নারীর শরীর, সিদ্ধান্তও তার 

নারীদেহ সম্পূর্ণ ভাবে তার ব্যক্তিগত সম্পত্তি এবং সেই শরীর নিয়ে সে তার ইচ্ছেমতো যা-খুশি করতে পারে। কিন্তু বাস্তবে তা হয় না। সেই রাজা-রাজড়ার আমল থেকে শুরু করে, বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের শাসনকাল পর্যন্ত– নারী শরীরের উপর নানারকম বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। জোর খাটিয়েছে সমাজ৷বর্তমান সমাজেও নারীদের উপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিবাহপূর্ব যৌনসম্পর্ক স্থাপন অপরাধ হিসাবে বিবেচিত হতো এযাবৎ। তবে চলতি দশকে এই আইনের পরিবর্তন ঘটেছে। অবশ্য আজও বহু দেশের আইনি বইতে এই বিষয়টি তেমন প্রাধান্য পায়নি, বইয়ের এক কোণায় অবহেলিত ভাবে উল্লিখিত আছে।

গর্ভপাতের বিষয়ে আইন একইরকম অবহেলিত। বেশিরভাগ দেশে গর্ভপাত করানোর বিষয়টি নারীর মৌলিক কিংবা প্রাকৃতিক অধিকার হিসাবে গণ্য হয় না। কারণ, ধর্ম গর্ভপাত বিরোধী। অথচ, ভগবানের উপর আস্থা, বিশ্বাস, ভক্তি প্রভতি যতই ধর্ম-কর্ম করা হোক না কেন ধর্ষণ নিয়ন্ত্রণ কিংবা বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে কি? না। কারণ, ধর্মের কাছে বেশিরভাগ সরকার-ই হার শিকার করে নেয়।

মুম্বই নিবাসী এক মহিলা গর্ভধারণের ২৫ সপ্তাহ পর গর্ভপাতের অনুমতি পেয়েছিলেন  সুপ্রিম কোর্ট থেকে। এই অনুমতি দেওয়া হয়েছিল আসলে অন্য কারণে। ওই মহিলার গর্ভস্থ যমজ সন্তানের মধ্যে একজনের ডাউন সিনড্রোম-এর সমস্যা ছিল। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত তো চিকিত্সক-ই নিতে পারতেন। এ বিষয়ে সরকার, আদালত, ধর্মগুরু, পূজারি, শাশুড়ি কিংবা স্বামী কারওর-ই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার থাকা উচিত নয়। এক্ষেত্রে গর্ভবতী মহিলা এবং তার দ্বারা নিযুক্ত চিকিত্সক-ই গর্ভপাত করানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার একমাত্র অধিকারী হওয়া উচিত। মেডিকেল টার্মিনেশন অফ প্রেগন্যান্সি অ্যাক্ট ১৯৭১ মোতাবেক, সব ক্ষেত্রে গর্ভপাত করানোর স্বাধীনতা নেই গর্ভবতীর। আইনের ৩ নম্বর ধারা অনুযাযী, চিকিত্সক ছাড়াও, কিছু ক্ষেত্রে গর্ভপাতের অনুমতি নিতে হবে উচ্চ আদালত থেকে।

যদি ১৮ বছরের কম বয়সি কোনও মেয়েকে গর্ভপাত করাতে হয়, সে ক্ষেত্রে তার মা কিংবা বাবার লিখিত অনুমতি আবশ্যক। কিন্তু প্রশ্ন হল এই যে, যদি গর্ভধারণের জন্য কারও অনুমতি না নিতে হয়,তাহলে গর্ভপাতের জন্য অনুমতির প্রয়োজন হবে কেন? অবশ্য গর্ভাবস্থায় যদি গর্ভবতীর কোনও শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়, সেক্ষেত্রে গর্ভপাতের আইনি ছাড়পত্র পাওয়া যাবে। এর বাইরে যদি কেউ গর্ভপাত করান, তাহলে তা অবৈধ বিবেচিত হবে।

এই ধরনের রীতিনীতিকে সমর্থন করা যায় না এবং দুঃখের বিষয় হল এই যে, আজও যেন ধর্মীয় হুকুম বলবৎ করা হচ্ছে মনে হয়। আসলে, ধর্মের ধ্বজাধারীরা আজও নারীর যৌনাঙ্গকে নিজের অধিকারে রাখতে চায়। তাই, তারা প্রতিদিন নিজের মতো করে নিয়ম তৈরি করে এবং নিয়ম বদলাতে থাকে। কখনও, কোথাও নারীকে দিয়ে পুজো করায়, তো কোথাও আবার শুদ্ধতার প্রমাণ চাওয়া হয়। আবার স্বামীর অতিরিক্ত যৌন চাহিদা পূরণ কিংবা অনেক সময় অনিচ্ছুকও যৌন চাহিদা পূরণ করতে হয় স্ত্রী-কে। এই অত্যাচার যদি স্বামীর উপর স্ত্রী করেন, তাহলে কি সমাজ তা ভালো ভাবে নেবে?

গর্ভপাত আইন আসলে নারীকে শাস্তি দেওয়ার জন্য তৈরি হয়েছে। গর্ভপাতের সময় যেমন গর্ভবতী নারী কষ্ট পান, ঠিক তেমনই গর্ভপাতের অনুমতি নিতে গিয়ে শাস্তি পান। কারণ, গর্ভপাতের বিষয়টি অবৈধ এবং অপরাধ হিসাবেই বিবেচিত হয় বেশিরভাগ মানুষের চোখে। সারা পৃথিবীতে প্রায় ছয় কোটি গর্ভপাত হয় প্রতি বছর। কিন্তু ধর্মীয় এবং আইনি ঝামেলার ভয়ে এদের মধ্যে প্রায় ৪৫ শতাংশ ভোগেন নিরাপত্তাহীনতায়। এমনকী, ধর্ষিত কোনও নারীও যদি গর্ভপাত করাতে যান, তাকেও চিকিত্সকের নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। তাই সারা পৃথিবীতে গোপনে চলে বহু অ্যাবর্শন সেন্টার।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল এই যে, গর্ভধারণ এবং গর্ভপাত নারীর স্বাভাবিক মৌলিক অধিকার হওয়া উচিত। এক্ষেত্রে পুরুষদের নাক গলানো উচিত নয়। মোটকথা, শরীর যার, সেই শরীরকে যেমন খুশি ব্যবহার করার অধিকার তারই থাকা উচিত। কিন্তু তার অনিচ্ছার বিরুদ্ধে কোনও কিছু হওয়া বা করা কাম্য নয়। পুরুষ যেমন তার শরীর নিজের ইচ্ছেমতো ব্যবহার করে, নারীর ক্ষেত্রেও তেমনই হওয়া বাঞ্ছনীয়। কাজ করতে গিয়ে হাতে-পায়ে আঘাত লাগলে যেমন স্বাভাবিক ভাবে চিকিত্সা পরিষেবা নেওয়া যায়, কোনও ধর্ম কিংবা আইন বাধা হয়ে দাঁড়ায় না ঠিক তেমনই নারী তার নিজের শরীর ইচ্ছেমতো নির্দ্বিধায় ব্যবহার করবে, এমনটাই কাম্য। কোনও কারণে যদি নারী গর্ভবতী হয়ে পড়ে, সেক্ষেত্রে চাইলে সে মাতত্বের স্বাদ নিতে পারে কিংবা গর্ভপাত করাতে পারে। সিদ্ধান্ত তার ইচ্ছানুসারে হওয়া উচিত। কারণ, শরীর তার, মনও তারই।

বন্ধুরা বান্ধবী সয়াপিং করতে রাজি ছিল

আমরা তিন বন্ধু আর আমাদের বান্ধবীরা মিলে একটি রিসর্টে বর্ষশেষের রাত কাটানোর প্ল্যান করি। সেখানে গিয়ে মধ্যপন করার পর আমাদের মাথায় দুষ্টুবুদ্ধি পেয়ে বসে। আমরা গার্লফ্রেন্ড সয়াপিং করার প্ল্যান করি। সেই মতো ঠিক হয় পর্যায়ক্রমে সবাই বান্ধবী বদলে বদলে উপভোগ করবে। শুরুতে আমি আমার বন্ধুর গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে সহবাস করি। কিন্তু আমার বান্ধবীকে সে যখন ভোগ করতে চায়, তখন আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারি না। এতে দলের মধ্যে মনোমালিন্য ও চূড়ান্ত অশান্তি তৈরি হয়। আমি সে রাতেই বান্ধবীকে নিয়ে ফেরত চলে আসি।

এখন সমস্যা হল, এরকম একটা প্রস্তাবে সম্মত হয়ে আমি অন্য মেয়ের সঙ্গে যৌনক্রিয়ায় লিপ্ত হওয়ায় আমার বান্ধবী খুবই আহত। সে সব সম্পর্ক আমার সঙ্গে ছিন্ন করতে চায়। আমি কী করব? তাকে আমি ভালোবাসি।

 

এরকম যৌনবিকৃতি ইদানীং খুব বেড়ে গেছে আমাদের সমাজে, এটা খুব দুর্ভাগ্যজনক । প্রাচীন কালে যৌনতায় কোনও আগল ছিল না, পড়ে সমাজে শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে এবং স্ত্রীলোককে সম্পত্তি হিসাবে না ভেবে তাকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে, বহুগামিতা বন্ধ করা হয়। আপনাদের আচরণে বহুগামিতার প্রতি আসক্তি স্পষ্ট। আপনি শেষপর্যন্ত নিজের বান্ধবীকে ভাগ্ করতে চাননি। এতে বলতে হবে দেরিতে হলেও আপনার মধ্যে শুভবুদ্ধির উদয় হয়েছে। এই ধরনের প্রস্তাবে রাজি হওয়ার আগে বান্ধবীদের মতামতটাও নেওয়া আপনাদের উচিত ছিল । আপনার বান্ধবী আপনার উপর সম্মান ও বিশ্বাস দুইই হারিয়েছেন। তাকে সময় দিন। তিনি যদি আপনাকে ক্ষমা করতে পারেন, তাহলে নিজেই ফিরে আসবেন। না হলে তাকে জোর করে আটকে রাখা সম্ভব নয় ।

 

গোটা দেশের অবস্থান গরম লাভার উপর

বেকারত্ব কিংবা কঠিন আর্থিক পরিস্থিতিতে পরিবার কীভাবে বাঁচবে, এই ভাবনায় এখনই দিশাহারা হয়ে পড়ার পরিস্থিতি তৈরি না হলেও, গোটা দেশ যে গরম লাভার উপর বসে আছে, এ বিষয়ে নিশ্চিত। কারণ, বেকারত্ব দরজায় কড়া নাড়ছে। এর মূলে কিন্তু রয়েছে করোনা নামক ওই মারণ ভাইরাস এবং লকডাউনের কারণে আয় কমে যাওয়া। তাই বলা যায়, এই মারণ ভাইরাস-এর বিরুদ্ধে বাঁচার লড়াই চালিয়ে গেলেও, বেঁচে থাকার সংঘর্ষ কিন্তু এখনই কাটছে না– এখন সে লুকিয়ে আছে কার্পেটের নীচে।

হাজার-হাজার পরিবারে হয়তো উপার্জনের লোক একজন। সেই তাদেরই যদি ভবিষ্যত টালমাটাল হয়, চাকরি থাকবে কিনা কিংবা ব্যবসা চলবে কিনা তার নিশ্চয়তা না থাকে, তাহলে বোঝাই যাচ্ছে পরিস্থিতির ভয়াবহতার বিষয়টি। চিন থেকে আসা করোনা ভাইরাসের উপর রাগ না দেখিয়ে পরিবারের সদ্য বেকার হওয়া মানুষটির উপর হয়তো রাগ দেখাবেন পরিবারের বাকি সদস্যরা।

স্বামী-স্ত্রী এক ছাদের নীচে থাকুন কিংবা দুজায়গায়, দুঃশ্চিন্তায় আছেন প্রত্যেকেই। কারণ, সেই একই জায়গায় দীর্ঘদিন থাকা, বাইরে বেরোতে না পারা, সীমিত খাবার খাওয়া, কাল কী হবে সেই দুঃশ্চিন্তা বহন করা, প্রভৃতির সময়টা কেটে গেলেও, কেউ শান্তিতে নেই এখন। শুধু গ্রাম থেকে শহরে কাজ করতে আসা গরিব মানুষই নন, মোটা মাইনে পাওয়া মানুষরাও এখন কেউ শান্তিতে নেই উপার্জন কমে যাওয়ার ফলে।অনেকে আবার কাজের সন্ধানে পরিবারকে ছেড়ে ভিন্ন শহরে পাড়ি দিয়েছেন৷ গোটা পরিবারের খরচ টানা অসম্ভব ভেবে নতুন শহরে কর্মসংস্থান করতে গিয়ে, পরিবারকে নিয়ে যাওয়া সম্ভবপর হচ্ছে না৷

মনোবিদ ডা. ডোনা ব্যাপটিস্ট, যিনি নর্থওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি-তে ক্লিনিক্যাল মনোবিজ্ঞানের শিক্ষক, তাঁর মতে, নিকটজনের থেকে দূরে থাকা এবং ভবিষ্যত যদি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তাহলে মানসিক রোগের শিকার হতে পারে মানুষ। বিশেষ করে স্বামী-স্ত্রী যদি দীর্ঘদিন আলাদা থাকেন, তাহলে অবিশ্বাসের জন্ম হয়, ভালোবাসা কমে যায় এবং শারীরিক মিলনের অভাবে, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়, রাগ হিংসা বেড়ে যায়। যদিও এর দায় সরকারের নয়, কিন্তু দুঃখের বিষয়, এই লকডাউন পরবর্তী সময়েও দীর্ঘ বিচ্ছেদ এবং অনিশ্চয়তার মর্মান্তিক ফল ভুগতে হতে পারে জনগণকে। বিশেষ করে তরুণ দম্পতির মধ্যে এই ধরনের সমস্যার ফলে, মামলা বিবাহবিচ্ছেদ পর্যন্ত গড়াতে পারে।

বয়ফ্রেন্ডের অনুপস্থিতিতে ওর ভাইয়ের সঙ্গে যৌনসম্পর্ক

আমি যে ছেলেটিকে ভালোবাসি সে সদ্য চাকরি পেয়ে বিদেশে পাড়ি দিয়েছে। আমি প্রথমে ওকে যেতে দিতে রাজি ছিলাম না কিন্তু ওর কেরিয়ার এবং ভবিষ্যতের সুখের  জন্য আমি রাজি হয়ে যাই। ওর বাড়িতে সকলেই আমাদের সম্পর্কের কথা জানেন এবং আমাদের বিয়ের সিদ্ধান্তে ওদের অন্তত নেই। ফলে ওর বাড়িতে আমার যাওয়া আসা আছে। বয়ফ্রেন্ড আমায় সপ্তাহে একবার করে টার বাড়িতে গিয়ে মা বাবা ও টার কলেজ পড়ুয়া ভাইয়ের খোঁজখবর নিয়ে আসার দায়িত্ব দিয়েছিল। আমি নিয়মিত সেটা পালন করছিলামও। এভাবেই চলছিল। একদিন বাড়িতে ওর ভাই  একাই ছিল । গিয়ে দেখি সে একা একাই মদ্যপান করছে। আমাকেও সে পানীয় অফার করে। আমরা দুজনেই মদ্যপ অবস্থায় অন্তরঙ্গ হয়ে পড়ি। আমাদের মধ্যে যৌন সম্পর্ক তৈরি হয়। পুরো ঘটনাটা হঠাৎ ঘটে যায় যার জন্য পড়ে আমি অপরাধবোধে ভুগতে আরম্ভ করি। মনে হয় আমি আমার বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছি। কিন্তু আমার দেওরের মধ্যে কোনও অপরাধবোধ আসেনি। সে বারবার আমার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করার জন্য জোর  দিচ্ছে। এই অবস্থায় কী করব বুঝে উঠতে পারছি না। দয়া করে সাহায্য করুন।

 

প্রথমত বলবো কাজটা সত্যিই অনৈতিক হয়েছে আপনাদের দুজনের ক্ষেত্রেই। যতই মদ্যপ অবস্থায় থাকুন, আপনার ভেতর থেকে সায় না থাকলে, আপনি এভাবে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হতে পারতেন না। আপনার দেওর আপনার ভুলেরই সুযোগ নিচ্ছে এখন। কারণ সে বুঝে গেছে যে আপনার অপরাধবোধই আপনাকে ওর দাদার কাছে সব কিছু খুলে বলতে আটকাবে। আপনি তাকে করা ভাষায় বলে দিন যে, আপনি এ ধরনের কাজ আর করতে চান না। আপনার  হবু শ্বশুর – শাশুড়ির অবর্তমানে ওই বাড়িতে আর যাবেন না। দেওরকে কিছুদিন এড়িয়ে চলুন। আশাকরি বিয়ের পর সব ঠিক হয়ে যাবে।

হরিয়ালি পাহাড়িয়া প্রন কাবাব

চিংড়ি মাছ অনেকেরই খুব প্রিয়৷ কিন্তু ডাব চিংড়ি বা মালাইকারি নয়, এবার সম্পূর্ণ ভিন্ন স্বাদের এরটি রান্না নিয়ে এসেছি আমরা৷ বাজার থেকে একটু বড়ো সাইজের চিংড়ি পেলেই কিনে আনুন৷ এত সুস্বাদু এই ডিশ , যে খাবে সে-ই আপনার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠবে ৷

উপকরণ : ৬টা বাগদা চিংড়ি বড়ো সাইজের, ৪ টেবিল চামচ টক দই, ৬ কোয়া রসুন, ছোটো ছোটো পিস আদা, ৩-টে কাঁচালংকা, ১ চা চামচ সাদা জিরে, নুন স্বাদমতো, সরষের তেল পরিমাণমতো, দেড় কাপ করে পুদিনাপাতা, ধনেপাতা।

প্রণালী : পুদিনাপাতা, ধনেপাতা, সাদা জিরে, নুন, আদা-রসুন, টকদই, কাঁচালংকা দিয়ে একটা পেস্ট বানাতে হবে। এবার বাগদা চিংড়িগুলোকে একটা ছড়ানো পাত্রে রেখে, তার মধ্যে বানানো পেস্ট ঢেলে দিতে হবে। এতে ২ থেকে ৩ টেবিল চামচ সরষের তেল মিক্স করতে হবে। এবার চিংড়ি মাছগুলোকে ভালো করে মাখিয়ে নিয়ে ৬ ঘণ্টার জন্য ম্যারিনেশন করতে হবে। স্মোকি ফ্লেভার আনার জন্য কাঠকয়লাকে আগুনে পুড়িয়ে ম্যারিনেট করা চিংড়ির পাত্রের মধ্যে একটা বাটি রেখে তার মধ্যে কয়লাটাকে রেখে সামান্য পরিমাণ সাদা তেল বা ঘি জ্বলন্ত কয়লার ওপর ঢাললেই ধোঁয়া বেরোবে। সঙ্গে সঙ্গে একটা ঢাকনা দিয়ে ঢেকে দিতে হবে পাত্রটা।

৬ ঘন্টা পর ম্যারিনেট করা চিংড়ি মাছগুলোকে শিকে গেঁথে নিতে হবে। এবার গ্যাসে ননস্টিক ফ্রাইপ্যান-এ ছোটো এক টুকরো মাখন দিয়ে মেল্ট করে নিয়ে শিকে গেঁথে রাখা চিংড়িগুলোকে ফ্রাইপ্যানে গ্রিল করার জন্য দিয়ে দিতে হবে। এপিঠ-ওপিঠ লাল লাল রং হয়ে এলে, আগুনে সামান্য সেঁকে স্যালাডের সঙ্গে পরিবেশন করুন হারিয়ালি পাহাড়িয়া প্রন কাবাব।

ছবি

অনেক মানুষ জীবনে ভুল করে থাকে, তা হয়তো পরে তার অনুতাপের কারণ হয়। রহমান সামান্য ফুর্তি আর আনন্দ পাওয়ার জন্য যে ভুল করেছিল তা যেন কেউ কোনও দিন না  করে।

হাসানপুরের রহমান আর দীপক ছোটোবেলা থেকেই অন্তরঙ্গ বন্ধু। একই বছরে গ্রামের স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে অনার্স-সহ একজন বিএ অন্যজন বিএসসি পাশ করে। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রহমান এমএ পাশ করে একটি গ্রামের স্কুলে মাস্টারি পায়, আর দীপক এমএসসি করে কলকাতার এক নামি কলেজে অধ্যাপনার কাজে নিযুক্ত হয়।

দীপকের মা শান্তাদেবী রহমানকে রমেন বলেই ডাকেন। মায়ের কথামতো দীপকও তাই। শান্তাদেবী রমেনকে নিজের ছেলের মতোই দেখেন। জাতপাতের বিচার তাঁর নেই।

দুই অন্তরঙ্গ বন্ধুতে বেশ কিছুদিন দেখা-সাক্ষাৎ নেই। মোবাইল থাকলেও পত্র লেখাতেই এদের বেশি আনন্দ। রহমানের প্রতি পত্রেই থাকে ওর ওখানে বেড়াতে যাওয়ার আমন্ত্রণ। দীপকেরও মাঝে মাঝে কলকাতার গণ্ডিবদ্ধ জীবনধারার বাইরে যেতে ইচ্ছে করে, কিন্তু কাজের চাপে যাওয়া হয়ে ওঠেনি।

এবার রহমান লিখেছে, ‘কলকাতার বাবু, বড়োদিনের ছুটিতে না এলে আর পত্র লিখব না। মোবাইলও বন্ধ করে রাখব।’ আগত্যা দীপককে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হয়।

স্টেশনে রহমান নিজে উপস্থিত ছিল। দু’বন্ধুতে দু’বছর পর দেখা। রাত ন’টা নাগাদ বাড়ি ফিরে খাওয়াদাওয়া শেষে একই বিছানায় আশ্রয় নেয়। সারারাত গল্পের পর ভোরের দিকে দুজনেই গভীর ঘুমে জড়িয়ে পড়ে।

– বাবু আপনার প্রাইভেটের ছাত্রছাত্রীরা এসে পড়েছে। সাতটা বাজে। চাকর রামু দরজায় ধাক্বা দিতে দিতে বলে।

রমেন তাড়াতাড়ি উঠে পড়ে, দীপক তখনও অঘোর ঘুমে আচ্ছন্ন।

প্রাইভেট পড়ানো প্রায় শেষ হওয়ার মুখে দীপক রমেনকে ডাক দেয়।

– বাবু পড়াতে বসেছে, আপনি মুখ হাত ধুয়ে নেন। চা-জলখাবার রেডি, বাবুরও ততক্ষণে পড়ানো শেষ হয়ে যাবে। রামু এসে জানায়।

– রমেন প্রাইভেট পড়ায় নাকি?

– হ্যাঁ, এখানের সব মাস্টারবাবুরাই তো পড়ায়।

এমন সময় রমেন এসে বলে, ‘দীপক উঠেছিস বুঝি? আমারও হয়ে এসেছে। চা খেয়ে তোকে আমাদের এখানকার বাজার দেখিয়ে আনব।’

রমেনের বাইরের ঘরে আঠারো-কুড়িটি ছেলেমেয়ে একমনে লেখাতে ব্যস্ত। সেদিকে তাকিয়ে একটি সুন্দরী মেয়েকে দেখে অবাক হয়ে যায় দীপক। পরনে দামি চুড়িদার, গায়ে রুচিসম্মত ওড়না জড়ানো, পিঠভর্তি কোঁকড়ানো চুলে দুটি বেনি, বেনি দুটিতে লাল ফিতে দিয়ে তৈরি দুটি গোলাপ ফুল আঁটা। কি অপূর্ব সৌন্দর্যে ঘেরা মুখশ্রী। এমন রূপসী মেয়ে দীপক জীবনে দেখেছে কি না সন্দেহ? এই বোধ হয় প্রথম।

আবাক বিস্ময়ে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে থাকে দীপক। হঠাৎ রমেনের ডাকে তার চেতনা ফেরে।

– কিরে আয়, জলখাবার খেতে হবে না?

খেয়েদেয়ে ওরা বেরিয়ে পড়ে বাজারের দিকে। গ্রামটি যেন পটে আঁকা ছবির মতো। বেশির ভাগই ধনী। রমেনের স্কুলটিও বেশ সুন্দর জায়গায়, গ্রামের একেবারে শেষ মাথায়। তার পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে একটি ছোট্ট নদী, রূপসী। এর চারপাশের সৗন্দর্য সত্যিই সকলকে মুগ্ধ করবে!

বাজার বেড়িয়ে ফেরার পথে হঠাৎ নারী কণ্ঠের ডাকে দুজনেই চমকে ওঠে। দীপক তাকিয়ে দেখে একটি বড়ো বাড়ির বাগানের সামনে দাঁড়িয়ে সেই মেয়েটি। কতরকমের ফুলে ভরা বাগানটির বেশিরভাগই গোলাপ, তাও লালই বেশি।

– মাস্টারমশাই, আমাদের বাড়িতে আসুন না। বাবা আছেন।

রমেন উত্তর দেয়, ‘আজ থাক্। পরে একদিন আসব।’

– বেশ প্রাইভেট টিউশন শুরু করেছিস রে ভাই, পথেঘাটে আমন্ত্রণ। শুধু পড়ানো, না আরও কিছু? হাসতে হাসতে টিপ্পনি কাটে দীপক।

–সে ভাই ইচ্ছে থাকলেও উপায় নাই। মেয়েটি যদিও আমাদের স্বজাতি, কিন্তু মস্ত বনেদি বাড়ির মেয়ে। কত যে ধনী তা তো দেখেছিস-ই। ওর নাম ফিরোজা। ওর বাবা এখানকার একজন নামকরা ডাক্তার। দুই দাদা, বড়ো ইঞ্জিনিয়ার, ছোটদাদা বিদেশে গবেষণা করছে। মেয়েটি পড়াশোনায় খুব ভালো। ভালো রেজাল্ট করে।

– আহা বড়ো বাড়ির মেয়ে তো কি হল? তোর ওকে ভালো লাগে না?

– না ভাই ও জিনিসে লোভ না করাই ভালো। বামন হয়ে চাঁদে হাত বাড়িয়ে কী লাভ বল? আমি হচ্ছি গরিব স্কুল মাস্টার। যেমন আছি ঠিক আছি। বুঝলি দীপক তোর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেব। মেয়েটির ব্যবহার খুব ভালো। কোনও অহংকার নেই।

দীপক বলে, ‘সত্যি রমেন এমন সুন্দরী মেয়ে সচরাচর দেখা যায় না।’

– কিরে তুই দেখছি ওর প্রেমে পড়ে যাচ্ছিস? বলে রমেন।

– তা পড়লে দোষ কি?

সারারাত গল্পের পর ভোরবেলায় দীপক ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘুমোনোর ইচ্ছা তার মোটেও ছিল না। সকাল সাতটায় ফিরোজা আসবে। ওকে দেখার জন্য যে ওর প্রবল একটা ইচ্ছা মনের মধ্যে আছে, তা তো আর রমেনকে বলতে পারে না। ভোরের ঘুমটা সব বারোটা বাজিয়ে দিল।

দীপকের ঘুম ভাঙল রমেনের ডাকে। সব ছাত্র-ছাত্রী তখন চলে গেছে যে যার নিজের বাড়িতে।

– কিরে ওঠ। ন’টা বাজে যে।

– ন’টা, আমাকে তুলিসনি কেন?

– তোমার সুন্দরী নূরজাহান আজ আসেনি বন্ধু। উঠলেও কিছু লাভ হতো না।

– বাঃ নামটা বেশ দিয়েছিস তো? ওই নামেই ওকে ডাকা উচিত। কি বলিস রমেন?

সেদিন ওরা ঘুরতে ঘুরতে ফিরোজাদের বাড়ির দিকেই যাচ্ছিল। রমেন অবশ্য বারকতক গেছে এর আগে। কাছে যেতেই ফিরোজার মধুর আহ্বানে ফিরে তাকায় দুজনেই।

– একি, ফিরোজা তুমি! বলে রমেন।

পরনে জাফরানি রঙের চুড়িদার, নীল ওড়না, তার দুটি বেনিতে ওদেরই বাগানের দুটি রক্ত গোলাপ।

সত্যি এ মেয়ের তুলনা বুঝি কারও সাথেই চলে না। দীপক অবাক হয়ে ভাবতে থাকে।

এবার আর ফিরোজার অনুরোধ উপেক্ষা করতে পারে না ওরা। তবে দীপকের আর এক দফা অবাক হবার পালা। যেরকম সুরুচি সম্পন্ন আসবাবপত্র, সেরকম নিপুণ হাতে সাজানো সারা বাড়িটি! গৃহকর্তাকে ধন্যবাদ দিতে ইচ্ছা জাগে তার।

ফিরোজার বাবার সাথে আলাপের পর ফিরোজাকে জিজ্ঞাসা করে রমেন, ‘আজ পড়তে যাওনি কেন?’

‘উঠতে দেরি হয়ে গিয়েছিল স্যার।’ ছোট্ট উত্তর ফিরোজার।

এবার দীপকের দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হাসে রমেন। কথায় কথায় প্রায় ঘন্টাখানেক কেটে যায় ওদের। ফিরোজার মা আর বড়ো দাদার সাথেও পরিচয় হয় দীপকের। ফেরার সময় ফিরোজা ওদের মূল রাস্তা পর্যন্ত এগিয়ে দেয়। আবার আসার আনুরোধ করে।

পথে নেমে বাড়ির দিকে এগিয়ে চলে দুটি নির্বাক মন। মৌনতা ভেঙ্গে রমেন প্রশ্ন করে, ‘কিরে দীপক বাকশক্তি হারিয়ে ফেললি নাকি?’

– তা হারালে দোষের কি ভাই!

– তুই কী ভাবছিস বল তো?

– ভাবছি, ভগবানের কি নিখুঁত তুলির কাজ।

– কিন্তু একটু ওলট-পালট হয়ে গেছে বন্ধু। তবে এ ব্যাপারে মন খারাপ কোরো না, ঘটকালিটা না হয় আমিই করব!

পরদিন অবশ্য ঘুম থেকে উঠতে দীপকের দেরি হয় না। তখন রমেন পড়াতে বসে গেছে। দীপক একটু ঘোরাফেরা করে সামনের রাস্তায়। দূর থেকে ফিরোজার দিকে দৃষ্টি পড়তেই দেখে ফিরোজা ওরই দিকে তাকিয়ে আছে। সত্যি মেয়েটিকে যেন সবসময় দেখতে ইচ্ছা করে। চোখ ফেরাতে মন চায় না। কেন যে এমন হয়?

ফিরোজা এসেছে আজ দেরি করে। আগের দিন আসতে পারেনি তাই আজ সবার ছুটির পরেও ফিরোজা একাই কিছুক্ষণ পড়ছে। রমেন ওকে পড়াচ্ছে। বাড়ির থেকে গাড়ি এসে ওকে নিয়ে যাবে। ধীরে ধীরে দীপক আসে সেখানে। বলে,‘ রমেন এবেলা আর তোকে বাজারে যেতে হবে না, আমিই যাচ্ছি।’

– আরে বাবা বোস না একটু এখানে, দুজনেই যাব। ফিরোজার গাড়ি এল বলে। হ্যাঁ ফিরোজা, তোমার বই রেখে যেও।

দীপক বলে, ‘আমি ভেতরে যাচ্ছি। তুই আয়, তারপর দুজনে বেরোব।’

দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর ফিরোজার বইটি দাগ দিতে দিতে বইয়ের ভিতরে একখানা ছবি দেখে রমেন দীপককে ডাকে।

– শোনো শোনো দীপকবাবু, তোমার স্বপ্নসুন্দরী নিজেই ধরা দিয়েছে। একবার এসে দেখে যাও।

ফিরোজার একখানা ছবি। শাড়ি পরা, চুল একই ভাবে সামনের দিকে বেনি বাঁধা আর তাতে গোঁজা ফুটন্ত লাল গোলাপ। মেয়েটা সত্যিই খুব ফুল ভালোবাসে।

দীপক ছবিটা রেখে দেয় নিজের কাছে গোপনে।

সেদিন রবিবার। দুপুরের দিকে রমেন পড়াশোনা করছে।। বিকেলে রমেনের টিউশনি আছে। আজ আর ফিরোজাদের নয়, অন্যদের। দীপক আস্তে আস্তে হেঁটে নদীর কাছাকাছি চলে যায়। একটু ফাঁকা জায়গা দেখে চুপ করে বসে থাকে আকাশের দিকে তাকিয়ে। মনে হয়, এখানকার সবই সুন্দর। রমেনটা বেশ আছে।

– আপনি এখানে যে সাহেব?

হঠাৎ ফিরোজার ডাকে তাকায় দীপক।

– এমনি বসে আছি। রমেনের ব্যাচ আছে তাই। তা তুমি এদিকে কোথায়?

– আমি আমার বন্ধুর বাড়ি থেকে আসছি। চলুন না আমাদের বাড়ি। বলে ফিরোজা।

– না আজ থাক। তাছাড়া রমেনও সঙ্গে নেই। তুমি বুঝি মোটর সাইকেল চালাতে পারো?

– হ্যাঁ কিছুদিন হল শিখেছি। আপনি কলকাতায় থাকেন তাই না।

– হ্যাঁ ওখানে একটা কলেজে পড়াই।

– স্যার বলেছেন।

– তোমার নাম তো ফিরোজা?

– হ্যাঁ সাহেব।

দীপক বলে, ‘নূরজাহান তোমার উপযুক্ত নাম।’

– ধ্যাৎ কি যে বলেন। লজ্জায় মুখ নামায় ফিরোজা।

– আমি এখন যাই। যাবেন স্যারের সাথে আমাদের বাড়ি।

–আচ্ছা ফিরোজা তুমি আমাকে সাহেব বললে কেন?

– বাঃ রে আপনার গায়ের রং সাহেবকেও হার মানায়। সাহেব, এবার আমি আসি।

বলেই মুচকি হেসে ফিরোজা বাড়ির পথ ধরে।

ফিরোজার ফিরে যাওয়ার পথের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে দীপক। সত্যি এই বুঝি ভালোবাসার নিয়ম। এদিকে কখন যে রমেন এসে দাঁড়িয়েছে খেয়াল করেনি দীপক।

– কিরে তুই এখানে? আমি তোকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। অমন করে কী দেখছিলিরে ভাই?

– তুই তো সবই দেখেছিস। আবার জিজ্ঞাসা করছিস কেন?

– দীপক তুই ভুল করছিস। এ হবার নয়।

– কেন নয়? ভালোবাসা কি মানুষ ইচ্ছা করে করে? ভালোবাসা কি চেষ্টা করে করতে হয়? ভালোবাসা হয়ে যায়। নিজের অজান্তেই হয়তো হয়ে যায়। যখন এমন ঘটে যায় তখন জাত-ধর্ম খড়কুটোর মতো উড়ে যায়।

– তা না হয় হল, কিন্তু ওর বাবাকে তুই চিনিস না। তাছাড়া তোর মা কি মেনে নেবেন? দ্যাখ ফিরোজাকে তুই ভুলে যা ভাই। বলিস তো সুন্দরী শিক্ষিতা তোর উপযুক্ত মেয়ে আমি দেখি।

দীপক নিরুত্তর থাকে।

দেখতে দেখতে দীপকের ছুটিও একদিন শেষ হয়ে যায়। বন্ধুর কাছে বিদায় নিয়ে চলে যায় কলকাতায়। ছবিটা রয়ে যায় দীপকের কাছে আর মনটা পড়ে থাকে ফিরোজার কাছে।

বন্ধুর চিঠিতে ফিরোজার খবরাখবর দীপক মাঝে মাঝে পায়। ফিরোজাকে দেখতেও মন চায় কিন্তু লজ্জায় এত তাড়াতাড়ি বন্ধুর ওখানে যেতে পারে না।

কেটে যায় একটা বছর।

যৌবনে নারী-পুরুষ দুজনে দুজনের প্রতি আকৃষ্ট হয়। এতে দোষের কিছু নেই। যদি জাত, ধর্ম, বয়স সব ক্ষেত্রে মিলে যায়, তাহলে তাদের প্রেম সঠিক পথে এগোয় আর যদি এগুলি না মেলে, তাদের প্রেমের পথে বাধা আসে প্রচুর। দীপকের বেলাতেও তাই হল। কোনও ব্যতিক্রম ঘটল না।

ছেলের বইয়ের আলমারি গোছাতে গিয়ে একটি সুন্দরী মেয়ের ছবি পান দীপকের মা শান্তা। ব্যস সেই শুরু! এ মেয়েকে তাঁরও খুব পছন্দ। কিন্তু যখন জানতে পারলেন এ মেয়ে ভিন্নধর্মের, আর এর সূত্রপাত রমেনের বাড়ি, তখন রমেনকে আসতে পত্র লিখলেন। সব জেনেও ছেলের বিয়ের জন্য অন্যত্র মেয়ে দেখা শুরু করলেন। ছেলের বন্ধুকে নিজের ছেলের মতো দেখা, সে যতই বিধর্মী হোক, তা দোষের নয়! তবে একটি মুসলমানের মেয়েকে পুত্রবধূ করে আনা সেটা বোধ হয় কোনও হিন্দু মা-ই পারে না। এতটা উদার মনের মানুষ দীপকের মা-ও নন এইক্ষেত্রে।

নানা জায়গা থেকে সম্বন্ধ আসতে লাগল। কয়েকটি মেয়ে সত্যিই সুন্দরী। অবশেষে একটি মেয়েকে পছন্দ করে তাদের বাড়িতে ওর মা কথা দিয়ে এলেন। দীপক কিছুতেই রাজি হল না।

এদিকে ফিরোজার অবস্থাও সঙ্গিন। প্রথম কয়েকবার চিঠি  আদান-প্রদানে বাড়ির কেউ তেমন জানতে বা বুঝতে পারেনি। পরে সব জানাজানি হয়ে যায়। পাছে রহমানের মাধ্যমে সূক্ষ্ম যোগাযোগ থেকে যায় এবং কোনওদিন ওরা লুকিয়ে চলে যেতে পারে এই ভয়ে, ফিরোজার বাবা উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর মেয়েকে সৌদি আরবে ওর কাকার কাছে পাঠিয়ে দিলেন।

বছর দুই পরে ওখানেই ফিরোজার কাকা বিয়ের ঠিক করেন একটি উপযুক্ত ছেলের সঙ্গে! কোনও কিছুতেই কোনও শুভফল হল না! ছেলেটিকে সব কথা জানিয়ে দেয় ফিরোজা।

অবশেষে মেয়েকে ফিরিয়ে এনে প্রায় জোর করে রহমানের সাথেই বিয়ে দিয়ে দেন ফিরোজার বাবা ডাক্তারসাহেব। রহমানকে তিনি অনেকদিন ধরেই দেখছেন। পাত্র হিসাবে মোটেই খারাপ নয়। হয়তো ওদের মতো ধনী নয়, তবে ছেলেকে বাড়ি, গাড়ি, মূল্যবান জিনিসপত্র আর মেয়েকে সোনা দিয়ে মুড়ে দিলেন। সর্বতোভাবে মেয়েকে সুখী করার চেষ্টা করলেন!

এতেও ফল ভালো হল না। মেয়েকে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছেন ঠিকই তবে ফিরোজা বা রহমান কেউই সুখী হল না জীবনে। প্রথম প্রেমিককে ফিরোজা কিছুতেই ভুলতে পারল না। ফিরোজার মন আর ভালোবাসা কোনওদিনই পেল না রহমান। নিত্য অশান্তি আর অসুখের সংসার করতে করতে দুজনেই জেরবার। ফিরোজার মনে আজও একটা সংশয়, দুদিক দিয়ে কথা চালাচালি রহমানই করেছে তাকে পাওয়ার জন্য। হয়তো এই জন্যই ওর বাবা এ বিয়ে দিয়েছেন।

এদিকে মায়ের চোখের জলের কাছে হার মেনে মায়ের কথা দেওয়া মেয়েটিকেই বিয়ে করতে বাধ্য হয় দীপক। মেয়েটি যথেষ্ট বুদ্ধিমতী। অপরূপা না হলেও বেশ সুন্দরী। তবে ফিরোজাকে শত চেষ্টা করেও সে ভুলতে পারেনি আজও। এ নিয়ে ওদের সুখের সংসারে অনেক ঝড় বয়ে গেছে। তবুও অনেক যন্ত্রণা, অনেক কষ্টের পর একটি পুত্র সন্তান এসেছে ওদের সংসারে।

এরপর কেটে গেছে অনেকগুলি বছর। ফিরোজার ছবিটি এখনও আছে দীপকের কাছে। সেই ছবিটি সে নিজের হাতে রং তুলি দিয়ে এঁকেছে। ছবিটি এতটাই জীবন্ত যেন এক্ষুনি কথা বলবে। সেটি সে রহমানকে পাঠিয়ে দিয়েছে উপহার হিসাবে।

শান্তি-অশান্তি নিয়ে কেটে গেল আরও বেশ কয়েকটা বছর। দেখতে দেখতে দীপকের ছোট্ট ছেলেটি ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে গেল। সে এখন অনেক বড়ো হয়েছে। বর্তমানে চেন্নাই-এ কর্মরত। কিছুদিনের মধ্যেই বিদেশ যাবে। দীপকের মা কিছুদিন আগে মারা গেছেন। ফিরোজার আর বেশি খবর সে রাখে না। হয়তো রহমানের সাথে ভালোই আছে!

ঘটনার চোরাস্রোতে এক বর্ণমুখর সন্ধ্যায় রহমানের সঙ্গে হঠাৎ দীপকের দেখা হয়ে যায়। প্রথমে না চেনার ভান করে রহমান। পরে অবশ্য সবই বলে সে দীপককে। চেহারারও অনেক পরিবর্তন হয়েছে রহমানের। ওর কাছেই জানতে পারে, ফিরোজা আর বেঁচে নেই। রমেন এখন ফিরোজাদের গ্রামে থাকেও না। তার একমাত্র মেয়েকে ওর মামা নিয়ে চলে গেছে, তার বয়স যখন মাত্র পাঁচ। তারপর থেকে সে তাকে আজও দেখেনি! ওখানকার স্কুলের চাকরি অনেকদিন আগেই ছেড়ে দিয়েছে।

শত অনুরোধ সত্ত্বেও রহমান সেদিন দীপকের বাড়িতে যায়নি। কোথায় থাকে, কীভাবে চলছে তার সেসব কিছু সে বলেনি। যেমন এসেছিল সেভাবেই চলে গেল।

বাড়ি ফিরে দীপক একটি মজার কথা শোনে ওর স্ত্রীর কাছে। তার ছেলে রোহন নাকি তহমিনা বলে একটি প্রবাসী মুসলমান মেয়েকে ভালোবাসে। তাকে সে বিয়ে করবে। এ বিয়ে যেন বাড়ি থেকে মেনে নেওয়া হয়।

মনে মনে হাসতে থাকে দীপক।

ফিরোজার বাবা ডাক্তার সাহেব বেঁচে আছেন। রহমান ফিরোজারা আজ না থাকলেও, ওদের বাড়িটি রং করানো চলছে, ঘরের সব অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ফেলে দিয়ে। তবে বাড়ির দেখভাল করার লোকটি একটি ছবি সরিয়ে ফেলে, কলকাতায় বিক্রি করলে এসব ছবির ভালো দাম পাওয়া যাবে ভেবে। বিয়ের পর ডাক্তার সাহেবের নাতনি নাতজামাই এই প্রথম আসবে। তাই এই সাজ সাজ রব। এত আয়োজন। অবশ্য মা মরা তহমিনার বিয়ে দিয়েছে ওর ছোটো মামা।

এদিকে রোহন তার স্ত্রীকে নিয়ে কলকাতার বাড়িতে এসেছে। ওদের মেনে নিতে হয়েছে সবকিছু। কিন্তু বউমাকে দেখে দীপক অবাক। একি! এ যে ফিরোজার প্রতিমূর্তি। ঠিক যেন যৌবনের ফিরোজা। এ কী করে সম্ভব?

রোহন যে-মেয়েটিকে বিয়ে করেছে তার বাবা মা কেউ নেই। ধনী মামারাই তাকে মানুষ করেছে। পাঁচ বছর বয়স থেকেই সে প্যারিসে মানুষ। এখন চাকরি করে প্যারিসেই। রোহনকে তার কোম্পানি প্যারিসের একটি প্রোজেক্ট হ্যান্ডল করতে পাঠায়। সেখানেই তহমিনার সঙ্গে  তার আলাপ এবং প্রেম। মা-বাবা রাজি থাকায় রোহন আর দেরি করতে চায়নি। বিয়েটা সেরে ফেলে চটজলদি। এদিকে মা বাবা কাউকেই তহমিনার ভালো করে মনে নেই। ছোটোমামার কাছেই সে থাকত। তহমিনার মুখে তার মামার বাড়ির কথা শুনে স্তব্ধবাক্ হয়ে যায় দীপক। ডাক্তারসাহেবের সঙ্গে তার কি নতুন করে আত্মীয়তা তৈরি করা উচিত? নাকি পরিচয়টুকু গোপন-ই থাক– এই দোলাচলে মনটা বেশ অস্থির হয়ে ওঠে তার।

দীপক ভাবে তার মা যা পারেননি ওদের তা পারতে হল। রোহনদের এ বাড়িতে আসা বেশ কয়েকদিন হয়ে গেছে। রোজই বিকালের দিকে ওরা কোথাও না কোথাও বেড়িয়ে আসে। এই কদিনে অনেক জায়গা ঘুরে, দেখে এসেছে। আর কদিন পরে ওরা যাবে তহমিনাদের বাড়িতে। ওখান থেকেই চলে যাবে নিজেদের কাজের জায়গায়।

সেদিন রোহন-তহমিনা রাত্রে ফিরে একটি মজার ঘটনা শোনায়। আজ একটি ছবির দোকানে ওরা একখানি বাঁধানো ছবি দেখে অবাক হয়ে গেছে। ছবিটি অপরূপা এক নারীর। ছবির নীচের কোণে ডি কে স্বাক্ষর করা। আশ্চর্যের ব্যাপার ছবিটি যেন হুবহু তহমিনাকে দেখে আঁকা।

সবই বুঝতে পারে দীপক। ফিরোজাকে উপহার দেওয়া তারই নিজের হাতে আঁকা ছবি।

আজ সকালে মাকে নিয়ে রোহনরা দক্ষিণেশ্বরে গেছে। বিকালে ওরা ছবিটি কিনে নিয়ে আসবে বলে ঠিক করেছে। ভেবে কূলকিনারা পায় না দীপক কী করবে সে এখন। আজ বাড়িতে কেউ নেই, যা করার তাকে এবেলাতেই করতে হবে। আজ সে কলেজে যাবে না।

এগারোটা নাগাদ সে ছবির দোকানে যায়। বহু অর্থের বিনিময়ে দীপক ছবিটি কিনে নেয়। এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে খবরের কাগজে মোড়া ছবিটি গঙ্গায় বিসর্জন দেয়। সেই সঙ্গে ফিরোজার বই থেকে পাওয়া ছবিটিও।

যে অন্তরে আছে তাকে বাইরে রেখে লাভ কি? ডি কে নামের অনুসন্ধান করতে গিয়ে শেষে সব জানাজানি হওয়ারই বা দরকার কি!

 

মেঘলা আকাশ

মেঘলা, আকাশ মেঘা বলে ডাকে। নামটা বেশ রোমান্টিক। সূর্য হাপুচুপু খায়। ভিজে যায় শরীর। আবার কখনও ফুঁপিয়ে কাঁদে মন। আকাশ যখন মেঘা বলে ডাকে,মেঘার শরীরজুড়ে শীতল বাতাস ছুঁয়ে যায়। আকাশের চোখে মুখে মনে হয় পৃথিবীর সব সুখ লেপটে রয়েছে।

দীর্ঘ শীতাবকাশের পর আজ ছিল কলেজ খোলার দিন। কলেজ ফেরত আকাশ রোজকার মতো ফিরছে তার মেসে। কিন্তু মেঘার সঙ্গে দেখা হয়নি! এই পাহাড়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শীতের ছুটি পড়ে ডিসেম্বর মাস থেকে। মেঘা আসেনি কেন বুঝতে পারছে না আকাশ। অথচ, ওর তো আসার কথা ছিল। কিংবা একটা তো খবর দেবে। এমন তো করে না মেঘা!

কলেজের শেষ পিরিয়ডটা করে বেশ কিছুক্ষণ ক্যান্টিনে দু’কাপ চায়ের ধূমায়িত পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে ভাবতে থাকে সেসব কথা। খুব দেরি হয়ে গিয়েছে মেসে ফিরতে হবে তাড়াতাড়ি। কিছুটা আলো থাকলেও সন্ধ্যা নামতে দেরি নেই। এমন সময় আকাশের মুখ ভার। মেঘের গর্জন। মেঘলা আকাশের বুক চিরে অবিশ্রান্ত বৃষ্টি কিংবা বিদ্যুতের ঝিলিক। ঝোড়ো পরিবেশ। কারেন্ট নেই। বিদ্যুতের ঝলকানির আলোতে ঝাপসা পথটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

বেশ কয়েকটা চড়াই-উতরাই পার করে আকাশের ছাত্রাবাস। সবুজ চা-বাগিচায় মোড়া সুখি উপত্যকার ঢালে মেস। স্থানীয় একজনের বাড়িতে প্রায় চার বছর ভাড়া রয়েছে। কাঠের সারি সারি ঘর, খুব পরিচ্ছন্ন আর লম্বা সরু এক ফালি বারান্দা। এই বারান্দা থেকে দূর পাহাড়ের বসতি ও উপত্যকায় চা-বাগিচার সবুজ যেন চুঁইয়ে পড়ে। কিছুক্ষণের জন্য চোখের আরাম হয় বইকি।

এই পাহাড়ি শহরে অনার্স কমপ্লিট করে মাস্টার ডিগ্রি করছে আকাশ-মেঘলা। বিষয় ভূগোল। ফাইনাল ইয়ার। আর প্রথম যেদিন ভর্তি হতে আসে সেদিন মেঘলার সঙ্গে পরিচয়। মেঘলার মাস্টারমশাই মনোময়বাবু সজ্জন মানুষ। প্রথম দিনই আলাপ জমে যায় আকাশের সঙ্গে। মেঘলাকে ভর্তির পর ক্যান্টিনে মোমো খেতে খেতে সব কিছু মনের কথা উজাড় করে দিয়েছেন মনোময় স্যার। আকাশের সহযোগিতায় মেঘলার জন্য একটা ঘরে পেয়িং গেস্ট থাকবার ব্যবস্থা করেন মনোময়বাবু। কিছুটা গার্জেনের ভূমিকা পালন করেন।

আজ দুর্যোগের দিন। মনখারাপ করা বিকালে হাঁটতে থাকে একাকী আকাশ। সাতপাঁচ ভাবতে থাকে। ঝিরঝিরে বৃষ্টি কিছুটা কমেছে। সবুজ কচিপাতায় ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি বিকালের রোদে মুক্তোর মতো ঝলমল করছে। পাহাড়ের সামনের ঢালে বৌদ্ধ মন্দিরে সান্ধ্য আরাধনার প্রস্তুতি চলছে। ঘন ধুপিগাছের সরলবর্গীয় কাণ্ডের ফাঁক দিয়ে অস্তগামী সূর্যের রশ্মি ঠিকরে পড়ছে চোখে মুখে। আরও কিছুটা পাহাড়ি রাস্তা পার হলেই হেয়ার পিন বেন্ড পথ। তামাটে বিকালের রং চোখে মুখে।

দুর্যোগ কিছুটা কমল মনে হচ্ছে। বাঁকটার কাছে আসতেই কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়াল আকাশ। এই পথ যা স্মৃতির সরণি বেয়ে উঠে গিয়েছে শর্বরী পার্কে। বেশ কিছুটা ছায়া-সুনিবিড়, সমতল সবুজ ঘাসের মখমলে ঢাকা। দেখা যায় তুষারধবল কাঞ্চনজঙঘার মোহনীয় রূপ। কিছুটা পরিচ্ছন্ন আবহাওয়া। রামধনু আকাশ ছুঁয়ে পাহাড়ের উপত্যকায় যেন জিরিয়ে নিচ্ছে। আকশের নীচে সবুজ উপত্যকা যেন সাতরঙের পেখম মেলেছে।

যেদিন শীতের ছুটি পড়ল সেদিন চুটিয়ে আড্ডা দিয়েছিল আকাশ মেঘলা এইখানে। সেইসব স্মৃতি উসকে দিচ্ছে। প্রায় দিন কলেজ শেষে এই পার্কে বসত। একটা ভিউ পয়েন্ট। পরিচ্ছন্ন আবহাওয়ায় মেঘেদের লুটোপুটি উপত্যকার বুকজুড়ে। দেখতে দেখতে কত সময় কেটে গেছে তাদের।

কখনও মেঘের দল এসে আকাশ-মেঘলাকে ঢেকে দিয়েছে। কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে গিয়েও খুঁজে পেয়েছে। হারিয়ে খুঁজে পাওয়ার একটা আনন্দ আছে বইকি! গভীর খাদটা যখন ভরে যেত মেঘে মেঘে তখন মনে হতো মেঘের সাগর। বিকালের ফুরফুরে হওয়ায় একটা ফুরফুরে মেজাজ। মেঘার এলোচুল কপালে চোখে মুখে উড়তে থাকত। আর ছোটো সাদা ধবধবে হাত দুটো দিয়ে নিমেষে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করত মেঘলা। একটা দূরত্ব রেখে বসত দুজনেই।

লাল টুকটুকে ঠোঁটের ওঠানামায় আর চোখে কী দারুণ একটা মাদকতা ছিল মেঘলার। দূর থেকে দেখত কীভাবে মেঘেরা ঘনিষ্ঠ হয়ে বৃষ্টি হয়ে ঝরছে। আবার পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে আকাশ। দেশলাই-বাক্সের মতো পাহাড়ি গাঁয়ের বসতি দেখা যায়। আর যে-পাথরটায় রোজ বসে গল্প করত সেই পাথরটাও খুব আপন হয়ে গিয়েছিল। দিনের শেষে বাগিচার শ্রমিকরা পিঠের ওপর দুধের শিশু নিয়ে ঘরে ফিরত। একটা সর্পিল পথ এই পাহাড়ের বাঁকটা ছুঁয়ে বেশ কিছুটা নীচে অন্য উপত্যকায় নেমে গিয়েছে। এই পথের নিয়মিত পথচারীরাও তাদের চিনে ফেলেছিল।

লেখাপড়ার গল্প আর বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা নিয়ে বেশি আলোচনা চলত। চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে পারত না কেউই। ভাসা ভাসা কথার ভাঁজে লুকিয়ে থাকত নির্ভেজাল মনের গল্প। রাতের বিছানায় স্মৃতি রোমন্থনে দুটো মন সময়ের বয়সে ঘনিষ্ঠ হয়ে গিয়েছে।

খুব দারিদ্রের মধ্যে বেড়ে ওঠা মেঘলার। মনোময় স্যার না থাকলে এই নামি কলেজটায় আসতেই পারত না। আকাশ প্রথম দিন কিছু কথা শুনেছিল মনোময়বাবুর কাছে।

এই সেই পাহাড়ি বাঁক, যেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করতে করতে জীবনের প্রায় সব কথাই বলেছিল মেঘলা। আকশের মনে পড়ছে এখন সে সব কথাকাহিনি। মেঘলা সেদিন বলেছিল, ছোটো বোন চন্দ্রিমার কথা। বাবার কথা মনে করতে পারি না। মেঘলার মা সীমা জ্যোৎস্না রাতে ফুটফুটে আকাশের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে শুনিয়েছে হারিয়ে যাওয়া পিতার গল্প। সেসব কথাও বলেছে মেঘলা আকাশকে একটু একটু করে। মায়ের কাছে শুনেছে, বাবা সইফুদ্দিন আকাশে তারা হয়ে জ্বলছে। পরে তারা দেখতে দেখতে যখন বড়ো হয়েছে সব বুঝেছে।

মেঘালয় রাজ্যের ডাউকি নদী সীমান্তঘেঁষা বাংলাদেশের সিলেট লাগোয়া অঞ্চলে বিক্ষিপ্ত কিছু খাসি জনজাতির বাস। আর পাহাড়ের কোলে ছবির মতো ছোটো গাঁয়ে বসবাস করত মেঘলাদের আদি খাসি পরিবার। সইফুদ্দিন সিলেটের বাসিন্দা। পুরুষানুক্রম থেকে চলে আসা ওদের মৎস্যশিকার আর জমিতে কৃষিকাজ-ই ছিল জীবিকা। পরিবহণ ব্যাবসার সঙ্গে যুক্ত ছিল সইফুদ্দিন।

নৌকা নিয়ে প্রায় দিন ডাউকি নদীর জল ভেঙে মাছ ধরত! কখনও পর্যটকদের মনোরঞ্জন করতে নৗকাবিহার করাত। কিছুটা পর্যটনের সঙ্গেই যুক্ত ছিল। ভালোই আয় হতো। আসা যাওয়ার পথে এই পাহাড়ি বসতির মানুষজন তার মুখচেনা হয়ে যায়। প্রথমে পরিচয়, মন দেওয়া নেওয়া তারপর বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ হয়! সীমা সফি বলে ডাকত। সফির বাবা মা পরিবার তা মেনে নেয়নি। ঘর থেকে পালিয়ে সীমার বন্ধনে আবদ্ধ হয় সফি।

খাসি পাহাড়ের পাদদেশে সুখের সংসার পেতেছিল সীমা-সফি। সইফুদ্দিন চোস্ত খাসি ভাষায় কথা বলতে পারত। বিয়ের পর দায়িত্ব বেড়ে যায় সফির। পরবর্তীতে পর্যটকদের সঙ্গী করে নৌকাবিহার পর্যটন ব্যবসায় যুক্ত হয়। তার নৗকাটাও বেশ সাজানো। নৌকার গায়ে আঁকা থাকত নদী, বিভিন্ন মাছের ছবি। ডাউকি বাজারলাগোয়া ডাউকি নদীর ঘাট পর্যটন মরশুমে পর্যটকদের ভিড়ে ঠাসা থাকত। নিশ্বাস ফেলার সময় হতো না সফির। নদীর স্বচ্ছ জলে নৌকা বিহার এখানে খুব জনপ্রিয়। আবার অফসিজনে কখনও মালবাহী ছোটো গাড়ি নিয়ে শিলং চেরাপুঞ্জি রওনা দিত। প্রায় দিন পাহাড়ি পথে সন্ধ্যা নামার আগেই ঘরে ফিরত।

সীমা ভুট্টা খেতে ভালোবাসত। সারাদিন স্টিয়ারিং ধরে ক্লান্ত অবসন্ন শ্রান্ত শরীর এলিয়ে দিত সীমার কোলে। সন্ধ্যায় ওরা দুজনে ডাউকির তীরে ভুট্টা খেতে খেতে গল্প করত। ডাউকি নদী যেন সীমা সফির কাছে ভালোবাসার পূণ্যতোয়া। রামধনু রঙে মাখামাখি জলে হরেক রকমের মাছের ছোটাছুটি দেখতে দেখতে বাসায় ফিরে যেত। এ ছিল তাদের রোজকার রুটিন।

মেঘলার মা সীমা সেই স্মৃতিচারণ করতে করতে প্রিয় সফিকে খুঁজে পেত। স্মৃতির চাতালে আজও দপদপ করে সেইসব দিনের কথা। মায়ের কাছে শুনেছে মেঘলা– তখনও সন্ধ্যা নামেনি, হঠাৎ একটা ঝাঁকুনি। নিমেষে থরথর করে কেঁপে ওঠে পাহাড়, যেন নৃত্য করছে। ডাউকির মাছরাঙা জল, উথলে উঠছে আকাশ ছোঁবে বলে। এমন একটা ধবংসলীলার চলচ্চিত্র সেদিন স্বচক্ষে দেখেছিল মা।

বাবা গাড়ি নিয়ে চেরাপুঞ্জির রাস্তায় ছিল সেদিন। শুনেছি বহু মানুষ সেই ভূমিকম্পে মারা গিয়েছিল। তারপর চোখ ছলছল হয়ে আসে মেঘলার। কিছুটা সামলে আবার বলতে থাকে– সেই সন্ধ্যায় আর ফেরা হয়নি সফির। আসলে সেই সময়টায় কে কোন দিকে গিয়েছে জানা যায়নি। আত্মীয়স্বজন অনেকেই খবর নিয়েছে কিন্তু খোঁজ মেলেনি বাবার। মেঘলা বলে, মায়ের কাছে শুনেছে বীভৎস সেই রাতের কথা।

সবুজ শৈলশিরাটা যেখানে শিকলের মতো নদীর স্রোত ছুঁয়েছে সেই ঢালে বিক্ষিপ্ত জনবসতি সেখানেই দু-কামরার সীমা-সফির সাধের ছোটো সাংসার। কুটির বলাই ভালো। নদীর কাছে কিছুটা সমতল জায়গায় কয়েকজন মিলে তাড়াহুড়ো করে বার হয়ে আসে তাই বেঁচে যায়। বহু ছবির মতো পাহাড়ি বসতি এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল। তারপর সরকারি ব্যবস্থাপনায় ত্রাণশিবিরে আশ্রয়।

তখন মা সন্তানসম্ভবা। একটি ত্রাণশিবিরে প্রথম প্রসব! সেদিন ছিল মেঘলা আকাশ। ঝিরঝিরে বৃষ্টি। যদিও বৃষ্টি-মেঘের খেলা নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। সীমা যমজ কন্যাসন্তানের জন্ম দেয়। ত্রাণশিবিরের সকলে নাম রেখেছিল মেঘলা, চন্দ্রিমা।

এরপর ডাউকি নদী দিয়ে বহু জল গড়িয়ে গিয়েছে। সীমান্তঘেঁষা উত্তর-পূর্বের মেঘালয় রাজ্যের পশ্চিম জয়ন্তিয়া পাহাড়ে অবস্থিত ডাউকি নদীর সীমান্তঘেঁষে মেঘার পাহাড়ি গ্রাম। ঢিলছোড়া দূরত্বে বাংলাদেশের সিলেট শহর। খাসি ভাষা একটি অস্ট্রো-এশীয় ভাষা যা মূলত ভারতের মেঘালয় রাজ্যে প্রচলিত।

ত্রাণ শিবিরের পর কোনওরকম একটা তাঁবুর মতো ছেঁড়া প্লাস্টিকের ছাউনিতে ঠাঁই হয়। কিংবা বর্ষার দিন প্রাইমারি স্কুলের বারান্দায় ঠাঁই নিত। মেঘালয়ের ব্যবচ্ছিন্ন মালভূমির মতো বিচ্ছিন্ন ছিন্নমূল দরিদ্র পরিবার। খাসি রমণী সীমা পরিশ্রমী। দুই কন্যাসন্তানকে শিক্ষায় আচার-আচরণে উন্নত করেছে সে। মায়ের স্থানীয় হোটেলে রান্নার কাজ নেওয়া, কখনও-বা ডাউকি নদীর ঘাটের কাছে ছোটো দোকান দিয়ে রোজগারের ব্যবস্থা করা। এসব জীবনযন্ত্রণার কথা দিনের পর দিন বলেছে মেঘলা আকাশকে।

ডাউকি নদীর বর্ডার প্রসিদ্ধ প্রাকৃতিক পর্যটন। নদীর মনোলোভা সৗন্দর্য চুম্বকের মতো আকর্ষণ করে পর্যটকদের। এরকম মনোরম পরিবেশে বেড়ে ওঠা মেঘলার।

ছোট্ট বয়সে বিয়ে হয়ে যায় চন্দ্রিমার। ভীষণ জেদ ছিল মেঘলার। বড়ো হবার জেদ। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পর্যটকদের খুব কাছ থেকে দেখেছে নদীতে নৗকা বিহার করতে। মায়ের সঙ্গে ডাউকি নদীর ধারে দোকানদারি করেছে সে। স্কুল পড়াশোনা, পাহাড়ের ঢালে জ্বালানি সংগ্রহ এই ছিল রোজকার রুটিন। শুকনো কাঠের জ্বালানি সংগ্রহ করতে গিয়ে কতবার কাঁটাঝোপে দুই বোনের আপেলের মতো গাল চিরে রক্ত ঝরেছে। সেই রক্ত রোদে জলে ধুয়ে গিয়েছে। খেয়ালই নেই মেঘলা, চন্দ্রিমার। ডাউকি নদীর আয়নার মতো জলে যখন সূর্যাস্ত হতো সিঁদুর মেঘের প্রতিচ্ছবি দেখা যেত, তারপর ক্রমশ ঘন রাত আঁকড়ে ধরত ডাউকির এই পাহাড়ি গ্রামকে।

ডাউকির জনপথলাগোয়া ফুটপাথেই ছিল সীমা-মেঘলা-চন্দ্রিমার বাস। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা। তারপর হাইস্কুল উচ্চমাধ্যমিক স্তর পার করেছে চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে বুঁদ হয়ে থাকত মেঘলা। দূর পাহাড়ের চূড়া থেকে সমতলে সিলেট শহরের রূপ দেখতে কখন সে আনমনা হয়ে পড়ত।

খাসি ভাষার কবি সো সো থামের কবিতা পড়তে ভালোবাসত মেঘলা। খাসি ও জয়ন্তিয়া পাহাড়ে এই প্রাচীনতম জনজাতির বাস। প্রকৃতি, প্রেম, কল্পনা, মননশীলতায় ভরপুর সো সো থামের খাসি কবিতার পুস্তকটি ইতিমধ্যে পড়ে ফেলেছে মেঘলা। এমন সুন্দরী সবুজ উপত্যকায় বসে দেখেছে পাহাড়ি ঝরনা আর সূর্যমেঘের লুকোচুরি। পিতৃহারা মেঘলা-চন্দ্রিমা দেখেছে তাদের মায়ের কঠোর শ্রম।

কল্পনা, প্রকৃতি আর বাস্তবতা এসব নিয়ে তাদের ছোটো সংসার।নংক্রেম নৃত্যও অতি প্রসিদ্ধ খাসি উৎসব। লোক নাচে বেশ দক্ষ ছিল মেঘলা চন্দ্রিমা। পুরোনা অ্যালবাম ঘেঁটে কয়েকটা স্কুলজীবনের নাচগানের ছবিও দেখিয়েছে। চন্দ্রিমা ভালো গান গাইত। জয়ন্তিয়া পাহাড়ের উপজাতীয়দের পার্বণ বেহদিয়েংখ্লাম পালিত হয় প্রতি বছর জুলাই মাসে। গারোরা পালন করেন ওয়াংগালা উৎসব যা আদতে সূর্যের উপাসনা। এসব কথা শুনতে শুনতে সন্ধ্যা নেমেছে পাহাড়ের পাকদণ্ডি পথে। এক নিঃশ্বাসে অনেক কথা বলত মেঘলা। দার্জিলিং পাহাড়ের সিঙ্গালিলা শৈলশিরায় বসে কলেজপড়ুয়া আকাশ জয়ন্তিয়া পাহাড়ের মেঘলার কথা শুনেছে।

‘প্রাইমারি স্কুল, হাইস্কুল, মাধ্যামিক, উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে বেশ কিছুদিন বাড়িতেই বসেছিলাম। কয়েকজন প্রতিবেশীর বাচ্চাদের টিউশন পড়াতাম।’ আকাশকে তাদের পরিবারের অনেক কথাই বলেছে মেঘলা। ‘জানো, স্যার আসত প্রায় খোঁজখবর নিতে। বোনের খুব ছোটোতে বিয়ে হয়ে যায়। পরির মতো টুকটুকে সুন্দরী বোন। ঘটকের পাল্লায় পড়ে আমারও বিয়ের সম্বন্ধ এসেছিল বহুবার। কিন্তু রাজি হইনি। বাড়ির কোণে ফুঁপিয়ে কেঁদেছি। পরে একদিন স্যার কে সব কথা বললাম। আমি শুধু পড়তে চাই।

স্যার আমাদের ক্লাসে বলতেন, ‘মেয়েদের পড়তে হবে। নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে।’ সে অনেক কথা– বলতে বলতে চোখ ছলছল হয়ে আসে মেঘলার। মনোময় স্যার প্রবাসী বাঙালি। শিলং শহরে তাদের বাস। প্রাচীন বাঙালি পরিবার। অবিভক্ত দেশের এই পাহাড়ি স্কুলটা ডাউকি সীমান্তে অবস্থিত। মনোময় স্যার এই স্কুলের একজন শিক্ষক। তাঁর উদ্যোগে মেঘলার এতটা পথ আসা। মেঘলা বলেছিল, সে পড়তে চায়! বড়ো হতে চায়। এদিকে মনোময় স্যার অবসর নেন যে-বছর, সেই বছরই উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে মেঘলা।

মাধ্যমিক পাস করবার পর থেকে অভাবী ঘরের মেধাবী ছাত্রী সকলের নজর কাড়ে। মনোময় মেঘলাকে স্নেহ করতেন। তিনি দুঃস্থ অসহায় পরিবারকে সব রকম সহযোগিতা করতেন। মনোময়বাবুর সহযোগিতা নিয়ে দার্জিলিঙে ভূগোল পড়তে আসা মেঘলার। সব কথাই আকাশকে বলেছিল মেঘলা দার্জিলিঙের শর্বরী পার্কের নির্জনতাকে সাক্ষী রেখে। কোনওদিন সন্ধ্যা গড়িয়ে গাঢ় অন্ধকার নামত পাহাড়ে।

ভোঁ ভোঁ শব্দে মেঘের চাদর ফুঁড়ে ফিরতি জিপগাড়িগুলো পাকদণ্ডি পথে হর্ন বাজিয়ে চলছে। সার্চলাইটের মতো গাড়ির হেডলাইট মেঘার কখনওবা আকাশের চোখে মুখে পড়ছে। প্রায় ঘণ্টাখানেক আড্ডা দিয়ে ফিরে যেত আপন আপন মেসে। একদিন তো ফিরতে বেশ দেরি হয়ে গিয়েছিল। এসব থরেথরে সাজানো স্মৃতি কথাগুলো মনে করতে করতে আজ মেসে ফিরল একলা আকাশ। সঙ্গে মেঘলা নেই । কিন্তু মেঘলার স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে কখনও পথে থমকে দাঁড়িয়েছে। আবার হাঁটা শুরু।

মূল সড়ক থেকে কিছুটা এবড়োখেবড়ো পথ নেমে গিয়েছে হ্যাপিভ্যালি চা বাগানের দিকে। এখন বৃষ্টি নেই। পরিচ্ছন্ন মেঘমুক্ত আকাশ। কয়েকটা ধাপ পা ফেলে ফেলে উঠলেই বারান্দা তার পর গভীর খাদ। ভেজানো দরজা খুলে লাইটের সুইচে হাত দিতেই আলোকিত হল ঘর। লাইট জ্বালিয়ে লেপটা বিছানায় বিছিয়ে দেয়। কারণ রাতের দিকে সব কিছু হিমশীতল হয়ে যায়।

সেই সকালে নীচের ঝরনা থেকে সংগৃহীত পানীয় জল বালতিতে কতটুকু রয়েছে দেখে নেয়। এর পর রান্নার তোড়জোড়। ডিম আলু ডাল একসঙ্গে সেদ্ধ করে নেওয়া। খিদে পেটে সব কিছুর স্বাদ অমৃত। রাত আটটার পর সব নিঝুম। তারার মতো দূর পাহাড়ের গায়ে গায়ে জ্বলজ্বল করে আলো। টগবগ করে ফুটছে ভাতের হাঁড়ির জল। কাঠের ছোটো ঘরের ফাঁকে খবরের কাগজ সাঁটানো।

শীতের রাতে গুনগুন করে গাইতে থাকে নেপালি গান, হিজো রাতি কিনো? কিনো? নিদ্রা লাগিনো, কসতো মায়া… কসতো মায়া… গানের কলি। ডেকচি উপচে ভাতের ফ্যানা পড়ছে।

ডালে-চালে আর আলু সেদ্ধ পেঁয়াজ লংকার তরিবতের খানা রেডি। কিছুক্ষণ সব ভুলে কলেজের পড়াসংক্রান্ত কাজ।

আকাশ রাতের খাওয়া-দাওয়া সেরে এখন ব্যালকনিতে। নিঝুম রাতের নিস্তব্ধতা ভাঙে পাহাড়ি কুকুরের ঘেউ ঘেউ ডাকে। এই সময়টা সে তার পড়া আর ভাবনাগুলোকে এক সূত্রে গাঁথে। আরও কয়েকটা মাস কাটাতে হবে পাহাড়ি শহরে। মনের মানুষের সান্নিধ্য বঞ্চিত হয়ে থাকতে হবে।

পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে নদী বিষয়ে গবেষণার বড়ো ইচ্ছা আকাশের। সব ইচ্ছা তো আর পূরণ হয় না। এসব এলোমেলো ইচ্ছের কথাও বলে ছিল আকাশ মেঘলাকে। বলেছিল, ডুয়ার্সের ছবির মতো তার গ্রামের কথাও! কখন যে মেঘালায়ের ডাউকি আর আকাশের রায়ডাক মিলেমিশে একাকার হয়েছে মনের মোহনায়, হয়তো টের পায়নি কেউ। বন্ধুত্ব থেকে ভালোলাগা ভালোবসায় রূপান্তরিত হয়েছে সময়ে সময়ে। দিনের পর দিন ভালোবাসা ঘন হয়েছে।

আসলে এই তো সেদিন ডুয়ার্সের ভূটান সীমান্ত গাঁ থেকে আকাশ এই পাহাড়ি শহরে এসেছিল অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে। পাহাড়ে খরচ বেশি। কিন্তু ভূগোল বিষয়ে সব কলেজে তখন পড়ার সুযোগ ছিল না। জমি বিক্রি করে টাকা জোগাড়! মাসে মাসে আবার খরচ আছে। আকাশদের একান্নবর্তী পরিবার। বাবা বিমল রায় একজন কৃষিজীবী।

আকাশের বাবারা ছিল তিন ভাই। বাকিরা সকলেই ব্যাবসাবাণিজ্য সরকারি চাকরি নিয়ে থাকত। ডুয়ার্সের কুমারগ্রাম ব্লকের খোঁয়াড়ডাঙা এলাকার নারারথলি গ্রামের এটাই সব চেয়ে বড়ো পরিবার। আকাশের বাবা খেতি কাজের পাশাপাশি ভেষজ চিকিৎসার মাধ্যমে ভাঙা হাড় জোড়া লাগানোর কাজও বেশ সফলতার সঙ্গে করেন।

স্থানীয় জঙ্গলের বিভিন্ন লতাগুল্ম দিয়ে হাড়গোড় জোড়া লাগাতেন আকাশের বাবা। ভোর থেকে লেগে থাকত ঘরময় রোগীর ভিড়। আকাশকে বড়ো মানুষ করে গড়ে তোলবার ইচ্ছা। সাত-পাঁচ করেই দার্জিলিং পাহাড়ের কলেজে ভর্তির বন্দোবস্ত করেছেন। আসলে, আকাশের দাদু হাড়ভাঙা ডাক্তার নামে এই সীমান্ত লাগায়ো আসাম-ভূটান স্ললাকায় বেশ পরিচিত ছিলেন।

কলেজ ছুটির ফাঁকে পাহাড় থেকে নেমে পড়ত আকাশ। জীবনের গতি এখানে যেন ধীর। আলিপুরদুয়ার ছুঁয়ে জাতীয় সড়কটা অসমের দিকে গিয়েছে। আর তেলিপাড়া থেকেই বাঁ দিকে পিচ ঢালা এক ফালি রাস্তা ছুটছে খোঁয়াড়ডাঙা অভিমুখে! যা ভূটানের গা-ছমছম গভীর জঙ্গলে ঢুকেছে। রাস্তার দু-ধারে ছায়াসুনিবিড় গাছ গাছালি। চরম গ্রীষ্মে যখন হাঁসফাঁস করে মানুষ তখন রোদের তীব্রতাকে এই পথছায়া গোগ্রাসে গিলে খায়। আর শরীরে এক মনোরম শীতল অনুভূতি জেগে উঠে। এমন একটা রূপকথার গাঁয়ে যাওয়ার প্রবল ইচ্ছে মনে মনে দানা বাঁধত মেঘলার।

আকাশের গ্রামের ঢিলছোঁড়া দূরত্বে ভূটান। জমজমাট গ্রামীণ বাজার। হাটের দিনগুলোতে উপচে পড়ে মানুষের ভিড়। শনি ও মঙ্গলবার হাট বসে। আকাশ যখন ছোটো ছিল বাবার সঙ্গে ঘরের মুরগি ও মরশুমের সবজি নিয়ে হাটে বসত। স্থানীয় নদ-নদীর তাজা নদীয়ালি মাছ যেমন পাওয়া যায় তেমনি ঘরের পোষা মুরগি হাঁস নিয়েও হাটুরেরা হাজির হয়। বিভিন্ন জনজাতীর মনপছন্দ খাদ্যতালিকা অনুযায়ী রকমারি সব কিছু হাটে মিলবে।

এখানকার গ্রামীণ হাটগুলো মেলার রূপ নেয়। এলাকাটি যেন মিনি ভারতবর্ষ। বিভিন্ন জাতি উপজাতি ধর্মের আর সংস্কৃতির মিলনক্ষেত্র। সহজসরল জীবনযাপন আর অফুরন্ত প্রাণ প্রাচুর্যে ভরপুর মানুষজন। ভাষা পোশাক ধর্ম আচার ভিন্ন হলেও কোথায় যেন একটা ঐক্যের সুর বাঁধা আছে। কৃষিপ্রধান এলাকা। রয়েছে বন বস্তি। আধুনিকতার ছোঁয়ায় ঘরবাড়ি পোশাকেও ছাপ পড়েছে। সব কথা মেঘলাকে শুনিয়েছে আকাশ। সকলকে আপন করে নেওয়ার কি অসাধারণ জাদু আছে আকাশের!

কলেজ জীবন শেষ করে এবার ঘরে ফেরা। তাঁর প্রিয় অধ্যাপকের পরামর্শ মতো নদী বিষয়ে গবেষণা শুরু করবে। ছোটো থেকেই নদীকে সঙ্গী করে জীবন। খুব কাছ থেকে দেখেছে কীভাবে ভূটান থেকে নেমে আসছে বিভিন্ন নদনদী! সংকোষ, রায়ডাকের মতো আন্তর্জাতিক নদী যেমন রয়েছে, তেমনি ঘোড়ামারা, জোড়াই, কুলকুলি প্রভৃতি নদী শিরা উপশিরার মতো ছড়িয়ে রয়েছে। অতি বর্ষণে বন্যা এই এলাকার স্থায়ী সঙ্গী। ভূটান পাহাড়ের অবৈজ্ঞানিকভাবে ডোলোমাইট উত্তোলন একটা কারণ। এই অঞ্চলের ঢাল দক্ষিণ-পূর্ব দিকে।

আকাশ দেখেছে নদীগুলোর পূর্ব দিকের পাড় ভাঙার প্রবণতা। হঠাৎ করে পাহাড় থেকে সমতলে নেমে আসায় নদীর গতিবেগ কমে যায়। নদী পাথরনুড়িতে বোঝাই হয়ে থাকে। ফলত বন্যার কবলে পড়ে এলাকা। এখান থেকে যেদিকে চোখ যায় শুধু সবুজ আর সবুজ। নদীমাতৃক বাংলার রূপসী রুপ যেন এখানে উপচে পড়ছে। এলোকেশী-নারী যেন ভরা বর্ষায় ফুঁপিয়ে কাঁদে। ভীষণ গর্জন করে ভাসিয়ে দেয় গ্রাম। শীতের মরশুমে শুধু শোনা যায় নদীর কুলুকুলু শব্দ আর নিস্তব্ধতা ভাঙে কোকিলের কুহু কুহু ডাকে।

বনবস্তির চরে বেড়ানো গরু-ছাগলের গলায় ঝুলানো টিনের তৈরি ঘণ্টা জানান দিচ্ছে তাদের অস্তিত্ব। নদী যেন একা নীরবে শুয়ে থাকে। এমন এক অনাবিল প্রাকৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা আকাশের। নদী পাহাড় তাকে আজও চুম্বকের মতো টানে।

শীতের ছুটির পর আর ফেরা হয়নি মেঘলার। ফিরবে কি করে! ফেরার দিন ঘটে গেল অঘটন। প্রতিদিন শিলং-গৗহাটি মেল নামে দুধসাদা বাসটা সাতসকালে হর্ন বাজিয়ে ডাউকি বাজার থেকে ছাড়ে। আর তখনই মেঘলাদের পুরোনো ঘড়িটা পেন্ডুলাম দোলাতে দোলাতে পাখির কিচিরমিচির আওয়াজ করে ঘড়ির কাঁটা মিলে যায় সাতের ঘরে।

সকাল সাতটা বাজে। এই সাত-পুরোনো ঘড়িটার একটা ইতিহাস আছে। মেঘলার বাবা সইফুদ্দিন বাংলাদেশ থেকে যখন চলে আসে তখন সীমাকে উপহার দিয়েছিল। সীমা দেওয়াল ঘড়িটা আগলে থাকে।

আজ মেঘলার দর্জিলিং ফেরার দিন। কিন্তু মা সীমার ঘুম ভাঙেনি। চলে গিয়েছে ঘুমের দেশে। হার্টের পেশেন্ট। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে। শোকের ছায়া ঘরজুড়ে! মাস্টারমশায় মনোময়বাবুর কাছে খবর যায়। মেঘলার বুকে তখন একটা নোনা বঙ্গোপসাগর তৈরি হয়েছে। ঘড়িটার দিকে নিঃষ্পলক তাকিয়ে থাকে মেঘলা।

কিছুদিন মনোময়বাবুর ঘরে থাকে। পরে একটি বেসরকারি স্কুলে শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত হয়। আকাশকে সেসব কথা জানিয়ে চিঠিও লিখে রেখেছিল। কিন্তু চিঠিটা ফেলা হয়নি ডাকবক্সে! কচিকাঁচা ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে কেটে যাচ্ছে দিনগুলো। প্রতিদিন সাতসকালে রাস্তায় পথ চলতি গাড়ি ধরে স্কুলে যায় মেঘলা। দুষ্টু-মিষ্টি শিক্ষার্থীরা তার বেঁচে থাকার রসদ। মনে মনে ভাবে জীবনটা যেন একটা অসম্পূর্ণ সনদ।

এদিকে দার্জিলিঙের পাট চুকিয়ে অব্যক্ত যন্ত্রণা বুকে নিয়ে ঘরে ফিরেছে আকাশ। ফিরেই সংবাদ পেল আকাশ গবেষণার জন্য নির্বাচিত হয়েছে। কৃষকের ছেলের এমন সাফল্যে গোটা গ্রামে উৎসবের মেজাজ। উত্তর-পূর্ব ভারতের এক বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারারশিপ ও নদী বিষয়ে গবেষণার জন্য নির্বাচিত হয়েছে। গবেষণার কাজ শুরু করতে রওনা দিল আকাশ।

ডুয়ার্সের গা ঘেঁষেই অসম। গুয়াহাটি হয়ে সেদিন শিলং পৌঁছোল আকাশ। আবার একটা মেসের মতো কোয়ার্টারে থাকবার ব্যবস্থা। উত্তর-পূর্ব ভারতের নদনদী চরিত্র ও নদী অধ্যুষিত অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা সম্পর্কিত টাটকা তথ্য সংগ্রহ করতে পাহাড়ি রাজ্য চষে ফেলেছে আকাশ। যখন কাজ শেষে রুমে ফেরে মেঘার কথা মনে পড়ে।

যাইহোক যদি পথে দেখা হয় কোনওদিন কি বলবে মেঘলাকে! কখনও রাগ অভিমানে গাল ফুলে যায়। আবার গবেষণার কাজে ডুবে যায় আকাশ। ভোলার চেষ্টা করে সব কথা। এবার ডাউকি নদী সীমান্তে যাবে। মেঘালয় মালভূমি থেকে আগত একটি পাহাড়ি নদী। ডাউকি চ্যুতির নাম অনুসারে নদীটির নাম ডাউকি। জল স্বচ্ছ কাচের মতো নান্দনিক সৗন্দর্যের যেন লীলাভূমি।

আকাশের গা ছমছম করে। সবে ডাউকি ব্রিজটা পার হয়ে গাড়িটা থামল। হকারের কাছে পায়ে পায়ে এগিয়ে একটু কফি কাপে চুমুক। শিলং থেকে যখন গাড়িটা ছাড়ে তখনই বৃষ্টি শুরু। আজ সকাল থেকে খুব মেঘলা। ডাউকি ঢোকার মুখে ব্রিজ। মনে পড়ছে মেঘলার কথা। ডাউকি মেঘলা মেঘালয় যেন অজান্তেই তার নিজের হয়ে গিয়েছে। শরীরটা যেন হিমশীতল হয়ে আসে!

গাড়িটা স্টার্ট দিতে আবার ঝমঝম শিলা বৃষ্টি। বৃষ্টির ফোঁটায় নদীর জলে বুদবুদ উঠছে। হু হু করে পাহাড়ি ঝরনা মূল সড়কে ধুয়ে খাদে পড়ছে বীভৎস গর্জন করতে করতে। অগত্যা গাড়ি থামাল চালক! মেইন রোডের পাশে একটা বেসরকারি স্কুল। নাম রিভার পয়েন্ট নার্সারি। এখানে কিছুক্ষণ বিরতি। মেঘে ঢাকা আকাশ। দিনের বেলায় যেন অন্ধকার নেমে আসছে।

গাড়ির জানলার কাচটা খুলতেই আকাশ দেখে বেশ চমকে গেল, পরির মতো অপ্সরা একজন মহিলা মেঘেঢাকা পাহাড়ের সর্পিল পথ বেয়ে নেমে আসছে। লুকস লাইক আ ফাউন্টেন, হয়তো মূল সড়কে উঠবে! হাত নেড়ে গাড়িটাকে ইশারায় অপেক্ষা করতে বলছে। যদিও আকাশদের গাড়িটা এমনি অতিবৃষ্টির দরুন দাঁড়িয়ে আছে। আকাশ কিছুটা হতোভম্ব হয়ে গাড়ির গেটটা খুলে দিল। সটান গেটে ছোটো হাতটা চেপে গাড়িতে উঠে পড়ল মহিলা।

খুব চেনা খুব জানা। কিন্তু দুজনেই নির্বাক। তখন আবার মেঘেঢাকা আকাশের বুক চিরে বিদ্যুতের রক্তিম আভায় টুকটুকে গাল দুটো স্মৃতির আলোর ঝরনাধারা। চোখের তারায় তারায় আনন্দ অশ্রুর প্লাবন।

জীবনের গাড়িটা হয়তো ছুটল পাহাড়ের পাকদণ্ডি পথ পেরিয়ে আলোর ঠিকানায়।

পুরোনো রেশম পথে

পুজো পেরোতেই মনটা পাহাড় পাহাড় করতে থাকে। নভেম্বরের শেষে তাই একরকম বিনা প্ল্যানেই টিকিট কেটে ফেলি। এনজেপি-র। তখনও ঠিক করিনি কোথায় যাব? ট্রেন থেকে নেমে এক বন্ধুকে ফোন করে কথা বলতেই ও পরামর্শ দিল পূর্ব সিকিমের দোরগোড়ায় রংলি সাবডিভিশনের মধ্যে অবস্থিত নিরিবিলি, কোলাহলশূন্য এক জনপদ ‘আরিতার’-এ যাওয়ার। ব্রেকফাস্ট শেষ করে গাড়ি ঠিক করে তখনই রওনা দিলাম। অন্তত বেশ কিছুদিনের জন্য কলকাতার হট্টমেলা থেকে কিছুটা নিস্তার!

সবুজ মহানন্দা স্যাংচুয়ারির বুক চিরে কালো পিচ বাঁধানো রাস্তা ধরে চলেছি। হঠাৎ-ই পাহাড়ের এক বাঁক ঘুরতেই সঙ্গী হল ঘোলা জলের বিশালাকার তিস্তা নদী। একে একে কালিম্পং, আলগাড়া, পেডং-এর পাহড়ি বসতিকে পেছনে রেখে চলে এলাম পূর্ব সিকিমের কাছে। একদিকে পশ্চিমবঙ্গ এবং অপর পারে সিকিম। জায়গাটি রেশিখোলা। বিশাল ব্রিজের নীচ দিয়ে তির তির করে সরু ধারায় বয়ে চলেছে রেশি খোলা (খোলা মানে নদী)। এখান থেকেই শুরু হল সবুজের ঘনত্ব।

শরীরে ঠান্ডা বাতাসের মসৃণ স্পর্শ অনুভব করলাম রেশি থেকে। মনে হল যেন প্রকৃতির এয়ারকন্ডিশনারের মধ্যে ঢুকে পড়েছি। পরপর কয়েকটি পাহাড়ি বাঁক পেরিয়ে পৌঁছোলাম রেনক। ছোট্ট সুন্দর পাহাড়ি জনপদ। বেশ জমজমাট। জিপস্ট্যান্ড, বাসস্ট্যান্ড, এটিএম, দোকান, বাজার, হোটেল, ছোটো ধাবা সবই রয়েছে এখানে।

টুকিটাকি প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে ডানহাতি চড়াই রাস্তায় আবার চলা শুরু।

রাস্তার দুই ধার জুড়ে দাঁড়ানো রঙিন, সাদা প্রেয়ার ফ্ল্যাগ, সবুজ গাছপালা, দূরে পাহাড়ের গায়ে লেগে থাকা টিনের চালের ঘর, ধাপচাষের নক্সা আঁকা ছোট্ট ছোট্ট গ্রাম আর রঙিন ফুলে ভরা গাছের আমন্ত্রণে যেন আমরা চলেছি। রেনক থেকে প্রায় আড়াই ঘন্টা জার্নি শেষে অবশেষে পৌঁছোলাম আরিতার।

Sikkim

ওহ… কী সুন্দর প্রাকৃতিক শোভা, বলতে বলতে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল সকলে। ফোনে ঠিক করা হোটেলের মালকিন সহাস্যমুখে এসে ওয়েলকাম জানালেন সকলকে। এই মুহূর্তে আমরা রয়েছি ৫৪০০ ফুট উচ্চতায় চারপাশ ঢেউ খেলানো

সবুজ-নীল পাহাড়ে ঘেরা চোখ জুড়ানো প্রাকৃতিক শোভার মাঝে আরিতারে। অপূর্ব ছবির মতো ল্যান্ডস্কেপ। নীল আকাশের নীচে যেন এক ফালি স্বর্গ। তারই মাঝে গোটা কয়েক হোটেল, লজ, দোকানপাট নিয়ে সম্প্রতি গড়ে উঠেছে আরিতার। সিল্করুটের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জনপদ হয়ে উঠেছে আরিতার। যারা সবুজের মিছিলে হারিয়ে যেতে চান আর হানিমুন কাপল যারা প্রাণভরে তরতাজা অক্সিজেন নিয়ে দু-চারদিন নিরিবিলি কাটাতে চান, তাদের পক্ষে আদর্শ জায়গা হল এই আরিতার।

ইতিহাসপ্রসিদ্ধ রেশমপথের প্যাঁচানো রাস্তা মূলত শুরু হয়েছে এখান থেকে। লাঞ্চ সেরে যখন হেঁটে ঘুরতে বেড়িয়েছি তখন ঘড়িতে বিকেল তিনটে। নীল আকাশের নীচে দূরে পাহাড়ের মাথায় দেখা যাচ্ছে তুষারাবৃত কাঞ্চনজঙঘার পর্বতশৃঙ্গগুলো। পাহাড়ের পাদদেশের দুধারে নীলসবুজ লম্বা লম্বা পাইনের সারি। তারই মাঝখানে কালো পিচ বাঁধানো মসৃণ চড়াই উৎরাই রাস্তা। অসাধারণ পথশোভা।

চলতে চলতে চোখে পড়ল একটা বড়ো স্কুল আর রঙিন পতাকায় ঢাকা ছোট্ট গুম্ফা। গুম্ফায় সারিবদ্ধ ভাবে সাজানো ছোটো ছোটো প্রেয়ার হুইল। যা ঘোরালে নাকি পূণ্য অর্জন করা যায়। তাই পুণ্যলাভের আশায় আমরাও ঘুরিয়ে নিলাম হুইলগুলো। ছোট্ট শিশুরা ঘরমুখী হয়েছে স্কুল ছুটির পরে।

আমরা ঘুরতে ঘুরতে দেখে নেব এখানকার বিখ্যাত লামাপোখরি লেক বা আরিতার লেক। আগে এর নাম ছিল খাতি সো লেক। সোজা রাস্তায় কিছুটা ট্রেক করে ডানহাতি সরু রাস্তায় ঢুকেই এই লেকের শুরু। লেকের দু’পাশ রংবেরং-এর বাহারি ফুল গাছে সাজানো। বিশালাকার সবুজ টলটলে জলে ভরা লামাপোখরি এক কথায় নয়নলোভন। লেকের চারপাশে উঁচু উঁচু পাহাড় সবুজ বনানীতে ঘেরা। লেকের জলে তাদেরই প্রতিচ্ছবি দেখা যাচ্ছে। রঙিন প্রার্থনা পতাকা টাঙানো, লেকের একমাথা থেকে অন্য মাথায়। চারধার বাঁধানো ঘেরাটোপ। জলে প্যাডেল বোট রাইডিং-এর ব্যবস্থা আছে। ইচ্ছা করলে হ্রদের জলে ভেসে পড়া যায়।

হঠাৎ বৃষ্টি আসায় আমাদের সে শখ আর মিটল না। জলের মধ্যে কয়েকশো রঙিন মাছের দল। মুড়ি, ছোলা, শসাকুচি কিনে জলে ফেললে দেখা যায় তাদের খেলা। লেকের একপাশে ভাসছে পাহাড়ি রুডিশেল হাঁস। লেকের পাশেই রয়েছে ছোট্ট এক গুম্ফা। তার মধ্যে রয়েছে পথ্বাসনে উপবিষ্ট পথ্বসম্ভবার মূর্তি। লেকের পাশ দিয়ে প্রায় এক কিমি পথ হেঁটে উঠে এলাম এক জায়গায়। তার নাম মানখিম ভিউ পয়েন্ট বা মানখিমদাড়া। এখান থেকে নীচে লামাপোখরি লেক সমেত সমগ্র আরিতারকে দেখা যায় পাখির চোখে। পাশে পাহাড়ের ঠিক মাথায় দাঁড়িয়ে বিখ্যাত মানখিম মনাস্ট্রি। যা আরিতার গুম্ফা নামেও পরিচিত।

চারপাশ মন্ত্রযুক্ত রঙিন পতাকায় ঘেরা হলুদ সাদা গুম্ফার পরিবেশ যেন নীরবতা পালন করছে। ভগবান বুদ্ধের আরাধনায় ব্যস্ত লামারা। ঘন্টা আর ড্রামের ধবনি যোগে শুরু হল প্রার্থনা। আমরা বাইরে বেরিয়ে আসতেই শুরু হল পশ্চিম আকাশে অস্তরাগের খেলা। চলতে লাগল হলুদ লাল আর আগুন রঙের হোলি। স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম সে দৃশ্য। আরিতারের বুকে এই সূর্যাস্ত দেখে মন ভরে উঠল।

travel Sikkim

দূরে পাহাড়ের গায়ে দেখা গেল ঐতিহাসিক রেশমপথের সেই বিখ্যাত প্যাঁচানো রাস্তা। সন্ধ্যা হওয়ার আগেই নীচে নেমে এলাম। লেকের পাশে পাইন বনে তখন ঘরে ফেরা পাখিদের কলকাকলি। কী অদ্ভূত সুরে ডেকে চলেছে হিলময়না। তার ডাকে মন উদাস হয়ে যায়। মনে হয় যেন ও তার প্রিয়জনকে হারিয়েছে।

আরিতার থেকে দেখে নেওয়া যায় নির্মলা ধাম, চিরসবুজ নার্সারি, রামগৌরি সংগ্রহালয় এবং হাড্ডো ফল্স। যারা ট্রেকিং করতে ভালোবাসেন তাঁরা যেতে পারেন লুংচক ভ্যালি বা লোকদাড়াতে। এছাড়া রিচলা পাহাড়ে ট্রেকিং করা এক অসাধারণ রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা, যা আপনার সারা জীবনের সঙ্গী হয়ে থাকবে।

আমাদের এবার এগিয়ে যাবার পালা। তাই আরিতার-কে বিদায় জানাতে হল। পরের গন্তব্য পদমচেন। জুলুক যাবার পথেই পড়ে পদমচেন। জুলুক এখন ওভার হাইপড্। ফলে প্রচুর মানুষের ভিড় জুলুকে। নিরিবিলি পছন্দ বলে আমাদের ট্রাভেল প্ল্যানে স্থান পেয়েছিল পদমচেন। জুলুকের পথে যেতে হলে অবশ্য পারমিট লাগে। রংলি থেকে পারমিট করিয়ে ঘন্টাখানেক গাড়িতে পৌঁছোলাম লিংটাম। সিকিমের একটি পরিচ্ছন্নতম গ্রাম। ছোটো একটা দোকানে মোমো দিয়ে প্রাতরাশ সেরে গাড়ি এগোল কুয়োখোলা জলপ্রপাতের দিকে।

অপূর্ব নৈসর্গিক দৃশ্য আর জলপ্রপাত, ফোটো সেশনের আদর্শ স্থান। সিকিমের পথেঘাটে প্রেয়ার ফ্ল্যাগ, যেন রঙিন প্রজাপতির মতোই উড়তে থাকে হাওয়ায়। পাহাড় জোড়া সবুজ আর পাখির ডাকের মায়াময়তায় ডুব দেব বলে, গাড়ি নিয়ে এগিয়ে চলি পদমচেনের দিকে।

আরও এক ঘন্টার পথ পেরিয়ে পৌঁছোলাম জঙ্গলঘেরা এক নিভৃত গ্রামে। বার্ড ভিউইং-এর জন্য আদর্শ এ জায়গা। কুপুপ ও নাথাং যাবার আগে এখানে অ্যাক্লাইমেটাইজেশন করাটাও অন্যতম উদ্দেশ্য। জঙ্গল ঘুরে পাখির ছবি তোলাটা দ্বিতীয় আকর্ষণ। পরের দিনটা বরাদ্দ সিল্করুটের জিগজ্যাগ পথ পেরিয়ে ১১,২০০ ফিট উচ্চতার থাম্বি ভিউ পয়েন্ট থেকে কাঞ্চনজঙঘা দেখার জন্য। আরও কিছুটা এগোলেই জুলুক এবং আমাদের অন্যতম দ্রষ্টব্য, কালপোখরি লেক, কুপুপ লেক এবং আদি বাবা মন্দির।

কুপুপ লেকটা একটু উচ্চতা থেকে দেখলে হাতির মতো আকারটা স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে। পৃথিবীর উচ্চতম গলফ্ কোর্সটাও কুপুপের অদূরেই। ওই পথেই জালেপলা পাস এবং ছাঙ্গুও যাওয়া যায়। কিন্তু এসব দেখতে হলে আমাদের থাকতে হবে নাথাং-এ।

পরদিন থাম্বি দেখতে রওনা দিলাম জুলুকের পথে। আধঘণ্টার রাস্তা। বহু হোমস্টে তৈরি হয়েছে এখন জুলুকে। রংবেরঙের ফুল আর পাইনের জঙ্গল পেরিয়ে এগোতে লাগল গাড়ি। মেঘ ঘিরে ধরল জুলুক পেরিয়ে থাম্বিতে নামতেই। পাহাড়ের মন বোঝা ভার। হঠাৎই এক পশলা ভিজিয়ে হয়তো মেঘ সরে যাবে। কিন্তু থাম্বির সৗন্দর্য ধরা দেয় না। মেঘের আস্তরণে ঢাকা। আমরা আরও উপরের দিকে উঠতে লাগলাম,

লাংথাং-নাথাং হাইওয়ে ধরে। পথে পড়ল স্ট্রবেরি লেক।

নাথাং-এর উচ্চতা প্রায় ১৩,৫০০ ফিট। চিন ও ভারতের সীমান্ত এটি। আর্ম বেস হওয়ার জন্য সেনা ছাউনির অতন্দ্র পাহারা গোটা অঞ্চল জুড়েই। নাথাং-এ হোমস্টে আমাদের রাত কাটানোর ঠাঁই। গরম গরম মুরগির ঝোল ভাতে ওরা করলেন অতিথি আপ্যায়ন।

রাতে বৃষ্টি নামল। সেই সঙ্গে শুরু হল বরফ পড়া। পরদিন যখন আমরা নাথাং থেকে কুপুপের পথে, পথ গিয়েছে ঢেকে বরফের চাদরে। সে এক অপরূপ মনভালো করা দৃশ্য। ক্যামেরার শার্টার টিপতে থাকি অক্লান্ত ভাবে। সিকিম যেন হঠাৎই বড়ো অপরূপ হয়ে ওঠে এই শ্বেতশুভ্র পোশাকে।

সেদিন রাত্রে হোমস্টে’র মালিক রাতে আমাদের জন্য বনফায়ার-এর ব্যবস্থা রেখেছিলেন। আগুন ঘিরে চলল বারবিকিউ আর আড্ডার মজা। রাত বাড়তেই

শীতের দামাল বাতাস বইতে থাকে। কলকাতার কথা মনে পড়ল। আমরা এখানে

রাতে লেপ-কম্বলের তলায় আর কলকাতায় এখনও তেমন ভাবে শীতের প্রকোপ শুরু হয়নি।

কীভাবে যাবেন – কলকাতা থেকে নিউ জলপাইগুড়ি বা শিলিগুড়ি নেমে গাড়ি বা বাসে রেনক। রেনক থেকে আরিতারের গাড়ি পাওয়া যায়। বাসের সংখ্যা খুবই কম। তাই সবচেয়ে ভালো নিজেরা গাড়ি ভাড়া করে আসা। গাড়ি ভাড়া পড়বে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা।

কোথায় থাকবেন – এখানে খুব বেশি হোটেল নেই। প্রায় সব হোটেলেই থাকা-খাওয়া সমেত ১২০০-১৫০০ টাকা জনপ্রতি।

বেড়ানোর উপযুক্ত সময় -অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর মাস। এছাড়া বর্ষাকাল বাদে আর যে-কোনও সময়।

কালাকাঁদ

ভারতীও এই মিষ্টিটির প্রধান উপাদান হল ছানা অথবা খোয়া। ভারত ছেড়ে পাকিস্তানেও কালাকাঁদ খুবই পপুলার মিষ্টি।

উপকরণ : ১ লিটার দুধ (ছানার জন্য), লেবুর রস। এছাড়াও লাগবে ১ লিটার দুধ, ১/২ কাপ চিনি, ১/৪ চা চামচ এলাচগুঁড়ো, ১ টেবিল চামচ পেস্তা থেঁতো করে নেওয়া, ১ টেবিল চামচ আমন্ড টুকরো করে কাটা।

 

আরও পড়ুন – বিষণ্ণতার চাদরে মুড়ে রেখেছিল আলকানন্দা নিজেকে। ভালোবাসার স্বপ্ন চোখে নিয়ে আদৌ তার কী পরিণতি হল জানতে চোখ রাখুন আমাদের গল্প বিভাগে।

 

প্রণালী : ১ লিটার দুধ ফুটতে দিন। ফুটে গেলে আঁচ বন্ধ করে ২ মিনিট রেখে লেবুর রস অল্প করে মেশাতে থাকুন, যতক্ষণ না ছানা পুরোটা কাটছে। একটি পরিষ্কার মসলিন কাপড়ে ছানার জলটা ছেঁকে নিয়ে জল দিয়ে ছানাটা ভালো করে ধুয়ে নিন, ছানার টক ভাবটা কাটাবার জন্য। ছানাটা ছেঁকে আলাদা সরিয়ে রাখুন।

আর একটি পাত্রে অন্য ১ লিটার দুধ ফুটিয়ে অর্ধেক করে নিন। এবার তৈরি ছানাটা ওতে দিয়ে দিন। চিনি, এলাচগুঁড়ো ওতে দিয়ে আরও নাড়তে থাকুন এবং দুধ আরও ঘন হতে দিন। ফ্ল্যাট একটি পাত্রে ঘি মাখিয়ে দুধ ও ছানার পুরো মিশ্রণটা ঢেলে পুরো পাত্রে চারিয়ে দিন সমান করে এবং বড়ো চামচ দিয়ে একটু চেপে চেপে দিন। উপরে শুকনো বাদাম ছড়িয়ে আর একটু চেপে দিন। ফ্রিজে রেখে দিন ২ থেকে ৩ ঘন্টা সেট হওয়ার জন্য। সেট হয়ে গেলে তৈরি আপনার সাধের কালাকাঁদ। টুকরো টুকরো করে কেটে নিয়ে ঠান্ডা ঠান্ডা পরিবেশন করুন।

অফিসে গসিপ

একসঙ্গে এক জায়গায় দশটা বাঙালি কাজ করবে আর গসিপ হবে না, সেটা এককথায় অসম্ভব! কিন্তু অফিস স্পেসে ছোটোখাটো গসিপ যদি বড়ো আকার নেয়, তখন তার পরিণাম কিন্তু মারাত্মক হতে পারে। পরনিন্দা-পরচর্চা, আগুনের মতোই ছড়ায় এবং এর ক্ষতির দিকটিও আগুনের মতোই বিধ্বংসী। কানাকানি হতে হতেই পাঁচকান হয় ছোটো একটা ঘটনা। শেষ পর্যন্ত জানাজানি হলে রটনাকারীর সমূহ বিপদ। এমনকী চাকরি থেকে বহিষ্কার পর্যন্ত হতে পারেন। ফলে চায়ের আড্ডাতেই হোক বা আফিস করিডোর-এ, গসিপ করার আগে দশবার ভাবুন। পরনিন্দা-পরচর্চার বিষয় যদি বস হয়, তাহলে তো আরওই সতর্ক হওয়া উচিত।

কয়েকটি সতর্কতা

  • কোনও ব্যাক্তিকে আপনার ব্যক্তিগত ভাবে পছন্দ না-ও হতে পারে, তাই বলে আড্ডা দেওয়ার সময় নির্বিচারে তাকে নিয়ে কুত্সা ছড়াবেন না
  • অত্যন্ত বিশ্বাসভাজন ছাড়া কারও সঙ্গেই অফিসের পদস্থ কারও প্রসঙ্গে পরচর্চা করবেন না
  • মনে রাখবেন আজ আপনি যার সঙ্গে পরচর্চায় মেতেছেন, স্বভাবদোষে কাল সেই ব্যক্তিটিই অন্য কারও সঙ্গে আপনার বিষয়ে নিন্দা করতে পিছপা হবে না
  • সব সময়ে অফিসে সবাই বন্ধু হতে পারে না। সর্বত্র ছড়িয়ে আছে কিছু সুযোগসন্ধানী মানুষ, যারা বন্ধু সেজে আপনাকে বিপদের মুখে ঠেলে দিতে পারে। তাদের চিনে রেখে তাদের সামনে ভুলেও ঊর্ধ্বতন সম্পর্কে কোনও গসিপে জড়াবেন না
  • প্রত্যেকটা প্রতিষ্ঠানের একটা নিজস্ব ওয়ার্ক কালচার থাকে, যেটা আপনার মনমতো না-ও হতে পারে। কিন্তু কিছু নিয়মশৃঙ্খলা মেনে না চললে আখেরে বিপদ আপনারই বাড়বে। তখন গসিপ করা সঙ্গীটি আপনার পাশে থাকবে না। তাই নির্লিপ্ত থাকার চেষ্টা করুন অন্যেরা যখন গসিপ করবে
  • ছোটোখাটো গোলমাল নিজে মেটানোর করার চেষ্টা করুন। আপনার বার্তাবাহক করে অন্য কাউকে পাঠাবেন না। আপনার বক্তব্যকে বিকৃত ভাবে উপস্থাপিত করা হতে পারে। নিজের সমস্যা নিজে ফেস করুন, প্রযোজনে ক্ষমা চেয়ে নিন ঊর্ধ্বতনের কাছে।
পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব