অলকানন্দার জলে

অলকানন্দা,

প্রথম দর্শনে মানুষ প্রেমিকার প্রেমে পড়ে। আমি প্রথম দর্শনে তোমাকে চরিত্রহীন ভেবে বসি। তাছাড়া তোমার শরীরটাও বেশ পুরুষ্ট। সালোয়ারের ভেতর থেকে দুটো পুষি বিড়াল সবসময় উঁকি দেয়। প্রতি মুহূর্তে মনে হতো হাত লেগে গেলে ম্যাও করে ডেকে উঠবে। পরে বুঝেছি হুলোই। এসব অবশ্য শাহিনকে বলিনি। তোমার স্তন দুটোর দুটো নাম দিয়ে ছিলাম তুমি জানো? দোয়েল আর কোয়েল। মনে রাখার সুবিধার জন্য। আসলে আমি মনে মনে দুটোকেই হুলো বেড়াল বলতাম। অত সেজে বাড়িতে কেউ থাকে! থাকে হয়তো। আমার জানা ছিল না। তোমাকেই প্রথম দেখেছিলাম বাড়িতে অত সেজে থাকতে। অবশ্য তোমার থেকে প্রথম দেখা প্রথম শেখা জিনিস আমার জীবনে অনেক। অথচ তুমি আমি কেউ কারও প্রথম প্রেমিক বা প্রেমিকা ছিলাম না।

তোমার খিদিরপুরের যে-অঞ্চলে বাড়ি, সেটা মারদাঙ্গা, খুনখারাপি, রাহাজানির জন্য এক সময়ে কুখ্যাত ছিল। তখন থেমে গিয়েছিল ঠিকই কিন্তু বদনামটা এখনও রয়ে গেছে। বিশেষ করে আমার মতো মফস্সলের ছেলের কাছে তো বটেই। অবশ্য পৃথিবীর যে-কোনও বন্দর শহরের সে বদনাম একটু আধটু থাকেই। তাই বলে কি সেখানে সুন্দরী থাকে না! জলপরিদেরও তো জল থেকে উঠে আসতে বন্দর লাগে। লাগে না? না লাগলে তুমি ওখানে গেলে কী করে?

বদনামটার ভয়ে সেদিন শাহিনকে সঙ্গে নিয়েছিলাম। ও বেচে গাড়ি আর আমি গাড়ির ইনসিওরেন্স। সেদিন ওর ওদিকে কোনও দরকারই ছিল না। ওকে বলেছিলাম তোমরা একটা নতুন প্রাইভেট কার নেবে। আমরা দুজনেই গুড্‌স ভেহিকেলস মানে মালবাহী বড়ো বড়ো লরির এক্সপার্ট। কিন্তু তোমরা তখন সবে চবিবশটা লরির ফ্লিট্ নিচ্ছ। শাহিন আপশোশ করছিল, লিডটা আগে পেলে ও ডিলটা ডান করতে পারত। মার্কেটে চাপা খবর ছিল, তাই ওকে কারের টোপটা দিই। মার্কেটিং লাইনে এসব টুকটাক মিথ্যে কথা চলতেই থাকে। শাহিনও হয়তো মিথ্যেটা বুঝেছিল, কিন্তু ও একবার তোমাদের সঙ্গে আলাপ করতে চাইছিল যদি পরে কখনও গাড়ি কেনার সময় ওকে ডাকো।

খিদিরপুর অঞ্চলে তোমাদের অনেকগুলো বাড়ি। গলি, তার ভেতরে গলি, কখনও কখনও কানা গলিতে ধাক্বা মেরেছি বাইক নিয়ে। তোমাদের ব্যাবসার তখনও অফিস ছিল না। সবে সবে ব্যাবসায় নেমেছ। বাড়ির ঠিকানা একটা ছিল। কিন্তু ঠিকানা থাকলেও কলকাতাতে বাড়ি খুঁজে পাওয়া যে এত কঠিন, সেদিন প্রথম বুঝেছিলাম। গলিগুলোর কত বাহারি নাম। হরিমঞ্চলেন, রামবাবু গুপ্তা রোড, এডেন ভিলা রোড! বললাম না তোমার থেকে কত কী প্রথম শিখেছি। অথচ সেল্সে কয়েক বছর কাজ করার সুবাদে কলকাতায় এ-মাথা ও-মাথা করেছি, কখনও কখনও বাড়ির নাম্বার, রাস্তার নাম না জেনে কিছু ল্যান্ডমার্ক জেনে নিয়েই ঠিক পৌঁছে গেছি।

অনেকটা গলির ভেতর তোমাদের প্রথম বাড়িতে পৌঁছে শুনলাম ঋষি রাজা লেনের বাড়িতে গেলে মালিককে এখন পাওয়া যাবে। গলির ভেতরে গাড়ি ঘোরানো কী যে কষ্টের তোমাকে বোঝানো যাবে না। ওই রকম সরু গলির ভেতর অত লোক যাতায়াত করে সব সময়, বাইক ঘোরাতে গেলেই বোঝা যায়। দু-দিক দিয়ে হইহট্টগোল। জলদি কিজিয়ে, জলদি কিজিয়ে! আরে বাবা জলদিই তো করছি। জলদিরও তো একটা সময় লাগে নাকি!

তবে তোমাদের প্রথম বাড়িটা গলির অনেক ভেতরে হলে কী হবে, ঢুকেই বুঝেছিলাম অর্থের বৈভব। একটা ছাবিবশ-সাতাশ বছর বয়সি ছেলে, পরে তুমি বলেছিলে তোমার ভাই, হিন্দিতে খুব রোয়াবে ঠিকানাটা বলেছিল। অর্ধেক বুঝিনি। শাহিন চট করে ধরে নিয়েছিল ঠিকানাটা। ওর মামার বাড়ি ওই অঞ্চলেই। ছোটো বেলায় খুব থাকত। পার্ক সার্কাস লোহাপুলের বাড়ি থেকে খিদিরপুর কার্ল মার্ক্স সরণিতে সাইকেল নিয়েই যাতায়াত করত তখন। এখন রয়েল এন্ডফিল্ড। যাকে তুমি বুলেট বলো। তোমার বরের তো বুলেট ছিল, বলেছিলে।

দ্বিতীয় বাড়িটায় পৌঁছোলাম চট করে। রাস্তাটা শাহিন চিনত। ওর বাল্যবন্ধুর বাড়ি। আর বাড়িটাও চওড়া রাস্তার ধারে। অথচ দেখো চওড়া রাস্তার নামে লেনের পদবি আর গলিগুলোর রোড, স্ট্রিট। পরে এই নিয়ে দুজনে খুব হাসাহাসি করেছিলাম তোমার মনে আছে? কিন্তু দ্বিতীয় বাড়িতে গিয়ে শুনলাম মালিকের শরীর খারাপ, তাই জিতেন সিং স্ট্রিটের বাড়িতে রেস্ট নিচ্ছেন। এ লোকটা তোমাদের ভাড়াটে। খুব বাবু বাবু করছিল।

দুপুর ঢিঢি করছে চারিদিকে। গরমকাল ছিল মনে আছে। সেল্স-এর লোকেদের অবশ্য এসব অভ্যাস আছে। আমরা মনে মনে নাছোড়বান্দা যে-কোনও সেল্স কলেই। বিশেষ করে এক সাথে চবিবশটা গাড়ির ইনসিওরেন্স মানে আমার বাঁধা ইনসেন্টিভ সে মাসে! অনেকদিন ধরে বউ একটা বালা চাইছিল। সেটা মাথায় ছিল। ফিরে যাওয়ার কোনও প্রশ্নই ছিল না। তবু একটা তো মানসিক ক্লান্তি আসে। দুই বন্ধুতে রাস্তার পাশের গুমটি থেকে দুটো দামি ব্র্যান্ডের মেন্থল সিগারেট কিনে ধরাই। আমাদের টিফিন বলো, রেস্ট বলো সবই ওই সাদা কাঠির সুখ টান আর ধোঁয়া ভর্তি গালের জাবর কাটা। অবশেষে তৃতীয় বাড়িতে তোমাদের পেলাম। না তোমাকে তো খুঁজতে যাইনি। চবিবশটা ফ্লিটের মালিকের সন্ধান পেলাম।

খিদিরপুর অঞ্চলের গলির ভেতর গলি, তার ভেতরে বাড়ি যে এত বৈভবের হতে পারে ধারণা ছিল না। তৃতীয় বাড়িটা ফ্ল্যাট টাইপের। প্রথম বাড়িটার থেকেও বেশি সাজানো। বাড়িগুলো বাইরে থেকে ইট বালির কঙ্কাল লাগে কিন্তু ভেতরের আসবাব, মেঝে, দেয়ালের কারুকাজ সব অন্যরকম। ওই ঘিঞ্জির মাঝেও যে ইটালিয়ান মার্বেলের মেঝে দেখব ভাবিনি। পুরো ফ্ল্যাটটাই সেন্ট্রালি এসি। গরম থেকে বাড়িতে ঢুকতেই এক রাশ স্বস্তি। যতটা না এসির কৃত্রিম ঠান্ডার জন্য, তার থেকেও বেশি অবশেষে চবিবশটা ফ্লিটের মালিকের কাছে পৌঁছোতে পারার জন্য। দুজনের দুটো ভালো পদ-নাম ছিল। আমি সেল্স ম্যানেজারের তকমা নিয়ে ঘুরি আর শাহিন ব্রাঞ্চ ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার। আসলে আমরা বেচুবাবু। মাল বেচাই কাজ। আমরা যা পাই বেচে দেবার সুযাগ খুঁজি।

অনেক বার বলেছি, তোমাদের ফ্ল্যাটটার নকশা ভালো নয়। কোনও প্রাইভেসি নেই। অতবড়ো ফ্ল্যাট অথচ উদোম। প্রথমে তোমাকে দেখার কথাটা বলি। চবিবশটা ফ্লিটের মালিকের নাম সতীশবাবু, টাইটেল জানি না। আধজানা ঠিকানায় পৌঁছে দেখলাম বড়ো ফ্ল্যাট। নিঃশব্দ। বয়স্ক কাজের মহিলা দরজা খুলে ড্রইংরুমে বসতে দিয়েছে। সোফাটা দামি। বসতেই ডুবে গেলাম। বসেছি ভেতরের দিকে মুখ করে। অপেক্ষা করছি। বেশ অনেকক্ষণ। মনে মনে সাজিয়ে নিচ্ছি বিমাকথা। যে-কোনও ভাবে তুলতেই হবে চেকটা। বউ যে নতুন ডিজাইনের বালা দেখেছে, এক জোড়া না একটাই বানাবে বলেছে। ইনসিওরেন্স ইজ আ সাবজেক্ট ম্যাটার অফ সলিসিটেশন। গুলি মার সলিসিটেশনের। যে করে হোক চেকটা আমার চাই।

আমি বা শাহিন কেউ কথা বলছি না। কাস্টমারের বাড়িতে আমরা একদম শান্ত ভদ্র। চোখে চোখে কথা হচ্ছে। ঠোঁটের অল্প নড়াচড়াতে দুজনে দুজনের ভাষা বুঝতে পারি। দু-একবার পর্দার আড়ালে তোমাকে দেখলাম। নিঃশব্দে নড়াচড়া করছ। আমি আর শাহিন চোখাচোখি করলাম। আবছা অবয়ব। শরীরের বর্ণনা দেব না। প্রেমিকার শরীর নিয়ে কথা বলা নোংরামি। কিন্তু দুজনে তোমাদের সোফায় বসে চোখ দিয়ে নোংরামিই করছিলাম। ওসব ছেলে ছেলেতে হয়ে থাকে। রাগ কোরো না। আর তখন কি জানতাম যে তোমার সাথে ওরকম দুনিয়া ভোলানো প্রেম হবে। আমি দেখতে শুনতে ভালো, লোকে স্মার্ট বলে। বেশ লম্বা চওড়া। ফর্মাল ড্রেসে সবাইকেই ভালো লাগার কথা। তাই বলে তোমার মত মারকাটারি সুন্দরী, সেক্সি বলব না। প্রেমিকাকে সেক্সি বলতে নেই, আমার সাথে প্রেম করবে ভাবতেই পারিনি।

মিনিট কুড়ি মানে অনেকক্ষণ। নতুন জায়গায় এসে বসে আছি অথচ কেউ কোনও কথা বলছে না। কোনও শব্দ নেই। নিঝুম। শুধু তুমি হেঁটেছ কয়েক বার খসখস করে। ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ হওয়ার পরেই বাইরের রোদ, তাপ, কোলাহল থেকে বহুদূরে চলে এসেছি। অন্য একটা শহর মনে হতে শুরু করেছে। ঘরের আসবাব সব অন্যরকম। একবার সদর স্ট্রিটের একটা অ্যাংলো ইন্ডিয়ানের বাড়িতে ঢুকে এরকম মনে হয়েছিল। যেন অন্য শহরের বাড়ি। সে বাড়িটা অবশ্য কেমন পড়ো শহর মনে হয়েছিল। আর এ বাড়িটা খুব উজ্জ্বল। মনে হচ্ছে কোনও অন্তরীপ শহরের আসবাব।

সেল্সম্যানদের ধৈর্য অকল্পনীয়। তবু অস্বস্তি হতে শুরু করেছে। বাইরে বাইকটা পড়ে আছে। এ অঞ্চলের বদনাম ভয় ধরাচ্ছে। চুরি গেলে ইনসিওরেন্সের ফুল ক্লেম পেলেও নতুন বাইক হবে না। আর ক্লেম পেতেও বেশ সময় লাগবে। ততদিন চলবে কী করে! তখনই তুমি বাইরে এলে, এক বৃদ্ধকে প্রায় জাপটে ধরে বাথরুমে নিয়ে যাচ্ছ। একজন পুরুষ আর নারীর প্রকাশ্যে জাপটে থাকা সব সময়ই অশোভন। আর তোমার সেজে থাকা! নেল পালিশ, লিপস্টিক, টিপ। সব কিছু গুলিয়ে দিচ্ছিল তোমার ফেটে পড়া শরীর। অনেক সুন্দরী দেখেছি কিন্তু তোমার মতো যৌবনবতী সুন্দরী আর দেখা হয়নি। তাছাড়া সতীশবাবু বৃদ্ধ হলেও বৃষস্কন্ধ, বয়সের তুলনায় সুঠাম। আমার দোষ কী বলো!

শাহিনও তো তোমাকে ভুল বুঝেছিল। আমি ও শাহিন তোমাকে নিয়ে কত কী ভেবেছি। তৃতীয় পক্ষের বউ, বউমা, নাতনি এমনকী রক্ষিতাও। সেই জন্যই তোমাকে বললাম না, প্রথম দর্শনেই তোমাকে চরিত্রহীন ভাবি। তোমাকে নিয়ে কত গবেষণা করেছি দুজনে। তবু বাপ-মেয়ে একবারও ভাবতে পারিনি। ওরকম জাপটে থাকলে কেউ ভাবতে পারে না। তুমি পরে বলেছিলে বাবা অসুস্থ ছিল। সরি অলকা। বাথরুম থেকে বেরিয়ে তুমি সতীশবাবুকে আমাদের কাছে সোফায় বসিয়ে দিয়ে গেলে। বসাতে গেলে ঝুঁকতেই হয়। আর ঝুঁকতেই তোমার সালোয়ারের ভেতর থেকে দুটো পুষি বিড়াল উঁকি দিয়ে গেল।

কাজের কথা বিশেষ কিছু হল না। তুমিও ওই যে সতীশবাবুকে বসিয়ে দিয়ে ঘরে ঢুকে গেলে আর বেরোলে না। সতীশবাবুর সামনে থেকে তো আর ঘরের পর্দার দিকে তাকিয়ে তোমাকে খোঁজা যায় না। তবু মনে মনে খুঁজছিলাম, যদি আর একবার দেখা যায় সুন্দরীকে। সতীশবাবু জাহাজে কাজ করতেন। আর জাহাজি মানুষের গল্পের শেষ নেই। সমুদ্র বৈচিত্র্যহীন কিন্তু বন্দরের তো গল্প অনেক। তখনই বুঝলাম তোমাদের বাড়ির অঙ্গসজ্জায় কেন বিদেশি সুবাস। বুঝলাম তোমার বাবা আর সমুদ্রে যেতে চায় না, এবার স্থলপথে আয় চায়। অনেক কষ্টে মুক্তি পেলাম। গল্প শুনতে ভালোই লাগছিল। কিন্তু কাজের তাড়া সেল্স-এর লোকেদের তাড়িয়ে বেড়ায়। এডেন বন্দর, তাহিতি, সুয়েজ ক্যানাল এসব গল্প কার না ভালো লাগে। আমার ভূগোলে জ্ঞান খারাপ, তবু ভালো লাগছিল। কানের মধ্যে একটা নতুন পৃথিবী তৈরি হয়ে পৌঁছে যাচ্ছিল হূদয়ে। শুধুমাত্র সতীশবাবুর মোবাইল নাম্বারটাই পেয়েছিলাম সেদিন। কবে আসব ইন্সিওরেন্সের জন্য জিজ্ঞাসা করতে নাম্বারটা দিয়ে বলেছিলেন, আসক্ মি ওভার টেলিফোন অ্যান্ড গিভ মি দ্য কোটেশন! তোমার বাবা ইংরেজি ছাড়া প্রায় কথাই বলতে পারে না।

চিঠিটা খুব বড়ো হয়ে যাচ্ছে জানি। আসলে আমারও তো বয়স বেড়েছে আরও দু-বছর, তোমারও। তোমার আমার গল্পও জমে গেছে অনেক। খুব স্মৃতি জমে গেলে রোমন্থন করেই আনন্দ। এসব কথা ফোনে হয় না। তুমি পড়লে আনন্দ পাবে ভেবেই লেখা। গতকাল আর আগামীকাল দুটোই আমাদের জীবনে দুটো গুরুত্বপূর্ণ দিন। তাই লিখছি আনন্দে আর বিষাদে।

শাহিনের কাছে সতীশবাবু নেগেটিভ কাস্টমার। আমার কাছে ইনসেন্টিভ, বউ-এর গয়না গড়িয়ে দেওয়া প্রত্যাশা। আমি ফলো আপ করব ঠিক করেই সতীশবাবুর থেকে বিদায় নিলাম। তোমাকে নিয়ে বেশি কথা ভাবার ছিল না। শাহিনের সাথে দেখা হলেই ও তোমার রূপ, রূপসজ্জা অথবা রূপটান নিয়ে বলে। তার বেশি কিছু না। আমিই শরীরের বেশি বর্ণনা দিতাম। শাহিন শুনত। তবে তোমাকে নিয়ে আমরা অন্য কোনও লোকের কাছে কথা বলতাম না। যেন আমাদের গোপন অভিযানে পাওয়া সম্পত্তি। জানাজানি হলে অংশীদারের ভয়।

তিনদিন পরে সতীশবাবুকে ফোন করলাম। তোমার বাবা কোটেশন চাইল। কোটেশন তো তৈরিই ছিল। আমি বললাম এখুনি দিয়ে আসছি। এবার আর শাহিনকে নিলাম না। চেনা হয়ে গেছে। সোজা চলে গেলাম জিতেন সিং স্ট্রিটের ফ্ল্যাটে। যে-ফ্ল্যাটে তোমাকে প্রথম তোমার বাবার সাথে দেখেছিলাম। একবারও ভাবিনি অন্য কোনও বাড়ির কথা।

তোমার একটা অমোঘ টান তো ছিলই। দরজা খুললে তুমি নিজেই। খুব অবাক হলাম তোমাকে দেখে। বিষণ্ণতার ঘন কুয়াশা তোমায় যেন মুড়ে রেখেছে। সেই প্রথম তোমার উপর মায়া হল। ধনীকে হঠাৎ গরিব দেখলে যেমন মায়া লাগে তার অস্বাচ্ছন্দ্যর কথা ভেবে, তেমনি। ভুল ভাঙল একটু পরেই। তুমি ভেতরে বসালে, যেন বাবাকে ডাকতে গেলে। বেশ কিছুক্ষণ আমি একাই সোফায়। খুব অস্বস্তিকর সময়। বাড়িতে একটাও বই নেই। টিভিও নেই যে চোখ মেলে সময় কাটাব। তোমার বাবা এল না। তুমিই এলে। আমার সামনের সোফায় বসলে। বসেই আমাকে সপাটে প্রশ্ন করলে, হ্যাংলার মতো আগের দিন তাকিয়ে ছিলেন কেন? আমি কী উত্তর দেব! লম্বায় ছয় ছুঁই ছুঁই কিন্তু লজ্জায় তখন জল ছুঁই ছুঁই। সেল্স লাইনে আমাকে সবাই ড্যাম স্মার্ট বলে। আমি বেচুবাবু হিসাবে যথেষ্ট কৃতি। গত তিনবছরে আমার মাইনে বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে, প্রোমোশন আর কোম্পানি পালটে। সেই আমি এসির ঠান্ডায় ঘামতে শুরু করি। এক গেলাস জল হলে ভালো হতো। ভাবি, একটা কমপ্লেন দিলেই চাকরিটা যাবে। আর এ-লাইনে চাকরি পাওয়া যাবে না। বউ বাচ্চা খাবে কী!

আমার অবস্থা দেখে তুমি নিজেই হেসে উঠলে। ছোটোবেলায় কুলগাছ নাড়িয়ে যেমন পাকা কুল পাড়তাম, কুল কুল করে তেমনি তুমি হেসে উঠলে। কোটেশন এনেছেন? দিন। বাবাকে দিয়ে দেব। এটা আমার বাড়ি। বাবার বাড়ি নয়। হাসতে হাসতে শুরু করে গম্ভীর হয়ে শেষ করলে কথাগুলো। পরে জেনেছি তুমি নাকি জানতে আমি আসব ওই ফ্ল্যাটেই। তুমি নাকি জানতে আমি ভালোবাসবই।

২৮ মার্চ, রবিবার ৮.১০ সকাল

জামদানীপুর।

রাজেন্দ্রনন্দিনী অলকানন্দা,

বাজার করতে গিয়েছিলাম। তুমি অবশ্য বাজার করা ব্যাপারটা বুঝবে না। নিজের হাতে বাজার করাটা খুব মজার ব্যাপার। টাটকা সবজি বেছে কেনা বা বড়ো হাঁসের ডিমটা খুঁজে নেওয়া। তোমরা ধনী। তোমাদের নিজস্ব বাজার সরকার আছে। সে-ই বাজার করে আনে। তিন বাড়িতে ভাগ করে দেয় বাজার। তুমি অবশ্য বেশির ভাগ দিন হোটেল থেকে খাবার কিনে আনাও বলেছ। তুমি ঝাল খেতে ভালোবাসো। লুকিয়ে দেখা করতে এসে দু-একবার তোমার বাড়িতে রান্না করা খাবার, টিফিন বাক্সে এনেছ। কী ঝাল, কী ঝাল! ঝালে আমি মরে যাই অবস্থা। আমি ভাবলাম তোমার জিভ থেকে ঠান্ডা নেব কিন্তু তোমার জিভও অত ঝাল কে জানত! তুমি ওই ঝাল চিলি চিকেন খেয়েই বেরিয়েছ বাড়ি থেকে। আমাকে বলোনি কেন? সেদিন তোমাকে বিষকন্যার মতো লাগছিল। সেদিন সেজেও ছিলে পাকা লংকা রঙের শাড়িতে।

প্রথম থেকেই তোমাদের ব্যাপারগুলো কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে ছিল। তোমার বাবার ইংরেজি আর ভাইয়ের হিন্দি শুনে ভেবেছিলাম তোমরা অবাঙালি হবে। ‘সতীশ সিং’ তোমার বাবার নাম লিখেছিলাম ইন্সিওরেন্স কভার নোটে মনে আছে। পরে তুমি বললে, তোমরা মুঙ্গেরের প্রবাসী বাঙালি। সিনহা, সিংহ হয়ে সিং-এ পৌঁছেছে। বারুইপুরে তোমাদের আদি শিকড়। বারুইপুর থেকে কয়েক পুরুষ আগে ভাগ্য অন্বেষণে মুঙ্গের। আবার ফেরা কলকাতায়। তোমার সাথে না আলাপ হলে জানতাম না, বারুইপুরে তোমার বাবার বিশাল অট্টালিকার কথা। অবশ্য তোমার সাথে আমার যেটা হয়েছে সেটা আলাপ নয়, দুকূল ছাপানো প্রেম। বারুইপুরের উঁচু পাঁচিল দেওয়া বাগানবাড়িতে একটা যৌবনবতী মহিলা কী করে বালিকাবেলায় ফিরে যেতে পারে সেদিন দেখেছিলাম। সেই প্রথম তোমাকে অযৌনতায় দেখি। খালি পায়ে মেক্সিকান ঘাসের উপর দৌড়োতে দৌড়োতে ক্লান্ত হয়ে আমার কোলের উপর মাথা রেখে শুয়ে পড়েছিলে। আমি ঘাসে বসে তোমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলাম, যেমন বাড়িতে তিন বছরের মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিই।

আমার মেয়ে তিন্নি খুব আদর খেতে চায়। খুব বায়না। এটা আনবে ওটা আনবে। আজ ক্যাডবেরি তো কাল খেলনা গাড়ি। ওর বায়না মেটাই বলে আমার বউ খুব রাগ করে। মানসী স্কুল মাস্টারের মেয়ে। ওর কাছে আদর্শ ব্যাপারটা সহজাত। পয়সা একদমই নষ্ট করতে চায় না। নিজে দামি পরবে না, মেয়েকেও পরাতে দেবে না। আমার ওইটুকু মেয়ের সাজার খুব শখ। ঠিক তোমার মতো। মাঝে মাঝে মনে হয় তিন্নি তোমার মেয়ে। মানসীর সম্পূর্ণ বিপরীত চরিত্র তোমার ও তিন্নির। মানসী অপ্রয়োজনে সাজে না। বাড়িতে টিপ পরতে বললেও লজ্জা অথচ মানসী দেখতে ভালোই। মুখশ্রী সুন্দর। তোমাকে তো আমাদের বিয়ের ফটো দেখিয়েছি। বাড়ি থেকে লুকিয়ে অ্যালবাম নিয়ে গেছি আমাদের বিয়ের। তুমি বহুবার আমাকে বলেছ তুমি মানসীকে খুব পছন্দ করো। আর তিন্নিকে তোমার খুব ভালো লাগে বলে সেই পছন্দটা এসেছে। তিন্নিকে তুমি বহুবার দেখতে চেয়েছ কিন্তু তিন বছরের মেয়েকে কী করে দেখাই বলো? আরও একটু বড়ো হোক কলকাতায় তোমাকে দেখাতে নিয়ে যাব। এই মফস্সল থেকে এখনই নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। মানসী এখন তিন্নিকে আমার সাথে একা ছাড়বেও না।

আমার মেয়ের কথা, বউয়ের কথা সব বলেছি। আমার বাড়ির সব কথাও। বাবা ঠাকুরদার গরিব জীবনের কথা। বিয়ে করার কথা। অথচ তুমি নিজের কথা ছাড়া বিশেষ কিছু বলতে চাও না। তোমার বাবার কথা মায়ের কথা প্রায় কিছুই বলোনি। যেটুকু জেনেছি তাও আমার অনন্ত প্রশ্নের আগ্রহে শোনা। তোমার মা দুটো বলেছিলে। তারা দুজনেই বেঁচে আছে না মরে গেছে কোনওদিন বলোনি। তোমার ভাই যাকে আমি প্রথমদিনই শাহিনের সাথে প্রথম বাড়িতে দেখি, সে কি তোমার সৎ ভাই? জিজ্ঞাসা করলে তুমি এড়িয়ে যাও। এই সব ব্যক্তিগত প্রশ্ন করলেই তুমি শরীর দেখাও আর আমাকে জাগিয়ে দাও শরীরে। আমি রম্ভার শরীর দেখি, মাখি, ছানি, অসম্ভব সব বক্রতা থেকে আমার মনের মতো যৌনতা খুঁজি। আমাকে তুমি এত শরীরী-সুখ দিয়েছ মাঝে মাঝে মনে হয় তুমিই স্বর্গ অথবা চরম সত্য। অথচ তোমার সাথে যৌনসম্ভোগ তখনও হয়নি। চূড়ান্ত সম্ভোগের কোনও সম্ভাবনাও ছিল না। তুমি কিছুতেই রাজি ছিলে না। তুমি আমাকে শরীরে মাখতে কিন্তু শরীরে নিতে রাজি ছিলে না।

আজ রবিবার। বাজার করে এনে দিয়েছি। এখন খাবার সময় হয়ে এসেছে। মুড়িঘণ্ট ডাল আর খাসির মাংস। স্নান করতে হবে এবার। অথচ কিছুতেই স্নান করতে ইচ্ছা করছে না। গত দু-বছর আমাদের সম্পর্ক। দু-বছরে অনেক কথা হয়েছে। তুমি ভালোবাসবে না শুধু বন্ধুত্ব রাখতে চেয়েছ। সেখান থেকে অনেক কষ্টে তুমি স্বীকার করেছ ভালোবাসো। ভালোবাসা ছাড়া সম্পর্কটা টিকত না। ‘ভালোবাসি’ কথাটা তোমার মুখ থেকে শুনতে চেয়েছিলাম। একটা অন্য রকম স্বীকৃতি। তুমি বললে, সেই অমোঘ শব্দরাশি ভালোবাসি, ভালোবাসি। আমাকে বললে পৃথিবীর মধ্যে সব থেকে ভালোবাসো। আমি জিজ্ঞাসা করলাম বরের থেকেও? তুমি থমকে গেলে। তারপর আবার সময় চাইলে। তোমার বর কী করে, কোথায় থাকে জানি না। পরে বলেছ সেও বাবার মতো জাহাজি। বাবার দেখে দেওয়া পাত্র। সেও নীল সমুদ্রে ঘুরে বেড়ায়। নীল আকাশে সমুদ্র-পাখি খোঁজে। আমি বলেছিলাম নাবিকের সংসার তো বন্দরে বন্দরে। তুমি কোনও উত্তর দাওনি। আমার মুখের মধ্যে গুঁজে দিয়েছিলে অসম্ভব যৌনতা। আমি বাকরুদ্ধ হয়ে যাই তোমার কৌশলে। আমার সমস্ত প্রশ্ন হারিয়ে যায়। আমি তখন শিশুর মত পৃথিবী ভুলে মায়ের কোল খুঁজি নির্মল আনন্দে। আমার নিবাস, আবাস, পরবাস, সুবাস তখন তোমার মধ্যে। তুমি নিতেও পারো আমাকে অসম্ভব। যেন তুমিও আমার মধ্যে খুঁজতে অন্য পৃথিবী। একটা দুরন্ত বালকের মাতৃত্ব সামলানোর মতো আমায় তৃপ্ত করতে, দৃপ্ত করতে, দৃঢ় করতে।

আজ কিছুতেই স্নান করতে ইচ্ছা করছে না। গত দু-বছরে আমরা দুজনে দুজনকে কাল প্রথম সম্পূর্ণ পেলাম। তুমি স্বীকার করেছ আমাকেই সব থেকে বেশি ভালোবাসো। আমিই তোমাকে সব থেকে বেশি বুঝি অথবা তুমি আমার সঙ্গেই সময় কাটিয়ে সব থেকে বেশি সুখ পাও। তোমার কোনও সন্তান নেই। তবু তুমি আমার সাথে পালাতে পারবে না। আমার সংসার তুমি ভাঙতে চাও না। আর আমিও যতই তোমাকে ভালোবাসি, মানসীকে বা তিন্নিকে ছাড়তে চাই না। তোমার মতো উদ্ভিন্ন যৌবনা মেয়ে আমার মধ্যে কী দেখেছে জানি না কিন্তু কাল প্রথম যখন অনেক দূরের একটা হোটেলে আমাকে শরীরে নিলে, আমার মনে হয়েছিল তুমিও আমাতে তৃপ্ত। শুধু একবার চরম তৃপ্তির আগের মুহূর্তে দ্বিতীয় দিনে দেখা বিষণ্ণতা কয়েক পলের জন্য ফিরে এসেছিল। কাল আমাকে যেতেই হবে। কোম্পানি আমাকে সেল্স ম্যানেজার থেকে অসমের তিনসুকিয়ায় ব্রাঞ্চ ম্যানেজার করে পাঠাচ্ছে। এটাও সম্ভব হয়েছে তোমাদের চবিবশটা গাড়ির ইন্সিওরেন্স পাবার জন্য। তুমি আমার চলে যাওয়ার ব্যাপারে কোনও মতামত দাওনি। তুমি কি চাইছ আমি দূরে চলে যাই? না হলে একবারও কেন বললে না থেকে যেতে? কালই তোমাকে পুরোপুরি পেলাম আর আজ আমাকে চলে যেতে হবে ভাবলেই কষ্ট হচ্ছে। তুমি অবশ্য কথা দিয়েছ তিনসুকিয়ায় আসবে। থাকবে বেশ কিছুদিন। খুব মজা হবে পাহাড়ি ঝরনার নীচে জলপরিকে পেলে! এখন যাই। স্নান করি। না হলে মানসী রাগারাগি করবে। শরীরে তোমার সুবাস নিয়ে আবার আজ শাওয়ারের নীচে দাঁড়াব শুধু আজ পাশে তোমাকে, রতিক্লান্ত তোমাকে পাব না।

২৮ মার্চ, ১.৫৫ দুপুর,

জামদানীপুর।

অলকানন্দা,

চিঠিগুলো পোস্ট করা হয়নি। ভেবেছিলাম পরিষ্কার করে আবার লিখে তোমাকে তিনসুকিয়া থেকে পোস্ট করব। কিন্তু এখানে এসে চার্জ নিয়ে সব কাজকর্ম বুঝে নিতেই দিন দশেক হয়ে গেল। তোমাকে এখানের ফোন নাম্বার আগেই দিয়ে এসেছিলাম। আমি অফিসে এসেও তোমাকে ফোন করেছিলাম দু-দুবার। দুবারই তোমার মোবাইল বেজে বেজে বন্ধ হয়ে গেল। তুমি বলেছিলে কোনও বিপদ বা জানাজানি হয়ে গেলে চুপচাপ হয়ে যেতে। ছ-মাস পর সব ঠান্ডা হয়ে গেলে আবার যোগাযোগ করা হবে। আমি ভয় পেলাম বোধহয় জানাজানি হয়ে গেছে! তোমার কথা ভেবেই আমার কলকাতার মোবাইল নাম্বার চালু রেখেছি। কলকাতার কাস্টমাররা বিরক্ত করছে, ইনকামিং টাকা কাটছে, তবুও তোমার কথা ভেবে চালু আছে আজও। আমি ধীরে ধীরে কাজের মধ্যে ডুবে যাই। এখানে অনেক দায়িত্ব। তবু রোজ রাতে তোমাকে ফোন করতে চাইতাম। এখানে একা থাকি। ফোন করলে বউয়ের কাছে ধরা পড়ার ভয় নেই। ফোনটা বুকে চেপে ঘুমিয়ে পড়তাম। ভাবতাম এই বুঝি তুমি ফোন করবে। তবু তোমার বিপদের কথা ভেবে কোনও দিন ফোন করতাম না। তুমি বলেছিলে তোমার বাবা জানতে পারলে অনার কিলিং-এ তোমার নাম উঠবে। আমি স্রেফ ভয়ে ফোন করিনি। চিঠি পোস্ট করার প্রশ্নই ওঠে না।

গত কয়েকদিন থেকে মনে হচ্ছে ধনীর মেয়ে, বড়োলোকের বউ। বর বিদেশে থাকে! শরীরের চাহিদায় তুমি আমার কাছে এসেছিলে। শরীর যখন পেলে তখনই আমাকে বহুদূরে চলে আসতে হল। তাই আমার প্রতি আর কোনও টান নেই। হয়তো এরকমই করো তুমি। বা সব নাবিকের ঘরনিই এরকম ভাবে সময় কাটায়। আবার মনে হচ্ছিল তুমি বুঝি সত্যিই ভালো। যেমন দেখেছি তেমনই ভালো। শরীর চাইলে পাঁচতারা হোটেলে শরীর খেলাতে পারতে। সব রকমই ভাবছি। সন্ধে থেকে একা এবং অফুরান সময়। ভাবনারাও খেলে বেড়ায় বামদিক ডানদিক, দুদিক। ভাবছি চূড়ান্ত তৃপ্তির আগের মুহূর্তের বিষাদ ব্যাধ কী তির মারল যে, তুমি এক পলকের জন্য উদাস হয়ে গেলে! বরের কথা মনে পড়েছিল? অথবা ব্যভিচারের সূক্ষ্ম পাপবোধ?

সব ভাবনাই শুধু ভাবার জন্য। উত্তর পাওয়ার কোনও উপায় নেই। কেউ জানে না আমাদের গোপন সম্পর্ক। কেউ না। শুধু শাহিন হয়তো কিছুটা আন্দাজ করতে পারে। শাহিনকে জিজ্ঞাসা করব কিনা কয়েকদিন মরিয়া চিন্তায় আছি। হঠাৎ কাল অনেক রাতে শাহিন ফোন করে। আমি তোমার ব্যাপারে জানতে যাব, শাহিনই তুলল তোমার কথা। জানো বস্ খিদিরপুরের সতীশ সিং-এর বাড়ির সেই সুন্দরী মেয়েটা উত্তরাখণ্ডের একটা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে সুইসাইড করেছে। নদীটার নাম নাকি মেয়েটার নামেই ছিল। মেয়েটাকে মনে পড়ে তোমার?

১২ এপ্রিল সকাল ৮টা

বক্স রোড তিনসুকিয়া, অসম।

 

আইডেন্টিটি

ফ্লাড রিলিফ ক্যাম্প-এর বাইরে লাইনটা ক্রমশ একটা অজগরের মতো এঁকে বেঁকে বৃহৎ আকার নিল। প্রায় ল্যাজের দিকে দাঁড়িয়ে রাবিয়া বারবার উঁকি মেরে দেখার চেষ্টা করছিল, সেই ভাগ্যবান লোকটিকে, যে একদম মুখের দিকে দাঁড়িয়ে। ক্যাম্প-এ মুহুর্মুহু ঘোষণা শুনে সকলেই ছুটে এসেছে, চিঁড়ে-গুড়, ত্রিপল, ওষুধ সংগ্রহের আশায়। তিন দিনের অঝোর বৃষ্টিতে, নদীনালা খালবিল মিশে গিয়ে একেবারে নারকীয় অবস্থা হয়েছে তাদের বস্তির। ঝুপড়িগুলো বেশিরভাগই ভেসে গেছে। ভেসে গেছে গরু-বাছুর মানুষ, কুকুর। এই অবস্থায় সরকারি সাহায্যই একমাত্র কুটো, যা আঁকড়ে বাঁচার প্রাণপণ এই চেষ্টা।

নাঃ শুরুর দিকে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা এখনও সরেনি। মানে তার প্রাপ্য চিঁড়ে-গুড় দেওয়া এখনও শুরু হয়নি। সে সরলে পরের জন পাবে, তারপর তার পরের জন– এভাবে কখন কপাল খুলবে রাবিয়ার, সে জানে না।

অসমের গোলাঘাটের আপাত শান্তশিষ্ট নদী ধানসিঁড়িকে, এসময় বড়ো অচেনা লাগে রাবিয়ার। এরকম তাণ্ডব সে আগে দেখেছে কয়েকবার। তবে এবার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ যেন কিছুটা বেশি। কত মানুষের তিল তিল করে জমানো খড়কুটো যেন নিমেষে ভাসিয়ে নিয়ে গেল রাক্ষুসী। তাদের চালাঘরটার চিহ্নমাত্র আর নেই। দশ বছরের ভাই আজিমের যক্ষের ধন খেলনাগুলোও ভেসে গেছে জলের তোড়ে। বেচারা ওগুলো বাঁচানোর জন্য শেষ চেষ্টা করেছিল, একটা ভাঙা টিনের বাক্স জোগাড় করে। কিন্তু ঈশ্বর অলক্ষ্যে থেকে হেসেছিলেন। বাস্তবের রূঢ় রূপটা দেখাবেন বলেই প্রায় শিকড় থেকে উপড়ে দিলেন তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁইটা।

রাবিয়া এই কুড়ি বছর বয়সে কী না দেখতে বাধ্য হল! সত্যি বলতে কী সৌভাগ্য কী তা বোঝার কখনও সুযোগই হয়নি তার। আজ এই ছিন্নমূল অবস্থায়, রিলিফ ক্যাম্প-এর লাইনে দাঁড়িয়ে তার সেই দুর্ভাগ্যের কথাই ভাবছিল রাবিয়া।

মা আর ভাই আজিমকে সে কাছেই একটা অস্থায়ী শরণার্থী শিবিরে রেখে এসেছে। ত্রাণ শিবির থেকে সরকারি সাহায্য, কাপড় জামা, খাবার যা পাবে নিয়ে যাবে ওদের জন্য। এখানে পরিবারের লোকসংখ্যা অনুযায়ী কম্বল, চাদর, পাউরুটি, বিস্কুট, চিঁড়ে, গুড় বিতরণ করা হবে।

আজিম যখন বছর দুয়েকের, তখনই আব্বার মৃত্যু হয়। তিনিও কত লড়াই লড়েছেন। শান্তিতে দুমুঠো খাবারের জন্য না জানি কত যন্ত্রণা সয়েছেন। এক ফালি জমিতে চাষ করে চারজনের পেট ভরাতে তাঁর নাভিশ্বাস উঠত। কখনও রাজনীতির ছল চাতুরির শিকার হয়েছেন, কখনও দুর্বৃত্তের কাছে ঠকেছেন। কখনও প্রকৃতি তাঁর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে দিয়েছে খরা কিংবা বন্যা। এত প্রতিকূলতার মধ্যে যে একটু সমবেদনা জানিয়েছে, তাকেই ঈশ্বর মেনেছেন।

জন্মানোর পর থেকেই দুর্ভাগ্যকে সঙ্গে নিয়ে বেঁচে আছে রাবিয়া। এ যেন এক অন্তহীন জেহাদ। কেন এই লড়াই, কেন বেঁচে থাকার এই সংঘর্ষ? কিছুতেই বুঝতে পারে না রাবিয়া।

এক ছটাক জমি ছিল আব্বার। তাতেই ফসল বোনা। লকলকে ধানগাছগুলো সোনালি ধানে ভরে না যাওয়া অবধি সে জমিতে কত যত্নআত্তি। আব্বা বলতেন, ‘ভূমি হল আমাদের মা। মা সারাবছর অন্ন জোগায়, আর তার সেবা যত্ন করব না?’ আম্মা-ও কত কষ্ট করে তাঁর বয়ে আনা ফসল, টিপে টিপে খরচ করতেন, যাতে কেউ অভুক্ত না থাকে, অথচ বেশি খেয়ে ফেলে ভাঁড়াড়ে টান না পড়ে। মা প্রথমেই সরিয়ে রাখত বীজধানটা, যাতে খিদের জ্বালায় সেগুলোও না চলে যায় বুভুক্ষু পেটে।

এত কষ্টের মধ্যেও আম্মা-আব্বার কারও প্রতি কোনও অভিযোগ ছিল না। না গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রতি, না সরকারের প্রতি। মুসলমান হওয়ার সুবাদে, মনে সবসময় একটা ভয় কাজ করত যে, কখনও যেন তারা বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী বলে চিহ্নিত না হয়। কিন্তু এত সাবধানতা সত্ত্বেও শেষ রক্ষা হল না।

২০১২-র সেই অভিশপ্ত দিনটা আজও ভুলতে পারেনি রাবিয়া। রোজকার মতো আব্বা গিয়েছিলেন জমিতে। মাথায় সবসময় তার অনেক প্রশ্ন ঘুরপাক খেত, কিন্তু বিদ্রোহ করে ওঠা মনটাকে সংযত রাখতেন। তিনি কে? কোথা থেকে এসেছেন? কেন এসেছেন? কবে থেকে আছেন? কতদিন থাকবেন? এমন নানা প্রশ্নে জর্জরিত হতে হতেও বাবা হাতজোড় করে প্রাণভিক্ষা চেয়েছিলেন। বোড়ো ,অহমিয়া অর্থাত এখানকার ভূমিপুত্রদের আপত্তি ছিল, এই রাজ্যে বহিরাগতরা থাকবে কেন? তাদের রাজনৈতিক চিন্তা ভাবনা যা-ই থাকুক না কেন, মোটের ওপর তাদের অন্নের ভাগীদার তারা চায় না।

আব্বা আর খেত থেকে ফিরলেন না। সেই থেকে অন্ন সংস্থান করাটাই সমস্যা হয়ে গেল রাবিয়াদের পরিবারের। একদিকে খিদে, প্রাণভয়, অন্যদিকে জমি বেদখল হওয়ার চিন্তা। রুজিরুটি,অসুখ-বিসুখ, দেশ থেকে বহিষ্কারের ভয়– এহেন অন্তহীন অন্ধকার। রাবিয়ার যেটুকু পড়াশোনা, সেটা বাড়িতেই হয়েছে আব্বার কাছে।

আম্মা-কে দেখত পাগলের মতো আঁতিপাঁতি করে কাগজের একটা টুকরো খুঁজতে। কখনও টিনের আলমারিতে, কখনও ট্রাংকে, বিছানার চাদরের নীচে– ওই প্রমাণপত্র যা আইনসিদ্ধ করবে তার পরিচয়। আব্বা চলে যাওয়ার পর আম্মা আরও অসহায় হয়ে পড়েছিলেন। কোথায় সেই কাগজ যা প্রমাণ করে দেবে তার পূর্বপুরুষরা ১৯৪২ সালের আগে থেকেই অসমে বসবাস করছেন। কিন্তু খুঁজে পেলেন না। যা ছিল, সবই হারিয়ে গেছে কালে কালে। রাবিয়া কী ভাবেই বা সাহায্য করতে পারত। তার তখন সবে চোদ্দো বছর বয়স। আম্মা আর ভাই-কে নিয়ে সে বেরিয়ে পড়েছিল কাজের সন্ধানে।

কখনও কোনও বাড়িতে, কখনও রাস্তার হোটেলে বা দোকানে– যখন যেখানে কাজ মিলেছে, রাবিয়া তা করেছে। আম্মাও বসে থাকেনি। রান্নার কাজ করেছে লোকের বাড়িতে। জীবন কোনওরকমে কেটে যাচ্ছিল। কিন্তু মাঝেমধ্যেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠত অহমিয়া ও বহিরাগত বসবাসকারীদের মধ্যেকার বিবাদ। প্রাকৃতিক বিপর্যয় অসমের এই নদী কূলবর্তী এলাকাগুলোর জন্য নতুন কোনও ঘটনা নয়। প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করেই এখানকার মানুষদের জীবনযাপন। গোলাঘাটের বাইরের পৃথিবীটাকে কখনও দেখেনি রাবিয়া। এই শহর এই ধানসিঁড়ি নদী– সবই তার তুলনায় অনেক বড়ো মনে হয়। বাইরের পৃথিবীটা যে এর ঠিক কতগুনে বড়ো তা সে আন্দাজও করতে পারে না।

এসব ভাবতে ভাবতে লাইনটা এগোচ্ছিল। হঠাৎ পেছনের মহিলার কাছে একটা গুঁতো খেয়ে সে সচকিত হয়ে ওঠে। এবার তার পালা, ত্রাণশিবিরের সাহায্য পাওয়ার। হঠাৎই চোখ গেল একজন বাবু সামনে টেবিল পেতে বসে আছেন। তিনি হঠাৎ বলে উঠলেন, ‘কার্ড বের করো, যেটা এনআরসি’র আইডেন্টিটি কার্ড হিসাবে দেওয়া হয়েছে।’

–‘কোন কার্ড’? রাবিয়া থতমত খেয়ে জিজ্ঞেস করে।

– আরে বাবা এনআরসি, ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ সিটিজেন-এর পরিচয়পত্র। ওটা দেখাও। না হলে ত্রাণের সরঞ্জাম পাবে না,’ বাবু ঝাঁঝিয়ে উঠলেন। ‘যাদের কার্ড আছে, আগে তারা পাবে।’

অপ্রস্তুত অবস্থা খানিক কাটিয়ে নিয়ে রাবিয়া বলে, ‘আজ্ঞে দ্বিতীয় দফার দরখাস্ত জমা দিয়েছি। কিন্তু এখনও তো সবার নাম ওঠেনি খাতায়। দয়া করে জিনিসগুলো দিন। আমি অনেকক্ষণ ধরে লাইন দিয়ে অপেক্ষা করেছি। আমার আম্মা আর ছোটো ভাইটা ক্যাম্প-এ অপেক্ষায় আছে।’

এদিকে রাবিয়ার ত্রাণ পাওয়া না পাওয়া নিয়ে এরকম বচসা তৈরি হয়েছে দেখে, লাইনের পেছন দিকে দাঁড়ানো কার্ডধারী শরণার্থীরা চিৎকার চ্যাঁচামেচি শুরু করেছে। তারা বারবার রাবিয়া-কে লাইন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য হল্লা করতে থাকে। কিন্তু রাবিয়ার জন্য এ যেন জীবন-মরণ সমস্যা। দুটো মানুষ না খেয়ে তার অপেক্ষায় বসে আছে। এখন কিছুতেই খালি হাতে এখান থেকে তার যাওয়া চলে না। দুপাট্টার খুঁটে করে সে কপালের ঘামটা মুছে নেয়। কোমরটা ভালো ভাবে বেঁধে নেয়, লাইনের ধাক্বাধাক্বি সামলাতে। এখন সে বুঝতে পারছে মানুষের স্বার্থে তৈরি হওয়া আইন আসলে কার্যক্ষেত্রে অনেকরকম অসুবিধেও তৈরি করে।

বাবুর পেছনে দাঁড়িয়েছিল ২৭-২৮ বছরের এক অহমিয়া যুবক। রাবিয়া দেখেছে অনেকেই তাকে নীরদ বলে সম্বোধন করছে। এবার সেই নীরদ-ই এগিয়ে এল রাবিয়াকে সাহায্য করতে। সে রাবিয়াকে বলে, ‘আপনি আমার সঙ্গে আসুন, বড়োবাবুর সঙ্গে দেখা করিয়ে দিচ্ছি। ওনাকে বলুন আপনার সমস্যার কথা। যদি তাতে কিছু সুরাহা হয়।’

রাবিয়া ভিড় ঠেলে কোনওরকমে ক্যাম্প-এর মধ্যে প্রবেশ করল। এবার সে সুঠাম চেহারার নীরদকে ভালো ভাবে দেখল। অনেক ছদ্মবেশী মানুষ সে দেখেছে এই জীবনে, যারা উপকার করতে এসে অন্য কিছু সুযোগ নিতে চায়। নীরদ-কে দেখে কিন্তু সেরকম মনে হয় না।

নীরদ-ও খুঁটিয়ে দেখছিল রাবিয়াকে। রোগা পাতলা, পানপাতার মতো মুখের মেয়েটির সুর্মা পরা চোখদুটি ভারি মায়াময়। চাইলেও চোখ ফিরিয়ে নেওয়া যায় না ওই মায়া-চোখ দুটি থেকে। রাবিয়ার চোখে-মুখে করুণ মিনতি তার নজর এড়াল না। এদিক ওদিক দেখে নিয়ে গলা নামিয়ে ফিসফিস করে নীরদ বলল, ‘জিনিসপত্র বন্টনের দায়িত্ব আমার উপরেই আছে। আমি এদিককার কাজ সেরে, বিকেলের দিকে তোমাদের শিবিরে গিয়ে জিনিসগুলো দিয়ে আসব। তুমি তোমার নাম বলে যাও।’

রাবিয়া নাম তো বলে দিল, কিন্তু মনে মনে অপরাধবোধ হল এই ভেবে যে, কাজটা সে অন্যায়ই করল। নীরদ যে একটু ভিন্ন প্রকৃতির মানুষ, সেটা রাবিয়া প্রথম দেখাতেই বুঝেছে। তার ফরসা গায়ের রং, পোশাক আশাক সাধারণ হলেও, ভিড়ের মধ্যে আলাদা করে চোখে পড়ার মতো।

নীরদ আপৎকালীন সহায়তা বিভাগের সরকারি কর্মচারী। চাকরি, টাকা, নিয়ম, রেজিস্টার, সরকারি প্রমাণপত্র– এসবের বাইরে তার একটা মানবিক মন আছে। আর সেইজন্যই বিপদে পড়া মানুষদের পাশে দাঁড়ানোটা তার সহজাত প্রবৃত্তি হয়ে উঠেছিল। কিছু কিছু সময় আইনের ফাঁসে তার সাহায্য করার সুযোগ আটকে গেলেও, সে কোনও না কোনও রাস্তা বের করে ফেলত পাশে দাঁড়াবার।নীরদ রাবিয়াকে বলল, ‘এখন যদি তোমায় এখান থেকে মালপত্র দিয়ে দিই, ন্যাশনাল রেজিস্টারে নাম তোলা নিয়ে বিরাট ঝামেলা শুরু হয়ে যাবে। কারণ তোমাদের কাছে প্রয়োজনীয় পরিচয়পত্র নেই।’

‘কী করি বলুন। আমাদের দুর্ভাগ্য যে ওই পরিচয়হীন চল্লিশ লক্ষ মানুষের দলে আমরাও আছি। সরকারি খাতায় আমাদের নাম নেই। আব্বা নেই। বাঁচার ফিকির করব নাকি নাম দাখিল করার জন্য ঘুরে বেড়াব,’ রাবিয়া বলে।

নীরদ সমস্যাটা বোঝে। একটু ভেবে নিয়ে বলে, ‘বেশ, দেখছি কী করা যায়। তোমরা ওই সরকারি স্কুলের শরণার্থী শিবিরে রয়েছ না? আমি কাজ শেষ করে সন্ধেবেলায় ৬টা নাগাদ যাব ওখানে। জিনিসগুলোও নিয়ে যাব, তুমি চিন্তা কোরো না।’

শিবিরে ফিরেও ঠিক যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না রাবিয়ার। বারবার সে চৌরাস্তার মুখে বড়ো বাড়িটার উপরে লাগানো ঘড়িটার দিকে তাকাতে লাগল। কিন্তু সত্যি সত্যিই সন্ধে নামার একটু পরেই নীরদ, দুটো কম্বল আর কিছু খাবারদাবার নিয়ে রাবিয়াদের শরণার্থী শিবিরে এসে উপস্থিত হল। আম্মি কৃতজ্ঞতায় কী করবেন ভেবে পাচ্ছিল না। নিজের তুলে রাখা একটা পরিষ্কার শাড়ি চটের উপর বিছিয়ে নীরদকে বসতে দিল। রাবিয়ার মুখে পুরোটা শুনে যেন নিজের চোখকে তিনি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। রাবিয়াও এক আধবার চোখ তুলে দেখছিল এই দেবদূতকে। নীরদের মনের ভাষা যে সে সবটা পড়তে পারছিল তা নয়, কিন্তু কেবল তার মনে হচ্ছিল ধানসিঁড়ির এই বন্যা যেন তার জীবনের এক নতুন অধ্যায় রচনা করে দিল।

শরণার্থী শিবিরে রোজ কিছু কিছু খাবার বিতরণ করা হতো ঠিকই। কিন্তু ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ সিটিজেনস্-এ যাদের নাম ছিল না, তাদের সরকারি সাহায্য পাওয়ার কোনও রাস্তা ছিল না। এ বিষয়ে স্থানীয় লোকেরাও সহযোগিতা করতে রাজি ছিল না। নীরদ সেই খাবার প্রায় রোজই লুকিয়ে এনে দিত রাবিয়াদের।

বাসভূমির রক্তক্ষয়ী ইতিহাস, প্রতিশোধের আগুন, নিরাপত্তাহীনতা, অসহায়তা এসবই দেখে এসেছে রাবিয়া। তার সুদিনের অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছু করার ছিল না। নীরদ এলে রাবিয়া তার আম্মি ও আজিম যেন নিশ্চিন্ততার নিঃশ্বাস নেয়। না হলে সেই প্রতিদিন ভয় আর আতঙ্ক নিয়ে বাঁচা।

রাবিয়া নীরদকে অনেক কিছু বলতে চায়, কিন্তু কেন যেন রাজ্যের মৌনতা তাকে ঘিরে ধরে। আর যতবেশি মৌন সে হয়ে যায়, তার অন্তর তত সরব। তার মনের জমিতে এক ফালি সবুজ ঘাসজমি যেন সে টের পায় আজকাল, যেখানে বিশ্রাম নিতে আসে নীরদ। কল্পনায় নীরদের কোলে মাথা রেখে যেন শুয়ে থাকে। নীরদ যেন ধানসিঁড়ির জলের মতো কত কথা বলে যায় রাবিয়ার কানে। কিন্তু সেসব কথা তো কেবল রাবিয়াই শুনতে পায়। নীরদ কি জানে রাবিয়ার মনের এই ঘাসজমির কথা?

এই অসমের মাটি তার বড়ো আপন। তার ভেসে যাওয়া ঘরবাড়ি সত্ত্বেও রাবিয়া নিজেকে কিছুতেই বহিরাগত ভাবতে পারে না। নীরদ এই ক’টা মাসে যেভাবে আঁকড়ে ধরেছে তাকে, যেভাবে বটবৃক্ষের মতো ছায়া দিয়েছে তার পরিবারকে– সে কী করে নিজেকে তার অনাআত্মীয় ভাববে! আজ বিকেলে নীরদ আসবে তাদের একটি ভাড়া বাড়িতে নিয়ে গিয়ে রাখার জন্য। রাবিয়া টুকিটাকি জিনিসগুলো গুছিয়ে পোঁটলা বাঁধতে থাকে। একটা কাগজের টুকরোয় সে কিছু লিখে রেখেছে। আজ সে সেটা নীরদকে দেবে।

নীরদ তার সাইকেল নিয়ে বিকেলবেলা আসতেই, রাবিয়া কাগজের টুকরোটা নীরদের আঙুলের ফাঁকে গুঁজে দিয়ে কোথায় যেন লুকিয়ে পড়ে। নীরদ কাগজটাখোলে। তাতে রাবিয়া লিখেছে, ‘আমার জন্ম অসমে, তাই আমি অসমের মেয়ে। তুমি অসমের ছেলে। আমরা দুজনেই যদি এই অসমের মাটিকে একইরকম ভাবে ভালোবাসি– তবে তোমার আমার মধ্যে তফাত কোথায়? তফাত যদি না থাকে, তাহলে একবার আমার সঙ্গে মন খুলে কথা বলো।’

নীরদ কাগজটার উলটো পিঠে লিখে দেয় ‘আমি কাল তোমার আম্মির সঙ্গে কথা বলব।’

রাবিয়াকে কলে জল ভরতে দেখে সে চিঠিটা তার হাতে দিয়ে সাইকেল নিয়ে তাড়াহুড়ো করে চলে যায়। তার ভেতরেও কী যেন একটা হচ্ছিল, সে নিজেকে যেন ঠিক বুঝতে পারছে না। তবে এটুকু বুঝেছে রাবিয়া তার মন জুড়ে রয়েছে।

চিঠিটা পেয়ে রাবিয়া প্রথমে ঠিক বুঝতে পারল না, নীরদ একথা কেন লিখল। তবে কি সে বিবাহিত? নাকি রাবিয়া মুসলমান বলে সে মুখ ফিরিয়ে নিল? রাবিয়া নিজেকে অসমিয়া বলায়, সে কি রেগে গেল?

এসব ভাবনা ক্রমাগত বুকে চেপে বসতে লাগল রাবিয়ার। রাতে সে কিছুই প্রায় খেল না। আজিমকে একটু বকাবকিও করে ফেলল। তারপর সিদ্ধান্ত নিল আর নীরদের সাহায্য নেবে না। এখান থেকে চলে যাওয়াই তাদের জন্য শ্রেয়। সে আম্মাকে বোঝাল নিজেরাই কিছু ব্যবস্থা করার জন্য এখনই বেরিয়ে পড়া উচিত। আম্মা কিছু একটা বুঝলেন হয়তো। কিন্তু মেয়েকে বললেন, ‘দিনকাল ভালো নয় রাবিয়া। এখানে তাও মাথার উপর একটা ছাদ আছে। এই আশ্রয় ছেড়ে বেরোনো নিরাপদ নয়। প্রাণ চলে যেতে পারে। আজিম তো নিছকই শিশু। সে কী ভাবে পারবে সব সামলাতে।’

রাবিয়া আর কথা বাড়াল না। সারারাত আর ঘুম এল না। ভোরের দিকে কখন যেন দুচোখের পাতা লেগে গেছিল। জলের লাইন দিতে হবে বলে আম্মি তার ঘুম ভাঙালেন।

এর খানিক পরে, খাবারদাবার সমেত নীরদ এল। আম্মির সামনে বসে পড়ল। আড়চোখে একবার রাবিয়াকে দেখে নিয়ে, আম্মির হাতদুটো ধরে বলল, ‘রাবিয়ার জন্য আপনাদের পরিবারকে খুব আপন মনে করি আমি। আপনারাও আশাকরি আমায় পর ভাবেন না। তাই আমি বলতে এসেছি আপনারা সকলে মিলে আমার সঙ্গে গুয়াহাটি চলুন। ওখানে রাবিয়াকে আমি একটা এনজিও’র কাজ জুটিয়ে দেব। আজিমকে একটা স্কুলে ভর্তি করে দেব। আপনার জন্যও সেলাই বা অন্য কোনও হাতের কাজের ব্যবস্থা করে দিতে পারি যাতেকিছু রোজগার হয়। আর থাকা নিয়েও আপনারা চিন্তা করবেন না। গুয়াহাটিতে আমাদের নিজস্ব বাড়ি আছে। দেখবেন আপনাদের কোনও অসুবিধাই হবে না।’

রাবিয়া অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে নীরদের দিকে। সে কখনও ঈশ্বরকে দেখেনি। কিন্তু নীরদ-কে আজকে তার ঈশ্বর বলেই মনে হল। আম্মি দুহাত দিয়ে নীরদের মুখটা চেপে ধরে, তার চোখে জল। বলে, ‘তুমি যা বলবে তা-ই করব বাবা। আমার ছেলের চেয়ে বেশি তুমি।’ আজিম কী বুঝল কে জানে, তবে সে নীরদের গায়ের কাছে এসে বসল।

এর কিছুদিন পরই সত্যি সত্যিই ওরা সকলে নীরদের সঙ্গে গুয়াহাটি চলে এল। নীরদের বাড়ির লাগোয়া আউটহাউস এখন ওদের আস্তানা। এরকম পরিচ্ছন্ন ঘর-বাথরুম রাবিয়া অনেকদিন দেখেনি। শরণার্থী শিবিরে দুঃস্বপ্নের মতো দিনগুলো কাটানোর পর– এরকম একটা স্বর্গ তার জন্য অপেক্ষা করেছিল, সে ভাবতে পারেনি।

কথা রেখেছিল নীরদ। রাবিয়ার এনজিও-তে চাকরি, আজিমের জন্য স্কুল, আম্মির জন্য টেলারিং শপ-এ দর্জির কাজ– সবই সে করে দিল। আর কীই বা চাইতে পারত রাবিয়া, তার এই ‘মসীহা’-র থেকে। কিন্তু এসব সত্ত্বেও মাথার উপর খাঁড়ার মতো ঝুলে রইল ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ সিটিজেনস্-এর বিষয়টা। এতও সহজ ছিল না

সুখে-শান্তিতে জীবন কাটানো।

মাসখানেক যেতে না যেতেই নীরদের মা তিনসুকিয়ায় তাঁর বাপের বাড়ি থেকে ফিরে এলেন। বাড়িতে এরকম অযাচিত অতিথিদের আশ্রয় দেওয়া হয়েছে দেখে তিনি বেশ অবাক। কৗতূহল চাপতে না পেরে, নিজেই দেখা করতে এলেন রাবিয়ার মায়ের সঙ্গে। এসেই প্রায় তোপের গোলার মতো কয়েকটি প্রশ্ন দেগে দিলেন। ‘নীরদ তো পরিষ্কার করে কিছুই বলল না, কিন্তু আপনারা কারা? আপনাদের জাতধর্মই বা কী? নীরদ বাড়ি ভাড়ার কথা কিছু বলেছে কি? আপনারা থাকবেনই বা কতদিন?’

রাবিয়া অপ্রস্তুত। কোনও উত্তর জোগাচ্ছে না তার মুখে। শেষে আম্মিই হাতজোড় করে বলল, ‘দিদি নীরদ আমাদের ছেলের মতো। বন্যায় আমাদের ঘরবাড়ি সব ভেসে গেছে। তাই ও আমাদের এখানে আশ্রয় দিয়েছে। আমরা একটু সামলে নিয়েই এখান থেকে চলে যাব।’

‘ছেলেটা আমার বরাবরই ওরকম কাণ্ডজ্ঞানহীন, বুঝলেন তো! ঘর জ্বালানি পর ভালানি। যাইহোক, আপনারা যত তাড়াতাড়ি পারেন নিজেদের ব্যবস্থা দেখুন।’

নীরদের মা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর অপমানে রাবিয়ার মুখটা লাল হয়ে উঠল। পরিচয়পত্র না থাকাটা বুকে কাঁটার মতো বিঁধে আছে। ঘাটা-আঘাটায় এভাবে কতদিন তারা ঘুরবে! কত প্রজন্ম ধরে এই মাটিতেই বসবাস করে এখন নিজেদের অনুপ্রবেশকারী, রিফিউজি মনে হতে শুরু করেছে। সরকারি খাতায় তাদের নাম নেই, অতএব তারা বহিরাগত। এই সত্যটা লুকিয়ে কতদিন তারা নিরাপদে বাঁচতে পারবে?

নীরদকে রাবিয়া দোষ দিতে পারে না। সে আশ্রয় দিয়েছে ঠিকই কিন্তু তাকেও কাজেকম্মে দীর্ঘ দীর্ঘ দিন শহরের বাইরে থাকতে হয়। সারাক্ষণ তাদের সুরক্ষা দেওয়া নীরদের পক্ষেও কি সম্ভব! তাছাড়া গত কয়েকদিন ধরে একটা অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটতে সে দেখছে, সেটার ব্যাপারে কাউকেই সে কিছু জানায়নি। সন্ধ্যা হলেই রান্নাঘরের জানলার পাশে কেউ একটা এসে দাঁড়ায়। সে আগেও দু-একবার টের পেয়েছে। সে বেরিয়ে দেখতে গেলেই ছায়ামূর্তিটা পেছনের ঝোপঝাড়ে মিলিয়ে যায়।

পরের সপ্তাহে নীরদ বাড়ি ফিরলে, রাবিয়া ভাবে তাকে সব কথা খুলে বলবে। তার মায়ের কথা, ছায়ামূর্তির কথা। কিন্তু কী ভেবে গুটিয়ে যায়। নীরদ তো এখনও মুখ ফুটে বলেনি যে, সে রাবিয়াকে নিয়ে কী ভাবে? কী তাদের সম্পর্ক? আর সে চায় না, তার একটা ভুলের জন্য আম্মি আর আজিমের জীবনটাকে অনিশ্চয়তার সামনে দাঁড় করাতে। অনেক ভাবনাচিন্তার পর সে ঠিক করল তাদের অপমানের কথাটা যদি না-ও জানায়, অন্তত ছায়ামূর্তিরূপী ওই আগুন্তুকের ব্যাপারটা নীরদের কাছে গোপন করবে না। সে ঠিক করে,  মা-কে এসব জানতে দেবে না৷ তাই নীরদকে সব খুলে বলবে বলে সে  কাছেই একটা জঙ্গুলে জায়গায় নীরদের সঙ্গে দেখা করল।

নীরদ সব শোনার পর নিশ্চিত হয়ে গেল, যে আসে সে রাবিয়ার জন্যই আসে। একা অসহায় যুবতিকে দেখে কোনও মানুষরূপী পশু ওৎ পেতে থাকে রাতের অন্ধকারে। নীরদের মধ্যে একটা আশঙ্কা দানা বাঁধল। এই আশ্রয়হীন পরিবারটা তার কথায় ভরসা করে তার সঙ্গে এখানে চলে এসেছে। সে কি সত্যিই রাবিয়ার যথাযথ দায়িত্ব নিতে পারবে তো ! সে নিজের বিবেকের কাছে কী জবাব দেবে, রাবিয়ার ভালো-মন্দ কিছু হয়ে গেলে? সে রাবিয়াকে জিগ্যেস করে, ‘রাবিয়া তুমি কি কাউকে ভালোবাসো? তাকে বিয়ে করতে চাও? তুমি আমায় নিশ্চিন্তে বিশ্বাস করে বলতে পারো সব কথা।’

রাবিয়ার চোখ সহসা জ্বলে ওঠে। সে মনে মনে যাকে এতটা ভালোবাসে সে খবরও রাখে না, তার প্রতি রাবিয়ার অনুভূতিটা কেমন! সে নিজেকে সংযত করতে পারে না। বলে, ‘কাকে বিশ্বাস করব, তোমায়? যে এতদিনেও আমার মন বুঝল না। আমি তোমাকে মনে মনে কবে থেকে আমার করে বসে আছি, আর তুমি জানতে চাইছ…’। সে আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারে না। নীরদের বুকের মধ্যে মুখ গোঁজে রাবিয়া। নীরদও যেন এরকমই একটা স্পর্শের অপেক্ষায় এতদিন নিজেকে বেঁধে রেখেছিল। আজ অনুভূতির বাঁধ ভেঙে গেল। দুজনে আলিঙ্গনবদ্ধ অবস্থায় কতক্ষণ রইল খেয়াল নেই। একসময় রাবিয়া-কে আলগোছে ধরে তার মুখটা দুহাতের পাতায় নিয়ে, নীরদ বলে, ‘বিয়ে করবে আমায় রাবিয়া?’

রাবিয়ার মুখে অনিশ্চয়তার রেখা স্পষ্ট। সে বলে, ‘কী করে করব আমরা বিয়ে? তুমি পারবে? আমার না হয় আম্মা আর আজিম ছাড়া কেউ নেই। কিন্তু তোমার পরিবার, আত্মীয়স্বজন? সমাজ?’

–‘তুমি আমায় ভালোবাসো তো রাবিয়া?’

–‘এ কথা কি আর বলার দরকার নীরদ?’

–‘তাহলে চিন্তা কোরো না। কেউ আমাদের বাধা দিতে পারবে না।’ আমি জানি সমাজকে, আমার পরিবারকে রাজি করানো খুব কঠিন কাজ। কিন্তু আমি তোমাকে ছেড়ে যাব না। সূর্য নেমে আসছে। আর এখানে থাকাটা নিরাপদ নয়।’ একথা বলতে বলতে রাবিয়ার হাত ধরে সে এগোতে যাবে, পেছনে থেকে কোনও এক আততায়ী একটা ভারী কিছু দিয়ে তাকে জখম করে, রাবিয়ার মুখ চেপে ধরে জঙ্গলের মধ্যে টেনে নিয়ে গেল। অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে থাকা নীরদ, জানতেও পারল না, কী সর্বনাশ হতে যাচ্ছিল রাবিয়ার।

শত দুর্ভাগ্যের মধ্যেও আজ রাবিয়ার হয়তো কিছু ভালো কাজের মূল্য প্রাপ্য হল। জঙ্গলের মধ্যে ভারী বুটের শব্দ পেল রাবিয়া। আততায়ীর সঙ্গে ধস্তাধস্তির মধ্যে একটু সুযোগ পেতেই সে চিৎকার করে উঠল সাহায্যের জন্য। পুলিশের টহলদারি চলছিল ক’দিন ধরেই একটা রাজনৈতিক খুন-কে কেন্দ্র করে। জঙ্গলের মধ্যে থেকে মহিলাকণ্ঠের চিৎকার পেয়েই পুলিশের লোকেরা টর্চ নিয়ে ঢুকে পড়ে জঙ্গলে। বিপদ বুঝে দুষ্কৃতি পালাল।

রাবিয়াকে পুলিশ উদ্ধার করল। নীরদ ও রাবিয়া মিলে থানায় গেল এফআইআর করতে। কিন্তু হায় রে ভাগ্য, জিজ্ঞাসাবাদ করতেই জানা গেল রাবিয়ার কোনও নথিপত্র নেই। প্রমাণ নেই নাগরিকত্বের। এসআই হাত উলটে দিয়ে বললেন, ‘যে এদেশের নাগরিক কিনা তা-ই জানি না, তার কীসের রিপোর্ট, কীসের কী। যান তো মশাই সময় নষ্ট করবেন না।’

কপালের পাশটা দিয়ে তখনও রক্ত বেরোচ্ছে নীরদের। সে রাবিয়াকে নিয়ে বেরিয়ে আসে থানা থেকে। রাগে অপমানে তার মুখটা তখনও লাল হয়ে আছে। ফেরার পথে সে সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়। আর দেরি করা যাবে না। রাবিয়াকে বলে, ‘চলো রাবিয়া, আমরা রেজিস্ট্রি করব যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। আমি আর তোমার জীবনটা এভাবে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে রাখতে পারি না।’

স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্ট অনুযায়ী দুজনে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেয়। বাড়িতে আপাতত ব্যাপারটা গোপন-ই রাখবে ঠিক করে নীরদ। সময় মতো দুজনে ম্যারেজ রেজিস্ট্রেশন অফিসে পৌঁছোয়। কিন্তু সেখানেও একই গোলযোগ। সঠিক পরিচয়পত্র না থাকার কারণে এ বিয়ে আইনত সিদ্ধ করা যাবে না।

তার ভাগ্য কী উপহাস করছে ভাবে রাবিয়া। আস্তে আস্তে সব রাস্তাই যেন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে তার সামনে। সেদিন রাতে বাড়িতে তার মায়ের সঙ্গে জোর অশান্তি হল নীরদের। কিছুতেই তিনি এই চালচুলোহীন বেজাতের মেয়েকে মেনে নেবেন না বউ হিসাবে। নীরদের বাবা মারা যাওয়ার পর তিনিই এবাড়ির কর্তৃ। তাঁরই হুকুম চলবে এ বাড়িতে। পরিবারের মানসম্মান রাখতে তিনি ছেলেকে ত্যাজ্য করতেও রাজি।

ভোর রাতে নীরদ এসে ডাকে রাবিয়াকে। বলে, ‘তৈরি হয়ে নাও রাবিয়া। আম্মি আর আজিমকেও বলো, রেডি হয়ে নিতে। আমরা সবাই ডিব্রুগড় যাব। ওখানে আমরা আমাদের কিছু বন্ধুবান্ধবকে সাক্ষী রেখে বিয়ে করব। কোনও ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের দরকার নেই। প্রয়োজন নেই সরকারি শীলমোহরের। আমি যথেষ্ট দায়িত্ববান একজন পুরুষ। আমি কথা দিচ্ছি ভালো রাখব তোমাকে।’

গাল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে রাবিয়ার। কিন্তু সে বিশ্বাস করে নীরদকে। সূর্য উঠতে তখনও কিছু দেরি। কিন্তু পুবের আকাশে লালচে ছোপ। চারজন মানুষ নতুন সম্ভাবনার দিকে পা বাড়ায়। ডিব্রুগড়গামী ট্রেনে জানলার দিকে বাইরে তাকিয়ে রাবিয়া দেখে, একটা লাল টকটকে সূর্য উঠছে। প্রকৃতি তার পরিচয় জানতে চায় না। প্রকৃতির কাছে তার একমাত্র পরিচয়, সে মানুষ।

প্রিয়জন

রাত দুটোর সময় হঠাৎ মোবাইলের শব্দে ধড়ফড় করে উঠে বসল দীপ্ত। ফোনটা হাতে নিয়ে দেখে ছোড়দির কল। ধড়াস করে ওঠে বুকটা, মায়ের কিছু হয়নি তো? না হলে এত রাতে ফোন? কোনওমতে ফোন অন করে বলল,  ‘হ্যা ছোড়দি দীপ বলছি। এত রাতে ফোন করলি? সব ভালো তো?’

ও-প্রান্ত থেকে উত্তর এল, ‘সরি ভাই এতরাতে তোদের ডিস্টার্ব করার জন্য। চিন্তা করিস না, মা-র কিছু হয়নি। তোদের অসুবিধা না থাকলে এক মিনিট কথা বলতে পারব কি?’

ছোড়দি সুপ্রিয়ার কথা বলার ধরন দেখে দীপ আরও ঘাবড়ে গিয়ে বলল, ‘না না অসুবিধা কেন হবে?  বল না কি হয়েছে? এনি প্রবলেম?’

‘শোন তোকে আর তোতলাতো হবে না। মিতার নিশ্চয় ঘুমটা ভেঙে গেছে। ফোনটা স্পিকারে রাখ, তাহলে দুজনেই শুনতে পারবি। এবার শোন আমাদের রুমা এখন বিয়ে করতে চলেছেন। বুঝতে পারছিস রুমা বিয়ে করবে? সম্ভব হলে সামনের মাসেই।’

একটা ছোট্ট হাই তুলতে তুলতে দী৫ বলল, ‘ও… এই কথা, এর জন্য এত রাতে–’

দীপ্তকে তার কথা শেষ করতে না দিয়ে পাশ থেকে ঘুম জড়ানো চোখে, গলায় যথা সম্ভব উদ্বেগ ঢেলে দিয়ে মিতা বলে উঠল, ‘সে কি? তুমি কী করে জানলে ছোড়দিভাই? রুমা কি নিজে বলেছে তোমাকে? ছেলেটা কে? কী করে হল?

‘জানি না রে মিতা। কী করে হল? কবে হল? কিচ্ছু জানি না। কিন্তু এর পর কী হবে তা নিয়ে ভীষণ চিন্তায় আছি।’

‘বড়দি জানেন?’ মিতা জানতে চাইল

‘হ্যাঁ বড়দিই তো আমাকে মেসেজ করে জানাল। আমি তক্ষুনি ফোন করাতে জানলাম তিনি রোগী নিয়ে ব্যস্ত আছেন, পরে কথা বলবেন। তাই তোদের ফোন করলাম। সরি রে তোদের ঘুম নষ্ট করলাম। তোরা শুয়ে পড়। সম্ভব হলে সন্ধে সাতটার পরে ফোন করিস। অলোচনা করে কিছু তো একটা ব্যবস্থা করতে হবে।

দীপ তখনও বুঝতে পারছিল না রাত দুটোর সময় হাজার মাইল দূরে ঘুমিয়ে থাকা ভাইকে ছোড়দি ঘুম থেকে তুলল এই খবরটা দেবার জন্য। এটা তো মেসেজ বা ইমেইল করেও জানাতে পারত। কিংবা দিনের বেলাতেও ফোন করতে পারত। তা না, দিল ঘুমের বারোটা বাজিয়ে। এবার জোর করে একটা হাইকে বুক থেকে টেনে মুখ দিয়ে বের করে দিতে দিতে চোখ বুজে দীপ নিদ্রাদেবীকে আহ্বান জানাল। কিন্তু পেছন থেকে তখনই মিতা একটা ছোট্ট গুঁতো মারল, ‘কি হল ঘুমিয়ে পড়লে? বুঝতে পারছ এবার কী হবে?’

‘না ব্যাপারটা ঠিক বুঝলাম না। তবে রুমা বিয়ে করবে –এই তো? হয়তো কিছু টাকা পয়সা চাইবে। দ্যটস্ ওকে। সি ইজ লাইক আ ফ্যামিলি মেম্বার।’

দী৫ আবার ওপাশ ফিরে শোবার চেষ্টা করতে গিয়ে দেখল অদ্ভুত কায়দায় মিতা শোয়া অবস্থা থেকে তড়াক করে উঠে বসল। দীপ ভাবল জিমটিম গিয়ে মিতা ভীষণ ভাবে ফিট হয়ে গেছে।

কিন্তু দীপ্তকে আর ভাবার সুযোগ না দিয়ে মিতা বলল, ‘সত্যি তোমার বুদ্ধির বলিহারি। তুমি টাকা দিলে আর রুমা বিয়ে করে ড্যাং ড্যাং করে নাচতে নাচতে শ্বশুরবাড়ি চলে গেল। ব্যস তোমার মতে সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। আরে বাবা সমস্যার শুরু তো তখন হবে যখন রুমা তোমাদের বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে।’

অন্ধকার ঘরে দীপ্তর মগজের টিউবলাইট তখন জ্বলে উঠল। তাই তো গত বারো তেরো বছর ধরে রুমা মায়ের কাছে আছে। যখন এসেছিল তখন ওর বয়স বোধহয় বছর তিরিশ হবে। বিয়ের পরে বাচ্চা না হবার জন্য শ্বশুরবাড়িতে অনেক গঞ্জনা সহ্য করতে হচ্ছিল। শেষে আর সহ্য করতে না পেরে মিউচুয়াল ডিভোর্স নিয়ে শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে চলে আসে। দাদা-বৌদির সংসারে হয়তো ঠাঁই হতো কিন্তু সেটা খুব একটা সম্মানের হতো না। তাই মায়ের এক প্রাক্তন সহকর্মীর কাছে খবর পেয়ে মায়ের কাছে কাজের খোঁজে আসে।

মা তার দুবছর আগে শিক্ষকতার চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন। সেই সময় দীপ অনেক কষ্ট করে তার স্বপ্নের দেশ আমেরিকা-তে এসে পৌঁছেছে। বড়দি আর কৃষ্ণনদা তখন তিথিকে নিয়ে বেঙ্গালুরুতে, ছোড়দি আর সমীরদা উত্তরবঙ্গের কোনও এক শহরে। মা শ্রীরামপুরে তার নিজের বাড়িতেই থাকবার কথা জানিয়ে দিয়েছেন। এ রকম অবস্থায় রুমা যখন মায়ের কাছে আশ্রয় চাইল মা তাকে না বলেননি। মনে একটু কিন্তু কিন্তু থাকলেও তারা তিন

ভাই-বোন ব্যাপারটা মেনে নেয় এই ভেবে যে, মায়ের জন্য একটা চবিবশ ঘন্টার কাজের লোক পাওয়া গেল।

রুমা থাকাতে মায়ের যে কত সুবিধা হয়েছে তা দু-বছর পরে দেশের বাড়িতে গিয়ে বুঝল দীপ্ত। দেখল মা সংসারটা রুমার হাতেই ছেড়ে দিয়েছে। রুমা সকাল থেকে সন্ধে অবধি ছুটে বেড়াচ্ছে। সকালে দীপ্তর জন্য ডালপুরি আলুর দম বানাচ্ছে তো দুপুরে মিতার পছন্দের পটলের দোলমা। তারই মধ্যে মায়ের জন্য একাদশীর ফলাহার। দীপ্তর মেয়ে দিঘি যেবার দেশের বাড়িতে গিয়ে ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ল রুমাই তখন রাত বারোটার সময় ওষুধের দোকান খুলিয়ে ওষুধ নিয়ে আসে। রুমা যে কবে কাজের লোক থেকে বাড়ির লোক হয়ে গেল বোঝাই গেল না।

শুধু যে মায়ের সংসারে সে অপরিহার্য হয়ে গেল তা নয়,পাড়া-প্রতিবেশীদের ছোটো খাটো প্রয়োজনেও রুমারই ডাক পড়ে আগে। সামনের বাড়ির মাসিমার টিউবলাইট-টা কাজ করছে না! রুমা দেখে যা তো বাবা, পাশের বাড়ির বউদির বাড়িতে হঠাৎ করে বাপের বাড়ির লোকজন এসেছে– ‘রুমা চট করে মোড়ের দোকান থেকে এগ রোল নিয়ে আয় তো সোনা।’

এ হেন রুমা-কে নিয়ে সুতপা সেনের সংসার ভালোই চলছিল।শুরু শুরু-তে যে ভয় ছিল কোথাও কোনও গন্ডগোল না বাঁধিয়ে বসে রুমা! সেটাও ধীরে ধীরে চলে গেল। এখন হঠাৎ করে চল্লিশোর্ধ রুমা বিয়ে করে চলে গেলে অসুবিধা তো হবেই। মা কার কাছে থাকবে? দিদিরা নিশ্চয়ই দীপ্তকে বলবে না মা-কে নিয়ে এসে নিজের কাছে রাখতে। তাও দু-তিন মাস কোনওমতে হয়তো ম্যানেজ করা যাবে কিন্তু তার বেশি তো কোনও ভাবেই সম্ভব নয়।

হঠাৎ দীপ্তর মাথায় একটা সম্ভাবনা এল। আচ্ছা এমনও তো হতে পারে যে রুমা বিয়ে করে শ্বশুরবাড়ি না গিয়ে ওর স্বামীকে নিয়ে মায়ের কাছে থেকে গেল। তাহলে ওরা দুজনে মিলে মায়ের দেখভাল করতে পারবে। সময়ে অসময়ে একজন পুরুষমানুষ বাড়িতে থাকলে সুবিধাই হয়! প্রয়োজন হলে দীপ না হয় আরেকটু বেশি টাকা পাঠাবে। সমস্যার এমন ভালো সমাধান পেয়ে দীপ শান্তমনে আবার ঘুমের চেষ্টায় চোখ বুজল।

দুই

সুচিত্রা বেশ খুশি মনে তার চেম্বারে ঢুকল। যদিও বেশ টায়ার্ড লাগছে কিন্তু মনটা তার প্রসন্ন। সবাই বলেছিল ওই পঁয়ত্রিশ বছরের রুগ্ন তিন বাচ্চার মা পেশেন্টের সিজারিয়ান সেকশন করতে, কারণ সে একদম পুশ করতে পারছিল না আর বাচ্চাটাও বেশ বড়ো ছিল। সুচিত্রা কিছুটা জেদ করেই ফরসেপস ডেলিভারি করিয়েছে। সি-সেকশনের পরে যেরকম যত্ন নেওয়া উচিত তা এই চার সন্তানের মায়ের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই সে চাইছিল যথা সম্ভব অপারেশনটা না করতে। যাক এখন সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে গেছে। বাচ্চাটা তো প্রায় সাড়ে তিন কিলো ওজনের।

সুচিত্রা অবাক হয়ে ভাবে এত রুগ্ন মায়ের পেটে এত হেল্দি বেবি কী করে হয়? আর তার মতো গাইনিকোলজিস্টকে ইনফারটাইল তকমা নিয়ে থাকতে হয়। যাকগে এই সব আজে বাজে কথা ভেবে সুচিত্রা আজকের এত ভালো দিনটা নষ্ট করবে না। সে তো এখন মা হয়েছে। অ্যাডপ্ট করা হলেও কী হবে, তিথি তো ওকে মা হবার সুযোগ দিয়েছে। নিজের ভালো হওয়া মনটাকে খারাপ হবার সুযোগ না দিয়ে চট করে ঘড়ি দেখে নিয়ে কৃষ্ণনকে মোবাইলে ফোন করল, ‘খাওয়া হয়ে গেছে?’

‘না তোর?’

‘না এক্ষুনি ওটি থেকে বেরোলাম। যে-পেশেন্টটা নিয়ে চিন্তায় ছিলাম ওর ফরসেপস ডেলিভারি করিয়েছি।। মাদার অ্যান্ড বেবি বোথ ওকে, ফিলিং স্যাটিসফায়েড।’

‘তাহলে চলে আয় আমার চেম্বারে, সেলিব্রেট করব।’ হই হই করে কৃষ্ণন বলল।

‘কী করে?’ সুচিত্রা জিজ্ঞেস না করে পারল না।

‘লুচি আর বোঁদে দিয়ে।’

কৃষ্ণনকে নিয়ে এই এক মুশকিল। ও খেতে খুব ভালোবাসে।

যে-কোনও সময় যা খুশি খেতে পারে, তা সে বিরিয়ানি দিয়ে ব্রেকফাস্ট হোক বা লস্যি দিয়ে লাঞ্চ।

চট করে ওটির জামাকাপড় চেঞ্জ করে নিয়ে কৃষ্ণনের চেম্বারে যেতে যেতে সুচিত্রা ঠিক করে ফেলল খাবার পরেই সুপ্রিয়াকে একবার ফোন করে নেবে। কাল রাতে ফোনে মায়ের কাছ থেকে রুমার বিয়ের কথাটা জেনেছিল। সকালে সুপ্রিয়াকে মেসেজ করেছিল। সরাসরি ফোন করেনি কারণ সুপ্রিয়া অল্পতেই নার্ভাস হয়ে যায়। তাই ভেবেছিল মেসেজ পড়ে কিছুটা ধাতস্থ হবার পরে ফোন করবে। কিন্তু সুপ্রিয়া সঙ্গে সঙ্গে ফোন করে এত প্রশ্ন করছিল আর তার সঙ্গে নিজের মন্তব্য ছুড়ে দিচ্ছিল যে সুচিত্রা তার রোগীর অজুহাত দেখিয়ে ওকে কোনওমতে থামাতে বাধ্য হয়। সঙ্গে এটাও প্রমিস করিয়ে নিয়েছিল যে, ও কোনওমতেই মা বা রুমাকে ফোন করে এ ব্যাপারে কোনও আলোচনা করবে না।

কৃষ্ণনের চেম্বারের দরজায় দুবারটোকা দিয়ে ভিতরে ঢুকে দেখল গাল ভরা হাসি নিয়ে কৃষ্ণন টেবিলে পুরি আর বোঁদে সাজিয়ে তারই অপেক্ষায় বসে আছে।

‘তোকে কে বলেছে এগুলো লুচি? এগুলো তো পুরি!’ সুচিত্রা ভ্রু কুঁচকে বলল।

‘লুচি আর পুরি একই হয়। বাংলার জামাই হয়ে লুচিকে আমি পুরি বলব?’

লুচি আর পুরির তর্কে না গিয়ে সুচিত্রা খেতে বসে গেল। তারপর জিজ্ঞেস করল ‘বোঁদে কোত্থেকে পেলি?’

অর্ধ নিমিলিত চোখে লুচি আর বোঁদে চিবোতে চিবোতে কৃষ্ণনের উত্তর, ‘আমার এক পেশেন্ট দিয়ে গেছে। হারনিয়া রিপেয়ার করেছিলাম। কলকাতার পেশেন্ট!’

‘কলকাতা থেকে হারনিয়া অপারেশন করাতে বেঙ্গালুরুতে এল। স্ট্রেঞ্জ, ওখানেই তো করাতে পারত।’ পুরির টুকরো ভেঙে মুখে দিতে দিতে সুচিত্রা বলল, ‘এখানে আসা-যাওয়া, থাকা-খাওয়া, অহেতুক পয়সা খরচ করে কী যে স্যাটিসফ্যাকশন পায় কে জানে?’

কৃষ্ণনের তখন খাওয়া শেষ হয়ে গিয়েছিল। জিজ্ঞেস করল, ‘অ্যাই সত্যি করে বল তো তুই আমার বউ নাকি শত্রু? কলকাতা থেকে পেশেন্ট আসছে, আমি দুটো পয়সা কামাচ্ছি, তা বুঝি তোর সহ্য হচ্ছে না।’ তারপর কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল, ‘আসলে আমার মনে হয় এটা হিউম্যান সাইকোলজি। যেটা হাতের কাছে পাই তার ভ্যালু আমরা বুঝি না। ওরা হয়তো ভাবে সাউথ ইন্ডিয়ান ডাক্তাররা ভালো, আর সেই ডাক্তার যদি বিশাল লম্বা সাউথ ইন্ডিয়ান নাম নিয়ে রোগীর সঙ্গে বাংলায় কথা বলে তাহলে তো আর কথাই নেই।’

কৃষ্ণন হয়তো আরও কিছু বলত কিন্তু তার আগেই ফোন এল– ‘অপারেশন থিয়েটার রেডি’।

চট করে উঠে চেম্বার থেকে বেরোতে বেরোতে বলল, ‘চলি রে, দুটো অপারেশন বাকি আছে। তোর তো বিকেলে চেম্বার নেই আজকে, দ্যাখ যদি সাতটার মধ্যে বাড়ি আসতে পারিস তাহলে দুজনে মিলে একটা সিনেমা দেখা যেতে পারে। আর শোন ভাবছি উইক এন্ডে তিথিকে একবার সারপ্রাইজ ভিজিট দিয়ে আসব। তুই প্ল্যান কর, আমি চলি।’

কৃষ্ণনের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে সুচিত্রা ভাবল– ও সত্যি কত ভালো আছে। বিয়ের আগে সবাই কত ভয় দেখিয়েছিল। অবাঙালি ছেলে, মাছ মাংস খায় না, তার মধ্যে মায়ের একমাত্র ছেলে ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু এখন দেখছে কৃষ্ণনের মতো স্বামী পাওয়া, নিজের গর্ভে জন্ম না দিলেও তিথির মতো মেয়ে পাওয়া, সত্যি ভাগ্যের ব্যাপার কিন্তু তাদের এই লাইফ স্টাইলের সাথে মা কি একটা দিনও মানাতে পারবে? নাকি মা এলে ওরা মা-কে বাড়িতে একা রেখে বাইরে এভাবে সময় কাটাতে পারবে? সকালে প্রিয়া ফোন করে এজাতীয় একটা প্রস্তাব রেখেছিল যেটা সুচিত্রার কাছে সম্পূর্ণ অবাস্তব মনে হয়েছিল।

সুচিত্রার চিন্তার জাল ছিঁড়ে মোবাইলটা বেজে উঠল। দেখল সুপ্রিয়ার কল… ‘হ্যাঁ প্রিয়া বল। না না শোন তুই মাথা গরম করিস না, আমি পরের সপ্তাহে শনিবার কলকাতা যাব। তুইও চলে আয়। তখন বসে কথা হবে। তুই প্লিজ মা বা রুমার সঙ্গে রাগারাগি করিস না। তুই ভাবিস না। আমি দীপ্তর সঙ্গে কথা বলে নিচ্ছি। আমি বুঝি রে তুই কত ব্যস্ত। তাহলে এখন রাখি? ভালো থাকিস।’

তিন

সুপ্রিয়ার কাজের অন্ত নেই। সকাল আটটার মধ্যে দশ বছরের যমজ দুই ছেলেকে তৈরি করে স্কুল পাঠাও। তার মধ্যে বেড টি নিয়ে ছেলেদের বাবাকে ঘুম থেকে তোলো। তারপর নিজে তৈরি হয়ে কোনওমতে নাকে মুখে খাবার গুঁজে সময়মতো কলেজ পৌঁছাও। ভাগ্য ভালো তার রান্নার মাসিটা খুব ভালো পেয়েছে। সে বেশ সকাল সকাল চলে আসে বলে সুপ্রিয়া রক্ষা পেয়েছে। কামাইও করে না। তবে সুপ্রিয়াও মাসিকে যথেষ্ট তোয়াজ করে রাখে। শনিবার আধা বেলা আর রবিবার তো ওর পুরো ছুটি!

শাশুড়ি মায়ের সকালের চা থেকে শুরু করে খাবার-দাবার সব তো মাসিই করে দেয়। উনি তো আমিষের ছোঁয়া খাবেন না, তাই মাসি আগে নিরামিষ রান্না করে তার পর আমিষ রান্নাগুলো করে। এর জন্য সুপ্রিয়াকে দুটো গ্যাস আভেন রাখতে হয়েছে। তারই মধ্যে ছেলে দুটো কখনও কখনও রান্না ঘরে ঢুকে কী রান্না হয়েছে দেখতে গিয়ে ছোঁয়াছুঁয়ি করে ফেলল তো আর দেখতে হবে না। বাড়িতে তুলকালাম কান্ড বেধে যাবে, আর সব দোষ সুপ্রিয়ার উপর পড়বে। কী যে জ্বালা! আর এখন এই ডামাডোলের মধ্যে মা-কে নিয়ে চিন্তা করতে হচ্ছে।

রুমা এখন বিয়াল্লিশ-তেতাল্লিশ বছর বয়সে ধেই ধেই করে নাচতে নাচতে বিয়ে করতে চলল। রুমা না থাকলে মায়ের পুরো দায়িত্ব সুপ্রিয়ার ঘাড়ে এসে পড়বে। হাতের কাছে তো সেই আছে। মাকে যে এখানে এনে রাখবে তারও উপায় নেই। শাশুড়িমা তার নিয়মের বেড়াজালে সংসারটাকে এমন করে বেঁধে রেখেছেন যে সুপ্রিয়ারই দমবন্ধ লাগে।

মঙ্গল আর শুক্রবারে কোনও পোড়া খেতে নেই তো বৃহস্পতি ও শনিবারে আমিষ খেতে নেই। এইমাসে লাউ খেতে নেই তো ওই মাসে কুমড়ো খেতে নেই।। আজকে সবার মাথায় তেল লাগাও তো কালকে গায়ে হলুদ লাগাও। শুরু শুরুতে তো পাগল পাগল লাগত। এখন সময়ের সাথে সবকিছু মানিয়ে নিয়েছে!

শাশুড়িমায়ের নিয়ম আছে তো সুপ্রিয়ার কাছে তার সহজ উপায় আছে। যেমন তেল বা হলুদ গোলা জল বাথরুমে রাখাই থাকে। প্রয়োজনে কপালে এক ফোঁটা ঘষে নিলেই হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও মাঝেমধ্যে খটাখটি লাগে। শাশুড়িমায়ের বদ্ধমূল ধারণা, মায়ের প্ররোচনায় দিদি আর কৃষ্ণনদা তাদের ব্যাচমেট সমীরের ঘাড়ে সুপ্রিয়াকে চাপিয়ে দিয়েছে। যদিও সমীর প্রায় দুবছর রীতিমতো সুপ্রিয়ার সঙ্গে কোর্টশিপ করার পর তার মায়ের অনুমতি নিয়ে বিয়ে করেছে। কিন্তু কে কাকে বোঝাবে?

সমীরকে বলে লাভ নেই। সে তার চাকরি নিয়ে সব সময় এত টেনশনে থাকে যে সুপ্রিয়া ওকে আর সংসারের অসুবিধার কথা বলে ব্যতিব্যস্ত করতে চায় না। দুবছর আগে পাওয়া কলেজের এই লেকচারারের চাকরিটা সুপ্রিয়া-কে বাঁচিয়ে দিয়েছে। বাড়ি থেকে কলেজটা একটু দূরে বলে যাতায়াতের সময়টা বেশি লাগে কিন্তু সেই সময়টাই ওর একান্ত নিজস্ব। ওই সময়টায় ও নিজের মনের সঙ্গে অনেক কথা বলে। কল্পনায় কখনও একা কখনও বা সমীরের আর ছেলেদের সঙ্গে দুরে কোথাও বেড়াতে চলে যায়। এমন কোনও জায়গা যেখানে কোনও সমস্যা নেই কোনও অভিযোগ অনুযোগ নেই। যেখানে মন খুলে হাসা যায়, গান গাওয়া যায়। সুপ্রিয়া জানে না, সেদিন সত্যি তার জীবনে আসবে কিনা।

চার

আজ সকাল থেকে বাড়িতে বেশ হইচই লেগেছে। সুতপা গত এক সপ্তাহ থেকে অপেক্ষায় ছিল এই দিনটার জন্য। গত সপ্তাহে তার তিন ছেলেমেয়ে জানাল– ওরা আসবে সব একসাথে। চিত্রা আর প্রিয়া-রা দুদিন থেকে চলে যাবে, তবে দীপ্ত, বৗমা আর নাতনিকে নিয়ে এক সপ্তাহ থাকবে। তারপর ওরা মুম্বই-এ দিঘির মামার বাড়িতে কয়েকদিন থেকে আমেরিকা ফেরত যাবে।

সুতপা ভালো করেই বুঝতে পারছে ওরা কেন আসছে! তাহলেও খুব ভালো লাগছে সবাইকে একসাথে দেখতে পাবে বলে। দীপ্তরা কাল রাতেই এসে পৌঁছেছে। কিন্তু অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল বলে ভালো করে কথা হয়নি। তবে দী৫ আজ কাকভোরে উঠেই চলে এসেছে মায়ের ঘরে। মায়ের খাটে মশারির মধ্যে ঢুকে বাবু হয়ে বসে কত যে বকবক করল তার ঠিক নেই। এরই মধ্যে তাদের কথাবার্তার আওয়াজ পেয়ে রুমা চা বানিয়ে নিয়ে এসেছিল। দীপ্তর জোরাজুারিতে সুতপাকে দাঁত না মেজেই চা খেতে হল খাটে বসে। এতে নাকি চায়ের আসল স্বাদ পাওয়া যায়।

আসলে সুতপার মনে হল বাকি সবাই এসে যাবার আগেই দী৫ সুতপার সঙ্গে সময় কাটাতে চাইছিল। সুতপার সেই ছোটোবেলার দীপ্তকে মনে পড়ে যায়। সবসময় মায়ের সঙ্গে লেগে লেগে থাকত। বড়ো হবার পর সেটা কমলেও সব সময় ও সুতপার দিকে নজর রাখত। ওদের বাবা মারা যাবার পর তো আরও বেশি করে। মা সময়মতো খাচ্ছে কিনা, শরীরের খেয়াল রাখছে কিনা। চোখ দেখিয়ে চশমার পাওয়ার চেঞ্জ করা হয়েছে কিনা! এমনকী পুজোতে মায়ের কটা নতুন শাড়ি হল তাও খেয়াল রাখত।

সুতপার জীবনগাছের দী৫ ছিল এক বলিষ্ঠ ডাল। তারপর সেই ডাল আমেরিকায় গিয়ে নিজে গাছ হয়ে গেছে। শুধু কি দী৫ নাকি, চিত্রা, প্রিয়া সবাই এক একটা গাছ হয়ে নিজেদের সংসারের মাটিতে শিকড় ছড়িয়ে দিয়েছে। সত্যি সুতপার ভাবতে খুব ভালো লাগে যে, তার তিন ছেলে মেয়ে সবাই জীবনে সুপ্রতিষ্ঠ। অজান্তে তার দৃষ্টি চলে গেল দেয়ালে বড়ো ফ্রেমে টাঙানো গৗতমের ছবির দিকে।

ব্যাংকে সামান্য চাকরি করা গৌতমের এক মাত্র লক্ষ্য ছিল তিন ছেলে মেয়েকে মানুষ করা। সংসারের একটু স্বাচ্ছল্য বাড়াবার জন্য সুতপা স্কুলে চাকরি নিয়েছিল। সুতপার মনে আছে সিনেমাপাগল গৗতম তার সন্তানদের নাম সিনেমার তারকাদের নামে রাখতে চেয়েছিল। দুই মেয়ের পরে ছেলের নামের সময় সুতপা বেঁকে বসেছিল শুভেন্দু নয় সুদীপ্ত রাখতে হবে।

হঠাৎ ড্রয়িংরুম থেকে হা হা করে হাসির শব্দ সুতপার ভাবনাটাকে উড়িয়ে নিয়ে চলে গেল। তার মুখেও একটা ছোট্ট হাসি খেলে গেল। সকালে বিছানায় বসে দীপ্তর সঙ্গে গল্প করার মধ্যেই প্রিয়া আর সমীর দুই ছেলে-সহ চলে এসেছিল। আর কিছুক্ষণের মধ্যে বোধহয় চিত্রারাও চলে আসবে। আবার জোর হাসির আওয়াজ এল, সঙ্গে সঙ্গে প্রিয়ার গলা ‘মা, মা তুমি এখানে এসো তো, এরা সবাই আমাকে যা তা বলছে তখন থেকে।’

ড্রয়িংরুমে যাবার বদলে সুতপা রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল। তার তিন ছেলেমেয়ের মধ্যে প্রিয়া চলনে বলনে অনেকটা ওদের বাবার মতো ছিল। গান গাইত ভালো, সিনেমার পোকা ছিল, ছবি-টবিও অাঁকত। চিত্রা আর প্রিয়া প্রায় পিঠোপিঠি বোন হলেও চিত্রা অনেক বেশি যত্ন পেয়েছে। চিত্রা ছিল চুপচাপ শান্ত গোছের, প্রিয়া ছিল তার উলটো। সংসার নিয়ে প্রিয়া এত ব্যস্ত থাকে যে সুতপা জানে না– ও গান গাইবার বা সিনেমা দেখার সুযোগ পায় কিনা।

‘ও ঠাম্মা তুমি এখানে কী করছ? চলো না সবাই তোমাকে ও ঘরে ডাকছে’ দিঘি সুতপার হাত ধরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে জিজ্ঞেস করল।

দিঘির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে সুতপা বললেন, ‘একটু কাজ আছে, তুমি যাও আমি আসছি।’

‘না তোমাকে এখনই যেতে হবে।’ দুপাশ থেকে দুই নাতি বাবুন আর টাবুন একরকম টানতে টানতে ড্রয়িংরুমে নিয়ে এল।

‘দেখলে তো কেমন পেয়াদা পাঠিয়ে তোমাকে ধরে আনলাম’ প্রিয়া বলল।

‘না রে জলখাবারের ব্যবস্থা করতে হবে তো, তাই রান্নাঘরে গিয়েছিলাম’ সুতপা জবাবদিহি করতে গেলেন।

‘ব্রেকফাস্ট তো সিঙারা জিলিপি দিয়ে হবে। দিদি আর কৃষ্ণনদা এই এল বলে ওগুলো নিয়ে। এয়ারপোর্টে নেমেই কৃষ্ণনদা জানতে চাইলেন, আমরা এরকম ব্রেকফাস্টে রাজি আছি কিনা, অ্যান্ড উই অল এগ্রিড।’

‘তা হলে বাচ্চাগুলো?’ সুতপা মিতার দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলেন।

‘ওরাও তাই খাবে’ মিতা জবাব দেবার আগেই সুপ্রিয়া তড়বড়িয়ে বলে উঠল।

‘আপনি চিন্তা করবেন না মা। আমি ইউএস থেকে ওট্‌স আর কর্নফ্লেক্সের প্যাকেট নিয়ে এসেছি, দিঘির সঙ্গে বাবুন টাবুনরাও খেতে পারে’ সেটা মিতা মিষ্টি করে জানিয়ে দিল তারপর সুপ্রিয়ার ভুরু কুঁচকানো গম্ভীর মুখের দিকে এক ঝলক দেখে নিয়ে বলল, ‘আসলে দিঘির পেটে তো সব কিছু সহ্য হয় না, তাই আমাকে ব্যবস্থা রাখতেই হয়।

ড্রয়িংরুমের আবহাওয়াটা একটু যেন থমথমে হয়ে গেল। কিন্তু পর মুহূর্তেই গেটের বাইরে থেকে কৃষ্ণনের আওয়াজ এল ‘ওরে গৃহবাসী, খোল দ্বার খোল’ পাশ থেকে চিত্রার ধমক– ‘চ্যাঁচাস না, পুরো পাড়া দরজা খুলে তোকে তাড়া করবে।’

পাঁচ

দুপুরে খাওয়ার সময় আরেক চোট জমাটিয়া আড্ডা হল। তারপর সুপ্রিয়া ঘোষণা করল ‘অনেক গল্প হয়েছে এবার কাজের কথায় আসা যাক। তোমরা ভুলে যেও না যে তোমরা কলেজ রি-ইউনিয়নে আসোনি বরং একটা পারিবারিক সমস্যার সমাধানের খোঁজে এসেছ। সুতরাং বাচ্চারা বাদে সবাই বসবার ঘরে গিয়ে বসো, আমি বাবুন টাবুনকে ওদের হোমওয়ার্ক করতে বসিয়ে আসছি। রুমা তুই তোর কোনও কাজ থাকলে তাড়াতাড়ি সেরে নে। আমরা তোর সঙ্গেও কথা বলতে চাই।’

দুই ছেলেকে সুপ্রিয়া সুতপার ঘরে পড়তে বসিয়ে দরজা বাইরে থেকে ভেজিয়ে দিয়ে ড্রয়িংরুমে এসে দেখল সবাই আবার গল্পে মেতেছে। মা শুধু সকালের খবরের কাগজটা চোখের সামনে ধরে পড়বার চেষ্টা করছেন। ওরা সবাই জানে মায়ের চোখের অসুখের কথা। দুবার অপারেশন করিয়েও কোনও লাভ হয়নি। ভালো করে দেখতে পায় না আর সেই জন্যেই তো সুপ্রিয়ার অত চিন্তা হয় মাকে নিয়ে।

সুপ্রিয়াকে দেখে সবাই নড়ে চড়ে বসল। এর মধ্যে রুমাও শাড়ির অাঁচলে হাত মুছতে মুছতে মায়ের পাশে মাথা নিচু করে বসল। কেউ কিছু বলছে না দেখে সুপ্রিয়াই শুরু করল– রুমা আমরা শুনলাম তুই নাকি বিয়ে করবি। এটা কি সত্যি?

রুমা ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বলাতেও আবার জিজ্ঞেস করল– ছেলেটা কে? কী করে? তোরা কবে এসব ঠিকা করলি?

রুমাকে কিছু বলতে না দিয়ে সুতপাদেবী মুখ খুললেন, ‘ছেলেটাকে আমি দেখেছি। ভালো ছেলে। আগে অটোরিক্সা চালাত এখন টোটো চালায়। রুমাকে ভালোই রাখবে।’

সুপ্রিয়া প্রায় অাঁতকে উঠল– রিক্সাওয়ালা? মানে ভাড়াতে চালায়? কী করে চিনলি ওকে? আই মিন বিয়ের ব্যাপার তো তাই জিজ্ঞেস করছি। এসব সিদ্ধান্ত ভালো করে ভেবে চিন্তে নেওয়া উচিত।

এবারেও সুতপা রুমার হয়ে উত্তর দিলেন– রিক্সা নয় অটোরিক্সা চালাত, এখন টোটো চালায়। কাছেই থাকে। ওর মা এক সময় এ বাড়িতে কাজও করেছে। তোরা হয়তো কখনও দেখেও থাকতে পারিস।

‘তার মানে রুমার উড বি মাদার ইন ল ইজ এ ঠিকে ঝি, অ্যান্ড সি ইউজড টু ওয়ার্ক ইন দিস হাউস। আই হোপ দিস ইজ নট এ প্ল্যান টু গেট সাম ফিন্যান্সশিয়াল বেনিফিট’ মিতা ইচ্ছে করে ইংরেজিতে কথাগুলো বলল যাতে রুমা বুঝতে না পারে। তারপর রুমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বলল, ‘রুমা আমরা সবাই তোমার ভালো চাই, তাই বার বার বলছি তুমি সবদিক দেখে শুনে ভালো ভাবে চিন্তা ভাবনা করে ডিসিশন নিও, বিয়ের ব্যাপারে তাড়াহুড়ো কোরো না।’

দ্যাখো তুমি এখানে যেভাবে আছো একজন অটোরিক্সাওয়ালাকে বিয়ে করে তার বাড়িতে কি তুমি সেভাবে থাকতে পারবে? হয়তো কোনও কারণে তোমার তাকে এখন ভালো লাগছে কিন্তু যখন দেখবে সংসারে অভাব অনটন আসছে তখন এই ভালোবাসা মনের জানলা দিয়ে উড়ে যাবে, পড়ে থাকবে শুধু শরীরটা। তুমি একবার কষ্ট পেয়েছ জীবনে, তাই আমরা চাই না আবার সেরকম কিছু স্লকটা হোক।’

নিজের বক্তব্য শেষ করে মিতা দেখল সবাই ওর দিকে তাকিয়ে আছে তারিফের দৃষ্টিতে! ব্যতিক্রম একমাত্র মা আর রুমা। মিতার কথার পিঠে কথা বসিয়ে সুচিত্রাও রুমাকে বোঝাবার চেষ্টা করল, ‘মিতার কথা আমিও মানছি। আমি এত পেশেন্ট দেখি তো, সব জায়গায় একই ব্যাপার। ছেলেরা বউ-এর কাছ থেকে শরীর, সন্তান আর সেবা এটাই আশা করে। বিনিময়ে মেয়েরা কি সেভাবে আদৗ কিছু পায় স্বামীর কাছ থেকে? রুমা ভালো করে ভেবে নিয়ে বিয়ে করিস বাবা।’

‘যা বাবা হঠাৎ করে আমাদের পেছনে পড়লি কেন চিত্রা? এবার তো আমার বউ আমার উদাহরণ দিয়ে সমস্ত পুরুষজাতিকে তুলোধনা করবে’ সমীর সুচিত্রাকে কথার খোঁচা দিল। তোমার বউ পাগল নয় যে কাজের কথা থেকে সরে গিয়ে অন্য কথা বলে সময় নষ্ট করবে! সুপ্রিয়া সমীরের পাশ থেকে উঠে এসে রুমার পেছনে দাঁড়িয়ে ওর পিঠে হাত রেখে বলল, ‘রুমা তুই প্রাক্টিক্যালি ভাবার চেষ্টা কর –একজন অটোরিক্সাওয়ালা এত বছর বিয়ে না করে এখন একজন তেতাল্লিশ বছর বয়সি মহিলাকে বিয়ে করতে চাইছে কেন? শুনলাম তোর

দাদা-বউদিরও নাকি মত নেই এ বিয়েতে। তাহলে তুই বিয়েটা করছিস কেন?’

রুমা সবার দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ওদেরকে একবার বোঝাবার শেষ চেষ্টা করল, ‘যতিন টোটো আর ভাড়াতে চালায় না। গত মাসে ওটা ও কিনে নিয়েছে। আর বাড়িতে খালি ওর মা আছে। আমার কাজ করা নিয়েও যতিনের কোনও আপত্তি নেই। দাদা-বউদির থেকে মাসিমাই আমাকে ভালো বোঝেন, তাই বলছিলাম’ রুমার কথা শেষ করতে না দিয়েই সুচিত্রা বলে উঠল, ‘তাহলে তুই মায়ের কাজ ছাড়বি না তো? বাবা বাঁচালি।’

দেখা গেল যারা এতক্ষণ রুমার বিয়ে নিয়ে চিন্তিত ছিল তাদের চিন্তার বিষয় হঠাৎ করে বদলে গেল। কৃষ্ণন সুচিত্রাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘বাট সি হ্যাজ নট সেইড দ্যাট। ডিড সি সে দ্যাট সি উইল ওয়ার্ক হিয়ার?’ তারপর রুমার দিকে সরাসরি তাকিয়ে জানতে চাইল, ‘বিয়ের পরেও কি তুমি তোমার মাসিমার কাছে থেকে তার সুবিধা অসুবিধার খেয়াল রাখতে পারবে রুমা?’

‘দ্যাট ইজ পসিবল ওনলি ইফ সি লিভস্ ইন দিস হাউস অ্যান্ড দ্যাট অলসো উইথ হার হ্যাজবেন্ড’ দীপ তার মনের কথাটা বলে দিল।

‘আর যতিনের মা? তিনি কি তার ছেলেকে ছেড়ে দেবেন। তিনিও সবার সঙ্গে চলে আসবেন। রিক্সাওয়ালা হোক বা ডাক্তার,বাঙালি মায়েরা ছেলেদের তাদের মুঠো ছাড়া করেন না। তারপর যিনি ছিলেন বাড়ির ঝি তিনিই হয়ে যাবেন মালকিন, আর আমার মা হয়তো তখন বাড়ির ঠিকে ঝির কাজটা করবে।’ সুপ্রিয়া রাগের বশে কথাগুলো বলে ফেলে বুঝতে পারল কাজটা ঠিক করেনি কারণ ততক্ষণে জলভরা চোখ নিয়ে রুমা দৗড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেছে!

কোনওমতে পিরস্থিতি সামাল দিতে সমীর বলল, ‘আচ্ছা আমরা তো যতিনের সঙ্গে কথা বলে দেখতে পারি। এমনও তো হতে পারে সকালে এসে সারাদিন এখানে থেকে রুমা রাতে যতিনের বাড়ি চলে গেল। মায়ের কাছে রাতে থাকার জন্য আমরা কোনও আয়ার ব্যাবস্থা করে দেব। অথবা রুমার বদলে অন্য কোনও চবিবশ ঘন্টার কাজের লোকও খোঁজা যেতে পারে।’

কিন্তু আমরা যদি রুমার সঙ্গে যতিনকেও এখানে রাখতে পারতাম তাহলে কিন্তু আমাদেরই সুবিধা হতো। রাত-বিরেতে বাড়িতে একজন পুরুষমানুষ থাকলে সুবিধাই হয়।’ দী৫ আরেকবার নিজের মতটা সবার ওপর চাপিয়ে দেবার চেষ্টা করল।

‘দী৫ ব্যাপারটা বোঝবার চেষ্টা কর। যতিন একটা রিক্সাওয়ালা সরি টোটো-রিক্সাওয়ালা। তাকে বাড়িতে রাখাটা মোটেই প্রেস্টিজিয়াস নয়। ও এখানে থাকলে দুদিন পরে ওর লেভেলের বন্ধু-বান্ধবরাও এখানে আসা যাওয়া করবে। তুই কি মনে করিস আমাদের এই সফিস্টিকেটেড পাড়াতে লোকে সেটা অ্যালাউ করবে? যেখানে সবার বাড়ির সামনে দামি-দামি গাড়ি থাকে সেখানে আমাদের বাড়ির সামনে টোটো দাঁড়িয়ে থাকবে। ‘উফ্ আমি আর ভাবতে পারছি না।’ সুপ্রিয়ার গলায় হতাশার ছোঁয়া যেন। সে কোনও মতেই রুমার বিয়ে মানতে পারছে না।’

সুতপার শরীরটা কেমন যেন করছিল। কোনওমতে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আমার তো দুপরে খাবার পর একটু শোবার অভ্যাস, তোরা কথা-বার্তা বল, আমি ও-ঘরে গিয়ে একটু বিশ্রাম নিই।’ নিজের ঘরে গিয়ে দেখলেন তছনছ অবস্থা। নাতিদের বইপত্র, বিছানার বালিশ, চাদর সব মাটিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। তোশকটা খাট থেকে অর্ধেক ঝুলে আছে আর খাটের ওপর বাবুন টাবুন মারামারি করছে। দরজা বন্ধ করে কোনওমতে গেস্টরুমে এসে দিঘির পাশেই শুয়ে পড়লেন। চোখ বুজে শুয়ে পড়লেও ঘুমাতে পারলেন না কারণ তখন ড্রয়িংরুমে জোর চ্যাঁচামেচি চলছে।

সুপ্রিয়া বলছে, ‘দ্যাখ দিদি, বাবা মারা যাবার পর মায়ের যখন দরকার ছিল কাউকে নিজের পাশে পাবার, তখন তুই বা দী৫ কেউ মায়ের কথা ভাবিসনি। তোরা কি পারতিস না এখানে সেটল করতে? তা না তোরা রওনা দিলি দক্ষিণ ভারতে, ফর ব্রাইটার ফিউচার। নার্সিংহোম তো এখানেও করতে পারতিস কিন্তু করিসনি জাস্ট টু অ্যাভয়েড রেসপন্সিবিলিটিজ।’

সুচিত্রার উত্তর যেন তৈরি ছিল, বলল, ‘সেকি কিছুক্ষণ আগে তুই বললি না যে বাঙালি মায়েরা ছেলেদের হাতের মুঠোর মধ্যে রাখে। ছেলেদের সংসারের মালকিন হয়ে থাকে, তাহলে মায়ের রেসপন্সিবিলিটি তো দীপ্তর নেওয়া উচিত। দীপ এখানে থাকতে পারত অথবা মা ইউএস চলে যেতে পারত ছেলেকে মুঠোর মধ্যে নিয়ে।’ দী৫ চুপ করে বসে রইল, তারপর লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে বলল, কলকাতা ছেড়ে আমরা চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলাম তিথির জন্য। ওকে অ্যাডপ্ট করার পাঁচ বছর পরেও কোথাও দেখা হলেই চেনা পরিচিত লোকজনেরা বলত, এই বুঝি আপনাদের দত্তক নেওয়া মেয়ে। বেশ ভালো রেখেছেন তো। কোথা থেকে নিয়েছিলেন যেন। মা বাবার কোনও খোঁজ পেয়েছেন কি? ইত্যাদি ইত্যাদি। তিথি তখন বুঝতে শিখেছিল, দুঃখ পেত। আমাদের মনে হয়েছিল দূরে কোথাও চলে যাওয়াটাই ভালো।’

‘ঠিক আছে তখন প্রবলেম ছিল চলে গেছিস এখন তো তিথি দিল্লিতে হস্টেলে আছে। কৃষ্ণনদার মাও বেঁচে নেই, যে ওনার অজুহাত দেখাবি। তোরা তাহলে এখন ওখানকার পাঠ চুকিয়ে কলকাতা চলে আয়। যেখানে পড়াশোনা করলি সেখানকার লোকেদেরও কিছু সেবা যত্ন কর সঙ্গে সঙ্গে মায়ের খেয়ালও রাখতে পারবি!’ সুপ্রিয়া স্লকপ্রকার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিল সুচিত্রা আর কৃষ্ণনের দিকে।

‘যেটা হয় না তা নিয়ে তর্ক করিস না ছোড়দি।’ দীপ সুপ্রিয়াকে থামাবার চেষ্টা করে।

‘তুই তো দিদির পক্ষ নিয়ে কথা বলবিই ভাই। দিদি যদি সাউথ ইন্ডিয়ায় গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরছে তাহলে তুই তো আরেক কাঠি ওপরে– আমেরিকায় মহানন্দে বিরাজমান এনআরআই। তোরা সব দায়িত্ব আমার ঘাড়ে চাপিয়ে যে যার মতো নিজেদের লাইফ এনজয় করছিস।’

সুচিত্রা এবার প্রায় চেঁচিয়ে উঠে ধমক দিল সুপ্রিয়াকে, ‘তুই চুপ করবি প্রিয়া? তখন থেকে খালি ঝগড়া করছিস। তুই এমন কী করেছিস যে তখন থেকে আমাদের দোষারোপ করে যাচ্ছিস।

‘করিনি আমি? মায়ের চোখ অপারেশন গত দুবছরে দুবার হল। কে এসে থাকল মায়ের কাছে? এ বছর যখন ভাইরাল ইনফেকশন থেকে মায়ের মারাত্মক জ্বর হল, কাকে দৗড়ে আসতে হল? আমেরিকার সাহেব টাকা পাঠিয়ে দিয়ে বললেন– ভালো নার্সিংহোমে ভর্তি কর আর বেঙ্গালুরুর ম্যাডাম দিনে দুবার ফোন করে জ্ঞান বিতরণ করলেন। সুপ্রিয়া কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেলল। তোরা সব বড়ো বড়ো ডিগ্রি নিয়ে নিজেদের ফিউচার ভালো থেকে আরও ভালো করার জন্য দৗড়োচ্ছিস আর আমি সকাল থেকে রাত অবধি দৗড়ে মরছি তোদের খুশি করার জন্য। আমি আর পারছি না।

হঠাৎ করে পুরো বাড়িটা যেন ভীষণ ভাবে নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পরে কৃষ্ণন বলল, ‘একটু চা খেলে বোধহয় ভালো হতো, কি বলিস সমীর?

সুচিত্রা উঠতে যাচ্ছিল চায়ের বন্দোবস্ত করতে, কিন্তু মিতা বলল, ‘তুমি বসো বড়দিভাই। আমি চায়ের ব্যবস্থা করছি।’

তারপর ঘর থেকে বেরোবার আগে থমকে দাঁড়িয়ে সবার দিকে ঘুরে প্রায় ফিসফিস করে বলল, ‘জাস্ট ইট কেম টু মাই মাইন্ড।’ এ বছরের শুরুতে রুমা একদিনের জন্য কোনও হসপিটালে বা নার্সিংহোমে ভর্তি হয়েছিল না? একটু চিন্তা করে সুচিত্রা বলল, ‘হ্যাঁ ভাইরাল গ্যাসট্রোএনটেরাইটিস হয়ে ডিহাইড্রেশন হয়েছিল। স্যালাইন নিতে হয়েছিল। কিন্তু কেন জানতে চাইছিস এসব এখন?’

‘সত্যি কি তাই হয়েছিল, নাকি প্রেগনেন্সি টারমিনেশন? ইউ নেভার নো।’

হংসীনির মতো গ্রিবা উঁচু করে মিতা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সবার মনে এক সন্দেহের কাটা গুঁজে দিয়ে।

ছয়

তিন মাস পরে দীপ একটা ইমেইল পেল সুতপার কাছ থেকে। চোখের অসুবিধাটা বাড়াবাড়ি হবার আগে মা নিয়মিত কম্পিউটার ব্যবহার করতেন। ইদানীংকালে সেভাবে না হলেও মাঝেমধ্যে মায়ের ইমেইল পায় সে আর তাছাড়াও মাসে দুবার করে ভিডিও চ্যাটও করে। তাই ইমেইলটা পেয়ে সে মোটেই অবাক হয়নি। কিন্তু সকালে কাজের তাড়া থাকায় সেটা পড়ে উঠতে পারেনি। সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরে ইমেইল খুলে দেখল মায়ের হাতে লেখা একটা চিঠি অ্যাটাচড করে পাঠানো হয়েছে।

চিঠিতে মা লিখেছেন–

আমার প্রিয়জনেরা,

আশাকরি তোমরা সবাই ভালো আছো। আমি ইমেইলটা দীপ্তকে পাঠাচ্ছি আর আশা করব এটা পড়বার পর দীপ চিত্রা ও প্রিয়াকে পাঠিয়ে দেবে। তোমরা হয়তো ভাববে মা ফোন না করে কেন চিঠি লিখছে। কারণ আমি সেকেলে মানুষ। মনের দ্বিধা সরিয়ে সব কথা চিঠিতে যেভাবে লেখা যায় তা বোধহয় ভিডিও চ্যাট বা ফোনে হয় না।

আসলে একটা খবর দেবার জন্য তোমাদের বিরক্ত করছি। আমি আর আধ ঘন্টার মধ্যে এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছি। ভয় পেও না, নিরুদ্দেশে যাত্রা করছি না। বরং রুমা আর যতিনের সঙ্গে ওদের বাড়িতে থাকতে যাচ্ছি। যতিনের মায়ের কোনও আপত্তি নেই ছেলের বউ-এর সঙ্গে তার মাসিমাকেও বাড়িতে আশ্রয় দিতে। আমি রুমাকে বলেছিলাম– ওদের দেড় খানা ঘরের বাড়িতে আমাকে নিয়ে গেলে অসুবিধা হবে, কিন্তু ওরা শুনল না।

যতিন বারাসতের দিকে একটা জমি দেখেছে। পাকা বাড়ি বানাবার জন্য। আমি বলেছিলাম কিনে দিই, কিন্তু ও কিছুতেই আমাকে কিনতে দিল না। ছেলেটার আত্মসম্মান বোধটা প্রবল, তাই আমি জোর করিনি। যতিনের এ বাড়িতে ইন্টারনেট নেই তাই আর ইমেইল করতে পারব না যদি না দোকানে গিয়ে করি। সেইজন্য ভাবলাম কাজের কথা এখনই সেরে নিই।

একটা উইল এর কপি পাঠালাম। বাড়িটা তোমাদের তিনজনের নামে করে দিয়েছি। পাড়ার অনেকেই কিনতে ইচ্ছুক। বিক্রি করে তোমরা টাকাটা ভাগ করে নিও অথবা কোনও আশ্রমে দান করে দিও। আমার মোবাইলটা সঙ্গে আছে, যখন খুশি কথা বলতে পারো আমার সঙ্গে।

তোমাদের মা তোমাদেরই আছে খালি আমার নতুন ঠিকানাটা তোমাদের জানালাম না। তোমরা এখানে এলে ওরা অস্বস্তিতে পড়বে আর তোমাদেরও হয়তো ভালো লাগবে না। কিন্তু আমি জানি, আমি সত্যি ভালো থাকব ওদের সাথে!

ওহো তোমাদের আসল কথাটা জানাতে তো ভুলেই গেলাম। গত রবিবার যতিন আর রুমার বিয়ে দিয়েছি আমরা। তোমাদের কাছ থেকে নব বরবধুর জন্য আশীর্বাদ কামনা করি।

ইতি

তোমাদের মা–

ইমেইলটা পড়ে দীপ স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে।

পেটের অসুখ এবং সঠিক চিকিৎসা

প্রবাদ আছে– যার পেট ভালো, তার সব ভালো। যারা পেটের অসুখে ভুগেছেন অথবা ভুগছেন, তারা অন্তত এই প্রবাদের যথার্থতা উপলব্ধি করতে পেরেছেন। আসলে, শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ভালোমন্দ অনেকটাই নির্ভর করে পেটের সুস্থতার উপর। একটু ভালো ভাবে নজর রাখলে প্রমাণ পাবেন, মাথার চুল পড়ে যাওয়া এবং ত্বকের জৗলুস হারিয়ে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হল ওই পেটের অসুখ। তবে শুধু চুল পড়া কিংবা ত্বকের সমস্যাই নয়, পেপটিক আলসার কিংবা লিভার ক্যানসারের মতো বড়ো অসুখগুলির সূত্রপাতও কিন্তু নিয়মিত হজমের গোলমাল কিংবা অ্যাসিডিটি থেকে। অতএব, পেটের সুস্থতা জরুরি। কীভাবে পেট ভালো রাখবেন, সেই বিষয়ে একগুচ্ছ গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিলেন ডা. সঞ্জয় মণ্ডল।

প্রতিদিন সকালে অ্যান্টাসিড খাওয়া কি পাকযন্ত্রের পক্ষে ভালো?

বিনা প্রয়োজনে ওষুধ খাওয়া উচিত নয়। কেবলমাত্র সেই সমস্ত মানুষেরই ওষুধ খাওয়া উচিত, যাদের শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। এই বিষয়টি অ্যান্টাসিড গ্রহণের ক্ষেত্রেও সমান ভাবে প্রযোজ্য। নিয়মিত কখনওই অ্যান্টাসিড খাওয়া উচিত নয়।

একজন ডায়াবেটিক রোগী কীভাবে তাঁর পরিপাক সম্পর্কিত বিষয়গুলিকে বিবেচনা করবেন?

একজন ডায়াবেটিক রোগীকে প্রথমেই চিনি ও কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাদ্য বর্জন করতে হবে। তাঁদের খাদ্য-তালিকায় রাখতে হবে প্রোটিন জাতীয় খাবার। অন্যান্য সাধারণ মানুষের মতোই অত্যধিক তেল ও মশলা জাতীয় খাবারকে তাদের খাদ্য-তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে। খাদ্য-তালিকা হতে হবে সুষম এবং খাদ্য গ্রহণ করতে হবে পর্যাপ্ত সময়ের ব্যবধানে। ডায়াবেটিক রোগীকে ভরপেট খাওয়া এড়িয়ে চলতে হবে। খাবারের মধ্যে ক্যালোরি’র মাত্রাকে সঠিক ভাবে বিচার করে খাবার খেতে হবে। একজন ডায়াবেটিক রোগীকে ইনসুলিন ও ওরাল হাইপোগ্লিসিমিক্সকে এড়িয়ে যাওয়া বন্ধ করতে হবে।

প্রাত্যহিক কর্মজীবনে পাকযন্ত্রকে সুস্থ রাখার জন্য কোন কোন বিষয়গুলিকে মাথায় রাখতে হবে?

ব্রেকফাস্ট করতে হবে ভারী। লাঞ্চ হবে হালকা এবং ডিনারটিও করতে হবে হালকা। এটাই হচ্ছে প্রাত্যহিক জীবনের ভালো খাদ্যাভ্যাস। তাছাড়া তেল-মশলা জাতীয় খাবারকে বর্জন করতে হবে। অ্যালকোহল ও ধূমপান বর্জন করতে হবে। ভালো ভাবে তৈরি টাটকা খাবার খেতে হবে এবং রেস্তোরাঁর খাবারকে এড়িয়ে চলতে হবে।

বর্তমান সময়ে পড়াশোনার কারণে ছাত্রদের মধ্যে প্রচন্ড ভাবে মানসিক চাপ তৈরি হচ্ছে। একইসঙ্গে দেখা যায় যে তাদের পাচন প্রক্রিয়াটিও যথাযথ নয়। ছেলেমেয়েদের পাকযন্ত্রকে সুস্থ রাখার জন্য তাদের বাবা-মায়েদের কী টিপ্স দেবেন?

ছেলেমেয়েদের বাড়িতে তৈরি খাবার দিতে হবে। খাবারকে হতে হবে সুষম ও পুষ্টিকর। বাইরের রেস্তোরাঁর খাবার থেকে তাদের দূরে রাখতে হবে। ছেলেমেয়েদের টাটকা ফল ও তরিতরকারি খেতে উৎসাহিত করতে হবে। ঠান্ডা ও নরম পানীয় এবং বাইরের খাবার এড়িয়ে চলতে হবে।

কেউ যদি তার জীবনচর্চার প্রাত্যহিক নির্ঘন্টকে নতুন করে সাজাতে চায়, তাহলে সেখানে স্বাস্থ্যকর পরিকল্পনা কী হতে পারে?

নিয়মিত ভাবে ব্যয়াম করতে হবে। সময়মতো খাবার খেতে হবে এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে ও সঠিকমাত্রার ক্যালোরি-যুক্ত খাবার খেতে হবে। অস্বাস্থ্যকর খাবারকে বর্জন করতে হবে।

ডায়েটিং কতটা স্বাস্থ্যসম্মত অথবা সঠিক ডায়েটটাই বা কী?

খাবারকে এড়িয়ে গিয়ে কখনওই ডায়েটিং হতে পারে না। সঠিক সময় উপযুক্ত ও পর্যাপ্ত মাত্রায় খাবার গ্রহণ করেই সঠিক ডায়েটিং হতে পারে। একজন মানুষকে সবসময় অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার, চিনি ও তেল-মশলা জাতীয় খাবারকে এড়িয়ে চলতে হবে।

অ্যাসিডিটি’র কারণ কী, এর প্রভাব এবং এর থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?

অ্যাসিডিটি হল কোনও মানুষের দেহের পাকস্থলি থেকে অতিরিক্ত মাত্রায় অ্যাসিড ক্ষরণের ঘটনা। এর কারণে পেটের উপরের দিকে ব্যথা হয় এবং বমি বমি ভাব তৈরি হয়। এর মাত্রা বেড়ে গেলে পাকস্থলিতে ক্ষতের সৃষ্টি হয়। সেখান থেকে রক্ত বের হয় এমনকী অন্ত্রে ছিদ্রও হয়ে যেতে পারে। এর চিকিৎসায় অ্যান্টাসিড খেতে হয়। কোনও কোনও ক্ষেত্রে চিকিৎসা হয় প্রোটন পাম্প ইনহিবিটার-এর সাহায্যে, যাকে পিপিআই বলা হয়ে থাকে।

সুস্থ পাকযন্ত্রের জন্য কোনও ব্যায়াম কি রয়েছে?

সুস্থ পাকযন্ত্র তৈরির ক্ষেত্রে কোনও সুনির্দিষ্ট ব্যায়াম নেই। তবে সার্বিক ভাবে নিয়মিত ব্যায়াম করলে সেটা শরীর এবং পরিপাক প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে ভালো হয়।

সুস্থ জীবনপ্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে হলে দিনের শুরুতে ব্রেকফাস্ট কীরকম হতে হবে?

ব্রেকফাস্ট হল দিনের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আহার। ব্রেকফাস্ট-এ সবচেয়ে বেশি পরিমাণে ক্যালোরিযুক্ত খাবার রাখতে হবে। ব্রেকফাস্ট কিংবা অন্য যে-কোনও খাবারই হোক না কেন, খাবার হতে হবে প্রাকৃতিক ও স্বাস্থ্যকর। রিফাইন্ড কার্বোহাইড্রেট এবং অত্যধিক পরিমাণে তেল ও চর্বি জাতীয় খাবার বর্জন করতে হবে।

ভারী অথবা তেল, মশলাযুক্ত খাবার গ্রহণের পর তাৎক্ষণিক ভাবে এর প্রতিকার কী হতে পারে?

যে-কোনও মানুষেরই উচিত সবসময় ভারী আহার এড়িয়ে চলা। তবে যদি কোনও কারণে ভারী আহার হয়ে যায়, তখন সমস্যা দেখা দিলে অ্যান্টাসিড খাওয়া যেতে পারে। সঙ্গে এনজাইমও খেতে হবে। এই এনজাইম খাবারকে হজম করতে সাহায্য করে।

পেপটিক আলসার গ্যাস্ট্রাইটিসকে এড়াতে হলে কী করতে হবে?

তেল ও মশলা জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলতে হবে এবং সেইসঙ্গে বর্জন করতে হবে ধূমপান এবং মদ্যপান।

জীবনে সুস্থ ও কর্মক্ষম ভাবে বাঁচার জন্য দৈনন্দিন সঠিক নির্ঘন্ট কী হওয়া উচিত?

নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে। নিয়ম করে আহার গ্রহণ করতে হবে। মানসিক চাপমুক্ত হয়ে থাকতে হবে। পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমোতে হবে। অতিরিক্ত মাত্রায় চা, কফি ও এনার্জি ড্রিংকস বর্জন করতে হবে।

ভাইরাল গ্যাস্ট্রোএন্টারাইটিস-এর কারণ ও তার চিকিৎসা কী, এর জন্য কী ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে?

স্বাস্থ্যকর অভ্যাস বজায় রাখতে হবে। এরমধ্যে রয়েছে– খাবার আগে ভালো ভাবে হাত ধুয়ে নিতে হবে। খাবার তৈরি ও সংরক্ষণ করতে হবে সঠিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে। টাটকা ও সঠিক ভাবে তৈরি খাবার খেতে হবে। ফল ও তরিতরকারি খাবার আগে সেগুলিকে ভালো ভাবে ধুয়ে পরিষ্কার করে নিতে হবে। যদি কারোর গ্যাস্ট্রোএন্টারাইটিস দেখা দেয় তাহলে প্রচুর পরিমাণে জল পান করতে হবে এবং ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন নিতে হবে। প্রয়োজনে একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সেইমতো চলতে হবে এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ গ্রহণ করতে হবে। অধিকাংশ সময়ই গ্যাস্ট্রোএন্টারাইটিস ভাইরাল অসুখ হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকের তেমন একটা প্রয়োজন হয় না।

ক্ষুধামান্দ কী, এর কারণ ও প্রতিকার কী?

নানান কারণে ক্ষুধামান্দ দেখা দিতে পারে। অধিকাংশ সময়ই এটা দেখা দেয় সীমিত সময়ের জন্য। তখন এর জন্য কোনও চিকিৎসারও প্রয়োজন হয় না। তবে যদি এই ঘটনা বেশিদিন ধরে চলতে থাকে এবং দিন দিন দেহের ওজন কমে যেতে থাকে তখন অবশ্যই এই বিষয় নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। চিকিৎসক তখন প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করে ক্ষুধামান্দ’র প্রকৃত কারণ নির্ণয় করতে পারবেন। সেই ভাবে তিনি তখন চিকিৎসা করতে পারবেন।

৫০ বছরের বেশি বয়সি মানুষের পরিপাক ক্রিয়া সঠিক ভাবে করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় টিপস কী হতে পারে?

প্রতি ঘন্টা ধরে হালকা খাবার গ্রহণ করতে হবে। অতিরিক্ত লবণ এবং অতিরিক্ত চিনি খাওয়া বর্জন করতে হবে।

——-

বিয়ে করছেন নাকি কিয়ারা আর সিদ্ধার্থ?

বেশ কিছুদিন হল, নিজেদের ভালোবাসার সম্পর্ক নিয়ে রাখঢাক সরিয়ে ফেলেছেন তাঁরা।এবার বলিউডে তাদের নিয়ে জোর গুঞ্জন যে শিঘ্রই বিয়ের শানাই বাজতে চলেছে তাদের। কিয়ারা আডওয়ানি আর সিদ্ধার্থ মালহোত্র।মিডিয়ার সামনেই এখন তারা একসঙ্গে হাতে হাত ধরে ঘোরেন।বিয়ের প্রসঙ্গে তারা মুখে জবরদস্ত কুলুপ আঁটলেও, খুব সম্প্রতি দু’জনকে একসঙ্গে লাঞ্চ ডেটে যেতে দেখা গেছে মুম্বইয়ের এক রেস্তোরাঁয়।

সিদ্ধার্থের জন্মদিন গিয়েছে কয়েকদিন আগে। সেই উপলক্ষেই মুম্বইয়ে এসেছেন তার বাবা-মা। শোনা যাচ্ছে,সেদিন রেস্তোঁরায় সিদ্ধার্থের সঙ্গে ছিলেন তার বাবা-মাও। আর সেই সুযোগেই নাকি পাত্রীকে বাবা-মায়ের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছেন অভিনেতা।

ইঙ্গিতটা পরিষ্কার। পরিবারের কাছে আর সম্পর্কটা লুকিয়ে রাখতে চান না সিদ্ধার্থ। কিয়ারাকে তার পরিবারের অংশীদার করে নিতে তাই এই উদ্যোগটা নিয়েছেন খোদ সিদ্ধার্থই। এদিন বেইজ রঙা ক্রপ টপ ও ফ্লেয়ারড প্যান্ট পরনে ছিল কিয়ারার, সঙ্গে ডেনিম জ্যাকেট। চুলটা টান করে বাঁধা।করোনা আবহে মুখে মাস্ক পরতেও ভোলেননি নায়িকা। অন্যদিকে সিদ্ধার্থ পরেছিলেন সাদা টি-শার্ট এবং বেইজ ট্রাউজার। আর কিয়ারার সঙ্গে মিল রেখে তারও অঙ্গে ছিল ডেনিম জ্যাকেট।

২০১৯ সাল  থেকেই তাদের প্রেম নিয়ে জোর গুঞ্জন শুরু হয় বলিউডে। গত বছর লকডাউন শুরুর আগেই আরমান জৈন এবং অনিশা মালহোত্রার রিসেপশনে এই জুটির অন্তরঙ্গ নাচের ভিডিয়ো ভাইরাল হয়েছিল সোশ্যাল মিডিয়ায়। দুজনের প্রেমের গুঞ্জনে মাসখানেক আগে ঘি ঢেলে দেন কিয়ারার লক্ষ্মী’ ছবির কো-স্টার অক্ষয় কুমার। ছবির প্রমোশনে কপিল শর্মার শো’তে হাজির হয়ে কিয়ারাকে ‘বড়ে সিদ্ধান্তওয়ালি লড়কি’ বলে কিছুটা  অপ্রস্তুতও করেন অক্ষয়।

করণ জোহরের আর-এক ‘স্টুডেন্ট’ সিদ্ধার্থ মালহোত্রা ও কিয়ারা আডওয়ানির সম্পর্ক গভীর হওয়ার পরই, তাঁরা একসঙ্গে আফ্রিকান সাফারি করতে গিয়েছিলেন। কিয়ারার ইনস্টাগ্রামে দেখা গিয়েছিল আফ্রিকার সেই ছবি। সিদ্ধার্থও নিজের মতো কিছু ছবি পোস্ট করেছিলেন নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে। নতুন বছর সেলিব্রেট করতে এই জুটিকে মলদ্বীপেও যেতে দেখা যায়। মলদ্বীপের বেশ কিছু ছবি তাঁরা আলাদা আলাদা করে সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করেন।

ঠিক যখন বরুণ ধাওয়ান আর নাতাশা দালাল-এর বিয়ে নিয়ে দিনভর মিডিয়া উত্তাল, ঠিক  তখনই আরেক জুটি নজর কাড়ল নেটিজেনদের। এবার হয়তো তাঁদের সম্পর্কের বয়ানে সিলমোহর দিতেই এই পদক্ষেপ  বলিউডের প্রেমিক-জুটির।

বিষ্ণুবর্ধনের শেরশাহ ছবিতে একসঙ্গে কাজ করছেন কিয়ারা আর সিদ্ধার্থ। । কার্গিল যুদ্ধে আত্মবলিদান দেওয়া ক্যাপ্টেন বিক্রম বাত্রার চরিত্রে অভিনয় করছেন সিদ্ধার্থ। আর তাঁরই বাগদত্তা ডিম্পল চিমার ভূমিকায় অভিনয় করেছেন কিয়ারা।

কবীর সিং করার পর থেকেই কিয়ারার কেরিয়ারের পালে হাওয়া লেগেছে। হাত ভর্তি ছবি আর ব্র্যান্ড এনডোর্সমেন্ট নিয়ে দিব্যি ব্যস্ততার দিন কাটাচ্ছেন কিয়ারা।অন্যদিকে সিদ্ধার্থ এখনও লড়ছেন, তাঁর কেরিয়ার নিয়ে। তবে রিয়েল লাইফ-এ দু’জনের জুটি যে বেশ শক্তপোক্ত, এটা মানতেই হবে!এবার সত্যি সত্যি বিয়ের মণ্ডপে কবে প্রবেশ করছেন দুজনে, সেটা জানার জন্য আরও কিছুটা অপেক্ষা করতে হবে অনুরাগীদের।

জুতো দিয়ে যায় চেনা

আপনার রুচির পরিচয় যেমন পাওয়া যায় আপনার পায়ের জুতোয়, ঠিক তেমনই বাড়িতে জুতো গুছিয়ে রাখাও একটা আর্ট।নিজের বাড়ি হচ্ছে এমন জায়গা, যেখানে আপনি নিজেকে সবচেয়ে বেশি নিরাপদ মনে করেন। বাইরে যাই হোক না কেন, নিজের বাড়ি ফিরতে পারলেই মনে হয় আপনি যেন সব বিপদের বাইরে।তাই বাড়িতে সব কিছুই গুছিয়ে রাখা প্রয়োজন যাতে তা দৃষ্টিনন্দন হয়ে ওঠে৷ এমন কি জুতো রাখার জায়গাটিও৷

ঘরের মূল দরজার সামনেই জুতো খুলে রাখবেন না। জুতোর র‌্যাক সব সময় মূল দরজার ডানদিকে রাখুন। অবিন্যস্ত ভাবে অনেকেই ড্রযিংরুমের এদিক ওদিক, কোণায়, খাঁজে জুতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখে দেন। এতে ঘরটা দেখতেও যেমন বিসদৃশ লাগে, ঠিক তেমনই প্রযোজনের সময় জুতোগুলো খুঁজেও পাওয়া যায় না।

 জুতো রাখার জায়গা

বাস্তুমতে জুতো যদি বাড়িতে সঠিক দিকে বা নির্দষ্ট স্থানে রাখা যায়, তাদলে তার ফলাফল শুভ হয়৷এই প্রেক্ষিতে মনে রাখুন কয়েকটি জিনিস৷

  • বাড়ির দক্ষিণ ও পশ্চিম দিকে ঘরের দক্ষিণ বা দক্ষিণ-পূর্ব দিকের দেয়াল।
  • উত্তর-পশ্চিমের ঘরের দক্ষিণে বা দক্ষিণ-পূর্ব দিকে র‌্যাক তৈরি করান
  • কোনও মতেই কোনও ঘরের উত্তর-পূর্বে জুতোর র‌্যাক রাখা বাঞ্ছনীয় নয়৷

Keep in order, your shoes at home

ইন্টিরিয়র ডেকরশনের অগ্রগতির ফলে কিন্তু এখন জুতোকেও সুন্দর করে গুছিয়ে রাখার নানা ব্যবস্থা রয়েছে। শু র‌্যাক-এও এসেছে নানা বৈচিত্র‌্য। ঘরের স্পেস ইত্যাদির প্রযোজনীয়তার কথা মাথায় রেখে, বেছে নিতে পারেন সুবিধামতো জুতো রাখার জায়গা।

ওভার দ্য ডোর শু র‌্যাক: ছোটো ফ্ল্যাটের জন্য আদর্শ। ক্লোজেট বা বেডরুমের দরজার ভিতর দিয়ে রড থেকে ঝুলিয়ে রাখতে পারবেন এই জুতোর র‌্যাক।

ফোল্ডেবল শু র‌্যাক : সাধারণত কাপড় ও রঙের তৈরি এই র‌্যাক সুবিধামতো খোলা ও বন্ধ করে জুতো রাখা যায়। প্রযোজন না থাকলে ভাঁজ করে তুলেও রাখা যায়।

শু র‌্যাক বেঞ্চ : একই সঙ্গে বসার জায়গা এবং ভিতরে জুতো রাখার ব্যবস্থা এটাই কনসেপ্ট এই শু র‌্যাক-এর। জুতো ঢুকিয়ে ঢাকনা বন্ধ করে দিলেই বেঞ্চ হয়ে যায় এই র‌্যাক।

নীলমাধবের চাঁদ

হাতে স্বর্গ পেল নীলমাধব। আজ তার সরকারের দেওয়া ৩৫ বছরের জীবনের শেষ দিন। একটু আগেভাগেই অফিস যাবে। প্রতিদিনের মতো শুধু নিজের চেয়ার টেবিল মুছে, টেবিলের কাচের নীচে রাখা কালি ঠাকুরকে পেন্নাম ঠুকে, এক গেলাস জল ঢক ঢক করে গলায় ঢালা শুধু নয়, আজ তার অফিসের চেয়ারের চারটে পায়ে প্রণাম করবে। টেবিলে খানিকটা মাথা ঠুকবে। ভেবে রেখেছে একটু কাঁদবেও। চোখের জল দিলে দেবতা খুশি হন।

ওই চেয়ার-টেবিল তো তার ভগবান। অফিসের লোকজন আসার আগেই সেসব আচার করে ফেলতে হবে। লোকজনের সামনে করলে হাসাহাসি হবে। এ জীবনে তার জন্য তো আর কোনও চেয়ার অপেক্ষা করে থাকবে না। কত মায়া ছিল ওই কাঠের চেয়ারটার। ডেলি-রেটেড মজদুর হিসেবে ঢুকে নিজের অধ্যবসায় আর মিষ্টি ব্যবহার দিয়ে সকলের মন জয় করে আজ ক্লার্ক হয়ে রিটায়ার করছে।

হ্যাঁ, সকাল সকাল অফিস যাবে বলে একটু আগেই চানঘরে ঢুকে গেছে নীলমাধব। সঙ্গে অভ্যাসমতো খবরের কাগজ। কমোডের উপরে বসে খবরের কাগজ পড়া তার অন্যতম বিলাসিতা। ভাঁজ খুলতেই হলুদ কাগজের একটা ছোটো প্যামফ্লেট সড়সড় করে নেমে মেঝেয় পড়ে গেল। না ভেজেনি। নীলমাধব ঝুঁকে কাগজের টুকরাটো হাতে নিয়ে চোখ বোলাতেই তড়াক করে লাফিয়ে উঠল। কয়েকদিন ধরে মনের ভেতর ঢুকে আসতে থাকা অন্ধকার ফিকে হয়ে আসছে যেন। নগ্ন, নির্মেদ প্রায় ছয় ফিটের শ্যামবর্ণ শরীর নিজের অক্ষের উপর চরকি মারল। তার চোখে পড়েছে। প্যামফ্লেটের একেবারে নীচের দুটি লাইন– একটিমাত্র ফোন আপনার জীবনের পরিবর্তন আনতে পারে। রত্না ঘোষ, ফোন- ৯৭৬৮৫৫৪২৭২।

বউ ঘোষণা করে দিয়েছিল অনেক আগেই, ‘সারাদিন বাড়িতে বসে ট্যাঙস ট্যাঙস করে কথার ফোড়ন কাটবে, সেটি হবেনি। হাত-পা মজবুত আছে, কাজ-কাম করোগে যাও।’

নীলমাধব জানে, ওই ঘোষণা মানে আদেশ। সত্যি সত্যি সারাটা দিন তাকে সইতে পারবে না বউ। এ-কথার পিঠে সে-কথা, তারপর তো বাড়ি মাথায় করে কুরুক্ষেত্র। আর সেসব এড়াতে রাস্তায় রাস্তায় উদ্দ্যেশ্যহীন কতদিন আর ঘুরে বেড়াতে পারবে! সে এবার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে প্যামফ্লেট পড়তে থাকে। হ্যাঁ হ্যাঁ আলো।

লেখা আছে, ‘ইউ এস মাল্টিন্যাশানাল কোম্পানি কলকাতায় তাদের ব্যাবসা বাড়াবার জন্য চাকরির অফার দিচ্ছে।’

নীলমাধব আতিপাতি করে খুঁজল কোনও শিক্ষাগত যোগ্যতার কথা বলেছে কিনা। সেখানে সে আটকে যেতে পারে। সে তো মাত্র উচ্চ মাধ্যমিক পাস। আর এখন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করার জন্য সোনার টুকরো সব ছেলেমেয়েরা বসে আছে। অফিসের বড়োবাবুর ছেলে তো বেঙ্গালুরু থেকে পাশ করেই ইনফোসিস না কি কোম্পানিতে চাকরি করতে চলে গেল, সে-ও মাল্টিন্যাশনাল।

পেট ও মনের যুগপত আরাম হয়ে এসময় নীলমাধবের চোখে পড়ল প্যামফ্লেট-এর দুই নম্বর খোপটিতে লেখা আছে গৃহবধূ, রিটায়ার্ড ব্যক্তি, ভিআরএস।

তার যোগ্যতা রিটায়ার্ড ব্যাক্তি। মানে কাল থেকে সে এই কোম্পানিতে কাজ করার যোগ্য। তবে কালকের জন্য নীলমাধব অপেক্ষা করবে না। আজকেই ফোন করে জেনে রাখবে সব। যাতে কালই বউয়ের কথা মেনে অফিসের সময়েই ঘরের বাইরে পা দেয়া যায়।

অফিসটা কেমন হবে! শুনেছে সে, এসব অফিস খুব সাজানো গোছানো হয়। সরকারি অফিসের মতো নোংরা আর অন্ধকার যেখানে সেখানে জমে থাকে না। ঝাঁ চকচকে, সেন্ট্রালি এসি। আর সেখানে কাঠের চেয়ার টেবিলের বালাই নেই, খোপে খোপে ডেস্ক আর গদি দেওয়া রিভল্ভিং স্টিলের চেয়ার।

একটা লম্বা করে শ্বাস নেয় নীলমাধব। কমোডে বসে থেকেই তার মনে হল এসব অফিসের ড্রেস কোডের কথা। অসীম-দার বউ কাজ করে ‘বোম্বাই প্রেস অ্যান্ড অ্যাডভার্টাইসমেন্ট -এর কলকাতা অফিস ১১১ পার্ক স্ট্রিটে। একদিন কী একটা কাজ নিয়ে অসীমদার সাথে সেই অফিসে গিয়েছিল। ওয়েটিং-এ তাদের জন্য যে মেয়েটি দামি ট্রেতে করে কফির কাপ, জলের গেলাস এনে দিল, তার দিকে চেয়ে তো বুকে কাঁপন ধরে গেছিল। সাদা ধবধবে পা হাঁটুর উপর পর্যন্ত যেন মাখন দিয়ে গড়া। লাল স্কার্ট, লাল হাই হিল আর টকটকে লাল ঠোঁট-ই যথেষ্ট, মাথা ঘুরিয়ে দিতে। তার উপর জামার উপরের একটা বোতাম খোলা আর কফির কাপ নামিয়ে রাখার সময় ঝুঁকে পড়তেই দুটি সোনার ফসলের অনেকটা চোখের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল যেন। মেয়েটা চলে যেতেই অসীমদা ফিসফিস করে বলেছিল, ‘কী রে একেবারে ফিদা হয়ে গেছিস?’

নীলমাধব ধরা পড়ে যাবার বিড়ম্বনায়, তো তো করে অজুহাত খুঁজতে যেতেই অসীমদা চোখে মুখে হাসি ছড়িয়ে বলেছিল, ‘ঝানু ঝানু পার্টিকে এভাবেই আতিথেয়তার প্রথম মুহূর্ত থেকেই বধ করে ফেলে। মতামতকে নিজেদের অনুকূলে নিয়ে যাবার জন্য এটা একটা প্রাচীনতম হিপনোটাইজিং ফ্যাক্টর।’

অসীমদাকে সিনিয়র হিসেবে শুধু নয়, তার নানা বিষয়ে জানাশোনার জন্য নীলমাধব মনে মনে শ্রদ্ধা করে। অসীমদা বেশ ইন্টেলেকচুয়াল। শুনেছে কফি হাউসে নাকি আড্ডা আছে তার। চাকরি ছাড়াও সংবর্ত নামে নাটকের দলে নাটক করে।

অসীমদা আবার কানের কাছে মুখটি নিয়ে ফিসফিস করে, ‘ওই যে মেয়েটার চলকে ওঠা বুকের উপর থেকে চোখ ফেরাতে পারছিলি না…।’

‘না না কী যে বলো তুমি…।’ নীলমাধব নিজেকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে।

অসীমদা বলে, ‘শোনই না, এদের অধিকাংশেরই নিজের বুক না, লিফট করা বুক। আর এরা মুখের সঙ্গে সঙ্গে ক্রিম, রং বুকেও মাখে। দেখলি না কেমন গলা মোমের মতো লাবণ্য ঝরছিল সেখানে!’

‘যাঃ, তুমি না বাজে কথার জাদুকর।’

‘আরে আমি না জেনে বলছি নাকি! আমার বউ এলে দেখবি, তার-ও বুক ফেটে পড়ছে মনে হবে। কিন্তু দুটো দামড়া দামড়া ছেলের মা অমন ঢাউস বুক পাবে কোথায়! সবই নিউ মার্কেটের প্যাডেড ব্রা-র কেরামতি। আমি তো জানি, এই এতটুকু।’বলে অসীমদা হাতের আঙুল পাঁচটি দিয়ে একটা কমলালেবুর আকৃতি করল।

নীলমাধব ভাবনার ভালোলাগায় তলিয়ে ছিল। সে একটু নিজত্বে এসে ভাবল, তাহলে নিজেকেও তো সাজিয়ে গুছিয়ে নিতে হবে। অনেকদিন থেকেই নন্দিনী বলছে ভালো এক সেট জামা কাপড় কিনতে। এই ক্যাবলাকান্তপনা জামা কাপড়ে চলছে না। দামি কোনও শোরুমে নিয়ে গিয়ে সে-ই কিনে দেবে সব। কিন্তু নীলমাধব তানা নানা করে ঠেকিয়ে রেখেছে।

নন্দিনী নীলমাধবের ফুসফুস। সংসারে খরখরে গ্রীষ্মযাপনের মধ্যে নন্দিনী তার মরুদ্যান। না না বাড়িয়ে বলা নয়। আহিরিটোলা ঘাটের কাঠের জেটিতে কম দামের বুট ঠুকে সন্ধ্যার অল্প আলোয় কচুরিপানার স্রোতকে ভাটার টানে ছুটে যেতে দিয়ে নন্দিনীর গায়ে গা ঘেঁষে থেকে সে মাঝে মধ্যেই বলে, ‘বেঁচে থাকার সুখটুকু তোমার জন্যই পাচ্ছি, বিশ্বাস করো আর না-ই করো।’

অফিসে-বাড়িতে ইঁদুরের মতো থাকতে অভ্যস্ত নীলমাধব এই একটুকু সময় নদীর উদারতার সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়ায়। গঙ্গার হাওয়া নন্দিনীর শরীরের গন্ধ নিয়ে তার বুকের ভেতর ঢোকে। আবার তাকে একটা দিন বাঁচার প্রেরণা দেয়। হেরে যাওয়া জীবনে এই একজনই তাকে সমর্থন করে। শুধু তো সমর্থন নয়, এই একজনই যে নিজেকে তার কাছে সমর্পণ করে বসে আছে।

দুই

বউ বলেছে দাদাকে ফোন করে দিচ্ছে, দাদা ঠিক একটা জুটিয়ে দেবে। বলেছে, বাসন্তীতে ১৫০ দিনের কাজে তার দাদা যে কত লোককে কাজে ঢুকিয়ে দিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। মাটি-কাটার কাজ আছে। চিংড়ির মীন ধরে আড়তে দেবার লোক – একটা না একটা জুটে যাবে। তবে কাজের আগে পাত্তিটাত্তি ছাড়তে হতে পারে। তার দাদা, বোনের বর বলে ছেড়ে দেবে না।

নীলমাধব থ মেরে যায় বউয়ের কথায়। এখন সে মাটি-কাটার কাজ করতে পারবে! ওদের গাঁয়ের মেয়েবউদের সাথে লুঙ্গি পরে জলে নেমে মীন ধরবে! সারাজীবন অফিসে চেয়ার-টেবিলে কাজ করার পর এই এত বয়সে লেবারের কাজ করতে যাবে! মাথাটা খারাপ হয়ে গেছে বউয়ের। কিন্তু বউয়ের যা গোঁ, কিছু একটা না করলে যদি ধরে-বেঁধে বাসন্তীতে পাঠিয়ে দেয়!

নীলমাধব চান শুরু করার আগে প্যামফ্লেটের শেষ অংশটুকুও পড়ে নিল, ‘বাড়ি থেকে অথবা অফিসে বসে কাজ।’

হ্যাঁ হ্যাঁ অফিসে বসেই কাজ করতে চায়। বাড়িতে বসে কাজ করতে বললে সে করবে না। মনে মনে ঠিক করে, পার্ট টাইম বা ফুল টাইম-এর মধ্যে, সে ফুল টাইমই নেবে।

একজন জহরকোট গায়ে দেওয়া ভদ্রলোক, মুখে ও হাতে শ্বেতির দাগ, প্রোজেক্টরের আলো এড়িয়ে এসে দাঁড়ালেন। কল টাইম ছিল বেলা তিনটে। ছোটো হল ঘরটা ভর্তি হয়ে গেছে। নীলমাধব থার্ড রো-তে মাঝামাঝি বসেছে। মাঝামাঝি থাকার নানা সুবিধে সে জানে। তার বাঁদিকে বসা পৃথুলা মেয়েটি অযথা কনুই দিয়ে চাপছে।

‘আমার নাম পি আচারিয়া।’ জহরকোট বলে উঠল। জহরকোট আরও বলল, ‘আসুন আমরা একসাথে তাল দি, প্রজেক্টরে একটা বিট বাজছিল।

নীলমাধব দেখল উপস্থিত সবাই ওই ভদ্রলোককে অনুসরণ করে হাততালি দিচ্ছে। এবং সে নিজেও।

‘এই কোম্পানির নাম হার্বলাইফ।’

পাওয়ার-পয়েন্টে প্রেজেন্টেশন পড়ছে পর্দায় আর মিঃ আচারিয়া নামে ওই জহরকোট বলে চলেছে, ‘এই কোম্পানির বয়স ৩৪ বছর। মানে যুবক এখন। এখন তার এক্সপ্যানশনের সময়। বিশ্বের ৯৬টা দেশে এই কোম্পানি কাজ করছে। সাড়ে দশ কোটি লোক এই কোম্পানির প্রোডাক্ট ইউজ করে।’

একমাথা লম্বা চুল যেন তাকে বিব্রত করছে, এরকম ভঙ্গিতে মাঝে মাঝে সে হাত দিয়ে মাথার চুল সরিয়ে দিলেও আবার সেসব চোখে মুখের উপর নেমে আসছে। নীলমাধবের মনে হল, পি আচারিয়া নামে ওই লোকটা তার চুলের অবিন্যস্ত অবস্থানটি নিশ্চই উপভোগ করে।

‘আমাদের প্রোডাক্ট উপভোক্তাদের কথা বলছিলাম, পর্দায় দেখুন, রোনাল্ডো, ওই যে ঢকঢক করে খেয়ে খেলায় নেমে গেল। গোল করল। বিরাট কোহলির জামায় দেখুন, লেখা রয়েছে হার্বলাইফ। ওই যে দেখুন, সাইক্লিস্টরা হার্বলাইফ-এর ড্রিংক খেয়ে নেমে পড়ছে রেসে।’

মাঝে মাঝে তিনি নেক্সট বলছেন, আর পাওয়ার-পয়েন্টে ছবি পালটে যাচ্ছে। একটা ছবিতে দেখানো হল একজন মোটা মেয়ে এই হেলথড্রিংক নিয়ে কীভাবে রোগা হয়েছে। ছবি থেকে দর্শক ও শ্রোতাদের দৃষ্টি সরিয়ে দিয়ে কমেন্ট্রেটর ভদ্রলোক একজন গৃহবধূকে সামনে ডেকে নিয়ে তার হাতে মাইক্রোফোন ধরিয়ে দিলেন। সেই বধূটি স্কিন টাইট পোশাকে স্ফিত বক্ষদেশের নীচে নিজের ক্ষীণ কোমরে হাত দেখিয়ে এবং বুক দুলিয়ে বললেন, এই ড্রিংক খেয়েই তিনি এরকম সিনেমার নায়িকার মতো শরীর তৈরি করতে পেরেছেন আর তিনি নাকি এই কোম্পানির একজন মার্কেটিং ম্যানেজার হয়ে মাসে লক্ষ লক্ষ টাকা রোজগার করেন এবং দেশে-বিদেশে কোম্পানির হয়ে ঘুরে বেড়াতে পারেন।

নীলমাধব মাথা ঠান্ডা রেখেছিল। পাশের মেয়েটি নোট নেবার সময়, হাততালির সময় যেন ইচ্ছে করেই ছুঁয়ে দিচ্ছিল। খুব ছোটো ছোটো চেয়ার। ডানদিকের হাতলে রাইটিং স্পেস। মেয়েটা একসময় তার শরীরের উপরের অংশ এতটা ঝুঁকিয়ে দিয়েছে যে, নীলমাধবের বাহুতে তার বুকের ভারী অংশ ঘষা লাগছে।

কী চায় মেয়েটি! নীলমাধব জানে চেহারায় তাকে চল্লিশোর্ধ মনে হয়। এই মেয়েটা ফাঁসাবে নাকি! ও কি জেনে গেছে রিটায়ারমেন্ট বেনিফিটের অনেক টাকা তার হাতে আসতে চলেছে! নীলমাধব আরও কুণ্ডলী পাকায়। নিজের ছোট্ট চেয়ারে। আর যুবতির শরীরের নরম  অংশের ছোঁয়ায় উত্তেজিত বোধ করলে ভাবনাকে অন্য দিকে গড়িয়ে দিয়ে নিষ্কৃতি পেতে চায়।

অন্য কি বা তার আছে নন্দিনী ছাড়া! নন্দিনী পই পই করে বলেছে চাকরি খুঁজতে গিয়ে ভুলভাল জায়গায় যেন না যায়।

গত বছর একটা ভুল জায়গায় সে চলে গিয়েছিল। অবশ্য সেটা নন্দিনীর সাথেই। নন্দিনীর সাথে চলতে তার কোনও ভাবনা হয় না। সব ভাবনা নন্দিনীর। নন্দিনী সঙ্গে থাকলে সে ফুরফুর করে ওড়ে। মেপে কথা বলা, মেপে চলা, কিচ্ছুটি করতে হয় না। কিন্তু অন্য সময় নীলমাধব শংকিত, সঙ্কুচিত থাকে, এই বুঝি কেউ তাকে ঠকাল, এই বুঝি কেউ তাকে অপমান করতে আসছে।

গত বছর নন্দিনী-ই নিয়ে গেল। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি। তাকে কিচ্ছুটি করতে হয়নি। শুধু কথামতো অফিস কেটে পৌনে দশটায় হাওড়া স্টেশনে বড়ো ঘড়ির নীচে নন্দিনী টিকিট কেটে দাঁড়িয়েছিল। দশটার কাটোয়া লোকাল।

‘আমার না খুব থ্রিল হচ্ছে জানো, এই প্রথম কলকাতার বাইরে কোথাও যাচ্ছি, তোমার সাথে। তোমার ভালো লাগছে তো! না কি আমি জোর করেছি বলে তুমি এলে?’

নন্দিনী জানালার পাশে বসেছে, হাওয়ায় তার কথা ভেসে যেতে পারে ভেবে সে অনেকখানি নীলমাধবের গায়ের ভেতর ঢুকে এসে কথা বলছে। তার ৩১ বছরের মাখন শরীর নীলমাধবের ছোঁয়া পেতে ব্যাকুল যেন। নীলমাধবের স্বপ্নে জড়ানো দুটি চোখের উপর থেকে চোখ সরাচ্ছে না। কামরার দু-একজন তো নন্দিনীর সৌন্দর্য থেকে চোখ ফেরাতেই পারছে না।

নীলমাধব নন্দিনীর কথার উত্তরে শুধু বলতে পেরেছিল, ‘স্বপ্ন যে সত্যি হয়, তা আমি বুঝতে পারছি আজ। কতদিন মনে মনে ভেবেছি, তোমার সাথে দূরে কোথাও বেড়াতে গেলে বেশ হয়। দূরের ট্রেনে পাশাপাশি যাওয়ার যে কি আনন্দ তা এই লোকাল ট্রেনেই টের পাচ্ছি।’

সোমড়াবাজার স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে মাঝদুপুরে নেমেছে মাত্র পাঁচ-সাতজন। নীলমাধব প্ল্যাটফর্মে নেমে ডাবের কাঁদি দেখে লোভে পড়ে কিনে ফেলল দুটি। বেশ মিষ্টি জল। ডাব খেতে খেতেই জেনে নিয়েছে নন্দিনী সবুজদ্বীপের টোটো কোথায় মিলবে, কত ভাড়া।

সুবল হালদারের ডিঙিনৌকায় উঠে নন্দিনী প্রায় কিশোরীর মতো আচরণ শুরু করে। জলের ভেতর হাত দিয়ে জলে শব্দ তোলে। নীলমাধবের কোলে শুয়ে ভর দুপুরে নিজের প্রিয় গানটা গুনগুন করে, ‘নিশি রাত বাঁকা চাঁদ আকাশে।’ কবে যেন একবার নীলমাধব নন্দিনীর রূপের প্রশংসা করতে গিয়ে বাঁকা চাঁদ বলেছিল তাকে। সেই থেকে সুযোগ পেলেই নন্দিনী গীতা দত্তকে নকল করে দু’কলি শুনিয়ে দেয়।

বেহুলা নদীর বয়স্ক মাঝি এসব দেখতে অভ্যস্ত। সে গা করে না। শহরের মানুষজনের আদেখলাপনা সে জানে। বদলে সে গল্প করে এমন ভাবে যেন নীলমাধবদের ওই শারীরিক খুনসুটি কিছুই নয়। মাঝি জানে বাবু খুশি হলে ফেরার সময় ভাড়া ১০০-র জায়গায় ১৫০ করতে ভাববে না।

বেহুলা নদীর বাঁক ঘুরতেই চওড়া জলরাশির গঙ্গা। মাঝি জানায় উলটোদিকে নবদ্বীপ। নীলমাধবের চোখে পড়ে খানিকটা দূরে জলের উপর মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে বনরাজি। এই তবে দ্বীপ। সবুজদ্বীপ।

অর্জুন গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে নদী দেখছিল নীলমাধব। নন্দিনী হঠাৎ পিঠ জাপটে ধরে ইশারা করল। শুকনো ঘাসের ঝোপের পাশে খসখস শব্দ। একটু ভয় পায় নীলমাধব। তবে কি সাপ! নন্দিনীর চোখ অনুসরণ করে নীলমাধব দেখল এক জোড়া ছেলে-মেয়ে শরীরী প্রেম করছে। ছেলেটা মেয়েটার ব্লাউজ খুলে ফেলেছে। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে মেয়েটার ধবধবে বুক। নীলমাধব নন্দিনীর বাহু ধরে টেনে নিয়ে আসে। এখানে থাকা ঠিক হবে না। নন্দিনী ওই দৃশ্যে উত্তেজিত। সে একটু সরে এসে নীলমাধবের ঠোঁট কামড়ে রক্ত বের করে দিয়েছিল। সে চাইছিল ওই ছেলে-মেয়েটির মতো বন্যতা।

‘এই যে মশাই, মেয়ে নিয়ে এসে বেশ ফুর্তি-ফার্তা করছেন। কিছু মালকড়ি ছাড়ুন তো, আমরাও একটু মস্তি করি।’যেন মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে এল তিন-চারটে ছেলে। নীলমাধব ভয় পেয়ে গেছে। তার মুখ থেকে কথা সরছে না। সে ভাবছে এইসব মাস্তানেরা মেরে ধরে সব কেড়েকুড়ে নিয়ে, তারপর হয়তো আরও ঘন বনের মধ্যে নন্দিনীকে টেনে নিয়ে গিয়ে গ্যাং রেপ করে দেবে।

নন্দিনী হঠাৎ কোমরে শাড়ি জড়িয়ে রানি লক্ষ্মীবাই হয়ে যায়। সে গলা সপ্তমে তুলে একেবারে বস্তির মেয়ের মতো অভিনয় করে দেয়। ‘আমি ওকে চুমু খেয়েছি, তোর বাপের কীরে? তুই যখন ওইদিকে ঝোপের আড়ালে একটা মেয়েকে ন্যাংটো করে মাটিতে ফেলে ঠাসছিলি, তখন আমি বলতে গেছি?’

চ্যাঁচাতে চ্যাঁচাতে সে খপ করে ছেলেটির হাতের কবজি ধরে খানিকটা টেনে নিয়ে যায়। ‘চল, গার্ডের কাছে। গিয়ে বল, ওই মেয়েটা তোর বউ কিনা! আর যদি বউ হয়, দিনে-দুপুরে লোকজনের মাঝে চিত করেছিলি কেন!’

ছেলেটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। অন্য ছেলেগুলোও কেমন অবাক চোখ করে তাদের পান্ডাকে রেখেই গুটিগুটি কেটে পড়ে। নন্দিনী ছেলেটার কবজি কিছুতেই ছাড়ে না।

‘না না, তেমন কিছু করিনি।’ ছেলেটা তোতলাতে থাকে।

নীলমাধবই ছাড়াতে চায়, ‘দাও ছেড়ে দাও।’

‘অমনি অমনি ছাড়ব, পুলিশের হাতে দেব না! বেড়ানোর জায়গা কি দুষ্কৃতীদের স্বর্গ হবে, শুধোতে হবে না গেটের পুলিশ ভাইকে?’

ছেলেটা এবার পরিত্রাহি মুখ খোলে, ‘না না, এবার ছেড়ে দিন, আর কোনওদিন হবে না এরকম।’

তিন

কিছুতেই ছাড়তে চাইছে না। নীলমাধবের পাশের সেই পৃথুলা মেয়েটির স্বর কাঁদো কাঁদো। সে বলছে, ‘না, নেই তো, আমার কাছে কোনও টাকা নেই।’

‘টাকা না নিয়ে এসেছ কেন? সামান্য ১০০০ টাকা থাকে না ব্যাগে!’ কোম্পানির সুন্দরী মেয়েটির ডাকাতে মুর্তি। তার কলেই অনেকে এসেছে এখানে। চাকরি পাবার শর্ত হিসেবে একটা পরীক্ষায় বসতে হবে। ফিজ ১০০০ টাকা। নিজের নিজের কনসালটেন্সির সময় এই টাকা নিয়ে নেওয়া হচ্ছে।’

সেই সুন্দরী আবার দাঁত-মুখ খিঁচোয়, ‘ব্যাগে এটিএম কার্ড নেই? যাও আমাদের লোক দিচ্ছি সঙ্গে, টাকা তুলে নিয়ে এসো।’

ভিড়ের চাপে নীলমাধব দরজার কাছেই এসে পড়েছিল। সে কাউন্সিলিং-এর ডাক আসার আগেই কাউকে না বলে সটকে পড়ে। সিঁড়ি দিয়ে নেমে ব্রড স্ট্রিটে পা রেখে হাঁফ ছাড়ে। চাকরি না-পাবার বিষণ্ণতায় গ্রাস হতে দেয় না ওই ১০০০ টাকা বাঁচিয়ে ফেলার আনন্দ। সন্ধেবেলায় গড়িয়াহাটে চায়ের দোকানে বসার আগে ভেবে নিল, নতুন কাজ জুটিয়ে ফেলার আগে শ্যালকের কাছে না হয় ঢুঁ মেরে আসবে খন। তাতে বউকেও খুশি করা যাবে আর যদি হিল্লে একটা হয়েই যায়। তবে হ্যাঁ, হাজার টাকার উপরে সে উঠবে না। শ্যালককে হাজার টাকাই দেবে।

হাজারেই হল। কিন্তু অত সকালে যেতে হবে! পারবে কি নীলমাধব! নীলমাধব নিজের মনে ভাবে কী এমন কাজ! সকালে পুরসভার গাড়ি নিয়ে অনেকেই বাঁশি বাজিয়ে ময়লা নিয়ে চলে যায়। ওই নোংরা কাজ করতে হবে না তো!

স্বস্তি পেয়েছে নীলমাধব। না নোংরা ফেলার কাজ নয়। মাছের সার ছড়ানোর কাজ। জায়গা পালটে পালটে যেতে হয়। বাসন্তীর কাজ শেষ করে, হেড়োভাঙায় করেছে, সাতজালিয়ায় করেছে। এমাসের দশ দিন গোসাবায় কাজ।

একটা জলঢোঁড়া খপ করে একটা মোটা চিংড়িকে বাগে নিয়ে নিল। অন্ধকার আর আবছা আলোর মিশেলে চোখে পড়েছে ঠিক। নীলমাধব দু-পা পিছিয়ে আসে। পঞ্চনাগ মনসাকে স্মরণ করে। আকাশের কোণটা লাল লাল লাগছে। ব্যাগের ভেতর এখনও অনেকটা মাছের খাবার। এত বড়ো বড়ো পুকুর যে এক পাক খেতেই ঘণ্টাখানেক সময় লেগে যায়। ঘুঘু চেপে, মানে ডিঙিনৌকোয় করে জলের মাঝখানে খানিক ছড়াতে হয়। কিন্তু জলে শব্দ তোলা বারণ, তাই বেশিটাই পাড় ধরে। সুশান্তদা পইপই করে বলেছে, জলের কোনও কোণ যেন ফাঁকা না থাকে। ছেলেবেলায় স্কুল-স্পোর্টসে যেমন চুনের দাগ টানতে হতো সমান করে, তেমনি। নীলমাধব হাত আর পা দুটোতেই গতি আনতে চায়।

হু হু করে টাকা আসছে। কিন্তু কাঁচা টাকা পেয়ে নীলমাধবের মাথা ঘুরে যায়নি। কাজ করতে করতে তার মনে প্রশ্ন জেগেছে। সে প্রশ্ন সুশান্তদাকে করবে, সে সাহস নেই তার। তবে ছক্বাকে অনেকবার শুধিয়েছে, ‘হ্যারা ভাইডি, এই যে আমরা মাছের চাষে সাহায্য করি, মানে জলায় জলায় মাছের সার দিই ভূতির মতো রাত থাকতি, তা দিনির বেলা দিলি কী ক্ষেতি?’ কলকাতায় থাকতে থাকতে দক্ষিণের ভাষা চলে গিয়েছিল। এই মাস তিনেক এদের সঙ্গে থেকে তা আবার ফিরে এসেছে। খুবই মিষ্টি, আর প্রাণের ভাষা।

ছক্বা বাইকের ধোঁয়া সুর্যের লাল-পানা মুখটার উপর ছড়িয়ে যেতে দিয়ে বলল, ‘তা অতো কতা আমি জানি! তবে শুনিছি সারারাত ঘুমনোর পর পোভাত কালে মাছের দেবতাদের খুব খিদে পায়, ত্যাকোন খাতি পালি তারা ধাই ধাই করে লম্বা হতি পারে।’

বাইকের পেছনে বসে বিড়ি ধরিয়ে ছক্বার মুখে গুঁজে দিতে দিতে নীলমাধব ভাবে, হ্যাঁ সে-ও তো শুনেছে বাগদা মাছের মীনগুলো অ্যান্টিবাওটিক পেলে ধা করে বড়ো হয়ে যায়। বালিগঞ্জের স্টেশন বাজারে দেখেছে বেশ বড়ো বড়ো চিংড়ি। দাম-ও তেমন নয়, ৩০০/৩৫০। সাধ্যের মধ্যে।

এপ্রিল মাস। মাঠ-ঘাঠ শুকিয়ে যাচ্ছে রোজ। সুশান্তদা, ইসমাইল ভাই গত সপ্তাহে বাজারের ক্লাব ঘরে ডেকেছিল নীলমাধবকে। শ্যালক-ও ছিল সেখানে। সে-ই ডেকে নিয়ে গেছে। বলেছে, দাদা নাকি নীলমাধবের কাজে খুব খুশি। এবার টাকা-পয়সা বাড়ায়ে দেবানে।

‘আর কত বাড়াবে!’ মুখ থেকে বেরিয়ে গেছল কথা। নিজের মুখে হাত চাপা দিয়ে নীলমাধব কথার বদলে জব্বর করে একটা হাই তোলে। শ্যালকের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। সে জানে, যে কথা পেড়েছে সে-ই পুরোটা কবে আনে, না ক’লি তার শান্তি নাই।।

বড়ো শ্যালক বলল, ‘নীলু, এতদিন মাছের কাজ করিছ, এবার চাষের কাজ। প্রাণ-মন দিয়ে করতি হবে। আর আরও একটু রাত থাকতি টেমি জ্বালায়ে কাজ শেষ করতি হবে। ভেড়ির বাঁধ কাটেকুটে চাষের মাঠে জল ঢোকাতি হবে রাতারাতি, যাতে দিনেরবেলায় ট্রাক্টর চালায়ে ভেজা মাটি উল্টি দেয়া যায়।’

খাটনি একটু বেশি হচ্ছে বটে, কিন্তু নীলমাধব প্রতিদিনই তিনটি হাজার টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরছে সকাল ১০টার মধ্যে। তারপর দুপুরে খেয়ে দেয়ে জম্পেস করে ঘুম। রাতের শেষ ট্রেনে ক্যানিং। সেখানে খানিকটা সময় ক্লাব ঘরে চা আর বিড়ি-টিড়ি খেয়ে বিশ্রাম নিয়ে বেরিয়ে পড়া ছক্বার বাইকে। কোন কোন বাঁধ কাটতে হবে তার লিস্ট থাকে ছক্বার কাছে।

আজ বেশি কষ্ট হয়নি। এই বাঁধের উপর দিয়ে লোক চলাফেরা করে না বলে মাটি নরম। তাড়াতাড়ি কেটে দেয়া গেছে। জল হুড়মুড় করে ঢুকছে জমিতে। নীলমাধব সেই জলের তোড়ে কোদালে লাগা মাটি ধুয়ে নেয়। নিজের হাত-পা ধুয়ে নেয়। এসময় ভেড়ির উলটো দিকে কয়েকটা আলোর ফুটকির নড়া-চড়া দেখে অবাক হয়। ছক্বা ছুটে এসে বলে, ‘নীলুদা, এক মুহূর্ত দেরি কোরো না। ওই দ্যাখো আলোগুলো ছুটি আসতিছে এদিকপানে।’

এক হ্যাঁচকা টান দেয় ছক্বা। ‘ওঠো, ওঠোদিনি, বাইকের পেছনে ওঠো।’

ছুটন্ত আলোগুলোর সাথে এবার পায়ের শব্দও কাছাকাছি। ছক্বা বাইকে ঝড় তুলে দেয়। সে ক্যানিং স্টেশনে যায় না। গলি-ঘুজি রাস্তা দিয়ে একেবারে বাইপাসে। হাফ-প্যান্ট, গেঞ্জি পরে আর কোদাল-সাবল হাতে নীলমাধবের মাথা ফাঁকা হয়ে গেছে। বাইকের আয়নার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ ছক্বা বলে, কুদাল আর সাফল ফেলি দাও ওই ডোবার ভেতরে নীলুদা। সামনে একটা চায়ের দোকানে দাঁড়াতিছি, সেখানে চা-খেতি খেতি তুমি ব্যাগ থেকে জামাপ্যান্ট বের করি পরি নাও। না হলে যমের কাছ থেকে ছাড়া পেয়ে, যমের অরুচির হাতে, মানে পুলিশের হাতে গিয়ে পড়বানে।’

নীলমাধব কিচ্ছুটি বুঝে ওঠেনি। ঘটনার ল্যাজা-মুড়ো সে কিচ্ছুটি জানে না। নীলমাধবের চোখ জোড়া প্রশ্ন অনেক আগেই পড়তে পেরেছে ছক্বা। সে চায়ের গেলাসে চুমুক দিয়ে একটা বিড়ি ধরাল। এই বয়স্ক মানুষটাকে কেন যেন বিপদের ভেতর ছেড়ে দিতে ইচ্ছে করছে না। নিজের বিপদটা আজ চোখের উপরে নেমে আসতে দেখেছে। দু’জন মেয়েছেলেকে বাঁধের উপরে অত ভোরে ঘোরাঘুরি করতে দেখে সন্দেহ আগেই হয়েছিল। তবে প্রথমে ভেবেছিল অন্ধকারে মেয়েছেলেরা মাঠকাজ সারতে এসেছে। কিন্তু খানিক বাদেই ওদের শঙ্খ বাজানো আর দূরে আলোর ফুটকিগুলোর নড়াচড়া ছক্বাকে বিপদের গন্ধ টের পাইয়ে দিয়েছে। প্রায় ধরে ফেলেছিল আর কি! আর ধরা পড়লে এতক্ষণে গণপিটুনিতে কী যে হতো, ভাবলেও শিউরে উঠছে। গতবছরে মেহতাব-এর তালগোল পাকানো লাশ পড়ে থাকতে দেখেছিল বাসন্তী বাজারে। মেহতাব-এর নামে পুলিশও কাঁপত, তার লাশ।

‘ভাইডি, কোনও পব্লেম আছে?’

নীলমাধব ছক্বার পাশে বসে তার বন্ধ চোখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে শুধোয়। ভোরের মিঠে হাওয়ায় বিড়ির তীব্র গন্ধ প্রকট হয়ে উঠেছে।

‘নীলুদা, তোমার মতো গেঁয়োলোক আমি দেকিনি। তুমি ক্যানো বুজতি চাওনা বহুৎ বেইমানির কাজ এডা।’

‘কেন কেন! এই যে সুশান্ত-দা কলো, এডা হলো গে সমাজসেবার কাজ। সুন্দরবনের ডেভলপমেন্ট নিয়ে এই এনজিও কাজ করতিছে। দেশ-বিদেশ থেকে নাকি ট্যাকা আসে!’

‘মিছে কতা। সাধারণ মানষির পেটে লাথি মারি সুশান্তদার মতো কয়ডা মানষির উন্নতি হতিছে এহানে।’

‘কিন্তু, এই যে আমারে এত ট্যাকা দিতিছে, তা পাতিছে কোত্থেকে!’ নীলমাধব কিছুতেই অবিশ্বেস করতে চায় না।

‘তোমারে দিতিছে, আমারে দিতিছে, আরো কয়েকজনকে। যেখানে যেখানে প্রণামি দিলি নিঃশব্দে রাতের অন্ধকারে সবকিছু হতি পারে, সেখানে দিতিছে। সব দিয়ে থুয়েও ওদের হাতে বিস্তর ট্যাকা। এত ট্যাকা যে একটা নতুন দ্বীপ কিনতি পারবে, সেখানে শহর গড়তি পারবে।’

নীলমাধবের শরীরে কাঁপুনি এসেছে, সে ছক্বার হাতটা ধরে কাঁপুনি থামাতে চায়। মনের ভেতরের অপাপভূমি থেকে সমর্থনের ইশারা পেতে চায়। ‘কিন্তু ছ্যামড়া, আমি তো কোনও অন্যায় কাজ করি নাই, আমি গায়ে খেটে ট্যাকা নিছি, হারামের কিছুডি নিই নাই। নিজের গতর নিংড়ে মাছের গতর গড়ছি।’

মুখে হাত চাপা দিয়ে হাসল ছক্বা। লোকজনের নজরে পড়তে চায় না। সে ফিসফিস করে, ‘ছাই! তোমার ওষুধে মাছ বাড়ত না, মরত।’

তা কেন, আমি তো আমাদের রেলবাজারে গিয়ে শুনছি, মাছের ফলন বাড়িছে, তা-ই দাম কম মাছের। আমার তো বেশ ভালো লাগত। সাধারণ মানুষ এই যে কম দামে মাছ পাতিছে, সিকেনে আমার ভূমিকা আছে।’

‘আছেই তো।’ছক্বার গলার স্বর কেমন ধাতব। সে হিসহিসায়, ‘বাসন্তীতে এত বেকার পোলাপান থাকতি তোমারে ক্যান কাজে নিল, তা কি একবারও ভাবিছ!’

নীলমাধব কাঁচুমাচু মুখে কথা ফেলে, ‘হাদুই শোন দিন, তা তো কই ভাবি নাই। ভাবছি শউড়ের পো কয়েছে তাই শান্তনুদা কাজটা দেছে।’

হ্যাঁ, শান্তনুদা তোমার মতো একটা সাদাসিদে লোক খুঁজতিছিল, যে বেশি খপর রাহে না। এলাকার বাইরের লোক হলি সুবিধা। পাঁচকান হবার ভয় নাই।’

‘ক্যান, কীসের ভয়?’ নীলমাধবের অবাক গলা।

ছক্বা নীলমাধবের কাছে আরো ঝুঁকে আসে। হ্যাঁ, সবটা জানিয়ে দেওয়া ঠিক হবে। মাস খানেক ধরেই তার মনে হচ্ছিল, বড়ো বিপদ আসতে চলেছে। আসলাম সানিকে অত লোকের মাঝে অপমান করেছিল শান্তনুদা। সেটা ঠিক হয়নি। গত সাত-আট বছর একসাথে রাজনীতি করে শান্তনুদার ঘাঁত-ঘোঁত সব জানে আসলাম। বাসন্তী, গোসাবা, কুলতলির প্রায় ৪৫ শতাংশ মানুষ মুসলিম। সন্দেশখালির দিকে এক একটা গাঁ তো পুরোটাই। আসলাম এই সব জায়গার ভোট জড়ো করত নানা কৌশলে। সে কি সহজে হজম করবে! গত সপ্তাহে শান্তনুদার এক স্যাঙাত উদয় মণ্ডলকে সোনারপুরে কুপিয়েছে আসলামের ছেলেরা। মাটি-কাটা নিয়ে বিবাদ। ছক্বা এতদিন এদের সাথে থেকে দেখেছে, পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া বাধিয়ে শত্রু নিকেশ করত শান্তনু-আসলাম জুটি। এখন আসলাম বুড়ো আঙুল চুষবে!

ছক্বা বলল, ‘নীলুদা, তুমি জালায় মাছের সার দিতে না, বিষ দিতে।’

‘অ্যাঁ কী কতিছিস ছ্যমড়া! আমি তো নিজের চোখে দেখিছি, মাছেরা ডাঙার কাছে এসে মুখ চিবোয়।’

‘ঠিক দেখিছ নীলুদা। তবে মাছে যে খাচ্ছে, তা ঠিক না। তোমার ছড়ানো সারে এমন অল্প করে বিষ থাকত, যে মাছ জলের ভেতর থাকতি না পেরে ছটফট করতি করতি ডাঙার কাছ ঘেঁষে সব মুখ বাড়ায়, আঁকুপাঁকু করে নিশ্বাস নেয়। মরে না। ঝুড়ি ঝুড়ি মাছ। কুইন্টল কুইন্টল মাছ। একসঙ্গে এত মাছ কিনবে কে! ভেড়ির মালিক জলের দরে তুলে দেয় নন্দীবাবু, দাসবাবু, ইমতিয়াজদের হাতে। এরা সবাই উঁচু উঁচু মান্যি জনের লোক। কাঁটায় যে দাম এরা হাঁকে, সেই দামেই ছাড়ি দিতি হয়। লাভের ট্যাকার মোটা অংশ শান্তনুদার ঘরে ঢোকে।’

নীলমাধব কথা হারিয়ে ফেলেছে। সে ছক্বার কবজি শক্ত করে ধরে আছে। সে তোতলায়, ‘কি কিন্তু আজ তো মাছে বিষ দিতি যাই নাই, সিকেনে আজ অত মানষি তাড়া করল, ক্যান?’

‘আজ কী করছিলে বলো?’

‘কেন, আজ তো কোনও দোষ করি নাই, মাঠে চাষের জন্য জল দিতিছিলাম।’

ছক্বার গলায় শ্লেষ, ‘কেন, তুমি কি সেচ দফতরের কর্মী নাকি, যে শ্যালো চালায়ে জল তুলে দেবা চাষিদের!’

ছক্বা থামে না, সে বলে চলে, ‘মাঠে কী জল ছাড়ছিলে?’

‘মীনের ভেড়ির জল।’

‘চিংড়ির মীন কোন জলে চাষ হয়? মিঠা জলে না নোনা জলে?’

‘নোনা জলে।’

‘ধান, পটল চাষের জন্যি কী জল লাগে?’

নীলমাধব মুখ চুন করে বলে ‘কেন, মিঠা জল।’

‘তালে বলো নীলুদা, তুমি ভেড়ির নোনা জল চাষের মাঠে ঢুকিয়ে চাষির কোন উপকারটা করলে!’

‘ভাইডি, আমারে যে কলো, রুখা জমি চাষের জন্যি বানাতি হবে। ভোর ভোর জল ঢুকালে চাষের সুবিধা। জমি নরম হবেনে। রোদ ওঠার আগে চাষ দিতি পারবে চাষি।’

‘তুমি বড্ড কাঁচা লোক গো নীলুদা। কিচ্ছু খপর রাখো না। এখন শহরের লাগোয়া আর জমিন নাই যে ঘরবাড়ি আর ফ্ল্যাট বানান যায়। সক্বলেই তাই জলা জমি, চাষের জমির দিকে হাত বাড়ায়ে আচে।’

নীলমাধবের গলা শুকিয়ে এসেছে। তাহলে সে এতদিন একটাও ভালো কাজ করেনি! নীলমাধবের পায়ের তলা থেকে ঝুরঝুর করে মাটি সরে সমুদ্রের নোনা জলের দিকে চলে যাচ্ছে। তার বুকে এখন হাউ হাউ করছে কান্না। কান্না চেপে সে অস্ফুট আওয়াজ বের করল, ‘কিন্তু চাষের জমিনে ভেড়ির নোনা জল ঢুকায়ে প্রামোটারের কী লাভ?’

‘আছে নীলুদা। সব সময় লাভ চোখের উপর দেখতি পাবা না। একটু তলায় থেকে সময় হলেই সে ভুস করে মাথা তোলে।’ চায়ের গেলাসে শেষ লম্বা চুমুক দিয়ে আবার বিড়িতে টান দেয় ছক্বা। তারপর বিড়ির টুকরোর উপর সব রাগ ঝেড়ে মাটিতে আছাড় মেরে থক করে একগাদা থুতু ফেলে।

‘ফ্ল্যাট বাড়ি বানানো দেহিছ নীলুদা? ফাঁকা জমিতে মাটি কেটে  ইট-বালি-সিমেন্ট সব মাটির ভেতর সেঁধোয়। পেত্থমে মনে হয় রাশি রাশি ট্যাকা মাটির বুকি ঢুকি যাতিছে। কিন্তু খানিক বাদে দেখবানে লকলক করি ধানের চারার মতো মাথা তুলি দাঁড়াতিছে এক একটা ফ্লোর, মানে লাখে লাখে ট্যাকা। তেম্বায়, ঠিক তেম্বায় শান্তনুদা চাষের জমিতে নোনা জল ঢুকোয়ে চাষিরে বাধ্য করে ভেড়ি বানাতে। জমিতে নোনা লেগে গেলে আর যে ফসল হবে না গো।’

ছক্বা কথা থামায়। সে দেখে নীলমাধব ঝরঝর করে কাঁদছে। ‘কী হল, কাঁদতিছ ক্যান?’

‘ভাইডি, তালে তো আমি কত লোকের ক্ষেতি করে দিলাম, না! কত চাষির কপাল খালাম, হায় হায় রে।’

ছক্বা ধমকাল, ‘কী ন্যাকামিটা করতিছ! এখানে লোকজন জড়ো করি সব জানায়ে দেবা বুঝি! হাড়গোড় একখানাও আস্ত থাকবেআনে ভাবিছ? চুপটি করে বাইকের পেছনে ওঠোদিন। তোমারে আজ বাড়িতে ছেড়ে দে আসতিছি। কেলো ফোনে খপর দেছে শ’দুয়েক লোক শান্তনুদার বাড়ি ঘিরে ফেলিছে। কী হয় কে জানে! আমারে তো কলো, ডুব মারতি।’

খুবই বিধবস্ত দেখাচ্ছে বাসন্তীর রুস্তম ছক্বাকে। সে সুশান্তদার নানা কারবারে জড়িত। নিজে কিছুই করে না, কিন্তু বাইকবাহনে চেপে নজরদারি করে। ভালো চেহারা। চোখে কালো চশমা, কানে দুল। গ্রামের গরিব মানুষেরা সমীহ করে। একটু থাকা, একটু কড়া চোখে তাকানো, তাতেই অনেকটা কাজ হয়ে যায়। সুশান্তদা বদলে মাস গেলে ৩০ হাজার দেয়।

এখন ছক্বার মনে হচ্ছে, দাদার গোলামিটা না করে, মানে জমি দখল করা, অন্যদলের মানুষের ইটভাটা বন্ধ করে দেওয়া, বাজার থেকে তোলা আদায় করা, মাটি বিক্রি করা –মানে হাজার একটা সুশান্তদার বেআইনি কাজে নিজেকে না জড়িয়ে, যদি এরকম একটা চায়ের দোকানও করত, শান্তিতে দু-মুঠো ভাত খেতে পারত। এতক্ষণে হয়তো গণ ধোলাইতে সুশান্তদা-র নাড়িভুড়ি বেরিয়ে গেছে। এখন পুলিশে গুঁতোলেও গুঁতোবে, নয়তো ওই আসলামের লোকজন মেরে পেট চিরে মাতলায় ভাসিয়ে দেবে। মরণ তার বাঁধা।

ভাবতে ভাবতে বাইকে স্টার্ট দেয় ছক্বা। বাইকের পেছনে বসা এক নিতান্ত ভালোমানুষকে মৃত্যুর হাত থেকে ছিনিয়ে আনা তার এ জীবনের একমাত্র ভালো কাজ। রুবির মোড়ে এসে ছক্বার হঠাৎ মনে হল, নীলমাধবদার বাড়িতে তো কিছুদিন সে লুকিয়ে থাকতে পারে। সেসময় ছক্বার মুখের উপর ভোরের সূর্য এসে বসেছে। তক্ষুনি বাইকের পেছনে বসা ভেঙে-চুরে যাওয়া নীলমাধবের চোখে পড়ল বড়োই ফ্যাকাশে এক বাঁকা চাঁদ পশ্চিমের আকাশে শুয়ে আছে। আর ছুটন্ত বাইকের পেছনে সোঁ সোঁ হাওয়ার ভেতর তার কানে এসে যেন বাজল নন্দিনীর গলা, ‘নিশি রাত বাঁকা চাঁদ আকাশে।’

 

 

গন্তব্য ভেড়াঘাট

মধ্যপ্রদেশের জব্বলপুরের একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ডেস্টিনেশন ভেড়াঘাট। তবে সবাই এর খোঁজ রাখেন না, প্রকৃত অর্থে যারা প্রকৃতি প্রেমিক, তাদের ট্রাভেল ডায়ারির এ এক আবশ্যক সংযোজন। জব্বলপুর এয়ারপোর্ট থেকে ৪৫ মিনিটের গাড়ি-পথে পৌঁছে গেছি ভেড়াঘাট। অক্টোবরের শুরু কিন্তু বেশ গরম। সদ্য বর্ষাস্নাত পাহাড়তলিতে যেন সবুজের রায়ট।

নর্মদার বহতা স্রোত ধরে জব্বলপুর থেকে ২০ কিমি দূরত্বে ভেড়াঘাটের অবস্থান। ছোট্ট এই জনপদ তেমন জনবহুল নয়। কিন্তু সৌন্দর্যের খনি। অতিকায় মার্বেল পাথরের ল্যান্ডস্কেপ ও নদী, যেন এক পিকচার পোস্টকার্ড-এর সাক্ষী করল।

বর্ষা পেরোনোর পর নর্মদা যেন তার স্বরূপে উদ্ভাসিত। একটি বোট-এর সঙ্গে দরদাম করে আমরা চড়ে বসলাম। মিনিট পনেরো জলে ভেসে বেড়ানোর পর যেন এক অন্য পৃথিবীতে গিয়ে পড়লাম। এ বড়ো প্রাচীন এক ল্যান্ডস্কেপ, যার বিশালত্বে ভয় করে। মার্বেলের ওই প্রাচীর যেন কোন প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে অমনই অগম্য অবস্থায় রয়ে গেছে।

ভেড়াঘাটে ক্রুজ শেষ করে আমরা চললাম পরের গন্তব্য ধুঁয়াধার ফল্স দেখতে। এ এক অসাধারণ জলপ্রপাত যাকে ইন্ডিয়ান নায়াগ্রার আখ্যা দেওয়া হয়। কেবল কার-এ চড়ে এর দর্শন করা একটা লাইফটাইম এক্সপিরিয়েন্স। শাহরুখ খান ও করিনা অভিনীত ছবি ‘অশোকা’ এই অঞ্চলে শুট হওয়ায়, অনেকেই পর্দায় এর সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়েছেন। এই অপরূপ জলপ্রপাত সত্যিই মন্ত্রমুগ্ধ করে দেয়।

travelogue
Destination Bheraghat

আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে মধ্যপ্রদেশ ট্যুরিজমের-এর নিজস্ব রিসর্টে। ভেড়াঘাটের খুব কাছেই এই রিসর্ট এক কথায় অসাধারণ। লাঞ্চ করে আমরা বেরিয়ে পড়লাম চৗষট্টি যোগিনী মন্দিরের উদ্দেশে। জব্বলপুরের ঐতিহাসিক তাৎপর্যটি জেনে নিই এক লোকাল গাইডের সাহায্যে। মৌর্য ও সতবাহন সাম্রাজ্যের ইতিহাস বহন করে জব্বলপুর। পরবর্তীকালে গু৫ ও কালাচুরি বংশের শাসকরা এখানে রাজ্যপাট চালান। এই কালাচুরি রাজত্বের এক অমাত্যই চৌষট্টি যোগিনী মন্দিরের প্রতিষ্ঠা করেন। ভেড়াঘাটের অনতিদূরে পাহাড়ের উপরে অবস্থিত এই মন্দির, ভারতের সবক’টি যোগিনী মন্দিরের মধ্যে সর্ববৃহৎ।

চৌষট্টি যোগিনী মন্দির ভারতের প্রচীনতম মন্দির স্থাপত্যগুলির অন্যতম। বস্তুত এটা দুর্গামন্দির। যোগিনীরা দেবীর সহচরী। প্রতিটি যোগিনী মূর্তি দেয়ালে খোদাই করা এবং এক গোলাকার প্রাচীরের উপর এগুলির অবস্থান। তবে প্রাচীরে রয়েছে মোট ৮৪টি কম্পার্টমেন্ট। তার মধ্যে ৬৪টি যোগিনী মূর্তি, অন্যগুলো অন্যান্য দেব-দেবীর। এই মন্দিরে পৌঁছোতে গেলে ১০০টি সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠতে হয়। একবার পৌঁছে গেলে কিন্তু মুগ্ধ করার মতো এক সৌন্দর্যের সাক্ষী থাকবেন সারাজীবন।

Travelogue
Destination Bheraghat

অনেকগুলি মূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায়, বর্তমানে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভের তত্ত্ববধানে এর সংরক্ষণের চেষ্টা হচ্ছে। গোলাকার ওই প্রাচীরের মাঝখানে গৌরী-শঙ্কর মন্দির। উপর থেকে নর্মদাকে দেখাও এক অনন্য সুন্দর অভিজ্ঞতা। সেই প্রাচীন কাল থেকে মানুষ কেন প্রকৃতির উপাসক হয়ে এসেছে, পাহাড়ের উপরে এই অনির্বচনীয় দৃশ্য দেখতে দেখতে সেটাই উপলব্ধি করছিলাম।

ফল দিয়ে দু’ রকম

কথায় বলে, প্রতিদিন একটি করে আপেল খেলে সারা জীবনের জন্যে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন হয় না। এই প্রবাদের সত্যতা আমরা পদে পদে অনুভব করি কারণ,  আপেল এমন একটি ফল যার মধ্যে রয়েছে ভরপুর পুষ্টিকর উপাদান যা শরীরের জন্যে অত্যন্ত উপকারী।  অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট, ভিটামিন, মিনারেল ও ফাইবারে ভরপুর  আপেল, খুব সহজেই বাজারে পাওয়া যায় ৷

আবার গরমের ফল আম এমনই সুস্বাদু, যা দেখে লোভ সংবরন করা মুশকিল৷ তাই যাঁরা ওজন কমানোর রেজোলিউশন নিয়েছেন তারা সাবধান৷ ওজন বাড়লেও এই ডিশটি থেকে মুখ ফেরানো দায়৷

আমরা দিচ্ছি ফল দিয়ে তৈরি দুটি অসাধারণ রান্নার হদিশ, যা নিমেষে সবার মন জয় করে নেবে৷

রাইস অ্যাপল স্যালাড

উপকরণ : ৩ কাপ বাসমতি চাল সেদ্ধ করা, ১টা আপেল কুচি করা, ১টা সবুজ আপেল কুচি করা, ১ ছোটো চামচ ভাজা জিরে, ১/২ ছোটো চামচ চিলি ফ্লেক্স, ৩ বড়ো চামচ ধনেপাতাকুচি, ২ বড়ো চামচ লেবুর রস, ৩ বড়ো চামচ অলিভ অয়েল, নুন, গোলমরিচ স্বাদমতো।

প্রণালী : একটা বোল-এ সমস্ত উপকরণ ভাতের সঙ্গে মিশিয়ে নিন। লেবুর রস ছড়িয়ে টস করে, সার্ভ করুন।

Pro-Biotic Yogurt Recipe

 

প্রোবায়োটিক ইয়োগার্ট

উপকরণ : ২০০ মিলি ইয়োগার্ট, ২০০ মিলি ফ্রেশ ক্রিম, ২৫০ মিলি কনডেন্সড মিল্ক, ১০০ গ্রাম আমের টুকরো, ১০০ মিলি প্রো-বায়োটিক মিল্ক।

প্রণালী : একটা বোল-এ ইয়োগার্ট, কনডেন্সড মিল্ক, ক্রিম এবং প্রো-বায়োটিক মিল্ক একসঙ্গে মিশিয়ে ফেটিয়ে নিন। ফ্লেভারের জন্য দিন ম্যাঙ্গো পিউরি। এবার এগুলি রোমেকিন্স বোলস্-এ ঢেলে আভেনে ওয়াটার বাথ করতে হবে। অর্থাৎ হট ওয়াটার প্যানে রেখে ১৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায়, ১৫ মিনিট বেক করতে হবে। এরপর আমের টুকরো দিয়ে সাজিয়ে ঠান্ডা পরিবেশন করতে হবে।

সারপ্রাইজ

অভিজিতের সঙ্গে পুনায় তার কর্মস্থলে চলে যাচ্ছে নন্দিনী। স্টেশনে তাদের দুজনকে সি-অফ করতে এসেছেন অভিজিতের বাবা-মা এবং বোন সীমা। মাত্র একমাস হল অভিজিতের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে নন্দিনীর। বিয়ের পর এই কটা দিন যেন সুখের স্রোতে ভেসে কেটে গেছে। অভিজিতের পরিবারের সদস্যরা মাত্র একদিনেই ভালোবেসে ফেলেছেন মাতৃহারা মেয়েটিকে।

আজ ছেলে-বউমাকে বিদায় জানাতে এসে সে-কথাটি বিলক্ষণ বুঝছেন সুরমা। তার দুচোখ জলে ভরে এসেছে। নন্দিনীর চিবুক ধরে আদর করে বলে উঠলেন, ‘মন চাইছে না তোকে ছেড়ে দিতে নন্দিনী। কিন্তু কী করব বল! ছেলেটা বিদেশবিভুঁইয়ে একা থাকবে, এটাই বা মা হয়ে কী করে সহ্য করি বল! জানি, তোর মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। মন খারাপ করিস না মা। যখন ইচ্ছে করবে চলে আসবি। আর ফোন তো রইলই!’

সুরমার কথা শুনতে শুনতে মনটা ভিজে উঠল নন্দিনীরও। সুরমার কাঁধে মাথা রেখে সে ফুঁপিয়ে উঠল। নিজের মায়ের স্মৃতি, সময়ের ব্যবধানে আর খুব বেশি উজ্জ্বল নয় তার কাছে। সুরমার মধ্যে, তার দেওয়া স্নেহের মধ্যে, সে তার নিজের মায়ের ছায়া দেখতে পেয়েছিল।

সীমা এগিয়ে এসে কানেকানে বলল, ‘বউদি, তুমি কী গো? আজকালকার মেয়েরা ভাবে, কতক্ষণে শ্বশুর-শাশুড়ির কড়া শাসনের বাইরে বের হবে। তোমার কাছে বিনা আয়াসে সেই সুযোগ যখন এসেইছে, তখন তুমি কাঁদছ? সত্যি তোমার দ্বারা কিস্যু হবে না!’

সীমার কথা শুনে সুরমার কাঁধ থেকে মাথা তুলে নন্দিনী ম্লান হাসি নিয়ে তাকাল।

পুনেতে একটা ফ্ল্যাট কিনেছে অভিজিৎ। তবে এখনও গৃহপ্রবেশ করেনি। একেবারে নন্দিনীকে নিয়ে সেই বাড়িতে গিয়ে উঠবে, ঠিক করেছে। ফার্নিচারগুলো অবশ্য বিয়ে উপলক্ষ্যে কলকাতায় ছুটি নিয়ে আসার আগেই নতুন ফ্ল্যাটে রেখে দিয়ে এসেছে সে। আর, চাকুরেদের যে-মেসটায় থাকত এতদিন, বকেয়া মিটিয়ে ছেড়ে দিয়ে এসেছে সেটা।

ট্রেন ছাড়ার সময় হয়ে আসতে, ওরা নিজেদের কামরায় উঠে পড়ল। একটা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কেবিন ভাড়া নিয়েছে অভিজিৎ। ভারী স্লাইডিং দরজাটা টেনে দিলে কেবিনটা একেবারে ব্যাক্তিগত হয়ে যায়। জানলার বাইরে গাঢ় অন্ধকার নেমেছে। কাচের বাধা ভেদ করে বাইরে কিছুই দেখা যায় না। রাত নটা নাগাদ ট্রেনের প্যান্ট্রি কার থেকে খাবার দিয়ে গেল। খেয়েদেয়ে দশটা নাগাদ উপরের বাংকে শুতে চলে গেল অভিজিৎ।

নন্দিনীও হাতে একটা পেপারব্যাক নিয়ে আধশোয়া হল। কিন্তু তার ঘুম আসছিল না। পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে বেরিয়ে হঠাৎই তার নিজেকে খুব একা মনে হতে লাগল। আর মনে পড়ে যেতে থাকল পুরোনো স্মৃতিগুলো।

মনে পড়ল, অমরশংকর কত চিন্তিত ছিলেন মেয়ের বিয়ে দেওয়া নিয়ে! নন্দিনী সুন্দরী, উচ্চশিক্ষিতা। বাধাটা সেদিক থেকে নয়। কিন্তু, পারিবারিক ইতিবৃত্তটি শোনার পর পাত্রপক্ষেরা পিছিয়ে যায়। আর, অমরশংকর তো সে কাহিনি না বলে মেয়ের বিয়ে দেবেন না। একসময় পাত্রপক্ষের সামনে সেজেগুজে বসতে বসতে ক্লান্ত নন্দিনী তো বাবাকে বলেই ফেলেছিল, ‘তুমি আর চেষ্টা করো না। বিয়ে করাটাই তো জীবনের একমাত্র লক্ষ্য নয়! আমি পড়ব। আরও পড়ব। ভালো একটা কেরিয়ার তৈরি করব।’

অমরশংকরও হতাশ হয়ে পড়ছিলেন ক্রমশ। এইসময়েই হঠাৎ দেবদূতের মতো হাজির হলেন সুরমা আর জয়ন্ত। সব শুনেও ওরা ওদের সিদ্ধান্তে অটল রইলেন।

অথচ সেই ইতিহাসের জন্য নন্দিনী কোনওভাবেই দায়ী ছিল না। নন্দিনীর মা বিনতা খুবই অর্ন্তমুখী স্বভাবের মহিলা ছিলেন। এমনকী কষ্টের কথাও তাকে কেউ কখনও মুখ ফুটে বলতে শোনেনি।

অমরশংকর সবে কলেজ পাশ করে চাকরি পেয়েছেন, এই সময়টায় বাড়িরঅমতে বিয়ে করেছিলেন বিনতাকে। বিয়ে করে আর দক্ষিণ কলকাতার সাবেকি বাড়িতে ওঠেননি ওরা। অন্যত্র বাসা নিয়েছিলেন। নন্দিনীরও জন্ম এখানেই। সমস্যার শুরু তার পরে।

নন্দিনীর খুব আবছা ভাবে মনে পড়ে শীতকালের এক দুপুরের কথা। স্কুল ছুটি ছিল। তাই বাড়িতেই ছিল সেদিন নন্দিনী। অমরশংকর যথারীতি অফিসে গেছিলেন। বাইরের বারান্দায় একা বসে, পুতুল এবং খেলনাবাটি নিয়ে সংসার পেতেছিল নন্দিনী। এইসময় সহসা বেজে উঠেছিল ফোনের ঘণ্টিটা। বিনতা ফোন ধরে কথা বলছিলেন। হঠাৎ খুট করে একটা শব্দ হতে কৗতূহলী হয়ে মায়ের ঘরের দরজায় ছুটে এসে দাঁড়িয়েছিল নন্দিনী। তারপর ভিতরের দৃশ্য দেখে সে যেন পাথর হয়ে গেছিল।

ফোনের রিসিভারটা ঝুলছে। বিনতা উপুড় হয়ে পড়ে আছেন মেঝের উপর। চুলগুলো খোলা। হাওয়ায় উড়ছে। থরথর করে কাঁপছে বিনতার শরীরটা। মুখ দিয়ে একটা গোঙানির আওয়াজ বের হচ্ছে। উন্মত্তের মতো মাথাটাকে এপাশে-ওপাশে দোলাচ্ছেন বিনতা।

নন্দিনীর বুকের মধ্যেটা শুকিয়ে গিয়েছিল। সে কী করবে প্রথমে বুঝে পেল না। তারপর নিজেই দরজা খুলে পাশের বাড়ি থেকে ডেকে এনেছিল দীপা কাকিমাকে। দীপাও ঘাবড়ে গিয়ে অমরশংকরকে ফোন করেছিল তাঁর অফিসে। দ্রুত বাড়িতে চলে এসেছিলেন অমরশংকর।

খানিকক্ষণ পরে ডাক্তার এসেছিলেন। বিনতাকে ঘুমের ওষুধ দেওয়া হয়েছিল। ক’দিনের মধ্যে বেশ সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন বিনতা। কিন্তু ডাক্তারবাবু সতর্কবাণী শুনিয়ে গেলেন। হিস্টিরিয়ার লক্ষণ দেখা দিচ্ছে বিনতার মধ্যে।

বিনতা সেই সময়ের মতো সুস্থ হয়ে গেলেও ক”দিন পরে আবার তার মধ্যে ফের একইরকম বৈকল্য দেখা দিল। তারপর থেকে বারবারই এমন হতে থাকল। উন্মত্তের মত আচরণ করতে লাগলেন বিনতা। এমনকী এসময় বিনতার কাছাকাছি যেতে ভয় পেতেন অমরশংকর নিজেও। ভয়টা যতটা তার নিজের জন্য, তার ঢের বেশি বিনতার জন্য।

বিনতা যখন পাগলের মতো আচরণ করেন, তখন কেউ তার দিকে এগোলেই তিনি ভাবতে থাকেন তাকে বুঝি মারতে আসছে। তার এই রোগটা ক্রমেই বাড়তে লাগল। কেবল প্রকোপের সময়টুকুতেই নয়, তার বাইরেও তিনি অসংলগ্ন আচরণ করতে শুরু করলেন।

অমরশংকর যেন মনের দিকে থেকে ভেঙেচুরে গেলেন। তার কাছের বন্ধুরা তাকে পরামর্শ দিলেন, বাড়িতে না রেখে বিনতাকে কোনও মেন্টাল অ্যাসাইলামে রাখতে। তাদের আসলে ভয় ছিল নন্দিনীকে নিয়ে। ডাক্তারবাবুও বলেছিলেন, ‘বিনতা যেরকম ভায়োলেন্ট হয়ে পড়ছে, তাতে করে আপনার নন্দিনীর কথাটা বোধহয় একটু ভাবা উচিত অমরবাবু। শুধু শারীরিক ক্ষতির ভয়ই নয়, বাচ্চা মেয়ে, তাই মনের উপরেও বিশ্রী চাপ পড়ার ভয় থেকেই যায়।’

অমরশংকর স্ত্রীকে খুবই ভালোবাসতেন। কিন্তু ডাক্তারবাবুর পরামর্শ শোনার পর আর ঝুঁকি নিতে রাজি হলেন না। সবচেয়ে নামি ও খরচবহুল একটি মেন্টাল অ্যাসাইলামে বিনতাকে রেখে এলেন তিনি। মাস-মাস মোটা টাকা ডোনেশন দিতে হতো সেখানে। বিনিময়ে বিনতা পেতেন সেরা যত্ন এবং দেখভাল।

নন্দিনীর মনে আছে, সপ্তাহে দুবার বিনতার সঙ্গে দেখা করতে যেতেন অমরশংকর। ঘণ্টাখানেক বিনতার পাশে বসে কাটিয়ে আসতেন। বিনতা বেশি কথা তো বলতেন না। অমরশংকরও চুপ করে তার পাশে বসে থাকতেন। মাঝেমধ্যে নন্দিনীর কথা আলোচনা করতেন।

এক সোমবার সকালে অ্যাসইলাম থেকে ফোন এল। বিনতা নেই। ফোনটা রেখে বাবা গুম মেরে বসে রইলেন। তারপর নন্দিনীকে ডেকে বললেন, ‘আমাদের এক্ষুনি একবার মেন্টাল অ্যাসাইলামে যেতে হবে। তুমি তৈরি হয়ে নাও।’ কী ঘটেছে, তা টেলিফোনের কথোপকথন শুনেই বুঝতে পেরেছিলন নন্দিনী। আলদা করে বলতে হয়নি।

বিনতার ক্রিয়াকর্মে যোগ দিতে নন্দিনীর দাদু-ঠাকুমাও এলেন। নন্দিনী তখন দশ বছরের বালিকা। প্রতিমা– অমরশংকরের মাকে এই প্রথম সে দেখল। ভদ্রমহিলার চোখেমুখে একটা অস্বাভাবিক কাঠিন্য আছে। কাজকর্ম মিটে যেতে প্রতিমা ছেলেকে বললেন, ‘তুমি তো ও বাড়িতে ফিরবে না। সে প্রত্যাশাও আমি বা তোমার বাবা করি না। কিন্তু নন্দিনীর ভবিষ্যতের কথা ভেবেই তোমার উচিত ওকে আমাদের কাছে রেখে মানুষ করা।’

অমরশংকর শুনে, গলায় শ্লেষ ঢেলে বললেন, ‘বেঁচে থাকতে বিনতাকে কোনওদিন তোমরা মেনে নাওনি। এখন তার মেয়েকে নিয়ে যেতে চাও?’

প্রতিমার ঠোঁটের চারপাশ আর চোখের তলার চামড়াটা আশ্চর্য ভাবে কুঁচকে গেল। কর্কশ স্বরে বললেন, ‘বিনতা তোকে আমাদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে গেছিল অমর। ওকে কোনওদিন ক্ষমা করতে পারব না আমরা।’

‘বিনতা নয়, তোমরা। তেমারাই আমাকে দূরে ঠেলে দিয়েছিলে।’ অমরশংকর রুখে উঠলেন, ‘সেখানেই শেষ নয়। আজ আমি ভালোই জানি, কার ফোন পেয়ে বিনতা অমন পাগলের মতো আচরণ করত।’

প্রতিমা চুপ করে গিয়েছিলেন। নন্দিনীর অতিসংবেদী শিশুমন তখনই স্পষ্ট করে বুঝে গিয়েছিল, সেদিন দুপুরে আসা ফোনটার অন্য প্রান্তে কে ছিল। ঘৃণায় ভরে গিয়েছিল তার মন। সে ঘৃণা আজও মোছেনি মন থেকে। কিন্তু এই কদর্য ছবিটার উলটো দিকে একটা সদর্থক ছবিও ছিল। যার জন্য অমরশংকরের জন্য নন্দিনীর মনে শ্রদ্ধার ভাবটা বেড়ে গিয়েছিল বহু শতগুণ। নিজের মনে একাকী হয়ে পড়েছিলেন তিনি। রাতে তার চোখে ঘুম আসতে চাইত না। সবটাই লুকিয়ে দেখেছিল নন্দিনী। বাবার পাশে দাঁড়ানোর বয়স বা সাহস কোনটিই তার ছিল না। কেবল অমরশংকরের জন্য অদ্ভুত এক কষ্ট তাকে পীড়িত করত।

অথচ অন্য সময় অমরশংকর যেন অন্য মানুষ। নন্দিনীকে স্কুলে নিয়ে যাচ্ছেন, দুপুরে সে বাড়ি ফেরার পর নিয়ম করে নির্দিষ্ট সময়ে ফোনে খবর নিচ্ছেন, আয়াকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিচ্ছেন, পার্টি এড়িয়ে চলছেন, কারণ তাঁকে সন্ধেয় দ্রুত বাড়িতে ফিরে নন্দিনীকে সঙ্গ দিতে হবে। দেখতে দেখতে দশটা বছর কোথা দিয়ে যেন কেটে গেল। পলক ফেলতে না ফেলতে।

অমরশংকর এবার নন্দিনীর বিয়ের জন্য উঠেপড়ে লাগলেন। খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিলেন। দ্রুত জবাব আসতে লাগল। পাত্রপক্ষের খুব পছন্দও হয় নন্দিনীকে। কিন্তু অমরশংকর যেই বিনতার কথা খুলে বলেন, তারা পিছিয়ে যায়। অমরশংকরের বন্ধুবান্ধবরা পরামর্শ দেন, ‘এত বিস্তারিত ভাবে পাত্রপক্ষকে সবকথা জানানোর কী আছে? ওরা কি মেয়েটাকে ঘরে নেবে, না তোমার বংশপরিচয়কে?’

অমরশংকর সব শুনেও নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। আর পাত্রপক্ষ শুকনো মুখে জানায়, ‘মেয়েকে তো আমাদের খুবই পছন্দ ছিল অমরবাবু। কিন্তু ভয় পাচ্ছি। মেয়ের মা পাগল। শেষে মেয়েও যদি কোনওদিন…!’

অমরশংকর ম্লান হাসেন।

নন্দিনীও ক্লান্ত হয়ে গেছিল প্রায় সন্ধ্যাতেই সেজেগুজে পাত্রপক্ষের সামনে হাজিরা দিতে দিতে। শেষে একদিন  মরিয়া হয়ে মুখ ফুটে বলে উঠেছিল, ‘বাবা তুমি কি মনে করো বিয়েই জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য? এখন মেয়েরা নিজেদের কেরিয়ারটাই আগে গড়তে চায়। আমিও কি সেরকম হতে পারি না?’

অমরশংকর বলেছিলেন, ‘অবশ্যই পারিস। কিন্তু কেরিয়ারের সঙ্গে বিয়ের তো বিরোধ নেই কোনও।’

এই সময়েই অকস্মাৎ একটা যোগাযোগ হয়ে গেল। অমরশংকরের সঙ্গে তার বন্ধু সুবিমলের ছেলের বিয়ের অনুষ্ঠানে গেছিল নন্দিনী। সেখানেই সুরমা তাকে প্রথম দেখেন। আর তারপরই খোঁজখবর নিয়ে ছেলে অভিজিতের জন্য সম্বন্ধ নিয়ে আসেন। মাল্টিন্যাশনাল ফার্মে মোটা মাইনের চাকরি করে অভিজিৎ। পারিবারিক কৗলিন্যও রয়েছে। অমরশংকরের ‘না’ বলার কোনও প্রশ্নই ছিল না। এবং কী আশ্চর্য, অমরশংকর পুরোনো সব কথা বলার পরেও সুরমা এবং জয়ন্তকে তাদের সিদ্ধান্ত থেকে টলানো গেল না।

জয়ন্ত বললেন, ‘মায়ের একটা মানসিক অসুস্থতা ছিল বলে ওরও থাকবে, এটা এ ক্ষেত্রে তেমন যুক্তিযুক্ত বোধহয় নয়।’

সুরমা বললেন, ‘আমাদের ভাগ্যে যদি সেটা থাকেই, তাহলে ঘটবে–!’

অমরশংকর ভারি নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন। ধুমধাম করে বিয়ে হয়ে গেল অভিজিৎ আর নন্দিনীর। কিন্তু বাস্তবের মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে নন্দিনী সেভাবে নিশ্চিন্ত হতে পারল না। বিয়ের কয়েকদিন পরেই কোনও এক দুর্বল মুহূর্তে চোখের জল ফেলে অভিজিতের কাছে সে জানতে চেয়েছিল, ‘আমিও যদি কোনওদিন মায়ের মতো অসুস্থ হয়ে পড়ি?’

জানলা দিয়ে ভোরের আলো ঢুকে এসে চোখের পাতায় বসতেই ঘুম ভেঙে গেল নন্দিনীর। সকালে হালকা ব্রেকফাস্ট করে অফিসে চলে যায় অভিজিৎ। কাজেই তার অফিসে বেরোনোর আগে অবধি, রান্নার তেমন ব্যস্ততা থাকে না। সেটা শুরু হয় পরে। অভিজিৎ বেরিয়ে যাওয়ার পর।

অভিজিতের অফিস তাদের ফ্ল্যাটের খুব কাছে হওয়ার জন্য, লাঞ্চের অবসরে অভিজিৎ ঘণ্টাখানেকের জন্য বাড়িতে আসে। তখন ওরা দুজনে একসঙ্গে খেতে বসে।

বিছানা থেকে নেমে নন্দিনী ঠিক করল, রেসিপির বইটা দেখে আজ কিছু আনকোরা রান্না তৈরি করবে। ভাবতে ভাবতেই ফোনটা বেজে উঠল। রিসিভার তুলেই নন্দিনী বুঝল, ফোনের অন্য প্রান্তে রয়েছেন অমরশংকর।

প্রথমেই বললেন, ‘শুভ জন্মদিন নন্দিনী! কেমন আছিস মা?’

‘ভালো আছি বাবা। তোমার শরীর ঠিক আছে?’

‘শরীর ঠিক আছে। তবে সত্যি বলতে কি, তুই শ্বশুর বাড়িতে চলে যাওয়ার পর বাড়িটা বড়ো ফাঁকা লাগে।’

নন্দিনীর বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে ওঠে।

অমরশংকর বলেন, ‘তোর জন্য একটা উপহার কিনে গতকালই কুরিয়র কোম্পানিকে দিয়ে দিয়েছি। আজই পেয়ে যাবি। পছন্দ হয়েছে কিনা জানাস–!’

অমরশংকর ফোনটা ছেড়ে দিলেন। অভিজিৎ বাথরুমে ঢুকেছে। চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কে ফোন করেছিল নন্দিনী?’

‘বাবা!’

অভিজিৎ নিজের মনেই বলল, ‘ও!’

কিচেনের দিকে যেতে গিয়ে আবার থমকে যেতে হল নন্দিনীকে। আবার ফোনের ঘণ্টি বাজছে। এবার সীমা।

ফোন তুলতেই কলকল করে উঠল, ‘শুভ জন্মদিন বউদি। তা, দাদা আজ কোথায় নিয়ে যাচ্ছে সেলিব্রেট করতে?’

‘সেলিব্রেশন? তোমার দাদা?’ বলতে বলতে নন্দিনীর বুকে একটা অভিমান দলা পাকিয়ে ওঠে, ‘এখনও অবধি উইশ করেনি জানো? বোধহয় ভুলেই গেছে।’

‘ভুলে গেছে?’ সীমা স্পষ্টতই অবাক হয়, কিন্তু প্রসঙ্গ পালটে বলে, ‘আচ্ছা, আমি এখন কলেজে যাচ্ছি, কেমন বউদি? বাবা-মা তোমার সঙ্গে কথা বলবে। আমি রাতে ফোন করব আবার। হিহি!’

সুরমা ও জয়ন্তর সঙ্গে কথা বলে ফোনটা রেখে পিছন ফিরতেই নন্দিনী দেখল, অভিজিতের স্নান হয়ে গেছে। তোয়ালেতে মাথা মুছতে মুছতে সে বাথরুমের বাইরে বেরিয়ে নিজের মনে গুনগুন করছে।

নন্দিনীকে দেখে উদাসীন গলায় বলল, ‘বাব্বা! আজ দেখছি একের পর এক ফোন আসছে তোমার। ব্যাপারখানা কী?’

ক্লিষ্ট হেসে সরে যেতে যেতে নন্দিনী বলল, ‘হয় এক-একদিন এরকম!’

কিন্তু মনটা তার ভেঙে দুমড়ে যাচ্ছে। অভিজিৎ কী করে বউয়ের জন্মদিনের কথাটা ভুলে যেতে পারে? কিন্তু আচরণ দেখে মনে হচ্ছে বিষয়টা মাথাতেই নেই ওর।

টেবিলে ব্রেকফাস্ট সাজিয়ে সে অভিজিৎকে ডাকল। কোনও কথা না বলে ওরা খাচ্ছে। নীরবতা ভেঙে অভিজিৎ সহজ গলায় জানতে চাইল, ‘তোমার কি মন খারাপ নন্দিনী?’

‘না তো! কেন?’– নন্দিনীর চোখদুটো জ্বালা করে উঠল।

‘না, তোমাকে অন্যমনস্ক দেখে ভাবলাম, হয়তো বাবার জন্য মন কেমন করছে। সেক্ষেত্রে কয়েকদিন তোমার বাবার ওখান থেকে আমরা ঘুরেও আসতে পারি।’

নন্দিনীর কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। খাওয়া শেষ হয়ে গেছে অভিজিতের। গলার টাইটা বেঁধে নিতে নিতে বলল, ‘ও। শোনো, একটা কথা তো তোমায় বলাই হয়নি। আমার একবন্ধুর জন্মদিন আজ। হোটেলে পার্টি থ্রো করেছে। যেতেই হবে। তুমি সন্ধেয় সেজেগুজে তৈরি থেকো।’

অভিজিৎ চলে যাওয়ার পর বন্ধ দরজাটায় পিঠ ঠেকিয়ে নন্দিনী ভাবতে থাকল, বন্ধুর জন্মদিন মনে রাখতে পারে অভিজিৎ। কেবল তার বেলাতেই ফাঁকি। এমন নয় যে, অভিজিৎ জানে না আজ তার জন্মদিন। কিন্তু কত সহজে সে সে-কথা ভুলে গেছে! প্রচণ্ড অভিমানে নন্দিনীও ঠিক করল, অভিজিৎকে কক্ষনও সে তার জন্মদিনের কথাটা মনে করিয়ে দেবে না। এমনকী সীমা বা সুরমার কাছ থেকে জানতে পেরে সে যদি কোনও উপহার কিনেও আনে, সে নেবে না। ফিরিয়ে দেবে।

মনের মধ্যে চিনচিনে একটা ব্যথা সত্ত্বেও সে অনেকক্ষণ ধরে সাজল। ভোটশিপের সময়, অভিজিতের পছন্দ করে কিনে আনা শাড়িটা পরে, সে অনেকক্ষণ ধরে নিজেকে ঘুরিয়েফিরিয়ে দেখল আয়নায়।

অফিস থেকে বাড়িতে ফিরে নন্দিনীকে দেখে চমকে গেল অভিজিৎ। মুগ্ধ চোখ ফেরাতে পারল না। যদিও তেমন উৎসাহ দেখাল না নন্দিনী। মনটা অশান্ত হয়ে আছে। সুরমা হয়তো এরকম কোনও দিনের আগাম কল্পনা করেই, চলে আসবার দিন নন্দিনীকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বলেছিলেন, ‘কখনও কখনও খুব ছোটো ছোটো ঘটনাও বড়োসড়ো ঝগড়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একটু বুদ্ধি দিয়ে ব্যাপারগুলোকে সামলালে দেখবি, সব ঠিক হয়ে গেছে। কোনও কথা যদি খারাপ লাগে, তাহলে তক্ষুনি জবাব না দিয়ে ঠিক সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে হয়।…’

নিজেও দ্রুত তৈরি হয়ে নিয়ে অভিজিৎ ব্যস্ততার সঙ্গে বলল, ‘চলো, দেরি হয়ে যাচ্ছে। যাওয়ার সময় আবার একটা ছোটোখাটো প্রেজেন্টেশনও কিনে নিতে হবে।’

সন্ধে নেমে এসেছে। চর্তুপাশ ঝলমল করছে আলোয়। গাড়ির ঢল নেমেছে। একটা বড়ো গয়নার দোকান দেখে তার সামনে গাড়ি থামাল অভিজিৎ। বলল, ‘তোমাকে বলা হয়নি নন্দিনী। আমার এই বন্ধুটি একজন ভদ্রমহিলা। অল্প দিন হয়েছে, তার সঙ্গে আমার আলাপ।’

দোকানের সুবেশ ছেলেটিকে হিরের আংটি দেখাতে বলল অভিজিৎ। নানা ডিজাইনের আংটি চলে এল। বেশ কয়েকটা পছন্দসই মনে হল অভিজিতের। সবকটাই একে একে নন্দিনীর আঙুলে পরিয়ে শেষপর্যন্ত একটিকে চূড়ান্ত বাছাই করল সে। আংটিটা সত্যিই খুব সুন্দর দেখতে। নন্দিনীকে জিজ্ঞেস করতে সেও মাথা হেলিয়ে ‘হ্যাঁ’ বলল।

আংটির দাম পঁচিশ হাজার টাকা। সব দেখে নন্দিনী যেন মনে মনে আরও বেশি করে নিভে যাচ্ছিল। বন্ধুর জন্য এত দামের উপহার, আর নিজের স্ত্রীর জন্য কিছুই না! কী অসম্ভব পরিহাস লুকিয়ে আছে গোটা ঘটনাটার মধ্যে।

গাড়ি আবার চলতে শুরু করল। অনেকটা পথ পেরিয়ে এবার এসে থামল এক বিরাট পাঁচতারা হোটেলের নীচে। গাড়িটা পার্ক করে, চোখের ইশারায় তাকে অনুসরণ করার কথাই বলল অভিজিৎ। সে হাঁটতে লাগল হোটেলের রেস্তোরাঁটির দিকে। চারপাশে তাকাতে তাকাতে। যদি নিমন্ত্রিত বন্ধুবান্ধবদের কারও সঙ্গে দেখা হয়ে যায়!

রেস্তোরাঁর মধ্যেটা নরম আলোর ঠান্ডা স্রোতে ভেসে যাচ্ছে। খুব হালকা ভল্যুমে কোনও চেনা সুর বাজছে। টেবিলে টেবিলে ছায়ার মতো নারী-পুরুষ। সেদিক না মাড়িয়ে অভিজিৎ একটু নিরালা থাকা দামি কেবিনগুলোর একটার দিকে এগেল।

কেবিনের ভারী পর্দাটা সরিয়ে অভিজিৎ বলল, ‘ওয়েলকাম ম্যাম!’

নন্দিনী একটু অবাক হয়। বলে, ‘কই গো, তোমার হোস্ট কই? আমরাই কি প্রথম এলাম নাকি?’

আবছায়ায় অভিজিৎ একটু হাসল। কখন আরও দুটি ছায়ামূর্তি কেবিনের মধ্যে এসে দাঁড়িয়েছে। তাদের পরনে হোটেলের কর্মীদের ইউনিফর্ম। হাতে ফুলের বোকে। দুজনে দুপাশ থেকে নন্দিনীর হাতে বোকে-দুটো তুলে দিতেই কেবিন মধ্যে হঠাৎ লাল-নীল নানা রঙের আলো জ্বলে উঠল। সেইসঙ্গে আলোয় লেখা ফুটে উঠল, ‘শুভ জন্মদিন, নন্দিনী’।

নন্দিনীর মনে হচ্ছিল সে যেন স্বপ্ন দেখছে। বিহ্বল মুখটা ফেরাতেই, সে আর লাল জামা পরা লোক দুজনকে দেখতে পেল না। বদলে তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অভিজিৎ। নন্দিনীর ডানহাতের অনামিকা তুলে ধরে সযত্নে হিরের আংটিটি পরিয়ে দিল অভিজিৎ।

নন্দিনী জানতে চায়, ‘এসব কী অভিজিৎ? তোমার বান্ধবী কই?’

‘বান্ধবী! তোমার চেয়েও ভালো ও কাছের বান্ধবী আর কেউ আছে নাকি আমার?’

নন্দিনীর গালদুটি নিজের বাড়িয়ে ধরা করতলে নিয়ে অভিজিৎ বলে ওঠে।

এত সুখ নন্দিনীকে যেন মাতাল করে দিচ্ছে। অভিজিৎ হাতে তালি দিতেই দুটি লোক হাতে খাবারদাবার নিয়ে এসে, টেবিলভর্তি করে সাজিয়ে দিয়ে চলে গেল।

অভিজিৎ নিজেই, তার আর নন্দিনীর প্লেটে খাবার তুলে দেয় চামচ দিয়ে। আর নিজের মনেই বলতে থাকে, ‘আমি কী ভাবছিলাম জানো নন্দিনী? সকাল থেকে তোমায় উইশ করিনি একবারও। তার উপর বান্ধবীর নাম করে দামি হিরের আংটি কিনেছি, তোমায় দিইনি– এতকিছুর পরে তুমি নিশ্চয়ই আমার উপর বেজায় খেপে যাবে। অভিমান করবে। কথা বলবে না। কিন্তু ঘটনা হল, কাছের মানুষজনকে সারপ্রাইজ দিতে আমার খুব ভালো লাগে। কোনও জিনিস স্বাভাবিক ভাবে হাতে এলে যত আনন্দ, আকস্মিক ভাবে এলে মজাটা তার বেশ কয়েকগুন হয়ে যায়। তাই নয় কি?’

অনেকক্ষণ পরে তার মনে হল, সে একাই বকবক করে যাচ্ছে, অথচ নন্দিনী কিছু বলছে না। তাই সে চোখ তুলে ডাকতে গেল, ‘নন্দিনী!’ কিন্তু তার মুখ দিয়ে আওয়াজ বের হল না। সে দেখতে পেল চেয়ারে অদ্ভূত ভাবে এলিয়ে পড়ে আছে নন্দিনী। চুলটা খোলা। এলোমেলো। শাড়িটাও বিস্রস্ত। যেন একটা ঝড় বয়ে গেছে নন্দিনীর উপর দিয়ে।

উদ্বিগ্ন অভিজিৎ চেয়ার ছেড়ে উঠে নন্দিনীর কাছে গিয়ে তার কাঁধদুটো ধরে ঝাঁকিয়ে ডেকে উঠল, ‘নন্দিনী, নন্দিনী, কী হয়েছে তোমার?’ পাছে আওয়াজটা বাইরে গিয়ে লোকের মনে কৗতূহল সৃষ্টি করে, তাই যথেষ্ট চাপা গলায় সে প্রায় চেঁচিয়ে ওঠে।

নন্দিনী চোখদুটো খুলল হঠাৎ। ভয় পেয়ে গেল অভিজিৎ। কেবিনের আলো-আঁধারিতে তার চোখদুটো অসম্ভব ঘোলাটে দেখাচ্ছে। দৃষ্টিটা যেন এ পৃথিবীর নয়। রঙিন ঠোঁট ভীষণ ছড়িয়ে হাসল নন্দিনী। এ তো স্বাভাবিক হাসি নয়। বুকে কাঁপন ধরানো এমন হাসি সে আগে কখনও দেখেনি।

দু-পা পিছিয়ে এল অভিজিৎ। তার মনে পড়ে, নন্দিনীই একদিন জিজ্ঞেস করেছিল তাকে, ‘আমার মায়ের মানসিক অসুস্থতা ছিল। আমার আবার সেরকম কিছু হবে না তো?’

সময় নষ্ট না করে, সে নিজের মনেই বিড়বিড় করল, ‘ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলতে হবে–!’

বলে, ঘুরে দাঁড়াতেই কেউ যেন তার জামা ধরে টানল। ফিরে তাকিয়ে চমকে গেল অভিজিৎ। নন্দিনী হাসছে। সহজ, স্বাভাবিক, সরল, মজা-পাওয়া হাসি।

উদভ্রান্ত অভিজিৎ তার মুখটা নিজের করতলে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কেমন আছো নন্দিনী?’

‘আমার কিছু হয়ইনি।’

‘তাহলে?’

নন্দিনী হাসতে হাসতেই জবাব দিল, ‘সারপ্রাইজ!’

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব