমস্ত আনন্দ হঠাৎ যেন হারিয়ে গেছে, নৈরাশ্য ঘিরে ধরে অবসাদে পীড়িত মানুষকে। অবসাদগ্রস্ত মন, নেগেটিভ চিন্তাভাবনার সাম্রাজ্য হয়ে ওঠে এবং পীড়িত মানুষটির আশেপাশে নৈরাশ্যের চাদর বিছিয়ে দেয়। অজানা ভয় মনকে গ্রাস করে। আশেপাশের আনন্দ তখন আর মনকে স্পর্শ করে না এবং নিজে থেকে কিছু করার আর সামর্থ্য থাকে না।

সকলেরই জীবনে একটা সময় আসে যখন মানুষ একাকিত্বে ভোগে। নিজের উপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। সেই সময় একটা প্রশংসাবাক্য মানুষের মনে আশার দীপ জ্বালাতে পারে। ভয় দূর করে মনকে আবার সতেজ করে তুলতে পারে।

অনেকেই মনে করেন, শুধুমাত্র প্রশংসার দরকার পড়ে বাচ্চাদেরই। কিন্তু আসলে বাচ্চা বা বয়স্ক, বিশেষ কোনও বয়সের সঙ্গে এর কোনও যোগাযোগ নেই। বরং সব বয়সের মানুষেরই প্রশংসার প্রয়োজন পড়ে। কারণ মানুষের বয়স বাড়তে থাকলেও, মানুষের মনের ভাবনা চিন্তার ধারা একই খাতে বইতে থাকে। বড়ো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হয়তো আমরা কিছুটা আমাদের ভাবনা-চিন্তাগুলোকে নিজেদের বশে রাখতে পারি। কিন্তু বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতিতে যখন মানুষ নিজেকে দুর্বল এবং স্বজনহারা মনে করতে শুরু করে, তখন যে-কারওরই তার উদ্দেশ্যে বলা দুটো প্রশংসাবাক্য তার মধ্যে হারিয়ে যাওয়া মনোবল, উদ্যম নতুন করে জাগিয়ে তুলতে পারে। ফলে অবসাদ গ্রাস করতে পারে না। দুর্বল মানসিক অবস্থায় মানুষ যখন অবসাদে ডুবে যেতে থাকে তখন সেই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে আত্মহননের পথই একমাত্র উপায় বলে তাদের মনে হয়। সেই সময় পজিটিভ মতাদর্শে বিশ্বাসী কোনও মানুষের সংস্পর্শেই একমাত্র সে পারে আত্মহত্যা করার ভাবনা মন থকে ত্যাগ করতে।

বৈশাখী হাসিখুশি, আধুনিক চিন্তাধারার মেয়ে। তার চরিত্রের এই দিকটার সুযোগ নিয়ে, তারই কলেজের সহপাঠী অন্বেষ তার সঙ্গে প্রথমে বন্ধুত্ব করে এবং পরে শারীরিক সম্পর্ক তৈরি করে। নিজেদের সম্পর্কটাকে মুঠোফোনে কামেরাবন্দি করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেবে বলে বৈশাখীকে ব্ল্যাকমেল করা আরম্ভ করে। প্রাণবন্ত মেয়েটা ধীরে ধীরে অবসাদে ডুবে যেতে শুরু করে।

তার স্বভাবের এই পরিবর্তন ওর মায়ের চোখ এড়ায় না। তাঁর শত জিজ্ঞাসা করা সত্ত্বেও সত্য ঘটনা কিছুতেই খুলে বলতে পারে না বৈশাখী। এই পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধরে মা ওর সঙ্গে নানা বিষয়ে কথা বলা শুরু করেন, ওর মনে সাহস জোগাতে থাকেন। এমনকী মেয়ের মনে এমন বিশ্বাসও ঢুকিয়ে দেন যে মেয়ের জীবনে সমস্যা যাই আসুক না কেন, উনি সবসময় মেয়ের সঙ্গে থাকবেন।

মায়ের স্নেহে এবং মায়ের কাছ থেকে আশ্বাস পেয়ে বৈশাখী নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে না। পুরো ঘটনা মায়ের কাছে বিস্তারিত জানায় এবং এটাও স্বীকার করে যে এই বিশ্বাসঘাতকতার জাল ছিঁড়ে বেরোবার রাস্তা না পেয়ে ও মনে মনে আত্মহত্যার রাস্তাই বেছে নিচ্ছিল।

মেয়ের উপর সজাগ দৃষ্টি রাখার ফলে বৈশাখীর মা সহজেই মেয়ের জীবনে আসা ঝড়ের পূর্বাভাস পেয়েছিলেন এবং মেয়েকে আত্মহত্যা করার হাত থেকে বিরত করতে পেরেছিলেন। মেয়ের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে, অন্বেষের দোষ প্রমাণ করে ওর সাজার ব্যবস্থা করেন এবং মেয়েকে নতুন জীবনে ফিরিয়ে আনতে পূর্ণ সহযোগিতা দেন।

সাইকায়াট্রিস্ট-দের মতে আজ ডিপ্রেশনের সংখ্যা এতটাই বেড়ে গেছে যে সাধারণ মানুষ এটাকে অসুখ বলে মানতেই চায় না। কিন্তু সমস্যা যদি জটিল হয় তাহলে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া উচিত কারণ নয়তো অসুস্থতা প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।

আধুনিক জীবনের জটিলতা এবং সামাজিক ও আর্থিক সমস্যার কারণে মানুষ বেশি করে অবসাদের শিকার হয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে প্রয়োজন হচ্ছে, নিজের নিজের সমস্যা বোঝার জন্য দৃষ্টিকোণ বদলানো, আপনজনকে দুটো প্রশংসা বাক্য বলা এবং তাদের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানো। আমেরিকা এবং কানাডার মতো দেশে ৬ ফেব্রুয়ারি ‘প্রশংসা দিবস’ হিসেবেই পালন করা হয়। বাড়ি, অফিস, কর্মক্ষেত্র সবজায়গাতেই গ্রিটিং কার্ডস-এর আদানপ্রদান হয় এবং মৌখিক সৌজন্য দেখিয়ে থাকে ওখানকার মানুষ।

আমরাও কি পারি না প্রশংসার মাধ্যমে পরকে আপন করে নিতে, তার জীবনের সব সমস্যা, গ্লানি মুছে দিয়ে নতুন জীবনের পথে তাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে?

 

ডার্ক সার্কল্স থেকে মুক্তি

ক’দিন ধরেই কি লক্ষ্য করছেন আপনার চোখের চারপাশ ঘিরে কালো ছোপ দেখা যাচ্ছে? এটাই আপনাকে অসুন্দর করে তুলছে? চোখের ক্লান্তি স্পষ্ট ভাবে ফুটে উঠছে সাজার পরও? তাহলে এর কারণগুলো জেনে নেওয়া এখনই প্রয়োজন। এক নাগাড়ে পর্যাপ্ত না ঘুমোনো, হরমোনের তারতম্য, টেনশন, অতিরিক্ত স্ট্রেস, জাংক ফুড বেশি মাত্রায় গ্রহণ করা প্রভৃতি কারণে চোখের চারপাশে কালি পড়ে। এই সমস্যা দ্রুত দূর করুন, না হলে পাকাপাকি এই কালো ছোপ থেকে যাবে। আসুন জেনে নিই এ থেকে মুক্তির উপায়।

হাইড্রেটেড রাখুন শরীর

শরীর থেকে টক্সিন নিষ্ক্রমণ খুব জরুরি। আর এটা তখনই সম্ভব, যখন আপনি বেশি পরিমাণে জল পান করবেন। রোজ কম পক্ষে ৮-১০ গ্লাস জল অবশ্যই গ্রহণ করুন। এর দ্বারা শরীরের বিষাক্ত উপাদান বেরিয়ে যাবে এবং আপনাকে সতেজ রাখবে।

ত্বকের যত্ন নিন

যদি ডার্ক সার্কলের সমস্যা নিবারণ করতে চান, তাহলে ত্বকেরও যত্ন নিতে হবে। চোখের মেক-আপ মুছে ফেলার পর, চোখের চারপাশে বাদাম তেল বা ভিটামিন-ই অয়েল বা সিরাম মাসাজ করুন। রোদে বেরোনোর আগে অবশ্যই সানস্ক্রীন ক্রিম ব্যবহার করুন।

মদ্যপান থেকে বিরত থাকুন

ধূমপান বা মদ্যপান ত্বকের পক্ষে ক্ষতিকারক। তাই এগুলো থেকে দূরে থাকুন।

ক্রিম মাসাজ

অ্যালার্জির কারণেও অনেক সময় ডার্ক সার্কলের সমস্যা হতে পারে।

গ্রিন-টি ব্যাগ ঠান্ডা জলে ডুবিয়ে কিছুক্ষণ ফ্রিজে রেখে দিন। তারপর ওই ঠান্ডা টি ব্যাগ চোখের উপর রেখে রিল্যাক্স করুন। এটা নিয়মিত ভাবে করলে চোখের ক্লান্তি ভাব দূর হবে।

স্ট্রেসমুক্ত থাকুন

আধুনিক জীবনশৈলীর সঙ্গে স্ট্রেস ও টেনশন অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। কিন্তু আপনার নিজস্ব টেনশন লেভেল আপনি নিজেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। কোন সমস্যাটাকে গুরুত্ব দেবেন আর কোন সমস্যাকে আপনার জীবনে প্রভাব ফেলতে দেবেন না, এটা নিজেকেই ঠিক করতে হবে। ভালো মিউজিক শুনুন, এতে আপনার নার্ভ-এর উত্তেজনা প্রশমিত হবে, এন্ডরফিন-এর প্রভাব কমে আসবে। মেডিটেশনও করতে পারেন। চাপমুক্ত হতে পারলে আপনার চেহারায়, ত্বকে, এমনকী চোখের নীচের ক্লান্তিও নিবারণ হয়ে, সতেজ ভাব আসবে।

ব্যালান্সড্ ডায়েট

জাংক ফুড বর্জন করা একান্ত জরুরি। যদিও আমাদের লাইফস্টাইলের সঙ্গে জাংক ফুড এখন ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে গেছে। কিন্তু আপনার উচিত এই ধরনের ফুড হ্যাবিট থেকে বেরিয়ে আসা। এতে এমন উপাদন থাকে, যা ত্বকে ফোলা ভাব এনে দেয়। এর কারণেও ডার্ক সার্কলের সমস্যা বৃদ্ধি পায়। মরশুমি ফল খান, সবজি খান, প্রতিদিন ডায়েটে স্যালাড রাখুন, লেবু, কিউই জাতীয় টক ফল খান, যাতে পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন সি শরীরে প্রবেশ করে এবং ডার্ক সার্কলের সমস্যা দূর হয়।

শসা-আলু-টম্যাটোর গুণ

কয়েকটি ঘরোয়া পদ্ধতিতেও সমস্যার সমাধান হওয়া সম্ভব। শসা, টম্যাটো বা আলু ডার্ক সার্কল হঠাতে সাহায্য করে। কারণ এতে রয়েছে ত্বক উজ্জ্বল করার উপাদান। এক চামচ রস বের করুন এই সবজিগুলো থেকে, তারপর চোখের চারপাশে লাগিয়ে কিছুক্ষণ রাখুন। ১০ মিনিট পর ঠান্ডা জলের ঝাপটায় চোখ ধুয়ে নিন। এই প্রক্রিয়া দিনে ২ বার করুন, ডার্ক সার্কলের সমস্যা দূর হবে।

কিন্তু যদি দেখেন এই পদ্ধতি অবলম্বন করার পরও সমস্যার সমাধান হচ্ছে না, তাহলে লেজার বা হিলিয়স-এর সাহায্য নিতে হবে। লেজার রশ্মির প্রয়োগে ডার্ক সার্কল দূর করার বিশেষ পদ্ধতি আছে। এর সাহায্যে চোখের কালো দাগ নির্মূল হবে, ঝুলে যাওয়া ত্বক অর্থাৎ ব্যাগস্ও কমে যাবে। ত্বক মোলায়েম হবে।

পর্যাপ্ত ঘুম জরুরি

কম করে ৬-৭ ঘন্টা ঘুম একান্ত জরুরি। আপনি যতই স্ট্রেসফুল কাজ করুন– ঘুমের সময়টা যেন বরাদ্দ থাকে। এটুকু ডিসিপ্লিন বজায় রাখলে চোখের নীচের ফোলা ভাব ও কালচে ভাব কমবে।

 

বিশ্ব কাঁপাচ্ছে কোরিয়ান ব্যান্ড

নতুন প্রজন্ম এখন ঠিক কী ধরনের গানে নিমজ্জিত জানেন? এরা হল কে-পপ ফ্যান। অর্থাৎ তাদের প্লে-লিস্টে কোরিয়ান গানের লম্বা তালিকা। গানের লিরিক জলের মতো মুখস্থ। প্রতিটি জনপ্রিয় ব্যান্ডের ইতিহাস, দক্ষিণ কোরিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিও তাদের নখদর্পণে। বিশ্বের অন্য দেশগুলির মতোই ভারতীয় টিনএজারদের মধ্যেও কোরিয়ান ব্যান্ডেরই জনপ্রিয়তা এখন তুঙ্গে।

এর মধ্যে অন্যতম পপুলার ব্যান্ড বিটিএস বা বাঙ্গটান বয়েজ। দক্ষিণ কোরিয়ার এই গানের দল বিটিএস, যাত্রার পর থেকেই চমক দেখিয়ে চলেছে। তারুণ্যনির্ভর এই দল ‘ডাইনামাইট’ গান দিয়ে বাজিমাত করেছে সারাবিশ্বের সংগীত অনুরাগীদের মনে। জয় করেছে অনেক স্বীকৃতি ও সাফল্য। গত বছরই বিলবোর্ড মিউজিক অ্যাওয়ার্ডে টপ সোশ্যাল আর্টিস্ট বিভাগে জাস্টিন বিবার ও সেলেনা গোমেজকে হারিয়ে নজর কেড়েছে এই ব্যান্ড।

তবে ভারতে এদের ফ্যানবেস বরাবর মাত্রাতিরিক্ত। শুধু তাই নয়, কোরিয়ান গানের দল হিসেবে সাম্প্রতিক সময়ে প্রথমবারের মতো গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডের মনোনয়ন পেয়ে নতুন ইতিহাসও তৈরি করেছিল তারা। গেল আগস্ট মাসে মুক্তি পাওয়া তাদের জনপ্রিয় গান ‘ডায়নামাইট’ এর জন্যই লেডি গাগা, টেইলর সুইফটের পাশাপাশি ‘সেরা পপ ডুয়ো/ গ্রুপ পারফরম্যান্স’ বিভাগের জন্য মনোনয়ন পেয়েছিল বিটিএস।

সাত সদস্যের এই ব্যান্ড ২০১৩য় ডেবিউ করে ‘নো মোর ড্রিম’ গানটি দিয়ে। অ্যালবামের নাম ছিল ‘টু কুল ফোর স্কুল’। সদস্যদের সকলেরই বয়স পঁচিশের কাছেপিঠে। জিমিন, ভি, জুংকুকের গানেই বুঁদ এখনকার প্রজন্ম।মিউজিক ব্যান্ড হিসেবে জনসংযোগের জন্য সবচেয়ে বেশি টুইটার ব্যবহার করায় গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডও করেছে বিটিএস।

এদের এই বিপুল জনপ্রিয়তা দেখে, যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সাল মিউজিক গ্রুপের (ইউএমজি) সঙ্গে মিলিত হচ্ছে কে-পপ মিউজিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বিগ হিট এন্টারটেইনমেন্ট। এর মাধ্যমে পরবর্তী কে-পপ বয় ব্যান্ডের সন্ধান করবে সুপরিচিত প্রতিষ্ঠানটি। ইউএমজির গেফেন রেকর্ডস এবং বিগ হিট কর্তৃক একটি যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত সংস্থার মাধ্যমে নতুন গ্রুপটি প্রকাশ করা হবে।

গেফেনের সংগীত প্রযোজনায় কাজ করেছে নির্ভানা, গানস এন রোজেস এবং এলটন জনের মতো শিল্পীরা। নতুন ব্যান্ডটির বেস হবে যুক্তরাষ্ট্রে। সম্প্রতি কে-পপ সম্পর্কে ক্রমবর্ধমান আগ্রহ প্রকাশ করছে মার্কিন সংগীত প্রতিষ্ঠানগুলোও। সংগীতের ক্ষেত্রে ভাষা যে আদৌ কোনও সীমাবদ্ধতা তৈরি করে না, বিটিএস–এর বিপুল জনপ্রিয়তাই তার প্রমাণ।

আপসনামা

কুড়ি পাতা দীর্ঘ আট পরিচ্ছদের গল্পটার ফোটোকপির বদলে হাতে লেখা মূল পাণ্ডুলিপি চেয়ে নেওয়ায় মনটা একটু খুঁত খুঁত করছিল। তবে আনন্দও হচ্ছিল। লিটিল ম্যাগাজিন হলেও, এই প্রথম কেউ বাড়ি বয়ে এসে লেখা চেয়ে নিয়ে যাচ্ছে, তাও শারদ সংখ্যার জন্য। তখন কি ঘুণাক্ষরে আঁচ পেয়েছিল, এই অমল চক্রবর্তীই পুজোর পর শ্রীতমা ফোন করলে কিছুতেই নেটওয়ার্ক পাবে না এবং বিরাটাকার গল্পটা ‘পরিব্রাজক’-এর দফতরে না পৌঁছে নিরুদ্দেশ হয়ে যাবে। হতচ্ছাড়া নির্ঘাত অন্যত্র নিজের নামে ছাপিয়েছে।

আর একটা সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বন্ধুপ্রেম। অমলের পরম বান্ধব মৃত্যুঞ্জয় ঘোষের সাথে শ্রীতমার একটা মনোমালিন্য হয়েছিল। এমন তস্করবৃত্তির প্রেরণা নিজের যশলোভ, না বন্ধুর প্রতিশোধস্পৃহা কে জানে। বন্ধুটি তো কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, সম্পাদক, সঞ্চালক, সংগঠক ইত্যাদি ইত্যাদি অনেক কিছু। সাড়ে ষাট হাজার শব্দের একটা স্বাস্থ্যকর সুপুষ্ট গল্প তার কাজে লাগবে বেশি। অবশ্য সবটাই অনুমান। হতেই পারে শ্রীতমাকে খানিকটা হয়রান করে মজা পাওয়াটাই একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল। তারপর থেকে কাউকে লেখা দিলে ভীষণ দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। কিন্তু লেখা চাইলে দেবে না এত হুপো দেখানোর জায়গায় পৗঁছোয়নি শ্রীতমা। তাছাড়া বড়ো পত্রিকায় লেখাগুলো পড়া হয় কিনা, তাই নিয়েও সংশয় থাকে। তাই বিশ্বাস করতেই হয় কাউকে না কাউকে। যেমন এখন করছে গৌরব পাত্র নামে এক মাঝবয়সি লেখককে এবং দেবপ্রিয় দামকে।

দেবপ্রিয় দামের প্রযোজনা সংস্থায় শ্রীতমা যোগাযোগ করেছিল কন্যা ও নিজের মডেলিং-এর জন্য। সে সব কিছু না হলেও শ্রীতমার একটি কবিতার বই কিনেছিল দেবপ্রিয়। সেখান থেকেই বইটা পড়ে অমল চক্রবর্তী, শ্রীতমার কবিতার প্রতি আগ্রহ দেখায়। সেই সূত্রেই অমলের পত্রিকা ‘পরিব্রাজক’এর সঙ্গে সম্পর্ক শুরু ছড়া ও কবিতা দিয়ে। অমলের বন্ধু হিসাবেই আলাপ মৃত্যুঞ্জয়ের সাথে। আলাপ থেকে প্রলাপ। প্রলাপের পর বিলাপ। এক সময় – শ্রীতমার তখন একুশ, কারও সাথে অ্যাফেয়ার আছে শুধু এই গুজবটুকুর জন্য ওর জীবনের শ্রেষ্ঠ অনুভূতিটা পূর্ণতা পায়নি। সঙ্কল্প সরে গিয়েছিল নীরবে। আজ চল্লিশ ছুঁই ছুঁই বয়সে সে বিবাহিতা এবং এক সন্তানের জননী – এগুলোও অধুনার প্রেমপ্রার্থীদের নিরস্ত করার পক্ষে যথেষ্ট নয়। এক নাছোড়বান্দা ছোকরাকে তো রুঢ়ভাবেই কাটাতে হয়েছে, কারণ ভালো ব্যবহার প্রশয় দেওয়ার সমার্থক হয়ে যাচ্ছিল। সমাজ এতটাই বদলেছে যে নিজেকে সেকেলে লাগে। অবশ্য তলিয়ে দেখলে আধুনিকতার বুলি আসলে আদিম রিপুর ছদ্মবেশ।

মৃত্যুঞ্জয় ঘোষ ওর চেয়ে বছর দুই তিন বড়োই, এখনকার প্রজন্মের মধ্যে পড়ে না। তবে আঁতেল সমাজে নাম লেখানো ব্যাটাছেলেদের ছোঁকছোঁকানির লাইসেন্স থাকে। প্রথম আলাপ অমল চক্রবর্তীর সাথে শ্রীতমার ফ্ল্যাটে ‘পরিব্রাজক’ সঙ্গে এনে। এক কাপ চা-ও স্পর্শ করেনি। দুর্দান্ত গরমে শরবত দিতে চাইলে বাধা দিয়ে বলেছিল, ‘ওসব মেয়েলি ড্রিংক’। পরে শ্রীতমাও বার কয়েক রহড়ায় ওর বাড়ির আড্ডায় গিয়েছিল। ক্রমশ ফোনে কথা হলে শ্রীতমাকে মদ্যপান ও চুম্বনের ওপর থিসিস শোনানো শুরু করে।

ধরা যাক মৃত্যুঞ্জয় শ্রীতমাদের বাড়ির কাছাকাছি এসেছে শুনে শ্রীতমা ভদ্রতার খাতিরে বলল, ‘তাহলে দেখা করে যান।’ প্রশ্ন এসেছে, ‘গেলে কী খাওয়াবেন?’

‘আগে খবর দিয়ে এলে আয়োজন রাখতাম। এখন না হয় চা পান করবেন টা সহযোগে। শরবত মেয়েলি পানীয় হতে পারে, কিন্তু চা তো দেখেছি আপনি ঘন ঘন খান।’

‘ধুর মশাই, আপনার কাছে গেলে চা খাব কেন? অন্য জিনিস চাই।’

বিব্রত করেই আনন্দ। সত্যি সত্যি এসে হানা দেয়নি কোনও দিন শ্রীতমাকে বাড়িতে একা পেতে।

শ্রীতমার কবিতার বই হাতে পেয়ে ক্যাটকেটে তির্যক মন্তব্য করলেও একটা দায়সারা প্রশংসাসূচক সমালোচনা লিখে দিয়েছিল। সেটা কোথাও ছাপেনি, শংসাপত্রের মতো নিজেরই সংগ্রহে রাখতে হয়েছে। শ্রীতমার একখানা কবিতাও চেয়ে নিয়ে মৃত্যুঞ্জয় একটি ক্ষুদ্র পত্রিকায় পাঠিয়েছিল। সেটা চটপট ছেপে বেরোনোর পর ফোন করে বলে, ‘আপনার বইয়ের রিভিউ লেখা হল, কবিতা ছাপা হল, আমার তো কিছু প্রাপ্য হয়।’

চড়াক করে মাথায় রক্ত উঠলেও ইঙ্গিতটা উপেক্ষা করতে হল, উদ্ভব অফিস থেকে ফিরেছে।

‘আপনার লেখা তো আমার পাঠানোর অপেক্ষা রাখে না। তবে আপনার বইয়ের রিভিউ আমাকে দিয়ে করাতে চাইলে করতে পারি।’

‘আপনার ভাষায় বলি, আমি হালুম করলাম। পাওনাটাও সেই মতো হয়।’

আর ন্যাকা সেজে থাকা সম্ভব নয়। পরের দিন দুপুরে একটা বার্তা পাঠায় মুঠোফোন থেকে, ‘আপনার সহযোগিতার দাম দিতে না পারায় আমি দুঃখিত।’

সঙ্গে সঙ্গে ফিরতি কল। ঝাড়া পঁয়ত্রিশ মিনিট ধরে বক্তৃতা উপদেশের বন্যা। মৃত্যুঞ্জয় ঘোষ যা করে, মনে ধান্দা নিয়ে নয়। সে যে রসিকতা করেছে সেগুলো আদি রসাত্মক হতে পারে কিন্তু তাতে নাকি যৗনতা নেই। কথাটার মাথা-মুণ্ড বোঝা গেল না। কিন্তু প্রশ্নও করল না শ্রীতমা। লোকটা দর্পিত ভাবে নিজের চরিত্রের সাফাই দিয়ে গেল– ‘সঙ্গ পেলাম না বলে অন্যদের মতো আপনার লেখা প্রকাশে ব্যাগড়াও দেব না। আপনার বাড়ি থেকে আমার বাড়ি কতই বা দূর? সেরকম মতলব থাকলে তো বাড়িতেই যেতে পারতাম। আপনাকে একা পাওয়া কি অসুবিধার ছিল?’… ইত্যাদি। শেষে যোগ করল, ‘কিন্তু ভেবে দেখুন আপনি যদি এটুকুও না নিতে পারেন, তা হলে লোকে আপনার জন্য করবে কেন?’

অতর্কিত আক্রমণের মুখে পড়ে সেদিন আমতা আমতা করে গিয়েছে শ্রীতমা। ঘণিষ্ঠতার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েও এমন কথা ঘোরাল যেন শ্রীতমার চিন্তাটাই অপরিচ্ছন্ন। জবাব খুঁজে না পাওয়ার পেছনে কি এই ভয়টাও কাজ করেছিল, প্রভাব খাটিয়ে যদি শ্রীতমার সদ্য তৈরি হওয়া লেখার জায়গাগুলো নষ্ট করে দেয়? ফোন রাখার পর জুতসই জবাবটা মনে মনে সাজানো গেল, ‘আপনার অশালীন রসিকতা বরদাস্ত করে আমায় এগোতে হবে না, নিজের কলমের জোরেই যত দূর পারি যাব।’ আগেও বলবে ভেবেছিল,বলেনি। এবারেও শুনেই গেল। একতরফা।

এর কদিন পরেই তার বন্ধুটি পুজো সংখ্যার জন্য কবিতা নয়, ঐ বড়োসড়ো গল্পটা যাকে নভেলেটও বলা যায়, নিয়ে গিয়েছিল। পুজোর আগে পর্যন্ত ফোন করলে বলেছে, ‘আপনার কপি আপনার বাড়ি গিয়ে দিয়ে আসব।’ কিন্তু পরে যখন অন্য সূত্রে শ্রীতমা পত্রিকাটির শারদ-সংখ্যা প্রকাশের খবর পেল, তখন অমল চক্রবর্তী ফোনের টাওয়ার পাওয়া ছেড়ে দিল।’ ‘হ্যালো, হ্যালো। শুনতে পাচ্ছি না’ পরিব্রাজকের প্রধান সম্পাদককে ফোন করে প্রশ্ন করায় সে তো আকাশ থেকে পড়ল। এমন কোনও লেখা তাদের দফতরে জমাই পড়েনি। বিশুদ্ধ হাপিশ! অন্য কোথাও অন্য কোনও শিরোনামে, স্থান-কাল-পাত্র বদলে, লেখকের নাম বদলে প্রকাশিত হয়েছে কিনা তদন্ত করে দেখা হয়নি। এর পেছনে তার চুম্বন রসিক বন্ধুর কোনও ইন্ধন ছিল কিনা সেটাও প্রমাণিত নয়।

তবে ব্যাপারটা শ্রীতমা, দেবপ্রিয়কে জানায়। মনে হয় দেবপ্রিয় একটু অস্বস্তিতে পড়েছিল। শ্রীতমাকে মডেল বা অভিনেত্রী হিসাবে না হলেও লেখিকা হিসাবে পথ খুলে দেওয়ার ব্যক্তিগত রাস্তাগুলো দেখছিল। অন্তত ব্যাপারটা শ্রীতমার কাছে এমনই। সেই সাথে শ্রীতমার প্রতি মানুষটার একটা আলগা ভালোলাগা যে কাজ করছে, সেটা টের পেলেও তেমন আপত্তিকর বলে মনে হয়নি। শ্রীতমাকে অপমান করেনি, ছুতোনাতায় গায়ে হাত দেবার চেষ্টা করেনি, রুঢ় ব্যবহারও করেনি। বস্তুত দেবপ্রিয় ফোন করলে শ্রীতমা খুশিই হয়। গলাটা বেশ আশ্বাস জাগানো।

‘হ্যালো। শ্রীতমা বলছি।’

‘আরে গুড মর্নিং। কী খবর বলুন?’

‘খবর নিতেই তো ফোন করা। ওই লেখাগুলোর কোনও গতি হয়েছে?’

‘সুখবরটা আমিই জানাতাম। তার আগেই আপনার ফোন এল। ‘পিঁপড়ের রানি’ গল্পটা বাল্যবন্ধুতে পাঠিয়েছিলাম। সুরেন্দ্র নস্কর নামে আমার এক বন্ধুরও লেখা পাঠিয়েছিলাম। ওরা সুরেন্দ্রর কবিতাটা নিয়ে খুঁতখুঁত করছে, কিন্তু আপনার গল্পটা পড়েই পছন্দ করেছে। তা দেখা কবে হচ্ছে?’

‘যবে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাব।’

‘আরে, সুন্দরী নায়িকার অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়াটাই তো সৌভাগ্যের। কাল, না কাল একটা কাজ আছে, পরশু আসুন। আছেন কেমন বলুন। কেমন ঘুরলেন?’

‘আমার যে শনি-রবি ছাড়া বেরোনোর উপায় নেই। তাও চূর্ণীর বাবা অফিস গেলে হয়ে গেল। জানেন তো মা বাবাকে নিয়ে বেড়াতে গিয়েছিলাম। মায়ের অ্যাক্সিডেন্টে হিপজয়েন্ট ভেঙে যায়। নড়াচড়া অসম্ভব। ট্রাভেল এজেন্টকে যা দেওয়া হয়েছে, তা তো ফেরত হলই না, কাশ্মীরের কোথাও কিছু না দেখে কাটরায় বাড়তি হোটেল ভাড়া গুণে ফেরার দিন পর্যন্ত বসে রইলাম। কী ভাবে যে একটা গাড়ি নিয়ে জম্মু এসে ফেরার ট্রেনে উঠেছি, তা ভাবলে এখনও অবাক লাগে…!’

‘কেন, বিকেলে কী অসুবিধা?’ লোকটা মায়ের অত বড়ো দুর্ঘটনার কথা শুনেও গ্রাহ্য করল না। শ্রীতমার কথা শেষ করতে না দিয়ে এত বিপর্যয়ের মধ্যেও বলছে দেখা করতে!

‘দুপুর সোয়া দুটো থেকে আড়াইটের মধ্যে চূর্ণী স্কুল থেকে ফেরে। ওকে নাইয়ে খাইয়ে সব সারতে বিকেল সোয়া তিনটে ছাড়িয়ে যায়। মেয়েকে কার জিম্মা করে যাব? যাঁর দায়িত্বে রেখে বেরোতাম, তিনি তো নিজে পাশও ফিরতে পারছেন না। যতক্ষণ আয়া আছে, আছে। তারপর বাকি সময়টা আয়া তো আমিই। খড়দা থেকে বেহালা শখের বাজার– একটুখানি রাস্তা তো নয়। চূর্ণীকে সঙ্গে নিয়ে বেরোতে পারি, কিন্তু ও টায়ার্ড থাকে। ওর কোনও কাজ হলে না হয় কষ্ট দেওয়া যেত। তিন চারটে ট্রান্সপোর্ট চেঞ্জ করে বেহালা যেতেই হয়তো ছ’টা বেজে যাবে। ফিরতে–’

‘আরে, বাচ্চা আনলে আপনার সাথে অভিসারটা হয় কী করে? আজ পর্যন্ত ঠিকমতো প্রেমালাপটাই তো হল না। চলে আসুন সময় করে।’

শ্রীতমা এবার হোঁচট খেল। ভদ্রলোক তাকে অনেকবার সুন্দরী বলেছে। চূর্ণী অর্থাৎ কাজু সম্পর্কেও প্রথম বার উচ্ছ্বাস দেখিয়েছিল। ইন্টারনেটে বিজ্ঞাপন দেখে যেহেতু কন্যার মডেলিং-এর উদ্দেশ্যেই যোগাযোগ, তাই রূপের প্রশংসাটা শংসাপত্র হিসাবেই নিয়েছে বরাবর। শ্রীতমাকে সংস্কার ত্যাগ করে তথাকথিত সাহসী হবার প্রস্তাব দিলেও ব্যবহারের মধ্যে এমন এক মার্জিত ভাব থাকে, যে অসভ্যতা মনে হয় না। আসলে মনে হলে চলবেও না। আলগোছে এড়িয়ে না চটিয়ে যদি সখ্যতা বজায় রাখা যায়। রূপের জন্য দরাজ সার্টিফিকেট দিলেও এবং একাধিক বিজ্ঞাপনের জন্য অফিসে ডেকে বিস্তর আলাপ আলোচনা করলেও আজ পর্যন্ত মা মেয়ে কাউকেই কাজ করায়নি। কেবল শ্রীতমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ সাগ্রহে কিনে নিয়েছিল প্রথম সাক্ষাতেই। সেই সূত্রেই পরিব্রাজক এবং জোচ্চুরি কাণ্ড।

চমক সামলে হেসে উঠল শ্রীতমা, ‘দূর মশাই, আমার প্রেমে পড়লে কি অমল চক্রবর্তীর মতো তস্করের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতেন? ভয়েস ওভার করার মতো মেল ভয়েস কি নেই বাজারে?’

‘অমলের সঙ্গে অনেকদিন পর কাল যোগাযোগ হল। ওই ফোন করেছিল।’

‘আমার গল্পটার খোঁজ নিয়েছেন?’

‘না, না। সেসব কথা হয়নি। সে এখন বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে নানান ডক্যুমেন্ট্রিতে কমেন্ট্রি করে।’

‘বাঃ! চুরির পুরস্কার? ভালো। ওই যে ডোর বেল বাজছে। মেয়ে চলে এসেছে। দেখছেন, আপনার সাথে কথা বলতে বলতে নীচেই নামা হয়নি। বেচারা ভারী ব্যাগ নিয়ে একাই উঠে এসেছে। ঠিক আছে…’

দরজা খুলে মেয়েকে ঢুকিয়ে নিল শ্রীতমা। ‘রাখছি এখন। চূর্ণীর জন্য কোনও অ্যাসাইনমেন্ট থাকলে দেখুন না। মেয়েটাকে যে দেখে অটো-অটো করে। কিন্তু কোনও কাজই মেটিরিয়ালাইজ করছে না।’

‘ওকেও লাগবে আর একটা অ্যাডে। আগে আপনাকে কাস্ট করি। নেচার কিওরের অ্যাডে আপনাকে লাগতে পারে।’

‘আচ্ছা। ওকে খাওয়াতে হবে। পরে কথা হবে।’

‘আমি কল ব্যাক করব? ধরুন এক ঘণ্টা পরে?’

‘করুন। রাখছি। বাই।’

‘কার ফোন?’ মায়ের গলা। শোবার ঘর থেকে। এসি চালাতে হয়েছে বলে দরজা বন্ধ থাকার কথা। এখন দেখছে খোলা। বোধ হয় বাবা খুলে এসেছে।

সুন্দর মুখের জয় নাকি সর্বত্র। কিন্তু শ্রীতমার ক্ষেত্রে তো বিড়ম্বনা। ওর লেখা যারা পছন্দ করে অথবা যারা করে না, প্রায় সব পুরুষ কবি লেখকই, শ্রীতমা সৌন্দর্যের খাতিরে সুবিধা পাচ্ছে এমন ইঙ্গিত করতে ছাড়ে না। শ্রীতমার কবিতার বইয়ের প্রথম সংস্করণ প্রায় নিঃশেষিত, সবটাই যদিও নিজে ফেরি করে। সেটা নাকি ওর মুখ দেখে, কবিতার গুণে নয়। এমন মন্তব্য কবি নির্মল সমাদ্দারের মতো বরিষ্ঠ মানুষেরও, যাঁর স্নেহ-ছত্রচ্ছায়ায় একাধিক স্তাবক প্রতিপালিত। নির্মলকাকু যথেষ্ট সম্মানিত ও প্রতিষ্ঠিত। তাঁর গাত্রদাহ কীসের? ওঁর পারিষদবর্গ কুড়ি বছর ধরে লিটল ম্যাগাজিনে ঘষ্টেও বেশি দূর এগোতে পারেনি বলে, নাকি শ্রীতমা কবিতার পাশাপাশি গদ্য লিখিয়ে হিসাবেও স্বীকৃতি পেয়ে যাচ্ছে বলে? কোনও নামি বাণিজ্যিক পত্রিকায় গল্প বার হওয়ার কথা জানলেই অভিনন্দন জানাতে গিয়েও বেশির ভাগ কেমন হিংস্র হয়ে ওঠে। স্বয়ং কবিতার বইয়ের প্রকাশকের মন্তব্য, ‘তোমার বই বি ডাবল ও কে – বুক দেখে বিক্রি হয়নি, হয়েছে বয় হ্রস্ব-উ ক – দেখে।’ মাথাটার ভেতরটা দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলেও না বোঝার ভান করতে হয়।

শ্রীতমার হাবেভাবে মাঝেমাঝে একটু অপরিণত মনস্কতা ফুটে ওঠে। নিজেও বুঝতে পারে। কাউকে তোয়াজ করে না, বরং একটু অসহিষ্ণু, কিন্তু লেখার জন্য ব্যকুলতা গোপন থাকে না। এটাই কি অপমানের আমন্ত্রক? এ যাবৎ দেবপ্রিয় দামকে তো হিতৈষী বলেই মনে হয়েছে। হঠাৎ কথাবার্তায় এমন লাগাম ছাড়া ভাবগতিক? এর সাথেও সম্পর্ক টিঁকলে হয়। দেবপ্রিয় চেয়েছিল বলেই কয়েকটা লেখার ফোটোকপি দিয়ে এসেছিল, সেখান থেকেই একখানা ‘বাল্যবন্ধু’-তে প্রকাশিতব্য। গল্পটা সন্ধ্যাতারাতেও মনোনীত, কিন্তু কত বছর পরে ছাপবে কেউ জানে না। ‘বাল্যবন্ধু’ টাকা না দিলেও চটপট বার করে দেবে। এই অবস্থায় দেবপ্রিয়কে অসন্তুষ্ট না করাই মঙ্গল।

সারা দিন নানা কাজের ব্যস্ততা, রাতে আয়ার বদলে নাইট ডিউটি। ব্যস্ততার মধ্যেও খচ্খচানিটা বিঁধে রইল। রাত বারোটায় ফোন।

‘বলুন।’

‘বড্ড অসময়ে ফোন করলাম না? কথা বলা যাবে?’

‘এতক্ষণে আপনার এক ঘণ্টা হল? অসময় তো বটেই, বলুন।’

‘নাথিং স্পেসিফিক। ওই নেচার কিওরের অ্যাডটার ব্যাপারে আপনাকে একবার আসতে হবে। পেমেন্ট বেশি নয়। হাজার টাকা। ডাবিংও করতে হবে। ডায়ালগ আছে। ওরাই শিখিয়ে দেবে। এমন কিছু নয়। আপনার আবার উইক-ডে-তে প্রবলেম। একটু দুপুর করেও যদি আসতে পারতেন। ঠিক আছে শনিবারেই আসুন।’

‘বেশ কয়েকবার তো দেখলেন। কোনওটাই শেষ পর্যন্ত মেটিরিয়ালাইজ করল না। আবার বেকার দৌড়াদৗড়ি না হয়। তাছাড়া শনিবার কলেজ স্ট্রিটে গিয়ে কয়েকজনকে লেখা দিতে হবে।’

‘কখন যাবেন?’

‘বিকেল পাঁচটা সাড়ে পাঁচটা নাগাদ পৌঁছোতে হবে।’

‘তার আগেই আমার সাথে দেখা করে যান না। কাজটা ফেলে রাখতে চাই না। আর আপনাকেও অনেক দিন দেখিনি।’

শ্রীতমা নিরুত্তর।

‘কিছু বলছেন না যে।’

‘শনিবার আসুক, দেখব।’

‘শনিবার তো কাজের কথা হবে। একটু অকাজের কথাও তো হওয়া দরকার। আমার তো আপনাকে দেখতে ভীষণ ইচ্ছা করে। একটা ইনোসেন্স আর সেক্স অ্যাপিলের দারুণ কম্বিনেশন। আর এখন কাশ্মীর থেকে ফিরে কাশ্মীর কি কলি হয়েছেন কিনা দেখতে আরও ইচ্ছা করছে।’

‘আপনার কি মনে নেই যে আমার মায়ের অ্যাক্সিডেন্টের জন্য কাশ্মীর ঘোরাই হয়নি? তাছাড়া শর্মিলার তখন বয়স ছিল ষোলো সতেরো। আমি এখন চল্লিশ। এই ভুঁড়িদার চেহারা আপনার ফ্যান্টাসির সাথে মিলবে না।’

শ্রীতমা ওপাশে কোমরতলি ভাঙা মায়ের দিকে তাকাল। এখনও ঘুমোয়নি। মেয়েটাও দিদা আর মায়ের মাঝখানে শুয়ে উশখুশ করছে। ওর গ্রীষ্মের ছুটিতে বেড়াতে গিয়েই বিপত্তি। জানলাহীন বসার ঘরে উদ্ভব মশা তাড়ানো তরল জ্বালিয়ে শুয়ে আছে। এমনিতে মশারি ছাড়া শুতেই চায় না। ফ্ল্যাটের একমাত্র বাতানুকুল ঘরখানা শাশুড়ির জন্য ছেড়ে দিয়ে নিজে কষ্ট করছে। মাকে গাড়িতে তোলা নামানো ছাড়াও বাথরুম ইত্যাদির ব্যাপারেও যেভাবে শ্রীতমাকে সাহায্য করেছে, নিজের ছেলেও পারে না। কলকাতায় ফিরে অবধি তার বিশ্রাম নেই। গাড়ি অ্যাম্বুল্যান্স দৌড়াদৌড়ি তো আছেই, জটিল অপারেশনের অনেকটা খরচই আপাতত উদ্ভব দিয়েছে। মা-বাবা চিকিৎসা বিমার টাকা না পেলে ফেরত নেবে না পণ করে আছে। সারা দিন অফিস ডাক্তার ওষুধ-পত্র করে ফিরে এসে মেয়েকে নিয়ে বসে। তারপর বালিশে মাথা ঠেকাতেই ঘরের বাতাস ওর নাকের গর্জনে মন্দ্রিত হতে থাকে। মেয়ে বাবাকে পাশে না পেয়ে ঘুমোবে না বলে একদিন এই গরমের মধ্যেই বসার ঘরের সরু ডিভানে পাশে শুয়ে উদ্ভবকে সারা রাত এক কাতে রেখেছিল। আর শ্রীতমা!  অসুস্থ মাকে আর মেয়েকে পাশে নিয়ে ঠান্ডা হাওয়া খেতে খেতে মাঝরাতে পরপুরুষের সঙ্গে হেজাচ্ছে? কীসের জন্য? ক্যামেরার সামনে আসার তাগিদটা তো মরেই গেছে, তবু সুযোগ এলে না করতে পারে না বলে? নাকি তার লেখা কবিতা গল্পগুলো যাতে মাঝপথে হারিয়ে না যায়, সেই দুর্ভাবনায়? ওর তো এক্ষুনি ফোন কেটে দেওয়া উচিত। মায়ের নাক বিরতি দিয়ে ডাকছে। কাজু চুপচাপ শুয়ে। উদ্ভবের নাকের শব্দ মাঝে মাঝে ফুঁসে উঠে স্তিমিত হয়ে যাচ্ছে। বসার ঘর থেকে আসা সেই আওয়াজ শ্রীতমাকে কিছুটা আশ্বস্তর সাথে অনেকটা অপরাধবোধে বিক্ষত করছে।

‘কোথায় ভুঁড়ি? ওটুকু না থাকলে তো আইটেম গার্লদের বাজার পড়ে যেত। ওই পেটের নাভিতে চুমু খাওয়াতেই তো মজা।’

‘হোয়াট? আর ইউ ড্রাংক?’ গলাটা চড়ে গিয়েছিল। দাঁতে দাঁত ঘষে গলা নামিয়ে আনল শ্রীতমা। ‘এরকম সর্বনেশে ইচ্ছা হলে তো আপনার সাথে দেখা করাই চলবে না। রাখছি।’

‘এতেই সর্বনাশ বললে কী করে হয়? একটু ইনহিবিশন ত্যাগ করে দেখুন, আপনারও ভালো লাগবে। আর আমি ড্রিংক করি না। যা বলছি পরিষ্কার মাথাতেই বলছি।’

‘পরে কথা হবে গুড নাইট।’

‘গুড নাইট। শনিবার আসার আগে ফোন করে নেবেন। দেখি বাল্যবন্ধু যদি ছাপায় তাহলে জানাব।’

বালিশের ফাঁকে চলভাষ ঢোকানোর পর মায়ের প্রশ্ন, ‘কার ফোন তপা?’

‘আমার কয়েকটা লেখা আছে এর কাছে। আসলে প্রযোজক। আবার হোটেলও আছে শঙ্করপুরে। এখনও পর্যন্ত তোমার নাতনিকে বা আমাকে কোনও কাজ দেয়নি। তবে কয়েকটা পত্রিকায় যোগাযোগ আছে। সেই সূত্রে আমার একটা ছোটোদের গল্প বাল্যবন্ধুতে পাঠিয়েছিল। শুনছি এ মাসেই বেরোবে।’

‘এত রাতে ফোন করে কী এত বকছিল?’

‘আমার মতো বেকার তো নয়। সারা দিন ব্যাবসার কাজে ব্যস্ত। শুটিং-ফুটিংও থাকে। কখনও কখনও সারা রাতই হয়তো জেগে থাকতে হয়।’

মনটা আবার খচ্খচ্ করছে। লোকটা বলল শনিবার যাওয়ার আগে ফোন করতে। তাছাড়া আগে বলেছিল ‘বাল্যবন্ধু’-তে গল্প বেরোচ্ছেই। এখন ‘যদি’ যোগ করল কেন? এভাবে ‘গুড নাইট’ বলে ফোন কেটে দেওয়া কি ঠিক হল? মৃত্যুঞ্জয়ের উপদেশ মনে পড়ল। সামান্য রসিকতাও যদি না নিতে পারে তাহলে লোকে আনস্পোর্টিং ভেবে সাহায্যের হাত গুটিয়ে নেবে। দেবপ্রিয়র মতো একজন হিতৈষীর রসিকতায় বিরূপ প্রতিক্রিয়া জানানোটা কি ঠিক হল? নির্ঘাত রসিকতাই। লোকটার বউ আছে, ছেলে আছে। আর অমন ডাকসাইটে প্রযোজক চাইলেই অনেক অল্পবয়সি সুন্দরী মেয়ে পেতে পারে। হয়তো শ্রীতমার জন্য সত্যিই একটু কোমল জায়গা আছে, অমলের জোচ্চুরির জন্য একটা সংকোচবোধও আছে। কলকাতায় ফিরে এসে শ্রীতমাই তো ফোন করে জানল যে দেবপ্রিয় তার লেখা পাঠিয়েছে যেটা ছাপতেও চলেছে। লোকটা তো পাওনা গণ্ডার হিসাব বুঝে নিয়ে কাজটা করেনি। আজ সকালে শ্রীতমা ফোন না করলে এখন এতসব কথা হতোই না। প্রার্থী যদি তেজ দেখায়, তাহলে ‘নিশ্চিত’ প্রকাশিত হচ্ছেগুলো ‘যদি তবে’র গেরোয় পড়ে যাবে। মাথার বালিশের পাশ থেকে মোবাইল তুলে খানিকক্ষণ ভেবে নিয়ে একটা ‘স্পোর্টিং’ বার্তা পাঠাল, ‘সর্বনেশে কথা শুনতে মন্দ লাগে না, যদি সেগুলো কথার জায়গাতেই থাকে।’

মিনিট কয়েকের মধ্যে ফিরতি দুটো বার্তা। টুংটাং টুংটাং। ‘এ ব্যথা কী যে ব্যথা বোঝে কি আনজনে, আমার আঙুলের আর ঠোঁটের আদর রইল ওই বুকে আর নাভিতে। যদি এসএমএস করার থাকে এক্খুনি করুন। সকালে ফোন সুইচ অন করার পর আর কারও চোখে পড়লে অসুবিধা আছে।’

কান-মাথা গরম হয়ে গেল। শ্রীতমার চলভাষ সারা রাত জাগ্রত থাকে। যা কোনওদিন করে না, তাই করল আজ– সুইচ অফ।

‘কাকে মেসেজ করলে মা?’ কাজু জেগে আছে!

সত্যিই কি শ্রীতমার এই লোকটার সাহায্য দরকার? সে ‘সন্ধ্যাতারা’য় যেসব গল্প ও ছড়া দিয়ে এসেছিল, সেগুলোর মধ্যে দুটো মনোনীত হবার চিঠি পেয়েছে জমা দেওয়ার এগারো মাস পরে। তার পরেও সাত মাস পেরোল। পত্রিকা অফিসে খোঁজ নিয়ে জেনেছে আরও অন্তত বছরখানেক অপেক্ষা করতে হবে। এই গল্পটাও মনোনীত জানল তখন, যখন সেটা অন্যত্র প্রকাশ পেতে চলেছে। এখন সন্ধ্যাতারার ভরসায় বাল্যবন্ধু থেকে গল্পটা তুলেও নেওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু শুধু এইটুকুর জন্য মাত্রা ছাড়ানো, মুখোশ খোলা পুরুষটাকে টুইয়ে চলা? ছিঃ!

কিন্তু কিছু প্রাপ্তির জন্য একটু উদার হওয়ার অভিনয় কি খুব দোষের? গত দু বছরে এইভাবে শ্রীতমা অনেককেই শত্রু করেছে। তাদের ক্ষেত্রে সরে আসা ছাড়া উপায় ছিল না। তারা আগেই নিজেদের পাওনাটা আদায়ের তালে থাকত। দেবপ্রিয় কি একটু ব্যতিক্রম নয়? এই লোকটাকে যে ভালো মানুষ বলে শ্রীতমা বিশ্বাস করতে শুরু করেছে। একটা নির্ভরতাও তৈরি হচ্ছে। এই সময় সব কিছু একদিনের ফোনের বাচালতায় নষ্ট করে ফেলতে হবে? নিশ্চই দেবপ্রিয় দাম নিজের কাঁচা আবেগ দেখিয়ে ফেলার জন্য লজ্জিত হবে। হয়তো দেখা হলে ঘুণাক্ষরেও এসব প্রসঙ্গ উল্লেখ করবে না। ভিড়ের মধ্যে সুযোগ খোঁজা পুরুষ যেমন আছে, ভিড় ঠেলে এগিয়ে যেতে সাহায্য করার মতো ভদ্রলোক কি ও দেখেনি ট্রেনে বাসে? কিন্তু….?

মা বোধহয় এখনই বেডপ্যান চাইবে। নড়ছে। মেয়ে কচি হাতে গলায় বেড় দিয়ে গায়ে পা চাপিয়ে বলল, ‘মা, তুমি শুধু গল্প লিখে যাও। আমায় বলো না।’

সকাল বেলা আয়া আসার আগে যথারীতি মাকে বেডপ্যান দিতে হল। শ্রীতমা দু জোড়া একবার ব্যবহারযোগ্য গ্লাভস্ বারবার ব্যবহারের জন্য রেখে দিয়েছে। একটা ও নিজে পরে আর একটা যে আয়া আসে তাকে দেয়। আয়া থাকলে রান্নার মেয়ের খুব একটা দরকার পড়ে না। একটু হাতে হাতে সাহায্য করলে নিজেই চালিয়ে নিতে পারে। তবু পুরোনো রান্নার মহিলা এসে টুকি দেওয়ায় হাতছাড়া করবে না বলে তাকেও বহাল করেছে এই বিপুল খরচের মধ্যে। উদ্ভবই বলেছে।

সকালে বর বেরিয়ে যেতে কম্পিউটারে বসেছে শ্রীতমা লেখা নিয়ে। মাঝে কয়েকদিন খুব উঠে পড়ে লেগেছিল মেয়ের মডেলিং কেরিয়ার গড়বে বলে। নিজেরও ছবি পাঠিয়েছে কয়েক জায়গায়। কেউ ঘরোয়া ছবি চায়, তো কেউ পোর্টফোলিও। বিশেষ সুবিধা না হওয়ায় এখন সে উৎসাহে ভাঁটা পড়েছে। এখন ও লেখালিখি নিয়েই ভাবতে চায়। কিন্তু সেখানেও প্রতি পদক্ষেপে আপোস। মাঝারি পত্রিকাও ভাব করে যেন বিশাল কিছু। তারা কেউ লেখার শিরোনাম বদলে দেয় তো কেউ কবিতার পিণ্ডি চটকে প্রকাশ করে। কেউকেটা নয় বলে অপছন্দসই সম্পাদনাও মাথা পেতে নেয়। আর শ্রীতমার গল্পের প্রতি উচ্ছ্বাস দেখিয়েও গৗরবদার যা মেজাজ। খোঁজ নিলেই বলেন, তাড়া থাকলে লেখা তুলে নাও।

শ্যামের বাঁশি। দেবপ্রিয় ল্যান্ডলাইন থেকে ফোন করছে।

‘তাহলে শনিবার আসছেন তো।’

মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল, ‘ফোনটা ড্রিম শেয়ার করছে না দেবপ্রিয় করছে?’

‘দু জনেই। কাজ তো আছেই। প্রেমটাও আছে।’

‘….আসলে আমি একটা ট্রাভেলগ লিখছি। সিকিম ভ্রমণের ওপর। কাশ্মীর দর্শন তো রসাতলে গেল। লেখাটা রবিবারের মধ্যে শেষ করতে হবে, মানে শনিবার বেরোলে অসুবিধা–’

‘আচ্ছা, আপনি লেখার বাইরে কিছু ভাবতে পারেন না, না? আমায় দেখতে ইচ্ছা করে না? আর আপনি কমিট করাতেই কিন্তু অ্যাডটা নিয়ে এগিয়েছি।’

লোকটা নিজের টপিক থেকে সরছে না। একটু চুপ করে থেকে শ্রীতমা বলল, ‘যেতে পারি। কিন্তু বেশিক্ষণ বসব না। কলেজ স্ট্রিটে যেতেই হবে।’

লেখার প্রবাহ ঝিমিয়ে গেল। যেচে বিপদ ডেকে আনছে না তো। উদ্ভবকে জানাতে হবে। একটা ছোটো পত্রিকায় শ্রীতমার খাতিরে দেবপ্রিয় একটা বিজ্ঞাপন দেওয়ার পর উদ্ভব ঠাট্টা করেছিল, দেবপ্রিয় দামকে বিয়ে করলে তোমার বেশ সুবিধা হতো। কিন্তু ইদানীং রাত বিরেতে ফোন এলে বিরক্তি চাপা থাকে না। এতদিন পরস্পরের অনুরাগী বা অনুরাগিনীদের নিয়ে দুজনে খোঁচাহীন নির্দোষ রসিকতাই করে এসেছে। মাঝে মাঝে শ্রীতমাই কপট সন্দহের ভান করে। বারো বছরের দাম্পত্যে কোনও দিন তৃতীয় ব্যক্তি বা সন্দেহের মতো বিষয় দানা বাঁধেনি। এখন সাহিত্যিক পরিচিতি লিপ্সার অপরাধে কি সিনেমা সিরিয়ালে এই বহু ব্যবহূত ক্লিশে বিষয়টার অনুপ্রবেশ ঘটছে? শ্রীতমার একটাই জোরের জায়গা সে বরকে কিছুই গোপন করে না। নিজের পুরোনো কিছু একতরফা অন্ভুূতির কথা লুকোয়নি। কেউ বিরক্ত করলে তো নয়ই। কিন্তু কিছু পাবার আশায় এভাবে? ঠিক পাওয়ার আশাও নয়, যেহেতু একটু সহযোগিতা পেয়েছে তাই সম্পূর্ণ এড়িয়ে যেতেও ভদ্রতায় বাধছে। নাঃ! পানি না ছুঁয়ে মাছ ধরার খেলা ওর জন্য নয়।

মা কিচ্ছু খাচ্ছে না। শরীর ভয়ানক দুর্বল। অন্যের হাতের রান্না পছন্দ না হলেও উপায় নেই। এই অনশনে শরীর আরও বিগড়োলে কে দায়িত্ব নেবে? বাবা? থাক, তার কথা না বলাই ভালো। একেই সারাটা দিন অস্বস্তি আর উশখুশানির মধ্যে কাটছে। দুপুরে মেয়ে স্কুল থেকে ফিরলে তাকে খাইয়ে দাইয়ে স্নান করিয়ে বুকে জড়িয়ে শুয়ে থাকাটা শ্রীতমার ভীষণ প্রিয় ব্যাপার। অনেক অশান্তি অতৃপ্তির উপশম ঘটে বুকের ওপর ছোট্ট হাতের স্পর্শে, পেটে তুলে দেওয়া আলতো পায়ের চাপে। আজ যে এতেও স্বস্তি হচ্ছে না। খানিকক্ষণ আদর করল। ঘাড়ে মুখ গুঁজে ‘বুজকু-বুজকু, মাম্মাম্ মাম্মাম্’ গন্ধ নিল। তবুও না।

বাড়ির যা অবস্থা দুই শোবার ঘর বিশিষ্ট ফ্ল্যাটে বরের সঙ্গে দুটো কথা বলারও অবকাশ ঘটছে না। ডাক্তার, ওষুধ, টেস্ট-রিপোর্ট, মেডিক্লেম, আয়া, ঝি, রাঁধুনি এসবের ফাঁকে কাজুর পড়া, ইউনিট টেস্ট, উদ্ভবের অফিসে আবার ট্রান্সফারের গুঞ্জন। বেশ হয় কলকাতার বাইরে বদলি হলে। যে নগরটিকে নিজের কেরিয়ার, সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য একদা গন্তব্য আর বর্তমানে আশ্রয় করেছে, সেখান থেকে পালিয়ে যেতে ইচ্ছা করছে। লেখালিখির জগতে সেরা রাজনীতিকরা বিরাজমান। পৃষ্ঠ দংশন, লেঙ্গি মারা, ঈর্ষা, হরেক কিসিমের নোংরামি। এসবের মধ্যে টিঁকে থাকার চামড়া বা কৗশল কোনওটাই শ্রীতমার নেই। আবার এমন বিরাট মাপের প্রতিভাও ও নয়, যে পর্বত সরিয়ে জায়গা করে নেবে। আর এত দৌড়েই বা কী হবে? পারবে সুনীল, শীর্ষেন্দু, সুচিত্রাদের মতো বছরে ডজন ডজন গল্প, সাত আটখানা করে উপন্যাস, ছোটোদের গোয়েন্দা কাহিনি লিখতে, যদি তেমন বরাত পায়ও? আসলে পারবে না ভাবলেই কান্না পায়।

উদ্ভব আজকাল শ্রীতমার দেহের ভাষা খেয়াল করে না। একটা ভালো মতো চটকাই মটকাই দিলেই পাগলি বউটা শান্ত হয়ে যায়, ভালো করেই জানে। তবু কেন যে না দেখার ভান করছে? আগে বউয়ের সামান্যতম ভাবান্তরও ওর নজর এড়াত না। কোনও দিন কোনও কথায় আহত হলে শ্রীতমা যতই স্বাভাবিক ব্যবহার করুক, ও যে রাগ করে আছে এটা ইঙ্গিতেও প্রকাশ করতে হতো না। এখন ওর চূড়ান্ত অস্থিরতা, বিরক্তি কোনওটাই যেন চোখে পড়ছে না। উদ্ভবের মতো মানুষ বছরের পর বছর পারে নিস্পৃহ থাকতে। শ্রীতমা এগিয়ে না গেলে এমনটাই চলতে থাকবে কোনও সুস্পষ্ট কারণ ছাড়াই। ঘুমের মধ্যে কখনও স্ত্রী-র ঘনিষ্ঠ হবার অনীহা প্রকাশ পেলে মাসের পর মাস আর কাছে আসে না। এখন তো বাড়ি ভর্তি মানুষ। পালানোর অনেক পরিসর। কিন্তু শ্রীতমার যে আদর ছাড়াও আশ্রয় দরকার এই সংকটে।

উদ্ভব অফিস থেকে ফিরেছে। মাকে আজকাল ডিভানে খানিকটা ঠেকের ব্যবস্থা করে দিলে সন্ধে বেলায় টিভি দেখতে পারে। বাবার দখলে রিমোট থাকে। তাই নিয়ে এক দিকে স্ত্রী আর এক দিকে নাতনিকে যুঝে চলে। গ্লোকোমা আক্রান্ত চোখ দিয়ে একটা মানুষ এত টিভিই বা দেখে কী করে, আর এত বই-ই বা পড়ে কী করে? শ্রীতমা বরকে ছোটো ঘরটায় ডাকল, ‘শোনো।’

‘কী?’

‘তুমি তো এখন আমার সাথে কথা বলার সময়ই পাও না। গলা ধরে এল।’

উদ্ভবের ভাবান্তর নেই।

‘ওই দেবপ্রিয় দাম। …এতদিন তো বেশ নিঃস্বার্থ হিতৈষীই মনে হচ্ছিল। এখন দুটো লেখা দুটো পত্রিকায় পাঠিয়েই গলার সুর বদলে গেছে। তাও তো রবিবারের ‘হট্টমেলা’ থেকে পরমার্থ সেনের কাছে ঠোক্বর খেয়ে তো ছড়াটা বাউন্সই করেছে। ‘বাল্যবন্ধু’-তে’ পাঠানো গল্পটাও এখন দেনা পাওনায় আটকে যেতে পারে। চোখ দিয়ে কয়েক ফোঁটা নেমে এল।

‘পৃথিবীতে একশো জনের মধ্যে নববইজন পুরুষ মেয়েদের একই রকম নজরে দেখে। তুমি যদি বোকা সেজে থাকো আমার কী করার আছে? তুমি কম্প্রোমাইজ করে লেখিকা হতে চাও না নিজের জোরে, সেটা নিজেই ঠিক করবে।’

‘একটা অ্যাডে কাস্ট করার কথাও বলছিল।’

‘তাহলে আর কী? যা ইচ্ছা করো। যে লোক রাত সাড়ে বারোটার সময় কোনও ভদ্রমহিলাকে ফোন করে গ্যাঁজায়, সে কী ধরনের মানুষ তা যদি তুমি এই চল্লিশ বছরেও না বোঝ, তাহলে কিছু বলার নেই।’

‘সারাদিন অন্য কাজে ব্যস্ত থাকে। তাছাড়া ফিল্ম লাইনের লোক। সারা রাত জেগে থাকাটাও স্বাভাবিক।’

‘তাহলে আমায় প্রশ্ন করছ কেন?’

‘আর কাকে করব?’

‘আমার উত্তর তো আমি দিয়েই দিয়েছি। জাস্ট যোগাযোগ রাখবে না। নম্বরটাই ডিলিট করে দাও। ফোন এলে রিসিভ কোরো না।’

‘বলছিল এই জুনেই বাল্যবন্ধু-তে বেরোবে। অন্য দিকে ‘সন্ধ্যাতারা’য় লেখা জমা দেওয়ার এক বছর পর চিঠিতে কনফার্ম করার পরেও সাত মাস পেরিয়ে গেল। শুনছি পুজো পর্যন্ত সব সংখ্যা তৈরি। তারপর ভূত-স্পেশাল। কবে আমার গল্প বেরোবে কোনও ঠিক নেই। লিটল ম্যাগগুলোতেও দলাদলি। ‘দিনকাল’-এ যে আমার গল্প ছাপল অজস্র ভুল করে, সেন্টেন্সগুলো পর্যন্ত এলোমেলো করে দিয়ে গল্পের বারোটা বাজিয়ে। বড়ো পত্রিকা বলে ওরা চাইলেই আমি আবার লেখা দিতে এক পায়ে খাড়া– এটা কম্প্রোমাইজ নয়? তাই এই লোকটাকে চটাতে পারছি না। লেখার কয়েকটা জায়গা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ইনফ্লুয়েন্শিয়াল…’

উদ্ভব উত্তর না দিয়ে স্নানঘরে চলে গেল।

শনিবার কলেজ স্ট্রিটের উদ্দেশে বাস ধরল। ট্রেন জার্নিটা ভিড়ের জন্য এড়াতেই চায়। তাছাড়া স্টেশনগুলোর চত্তরে বড়ো কটু গন্ধ। শহর ও শহরতলির সমস্ত রাস্তা ঘাটই অবশ্য পুরুষ মানুষের জল বিয়োগ ক্ষেত্র। এই গন্ধের জন্য হাঁটতে চলতে নাকে-মুখে কাপড় চাপা দিয়ে শ্বাস বন্ধ করে প্রাণায়াম করে যেতে হয়। সময় অনেক বেশি লাগলেও তাই বাসটাই ধরতে চায়। বেরোতে বেরোতে প্রায় তিনটে বেজে গেল। এখন বেহালা যাবার প্রশ্নই ওঠে না। ফোন।

‘আসছেন তো?’

‘দেরি হয়ে গেছে অনেক। সামনের সপ্তাহে না হয় উইক ডে দেখেই সময় করে যাব।’

‘নেচার কিওয়ের অ্যাডটাও তো ফাইনাল করা দরকার। পরের শনি নয়তো রবি শ্যুটিং। আজই ফাইনাল করে নিতাম।’

‘আ..চ্ছা। আমার কিন্তু দেরি হবে। আর যখন পৌঁছোব, তখন বসার সময় বেশি থাকবে না।’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ। মিনিট পনেরো থেকে আধ ঘণ্টার ডিসকাশন।’

‘আপনার অ্যাড দেওয়া ‘ক্রমাগত’টাও অবশ্য সঙ্গে রয়েছে।’

‘ওটা এমন কিছু না। আপনি আসুন।’

দোনোমনো করে শ্যামবাজারে নেমে মেট্রো ধরল। কালীঘাটে নামতে হবে। সেখান থেকে অটো বদলে বা টানা বাস পেলে বেহালা শখের বাজার। আজ কফি হাউসে যাওয়া খুব জরুরি ছিল। একটা পত্রিকা হাতে পাওয়ার কথা, আর দুটোতে লেখা দেওয়ার। আর শনিবার গেলে অনেকের সাথে দেখা হয়। লেখার পরিসর বাড়তে পারে। নিছক আড্ডা মারতে যাওয়ার তাগিদ নেই। তাছাড়া ওই মাছের বাজারকে মাত দেওয়া শোরগোলে গলা তুলে কথা বলায় কোনও সুখ নেই। কেউ কেউ অবশ্য এজন্য শ্রীতমাকে ধান্দাবাজ ইঙ্গিত করে।

শখের বাজারে নেমে অনেকটা হাঁটতে হয়। জেমস্ লং সরণি পেরিয়ে বাঁদিকে কিছুটা গলির ভেতর হাঁটলে, তবে মহাশয়ের বাড়ি তথা দফতর। হাঁটতে হাঁটতে মোবাইলে বার্তা আসার শব্দ পেল। মোবাইল কোম্পানির বা অন্য কোনও প্রমোশনাল মেসেজ হতে পারে। দেখা হল না। জৈষ্ঠের আকাশে আলো ম্লান হয়নি তখনও। আধ ঘণ্টার মধ্যে হয়ে গেলে কলেজ স্ট্রিটটাও ছুঁয়ে আসার চেষ্টা করবে।

গেট দিয়ে ঢুকে লম্বা প্যাসেজ পেরিয়ে দারোয়ানকে বলে সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় উঠতে হয়। অফিসের রিসেপশনের মতো জায়গাটা ফাঁকাই দেখেছে এযাবত। ভেতরের ঘরে বসে মালিক। দারোয়ান দোতলার অফিসের বাইরের ঘরে শ্রীতমাকে বসিয়ে তিনতলা গিয়ে ফিরে এসে বলল, ‘স্যার চান করছেন। এক ঘণ্টা বসতে হবে।’

পাঁচবার ফোন করে ডেকে এনে এ কী রসিকতা! ফোন বার করে দেখল রাস্তায় আসা মেসেজটা দেবপ্রিয়ই করেছে। সেটা না পড়ে অসহিষ্ণু ভাবে ফোন করল। দূর! বাথরুমে গেলে কি মোবাইল ধরতে পারবে? অবশ্য বাড়ির লোক ধরতে পারে। কাটতে যাচ্ছিল। ওপাশ থেকে পরিচিত গলা, ‘হ্যালো। কোথায়?’

‘আপনার অফিসে। কিন্তু আমাকে ডেকে আপনি এখন কী করছেন?’

‘স্নান করছি। মিনিট পনেরো কুড়ি বসুন।’

‘আমার তাড়া আছে। এমনিতেই দেরি হয়ে গেছে।’

লাইন কেটে মেসেজটা পড়ল। ‘আজ আমার আঙুল আর ঠোঁট– আদরে পাগল করে দেবে ঠিক তো?’

চড়াং! কাজের দোহাই দিয়ে ডেকে এনে বাথরুম থেকে পরনারীকে এই বার্তা? এরপর বসে থাকার একটাই অর্থ হয়। তরতর করে নীচে গিয়ে দারোয়ানকে বলল শ্রীতমা, ‘আমায় বেরিয়ে যেতে হবে। একটা বই আপনার স্যারের জন্য রেখে যাচ্ছি। এক টুকরো কাগজ দিতে পারবেন? চিঠি লিখে দিয়ে যাব।’

কাঁপা হাতে নোটপ্যাডের পাতায় লিখল, ‘দেবপ্রিয়বাবু, আজ আমার পক্ষে অপেক্ষা করা আর সম্ভব হল না। ‘ক্রমাগত’র কপি রেখে গেলাম। আপনার সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ। এসএমএসটা আমার সঙ্গে রইল।’

এর আগের বার্তাগুলো মুছে ফেলেছে। এটাকে না মুছে একটা ফোল্ডারে সেভ করে রাখবে। ভাগ্যিস লোকটা স্নানে ঢুকেছে। উর্দ্ধ্বশ্বাসে ছুটল ডায়মন্ড হারবার রোডের দিকে। বড়ো রাস্তায় পৗঁছেই একটা ডাবের খোলায় হোঁচট খেয়ে সপাটে আছাড়। সর্বনাশ! বাড়ির এই অবস্থায় ওরও কিছু হলে আর দেখতে হবে না। বাঁ হাতের কবজির ষন্ত্রণায় প্রথমটায় খেয়াল করেনি তালুটাও সামান্য ছড়ে গেছে।

সাড়ে ছটা। এখন আর কফিহাউস নয়। সোজা বাড়ি। সামনে যে বাস এল তাতেই চড়ে পড়ল। শিয়ালদা যাচ্ছে। ভালোই।

বাসে পরের স্টপেই জায়গা পেল মহিলা সিটে। তবে জানলার দিকে নয়। বসতে না বসতেই আবার চলভাষে সুরধবনি। কাঁপা হাতে ফোন ধরে যথাসম্ভব ঠান্ডা গলায় বলল, ‘বলুন।’

‘কী বলি বলুন তো। কীভাবে স্যরি বলব?’

‘বলতে হবে না। শুধু বুঝুন বেকারদের সময়ও দামি। আর স্যরি যদি বলতেই হয়, আপনার মেসেজটার জন্য বলুন।’

‘মেসেজ মানে? ওহ্! হো হো হো! এই ব্যাপার? হঠাৎ এত সিরিয়াস হয়ে গেলেন? এতদিন তো…’

‘এতদিন কী? আপনার রসিকতাকে রসিকতা হিসাবেই দেখেছি।…’

‘এভাবে পৃথিবীর সাথে মানাবেন কী করে? সুমনের একটা গান আছে, …। আমার নিজেরও একটা কবিতা আছে, শুনবেন…’

‘…নিজের ই-ইল্লিসিট ইচ্ছাকে …র-র্যাশনালাইজ করার জন্য হাজারটা উদ্ধৃতি দেওয়া যায়। আর নেচার কিওর অ্যাডটার জন্য বোধহয় আমাকে আর দরকার লাগবে না।’

‘ওটার জন্য তো আপনার সিলেকশন হয়েই আছে। আপনি এখন নিজে রাজি না থাকলে–’

‘প্রফেশনালি কাজ তো হবার নয়।’

‘আপনি চাইলেই হতে পারে।’

ছিছিঃ! শ্রীতমা এখনও লোকটার মুখের ওপর উচিত কথা না শুনিয়ে নিজেকে খেলো করে যাচ্ছে? নিজের লেখায় যে এত আপসহীন, এত সাহসী, এত অকপট, লেখাগুলোর প্রতি অপত্যস্নেহে সেই মানুষ এত দুর্বল? দেবপ্রিয় দামের কত বড়ো হাত?

‘চুপ করে আছেন যে?’

‘আপনার সঙ্গে এখনও কথা বলছি, ইজন্ট ইট স্ট্রেঞ্জ? সুরেন্দ্র নস্করের কাছেও কি একই এক্সপেক্টেশন রাখেন?’

কী জবাব এল বোঝা গেল না বাসের আওয়াজে। বোধহয় সুরেন্দ্র আর শ্রীতমা এক নয় সেটাই বোঝাতে চাইল।

‘ওই ভদ্রলোক আপনার বন্ধু। তিনি ভাগ্যবান। বিকজ ইউ আর নট আ গে আই থিংক। আমাকে বন্ধু ভাবতে পারলেন না। গিভ এ্যান্ড টেক চলে এল। আমি দেখতে ভালো, এটা কি আমার দোষ?’

‘ও হো হো হো। আচ্ছা, আপনি সুন্দর কে বলেছে? কতজন বলেছে?’

মনে হল সপাটে গালে চড় পড়ল। দাঁত চিপে বলল, ‘অনেকেই। আর একজন মিথ্যুক তো অনেকবার বলেছে।

আবার হাসি, উপদেশ। খেলো মেলোড্রামা ভরা স্থূল বার্তা পাঠিয়ে এখন এমন ভাবে হাসছে যেন শ্রীতমার মতো অপরিণত মেয়ে আর হয় না। এখনও কেন লোকটাকে বাজে বকার সুযোগ দিয়ে যাচ্ছে? কেন গল্প, উপন্যাসের নায়িকাদের মতো, সিদ্ধান্তহীনতায় না ভোগা ঋজু চরিত্রের মানুষের মতো কড়া কথা বলে ফোন কেটে দিতে পারছে না? অ্যাড ফিল্ম না বাল্যবন্ধু পত্রিকা? দুটোই তো গেল। নাকি নিজের বোকার মতো বিশ্বাসের মর্যাদা রাখার মরিয়া চেষ্টা, বন্ধুত্বের লোভ?

কথা যখন শেষ হল তখন খেয়াল করল, তার ডান কাঁধে ভর দিয়ে তার গোপন অঙ্গটিকে একরকম শ্রীতমার কাঁধে চেপে ধরে জুত করে একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে। শ্রীতমা ফোন কেটে সচকিত হতেই জানোয়ারটা ঝট্ করে সরে গেল।

‘ইতর কোথাকার! কেটে ফেলতে হয়! বাসে কী এমন ভিড় যে ঠিকভাবে দাঁড়ানো যায় না?’

ঘেন্নায় অপমানে উদ্গত অশ্রু সামলাতে গিয়ে গলা কন্কন্ করে উঠল। শ্রীতমা সত্যিই অপরিণত। তার বয়সি মহিলাদের সাথে বাসে ট্রেনে এমন বজ্জাতি করার সাহস চট্ করে দেখানো যায় না। ও একাই চেঁচিয়ে গেল। বাসে কেউ কিছু বলল না। কন্ডাক্টর বোবা।

দেবপ্রিয়র প্রতি আর কোনও বিদ্বেষ নেই। বাসের এই নরকের কীটটা দেবপ্রিয়র মতো বুকে পেটে চুমু খাওয়ার আবেদন করেনি। সুযোগ বুঝে নিজের নোংরা প্রত্যঙ্গটা ওর কাঁধে ঠেকিয়ে দিয়েছে। পোশাকের আবরণ সত্ত্বেও ঘেন্না আর রাগে গা রিরি করছে।

যে মানুষটা দু বছরের পরিচয়ের ভিত্তিতে শ্রীতমাকে ছোঁয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল, হয়তো মতলবই করেছিল, সে তো স্নান করে পরিষ্কার হয়ে তৈরি হচ্ছিল অভিসারের জন্য। নৈতিকতার খাতিরে তার কাছ থেকে সব সহযোগিতার রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে এসে ভাগ্যের কাছে কী প্রতিদান পেল?

অন্ধকার হয়ে এসেছে। বাসের জানলা দিয়ে ভেসে আসা উন্মুক্ত পুরুষ ইউরিনালের গা গোলানো দূষিত গন্ধ নাকে মুখে ঝাপটা মারছে অনুমতির তোয়াক্বা না করে।

আপনার শিশু সঠিক পুষ্টি পাচ্ছে তো?

শিশুর ১ বছর বয়স হলে তাকে একটু একটু করে শক্ত খাবার দেওয়া শুরু করুন৷ সমস্ত কিছু মুখে রাখার প্রাকৃতিক কৌতূহল, বাচ্চাকে নতুন খাবারে অভ্যস্থ করার সুযোগ দেয়৷ মা–কে সেই সুযোগেরই সদ্ব্যবহার করতে হবে৷

নতুন বাবা বা মা হিসাবে আপনার সন্তানের বড়ো হওয়ার সাথে সাথে, খাবারের মধ্যে কী কী থাকা দরকার, তার একটা স্পষ্ট ধারণা তৈরি করে নিন৷ প্রয়োজনে আপনার পেডিয়াট্রিশিয়ানের সাহায্য নিন।

মনে রাখবেন, শিশুদের নিউট্রিশন-ও বড়োদের মতোই ভিটামিন, খনিজ পদার্থ, কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন ও ফ্যাট সমৃদ্ধ হওয়া উচিত। তবে একটা জিনিস খেয়াল রাখা জরুরি, এই সমস্ত উপাদানের পরিমাণ বয়স অনুযায়ী আলাদা হওয়া বাঞ্ছনীয়। কারণ শিশুর বাড়বৃদ্ধির সঙ্গে এগুলি সরাসরি সম্পর্কিত।

৩ মাস থেকে আপনার বাচ্চার ডায়েটে শাকসবজি রাখুন৷ তাকে এগুলির স্বাদে অভ্যস্ত করতে এবং খাবারের প্যালেট প্রশস্ত করতে এগুলি দেওয়া উপকার।ফল খাওয়ানো প্রোয়োজন৷ফলের মন্ড বা পিউরি তৈরি করা সহজ, খাওয়া সহজ এবং সর্বোপরি প্রচুর পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ, যা শিশুদের সার্বিক বিকাশে সহায়তা করে। কিন্তু যদি প্রতিদিন একই ধরনের ফলের মন্ড বা পিউরি বাচ্চাকে পরিবেশন করেন, বাচ্চা রেগে যাবে ও বিরক্ত হবে। তাই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নানা রকমের ফল দিন৷

সঠিক বৃদ্ধি এবং বিকাশের জন্য আয়রন একটি প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান। এটি ফুসফুস থেকে শরীরের অন্যান্য অংশ ও পেশীগুলিকে অক্সিজেন সংরক্ষণে সহায়তা করে৷ এর ফলে শরীরের ক্রিয়াকলাপ সঠিক ভাবে হয়। মূলত, আয়রন স্বাস্থ্যকর রক্তের প্রধান উপাদান৷ আয়রনের অভাব রক্তাল্পতার কারণ হতে পারে, যা সন্তানের দেহের মূল কার্যগুলিকে প্রভাবিত করে।

বাচ্চাদের ডায়েট-এ শাকসবজি প্রবর্তনের সর্বোত্তম উপায় হল সবজি দিয়ে তৈরি সুপ দিয়ে শুরু করা। শিশুর বন্ধ নাক পরিষ্কার করা থেকে,  স্বাদকোরকগুলিকে উত্তেজিত করা—সুপ এমন প্রচুর উপকারে লাগে।সুপে থাকা জল আপনার সন্তানের দেহে প্রয়োজনীয় তরল সরবরাহ করে। সুপে থাকা শাকসবজিগুলি ছেঁকে শুধু তরল আকারে খাওয়াতে পারেন৷ আবার পিউরি তৈরি করেও খাওয়াতে পারেন৷ এটি তার হজমে সহায়তা করে। যদি আপনার শিশুটি সর্দি-কাশিতে ভোগে, তবে সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য আপনি ভিটামিন সি সমৃদ্ধ শাকসবজি দিয়ে তৈরি এক বাটি উষ্ণ সুপ দিন৷

শিশুর পক্ষে উপকারা খাবার হল দালিয়া বা ডালিয়া৷ যদিও ডালিয়া নামেই এই খাবারটি সারা দেশে পরিচিত, এর সঠিক উপকরণটি হল ভাঙা গম বা ফাটানো গম। বিভিন্ন দেশে যব এবং ভুট্টার মতো বিভিন্ন শস্যের মতো, এই শস্যও ব্যবহৃত হয়। ভারতের বেশিরভাগ অঞ্চলে গম থেকে তৈরি ডালিয়া বিভিন্ন উপায়ে ব্যবহার করা হয়। বড়ো হওয়া বাচ্চাদের জন্য সাধারণত যে-ডালিয়া তৈরি করা হয়, তা ঘন ও সবজি সমেত পরিবেশিত হয়৷সবেমাত্র কঠিন খাবার খাওয়া শুরু করা শিশুদের জন্য ডালিয়া পাতলা করে খাওয়া হয়, ফলে এটি হজম করা শিশুদের পক্ষে সহজ হয়।

বছরের শিশুদের খাবারের কিছু পরামর্শ

প্রোটিন : সি ফুড, পোলট্রি চিকেন, ডিম, বিন, চর্বিবিহীন পাঁঠার মাংস, নানা ধরনের ছোলা-মটর-সোয়াবিন, বাদাম বা অন্যান্য বীজ, ডায়েট-এ রাখা জরুরি।

ফল : বাচ্চাকে গোটা ফল, কামড়ে খাওয়ার অভ্যাস করান। ফ্রোজেন জুস-এর তুলনায় এটা অনেক বেশি উপকারী। যদি ক্যানড জুস খাওয়াতেই হয়, খেয়াল রাখুন তাতে যেন অ্যাডেড সুগার-এর পরিমাণ কম থাকে।

সবজি : স্টু বা স্যালাড যে-কোনও ফর্ম-এ সবজি অবশ্যই শিশুর ডায়েট-এ রাখুন। যদি ক্যানড সবজি কেনেন, তাহলে অবশ্যই দেখবেন যেন তাতে সোডিয়ামের মাত্রা কম থাকে।

দানাশস্য : হোল গ্রেইন, যেমন হুইট ব্রেড, ওটমিল, পপকর্ন এগুলি বাচ্চাকে অবশ্যই দেবেন। হোয়াইট ব্রেড, পাস্তা এড়িয়ে যাওয়াই ভালো।

ডেয়ারি : ফ্যাট ফ্রি বা লো ফ্যাট ডেয়ারি প্রোডাক্ট যেমন দুধ, ইয়োগার্ট, চিজ বা সোয়া মিল্ক শিশুকে খাওয়াতে পারেন। ফুল ফ্যাট ডেয়ারি প্রোডাক্ট-এ প্রচুর স্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকে, যেটা শরীরে যাওয়া ঠিক নয়। ভেজিটেবল বা নাট অয়েল-এ রান্না করা খাবার শিশুকে খাওয়ান, এতে তার খাবার হজম করতে সুবিধা হবে।

মনে রাখবেন অল্প বয়স্ক শিশুদের হজম শক্তি দুর্বল৷তাই যে-খাবারগুলি তাদের তন্ত্রের সাথে খাপ খায় না, তা দেহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে৷  বিভিন্ন খাবারে অ্যালার্জির সমস্যাও হয়৷ তাই বাচ্চার পুষ্টির দিকটা যেমন মাথায় রাখছেন, তেমনি এই বিষয়গুলিও অবহেলা করলে চলবে না৷

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব