সামান্য দেরিতে (পর্ব-০৩)

—কবে থেকে জ্বর আসছে? টেস্টের রিপোর্ট কবে পাবে? প্রতীকের কথায় একতা বুঝল প্রতীক ওর দিদি অনুপমার সঙ্গে কথা বলছে। অনুপমাদের আর্থিক অবস্থা তেমন ভালো নয়। তা সত্ত্বেও ও বা ওর স্বামী সোমনাথ নিজেদের আর্থিক পরিস্থিতি উন্নত করার কোনও চেষ্টাই করত না। ওদের কাজ ছিল পরিচিতদের কাছে টাকার জন্য হাত পাতা।

পেশায় ইলেক্ট্রিক ইঞ্জিনিয়র সোমনাথের দু’বছর আগেই চাকরি চলে গেছে। ওই সময় সোমনাথ ইলেক্ট্রিকের জিনিস বিক্রির ব্যাবসা শুরু করার ইচ্ছা প্রকাশ করাতে, প্রতীক টাকা দিয়ে সাহায্য করে ব্যাবসা শুরু করতে। বেশ কিছুদিন সব ঠিকঠাক চলার পর সোমনাথ অভিযোগ করা আরম্ভ করে যে— এই ব্যাবসায় লাভ ওর চাহিদামতো হচ্ছে না। আর এত বছর চাকরি না করার জন্য চাকরি পাওয়াও মুশকিল হচ্ছে।

এদিকে অনুপমাও এই অসহনীয় পরিস্থিতির কথা সকলের কাছে বলে আর্থিক সাহায্য চাওয়া আরম্ভ করে। প্রতীকের বড়ো ভাই কিছু সাহায্য করলেও, শেষমেশ প্রতীকের উপরেই নির্ভর করা শুরু করে অনুপমা। প্রতীকও সাধ্যমতো বড়ো দিদিকে সাহায্য করতে কার্পণ্য করত না।

আজ আবার অনুপমার ফোন আসাতে একতা নড়েচড়ে বসল। বুঝতে পারল নতুন কোনও সমস্যার কথা শোনাতেই দিদির এই ফোন। একতার খালি শম্ভুনাথজির মেসেজগুলোই মনে পড়ে যাচ্ছিল। কয়েক মুহূর্ত আগেই স্বামী-স্ত্রী মিলে ফ্ল্যাট কেনার কথা বলছিল আর এখন যদি অনুপমাদিকে আর্থিক সাহায্য করতে হয় তাহলে হয়তো প্রতীক ফ্ল্যাট কেনার চিন্তা এখন বন্ধ করে দেবে, এই ভেবে একতা মনে মনে ভয় পেল।

একতার মনে হল এই সমস্যা থেকে একমাত্র মুক্তির পথ হল মহারাজজিকে কিছু অর্থ দান করা। কারণ একমাত্র শম্ভুনাথজি ভোগবিলাস থেকে দূরে, ভক্তি সাধনায় সাধারণ ভাবে জীবনযাপন করছেন। সুতরাং দান করার জন্য ওনার থেকে ভালো অন্য কোনও ব্যক্তি হতেই পারে না। শম্ভুনাথজিও নিশ্চই এই দানের অর্থ মানবকল্যাণেই খরচ করেন।

প্রতীক অনুপমার সঙ্গে ফোনে কথা বলায় ব্যস্ত থাকায় মেনুকার্ড দেখে অনুপমাই পানের ফ্লেভারযুক্ত আইসক্রিম অর্ডার করে দিল।

ফোন ছাড়তেই একতা প্রতীককে জিজ্ঞেস করল, “দিদি ফোন করেছিল?’

—হ্যাঁ, বাড়ি ফিরে এ ব্যাপারে কথা বলছি। মনে মনে কিছু নিয়ে চিন্তিত মনে হল প্রতীককে।

আইসক্রিম খেতে খেতেই নানা চিন্তা একতার মাথায় খেলা করছিল। হঠাৎ-ই পাঁচটা টেবিল ছেড়ে কোণের একটা টেবিলে একতার নজর স্থির হল। নিজের চোখকেই বিশ্বাস হচ্ছিল না একতার। শম্ভুনাথজি ওখানে বসে নানা পদে আহার করতে ব্যস্ত। পরনে সবসময়ের মতো পট্টবস্ত্রের বদলে টি-শার্ট এবং জিন্‌স। সঙ্গে ওনার গা ঘেঁষে চেয়ারে বসে এক সুদর্শনা নারী। অথচ শম্ভুনাথজি নিজেকে বলেন সংসারত্যাগী সন্ন্যাসী।

রেস্তোরাঁর একজন কর্মচারী এসে ওই মহিলার সামনে একটি কেক এনে রাখল। শম্ভুনাথজি ওই মহিলার হাত ধরে কেক কাটলেন তারপর ‘হ্যাপি বার্থডে’ বলে মহিলাকে আলিঙ্গন করে চেয়ারে আবার বসে পড়লেন। একটি কেকের টুকরো নিয়ে মহিলার মুখে ঢোকাতেই একতা শম্ভুনাথজির থেকে চোখ সরিয়ে নিল।

—এটাই তাহলে মহারাজের মানব কল্যাণমূলক কাজ, যাতে দানের অর্থ শম্ভুনাথজি খরচ করেন। এই ভেবে একতা বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়ল।

বাড়িতে এসে প্রতীক ফোনের কথাটা খুলে বলল। একতা ঠিকই সন্দেহ করেছিল। সোমনাথ অসুস্থ থাকায় অনুপমারা বাড়ি ভাড়ার টাকা দিতে পারেনি। সোমনাথ যা টাকা জোগাড় করতে পেরেছিল সব ডাক্তার আর ওষুধে খরচ হয়ে গিয়েছে।

—এবার তাহলে ওদের কত টাকা দিতে হবে? বিরক্ত হয়ে একতা প্রশ্ন করল!

অনেক করেছি এবার আর নয়। প্রতীকের গলায় বিদ্রোহের আঁচ শুনে একতা একটু অবাকই হল!

—মানে… এবার আর তুমি টাকা দেবে না?

—না! অনেক সাহায্য করেছি দিদি, জামাইবাবুকে। এরা বেচারা সেজে অন্যকে লুটছে। খারাপ সময় কাউকে সাহায্য করা আলাদা ব্যাপার কিন্তু কেউ যদি অন্যের রোজগারের উপর লক্ষ্য রেখে নিজেরা অসহায় সেজে অপরকে লুটতে থাকে, তাহলে তো সেটা মেনে নেওয়া যায় না। মনে আছে গত বছর কাজের জন্য আমেদাবাদে গিয়েছিলাম? তখন একদিন দিদিদের কাছে থেকেছিলাম। —হ্যাঁ, মনে আছে। শান্ত ভাবে একতা উত্তর দিল।

চোরের বদলা (শেষ পর্ব)

রাত যখন দুটো বাজে একটি ট্রেন জোরে হুইশেল বাজাতে বাজাতে স্টেশন ছাড়ে, ঠিক তখনই ব্যালকনির গ্রিল কেটে কাচের জানলা ভেঙে ঘরে প্রবেশ করে আরও একজন। সে দরজার সামনে এসে দেখে দরজা লক করা কিন্তু তালা অ্যাসিড দিয়ে নষ্ট করা। দরজায় নক করে তৃতীয় জন, ঠক্ ঠক্ ঠক্।

প্রথম চোর আওয়াজ শুনে— ক্যাডারে? ভূত-টুত নাকি! না এই বাড়ির লোক?

দ্বিতীয় চোর— দাঁড়া দেখতাছি! এগিয়ে দেখে দরজার সামনে পিঠে ব্যাগ নিয়ে আরও এক চোর হাজির।

দরজা খুলে প্রথম চোর বলে— তুইও কী চোর?

তৃতীয় জন— কেন কী মনে হইতাছে?

দ্বিতীয় চোর— না মানে…

প্রথম চোর— তোরা কী করে জানলি এই বাড়িতে কেউ নাই বাইরে গ্যাছে?

তৃতীয় চোর— আমি সবরকম খুঁজ নিইয়া আইছি।

দ্বিতীয় চোর— আর কী করে বুঝলি যে এই ঘরে উন্য চোর ঢুকছে?

তৃতীয় চোর— বুঝুম না! এই লাইনে আজকা বিশ বছর, আর দ্যাখলাম তো বাইরের তিনটা তালাই অ্যাসিড অ্যাটাক! ব্যস সুন্দেহ দূর।

তৃতীয় চোর— বুঝলি? আমরা তিনজনে চুরির মাল সব তিন ভাগ করি, ভোর হইতে আর বেশি দেরি নাই। আর দ্যাড় ঘন্টার মতো আছে। তার আগেই আমাদের এই বাড়ি ছাড়তে হইবো।

প্রথম ও দ্বিতীয় চোর— হ্যাঁ ঠিক কথা কইছিস।

চুরির জিনিসপত্র ব্যাগে ঢোকাতে ঢোকাতে প্রথম চোর বলে ফ্রিজে কী আছে দ্যাখ তো, বাইর কর, খুব খিদা পাইতাছে আমার। দ্বিতীয় চোর ফ্রিজ খুলে দেখে তাতে শরবত, আইসক্রিম বার, পায়েস, কেক আর দামি কিছু বিদেশি মদ রাখা আছে।

তৃতীয় চোর— আমারও খুব খিদা পাইতাছে রে। আজকা শালা সব খামু বাইর কর!

তিনজনে ফ্রিজে রাখা খাবার সব কিছু খেয়ে শেষ করে এবং মদের শেষ বিন্দুটুকুও ছাড়ে না। মদ খেয়ে দ্বিতীয় আর তৃতীয় চোর একদম মাতাল হয়ে যায়। তিন জনের কাড়াকাড়িতে প্রথম চোরের ভাগে মদের পরিমাণ একটু কম পড়ে। আর সেজন্য প্রথম চোর কম মাতাল হয়। ফ্রিজের সব কিছু খেয়ে তৃতীয় চোর বলে এত বুড়ো ঘর, শালা মুকমলের মুতো বিছানা! একটু রেস্ট নিয়া নি।

বিছানায় শোয়া মাত্রই তৃতীয় চোর নাক ডাকতে আরম্ভ করে গড় গড় করে, ঘুমে একেবারে অচেতন। দ্বিতীয় চোর— এই তো জীবন যাক না যেদিকে য্যাতে চায় মুন, গান গাইতে গাইতে ধপাস করে বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ে নাক ডাকতে থাকে।

এদিকে প্রথম জনের ঘুম এলেও একটু কম মাতাল হয়েছে বলে সে অনেকক্ষণ চিন্তা ভাবনা করে তিন জনের চুরি করা মালপত্র, টাকা পয়সা, সোনার গয়না, হিরের নেকলেস সব নিজের ব্যাগে ঢুকিয়ে, দরজা বাইরে থেকে ভালো করে লক করে বাইরে বেরিয়ে আসে। উদ্দেশ্য নিকটবর্তী স্টেশনে পৌঁছে সাধারণের মতো হাবভাব নিয়ে মানুষের চোখে ধুলো দিয়ে ভোরের ট্রেন ধরে এলাকা থেকে চম্পট দেবে।

সকালের পাখির কিচিরমিচির শুনে বিছানা থেকে ধড়ফরিয়ে উঠে পড়ে ওই দুই চোর। তাকিয়ে দেখে চুরি করা ওদের ভাগের জিনিস নেই। ঘরও বন্ধ বাইরে থেকে। দ্বিতীয় চোর বলে, বুঝলি ওই চোর ব্যাটা আমাদের ডবল ক্রস করছে। উঁকি দিয়ে বাইরে তাকাতেই দেখে প্রায় জনা পঞ্চাশেক লোক বাইরে দাঁড়িয়ে আছে হাতে লাঠি নিয়ে, হই হট্টগোল চলছে।

পাবলিকের মার দুনিয়ার বার— ভেবেও ব্যালকনির ভাঙা জানলা দিয়ে দুজনে লাফ দেয় এবং গিয়ে পড়ে একদম লোকের মাঝখানে। আর যাবে কোথায়! দুম ধাড়াক্কা ঘুষি, লাথি, লাঠির মার সব পড়ে গিয়ে ওই দুই চোরের গায়ে।

পুলিশ এসে চোর দুটোকে প্রশ্ন করে— বল চুরির মাল কোথায় পাঠিয়েছিস? চোরেরা বলতে পারে না সে কথা। পুলিশ বুঝে নেয় চোরেদের কথা মিথ্যে, ওরা সব জানে। রাজীব সেনও ওনার কাজ সম্পূর্ণ করে সকালে পৌঁছে যান নিজ বাসস্থানে। পুলিশ চোরেদের ধরে নিয়ে যায় এবং চুরির দায়ে ওই দুই চোরের জেল হয়।

এরপর সাজা খেটে জেল থেকে ছাড়া পায় ওই দুই চোর। ছাড়া পেয়ে ওই দুই চোর, প্রথম চোরের প্রতি ক্ষোভ-বিদ্বেষে ফেটে পড়ে। তারা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় যে করেই হোক এর বদলা নিতে হবে। না হলে চোর সমাজে তাদের মান থাকবে না! তাই তারা প্রথম চোরের ব্যাপারে অনুসন্ধান করতে থাকে। কিছুদিনের মধ্যেই তারা একাজে সফল হয়। প্রথম চোর এবং তার গ্যাং-এর সবকিছু তথ্য সংগ্রহ করে তারা থানায় যায়। থানায় গিয়ে প্রথম চোরের ঠিকানা আর ওদের গ্যাংয়ের গোপনীয় তথ্য সব ফাঁস করে দেয়। সেই সূত্র ধরে পুলিশ গ্রেফতার করে ওদের লিডার-সহ আরও ত্রিশ-চল্লিশজনের তিনটি গ্যাং-কে।

এলাকায় চুরি যাওয়া মূল্যবান সব জিনিস পুলিশ উদ্ধার করে। জনসাধারণও চুরি যাওয়া জিনিষপত্র ফিরে পাওয়ায় যারপরনাই আনন্দিত। এই ব্যাপারে সকলে পুলিশকে ধন্যবাদ জানায়। চোরেদের সম্পূর্ণ গ্যাং গ্রেফতার হওয়ায় এলাকায় তারপর থেকে ছোটো-বড়ো সব ধরনের চুরির ঘটনা একরকম প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। লোকজনের মন থেকেও আতঙ্ক দূর হয়। এরপর এলাকাবাসীও শান্তিতে বসবাস করতে শুরু করে।

(সমাপ্ত)

পাশার দান (শেষ পর্ব)

রমাকান্তের পরামর্শ রবির মনেও খুব ধরেছিল। রবিও রোজ সকালে উঠে বাবাকে রান্নাঘরে কিছু না কিছু সাহায্য করতে আরম্ভ করল এবং একটু করে রান্নাও শিখতে লাগল।

আরতি আর সঙ্গীতা রান্নাঘরে এলেও রমাকান্ত তৎক্ষণাৎ ওদের বাইরে বার করে দিতেন আর ওরা মনের আনন্দে পার্কের দিকে হাঁটা লাগাত।

পার্কে মর্নিং ওয়াক আর ব্যায়াম সেরে দুজনে বাড়ি ফিরত যখন, গরম গরম ব্রেকফাস্ট ওদের জন্য অপেক্ষা করত। টেবিলে একসঙ্গে বসে নানা বিষয়ে ওদের আলোচনা হতো। সকালটা ভালো ভাবে কাটলে পুরোটা দিনটা ভালো করে কাটার সম্ভাবনা দ্বিগুন বেড়ে যেত। শ্বশুর-শাশুড়ি আসাতে সঙ্গীতার আনন্দ দিন দিন বাড়ছিল। সব কাজেই আরতি ওকে সাহায্য করতেন। ফলে সঙ্গীতারও অনেক সুরাহা হতো। অনেক কিছু নতুনও শিখল শাশুড়ির কাছে।

রবির মাঝেমধ্যেই বন্ধুদের সঙ্গে বসে মদ খাওয়ার ইচ্ছা হলেও সাহসে কুলোত না। মদের নেশার কারণে নিজের মা-বাবার ঝগড়া হোক সেটা ও একেবারেই চাইত না। ধীরে ধীরে মদ খাওয়ার অদম্য ইচ্ছা ওর মনে জাগা বন্ধ হয়ে গেল। রবির এই মানসিক পরিবর্তনে সঙ্গীতাও অত্যন্ত আনন্দিত হল।

এক সপ্তাহের উপর সকালে হাঁটা এবং ব্যায়াম করার ফলে সঙ্গীতারও মেদ ঝরতে আরম্ভ করেছিল। প্রায় দুই কেজি ওজন কম হওয়ার আনন্দসংবাদ সঙ্গীতা বাড়িতে খুব আগ্রহের সঙ্গে শেয়ার করল।

—কাল রবিবার। বউমার এই সাফল্যে আমরা কালই পার্টি করব। আমি আর সঙ্গীতা মিলে সব রান্না করব। আরতি এই ঘোষণায় সকলে হাততালি বাজিয়ে সায় দিল।

রবিবার সকালে রমাকান্ত রবির সঙ্গে গিয়ে বাজার থেকে সব প্রয়োজনীয় জিনিস এনে দিলেন। মাছ, মাংস, পোলাও, মিষ্টি – মেনুতে কিছুই বাদ রাখলেন না আরতি।

রান্নার প্রশংসায় সকলেই একমত হয়ে আরতিকে বাহবা দিতেই তিনি পরিষ্কার জানালেন— সঙ্গীতারও এতে সত্তর শতাংশ অবদান আছে।

—রেস্তোরাঁয় পাঁচ হাজার টাকা খরচ করলেও এত সুস্বাদু খাবার পাওয়া যেত না। রবি মা এবং বউকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলো বলল।

—রবি, সুস্বাদু খাবারই বলিস আর মনের আনন্দই বলিস- চোখ জলে ভরে গেল।

—এসব কিছুই বাড়ির বাইরে খোঁজাটা মুর্খামি। বলতে বলতে মায়ের

—মা, তুমি কেন কাঁদছ? রবি মায়ের চোখের জল মুছতে মুছতে জিজ্ঞেস করল। -আমরা কি কোনও অন্যায় করেছি মা! ঘাবড়ে গিয়ে সঙ্গীতা জিজ্ঞেস করল।

—না বউমা। সঙ্গীতার গালে আলতো করে হাত ছুঁইয়ে আদর করলেন আরতিদেবী। বললেন, সবাইকে একসঙ্গে এখানে আনন্দ করতে দেখে আমি চোখের জল আটকাতে পারিনি।

—এটা তো আপনাদেরই আশীর্বাদ। সঙ্গীতা আদর করে শাশুড়ির হাত নিজের গালের উপর রাখল।

রমাকান্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, “আজ সন্ধেবেলায় আমরা ফিরে যাচ্ছি, তাই হয়তো আরতির চোখে জল এসে গেছে।” —হঠাৎ তোমরা ফিরে যাওয়ার প্ল্যান কখন করলে? রবি আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল।

—না মা, আপনাদের আমি কিছুতেই এখন যেতে দেব না। সঙ্গীতার কথাটা বলতে বলতে গলা ধরে এল।

—আমরা আজকেই ফিরে যাব ঠিক করেই এসেছিলাম বউমা। তোমার ভাসুর, ভাসুর বউও আমাদের যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। ছোট্ট রেহানও অপক্ষো করে আছে কখন ঠাম্মা দাদু যাবে। বলে আরতি একটু হাসার চেষ্টা করলেন কিন্তু অসফল হয়ে সঙ্গীতাকে জড়িয়ে ধরলেন।

রবি এবং সঙ্গীতার চোখ জলে ভলে গেল। “বাবা, তোমরা দু’জন এখন যেও না। তোমরা আসাতে আমাদের জীবন আনন্দে ভরে উঠেছে। তোমরা চলে গেলে আবার হয়তো আমাদের জীবন অন্ধকারে ডুবে যাবে। বলতে বলতে রবি উদাস হয়ে পড়ল।

রমাকান্ত রবির চুলে স্নেহের বশে আঙুল চালাতে চালাতে বললেন, ‘রবি নিজের সংসারের খুশি, সুখশান্তি এবং নিজেকে আনন্দে রাখতে অপরের উপর কখনও নির্ভর করে থেকো না। তোমরা যদি বুঝেশুনে ঠিকমতো চলো তাহলে আমরা চলে যাওয়ার পরেও এই ভাবেই তোমাদের সংসারে খুশি বজায় থাকবে।’

—ব্যস আমাদের একটাই কথা মনে রেখো দুজনে। আরতিদেবী স্নেহভরা স্বরে দুজনকে বললেন, নিজেদের মধ্যে লড়াই-ঝগড়ায় মনের মধ্যে বিদ্বেষ জমা হতে থাকে। কাউকে ভালোবাসতে কিংবা লড়াই ঝগড়া করতে অনেক এনার্জি খরচ হয়। তোমরা দু’জন লড়াই করো কিংবা প্রেম ভালোবাসায় সময় কাটাও, সবসময় লক্ষ্য রেখো এনার্জির সঙ্গে যেন মনের বিদ্বেষও জলের মতো বয়ে চলে যায়। অতীতে কী ঘটে গেছে তাই নিয়ে বর্তমান বা ভবিষ্যতের জীবনের আনন্দ নষ্ট করতে যেও না।

রবি আর সঙ্গীতা দুজনেই মায়ের কথা মন দিয়ে শুনে ঘাড় নাড়ল।

—মা আপনি যখন পরের বার আসবেন পুরো অন্য এক সঙ্গীতাকে দেখতে পাবেন। সঙ্গীতা শাশুড়ির হাত ধরে আশ্বাস দিল। আমাদের চোখে এতদিন পর্দা ঢাকা ছিল, তোমরা সেই পর্দা সরাতে আমাদের সাহায্য করেছ। তোমাদের দুজনকেই ধন্যবাদ। রবি ধরা গলায় বলল।

—মা-বাবা সবসময় বাচ্চাদের শুভ চিন্তাই করে। তোদের বাবার সঙ্গে আমার লড়াইটা নাটকই ধরে নিস। আরতি বললেন। কথাগুলো বলে রহস্যময় ভঙ্গিতে আরতি স্বামীর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন।

কেক (শেষ পর্ব)

তৃষাকে বাঁচানো যায়নি। পিনাকি কিন্তু বেঁচে গিয়েছিল। ঝরনামাসি আর মেসো পিনাকির টাকার কাছে চুপ করে গিয়েছিল। ছোটো মেয়ে তিস্তাকে বিনা পণে এমন ওজনদার পাত্রর ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া স্বপ্নের মতো। তৃষা মরে বাঁচিয়ে দিয়ে গেছে তার পরিবারকে। পিনাকিদাকে মেনে নিতে আপত্তি ছিল না তিস্তার, সে শুধু বলেছিল তিতলির দায়িত্ব সে নেবে না। ঝরনামাসি আর মেসোর কাছে আপাতত তিতলি আছে। একটু বড়ো হলে ওকে হস্টেলে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।

—তিস্তা কেমন আছে মাসি? পিনাকি ওর গায়ে হাত তোলে না তো?

—হাত তুলবে কী রে! সোনার টুকরো ছেলে। তিস্তাকে দামি পোশাক গয়নায় মুড়ে রেখেছে। এই তো সুইজারল্যান্ড যাবার টিকিট, হোটেল বুকিং সব হয়ে গেছে।

—তিস্তা ভালো আছে তো মাসি?

—তোর বুঝি ওর ভালো থাকায় আপত্তি? কী শুনতে চাস বলতো? তৃষা নিজেই জেদি ছিল। মেয়েদের একটু আধটু মানিয়ে নিতে হয়। তিস্তা আমার বুদ্ধিমতী মেয়ে।

ফোনটা রেখে সোনালি বারান্দায় দাঁড়াল। তিস্তা ভালো আছে এটা মানতে অসুবিধা হচ্ছে কেন তার? নাহ বড্ড বেশি সে সবকিছুর মধ্যে জড়িয়ে যাচ্ছে। কিছুদিনের জন্য বাইরে চলে যেতে হবে। এবার সে সমুদ্রে যাবে। কোথাও ঘুরবে না, খাবেদাবে আর হোটেলের রুমে শুয়ে থাকবে। শুধু সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের সময় বাইরে বেরোবে। অনলাইনে ট্রেনের টিকিট আর হোটেল বুকিং সেরে নিল। তাজপুর আগেও গেছে, বেশ নির্জন সৈকত, নিজের মতো ক’টা দিন কাটাতে পারবে।

—আপনাকে খুব চেনা চেনা লাগছে, কোথায় দেখেছি বলুন তো? ওড়নাটা গায়ে জড়িয়ে নিয়ে সোনালি ভদ্রলোকের দিকে তাকায়, আর তারপরেই কেঁপে ওঠে। পার্থদা এখানে? এভাবে নির্জন সমুদ্র সৈকতে সূর্যাস্তের সিঁদুরে রঙে মাখামাখি হতে হতে পার্থদার সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে স্বপ্নেও ভাবেনি সোনালি।

—ওদিকটায় একটু বসবে সোনালি? ভ্রাম্যমাণ চা-ওয়ালাকে ডেকে দু ভাঁড় চা নিল। সোনালির এ ধরনের চা খাওয়ার অভ্যাস বহুদিন গেছে। সে ইলেক্ট্রিক কেটল আর পছন্দের টি ব্যাগ ক্যারি করে বাইরে গেলে। এখন আপত্তি না জানিয়ে এই দুধে ফোটানো চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দিল। পার্থদা গভীর দৃষ্টিতে তাকে দেখছিল।

—তোমার এমন চা খাবার অভ্যাস নেই, না?

সোনালি উত্তর দেয় না। অশান্ত হাওয়ায় তার চুল এলমেলো হয়ে যায়। পার্থদা কী যেন একটা বলতে চেয়েছিল! ঝুনুদি বারবার বলেছে, এমনকী তার ফোন নাম্বারটাও দিয়েছে। সোনালি সমুদ্র থেকে চোখ ফিরিয়ে পার্থদার চোখে চোখ রাখল। পার্থদার নীলচে মণিও সমুদ্রের মতোই অশান্ত।

—পার্থদা তুমি মনে হয় আমাকে কিছু বলতে চাও?

—হ্যাঁ বলব তো। তার আগে অন্য একটা কথা বলি, ঝুনু বলছিল তোমার এক কাজিনের মেয়েকে অ্যাডপ্ট করতে চাও। তোমার তো তেতাল্লিশ চলছে, একা এই বয়সে এত ঝক্কি সামলাতে পারবে?

সোনালি অবাক হয়ে যায়। এটা তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, এ ব্যাপারেও ঝুনুদি বাইরের লোকের সঙ্গে আলোচনা করে! উফ ঝুনুদিকে নিয়ে আর পারা যাচ্ছে না, জাস্ট আনটলারেবল। সোনালির মুখে অসন্তোষ ফুটে উঠতেই পার্থ চুপ করে যায়। অন্ধকার নেমে আসছে, দোকানপাট বন্ধ হয়ে আসছে। সোনালি উঠে পড়ে। দেখাদেখি পার্থদাও।

—কাল আমি চলে যাব, জানি না আবার তোমার সঙ্গে দেখা হবে কিনা! কথাটা বলার সুযোগ পাব কিনা! অন্ধকার থাকায় পার্থদার সুবিধাই হল।

—সেদিন আমি ইচ্ছা করেই তোমাকে… আসলে ঝুনুর সঙ্গে যত জড়িয়ে পড়ছিলাম তোমার প্রতি আকর্ষণ ততই বাড়ছিল। হিসহিস করে উঠল সোনালি, ‘ঝুনুদি জানে? আমার থেকে তার একথাটা জানা বেশি দরকার।”

—হ্যাঁ জানে। জানে বলেই তোমাকে নিয়ে এত ভাবছে, তোমার জীবনটা অন্য কারুর সঙ্গে জড়িয়ে দিতে চাইছে, এভাবে একা বাঁচা যায় না সোনালি। তুমি কি কিছুই বুঝতে পারো না?

হনহন করে হেঁটে যায় সোনালি। আলো ঝলমলে হোটেলের গেটটা দেখা যাচ্ছে। পার্থদার গায়ে অন্ধকারের মোটা পরদা। যত অন্ধকার ক্লাস নাইনের একটা মেয়ের গায়ে মাখিয়ে দিয়েছিল তার শতগুণ ফিরে এসেছে তার কাছে আজ এই সামুদ্রিক হাওয়ায়।

ঝুনুদি এসেছে পিন্টুর বাড়ি। ফোনে কথা হয়। আজকাল আর পার্থদার ব্যাপারে কথা তোলে না। অথচ সোনালি যেন অনেক কিছু শুনতে চায়। তিতলিকে অ্যাডপ্ট করবে মনস্থির করে ফেলেছে। শুধু মাঝেমাঝে রাত্রে ঘুম ভেঙে গেলে দুশ্চিন্তা হয়, সে একা হাতে পারবে তো সবকিছু সামলাতে। খুব ইচ্ছা করে কেউ কেউ এগিয়ে এসে শক্ত করে হাতটা ধরুক।

—জানিস আবার জন্মদিন পড়ছে ক’দিন পরেই। পিন্টুর বউ তো সেই নিয়ে মাতামাতি শুরু করে দিয়েছে। নতুন শাড়ি কিনে দিয়েছে। দুপুরে পঞ্চব্যাঞ্জন, পায়েস সব নিজের হাতে বানাবে। রাত্রে বাইরে ডিনারে নিয়ে যাবে। তুই বল এ বয়সে এইসব মানায়! কিন্তু পিউ শুনলে তো! আহ্লাদে গলে পড়ে ঝুনুদি।

সোনালি হিসেব করে নেয়, ওইদিন শনিবার। ঝুনুদি খুব শাড়ি ভালোবাসে, একটা শাড়ি কিনবে ঝুনুদির জন্য। আর নিজের হাতে একটা কেক বানিয়ে নিয়ে যাবে।

সোনালি বলে, “তার মানে সন্ধেটা বার্থডে গার্ল ফ্রি থাকবে?”

মুখ ঝামটায় ঝুনুদি, ‘এই তুই আর ন্যাকামি করিস না তো!”

কেকটা মনের মতো বানিয়েছে সোনালি। পিন্টুর ঠিকানা তো ঝুনুদির কাছে শুনে শুনে মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। সন্ধে সাতটার দিকে পৌঁছে গেল। দরজায় চাপ দিতেই সেটা খুলে গেল। ভিতরের ঘর থেকে চিৎকার ভেসে আসছে, ‘তোমার মায়ের কী দরকার ছিল বুড়ো বয়সে জন্মদিন, জন্মদিন করে আদিখ্যেতা করার? গুষ্টিশুদ্ধ আত্মীয়স্বজন সকাল থেকে ফোন করেই যাচ্ছে। আর জিজ্ঞেস করছে, সন্ধেটা তোমরা বাড়িতেই থাকছ তো? উনি তো নিজের ফোন বন্ধ করেই খালাস। যত ফোন ঢুকছে আমার মোবাইলে। পাগল হয়ে যাচ্ছি আমি। এই আমি বলে দিলাম কেউ এসে পড়লে আমাকে ডাকবে না।”

সোনালি ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে। ঝুনুদির জন্য কেনা শাড়ি আর ফুলের বোকেটা সেন্টার টেবিলের উপর নামিয়ে রাখে। কী মনে হতে কেকের প্যাকেটটা সঙ্গে করে নিয়ে আসে। ফেরার পথে চিলি চিকেন আর ফ্রায়েডরাইস প্যাক করিয়ে নিল। বাড়ি ফিরে অনেকক্ষণ ধরে স্নান করল। পাটভাঙা একটা শাড়ি পরে ডিনার টেবিল সাজাল। অনেকদিন আগে কিনে রাখা সুগন্ধী মোমবাতিগুলো জ্বালাল। দামি ক্রকারি সেটটা বার করে খাবার সাজাল। তারপর কেকটার বুকে মসৃণ ভাবে ছুরি চালাল। চকোলেট কেকের একটা টুকরো নিজের মুখে তুলে দিতে দিতে ফিসফিস করে বলল, ‘হ্যাপি বার্থডে টু মি।’

হ্যাঁ আজ তার জন্মদিন, অনেক কিছুর মধ্যে জড়িয়ে যাচ্ছিল সে। আজ বুঝতে পারছে এই বেশ ভালো আছে। তার একলা জীবন আলোকিত হয়ে উঠুক, এই একলা থাকার জন্মদিন আজ, কাল আর প্রতিটা দিন।

(সমাপ্ত)

কেক (পর্ব-০১)

( এক )

রবিবারের সকালটা আলস্যে মুড়ে কাটিয়ে দেয় সোনালি। এইদিন কাজের লোকদের ছুটি। কলিংবেলের আওয়াজ নেই। কী রান্না হবে? বারান্দার টবগুলো সরিয়ে মুছবে কিনা! এই সব হাজার প্রশ্নের উত্তর দেওয়া নেই। সপ্তাহে এই একটা দিন সোনালি নিজের মতো করে কাটায়। ইচ্ছা হলে রান্না করে, নাহলে হোম ডেলিভারিতে একটা ফোন করে দেয়। আবার এসব ইচ্ছা না করলে ফ্রুট জুস আর ফ্রুট স্যালাড নিয়ে কাটিয়ে দেয়।

কলিংবেলটা দু’বার বাজতে তাই একটু অবাক হল। কে এল এত সকালে? আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে খুব একটা যোগাযোগ নেই, তাদের বিপদে আপদে অবশ্য সোনালি সবসময় পাশে দাঁড়ায় কিন্তু তা বলে হুটহাট করে তারাও কেউ চলে আসবে না।

আসার আগে অন্তত তৃতীয়বার কলিংবেলটা বাজতেই সোনালি বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল। হাউসকোটটা পরে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। দরজা খুলতেই অবাক। ঝুনুদি এত সকালবেলা? আর তার ঠিকানাই বা পেল কার কাছে? সোনালিকে ঠেলে ভিতরে ঢুকে পড়ে ঝুনুদি। তারপর চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ওর সুসজ্জিত ড্রয়িংরুমটা দেখতে দেখতে ধপ করে সোফায় বসে পড়ে।

সোনালির সঙ্গে শেষ দেখা বছর দশেক আগে, আগের থেকে অনেকটা মোটা হয়ে গেছে, তবুও চিনতে অসুবিধা হল না।

—বাপরে কুম্ভকর্ণের মতো ঘুম তোর, কতবার যে কলিংবেল বাজালাম!

সোনালি এখনও বুঝতে পারছে না ঝুনুদির এই সাতসকালে আসার কারণ। আর তাছাড়া মুর্শিদাবাদ থেকে কি সাতসকালে সোজা তার কাছেই উঠল নাকি অন্য কোথাও ছিল? হাজার প্রশ্ন সোনালির মাথায় ভিড় করছে।

—আদা দিয়ে কড়া করে এক কাপ চা বানিয়ে দে তো! উফ মাথাটা ধরে গেছে।

সোনালি এই সব হুকুমে অভ্যস্ত নয়, একা থাকতে থাকতে খুব একটা অতিথি আপ্যায়নেও আগ্রহী নয়। তবু চোখে মুখে জল দিয়ে কিচেনে ঢুকল। কিছুক্ষণ পরে দু’কাপ চা নিয়ে ঝুনুদির মুখোমুখি বসল। তারপর সরাসরি জিজ্ঞেস করেই ফেলল, “তারপর কী মনে করে?”

—আরে বাবা নিজের আপনজন, বোনের বাড়িতে আসব, ক’টা দিন হাত পা ছড়িয়ে থাকব। তার আবার মনে করা-করির কী আছে!

সর্বনাশ ক’টা দিন থাকবে! সোনালির প্রাইভেসির দফারফা। আর তাছাড়া এই রবিবারের নিজস্ব মাধুর্যটা নষ্ট হল বলে। ঝুনুদিকে তো চেনে, সারাক্ষণ অন্যের সমালোচনা করতে ব্যস্ত। শেষ যে বার বাপ্পার মেয়ের অন্নপ্রাশনে দেখা হয়েছিল, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একটা কথাই শুধু বলছিল, “চাকরি করে এক কাঁড়ি টাকা রোজগার করলেই তো হল না, স্বামী সন্তান নিয়ে সংসার না করলে ষোলো আনাই মাটি!’

তারপর সোনালির কান বাঁচিয়ে বলেছিল, ‘যেসব মেয়েরা একলা থাকে তাদের স্বভাব চরিত্রও ভালো হয় না। অমন বারমুখো মেয়েদের কোন পুরুষ ঘরে তুলবে?” সেই ঝুনুদি তার সামনে বসে তার বানানো চা খাচ্ছে। সোনালির মাথার মধ্যে একরাশ অশান্ত পাখি ঠোকরাতে শুরু করেছে। সে খবরের কাগজটা তুলে নিয়ে বারান্দায় গিয়ে বসল। নিজের হাতে যত্ন করে কিছু ইনডোর প্ল্যান্ট আর মরশুমি ফুলের গাছ লাগিয়েছে। তাছাড়া বেশ কিছু সাকুলেন্টও তার সংগ্রহে আছে, বেশিরভাগটাই অন লাইনে কিনেছে। এই সবুজের দুনিয়াতে ঢুকে গেলে সোনালি সবচেয়ে শান্তি পায়।

ঝুনুদি স্নান সেরে তার সামনে এসে দাঁড়াল। রান্নাবান্না কখন করবি? জলখাবারে কী খাবি? কাগজ থেকে মুখ না সরিয়েই সোনালি জবাব দেয়, ফ্রিজে ব্রেড আছে আর কন্টেনারে মিষ্টি, ওই দিয়ে চালিয়ে নাও। দুপুরে বাইরে থেকে খাবার আনিয়ে নিচ্ছি। রবিবার আমার বাড়িতে রান্নাবান্নার পার্ট নেই।

ঝুনুদি যেন অবাক কথা শুনছে, মুখের অভিব্যক্তি তেমনই হয়ে গেছে। মুখ গোঁজ করে কিচেনের দিকে চলে গেল। সোনালির এবার খারাপ লাগছে, এত রুড হচ্ছে কেন? ঝুনুদি তার মেজ জেঠুর মেয়ে, একসঙ্গে যৌথ পরিবারে বেড়ে উঠেছে, সুখ দুঃখের অনেক স্মৃতি। খবরের কাগজটা বন্ধ করে সোনালিও উঠে পড়ল। ঘরটা ডাস্টিং করে স্নানে ঢুকে পড়ল। স্নান সেরে বেরোতেই দেখে, মুচমুচে টোস্ট, মিষ্টি আর সুজি রেডি। সুজি যে কিচেন ক্যাবিনেটের এক কোণায় পড়ে আছে সোনালি নিজেই ভুলে যায়।

রান্নার মেয়েটি মাঝেমাঝে ঝাল সুজি বানিয়ে দিয়ে যায়। মিষ্টি খেতে ভালোবাসলেও একটু এড়িয়ে চলে। কালেভদ্রে কিনে আনে, আর মিষ্টি সুজি কতকাল যে খায়নি। ঝুনুদির ইশারায় চেয়ার টেনে বসে পড়ল সে। এত যত্ন করে কতদিন কেউ তার সামনে খাবার সাজিয়ে দেয়নি, ঝুনুদির প্রতি কৃতজ্ঞতায় মন ভরে গেল। যদিও বাইরে সেটা প্রকাশ করল না। ঝুনুদি খেতে খেতে বলল, গোবিন্দভোগ চাল আছে দেখলাম, একটু ভাতে ভাত করে নেব। বাইরের খাবার নাই বা খেলি?

সোনালি হাঁ হাঁ করে উঠল। রান্না মানেই গুচ্ছের বাসন, তাকেই মাজতে হবে। ঝুনুদিকে দিয়ে তো আর বাসন ধোয়াতে পারে না। যদিও গোবিন্দভোগ চালের ভাত, এক টুকরো গন্ধরাজ লেবু আর ঘি দিয়ে তো দেবভোগ্য।

—আরে এত ভাবিস না তো। এইটুকু কাজ আমি সামলে নেব, তোকে রান্নাঘরে ঢুকতেই দেব না।

ঝুনুদি আরেকটু সুজির হালুয়া সোনালির প্লেটে তুলে দিল। সোনালির মনে পড়ে যাচ্ছিল, ছোটোবেলায় সুজির ভাগ নিয়ে ভাই বোনেদের মধ্যে রীতিমত প্রতিযোগিতা চলত। সেসব দিনগুলোই মনে হয় ভালো ছিল। ঝুনুদির মধ্যে সেই রুক্ষতাটা নেই, বেশ একটা আপনজন আপনজন ভাব। তবে হঠাৎ তার এখানে এল কেন এই বিষয়টা পরিষ্কার হচ্ছে না সোনালির।

—সপ্তাহ খানেক তোর এখানে থাকলে কি খুব অসুবিধা হবে সনু? আসলে আমি বড়োছেলের কাছে এসেছিলাম। কাল সকালে ওর বাড়িতে যাবার পর জানতে পারলাম আজ সন্ধের ফ্লাইটে ওদের পন্ডিচেরি বেড়াতে যাবার কথা। তাই তোর এখানেই চলে এলাম।

—পিন্টু এখন কলকাতায় পোস্টিং? এটা জানতাম না তো! সোনালি অবাক হয়, ওরা বেড়াতে যেতেই পারে তার জন্য মাকে অন্যের বাড়িতে চলে আসতে হবে কেন? আর তাছাড়া, মা তো ক’দিন ছেলের বাড়ির দেখভালও করতে পারত। সোনালির মাথায় সংসারের এসব জটিলতা ঢোকে না। সে এঁটো প্লেটগুলো তুলে নিয়ে সিঙ্ক-এর দিকে এগিয়ে যায়।

(ক্রমশ…)

সারভাইভ্যাল গিল্ট (পর্ব-০১)

দশাশ্বমেধ ঘাটে সন্ধ্যারতির থিকথিকে ভিড়ের মধ্যে দূর থেকে হঠাৎ একটা চেনা মুখ দেখে পূজা চমকে উঠল। পরক্ষণেই ভাবল- ধুর, এখানে এত দূরে সে আসবে কী করে? তাও আবার এই সন্ধেবেলা? সব তার মনের ভ্রম। চোখ কচলে ভালো করে আবার দেখার চেষ্টা করল।

হ্যাঁ, সেই তো মনে হচ্ছে। পাশে একজন মহিলা, তাকে কিছু যেন বলছে। সে মাঝে মাঝে ঘাড় নাড়ছে আর একদৃষ্টে আরতি দেখছে। ইচ্ছে হল দৌড়ে কাছে যায়, পরক্ষণেই অভিমানে বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। যে তাকে অবহেলা করে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, একটা খোঁজখবরও নেয় না, কেন সে যাবে তার কাছে হ্যাংলার মতো? তার সঙ্গে আবার কীসের কথা?

কিন্তু পারল না। বন্ধুদের একটু দাঁড়াতে বলে ভিড় ঠেলে কাছে গিয়ে দাঁড়াল। দেখল হ্যাঁ রঞ্জনই। সন্ধ্যারতির মৃদু আলোতেও মনে হল চেহারাটা কেমন যেন শুকনো, দুর্বল। এই দু’বছরে বয়সটা যেন বেশ বেড়ে গেছে। অজান্তেই ঠোঁট দু’টো নড়ে উঠল, ‘কেমন আছো রঞ্জনদা?”

ছেলেটি তার দিকে একবার তাকিয়ে ঠান্ডা গলায়, ভালো বলে মুখ ঘুরিয়ে নিল। তার নিস্পৃহ ভাব দেখে পূজা অবাক হয়ে গেল, কী বলবে ভেবে পেল না। পাশের মহিলাটি জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কে? রঞ্জনকে চেন নাকি?’

পূজা মৃদুস্বরে বলল, “আমার নাম পূজা। আমরা কলকাতায় বঙ্গবাসী কলেজে একসঙ্গে পড়তাম।’

—আচ্ছা। এখানে বেড়াতে এসেছ বুঝি?

—না, আমি এখানেই থাকি, আইআইটিতে পড়ি। মাঝে মাঝে গঙ্গারতি দেখতে আসি।

—তাই নাকি? খুব ভালো।

—আপনারা এখানে ?

—একে নিয়ে এসেছি কয়েকদিন হল। কালই চলে যাব।

পূজার কেমন যেন খটকা লাগল। ‘নিয়ে এসেছি’ মানে? মুখ ঘুরিয়ে দেখে রঞ্জন উলটো দিকে তাকিয়ে আছে, তার উপস্থিতি যেন জানেই না। আর মহিলার বিধবার বেশ কেন? সে তো জানত ওর বাবা আছে। জিজ্ঞেস করল, , “আপনি…?’

—রঞ্জন আমার ছেলে।

—কিন্তু আপনার এই বেশ, আমি ঠিক…।

মহিলা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভারী গলায় বললেন, ‘সে অনেক কথা।”

হঠাৎ রঞ্জন বলে উঠল, ‘মা, আশ্রমে চলো, আর ভালো লাগছে না।”

—হ্যাঁ বাবা চল। বলে মহিলা ছেলের হাত ধরে বেরোবার উপক্রম করলেন। পূজাকে বললেন, ‘আমরা এবার যাই।’

পূজার সবকিছু যেন রহস্যময় লাগল, এদের ব্যাপার-স্যাপার ঠিক মাথায় ঢুকল না। হঠাৎ কী মনে হল কে জানে। দৌড়ে সামনে গিয়ে বলে উঠল, “আমি পরের সপ্তায় বাড়ি যাচ্ছি। যদি আপত্তি না থাকে, আপনাদের বাড়ির ঠিকানাটা পেলে ভালো হতো, একটু যেতাম।’

মহিলা পূজার মুখের দিকে তাকাল একঝলক। তারপর ঠিকানাটা বলে দিয়ে ছেলের সাথে আস্তে আস্তে বেরিয়ে গেলেন। পূজা তাদের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। আর ভালো লাগল না, বন্ধুদের নিয়ে দশাশ্বমেধ ঘাট থেকে বেরিয়ে এল।

হোস্টেলে ফিরে গিয়ে রাতে ঘুম এল না, বিছানায় শুয়ে ছটফট করতে লাগল। আবার দগদগিয়ে উঠল পুরোনো ক্ষতটা। মনের মধ্যে ভেসে উঠতে লাগল ফেলে আসা দিনগুলোর কথা।

বঙ্গবাসী কলেজে ভর্তি হওয়ার দিন থেকেই রঞ্জনের সারল্য, বুদ্ধিদীপ্ত কথাবার্তা আর প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস পূজাকে আকর্ষণ করেছিল। দু’জনের মধ্যে ক্রমশ গড়ে উঠল ঘনিষ্ঠতা, স্বপ্ন দেখতে লাগল সারাটা জীবন একসঙ্গে কাটানোর। পড়তে পড়তে পূজা পরীক্ষা দিচ্ছিল আইআইটির, ইচ্ছে ছিল সুযোগ পেলে ইঞ্জিনিয়রিং পড়বে। অন্যদিকে রঞ্জনের ইচ্ছে ছিল বাবার মতো আর্মি অফিসার হবে, এনডিএ পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

বছর খানেক পরে কলেজে একদিন হঠাৎ রঞ্জনের ব্যবহার দেখে পূজা অবাক হয়ে গেল। এমনিতেই ও কথা কম বলে কিন্তু সেদিন সারাটা সময় গোমড়া মুখে ক্লাসে বসে রইল। তার সঙ্গে ভালো করে কথাই বলল না। সে দু’একবার কাছে গিয়ে কথা বলার চেষ্টা করতে তার উপর চেঁচিয়ে উঠল। পূজা বুঝতে পারল না হঠাৎ তার হলটা কী ?

তারপর বেশ কয়েকদিন রঞ্জনকে কলেজে না আসতে দেখে পূজা তাকে ফোন করল। কিন্তু দু’একটা ‘হুঁ’ ‘হ্যাঁ’ বলেই রঞ্জন ফোন রেখে দিল, ভালো করে কথাই বলল না। মনে বড়ো আঘাত লাগল পূজার। নানারকম ভাবনা মাথায় আসতে লাগল। তবে কি ও এনডিএতে চান্স পেয়ে চলে যাচ্ছে? নাকি অন্য কোনও ঘাটে তরি ভিড়িয়েছে ? যাই হোক, সেটা তো মুখ ফুটে বললেই পারত, এরকম ব্যবহার করার মানে কী? খুব অভিমান হল, ভাবল বয়ে গেছে আমার ওর পিছনে হ্যাংলার মতো পড়ে থাকতে!

তারপর বেশ কিছুদিন পূজার প্রাণোচ্ছলতা হারিয়ে গিয়েছিল, সবসময় মনমরা হয়ে থাকত। মা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করে সব কথা জানতে পেরে মেয়েকে খুব বকেছিল। বারণ করেছিল — ওইরকম বাজে ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ না রাখতে।

হঠাৎ এল তার জয়েন্টের পাশের খবর, সে চান্স পেয়েছে বেনারস আইআইটিতে, শিগগির যেতে হবে কাউন্সেলিং-এ। যাওয়ার আগে একবার ফোন করল রঞ্জনকে খবরটা দিতে। কিন্তু পূজা আশ্চর্য হয়ে গেল তার কথা শুনে। নিস্পৃহ ভাবে উত্তর দিল, ‘ভালোই তো, চলে যাও’ বলে ফোন রেখে দিল। চোখে জল এসে গিয়েছিল পূজার। পরে ফোন করার আর প্রবৃত্তি হয়নি। বারাণসী গিয়ে বারবার ভাবত, মানুষ এত তাড়াতাড়ি বদলে যায় কী করে? যাক যা হয়েছে ভালোই হয়েছে, ভগবান বাঁচিয়ে দিয়েছেন।

কিন্তু আজ ওর মায়ের কথাগুলো পূজার কাছে কেমন যেন রহস্যময় মনে হল। রঞ্জনকে নিয়ে হঠাৎ বারাণসী এসেছে কেন? ওর বাবা কী করে এত তাড়াতাড়ি মারা গেল? কী এমন ‘অনেক কথা’ আছে যা রঞ্জন ওর মাকে বলার সুযোগ দিল না?

পূজা স্থির করল পরের সপ্তাহে সামার ভ্যাকেশানে কলকাতা গিয়েই একবার রঞ্জনের মায়ের কাছে যাবে।

দিন দশেক পরে পূজা একদিন বিকেলে গিয়ে হাজির হল রঞ্জনদের বাড়ি। ওর মা তাকে দেখে বেশ খুশি হল, আপ্যায়ন করে বসাল। রঞ্জনকে দেখতে না পেয়ে জিজ্ঞেস করল, “রঞ্জন কোথায়? দেখছি না তো?”

—ও ঘরে শুয়ে আছে।

—ও এখন কী করে? পড়ছে না চাকরি করে?

রঞ্জনের মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “আর চাকরি, তাহলে তো আমার কপালই খুলে যেত!”

কথাটা পূজার ঠিক বোধগম্য হল না। তারপর মহিলার কাছে সমস্ত বাপারটা শুনে পূজা স্তম্ভিত হয়ে গেল।

(ক্রমশ…)

তালিত গড়ের ঢিবি (পর্ব-০১)

মফস্সলের বাইরে এই জায়গাটা এখনও আদিম রয়ে গেছে। আদিগন্ত বিস্তৃত গাছের সারির নীচে মখমলের মতো পুরু ঘাসে ভর্তি শান্ত নিরিবিলি নির্জন এক স্থান। অনেকগুলি ছোটো ছোটো ঢিবি অর্ধচন্দ্রের মতো বিস্তৃত সমস্ত এলাকা জুড়ে। ঢিবির পশ্চিমদিকে খনন করা পরিখার মাঝে বাঁধ দিয়ে পুকুর তৈরি করে নেওয়া হয়েছে। উপর থেকে দেখলে অনেকটা ঘোড়ার নালের মতো দেখায়। অপূর্ব তার সৌন্দর্য। একটু গভীর ভাবে নিরীক্ষণ করলে বোঝা যায় শত্রু বাহিনীর আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যেই এমন নিরাপত্তা বেষ্টনীর নির্মাণ করা হয়েছিল।

সবুজ ধানে ভরা জমির আল পেরিয়ে ঢিবিতে উঠতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠল রেহান। একটা বড়ো গাছের নীচে গিয়ে বসে পড়ল। এত হাঁপিয়ে গেল কেন ও! বয়স কি তাহলে ওর ক্ষমতার উপর থাবা ফেলছে? ভাবছিল রেহান। এদিকে সন্ধে নেমে এসেছে। আকাশে গোলাকার রুপোর থালার মতো চাঁদ উঁকি দিচ্ছে গাছের ফাঁক দিয়ে। এলোমেলো ভাবে বয়ে চলা বাতাস গাছের পাতায় ধাক্কা খেয়ে শনশন্ শব্দে ঝরে পড়ছে নীচের দিকে।

শরতের মৃদু হাওয়ায় মৃত হলুদ পাতাগুলো উড়ে এসে পড়ছিল রেহানের মাথার উপরে। চোখ বন্ধ বেশ কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিয়ে উঠে পড়ল সে। আস্তে আস্তে হাঁটতে শুরু করল ঢিবিটার উপরে যাওয়ার জন্য। অন্ধকার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চাঁদের আলো আরও স্পষ্ট হচ্ছিল। মাথার উপরে ঘন গাছের ডালপালার আস্তরণ ভেদ করে চুঁইয়ে চুইয়ে তিরের ফলার মতন পড়ছিল চাঁদের আলোর শিখা। সেই আলোয় নীচের ঘন সবুজ ঘাসের ডগাগুলো ঝিকিয়ে উঠছিল ছুরির ফলার মতন। চাঁদের আলো আর গাছপালা নিয়ে ঢিবিটায় সুন্দর মায়াবী পরিবেশ। বুনো গাছের গন্ধ আর নির্জনতায় ভরা এই ঢিবিটা যেন পৃথিবীর আদিমতা এখনও শেষ হয়ে যেতে দেয়নি।

ঢিবিটার উপরে গিয়ে খানিকটা আকাশের দেখা পেল রেহান। এখানে বেশ খানিকটা ফাঁকা জায়গা। ঢিবির আশে পাশের ঢালু জায়গায় বড়ো বড়ো গাছপালা দিয়ে ঢাকা থাকলেও এখানে গাছ নেই। আকাশের দিকে তাকিয়ে মোহিত হয়ে গেল রেহান। অপরূপ জ্যোৎস্নার রূপ। মেঘমুক্ত আকাশ থেকে যেন জ্যোৎস্নার ফুল ঝরে পড়ছে। রূপকথার পরিবেশ তৈরি হয়েছে সমস্ত চরাচর জুড়ে। চাঁদের আলোর শুভ্রতায় মনে হচ্ছে যেন এক্ষুনি আকাশ থেকে রূপকথার পরিরা ডানা মেলে নেমে আসবে। সমস্ত আকাশজুড়ে খণ্ড খণ্ড রূপোলি মেঘের দলের আনাগোনা। বহুদিন আকাশের দিকে তাকায়নি রেহান। আজকের রাতের আকাশের দৃশ্য দেখে মন ভালো হয়ে গেল ওর। মনের মধ্যে জমে থাকা কষ্টটা আচমকা গলে জল হয়ে গেল। মনটা বেশ ফুরফুরে লাগছিল।

ঢিবির উপর থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সামনের পরিখাটা। স্থির জলে ভাসছে পূর্ণিমার চাঁদ। ঢিবির চুড়ো থেকে ধীরে ধীরে নীচের দিকে নামছিল রেহান। পরিখার কাছাকাছি পৌঁছোতেই চোখ চলে গেল একটু দূরে ঢিবি লাগোয়া গ্রামটির দিকে। গাছপালায় ঘেরা সবুজ গ্রামটায় আধুনিকতার ছাপ। চাঁদের আলোয় গাছপালার ফাঁক ফোঁকর দিয়ে দেখা যাচ্ছে বেশ কয়েকটি পাকা বাড়ি।

এই গ্রামটা একসময় খুব প্রিয় ছিল রেহানের। অনুন্নত এই গ্রামের মানুষগুলো ছিল খুব সহজ সরল প্রকৃতির। বেশির ভাগ মানুষই ছিল জেলে সম্প্রদায়ের। ঢিবি লাগোয়া পুকুরে মাছ চাষ করত ওরা। এছাড়া অন্যের পুকুরে ভাগে মাছ চাষ আর বর্ষার সময় কাছাকাছি বাঁকা আর দামোদর নদে গিয়ে মাছ ধরেই জীবিকা অর্জন করত। গাছ দিয়ে ঘেরা ছোটো ছোটো তালপাতা আর খড়ের ছাউনি দেওয়া ঘরগুলো খুব ভালো লাগত রেহানের। আর ভালো লাগত প্রমাকে।

প্রমার সাথে প্রথম পরিচয় এই তালিত গড়ের ঢিবিতেই। রেহান তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস কমিউনিকেশনের ছাত্র। শহর জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রাচীন মন্দির, জনপদ, ঢিবিগুলোর অতীত কথকতা নিয়ে প্রচণ্ড আগ্রহ। সময় পেলেই বেরিয়ে পড়ত ক্ষেত্র সমীক্ষায়। এই বিষয়ে ওর বেশ কিছু গবেষণামূলক লেখা প্রকাশিত হয়েছিল বহুল প্রচারিত সংবাদপত্রে।

মফস্সলের এত কাছে যে একটা ঐতিহাসিক ঢিবি আছে জানা ছিল না রেহানের। বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট্রাল লাইব্রেরির রেফারেন্স সেকশনের রিডিং রুমে কথা প্রসঙ্গে বাংলা বিভাগের ইন্দ্রর কাছ থেকে ও তালিত গড়ের ঢিবিটার সন্ধান পায়। সময় করে একদিন রওনা দেয় তালিত গড়ের ঢিবির উদ্দেশ্যে। বাইকে করে নবাবহাট মোড় পেরিয়ে ডানদিক ন্যাশনাল হাইওয়ে দিয়ে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে বাঁদিকের রাস্তা ধরে পৌঁছে যায় তালিত গড়ের ঢিবিতে।

শীতকাল, মাঠের ধান কাটা হয়ে গেছে। একটু দূরে উঁচু উঁচু গোলাকার ঢিবিগুলো দেখা যাচ্ছে। সরু আল পথ ধরে তবেই পৌঁছানো যাবে ঢিবিতে। বাইক নিয়ে যাওয়া ঝুঁকির হয়ে যাবে। অগত্যা আলপথ ধরে হাঁটতে শুরু করল রেহান। কিছুটা হেঁটে পৌঁছে যায় ঢিবিতে। শীতের দুপুরের কমলা রঙের সূর্যের আলো তখন ছড়িয়ে পড়েছে সমস্ত ঢিবিজুড়ে। রেহান ঘুরে ঘুরে দেখছিল পুরো ঢিবিটা। এখানে আসার আগে বইপত্র ঘেঁটে ঢিবিটার সম্বন্ধে কিছুটা ধারণা হয়েছিল রেহানের। এছাড়া ইন্দ্রর কাছ থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও পেয়েছিল। রেহান যেখানেই ক্ষেত্রসমীক্ষায় যায় তার আগে সেই জায়গাটার সম্বন্ধে বেশ পড়াশোনা করেই যায়। এলাকার লোকেদের সাথেও কথা বলে। বিশেষ করে বয়োঃজ্যেষ্ঠদের সাথে। এতে অনেক নতুন তথ্য ওর হাতে আসে যা পরবর্তী কালে ওর লেখার রসদ জোগায়।

এখানে এই ঢিবিতে এখনও পর্যন্ত একজন মানুষের সাথেও ওর দেখা হয়নি। চারিদিক শুনসান। সবুজ পাতার আড়াল থেকে পাখিদের কিচির মিচির শব্দে প্লাবিত সমস্ত ঢিবি। সেই সুরের অনুরণন রেহানের কানের মধ্যে দিয়ে মনের গভীরে প্রবেশ করছে। অদ্ভুত এক ভালোলাগায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল সে। ঢিবির পরিবেশটা আচমকাই সম্মোহিত করে ফেলল ওকে। যেন কয়েকশো বছরের আগের এক আদিম পৃথিবী। যেখানে গাছপালা আর পশুপাখির রাজত্ব।

(ক্রমশ… )

লেডিস কম্পার্টমেন্ট (শেষ পর্ব)

প্রায় ভেজা সালোয়ার কামিজে নন্দিতা যখন শিয়ালদা স্টেশনে এসে পৌঁছোল তখন ঘড়িতে সাড়ে আটটা বাজব বাজব করছে। সাউথ সেকশনের দিকে ছুটতে ছুটতে কানে এল ট্রেন লাইনে জল জমায় আর তার ছিঁড়ে যাওয়ায় অনেক ট্রেন বাতিল হয়েছে আজ। ডিজিটাল বোর্ডটায় দেখল আর একটি মাত্র ট্রেন ছাড়তে মাত্র তিন মিনিট মতো বাকি। দুই নম্বর প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনটার কামরাগুলোর বেশিরভাগ কুপের জানলা এখনও ঝরতে থাকা বর্ষার জলের জন্য ভেতর থেকে বন্ধ। কোনও কোনওটার তো দরজাও অর্ধেক আটকানো। এমনই অবস্থা যে, কোনটা লেডিস, কোনটা গুডসের কামরা আর কোনটা জেনারেল — সেটাও ঠিকমতো বোঝা যাচ্ছে না! ভাগ্যিস আজ চুড়িদার পরেছিল তাই রক্ষে, নাহলে শাড়ি পরে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে ভিড় ঠেলে দৌড়ে ট্রেনটা ধরা সম্ভব হতো না নন্দিতার পক্ষে। মাত্রাতিরিক্ত ভিড় দেখেও এই দুর্যোগে ট্রেনটা যাতে মিস না হয় তাই তাড়াহুড়োয় একটা জেনারেল বগিতেই উঠে পড়ল নন্দিতা।

লোকাল ট্রেনে যাতায়াতের অলিখিত নিয়মই হল যে যার গন্তব্য স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম কামরার দুটো দিকের গেটের মধ্যে যেদিকে পড়বে সে সেই দিকের গেটের কাছে গিয়ে দাঁড়ায় ট্রেন থেকে নামার সুবিধের জন্য। ফেরার সময় যাদবপুর স্টেশন পড়ে বাম দিকে কিন্তু ভিড়ের ঠেলায় নন্দিতা গিয়ে পৌঁছল কামরার দুই গেটের মাঝখান থেকে প্রায় ডান দিকের গেটের কাছাকাছি জায়গায়। বাম কাঁধে নেওয়া সাইড ব্যাগটা সামলে ডান হাত দিয়ে কোনও মতে ধরল ট্রেনের দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীদের জন্য টাঙানো হাতলগুলো।

আওয়াজ করে ছাড়ল ট্রেন। পার্ক সার্কাস ঢুকতেই যেন এতক্ষণের অপেক্ষায় থাকা যাত্রীরা ট্রেনে উঠে ট্রেনের কামরাগুলোকে জনসমুদ্রে পরিণত করল। এমনই অবস্থা যে নন্দিতা যদি ধরার ঝোলা হাতলগুলো ছেড়েও দেয় তবুও শুধু ভিড়ের চাপে এমনিই দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে। লোকে যে দুই কামরার মাঝে আর মাথায় চেপে বসেনি এই অনেক!

পার্ক সার্কাস থেকে ট্রেনটা ছাড়তেই হঠাৎ শরীরে এক অজানা অস্বস্তি টের পেতে শুরু করল নন্দিতা। পেছন থেকে একটা অচেনা হাত প্রথমে ঠেকল ওর দেহে তারপর ক্রমশ সেটা নন্দিতার বুকের কাছ থেকে শুরু করে উরুর উপর পর্যন্ত অশ্লীল ভাবে ছোঁয়ার চেষ্টা করে চলল ওর শারীরিক গোপনীয়তাকে! এর আগে কোনওদিন এইরকম অবস্থার কথা দুঃস্বপ্নেও ভাবতে না পারা কিংকর্তব্যবিমূঢ় নন্দিতা, আগুপিছু কোনও দিকে ঘুরে তাকাতে এবং নড়াচড়া করতে না পেরেও খপ করে ডান হাত দিয়ে চেপে ধরল মানুষরূপী পশুটার হাতটা। উদ্দেশ্য, এই যে ভিড়টা একটু কমলেই জঘন্য কীটটার হাতটা টেনে সামনে এনে ঠাটিয়ে একটা থাপ্পড় কষানোর। ওর একবার মনে হল আশেপাশের কেউ কি কিছু দেখতে পাচ্ছে না এই সাংঘাতিক ভিড়ে নাকি ও চেঁচিয়ে কারও থেকে কোনও সাহায্য চাইছে না বলেই কেউ আগ বাড়িয়ে অন্যের ব্যাপারে নাক গলাতে চাইছে না! কোনও মহিলা যাত্রীও তো চোখে পড়ছে না এই মানুষের মাথার ভিড়ে! এখন যদি পরের স্টেশন আসার আগেই লাইন ক্লিয়ার বা সিগন্যাল না পেয়ে ট্রেনটা হঠাৎ থেমে যায় তবে ঠিক কী করা উচিত হবে তার? স্থির করতে না করতেই ট্রেনটা ঢুকেছে বালিগঞ্জ স্টেশনে। আরেকপ্রস্থ জনজোয়ারের সুযোগে নোংরা লোকটা নন্দিতার হাত ছাড়িয়ে কেটে পড়েছে, সম্ভবত ট্রেন থেকে নেমে গেছে স্টেশনে। চেহারা না দেখতে পাওয়ায় যাকে চেনা আর সম্ভব নয় নন্দিতার পক্ষে, শাস্তি দেওয়া তো অনেক দূরের কথা! শরীর আর মস্তিষ্কের ঘেন্না আর রাগটাকে বাধ্য হয়ে মনেই চেপেই রাখতে হল তাই!

আর এক স্টেশন পরেই যাদবপুর। ভিড় অনেকটা কমে কামরায় চলাফেরা করার মতো স্বাভাবিক অবস্থাতে এলেও যেন হঠাৎই জড়বস্থানু হয়ে গেছে নন্দিতা। এতটাই যে বাম দিকের গেটের কাছে যেতেও যেন পা সরছে না ওর! আরেকটু অল্প বয়স হলে হয়তো চোখে জল বাঁধ মানত না কিন্তু মাঝ-বয়সের অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়েছে বাড়ির বাইরে রাস্তাঘাটে নিজের আবেগকে সংযত ভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে, নাহলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হিতে বিপরীত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবুও অপমানে লাল হয়ে থাকা নাকের পাটা আর অসম্মানে গরম হয়ে ওঠা কান নিয়ে নন্দিতার ইচ্ছে করছে কোনও অন্ধকার ঘরে লুকিয়ে হাপুস নয়নে কাঁদতে অথবা গলা ফাটিয়ে খুব খুব জোরে চিৎকার করতে— যেটার কোনওটাই করা সম্ভব নয় তার পক্ষে, অন্তত এই মুহূর্তে!

নন্দিতার মুখ-চোখের অবস্থা লক্ষ্য করেই বোধহয় ট্রেনের গেটের কাছেই দাঁড়িয়ে থাকা পিতৃস্থানীয় এক বয়স্ক ভদ্রলোক হয়তো বা কিছু একটা আঁচ করেই বলে উঠলেন— ‘ট্রেনে ভিড় থাকলে জেনারেলে না উঠে লেডিসে উঠবেন, মা… ‘

যাদবপুরে নেমে স্টেশনের ওভারব্রিজের সিঁড়িটার গোড়ায় দাঁড়িয়ে ওড়নাটা ঠিক করতে করতে সবে একটু ধাতস্থ হয়েছে নন্দিতা; চোখের সামনে দিয়ে আস্তে আস্তে বেরিয়ে যাচ্ছে লোকাল ট্রেনটা একটু আগেই যেটার যাত্রী ছিল সে। হঠাৎ খুব স্বাভাবিক ভাবেই চলন্ত ট্রেনটার একটা বগির গায়ে ‘মহিলা কামরা’/ ‘মহিলাও কে লিয়ে আরক্ষিত’/ ‘লেডিস ওনলি’— লেখাগুলো চোখে পড়ল নন্দিতার আর জীবনে এই প্রথমবার ‘লেডিস কম্পার্টমেন্ট’ বাক্যাংশটাকে একটা নীরব সুরক্ষাবলয়ের মতো মনে হল তার।

(সমাপ্ত)

আড়াল (পর্ব-০১)

কলিংবেল টিপতেই ভিতর থেকে কুকুরের সে কী ভয়ংকর ঘেউ ঘেউ। কলিংবেলের শব্দ না শুনলেও কুকুরের কান ফাটানো এই চিৎকার তো কানে যাবেই। তাই দ্বিতীয়বার আর বেল টেপেনি তিন্নি। এরই মধ্যে সদর দরজা খুলে সামনে এসে যিনি দাঁড়ালেন, তাঁকে দেখেই তার মনে হল, ইনিই তিয়াসের মা।

খুব কম দিন হল না, তিয়াসের সঙ্গে ও মিশছে। কিন্তু এ পথ দিয়ে যেতে যেতে দূর থেকে একদিন দেখালেও, তিয়াস কখনও তাকে এ বাড়িতে নিয়ে আসেনি। কিছুদিন হল তিয়াসের ছোটোখাটো নানান আচরণ নিয়ে তিন্নির মনের মধ্যে বেশ তোলপাড় হচ্ছিল। সন্দেহটা যখন মনের মধ্যে একেবারে গেড়ে বসেছে, তখনই সে ঠিক করেছিল, আচমকা একদিন তিয়াসের বাড়ি গিয়ে দেখবে সে যা ভাবছে সেটা সত্যি কি না।

কিন্তু প্রথম দিনই অযাচিত ভাবে কোনও মেয়ের পক্ষে তো হুট করে তার প্রেমিকের বাড়ি যাওয়া ঠিক নয়। বাইরের লোকের কথা না হয় বাদই দিলাম, ওর বাড়ির লোকেরা কী ভাববে! তাই খুব ছোটোবেলাকার বন্ধু রঞ্জনাকে সব কথা খুলে বলেছিল সে।

রঞ্জনা বলেছিল— সে নয় যাওয়া যাবে। কিন্তু তুই যে বলছিস, ও যখন বাড়ি থাকবে না তখন যাবি। তুই বুঝবি কী করে ও কখন বাড়ি নেই?

তিন্নি বলেছিল— ও বাড়ি ঢুকলেই মোবাইল অফ করে দেয়। আর যতক্ষণ না বাড়ির বাইরে বেরোয়, ততক্ষণ অফই থাকে। ফলে ফোন করে যখন দেখব ওর মোবাইল অন, তখন ও কোথায় আছে জেনে নেব। ওর বাড়ি তো বেশি দূরে নয়। যদি দেখি এক দেড় ঘণ্টার মধ্যে ওর বাড়ি ফেরার কোনও সম্ভাবনা নেই, তখন যাব।

—ও যদি মিথ্যে কথা বলে? কাছাকাছি থেকেও যদি বলে দূরে আছি?

—না না, অতটা মিথ্যে বলবে কি! ও জানবে কী করে যে, ওর বাড়ি যাওয়ার জন্য আমি এটা জানতে চাইছি। তা ছাড়া যে যাই বলুক না কেন, ও কিন্তু অতটা খারাপ না। আমাকে যথেষ্ট ভালোবাসে। এই তো ক’দিন আগে আমার জ্বর হয়েছিল দেখে উপোস করে দক্ষিণেশ্বরে গিয়ে পুজো দিয়ে এসেছিল, যাতে আমি তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠি। আর ওর যদি খারাপ মতলবই থাকত, তা হলে সে দিন এমন সুবর্ণসুযোগ পেয়েও আমাকে ছেড়ে দিত না। এরই মধ্যে কবে যেন আমরা কোথায় একটা যাচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখি সামনেই, কোনও বাড়িতে বোধহয় কোনও অনুষ্ঠান ছিল— রাস্তার পাশেই গাদাগুচ্ছের কী সব এঁটো পাতা-টাতা ফেলেছে। কতকগুলো কুকুর সেখানে তাড়াকাড়ি করে খাচ্ছে। তুই তো জানিস, ছোটোবেলায় আমাকে একবার কুকুরে কামড়েছিল। চোদ্দোটা ইনজেকশন নিতে হয়েছিল। তার পর থেকে কুকুর দেখলেই আমি একশো হাত দূরে থাকি।

আমাকে থমকে যেতে দেখে ও বলেছিল— কোনও ভয় নেই আমি তো আছি। চলো। বলেই, আমাকে অন্য পাশে নিয়ে যে-দিকে কুকুর, সে দিকে চলে গিয়েছিল ও। আমরা কুকুরগুলোর পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলাম। কুকুরগুলো তাকালও। কিন্তু কিচ্ছু করল না। তেড়ে আসা তো দূরের কথা, একটা ঘেউ ঘেউ পর্যন্ত করল না। জায়গাটা পেরিয়ে যাওয়ার পর ও বলল, দেখলে তো, তুমি যদি কিছু না করো ওরাও তোমাকে কিছু করবে না।

আমি বলেছিলাম—না বাবা, কুকুরকে আমি বিশ্বাস করি না। ওই একবারেই আমার শিক্ষা হয়ে গেছে। আর যেখানেই যাই, সেখানে কুকুর আছে জানলে আমি কিছুতেই যাব না। ও বলেছিল, আমার সঙ্গে থাকলে তোমাকে কখনও কোনও কুকুর কামড়াবে না। বলেই, হো হো করে হেসে উঠেছিল।

—তাতে কী হল? রঞ্জনা জিজ্ঞেস করতেই তিন্নি বলল, ‘সেটাই তো বলছি। তার পর থেকে আমাকে নিয়ে বেরোলে, রাস্তায় কোথাও কোনও কুকুর থাকলে, আমি দেখতে না পেলেও— ও কিন্তু দূর থেকেই ঠিক দেখতে পেত এবং বুঝতে পারতাম, আমি যাতে ভয় না পাই সে জন্য ও আমাকে আগলে নিয়ে যাচ্ছে। আর সত্যি কথা বলতে কী, কুকুরে আমার যে এত ভয় ছিল, সেটা কিন্তু আস্তে আস্তে ও-ই অনেকটা দূর করে দিয়েছে। যে আমার এত কেয়ার নেয়, সে কি এত ছোটোখাটো ব্যাপারে আমাকে মিথ্যে বলবে! আমার মনে হয় না।’

—সেটা দ্যাখ। তুই যেটা ভালো বুঝবি। ও নেই দেখে হয়তো গেলি। তার পর গিয়ে দেখলি, ও বাড়িতে, তখন!

—তখন না-হয় যা হোক কিছু একটা বানিয়ে বলব। কিন্তু সত্যিটা তো জানতে পারব। প্রত্যেক দিন তো আর মনের মধ্যে সন্দেহ নিয়ে দগ্ধে দগ্ধে মরতে হবে না। আর আমি যেটা আঁচ করছি, সেটা যদি সত্যি হয়, তা হলে তো হয়েই গেল। এই সম্পর্কটাকে টিকিয়ে রাখার কোনও মানেই হয় না। তাই না?

—একদম। একদম ঠিক বলেছিস। অন্যমনস্ক ভাবে রঞ্জনা কথাটা বললেও, সে দিন থেকেই তক্কে তক্কে ছিল তিন্নি। আজ সকালেই যখন ফোন করে জানতে পেরেছে, তিয়াস এইমাত্র বেরোল, ফিরতে একটু দেরি হবে— তখনই ঠিক করে ফেলল, আর এক মুহূর্ত দেরি নয়। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওর বাড়ি যেতে হবে। সেই মতো সঙ্গে সঙ্গে ফোন করে রঞ্জনাকেও বলে দিয়েছিল, রেডি হয়ে পাড়ার মোড়ে চলে আসতে।

তাও বেরোতে বেরোতে সাড়ে দশটা বেজে গেল। মাথার উপরে বৈশাখ মাসের খাঁ খাঁ রোদ্দুর। তেমনই গরম। চার রাস্তার মাথায় এসে একটা অটোয় উঠে পড়ল ওরা। দশ মিনিটের পথও নয়। অটোটা যত তিয়াসের বাড়ির কাছাকাছি আসতে লাগল, তিন্নি ততই ঈশ্বরকে মনে মনে ডাকতে লাগল— ‘হে ঈশ্বর, আমি যেটা সন্দেহ করছি, সেটা যেন সত্যি না হয়— সত্যি না হয়, সত্যি না হয়…

(ক্রমশ…)

অষ্টমীর নন্দিনী (শেষ পর্ব)

সপ্তর্ষির চকিতে রোমির কথা মনে পড়ে গেল। গত বছর অষ্টমীতে সে তাকে নিয়ে শ্রীরামপুরে ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছিল। রোমি এখন তার কেউ নয়। সে এখন দীপাংশুর গার্লফ্রেন্ড। সপ্তর্ষি ভালো করেই জানে, দীপাংশু ওকে বিয়ে করবে না। সাতঘাটের জল খাওয়া দীপাংশু মস্তি ফুরিয়ে গেলেই রোমিকে চায়ের ভাঁড়ের মতো ছুড়ে ফেলে দেবে। তখন বুঝবে সপ্তর্ষিকে বিট্রে করার কী মজা। আর রোমির চোখের সামনে ভেনাসকে নিয়ে সপ্তর্ষি যদি ঘুরে বেড়ায়, তা হলে তো সোনায় সোহাগা।

—আগে ছিল। এখন নেই, বলে সপ্তর্ষি অন্যমনস্ক ভাবে দেয়ালে ঝোলানো ‘ফায়ার’ লেখা আগুন নেভানো যন্ত্রের দিকে তাকাল। মেয়েটি অর্থাৎ ব্ল্যাক ভেনাস বলে উঠল, ‘তা হলে আজ আমরা কলকাতায় ঠাকুর দেখতে যাচ্ছি। আমি কিন্তু শ্রীরামপুর স্টেশনের বুকিং কাউন্টারের সামনে বিকেল পাঁচটায় অপেক্ষা করব। কথার খেলাপ হবে না তো?”

—তোমার মতো এরকম একজন ‘জোধাবাই’ থুড়ি সুন্দরী ব্ল্যাক ভেনাসের কথার খেলাপ করব, তেমন বুকের পাটা আমার নেই। এই রে, আপনাকে তুমি বলে ফেললাম। কিছু মনে করবেন না, বলেই সপ্তর্ষি একটু লজ্জিত হল।

মহিলাটি বলল, “আজ আমাকে আপনি প্রথম তুমি বললেন, কাল আপনাকে আমি তুমি বলব। কথা দিলাম।”

এরই মধ্যে জেনারেটর চালু হতেই শপিং মলের আলো জ্বলে উঠল। একটু আগে লোডশেডিং হওয়াতে শপিং মলের ক্রেতাদের দেখে মনে হয়েছিল, কেউ যেন তাদের মরণকাঠি ছুইয়ে দিয়েছিল। আলো জ্বলে উঠতেই জিয়নকাঠির স্পর্শে যেন তারা আবার সচল হয়ে উঠেছে। একটু আগে রোমির কথা মনে হয়েছিল, এখন আর তা নেই। রোমির বিকল্প সে পেয়ে গিয়েছে। হঠাৎ ওর হাতের মোবাইলটা বেজে উঠল।

সপ্তর্ষি মোবাইলটা কানে রাখতেই ফুলদির গলা ভেসে এল, ‘এত দেরি করছিস কেন?’ সপ্তর্ষি ভেনাসের মুখে মুক্তোর মতো ফুটে উঠা বিন্দু বিন্দু ঘামের দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে মিথ্যা বলল, ‘জ্যামে আটকে আছি, ১৫ মিনিটের মধ্যেই যাচ্ছি।’

—সত্যি! আপনি পারেনও বটে, বলে ভেনাস হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ল।

হাসলে যে ওকে আরও সুন্দর লাগে, তা সপ্তর্ষির জানা ছিল না। সঙ্গে কোনও ফোটোগ্রাফার থাকলে এখনই ভেনাসের হাস্যোজ্জ্বল মুখের ছবি তুলে ‘অষ্টমীর নন্দিনী’ ক্যাপশান দিত। তা যখন নেই, তখন সপ্তর্ষিই বা সুযোগ ছাড়ে কেন!

সে ভেনাসের মুখের হাসির রেশটুকু মোবাইলের ক্যামেরায় তুলে বলল, ‘পারমিশন না নিয়েই কিন্তু তোমার একটা ফোটো তুললাম। কিছু মনে করলে না তো?’

—না, আমি তোমার কোনও কিছুতেই কোনও আপত্তি করছি না। এই রে, তুমি বলে ফেললাম! তুমিটা কাল বলব ভেবেছিলাম, আজই বলে ফেললাম।”

—তুমি কিন্তু কথার খেলাপ করলে।

—বেশ করেছি, যাও। তোমাকে যে বললাম একটা পারফিউম চয়েস করতে, তার কী হল ?

তা শুনে সপ্তর্ষি একটা পারফিউম পছন্দ করে ভেনাসের হাতে তুলে দিল এবং ভেনাসকে গিফট দেওয়ার জন্য যখন পছন্দসই পারফিউম খুঁজে বেড়াচ্ছে ও, ঠিক তখনই সে শুনতে পেল ‘এক্সকিউজ মি, আমার একটু তাড়া আছে। আমি চলি। কেমন? বিকেলে দেখা হবে।’

সপ্তর্ষিকে কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়ে ভেনাস আঁচল উড়িয়ে পরির মতো হুস করে চলে গেল। সপ্তর্ষির অনেক কথা বলার ছিল। কিন্তু ভেনাস যে এত তাড়াতাড়ি চলে যাবে সে ভাবতেই পারেনি। ভেনাসের সঙ্গে পরিচয় হয়ে সে রোমির দুঃখটা ভুলেছিল। অল্প কিছুক্ষণের আলাপে ভেনাস তার কাছে রোমির বিকল্প হয়ে উঠেছিল। কিন্তু সে হঠাৎ চলে যাওয়ায় সপ্তর্ষির বুকের ভিতর গুমরে গুমরে উঠল পুরোনো যন্ত্রণাটা। অবশ্য ভেনাসেরই বা দোষ কী! তার হয়তো বাড়ি যাওয়ার তাড়া আছে। সে তো মাথার দিব্যি দেয়নি যে, সব কাজ ফেলে সপ্তর্ষির পাশে থাকতে হবে।

তা ছাড়া সে তো কথা দিয়েছে আজ অষ্টমীর সন্ধেয় তার সঙ্গে সাউথ ক্যালকাটায় ঠাকুর দেখতে যাবে। সপ্তর্ষি বৃথা চিন্তা না করে ফুলদির কথামতো গোবিন্দভোগ চাল, কাজু কিশমিশ, জম্মু রাজমা আর ঘি ট্রলিতে ভরে কাউন্টারের সামনে এসে দাঁড়াল।

সপ্তর্ষি ব্যাকপকেট থেকে মানিব্যাগ বের করার জন্য হাত বাড়াতেই শূন্য হাতটা উঠে এল। সে অস্ফুটে বলে উঠল, ‘আমার মানিব্যাগ?” –কত ছিল আপনার মানিব্যাগে? কাউন্টারে বসা ছেলেটি জিজ্ঞেস করল।

—১০ হাজার টাকা।

—যে-মেয়েটি আপনার সঙ্গে গল্প করছিল এটা তারই কাজ। গত বছরও পুজোর সময় ওই মেয়েটি একজনের পকেট থেকে পাঁচ হাজার টাকা চুরি করেছিল। প্রমাণের অভাবে আমরা ওকে ধরতে পারিনি। এবার আপনাকে সাবধান করতে গিয়েও পিছিয়ে এসেছি। যেভাবে আপনি ওর সঙ্গে গল্প করছিলেন তাতে মনে হল উনি আপনার পরিচিত কেউ।

সপ্তর্ষি আর কথা না বাড়িয়ে মোবাইল ফোনটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “এটা জমা রাখুন। বিকেলে টাকা দিয়ে ছাড়িয়ে নিয়ে যাব।”

—তার দরকার হবে না। আপনি বোনাফাইড কাস্টমার। টাকাটা বিকেলেই দেবেন। ছেলেটি মোবাইলটা ফেরত দিয়ে বলল। সপ্তর্ষি কমলা রঙের ব্যাগ হাতে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে বাইকে বসে শপিং মলের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাল। আর সেখানে ইংরেজি হরফে লেখা রয়েছে, “মোর কোয়ালিটি মোর ভ্যারাইটি, মোর কনভিনিয়েন্স, মোর ভ্যালু।”

(সমাপ্ত)

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব