ভিডিও কনফারেন্সিং এটিকেট

ভিডিও কনফারেন্সিং আম ঘটনা হয়ে গিয়েছে এখন। বিশেষ করে সম্প্রতি পেরিয়ে আসা লকডাউন আমাদের উপলব্ধি করিয়েছে এর প্রযোজনীয়তা। এখনও মানুষ নানা জরুরি কাজে ভিডিয়ে কনফারেন্স-এরই সাহায্য নিচ্ছেন। ফলে ভারতেও ভিডিও কনফারেন্সিং মিট এখন ভীষণ ভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। কিন্তু মিট করার সময় কিছু ডেকোরাম মেনে চললে, এর উপস্থাপনা বেশ শালীন হতে পারে। চোখ বুলিয়ে নিন সেই সব নিয়মকানুনে।

যা যা মনে রাখবেন

  • পোশাক-আশাক যেন রুচিশীল ও পরিচ্ছন্ন হয়৷ ফর্মাল পোশাক পরুন তেমন প্রয়োজন বুঝলে
  • এমন জায়গায় বসে ভিডিও মিটিং করুন, যেখানে বাড়ির লোকজন আসবেন না। আগে থেকে তাঁদের বলে দিন
  • জায়গাটায় যেন যথেষ্ট আলো থাকে
  • বিশেষ খেয়াল রাখুন ব্যাকগ্রাউন্ডের দিকে। অনেকেরই বাড়িতে জিনিসপত্র এলোমেলো থাকে, অগোছালো হয়ে থাকে। আপনার ব্যাকগ্রাউন্ডটা একটু গুছিয়ে নিতে ভুলবেন না। অপ্রযোজনীয় আজেবাজে জিনিস সরিয়ে দিন ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে
  • ভিডিও মিটিংয়ে কানেক্টিভিটির সমস্যা হতে পারে, আরও নানা যান্ত্রিক সমস্যা হতে পারে। একেবারে শেষ মুহূর্তে লগ-ইন করলে সামাল দিতে পারবেন না। মিটিং শুরুর অন্তত পনেরো মিনিট আগে লগ-ইন করে অপেক্ষা করুন
  • ভিডিও মিটিংয়ে বসে দাঁতে নখ কাটবেন না, গা এলিয়ে বসে থাকবেন না। অফিসে মিটিং থাকলে যেভাবে আচরণ করেন, তেমনই থাকুন
  • খুব প্রয়োজন না পড়লে চেয়ার ছেড়ে উঠে যাওয়াও ঠিক নয়
  • মিটিংয়ের মাঝখানে কিছু খাবেন না, দেখতে খুব খারাপ লাগে
  • কম্পিউটারের ক্যামেরা আর মাইক্রোফোন ঠিকমতো কাজ করছে কিনা সেটাও আগে থেকে দেখে নিতে হবে
  • হাতের কাছে জলের বোতল বা গেলাস রাখুন। নোটবই আর কলম নিয়ে বসুন
  • কেউ কথা বললে আগে ভালো করে শুনুন৷ সেইমতো টু দি পয়েন্ট উত্তর দিন৷ খুব দীর্ঘ বক্তব্য রাখবেন না
  • মোবাইল ফোন অবশ্যই সাইলেন্ট রাখবেন।

শিশুকে শেখান সহবত

ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে, ‘ওয়েল বিগান ইজ হাফ ডান’। অতএব, শুরুটা ভালো হওয়া চাই। ভিত সুন্দর এবং মজবুত হলে তবেই ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হবে। শিশুরা কাঁচা বাঁশ কিংবা নরম মাটির মতো। তাই নরম থাকা অবস্থায় তাকে ইচ্ছে মতো সুন্দর রূপ দেওয়া যায়। আর শিশুকে সুন্দর ভাবে গড়ে তোলার শিল্পী বা কারিগর কিন্তু শিশুর মা-বাবা। শুধু ভালো স্কুল-এ ভর্তি, ভালো লেখাপড়া কিংবা পুষ্টিকর খাবার খাওয়ালেই শিশুর ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করে তোলা সম্ভব নয়। শিশুকে সহবতও শেখাতে হবে। যাতে তার ব্যবহারে ভদ্রতা, নম্রতা এসব বজায় থাকে। যেন সে মিশুকে এবং দয়ালু হয়, স্বার্থপর না হয়, অন্যকে সাহায্য করে, সহানুভূতি দেখায়। কারণ, শিশুরাই সমাজ এবং দশের ভবিষ্যৎ। মনে রাখবেন, সহবত শেখানো এবং দেখানো, দুটি বিশেষ গুণ। এই গুণ-কে ছোটো থেকে লালন করতে পারলে নিজের এবং অন্যের সবার-ই মঙ্গল। মা-বাবা যদি তাদের সন্তানকে ছোটো থেকে সহবত না শেখান, তাহলে যে কী কী হতে পারে, তেমন-ই কিছু ঘটনার উল্লেখ করছি এখানে।

বিয়ের পাকা দেখা চলছে। মেয়ের বাড়ির লোকেরা উপস্থিত ছেলের বাড়িতে। টেবিলে জল, মিষ্টি, চা প্রভৃতি দেওয়া হয়েছে অতিথিদের। এমন সময় ওই বাড়ির একটি বাচ্চা ছেলে নিজের ছোট্টো সাইকেলে চড়ে এ-ঘর, ও-ঘর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। ওকে বাড়ির কেউ থামাচ্ছেও না। অতএব, বিপর্যয় ঘটার-ই ছিল! বাচ্চাটি সাইকেলে চড়ে জোরে এসে ধাক্বা মারল টেবিলে। মুহূর্তের মধ্যেই চা, মিষ্টি, জল সমস্ত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে, কাচের বাসনপত্র ভেঙে একাকার। অনেকের গায়ে গরম চা পড়ে সে এক করুণ পরিস্থিতি। ‘বাচ্চা ছেলে কী আর করা যাবে’ বলে হাসিমুখে তাৎক্ষণিক ভালো প্রতিক্রিয়া দিলেও, পরে মেয়ের বাড়ির লোকেরা সিদ্ধান্ত বদলে ফেলেন। অতিথিদের সামনে কী সহবত দেখাবে বাচ্চা, তা যে বাড়িতে শেখানো হয় না, সেই বাড়িতে মেয়ের বিয়ে দিলে মেয়ে সুখী হবে না, এমনটাই ধরে নিয়েছিলেন মেয়ের বাড়ির লোকেরা। কার্যত, বিয়ের সম্বন্ধটা ভেঙে যায়।

স্কুলের প্রধান শিক্ষকের ছেলে হওয়া সত্ত্বেও, তাকে যে ঠিক মতো সহবত শেখানো হয়নি, তারই প্রমাণ পাওয়া গেল একটি ঘটনায়। প্রধান শিক্ষকের বাড়িতে তাঁর ছেলে রিন্টু ছাড়াও কয়েকজনকে পড়াতেন এক শিক্ষক। একবার পড়ুয়া এবং শিক্ষককে পায়েস খেতে দিয়েছেন রিন্টুর মা। আর রিন্টুকে বলেছেন পড়া শেষ হলে খেতে দেবেন। এ কথা শুনে রিন্টু হঠাৎ উঠে চলে গেল। খানিক বাদে আবার পড়ার ঘরে ঢুকল হাসতে হাসতে। এর ঠিক এক মিনিট বাদে রিন্টুর মা ভেজা কাকের মতো হয়ে ঢুকলেন পড়ার ঘরে এবং রুটি গড়ার বেলনা দিয়ে রিন্টুকে পেটাতে থাকলেন শিক্ষকের সামনেই। কী হয়েছে শিক্ষক জানতে চাইলে রিন্টুর মা জানালেন, পড়া শেষ হলে খেতে দেব বলায়, গায়ে এক বোতল জল ঢেলে দিয়ে এসেছে। গড়া রুটি, পায়েস সব নষ্ট হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, শীতকালে ফ্রিজে রাখা কনকনে ঠান্ডা জল মাথায় ঢাললে কী কষ্ট হতে পারে, তা বেশ টের পেয়েছিলেন রিন্টুর মা।

বাড়িতে আসা অতিথিদের মুখোমুখি বসে খাচ্ছিল পিঙ্কু। হঠাৎ সজোরে হাঁচি দিল নাকের সামনে হাত না রেখে। ব্যস! নাকের সর্দি গিয়ে পড়ল অতিথির গায়ে এবং খাবারে। খাওয়া পণ্ড হল অতিথির।

এমন আরও অনেক অপ্রিয় ঘটনার খবর আসতে থাকে কানে। কেউ হয়তো হাত দিয়ে মুখ না ঢেকে জোরে জোরে হাই তুলছে, কেউ শব্দ করে খাবার চিবোচ্ছে, বড়োরা যখন কথা বলছে তখন হঠাৎ-ই তাদের মাঝে লাফ দিয়ে পড়ছে, কেউ এলোপাথাড়ি ঢিল ছুঁড়ছে, কেউ অন্য কোনও বাচ্চার খেলনাপত্র কেড়ে নিচ্ছে, কেউ ধারালো কিছু দিয়ে অন্যকে খুঁচিয়ে দিচ্ছে, অন্যের চুল ধরে টানছে, মারছে, জামা-প্যান্ট-এ কালির দাগ কেটে দিচ্ছে। যে-কোনও ডে-কেয়ার বা ক্রেশ-এর এটি পরিচিত দৃশ্য। অর্থাৎ শিশুরা হাজারো অন্যায় করছে সঠিক গাইড-এর অভাবে।

অবশ্য এর ঠিক উলটো ছবিও দেখা যায় অনেক ক্ষেত্রে।

নিয়ম-নীতি, উচিত-অনুচিত এসব জেনে-বুঝে কাজ করে অনেকে। হাত না ধুয়ে খাবার খেলে যে অসুখ হতে পারে, এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা ছোটো থেকেই শেখাতে হবে। খাবার টেবিল-এ কী সহবত দেখাতে হবে, তাও অত্যন্ত জরুরি বিষয়। হাঁচি, কাশির পর কিংবা বড়োদের গায়ে পা লাগলে যে ‘সরি’ বলতে হবে, এটা বাচ্চাদের অবশ্যই শেখাতে হবে। আস্তে কথা বলা, অন্যের কথার মাঝে কথা না বলা ইত্যাদি শেখানোও আবশ্যক। কেউ কিছু দিলে মা-বাবার অনুমতি নিয়ে খাওয়া, অনুমতি নিয়ে কোথাও কিংবা কারওর সঙ্গে যাওয়ার অভ্যাসও গড়ে তোলাতে হবে। যত্রতত্র ময়লা না ফেলে ওয়েস্টবিন-এ ময়লা ফেলা, যেখানে খুশি মলমূত্র ত্যাগ না করে শৗচালয়ে ত্যাগ করাও শেখাতে হবে ছোটো থেকেই। অনুমতি না নিয়ে কারও ঘরে ঢোকা যে উচিত নয়, তাও যেন শৈশবেই শিখে রাখে বাচ্চারা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ছেলে বাচ্চাদের ছোটো থেকেই শেখাতে হবে, মেয়েদের সম্মান করতে।

নিজের বাড়ির পাশাপাশি রাস্তায়, উৎসব-অনুষ্ঠানে, অন্যের বাড়িতে, শিক্ষাক্ষেত্রেও কী-কী সহবত দেখাতে হবে, তাও ছোটো থেকেই শেখাতে হবে। বাম দিকের ফুটপাথ ধরে হাঁটা, রেড সিগনাল দেখে জেব্রা ক্রসিং দিয়ে রাস্তা পার হওয়া, অন্যকে ধাক্বা না দিয়ে চলা প্রভৃতি শেখানোও যেমন জরুরি, তেমনই উৎসব অনুষ্ঠানে খাওয়ার জন্য হ্যাংলামো না করে সবার সঙ্গে বসে ঠিকঠাক ভাবে খাওয়া, ভিড়ের মধ্যে লাফালাফি না করে বড়োদের হাত ধরে থাকা, ফুলের গাছে কিংবা সাজানো কোনও কিছুতে অযথা হাত না দেওয়া প্রভৃতি নিয়ম-নীতিগুলি বুঝিয়ে দিতে হবে বাচ্চাদের। শিক্ষাক্ষেত্রে সহপাঠীদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার করা, অকারণে অন্যের বিরুদ্ধে শিক্ষক-শিক্ষিকার কাছে মিথ্যে নালিশ না করা, অন্যের ব্যাগ থেকে কোনও জিনিস তুলে না নেওয়া, অন্যের খাবার জোর করে না খাওয়া, ঝগড়া না করা, লেখাপড়ায় মনযোগ দেওয়া প্রভৃতি শেখানো অত্যন্ত জরুরি। শিক্ষক-শিক্ষিকার কথা ঠিকমতো শোনা, পরীক্ষার সময় অন্যের খাতা দেখে কিংবা বই দেখে যাতে না লেখে, লিখলে কী শাস্তি হতে পারে তা বন্ধুর মতো বুঝিয়ে দিতে হবে ছোটো থেকেই।

বাচ্চাদের সামনে ঝগড়া-মারামারি-গালমন্দ না করা, অন্যদের এসব করতে না দেওয়ার সহবত দেখাতে হবে মা-বাবাকে। আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, বাচ্চাদের সামনে ধূমপান, মদ্যপান করা, স্বামী-স্ত্রী-র শারীরিক ভাবে ঘনিষ্ঠ হওয়া প্রভৃতি থেকেও স্ট্রিক্টলি বিরত থাকতে হবে। আর যদি দেখেন বাচ্চা কোনও ভাবে সহবত শিখছে না, কথা না শুনে চিৎকার-চ্যাঁচামেচি করে একরোখা স্বভাবের হয়ে উঠছে, তাহলে ভাববেন সমস্যার শিকড় লুকিয়ে আছে গভীরে। আর নিজেরা যদি সমস্যার সমাধানে অসফল হন বারংবার, তাহলে আর দেরি না করে কোনও ভালো মনোবিদ কিংবা মনরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে বাচ্চাকে নিয়ে গিয়ে কাউন্সেলিং করাবেন অবশ্যই। নয়তো এর ফল ভুগতে হবে আপনাদের এবং দেশ-বিদেশের সুস্থ নাগরিক সমাজকে।

কেয়ারলেস ফ্যাশনই ট্রেন্ডিং এই বসন্তে

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিরন্তর পালটায় ফ্যাশন। কিন্তু যা পালটায় না তা হল, পোশাকে কমফর্টেবল থাকার ইচ্ছেটা। তাই কখনও বডি কন্টুরের সঙ্গে আঁটো হয়ে থাকা পোশাকের চাহিদা তুঙ্গে উঠলে, পরবর্তী ফ্যাশন ট্রেন্ড হয়ে দাঁড়ায় ঢিলেঢালা পরিচ্ছদ। ফ্যাশনের মূল মন্ত্রই হল কমফর্ট অর্থাত্ স্বাচ্ছন্দ্য। শুধু লুক গুড ফ্যাক্টরটাই সব নয়, পোশাক কমফর্টেবল না হলে আপনার গোটা সাজটাই মাটি হতে পারে। একথা এখন মেনে নিয়েছেন তাবড় ডিজাইনাররাও।

এই মুহূর্তে অ্যান্টি-ফিট পোশাক রয়েছে চাহিদার শীর্ষে। অর্থাত্ লং, লেয়ার্ড, ঢিলেঢালা পোশাকই ভীষণ ভাবে ইন। বডি কন এখন ডেটেড হয়ে গেছে। বসন্ত জাগ্রত দ্বারে৷ তাই প্রকৃতির রঙে রং মেলানো পোশাক, ভাইব্রান্ট প্রিন্টস্ এগুলিই এখন পছন্দের শিরোনামে। বাড়ছে কটনের চাহিদা। বিভিন্ন শেডের নীল, সাদা, ফ্লোরাল টেক্সচারস এখন খুব ইন। সঙ্গে অবশ্যই থাকছে স্টেটমেন্ট জুযোরির ফ্যাশন। লং শ্রাগ বা সুতির জ্যাকেটের কদরও এখন আরও কিছুদিন চলবে।

স্টেটমেন্ট প্রিন্টের পাশাপাশি, কালার ব্লকিং-এর ফ্যাশনও চলবে। স্ট্রাইপড আপার ও লোয়ার এখন অনেকেই পছন্দ করছেন। কুল অ্যান্ড ওয়ার্ম টোন-এর কন্ট্রাস্ট-ও রাখতে পারেন উপরের ও নীচের পোশাকে। কটনের পাশাপাশি ফ্যাব্রিক হিসেবে গুরুত্ব বাড়ছে অর্গ্যাঞ্জা, ক্রেপ ও সাটিনের। অফিসে পরার পক্ষেও আদর্শ হয়ে উঠছে স্ট্রাইপড পোশাক৷এর দরুন সাজে বেশ একটা সেমি ফর্মাল লুক আসে৷

খুব টাইট প্যান্ট বা গায়ের সঙ্গে লেপ্টে থাকা চুড়িদার নয়,  এখন বেশি চলছে ঢিলেঢালা পোশাক। কোমরের কাছ থেকে ফ্লেয়ার দেওয়া আনারকলি দেখতে যতটা ভালো পরলেও ঠিক ততটাই আরাম মিলবে।

দু’ নম্বর, বছরের শেষ ক’টা মাস বাদ দিলে এ রাজ্যে গরম আর ঘামে বড়ো নাজেহাল হতে হয়। তাই এমন ফ্যাব্রিক থেকে পোশাক তৈরি করুন যা আপনাকে সারাদিন ঝরঝরে থাকতে সাহায্য করবে।

সলিড কালার এখন খুব চলছে।  নানা প্যাস্টেল শেডের সলিডস বেছে নিতে পারেন।  শাড়ি কেটেও দিব্যি সুন্দর ড্রেস তৈরি করে নিতে পারেন। অনেকেই পশ্চিমি পোশাক বেশি পছন্দ করেন৷ ওয়েস্টার্ন পোশাকের সঙ্গে শ্রাগ ভালো মানায়। সুতি থেকে ডেনিম-বেছে নিতে পারেন নিজের পছন্দ মতো। নিজের পছন্দ অনুযায়ী বেছে নিন শ্রাগের ঝুল। এখন লম্বা এবং খাটো, দু’রকমের শ্রাগই কিন্তু ফ্যাশনে রয়েছে।

সাদামাঠা ড্রেসকে অন্য মাত্রায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য সাহায্য নিন স্টেটমেন্ট গয়নার। একটা বড়ো ও ভারী হার বা কানের দুল আপনার গোটা লুকটাই চেঞ্জ করে দেবে। রুপোর বা তার উপর মিনে করা গয়না পরলে খুব সুন্দর দেখাবে।

আরামদায়ক, কোলাপুরি, জুতি বা মোজরি রাখুন হাতের কাছে। এই ধরনের দেশি নকশার জুতো এই মুহূর্তে দারুণ ফ্যাশনেবলও বটে!

রুমাল

মাথা নীচু করে ক্লাসে ঢুকতেই শুনতে পেলাম একজন ক্লাসমেট-এর মন্তব্য— শালা ভিখারির বাচ্চাটা এসে গেছে।

আর একজনের কটূক্তি শব্দভেদী বানের মতো অতর্কিতে ছুটে এল আমার দিকে– ব্যাটার হিরো হওয়ার শখ একেবারে ঘুচে গেছে।

আমি ওদের কথায় কান না দিয়ে পাস কাটিয়ে লাস্টবেঞ্চের এক কোণে বসলাম। এখন শুধু কটূক্তি শোনার পালা, র্যালা মারার দিন আমার শেষ। আমি শেকসপিয়রের জুলিয়াস সিজারের মতো পরাজিত রোমান সম্রাট। আমার চারপাশে ব্রুটাসের দল আমাকে হেনস্থা করার জন্য ওত পেতে আছে। আমার পরাজয়েই তাদের সুখ। তাদের আনন্দ।

রাগে আমার গা রি রি করছে। অথচ কিছু করার নেই। ক্লাসের সমস্ত সিলিং ফ্যানগুলো ফুল স্পিডে চলা সত্ত্বেও আমার গা দিয়ে দরদর করে ঘাম ঝরছে। অথচ এটা গ্রীষ্মকাল নয়, ভরা শ্রাবণ। শরৎ আসতে আর দেরি নেই। এর মধ্যেই একটু ঠান্ডা ভাব এসে গেছে। ভোরের দিকে শীত শীত মনে হয়। আকাশে বাতাসে পুজো পুজো গন্ধ। ভোরের দিকে শিউলির গন্ধ টের পাই।

কী শীত কী গ্রীষ্ম, সব সময়েই আমার গা দিয়ে ঘাম ঝরে। মনে হয় আমার শরীরে নুনের পরিমাণ একটু বেশি আছে। যাই হোক,

জিন্স-এর ট্রাউজারের পকেটে হাত ঢুকিয়ে ঘাম মোছার জন্য রুমালটা বার করতে যেতেই শূন্য হাতটা উঠে এল। অর্থাৎ আমার রুমাল হাওয়া। বেশ মনে আছে বাড়ি থেকে বেরোবার সময় সুগন্ধি লাল রুমালটা পাঞ্জাবির বাঁ পকেটে যত্ন করে রেখেছিলাম। পকেটে এখনও সেন্টের গন্ধ ম-ম করছে। এই, এই একটা জিনিস পকেটে রাখতে কখনও ভুল করি না। ও আমার নিত্য সহচর। একান্ত আপন।

একবার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের গার্ডেনে কলেজ থেকে কাট মেরে আমি আর নন্দিতা বসে গল্প করছিলাম। একবার গল্প শুরু হলে বাড়ি ফেরার কথা আমাদের মনেই থাকত না। হঠাৎ অস্তমিত সূর্যের কিরণ চোখে এসে পড়তেই নন্দিতা তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়িয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল– এই রে দেরি হয়ে গেছে। তাড়াতাড়ি চল বাড়ি ফিরতে হবে। বাড়িতে বলেছি অনার্সের স্পেশাল ক্লাস আছে। দেরি হলেই মা চিন্তা করবে।

নন্দিতা সবুজ ঘাসের ওপর যে রুমালটা পেতে বসেছিল সেটা না নিয়েই উঠে পড়েছিল। আমি ওর অলক্ষ্যে সেই রুমালটা কুড়িয়ে পকেটে পুরেছিলাম। যেন সাত রাজার ধন এক মানিক কুড়িয়ে পেয়েছি। ট্রেনে জানলার ধারে বসে গরমে ঘাম মুছতে গিয়ে তার মনে পড়েছিল রুমালটার কথা। মনে পড়া মাত্রই সে তার নিজস্ব ভঙ্গিতে বলে উঠেছিল, ‘এইরে ভিক্টোরিয়ার মাঠে রুমালটা ফেলে এসেছি।’

আমি আমার রুমালটা ওর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে চাপাস্বরে বলেছিলাম, ‘ওটা আমার পকেটে আছে।’

–তা হলে তোরটা কেন, আমার রুমালটা দে।

–ওটা আর তোকে দেব না। তুই যখন আমার পাশে থাকবি না তখন এই রুমালটার সুগন্ধ তোর কথা আমায় মনে করিয়ে দেবে। তোর ঘামে ভেজা শরীরের সুগন্ধ ওই রুমালটার মধ্যেই খুঁজে পাব।

আমার কথা শুনে নন্দিতা বলেছিল, ‘রুমাল নিলে কিন্তু প্রেম টেকে না। ছাড়াছাড়ি হয়।’

বলেছিলাম, ‘সেই জন্যই তো এখন থেকে তোর একটা স্মৃতি নিয়ে রাখলাম।’

আমার বেশ মনে আছে বাড়ি থেকে বেরোবার সময় রুমালটা পকেটে রেখেছিলাম। সেটা কোথায় হারিয়েছি কে জানে। আজ যে এরকম অঘটন হবে বুঝতেই পারিনি। সকালে কার মুখ দেখে উঠেছিলাম কে জানে।

আজ শনিবার। মনে হয় আজ আমার ওপর শনির কোপ পড়েছে। বাড়ি থেকে বেরোবার সময় যথারীতি মা তারার ফটোকে ভক্তি ভরে প্রণাম করেছি। তবে কোন পাপে আমার এই দশা হল। মনে করতে চেষ্টা করলাম আজ সকাল থেকে এ পর্যন্ত কী কী পাপ করেছি। যতদূর মনে পড়ে একটাও মিথ্যে কথা বলিনি। কাউকে কটু কথা বলিনি। এমনকী কারও বাড়া ভাতে ছাই দিইনি। বরং শেওড়াফুলি স্টেশনের বুকিং কাউন্টারের সামনে বসা ভিখারিকে আজ এক টাকার একটা কয়েন দিয়েছি। তাকে দেখলেই কেন জানি না আমার মৃত ঠাকুমার কথা মনে পড়ে। আমার ঠাকুমার মুখের সঙ্গে তার হুবহু মিল আছে।

হঠাৎ মনে পড়ে গেল আজ সকালে ঘুম থেকে উঠেই পাশের বাড়ির মাকুন্দ নিতাইয়ের মুখ দেখেছি। লোকে বলে ওর মুখ দেখলেই নাকি দিনটা খারাপ যায়। হলও তাই। একটা অপয়া লোকের মুখ দেখার জন্যই আমার রুমাল হারিয়ে গেছে। রুমাল হারানোর কথা ভাবতে গিয়ে হঠাৎ আমার মাথার বাঁদিকে মৃদু যন্ত্রণা শুরু হল। চোখে অন্ধকার দেখলাম। একটা অ্যানাসিন পেলে হতো। হাতের কাছে তা যখন নেই, তখন জলই খাওয়া ভালো। ফোলিও ব্যাগের চেনটা খুলে প্লাস্টিকের বোতল বার করে ঢকঢক করে খানিকটা জল খেয়ে নিলাম। তাতেও আমার যন্ত্রণা কমল না বরং বেড়ে গেল। যন্ত্রণাটা মাথার না মনের কিছুই বুঝে উঠতে পারলাম না।

আমার পাশে বসা সুনীতি ব্যানার্জী হঠাৎ বলে উঠল, ‘কিরে ভাস্কর তোর মুখটা অমন শুকনো লাগছে কেন? কি হয়েছে তোর? এনিথিং রঙ?’

ওর কথা কানে ভেসে আসতেই আমার তন্ময়তা কাটল। আমি এতক্ষণ একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম। বুঝতেই পারিনি কখন ইংরেজির প্রফেসর পড়ানো শেষ করে ক্লাস থেকে চলে গেছেন। কখন গুলতানি শুরু হয়েছে ক্লাসে।

বললাম, ‘জানিস আজ আমার রুমালটা হারিয়ে গেছে। ওটা আমার ভীষণ পয়া ছিল।’

ব্যস পাগলকে দিয়েছি সাঁকো নাড়া দিতে। সুনীতি আমার কথা শুনে ব্ল্যাক বোর্ডের কাছে গিয়ে গলা চড়িয়ে বক্তৃতার ঢঙে বলল, ‘লেডিজ এ্যান্ড জেন্টলম্যান, আজ আমাদের ভাস্কর স্যান্যালের রুমাল হারিয়ে গেছে। ওর মন খারাপ। তাই ওর শোকাচ্ছন্ন মনের শান্তির জন্য এসো আমরা এক মিনিট নীরবতা পালন করি।’

তার কথা শুনে ক্লাস শুদ্ধু সকলের সে কি হাসি। চন্দননগরের মেয়ে কস্তুরী সিন্হা হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ল। আমার এখন ইচ্ছে করছে এক ঘুসি মেরে ওর বত্রিশ পাটি দাঁত ফেলে দিতে। ও আগে বিধান কলেজে পড়ত। হঠাৎ কি খেয়াল হল ওখানে এক বছর পড়ে আমাদের কলেজে উড়ে এসে জুড়ে বসেছে। অনেকের মুখে শুনেছি রিষড়ার বিধান কলেজের অনেক ছেলের মাথা খেয়ে আমাদের কলেজে ঢুকেছে। এক নম্বর ছেলেবাজ।

কস্তুরী আমাদের কলেজে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই অনেকেরই চিত্তচাঞ্চল্য বেড়ে গেছে। চারটে বাজলেই যারা পালাই পালাই করত, তারা পাঁচটা পর্যন্ত কলেজে থাকে। আসলে কস্তুরীর মেয়েদের চাইতে ছেলে বন্ধু বেশি। কস্তুরী যেখানে ছেলেরাও সেখানে। এ যেন সেই চিটে গুড়। যেখানে রাজ্যের মাছি ভন ভন করে। অথচ কস্তুরীকে দেখতে এমন কিছু আহামরি নয়। খুবই সাধারণ। গায়ের রং কালো, মুখটা লম্বা মতন, চোখ দুটো বড়ো বড়ো। দেহে মেদের পরিমাণ বেশি। দূর থেকে দেখলে মনে হবে একেবারে সাক্ষাৎ মা কালি। তবু কি আশ্চর্য সে আমাদের কলেজের অনেক ছেলের চোখে বিশ্ব সুন্দরী, মিস ইউনিভার্স। টিফিনের সময় ক্যান্টিনে গেলেই কলেজের ছেলেগুলো ওর সামনে মাছির মতো লেপটে থাকে।

ওদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা লেগে যায় কস্তুরীর পাশের চেয়ারে কে বসবে। পাশে বসলে কস্তুরীর শরীরের অল্প বিস্তর স্পর্শ সুখ ফাউ পাওয়া যায়। আমি ওই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ভুলেও অংশগ্রহণ করি না। ওরা যখন অফ পিরিয়ডে খোশ মেজাজে গল্প করে আমি তখন এক কোণে বসে বাংলা অনার্সের রেফারেন্স বইয়ের ভেতর ডুবে থাকি। ওদের আলোচনার বিষয় হল পরচর্চা আর রাজনীতি যা আমার একেবারেই ভালো লাগে না। আমি আসলে হই হট্টগোল পছন্দ করি না। তা ছাড়া যেখানে একজন মেয়ের সঙ্গ অনেকে কামনা করে, আমি তাদের থেকে সব সময় দূরে থাকি।

তবু চক্ষুলজ্জার মাথা খেয়ে কস্তুরী যখন ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাস সম্পর্কে আলোচনা করতে আসে, আমার তখন বুকের মধ্যে ধুক-পুকুনি শুরু হয়। আমি তখন ইষ্টনাম জপ করতে থাকি। ক্লাসের ছেলেগুলো বিষদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। মনে হয় কস্তুরী ওদের যেন ব্যক্তিগত সম্পত্তি। ওদের জিনিসে ভাগ বসাব এমন ইচ্ছে আমার কখনও হয়নি। কস্তুরী যদি সেধে আমার সঙ্গে গল্প করতে আসে আমি কী করব?

একদিন লাইব্রেরি রুমে ও আমাকে বলেছিল, ‘তোমার গায়ে প্রেম প্রেম গন্ধ। তুমি অনেক মেয়ের সঙ্গে প্রেম করবে।’

বলেছিলাম, ‘প্রেমের আবার আলাদা গন্ধ আছে না কি?’

কস্তুরী বলেছিল, ‘তোমার কথাবার্তায়, চালচলনে তো অনুভব করা যায়। তা ছাড়া তুমি তো আমাদের পাত্তাই দাও না।’

বলেছিলাম, ‘ওটা তোমাদের ভুল ধারণা। তোমাদের সঙ্গে নিজেকে ঠিক খাপ খাওয়াতে পারি না। তা ছাড়া আমি একটু নির্জনতা পছন্দ করি।’

কস্তুরী তখন বলেছিল, ‘বলো কোন নির্জন জায়গায় তুমি যেতে চাও? জু গার্ডেন, মিলেনিয়াম পার্ক, ভিক্টোরিয়া, প্রিন্সেপ ঘাট। যেখানে শুধু আমি আর তুমি সারাদিন মজা করে কাটাব।’

বলেছিলাম, ‘ঠিক আছে। পরে ভেবে বলব।’

হঠাৎ রঙ্গমঞ্চে গদা হাতে ভীমের প্রবেশের মতো পলিটিক্যাল সায়েন্সের প্রফেসর এন দে, এসে হাজির। উনি সাধারণত ঘন্টা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আসেন না। আজ হঠাৎ এসে গেলেন। ওকে ঢুকতে দেখে ক্লাসের সব ছেলে মেয়েরা হাসি বন্ধ করে ক্লাস নোটের খাতা খুলে বসল। ভয়ে কস্তুরীর মুখ এতটুকু হয়ে গেল।

প্রফেসর এন দে তাঁর চেয়ারে বসে প্রথমেই বললেন, ‘আমি জানতে চাই তোমাদের হাসির কারণটা কি?’

শঙ্কর উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘স্যার আমাদের ভাস্কর স্যান্যাল

মা-আ-নে…’

প্রফেসর এন দে আমার দিকে ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, ‘কি ব্যাপার ভাস্কর।’

আমি উঠে দাঁড়িয়ে মাথা নীচু করে বললাম, ‘স্যার আমার একটা রুমাল হারিয়ে গেছে। শুনে ওরা সবাই হাসছিল।’

আমার কথা শুনে ক্লাসের সকলকে উদ্দেশ্য করে এন দে বললেন, ‘মনে রেখো এটা কলেজ। ক্লাবঘর নয়। আর যেন কখনও এরকম না হয়। তোমাদের মনে রাখা উচিত পাশের ঘরে আর একটা ক্লাস চলছে। অসভ্যতা তোমাদের এখনও গেল না।’

কলেজ ছুটির পর মন খারাপ করে বাড়ি ফিরলাম। আজ কিছুই ভালো লাগছে না। না ভালো লাগছে টিফিন খেতে, না ভালো লাগছে পার্ট টু-এর পড়া করতে। মাকে শরীর খারাপের অজুহাত দেখিয়ে রাতে কিছু না খেয়েই বিছানায় শুয়ে পড়লাম। বারবার লাল রুমালটার কথা মনে পড়ল। নন্দিতার সব চিঠি পুড়িয়ে ফেললেও রুমালটা ফেলে দিতে পারিনি। লেডিস রুমালটা আমার রক্ত মাংস, মেদ মজ্জার সঙ্গে একাত্ম হয়েছিল। আজ সেটা হারিয়ে যেতে মনে হচ্ছে এত দিন নন্দিতার যে স্মৃতি উজবুকের মতো বয়ে বেড়িয়েছি, আজ তা থেকে মুক্তি পেলাম। স্বপ্নে দেখতে পেলাম নন্দিতার লাল রুমালটা রাজপথে অযত্নে পড়ে আছে। পথচারীরা রুমালটা মাড়িয়ে আমার প্রেমকে দুপায়ে থেঁতলে চলে যাচ্ছে।

হঠাৎ মাঝরাতে বাড়ির ফোনটা বেজে উঠতেই ঘুমটা ভেঙে গেল। মিউজিক থামার পর ফোনটা ধরতেই ক্লাসমেট সুনীতি ব্যানার্জীর গলা ভেসে এল, ‘হ্যালো ভাস্কর সুখবর আছে।’

–সুখবর?

–হ্যাঁ, নন্দিতার সঙ্গে বলাই-এর ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে।

–কেন ?

–বলাই এখন রীনার প্রেমে মেতেছে। বড়োলোকের প্রেম মানেই চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দিয়ে ফেলে দেওয়া।

–খবরটা দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। গুড নাইট, বলে আমি বিরক্ত হয়ে ফোনটা ছেড়ে দিয়ে শুয়ে পড়লাম।

সোমবার প্রফেসর প্রতাপরঞ্জন হাজরার ক্লাস ছিল এগারোটায় কিন্তু আমি চলে এলাম পৌনে দশটায়। এত আগে আমার কলেজে আসার কথা নয়। কিন্তু কেন জানি না আমি খানিকটা ঘোরের মধ্যে এক ঘন্টা আগে চলে এসেছি। ঘোরের মধ্যেই কখন জিন্স-এর ট্রাউজারের বদলে পাজামা পাঞ্জাবি পরেছি খেয়াল নেই। এই কেন-র উত্তর আমার জানা নেই। কে জানে কেন আজ সকাল হতেই একজনের মুখ আমার অবচেতন মনে ভেসে উঠেছিল। তাকে দেখার জন্যই কি আজ আমি সাত তাড়াতাড়ি কলেজে চলে এসেছি। কে জানে হয় তো তাই। কিন্তু যে আমাকে বিট্রে করেছে তার জন্য কেন এত ভেবে মরছি। ভালোবাসা কি এতই ঠুনকো।

যাইহোক সাত তাড়াতাড়ি যখন কলেজে এসেই পড়েছি তখন রেফারেন্স বই দেখে নোটটা লিখে ফেলা যাক। কারণ বইটা আর একদিন রাখলেই লাইব্রেরিতে আমাকে ফাইন দিতে হবে। এখনও কলেজে কোনও ছাত্র আসেনি। নিরিবিলিতে রেফারেন্স বই দেখে যতটা লেখা যায়। সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে একেবারে কোণের ক্লাস রুমের ভেজানো দরজা ঠেলতেই চোখ পড়ল লাস্ট বেঞ্চে কে যেন আধশোয়া অবস্থায় রয়েছে। আধো আলো আধো অন্ধকারে দূর থেকে দেখা গেল বেঞ্চের নীচে গোলাপি ফলস্ পাড় ঝুলছে।

বুকটা আমার ছ্যাঁত করে উঠল। অশরীরী প্রেতাত্মা নয় তো? দু’বছর আগে পার্ট ওয়ানের একজন ছাত্রী ফাইনাল পরীক্ষায় রেজাল্ট খারাপ হয়েছিল বলে গলায় ওড়নার ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছিল। যে ঘরে সে আত্মহত্যা করেছিল আমি এখন সেই ঘরের দরজার সামনে একা দাঁড়িয়ে। মেয়েটার নাম সুমনা রায়। শ্রীরামপুরে বাড়ি। খুব হাসিখুশি মেয়ে ছিল। অনেকেই নাকি সন্ধের পর তাকে তিন তলার ছাদে ঘুরতে দেখেছে। কাঁধে শান্তিনিকেতনি চামড়ার ব্যাগ, চুলে বিনুনি। দু’বছর আগে মারা গেলেও সে এখনও কোন্নগর হীরালাল পাল কলেজের মায়া ছাড়তে পারেনি।

আমি যে এক ছুটে তাড়াতাড়ি নীচে নেমে যাব তার উপায় নেই। কে যেন আমার পায়ে পেরেক ঠুকে এখানে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। হঠাৎ নারী কণ্ঠের মৃদু গোঙানির শব্দ ভেসে আসতেই চমকে উঠলাম। আমি মনে মনে সাহস সঞ্চয় করে এগিয়ে দেখলাম নন্দিতা হাঁটু মুড়ে কপালে হাত রেখে শুয়ে আছে। মাথার নীচে বইয়ের ব্যাগ। জল ভরা প্ল্যাস্টিকের বোতল রয়েছে পাশের বেঞ্চিতে। মেহগনি গাছের ফাঁক দিয়ে একফালি রোদ্দুর জানলা দিয়ে টপকে তার মেক-আপ করা মুখে এসে পড়েছে।

আমি তার যন্ত্রণা কাতর মুখটা দেখে বললাম, ‘এই তোর কি হয়েছে?’

আমাকে দেখে তার কাজল টানা চোখ দিয়ে টসটস করে জল পড়তে লাগল। এর আগে নন্দিতাকে কলেজে অনর্গল কথা বলতে দেখেছি, হাসতে দেখেছি। কখনও এরকম কাঁদতে দেখিনি। কাঁদলেও যে তোকে কত মধুর লাগে তা এই প্রথম দেখলাম। সে চোখের জল মুছে বলল, আজ সকাল থেকে এ্যাপেন্ডিসাইটিসের ব্যথাটা হচ্ছে।

বললাম, ‘ডাক্তার দেখাসনি কেন?’

‘দেখিয়েছিলাম। পার্ট টু পরীক্ষা হলেই অপারেশন করতে হবে’, বলে নন্দিতা কপাল থেকে হাতটা সরাল।

হাতটা সরাতেই তার লাল কাচের চুড়ির শব্দে মল্লার রাগ বেজে উঠল। কোথা থেকে একটা পায়রা ডানা ঝাপটিয়ে ভেন্টিলেটারে গিয়ে বসল। মুখে মুখ লাগিয়ে তার প্রেমিকার সঙ্গে বকবকম শুরু করে দিল।

 

আমি তার পায়ের কাছে বসে বললাম, ‘তোর পেটে একটু হাত বুলিয়ে দিই। দেখবি ভালো লাগবে।’

 

সে কোনও কথা না বলে শুধু তার পেটের কাছ থেকে শাড়ির অাঁচলটা সরিয়ে দিল। যন্ত্রণা কমানোর উদ্দেশ্যে আমি তার মাখনের মতো নরম ফরসা পেটে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললাম, ‘জানিস তোর রুমালটা কাল হারিয়ে গেছে।’

সে কথা শুনে নন্দিতা উঠে বসে আমার গলা জড়িয়ে ধরে বলল, ‘রুমাল হারিয়েছে তো কী হয়েছে? আমাকে তো পেয়েছিস।’

আমি কিছু বলার আগেই সে তার উষ্ণ চুম্বনে আমার ঠোঁট দুটো পুড়িয়ে দিল। ভুলিয়ে দিল রুমাল হারানোর কষ্টটা।

মন্দির নয়, হাসপাতাল জরুরি

কোভিড ১৯-এর ভ্যাকসিন এসেছে ঠিকই, কিন্তু তাও স্বাস্থ্য পরিষেবা নিযে ভাবনা-চিন্তার প্রয়োজন আছে। কারণ, ভ্যাকসিন প্রযোগের পর, সাধারণ জ্বরে আক্রান্ত হলেও আমরা আবারও আতঙ্কিত হয়ে পড়তে পারি । তাই তখনও হাসপাতালে ভর্তি কিংবা চিকিৎসার প্রয়োজন কমবে না। সাধারনত যে-কোনও মহামারির ক্ষেত্রে একটা সেকেন্ড ওয়েভের আশঙ্কা সব সময়ই থেকে যায়৷ইউরোপকে যেমন সেই ধাক্কায় সামিল হতে দেখলাম আমরা৷

সাধারণ ভাবে বলতে গেলে, শহর, মফসস্বল কিংবা গ্রাম– সর্বত্র হাসপাতাল থাকা অত্যন্ত জরুরি। আর এই কোভিড আবহে আগের থেকে হাসপাতালের প্রয়োজন আরও বেড়েছে। সরকার যেমন থানা বা পুলিশ চৌকির সংখ্যা বাড়িয়েছে সমাজের সুরক্ষার দিকটি বিবেচনা করে,  সেই হারেই বাড়ানো দরকার হাসপাতালের সংখ্যাও।

সেকেন্ড ওয়েভ আসুক বা না আসুক, এখন প্রত্যেক অঞ্চলের প্রতিটি কলোনিতে এবং সমস্ত গ্রামে উন্নত ক্লিনিক তৈরি করা অত্যন্ত প্রয়োজন। কারণ, ক্লিনিক বাড়লে, অর্থাৎ চিকিৎসা পরিষেবা পাওয়ার সুযোগ হাতের কাছে থাকলে,এবং  পরিষেবা পাওয়ার প্রক্রিয়া  জটিল না হলে,বাড়ির মহিলারা একা গিয়েই নির্দ্বিধায় নিতে পারবেন চিকিৎসার সুযোগ। আর এ প্রসঙ্গে মনে রাখা দরকার, দিল্লিতে যেমন বিদ্যুৎ এবং জল সস্তায় পাওয়া যায়, চিকিৎসা পরিষেবাও তেমনই সস্তায় পাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এই বিষযে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে এবং সবাই যাতে সুলভে ওষুধ পান, সেই ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা জরুরি। এমনকী প্রতিটি বড়ো হোটেল, বাজার, সিনেমা হলে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একটা করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র করে দিতে হবে সরকারকেই।

সবে পেরিয়ে আসা কোভিড পরিস্থিতির কারণে, সারা পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষ এখন চরম আর্থিক সংকটে রয়েছেন। এই অবস্থায় পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে আর্থিক পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে বাধ্য।কোভিড মহামারির সময়ে অবশ্য, চিকিৎসক এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীরা অনেকেই প্রতিদিন আন্তরিক পরিষেবা দিয়েছেন। প্রায় জীবন বাজি রেখেই তাঁরা এই সেবা দান করেছেন। তাই, তাদের প্রতিও সহানুভতি প্রদর্শন করা আবশ্যক।

এটা উপলব্ধি করতেই হবে যে, মন্দির, মসজিদ, গির্জা কিংবা গুরুদ্বার নয়, চাই আরও হাসপাতাল। এতে সবারই মঙ্গল হবে, বাঁচবেন গরিব সাধারণ মানুষেরাও। আর চিকিৎসার সুবিধে বাড়লে, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার সুযোগ বাড়বে এবং আমরা সুস্থজীবন পাব। এই কোভিড পরিস্থিতিতে আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ঠিক রাখার জন্য রুটিন চেক-আপ সঠিক ভাবে পেলেও আমরা লাভবান হব।

এখন আমাদের ভাবতে হবে যে, বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে, নতুন-নতুন ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনাও বাড়ছে প্রতিদিন। তাই, রাম মন্দির, প্যাটেলের মূর্তি কিংবা নতুন সংসদ ভবন নিযে মাতামাতি কমিযে চিকিৎসা-কেন্দ্র বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে। কোভিডকালীন জরুরি অবস্থায়, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল যেমন স্বাস্থ্য পরিষেবা বাড়ানোর প্রয়াস জারি রেখেছিলেন, ঠিক তেমনই সমস্ত জায়গায় একইরকম উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। ৫ থেকে ৬টি শয্যা এবং তিন-চারজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ করে, ছোটো ছোটো স্বাস্থ্যকেন্দ্র সর্বত্র গড়ে তোলার এখন ভীষণ প্রয়োজন। সেই সঙ্গে, মেডিকেল অ্যাম্বুল্যান্স-এর সংখ্যাও আরও বাড়ানো দরকার। আর এই পরিষেবার জন্য ট্যাক্সের টাকা থেকে অর্থের জোগান দেওয়া উচিত। কারণ, চিকিৎসার বিষয়ে আর কোনও অবহেলা চলবে না। যাতে আগামী দিনে, শুধু বিত্তবানরাই নয়, সবার চিকিৎসা পরিষেবা পাওয়ার অধিকার সুনিশ্চিত করা যায়।

সুন্দরবনের দুই রোমাঞ্চকর দ্বীপে

বিশ্বের একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য উপভোগ করতে বছরজুড়েই পর্যটকদের আসা-যাওয়া থাকে। তবে, শীতের মরশুমে পর্যটকদের অত্যন্ত প্রিয় ডেস্টিনেশন হয়ে ওঠে সুন্দরবন। আমরা এখানে বলছি এর উন্তরগত দুটি দ্বীপের কথা।

সুন্দরী, হেতাল, গরান, কেওড়া, গর্জন, বাইন আরও কত নাম না-জানা গাছে ঘেরা জঙ্গল। অরণ্যের জমাটবাঁধা অন্ধকারে কোথাও লুকিয়ে আছে হিংস্র শ্বাপদ, রয্যাল বেঙ্গল টাইগার। জঙ্গুলে পরিবেশে রাত কাটানোর এ-এক আদর্শ সময়। রোমাঞ্চ যাদের পছন্দ তারা বেছে নিতে পারেন কলস দ্বীপকে। পৃথিবীর বৃহত্তম নদী ব-দ্বীপ সুন্দরবনে, রয়েছে ছোটো বড়ো মিলিয়ে প্রায় ১০২টি দ্বীপ। তার মধ্যে একটা এই কলস দ্বীপ অন্যটির নাম পাখিরালয়।। ম্যানগ্রোভ অরণ্যের মধ্যে সরু সরু খাঁড়িপথের রসহ্যজনক বিস্তার। ভযংকর সুন্দর বোধহয় একেই বলে। আর সেই জন্য পৃথিবীর কাছে সুন্দরবন আজও এক বিস্ময়কর ভ্রমণের নাম।

কলস দ্বীপ : ক্ষীণকায়া, স্ফীতধারা বহু নদীর সমাহার সুন্দরবনে। যেমন ঠাকুরান নদী। এই নদী পেরিয়ে রামগঙ্গা হয়ে যাওয়া যায় স্বনচি বিটের খুলিভাসনি। এই ব্লকেরই অন্তর্গত কলস দ্বীপ।

কোর জঙ্গলের মধ্যে পড়ে দ্বীপটি, তাই একই সঙ্গে ভযংকর এবং আকষর্ণীয়। চারপাশে নিঝুম জঙ্গল। পাখপাখালির শব্দে ভোর হয়। খাঁড়ির পাশের কাদামাটিতে দেখতে পারেন দক্ষিণরায়ের টাটকা পায়ে ছাপ। বোটে চেপে জঙ্গল ঘুরতে ঘুরতে, ছোটো সমুদ্রতটেও যেতে পারেন। আর কোথাও না গেলেও কটেজের হাতায় বসেই কাটিয়ে দিতে পারেন দুটো দিন।

কীভাবে যাবেন : ধর্মতলা থেকে বাসে রামগঙ্গা পৌঁছোন। ওখান থেকে লঞ্চ বা নৌকায় পেঁছোনো যায় কলসদ্বীপে।

কোথায় থাকবেন : বনবিভাগের ক্যাম্প-এ থাকতে পারেন। বুকিংয়ে জন্য যোগাযোগ– ডিএফও, দঃ ২৪ পরগণা বনবিভাগ, নব-প্রশাসনিক ভবন, বিপ্লবী কানাইলাল ভট্টাচার্য সরণি, আলিপুর, কলকাতা-২৭। ফোন ০৩৩-২৪৭৯৯৩২।

Pakhiralaya near Sunderbans

পাখিরালয় : সুন্দরবনের সবুজ রহস্য আর দ্বীপের মধ্যে থাকার রোমাঞ্চ যদি অনুভব করতে চান, তাহলে আপনার গন্তব্য হোক পাখিরালয়। সুন্দরবনের গোসাবার অন্তর্গত এই দ্বীপের কোনও তুলনা নেই। একসময় ঘন জঙ্গলের ভয়ে মানুষ পা রাখতে দ্বিধা করত। সময়ে সঙ্গে সঙ্গে গাছ কেটে বসতি গড়ে উঠেছে। কিন্তু চারপাশে গা ছমছমে সুন্দরবনের পরিবেশ এখনও বেশ রোমাঞ্চ জাগায়। ক্কচিত্ দক্ষিণরায় সাঁতরে চলে আসে এই দ্বীপে গরু-বাছুর শিকার করতে।

সুন্দরবনের অসংখ্য নদী-নালার মধ্যে বেশ উল্লেখযোগ্য হল গোমর নদী। পাখিরালয়ে থাকা মানে এই নদী আপনার সর্বক্ষণের সঙ্গী। নদীর ওপারে সজনেখালি। ওয়াচটাওয়ারে বসে জন্তুজানোয়ার চোখে পড়তে পারে। হরিণ, বন্য শুয়োর, বাঁদর বা সাপ প্রায়ই বেরিয়ে আসে জঙ্গলের সবুজ ভেদ করে। কপাল খুব ভালো হলে বাঘেরও দেখা মিলতে পারে।

সজনেখালিতে রয়েছে একটি প্রদর্শনীকেন্দ্র। সুন্দরবন সম্পর্কিত বহু তথ্য সমৃদ্ধ এই প্রদর্শনী দেখে নিতে পারেন। গোসাবা দ্বীপে রয়েে হ্যামিলটন সাহেবের বাংলো। তাঁকেই এই অঞ্চলের উন্নয়নের পুরোধা বলা হয়। বাংলোটিতে একসময় পা দিয়েিলেন স্বযং রবীন্দ্রনাথও। একটা সপ্তাহান্তের ছুটি কাটানোর জন্য শীতকালই আদর্শ সময়।

কীভাবে যাবেন : ট্রেনে বা গাড়িতে ক্যানিং। মাতলা নদী পেরিয়ে বাসন্তীর ডকঘাট। মাতলা নদীর উপরে সেতু দিয়ে পায়ে হেঁটেও যাওয়া যায়। ওপারে গেলে গদখালি যাওয়ার যানবাহন পাবেন। ধর্মতলা থেকে বাসেও গদখালি যাওয়া যায়। তারপর নদী পেরোলেই গোসাবা বাজার।

কোথায় থাকবেন : জেলা পরিষদের ডাকবাংলো আছে। ২৪৭৯ ৮৯৯৮ এই ফোন নম্বরে যোগাযোগ করে বুকিং করতে পারেন।

স্তন ক্যানসার

৫০ বছরেরর ঊধের্ব বা তার বেশি বয়সি মহিলাদের মধ্যে কি স্তন ক্যানসারের প্রবণতা বেশি?

  • সাধারণত ৪০ থেকে ৫০ বছর বয়সি মহিলাদের মধ্যে স্তন ক্যানসারের প্রবণতা বেশি দেখা যায়। ৫০ বছর বয়সি কোনও মহিলারও একজন তরুণীর মতোই তাঁর শরীরে স্তন ক্যানসার দেখা দেওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক থাকা উচিত। বয়স্ক মহিলাদের কী কারণে স্তন ক্যানসার হতে পারে, কী ধরনের রিস্ক ফ্যাক্টর কাজ করে, সে সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য জানা গিয়েছে। এই রিস্ক ফ্যাক্টরগুলির জন্যই স্তন ক্যানসারের সম্ভাবনা বাড়ে।

এই রিস্ক ফ্যাক্টরগুলি সম্পর্কে বিস্তারিত ভাবে কিছু বলা সম্ভব কি?

  • সাধারণত একজন মহিলা কোন বয়সে রজঃস্বলা হচ্ছেন এবং কোন বয়সে তাঁর মেনোপজ হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে তাঁর স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কতখানি। যেসব মহিলা ১২ বছর বয়স হওয়ার আগেই রজঃস্বলা হন এবং ৫৫ বছর বয়স হওয়ার পর যাঁদের মেনোপজ হয়– তাঁদের স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা সামান্য বেশি। কারণ, নারী হরমোন ইস্ট্রোজেন এবং প্রোজেস্টেরনের উপস্থিতি এর ফলে শরীরে বেশিদিন থেকে যায়, যা স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। এছাড়াও, বয়সজনিত অন্যান্য শারীরিক পরিবর্তনও স্তন ক্যানসারের সম্ভাবনা বাড়াতে পারে। বয়স বাড়ার সঙ্গে মহিলাদের স্তনের তন্তুর গঠন পরিবর্তিত হয়। এই পরিবর্তনের ফলেও স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে।

স্তন ক্যানসারের চিকিৎসা কি বয়সভেদে আলাদা?

  • বয়স্ক মহিলাদের ক্ষেত্রে স্তন ক্যানসারের চিকিৎসায় থেরাপি কম্বিনেশেন সংখ্যায় কম হয়। ফলে চিকিৎসা পদ্ধতি সহজ হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে যেসব সাইড এফেক্ট বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়, তা অনেক সময় সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। যদি কোনও বয়স্ক মহিলার স্তন ক্যানসার অ্যাডভান্সড স্টেজে বা প্রাথমিক চিকিৎসার সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর ধরা পড়ে, সেক্ষেত্রে কেমোথেরাপিই যথাযোগ্য চিকিৎসা পদ্ধতি। যদিও অল্পবয়সিদের তুলনায় বয়স্কদের শরীরে এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বেশি হবে। রোগীর শরীর এই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কতখানি গ্রহণ করতে পারছে এবং তাঁর দৈনন্দিন জীবনে তার কী ধরনের প্রভাব পড়বে, তার ওপর ভিত্তি করেই চিকিৎসা পদ্ধতি ঠিক করা হয়।

বয়স্ক মহিলাদের স্তন ক্যানসারের জন্য কী ধরনের শারীরিক পরীক্ষা বা স্ক্রিনিং হওয়া উচিত?

  • ৪০ বছরের বেশি বয়সি মহিলাদের সব সময়ই স্তন ক্যানসারের জন্য শারীরিক পরীক্ষা হওয়া উচিত। পরীক্ষা দুভাবে হতে পারে। বাড়িতেই কোনও মহিলা নিজের স্তন পরীক্ষা করতে পারেন। একে হোম সি্্ক্রনিং বলা হয়। আবার চিকিৎসক ও নার্সরা হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পরীক্ষা করতে পারেন। একে বলা হয় ক্লিনিক্যাল সি্্ক্রনিং। পারিবারিক ইতিহাস ও ঝুঁকির বিষয়টি খতিয়ে দেখে চিকিৎসকরা ৫০ বছরের বেশি বয়সি মহিলাদের প্রতি দুই থেকে তিন বছর অন্তর ম্যামোগ্রাফি করানোর পরামর্শ দিতে পারেন।

কী ধরনের শারীরিক উপসর্গ ও লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন থাকা উচিত?

  • স্তন ক্যানসার বোঝার সবচেয়ে সহজ উপায় স্তনে নতুন লাম্প বা মাংসপিণ্ডের উপস্থিতি। এই মাংসপিণ্ড শক্ত হতে পারে, ব্যথা নাও থাকতে পারে। আবার মাংসপিণ্ড তুলনায় নরম ও গোলাকার হতে পারে, তাতে ব্যথাও হতে পারে। এছাড়াও স্তন ক্যানসারের অন্যান্য লক্ষণগুলি হল স্তনের একাংশ বা গোটা স্তনই ফুলে যাওয়া (এমনকী, যদি কোনও মাংসপিণ্ডের অস্তিত্ব আলাদা করে বোঝা না-ও যায়), চামড়ায় জ্বালাযন্ত্রণা এবং চামড়া কুঁচকে যাওয়া (কমলালেবুর খোসার মতো), স্তন ও স্তনবৃন্তে ব্যথা, স্তনবৃন্ত ভেতরের দিকে ঢুকে যাওয়া, বৃন্ত লালচে হয়ে যাওয়া এবং তা থেকে রস নিঃসৃত হওয়া। মহিলাদের উচিত নিয়মিত স্তন পরীক্ষা করা এবং কোনও ধরনের অস্বাভাবিকতা দেখলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।

স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি কী ভাবে কমাতে পারেন মহিলারা?

  • স্তন ক্যানসার প্রতিরােধের নির্দিষ্ট কোনও পথ নেই। তবে একটু সতর্ক থাকলে ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব। যেমন, অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ বন্ধ করতে হবে, শারীরিক ভাবে সক্ষম থাকতে দৈনন্দিন কাজ চালিয়ে যেতে হবে, স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাবার খেতে হবে। যেসব মহিলা সন্তানের জন্ম দেওয়ার পর বেশ কিছু মাস পর্যন্ত দুগ্ধপান করান, তাঁদের স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি কম। যাঁরা একেবারেই দুধ পান করান না সন্তানকে, তাঁদের ঝুঁকি তুলনায় বেশি।

স্তন ক্যানসারের স্ক্রিনিং বা চিকিৎসা শুরুর আগে, মহিলাদের কী কী বিষয় সম্পর্কে সচেতন থাকা দরকার?

  • ৬০ বা তার বেশি বয়সি মহিলাদের স্ক্রিনিং ও চিকিৎসা পদ্ধতি অন্যদের তুলনায় জটিলতর হয়। সুতরাং, আগে থেকেই রোগিণীকে এই চিকিৎসা ও স্ক্রিনিংয়ের উদ্দেশ্য বুঝিয়ে দেওয়া উচিত। তা ছাড়াও চিকিৎসার খরচ ও ঝুঁকি সম্পর্কে তাঁদের অবগত করা উচিত। চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং রোগিণীদের জীবনযাত্রায় তার প্রভাব সম্পর্কেও তাঁদের সচেতন করা উচিত। যেসব বয়স্ক মহিলা স্ক্রিনিং করানোর কথা ভাবছেন বা যাঁদের কিছু দিন আগে স্তন ক্যানসার ধরা পড়েছে, তাঁদের নিম্নলিখিত বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত-
  •  সম্পূর্ণ শারীরিক অবস্থা (রোগিণীর শরীরে অন্যান্য উপসর্গ, তাঁর পৗষ্টিক ও মানসিক অবস্থা)
  • রোগিণীর অবস্থা ও জীবনের মেয়াদ যাচাই করা
  • স্ক্রিনিং ও চিকিৎসার সম্ভাব্য সুবিধা ও অসুবিধা সম্পর্কে রোগিণীকে অবগত করা
  • জীবন ও স্বাস্থ্যের বিষয়ে ব্যক্তিগত বাছাই– অর্থাৎ রোগিণী কম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াযুক্ত চিকিৎসা চান নাকি আগ্রাসী চিকিৎসা পদ্ধতি অবলম্বন করতে চান। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে দেহে নতুন করে ক্যানসার ছড়ানোর সম্ভাবনা কমে যায় ।

তরুণীদের তুলনায় বয়স্ক মহিলাদের চিকিৎসার ফলাফল ভালো নাকি খারাপ হতে পারে?

  • বিষয়টি ব্যক্তিনির্ভর। তবে আধুনিক প্রযুক্তি ও চিকিৎসা ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বদল, বয়স্ক নারীদের চিকিৎসা সফল হতে ও তাঁদের জীবনের মেয়াদ বাড়াতে সাহায্য করছে। গবেষণা বলছে, যদিও ৬০ বছর বয়সের পর মহিলাদের স্তন ক্যানসারের সম্ভাবনা বেড়ে যায়, তবু ওই বয়সে মৃত্যুর ঝুঁকি কম থাকে।

আপনি কেন মনে করেন, বয়স্ক মহিলাদের স্তন ক্যানসারের সম্ভাবনার প্রতি বেশি নজর দেওয়া উচিত?

  • আমরা সকলেই জানি, বয়স্কদের শরীরে নানা ধরনের রোগের উপসর্গ দেখা দেয়। তার সঙ্গে যদি স্তন ক্যানসার যোগ হয়, তা হলে চিকিৎসা পদ্ধতি অনেক বেশি জটিল হয়ে পড়ে। আরোগ্যের সম্ভাবনাও কমে যায়। সে জন্যই বয়স্ক মহিলাদের সচেতন করা উচিত, যে-কোনও বয়সেই স্তন ক্যানসার হতে পারে এবং তা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চিহ্নিত করা দরকার। এ জন্য নিয়মিত সি্্ক্রনিং ও রিস্ক ফ্যাক্টর সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। এর ফলে সময় থাকতে রোগ নির্ণয় করা সম্ভব হয় ও চিকিৎসা সফল হওয়ার সম্ভাবনাও বাড়ে।

বর্তমানে ভারতীয় মহিলাদের মধ্যে সার্ভাইক্যাল ক্যানসারের চেয়েও স্তন ক্যানসারের প্রবণতা বেশি দেখা যায়। যদিও কমবয়সি মহিলাদের মধ্যে স্তন ক্যানসার বেড়ে যাওয়া নিয়ে মাথাব্যথা দেখা দিয়েছে, তবু বয়স্ক মহিলাদেরও এ রোগে আক্রান্ত হতে দেখা যায়। দুর্ভাগ্যের বিষয় হল, কোনও নতুন ওষুধ বাজারে এলে বা চিকিৎসার নতুন পদ্ধতি আবিষ্কৃত হলে বয়স্ক বা বৃদ্ধাদের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বা গবেষণামূলক পরীক্ষার অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হয় না। ভারতে এত বেশি সংখ্যক বয়স্ক মহিলার শরীরে স্তন ক্যানসারের সম্ভাবনা দেখা যায় যে, প্রয়োজনীয় স্ক্রিনিং ও চিকিৎসা পদ্ধতি খতিয়ে দেখে এবং তাতে উল্লেখযাগ্যে পরিবর্তন ঘটিয়ে তাঁদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা দরকার।

চোরাবালি

গ্যাসে পাউরুটি সেঁকতে সেঁকতে স্ত্রী অনসূয়ার কথাই ভাবছিল দেবল। পনেরো দিন হল বাপের বাড়ি গিয়েছে অনু, আর এরই মধ্যে হাঁপিয়ে উঠেছে সে। কটা মাস কীভাবে কাটাবে জানা নেই দেবলের।

মা হতে চলেছে অনু। বিয়ের পর বাপের বাড়িতে মাত্র তিনবারই যেতে পেরেছে সে। দেবলকে একা রেখে যেতে কিছুতেই মন চায় না অনুর। এবার দেবলই একপ্রকার জোর করে অনুকে বাপের বাড়ি পাঠিয়েছে। ওখানে থাকলে অনুর ঠিকমতো দেখাশোনা হবে। অফিস থেকে দেবলের ফেরার কোনও ঠিক থাকে না। এতক্ষণ এই অবস্থায় অনুকে বাড়িতে একা রাখতে দেবলের মন সায় দেয়নি। তাছাড়া ডাক্তারের কথামতো এইসময় একটু বিশেষ যত্নেরও প্রয়োজন  অনুর।

যথারীতি রোজকার মতো ডিম-পাউরুটি দিয়ে ব্রেকফাস্ট সেরেই, দেবল অফিস পেঁছোল। লাঞ্চটা আজকাল বাইরেই সারে। অনু থাকতে টিফিন প্যাক করে ব্যাগে ভরে দিত। সারাদিন অফিসে কাটিয়ে বাড়ি যখন ফিরল দেবল, নিজেকে অসম্ভব ক্লান্ত মনে হচ্ছিল। জিরিয়ে নিতে সোফায় এসে বসল। ক্লান্তিতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে খেয়াল নেই। ঘুম ভাঙল ফোনের একনাগাড়ে বেজে চলা ক্রিং ক্রিং শব্দে। অনুর ফোন। তাড়াতাড়ি উঠে বসল হ্যালো।

এত দেরি হল ফোন ধরতে? নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে পড়েছিলে? এক কাজ করো বাইরে থেকে খাবার আনিয়ে নাও। বাড়িতে কিছু আর করতে হবে না, চিন্তিত লাগল অনুকে।

অনু ফোন ছেড়ে দিলে হাতমুখ ধুয়ে দেবল ফ্রেশ হয়ে নিল। সবে ফোনটা নিয়ে খাবারের অর্ডার দিতে যাবে, কলিংবেলটা বেজে উঠল। মনে মনে বিরক্ত হল, এই সময় কে আবার এল?

দরজা খুলতেই দেখল তিরিশ-বত্রিশ বছর বয়সি একটি তরুণী দরজায় দাঁড়িয়ে ফরসা, বেশ সুন্দরী। এক মুখ হাসি লেগে রয়েছে ঠোঁটের কোণায়।

আপনি?

আমি মিতা, আপনাদের ঠিক উপরের ফ্লোরেই থাকি।

কিন্তু আপনাকে তো আমি কোনও দিন…

দেবলের কথা শেষ হওয়ার আগেই মিতা বলে উঠল, হ্যাঁ, আপনি আমাকে চেনেন না। কিন্তু আমি আপনাকে চিনি। অনুর হাজব্যান্ড আপনি। অনু ডেলিভারির জন্য বাপের বাড়ি গেছে।

মিতার কথা শুনতে শুনতে একটা কথাই দেবলের মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল, ওদের সম্পর্কে মহিলা এত কথা কী করে জানলেন? এছাড়াও একই বিল্ডিং-এ থেকেও কী করে দেবল মহিলাকে চেনে না?

এত চিন্তা করতে হবে না। মাত্র একমাস আগেই এখানে শিফট হয়েছি আমি। কিছুই খবর রাখেন না দেখছি। আগে যারা থাকত তাদের জায়গায় এসেছি। অবশ্য আপনি সকালে অফিস বেরিয়ে যান, ফেরেন দেখি সেই সন্ধেবেলায়। আর আমাকে কী বাইরেই দাঁড় করিয়ে রাখবেন? ভিতরে আসতে বলবেন না?

ওহ! সরি, প্লিজ ভিতরে আসুন। দেবল মিতাকে বসার ঘরে সোফায় এনে বসায়।

সারাক্ষণ বাড়িতে দমবন্ধ হয়ে আসে না আপনার? বড়ো শহরের এই এক অসুবিধা। অন্যান্য সুবিধা তো প্রচুর আছে কিন্তু জায়গা অত্যন্ত সীমিত আর লোকগুলোও বড়ো স্বার্থপর। নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে। অপরের জন্য কোনও সময় নেই।

মিতার কথা শুনে দেবল হেসে ফেলে।

আরে আমি আপনার খাবার নিয়ে এসেছি। কথায় কথায় সেটা দিতেই ভুলে গেছি, বলে মিতা হাতে রাখা কাপড় ঢাকা থালাটা সোফার সামনেই টেবিলে নামিয়ে রাখল।

খাবার দেখে অস্বস্তি বোধ করছিল দেবল। কিন্তু কিছু বলার আগেই মিতা বলে উঠল, আমি জানি আপনি বলবেন এসবের কী দরকার ছিল? আরে আমি নিজের জন্য খাবার বানাচ্ছিলাম ভাবলাম, আপনারটাও বানিয়ে নিই।

মিতাকে হাসতে দেখে দেবলও মুখে হাসি টেনে আনে।

কথায় কথায় দেবল জানতে পারে, মিতা লখনউ-এর মেয়ে ওর স্বামী দুবাইতে ব্যাবসা করেন। এতদিন ওখানেই ছিল মিতা কিন্তু নিজে কিছু করবে ভেবে দেশে ফিরে আসে। এখানে একটি এনজিও-র সঙ্গে যুক্ত সে।

ঠিক আছে আজ চলি। বাসনের চিন্তা করবেন না। সকালে এসে আমি নিয়ে যাব। মিতা চলে গেল। দেবল একদৃষ্টে মিতার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে চিন্তায় ডুব দিল।

সকালে বাসন নেওয়ার অছিলায় গরম গরম আলুর পরোটা আর এক বাটি দই জোর করে ধরিয়ে দিয়ে গেল দেবলের হাতে। দেবল প্রতিবাদ করলে, মিতা বলল, দেবলকে দেখে ওর মৃত দাদা অক্ষয়ের কথা মনে পড়ে যায়। সুতরাং দেবল কিছুই আর বলে উঠতে পারে না।

 

এরপর থেকে রোজই কিছু না কিছু খাবার বানিয়ে দিয়ে যেতে আরম্ভ করে মিতা। অনু কিছু ভুল না ভেবে বসে, এই ভেবে বলব না বলব না করেও, শেষমেশ সবকিছু খুলে বলে দেবল।

সব শুনে অনু বলে, হ্যাঁ মনে পড়েছে, আমার এখানে চলে আসার আগেই ভদ্রমহিলা ওখানে শিফট করেন। অল্পবিস্তর আলাপ হয়েছিল। যাক বাড়ির তৈরি খাবার পাচ্ছ, আমি নিশ্চিন্ত। কিন্তু দেখো ওই খাওয়া অবধি, ওর থেকে বেশি কিন্তু এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা কোরো না। নিজের রসিকতায় অনু নিজেই হেসে ওঠে।

কখনও পোলাও-মাংস তো কখনও লুচি-তরকারি আবার কখনও সাদামাটা ঘরোয়া খাবার রোজই কিছু না কিছু দেবলের কাছে আনা আরম্ভ করল মিতা। কিছু বললেই বলে, আপনার জন্য আমারও তো খাওয়া হচ্ছে।

এত কিছু খেয়ে ফিট থাকেন কী করে বলুন তো? জিজ্ঞেস করেই বসে দেবল।

কেন, রোজ হাঁটা এবং জিম দুটোই করি নিয়ম করে।

বাঃ, তাহলে চলুন কাল থেকে আমিও আপনাকে সঙ্গ দেব, দেবল বলে।

উৎফুল্ল হয়ে ওঠে মিতা। এরপর রোজই সকালে দুজনে একসঙ্গে হাঁটতে বেরিয়ে যেত আর সন্ধেবেলায় জিম যাওয়াটা ওদের রুটিন হয়ে দাঁড়াল।

ধীরে ধীরে মিতা আর দেবলের বন্ধুত্ব গাঢ় হয়ে উঠতে লাগল। বিশ্বাস থেকে মিতার উপর একটা নির্ভরতা গড়ে উঠল। কথায় কথায় একদিন আগত সন্তানকে নিয়ে স্বপ্ন দেখার কথা শেয়ার করছিল দেবল, খেয়াল করল মিতা কিছুটা উদাস। কারণ জিজ্ঞেস করতে দেবল জানতে পারল, ডাক্তাররা নাকি জানিয়ে দিয়েছেন, মিতা কোনও দিনও মা হতে পারবে না। তবে ওদের স্বামী-স্ত্রীর ইচ্ছে কোনও অনাথ শিশুকে নিয়ে এসে মানুষ করা। এটা জানার পর মিতার প্রতি দেবলের মনে সম্মানের জায়গাটা আরও বেড়েছে।

সেদিন বিকেল থেকেই বৃষ্টি। আকাশ কালো করে শুধু মেঘের গর্জন। ছুটির দিন। অনুর কথা খুব মনে হচ্ছিল দেবলের। ও যদি বাড়িতে থাকত এই বৃষ্টির মরশুমে ছুটত গরম গরম পকোড়া ভাজতে। থালা ভরে দেবলের সামনে এনে রেখে দিত। নিজের হাত পুড়িয়ে পকোড়া ভাজতে মন চাইল না দেবলের। বিকেলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টিভেজা প্রকৃতির সৌন্দর্যে  বুঁদ হয়ে রইল।

ফোনটা বাজতেই চিন্তায় ছেদ পড়ল। মিতার ফোন, পকোড়া বানাচ্ছি। চলে আসুন আমার ফ্ল্যাটে।

যাক বাঁচা গেল। সত্যিই খুব পকোড়া খেতে ইচ্ছে করছিল। আমি এখনই আসছি, বলে দেবল ফোন ছেড়ে দিল।

মিতার ফ্ল্যাটে পৌঁছোতেই সঙ্গে সঙ্গে প্লেট ভর্তি করে পকোড়া হাজির। দেবলকে বসিয়ে মিতা পকোড়ার সঙ্গে গরম গরম চা বানিয়ে আনল। চা আর পকোড়ার সঙ্গে ওদের আড্ডাও বেশ জমে উঠল।

হঠাৎ-ই খেয়াল হল বাইরে বেশ অন্ধকার হয়ে গেছে।, আড্ডা মারতে মারতে খেয়ালই হয়নি। উঠব উঠব করেও কিছুতেই ওঠা হয়ে উঠছিল না। মাথাটাও কেমন জানি ঘুরছে বলেই মনে হল দেবলের। মিতা জোর করল, ডিনার খেয়ে যেতে হবে। বারণ করা সত্ত্বেও কথা কানে তুলল না মিতা। রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।

হেঁটে একটু হাত-পাগুলো ছাড়িয়ে নিতে ইচ্ছে হচ্ছিল দেবলের। সেই কখন থেকে এক ভাবে সোফায় বসে আছে। উঠে দাঁড়াতেই মাথাটা জোরে ঘুরে গেল দেবলের। চারপাশটা অন্ধকার হয়ে এল। জ্ঞান হারিয়ে সোফায় লুটিয়ে পড়ল দেবল।

খানিক পরে মিতা এসে ঘরে ঢুকল। দেবলের ওই অবস্থা দেখে ঠোঁটের কোণায় হাসি ফুটে উঠল। কোনও ভাবে টানতে টানতে দেবলের বেহুঁশ শরীরটাকে শোবার ঘরে এনে বিছানায় শুইয়ে দিল। নিজেকে আয়নায় ভালো করে দেখল মিতা। যে-কোনও পুরুষমানুষের হুঁশ উড়ে যাওয়ার মতোই রূপ। ঘরের আলো নিভিয়ে দেবলের পাশে এসে শুয়ে পড়ল মিতা।

 

পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই লক্ষ্য করল দেবল, মিতার নগ্ন শরীরটাকে ও বাহুবন্ধনে শক্ত করে জড়িয়ে রেখেছে। এ কী করে সম্ভব? চমকে উঠে বসল দেবল। ঘটনাস্রোত মনে করার চেষ্টা করল কিন্তু সব অন্ধকার।

ততক্ষণে মিতাও উঠে বসেছে। চাদর দিয়ে ঢেকে নিয়েছে নিজেকে। দেবলের বিস্ফারিত দুই চোখের দিকে তাকিয়ে অশ্রুসজল হয়ে উঠল ওর দুই চোখ। দেবলের দিকে তাকিয়ে বলল, কাল রাতে কী হয়েছিল তোমার? এর আগে কখনও এভাবে জবরদস্তি করোনি। আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম। কাল রাতে তোমার শরীরের জোরের সঙ্গে আমি পেরে উঠিনি।

লজ্জায় চোখ তুলে তাকাতে পারল না দেবল। নিজের প্রতি নিজেরই ঘেন্না হল। যে ওকে দাদার আসনে বসিয়েছিল, তাকেই ও নিজের বাসনার শিকার করল। এই ভুল ও কী করে করল? যে কিনা কোনও দিন অন্য মহিলাদের দিকে চোখ তুলে তাকায়নি পর্যন্ত। ভুল করে ফেলেছে, কী করেই বা সেটা শুধরানো যায়?

দেবলের ইচ্ছে হচ্ছিল ফোন করে মিতার কাছে ক্ষমা চায় কিন্তু সাহসে কুলোল না। মিতা ফোন করা পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছিল। দেবলের ভয় করতে লাগল, মিতা যদি ওর উপর ধর্ষণের অভিযোগ নিয়ে আসে তাহলে অনু আর সমাজের সামনে কী করে সে মুখ দেখাবে? ফোনে অনুর সঙ্গে রোজই কথা হতো দেবলের কিন্তু এই ঘটনার কথা দেবল কিছুতেই অনুকে বলতে পারল না।

 

একদিন হঠাৎ নিজে থেকেই মিতা এসে হাজির হল দেবলের কাছে। দেবল ওকে দেখেই আমতা আমতা করে বলে উঠল, মিতা আমিই তোমার কাছে আসতাম ক্ষমা চাইতে।

কীসের ক্ষমা দেবল? সেদিনের ঘটনায় না তোমার দোষ ছিল আর না আমার। ঘটনাটা হওয়ার ছিল হয়ে গেছে। দুর্ঘটনা ভুলে যেতে পারলেই ভালো। আমি মন থেকে ওটা মুছে ফেলেছি।

মিতার কথা শুনে দেবলের মধ্যে যেন প্রাণ এল। মনে হল, সত্যিই মিতার মতো মেয়ে হয় না!

দেবল, আমি একটা অন্য কাজে তোমার কাছে এসেছি। হঠাৎ আমার কিছু টাকার দরকার হয়ে পড়েছে। এই মুহূর্তে এত টাকা আমার কাছে নেই। আমি তাড়াতাড়িই তোমাকে টাকাটা ফিরিয়ে দেব, বলে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে মিতা দেবলের দিকে তাকাল।

কত টাকা?

পঞ্চাশ হাজার। টাকা এসে গেলেই আমি তোমার টাকা ফিরিয়ে দেব, দেবলের চোখে চোখ রাখে মিতা।

দোষী দোষ ঢাকতে কী না করে? যখন-তখন প্রযোজনের জন্য বাড়িতে চল্লিশ হাজার মতো রেখেই দেয় দেবল। সেই টাকাটাই বার করে এনে মিতার হাতে তুলে দিয়ে বলল, এই মুহূর্তে আমার কাছে চল্লিশ হাজারই আছে মিতা। টাকাটা দিয়ে দেবলের মনে হল, কিছুটা হলেও ওর অপরাধের বোঝা হালকা হয়েছে।

 

সেই শুরু। এরপর থেকে মাঝেমাঝেই মিতা কখনও দশ-বিশ হাজার টাকা দেবলের কাছে চাইতে শুরু করল। দিয়ে দিত দেবল, কিন্তু কত দিন? কুবেরের ধন নেই ওর কাছে! সুতরাং একদিন দেবলকে না বলতেই হল মিতার মুখের উপর। মিতাও চুপ করে থাকল না।

না শোনার অভ্যাস নেই মিতার। ফোঁস করে উঠল। তুমি কী ভেবেছ দেবল? ওই রাতের ঘটনা আমি ভুলে গিয়েছি? সেদিন তুমি যা কিছু করেছ তার সব প্রমাণ আমার কাছে আছে। দেখতে চাও? বলে নিজের ফোনে রেকর্ড করা পুরো ভিডিও-টা তুলে ধরল দেবলের সামনে। ভিডিও-তে পরিষ্কারই দেখা যাচ্ছে দেবল মিতার সঙ্গে জবরদস্তি করার চেষ্টা করছে আর মিতা ওর হাত থেকে নিজেকে বাঁচাবার চেষ্টা করছে। সবকিছু দেখে ঘেমে উঠল দেবল।

কী বলো দেবল? ভিডিও-টা নিয়ে পুলিশের কাছে যাব, না সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে ভাইরাল করে দেব? ভালোই হবে, অনুও দেখবে তোমার আসল রূপ, বাঁকা হাসি হেসে বলে মিতা।

শিউরে ওঠে দেবল। যে ওকে দাদা বলে মেনেছিল তার কাছ থেকে এরকম ব্যবহার? ভাবতে পারেনি দেবল। সে মিতাকে কারণটা সরাসরি জিজ্ঞাসা করে। উত্তরও পায়।

একটা বড়ো বাড়ি দেখেছি। পঞ্চাশ লাখ দাম বলছে। তোমাকে দিতে হবে টাকাটা। একবারে নয়, কিছু কিছু করে দিলেই চলবে কিন্তু দিতে তো তোমাকে হবেই। নয়তো আমি কী করতে পারি এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝে গেছ, শ্লেষের ভঙ্গিতে বলে মিতা।

খুব ভালো করেই বুঝেছে দেবল, ওর সঙ্গে আলাপ করাটা মিতার একটা কৌশল ছিল। অনুর কথাগুলো মনে পড়ল, কাউকে ভালো করে না জেনেশুনে ভরসা কোরো না। এটা যে কত বড়ো সত্যি আজ টের পাচ্ছে দেবল।

অনু ডেলিভেরির জন্য হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে শুনেই দেবল কয়েক দিনের ছুটি নিয়ে কানপুর রওনা হল। অনুর বাপের বাড়ি ওখানেই। কিন্তু দেবল পৌঁছনোর আগেই অনু ফুটফুটে পুত্রসন্তানের জন্ম দিয়েছে। সুতরাং হাসপাতালে পৌঁছে নিজের সন্তানকে দেখে গত কয়েক মাসের দুশ্চিন্তা ঝেড়ে ফেলে স্ত্রী আর নবজাত সন্তানকে নিয়ে মেতে উঠল দেবল। এদিকে ছুটিও ফুরিয়ে আসছিল। অনুর ইচ্ছে ছিল দেবলের সঙ্গেই ফিরে যায় কলকাতায়। কিন্তু ডাক্তারের কথামতো আরও একমাস কানপুরে মা-বাবার কাছে থেকে যেতে বাধ্য হল অনু। দেবল ফিরে এল একাই।

আবার সেই মিতার মুখোমুখি হওয়া। সেই টাকার জন্য চাপ। ভিডিও ভাইরাল হওয়ার ভয়। দমবন্ধ হয়ে আসতে লাগল দেবলের। পরিত্রাণ পাওয়ার কোনও রাস্তা দেখতে পেল না সে।

এক মাস বাদেই অনু ফিরে এল সন্তানকে নিয়ে এসে অবাক হল দেবলের ব্যবহারে। যে-সন্তানকে নিয়ে এতদিন এত স্বপ্ন দেখেছে দেবল, সেই সন্তানকে কোলে নেওয়া তো দূরে থাক, তার একটু কান্নায় বিরক্ত হয়ে উঠতে লাগল দেবল। নতুন খেলনা কিনে আনার কথা বললে রেগে উঠত বলত, বাজে খরচ করা বন্ধ করো অনু।

শুধু এটুকুই নয়, অনুর থেকেও দূরে দূরে থাকতে আরম্ভ করল দেবল। অনু কাছে আসার চেষ্টা করলে, অন্য ঘরে চলে যাওয়াটা রোজকার ঘটনা হয়ে দাঁড়াল।

 

সেদিন দেবলের ছুটি। রোজকার থেকে একটু ধীরে ধীরেই বাড়ির কাজ সারছিল অনু। দেবের মোবাইলটা অনেক্ষণ থেকে বাজছে। এত সকালে কোথায় গেল দেব? এদিক ওদিক চাইল অনু। নাঃ আশেপাশে কোথাও নেই। বাধ্য হয়ে হাত মুছে মোবাইলটা ধরল। হ্যালো বলার আগেই ওধার থেকে নারীকণ্ঠ ভেসে এল, দুদিন ধরে সমানে ফোন করছি, ফোন ধরছ না কেন? দ্যাখো আমাকে রাগিয়ে দিও না। তাহলে আমি বাধ্য হব ভিডিও-টা ভাইরাল করে দিতে। তখন তোমার অবস্থা কী হবে ভেবে দেখেছ একবার? আমার এখুনি পনেরো লাখ টাকা চাই। আর যখনই টাকার কথা বলব, এসে দিয়ে যেও। আর আজ রাত্রে একবার ফ্ল্যাটে এসো আমার শরীর জ্বলে যাচ্ছে, হঠাৎই ফোনটা কেটে গেল।

অনুর পায়ে তলার মাটি সরে গেল। মহিলা কে? দেবলের কাছে কেন টাকা চাইছে? কোন ভিডিও ভাইরাল করার ভয় দেখাচ্ছে? রাত্রিতে কেন দেবলকে ফ্ল্যাটে ডাকল? এরকম নানা প্রশ্ন এসে অনুর মাথায় ভিড় করতে শুরু করল। ইচ্ছে হল সঙ্গে সঙ্গে দেবলের মুখোমুখি হতে কিন্তু আটকাল নিজেকে। আগে ব্যাপারটা বুঝতে হবে, ঘটনার শুরুটা জানতে হবে, তবেই কোনও পদক্ষেপ করা সম্ভব।

দেবল বাইরে থেকে ফিরলে, আজ অনেক দিন পর ওর মুখের দিকে চেয়ে দেখল অনু। সত্যি কত রোগা হয়ে গেছে। চোখের তলায় কে যেন কালি ঢেলে দিয়েছে। অনু নিজেকেই দোষারোপ করল, কেন লোকটার দিকে এতদিন ভালো করে তাকায়নি? কী এমন দুঃখ বুকে চেপে বসে আছে, যেটা ওকেও বলতে পারেনি দেবল?

দেব? অনেকটা সাহস বুকের মধ্যে ভরে নিয়ে অনু তাকাল দেবলের দিকে। আমাকেও বলবে না, তোমার কী হয়েছে? আমরা তো কথা দিয়েছিলাম, কেউ কাউকে কোনও কথা লুকোব না। তাহলে এত বড়ো ঘটনা তুমি কী করে লুকিয়ে রাখলে?

ছ্যাঁত করে উঠল দেবলের বুকটা। অনু কি তাহলে সব জেনে গেল? সবকিছু অনুর কাছে খুলে বলার জন্য দেবলের মনটা উদ্বেল হয়ে উঠতে লাগল। কিন্তু মুখ ফুটে একটা শব্দও বেরোল না।

বলো না দেব, কে ওই মহিলা, যার সঙ্গে কথা বলার জন্য তোমাকে বাড়ির বাইরে যেতে হয়? আজ তুমি না থাকাতে আমি ফোন ধরেছিলাম। যতক্ষণ তুমি না বলবে আমাকে, আমি কী করে জানব কেন তোমাকে মহিলা বিরক্ত করছেন? প্লিজ আমাকে খুলে বলো, হয়তো তাহলে তোমাকে কিছু সাহায্য করতে পারব।

অনুর কথায় দেবের চোখ জলে ভরে এল। নিজেকে আর আটকে রাখতে পারল না দেবল। কী কী ঘটনা ওর সঙ্গে ঘটেছে সব খুলে বলল দেবল।

এত কিছু হয়ে গেছে, তুমি আমাকে জানাওনি? কীসের ভয় ছিল তোমার, যে আমি তোমাকে ভুল বুঝব? আমি তোমার স্ত্রী, এতদিনে তুমি আমাকে এটুকুই চিনেছ? তোমার সুখ-দুঃখের সঙ্গী আমি, একটু তো ভরসা করতে পারতে আমাকে। যাই হোক, যা হবার হয়েছে। আমি তোমাকে ঠিক এই চোরাবালি থেকে টেনে বার করবই।

সারাটা দিন ধরে ভাবল অনু। রাতে খেতে বসে মনে মনে ঠিক করে রাখা প্ল্যানটা জানাল দেবলকে।

সত্যিই অনু, তুমি যেটা করবে ভাবছ সেটা আদৌ কি হওয়া সম্ভব? তুমি জানো না ওই মহিলা কতখানি চালাক, শঙ্কিত চোখে প্রশ্নটা করে দেবল।

অবশ্যই হবে দেব তবে আমাদের একটু ধৈর্য ধরতে হবে, দেবলের হাতে হাত রেখে ওকে ভরসা দেয় অনু।

প্ল্যান অনুযায়ী অনু, মিতার সঙ্গে বেশি করে মিশতে আরম্ভ করল, যাতে বন্ধুত্বটা আরও গাঢ় হয়। যখন অনু বুঝল মিতা এখন ওকে বিশ্বাস করতে আরম্ভ করেছে তখন ও শেষ চালটা দিল।

আজ ছেলেকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব। হয়তো দেরি হবে ফিরতে, দেবল ফিরলে তুমি বাড়ির চাবিটা দিয়ে দিও আর পারলে কিছু খাইয়ে দিও, নয়তো বেচারা খিদে পেটে নিয়ে বসে থাকবে। হাত জোড় করে বলে অনু। মিতার মনে হয় আকাশের চাঁদ আপনিই এসে ওর হাতে ধরা দিয়েছে।

আরে হাত জোড় কেন করছ অনু। চাবি দিয়ে দেব আর তোমার বরকে পেট ভরে খাইয়ে দেব। চিন্তা কোরো না।

মিতাকে হাসতে দেখে গা জ্বলে উঠল অনুর। মনে মনে বলল অনু, হেসে নাও এখন যত খুশি। তুমি আমার দেবকে কাঁদিয়েছ মিতা, আমি তোমাকে উচিত শিক্ষা দেব।

অফিস থেকে ফিরে নিজের বাড়িতে মিতাকে দেখে দেবল অবাক হবার ভান করল। মিতা তুমি আমার বাড়ির ভিতর, কী করছ?

তোমার অনু আমার হাতে তোমাকে সঁপে দিয়ে গেছে দেবল। রহস্যময় হাসিতে মুখ ভরে উঠল মিতার। চাবির গোছাটাকে আঙুলে ঘোরাতে ঘোরাতে দেবলের খুব কাছে ঘেঁষে এল মিতা।

প্লিজ বন্ধ করো তোমার ফালতু নাটক। কেন করছ তুমি এরকম আমার সঙ্গে? তুমিই বলেছিলে আমার মধ্যে তুমি তোমার দাদাকে দেখতে পাও। তাহলে আমার সঙ্গে এসব করতে তোমার লজ্জা করে না?

ইচ্ছে করেই দেবল আবার ওই একই প্রসঙ্গ টেনে আনল। সেদিন তোমার ফ্ল্যাটে আমাকে প্ল্যান করেই ডেকেছিলে, তাই না? চা-পকোড়ার নাম করে নেশার ওষুধ মিশিয়ে দিয়েছিলে চায়ের মধ্যে? ধর্ষণ আমি করিনি, তুমি করেছিলে আমাকে। বলো আমি মিথ্যা বলছি?

হ্যাঁ, তুমি ঠিকই বলছ। পুরোটাই আমার প্ল্যান ছিল। নেশার ওষুধ খাইয়ে শোবার ঘরে নিয়ে গিয়ে তোমার জামাকাপড় নিজের হাতে খুলে তোমাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়েছিলাম। তুমি ঠিকই বলেছ, আমিই তোমাকে ধর্ষণ করি। কিন্তু একথা তুমি কী করে প্রমাণ করবে দেবলবাবু? ভিডিও-তে যা দেখা যাচ্ছে সেটাই সত্যি বলে সবাই ধরবে। যেদিন তোমাকে আমি বড়ো গাড়িটা করে যেতে দেখেছিলাম, সেদিনই ঠিক করে নিই, তোমাকে কোনও ভাবে ফাঁসাতে হবে। সত্যিই বলছি দেবল, এই দেশলাই বাক্সর মতো ফ্ল্যাটে দম আটকে আসছে। বড়ো বাড়ি, গাড়ি হবে। চাকরবাকর থাকবে আর পর্যাপ্ত শারীরিক সুখ, দেবে তো আমাকে দেবল?

আচ্ছা এইসব এইজন্যই তুমি করেছ যাতে আমাকে ব্ল্যাকমেল করতে পার?

হ্যাঁ দেবল। পঞ্চাশ লাখ টাকা আমাকে দিয়ে দাও, তারপর তুমি তোমার রাস্তায় আর আমি আমার রাস্তায়। তুমি তো টাকা দিতে ঝামেলা করছ।

আর আমি যদি টাকা না দিই?

তুমি আমার হাত থেকে রেহাই পাবে না। চেঁচিয়ে ওঠে মিতা। অনু যে বাইরে দাঁড়িয়ে সব শুনছে এবং ও পুলিশ নিয়ে এসেছে ভাবতেও পারেনি মিতা।

 

এবার তুই আমাদের হাত থেকে রেহাই পাবি না। অনেক ঘোল খাইয়েছিস। হঠাৎই মহিলা পুলিশ দেখে ঘাবড়ে যায় মিতা।

দেবল কিছু বলে ওঠার আগেই মিতা নকল অশ্রু ঝরাতে ঝরাতে বলে ওঠে, অফিসার এই লোকটা আমাকে ধর্ষণ করেছে আর এখন ব্ল্যাকমেল করার চেষ্টা করছে। বলছে ওর কথা না শুনলে ওর কাছে রেকর্ড করে রাখা ভিডিও ভাইরাল করে দেবে।

কোন ভিডিও-টা? যেটা উনি নন, তুই বানিয়েছিস? তোকে খুব ভালোমতন চিনি, বলে মহিলা পুলিশটি অনুদের দিকে তাকিয়ে বললেন, এই মহিলা এক নম্বরের ঠগ, জোচ্চোর। বহু লোককে এভাবে ঠকিয়েছে। অনেক দিন ধরেই পুলিশ একে খুঁজছিল। এর আসল নাম মিতা নয়, সোনম।

মিতার ফ্ল্যাট থেকে পুলিশ লাখ লাখ টাকা আর অনেকগুলো ভিডিও উদ্ধার করল। মিতাকে এবং ভিডিওগুলো পুলিশ নিজেদের হেফাজতে নিয়ে বেরিয়ে গেল। অনুদের বাড়ি ছেড়ে যাবার সময় মিতার চাহনি একটাই কথা দেবলকে বলে গেল, তোমাকে আমি ছাড়ব না।

থ্যাংকস অনু। তুমি যদি শেষ চালটা না চালতে তাহলে যে আমার কী হতো জানা নেই। হয়তো চোরাবালি-ই গ্রাস করত আমাকে। দেব অনুকে নিজের কাছে টেনে নিল। অনুও সম্পূর্ণ ভাবে নিজেকে দেবের হাতে সঁপে দিল।

 

ওয়ার্ডরোব গোছানোর ট্রিক্স

তাড়াহুড়োর মধ্যে বেশিরভাগ সময় অর্ধেক জিনিসই ওয়ার্ডরোব-এ খুঁজে পেতে অসুবিধা হয়। তার কারণ হচ্ছে অগোছালো জিনিসপত্র এবং ওয়ার্ডরোব-এর অপর্যাপ্ত আলো। অথচ দৈনন্দিন জীবনে ওয়ার্ডরোব-এর প্রয়োজন অবহেলা করার নয়। ওয়ার্ডরোব-এ কীভাবে গুছিয়ে রাখবেন আপনার নিত্য প্রয়োজনীয় প্রিয় আলমারিটি তারই কিছু পরামর্শ এখানে দেওয়া হচ্ছে।

  • ওয়ার্ডরোব সবথেকে নীচের তাকটি আগে গুছিয়ে নেওয়া দরকার। আধুনিক বেশিরভাগ ওয়ার্ডরোব সঙ্গে নীচে একসঙ্গে একটা শু-বক্স দেওয়া থাকে। সুতরাং বাড়িতে শু-র্যাক না থাকলে, ফ্লোরে জুতো না রেখে টেম্পোরারি নতুন জুতো ওই শু-বক্সেই গুছিয়ে রাখুন। পরে শু-র্যাক কিনে নিতে পারেন বা হ্যাংগিং শু-অর্গানাইজার-ও, বাক্সের বদলে ব্যবহার করতে পারেন।
  • সপ্তাহে একদিন অন্তত আধঘন্টা সময় দিন পুরো আলমারিতে কী কী আছে দেখার জন্য। যেগুলো একদম পরেন না সেগুলি একটি কিংবা দুটি বাক্সে গুছিয়ে রাখুন। একটি আলমারিতেই রাখুন অসময়ে দরকারের জন্য এবং অন্য বাক্সটি অন্যত্র সরিয়ে রাখুন। লক্ষ্য হচ্ছে, যে পোশাকগুলি সবসময় পরছেন সেগুলি ওয়ারড্রোবে গুছিয়ে রাখা এবং বাকি পোশাক স্টোরেজে রেখে দেওয়া অথবা অন্য কেউ পরতে চাইলে তাকে দিয়ে দেওয়া। তবে সারাজীবন ধরে এটা করে যাওয়ার প্রয়োজন হবে না। একবার ওয়ারড্রোবের জিনিসপত্র কম হয়ে গেলে তখন মাসে একবার করে আলমারি গোছালেই চলবে।
  • যে পোশাকগুলি আপনি পরতে চান না বা পছন্দ করেন না সেগুলো কোনও অনাথ আশ্রম বা ত্রাণশিবিরে দান করে দিতে পারেন। তাই বলে দাগ লাগা, ছিঁড়ে যাওয়া বা ফুটো হয়ে যাওয়া জামাকাপড় অপরকে দান করা বাঞ্ছনীয় নয়। যদি তারা এই ধরনের ছেঁড়া, ফাটা জামাকাপড় নিতে আগ্রহী হয় তবেই এগুলি তাদের দিতে পারেন নয়তো এগুলি ফেলে দিন।
  • একটা ড্রেস হয়তো অনেকদিন ধরে আপনার ওয়ারড্রোবে পড়ে রয়েছে কিন্তু আপনি শিওর নন ওটা পরে আপনাকে কেমন লাগবে, ওটা রাখবেন না ফেলবেন বুঝে উঠতে পারছেন না। সেই ক্ষেত্রে আয়না এবং ক্যামেরার সাহায্য নিন। পোশাকটির সঙ্গে যা কিছু সেন্টিমেন্ট সব ঝেড়ে ফেলে দিন। পোশাকটি পরে আয়নায় নিজেকে দেখুন আপনাকে মানাচ্ছে কিনা অথবা যদি কনফিউজ হয়ে যান তাহলে আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবির একটি ছবি তুলে নিন ক্যামেরায়। ক্যামেরায় নিজের ছবি দেখে বোঝা অনেক সহজ হয়ে যাবে, আদৗ পোশাকটি আপনাকে মানাচ্ছে কিনা।
  • আপনি হয়তো আগে মোটা ছিলেন। ডায়েট কন্ট্রোল এবং জিম করে অনেকটাই রোগা হয়েছেন। সুতরাং মোটা থাকা অবস্থায় কেনা পোশাক এবং বর্তমানে রোগা হওয়ার পর কেনা পোশাক আলাদা করুন। যদি মনে করেন মোটা অবস্থায় যখন ছিলেন তখনকার কেনা পোশাক সামনে রাখতে চান নিজের ডায়েটের উপর কন্ট্রোল রাখার জন্য তাহলে একটা বা দুটো পোশাকই যথেষ্ট আলমারিতে রাখার জন্য। যেটা সর্বক্ষণ আপনাকে মনে করাবে ডায়েটে থাকার কথা এবং যেটা কন্ট্রেল না করলেই আবার মোটা হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। বাকি ওভার সাইজ পোশাক বাতিল করুন।
  • নতুন পোশাক যখনই কিনবেন, একটা পুরোনো পোশাক আলমারি থেকে সরিয়ে দিন। যে-কোনও কিছু নতুনের বদলে খারাপ হয়ে যাওয়া পুরোনো জিনিস স্যাক্রিফাইস করুন। হয়তো পাহাড়ে ঘুরতে যাওয়ার জন্য একটা ট্রেকিং-শু কিনে আনলেন, তাহলে জুতোর বাক্সে পড়ে থাকা পুরোনো কাপড়ের জুতোটা যেটা চার-পাঁচটা বর্ষায় তথৈবচ অবস্থা সেটা রেখে দেওয়াটা কি একান্তই দরকার? ভেবে দেখুন।
  • ওয়ার্ডরোব-এর ভিতরে আলোর ব্যবস্থা রাখুন। অনেক সময় আলমারির পিছনের দিকটা হাত দিতেই ইচ্ছে করে না, অন্ধকার থাকে বলে। একটা ক্লিপ লাইট আলমারির ভিতরে ঝোলাবার ব্যবস্থা করতে পারেন। অথবা ব্যাটারি চালিত স্টিক লাইট ও হার্ডওয়্যার দোকান থেকে কিনে এনে আলমারিতে ফিট্ করে দিতে পারেন। আলমারির ভিতর পর্যন্ত আলো পৌঁছোলে তবেই পিছনের দিকে থাকা জিনিস চোখে পড়বে এবং সেগুলো ব্যবহারের কথা মনে হবে।
  • আলমারিতে কোথায় কী টাঙিয়ে রাখবেন সেটা নিয়ে অনেকের সমস্যা থাকে। যেগুলো মাঝেমধ্যে ব্যবহার হয় সেগুলো পিছনের দিকে রাখা যেতে পারে। রোজের ব্যবহারের জিনিস সামনের দিকে রাখা ভালো।
  • শাড়ির সঙ্গে ম্যাচিং ব্লাউজ এক জায়গায় করুন আর সঙ্গে ম্যাচিং পেটিকোট। সালোয়ার কামিজ সেট করে গুছিয়ে তুলুন। শার্ট, কুর্তা, জাম্পার ইত্যাদি একদিকে রাখুন এবং প্যান্ট, পালাজো, লেগিংস, লং স্কার্ট ইত্যাদি একদিকে যাতে সময় নষ্ট না করে ম্যাচিং করিয়ে চট্ করে পরে নেওয়া যায়।
  • ভাবছি এটা কাল পরব, সোয়েটারটা নোংরা নয় আবার পুরোপুরি পরিষ্কারও বলা চলে না– এরকম কনফিউশন সবারই হয়। এমন একটা পোশাক বাছি যেটা কয়েকদিনই মাত্র পরা হয়েছে এবং আরও এক দুদিন পরা যাবে। উদাহরণ হিসেবে সোয়েটার, দামি শাড়ি, স্যুট ইত্যাদি বলা যায়। এগুলো একবার পরেই কেউ কাচে না। সুতরাং এগুলোর জন্য আলমারিতে একটা আলাদা র্যাক করুন।
  • প্রয়োজনীয় হ্যাঙ্গার কিনে আনুন। শার্টের জন্য, প্যান্ট, শাড়ি, লঞ্জিরি ইত্যাদি সবকিছুর জন্যই আলাদা আলাদা হ্যাঙ্গার পাওয়া যায়। হ্যাঙ্গারে টাঙিয়ে রাখা পোশাক তাহলে আলমারির ফ্লোরে পড়ে দলা পাকিয়ে যাবে না।
  • পোশাক কেনার সময়, যা আছে তার সঙ্গে কো-অর্ডিনেট করে কেনাটা জরুরি। আলমারিতে রাখা পোশাকের কথা মাথায় রেখে নতুন পোশাক ম্যাচ করে কিনলে আপনিই লাভবান হবেন। আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে অর্ধেক পোশাক পরে বাকিটা ম্যাচিং করে কী পরবেন সেটা ভাবতে হবে না।

দাগ

সকাল সকাল ঘরটার অবস্থা দেখে সুচিত্রার গলা ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছিল। ছেলে তো সেই সকাল সাতটার আগেই স্কুলের জন্য রওনা হয়ে গেছে। প্রতিদিনই স্কুলবাস আসে বাড়ির দরজায়। আর অরুণাভও তো অফিসের জন্য বেরিয়ে গেল। কিন্তু বাড়ি খালি বলে, সুচিত্রার কিন্তু কোনও বিশ্রাম নেই। দু-কামরার ফ্ল্যাটটাকে বাপ-ব্যাটা মিলে আস্তাকুঁড় বানিয়ে রেখেছে যেন। চারিদিকে জামা কাপড় ছড়িয়ে রেখে গেছে। ছেলে রুমন পড়াশোনা যত না করেছে, তার থেকে বই-খাতা ছড়িয়েছে বেশি। সারা মেঝেতে দলাপাকানো কাগজ ছড়িয়েছে। এগুলো সব পরিষ্কার করে, ঘর-দোর গুছিয়ে তুলতে তুলতে সুচিত্রা জানে পাক্বা দু-তিন ঘন্টা লেগে যাবে। কোথা থেকে শুরু করবে ভেবে পাচ্ছিল না সুচিত্রা।

বাথরুমে ঢুকে ভেজা টাওয়েল এবং অরুণাভ-র ছাড়া শার্ট আর গেঞ্জিটা বার করে ওয়াশিং মেশিনে ফেলতেই যাচ্ছিল সুচিত্রা, খাটের পাশে রাখা মোবাইলটা বেজে উঠল। বিরক্ত হল ও। এই অসময়ে কার ফোন হতে পারে? সব রাগ গিয়ে পড়ল মোবাইল কোম্পানিগুলোর উপর। ওরা ছাড়া এই অসময়ে আর কে-বা হতে পারে! লেটেস্ট গানের কলার টিউন দিচ্ছে বলে ফোন করে করে জ্বালিয়ে যাবে। পুরো ব্যাপারটাই সুচিত্রার বুজরুকি কারবার ছাড়া কিছু মনে হয় না।

বিরক্ত হয়েই হাতটা নাইটিতে মুছে নিয়ে সুচিত্রা ফোনটা তুলে নিল। কলার আইডি দেখে সুচিত্রার রাগ মুহূর্তে জল হয়ে গেল। বিলাসপুর থেকে ননদের ফোন। একটু চিন্তিতও হল সুচিত্রা। দিদি সাধারণত দুপুরের দিকেই ফোন করে। আজ কী হল যে এত সকাল সকাল ফোন করছে?

‘হ্যালো দিদি, কেমন আছ? আজ এত সকাল সকাল ফোন করেছ সব ঠিক আছে তো?’

‘না সুচিত্রা, সব মনে হচ্ছে ঠিকঠাক নেই।’

‘কী হয়েছে’, খারাপ খবর শোনার আশঙ্কায় ঘাবড়ে গেল সুচিত্রা। যত খারাপ খবর সব কি এই সকালেই আসতে হয়?

‘তনুর শরীরটা মনে হয় ভালো নেই। সেদিন ফোন করেছিলাম ও ঘরে ছিল না। ওর রুমমেট বলল, সারারাত নাকি তনু ঘুমোয় না। জিজ্ঞেস করলে বলে ঘুম আসছে না। শরীরে অস্বস্তি হচ্ছে।’

‘কবে থেকে এটা হচ্ছে?’

‘দুই-তিন মাস ধরে চলছে’ , কেঁদে ফেলে দিদি।

‘দিদি, শুধু শুধু কাঁদছ কেন? আমাকে আগেই তো বলতে পারতে, আমি একবার গিয়ে খোঁজ করে আসতাম। ঠিক আছে আমি আজই একবার চলে যাব।’ঘড়ির দিকে তাকায় সুচিত্রা, ‘দিদি এখন নটা বাজে, একটু পরেই ওর কলেজ শুরু হয়ে যাবে। বিকেল ছাড়া ওর সঙ্গে দেখা হবে না। ওর সঙ্গে দেখা করে আমি তোমাকে রাতে ফোন করে দেব।  চা-জলখাবার খেয়েছ?’

‘না…’

‘সে কী? যাও, নিশ্চিন্তে খাওয়াদাওয়া করো। আমি বাড়ির কাজ সেরে রুমন আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করে বেরোব। তুমি এখন ফোন ছাড়ো। আমিও কাজ সেরে স্নান করে নিই।’ সুচিত্রা মোবাইল বন্ধ করে।

বাড়ির কাজ করতে করতে সুচিত্রার মাথায় ঘুরতে থাকে তনু মানে দিদির মেয়ে তানিয়ার কথা। শেষবার যখন দেখা হয়েছিল তখন তনুর শরীর তো ঠিকই মনে হয়েছিল। বাড়ির এবং আত্মীয়স্বজনের সবকটি ছেলেমেয়ের মধ্যে তনুই সবথেকে ভালো পড়াশোনায়। এছাড়াও প্রচণ্ড পরিশ্রমী এবং খেলাধূলাতেও খুবই ভালো। রুমনকে সবসময় পরামর্শ দেয় সুচিত্রা, ওর দিদির থেকে কিছু শেখার জন্য কিন্তু রুমনের পড়াশোনাতে মন আছে বলেই মনে হয় না সুচিত্রার। প্রতি মাসে পাঁচ-ছয় হাজার টাকা ওর টিউশনের পিছনেই খরচ করে সুচিত্রা আর অরুণাভ।

তাড়াতাড়ি বাড়ির কাজ আর রান্নাবান্না সেরে স্নান সেরে নিল সুচিত্রা। রুমনের বিকেলের জলখাবারের জন্য কড়াইশুঁটির কচুরি তৈরি করে ক্যাসারোলে তুলে রেখে দিল সুচিত্রা, যাতে ছেলেটা বিকেলে ‘খিদে খিদে’করে পঞ্চাশবার ফোন না করে। কয়েকটা তনুর জন্যেও প্যাক করে গুছিয়ে নিল। মেয়েটা বড়ো ভালোবাসে এইসব খেতে। হস্টেলে পাবেই বা কোথায়? দিদির এই মেয়েটাকে বড়ো ভালোবাসে সুচিত্রা। আজকালকার দিনে এমন মেয়ে খুব একটা চোখে পড়ে না। সুচিত্রা চাইছিল তনুকে সারপ্রাইজ দিতে তাই ওকে ইচ্ছে করেই ফোন করল না। একটার মধ্যে রুমন স্কুল থেকে বাড়ি ঢুকলে মা-ব্যাটায় দুপুরের খাবার খেয়ে রুমনকে সব বুঝিয়ে, সুচিত্রা তনুর হস্টেলে যাবার জন্য বেরোল। বাসস্ট্যান্ড অবধি পৌঁছোতে পৌঁছোতে অরুণাভকেও সবকিছু জানিয়ে রাখল সুচিত্রা।

তনুর হস্টেল, শহর থেকে একটু দূরে। দু’বার বাস বদলে যেতে হয়। ওর হস্টেলে যখন পৌঁছোলো সুচিত্রা, তখন চারটে বেজে গেছে। হস্টেল থেকে মেয়েরা বেরিয়ে কেউ কেউ টিউশন নিতে যাচ্ছে।

মুখেই দেখা হল তনুর রুমমেটের সঙ্গে। আগেই আলাপ হয়েছিল সুচিত্রার সঙ্গে, নাম সঞ্চিতা। সুচিত্রাকে দেখেই হাসিমুখে এগিয়ে এল, পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল।

‘কেমন আছো?’ আশীর্বাদের ভঙ্গিতে সঞ্চিতার মাথায় হাত রাখল সুচিত্রা।

‘ভালো, মামিমা। আপনার আজকে আসার কথা ছিল? তনু জানে আপনি আসবেন?’

‘না, ওকে জানাইনি, সারপ্রাইজ দেব বলে। কিন্তু ও কোথায়?’ সুচিত্রা জিজ্ঞেস করে।

‘ও রুমে আছে,’ বলে সঞ্চিতা চলে গেল।

সুচিত্রা সিঁড়ি দিয়ে উঠে ওয়ার্ডেনের ঘরের দিকে পা বাড়াল। রেজিস্টারে সাইন করে তবেই তনুর ঘরে যাওয়ার পারমিশন পাবে।

সাইন করে তনুর রুমের সামনে গিয়ে অভ্যাসবশত দরজাটা হাত দিয়ে ঠেলতেই দরজাটা সামনের দিকে কিছুটা খুলে গেল। ঘরটা অন্ধকার। তনু সিলিঙের দিকে দৃষ্টি মেলে চুপচাপ শুয়ে আছে। বাইরের নিভু নিভু আলোয় ঘরের ভিতরের অবয়ব অস্পষ্ট, ধোঁয়াটে। সুচিত্রা পা টিপে রুমে ঢুকে দরজা ভেজিয়ে দিল। তনু কিছুই টের পেল না। ধীর পায়ে সুচিত্রা ওর মাথার পিছনে দাঁড়িয়ে দুই হাতে তনুর চোখ চেপে ধরল।

‘কে… কে?’ ভয় পেয়ে চেঁচিয়ে ওঠে তনু।

‘বল তো কে…’

‘ও… মামি, তুমি।’ গলার আওয়াজ চিনতে পেরে ওর সারা মুখে হাসি ছড়িয়ে যায়। বিছানা থেকে উঠে লাইট জ্বালায় তনু।

সুচিত্রা খাটের পাশে গিয়ে বসে। হাতটা ভিজে ভিজে ঠেকে, ‘কীরে কাঁদছিলি নাকি?’

‘না তো মামি’, তাড়াতাড়ি করে চোখের জল মোছবার চেষ্টা করে তনু।

ভালো করে তাকায় সুচিত্রা ওর দিকে। তনুর চোখ লাল হয়ে ফুলে উঠেছে। মুখটাও শুকনো, চোখের কোলে কালি পড়েছে। চুলগুলো অবিন্যস্ত, অগোছালো।

‘কী রে, কী হয়েছে তোর?’ চিন্তিত সুচিত্রা তনুর কাছে ঘেঁষে আসে। ‘সকালে তোর মা ফোন করেছিল, বলল, তুই নাকি খুব অসুস্থ। আমার কাছেও তো চলে আসতে পারতিস বা বাড়িতেও ক’দিন ঘুরে আসতে পারতিস। ডাক্তার দেখিয়ে ওষুধ খাচ্ছিস?’

‘আরে আরে দাঁড়াও মামি, একসঙ্গে কত প্রশ্ন করছ। আমি একদম ঠিক আছি, চিন্তা করার মতো কিচ্ছু হয়নি। তুমি বসো, আমি চা নিয়ে আসি , অগোছালো চুলটা হাতে পাকিয়ে খোপা করতে করতে তনু খাট থেকে নামার উপক্রম করে।

সুচিত্রা ওকে আটকে দেয়, ‘আমি চা খেয়েই এসেছি। তুই এখানে চুপচাপ বস, এখন কোথাও তোকে যেতে হবে না।’ হাতের ব্যাগটা থেকে বার করে টিফিন কৌটো-টা তনুর হাতে ধরিয়ে দেয় সুচিত্রা, ‘নে খেয়ে নে, কড়াইশুঁটির কচুরি আছে। আলুর দম আর মিষ্টি দিয়ে আজ খেয়ে নে। যেদিন প্ল্যান করে আসব তোর অর্ডারি রসোগোল্লার পায়েস নিশ্চয়ই নিয়ে আসব।’

অন্যদিন হলে সুচিত্রার হাত থেকে প্রায় কেড়েই কৌটো খুলে বসত তনু কিন্তু আজ সুচিত্রা আশ্চর্য হল, তনু কৌটোটা সরিয়ে রাখল, ‘এখন ইচ্ছে করছে না মামি, পরে খেয়ে নেব। কৌটো-টা টুলের উপর রাখতে গিয়ে হাত লেগে তনুর একটা পড়ার বই মাটিতে পড়তেই, বইয়ের ভিতর থেকে একটা ওষুধের পাতা ছিটকে কিছুটা দূরে গিয়ে পড়ল। সুচিত্রা চট্ করে ওষুধটা তুলে নিল। নামটা দেখে বুঝতে পারল ওটা ঘুমের ওষুধ। তনুর দিকে তাকিয়ে সুচিত্রা বলল, ‘কী রে তোর ঘুম হয় না? ঘুমের ওষুধ খাস কেন?’

তনু, সুচিত্রার চোখের দিকে তাকাতে পারে না। ‘না-না সেরকম কোনও ব্যাপার নয়। তুমি বসো, আমি দৌড়ে চা নিয়ে আসি।’

‘তুই খাবি?’ সুচিত্র প্রশ্ন করে।

‘না, আমি খাব না।’

‘তবে আমার কাছে বস। আমাকে তাড়াতাড়ি বেরোতেও হবে। পড়াশোনা কেমন চলছে তোর?’

‘তেমন কিছু নয়।’

সুচিত্রা লক্ষ্য করল, তনু কিছুতেই ওর চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলছে না। অথচ আগে সুচিত্রা এলেই ওর গলা জড়িয়ে ধরে রাজ্যের গল্প জুড়ে দিত তনু। বন্ধুরা কী করল, ক্লাসে কী হল, ওকে কে কী বলল, এ সব খুলে না বললে তনুর নাকি ঘুম আসত না। অথচ আজ এত চুপচাপ। প্রথম থেকেই সুচিত্রার সঙ্গে ওর বন্ধুর সম্পর্ক আর সুচিত্রারও মনে এই মেয়েটির প্রতি একটা ভালোবাসা সেই কবেই গড়ে উঠেছে।

কিন্তু আজ সুচিত্রার পরিবেশটা অন্যরকম মনে হল। যা প্রশ্ন করছে সেই উত্তরটুকুই খালি পাচ্ছে, আর বাকি সময়টা কিছু একটা চিন্তায় ডুবে যাচ্ছে তনু। সুচিত্রা ভেবে পেল না কীভাবে তনুর মনে কী চলছে সেটা জানবে কিন্তু কিছু যে একটা গোপনে ঘটে চলেছে সেটা বেশ ভালোই বুঝতে পারছিল সুচিত্রা। এরই মধ্যে তনুর রুমমেট সঞ্চিতাও রুমে ফিরে এল।

‘মামিমা, আপনি তনুকে সঙ্গে করে বাড়ি নিয়ে যান। সারা রাত ঘরের মধ্যে পায়চারি করে, জিজ্ঞেস করলে বলে ঘুম আসছে না। ওকে আমিই ঘুমের ওষুধ খেতে বলেছি। খাওয়া-দাওয়া ঠিকমতো করে না, পড়াশোনাও লাটে তুলে দিয়েছে। ওর রোগটা মনে হয় ‘প্রেমরোগ , বলে হাসতে থাকে সঞ্চিতা।

‘চুপ কর সঞ্চিতা। মামির সামনে মুখে যা আসছে বলে যাচ্ছিস , রেগে যায় তনু।

‘আরে আমাকে নামটা বলিসনি ঠিক আছে কিন্তু মামিকে তো ছেলেটার নাম বলে দে। হতে পারে মামি তোকে এবারের মতো প্রেমসমুদ্রে হাবুডুবু খাওয়ার থেকে বাঁচাতে সাহায্য করবে। নে… নে, মেলা নাটক না করে মামিকে সব বলে দে। আমি বরং বাইরে চলে যাচ্ছি , বলে সঞ্চিতা দুজনকে কথা বলার সুযোগ করে দিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল।

‘ইডিয়েট একটা , তনুর স্বগতোক্তি সুচিত্রারও কানে এসে পৌঁছোল।

সঞ্চিতার কথাগুলোই সুচিত্রার সত্যি মনে হল। ও তনুর দুটো হাত নিজের হাতে নিয়ে বলল, ‘কোনও ছেলেকে পছন্দ করিস তো বল, আমি দিদির সঙ্গে কথা বলব।’

‘না কেউ নেই , হাতটা সরিয়ে নিল তনু।

সুচিত্রা ওর থুতনিটা হাত দিয়ে তুলে ধরল, ‘সত্যি করে বল কী হয়েছে, আমি তোর মামি। কিছু তো একটা তোর মনের উপর চেপে বসেছে সেটা বেশ বুঝতে পারছি। আর সেই জন্যই তুই ঘুমের ওষুধ খাচ্ছিস। আমার উপর বিশ্বাস রাখ, তোর কোনও কথা কেউ জানবে না। তুই আমাকে বন্ধু ভাবিস তো… তাহলে বল, তুই কোনও ভুল কাজ করেছিস কি? কারও কাছে খুলে বললে মন হালকা হবে আর তাছাড়া হয়তো আমিও তোকে কিছু সাহায্য করতে পারব। প্রেম ট্রেমের চক্বরে পড়েছিস নাকি হস্টেলের কোনও প্রবলেম…?’ দশ পনেরো মিনিট ধরে বারবার একই কথা সুচিত্রা বলতে লাগল যাতে তনু আসল সত্যিটা ওর কাছে খুলে বলে।

অনেক চেষ্টা করেও সুচিত্রা তনুর পেট থেকে কথা বার করতে সফল হল না। একটু রাগও হল ওর, ‘ঠিক আছে, তনু, তোর যখন আমার উপর এতটুকু বিশ্বাস নেই আর ঠিকই যখন করেছিস আমাকে কিছুই বলবি না, তাহলে শুধু শুধু এখানে বসে থেকে কী লাভ আমার? এখন আমি তাহলে চললাম, ভালো থাকিস , বলে সুচিত্রা উঠে দাঁড়াবার উপক্রম করে।

‘মামি…’, তনু সুচিত্রার হাতটা আঁকড়ে ধরে। ওর চোখ দিয়ে অঝোরে জল পড়তে থাকে। সুচিত্রা তনুর চোখে জল দেখে ভিতরে ভিতরে ঘাবড়ে গেলেও কথা বার করার জন্য চিন্তাটা মুখের মধ্যে প্রকাশ হতে দেয় না, ‘কেন, আমি এখানে বসে আর কী করব , আমাকে বাড়িও তো ফিরতে হবে। নয়তো রুমনকে পড়ানোর সময় পেরিয়ে যাবে।’

কথা শেষ হওয়ার আগেই তনু সুচিত্রাকে জড়িয়ে ধরল। ওর কাঁধে মাথা রেখে হাউহাউ করে কেঁদে উঠল ও, ‘মামি, আমি একটা ভুল করে ফেলেছি।’

‘কী ভুল করেছিস?’ সস্নেহে সুচিত্রা প্রশ্নটা করে।

‘একজনের সঙ্গে আমি সম্পর্কে…’

আজকালকার মেয়ে প্রেমে পড়েছে হতেই পারে কিন্তু তনু, সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার কথা বলাতে সুচিত্রার হাত-পা কাঁপতে শুরু করে। তনুর উপর প্রচন্ড রাগ হতে থাকে সুচিত্রার কিন্তু ও ভালো করেই জানে এখন বকাঝকা আরম্ভ করলে তনু সত্যি কিছুতেই ওর কাছে খুলে বলবে না।

তনুর হাত ধরে সুচিত্রা ওকে খাটে বসিয়ে নিজেও ওর সামনে এসে বসল। এই অবস্থায় রাগারাগি করলে সুচিত্রা জানে, এই মেয়ে কিছু একটা করে বসতে পারে, সুতরাং খুব সাবধানে সব কথা ওর পেট থেকে বার করতে হবে।

ধীরে ধীরে তনু শান্ত হলে সুচিত্রা ওকে পুরো ঘটনা খুলে বলতে বলে। তনুর মুখ থেকে সব ঘটনা শুনে মোটামুটি একটা ছবি পরিষ্কার হয়ে যায় সুচিত্রার, যে তনু পরিস্থিতির শিকার।

তনুর হস্টেলের ঠিক পাশেই ‘চন্দন স্টেশনারি শপ’ যেখান থেকে তনু প্রয়োজনীয় খাতা, পেন কেনার সঙ্গে সঙ্গে নোট্‌স, সার্টিফিকেট ইত্যাদি ফোটোকপি করাত। হস্টেলের সব মেয়েরাই ওই দোকানটা থেকেই এসব কেনাকাটা করে। এছাড়াও ওখানে কুরিয়ার, ফোনবুথ এবং ছবি তোলার জন্য একটা স্টুডিও-ও একসঙ্গে ছিল।

দোকানের মালিক চন্দনের বাড়িতেই নীচের তলাটা জুড়ে দোকানটা রমরমিয়ে চলত। দোকান দেখার জন্য একটা লোকও ছিল কিন্তু চন্দনের বউ রীতাও সকাল থেকেই দোকানে এসে বসত।

রোজ প্রায় আসা-যাওয়াতে, হস্টেলের অন্য মেয়েদের মতোই তনুর বন্ধুত্ব হয়ে যায় রীতা এবং চন্দনের সঙ্গে। কখনও দোকান খালি থাকলে রীতা তনুকে বসিয়ে স্ন্যাক্স, চা খাইয়ে তবে ছাড়ত। রীতার চার আর সাত বছরের দুটি ছেলে। ওদের জন্য রীতা ভালো একজন টিউটারের সন্ধানে ছিল।

রীতা সঞ্চিতার কাছে টিউটারের জন্য বলে রেখেছিল। সঞ্চিতার নিজের কোনও সময় ছিল না কারণ ওর বন্ধুবান্ধব, পার্টি ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ততার কারণে ও ঘুরে ঘুরে বেড়াত। ফলে ও তনুকে পড়াবার জন্য বলাতে তনু সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেল। বাচ্চাদের পড়ানোর কাজটা এমনিতেই তনুর খুব পছন্দের ছিল তার উপর হস্টেলের পাশে বলে ওর আরও সুবিধা হল। রীতার বাচ্চাদের পড়াবার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিল।

দুই সন্তানের বাবা চন্দন, কিন্তু ওর চেহারা দেখে বয়স বোঝার কোনও উপায় ছিল না। সুপুরুষ চেহারা, দেখলে আঠাশ-তিরিশের বেশি বলে মনে হয় না। তনুর বয়সও কুড়ি-একুশের বেশি নয় এবং যথেষ্ট সুন্দরীও বলা চলে। বাচ্চাদের পড়াতে পড়াতে মাঝেমধ্যেই তনু লক্ষ্য করত যেতে-আসতে আড়চোখে চন্দন ওকে লক্ষ্য করছে। তনুও যে, যৌবনের আকর্ষণকে অগ্রাহ্য করতে পারত এমন নয়। চন্দনের স্ত্রী এবং সন্তান আছে সব জেনেও ওর প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ বোধ করত ও।

হঠাৎই একদিন মায়ের অসুস্থতার খবর পেয়ে রীতা ছোটো ছেলেকে নিয়ে বাপের বাড়ি চলে গেল তাড়াহুড়ো করে। এদিকে শহরে ধর্মীয় গন্ডগোলের কারণে দোকানপাট বন্ধ করিয়ে দিল মন্ত্রীর চ্যালাচামুণ্ডারা। অগত্যা দোকান বন্ধ রাখতে বাধ্য হল চন্দন। বাড়ির কাজে মন দিল। রীতা কিছুই গুছিয়ে যাওয়ার সময় পায়নি, চন্দন সেগুলো সবই গুছিয়ে তুলে রাখল।

এর দুদিন পর তনু নিয়মমতো পড়াতে গিয়ে দেখল চন্দনের দোকান বন্ধ রয়েছে। এতদিনে কখনও ও দোকান বন্ধ হতে দেখেনি, তাই অবাক হল। বাড়িতে ঢুকে চন্দনের কাছ থেকে রীতা আর দোকানের সব খবর শুনল তনু। ছোটো ভাই না থাকাতে চন্দনের বড়ো ছেলে কিছুতেই পড়তে রাজি হচ্ছিল না, তনু ওকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে পড়তে বসাল। এরই মধ্যে চন্দন তনুকে চা আর চানাচুর দিতে এল। চন্দনকে বাড়ির পোশাকে প্রথম দেখল তনু।

‘রীতাদি কবে ফিরবে?’ কাপ হাতে নিতে গিয়ে চন্দনের আঙুলের সঙ্গে তনুর আঙুল ছুঁয়ে গেল। তনুর শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেল।

‘কাল বা পরশু ফিরবে রীতা , নিজের চা-টা নিয়ে চন্দন ওখানেই একটা চেয়ার টেনে বসল।

‘চা-টা খুব ভালো হয়েছে , তনু হেসে বলল।

‘বাঃ বাঃ, আপনার মতো ম্যাডামের আমার বানানো চা যে ভালো লেগেছে সেটা জেনে ভালো লাগছে , চন্দন হাসল।

তনুর ছাত্র যেই দেখল বাবা আর দিদি গল্পে ব্যস্ত, ও ওমনি চেয়ার ছেড়ে বাইরে খেলতে বেরিয়ে গেল।

‘আরে রাতুল… কোথায় পালাচ্ছিস…’। তনু কাপ রেখে তাড়াহুড়ো করে রাতুলের পিছনে দৌড়োতে গিয়ে চেয়ারের পায়ে পা জড়িয়ে সামনে হুমড়ি খেয়ে পড়ার উপক্রম হতেই চন্দন চট্ করে ওকে ধরে ফেলল। ‘কী হল ম্যাডাম, শেষে আমার বাড়িতে হাত-পা ভেঙে আমাকে কেস দেওয়ার চেষ্টায় আছেন নাকি?’ বলে তনুকে খাটে বসাল চন্দন।

তনু কিছুতেই চন্দনের চোখের দিকে তাকাতে পারছিল না। ওর বুকের ভিতর যেন হাতুড়ির ঘা পড়ছিল। চন্দনের শরীরের এতটা কাছাকাছি এসে ওর সারা শরীরে শিহরণ উঠছিল। স্পষ্ট বুঝতে পারছিল তনু, ও যদি চন্দনের চোখে চোখ রাখে তাহলে চন্দনকে নিজের করে পাওয়ার আকুতি স্পষ্টই ওর চোখে ফুটে উঠবে। বুড়ো আঙুলে সামান্য চোট পেয়েছিল তাই সামনে থেকে চোখ সরিয়ে আঙুলের উপর সম্পূর্ণ মনোনিবেশ করল তনু।

‘আঙুলটা ব্যথা করছে?’ চন্দন জিজ্ঞেস করল।

‘হ্যাঁ।’

‘দাও আমি ঠিক করে দিচ্ছি , চন্দন তনুর বুড়ো আঙুলটা ধরে এক ঝকটায় জোরে টানল। তনুর গলা দিয়ে সামান্য চিৎকার বার হল, ব্যস ব্যথা একদম গায়েব।

‘নাও, ঠিক হয়ে গেছে। তোমার মুখের থেকে পা আরও বেশি সুন্দর, তুলোর মতো নরম এবং ফরসা ’, তনুর পায়ে হাত রেখে চন্দন সরাসরি তাকাল তনুর চোখে।

তনুর শরীরে নতুন করে শিহরণ খেলে গেল। নিজের অস্বস্তি ঢাকতে তনুর মনে হল কিছু বলা দরকার, ‘আপনাকেও তো সকলে হ্যান্ডসাম বলে। বাড়ির পোশাকেও আপনি সুপুরুষ আর জানেনই তো লোমশ চেহারার পুরুষ সব মেয়েদেরই পছন্দ।’

কথাগুলো বলার সঙ্গে সঙ্গেই তনু বুঝতে পারে ভুল বলে ফেলেছে। লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে ও, ‘ও… ও… ভেরি সরি… আমি ঠিক এটা বলতে চাইনি।’

চন্দনের কাছে তনুর মুখের এই প্রশংসাটুকু প্রেম নিবেদন বলেই মনে হল। হঠাৎ-ই চন্দন নীচু হয়ে তনুর ঠোঁট স্পর্শ করল। চন্দনের তপ্ত নিঃশ্বাসের উত্তাপে তনুর প্রতিরোধ বাষ্প হয়ে উবে গেল। দু’জনেই বুঝতে পারছিল যেটা ঘটতে চলেছে সেটা অন্যায় কিন্তু এটাকে আটকাবার মানসিকতা দুজনের মধ্যে কারওরই ছিল না।

শারীরিক ক্ষুদা তৃপ্ত হতেই সম্বিৎ ফেরে দুজনেরই। নিজের আচরণে তনু লজ্জায় চন্দনের সঙ্গে চোখ মেলাতেও ইতস্তত করে। কোনও রকমে অবিন্যস্ত পোশাক ঠিক করে নিয়ে বেরিয়ে আসে তনু। রাতুলকে কোথাও দেখতে পায় না। হস্টেলে ফিরে এসে নিজের প্রতি ঘৃণা এবং সঙ্গে ভয় তনুকে ঘিরে ফেলে। নিজেকে শতবার দোষারোপ করতে থাকে যে পড়াশোনা শিখে এরকম নির্বুদ্ধিতার পরিচয় কীভাবে দিতে পারল ও।

বাচ্চাদের পড়ানো ছেড়ে দিল তনু। রীতা ফিরে এসে জিজ্ঞেস করলে তনু বলে দিল ওর শরীর ভালো নয় তাই পড়ানোর ধকল নিতে পারছে না।

চন্দনের মনেও শান্তি ছিল না। তনুর ক্ষতি করার জন্য নিজেকেই অপরাধী ভেবে নিল। কীভাবে মেয়েটার কাছে ক্ষমা চাইবে তার কোনও উপায় বার করতে পারল না চন্দন। তার উপর তনুর বাড়িতে আসা ছেড়ে দেওয়াতে এবং দোকানেও আসা যাওয়া বন্ধ করে দেওয়াতে তনুর সঙ্গে দেখাই হতো না ওর।

তনুর জীবনও দুর্বিষহ হয়ে উঠতে লাগল। যে ভুল একবার করে ফেলেছে তার পরিণাম যে কত ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে সেটা ভেবেই সারারাত ঘুমোতে পারত না তনু। মা-বাবার বিশ্বাস ভাঙার গ্লানি কুরে কুরে খেতে লাগল তনুকে। একবার যদি সমাজে বদনাম হয়ে যায় তাহলে আত্মহত্যা করা ছাড়া আর উপায়ই বা কী আছে, সেই চিন্তাতেই তনুর শরীর দিন দিন ভেঙে পড়তে লাগল।

‘মামি, প্লিজ, মা-বাবা যেন এই কথা জানতে না পারে , কাঁদতে কাঁদতে তনু সুচিত্রার দুহাত শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

‘বিশ্বাস রাখ তনু, কেউ জানবে না। শুধু একটা কথা বল কোনওরকম শারীরিক অসুবিধা কিছু মনে হচ্ছে কি?’ সুচিত্রার গলার স্বরে আশঙ্কা প্রকাশ পায়।

‘না।’

‘এখন এই পুরো ঘটনাটা মন থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা কর। খুব বড়ো ভুল করেছিস সন্দেহ নেই। কিন্তু ভবিষ্যতেও যদি নিজেকে ঠিক না করিস তাহলে আমার থেকে খারাপ কেউ হবে না। চট্ করে দু-তিনটে জামাকাপড় গুছিয়ে ব্যাগে ভরে নে। আমার সঙ্গে আমার বাড়ি যাবি এখন।’

‘কিন্তু…’

‘কোনও কিন্তু নয়। আমি ওয়ার্ডেনের কাছ থেকে তোর এক সপ্তাহের ছুটি মঞ্জুর করিয়ে নিয়ে আসছি। কাল তোকে একটা জায়গায় নিয়ে যাব কারণ আজ অনেক রাত হয়ে গেছে , বলে সুচিত্রা ওয়ার্ডেনের ঘরের দিকে চলে গেল।

রাস্তায় যেতে যেতে সুচিত্রা বলল, ‘তনু এই পুরো ঘটনাটা কারও কাছে বলবি না এমনকী বন্ধুবান্ধবকে-ও না। আমি জানি, তোরা সব কথা শেয়ার করিস কিন্তু এটা কাউকে বলবি না।’

বাড়ি ঢুকতেই তনুকে দেখে রুমন খুশিতে লাফিয়ে উঠল। অরুণাভ তনুর চেহারা দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কী রে চেহারা এত খারাপ হয়েছে কেন? হস্টেলে কিছু খাস না?’

তনুর সঙ্গে সুচিত্রার চোখাচোখি হল, তনু উত্তর দিল, ‘না, না খাবার ঠিক মতোই খাই। পড়াশোনোর চাপ একটু বেশি।’

সুচিত্রাও তনুর কথায় সায় দিল, ‘তাই জন্যই তো ওকে এক সপ্তাহের ছুটি করিয়ে নিয়ে এসেছি। শরীরটা একটু সারিয়ে তারপর হস্টেলে পাঠাব।’

‘ভালোই করেছ , বলে অরুণাভ অন্য ঘরে চলে গেল।

স্বামীকে মিথ্যা বলতে সুচিত্রার খারাপই লাগল কিন্তু তনুর সম্মান আর মর্যাদা বাঁচাতে হলে হাজারো মিথ্যা বলার জন্য সুচিত্রা মনকে আগে থেকেই প্রস্তুত করে রেখেছে সুতরাং বাড়ি থেকে শুরু করতে অসুবিধা হল না ওর।

ফোন করে দিদিকে জানিয়ে দিল সুচিত্রা, তনুর শরীর পড়াশোনার চাপে সামান্য খারাপ হয়েছে ঠিকই কিন্তু চিন্তা করার মতো কিছু হয়নি।

রাতের খাওয়া শেষ হতেই তনুকে রুমনের ঘরে শুইয়ে দিল সুচিত্রা আর ছেলেকে নিজের সঙ্গে নিয়ে নিল। সারা রাত সুচিত্রা চোখের পাতা এক করতে পারল না। তনুর কথাই বারবার মনে হতে লাগল। আজকাল ইয়ং জেনারেশনের এতটা চেঞ্জ সুচিত্রা কিছুতেই সমর্থন করতে পারল না। কোনও বুদ্ধি-বিবেচনা করে এই প্রজন্ম কাজ করে না যেটা সত্যিই বিরক্তিকর।

সুচিত্রা খুব ভালো করেই জানে, চন্দনের সঙ্গে সঙ্গে তনুও এই ঘটনার জন্য সমান দোষী। তবুও এই ব্যাপারটা দিদিরই জানার কথা ছিল কিন্তু সুচিত্রা জানে, মায়েদেরও একটা বিশাল দোষ যে, তারা সন্তানের সঙ্গে বন্ধুর মতো আলোচনা করে না, অথচ সমস্যা কিছু একটা হলে শাসন করতে ছাড়ে না। ফলে সন্তানও মায়ের সঙ্গে শেয়ার করতে চায় না।

সকালবেলায় রুমন বায়না ধরল স্কুল যাবে না, তনুদিদির সঙ্গে সারাদিন কাটাবে। সুচিত্রা অনেক বুঝিয়ে ওকে স্কুল পাঠাল। সবাই কাজে চলে গেল। সুচিত্রা তনুকে বলল, ‘তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নে। তোকে নিয়ে একটু বেরোব, ডাক্তারের কাছে যাব।’

‘ডাক্তার… কেন মামি…?’ মনে হল তনু ওখানেই বসে পড়বে।

‘আমি তোকে কালকেই বলেছিলাম, তোকে নিয়ে একটা জায়গায় যাব। তোর জীবনটা নিয়ে কোনওরম রিস্ক আমি নিতে চাই না , সুচিত্রা তনুর মনে সাহস জোগাবার চেষ্টা করল।

ডাক্তার তনুর সবরকম পরীক্ষা করলেন। উনি সুচিত্রাকে আলাদা ডেকে জানালেন, ‘ঘাবড়াবার কিছু নেই। অনেক কারণেই ইয়ং বয়সে পিরিয়ডের সমস্যা হয়ে থাকে। আমি ওষুধ লিখে দিচ্ছি, কয়েকদিন খেলেই আবার এনার্জি ফিরে পাবে। ও সামান্য দুর্বল সুতরাং ওর খাওয়া-দাওয়াটার একটু খেয়াল রাখা দরকার। এমনি আর কোনও ওর প্রবলেম নেই।’

আনন্দে সুচিত্রা ডাক্তারকে ধন্যবাদ জানিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। মন থেকে মেঘ সরে যেতেই সুচিত্রা আবার রোদ ঝলমলে দিনের অগ্রিম আভাস টের পেল।

রাস্তায় বেরিয়ে তনুর জন্য শপিং করল সুচিত্রা। রেস্তোরাঁয় বসে দুজনে তনুর পছন্দের খাবার আর আইসক্রিম খেয়ে বেরিয়ে এল। দুঃস্বপ্নের দিনগুলো থেকে তনুকে বাইরে বার করে আনার চেষ্টার কোনও ত্রুটি রাখল না সুচিত্রা।

বাড়ি ফিরতেই তনু সুচিত্রার গলা জড়িয়ে ধরল, ‘থ্যাংক্স মামি। কালকে তোমার সঙ্গে কথা বলার পর থেকে আজ পর্যন্ত যা যা হয়েছে তাতে আমার মন অনেক হালকা লাগছে। সত্যিই তুমি যদি আমাকে জোর না করতে আমি হয়তো তোমাকে খুলে বলতেই পারতাম না ঘটনাটা। মনের মধ্যেই পুরোটা থেকে যেত এবং কিছু হয়তো একটা করেও বসতাম। তুমি যেভাবে ব্যাপারটা হ্যান্ডল করেছ আমি সত্যিই টেনশন ফ্রি হয়ে গেছি।

শুধু একটাই কথা খালি মনে হচ্ছে, ‘আমি কী করে এমন অবিবেচকের মতো কাজ করলাম? ঘটনাটায় আমার নিজের সবথেকে বেশি দোষ এটা স্বীকার না করা ছাড়া উপায় নেই , বলতে বলতে তনুর চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগল।

‘অবশ্যই তুই এমন একটা ভুল করেছিস যার কোনও ক্ষমা নেই। কিন্তু এই যে তুই নিজের ভুল বুঝতে পেরেছিস, প্রায়শ্চিত্ত করেছিস এটাই সবথেকে বড়ো কথা। সম্পর্ক সবসময় প্রথম মন থেকে হয়। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক হোক অথবা প্রেমিকের সম্পর্কই হোক, প্রথম সম্পর্ক মনের গভীর থেকেই শুরু হয়। শরীর দিয়ে নয়।

চন্দনের সঙ্গে তোর মনের কোনও সম্পর্কই যেখানে ছিল না সেখানে ওকে নিয়ে এত চিন্তা করার দরকারটা কী? বরং ওকে মন থেকে সরিয়ে এবারে পড়াশোনায় মন দে আর আমার বিশ্বাস আর তুই এরকম ভুল করবি না’, বলে সুচিত্রা আলতো করে তনুর গালে সস্নেহে আদর করে। তনু যেন খানিকটা বিহ্বল হয়েই জড়িয়ে ধরে সুচিত্রাকে।

সেই মুহূর্তেই তনুর মোবাইল বেজে ওঠে, ‘মা আমি এখন একদম ভালো হয়ে গেছি। মামি আমার অসুখ সম্পূর্ণ সারিয়ে দিয়েছে…’ বলতে বলতে তনুর হাসির শব্দ সারা ঘরে প্রতিধবনিত হতে থাকে।

 

 

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব