পাহাড়ি গ্রাম রামধুরা, ইচ্ছেগাঁও, পেডং

ইন্টারনেটে খানাতল্লাশি চালিয়ে খুঁজে পেলাম ঝান্ডিগাঁও, ইচ্ছেগাঁও, সিলারিগাঁও, রামধুরা, নেওরা উপত্যকার কোলাখাম ইত্যাদি। ভ্রমণপিয়াসিদের কাছে দার্জিলিং গ্যাংটক জলভাত হয়ে গেছে। সবাই খোঁজে ‘অফ বিট’ কিছু। এই অন্যরকমের ভিড়ে লাভা, লোলেগাঁও ও রিশপও এখন খুব পরিচিত নাম।

যে -জায়গাগুলোর নাম করলাম সেগুলিও লাভা, লোলেগাঁও ও রিশপের কাছাকাছিই, তবে  আরও কিছুটা প্রত্যন্ত গ্রাম, যেখানে হোটেল রিসর্ট সুলভ নয়, বরং পাওয়া যায় হোম-স্টে– অর্থাৎ দু-চার দিনের জন্য পেয়িং গেস্টের ব্যবস্থা। কন্যার বার্ষিক পরীক্ষা ও ফলাফলের দিনক্ষণ জানা মাত্র শিলিগুড়ি যাওয়া আসার টিকিট কেটে রেখেছিলাম। তাও ওয়েটিং লিস্টের অনিশ্চয়তা ভোগ করতে হয়েছিল যাত্রার দু দিন আগে অবধি। কোনও জায়গা ভ্রমণের খুঁটিনাটি জানিয়ে পরামর্শ দেওয়া যায়, কিন্তু ছুটিছাটার মরশুমে রেলের টিকিট পাওয়ার উপায় বাতলানো দুঃসাধ্য।

কলকাতা থেকেই বিস্তর খোঁজাখুঁজির পর বুকিং পেলাম রামধুরায়, কালিম্পং থেকে ১৫ কিলোমিটার আর শিলিগুড়ি শহর থেকে ৮৪ কিলোমিটারের মতো দূরত্বে। একাধিক জায়গা বুড়ি ছোঁয়ার বদলে একটি জায়গা ভালো করে দেখার ও বিশ্রামের সিদ্ধান্ত নিয়েই যাত্রা।

রামধুরা

আমার তৎকালীন আবাস সেবক মিলিটারি স্টেশন, আসলে শিলিগুড়ি শহর থেকে ৬ কিলোমিটার দূরে শালুগড়ায়। জায়গাটা নিজেই যথেষ্ট রূপসী হলেও যোগাযোগ ব্যবস্থা একটু অসুবিধার। অনুমতি ছাড়া বাইরের গাড়ি বা ব্যক্তি ঢুকতে পারে না। সেই অটো করে যেতে হল পানিটাঙ্কির মোড় যেখান থেকে দার্জিলিং, কালিম্পং, মিরিক, গ্যাংটক ইত্যাদির বাস ও অন্যান্য গাড়ি ছাড়ে। রামধুরার যে হোম-স্টে-তে বুকিং ছিল তাদের শিলিগুড়ি, এনজেপি স্টেশন, এমনকী বাগডোগরা থেকেও কার পিক-আপ-এর ব্যবস্থা আছে। কিন্তু তা অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে যেত, কমপক্ষে ৩৫০০ টাকা। তার বদলে কালিম্পং গিয়ে সেখান থেকে ৭৫০ টাকা দিয়ে নরগিমা হোম-স্টে-র পাঠানো গাড়িতে রামধুরা যাব ঠিক করলাম।

আগের রাতে তুমুল বৃষ্টি পড়েছে। সকালটাও মেঘাচ্ছন্ন, ঝিরঝিরে। গোটা দার্জিলিং সিকিম পর্যটনের অন্যতম ইউএসপি তথা আকর্ষণ হল কাঞ্চনজঙঘা। আমরা পেলিং-এ গিয়েও মেঘ আর কুয়াশার কারণে তার দর্শন পাইনি। দার্জিলিং গ্যাংটক থেকে যা দেখেছি তা সূর্যোদয়ের পরের রূপ। আর এবার তো বৃষ্টি বাদলা নিয়েই বেরোলাম। কপালটাই মন্দ। মন খারাপ করে কালিম্পং পর্যন্ত সারাটা রাস্তা ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিলাম। এই রাস্তা দিয়ে বহুবার গিয়েছি। পাহাড়, পাকদণ্ডি, বন কিংবা তিস্তার বর্ণনা আর কতবার দেওয়া যায়?

বাস তথা গাড়ি স্ট্যান্ডটা যথেষ্ট অপরিচ্ছন্ন ও ঘিঞ্জি। স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় আরও বিশ্রী লাগছিল। ফোনে চালকের সঙ্গে কথা বলে রাখা ছিল। কালিম্পং-এ নেমেই নরগিমার গাড়ি পেয়ে গেলাম। ঘিঞ্জি শহরের ভেতর দিয়ে কুয়াশা কেটে পৌঁছোলাম ছোট্ট গ্রাম রামধুরায়। মার্চ মাসের শুরু , তাই প্রচণ্ড ঠান্ডা। মন মেজাজ খারাপ করা আবহাওয়ায় যেটা একমাত্র ভালো লাগল, তা হল থাকার ঘর ও স্নানঘরখানা। বুকিং করার সময়ই আমাদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, এসে দেখলাম একটুও বাড়িয়ে বলেনি।

যাওয়া মাত্র কফি করে দেওয়া হল, যদিও তখন বারোটা বেজে গেছে এবং দুপুরের খাওয়ার তোড়জোড় চলেছে। দার্জিলিং-কালিম্পং যেখানে জলকষ্টের জন্য সুবিদিত, সেখানে আমাদের বাথরুমের প্রতিটি কলেই জল পাওয়া যাচ্ছে দেখে অবাক লাগল। আমাদের ঘর সংলগ্ন ব্যালকনি থেকে বাইরে তাকালে মনে হয় এরোপ্লেনের জানলা দিয়ে দেখছি। নীচটায় ঘন মেঘের আস্তরণ। তিস্তা নদী দেখা যায় বলে শুনলাম,যদিও মেঘের আস্তরণ ভেদ করে দেখতে পেলাম না।

দর্শনীয় জায়গাগুলোর তালিকা নিয়ে গিয়েছিলাম। কালিম্পং-টাও দেখে নেওয়ার ইচ্ছা ছিল, যেটা দার্জিলিং বার তিনেক গিয়েও ঠিকভাবে দেখা হয়নি এক ডেলো ছাড়া। তাই দুপুরে খেয়েই বেরোনোর ইচ্ছে ছিল। কিন্তু খারাপ আবহাওয়ার জন্য গাড়ির চালক আমাদের বিশ্রাম নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে চলে গেল।

আশেপাশে কিছুই নেই, জনবসতিও বিরল। কেবল অনতিদূরে পাহাড়ের গায়ে কয়েকটা কাঠের বাড়ি আবছা চোখে পড়ল। ওইটাই নাকি ইচ্ছেগাঁও। আকাশে রোদ একটু উঁকি মারতেই অগত্যা পদব্রজে চড়াই পথে ইচ্ছেগাঁওয়ের দিকে হাঁটা দিলাম। সঙ্গে ছাতা ছিল। ঠিক করলাম বৃষ্টির আভাস পাওয়ামাত্র ফিরব।

সিঙ্কোনা প্লান্টেশনকে বাগান বলা যায় কিনা জানি না, তবে সৌন্দর্যে চা বাগানের ধারে কাছে লাগে না। তারই মধ্যে দিয়ে রাস্তা উঠেছে ওপরে। সিঙ্কোনা ছাড়াও দু পাশে পাইন বৃক্ষের সমাহার। আধ ঘন্টা হাঁটার পর দেখলাম আকাশের আলো কমে আসছে। মেঘের জন্য সূর্য অস্ত যাবে কিনা বোঝা গেল না। সদ্য শিলিগুড়ি থেকে পৌঁছে আর এগোনোর তেমন ইচ্ছা বোধ করলাম না, সময়ও ছিল না। উপরন্তু আমার ঠান্ডা লেগে হাঁচি হচ্ছিল, সঙ্গে গলায় কষ্ট। কিন্তু ত্রিসীমানায় ওষুধের দোকান কেন, কোনও দোকানপাটই চোখে পড়েনি। তাই মাঝপথ থেকেই ফিরে এলাম। ঠান্ডার মধ্যে তখন পরিষ্কার হয়ে কম্বলে ঢুকে বিশ্রাম নিতেই ইচ্ছা করছিল।

travel
travelogue

দুটি খাটে পরিষ্কার বিছানা ও দুটি করে বালিশ আর কম্বল। আমি আর আমার মেয়ের এক বিছানায় শীতের মধ্যে অসুবিধা হল না। ঘুমটা ভালোই এসেছিল। ভাঙল সান্ধ্য কফি ও পেঁয়াজ পকোড়ার ডাকে। তারপর আবার আলসেমি। উঠলাম রাতের খাওয়া আসাতে। মালকিনের ঘর ও রান্নাঘর থেকে কয়েক ধাপ সিঁড়ি দিয়ে নেমে আমাদের ঘর। আমরা শীতে জবুথবু। কিন্তু ভদ্রমহিলা হাসি মুখে আমাদের ঘরে খাবার পৌঁছে দিলেন তিনবারই।

পরের দিন রামধুরা, ইচ্ছেগাঁও, সিলেরিগাঁও, পেডং-সহ পুরো বার্মিক অঞ্চলটা ঘুরে দেখার পরিকল্পনা। কিন্তু বেরোনোর আগ্রহটাই মাটি হয়ে গেছে, কাঞ্চনজঙঘায় সূর্যোদয় দেখা আমাদের কাছে কি মিথ হয়েই থাকবে? এমন হতভাগ্য যে পেলিং-এ গিয়েও বঞ্চিত থাকতে হয়েছিল। মার্চ মাসে কোথা থেকে এত মেঘ আসে আর বৃষ্টিপাত হয়, আমার সামান্য ভূগোল ও বিজ্ঞানের বিদ্যা দিয়ে বুঝে পাই না।

পরের দিন  সকালে ঘুম ভাঙল শয্যা-চা পাওয়ার  ডাকে। ব্যাজার হয়ে ঠান্ডার মধ্যে কম্বলের ওম ফেলে বেরিয়ে এসে আকাশের উত্তর-পশ্চিম কোণায় তাকিয়ে চোখ ভরে গেল। অবশেষে! ঠিক সূর্যোদয়ের সময় কিনা বুঝতে পারলাম না, তবে তুষারাবৃত পাহাড় চূড়াকে অগ্নিবর্ণাই মনে হচ্ছিল। যে-কোনও বরফ চূড়াই সূর্যোদয় বা সূর্যাস্তের আলোয় হয়তো স্বর্ণবর্ণই লাগে। তবু যা দেখলাম তারই নাম ‘কাঞ্চনজঙঘা’। কিছুটা মেঘের অন্তরালে থাকলেও দৈর্ঘ্য বরাবর অনেকটা দেখা যাচ্ছে। বেশ কয়েকটা চূড়া, প্রত্যেকের আলাদা নামও আছে। আমার মেয়েকে জোর করে তুলে দিলাম। সে বাইরে এক ঝলক দেখেই বাবাকে ছবি তোলার নির্দেশ দিয়ে আবার গিয়ে কম্বলের তলায় ঢুকে পড়ল। তুষার শৃঙ্গের চালচিত্রে কাঁপতে কাঁপতে সকালের লিকার চা সারলাম।

রোদ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু মেঘ এসে জড়ো হলেও কুয়াশা হালকা হয়ে ভারতের সর্বোচ্চ শৃঙ্গকে আরও স্পষ্ট করে দিল। আগের দিনের মন খারাপটা দূর হয়ে চনমনে লাগল। নাহ্! এসেছি যখন যতটা পারি দেখেই যাই।

অন্যান্য পর্যটন কেন্দ্রগুলোয় যেমন হোটেল থেকে সাইট সিন-এর জন্য খদ্দের ধরার চেষ্টা দেখা যায়, এখানে তেমন নয়। আমরাই ওই একই গাড়িকে ফোন করে আগের দিন বলে রেখেছিলাম বেরোনোর কথা। সকাল নটায় ওই গাড়িটাই হাজির। স্থানীয় দ্রষ্টব্য স্থানগুলো দেখাবে। ন্যূনতম হাজার টাকা থেকে শুরু, তারপর যে যতদূর ঘুরবে তার ওপর নির্ভর করছে দর। আমরা যে জায়গাগুলো গেলাম তাতে পড়ল ১৮০০ টাকা। প্রাতরাশ সেরে রওনা হলাম।

travel
travelogue

মহাদেব ধাম মন্দির

রাস্তায় প্রথমে পড়ল একটি শিব মন্দিরের প্রবেশ পথ। কিছুটা ওপরে উঠে মন্দির। মন্দিরে তেমন জনসমাগম নেই। ওপর থেকে অনেকটা দূর পর্যন্ত দেখা যায়। তবে বহুবার পাহাড়ে ঘুরে ঘুরে এই দৃশ্যগুলোয় নতুনত্ব কিছু পাই না।

জলসা বাংলো

১৯৩০ সালে ব্রিটিশদের তৈরি এই বাংলো এখন সরকারি রিসর্ট। একটা ছোটো পাহাড়ের মাথায় ছিমছাম বাংলো। থাকার পক্ষে কেমন, সেই অভিজ্ঞতা নেই, তবে দেখার পক্ষে খুব কিছু আকর্ষণীয় মনে হল না। এখান থেকেও তিস্তা নদী অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। কাঞ্চনজঙ্ঘাও দেখা যায়।

মঙ্গরজান

রামধুরা থেকে কিছুটা নীচে আছে মঙ্গরজান, যেখান থেকে তিস্তা অববাহিকার অনেকটা দীর্ঘ পথ দেখা যায়। আমাদের আস্তানা থেকে যা অনেক দূরবর্তী, এখান থেকে তা অনেক স্পষ্ট। তাছাড়া আকাশও পরিষ্কার। মঙ্গরজানেও বেশ কিছু সাজানো গোছানো হোম-স্টে আছে। একটা ওয়াচ টাওয়ার নির্মীয়মান। পর্যটকের ভিড় চোখে পড়ল না। ওখান থেকে আমাদের হোম-স্টে দেখা যাচ্ছিল। দেখা গেল ডেলো পাহাড়ের চূড়ায় লাগানো টাওয়ার। আর চোখে পড়ল একটা চাতাল মতো সুদৃশ্য জায়গা। ওটা কোন দ্রষ্টব্য প্রশ্ন করে জানা গেল দ্রষ্টব্য স্থান নয়, ওটা দেওরালি সেনা ছাউনি।

ইচ্ছেগাঁও

৫৮০০ ফুট উচ্চতায় ছোটো পাহাড়ি গ্রাম। রামধুরায় যেখানে ছিলাম, সেখান থেকে পাইন বন ও সিঙ্কোনা বাগানের মধ্যে দিয়ে দু কিলোমিটার চড়াই রাস্তায় ঘণ্টাখানেকের ট্রেক। সেই চেষ্টাই করেছিলাম আগের দিন, গন্তব্যে পৗঁছোতে পারিনি। এদিন গাড়ি করেই পৌঁছে গেলাম। ইচ্ছেগাঁও থেকেও রামধুরার সুন্দর নিসর্গ দেখা যায়। এখানে কিছু পর্যটক ও বলা বাহুল্য বাঙালি পর্যটক দেখলাম। ইচ্ছেগাঁওতেও পাহাড়ের গায়ে ঘনঘন কিছু হোম-স্টে। সব মিলিয়ে ভালো লাগলেও কাঞ্চনজঙঘা ও তিস্তা একসাথে দেখার জন্য রামধুরায় আমাদের আবাসটিই আদর্শ মনে হল।

রমিতেধারা

ইচ্ছেগাঁওয়ের কাছে একটা ভিউ পয়েন্ট বলা যায়। এখান থেকে কাঞ্চনজঙঘা আর তিস্তার সবচেয়ে লম্বা গতিপথ চোখে পড়ে। ১৪টি বাঁক নাকি দেখা যায়। কিন্তু আকাশ কিছুটা ফিকে হলেও তলার দিকে আবার খানিকটা মেঘ জমে থাকায় স্পষ্ট করে বিশেষ কিছু বোঝা গেল না। আর একটি ভিউ পয়েন্ট তিনচুলে যাওয়ার তাগিদ অনুভব করলাম না, কারণ দ্রষ্টব্য সেই একই।

সিলেরি গাঁও

এই গ্রামটা বেশ কিছুটা উঁচুতে। ওখানে আমাদের মারুতি ওয়াগনার যেতে পারবে না, বড়ো চাকার গাড়ি চাই, রাস্তা খুব খারাপ। চালক কথাটা এমন সময় বলল, যখন বিকল্প গাড়ি নেওয়ার উপায় নেই। অবশ্য নরগিমা হোম-স্টে থেকে অন্য গাড়ির ব্যবস্থা হতো কিনা তাও জানি না। সিলেরি গাঁও কাঞ্চনজঙঘা দেখার পক্ষে নাকি আরও প্রশস্ত, যদি অবশ্য আকাশ পরিষ্কার থাকে। ইচ্ছেগাঁও থেকে হেঁটেও যাওয়া যায়।

ড্যামসাং ফোর্ট

এই নামে একটি ঐতিহাসিক কেল্লাও আছে ৬ কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে। কিন্তু ড্রাইভার যেতে রাজি নয়। তাছাড়া নেটে পড়েছি শুধু ধবংসাবশেষ পড়ে আছে। সেটা দেখার জন্য আমরাও বাড়তি সময় খরচে আগ্রহ বোধ করলাম না। পরিবর্তে আরও দূরের একটি মনাস্ট্রি দেখতে ছুটলাম।

সাংচেন দোরজি মনেস্ট্রি

ভুটানে বসবাস কালে অনেক বৌদ্ধমন্দির ও মনেস্ট্রি দেখেছি। তবু পেডং-এর কাছে এই বৌদ্ধমঠে গেলাম। তিনশো বছরের পুরোনো। যখন পেডং ভুটান রাজের অধীনে ছিল তখনকার নির্মাণ। দেয়াল চিত্রে বৌদ্ধধর্মে তন্ত্রসাধনার ছবি বিবৃত। এই নাস্তিক্য দর্শনে তন্ত্রসাধনা কীভাবে ঢুকল সেটা আমার কাছে এক রহস্য। কিন্তু তন্ত্রচর্চার কথা আমি ভুটানে গিয়েও শুনেছি। আসলে বৈদিক আনুষ্ঠানিকতা থেকে বিদ্রোহ করে পৃথক হয়ে যাওয়া এই বৌদ্ধধর্ম হিন্দুধর্মের সঙ্গে নাড়ির যোগ কখনওই ছিন্ন করতে পারেনি। বৌদ্ধতন্ত্র আসলে হিন্দুতন্ত্রেরই বিবর্তিত রূপ। বিহারটির মূল আকর্ষণ অবশ্য এক ভুটানি পুরোহিতের মমিকৃত দেহ। এপ্রিল-মে মাসে বার্ষিক ‘চিয়াম’ উৎসবে বর্ণাঢ্য নাচগান হয়।

দুপুরে একটু দেরি হল খেতে। আর রুমে নয়, ওদের রান্নাঘরে পেতে রাখা চেয়ার টেবিলেই। পাশে রেস্তোরাঁ লেখা ঘরটা বন্ধই পড়েছিল। আমরা ছাড়া আর কোনও পর্যটক ছিল না। থাকলে হয়তো খুলবে। ভেতরটা যতটুকু চোখে পড়ল সাজানো গোছানো চালু পানাহারের ঠেক বলেই মনে হল।

আমি ওই দিনই ডেলো যাওয়া যায় কিনা জানতে চাইলাম। ড্রাইভার বলল, দুপুর বেলা প্রবল হাওয়া বইবে । কথা হল পরের দিন কালিম্পং হয়েই যেহেতু ফিরতে হবে, তাই কালিম্পং-এর খানিকটা ঘুরিয়ে গাড়ি স্ট্যান্ডে ছেড়ে দেবে বাড়তি ভাড়ার বিনিময়ে। সুতরাং খেয়েদেয়ে আবার বিশ্রাম। আশেপাশে দোকান বাজার না থাকায় ঘুরপাক খাওয়ার তেমন ইচ্ছা জাগল না। বরং রোদ পড়ে যাওয়ার আগে কাঞ্চনজঙঘার সাথে আর এক প্রস্থ মোলাকাত করে বিছানায় সিঁধোলাম। বিকেলে এদিন পেঁয়াজির বদলে আলুর চপ জাতীয় কিছু দেওয়া হল চায়ের সঙ্গে। রাতের খাবার এরা আটটায় ঘরে পৗঁছে দিয়ে তড়িঘড়ি শুয়ে পড়ে।

পরদিন ফেরার পালা। এদিনও সকালে কাঞ্চনজঙঘার অবগুণ্ঠনহীন দর্শন। সামনে খানিকটা সিকিম পাহাড়ের আড়াল। আমরা ওই পাহাড় পেরিয়ে পেলিং-এ গিয়েও হতাশ হয়েছি। কিন্তু ছোট্ট পাহাড়ি গাঁ রামধুরা সাধ্যমতো উজাড় করে দিল।

 

এখন রয়ে গেছে শুধু ভয়

আমাদের ভারতবর্ষের সরকার করোনার ক্রমাগত বাড়তে থাকা প্রকোপ কে গুরুত্ব না দিয়ে বরং বিহারে সরকার গড়তে, পশ্চিম বাংলায় সরকার ফেলতে, লভ জিহাদের উপর নতুন আইন কায়েম করতে, রাম মন্দির নির্মাণে এবং কিছু না পেলে পাকিস্তানের আলোচনা সামনে এনে সাধারণ জনসাধারণের কণ্ঠরোধ করতে নতুন উদ্যমে উঠে পড়ে লেগেছে। সরকারের একমাত্র অভিন্ন হৃদয় বন্ধুর জন্য গুজরাতে বিশাল জনসভার আয়োজন করা হয়েছিল যেখানে,সমস্বরে সবাইকে বলতে শোনা গিয়েছিল, ‘ফির এক বার ট্রাম্প সরকার’। অথচ ট্রাম্পের মাথায় তখন একটাই চিন্তা, ভোটে হেরে যাওয়া টাকে কোনও ভাবে জিতে বদলাতে হবে।

ভারতীয় নেতা মন্ত্রীদের মতো ট্রাম্পও নিজের দেশ নিয়ে কতটা চিন্তা করেছিলেন সন্দেহ হয়। তাঁর মতে পুরো পৃথিবীটাই হল পাশা খেলার ময়দান। ভারত এই ধারণা টাকে একটু বদলে নিয়ে এটাকেই পৌরাণিক আকার দিতে চেয়েছে এই বলে যে, সব জন্মেই সুখ দুঃখ রয়েছে। পাপ যে করবে পরের জন্মে সে তাঁর ফল পাবে। আর এখন কষ্ট পাচ্ছ মানে আগের জন্মে পাপ করেছিলে যার প্রায়োশ্চিত্ত করা বাকি রয়ে গিয়েছিল।

কোভিড-১৯ এ যদি কারও মৃত্যু হয়ে থাকে তাহলে এর দায় সরকারের নয়, নিশ্চই এটা তার কর্মফল। আসছে জন্মে যাতে নিজেকে শুধরে নেওয়া যায় তার জন্য তো সরকার মন্দির বানিয়ে দিচ্ছে, যারা সরকারের বিরোধিতা করার কথা ভাবছে তাঁদের জেলে পুরে দিচ্ছে। মন্দিরে আরতি, পূজাপাঠের এলাহি ব্যবস্থা করা হয়েছে, এর থেকে বেশি সরকার আর কীই বা করতে পারে?

দেশের রাজধানী শহর দিল্লিতে করোনার সংক্রমণ ক্রমশ বাড়তে থাকায় এটা পরিষ্কার সকলের কাছে যে, কেন্দ্র সরকার নতুন কোনও হাসপাতাল বানায়নি যেখানে গরিব ধনী সকলেই সমান সমান মেডিকেল হেল্প পাবে। আসলে যে সব রাজ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের রোব এখনও তেমন জমে উঠতে পারেনি, সে সব রাজ্যের সরকার আইনত এতটাই পঙ্গু যে তার করার ক্ষমতা খুবই সীমিত। সব কিছুতেই কেন্দ্রীয় সরকারের সম্মতি নেওয়ার প্রয়োজন। লোকেদের রোজগারের পথ বন্ধ হচ্ছে, চাকরি যাচ্ছে, ব্যাবসা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। যা কিছু জমানো ছিল তা প্রায় শেষের পথে। হাসপাতালে একটা বেড পাওয়ার জন্য লোক পাগলের মতো হাসপাতালের চক্কর কাটছে। আর সরকারকে দ্যাখো, বড়ো বড়ো স্বপ্ন দেখাচ্ছে মানুষকে যার একটাও আজ পর্যন্ত পূরণ হতে কেউ দেখল না।

এখনও সময় আছে, মন্দির নির্মাণের জায়গায় হাসপাতাল বানানো হোক। বর্ডারে গুলিবর্ষন করার পরিবর্তে ভ্যাকসিন তৈরিতে বেশি করে মস্তিষ্ক লাগানো হোক। কোভিড যোদ্ধাদের অর্থ এবং সুবিধে দেওয়া হোক যারা নিজেদের প্রাণের মায়া না করে, স্ত্রী সন্তান, মা-বাবার কথা না ভেবে রাতদিন অপরিচিত মানুষদের সেবায় নিজেদের প্রাণপাত করছে।

দেশের নেতা মন্ত্রী, পান্ডা-পুরোহিত সকলেই নিজের নিজের শরীর স্বাস্থ্য, ভালো মন্দের যথেষ্ট খেয়াল রেখে চলছে, অথচ আর কারও চিন্তা তাদের মাথায় নেই। সাধারণ মানুষ , যাদের পরিবারের কেউ কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হচ্ছে তাদের সকলেরই একটাই চিন্তা, প্রিয়জন যাতে সুস্থ হয়ে ওঠে, সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ফেরে। কিন্তু নেতাদের এই মানুষগুলোর কোনও চিন্তা আছে কি? তারা নিজেদের ভালোমন্দ নিয়েই ব্যস্ত। তাই সাধারণ মানুষ ভরসা করাই ছেড়ে দিয়েছে। আজ শুধু রয়ে গেছে মনের মধ্যে একটা ভয়। সরকারের অকর্মণ্যতাই মানুষের মনে এই ভয় তৈরি করেছে। এর জন্য দায়ী সরকার।

ফ্যাশনের শীর্ষে বাগড়ুু

বাগড়ু প্রিন্ট আপনাদের অনেকেরই খুব চেনা। বিশেষ করে যাঁরা প্রাদেশিক শাড়ি পড়তে ভালোবাসেন। জয়পুর থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে এই গ্রাম। রাজস্থানের গন্ধমাখা গ্রামটায় গেলেই চোখে পড়ে ইতস্তত মাটির বাড়ি, উটে টানা গাড়ি, আর কারিগরদের পসরা সাজানো। এ এক শৈল্পিক গ্রাম যেখানে মানুষের জীবিকার আধার বাগড়ু প্রিন্টিং করা।

রাস্তার উপরেই এক তোরন যা দিয়ে ঢুকলেই বাগড়ু শ্রমিকদের ঘর সংসার চোখে পড়ে। বাড়ির উঠোনে, ছাদে, সর্বত্র মেলে দেওয়া আছে সার সার কাপড়। এখানে ওখানে রঙের চৌবাচ্চা।কেউ তৈরি করছেন কাদামাটির মিশ্রণ, কেউ বা ভেষজ রঙ। এই রঙ বানানোকেই বলা হয় ডাবু করা। প্রত্যেকটি পরিবারের বিশেষ কিছু ফর্মুলা থাকে নিজেদের রঙটির স্থায়িত্ব এবং সৌন্দর্য দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য।

চারশো বছরের প্রাচীন ইতিহাস নিয়ে এই গ্রামের মানুষরা বেঁচে থাকার লড়াই করছে, এই শিল্পকে জীবিকা করে। এখানে কৃষ্ণমৃত্তিকা থেকে নিংড়ে বের করা হয়েছে রঙ। যে রঙ রঙীন হয়ে, আমাদের অঙ্গে তুলে দেয় একটি জায়গার বেঁচে থাকার সংগ্রাম, পরম্পরাকে টিকিয়ে রাখার অদম্য প্রয়াস। এখানে সঞ্জারিয়া নদীর আর তার রৌদ্রময় বেলাভূমি একসময় ছিপা সম্প্রদায়কে আকৃষ্ট করেছিল এখানে বসত গড়তে।পাশাপাশি ছিল রাজানুগ্রাহিতা। এখন জলের সংকট, নদী আর আগের মতো ভরা নেই, শুকিয়ে যাচ্ছে, আর তাই বেঁচে থাকার সংগ্রামও আরো কঠিন হচ্ছে।তাই এই শিল্প ফ্যাশনে উঠে আসা মানে,কিছু মানুষের বেঁচে থাকাও।১৯৭০ সালের হিপি আন্দোলন প্রায় টিমটিম করে চলতে থাকা ব্লক প্রিন্টিং এর এই গ্রামে একটি নতুন তরঙ্গ নিয়ে আসে। আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত হয় বাগড়ু ব্লক প্রিন্টিং। দেখতে সহজ সরল প্রিন্টিং এর মূল সুরকে বজায় রাখে তার ভেষজ সত্তা।

Bagdu Saree in Fashion

বাগড়ু প্রিন্ট এই অঞ্চলেরই বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে। এর উৎস, ইতিহাস আর টেকনিক সবই খুব ইন্টারেস্টিং। প্রকৃতি নির্ভর শৈলির উপাদানও প্রাকৃতিক। বেদানার খোসা, কাঁচাহলুদ, ইন্ডিগো, চুনজল এবং লতাগুল্মের শিকড় থেকে তৈরি রং বা ন্যাচরাল ডাই ব্যবহার করা হয় এই শাড়িতে। নদীর কাদামাটি, সোডা ও লাইমের জলে চুবিয়ে কাপড়গুলোকে প্রথমে বিশেষ মেটে রঙের আবহ দেওয়া হয়। তারপর কাঠের তৈরি ব্লক দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয় বছরের বছরের পর বছর চলতে আসা ফুল, পাতা নক্সার বাহার। প্রিন্টিং শেষে সমস্ত কাপড়ের ওপর ছড়িয়ে দেয়া হয় কাঠের গুঁড়ো, নাহলে রঙগুলো ধেবড়ে যাবার সম্ভবনা থাকে। তাই প্রয়োজন সূর্যের প্রখর তাপ। রঙ তৈরির আরও একটি প্রধান উপকরণ হরিতকী। হরিতকীর সঙ্গে আঠা এবং এখানকার বিশেষ কৃষ্ণমৃত্তিকা, পচা আটা, লাইমস্টোন, গোবর মিশিয়ে রেখে দেওয়া হয়। সেটা থেকেই তৈরি হয় ফ্যাব্রিক। ঘন নীলের দীপ্তিহীন আভিজাত্য।

নজরকাড়া বাগড়ু ডিজাইন এখন উঠে এসেছে বিশ্বের ফ্যাশন মানচিত্রে। ট্র্যাডিশনাল নক্সা থেকে বেরিয়ে এখন অবশ্য ফিউশনের সমারোহ। জেগে উঠছে তার মধ্যে অন্য অলঙ্করণ। এই শাড়ি হয়ে উঠছে আরও বেশি আন্তর্জাতিক।।বাগড়ু গ্রামের ছিপা মহল্লা থেকে দেশেবিদেশে পৌঁছোচ্ছে শাড়ি, ড্রেস মেটিরিয়াল, বেড কভার বা থান। ইকো ফ্রেন্ডলি মেটিরিযাল আর সফট আরামদায়ক ফ্যাব্রিক–এই দুইয়ের কারণেই বাগড়ু প্রিন্টের শাড়ি বা কুর্তি, হয়ে উঠেছে সবার পছন্দের পরিধান।

মন থেকে ডিপ্রেশনের মেঘ সরান

আমাদের সমাজে ভীষণ ভাবে আত্মহত্যা বাড়ছে। রোজকার  জীবনচর্যায় মানুষ বড়ো বেশি একাকিত্বের শিকার। বিবাহ বিচ্ছিন্ন হয়ে জীবন কাটানো অথবা বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া এখন আর নতুন কোনও ঘটনা নয়। একক জীবনযাপনে কেউ কেউ মুক্তির আনন্দ খুঁজে নেন। কেউ আবার ডিপ্রেশনের শিকার হয়ে মৃত্যু -কে  আঁকড়ে ধরেন। স্বেচ্ছায় হোক বা পরিস্থিতির চাপেই হোক — কীভাবে সামলাবেন একাকিত্ব, কাটিয়ে উছবেন মৃত্যুচিন্তা– তার পরামর্শ রইল এখানে। কয়েকটি উপায় তুলে ধরা হল যেগুলো ডিপ্রেশনের  মেঘ কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও কাজ করবে। এই সমাধান যে সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে কাজ করবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তবে পুরোপুরি বিফলে যাবে সেটাও বলা যাবে না। আপনার  মনের প্রকৃতি অনুযায়ী সমাধান খুঁজতে হবে আপনাকেই।

এমন কিছু করুণ যাতে একঘেয়েমি কেটে যায় 

একাকিত্ব একটি অস্থায়ী অনুভূতি। জীবনের বিভিন্ন পট পরিবর্তনে আমরা একাকি বোধ করি। সেটা হতে পারে নতুন কলেজ জীবন শুরু করা বা সম্পূর্ণ নতুন কোনো স্থানে বসবাস শুরু করা। বিভিন্ন সৃজনশীল কাজ একাকিত্বের কষ্ট থেকে আমাদের দূরে রাখতে সাহায্য করতে পারে। তাছাড়া সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একাকিত্ব বোধ ফিকে হয়ে যায়।

সেক্ষেত্রে এমন কোনো কাজ করুন যেটা আপনি পছন্দ করেন। বিশেষ করে সেই কাজটি, যেটা আপনার মনোযোগ এতোটাই কেড়ে নেবে যে সময় কিভাবে কাটছে আপনি ভুলে যাবেন।

সেটা হতে পারে বই পড়া, কোনো শখের চর্চা বা পছন্দের কোনো কাজ করা। এই কাজগুলো আপনার শরীর ও মন দুই-ই ভাল রাখবে।

যোগাযোগ বাড়ান

সামাজিক সংগঠন বা সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে যোগ দিন।এই সমাধানের বিষয়টি শুনতে একটু গতানুগতিক ঠেকবে। যদি আপনার একাকিত্বের কারণ আপনার আশেপাশে লোকজনদের সঙ্গে মেলামেশা কমে যাওয়ার ফলে হয়ে থাকে, তাহলে যোগাযোগ বাড়ানো আপনার জন্য ভালো সমাধান হতে পারে।  পারলে অনাথ আশ্রম বা বৃদ্ধাশ্রমে সময় দিন। এতে ভালো কাজের জন্য মানসিক তৃপ্তি পাবেন।

যদি অপরিচিতদের সাথে কথা বলার বিষয়টি আপনাকে ভীত বা অপ্রস্তুত করে তাহলে, এমন একটি সংগঠন বেছে নিন যেখানে আপনি কাজের পাশাপাশি সৃজনশীল কিছু করতে পারবেন। হয় কোনো গানের  বা নাটকের দলে যোগ দিন অথবা কিছু তৈরি করা শিখুন। এতে করে, ইচ্ছার বিরুদ্ধে কারো সঙ্গে কথা বলার চাপে থাকতে হবে না। সেইসঙ্গে নিজের পছন্দের কোনও কাজ বেছে নেওয়ায় আপনি হয়তো সেখানে এমন কাউকে পেয়ে যাবেন, যার সঙ্গে আপনার চিন্তা ভাবনা মিলে যাবে।

 জীবনকে ইতিবাচক করতে চিন্তা ভাবনায় পরিবর্তন আনুন

একটি সমীক্ষায় মানুষের সহানুভূতির মাত্রা পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে, যারা নিজেদের একাকী বলে দাবি করেন, তারাই কিন্তু সমাজের অন্য মানুষের প্রতি অনেক বেশি সহানুভূতিশীল। বিশেষ করে তাদের প্রতি, যারা কোনো কষ্টকর সময় পার করছেন। পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া বা মানসিক চাপ কাটিয়ে ওঠার বিভিন্ন কৌশল শিখে নিতে পারেন, আপনারই মতো কোনও  একা অথচ পজিটিভ মনোভাবের মানুষের সান্নিধ্যে এসে।

দ্বিধা কাটিয়ে কথোপকথন শুরু করুন

অপরিচিতদের কারও সঙ্গে কথাবার্তা শুরু করার জন্য এক ধরনের মানসিক শক্তির প্রয়োজন। কিন্তু এজন্য আপনাকে শুরুতেই গভীর কোনও কথা বলতে হবে, এমনটা নয়।খুব সাধারণ কথাবার্তা দিয়ে আলাপচারিতা শুরু করুন।

অনুভূতি গোপন করবেন না

আপনার অনুভূতি সম্পর্কে বন্ধুবান্ধব বা পরিবারের সাথে কথা বলুন। যদিও এ ধরনের সমাধান দেওয়া যতটা সহজ, বাস্তবে করা ততটা সহজ না। কিন্তু আপনাকে খুঁজে বের করতে হবে পরিবারের বা তার বাইরের কোনও একজন মানুষকে, যার উপর আপনি কিছুটা হলেও নির্ভর করতে পারবেন। তাঁর কাছে মনের কথা শেয়ার করুন।

ইতিবাচক ভাবনাকে মনে স্থান দিন

প্রতিটি মানুষের ইতিবাচক দিকটি দেখার চেষ্টা করুন। যারা একাকীত্ব ভোগেন, তাদের অন্যের প্রতি বিশ্বাসের ভিত্তিটা নড়বড়ে। তাই এই সমাধানটির মূল বিষয়বস্তু হল, মানুষের ভেতর থেকে এমন ভালো কিছু খুঁজে বের করা,যাতে তার প্রতি বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ে।

আপনি যদি মনে করেন যে কেউ আপনাকে তিরস্কার করেছে বা কটূ কথা বলেছে– তাহলে ভেঙে না পড়ে, ইতিবাচক-ভাবে ভাবুন। নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, আপনার বিরুদ্ধে তার কথাগুলো সত্য কিনা। সে ব্যাপারে কোনো প্রমাণ আছে কিনা। না হলে ভিন্নভাবে ভাবুন। সম্ভবত তারা ব্যস্ত বা ক্লান্ত ছিল অথবা তাদের মন খারাপ বা মানসিক চাপের মধ্যে ছিল, তাই আপনার সম্পর্কে খারাপ কথা বলেছে।। আপনার হয়তো এক্ষেত্রে কিছুই করার ছিল না।

একাকিত্বের কারণ সনাক্ত করুন

আপনি কেন একাকিত্ব বোধ করেন সেটা খুঁজে বের করুন। প্রতিটি মানুষের একাকিত্বের কারণ আলাদা। কেউ হয়তো শারীরিক ভাবে নিজেকে বিচ্ছিন্ন মনে করেন, আবার কেউ হয়তো শিকার হয়েছেন বৈষম্যের। কারও পক্ষে অন্যকে বিশ্বাস করা কঠিন, আবার অনেকেই জানেন না নিজের মন মানসিকতার সঙ্গে মিল আছে এমন মানুষ কোথায় পাবেন।

একাকিত্ব থেকে বেরিয়ে আসার, সমাধান বের করার সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ হল, কেন একাকিত্ব অনুভব করছেন সেটা আগে জানা। এক্ষেত্রে আপনার সমাধান যদি কাজ না করে তাহলে অন্য কিছু চেষ্টা করুন।

অপেক্ষা করুন, মন ভালো হওয়ার

আমরা জানি যে একাকিত্বের এই অনুভূতি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অস্থায়ী। একাকিত্বের এই অনুভূতি সময়ের সাথে চলে যায়। তাই সে পর্যন্ত অপেক্ষা করা দরকার। দুঃখ কেন আপনার কাছচাড়া হচ্ছে না এই ভেবে ডিপ্রেসড হয়ে পড়বেন না। তবে যারা দীর্ঘস্থায়ী একাকিত্বে ভুগছেন, তাদের জন্য হয়তো কুকুর বা অন্য কোনও পোষ্য রাখা কার্যকর হতে পারে, যাকে নিয়ে বেশ কিছুটা সময় কাটিয়ে দিতে পারবেন।

প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয় কাটিয়ে উঠুন

মানুষকে আপনার সাথে কোনও কাজে যোগ দিতে বলা  বা কারও সাহায্য চাওয়া, ভালো অভ্যাস। প্রত্যেকেই এটা ভাবতে চান যে, তাদের মতো হয়তো অন্যরাও কোনো কাজের প্রতি সাড়া দেবেন। কিন্তু তাদের থেকে কখনও কখনও নেতিবাচক উত্তর আসতে পারে। আপনাকে এই ‘না’ শোনার ভয় কাটিয়ে উঠতে হবে। কেউ যদি বলেন যে, সেদিন তিনি ব্যস্ত আছেন, তাহলে বুঝতে হবে সত্যিই হয়তো তিনি ব্যস্ত আছেন। তাই হুট করে এটা ভেবে বসবেন না যে তারা আপনাকে এড়িয়ে চলছেন। অন্যের ‘না’-কে স্বাভাবিক ভাবে নিন।

নিজেকে ভালোবাসুন

সাজগোজ করা বা নিজের জন্য একটা নতুন রেসিপি ট্রাই করার মধ্যেও কিন্তু আনন্দ আছে।  নিজেকে মাঝে মধ্যে ছোটোখাটো অ্যাচিভমেন্ট-এর জন্য উপহার দিন। সেটা যে সবসময় খুব দামি কিছু হতে হবে তা নয়। হয়তো এমন কোনও জিনিস যা আুনি বহুদিন আকাঙ্খা করেছেন কিন্তু কেনা হয়নি। বা ধরুন নিজের জন্য একটা ভ্যাকেশন প্ল্যান করলেন খুব পছন্দের কোনও জায়গায়। আসল কথা হল, জীবনের ছোটো ছোটো অনুভব থেকে আনন্দ খুঁজে নিন।

এটা ঠিক যে, সব সমাধান সবার জন্য কাজ করবে না। একাকিত্বে আক্রান্তদের একেকজন একেকভাবে নিজেদের সমস্যা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করা দরকার। একটি সমাধান যদি কাজ না করে , তাহলে  ভিন্ন কিছু করার চেষ্টা করুন। জীবনকে ভালোবাসুন। মৃত্যু কে বেছে নেওয়া কোনও সমাধানের পথ নয়।

প্রত্যাখ্যান কীভাবে সামলাবেন

প্রত্যাখ্যান মানুষকে নতুন উদ্যমে কাজ করতে প্রেরণা জোগায় এবং বড়ো ক্যানভাসে সফল হতে না পারাকে জীবনের শেষ ভেবে নেওয়ার আগে, নিজেকে কিছু প্রশ্ন অবশ্যই করুন। জীবনে সকলকেই কখনও না কখনও প্রত্যাখ্যানের মুখোমুখি হতে হয়। কারণ অনেক কিছুই হতে পারে। ভালো স্কুল কলেজে ভর্তি হতে পারলেন না, পরীক্ষার রেজাল্ট খারাপ হল, কর্মক্ষেত্রে সফল হতে না পারা, প্রেমে আঘাত ইত্যাদি নানা কারণে নিজেকে প্রত্যাখ্যাত মনে করতে পারেন। কিন্তু ভেঙে পড়ে অবস্থার কাছে নতি স্বীকার করে নেওয়া মানে হেরে যাওয়া। সুতরাং মনকে বোঝান, সাহস আনুন মনে।

 

প্রথমে নিজেকে প্রশ্ন করুন : সবথেকে আগে নিজেকে প্রশ্ন করুন, কেন আপনি ওই জিনিসটা পেতে চান? যেমন ভালো নম্বর, চাকরি, সম্পর্ক, ভালোবাসা ইত্যাদি। সাধারণত এগুলি মানুষ চায় সমাজে প্রতিষ্ঠা পেতে, নিজে কিছু করে দেখাবার আশায়। অথবা জীবনের পথ চলার জন্য একজন সঙ্গী পেতে। জবাব পেয়ে গেলে ভাবুন, নিজেকে উত্তম প্রমাণিত না করতে পেরে, শেষ করে ফেলাটা কি আপনার উচিত হবে? অবসাদে ডুবে না গিয়ে পরের বার আরও ভালো করার জন্য নিজেকে তৈরি করুন।

নিজেকে কষ্ট দেবেন না : হার-জিত জীবনে লেগেই থাকবে। জীবনের কোনও একটা পর্যায়ে প্রত্যাখ্যান এলে মনকে বোঝান, ওটা আপনার জন্য নয়। নিজেকে ছোটো ভাববেন না, নেতিবাচক ভাবনা স্থান দেবেন না মনে, অবসাদ দূরে রাখবেন।

নিয়ন্ত্রণে থাকুন : সাধারণত যেটা আমরা চাই সেটা না পেলে বিকল্প হিসেবে ভুল রাস্তা বেছে ফেলি। যে-কোনও উপায়ে জিনিসটা হাসিল করার চেষ্টা করি। এটা অন্যায়, নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা উচিত।

পরিস্থিতি নতুন করে পর্যালোচনা করা উচিত : কোনও কাজ আপনাকে দেওয়া না হলে ভেঙে পড়বেন না বা কেউ সম্পর্ক ভেঙে দিতে চাইলে আঘাত পাবেন না। অন্য ভাবে জিনিসটাকে নেওয়ার চেষ্টা করুন। হয়তো কাজটা বা সঙ্গীটি আপনার মতো লোকের জন্য নয়। এর থেকে অনেক ভালো কিছু পাওয়ার যোগ্য আপনি অথবা ওই সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখলে ক্ষতি আপনারই বেশি হতো।

ব্যর্থতাও প্রেরণা দেয় : সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে ব্যর্থতাও জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। জীবনে যখনই খারাপ কিছু ঘটে, আমরা ভেবে নিই এটা সবসময় আমার সঙ্গে হয়। কিন্তু এটা সত্যি নয়। আশেপাশে যারা আছে সবাইকেই জিজ্ঞেস করুন, প্রত্যেককেই জীবনের কোনও একটা পর্যায়ে প্রত্যাখ্যান স্বীকার করতে হয়েছে।

প্রত্যাখ্যান মানুষকে কাজ করতে প্রেরণা দেয়। সুতরাং সব সময় ইতিবাচক চিন্তা রাখুন।

শিল্পী

আমার শ্যালক সুজয়কুমার শিল্পী। শিল্পীরা একটু খামখেয়ালি হয়। আর শিল্পী মানেই বড়ো মাপের প্রেমিক। সবকিছু ঠিকঠাক চললে তার প্রেমের নিদর্শন এতদিনে দৃষ্টান্ত হতো। অন্তর্ঘাতের জন্যে হয়নি। নিজেকে প্রমাণ করতে না পারার ব্যর্থতা তাকে আজও কষ্ট দেয়। বাড়িতে নতুন কেউ এলে যে-কোনও অজুহাতে ছাদে নিয়ে যায়, যেখানে খোদাই করে লিখেছিল ‘দোলনচাঁপা’। পাশে পায়রার ফাঁকা বাক্স। এখানে দাঁড়িয়ে দোলনচাঁপাদের বাড়ির ছাদ এবং ওর ঘরের জানালা দেখা যায়। প্রথম পরিচয় থেকে শুরু করে দোলনচাঁপার বিয়ে পর্যন্ত সবটাই শ্রোতাকে ধৈর্য ধরে শুনতে হয়। কেবল ব্যাগ চুরির ঘটনাটা চেপে যায়। হয়তো দোলনচাঁপার থেকেও গৃহত্যাগ করতে না পারার ঘটনা তাকে বেশি কষ্ট দেয়। আরও কষ্ট হয় যখন বাড়ির মানুষগুলো উপহাস করে। যেন প্রেমে ব্যর্থ হওয়ার থেকে হাস্যকর আর কিছু হয় না।

কাউকে বিশ্বাস করে না সুজয়। না বাড়ির, না বাড়ির বাইরে কারওকে। একমাত্র আমাকে যা একটু ভরসা করে। হতে পারে একসময় আমি শিল্পচর্চা করতাম বলে, এখনও খোঁজখবর রাখি বলে। তার চেয়েও বড়ো কথা সুজয়ের ছবির সমঝদার। দ্বিতীয় কারণটি পারিবারিক। সুজয়ের দিদিকে আমি ভালোবেসে বিয়ে করেছি। বাড়ির অমতে, পালিয়ে। সুজয়দের বাড়ি থেকে মেনে নিয়েছে বছরখানেক পরে। সেখানে মধ্যস্থতাকারী হিসাবে বড়ো ভূমিকা ছিল সুজয়ের। এখন সকলের সাথে ভালো সম্পর্ক। একমাত্র শ্বশুরমশাই এখনও সেভাবে মেনে নিতে পারেননি। কথা বলেন প্রয়োজনে।

আমার শ্বশুরবাড়ি এখনও একান্নবর্তী। শ্বশুরমশায়ের পাঁচ মেয়ে চার ছেলে, আমি বলি নবরত্ন। জ্যাঠতুতো ভাইবোন ধরলে পনেরো। ভাগ্যিস কাকাশ্বশুর বিয়ে করেননি। করলে সংখ্যাটা কোথায় যেত সন্দেহ! সব পিঠোপিঠি ভাইবোন। বন্ধুর মতো সম্পর্ক। দল বেঁধে ফুটবল খেলছে, সিনেমায় যাচ্ছে, এ ওর পেছনে লাগছে, হৈ-হুল্লোড় লেগে আছে সবসময়। সবচেয়ে বেশি পেছনে লাগে সুজয়ের। সুজয়ের খ্যাপাটে আচরণ, গোলমেলে কথাবার্তা আর আজব কাজকর্মের জন্যই হয়তো।

শিল্পী সুজয়ের কদর কেউ না বুঝুক সুজয় জানে, এই সময়ের সে ব্যতিক্রমী প্রতিভা। ছবির বিষয়, আঙ্গিক এবং উপস্থাপন সবেতেই স্বতন্ত্র। তবে চিত্রকলা নয়, ভাস্কর্যে তার আগ্রহ বেশি। কিছু দিন মূর্তি নির্মাণ শিখেছিল। ইচ্ছা আছে শুশুনিয়া পাহাড়কে ভবিষ্যতে সাধনপীঠ হিসাবে বেছে নেবে। দেশে হিমালয়ের মতো পাহাড় থাকতে শুশুনিয়া কেন? কারণ শুশুনিয়া চুনা পাথরের। চুনা পাথরই বিবর্তনের ফলে মার্বেল পাথরে রূপান্তরিত হয়। শুশুনিয়া এখন মাঝামাঝি অবস্থায়। অপেক্ষাকৃত নরম চুনা পাথর কুঁদে মূর্তি বানানোয় কষ্ট কম, ভবিষ্যতে সেই মূর্তি মার্বেল মূর্তিতে পরিণত হবে। কয়েক হাজার বছর সময় লাগবে হয়তো। মহাকালের নিরিখে এটা এমন কিছু সময় নয়। কেবল সে থাকবে না তখন। না থাকুক, তার শিল্প থাকবে। আর শিল্প থাকলেই শিল্পীর অমরত্ব। কাজটা সময়সাপেক্ষ। প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। সুজয় পয়সা জমাতে শুরু করেছিল।

একসময় তার জীবনে প্রেম এল।

বাড়ির উলটো দিকে ফাঁকা জায়গাটা কিনে বাড়ি বানালেন একজন মাস্টারমশাই। স্বামী-স্ত্রী আর তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে ছোটো সংসার। ছেলেটি ছোটো। বড়ো মেয়ে দোলনচাঁপা প্রথমবর্ষের ছাত্রী। সুজয়ের ঘরের জানলা দিয়ে বাড়িটা দেখা যায়, ছাদে উঠলে দোলনচাঁপার ঘরের জানলা। কিছু দিনের মধ্যে সুজয়ের বোনেরা আবিষ্কার করল, সুজয়ের ক্যানভাস জুড়ে দোলনচাঁপার মুখ। ততদিনে দুই পরিবারের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা হয়েছে, সুজয়ের বোনদের সাথে দোলনচাঁপার বন্ধুত্ব হয়েছে, বিকালের দিকে সুজয়দের বাড়ি আসে গল্পগুজব করতে। কথাটা তার কানেও উঠল এবং সুজয়ের বোনদের সাথে হাসিতে মাতল। আড়াল থেকে লক্ষ্য করল সুজয়, খারাপ লাগল তার। অপমানটা জমে থাকল ভেতরে।

দুদিন বাদে কলেজ থেকে ফেরার সময় দোলনচাঁপার পথ আটকাল সে, আপনার সাথে কথা আছে।

দোলনচাঁপা জানত সুজয়ের দুর্বলতা, এমন কিছু যে ঘটতে পারে সে আশঙ্কাও ছিল। মানসিক ভাবে একরকম প্রস্তুত ছিল। তবু না বোঝার ভান করল, ওমা এখানে কেন! বাড়িতে বললেই তো পারতেন।

–সব কথা বাড়িতে বলা যায় না। আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে।

–তাহলে তো আমার মা-কে জানানো উচিত। একদিন আসুন না আমাদের বাড়ি। মা-র সাথে আলাপ করিয়ে দেব।

–সেদিন অমন বিশ্রী ভাবে হাসলেন কেন? আপনার ছবি অাঁকা অন্যায় না হাস্যকর? আপনি আপনাকে হাস্যকর ভাবতে পারেন, আমি ভাবি না। আমার জীবনে আপনি…

–এমা ছিছি, এ তো আমার সৗভাগ্য। আপনার মতো গুণী শিল্পী…

সুজয় খুশি হল, আপনি দেখেছেন?

–দেখেছি। আপনার অনুমতি না নিয়েই আপনার ঘরে ঢুকেছিলাম।

–ভালো লেগেছে?

–ভীষণ।

–আসলে ছবির আপনি তো শুধু আপনি নন, কল্পনায় আপনাকে যেভাবে দেখি… কথাটা কীভাবে বলব ঠিক বুঝতে পারছি না। আপনি ভুল বুঝলে…

দোলনচাঁপা বিষম খেতে খেতে সামলে নেয়, বুঝেছি। সত্যিই অন্যায় হয়ে গেছে। আপনার অনুমতি ছাড়া ঘরে ঢোকা উচিত হয়নি।

–আমি সে কথা বলছি না। আপনার যখন খুশি যাবেন, যতক্ষণ খুশি থাকবেন, চাইলে সারা জীবন…

এবার আর সামলাতে পারল না, বিষম খেল। একটু ধাতস্থ হলে বলল, ফুচকা খাবেন? আমার ফেভারিট।

–আমারও।

–চলুন।

–পয়সা কিন্তু আমি দেব।

–অফার আমি করেছি, আপনি কেন দেবেন?

–আমার ইচ্ছা।

–পরের দিন কিন্তু আমি দেব।

পরের দিন ফুচকা নয়, রেস্টুরেন্ট। ফিস কবিরাজির ভিতর কাঁটা চামচ চালাতে চালাতে আসল কথাটা বলে ফেলল সুজয়, কিছু বুঝতে পারছেন?

–কী?

–আমি আপনার প্রেমে পড়েছি।

টকাস করে এক টুকরো ফিস কবিরাজি মুখে পুরে দোলনচাঁপা বলল, থ্যাংক য়ু।

সুজয় থতমত খেল। এই কথায় এই উত্তর! তালগোল পাকিয়ে যায় কেমন। কথা খুঁজে পায় না। দোলনচাঁপা মুখ নামিয়ে হাসি চাপার চেষ্টা করছিল। মুখের খাবার শেষ হলে সোজা তাকাল সুজয়ের দিকে। স্বাভাবিক ভাবে বলল, কেউ ভালোবাসে শুনলে কার না ভালো লাগে বলুন। এই একটা ব্যাপারে আমি কিন্তু ভাগ্যবান, অনেকের মুখেই কথাটা শুনেছি। তবে আপনার মতো শিল্পী যখন বলে…

–আমি বোধহয় আপনাকে বোঝাতে পারছি না।

–পেরেছেন। সত্যি কথা বলতে কী, এ ব্যাপারে আমি অসহায়। দোলনচাঁপা এবার সিরিয়াস হয়, মেঘ করে আসে মুখে। দমধরা গলায় বলে, সাধ থাকলেও সাধ্য নেই। বাবার আবদার তার পছন্দে বিয়ে করতে হবে, না হলে আত্মহত্যা করবে। বাবাকে আমি ভীষণ ভালোবাসি, সে আঘাত পায় এমন কোনও কাজ করতে পারব না।

–বিষয়টা আমার উপর ছেড়ে দাও। তোমার বাবাকে রাজি করানোর দায়িত্ব আমার। আমি তোমার মতামত জানতে চাইছি।

–বললাম তো, বাবার ইচ্ছাই আমার ইচ্ছা।

সুজয় খুশি হয়। দোলনচাঁপা তাকে হতাশ করেনি, বরং আশার আলো দেখিয়েছে। এই ছোট্ট আলোকবিন্দু একদিন দাবানলে পরিণত হবে।

সুজয় পক্ষীরাজ হয়ে ওড়ে, পিঠে দোলনচাঁপা। কখনও ভিক্টোরিয়া, রবীন্দ্রসদন, কখনও সিনেমা, নাটক। দেদার পয়সা ওড়ে। জমানো টাকায় হাত পড়ে একসময়। তবে এসব প্রসঙ্গ গৗণ। ভালোবাসার কাছে পৃথিবীর সমস্ত অর্থও কিছু না। তার শিল্পকর্মেও জোয়ার আসে। একটার পর একটা দোলনচাঁপার পোর্টেট। কখনও ওয়াটার কালার, কখনও অয়েল পেইন্টিং, কখনও স্রেফ পেন্সিল স্কেচ। ততদিনে দোলনচাঁপাদের বাড়ির দরজাও খুলে গেছে। দোলনের মা তাকে পছন্দ করে। সুজয় ডাকে মাসিমা। মাসিমার এটা-ওটা ফাইফরমাস খেটে দিতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে করে।

বছর দুই কেটে যায় এভাবে উড়তে উড়তে। দোলনচাঁপা বিএ ফাইনাল দেয়। সুজয়ের মনে হয় এবার দোলনের বাবাকে জানানো উচিত। অথচ বলি বলি করেও বলা হয় না।

মাসখানেক বাদে একদিন অসময়ে সুজয়ের ঘরে এসে হাজির হয় দোলনচাঁপা। অপরাধী অপরাধী ভঙ্গিতে একটা বিয়ের কার্ড সুজয়ের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে, বাবা হঠাৎ ঠিক করে ফেলল।

আচমকা আঘাতে সুজয় হতভম্ব। কার্ডটা মুঠো করে ধরে চুপচাপ বসে রইল। কিছু বলতে পারল না।

কাছে এগিয়ে এল দোলনচাঁপা, সুজয়ের ডানহাতটা চেপে ধরে অনুনয় করল, বিয়েতে থেকো কিন্তু। না হলে বুঝব… শিল্পীর ভালোবাসার কোনও মূল্য নেই। সব মিথ্যে…

সাচ্চা প্রেমের প্রমাণ দিতে বিয়ের দিন আর পাঁচজন নিমন্ত্রিতের মতো সেও উপস্থিত থাকল। কিছু কিছু দায়িত্ব পালন করল। সাতপাকের সময় পিঁড়ি ধরল। শুভদৃষ্টির সময় প্রত্যাশা করল এক বারের জন্য হলেও তার দিকে তাকাবে। শেষপর্যন্ত না তাকালেও দুঃখ পেল না। ভাবল সংকোচে…

পরদিন সন্ধ্যায় চাকুরীজীবী বরের হাত ধরে শ্বশুরঘরে যাওয়ার পর সবার অলক্ষ্যে ছাদে উঠে এল সুজয়। বিয়ের চিঠি হাতে পেয়ে দুঃখে ছাদ খোদাই করে সেখানে দোলনচাঁপার নাম লিখেছিল। পাশে পায়রার বাক্স। পায়রা পোষার শখ সুজয়ের ছোটোবেলা থেকে। বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় গোটা তিরিশেক পায়রা এই মুহূর্তে তার জিম্মায়। দরজা খুলে সবগুলোকে উড়িয়ে দিল। অনেক রাত অবধি চোখের জল ফেলল। চাঁদ তারা সাক্ষী রেখে প্রতিজ্ঞা করল, শিল্পীর ভালোবাসায় খাদ থাকে না। প্রমাণ আমি করবই। কেবল তোমার কাছে না, তামাম দুনিয়ার কাছে…

এরপর থেকে সময় পেলেই ছাদে আসে। বিশেষ করে রাতের দিকে। দোলনচাঁপা-র সামনে। ফাঁকা পায়রার খোপের দিকে তাকিয়ে থাকে। দোলনচাঁপাদের বাড়ির দিকে তাকায় না। দিনেরবেলা যতক্ষণ ঘরে থাকে দরজা বন্ধ করে রাখে। বোনেদের কারও কারও সন্দেহ হওয়ায় গোয়েন্দাগিরি শুরু করে দিল। বিশেষ কিছু উদ্ধার করতে না পারলেও এটুকু বুঝছে, রহস্যের মূলে আছে একটা বড়ো ব্যাগ। সাধারণত টুরে যাওয়ার সময় যে-ধরনের ব্যাগ ব্যবহার হয়। তবে কি সুজয় কোথাও যাচ্ছে! বাড়ি থেকে বেরনোর সময় দরজায় তালা লাগিয়ে বেরোয়। কোথায় যাচ্ছে জিজ্ঞাসা করলে বলে না। তবু খবর আসে বাড়িতে। বন্ধু-বান্ধব আত্মীয়-স্বজন পরিচিত সকলের কাছ থেকে টাকা ধার করছে। কারও কারও কাছে অনুদান হিসাবেও নিয়েছে। কারণ হিসাবে বলেছে, বাড়িতে আর ভালো লাগছে না। গৃহত্যাগী হয়ে পাহাড়ে যাবে।

বাড়ির লোকজন ভয় পায়। এবার আর সুজয়ের আচরণে হাসে না। সুজয়ের অনেক বিপজ্জনক ক্ষ্যাপামির স্মৃতি এখনও তারা ভুলতে পারেনি। সুজয়ের বাবাও চিন্তায় পড়েন। ছেলের জেদ তিনি জানেন। কারও কথায় সিদ্ধান্ত বদলাবে না। একমাত্র তার এই অপ্রিয় জামাইটি চেষ্টা করলে হয়তো পারতে পারে। এই একটি মানুষকেই সে যা একটু সমীহ করে। তাই জরুরি তলব পাঠালেন।

গেলাম। প্রথমে দেখা করলাম সুজয়ের সাথে। দোলনচাঁপার বিয়ের খবর আগেই পেয়েছিলাম। স্ত্বান্না দিলাম ভুলে যাওয়ার জন্যে। নতুন করে জীবন শুরু করার পরামর্শ দিলাম। সুজয় উত্তর দিল না। চুপচাপ শুনল। বুঝলাম আমার কথা ভালো লাগছে না। বাধ্য হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, গৃহত্যাগী হচ্ছ শুনলাম?

–হু।

–দোলনচাঁপার মতো একটা ফালতু মেয়ের জন্য?

-না, আমার প্রেমের প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে।

–কোথায় যাচ্ছ?

–শুশুনিয়া।

–তোমার সেই প্রোজেক্ট?

–হ্যাঁ।

–বিষয় ঠিক হয়েছে?

–আমার প্রেম। দোলনচাঁপা। দোলনচাঁপার মূর্তি বানাব।

ব্যাখ্যা যাই হোক রোগের নাম দোলনচাঁপা। শিল্পী মেয়ে। ও মেয়ে যে দাগা দেবে প্রথমবার দেখেই মনে হয়েছিল। বাড়ির সবাই বুঝত। যে কারণে কেউ মাথা ঘামায়নি। কিন্তু তার পরিণতি এমন হবে কেউ কল্পনাও করেনি।

বললাম, গুড আইডিয়া। কবে যাচ্ছ?

–সামনের বুধবার। কিছু ছেনি ছিল, কিছু বানাতে দিয়েছি। ওগুলো পেতে পেতে মঙ্গলবার। বিভিন্ন মাপের গোটা দশেক হাতুড়ি কিনেছি।

–আমার কোনও সাহায্য লাগলে বোলো। সাধ্যমতো চেষ্টা করব।

–দেখবেন বাড়ির কেউ না জানে। আটকাতে পারবে না জেনেও দল বেঁধে ঝামেলা পাকাবে। শুভকাজে যাওয়ার আগে ঝামেলা ভালো লাগে না।

–বেশ, তুমি যা চাও তাই হবে।

সুজয়ের পর শ্বশুরমশাই। সে অর্থে এই প্রথমবার মুখোমুখি। প্রথমবার কোনও সিরিয়াস বিষয় নিয়ে আলোচনা। এর আগে কুশল বিনিময় ছাড়া কোনও কথা হয়নি। বেশ অসহায় আর উৎকণ্ঠিত মনে হল ভদ্রলোককে। জানতে চাইলেন, কিছু জানতে পারলে?

–জেনেছি। আমাকে বিশ্বাস করে বলেছে। কাউকে বলতে বারণ করেছে। তবু আপনাকে বলব, বলা প্রয়োজন তাই…। কাউকে বলতে পারবেন না। কথা দিতে হবে।

–বিশ্বাস করতে পারো।

শ্বশুরমশাইকে সব কথা বললাম। শুনে তাঁর কপালের ভাঁজ আরও গভীর হল। চুপচাপ ভাবলেন কিছুক্ষণ, তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, কী মনে হয়, সত্যিই যাবে?

–আপনার ছেলেকে আপনি জানেন। যেভাবে ক্ষেপে উঠেছে মনে হয় না আটকানো যাবে।

–কত দিনের প্রোগ্রাম?

–বলা কষ্ট। দু বছর হতে পারে, পাঁচ বছর হতে পারে আবার সারা জীবনের জন্যও হতে পারে।

–অসম্ভব। এ হতে দেওয়া যায় না। ওকে আটকাও। একাজ একমাত্র তুমি পারবে। তোমার কথা শুনবে।

–কারও কথা শোনার মতো মানসিকতা ওর নেই।

–তোমার উপর আমার ভরসা আছে।

খুশি হই। উপভোগ করি ভদ্রলোকের অসহায়তা। আনন্দ হয় আমার শরণাপন্ন হওয়ায়। গত দশ বছর ধরে নিঃশব্দে আমাকে অপমান করে চলেছে। এখন বিপদে পড়ে…

আমি চুপ করে থাকি।

এক ভোরে বাড়িসুদ্ধ মানুষের ঘুম ভাঙল সুজয়ের চিৎকারে। সবাই ছুটে এল। ঘটনা গুরুতর, টাকাপয়সা ছেনি-হাতুড়ি সহ পুরো ব্যাগটাই গায়েব। অথচ দরজা জানলা যেমন বন্ধ ছিল তেমনই আছে। পড়ে আছে কেবল একটা বাটালির আছার। রসিকতা করতে ইচ্ছে করে ফেলে গেছে। বাড়ির সবাইকে উদ্দেশ্য করে হুংকার ছাড়ল, একাজ তোমরা করেছ। ভালো চাও তো ফেরত দাও।

এ ওর মুখের দিকে চাইল। কথা বলল না। এত বড়ো বুকের পাটা কার আছে ভাবার চেষ্টা করল সবাই। সবাই সবাইকে সন্দেহ করল। সিদ্ধান্তে পৌঁছোতে না পেরে আবার প্রথম থেকে ভাবতে শুরু করল…। সবাই সবাইকে জিজ্ঞাসা করল। শেষপর্যন্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছোল, ব্যাগটা চোরেই নিয়েছে।

সুজয়ের হম্বিতম্বিতে চোরের বিশেষ কিছু এসে গেল বলে মনে হল না।

সর্বস্ব খুইয়ে সব দিক থেকেই ভেঙে পড়ল সুজয়। সারাদিন বাড়িতে থাকে। ঘর থেকে বেরোয় না। দরকার ছাড়া কথা বলে না। ভাইবোনেরাও তার পেছনে লাগে না। তবে চোখে চোখে রাখে। অসঙ্গতি কিছু দেখলে নজরদারি আরও বাড়িয়ে দেয়।

স্বাভাবিক হতে অনেকদিন সময় লেগেছিল সুজয়ের।

এর পরের গল্পে কোনও বৈচিত্র্য নেই। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় পাত্রী খুঁজে বছরখানেকের মধ্যে সুজয়ের বিয়ে দিলেন শ্বশুরমশাই। বছর দেড়েকের মাথায় একটি কন্যাসন্তান হল। এখন সেই মেয়ের বয়স আড়াই বছর। পাঁচ বছরের ব্যবধানে দোলনচাঁপার শোক এখন ফল্গুধারায়, আলাদা করে কোনও বহিঃপ্রকাশ নেই। দোলন বাপের বাড়ি ঘুরতে এলেও মুখোমুখি হয় না। তবু কোনও কোনও তারাভরা রাতে ছাদে গিয়ে দাঁড়ায়। লেখাটা এখনও একইরকম আছে, একটু যা ছ্যাতলা পরেছে। পায়রার খোপগুলো ফাঁকা।

দোলনচাঁপার ঘরে এখন তার ছোটোভাই থাকে।

কেবল খোয়া যাওয়া ব্যাগটার দুঃখ এখনও ভুলতে পারেনি। সুজয়ের বিশ্বাস, তার সাথে অন্তর্ঘাত হয়েছিল। বাড়িরই কেউ বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। ব্যাগটার প্রসঙ্গ উঠলে এখনও সে উত্তেজিত হয়ে ওঠে। সারাজীবনের সমস্ত স্বপ্ন ওই ব্যাগটায় গচ্ছিত ছিল। প্রেমিকা তো গেছেই, ব্যাগটার সাথে প্রেমও গেল। গ্রীষ্মের দুপুরে কিংবা শীতের ভোরে, বর্ষার মেঘে কিংবা বসন্তের পলাশে-মাদলে শুশুনিয়ার নেড়া মাথায় তা দীর্ঘশ্বাস হয়ে ঘোরে।

আর কোনওদিনও শুশুনিয়া যাবে না সুজয়।

সুজয় এখন আর ছবি অাঁকে না।

গত পাঁচ বছরে শ্বশুরবাড়ির সাথে আমার সম্পর্কের আরও উন্নতি হয়েছে। গুরুত্ব বেড়েছে। গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে। সামান্য পারিবারিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেও আমার পরামর্শ নিতে ভোলেন না আমার শ্বশুরমশাই। তাঁর সাথেও সম্পর্কের উন্নতি হয়েছে। এখন আমি তাঁর প্রিয় জামাই।

ব্যাগটা শুধু অণুঘটকের কাজ করেছে।

১১টি অ্যান্টিএজিং ফুড

চল্লিশ বছর বয়সের পর শরীরে কিছু পরিবর্তন এবং সমস্যা দেখা দেয়। যেমন– ত্বকের টানটান ভাব কমে যাওয়া, চোখের নীচে ভাঁজ পড়া, চুল পাকা, ক্লান্তি ভাব, দুর্বলতা অনুভব, গাঁটে ব্যথা, যৌনইচ্ছে কমে যাওয়া প্রভৃতি। আর এই পরিবর্তন এবং সমস্যা দূর করার জন্য অনেকেই নানারকম ক্রিম, লোশনের ব্যবহার কিংবা এনার্জি টনিক, ভিটামিন ট্যাবলেট সেবন করেও আশানুরূপ ফল না পেয়ে নিরাশ হয়ে পড়েন। কিন্তু বয়স আটকানোর জন্য এসব সঠিক মাধ্যম নয়।

জানতে হবে তারুণ্য বজায় রাখার উপযুক্ত কৌশল। না, কোনও জাদুবলে কিংবা মন্ত্রবলে নয়, আপনার রান্নাঘরে প্রতিনিয়ত যে-সামগ্রী ব্যবহার করেন, সে-সবই আপনার প্রয়োজন মেটাবে, মুশকিল আসান করবে। ভেবে দেখুন, কোনও ক্রিম, লোশন, টনিক, ট্যাবলেট নয়, মুনিঋষিরা সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার জন্য মাধ্যম করতেন প্রাকৃতিক উপাদানকে। যা হাতের কাছে পাওয়া যায়, যা সহজলভ্য, তারই উপযুক্ত ব্যবহারের ফলেই আগেকার দিনের মানুষ ১০০ বছরের বেশি বয়স পার করে দিয়েছেন।

আসলে চাই সঠিক রসদ। কারণ, মনুষ্য শরীরও মেশিনের মতো। শরীরকে সচল রাখতে হলে উপযুক্ত রসদের জোগান দিতে হবে এবং এই রসদ হল– অ্যান্টিএজিং ফুড। যার নাগাল পাওয়া অসম্ভব নয়। প্রায় সবার রান্নাঘরেই থাকে এই খাদ্য উপকরণ। আর যদি সংগ্রহে নাও থাকে, তাহলে তা বাজার থেকে সংগ্রহ করা যায় অনায়াসে। অতএব, জেনে নিন কী সেই অ্যান্টিএজিং ফুড এবং কী তার গুণ।

ডিম – ডিমে আছে ভিটামিন এ, বি এবং ই। এইসব ভিটামিন বার্ধক্য আটকাতে সাহায্য করে। শরীরের ক্ষতিগ্রস্ত কোশের মেরামতি কিংবা প্রোটিনের জোগান দেবে ডিম। তাই প্রতিদিন খান দুটো করে ডিম।

সোয়া – সোয়াবিন, সোয়া আটা, সোয়া দুধ প্রভৃতিতে ভরপুর ক্যালসিয়াম থাকে। সোয়া উপকরণ ব্যবহার করলে যেমন শরীর মজবুত থাকবে, তেমনই, ক্যানসার প্রতিরোধের ক্ষমতাও বাড়বে অনেকটাই।

বেদানা – বেদানা এজিং প্রোগ্রেস আটকায় এবং শরীরের ডিএনএ-তে অক্সিডেশনের গতি কমিয়ে দেয়। এই ফলের রস খেলে ত্বকের স্বাস্থ্য বজায় থাকে এবং ত্বক উজ্জ্বল হয়। প্রতিদিন একটা বেদানা আপনার সুস্বাস্থ্য অটুট রাখবে।

গ্রিন টি – গ্রিন টি-তে থাকে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট। এই অ্যান্টি অক্সিডেন্ট হজম শক্তি বাড়ায় এবং চেহারায় বয়সের প্রভাব পড়তে দেয় না। যদি আপনিও তারুণ্য বজায় রাখতে চান, তাহলে প্রতিদিন দু’কাপ গ্রিন টি পান করুন।

আঙুর, কমলালেবু এবং মুসম্বি – আঙুর, কমলালেবু, মুসম্বি প্রভৃতি ফলে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি থাকে। ক্যানসার উৎপাদনকারী কার্সিনোজন্স-কে শরীরের বাইরে বের করতে সাহায্য করে এইসব ফল।অ্যান্টিঅক্সিডেন্টও পর্যাপ্ত মাত্রায় থাকে। সারাদিনের খাদ্যতালিকায় অবশ্যই এইসব ফল রাখুন।

ব্লুবেরি এই ফল একটু দামি, তবে এতে গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিন এবং পলিফিনল পাওয়া যায়। এই ফল খেলে চেহারায় বয়সের ছাপ যেমন কম পড়বে, তেমনই সুগার এবং ক্যানসার আটকাতেও সাহায্য করবে। তাই, প্রতিদিন না পারলেও সপ্তাহে অন্তত দু’-তিন দিন খান ব্লুবেরি।

দই – দইতে এমন কিছু ব্যাকটেরিয়া থাকে, যা হজম করাতে সাহায্য করে। এতে ক্যালসিয়াম থাকার কারণে, গেঁটে বাত  কিংবা অস্টিওপোরোসিস জাতীয় রোগও আটকায়। সেইসঙ্গে, ত্বকের লাবণ্য বজায় রাখতেও সাহায্য করে।

অঙ্কুরিত ছোলা – প্রতিদিন অঙ্কুরিত ছোলা খেলে নানারকম রোগের আক্রমণ প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। বিশেষ করে ক্যানসার আটকাতে অঙ্কুরিত ছোলার জুড়ি নেই। শুধু তাই নয়, প্রতিদিন অঙ্কুরিত ছোলা খেলে শরীরের এনার্জি বাড়বে।

স্ট্রবেরি – স্ট্রবেরিতে এক বিশেষ ধরনের ফাইবার আছে, যা পেট পরিষ্কার করতে সাহায্য করে। শুধু তাই নয়, স্ট্রবেরি ব্লাড সুগার লেভেল-কেও নিয়ন্ত্রণে রাখে। প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে স্ট্রবেরিতে, যা তারুণ্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।

টম্যাটো এবং তরমুজ – টম্যাটো এবং তরমুজ লাইকোপেন-এ সমৃদ্ধ। আর এই লাইকোপেন ক্যানসারের সম্ভাবনাও কমিয়ে দেয়। তাছাড়া, এই দুটি ফলে ফাইবারও আছে, যা পেট পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে এবং বার্ধক্যের ছাপ পড়তে দেয় না।

বাদাম – সবরকম বাদামে আছে স্বাস্থ্যবর্ধক ফ্যাট। এছাড়া বাদাম অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট-এও সমৃদ্ধ। তবে বেশি বাদাম খাবেন না, কারণ বাদামে প্রচুর ক্যালোরি থাকে। তাই প্রতিদিন দুটো চিনাবাদাম, দুটো পেস্তাবাদাম, দুটো কাজুবাদাম এবং একটা আখরোট খেতে পারেন। তবে একসঙ্গে নয়, সারাদিন ধরে মাঝেমধ্যে খান, ত্বকের ঔজ্জ্বল্য বজায় থাকবে।

হজমের গোলমাল

বছরের বেশিরভাগ সময় তেল-মশলাযুক্ত খাবার কম খেয়ে অনেকে শরীর ফিট রাখার চেষ্টা করেন কিন্তু উৎসবের সময় অথবা অনুষ্ঠান বাড়িতে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে গেলে অনিয়ম এবং স্পাইসি খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকতে পারেন না। ফলে শুরু হয় হজমের গোলমাল। মহিলাদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা আবার কিছুটা আলাদা মাত্রা নেয়। তাই, এ ক্ষেত্রে কী কী সমস্যা হতে পারে এবং সমস্যা কাটিয়ে কীভাবে ফিট থাকবেন, সেই বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন গ্যাস্ট্রো ইন্টেস্টিনাল ল্যাপারোস্কোপিক সার্জন ডা. সঞ্জয় মণ্ডল।

কী কী কারণে সমস্যায় ভোগার সম্ভাবনা প্রবল রয়েছ        

১)আপনার যদি সুপ্ত গলব্লাডার স্টোন থাকে, তাহলে ঝাল, ফ্যাটযুক্ত খাবার কিন্তু পেটে অসহ্য ব্যথা চাগিয়ে তুলতে পারে। শুধু তাই নয়, এক্ষেত্রে অ্যালকোহল পান করলে তা পরবর্তীকালে জীবন সংশয়ী প্যানক্রিয়াটাইটিস-এর চেহারা নিতে পারে

২)স্ট্রিট ফুডের প্রতি আসক্ত হয়ে অস্বাস্থ্যকর খাবার খেলে টাইফয়েড বা ভাইরাল হেপাটাইটিসের শিকার হতে পারেন

৩)অপরিমিত মাংস আপনার ডায়েট চার্টে থাকলে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যায়ে ভোগার প্রবল সম্ভবনা রয়েছে

৪)সাধারণ অভ্যাসের বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত পরিমাণে মশলাদার রাস্তার খাবার (Street food) খেলে ব্লটিং, বমি, পেট খারাপ, পেট ব্যাথা, জ্বালার অনুভূতি ইত্যাদি সমস্যা দ্যাখা দিতে পারে

 

মহিলাদের সমস্যা

পুরুষ ও মহিলা উভয়েরই গ্যাসট্রোইনটেস্টিনাল ট্র্যাকের গঠনগত পার্থক্য খুব একটা না থাকলেও, মহিলাদের শারীরিক গঠন আলাদা। তাই, হজমের কোনও কোনও সমস্যার ক্ষেত্রে উপসর্গগুলোও আলাদা। বেশিরভাগ মহিলার স্বাদকোরক খুবই সংবেদনশীল। পুরুষদের তুলনায় মিষ্টি ও তেতো খাবারের স্বাদ তাদের জিভে একটু বেশিই ঠেকে। অল্প পরিমাণে খাবার খেলেও খাবারের স্বাদ তারা স্পষ্ট বুঝতে পারেন। মহিলাদের ইসোফেগাসের উপরিভাগে থাকা ভাল্ভ, পুরুষদের তুলনায় বেশি হাইপারসেনসিটিভ। ফলে গলায় কোনও কিছু দলা পাকিয়ে থাকলে তার অনুভূতি এদের বেশি হয়। আবার মহিলাদের পাকস্থলী আর ইসোফেগাসের মধ্যবর্তী ভাল্ভ বেশি দৃঢ় ও শক্তিশালী। তাই, পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের বুকজ্বালা বা রিফ্লাক্স সিম্পটম কমই হয়। কিন্তু মহিলাদের ভাল্ভ বেশি সংবেদনশীল বলে বুকজ্বালা হলে বেশি টের পান তাঁরা। তবে অ্যাসিড রিফ্লাক্স-এর জন্য ইসোফেগাসের সেভাবে কোনও ক্ষতি হয় না। অতিরিক্ত তেল-মশলাযুক্ত খাবার, কফির প্রতি আসক্তি, একসঙ্গে বেশি খেয়ে ফেলা, মিষ্টি-চকোলেট জাতীয় খাবার বেশি খাওয়া, ওবিসিটি, খেয়েই ঘুমিয়ে পড়া ইত্যাদির ফলে বুকজ্বালা হতে পারে। এরজন্য প্রথমেই জীবনযাপনে বদল আনতে বলা হয়। কাজ না হলে ওষুধ দেওয়া হয়। দুটোর কোনওটাতেই কাজ না হলে রোগীকে এন্ডোস্কোপি করতে বলা হতে পারে।

দীর্ঘদিন ধরে অ্যাসিড– সাপ্রেশন ড্রাগস খেলে অস্টিওপোরোসিসের আশঙ্কা দেখা দিতে পারে। যেহেতু মহিলারা (বিশেষত মেনোপজের পরে) হাড়ের সমস্যায় বেশি ভোগেন, তাই আগে থেকে সতর্ক হওয়া দরকার। কাজ ও সংসারের চাপে অনেক মহিলাই দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকেন। ফলে, বমিবমি ভাব, পেট ভার হয়ে থাকা, ব্লোটিং ইত্যাদি হতে পারে। ছোটো ছোটো মিল খান। একবারে বেশি না খেয়ে মাঝেমাঝে অল্প করে খান। ফ্যাটযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলুন। এতে কাজ না হলে ডাক্তারের পরামর্শে প্রোকাইনেটিক গ্রুপের ওষুধ খেতে পারেন। কিন্তু খুব বেশিদিন এ ধরনের ওষুধ খেলে মহিলাদের হরমোনাল সমস্যা দেখা দিতে পারে। অনিয়মিত পিরিয়ড, বন্ধ্যাত্ব ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিতে পারে। পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের বৃহদ্রান্ত্র খালি হয় ধীরগতিতে। মহিলাদের কোষ্ঠকাঠিন্য তুলনায় বেশি হওয়ার পিছনে এই প্রক্রিয়াটাই দায়ী। এর সমাধানে পর্যাপ্ত পরিমাণে জল ও ফাইবারযুক্ত খাবার খাওয়া জরুরী। কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা তাতেও না কমলে, ওষুধের সাহায্য নেওয়ার কথা ভাবা যেতে পারে। মহিলাদের এনাল ক্যানাল SPHINCTAR পুরুষদের তুলনায় দৈর্ঘ্যে ছোটো ও কম শক্তিশালী। তাদের রেক্টাম বেশি পরিমাণে স্টুল ধরে রাখতে অনুপযোগী। পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের গলব্লাডার খালি হয় ধীরে ধীরে। ফলে, গলব্লাডারে পাথরের আশঙ্কাও মহিলাদের বেশি। হরমোনগত কারণে, বিশেষত প্রেগনেন্সির সময় মহিলাদের গলব্লাডার আরও দ্রুত খালি হয়। গলব্লাডার স্টোন প্রতিরোধের সেরকম কোনও নির্দিষ্ট উপায় নেই। তবে দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকা, দ্রুত ওজন কমানোর চেষ্টা, তেল-মশলাযুক্ত খাবার খাওয়া এই সমস্যার সম্ভাবনাকে অনেকটাই বাড়িয়ে তোলে। ঘড়ি ধরে ছোটো ছোটো মিল-এ ভাগ করে খান। খাওয়ার পরে আপার অ্যাবডোমেনে ব্যথা, বমি, জন্ডিস ইত্যাদি হলে বুঝবেন সতর্ক হওয়ার সময় এসেছে। চিকিৎসার উপায় বলতে সার্জারির মাধ্যমে গলব্লাডার স্টোন থেকে মুক্তি মেলে। এখন ল্যাপারোস্কোপিক বা কি-হোল সার্জারিই জনপ্রিয়।

পরিত্রাণের উপায়

ক) বাইরের খাবার যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলুন। একান্তই না পারলে, বাইরে থেকে টাটকা খাবারই খান। আর অবশ্যই এমন জায়গায় খান যেখানে রান্নাও হয় স্বাস্থ্যসম্মত পদ্ধতিতে আর তা রাখাও হয় পরিষ্কার জায়গায়, যাতে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ না ঘটে

খ) অবশ্যই পর্যাপ্ত পরিমাণে জল খান। জলই পারে আপনার পরিপাকক্রিয়া ঠিক রাখতে। বাইরের প্লাস্টিকের বোতলে জল খাওয়ার পরিবর্তে বাড়ি থেকে জল নিয়ে বেরনোর চেষ্টা করুন। এটা স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো। না পারলে, শুধুমাত্র সিল্ড মিনারেল ওয়াটারই কিনে খান

গ)       বেশি তেল-ঝালযুক্ত রেসিপি এড়িয়ে চলুন

ঘ)      এটা মানা একটু কঠিন উৎসব ও অনুষ্ঠানে, তবুও খেয়াল রাখুন খাওয়ার সময়ে যেন বাড়াবাড়ি রকমের অনিয়ম না হয়। বিশেষ করে ব্রেকফাস্ট আর ডিনার যেন সময়ের মধ্যেই করা যায়

ঙ)     কিছু খেলে যদি আপনার শারীরিক অসুবিধা দেখা দিতে পারে মনে হয়, তাহলে অবশ্যই সেই খাবার খাবেন না। যাদের অ্যাবডমিনাল বার্নিং ডিসপেপসিয়া-র সমস্যা রয়েছে, তারা সঙ্গে অ্যান্টাসিড রাখুন

চ)     রাতে হালকা ডিনার করুন। খুব ভোরে বা খুব রাতে খাবার না খাওয়াই ভালো, কারণ এতে শরীরের স্বাভাবিক বায়োলজিকাল ক্লক পালটে যায়

ছ)    বেশি মিষ্টি খাবেন না। অতিরিক্ত সুগার রিফ্লাক্স সিম্পটমের সৃষ্টি করে, আবার বর্ডারলাইন ডায়াবেটিক রোগীরাও বেশি মিষ্টি খেয়ে বিপদে পড়তে পারেন

জ)    শরীর ও সময়ের দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে খেয়ে গেলে সেটা যেমন বিপজ্জনক, আনন্দে গা ভাসিয়ে অতিরিক্ত  মদ্যপান করা তার থেকেও বেশি ক্ষতিকারক। তাই, অতিরিক্ত মদ্যপান থেকে বিরত থাকুন

ইস্তানবুল ডায়ারিজ

তুরস্কের একটি বড়ো শহর ইস্তানবুল। ঐতিহাসিক মাহাত্ম্য, সৗন্দর্য এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কারণে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে এই শহর। এক সময় এই ইস্তানবুল-ই ছিল তুরস্কের রাজধানী।

তিন বছর আগে পাঁচ বন্ধুকে নিয়ে আমি ইস্তানবুল গিয়েছিলাম। আমাদের এই ট্রিপ চার দিনের ছিল। আমরা খুব আনন্দ করেছিলাম ওই কয়েকদিন। ঘোরাফেরা, কেনাকাটা, খাওয়াদাওয়া করে খুব মজা করেছি। অর্থাৎ এক যাত্রায় যতটা হইচই, আনন্দ করা যায়, তার পুরোটাই উপভোগ করেছি আমরা। তাই আমাদের কাছে স্মরণীয় হয়ে আছে এই ট্রিপ। এখনও যখন আমরা সবাই এক জায়গায় জড়ো হই, তখন ইস্তানবুলের প্রসঙ্গ উঠবেই এবং আমরা ওই আনন্দের দিনগুলি স্মরণ করবই। সত্যিই ভরপুর সৗন্দর্যে সমৃদ্ধ এই শহর।

বাসপোরস নদীর সৗন্দর্য

আপনারা এটা জেনে অবাক হবেন যে, ইস্তানবুল ভ্রমণের আগে আমি কখনও নদী দেখিনি। শুধু শুনেছিলাম নদীর সৌন্দর্য সম্পর্কে। কিন্তু ইস্তানবুল গিয়ে  বাসপোরস নদী দেখে আমি মুগ্ধ। শুধু দেখেই চলেছিলাম নিষ্পলক। এতটাই পরিষ্কার, স্বচ্ছ এই নদী যে, আমার মন কেড়ে নিয়েছিল। ওখানকার সব নদী দেখে-ই আমি মুগ্ধ হয়েছি। নদীর জল নীলাভ। তবে এই নীল রঙেরও নানা শেডখেলা করে নদীর জলে, যা দেখে আমি চোখের পলক ফেলতে পারিনি। এছাড়া আমরা সবাই ক্রুজে গিয়েছিলাম।এই এক্সপিরিয়েন্স-টাও ছিল অসাধারণ। ক্রুজ-এর সৗন্দর্যও মনে গেঁথে আছে এখনও।

খাওয়াদাওয়া

ইস্তানবুলের খাবারও দারুণ! সেই টেস্ট আজও ভুলতে পারিনি। সব খাবারের নাম হয়তো ঠিক মতো বলতে পরব না এখন কিন্তু এক একটা রেস্তোরাঁয় এক এক রকম খাবারের স্বাদ পেয়েছি। বিভিন্ন দেশের খাবারে সমৃদ্ধ সেসব রেস্তোরাঁ। তবে ওই তালিকায় ইন্ডিয়ান খাবার না থাকার জন্য আমার একটু অসুবিধা হয়েছিল। কারণ, তিন দিনের বেশি ইন্ডিয়ান খাবার না পেয়ে আমার একটু কষ্ট হয়েছে। তাই, চতুর্থ দিন আমরা ইন্ডিয়ান খাবারের খোঁজ শুরু করি। অনেক খোঁজাখুজির পর অবশেষে পেয়েছিলাম একটা ইন্ডিয়ান ধাবা। ওখানে আমরা বাটার চিকেন, বাটার নান্, তন্দুরি নান্, ডাল মাখানি, বিরিয়ানি সবকিছুরই স্বাদ নিয়েছি। সত্যি বলতে কী, বিদেশে গিয়ে ইন্ডিয়ান খাবার পেয়ে আনন্দে আমরা প্রায় আত্মহারা হয়েছিলাম।

ইস্তানবুল-এর দুই রূপ

ইস্তানবুলের ভৌগোলিক ক্ষেত্রের কথা বলতে গেলে, এর দুটি ভিন্ন রূপের উল্লেখ করতেই হবে। কারণ, এই দুটি জায়গা একে অন্যের থেকে আলাদা। এক হচ্ছে পরম্পরাগত পুরোনো ইস্তানবুল, আর অন্যটি আধুনিক শহরের  চাকচিক্য। তবে আমরা দেখলাম, পুরোনোর থেকে বেশি ভিড় ছিল নতুন ভাবে গড়ে ওঠা অংশে। আমরা অবশ্য দু’টি রূপ-ই উপভোগ করেছি। বুঝেছি দুটি ক্ষেত্রের সাংস্কৃতিক তফাত। অন্যান্য দেশের মতো ইস্তানবুলেরও একটা অংশ আধুনিকতায় মোড়া, কিন্তু যে-অংশ তুরস্কের ঐতিহ্য বহনকারী, তা দেখে বেশি ভালো লেগেছিল আমাদের। আর ওই পুরোনো জায়গাতেই আমরা প্রচুর জাংক জুয়েলারি কিনেছি। শুধু নিজের জন্য নয়, বন্ধুদের জন্যও অনেক অলংকার এবং উপহার কিনেছিলাম। ওখান থেকে এত কিছু কিনেছিলাম কারণ, ওখানকার সব জিনিসই ইউনিক ছিল, যা অন্য কোথাও পাওয়া মুশকিল।

Travelogue Istanbul

মনকাড়া ইতিহাস

ইস্তানবুলের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট উল্লেখ করতেই হচ্ছে। এই শহরের আদি নাম কন্সটান্টিনোপল। তবে একসময় বাইজান্টিয়াম নামেও পরিচিত ছিল এই শহর। সাত পাহাড়ের শহরও বলা হয় ইস্তানবুলকে কারণ, শহরের সবচেয়ে প্রাচীন অংশটি গড়ে উঠেছে সাত পাহাড়কে কেন্দ্র করে।

ইস্তানবুল প্রসঙ্গে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরতে চাই। বিষয়টি হল– এটি দুটি মহাদ্বীপের মধ্যে অবস্থিত। এর একদিকে ইউরোপ, অন্যদিকে এশিয়া। তাছাড়া, তুরস্কের আর্থিক এবং সাংস্কৃতিক কেন্দ্রও এই ইস্তানবুল। তাই, এক আলাদা গুরুত্ব রয়েছে এই শহরের। ইস্তানবুলে এমন কয়েকটি সংগ্রহশালা রয়েছে, যা এখানকার ইতিহাস এবং সংস্কৃতিকে তুলে ধরেছে।

পেরা মিউজিয়াম, আতাতুর্ক মিউজিয়াম, সিটি মিউজিয়াম, ইস্তানবুল মিউজিয়াম অফ মডার্ন আর্ট, টার্কিশ অ্যান্ড ইসলামিক আর্ট মিউজিয়াম প্রভৃতি যেমন ইতিহাসকে আগলে রেখেছে, ঠিক তেমনই, প্রিন্সেস আইল্যান্ড প্রাকৃতিক সৗন্দর্যের আকর হয়ে রয়েছে।

ফতেহ অঞ্চলে অবস্থিত বেজিদ মসজিদের খুব কাছেই রয়েছে বইয়ের বাজার। যেখানে পাওয়া যাবে ইস্তানবুলের শিক্ষা, সাহিত্য,সংস্কৃতি এবং ইতিহাস বিষয়ক বই।যারা শপিং ভালোবাসেন, তাদের জন্য রয়েছে গ্র্যান্ড বাজার। ওখানকার পুরোনো বাজারগুলির মধ্যে এই বাজার অন্যতম। রবিবার ছাড়া প্রতিদিন-ই খোলা থাকে এই বাজার। গয়না, সাংসারিক জিনিসপত্র, পোশাক, খেলনা সবকিছুই রয়েছে এখানে। তবে এখানে সবচেয়ে বিখ্যাত হল রান্নার মশলা। নানারকম সেই মশলার গন্ধ আজও আমার নাকে লেগে রয়েছে।

দেবড়িগড় জঙ্গলে

ফরেস্ট চেক পোস্ট থেকে অগ্রিম অনুমতি নেওয়া ছিল। হেডলাইটের আলোয় দুপাশের ঘন জঙ্গলের বুক চিরে এই রোমাঞ্চকর পথ নিমেষে আবিষ্ট করে ফেলল। চকিতে চোখে পড়ল একটি চিতল, যে হেডলাইটের আলোয় ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দৗড় দিল জঙ্গলের সবুজে। এই জঙ্গল মূলত বাইসনের জন্য বিখ্যাত। বহুরকমের পাখপাখালিও আছে। আমাদের রাত্রিযাপনের জন্য পৌঁছে গেলাম ধুদ্রুকুসুম বন-আবাসে।

দেবড়িগড় ওয়াইল্ড লাইফ স্যাংচুয়ারি সম্পর্কে খুব বেশি আলোচনা হয় না। অথচ এ এক অপূর্ব জঙ্গল। আমাদের থাকার জায়গাটি প্রায় জঙ্গলের হাতায় অবস্থিত। পথে আসার সময়ই আমাদের প্রয়োজনীয় রেশন তুলে এনেছি। ডিম, চিকেন সবই পর্যা৫ পরিমাণে। ধুদ্রুকুসুমের পথ খুঁজতে বেশ সমস্যা হয়েছিল। আমাদের কপাল ভালো যে ধুদ্রুকুসুমের রেঞ্জ অফিসারের দেখা মিলেছিল, যার সাহায্যে এই রাত্রিবাস সম্ভব হল। কেয়ার টেকারের সহায়তায় কাঠ জ্বেলে শুরু হল আমাদের তন্দুরি চিকেন তৈরি, সেই সঙ্গে একজন স্থানীয় রাঁধুনি জুটে গেল আমাদের রাতের খাবারের ব্যবস্থাপনায়।

travel

পরদিন সকালে ফরেস্ট গাইড নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম জঙ্গল ভ্রমণে। শুনলাম শুধু বাইসন-ই নয়, এই জঙ্গলে লেপার্ড, সম্বর, শ্লথ ভল্লুক, লঙ্গুর, সজারুও আছে পর্যাপ্ত। গাইড আমাদের সদ্য ছেড়ে যাওয়া পায়ের ছাপ দেখিয়ে জানাল এগুলি লেপার্ডের। এক ঠান্ডা হিমস্রোত অনুভব করলাম পাঁজরে। মহানদীর ঠান্ডা হাওয়া, নাকি হিংস্র পশুটির কথা ভেবে, তা ঠিক ঠাওর করতে পারলাম না।

travel

জিপে করে এই জঙ্গল সফরে আমরা যাব চৗরাসিমাল কটেজে। ২১ কিমি দূরত্বের সবটুকু গহিন জঙ্গুলে পথ। বাইসনের একটি হার্ড দেখে গাড়ি থামল। চলল আমাদের ছবি তোলা। আরও কিছুটা এগোতে দেখলাম দুটি ময়ূর এবং একটি শ্লথ ভল্লুক। পাখির কলকাকলিতে গোটা বনান্তর মুখর হয়ে আছে। ঝোপের এদিক সেদিকে হরিণের ইতস্তত ঝাঁক। বেশ কিছু সল্ট লিক তৈরি করা আছে জঙ্গলময়। সেটার লোভেই পশুরা এদিক ওদিক দর্শন দিচ্ছে আমাদের।

চৌরাসিমাল ফরেস্ট কটেজ পৌঁছে চা খেয়ে, পায়ে হেঁটে একটা জায়গায় পৌঁছোলাম। সেখানে স্থানীয় জেলেরা তাদের বাসস্থান তৈরি করেছে। মহানদীর একটা অংশ ওই জঙ্গলের গা ঘেঁষে বইছে। সেখানে মাছ ধরাই এই জেলেদের রুজিরুটি জোগাড় করতে সাহায্য করে। একটা প্রায়

৫ কিলো ওজনের কাতলা মাছ ধরা পড়ল আমরা থাকতে থাকতেই। এটিকেই নিয়ে চললাম আমরা ধুদ্রুকুসুম। আজ লাঞ্চটা বেশ জমে যাবে!

 

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব