লাইফ সিক্রেট ইন গ্রিন-টি

সকাল থেকে শুরু করে রাত অবধি চা খেয়ে থাকেন অনেকে। চা খেলে শরীর ও মন চাঙ্গা থাকে। আর চা যদি পান করতেই হয়, তবে খেতে পারেন গ্রিন-টি। এই গ্রিন-টি দিয়ে শুরু করতে পারেন আপনার দিনের সকাল।

চা গাছের সবুজ পাতাই মূলত গ্রিন-টি। বিশেষ ভাবে প্রক্রিয়াজাত করে শুকিয়ে ব্যবহার করা হয় এই চা। স্বাদে তেতো হলেও পুষ্টিগুণে ভরপুর এই চা। সবুজ চায়ে রয়েছে ভিটামিন এ, ই ও সি। আরও আছে ক্যালসিয়াম,ম্যাগনেসিয়াম ছাড়াও বিভিন্ন মিনারেল। আসুন জেনে নেওয়া যাক, নিয়মিত সবুজ চা পানে কী বিস্ময়কর ভাবে উপকৃত হয় আপনার শরীর৷

সাধারণত বাগান থেকে চাপাতা তোলার পর কীভাবে তা প্রক্রিয়াকরণ করা হচ্ছে, তার ওপরই চায়ের ধরন ও গুণাগুণ নির্ভর করে। যত কম প্রক্রিয়াকরণ হবে, চায়ের গুণাগুন তত বেশি বজায় থাকবে।

গ্রিন-টি 

চা পানের পরই সব ক্লান্তি চলে যায়, বেশ সতেজ লাগে। চায়ে থাকা উপাদান ক্যাটেচিনের কারণেই এমন সুখানুভূতি প্রকাশ পায়। চায়ে মূলত তিনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ উপাদান থাকে, যা শরীরের জন্য উপকারী। আইসোফ্লাভন, পলিফেনল ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট।

গ্রিন-টি সবচেয়ে কম প্রক্রিয়াকরণ করা হয়। তাই সবুজপাতা অনেকটা সবুজ থাকে। ফলে এই চায়ে সবচেয়ে বেশি গুণ রয়েছে। দিনে ২ কাপ গ্রিন-টি পান করাই যায়। এই চা শরীরের রক্ত চলাচল বাড়িয়ে শরীরকে সতেজ ও ঝরঝরে করে তোলে এবং অতিরিক্ত ওজন কমায়।

সকালে গ্রিন-টি পানের উপকারিতা

১. এটি অ্যান্টি কার্সিনোজেনিক৷ অর্থাত গ্রিন-টিতে থাকা অ্যাপিক্যাটেচিন, অ্যাপিগ্যালোক্যাটেচিন-৩ উপাদান, শরীরে ক্যান্সার প্রতিরোধ করে।

২. এই চা পান করলে ইনসুলিন রেজিট্যান্স কমে আর ইনস্যুলিন সেনসিটিভিটি বাড়িয়ে দেয়, ফলে অল্প ইনস্যুলিনেই বেশি কাজ হয়।ফলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকে।

৩. ‘ইউরোপিয়ান জার্নাল অফ নিউট্রিশন’ অনুযায়ী মুখের  দুর্গন্ধ, দাঁত বা মাড়ির যেকোনো রকম সমস্যা থাকলে গ্রিন টি খেতে পারেন। ওরাল হাইজিন বজায় থাকবে৷

৪. এই চায়ে উপস্থিত ক্যাটেচিন ও পলিফেনল হরমোন নিয়ন্ত্রণ করে এবং চায়ে বিদ্যমান অ্যাপিগ্যালোক্যাটেচিন গ্যালাট নামক একটি যৌগিক পদার্থ চুল গজাতেও সাহায্য করে।

৫. অ্যান্টি এজিং এর দাত থেকে বাঁচা? গ্রিন- টি৷ এর পলিফেনল বয়স ধরে রাখতে সাহায্য করে। ত্বকের ঔজ্জ্বল্য বাড়ায় ও স্নায়ুর ক্ষতি রোধ করে।

৬. শরীরে উচ্চ রক্তচাপ বৃদ্ধিকারী হরমোনকে নিয়ন্ত্রণে রেখে রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখে৷

সুস্বাদু গ্রিন-টি বানাতে

উপকরণ – একটি গ্রিন-টি ব্যাগ,এক কাপ ফুটন্ত গরম জল, এক-দুই চা চামচ অ্যাপল সাইডার ভিনেগার, দুই চা চামচ লেবুর রস, এক চা চামচ মধু, আধ চা চামচ আদাকুচি৷

প্রণালী– গরম জলে টি ব্যাগ দু মিনিট ভিজিয়ে রাখতে হবে। চায়ের রঙ বেরিয়ে এলে, এতে একে একে সমস্ত উপাদান মিশিয়ে, ভালোভাবে নেড়ে নিন৷  তৈরি আপনার পারফেক্ট সুস্বাদু গ্রিন-টি।

বাচ্চাকে শেখান ভালো অভ্যাস

ছোটো থেকেই বাচ্চাকে ভালো ব্যবহার এবং অভ্যাস শেখানো উচিত অভিভাবকদের। শৈশবে শিশু যা শেখে, বড়ো হয়ে তার ব্যবহারে সেগুলোই দৈনন্দিন প্রতিফলিত হয়। কী শেখাবেন, কেন শেখাবেন আসুন জেনে নেওয়া যাক।

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস

 ছোটোবেলায় বাচ্চাকে যা শেখানো হবে, বড়ো হয়ে সেটাই তার অভ্যাসে পরিণত হবে। তাই শিশুর শৈশবের দিনগুলো থেকেই তার মধ্যে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস গড়ে তোলা খুব জরুরি। নীচের অভ্যাসগুলির সঙ্গে বাচ্চাদের পরিচয় করিয়ে পরিচ্ছন্নতার প্রতি তাদের সজাগ করে তুলতে পারেন।

১) হাতমুখ ধোওয়া দিয়ে বাচ্চাদের দিন শুরু করতে শেখান।

২) ২ থেকে ৩ মিনিট ঠিক ভাবে নিজের দাঁত ব্রাশ করতে বলুন যাতে শিশুর দাঁত ক্যাভিটিমুক্ত থাকে। দিনে অন্তত ২ বার ব্রাশ করার অভ্যাস করান।

৩) বাচ্চাকে নখ ছোটো রাখতে বলুন কারণ বড়ো নখে নোংরা জমে। এই নোংরা থেকেই সংক্রমণের ভয় থাকে।

৪) সর্দি-কাশি হলে বা হাঁচি পেলে রুমাল বা টিস্যু পেপার মুখ এবং নাকের উপর যাতে ধরে, সেই অভ্যাস বাচ্চার মধ্যে গড়ে তুলুন।

৫) কাচা এবং ইস্তিরি করা পোশাক পরার অভ্যাস করান।

৬) নোংরা বা বর্জ্য পদার্থ ডাস্টবিনে ফেলার অভ্যাস করান।

৭) অভিভাবকদের বাচ্চাকে বোঝানো উচিত, নিজেকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার সঙ্গে সঙ্গে নিজের ঘর, ঘরের আশপাশ এবং যে-লোকালিটিতে থাকে সেটা পরিষ্কার রাখাও তার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

৮) বাচ্চাকে নিজের জিনিস যেমন খেলনা, বই ইত্যাদি সঠিক জায়গায় রাখার শিক্ষা দিতে হবে।

৯) পেনসিল, পেন, রাবার, আঙুল ইত্যাদি যেন নাক বা মুখের ভিতর না ঢোকায় সেটাও বাচ্চাকে শেখাতে হবে।

১০) বাচ্চাকে শেখান রাস্তায় বেরিয়ে কোথাও যেন নোংরা না ফেলে। বাইরে যাওয়ার সময় একটা পেপার ব্যাগ নিয়ে যেতে বলুন যাতে রাস্তায় নোংরা ফেলতে না হয়।

শুরু করুন বাড়ি থেকে

 বাড়ি থেকেই বাচ্চাদের অভ্যাস তৈরি করাটা খুব দরকার। অনেক বাচ্চাই খাওয়ার সময় মুখে আওয়াজ করে খায়। কেউ কেউ ন্যাপকিন এবং নাইফ-এর ব্যবহার ঠিকমতো জানে না। সামাজিক কোনও অনুষ্ঠানে অথবা রেস্তোরাঁয় খেতে গেলে, বাচ্চাকে টেবিল ম্যানার্স শেখানো খুবই দরকার। কীভাবে বসবে, খাবে ইত্যাদি শিষ্টাচার বাড়ি থেকেই শেখানো শুরু করতে হবে।

বাড়ির বাইরে গিয়ে যাতে সকলের সঙ্গে খেতে বসে বাচ্চার অসুবিধা না হয়, তার জন্য আগে থেকেই টেবিল ম্যানার্স বাড়িতেই প্রাক্টিস করানো দরকার। যদি বাচ্চা কারও বাড়ি গিয়ে অথবা রেস্তোরাঁয় খেতে গিয়ে কোনওরকম ভুল করে ফেলে, সেই মুহূর্তে ওখানে বকাবকি না করে, বাড়ি ফিরে এসে ভালো করে ধীরেসুস্থে বুঝিয়ে বলুন।

ছোটো থেকেই যদি বাচ্চার টেবিল ম্যানার্স-এর অভ্যাস হয়ে যায় তাহলে বড়ো হয়ে যে-কোনওরকম সোশ্যাল গ্যাদারিং-এ তার আত্মবিশ্বাস অটুট থাকবে।

১) টেবিল ম্যানার্স-এ প্রথমেই শেখান খেতে বসে অল্প করে খাবার তুলে মুখে দিতে এবং ভালো করে খাবার চিবোতে। মুখ বন্ধ করে খাবার চিবোতে বলুন যাতে আওয়াজ না হয়। জল খেতে গিয়েও যেন আওয়াজ না হয়। এই অভ্যাসও করান, সে যতটুকু খেতে পারবে ততটুকুই প্লেটে যেন নেয়, যাতে অযথা খাবার নষ্ট না হয়। প্রয়োজন হলে পরে আবার নিতে বলুন।

২) কোন বাসনে খাবে সেটাও বাচ্চাকে ছোটো থেকেই শেখাবার প্রয়াস করুন। যেমন স্যুপের জন্য বড়ো চামচ এবং ডেসার্টের জন্য ছোটো চামচের ব্যবহার, গ্রেভি-যুক্ত খাবারের জন্য বাটির ব্যবহার ইত্যাদি। বাচ্চাকে এও শেখান কারও তৈরি খাবার ভালো লাগলে, যে খাবারটি তৈরি করেছে তার প্রশংসা করতে। খাবার ভালো না লাগলে খারাপ করে না বলে বিনম্রভাবে তাকে জানানো যে ওর ওই খাবারটি ভালো লাগেনি।

৩) নিজের বাড়িতে অথবা কারও বাড়িতে খেতে গেলে, খাওয়ার শেষে নিজের এঁটো প্লেট তুলে নিয়ে সিংক-এ রাখতে শেখান।

৪) রেস্তোরাঁয় গিয়ে ন্যাপকিনের ব্যবহার শেখান যাতে হাত এবং মুখ মুছতে অসুবিধা না হয়। টেবিলে বসে এমন ভাবে হাত রাখা উচিত যাতে পাশে বসা ব্যক্তির অসুবিধা না হয়।

৫) খেতে বসে কথা যেন না বলে, সেটার শিক্ষাও ছোটো থেকেই দেওয়া উচিত। খাবারের সময় বিভিন্ন কাটলারির ব্যবহার বাচ্চা কী করে করবে, সেটাও বাড়িতেই শেখান যেমন নাইফ ডানহাতে এবং ফোর্ক বাঁহাতে ধরতে হয়, এঁটো হাত দিয়ে গেলাস না ধরে, খাওয়ার পর গেলাসের জল দিয়ে হাত না ধোয় ইত্যাদি। এছাড়াও খাবার খাওয়া শেষ হয়ে গেলে, যতক্ষণ না সবাই খেয়ে উঠছে ততক্ষণ সকলের সঙ্গে বসে থাকাটা ম্যানার্স, এটাও বাচ্চাকে বুঝিয়ে বলতে হবে।

৬) ডাইনিং টেবিলে রাখা কোনও ডিশ খাওয়ার ইচ্ছে হলে পাশের ব্যক্তিকে ডিশটি পাস করতে বলতে শেখান। ডাইনিং টেবিলের উপর যেন উঠে না পড়ে খাবার প্লেটে নেবার জন্য।

বাচ্চা যদি খুব দুষ্টু হয় তাহলে পাবলিক প্লেস-এ নিয়ে গিয়ে অভিভাবকেরা অনেক সময় লজ্জায় পড়ে যান। প্রায়শই দেখা যায় খাওয়ার সময় এক জায়গায় না বসে, বাচ্চা এদিক-ওদিক দৌড়ে বেড়াচ্ছে। টেবিলে রাখা ক্রকারিতে হাত দিচ্ছে, টেবিলে রাখা জল উলটে ফেলছে, খাবার ফেলে দিচ্ছে। এর ফলে অন্যান্য অতিথিরাও সমস্যায় পড়েন। সুতরাং ছোটো থেকেই বাচ্চাকে ভালো অভ্যাসের সঙ্গে সঙ্গে টেবিল ম্যানার্সও শেখাতে থাকুন যাতে বাড়িতে বা বাইরে আপনাকে লজ্জার সম্মুখীন না হতে হয়।

কৌশল

হিসাবের খাতা দেখে চমকে উঠল সুজয়। এত বেশি খরচ! মাত্র এক মাসে যদি এত খরচ হয়, তাহলে তো রাজাও ভিখারি হয়ে যাবে। বিড়বিড় করতে করতে সুজয় হাত দিয়ে নিজের কপাল চাপড়াল।

গত এক-দু’মাস ধরে সুজয় লক্ষ্য করছে যে, যখন-তখন এটিএম থেকে টাকা তুলে নিয়ে আসছে নন্দিতা। আবার যখন এটিএম থেকে টাকা তুলে আনার সময় পাচ্ছে না, তখন সুজয়ের থেকে টাকা চেয়ে নিচ্ছে সে।

কিছুদিন আগে এই খরচের বিষযটাকে খুব বেশি গুরুত্ব দেয়নি সুজয়। কারণ, তখন সে ভাবত, নতুন বিয়ে সদ্য সংসার সামলাচ্ছে নন্দিতা, তাই হয়তো খরচে লাগাম টানতে পারছে না। তবে মজার বিষয় হল এই যে, সুজয়ের নিজেরও সংসার খরচের কোনও জ্ঞান ছিল না। কারণ, তাদের যৌথ পরিবারের বেশিরভাগ সংসার খরচ সামলাতেন সুজয়ের মা এবং বাবা। আর বেশি কিছু না জানার কারণে, সুজয়ও বিয়ের প্রথম দিকে তেমন কিছু বলত না নন্দিতাকে। কিন্তু লাগামছাড়া খরচ হতেই সুজয় দুঃশ্চিন্তায় পড়েছে। এখন ওর মনে প্রশ্ন, এত টাকা কোথায় খরচ করছে নন্দিতা?

কিছুদিন আগেই বিয়ে হয়েছে সুজয় এবং নন্দিতার। কানপুর বদলি হওয়ার পর প্রথম দুমাস তো খরচ মোটামুটি ঠিকই চলছিল। কিন্তু তারপর ধীরে ধীরে খরচ অনেক বেড়েছে বলে মনে হয়েছে সুজয়ের। তাই সে এ ব্যাপারে নন্দিতাকে সতর্কও করেছিল কিন্তু নন্দিতা খুব বেশি গুরুত্ব দেয়নি সুজয়ের কথায়। ফলে, এই বিষয়ে সুজয়ের চিন্তা বাড়ছিল। ব্যবসায়ীর মেয়ে, টাকার অভাব নেই। বাঁধাধরা আয়ের সংসারে কীভাবে ভেবেচিন্তে খরচ করতে হয়, তা নন্দিতা কতটা বুঝবে, এই নিয়ে বিয়ে আগে থেকেই দুঃশ্চিন্তায় ছিল সুজয়।

এখন খরচের কথা ভেবে খুব রাগ হল সুজয়ের। সে এ বিষযে কড়া ভাবে সতর্ক করার জন্য বেশ রাগত স্বরেই ডাক দিল নন্দিতাকে।

সুজয়ের ওরকম গম্ভীর স্বর আগে কখনও শোনেনি নন্দিতা। তাই সে ঘাবড়ে গেল। রান্নার কাজ ছেড়ে বাইরে এল।

নন্দিতার ওইরকম ঘাবড়ে যাওয়া মুখ সুজয়ও আগে কখনও দেখেনি। এই প্রথম এক অদ্ভুত সৌন্দর্য নন্দিতার মুখে ফুটে উঠতে দেখে, রাগের আগুন অনেকটাই নিভে গেল। নন্দিতাকে জড়িয়ে ধরে, ওর ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়াতে খুব ইচ্ছে হল তার কিন্তু খরচে লাগাম টানতে হবে এই তাগিদে নিজেকে সামলে নিল সুজয়। তারপর কোনও রকমে বলল, নন্দিতা, হিসাবের এই খাতাটা দেখো। খরচ কেন নিয়ন্ত্রণ করতে পারছ না তুমি? গত মাসেও তোমাকে রিকোয়েস্ট করেছিলাম আমি।

লজ্জাবনত হয়ে নন্দিতা উত্তর দিল, খরচ তো আমি নিয়ন্ত্রণেই রেখেছি। শাড়িও কিনছি না, মেক-আপ সামগ্রীও না, বিউটিপার্লার-এও যাওয়া ছেড়ে দিয়েছি। যা খরচ করছি তা তো সংসারের প্রযোজনীয় সামগ্রী কিনতেই।

নন্দিতার উত্তরের পর খরচ নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে কথা হয়তো আরও এগোত কিন্তু হঠাত্ সুজয়ের মোবাইল ফোন বেজে উঠল। ফোন রিসিভ করার পর সুজয় জানতে পারল, সহকর্মী সৌরভ তার জন্য হাউজিং-এর বাইরের গেট-এর সামনে অপেক্ষা করছে।

 

কলকাতা থেকে একই সঙ্গে কানপুরে ট্রান্সফার হয়েছে সুজয় এবং সৌরভ। দুজনে খুব ভালো বন্ধু। তাই, একই হাউজিং-এই কোয়ার্টার নিয়েছে দুজনে। অনেক সময় ওরা দুজনে একসঙ্গে অফিসে যায়। আজও তাই গেল।

এরই মধ্যে সুজয়ের বউ নন্দিতা এবং সৌরভের বউ শুভ্রার মধ্যেও একরকম বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। কখনও ওরা ডিনারও একসঙ্গে করে। যে-কোনও একজনের কোয়ার্টার-এ জড়ো হয়ে নন্দিতা এবং শুভ্রা দুজনে মিলে পছন্দের খাবার রান্না করে সবাই মিলে হইহুল্লোড় করে খায়।

কয়েক মাস আগে, একদিন সকালে নন্দিতার সঙ্গে দেখা করতে এল শুভ্রা। তাকে খুব চিন্তিত লাগছিল। সে বলল, আমার বাড়িতে একটুও চিনি নেই। বাচ্চাটার দুধে একটু চিনি লাগবে। সামনের মুদি দোকানটাও আজ বন্ধ। কিছুটা চিনি দাও, আমি কিনে এনে ফেরত দিয়ে দেব।

নন্দিতা হেসে ফেলল, আরে তুমি এত কিন্তু কিন্তু করছ কেন? এমন তো আমারও হতে পারে। সুজয়ও তো কিছু জিনিস আনতে ভুলে যেতে পারে। দাঁড়াও, দিচ্ছি।

চিনি হাতে নিয়ে শুভ্রা আবার জানাল, সন্ধেবেলা ফেরত দিয়ে যাব।

এক কৌটো চিনি ফেরত দেওয়াটা কি খুব জরুরি? আমাদের বন্ধুত্বটা কি এমনই ঠুনকো? কপট রাগ দেখায় নন্দিতা।

আচ্ছা ঠিক আছে ফেরত দেব না, হল তো? বলেই বল্ধুত্বপূর্ণ হাসি হাসল শুভ্রা।

এরপর থেকে সংকোচ কেটে গিয়েছ্লি শুভ্রার। যখন যা ফুরিয়ে যেত, নির্দ্বিধায় এসে নন্দিতার থেকে চেয়ে নিয়ে যেত। আর অজুহাত হিসাবে, বর সৌরভের সংসারের প্রতি উদাসীনতার কাহিনি শুনিয়ে যেত।

প্রথম দিকে সুজয় ও সৌরভ দুজনেই নিজেদের স্কুটার নিয়ে অফিসে যেত। এরপর খরচ বাঁচানোর জন্য দুজনে একটা স্কুটারে অফিস যাওয়া শুরু করল। একদিন সুজয়ের স্কুটার তো পরের দিন সৌরভের স্কুটারে অফিস যাওয়ার সিদ্ধান্ত হল।

কখন সন্ধে নেমেছে বুঝতে পারেনি নন্দিতা। সুজয়ের স্কুটারের শব্দে বাইরে এল সে। দেখল, স্কুটারের পিছনে একটা পাঁচ লিটারের রিফাইন্ড তেলের জার নিয়ে বসে আছে সৌরভ। সুজয় স্কুটার থামাতেই সৌরভ স্কুটার থেকে নেমে বলল, এই নিন বউদি আপনার রান্নার রসদ ৷ এই বলে তেলভর্তি জার-টা নন্দিতার হাতে ধরিয়ে দিয়ে চলে গেল।

ওদিকে সুজয়ের মাথা থেকে তখনও সংসারের অতিরিক্ত খরচের বিষযটা মুছে যায়নি। তাই সে নন্দিতাকে পাশে বসিয়ে হিসাবের খাতার প্রতিটা পাতা আবার দেখতে শুরু করে। কিছুক্ষণ দেখার পর, প্রত্যেকটি জিনিস কেন এত বেশি খরচ হচ্ছে জানতে চায় সুজয়।

নন্দিতা, গত মাসে পাঁচ কেজি চিনি কিনেছ। এত চিনি কোথায় খরচ করলে? দুজন তো মাত্র লোক আমরা। প্রতি মাসে খুব বেশি হলে দু-আড়াই কিলোগ্রামের বেশি চিনি খরচ হওয়ার কথা নয়!

এই প্রশ্নের কী উত্তর দেবে খুঁজে পায় না নন্দিতা।

সুজয় আবার বলতে থাকে, ডিটারজেন্ট পাউডারও ডবল এসেছে দেখছি। ৫০০ গ্রাম ডিটারজেন্ট-এ দুজনের জামকাপড় কাচা হয়ে যাওয়া উচিত। তা নয়, মাসে ১ কিলোগ্রাম খরচ হয়েছে দেখছি।

এবার আর চুপ থাকতে পারল না নন্দিতা। আস্তে আস্তে বলল, সৌরভ মুদিমশলা কেনার সময় পায়নি, তাই শুভ্রা এসে কিছু জিনিস ধার নিয়ে গেছে। বলেছে খুব তাড়াতাড়ি ফেরত দেবে।

সে না হয় বুঝলাম কিন্তু ২০ দিনে গ্যাস সিলিন্ডার ফুরোল কী করে? আমাদের তো তিনমাস চলে যায়।

সৌরভ গ্যাস বুক করারও সময় পায়নি। শুভ্রা তাই এসে আমাদের এখানে রান্না করে নিয়ে যায়।

নন্দিতার কথা শুনে সুজয় খুব রেগে যায় এবার। প্রায় চিত্কার করে বলতে থাকে, সৌরভের সময় না থাকলে শুভ্রা গ্যাস সিলিন্ডার বুক করে নিতে পারত, না পারলে আমাকে বললে আমি বুক করে দিতাম।

একটু থেমে সুজয় আবার বলতে শুরু করল, আর এত সবজি কীভাবে খরচ হল?

সবজিও যে শুভ্রা নিয়েছে, একথা আর নিজের মুখে বলতে পারল না নন্দিতা। এরপর নন্দিতাকে চুপ করে থাকতে দেখে সুজয় হিসাবের খাতা বন্ধ করে রাখল। আর পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য নন্দিতা বলল, তুমি-ই বা কী লোক, অফিস থেকে এসেই হিসাবের খাতা নিয়ে বসে পড়লে! চা-খেয়ে একটু তো বিশ্রাম নেবে…

বিষয়টা তা নয় নন্দিতা। আমার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট-এ আর সামান্য ১০ হাজার টাকা পড়ে আছে। ফ্রিজ-এর জন্য ৫ হাজার টাকার কিস্তি মেটালাম। এদিকে সৌরভ বলল, ওর হাতে একদম টাকা নেই৷ ছেলের স্কুলের ফিজ দেওয়ার জন্য আড়াই হাজার টাকা ধার নিল আমার থেকে। আমার মাথায় ঢুকছে না, এসব কী ঘটছে! বলেই ওখান থেকে উঠে অন্য ঘরে চলে গেল সুজয়।

 

দিনটা ছিল রবিবার। হঠাত্ একটা অদ্ভুত শব্দ কানে এল সুজয়ের। কীসের শব্দ বোঝার জন্য ছাদে গেল সে। ছাদে গিয়ে দেখল, দুটো লোক ডিশ বসাচ্ছে পাশের ছাদে। আর ওদের পাশে দাঁড়িয়ে তদারকি করছে সৌরভ। এই দৃশ্য দেখে, নীচে নেমে এল সুজয়।

ঘরে ঢুকে নন্দিতাকে সুজয় জানাল, দুদিন আগেই ছেলের স্কুলের ফিজ দিতে পারছিল না সৌরভ, আজ কী করে ডিশ বসাচ্ছে?

বিষযটা তখনকার মতো সামাল দেওয়ার জন্য নন্দিতা সুজয়কে বলে, আরে ওদের কেবললাইন খুব ডিসটার্ব করছিল, টিভি ঠিকমতো চলছিল না। শুভ্রার বাড়িতে একা একা সময় কাটানোই দায়৷ তাই হয়তো ডিশ বসাচ্ছে।

সে ঠিক আছে কিন্তু তাই বলে অন্যের কাছে টাকা ধার নিয়ে? রাগত স্বরে প্রশ্ন সুজয়ের।

এই কথার পরিপ্রেক্ষিতে নন্দিতা বলল, একটা কথা জিজ্ঞেস করব, রাগ করবে না তো?

বলো, কী বলতে চাও।

সৌরভ-শুভ্রার সঙ্গে এত ঘরোযা সম্পর্ক, তাই তোমাকে এতদিন কিছু বলিনি। এই যে তুমি প্রায়ই বলছ না যে, খরচ এত বাড়ছে কেন? তাহলে শোনো, শুভ্রা যা যা জিনিসপত্র ফেরত দেবে বলে নিয়ে গেছে, তা আজ পর্যন্ত ফেরত দেয়নি।

মানে? আর কী কী নিয়েছে শুভ্রা?

সবজি, দুধ, চা, চিনি, রিফাইন্ড তেল আরও অনেক কিছু। রান্না করেও নিয়ে যায় আমাদের বাড়ি থেকে।

এ যে নিয়মিত চলছে, এ কথা আমাকে আগে বলোনি কেন?

আসলে আমি বিষযটাকে খুব হালকা ভাবে নিয়েছিলাম এতদিন। তাছাড়া, সৌরভ তোমার সহকর্মী, বন্ধু…

ঠিক আছে, সতর্ক থেকো এবার থেকে।

কিন্তু কীভাবে?

আবার কিছু চাইতে এলে একটা কিছু অজুহাত দিয়ে না করে দিও। এমন ভাবে বলবে যেন খারাপ না ভাবে।

আমি তো ঠিকমতো অজুহাত দিতেও পারি না।

যাইহোক একটা কিছু বলে দিও। যেমন দুধ কেটে গেছে, চিনি শেষ হয়ে গেছে এমনই একটা কিছু।

এই পর্যন্ত বলে অন্য ঘরে চলে গেল সুজয়। এর একটা হেস্তনেস্ত করা দরকার৷

 

পরের দিন সকালে শুভ্রা আবার নন্দিতাদের ঘরে ঢুকে পড়ে। তারপর বলতে শুরু করে, আরে এভাবে দরজা খুলে রেখেছ কেন?

কথার কোনও উত্তর নন্দিতার থেকে না পেয়ে আবার শুভ্রা বলতে থাকে, আরে কী বলব আর, আজ আমার কপালটাই খারাপ। দুধ গরম করতে বসিয়ে স্নান করতে গিয়েছিলাম, এসে দেখি সব দুধ উপচে পড়ে গেছে। একটু দুধ দাও, বাচ্চাকে খাওয়াব।

দুধ কেটে গেছে গো– সুজয়ের শেখানো এই অজুহাত দেওয়ার আগেই নন্দিতা দেখে অবাক হল যে, ফ্রিজ খুলে, এক প্যাকেট দুধ বের করে নিয়েছে শুভ্রা৷ বলল, নিলাম একটা প্যাকেট, সন্ধেবেলা সৌরভ আনলে ফেরত দিয়ে যাব।

নন্দিতা কিছু বলার আগেই দুধের প্যাকেট নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেল শুভ্রা।

এক ঘন্টা বাদে আবার ডোরবেল বাজল। নন্দিতা দরজা খুলে দেখল, শুভ্রা দাঁড়িয়ে এরপর নন্দিতাকে সরিয়ে সোজা রান্নাঘরে ঢুকে গিয়ে জানতে চাইল, আজ কী রান্না করছ?

নন্দিতা কী বলবে বুঝে উঠতে পারছিল না। ওর মুখ থেকে তাই বেরিয়ে গেল, উচ্ছে ভাজছি।

শুভ্রা বাহ্ বলার পর আরও ঘাবড়ে গেল নন্দিতা। এবার তো মনে হচ্ছে উচ্ছে ভাজাও চাইবে!

না, তা চাইল না শুভ্রা। বরং বলল, তাহলে তো আজ আলু আর লাগছে না কোনও সবজিতে। দাও চারটে আলু। আমার ঘরে আজ আলু ফুরিয়েছে।

নন্দিতার কাঁদো কাঁদো অবস্থা। সুজয়ের দেওয়া টোটকা কাজে লাগাতে না পেরে নিজেকে খুব অসহায় লাগছে তার।

সন্ধেবেলা নন্দিতার মুখ থেকে পুরো ঘটনার বিবরণ শুনে, সুজয়ও মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল। এই সমস্যার সমাধান কীভাবে করবে, বুঝে উঠতে পারছিল না সুজয়ও।

 

আবার এক রবিবার এসে গেল। সুজয় দেখল, ওর অন্য এক সহকর্মীও ওদের পাশের কোয়ার্টারে মালপত্র নিয়ে ঢুকল। অপূর্ব নামের ওই সহকর্মীর সঙ্গে ওর বউকেও দেখা গেল।

অপূর্বর অনুরোধে সুজয় ও সৌরভ দুজনেই জিনিসপত্র গাড়ি থেকে নামিয়ে ঘরে ঢোকাতে সাহায্য করল।

জিনিসপত্র ঢোকানো শেষ করে সৌরভ নিজের ঘরে চলে গেল। সুজয় থেকে গেল অপূর্বর সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার জন্য। আর আড্ডার মধ্যেই ডিনারের জন্য নিমন্ত্রণও করে এল।

রাতে খাবার খেতে খেতে কথায় কথায় সুজয়কে অপূর্ব বলল, জানিস সুজয়, এই সৌরভটা তো দেখছি অদ্ভুত মানুষ! সিলিন্ডারে গ্যাস ফুরিয়েছে বলে দুপুরে আমাদের বাড়ি থেকে ইন্ডাকশন কুকারটা নিয়ে গেল, এখনও ফেরত দিল না।

তোদের ইন্ডাকশন কুকার আছে সৌরভ জানল কী করে? প্রশ্ন সুজয়ের।

জিনিসপত্র নামানোর সময় তো সৌরভও ছিল সঙ্গে, দেখেছে তখনই। জানায় অপূর্ব।

এই কথা শোনার পর সুজয় এবং নন্দিতা পরস্পরের দিকে তাকায়। নন্দিতা কিছু বলতে চায়। ওর ইচ্ছে হয় সৌরভ ও শুভ্রার মুখোশটা অপূর্বদের সামনে খুলে দিতে। কিন্তু সুজয় ইশারায় বারণ করে কিছু বলতে।

অপূর্ব এবং ওর স্ত্রী কুহেলী, সুজয়ের বাড়িতে ডিনার সেরে নিজেদের কোয়ার্টারে চলে যায়। কিন্তু সৌরভ-শুভ্রার অন্যায় আবদারের বিষয়টা মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকে সুজয়ের। সে ভাবতে থাকে, সবার থেকে জিনিস নিয়ে ফেরত না দেওয়া তো এক রকমের চিটিংবাজিই। দিনের পর দিন এ তো সহ্য করা যায় না। এ তো অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে। সে ওদের অসভ্যতা বন্ধ করার পথ খুঁজতে থাকে কিন্তু পায় না। তখন সে এর কিছু একটা উপায় বের করতে অনুরোধ করে নন্দিতাকে।

সুজয়কে বিচলিত হতে দেখে নন্দিতা বলে, আমরা আর কিছু দিতে পারব না বলে সরাসরি জানিয়ে দেব।

না, তা ঠিক হবে না। সম্পর্ক নষ্ট হবে।

আচ্ছা, দেওয়া জিনিসগুলো যদি ফেরত চাই, তাহলে বেশ জব্দ হবে কিন্তু।

তা করা যেতে পারে কিন্তু বুঝে যাবে বিষয়টা।

তাহলে তো কোয়ার্টার চেঞ্জ করে অন্য কোথাও চলে যাওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় নেই।

কোয়ার্টার বদলানো খুব সহজ কাজ নয় নন্দিতা। তাছাড়া, সেখানেও তো এমনই কেউ কপালদোষে জুটে যেতে পারে। তাহলে তখন কি আবার কোয়ার্টার চেঞ্জ করব নাকি? না, না, কোয়ার্টার চেঞ্জ করা কোনও সলিউশন হতে পারে না।

সমাধানসূত্র সে রাতে আর বের করতে পারল না ওরা।

পরের দিন সুজয় অফিস চলে যায়। শুভ্রা যথারীতি এসে পেঁয়াজ, চিনি এবং কাপড় কাচার সাবান নিয়ে যায় নন্দিতার থেকে। একথা ফোন করে সুজয়কে জানায় নন্দিতা।

 

অফিসে লাঞ্চ টাইম। অনেকে একসঙ্গে বসে লাঞ্চ করছে। সৌরভের উদ্দেশ্যে সুজয় হঠাত্ বলল, শোন সৌরভ, আজ তোর বাড়িতে পেঁয়াজ, চিনি, ডিটারজেন্ট পাউডার ফুরিয়েছে। বাড়ি ফেরার সময় কিনে নিয়ে যেতে ভুলবি না।

তুই কী করে জানলি?

আরে বন্ধু, তুই তো বাড়ির সব জিনিস কিনতে ভুলে যাস, আর বেচারা ম্যাডাম শুভ্রা এর-ওর থেকে ধারবাকি নিয়ে সংসার চালাচ্ছেন। তাই, নন্দিতাকে আমি বলে এসেছিলাম সৌরভের বাড়িতে যা যা থাকবে না, আমাকে জানাতে। একটু আগে নন্দিতা জানিয়েছে, আজ শুভ্রা ম্যাডাম পেঁয়াজ, চিনি আর ডিটারজেন্ট পাউডার নিয়ে গেছেন আমাদের বাড়ি থেকে।

সুজয়ের কথা শুনে বেশ রেগে যায় সৌরভ। সবার সামনে এভাবে অপমানিত হবে ভাবতে পারেনি। তাই সামাল দেওয়ার জন্য সৌরভ বলে যে, আরে এটা নিতান্তই মেয়েলি বিষয়৷ তাছাড়া ফলাও করে বলার মতো কী আর এমন নিয়েছে!বন্ধু-প্রতিবেশীদের মধ্যে এটুকু আদানপ্রদান তো চলতেই থাকে। কিন্তু তাই বলে ঢাক পেটানোর মতো কিছু হয়নি।

সৌরভের কথা শেষ হতে না-হতেই অপূর্ব এসে বলে, আরে তোর গ্যাস সিলিন্ডার

এল? আমার ইন্ডাকশন কুকারটাও তো ফেরত দিলি না।

এমন দু’মুখো আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিল না সৌরভ। তাই আর কথা বাড়াল না।

এরই মধ্যে ওদের এক অন্য সহকর্মী বিপিন একটা টিফিনবক্স থেকে এক চামচ পটলের তরকারি তুলে নিয়ে মুখে ভরে বলল, বাহ্, দারুণ তো। এটা কার বাড়ির?

আমার বাড়ির, বেশ জোর দিয়ে বলল সৌরভ।

এটাও সুজয়ের বাড়ির নয় তো? নিজের বাড়ির বলে চালিয়ে দিচ্ছিস… বলেই হো হো করে হেসে উঠল বিপিন।

খবরদার, ভুলভাল মন্তব্য কোরো না বিপিন। আজ আমার বাড়িতে পটল রান্না করেছিল বউ। রাগত স্বরে উত্তর দেয় সৌরভ।

কাউন্টারে বিপিন জানায়, আসলে রোজই তো সুজয়ের বাড়ির খাবার আসে, তাই আজও ভাবলাম…

কথা আরও এগোতে, সৌরভ রেগে টিফিনবক্স নিয়ে উঠে চলে গেল।

সন্ধেবেলা সুজয়ের স্কুটারের পিছনে বসে বাড়ি ফিরছিল সৌরভ। বাজার আসতেই স্কুটার থামিয়ে সুজয়, সৌরভের উদ্দেশ্যে বলে, যা, যেসব জিনিস বাড়িতে নেই, কিনে নে সব। আমার খুব খারাপ লাগে, শুভ্রা ম্যাডামের জন্য। বেচারা চেয়েচিন্তে সংসার চালান।

সুজয়ের কথা শোনার পর, এক হেরে যাওয়া সৈনিকের মতো বাধ্য হয়ে সব জিনিসপত্র কিনতে থাকে সৌরভ।

এক মুদি দোকানি তো বলে বসল, ক্যায়া বাত হ্যায় সাহাব, ইতনা দিন বাদ!

সৌরভকে আরও খোঁচা দিতে, মান্ডি-মার্কেটের দোকানির উদ্দেশ্যে সুজয় বলে, ম্যায় হি লে জাতা হুঁ সব কুছ, লেকিন কলসে ইয়ে আয়েগা, চিন্তা মত কিজিয়ে৷

কথা শেষ করার পর, সুজয় বেশ কিছু জিনিসপত্র আলাদা প্যাক করতে বলে দোকানদারকে। আর সৌরভের উদ্দেশ্যে বলে, শোন, কিছু জিনিস আমি বাড়ি নিয়ে যাব। টাকা তুই দিবি। কারণ, ধার-করা জিনিস শুভ্রা ম্যাডাম নিজের হাতে ফেরত দিতে এলে আমার খারাপ লাগবে। তাই, আগে থেকেই আমি এসব নিয়ে চলে যাচ্ছি। কেউ জানতে পারবে না।

সবকিছু দেশেশুনেও কিচ্ছু বলার ছিল না সৌরভের। তাই, সে চুপচাপ দোকানদারকে টাকা মিটিয়ে দিয়ে সব জিনিসপত্র পিঠে তুলে, সুজয়ের স্কুটারের পিছনের সিটে এসে বসে।

সৌরভকে স্কুটার থেকে ওর কোয়ার্টার-এর সামনে দিয়ে নিজের কোয়ার্টার-এ আসে সুজয়। সৌরভের থেকে নেওয়া জিনিসপত্র স্কুটার থেকে নামিয়ে নন্দিতার হাতে দেয় সে।

জিনিসপত্র রাখতে রাখতে নন্দিতা জিজ্ঞেস করল সুজয়কে, শুভ্রা যা নিয়ে যাবে, রোজই কি তোমাকে ফোন করে জানাতে হবে?

কাল থেকে আর ফোন করার প্রয়োজন হবে না বলে মনে হয়।

মানে?

আজ এমন মুশকিলে ফেলেছি সৌরভকে, সারা জীবন মনে রাখবে। সব জিনিস ওর টাকায় কিনেছি। শুধু তাই নয়, আরও দুহাজার টাকা গচ্চা যাবে ওর। আমার স্কুটারেই এতদিন যাতায়াত করেছে। কথা ছিল, এক-এক দিন এক-একজন স্কুটার নিয়ে অফিস যাব। তা না করে, এতদিন নিজের স্কুটার খারাপ বলে বাহানা দিয়ে আমার স্কুটার ব্যবহার করেছে। কাল আর সে বাহানাও দিতে পারবে না। মেকানিক পাঠিয়ে স্কুটার সারাই করিয়ে দিয়েছি। বাড়িতে ঢুকলেই মেরামতের বিল পেয়ে যাবে। এতক্ষণে বিল পেয়েও গেছে হয়তো। বলেই হো হো করে হাসতে থাকে সুজয়।

নন্দিতা সুজয়ের কথা শুনে হতবাক হয়ে বোকার মতো দাঁড়িয়ে থাকে কয়েক সেকেন্ড। তারপর বলে, তুমি সত্যি জিনিয়াস! হাসতে হাসতে সুজয়ের গায়ে ঢলে পড়ে নন্দিতা। ওদের আনন্দ আর হাসিতে মুখরিত হয় সন্ধের পরিবেশ। মাথার উপর পূর্ণিমার চাঁদটাও যেন মিটিমিটি হাসছে তখন।

সবুজ দ্বীপের সফরনামা

একসময় কালাপানি-তে দ্বীপান্তর হবে শুনলেই বুকের ভেতর রক্তস্রোত যেন জমাট বেঁধে যেত। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সেই রক্তাক্ত ইতিহাস বুকে করে আজও আন্দামান তার আপন মহিমায় উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে ভারতীয় মানচিত্রে। তবে আন্দামান প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর অতুলনীয় বৈচিত্র্যময়তার জন্যও বিখ্যাত। বায়ুপথে পোর্ট ব্লেয়ার পৌঁছে সেই সৌন্দর্যের সাক্ষী হতেই এবারের সফর। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সবুজদ্বীপের রাজার স্মৃতিমেদুরতা বুকে নিয়ে যাত্রা। বহু দ্বীপের সমন্বয়ে তৈরি আন্দামানের, মাত্র কয়েকটি দ্বীপে মানুষের বাস।

আমাদের নির্দিষ্ট রিসর্টে পৌঁছে আশপাশের দৃশ্য দেখে মন ভরে গেল। সামনেই নীল জলের সমুদ্র। বারান্দায় বসেই বেশ সময় কেটে যায়। লাঞ্চ সেরে ঘুরে নিলাম কাছেই কর্বিনস্ কোভ বিচ। যাওয়ার পথেই চোখে পড়ে রস আইল্যান্ড। বিকেলে পৌঁছোলাম সেলুলার জেল। মনটা অচিরেই ভারী হয়ে আসে বহু স্বাধীনতা সংগ্রামীর ফাঁসির মঞ্চটি দেখে। এই জেলেই একসময় বন্দী ছিলেন বিপ্লবী বীর সাভারকর।

পরদিন প্রাতরাশ সেরে আমাদের গন্তব্য রস আইল্যান্ডের উদ্দেশে রওনা দিলাম। জেটি থেকে ১০ মিনিটের বোটযাত্রা। একসময় এই দ্বীপ রাজধানী ছিল আন্দামানের। এখনও কিছু পুরোনো স্থাপত্য রয়ে গেছে ওই দ্বীপে।

এরপরের গন্তব্য চিড়িয়াটাপু। একটা অটোয় চড়ে রওনা দিলাম অরণ্যে ঘেরা পথ দিয়ে। এই জঙ্গলে প্রচুর পাখির বাস। তাই হয়তো জায়গাটার নাম চিড়িয়াটাপু। সামনেই আদিগন্ত সমুদ্র ও এক ফালি মায়াময় বিচ। এক অপূর্ব সূর্যাস্তের সাক্ষী হলাম চিড়িয়াটাপুতে। ফিরে এসে সি-ফুড সমৃদ্ধ ডিনার খেয়ে মন ভরে গেল।

পরদিন ভোর ভোর উঠে আমরা তৈরি হলাম জলিবয় দ্বীপের উদ্দেশে রওনা দেব বলে। এর জন্য ওয়ানডুর থেকে বোট-এ উঠতে হয়। ওয়ানডুর পোর্ট ব্লেয়ার থেকে ৩০ কিমি দূরে। টিকিট নিয়ে আমরা বোটে উঠলাম সকাল ৯টায়। ওই বোট দ্বীপ ঘুরে দেখার জন্য আমাদের ঘন্টা তিনেক সময় বরাদ্দ করেছে। দ্বীপটি মহাত্মা গান্ধি মেরিন ন্যাশনাল পার্কের অন্তর্গত। এখানে সংরক্ষিত কোরাল ও নানা জলজ উদ্ভিদ দেখে মন ভরে গেল। বোটে করে নিয়ে যায় এই কোরাল রিফ দেখতে। বোটের তলদেশ কাচের তৈরি। ফলে জলজীবন স্বচ্ছ ভাবে দেখা যায় এই বোটযাত্রায়। কোরাল ছাড়াও দেখতে পেলাম ক্রাউন, প্যারট, জেব্রা, স্টারফিশ প্রভৃতি নানা মাছ। ২টো অক্টোপাসও দেখা গেল কাচের গা ঘেঁষে যেতে। ওখানে স্নরকেলিং-এর ব্যবস্থা থাকায় আমরা গাইডের সাহায্যে আরও একটু গভীর সমদ্রে ডুব সাঁতার দিলাম, আরও কিছু জলচর দেখব বলে। সাঁতার শেষে বেশ ক্লান্ত হয়ে হোটেলে ফিরলাম লাঞ্চ সারতে। সেদিন বিকেলে হাঁটাপথে অ্যানথ্রোপোলজিকাল মিউজিয়াম ঘুরে এলাম।

পরদিনটা নির্দিষ্ট ছিল জাহাজে করে হ্যাভলক ও রাধানগর দ্বীপ দেখার জন্য। ফিনিক্স বে জেটি থেকে জাহাজ ছাড়ল। নীল জলরাশি পেরিয়ে ২ ঘণ্টা পর পৌঁছোলাম হ্যাভলক। নির্জন দ্বীপটিতে খুব স্বল্প জনবসতি। একটা সুন্দর রিসর্ট-এ পৌঁছোলাম। তার নাম সি-শেল। নারকেল গাছের ছায়া ঘেরা সুন্দর লনে ছিল মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন। কাছেই বিচ। খানিক বিশ্রাম নিয়ে আমরা রাধানগর বিচের উদ্দেশে রওনা হলাম। সিলভার স্যান্ড-এর জন্য বিখ্যাত এক রোমান্টিক বিচ এটি। এশিয়ার দ্বিতীয়তম সুন্দর বিচ বলে খ্যাত।

হ্যাভলকের দ্বিতীয় দিনের সকালটা বহু প্রতীক্ষিত ছিল। আমাদের প্ল্যান স্কুবা ডাইভিং-এর। গো-ডাইভ ইন্ডিয়া সেন্টারের ইন্সট্রাক্টর আমাদের বুঝিয়ে দিলেন কী করতে হবে। ৬-৮ ফিট জলের নীচে ডাইভ দিয়ে এর পর জলের নীচের পৃথিবীটাকে আরও কাছ থেকে দেখার সুযোগ মিলল। প্রায় এক ঘন্টা জলের নীচে সাঁতার কাটার এই অভিজ্ঞতা, সারা জীবনেও ভোলার নয়।

পরদিন আবারও জাহাজে উঠে আমরা পোর্টব্লেয়ার ফিরলাম। এবার ঘরে ফেরার পালা। চোখে লেগে রইল প্রবাল দ্বীপের অতলের ওই রহস্যময়তা, ভাষায় যার বর্ণনা হয় না।

গরমে ক্যাজুয়াল সাজ

গরমে ফ্যাশনের দিকে যেমন নজর দিয়ে থাকি আমরা তেমনি অসহ্য গরমে কীভাবে একটু হলেও আরাম পাওয়া যায়, সেই পরিত্রাণের উপায় কম বেশি সবাই খুঁজি।কারণ যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে ফ্যাশনের বিকল্প নেই। আর গরম মানেই মাথাতে যে নামটা প্রথমে আসে সেটা হল ক্যাজুয়াল। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে তাই ছেলে মেয়ে উভয়েই পরতে ভালোবাসে ক্যাজুয়াল পোশাক।

এ কথা অস্বীকার করে লাভ নেই যে, আমাদের জীবনের একটা খুব বড়ো অংশ জুড়ে থাকে কাজের জায়গা, অর্থাৎ অফিস। আলমারিতে পার্টি বা অনুষ্ঠানে যাওয়ার উপযোগী পোশাক যেমন থাকা দরকার, তেমনই মাঝে মধ্যেই অফিসের পোশাকের জন্যও শপিং করা উচিত।

গরমের দিনে অফিসে সুতির পোশাক পরে যাওয়াই সবচেয়ে ভালো, কিন্তু শীতকালে সিল্ক পরতে পারেন। যাই পরুন না কেন, অফিসে যাওয়ার জামাকাপড় যেন পরিষ্কার করে ইস্তিরি করা হয়, সেটা দেখবেন। কুঁচকে, দুমড়ে থাকা পোশাক দেখতে খারাপ লাগে।

পছন্দের পোশাকের তালিকাতে এখন মেয়েরা কুর্তিকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে।  এই কুর্তি একদিকে যেমন দেশীয় ঐতিহ্য প্রকাশ করে, তেমনি অনেক ফ্যাশনেবল দেখতে লাগে।কুর্তি ভয়েল, সুতি যেকোন কাপড়েরই হতে পারে। অফিসে বা যেকোন কাজের জায়গাতে মেয়েরা আজকাল কুর্তি পরেই আরাম অনুভব করে।কর্পোরেট অফিসে বা যে সব ক্ষেত্রে ড্রেস কোড আছে, সেখানে এমন কিছু পরবেন না যা শরীরের অনেকটা অনাবৃত রাখে।যে সব অফিসে ভারতীয় পোশাক পরাই দস্তুর, সেখানে সালোয়ার কামিজ় বা শাড়িই আপনার একমাত্র অপশন। খুব ডিপ স্লিভলেস বা কাটের ব্লাউজ় পরবেন না। শাড়ির আঁচল প্লিট করে গুছিয়ে কাঁধের উপর তুলে রাখুন।

গরমের জামাকাপড়ের বাছার আগে সবার আগে নজর রাখুন ফেব্রিকের উপর৷ সুতির পোশাকই হোক গরমের পোশাকের প্রথম পছন্দ৷ দিন হোক বা রাত, গরম থেকে বাঁচতে সুতি কাপড়ের তৈরি পোশাক কিন্তু একদিকে যেমন ফ্যাশনেবল, তেমনই আরামদায়কও৷পোশাকের রং হিসেবে গরমে বাছুন হালকা রং৷ সাদা এ ব্যাপারে একদম পারফেক্ট৷ চলতে পারে হালকা গোলাপি, হলুদ, কিংবা সবুজ রং৷ দিনের বেলা উজ্জ্বল রং না বাছাই ভাল৷ গরমকালে জমকালো রং একটু এড়িয়ে চলাই উচিত।

টাইট পোশাকের পরিবর্তে পরুন ঢিলেঢালা পোশাক৷ রোদে বেরনোর সময় ফুলহাতা পোশাক পরুন৷ ব্যবহার করতে পারেন টুপি কিংবা বান্ডানা৷ অফিসে যাওয়ার সময় ব্যাগে অতিরিক্ত জামা ক্যারি করুন৷ রোদে ঘামে ভিজে যাওয়া জামার পরিবর্তে অফিসে ঢুকে জামা পাল্টে নিন। সেই সঙ্গে প্রতিদিন ব্যবহার করুন হালকা কোনও সুগন্ধি। বিশেষ করে যাঁরা খুব ঘামেন, তাঁরা সব সময় সঙ্গে একটি সুগন্ধি রাখতে পারলে ভালো হয়।

সময়ের স্রোতে

অভিকে গেটের ভিতর ঢুকিয়ে দিয়ে মানস গাড়িতে উঠতে যাবে, গেট খুলে দৌড়ে এসে অভি মানসের হাত জড়িয়ে ধরে, ‘তুমি যেও না বাবা, প্লিজ এখানেই থেকে যাও… তোমাকে ছাড়া আমার একদম ভালো লাগে না…।’

‘আসছে রবিবার তো আবার আসব অভি। প্রতিবারই তো আসি’, মানস অভির গালে আলতো টোকা দেয়।

‘না, তুমি অনেকদিন পর পর আসো। তোমার কথা খুব মনে হয় বাবা, বন্ধুরাও সব সময় তোমার কথা জিজ্ঞেস করে। তুমি আমার স্কুলেও কখনও আসো না। অন্য বন্ধুদের বাবারা তো সবাই আসে… তাহলে তুুমি কেন আস না বাবা?’

মানস ওর আট বছরের ছেলের অজস্র প্রশ্নের কী উত্তর দেবে ভেবে পাচ্ছিল না। যে প্রশ্নের উত্তরগুলো নিজেই ঠিকমতো জানে না মানস। ছেলেকে সেগুলোর উত্তর কীভাবে দেবে? মানস বুঝতে পারে না এইভাবে আর কতদিন ও ছেলের কাছে সব চেপে যেতে পারবে?

‘আমি আবার আসব অভি। তুমি তো খুব ভালো ছেলে সবকিছুই বোঝো। এরকম জেদ কোরো না। এখন লক্ষ্মী হয়ে উপরে যাও। আমি কয়েকদিনের ছুটি নিয়ে তোমাকে আমার কাছে নিয়ে গিয়ে রাখব। তখন আমরা খুব মজা করব।’

‘কিন্তু মজা কী করে হবে? মা তো ওখানে থাকবে না।’

‘অভি, এখন তুমি উপরে যাও। পরে আবার তোমার সঙ্গে কথা হবে। আমারও দেরি হয়ে যাচ্ছে। মানস গেট খুলে অভিকে লিফটে ঢুকিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। চাবি দিয়ে গাড়ির দরজা খুলে গাড়িতে উঠে বসল। একই শহরে থাকলেও দুটো বাড়ির দূরত্ব অনেকটাই। তা-সত্ত্বেও প্রতি রবিবার মানস অভিকে নিয়ে কোথাও না কোথাও ঘুরতে বেরোয়।

মানস একটা বড়ো কোম্পনিতে বড়ো পদে রয়েছে ওর উপরে বড়ো দায়িত্ব ফলে কাজের ব্যস্ততার সঙ্গে সঙ্গে ট্যুরও করতে হয় ওকে। দশ বছর আগে মধুমিতার সঙ্গে ওর বিয়ে হয়। বিয়েটা লাভ ম্যারেজই ছিল। একসঙ্গেই দুজনে এমবিএ পড়েছিল এবং প্রেমটা ওদের সেখান থেকেই। মিশুখে, সুন্দরী এবং ফ্যাশনেবল মধুমিতাকে দেখেই মানস ওর প্রেমে পড়ে। এমবিএ কমপ্লিট করার আগেই ক্যাম্পাস প্লেসমেন্টে দুজনেই ভালো চাকরি পেয়ে যায়। চাকরি পেয়েই দুজনে বাড়িতে পরস্পরের সম্পর্কে জানায়। দু’জনের বাড়ি থেকেই আনন্দের সঙ্গে বিয়েতে সম্মতি দিলে, কিছু দিনের মধ্যেই ওরা বিয়ে করে নেয়। দুজনেরই প্রথম পোস্টিং বেঙ্গালুরু। সুতরাং বিয়ের পর ওরা বেঙ্গালুরুতেই নতুন সংসার পাতে।

নতুন চাকরির ব্যস্ততা এবং নতুন বিয়ে, দিনগুলো যেন খুশির পাখায় ভর দিয়ে উড়তে থাকে। প্রথম বছরটা হইচই,আনন্দে কীভাবে কেটে যায় ওরা বুঝতেও পারে না। দ্বিতীয় বছরে না চাইতেও মধুমিতা সন্তানসম্ভবা হয়ে পড়ে যেটার জন্য ওরা স্বামী-স্ত্রী মানসিক ভাবে একেবারেই প্রস্তুত ছিল না। বাড়ির লোকেদের কাছে ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে যেতে চাপে পড়ে ওরা পরিবার বাড়াতে রাজি হয়ে যায়।

মধুমিতাকে বাধ্য হয়ে চাকরি ছাড়তে হয় যেটার জন্য ও একেবারেই তৈরি ছিল না। মানস ওকে বোঝায় যে বাচ্চা একটু বড়ো হয়ে গেলেই ও আবার চাকরি জয়েন করতে পারে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাচ্চা এবং বাড়ির দায়িত্ব এতটাই বেড়ে গেল যে, মধুমিতা চাকরি করতে যাওয়ার কথা চিন্তাতেই আনতে পারল না। এদিকে বাড়ির দায়িত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানসেরও কোম্পানিতে পদোন্নতি হতে থাকল। ফলে কর্মক্ষেত্রে কাজের দায়িত্বও অনেক বেড়ে গেল।

দায়িত্ব বাড়তেই মানসের শুরু  হল দেরি করে বাড়ি ফেরা। মধুমিতার ধৈর্য প্রথম থেকেই একটু কম ছিল। তার উপর চাকরি ছাড়তে হয়েছিল বলে মনে মনে মানসের উপর একটা রাগও তৈরি হয়েছিল। সুতরাং মানসের অত্যধিক ব্যস্ততা মধুমিতার সব ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিল। অসহিষ্ণু হয়ে পড়তে লাগল সে। কথায় কথায় মানসের সঙ্গে ঝগড়া, রাগারাগি –এটা ওদের দৈনন্দিন রুটিন হয়ে দাঁড়াল। রোজই প্রায় মানস রাত করে বাড়ি ফিরত।

‘এই ভাবে আর কতদিন চলবে? আমি, অভি কি তোমার কেউ হই না? সংসারে এতটুকু সময় তুমি দাও না। আমাদের প্রতি তোমার কি কোনও দায়িত্ব নেই?’ মধুমিতার এই প্রশ্নের উত্তরে মানসও রাগ না দেখিয়ে চুপ থাকতে পারে না, ‘আমি কি দায়িত্ব পালন করছি না? তোমাদের জন্য এবার কি তাহলে আমি চাকরি ছেড়ে দেব?’ ক্লান্তিতে মানস চেয়ারে বসে পড়ে। রেগে থাকাতে, ক্লান্ত মানসের চোখের অভিব্যক্তি মধুমিতার চোখ এড়িয়ে যায়। ঝাঁঝালো স্বরে বলে, ‘এমন কী চাকরি তুমি করো? কতদিন হয়ে গেলো অভির সঙ্গে খেলা তো দূরে থাক, ঠিকমতো কথাও বলোনি। রাত্রে যখন বাড়িতে আসো ও তখন ঘুমিয়ে থাকে। আর সকালে যখন ও স্কুলে যাচ্ছে তখন তুমি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ট্যুর-এ যাও। ফিরে একদিন দুদিন শহরে থাকো আবার অন্য ট্যুর-এ বেরিয়ে যাও। নিজের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের জীবনও তুমি নরক বানিয়ে দিয়েছ।’

‘মধুমিতা, তুমিও তো প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করতে…! সুতরাং প্রাইভেট কোম্পানির ব্যস্ততা তুমি ভালো মতোই বোঝো, তাহলে এরকম অবুঝের মতো কথা বলছ কেন? এমনি, এমনি তো এত উঁচু পদে পৌঁছোইনি… পরিশ্রম এবং দায়িত্ব নিয়ে কাজ করেছি বলেই কোম্পানি আমাকে ওই পদে বসিয়েছে। তোমাদের টাকাপয়সা, আরামের কোনও অভাব আমি রাখিনি… এই সবই তো আমার প্ররিশ্রমেরই ফল।’

‘এই আরাম, টাকাপয়সা আমরা চাই না মানস। আমারা তোমাকে চাই। তোমাকে আমাদের সময় দিতে হবে।’ মধুমিতার গলা ভেঙে আসে, ‘বাড়িতে এসেও তুমি ফোনে ব্যস্ত থাকো।ঞ্জআমার সঙ্গে কথা বলারও তোমার সময় হয় না।’

‘অফিসের কাজের জন্যই তো ফোন আসে। তোমার জন্য কি সেগুলোও অ্যাটেন্ড করা বন্ধ করে দেব?’

মানসের রাগের পারদ চড়তে থাকে।

‘কতদিন হয়ে গেছে, তোমার অফিসের ব্যস্ততার জন্য, আমরা কোনও বন্ধুবান্ধবের বাড়ি যেতে পারি না, কাউকে আমাদের এখানেও ডাকতে পারি না। কোথাও বাইরে যাই না ছুটির দিনে তুমি ক্লান্ত হয়ে থাকো।’

‘তাই বলে, আমি কি তোমাকে সোশ্যাল হতে বাধা দিয়েছি? তুমি নিজের মেলামেশা বাড়াও না, কে মানা করেছে? ব্যস্ত থাকলে আজেবাজে ব্যাপারগুলোয় মন দেবার সময় পাবে না’, এই বলে মানস চেয়ার থেকে উঠে পড়ে শোবার ঘরের দিকে পা বাড়ায়। আহত সিংহীর মতো মধুমিতা নিজের মধ্যেই গুমরাতে থাকে।

এই কথাকাটাকাটি, ঝগড়ার পরিবেশই ধীরে-ধীরে মধুমিতা আর মানসের দাম্পত্যে বড়ো একটা ফাটল ধরাতে শুরু করল। বরং টুর থাকলেই মানস, মধুমিতার অনুপস্থিতিতে বাড়ির ঘটনাক্রমকে লজিক্যালি দেখার এবং বোঝার চেষ্টা করত। মানস বুঝতে পারত, মধুমিতার তার প্রতি ক্ষোভ, নালিশ সম্পূর্ণ মিথ্যাও তো নয়। মনে মনে ঠিক করত, এবার বাড়ি ফিরে মধুমিতা আর অভিকে একটু বেশি সময় দেবে।

মানস শহরের বাইরে থাকলে মানসের অবস্থাটাও মধুমিতা বোঝার চেষ্টা করত। সত্যিই, লোকটা করবেটাই বা কী? কোম্পানির বড়ো পদ সামলাচ্ছে যখন, তখন সঙ্গে দায়িত্ব তো থাকবেই। সারাদিন কাজের পর ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফেরে মানস…। কোথায় ওর ক্লান্তি দূর করার চেষ্টা করবে, তা নয়, উলটে ঝগড়া করেই সময় নষ্ট করে সে।

অথচ এই একই মানুষ দুটো যখন সামনাসামনি হয় তখন মনের এই ভাবনাগুলো কোথায় হারিয়ে যায়। মানসের ব্যস্ততা স্বামী-স্ত্রীর শারীরিক সম্পর্কও প্রভাবিত ফেলতে শুরু করল। একে তো সময়ের অভাব, তার মধ্যে আবার ঝগড়া, কথাবন্ধ। মাস গড়িয়ে যেত, শারীরিক সম্পর্কটুকু রাখাও ওদের হয়ে উঠত না। দুজনেই মানসিক এবং শারীরিক ভাবে একাকিত্ব বোধ করতে শুরু করল।

এই সমস্যা শুধু মানস আর মধুমিতারই নয়, আজকের বহু দম্পতির এই একই সমস্যা। দুজনের চাকরির ব্যস্তস্তা সঙ্গে অফিস আর বাড়ির দূরত্ব এতটাই যে, রোজ যাতায়াত করার কষ্ট এবং ক্লান্তি দূর করতে করতেই ছুটি শেষ, সঙ্গে অন্যান্য জরুরি কাজগুলো তো আছেই। ফলে ছেলে বা মেয়ে কেউই এখন বিয়ের দায়িত্ব নিতে চাইছে না অথবা বিয়ের পর সন্তান নেওয়ার কথা ভাবছে না। কারণ তারা জানে বাচ্চা হয়ে যাওয়ার পর নিজের স্বাধীনতা এবং চাকরি ছাড়তে হতে পারে।

ধীরে ধীরে মানস আর মধুমিতার মৌখিক ঝগড়া ঠান্ডা লড়াইয়ে পরিণত হল। দুজনের মধ্যে কথা প্রায় হতো না বললেই হয়। হঠাৎ-ই একদিন মধুমিতা জানাল ও একটা চাকরি পেয়ে গেছে এবং অফিসের পাশেই একটা ফ্ল্যাট ভাড়াও নিয়ে নিয়েছে। সেখানেই ও অভিকে সঙ্গে নিয়ে উঠে যাবে।

মানসের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে মধুমিতার প্রস্তাবে। মধুমিতাকে কাছে টেনে নিয়ে ওর বলতে ইচ্ছে করছিল একলা চাকরি করে অভিকে ও কী করে মানুষ করবে, আর যদি একান্তই চাকরি করতে হয় তাহলে এখানে থেকেও তো অনায়াসেই সেটা করা যায়। কিন্তু মানসের আত্মাভিমান ওর গলা টিপে ধরল। যেখানে মধুমিতাকে নিয়ে ও এত চিন্তা করছে, সেখানে মানসকে ছেড়ে চলে যাওয়ার ডিসিশন নিতে মধুমিতার তো এতটুকুও বাধল না। পরের দিনই অভিকে নিয়ে মধুমিতা ঘর ছাড়ল। দিনটা আজও মানস ভুলতে পারে না। দু’বছর প্রায় হতে চলল। ছয় বছরের অভি আজ আট বছরের হয়ে গেল। মানসের জীবন, চাকরি এবং এই দুটো বাড়ির দূরত্ব মাপতে মাপতেই বেশ কেটে যাচ্ছিল।

লাল বাতিতে গাড়ি ব্রেক কষতেই মানসের চিন্তা ভগ্ন হল। আর কত দিন এভাবে চালানো সম্ভব? মানস সব সময় চেষ্টা করত ওদের স্বামী-স্ত্রীর দূরত্ব যেন অভির উপর কোনওরকম প্রভাব না ফেলে। দুজনেরই ভালোবাসায় ও যেন বড়ো হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু চাইলেও এটা কিছুতেই সম্ভব হয়ে উঠছিল না।ঞ্জঅভির ব্যক্তিত্ব দুটো ভাগে ভাগ হয়ে যাচ্ছে এটা মানস খুব ভালো বুঝতে পারছিল। অভির জীবনে একটা শূন্যতাবোধ ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছিল।

রাস্তার ভিড় অতিক্রম করে বাড়ি পৌঁছোতে মানসের অনেকটা সময় পার হয়ে গেল। মনটা ভারাক্রান্ত লাগছিল। অভির অগুনতি প্রশ্নের কোনও উত্তর ওর কাছে ছিল না। মনে হল, অভি নিশ্চয়ই এই প্রশ্নগুলো ওর মা-কেও করে, মধুমিতার কাছে কি এই প্রশ্নগুলোর কোনও উত্তর আছে…? আর কতদিন এসব সহ্য করতে হবে?

মানস এবং মধুমিতার পরিবারের সকলে দুজনকে বোঝাবার অনেক চেষ্টা করে যাতে নিজেদের মধ্যে দূরত্ব সরিয়ে দুজনে একসঙ্গে আবার জীবন শুরু করে। কিন্তু দুজনেই নিজের নিজের জেদে অটল, কেউ এক চুলও জেদ ছাড়তে রাজি নয়। বিরক্ত হয়েই মানসের মা-বাবা ছেলের কাছে প্রস্তাব রাখেন, ‘সঙ্গে যদি থাকতেই না চাস তাহলে ডিভোর্স নিয়ে নে। জীবন আবার নতুন করে শুরু করার চিন্তাভাবনা কর।’

মানসের শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা একটা শিহরণ বয়ে যায়। সত্যিই কি জীবনের একটা অধ্যায় এত সহজে শেষ করে ফেলা যায়? নতুন শুরু করার কথা ভাবাই যায় না। আজ ও লাইফে ব্যস্ত কিন্তু কালও কি এতটাই ব্যস্ত থাকবে ও? আর অভি? ওর কী হবে? অভির করা প্রশ্নগুলো ওর মাথায় ভিড় করে আসে। কী করবে ও? অনেকবার মনে হয়েছে মধুমিতা যেমন নিজের ইচ্ছেয় ঘর ছেড়েছিল একদিন হঠাৎই আবার ফিরে আসবে কিন্তু অপেক্ষা করে করে দুই বছর কাটতে চলল। মধুমিতা নিজে থেকে কোনওদিন ওকে ডেকে পাঠাল না। আর এখন তো একা থাকারই অভ্যাস হয়ে গেছে।

অভি বাড়িতে ঢুকেই সোজা নিজের ঘরে চলে গেল। কিছু ভালো লাগছিল না ওর। এতটুকু বয়সেই মনটা ওর যেন ক্লান্তিতে ভেঙে আসছিল। অপেক্ষা আর অপেক্ষা। কবে থেকে মা আর বাবা একসঙ্গে ওর সাথে থাকবে, এই অপেক্ষায় ও রয়েছে। প্রতি সপ্তাহেই রবিবার আসে। বাবাও আসে আর এসেই ওকে বাইরে ঘুরতে নিয়ে চলে যায়। পছন্দের খাবার খাওয়ায়, জিনিসপত্রও কিনে দেয়। কিছু প্রয়োজন আছে কিনা জিজ্ঞেস করে এবং সন্ধেবেলায় আবার মা-র কাছে পৌঁছে দিয়ে, অন্য বাড়ি চলে যায়। সোমবার হলেই মায়ের অফিস আর ওর স্কুল। এইভাবেই সপ্তাহ কেটে গিয়ে আবার রবিবার আসে। এটাই অভির সারা সপ্তাহের রুটিন। ওর কিচ্ছু ভালো লাগে না। বাবার সঙ্গে থাকলে মায়ের জন্য মন খারাপ লাগে আর সারাটা সপ্তাহ বাবাকে অভি মিস করে খুব। সব সময়ই মনে হয় কেন মা-বাবা একসঙ্গে থাকতে পারে না?

মানসের সঙ্গে ঘুরে আসার পর এক ঝলক ছেলেকে দেখল মধুমিতা তারপর তার আর কোনও আওয়াজ না পেয়ে মধুমিতা রান্নাঘর থেকে ছেলের নাম ধরে হাঁক পাড়ল। না, কোনও শব্দ নেই! কী হল, চিন্তিত হল মধুমিতা। হাতটা মুছে নিয়ে অভির স্টাডিরুমে ঢুকল ও। ছেলেটা টেবিলে মাথা রেখে মুখটা ঢেকে রয়েছে। ঘরের আলোটা পর্যন্ত জ্বালায়নি।

ঘরের আলো জ্বালিয়ে মধুমিতা এসে অভির মাথায় হাত রাখল, ‘কী হল অভি? কেমন কাটল আজ সারাটা দিন?’

অভি উত্তর দিল না। টেবিল থেকে মাথা তুলে মায়ের দিকে তাকাল না পর্যন্ত।

‘কী হল? মন খারাপ।’ ছেলের চুলে আঙুল দিয়ে বিলি কাটতে কাটতে মধুমিতা জিজ্ঞেস করল।

‘কিছু হয়নি’, বলে অভি মায়ের হাতটা এক ঝটকায় সরিয়ে দিল।

‘চুপচাপ কেন বসে আছিস? কেউ কিছু বলেছে তোকে?’

‘না’, বলেই মধুমিতার হাত আঁকড়ে ধরে অভি, ‘মা, আমরা কেন বাবার সঙ্গে গিয়ে থাকতে পারি না? বলো না, কবে আমরা বাবার কাছে গিয়ে থাকব? চলো না আমরা বাবার কাছে গিয়ে থাকি।’

‘বাজে কথা শুনতে ভালো লাগে না অভি’, মধুমিতার কোমল কণ্ঠস্বর হঠাৎই রুক্ষ হয়ে ওঠে, ‘রাত হয়েছে, ডিনার খেয়ে শুয়ে পড়ো। কাল স্কুল রয়েছে।’

‘আমি খাব না। আগে তুমি আমার কথার উত্তর দাও,’ অভি জেদ করতে থাকে।

‘বললাম না, ফালতু কথা শোনার আমার সময় নেই। আমরা এখানেই থাকব, খেয়ে শুয়ে পড়ো’, হাত ছাড়িয়ে নিয়ে রান্নাঘরে চলে যায় মধুমিতা।

অভি বসেই থাকে। কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করলেই দুজনের কেউই জবাব দেয় না, বরং বকে ওকে থামিয়ে দেওয়ারই চেষ্টা করে। অভি কী করবে বুঝে পায় না।

কাজ শেষ করে মধুমিতা শোওয়ার ঘরে ঢুকে দেখল, অভি খেয়ে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। ওর কচি মুখটা দেখে মধুমিতার মনে হল কোলে টেনে নিয়ে অজস্র চুম্বনে ভরে দেবে ওর ছোট্ট মুখটা। নিজেকে সংযত করল ও। ঘুম ভেঙে যাবে ছেলেটার। বড্ড প্রশ্ন করে আজকাল অভি। সেই সব প্রশ্নের কোনও উত্তর ওর জানা নেই। অভির শৈশবটা সত্যিই হাজার সমস্যায় ভরা। মধুমিতা উদ্দেশ্যহীন ভাবে জীবনটা কাটিয়ে দিতে চাইছে, সিরিয়াসলি কখনও ও নিজেকে এবং অভিকে নিয়ে ভাবে না। জাস্ট এক একটা করে দিন কাটাচ্ছে? অভি ধীরে ধীরে বড়ো হচ্ছে। ওর শিশুসুলভ প্রশ্নগুলোই জেদের বশে কবে কঠোর হয়ে উঠবে কে বলতে পারে? একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে মধুমিতা।

মানসের সঙ্গে জীবন কাটানো অসহনীয় হয়ে উঠেছিল ওর কাছে, কিন্তু ওকে ছেড়ে এসেও কি ভালো আছে ও? মধুমিতা মনে মনে ভাবে। ছেড়ে আসার সময় মনে হয়েছিল মানসকে একটা শিক্ষা দেওয়া দরকার যাতে ওর জীবনে স্ত্রী-র গুরুত্ব ও উপলব্ধি করতে পারে। কিন্তু শেষপর্যন্ত চলে আসাটা অর্থহীন হয়ে দাঁড়াল। প্রথম প্রথম মধুমিতা মানসের আসার অপেক্ষা করে থেকেছে। ওর মনে হতো, মানস নিশ্চয়ই একদিন এসে ওর রাগ ভাঙিয়ে বাড়ি ফেরত নিয়ে যাবে। মধুমিতাও সব ভুলে গিয়ে মানসের সঙ্গে ফিরে যাবে। কিন্তু অপেক্ষা, অপেক্ষা হয়েই থেকে গেছে। মানসও আসেনি ওকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে আর মধুমিতাও ফিরে যেতে পারেনি মানসের কাছে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দূরত্বও বাড়তে থেকেছে। নিজের নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে দুজনেই। মাঝেমধ্যে শুধু অভির প্রশ্নগুলো মধুমিতাকে বাস্তবের সম্মুখীন হতে বাধ্য করত।

গতকালই মায়ের ফোন এসেছিল। সেই-ই একই কথা। মানসের কাছে ফিরে না গেলে ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু তো একটা ভাবা দরকার। মধুমিতা খুব ভালো করেই জানে মা, ভবিষ্যৎ মানে কী বোঝাতে চাইছেন। মানসকে ডিভোর্স দিয়ে দ্বিতীয়বার বিয়ের পিঁড়িতে বসা। কিন্তু এটা বলা এবং করার মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। এতই কি সোজা পুরো ব্যাপারটা? অভির কী হবে? ও আর মানস দুজনেই যদি আলাদা করে দ্বিতীয়বার বিয়ের কথা ভাবে তাহলে দুজনের কাছেই অভির প্রেজেন্সটা অবাঞ্ছিত হয়ে উঠবে না? চিন্তাটা আসাতেই মধুমিতা শিউরে উঠে অভিকে নিজের কোলের কাছে টেনে আনে।

মধুমিতা অভির ঘুমন্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকে খানিকক্ষণ। সত্যিই, ছোটো থেকেই ছেলেটার জীবনে সমস্যার শেষ নেই, মা-বাবার যৗথ ভালোবাসা ওর কপালে আজ পর্যন্ত জুটল না। এর উপর মধুমিতা নিজে আর ওর সমস্যা বাড়াতে একেবারে চায় না। অভির শরীরের ওম ধীরে ধীরে মধুমিতার চোখে তন্দ্রা এনে দিতে সাহায্য করে। আজ কেন জানি না মধুমিতার মনে হল ওর মনের ভিতর জমে থাকা বরফটা সামান্য হলেও গলতে শুরু করেছে। যেগুলো মেনে নিতে আগে কিছুতেই মন চাইত না আজ সেগুলো মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে না। সমস্যাগুলো রয়েই গেছে মধুমিতার জীবনে তবুও ওর মনে হল, সমস্যাগুলোকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেছে ওর। ও নিজের মন-কে বোঝার চেষ্টা করে। ভাবতে ভাবতেই কখন ঘুমিয়ে পড়ে, নিজেই টের পায় না মধুমিতা।

সকালে অভি আবার স্বাভাবিক। কিছু কিছু জিনিস যে ওর জীবনে বদলাবার নয় সেটা ও ভালোমতোই এতদিনে বুঝে গিয়েছিল।

স্কুলে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে নিল অভি। অভিকে স্কুলে পাঠিয়ে মধুমিতাও নিজের অফিস এসে পৌঁছোল। রোজকার মতোই একটা দিন, কিন্তু মনের ভিতর সন্তুষ্টি অনুভব করছিল মধুমিতা। সারাটা সপ্তাহ ব্যস্ততার মধ্যেই ওদের কেটে গেল। আবার এসে গেল রবিবারের পালা।

মানস যথারীতি মধুমিতার ফ্ল্যাটের নীচে দাঁড়িয়ে ফোন করে নিয়ম মতো অভিকে ডেকে পাঠাল। কিন্তু প্রতি রবিবরের মতো অভি একা নামল না, মধুমিতাও এল ওর সঙ্গে যেটাতে শুধু মানস-ই নয় অভিও খুবই অশ্চর্য হল।

মানস লক্ষ করল, মধুমিতার চেহারায় লাবণ্য যেন অনেকটাই আবার ফিরে এসেছে। কঠোরতাটা অনেক কম। একলা লড়াই চালাতে চালাতে সৌন্দর্য কিছুটা মলিন হয়ে পড়েছে। তিনজন সামনাসামনি হলেও কারও মুখে কোনও শব্দ জোগাল না। মনের মধ্যে নানা কথা ভিড় করে আসছিল কিন্তু বলার ভাষা জোগাতে পারল না কেউই।

‘অভি চলো’, মানসই প্রথম নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করল। মধুমিতার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই মধুমিতা চোখ নামিয়ে নিল। মানসের মনে হল মধুমিতা কিছু বলতে চায় কিন্তু ওর দিক থেকে কোনও কথা না আসায় মানস অভির হাত ধরে গাড়িতে ওঠার উপক্রম করতেই পিছন থেকে মধুমিতার কণ্ঠস্বর কানে এল, ‘মানস’। মানসের মনে হল একটা যুগ পার করে মধুমিতার গলায় নিজের নামটা ও শুনল। ‘কাল অভির স্কুলে পেরেন্ট-টিচার মিটিং আছে। তুমি যদি একটু সময় বার করে আসতে পার অভির খুব ভালো লাগবে।’

মানসের ‘হ্যাঁ’ বলে দিতে ইচ্ছে করছিল কিন্তু ও উত্তর দিল, ‘আমার সময় হবে না… কাল টুরে বেরিয়ে যাব আমি।’ উত্তর দিয়েই পালটা জবাবের জন্য প্রতীক্ষা না করে মানস ড্রাইভার সিটে উঠে বসল।

মধুমিতা নিজের জায়গায় পাথর  হয়ে দাঁড়িয়েই রইল। মন চাইছিল মানসের নাম ধরে আর একবার ডাকার কিন্তু গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোল না। ততক্ষণে মানস গাড়ি স্টার্ট করে দিয়েছে। সম্পর্কের বরফ গলাবার চেষ্টা করাটা ব্যর্থ হয়ে গেল মধুমিতার। মানসের, মুখের উপর ‘না’ বলে দেওয়ার ভয়েই মধুমিতা সম্পর্কের এই বরফ গলাবার চেষ্টা করতেই বরাবর ভয় পেয়ে এসেছে। ক্লান্ত পায়ে মধুমিতা লিফটের দিকে পা বাড়ায়।

সন্ধেবেলায় অভি বাড়ি আসতে প্রত্যেকবারের মতো মধুমিতা এবারে ওকে কিছুই জিজ্ঞেস করল না। অভিও সারাদিন  কী করল– না করল কিছুই মধুমিতাকে বলল না, কারণ বলার মতো কিছুই ছিল না। পুরোটা দিন দুজনের মধ্যে কথা প্রায়ই হয়নি। নিজের নিজের চিন্তাতেই দুজনে বিভোর ছিল। অভি একবারও মানসকে স্কুলে পেরেন্টটিচার মিটিং-এ আসার জন্য বায়না করেনি।

অভিকে ছেড়ে বাড়িতে আসার পর মধুমিতার মুখটাই মানসের খালি মনে পড়ছিল। স্কুলের জন্য ‘না’ বলে দেওয়াতে মধুমিতার চোখে যে ব্যথার ঝলক মুহূর্তের মধ্যে দেখা দিয়ে মিলিয়ে গিয়েছিল, সেটা আর কেউ না হলেও মানসের চোখ এড়ায়নি। অভিও, একবার ওকে স্কুলে আসার জন্য বায়না করেনি। হয়তো অভিও ওর কাছ থেকে উত্তর আশা করাই ছেড়ে দিয়েছে। এইসব ভাবতে ভাবতেই বাইরের পোশাক ছেড়ে মানস বিছানায় গা এলিয়ে দিল। খাওয়ার ইচ্ছে হল না কিছুতেই।

পরের দিন মধুমিতা অভিকে সঙ্গে নিয়ে ঠিক সময়ে স্কুলে পৌঁছে গেল। ক্লাসরুমের দিকে যেতে গিয়ে দুজনেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। করিডরে মানস ওদেরই অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। অভি ছুট্টে গিয়ে মানসকে জড়িয়ে ধরল।

অভির আনন্দ দেখে মানস আর মধুমিতা দুজনেরই চোখে জল এসে গেল। মধুমিতা ওদের দুজনের কাছে আর একটু ঘন হয়ে সরে এল। ওর মুখও প্রসন্ন হাসিতে ভরে যায়। ‘থ্যাংকস, মানস… তোমাকে দেখে অভি প্রচণ্ড খুশি হয়েছে। আমরা ভাবতেই পারিনি তুমি…’

পেরেন্ট-টিচার মিটিং শেষ হতেই বাইরে এসে অভি বন্ধুদের সঙ্গে মানসের আলাপ করাতে শুরু করল। ওর আনন্দ দেখে মানসেরও মনে হল ও স্কুলে এসে ঠিক কাজই করেছে।ঞ্জঅভিকে বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতে ছেড়ে দিয়ে মানস স্কুলের বাইরে এসে দাঁড়াল। মধুমিতাও ওর পিছন পিছন স্কুলের বাইরে বেরিয়ে আসে।

মধুমিতাই প্রথম কথা শুরু করে, ‘এত খুশি হতে অভিকে আমি অনেক দিন দেখিনি মানস।’

‘হ্যাঁ, অভি এখনও বাচ্চা… সুতরাং ছোটো ছোটো জিনিসেই ও খুশি হয়ে ওঠে’, বলে আবার মানস চুপ হয়ে যায়। মধুমিতাও কথা খুঁজে পায় না। ‘ঠিক আছে… এবার আমি যাব। অভিকে বলে দিও আমার দেরি হয়ে যাচ্ছিল… রবিবার ওকে নিতে আসব’, কথা শেষ করে মানস যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়।

‘মানস’, অনুশোচনায় মধুমিতার গলা বুজে আসে, ‘একটা কথা জিজ্ঞেস করব।’

‘হ্যাঁ, করো।  কী জিজ্ঞেস করতে চাও?’

মানসের কণ্ঠস্বরে প্রশ্রয় অনুভব করে মধুমিতার ইচ্ছে হচ্ছিল দুই বছরের জমে থাকা চোখের জল বইয়ে দেয় মানসের কাঁধে মাথা রেখে। নিজেকে সংযত করল ও, ‘আচ্ছা মানস, এই দুই বছরে কখনও আমার অভাব বোধ করেছ? আমাদের ছাড়া তুমি জীবনে খুশি হতে পেরেছ? মধুমিতার স্বর খুব ক্লান্ত শোনাচ্ছিল, মনে হচ্ছিল কথাগুলো বলার জন্য ওর নিজের সঙ্গেই নিজেকে লড়তে হচ্ছে। অথচ বলে দেওয়ার পর ওর মনে হচ্ছিল বলাটা এতটাও কঠিন ছিল না। আগে কেন তাহলে কথাগুলো বলতে পারেনি ও? কথাগুলো বলে মধুমিতা, মানসের দিকে তাকাল, চেষ্টা করল ওর মুখের অভিব্যক্তিগুলো পড়ার।

‘আমার অভাব তুমি কখনও ফিল করেছ?’ কিছুক্ষণ চুপ থেকে মানস জিজ্ঞেস করল।

মধুমিতা উত্তর দিল না। উত্তর না পেয়ে মানস বলল, ‘ছাড়ো এসব কথা… এখন ও সব কথা বলে কী লাভ? অনেক দেরি করে ফেলেছি দুজনেই।’

‘এখন না হয় দেরি হয়ে গেছে, আগেও তো তুমি কখনও আমাকে একবারও ডাকোনি’, ভিজে স্বরে মধুমিতা বলে।

‘আমি তোমাকে ডাকিনি ঠিকই কিন্তু আমি তোমাকে বাড়ি থেকে চলে যেতেও বলিনি। তুমি নিজের ইচ্ছেয় বাড়ি ছেড়েছিলে, আবার নিজের ইচ্ছেয় বাড়ি ফিরেও আসতে পারতে, মানস বলে।

‘একবার তো ডাকতে পারতে। আমি ঠিক ফিরে আসতাম’, চোখের পাতা ভিজে আসে মধুমিতার।

‘তখন তোমাকে ডাকলেও তুমি ফিরতে না। ফেরারই যদি হতো তাহলে তুমি বাড়ি ছেড়ে যেতেই কেন? বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার সময় শুধু নিজের কথা না ভেবে একবারও যদি অভির কথা চিন্তা করতে, তাহলে কিছুতেই বাড়ি ছেড়ে যেতে পারতে না। আমাদের দুজনের জেদের বলি হতে চলেছে অভি। ওর শৈশব হারিয়ে যাচ্ছে বড়োদের ঝগড়ার মাঝে। আমরা ওকে কী দিতে পেরেছি? না নিজেরা আনন্দে আছি না সন্তানকে আনন্দে রাখতে পেরেছি’, বলে মানস নিজের চোখের জল লুকোতে গাড়ির দরজা খুলে উঠে বসে গাড়ি স্টার্ট করে।

মুহূর্তে মধুমিতার মনে হয়, গিয়ে মানসের রাস্তা আটকে দাঁড়ায়, ওকে জড়িয়ে ধরে বলে যে ওর কাছে ফিরে আসতে চায়। কিন্তু ভাবতে ভাবতেই মানস গাড়ি স্টার্ট করে ট্র্যাফিকের সঙ্গে মিশে যায়। নিজের মন ঠিক করে নেয় মধুমিতা। অনেক দেরি করে ফেলেছে ও আত্মসম্মান বজায় রাখার নাম করে। কিন্তু আর নয়, দোষ যখন নিজে করেছে, শুধরোতেও নিজেকেই হবে। অভিকে নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে ও।

পরের দিন অফিস যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে মানস, নীচের কলিংবেলটা বেজে উঠল। এত সকাল সকাল কে এল ভাবতে ভাবতে দরজা খুলতে নামল ও। দরজা খুলতেই দেখল, মধুমিতা আর অভি দাঁড়িয়ে আছে দরজায়।

‘তোমরা!’ নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না মানস।

‘ভেতরে আসতে বলবে না?’ মধুমিতা জিজ্ঞেস করে।

‘তুমি নিজের বাড়ি এসেছ মধুমিতা আমি তোমার রাস্তা আটকাবার কে?’ মানস দরজার পাশে সরে দাঁড়াল। মধুমিতা আর অভি ভিতরে ঢুকে এল। মানস দরজা বন্ধ করতে করতে নিজের মনেই একটা প্রতিজ্ঞা করল, এবার আর ও নিজের খুশিকে দরজা দিয়ে কখনও বাইরে বার হয়ে যেতে দেবে না।

শাসক ও জনতা

করোনার  প্রকোপে ভারতীয় অর্থনীতির যে বেহাল অবস্থা, তা সামলানো খুব সহজ নয়। পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাবে আগামী কয়েক বছরে। সত্যি কথা বলতে কী এর প্রভাবে সবচেয়ে বেশি জর্জরিত মধ্যবিত্ত সংসারগুলি। তাদের আগাম প্রস্তুত থাকা প্রয়োজন, আরও বড়ো বিপর্যয় সামলাবার জন্য। এখন এটা পরিষ্কার বুঝে নিতে হবে যে, মাঝেমাঝেই অতিমারির সঙ্গে যুঝতে হবে। সুস্থ থাকার লড়াইটাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড়ো লড়াই৷

এদিকে কয়েকমাস আগে. চিনের সীমানা দখলের প্রচেষ্টার কারণে আমাদের সমস্ত টাকাই খরচ হয়েছে হিমালয়ের পাথর ফাটিয়ে রাস্তা নির্মাণ আর অস্ত্র এবং বোমারু বিমান ক্রয় করতে। আগামী দিনেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের ততপরতায়, আরও এয়ারবেস তৈরি হবে, ব্যারাক তৈরি হবে, কিন্তু সাধারণ মানুষের টান পড়বে তার সঞ্চয়ে৷ দেশের ব্যাবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর মধ্যবিত্ত কোনও ভাবেই ভালো বাড়ি, ভালো গাড়ি, ভালো চাকরি, ভালো ভ্রমণের কথা ভাবতে পর্যন্ত পারবে না।

পেট্রোলের আকাশছোঁয়া দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত জিনিসের মূল্য বৃদ্ধি হচ্ছে। মানুষের ক্রয় ক্ষমতা কমছে। চাহিদা কম বলে বিলাসবহুল সামগ্রীর জোগানও কম হচ্ছে। সবচেয়ে বড়ো কথা ঘরে চাল-ডালের পাশাপাশি বেশ কিছু টাকা স্বাস্থ্যবাবদ সরিয়ে রাখতেই হবে এবার সাধারণ মানুষকে। কর্মহীন মানুষের এমনিই যেখানে দিনগুজরান মুশকিল হয়ে গেছে, সেখানে ডাক্তার খরচ বাড়লে প্রমাদ গুণতে হবে।

প্রচুর ছোটোবড়ো ব্যাবসা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, আরও যাবে। সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখার বিলাসিতা আর আগের মতো নেই। মল ক্রমে তার জৌলুশ হারাবে। যতদিনে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা স্বাভাবিক হবে, ততদিনে ঝলমলে পোশাকগুলো ম্লান হয়ে যাবে। অর্থনৈতিক শিড়দাঁড়াটা ভেঙে গেলে আর কি সোজা হয়ে দাঁড়ানো যাবে? বেকারত্ব যেভাবে জাল প্রসারিত করেছে, তাতে এর কবল থেকে সহজে পরিত্রাণ নেই।

তবে শুধু আমাদের দেশকেই নয়, আমেরিকা কিংবা টার্কির মতো দেশকেও সামলাতে হচ্ছে অযোগ্য শাসকের কর্মফল। কথায় বলে না, পিপল ডিজার্ভ দ্য কিং, হোয়াট দে আর। মানুষ যেমন হয়, তাদের শাসকও তেমনই জোটে। সময় বলবে কী আমাদের নিয়তি৷ আমরা তো প্রতিবাদ ভুলে হোয়াটসঅ্যাপ আর ফেসবুক-এ মিথ্যে খবর ফরোয়ার্ড করতে ব্যস্ত। আমাদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের খবর রাখার আমাদের সময় কই!

বলিউডের ছবিতে এবার আমির–পুত্র জুনেইদ খান

পর্দায় আবির্ভাব ঘটতে চলেছে এবার অভিনেতা আমির খানের জ্যেষ্ঠ পুত্র, জুনেইদ খানের। বলিউডে তাঁর অভিষেক নিয়ে এতদিন গুঞ্জন চললেও এবার সব কৌতুহলের অবসান হলো। জুনেইদের প্রথম ছবির নাম ‘মহারাজ’। মহারাজ সিনেমাটি গুজরাতের লেখক ও সমাজ সংস্কারক কর্সনদাসের জীবনীর ওপর নির্মাণ করা হচ্ছে। ছবিটি পরিচালনা করছেন জনপ্রিয় পরিচালক সিদ্ধার্থ মালহোত্রা।সম্প্রতি শুরু হয়েছে সিনেমার শুটিং, প্রযোজক যশ রাজ প্রোডাকশনস।

এই প্রযোজনা সংস্থা অতীতে অনুষ্কা শর্মা, রনবীর সিং সহ অনেক বড়ো বড়ো তারকাদের বলিউডে লঞ্চ করিয়েছে। এবার জুনেইদের জন্য তারা বেছে নিয়েছেন একটি পিরিয়ড পিস। ১৮৬২ সালের মহারাজ লাইবেল মামলার ওপর সিনেমা-টি তৈরি হচ্ছে। এই সিনেমার জন্য মুম্বইয়ের মাড আইল্যান্ডে বিশাল সেট তৈরি হয়েছে।

ছবির প্রস্তুতি হিসেবে, জুনেইদ রীতিমতো ওয়ার্কশপ করেছেন। চাঞ্চল্যকর ‘মহারাজের মিথ্যা মামলা’র ওপর নির্মিত এই ছবিতে, এক সাংবাদিকের ভূমিকায় অভিনয় করতে পেরে বেশ এক্সাইটেড এই তরুণ অভিনেতা। জানিয়েছেন, এই সিনেমায় অভিনয়ের জন্য তাঁকে দীর্ঘ ৫ মাস ধরে প্রস্তুতি নিতে হয়েছে।

২৫ জানুয়ারি ১৮৬২ সালে বম্বে হাইকোর্টে সাংবাদিক করসানদাস মুলজি, যিনি সত্যপ্রকাশ নামে এক সংবাদপত্রের সাংবাদিক ছিলেন এবং তার পাবলিশার নানাভাই রুস্তমজি রাণিনা। এক ধর্মগুরুর, তাঁর শিষ্যাদের নিয়ে যৌন কেলেঙ্কারির খবর ছাপানোর জন্য রাণিনার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। জানা গিয়েছে, আমির খানের পুত্র জুনেইদ, এই সাংবাদিক মুলজির ভূমিকায় অভিনয় করবেন।

জুনেইদ দীর্ঘদিন ধরে থিয়েটারে অভিনয় করেছেন এবং বেশ কিছু সফল নাটক উপহারও দিয়েছেন। স্টেজ থেকে তিনি সরাসরি পর্দায় আসতে চান বলে কিছুদিন আগে ইচ্ছাপ্রকাশ করেছিলেন।এবার রুপোলি পর্দায় তাঁর সেই নতুন জীবন শুরু করছেন যশ রাজ ফিল্মসের মাধ্যমে। জুনেইদ ছাড়াও এই সিনেমায় অভিনয় করবেন, অর্জুন রেড্ডি, অভিনেত্রী শালিনী পান্ডে, শর্বরী ওয়াগ, এবং জয়দীপ আহলাওয়াত।

জুসি মাশরুম আর ম্যারিনেটেড কপি

এক এক দিন এমনও যায়, যেদিন রান্না করতে মন চায় না৷ সব রান্নাই খুব একঘেয়ে মনে হয় ৷ কেউ কেউ এমনও আছেন, যাদের রান্না করতে মোটেই ভালো লাগে না৷ আজ রইল তেমনই ঝটপট রান্নার সহজ রেসিপি৷খেতে সুস্বাদু কিন্তু পরিশ্রমসাপেক্ষ নয় একেবারেই৷

প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় শাকসবজি অনেকখানি অংশ জুড়ে রয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আমরা  ভিটামিন ও খনিজ লবণ পাওয়ার জন্য শাকসবজি খেয়ে থাকি।তবে সবজি শুধু স্বাদ ও পুষ্টির জন্য নয়। এর বিষয়ে ভালোভাবে জেনে শরীরের প্রয়োজন-অপ্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য  রেখে তবেই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায়, সবজিকে স্থান দিতে হবে।আর মাথায় রাখতে হবে তাড়াতাড়ি রান্না হওয়ার সমীকরণটাও৷

জুসি মাশরুম

উপকরণ  -২৫০ গ্রাম মাশরুম, ৩/৪ কাপ দই, ১/২ –  ১/২ ছোটো চামচ নুন ও গোলমরিচ, ১/২ –  ১/২ ছোটো চামচ অরিগ্যানো ও চিলি ফ্লেক্স, ২ ছোটো চামচ পুদিনাবাটা, ১ ছোটো চামচ অলিভ অয়েল।

প্রণালী – মাশরুমগুলি ময়দা মাখিয়ে রগড়ে ধুয়ে নিন। এবার মাঝখান বরাবর চিরে নিন। দইয়ের সঙ্গে মশলা, তেল ও পুদিনা মিশিয়ে নিন। মাশরুমের উপর ছড়িয়ে হালকা হাতে মেখে নিন। ৩-৪ ঘণ্টা ঢেকে রাখুন। গ্রিলার গরম করে, শিকে গেঁথে গ্রিল হতে দিন। চাটনি, সস, গরম মটরশুঁটি সেদ্ধ বা ফল–  যে-কোনও কিছুর সঙ্গেই এটা পরিবেশন করা যায়।

Marinated Cauliflower Recipe

ম্যারিনেটেড কপি

উপকরণ – ১টা ফুলকপি, ১/২  কাপ দই, ২ বড়ো চামচ কাঁচালংকাবাটা, পুদিনা আর ধনেপাতা চাটনি, চাটমশলা, গোলমরিচ প্রয়োজনমতো, ১ ছোটো চামচ অলিভ অয়েল, ১টা লেবুর রস।

প্রণালী -দইয়ের সঙ্গে অলিভ অয়েল, চাটনি, নুন ও মশলা মিশিয়ে নিন। লেবুর রস ছড়িয়ে ফুলকপির টুকরো  দইয়ে ম্যারিনেট করুন। ৫-৬ ঘণ্টা পরে শিকে গেঁথে গ্রিল করুন। ডিপ, স্যালাড, ধনেপাতার চাটনির সঙ্গে পরিবশেন করুন।

ইয়াকতেন-পাখিয়ং-চোচেনফেরি-লোসিংমাছং

মধ্যাহ্নে রেস্তোরাঁর দোতলায় বসে চিকেন ড্রাই-ফ্রাই-এর স্বাদ আস্বাদন করতে করতে সুন্দরী তিস্তাকে দেখার অভিজ্ঞতা আগে ছিল না। এই সুযোগ করে দিল আমাদের সফরপথের গাড়িচালক স্যামুয়েল লেপচা। বেলা বারোটায় বাগডোগরা বিমানবন্দরের বাইরে এসে গাড়িতে উঠে খিদে পাওয়ার কথা জানাতেই, সেবক রোড-এ অবস্থিত ‘অভিনয়’ রেস্তোরাঁয় খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল স্যামুয়েল। তাই, পথে চা-পান করলেও, ভালো খাবারের জন্য একটু অপেক্ষা করতেই হল।

পাহাড়ি জল পেটে সহ্য নাও হতে পারে, এই ভেবে নামি ব্র্যান্ডের কয়েকটা পাঁচ লিটারের জলের জার কিনে গাড়িতে তুললাম। তারপর চললাম পূর্ব সিকিমে আমাদের প্রথম গন্তব্য ইয়াকতেন-এর উদ্দেশে।

তিস্তার ফিগার এখন স্লিম। কারণ, শীতে তার জলভার কমে গেছে। এহেন বহমান তিস্তাকে পাশে রেখে ছুটে চলল আমাদের গাড়ি। তিস্তা বাজার, লাভার্স পয়েন্ট ছাড়িয়ে গ্যাংটকগামী পথে কিছুটা চলার পর তিস্তাকে আর পাশে পাওয়া গেল না, রানিপুল থেকে গাড়ি ঢুকল অন্য পথে।

সিকিমের অন্য পর্যটন পথের মতো এ পথে (ইয়াকতেন-এর) গাড়ির ততটা চাপ নেই। তাই সর্পিল পাহাড়ি পথের ডানদিকে পাহাড় আর বাম দিকে শাল-সেগুন প্রভৃতি বৃহৎ বৃক্ষের ঘন জঙ্গল ভেদ করে যখন আমাদের গাড়ি ছুটে চলেছে, তখন নির্জনতার এক অদ্ভূত রোমাঞ্চ অনুভূত হচ্ছিল। এভাবেই ১০৮ কিলোমিটার পথে (রানিপুল থেকে) দুপুর-বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নামল সফর পথে।

সন্ধে সাতটা। গাড়ি থামালাম পাখিয়ং বাজারে। পূর্ব সিকিমের পর্যটনকে যাঁরা আরও উন্নত করতে চান, সেই দুই প্রধান উদ্যোক্তা নারায়ণ প্রধান এবং হূষিকেশ গুরুং-এর আমন্ত্রণে কিছুক্ষণের জন্য গেলাম ‘অ্যালপাইন হোম স্টে’-তে চা-পান করতে। প্রায় ১০৪ বছরের প্রাচীন বাড়িটিকে সুন্দর ভাবে সাজিয়ে গুছিয়ে পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে এখানে। জমিদার আমলের আসবাব আর গৃহস্থালিতে সমৃদ্ধ এই হোম স্টে, সত্যিই মন কেড়ে নিল, কিন্তু থাকা হল না সফর তালিকায় না থাকার জন্য। তবে জেনে নিলাম, এখানে মোট কুড়িজন একসঙ্গে থাকতে পারবেন। থাকা-খাওয়া বাবদ প্রতিদিন মাথাপিছু খরচ করতে হবে ৮00 টাকা।

পাখিয়ং-এ তিরিশ মিনিট চা-পানের বিরতির পর আবার গাড়িতে উঠলাম। দশ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ঠিক রাত আটটার সময় পৌঁছোলাম ইয়াকতেন ‘অর্কিড হোম স্টে’-তে।

স্থানীয় প্রথা অনুযায়ী হোম-স্টে-তে আমাদের বরণ করা হল দই-চাল-দানাশস্য আর পাহাড়ি ফুল দিয়ে। বরণ-পর্ব শেষ হওয়ার পর, থাকার ঘরে পৌঁছোনোর জন্য প্রায় তিরিশ ধাপ সিঁড়ি ভাঙতে হল। কারণ এখানে পাহাড় কেটে তৈরি হয়েছে হোম-স্টে। বরাদ্দ পেল্লাই সাইজ-এর ঘরে রয়েছে, বড়ো খাটে সুন্দর বিছানা, বসার জন্য বড়ো সোফা, ঘরে হিটার, গিজার, কফি-মেকার সহ যাবতীয় প্রয়োজনীয় সামগ্রী। শীতকে উপভোগ্য করার জন্য এসবের ব্যবস্থা রয়েছে দেখে স্বস্তি পেলাম।

আধ ঘণ্টার মধ্যে ফ্রেশ হয়ে রাত-পোশাকে বাইরে এলাম। আকাশের আধফালি চাঁদের আবছা আলোয় তখন চারিদিকে এক মায়াবি পরিবেশ। তারই মধ্যে বনফায়ার আর বারবিকিউ-র ব্যবস্থা করেছেন অর্কিড হোম স্টে-র সর্বময় কর্তা জ্ঞান বাহাদুর সুব্বা। বসার জায়গা করে দিয়ে জ্ঞানু (ডাক নাম) আমাদের হাতে ধরিয়ে দিলেন ফারমেন্টেড মিলেট তরল। বাঁশের পাত্র এবং বাঁশের স্ট্র সহযোগে ‘টুংবা’ নামের এই বিশেষ পানীয়, প্রবল শীতে (৩-৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস) খুব কাজে লাগল। শরীর গরম হয়ে গেল কিছুক্ষণের মধ্যে। এরপর আমাদের বিনোদনের জন্য সুব্বা সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েরা শুরু করল সিকিমিজ লোকগান আর লোকনৃত্য। নিংমা, ডোমা শেরপা, মনিতা সুব্বা, ইশনিয়া সুব্বা নাচল নীতেন ছেত্রীর গানের সঙ্গে। প্রথম রাতেই মনটা বেশ ভরে গেল আনন্দে। রাতে জ্ঞান বাহাদুরের স্ত্রী বাসন্তীর হাতে গড়া রুটি, ডাল, আলুভাজা আর চিকেন কারির স্বাদ নিয়ে ঘরে ঢুকলাম পরের দিনের আলোয় প্রকৃতিকে দেখার কৌতূহল নিয়ে।

প্রসঙ্গত নারায়ণ প্রধান জানিয়েছিলেন, আবহাওয়া অনুকূল থাকলে ইয়াকতেন থেকে ভোরবেলা কাঞ্চনজঙঘা দর্শন করা যায়। সেই লোভে হাড় কাঁপানো শীতের মধ্যে বিছানা ছাড়লাম ভোরবেলা। দরজা খুলে চোখ মেলতেই দেখি কাঞ্চনজঙঘার রূপের আলোর বিচ্ছুরণ। আহা কী অপরূপ রূপ, কী মহিমা! ক্যামেরা বের করে দু’দশটা ছবি তুলতে-তুলতেই আবার ঝাপসা হয়ে গেল কাঞ্চনজঙঘা। তখন চোখ ফেরালাম ইয়াকতেনের অর্কিড হোম স্টে-র চারপাশে। চোখে পড়ল অর্কিড-এর বহুবর্ণ ফুলের বাগিচা, কিউই, স্কোয়াশ আর শাকসবজির খেত। ফুলের উপর ঝাঁকে ঝাঁকে প্রজাপতি ঘুরে বেড়াতেও দেখা গেল। আর দেখা হল মধু চাষের প্রক্রিয়া। ফুলের বাগানে বসানো রয়েছে মৌচাক তৈরির বাক্স।

মকাই আটার রুটি, জিরে-আলু ভাজা, ছানার ডালনা, আর দেশি মুরগির ডিম সিদ্ধ দিয়ে ব্রেকফাস্ট সারলাম। স্নানে যাওয়ার আগে জ্ঞানুর কাছ থেকে জেনে নিলাম ‘ইয়াকতেন’ নামের মাহাত্ম্য। জ্ঞানু জানালেন, সিকিমিজ ল্যাংগুয়েজ-এ ইয়াকতেন বলতে বোঝায় ‘ওয়েলকাম টু মাই নিউ হোম’।

আগের সন্ধেয় পাখিয়ং-কে জাস্ট ছুঁয়ে এসেছিলাম, আজ দ্বিতীয় দিনে ভালো করে আলাপ-পরিচয় হবে। সেইমতো বেলা ন’টার সময় বেরোলাম গাড়ি নিয়ে। আমাদের ড্রাইভার কাম গাইড স্যামুয়েল প্রথমে নিয়ে গেল ইয়াকতেন থেকে ৬ কিলোমিটার দূরের পাখিয়ং এয়ারপোর্ট ভিউ পয়েন্ট-এ। একটা উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে, পাহাড়ি ঝাউগাছের ফাঁক দিয়ে আমরা দেখলাম নবনির্মিত পাখিয়ং বিমানবন্দরকে। পাহাড় কেটে তৈরি হয়েছে ছোট্ট রানওয়ে। জানা গেল, চলতি বছরের শেষের দিকে নাকি এখান থকে ওঠানামা করবে বিমান। তবে পঞ্চাশ থেকে ষাট সিটারের যাত্রী বহনকারী বিমান-ই শুধু ওঠানামা করবে বলে জানা গেছে। এও জানা গেছে, কলকাতা থেকে বাগডোগরা পর্যন্ত যা ভাড়া, মোটামুটি সেইরকম অর্থ ব্যয় করলেই পর্যটকরা পৌঁছে যেতে পারবেন পূর্ব সিকিমের এই (পাখিয়ং) বিমানবন্দরে। তারপর এখান থেকে গ্যাংটক কিংবা অন্যত্র খুব কম সময়ের মধ্যে গাড়ি করে পৌঁছানো যাবে।

বায়ুপথে আরামে যাতায়াত করা যাবে এই আনন্দে মনটা যখন বিভোর, তখন স্যামুয়েল জানাল, আজ সে দেখাবে পাখিয়ং-এর দুটি নতুন জায়গা– পাসতাংগা আর আচ্ছাম লিংজে।

পাখিয়ং এয়ারপোর্ট থেকে পাথুরে পথে গাড়ি এগোতে থাকল পাসতাংগার দিকে। রাস্তার দুদিকে দেখা গেল ফুলঝাড়ু তৈরির অসংখ্য গাছ, ফসলের খেত, ঝাউবন, বাঁশগাছ আর টকটকে লাল পাতাবাহার গাছ। এরপর একটা জায়গায় গাড়ি থামাতেই হল ছবি তোলার জন্য। অসংখ্য কানের ঝুমকো দুলকে একসঙ্গে ঝুলিয়ে রাখলে যে সৗন্দর্য প্রকাশিত হবে, তেমনই কমলারঙা একাধিক ফুলের গাছের সারি চোখ জুড়িয়ে দিল। স্থানীয় একটি মেয়ে ভাঙা ভাঙা হিন্দিতে জানাল, এটা সোসতানি ফুলের গাছ। পবিত্র এই ফুল দিয়ে দেবদেবীকে সন্তুষ্ট করা যায় বলে অঞ্চলের অধিবাসীদের বিশ্বাস। পাখিয়ং-এর পাসতাংগার দামলাখা অঞ্চলে জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত এই ফুল ফুটতে দেখা যায়।

ফুলের ছবি তুলে গাড়ি একটু এগোতেই স্যামুয়েল দেখাল সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুল। এই স্কুলেই নাকি একসময় লেখাপড়া করতেন ফুটবলার বাইচুং ভুটিয়া।

পাসতাংগার ছাঙে মনাস্ট্রি দেখার আগে, স্যামুয়েল গাড়ি থামিয়ে আলাপ করাল পল করন রাই-এর সঙ্গে। জানা গেল, ইনি রাই সম্প্রদায়ের অভিজাত পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের সদস্য। কথা বলে বুঝলাম, সত্যি জ্ঞানী এবং সম্ভ্রান্ত মানুষ। বিনয়ী স্বভাবের এই মানুষটি আমাদের ভ্রমণকে সার্থক করতে অনেকটাই সাহায্য করলেন স্বেচ্ছায়। প্রথমে তিনি তাঁর অভিজাত ‘রাই হাউস’-এ নিয়ে গিয়ে মকাই চুরা (ভুট্টার তৈরি) আর ‘টুংবা’ দিয়ে আপ্যায়ন করলেন। অতিথিকে আপ্যায়ন করার ওটাই নাকি স্থানীয় রীতি।

যাইহোক, তারপর পল রাই দেখালেন তাঁর নানা প্রজাতির কুকুর, বেড়াল, খরগোশ প্রভৃতির ছোট্ট চিড়িয়াখানা। দেখালেন বইয়ের সংগ্রহ। সংগীত প্রেমীদের জন্য গিটার ছাড়াও তিনি রেখেছেন নানারকম মিউজিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট। এসব দেখানোর পর তিনি আমাদের নিয়ে গেলেন তাঁর বাড়ির অনতিদূরের রংরং ঝরনা দেখাতে। বিশাল না হলেও মন্দ নয় সেই ঝরনা। ‘এপিকা গার্ডেন’-এর প্যারাগ্লাইডিং-ও রোমাঞ্চিত করল আমাদের। মিস্টার পল দূর থেকে দেখালেন দেওরালি জনপদ।

এরপর পাহাড়ি জঙ্গলে কিছুটা ট্রেক করে (১৫ মিনিট) পৌঁছোলাম একটা উঁচু জায়গায়। পাসিংটেল (ভুটিয়ারা বলে পাথরের স্তুপ) নামে পরিচিত ওই উঁচু পাহাড়ে রয়েছে ছোটো ছোটো তিনটে জলাধার– বালাখোলা, একচেন খোলা আর সেলেলে। স্থানীয় লেপচারা বলে, ডুঙ্গেল খাড়ুকা। একসময় নাকি এখানে বাস করত ডুঙ্গেল পরিবার। চাষাবাদের জন্য তারাই নাকি এইসব জলাধার তৈরি করেছিল। সে যাইহোক, মিস্টার পল জানালেন, এখান থেকেও নাকি কাঞ্চনজঙঘা এবং পান্ডিম দেখা যায় ভোরবেলা।

পল রাইকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে এরপর আমরা চললাম পাখিয়ং-এর আচ্ছাম লিংজের লিম্ব গ্রামে। স্যামুয়েল আলাপ করাল বিক্রম সুব্বার সঙ্গে। পুলিসের চাকরি ছেড়ে ইনি এখন ব্যস্ত পর্যটনে। এরজন্য তাঁর স্ত্রী তাঁকে ‘পাগল’ বললেও, তিনি পর্যটকদের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন হাসিমুখে।

সিকিম পর্যটন দফতরের প্রেরণায় গড়ে ওঠা ‘ইয়াকচেরি হোম স্টে’-কে জনপ্রিয় করে তোলার দায়িত্ব পালন করছেন এই প্রাক্তন পুলিশকর্মী। এ ব্যাপারে তাঁকে সাহায্য করছেন মন বাহাদুর সুব্বা। ছিমছাম হোম স্টে দেখানোর পর স্লঁরা তাঁদের নিজের হাতে তৈরি ‘ইন্টারন্যাশনাল অর্কিড ফার্ম’ এবং ‘মেডিটেশন সেন্টার’ দেখালেন। এসব দেখে তাঁদের উদ্যোগকে স্বাগত জানাতেই হল। আরও কিছু দেখার আবদার করতে ওঁরা নিয়ে গেলেন ‘ওহো প্যারাগ্লাইডিং পয়েন্ট’-এ। মিনিট পনেরো হেঁটে ওই পয়েন্ট-এ পৌঁছোলাম। তবে প্যারাগ্লাইডিং (২০৫০ টাকা) করার সময় না পেলেও, ফুলে ভরা পাহাড়ি অঞ্চলটির সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হলাম। ওহো থেকে আরও পনেরো মিনিট পায়ে হেঁটে আমরা পৌঁছোলাম সারমসা গার্ডেন-এ। সেই বাগানের রূপ পাগল করার মতো। এক এক করে সমস্ত ফুল চেনালেন বিক্রম। করোনেশন, জারবেরা, গোলাপি আরু, বালটিক গ্লোসিয়ার, পাইন ক্লাস, মুন ভেনাস, জুনিপার, ছুজেন, রাম্বও মাস্টার পিস, কারমিট, নোবিলি, বলবো ফাইলাম, বারবেটা প্রভৃতি আরও কত কি ফুল, সব নাম আর মনে নেই। এসব দেখার পর মন বাহাদুরের স্ত্রী আমাদের ভাত, ডাল, রাই শাক আর ডিমের কারি খাওয়ালেন মধ্যাহ্নে। এরই ফাঁকে বিক্রমের ধামসা বাজানোর প্রতিভার কথা জানতে পেরেছিলাম, তাই সে সুযোগও হাতছাড়া করলাম না। পাখিয়ং-এর লিম্বু গ্রাম-কে বিদায় জানানোর আগে, বিক্রম মাতালেন ধামসা বাজিয়ে। সেদিনের মতো আবার আমরা ভ্রমণ পিপাসুরা সন্ধের মধ্যে ফিরলাম ইয়াকতেন-এর অর্কিড হোম স্টে-তে।

তৃতীয় দিন সকালে প্রাতরাশ সেরে আমরা পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়ালাম ইয়াকতেন-এর পাহাড়ি জঙ্গলে। নিঃশব্দে নানা জাতের পাখির ছবি তুলতে তুলতে শুনলাম তাদের কলকাকলি। মধ্যাহ্ন ভোজের পর আমরা ইয়াকতেন ছাড়লাম। এবার আমাদের গন্তব্য ২৫ কিলোমিটার দূরের চোচেনফেরি। এই সফর পথে পড়ে পারাখার জঙ্গল। দেখলাম শাল, সেগুনে ভরা সেই জঙ্গলের মধ্যে এক প্রাচীন মন্দির– মাংখিম। স্থানীয় দেব-দেবী পূজিত হন সেখানে।

পড়ন্ত বিকেলে আমরা পৌঁছোলাম ‘চোচেনফেরি ইকো-হাট হোম স্টে’-তে। গাড়ি থেকে নামতেই দেখলাম দারুণ ল্যান্ডস্কেপ। ধাপচাষের জমির ঠিক কেন্দ্রস্থলে রয়েছে একটি লেক। জানলাম, এই চোচেন লেক বর্ষাকাল ছাড়া শুকনো থাকে বাকি সময়। আলু, মটর, গম, ভুট্টা, রাই, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ব্রোকোলি প্রভৃতি চাষের জমির মাঝ-বরাবর, সরু নুড়ি-মাটির রাস্তা ধরে হেঁটে পৌঁছোলাম গন্তব্যে। দেখলাম, কিশোর-কিশোরীদের আর্চারির (তিরছোঁড়া) ট্রেনিং। বেশ উৎসাহের সঙ্গে শিখছে ওরা।

সন্ধে নামতেই বনফায়ারের ব্যবস্থা করলেন বসন্ত গুরুং এবং কিরণ ভুশাল। লেপচা আর ভুটিয়া ছেলেমেয়েরা আমাদের দেখাল তাদের লোকনৃত্য। রাই শাকের পকোড়া, চিলি চিকেন আর রডোডেনড্রন ফুল থেকে তৈরি বিশেষ পানীয় সহযোগে রাতটা বেশ জমে গেল। পরের দিন সকালে লুচি আর আলুর দম খেয়ে আমরা দেখলাম স্থানীয় এথনিক ভিলেজ। প্রায় একশো বছরের পুরোনো বাড়িগুলি মাটি, কাঠ আর টিনের চালে ছাওয়া। ধান, গম, ছোলা, সরষে, অড়হড় চাষ আর গবাদি পশু নিয়েই ওদের জীবন ও জীবিকা।

এই চোচেনফেরির অবস্থান ঠিক জুলুক কিংবা সিল্ক রুটের নীচে। এখান থেকে পাঁচ-ছয় ঘন্টা ট্রেক করে পৌঁছে যাওয়া যায় ছাংগু লেক-এ। এই ট্রেকিং পয়েন্টকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় খেদি ট্রেকিং পয়েন্ট। এই ট্রেকিংয়ের শুরুতেই আমরা দেখলাম চোচেন গুম্ফা। বেশ প্রাচীন এই গুম্ফার ভেতরে রয়েছে অসাধারণ সব তৈলচিত্র, যা পৌরাণিক কাহিনির পরিচয় বহন করছে। রয়েছে শিঙা এবং সানাই।

খুব ইচ্ছে থাকলেও পুরোটা ট্রেক করতে পারিনি। তাই হয়তো অনেক কিছুর দর্শন থেকে বঞ্চিত হলাম। ঘন্টাখানেকের মধ্যে পাহাড় থেকে নেমে এসে আমরা গাড়িতে উঠলাম। গাড়ি চলল লোসিংমাছং-এর উদ্দেশে।

চোচেনফেরি থেকে চার কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়ার পর ঝুলন্ত রোলেপ সেতু পেরিয়ে গাড়ি থামাল স্যামুয়েল। দেখলাম, পাহাড়ি ঝরনার জলে পুষ্ট রংপো খোলা। নানা আকৃতির পাথরের ফাঁক দিয়ে বয়ে চলা এই নদী, তার একদিকে পাহাড়, অন্যদিকে জঙ্গল– সব মিলে সে এক নয়নাভিরাম পরিবেশ। তবে এখানেই শেষ নয়, খানিক হাঁটিয়ে নিয়ে গিয়ে স্যামুয়েল আমাদের প্রায় দু’শো মিটার নীচে নামিয়ে নিয়ে দেখাল এক রোমাঞ্চকর হিডেন ফলস। গুহার মতো একটি জায়গায় ঝরঝর করে পড়ছে জল। অদ্ভূত এই ঝরনার ওপরে সেতু দিয়ে গাড়ি গেলেও, ঝরনা দেখা যায় না। বুদ্ধা নামের এই হিডেন ফলস দেখতে হলে কিছুটা ঝুঁকি নিয়ে নীচে নামতেই হবে।

প্রয় ২১ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে মধ্যাহ্নে পৌঁছোলাম লোসিংমাছং-এর রিভার ভ্যালি রিসর্ট-এ। নামে ‘রিসর্ট’ শব্দটি থাকলেও, এটা আসলে একটা হোম স্টে। এর সামনে দিয়েও বয়ে চলেছে রংপো খোলা। ট্রাউট এবং আসালা মাছে সমৃদ্ধ এই নদী। শুনেছি দারুণ স্বাদের সেই মাছ। তাই রিভার ভ্যালি রিসর্ট-এর কর্তা মিলন সুব্বাকে অনুরোধ করে মধ্যাহ্নভোজ হল ওই দুই সুস্বাদু মাছের ঝোল আর ভাত দিয়ে। বিকেলে ঘুরলাম রংপো নদীর পাড় ধরে। জল-জঙ্গল আর পাহাড়ি পরিবেশে শুধু মাছ, ফুল, পাখি আর প্রজাপতির সান্নিধ্যে মনটা রঙিন হয়ে উঠল।

রংপো-খোলার কলকল শব্দে আচ্ছন্ন ছিলাম সারা রাত। ভোরবেলা ঘুম ভাঙল পাখির কুজনে। সেই কুজনে মিষ্টতা থাকলেও, সফর শেষের মনখারাপি যেন বিদায়ের বিরহী সুর মনে হল। সকাল দশটায় বাড়ি ফেরার জন্য যখন গাড়িতে উঠলাম, তখনও মনে হল কে যেন অলক্ষ্যে হাত ধরে আরও ক’টা দিন থেকে যাওয়ার অনুরোধ করছে। কিন্তু ছুটি শেষ, সফরও শেষ। ফিরতি পথে শুধু স্মৃতিটুকুই সম্বল! আর সেই স্মৃতি রোমন্থন করতে করতেই নিউ জলপাইগুড়ি রেলওয়ে স্টেশনের দিকে ১২০ কিলোমিটার পথ (লোসিংমাছং থেকে) পাড়ি দিলাম।

জরুরি তথ্য

কীভাবে যাবেন – শিয়ালদহ কিংবা হাওড়া রেলওয়ে স্টেশন থেকে নিউজলপাইগুড়িগামী পদাতিক এক্সপ্রেস, দার্জিলিং মেল, কাঞ্চনজঙঘা এক্সপ্রেস কিংবা শতাব্দী এক্সপ্রেস ধরে নামুন এনজেপি স্টেশনে। অথবা কলকাতা বিমানবন্দর থেকে বায়ুপথে চলে যান বাগডোগরা। এরপর এনজেপি কিংবা বাগডোগরা থেকে এইট সিটার সুমো কিংবা স্করপিও ভাড়া করে ইয়াকতেন পৌঁছোতে খরচ পড়বে ৩০০০ টাকা থেকে ৪০০০ টাকার মধ্যে। দু’হাজার টাকায় ছোটো গাড়িও পাওয়া যাবে। ইয়াকতেন থেকে সারাদিন ঘোরার জন্য খরচ করতে হবে মাথাপিছু ৫০০ টাকা।

কী খাবেন – অর্গানিক ফুড ছাড়াও অর্ডার দিলে মাছ, মাংস, ডিম সবই পাওয়া যাবে।

কোথায় থাকবেন – প্রত্যেক লোকেশনে একাধিক হোম স্টে আছে। তবে সরকারি সহযোগিতায় গড়ে ওঠা হোম স্টেগুলিতে (অ্যালপাইন, অর্কিড, ইয়াকচেরি, রিভার ভ্যালি প্রভৃতি হোম স্টে) থাকা এবং খাওয়া বাবদ খরচ পড়বে মাথাপিছু ১৫০০ টাকা।

যোগাযোগ-০৩৫৯২-২৫৭৬০০/৯৮৩২০৬৫৬১৭/৮৩৪৮৮১৩৮৪৫

Email : yaaktenvillagehomestay@gmail.com

 

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব